এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    আশির আউনিবাউনি - স্মৃতি ভদ্র | ছবি: রমিতএকটা প্রকান্ড বরইগাছের তলায় দাঁড়ানো দোতলা টিনের ঘর। বহুদিনের রোদজলে টিনগুলোতে জং ধরা সময় এমনভাবে গেঁড়েগুড়ে বসে থাকতো যে তাকাতেই বহুবছরি জীবনের গল্প একদম রাখঢাক না করেই বলে দিতো বিনাদ্বিধায়। পিচঢালা পথ ছেড়ে কম করে হলে শ’কদম। মাটির, ছায়াঢাকা পথ। সে পথের দু’পাশে দেবদারু গাছের সবুজ প্রহরা। একটু কসরত করলেই ডানেবামে সেই নিছিদ্র প্রহরা অতিক্রম করে চোখ চলে যায় তাঁতঘরে। তবে সেসব তাঁতঘরে মাকুর আওয়াজ কমতে শুরু করে দিয়েছিলো ততদিনে। হাতে টানা তাঁতমাকুর নিরবচ্ছিন্ন ‘খটাস খটাস’ শব্দ বুজে আসা শুরু হলেও ভেতর বাড়ির উঠোনে তখনও অবশিষ্ট বনেদিয়ানা বিদ্যমান। উঠোনের রোদে তিল তিসির যুগলবন্ধন, ঢেঁকিপাড়ে তুলসীমালা চালের গুঁড়ো গুঁড়ো সময় আর কারণে অকারণে উনুনে পরবের পদ—সবই আসলে পুরোনোকে বহাল রাখার যথাযোগ্য চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে সময়ের গতি তো একমুখী। তাই পুরোনো যতই ধুয়েমুছে যত্ন করে রাখো না কেন নতুনের আছড়ে পড়া ঢেউকেও যে আপন করে নিতে হয়, এটা মনে হয় জীবনের স্বত:সিদ্ধ বোঝাপড়া। তাই উঠোনের অন্যপাশে প্রাচীন কতগুলো সারাবছরি আম গাছের বিসর্জন কালেই বাজনা বেজে উঠেছিলো ইমারত বোধনের। দিনক্ষণ দেখে সাহাপাড়ার গোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত তেল সিঁদুর মাখানো নারায়ণ শিলা যেদিন তুলসীতলায় রাখলো ঠিক সেদিনই উলুযোগারের আওয়াজে স্পষ্ট হয়েছিলো বাড়িতে লক্ষ্মীবরণের প্রস্তুতিও চলছে। তিনখানা সিমেন্টের ঘর। হালকা হলুদ রঙের দেওয়াল। নতুন আসবাব। শ্রাবণের মেঘে উড়ে এসেছিলো বারতা। বাঘকাকুর বিয়ে। পাশের পাড়ার সুতনূ কিশোরী আমার ছোট বৌমা হয়ে আসছে। সময়টা আশির প্রথমভাগ। দাদুর রেডিও তখনও কাঠের টেবিলে নিত্য পরিসেবারত। তবে ওই যে যুগের হাওয়া, যার টোকায় একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাবার নামই তো জীবন!ছোট বৌমা বাড়িতে এলো শ্রাবণের এক সন্ধ্যায়। আর তাকে বৌভাতের দিনে স্বয়ং বাঘকাকু উপহার দিলো নতুন এক অবাক বাকশো। সে বাকশো বাড়িতে ঢুকতেই সকলের ভেতর অস্ফুট শোরগোল। দত্ত স্টুডিও থেকে সাটার টানা ক্যামেরাও বাড়িতে এলো সময়কে কালো রিলে বন্দি করবে বলে। ঝলমলে ছোটবৌমা গা ভর্তি গহনা পড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সেই অবাক বাকশোর পাশে। ক্লিক…ক্লিক…ক্লিক…রিলে টানা সময়ের চালচিত্রে শুরু হলো বাড়ির উঠোনের এক নতুন গল্প।যদিও গল্পের মধ্যমণি যথারীতি সেই অবাক বাকশো। বিশ ইঞ্চির এক বড়সড় বাকশো। সামনে কাঁচ লাগানো আর কতগুলো রুপালী রঙের নব। সেসব নব ঘুরালে প্রথমে কাঁচের দেয়ালে সাদাকালো ঝিরঝির। এরপর উঠোনে বাঁশের মাথায় লাগানো এন্টেনার মাথা এদিক ওদিক ঘোরালে আস্তে আস্তে স্পষ্ট ছবি। সে ছবি হাসে, কাঁদে, গল্প বলে। আমাদের একান্ন উঠোনকে মাঝখানে রেখে চারপাশের ঘরগুলোর মধ্যে বড়ঘরই ছিল আমাদের অঘোষিত বৈঠকখানা। কেতাবিয়ানা ছিল না তাতে মোটেও। ঘরের মেঝেয় নেহাতই পাটি পেতে সকাল-সন্ধ্যায় চা মুড়ি খাওয়া অথবা জরুরি কোনো আলোচনার আটপৌরে আয়োজনে সে ঘরই ছিল আমাদের অব্যর্থ গন্তব্য। একখানা কালো রঙের নকশি কাঠের খাট, খুব সাধারণ একখানা টেবিলক্লথে ঢাকা টেবিল আর মাত্র একটা চেয়ার। সেই চেয়ার অবশ্য বাড়ির যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একমাত্র দাদুর দখলে থাকতো দায়িত্বশীলতার একমাত্র বাহক হয়ে। আর ছিল বারো ব্যান্ডের রেডিওখানা। যে সন্ধ্যা থেকে কুনকুন সুরে কখনো গাইতো কখনো গুরুগম্ভীর হয়ে পড়ে যেতো সন্ধ্যা সাতটার সংবাদ। তবুও বৈঠকখানার সাধারণ সংজ্ঞা হয়ে বড়ঘরই ছিল আমাদের সকল বিনোদনের একমাত্র অনুষঙ্গ। কিন্তু সেই অবাক বাকশো আমাদের বাড়িতে আসতে না আসতেই বদলে গেলো সন্ধ্যার সকল চিরচেনা হিসেবনিকেশ। একান্ন উঠোনের পশ্চিমপাশে তখন একহারা তিনটা ইটের ঘর। সদ্য মাথা তোলা সেই ঘরগুলোর একটিতে মহাসমারোহে স্থাপিত হয়েছিলো সেই বাকশো। বিকেল হতেই বাড়ির উনুন নিভে যেতো। মা বৌমারা গা ধুয়ে মাড় দেওয়া কড়কড়ে শাড়ি পড়ে যখন কপালে সিঁদুর আঁকতে বসতো তখন মনিপিসি ঘড়ি দেখে ঠিক পাঁচটায় পৌঁছে যেতো অদ্ভুত সেই বাকশের সামনে।নব ঘুরিয়ে এন্টেনা এদিকওদিক নাড়িয়ে নানা কসরতে যখন বাকশোতে ছবি স্পষ্ট করতো তখন সেখানে নেহাতই কোনো এক গুরুগম্ভীর আলোচনা কিংবা হাটেমাঠে কৃষি নিয়ে জরুরী কোনো বার্তালাপ। তবে এসবের মাঝেও মন খুশি হয়ে উঠতো যখন নিটোল মুখের অঞ্জলি মোস্তফা ঘোষণা করতো 'বি জে এন্ড দ্যা বিয়ার' উপস্থাপনার, তখন বেশ গেঁড়েগুড়ে বসতাম আমি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার আশেপাশে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তো। মা কাকিদের কেউ কেউ সন্ধ্যার চায়ের পালা শেষ করেই এসে বসতো সেই অবাক বাকশের সামনে। তবে সপ্তাহের কোনো একদিন যখন রাত ন'টার পর সকাল-সন্ধ্যা নাটকের প্রারম্ভিক সুর বেজে উঠতো তখন বলতে গেলে সারা পাড়া হয়ে উঠতো আমাদের কুটুম। ঘর ছাড়িয়ে বারান্দা উঠোন থেকেও তখন একনিষ্ঠ নিবদ্ধ অসংখ্য চোখ সেই অবাক বাকশে। এরপর রাত পোহালেও সপ্তাহজুড়ে মা কাকিদের গল্পে থেকে যেতো সেই শিমু ভাবি কিংবা বুবলি। গল্প বদলে যায় বাড়ির। বদলে যায় বাড়ির সন্ধ্যা। মাটির কোলে, যদি কিছু মনে না করেন, এইসব দিনরাত্রি, ছায়াছন্দ, পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি, দ্যা বিল কসবি শো, মাটি ও মানুষ---আমরা বড়ঘরকে পেছনে ফেলে একটু একটু করে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম সেই অবাক সাদাকালো বাকশে। বড়ঘরের লালমেঝেয় পাতা পাটিকে একলা করে আমাদের চায়ের আড্ডা সীমিত হয়ে আসছিলো ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই।সাদাকালো অবাক বাকশো বদলে দিচ্ছিলো আমাদের বাড়ির একান্ন সময়ের গল্প। তবে সেই অবাক বাকশের সকল আকর্ষণ উপেক্ষা করে কাঠের টেবিলে কুনকুন করে বেজে চলা রেডিও তখনও দাদুর সামনে একাই বলিষ্ঠ হয়ে বলে চলতো,সন্ধ্যা সাতটা, আপনারা শুনছেন ভয়েস অফ আমেরিকা…দাদু ঘাড় গুঁজে মনোযোগ দিয়ে সেই রেডিওর সামনে বসে থাকতো রাত অবধি। কখনো ভাবগম্ভীর চেহারা কখনও উচ্ছল। আর কখনও গুনগুন সুর,চারিপাশে মোর উড়িছে কেবলশুকনো পাতা মলিন ফুল-দলবৃথাই কেন হায় তব আঁখিজলছিটাও অবিরল দিবস-যামীহারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে…আশির আউনিবাউনি তাই সেই শোলোক যা আওড়াতে আওড়াতে আমরা শুধু বড়ই হই না, বদলেও যাই একান্ন উঠোনের এক্কাদোক্কা সময়কে পাশ কাটিয়ে। আর সেই বদলই আমাদের হাত ধরে নিয়ে যায় কোনো এক একলা দিনের গান শোনাতে। চলবে...
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া এই জেলাগুলি বহু ভাবে আমাকে ঋদ্ধ করেছে। শাল পিয়ালের ছায়াঘেরা পথে হাঁটতে হাঁটতে একবার খোঁজ পেয়েছিলাম এক ধনভাণ্ডারের - শালতোড়ার জঙ্গল পেরিয়ে, দ্বারকেশ্বর নদের কোলে শুশুনিয়া পাহাড়ের আড়ালে এক আশ্চর্য ইস্কুল, যেখানে আমের মুকুলের ছাতার তলায় ছোট ছোট কুঁড়ির মনে অ আ ক খ, বর্ণপরিচয় আর সহজ পাঠের স্বপ্ন বোনা হয়। বাঁকুড়ার ঝন্টিপাহাড়ী গ্রামে ছাঁচনপুর এলাকায় লক্ষ্মী মুর্মু স্মৃতি শিশু বিদ্যালয় - ব্লক ছাতনা। ছাঁচনপুর, পাকা রাস্তার নাগালের বাইরে, গুগল বাবাও যার খোঁজ পায়না: যেখানে জেদ আর ভালোবাসা হাত ধরাধরি করে চলে। দুই নারী লক্ষ্মী মুর্মু আর রেবা মুর্মু - তাঁদের অদম্য লড়াই দেখে চমকে উঠেছিলাম। জন্ম থেকেই অকুতোভয় লক্ষ্মী - গ্রামের আর পাঁচটা মেয়ের পথে না চলে গ্রাম থেকে দূরে হাই ইস্কুলে পড়তে গেলেন। পাড়ার মোড়লেরা সেটা ভালো ভাবে নিতে পারেননি। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী - তখন কৈশোর, ইস্কুলের হোস্টেল থেকে ছুটিতে বাড়ি এলেন, আর পাঁচটা শহরে বা গ্রামে ছেলে মেয়েরা যেমন আসে। কিন্তু লক্ষ্মীর গাঁয়ে ব্যাপারটা সহজ হলনা। একদিন সেই লক্ষ্মী মেয়ে ভিডিও শো দেখে ঘরে ফিরছিল দুই বন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু নাঃ সুস্থ দেহে ফেরা আর হলনা। উদ্ধার হল সংজ্ঞাহীন দেহ - কি ভাগ্যি প্রাণটুকু কীভাবে যেন টিঁকে গিয়েছিল খাঁচার ভেতর। তবে পরের ঘটনাপ্রবাহও বাঁধা গতে চললোনা। লাগলো অবশ্য বেশ কয়েক বছর - হাল ছেড়ে দেবার জন্য সময়টা যথেষ্ট লম্বা। কিন্তু হাল ছেড়ে দেবার পাত্রী আমাদের লক্ষ্মী মেয়ে ছিলেননা। শেষ পর্যন্ত ষোলো জন অভিযুক্তের দুজন ছিল ফেরার, আর বাকি চোদ্দ জনের বারো বছর জেল হল। তবে এই ফলাফলের মাঝখানে ভয় দেখানো, বাড়ি ছাড়া করা, কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া, একঘরে করা সব চলেছে। শুধু দমানো যায়নি লক্ষ্মী মেয়েকে। পাশে ছিল এক জুনিয়র বান্ধবী রেবা। লক্ষ্মী চলে গেছেন ক্যানসারে। রেবা রয়েছেন তাঁর সব কাজের ভার কাঁধে নিয়ে। দুজনে মিলে তৈরি করেছেন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী। গ্রামে মাদকের ঠেক বন্ধ করেছেন। গড়ে তুলেছেন ‘ছাচনপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি’, মায়েদের বাচ্চা রাখার ক্রেশ। এলাকার লোকেদের বুঝিয়ে তাদের বাচ্ছাদের নিয়ে শুরু করেছেন ইস্কুল। লক্ষ্মীকে চোখে দেখার সৌভাগ্য হলনা। শার্ট প্যান্ট পরা আটপৌরে রেবা মুর্মুকে দেখে আমি তো বাকরুদ্ধ। ছোট খাটো চেহারাটি - অতি সাধারণ সুতীর শার্ট প্যান্টের আড়ালে পেশির শক্তি বোঝা যায়। একেবারে ছোট করে ছাঁটা চুল, মুখের রেখায় জীবনের বহু ঝড় ঝাপটা পেরোনোর মানচিত্র। কিন্তু দু চোখের দৃষ্টিতে যেন করুণার ফল্গুধারা, আর মুখের হাসিতে এক আকাশ সারল্য। অল্প বয়স থেকে মানুষ চরিয়ে খাই। এই রুক্ষ প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন অদম্য প্রাণশক্তির দেখা পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি। গিয়ে দেখলাম গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে রোদ্দুরের ঝিলিমিলি। আর সেই পরিবেশে আলাদা আলাদা ইঁটের গাঁথুনির শ্রেণীঘর, যেন এক একটি কুটীর - কাছে গিয়ে দেখি শুধু পিলার আর মেঝে পাকা, মাথায় করোগেটেড ছাউনি, দেয়াল হয়নি পয়সার অভাবে, হয়তো হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু সেই পিলারের গায়ে গায়ে বাংলার মনীষীদের ছবি আঁকা। মেঝেতে কচিকাঁচার দল হাসিতে উচ্ছল। নামতা, সহজ পাঠ সব একেবারে ঠোটস্থ। একবার সুইচ টিপে দিলেই ব্যাস - সুর করে তারস্বরে শেষ অবধি তারা বলবেই। ঘন্টা পড়তেই, নিজের নিজের থালা ধুয়ে এনে খেতে বসল সব। খাবার পর আবার নিজের থালা মেজে আনলো। দিকে দিকে বাচ্চারা আর শিক্ষকেরা মিলে নানারকম চাষ আবাদ করেছেন দেখলাম। মাঠে দোলনাও আছে। ইসকুলে লাইব্রেরিও আছে। ছবি দেখলাম, কখনও বন মহোৎসব হচ্ছে, কখনও সাপে কামড়ানোর ব্যাপারে সাবধানতা শেখানো হচ্ছে, হাতের কাজ শিখছে বাচ্চারা। পড়াশোনার সঙ্গে চলেছে জীবন গড়ার পাঠ। সমস্যা হল ২০১৫ থেকে শত চেষ্টা করেও এখনও সরকারি খাতায় ইস্কুলের নাম ওঠেনি। কেউ কখনও খবর পেয়ে সেখানে যান, কিছু সাহায্য দিয়ে আসেন, বই-খাতা, স্কুল ব্যাগ, পেনসিল, কলম, রং তুলি। এভাবেই চলছে। তবে এখানকার বাচ্চাদের মৌলিক চাহিদা হল পোশাক, ব্যাগ ও জুতো, এবং অবশ্যই দুপুরের নিশ্চিত খাবার। ছোটদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য চাই গ্রন্থাগারের জন্য নতুন বই ও নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা। এর সঙ্গে দরকার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিঃস্বার্থ সময় ও মমতা। পুরুষ মহিলা মিলে চারজন শিক্ষককে দেখলাম। নামমাত্র সাম্মানিকে কাছে পিঠের গ্রাম থেকে ভালোবাসার টানে আসেন। ইশকুলটা সরকারি হয়ে গেলে শিক্ষকদের মাইনের চাপটা কমে, কিন্তু অন্য আর একটা বিপদও আছে। বাইরে থেকে চাকরির জন্য চাকরির মানসিকতা নিয়ে এখানে লোক এলে মান ধরে রাখা মুশকিল হবে। আজ এখানে তেমন কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ নেই, আছে কেবল মানুষ গড়ার সংকল্প। তাত্ত্বিক ভূগোলের আলোয় ছাঁচন পুরের এই ইশকুলকে যদি বিচার করি, তবে দেখি এ এক অদ্ভুত বিকল্প ক্ষমতার সমীকরণ। লক্ষ্মী আর রেবা - এঁদেরকে যদি আমি ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী ভাবি, তাহলে বলব এঁরা দুজনেই ‘স্পেস’ (Space) বা স্থান এবং ‘পাওয়ার’ (Power) বা ক্ষমতার সমীকরণ যে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। একটু বুঝিয়ে বলি আমার ভাবনা। আসলে প্রথাগত গ্রামীণ সমাজে ‘স্পেস’ বা স্থান ভাগ করা থাকে। বাড়ির ভেতরটা নারীর, আর বাইরের জগৎ, পঞ্চায়েত, মোড়লতন্ত্র বা হাইস্কুলের পথটি পুরুষের—এই হল অলিখিত নিয়ম। লক্ষ্মী মুর্মু যখন গ্রামের সীমানা পেরিয়ে দূরের হাইস্কুলে পড়তে গেলেন, তখন তিনি আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তৈরি সেই ‘স্থানিক সীমানা’ (Spatial Boundary) লঙ্ঘন করেছিলেন। মোড়লদের ক্ষোভ কেবল শিক্ষার বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল একজন আদিবাসী মেয়ের এই স্থানিক স্বাধীনতা বা 'Spatial Mobility'-র বিরুদ্ধে। সামাজিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করলে বিশ্ব জুড়ে এই যে নৃশংস অত্যাচারের প্র্যাকটিস, তা আসলে নারীর শরীরকে একটি ‘রণক্ষেত্র’ (war -territory) বানিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের পুরুষতান্ত্রিক অপচেষ্টা অথবা বলা যেতে পারে একধরণের ফিয়ারস্কেপ তৈরি করা। যখন গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটল, তখন চারপাশের চেনা ভূগোলটাই (যেমন- হাইস্কুলের রাস্তা, জঙ্গল, বিকেলের নির্জন পথ) আদিবাসী মেয়েদের জন্য একটি 'ভীতিপ্রদ স্থান' বা Fearscape-এ পরিণত হলো। ভূগোলবিদ জিল ভ্যালেন্টাইন (Gill Valentine) রেচেল পেইন (Rachel Pain) বা গিলিয়ান রোজের মতো নারীবাদী ভূগোলবিদরা এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন - ভূগোলের এই শাখাটির নাম দেওয়া হয়েছে জিওগ্রাফি অফ ফিয়ার। মোড়লতন্ত্র আসলে এই ভয়ের ভূগোলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল যাতে অন্য কোনো মেয়ে আর গ্রামের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার সাহস না পায়। সমাজে এই পরিস্থিতিতে ভয় কেবল একটা মানসিক অনুভূতি থাকেনা, ভৌগোলিক ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একঘরে করা, কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া—এগুলো সবই হলো সামাজিক ও ভৌগোলিক স্পেস থেকে একজন মানুষকে উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া। এতে একজন মানুষকে ইনসাইডার থেকে জোর করে আউটসাইডার বানিয়ে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু সাজা ঘোষণা এবং ঘরে বাইরে দুরন্ত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে লক্ষ্মী ও রেবা সেই ভয়ের ভূগোলকে ‘প্রতিরোধের ভূগোল’ (Geography of Resistance)-এ রূপান্তরিত করেছেন। এই আখ্যানের সবচেয়ে জাদুকরী এবং ঐতিহাসিক দিকটি এখানেই। লক্ষ্মী দেবী এবং রেবা দেবী কেবল ভয়ের শিকার হয়ে বেঁচে থাকেননি; তাঁরা সেই ফেনোমেনোলজিক্যাল ট্রমা বা ব্যক্তিগত ভয়ের অভিজ্ঞতাকে একটি সমষ্টিগত সামাজিক স্পেসে (Spatial Resistance) রূপান্তরিত করেছেন। লক্ষ্মী দেবী নিজের শরীরের এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সেই গভীর ক্ষত ও ভয়কে এক অদ্ভুত দার্শনিক উত্তরণের মাধ্যমে সবার প্রতি ‘সহমর্মিতা’ বা Empathy-তে রূপান্তর করলেন যা সবাই পারেনা। রেবা দেবীকে সাথে নিয়ে তিনি যখন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও সেই দেয়ালহীন স্কুলটি গড়লেন, তখন তাঁরা আসলে সেই পুরনো ‘ভয়ের ভূগোল’ বা Fearscape-টিকে মুছে দিলেন। যে পথ দিয়ে হাঁটতে মেয়েরা ভয় পেত, আজ সেই পথ দিয়েই শিশুরা সুর করে নামতা বলতে বলতে স্কুলে যায়। এটাকেই বলে স্থানের পুনর্নির্মাণ বা ‘পাবলিক’ আর ‘প্রাইভেট’ স্পেসকে মিলিয়ে দেওয়া। নারীবাদী ভূগোলের অন্যতম উদ্দেশ্য হল এই দুটো স্পেসের বিভাজন রেখা মুছে ফেলা। রেবা ও লক্ষ্মী যখন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করলেন এবং ‘ছাঁচনপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি’র মাধ্যমে একটি ক্রেশ বা মায়েদের বাচ্চা রাখার জায়গা গড়লেন তখন যে মায়েরা ঘরের কাজের জন্য বাইরে বেরোতে পারতেন না, তাঁরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ‘পাবলিক স্পেস’-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন। গৃহস্থালির শ্রমের বোঝা ভাগ করে নিয়ে তাঁরাও কিছুটা স্থানিক ক্ষমতা (Spatial Empowerment) অর্জন করলেন।নারীবাদী ভূগোলে বডি স্পেস বা ‘শরীর’ নিজেই একটি ক্ষুদ্রতম ভৌগোলিক স্কেল - সাইট। রেবাকে যেমন দেখলাম - সেই সুতীর আটপৌরে শার্ট-প্যান্ট, ছাঁটা চুল, পোশাকের আড়ালে পেশির শক্তি—তা প্রথাগত ‘নারীসুলভ’ শরীরের ভৌগোলিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। রুক্ষ প্রাকৃতিক পরিবেশের আর প্রতিকূল সমাজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তাঁর শরীর নিজেই একটি প্রতিরোধের প্রতীক বা ‘Site of Resistance’ হয়ে উঠেছে। হিউম্যানিস্টিক বা মানবিক ভূগোলের সবচেয়ে মৌলিক তত্ত্ব হলো শূন্য স্থান বা ‘Space’ কীভাবে মানুষের আবেগ দিয়ে একটি চেনা জায়গা বা ‘Place’-এ পরিণত হয়। গুগল ম্যাপে কিন্তু ছাঁচনপুরের ওই বিন্দুর কোনো অস্তিত্ব নেই। সেটি গুগল বাবার কাছে একটি নামহীন, অবহেলিত ‘Space’। কিন্তু লক্ষ্মী ও রেবা মুর্মু তাঁদের ভালোবাসা, শ্রম এবং শিশুদের কলকাকলি দিয়ে সেই শূন্যস্থানকে একটি ‘Place’ (স্থান)-এ রূপান্তরিত করেছেন। যে স্বচক্ষে ইশকুলটা দেখেছে তার কাছে জায়গাটা আর শুধু অক্ষাংশ - দ্রাঘিমাংশের হিসেবে আটকে নেই; এটি এখন প্রান্তিক শিশুদের স্বপ্ন, আবেগ আর ভরসার এক ভৌগোলিক ঠিকানা। দার্শনিক ই-ফু-তুয়ানের ভাষা ধার করে বলা যায় ছাঁচনপুরের ইশকুল হল ঐ এলাকার শিশুদের জন্য এক পারফেক্ট টোপোফিলিয়া। ই-ফু তুয়ান বলেছিলেন, মানুষের জন্মের সময় মানচিত্রে কোনো একটি জায়গা কেবলই একটা শূন্য স্থান বা জ্যামিতিক বিন্দু থাকে, যাকে আমরা বলি ‘Space’। কিন্তু মানুষ যখন সেখানে বাস করতে শুরু করে, তার স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, আনন্দ এবং কান্নাকে সেই জায়গার সাথে জড়িয়ে ফেলে, তখন সেই জড় ‘Space’ রূপান্তরিত হয় একটি জীবন্ত ‘Place’ বা ‘স্থান’-এ।এই ‘Place’-এর প্রতি মানুষের মনের ভেতর যে ভালোবাসার ফল্গুধারা বইতে থাকে, তা-ই হলো টোপোফিলিয়া। মানবিক ভূগোলে বলা হয়, টোপোফিলিয়া মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিশুরা নিজেরা শিক্ষকদের সাথে মিলে চাষআবাদ করছে, মাঠের দোলনায় খেলছে, সাপের কামড় থেকে বাঁচার বাস্তব পাঠ নিচ্ছে। এর ফলে ওই রুক্ষ প্রকৃতির রুক্ষতাটুকু চলে গিয়ে শিশুদের মনে ওই মাটির প্রতি, ওই বিদ্যালয়-ক্ষেত্রের প্রতি এক গভীর আত্মিক টান বা টোপোফিলিয়া তৈরি হচ্ছে। মানুষ যখন তার চারপাশের পরিবেশকে ভালোবাসতে শেখে (টোপোফিলিয়া), তখন তার মধ্যে এক ধরণের ‘Belongingness’ বা ‘আমি এই জায়গারই একজন’—এই বোধটা জাগে। এই বোধটাই মানুষকে ছদ্ম-হীনম্মন্যতা থেকে বাঁচায়। আমরা সেই জিনিসটাকেই রক্ষা করি, যাকে আমরা ভালোবাসি। ছাঁচনপুরের শিশুরা আজ যেভাবে ওই মাটির টানে, রেবা মুর্মুর স্নেহের টানে সেখানে পড়াশোনা আর জীবন গড়ার পাঠ নিচ্ছে — আশা করা যায় বড় হয়ে তারা ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবে। চাকরি জীবনের প্রথম দিকে আমি দেখেছি এমন ছাত্রকে যে সব সময়ে লাস্ট বেঞ্চে মাথা লুকিয়ে বসে থাকতো, কাছে ডাকলেও আসতোনা। কিন্তু মুর্শিদাবাদে ফিল্ডে গিয়ে সে হোটেলের খাটের ছত্রি ধরে ঝুলে ছত্রি ভেঙে ফেলল। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, সাত চড়ে রা নেই, কিছুতে কোন মতামত নেই - ও খাট ভাঙল? এখন আমি বুঝেছি, সাধারণ স্কুলে ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার বলে একটা শিশুর যে অবহেলা জোটে, তা তার আত্ম-মূল্যায়নকে ধ্বংস করে দেয়। সে নিজে নিজেই নিজেকে আউটসাইডার ভেবে নেয়। স্কুল পেরিয়ে কলেজে এই অবদমন আরও বাড়ে, হয়তো সব পড়া আলোচনা বুঝতেও পারেনা, জিজ্ঞেস করতে পারেনা। শ্রেণীকক্ষের চারটে দেওয়ালে এক ধরণের টোপোফোবিয়া তৈরি হয়। এই অবদমন ভেতরে ভেতরে এক জমাটবদ্ধ ক্ষোভ বা 'Aggression'-এ রূপ নেয়। যখনই তারা প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বাইরে কোনো মুক্ত বা বিশৃঙ্খল পরিবেশ পায়, তখন সেই অবদমিত শক্তি কোনো ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জাহির করে। এ হল অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাওয়া আত্মবিশ্বাস মানুষকে কেবল চাকরি পাওয়ার যোগ্য করে না; সেই প্রত্যয় মানুষকে নিজের জীবনের বা সমাজের অন্ধকার অধ্যায়গুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে লড়াই করার এবং বিজয়ী হওয়ার দার্শনিক অস্ত্র দেয়। সাধারণ ইশকুল কলেজে সেই অস্ত্র ছাত্রছাত্রীর হাতে তুলে দেওয়া সব সময়ে সম্ভব হয়না। শুশুনিয়ার সেই লালমাটির রুক্ষতা, শাল-পিয়ালের জঙ্গল আর তার মাঝখান থেকে উঠে আসা লক্ষ্মী মুর্মু ও রেবা মুর্মুর এই যে রূপকথা-সম লড়াই—তা কেবল একটা স্কুলের গল্প নয়, তা আসলে মানুষের অপরাজেয় চেতনার এক জীবন্ত দলিল। গুগল ম্যাপে যে ছাঁচনপুরকে খুঁজে পাওয়া যায়না, সেই প্রত্যন্ত কোণে বসে এই দুই নারী যা তৈরি করেছেন, তা শুধু ইঁটের দেয়ালহীন কিছু শ্রেণীকক্ষ নয়; তাঁরা আসলে প্রান্তিক শিশুদের জন্য তৈরি করেছেন এক "আত্মবিশ্বাসের অভয়ারণ্য"। চলবে...
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
  • হরিদাস পালেরা...
    অমৃতকাল - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | মোট ১০ টা বিধানসভা কেন্দ্রের ৪০০০ ইভিএম পুড়ে গেল আলিপুরে। গুণে-গেঁথে ঠিক ৪০০০টাই ছিল কীকরে জানা গেল? জানা নেই। তবে নবনিযুক্ত দমকল মন্ত্রী কৌশিক চক্রবর্তী বলেছেন, ৩ এবং ৪ তলায় আগুন লাগে। সেখানে ইভিএম ছিলনা। তারপর সেই আগুন লাফিয়ে চলে যায়, ৭ এবং ৮ তলায়। সেখানেই ছিল ইভিএম। মাঝের কোনো তলায় কোনো আগুনের চিহ্ন নেই। আগুন কীকরে হনুমানের মতো লাফাল জানা নেই। কিন্তু সব ইভিএমই পুড়ে গেছে এটা জানা গেছে। মন্ত্রী বলেছেন। মন্ত্রী আরও বলেছেন, ব্যাপারটা খুব রহস্যজনক। কিন্তু খুব গরম হওয়ায় ফরেনসিক এখনও ঢুকতে পারেনি, তাই কিছু বলতে পারবেন না। আমাদেরও কারও কারো আপাতদৃষ্টিতে তাইই মনে হচ্ছে। কারণ ভোটের পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন, গণনাকেন্দ্রে গা-জোয়ারি এবং জালিয়াতি হয়েছে বলে। মামলা করবেনও বলেছিলেন। তারপর তো তাঁর পার্টিই লুঠ হয়ে গেল। মামলা করলে কিছু হত কিনা কেউ জানেনা, কিন্তু করার আগেই ৪০০০ ইভিএম পুড়ে গেল। আগুন যখন লাফাচ্ছিল, তখন নতুন প্রশাসনের দমকল কী করছিল জানা নেই। ঘটনাচক্রে নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন মাথাই এখন মুখ্যসচিব। ওদিকে বাংলার সুবিখ্যাত সংবাদমাধ্যম, যারা তিল দেখতে না পেলেও তালগাছ বানিয়ে ফেলে থাকে, এই ভয়ানক ঘটনার বিবরণ, তাদের পাতায় বা পর্দায় খুঁজতে গেলে মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ দুইই লাগবে। এবং কদিন বাদে হয়তো জানা যেতে পারে, গণনার ফুটেজও আইন মেনে মুছে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ সন্দেহজনক লাগলেও, মনে রাখবেন, নতুন জমানা এসে গেছে। তাই পুরোটাই নিছকই দুর্ঘটনা, আর নেহাৎই কাকতালীয়ই হবে। এরকম কাকতালীয় ঘটনা অবশ্য একটা না। ঘটেই চলেছে। মীনাক্ষী নটরাজন এই দিনকতক আগে কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশে। মনোনয়ন গেল বাতিল হয়ে। বিজেপির দিক থেকে অভিযোগ ছিল, হলফনামায় তিনি তাঁর সম্পর্কে একটা এফআইআর বা কেস নাকি উল্লেখ করেননি। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওটা কোনো ক্রিমিনাল কেস ছিলনা, কেবলই একটা আইনী নোটিস পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু রিটার্নিং অফিসার সে কথায় কান দেননি। মীনাক্ষী সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এসব নির্বাচন কমিশনের আওতায়, তাদের এক্তিয়ারে না। সব মিলিয়ে বিজেপি তিনটি রাজ্যসভা আসনই জিতে নিয়েছে ওই রাজ্য থেকে। একটা, সংখ্যার হিসেবে তাদের জেতার কথা ছিলনা। ঘোড়া কেনাবেচা হতে পারে, এই আশঙ্কায় কংগ্রেস বিধায়কদের বেঙ্গালুরুতে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, তাতে বিজেপিকে আটকানো যায়না। এই যে, ঠিক সময়েই মীনাক্ষীর "ভুল" হল, মনোনয়ন বাতিল হল, এ সবই কাকতালীয় ঘটনা।এরও আগে সংসদে রাঘব চাড্ডা, অশোক মিত্তাল পাঞ্জাবে আআপ সাংসদরা সদলবলে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। আপএর দুই-তৃতীয়াংশ নিয়েই যোগদান হয়েছিল, সম্পূর্ণ আইনসঙ্গতভাবে। এবং তার আগে অশোক মিত্তালের সম্পত্তিতে ইডি হানা হয়েছিল। সেটাও সম্পূর্ণ কাকতালীয়। তারপর, একদম সাম্প্রতিককালে তৃণমূলের অনেকেই নাকি বিদ্রোহী হয়েছেন শোনা যাচ্ছে। তাঁরা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন কিনা জানা নেই। এর আগে ট্রাইবুনালে ৩৫ লক্ষ নামকে ঝুলিয়ে রেখে পশ্চিমবঙ্গে অবাধ নির্বাচন হয়েছে, তাতে বিজেপি জিতেছে। তারপর তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ অভিযোগ করেছেন, পুরোনো সাংসদদের চাপ দেওয়া হয়েছে নানাভাবে। এই সবই কাকতালীয়। এই সব কাকতালীয় ঘটনা যোগ করলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি নির্বাচনে সংখালঘু থাকলেও নির্বাচনোত্তরপর্বে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। একবার হয়ে গেলে ডিলিমিটেশন সহ যা যা পাশ করাতে চায়, সবই টপাটপ পাশ করিয়ে ফেলতে পারবে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক। কিন্তু আসলে তা নয়। আসল কথা হল, আচ্ছে-দিন টপকে এখন অমৃতকাল এসে গেছে। এইসব সময়ে এইসব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে থাকে। নইলে তো সন্ধ্যেবেলার ঘন্টাখানেক মাছের বাজারে চুলচেরা বিশ্লেষণ দেখতে পেতেন, নাকি?
    ভাগবত পুরাণ - ১/৬ - Kishore Ghosal | এইখানে মহামতি ভীষ্ম হিন্দু ধর্মের অসাধারণ ভক্তিমার্গের দিশাটি ভক্তদের মনে জাগিয়ে তুললেন। ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের নানারূপে দেখা দিতে পারেন। পরবর্তী কালে আমরা দেখব মাকালী কন্যারূপে ভক্তকবির ঘরের বেড়া বেঁধেছেন। কখনো অভিমানী ভক্তকবি গেয়েছেন, "মাগো, গেছিস কি তুই মরে, গয়া গিয়ে আসি গে তোর শ্রাদ্ধ-শান্তি করে", অথবা রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন, "তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে"। হিন্দু ধর্মের ঈশ্বর সর্বদাই উদাসীন করুণাময় নয়, তিনি নিষ্ঠুর হাতে সর্বদা দণ্ড বিধান করেন না, তিনি ভক্তের মনে প্রিয়জন রূপে বিরাজও করেন।] "ভাগবত পুরাণ" প্রথম স্কন্ধ - পর্ব ৬ ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬
    শুধু, একমুঠো নুনের জন্য ...... - Somnath mukhopadhyay | শুধু, এক মুঠো নুনের জন্য ..…… বছর কয়েক আগের কথা। হাওড়া থেকে চলতে শুরু করা আমাদের যন্ত্র শকটটি ইস্পাতের বাঁধা পথ ধরে গড়াতে গড়াতে একেবারে ভোররাতে এসে থেমেছে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে। সঙ্গে বিস্তর লটবহর, তার ওপর একেবারেই অচেনা নতুন জায়গা। লোকজনের ব্যস্ত ভিড়, কুলিদের হাকডাক, ঠেলাঠেলি - সবকিছু সামলে নিয়ে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আসি। সঙ্গে কন্যা। যাবে পুদুচেরি। উচ্চতর পাঠ নিতে। বাপ বেটিকে দেখে উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে আসে অনেক মানুষ – কেউ অটোরিকশা চালক, কেউবা প্রাইভেট গাড়িচালক। সকলেই ব্যস্ত স‌ওয়ারি ধরতে। দেশের দক্ষিণে এলে মন খুলে কথা বলার ক্ষেত্রে ভাষা একটা বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। খানিকক্ষণ মূকাভিনয় করার পর জট ছাড়ানো গেল। বাপ বেটি দুজনে সমস্বরে কোয়াম্বাডু বাসস্ট্যান্ড যাবো বলাতে বেশ সুবিধা হয়। চেনা শব্দবন্ধের যাদুই যে এমন। খানিক সময় দরাদরি করে শেষমেশ এক অটোরিকশায় উঠে পড়ি দুজনে। ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল। কোয়াম্বাডু থেকে আমরা পুদুচেরী যাবার বাস ধরবো। সুবিশাল বাসস্ট্যান্ড। সামান্য খোঁজাখুঁজি করে নির্দিষ্ট বাসে উঠে পড়ি। কন্ডাক্টরের সহযোগী মানুষটি বেশ যত্ন করে আমাদের মালপত্র বাসের খোলে ঢুকিয়ে দেন। আমরা স্বস্তিতে গদিয়ান হ‌ই। বাসের চাকা সচল হয়। খিড়কি গলে আমাদের নজর তখন বাইরের দৃশ্যপট নয়নবন্দি করতে শুরু করে। বাস মামাল্লাপুরম ছাড়তেই বাইরের ছবিটা বেমালুম বদলে যায়। দূরে সমুদ্রের উপস্থিতির আভাস মেলে। অগভীর জলা জমির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধবধবে সাদা রঙের ছোট ছোট টিলা সহজেই নজর পড়ে – ওগুলো সব নুনের টিলা। সমুদ্রের জলকে উপকূলের অপেক্ষাকৃত উঁচু অংশে তুলে এনে ছোটো ছোটো আল বাঁধা জমিতে জমা করা হয়। সেই জল সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হলে, জলের সঙ্গে মিশে থাকা লবণ জমিতে বিছানো প্লাস্টিকের চাদরের ওপর থিতিয়ে পড়ে। সেই থিতিয়ে পড়া লবণকে পরিশোধন করার পর আমরা পাই ভক্ষ্য লবণ। কাজটা মোটেই সহজসাধ্য নয়, বরং অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। বর্ষার মাসগুলোকে‌ বাদ দিয়ে বাকি মাসগুলোতে চলে লবণ তৈরির কাজ। লবণ রোজকার খাবার পাতের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। লবণ ছাড়া আমাদের এক মুহুর্ত চলে না, অথচ এই সূক্ষ্ম দানাদার উপাদানটিকে আমাদের পাত অবধি পৌঁছে দেবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের শ্রম, ঘাম,রক্ত,বঞ্চনা আর কান্না। কচ্ছের রন অঞ্চল – ভারতের বৃহত্তম লবণ উৎপাদন ক্ষেত্র। গুজরাটি শব্দ রন্ এবং সিন্ধ্রি শব্দ রিন্ – দুটির‌ই ব্যুৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ইরিন্ থেকে যার অর্থ হলো লবণাক্ত জলে ভরা অনুর্বর জমি। ঋগ্বেদ ও মহাভারতে এই সুবিস্তৃত জলাভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। অবস্থানগতভাবে উত্তরের বৃহৎ ভারতীয় মরুভূমি বা থর মরুভূমির দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর অবস্থান করছে এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অঞ্চলটি। গুজরাটের কচ্ছ জেলার প্রায় ২৬০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রন্ অঞ্চলটি। বৃষ্টিহীন এই শুষ্ক অঞ্চলটিকে বিশেষজ্ঞরা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ লবণাক্ত মরুভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গোটা এলাকাটিকে আবার দুটি অংশে ভাগ করা হয়েছে - বৃহৎ রন্ এর পরিসর ১০০০০বর্গ কিলোমিটার এবং প্রায় ৫০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বিশিষ্ট ক্ষুদ্র রন্ অঞ্চল। এই ক্ষুদ্র রনের লবণাক্ত জলাভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ভারতের সবথেকে বড়ো লবণ উৎপাদক অঞ্চল।  রন্ অঞ্চলের উৎপত্তির ইতিহাস‌ও কম বৈচিত্র্যময় নয়। এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন, জটিল ও প্রবল ভূকম্পনের ঘটনা এবং বদলে যাওয়া জলবায়ুর এক আশ্চর্য ইতিবৃত্ত। গবেষকরা জানিয়েছেন যে এক সময় বাণিজ্যপথ হিসেবে এই বৃহৎ ভূখণ্ডটিকে ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা নিছকই একটি অনুর্বর বন্ধ্যা ভূমিতে পরিণত হয়েছে। জোয়ারের সময় ঢুকে পড়া সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে ধরে রেখে তা থেকে উৎপাদন করা হয় আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় লবণ। ভক্ষ্য লবণ সোডিয়াম ক্লোরাইডের পাশাপাশি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আরও বেশ কিছু লবণের অন্যতম জোগানদার এই এলাকাটি। জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত আরব সাগরের জোয়ারের জল গোটা রন্ অঞ্চলের সুবিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তার সাথে যুক্ত হয় বৃষ্টির জল। সেপ্টেম্বর মাসের পর দ্রুত জল নেমে যায়, গ্রীষ্মের চড়া রোদে জল বাষ্পীভূত হলে জলের দ্রবীভূত লবণ থিতিয়ে পড়ে। লবণের সূক্ষ্ম কেলাসের কণায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। এরপরের অংশটুকুতেই জড়িয়ে আছে এই এলাকার আবাসিক মানুষদের ঘাম রক্ত আর কঠোর কৃচ্ছতার কাহিনি। লবণের কথাই যখন এলো তখন ভারতবাসী হিসেবে পরাধীন ভারতে বিখ্যাত লবণ সত্যাগ্রহের কথা বিস্মৃত হ‌ই কী করে? ১৯৩০ সালে দমনমূলক বৃটিশ লবণ নীতির প্রতিবাদে গান্ধীজির নেতৃত্বে ৭৮ জন সত্যাগ্রহী পথযাত্রী এক ঐতিহাসিক পদযাত্রায় অংশ গ্রহণ করলেন। এক চিমটি লবণ ছাড়া যে খাবার মুখে রুচবেনা, অথচ তাকে নিয়েই এই অহেতুক আইন – ভারতীয়রা লবণ তৈরি করতে পারবে না। তাঁদের বৃটিশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই লবণ কিনতে হবে। গর্জে উঠলেন গান্ধীজী। তিনি স্বয়ং প্রতিবাদে মুখর হলেন। সামিল হলেন এক প্রতিবাদী পদযাত্রায়। সবরমতী আশ্রম থেকে নভসারি বা ডান্ডি পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৮৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা পৌঁছলেন ডান্ডিতে। সেখানেই সমুদ্রের জল থেকে তৈরি করা হলো লবণ, ইংরেজ সরকারের ফরমানকে অস্বীকার করে। লবণের অধিকার ফিরে পাবার এই আন্দোলন পরবর্তী কালের বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল ; আর ঐতিহাসিক এই পদযাত্রা ইতিহাসে স্থায়ী আসন পেল ডান্ডি পদযাত্রা হিসেবে। প্রতিদিনের খাবার পাতে এক চিমটি লবণ পাওয়া যে আমাদের সকলের অধিকার, এই আন্দোলন তাকেই প্রতিষ্ঠিত করলো। এ বছর রোদ ভীষণ চড়া! এর মাঝেই কাজ করতে হয় লবণ তৈরির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের। কাজের চাপ এতোটাই যে ঘরে ঢুকে একটুখানি সময় জিরিয়ে নেবার জো নেই। বর্ষার আগে আগেই জমে থাকা লবণের বোঝা খালাস করতে না পারলে, পুরোটাই বরবাদ হয়ে যাবে। এমন গরমের দাপটকে এড়িয়ে কাজ করাই যে অসাধ্য। অথচ তাকে অস্বীকার করার উপায়ও যে নেই। তাই গরমের মধ্যেই মুখ বুজে কাজ করে যাওয়াটাই যেন দস্তুর। গুজরাটের এই বিজন এলাকায় আট মাস ধরে লাগাতার হাড়ভাঙা খাটুনির পর্ব চলে প্রায় ৫০০০০ আবাসিক শ্রমজীবী মানুষের। একেক সময় মনে হয় এ যেন দেশের বাইরের এক এলাকা – ইলেক্ট্রিসিটি নেই, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা নেই,প্রখর রোদে শুকিয়ে যাওয়া গলায় দু ঢোঁক জল ঢালতে গেলেও মানুষগুলোকে প্রতিপদে ভাবতে হয় মিঠা জলের গাড়ি আসার পঁচিশ দিন পূর্ণ হতে আর কতদিন বাকি? জমানো জল যে বাড়ন্ত! লিটিল রনের তাপমাত্রা এখন‌ই ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমান্ত ছাড়িয়ে গেছে। পারদ চড়তে চড়তে শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আগাম আঁচ করা যে স্বয়ং বরুন দেবের পক্ষেও অসাধ্য।  এ কেমন বৈপরীত্য! যে উষ্ণতাকে গায়ে মেখে দু দণ্ড তিষ্টনো দায় তাই হলো লবণ তৈরির জন্য একেবারেই আদর্শ। আর এই বিশেষ সুবিধার দৌলতে, গুজরাত রাজ্য দেশের তিন চতুর্থাংশ লবণ উৎপাদন করে। সূর্য ওঠার আগে থেকেই কাজ শুরু করতে হয়। দুপুরে খানিকক্ষণ বিরতি। আবার সূর্য দেব অস্ত গেলে জমিতে নেমে পড়া। নেহাৎ দেশের একেবারে পশ্চিমা এলাকা,তাই সূর্যাস্তের পরেও কাজ চালিয়ে যাবার মতো আলো মেলে। এই সুযোগটুকুই তাদের কাছে পরম আশীর্বাদের মতো মনে হয়। রোদ জ্বলা দিনের হাত থেকে একটু স্বস্তির জন্য নিজেরাই অবশ্য তৈরি করে নিয়েছে কতগুলো অস্থায়ী আস্তানা। চারটে খুঁটির ওপর মোটা, হাতে বোনা কাপড়ের এক চিলতে ছাউনি, গাধার মলের সঙ্গে মাটি মিশিয়ে গড়া হয় চারপাশের দেওয়াল –খানিকক্ষণ বিশ্রামের পক্ষে অবশ্য এগুলো একদম আদর্শ আস্তানা। বাইরের চাঁদি ফাটা রোদ্দুরে এটাকেই মনে হয় বাতানুকুল আবাস। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে ক্ষণিক স্বস্তি লাভের প্রচেষ্টা। ভাবনা, কাঞ্চন, পুর্নিমা কিংবা বাবুলালদের কাছে এটুকুই যে পরম পাওয়া। এর বেশি যে ওদের চাওয়ার নেই।  রৌদ্র দগ্ধ, লবণাক্ত মরুভূমি প্রায় এই জমিতে সবুজের প্রবেশের কোনো অধিকার নেই। থাকলে হয়তো অন্য এক স্বস্তি মিললেও মিলতে পারতো। সাদা লবণের চাদর থেকে ঠিকরে ওঠা আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেলেও যে নিস্তার নেই মানুষগুলোর। গরম থেকে বাঁচতে নিজেরাই কতক উপায় বেছে নিয়েছে – ভিজে মোটা কাপড়ে মোড়া জলের বোতলকে দড়ি দিয়ে বেঁধে সামনে ঝুলিয়ে রাখে। বাষ্পীভূত জলের ঠান্ডা আমেজ থেকে স্বস্তি বোধ করতে। এরফলে জলটাও বেশ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কেউবা লিকার চা বানিয়ে পান করে যাতে খানিকটা গরমের অনুভূতি কম হয়, শরীরে বাড়তি স্ফূর্তি আসে। প্রাকৃতিক উপায়ে লবণাক্ত জল থেকে প্রয়োজনীয় লবণ তৈরির কাজটিও যে সহজে সেরে ফেলা যায় তেমন নয়। পাম্প চালিয়ে নোনা জল জমিতে ঢোকানো, তাকে রোদের তাপ আর বাতাসের স্পর্শে শুকিয়ে নেওয়া। লবণের কেলাসগুলোকে নেড়েচেড়ে সমানভাবে তৈরি হতে দেওয়া, তারপর সেই কেলাসিত উপকরণকে ঠিকমতো গুছিয়ে ছোট ছোট টিলার আকার দেওয়া। এরপর তাকে গাড়িতে করে কারখানায় পৌঁছনো – কাজ তো নেহাত কম নয়। আর এর সবটুকুই করতে হয় খোলা আকাশের নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে। এই বছর আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী তাপ প্রবাহের দাপট আরও দীর্ঘায়িত হতে চলেছে, যার অর্থ আমাদের সবার পাতে এক চিমটি লবণ পৌঁছে দিতে আরও অনেক অনেক ঘাম ঝরাতে হবে রনের লবণ তৈরির মেহনতী শ্রমিকদের।  কিছুদিন আগে পর্যন্ত ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের সাহায্যে সমুদ্রের জল তুলে জমিতে ফেলা হতো। এখন সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে পাম্প চালিয়ে জল তোলা হয়। এরফলে খরচে সাশ্রয় হয়, পোড়া ডিজেলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়না তবে এখন শ্রমিকদের কাজ করতে হয় অনেকটা বাড়তি সময় ধরে। বর্ষা আগমনে আর খুব বেশি দেরি নেই,তাই এখন নোনা জমির ফসল ঘরে তুলতে সকলের ব্যস্ততা একেবারে তুঙ্গে। একটানা ছয় মাসের‌ও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ প্রাণহর একটা পরিবেশে কাজ করার ফলে শ্রমিকদের শরীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই উপেক্ষিত থেকে যায়। বিরামহীনভাবে কাজের ফলে শরীরে বাসা বাঁধে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা, নানারকম প্রাণঘাতী রোগ। এসবের পরিণতিতে অকালে ঝরে যায় কত তরতাজা প্রাণ। সমীক্ষা সূত্রে জানা গেছে যে শ্রমিকরা ডিহাইড্রেশন, হিট স্ট্রেস্ থেকে শুরু করে কিডনির কার্যকারিতার সমস্যায় আক্রান্ত হয়। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ছাড়া অন্য কোনো ওষুধের পরিষেবা পায়না এখানকার শ্রমিকরা। দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘন লবণের দ্রবণের মধ্যে থেকে কাজ করার ফলে শরীরের চামড়া শক্ত হয়ে গিয়ে ফেটে যায়, রক্ত বেরিয়ে আসে। আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে তাপের সহনশীলতার সর্বোচ্চ মান বেঁধে দেবার ব্যবস্থা নেই, অর্থাৎ তাপমাত্রা কতটা হলে তা শ্রমিকদের শরীর স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তার কোনো আইনি বিধিনিষেধ নেই। এই ফাঁকটাকে কাজে লাগিয়ে অনেক সময়ই শ্রমিকদের অসহনীয় পরিবেশে কাজ করতে হয়। এক চিমটে নুন আমাদের খাবার পাতে তুলে দিতে গিয়ে এমন‌ই লড়াই করতে হয় লবণ ভাঁটির শ্রমিকদের। অবস্থা দিনদিন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় আকস্মিক আবহিক বিপর্যয়ের ফলে এই শিল্পের অস্তিত্বের সংকট বাড়ছে। হঠাৎ করে নেমে আসা বৃষ্টি বা ঝড়ের ফলে খোলা মাঠে জমিয়ে রাখা লবণ নষ্ট হয়ে গেলে লোকসানের মুখে পড়তে হয়, যার ঝাপটা এসে পড়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে। এই অনিশ্চয়তাকে সম্বল করেই বেঁচে থাকতে হয় দেশের লবণ শ্রমিকদের। প্রশ্ন করা হয়েছিল – এতো কষ্ট সয়ে আপনারা এই কাজ করেন কেন? অন্য কিছু করতে পারেন না? প্রশ্ন শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মানুষগুলো। বেশ কিছুটা সময় পরে শান্ত গলায় উত্তর দেয় – আমরা কাজ ছেড়ে দিলে আপনাদের খাবার যে বিস্বাদ লাগবে। আপনারা কি তাই চান? এবার নির্বাক হবার পালা আমাদের।   সোমনাথ মুখোপাধ্যায়।মে ২৪, ২০২৬.
  • জনতার খেরোর খাতা...
    দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত। - লতিফুর রহমান প্রামানিক | দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত। দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য টা কমপক্ষে দশ বার ঘুরে ঘুরে শুনেছি। একজন ঝানু রাজনীতিবিদ ও কুটনৈতিকের বক্তব্য আলাদা করে দেখার চেষ্টা করেছি। কুটনৈতিক একজন ব্যক্তির বক্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভার সম্পন্ন। প্রায় দুই বছর ধরে ভারতের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নানা কথা চলিত আছে। সম্প্রতি বিধান সভার নির্বাচন এবং বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের জন্য অনেক নতুন হিসাব নিকাশ গড়ে দিচ্ছে। কয়েক দিন ধরে সীমান্তে পুশইনের খবর টাও ভারতীয় মিডিয়া ফলাও করে প্রচারণা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের মিডিয়া ও কম যায়নি। হঠাৎ করে বিডিআর এর সাহসী আর দেশপ্রেমের মশাল জ্বেলে ওঠাও বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির উপস্থিতি এন সি পির কাছে অস্বস্তিকর মনে হলেও বিরোধীদল জামাতে ইসলাম উদার কুটনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় সেটা হজম করেছে বা মেনে নিয়েছে। নির্বাচনের পরে সরকারের মুখে ও বিরোধী শিবিরে ভারত বিরোধী কোন উল্লেখযোগ্য বক্তব্য আর আসেনি। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও হিস্যা আদায় করে নিতে অনড় অবস্থানের ও চিত্র বহাল যে আছে তার প্রমাণ এসেছে সম্প্রতি বি ডি আর এর গলায় যখন শুনি, আপনি গুলি করলে, আমাদের ও গুলি আছে। আমরা চুপচাপ বসে থাকবো না। ঠিক সেই মুহূর্তের কিছু আগে, হাদী খুন হবার অন্তরালে ভারতীয় সরকারের পরোক্ষ অংশগ্রহণের একটা গোপন ঘটনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে ফাস করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি ও নতুন করে প্রশ্নের মুখোমুখি করার কিনার থেকে আপাতত ফিরে আসার ঘটনা ও আলোচনার বারুদ জমা করা থাকছে। শুভেন্দু বাবুর বিগত সময়ের বাংলাদেশ নিয়ে উগ্রতা খানিকটা প্রশমিত হয়েছে বলে আপাত দৃষ্টিতে তারই চিত্র দেখেছি সম্প্রতি বাংলাদেশ নিয়ে তার এড়িয়ে যাওয়া উত্তর থেকে। দুই দেশের এই অসহিষ্ণু সম্পর্ক দুই দেশকে স্বস্তিতে রাখতে পারবে না ধরে নিয়েই কি ত্রিবেদীর সুর পালটে যাওয়া? এবার সেই কথায় আসি। হেটে হেটে সীমারেখা পার হয়ে কুটনৈতিক দায়িত্ব নেওয়ার এই ঘটনা বিরল। করোনা কালে বিমান বন্ধ থাকার সময়ে আখাউড়া দিয়ে ভারতীয় সরকারের প্রতিনিধি আসার ঘটনা প্রথম হলেও এবারের প্রেক্ষাপট সম্পুর্ন আলাদা এবং ঘিয়ে জল ঢেলে দেওয়ার মতো বিরলতম ঘটনার স্বাক্ষী হলেন ভারতীয় সরকারের প্রতিনিধি কুটনৈতিক ত্রিবেদী ও স্ত্রী। সাবেক রেলমন্ত্রী ও তুখোড় পার্লামেন্টারি রাজনৈতিক নেতার এই পদে প্রথম বার নিয়োগ এবং বাংলাদেশের সাথে যে মুহূর্তে একটা নাজুক সম্পর্ক বিদ্যমান তা অনেক চিন্তার খোরাকেরই জোগান দিচ্ছে। তার সহাস্যে আগমন, কুশলাদি বিনিময়ের মাধ্যম ও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাথে ভারতীয় ক্রিকেট দলের একিভুত করার স্বপ্ন কি শুধু কথার কথা নাকি এর পিছনে আরও রাজনৈতিক বিষয় জড়িয়ে আছে তা নিয়ে আলোচনা করার পথ প্রসারিত হয়েছে আরেকবার। আগেই বলেছি ত্রিবেদীর পরিচয়। তিনি ঝানু রাজনীতিবিদ এবং কুটনৈতিক। প্রথমে কংগ্রেস তারপর মমতাবন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃনমুল কংগ্রেসের সাথে এরপর ভারতীয় জনতা পার্টির পলিসি মেকানিক ত্রিবেদীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার তুলনা হয় না। তাই বাংলাদেশের সাথে সখ্যতা রয়েছে যাদের, তারা হোক কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসের বা জনতা পার্টির। সবার সাথে তার রয়েছে ভালো সম্পর্ক। তাই বাংলাদেশ কে সামলাতে হবে দু দিক থেকেই। ভারতীয় সরকারের ও ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে বিচার করতে হবে তার এই বক্তব্য টা। তার সরল বিশ্বাসী কথা যেমন, আমাদের ১৪০ আর বাংলাদেশের ২০ এই নিয়ে ১৬০ কোটি জনগণের দেশ যে বিশ্ব শক্তির উদাহরণ তা চীনের প্রতি একটা হুমকি দিয়ে রাখাই কি না তা ভবিষ্যতে জানা যাবে। যে মুহূর্তে চীনের তিস্তা প্রকল্পে ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ করার হাতছানি দিচ্ছে ঠিক এই মুহূর্তে ভারত বাংলাদেশের একই আকাশ বাতাস আর একই যন্ত্রণার ইংগিত নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। কেউ কেউ অখংড ভারতের পুরনো স্মৃতি নতুন করে ভাবাচ্ছে এক সাথে থাকা দীর্ঘ বছরে ও যখন বাংলাদেশ বঞ্চিত ছিলো তা নতুন করে সীমান্ত তুলে দিয়ে আবারও ভারতের সাথে একীভূত করার স্বপ্ন ঠিক কোন দৃষ্টিতে বলা হয়েছে তা ভাবনার বিষয়। যা কিনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর চোখ কিনা সেটাও ভাবায়। পক্ষান্তরে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসাবে দুই দেশের চিরাচরিত সুশীল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বার্তা যদি হয় তাহলে সেটা রাজনৈতিক গুগলি হিসাবে ভারতীয় সরকারের পলিসি কিনা তাও অগ্রাহ্য করা যায় না। ঠিক এই মুহূর্তে ভারত বাংলাদেশের এই অসুস্থ সম্পর্ক দ্রুত সেরে উঠার জন্য ভারতীয় সরকারের প্রতিনিধি কুটনৈতিক ত্রিবেদী কে নিয়োগের পিছনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে সেই হিসেবে দেখতে হবে। সীমানা বেড়া, পুশইন সমস্যা, মাদক, অস্ত্র পাচার সহ বানিজ্যের অনেক বিষয় নিয়ে দেনদরবার করার ও সর্বোপরি ত্রিবেদী কে ডিল করার যাবতীয় প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সময় অপেক্ষা করে আছে।
    ১৭ জুন ২০২৫  - Srimallar Speaks | উড়িছাদএরই মধ্যে ঢুকে গ্যাছে,গোপনগন্ধকিছু।গোপনই আমার ভাল। গোপনেই, উড়িছাদ।ঘনিষ্ঠজড়াবসেকথা আমি ভুলতে পারব না।ভুলতে চাইও না।যখন পড়বে মনে–তখন একটিবার, ঘনিষ্ঠজড়াব!এখন বড় হ’য়ে গেছিবাজারমুদিখানাসাইকেল—যেতে আসতে হাসিবিনিময়।এখন বড় হ’য়ে গেছি, পারব না ছোট হতে তাই।ধ্বংস, ধ্বংসইজলের ছাপ। কালরাতে ধ্বংস এসেছিল।ধ্বংস যখনই আসে,আমরাও ভাবি লড়ে জিতব।ধ্বংস একাই পারে–ক’রে দিতে আমাদের ধ্বংস!বিপদপ্রস্তুতিআকাশছাদ, আকাশলোক।বারান্দা, পুজোর ঘর।মাথায় ছাদ,আচমকা আচমকা আচমকা!   ~ গুরুচণ্ডা৯ তে ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে প্রকাশ করা আমার প্রথম কবিতাগুলো! কবিতাগুলো একসময়ে আমারই লেখা। অথচ কবিতাগুলোকে আজকে দেখলে, কত যে বেশি একাবোকা দেখায়!
    ভাবুক মন, তোকে  - श्रीमल्लार | আমাকে আমার মতো ভাবতে ব'লে তুমি- গিয়েছ ঝড়ের মতো। আসবে না তুমি। এখন পাখিরা শুধু ফুল নিয়ে ভাবে-আয়ু তো আহাম্মক। বলাকা ভাবাবে। জীবন অচেনা। দেখি সমারোহ পাতার, বৃষ্টি আসে ক্ষত নিয়ে। অনন্যবারতার। গিয়েছ ঝড়ের মতো। মাধুর্যে থাকি।বিকেল সবুজে নীল। ব্যথাও একাকী।
  • ভাট...
    commentভাল বিশ্লেষণ |
    comment:|: | আবাপের ট্রান্সলেটর এতো শোলো ক্যানো? বেলফাস্টের খবর এখনও টুকতে পারলো না। তোয়ালেজি পাঁচ হাজারই যদি দিলেন আর পঞ্চাশটি টাকা বাড়িয়ে দিলেই পারেন!
    commentkk |
    "Ganymede অপহরণে তো আমি খুব ভুল কিছু দেখতে পেলাম না।"
     
    এই লাইনটা পড়ে খুবই অবাক হলাম। কারুর রূপে সাময়িক মোহগ্রস্ত হয়ে একজন লোক, শুধুমাত্র সে প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী বলে, একজন মানুষকে জোর জবরদস্তি তুলে নিয়ে যাচ্ছে তাতে ভুল কিছু নেই? তুলে নিয়ে গিয়ে তাকে অনন্তকাল ধরে পানপাত্র বাহক বানিয়ে রেখে দিলো, তাতে ভুল কিছু নেই? গ্যানিমিড অসামান্য সুন্দর ছিলেন। "ওহে সারা জগৎ দেখো, আমার কাছে এই সবচেয়ে সুন্দর খেলনাটি রয়েছে" এইটা বলতে পারার আনন্দের জন্য, ইগোর জন্য একজন মানুষের জীবন নষ্ট করে দেবার জন্য ভুল কিছু নেই? এইটা কোনো হোমোসেকশুয়ালিটিকে ভালো আলোয় দেখানোর রাস্তা নয়। তার জন্য অন্য উদাহরণ আছে।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত