এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    নজরুলের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব - পারভেজ আলম | অলংকরণ: রমিত ১ মা ফাতেমা! কোন জন্নতে আছ? দুনিয়ার পানে চাহো,প্রার্থনা করো, দূর হোক ভায়ে ভায়ে বিদ্বেষ দাহ!- “মোহররম”, (অগ্নিবীণা) কাজী নজরুল ইসলাম কাজী নজরুল ইসলামের লেখালেখিতে ধর্ম এবং আধুনিকতার যেই বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্ব দেখা যায় (যা নিয়ে আজো অনেক আলোচনা চলছে), তাকে আর বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্ব মনে হবে না, যদি আমরা নজরুলের চিন্তায় উপস্থিত থাকা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বকে (পলিটিকাল থিওলজি) আমলে নেই। নজরুল ছিলেন খুবই সহজাত একজন রাজনৈতিক ধর্মতাত্ত্বিক লেখক/ভাবুক। কিন্তু রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব বলতে কী বুঝাচ্ছি?রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব (পলিটিকাল থিওলজি) বিষয়ক সমকালীন তত্ত্বের সারকথা হলো যে আধুনিক যুগের অধিকাংশ রাজনৈতিক দার্শনিক তত্ত্ব আসলে সেকুলারাইজড ধর্মতত্ত্ব। বা বহু রাজনৈতিক দার্শনিক তত্ত্বেরই ধর্মতত্ত্বীয় পূর্বসূরী পাওয়া যাবে। যদিও রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব ধারণার এহেন সংজ্ঞায়নে কার্ল শ্মিটের ভূমিকাই সবচাইতে বেশি স্বীকৃতি পেয়ে থাকে, কিন্তু ধারণাটি তার আগে থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে। এবং কার্ল শ্মিটের সমকালীন ইহুদি মার্ক্সিস্ট দার্শনিক ও সংস্কৃতি বিচারক ওয়াল্টার বেনিয়ামিনও পলিটিকাল থিওলজি বিষয়ক সমকালীন তত্ত্ব নির্মাণে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন। জার্মান ভাষায় ধারণাটি প্রথম ব্যবহার করেন এনলাইটেনমেন্টের আমলের ইহুদি দার্শনিক সলমোন মাইমন। তিনি ধারণাটি নিয়েছেন স্পিনোজার বিখ্যাত বই পলিটিকাল থিওলজিকাল ট্রিটিজ থেকে। স্পিনোজার লেখায় পলিটিকাল থিওলজির অর্থ হলোঃ সেকুলার থিওলজি (বা পলিটিকাল ফিলোসফি)। যেহেতু তিনি পলিটিকাল এবং সেকুলার শব্দ দুইটিকে সমার্থক অর্থে ব্যবহার করেছেন। এক্ষণে স্মরণ করা যেতে পারে যে বাংলা ভাষায়ও উনবিংশ শতকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ধর্মতত্ত্ব ধারণাটির একটি সেকুলার ব্যাখ্যা (দ্বীজবর্ণের কালচার অর্থে) হাজির করেছিলেন, যেই ব্যাখ্যা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারাডাইমের ভূমিকা রেখেছে। আমি এখানে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব ধারণাটি ব্যবহার করছি মোটাদাগে ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের অনুসরণে। বেনিয়ামিন আধুনিক বিভিন্ন রাজনৈতিক তত্ত্বের ধর্মতত্ত্বীয় কাঠামোকে অস্বীকার বা গোপন করার বদলে উন্মোচন করার পক্ষপাতি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি মার্ক্সিয় তত্ত্বচর্চা ও বিশ্লেষণে পলিটিকাল থিওলজিকাল বিভিন্ন বর্গ, তত্ত্ব ও ধারণার (যেমনঃ মেসিয়ানিজম) ব্যাবহারও করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের লেখায় উপস্থিত থাকা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব বোঝার জন্যেও মাহদিবাদ (মেসিয়ানিজম) গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে। এমনিতে নজরুলের বহু কবিতাতেই একধরণের সেকুলার মাহদিবাদ উপস্থিত আছে প্রচ্ছন্নভাবে। বিশেষ করে, নজরুলের অন্যতম দুই সমাজতন্ত্রী কিতাব সর্বহারা (২৯২৬) এবং সাম্যবাদী (১৯২৫) কে মার্ক্সিয় মাহদীয় ধারার কিতাব হিসাবে পাঠ করা সম্ভব। বিশেষ করে "মানুষ" (সাম্যবাদী) অথবা "ধূমকেতু"র (অগ্নিবীণা, ১৯২২) মতো কবিতাগুলিতে নজরুলের মাহদিয় চেতনা বেশ স্পষ্ট। চব্বিশের জুলাইয়ের দিনগুলিতেও, দেবাশিসের পোস্টারের স্লোগান হিসাবে ধূমকেতু কবিতার কিছু মাহদিয় পঙক্তি গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণা জুগিয়েছিল। ২ বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই 'নবি'। কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!- কাজী নজরুল ইসলাম, "আমার কৈফিয়ত", সর্বহারা সর্বহারা (১৯২৬) নিখাদ কবিতার বই না। বইটাকে খুব সহজেই এক ধরণের সমাজতন্ত্রী মেনিফেস্টো বা অন্তত সমাজতন্ত্রী প্রোপাগান্ডা হিসাবে হিসাবে পাঠ করা যেতে পারে। বিশের দশকের নজরুল সমাজতন্ত্রী ভাবধারা প্রভাবিত বিদ্রোহী-বিপ্লবী ভাবের কবি এবং রাজনৈতিক কর্মী (একটিভিস্ট) ছিলেন। সেসময় মোল্লাদের সাথেও তিনি বড় ধরণের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কাফের ফতোয়া পেয়েছেন। আবার ফারসি শব্দ ব্যবহারের কারনে তৎকালীন হিন্দু পাঠক সমাজও তাকে নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল। "আমার কৈফিয়ত" কবিতায়, কবির ভাষায়ঃ "মৌ-লোভী যত মৌলবী আর 'মোল্-লারা কন হাত নেড়ে,'দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!ফতোয়া দিলাম-কাফের কাজী ও,যদিও শহীদ হইতে রাজি ও!'আমপারা'-পড়া হাম্বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!'হিন্দুরা ভাবে, পার্শি শব্দে কবিতা লেখে, ও পাত-নেড়ে!"আবার, কবিকুল ও সাহিত্য সমালোচকদেরকেও জবাব দিতে চেয়েছেন নজরুল, যারা হয়তো তার "অকবি"-সুলভ রাজনৈতিকতার কারনে তার কবিত্বকে খারিজ অথবা খাটো করতে চাইতেন। একটা রাজনৈতিক মেনিফেস্টো ধরণের বইয়ে "আমার কৈফিয়ত" কবিতাটি খুব সম্ভবত নজরুলের সবচাইতে ব্যক্তিগত কাব্য। অন্তত, যদি আমরা এই কবিতার বইয়ের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতার কথা মাথায় রাখি। কেননা, সর্বহারা বইটি হয়তো এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে সফল প্রোপাগান্ডাধর্মী বইগুলির একটি। বাংলাদেশের সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতির জগতে বইটির বিভিন্ন কবিতা, রূপক ও ধারণা আজো প্রচন্ড রকম প্রভাবশালী।সর্বহারা বইটিতে যদিও নজরুলের সমকালীন সমাজতন্ত্রী পজিটিভিজমের (ইতিহাস অনিবার্যভাবে সাম্যবাদী বিপ্লবের দিকে আগাইয়া যাইতেছে) ছাপ দেখা যায়, কিন্ত কবি দিনশেষে নিজেকে পজিটিভিস্ট সমাজতন্ত্রীদের থেকে আলাদা রেখেছেন বলেই মনে হয়। তিনি পরিষ্কার করেই বলেছেন যে তিনি "নবী" নন। তিনি ভবিষ্যতবাণী করছেন না। বরং তিনি "বর্তমানের কবি"। তিনি, আমাদের "বর্তমানের" কবিও বটে। ইতিহাসের অনিবার্য নিয়মে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একদিন সাম্যবাদী বিপ্লব ঘটবে, এমন ভবিষ্যতবাণী তিনি করছেন না আলোচ্য কবিতাটিতে। বরং, বর্তমানেই সাম্যবাদকে ধরে রাখতে চাচ্ছেন, সংগ্রাম ও কাব্যের মধ্যে। "আমার কৈফিয়ত" নামক আপাত ব্যক্তিগত কবিতাটিও এইদিক থেকে প্রচন্ড রাজনৈতিক, যেহেতু তা শেষ হয়েছে সর্বহারার পক্ষ থেকে প্রতিশোধের ঘোষণার মাধ্যমেঃ"পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে।মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।প্রার্থনা করো-যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!" ৩ "পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল !–মুর্খরা সব শোনোমানুষ এনেছে গ্রন্থ, – গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।" - মানুষ (সাম্যবাদী)বাংলাদেশের আধুনিকতাবাদী, সেকুলার, নাস্তিক ও বামপন্থীদের মধ্যে “মানুষ” নাম কবিতার এই দুই পঙক্তি অত্যন্ত জনপ্রিয়। নাস্তিক এবং বক-ধার্মিক, দুই পক্ষের কাছেই এই দুই লাইন নাস্তিকতাবাদী বক্তব্য হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু নজরুলের কবিতার প্রায় স্বতস্ফূর্ত রাজনৈতিক ধর্মতাত্ত্বিকতাকে আমলে নিলে এই দুই লাইনের একেবারেই ভিন্ন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কোন টেক্সট/বিধান বা এমনকি কোরানও যে নিজে থেকে কিছু বলতে পারে না, বরং মানুষকেই ব্যাখ্যার কর্তা হইতে হয় (বা মানুষই হলো জীবন্ত কোরান), এহেন ধারণা ইসলামী ঐতিহ্যে নতুন কিছু না। কিন্তু নজরুলের কবিতায় এই ধরণের চিন্তা ধর্মতত্ত্বের গন্ডি অতিক্রম করে আধুনিকতা ও সেকুলার রাজনৈতিকতার মোকামে উত্তীর্ণ হয়েছে, যা এই কবিতার আরো বহু বাক্য থেকেই স্পষ্ট। নজরুলের যেই আধুনিকতার মোকাম, বাঙালি রক্ষণশীল মুসলমানরা তাতে উঠতে পেরেছেন, তা বলা যাবে না। কিন্তু আধুনিকতাবাদীরাও তো নজরুলকে নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন। মানুষ কবিতাটিতে এমন অনেক লাইন আছে, যা তারা পাতে তুলতে রাজি নয়। যেমন, মানুষ কবিতাতে, উপরে উল্লেখিত পঙক্তিদ্বয়ের পরেই, নজরুল লিখেছেনঃ "আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদকৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর, - বিশ্বের সম্পদ।" এসব বাক্যকে বাঙলার বামপন্থীরা আধুনিকতার মোকামে (তারা মোকামটাকে যেভাবে চেনেন আর কী) প্রবেশ করতে দিতে চান না। তাই তাদের মুখস্ত দুই পঙক্তির পরেই যে এই দুইটা লাইন উপস্থিত আছে, তাও অনেকে জানেন না। এমনকি নজরুল যে আমাদের মধ্যে নবী রাসুল কিংবা কৃষ্ণ বুদ্ধদের এযুগের উত্তরসূরী হওয়ার সদা বিদ্যমান সম্ভাবনার কথা বর্ণনা করেছেন, তাও তাদের অনেকের জন্যেই অস্বস্তিকর। নজরুল হাসতে মানা করলেও, আজকালকার অনেক নাস্তিক নিচের লাইনগুলা পড়ে হাসতেও পারেনঃ "আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহকে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।হেস না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীমআমিই কি জানি কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।" উপরোক্ত পঙক্তিগুলোর মধ্যে একধরণের প্রচ্ছন্ন মাহদিয় ধর্মতত্ত্বের উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। কিন্তু এর পরের লাইনগুলিতে নজরুলের মাহদিয় তাত্ত্বিকতা বেশ স্পষ্ট ভাষাতেই উচ্চারিত হয়েছেঃ"হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?" বাংলাদেশের ইতিহাসে (হয়তো আধুনিক মুসলমানদের ইতিহাসেও), নজরুলের হাত ধরেই মাহদি, মসিহ, কল্কি ইত্যাদি নামগুলো অনাগত কোন ব্যক্তির নাম নয়, বরং এমনকিছু ধারণায় পরিণত হয়েছে, যা বর্তমানেই উপস্থিত আছে, প্রভাবক সম্ভাবনা আকারে, আমাদের সকলের দেহের মধ্যেই। এমনিতে এধরণের মাহদিয় চিন্তারও পূর্বসূরী আছে সুফিতত্ত্বের মধ্যে (যেমন মাওলানা রুমির কবিতায়)। তবে যা বললাম আর কী, নজরুল ইসলামী ধর্মতত্ত্বের বহু ধারণাকেই আধুনিকতার মোকামে উত্তীর্ণ করেছেন। মাহদিবাদের ক্ষেত্রেও তা বলা যায়। এবং আমরা আধুনিক বাংলাদেশীরা (জনগণ হিসাবে) আজো নজরুলের আধুনিকতাবাদের মোকামে উত্তীর্ণ হইতে পারি নাই। ৪ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লবী মুহুর্তে কাজী নজরুল ইসলামের বিশের দশকের কবিতার প্রভাব ও ব্যবহার দেখা যায়। সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও তা দেখা গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রাখা দেবাশিস চক্রবর্তীর কিছু পোস্টার-আর্টে নজরুলের কবিতার যেই উপস্থিতি, তা আমাদের আলোচনার জন্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের বেশ কিছু পোস্টারে দেবাশিস গণঅভ্যুত্থানের মুহূর্তটিকে উপস্থাপন করেছেন ধূমকেতুর ছবির মাধ্যমে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরাসরি নজরুলের ধূমকেতু কবিতার পঙক্তি ব্যবহার করে। এই পোস্টারগুলোর মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত খুব সম্ভবত রক্তাক্ত জুলাই (Bloody July in Bangladesh) পোস্টারটি। কারফিউ, ইন্টারনেট ব্লাকআউট, আর বর্বর হত্যাযজ্ঞের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের মানুষ সে সময়টিতে যে প্রবল শক (shock) ও শোকে আক্রান্ত হয়েছিল, তার প্রকাশ দেখা যায় এই পোস্টারটিতে। জনগণ তখন শোকার্ত, ক্ষুদ্ধ, এবং হতবিহবল। জনগণের যৌথ চেতনা ও অচেতনে উপস্থিত অব্যক্ত ভাব প্রকাশের সক্ষমতার কারনেই পোস্টারটি তখন ভাইরাল হয়েছিল। লাল রঙের এই পোস্টারটিতে আমরা এক তরুণকে তার শহীদ সহযোদ্ধার লাশ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আর তার পেছনের লাল দিগন্ত ফুড়ে খসে পড়ছে একটা ধূমকেতু। পরবর্তি কিছু পোস্টারে আমরা দেখি আসমানের দিকে ধেয়ে উঠতে থাকা এক অথবা বহু ধূমকেতুর দৃশ্য। জমিনে প্রতিবাদরত ছাত্র জনতা আর আসমানে ধেয়ে ছুটতে থাকা ধূমকেতুর এসব পোস্টার জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ইতিহাসের দিগন্ত ছাড়িয়ে উপস্থাপন করেছে এক মহাজাগতিক দিগন্তে। অথবা, বলা যায় যে, ঐতিহাসিক এবং মহাজাগতিক দিগন্ত এসব পোস্টারে একাকার হয়ে গেছে।এমনিতে নজরুলের প্রভাব দেবাশিসের উপর নতুন নয়, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পূর্বেও নজরুলের বিভিন্ন কবিতার ব্যবহার দেখা যায় তার শিল্পে। কিন্তু তার আঁকা জুলাইয়ের পোস্টারগুলি যে বিশেষভাবে নজরুলের মাহদিয় চেতনা দ্বারা প্রভাবিত, তা বেশ পরিষ্কার। নজরুলের ধূমকেতু কবিতার দুইটি পঙক্তি (“আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু, এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু”) তিনি ব্যবহার করেছেন জুলাইয়ের দুটি পোস্টারে। ধূমকেতু হলো কলিযুগের (শেষ জমানার) মাহদিয় অবতার কল্কির প্রতীক। আর মহাকালতো দেবতা শিবেরই অপর নাম, যার তাণ্ডব নৃত্যে পুরাতন দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যায়, আর নতুন দুনিয়ার সুচনা ঘটে। নজরুল ও দেবাশিস যেই মাহদিয় সত্ত্বার উপস্থাপন করেছেন, তিনি কোন অনাগত ভবিষ্যতের মাহদি/কল্কি নন। বরং যিনি ইতিহাসে বারবার ফেরত আসেন, ধূমকেতুর মতো। যিনি ধূমকেতুর মতোই ফেরত এসেছিলেন জুলাইয়ের ওয়াক্তে। কিন্তু আবার ধূমকেতুর মতোই, দ্রুতই চোখের আড়াল হয়েছেন।
    তারাদের কথা- পর্ব এক- কোটিপতির জুড়ি গাড়ি - হীরেন সিংহরায় | নামাঙ্কন: রমিতচার্লস রোলস-হেনরি রয়েস একদিকে দেওয়াল জোড়া ওক কাঠের প্যানেল, অন্যদিকে বিশাল আয়না, মেঝের কার্পেটে হাঁটু ডুবে যায়। ঘরের মাঝখানে টেবিল ঘিরে বসে আছেন সাত জন প্রবীণ ব্যক্তি। তাঁদের সামনে একটি চেয়ারে আসীন এই গাড়ি কোম্পানির চিফ ডিজাইনিং এঞ্জিনিয়ার। তিনি নবীনতম এঞ্জিনের গুণবত্তা ব্যাখ্যান শেষে বললেন, ‘আমাদের এঞ্জিনের বৈশিষ্ট্য তার নীরব নৈপুণ্য। এবার এমনকি একশো দশ মাইল স্পিডে চালালেও ঘড়ির কাঁটার টিক টিক বাদে আর কোন যান্ত্রিক শব্দ শোনা যাবে না।’ঘর জোড়া নৈঃশব্দ ভেঙ্গে পক্বকেশ এক বোর্ড ডিরেক্টর বললেন, ‘আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো গাড়ি বানাই একশো বছর ধরে, কারো শান্তি বিঘ্নিত না করে, মানুষের হাতে তৈরি ইঞ্জিন কাজ করে চলে নীরবে। ওই ঘড়ির আওয়াজটা বন্ধ করা যায় না?’গাড়ির নাম রোলস-রয়েস সেখানে কিছু বদলায় না সহজে কিন্তু এবার, একশ বছর বাদে হাতে গড়া সুইস ঘড়ির বদলে এলো ইলেক্ট্রনিক ঘড়ি সে নিখুঁত সময় দেবে নিঃশব্দে। চার্লি রোলস ও হেনরি রয়েসহেনরি রয়েসের জন্ম ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডের পিটারবরার কাছে অলওয়ালটনে। অভাবের সংসার; মা বাড়ি বাড়ি কাজ করেছেন, বাবা জেমস কল থেকে কলে কাজ খুঁজেছেন, পেয়েছেন, হারিয়েছেন। জেমস একদিন তিন মেয়েকে তাদের মায়ের কাছে রেখে ভাগ্যের সন্ধানে দুই ছেলেকে নিয়ে লন্ডন গেলেন, আটা কলে মজদুরি করলেন। হেনরি রয়েসের আট বছর বয়েস, সবে স্কুলের মুখ দেখেছে, বাবা মারা গেলেন। প্রায় অনাথ হেনরি, ক্ল্যাপহ্যাম স্টেশনের বাইরে খবর কাগজ ফিরি করে, ঠাণ্ডায় কুকুরকে জড়িয়ে ঘুমোয় কিছু উষ্ণতার সন্ধানে। এক সহৃদয়া কাকিমার অর্থ সাহায্যে গ্রেট নর্দার্ন রেলওয়েতে অ্যাপ্রেনটিসের কাজ জুটল, রাতে সিটি গিলডে অঙ্ক, ইঞ্জিনিয়ারিং শেখেন। প্রাথমিক স্কুল পাশ করেননি, কিন্তু যন্ত্রপাতি যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে। কাজ পেলেন ম্যাক্সিন- ওয়েষ্টন নামের এক ইলেকট্রিকাল সরঞ্জাম তৈরির কোম্পানিতে, সত্বর পেটেন্ট নিলেন বেয়নেট স্টাইল বালবের (যা ইংল্যান্ডে আজও চালু)। হাতে দু পয়সা এলো, বন্ধু ক্লেয়ারমন্ট এবং হেনরি মিলে মোট সত্তর পাউন্ড নিয়ে ম্যানচেস্টারে বিজলি বালব, ডায়নামো, ইলেকট্রিক ক্রেনের ব্যবসা খুললেন। তিরিশ বছর বয়েসে যে ডাইনামোর পেটেন্ট নিয়েছিলেন, তার অভাবনীয় বিক্রি থেকে এলো জীবনে প্রথম সাচ্ছল্য। অতঃপর বিয়ে এবং প্রথম গাড়ি, ফরাসি। চার চাকায় চড়ার প্রথম চমক কাটলে হেনরি লক্ষ করলেন গাড়ি যত না চলে শব্দ করে তার চেয়ে বেশি। তিতিবিরক্ত হয়ে গাড়ির কলকবজা খুলে একটি ইঞ্জিন বানালেন নিজের হাতে। এবার ট্রায়াল। ক্লেয়ারমন্ট বললে, হেনরি, গাড়ি বেশ বানালে, এ চলবে তো? হেনরি বললেন, নির্ঘাত চলবে। এই গাড়ি চালিয়ে শুক্কুরবার আমি এখান থেকে বাড়ি যাবো। পনেরো মাইল রাস্তা। এক কাজ করো এই হুলমের কুক স্ট্রিট থেকে তুমি আমার পেছনে পেছনে ওই ফরাসি দেকভিল চালিয়ে এসো। আমার গাড়ি যদি থেমে যায়, আমাকে তুলে নেবে; মনে হয় না তার প্রয়োজন হবে। অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন তখন অনেক দূরে, বিপদে পড়লে দমকল ভরসা, তারা বিপন্ন মানুষকে বড়জোর হাসপাতাল নয় বাড়ি পৌঁছে দেয়, গাড়ি সারায় না। ক্লেয়ারমন্ট অবাক হয়ে দেখলেন হেনরির গাড়ি দিব্যি পৌঁছুল নুটসফোর্ডে, বাড়ির সামনে কৌতূহলী জনতার ভিড়! হেনরির নিজের হাতে বানানো গাড়ি থেমে যায়নি। নতুন কিছু তিনি আবিষ্কার করেননি, যা পেয়েছেন তারই ওপরে খোদকারি করে বানালেন এমন গাড়ি যা চলে মসৃণ ভাবে। যে আমলে গাড়ি ছিল খাটারা, যার বিকট শব্দে পথচারী সন্ত্রস্ত হয়ে রাস্তা ছেড়ে দিতো সেই সময়ে হেনরির গাড়ি চলল, গাড়লের মতো না কেশে, লোককে জানান না দিয়ে! হেনরি আনলেন দশ হর্স পাওয়ার টু সিলিন্ডার সাইলেন্ট গাড়ি। ভবিষ্যতের রোলস-রয়েসের জন্ম হলো, সেদিন এপ্রিল ফুলস ডে, শুক্রবার, পয়লা এপ্রিল ১৯০৪। হুলমের হেনরি রয়েসকে চেনে কে? এ গাড়ি বেচবে কে? ঠিক একমাস বাদে হেনরির সহযোগী ডিরেক্টর, আরেক হেনরি (এডমানডস) একটা খবর দিলেন। বাপের বাউণ্ডুলে গোছের একটি যুবকের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে, ধন ও বিদ্যা দুইই তার প্রচুর, লন্ডনে গাড়ি বিক্রির শোরুম চালায়। ম্যানচেস্টারে আসবে শিগগির, তাকে লাঞ্চে ডাকা যাক। ব্রিটিশ এম্পায়ারের জৌলুসের দিন; পিটার স্ট্রিটে সবেমাত্র খুলেছে মিডল্যান্ড হোটেল (আজও সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, ইন্দ্রনীল ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে দেখা করতে গেলে সেখানে রাত্রিবাস করেছি)। মে মাসের চার তারিখ মিডল্যান্ড হোটেলের লাঞ্চের টেবিলে বসলেন সমাজের দুটি আলাদা পাড়ার মানুষ- কল মজুরের ছেলে চল্লিশ বছরের হেনরি রয়েস যিনি স্কুলের গণ্ডি পেরুতে পারেননি, নিজেই লিখে গেছেন পাটিগণিতটুকু (এরিথমেটিক) জানেন, স্লাইড রুল অবধি শেখেননি, দারিদ্র্যকে চিনেছেন অর্ধেক জীবন, একমাত্র হবি মেশিন। অন্যদিকে ওয়েলসের মনমাউথশায়ারের জমিদার লর্ড লিনগ্লটকের সাতাশ বছরের সন্তান চার্লস রোলস, জন্মেছেন লন্ডনের অভিজাততম পাড়া বারক্লে স্কোয়ারে, স্কুল ইটন, অতঃপর যা স্বাভাবিক, ট্রিনিটি কলেজ কেমব্রিজ; স্পোর্টসে দারুণ সফল, কেমব্রিজ হাফ ব্লু (অক্সফোরড -কেমব্রিজ ম্যাচে খেললে পুরো ব্লু), হবি হট এয়ার বেলুন চড়া, বাইসাইকেল রেসিং, মোটর রেসিং। আঠারো বছর বয়েসে প্যারিস থেকে পিউজো ফিটন গাড়ি কিনে সেটি চালিয়ে কেমব্রিজ পৌঁছে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছেন, কেমব্রিজের প্রথম স্বতসচলশকট! গাড়ি নিয়ে মেতে পড়েছেন, বাবার কাছ থেকে সাত হাজার পাউন্ড নিয়ে বন্ধু ক্লদ জনসনের সঙ্গে সি এস আর লিমিটেড নামে গাড়ির শোরুম খুলেছেন পশ্চিম লন্ডনের ফুলহ্যামে। শুধু ইউরোপিয়ান গাড়ি নয়, ব্রিটিশ গাড়িও সেখানে রাখতে চান।    প্রথম রোলস রয়েসবিশাল সামাজিক ব্যবধান সত্ত্বেও এক জায়গায় এই দুজনে মিল খুঁজে পেলেন – চোদ্দ বছর বয়েসে হেনরি ইলেকট্রিকাল যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করেছেন, একই বয়েসে চার্লস নানান মেশিন নিয়ে হাত নোংরা করেন। ঐতিহ্য মণ্ডিত ইটনে, যেখানে স্কুলের ছেলেরা ফ্রক কোট না পরে দরোজার বাইরে পা দেয় না তাঁর নাম হয়ে যায় ডারটি চার্লি। মিডল্যান্ড হোটেলে সেই সাক্ষাৎকারের কোন বিবরণী পাওয়া যায় না, কেউ নোট নেননি। হেনরি এডমানডস মোটামুটি রয়েসের দশ হর্স পাওয়ারের গাড়ির বর্ণনা দিয়ে রেখেছিলেন। লাঞ্চের সময়ে হেনরি রয়েস বলেছিলেন, আমার গাড়িটা একবার চালিয়ে দেখবেন? হোটেলের সামনে পার্ক করা আছে। এক ঘণ্টা বাদে সে গাড়ি চালিয়ে উচ্ছ্বসিত চার্লি রোলস হেনরির করমর্দন করে বললেন, শুধু টু সিলিন্ডার নয়, বানান চার, ছয় সিলিন্ডারের গাড়ি, আপনি বানাবেন, আমি বেচব।বাংলায়, আপনার কাজ আর আমার হাতযশ! বাকিটা ইতিহাস। হেনরির প্রথম ড্রাইভের ঠিক দু বছর বাদে আড়াই লক্ষ পাউন্ড মূলধন নিয়ে পনেরোই মার্চ ১৯০৬, লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটের লাগোয়া ১৪-১৫ কনডুইট স্ট্রিটে যে কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হল তার নাম রোলস-রয়েস লিমিটেড (আলফাবেট অনুযায়ী রোলস আসে রয়েসের আগে!)। চার্লসের বন্ধু ক্লদ জনসনের নাম কাটা গেলো; চার্লস বললেন রোলস-রয়েস-জনসন বড়ো খটমটো।মহাযজ্ঞে উপেক্ষিত ক্ষুণ্ণ হয়েও জনসন ঠাট্টা করে বলেছেন, আমি রয়ে গেলাম রোলস আর রয়েসের মাঝখানে, হাইফেনে! দু বছর বাদে চল্লিশ হর্স পাওয়ারের নতুন রোলস রয়েসের বিজ্ঞাপনে মাস্টার সেলসম্যান ক্লদ জনসন ট্যাগ লাইন লিখলেন – ‘সিক্স সিলিন্ডার রোলস-রয়েস - নট ওয়ান অফ দি বেস্ট বাট দি বেস্ট কার ইন দি ওয়ার্ল্ড’। এই লাইনটি টিকে গেল। চার্লি রোলস এক জায়গায় থিতু হবার মানুষ নন। আটলান্টিকের অন্য তীরে রাইট ভাইয়েরা প্লেন উড়িয়েছেন কয়েক বছর আগে। এবার তাঁরা ইউরোপে এলেন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হাওয়াই জাহাজ বিক্রি করতে। ট্রায়াল ফ্লাইটে উঠে কয়েক মাইল উড়েই রোলস বললেন, এই খেলনাটি তাঁর চাই! কিনলেন কিন্তু বছর খানেক বাদে বোর্নমাউথে এক উড়ানে সে প্লেন ভেঙ্গে পড়লে প্রাণ হারালেন দুঃসাহসী অস্থির চার্লস রোলস। তাঁর বয়েস মাত্র তেত্রিশ। চার্লি রোলসের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠলে হেনরি রয়েস প্রথমত এই উড়োজাহাজের ইঞ্জিনটাকে বুঝতে চাইলেন। একদিন যেমন তিনি ফরাসি দেকভিল গাড়ির বনেট খুলে ফেলে তাঁর মনের মতন করে নতুন ইঞ্জিন বানিয়েছিলেন তেমনই এবার ফরাসি রেনো কোম্পানির (রাইট ভাইয়েদের লাইসেন্স নিয়ে তাঁরা ইউরোপে কাজ করেছেন) ভি এইট ইঞ্জিন খুলে ফেলে তৈরি করলেন ঈগল ভি ১২! প্রথম মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তির অর্ধেক এয়ার পাওয়ার সরবরাহ করেছে রোলস রয়েস অ্যারো ইঞ্জিন, ক্রমশ এলো জেট ইঞ্জিন! আজ আপনি এয়ার বাস, বোইং, ড্রিমলাইনার যে কোন হাওয়াই জাহাজেই যখন উড়বেন, জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখুন তো কোথাও RR লেখা চোখে পড়ে কিনা! তখন মনে করবেন ফ্রেডেরিক হেনরি রয়েসকে। অদম্য উৎসাহে অক্লান্ত পরিশ্রমে হেনরি বানাচ্ছেন গাড়ি, অ্যারো ইঞ্জিন (যা একদিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আকাশে ওড়াবে বোমারু জাহাজ), একদিন তাঁর শরীর এমন ভেঙ্গে পড়ল যে ডাক্তাররা, কোম্পানি ডিরেক্টররা বললেন খবরদার, কারখানার একশো মাইলের মধ্যে পা দিলেই আপনার নির্ঘাত মৃত্যু। তাদের আদেশ মেনে নিয়ে হেনরি পরের বিশ বছর তিনজন ডিজাইনার দু জন সেক্রেটারি নিয়ে নির্বাসনে গেলেন- শীতকালে ফ্রান্সের সাঁ ত্রপের ভিলা লা মিমোসা, গ্রীষ্মকালে সাসেক্সে উইটারিঙ্গের বাড়িতে। ই মেল, ফেসবুক, জুম কল ছিলো না। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় ফরাসি ও ব্রিটিশ ডাকের ভরসায় তিনি তাঁর গাড়ি ও অ্যারো এঞ্জিনের ব্যবসা চালালেন কয়েকশ মাইল দূরে বসে। নিখুঁত ভাবে বলে দিতেন কোন মেশিন কোথায় বসবে। পরে তাঁর চিঠিগুলি একত্র করে ৩০১ পাতার একটি বাঁধানো ভলিউম তৈরি হয়, যার মাত্র ছটি কপির অস্তিত্ব জানা গেছে। তালা চাবি দিয়ে গোপন দেরাজে বন্ধ থাকে, এর নাম কোম্পানি বাইবেল। প্রয়োজনে মাত্র কয়েকজন নির্দিষ্ট ডিরেক্টর সেটি খুলতে পারেন। ১৯১৮ সালে হেনরি ও বি ই (অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার) খেতাব পেয়েছিলেন, ১৯৩০ সালে সালে রাজা পঞ্চম জর্জ তাঁকে নাইটহুড প্রদান করেন। সত্তর বছর বয়েসে তিনি যখন মারা যান ততদিনে ফ্র্যাঙ্ক হুইটল জেট এঞ্জিনের পেটেন্ট নিয়ে ফেলেছেন। এদের দুজনের মধ্যে কতটা যোগাযোগ ছিল তার সরকারি তথ্য মেলে না তবে পরের কয়েক বছরের মধ্যে রোলস- রয়েসের অ্যারো ইঞ্জিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নির্ণয়ে সাহায্য করবে। রোলস রয়েস  ফ্যান্টমসিটি ব্যাঙ্ক লন্ডনে রোলস-রয়েস রিলেশনশিপ ম্যানেজার ক্রিস কথা প্রসঙ্গে একদিন বললেন আমাদের সিনিয়র আমেরিকান কলিগরা রোলস-রয়েসের অফিস ভিজিটে গেলে প্রশ্ন করেন আপনাদের গাড়ি কেমন বিক্রি হচ্ছে! তাঁরা এখনো মনে করেন রোলস -রয়েস শুধু গাড়ি বানায়! তখনই, সেই আটের দশকে তাদের বার্ষিক আয়ের মাত্র দশ শতাংশ আসে গাড়ি বিক্রি থেকে (আজ পাঁচ শতাংশের কম), বাকিটা অ্যারো ইঞ্জিন থেকে। আরেক বড়ো আয় আফটার সেলস সার্ভিস, দুনিয়ার হাজারটা এয়ারপোর্টে রোলস রয়েসের সেবক আপনার সুরক্ষার জন্য হাজির। ক্রিসের কাছেই শুনেছি আরেক গল্প -তিনি বলেছিলেন আমরা তো সিটি ব্যাঙ্কে কামরাদেরির খুব বড়াই করি, রোলস-রয়েসে সেটা চোখে দেখি, কানে শুনি। অফিসার, স্টাফ যে যত উঁচু পদেই থাকুন না কেন, তাঁদের পরিচয় কেবলমাত্র নাম ও পদবির আদ্যক্ষর দিয়ে। ক্রিসের সময়ে হেড ডিজাইনার ছিলেন গ্রাহাম হাল, তাঁর বস ফ্রিতস ফেলার- কোম্পানির আরদালি থেকে শোফার, কারখানার ফিটার, যে কেউ তাঁদের সম্বোধন করতেন জি এইচ বা এফ এফ বলে, তার আগে সার তো নয়ই, এমনকি মিস্টারও বাদ। একমাত্র প্রয়াত হেনরি রয়েসের পরিচয় এক অক্ষরে, শুধুই আর! আই বি এমে সাদা শার্ট ডার্ক সুট পরার কড়াকড়ি চালু করেছিলেন টম ওয়াটসন। হেনরি রয়েস সবাইকে সমান করে দিয়েছিলেন এই আদ্যক্ষর নাম চালু করে! ধরা যাক কেউ হয়তো নাইটহুড পেলেন, অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার খেতাব পেলেন তখন তাঁদের সহকর্মীরা যারা একই সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছেন একই পাবে বিয়ার পান করেছেন তাঁদের কি সার উইলিয়াম বা হনরেবল ট্রেভর বলতে হবে? ইনিশিয়াল দিয়ে ডাকলে সে ঝামেলা নেই। স্টেট ব্যাঙ্ক ইন্ডিয়াতে বিপরীত দৃষ্টান্ত দেখেছি। ২০০৮ সালে আমাদের উনিশশ বাহাত্তরের প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের ওমি (ওম প্রকাশ ভাট) ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান হলো। পরের বছর তার মেয়ের বিয়েতে গেছি। ওমির অফিশিয়াল বসত, মালাবার হিলসের সবচেয়ে মূল্যবান ভুখণ্ড, বিশাল প্রাঙ্গণ নিয়ে ‘ডানেডিন’। স্কটিশ ব্যাঙ্কারদের স্মৃতি! সেখানে আমাদের ব্যাচের অনেকে হাজির যেমন শ্রীধর (আমরা একসঙ্গে ফ্রাঙ্কফুর্টে তিন বছর কাজ করেছি, পরে সে এস বি আইয়ের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়েছে); অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমাদের ব্যাচের শ্রীধর, ভারতী রাও, দেবজ্যোতি রায় সবাই ওমিকে সার বলছে! আমার চোখে বিস্ময় দেখে শ্রীধর আমাকে আড়ালে ডেকে বললে, প্রশ্ন করো না, এটাই দস্তুর। কারো পদমর্যাদা বেড়ে গেলে সেই অনুযায়ী অ্যাড্রেস করতে হবে, ভুলে যাও কবে তার সঙ্গে কোন পাবে গিয়ে মদ্যপান করেছ, কোন নষ্টামি করেছ। আরেক ধাপ এগিয়ে বলল, কেন, পোপের নির্বাচনী পরীক্ষায় সব কার্ডিনাল একত্র বসেন, তার মধ্যেই তো যে জন পোপ হবেন, তিনি সবার বস! দূর থেকে উদ্ভ্রান্তের মতো সঞ্চরণরত কন্যা কর্তা ওমিকে দেখে পোপের সঙ্গে তার সাদৃশ্য খোঁজবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি! ভেবেছি তার ড্রাইভার গাড়ির দরোজা খুলে দিয়ে কোনদিন কি বলতে পারবে, গুড মর্নিং, ও বি? জুড়ি গাড়ির যাত্রা কলকাতার ভিনটেজ কার র‍্যালিতে কখনো হাজিরা দিইনি, গেলে নিশ্চয় রোলস- রয়েস দেখতে পেতাম। সাতের দশকে লাইটহাউসে ইয়েলো রোলস-রয়েস ছবিটি দেখেছিলাম। কচি লেবু রঙের গাড়িটির মালিক বদলায়, তেমনই তিন বার বদলায় গল্পের মোড়; রেক্স হ্যারিসন, শারলি ম্যাকলেন, ওমর শরিফ, জিন মরো, ইনগ্রিড বের্গমান, আলাঁ দেলঁ মিলে একেবারে অল স্টার কাস্ট। কিন্তু ছবির শেষে মনে হবে গল্পের আসল হিরো, একটি রোলস-রয়েস, ১৯৩১ সালের ফ্যানটম টু! জার্মানিতে আমার প্রথম গাড়ি সাত বছরের পুরনো ফিয়াট মিরাফিওরি, কিনেছিলাম নগদ কড়কড়ে পাঁচশ মার্ক দিয়ে - আমাদের হিসেবে, শুনলে বিশ্বাস হবে না, তিন হাজার টাকা। তার ডিকি বন্ধ করতে হতো লকের জায়গায় একটা লোহার তার ঢুকিয়ে। কারো বাড়িতে গেলে সেই চলতি-কা-নাম গাড়িকে যতটা সম্ভব দূরে পার্ক করতাম। একদিন হেসেনের রাজধানী ভিজবাদেনের একটি পেট্রল পাম্পে গাড়িতে তেল ভরছি, পাশে এসে প্রায় নিঃশব্দে দাঁড়াল রাজ হংসের মতন সাদা রোলস রয়েস। এতো বড়ো গাড়ি কখনো চোখে দেখিনি, তখন ফোন ক্যামেরা থাকলে ধনী ও দরিদ্রের এ হেন সহাবস্থানের ছবিটি তুলে রাখা যেতো! চালক নিজেই নেমে এসে তেলের নল লাগিয়েছেন; বোকার মতন বলে ফেললাম কি সুন্দর গাড়ি! আচ্ছা এক লিটারে এ গাড়ি কতটা চলে? অসম্ভব পরিশীলিত উচ্চারণে সুবেশ মধ্য বয়স্ক জার্মান ভদ্রলোক মাথাটি কিঞ্চিৎ ঝুঁকিয়ে বললেন, ধন্যবাদ, দুনিয়ার সেরা গাড়ি। তেল কত খায় কে জানে। (ডের বেস্টে ভাগেন ডের ভেলট! হোয়ের পাসট আউফ ডেন বেনজিন ফেরব্রাউখ)? সিটি ব্যাঙ্ক লন্ডনে গাড়ি তিরিশ হাজার মাইল চলে অথবা তিন বছর বাদে নতুন গাড়ি পাওয়া যেতো। প্রথম বাহন ছিল ভলভো। বেতন ও গ্রেডের মনসবদারি বাড়লে মার্সিডিজ ২২০ অর্ডার করেছি। একদিন ফোন এলো তাদের স্টুটগার্ট অফিস থেকে। এ মাসের শেষ মঙ্গলবার গাড়িটি নিকটবর্তী জিনডেলফিঙ্গেনের কারখানায় তৈরি হবে, ইচ্ছে করলে সেদিনটা তাদের কারখানায় সেই গাড়ির নির্মাণ পর্ব নিরীক্ষণ করতে পারি, গাড়ির ফিজিকাল ডেলিভারি অবশ্য হবে তিন সপ্তাহ বাদে। গাড়ি দিচ্ছে তাই যথেষ্ট, ব্যাঙ্ক আমাকে স্টুটগার্ট আসা যাওয়ার খরচা দেবে না, ছুটি তো নয়ই। ধন্যবাদ সহকারে এই আমন্ত্রণ প্রত্যখ্যান করতে হল।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রোলস রয়েসের যে কোন মডেল, ফ্ল্যাগশিপ গাড়ি ফ্যানটম, ঘোস্ট, কালিনান (এসইউভি), ডন (কনভারটিবল) তৈরি হতে ছ মাস লাগে। ক্রেতা অনেক কিছুই কাস্টমাইজ করে নিতে পারেন, যেমন তাঁর অভিরুচি। তাতে সময় ও ব্যয় দুটি বাড়ে, তবে এ গাড়ির ক্রেতারা পাই পয়সা গোনেন না। গাড়ির ভেতরটি মুড়ে দেবার জন্য বরোদার গায়েকওয়াড় পাঠিয়েছিলেন বিশেষ সিল্ক, রানি তাঁর প্রিয় লিপস্টিক, যেটি হবে গাড়ির ইনটেরিয়র কালার। রোলস রয়েস এর ড্যাশবোর্ডযে কোন মডেল কিনলে পাবেন চার বছরের আনলিমিটেড ওয়ার‍্যান্টি, মাইলেজ যাই হোক। গড়ে পনেরো বছর অথবা ১,৫০,০০০ মাইল এ গাড়ি চলে কোন রিপেয়ার ছাড়াই। দশ সিলিন্ডার, ৫২০ থেকে ৬৫০ হর্স পাওয়ার সম্বলিত আড়াই হাজার কিলোগ্রাম ওজনের গাড়িকে তার সাসপেনশন ক্ষমতা পরীক্ষার জন্য চল্লিশ মাইল চালানো হয় রোলারের ওপরে, মেঠো গ্রাম্য পথে দেড়শ মাইল, তাকে ঝাঁকানো হয় অজস্রবার, বিশাল কৃত্রিম জল ধারার নিচে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় সারা দিন, ভেতরে যেন কণামাত্র জল না ঢোকে তা চেক করার জন্য, ডাস্ট ফ্রি চেম্বারে ছ সপ্তাহ ধরে গাড়ির ওপরে পাঁচ প্রস্থ রঙের পোঁচ পড়ে। অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচাটি দেড় সপ্তাহ। অটোমেটিক রিগ দিয়ে গাড়ির দরোজা এক লক্ষ বার খোলা বন্ধ করে দেখা হয় সেটি নিঃশব্দে সাধিত হচ্ছে কিনা। মোট টেস্টের সংখ্যা আঠানব্বুই। দুনিয়ার নব্বুই শতাংশ গাড়ি বানাতে গড়ে তেরো ঘণ্টা লাগে (ইনটেরিওরের কাজ বাদে)। খুঁতওলা রোলস-রয়েস হয় না। হেনরি রয়েস একবার বলেছিলেন, তেমন গাড়ি যদি ভুল ক্রমে তৈরি হয়েও থাকে, আমাদের দরোয়ান তাকে ফ্যাক্টরি থেকে বেরুনোর অনুমতি দেবে না, দরজায় আটকে দেবে! তবু দৈবের বশে গাড়ি যদি কোথাও থেমে যায়, অকুস্থলে প্রয়োজনে হাওয়াই জাহাজে মিস্ত্রী পাঠানো হতো মেরামতির জন্য (এখন কাছাকাছি সার্ভিস সেন্টার হতে মেকানিক আসেন)। হেনরি রয়েস এবং তাঁর সাথিরা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার; তাঁরা জানতেন যন্ত্রই আসল চালক, গাড়ির ভেতরে আসনের আবরণ লাগানো দরজির কাজ, ড্যাশবোর্ড বানাবে ছুতোর মিস্ত্রী। পরে দেখা গেলো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান এ গাড়ি যারা কিনবেন তাঁরা চাইলেন এর অভ্যন্তরকে নিজের মনের মতন করে সাজিয়ে নিতে। আজ যে কোন ক্রেতা বেছে নিতে পারেন কোনো গদির রং, লিনেন, আভ্যন্তরীণ কালার কম্বিনেশন, রিভলভিং বার, ফ্রিজ, ল্যাপটপের খোপ, ছাতা রাখা ও বের করার ইলেক্ট্রনিক ব্যবস্থা। তবে একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত আছে – ড্যাশবোর্ড, গাড়ির দরজার প্যানেলিং আখরোট কাঠের হতে হবে এবং সেটি কাটা হবে একটিমাত্র গাছের গুঁড়ি থেকে। আজ যে কোন গাড়িতে সতেরো সপ্তাহ লাগে রোলস রয়েসের ইনটেরিয়র সাজাতে। সিটে বসলে মাথার ওপরে যে কৃত্রিম আকাশ দেখেন, তার অঙ্গদকে তারায় তারায় খচিত করা, প্রতিটি আলো বসানো হয় ছুঁচ দিয়ে, যাবতীয় সেলাইয়ের কাজে ছ থেকে আট সপ্তাহ লাগে। ডাক্তার যেমন স্টেথোস্কোপ দিয়ে রুগী দেখেন, রোলস–রয়েসের দরজি, ছুতোর মিস্ত্রী গাড়িকে তেমনই সযত্নে বধু বেশে সাজান। ক্রেতার সকল আবদার বায়নাকে সমান আদর ও প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন রোলস-রয়েস। রোলস-রয়েস ও কোয়ালিটি সমার্থক। ‘আমরা রোলস-রয়েস সার্ভিস দিয়ে থাকি’ এই বাক্যবন্ধ আজ ইংরেজি ভাষার অঙ্গ। লা রোজা নোয়া ড্রপ টেলপ্রথম গাড়িটির দাম ছিল ৩৭৫ পাউন্ড, আজকের মাপে ষাট হাজার পাউন্ড। বর্তমান ফ্যানটম সিরিজের দাম শুরু হয় পাঁচ লক্ষ পাউন্ড থেকে, সবচেয়ে দামী গাড়ির নাম লা রোজ নোয়া (কালো গোলাপ) ড্রপ টেল, মূল্য তিন কোটি ডলার, কোন রইস আদমি সেটি অর্ডার করলে তবেই বানানো হয়, শো রুমে সাজানো থাকে না। গাড়ির মালিকের নাম ঠিকানা এক প্রাইভেট ইনফরমেশন, তবে যতদূর জানা যায় এ অবধি চারটে লা রোজ নোয়া বিক্রি হয়েছে, একটির মালিকের নাম গায়িকা বিওন্স। নিতান্ত হাঘরে ক্রেতাদের জন্য আছে এন্ট্রি লেভেল রোলস, ঘোস্ট সিরিজ, দাম মাত্র তিন লক্ষ পাউন্ড বা প্রায় চার কোটি টাকা। ট্যাক্সের কারণে ভারতবর্ষে সে গাড়ির দাম ডবল হয়ে যায় কিন্তু আজকের কোনো নুভো রিশের কাছে সে টাকা খোলামকুচি মাত্র। ফিল্ম স্টার কাজল তাঁর পতিদেব অজয় দেভগনের সঙ্গে সাত কোটি টাকার ঘোস্ট চড়েন। হংকং এই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ নয় কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে সেখানকার মানুষ রোলস-রয়েসের পুজো করেন! মাথা পিছু সবচেয়ে বেশি রোলস-রয়েস আছে সেখানে (জনসংখ্যা ৭০ লক্ষ, রোলস-রয়েস ১১০০)। সব মডেল মিলিয়ে বছরে কুড়ি লক্ষ নতুন মার্সিডিজ পথে নামে, এমনকি তাদের সবচেয়ে মহার্ঘ্য ব্র্যান্ড মাইবাখের বার্ষিক বিক্রির সংখ্যা বারো হাজার! ইংল্যান্ডের পথে দেখিনি, গত বছর যুবভারতীতে মোহনবাগানের খেলা দেখতে গিয়ে একটা মাইবাখ চোখে পড়ল; আমার স্কুলের ছেলে আর পি জির জাঁদরেল অফিসার প্রসেনজিত জানালে সেটি সঞ্জীব গোয়েঙ্কার ব্যক্তিগত শকট। ছ’হাজারের বেশি রোলস-রয়েস গুডউড ফ্যাক্টরির দরজা দিয়ে কোনো বছরে বেরোয় না। হেনরির মন্ত্র ছিল, এখনও সেটি মানা হয় - এ গাড়ির গৌরব তার নিপুণতায়, সেলস ফিগারে নয়। সেই প্রথম দিন থেকে যতগুলি রোলস-রয়েস গাড়ি পথে নেমেছে, তার ষাট শতাংশ এখনো চলার যোগ্য।মনে আছে জার্মানিতে ফেরারি ডয়েচল্যান্ডের অফিসে ব্যবসার আলোচনার সময়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রতি বছর গাড়ির সেলস বাড়ানোর চাপ আসে না মারানেলোর হেড অফিস থেকে? তিনি বলেছিলেন, তাঁর গাড়ির বিক্রি কম রাখাটাই তাঁর জব টার্গেট। ফেরারি দেয় মর্যাদা প্রেস্টিজ, অটোবানে ধাবিত হবার স্বাধীনতা। ফেরারি বিরল ব্র্যান্ড, সুপার মার্কেটে শপিং করার জন্য নয়। জার্মানিতে এক বছরে আটশো ফেরারি গাড়ি বিক্রির অনুমতি ছিলো (১৯৯১)। আজ সারা দুনিয়ায় বছরে তেরো হাজারের বেশি নতুন গাড়ি রিলিজ করা হয় না, অধিক ফেরারিতে বাজার নষ্ট; যেমন হীরের বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রেখে দে বেয়ারস তার দাম উঁচু জায়গায় বেঁধে রাখেন। জুড়ি গাড়ির আস্তাবল রোলস রয়েস কেবল বাহন নয়। চার্লি রোলস বলেছিলেন, এ গাড়ি হবে ঐশ্বর্য, বিলাস এবং সম্ভ্রমের সমার্থক, অ্যান্ড সামথিং ব্রিটিশ!আজ রোলস-রয়েস ব্র্যান্ডের মালিক জার্মান বি এম ডব্লিউ (বায়ারিশে মোটরেন ভেরকে), সিইও তুরস্কের মানুষ, কিন্তু তারা সেই ব্রিটিশনেস অক্ষুণ্ণ রেখেছে। রোলস রয়েসের সৃষ্টির প্রথম তিন দশকে তার ক্রেতা ও পৃষ্ঠ পোষক ছিলেন রাজন্যবর্গ। ব্রিটেনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ জর্জ থেকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন সকলেই ছিলেন রোলস রয়েসের পৃষ্ঠপোষক – শোনা যায় তাঁর গাড়ি তৈরির অগ্রগতি দেখার জন্য শিশুর মতন কৌতূহলে লুই মাউন্টব্যাটেন নিয়মিত হাজিরা দিতেন কারখানায়। ১৯১০ সালে জার নিকোলাস দুটি সেভেন সিটার অর্ডার করেন যার আপহোলস্টারি ছিল আগাগোড়া সিল্কের। জাপানের বর্তমান সম্রাটের প্রপিতামহ ইওশিহিতোর গাড়ির রং ছিল চেরি-রেড, দুই দরোজায় ওপরে সোনার জলে আঁকা চন্দ্রমল্লিকা। শ্যাম দেশের (থাইল্যান্ড) রাজা চতুর্থ রামার গাড়ি ছিল সম্পূর্ণ ক্রোমিয়াম প্লেটেড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের বিরুদ্ধে সিনাই পেনিনসুলাতে গেরিলা লড়াই চালানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার দুটি রোলস রয়েস গাড়ি ‘লোন’ দিয়েছিলেন অতি সাধারণ ঘরের এক মানুষ টমাস এডওয়ার্ড লরেন্সকে। যুদ্ধ জেতার পরে লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া একদিন বন্ধু লাওয়েল টমাসকে বলেন, জানো, অনেক টাকা থাকলে কিনতাম একটা রোলস রয়েস গাড়ি, অনেকগুলো টায়ার আর সারা জীবন চালানোর জন্য জরুরি তেল। মাত্র এক বছর পরে ডরসেটে মোটর বাইক অ্যাক্সিডেন্টে তিনি মারা যান। মিশরের শেষ ‘ফারাও’ রাজা ফারুকের একটি রোলস কালেকশন ছিল আলেকজান্দ্রিয়াতে। ব্রুনেইয়ের বর্তমান সুলতান হাসান আল বোলকিয়া হয়তো আরব্য রজনীর শেষ খলিফা – তাঁর আস্তাবলে পাঁচশোর বেশি রোলস রয়েস শোভা পায়। একদিন রাজন্যবর্গের স্থান নিলেন শিল্পপতি, রাষ্ট্রনেতা, ফিল্ম, স্পোর্ট সেলিব্রিটি - জন পিয়েরপন্ট মরগান, ভ্যানডেরবিলট পরিবার, ইওসেপ ব্রজ টিটো, সোভিয়েত ইউনিয়নের আনাস্তাস মিকোয়ান, ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস, এলভিস প্রেসলি, আদানি, আম্বানি, জেনিফার লোপেজ, ডেভিড বেকহ্যাম, শাকিল ও’নিল, সাইমন কাওল এবং আরও অনেকে। ঐতিহ্যের নাম রোলস-রয়েস, সেখানে সহজে কিছু বদলায় না কিন্তু তাদের নিজেদের তথ্য অনুযায়ী, একশ বছর আগে মাত্র পাঁচ শতাংশ মালিক নিজে গাড়ি চালাতেন, আজ মাত্র পাঁচ শতাংশ গাড়ি শোফার ড্রিভন। রোলস-রয়েসের প্রথম চার দশকের ইতিহাসের সঙ্গে আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে ভারতীয় রাজাদের গল্প। হায়দ্রাবাদের সপ্তম নিজামের আস্তাবলে ছিল পঞ্চাশটি রোলস রয়েস; তাঁর প্রিয় গাড়িটির বডি রূপোর, পেছনের সিটটি সিংহাসনের মতন, সেটিকে ফ্ল্যাট করলে হয়ে যেত আরামদায়ক শয্যা। চল্লিশ বছরে গাড়িটি চলেছিল মোট চারশ মাইল। পাতিয়ালার মহারাজা একদা একসঙ্গে পাঁচটি রোলস অর্ডার করেন, সব সমেত তাঁর আস্তাবলে ছিল ৩৫টি। নিয়মিত ব্যবহারের গাড়িতে গোল্ড প্লেটেড ড্যাশ বোর্ড, বিশেষ সুইস ঘড়ি, মেডিসিন এবং পানীয় গেলাসের চেস্ট। শিকারের সময়ে দাঁড়িয়ে বন্দুক চালানোর জন্য রোলস-রয়েস বানিয়ে ছিলেন হুড খোলা, ফ্লাড লাইট লাগানো একটি বিশেষ গাড়ি। আরেক মহারাজা হাতির দাঁত সরবরাহ করেছিলেন তাঁর গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের জন্য। রাজ মহিষীদের ঝরোখার আড়াল থেকে বাইরের দুনিয়া দেখার সুবিধেও করে দিয়েছিল রোলস-রয়েস, প্রথম ফ্রস্টেড গ্লাস উইন্ডো! আমাদের সময়কার কারো মনে থাকতে পারে বহু বছর আগে, আজকের সানডে সাসপেন্সের মতন গল্প পাঠের আসর বসতো বিবিসিতে। সায়েদ জাফরির কণ্ঠে শোনা একটি গল্প এই প্রসঙ্গে আজ মনে পড়ছে (লেখকের নাম মনে নেই বলে দুঃখিত) –প্রিভি পার্স বাতিল হয়ে গেছে। এক ভারতীয় মহারাজার সংসারে আর্থিক দুর্দিন ঘনায়িত; লন্ডন টাইমসে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন - ফ্যানটম, রেথ মিলিয়ে ছটি রোলস রয়েস বিক্রি করবেন, তাঁর একান্ত অভিলাষ ক্রেতা তাঁর গাড়িগুলিকে ভালবাসবেন, তাদের সম্যক পরিচর্যা করবেন। লিভারপুলের এক ধনী ব্যবসায়ীর প্রতিনিধি এলেন; ইংরেজ এজেন্ট দরাদরি করলেন না। সেটা মহারাজাকেও মানায় না। গ্যারাজের দেউড়িতে দাঁড়িয়ে মহারাজা তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় গাড়িগুলির দিকে করুণ চোখে চেয়ে লন্ডনের এজেন্টকে জিজ্ঞেস করলেন, একটা কথা জানা হয়নি। আপনার প্রভু এই গাড়িগুলি নিয়ে কি করবেন?এজেন্ট একটু অবাক হয়ে বললেন, আই অ্যাম সিওর হি উইল ড্রাইভ দেম, ইওর ম্যাজেস্টি! মহারাজা বিষণ্ণ মুখে বললেন, হাউ স্যাড। পরিশিষ্ট উঠোনে রোলস রয়েসব্যাঙ্কের কাজ চুকলে অখণ্ড অবসর কাটানোর জন্য একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং বুটিকের ভার নিয়েছি। অফিস ছোট ক্ষতি নেই, সিইও আখ্যা জুটল। এক পুরনো বন্ধু, লন্ডন ফরফাইটিং এর টোনি নাইটের ছেলে ক্রিস তখন আমার অফিসের সব কাজের কাজি। একদিন দরোজায় উদিত হয়ে বললে, মুশকিলে পড়া গেছে বস। দুবাইতে আমাদের এক সহযোগী সংস্থার মালিক একটা রোলস-রয়েস কিনেছেন; তার এক্সপোর্ট ডকুমেন্ট বানাতে সময় লাগছে। তাঁদের অনুরোধ আমরা গাড়িটির সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। একে আমাদের অফিসের ছাদে বা কোন পার্ক হাউসে তুলে দেওয়া যায় না। আপনার বাংলোয় বড়ো ড্রাইভ আছে, সেখানে যদি কিছুদিনের জন্য রাখেন!ক্রিসকে বলতে হল আমার মতো সামান্য মানুষের দুয়োরে রোলস-রয়েস দাঁড়িয়ে থাকলে সারে পুলিস এমনকি এমআইফাইভের নজর পড়তে পারি, পাড়া প্রতিবেশীর তির্যক দৃষ্টির কথা বাদই দিলাম। বউকে বোঝাতে হবে আমার চাকরিতে হঠাৎ উন্নতি হয়নি এবং এটি চোরি কা মাল নয়! ক্রিস বললে গাড়ির দলিল এবং পারচেজ ডকুমেন্ট রাখুন না!তবে যতদূর জানি এই রোলস- রয়েসে অনেক কাজ করানোর আছে, সেটা নতুন মালিক দুবাইতে করাবেন।লম্বা গল্পকে ছোট করে বলি, উপরোধে ঢেঁকি গিলতে হয়েছিল। গাড়িটি এলো আরেক পেল্লায় গাড়িতে চড়ে কারণ এটি অযান্ত্রিক, চলার অবস্থায় নেই। অবাক হয়ে দেখলাম চল্লিশ বছর আগে জার্মানির ভিজবাদেনে আমার প্রথম দেখা সাদা রাজহংসের মতন! তবে ভেতরে ও বাইরে কাজ বাকি। এ গাড়ি চালানোর প্রশ্ন ওঠে না আমার ইনসিউরেন্স নেই। সাদা রাজহংসটি তার গভীর চলা গোপন রেখে আমাদের উঠোনে রয়ে গেল। আমাদের মালি ইয়ান ময়েস অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে একদিন বললে, এভাবে শুধু লক করে এ গাড়ি ড্রাইভে ফেলে রাখাটা কোন কাজের কথা নয়, একটা এক্সট্রা অ্যালার্ম লাগাবেন!মাস দুয়েক গাড়িটি আমাদের ড্রাইভের শোভা বর্ধন করেছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই অভ্যাগতকে (এমনকি আমার স্কুলের সহপাঠী চিন্ময়কে) বলেছি, ও গাড়ি আমাদের নয়! কে কতটা বিশ্বাস করেছে জানি না। বাড়িতে রোলস-রয়েস আছে এই গপ্প বাজারে ছেড়ো না এমন ওয়ার্নিং দেওয়া সত্ত্বেও আমার মেয়েরা মহা উৎসাহে গাড়িতে বসে নিজেদের ছবি তুলে নিয়ে পাঠিয়েছে একদিন।  সেই রোলস রয়েসে আমার মেয়েকৌতূহলী পাঠকের জন্য পিটার পিউ - দি ম্যাজিক অফ এ নেম আরভিং ওয়ালেস - দি সানডে জেনটলম্যান মিটিংস দ্যাট মেড হিস্টরি - অ্যান্ডমিটিংস.কম  
  • হরিদাস পালেরা...
    শুধু, একমুঠো নুনের জন্য ...... - Somnath mukhopadhyay | শুধু, এক মুঠো নুনের জন্য ..…… বছর কয়েক আগের কথা। হাওড়া থেকে চলতে শুরু করা আমাদের যন্ত্র শকটটি ইস্পাতের বাঁধা পথ ধরে গড়াতে গড়াতে একেবারে ভোররাতে এসে থেমেছে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে। সঙ্গে বিস্তর লটবহর, তার ওপর একেবারেই অচেনা নতুন জায়গা। লোকজনের ব্যস্ত ভিড়, কুলিদের হাকডাক, ঠেলাঠেলি - সবকিছু সামলে নিয়ে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আসি। সঙ্গে কন্যা। যাবে পুদুচেরি। উচ্চতর পাঠ নিতে। বাপ বেটিকে দেখে উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে আসে অনেক মানুষ – কেউ অটোরিকশা চালক, কেউবা প্রাইভেট গাড়িচালক। সকলেই ব্যস্ত স‌ওয়ারি ধরতে। দেশের দক্ষিণে এলে মন খুলে কথা বলার ক্ষেত্রে ভাষা একটা বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। খানিকক্ষণ মূকাভিনয় করার পর জট ছাড়ানো গেল। বাপ বেটি দুজনে সমস্বরে কোয়াম্বাডু বাসস্ট্যান্ড যাবো বলাতে বেশ সুবিধা হয়। চেনা শব্দবন্ধের যাদুই যে এমন। খানিক সময় দরাদরি করে শেষমেশ এক অটোরিকশায় উঠে পড়ি দুজনে। ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল। কোয়াম্বাডু থেকে আমরা পুদুচেরী যাবার বাস ধরবো। সুবিশাল বাসস্ট্যান্ড। সামান্য খোঁজাখুঁজি করে নির্দিষ্ট বাসে উঠে পড়ি। কন্ডাক্টরের সহযোগী মানুষটি বেশ যত্ন করে আমাদের মালপত্র বাসের খোলে ঢুকিয়ে দেন। আমরা স্বস্তিতে গদিয়ান হ‌ই। বাসের চাকা সচল হয়। খিড়কি গলে আমাদের নজর তখন বাইরের দৃশ্যপট নয়নবন্দি করতে শুরু করে। বাস মামাল্লাপুরম ছাড়তেই বাইরের ছবিটা বেমালুম বদলে যায়। দূরে সমুদ্রের উপস্থিতির আভাস মেলে। অগভীর জলা জমির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধবধবে সাদা রঙের ছোট ছোট টিলা সহজেই নজর পড়ে – ওগুলো সব নুনের টিলা। সমুদ্রের জলকে উপকূলের অপেক্ষাকৃত উঁচু অংশে তুলে এনে ছোটো ছোটো আল বাঁধা জমিতে জমা করা হয়। সেই জল সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হলে, জলের সঙ্গে মিশে থাকা লবণ জমিতে বিছানো প্লাস্টিকের চাদরের ওপর থিতিয়ে পড়ে। সেই থিতিয়ে পড়া লবণকে পরিশোধন করার পর আমরা পাই ভক্ষ্য লবণ। কাজটা মোটেই সহজসাধ্য নয়, বরং অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। বর্ষার মাসগুলোকে‌ বাদ দিয়ে বাকি মাসগুলোতে চলে লবণ তৈরির কাজ। লবণ রোজকার খাবার পাতের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। লবণ ছাড়া আমাদের এক মুহুর্ত চলে না, অথচ এই সূক্ষ্ম দানাদার উপাদানটিকে আমাদের পাত অবধি পৌঁছে দেবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের শ্রম, ঘাম,রক্ত,বঞ্চনা আর কান্না। কচ্ছের রন অঞ্চল – ভারতের বৃহত্তম লবণ উৎপাদন ক্ষেত্র। গুজরাটি শব্দ রন্ এবং সিন্ধ্রি শব্দ রিন্ – দুটির‌ই ব্যুৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ইরিন্ থেকে যার অর্থ হলো লবণাক্ত জলে ভরা অনুর্বর জমি। ঋগ্বেদ ও মহাভারতে এই সুবিস্তৃত জলাভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। অবস্থানগতভাবে উত্তরের বৃহৎ ভারতীয় মরুভূমি বা থর মরুভূমির দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর অবস্থান করছে এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অঞ্চলটি। গুজরাটের কচ্ছ জেলার প্রায় ২৬০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রন্ অঞ্চলটি। বৃষ্টিহীন এই শুষ্ক অঞ্চলটিকে বিশেষজ্ঞরা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ লবণাক্ত মরুভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গোটা এলাকাটিকে আবার দুটি অংশে ভাগ করা হয়েছে - বৃহৎ রন্ এর পরিসর ১০০০০বর্গ কিলোমিটার এবং প্রায় ৫০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বিশিষ্ট ক্ষুদ্র রন্ অঞ্চল। এই ক্ষুদ্র রনের লবণাক্ত জলাভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ভারতের সবথেকে বড়ো লবণ উৎপাদক অঞ্চল।  রন্ অঞ্চলের উৎপত্তির ইতিহাস‌ও কম বৈচিত্র্যময় নয়। এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন, জটিল ও প্রবল ভূকম্পনের ঘটনা এবং বদলে যাওয়া জলবায়ুর এক আশ্চর্য ইতিবৃত্ত। গবেষকরা জানিয়েছেন যে এক সময় বাণিজ্যপথ হিসেবে এই বৃহৎ ভূখণ্ডটিকে ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা নিছকই একটি অনুর্বর বন্ধ্যা ভূমিতে পরিণত হয়েছে। জোয়ারের সময় ঢুকে পড়া সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে ধরে রেখে তা থেকে উৎপাদন করা হয় আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় লবণ। ভক্ষ্য লবণ সোডিয়াম ক্লোরাইডের পাশাপাশি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আরও বেশ কিছু লবণের অন্যতম জোগানদার এই এলাকাটি। জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত আরব সাগরের জোয়ারের জল গোটা রন্ অঞ্চলের সুবিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তার সাথে যুক্ত হয় বৃষ্টির জল। সেপ্টেম্বর মাসের পর দ্রুত জল নেমে যায়, গ্রীষ্মের চড়া রোদে জল বাষ্পীভূত হলে জলের দ্রবীভূত লবণ থিতিয়ে পড়ে। লবণের সূক্ষ্ম কেলাসের কণায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। এরপরের অংশটুকুতেই জড়িয়ে আছে এই এলাকার আবাসিক মানুষদের ঘাম রক্ত আর কঠোর কৃচ্ছতার কাহিনি। লবণের কথাই যখন এলো তখন ভারতবাসী হিসেবে পরাধীন ভারতে বিখ্যাত লবণ সত্যাগ্রহের কথা বিস্মৃত হ‌ই কী করে? ১৯৩০ সালে দমনমূলক বৃটিশ লবণ নীতির প্রতিবাদে গান্ধীজির নেতৃত্বে ৭৮ জন সত্যাগ্রহী পথযাত্রী এক ঐতিহাসিক পদযাত্রায় অংশ গ্রহণ করলেন। এক চিমটি লবণ ছাড়া যে খাবার মুখে রুচবেনা, অথচ তাকে নিয়েই এই অহেতুক আইন – ভারতীয়রা লবণ তৈরি করতে পারবে না। তাঁদের বৃটিশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই লবণ কিনতে হবে। গর্জে উঠলেন গান্ধীজী। তিনি স্বয়ং প্রতিবাদে মুখর হলেন। সামিল হলেন এক প্রতিবাদী পদযাত্রায়। সবরমতী আশ্রম থেকে নভসারি বা ডান্ডি পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৮৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা পৌঁছলেন ডান্ডিতে। সেখানেই সমুদ্রের জল থেকে তৈরি করা হলো লবণ, ইংরেজ সরকারের ফরমানকে অস্বীকার করে। লবণের অধিকার ফিরে পাবার এই আন্দোলন পরবর্তী কালের বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল ; আর ঐতিহাসিক এই পদযাত্রা ইতিহাসে স্থায়ী আসন পেল ডান্ডি পদযাত্রা হিসেবে। প্রতিদিনের খাবার পাতে এক চিমটি লবণ পাওয়া যে আমাদের সকলের অধিকার, এই আন্দোলন তাকেই প্রতিষ্ঠিত করলো। এ বছর রোদ ভীষণ চড়া! এর মাঝেই কাজ করতে হয় লবণ তৈরির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের। কাজের চাপ এতোটাই যে ঘরে ঢুকে একটুখানি সময় জিরিয়ে নেবার জো নেই। বর্ষার আগে আগেই জমে থাকা লবণের বোঝা খালাস করতে না পারলে, পুরোটাই বরবাদ হয়ে যাবে। এমন গরমের দাপটকে এড়িয়ে কাজ করাই যে অসাধ্য। অথচ তাকে অস্বীকার করার উপায়ও যে নেই। তাই গরমের মধ্যেই মুখ বুজে কাজ করে যাওয়াটাই যেন দস্তুর। গুজরাটের এই বিজন এলাকায় আট মাস ধরে লাগাতার হাড়ভাঙা খাটুনির পর্ব চলে প্রায় ৫০০০০ আবাসিক শ্রমজীবী মানুষের। একেক সময় মনে হয় এ যেন দেশের বাইরের এক এলাকা – ইলেক্ট্রিসিটি নেই, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা নেই,প্রখর রোদে শুকিয়ে যাওয়া গলায় দু ঢোঁক জল ঢালতে গেলেও মানুষগুলোকে প্রতিপদে ভাবতে হয় মিঠা জলের গাড়ি আসার পঁচিশ দিন পূর্ণ হতে আর কতদিন বাকি? জমানো জল যে বাড়ন্ত! লিটিল রনের তাপমাত্রা এখন‌ই ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমান্ত ছাড়িয়ে গেছে। পারদ চড়তে চড়তে শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আগাম আঁচ করা যে স্বয়ং বরুন দেবের পক্ষেও অসাধ্য।  এ কেমন বৈপরীত্য! যে উষ্ণতাকে গায়ে মেখে দু দণ্ড তিষ্টনো দায় তাই হলো লবণ তৈরির জন্য একেবারেই আদর্শ। আর এই বিশেষ সুবিধার দৌলতে, গুজরাত রাজ্য দেশের তিন চতুর্থাংশ লবণ উৎপাদন করে। সূর্য ওঠার আগে থেকেই কাজ শুরু করতে হয়। দুপুরে খানিকক্ষণ বিরতি। আবার সূর্য দেব অস্ত গেলে জমিতে নেমে পড়া। নেহাৎ দেশের একেবারে পশ্চিমা এলাকা,তাই সূর্যাস্তের পরেও কাজ চালিয়ে যাবার মতো আলো মেলে। এই সুযোগটুকুই তাদের কাছে পরম আশীর্বাদের মতো মনে হয়। রোদ জ্বলা দিনের হাত থেকে একটু স্বস্তির জন্য নিজেরাই অবশ্য তৈরি করে নিয়েছে কতগুলো অস্থায়ী আস্তানা। চারটে খুঁটির ওপর মোটা, হাতে বোনা কাপড়ের এক চিলতে ছাউনি, গাধার মলের সঙ্গে মাটি মিশিয়ে গড়া হয় চারপাশের দেওয়াল –খানিকক্ষণ বিশ্রামের পক্ষে অবশ্য এগুলো একদম আদর্শ আস্তানা। বাইরের চাঁদি ফাটা রোদ্দুরে এটাকেই মনে হয় বাতানুকুল আবাস। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে ক্ষণিক স্বস্তি লাভের প্রচেষ্টা। ভাবনা, কাঞ্চন, পুর্নিমা কিংবা বাবুলালদের কাছে এটুকুই যে পরম পাওয়া। এর বেশি যে ওদের চাওয়ার নেই।  রৌদ্র দগ্ধ, লবণাক্ত মরুভূমি প্রায় এই জমিতে সবুজের প্রবেশের কোনো অধিকার নেই। থাকলে হয়তো অন্য এক স্বস্তি মিললেও মিলতে পারতো। সাদা লবণের চাদর থেকে ঠিকরে ওঠা আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেলেও যে নিস্তার নেই মানুষগুলোর। গরম থেকে বাঁচতে নিজেরাই কতক উপায় বেছে নিয়েছে – ভিজে মোটা কাপড়ে মোড়া জলের বোতলকে দড়ি দিয়ে বেঁধে সামনে ঝুলিয়ে রাখে। বাষ্পীভূত জলের ঠান্ডা আমেজ থেকে স্বস্তি বোধ করতে। এরফলে জলটাও বেশ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কেউবা লিকার চা বানিয়ে পান করে যাতে খানিকটা গরমের অনুভূতি কম হয়, শরীরে বাড়তি স্ফূর্তি আসে। প্রাকৃতিক উপায়ে লবণাক্ত জল থেকে প্রয়োজনীয় লবণ তৈরির কাজটিও যে সহজে সেরে ফেলা যায় তেমন নয়। পাম্প চালিয়ে নোনা জল জমিতে ঢোকানো, তাকে রোদের তাপ আর বাতাসের স্পর্শে শুকিয়ে নেওয়া। লবণের কেলাসগুলোকে নেড়েচেড়ে সমানভাবে তৈরি হতে দেওয়া, তারপর সেই কেলাসিত উপকরণকে ঠিকমতো গুছিয়ে ছোট ছোট টিলার আকার দেওয়া। এরপর তাকে গাড়িতে করে কারখানায় পৌঁছনো – কাজ তো নেহাত কম নয়। আর এর সবটুকুই করতে হয় খোলা আকাশের নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে। এই বছর আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী তাপ প্রবাহের দাপট আরও দীর্ঘায়িত হতে চলেছে, যার অর্থ আমাদের সবার পাতে এক চিমটি লবণ পৌঁছে দিতে আরও অনেক অনেক ঘাম ঝরাতে হবে রনের লবণ তৈরির মেহনতী শ্রমিকদের।  কিছুদিন আগে পর্যন্ত ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের সাহায্যে সমুদ্রের জল তুলে জমিতে ফেলা হতো। এখন সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে পাম্প চালিয়ে জল তোলা হয়। এরফলে খরচে সাশ্রয় হয়, পোড়া ডিজেলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়না তবে এখন শ্রমিকদের কাজ করতে হয় অনেকটা বাড়তি সময় ধরে। বর্ষা আগমনে আর খুব বেশি দেরি নেই,তাই এখন নোনা জমির ফসল ঘরে তুলতে সকলের ব্যস্ততা একেবারে তুঙ্গে। একটানা ছয় মাসের‌ও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ প্রাণহর একটা পরিবেশে কাজ করার ফলে শ্রমিকদের শরীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই উপেক্ষিত থেকে যায়। বিরামহীনভাবে কাজের ফলে শরীরে বাসা বাঁধে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা, নানারকম প্রাণঘাতী রোগ। এসবের পরিণতিতে অকালে ঝরে যায় কত তরতাজা প্রাণ। সমীক্ষা সূত্রে জানা গেছে যে শ্রমিকরা ডিহাইড্রেশন, হিট স্ট্রেস্ থেকে শুরু করে কিডনির কার্যকারিতার সমস্যায় আক্রান্ত হয়। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ছাড়া অন্য কোনো ওষুধের পরিষেবা পায়না এখানকার শ্রমিকরা। দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘন লবণের দ্রবণের মধ্যে থেকে কাজ করার ফলে শরীরের চামড়া শক্ত হয়ে গিয়ে ফেটে যায়, রক্ত বেরিয়ে আসে। আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে তাপের সহনশীলতার সর্বোচ্চ মান বেঁধে দেবার ব্যবস্থা নেই, অর্থাৎ তাপমাত্রা কতটা হলে তা শ্রমিকদের শরীর স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তার কোনো আইনি বিধিনিষেধ নেই। এই ফাঁকটাকে কাজে লাগিয়ে অনেক সময়ই শ্রমিকদের অসহনীয় পরিবেশে কাজ করতে হয়। এক চিমটে নুন আমাদের খাবার পাতে তুলে দিতে গিয়ে এমন‌ই লড়াই করতে হয় লবণ ভাঁটির শ্রমিকদের। অবস্থা দিনদিন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় আকস্মিক আবহিক বিপর্যয়ের ফলে এই শিল্পের অস্তিত্বের সংকট বাড়ছে। হঠাৎ করে নেমে আসা বৃষ্টি বা ঝড়ের ফলে খোলা মাঠে জমিয়ে রাখা লবণ নষ্ট হয়ে গেলে লোকসানের মুখে পড়তে হয়, যার ঝাপটা এসে পড়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে। এই অনিশ্চয়তাকে সম্বল করেই বেঁচে থাকতে হয় দেশের লবণ শ্রমিকদের। প্রশ্ন করা হয়েছিল – এতো কষ্ট সয়ে আপনারা এই কাজ করেন কেন? অন্য কিছু করতে পারেন না? প্রশ্ন শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মানুষগুলো। বেশ কিছুটা সময় পরে শান্ত গলায় উত্তর দেয় – আমরা কাজ ছেড়ে দিলে আপনাদের খাবার যে বিস্বাদ লাগবে। আপনারা কি তাই চান? এবার নির্বাক হবার পালা আমাদের।   সোমনাথ মুখোপাধ্যায়।মে ২৪, ২০২৬.
    একা বেড়ানোর আনন্দে-৩৭ - কুম্ভলগড়  - সমরেশ মুখার্জী | অনেকদিনের ইচ্ছে  ২০১১ জানুয়ারি‌র মাঝামাঝি এক শুক্রবার। গতকাল বিকেলে উদয়পুর এসেছি অফিসে‌র কাজে। এরপর মঙ্গলবার সকালে কোটায় যেতে হবে। সেটাও অফিসে‌র কাজে‌ই। সোমবার বিকেল টিকিট আছে চেতক এক্সপ্রেসে। মানে শনি, রবি ও সোমবার‌ বিকেল চারটে অবধি ফ্রী। শীতের মরশুমে এমন সুযোগ হেলায় হারানো যায় না। কোম্পানির ট্র্যাভেল ডেস্ক ঘর দিয়েছে হাতি পোলের কাছে রাজদর্শন লেকভিউ হোটেলে। অবস্থান পিচোলা ও ফতেহ সাগর লেকের সংযোগকারী স্বরূপ সাগর লেকের দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে।‌ সুন্দর লোকেশনে চৌহদ্দি‌র মধ্যে‌ গাছপালা নিয়ে হোটেলটি ১৯৮৪ সালে তৈরী।  আগে দুবার উদয়পুর এলেও অনেকদিনের একটি ইচ্ছা - মহারাণা প্রতাপের জন্মস্থান ঘুরে আসা‌ - হয়ে ওঠেনি। এবার হাতে সময় থাকায় রিসেপশনের ছেলেটিকে সকালে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কুম্ভলগড়ে যাওয়ার বাস কোথায় পাওয়া যাবে? সে বলে, কুম্ভলগড় ৮০ কিমি দূরে একটা একটেরে জায়গায়। ওখানে বাস যায় বলে জানা নেই। চাইলে হোটেল থেকে ইন্ডিকা পাবেন, আসা যাওয়া, ওয়েটিং নিয়ে আড়াই হাজার পড়বে।  ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, আচ্ছা ভেবে দেখি। কিন্তু একাকী ভ্রমণে‌র ক্ষেত্রে রিজার্ভ গাড়ির বদলে নবনীতাদির ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহন’ মুডে জনবাহনে বা হিচহাইক করে বেড়নোই আমার পছন্দ। তা শুধু সস্তাই নয়, তেমন যাত্রায় হয় নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতা।  চিরতাবাবু‌ও তাই বললেন  চারটে নাগাদ কাজ মিটে যেতে গেলাম উদয়পোলের কাছে সেন্ট্রাল বাস ডিপো। কুম্ভলগড়ে যাওয়ার বাসের খোঁজ করতে পুছতাছ খিড়কির কর্মীটি বেজার মুখে জানালেন - কুম্ভলগড়ে কোনো বাস যায় না, গাড়ি‌ বুক করে যেতে হয়। কারণ যাই হোক, লর্ড কর্ন‌ওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো কিছু লোকের মুখ‌ও চিরস্থায়ী বিরক্তিতে কুঁচকে থাকে। কিন্তু মহারানা প্রতাপের জন্মস্থানে কোনো বাস যায় না? বেশ অবাক লাগে।‌ অথচ ভারতবর্ষকে জনপ্রিয় করতে Incredible India, অতিথি দেবো ভবঃ ক্যাম্পেন হচ্ছে। এসব ক্যাম্পেনের উদ্দেশ্য বিদেশী পর্যটক ও মূদ্রা আকর্ষণ বলেই হয়তো দেশি ব্যাকপ্যাকার শৈলীর পর্যটকদের নিয়ে ভাবার দায় কত্তাদের নেই।  ধুমকেতু‌র দৌলতে বেঁচে গেল আড়াই হাজার এইসব ভেবে কিঞ্চিৎ বিমর্ষ হয়ে‌ই ফতেহ সাগর বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটছিলাম। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। লেকের জলে পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো। অমন সুন্দর পরিবেশে মনের ভার নেমে যায়। এক বয়স্ক কিন্তু চটপটে ভদ্রলোক হাফপ্যান্ট, টি শার্ট, স্নিকার্স পরে গটগট করে হেঁটে আমায় অতিক্রম করে পিছন ফিরে অমায়িক হেসে বলেন, আপনাকে তো এখানে আগে দেখিনি? নতুন এসেছেন?  বলি, আমি এখানে থাকিনা। অফিসের কাজে এসে সময় পেয়ে এদিকে ঘুরতে এসেছি। উনি বলেন, তা বেশ, তো উঠেছেন কোথায়? বলি, হোটেল রাজ দর্শন, কোম্পানি থেকেই বুক করেছে। ভদ্রলোক আড্ডা‌বাজ টাইপের। বললেন, ও তাই নাকি! সত্যি কিনা জানিনা, তবে শুনেছি হোটেলটি উদয়পুরের রাজপরিবার, মুম্বাইয়ের ক্রিকেট জগত ও বলিউডে‌‌ও বিশেষ পরিচিত এক হাই প্রোফাইল ব্যক্তি‌ রাজ সিং দুঙ্গারপুর ও তাঁর বিশেষ পরিচিতা লতা মঙ্গেশকরের জয়েন্ট ভেঞ্চার।  আমি আদার ব্যাপারী, ফল খেয়েই খুশি, গাছ না চিনলেও চলে। একথা সেকথার পর জানাই আমার মনোবাসনা এবং চিরতাবাবুর নিদান শুনে মনোবেদনার কথা। উনি বলেন, ঠিক‌ই তো, একা ঘুরতে অযথা আড়াই হাজার দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার মানে‌ হয়না। ডিপো ম্যানেজার আমার বন্ধু, দেখি, ও কী বলে। ডিপো ম্যানেজারকে ফোন লাগিয়ে বলেন, আমার ‘এক বিশেষ পরিচিত’ Mr. Mukherjee এখানে একা এসেছেন। বাসে কুম্ভলগড় যেতে চান।‌ এনকোয়ারি থেকে বলেছে ওখানে কোনো বাস যায় না! একটু গাইড করুন তো ওনাকে। এই বলে, সদ্য আলাপেই ‘বিশেষ পরিচিত’ হয়ে যাওয়া আমায় ফোন ধরিয়ে দিলেন। ডিপো ম্যানেজার অতি সজ্জন। বলেন, উদয়পুর - যোধপুর রুটে ভলভো থেকে সাধারণ, সব বাস‌ই যায় হাইওয়ে ধরে। কুম্ভলগড় ঐ রুটে পড়ে না। তবে একটাই জেনারেল বাস সকাল সাড়ে পাঁচটায় ভিতরে‌র রাস্তা দিয়ে কেলওয়াড়া হয়ে জয়পুর যায়। ঐ বাসে আপনি কেলওয়ারা যেতে পারেন। ঘন্টা দুয়েক লাগে। ওটাই জয়পুর থেকে ফিরে আসে উদয়পুর। কেল‌ওয়ারা থেকে পাবেন বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। তবে কেল‌ওয়াড়া গাঁও থেকে কুম্ভলগড় কেল্লা আট কিমি। তাই হয়তো এনকোয়ারি থেকে বলেছে কুম্ভলগড়ে কোনো বাস যায় না। বলি, কেলওয়াড়া থেকে কুম্ভলগড় কিভাবে যাবো? উনি বলেন, তা বলতে পারবো না। ওখানে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রাখি। ভাবি, কিছু না পেলে আসা যাওয়া ১৬ কিমি। বেশ বড় কেল্লাটি দেখতে হয়তো আরো দুই কিমি। তবে ১৮ কিমি ধীরেসুস্থে হাঁটলেও পাঁচ ঘন্টার মামলা। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা - দশ ঘন্টা। হন্টনের সময় বাদ দিলে হাতে থাকবে পাঁচ ঘন্টা। কেল্লা ঘুরে দেখার জন্য যথেষ্ট। আগে‌ও কয়েকবার শীতকালে হেঁটে ঘুরে বেশ আনন্দ পেয়েছি। আগামীকাল চরৈবেতি মন্ত্রে জনবাহনে কুম্ভলগড় যাওয়ার একটা হাল হয়ে যেতে সদ্য পরিচিত ভদ্রলোকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। উনি ধুমকেতুর মত উদয় হলে কুম্ভলগড় যেতে কপালে আড়াই হাজারি গচ্চা ছিল।  নীমচমাতার থান  ভদ্রলোকের সাথে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চাই, ডানদিকে ঐ পাহাড়ের মাথায় ওটা কীসের মন্দির? সন্ধ্যে হয়ে আসছে। আলো টালোও জ্বলতে দেখছিনা। এখন কি ওখানে একা যাওয়া ঠিক হবে? উনি বলেন, ওটা দেবী নীমচমাতার মন্দির। অতীতে উদয়পুরের রাজপরিবারের কুলদেবী। স্থানীয়‌দের কাছে খুব‌ই মান্য দেবী। অনেকে ভাবেন অম্বাজী। সুন্দর পথ। ল্যাম্পপোস্ট‌ও আছে। সন্ধ্যায় আলো জ্বলে। রাত ৯টা পর্যন্ত মন্দির ঘোলা। অবশ্যই যেতে পারেন। কোনো ভয় নেই। ওনাকে আর একপ্রস্থ ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত পা চালা‌ই।  ফতেহ সাগর বাঁধের মাঝামাঝি থেকে প্রায় দেড় কিমি ধীর ছন্দে হেঁটে‌ও চড়াই বলে একটু হাঁফ ধরে। মন্দিরের নীচে বসার জায়গায় বসে বিশ্রাম নি‌ই। এখন রোপ‌ওয়ে‌ হ‌ওয়াতে যাদের হাঁটতে অসুবিধা তাদের সুবিধা‌ হবে।  ওপরে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। উদয়পুর শহরকে ঘিরে আছে সাতটি প্রধান সরোবর - পিচোলা লেক, ফতেহ সাগর, স্বরূপ সাগর, উদয় সাগর, রঙ সাগর, দুধ তালাই এবং বড়ি তালাও বা জিয়ান সাগর যদিও শেষোক্তটি শহর থেকে একটু দূরে অবস্থিত। এতোগুলি লেক থাকায় উদয়পুর ভেনিস অফ দ্য ইস্ট নামে‌ও পরিচিত। মন্দির চত্বর থেকে দক্ষিণে দূরে পিচোলা লেকের মাঝে আলো ঝলমলে লেক প্যালেস। কাছে ফতেহ সাগরের কিনারা সদ্য জ্বলে ওঠা আলোয় নেকলেসের মতো লাগছে। পূবে উদয়সাগর। পশ্চিম সজ্জনগড় পাহাড়ে মনসুন প্যালেসে‌র দিকে সূর্যদেব অস্ত যাচ্ছে‌ন। মন্দিরে ভক্তদের ঘন্টাধ্বনি, ধূপ ধুনোর গন্ধ - সব মিশে মায়াবী পরিবেশ। জানুয়ারি‌র ঠান্ডা-মিঠে হাওয়ায় পাহাড় শীর্ষে সেই মনোরম মন্দির চত্বরে অনেকক্ষন বসে রইলাম। আকাশে সূর্যাস্ত থেকে গোধূলি - নানা রঙের খেলা দেখে অন্ধকার হয়ে যেতে সাড়ে সাতটা নাগাদ নামতে শুরু করলাম। তখন গোটা পথে আলো জ্বলছে। বেশ লাগলো মাতাজির মন্দির দর্শন। মন শান্তির পরশ বোলানো এমন অনুভূতির সাথে ঈশ্বরভক্তি সম্পর্করহিত। ZRTI প্রসঙ্গে মন্দিরের নীচে বেঞ্চে যেখানে জিরিয়েছিলাম, সেখানে‌ অন্য বেঞ্চে চারজন মধ্যবয়সী লোক বসে গল্প করছিলেন। তাদের কথাবার্তায় আগ্ৰহ হোলো। আলাপ করে জানলাম ওনারা‌ লোকো ড্রাইভার। উদয়পুরে রেলের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে - ZRTI (জোনাল রেলওয়ে ট্রেনিং ইনস্টিটিউট)। চারজনে ওখানে ক’দিনের ট্রেনিং নিতে এসেছেন। রেসিডেনসিয়াল ক্যাম্পাসটি আড়াই কিমি দূরে সুখাড়িয়া সার্কেলে। ক্লাসের শেষে বিকেলে এখানে ঘুরতে এসেছেন।  জানলাম ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ZRTI এশিয়ার বৃহত্তম কিছু রেল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পাসগুলির একটি। এমু (EMU) লোকাল, মেট্রো ট্রেন, ডিজেল ও ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ চালকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপারেটিং স্টাফদেরও এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।  আগ্ৰহ প্রকাশ করে জানলাম, ভারতীয় রেলে প্রথমে সাইডিং লাইনে শান্টার হিসেবে কাজ করতে হয়। কারণ সেখানে যাত্রীদের প্রাণের দায়িত্ব নেই। তারপর সময়ের সাথে অভিজ্ঞতা বাড়লে ট্রেনিং নিয়ে ALP (Asst Loco Pilot) Goods বা মালগাড়ি‌র সহকারী ড্রাইভার হ‌ওয়া যায়। তার পরে LP-Goods, ALP/LP-Passenger, Express, Superfast, Rajdhani এভাবে পদোন্নতি হয়।  প্রতিবার প্রোমোশনের আগে রিফ্রেশার ট্রেনিং, প্র্যাক্টিকাল ট্রেনিং, সিমুলেশনে টেস্ট, লিখিত পরীক্ষা, মেডিক্যাল টেস্ট ক্লীয়ার করতে পারলে তবেই প্রোমোশন হয়। ভারতীয় রেল ব্রিটিশ অপারেশনাল লিগেসি ফলো করে বলে এ ব্যাপারে খুব‌ই স্ট্রিক্ট। সারা ভারতে বিভিন্ন ডিভিশনে অর্ধশতাধিক ট্রেনিং সেন্টার আছে। সবগুলো ZRTI উদয়পুরের মতো বড়ো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়।  ভালো লাগলো ওনাদের সাথে কথা বলে। এতোদিন ট্রেন লেট হলে রেল দপ্তরের মুণ্ডুপাত করেছি। কিন্তু ধরা যাক হাওড়া থেকে মুম্বাই একটা ট্রেন যাচ্ছে - সেক্ষেত্রে তার প্রেক্ষাপটে কতো রেলকর্মীর কতো রকমের ভূমিকা আছে, কখনো তলিয়ে ভাবিনি। ওনাদের ধন্যবাদ দিয়ে মন্দিরে‌র দিকে একটু যেতে‌ই একজন পিছন থেকে ডাকলেন - বেঞ্চে তো আপনার ক্যামেরা ফেলে যাচ্ছেন। লোকো পাইলটের নজর! পিছিয়ে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আর একপ্রস্থ ধন্যবাদ জানাই। উনি হেসে বলেন, মনের ভুলে হয় এরকম, খেয়াল রাখবেন। আগামীকালের প্রস্তুতি  নীচে এসে হোটেল যাওয়ার পথে মটরশুটি, গাজর, পেয়ারা আর গুড ডে বিস্কুট কিনি। কালকে ডে ট্রিপের ড্রাই লাঞ্চ। কোথায় কী পাবো কে জানে। তৈরী থাকা ভালো। কুম্ভলগড়ে গিয়ে বুঝেছি সেই প্ল্যানিং কতো কাজের ছিল। নিলাম দশ টাকায় কুড়িটা পার্লে কিসমি মিল্ক টফি। টুকটাক মুখ চালাতে বেশ লাগে। পথে দেখা ছোটদের সাথে ভাব জমাতে‌ও কাজে আসে। হোটেলে ব্রেকফাষ্ট কমপ্লিমেন্টারি। রুমে এসে ইন্টারকমে জিজ্ঞাসা করি, ভোর সোয়া চারটেয় কি ব্রেকফাস্ট পাওয়া যাবে? সে বলে, সরি স্যার, সাতটার আগে রেগুলার ব্রেকফাস্ট রেডি হয়না, তবে 24Hrs কফিশপে বাটার টোষ্ট, বয়েলড এগ আর কফি বলে দিতে পারি। তাকে হ্যাঁ বলে দিই।  বাইরে এসে একটা দোকানে জিজ্ঞাসা করি, এখান থেকে সকাল পৌনে পাঁচটা নাগাদ অটো পাওয়া যাবে? দোকানি বলে, কুছ অটো ইধর সে যাতি হ্যায় উস ওয়ক্ত টেশন কি তরফ, মিল যায়েগি।  তার আশ্বাসে ভরসা হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে আমি সেফ প্লে করি। রিসেপশনের ছেলেটির কাছে জেনে নিয়েছি সেন্ট্রাল বাস ডিপো আন্দাজ আড়াই কিমি। বাড়িতে নিয়মিত 4% স্লোপে 45 মিনিট ট্রেডমিলে হেঁটে জানি পাঁচ কিমি গতিতে সমতল রাস্তায় আধঘণ্টা হাঁটা কোনো ব্যাপার‌ই নয়। একটু আগে বেরোবো, অটো না পেলে হেঁটেই চলে যাবো। বিশ্বস্ত পদযুগল অর্ধশতাব্দী‌ ধরে আমার ভার বয়ে চলেছে। তাদের ওপর ভরসা করা‌ যায়। অকপট অটো‌ওয়ালা পরদিন পৌনে পাঁচটায় বাইরে এসে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকারে, জানুয়ারি‌র ঠাণ্ডায় রাস্তা শুনশান। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে হাঁটা দিলাম। একটু যেতে দেখি একটা অটো আসছে।‌ হাত দেখাতে থামলো। বাসস্ট্যান্ড যাইয়েগা? সত্তর রুপিয়া। বলি, দিনমে তো পাঁচ রুপিয়ামে শেয়ার মে গিয়া থা ইঁহাসে? আভি সত্তর? সে শুধু মিতবাক‌ই নয়, সুরসিক‌ও বটে। তো সুরজ নিকালনেকা ইন্তেজার কিজিয়ে - বলে চলে যায়। হেঁটে যেতে হতে পারে তো ভেবে‌ইছিলাম। তাই হাঁটতে থাকি। একটু গিয়ে‌ই, অটো থামিয়ে সে মুখ বাড়িয়ে বলে - পচাশ দিজিয়েগা? হয়তো পরদেশীকে সুযোগ পেয়ে লোটার ফন্দিতে কিঞ্চিৎ বিবেকদংশন হয়েছে। বসে পড়ি। এবার সে নরম গলায় বলে, বাবুজি, হমলোগ ভি ওয়ক্ত দেখকে মৌকা ঢুন্ডতে হ্যায়। কিঁউকি সাত বজে কা বাদ চালু রুট মে কো‌ই রিজাভ করকে নেহি যাতা। তব লোগ শেয়ার মে যাতে হ্যায়। অভি ম্যয় যা রাহা হুঁ টেশন সে কিসিকো লেনে কে লিয়ে। আপ মিল গয়ে, হমে ভি পচাশ উপর সে কামানে কা ম‌ওকা মিল গয়্যা। বুরা মত মানিয়ে, বাবুজি।  তার অকপট ভাষণে অভিভূত হ‌ই। সত্যি‌ই তো, ও যা বললো - চারো তরফ বেসুমার ম‌ওকাপরোস্ত ঔর এহসানফরামোশ ইনসান। তাই ওর ক্ষেত্রে‌ গোবরে পদ্মফুল আশা করা বৃথা।  তবে আছে ব্যতিক্রম‌‌  ৫/১৬ কর্মজীবনে ইতি টেনে ১/১৭ গেছিলাম ১৫ দিনের প্রথম মাইক টেস্টিং একাকী ভ্রমণে। জানুয়ারি‌র ঠাণ্ডায় ঝাঁসির নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি ভোর পাঁচটায়। একটা খালি অটো আসছিলো। হাত দেখিয়ে বলেছিলাম - স্টেশন যাবো। সে বলে, রিজার্ভে যাবেন? বলি একা মানুষ, এই তো দুটো স্যাক, শেয়ারেই চলো, যদি রাস্তায় কাউকে পাও, নিয়ে নিও।  সেদিন সেও ম‌ওকা বুঝে বলতে পারতো, এতো ভোরে শেয়ার চলে না। কিন্তু বললো, ঠিক আছে, বসুন, কুড়ি টাকা দেবেন। সাড়ে তিন কিমি পথ, দুদিন আগে সকালে শেয়ারে এসেছি দশ টাকায়। সে মাত্র ডবল চাইলো। পথে আর কাউকে পেলো না। স্টেশনে পৌঁছে চল্লিশ টাকা দিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে টাকাটা কপালে ঠেকিয়েছিল। মনে হয় শুধু‌ই বৌনির স‌ওয়ারী বলে নয়। ২০১৯এ মধ্যপ্রদেশে দেখা পেয়েছিলাম রামুর (এই সিরিজের ১৯তম পর্ব পশ্য)। এরা অন্য গোত্রের মানুষ। সরকারি বাসের মহিমা অনুসন্ধানে এখন যিনি আছেন তিনি বেশ অমায়িক। হয়তো পরদেশী বুঝেই, আমায় নরম করে বলেন, ঐ প্ল্যাটফর্মে বাস আসবে। সাড়ে পাঁচটায় ছাড়বে। তাঁকে ধন্যবাদ সেখানে গিয়ে দাঁড়াই। ৫-২৫এও বাসের দেখা না পেয়ে কুণ্ঠিত হয়ে আর একবার শুধোই - আসবে তো ঠিক? উনি বলেন, অবশ‌্যই, ঐ দেখুন কেল‌ওয়াড়ার মেলব্যাগ পড়ে আছে, ওটা ডাক বাস, বাতিল হয়না। এতোক্ষণ ঐ প্ল্যাটফর্মে‌র আশপাশে বিশেষ যাত্রী না দেখে ভাবছিলাম, সরকারি ব্যাপার, নাও আসতে পারে বাস। এবার মেলব্যাগ দেখে ভরসা হয়। ৫-৩২এ এলো ৩x২ কনফিগারেশনে ৪৮ সীটার বাস।‌ সাকুল্যে জনা পনেরো স্থানীয় গ্ৰাম্য যাত্রী উঠলো। ৫-৩৭এ বাস ছেড়ে দিলো। এমন পাঙ্কচুয়ালিটি তো বহু ট্রেনের ক্ষেত্রে‌ও দেখা যায় না! মাত্র চল্লিশ টাকা ভাড়া। উদয়পুর থেকে কেল‌ওয়াড়ার দূরত্ব ৭৬ কিমি। মাঝারি গতিতে (৪০-৫০ হবে) বাস চলতে র‌ইলো।  রাজপুত বংশের প্রেক্ষাপট  যতক্ষণ বাস যাচ্ছে দেখে নেওয়া যাক অতীতে উত্তর-পশ্চিম ভারতে রাজপুত বংশের প্রেক্ষাপট। রাজপুত কিংবদন্তি অনুযায়ী, অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী বিপর্যস্ত হলে ঋষি বশিষ্ঠ আবু পর্বতে যজ্ঞ করেন। সেই যজ্ঞাগ্নি থেকে চারটি ক্ষত্রিয় বংশের উৎপত্তি হয় - পরমার, প্রতিহার, চৌহান ও শোলাঙ্কি (চালুক্য)। তাদের ওপর ধর্ম ও রাজ্য রক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। এই চারটি বংশের মধ্যযুগীয় উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাদের প্রধান কেন্দ্রগুলি ছিল নিম্নরূপ: চৌহান - আজমের, দিল্লি পরমার - মালব বা মাল‌ওয়া অঞ্চল (উজ্জয়িনী, ইন্দোর, ধার, মাণ্ডু ইত্যাদি)। প্রতিহার - (বা গুর্জর-প্রতিহার এবং পরে সরলীকৃত হয়ে পরিহার) প্রথমে উত্তর ভারতের কানৌজ এলাকায় পরে মারোয়ার অঞ্চল।  শোলাঙ্কি/চালুক্য - গুজরাটের আনহিলওয়াড়া (পাটন) উপরে উল্লেখিত কিংবদন্তিতে চারটি অগ্নিকুলজাত রাজপুত বংশের মধ্যে মেবারের গুহিল/সিসোদিয়া বংশ নেই। তারা নিজেদের সূর্যবংশীয় রাজপুত অর্থাৎ পৌরাণিক রাজা রাম-এর ইক্ষ্বাকু বংশের উত্তরাধিকারী বলে দাবি করতো। তেমনি চন্দ্রবংশীয় রাজপুতরা নিজেদের উৎস পৌরাণিক “চন্দ্রবংশ” বা চাঁদের বংশ থেকে হয়েছে বলে দাবি করত। পুরাণে চন্দ্রদেব, বুধ, পুরুরবা, যযাতি, যদু/পুরু প্রভৃতি রাজবংশের ধারাই চন্দ্রবংশ। রাজপুত ঐতিহ্যে চান্দেলা (খাজুরাহো মন্দির সমূহের স্রষ্টা), যাদব, তোমর রাজপুত বংশ চন্দ্রবংশীয় হিসেবে উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক মতে এই সব কিংবদন্তি ক্ষত্রিয়‌দের রাজনৈতিক মর্যাদা ও বৈধতা প্রতিষ্ঠার পরম্পরা। কুম্ভলগড় যেহেতু রাজস্থানে তাই মধ্যযুগীয় উত্তর-পশ্চিম ভারতের তিনটি মুখ্য রাজপুত বংশে‌ই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাক। এগুলি হচ্ছে - মেবার (মেওয়ার), মার‌ওয়ার এবং হাডা (চৌহান) রাজবংশ।  মেওয়ার রাজপুত বংশ  অষ্টম শতকে বাপ্পা রাওয়াল তাঁর শাসনকালে (৭২৮-৭৫৩) গুহিলা বা গেহলোট (রাজস্থানে‌র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলোট স্মর্তব্য) সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করেন মে‌ওয়ার রাজবংশের। সেখান থেকেই উদ্ভব হয় সিসোদিয়া বংশ - অতঃপর মেওয়ারের ধারাবাহিক রাজপুত শাসক।  বাপ্পা রাওয়ালের সময় থেকেই মে‌ওয়ারের রাজধানী ছিল চিত্তোরগড়। তাঁর আগে ঐ এলাকা ছিল রাজস্থানে‌র মোরি রাজপুত বংশের চিত্রাঙ্গদ মোরির অধীনে। চিত্তোরগড় উঁচু পাহাড়ের উপর অনেকটা সমতল জায়গা। সেখানে বহু শতাব্দী ধরে মানুষের বসতি ছিল। সেই বসতিকে কেল্লার রূপ দেওয়ার আদি কারিগর চিত্রাঙ্গদ মোরি। তাই শুরুতে তার নাম ছিল চিত্রকোট (কোট অর্থ দুর্গ)। তাঁকে পরাজিত করে বাপ্পা রাওয়াল দখল নেন দুর্গের। ক্রমে উচ্চারণের পরিবর্তনে চিত্রকোট - চিত্তৌড় - হয়ে চিত্তোরগড় হয়েছে যার বর্তমান রূপ বহু শতাব্দী‌ ধরে নানা মেওয়ার রাণাদের সংযোজনের ফল।  রাজস্থানের প্রচলিত প্রবাদ “गढ़ तो चित्तौड़गढ़, बाकी सब गढ़ैया;ताल तो भोजताल, बाकी सब तलैया।” ছড়াকারে এর ভাবার্থ হতে পারে: বিশাল দুর্গ বলতে গেলেসে তো শুধু চিত্তোরগড়, অন্য যা সব যায় গো দ্যাখা তা তো সব‌‌ই চুনকিগড়।  বিশাল হ্রদ বলতে গেলেসে তো শুধু ভোজ সরোবর অন্য যা সব যায় গো দ্যাখা তা তো সব‌‌ই পুঁচকে পোখর।  ভোজতাল বলতে একাদশ শতকে পরমার বংশীয় রাজা ভোজ কর্তৃক ভোপালে কোলান নদীর ওপর নির্মিত মাটির বাঁধের ফলে সৃষ্ট ৩৬ বর্গকিমি ব্যাপী আপার লেক বা বড়া তালাও বোঝায়।  চারদিকে সমতলের মাঝে উন্মুক্ত পাহাড়ি কেল্লা চিত্তোরগড় সরাসরি আক্রমণে পরাজিত করা কঠিন ছিল। তবে নীচে দীর্ঘ অবরোধের মাধ্যমে কেল্লায় খাদ্যের যোগান বন্ধ করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করাও একটি সামরিক কৌশল (siege tactics). চিত্তোরগড় তেমন তিনটি দীর্ঘ অবরোধে হার মেনেছে। রাণী পদ্মিনী‌র রূপের খ্যাতি শুনে আলাউদ্দীন খিলজীর চিত্তোর আক্রমণ (১৩০৩)। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ (১৫৩৫) ও আকবরের (১৫৬৭-৬৮) চিত্তোর অবরোধ।‌ রাণী পদ্মিনী বাস্তব চরিত্র না কিংম্বদন্তী তা নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ আছে। তবে ১৫৩৫এ চিত্তোরের পতনে রাণা সাঙ্গার (সংগ্ৰাম সিং) বিধবা পত্নী রাণী কর্ণাবতী‌র সম্মিলিত মহাজৌহর ঐতিহাসিক সত্য।  প্রবাদে চিত্তোরগড়ের গড়িমা তাই কেবল তার বিশালতা বা সরাসরি আক্রমণের দুর্ভেদ্যতা‌ সূচক নয়, বরং পরাজয় নিশ্চিত বুঝলে রাজপুত যোদ্ধাদের ‘সাকা’ করে অন্তিম লড়াইতে যাওয়া ও দুর্গবাসিনী রাজপুত রমণীদের সম্মিলিত জৌহর - বা জহরব্রত পালন - এহেন সব রাজপুত বীরত্ব ও গৌরবসূচক। চরম সময়ে জৌহর প্রথা মে‌ওয়ার, মার‌ওয়ার বা হাডা চৌহান - তিন রাজপুত বংশে‌ই দেখা গেলেও চিত্তোরগড়ের ঐ তিনটি মহাজৌহর তাকে অনন্য মর্যাদা দেয়।  দুর্গের পতন অনিবার্য বুঝলে দুর্গে শঙ্খধ্বনি শুরু হোতো।‌ তখন শত্রুর হাতে বন্দিত্ব বা অপমান এড়াতে দুর্গের নারীরা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে শিশুদের নিক্ষেপ করে নিজেরাও ঝাঁপিয়ে আত্মাহুতি দিতেন। তারপর পুরুষ যোদ্ধারা পাগড়িতে কেশরিয়া বা গেরুয়া কাপড় বেঁধে, দুর্গের ফটক খুলে মরণপণ শেষ লড়াই‌তে বেরিয়ে যেতেন। এটাই “সাকা”। তাই সাকা ছিল কার্যত একমুখী যাত্রা, ফিরে এসে কাউকে আর রক্ষা করার প্রত্যাশা থাকত না। তাই ঐ প্রবাদে চিত্তোরগড় শুধু একটি দুর্গ নয়, রাজপুত বীরত্ব, আত্মসম্মান ও স্বাধীনচেতা মানসিকতা‌র প্রতীক। জৌহর প্রথা কেবল রাজস্থানেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। ২০১৯এর একাকী ভ্রমণে মধ্যপ্রদেশে‌র চান্দেরী কেল্লাতেও জৌহর কুণ্ড দেখে মন ভারাক্রান্ত হয়েছিল। ১৫২৮ সালে বাবর চান্দেরী আক্রমণ করলে পরাজয় আসন্ন বুঝে নারীরা জৌহর করেন ও রাজপুত শাসক মেদিনী রায়ের নেতৃত্বে কেল্লার যোদ্ধা‌রা সাকা প্রথায় মূল প্রবেশ তোরণে মরণপণ লড়াইয়ে মৃত্যু‌বরণ করেন। সেখানে রক্তবন্যা বয়েছিল বলে পরে লোকমুখে সেই তোরণের নাম হয় খুনী দর‌ওয়াজা।  গোয়ালিয়র কেল্লাতেও ১২৩২ সালে দিল্লির সুলতান শামস-উদ-দীন ইলতুতমিশ দুর্গ দখল করলে কেল্লার নারীরা জৌহর করেন। কেল্লার উত্তরে জৌহরস্থানের পাশে জলাশয়টি তাই জৌহর-তাল নামে পরিচিত। ২০১৯এর সেই একাকী ভ্রমণেই গোয়ালিয়র কেল্লা‌য় সেই তাল দেখে, তার প্রেক্ষাপট জেনে খারাপ লেগেছিল। মার‌ওয়ার রাজপুত বংশ  মারওয়ারের রাঠোর রাজবংশের কেন্দ্র ছিল জোধপুর অঞ্চল। মেবারের মতো রাঠোররা‌ও নিজেদের সূর্যবংশীয় ভাবতেন এবং উত্তর ভারতের প্রাচীন কনৌজ রাজের বংশধর বলে পরিচয় দিতেন। ১১৯৪ সালে চান্দাওয়ারের যুদ্ধে মুহম্মদ ঘোরীর হাতে কনৌজের রাজা জয়চন্দ্র নিহত হলে তাঁর বংশধর সিহাজি রাঠোর পশ্চিমে রাজস্থানের দিকে চলে আসেন। তিনিই মারওয়ারে রাঠোর শক্তির প্রতিষ্ঠাতা। “মারু” অর্থ মরুভূমি‌ এবং “ওয়ার” অর্থ অঞ্চল। অর্থাৎ মারওয়ার অর্থ মরুপ্রদেশ। বর্তমান পশ্চিম রাজস্থানের বিশাল শুষ্ক অঞ্চলই ছিল ঐতিহাসিক মারওয়ার। এর মধ্যে আজকের জোধপুর, পালি, নাগৌর, বারমের, জালোর ইত্যাদি অঞ্চল পড়ত। শুরুতে রাঠোররা পালি অঞ্চলে শক্তিবৃদ্ধি করে স্থানীয় প্রতিহার, পরমার, চৌহান প্রভৃতি শক্তিকে সরিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। প্রকৃত উত্থান ঘটে রাও জোধা রাঠোরের সময়। আগে মার‌ওয়ারের রাজধানী ছিল মাণ্ডোর, যা সমতলে বলে নিরাপদ ছিল না। তাই রাও জোধা রাঠোর ১৪৫৯ সালে জোধপুর শহরের প্রতিষ্ঠা করে পাহাড়ের উপর মেহরনগড় দুর্গ নির্মাণ করেন। মজবুত উঁচু প্রাচীর এবং বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফলে এটি ছিল একটি দুর্ভেদ্য কেল্লা। মেবারের সিসোদিয়া ও মারওয়ারের রাঠোর, এই দুই সূর্যবংশীয় রাজপুত ধারা রাজস্থানে মর্যাদার শীর্ষে ছিল। তাদের মধ্যে কখনও মিত্রতা, কখনও প্রতিদ্বন্দ্বীতা আবার কখনো বিবাহ সম্পর্কও ছিল। রাঠোর বংশে রাও মালদেও রাঠোর ষোড়শ শতকে মারওয়ারকে প্রবল সামরিক শক্তিতে পরিণত করেন। শের শাহ সূরি‌ও তাঁকে সমঝে চলতেন।  মুঘল সম্রাট বিচক্ষণ আকবর রাজপুতদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তাই মারওয়ারের বহু রাঠোর অভিজাত মুঘল দরবারে উচ্চপদে যান। তার মধ্যে রাজা উদয় সিংয়ের কন্যা জগত গোসাঁই ছিলেন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী অর্থাৎ শাহজাহানের জননী।  মহারাজা জসওয়ন্ত সিং মুঘল সাম্রাজ্যের বড় সেনাপতি ছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সময় তখন‌ও উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর পুত্রের জন্ম না হ‌ওয়ায় চতুর ঔরঙ্গজেব মারওয়ারকে সরাসরি মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চান। এর ফলে শুরু হয় দীর্ঘ রাজপুত বিদ্রোহ। মারওয়ারের মহাবীর দুর্গাদাস রাঠোর শিশুরাজা অজিত সিংকে রক্ষা করে ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বহু বছর গেরিলা যুদ্ধ চালান। রাজপুত ইতিহাসে তাঁর মর্যাদা ও বীরত্ব মেবারের মহারাণা প্রতাপের সমতুল্য। শেষ পর্যন্ত মারওয়ার পুনরায় তার স্বাধীন মর্যাদা ফিরে পায়। ব্রিটিশ আমলে জোধপুর স্টেট ছিল রাজপুতানার অন্যতম বৃহৎ ও ধনী দেশীয় রাজ্য। জোধপুর ল্যান্সারস নামে বিখ্যাত অশ্বারোহী বাহিনীও ছিল। স্বাধীনতার পর বহু স্বাধীন দেশীয় রাজ্যের মতো জোধপুর স্টেট বা মার‌ওয়ার‌ও ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মেবারের ঐতিহ্যে স্বাধীনচেতা মনোভাবের গৌরব প্রাধান্য পেয়েছে কিন্তু মারওয়ারের ইতিহাসে সামরিক শক্তির বিকাশের সাথে বাস্তববাদী কূটনৈতিক কৌশলের গুরুত্ব‌ও দেখা গেছে।  হাডা চৌহান রাজপুত বংশ  হাডারা মূলত চৌহান রাজপুত বংশেরই একটি শাখা। যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ড হতে উদ্ভুত বলে চৌহানরা‌ নিজেদের “অগ্নিবংশীয়” রাজপুত ভাবতেন।‌ চৌহানরা উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক শক্তিশালী ক্ষত্রিয় রাজবংশ, যাদের উত্থান হয়েছিল আজমের - শাকম্ভরী অঞ্চলে।  অতীতে রাজপুত রাজারা সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মেবারের রাণা সাঙ্গার শরীরে বহু যুদ্ধে‌র ক্ষতচিহ্ন ছিল, একটি চোখ ও একটি হাত‌ও অকেজো হয়ে গেছিল তাও তিনি অসীম মনোবলে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মেবারের রাণা প্রতাপ দীর্ঘ মুঘল বিরোধী যুদ্ধে কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত। তেমনি‌ই ছিলেন দুর্গাদাস রাঠোর (মার‌ওয়ার), পৃথ্বীরাজ চৌহান‌ (চৌহান), রাও সুরজন হাডা, রাও রতন সিং হাডা (বুন্দির হাডা বংশ) ইত্যাদি। মাত্র ২৬ বছরের জীবনকালে (১১৬৬-৯২) এবং ১৫ বছরের রাজত্বকালে (১১৭৭-৯২) পৃথ্বীরাজ চৌহান দু’বার উত্তর ভারতে মুসলিম আক্রমণ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা করেন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মুহম্মদ ঘোরীকে পরাজিত করলেও তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ও মৃত্যু ভারতীয় ইতিহাসের একটি মর্মান্তিক অধ্যায়। কারণ তার পরে উত্তর ভারতে তুর্কি-মুসলিম শাসনের পথ অনেকটাই খুলে যায়। চৌহানদের বহু শাখার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা “হাডা” নামটি এসেছে এক পূর্বপুরুষ “হাড়া” বা “হররাজ” নাম থেকে। তাঁর বংশধররাই পরে হাডা নামে পরিচিত হন। প্রথমদিকে এরা মেওয়ালের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে শক্তি বাড়াতে থাকে। ১৩শ–১৪শ শতকে বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব রাজস্থানের পাহাড়ি বনাঞ্চল মীণা উপজাতীয় প্রধানদের প্রভাব ছিল। হাডা চৌহান নেতা রাও দেবা হাডা ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন বলে তাঁকেই বুন্দি রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয়। তিনি মীণা প্রধানদের পরাজিত করে বুন্দিকে রাজধানী করেন। হাডা চৌহানদের শাসনের জন্যই ওই অঞ্চল “হাডৌতি" নামে পরিচিত। বর্তমান বুন্দি, কোটা, ঝালাওয়াড় প্রভৃতি অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত। প্রথমে কোটা ছিল বুন্দিরই অংশ। পরে হাডা বংশের আরেক শাখা কোটার শাসক হন। এর ফলে দুটি পৃথক হাডা রাজ্য গড়ে ওঠে, বুন্দি ও কোটা। দুটিই রাজপুতানার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।  (প্রসঙ্গত বলি - ২০২৩এর জানুয়ারি‌তে দু'মাসের একাকী ভ্রমণে বুন্দি, কোটা, ঝালাওয়াড় ও সংলগ্ন ঝালরাপাটান - কেবল এই তিনটি জায়গা‌তেই ১৩ দিন ধরে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে ঘুরেছি। দলে গেলে জনতা বোর হয়ে যেতো। অপূর্ব সেসব অভিজ্ঞতা)  দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী হাডা রাজপুতরা যুদ্ধকুশলতা ও বীরত্বের জন্য বিখ্যাত ছিল।‌ অন্যান্য রাজপুত বংশের মতো তারাও পরে আকবরের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে।‌ বিশেষ করে কোটার হাডা রাজারা মুঘল সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ভূমিকা পালন করেন। হাডা শাসকদের সঙ্গে জড়িত বিখ্যাত স্থাপত্যের মধ্যে বুন্দির তারাগড় দুর্গ ও প্যালেস এবং কোটার গড়প্যালেস উল্লেখযোগ্য। বুন্দির প্রাসাদ ও দেওয়ালচিত্র (Boondi School of Arts) রাজস্থানি শিল্পকলায় খুব‌ই বিখ্যাত।  পৌঁছে গেলাম কেল‌ওয়াড়া দু ঘন্টা ঘুমপাড়ানি ছন্দে, নন-স্টপ চললো বাস। মাঝে কেউ উঠলো‌ও না, নামলো‌ও না। পৌনে আটটা পৌঁছলাম কেল‌ওয়াড়া। ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর নেমে গেলো চা, নাস্তা করতে। আমি‌ও নামলাম। ভোরে টোষ্ট, ডিম সেদ্ধ খেয়েছি, তাই ক্ষিদে তেমন পায়নি। তবে কোথাও বসে খোঁজ‌খবর নিতে হবে। গতকাল বিকেলে বাসডিপোর নিমানন বাবুর স্মৃতি তখন‌ও তাজা। তাই এক অমায়িক দর্শন দোকানীর নাস্তার দোকানে পোহা, চা নিয়ে বসে জানতে চাই কেল্লা কতদূর?  তিনি বলেন, সাত আট কিমি হবে। বলি, তাহলে কিভাবে যাবো? উনি যা বললেন, তার মর্মার্থ হচ্ছে - সাড়ে নটা নাগাদ একটা বাস আসবে যেটা রণকপুর যাবে। তাতে গিয়ে পাঁচ কিমি দূরে T জংশনে নেমে পড়তে হবে। সেখানে রাণা প্রতাপের একটি পুতলা (স্ট্যাচু) আছে। সেখান থেকে বাস চলে যাবে বাঁয়ে রণকপুর। ডাইনে গেলে কেল্লা।  মাত্র পাঁচ কিমির জন্য দেড় ঘন্টা অপেক্ষা‌র মানে হয়না। বলি, হেঁটে‌ যেতে পারি না। তিনি বলেন, অবশ্যই পারেন। বেড়াতেই তো এসেছে‌ন, সঙ্গে মাল‌ও নেই, হাঁটায় অসুবিধা না থাকলে যেতেই পারেন। একটাই পথ, ভুলের কোনো সম্ভাবনা নেই।   উপরে উপগ্ৰহ চিত্রের 1 নম্বর পয়েন্ট থেকে হাঁটতে শুরু করেছি। আর 2 নম্বর পয়েন্ট T-জংশন। মামূলী চড়াই পথ। এখন ম্যাপে দেখলাম কেল‌ওয়াড়া থেকে গড়ের গেট অবধি ৭ কিমি পথ। চড়াই প্রায় সাতশো ফুট, উৎরাই দুশো।‌ এমন কিছু নয়। গেট থেকে কেল্লার উচ্চতম পয়েন্ট বাদলমহল আরো দুশো ফুট। তবে তা একটানা চলার পথে নয়। কেল্লা‌য় ঢুকে ধীরে সুস্থে আশপাশে ঘুরে দেখে পরে উঠেছিলাম।   একটু গিয়ে 1A পয়েন্টে রাস্তা‌র বাঁদিকে দেখলাম লাখেলা লেক। নেট থেকে নেওয়া ২০২৫এর ছবিতে দেখি বেশ বড় রিসোর্ট হয়েছে।‌ বেশ সুন্দর লোকেশন। তবে ২০১১ তে ওখানে কিছু‌ই ছিল না। শীতের সকালে মোলায়েম রোদে হাঁটতে বেশ লাগছে। নদীখাত, পাহাড়, জঙ্গল নিয়ে রাস্তার দুপাশের দৃশ্য চমৎকার। সুন্দর প্রকৃতির মাঝে এমন নির্জন পথে হাঁটলে মনের আরাম হয়।   সাড়ে নটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ম্যাপে 2 নম্বর পয়েন্টে T জাংশনে। পাশেই ঝকঝকে একটা ফাঁকা চায়ের দোকানে বসে চা বলি। সৌম্যদর্শন মৃদুভাষী দোকানীকে বেশ লাগে। তার ছোট মেয়েটি দোকানে বাবার কাছে বসেছি‌ল।‌ স্যাক থেকে দুটো টফি বার করে দিই। গোলগাল, আদুরে মুখ। দোকানীকে বলি, ওর একটা ছবি নেবো। হেসে সায় দেয়। চলার পথে এসব ছোট্ট বোনাস।  দোকানীর সাথে গল্পে জানলাম কুম্ভলগড় থেকে রনকপুর ৩০ কিমি‌র জাঙ্গল ট্রেক রুট আছে। মাঝে এক রাত থাকতে হয়। তবে ঐ পথ কুম্ভলগড় ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুযারির মধ্যে দিয়ে, গাইড ছাড়া যাওয়া উচিত নয়। চল্লুম কেল্লার পানে  চা খেয়ে ডানদিকে হাঁটি কেল্লার দিকে। প্রথম উপগ্ৰহ ম্যাপে দেখানো 2 এবং 3 পয়েন্টে‌র মধ্যে রাস্তায় প্রথমে এলো আরেত পোল। এতোটা এসে‌ও কেল্লা বা তার দেওয়া‌ল চোখে পড়েনি। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় - আসবো পরে।   আর একটু যেতে এলো হাল্লা পোল। এইখান থেকে কেল্লার প্রাচীর দেখা গেল যার মাঝে মাঝে নিয়মিত দূরত্বে বিরাট মোটা গোলাকার বুরুজ।   হাল্লা পোল থেকে কিছু‌টা যেতে ম্যাপে 3 নম্বর পয়েন্টে হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়ে অভিভূত করেছিল বাদল মহল (5)।  এই ম্যাপ আর একটু এনলার্জড্। এতে 4 নম্বর পয়েন্ট কেল্লার প্রাচীরের বাইরে দ্বিতল বড় প্রবেশদ্বার - হনুমান পোল। 4A- প্রাচীরের মধ্যে কেল্লার মুখ্য গেট - রাম পোল। এখানে‌ই ASI টিকেটঘর। 5 নম্বর - বাদল মহল। 6 নম্বর - বাহান্ন দেউড়ি জৈন মন্দির - সেখানে বসে লাঞ্চ করেছি‌লাম।  ড্রোন ভিউতে কেল্লার পশ্চিমে মুখ্য অংশ‌ - একদম ওপরে বাদল মহল (5)  কেল্লা‌র পোল বা দ্বারের বৃত্তান্ত   কুম্ভলগড় কেল্লার ১০টি পোল বা দ্বার স্যাটেলাইট বা ড্রোন ভিউতে ঠিক বোঝা যায়না। তাই এই স্কিমেটিক স্কেচটা রাখলাম। নয়টি পোল কেল্লার পশ্চিম দিকে। কেল্লার বাইরে এ্যাপ্রোচ রোডে ১.আরেত পোল ২. হাল্লা পোল। কেল্লার প্রাচীরের কাছে ৩. হনুমান পোল ও ৪. রাম পোল। বাকি গেটগুলি কেল্লার মধ্যে বাদল মহলের দিকে যেতে ৫. ভৈরব পোল ৬. নিম্বু পোল ৭. চৌগান পোল ৮. পাগড়া পোল ও অন্তিমে বাদল মহলে ঢোকার আগে ৯. গণেশ পোল।‌ কেল্লার পূব দিকের প্রাচীরে ১০. বিজয় পোল। এই ১০টি ডকুমেন্টেড পোল ছাড়াও প্রাচীরে বিভিন্ন জায়গায় আরো ৭ থেকে ১২ টি গেট ছিল। তার কিছু কেল্লা‌য় মালপত্র আনার জন্য (supply gates), কিছু প্রয়োজনে পলায়নের জন্য গুপ্ত দ্বার (Escape gates). বলে নাকি কুম্ভলগড়ের ৩৬ কিমি দুর্গপ্রাকার বিশ্বে চায়না ওয়ালের পরে দ্বিতীয় দীর্ঘ‌তম। সেই দীর্ঘ প্রাচীরের অনেক জায়গা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বলে বাকি গেটগুলি শনাক্ত করা যায় না।   যেমন উপরের ছবি দুটিতে লাল তীর গুলি দূরবর্তী দুর্গপ্রাকারের অবস্থান। চীনের প্রাচীরের মতোই পাহাড়ের শিখর, গিরি শিরা ধরে চলে গেছে কত দূর অবধি! কেল্লার ভিতরে - পূবে  ১৪৪৩ থেকে ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিশাল কুম্ভলগড় দুর্গ নির্মাণ করেন মেবারের বিখ্যাত শাসক রানা কুম্ভ।‌ আরাবল্লী পাহাড়ের উঁচুনীচু গিরাশিরা ধরে ৩৬ কিমি প্রাচীরে ঘেরা ২০ থেকে ২৫ বর্গকিমি এলাকায় বিস্তৃত এই সুবিশাল দুর্গ মাত্র ১৫ বছরে তৈরী হয়েছে ভাবলে অকল্পনীয় মনে হয়। ঐতিহাসিকদের‌ও অনুমান আগে পাহাড়ের উপর কিছু পুরনো প্রতিরক্ষা কাঠামো থাকতে পারে, তবে বর্তমানে দৃশ্যমান দুর্গ মূলত রানা কুম্ভর‌ই সৃষ্টি।   রামপোলের দরজা দিয়ে ঢুকে ডাইনে পূবদিকে কেল্লার প্রাচীরের ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ১৫ থেকে ২৫ ফুট চওড়া প্রাচীর, কিছুটা অন্তর অর্ধবৃত্তাকার বড় বুরুজ (bastions). কুম্ভলগড় দুর্গে ৩৬০টি মন্দির ছিল, ৩০০টি জৈন মন্দির, ৬০টি হিন্দু মন্দির। রাজপুত হিন্দু শাসকদের দুর্গে এতো জৈন মন্দিরের উপস্থিতিতে বোঝা যায় যে জৈন সম্প্রদায়ের প্রতি মেবারের শাসকদের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এখন অধিকাংশ মন্দির ভগ্নপ্রায়। কিছু টিকে আছে। তার কিছু বেশ কারুকার্যমন্ডিত।   টিকে থাকা জৈন মন্দিরে‌র মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বাওয়ান দেবড়ি দিগম্বর জৈন মন্দির। এটি কেল্লা নির্মাণ সম্পন্ন (১৪৫৮) হ‌ওয়ার অনতিপরে আনুমানিক ১৪৬৪ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্ন হয়। বাওয়ান শব্দের অর্থ ৫২ এবং দেবড়ি অর্থ উপমন্দির। কেন্দ্রের মূল মন্দিরটি ভগবান পার্শ্বনাথের। তাকে ঘিরে ৫২টি উপমন্দির নির্মিত হয়েছে বলে এই নাম। মন্দিরে খোদাইয়ের কাজ সূক্ষ্ম। সে‌ই নির্জন মন্দিরের চাতালে বসে‌ সেদিন দুপুরে মটর, গাজর, পেয়ারা সহযোগে মধ্যাহ্ন ভোজ করেছিলাম।‌ কেল্লার ভিতরে - পশ্চিমে একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরে গেলাম রাম পোলের কাছে। জয়সলমীর (সোনার) কেল্লায় দেখেছি ভিতরে আজ‌ও বহু লোকজন বসবাস করে, তাই ওটাকে লিভিং ফোর্ট‌ বলা হয়।‌ এখানে‌ও রাম পোলের উত্তরে কিছু টিনের চালের ঘর দেখলাম। শুনলাম ওরাও বহু পুরোনো আমলের স্থানীয় লোক, তাই ASI উচ্ছেদ করেনি। তাদের কেউ কেল্লার কর্মচারী।   ওদিকে একটু দেখতে গিয়ে আবার‌ও কিসমি টফি কাজে এলো। Lost in thought ভঙ্গিতে একটি শিশু গাছের তলায় দাঁড়িয়ে। মুখ থমথমে। চোখ ছলছলে। দূর থেকে চকিতে সেই হন্টিং মুখটি জুম ইন করে ধরি। সে খেয়াল করেনি। কাছে গিয়ে তালুতে চারটে কিসমি টফি নিয়ে বাড়িয়ে ধরি। সে মুখ তুলে তাকায়। চোখ ইশারায় বলি, নাও। টফিগুলো নিয়ে নীরবে চলে যায়। সুক্রিয়া গোছের পোশাকি ভদ্রতা জানানোর বয়স ওটা নয়। হয়তো ও নিজের ঘোরে মগ্ন। শিশু‌দের ভাবনার নাগাল পাওয়া‌ বড়দের কম্মো নয়। দুর্ভেদ্য কুম্ভলগড়  বাদল মহলের দিকে যেতে ভৈরব পোলের কাছে একটি মন্দিরের মত জায়গায় একটা অদ্ভুত দর্শন পাথরের মুখের মতো দেখেছিলাম। তাতে চপচপে করে সিঁদুর মাখানো। তখন তার তাৎপর্য বুঝিনি। ওপরে বাদল মহলে গিয়ে ASI গার্ডের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য জনশ্রুতি শুনলাম। রানা কুম্ভ দুর্গট নির্মাণ করতে গেলে নানা জায়গায় রহস্যজনকভাবে ভেঙে পড়তো বা নানা বাধা পড়তো। তখন এক সাধু রাণাকে বলেন‌ যে, কেল্লার স্থান নির্বাচনে‌ই ভুল হয়েছে এবং এই কেল্লা নির্মাণ সম্পন্ন করতে কারুর আত্মবলিদান প্রয়োজন।‌ তিনি নিজেকে এর জন্য উৎসর্গ করতে চান। তিনি রানাকে নির্দেশ দেন তাকে অনুসরণ করতে এবং তার নির্বাচিত স্থানে তার শিরশ্ছেদ করতে। যেখানে ছিন্ন মস্তকটি পড়বে, সেখানে তার স্মৃতি‌তে একটি স্মারক করতে হবে।‌ শিরচ্ছেদের পরেও দেহটি কিছুটা গিয়ে যেখানে মাটিতে পড়বে, সেখানে কেল্লার মূল প্রতিরক্ষা দ্বার বানাতে হবে। জানলাম সেই সিঁদুর মাখা পাথরের কাছে‌ই রাণা কুম্ভ সাধুর নির্দেশে তাঁর শিরচ্ছেদ করতে মস্তকবিহীন দেহটি শ খানেক মিটার গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। সেখানে‌ই বর্তমানে দ্বিতল, বৃহৎ হনুমান পোল।  প্রথমে রাণা কুম্ভ নির্বাচিত স্থানটি ছিল উন্মুক্ত স্থানে। সাধু নির্দেশিত বর্তমান স্থানটি আরাবল্লী পর্বতমালার ভাঁজের মধ্যে লুকানো। এটি চিত্তোরগড়, মেহরনগড়, গোয়ালিয়র কেল্লার মতো দূরে নীচের সমতল থেকে তো নয়‌ই, অনেকটা ওপরে এলেও দৃশ্যমান নয়। আমি‌ও সেদিন কেল‌ওয়াড়া থেকে ৬ কিমি আসার পর স্যাটেলাইট ইমেজে দেখানো ২ থেকে ৩ এর মধ্যে সেই প্রথম কেল্লার দেওয়াল দেখতে পেয়েছিলাম। লোককথার এই অংশে বাস্তব সত্যের একটি গ্ৰহণযোগ্য উপাদান রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে এমন লুক্কায়িত অবস্থানের জন্য শত্রুপক্ষ দূর থেকে দুর্গের বিন্যাস সহজে বুঝতে পারত না, গোলন্দাজ মোতায়েন করা কঠিন ছিল। কাছে এসে‌ও আঁকাবাঁকা চড়াই পথে অতোগুলি প্রতিরক্ষা তোরণ থাকায় যুদ্ধহস্তী দিয়ে গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকা সহজ ছিলনা। ভিতরে চ‌ওড়া প্রাচীর দিয়ে অনেক সৈন্য এসে ওপর থেকে, পাথর, তীর, গোলা বর্ষণ করতো। গরম জল ঢেলে দিতো। এসবের ফলে সরাসরি আক্রমণ করে কুম্ভলগড় কেল্লা জেতা কঠিন ছিল।   চিত্তোরগড় উঁচু পাহাড়ের মাথায় প্রাচীর ঘেরা ৭০০ একর বা ৩ বর্গকিমি সমতল এলাকা। কুম্ভলগড়ের মূল এলাকা চিত্তোরগড়ের থেকে সামান্য কম কিন্তু ৩৬ কিমি সুরক্ষা প্রাচীরের মধ্যে এলাকা প্রায় ২২ বর্গকিমি‌। উপরের ছবিতে উত্তরে লাল তীর থেকে বোঝা যাবে কী বিশাল পাহাড়ি এলাকা ঐ প্রাচীরের মধ্যে ছিল। প্রভূত বর্ষা‌র জল ধরে রাখা যেতো। চাষাবাদ, ফলমূলের বাগান, পশুচারণও করা যেতো। ফলে শত্রুপক্ষ বাইরে অবরোধ করে কেল্লা‌য় খাদ্যাভাব তৈরী করতে চাইলে জমানো শষ্য ছাড়া‌ও উৎপাদন করেও আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দীর্ঘদিন খুঁটি গেঁড়ে বসে থাকা যেতো।  মুঘলদের বিরুদ্ধে আভ্যন্তরীণ ঐক্যবদ্ধ‌তা না থাকায় বিভিন্ন সময়ে মুঘলদের সাথে আম্বর-এর (আমের, পরে জয়পুর) কচ্ছওয়াহা রাজপুত, বিকানির বংশ, জয়সলমীরের ভাটি রাজপুত, মার‌ওয়ারের রাঠোর বংশ‌‌ও যোগ দিয়েছিল। মুঘলদের বিরুদ্ধে রাণা প্রতাপের ইতিহাস বিখ্যাত হলদিঘাটির যুদ্ধে (১৫৭৬) মুঘল বাহিনীর প্রধান সেনানায়ক‌ ছিলেন আমেরের রাজা মান সিং (১ম)।‌ হলদিঘাটির যুদ্ধের পর রানা প্রতাপ কুম্ভলগড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই সময় রাজপুত জোটের সাহায্যে মুঘল সম্রাট আকবরের নেতৃত্বে শাহবাজ খান কাম্বোহ সহ অন্যান্য সেনাপতিদের সম্মিলিত বড় বাহিনী দুর্গটি অবরোধ করে। অনেকদিন দুর্গটি সেই অবরোধ প্রতিরোধ করেছিল। আকস্মিক বিস্ফোরণে রসদ, কামানের গোলাবারুদের ভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হতে কেল্লার প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মুঘলরা সাময়িকভাবে দুর্গটি দখল করলেও বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি।  মুঘলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন সংগ্ৰাম করে রাণা প্রতাপ চিত্তোরগড় ছাড়া মেবারের অনেক অংশ পুনরুদ্ধার করেন। যদি পশ্চিম ভারতের সব রাজপুত গোষ্ঠী একজোট হয়ে থাকতে পারতো তাহলে হয়তো তারা সম্মিলিতভাবে মুঘলদের প্রতিরোধ করতে পারতো। কিন্তু রাজপুত রাজনীতি ছিল অত্যন্ত বিভক্ত। প্রত্যেক রাজ্য টিকে থাকার প্রয়োজনে সময়ের সঙ্গে জোট ও সম্পর্ক বদলাত। তাই আম্বর মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছিল, কিন্তু মহারাণা প্রতাপের নেতৃত্বে মেবার মুঘলদের দীর্ঘ প্রতিরোধের পথ গ্রহণ করেছিল। এই পার্থক্যই রাজপুত ইতিহাস, লোকগাথা ও স্মৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব পায়।  ধাত্রী পান্নার ত্যাগ - উদয়পুরের উত্থান  ১৫২৭ সালে দ্বিতীয়‌বার বাবরের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর খানওয়ার যুদ্ধে রাণা সাঙ্গা বিশাল রাজপুত জোটের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে রানা সাংগা গুরুতর আহত হয়ে ১৫২৮ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে মেবারে উত্তরাধিকার নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। বয়োজ্যেষ্ঠ বলে প্রথমে রাণার অন্য পত্নী‌র সন্তান রতন সিংহ সিংহাসনে বসেন। ১৫৩১ সালে তিনি শিকারে গিয়ে মারা যেতে রাণা সাঙ্গা‌র পাটরাণী রাণী কর্ণাবতীর বড় ছেলে ১৪ বছরের বিক্রমাদিত্য সিংহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু অযোগ্য, দুর্বিনীত কিশোর বিক্রমাদিত্য অচিরেই সকলের বিরাগভাজন হয়ে পড়ে। রাজপুত সামন্তদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে। কিন্তু বুন্দির হাডা চৌহান বংশের কন্যা রাণী কর্ণাবতী তাঁর স্বামী রাণা সাঙ্গা‌র মতোই তেজস্বিনী, সাহসী নারী।‌ তাই তিনি বিক্রমাদিত্যর বকলমে রিজেন্ট কু‌ইন বা অভিভাবক রাণী হিসেবে মেবারের নেতৃত্বভার নিলে তা মেনে নেওয়া রাজপুত প্রধানদের মর্যাদায় বাঁধে নি, তারা বীরপূজক - সে রাজা হোক বা রাণী।  তেমন এক রাণী ছিলেন মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের পুত্র রাজারাম (প্রথম)-এর স্ত্রী তারাবাঈ ভোঁশলে (১৬৭৫–১৭৬১)। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে মারাঠাদের দীর্ঘ সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা অসাধারণ। ১৭০০ সালে রাজারাম মারা গেলে তাঁর পুত্র ছিল অল্পবয়সী। তখন তারাবাঈ মারাঠা সাম্রাজ্যের রিজেন্ট বা অভিভাবক-শাসক হন। তিনি সেনাবাহিনী পরিচালনা, দুর্গ রক্ষা ও গেরিলা যুদ্ধ কৌশল সংগঠিত করতেন। তারাবাঈ সেই সময় নেতৃত্ব না দিলে তবে মুঘলদের দাপটে মারাঠা শক্তি ভেঙে পড়তে পারত। (২০২০ সালের শীতে ৬৩ দিনের একাকী ভ্রমণে বেরিয়ে কোলহাপুর গিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে দেখেছিলাম ছত্রপতি সাহুজী মহারাজ (নিউ প্যালেস) মিউজিয়াম। দরবার হলে শাড়ি পরে কোমরে তলোয়ার নিয়ে ঘোড়ায় চড়া আভিজাত্য‌ময় ব্যক্তি‌ত্বময়ী এই নারীর বিরাট তৈলচিত্রটি দেখে বেশ সম্ভ্রম হয়েছিল। ওখানে ছবি তোলা নিষেধ। এখানে যে ছবিটি রেখেছি সেটা উইকি থেকে নেওয়া ঐ ছবিটার‌ই ডিজিটাল সংস্করণ) ফিরে আসি চিত্তোরে। কঠিন প্রতিরোধ স্বত্ত্বেও ১৫৩৫ সালে গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহের আক্রমণে চিত্তোরগড়ের পতন অনিবার্য বুঝে রাণী কর্ণাবতীর সম্মিলিত মহাজৌহরের কথা আগেই লিখেছি। তখন বিক্রমাদিত্য ও উদয় ছিল নিরাপদে বুন্দিতে মামার বাড়ি‌তে। বাহাদুর শা চিত্তোরগড় জয় করেও অত বড় কেল্লা কব্জায় রাখতে চাপে ছিলেন। ওদিকে খবর এলো হুমায়ূন চলেছে‌ন গুজরাতের দিকে। তাই চিত্তোর ছেড়ে তিনি দ্রুত গেলেন গুজরাতে। চিত্তোরগড় আবার মেবারের সিসোদিয়া রাজপুত‌দের অধীনে এলো। বিক্রমাদিত্য ও উদয়কে বুন্দি থেকে আনা হোলো চিত্তোরে। চিত্তোরের ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে রাণা সাঙ্গা‌র ভাইপো বনবীর ১৯ বছরের বিক্রমাদিত্যকে হত্যা করে ছোট রাজপুত্র উদয়কেও হত্যা করতে চায়, যাতে মেবারের সিংহাসনের আর কোনো বৈধ দাবিদার না থাকে। তখন পান্না দাই ছিলেন উদয়ের তত্ত্বাবধানে। বনবীরের ষড়যন্ত্রে‌র আভাস পেয়ে পান্না উদয়কে বিশ্বস্ত ভৃত্যদের সাহায্যে দুর্গের বাইরে পাচার করে নিজের পুত্র চন্দনকে রাজপুত্রের পোশাক পরিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন। বনবীর তরবারি হাতে ঘরে ঢুকে বিছানায় শোয়া চন্দনকেই উদয় ভেবে পান্নার সামনেই হত্যা করেন।‌ পান্না নিজের সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে মেবারের উত্তরাধিকারীকে রক্ষা করেন। এতোদিন জানতাম ধাত্রী পান্না বছর পাঁচেকের শিশু উদয়কে নিয়ে পালিয়ে গেছিলেন চিত্তোর থেকে। এই লেখার জন্য সংগৃহীত তথ্যের কালানুক্রম অনুধাবন করে বুঝলাম, তখন উদয় ১৪ বছরের কিশোর। চিত্তোরগড় থেকে পান্না দাই উদয়কে নিয়ে প্রচলিত রাস্তায় দিনের বেলায় গেলে বনবীরের লোক ধরে ফেলবে। তাই আরাবল্লীর দুর্গম শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যপথে, রাতের অন্ধকারে প্রায় ১২০ কিমি ঘুরপথে বেশ কিছুদিন পরে পৌঁছান কুম্ভলগড়ে। পথে মেবারের অনুগামী বিশ্বস্ত, রাজপুত ও সাহসী ভীল উপজাতির সর্দার‌রা পান্না‌কে আশ্রয় দিয়েছে‌ন, নিরাপদে কুম্ভলগড়ে পৌঁছে দিয়েছেন। ভীল উপজাতি পরে রাণা প্রতাপের দীর্ঘ মুঘল বিরোধী যুদ্ধে‌ও সাথে ছিলেন। যখন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে উদয় সিংহ জীবিত আছেন, তখন মেবারের রাজপুত প্রধানরা তাঁকে‌ই বৈধ মহারানা হিসেবে স্বীকার করে বনবীরকে পরাজিত করে চিত্তোর পুনর্দখল করেন।  ধাত্রী পান্নার অকল্পনীয় ত্যাগে উদয় সিং (২) বেঁচে যেতে পরে তাঁর সন্তান রাণা প্রতাপের জন্ম‌ হয় কুম্ভলগড়ে। ১৫৪০ সালে মেম্বারের শাসক হয়ে উদয় সিংহ চিত্তোরের অবস্থা‌নগত দুর্বলতা‌ উপলব্ধি করে ১৫৫৯ সালে উদয়পুর শহরের নির্মাণ করে মেবারের রাজধানী‌ সেখানে সরিয়ে আনেন। অবশ্য মেবার বংশের প্রতিষ্ঠাতা বাপ্পা রাওয়ালের মতোই উদয় সিংহ‌ও উদয়পুরের পত্তন শুন্য থেকে করেন নি। বাপ্পা রাওয়াল তাঁর আমলেই (৭২৮-৭৫৩) উদয়পুরের ২০কিমি উত্তরে কৈলাশপুরীতে একলিঙ্গজী (শিব) মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। মেবারের মহারাণারা নিজেদের শিবের “দেওয়ান” বা প্রতিনিধি মনে করতেন। ফলে প্রাচীন কাল থেকেই ঐ এলাকায় জনবসতি ছিল। উদয় সিংহ তাই সেখানে‌ই পরিকল্পিত রাজধানী নগরী উদয়পুরের নির্মাণ করেন যেমন রাও জোধা মান্ডোর থেকে জোধপুর নগরের পত্তন করে মার‌ওয়ারের রাজধানী সরিয়ে আনেন। বাদল মহল বাদল মহলের এক জায়গায় লেখা “Rana Pratap was born here"। এটা দেখতেই তো এখানে আসা। ঐ রাজপুত বীরের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে। মহিয়সী নারী ধাত্রী পান্নার ঘরও দেখতে পেলাম। এক ASI গার্ড উৎসাহ নিয়ে আমাকে সেসব ঘুরিয়ে দেখালেন। বললেন, কুম্ভলগড়ে মে হ্যায় এক "ছত্তিশ কা আঁকড়া” - ইয়ানি ৩৬ কিমি পরকোটা (দুর্গপ্রাচীর) গুণা ১০ = ৩৬০ মন্দির গুণা ১০ = ৩৬০০ ফুট উঁচা বাদলমহল কি শিখর।  পরে জাল ঘেঁটে দেখেছি এই “ছত্তিশ গুণা দশ"-এর নামতাটি প্রায় ঠিক তবে সম্পর্কটা কাকতালীয়, কোনো উর্বর মস্তিষ্কের আবিষ্কার। কেননা যখন এই কেল্লা তৈরী হয় তখন গড় সমূদ্রতলের সাপেক্ষে কোনো স্থানে‌র উচ্চতা‌ নিরুপনের ধারণা ভবিষ্যতে‌র গর্ভে। হোয়াতে দেখেছি এমন‌ই এক চমকপ্রদ মেসেজ - "শিবশক্তি অক্ষরেখা"। তাতে বলা হয়েছে প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান এত‌টাই উন্নত ছিল যে উত্তরে কেদারনাথ থেকে দক্ষিণে রামেশ্বরমে রামনাথস্বামী মন্দিরে‌র মধ্যে আরো গোটা ছয়েক শিবমন্দির প্রায় একই দ্রাঘিমারেখায় (79°E) নির্মিত হয়েছে। এই দাবিও প্রায় সঠিক, তবে কোথাও এক ডিগ্ৰির বেশি বা একশো কিমির তফাৎ‌ও আছে। তবে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদবাবু‌‌ও বলে গেছেন, সব‌ই ব্যাদে আছে, সুতরাং…। গার্ডমশাইকে ওনার তথ্যসম্বলিত ভাষ্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে, কিছু বকশিশ দিলাম। কিন্তু উনি শেষে যা বললেন, মনে হোলো নিয়তি‌র নিষ্ঠুর পরিহাস। নিয়তির পরিহাস মেবারের ইতিহাসে রাণা কুম্ভের শাসনকাল (১৪৩৩~১৪৬৮) এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সুবিশাল, দুর্ভেদ্য কুম্ভলগড় কেল্লার নির্মাণ করে তিনি মেবারকে শক্তিশালী করে তোলেন। চিত্তোরগড় তো বহু শতাব্দী প্রাচীন। সেখানে‌ও তিনি কুম্ভ মহল (যেখান‌ থেকে পান্না দাই উদয়কে নিয়ে পালিয়ে আসেন)‌ নির্মাণ করেছিলেন। কুম্ভ শ্যাম মন্দিরে‌র সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেছিলেন যার সাথে পরে মীরা বাইয়ের নাম জুড়ে যায়। মালওয়ার সুলতান মাহমুদ খিলজি-র ওপর জয়ের স্মৃতিতে তাঁর নির্মিত ৯ তলা উঁচু রাজপুত সামরিক গৌরবের প্রতীক “বিজয় স্তম্ভ” চিত্তোরগড়ের সর্বাধিক পরিচিত স্মারক। তিনি চিত্তোরে শুধু নতুন স্থাপত্যই নির্মাণ করেননি, দুর্গের বহু অংশ মজবুত ও সংস্কারও করেছিলেন। স্থাপত্য ছাড়াও রানা কুম্ভ সঙ্গীত ও শাস্ত্র অধ্যয়নেও আগ্রহী ছিলেন। তাই শুধু যোদ্ধা নয়, ইতিহাসে তিনি “Scholar-King” হিসেবে‌ও পরিচিত। তাই তিনি ইতিহাসে সিসোদিয়া রাজবংশের শ্রেষ্ঠ নির্মাতা-শাসক হিসেবে মান্য।  ইতিহাসে বিভিন্ন রাজবংশে সিংহাসনের লোভে ভ্রাতৃহত্যার উদাহরণ আছে। মেবারে‌ই বনবীর বিক্রমাদিত্য ও উদয় ভেবে চন্দনকে হত্যা করে। ১৫৯৫ সালে পিতার মৃত্যুর পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের ত্রয়োদশ সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেই তৃতীয় মুহাম্মদ তার ১৯ জন ভাইকে একসাথে মৃত্যুদণ্ড দেন। আওরঙ্গজেব তাঁর ভাই দারা শিকোহ ও মুরাদ বখ্‌শ-কে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে হৃদয় পরিবর্তিত মহামতি অশোক‌ নাকি যৌবনে সিংহাসনে বসার জন্য ভাইদের হত্যা করেন। সিংহাসনের জন্য পিতাকে বন্দি করে রাখার ঘটনাও আছে। গুণধর আওরঙ্গজেব‌ই শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। তবে ক্ষমতা দখলের জন্য পিতৃহত্যা‌র ঘটনা বিরল হলেও আছে। মগধের সিংহাসনের আকাঙ্ক্ষা‌য় অজাতশত্রু পিতা বিম্বিসারকে বন্দি করেন ও তাঁর মৃত্যুর কারণ হন। এক মাঘে শীত যায় না। তাই অজাতশত্রুকে হত্যা করে তাঁর পুত্র উদয়ীন মগধের সিংহাসনে বসেন। ফেরা যাক রাণা কুম্ভ‌র প্রসঙ্গে। তখন তিনি ছিলেন কুম্ভলগড়ে। তিনি সন্ধ্যায় নিয়মিত পূজা ও সঙ্গীতচর্চা করতেন। ১৪৬৮ সালের এক সন্ধ্যায় রাণা মন্দিরে পূজায় নিমগ্ন, উদয় সিং (প্রথম) তাঁকে পিছন থেকে হত্যা করেন। ক্ষমতার লোভ ভয়ংকর। রাণা কুম্ভ কুম্ভলগড় কেল্লা নির্মান করেছিলেন বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধে এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি‌তে চিত্তোরগড় বা অন্য কোনো স্থান থেকে কৌশলগত পশ্চাদপসরণের ক্ষেত্রে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে (Fallback fort during strategic retreat). পরবর্তী‌তে মেবারের শাসকদের তা কাজে‌ও এসেছি‌ল। রাণা প্রতাপ‌ও মুঘলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন যুদ্ধে‌র সময় এখানে এসে মাঝে মাঝে আশ্রয় নিয়েছে‌ন।  কিন্তু রাণা কুম্ভ তাঁর নিজের তৈরি কেল্লার অভ্যন্তরে‌‌ই তাঁর‌ সন্তানের হাতে‌ নিহত হলেন। তাই রাণা কুম্ভ‌র মৃত্যু রাজপুত ইতিহাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি এবং পিতৃহন্তারক প্রথম উদয় সিংহ এক কলঙ্কিত খলনায়ক।  কিসমি যখন সেতু  ফেরার পথে উৎরাই বলে কেল‌ওয়াড়া চলে এলাম গড়গড়িয়ে। একটা ৩০ সীটার ছোট প্রাইভেট বাস দাঁড়িয়ে আছে। যাবে চেতক সার্কেল। ভাড়া এ‌ক‌ই - চল্লিশ। সরকারি বাস তখনো আসেনি। হাতের একটা পাখি ছাড়তে নেই। উঠে দেখি কেবল পিছনে কয়েকটি সীট রয়েছে। কন্ডাক্টরকে বলি, ভাই মেরা ব্যাক পেন হ্যায়, বীচমে কো‌ই সীট নেহি মিলেগি?  প্রাইভেট বাসের কন্ডাক্টরের রানিং মেমোরি দারুণ। যারা শেষ অবধি যাবে না, তাদের কে কোথায় নামবে, মনে থাকে। সে বাসে উঠে এদিক ওদিক দেখে ডানদিকে জানলার পাশে বসা একটি কিশোরকে বলে, বেটা, তু তো সামনে উতর যায়েগা, যা, পিছলে সীটমে বৈঠ যা, ইঁয়াহা বাবুজীকো বৈঠনে দে।  রঙ্গে ভরা বঙ্গে কন্ডাক্টর এমন কথা কাউকে বললে কথাকাটাকাটি লেগে যেতো। কিন্তু একাকী ভ্রমণে মধ্যপ্রদেশে দেখেছি কন্ডাক্টরের বলাতে অনেক যুবক‌ও সীট ছেড়ে দিয়েছে। হয়তো কন্ডাক্টরের দাপটে নয়, আমি পরদেশী বুজুর্গ বলে‌ - সৌজন্যে, শিষ্টতায়। রাজস্থানে‌ও তার ব্যত্যয় হোলো না।  বাস চলতে শুরু করলো। আমার সামনে টানা আড়া সীটে বছর ত্রিশের গ্ৰাম্য মহিলা বসেছে। কোলে একটা বছর তিনেকের ছেলে, পাশে আমার হাঁটুর সামনে বছর পাঁচেকের একটি মেয়ে, তার‌ই দিদি মনে হোলো। হয়তো আমায় স্থানীয়‌দের মতো দেখতে নয় বলে তারা দুজনেই মাঝে মাঝে আমায় আড়চোখে দেখছে। চোখাচোখি হলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। আমার বেশ মজা লাগে। উইন্ডচিটাররে বুক পকেটে কয়েকটা কিসমি টফি ছিল। আমি একটা বার করে ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে ধীরে সুস্থে মোড়ক খুলে মুখে ফেলি। যা ভেবেছি। দুটি শিশু গভীর আগ্ৰহে আমায় দেখছে‌। এবার একটা টফি বার করে মেয়েটি‌র হাতে দি‌ই। দিদি বলে কথা, ও মোড়ক ছাড়িয়ে টফিটা ভাইকে দেয়। আর একটা বার করতে দেখি তার মুখে লেগে আছে প্রত্যাশা। টফিটা ওকে দিতে এবার ও মোড়ক খুলে নিজে খায়। নরম কিসমি টফি মুখে দিলে একটু পরে‌ই চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। বাস চলছে, আমি কিছুক্ষণ পরে পরে, ভাই আর বোনকে একটা করে টফি দিচ্ছি। কুড়িটা টফির মধ্যে আমি খেয়েছি দুটো, চায়ের দোকানে আর কেল্লায় শিশুদুটিকে দিয়েছি ছটা। অর্থাৎ আমার পকেটে ছিল বারোটা। ওরা ভেবে পাচ্ছে না, কতো টফি আছে আমার পকেটে। ওদের মাকে দেখে মনে হয় প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষ। চকলেট, টফি ওদের কাছে হয়তো বিলাসিতা।   তবু মনে হোলো, ভাইবোনের দৃষ্টিতে আগ্ৰহ থাকলেও লোভ নেই। না পেয়ে পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেলে শিশুদের মধ্যেও একটু নির্লিপ্ততা এসে যেতে পারে। বাস উদয়পুরে ঢুকছে। তখন‌ও পকেটে গোটা ছয়েক টফি। সবকটা বার করে মেয়েটির হাতে দি‌ই। আর্থিক মূল্য তার খুবই সামান্য, কিন্তু তা পেয়ে দুজনের মুখে যে হাসি দেখলাম, তার মূল্যায়ন টাকায় হয়না। এবার তাদের মাও দেখি মুখে আঁচল দিয়ে হাসছে। অর্থাৎ চলন্ত বাসে এতক্ষন ধরে নীরবে যে নাটক হচ্ছিল, সব‌ই টের পেয়েছে সে।  কেল্লা থেকে ফেরার সময় রাণা কুম্ভ‌র মর্মান্তিক অন্ত জেনে মন একটু বিষন্ন হয়ে গেছিল। বাসে দুটি শিশুর সাথে কিসমির দৌলতে নীরব আদানপ্রদানে একটু হালকা লাগলো। সেদিন কুম্ভলগড় ভ্রমণে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছিল আড়াইশো‌ টাকার‌ও কম। অথচ গাড়িতে গেলে, কেবল তাতেই লাগতো আড়াই হাজার। তাই শুরুতে বলেছিলাম, একাকী ভ্রমণে জনবাহনে গেলে খরচ তো অনেক কম হয়‌ই, সাথে বোনাস হিসেবে এমন কিছু তুচ্ছ ঘটনার সুন্দর স্মৃতি মনে রয়ে যায় বহুদিন। পুনশ্চ - Ext HDD ক্র্যাশ করে কুম্ভলগড়ের সাথে আরো বহু ছবি চিরতরে উড়ে গেছে। ঐ শিশু দুটির ছবি অন্য জায়গায় ছিল বলে বেঁচে গেছে। তাই এ লেখায় সব ছবি নেট থেকে নেওয়া। রাজপুত এলাকার ম্যাপ ও কুম্ভলগড়ের পোলের স্কিমেটিক স্কেচ জীপুদার সাথে কয়েকবার আলোচনা করে নামিয়ে‌ছি। তথ্যসূত্র নেট ও জীপুদা।
    বড় হওয়ার বিপদ - Amit Chatterjee | বাতাস তখন অন্যরকম একটু কড়া একটু মিঠে।সুয্যি মামা দিচ্ছে হামাছড়িয়ে আগুন মেঘের পিঠে।গাছেরা রয়েছে চুপটি করেওদের মনে দুঃখ ভারি।একে একে বন্ধুরা সবদূরের দেশে দিচ্ছে পাড়ি!দিস না ছায়া মানুষকে আর,হিজল বলে, বট কে ডেকে,কত কিছুই দিচ্ছি তবুপাচ্ছি দুঃখ ওদের থেকে।আমরা সবাই মানুষকে দিইফল ফুল আর মাথায় ছায়া।গাছ কেটে তাও বসত গড়েওদের মনে নেই তো মায়া।পাতার ফাঁকে পাখ-পাখালি।গাছকে ডেকে মন্ত্রণা দেয়।দিস না ছায়া মানুষকে আরওরা শুধুই যন্ত্রণা দেয়!চেয়ে থাকে অবাক চোখেছাগ-শিশু আর গাছের চারা,জানেনা তো বাড়লে বয়েসমাথার ওপর ঝুলবে খাঁড়া! 
  • জনতার খেরোর খাতা...
    ভূমি - Srimallar Speaks | তোমাকে ভালবেসে,সহসা কাছে এসে–বিপদে জ্ব’লে আছে, তেপান্তর...আমারই ভুল ছিল,হেরেছে কাক চিলও–এখন মন মানে, সততাজ্বর। কেটেছে সুখবায়ু,নিজের মুছে আয়ু–না জানি দিন কেন, মিলনছেদ...তোমাকে ভালবেসে,সহসা কাছে এসে–যাব না দূরে আর। এটাই জেদ...  
    জয়লাভ করার পরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে গেল কেন?  - AR Barki |  এটি ইতিহাসের অন্যতম একটি বড় বৈপরীত্য—যুদ্ধে জিতেও ব্রিটেন তার সাম্রাজ্য হারিয়েছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনী জয়লাভ করলেও, এই যুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। যুদ্ধ জয়ের জন্য ব্রিটেনকে তার সমস্ত সম্পদ বাজি রাখতে হয়েছিল। ১৯৪৫ সাল নাগাদ ব্রিটেনের অর্থনীতি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধের খরচ চালাতে ব্রিটেন আমেরিকার কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ (Lend-Lease act) নিয়েছিল, যা তাদের ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দেয়। সাগরের ওপারে বিশাল সাম্রাজ্য এবং সেনাবাহিনী টিকিয়ে রাখার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য ব্রিটেনের আর ছিল না। নিজেদের দেশ পুনর্গঠন করাই তখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যুদ্ধের পর বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু লন্ডন থেকে সরে যায়। ব্রিটেন আর বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি ছিল না। পৃথিবীতে নতুন দুটি পরাশক্তির (Superpower) উদয় হয়—আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই দুটি দেশের কেউই পুরোনো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পক্ষে ছিল না। বিশেষ করে আমেরিকা অর্থনৈতিক সাহায্যের বিনিময়ে ব্রিটেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল যেন তারা তাদের উপনিবেশগুলোকে স্বাধীনতা দিয়ে দেয় এবং উন্মুক্ত বাণিজ্যের পথ তৈরি করে। যুদ্ধের সময় থেকেই ভারতসহ বিভিন্ন উপনিবেশে স্বাধীনতার দাবি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় রত্ন ছিল ভারত। ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের তৎপরতা ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ভারতকে আর বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা বাকি উপনিবেশগুলোর জন্যও পথ খুলে দেয়। দীর্ঘ ছয় বছর যুদ্ধ করার পর ব্রিটিশ সেনারা ক্লান্ত ছিল। দূরবর্তী কোনো দেশে গিয়ে সেখানকার বিদ্রোহ দমন করার মতো মানসিক বা শারীরিক শক্তি তাদের ছিল না। ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে যুদ্ধজয়ী প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল (যিনি সাম্রাজ্য ধরে রাখার পক্ষে ছিলেন) পরাজিত হন। ক্ষমতায় আসে ক্লিমেন্ট অ্যাটলির নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি। লেবার পার্টির মূল ফোকাস ছিল ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, যেমন—বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা (NHS) চালু করা এবং নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা উপনিবেশ ধরে রাখার পেছনে অর্থ অপচয় করার চেয়ে যত দ্রুত সম্ভব সম্মানজনকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করাকে শ্রেয় মনে করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটেনকে বিজয়ী করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিল যে নিজের বিশাল সাম্রাজ্যের বোঝা বইবার ক্ষমতা তাদের আর ছিল না।
    খেদ - Srimallar Speaks | বাহু তুলে উন্মনে একা। বিরহে জটিল নবাগত... আজকে যে ভুলে গেছে তোমায়, চাইলে কিসে তোমার হ’তো?বাহু তুলে মৃত্যুআহত।  পরিচিতি বাড়ানোই কাজ।আজকে যাকে ভাল লাগে, কালকে তাকেভুলে যাওয়া কাজ।অনর্থক এই বহির্সাজ। খাবারের খোঁজে এসে পিঁপড়ে জানে না, ফের ফিরবে কিনা ঘরে সে আজ। ভাতে নেই মাগন্ধ। সময় এক অপূর্ব জাহাজ।  
  • ভাট...
    commentalbert banerjee | আর একজনের নাম ওমর খৈয়াম, আমি কবি ওমর খৈয়ামের কথা বলছি [ cubic equations geometrical solution ]
    commentalbert banerjee | এছাড়া
    মাধব সঙ্গমগ্রাম(কেরল ), Georges Lemaître, Father Augustine O Konnully (1917–1998) আরো অনেকেই ​​​​​​​আছেন ​​​​​​​যারা একাধারে ধার্মিক স্কলার ও গণিতবিদ।
    commentalbert banerjee | সিধরাচার্য কে বাদ দিচ্ছেন কি ভাবে? অংক নিয়ে কালচার তো প্রত্যেক ধর্মেই আছে।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত