এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    আলোকপাঠ - মানফ্রেড রোমেলের রসিকতা সঙ্কলন - হীরেন সিংহরায় | ছবি: রমিতমানফ্রেড রোমেলের রসিকতা সঙ্কলন সম্পাদনা উলরিখ ফ্রাংক-প্লানিতস এঙ্গেলহর্ন প্রকাশন স্টুটগার্ট১৯৯৯ এই এপ্রিল মাসে মিউনিকে কার্লস প্লাতসের একটি বইয়ের দোকানে চোখে পড়ল মানফ্রেড রোমেলের রসিকতা সঙ্কলন। সেটি আমার আজকের আলোক পাঠ। এরউইন রোমেলের কাহিনী মোটামুটি সর্বজন বিদিত; তিনি নাৎসি আমলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একমাত্র মানুষ যার নামে জার্মানিতে প্রায় তিরিশটা রাস্তা, স্কোয়ার, আর্মি ব্যারাক নামাঙ্কিত হয়েছে। তাঁর শেষ আবাসের বর্তমান ঠিকানা এরউইন রোমেল স্টাইগে ১৩। তবে তস্য পুত্র মানফ্রেডের নামটা হয়তো আমাদের কাছ তেমন পরিচিত নয়; তবে বইটির কথা বলতে গেলে প্রথমেই তাঁর পিতার সঙ্গে শেষ দেখার কাহিনী থেকে শুরু করতে হয়। প্রাক কথন পিতা পুত্র: শেষ ছ’টি ঘণ্টা হ্যারলিঙ্গেন, অক্টোবর ১৪, ১৯৪৪, সকাল ছ’টা হারলিঙ্গেন  স্টেশনকুয়াশা মোড়া সকালে ট্রেন থেকে নামল সামরিক ইউনিফর্ম পরিহিত এক কিশোর। গত সন্ধ্যায় তার বাবা ফোন করেছেন, মানফ্রেড যেন রিডলিঙ্গেনে তার বিমান বহরের সহায়কের কাজ থেকে দু দিনের ছুটি নিয়ে অতি অবশ্য আজ হ্যারলিঙ্গেনে তার বাবার কাছে আসে। তিন মাস আগে ফ্রান্সে তাঁর গাড়ির ওপরে ফাইটার বিমানের আক্রমণে তিনি ঘাড়ে ও কাঁধে চোট পেয়েছেন, বাঁ চোখের দৃষ্টি হয়েছে ক্ষীণ। কর্ম জীবনে প্রথম লম্বা ছুটি নিয়ে আগস্ট মাস থেকে রয়েছেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে। ডাক্তারদের চিকিৎসা এবং স্ত্রীর শুশ্রূষায় তিনি ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছেন, চোখের জ্যোতি খানিকটা ফিরে এসেছে।এত কম সময়ের নোটিসে মানফ্রেডের ছুটি পাওয়া শক্ত হয়নি। তার বাবার নাম ফিল্ড মার্শাল এরউইন রোমেল।মাত্র তিন বছর আগে উত্তর আফ্রিকায় ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লিবিয়া, মিশরে তাঁর ঝটিকা আক্রমণ এবং যুদ্ধ চাতুরীর জন্য মরুভূমির শৃগাল – ডেজার্ট ফক্স - নামে খ্যাত হয়েছিলেন; তোবরুকের বিজয় গাথা রূপকথার পর্যায়ে পৌঁছেছে। মিশরের এল আলামেনে আফ্রিকা কর্পসের পরাজয়ের পরে জার্মানির জয়রথ থেমে গেছে, রোমেলের তারকা নিম্নগামী; স্তালিনগ্রাদে সিক্সথ আর্মি সহ ফিল্ড মার্শাল ফন পাউলুসের আত্মসমর্পণ, সিসিলিতে মিত্রশক্তির আক্রমণ এবং জুন মাসে মিত্র সেনার নর্ম্যান্ডি তটে অবতরণের পর এরউইন রোমেল ক্রমশ হিটলারের রণনীতির ওপরে আস্থা হারাচ্ছেন; এই যুদ্ধে পরাজয়কে আসন্ন মনে করেছেন। গত বছরে ভিয়েনার নয়স্টাড থেকে পারিবারিক বাসস্থান সরিয়ে এনেছেন উলমের কাছে হ্যারলিঙ্গেনে, যেটি তাঁর জন্মস্থান হাইডেনহাইম থেকে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। তাঁর বাড়িটিকে ফিল্ড মার্শালের মর্যাদা মাফিক সাজানো গোছানোর ভার নিয়েছে উলমের পৌরসভা। রোমেল ভাবেন পূর্ব ফ্রন্ট, নর্ম্যান্ডি, ইতালি থেকে বহুদূরের এই ছোট্ট জনপদে তাঁর স্ত্রী লুসিয়া মারিয়া ও একমাত্র সন্তান মানফ্রেডের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত।ম্যানফ্রেড, লুসিয়া ও এরউইন রোমেলনর্ম্যান্ডি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজের হেড কোয়ার্টারে যাবার পথে সাঁ ফয় দে মন্টগোমেরিতে যেদিন তাঁর স্টাফ কারের ওপরে ব্রিটিশ সুপারমেরিন স্পিটফায়ার গুলি চালায়, তার ঠিক তিন দিন বাদে কাউন্ট ফন স্টাউফেনবের্গের নেতৃত্বে পূর্ব প্রাশিয়ার রাস্টেনবের্গে (নেকড়ের আস্তানা, ভলফশান্তসে) হিটলার হত্যার ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে এরউইন রোমেল যে জড়িত ছিলেন এমন গুজবের পক্ষে কোন প্রমাণ সাবুদ কখনো মেলেনি। ১৯৪৩ সাল থেকেই তিনি প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে হিটলারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিক যে কি ঘটছে সেটা না বুঝে বা না জেনেই যে হিটলার লড়াইয়ের ছক কষেন, তিনি তার ঘোর বিরোধী! বিশে জুলাই হিটলারের ওপরে হামলার পরে তিনি এও বলেছিলেন, স্টাউফেনবের্গ কাঁচা কাজ করেছেন, আমাদের যে কোন সেনা এটা সহজে সারতে পারতো। আগস্ট মাসে তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, ‘নর্ম্যান্ডিতে যে ধ্বংস লীলা ও প্রাণহানি দেখলাম, তাতে আমার মনে হয় না এ যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কোন অর্থ আছে। যে ভাবে হোক, শেষ হলেই ভালো।’ হ্যারলিঙ্গেন ট্রেন স্টেশন থেকে তার বাড়ি ভিপিঙ্গার স্টাইগে ১৩ মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। ভিলার দুয়োরে দাঁড়িয়ে ছিলেন পিতা, ছেলে আসতেই তাকে দোতলায় নিয়ে গেলেন; সেখানে পিতা পুত্রকে ব্রেকফাস্ট, ফ্রুইষটুক পরিবেশন করলেন মা লুসিয়া মারিয়া, এরউইন রোমেলের ‘লুতসি’। খাওয়া শেষে বললেন, চলো মানফ্রেড, বাগানে একবার হেঁটে আসি। এই পরিক্রমায় তিনি ছেলেকে বললেন, জানি না স্টেশন থেকে আসার পথে তুমি লক্ষ করেছো কি না, আমাদের ছোট গ্রাম গেস্টাপোয় ভরে গেছে, এই বাড়ির ওপরে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। মানফ্রেড বলল, হ্যাঁ, স্টেশন থেকে আসার পথে দেখলাম আমাদের বাড়ির গেটের সামনে, একটু দূরে কয়েকটা সামরিক গাড়ি পার্ক করা আছে, তার ভেতরে বন্দুকধারী অসামরিক পোশাকের মানুষ বসে। কিন্তু কেন? রোমেল বললেন, ‘ফুয়েরার মনে করেন আমি ভালকিয়েরির (২০শে জুলাই ১৯৪৪ হিটলার হত্যা প্ল্যান) সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, আমার চিফ অফ স্টাফ হান্স স্পাইডেল বলেছেন আমি সক্রিয় ভাবে যোগ না দিলেও দূর থেকে সমর্থন করেছি, আরেক ষড়যন্ত্রকারী জেনারেল স্টুলপনাগেল তাঁর মৃত্যুকালীন এক অসংলগ্ন বিবৃতিতে আমার নাম জড়িয়েছিলেন। অনেক বিষয়ে যে ফুয়েরার ও আমি একমত নই, কখনো ছিলাম না তা তিনি জানেন, সবাই জানেন। কিন্তু তাঁকে মেরে ফেলাটা আমি সমর্থন করতে পারি না, যদিও কোনো মহল আমার ভূমিকা সম্পর্কে অন্য মত পোষণ করেন। আজ বার্লিন থেকে ফুয়েরারের বার্তাসহ দু জন আসবেন, জেনারেল বুর্গডর্ফ ও জেনারেল মাইজেল। আমার আরোগ্যের পরে হয়তো বদলির আদেশ হবে, হয়তো পূর্ব ফ্রন্টে যেতে হবে, অথবা অন্য কোন আদেশ। তোমাকে জানাব কী ঘটতে যাচ্ছে। ভিপিংগার স্টাইগে ১৩ ১৯৪৪/ ডানদিকে এরউইন রোমেল স্টাইগে ১৩ ২০২৬ ঠিক এগারোটায় সামরিক ইউনিফর্মে সজ্জিত ভেরমাখটের সেই দুই জেনারেল এলেন। রোমেল তাঁদের নিয়ে লাইব্রেরি ঘরে বসে পঁয়তাল্লিশ মিনিট কথা বলার পরে আবার দোতলায় উঠে ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘মানফ্রেড, ফুয়েরারের মতে আমি বিশ্বাসঘাতকতার (হোখফেরাত) অপরাধে অপরাধী। আমার সামনে দুটো শর্ত রাখা হয়েছে, স্বেচ্ছায় মৃত্যু মেনে নিলে আমাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত করা হবে, তোমার মা আজীবন পেনশন পাবেন। অন্যথায় জনতার আদালতে আমার বিচার হবে। তুমি জানো গত তিন মাসে বিচারক রোলান্ড ফ্রাইসারের আদালতে কোন সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়াই কতজন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, পিয়ানোর তারে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। আমি প্রথম পথ বেছে নিচ্ছি। এবার চলো তোমার মাকে গিয়ে জানাই পনেরো মিনিট বাদে আমার মৃত্যু হবে।’ বেলা একটা। রোমেল তাঁর সবচেয়ে গর্বের আফ্রিকা কর্পসের ইউনিফর্ম, টুপি পরে হাতে ফিল্ড মার্শালের ব্যাটন নিয়ে ভিলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পুত্র মানফ্রেড ও লুসিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিলেন; তাঁর দীর্ঘদিনের সহকারী অ্যাডজুটেনট আলডিনগারকে বললেন, আপনার কাছ থেকেও বিদায় নিতে হবে (ইখ মুস আউখ ফন ইনেন আবশিড নেমেন) জেনারেল বুর্গডরফ ও জেনারেল মাইজেলকে ‘হাইল হিটলার’ বলে স্টাফ কারে (হরখ ৮৫৩) উঠে বসলেন এরউইন রোমেল, দু’পাশে দুই জেনারেল। মানফ্রেড ও লুসিয়া ছাড়া একমাত্র দীর্ঘদিনের একান্ত অনুগত সাথি আলডিনগার জানতেন রোমেল আর কখনো ফিরবেন না। এরউইন রোমেলের শেষ ছবিহ্যারমান আলডিনগার রোমেলকে বলেছিলেন, আরেকটা পথ আছে, চলুন আপনি আমি বন্দুক উঁচিয়ে এই গ্রাম থেকে বেরিয়ে যাই। কে আটকাবে আপনাকে? রোমেল রাজি হন নি। পরের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাওয়া যায় না। গ্রাম ছাড়িয়ে কোন নির্জন রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করানো হয়েছিল যেখানে হিটলারের পাঠানো সায়ানাইড ক্যাপসুল মুখে দিয়ে এরউইন রোমেল স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণ করেন। জেনারেলদের সঙ্গে গাড়িতে ওঠার পনেরো মিনিট বাদে রোমেলের ভিলায় ফোন বাজলে হ্যারমান আলডিনগার সেটি ধরলেন। নিকটবর্তী শহর উলমের ভাগনার ফিল্ড হাসপাতাল থেকে এক ডাক্তার একান্ত দুঃখ ও সমবেদনার সঙ্গে জানাচ্ছেন বার্লিন যাওয়ার পথে আকস্মিক ব্রেন হেমারেজের কারণে মারা গেছেন ফিল্ড মার্শাল ইওহানেস এরউইন অয়গেন রোমেল।এক মাস বাদে তাঁর তিপ্পান্ন বছর বয়েস পূর্ণ হতো। সেদিন শনিবার, সময় দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিট। * চার দিন বাদে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সহিত স্বস্তিকায় মোড়া কফিন উলমে সমাধিস্থ করা হল। জেনারাল ফন রুনডস্টেড পড়লেন হিটলারের মর্মস্পর্শী বিদায় বার্তা।একদিন মানফ্রেড রোমেল মানফ্রেড রোমেলঅন্য অনেকের মতন দেশে থাকতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উত্তর আফ্রিকা ফ্রন্টে এরউইন রোমেলের খ্যাতি এবং হিটলারের আদেশে তাঁর স্বেচ্ছা মৃত্যুর কাহিনী আমার জানা ছিল; প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে জার্মানি এসে আবিষ্কার করলাম আরেক রোমেলকে, মানফ্রেড রোমেল।যদিও কোন দেশ প্রতিযোগিতায় নামেনি, কিন্তু সাতের দশকে ইউরোপের সবচেয়ে বোরিং টিভির গোল্ড মেডাল প্রাপ্য ছিল জার্মান (এবং ডাচ) টেলিভিশনের। দুটি মাত্র ন্যাশনাল চ্যানেল, সন্ধ্যে ছটায় শুরু, সাতটায় পনেরো মিনিটের বিজ্ঞাপন, এগারোটায় স্ক্রিন অন্ধকার। সেখানে খবর, খবরের আলোচনা শুরু হয় রাত আটটায় প্রাইম টাইমে! হন্যে হয়ে নিজের মুখের ভাষাটি পালিশ, মেরামত করার জন্য সেগুলোই শুনি, খানিক বুঝতে পারলে ভীষণ খুশি হই। একদিন সেখানে হের নোভোতনির বনার রুনডেতে (রাজনৈতিক আলোচনা) দেখা দিলেন জার্মানির পঞ্চম বৃহৎ জনপদ স্টুটগার্ট শহরের মেয়র, মানফ্রেড রোমেল। একটা শিহরন জাগল -এই সেই মানুষ যিনি পনেরো বছর বয়েসে তাঁর পিতাকে সরাসরি মৃত্যু মুখে যেতে দেখেছেন, তাঁর বাবা বলেছেন পনেরো মিনিট বাদে জানবে আমি মৃত? সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী ব্রেন হেমারেজ। এক বছর বাদে ফরাসি কারাগারে বন্দি পুত্র মানফ্রেড রোমেল প্রথম সত্যি কথাটা দুনিয়াকে জানালেন। মহাগুরু নিপাতের দুর্ভাগ্য আমাদের অনেকেরই হয়েছে কিন্তু তা বলে এই ভাবে? এই বোঝা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটে? সব কথা বুঝতে পারলাম তা নয় তবে প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেলো। গড়পড়তা জার্মান রাজনীতিকদের বক্তিমে বা ইন্টারভিউ অসম্ভব ক্লান্তিকর, কিন্তু মানফ্রেড রোমেলের মুখে খেলা করে একটা চাপা কৌতুক। তিনি যে শুধু হাসিমুখে পলিটিকালি ইনকারেক্ট কথা বলেন তাই নয়, সেটি বলেন তাঁর অননুকরণীয় শোয়বিশ অ্যাকসেন্টে! গোয়েথে ইনসটিটিউটে জার্মান শিক্ষার ক্লাসে কানে হেডফোন লাগিয়ে দেশের নানান আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে পরিচয় করানো হতো আমাদের। মেসেজ ছিল - এগুলি চিনে রাখুন, অনুকরণ করবেন না! আমার গুরু মুজতবা আলী সায়েব বলেছেন চিড়িয়াখানায় বাঘ সিংহ দেখার পরে খাটাশটাকেও দেখে নেওয়া ভালো, কোন বাড়তি খরচা যখন নেই। এই পর্যায়ে সহজবোধ্য নয় কিন্তু শ্রুতিমধুর এবং আন্তরিক মনে হয়েছে বায়ারিশ (ব্যাভেরিয়ান) এবং শোয়েবিশ (শোয়েবিয়ান) উচ্চারণ, যা শোনা যায় যথাক্রমে মিউনিকে, স্টুটগার্টে, আমার কর্মক্ষেত্র ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ, ডুসেলডর্ফে নয়। লোকাল টান থাকলেও সকলে একটা স্ট্যান্ডার্ড জার্মান বলার চেষ্টা করে থাকেন, বিশেষ করে বিদেশির সঙ্গে। মানফ্রেড রোমেল পার্টি লাইন মাফিক হানোভার গোয়েটিঙ্গেনের হোখ ডয়েচ নয় গর্বের সঙ্গে জাতীয় স্তরে শোয়েবিশ বলেন। বুকের পাটা আছে বটে! খানিক খোঁজ খবর করে জানলাম পিতার মৃত্যুর পরে মানফ্রেড লুফতওয়াফের সহকারীর চাকরিতে ফিরে যান। কিন্তু কয়েক মাস বাদে, ১৯৪৫ সালের শুরুতে জার্মান বিমান বহরের অবস্থা সঙ্গিন, তাঁর কাজ গেল। ইতিমধ্যে ফরাসি বাহিনী স্টুটগার্ট পৌঁছেছে, মানফ্রেড তাঁদের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এরউইন রোমেল যে ব্রেন হেমারেজে মারা যাননি হিটলারের চাপে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই কাহিনীটি চাউর করেন তাঁর একটি সাক্ষ্যে। পরে লুসিয়া মারিয়া সেটি সমর্থন করে বিবৃতি দেন। ফরাসি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে, একটু দেরিতে, আঠারো বছর বয়েসে স্কুলের গণ্ডি পেরুলেন। টুইবিঙ্গেনে আইন পাশ করে বাদেন ভুরতেমবুরগ রাজ্যের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন, কালে অর্থ সচিব এবং পরে ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক দলের টিকিটে রাজনীতিতে প্রবেশ। বারো বছর তিনি সমস্ত জার্মান শহরের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৭৪ সালে স্টুটগার্টের মেয়র নির্বাচিত হন, পরপর তিনবার ক্রমশ বিপুল হতে বিপুলতর ভোটে সেই পদে পুনঃনির্বাচিত হয়েছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়া, সাইলেশিয়া হতে ছিন্নমূল জার্মানদের পুনর্বাসনে তাঁর ভূমিকা বিশাল, শুধু তাই নয়, পরবর্তীকালে তিনি একই ভাবে তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের আশ্রয় দেবার চেষ্টা করেছেন। স্পষ্ট বক্তা,জনপ্রিয় এবং জনদরদী মানফ্রেড রোমেলকে স্টুটগার্ট মনে রেখেছে অনেক কারণে।আমি যখন জার্মানি যাই, বাদের-মাইনহোফ গ্রুপ অথবা রোটে আরমে ফ্রাকতশিওন (রেড আর্মি ব্রিগেড) নামের একটি বামপন্থী জার্মান টেররিষ্ট দল সারা দেশে রীতিমত ত্রাসের সঞ্চার করেছে। মনে আছে ড্রেসনার ব্যাঙ্কে অফিসে ঢোকার সময়ে কি কঠোর খানা তল্লাসি হতো! স্টুটগার্ট-স্টামহাইম জেলে সেই দলের নেতারা দলবদ্ধ আত্মহত্যা করেন। এঁদের রীতি মাফিক সমাধিস্থ করার বিরুদ্ধে প্রবল নাগরিক প্রতিবাদ শোনা গেল- আশঙ্কা, সেটি কিছু মানুষের কাছে শহিদ বেদী হয়ে উঠতে পারে! সেই আপত্তি সত্ত্বেও (এমনকি নিজের দলেরও) মেয়র মানফ্রেড রোমেল তাঁদের যথাযথ অন্ত্যেষ্টি এবং সমাধির ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেছিলেন সমস্ত শত্রুতা কোন এক বিন্দুতে গিয়ে শেষ হয়, আমি মনে করি মৃত্যুই সেই বিন্দু। সেই একই স্পিরিটে যুদ্ধের শেষে পুরনো বিবাদ ভুলে গিয়ে মানফ্রেড রোমেল আজীবনের বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন যুদ্ধকালীন জার্মানির দুই প্রাক্তন শত্রুর সন্তানের সঙ্গে। ১৯৫৮ সালে আমেরিকান সপ্তম বাহিনীর কমান্ডার পদে স্টুটগার্টে এলেন ডাকসাইটে আমেরিকান জেনারেল জর্জ প্যাটনের ছেলে জর্জ স্মিথ প্যাটন। মানফ্রেড রোমেল তখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে উঠতি তারকা, নিজে গিয়ে আলাপ করেন প্যাটনের সঙ্গে, আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করেন দুজনেরই জন্মদিন ২৪শে ডিসেম্বর (মানফ্রেড পাঁচ বছরের বড়ো), কয়েক বছর একত্রে পালন করেছেন দিনটি! যুদ্ধোত্তর জার্মানিতে বিজয়ী দখলদারি আমেরিকান বাহিনীর সঙ্গে জার্মানির হৃদ্যতা বর্ধনে এই বন্ধুত্বের অবদান অপরিসীম। আরেক চমক অপেক্ষা করছিল। ১৯৭৯ সালে স্টুটগার্টের মেয়র মানফ্রেড রোমেল ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে লন্ডন গেছেন, এক রিসেপশনে তাঁর হোস্ট একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি সেকেন্ড ভাইকাউন্ট লর্ড মন্টগোমেরি অফ আলামেন। মানফ্রেড রোমেল তৎক্ষণাৎ বলেন, মি লর্ড, জানি কোনো মরুভূমিতে একদিন দুই ফিল্ড মার্শাল, আমার ও আপনার বাবার মধ্যে লড়াই হয়েছিল, আপনার বাবা জিতেছিলেন কিন্তু সেটা আমাদের বন্ধুত্বের পথে বাধা হতে পারে না! লর্ড মন্টগোমেরি হাত বাড়িয়ে বলেন, লর্ড নয়, আমি ডেভিড। পরে দুজনে জানলেন তাঁদের জন্মের বছর এক, ১৯২৮, ডেভিড চার মাসের বড়ো। এই দুজনের নিবিড় প্রীতির বন্ধন আমৃত্যু স্থায়ী হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জন্য দায়ী আসামি নাম্বার ওয়ান জার্মানিকে সভ্য সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে মানফ্রেড রোমেলের অবদান বিপুল। প্রসঙ্গত, কয়েক বছর আগে কাইরো থেকে আলেকজান্দ্রিয়া যাওয়ার পথে চোখে পড়েছে এল আলামেনের রোড সাইন, মনে হয়েছে এখানেই তো মরুভূমির শৃগাল মুখোমুখি হয়েছিলেন ফিল্ড মার্শাল মন্টগোমেরির সঙ্গে! সেই যুদ্ধ বিজয়ের সম্মানে তাঁকে লর্ড আলামেন উপাধি দেওয়া হয়। চার্চিল বলেছিলেন, এল আলামেনের আগে আমরা কোন যুদ্ধ জিতি নি, এল আলামেনের পরে কোন যুদ্ধ হারিনি। ব্রিটিশ সরকার রোমেলকে ও বি ই (অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার) সম্মানে বিভূষিত করেছেন, আমেরিকার মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি পেয়েছেন ডক্টরেট, জার্মান- আমেরিকান বন্ডিং পুরস্কার, আপন দেশে পেয়েছেন জার্মানির উচ্চতম সম্মান, বুন্দেসফেরদিনস্টঅরডেন। শেষদিন পর্যন্ত মানফ্রেড রোমেল যে পদকের জন্য বিশেষ গর্বিত ছিলেন সেটি হল শোয়েবিয়ান ডায়ালেক্টের প্রতি আজীবন সেবার সম্মানে প্রদত্ত ফ্রিডরিখ ফোগট মেডাল। জার্মান জনজীবনে কৌতুকের যে একান্ত অভাব এমন কথা তাঁদের বন্ধু এবং শত্রু সমস্বরে বলে থাকেন। তাঁরা হাসতে জানেন না, অথবা পারেন না; এ বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও জার্মান বৈঠক খানা, কফির আসরে, ট্রেনে বাসে, পার্লামেন্টের ভেতরে হাসির অভাব নিয়ে দ্বিমত দেখা যায় না। সম্ভবত মার্ক টোয়েন বলেছিলেন জার্মানরা হাসতে জানেন না সেটি অতিকথন মাত্র; প্রতি বছর কারনেভালের সময়, (ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে) তাঁরা প্রচুর পান আনন্দ উল্লাস অট্টহাস্য করেন এবং বাকি এগারো মাস এই উচ্ছ্বাস মুলতুবি রাখেন! বক্তাদের প্রতি এই বইটির ভূমিকায় মানফ্রেড রোমেল এই অভিযোগ মাথা পেতে মেনে নিয়েছেন। তিনি তাবৎ জার্মান বক্তিয়ার খিলজিকে উৎসাহিত করেছেন, আপনারা একটু হাস্যরস মিশিয়ে বলতে শিখুন, নীরস বক্তিমে না করে কৌতুককে তার সম্যক স্থান দিন। জ্ঞান অর্জন করার জন্য কোন জার্মান আপনাদের বক্তৃতা শুনতে আসে না, আপনি যা বলেন বা বলবেন তার সারাংশ তাঁরা অবগত আছেন। এছাড়া আপনারা তাই বলেন যা শ্রোতারা শুনতে চায়, তাতে না আছে কোন নতুনত্ব না আছে বাহাদুরি। আপনার বাগাড়ম্বরের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এই অনাগ্রহী মানুষদের জাগিয়ে রাখা। বেশির ভাগ সময়েই দেখা যায় মিনিট দশেকের পর শ্রোতা হাই তোলেন, কখনো হাত ঘড়ি ঝাঁকিয়ে দেখেন সেটা ঠিক চলছে কিনা, হলের আলোর সংখ্যা গুনতে আরম্ভ করেন অথবা ভুল জায়গায় হাততালি দিয়ে আশা করেন এবার বক্তা থামবেন। লক্ষ করবেন আপনারা যতো বকে যাচ্ছেন, শ্রোতারা তত ক্রুদ্ধ হতে থাকেন, এ ব্যাটা থামবে কতক্ষণে? তাঁদের অস্বস্তি, ক্রোধ নিরসনের দায়িত্ব আপনারই। মনে রাখুন বাইবেলে (সাম ১২৭:২) ঈশ্বর জানিয়েছেন, তিনি যাঁদের ভালবাসেন তাঁদেরই নিদ্রা উপহার দিয়ে থাকেন। মিনিটে মিনিটে শ্রোতার চেহারা -   মানফ্রেড রোমেলের আঁকা স্কেচতাহলে এঁদের জাগিয়ে রাখার উপায় কি?কৌতুক, হিউমর! এই বইতে তিনি কোন মহান জ্ঞান নয়, মাত্র কিছু টিপস দিতে চান যেগুলির জুতসই ব্যবহারে বক্তা শ্রোতাদের ঘুমিয়ে পড়া থেকে নিরস্ত করতে পারেন এবং দৈনন্দিন জীবনে তার সম্যক প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। মনে আছে ইংল্যান্ডে আসার কিছু পরে বায়ারিশে ফেরআইনসব্যাঙ্কের লন্ডন অফিসে এক রিসেপশনে মিউনিকের জনৈক ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ; তিনি বছর খানেক হল এ দেশে এসেছেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি এই যে এক বছর লন্ডনে কাটালেন, কোন জিনিসটা সবচেয়ে মনে রাখার মতন? ভেসনা গ্রাপিচ উত্তরে বলেছিলেন, এ দেশে লোকে কারণে বা অকারণে প্রচুর হাসেন! চার দশকে যে ইংলিশ হিউমরকে প্রায় পাওনা বলে ধরে নিয়েছি, টেকেন ফর গ্রান্টেড, জার্মান জনজীবনে তা সুলভ নয়। মানফ্রেড রোমেল সেটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে দ্বিধা বোধ করেননি। ইংল্যান্ডে টাং ইন চিক হিউমর কথাটা খুব চালু, তার বাংলা কি হতে পারে জানি না, তবে জার্মানিতে সেটি অমিল। প্রথমেই বলে রাখি, মানফ্রেড রোমেলের হাস্যরস কখনো অত্যন্ত শুষ্ক, কখনো ছুরির মত ধারালো। যে কোন পরিস্থিতিতেই অবহেলায় অফ দি কাফ মন্তব্য করেন, সে কৌতুক আপনার পছন্দ হোক বা নাই হোক; কোন পপুলারিটি পোলের ধার ধারেন না। মানফ্রেড একটু তোতলা ছিলেন, মাঝে মাঝে কথা জড়িয়ে যেতো, কিন্তু এই আপাত দুর্বলতাকে তিনি তাঁর ব্র্যান্ডে পরিণত করেন – ‘আমার নাম মানফ্রেড রোমেল, আমি তোতলা এবং কখনো ফিস ফিস করে কথা বলে থাকি’ এমন একটা প্রস্তাবনার পরে শ্রোতার প্রতিরোধ ভেঙ্গে যেতে বাধ্য! তাঁর অর্থ দফতরে সোমবারের মিটিং – একজন খুব ভয়ে ভয়ে জানালেন দু নম্বর ওয়ার্ডের ক্যাশিয়ারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানফ্রেড অবলীলাক্রমে বললেন, ভল্টের ভেতরটা একবার খুঁজে দেখেছেন? হয়তো সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিরালায় বসে মানফ্রেড রোমেল কোন রসিকতার সঙ্কলন লিখেছেন বলে জানা যায় না। তাঁর কৌতুকের ছটা বিকশিত হয়েছে, কোন না কোন প্রসঙ্গে; বিভিন্ন গল্প গুজবে, সাক্ষাৎকারে, বক্তৃতায়, ব্যক্তিগত আলাপচারিতে এই বইটির সম্পাদক সেগুলি একত্র করেছেন। ধরুন মদ্য পান করে স্টেজে নেমে অভিনেতা প্রম্পটারকে জিজ্ঞেস করছেন, এটা কোন নাটক? প্রসঙ্গ - এমন অনেক সরকারি বক্তা আছেন যারা বিষয় বস্তুকে সম্পূর্ণ ভুলে মেরে দিয়ে স্টেজে বাকতাল্লা করেন। আমলাদের বুদ্ধিমত্তা? ধরুন নির্মীয়মাণ বাড়ির ভারা খোলা মাত্র গোটা স্ট্রাকচার হুড়মুড় করে পড়ে গেল। অবিচলিত আর্কিটেক্ট বললেন, বাড়ির ভেতরে যখন দেওয়াল রং হবে তখনই ভারা খোলা উচিত ছিল। কিংবা গৃহকর্তা বাড়ির কাজ দেখতে এসে বললেন, একি উলটো পালটা কাজ হচ্ছে? এঞ্জিনিয়ার বললেন, আমাদের সাইট প্ল্যানটা বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল সার। মানফ্রেড রোমেলের শোয়েবিশ অ্যাকসেন্ট এবং অননুকরণীয় বাকভঙ্গিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ কম্ম নয়। একদিন কোন সুযোগ্য জার্মান বেত্তা লেখক বাঙালির আসরে সমাদরে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করবেন, এ আশা রাখি। আপাতত আমার টুটা ফুটা জার্মান জ্ঞানের সম্বলে অনুদিত কিছু মণি মুক্তা পাঠকের কাছে পেশ করার লোভ সম্বরণ করা গেল না। এক। হাইডেলবের্গ।নেকার নদীর তীরে বিকেল বেলা একজন বয়স্ক মানুষ পায়চারি করছেন। এক ডুবন্ত মানুষের আর্তনাদ। - বাঁচান, ডুবে যাচ্ছি। নদীর ধারে দাঁড়ানো ভদ্রলোক জানতে চাইলেন: - আপনার নাম কি?- ক্রাউটলে। বাঁচান। - কোথায় থাকেন?- বাদে স্ত্রাসে। একটু হাত বাড়াবেন? - বাদে স্ত্রাসে কতো নম্বর?- চার।- ধন্যবাদ। অনেক দিন ঐ পাড়ায় ফ্ল্যাট ভাড়া খুঁজছি।দুই। নেকার নদীর তীর তীব্র আর্তনাদ শোনা গেল ‘জলে পড়ে গেছি, সাঁতার জানি না’তীর থেকে উত্তর - সাঁতার আমিও জানি না। কিন্তু তাই বলে আপনার মতন লোক ডেকে সেটা জানাই না। তিন। রাজধানী বন। ট্রেন স্টেশন।ব্যস্ত সমস্ত উপ মন্ত্রী ট্যাক্সিতে উঠেছেন - কোথায় যাবেন?- যেখানে হোক। সকলেই তো আমাকে চায়। চার। সুইমিং ক্লাবের ডিনার প্রেসিডেন্টের ভাষণ - সব শেষে বলি, যদিও এ বছর কোন প্রতিযোগিতায় আমাদের কেউ কোন মেডাল পায়নি, চ্যাম্পিয়নও কেউ হয় নি কিন্তু আনন্দের কথা এই যে কেউ জলে ডুবেও যায়নি। পাঁচ। হান্টিং ক্লাব দুই বিষণ্ণ শিকারি ফিরেছেন। মুখ গম্ভীর। একজনের স্ত্রী বললেন, এতো মন খারাপের কি আছে, তোমার রুকস্যাক বেশ ভারি দেখছি। উত্তর – চুপ, ওটা আমার কুকুর।ছয়। ডাক্তারখানা - আপনি আমার বউকে বলেছিলেন এই ওষুধটা খেলে সেরে যাবে। সে মারা গেছে গতকাল। - কতদিন যাবত তিনি এই ওষুধটা খাচ্ছিলেন?- পনেরো দিন। - আমি যে বলেছিলাম এক মাস ধরে খেতে?সাত। ইন্টারভিউ - নাম? - আলফ্রেড ফায়ারআবেনড (ফায়ারআবেনড - আক্ষরিক অর্থে দিনের ছুটি, কাজ শেষ)- কাজে রাখতে পারবো না। কেউ ফোন করলেই আপনি বলবেন ফায়ারআবেনড। লোকে ভাববে অফিস ছুটি হয়ে গেছে। পুনশ্চ: অন্য অনেক দেশের মতন জার্মানিতেও টেলিফোন এটিকেট হলো ফোন তুলেই আপন পদবী ঘোষণা করা। আমার ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রবাসের কালে হারডি-স্লোমান ব্যাঙ্কে সত্যি একজন ছিলেন যার পদবী ফায়ারআবেনড! আট। ভবিষ্যৎ - আপনি আমায় ভালো চেনেন, বলুন তো আমার কী হওয়া উচিত, কবি না শিল্পী?- কবি। - কেন আপনি কি আমার কবিতা পড়েছেন?- না, আমি আপনার আঁকা ছবি দেখেছি নয়। স্তালিন -এটা কি সত্যি স্তালিন তাঁকে নিয়ে কথিত সব জোক জমিয়ে রাখতেন?-হ্যাঁ, তার সঙ্গে ঐ জোক যারা ছড়াতেন তাদেরও। দশ। পোস্ট অফিস - আপনার ভাই কি করে?- পোস্ট অফিসে সারাদিন খামের ওপরে স্ট্যাম্প মারে। - খুব একঘেয়ে কাজ নয়?- কেন, রোজই তো তারিখ বদলে যায়। এগারো। গ্রিনজিং, ভিয়েনা ইওহান স্ট্রাউসের ওয়ালতসের আসর বসেছে,একের পর এক বাজে ব্লু ডানিউব, গেশিখটে আউস ভিনার ভালড, কাইজার ওয়ালতস। সামনে সারিতে স্বয়ং স্ট্রাউস বসে শুনছেন। অভিভূত স্ট্রাউস প্রোগ্রাম শেষে কন্ডাক্টরকে ধন্যবাদ জানাতে নিজে গেলেন ব্যাক স্টেজে। কন্ডাক্টর হের স্ট্রাউস, আপনি তো ওয়ালতসের নোট লিখেই খালাস। সেটা বাজানো যে কি শক্ত কাজ যদি জানতেন। বারো। অর্থনীতি - মিনিস্টার, ডলার ডুবে যাচ্ছে - ডুবুক, মানুষ বাঁচলেই হল। তেরো। পশ্চিম বার্লিন, দুই জার্মানির পুনর্মিলনের পরে আলদির (সস্তার সুপার স্টোর) সামনে বিরাট লম্বা লাইন। উত্তেজিত পূর্ব বার্লিনার - এ যে দেখি কমিউনিস্ট জার্মানির র‍্যাশনের দোকানের মতন লাইন পড়েছে পেছন থেকে পশ্চিম বার্লিনার - এখানে আপনাকে কেউ দাঁড়াতে বলেনি। চৌদ্দ। দোকানের সামনে দুজনে কথা হচ্ছে - আমি তিন মাস অন্তর তেল বদলাই। - কোন গাড়ি চালান যে তিন মাসে একবার তেল বদলাতে হয়?- আলু ভাজার দোকান চালাই। (পমেস ফ্রিতেস / ফরাসি ফ্রিতেরি) পনেরো। ট্রেন মহিলা - ট্রেনটা কি ছেড়ে দিয়েছে? টিকিট কলেকটর - আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি কি ভাবছেন দু’পাশের বাড়িগুলি টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?ষোলো। ট্রেন হন্ত দন্ত ধাবিত যাত্রী - উলমের ট্রেনটা কি ধরতে পারি?- যদি দৌড় লাগান; পাঁচ মিনিট আগে সেটা ছেড়ে গেছে। সতেরো। ট্রেন - ফরতসহাইম যাবার পরের ট্রেন কখন?- পাঁচ মিনিট বাদে ইন্টার সিটি, পনেরো মিনিট বাদে এক্সপ্রেস, আধ ঘণ্টা বাদে ধীরগতি প্যাসেঞ্জার ট্রেন। শেষেরটাই ধরে নিন। - কেন?- কারণ একমাত্র সেটা এখানে থামে। আঠারো। পথে মদ্যপ মাতাল হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছেন - আহা, হাড় ভাঙেনি তো?- না, সেটা ভাঙবে পরের আছাড়ে। উনিশ। মদ্যপ অভিনেতা মঞ্চে নেমে অভিনেতা কথা খুঁজে পাচ্ছেন না, পাশ থেকে প্রম্পটার খেই ধরানোর দুর্বার চেষ্টা করে চলেছেন। অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে অভিনেতা বললেন, কানের কাছে ডায়ালগ শোনালেই হবে? এটা কোন নাটক সেটা বলবেন তো? কুড়ি। নাটক শেষে হ্যামলেট নাটকের অসম্ভব বাজে অভিনয় দেখে দর্শক ক্ষিপ্ত, হাতের কাছে যা পাচ্ছেন তাই ছুঁড়ছেন মঞ্চের দিকে। হ্যামলেট চরিত্রাভিনেতা – জানি এ নাটকে খুন খারাবির শেষ নেই, নয় জন মরলেন। এতে আমার কি দোষ কী বলুন তো? এই বাজে গপ্প কি আমি লিখেছি? একুশ। চুল কাটার সেলুনে হান্স - পোপের দর্শন পেতে রোমে যাবো।নাপিত - কেন অনর্থক পয়সা নষ্ট করবেন? আমি হলে কখনো যেতাম না। পোপ এতোটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন যে তাঁকে প্রায় দেখাই যায় না।তবু হান্স গিয়েছে রোমে। নাপিত - পোপকে দেখতে পেলেন? অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকে না? ঠিক বলেছিলাম না?হান্স - মোটেও না। আমি পোপের একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। নাপিত - তা তিনি কী বললেন?হান্স - তিনি আমার মাথায় হাত দিলেন; বললেন ঈশ্বরের করুণা বর্ষিত হোক তোমার ওপরে, কিন্তু বলো দেখি এতো খারাপ চুল কাটাতে কার কাছে যাও? বাইশ। চুল কাটার সেলুনে কমিউনিস্ট পোল্যান্ড, আটের দশক। প্রেসিডেন্ট ইয়ারুইয়েলস্কির কঠোর রেজিমের বিরদ্ধে অগ্নিগর্ভ পোল্যান্ডের পথে ঘাটে তুমুল বিক্ষোভ। পরিস্থিতির বিবরণ সাক্ষাতে জানানোর জন্য প্রত্যেক মাসে রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের ডাক পড়ে মস্কোতে। এই সুযোগে তিনি আরবাত পাড়ার একটি সেলুনে যান চুল কাটাতে। নাপিত দিমিত্রি জানতে চায় পোল্যান্ডে কী ঘটছে। মানুষজন যে সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়ছেন সে খবর দিলেন রাষ্ট্রদূত। নাপিত বললে আমরা ভাবতেও পারি না কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে এমন লড়াই সম্ভব হতে পারে, মাথার চুল দাঁড়িয়ে যায়। পরের মাসে রাষ্ট্রদূত আবার এসেছেন চুল কাটাতে। নাপিত আবার বলে, পোল্যান্ডের খবর বলুন, সবাই শুনুক। রাষ্ট্রদূত বললেন নতুন কিছু নয়, ঐ একই রকম। নাপিত বললে, আপনি একটু উঁচু গলায় বলুন না, সবাই শুনুক, চুল কাটতে আমার সুবিধে হবে। তেইশ। চুল কাটার সেলুনে রালফ দাড়ি কামাবেন। নাপিত - আপনি আগে কি কখনো আমার দোকানে দাড়ি কামিয়েছেন?রালফ - না, তবে আমার গালের যে কাটা দাগটা দেখেছেন সেটা গত যুদ্ধের। চব্বিশ। অটোবান মদ্যপান করে লোথার গাড়ি চালাচ্ছে উলটো মুখে। গাড়ির রেডিওতে শোনা গেল – সাবধান স্টুটগার্ট- কিরখহাইম অটোবানে একজন উলটো মুখে গাড়ি চালাচ্ছেন। লোথার – একজন? অগুনতি ড্রাইভার!পঁচিশ। লেভেল ক্রসিং গেট নামানো। এক বাইক আরোহী লাইন পার হতে যাচ্ছে। প্রহরী - একটু অপেক্ষা করুন, ট্রেনটা পার হয়ে যাক।বাইক আরোহী - আমার কিছু হলে আপনার কী?প্রহরী - আমাকে হাত নোংরা করতে হবে যে। ছাব্বিশ। বক্তা ও বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তা বিড় বিড় করছেন, কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। সামনের সারি থেকে - কী এত ভাবছেন? যে টুকু জানেন, তাই বলে ফেলুন, এক মিনিটের বেশি লাগবে না।বক্তা - না, বরং আপনি ও আমি দুজনে যা জানি সেটাই বলি, তাতে তিরিশ সেকেন্ডও লাগবে না। সাতাশ। বক্তা ও বক্তৃতা অত্যন্ত নিচু কণ্ঠে বক্তা বলে চলেছেন। পেছনের সারি থেকে একজন একটু জোরে বলুন, কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। সামনের সারি থেকে একজন - আমি তো সব কথাই বুঝতে পারছি। তবে যদি চান আপনার সঙ্গে সিট বদল করে নিতে আমার কোন আপত্তি নেই। সবশেষে গ্র্যান্ড কাউন্সিল, বার্ন, সুইজারল্যান্ড - আমি এই বলে শেষ করতে চাই যে আমার আরও অনেক কিছু বলার ছিল। তবে যদি জানতাম সেটা কী! *সূত্র স্টুটগার্টের ফরাসি মিত্রশক্তির কাছে মানফ্রেড রোমেলের সাক্ষ্য, ২৭শে এপ্রিল ১৯৪৫ Manfred Rommels gesammelte Witze Zusammengestellt und herausgegeben von Ulrich Frank-PlanitzEngelhorn Bücherei Stuttgart 1999পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৮ শব্দ সংখ্যা ১৩,০০০ পুনশ্চ আর দুটো কথা এরউইন রোমেলের মৃত্যুতে চার জন জেনারেলের ভূমিকা জেনারেল হান্স স্পাইডেল (১৮৯৭-১৯৮৪) - রোমেলের চিফ অফ স্টাফ, বিশে জুলাই হিটলার হত্যা প্লটের চক্রী, ধরা পরার পরে জবাবদিহিতে তিনি রোমেলের নাম জড়ান। নিজে গেস্টাপোর হাত থেকে পালাতে সক্ষম হন, পরে পশ্চিম জার্মান সেনা বাহিনীতে বিশাল পদ প্রাপ্তি। জেনারেল স্টুলপনাগেল (১৮৮৬- ১৯৪৪) - বিশে জুলাইয়ের প্ল্যানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত; এক জবানবন্দিতে তথ্য প্রমাণ ছাড়াই রোমেলের নাম উল্লেখ করেন। ফাঁসিতে চড়েন। জেনারেল মাইজেল (১৮৯৬-১৯৭৮) - যুদ্ধের পরে আমেরিকানদের হাতে ধরা পড়েন। কট্টর নাৎসি সহযোগী হওয়ার অপরাধে মাত্র দু বছরের সাজা হয়। তিনি স্বীকার করেন হিটলারের প্লট জানতেন, কিন্তু নিজের হাতে রোমেলকে সায়ানাইড দেননি। নির্জন জায়গায় গাড়ি থামিয়ে বুর্গডরফ তাঁকে ও ড্রাইভারকে নেমে যেতে বলেন, পাঁচ মিনিট বাদে এসে তিনি দেখেন রোমেল মৃত। জেনারেল বুর্গডরফ (১৮৯৫-১৯৪৫) - মাইজেলের বিবৃতিকে যিনি চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন সেই জেনারাল বুর্গডরফ বার্লিনের আত্মসমর্পণের দিন(২ মে ১৯৪৫) হিটলার বাঙ্কারে আত্মহত্যা করেন।  
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    মায়া-হরিণের টানে - স্বাতী রায় | ছবি: রমিত ১। রাজেশের রাজত্ব-বিস্তার১৯৮২ সালের ব্যাঙ্গালোর। যশবন্তরাই মেহতার দুই পুত্র প্রশান্ত ও রাজেশ ১২০০ টাকা ধার নিয়ে এক রূপোর গয়নার ব্যবসা খুললেন। ব্যবসার মডেলটি কিঞ্চিৎ অভিনব। চেন্নাই, রাজকোট, হায়দ্রাবাদ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে এক জায়গার জিনিস অন্যত্র অভিনবত্বের কারণে চড়া দামে বিনিময় করতেন। ফল দ্রুত নিজ মূলধন বৃদ্ধি।তবে দুই ভাইয়ের চোখে স্বপ্ন বিশাল। সামান্য রূপোর গয়নায় আটকে থাকলে তাঁদের চলবে কেন? ১৯৮৯ সালে ব্যাঙ্গালোরের আর টি নগরে ১০ জন কারিগরকে নিয়ে শুরু হল এক সোনার গয়নার রপ্তানির ব্যবসা। (১) ১৯৯৫ সালে “রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড” কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হল আর সেই বছরই তারা স্টক মার্কেটে নাম তালিকাভুক্ত করল। আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে ১০ কোটি টাকা তুলল, উদ্দেশ্য রপ্তানি ব্যবসা আরও বড় করা। এরপর থেকে এই লেখায় এই কোম্পানিকে REL বলে উল্লেখ করব, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। ১৯৯০ এর দশক ফ্যামিলি-বিজনেসের স্বর্ণযুগ। রাজেশের ব্যবসারও পালে হাওয়া লেগেছিল। ২০০১-০২ সালে REL ব্যাঙ্গালোরে শুরু করল ২৫০ টনের এক সম্পূর্ণ অটোমেটেড অলঙ্কার উৎপাদন কেন্দ্র। সেই সময় ভারতের সোনার গয়নার ৯০% কারিগরদের হাতে তৈরি হত। ১৯৯০ এর আশেপাশে মেসিন চেনের জনপ্রিয়তা বাড়লেও দেশে তার বাজার ছিল খুবই সীমিত। রপ্তানিকারকরা কিছু কিছু টুকরো কাজ মেসিনে করতেন মাত্র। সেখানে রাজেশ গয়না উৎপাদনের প্রতিটি ধাপকে ভেঙ্গে আগাগোড়া যন্ত্রের মাধ্যমে গয়না তৈরির পদ্ধতি চালু করলেন। ফল, উৎপাদনের সময় হ্রাস, গয়নার ওজন কমানো, আরও ভালভাবে সোনার গুণমান রক্ষা ও সোনা নষ্ট কমানো। কারিগরি হস্তশিল্প থেকে একটা বিশাল স্কেলের অটোমেটেড ফ্যাক্টরি পাইপলাইন তৈরির কৃতিত্বের খানিকটা রাজেশের প্রাপ্য। ২০০৩ সালে ভারতের মোট বার্ষিক সোনার চাহিদা ছিল ৬৫০-৭০০ টন। রাজেশের উৎপাদন কেন্দ্র একাই তার ৩৫ শতাংশ সরবরাহ করতে পারত। তবে তখনও রাজেশের মূল চোখ কেবলমাত্র বিজনেস টু বিজনেস রপ্তানির দিকেই। ২০০৭-০৮ সালে কোচির SEZ এ খুলল দ্বিতীয় ১০০ টনের উৎপাদন কেন্দ্র। সমসময়েই তিনি দেশের খুচরো বাজারেও নজর দিলেন। ২০০৬ সালের মার্চে Oyzterbay র রিটেইল নেটওয়ার্ককে কিনে নিলেন। (২) ২০০৬-০৭ সালে শহুরে ক্রেতার জন্য খোলা হল লাভ ব্র্যান্ডের গয়নার দোকান। (৩) ইতিমধ্যে ২০০৭ সালে সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জের মারফত FCCB ইস্যুর মাধ্যমে REL প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা তোলে। সেই টাকা বিনিয়োগ করে ২০০৭-০৮ সালে REL নিয়ে এল আরেকটি ব্র্যান্ড – শুভ। (৪)কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ জুড়ে স্থানীয় জুয়েলার্সদের নিজস্ব গয়নার সম্ভার অধিগ্রহণ করে ফ্রানচইজি মডেলে এই ব্যান্ড শুরু হয়। (৫) কিন্তু রাজেশ মেহতার স্বপ্ন ছিল "mines to consumers" গোটা ব্যবসা নিজের দখলে আনার। ২০১১ সালে তিনি সিঙ্গাপুরে REL এর সাবসিডিয়ারি সংস্থা REL Singapore Pte Ltd নিবন্ধন করলেন। ২০১৩ সালে REL উত্তরাখন্ডে খুলল বছরে ৪০০ টন সোনা পরিশুদ্ধ করার কেন্দ্র। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি REL Singapore এর মাধ্যমে REL ইউরোপিয়ান গোল্ড রিফাইনারিজ হোল্ডিং এস এ (EGR) কে অধিগ্রহণ করে। তাতে হাতে চলে আসে ইউরোপের বৃহত্তম রিফাইনারি ভ্যালক্যাম্বি এসএ (বার্ষিক ২০০০ টন ক্ষমতা)। (৬) পরে অবশ্য গ্লোবাল গোল্ড রিফাইনারিজ এজি (GCR) বলে একটি কাগুজে হোল্ডিং সংস্থা তৈরি করা হয় ও EGR GCR এর মধ্যে মিশে যায়। REL হয় পৃথিবীর বৃহত্তম সোনা পরিশোধনকারী। সোনার দৌলতেই REL-এর নাম ফরচুন গ্লোবাল ৫০০ এ উঠেছে, তবু সোনাতেই কি আটকে থাকবেন? ২০২০ সালে খোলেন এলেস্ট – লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির কোম্পানি। ২০২২ সালে সরকারের PLI ACC স্কিমে বিড করে 5 GWh ব্যাটারির কোটা জিতে নেন। (৭)ফলে সংস্থা বিপুল সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হল। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নিবন্ধিত হয় ১০০% মালিকানাধীন "ACC Energy Storage"। সোনার রাজত্ব বিকশিত হয় সরকারি নবোদ্যোগে।২। সুখের পথের কাঁটাগুলি তবে রাজেশের উত্থানের এই আকাশমুখী রেখাচিত্রটি শুধুই কর্মস্পৃহা আর উদ্যমের গল্প নয়। বিতর্ক রাজেশ মেহতার পিছু ছাড়ে না কিছুতেই। ১৯৯৫ সালের আইপিও নিয়ে সেবি অভিযোগ তোলে যে আইপিওর সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরে ইস্যু করা ব্যাকডেটেড এপ্লিকেশনের ভিত্তিতে শেয়ার দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে, Viswapriya Group / associates র সঙ্গে হাত মিলিয়ে শেয়ারের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা ও আইপিওর টাকা থেকে Viswapriya Group কে ২.৩৭ কোটি টাকা ঘুরপথে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও জানায় সেবি। ২০০৩ সালের ২৭ শে জানুয়ারি সেবি সেই সময়ের REL এর সব ডিরেক্টর দের তিন বছরের জন্য ক্যাপিট্যাল মার্কেট থেকে দূরে থাকার ও কোনরকম শেয়ার কেনা বেচায় অংশ নিতে নিষেধ করে নির্দেশ দেন। (৮)২০০৪ সালের DRI র বিরুদ্ধে মামলা: ২০০২-০৭ সালের এক্সইম (EXIM) পলিসিতে সরকার বছরে ২৫%-এর বেশি রপ্তানি বৃদ্ধি করলে বৃদ্ধির ১০% মূল্যের পণ্য নিঃশুল্ক আমদানি করতে পারবে বলে ঘোষণা করে। কিন্তু ২০০৪ সালের শুরুতে ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (DRI) দেখে, আদানি এক্সপোর্টস, কনক এক্সপোর্টস এবং রাজেশ এক্সপোর্টস-এর মতো বড় বড় সংস্থারা দুবাইতে নিজেদেরই কিছু কাগুজে বেনামি কোম্পানি বানিয়ে সেখানে সোনা পাঠাচ্ছে। দুবাইতে পৌঁছানোর পর আমদানির ট্যাক্স বাঁচাতে সেইসংক্রান্ত কাগজ বদলে ওগুলোকে 'সোনার স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি' বলে দেখানো হচ্ছে, আর সেই সোনা আবার ঘুরে ভারতে চলে আসছে। একই সোনা বারংবার গোল গোল করে ঘুরিয়ে এই কোম্পানিগুলো নিজেদের রপ্তানি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখাচ্ছে আর সরকারের থেকে কোটি কোটি টাকার শুল্কমুক্ত আমদানির ইনসেন্টিভ হাতিয়ে নিচ্ছে। জালিয়াতি ধরতে পেরে সরকার তখন তড়িঘড়ি নোটিফিকেশন জারি করে সোনা, হিরে ও গয়নাকে এই স্কিম থেকে বাদ দিয়ে দেয়। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই কোম্পানিগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ে ফলাফল মিশ্র হলেও, এই ঐতিহাসিক মামলার মাধ্যমে ভারতীয় কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি জালিয়াতির পন্থা লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। (৯) এই সময় আদানি এক্সপোর্টের সহযোগী সংস্থা হিসেবে রাজেশ এক্সপোর্ট কাজ করছিল। ২০১৩ সালের চোরাচালান কাণ্ডঃ কোচিনের SEZ থেকে একজন REL কর্মী কাগজ ছাড়া ৯০০ গ্রাম সোনা নিয়ে ট্রেনে উঠতে গিয়ে ধরা পড়েন। তদন্তে দেখা যায়, তিন বছর ধরে SEZ এ পূর্ণ-রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানি করা নিঃশুল্ক সোনা ব্যাঙ্গালোরে এনে রিটেইল বাজারে বেচে অন্তত ৯০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। (১০) DRI যখন কোচিনের SEZ র কারখানায় হানা দেয়, তখন তারা সেখানে শুধুমাত্র একজন দারোয়ান ও একটা মাত্র ছোট মেসিন পান। গয়না উৎপাদন ও রপ্তানির কোন প্রমাণ তাঁরা পাননি। (১১) কোথায় সেই ১০০ টনের গয়না তৈরির কারখানা! তবু REL মিডিয়ায় খুবই সমাদৃত ছিল। ২০০৯ সালেই খবর হয়েছিল যে REL আদতে একটি বিশিষ্ট মিডিয়া হাউজের Private Treaties এর অন্তর্গত। (১২) হয়ত এত ভাল ভাল খবর বেরোন সেই কারণেই। ৩। সেবির সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী আদেশREL এর অস্বচ্ছ ম্যানেজমেন্ট ও আইনকে কাঁচকলা দেখানো বিভিন্ন সমস্যাজনক কাজকর্ম নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীমহল যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে একজন শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগের ভিত্তিতে সেবি তদন্তে নামে। সেবির তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ছবি। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত পাঁচ বছরে মোট ১৫,১৫,৩৮৫ কোটি টাকা বেশি আয় দেখানো হয়েছে। হিসেবমত REL এর আয়ের ৯৭-৯৯ শতাংশ আসে বিদেশি সাবসিডিয়ারি থেকে। অথচ সেই সব সাবসিডিয়ারির নিরীক্ষিত রিপোর্ট তারা কখনো প্রকাশই করেনি। বিনিয়োগকারীরা অন্ধকারেই ছিলেন। এমনকি এমনই একটি সাবশিডিয়ারি ভ্যালক্যাম্বি এস এর নিরিক্ষিত হিসেবের সঙ্গে তার হোল্ডিং কোম্পানির নিরিক্ষিত হিসেবের কোন সাযুজ্যই নেই, অথচ সেই অনিরিক্ষিত ডেটাই ব্যবহার করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা জনিত অর্থের বদল ( ২০২১-২৪ তিন বছরে ৮৬৬.৬ কোটি টাকা) বা মিউচুয়াল ফান্ডের ডিভিডেন্ডকে ( ওই একই সময়কালে ২০৪ কোটি টাকা) ব্যবসায়িক আয় বলে দেখিয়ে আয়কে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার উপর বাড়ানো হয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করা শেয়ার বাজারের ডেরিভেটিভ ট্রেডিংও এসে ঢুকেছে কোম্পানির খাতায় ব্যবসার আয় হিসেবে! ২০২১-২৪ তিনবছরে বেশি দেখানো হয়েছে ১১,৪৮৭ কোটি টাকা, ভারতীয় সংস্থার এই তিন বছরের আয়ের ৬৬%। কোম্পানির টাকা বোর্ডের অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নেওয়া, নথি পত্র ছাড়াই এর ধার তাকে মেটানো, ইন্ট্রা-গ্রুপ ইনভেস্টমেন্টের সঠিক হিসাব লুকানো, আফ্রিকায় সোনার খনিতে বিনিয়োগ করেছেন জানিয়েও নথি দেখাতে না পারা—পাতায় পাতায় গলদ। সেই সঙ্গে সেবির তদন্তকারীদের তথ্য না দিয়ে অসহযোগিতা করার অভিযোগ তো আছেই। বস্তুত সেবির এই ১০৯ পাতার অন্তর্বর্তী আদেশ যেন এক রহস্য রোমাঞ্চ গল্প। (১৩) ৩ রা জুন ২০২৬ এ বের হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে সেবি REL ও রাজেশ মেহতাকে তিরিশ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট দিতে বলেছে, এছাড়াও রাজেশ মেহতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে REL এর শেয়ার কেনা-বেচা-হস্তান্তর না করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং REL কে সেবির বিধি মেনে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সংশ্লিষ্ট সকল তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের হিসাব ও অন্যান্য সব কিছু প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে। সেবির তদন্তে আরও বেরোয় যে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি, REL ও Elest উভয়েই ACC তে টাকা দেয়। এর ফলে ACC-তে REL-এর মালিকানা ১০০% থেকে কমে ৫১.০৫% হয়। একই দিনে রাউন্ড ট্রিপিং হয়ে Elest থেকে ACC Energy-তে যায় ১৪৭ কোটি টাকা আর ACC Energy থেকে Elest-এ ফেরত যায় ১১২ কোটি টাকা। সেবির নির্দেশের পরে REL এর প্রকৃত আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। ভারি শিল্প মন্ত্রক নড়েচড়ে বসে। এমনিতেও এসিসি স্রেফ একটা দেওয়াল তোলা আর একটা শেড বানানো ছাড়া আর কিছুই এতদিনে করেনি। (১৪) বর্তমানে মন্ত্রক রাজেশ এক্সপোর্টকে চিরকালের মতন লিস্ট থেকে সরানোর কথা ভাবছে। (১৫) একটাই আনন্দের বিষয় যে অন্তত REL কে কোন ইনসেন্টিভের টাকা দেওয়া হয়নি। রাজেশ এরপর সেবিকে জানিয়েছেন যে আয়ের হিসেব একদম সঠিক দেখানো আছে। এবং এই পুরো ব্যাপারটাই নাকি সেবির সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি। আপাতত আগামীতে এই ঘটনা কোনদিকে গড়ায় সেটাই দেখার জন্য আমজনতার অপেক্ষা।৪। এল আই সি - REL এর গাঁটছড়া এলআইসির REL এর শেয়ারে বিনিয়োগের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত এলআইসির বিনিয়োগ খুব সীমিত ছিল। কিন্তু ২০১৭-১৮ সালে এলআইসির অংশীদারিত্ব এক লাফে ১.৯৯% থেকে বেড়ে হয় ৫.২৮%। তারপর থেকে ধাপে ধাপে বাড়তে বাড়তে ২০২১-২২ সালে তা পৌঁছায় ১০.৮%। টেবিল ১ – এল আই সির বছরওয়াড়ি শেয়ারের মালিকানা বৃদ্ধিপ্রশ্ন হলো – কেন? ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে যেসব খারাপ খবর পৌঁছাচ্ছিল, এলআইসি কি সেসব পায়নি? এটা প্রায় অসম্ভব। তাহলে? মনে রাখতে হবে কোন মিউচুয়াল ফান্ড কিন্তু এই শেয়ারের বড় সংখ্যায় শেয়ার কখনোই কেনেনি। একা এলআইসি-ই ফাঁসেনি। কানারা ব্যাংক বিদেশ থেকে সোনা আমদানির জন্য হয়ে REL এর হয়ে এলসি( লেটার অফ ক্রেডিট) ইস্যু করত। সেই টাকা পেত ভ্যালক্যাম্বি এস এ। ২০২০ তে ব্যাংক ভ্যালক্যাম্বিকে টাকা দিয়ে দিলেও REL ব্যাংককে টাকা দিতে পারেনা। কানাড়া ব্যাংকের ৫০৯.৩৯ কোটি ঋণটি এখন "Stressed Loan Exposure" -এ পরিণত হয়েছে। তারা সম্প্রতি একটি বিড নোটিসে সেই ঋণ অন্য কোনো ব্যাংক বা এনবিএফসি-র কাছে খোলা নিলামে বিক্রির জন্য ডাক দিয়েছে। (১৬) অথচ সেবি প্রমাণ করেছে, বিপুল পরিমাণ টাকা কোম্পানি থেকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নেওয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, কানারা ব্যাংকের এই ঋণটি দীর্ঘমেয়াদী টার্ম লোন নয়, তাই REL এখনও বুক ফুলিয়ে নিজেদের ঋণমুক্ত কোম্পানি দাবি করছে।বিরোধী দলগুলোর প্রশ্ন, ED, SFIO, CBI-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি এত বড় অনিয়মের বিরুদ্ধে এতদিন নীরব কেন? LIC-র বিনিয়োগ কি 'ruling ecosystem'-এর নির্দেশে হয়েছিল? (১৭) (১৮) সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে যে তবে কি কোন রাজনৈতিক যোগসাজশ ছিল, নাহলে যার ট্র্যাক রেকর্ড এত জঘন্য, তাকে কীভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা সংস্থা বছরের পর বছর ধরে অক্সিজেন দিয়ে গেল? এটাই এখন ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় কর্পোরেট-পলিটিক্যাল স্ক্যান্ডাল।৫। সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘ ধূসর ছায়া তথ্য-প্রমাণ যা বলছে, শুরু থেকেই রাজেশ মেহতার অবস্থান ধূসর এলাকায়। তার বার্ষিক আয়ের হিসেব শুরু থেকেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ১৯৮২ সালে ১২০০ টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করে ১৯৯২ সালে ২ কোটি, ১৯৯৫ সালে ৩৫ কোটি, ১৯৯৮ সালে ১২০ কোটি এবং ২০০২ সালে ১০০০ কোটি টাকায় পৌঁছে যাওয়া — এই অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন দেখলে কেমন “কাকেশ্বর কুচকুচের অঙ্ক” বলে মনে হয় না? সে আমলে সোনার ব্যবসায় শুধু সার্কুলার ট্রেডিং বা চোরাচালান নয়, আরও বিভিন্নপথে জালিয়াতি হত। বিপিন সেহগাল মামলায় যেমন দেখা যায়, গয়না রপ্তানির অছিলায় সোনা আমদানি করে রপ্তানি করা হতো রূপোর ওপর সোনার জল দেওয়া গয়না – আর আসল সোনা কালোবাজারে বেচে লাভ-হি-লাভ। (১৯)রাজেশের কোম্পানি যে অ্যাকাউন্টিংয়ের সাধারণ নিয়ম মানে না সেটা বোঝা যায় ২০১৫ সালে ভ্যালক্যাম্বি অধিগ্রহণের সময় তাদের মন্তব্যেই। “For the last three years, on average per year, Valcambi generated revenues in excess of $38 billion and earnings before interest, tax, depreciation and amortization (Ebitda) of $33 million by refining and selling 945 tonnes of gold and 325 tonnes of silver per year,” (২০) ভ্যালক্যাম্বি টোল-রিফাইনার, তৃতীয় পক্ষের সোনা পরিশোধন করে — সোনাটা তার নিজের নয়। তাহলে তার ৩৩ মিলিয়ন ডলার EBITDA র সঙ্গে REL-এর হিসেবমত এত বিপুল অঙ্কের আয়ের আদৌ কি যথেষ্ট সাযুজ্য আছে? আপনি যদি কোন দোকানে এক লাখ টাকার সোনা পরিশোধন করতে দেন, আর সেই দোকান যদি পরিশোধনের জন্য ১০০ টাকা নেয়, তাহলে তো সেই দোকানের ব্যবসার আয় ১০০ টাকাই হবে, ১০০০০০ টাকা তো হতে পারে না, তাই না? অধিগ্রহণের পর ২০১৫-১৬ সালে REL-এর আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১,৬৫,২১১ কোটি টাকা – আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। একমাত্র ভ্যালক্যাম্বির বার্ষিক আয় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ধরলেই এই বৃদ্ধি ব্যাখ্যা করা যায় – কিন্তু সেটা কি ঠিক ঠিক একাউন্টিং হল? সেই প্রশ্নই আজ ফিরে এসেছে। বর্তমানের তদন্তে সেবি ২০২০-২০২৪ সালের ডেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে: ভ্যালক্যাম্বির আয়ের চেয়ে তার হোল্ডিং কোম্পানি CGR-র আয় কেন বহুগুণ বেশি, CGR-র যখন নিজস্ব কোনো ব্যবসায়িক আয় নেই? REL এর বক্তব্য যে ভ্যালকাম্বি এসএ শুধুমাত্র প্রসেসিং আয় দেখিয়েছে। অন্যদিকে, GGR সোনার লেনদেনের সম্পূর্ণ মূল্য (গ্রস ভ্যালু) প্রসেসিং চার্জের সঙ্গে একসঙ্গে দেখিয়েছে। অথচ GGR এর এই হিসাব পদ্ধতির স্বপক্ষে REL কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত, মালিকানা রেকর্ড, ঝুঁকি বণ্টনের নথি বা গ্রুপের ভেতরের চুক্তিপত্র কিছুই দেখাতে পারেনি। ৬। লোভের ফাঁদ ও সিস্টেমের দুর্বলতাকিন্তু কেন আয় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো? কারণ বিশাল আয় মানেই সরকারি সুবিধার ভান্ডার ‘খুল-যা-সিম-সিম’। ১৯৯৫ সালে স্টার ট্রেডিং হাউসের তকমা পেলেই মিলত হস্তান্তরযোগ্য আমদানি পারমিট, শুল্ক ছাড়, ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া আমদানি এবং গ্রিন চ্যানেলের সুবিধা সহ হরেক রকম সুযোগ। অথচ সেই তকমা পেতে গেলে বছরে গড়ে ৩৭৫ কোটি টাকার রপ্তানি দেখাতে হতো। সোনার ব্যবসায়ীদের জন্য এই লক্ষ্য ছিল দ্বিগুণ। প্রাক-ইন্টারনেট যুগে জালিয়াতি ধরাও ছিল অনেক কঠিন। তাই লোভী মানুষ সহজেই সে পথে গড়িয়ে পড়তেন।যে স্কিম ব্যবসায়ীদের রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে তৈরি হয়েছিল, সেই স্কিমই লোভীদের জালিয়াতিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ২০২১-২২ সালের PLI স্কিমেও একই ছবি — ১৫০০ কোটির বেশি নেট ওয়ার্থ বা প্রতি GWh-এ ২২৫ কোটি টাকা নেট ওয়ার্থ দেখাতে পারলে তবেই ১৮,০০০ কোটি টাকার ইনসেনটিভের অংশ আসবে হাতের মুঠোয়।তাছাড়া কাগজে-কলমে কোম্পানিকে মহাশক্তিশালী দেখালেই ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজ হয়ে যায়। শেয়ার মার্কেটে দাম বাড়ে চরচরিয়ে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা ঢালতে থাকে। এরপর সেইসব অর্থের কিছু অংশ যদি বহুস্তরীয় অফশোর লেনদেনের জালে হারিয়েও যায়, তাহলে সেই টাকার হদিশ পাওয়া কি এতই সহজ?কখনও কখনও তীরে এসে তরী ডোবে, এই যা দুঃখ।৭। বিনিয়োগকারীর বাস্তবতা৩ রা জুন, যেদিন সেবির অর্ডার বেরোল, সেদিন রাজেশ এক্সপোর্টের শেয়ারের দাম ছিল ১০৯.৩৮ টাকা আর ৯ই জুন সেটা দাঁড়িয়েছে ৮৯.১১ টাকায়। অর্থাৎ এই কদিনে বাজার থেকে এই একটি মাত্র শেয়ারের দরুণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা মুছে গেছে। ১০.৮% শেয়ারের মালিক এলআইসির বড় ক্ষতি হল। দেশি খুচরো বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল ১৫% মতন শেয়ার। তাদেরও ক্ষতি যথেষ্ট। কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক আয় দেখানো রাজেশ এক্সপোর্টসের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬৩১ কোটি টাকায়। অবশ্য এখনও শেয়ার কেনাবেচা চলছে – হয়ত বা বড় দাঁও মারার আশায়। এই ধরণের ঘটনা ভারতে এই প্রথম না। সত্যম কেলেংকারিতে রামলিঙ্গ রাজু ঠিক এই ভাবে ভুয়ো তথ্য দিয়ে ব্যবসার আয় ফাঁপিয়ে তুলেছিল। DHFL রাশি রাশি শেল কোম্পানির মধ্যে দিয়ে টাকা ঘুরিয়ে গোলক ধাঁধা বানিয়েছিল। রাজেশের আইপিও কেলেঙ্কারিরর ছায়া দেখা যায় ২০০১ সালের কেতন পারেখের কীর্তিতে। তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীর ভবিষ্যৎ কি কেবল স্ক্যামড হওয়ার অপেক্ষায় থাকা? সেবির কি কিছুই করার নেই? এই সংস্কারগুলি নিতান্তই জরুরি -১) ভারতীয় লিস্টেড কোম্পানির বিদেশি সাবসিডিয়ারিগুলির আয় গ্রুপের মোট আয়ের নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি হলেই বাধ্যতামূলকভাবে ভারতীয় শীর্ষ অডিট ফার্ম দিয়ে সেই সাবসিডিয়ারিসমূহের পিয়ার রিভিউ অডিট করানো বাধ্যতামূলক করা হোক।২) অনিরীক্ষিত ডেটা ভারতের কনসোলিডেটেড ব্যালেন্স শিটে যোগ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হোক। ৩) কোনো অডিটর বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম অবহেলা বা জালিয়াতির সাথে আপস করলে, তবে শুধু তাদের লাইসেন্স বাতিল নয়, বরং তাদের ওপর এমন বিপুল অংকের আর্থিক জরিমানা করা হোক যা কোম্পানির জালিয়াতির পরিমাণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ৪) অস্বাভাবিক অনুপাতের Receivables, বেসিক compliance লঙ্ঘন বা financial statement-এ বড় অসঙ্গতি দেখা দিলে সিস্টেমের থেকে রিয়েলটাইম "রেড ফ্ল্যাগ" জারি করার ব্যবস্থা হোক।২০০৯ সালের সত্যম স্ক্যামের পরে, বিগত বছরগুলোতে ভারতীয় বাজার অনেক বেশি পোক্ত হয়েছে। আজকের দিনে সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো "তথ্য এবং সতর্কতা"। তাই নিয়মটি খুব সহজ: যে কোম্পানির ব্যবসা আপনি নিজের চোখে বা সহজ বুদ্ধিতে বুঝতে পারছেন না, যার ব্যালেন্স শিটের বেশিটা আপনি দেখতেই পাচ্ছেন না, তা যতই লোভনীয় হোক, সেই শেয়ার থেকে দূরে থাকাই আত্মরক্ষার সব চেয়ে বড় উপায়।রেফারেন্সগুলি:১) https://www.forbesindia.com/article/lists/india-rich-list-2016/the-gold-rush-how-rajesh-mehtas-out-of-the-box-ideas-helped-him-build-his-jewellery-empire/45105/1২) https://archives.digitaltoday.in/businesstoday/20061231/current2.html৩) https://www.oneindia.com/2007/01/16/rajesh-exports-unveils-chain-of-laabh-retail-outlets-1168940503.html৪) https://economictimes.indiatimes.com/industry/cons-products/fashion-/-cosmetics-/-jewellery/rajesh-exports-all-set-to-launch-shubh-jewellers/articleshow/2563257.cms?from=mdr৫) https://economictimes.indiatimes.com/industry/cons-products/fashion-/-cosmetics-/-jewellery/rajesh-exports-buying-out-jewellers-in-south/articleshow/2357059.cms?from=mdr৬) https://www.livemint.com/Companies/xvkie5JEakKk0kscCJad9J/Rajesh-Exports-acquires-European-precious-metals-refiner-for.html৭) https://www.pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=1809037®=48&lang=2৮) https://www.sebi.gov.in/enforcement/orders/jan-2003/order-against-rajesh-mehta_16514.html৯) https://indiankanoon.org/doc/185919182/১০) https://www.business-standard.com/article/companies/rajesh-exports-under-dri-scanner-113051400355_1.html১১) https://www.newindianexpress.com/cities/kochi/2013/May/22/gold-firm-involved-in-dubious-deals-dri-479600.html১২) https://fraudsofindia.blogspot.com/search?q=Rajesh+Exports১৩) https://www.sebi.gov.in/enforcement/orders/jun-2026/interim-order-in-the-matter-of-rajesh-exports-limited_101820.html১৪) https://www.casansaar.com/news-SEBI/rajesh-exports-under-government-lens-as-sebi-order-triggers-fresh-concerns/14426.html১৫) https://auto.economictimes.indiatimes.com/news/auto-components/sebi-allegations-rock-rajesh-exports-as-pmo-reviews-battery-pli-scheme/13158179১৬) https://www.canarabank.bank.in/documents/20120/0/CB_REL+-+Trf+of+Loan+Exp+-+BPD+-+04.05.2026+Final.pdf/50e1c2ca-d5a5-abe8-cd04-fe6ccfb452d1?version=1.0&t=1777895212391&download=true&objectDefinitionExternalReferenceCode=44600fa6-ade9-4413-6e1d-ae968cf3c663&objectEntryExternalReferenceCode=2c9f9a3c-b917-4943-0431-5e9838afd5b4১৭) https://www.thehindu.com/business/why-did-ed-cbi-fail-to-raise-red-flags-over-alleged-irregularities-of-rajesh-exports-asks-congress/article71066742.ece১৮) https://economictimes.indiatimes.com/news/politics-and-nation/congress-questions-lics-10-8-stake-in-sebi-probed-rajesh-exports/articleshow/131500949.cms?from=mdr১৯) https://indiankanoon.org/doc/36385212/২০) https://www.livemint.com/Companies/xvkie5JEakKk0kscCJad9J/Rajesh-Exports-acquires-European-precious-metals-refiner-for.html
  • হরিদাস পালেরা...
    পশ্চিমবঙ্গ দিবস, শ্যামাপ্রসাদ ও চাড্ডিদের নানা ধানাইপানাই  - এলেবেলে | আজ অর্থাৎ ২০ জুন, আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাকে দু’টুকরো করা হয়েছিল। সৃষ্টি হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গের। দেশভাগের এই অভিঘাতে সহসা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন অগণিত মানুষ, সীমান্তের দুই পারে শরণার্থীদের আসা-যাওয়ার বেদনাবিধুর ঘটনাটি আজও পৃথিবীর বৃহত্তম অভিনিষ্ক্রমণ (largest exodus) হিসাবে অভিহিত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের থেকে চোদ্দ হাত দূরে থাকা রাজনৈতিক দলটি লাখো লাখো নারী-পুরুষের ছিন্নমূল হওয়ার যাবতীয় যন্ত্রণা ও মৃত্যুকে তুচ্ছ করে এই দিনটিকে আনন্দের সঙ্গে উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। এত দিন এই নিয়ে নানাবিধ ধানাইপানাই চলছিল, কিন্তু এবারে তারাসানাইটির সুর একেবারে সপ্তকে উঠেছে। এই সুবাদে দেখে নেওয়া যাক পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির পেছনে দল হিসাবে হিন্দু মহাসভা ও নেতা হিসাবে শ্যামাপ্রসাদের ঠিক কী ভূমিকা ছিল।   হুমায়ুন কবীর কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনাটির উল্লেখ করে বলেছেন, ১৯৩৭ সালেই ফজলুল হক তাঁর প্রথম মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর জন্য বরাদ্দ ছিল শিক্ষা দফতর। মনে রাখতে হবে, শ্যামাপ্রসাদ তখন কংগ্রেস থেকে আইনসভায় নির্বাচিত এবং তখনও পর্যন্ত সরকারে আসীন হওয়ার ব্যাপারে কংগ্রেস চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। শ্যামাপ্রসাদ যে মন্ত্রীত্ব নিতে গররাজি ছিলেন তেমনটা জানা যায় না, যদিও শেষ পর্যন্ত মুসলিম লিগের মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদের যোগ দেওয়ার ব্যাপারটি ঘটেনি। তবে ঘটলে তিনি হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তেন কি না, সে প্রশ্নের উত্তর আজ আর মেলার সম্ভাবনা নেই। এই ঘটনার মাত্র দু’বছর পরে শ্যামাপ্রসাদ কেন হঠাৎই কংগ্রেস ছেড়ে দিয়ে হিন্দু মহাসভায় যোগ দিলেন, ‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি’ গ্রন্থে তার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অন্নদাশঙ্কর রায়। কংগ্রেসের বদলে হিন্দু মহাসভায় যোগ দেওয়ার ব্যাপারে অন্নদাশঙ্কর তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে শ্যামাপ্রসাদ অকপটে স্বীকার করেন, “কংগ্রেসে আগে থেকে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা কি আমাকে এত সহজে এত উচ্চে উঠতে দিতেন?” হিন্দু মহাসভায় গিয়ে তিনি যে সঙ্গে সঙ্গে দলপতি হয়েছিলেন, সে কথা জানানোর পাশাপাশি অন্নদাশঙ্কর আরও লেখেন যে, কেবল সহজে নেতা হওয়ার জন্যই শ্যামাপ্রসাদের রাতারাতি দলবদল নয়। তিনি জানতেন “জেলে না গেলে, কেউ কংগ্রেস নেতা হয় না।” এই জেলযাত্রা এবং জেলে থেকে পচার বদলে তিনি হিন্দু মহাসভাকেই শ্রেয় বলে মনে করেন। অর্থাৎ হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা নয়, তাঁদের জন্য আলাদা বাসস্থানের দাবি তোলাও নয় - শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভায় যোগদানের এক ও একমাত্র কারণ ছিল ব্যক্তিগত উচ্চাশা পূরণ। আরও একটা মজার কথা বলা যাক। ১৯৪৩ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত পাঞ্জাবের ক্যানেল কলোনির লায়ালপুরে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এক সম্মেলনে শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ভাষণে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন: “ভারত বিভাজন সাম্প্রদায়িক সমস্যার কোনও সমাধান নয়। আর্থিক ভাবে এটি অবাস্তব। অর্থনীতির দিক থেকে এটি বিপর্যয়কর। আর সামগ্রিক ভাবে ভারতের জন্য এটি সর্বনাশা।” হ্যাঁ, বর্তমানে হিন্দু বাঙালিদের মসিহা হিসাবে হাজির করা শ্যামাপ্রসাদ যে ১৯৪৩ সালেও অখণ্ড ভারতবর্ষের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, এই ভাষণ তার প্রমাণ। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার, তাঁর এই বক্তব্যের ৬ বছর আগে সাভারকর দ্বিজাতি তত্ত্বের অবতারণা করেন এবং ৩ বছর আগে পেশ হয় মুসলিম লিগের লাহোর প্রস্তাব। এবারে পাঞ্জাব থেকে বাংলায় আসা যাক। বাংলা যখন ভাগ হচ্ছে, তখন শ্যামাপ্রসাদ ও তাঁর দল হিন্দু মহাসভা কতটা শক্তিশালী? আমরা দেখতে পাই, ১৯৪৫-এর শেষের দিকে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিল ১০, ২১৬ এবং ‘অমিতবিক্রম’ শ্যামাপ্রসাদ পেয়েছিলেন মাত্র ৩৪৬টি ভোট। এমনকি ওই নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ-সহ হিন্দু মহাসভার প্রতিটি প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। শুধু তা-ই নয়, ১৯৪৬-এর প্রথম দিকে প্রাদেশিক নির্বাচনেও চিত্রটা খুব বেশি আলাদা ছিল না। অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু মহাসভা ২৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, কিন্তু একটি ছাড়া সব ক’টি আসনে তাদের সমস্ত প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। একমাত্র শ্যামাপ্রসাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। সাধারণ নির্বাচনী এলাকায় মহাসভা সাকুল্যে পায় শতকরা ২.৭ ভাগ ভোট। এই হচ্ছে নেতা হিসাবে শ্যামাপ্রসাদ ও দল হিসাবে হিন্দু মহাসভার প্রতি তদানীন্তন বাংলার মানুষের মনোভাব। বস্তুতপক্ষে ১৯৪৬-এর নির্বাচনে বাংলার হিন্দু ভোটাররা যে হিন্দু মহাসভার বদলে কংগ্রেসকে বেছে নিচ্ছেন, এ বিষয়ে আক্ষেপের বিষয়টা শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরির পাতায় পাতায় চোখে পড়ে।এহেন শ্যামাপ্রসাদ বাংলা বিভাজনের জন্য নেহরু-প্যাটেলের দ্বারস্থ হন। ১৯৪৭-এর ১১ মে প্যাটেলকে তিনি লেখেন: “ঘটনার চাপে মিঃ জিন্না যদি [ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা] অবশেষে গ্রহণ করতে বাধ্য হন, তাহলে বাংলা ভাগের প্রশ্ন যেন পরিত্যক্ত না হয়, তা অনুগ্রহ করে দেখবেন। ...পাকিস্তান হোক আর না হোক, আমরা বর্তমান বাংলার সীমানার মধ্যে দুটো প্রদেশ গঠিত হোক, এই দাবি করি।” একই মর্মে তিনি নেহরুকেও একটি চিঠি পাঠান। আর এই দুই ঘটনার সামান্য আগে ১৯৪৭ সালের ২ মে, তিনি গোপনে ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে চিঠি লিখে ভারত অখণ্ড থাকলেও বাংলার বিভাজন দাবি করেন। এর উত্তরে প্রথমে নেহরু শ্যামাপ্রসাদকে লেখেন, “[ভারতীয়] ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন সার্বভৌম বাংলার ধারণা ব্যক্তিগতভাবে আমি মোটেই পছন্দ করি না। ...৩১ মে দিল্লিতে কংগ্রেস কাযনির্বাহী কমিটির বৈঠক হবে। ওই সময়ে আপনি দিল্লিতে উপস্থিত থাকলে সুবিধা হবে।” এর তিন দিন পরে অর্থাৎ ১৭ মে, শ্যামাপ্রসাদকে আশ্বস্ত করে প্যাটেল লেখেন: “কার্যকরী ও সুষ্ঠুভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য আপনি আমাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন। বাংলার হিন্দুরা যতক্ষণ দৃঢ় থাকবেন এবং যে সাহায্য তাঁরা শুধু আমাদের দিতে পারেন সেই সাহায্য দেবেন, ততক্ষণ তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নিরাপদ।” কিন্তু মজার কথা এই যে, প্যাটেল ও নেহরুকে শ্যামাপ্রসাদের চিঠি লেখার বহু আগে নেহরু-প্যাটেল জুটির বাংলা বিভাজনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া সারা। ১৭ ফেব্রুয়ারি (ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ‘ক্ষমতা হস্তান্তর’-এর ঘোষণা করার তিন দিন আগে এবং লিয়াকত আলির বাজেট পেশ হওয়ার মাত্র ১১ দিন আগে) প্যাটেল ওয়াভেলকে জানান যে, তিনি মুসলমানদের— যদি তাঁরা যোগ দিতে ইচ্ছুক হন— পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং পূর্ব বাংলা ছেড়ে দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত আছেন। এহ বাহ্য, ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ অ্যাটলির ঘোষণার পরের দিনই নেহরুও প্যাটেলের মতোই ওয়াভেলকে বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাজনের কথা বলেন।  অর্থাৎ বাংলা বিভাজনের জন্য শ্যামাপ্রসাদ যখন নেহরু ও প্যাটেলের দ্বারস্থ হচ্ছেন কিংবা গভর্নর বারোজ বা ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনকে গোপনে চিঠি পাঠাচ্ছেন, তার অনেক আগে বাংলা ভাগের ব্যাপারে ভাইসরয় ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের চূড়ান্ত নীতি গৃহীত হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত, হিন্দু মহাসভা যখন ৪ থেকে ৬ এপ্রিল তারকেশ্বরে দ্বিখণ্ডিত বঙ্গের জন্য সভা করছে, তার প্রায় দেড় মাস আগে প্যাটেল ও নেহরু বাংলার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছেন, এমনকি ওই সভার এক মাস আগে এ ব্যাপারে ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। কাজেই লিয়াকত আলির বাজেট যেমন দেশভাগের সম্ভাব্য কারণ হিসাবে পরিগণিত হতে পারে না, ঠিক তেমনই শ্যামাপ্রসাদের চিঠিচাপাটি কিংবা সভা-সমিতি বাংলা বিভাজনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না। এবারে নির্দিষ্ট ভাবে ১৯৪৭ সালের ২০ জুনের দিনটিতে আসা যাক। ওই বছরের ১০ জুন ভাইসরয় ঘোষণা করেন যে, দেশভাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্যে ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভার অধিবেশন বসবে এবং এই অধিবেশনে মুসলিম ও অ-মুসলিম সদস্যরা পৃথক দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে ভোট দেবেন। সেই মোতাবেক ১২৬ জন সদস্য পাকিস্তানের নতুন গণপরিষদে যোগদানের পক্ষে এবং ৯০ জন সদস্য বিদ্যমান গণপরিষদে অংশগ্রহণের পক্ষে মত দেন। পরবর্তীতে হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর সদস্যরা ৫৮ বনাম ২১ ভোটে দেশভাগের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা পরিবর্তনের দাবি ওঠে এবং প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে একটি নতুন হিন্দু মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। এই গোটা কার্যক্রমে হিন্দু মহাসভার সবেধন নীলমণি ভোটারটি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। একটা মাত্র ভোট সম্বল করে পাকিস্তানের কবল থেকে পশ্চিমবঙ্গকে ছিনিয়ে আনা ‘চাড্ডি’খানি ব্যাপার নয়! এখানেই শেষ হলে বাঁচা যেত। কিন্তু পিকচার আভি বাকি হ্যায়। ব্রিটিশ সরকারের তরফে ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ৩ জুন বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের বিভাজন সম্পর্কিত যে বিবৃতি প্রকাশ করেন, তার সংযোজনী অংশে ১৯৪১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে এই দুটি প্রদেশের কোন জেলাগুলিকে মুসলিম-গরিষ্ঠ এলাকা হিসাবে গণ্য করা হবে, তার একটি তালিকা পেশ করা হয়। ৯ জুলাই সীমানা কমিশনের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই সরকার কমিশনের প্রাথমিক কাজ চালানোর সুবিধার জন্য মুসলিম অধ্যুষিত ১৬টি জেলার তালিকা উল্লেখ করে ‘provisional boundary’ বা সাময়িক সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। ওই সরকারি তালিকায় ১৬টি জেলা ছিল চট্টগ্রাম ডিভিশনের চট্টগ্রাম, নোয়াখালি ও ত্রিপুরা; ঢাকা ডিভিশনের বাখরগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ; প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের যশোহর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া এবং রাজশাহী ডিভিশনের বগুড়া, দিনাজপুর, মালদহ, পাবনা, রাজশাহি ও রংপুর। এখানেও যে পরে নবগঠিত দুই দেশের মধ্য নদীয়া, যশোহর, দিনাজপুর, মালদহ ও জলপাইগুড়ি জেলা ভাগ হয়; সেখানে শ্যামাপ্রসাদের বিন্দুমাত্র ভূমিকা ছিল না। আর পরবর্তীকালে সংযোজিত কুচবিহার কিংবা পুরুলিয়ার উল্লেখ না করলেও চলে।  আদতে সেই সময়ে শ্যামাপ্রসাদ কিংবা তাঁর হিন্দু মহাসভার অন্তহীন ব্রিটিশ চাটুকারিতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিকে বাংলার মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। হিন্দু মহাসভা স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে সারা বাংলায় কতটা শক্তিশালী ছিল, তার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও সেই মনোভাবে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি, আর আসেনি বলেই ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনসংঘ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মাত্র ৪ শতাংশেরও কম আসনে জয়লাভ করে।এই শ্যামাপ্রসাদই এখন বাঙালির নতুন আইকন আর হুতোমের ভাষায় পশ্চিমবঙ্গ দিবস 'এই এক নতুন'!
    মাটি  (গল্প)   - রানা সরকার | “এবছর দুর্গাপুজো ঘটেই করতে হবে রে, বুঝলি?”। সন্ধ্যাবেলায় মুখার্জীবাড়ির বড়কর্তার এই কথায় বাকি শরিকরা কেঁপে উঠলেন।প্রতি বছরের মতো এই বছরও মিটিং-এ শরিকরা এসে উপস্থিত হয়েছেন। উপস্থিত হয়েছে ওদের ছেলেমেয়েরাও। আসেননি শুধু ছোট আর মেজ শরিকের এক ছেলে আর এক মেয়ে। ওরা যথাক্রমে একজন আছেন জার্মানী আর একজন অ্যামেরিকায়। অনলাইন হতে পারতেন, তবে বলে দিয়েছেন যে অন্যান্য শরিকেরা যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাতেই তারা সিলমোহর দেবেন।নাতি-নাতনিরাও কেউ আসেন নি এই মিটিং-এ। তারাও ব্যস্ত তাদের নিজেদের নিজেদের কাজে।বড়কর্তার এই কথা শুনে মেজকর্তা বলে উঠলেন, “বলছো কি দাদা! প্রায় ১২৭ বছরের পুরনো আমাদের এই পুজো! বারকয়েক এমন হয়েছিল শুনেছিলুম…, কিন্তু…, তখন তো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না!”“ঠিক, মেজদা। ঠাকুমার মুখে শুনেছিলাম। বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ আর ভারতছাড়ো আন্দোলন…। আমাদের গাঁয়ের কতজন শহীদ হলেন। দেশভাগ…”, ছোটকর্তা বললেন। বললেন, “যেবার তেভাগা, তেলেঙ্গানা আন্দোলনে আমাদের এক জামাই শহীদ হয়েছিল, সেইবারেও…। বিল্টুর বাবা…”।“হুম”।“তারপর বিপ্লবী মাষ্টারদা, বিনয়-বাদল-দীনেশ, যতীন্দ্রনাথ বাঘা যতীন – শহীদ হলেন, সেই সেই বছরও তো…। যদিও ২০০০ নাগাদ কোথায় যেন আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের বড়বোনের ছোট ছেলেটা …”, বলেই চুপ করে গেলেন ছোটকর্তা।বাকিরাও চুপ করে গেলেন।সেই ছেলে অবশ্য বেঁচে থাকলে আজ ওর বয়স হত ৪৬-৪৭।বড় বোন একসময় প্রায়ই চোখের জল ফেলতেন। তবে তার বড় ছেলেও আর ইহজগতে নেই। নাতিপুতি নিয়ে বুড়ি এখনও দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন।এই জঙ্গলডোবার মুখার্জীরা ৩ ভাই আর ২ বোন। জায়গাটা হুগলীতে। কলকাতা থেকে সড়কপথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভেতরে। ওদের দাদু ছিলেন এই গ্রামের জামাই। প্রপিতামহের ছিল দুই মেয়ে আর এক ছেলে। ছেলে কলকাতায় একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর আর দুই মেয়েকে কাছ ছাড়া করেননি তিনি। তারপর বড় মেয়ে অকাল বিধবা হয়ে কাশীবাসিনী হলেও, ছোট মেয়ের বরই জমিদারি দেখাশোনা থেকে শুরু করে সমস্ত দায়িত্ব একার কাঁধে নিয়ে মুখার্জী পরিবারকে আগলে আগলে রেখেছিলেন।তবে তাদের এই পুজো যেহেতু বহু পুরনো, কথিত আছে একসময় নরবলি পর্যন্ত হয়েছিল। তারপরে মোষ, পাঁঠা হলেও, গত পঞ্চাশ বছর ধরে চালকুমড়োই বলি দিয়ে আসছেন তারা।আর পুজোর এই ক’টা দিন বাড়ির সমস্ত শরিক আর তাদের ছেলেমেয়েরা নাতিনাতনিরা মাতিয়ে রাখেন। দারুণ সব হইচই, খাওয়া-দাওয়া, হরেক কিসিমের মজা – স্বপ্নের মতো কেটে যায় ক’টা দিন।এদিকে বড়, মেজ আর ছোটকর্তার বয়েস হয়েছে প্রায় যথাক্রমে ৭০, ৬৬ আর ৬৪ বছর। বড় বোন ৬২ আর ছোটবোন ৬০। ওদের ছেলেমেয়েরাই অনেকে প্রায় ৪৫ ছুঁইছুঁই হয়ে গেছে। কারুর কারুর নাতি-নাতনির আবার বিয়েও গেছে হয়ে।জমিদারীর অবশ্য কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। অনেক জমি দান করে দেওয়া হয়েছিল। তাতে স্কুল হয়েছে; কলেজ হয়েছে। হয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র; পাঠাগার আর দাতব্য চিকিৎসালয়।তবে জমিদারি না থাকলেও মেজাজ খানিকটা গেছে রয়ে। ছেলেমেয়েরা অবশ্য পড়াশোনা আর ব্যবসা করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কলকাতা আর শহরতলির বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন তারা। আর পুজোর ক’টা দিন চলে আসেন জঙ্গলডোবায়। এখানের বাড়ি আর লাগোয়া সামান্য জমি দেখাশোনা করেন গ্রামের দুইভাই। নাম ভোলা আর মহাদেব। ওদেরও প্রায় ৬০-৬৫ বয়স হয়ে গেল।বড়দার মুখে এই কথা শুনে দুই বোন বড়দার দিকে তাকিয়ে প্রায় একসঙ্গেই বললেন, “এ কি অলুক্ষুনে কতা বলচ গো বড়দা? ঘটে পুজো কেন?”“মাটি! মাটি। রাজ্যে মাটির বড় অভাব। ভোলাকে কুমোরটুলি পাঠিয়েছিলুম। কাগজে পড়িস নি? প্রথমে কুমোরটুলিতে মাটি আসত উলুবেড়ে থেকে। নদীর পাড় কেটে বাগবাজার পটুয়াপাড়ায় সরবরাহ করা হত। পরে নদীর ভাঙন রুখতে সেসব বন্ধ হল”।“তারপর?”, জিজ্ঞাসা করলেন ছোট বোন।“তারপর…, মাটি আসত ডায়মন্ডহারবার থেকে। এই মাটি নিয়েও চলত দুর্নীতি। আগের জমানায় মাটি চুরির অভিযোগ উঠেছিল, তাই এই সরকার মাটি কাটা এখনও পর্যন্ত বন্ধ রেখেছেন। তদন্ত হবে হয়তো…”“তাই নাকি! বলো কি গো বড়দা!”, মেজকর্তা বললেন।“হ্যাঁ। কুমোরটুলিতেও মাটি আসছে না। ওদিকে সামনের অক্টোবরে পুজো। খড় বেঁধে মাটির প্রলেপ দেওয়ার সময় এখন”।“কেন? কিছু বলেছে?”“হ্যাঁ। বললুম যে, প্রশাসনের অর্ডার ছাড়া মাটি কাটা যাচ্ছে না। সাউথ-চব্বিশ পরগনার কে এক মাটি মাফিয়া…, বলছে নাকি কোটি কোটি টাকার মাটি পাচার করেছে!”“বলো কি হে?”“হ্যাঁ। কাগজে…, টিভিতেও দেখাচ্ছিল”।“কিন্তু পুজোর আর বাকি ১০০ দিনের কিছু বেশি। কত বারোইয়ারী পুজো! তারপর আমাদের মতো কত্ত বাড়ির পুজো…!” “তোমরা আর বদলালে না”, এবার কথা বলল বড়কর্তার ছেলে। বলল, “পরিবেশ বলে একটা বস্তু আছে, জানো তো? আর আমরা হলাম সেই পরিবেশের, সেই প্রকৃতির সন্তান। একদিকে তো সারা দেশে ভেজাল উন্নয়নের নামে নির্বিচারে চলছে পরিবেশ ধ্বংসের কাজ…”“সেইই। আর আমরা যদি সারাটা ভারতবর্ষ জুড়ে উন্নয়নের মিথ্যা বুলি কপচে কপচে নির্বিচারে পরিবেশ ধ্বংস করি, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কি আর কিছু পড়ে থাকবে?”, মেজকর্তার মেয়ে প্রশ্ন তুলল।“এদিকে মাত্র ৫০ বছরে জনসংখ্যা করে ফেলেছি ডবল। আর তার ওপর পুঁজিপতিদের, ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দেশের বেশিরভাগ সম্পদ; জনগণের সম্পদ। আজ গ্যাস, তেল আর পেট্রোলের দাম কত বেড়ে গেছে। ভোজ্য তেল; ওষুধপত্র। ওদিকে লোকের কাজ নেই; শান্তি নেই। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সব যাবে কোথায়? যেভাবে হকার তুলে দিল! ভাগ্যিস কোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছে। পুজো মানে ওদের সারা বছরের ইনকাম। সংসার পরিবার ছেলে মেয়ে নিয়ে যাবেন কোথায় তারা? ”“ওদিকে দেখ, চীন কেমন সামলাচ্ছে। জনসংখ্যা একটা সমস্যা, সত্যিই সমস্যা, কিন্তু দেশের বেশিরভাগ নেতা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তুমি কি করবে?”“তার ওপর আছে চেতনাহীন মানুষ। সামনে দিয়ে সূঁচ চুরি করলে হাঁই হাঁই করে উঠছেন, কিন্তু পেছন দিয়ে হাতি চুরি করলে, বুঝতে বুঝতে আর ধরতে ধরতে এতো সময় লেগে যায় যে …”“আর শাসক হলেই যেন দূর্নীতি করার লাইসেন্স পেয়ে গেলাম। বাঃ! আর মানুষ তো একদিনে দুর্নীতিগ্রস্ত হয় নি। ওপর তলার দেখে দেখে শিখেছে। হোয়েন দ্য আপার হায়ারার্কি বিকাম্‌স কোরাপ্ট…”“আহ! বাদ দে না… বদ্দা। মেজদি। বড়দের একটা কথা বলি”, এবার বলে উঠল ছোটকর্তার বড় মেয়ে।জেঠুরা আর পিসিরা বললেন, “বল। এখন তোরাই সব। এবার থেকে তোরাই …, সব সামলাতে হবে…তো”।“বলছিলাম, আগে যেমন আমরা গুল কয়লায় রান্না করতাম। বা পাথুরে কয়লায়। এখন কি করি?”“নাহ্‌। তবে গ্যাস সরবরাহের যা অবস্থা তাতে করে…, যুদ্ধ!”।“বেশ। আগে আমরা কাঠ দিয়ে খাট বানাতাম। এখন বেশিরভাগ জায়গায় রট আয়রণ। রাইট?”“ঠিক”।“আগে রেডিও আর ছিল কাগজ। সেসব এখনও আছে, কিন্তু টিভি, মোবাইল…। সব ডিজিটাল। একসময় ইঞ্জিন বলে কোনও বস্তুও ছিল না…”।“সে তো ইলেকট্রিকও ছিল না। তুই ঠিক কী বলতে চাইছিস?”, এবার জানতে চাইলেন ছোটকর্তা মানে ওর বাবা।“আমি বলতে চাইছি, পৃথিবী জুড়ে পরিবেশ তো তছনছ হয়ে যাচ্ছে। কিয়োটো প্রোটোকল টোটোকল সব লোভের গমকলে ভাঙিয়ে ফেলেছে…”“মেক ইট শর্ট, বোনু”, বলল বড়কর্তার ছেলে। সেই সময় ভোলাদাদু আর মহাদেবদাদুর দুই বউ, মঙ্গলা দিদিমা আর টগর দিদিমা মুড়ি, নারকেল আর বাড়িতে ভাজা চপ নিয়ে হাজির হলেন। বাটি বাটি সবাইকে এক এক করে দিলেন বেড়ে। এক গাল মুড়ি, বাড়ির গাছের নারকোল আর চপ কামড়ে আবার সবাই কথা বলতে থাকলেন।ছোটকর্তার বড় মেয়ে যেখানে থেমেছিল সেখান থেকেই শুরু করল। বলল, “শোনো, যুগের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও কিন্তু পাল্টাতে হবে। একদিকে মঙ্গলে মহাকাশ যান পাঠিয়ে ফেলল, আর একদল মানুষ মঙ্গলের জন্য প্রবাল পরছেন। জাস্ট ইমাজিন…, একদিনে ডি.এন.এ., আর.এন.এ., জিন আর অন্যদিকে ধর্ম; ধর্ম আর ধর্ম। আমি সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কথাই বলছি…। সারা দুনিয়া জুড়ে ধর্মের এই ধ্বংস, কবে যে শেষ হবে!”।“ও হবে না। তুই এই কথা বলছিস তো? তাহলে শোন…”, এবার বলতে শুরু করল বড়কর্তার ছোটছেলে। মুড়ি চেবোতে চেবাতে বলল, “আমি একবার পাড়ার ক্লাবে, এই কয়েক বছর আগে, পুজোর মিটিং-এ একটা সাজেশন দিয়েছিলাম। বলেছিলাম যে কাছাকাছি ৩-৪টে পুজোকে যদি মার্জ করা যায়…”।“একটু এক্সপ্লেইন কর।”“ধর, একটা পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপ্যালিটির দুটো ওয়ার্ড মিলিয়ে পাঁচ বা ছ’টা পুজো হয়। ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ। ক্লিয়ার?”“জলের মতো”।“বেশ। এবার ধর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, যে এই পাঁচ বা ছ’টা পুজোর জায়গায় পুজো হবে একটা। যেমন ধর, একবার পুজো হল ক-তে। তার পরের বছর খ-তে। তারপর পর পর বছর গ, ঘ, ঙ, চ…, এইভাবে”।“তাতে কী হবে?”“অনেক উপকার হবে। প্রথমত, পাঁচটা বা ছ’টা পুজোর জায়গায় একটা পুজো করলে খরচ কমে যাবে। ইলেকট্রিক, ফুল-বেলপাতা। শব্দ দূষণ কম হবে…”“তারপর?”“মানুষকে কম চাঁদা দিলেই চলবে। রাস্তায় রাস্তায় জ্যাম জট হবে কম। আধিকারিকরাও রোটেশনে ছুটি পাবেন। তাদের কাজের চাপ কমে যাবে। তারাও পরিবার নিয়ে পুজো দেখতে বেরবেন”।“বেশ। তারপর?”“তবে সবচেয়ে যেটা ইম্পর্ট্যান্ট, ঐ পাঁচ ছ’টা পুজোর মানুষজন, যারা ভাগ ভাগ হয়ে পুজো কাটাতেন বা কাটাচ্ছিলেন, তারা ক’টা দিন একসঙ্গে মিলেমিশে…। এক হয়ে গল্প গুজব, হইচই করে, খাওয়া-দাওয়া করে কাটাতে পারবেন। এতে মানুষে মানুষে বিভেদ কমবে। প্রতিযোগিতা কমবে। মানুষ এক হতে পারবেন”।“বুঝলাম। কিন্তু ঐ পাঁচ ছটা পুজোর ঢাকি, পুরুত? যারা থিমের প্যান্ডেল করেন, তারা? – একজন বাদে বাকিদের তো কাজ গেল? ফুটুস?”“একদম না”।“মানে?”“বাকিরাও একসঙ্গে ঢাক বাজাবেন; পুজো করবেন। প্যান্ডেল বানাবেন। আসলে আমি চাইছিলাম যে মানুষ এক হোক। একতা বাড়ুক। আর খরচ কমুক। সঙ্গে পরিবেশ বাঁচুক”। “বাঃ! তোর ভাবনাটা তো বেশ ভালো রে!”, বড় কর্তা বলে উঠলেন। মেজ আর ছোটও মাথা নাড়লেন। বড়কর্তা বললেন, “তারপর? এই প্রস্তাব রাখবার পর কী বলল?”“তেড়ে এলো। বলল, তুই ব্যাটা কে রে এতো জ্ঞান দেওয়ার! নিজের বাড়িতে গিয়ে জ্ঞান দে! বলল, পুজো অর্গানাইজ করলে বুঝতিস তার ঠেলা। দু’পাতা বই পড়ে হনু গেছিস, না? ফালতু জ্ঞান দিতে আসবি না। আর ঐভাবে পুজো করা যায় না। যা ভেঙে যায় তা আর জোড়া লাগে না, বুঝলি”।“হুম। বোঝা গেল যে পুজোকে ঘিরে বেশিরভাগ কর্মকর্তার এলাকায় একটা কর্তালি করবার মানসিকতা…। আবার টু’পাইস ইনকাম। দেখা যাবে এলাকায় এক সময় একটাই পুজো হত। তারপর ইগোতে ইগোতে…। একান্নবর্তী সংসারই ভেঙে গেল। তারপর, নতুন কারখানা কোথায়? আগে, এই বিশ ত্রিশ বছর আগেও কেমন বিশ্বকর্মা পুজো হত সব কারখানা কারখানায়। আর এখন? ঐ অটো, টোটো আর রিক্সো স্ট্যান্ড। তারপর আবার ইউনেস্কো নিয়ে কীসব কেলেঙ্কারি আবার শুনছি…, ইসস!”“সবই তো বুঝলুম, এবার মাটির কী হবে?”, এবার জানতে চাইলেন ছোটবোন। সকালের দিয়ে যাওয়া কাগজটা দেখিয়ে মহাদেবদাদু বললেন, “দেকুন দাদা, একানে কী লিকচে। পটুয়াপাড়া অ্যাসোসিয়েসন, লিকচে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিছে”।“নিশ্চয়ই একটা কিছু হবে। তবে বর্ষার আগেই অনেক শিল্পী কাজ এগিয়ে রাখেন তো। রোদে শুকোনোর ব্যাপার ট্যাপার আছে তো…”। “বিধায়কের সঙ্গে কতাও বলচেন সবাই”।“দেখো জেঠু, মনে যদি ভক্তি থাকে, তাহলে অনেক কিছুই মেনে নেওয়া যায়। কথায় বলে, যদি হও সুজন তেঁতুল পাতায় নজন। প্রতিমা বড় না ভক্তি বড়? থিম, জাঁক বড় না ভক্তি বড়? প্রতিযোগিতা বড় না ভক্তি বড়?”, এবার প্রশ্নটা তুলল ছোটকর্তার ছোট মেয়ে।“কিন্তু সংস্কার?”“আর সংস্কার। এই সংস্কার তো চাপিয়ে দেওয়া। আমাদের পুজোর মধ্যেকার এসেন্সটা কী?”“কী?”“অ্যাগ্রেরিয়ান ইকোনমি। কৃষিকাজ। সেই কৃষিজ ফসল কাটবার আনন্দের উদযাপন। আগে বসন্তে ছিল; পরে আশ্বিনে। অকাল বোধন। এই যে নবপত্রিকা পূজা, শষ্য আর উর্বরতার দেবী হিসেবে পূজিতা হন মহামায়া। পদ্মফুল; কৃষিজাত নৈবেদ্য…, তাহলে?”।“হুম”।“তারপর বিদেশে তো ফাইবারের প্রতিমা মূর্তি যায়। সংরক্ষণ করলেই হল। বিজ্ঞানে তো সংরক্ষণ নিয়ে একটা গোটা চ্যাপ্টার আছে, তাই না? পরিবেশ সংরক্ষণ করতে না পারলে…”। “তাহলে, তোরা কী বলছিস?”“আমার মনে হয় বদ্দা, ক’টা দিন দেখি। সরকার কী স্টেপ নিচ্ছেন দেখি। তারপর না হয় একটা…”, মেজকর্তা বললেন।“ঠিক আছে। তাহলে, আজকের মিটিং এইখানেই ভঙ্গ হইলো”।রাতে খাওয়া-দাওয়া করে সবাই শুয়ে পড়লেন। কেউ আগে; কেউ বা পরে।পরদিন ভোরবেলায় ভোলাদাদু এসে ডাকাডাকি শুরু করে দিলেন। হাঁক পেড়ে বললেন, “কই গো সবাই? কই গো, ঘুম কাটেনে দেগচি!”।ছোট আর মেজকর্তার আবার ভোর ভোর উঠে জপতপ করার অভ্যাস আছে। ভোলাদাদুর এই হাঁকডাক শুনে দুই কর্তা বেরিয়ে এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্যাপার কী হে? এতো সকাল সকাল?”“ভালো একডা খপর আচে। আফনেরা যদি চান…”, বলেই চুপ করে গেলেন ভোলা।“কী বলবি তো?”“শোনেন, হাকিমপাড়ার মন্সুর মিঞা বলচিলেন, তার জমি থেকে মাডি দেবেন”।“মন্সুর মিঞা! ঐ যার ছোট মেয়েটা গত বছর আম পাড়তে গিয়ে বাজ পড়ে মারা গেল? আহা! ফুলের মতো…! আহা গো! পুজোর সময় কত আসত এখানে…”।“হ্যাঁ, দাদা…। কত খেলা করত। মজা করত”।“দেখো, আমাদের আবার বুঝতেই পারছ, বড়দাকে জিজ্ঞাসা না করে। তবে উনি শুনেছি বামমনস্ক মানুষ”।“বাচ্ছাদের জন্যি অবৈতনিক ইস্কুল করিচেন। বলেন, শিক্ষিত না হলি মানুষ হবে না। শিক্ষাই মানুষের মেরুদন্ড…”“সঠিক বলেছেন। তা চাষবাস কে করেন?”“লোক আচে”।সেইসময় বাড়ির বড়কর্তা ঘুম থেকে উঠে এসে হাজির হলেন দাওয়ায়। একটা প্রকান্ড হাই তুলে জানতে চাইলেন, “কী ব্যাপার ভোলা? এতো সকাল সকাল!”ভোলাদাদু সব কথা খুলে বললেন। তাতে বড়কর্তা চুপ করে একবার আকাশের দিকে তাকালেন। ভোরের আকাশ। লালচে আভা দেখা দিয়েছে। কিছু পাখী উড়ে যাচ্ছে। মুখ দেখে মনে হল কাকে যেন প্রশ্ন করছেন। তারপর গাছগুলোর দিকে তাকালেন। শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেজ আর ছোটভাইদের দিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোরা কী বলিস?”“সমস্যা কোথায়? বাজারে যে জিনিস কিনি, দোকান থেকে যে খাবার কিনি, জামাকাপড় কিনি, এমনকি রক্ত, এমারজেন্সিতে রক্ত…, তখন কি আর…”, ছোটকর্তা বললেন।“ঠিক বলেছিস। ঠিক। মাটির আবার প্রাতিষ্ঠানিক ধম্ম! হু! মাটির ধম্ম হল সৃষ্টি। ভোলা, তুমি মন্সুরকে বলে দাও। তবে আমরা কিন্তু কিনে নেবো…”।“হ্যাঁ। কদটুকুই বা লাগবে। এক ছাইয়া…” ভোলা মাথা নেড়ে প্রফুল্ল চিত্তে চলে গেলেন। ঘন্টা তিন পরে মুখার্জী বাড়ির সবাই একে একে জানতে পারলেন যে মাটির বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে একটা স্বস্তির আবহাওয়া বিরাজ করতে থাকল। ছোটকর্তার মেয়ে গান ধরল – “আলোয় আলোকময় করে হে এলে আলোর আলো…”। ওদিকে রান্নাঘরে চলছে জল খাবারের আয়োজন।সেইসময় বাইকে করে ভোলা আর মন্সুর মিঞা এসে হাজির। প্রাথমিক অভিবাদনের পর মন্সুর ভাই বললেন, “আমার একটা আর্জি আছে দাদা”।মন্সুর মিঞাকে আপ্যায়ন করে কর্তারা বসালেন। হাঁক মেরে বললেন, “কই গো, চা বিস্কুট দিয়ে যাও”।একটা চেয়ারে মন্সুর মিঞা বসবার পর ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “টাকা আমি নিতে পারবো না দাদা। না। উৎসবের ক’টা দিন রুখসানা মা এখানে এসে কত্ত মজা…”, চোখের জল সামলে নিলেন মন্সুর মিঞা। বললেন, “তাও তো আগে মেলা বসত। নাটক গান হত; ম্যাজিক শো…। দুটো মেয়েই আসত। খেত দেত। খেলত…”। আবার উদাস হয়ে বোবা দৃষ্টিতে সামনে দিকে তাকালেন মন্সুর মিঞা। বললেন, “টাকা আমি নিতে পারবো না দাদা। তবে চাইলে আপনারা আমার পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন…”।ছোটবোন এসে সবাইকে চা বিস্কুট দিয়ে গেলেন। ভোলাদাদু আর মন্সুর মিঞাকে বললেন, “লুচি না খেয়ে কিন্তু যাবেন না”।বড়কর্তা একবার ছোট আর একবার মেজোর দিকে তাকালেন। তারপর মাথা নেড়ে সায় দিলেন। বললেন, “সেই একটা গান ছিল না?”“কোন গান গো বদ্দা?”, ভোলাদাদু জানতে চাইলেন।“কবর দাও বা চিতায় পোড়াও, মরলে সবাই মাটি…”“ওফ! ঠিক বলেছেন। দারুণ লিরিক”, মন্সুর মিঞা হেসে উঠে চা-এ চুমুক দিলেন। বললেন, “আমি হলাম শিবনারায়ণ রায়ের লোক। র‍্যাডিকাল হিউম্যানিস্ট। সমাজে আর ধর্মে সংস্কার না হলে সেই সমাজ, সেই ধম্ম ক্রমশ আবর্জনা হয়ে যায়। আমি সব ধম্ম আর সমাজের কথাই বলছি”।“ঠিক। একেবারে আগাছা হয়ে যায়”, বললেন মেজকর্তা।ভোলাদাদু আর কর্তারা চা পান শুরু করলেন। বড়কর্তা কী যেন একটা ভাবছিলেন। সেটা লক্ষ্য করে মন্সুর মিঞা জিজ্ঞাসা করলেন, “কিছু কি বলবেন?”“হ্যাঁ। তোমার রুখসানা মায়ের একটা ছবি দিয়ে যেও না…। আছে তো?”“বেশ”।এরপর কেটে গেল ক’টা মাস। তারপর আশ্বিনের শারদ প্রভাতে বেজে উঠল আলোর বেনু।মহালয়ার দিন গ্রামের লোকজন মাতৃপ্রতিমার মুখ দেখতে এসে অবাক হয়ে গেলেন। তারা দেখলেন প্রতিমার মুখটা একেবারে রুখসানার মতো। মন্সুর মিঞার ছোট মেয়ে রুখসানা, যে গত বছর বজ্রাঘাতে মারা গেছে। ================================================================== পুনশ্চঃ গত মাসে একটি বাংলা দৈনিকে খবর দেখে গল্পের আইডিয়াটা আসে। ধন্যবাদ।
    রাম মূর্তি!  - bikarna | গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে রামের বিগ্রহ নির্মাণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা। কেন এই উত্তেজনা তা বুঝতে হলে আপনাকে ঘিলুহিন হতে হবে, একটুও যদি ঘিলু থাকে তাহলে আপনি বুঝবেন না এই উত্তেজনার কারণ। মন্দিরে বিগ্রহ তৈরি হবে, তারা মূর্তি পূজা করে, এইটা তাদের ধর্মীয় আচারন। এখানে অন্য ধর্মের কেউ কেন বাধা দিবে? মন্দিরে মূর্তি থাকা নিয়ে যদি উত্তেজনা তৈরি হয় তাহলে তাহলে মুশকিল না? এর তো আশু কোন সমাধান নাই। আসলে আশু না, কোন সমাধানই না। আছে হচ্ছে একটাই রাস্তা, এই দেশে আর কোন মন্দির তৈরি হবে না, কোন বিগ্রহ তৈরি হবে না, এইটা সরকারি ভাবে ঘোষণা দিয়ে দেওয়া। আমি তো আর কোন রাস্তা দেখি না এখানে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করল রামের নামে এইদিকে কিছু হবে কেন? এদিকে শুধু হবে দুর্গা পূজা, কালি পূজা ইত্যাদি। কেউ কেউ দেখি শিবের নামও নিলো! শিব পূজা কবে কে করে জিজ্ঞাস করলে দাঁত লেগে যাবে কিন্তু বলে দিল এখন একটা কথা! বলা হল রাম নিয়ে কারবার সব উত্তর ভারতের দিকে, এইটা ভারতের ষড়যন্ত্র! মানে এইদিকে রামকে মানুষ চিনেই না? পাশাপাশি এত বছর থাকার পরে হিন্দুদেরকে ধমক দেওয়া যায় কেন তারা মুসলমানদের সম্পর্কে জানে না বলে অথচ নিজেরা এইটুকুও জানে না যে কম হলেও (ভারতবর্ষের অন্য অঞ্চলের তুলনায়) রামের নাম এই অঞ্চলেও চালু আছে, বহু আগে থেকেই আছে। বাংলাদেশের এমন একটা অঞ্চলও পাওয়া যাবে না যে অঞ্চলে রামের নামে কোন এলাকার নাম নাই। রামপুর, রামপুরা কিংবা রাম রামপুর বাজার, এমন সহস্র নাম আছে এখানে। রঘুনাথ মন্দির আছে সব জায়গায়। রাঘব, রঘুনাথ, রঘুপতি এগুলা রামেরই আরেক নাম। তাহলে হঠাৎ রাম মূর্তি দেখে চমকে যাওয়া কেন? এর মধ্যে ভারতের ষড়যন্ত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কেন? আমি ভারত চিকিৎসার জন্য বা ঘুরতে যাইতে চাই, এ জন্য ভিসা চাই, শুধু এইখানেই কোন ষড়যন্ত্র নাই, বাকি সব জায়গায়ই ভারতের ষড়যন্ত্র? এরপরে এই শক্তি, যারা আজকে আস্ফালন করে বিগ্রহ নির্মাণ বন্ধ করে দিলো তাদের চাহিদা কী হবে? তারা জানায় দিবে কত বড় বিগ্রহ বানানো যাবে? তারা সিদ্ধান্ত নিবে দুর্গা পূজায় কে কেমন করে কত বড় প্রতিমা তৈরি করবে? আমরা এর আগে নোবেল ম্যানের আমলে দুর্গা পূজার সময় অসুরের দাঁড়ি গোঁফ থাকবে না থাকবে না তা নিয়ে আলোচনা দেখেছি। কোন কোন জায়গায় গামছা দিয়ে অসুরের দাঁড়ি ঢেকে দেওয়াও হয়েছিল। আমরা আবার তেমন কিছুই দেখব? ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত শুধু এক ধর্মের মানুষেরই অধিকার? এই বিগ্রহের কাজ বন্ধের দাবিতে ঢাকায় যে হিন্দুধর্মকে চরমভাবে অপদস্থ করা হল প্রতিবাদের নামে তাতে কেউ কিছুই মনে করবে না? রীতিমত রামের ছবিতে জুতা মারা হয়েছে! এতে কোন ধর্ম অবমাননা হয়নি? এতে কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগবে না? আচ্ছা, তাদের সেই অধিকার আছে? ৮১ ফিট উচ্চতার রাম মূর্তি বানানো হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল এইটা এশিয়ার সবচেয়ে বড় রাম মূর্তি। এই মন্দির প্রাঙ্গণে শিব ও কৃষ্ণের মূর্তি আগে থেকেই ছিল, এখন রামের মূর্তি বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু কাজ স্থিগত করা হয়েছে। এই জিনিস আর আলোর মুখ দেখবে না। অন্তত এখনই দেখার কোন সম্ভবনা নাই। বাংলাদেশের সুশীল সমাজ ফুল পাখি লতাপাতা নিয়ে ব্যস্ত আছে। কেউ একটু মৃদু গলা খাকড়ি দিয়ছেন।ভালো হচ্ছে না কিন্তু বলে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন তারা। সংসদ চলছে, সেখানে অন্য সবার সাথে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনও আছেন। তারা কেউ একটা শব্দ পর্যন্ত করে নাই এখন পর্যন্ত। সংসদে তো নাইই সংসদের বাহিরেও কোন উচ্চবাচ্য নাই। সংসদে দেখলাম কোন শিবির নেতা গার্ল ফ্রেন্ডকে প্রেগন্যান্ট করে পালিয়েছিল, তাকে গুম করা হয়েছে বলে জামাতের আমিরও চিল্লাফাল্লা করেছেন। এখন সেই পোলা ধরা খাইছে। এইটা নিয়া সরকারি আর বিরোধী দল ব্যাপক তর্ক করে চলছে।এই ফাঁকে বগুড়ায় তিনটা মন্দির ভাঙা হয়েছে, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায় নাই। কোন পথে যাচ্ছে দেশ? জানি না আসলে। আমি জানি না এরপরে যদি কেউ সরকারকে উগ্রবাদীদের কাছে নতজানু বলে তাহলে সরকার তা অস্বীকার করবে কি না। আমি জানি না কেন দিনের পর দিন বিনা অপরাধে একজনকে জেলে থাকতে হচ্ছে! আমি জানি না এই দেশের মানুষ কবে প্রকৃত অর্থেই মানুষ হয়ে উঠবে। আমি জানি কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস! এখনই শক্ত হাতে এগুলাকে প্রতিহত না করতে পারলে সামনে আরও ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। এইটা আমরা জানি। ভয়ংকর কতখানি তার নমুনা পাওয়া যায় যে কোন হিন্দু মানুষের সাথে কথা বললে। এদের বড় অংশ ভারতে মুভ করতে চায়। বিজেপি এসে বৈধ অবৈধ সব ঠেলে পাঠানো শুরু করছে সীমান্তে। যত এগুলা হচ্ছে তত এরা আতঙ্কিত হচ্ছে। যাবে কই? এদেরকে দেখবে কে? রক্ষাকর্তা কে? দেশ ছেড়ে কয়জন যেতে পারে? কিন্তু কল্পনা করে যে ধুর, চলে যাব ইন্ডিয়া! কল্পিত এক রাষ্ট্রের ভাবনা মাথায় নিয়ে ঘুরে। ভাবে সেখানেই বুঝি মিলবে মুক্তি। এখন সেই কল্পনার সুখটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে!  
  • জনতার খেরোর খাতা...
    অভিজ্ঞতা - শ্রীমল্লার | অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা। রান্নায় স্বাদ হয়নি তেমন। অভিজ্ঞতা। বদলে যাবেই—মেঘপিয়ানোআকাশবাতাস, তোমারকথা। সমস্তটাই অভিজ্ঞতা। মলিনস্রোতা। Automatic backups। সবই অভিজ্ঞতা। ধর্ষক আর দস্যু ভাল। অভিজ্ঞতা। রক্ত ভাল। সময় ভাল। বন্ধু খারাপ। এবার্থেকে আলাপ কেবল দূরত্বতেই। অভিজ্ঞতা। অসীম। হঠাৎ। অভিজ্ঞতা। 
    কবিতা - আমার ছেড়া জামা - বই পুরুষ | গায়ের গন্ধে ভেজা জাতির পতাকা, আমার ছেড়া জামা।পুড়ছে, খালি পেট... বুলডোজারে ভাঙা বাসা...তোমার দিকে তাকিয়ে আছি, আমার ছেড়া জামা।খোলা আকাশের নিচে.... তোমার সবুজ প্রাণগুলো;রক্ত রঙের মাটির উপর, লাশটা পড়ে ছিলো।কালো পুঁজির... উষ্ণ মরুর... বালির খনিতে,উড়বে তুমি ডানা মেলে, আমি দেখবো দাড়িয়ে।যদিও ভেঙে গিয়েছে তুলি, তবুও আঁকবো,কত ভাঙা ঘরের ছবি......কত জীবন্ত কঙ্কাল, কত হারানো চাষের জমি।কারখানায় পুড়ে যাওয়া মাংস আমার.....প্রিয় জন্মভূমি,তোমার প্রেমে মগ্ন আমি, আমি জানি.....একদিন তুমি উড়বে আকাশ জুড়ে, আমি দেখবো দাড়িয়ে।আমার মেয়ের শরীর যখন বিকোবে বাজারে!ভাঙা ছাদের ঘরে বসে, ছেড়া জামা গায়ে জড়িয়ে,সাদা পেনে কালো খাতায়, লিখবো ইতিহাস;ভালো সময়ের... কালোবাজারির... বাজার ইতিহাস।
    তৃতীয়-বিশ্বের দেশগুলিতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্তরণে ধর্মীয় মৌলবাদের ভূমিকা : সমাজতন্ত্রের পতনের পরবর্তী সময়ের একটি বিশ্লেষণ - Manali Moulik | কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে, ইতিহাস-সচেতন সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একচেটিয়া ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। প্রথমত, প্রযুক্তিগতভাবে এত উন্নত ও আধুনিক যুগেও ধর্মীয় মৌলবাদের টিকে থাকার উপাদানগুলো কী, তা আমাদের বিস্মিত করে। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে কি কোনো ধরনের একমুখী সমীকরণ রয়েছে? ভারতীয় বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ধারণাটি ঠিক কী? কীভাবে একটি মৌলবাদী চিন্তাভাবনা জাতীয়তাবাদী চেতনার সাথে মিশে যায়? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির স্তরবিন্যাস এবং আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মধ্যে।​এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা দরকার—এই সার্বিক পরিস্থিতি থেকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি ফায়দা তুলছে এবং অর্থনৈতিক মুনাফার বড় অংশটি চলে যাচ্ছে তাদেরই পছন্দের কিছু পুঁজিপতিদের পকেটে। ফলস্বরূপ, এটি এক ধরনের 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' বা তোষামোদি পুঁজিবাদের উত্থানে সাহায্য করছে। এই নিবন্ধে আমরা মূলত তিনটি ভাগে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।​প্রথম ভাগে, আমরা ধর্মীয় মৌলবাদের সাথে জাতীয়তাবোধের সংযোগটি খতিয়ে দেখব।​দ্বিতীয় ভাগে, ভারতের মতো বহুভাষিক ও বহুধার্মিক দেশে একচেটিয়া সাম্প্রদায়িকতা এবং মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি মূল্যায়ন করব; এখানে আমরা তথাকথিত "হিন্দুত্ব"-এর স্তরবিন্যাস ও এর রাজনৈতিক ধারণা ব‍্যাখ‍্যা করার চেষ্টা করব।​তৃতীয় ভাগে, দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের কারণ এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ইস্যু সামনে এনে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ক্ষমতা দখলের মানসিকতা বিশ্লেষণ করব। ​১. জাতীয়তাবাদ ও মৌলবাদ ​ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে কখনো ইউরোপ-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় শাসনব্যবস্থার মূল সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৭-পূর্ববর্তী ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি ঔপনিবেশিক-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে মাতৃভূমিকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করা।​অ্যাপোলো ৯ মহাকাশ অভিযানের (১৯৬৯) প্রধান বিজ্ঞানী ও নভোচারী রাস্টি শোয়েখার্ট (Rusty Schweickart) একবার বলেছিলেন:​"আপনি যখন মাত্র দেড় ঘণ্টায় পুরো পৃথিবীটা ঘুরে আসবেন, তখন আপনি বুঝতে শুরু করবেন যে আপনার পরিচয় আসলে এই সমগ্র পৃথিবীর সাথেই জড়িয়ে আছে... আপনি যখন উপর থেকে নিচের দিকে তাকাবেন, আপনি ভাবতেই পারবেন না যে কত শত সীমানা আর বর্ডার আপনি পার হয়ে চলে যাচ্ছেন..."​তাই জাতীয়তাবাদের ধারণাকে ভৌগোলিক গণ্ডিতে সংকীর্ণ করে ফেলাটা এক অর্থে বিভ্রান্তিকর। বর্তমান যুগে ধর্মীয় মৌলবাদকে এক ধরনের 'রোমান্টিক জাতীয়তাবাদে'র অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সমাজে "আমরা বনাম ওরা" নামক একটি দ্বিমুখী বিভাজন (Binary Opposition) তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় মাল্টিমিডিয়া এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমগুলো গণমনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করার এবং কাল্পনিক ভয় বা বিভ্রান্তি তৈরি করে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ জাগিয়ে তোলার দুর্দান্ত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।​আমরা যদি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব ১৯৪৭ সালের ঠিক পরপরই ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার আনন্দ একসময় যৌথ স্মৃতিতে পরিণত হয় এবং তার ঘোর কেটে যায়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দেয়, যা বেকারত্ব, দারিদ্র্য, নাগরিক জীবনে দুর্নীতি, নিরক্ষরতা এবং জনসংখ্যা বিস্ফোরণের মতো সমস্যাগুলোকে আরও তীব্র করে তোলে। বিভেদমূলক শক্তিগুলো নজিরবিহীন হিংস্রতা নিয়ে আবার মূল মঞ্চ দখল করে।​ফলে, জাতীয়তাবাদের যে ধারণা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় সমাজ গঠন করার কথা ছিল, তা যেন ধর্ম, জাতি, শ্রেণি, অঞ্চল এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন একগুচ্ছ উপ-সম্প্রদায়ের জন্ম দিল। রাষ্ট্র নিজেই নিজের নাগরিকদের ওপর নিপীড়ন চালাতে শুরু করল। যেকোনো ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে ছোটখাটো বা প্রান্তিক আন্দোলন দেখলেও রাষ্ট্র ক্রমশ শঙ্কিত হয়ে উঠতে লাগল।​ফলস্বরূপ, সর্বভারতীয় শাসনব্যবস্থা আর সাধারণ মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের আনুগত্য ধরে রাখতে পারল না। এর জায়গা দখল করতে লাগল ছোট ছোট আঞ্চলিক সত্তা—যাদের দাবি ও লড়াইকে প্রায়শই 'আঞ্চলিকতাবাদ', 'ভাষাগত সংকীর্ণতা' বা 'বিচ্ছিন্নতাবাদ' বলে হেয় করা হতো। সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নতুন নতুন এলাকায় তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এবং সমাজের আরও বেশি মানুষকে গ্রাস করল।​তাই এটি দ্ব্যর্থক অর্থে একটি 'সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদে' পরিণত হলো; এটি কেবল অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিপরীতের সাম্প্রদায়িক নয়, বরং হিন্দু সমাজের অন্তর্গত একটি বিশাল অংশের নিম্নবর্ণের মানুষের বিরুদ্ধেও সমভাবে কাজ করে। তাই একে আরও নিখুঁতভাবে বলা যায় 'উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণবাদী জাতীয়তাবাদ।' এটি আমাদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের একটি বিভ্রান্তিকর রূপ।  ​২. সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার একচেটিয়া ধারণা: দক্ষিণপন্থী সুযোগসন্ধানের একটি সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধান  ​'সেক্যুলার' (Secular) শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'Saeculum' থেকে, যার অর্থ 'এই সময়' বা ইহকাল। এটি 'সেই সময়' (যখন রাষ্ট্র ও দৈব শক্তি এক ছিল, থমাস হবসের সময় থেকে যা পৃথক হতে শুরু করে) থেকে আলাদা। সুতরাং, ধর্মনিরপেক্ষতার এই ধারণাটি এমন কিছুর সাথে সম্পর্কিত যা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা আধ্যাত্মিক জগতের সাথে যুক্ত নয়। এটি মূলত ইহজাগতিক বিষয়াবলী নিয়ে কাজ করে।​তাত্ত্বিকভাবে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ছাড়াও তিন ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যমান থাকতে পারে:​ক) ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র (Theocratic State)​খ) একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রধর্ম চালিত রাষ্ট্র​গ) একাধিক স্বীকৃত রাষ্ট্রধর্ম চালিত রাষ্ট্র​ধর্মনিরপেক্ষতাও কখনো কখনো বহু-ধর্মীয় কাঠামোর সাথে কাজ করে, তবে এর মূল পার্থক্যটি থাকে এর ধর্মনিরপেক্ষ উদ্দেশ্যে। এই প্রসঙ্গে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কোনো ধর্মীয় লক্ষ্য থাকতে পারে না এবং পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া চলে না। যেমন ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতায় (Laïcité) কেউ নিজের ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শন করে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না।​আমাদের ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা কিছুটা ভিন্ন, যাকে আমরা 'বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষতা' (Alternative Secularism) বলতে পারি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে 'হিন্দুত্ববাদী' জাতি-কেন্দ্রিক রাজনীতির উত্থান এই সাংবিধানিক আদর্শকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। বিজেপি-আরএসএস-বজরং দলের মতো দলগুলোর মাঠপর্যায়ের রাজনীতিকে 'সম্প্রদায়-ভিত্তিক অতীতের গৌরবগাথা' হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এই ধরণের তত্ত্বের নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অবশ্যই একজন 'শত্রু'র আখ্যান প্রয়োজন হয়।​তবে এই রাজনীতি যে কেবল মুসলিমদের বিরুদ্ধেই যায় তা নয়, এটি এমন এক স্তরায়নযুক্ত হিন্দু সমাজ তৈরি করতে চায় যেখানে দলিত, আদিবাসী এবং নিম্নবর্ণের মানুষেরা সমানভাবে প্রান্তিকতার শিকার হবে। এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস প্রান্তিক মানুষকে আরও বেশি শোষিত করবে এবং উচ্চবর্ণের অভিজাতরা সমাজে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করবে। ধর্মীয় এই স্তরবিন্যাস এমন একটি ধারণার জন্ম দেয় যে—"আমাদের সম্প্রদায় ন্যায়পরায়ণ এবং অন্যেরা আক্রমণাত্মক; তারা ঐতিহাসিকভাবে আমাদের ওপর আক্রমণ ও শোষণ চালিয়ে এসেছে।"​রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জি. আলোয়শিয়াস (G. Aloysius) বলেছিলেন,​"যখন বিষয়টি হিন্দুদের এবং উদ্বেগটি হিন্দুত্ব নিয়ে, তখন এই সমীকরণে মুসলিমরা কীভাবে চলে আসে? কেন তাদের প্রতি এই অনবরত ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে?"​আসলে, এই ধরনের একচেটিয়া সাম্প্রদায়িকতা এবং দক্ষিণপন্থী রাজনীতি কোনো 'প্রতিপক্ষ' বা 'শত্রু'র আখ্যান ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। পূর্বোল্লিখিত যেকোনো রাষ্ট্রের ধর্মীয় গঠন বা ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের তিনটি স্তর থাকে। রাষ্ট্রকাঠামো ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে এদের সংযোগ বা বিযুক্তি নিচের তালিকায় দেখানো হলো:​ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রকাঠামোর বিভিন্ন স্তরের সংযোগ ও বিযুক্তি স্তর (Orders) ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র রাষ্ট্রধর্ম বিশিষ্ট রাষ্ট্র মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র১. রাষ্ট্রের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য (প্রথম স্তর) সংযুক্ত (C) সংযুক্ত (C) বিচ্ছিন্ন (D)২. পদাধিকারী ও কর্মকর্তা (দ্বিতীয় স্তর) সংযুক্ত (C) বিচ্ছিন্ন (D) বিচ্ছিন্ন (D)৩. আইন ও নীতি (তৃতীয় স্তর) সংযুক্ত (C) সংযুক্ত এই সামগ্রিক রূপরেখাটি এটাই প্রমাণ করে যে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মীয় এজেন্ডা স্থান পেতে পারে না। দক্ষিণপন্থীরা তাদের রাজনৈতিক বিস্তারের সময় দেখাতে চায় যে তারা ভীষণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং অন্তরের দিক থেকে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সব মানুষই তাদের কাছে সমান। কিন্তু একজন মাহার হিন্দু এবং একজন ভূমিহার হিন্দু, কিংবা একজন দলিত হিন্দু এবং একজন মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ হিন্দু কখনোই বাস্তবতায় এক হতে পারেন না। সেই নিজস্ব সম্প্রদায়ের ভেতরের জাতিগত ও শ্রেণিগত শোষণকে সেখানে আড়াল করা হয়। ফলে সমাজে সম্পদের সিংহভাগ কুক্ষিগত করার জন্য এটি খুব সহজেই একটি শোষণের স্তরবিন্যাস তৈরি করে ফেলে। ​৩. সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং এর ব্যর্থতা: কারণ ও প্রতিফলন ​ইতিহাস আমাদের বলে যে, গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ বিশ্বের অধিকাংশ দেশই স্বাধীনতার পর সমাজতন্ত্রকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু কেন এই শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হলো? বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, বিশেষ করে ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) পতনের পর থেকে দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোর উত্থান ঘটে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় মৌলবাদী সরকারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে। কোথাও কোথাও এই মৌলবাদ তথাকথিত রাজনৈতিক দলের আড়ালে কাজ করছে।​ডঃ স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে এই সমস্যাটিকে 'ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন' বা 'সভ্যতার সংঘাত' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ পর্যায়টি (১৯৮০-৮৮) কোনো না কোনোভাবে এই পরিস্থিতির সাথে যুক্ত ছিল। সোভিয়েত-আফগান সংঘাত কিংবা আফ্রিকার গৃহযুদ্ধগুলো আমাদের কাছে এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে।​এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো তাদের অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি করেছে। এই দেশগুলোর জিডিপি (GDP) বেড়েছে, কিন্তু জিডিপি এবং মাথাপিছু জিডিপি (GDP per capita) এক জিনিস নয়। জিডিপি বাড়ার অর্থ এই নয় যে দেশগুলো তাদের সমস্ত আর্থ-সামাজিক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে। উল্টো সেখানে আপেক্ষিক দারিদ্র্য এবং ব্যাপক বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।​তাহলে মানুষ-কেন্দ্রিক সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে মানুষের মুখ কেন ধর্মীয় মৌলবাদের দিকে ঘুরে যাচ্ছে? এর একটি কারণ হতে পারে দক্ষিণ বিশ্বে কমিউনিস্ট শাসনের কিছু নেতিবাচক প্রভাব। কম্বোডিয়ার ঘটনা এবং সেখানে প্রায় ১,৬০,০০০ মানুষের মৃত্যু মানুষের মনে একটি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ববর্তী আদর্শ থেকে সরে এসে পুঁজিবাদী ও ব্যবসায়িক-সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের দিকে রূপান্তর মানুষকে এই মতাদর্শ সম্পর্কে হতাশ করেছিল।​পাশাপাশি, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে সংগঠিত শ্রমিক শক্তির অভাব দেখা দিয়েছে। শিল্প অর্থনীতি নিয়ে মার্কসীয় বিশ্লেষণ এখন ফটকা বাজার-ভিত্তিক আর্থিক অর্থনীতিতে (Speculation-based financialised economy) রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন বা সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্মগুলো সহজেই হারিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের সমস্যা নয়, বরং দক্ষিণপন্থী মৌলবাদের উত্থানেরও কারণ।​মানুষের মনস্তত্ত্বকে তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করেছে। অর্থনৈতিক হতাশা এবং মানুষের একাকীত্ব এই আগুনে কেবল ঘি ঢেলেছে। ১৯৩০-এর দশকের জার্মানির একজন পূর্ণকালীন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী অটো স্ট্র্যাসার (Otto Strasser) একবার বলেছিলেন:​"তোমরা মার্কসবাদীরা সবসময় মার্কসের তত্ত্বের দোহাই দাও। মার্কস ভেবেছিলেন যে তত্ত্ব কেবল অনুশীলনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। কিন্তু তোমরা সবসময় শ্রমিকদের আন্তর্জাতিকতাবাদের পরাজয়ের অজুহাত নিয়ে হাজির হও। তোমাদের মার্কসবাদ ব্যর্থ হয়েছে। ১৯১৪ সালের পরাজয়কে তোমরা ব্যাখ্যা করো 'সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের দলবদল' দিয়ে, ১৯১৮ সালের পরাজয়কে ব্যাখ্যা করো তাদের 'বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি' দিয়ে, আর এখন বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে জনগণ বামপন্থার দিকে না গিয়ে কেন ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে, তার জন্য তোমাদের কাছে নতুন 'ব্যাখ্যা' রয়েছে। কিন্তু তোমাদের এই ব্যাখ্যা পরাজয়ের বাস্তব সত্যকে বদলে দিতে পারে না! বিগত আশি বছরে, বাস্তব কর্মের মাধ্যমে সামাজিক বিপ্লবের প্রমাণ কোথায় মিলেছে? তোমাদের মূল ভুল হলো—যে মন বা চেতনা সবকিছুকে পরিচালিত করে, তাকে বোঝার চেষ্টা না করে তোমরা তাকে অস্বীকার করো অথবা উপহাস করো।"​চেতনা বা মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে এই আধ্যাত্মিক/অধিবিদ্যামূলক ধারণার অভাবই হয়তো সমাজতান্ত্রিক শাসনের প্রতি জনসমর্থন কমার অন্যতম কারণ ছিল। সেই সময়ে মানুষের মানসিক অবস্থা এবং তাদের হতাশাকে মৌলবাদীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। এর পতনের জন্য আরও কিছু কারণ দায়ী থাকলেও, ওপরের আলোচনাটিকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।​ *উপসংহার*​এই নব্য-ঔপনিবেশিক বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করেছে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং ধর্মীয় মৌলবাদ। প্রযুক্তির উন্নয়ন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি কিংবা অস্ত্রের জমকালো প্রদর্শন দিয়ে সমাজের গভীরে প্রোথিত সমস্যাগুলোকে আড়াল করা যায় না। রাজনৈতিক লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামাজিক ক্ষেত্রের সাথে গভীরভাবে যুক্ত, তাই সঠিক পর্যবেক্ষণই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।​তথাকথিত বিশ্বায়নের কারণে গ্লোবাল সাউথ নিজেই বহু অসন্তোষ ও ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। এখন তাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর্থ-সামাজিক গতিপথ থেকে সরে গিয়ে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক রূপ নিচ্ছে। যা এই দেশগুলোর প্রান্তিক নাগরিক এবং সংখ্যালঘুদের জন্য মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের গ্লোবাল সাউথের এই ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ​সূত্রাবলী (References):​Aloysius G, Nationalism Without A Nation In India, 1997, Oxford University Press, New Delhi, India.​Bhargava Rajeev, Ashok Acharya, Political Theory: An Introduction, 2016, Pearson, Noida, India.​Aloysius G, Trajectory Of Hindutva, 1994, Economic and Political Weekly, Vol. 29, No. 24, pp. 1450-1452.​Hansberger Bruce, Religious Fundamentalism, Right Wings Authoritarianism, and Hostility Towards Homosexuals in Non-Christian Religious Groups, The International Journal For The Psychology Of Religion, 2009, Vol. 6, No. 1, pp. 39-49.
  • ভাট...
    commentdc | কেকে কি কোন অসুবিধায় আছেন? তাহলে তাড়াতাড়ি কাটিয়ে বা সেরে উঠুন, শুভেচ্ছা রইল।
    commentdc | আমাদের পাড়ায় একজন কুকুর ছিল, তার নাম মানি - ইংরেজি মানি নয়, তামিল মানি। সে আজ মারা গেল। অনেক বয়স হয়েছিল, ক বছর আগে একটা মোটরসাইকেলের সাথে ধাক্কাও খেয়েছিল, কিন্তু ভেটেরিনারি হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে দিব্যি ছিল। ওর প্রিয় খাবার ছিল সেদ্ধ ডিম। দুয়েকদিন ধরে খেতে অসুবিধা হচ্ছিল, আমরা ভাবছিলাম ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব, এর মধ্যে গতকাল রাত থেকে এক জায়গায় শুয়ে ছিল আর আজ হঠাত করে চলে গেল। এমনিতে পাড়ার লোকেদের একটু মন খারাপ, কিন্তু অবাক ব্যপার হলো, আরও দুয়েকটা কুকুর আছে, তারাও সব চুপচাপ হয়ে গেছে। সন্ধেবেলা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, দেখি সবাই নিজের নিজের জায়গায় শুয়ে বা বসে আছে, আমাকে দেখে কেউ উঠে এলো না। কুকুররাও বুঝতে পারে বোধায়।
    comment | আপনারা ভাবছেন ২০১২ -১৩ থেকে আইটিসেলের দুটাকার কর্মীরা কাজে লেগেছে? নাহ হিন্দু মহাসভা (বিজেপীর আদিপিতা) সেই গত শতাব্দী থেকেই এই জিনিষ করে আসছে। এই দেখুন এটা মণিকুন্তলা সেনের 'সেদিনের কথা'য় আছে। হিন্দু কোড বিল পাশের সময়কার কথা। কিন্তু এত যুদ্ধ মন্বন্তর দেশভাগ, মহামারী পেরিয়েও রেট সেই দুটাকাই রয়ে গেছে। কি অবস্থা!
     
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত