এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শারদা মণ্ডলের 'পাকশালার গুরুচণ্ডালি' বই থেকে, পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাসজ্যোতিষ্ক দত্তর লেখা ‘সে ছিল একদিন আমাদের' বই থেকে 'ইস্কুলের গল্প'। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।মৃণাল শতপথীর লেখা ‘দিতি ও মহারানি' বই থেকে নেওয়া গল্প - পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    আরশোলার ধর্নায় একদিন - শুভদীপ মণ্ডল | অলংকরণ: রমিত‘কোথা থেকে আসছেন?’ ‘নাম কী?’ ‘কী করা হয়?’হাসিমুখে, আলাপ জমানোর ভঙ্গিতেই একের পর এক প্রশ্নগুলো আসতে থাকলো, অবশ্যই হিন্দিতে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানালেন, এত লোকজনের জমায়েত হচ্ছে, নিরাপত্তার দায়িত্ব তো ওনাদের উপরেই – তাই একটু বাড়তি সতর্কতা। স্থান – দিল্লির যন্তরমন্তর-সংলগ্ন ককরোচ জনতা পার্টির ধর্না ও অনশন মঞ্চ, আর উপরোক্ত প্রশ্নকর্তা খাকি উর্দিধারী দিল্লি পুলিশ। ধর্নার জন্য নির্ধারিত জায়গাটি ডাইনে-বামে দেওয়াল আর সামনে-পিছনে পুলিশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা। পিঠের ব্যাগ স্ক্যান করিয়ে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে তারপর ভিতরে ঢোকা গেল। শুধু পুলিশ নয়, সঙ্গে প্যারা-মিলিটারি ফোর্স আর র‍্যাফ মিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ’ পুরো চত্বর [১]। শুধু পাহারা দেওয়া নয়, দিল্লি পুলিশ-নিযুক্ত ফোটোগ্রাফাররা ক্যামেরা হাতে টহল দিচ্ছেন চারিদিকে। ছোটোখাটো সমস্ত ঘটনা, জটলা, কলেজপড়ুয়াদের আলাপচারিতা, গান-বাজনা এবং প্রতিবাদীদের সমর্থনে হাজির হওয়া প্রতিটি মানুষ দিল্লি পুলিশের ক্যামেরাবন্দি হচ্ছেন। বিশেষ করে, যে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিবাদকারীদের জন্য জল, খাবার, ওষুধ এসব নিয়ে আসছেন – তাঁদের রীতিমতো মুখের সামনে ক্যামেরা ধরে জেরা করা হচ্ছে। এ-ও জানা গেল, কিছু স্বেচ্ছাসেবীর বাড়িতেও হানা দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ চলেছে তাদের টাকার সোর্স জানতে। দুঃখের ব্যাপার এই, যে, এখনো অবধি জর্জ সোরোস, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ – কোনো লিঙ্কই খুঁজে পাওয়া যায়নি। জেরায় জানা গেছে, কিছু লোকজন নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করেই প্রতিবাদকারীদের টিকে থাকার রসদ জুগিয়ে যাচ্ছেন। এসব গালগল্প অবশ্য দিল্লি পুলিশ কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না। তদন্ত এবং নজরদারি চালু আছে চব্বিশ ঘণ্টা। আশা করা যায়, বলিউডের দেশপ্রেমী ডাইরেক্টররা দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তাঁদের হাত ধরে সত্য নিশ্চয়ই একদিন উন্মোচন হবে এবং সেদিন কোনো মাল্টিপ্লেক্সের বড় পর্দায় পপকর্ন খেতে খেতে দেশের জনসাধারণ জানবে – কীভাবে এইসব দেশদ্রোহী বেকার ছেলেমেয়েদের দল দেশের ভিতর থেকে দেশকে টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্র করেছিল আর কীভাবে দিল্লি পুলিশের ধুরন্ধররা নিজেদের মগজাস্ত্র প্রয়োগ করে সেই রহস্য ভেদ করেছিলেন। [৭ - ৮] সে যাই হোক, আগামীর আচ্ছে দিনের স্বপ্ন সাইডে সরিয়ে রেখে আপাতত ডিসেম্বর মাসের রেকর্ড-ব্রেকিং AQI আর জুন-জুলাইয়ের হিটওয়েভের দিল্লিতে ফেরা যাক। জনপথ মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে মোটামুটি পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। তাতেই ধর্না মঞ্চ অবধি পৌঁছানোর আগেই পুরো টি-শার্ট ঘামে জবজবে। এই আবহাওয়ায় ককরোচদের অবস্থানের সেদিন দশম দিন। পৌঁছে জানলাম – শুধু সোনম ওয়াংচুক নন, অনশনে আছেন দিল্লি, জওহরলাল নেহরু এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত কিছু ছাত্রছাত্রী-সহ জনা পনেরো [৭]। প্রাথমিক দাবি – NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং আরও বৃহত্তরভাবে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা। সমবেত মানুষজনের কথায় আরও অনেক বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটলেও, মূল দাবী ওইটুকুই। এঁদের মধ্যে কয়েকজন সোনম ওয়াংচুক আসার আগে থেকেই অনশনে রত এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার বেশ খানিকটা অবনতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এর কোনো খবরই বাইরে বিশেষ বের হয়নি, তার কারণ – সামগ্রিকভাবে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনকে বয়কট করেছে। অবশ্য ধর্না চত্বরে ক্যামেরার অভাব নেই। কিছু ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া হাউস ছাড়াও অনেকেই নিজেদের ইউটিউব বা ইন্সটাগ্রাম ভিডিও বানাচ্ছেন এবং শেয়ার করছেন। বড়সড় ইনফ্লুয়েন্সাররা অবশ্য অনুপস্থিত। সে নিয়েও ক্ষোভ আছে বোঝা গেল। রাস্তার ধারে অস্থায়ী টেবিল পেতে জল আর খাবার-দাবারের জোগান দিচ্ছেন উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, দিল্লি, হরিয়ানা থেকে আগত বিভিন্ন ধর্ম আর ভাষার মানুষজন [১০]। তার পাশেই চোখে পড়ল মেডিসিন কাউন্টার। জনৈক ডাক্তার নিজেই এসেছেন First-Aid Kit, ORS, Paracetamol-সহ বিভিন্ন ওষুধের পসার নিয়ে [৯]। এক বাম ছাত্র সংগঠনের তরফ থেকে খোলা হয়েছে অস্থায়ী লাইব্রেরি। অবস্থানরত মানুষজন বই নিচ্ছেন, পড়ছেন, আবার ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন। এই লেখা যেদিন লিখছি, তার ৩-৪ দিন আগে হঠাৎ সেই লাইব্রেরি বন্ধ করতে উদ্যোগী হয় দিল্লি পুলিশ। এ নিয়ে ধস্তাধস্তি হয় এবং ছাত্রদের তরফ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে গালাগালি ও ধমকধামক করার অভিযোগ আসে [১১]। স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশ্নের উত্তরে দিল্লি পুলিশের তরফে জানানো হয়, লাইব্রেরি নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। অবশ্য অভিযোগ ঠিক কী আর কারা সেই অভিযোগ করেছেন – সে প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি। [৯ - ১১] সরাসরি বলপ্রয়োগ না করে, নিজেদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি, ক্যামেরার নজরদারি আর জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আন্দোলোনকে কক্ষচ্যুত করার চেষ্টা চলছে প্রশাসনের তরফে। মাঝে মাঝে লাউডস্পিকারে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে – এই ধর্নার সময়সীমা প্রথমদিন বেলা পাঁচটাতেই শেষ হয়ে গেছে, তাই সবাই যেন স্ব-স্ব-গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। এছাড়াও গত রবিবার (৫ই জুন) একসঙ্গে আরও পাঁচটি সংগঠনকে ওই একই জায়গায় অন্যান্য ইস্যুতে প্রতিবাদ জানানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়, খুব সম্ভবত একটা গোলমাল পাকানোর উদ্দেশ্য নিয়ে, যাতে একটা অজুহাত খাড়া করে অবশেষে ককরোচদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যায়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা – সোনম ওয়াংচুক এসে পড়ায় পরিস্থিতি একটু জটিল হয়ে গেছে, নাহলে এত ছলাকলার আশ্রয় না নিয়ে, সরাসরি বলপ্রয়োগ করে এই আন্দোলন হয়তো আরও আগেই থামিয়ে দেওয়া হত। প্রশাসন মোটের উপর নিষ্ক্রিয় থাকলেও উনিজির ভক্তকূল কিন্ত বসে নেই। প্রথমদিন থেকেই টুকটাক চেষ্টা চলছে উপস্থিত আন্দোলোনকারীদের উত্যক্ত করে গোলমাল সৃষ্টি করার – সে ‘সাংবাদিক’ বা ‘আমজনতার প্রতিনিধি’ সেজে ট্যাঁড়া-ব্যাঁকা প্রশ্ন করেই হোক, বা ‘আন্দোলোনকারী’ সেজে ক্যামেরার সামনে সাজানো ইন্টারভিউ দেওয়ার নাম করে উত্তেজক কথাবার্তা বলে। সরাসরি গুন্ডামির ঘটনাও একটা দুটো ঘটেনি এমন নয়, তবে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনাই। অভিজিৎ দিপকে বারবার আন্দোলোনকারীদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন – শত প্ররোচনাতেও এদের ফাঁদে পা না দিতে এবং এখনও অবধি তেমন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই। সমাজমাধ্যমে বিজেপির আইটি সেল আন্দোলনকে বদনাম করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে – সোনম ওয়াংচুক বোতল থেকে জল নয়, চিকেন স্যুপ পান করছেন [৮], আবার কখনও বলা হচ্ছে অনশনকারী ছাত্রছাত্রীরা নাকি টয়লেটে গিয়ে চেটেপুটে খাবার-দাবার খেয়ে আসছেন। কয়েকজনকে ক্যামেরা হাতে টয়লেটের আশেপাশে ঘুরঘুর করতেও দেখা গেছে। ধন্য তাদের অধ্যবসায়। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলোনকারীদের ‘ভাইরাস’ এবং ‘আতঙ্কবাদীদের বি-টিম’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়াও উপাধি হিসাবে ‘দেশবিরোধী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ – এসব উপরি পাওনা তো আছেই। অবশ্য ভক্তকূল ছাড়া এসব বস্তাপচা হেটস্পিচ আর কেউ গিলছে বলে মনে হয় না। বরং সংহতির দৃশ্য চোখে পড়েছে অনেক বেশি। কৃষক নেতারা এসেছেন, মঞ্চের উপর উঠে সমর্থন জানিয়ে গেছেন। প্রবীণ স্বাধীনতাসংগ্রামী পণ্ডিত রামকিষণ এসেছেন। বয়স ১০১ বছর, ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে শুরু করে আজীবন আপোষহীন সংগ্রাম করেছেন। জেল খেটেছেন স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তীকালে, এমারজেন্সির সময়। এই বয়সেও প্রতিবাদ-মঞ্চে এসে অনেকটা সময় কাটালেন। বক্তব্য রাখলেন, ধৈর্য্য ধরে আন্দোলোনকারীদের কথা শুনলেন, উৎসাহ দিলেন, উপস্থিত জনতার প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। প্রশান্ত ভুষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সঞ্জয় সিং, মহুয়া মৈত্র, সাগরিকা ঘোষ, বৃন্দা কারাত – প্রমুখেরাও হাজিরা দিয়েছেন/দিচ্ছেন একে একে। এসেছেন অরুন্ধতী রয় ও আরও অন্যান্য সমাজকর্মীরা। সাধারণ মানুষজন আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে [৩]। তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায় এবং তার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে কীভাবে প্রশাসনিক হেনস্থার শিকার হয়েছেন – সেইসব ঘটনা তুলে ধরছেন। তাঁদের কথায় উঠে আসছে কিছু কমন ফ্যাক্টর – বিজেপি-শাসিত রাজ্য, বিবিধ দুর্নীতি, আতঙ্কের পরিবেশ, আর পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা ক্ষেত্রবিশেষে অতি সক্রিয়তা। ক্ষমতাবানের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে ক্লান্ত হলেও, হাল ছাড়েননি তাঁরা। দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন এই ধর্না মঞ্চে, আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানাতে। এগিয়ে আসছেন – NEET-কেলেঙ্কারি যেসব ছাত্রছাত্রীদের ঠেলে দিয়েছে আত্মহত্যার পথে, তাদের বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনেরা [১২]। যেটুকু সময় থাকছেন, স্বেচ্ছাসেবীরা আগলে রাখছেন এঁদের সবাইকে। কাঠফাটা রোদ, ধুলোর ঝড়, মুষলধারায় বৃষ্টি – সবকিছুই সহ্য করতে হয়েছে, হচ্ছে। অনশনরত ছাত্রছাত্রীদের অস্থায়ী ছাউনি কোনোভাবেই পর্যাপ্ত ছিল না। বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে তাদের সবকিছু। তেরপল নিয়ে আসতে বাধা দিচ্ছে দিল্লি পুলিশ। তার জন্যও নাকি অনুমতি আসতে হবে ‘উপর’ থেকে [২, ১৪]। প্রধান মঞ্চের উপর অভিজিৎ ও আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীদের দেখা গেল – একটা বড়সড় ব্যানার মাথার উপর ধরে সোনম ওয়াংচুককে প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে। ম্যাগসেসে পুরষ্কারজয়ী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী... তাঁর মতো মানুষ যে কোনো দেশের সম্পদ। ভাবছিলাম, আমার দেশের সংখ্যাগুরু নাগরিকের সেই বোধটুকুও কী আছে? প্রশ্ন এখানে দায়বদ্ধতার। পদ যত উঁচু, সেই পদের দায়বদ্ধতাও তত বেশি। কারণ সেইসব পদাধিকারীর একটা ভুল অগুনতি মানুষের জীবন ছারখার করে দিতে পারে—যা এক্ষেত্রে হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর অযোগ্যতা, অক্ষমতা – যাই বলুন না কেন, তা ২০-২২টা ছেলেমেয়েকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছে। অগুনতি ছেলেমেয়েকে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। আর এটা তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গত কয়েকবছরে এতগুলো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সামনে এসেছে – এ যেন গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে আমাদের। চলতি বছরেই অভিযোগ এসেছে UPSC এবং NET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়েও। Hanlon’s razor বলে, “Never attribute to malice that which is adequately explained by stupidity”, আবার Grey’s law অনুযায়ী, “Any sufficiently advanced incompetence is indistinguishable from malice”. যা ঘটে গেছে, তা স্রেফ অযোগ্যতার নিদর্শন, বা ইচ্ছাকৃত অনিষ্টসাধনের চেষ্টা... যে সিদ্ধান্তেই আপনি উপনীত হন না কেন, ক্ষমা-ঘেন্না করে দেওয়ার সময় অতিক্রান্ত। আর এই বিপুল ক্ষতির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াকে ‘এমন কিছু বড় ঘটনা নয়’ প্রমাণ করতে বাজারে নেমেছেন। আশা করি তাঁদের বিবেক, মনুষ্যত্ব একদিন জাগবে। বছর বছর স্কুলে ছেলেমেয়েদের ঘাড় ধরে বসিয়ে যে প্রধানমন্ত্রীর ‘পরীক্ষা পে চর্চা’-র বাণী গিলতে বাধ্য করা হয়, পরীক্ষা নিয়ে এত বড় একটা কেলেংকারির পরও তা নিয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি। অথচ দ্বিতীয়বার NEET পরীক্ষা সফল’ভাবে পরিচালনা করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে দেরি হয়নি একটুও। সাফল্যের কৃতিত্বের ভাগ নিতে সদা তৎপর। আর ব্যর্থতা এলে দেশবাসীর জন্য বরাদ্দ হিরন্ময় নীরবতা। [৫, ৬] আশার কথা, কিছু দক্ষিণপন্থী সমর্থকও অবশেষে জেগে উঠছেন এবং অন্তত এই একটি বিষয়ে সরকারকে সমর্থন করছেন না [৪, ১৩]। যন্তর-মন্তরে লোকজনের ভিড় বাড়ছে, কমছে। এক একদিন তিল ধারণের জায়গা থাকছে না, আবার কোনওদিন মেরেকেটে ৫০-১০০ জন। তাতে অবশ্য ককরোচদের উৎসাহে ভাটা নেই। রোদ, বৃষ্টি, ধুলোর ঝড় উপেক্ষা করে ওরা রোজ স্লোগান দেয়, গান গায়, একে অন্যের মনোবল বাড়ায়, ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারেই একটু ঘুমিয়ে নেয়, আবার নতুন উদ্যমে দিন শুরু করে। আমিও যাচ্ছি মাঝেসাঝে। স্লোগান দিতে বা অনশন করতে নয়, স্রেফ হাজিরা দিতে। গত বেশ কয়েকবছর ধরে দিল্লি থেকে সামান্য দূরে থাকি চাকরির সূত্রে। যাদের মাঝে ওঠাবসা, তাদের অনেকের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অদ্ভুত উদাসীনতা বা নারকীয় উল্লাস দেখে প্রায়শই নিরাশায় ভুগি। এই কমবয়সী ছেলেমেয়েগুলোর দৃপ্ত চেহারা, মুষ্টিবদ্ধ হাত, প্রাণখোলা হাসি আর লড়াকু স্লোগানে আমার মনের অন্ধকার যেন একটু ফিকে হয়ে আসে। দিল্লির অসহ্য গরমও আর অতটা টের পাই না। দেখি – এদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মাঝবয়সীরাও আসছেন। অফিস-ফেরতা, পিঠে বা হাতে ব্যাগ আর চেহারায় একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। এঁরা সেই শ্রেণীর মানুষ, যাঁদের অনেককিছু হারানোর ভয় – স্থায়ী চাকরি, তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসার, মাসিক কিস্তিতে কেনা গাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি... যাঁরা খুব অতিষ্ঠ না হলে সচরাচর নিজেদের সযত্নে লালিত গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে পা রাখেন না। এই আন্দোলন যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এঁদের মতো আরও অনেকে আসবেন একটু একটু করে ভয় আর জড়তা কাটিয়ে। সেদিন মানুষের ভিড় যন্তর-মন্তর ছাড়িয়ে রাজপথে নেমে আসবে। আশা করবো – সেইদিন খুব দূরে যেন না হয়। সোনম ওয়াংচুক ইতিমধ্যেই প্রায় শয্যাশায়ী, তাঁর ওজন কমেছে ৭ কিলো। রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মান বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে। অনশনরত এক ছাত্র আর এক ছাত্রীকে ইতিমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে [৫, ৬]। সোনম, অভিজিৎ, নেহা, আশুতোষ, জুনেইদ, সৌরভ আর তাদের সঙ্গীসাথীরা যে লড়াইয়ে নেমেছেন – তা আমাদের সবার লড়াই। জয়লাভ হবে কিনা জানা নেই, কিন্তু ময়দানে থাকতে হবে – এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। চরৈবেতি। [১] Youths rally in large numbers; bang plates, spoons to demand accountability at CJP protest - The Hindu[২] 'People falling sick': CJP's Dipke claims Delhi Police denied tarpaulin at protest site despite rain - Hindustan Times[৩] Fresh political support pours in on 15th day of CJP protest; student hospitalised - The Hindu[৪] Spoke to the AISA student activists about their hunger strike being ignored by the government - @PeekTVOfficial[৭] 6 Days Without Food Or Support From Parents - @PeekTVOfficial[৮] ‘Even If I D!e…’: Wangchuk’s Reply To Critics - @PeekTVOfficial[১২] Father Who Lost His Son Due to Paper Leak - @PeekTVOfficial[১৩] 58% NDA Voters Chahte Hain Dharmendra Pradhan Istifa Dein? | C-Voter Survey Mein Bada Khulasa - @official_cockroachjantaparty[১৪] CJP founder Abhijeet Dipke confronts Delhi police for not allowing tarpaulins at protest amid rains - @thenewindianxpress
  • হরিদাস পালেরা...
    সোনম ওয়াংচুকের অনশন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | নিট নামক যে ধ্যাষ্টামো এবং অন্যান্য যেসব অরাজকতা চলছে, তার প্রতিবাদে দিল্লির যন্তরমন্তরে অনশন চলছে। সোনম ওয়াংচুকের অনশন ১৭ দিন পার করল। খুবই অসুস্থ, যা হবার কথা। কিন্তু সবাই দেখি এই চক্করে আমীর খানকে নিয়ে পড়েছে। আমীর নাকি সোনমের চরিত্র অবলম্বনে একটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। তার নাম থ্রি ইডিয়টস। সত্যিই ওটা সোনমকে নিয়ে কিনা আমি জানিনা। ট্রেলার চালিয়ে দেখলাম, আমীর আর করিনা কাপুর একসঙ্গে অনেক ছাতা খুলে ধাঁইধপাধপ নাচছেন। তৃতীয় শ্রেণীর বলিউডি সিনেমায় যেমন হয়। সোনমকে দেখে মনে হয়নি, ওরকম নাচবেন।এবার কথা হল, যদি সোনমকে নিয়েই সিনেমাটা হয়ে থাকে তো কী। বলিউডি সিনেমার প্রোডিউসার পছন্দমতো বিষয়বস্তু পেয়ে একটা থার্ডক্লাস রদ্দি মাল বানিয়ে বাজারে ছেড়েছেন। তাতে বলিউডি নেত্যকালীরা নেচেছেন। ব্যবসা হয়ে গেছে। মিটে গেছে। এবার সিনেমার নায়ক, সত্যিই সোনম ওয়াংচুক হয়ে রাস্তায় নামবেন নাকি?লোকে যে এইটা প্রত্যাশা করছে, তার একটা বড় কারণ হল নিজের মনেই বলিউডি নায়কদের একটা লার্জার-দ্যান লাইফ ইমেজ বানিয়ে রেখেছে। অখাদ্য সিনেমা দেখে দেখে যা কুঅভ্যাস হয় আরকি। মনে হয় অমিতাভের ওই অসহ্য ঢিসুম-ঢাসুমই বাস্তব, শাহরুক খান সত্যিই দুই হেলিকপ্টার দুই হাতে ধরে রাখতে পারেন। এই নায়ক-পুজো সর্বত্র। আদালতের এক বিচারক হঠাৎ ভগবান হয়ে যান। কোনো ফুটবলার হয়ে যান আস্ত দেবদূত, যেন অতিপ্রাকৃতিক কোনো শক্তির অধিকারী। টিভি চ্যানেল হয় সত্যের পরাকাষ্ঠা। আর সেলুলয়েড, বীরপুজোর আখড়া।পৃথিবীতে যত তৃতীয় শ্রেণীর জিনিসের রমরমা হচ্ছে, তত এগুলো বাড়ছ। অথচ, ভালো সিনেমায় দেখুন, এরকম কোনো প্রত্যাশা থাকেনা। গান্ধি চরিত্রে অভিনয় করা বেন কিংসলেকে কেউ কখনও বলেছে, একটু সত্যাগ্রহ করে দেখান প্লিজ? সুভাষ বসুর চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে কি আর লোকে প্রত্যাশা করে অভিনেতা সাবমেরিন চড়ে জাপান যাবেন?এইসব দাবী কখনও ওঠেনা, কারণ, সবাই জানে, বেন কিংসলে নকল। অথচ এখানে মনে হচ্ছে, উল্টো। সেটা ওই অখাদ্য সিনেমা ক্রমাগত গলাধঃকরণ আর আত্মস্থ করার ফল। কিন্তু বাস্তব হল, আমীরের জন্য সোনম সোনম হননি। সোনম সোনমই, আমীর তাঁর অক্ষম অনুকরণ। অনুকরণ করে পয়সা কামিয়েছেন। আপনরা কেন বেছে বেছে সেই অখাদ্য জিনিস দেখেছেন, সে আপনারাই বলতে পারবেন। কিন্তু বাস্তব হল, সিনেমার হিরোরা হিরো নন। টিভি চ্যানেল সত্যের পরাকাষ্ঠা নয়। কোনো হিরো ঢিসুম-ঢাসুম করে কিংবা কোনো সঞ্চালক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে, অথবা কোনো বিচারক মারকাটারি ন্যায়বিচার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করবেনা। বরং হিরোরা চেপে যাবেন, সঞ্চালকরা মিথ্যে বলবে, আর আদালতের এখানে কিছুই করার নেই।সোনম বলেছেন তিনি হিরো না। ঠিক কথা। তিনি শ্রদ্ধেয় এবং সম্মাননীয় ব্যক্তি। তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে লড়ছেন। সবকিছুতে মত মিলবেনা, কিন্তু লড়ছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এবং এই লড়াইয়ে কোনো ঢিসুম-ঢাসুম হবেনা। খুব বেশি হলে মরে যেতে পারেন। সিনেমার হিরোরা মরেনা, ঠিক সময়ে কোনো পুলিশের গাড়ি এসে বাঁচিয়ে দেয়, অথবা টিভির কোনো সাংবাদিক হঠাৎ গর্জে ওঠেন। নিশ্চিন্ত থাকুন, ওসব এখানে হবেনা। গঙ্গার দূষণ রোধে আমরণ অনশন করে চুপচাপ মরে গেছেন একজন, এই কিছুদিন আগে। কে জানে তাঁর কথা? আমরা যদি খবর ছড়াতে পারি তো জানবে, নইলে জানবেনা।এইসব জেনেশুনেই সোনম জীবন বাজি ধরেছেন। এবং এইজন্যই তিনি হিরো। তাবৎ বলিউডকে যোগ করলেও নায়কত্বে তাঁর ধারেকাছে কেউ পৌঁছবেনা। পুঃ এই খবর, এই বার্তা চারদিকে ছড়ান। কারণ, আমরা আমাদের নায়ককে নিশ্চয়ই মরতে দিতে চাইনা। যে সুতোর উপর সোনমের জীবন ঝুলে আছে, সেটার অনেকটাই আমরা। বলিউড ছাড়ুন, গোদি মিডিয়া ছাড়ুন, নকল নায়কপুজো ছাড়ুন। বাস্তবটা মেনে নিন।
    হিমাচলের ইতি উতি - ১০ - দ | ছবির মত গ্রাম গ্রাহাণ১২ তারিখ সকালে ঘুম ভাঙতে বেশ দেরী হল। আগেরদিনের অত হাঁটাহাঁটি সিঁড়ি ওঠানামায় এমন ক্লান্ত ছিলাম যে চোখ খুলতে খুলতে বেলা প্রায় সাড়ে নটা। তৈরী হয়ে বেরোতে সাড়ে দশটা। বাইরে একেবারে নীল চকচকে কাচের মত আকাশ। প্রথমেই হাজির হই The Evergreen Cafe. স্প্যানিশ অমলেট, বাটার টোস্ট আর কফি দিয়ে ভাল করে পেটপুজো সেরে একে ওকে জিজ্ঞাসা করে অল্প কিছুটা এগোতেই পুরোন ব্রিজ আর তার পাশ থেকেই ছাড়ছে গ্রাহাণ যাবার বোলেরো ক্যাম্পার। https://youtube.com/shorts/RyKGP0NbQSM?si=sZZvjWzg-oj6jWWGব্রিজ পেরিয়ে নদীর পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রাহাণের পথগ্রাহাণ ৭৭০০ ফিট উচ্চতায় একটা ছবির মত গ্রাম যেখানে এটিএম নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, টিভি নেই, ইলেকট্রিসিটি খুব লিমিটেড, মদ্যপান, মদ্যপ্রস্তুতি, মদ্য প্রক্রিয়াকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে গোটা পার্বতী উপত্যকা যে কারণে বিখ্যাত বা কুখ্যাত সেই মালানা ক্রিম এখানে দিব্বি পাওয়া যায়, তার চাষবাসও ভালই হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও জনসমাগমের বাইরে একটেরে এই গ্রামের খবর আমায় দিয়েছিলেন ভ্রামণিক সুদীপ চ্যাটার্জি। চালাল দেখে তেমন খুশী হই নি একথা জানানোয় সুদীপ বলেছিলেন আরেকটু ওপরে গ্রহণ চলে গেলেই ভাল লাগত। গ্রহণ বা গ্রাহাণ নিয়ে তখুনি খোঁজ খবর করে ওই ওপরের তথ্যগুলো দেখে মনে হল এখানে তো যেতেই হবে। চারদিন থাকছি কাসোলে একটা দিন আমায় গ্রাহাণে যেতেই হবে। আজ ১২ই নভেম্বর সেই দিন। দ্য এভারগ্রিন থেকে বেরিয়ে ওই রাস্তায় সোজা কিছুটা হাঁটলেই একটা বেশ পুরোন ব্রিজ। এখানে পার্বতীর আওয়াজ এত জোরালো যে রীতিমত গলা তুলে কথা বলতে হয়। ওহো বলা হয় নি, ক্যাফের লোকেশানও ভারী চমৎকার, ফরেস্ট রেস্ট হাউসের পাশেই। এদের ওপন এয়ার বসার জায়গায় দিব্বি পার্বতী দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে খাওয়া দাওয়া করা যায়। ব্রিজের মুখেই কাদামাখা দুখানা বোলেরো ক্যাম্পার দাঁড়িয়ে, পার্বতী চলার পথে সুক্ষ্ম জলকণা ছড়িয়ে গোটা ব্রিজ, রাস্তা ভিজিয়ে নাচতে নাচতে চলেছে। ক্যাম্পারের ছাদ খোলা অংশে বসলে ভাড়া ২০০/- আর ভেতরে বসলে ৩০০/-। একটা কাদামাখা গাড়ির সারথী রাস্তার অন্যদিকের পাহাড়ের গা বেয়ে নামা একটা রোগাটে জলধারার সাথে পাইপ লাগিয়ে গাড়িটা ধুচ্ছিলেন, জানালেন ওঁরই নাম্বার যাবার। ধোয়া হলে ভেতরে উঠে একটা জানলার ধার দখল করে বসা গেল। যাত্রা শুরুমিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যেই গাড়ি ভরে গেল। সারথী জানালেন যাদের যাদের ইউপিয়াই পেমেন্ট তারা এখানেই ভাড়া মিটিয়ে দেন যেন। ওখানে পৌঁছে ক্যাশ ছাড়া কিছুই নেওয়া সম্ভব নয়। টুং টাং করে ভাড়া মেটানোর আওয়াজ শেষ হতেই গাড়ি স্টার্ট নিল। কাসোল থেকে গ্রাহাণের দূরত্ব ১০ কিমি, উচ্চতা বৃদ্ধি ২৫০০ ফিট। ঘন দেওদার বনের মধ্যে দিয়ে অতি সঙ্কীর্ণ পাথুরে এবড়ো খেবড়ো চড়াইপথ। পুরো পথ কাটাকুটি করে বয়ে আসছে গ্রাহাণ নালা। নদীর বুকে মস্ত মস্ত বোল্ডারে ধাক্কা খেয়ে জায়গায় জায়গায় জল সহস্রধারায় নেমে এসে একফুট কি দেড়ফুট ছোট্ট প্রপাত তৈরী করছে।এই নড়বড়ে ব্রিজটা পেরিয়ে এগোলে পথ হারানো অবধারিততাই এই ব্রিজের আগে সতর্কবার্তা দেওয়া আছে। স্থানীয়রাও চারণিকদের সাবধান করে দেনরাস্তা নয় পুরোটাই অফফরোডিং। মজা হচ্ছে যখন উল্টোদিক থেকে কোন ক্যাম্পার আসছে, একে তখন অনেকটা পিছিয়ে যেখানে সামান্য সাইড করার জায়গা আছে সেখানেই দাঁড়াতে হচ্ছে। যে নামছে তার রাস্তায় অগ্রাধিকার, উঠনেওয়ালা দাঁড়িয়ে পাশ দেবে এইই নিয়ম। পাশ কাটানোর সময় জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দুই সারথী রাস্তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করেন। তাতেই জানা গেল পাঁচ কিলোমিটারের মাথায় এক জায়গায় রাস্তার কাজ হচ্ছে সেখানে মিনিট পনেরো দাঁড়াতে হবে। গ্রাহাণ নালা কাটাকুটি খেলেছে গোটা পথ জুড়েসে না হয় হল কিন্তু এখানে রাস্তাই নেই তো আবার রাস্তার কাজ কিসের? শোনা গেল এই নেই-রাস্তাও মাঝে মধ্যে ভেঙে ধ্বসে যায়, মাঝে মাঝে পাথর পড়ে মিনি টিলা হয়ে থাকে। নিয়মিত সেসব সরিয়ে তাপ্পিতুপ্পি দিয়ে ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি চলার উপযুক্ত করে রাখতে হয়। আমরা যত উপরে উঠছি, নালা ততই নীচে চলে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ কোন বাঁক পেরিয়েই দেখা হয়ে যাচ্ছে পাহাড় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা অন্য এক জলধারার সাথে। সেও ‘'এসেছ? এসো এসো এগিয়ে চলো' বলতে বলতে হইহই করে দৌড়ে নেমে যাচ্ছে নীচের নালার দিকে। সরু জলধারা নেমে আসছে জঙ্গলের মধ্য দিয়েগ্রাহাণ গ্রামের ওপরের তিনটে জলপ্রপাত আর পথের সব কটা জলধারা মিশে তৈরী গ্রাহাণ নালা গিয়ে পার্বতীর সাথে মিশেছে কাসোলের একটু আগে। সেখানে নদীর গর্জনে কানে প্রায় তালা লেগে যায়। জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা পর পরই গাছের গায়ে গ্রাহাণের পথনির্দেশ দেওয়া। যাঁরা এপথে চারণিক তাঁদের পথ হারানোর সম্ভাবনা বেশ কম। মোটামুটি তিরিশ মিনিট হেঁটে কোন পথনির্দেশ দেখতে না পেলে জানবেন আপনি হারিয়ে গেছেন। থুঞ্জাগ্রামের রাস্তা খাড়াই উঠে গেছে, সারথী জানান এ গ্রামে নাকি মাত্র দুটো হোমস্টে আছে। পথের মাঝে এক জায়গায় দেখা গেল পাশে অনেকটা পরিস্কার খোলা জায়গা, একপাশে একটা স্টেজের মত করা। শুনলাম সেখানে রেভ পার্টি হয় নিয়মিত। ৩১শে ডিসেম্বর পার্টির জন্য এই ধরণের অফগ্রিড জায়গার চাহিদা খুব বেশী। সমগ্র পার্বতী উপত্যকায় বেশ কয়েক হাজার পার্টি হয় ইংরিজি বছরশেষের দিনটায়। তার শতকরা আশিভাগই এরকম পাহাড়ের গায়ে জঙ্গলের মধ্যে যেখানেই খানিকটা সমতলভূমি পাওয়া যায় সেখানেই হয়। তবে গ্রাহাণে বিশেষ পার্টি হয় না। অ্যালকোহলের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা এখানে শাপে বর হয়েছে। গ্রাহাণে পৌঁছাবার বেশ অনেকটা আগে থেকেই গাছের গায়ে নোটিশ ঝুলছে ‘'নো অ্যালকোহল জোন'। শুধু যে গ্রাহাণে পাওয়া যায় না তাই নয় বহিরাগতরাও এখানে কোনওরকম অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় আনতে পারেন না। ধরা পড়লে গ্রাম থেকে বহিষ্কার এবং মোটা অঙ্কের জরিমানা হয়। কথিত আছে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি, স্থানীয় ভাষ্যে ইয়্যাজ্ঞ বাল বা ইয়্যাজ্ঞল ঋষি, এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সেই থেকে বহু শত বছর ধরে এই প্রথা চলছে। আমরা গাড়ির মধ্যে বলাবলি করি আগেকার মুনিঋষিরা তো গাঁজাই বেশী পছন্দ করতেন কিনা তাই। এক একটা বাঁক এমন সরু আর এমন খাড়াই যে গাড়ি ২ কি ৩ বারের চেষ্টায় উঠে মোড় ঘুরতে পারে আর ঘোরার সময় অবধারিত একদিকের চাকা শুন্যে ঘোরে। এক চুলের ভুল মানেই সোওজা স্বগগো। তা সেসব পেরিয়ে ক্যাম্পার একসময় এসে দাঁড়ায় গ্রাহাণের বেস পয়েন্টে। গ্রামের দূরত্ব এখান থেকে ১ কিলোমিটার কিন্তু খাড়াই প্রায় সাড়ে পাঁচশো ফুট। সবাই ঝটপট নেমে চড়তে শুরু করে দিলেন। তাকিয়ে দেখি সামনে আবার একটা ভাঙা ধ্বসে যাওয়া ঢাল প্রায় ১৫ ফিটের মত উঁচু। লাঠি বসালেই লাঠিটা ভুসভুস করে ঝুরো মাটির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। দুই তিনবার এগিয়ে পিছিয়েও বিশেষ সুবিধে করতে পারলাম না। আচ্ছা মুশকিল তো। খান পাঁচেক বোলেরো ক্যাম্পার ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদেরই এক সারথী বলেন এইটুকুই একটু ভাঙা, ওই উপরে উঠলে পাকা রাস্তা পাবেন। পাকা রাস্তা! বলে কি রে! কিন্তু এইটাই বা উঠবো কী করে? এবার আরেকজন এগিয়ে আসেন ‘'চলিয়ে ম্যাডাম’’ বলে হাত বাড়িয়ে দেন। এইবার একহাতে লাঠি আরেকহাতে ওঁর হাত ধরে সেই নরম ঝুরঝুরে ধ্বসা জায়গাটা পেরিয়ে উঠে আসি। ওই যে নীচে ক্যাম্পার দাঁড়িয়ে আছে সারিসারি ওইটাই গ্রাহাণের বেস পয়েন্টআর্ধেক হাঁটু অবধি ট্রাউজার, জুতোয় চন্দনরঙা মিহি মাটির একটা হাফ ইঞ্চি স্তর হয়ে গেছে। সত্যিই এখান থেকে বেশ একটা রাস্তাই করা। কোথাও মাটির পথের উপরে পাতলা সিমেন্টের আস্তরণ কোথাও পাথরের ফাঁকে ফাঁকে সিমেন্ট জমিয়ে তৈরী পথ। ওই ভাঙা জায়গাটা পেরিয়ে উঠেই একটা ছোট চায়ের দোকান। চা, ম্যাগী, মোমো, ওমলেট ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে। দোকানে না উঠে একটু বসি দোকানের ধাপে। অল্পবয়সী দোকানি ছেলেটি বলে দিদি বেশীক্ষণ বোসো না, একটু দম নিয়েই উঠতে শুরু করো। এই এক কিলোমিটার রাস্তা একটু খাড়াই আছে। তা খাড়াই বলে খাড়াই… আমার অনভ্যস্ত ঠ্যাঙ আর তারচেয়েও বেশী অনভ্যস্ত হৃৎপিন্ড একটা করে বাঁক ঘুরলেই এমন দুমদুমাদুম করে লাফাতে থাকে যে কোথাও পাঁচমিনিট কোথাও আরো বেশী জিরিয়ে নিই। অনেক জায়গাতেই রাস্তা এত সরু যে জিরোতে গেলে ওই পাশের পাথরে ভর দিয়ে হেলে অন্যদের পাশ দিতে হয়। ওঠার লোক সব চলে গেলেও অনেকে নামছেন। ট্যুরিস্টই মূলত, একদিন বা দুদিন কাটিয়ে কিম্বা আরো উপরে ট্রেক করে ফিরছেন। সকলেই উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন ‘'বাস আ গ্যয়ে, অউর থোড়া হি যানা হ্যায়’’ এবং আমি চড়ছি তো চড়ছিই। ট্র‍্যাডিশানাল পাথর আর কাঠের বাড়িতা চলতে থাকলে সব রাস্তাই একসময় ফুরায়, এও ফুরালো। ঠিক গ্রামে ঢোকার আগে প্রায় ৮০ ডিগ্রি কোণে খান চল্লিশেক সিঁড়ি। একবার ভাবি ধুত্তোর আর পারছি না এখান থেকেই ফিরি। এমনিতে তো এই রাস্তাটাও দেওদার গাছের চিরল পাতার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্য্যের আলোয় চিকরি মিকরি নকশাকাটা, ছায়া ছায়া ঘুম ঘুম। পাতার ফাঁকে বাতাস চলার হালকা শিষের আওয়াজ হলুদ ঠোঁট ম্যাগপাই আর ব্লু হুইসলিং থ্রাশের ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। https://youtube.com/shorts/IHDQj4vqRi4?si=K3WAOurZ6pwAgXoCSound of Silenceএখানেই এলিয়ে বসে থাকি খানিকক্ষণ, তারপর নামবো। আজকের আকাশটা মনে হচ্ছে কেউ পার্বতীর জলে ধুয়ে, লাপিস লাজুলির রঙে ছুপিয়ে মেলে দিয়েছে, এত উজ্জ্বল। ঈশ সুদীপ বলেছিলেন তেমন কিছু নয় নিতান্ত সহজ রাস্তা, শেষটা একটু খাড়া। এ তো বেশ খাড়াই বাপু। সুদীপের উদ্দেশ্যে কি একটু দাঁত কিড়মিড় করবো? নাহ তাতে অনেকটা এনার্জী খরচা হবে। তার চেয়ে বরং সিঁড়িটাই চড়ার চেষ্টা করা যাক। এরকম খাড়া সিঁড়ির ক্ষেত্রে আমি সব জায়গায় যা করি, এখানেও তাই করলাম। সোজা চার হাতপায়ে উঠতে শুরু করলাম। নামার সময় বসে বসে নেমেছিলাম। পাথরের ছাদওলা বাড়ি, সামনে শীতের জন্য কাঠ জড়ো করে রাখাগ্রাহাণ গ্রামে যতগুলো বাড়ি ঠিক ততগুলোই বা তার চেয়েও কয়েকটা বেশী হোমস্টে। তবে টিভি, মোবাইল, বাইক, গাড়ি এইসব না থাকায় ভারী শান্ত চুপচাপ জায়গা। এখানে একটা প্রাইমারী আর একটা জুনিয়ার হাই স্কুল আছে। স্কুল বোধহয় সকালে বসে, এখন ছুটি। রাস্তা জুড়ে অনেক বাচ্চা দৌড়ে খেলে বেড়াচ্ছে। বাড়িগুলো কাঠ আর পাথরের তৈরী। একটা বাড়ির বাইরে ডিশ অ্যান্টেনা লাগানো দেখে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি মাঝেমধ্যে দু একটা চ্যানেলের সিগনাল পাওয়া যায়। ঘুরেফিরে মন্দির চত্বরে পোঁছাই। কাঠের উপরে সুক্ষ্ম কুনি কাজ করা মন্দিরপাথরের ভিতের ওপরে কাঠের কুনিকাজ করা অপূর্ব স্থাপত্য। বহিরাগতদের মন্দিরে ঢোকা বা মন্দিরের কোন অংশ স্পর্শ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মন্দিরে উপাস্য দেবতা হলেন ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য। গ্রামের চারদিকে গম আর বার্লির খেত। গম তোলা হয়ে গেছে, বার্লি কিছু আছে এখনো। আর আছে সর্ষেখেত। যেদিকে তাকাই সেদিকেই ধাপে ধাপে হলুদ আর সবুজের নানা শেডের রংবাহার। সুকুন ক্যাফের বাইরের সিঁড়ির ধাপে বসে ইউকুলেলে নিয়ে টুং টাং করছিলেন এক যুবক, নাম বললেন যোশুয়া। এখানে এসেছেন দিন পনেরো, কাসোলে আরো আগে। যাজ্ঞবল্ক্যের মন্দির - ভারতে আর কোথাও আছে কি? যোশুয়া এতদিনে হিন্দি মোটামুটি বলতে পারেন এবং হিন্দী বাৎচিৎ করতে ভারী উৎসাহী। দু:খ করে বললেন একটা রাস্তা তৈরী হচ্ছে, দুই তিন বছরের মধ্যে হয়ে যাবে নয়া গ্রাহানের দিক দিয়ে। নয়া গ্রাহাণ আবার কোথায়? ওইই যে গ্রামের যেদিকটা তত খাড়া নামে নি একটু ঢালু হয়ে নেমেছে সেইদিকে দেখো কখানা বাড়ি, ওই হল নয়া গ্রাহাণ। পিছন থেকে একটা কচি গলা বলে ও গ্রামের নাম পুলগি, তোমাদের জন্য নয়া গ্রাহাণ বলা হয়। ফিরে দেখি।একজন আড়াইফুটি ভদ্রমহিলা, স্কুল ড্রেস পরা। সঙ্গে আরো তিনজন ওনার সাইজের। সকলেই স্কুল ফেরত। এদিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকা যায় ঘন্টার পর ঘন্টাসবকটা পুঁচকে একসাথে তড়বড়িয়ে কথা বলতে লাগল। সে এক্কেবারে কলকাকলি ব্যান্ড। অনেক কষ্টে বোঝা গেল এরা আমায় জলপ্রপাত দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। যদিও পা আর চলছে না তবু ঝকঝকে চোখের কচি মুখগুলোকে নিরাশ করতে মন চাইল না। কিন্তু গ্রাম ছাড়িয়ে একশো মিটার মত উঠেই এমন পা ব্যথা শুরু হল যে আর এগোনর সাহস পেলাম না। ওই বদখত পথটা নেমে ফিরতে হবে তো। তা সেও একসময় নামলাম। এবারে দোকানে ঢুকে বসি। নামার সময় পায়ের পাতায় চাপ পড়ে খুব, একটু বসে নেওয়া যাক। জলপ্রপাত - গ্রাহাণছবি সৌজন্য - যোশুয়াদোকানী ছেলেটির নাম চাঁদ। ও মানালির অটলবিহারি বাজপেয়ী ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে অ্যাডভান্সড কোর্স করেছে, সার্টিফায়েড গাইড। এছাড়া বরা সিগ্রি হিমবাহ ট্রেকিঙের সময় তুষারঝড়ের পরে উদ্ধারকাজেও অংশ নিয়েছে, প্রশংসাপত্র পেয়েছে। বলে দিদি তুমি ক্ষীরগঙ্গা ট্রেকে এসো, আমায় ৩ মাস আগে বলবে, আমি তোমাকে হাতে ধরে ঘুরিয়ে আনবো। সার পাস ট্রেক ক্ষীরগঙ্গার চেয়ে কঠিন। ক্ষীরগঙ্গা আরামসে গাছের ছায়ায় ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে দেখো। চাঁদভাইশুনে লোভ লাগে। আসতে হবে, কিন্তু তার আগে ফিটনেস আরেকটু বাড়াতে হবে। জিজ্ঞাসা করি ও যখন গাইড হয়ে যায় তখন দোকান কে দেখে? বলে আরে এটা আমার মৌসির দোকান। মৌসি গেছে খেত থেকে বার্লি তুলতে আমি আজ ফ্রি তাই বসেছি। অনেক গল্প করে ওর ট্রেক করানোর, রেস্কিউ করার। সেই মাটি ধ্বসা পনেরো ফুট হাত ধরে নামিয়ে বোলেরো স্ট্যান্ডে পৌঁছে দিয়ে যায়। এক সারথীকে ডেকে বলে দিদিকে সাহি সালামৎ কাসোল পৌঁছে দিও। আমায় বলে, নম্বর তো রইল, হোয়াপ করে চলে এসো নিয়ে যাবো ক্ষীরগঙ্গা, মানতালাই লেক। ক্যাম্পার তো অন্তত পাঁচজন না হলে ছাড়বে না। আরেক সরকারী আধিকারিক ছিলেন অপেক্ষায়। গ্রাহাণে কিছু সরকারি কাজে এসেছেন। এলেন এক পুলিশ সাব ইনস্পেক্টার, তবে তিনি তাঁর শালার বাড়ি এসেছিলেন কোন বিয়ের সম্বন্ধের ব্যপারে। এইসব শুনতে শুনতে দেখতে দেখতে আরো জনা তিনেক হয়, তবে তাঁরা লোকাল তাই ৫০ টাকা করে দেবেন এবং খোলা জায়গায় বসবেন। আরো একজন হতে পুলিশবাবুর তাড়ায় গাড়ি ছাড়ে। অন ডিউটি না হলেই বা কি, পুলিশ তো বটে। পথে এক জায়গায় পাথর পড়ায় তার আগের বাঁকে থামতে হয়েছিল মিনিট পঁচিশেক মত। ততক্ষণে বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে, গাড়ি থেকে নেমে দেখি কনকনে ঠান্ডা। গাড়ি থামাবার জন্য যারা নিযুক্ত, তারা রাস্তার পাশে কাঠ, গাছের ডাল শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন জ্বেলেছে। বলে এসো এসো হাত পা সেঁকে নাও, কতক্ষণ পাথর পড়বে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। তিনজন অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে হেঁটে ফিরছিল, বলে আমরা চলে যাই, হাঁটছি তো। সবাই হেসে ওঠে, ‘পাগল নাকি তোমরা? পাথর কি জানে তোমরা হাঁটছ, তাই রেয়াত করবে?’  কাসোলে সন্ধ্যে গাঢ়, পাহাড়চুড়ায় তখনো অস্তসূর্য্যের রশ্মি মেয়েদুটো দিল্লি ইউনিভার্সিটির, ইংরিজিতে মাস্টার্স করছে, ছেলেটা এমবিএ ছাত্র। কাসোলে এসেছিল বেড়াতে, আগামীকাল ফেরত যাবে। কাসোল ফিরতে ফিরতে প্রায় অন্ধকার হয়ে আসে। কাল ফেরা, সারাদিন বাসে কাটবে তাই কিছু শুকনো খাবার কিনে হোস্টেলে ফিরি। কাসোল পুরোন ব্রিজ থেকে পুরোন মার্কেট পর্যন্ত খান আষ্টেক জার্মান বেকারি৷ চিজকেকের স্বাদ পুণের জার্মান বেকারির মত নয়, একটু নীরেশ। হোস্টেলে ফিরে খানিক জিরিয়ে নৈশাহারের জন্য বেরোই রাত আটটা নাগাদ। রাতের কাসোলমুনড্যান্স ক্যাফে একেবারে নদীর ধার ঘেঁষে। প্রথমে বাইরের লনে মিনিট পনেরো বসে প্রায় জমে যাবার অবস্থা। বাধ্য হয়ে ভেতরে গিয়ে বসি। হিমাচলে ট্রাউট মাছ ধরার সময় হল ৩১শে মার্চ থেকে ৩১শে অক্টোবর। নির্বিঘ্ন প্রজননের জন্য ১লা নভেম্বর থেকে ৩০শে মার্চ অবধি ট্রাউট ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে নভেম্বরের প্রথম দুই তিন সপ্তাহ কাসোলে অন্তত আপনি টাটকা ট্রাউট খেতে পাবেন। সরকারি পরিদর্শন হলে ফ্রিজারে রাখা মাছ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। নিট্টু বলেছিল মুনড্যান্সে টাটকা মাছ পাবোই। গ্রিলড ট্রাউট উইত ম্যাশড পট্যাটোতা পেলাম। গ্রিলড ট্রাউট, আস্ত মাছও নেওয়া যায় বা কিছুটা অংশ। গ্রিলড ট্রাউট উইত ম্যাশড পোট্যাটো। সাথে স্যালাড ও দুই টুকরো গার্লিক ব্রেড। আহাহা অপূর্ব স্বাদ। মাছট এত টাটকা, মুখে দিলে মিলিয়ে যায়। খেয়েদেয়ে আজ আর ঘোরাঘুরি করতে পারলাম না, সোজা হোস্টেল এবং নিদ্রাদেবীর কোল। ১৩ই নভেম্বর সকালে উঠে তাপমাত্রা দেখে তো হাঁ। -২৪!! সোসান হলেও সেখানে এত কম হওয়া কী করে সম্ভব? কে জানে হয়ত কোন গ্লেসিয়ার আছে কাছাকাছি। নিট্টুকে আগেই বলে রেখেছিলাম আজ সকাল সাড়ে আটটায় কফি চাই আমার। চাইই চাই। এ কি গ্লেসিয়ারের পাশে নাকি, অ্যাঁ! কাসোল থেকে দিল্লি আসার সরাসরি বাস সবকটাই রাত্রিবেলা। আমি চাইছি সকাল বা দুপুরের বাস, যাতে রাত্রে দিল্লি পৌঁছাতে পারি। তা ওডিন হোস্টেলের গেটের পাশের বাস বুকিং অফিস জানিয়েছিল সকাল সাড়ে এগারোটার দিল্লিগামী বাস আছে তবে ভুন্টার থেকে। নিজ দায়িত্বে সাড়ে এগারোটার মধ্যে ভুন্টার পৌঁছাতে হবে। সেইমত ট্যাক্সি ইউনিয়ানের অফিসে বলে এসেছিলাম সকাল নটায় গাড়ি লাগবে। ওঁরা বলেছিলেন পনেরো মিনিট আগে ফোন করতে, তখন যে সারথীর নম্বর আসবে তাকেই পাঠাবেন। ভুন্টার থেকে দিল্লির পথে মান্ডির কাছাকাছিসেইমত ফোন করে যাকে পাওয়া গেল সে নিতান্ত বাচ্চা ছেলে। একটু চিন্তিত হয়ে বয়স জিজ্ঞাসা করে জানা গেল কুড়ি। কিছুদূর যেতেই তার গাড়ির অ্যালার্ম পিঁক পিঁক শুরু করল। ক্রমশ বাড়তে থাকায় এক জায়গায় একটা সার্ভিস সেন্টার পেয়ে সেখানে দেখিয়ে জানা গেল এঞ্জিন অয়েল লিক করছে। ছেলে গজগজ করছে এইমাত্র সার্ভিস করিয়েছি। মেকানিক সাহেব এক দাবড়ানি দিলেন, এ পুরোন লিকেজ নিশ্চয়ই দেখিয়েছিল তুমি পয়সা বাঁচাতে তাপ্পি লাগিয়েছ। ১৩০০ টাকা দিয়ে ঠিক করিয়ে গাড়ি চলল সাথে চলল ছেলের গজগজ। ১৫০০ টাকা ভাড়ার ১৩০০ বেরিয়ে গেল, আমার তো তেলের খরচই উঠবে না। কুলুর কাছেবাকী পথটুকু নির্বিঘ্নেই কাটল। ভুন্টারে পৌঁছে ঘন্টা দেড়েক অপেক্ষার পর বাসও এলো। বড় ভলভো, আরামদায়ক যাত্রা। শুধু চন্ডীগড়ে পঞ্চকুল্লার ওখানে এমন মারাত্মক জ্যাম পেলাম যে দিল্লি ISBT তে রাত দশটার বদলে পৌণে একটায় গিয়ে নামলাম। পরে দেখি সেই ছোকরা গুগল পে'তে মেসেজ করেছে বাড়িভাড়া দিতে পারছে না, ২০০০ টাকা পাঠাই যেন আমি। উত্তর না পেয়ে ১০০০টাকা ধার দিতে পারবো কিনা। যেহেতু ট্যাক্সি ইউনিয়ান থেকে পাঠিয়েছিল তাই আমার ফোন নম্বর ছিল না, গুগল পেতেই মেসেজ করে গেছে।ইনি বাসের পাশে পাশে উড়ছিলেনফিরে আসবার এতগুলো মাস পরেও কালগা পুলগা পরীবন গ্রাহাণের কথা মনে হলেই একটা কনকনে ঠান্ডা, চনমনে ভাললাগায় মন ভরে যায়। ভুলে গেছি চড়াই ওঠার কষ্ট। ভুলে গেছি গ্রাহাণ থেকে নামার পরের পায়ের ব্যথার কথা, ভুলে গেছি বাড়ি ফেরার পরে এক সপ্তাহ পায়ের ফোলা, পা ফেলতে না পারা ব্যথার কথা। মনে আছে মায়াবী পরীবন, ছোট্ট জলপ্রপাত, উত্তাল গ্রাহাণ নালা, স্কুল ইউনিফর্ম পরা অপাপবিদ্ধ তিন শিশুর কলকল, হলুদ সবুজ বাদামী ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া খেত। আবার যাবো শীগগিরই। (সমাপ্ত)
    প্রস্তর যুগ - Nirmalya Nag | “আজকে তোমার একটা জরুরী মিটিং আছে না?” বেডরুমের দরজায় এসে জিজ্ঞাসা করল রিমা।দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে চোখ গেল জয়দীপের; ন’টা প্রায় বাজে, ট্রেনটা মিস হয়ে না যায়। অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে তিন বছরের মেয়ের সঙ্গে বকবক করছিল সে। সদ্য জ্বর সেরে ওঠা রিয়া বাবার হাত চেপে ধরল। ধীরে ধীরে মেয়ের আঙুলগুলো ছাড়িয়ে নিল জয়দীপ, দু-গালে হামি খেয়ে টাটা বলে উঠে পড়ল। রিয়ার আয়া ঝর্ণাদিও এসে গেছে; জয়দীপ তাড়াতাড়ি মায়ের ঘরে গিয়ে “আসছি” বলে ছুটল বাইরের বারান্দার দিকে।খুব দেরি হয়ে গেছে, অন্য দিনের তুলনায় সাত-আট মিনিট বেশি সময় কাটিয়েছে রিয়ার সঙ্গে আজ। বিয়ের প্রায় আট বছর পরে তাদের জীবনে এসেছে মেয়ে, বড্ড বেশি আদর পায় সে বাবার কাছে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বারান্দার দরজার চৌকাঠে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে জোর ধাক্কা লাগল জয়দীপের। দরজার ফ্রেমটা ধরে ব্যালান্স রাখল জয়দীপ, গলায় আসা চিৎকারটা গিলে নিয়ে পায়ের দিকে তাকালো। নখের ঠিক নিচে খানিকটা কেটে গেছে নিশ্চয়, রক্ত বেরিয়ে মোজার একটু জায়গা ভিজে যাচ্ছে। যন্ত্রনাটা পা বেয়ে ওপরে উঠে আসছে যেন, মুখটা বিকৃত হয়ে গেল জয়দীপের। “ভাগ্যিস রিমা দেখতে পায়নি; তাহলে এখনই বরফ টরফ লাগাতে বলতো, আর আরও দেরি হয়ে যেত।” বারান্দায় এল জয়দীপ, খেয়াল রাখল যাতে না খোঁড়ায়; রিমা এখনই এসে যাবে।বারান্দার এক পাশে একটা জুতোর র‍্যাক আর তার পাশে একটা প্লাস্টিকের টুল রাখা। টুলে বসতে না বসতেই রিমা এসে দাঁড়াল পিছনে। র‍্যাকের একটা পাল্লা খুলে ভিতরে তাকাল জয়দীপ, তার জন্য বরাদ্দ তাকেরত সামনেই রাখা আছে পুরনো ব্রাউন রঙের লেদার স্নিকারটা, সেটাই এক ঝটকায় টেনে বার করে ডান পা’টা আগে জুতোয় গলালো সে, তারপর বাঁ পা।“আবার সেই পুরনোটা…নতুনটা পরো,” ৩৯-বছরের স্বামীকে বলল রিমা।“সময় নেই, ট্রেন মিস হবে…,” ফিতে বাঁধা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো জয়দীপ। “আসি,” বেরিয়ে পরল জয়দীপ।“সাবধানে যেও,” বলে দরজা বন্ধ করল রিমা, আর এক ঘণ্টার মধ্যে তাকেও বেড়োতে হবে। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা স্কুলে পড়ায় সে।গলি দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল জয়দীপ, এই জুতোটা একটু ভারি, পায়ে লাগছে বেশ, আগের মত সুরক্ষা মনে হয় আর দিতে পারছে না; নতুনটা প’রে এলেই হত। ওই সিন্থেটিক হালকা জুতো জোড়া গত জন্মদিনে তাকে উপহার দিয়েছিল রিমা। র‍্যাকের মধ্যে পুরনোটার পাশেই নতুনটা রাখা থাকে, দ্বিতীয় পাল্লাটা খুললেই ‘পা-লোক’কে পাওয়া যেত। ছোট থেকেই নানা জিনিসের নামকরণের বাতিক আছে জয়দীপের। নিজের বাড়ির নাম দিয়েছে ‘সুবোধ বালক’, অফিস হল ‘মাস-ও-হারা’। আগের জুতোটাকে ডাকে ‘চর্মসহচরী’, সেখান থেকে ছোট করে ‘সহচরী’;আর নতুনটার নাম ‘পা-লোক’। মিনিট দুয়েক পরেই জশোর রোডে এসে পড়ল জয়দীপ, বাঁদিকে ঘুরে ভাঙাচোড়া ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল বেলগাছিয়া মেট্রো স্টেশনের দিকে।সোমবারের অফিস টাইমে যশোর রোড পুরো জমজমাট; গাড়ির ধোঁয়ার গন্ধ, ট্রাফিকের শব্দ, বাস কন্ডাক্টর আর অটোচালকদের হাঁকাহাঁকির মধ্যে দিয়ে দ্রুত চলতে গিয়ে ঘেমে গেল জয়দীপ। বর্ষাকাল প্রায় শেষ হয়ে এল, আবহাওয়া বেশ আর্দ্র; আজ সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হতে পারে মোবাইলে দেখেছে সে।পায়ের ব্যাথাটা ভালই জানান দিচ্ছে; আস্তে আস্তে হাঁটারও উপায় নেই। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামল জয়দীপ – সারি সারি বাস, প্রাইভেট গাড়ি, হলুদ ট্যাক্সি, সাদা ক্যাব, টু-হুইলার, অটো আর সাইকেলের মধ্যে দিয়ে কোনও রকমে রাস্তার অন্য দিকে এল সে। পৌঁছে গেল মেট্রো স্টেশনে। ট্রেনটা মিনিট দুই দেরি করে এল, তাই পেয়ে গেল জয়দীপ। ভিড়ের মধ্যে গোঁটাগুঁতি করে এগোবার চেষ্টা করল সে, খান তিনেক স্টেশন পেরোবার পর জায়গাও পেয়ে গেল। ভালই হল, একটু আগে একজন পা মাড়িয়ে দেওয়াতে ব্যাথাটা বেড়ে গেছে, দপদপ করছে আঙুলটা।সামনে একটু ঝুঁকে পায়ের দিকে তাকাল জয়দীপ; জুতোটার অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে গেছে – চামড়ার গায়ে ঘষা দাগ, হিলের একটা দিক ক্ষয়ে গেছে, লেসও যেন বেশি টান পড়লেই ছিঁড়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। পালিশও করা হয়নি কিছুদিন। ‘সহচরীর’ আশেপাশে এখন অনেকগুলো নতুন আর পুরনো ডার্বি, ফ্লোটার, অক্সফোর্ড, স্নিকার আর স্যান্ডাল; তাদের নানা ব্র্যাণ্ড, নানা রঙ, নানা দাম। তাদের মালিকদের কথাবার্তা, ফোনালাপ আর বিরক্তিকর রিলের আওয়াজের মাঝে একটু ঝিমুনি এল জয়দীপের।হঠাৎ কানে এল কারও গলা; তারুণ্যে ভরা স্বর, তাতে কিছুটা যেন বিদ্রূপ মেশানো; সে বলছে, “তোমাকে দিয়ে আর বেশি দিন চলবে না।”এর উত্তরে কেউ বলল, “কাউকে দিয়েই চির দিন চলে না; তবে যার যা কাজ তাকে সেটা শেষ পর্যন্ত করেই যেতে হয়।” এই গলার মালিক মনে হয় বয়স্ক।কারা কথা বলছে বুঝতে পারল না জয়দীপ, এদিক ওদিক তাকাল। খুব কাছ থেকেই শোনা গেল দুটো গলা, কিন্তু এই মুহুর্তে তো কাছাকাছি কেউই কথা বলছে না। ট্রেনে ঘোষণা হল এসপ্ল্যানেড স্টেশন আসছে। আবার চোখটা বুজে এল তার।প্রথম গলাটা ফের শোনা গেল,”তোমার চামড়া, তোমার রাবার সোল – সব গেছে। গত সপ্তাহে স্লিপ করেছ, আর একবার তো পেস্টিং খুলে যাচ্ছিল আর একটু হলেই। সময় হয়েছে, এবার সরে যাও। তুমি এখন লায়াবিলিটি।”দ্বিতীয় জনের স্বর এবার গম্ভীর। “সময়? অনেক কঠিন সময় পেরিয়ে এসেছি। হিলটা ক্ষয়ে গেছে কেন? সাত-আট বছর ধরে ঘোরাঘুরি ক’রে; এই ডাক্তার থেকে ওই ডাক্তার; এই টেস্ট থেকে সেই টেস্ট, অনেক হতাশার ভার বয়ে তবে আজ রিয়া এসেছে। বাঁ দিকের ওই স্ক্র্যাচটা? রূপকুণ্ড ট্রেক করার সময়ে পাথরে পা আটকে গিয়েছিল একটা বিপজ্জনক জায়গায়। টাকা দিয়ে আমার মূল্য বিচার করতে যেও না।”আদালতের সওয়াল জবাবের মত এই কথোপকথন কারা করছে এইবার জয়দীপের কাছে পরিস্কার হয়ে গেল -- সহচরী আর পা-লোক। নতুন জুতো আক্রমণ চালিয়ে গেলঃ “সেন্টিমেন্ট দিয়ে জীবন চলে না; সময়কে মেনে নিতে হয়। আবার বলছি, তুমি এখন লায়াবিলিটি।”লোকজনের হুড়োহুড়িতে চোখ খুলল জয়দীপ; পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে দরজা খুলছে। তাড়াতাড়ি করে প্ল্যাটফর্মে নেমে অন্য অফিসযাত্রীদের ভিড়ে মিশে গেল সে; হাঁটতে গিয়ে টের পেল পা-টা আবার ব্যথা করছে। রাস্তায় এসে অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হল পা-লোকের যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না; আবার সহচরী যা বলেছে সেগুলোও ঠিক। গ্র্যান্ড হোটেল আর্কেডের একটা দোকান থেকে ১৫ বছর আগে সহচরীকে সংগ্রহ করেছিল সে, সেই সময়ের সাধ্যের কিছুটা বাইরে গিয়েই কিনেছিল। সে দিনের ঝকঝকে জুতোটা আজ জীর্ণ হয়েছে। পা-লোককে কিনেছিল অনলাইনে, অনেক দেখাশোনা রিসার্চ টিসার্চ করে; রিমা বলেছিল, “তুমি কিনে নাও, টাকা আমি দেবো।” আজকের মিটিংটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট, তবে পা-টাকেও একটু দেখতে হবে। একটা স্প্রে বা জেল টেল কিছু লাগালে আরাম হবে মনে হয়। আপাততঃ নিচু হয়ে জুতোর ফিতেটা টাইট করে বেঁধে নিল জয়দীপ; পা বাড়ালো ‘মাস-ও-হারার’ দিকে।এক ঘন্টার মিটিং ভালো ভাবেই চলল। কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হল জয়দীপকে; এবার প্রায় স্পষ্ট হয়ে গেল পরের প্রমোশন আসছে, এর জন্য দু’ বছর অপেক্ষা করে আছে সে। তৃপ্ত মনে এবার পায়ের দিকে নজর দিল সে।একজন অফিস অ্যাসিসট্যান্টকে দিয়ে ফার্স্ট এড বক্সটা আনালো জয়দীপ। ডান পায়ের জুতোটা খুলে দেখল রক্ত শুকিয়ে মোজাটা আটকে আছে বুড়ো আঙুলের কেটে যাওয়া জায়গাটায়। সাবধানে মোজা খুলল সে, ফুলে গেছে বুড়ো আঙুলটা, কাটা জায়গায় কালচে লাল শুকনো রক্ত। ডেটল দিয়ে ক্ষতর জায়গাটা পরিস্কার করে একটা ব্যান্ড এড লাগালো সে, পেন কিলার স্প্রে করল, ব্যাথাটা কমল কিছুটা। জুতোটা পরার সময়ে খেয়াল করল সোলের কাছটা আলগা হয়ে এসেছে; অন্যটা দেখল, সেটারও একই অবস্থা।আজকের বিশেষ দিনে লাঞ্চের সময়ে পার্থর কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে খেল সে, যদিও ধূমপান সে কদাচিত করে। পার্থ আবার অফিসের প্রচুর গোপন খবর রাখে, বলল কোম্পানি সম্ভবত অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের ঝা-জীকে আর রাখবে না। নানা শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত ঝা-জী এখন খুব ছুটি নেন, আরও বছর চারেক চাকরি ছিল ওনার।সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল, যে কোনও সময়ে বৃষ্টি আসবে। পায়ের ব্যাথাটা আবার ফিরে এসেছে, অফিস ছুটির পর জয়দীপের ইচ্ছে হল না মেট্রো অবধি যাওয়ার; একটা ক্যাব বুক করল সে।ক্যাবে উঠলে এসি চালিয়ে দিল ড্রাইভার, গাড়ি চলতে শুরু করল বেলগাছিয়ার দিকে। ব্যাকপ্যাকটা পাশেই সিটের ওপর রেখে আরাম করে বসল জয়দীপ। মাথাটা হেলিয়ে দিল পিছনের দিকে, একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে ভাবতে লাগল যে নতুন দায়িত্ব অফিস দিয়েছে সেগুলো কী ভাবে ঠিক মতো করা যাবে। লেনিন সরনীর মোড় পেরিয়ে যাওয়ার পর পা দুটো একটু সরাতে গেল সে। চোখ গেল সহচরীর দিকে। কোন যুগ থেকে এই জুতোটা আছে তার কাছে। সহচরী তার সম্পর্কে যা জানে, ততটা হয়তো রিমাও জানে না।গাড়ির কাঁচ আর ছাদের ওপর বৃষ্টি পড়া শুরু হল, প্রথমে আস্তে, তার একটু পরেই বেশ জোরে।“ভালো বৃষ্টি হবে স্যার, সকাল থেকেই মেঘলা রয়েছে,” বলল ড্রাইভার। জয়দীপ শুধু “হুমমম” বলে থেমে গেল; ড্রাইভার বুঝল তার প্যাসেঞ্জারের কথা বলার ইচ্ছে নেই।একটু ঝিমুনি এসেছে জয়দীপের। তার মধ্যেই শুনতে পেল পা-লোকের গলা, “এই যে স্যার, তোমার মত টুটাফুটা চিজকে ইনি কেন এত পছন্দ করে বলো তো?”সহচরীর উত্তরে কি একটু আবেগের ছোঁয়া পাওয়া গেল? “মহাফেজখানা কাকে বলে জানো? আমি হলাম তাই। ওর জীবনের হাজারো দামী সময়ের সাক্ষী ছিলাম আমি। রিমার বাবা-মা ওর সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজী ছিল না; ও রিমার বাড়ি যেদিন যায় আর সফল হয়ে বেরিয়ে আসে সেদিন আমি ছিলাম। সেটা ছিল বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যা। রিয়া হওয়ার সময়ে খুব সমস্যা হয়েছিল; হাসপাতালের করিডোরে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি করেছি প্রায় সারা রাত, একটা মঙ্গলবারের রাত। সেই শুক্রবারের বিকেলে যখন ওর বাবা মারা যান, আর ও অফিস থেকে ফিরে আসে সেদিনও আমি ছিলাম।” পা-লোক বলল, “ইতিহাসের সাল তারিখ কোন কাজে লাগবে? এই দিয়ে কি তোমার ক্ষয়ে যাওয়া সোল নতুন হবে, না আলগা হওয়া পেস্টিং শক্ত হবে? এবার তোমার সাম্রাজ্যের পতনের সময়।”হাসির শব্দ কানে জয়দীপের; দীর্ঘ নির্মল হাসি। “সময়কে একটু সময় দাও, তারপর দেখ। গুড লাক।”“হাসির আবার কী হল?” জিজ্ঞাসা করল পা-লোক। সহচরীর কাছে থেকে কোনও উত্তর এল না। জয়দীপের মনে পড়ল না ওই জুতোর মধ্যে নারীসুলভ কিছু না থাকা সত্ত্বেও কেন ‘সহচরী’ নাম দিয়েছিল সে।বিদ্যুতের চমকে আকাশ ফালাফালা হয়ে যাওয়ার পরেই প্রচন্ড আওয়াজ করে বাজ পড়ল। আজকাল বাজ পড়ছে খুব বেশি, কেন কে জানে। বৃষ্টিও এখন বেশ জোরে পড়ছে, ট্রাফিকের স্পিড কমে গেছে। কপাল ভালো জয়দীপের, শ্যমবাজার পাঁচমাথার মোড়ে সিগন্যাল খোলা পেল সে, নইলে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত কে জানে! আর জি কর হাসপাতাল পেরোবার সময়ে মোবাইল বেজে উঠল; রিমা। জিজ্ঞাসা করল কোথায় আছে ও, প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছে বাড়ির কাছে। আর জানালো রিয়া এখন অনেকটা ভালো আছে। ফোন রেখে সামনে তাকালো জয়দীপ; উইন্ডস্ক্রিনের ওপর অঝোরে জল পড়ছে, ওয়াইপার এদিক ওদিক করছে ফুল স্পিডে। পাশের দিকে তাকালো সে, জলে পুরো ভেজা দু-একটা লোক ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, এই বৃষ্টিতে ছাতা কোনও কাজেই লাগবে না। বেশ কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছে দোকানের সামনে। গাড়ির চাকার ধাক্কায় রাস্তার জল ছোটখাটো ঢেউ-এর মত ধাক্কা মারছে ফুটপাথের পাথরে। কারেন্ট যায়নি এই বাঁচোয়া।ব্যাকপ্যাক থেকে নিজের জন্য ফোল্ডিং ছাতা আর ব্যাগের জন্য রেন কভার বার করল জয়দীপ; আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ি ঢুকে যাবে সে। ক্যাবটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল; ড্রাইভার চাবি ঘোরালো বার দুই, গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে সামান্য এগিয়ে ফের থেমে গেল। ড্রাইভার বিড়বিড় করে গাল দিচ্ছে বুঝতে পারল জয়দীপ। গিয়ার, ক্লাচ আর চাবি নিয়ে আরও কয়েকবার চেষ্টা করল ড্রাইভার, গাড়ি এগোল না। পিছন থেকে ড্রাইভাররা হর্ন দিতে আরম্ভ করেছে, তারপর জল জমা ট্রাফিকে ভরা রাস্তায় বেশ কষ্ট করেই গাড়ি ঘুরিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করল।“কী হয়েছে?” বিরক্তি আর উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল জয়দীপ। “ব্যাটারি গেছে স্যার,” উত্তর দিল ড্রাইভার, তার গলায় অসাহয়তা। “দেখে বেরোন না কেন? কী করব এখন?” বলল জয়দীপ। “সরি স্যার; এই বৃষ্টির মধ্যে কিছু করার নেই।”এসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বদ্ধ গাড়ির মধ্যে গরম লাগতে শুরু করেছে জয়দীপের; বাইরের দিকে আবার তাকালো সে - ঘোলাটে জলের স্রোত বয়ে চলেছে রাস্তা দিয়ে। বাড়ির গলির মুখটা এখনও একটু দূরে; হেঁটে গেলে পাঁচ-ছয় মিনিটের মধ্যে বাড়ি পোঁছে যাওয়া যাবে। সহচরীর কথা একবার ভাবল সে… খুলে ফেলবে? নাহ, পায়ের কাটার জন্য সেটা ভালো হবে না; গাড়ির মধ্যে বসে থাকারও কোনও মানে নেই। রেন কভারটা ব্যাকপ্যাকে আটকে পিঠে নিয়ে নিল জয়দীপ, প্যান্টটা একটু গুটিয়ে নিল, ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। কাদাগোলা ঠান্ডা জল জুতোয় ঢুকে এল সঙ্গে সঙ্গে, ছাতা খোলার আগেই মাথা, জামা আর প্যান্টের বেশ কিছুটা ভিজে গেল। ফুটপাথে উঠে গেলে জল একটু কমবে; নোংরায় আটকে থাকা গালিপিটের দিকে দ্রুত ধেয়ে যাওয়া জল এড়িয়ে ফুটপাথে উঠল সে। গলিটা এখনও প্রায় ২০০ মিটার দূরে, জোরে পা চালালো সে। বৃষ্টির জন্য ভালো দেখা যাচ্ছে না, তার ওপর জয়দীপের ছাতাটাও একটু বড়। ঠিক এই জায়গাটায় কোনও দোকান নেই; উল্টো দিক থেকে এক জন মহিলা আসছেন, তাঁকে জায়গা দেওয়ার জন্য একটু বাঁ দিকে সরে গেল জয়দীপ, আর তার পরেই বাঁ পা-টা জোর ধাক্কা খেল একটা জমে যাওয়া সিমেন্টের বস্তায়।দাঁত চিপে যন্ত্রণাটা সহ্য করল সে, দাঁড়িয়ে গেল মিনিট খানেকের জন্য। এবার তার একটা পায়ে ক্ষত আর অন্যটায় চোট, দুটোই সহচরীর ফিতেয় বাঁধা।হঠাতই জয়দীপের মনে হল পা-লোকের গলা শোনা যাচ্ছে… “জল আর কাদায় পুরনো লেদার বডি ভারি হয়ে গেছে, ও আর চলবে না।” সহচরীর দিক থেকে কোনও উত্তর এল না।দুই পায়েই সমস্যা নিয়ে চলতে অসুবিধে হচ্ছে জয়দীপের, ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো সে, গলির মুখে এসে দেখে ভেতরটা অন্ধকার, রাস্তার আলোগুলো জ্বলেনি। এখান থেকে বাড়ি যেতে স্বাভাবিক দিনে দুই থেকে তিন মিনিট লাগে, তবে আজকের কথা আলাদা।মজুমদার বাবুর বাড়ি এসে গেল, বছর তিনেক আগে উনি মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা বন্ধ হয়েই পড়ে আছে। বাউণ্ডারি ওয়ালের নিচের একটা গর্ত দিয়ে ভলকে ভলকে জল বেড়িয়ে আসছে বাড়ির ভেতর থেকে, গলির এক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে বড় রাস্তার দিকে।মজুমদার বাবুর বাড়িতে আলো জ্বলছে না বলে ওখানটা আরও বেশি অন্ধকার, বৃষ্টি পড়ছে আর তার ওপর রয়েছে বড় ছাতা। বন্ধ গ্রিল গেটের কাছটায় জঞ্জাল জমে ছিল, খেয়াল করেনি জয়দীপ, তার ওপর দিয়ে হাঁটতে যেতেই বাঁ পা-টা আটকে গেল। টেনে বার করতে গিয়ে লাভ হল না। বোঝা গেল জঞ্জালের নিচে কোনও কিছুতে পা আটকে গেছে। বেশ বিরক্ত হয়ে ফের হ্যাঁচকা টান দিল সে, এবার পা-টা একটু নড়ল; তৃতীয় টান আরও জোরে, এবার কাজ হল, পা খুলে এল।ব্যালান্স সামলে নিয়ে পায়ের দিকে তাকালো জয়দীপ। সহচরীর বাঁ দিকের সোল আর বডির মধ্যে আর যোগ নেই, সামনের দিকটা আলগা হয়ে ঝুলছে। বাঁ পা-টা ঝাড়া দিল জয়দীপ, টুটাফুটা জিনিসটা প্রবল ঝটকা খেল, তবুও পায়ে আটকেই রইল।“আর আই পি,” তারুণ্যে ভরা গলা শুনতে পেল সে।প্রায় অন্ধকার গলিতে একা দাঁড়িয়ে রইল জয়দীপ; ঠান্ডা জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে খোলা পা আর ছেঁড়া জুতোর ওপর দিয়ে, সহচরীর গায়ে লেগে থাকা ময়লায় যেন কিছুটা পরিস্কার হল। ডান পায়ের জুতোটা এখন কোনও কাজের নয়।একটু সরে এসে ছাতা সামলে এক হাঁটু গেড়ে বসল জয়দীপ; কষ্ট করে খুলে ফেলল বাঁ পায়ের জুতোর ভিজে যাওয়া ফিতে, পা থেকে ছাড়িয়ে ফেলল সেটা। তার পর ডান পায়েরটাও।জুতো জোড়া হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল জয়দীপ, কয়েক পা এগিয়ে জলের স্রোতের ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিল সে দুটো। স্রোতের ধাক্কায় একটু একটু করে পিছিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ভলকে জল এল, এক পাটি পড়ে গেল পাশের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে জলের টানে গলির অন্ধকারে হারিয়ে গেল সহচরী।  
  • জনতার খেরোর খাতা...
    আমাদের ঈশ্বর - Muradul islam | নতুন এলাকায় আমরা উঠে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই আমি লক্ষ করি আমাদের বাসার ঠিক সামনে, অন্যপাশের পার্কটির এক নির্জন বেঞ্চে একজন বৃদ্ধ লোক বসে থাকেন। বসে কাজ করতে থাকলে প্রায় ঘন্টাখানেক পরে পরেই ঘড়ি একটা সংকেত দিত, অনেকক্ষণ বসা হয়ে গেছে, এইবার একটু হেঁটে আসুন। সেই সংকেতকে সম্মান দিতে, এবং প্রতিদিনের আট হাজার স্টেপ হাঁটার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমি দিনে কয়েকবার বের হতাম হাঁটতে। পার্কটি দুই চক্কর দিয়ে আবার ফিরে আসতাম।যতবার হাঁটতে গিয়েছি, ততবার লোকটাকে ঠিক একই জায়গায় বসে থাকতে দেখেছি। তাঁর শাদা লম্বা চুল ঘাড় পর্যন্ত, বেশভূষা পরিষ্কার। মাথায় হ্যাট, পরনে থাকত ধূসর রঙের এক কোট, এবং শাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। তাঁর জুতার রং ছিল চোখে লাগার মত লাল। তাঁকে দেখতাম পত্রিকা পড়ছেন, বা কোন বই পড়ছেন আর সিগার খাচ্ছেন। হঠাৎ হঠাৎ তিনি উঠে গিয়ে রাস্তার পাশের ক্যাফে থেকে নিয়ে আসতেন কফি।তাঁকে দেখে আমার একটা আগ্রহ জন্মাল। আমার ধারণা হয়েছিল, তিনি একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। তাঁর প্রতিদিনের এইভাবে বসে থাকা ও পড়া দেখে মনে হচ্ছে, তিনি ঠিকঠাক নিয়ম মেনে চলা লোক, এবং জ্ঞানী। এরকম লোকজনই আমার ভালো লাগে, এদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়।আমি একদিন তাঁর সাথে পরিচিত হতে গেলাম। নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন তাঁর নাম ঈশ্বর।আমি বললাম, আমি এখানে নতুন এসেছি, আমি ও আমার স্ত্রী। এই পার্কের অন্যপাশের বাসাটাতে থাকি। আপনাকে প্রায়ই এখানে বসে থাকতে দেখি তাই ভাবলাম পরিচিত হই। আপনি কি প্রতিদিনই এখানে আসেন?তিনি বললেন, হ্যাঁ, প্রতিদিনই আসি।আমি কথা জমাতে তাঁর পাশে বসতে বসতে বললাম, আমি একটা হেজ ফান্ডে কোয়ান্ট হিশেবে কাজ করছি। আপনি নিশ্চয়ই রিটায়ার্ড?তিনি বললেন, হ্যাঁ, ত্রিশ বছর আগে কাজ ছেড়েছি।আমার আগ্রহ জন্মাল জানতে কাজটা কী। জিজ্ঞেস করলাম, কিছু মনে না করলে, জানতে পারি কি আপনি কী কাজ করতেন?তিনি বললেন, তেমন কিছু না।অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন না। ফলে আমি আর জিজ্ঞেস করলাম না, সেটা অভদ্র দেখাবে। আরো কিছুক্ষণ পার্ক ও এলাকা বিষয়ে দু’-চারটা কথা বলে সেদিন চলে আসলাম। কিন্তু আমার মনে আগ্রহটা বাড়তেই থাকল, লোকটা কেন বললেন না তিনি কী কাজ করতেন। হয়ত এখানে কোন রহস্য আছে, এটা আমাকে জানতেই হবে।হাঁটতে বের হলে প্রতিদিনই তাঁর সাথে কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা করে আসতাম। তিনি হাসিমুখে আমার সাথে কথা বলতেন। আমার মনে হতে লাগল তিনি আমার এ সঙ্গ পছন্দ করছেন। তাঁর পরিবার বলতে কেউ নেই। একা একাই থাকেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এখানে পার্কে এসে বসে থাকেন। পত্রিকা পড়েন, যে বইটা সাথে নিয়ে আসেন ওইটা পড়েন। চিন্তা করেন। বাসায় ফিরে যান সন্ধ্যাবেলায়। দিনে তিনি কফি ছাড়া আর কিছুই খান না সাধারণত।আমি তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করলাম, এই যে সারাদিন শুধু বসেই থাকেন, এতে কি আপনি বিরক্ত হন না?তিনি বললেন, না। বিরক্ত কেন হব, এটা তো ভালোই।আমাদের আলাপ আলোচনা নিয়মিত হবার প্রায় মাস খানেক পরে আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তাঁর কাজটা কী ছিল সেই বিষয়ে। তিনি হেসে বললেন, আমি খেয়াল করেছি শুরু থেকেই এ ব্যাপারে তোমার আগ্রহ। দিনে দিনে তোমার আগ্রহটা বেড়েছে।উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে তিনি আমাকে তুমি করে বলা শুরু করেছেন। আমিই তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম।তিনি বললেন, আমি ত্রিশ বছর আগে, পেশায় ছিলাম এক জাদুকর।আমি হাসিমুখে বললাম, এটা তখন বললেন না কেন? নাকি আমার ভেতরে আগ্রহ জন্মাতে চাইলেন?তিনি বললেন, হয়ত, কিন্তু একটা ব্যাপার আছে এখানে। তুমি যেরকম ভাবছো, খেলা দেখানোর ম্যাজিশিয়ান, এরকম না। আমি ছিলাম সত্যিকারের জাদুকর।আমি বললাম, সত্যিকারের বলতে একেবারে আদি ও অকৃত্রিম জাদুর কথা বলছেন? মানে সত্যি সত্যি আপনি মানুষ অদৃশ্য করে দিতে পারেন ইত্যাদি?তিনি বললেন, হ্যাঁ। কোন খেলা না, চালাকি না, সত্যিকারের জাদু।আমি হাসলাম, বললাম, বিজ্ঞান, যুক্তি ও গণিত আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। আমাকে অন্তত আপনি এটা বিশ্বাস করাতে পারবেন না। সত্যিকারের জাদু বলে কিছু হয় না। কিন্তু আমি এটা মানি যে, ভালো ম্যাজিক কৌশল একটা চমৎকার আর্ট হতে পারে।তিনি বললেন, তা তো খেলার শিল্প। কিন্তু আমি যেটা বলছি, সেটা শিল্পের ঊর্ধ্বে। সত্যিকারের জাদু।আমি তাঁর চোখের দিকে তাকালাম তখন, তাঁর ঘোলাটে চোখদুটি জ্বলজ্বল করছে। তিনি সিরিয়াস ভঙ্গিতেই কথা বলছেন। এই প্রথমবারের মত লোকটাকে আমার কিছুটা অস্বাভাবিক লাগল। আমার স্ত্রী মিনা আমাকে বার বার নিষেধ করেছে, এভাবে অপরিচিত এই বৃদ্ধ লোকের সাথে খাতির জমানো তার পছন্দের না। লোকটার চোখ দুটি দেখে আমার মিনার কথাগুলি মনে হলো।আমি বললাম, ঠিক আছে, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করব যদি কোন একটা জাদু আমাকে দেখাতে পারেন। এই সামনের গাছটাকে অদৃশ্য করে দেখান তো।তিনি হাসলেন, তোমাকে তো বলেছি যে আমি ত্রিশ বছর আগেই সব ছেড়ে দিয়েছি।আমি বললাম, এটা কিন্তু আপনার চালাকি। আপনি সত্যিকার জাদুকর হলে অবশ্যই এই গাছকে নিমেষে অদৃশ্য করে ফেলতেন।তিনি হাসলেন। কিছু আর বললেন না। আমি তাঁকে তখন বলতে থাকলাম জাদুবিদ্যার ইতিহাস সম্পর্কে। এই বিষয়ে আমার জ্ঞান যে একেবারে কম না তা তাঁকে জানিয়ে দেয়া উচিত বলে মনে হলো। গাইড ফর দা পারপ্লেক্সড থেকে শুরু করে এগ্রিপ্পার অকাল্ট, যা যা জানতাম সব সারমর্মে বিবৃত করলাম। তিনি হাসিমুখেই শুনলেন, কোন বিতর্ক করলেন না।আমি কাজ শেষ করে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ঘুমাই। ঘুম থেকে সেদিন উঠলাম সন্ধ্যা নয়টায়। কফি নিয়ে বসেছি টেবিলে, এবং দিনের ওই কথাবার্তার রেশ ধরে একটু জাদুবিদ্যার বইগুলি আবার পড়তে ইচ্ছা হচ্ছিল। বুকশেলফ-এর এক কোনা থেকে বের করে আনলাম শামস আল মা'রিফ। বইটা খুলে আমি রীতিমত চমকে গেলাম। আমি মাঝের একটা পাতা খুলেছিলাম, দেখলাম সেখানে একটা শাদা কাগজে লেখা, এটাই আমার জাদু। এবার কি বিশ্বাস হলো? নিচে আজকের তারিখ দেয়া।প্রাথমিক ভাবে আমার মাথা কাজ করছিল না। এখানে কী হলো, এই কাগজ তো আমি এখানে রাখার প্রশ্নই আসে না। আমি লজিক্যালি ভাবার চেষ্টা করলাম। এই কাগজ এখানে এসেছে মানে নিশ্চয়ই কেউ একজন রেখে গেছে। বাসায় আমি ও আমার স্ত্রী, দুইজন থাকি। তাহলে এই কাজ আমার স্ত্রীই করেছে, আর কারো পক্ষে করা সম্ভব না।আমি আমার স্ত্রীকে কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকতে ডাকতে গেলাম বসার ঘরে। সে কার সাথে জানি মোবাইলে কথা বলছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এই বইয়ে কোন কাগজ রেখেছ?মিনা আমার কথায় বিরক্ত হলো। বলল, আমি কেন কাগজ রাখতে যাব? তোমার বুকশেলফে আমি হাতই দিইনি।আমি তার হাতে কাগজখানা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, এই কাগজ তুমি রাখনি?সে কাগজ একবার হাতে নিল, দেখল, ও বলল, ধুর! আমি এটা কেন রাখতে যাব? যাও তো, আমাকে কথা বলতে দাও।আমি আমার কক্ষে ফিরে আসলাম। আবার চিন্তা করতে বসলাম ঠাণ্ডা মাথায়। মিনা কখনো আমার সাথে মিথ্যা বলে না। সে সত্যি বলেছে তা আমি বুঝতে পারছি। আর যদি রেখেও থাকে, তাহলে, এই বই যে আমি নেব তা সে কীভাবে জানবে? তখন তাকে সব বইতে রাখতে হবে। যদি ওই লোকটার সাথে তার পরিচয় থাকে, এবং কোন প্র্যাংক করার জন্য করে থাকে, তাহলে, ওই লোকটা তাকে বলতে পারে, ম্যাজিকের বইগুলাতে রাখতে। কারণ, যেহেতু ম্যাজিক নিয়ে আজ কথা হয়েছে তাহলে আমি ম্যাজিকের বই খুলতে পারি, এটা একটা ভালো অনুমান। আমি তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠে আমার বুকশেলফে থাকা ম্যাজিকের বইগুলা বের করতে লাগলাম। ওয়ে অব হার্মিস, নস্টিক স্ক্রিপচারস, ন্যাক্রোমানচার'স ম্যানুয়াল, পিকাট্রিক্স ইত্যাদি যা যা ছিল, সব খুলে দেখলাম। কোনটাতে কোন কাগজ পেলাম না। তাহলে কীভাবে যে কাগজটি রেখেছে সে জানতে পারল আমি শামস আল মা'রিফই খুলব!আমার মাথা কাজ করছিল না। রীতিমত মাথার চুল ধরে টানছি এমন অবস্থায় আমার চোখ গেল আমার টেবিলের ড্রয়ারের দিকে। এটা বিশেষ ভাবে বানানো, ইন্টারনেটের সাথে কানেক্টেড এবং কেবলমাত্র আমার ফিঙ্গারপ্রিন্টেই খোলে। এখানে আমি কিছু দরকারি জিনিশ, বিটকয়েন কোল্ড ওয়ালেট রাখি। আমার মনে হতে লাগল, এটার ভেতরে কিছু একটা ঘটছে, কেমন যেন ফুঁস ফুঁস শব্দ আসছে ভেতর থেকে। আমি ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ড্রয়ার খুললাম। খুলে দেখলাম খুব ছোট চারকোনা একটা আয়না সেখানে। আয়নাতে স্ক্রিনের মত লেখা ভেসে উঠল, স্ত্রীকে জ্বালাতন কোরো না। সে রাখে নাই। তুমি সত্যিকার জাদু দেখতে চেয়েছিলে, তাই দেখালাম।আমার মাথা দিয়ে তখন যেন ধোঁয়া বের হচ্ছিল। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। মিনাকে কিছু বলব না ঠিক করলাম। হয়ত প্যানিক করবে, অথবা আমাকে উন্মাদ ভাববে। দুইটাই অশান্তির কারণ হবে।সে রাতে আমার প্রায় ঘুম হলো না বললেই চলে। রাতে ঘুম না হওয়ায় চোখ ফুলে গেল সকালে। অফিস থেকে ছুটি নিলাম ফিলিং আন্ডার দ্য ওয়েদারের অজুহাত দেখিয়ে। সেদিন ঈশ্বর ভদ্রলোক আসার আগে আগেই আমি গিয়ে তাঁর বেঞ্চে বসে রইলাম। তিনি এসে আমাকে দেখে হাসলেন। বললেন, কী কেমন ঘুম হলো আজকে?আমি তাঁর দিকে আজ তাকাচ্ছিলাম ভয়মিশ্রিত সমীহ নিয়ে। বললাম, এটা আপনি কীভাবে করলেন? আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।তিনি বসতে বসতে বললেন, শান্ত হও। এ আর এমন কী। তবে অনেক অনেক দিন পরে কোন জাদু দেখালাম। খারাপ লাগছে, নিজে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তা ভেঙে ফেললাম, অবশ্য মজার জন্য করেছি। সিরিয়াস জাদু তো আর করিনি? তুমি কী বলো?আমি বললাম, আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আপনি এটা কীভাবে করতে পারলেন?তিনি কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললেন, দেখো, তুমি বিশ্বাস করো আর নাই করো, আমি আর কোন কিছু তোমাকে দেখাতে পারব না, সেদিন তুমি জাদুবিদ্যা নিয়ে যে পণ্ডিতি কথাবার্তা সব বলে গেলে, তাতে আমারও ইগোতে লেগে গিয়েছিল। তাই ভাবলাম তোমার সাথে একটু মজা করি।ওইদিন আমি অনেকক্ষণ তাঁর সাথে এই বিষয়ে কথা বললাম। তিনি তাঁর জাদু দেখানো সময়কালের কথা তেমন কিছুই শেয়ার করতে চান না। বার বার বলেন, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, এসব আর কখনোই করব না।আমি বললাম, আমি আপনার কাছ থেকে শিখতে চাই, আমাকে শেখান প্লিজ। এর জন্য যা করতে হয় তা করব।তিনি হাসলেন। বললেন, কিছু কিছু জ্ঞান একটা অভিশাপ বন্ধু, তুমি বুঝতে পারছ না।আমি বললাম, আপনি কি ওই ফস্টাস আর শয়তানের প্রসঙ্গ ধরে বলছেন, যে শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করেছিল?তিনি বললেন, না। তা নয়। এটা একটা ভুল গল্প এমনিতেই। দেখো, শয়তান মানুষের আত্মা নিয়ে করবেটা কী! এটা কখনোই ওই গল্পের পয়েন্ট না। গল্পের মূল পয়েন্ট হচ্ছে, কিছু কিছু জ্ঞান নিয়ে আসে ক্ষমতা, এবং সেই ক্ষমতায় মানুষ নিজেই শয়তান হয়ে উঠে।আমি বললাম, আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি। আপনার যে মাপের ক্ষমতা আছে, অনেক কিছুই আপনি করতে পারবেন। কিন্তু ভেবে দেখুন, খারাপ জিনিশ যেমন করতে পারবেন, তেমন ভালো জিনিশও করতে পারবেন। আপনি যদি আমাকে সাথে রেখে শেখান, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমি শুধু মানুষের ভালোর জন্যই ব্যবহার করব…আমাদের সামনের রাস্তা দিয়ে একটা স্কুলবাস যাচ্ছিল ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। ভদ্রলোক ওটার দিকে তাকিয়ে আমার হাত ধরে আমার কথা বলা থামালেন। শান্তভাবে বললেন, দেখো, স্কুলবাসটা যাচ্ছে।আমি তাঁর কথামতো ঐদিকে তাকালাম। স্কুলবাস আমাদের দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করে চলে গেল।ভদ্রলোক তাঁর হাতঘড়িটা দেখলেন। বললেন, আর পাঁচ মিনিট পরে, সামনের তিন রোড এগিয়ে যাবার পরে এই বাসটা দূর্ঘটনায় পতিত হবে। অনেক হতাহত হবে।ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি হইচই দেখতে পেলাম। একটু এগিয়ে গিয়ে শুনে আসলাম, বাসটা সত্যি সত্যি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।আমি বেঞ্চিতে ফিরে এসে দেখলাম ভদ্রলোক আরেক কাপ কফি নিয়ে বসেছেন, আজ সাথে ডোনাটও আছে একটা। আমি ব্যস্ত হয়ে তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এটা কী করলেন? আপনি চাইলে তো এই বাসকে আটকাতে পারতেন। নিষ্পাপ বাচ্চারা বেঁচে যেত। কেন থামালেন না? আপনি কি থামাতে পারতেন না?তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ, পারতাম। কিন্তু তাতে, ঘটনাগুলার ক্রম ভেঙে যেত। এবং এর ফল হিশাবে আরো দশটা বড় দুর্ঘটনা ঘটত এই শহরে বিশ বছরের ব্যবধানে, শুধুমাত্র এই ঘটনাকে ঘটতে না দেয়ার জন্য। আমি শুধু এটা আজ ঘটবে তাই জানতাম না, এটা না ঘটলে এর ফল হিশাবে কী কী ঘটবে তাও জানতাম। ফলে এখানে আমার করার কিছুই ছিল না। তুমি যেটাকে ভালো কাজ হিশাবে দেখছ, সেটা না করাই আমার কাছে বেটার কাজ। বুঝতে পারছো কি?আমি বললাম, তাহলে...কীভাবে কী হচ্ছে?তিনি বললেন, কী হচ্ছে? বসো, কফি খাও।তিনি আমার জন্যও একটা ক্যাফে মকা নিয়ে এসেছেন।আমি বললাম, আমার আসলে অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি এত কিছু জানেন, এত ক্ষমতা রাখেন কিন্তু কিছুই করছেন না!ঈশ্বর বললেন, হ্যাঁ। আমি জানি, এইজন্যই কিছু করতে পারছি না। আমি জানি যে, আমি যদি কাজটা করি, কোন একটা খারাপ জিনিশ আটকে দিই, সেটা এর চাইতে বড় খারাপ নিয়ে আসবে ঘটনার ধারাক্রমে। সব কিছু পরস্পর সম্পর্কিত একটা সিস্টেমে চলে বন্ধু। স্পিনোজার গডের এই ধরণীতলে যারা প্রকৃত জানে, তারা বসেই থাকে, কিছু করে না। তাদের জন্য এই জানাটা, এই ক্ষমতাটা, তুমি মহান আশীর্বাদ বলবে না কঠিন অভিশাপ হিশেবে দেখবে তা একান্তই তোমার বিবেচনা।
    যে কথা না-বললেই নয় : ৭ - অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় | তৃণমূলের পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া নেতারা সবাই অভিষেককেই দোষারোপ করছে। অভিষেক এত খারাপ, অভিষেকের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া যায় না, তাহলে পরাজয়ের আগে পর্যন্ত চুপ ছিল কেন? অভিষেকের বিরোধিতা করলে শুভেন্দুর গুডবুকে থাকা যাবে, তাই তো? ইডি, সিবিআই, জেলহাজত সব দূরে থাকবে। তাই তো? তাই অভিষেককে যত হ্যাটা করা যাবে, ততই শুভেন্দু খুশি হবে। অভিষেক শুভেন্দুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কারণ শুভেন্দুর স্বপ্ন ছিল মমতার পরেই উনি মুখ্যমন্ত্রী হবে। হঠাৎ অভিষেকের উত্থান শুভেন্দুর সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। শুভেন্দু বুঝে নিয়েছিল তৃণমূলে থাকলে তার পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া কোনোমতেই সম্ভব নয়। শিকে যদি ছেঁড়ে, সেই ভরসায় থাকলে ইডি/সিবিআইয়ের তাড়া খেয়ে জেলের ভাত খাওয়া নিশ্চিত ছিল। মেদিনীপুরের লোকেরা এত বোকা নয়। তাই তৃণমূল ছেড়ে নেতাহীন বিজেপিতে ঢুকে সর্বময় নেতা হয়েছে, এখন মুখ্যমন্ত্রী। এই অভিষেক বিরোধিতা শুভেন্দুর ছিল, এখনও আছে। সেটা দলত্যাগীরাও অনুসরণ করছেন। অভিষেক কেন তথাকথিত বিদ্রোহীদের পথের কাঁটা সেটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। অভিষেক খারাপ, সেটা দল হেরে যাওয়ার পর মনে হল? এতদিন তো "মমতা ব্যানার্জি জিন্দাবাদ", "অভিষেক ব্যানার্জি জিন্দাবাদ" বলত। এখন আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের লবিতে গিয়ে ভিড়েছে। ইডি/সিবিআই শুভেন্দুই সামলে দেবে।
    That Pig of a Morin by Guy de Maupassant অনুবাদের দায় আমার  - albert banerjee | প্রথম অংশ"এই যে, আমার বন্ধু," আমি লাবার্বকে বললাম, "তুমি এইমাত্র সেই পাঁচটি শব্দ আবার উচ্চারণ করলে, যেটা ঐ মোরিন নামের শূকরটার জন্য ব্যবহৃত হয়। কেন যেন মোরিনের নাম শুনলেই তাকে শূকর বলে ডাকা হয়, সেটা আমি কখনো বুঝতে পারি না?"লাবার্ব, যিনি একজন ডেপুটি (প্রতিনিধি), প্যাঁচার মতো চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে তুমি মোরিনের কাহিনী জানো না, অথচ তুমি লা রোশেল থেকে এসেছ?" আমি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে আমি মোরিনের কাহিনী জানি না, তাই লাবার্ব হাত ঘষতে লাগলেন এবং তাঁর বর্ণনা শুরু করলেন।"তুমি মোরিনকে চিনতে, তাই না? আর কুয়াই দে লা রোশেল-এ তার বড় কাপড়ের দোকানের কথাও মনে আছে?""হ্যাঁ, খুব ভালো করেই।""আচ্ছা তাহলে। তোমাকে জানাতে হবে যে, ১৮৬২ বা '৬৩ সালে মোরিন মজা করার জন্য বা নিজের বিনোদনের জন্য, কিন্তু স্টক পুনর্নবীকরণের অজুহাতে, প্যারিসে পনেরো দিন কাটাতে গিয়েছিলেন। তুমি তো জানোই একজন প্রাদেশিক দোকানদারের জন্য প্যারিসে পনেরো দিন মানে কী—তা তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রতি সন্ধ্যায় থিয়েটার, নারীদের ঝরঝরে পোশাক তোমার গায়ে ঘষা লাগে, আর নিরন্তর উত্তেজনা—এতে মানুষ প্রায় পাগল হয়ে যায়। কেবল টাইট পরা নর্তকী, গভীর নেকলাইনের অভিনেত্রী, গোলাকার পা, মোটা কাঁধ—সব যেন হাতের নাগালে, কিন্তু ছোঁয়ার সাহস বা ক্ষমতা নেই, আর খাবারও ঠিকঠাক হজম হয় না। শহর থেকে বেরোনোর সময় মনটা এখনও অধীর, আর মস্তিষ্কে একধরনের চুম্বনের আকাঙ্ক্ষা দোলা দেয় যা ঠোঁটে সুড়সুড়ি দেয়।"মোরিন সেই অবস্থায়ই রাত সাড়ে আটটার এক্সপ্রেস ট্রেনে লা রোশেলের টিকিট কাটলেন। স্টেশনের ওয়েটিং রুমে হাঁটতে হাঁটতে তিনি হঠাৎ এক যুবতীর সামনে থমকে দাঁড়ালেন, যিনি এক বৃদ্ধা নারীকে চুম্বন করছিলেন। তাঁর ঘোমটা উঠানো ছিল, আর মোরিন আনন্দে গুনগুন করে বললেন, 'বাহ! কী সুন্দরী মেয়ে!'"যখন তিনি বৃদ্ধাকে বিদায় জানিয়ে ওয়েটিং রুমে এলেন, মোরিন তাঁর পিছু নিলেন; তারপর তিনি প্ল্যাটফর্মে গেলেন, মোরিন আবার পিছু নিলেন; তারপর তিনি একটি ফাঁকা কামরায় উঠলেন, এবং মোরিন আবার তাঁর পিছু নিলেন। এক্সপ্রেস ট্রেনে খুব কম যাত্রী ছিল। ইঞ্জিন বাঁশি বাজাল, আর ট্রেন ছেড়ে দিল। তারা দুজনেই একা। মোরিন তাঁর দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর বয়স উনিশ বা বিশের মত হবে, ফর্সা, লম্বা, সাহসী দৃষ্টি। তিনি একটি রেলের কম্বল গায়ে জড়িয়ে শোয়ার আসনে ঘুমাতে শুয়ে পড়লেন।"মোরিন নিজেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আশ্চর্য, তিনি কে?' আর হাজারো অনুমান, হাজারো পরিকল্পনা তাঁর মাথায় ঘুরতে লাগল। তিনি ভাবলেন, 'রেলযাত্রায় এত রকমের কাহিনী ঘটে বলে শোনা যায়, হয়তো এটাও আমার জীবনে ঘটতে চলা এমন একটা ঘটনা। কে জানে? এমন সৌভাগ্য খুব হঠাৎ ঘটে, আর হয়তো আমার শুধু একটু সাহসী হওয়া দরকার। ড্যান্টন কি বলেননি—"সাহস, আরও সাহস, আর সর্বদা সাহস"? যদি ড্যান্টন না বলে থাকেন, তাহলে মিরাবো বলেছেন, কিন্তু সেটা আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার সাহস নেই। ওহ! যদি কেউ জানত, যদি কেবল মানুষের মন পড়তে পারত! আমি বাজি ধরতে পারি যে প্রতিদিন মানুষ অসাধারণ সুযোগ পেয়েও চিনতে পারে না, অথচ অল্প ইশারায় জানা যেত তার মন কী চায়।'"তারপর তিনি কল্পনা করলেন এমন সব পরিকল্পনা যা তাকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি কোনো বীরত্বপূর্ণ কাজ বা তাঁর করা কোনো সামান্য সেবার ছবি আঁকলেন, একটি প্রাণবন্ত, বিনয়ী কথোপকথন যার পরিণতি হবে ভালোবাসার প্রকাশ।"কিন্তু তিনি কোনো সুযোগ পেলেন না, কোনো অজুহাত পেলেন না, আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন, তাঁর হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে আর মাথা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। রাত কেটে গেল, আর সুন্দরী মেয়েটি তখনও ঘুমুচ্ছিল, আর মোরিন নিজের পতন ভাবতে থাকলেন। ভোর হলো, আর শিগগিরই সূর্যের প্রথম রশ্মি আকাশে দেখা দিল, একটি দীর্ঘ, স্পষ্ট রশ্মি যা ঘুমন্ত মেয়েটির মুখে পড়ল এবং তাকে জাগিয়ে দিল। তিনি বসে পড়লেন, দৃশ্য দেখলেন, তারপর মোরিনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তিনি একজন সুখী নারীর মতো হাসলেন, আকর্ষণীয় ও উজ্জ্বল দৃষ্টিতে, আর মোরিন কেঁপে উঠলেন। নিশ্চয় সেই হাসি তাঁর উদ্দেশ্যে; এটা ছিল সূক্ষ্ম আমন্ত্রণ, সেই সংকেত যার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন। সেই হাসির অর্থ ছিল: 'কী বোকা, কী নির্বোধ, কী গাধা তুমি, যে সারা রাত স্তম্ভের মতো বসে থাকলে!'আমার দিকে তাকাও, আমি কি মোহনীয় নই? আর তুমি সারা রাত এভাবে কাটিয়েছ, যখন তুমি একজন সুন্দরী নারীর সাথে একা ছিলে, মহা বোকা তুমি!'"সে এখনও তাঁর দিকে হাসছিল; সে এমনকি হেসে উঠল; আর মোরিনের মাথা খারাপ হয়ে গেল কিছু বলার জন্য, কিছু না, কিছু। কিন্তু তিনি কিছুই ভাবতে পারলেন না, কিছুই না, এবং তারপর, এক কাপুরুষের সাহসে, তিনি নিজেকে বললেন, 'যা হওয়ার হবে, আমি সব ঝুঁকি নেব,' এবং হঠাৎ, কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই, তিনি তাঁর দিকে এগোলেন, বাহু প্রসারিত, ঠোঁট বের করে, এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলেন।"তিনি তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠলেন, চিৎকার করে বললেন, 'বাঁচাও! বাঁচাও!' এবং ভয়ে চিৎকার করতে লাগলেন; তারপর তিনি কামরার দরজা খুলে বাইরে হাত নেড়ে ট্রেন থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করলেন, অন্যদিকে মোরিন প্রায় বিভ্রান্ত হয়ে নিশ্চিত যে তিনি লাফিয়ে পড়বেন, তাঁর স্কার্ট ধরে জড়িয়ে বললেন, 'ওহ, মাদাম! ওহ, মাদাম!'"ট্রেনের গতি কমে এল এবং থেমে গেল। যুবতীর উন্মত্ত ইশারায় দুই গার্ড দৌড়ে এলেন। তিনি তাদের বাহুতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, থোকা থোকা করে বললেন, 'ঐ লোকটি চেয়েছিল—চেয়েছিল—চেয়েছে—' তারপর তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।"তারা মোজ স্টেশনে পৌঁছাল, এবং কর্তব্যরত জেন্ডারম মোরিনকে গ্রেপ্তার করলেন। যখন তাঁর অশোভন প্রশংসার শিকার সেই নারী জ্ঞান ফিরে পেলেন, তখন তিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন, এবং পুলিশ তা রেকর্ড করল। দরিদ্র কাপড়ের দোকানদার সেই রাতেই বাসায় ফিরলেন, জনসমক্ষে নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা তাঁর ওপর ঝুলন্ত অবস্থায়।দ্বিতীয় অংশ"সেই সময় আমি 'ফানাল দে শারাঁত'-এর সম্পাদক ছিলাম, এবং আমি প্রতিদিন 'ক্যাফে দু কোমার্স'-এ মোরিনের সাথে দেখা করতাম, এবং তাঁর দুঃসাহসিক ঘটনার পরের দিন তিনি আমার কাছে এলেন, কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। আমি তাঁর সম্পর্কে নিজের মতামত লুকাইনি, বরং বললাম, 'তুমি একটা শূকর ছাড়া আর কিছু নও। কোনো শালীন মানুষ এরকম আচরণ করে না।'"তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে মারধর করেছিলেন, এবং তিনি তাঁর ব্যবসা ধ্বংস হওয়া, তাঁর নাম কাদায় মাখানো ও অসম্মানিত হওয়া, বন্ধুরা কলঙ্কিত ও তাঁকে উপেক্ষা করা—এসব দেখতে পাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আমার করুণা জাগালেন, এবং আমি আমার সহকর্মী রিভে-কে ডেকে পাঠালাম, একজন রসিক কিন্তু খুব বুদ্ধিমান ছোট মানুষ, যাতে তিনি আমাদের পরামর্শ দেন।"তিনি আমাকে পাবলিক প্রসিকিউটরের সাথে দেখা করতে পরামর্শ দিলেন, যিনি আমার বন্ধু ছিলেন, তাই আমি মোরিনকে বাড়ি পাঠিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন যে যে নারীকে অপমান করা হয়েছে তিনি হলেন যুবতী মাদমোয়াজেল অঁরিয়েত বোনেল, যিনি সম্প্রতি প্যারিসে গভার্নেসের সনদ পেয়েছেন এবং তাঁর মেসো মাসির সাথে ছুটি কাটাচ্ছেন, যাঁরা মোজের খুব সম্মানিত ব্যবসায়ী। মোরিনের মামলাটি আরও গুরুতর করে তুলেছিল যে মেসো অভিযোগ দায়ের করেছিলেন, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা যদি এই অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয় তাহলে মামলা ড্রপ করতে রাজি ছিলেন, তাই আমাদের তা করানোর চেষ্টা করতে হবে।"আমি মোরিনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখি তিনি উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর স্ত্রী, একজন লম্বা-চওড়া, দাড়িওয়ালা মহিলা, তাঁর ওপর নিরন্তর গালিগালাজ করছিলেন, আর তিনি আমাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বললেন, 'তাই তুমি এই মোরিন নামক শূকরটাকে দেখতে এসেছ? বেশ, এই যে তিনি, প্রিয়তম!' আর তিনি বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত কোমরে রাখলেন। আমি তাঁকে পরিস্থিতি জানালাম, আর তিনি আমাকে মেয়েটির মেসো মাসির সাথে দেখা করতে অনুরোধ করলেন। এটি ছিল একটি দায়িত্ব, আমি তা গ্রহণ করলাম, আর বেচারা লোকটি বারবার বলতে থাকল, 'আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি আমি তাকে চুম্বনও করিনি; না, এমনকি সেটাও না। আমি শপথ করে বলছি!'"আমি জবাব দিলাম, 'সব একই কথা; তুমি একটা শূকর মাত্র।' আর তিনি আমাকে যে হাজার ফ্রাঁ দিয়েছিলেন তা আমি যথাযথ ব্যবহারের জন্য নিলাম, কিন্তু যেহেতু আমি একা তাঁর মাসির বাড়ি যেতে সাহস পাচ্ছিলাম না, তাই আমি রিভে-কে আমার সাথে যেতে বললাম, তিনি রাজি হলেন শর্তে যে আমরা এখনই যাব, কারণ লা রোশেলে তাঁর কিছু জরুরি কাজ ছিল। তাই দুই ঘন্টা পরে আমরা একটি সুন্দর গ্রাম্য বাড়ির দরজায় ঘণ্টা বাজালাম। এক আকর্ষণীয় মেয়ে আমাদের দরজা খুললেন—নিশ্চয়ই সেই যুবতী, এবং আমি রিভে-কে আস্তে বললাম, 'ধুর! এখন আমি মোরিনের অবস্থা বুঝতে পারছি!'"মেসো , মঁসিয়ে তোনলে, 'ফানাল'-এর গ্রাহক ছিলেন এবং আমাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন। তিনি আমাদের খোলা মনে গ্রহণ করলেন এবং আমাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানালেন; তিনি তাঁর বাড়িতে দুই সম্পাদককে পেয়ে আনন্দিত ছিলেন, আর রিভে আমার কানে ফিসফিস করে বললেন, 'আমার মনে হয় আমরা মোরিন নামক ঐ শূকরটার ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে পারব।'"ভাইঝি ঘর থেকে চলে গিয়েছিলেন, এবং আমি সূক্ষ্ম বিষয়টি উত্থাপন করলাম। আমি তাঁর চোখের সামনে কলঙ্কের ভূত নেড়ে দিলাম; আমি সেই অনিবার্য অবমূল্যায়নের ওপর জোর দিলাম যা যুবতীকে সহ্য করতে হবে যদি এমন ঘটনা প্রকাশ পায়, কারণ কেবল চুম্বনের কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, আর ভালো মানুষটি দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হলো, কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীকে ছাড়া কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না, যিনি আজ রাতে দেরি করে ফিরবেন। কিন্তু হঠাৎ তিনি বিজয়ের চিৎকার করে বললেন, 'দেখুন, আমার একটি চমৎকার ধারণা হয়েছে; আমি আপনাদের এখানে রাতের খাবার ও ঘুমানোর ব্যবস্থা করব, আর যখন আমার স্ত্রী ফিরবেন, আশা করি আমরা বিষয়টা মিটিয়ে ফেলতে পারব।'"রিভে প্রথমে আপত্তি করলেন, কিন্তু ঐ মোরিন নামক শূকরটাকে উদ্ধারের ইচ্ছা তাঁকে রাজি করালো, এবং আমরা আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম, আর খালু আনন্দে উঠে ভাইঝিকে ডেকে তাঁর বাগানে বেড়ানোর প্রস্তাব দিলেন, বললেন, 'আমরা গুরুতর বিষয়গুলো সকাল পর্যন্ত রাখব।' রিভে এবং তিনি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন, অন্যদিকে আমি শীঘ্রই পিছিয়ে পড়লাম 'সত্যিই মোহনীয়—মোহনীয় মেয়েটির' সাথে, এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আমি তাঁর কাছে তাঁর দুঃসাহসিক ঘটনা নিয়ে কথা বলা শুরু করলাম এবং তাকে আমার মিত্র বানানোর চেষ্টা করলাম। তবে তিনি মোটেও বিব্রত বলে মনে হলেন না, এবং এমন একজন ব্যক্তির মতো শুনলেন যিনি পুরো বিষয়টি খুব উপভোগ করছেন।"আমি তাঁকে বললাম, 'ভাবুন তো, মাদমোয়াজেল, আপনার জন্য এটি কত অপ্রীতিকর হবে। আপনাকে আদালতে উপস্থিত হতে হবে, বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টির মুখোমুখি হতে হবে, সবার সামনে কথা বলতে হবে এবং রেল কামরায় ঘটে যাওয়া সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা প্রকাশ্যে বর্ণনা করতে হবে। আপনি কি মনে করেন না, আমাদের মধ্যে কথা বলতে, যদি আপনি ঐ নোংরা বদমাইশকে ফিরিয়ে না ডেকে সাহায্য না চাইতেন এবং কেবল আপনার কামরা পরিবর্তন করতেন তবে তা অনেক ভালো হতো?' তিনি হেসে উঠলেন এবং উত্তর দিলেন, 'আপনি যা বলছেন তা সত্য, কিন্তু আমি কী করতাম? আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, আর যখন কেউ ভয় পায়, তখন সে যুক্তি দিয়ে থামে না। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমি খুব আফসোস করেছিলাম যে চিৎকার করেছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আপনাকে আরও মনে রাখতে হবে যে ঐ বোকা মানুষটি কোনো কথা না বলে, পাগলের মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমি বুঝতেই পারিনি সে আমার কাছ থেকে কী চায়।'"তিনি কোনো ভয় বা ভীতিহীনভাবে আমার মুখের দিকে তাকালেন, এবং আমি নিজেকে বললাম: 'সে এক অদ্ভুত মেয়ে; আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি কীভাবে ঐ শূকর মোরিন ভুল করেছিল,' এবং আমি ঠাট্টা করে বললাম, 'আসুন, মাদমোয়াজেল, স্বীকার করুন যে তিনি ক্ষমার যোগ্য ছিলেন, কারণ শেষ পর্যন্ত, আপনার মতো সুন্দরী মেয়ের সামনে একজন পুরুষ তার প্রাকৃতিক চুম্বনের ইচ্ছা অনুভব না করে পারে না।'"তিনি আগের চেয়েও বেশি হাসলেন এবং দাঁত দেখিয়ে বললেন, 'ইচ্ছা এবং কাজের মধ্যে, মঁসিয়ে, শ্রদ্ধার জায়গা আছে।' এটি একটি অদ্ভুত অভিব্যক্তি ছিল, যদিও খুব স্পষ্ট ছিল না, এবং আমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, 'আচ্ছা, এখন যদি আমি আপনাকে চুম্বন করি, তাহলে আপনি কী করবেন?' তিনি থেমে আমাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখলেন এবং তারপর শান্তভাবে বললেন, 'ওহ, আপনি? এটা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার।'"আমি খুব ভালো করেই জানতাম, যে সেটা একই ব্যাপার নয়, কারণ আশেপাশের সবাই আমাকে 'হ্যান্ডসাম লাবার্ব' বলে ডাকত—আমার বয়স তখন ত্রিশ বছর—কিন্তু আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কেন, বলুন তো?' তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন এবং উত্তর দিলেন, 'আচ্ছা! কারণ আপনি তাঁর মতো বোকা নন।' আর তারপর তিনি চালাকি করে আমার দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন, 'না এত কুৎসিতও নন।' আর তিনি নড়াচড়া করার আগেই আমি তাঁর গালে এক জোরালো চুম্বন বসিয়ে দিলাম। তিনি সরে গেলেন, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে, এবং তারপর বললেন, 'আচ্ছা, আপনিও তো কম লাজুক নন! কিন্তু এরকম আর করবেন না।'"আমি বিনীত ভাব ধারণ করে নিচু গলায় বললাম, 'ওহ, মাদমোয়াজেল! আমার জন্য, যদি এমন কিছু থাকে যা আমি বেশি চাই, তা হলো মোরিনের মতো একই কারণে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হওয়া।'"'কেন?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আর তাঁর দিকে অবিচল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমি উত্তর দিলাম, 'কারণ আপনি জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরীদের একজন; কারণ আপনার প্রতি সহিংসতা করার ইচ্ছা আমার জন্য সম্মান ও গৌরবের বিষয় হত, আর আপনার পরে দেখে লোকেরা বলত: "আচ্ছা, লাবার্ব যা পেয়েছে তা সে পুরোপুরি পেয়েছে, কিন্তু তবুও সে ভাগ্যবান লোক।"'"তিনি আবার প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়লেন এবং বললেন, 'আপনি কত মজার!' আর তিনি 'মজার' শব্দটি শেষ করার আগেই আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরে উদ্যমের সাথে চুম্বন করতে লাগলাম যেখানেই জায়গা পাচ্ছি—কপালে, চোখে, মাঝে মাঝে ঠোঁটে, গালে, মাথায় সব জায়গায়, কিছু অংশ যা তিনি বাধ্য হয়ে উন্মুক্ত রাখছিলেন অন্যগুলো বাঁচানোর জন্য; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে মুক্ত করলেন, লাল হয়ে ও রেগে। 'আপনি খুব অভদ্র, মঁসিয়ে,' তিনি বললেন, 'এবং আমি আফসোস করছি যে আমি আপনার কথা শুনেছি।'"আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে তাঁর হাত ধরে থোকা থোকা করে বললাম, 'আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে ক্ষমা করুন, মাদমোয়াজেল। আমি আপনাকে অপমান করেছি; আমি পাশবিক আচরণ করেছি! আমি যা করেছি তার জন্য আমার ওপর রাগ করবেন না। যদি আপনি জানতেন—' আমি নিরর্থক কোনো অজুহাত খুঁজতে লাগলাম, এবং কিছু মুহূর্তের মধ্যে তিনি বললেন, 'আমার জানার কিছু নেই, মঁসিয়ে।' কিন্তু আমি বলার মতো কিছু খুঁজে পেয়েছিলাম, এবং আমি চিৎকার করে বললাম, 'মাদমোয়াজেল, আমি আপনাকে ভালোবাসি!'"তিনি সত্যিই অবাক হলেন এবং আমার দিকে তাকাতে চোখ তুললেন, এবং আমি বলতে থাকলাম, 'হ্যাঁ, মাদমোয়াজেল, এবং দয়া করে আমার কথা শুনুন। আমি মোরিনকে চিনি না, এবং তাঁর সম্পর্কে আমার কিছু যায় আসে না। তিনি বিচারের মুখোমুখি হন আর তালাবদ্ধ থাকেন সেটা আমার কাছে তেমন কিছু নয়। আমি গত বছর এখানে আপনাকে দেখেছিলাম, এবং আমি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে আপনার চিন্তা তখন থেকে আমাকে ছাড়েনি, এবং আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি আপনাকে আরাধ্য ভেবেছিলাম, এবং আপনার স্মৃতি আমাকে এতটাই পেয়ে বসেছিল যে আমি আবার আপনাকে দেখার জন্য আকুল হয়েছিলাম, এবং তাই আমি ঐ বোকা মোরিনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করলাম, আর এই যে আমি এখানে। পরিস্থিতি আমাকে সম্মানের সীমা অতিক্রম করিয়েছে, এবং আমি কেবল আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে পারি।'"তিনি আমার দিকে তাকালেন আমি সিরিয়াস কিনা এবং আবার হাসতে প্রস্তুত কিনা। তারপর তিনি গুনগুন করে বললেন, 'বাজে কথা বলবেন না!' কিন্তু আমি হাত তুলে সত্যিকারের সুরে বললাম (এবং আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে আমি সিরিয়াস ছিলাম): 'আমি শপথ করে বলছি আমি সত্য বলছি,' এবং তিনি খুব সহজভাবে উত্তর দিলেন, 'বাজে কথা বলবেন না!'"আমরা একা ছিলাম, পুরোপুরি একা, কারণ রিভে এবং তাঁর খালু একটা ফুটপাথ দিয়ে অদৃশ্য হয়েছিলেন, এবং আমি তাঁকে ভালোবাসার সত্যিকারের ঘোষণা দিলাম, যখন আমি তাঁর হাত চেপে ধরলাম এবং চুম্বন করলাম, এবং তিনি তা নতুন ও আনন্দদায়ক কিছু হিসেবে শুনলেন, ঠিক কতটা বিশ্বাস করবেন তা না জেনেই, আর শেষ পর্যন্ত আমি উত্তেজিত বোধ করলাম, এবং সত্যিই নিজেও যা বলেছি তা বিশ্বাস করতে লাগলাম। আমি ফ্যাকাশে, উদ্বিগ্ন এবং কাঁপছিলাম, এবং আমি আলতো করে তাঁর কোমরে হাত রাখলাম এবং তাঁর কানের পাশের ছোট পাকানো চুলে ফিসফিস করে নরম গলায় কথা বললাম। তিনি স্বপ্নের মতো মনে হলেন, এতটাই চিন্তায় মগ্ন ছিলেন।"তারপর তাঁর হাত আমার হাত স্পর্শ করল, এবং তিনি তা চেপে ধরলেন, এবং আমি ধীরে ধীরে কিন্তু শক্ত করে তাঁর কোমর জড়িয়ে ধরলাম। তিনি এখন নড়ছিলেন না, এবং আমি তাঁর গালে ঠোঁট রাখলাম, এবং হঠাৎ অনিচ্ছায় আমার ঠোঁট তাঁর ঠোঁটের সাথে মিলিত হলো। এটি ছিল একটি দীর্ঘ, দীর্ঘ চুম্বন, এবং তা আরও দীর্ঘস্থায়ী হত যদি আমি আমার পেছনে 'হ্ম! হ্ম!' শব্দ না শুনতাম, যা শুনে তিনি ঝোপের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে গেলেন, এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম রিভে আমার দিকে আসছেন, এবং পথের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো হাসি ছাড়াই বললেন, 'এইভাবে তুমি সেই মোরিন নামক শূকরটার ব্যাপার মিটিয়ে ফেলছ?' আর আমি গর্বিতভাবে জবাব দিলাম, 'কাজ যেটা পারা যায়, প্রিয় বন্ধু, তাই করি। কিন্তু খালুর কী অবস্থা? তাঁর সাথে কেমন চলল? ভাইঝির দায়িত্ব আমার।' 'আমি তাঁর সাথে তেমন সৌভাগ্যবান হইনি,' তিনি উত্তর দিলেন।"অতঃপর আমি তাঁর হাত ধরলাম এবং আমরা ভেতরে গেলাম।"তৃতীয় অংশ"রাতের খাবার আমাকে পুরোপুরি মাথা হারাতে বাধ্য করল। আমি তাঁর পাশে বসলাম, এবং টেবিলক্লথের নিচে আমার হাত বারবার তাঁর হাতের সাথে মিলিত হচ্ছিল, আমার পা তাঁর পা স্পর্শ করছিল এবং আমাদের দৃষ্টি মিলছিল।"রাতের খাবারের পর আমরা চাঁদের আলোয় হাঁটতে গেলাম, এবং আমি তাঁর কাছে সমস্ত কোমল কথা ফিসফিস করে বললাম যা ভাবতে পারি। আমি তাঁকে কাছে জড়িয়ে ধরলাম, প্রতি মুহূর্তে চুম্বন করলাম, অন্যদিকে তাঁর খালু এবং রিভে আমাদের সামনে হাঁটতে হাঁটতে তর্ক করছিলেন। তারা ভেতরে গেলেন, এবং শীঘ্রই এক বার্তাবাহক মাসির কাছ থেকে একটি টেলিগ্রাম নিয়ে এলেন, যাতে বলা হলো তিনি আগামীকাল সকাল সাতটায় প্রথম ট্রেনে ফিরবেন না।"'ঠিক আছে, অঁরিয়েত,' তাঁর মেসো বললেন, 'ভদ্রলোকদের তাদের ঘর দেখিয়ে দাও।' তিনি প্রথমে রিভেকে তাঁর ঘর দেখালেন, এবং তিনি আমার কাছে ফিসফিস করে বললেন, 'আগে তোমার ঘরে নিয়ে যাওয়ার কোনো বিপদ ছিল না।' তারপর তিনি আমাকে আমার ঘরে নিয়ে গেলেন, এবং তাঁর সাথে একা পেয়ে আমি আবার তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম এবং তাঁর আবেগ জাগানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু যখন তিনি বিপদ দেখতে পেলেন, তিনি ঘর থেকে পালিয়ে গেলেন, এবং আমি অত্যন্ত বিরক্ত ও উত্তেজিত এবং বোকা বোধ করে ঘরে ফিরে এলাম, কারণ আমি জানতাম যে আমি বেশি ঘুমাব না, এবং ভাবছিলাম কীভাবে এমন ভুল করলাম, এমন সময় আমার দরজায় আলতো করে টোকা পড়ল, এবং আমি জিজ্ঞেস করলাম কে, আস্ত গলায় উত্তর এল, 'আমি।'"আমি তাড়াতাড়ি পোশাক পরে দরজা খুললাম, এবং তিনি ভেতরে এলেন। 'সকালে আপনি কী নেবেন তা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম,' তিনি বললেন; 'চকলেট, চা নাকি কফি?' আমি তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে উৎসাহের সাথে চুম্বন করতে করতে বললাম, 'আমি নেব—আমি নেব—'"কিন্তু তিনি আমার বাহু থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন, আমার মোমবাতি নিভিয়ে দিলেন এবং অদৃশ্য হয়ে গেলেন, আর আমাকে অন্ধকারে একা রেখে গেলেন, ক্ষিপ্ত হয়ে, কিছু ম্যাচ খুঁজতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পেলাম না। শেষে কিছু পেলাম এবং আমি করিডোরে গেলাম, হাতে মোমবাতি নিয়ে প্রায় পাগল হয়ে।"আমি কী করতে যাচ্ছিলাম? আমি যুক্তি করতে থামিনি, আমি কেবল তাঁকে খুঁজে বের করতে চেয়েছিলাম, আর খুঁজবই। আমি চিন্তা না করে কয়েক পা এগোলাম, কিন্তু তারপর হঠাৎ ভাবলাম, 'যদি আমি খালুর ঘরে চলে যাই, তবে কী বলব?' এবং আমি থমকে দাঁড়ালাম, মাথা শূন্য আর হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে। কিন্তু কিছু মুহূর্তের মধ্যে আমি একটি উত্তর ভাবলাম: 'অবশ্যই, আমি বলব যে আমি রিভের ঘর খুঁজছিলাম তাঁর সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার জন্য,' এবং আমি সব দরজা পরীক্ষা করতে শুরু করলাম, তাঁর দরজা খুঁজতে, এবং শেষে আমি একটি হাতল ধরে ফেললাম, ঘুরিয়ে ভেতরে গেলাম। সেখানে অঁরিয়েত, তাঁর বিছানায় বসে অশ্রুসজল নেত্রে আমার দিকে তাকিয়ে। তাই আমি ধীরে ধীরে চাবি ঘুরিয়ে, পায়ের আঙুলের ওপর হেঁটে তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, 'আমি আপনাকে কিছু পড়ার জন্য জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম, মাদমোয়াজেল।'"আমি চুপিচুপি নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছিলাম, এমন সময় এক মোটা হাত আমাকে ধরে ফেলল এবং একটি গলা—সেটা রিভের গলা—আমার কানে ফিসফিস করে বলল, 'তাই তুমি এখনও মোরিনের ব্যাপারটা মিটাতে পারোনি?'"পরদিন সকাল সাতটায় অঁরিয়েত নিজেই আমাকে এক কাপ চকলেট নিয়ে এলেন। আমি এর আগে কখনো এরকম কিছু পান করিনি—নরম, মখমলি, সুগন্ধি, দিব্যি। আমি কাপ থেকে ঠোঁট সরাতে পারছিলাম না, এবং তিনি ঘর ছাড়তেই রিভে ঢুকলেন। তিনি উত্তেজিত এবং খিটখিটে মনে হলেন, যেমন একজন মানুষ যিনি ঘুমাননি, এবং তিনি রাগ করে আমাকে বললেন:'এভাবে চলতে থাকলে তুমি সেই মোরিন নামক শূকরটার ব্যাপার শেষ পর্যন্ত নষ্ট করে দেবে!'"সকাল আটটায় মাসি এলেন। আমাদের আলোচনা খুব সংক্ষিপ্ত ছিল, কারণ তারা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিলেন, এবং আমি শহরের দরিদ্রদের জন্য পাঁচশ ফ্রাঁ রেখে গেলাম। তারা আমাদের সারা দিন রাখতে চাইলেন, এবং কিছু ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাওয়ার আয়োজন করলেন। অঁরিয়েত তাঁর বাবা-মার পিছনে আমার দিকে ইশারা করলেন থাকার জন্য, এবং আমি রাজি হলাম, কিন্তু রিভে যেতে বদ্ধপরিকর ছিলেন, এবং যদিও আমি তাঁকে একপাশে নিয়ে অনুরোধ ও মিনতি করলাম আমার জন্য এটা করতে, তিনি সম্পূর্ণ বিরক্ত হয়ে বলতে থাকলেন, 'ঐ মোরিন নামক শূকরটার ব্যাপার আমার যথেষ্ট হয়েছে, শুনতে পাচ্ছ?'"অবশ্যই আমাকেও চলে যেতে বাধ্য হলাম, এবং এটা ছিল আমার জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোর একটি। আমি সারা জীবন ঐ ব্যাপারটা মিটিয়ে চলতে পারতাম, এবং যখন আমরা রেল কামরায় ছিলাম, চুপচাপ তাঁর সাথে করমর্দন করার পর, আমি রিভেকে বললাম, 'তুমি নিছক পশু!' এবং তিনি উত্তর দিলেন, 'আমার প্রিয় বন্ধু, তুমি আমাকে বিরক্ত করতে শুরু করেছিলে খুব বেশি।'"'ফানাল'-এর অফিসে পৌঁছে আমি দেখি এক ভিড় আমাদের অপেক্ষা করছে, এবং তারা আমাদের দেখতেই চিৎকার করে উঠল, 'আচ্ছা, ঐ মোরিন নামক শূকরটার ব্যাপার মিটিয়েছ?' গোটা লা রোশেল এ নিয়ে উত্তেজিত ছিল, এবং রিভে, যিনি যাত্রাপথে তাঁর খিটখিটে ভাব কাটিয়ে উঠেছিলেন, খুব কষ্টে নিজেকে হাসি থামিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, লাবার্বের কল্যাণে আমরা তা করতে পেরেছি।' এবং আমরা মোরিনের কাছে গেলাম।"তিনি একটি আরামকেদারায় বসেছিলেন, পায়ে প্লাস্টার আর মাথায় ঠান্ডা ব্যান্ডেজ, দুঃখে প্রায় মৃত। তিনি এমন একজন মৃতপ্রায় মানুষের মতো শুকনো কাশি কাশছিলেন, কেউ জানত না কীভাবে তা ধরেছে, আর তাঁর স্ত্রী তাঁকে বাঘিনীর মতো তাকিয়ে ছিলেন যেন খেয়ে ফেলবেন, এবং আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি এত জোরে কেঁপে উঠলেন যে তাঁর হাত-পা কাঁপতে লাগল, তাই আমি তাঁকে তৎক্ষণাৎ বললাম, 'সব মিটে গেছে, তুমি নোংরা বদমাইশ, কিন্তু এ ধরনের কাজ আর করবে না।'"তিনি উঠে দাঁড়ালেন, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে, আমার হাত ধরে রাজকুমারের হাতের মতো চুম্বন করলেন, কাঁদলেন, প্রায় অজ্ঞান হলেন, রিভেকে জড়িয়ে ধরলেন এবং এমনকি মাদাম মোরিনকেও চুম্বন করলেন, যিনি তাঁকে এত জোরে ধাক্কা দিলেন যে তিনি হোঁচট খেয়ে আবার চেয়ারে পড়ে গেলেন; কিন্তু তিনি কখনো এই আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারলেন না; তাঁর মনের ওপর এত বেশি চাপ পড়েছিল। আর আশেপাশের সমস্ত অঞ্চলে, তিনি 'ঐ মোরিন নামক শূকর' ছাড়া অন্য কিছুতে ডাকতেন না, এবং এই উপাধিটি প্রতিবার শুনলে তাঁর মধ্যে তরবারির আঘাতের মতো বিঁধত। যখন কোনও রাস্তার ছেলে তাঁর পিছনে ডাকত 'শূকর!' তিনি স্বভাবতই মাথা ঘুরাতেন। তাঁর বন্ধুরাও তাঁকে ভয়ানক ঠাট্টায় জর্জরিত করত এবং যখনই তারা শুয়োরের মাংস খেত, জিজ্ঞেস করত, 'এটা কি তোমার নিজের টুকরো?' তিনি দুই বছর পর মারা গেলেন।"আমার নিজের কথা বলি, ১৮৭৫ সালে যখন আমি চেম্বার অফ ডেপুটিজের প্রার্থী ছিলাম, আমি ফুসেরের নতুন নোটারি, মঁসিয়ে বেলোংকলের কাছে তাঁর ভোট চাইতে গেলাম, এবং একজন লম্বা, সুদর্শন ও স্পষ্টতই ধনী মহিলা আমাকে গ্রহণ করলেন। 'আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?' তিনি বললেন। আর আমি থোকা থোকা করে বললাম, 'কেন—না—মাদাম।' 'অঁরিয়েত বোনেল।' 'আহ!' আর আমি অনুভব করলাম আমি ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছি, অন্যদিকে তিনি সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন এবং আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ছিলেন।"যখন তিনি আমাকে তাঁর স্বামীর সাথে একা রেখে চলে গেলেন, তিনি আমার দুই হাত ধরে চেপে ধরলেন যেন চূর্ণ করবেন, এবং বললেন, 'আমি অনেকদিন ধরে আপনার সাথে দেখা করতে চাচ্ছিলাম, প্রিয় মহাশয়, কারণ আমার স্ত্রী প্রায়ই আপনার সম্পর্কে আমাকে বলেছেন। আমি জানি—হ্যাঁ, আমি জানি কী বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে আপনি তাঁর সাথে পরিচিত হয়েছিলেন, এবং আমি আরও জানি আপনি কত সুন্দর আচরণ করেছিলেন, কত সূক্ষ্মতা, কৌশল ও নিষ্ঠা দেখিয়েছিলেন সেই বিষয়ে—' তিনি থামলেন এবং তারপর নিচু সুরে বললেন, যেন তিনি কিছু নিচু ও অশ্লীল কথা বলছেন, 'ঐ মোরিন নামক শূকরটার বিষয়ে।'" 
  • ভাট...
    commentManali Moulik | ৩ ইতিহাস ও রাজনীতিতে বলুন-- শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব নামক সোনার পাথরবাটি কী জিনিস? কেন সবচেয়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আমেরিকা ইংলণ্ডে বিপ্লব না হয়ে পিছিয়ে থাকা কৃষি প্রধান দেশ রাশিয়ায় হল? অতি উৎপাদনের সমস্যা, রিজার্ভ আর্মি অফ লেবারের সমস্যা ইত্যাদি। রাশিয়ার মত সমাজতান্ত্রিক দেশে পুঁজির সামাজিকীকরণ হয়েছিল না রাষ্ট্রীয় করণ? শ্রমিকেরা পুঁজির (অর্থাৎ উৎপাদনের সাধন) মালিক হয়েছিল ? নাকি বিপ্লবের আগের অবস্থার মত ওয়েজ লেবার থেকে গেল?
     
     
     
     
    শ্রমিকের একনায়কত্ব তো তখনই আসবে যখন ক্ষমতা ও উৎপাদন শক্তি দুটোই যাবে তাদের হাতে। এখানে লেনিনের "imperialism : the highest stage of capitalism " গ্রহণযোগ‍্য। আমেরিকা বা ইংল‍্যন্ডের সর্ববৃহৎ উপনিবেশ ও পুঁজিবাদী কাঠামো থাকা সত্ত্বেও তারা সফল হয়েছিলো একটি "অনুগত - অভিজাত শ্রমিক শ্রেণী" তৈরী করতে। উদবৃত্ত মূল‍্যের সামান‍্য অংশ তাদের দিয়ে একটা স্তাবক শ্রেণী যারা বিপ্লব বা পরিবর্তন হতে দেবে না। তবে এরও সমালোচনা আছে। ডেভীড টমসন লেনিনের এই ধারণাকে হার্সলি ক্রিটিসাইজ করে বলছেন, ডেনমার্ক বা সুইডেনের তো কোনো উপনিবেশ ছিলো না বা খুব বড়োলোক দেশও তারা নয়। সেখানে তাহলে অনুগত শ্রমিক শ্রেণী গড়ে উঠলো কীকরে?
    স্বাস্থ‍্য, বীমা, শিক্ষা, সমবায়, ইত‍্যাদি আলতোভাবে দিয়ে যে আনুগত্য তৈরী করা সেটা 'বোনাপার্টিষ্ট ষ্টেট' (তৃতীয় নেপোলিয়ন দ্বারা অনুপ্রাণিত ) এর লক্ষণ বলা চলে। আসলে মূল উন্নয়ন কিছুই হয় না কেবল রিলেটিব অটোনমির একটু চালচলন বদলে দেওয়া। গ‍্যারি মিলল‍্যান্ড আর এরিখ হবসবমের সমালোচনা ও ব‍্যাখ‍্যামূলক কাজ আছে এটার উপর। সোভিয়েতের পতনের কারণ তো অবশ‍্যই পার্টির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভবন হওয়া। তবে প্রথমে যা হয়েছিলো, সেটা অ‍্যাকশন ডগমার থেকে বেশী বলা চলে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলি ন‍্যাশানালীজমের সঙ্গে সোশ‍্যালীজমে সংযুক্ত করে একটা নব‍্য-ধারণা তৈরী করেছে। এগুলো প্রতিটা দেশের ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল। তা অবশ‍্যই গ্রহণযোগ‍্য।
    commentManali Moulik | //১ দর্শনে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ! হেগেল আর ফয়েরবাখ, ইউনিটি অফ অপোজিট, নেগেশন অফ নেগেশন--খালি শব্দগুলো জানি।//
     
     
     
    রঞ্জন স‍্যার, দেখুন, হেগেল সম্পর্কে বাট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, "সহজ ভাষায় ফিলোসফিকে ব‍্যাখ‍্যা করা কেন ওনাকে কেউ শেখাতে পারেননি?" খুব সত‍্যি কথা। হেগেল বোঝা অতি দুঃসাধ‍্য। এবার মোটমাট কথা হলো জার্মানির ক্ষতবিক্ষত অবস্থা ও গঠনগত পরিবর্তন আনতে না পারা ফলে ইন্টেলিজেন্সিয়ার পতন ওনাকে ব‍্যথিত করেছিলো। তাই একটা ষ্ট্রং সেন্ট্রালাইজেশনের দিকে ওনার মন এগিয়ে চলেছিলো। এবার হেগেলের মূল বক্তব‍্য বা ডায়ালেক্টিকাল মেথড মার্কস গ্রহণ করেন। কিন্তু অপরদিকে মেটেরিয়ালিজম ওনার নিজস্ব তত্ত্ব। এখানে বক্তব্য হচ্ছে প্রতিটি বস্তুর মধ‍্যে দুটি বিপরীত সত্ত্বা কাজ করছে। সেই দুটি অপোজিশন যখন একত্রে আসে তার পরিণতি ঘটে উত্তরণের দিকে। এটা পরে জোসেফ ষ্টালিন বলেছিলেন রুশ বিপ্লবের ব‍্যাখ‍্যায়। যে যা যা জায়মানভাবে বেড়ে চলেছে, তা বৈপরীত‍্যকামী ক্ষয়িষ্ণুতার সঙ্গে সংঘর্ষে আসতে বাধ‍্য ও দুটির সংঘাত ঘটবে। তখন রাশিয়ায় ও সমগ্র ইউরোপে বেড়ে চলেছিলো শ্রমিক শ্রেণীর সংখ‍্যা, অসন্তুোষ ও জীবনযাপনের অবনমন। তাই ক্রমবর্ধমান শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থের সংঘাত দেখা যায়। নারদনিয়া ভলিয়‍্যা কিন্তু ব‍্যর্থ হয়। এর মানে এই নয় যে যারা সবচেয়ে গরীব তারাই বিপ্লবে জয়যুক্ত হবে। তাহলে তো ভিখারী বা ভবঘুরেরা আগে হওয়ার কথা। বৈপরীত্যযুক্ত ক্রমঅগ্রসর শ্রেণী এটা করে।
     
    হেগেলের তত্ত্বের মূল ধারণার একটা স্তম্ভ এই নেগেশন অফ নেগেশন। যেটিকে মার্কস তত্ত্বের ধারণায় ব‍্যবহার করেন। খুব সোজা কথায় একটা গাছের বীজ হতে পারে (থিসিস), বীজ অঙ্কুরিত হয়ে গাছ জন্মালো ও ফুল ফল ধরলো (অ‍্যান্টিথিসিস) ফল বিদীর্ণ হয়ে আবারনতুন বীজ পাওয়া গেলো (সিন্থেসিস) শ্রমের মূল‍্য থেকেই বর্তমান ক‍্যাপিটালিষ্ট সভ‍্যতার উন্নতি, কিন্তু সেখানে শ্রমিকের মূল‍্যহীনতা ও শোষণ অ‍্যান্টিথিসিস। যখন নতুন সমাজকাঠামোয় শ্রমিক তার যোগ‍্য মূল‍্য ও সম্মান পাবে সেটা হবে সিন্থেসিস। নেগেশন ইন নেগেশন খুব সহজ কথায় বলা যায়, অ‍্যালজেব্রায় (-) × (-) = (+) অথবা
    কাল আমার কলেজ যাওয়া হবে না। (আমি কলেজ যাবো না)
    কাল আমার কলেজ না যাওয়াটা হবে না। (অবশ‍্যই আমাকে কলেজ যেতে হবে)
    এখন হেগেলের চিন্তাধারার দুটি বিভাজন আছে, কনজারভেটিভ হেগেলিয়ান যথা ফয়েরবাখ ও র‍্যাডিকাল হেগেলিয়ান যথা মার্কস। ফয়েরবাখের বক্তব‍্য হিউম‍্যানিষ্ট, ইকোনমিস্ট ততোটা নয়। ধরুন 'এলিয়েনেশন' ব‍্যাপারটা। ফয়েরবাখ বলছেন যে যখন একটা মানুষ তার বাস্তব চাহিদা (অর্থনৈতিক, সামাজিক এগুলির ) পরিতৃপ্তি না পায়, সে নিজেকে বিছিন্ন করে ও কাল্পনিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। এটি নিজের কাছ থেকে পালানোর পন্থা। মার্কসের ধর্ম ও ঈশ্বর বিষয়ে ধারণা সুবিশাল, সে আলোচনার সবটা আমার জানা নেই এখানে করছিও না। তবে একটা কথা বলবো, বাঙালিরা যে 'রিলিজীয়ন হচ্ছে অপিয়াম" বলে ছেড়ে দেয়, কথাটি কিন্তু ওইটুকু নয়।
    " Religion is the sigh of oppressed creatures, heart of the heartless condition, soul of the soulless condition and opium of the masses."
    আফিম তো নেশাদ্রব‍্য কেবল না। ব‍্যথা সারানোর ওষুধও বটে। ধরে নিন, এক কৃষকের স্ত্রীকে এলাকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দাদারা তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করলো। পুলিশ অভিযোগ নিলো না। বললো, "প্রমাণ কী?"
    -- আমার ভাই নিজের চোখে দেখেছে।"
    তারা খিক করে হেসে বললো, "যদি বলি পয়সা দিয়েই করছিলাম? তোর ভাই দেখে ফেলায় বউ লজ্জা বাঁচাতে মিথ‍্যে বলেছে?"
    সে জানে কেউ নেই। কাউকে বলার নেই। পরিশ্রান্তদেহে একটু চৌধুরীবাড়ির কৃষ্ণমন্ডপে যাওয়া যাক। সব পাপ আর যন্ত্রণার বাইরে মনটা ঠাকুরের নাম শুনে শান্ত হবে। সেটাই কিন্তু আফিমের তাপহরণ গুণ। আর 'পুতুলনাচের ইতিকথায়' তো যাদব পন্ডিত ও ওনার স্ত্রীর আফিম খেয়ে স্বেচ্ছামৃত‍্যুর কেসটা শশী ডাক্তার বলেই বুঝতে পেরেছিলো। কিন্তু সিঁদুর মালা ঢাকঢোলের আফিমসম হট্টগোলের মধ‍্যে একা সে কিছুই করতে পারেনি। মানিকবাবু সত‍্যি আফিম আর ধর্মের আফিম মিলিয়েছেন এইভাবেই না?
    commentRanjan Roy | তরমুজ
     
    বেশ, আপনি মার্ক্সবাদ বোঝেন। বাঙালিরা বোঝে না। অবাঙালিরা বোঝে। বেশ।
    তা আমাদের একটু বোঝান না!
     
    ১ দর্শনে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ!
    হেগেল আর ফয়েরবাখ, ইউনিটি অফ অপোজিট, নেগেশন অফ নেগেশন--খালি শব্দগুলো জানি।
    আপনি একটু বুঝিয়ে দিন।
    ২ ইকনমিক্সে সারপ্লাস ভ্যালু কী করে সৃষ্ট হয়। পুঁজির অর্গানিক কম্পোজিশন, প্রবলেম অফ ভ্যালু রিয়ালাইজেশন এগুলো বলুন। আর টেকনোলজির উন্নতিতে ক্যাপিটালে কী পরিবর্তন আসবে/ তাতে শ্রমিকের হাল কী হবে? একটু বলুন।
    ৩ ইতিহাস ও রাজনীতিতে বলুন-- শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব নামক সোনার পাথরবাটি কী জিনিস? কেন সবচেয়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আমেরিকা ইংলণ্ডে বিপ্লব না হয়ে পিছিয়ে থাকা কৃষি প্রধান দেশ রাশিয়ায় হল? অতি উৎপাদনের সমস্যা, রিজার্ভ আর্মি অফ লেবারের সমস্যা ইত্যাদি।
    রাশিয়ার মত সমাজতান্ত্রিক দেশে পুঁজির সামাজিকীকরণ হয়েছিল না রাষ্ট্রীয় করণ? শ্রমিকেরা পুঁজির (অর্থাৎ উৎপাদনের সাধন) মালিক হয়েছিল ? নাকি বিপ্লবের আগের অবস্থার মত ওয়েজ লেবার থেকে গেল?
     
    ৪ আর কেন সাম্যবাদী রাজনীতি ক্ষমতায় না থাকলে মানবাধিকার, বহুত্ববাদ, মত প্রকাশের অধিকার এসব নিয়ে গলা ফাটায় আর ক্ষমতায় এলে জনগণের স্বার্থে এক রাষ্ট্র, এক পত্রিকা, একদলীয় রাজনীতির কথা বলে?
     
    লিস্ট যদি লম্বা হয়ে থাকে তাহলে একটা একটা করে একেক দিনে বলুন।
    সবাই শুনব।
     
    পালিয়ে যাবেন না।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত