এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • পায়ের তলায় সর্ষেঃ বরফ ঢাকা স্পিতি

    সিকি লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | ০৪ মার্চ ২০১৭ | ১৬৪৩১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সিকি | ০৪ মার্চ ২০১৭ ১১:৪৯365749
  • সেই যে ভোররাতে একলা বেরিয়ে পড়েছিলাম লাদাখের উদ্দেশ্যে, সে ছিল দু হাজার পনেরো সাল। সে-ও দেখতে দেখতে এক বছর পেরিয়ে দেড় বছর হয়ে গেল, আর তেমন করে কোথাও বেরনো হয়ে উঠছিল না। জীবনে অন্যান্য জটিলতা ক্রমেই বেড়ে যেতে লাগল, আর তেমন করে নতুন কোনও নিরুদ্দেশের দিকে বেড়াতে যাবার প্ল্যান ক্রমেই জীবনের প্রায়োরিটি লিস্টের নিচের দিকে নেমে যেতে লাগল। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম না এলে ঝলক দিয়ে যায় বটে নির্জন হাইওয়ে – কিন্তু কই, তেমন করে তো আর ডাক শুনতে পাই না!

    দু হাজার ষোলর শেষাশেষি আমার কেমন ভয় লাগতে শুরু করল – তা হলে কি আমার মানসিকতা পালটে যাচ্ছে? বয়েস হয়ে যাচ্ছে মনের?

    গেছোদাদার সঙ্গে এমনিই একদিন কথা হচ্ছিল অফিসে বসে ফোনের মাধ্যমে, কাজের চাপ সেদিন কম ছিল, তা প্রস্তাবটা গেছোদাদাই দিল, একটা দু সপ্তাহের প্ল্যান বানাও, নর্থ ইস্ট। আসাম, অরুণাচল আর মেঘালয় মিলিয়ে একটা চমৎকার প্ল্যান হয়ে যাবে, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে, দারুণ একটা ব্যাপার হবে।

    বার খাওয়াতে যতটা দেরি, আমি অমনি পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। আরও বার কয়েক ফোন চলবার পরে সময় ফাইনাল হল ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ। আমি তিন দিনে গৌহাটি পৌঁছবো, আর গেছোদাদা সেখান থেকে চলতে শুরু করবে আমার সাথে। ঘোরা হলে আমি বাইক ট্রেনে তুলে দিয়ে ফ্লাইটে ফেরত আসব।

    উত্তম প্রস্তাব। যত রকমের আইটিনেরারি, ট্র্যাভেলগ পাওয়া যায়, সমস্ত পড়ে ফেললাম। অনেকদিন বাইক নিয়ে বেরনো হয় নি – তাই দিওয়ালির পরের দিন একটা “ড্রাই রান” মারব বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম শিমলার উদ্দেশ্যে। ঘোরাঘুরি নয় – একদিনে কতটা বাইক চালাতে পারি ক্লান্ত না হয়ে – সেটাই দেখা উদ্দেশ্য ছিল। আমার এর আগের লেখা “একলা পথে চলা আমার”-এ আমার সেই ছোট্ট জার্নি নিয়ে লিখেছি। ... তা দেখলাম, এখনও ধকল সয়। সকাল পৌনে পাঁচটায় শুরু করে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত প্রায় সাতশো কিলোমিটার লাগাতার যাওয়া এবং আসার পরেও খুব বেশি ক্লান্তি গ্রাস করে নি আমাকে। এবার তা হলে লম্বা জার্নির প্ল্যান করে ফেলাই যায়।

    মাথায় একবার ঘোরার পোকা চেপে গেলে তখন কি আর ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ধৈর্য ধরে বসে থাকা যায়? ঘরের লোকজনের সাথেই তাই একটা ছোটোখাটো প্ল্যান করে ফেললাম – শীতকালে শুনেছি, বরফ পড়ে মানালি একেবারে শ্বেতশুভ্র হয়ে যায়, সেইটা একবার দেখে আসলে কেমন হয়? মানালি পর্যন্ত তো রাস্তা দিব্যি খোলা থাকে।

    যে কথা সেই কাজ। মানালি আমাদের বার কয়েক যাওয়া আছে, কিন্তু শীতকালের মানালির সৌন্দর্যই আলাদা। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তাই বেরিয়ে পড়লাম।

    কিন্তু কপালে বোধ হয় অন্য কিছু নাচছিল সেদিন। কুলুর খানিকটা আগে, মানালির থেকে ঠিক সত্তর কিলোমিটার আগে, উল্টোদিক থেকে আসা একটা পাঞ্জাব রোডওয়েজের বাসকে যতক্ষণে দেখতে পেলাম, ততক্ষণে ব্রেকে পা দাবিয়েও কিছু বিশেষ লাভ হল না, ভগ্নাংশ সেকেন্ড আগে শুধু বুদ্ধি করে স্টিয়ারিংটা উল্টোদিকে মোচড় দিতে পেরেছিলাম, তাই হেড অন কলিশন হল না, বাসটা আমার গাড়ির সামনের ডানদিকটা তীব্র বেগে স্ম্যাশ করে দিয়ে বেরিয়ে গেল – আমি ড্রাইভারের সীটে বসে ছিলাম, আমার ঠিক পাশের দরজাটাও বেঁকে গেল। গাড়িটা ইমপ্যাক্টে ছিটকে গেল রাস্তার বাঁ দিকে, সৌভাগ্য, সেদিকে খাদ ছিল না, আমি সাথে সাথে আবার স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সেটাকে রাস্তায় উঠিয়ে আনতে পেরেছিলাম।

    অনেক কিছুই হতে পারত, কিছুই হয় নি, আমাদের কারুর গায়েই একটাও আঁচড় লাগে নি, কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষত যেখানটায় তৈরি হয়ে গেল, সেটা হল – আমার আত্মবিশ্বাস। এর পরে সেই ভাঙা গাড়ি নিয়েই কোনওরকমের মানালি পৌঁছেছিলাম, এবং অবিশ্রান্ত তুষারপাতের মধ্যে ওই ভাঙা দরজা সমেত গাড়ি চালিয়ে ফিরে আসা সম্ভব নয় জেনে গাড়ি মানালির হোটেলের সামনে রেখেই ফিরে আসা, অবশেষে জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে তুষারপাত কমার পরে, মানালির রাস্তা আবার খোলার পরে সেখান থেকে গাড়ি টো করিয়ে মানেসার নিয়ে আসা, এবং মানেসার থেকে দিল্লি আবার টো করিয়ে নিয়ে আসা – কারণ তিন সপ্তাহ বরফের নিচে চাপা থাকার ফলে গাড়ির ব্যাটারি একেবারে ডিসচার্জ হয়ে গেছিল, এবং তার পরে মারুতির ওয়ার্কশপে আরও তিন সপ্তাহ যত্নআত্তি করিয়ে ফাইনালি এই সেদিন যখন গাড়ি আবার আমার বাড়িতে ফিরল, টের পেলাম প্রায় চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা আমার এর মধ্যেই বেরিয়ে গেছে।

    নর্থ ইস্ট বেড়াতে যাওয়া ক্যানসেল করতেই হল, কারণ অত লম্বা ট্রিপে যাবার মত খরচা আর করবার বিলাসিতা আমার আর নেই – সম্ভবই নয়।

    মানালি বেড়াবার দুদিনের ছুটি গিয়ে দাঁড়াল অর্ধেক লাখ টাকার লোকসানে, মানসিক আতঙ্ক এবং, সবচেয়ে বড় ব্যাপার, ট্রমা। যে নিয়মিত গাড়ি আর মোটরসাইকেল চালায়, তার পক্ষে এই কনফিডেন্স উড়ে যাওয়াটা যে কী ভয়ঙ্কর, সে বলে বা লিখে বোঝানো মুশকিল। বাড়ি থেকে আমার অফিস মাত্র সাত কিলোমিটার, পিক ট্র্যাফিকেও কুড়ি মিনিটে পৌঁছে যাই, কিন্তু গোটা জানুয়ারি মাস ধরে আমার হাত পা বাইকের ক্লাচ গিয়ার কন্ট্রোল করছিল ঠিকই, আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার ফোকাস সরে যাচ্ছে। ব্যাক ইন দা মাইন্ড খালি ফিরে ফিরে আসছে ঐ কয়েক সেকেন্ডের স্মৃতি, পাহাড়ী রাস্তার বাঁকে হঠাৎ বাসটার চলে আসা, এবং ব্রেকে পা লাগানোর সাথে সাথেই বুঝতে পারা, আর সময় নেই, আমি স্টিয়ারিংটা না ঘোরালে আমি, আমার মেয়ে – কেউ বাঁচত না। চেনাই যেত না আমাদের শরীর। ... পরক্ষণেই আবার ঝাঁকুনি দিয়ে বাস্তবে ফিরে আসছি, বাইক চালানোয় মন দিচ্ছি।

    আশ্চর্যের ব্যাপার, বাড়িতে থাকলে বা অফিসে বসে থাকলে এসব কিছুই হচ্ছে না, হচ্ছে খালি যখনই আমি বাইক নিয়ে রাস্তায় বেরোচ্ছি। গাড়ি তখনও মানালি থেকে আসে নি, দিল্লিতে বাইকই ভরসা।

    গেছোদাদার সঙ্গে বার দুয়েক কথা হল, বললাম আর যেতে না পারার কথা, কিন্তু মাথার পেছনে অন্য খেলাও শুরু হতে লাগল, তা হলে আমি হার স্বীকার করে নেব? কনফিডেন্স কমে গেছে, সেটাকেই মেনে নিয়ে লং জার্নি একেবারে বন্ধ করে দেব? অ্যাক্সিডেন্ট তো কত লোকেরই হয়, দিল্লির রাস্তাতেই তো রোজ কত অ্যাক্সিডেন্ট হয়, আমি নিজে বার তিনেক স্পট ডেথ দেখেছি, অন্তত পাঁচবার রান-ওভার হওয়া মৃতদেহ দেখেছি, আগে তো কখনও এমন হয় নি! ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসার তা হলে রাস্তা কী?

    রাস্তা তো একটাই, হিট দ্য রোড আগেইন। রাস্তায় না নামলে কনফিডেন্স বাড়বে না। এক নাগাড়ে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত বাইক না চালাতে পারলে, সফল আরেকটা জার্নির নতুন স্মৃতি মনের মধ্যে বসিয়ে দিতে না পারলে – এই স্মৃতিকে ওভাররাইট করে ফেলা সম্ভব নয়।

    কোথায় যাওয়া যায়? ...

    ... অফিসের সেই পঞ্জাবী ছেলেটির সাথেই একদিন দেখা হয়ে গেল লাঞ্চ ব্রেকে। ও একটা বুলেট ওনার্স গ্রুপের মেম্বার, চণ্ডীগড়ের। গ্রুপটার নাম বুলেট ক্যাফে। চণ্ডীগড়ের কাছে জিরাকপুর বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে এদের একটা ছোট রেস্টুরেন্টও আছে, বাইকের বিভিন্ন অ্যাক্সেসরিজ দিয়ে ডেকোরেশন করা সেই রেস্টুরেন্ট। তো, সে যাই হোক, সেই ছেলেটিই আমাকে কথায় কথায় জানাল, ওরা ফেব্রুয়ারি মাসের পঁচিশ তারিখে স্পিতি ভ্যালি যাচ্ছে। বরফে মোড়া – হোয়াইট স্পিতি।

    পা-জি, আপনে চলনা হ্যায় ক্যা?
  • | ০৪ মার্চ ২০১৭ ২০:০৯365760
  • তারপর?
  • Boka | ০৫ মার্চ ২০১৭ ০০:২১365771
  • আকর্ষণীয় রবিবার!! অপেক্ষায়...
  • swati | ০৫ মার্চ ২০১৭ ১৭:৪২365782
  • তারপর?
  • সিকি | ০৫ মার্চ ২০১৭ ২০:২১365793
  • সময় পাই নাই। এখন বসছি লিখতে।
  • সিকি | ০৫ মার্চ ২০১৭ ২২:১৭365804
  • নট আ ব্যাড আইডিয়া। ঠিক দু দিন লাগল নিজের মনকে বশ করতে – এটা আমাকে করতেই হবে, এবং ক-র-তে-ই হবে। যেতে পারব কি পারব না সেটা পরের ব্যাপার, কিন্তু ইনফর্মেশনগুলো তো আগে থেকে কালেক্ট করে ফেলা দরকার! জিজ্ঞেস করলাম, তোরা কবে যাচ্ছিস? কদিনের জন্য যাচ্ছিস? কী রকম খরচার প্ল্যান করছিস?
    পঞ্জাব দা মুন্ডা আমাকে তাদের পুরো প্ল্যান দিয়ে দিল, পাঁচদিনের প্ল্যান। ওরা শুরু করছে পঁচিশে ফেব্রুয়ারি, শিমলা ফিরছে পয়লা মার্চ রাতে। তার পরে যারা যারা চণ্ডীগড় ফেরার বা দিল্লি ফেরার, তারা সবাই নিজের নিজের বাড়ি ফিরবে দু তারিখে। হাজার পাঁচেক পারহেডে হয়ে যাবে, আশ্বস্ত করল আমাকে ছেলেটি।
    পাঁচ হাজার – হুঁ, এটুকু বোধ হয় খরচা করার মত অবস্থায় আছি, তবে আর দেরি কেন?
    স্পিতি – স্থানীয় ভাষায় শব্দটির মানে হচ্ছে মধ্যবর্তী অঞ্চল, মিডল ল্যান্ড। হিমাচল প্রদেশের উত্তর পূর্ব দিকে এই এলাকাটি ভারত আর তিব্বতের মধ্যবর্তী অঞ্চল। অনেকটা লাদাখের মতই এই এলাকাটাও শীতল মরুভূমি টাইপের, গাছপালা নেই, রুক্ষ পাথর আর পাহাড়ের মাঝে ছোট ছোট উপত্যকা। এর বেশির ভাগটাই পড়ে হিমাচল প্রদেশের কিন্নৌর জেলায় – তাই এটাকে কিন্নৌর ভ্যালিও বলা হয়। উপত্যকাটি তৈরি হয়েছে মূলত শতদ্রু বা সাটলেজ নদের অববাহিকায়।
    ছোট করে আগে ম্যাপটা দিয়ে দিই – তা হলে বোঝার সুবিধে হবে।



    স্পিতি ভ্যালি যাবার দুটো রাস্তা আছে। সবচেয়ে সহজ রাস্তাটা শিমলা দিয়ে। শিমলার পরে নারকন্ডা, রামপুর, করছাম, রিকং পিও হয়ে নাকো, টাবো, কাজা – তার পরে আরও একটু এগিয়ে লোসার হয়ে পড়ে কুনজুম পাস, এইটা পেরোলেই আমাদের সবার পরিচিত রোহতাং পাস – বাঙালিরা যার উচ্চারণ করে “রোটাং” পাস, মানালির শুরু। এর পরে মানালি দিয়ে আবার চণ্ডীগড় বা দিল্লি ফিরে আসা যায়। পুরোটা ঘুরে ফেলাকে বলা হয় ফুল সার্কিট, কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস, যখন সদ্য বরফ গলেছে, বেশির ভাগ রাস্তাই খোলে নি, কুনজুম পাস খোলার তো কোনও প্রশ্নই নেই, তখন ওই একটাই দিক দিয়ে যাওয়া আসা সম্ভব হয়, শিমলা। যাওয়া যায় যতদূর পর্যন্ত রাস্তা খোলা পাওয়া যাবে, ততদূর পর্যন্ত। শীত কমার সাথে সাথে ধাপে ধাপে গ্রামগুলোতে যাবার রাস্তা খোলে।
    শুধুই মূল রাস্তাটা জার্নি নয় কিন্তু, জায়গায় জায়গায় দেখুন, ব্র্যাঞ্চিং বেরিয়েছে, করছাম থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে সাংলা আর চিটকুল যাবার রাস্তা। এই চিটকুল হচ্ছে তিব্বত সীমান্তে শেষ ভারতীয় গ্রাম। আবার করছাম থেকে একটু এগিয়ে রিকং পিও থেকে রাস্তা চলে যাচ্ছে আরেকটা গ্রামের দিকে – কল্পা। প্রতিটা জায়গাই মনমুগ্ধকর। তবে শীতকালের মধ্যে সব সৌন্দর্যই এক রকমের – দুধসাদা। হোয়াইট স্পিতি।

    নরেন্দ্র কুমার গৌতম, ওরফে মাস্টারজি দিল্লির নজফগড় এলাকার একটি স্কুলের মাস্টারমশাই। ফি বছর গরমের ছুটিতে উনি একটি এলএমএল স্কুটার নিয়ে লাদাখ বেড়াতে যান, প্রতি বছর। লাদাখের আনাচকানাচ মাস্টারজির মতন কেউ চেনে না। স্পিতিও উনি গেছেন অনেকবার, এই ইনিই এ বছর জানুয়ারি মাসের শেষদিকে একা একা স্কুটার চালিয়ে ঘুরে এসেছেন হোয়াইট স্পিতি।
    মাস্টারজিকে ফোন লাগালাম একদিন। উনি ধৈর্য ধরে বিস্তারিত বোঝালেন, কোথাকার রাস্তা কেমন, কোনদিন কতটা করে গেলে জার্নিটা সুবিধেজনক হবে, কী কী সাবধানতা নিতে হবে যাওয়া আসার পথে। দুটি জিনিসে উনি জোর দিলেন – ঠাণ্ডা প্রচণ্ড, এমনিতে মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, তবে বাইক চালাবার সময়ে ওটা ফীল লাইক মাইনাস তিরিশও হতে পারে, অতএব, একটা গ্লাভসে হবে না। পারলে ডবল লেয়ার গ্লাভস প’রো। হাতের সেন্সিটিভিটি কমে যেতে পারে, ক্লাচ অ্যাক্সিলারেটর হয় তো আরামসে কন্ট্রোল করতে পারবে না। কিন্তু ধীরেসুস্থে চালালে সেটা তেমন কোনও সমস্যা তৈরি করবে না। আর দুই, বাইক নিয়ে যাচ্ছো, পারলে স্নো চেন জোগাড় করে নিয়ে যাও। স্নো চেন লাগিয়ে যত সহজে বাইক চালানো যায় বরফের মধ্যে, সেটা বিনা স্নো-চেনে সম্ভব হয় না।
    স্নো-চেন যে দরকার হয় বরফে চালাতে গেলে, সে আমি গাড়ি নিয়ে মানালি পৌঁছে বিলক্ষণ টের পেয়েছিলাম। সেদিন ছিল ছয়ই জানুয়ারি, মাত্রাতিরিক্ত তুষারপাতের ফলে মানালির রাস্তায় রাস্তায় পুরু বরফ, এবং তার নিচের লেয়ার জমে শক্ত হয়ে গেছে, যাকে বলে হার্ড আইস। আর একবার হার্ড আইস/ব্ল্যাক আইস জমে গেলে সে জিনিসের মত ভয়ঙ্কর আর কিছু হয় না, আমি টের পাচ্ছিলাম প্রতি পদে। দুপুরেই অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গাড়ির দরজা বেঁকে গেছে, অবিশ্রান্ত তুষারপাতের একটা অংশ এসে পড়ছে ড্রাইভারের সীটে বসে থাকা আমার গায়ের ওপরে, আর এক ইঞ্চি গাড়ি এগোতে গেলেই বুঝছি গাড়ি আমার কন্ট্রোলে নেই – ডানদিকে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ক্লাচ ছাড়ছি, গাড়ি স্কিড করে যাচ্ছে বাঁদিকে, ব্রেক মারতে গেলে আরও হুড়মুড়িয়ে স্কিড করে যাচ্ছে। অন্তত তিনবার চারপাশের লোকজন বাইরে থেকে আমার গাড়িকে ধরে আমাকে নিশ্চিত পরবর্তী অ্যাক্সিডেন্টের হাতে থেকে বাঁচিয়েছিলেন। অতএব, স্নো-চেন মাস্ট।
    মাস্টারজি যে বাইকার্স গ্রুপে নিজের জার্নির ছবিটবি পোস্ট করেন, সেখানেই আরেকটি ছেলে তার নিজের তৈরি স্নো চেনের বিজ্ঞাপন দিয়েছিল সম্প্রতি। জয়পুরে থাকে, স্নো চেন লাগিয়ে তারাও এক গ্রুপ জনতা আগের সপ্তাহেই স্পিতি ভ্যালি ঘুরে এসেছে। অতএব, অর্ডার দিয়ে দিলাম নিজের বাইকের চাকার স্পেসিফিকেশন সমেত, এবং বানাবার পরে জয়পুর থেকে দিল্লিতে তার ডেলিভারি হয়ে গেল ঠিক এক দিনের মাথায়।
    মাইনাস টুয়েন্টির গ্লাভস তো ছিলই আমার কাছে, লাদাখে কেনা সেই গ্লাভস, যেটা প্রায় খাদে নেমে গুরদীপ উদ্ধার করে দিয়েছিল আমাকে, একদিন দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে আর্মি স্টোর থেকে উলের মোটা গ্লাভস আর একটা স্লিপিং ব্যাগও কিনে নিয়ে এলাম। প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পূর্ণ।
    ছ দিনের প্ল্যান বানালাম। যাব আমি একাই, পঞ্জাবী ছেলেপুলের গ্রুপের সঙ্গে নয়। লাদাখে যে রকম মাঝরাস্তায় সঙ্গী মিলে গেছিল, আশা করি এবারেও কেউ না কেউ মিলে যাবেই যাত্রাপথে। অফিসের সেই ছেলেটির চণ্ডীগড়ের গ্রুপ বেরোবে পঁচিশ তারিখ, শনিবার। এদিকে চব্বিশ তারিখ শুক্রবার শিবরাত্রির একটা ফ্লেক্সি হলিডে আছে। ওদিকে দোসরা মার্চ আমার মেয়ের জন্মদিন। ওদের পাঁচদিনের প্ল্যান, আমার ছ দিনের। তা হলে একটা কাজ করা যায় – আমি শিবরাত্রিরও আরেক দিন আগে বেরোই – অফিসে একটা ক্যাজুয়াল লিভ ফিরে এসে নিয়ে নিলেই হবে। তেইশে বেরোব, আঠাশে ফিরব। এক তারিখটা বাফার থাকবে, যদি কখনও কোথাও আটকে পড়ি, তো লেটেস্ট এক তারিখে ফিরব।
    প্ল্যান দাঁড়াল এই রকমঃ
    ২৩শে ফেব্রুয়ারি – দিল্লি – জিওরি
    ২৪শে ফেব্রুয়ারি – জিওরি – নাকো
    ২৫শে ফেব্রুয়ারি – নাকো – কাজা
    ২৬শে ফেব্রুয়ারি – কাজা – আশেপাশে – নাকো
    ২৭ ফেব্রুয়ারি – নাকো – রামপুর
    ২৮শে ফেব্রুয়ারি – রামপুর – দিল্লি
    ১লা মার্চ – বাফার দিন

    এই সময়েই আরেকটা গ্রুপের সঙ্গে কথা হল অন্য একটা বাইকার্স গ্রুপে – তারা চণ্ডীগড় থেকে স্টার্ট করছে তেইশ তারিখ বিকেলে, রাতের মধ্যে তারা রামপুরে পৌঁছবে। রামপুর থেকে জিওরি মাত্র বাইশ কিলোমিটার, ওরা চব্বিশ সকালে জিওরিতে এলে আমি ওদের সাথেই বাকি রাস্তাটা যাবো – এই রকম প্ল্যান করা হল। গ্রুপের লিডার, জীবন সোঁধি (বাংলা করলে হয় তো হবে জীবনসন্ধি) আমাকে তার নম্বর টম্বর দিয়ে খুব আশ্বস্ত করল, চিন্তা মত্‌ করিও – জিওরি থেকে হম একসাথ চলেঙ্গে।
    আমার মনে পড়ে গেল, প্রায় দু বছর আগে, এই রকমই আরেক পঞ্জাব দা পুত্তর আমাকে আশ্বস্ত করেছিল, আম্বালা চলে আইও, বাকি ম্যায় সাম্ভাল লুঙ্গা। তারপরে কোথায় রইল সে, আর কোথায় আমি – কেমন একটা মনে হচ্ছিল, এবারেও সে রকমই কিছু হতে চলেছে। জীবনসন্ধির সাথে আদৌ জিওরিতে দেখা হবে কিনা – কে জানে!
    বাইশ তারিখ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে এসে গোছগাছ শেষ করে ঘুমোতে গেলাম, সকাল চারটেয় উঠে তৈরি হয়ে বেরোতে হবে।
  • রোবু | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১০:৫৩365815
  • লাদাখের লেখাটার লিংক দিয়েই দাও তো বুগু। ওটা মিস হয়ে গ্যাছে মনে হচ্ছে।
  • সিকি | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১০:৫৬365826
  • খুঁটে খাও পাঠক :)
  • d | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১৩:৩৫365750
  • এটা পড়ে ফেলেছি। তারপর?
  • সাতমার পালোয়ান | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১৪:০৩365751
  • একটা বোকা বোকা কোশ্নো ছিলো। লোকে বাইকে অতক্ষণ বসে থাকে কী করে?

    সেদিন এক কোলীগের বাইকে নিউটাউন থেকে সেক্টর ফাইভ গেছিলুম - পিছনে বসে। ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে পায়ে ব্যথা ধরে গেলো। এই যারা লাদাখ টাদাখ যায়, আবার কতজন তো পিছনেও বসে - তাদের পায়ে কি নার্ভ নাই?
  • সিকি | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১৫:২১365752
  • কী করে-টা আমিও জানি না। বাইক চালাতে চালাতেই একটা সময়ে অবিষ্কার করেছিলাম ঘন্টাকয়েক একভাবে বসে থাকলেও আমার হাতেপায়ে খিল ধরে না, অসুবিধে হয় না।

    এমনিতে বাইক রাইডিংয়ে প্রতি দেড় ঘন্টায় একটা করে স্টপ দিয়ে একটু হাত পা খেলিয়ে নেওয়া নিয়ম।
  • সাতমার পালোয়ান | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১৫:৪৪365753
  • দেড় ঘন্টা? আধ ঘন্টায় পা খুলে হাতে চলে আসার মত হাল হয়ে যাবে যদি এইটুকুতে অমন হয়! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল সাইকেলে এমন কিসুই হয় না।

    জানি না, নতুন এনফিল্ডের পিছনের সীটের স্পেশ্যালিটি কিনা...
  • পিঠের আরাম হতো তাহলে | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১৫:৪৬365754
  • আচ্ছা ব্যাকরেস্ট ওয়ালা বাইকসিট পাওয়া যায়?
  • সাতমার পালোয়ান | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১৫:৪৭365755
  • হার্লে কিনুন।

    বাজাজের একটা হার্লে মার্কা মডেল আছে - অভাবে সেইটা।
  • সিকি | ০৬ মার্চ ২০১৭ ১৬:২৪365756
  • অ্যাভেঞ্জার।
  • সিকি | ০৬ মার্চ ২০১৭ ২১:৫৮365757
  • তেইশে ফেব্রুয়ারি, দিন ১

    চারটেয় অ্যালার্ম বাজল, ঘুম থেকে উঠলাম, তৈরিও হয়ে গেলাম। এ বছর ঠাণ্ডা একটু তাড়াতাড়িই চলে গেছে দিল্লি থেকে, সোয়েটারের বিশেষ দরকার আর হচ্ছে না। তবুও, ভোররাতের হাওয়ার থেকে বাঁচতে কিছু তো গায়ে চাপাতেই হয়।

    লাগেজ সবশুদ্ধ তিনটি। ভায়াটেরার স্যাডল ব্যাগ, রাইনক্সের ট্যাঙ্ক ব্যাগ আর পিঠে আরেকটি ব্যাগ, তাতে ভরা স্লিপিং ব্যাগটা। খানিক জায়গাও খালি রয়েছে, পরে বেলা বাড়লে জ্যাকেট ছেড়ে ঢোকাতে হবে।

    দেড় বছর আগে লাস্ট বাঁধাছাঁদা করেছিলাম, এইবারে পার্কিংয়ে গিয়ে স্যাডল ব্যাগকে বাইকের পেছনে নতুন করে বাঁধতে গিয়ে বুঝলাম, প্রায় পুরো পদ্ধতিটাই ভুলে গিয়েছি। তাও, যতটা যা মনে আসে, সেই মত করে সব বেঁধেছেঁদে নিলাম। এবার আর আমি অত নভিস নই, সাথে প্লেনটি অফ বান্‌জি কর্ড রয়েছে, তাই দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে লাগেজ বাঁধলাম।

    ট্যাঙ্ক ব্যাগ লাগানোটা একটা বিভীষিকা বিশেষ। সামনের বেল্টটা বাইকের মুণ্ডুর তলা দিয়ে একটা সরু জায়গা দিয়ে ঘুরিয়ে এনে বাঁধতে হয়, সে প্রায় চারবারের চেষ্টায় পেরে উঠলাম, এর থেকে ছুঁচে সুতো পরানো সহজ। সমস্ত বাঁধাছাঁদা শেষ করে যখন গাড়িতে স্টার্ট দিতে পারলাম, ঘড়িতে তখন বাজে পাঁচটা চল্লিশ, ভোর হবো-হবো করছে। আগের বারের থেকে পাক্কা এক ঘণ্টা লেট।

    ঠিক হ্যায়, আগের বারে শিমলা পৌঁছেছিলাম বেলা সাড়ে এগারোটায়, এবার না হয় পৌঁছব সাড়ে বারোটায়, তাতেও খুব অসুবিধে হবার কথা নয়। জিওরি ওখান থেকে দেড়শো কিলোমিটার। বিকেল চারটে না হলে, পাঁচটাতেই না হয় পৌঁছবো, যদি ঠিকঠাক চলতে পারি।

    জিওরি – ইংরেজিতে বানানটা Jeory হলেও হিন্দিতে জায়গাটার নাম লেখা হয় জ্যুরি। এখানে হিমাচল প্রদেশ পিডাব্লিউডি-র রেস্ট হাউস বুক করে রাখা আছে। হিমাচলের জায়গায় জায়গায় পিডাব্লুডির রেস্ট হাউস বানিয়ে রাখা রয়েছে, এবং যে কেউ আগে থেকে ফোন করে বুকিং করে সেখানে গিয়ে থাকতে পারে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বড়সড় কামরাওলা রেস্ট হাউস সমস্ত। … কিন্তু জিওরি কেন বুক করলাম আমি? আগে পিছে অনেক জায়গাই তো ছিল – নারকণ্ডার পরে রামপুর (পুরো নাম রামপুর বুশহর) একটা বেশ বড়সড় টাউন, সেখানে থাকার অনেক অপশন আছে, জিওরি সেই রামপুর থেকেও তেইশ কিলোমিটার আগে।

    দুটো কারণ – এক, যতটা সম্ভব এগিয়ে থাকা, আর দুই, এদিক ওদিক দু চারটে ট্র্যাভেলগ পড়ে জিওরির পিডাব্লুডি রেস্ট হাউসের সম্বন্ধে বেশ পজিটিভ ফীডব্যাক পেয়েছিলাম, আর মাস্টারজিও যে প্ল্যান বানিয়ে দিয়েছিলেন, তাতে উনি বিশেষ জোর দিয়ে বলেছিলেন জিওরিতে থাকার কথা, তাই আর বিশেষ মাথা না ঘামিয়ে জিওরিতেই বুক করে নিয়েছিলাম। এতই সহজ বুকিং, ফোন করলাম, বললাম, অমুক দিনে থাকব, – তো অন্যপ্রান্তের ভদ্রলোকটি বললেন, ঠীক হ্যায়, আপ আ জাইয়ে। আমি নিজেই উপযাচক হয়ে বললাম, আমি সঙ্গে আইডেন্টিটি প্রুফ হিসেবে আধার কার্ড দেখাবো, উনি বললেন, কোনও দরকার নেই, আপনি এসে নাম বললেই হবে।

    তো, আজকের গন্তব্য জিওরি। পৌনে ছটায় বাইকে স্টার্ট দিয়ে সেই চেনা রাস্তায় গিয়ে পড়লাম – গাজীপুর, হসনপুর, গীতা কলোনী। এই পর্যন্ত এসে মনে হল আবার কিছু ঝাম হচ্ছে আমার পেছনে, আমার বসার জায়গাটা কেমন যেন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বাইক থামিয়ে নেমে দেখলাম – যা ভেবেছি তাই, স্যাডল ব্যাগ বাঁধা ঠিক হয় নি, সামনের দিকে সরে এসে আমার বসার জায়গা খেয়ে নিয়েছে, আর ডানদিকে হেলেও গেছে খানিক, বিলকুল সেই সতীশ শাহের মৃতদেহর মতন।

    অগত্যা, সমস্ত বান্‌জি কর্ড খুলে আরেকবার কষে ইড়িমিড়িকিড়ি বাঁধন দিতে হল। আরও খানিক সময় নষ্ট হল, তবে এইবারে মনে হল বাঁধন বেশ পোক্ত হয়েছে। সত্যিই, সেদিন আর সারাদিনে লাগেজ নিয়ে কোনও ঝামেলা হয় নি। বাইকে আবার স্টার্ট দিলাম, এবং হাওয়ার গতিতে পেরিয়ে যেতে লাগলাম লালকেল্লা, কাশ্মীরি গেট, মজনু কা টিলা, মুকারবা চক, আলিপুর। সোনেপত থেকে হরিয়ানার শুরু, সেখানে ঢোকার আগে দিল্লির শেষ পেট্রল পাম্প থেকে বাইকের ট্যাঙ্ক ফুল করে নিলাম, তার পরে দুশো কিলোমিটার একটা ঘ্যানঘ্যানে জার্নি – আম্বালা পর্যন্ত।

    নটার সময়ে আম্বালা পৌঁছলাম, আগের বারের থেকে এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট লেটে। এর পরে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে চণ্ডীগড়। দু মিনিট বিশ্রাম, বাড়িতে সিকিনীকে ফোন করে স্টেটাস আপডেট, এবং আবার বাইকে স্টার্ট।

    চণ্ডীগড়ের শুরুতে জিরাকপুরে আছে আমার অফিসের সেই পাঞ্জাব-দা-পুত্তর কথিত বুলেট ক্যাফে – সে বলে রেখেছিল আমি যেন ঐখানে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করি, অনেক কষ্টে খুঁজেপেতে সেই জায়গায় গিয়ে তো পৌঁছলাম, কিন্তু বুলেট ক্যাফে আর খুঁজে পাই না, জিপিএস বলছে সে এখানেই, সামনে গলির মধ্যে, কিন্তু সামনে তো কোনও গলিই নেই। অগত্যা সেই ছেলেটিকে ফোন লাগালাম। সকাল দশটা, ব্রাহ্মমুহূর্ত – সে বেচারা তখন ঘুমোচ্ছিল, বলল, দাঁড়াও, আমি ফোন লাগাচ্ছি, ও এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।

    দাঁড়ালাম। পাঁচ মিনিট বাদে ফোন এল – ওর এক রিশতেদারের মা মারা গেছেন, ও গেছে লুধিয়ানা, আজ ক্যাফে খুলবে না, ভেরি সরি পা-জি, আপ কঁহি অওর ব্রেকফাস্ট কর লো।

    কী বিরক্তিকর রে বাবা। অলরেডি গুচ্ছখানেক ধাবা পেরিয়ে এসেছি, আর তেমন ভালো ধাবাও নেই সামনে, সেটা জানি, তাও এগোই – যা পাওয়া যাবে – খিদে পেয়েছে বেশ জোরদার।

    চণ্ডীগড় পেরিয়ে পিঞ্জোর। এখান থেকে বাঁদিকে বেরিয়ে গেছে পিঞ্জোরের রাস্তা, আর সোজা চলে গেছে শিমলা। শিমলা এখান থেকে ঠিক আর নব্বই কিলোমিটার। সেই জাংশনে একটি রোডসাইড রেস্টুরেন্ট পেলাম, মাথায় হাত বুলিয়ে অগামারা ছোলে ভাটুরে আর কফি খাইয়ে একশো ষাট টাকা নিয়ে নিল। তখনই ঘড়িতে বাজে বারোটা। যখন আমার শিমলায় পৌঁছে যাবার কথা। … যাক গে, দেরি হয়েছে তো হয়েছে। বিকেলের জায়গায় না হয় সন্ধ্যেতেই পৌঁছব।

    তা, শিমলা ঢুকলাম তখন বাজে বেলা দেড়টা। নিশ্চিন্ত রাস্তা, এদিক ওদিক হবার চান্স নেই, সাধারণ ট্রাফিক। শিমলায় লাঞ্চ করে নেওয়া উচিত, কিন্তু আমি সকালের খাবারটাই খেয়ে উঠেছি বেলা বারোটায়, অতএব আজ লাঞ্চ স্কিপ করে ফেলাই যায়, কিন্তু আগে বাইকটাকে খাওয়াতে হবে। সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দৌড়ে ফেলেছে, পেট্রল তলানি। কিন্তু শিমলা শহরে মলএর ঠিক নিচেই যে পেট্রল পাম্পখানি, তাতে আজ পেট্রল নেই। কেলো করেছে। এখানে তো আর কোনও পেট্রল পাম্প আছে বলেও জানি না। দু একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বলল, চিন্তার কিছু নেই, নারকণ্ডার রাস্তাতেই অনেক পেট্রল পাম্প পড়বে, হুই যে সামনে টানেলটা দেখছো – ওটা পেরোলেই ঢাল্লি, ঢাল্লিতে দেখবে পর পর তিন চারখানা পেট্রল পাম্প, এই এখান থেকে তিন কিলোমিটার মত হবে।

    ঢাল্লি পৌঁছে সত্যিই দেখলাম পর পর পেট্রল পাম্প। এটাই বোধ হয় শিমলার পেট্রল ভরার হাব, কারণ শিমলা শহরে তো আর পেট্রল পাম্প খোলার জায়গা নেই। বাইকের ট্যাঙ্ক ফুল করে নিলাম, আবার আগামী চারশো কিলোমিটারের জন্য নিশ্চিন্ত। এখান থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে নারকন্ডা, সেখান থেকে আরও নব্বই কিলোমিটার দূরে জিওরি – মাত্রই দেড়শো কিলোমিটার দূরে।

    ঢাল্লি থেকে একটু এগোলেই কুফরি, সারি দিয়ে চাউমিনের দোকান আর চমরি গাই নিয়ে টুরিস্টের আশায় দাঁড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষজন, অল্পবিস্তর ভিড়ও আছে। বেশির ভাগ গাড়ির নম্বরই দিল্লি ইউপি হরিয়ানা পঞ্জাব। দেখতে দেখতে নারকন্ডা পৌঁছে গেলাম, ঘড়িতে তখন বাজে সাড়ে তিনটে।

    নারকন্ডা শিমলা থেকে একটু ওপরের দিকে, সেখান থেকে পুরো একটা চুলের কাঁটার মত বাঁক নিয়ে রাস্তাটা আবার নিচের দিকে নামছে – রামপুরের দিকে। বাঁকটা নিতেই মনটা একেবারে গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেল – রাস্তার ধারে চাপ চাপ বরফ জমে আছে – তাই ভাবি, একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল কেন। সক্কাল সক্কাল দিল্লি থেকে বেরিয়ে দুপুরেই বরফদর্শন, হোক না কাদানোংরা মাখা কেল্টেপানা বরফ, তাও একটা ছোট স্টপ তো মাংতাই হ্যায়।





    ছোট একটা ব্রেক নিয়ে আবার এগনো শুরু করলাম। এখান থেকে রাস্তা শুধুই ডাউনহিল গেছে। গড়াতে গড়াতে একদম বিকেলের শেষে গোধূলিলগ্নে রামপুরে পৌঁছলাম। জিওরি আর তেইশ কিলোমিটার। যে নম্বরে ফোন করে বুকিং করেছিলাম, সেখানে আরেকবার ফোন করে জেনে নিলাম, জিওরি পৌঁছে পিডাব্লুডির গেস্টহাউস কী করে চিনব। তো, অন্যপ্রান্তের ভদ্রলোক বললেন – ওখান থেকে সারাহানের জন্য রাস্তা উঠে যাচ্ছে ওপরে, সেই রাস্তায় একটু গেলেই পিডাব্লুডির রেস্টহাউস, জিওরিতে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে।

    তা দিল। সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় জিওরি পৌঁছে গেস্টহাউসটা খুঁজে বের করতে সময় লাগল ঠিক কুড়ি মিনিট। অন্ধকারে গেটটা বুঝতে না পেরে আমি বেশি ওপরে উঠে গেছিলাম, আবার আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে নেমে আসতেই গেটটা দেখতে পেয়ে গেলাম।

    কেয়ারটেকার এক বৃদ্ধ সর্দারজি, ঠেঁট পঞ্জাবী ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেন না। নাম বলতেও হল না, দিল্লি সে আ রহা হুঁ বলতেই – হাঞ্জি হাঞ্জি এক রুম রাক্‌খিয়াসি টাইপের কিছু বলে আমাকে তালা খুলে ঢুকিয়ে দিলেন এক ঢাউস রুমের ভেতর, ভেতরে অন্তত গোটাতিনেক টেবিল টেনিস বোর্ড পাশাপাশি রাখার জায়গা হয়ে যায়। ইয়া উঁচু সিলিং, ছাদ থেকে প্রায় মেঝে ছোঁয়া জানলা, স্বচ্ছ কাঁচ, তাতে মোটা পর্দা লাগানো। বাথরুমও অনুরূপ, মাইনাস পর্দা। মানে, সেখানেও একটা ঢাউস জানলা, তাতে ঝকঝকে কাঁচ লাগানো, কিন্তু পর্দা টর্দা নেই। মানে বাইরে থেকে বাথরুমের ভেতরটা পুরোটাই দৃশ্যমান।

    কেলো করেছে। এ বাথরুম ইউজ করব কী করে? এদিকে তোয়ালেও দেয় নি। আবার দৌড়লাম সর্দারজির কাছে। খানিক ঘ্যানঘ্যান করার পরে একটা তোলায়ে পেলাম, সেইটা জানলার পাল্লায় ঝুলিয়ে খানিক ঢাকাঢুকি হল, তারপরে বাথরুম ইউজ করা গেল।

    চান করে বেরোতেই আবার সর্দারজির মুখোমুখি – ডিনার করোগে তুস্‌সি? হ্যাঁ করব, অবশ্যই করব। সারাদিনে বিশেষ কিছু খাওয়া হয় নি, লেট ব্রেকফাস্ট ছাড়া। কী পাওয়া যাবে?

    চাওল, রোট্টি, সবজি, দাল।

    মানে, ভ্যাজ। তাই সই। বললাম, হয়ে গেলেই ডেকে নিও, আমি খেয়ে ঘুমোব।

    তা ডাকলেন, নটা নাগাদ। গিয়ে তো খাবার দেখে ভ্যাক করে কেঁদে ফেলার জোগাড়! কী বলব কালীদা, ভ্যাজ সবজিতে অনেক কিছু আছে, কেবল আলু নেই। বীন, বরবটি, গাজর, মটরশুঁটি এইসব দিয়ে বানানো একটা সবজি। … চোখকান বুজে চারখানা রুটি আর দুমুঠো ভাত তাই দিয়ে খেয়ে ফেললাম। আমার স্বল্পাহার দেখে সর্দারজি যারপরনাই বিরক্ত হলেন, কিন্তু কী করব, তখন তো আর আলু চাওয়া যায় না, আর চাইলেও যে রাত সোয়া নটায় জিওরিতে আলু পাওয়া যাবে, এমন কোনও গ্যারান্টি নেই।

    জীবনসন্ধিকে ফোন করলাম, ওরা বেরিয়ে পড়েছে ঠিক সময়েই চণ্ডীগড় থেকে, তখন নারকন্ডা পেরোচ্ছে, আমাকে বলল, পাঁচজনের টিম আসছে, রাত এগারোটার মধ্যে রামপুরে পোঁছে ওখানেই থেকে যাবে। পরদিন সকালে জিওরি এসে আমাকে সঙ্গে নিয়ে নেবে।

    সবকিছু প্ল্যানমাফিকই চলছে। অনেকদিন বাদে সোয়া পাঁচশো কিলোমিটার একটানা চালিয়ে গায়ে কাঁধে অল্প অল্প ব্যথা।

    শুয়ে পড়লাম, এবং শোয়ামাত্র ঘুম।
  • de | ০৬ মার্চ ২০১৭ ২৩:২১365758
  • বাপ্পোস! শয়ে শয়ে কিলোমিটার সিকি কেমন কিলোমিটার স্কেলের মতো করে ট্রাভেল করে! একদম লং জার্নির জন্য ফিট লোক!

    তবে মানালির কেসটা শুনে যথেষ্ট চাপ খেলাম - বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে রিস্কটা এট্টু বেশীই হয়ে গেসলো!
  • রোবু | ০৭ মার্চ ২০১৭ ০০:১৫365759
  • এক বাইকে দুজন কী করে যায়? এটা লাদাখ টই-এর প্রশ্ন।
  • সিকি | ০৮ মার্চ ২০১৭ ১৩:৩২365761
  • একজন পিলিয়ন রাইডার হয়ে।

    সাধারণত বুলেটেই এটা সম্ভব, কারণ স্যাডল ব্যাগ - আমি যেটা ইউজ করি, ওটা পালসার বা কেটিএম জাতীয় বাইকে ব্যাকসিটে বাঁধতে হয়, ফলে পেছনে বসার জায়গা থাকে না। বুলেটের জন্যে স্যাডল ব্যাগ আলাদা রকমের পাওয়া যায়, তবে বুলেটে লং জার্নির পথিকরা দুদিকে লাগায় একটা করে লোহার খাঁচা, যার নাম হচ্ছে লাদাখ ক্যারিয়ার বা এলসি। এতেই থলিতে করে জিনিসপত্র পেট্রলের জেরিক্যান ইত্যাদি ভরে ভটভটিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়, ব্যাকসিটটা খালিই থাকে। সেইখানে পিলিয়ন বসে - যেমন বিবেকের পেছনে বসে ছিল পুপ্পু :)
  • সিকি | ০৯ মার্চ ২০১৭ ০০:৩৭365762
  • আমার 06 Mar 2017 -- 09:58 PM-এর পোস্টে একটা ভাইটাল ইনফর্মেশন বাদ চলে গেছে। তেইশে ফেব্রুয়ারি, দিন ১।

    মাঝের একটা প্যারাগ্রাফ এইভাবে পড়তে হবে।
    ============================

    অগত্যা, সমস্ত বান্‌জি কর্ড খুলে আরেকবার কষে ইড়িমিড়িকিড়ি বাঁধন দিতে হল। আরও খানিক সময় নষ্ট হল, তবে এইবারে মনে হল বাঁধন বেশ পোক্ত হয়েছে। সত্যিই, সেদিন আর সারাদিনে লাগেজ নিয়ে কোনও ঝামেলা হয় নি।
    আর সেই সময়েই মনে পড়ল একটা দারুণ ব্যাপার। এত মন দিয়ে, এত যত্ন করে সমস্ত লাগেজ গুছিয়েছিলাম যে, বেরোবার সময় এক্কেবারে আসল জিনিসটাই নিয়ে বেরোতে আমি ভুলে গেছি।

    ক্যামেরা। সে পড়ে আছে আমার কম্পিউটার টেবিলের নিচে।

    কী আর করা। এই যাত্রায় তার মানে মোবাইলের ক্যামেরাই একমাত্র। মোবাইলটাকে সামলেসুমলে রাখতে হবে। ... বাইকে আবার স্টার্ট দিলাম, এবং হাওয়ার গতিতে পেরিয়ে যেতে লাগলাম লালকেল্লা, কাশ্মীরি গেট, মজনু কা টিলা, মুকারবা চক, আলিপুর। সোনেপত থেকে হরিয়ানার শুরু, সেখানে ঢোকার আগে দিল্লির শেষ পেট্রল পাম্প থেকে বাইকের ট্যাঙ্ক ফুল করে নিলাম, তার পরে দুশো কিলোমিটার একটা ঘ্যানঘ্যানে জার্নি – আম্বালা পর্যন্ত।
  • সিকি | ০৯ মার্চ ২০১৭ ০০:৫৬365763
  • চব্বিশে ফেব্রুয়ারি, দিন ২

    আদতে আমি আর্লি রাইজার, তাই সাড়ে ছটার সময়েই ঘুম ভেঙে গেল, অ্যালার্ম দিয়ে না রাখা সত্ত্বেও। আসলে, রাত সাড়ে নটা থেকে ভোঁসভোঁসিয়ে ঘুমোচ্ছি, আর কাঁহাতক ঘুমনো যায়? আমি কি বুনান নাকি?

    সাড়ে সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিলাম। অতঃপর সর্দারজির খোঁজ। সর্জারজি তখন সদ্য ঘুম থেকে উঠেছেন, আমাকে দেখে একমুখ বিস্ময় নিয়ে বললেন, নাহা লি হো তুস্‌সি?

    তা আর নাইব না? একে তো বাথরুমের জানলায় পর্দা নেই, যা করবার ভোর ভোরই করে ফেলতে হবে, তার ওপরে আগামী কদিন চান করার সুযোগ জুটবে না, কে জানে! চানটি তাই সকালেই সেরে রেখেছি, নাশতা পাওয়া যাবে?

    সর্দারজি মাথা নাড়লেন। না, ব্রেকফাস্টের কিছু মিলবে না, নিচে প্রচুর দোকানপাট আছে, সেখানে গিয়ে খেয়ে নাও গে।

    শুনে খুব আশ্বস্ত হলাম। কাল রাতে যা হরিবল খেয়েছি, সকালেও যদি বরবটি আর গাজর টাইপের কিছু বানিয়ে দেয়, আমি একেবারে না খেতে পেয়ে মরে যাবো।

    আটটার সময়ে জীবনকে ফোন করে জানলাম, তারা বেরোচ্ছে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে। বলে দিলাম – জিওরির যে মোড় থেকে সারাহানের দিকের রাস্তাটা ওপরে উঠে যাচ্ছে, আমি বাইকসমেত ওখানেই থাকব। লাগেজপত্তর বেঁধে নিলাম ধীরে ধীরে।

    সর্দারজিকে পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিতে তিনি যারপরনাই খুশি হয়ে আমাকে এক কাপ গরম চা খাইয়ে দিলেন। বললাম, কদিন বাদেই ফিরছি, এখানেই এসে থাকব কিন্তু, আবার ফোন করে বুক করতে হবে, না চলে এলেই থাকতে দেবেন?

    সর্দারজি বললেন, না, এই রেস্ট হাউস আজ থেকেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, রিনোভেশনের জন্য। কাল থেকে আর বুকিং নেওয়া হবে না। থাকতে হলে অন্য জায়গা দেখতে হবে।

    জিওরির মোড়ে ফিরে এলাম। সকাল সাড়ে আটটা, দোকান খুলেছে একটা দুটো করে। পেটপুরে চমৎকার ডিম চাউমিন আর কফি খেয়ে ফেললাম, এখন সারাদিনের জন্য নিশ্চিন্তি।

    ঠিক নটায় চারখানি বুলেট এসে থামল। পঞ্জাব আর চণ্ডীগড়ের নাম্বার প্লেট। দুজন সর্দার, একেবারেই খোকা সর্দার, বাকিরা পাগড়িবিহীন। পাগড়িবিহীন অথচ একমুখ দাড়ি, চোখে গোল সানগ্লাস এমন একজন এগিয়ে এসে জানাল, তারই নাম জীবন সোঁধি। বাকিরা সুখদীপ, বিশাল, আর একটা মোটরসাইকেলে দুজন – তারা বোধ হয় দুই ভাই, নামেও বেশ মিল, সুনীল আর অনিল মিত্তল। মোটরসাইকেল চার (আমাকে বাদ দিয়ে), আওর আদমি পাঁচ। এটা ইনসাফি না না-ইনসাফি, তখনও বুঝতে পারি নি, জানা গেল, তার নাকি ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে পড়েছে, ব্রেকফাস্ট করে নি।

    বোঝো! ব্রেকফাস্ট না করেই যদি তেইশ কিলোমিটার আসতে বেলা নটা বাজে, তা হলে ... বললাম, এক কাজ করো, এখানে তোমরা ব্রেকফাস্ট করো, আমি পেট্রল পাম্প থেকে চট করে ট্যাঙ্ক ফুল করিয়ে আনি।

    জিওরি থেকে রামপুরের দিকে দেড় কিলোমিটার পিছিয়ে গেলেই পেট্রল পাম্প। রাস্তায় আগেও পেট্রল পাম্প পড়বে বেশ কয়েকটা, কিন্তু পাম্প থাকলেই যে তাতে পেট্রল থাকবেই, এমন কোনও গ্যারান্টি নেই, তাই শুরুতে ভরিয়ে নেওয়াই ভালো। সঙ্গে আমার ছ লিটার পেট্রল রিজার্ভ আছে অবশ্য, তিনখানা দু লিটারের কোকের বোতলে। নিতান্ত অসুবিধেয় পড়লে ওই তেলে দুশো কিলোমিটার পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে।

    ধীরেসুস্থে পেট্রল ভরিয়ে আবার যখন জিওরির মোড়ে ফিরলাম, তখনও তাদের ব্রেকফাস্ট পর্ব শেষ হয় নি। অনিল-সুনীল দুই খোকা কিছুই খায় নি, কারণ নাকি তাদের “ডাইজেশন মে দিক্কত” হচ্ছে। লে পচা, সর্দারদেরও পেট খারাপ হয়?
    পৌনে দশটার সময়ে অবশেষে স্টার্ট করতে পারলাম। কথায় কথায় জানা গেল, অনিল সুনীল আর বিশালের নাকি এই প্রথম লং ট্রিপে বেরনো, সদ্য কুড়ি হয়েছে কি হয় নি, চণ্ডীগড়ের কোন এক কলেজের সেকেন্ড আর থার্ড ইয়ারের ছাত্র সব। জীবনের নিজস্ব বিজনেস আছে, আর সুখদীপ চাকরি করে।

    সামহাউ, টিমটাকে দেখে প্রথম থেকেই আমার কেমন একটা জুতের লাগে নি। কারণ বলতে পারব না, “টিম” বলতে যা বোঝায়, সেই ধরণের মেন্টালিটি বা অ্যাটিট্যুড – কিছু একটার কমতি ছিল মনে হল এদের মধ্যে। দিনের জার্নি শুরু করবার আগে বার বার করে ওদের কিছু টিপস দিতে চাইলাম উপযাচক হয়ে – পাহাড়ী রাস্তার জার্নিতে গ্রুপে সাধারণত যে ধরণের কমন নিয়ম সবাই মেনে চলে – হেডলাইট আর ব্লিঙ্কার অন করে চলা, এবং দলছুট না হয়ে পড়া। আগে প্রচুর খারাপ রাস্তা আছে, কোনও কারণে কেউ অসুবিধেয় পড়লে যাতে বাকিরা তাদের কানেক্ট করে নিতে পারে। এর পর একটা জায়গার পর থেকে মোবাইলের কানেক্টিভিটিও থাকবে না, তখন একসাথে থাকাটা খুবই জরুরি। সামনে এগিয়ে যাওয়া কাউকে থামবার সঙ্কেত দিতে চাইলে কী ভাবে হর্ন বাজানো উচিত, পেছনে থাকা কাউকে থামতে বললে কীভাবে ইন্ডিকেটর ব্লিঙ্ক করা উচিত – তবে মনে হল না তাদের মাথায় কিছু ঢুকছে বলে। বেসিকালি, পুরো দলটাকেই কেমন লাগছিল জলিয়ন ওয়াগের নাটকের দলের মত, জাস্ট মস্তি করবে বলে বুলেট নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। ইন ফ্যাক্ট, আমার সাথেও আলাপ করতে তাদের কেউই খুব বেশি উৎসাহী বলে মনে হল না। অতএব, বেরোলাম।

    আজকের গন্তব্য, নাকো। দূরত্ব মোটামুটি দুশো কিলোমিটার। খানিক এগোতেই ভাবানগর।

    গতকাল, নারকন্ডা পেরোনর পর থেকেই শতদ্রু নদী আমার সঙ্গ নিয়েছিল, এখন পুরো রাস্তাটাতেই শতদ্রু আমার সাথে সাথে চলবে। জায়গায় জায়গায় ড্যাম বানানো, হাইড্রোইলেকট্রিক প্ল্যান্টের জন্য, নীলচে সবুজ জল নেচে নেচে চলেছে পাশে পাশে।

    ভাবানগর থেকে একটু এগোতেই এসে গেল শিমলা জেলার শেষ আর কিন্নৌর জেলার শুরুর বাউন্ডারি। আর খানিক এগোতেই বাঁকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল কিন্নৌরের গেটওয়ে – স্পিতি বেড়াবার সমস্ত ট্র্যাভেলগে এই ছবি পাবেন। পাহাড় কেটে বানানো স্বপ্নের মত রাস্তা।





    এই রাস্তায় চালানো এক দারুণ অভিজ্ঞতা।

    দেখতে দেখতে এসে গেল ওয়াংটু। বুলেটবাজদের দল যে কখন কোথায় পিছিয়ে পড়েছে, তাদের আর দেখা নেই। দু মিনিট দাঁড়ালাম, তাতেও পাত্তা নেই – ধুত্তেরি বলে এগোতে থাকলাম। এর পরে করছাম, রিকং পিও, পুহ্‌, পর পর আসবে।

    কিন্তু ওয়াংটুর পরেই রাস্তা ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করল। যাচ্ছি পর পর সব হাইড্রোইলেকট্রিক প্ল্যান্টের পাশ দিয়ে, যেখানে যেখানে এদের অফিস ইত্যাদি, সেখানে একেবারে ঝকঝকে রানওয়ের মত রাস্তা, তার পর একটু এগোলেই একেবারে নেই-রাস্তা। মোটামোটা পাথর মুড়ি – এসবের ওপর দিয়ে যাওয়া, একটানা পনেরো-সতেরো, খুব বেশি হলে কুড়ি কিলোমিটারের স্পিডে চলতে থাকা। বিরক্তি এসে যায়। কিন্তু বিরক্ত হয়ে তো লাভ নেই – এর চেয়ে বড় লেভেলের অফরোডিং করেছি লাদাখে, এ তো কিছুই না, আর স্পিতির রাস্তাকে বলা হয় দুনিয়ার সবথেকে খারাপ রাস্তা, ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ট্রেচারাস রোড, তার নমুনা দেখতে পাচ্ছি আস্তে আস্তে। গাছপালা কমে আসছে, রুক্ষ পাহাড় চারদিকে, দূরে দূরে বরফের চূড়ো দেখা যাচ্ছে – মনে হচ্ছে আরেকটু গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে, আর ততোধিক খারাপ রাস্তা। জায়গায় জায়গায় নোটিস বোর্ড – শুটিং স্টোন এরিয়া, ড্রাইভ কেয়ারফুলি। এই সব জায়গায় ভালো রাস্তা মেনটেন করাই যায় না – মাঝে মাঝেই পাহাড়ের ওপর থেকে ছোটমেজবড় বিভিন্ন সাইজের পাথর ঝরে ঝরে পড়তে থাকে। সাবধানে গাড়ি চালানোটা এখানে মাস্ট। এমনকি, যে সব জায়গায় রাস্তা ভালো, সেখানেও প্রায়ই দেখা যায় – ঝকঝকে রাস্তার মাঝে একটা দুটো দশটা পাথর পড়ে রয়েছে ইতস্তত। কাটিয়ে কুটিয়ে এগোতে হয়।

    করছাম পৌঁছলাম বেলা সাড়ে এগারোটায়। পেছনে কারুর পাত্তা নেই। এখান থেকে সাংলা আর চিটকুলের রাস্তা বেঁকে গেছে ডানদিকে, কিন্তু আমি যাবো সোজা স্পিতি ভ্যালির দিকে। পুলিশ চেকপোস্টে দাঁড় করালো আমাকে জনাসাতেক পুলিশ।

    হিমাচলের পুলিশ খুবই নিরীহ, কারণ এদের ম্যাক্সিমামই ট্যুরিস্টদের হ্যান্ডল করতে হয়। যাত্রাপথে এই প্রথমবার সেই টিপিকাল প্রশ্নসমূহের মুখোমুখি হলাম – দিল্লি সে চালা কে আ রহে হো? আকেলা? বললাম পাঁচজন আরও আছে, পেছনে পড়ে গেছে। তো পুলিশ বলল, তা হলে একটু দাঁড়িয়ে যাও, সবাই এলেই এগিও একসাথে, আগে রাস্তা তো ভালো নয়।

    তো দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়েই রইলাম। বুলেটবাজরা আর আসে না। জীবনকে ফোন করলাম, ফোন বেজে গেল, তুললই না।

    আধঘণ্টার মাথায় দুটি বুলেট দেখা গেল দূরে। জীবন আর সুখদীপ আসছে। বাকিরা কোথায়?

    যা শুনলাম, নেহাত ছেলেগুলো নতুন পরিচিত না হলে ওখানেই খ্যাঃ খ্যাঃ করে হেসে উত্তাল আওয়াজ দিতাম। ব্যাটা পঞ্জাব দা পুত্তরের দল – যা ভেবেছি ঠিক তাই, কলেজ স্টুডেন্ট, বাড় খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে স্পিতির রাস্তায় চালাবে বলে, জীবনে এর আগে তারা কোনওদিন পাহাড়ের রাস্তায় চালায় নি – করছাম পর্যন্ত এসে উঠতে পারে নি তারা, ওয়াংটুর পরে “টাপরি” বলে একটা জায়গা পড়ে, সেই পর্যন্ত এসেই তাদের দম বেরিয়ে গেছে, খারাপ রাস্তা আর পাহাড়ি রাস্তার আঁকবাঁক সামলাতে গিয়ে নাকি অনিল সুনীল দুই খোকার দম বেরিয়ে গেছে। তাদের সর্‌ চক্কর খাচ্ছে।

    অতএব, তারা ফিরে গেছে।

    মানে?

    মানে তাই, ওরা ধীরে ধীরে আজ আবার রামপুর ফিরে যাবে। ওখানে একদিন রেস্ট নিয়ে মাথার চক্কর খাওয়া থামাতে পারলে তবেই তার পরের দিন আবার চণ্ডীগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। জীবন আর সুখদীপ অন্তত তাইই বলল, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ওরাও খোরাক করছে হয় তো, একটু পরেই বাকিরা এসে পড়বে, কিন্তু যে রকম সিরিয়াস মুখ করে সমস্ত ন্যারেশন দিল – বিশ্বাস না করেও উপায় ছিল না, আর হেসে ফেলার তো উপায় নেইই।

    অতএব, পাঁচ প্লাস এক, ছয় থেকে আমরা এখন তিন। তিনটি লোক, তিনটি মোটরসাইকেল। হাঁ, আব ইনসাফি হুয়া। হিসাব বরাবর হ্যায়।

    করছামের পর থেকে রাস্তা উত্তরোত্তর খারাপ হতে লাগল। মানে এতই খারাপ রাস্তা যে রাস্তা ছাড়া আর কিছু দেখার উপায় নেই। চারদিকে সৌন্দর্য উত্তরোত্তর ডাক দিচ্ছে, কিন্তু আমাকে সমানে নুড়ি-পাথর-বোল্ডার দেখে চালিয়ে যেতে হচ্ছে, দেখতে দেখতে আবারও দেখি জীবন সুখদীপ পেছনে কোথায় হারিয়ে গেছে।

    মরুক গে যাক, দেখা ঠিকই হয়ে যাবে পরে, আমি যখন আগেই আছি, তখন মিস হবে না।

    রিকং পিও এলাম বেলা একটাতে। চট করে ঘরে একটা ফোন করে নিয়ে আবার এগোলাম। সকালে ভরপেট লাঞ্চ করেছি, এক্ষুনি আর খাবার দরকার নেই, আর খেতে চাইলেও খাবার পাচ্ছি কোথায়? এ তো দেখছি এমনি একটা তেমাথার মোড়, সোজা পুহ্‌র রাস্তা, আর বাঁদিকে ওপরে রাস্তা উঠে যাচ্ছে, সেইটা ধরে বেশ খানিকটা গেলে রিকং পিও গ্রাম, সেই রাস্তা পরে বেরিয়ে যাচ্ছে কল্পার দিকে। আমি ডাইভার্সনে যাবো না, দেখা যাক, আরও এগোই, পুহ্‌তে কিছু খাবারের জায়গা পেলে সেখানে খেয়ে নেব।
    অনেকটা যাবার পরে রাস্তার অবস্থা একটু ভালো হল। পুহ্‌ আর পঁচিশ কিলোমিটার।



    স্পিড বাড়ালাম। কুড়ি-আঠেরো-ষোল ... পুহ্‌ যখন বারো কিলোমিটার বাকি, তখন শতদ্রুর ওপর এল একটা ছোট্ট ব্রিজ। ডানদিকে বেঁকে ব্রিজটা পেরোলাম, কিন্তু ব্রিজের অন্যপারে দুদিকে দুটো রাস্তা গেছে। কোনটা পুহ্‌ যায়?

    মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই, ম্যাপ কাজ করছে না।

    দু মিনিট দাঁড়ালাম। চারদিকে কেউ কোত্থাও নেই। ভালো করে দু দিকের রাস্তা দেখলাম, বাঁদিকে অনেকগুলো গ্রামের নাম লেখা, সামসো না কী সব যেন, কিন্তু হায়, অন্যদিক সম্বন্ধে কবি কিছুই বলেন নাই। পুহ্‌ জায়গাটার কথা আশেপাশে কোথাও লেখা নেই।
    বাঁদিকের রাস্তাটা ভালো, ডানদিকেরটা ভাঙাচোরা। যা হয় হোক, বলে বাঁদিকের রাস্তা নিলাম।

    চলছি, চলছি, আস্তে আস্তে আবার রাস্তা খারাপ হচ্ছে। কিন্তু একটি জনমনিষ্যির দেখা নেই। প্রায় সাত কিলোমিটার চলে এসেছি। আরও এগোব? নাকি ফিরে গিয়ে সেই ব্রিজের ধারে অপেক্ষা করব?

    আরও এক কিলোমিটার এগোলাম, উল্টোদিক থেকে একটা বাস এল, তাতে লেখা রিকং পিও। সে ঠিক আছে, রিকং পিও যাচ্ছে, কিন্তু আসছে কোথা থেকে?

    এই সময়ে দেখি একটা লোক রাস্তার ধারে একা একা হাঁটছে। জয়গুরু, সোজা তার পাশে গিয়ে বাইক থামালাম। জিজ্ঞেস করে বুঝলাম, যা ভেবেছি, ঠিক তাই। ব্রিজ বেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা ছিল পুহ্‌-এর জন্য। আমাকে আবার ফিরতে হবে। এতক্ষণে প্রায় ন কিলোমিটার চলে এসেছি হয় তো, আবার বাইক ঘোরালাম, এবং খানিক বাদে আবার ন কিলোমিটার উলটো চলে সেই ব্রিজের ধারে এসে পৌঁছলাম। সেই জনশূন্য ব্রিজে এখন একটু আগে দেখা সেই বাসটা পার হচ্ছে, আর উল্টোদিকের রাস্তা, যেটা সাপোজেডলি পুহ্‌ যাবার রাস্তা সেদিক থেকে একটা ডাম্পার আসছে বাসের পেছনে ব্রিজ পেরোবে বলে, আর তিন মাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটি পুলিশ, খাকি উর্দি পরা।

    আমাকে দেখেই তারা ইশারা করল থামতে। কোত্থেকে আসছো?

    বললাম, বুঝতে না পেরে ওদিকে চলে গেছিলাম, যাবো তো নাকো, আপাতত পুহ্‌ যাবার আছে। পুলিশ মনে হল না আমার কথা বিশ্বাস করল, বলল, এখান দিয়েই যখন গেছো, আমাদের জিজ্ঞেস করলে না কেন যাবার সময়ে?

    লে হালুয়া। কেউ ছিলই না, তোমরাও ছিলে না এখানে আধঘণ্টা আগে। বললাম, এইবারে মনে হল কনভিন্সড হয়েছে, কারণ ওরা তো জানে ওরা এখানে ছিল না। কথা বাড়াল না আর, হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল, এই রাস্তায় চলে যাও, পুহ্‌ আর দশ কিলোমিটার।



    তিনটের সময়ে পুহ্‌ পৌঁছলাম। কোথাও কিছু নেই, একটা ছোটখাটো মিলিটারি এসট্যাবলিশমেন্ট। রাস্তার ধারে দুটো মিলিটারি ট্রাক অলসভাবে ঝিমোচ্ছে, তার ড্রাইভার সিটে দুটি ফৌজি, সামনে একটা গাড়ি সারাবার ওয়ার্কশপ, সেটা কাঁচা হাতের সাইনবোর্ড দেখে বোঝা যায়, ঝাঁপ বন্ধ। খাবারের কোনও দোকান টোকান নেই।

    ট্রাকের সিটে বসে থাকা ফৌজিকে জিজ্ঞেস করলাম, এখান দিয়েই নাকো যেতে হয় তো?

    ফৌজি বলল, নাকো? হ্যাঁ, একদম সিধা রাস্তা। চলে যাও। ... দিল্লি থেকে আসছো?

    বললাম, হ্যাঁ।

    এখন কোথা থেকে আসছো?

    আজ বেরিয়েছি তো জিওরি থেকে।

    দুপুরের খাওয়া হয়েছে?

    হেসে ফেললাম, নাঃ, খাওয়া হয় নি, খাবারের জায়গা খুঁজছি, আছে নাকি এখানে কিছু?

    ফৌজি নড়েচড়ে বসল, এখান দিয়ে এক কিলোমিটার চলে যাও, দেখবে আর্মির এসট্যাবলিশমেন্টের গেট আছে – ট্রাইপিক লেখা। ওখানে জিজ্ঞেস কোরো, ক্যাফেটেরিয়াতে খাবার পেয়ে যেতে পারো।

    ছেলেটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এগোলাম। বুলেটবাহী দুই মূর্তির কোনও দেখা নেই, আমি তো টোটাল আঠেরো কিলোমিটার ভুল রাস্তায় চালিয়ে এসেছি, কে জানে, ওরা এখন আগে বেরিয়ে গেছে না পেছনে পড়ে আছে।

    ঠিক এক কিলোমিটার এগোতেই দেখলাম Tri-Peak লেখা একটা মিলিটারি এসট্যাবলিশমেন্টের দরজা। সেন্ট্রি বসে ছিল মেন এন্ট্রান্সে, গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, খানা মিলেগা ভাইয়া?

    রুটিন কিছু পুছতাছ সেরে হুকুম হল, গাড়ি ইধার লাগা লো, আরেকজন আর্মিম্যান দাঁড়িয়ে ছিল পাশেই, সে আমাকে বলল, আও মেরে সাথ।

    গেলাম, কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এদের এসট্যাবলিশমেন্টেরই ডাইনিং হল। এদের লাঞ্চ আওয়ার শেষ, খাবার কিছু বেঁচে ছিল, তাই দিয়ে এখন অতিথি সৎকার হবে। ওদের কেতামাফিক।

    প্রথমে হুকুম হল, ওইখানে হাত ধুয়ে নাও। – নিলাম। স্ট্যান্ডে পর পর প্লেট রাখা আছে, একটা প্লেট নিয়ে নাও। – তাও নিলাম।

    এইবারে ঢুকলাম কিচেনে। সেখানে ইয়া ইয়া গামলায় অবশিষ্ট খাবার দাবার রাখা। প্রথম গামলা থেকে বেরোল ফ্রায়েড রাইস। বেশ কাজু কিশমিশ দেওয়া। তার পরে ডাল। পনীরের তরকারি।

    ব্যস ব্যস, এতেই আমার হয়ে যাবে। থালায় খাবার ভরে চলে এলাম ডাইনিং হলএ। খানিক বাদে সেই আর্মিম্যানটি এসে আমাকে একটা প্লাস্টিকের গ্লাস ভর্তি ক্ষীর (আসলে সেমাইয়ের পায়েস) দিয়ে গেল – ইয়ে ভি লে লো, মিঠা হ্যায়।

    গুরু, আর কী চাই জীবনে? হ্যাঁ, জীবন। জীবনকে ফোন লাগালাম, ফোন লাগল না, কভারেজ ক্‌ষেত্র সে বাহার হ্যায়। দু তিনবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলাম। বাড়িতে ফোন লাগালাম, আপডেট দিলাম।

    পেটপুরে খেয়ে ভাবছিলাম কাউকে জিজ্ঞেস করব কিনা খাবারের পয়সা দিতে হবে কিনা ইত্যাদি, তো কাউকেই দেখতে পেলাম না। গুটিগুটি হাত ধুয়ে থালাটিকে এক সাইডে জমা করে ব্যাগ নিয়ে ওপরে উঠলাম। সেন্ট্রি তখনও একভাবেই বসে আছে, ওটাই ওর ডিউটি আর কি। খানিক খেজুর করলাম, তার পর তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার এগোলাম।



    রাস্তা ভালোয় মন্দয় মিশিয়ে। এর পরে আর মাইলস্টোনে নাকো-র নাম দেখতে পাবেন না কোথাও। মালিং বলে একটা জায়গার নাম পাবেন, আর পাবেন কাজার দূরত্বের হিসেব। কিন্তু কাজা তো আজ যাবার নেই, আজ পৌঁছতে হবে নাকো।

    বরফের পাহাড়েরা খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। রাস্তার ধারে ধারে বরফ দেখা যাচ্ছে।




    রাস্তাতেই দুইমূর্তির সাথে আবার দেখা হল, তারা তখন দাঁড়িয়ে ফটো তুলছিল। ওদের ফটো আবার বেশির ভাগই সেলফি – প্রকৃতির ছবিছাবা তোলায় ওদের বিশেষ উৎসাহ ইত্যাদি নেই।

    এর পরে আর সঙ্গ ছাড়লাম না, একসাথে পৌঁছে গেলাম নাকো গ্রামে, তখন বাজে বিকেল ঠিক পাঁচটা। আজকের মত জার্নি শেষ, থাকার জায়গা খুঁজতে হবে।

    তা খুঁজতে খুব একটা হল না। সামনেই পর পর সাইনবোর্ড লাগানো, অমুক হোমস্টে, তমুক হোমস্টে। সামনের চাতালে বসে ক্যারম খেলছিল জনাচারেক ছেলে, তাদেরই একজন বলল, আইয়ে, বলে দেখিয়ে দিল হোমস্টে-র জায়গা।
  • সিকি | ০৯ মার্চ ২০১৭ ১৫:০৩365764
  • অমর হোমস্টে। একদিকে বিস্তৃত বরফের চাদর, এমনিতে বোধ হয় চাষের ক্ষেত, এখন সাদা বরফে ঢাকা, তার মাঝে একটা ইউকো ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্কের পেছনে সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে সারি সারি কয়েকখানা চৌকো টাইপের ঘর, তাতে চৌকি আর মেগা মেগা সাইজের লেপতোষক ভাঁজ করে রাখা রয়েছে। গোটা ঘর থেকে কেমন একটা বদ্ধ, চামসে টাইপের গন্ধ বেরোচ্ছে। মেঝে মাটির, তার ওপরে প্রাচীনকালে একটা কার্পেট পেতে দেওয়া হয়েছিল, সে আর ওঠে নি, এখন জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, লেপগুলোও কোনওদিন কাচাকুচি বা ড্রাইওয়াশ করানো হয়েছে বলে মনে হল না। তা কী আর করা, এ সব জায়গায় হোমস্টে এই রকম জায়গাতেই হয়।



    হোমস্টে-র ছেলেটি বলে দিল, জল পাওয়া যাবে না, সুতরাং টয়লেটের কাজ বাইরে খোলা জায়গায় সেরে আসতে হবে। শোনামাত্র আমি নো-টয়লেট মোড অন করে নিলাম। এক রাতের তো ব্যাপার।

    দু খানা বুলেট আর একখানা পালসার সাইডে পার্কিং করে ফেললাম ঝটপট। সেখানে ইতিমধ্যেই আরেকটা বুলেট দাঁড়িয়ে ছিল। হোমস্টে-র ছেলেটি নিজেই বলল, কেরালা থেকে দুজন এসেছে। ওরা একটা বাইক এখানে রেখে আরেকটা বাইকে দুজনে চেপে গেছে কাজা। ওখানে থাকবে না, দুপুরে পৌঁছে ঘুরে টুরে আবার বিকেলেই চলে আসবে। আসার সময় প্রায় হয়ে এসেছে।

    তাই নাকি? কাজা দিনের দিন ঘুরে চলে আসা যায়? ছেলেটা বলল, হ্যাঁ, কেন নয়? মাত্র তো একশো সোয়াশো কিলোমিটার। আপডাউন মিলিয়ে দুশো পড়বে। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লে সন্ধ্যের মধ্যেই ফিরে আসা যায়।

    রাস্তা কেমন?

    এই যেমন এলেন, এই রকমই।

    রাস্তা খোলা আছে কাজা পর্যন্ত?

    হ্যাঁ, দুদিন আগেই খুলেছে। বরফ পাবেন প্রচুর, তবে রাস্তা খোলা আছে।

    জীবন আর সুখদীপের সাথে জলদি বৈঠক সেরে নিলাম। কেমন যেন ছাড়া ছাড়া পাবলিক, কোনও আলোচনাতেই উৎসাহ নেই, নিজেদের মতন নিজেরা থাকে, তিনজন যে ফেরত চলে গেল, তাই নিয়েও উচ্চবাচ্য নেই, আমি একতরফাই চেষ্টা করে যাচ্ছি আলাপ জমানোর, অন্য তরফে কোনও তাগিদ নেই।

    যাই হোক, আলোচনাতে এটুকুই স্থির হল যে, আমরাও কাল সকালবেলা লাগেজ সমস্ত এখানেই রেখে কাজা যাবো। সন্ধ্যের মধ্যে আবার ফিরে চলেও আসব। একটা দিনও বেঁচে যাবে, আর কাজাতে থাকার জন্য আলাদা করে খুঁজতেও হবে না জায়গা কাল রাতে এখানেই এসে থাকব। পরশু এখান থেকে আবার রামপুর ফিরে যাবো।

    হোম-স্টে-র ছেলেটা বলল, এই কাছেই নাকো লেক আছে, যান না, দেখে আসুন। ও-ই যে লাল রঙের বাড়িটা দেখছেন, ওর পেছনেই নাকো ঝিল। এখন পুরো জমে বরফ হয়ে আছে।

    আমার মোবাইলে সিগন্যাল নেই, এখানে শুধু বিএসএনএল চলে, তাই ছেলেটার থেকে ফোন চেয়ে নিয়ে বাড়িতে একটু কথা বলে নিলাম। তার পরে আমি একাই বাইক নিয়ে এগোলাম নাকো লেকের দিকে। জীবন আর সুখদীপ খুব “ক্লান্ত”, তারা তাই “আয়েশ” করতে চায়, লেক কাল কাজা থেকে ফেরার পথে দেখে ফিরবে।

    দেড় কিলোমিটার দূর, হেঁটে যাওয়াই যায়, তবে এখানে অক্সিজেনের অভাবটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে একবার ওঠানামা করলেই হাঁফ ধরে যাচ্ছে, আমার তো এমনিতেই দম কম, ফুসফুস ড্যামেজড, তাই আর হাঁটার রিস্ক নিলাম না।

    অবশ্য বাইকও কম রিস্কি ছিল না। একটু এগোতেই পেলাম হাল্কা চড়াই, সেখানে বরফ ঢাকা, কিছু জুতোর দাগ রয়েছে, সেখানে গেল বাইক দাঁড়িয়ে। যতই অ্যাক্সিলারেটর বাড়াই, পেছনের চাকা বাঁইবাঁই করে ঘুরে যায় বরফে স্কিড করে, বাইক আর এগোয় না। দু পায়ে ভর করে, পা দিয়ে ঠেলে এক ইঞ্চি, আধ ইঞ্চি করে একটু এদিক ওদিক করতে বাইক আবার বরফের অন্য টেক্সচার পেল, যেখানে টায়ার বসার সুযোগ পেল, বাইক এগোল। আর থামার চান্স নিলাম না, কারণ বরফে ব্রেক দাবানোটা বেশ বিপজ্জনক, এখানে চলতে হয় শুধু গিয়ারে।

    লেকে আসার মুখ পেলাম না, একটা ঘিজিমিজি বাড়ি-ওলা গ্রামের মধ্যে এসে রাস্তাটা শেষ হয়ে গেল। ওখানেই বাইকটা রেখে একটা বাচ্চা ছেলেকে জিজ্ঞেস করে এর বাড়ির গোয়াল তার বাড়ির উঠোনের মধ্যে দিয়ে নাকো লেকের সামনে এসে পৌঁছলাম।

    নাকো লেকের এমন ছবি যা দেখেছি, সেগুলো জল থাকা অবস্থায় তোলা। ফ্রোজেন লেক এমন কিছু আহামরি লাগল না, তার ওপর লেকে নামার কোনও রাস্তাই নেই, চারদিকে বাউন্ডারি লাগানো। হতে পারে লেকে পা রাখাটা “অপবিত্র” বা বিপজ্জনক কিছু। সাধারণভাবে যখন লেকে জল থাকে, তখন উল্টোদিকের পাহাড়ের ছায়া পড়ে লেকের জলে, সেটা একটা মারকাটারি দৃশ্য হয় – অনেকটা এই রকমঃ



    আর এখন যা দেখলাম, তা হল এই –




    সরু গলির এক কোণায় দাঁড় করানো ছিল বাইকটা। সেখান থেকে ঘুরিয়ে আনতে গিয়ে হাল্কা করে পা পিছলে গেল বরফে, ব্যালেন্স হারালাম, এবং বাইকটা উল্টোদিকে উলটে পড়ল। আমি ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাইকটাকে পড়ে যেতে দেখলাম।

    এবার কী করণীয়? এমনিতেই দমে কুলোচ্ছে না, এখন এই একশো কিলোর বাইককে চাগাড় দিয়ে তুলি কী করে? আশেপাশে দু চারটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই।

    মিনিট তিনেক দাঁড়িয়ে দম নিলাম, নিশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলে উল্টোদিকে গিয়ে খুব জোর করে বাইকটাকে তুলে সোজা করবার চেষ্টা করলাম। দম একেবারে আটকে যাচ্ছে, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছে, হৃদ্‌পিণ্ডটা প্রায় গলার কাছে এসে আটকে গেছে, এতটা কষ্টকর কাজ একটা শুয়ে থাকা বাইককে তুলে দাঁড় করানো? … আবার শরীরের সমস্ত জোর লাগালাম। আবার, আবার – তিন বারের চেষ্টায় বাইক সোজা হয়ে দাঁড়ালো, ঝটিতি সাইড স্ট্যান্ড দিয়ে আমি বাইকের গায়েই হেলান দিয়ে পুরো জিভ বের করে হ্যা-হ্যা করে হাঁফাতে লাগলাম।

    যতক্ষণে আবার স্বাভাবিক হতে পারলাম ততক্ষণে দিনের আলো মরে গেছে, সন্ধ্যে নেমে গেছে। এখনও একটা ছোট স্ট্রেচ পার হবার আছে, যেখানে বরফ পড়ে আছে। ধীরেসুস্থে বাইকে স্টার্ট দিলাম।

    নামতে খুব একটা কষ্ট হল না। হোমস্টে-তে পৌঁছলাম সন্ধ্যে পৌনে সাতটায়। ইউকো ব্যাঙ্কের পাশেই ছেলেটার বিশাল কিচেন, সেখানে একটা উনুনে আগুন জ্বালিয়ে বেশ কয়েকজন আগুন পোয়াচ্ছে। আমিও দলে ভিড়ে গেলাম।

    কেরালার ছেলেদুটো কাজা জয় করে এখনও ফেরে নি। কে জানে কতক্ষণে ফিরবে। বলে রাখলাম, ফিরলে যেন একবার আমার সাথে কথা বলিয়ে দেয়।

    অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনলাম। নাকো থেকে একটু এগোলেই চাংদো, আর তার পরে সুমদো বা সম্‌দো বলে একটা জায়গা আছে, যেখানে বাইক বা গাড়ি নিয়ে এন্ট্রি করতে হয় আর্মির চেকপোস্টে। এই চাংদো আর সম্‌দোর মাঝের কয়েক কিলোমিটার স্ট্রেচটা খুবই বিপজ্জনক। কালও পাথর গড়িয়ে পড়েছে ওপর থেকে – একটা মারুতি জিপসি যাচ্ছিল, বড় একটা বোল্ডার তার ওপরেই পড়েছে। পাঁচজন সওয়ারীর মধ্যে তিনজনেই একেবারে সাথে সাথে থেঁতলে গেছে। এত বড় পাথর, যে তাদের দেহ কেটে কেটে বের করতে হয়েছে, পাথর সরানো যায় নি। ড্রাইভার একেবারে বিনা আঘাতে বেঁচে গেছে, দুজনের আঘাত গুরুতর, তাদের নিচে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    আমার কাল ঐ রাস্তায় যাওয়া। দেখি, কী আছে কপালে।

    ঘরে ঢুকে দেখি, দুই মক্কেল বোতল খুলে বসেছেন।

    মাথাটা বেশ গরম হয়ে গেল। চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে আবার গিয়ে দাঁড়ালাম বরফের মধ্যে। না, এদের সঙ্গ ছাড়াতেই হবে। পোষাচ্ছে না। অ্যাপারেন্টলি এদেরও আমাকে পোষাচ্ছে না – হতেই পারে।

    ফিরে এসে ঘরে ঢোকার আগে আশেপাশের ঘরগুলো একবার চেক করে নিলাম। সবকটাই ফাঁকা, একটাতে কিছু লাগেজ রয়েছে, মনে হয় ওই কেরালিয়ান ছেলেদুটো এই ঘরেই আছে। এর মধ্যে আর কেউ আসে নি, আর কেউ নেই-ও, মানে, অন্য ঘরগুলো ফাঁকা আছে।

    আমি চুপচাপ আমাদের ঘরে ঢুকে ছোট ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পাশের অন্য একটা ঘরে ঢুকে গেলাম। এদের সাথে ঘুমনো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

    রাত নটা নাগাদ খাবার এল, গরম গরম এগ চাউমিন। ঠাণ্ডার কামড় তখন সারা গায়ে বসাতে শুরু করেছে, হাত জমে যাচ্ছে সমানে, চাউমিন খেয়ে আবার ফিরে গেলাম কিচেনে, খানিক আগুন পুইয়ে ফিরে এলাম আমার নতুন ঘরে। নিশ্বাস নিতে হাল্কা সমস্যা হচ্ছে, যা-ই করছি, মনে হচ্ছে হাঁফিয়ে যাচ্ছি। জ্যাকেটটা ছাড়লাম, খানিক হ্যা-হ্যা করে হাঁফিয়ে নিলাম, ব্যাগের চেন খুলে দু একটা জিনিস বের করলাম, ঢোকালাম, আবার হ্যা-হ্যা করে হাঁফানো, ভাঁজ করা গন্ধমাদন লেপটাকে বিছানায় ছড়াতে গিয়ে দেখি বিছানা একেবারে হিমশীতল।

    ধড়াচুড়ো পড়ে মনে গুচ্ছ সাহস সঞ্চয় করে গিয়ে লেপের তলায় ঢুকলাম। ঘুম, ঘুম, ঘুম।
  • de | ০৯ মার্চ ২০১৭ ১৯:০৫365765
  • আমার তো ফ্রোজেন লেকটাও দারুণ লাগলো। এসব জায়গায় হোমস্টে ছাড়া হোটেল জাতীয় কি কিছুই নেই?
  • সিকি | ০৯ মার্চ ২০১৭ ১৯:৩১365766
  • হোটেল আছে তো। সমস্ত বন্ধ। কারণ জলের সাপ্লাই বন্ধ। হোমস্টের সনেই ছিল গোটাতিনেক হোটেল। সব বন্ধ।
  • সিকি | ০৯ মার্চ ২০১৭ ২৩:১০365767
  • অ্যাঃ - ফ্রোজেন লেকের ছবি আসে নি। ব্যাড।



  • Manish | ১২ মার্চ ২০১৭ ১০:২৭365768
  • পড়ছি
  • সিকি | ১২ মার্চ ২০১৭ ২১:৩৫365769
  • কাল লিখব আবার। তুলে রাখলাম।
  • a | ১৫ মার্চ ২০১৭ ১১:৪৪365770
  • কই?
  • সিকি | ১৫ মার্চ ২০১৭ ১১:৫১365772
  • টাইম পাচ্ছি না।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন