এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শারদা মণ্ডলের 'পাকশালার গুরুচণ্ডালি' বই থেকে, পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাসজ্যোতিষ্ক দত্তর লেখা ‘সে ছিল একদিন আমাদের' বই থেকে 'ইস্কুলের গল্প'। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।মৃণাল শতপথীর লেখা ‘দিতি ও মহারানি' বই থেকে নেওয়া গল্প - পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    আরশোলার ধর্নায় একদিন - শুভদীপ মণ্ডল | অলংকরণ: রমিত‘কোথা থেকে আসছেন?’ ‘নাম কী?’ ‘কী করা হয়?’হাসিমুখে, আলাপ জমানোর ভঙ্গিতেই একের পর এক প্রশ্নগুলো আসতে থাকলো, অবশ্যই হিন্দিতে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানালেন, এত লোকজনের জমায়েত হচ্ছে, নিরাপত্তার দায়িত্ব তো ওনাদের উপরেই – তাই একটু বাড়তি সতর্কতা। স্থান – দিল্লির যন্তরমন্তর-সংলগ্ন ককরোচ জনতা পার্টির ধর্না ও অনশন মঞ্চ, আর উপরোক্ত প্রশ্নকর্তা খাকি উর্দিধারী দিল্লি পুলিশ। ধর্নার জন্য নির্ধারিত জায়গাটি ডাইনে-বামে দেওয়াল আর সামনে-পিছনে পুলিশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা। পিঠের ব্যাগ স্ক্যান করিয়ে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে তারপর ভিতরে ঢোকা গেল। শুধু পুলিশ নয়, সঙ্গে প্যারা-মিলিটারি ফোর্স আর র‍্যাফ মিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ’ পুরো চত্বর [১]। শুধু পাহারা দেওয়া নয়, দিল্লি পুলিশ-নিযুক্ত ফোটোগ্রাফাররা ক্যামেরা হাতে টহল দিচ্ছেন চারিদিকে। ছোটোখাটো সমস্ত ঘটনা, জটলা, কলেজপড়ুয়াদের আলাপচারিতা, গান-বাজনা এবং প্রতিবাদীদের সমর্থনে হাজির হওয়া প্রতিটি মানুষ দিল্লি পুলিশের ক্যামেরাবন্দি হচ্ছেন। বিশেষ করে, যে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিবাদকারীদের জন্য জল, খাবার, ওষুধ এসব নিয়ে আসছেন – তাঁদের রীতিমতো মুখের সামনে ক্যামেরা ধরে জেরা করা হচ্ছে। এ-ও জানা গেল, কিছু স্বেচ্ছাসেবীর বাড়িতেও হানা দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ চলেছে তাদের টাকার সোর্স জানতে। দুঃখের ব্যাপার এই, যে, এখনো অবধি জর্জ সোরোস, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ – কোনো লিঙ্কই খুঁজে পাওয়া যায়নি। জেরায় জানা গেছে, কিছু লোকজন নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করেই প্রতিবাদকারীদের টিকে থাকার রসদ জুগিয়ে যাচ্ছেন। এসব গালগল্প অবশ্য দিল্লি পুলিশ কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না। তদন্ত এবং নজরদারি চালু আছে চব্বিশ ঘণ্টা। আশা করা যায়, বলিউডের দেশপ্রেমী ডাইরেক্টররা দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তাঁদের হাত ধরে সত্য নিশ্চয়ই একদিন উন্মোচন হবে এবং সেদিন কোনো মাল্টিপ্লেক্সের বড় পর্দায় পপকর্ন খেতে খেতে দেশের জনসাধারণ জানবে – কীভাবে এইসব দেশদ্রোহী বেকার ছেলেমেয়েদের দল দেশের ভিতর থেকে দেশকে টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্র করেছিল আর কীভাবে দিল্লি পুলিশের ধুরন্ধররা নিজেদের মগজাস্ত্র প্রয়োগ করে সেই রহস্য ভেদ করেছিলেন। [৭ - ৮] সে যাই হোক, আগামীর আচ্ছে দিনের স্বপ্ন সাইডে সরিয়ে রেখে আপাতত ডিসেম্বর মাসের রেকর্ড-ব্রেকিং AQI আর জুন-জুলাইয়ের হিটওয়েভের দিল্লিতে ফেরা যাক। জনপথ মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে মোটামুটি পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। তাতেই ধর্না মঞ্চ অবধি পৌঁছানোর আগেই পুরো টি-শার্ট ঘামে জবজবে। এই আবহাওয়ায় ককরোচদের অবস্থানের সেদিন দশম দিন। পৌঁছে জানলাম – শুধু সোনম ওয়াংচুক নন, অনশনে আছেন দিল্লি, জওহরলাল নেহরু এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত কিছু ছাত্রছাত্রী-সহ জনা পনেরো [৭]। প্রাথমিক দাবি – NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং আরও বৃহত্তরভাবে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা। সমবেত মানুষজনের কথায় আরও অনেক বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটলেও, মূল দাবী ওইটুকুই। এঁদের মধ্যে কয়েকজন সোনম ওয়াংচুক আসার আগে থেকেই অনশনে রত এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার বেশ খানিকটা অবনতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এর কোনো খবরই বাইরে বিশেষ বের হয়নি, তার কারণ – সামগ্রিকভাবে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনকে বয়কট করেছে। অবশ্য ধর্না চত্বরে ক্যামেরার অভাব নেই। কিছু ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া হাউস ছাড়াও অনেকেই নিজেদের ইউটিউব বা ইন্সটাগ্রাম ভিডিও বানাচ্ছেন এবং শেয়ার করছেন। বড়সড় ইনফ্লুয়েন্সাররা অবশ্য অনুপস্থিত। সে নিয়েও ক্ষোভ আছে বোঝা গেল। রাস্তার ধারে অস্থায়ী টেবিল পেতে জল আর খাবার-দাবারের জোগান দিচ্ছেন উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, দিল্লি, হরিয়ানা থেকে আগত বিভিন্ন ধর্ম আর ভাষার মানুষজন [১০]। তার পাশেই চোখে পড়ল মেডিসিন কাউন্টার। জনৈক ডাক্তার নিজেই এসেছেন First-Aid Kit, ORS, Paracetamol-সহ বিভিন্ন ওষুধের পসার নিয়ে [৯]। এক বাম ছাত্র সংগঠনের তরফ থেকে খোলা হয়েছে অস্থায়ী লাইব্রেরি। অবস্থানরত মানুষজন বই নিচ্ছেন, পড়ছেন, আবার ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন। এই লেখা যেদিন লিখছি, তার ৩-৪ দিন আগে হঠাৎ সেই লাইব্রেরি বন্ধ করতে উদ্যোগী হয় দিল্লি পুলিশ। এ নিয়ে ধস্তাধস্তি হয় এবং ছাত্রদের তরফ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে গালাগালি ও ধমকধামক করার অভিযোগ আসে [১১]। স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশ্নের উত্তরে দিল্লি পুলিশের তরফে জানানো হয়, লাইব্রেরি নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। অবশ্য অভিযোগ ঠিক কী আর কারা সেই অভিযোগ করেছেন – সে প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি। [৯ - ১১] সরাসরি বলপ্রয়োগ না করে, নিজেদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি, ক্যামেরার নজরদারি আর জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আন্দোলোনকে কক্ষচ্যুত করার চেষ্টা চলছে প্রশাসনের তরফে। মাঝে মাঝে লাউডস্পিকারে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে – এই ধর্নার সময়সীমা প্রথমদিন বেলা পাঁচটাতেই শেষ হয়ে গেছে, তাই সবাই যেন স্ব-স্ব-গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। এছাড়াও গত রবিবার (৫ই জুন) একসঙ্গে আরও পাঁচটি সংগঠনকে ওই একই জায়গায় অন্যান্য ইস্যুতে প্রতিবাদ জানানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়, খুব সম্ভবত একটা গোলমাল পাকানোর উদ্দেশ্য নিয়ে, যাতে একটা অজুহাত খাড়া করে অবশেষে ককরোচদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যায়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা – সোনম ওয়াংচুক এসে পড়ায় পরিস্থিতি একটু জটিল হয়ে গেছে, নাহলে এত ছলাকলার আশ্রয় না নিয়ে, সরাসরি বলপ্রয়োগ করে এই আন্দোলন হয়তো আরও আগেই থামিয়ে দেওয়া হত। প্রশাসন মোটের উপর নিষ্ক্রিয় থাকলেও উনিজির ভক্তকূল কিন্ত বসে নেই। প্রথমদিন থেকেই টুকটাক চেষ্টা চলছে উপস্থিত আন্দোলোনকারীদের উত্যক্ত করে গোলমাল সৃষ্টি করার – সে ‘সাংবাদিক’ বা ‘আমজনতার প্রতিনিধি’ সেজে ট্যাঁড়া-ব্যাঁকা প্রশ্ন করেই হোক, বা ‘আন্দোলোনকারী’ সেজে ক্যামেরার সামনে সাজানো ইন্টারভিউ দেওয়ার নাম করে উত্তেজক কথাবার্তা বলে। সরাসরি গুন্ডামির ঘটনাও একটা দুটো ঘটেনি এমন নয়, তবে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনাই। অভিজিৎ দিপকে বারবার আন্দোলোনকারীদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন – শত প্ররোচনাতেও এদের ফাঁদে পা না দিতে এবং এখনও অবধি তেমন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই। সমাজমাধ্যমে বিজেপির আইটি সেল আন্দোলনকে বদনাম করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে – সোনম ওয়াংচুক বোতল থেকে জল নয়, চিকেন স্যুপ পান করছেন [৮], আবার কখনও বলা হচ্ছে অনশনকারী ছাত্রছাত্রীরা নাকি টয়লেটে গিয়ে চেটেপুটে খাবার-দাবার খেয়ে আসছেন। কয়েকজনকে ক্যামেরা হাতে টয়লেটের আশেপাশে ঘুরঘুর করতেও দেখা গেছে। ধন্য তাদের অধ্যবসায়। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলোনকারীদের ‘ভাইরাস’ এবং ‘আতঙ্কবাদীদের বি-টিম’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়াও উপাধি হিসাবে ‘দেশবিরোধী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ – এসব উপরি পাওনা তো আছেই। অবশ্য ভক্তকূল ছাড়া এসব বস্তাপচা হেটস্পিচ আর কেউ গিলছে বলে মনে হয় না। বরং সংহতির দৃশ্য চোখে পড়েছে অনেক বেশি। কৃষক নেতারা এসেছেন, মঞ্চের উপর উঠে সমর্থন জানিয়ে গেছেন। প্রবীণ স্বাধীনতাসংগ্রামী পণ্ডিত রামকিষণ এসেছেন। বয়স ১০১ বছর, ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে শুরু করে আজীবন আপোষহীন সংগ্রাম করেছেন। জেল খেটেছেন স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তীকালে, এমারজেন্সির সময়। এই বয়সেও প্রতিবাদ-মঞ্চে এসে অনেকটা সময় কাটালেন। বক্তব্য রাখলেন, ধৈর্য্য ধরে আন্দোলোনকারীদের কথা শুনলেন, উৎসাহ দিলেন, উপস্থিত জনতার প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। প্রশান্ত ভুষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সঞ্জয় সিং, মহুয়া মৈত্র, সাগরিকা ঘোষ, বৃন্দা কারাত – প্রমুখেরাও হাজিরা দিয়েছেন/দিচ্ছেন একে একে। এসেছেন অরুন্ধতী রয় ও আরও অন্যান্য সমাজকর্মীরা। সাধারণ মানুষজন আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে [৩]। তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায় এবং তার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে কীভাবে প্রশাসনিক হেনস্থার শিকার হয়েছেন – সেইসব ঘটনা তুলে ধরছেন। তাঁদের কথায় উঠে আসছে কিছু কমন ফ্যাক্টর – বিজেপি-শাসিত রাজ্য, বিবিধ দুর্নীতি, আতঙ্কের পরিবেশ, আর পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা ক্ষেত্রবিশেষে অতি সক্রিয়তা। ক্ষমতাবানের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে ক্লান্ত হলেও, হাল ছাড়েননি তাঁরা। দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন এই ধর্না মঞ্চে, আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানাতে। এগিয়ে আসছেন – NEET-কেলেঙ্কারি যেসব ছাত্রছাত্রীদের ঠেলে দিয়েছে আত্মহত্যার পথে, তাদের বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনেরা [১২]। যেটুকু সময় থাকছেন, স্বেচ্ছাসেবীরা আগলে রাখছেন এঁদের সবাইকে। কাঠফাটা রোদ, ধুলোর ঝড়, মুষলধারায় বৃষ্টি – সবকিছুই সহ্য করতে হয়েছে, হচ্ছে। অনশনরত ছাত্রছাত্রীদের অস্থায়ী ছাউনি কোনোভাবেই পর্যাপ্ত ছিল না। বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে তাদের সবকিছু। তেরপল নিয়ে আসতে বাধা দিচ্ছে দিল্লি পুলিশ। তার জন্যও নাকি অনুমতি আসতে হবে ‘উপর’ থেকে [২, ১৪]। প্রধান মঞ্চের উপর অভিজিৎ ও আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীদের দেখা গেল – একটা বড়সড় ব্যানার মাথার উপর ধরে সোনম ওয়াংচুককে প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে। ম্যাগসেসে পুরষ্কারজয়ী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী... তাঁর মতো মানুষ যে কোনো দেশের সম্পদ। ভাবছিলাম, আমার দেশের সংখ্যাগুরু নাগরিকের সেই বোধটুকুও কী আছে? প্রশ্ন এখানে দায়বদ্ধতার। পদ যত উঁচু, সেই পদের দায়বদ্ধতাও তত বেশি। কারণ সেইসব পদাধিকারীর একটা ভুল অগুনতি মানুষের জীবন ছারখার করে দিতে পারে—যা এক্ষেত্রে হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর অযোগ্যতা, অক্ষমতা – যাই বলুন না কেন, তা ২০-২২টা ছেলেমেয়েকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছে। অগুনতি ছেলেমেয়েকে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। আর এটা তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গত কয়েকবছরে এতগুলো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সামনে এসেছে – এ যেন গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে আমাদের। চলতি বছরেই অভিযোগ এসেছে UPSC এবং NET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়েও। Hanlon’s razor বলে, “Never attribute to malice that which is adequately explained by stupidity”, আবার Grey’s law অনুযায়ী, “Any sufficiently advanced incompetence is indistinguishable from malice”. যা ঘটে গেছে, তা স্রেফ অযোগ্যতার নিদর্শন, বা ইচ্ছাকৃত অনিষ্টসাধনের চেষ্টা... যে সিদ্ধান্তেই আপনি উপনীত হন না কেন, ক্ষমা-ঘেন্না করে দেওয়ার সময় অতিক্রান্ত। আর এই বিপুল ক্ষতির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াকে ‘এমন কিছু বড় ঘটনা নয়’ প্রমাণ করতে বাজারে নেমেছেন। আশা করি তাঁদের বিবেক, মনুষ্যত্ব একদিন জাগবে। বছর বছর স্কুলে ছেলেমেয়েদের ঘাড় ধরে বসিয়ে যে প্রধানমন্ত্রীর ‘পরীক্ষা পে চর্চা’-র বাণী গিলতে বাধ্য করা হয়, পরীক্ষা নিয়ে এত বড় একটা কেলেংকারির পরও তা নিয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি। অথচ দ্বিতীয়বার NEET পরীক্ষা সফল’ভাবে পরিচালনা করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে দেরি হয়নি একটুও। সাফল্যের কৃতিত্বের ভাগ নিতে সদা তৎপর। আর ব্যর্থতা এলে দেশবাসীর জন্য বরাদ্দ হিরন্ময় নীরবতা। [৫, ৬] আশার কথা, কিছু দক্ষিণপন্থী সমর্থকও অবশেষে জেগে উঠছেন এবং অন্তত এই একটি বিষয়ে সরকারকে সমর্থন করছেন না [৪, ১৩]। যন্তর-মন্তরে লোকজনের ভিড় বাড়ছে, কমছে। এক একদিন তিল ধারণের জায়গা থাকছে না, আবার কোনওদিন মেরেকেটে ৫০-১০০ জন। তাতে অবশ্য ককরোচদের উৎসাহে ভাটা নেই। রোদ, বৃষ্টি, ধুলোর ঝড় উপেক্ষা করে ওরা রোজ স্লোগান দেয়, গান গায়, একে অন্যের মনোবল বাড়ায়, ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারেই একটু ঘুমিয়ে নেয়, আবার নতুন উদ্যমে দিন শুরু করে। আমিও যাচ্ছি মাঝেসাঝে। স্লোগান দিতে বা অনশন করতে নয়, স্রেফ হাজিরা দিতে। গত বেশ কয়েকবছর ধরে দিল্লি থেকে সামান্য দূরে থাকি চাকরির সূত্রে। যাদের মাঝে ওঠাবসা, তাদের অনেকের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অদ্ভুত উদাসীনতা বা নারকীয় উল্লাস দেখে প্রায়শই নিরাশায় ভুগি। এই কমবয়সী ছেলেমেয়েগুলোর দৃপ্ত চেহারা, মুষ্টিবদ্ধ হাত, প্রাণখোলা হাসি আর লড়াকু স্লোগানে আমার মনের অন্ধকার যেন একটু ফিকে হয়ে আসে। দিল্লির অসহ্য গরমও আর অতটা টের পাই না। দেখি – এদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মাঝবয়সীরাও আসছেন। অফিস-ফেরতা, পিঠে বা হাতে ব্যাগ আর চেহারায় একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। এঁরা সেই শ্রেণীর মানুষ, যাঁদের অনেককিছু হারানোর ভয় – স্থায়ী চাকরি, তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসার, মাসিক কিস্তিতে কেনা গাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি... যাঁরা খুব অতিষ্ঠ না হলে সচরাচর নিজেদের সযত্নে লালিত গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে পা রাখেন না। এই আন্দোলন যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এঁদের মতো আরও অনেকে আসবেন একটু একটু করে ভয় আর জড়তা কাটিয়ে। সেদিন মানুষের ভিড় যন্তর-মন্তর ছাড়িয়ে রাজপথে নেমে আসবে। আশা করবো – সেইদিন খুব দূরে যেন না হয়। সোনম ওয়াংচুক ইতিমধ্যেই প্রায় শয্যাশায়ী, তাঁর ওজন কমেছে ৭ কিলো। রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মান বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে। অনশনরত এক ছাত্র আর এক ছাত্রীকে ইতিমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে [৫, ৬]। সোনম, অভিজিৎ, নেহা, আশুতোষ, জুনেইদ, সৌরভ আর তাদের সঙ্গীসাথীরা যে লড়াইয়ে নেমেছেন – তা আমাদের সবার লড়াই। জয়লাভ হবে কিনা জানা নেই, কিন্তু ময়দানে থাকতে হবে – এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। চরৈবেতি। [১] Youths rally in large numbers; bang plates, spoons to demand accountability at CJP protest - The Hindu[২] 'People falling sick': CJP's Dipke claims Delhi Police denied tarpaulin at protest site despite rain - Hindustan Times[৩] Fresh political support pours in on 15th day of CJP protest; student hospitalised - The Hindu[৪] Spoke to the AISA student activists about their hunger strike being ignored by the government - @PeekTVOfficial[৭] 6 Days Without Food Or Support From Parents - @PeekTVOfficial[৮] ‘Even If I D!e…’: Wangchuk’s Reply To Critics - @PeekTVOfficial[১২] Father Who Lost His Son Due to Paper Leak - @PeekTVOfficial[১৩] 58% NDA Voters Chahte Hain Dharmendra Pradhan Istifa Dein? | C-Voter Survey Mein Bada Khulasa - @official_cockroachjantaparty[১৪] CJP founder Abhijeet Dipke confronts Delhi police for not allowing tarpaulins at protest amid rains - @thenewindianxpress
  • হরিদাস পালেরা...
    বহ্নি মধুময় অথবা মধু বহ্নিময়ঃ (উপন্যাসিকা ঃ পর্ব ২)  - রানা সরকার | অনাদিবাবুর ঘরোয়া ক্লাব ঘর। এখানে কাউকে পরোয়া করা হয় না বা কেউ এখানে জড়োয়া গয়না পরে এসে ভেড়ৃয়া ময়না সেজে বসে থাকে না। এখানে যখন এসেছ তখন তুমি মুক্ত হও। মানে তোমার মনের কোণে যে শব্দগুচ্ছ জমেছে তা ক্লাবঘরের উষ্ণ আলাপচারিতায় গলিয়ে ফেল। জ্ঞান দাও; জ্ঞান নাও। কিন্তু বাপু ঘ্যানঘ্যান কোরো না।সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছিল। তবে জোরে নয়, ইলশেগুড়ি। আড্ডার টানে প্রায় সবাই এসে হাজির। আলোচনাও বেশ জমে উঠেছে। বিষয় ব্যবসা। অনেকে অনেক কথা বলল। যেমন, বাঙালীরা ব্যবসা বিমুখ। ব্যবসা করা ছেলের সাথে বিয়ে দিতে মেয়ের মায়েরা বত্রিশবার ভাবেন। অন্যজন বললেন যে ওটা আসলে অজুহাত। আসলে বাঙালীর উদ্যোম নেই। অনেকে হা হা করে উঠল। তাহলে দ্বারকানাথ, রবীন্দ্রনাথ, মতিলাল শীল প্রমুখেরা জন্ম নিতেন না। কতধরণের কতরকমের ব্যবসা আছে সেসব নিয়ে আলোচনা করলেন বারিণবাবু।সবশুনে অনাদিবাবু বললেন, “দেখ বাপু, সব থেকে ভালো ব্যবসা হল বিয়ের ব্যবসা।বেশ একটা শাঁসাল শ্বশুড় দেখে মেয়ে পাকড়াও, মানে পটিয়ে ফেল।ব্যাস, তারপর বিন্দাস দিন কাটাও”।বারিণবাবু হাসতে থাকলেন। বললেন, “তোমার মুখে আজকালকার ছেলে-ছোকরাদের ভাষা শুনতে বেশ লাগে। তবে ব্যাপারটা গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে না তো? ব্যবসা, বিয়ে -গুলিয়ে যাচ্ছে না তো?”“বিন্দুমাত্র না। আগেকার রাজারাও বিয়ে করে করে রাজ্যবিস্তার করত। বিম্বিসারই তো করেছে”।“কিন্তু কোথায় রাজা আর কোথায় প্রজা..?”“এটা কিন্তু এখন প্রজাতান্ত্রিক দেশ। আর অনেক বিয়ে করারও দরকার নেই। বিম্বিসার রাজ্যবিস্তার করেছে, এরা না হয় একটা বিয়ে করে যৎকিঞ্চিৎ অর্থবিস্তার করবে”।কথাগুলো পলতেদা, মধু, মংকাদের লক্ষ্য করে। ওরা একটু চার্জড হয়ে উঠল।“কিন্তু এই সম্পর্ক কি মধুর হবে রায়মশা্ই ...?”“আরে হবে, হবে। মধু খাবেন আর হুল খাবেন না? তা হয়? তবে মনের চুনটি সাথে করে রাখতে হবে সবসময়। ফোটালেই প্রলেপ দিয়ে নেবেন”। “আপনি পারেনও বটে”।“হ্যাঁ!, শুনে নাও যুবাগন। প্রেম করতে হবে। ধরতে হবে পয়সাওয়ালা মেয়ে।তার জন্য হতে হবে উদ্যোগী ..”।“কারণ?”“কারণ ‘উদ্যোগীনঃ পুরুষসিংহ উপোত্যই পত্নী’”।সবাই হাসতে থাকল। যে গুমোট ভাবটা সবার মনে আকাশ বেয়ে জমে ছিল তা কেটে গেল অনেকটা। পুরোহিত মশাই কোণের দিক করে বসে ছিলেন। অনাদিবাবু তার মুখের জ্যামিতিটা পড়ে নিয়ে বললেন, “কী পুরোহিত মশাই, কথাটা মনে হচ্ছে মনঃপুত হয় নি আপনার ?”নিজের দিকে সবার দৃষ্টি অনুভব করে একটু নড়েচড়ে বসলেন পুরোহিত মশাই। বেশ একটা কেউকেটা ভাব করে বললেন, “হু, বন্দোবস্তোটা মন্দ নয়; মন্দ নয়। তবে অনেক কিছু দেখে নিতে হবে। যে সে মেয়ে বিয়ে করে শেষে ফাঁসবে নাকী ..”“সেটা কীরকম?”, বারিণবাবু জানতে চাইলেন।“প্রথমেই দেখে নিতে হবে মেয়ে মাঙ্গলিক কী না ...”।“কী লিক?”“মেয়ের মঙ্গল লিক করেছে কীনা দেখে নিতে বলছেন”, পলতেদা সবাইকে বুঝিয়ে দিলো।সবাই আবার ফেটে পড়ল হাসিতে।“এইজন্যই আমি কিছু বলি না। যতসব পশ্চাৎপাকার দল। ... যান, আমি আর বলবই না”। পুরোহিতমশাই গোঁসা করে মুখ গুঁজে রইলেন। সবাই যে যার মতো তাকে বোঝতে লাগল। শেষে অনাদিবাবু পলতেদাকে ইশারা করলেন। মুখ চেপে হেসে পলতেদা ক্ষমা চাইল। এই ব্রম্হাস্ত্রতে কাজ দিল। পুরোহিত মশাই পলতেদাকে ভগবানের ভঙ্গিতে বরাভয় দিয়ে বললেন, “ও আমি কিচ্ছু মনে করিনি। হ্যাঁ, সোনার চাঁদ ছেলেরা সব। ও একটু আধটু হয় ....”।“হ্যাঁ, কী যেন বলছিলেন?”, অনাদিবাবু খেইটা ধরতে চাইলেন।“মঙ্গল”, মংকা ধরিয়ে দিল।“হ্যাঁ, দেখে নিতে হবে মেয়ে মাঙ্গলিক কী না বা ভৌমদোষ আছে কীনা। পাত্র-পাত্রীর জন্মছক মেলাতে হবে। ওপাড়ার সমীরণ, বলি আমার কথা না শুনে করলি তো বিয়ে, করলি তো? তারপর সাতমাসের মাথায় কী হল, কী হল? .... গেলি তো ...”পুরোহিত মশাই যেন নস্ট্রাডামুস আর আমরা সব পাপীতাপী। যেন দিব্যচক্ষে যা দেখছেন বা বলা ভালো অবলোকন করছেন তাই কমেন্ট্রির মাধ্যমে আমাদেরকে বলছেন। বলছেন আমাদের মঙ্গলের জন্য, আমাদের পাপস্খালনের জন্য।পুরোহিত মশাই বলে চললেন, “আমি হলফ করে বলতে পারি, সমীরন যাকে বিয়ে করেছিল তার জন্মকুন্ডলীতে চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, দশম অথবা দ্বাদশের কোথাও না কোথাও মঙ্গল আছে”।পকাই প্রতিবাদ করে উঠল, “না, পুরোহিত মশাই আপনার কথা মানতে পারলাম না। সমীরণদা খুব মদ খেত, তাই সিরোসিস হয়েছিল....”খুব করে পকাইকে লক্ষ্য করে হেসে নিলেন। বললেন, “আরে! ওকে মদ কে ধরিয়েছিল ?”“সবাই জানে। সারদাপল্লীর নাড়ুমাতাল!”।“না। নাড়ু না। ওকে মদ ধরিয়েছিল মঙ্গল ...”“কে মঙ্গল?”“কে মঙ্গল...”, পুরোহিত মশাই খানিকটা ভেঙালেন। বললেন, “মঙ্গলগ্রহ”।আমরা সবাই ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে লাগলাম।পলতেদা আর থাকতে না পেরে বলল, “আপনার মঙ্গল কোথায় আছে ? নুনশোতে আবার লাইন দেয়নি তো ?”“এই ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। যত্ত সব ....। তারপর গণ দেখতে হবে...”“সে আবার কী?”, মধু জানতে চাইল।“সেকী! তুমি গণ জানো না? নরগণ, দেবগণ আর রাক্ষসগণ ...”এবার অনাদিবাবু বাকযুদ্ধে অবতির্ন হলেন। বললেন, “ঠাকুরমশাই, তাহলে হেক্সাগন, পেন্টাগন, ডেকাগন ...., এদের কী হবে?”“কিন্তু এদের সম্বন্ধে তো আগে কিছু শুনিনি!”। খানিকটা ধন্দে পড়ে গিয়ে বললেন, “আরো গণ আছে নাকী?”“আছে বৈকী। তবে সবচেয়ে ভয়ানক গন হল ...”মুখের কথা কেড়ে ঠাকুরমশাই এর জবাব, “রাক্ষস!”।“না”।“তবে?”“জনগণ"।সবাই তুমুল হাসতে লাগল। কেউ কেউ হাসি চাপতে না পেরে টেবিলে, মেঝেতে, এর ওর গায়ে চাপড় মারল। ঠাকুরমশাই অপ্রস্তুত হযে পড়লেন। "হ্যাঁ। জনগণ। পুরো বাই পোলার। এই ভালো তো এই খারাপ। কখনও আদরে আদরে অতিষ্ঠ করে দেবে, আবার কখনও কেলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দেবে!!" “বড্ড বাজে কথা হচ্ছে”। জয়ন্তদার জলদগম্ভীর গলায় তর্কের প্রস্তুতি। জয়ন্তদা একটা কলেজে পার্টটাইম করেন; বিষয় পলিটিক্যাল ইকনমিক্স। এই কিছু দিন আগে ঐতিহাসিক ভুল টুল ইত্যাদি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছিল অনাদিবাবুর সঙ্গে। মার্কক্সিস্ট তাত্ত্বিক হিসেবে সমধিক পরিচিত। শোনা যায় জয়ন্তদা প্রেমে হাফসোল খেয়েছেন। অনেকক্ষন ধরে কী একটা যেন পড়ছিলেন। আমরা সকলে সাবধান হয়ে বসলাম। মনটাকে বললাম, খবরদার।জয়ন্তদা বলে চললেন, “আসল কথাটা কেউ বলছে না। যদি মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখো, তবে দেখবে মেয়ে হ’ল চারপ্রকার .....”।ঠাকুরমশাই ব্যাপারটা নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্ল শুরু করলেন। বললেন, “অ্যাহ! কী চারপাতা ইংজিরি শিখেছ, আর বিদ্যে জাহির করছ? বলি পাঁজিটা পড়ে দেখেছ একবার? সেখানে জ্বলজ্বল করে লেখা আছে মেয়ে হল পাঁচপ্রকার। শঙ্খিনী, পদ্মিনী, হস্তীণী ...”।“দেখুন ঠাকুরমশাই এটা একটা ইন্টেলেকচুয়াল কথা হচ্ছে। আপনি আপনার নন-ইন্টেলেকচুয়াল পাঁজিপত্তর এর বাইরে রাখলেই ভালো হয়”।ঠাকুরমশাই মানে না বুঝে আবার কথা বলতে উদ্যত হয়েছিলেন। অনাদিবাবু ব্যাপারটা সামলালেন। ঠাকুরমশাইকে বললেন “আপনার বলার সময় জয়ন্ত কিন্তু কিছু বলেনি। সুতরাং কী বলছে আগে শুনুন, ওকে বলতে দিন। বলো, জয়ন্ত”“হ্যাঁ, যা বলছিলাম”, নিজেকে গুছিয়ে নিলেন জয়ন্তদা।, “যদি মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখ তবে দেখবে মেয়ে হ’ল চারপ্রকার”।“কী রকম?”“আদিম সাম্যবাদী মেয়ে, সামন্ততান্ত্রিক মেয়ে, বুজোর্য়া মেয়ে আর প্রলেতারিয়েত মেয়ে। আদিম সাম্যবাদী মেয়ে পাওয়া এখন খুব মুশকিল। এরা অল্পবয়সেই বিয়ে করে নেয়, বেশী পাওয়া যায় না। স্বভাবে এরা খুব ঠান্ডা হয়। খুব যত্নআত্তি করে টরে”। “মানে নাবালিকা অবস্থাতেই ....?। আর সামন্ততান্ত্রিক?”, বারিণবাবু জানতে চাইলেন।“না। সদ্য সাবালিকা হলেই..., আর সামন্ততান্ত্রিকরা আবার মারধোর করলেও ঠিক সময়ে খেতে টেতে দেয়। মুড ভালো থাকলে আদরযত্নও করে”। “মারধোর!”, ভয়ে সিঁটিয়ে গেল মংকা।“হ্যাঁ। টাকা রোজগার করে না আনলে ঠ্যাঙাবে না? আর বুর্জোয়া মেয়েরা হল আবার বাজারকেন্দ্রিক। প্রতিমাসে এ্যায়সান শপিং করবে, এ্যায়সান শপিং করবে, যে দেখবে পকেট ফেল করে গেছে। তারপর ফি হপ্তায় এখানে খেতে যাওয়া, ওখানে আউটিং-এ যাওয়া...”। মধুরা সবাই নিজেদের পকেট হাতড়াল।“আর প্রলেতারিয়েত?” ফচকা আশাহত ভাবে জানতে চাইল।“এরা মুখরা হয়। হ্যাঁ, মুখে মুখে প্রচন্ড ঝগড়া করে। ঠ্যাঙাতেও ওস্তাদ। বড় বড় কথা বলে বাপের বাড়ি সম্বন্ধে। কিন্তু আসলে লবডঙ্কা.....। নিজেরা সব সময় কর্তৃত্ব করে। তবে মনটা ভালো হয়...। একেবারে জলের মতো”। “তাহলে কাকে বিয়ে করব?”, পলতেদার সারেন্ডার ভঙ্গি। “হুঁ, বলা খুব কঠিন”।অনাদিবাবু আমাদের আশ্বস্ত করলেন, “একটা সাম্যবাদী পয়সাওয়ালা বিধবা বা ডিভোর্সী মেয়ে পেলে তোমাদের ভালো হয়। তোমাদের তো চিনি। যা এক একটা ভীতু আর লোভী ছেলে সব তোমরা ...”।মধুময়ের এতো কিছু মাথায় ঢুকছিল না। একটা বিয়ে করবে তার জন্য এতো কিছু! কই, তাদের গুরুজনেররাও তো বিয়ে করেছেন। এতো ঝামেলা তো ছিল না। মা-বাবা পছন্দ করেছে আর ছেলে-মেয়ে তাদের কথা মতো বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে। বিয়ের পর হয়েছে প্রেম। তারপর সন্তানাদি নিয়ে হইহই করে করেছে সংসার। এখন না হয় ব্যাপারটা একটু পাল্টাতে পারে। যেমন আগে বাবা-মা পছন্দ করেছেন, এখন না হয় ছেলে-মেয়েরা নিজেদের পছন্দ করবে আর বাবা-মা দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেবে। তা বলে এতো সব! এর মধ্যে বরুনদা আবার আরও নতুন কথা শোনালেন। বরুনদা মানে বরুণ চট্টোপাধ্যায়। এশিয়াটিক সোসাইটিতে রিসার্চ করেন। সঙ্গে ফিল্ম স্টাডিজ। বহু সিনেমা দেখেছেন। ঐ যাকে বলে পুরোদস্তুর ‘ফিল্ম-বাফ’। তিনিও বললেন যে মেয়ে চাররকমের হয়, তবে জয়ন্তদা যা বলল ঠিক সেই রকম নয়, ওর কনসেপ্টটা নাকী পুরোনো; জং ধরে গেছে। নতুন কনসেপ্টে চারপ্রকার মেয়ে হল - পোস্টমর্ডান, পোস্টকলোনীয়াল, পোস্টস্ট্রাকচারাল আর পোস্টমার্ক্সীয়ান!।মধুময় ভাবতে বসল, এরা আবার কী রকম হবে কে জানে? বিয়ের পর সবকিছু ‘পোস্ট’ না করে দেয়! এদের বলা হয় নি, অনেকদিন ধরে পাড়ার ঐ বহ্নিকে তার বেশ পছন্দ। গ্রীবাটি একদম হংসের মতো। চাঁদের মতো মুখ। কলেজ যাবার পথে মধুকে দেখেছে কয়েকবার, হেসেছেও বোধহয়। কিন্তু মধু ভেবে পাচ্ছে না ঠিক কীভাবে ওর সাথে ভাব জমাবে। যা একটা জাঁদরেল বাবা। তার ওপর আছে একটা বিটকেল কাজের লোক।(চলবে)
    কথার কথা  দুই - হীরেন সিংহরায় | কথার কথা দুই ফ্রেজ ইডিয়ম উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাসে বাংলা প্রবাদ, ইংরেজি ফ্রেজ ইডিয়ম এবং তার প্রয়োগ অবশ্য পাঠ্য ছিল। ‘ তুমি যে ডুমুরের ফুল ‘লিখলেই হবে না, তাকে মাত্র কখনো সখনো দেখা যায় বলেই যে সে এই কৌলীন্য অর্জন করেছে বাক্যের মধ্যে সেটি বোঝাতে হবে। নইলে মাথায় দুটি চাঁটি অবধারিত। বাংলা ইংরেজির প্রবাদ প্রচলনে জানা গেল কিছু বাক্যাংশ দু ভাষাতেই মেলে, একটু অন্য চেহারায় যেমন ‘ নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা ‘ আর ‘ এ ব্যাড ওয়ার্ক ম্যান কোয়ারলস উইথ হিজ টুলস’, যেমন ‘ অমাবস্যার চাঁদ’ আর ‘ ব্লু মুন’। ব্যতিক্রমও পেলাম – ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রি নামক শহরে কেউ যেতে চাইতেই পারে কিন্তু জানতে হয়েছে কোনো মানুষকে সেখানে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া মানে তাকে দূর করে দেওয়া ( সেন্ড হিম টু কভেন্ট্রি )। এমন শ খানেক ফ্রেজ ইডিয়ম মুখস্ত করে দুরুস্ত হয়ে তবেই না এই দ্বীপে পা দিয়েছি। ক্রমশ জানলাম, এতো সহজ নয়, সেখানেও হার্ডল রেস; পদে পদে বেড়া টপকানোর পালা।হয়তো আধেক শিখেছি গো, আধেকের বেশি আছে বাকি !হোয়েন রাবার হিটস দি রোড সবে কাজ শুরু করেছি লন্ডনে ; আমার চিফ জো ম্যাকিয়েভিতস চেনাচ্ছেন সিটি ব্যাঙ্ক। তিনি বলেছিলেন, ব্যাঙ্ক বদল করেছ, কিন্তু নতুন করে ব্যাঙ্কিং শিখতে হবে না। তবে ব্যবসা এক হলেও দু ব্যাঙ্কে কর্ম পদ্ধতি আলাদা হতেই পারে, সেটা চিনে নেওয়া দরকার। আগের ব্যাঙ্কে আমরা এটা এইভাবে করতাম, ওটা ঐ ভাবে করতাম এমন বলতে থাকলে তুমি সিটি ব্যাঙ্কে কেবল শত্রু সংখ্যা বৃদ্ধি করবে। আশা করি তুমি এখানে টিকবে অনেক দিন; আপাতত আমার দফতর নয়, নানা ডিপার্টমেন্টে পাঠাবো, যাও দেখো কোথায় কে কোন কম্ম করে, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। সেই প্রস্তুতি পূর্ণ করে যখন মাঠে নামবে, হোয়েন রাবার হিটস দি রোড, কোন অসুবিধে হবে না। প্রখর অ্যাংলোফাইল স্ত্রী শুনে বললেন রাবার হিটস দি রোড ? কখনো শুনি নি। মানে কি ?ধরে নেওয়া যাক এটি একটি চিত্রকল্প -মোটর গাড়িতে রাবারের টায়ার লাগানো হয়েছে কিন্তু সেটি কতটা বা আদৌ কর্মক্ষম কিনা সেটি বোঝা যাবে যখন সে গাড়ি পথে নামবে। গুজরাতিতে বলে নতুন বউ খোঁড়া বলে বাজে লোকে গুজব রটাচ্ছে, বহু জব চলে তো জানিও। অর্থান্তরে, এতদিন কি শিখলে, এবারে কাজে করে দেখাও। পথে নামো সাথি, অ্যাকশন !হিট দি গ্রাউনড রানিং সিটি ব্যাঙ্কের লুইশাম ট্রেনিং সেন্টারের প্রধান জন ম্যাকডোনালড নবীনতম কর্মীদের একটি ক্লাস নিচ্ছিলেন, শেষে তিনি বললেন, নাউ ইউ ক্যান হিট দি গ্রাউনড রানিং। মানে কি ? লাঞ্চ ব্রেকে অন্য শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রসঙ্গটা উঠলো। এতক্ষণ কি আমরা নির্জীব হয়ে কোথাও বসে ছিলাম বা শূন্যে বা স্বপ্নে দৌড় দিচ্ছিলাম, এবার মাটিতে পা ফেলে ? পরে জেনেছি বক্তার উদ্দেশ্য অন্য, তিনি বলতে চাইছেন বিদ্যা অর্জন করেছ, তোমরা এবারে প্রস্তুত, জিন দিয়ে ঘোড়ায় চড়েছো, দৌড় লাগাও, জান প্রাণ দিয়ে কাজে লাগো। এর অর্থ যে সহজবোধ্য নয় সেটা পরে একদিন ফরচুন ম্যাগাজিনে পড়লাম। এক পারসোনেল ম্যানেজার লিখেছেন তাঁর দফতরে কয়েকজন নব নিযুক্ত কর্মী এসে বলেছিলেন, এই যে সি ই ও তাঁর সম্বোধনী ভাষণে বললেন হিট দি গ্রাউনড রানিং। মানে কি আমরা অত্যন্ত অলস, এবারে দৌড় দিতে হবে ? পারসোনেল ম্যানেজার বোঝালেন সি ই ও বলতে চাইছেন তৎপর হয়ে কাজ করো !সংস্কৃতে যেমন বলেছে, উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত !ইফ ইট সাউনডস টু গুড টু বি ট্রু, ইট অফন ইজ / হ্যাভ আই গট এ ডিল ফর ইউ লন্ডনে কাজের প্রথম বছর বষ্টনের জো ম্যাকিইয়েভিতস এক পক্ষী শাবকের মতন আমাকে আগলে রেখেছিলেন। তাঁর কাছে শুধু কাজ নয়, সিটি ব্যাঙ্কের গলি ঘুঁজিতে, অন্ধকারে পথ খুঁজে পেয়েছি, চিনেছি অজস্র আমেরিকানিজম। জো বলতেন আমরা সবাই দু পয়সা রোজগারের ধান্দায় আছি, ছুটছি, কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এমন সময়ে কেউ একটা লোভনীয় ডিল নিয়ে এলো, হাতে মোয়া পেলাম ( ম্যানা ফ্রম হেভেন ) না চাইতেই জল ; ব্যাঙ্কের ঝুঁকি কম, ফি বেশি, পয়সা হি পয়সা। সেই উত্তেজনা শিকেয় তুলে ঠাণ্ডা মাথায় খুঁটিয়ে দেখো- যেখানে কেবল লাভই চোখে পড়ছে কোন রিস্ক নয়, খবর করো তার পিছনে কোন গলদ আছে কিনা। সন্দেহের মার নেই । বাংলায় অতি ভালো ভালো নয়। বরো এ ব্রেন বিলীয়মান আইরিশ অ্যারিস্টোক্রেসির অন্যতম শেষ প্রতিভূ নিল পাইককে প্রভু হিসেবে পাওয়ার দুর্ভাগ্য ঘটেছিল আমার মতো জনা বারো নিরপরাধ ব্যাঙ্ককর্মীর। নিল পাইকের আচরণ এমন উদ্ধত ছিল, এক সময়ে পারসোনেল ডিপার্টমেন্ট তাঁকে মনে করিয়ে দেয় কেউ গুড মর্নিং বললে তার উত্তরে গুড মর্নিং বলতে হয়। ডমিনিক লেমেয়ার নামের এক আমেরিকান যুবক ছিল আমাদের সহকর্মী, ইংরেজি ও ফরাসি দুই ভাষাতে সমান স্বচ্ছন্দ, কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে নিলের অপছন্দের খাতায় তার নাম উঠে গিয়েছিল। তার বুদ্ধি শুদ্ধির ব্যাপারে নিল প্রায়শ গভীর সংশয় প্রকাশ করতেন।। একদিন এক কাস্টমার মিটিঙে যাবো দুজনে। আমাদের প্রি মিটিং আলোচনা হচ্ছে নিলের অফিসে দাঁড়িয়ে ( কখনো বসতে বলতেন না ) কোন কোন বিষয় কভার করা দরকার। এক সময়ে ডমিনিক বললে, আর কিছু নিল ? নিল পাইক অবলীলাক্রমে বললেন, ও ইয়েস, বরো এ ব্রেন।এটি নিছক বক্রোক্তি। কখনো কৌতুকের ছলে, বেশির ভাগ নিন্দার্থে ব্যবহৃত। ইউ ক্যান নট বি সিরিয়াস পরপর পাঁচ বারের উইম্বলডন টেনিস বিজয়ী বিওরন বর্গকে তাঁর ধারাবাহিক ষষ্ঠ ফাইনালে ( ১৯৮১) তাঁকে হারিয়ে ধূমকেতুর মতন উদিত হয়েছেন জন ম্যাকেনরো। দুনিয়া জুড়ে টেনিস কোর্ট দাবড়ে বেড়াচ্ছেন, সেই সঙ্গে টেনিসের ব্যাড বয়েজের ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন।তাঁর র‍্যাকেট এবং মুখ দুইয়ের আক্রমণ ভীতিজনক। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে তিনি ঘোর অনিচ্ছা প্রকাশ করে থাকেন। ইলেক্ট্রনিক মাপক যন্ত্র বহু দূরে তখন, নেটের অনেকটা ওপরে চেয়ারে বসা আম্পায়ার বেস লাইনে দাঁড়ানো লাইন জাজের মত মেনে নিয়ে অথবা ওভাররুল করে হয়তো বললেন বলটা আউট । ম্যাকেনরো মনে করেন তাঁর বল কিছুতে আউট হতে পারে না, চকখড়ির লাইনের ভেতরেই পড়েছিল। প্রায় করজোড়ে কিন্তু উচ্চস্বরে তিনি আম্পায়ারকে বলতেন, কাম অন, ইউ ক্যান নট বি সিরিয়াস। পরবর্তী কালে জেফ টারাংগো বা নিক কিরগিওসের মতন অ্যাংগ্রি ইয়াং মেন আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্টাইলকে অন্য লেভেল নিয়ে গেলেও কারো কথা বা প্রস্তাব পছন্দ না হলে সেই আপত্তি জানাতে জন ম্যাকেনরোর, ‘ইউ ক্যান নট বি সিরিয়াস ‘ আমাদের বাচন ভঙ্গির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। হু পেজ ইওর বোনাস /হু ডু ইউ রিপোর্ট টু?বাজারের তুলনায় আমরা একটু বেশি ফি দাবি করছি না কি ? কিংবা হয়তো সুদের হারটা একটু কমানো যেতে পারে ? উত্তরে জো বলেন, কে তোমার বোনাস দেয় ? কার চাকরি করো ?সবার উপরে বস সত্য, তাহার উপরে নাই।যদি ভুল করেও তাঁর নির্দেশ অমান্য করি বা তাঁর মতের বিপক্ষে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাই, তিনি মনে করিয়ে দেন আমার জান মালের মালিক তিনিই। তিনি আমার প্রভু, আমাকে পদচ্যুত করতে পারেন এবং তিনিই সাম্মানিক দক্ষিণা দিতে পারেন যার পোশাকি নাম বোনাস। বিশেষ করে সিটি ব্যাঙ্কে এটি অনেকবার শুনতে হয়েছে।অ্যানাদার ডে অ্যানাদার ডলার/ এ ডে টু লং , এ ডলার টু শর্ট জাহাজি নাবিকের অভিজ্ঞতা থেকে জোসেফ কনরাড ( হার্ট অফ ডার্কনেস -একশ চল্লিশ পাতার বইটি অবশ্য পড়বেন, কঙ্গোর নির্মম ছবি ) লিখেছিলেন, সে সময়ে দিনের কাজের শেষে নাবিকরা হাতে দৈনিক মজুরি পেতেন এক ডলার ; দিন আনি দিন খাই ! দিনগত পাপক্ষয়, দিনগত ডলার আয়, ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি। চাকা ঘুরতেই থাকে। ব্যাঙ্কের ট্রেডিং ডেস্কে অ্যানাদার ডে অ্যানাদার ডলার খানিকটা অন্য অর্থ বহন করে। কালকের প্রফিট ভুলে যাও, ইউ আর অ্যাজ গুড অ্যাজ ইয়োর নেক্সট ট্রেড। আমাদের দেশের ভাষায় ড্রাইভার কি জিন্দগি গাড়ি কি চাল পর, কারেন্সি, মানি, শেয়ার ট্রেডারের জিন্দগি আগলি ট্রেড কি মুনাফা পর ! আগের দিনটা হিস্টরি, পুরানা কিসসা মাত্র, নতুন দিনে চাই নতুন লাভ, অ্যানাদার ডলার। ক্ষণজীবী দৃষ্টিকোণ।জাপান সোনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা আকিও মোরিতা সিটি ব্যাঙ্ক নিউ ইয়র্কে আমন্ত্রিত হয়েছেন, ব্যাঙ্কের নানান বিভাগে ঘুরছেন। কারেন্সি ডেস্কে এক ট্রেডারকে জিজ্ঞেস করলেন, ডলার/ ইয়েন বিনিময় দর কোনদিকে যাবে বলে তিনি মনে করেন। উত্তরে ট্রেডার বলেন, ৩৫০। মোরিতা জানতে চান এটা কতদিনের জন্য ধরে নেওয়া যায় ? ট্রেডার বলেন, আজকের লাঞ্চ অবধি। আকিও মোরিতা তাঁর আত্মজীবনীতে ( মেড ইন জাপান ) লিখেছেন জাপানে আমরা এতোটা স্বল্প মেয়াদি চিন্তা করি না ! সবেরই অর্থ বিস্তার হয়। জো ফিট নাম্নী এক ইংরেজ তরুণী কিছুকাল আমার জন্য কাজ করেছে, তার বয় ফ্রেন্ড ছিল ষ্টক ট্রেডার। সে বলতো , যদি জানতে চাও কেমন আছি, তাহলে বলব - এ ডে টু লং, এ ডলার টু শর্ট ! ব্যবসা খারাপ, আরেকদিন কেটে গেলো, আরেকটা ডলার এলো না !স্টাম্প আপ দি ক্যাশ মাল ছাড়ো, টাকা ঢালো। সিটি ব্যাঙ্কের সহকর্মী অ্যানড্রু গার্ডেনের বাস ছিল ব্রিটেনের একমাত্র প্ল্যানড টাউন মিলটন কিনসের অদূরে ক্লিফটন রেইনস গ্রামে। মিলটন কিনসের বোলে জুলাই মাসে মিউজিক ফেস্টিভাল হতো, ঐন্দ্রিলাকে সেখানে পৌঁছে অ্যানড্রুর বাড়ি গেছি, অনুষ্ঠান শেষে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। অ্যানড্রু এম সি সির ফুল মেম্বার। বড়ো ম্যাচে তার টিকিট বাঁধা কিন্তু আমাদের মতন আম আদমির কপালে কি জোটে ? ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ড বনাম ভারতের লরডস টেস্টের টিকিট খুঁজছি। অ্যানড্রু বললে সে বিশ্বস্ত কাউকে জানে, টিকিট পাওয়া যাবে তবে আগে ভাগে ইউ হ্যাভ টু স্টাম্প আপ দি ক্যাশ। ক্রিকেট খেলার স্টাম্প জানি, এর সঙ্গে নগদ নারায়ণের কি সম্পর্ক ?আমেরিকার ওয়াইল্ড ওয়েস্টের পশু মেলায় ঘোড়া কেনা বেচা শুরুর আগেই ক্রেতা তার ক্যাশটি এক খুঁটিতে ( স্টাম্প ) বেঁধে জানিয়ে দিতো তার দৌড় কতদূর, জুয়োর ভাষায় শো অফ হ্যান্ড । এবার দরাদরি। কালক্রমে এই অভিব্যক্তি দীর্ঘায়িত হয়ে ঘোড়ার ব্যবসা থেকে অর্থের ব্যবসায় ঢুকে পড়ল – স্টাম্প আপের সঙ্গে যোগ হল ক্যাশ। অরিজিনাল যুক্তিতে খদ্দের স্টাম্প আপ করেছে, ক্যাশ দেখিয়েছে হয়তো অধিকন্তু ন দোষায় বলে দি ক্যাশ যোগ হয়েছে।সাক ইট অ্যান্ড সি স্টিভেন পারট্রিজ -হিক্সকে আমাদের লন্ডনে অফিসের চিরস্থায়ী অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর বলা হতো। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের দারুণ ডিগ্রিধারী স্টিভেন জটিল অঙ্ক কষে ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি বানাতো। তার কাজটা এমনি রিফাইন্ড স্টেজে পৌঁছে যায় যে নির্জনে গোপনে রিসার্চ করার সুবিধের জন্য তাকে স্ট্র্যানড অফিসের সাত তলায় আলাদা অফিস দেওয়া হয়। সেখানে ঢুকতে পাসওয়ার্ড লাগতো, সেই ১৯৮৬ সালেই ! তার কঠিন অঙ্কের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে যখনই কেউ বলত এটা ঠিক কীভাবে কাজ করে, স্টিভ ? তার উত্তর হতো – সাক ইট অ্যান্ড সি। যেমন আইসক্রিম চুষেই বোঝা যায় সেটা ভালো কিনা, তেমনই তার থিওরি কাজে লাগালেই তার গুণবত্তা বোঝা যাবে। আমাদের মহিলা সহকর্মীরা প্রথম দিকে এই ব্যাখ্যা শুনে বেশ অসন্তুষ্ট হতেন মনে আছে।দিস ডিসকাশন হ্যাজ নট টেকন প্লেস / ইউ নেভার হার্ড ইট ফ্রম মি /বিটউইন ইউ অ্যান্ড মি গুপ্তকথা মন্দ নয় গোছের এই লাইনটি যে কতবার শোনা গেছে ; বক্তা কোন গুজব অথবা আসন্ন কোন অঘটনের সংবাদ দেবার আগে এই মুখড়াটি করেন। বাংলায় আমরা বলি, কাউকে বোলো না যেন,শুধু তোমাকে বলে বলছি। এক্ষেত্রে অমুক লোক তমুক জায়গায় বদলি হবেন, ঐ জনের কাজ গেল, টম বিশাল বোনাস পাচ্ছে অথবা বরখাস্ত হবে এই খবরটি যিনি দিচ্ছেন তিনি গোড়াতেই একটি চেতাবনি দিয়ে রাখলেন, আমাকে ফাঁসিও না, এ খবর আমি তোমাকে দিই নি। এ রকম কোন আলোচনাই কখনো হয় নি, আমার কাছে শোনো নি। সবশেষে, ব্যাপারটা তোমার আমার মধ্যেই থাকুক, পাঁচ কান যেন না হয়। অস্ট্রিয়ান ব্যাঙ্ক ক্রেডিট আনস্টালট ব্যাঙ্কের মিকলস পালফি আমাকে একটি ট্রেড ডিলে ট্যাক্স বাঁচানোর রাস্তা বাতলে দিয়ে বলেছিলেন, এটা আমি আপনাকে বলিনি। অর্থাৎ বিনা স্বার্থে কোন অস্ট্রিয়ান ব্যাঙ্কের পক্ষে এক আমেরিকান ব্যাঙ্কের ব্যবসায় সুবিধে করে দেওয়াটা তার বসেরা ভালো চোখে দেখবেন না। অতএব আমি যেন সেটা প্রচার না করি, দিস ডিসকাশন হ্যাজ নট টেকন প্লেস। লিভ টু ফাইট অ্যানাদার ডে লাইনটা কবি অলিভার গোল্ডস্মিথেরহি হু ফাইটস অ্যান্ড রানস অ্যাওয়েলিভস টু ফাইট অ্যানাদার ডেআজকে হার মেনে নেওয়া সই, আপনি বাঁচলে আরেকদিন লড়াই হবে! ১৯৪০ সালের মে -জুন মাসের দশ দিনে ডানকার্ক থেকে ব্রিটিশ এক্সপিডিশনারি ফোরসের গৌরবময় পশ্চাপদসরণ এমনি একটি উদাহরণ। সেই দশ দিনে প্রায় চার লক্ষ ব্রিটিশ সৈন্য জার্মান সেনা বাহিনীর মুখোমুখি না হয়ে পলায়ন করলেন; ইংরেজ তার নাম দিয়েছে গ্লোরিয়াস রিট্রিট। তবে একে কি নিছক লেজ তুলে পালানো বলা যায় ? চার বছর বাদে নরমান্দি ল্যান্ডিঙে এঁরাই আরেকবার সুযোগ পেলেন জার্মানদের পালটা মার দেওয়ার! একটা ডিল হারালেই সব কিছু শেষ হয়ে যায় না, আমার টিম মিটিঙে অনেক বার বলেছি, ক্ষতি নেই, বেঁচে যখন আছি, আবার লড়ব ! উই লিভ টু ফাইট অ্যানাদার ডে !হোয়ার ডু আই সাইন মানে ডিল এতো ভালো, আর কিছু দেখার দরকার নেই, প্রশ্ন নেই। সই করে ফেলি। সাধু ব্যক্তি এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করে থাকেন! জার্মানে বলে বিশ্বাস করা ভালো, পড়ে দেখে নেওয়াটা আরেকটু বেশি ভালো। গেটিং দেয়ার , স্লোলি যখন লন্ডনে আসি, ব্রিটিশ রেল ছিল সরকারি মালিকানায়। ট্যাগ লাইন কথাটা তখন চালু হয় নি, তাই বলা যাক ব্রিটিশ রেলের স্লোগান ছিল – গেটিং দেয়ার। কেমন করে জানি না, পাবলিকের কথা বার্তায় এটি অসম্ভব ব্যবহার হতো – কাজটা শেষ হল ? উত্তর গেটিং দেয়ার, নতুন বাড়ি খুঁজছিলেন এতদিন, পেলেন ? গেটিং দেয়ার। ক্রমশ দেখা গেল ব্রিটিশ রেলের সময়ানুবর্তীতা এমনি খারাপ, কোন ট্রেন কোথাও সময়ে পৌঁছয় না। কুলোকে জুড়ে দিল গেটিং দেয়ার,স্লোলি ! অফিসে এমন উত্তর শুনেছি, কাজটা হল ? ইয়েস, গেটিং দেয়ার, স্লোলি !ওয়ান স্টপ শপ আজকের গ্লোবালাইজেশনের যুগে পৌঁছে বলতেই হয় এর পুরোধা, পাইওনিয়ার ছিল সিটি ব্যাঙ্ক। ১৯৮৫ সালে যে সিটি ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছি সেটি ছিল চার আই এর জন্য বিখ্যাত – ইনডিভিজুয়াল ব্যাঙ্ক ( আপনার আমার সেভিংসের খাতা, ক্রেডিট কার্ড ),ইনসটিটিউশনাল ব্যাঙ্ক (আজকের কর্পোরেট ), ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক এবং ইন্সিউরেন্স। কোন কোম্পানিকে টাকা ধার দেওয়া, তার শেয়ার ট্রেডিং, সি ই ওর গোল্ড কার্ড, নানান প্রকারের ইন্সিউরেন্স- মানে একবার কেউ ব্যাঙ্কে পদার্পণ করলে তার আর ছাড় নেই – পাঁচটা প্রোডাক্ট তাকে ধরিয়ে দেওয়া হবে – বচকে রহনা ! যদিও ওয়ান স্টপ শপের সোল কপি রাইট আমরা দাবি করতে পারি না এটি আমাদের প্রেজেন্টেশনে আকছার ব্যবহার করেছি। আজকের একমেবাদ্বিতিয়ম ওয়ান স্টপ শপের নাম – আমাজন !দ্যাট ওয়াজ দি লঙ্গেষ্ট ফাইভ মিনিটস মাইকের সঙ্গে মিটিং দশটায়, পথে স্লো ট্রাফিক। ফোন করে বললাম, পাঁচ মিনিটে হাজির হব। আধ ঘণ্টা বাদে পৌঁছুলে মাইক বললেন ওয়েল, দ্যাট ওয়াজ দি লংগেষ্ট ফাইভ মিনিটস। হেলিকপটার ভিউ / টেন থাউজেনড ফিট ভিউ বেয়ার স্ট্যার্ণ থেকে এসেছিলেন লেনি ( লেওনারড ) ফেদার ; এক সময়ে ইকুইটি ট্রেডিং করতেন। পরে আমাদের ব্যাঙ্কে ফাইনানশিয়াল মার্কেটসের চিফ হয়েছিলেন, যার অধীনে সতেরোটা বিভিন্ন ব্যবসা। তাঁর পক্ষে সবগুলিকে খুঁটিয়ে চেনা জানা সম্ভব নয়। তিনি জানতে চান সব মিলিয়ে কেমন চলছে মানে ধরুন আকাশ থেকে দেখছেন একটা র‍্যাঞ্চ, তার আকার, রেভেনিউ সাইজ কতো বড়ো সেটা জানতে চান ; কোন ঘরে দশ বুশেল গম আছে কোন ঘরে একশ মুরগি সেটা নয়। খুঁটি নাটি বা নাট বলটু নয়, গোটা মেশিনের চেহারা। আমরা সবাই এমন অনেক বস পেয়েছি যারা ঐ ‘ মোটা মোটা ‘ কত হবে তাই জানতে চান, ডিটেলসে যেতে অনিচ্ছুক। সেটা জানালেও বুঝবেন না। জারগন ফরাসি শব্দ জারগোঁ থেকে আমরা পেয়েছি জারগন ; পাখির কিচির মিচির, টুইট, যার শব্দ আছে অর্থ নেই, হায়ারোগ্লিফিকের মতো দুষ্পাঠ্য। ক্রমে মানুষের অস্পষ্ট অর্ধ উচ্চারিত সাঙ্কেতিক কিছু শব্দকে জারগন, আখ্যা দেওয়া হল; যার কোন ব্যাকরণ সম্মত অর্থ নেই। এটির ব্যবহার তবে কোথায় ? খুঁজে দেখুন জারগন আছে সর্বত্র, আমাদের তিসরা কোলিয়ারির বাড়িতে একটি অন্ধকার ঘরের নাম ছিল চোর কুঠুরি, সেটি কুঠুরি বটে কিন্তু চোর থাকত না সেখানে। আমার বাল্য বন্ধু চিন্ময়ের আলু পোস্তা থেকে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া সব জায়গাতেই দেখেছি অনেক নাম বা শব্দ ব্যবহৃত হয় যেগুলির নিহিত অর্থ শুধু ঘরের লোকেরা জানেন, সিক্রেট সোসাইটির যেমন থাকে কোড ওয়ার্ড ! জারগন তাই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পারস্পরিক বাক বিনিময়ের মর্স কোড – গোপন কথাটি রবে গোপনে। ট্রামে বাসে টিউবে ব্যাঙ্কের বিজনেস নিয়ে আলোচনা করতে পারি এমন ভাবে যে পাশের কেউ সেটা বুঝবে না। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, কনটিনেনটাল ইলিনয়, সিটি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড – যেখানেই কাজ করেছি, পেয়েছি এমনি কিছু সাঙ্কেতিক শব্দবন্ধ। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াতে কলকাতার হেড অফিসের বাতানুকুলিত আরাম থেকে রাজাভাতখাওয়া বা খেজুরিয়া ব্রাঞ্চে বনবাসে পাঠানোর প্রক্রিয়ার নাম ছিল লাইন অ্যাসাইনমেন্ট- এই লাইনটি কি সে প্রশ্ন করে লাভ নেই। কনটিনেনটাল ইলিনয়তে তাদের নাম টি সি এন ( থার্ড কান্ট্রি ন্যাশনাল ), আমাকে ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ব্রাসেলসে বদলি করলে আমার পরিচয় হতো তৃতীয় দেশ বাসী। আজ বলতে পারি সিটি ব্যাঙ্কের জারগন সঞ্চয় অন্য সব প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে গিয়েছিল বহুগুণে, লন্ডনে আমার শিক্ষানবিশির বিপুল অংশ কেটেছে জারগন চিনতে এবং যথাবিধি প্রয়োগ করতে। জারগন চিনতে জানতে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়! যদিও অনেক বছর কেটে গেছে, চারজন সি ই ও বদলেছে তবুও নিউক্লিয়ার কোডের মতন সিটির গুঢ় গোপন রহস্য হাটে বাজারে ফাঁস করা সমীচীন হবে কিনা জানি না। সামান্য কিছুর উল্লেখ হয়তো করা যায়: যেমন অ্যাক্রোনিম বানানোয় সিটি ব্যাঙ্কের জুড়ি ছিল না। আপাত দৃষ্টিতে সহজবোধ্য একটা টার্ম - এম আই এস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) , যা দিয়ে কর্তা ব্যক্তিরা চলতি আয় ব্যয়ের ওপরে চোখ রাখতে পারেন। কিন্তু এর প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে যখন বলি লন্ডনের একটি ডিলের আয়ের তিনভাগের একভাগ এম আই এস করে আরেক দেশের সিটি ব্যাঙ্ক ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এই এম আই এস কোন অন লাইন মানি ট্রান্সফার নয়, এর অস্তিত্ব একমাত্র কল্পনায় এবং আমার বার্ষিক বাজেটে। ক্রস বর্ডার মানে সীমান্ত পেরুনো নয়, বিদেশি রিস্ক ; ফাস্ট (এফ এ এস টি ) মানে দ্রুত নয় – ফরেন অ্যাসাইনমেনট শর্ট টার্ম, ও ইউ সি – অরিজিনেশন ইউনিট কোড ঠিক কোন দফতর থেকে কোন বাণিজ্য হয়েছে তার মার্কা - এটিকে ঠিকমত ম্যানেজ করতে না পারলে আমার বিজনেসের আয় অন্য কেউ খেয়ে নিতে পারে। সিটি স্পিক নামের একটি আভ্যন্তরীণ বাক প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছিল। যারা স্কুল বা কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সিটিতে ঢুকেছেন তাঁরা এই বাচন ভঙ্গিতে সিদ্ধবাক, কিন্তু আমার মতন যারা বিলম্বে ( মিড ক্যারিয়ার হায়ার ) এই অট্টালিকায় প্রবেশ করেন তাদের মনে হয়েছে তোমার ভাষা বোঝার আশায় দিয়েছি জলাঞ্জলি ! মনে আছে লন্ডনের একটি ককটেল রিসেপশনে লয়েডস ব্যাঙ্কের ইয়ান ফিটজেরাল্ড বলেছিলেন, তোমাদের জারগন এতো জটিল কেন ? পাছে বাইরের কেউ তোমাদের ব্যবসার ঘাঁত ঘোঁত ধরে ফেলে সেই ভয়ে কি সিটির এই কাঁটাতারের বেড়া? আমার মনে হয় ব্যাঙ্কের ভেতরেও হয়তো সবাই সেগুলো বুঝে ওঠে না !শব্দজব্দ ইনফরমেশন টেকনোলজি এবং শব্দের সুনামি বিলেতের কর্ম জীবনে নানান টার্ন অফ ফ্রেজ শুনি। সে শুধু কথার মার প্যাঁচ নয়, তার মধ্যে আছে সুপ্ত কৌতুকের আভাস। একটি কথাকে অন্যভাবে বলা, তার অর্থকে নিয়ে খেলা করাটা বুদ্ধির মধুর ব্যায়াম। কিন্তু তারও ভোল বদলাতে থাকল নয়ের দশকে। ইন্টারনেট টেকনোলজি কেবল এক নতুন যুগের সূচনা করে নি, তার প্রয়োগশালা অ্যাংলো কলা কৌশল সম্বলিত বাচন যার ভেতরে অনেক চেষ্টা করেও কোন বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার ইঙ্গিত খুঁজে পাই নি। কিছু নামি সি ই ও যেমন কালো টারটল নেক পরা স্টিভ জবস, অনেক মাথা মুণ্ডুর মালিক, ইনহিউমান রিসোর্সের সঞ্চালকবৃন্দ এমন স্টাইলিস্ট কেতায় তার যথেচ্ছ ব্যবহার করলেন যে অনুগামীবর্গ,, প্রেস, পাঠক এবং বৃহত্তর কর্ম জগত নির্দ্বিধায় তাকে মেনে নিলো। আহা বেশ, এই বুঝি নতুন বিজনেস ল্যাঙ্গুয়েজ, এই তব নব মেঘদূত ! অপূর্ব অদ্ভুত ! অন লাইনে চলিয়াছে অলক্ষ্যের পানে। এতাবৎ আমরা যে ভাষায় ব্যবসার কথা বলেছি, তা নিতান্ত ওল্ড ফ্যাশনড। আমি নিজে ওল্ড, আমার ফ্যাশনটা ওলডার। উপায় ছিল না বলে এই নির্মম নির্বোধ ভাষার নিপীড়নে অভ্যস্ত হতে হয়েছে, কিন্তু আমার নিজের টিম মিটিং বা পাবলিক স্পিকিঙ্গে আন্তরিক প্রচেষ্টায় তাকে এড়িয়ে গেছি। আমার নিজস্ব অপছন্দ শব্দের তালিকা দীর্ঘ ; আজ মাত্র কয়েকটি বেছে নিলাম। পাঠক অনায়াসে আপন পছন্দের অপছন্দের শব্দাবলী যোগ করতে পারেন।ব্যান্ডউইডথ আক্ষরিক অর্থে কতটা ডেটা কোনো এক সময়ে নেট ওয়ার্কে পাঠানো যায় তাকে বলে ব্যান্ডউইডথ কিন্তু রূপক অর্থে ব্যান্ডউইডথ বোঝাল আমার বা আমার গ্রুপের কাজ করার সময় বা এলেম কতোটা। যেমন একদিন প্রভু বললেন, সকলের ব্যান্ডউইডথ অনুযায়ী কাজের বণ্টন করা প্রয়োজন। বলা যেতে পারতো না কার হাতে কতটা সময় বা কাকে দিয়ে কাজ হবে সেই বুঝে ?আনপ্যাক দ্যাট কথাটা খুবই দুর্বিনীত এবং অহংকারী শোনাবে এ কথা মনে রেখেই বলি এম বি এ এবং দুনিয়ার তাবৎ কনসালটেনটের প্রতি আমার বহু দিনের অনীহা আছে ; কোন কিছুই নিজের হাতে না করেও সে বিষয়ে জ্ঞান দিতে এঁদের জুড়ি নেই। এই দুই জগতের কোন মানুষকে আমি কখনো কাজে রাখি নি। একমাত্র কনসালটেনটকে বলতে শুনেছি ব্যাগটা খুলুন, এখুনি। একটা ব্যাগ বা বাকসোর ভেতরের সব জিনিস পত্তর উজাড় করে ফেলুন, অদ্য এই অকুস্থলে। বাংলায় ঝেড়ে কাশুন ? কণ্ঠ ছাড়ো জোরে ?সোশিয়ালাইজ কেউ একটা নতুন আইডিয়া পেশ করেছেন, বস হাঁ না কোনটাই বলতে চান না, তাঁর সে মুরোদ নেই। খানিক ভেবে দাড়ি চুলকে বললেন, দারুণ আইডিয়া। লেট মি সোশিয়ালাইজ ইট। তার অর্থ আপিসে বড়ো কর্তাদের কাছে এটা একটু বাজিয়ে দেখি, তারা কি ভাবেন বুঝে নিই। সোজা বাংলায় বলটা ওপর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দেখি কেউ ধরেন কিনা। তাঁর নিজের কি মত সেটি জানালেন না। শেষ অবধি বললেন, না হে,, তোমার এই দারুণ আইডিয়া কেউ পছন্দ করেছেন না। পলাতকের গানের মতন কার কাছে রাখিলাম রিপোর্ট, কার কাছে যে মত চাই গো, দোষ দিও না আমায় বন্ধু, আমার কোন যে দোষ নাই !স্পেস এককালে জানতাম স্পেস মানে মহাশূন্য। ইউরোপ তথা পশ্চিমে চারটে এলিমেন্ট – বায়ু অগ্নি বাতাস পৃথিবী আমরা তার সঙ্গে যোগ করেছি স্পেস, মহাশূন্যকে। কিন্তু আমার মতে আজ এটি অস্থানে কুস্থানে সর্বাধিক অপব্যবহৃত শব্দ। রীতিমত অস্বস্তি হয় যখন শুনি ইকুইটি স্পেস, রিটেল স্পেস, ফেস বিউটি স্পেস, হেলথ স্পেস – বলতে পারেন না এগুলি আসলে সেক্টর, বিভিন্ন ব্যবসা, স্পেস নয়? চার্লস করবেট আমার জন্যে কাজ করতো – আমাকে বলেছিল আমাদের টিম মিটিঙে দয়া করে স্পেস শব্দটা উচ্চারণ করবেন না, আই ফিল সিক। আমি বলেছিলাম, আমমো। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ; তবে আজকাল এর ধার কমে গেছে ভেবে স্বস্তি পাই।টেক ইট অফ লাইন কথা হচ্ছে পাঁচ বা দশ জনের মিটিঙে। আমি একটি বিষয় উত্থাপন করলাম ; বস বললেন, ওটা আমরা অফ লাইনে আলোচনা করে নেব। এটি একটি বহুল ব্যবহৃত অভিব্যক্তি; আমার মতে তার কারণ দ্বিবিধ ; আমার বস এ বিষয়ে মিটিঙে, সর্বসমক্ষে কিছু বলতে চান না, পরে আড়ালে আবডালে সেটি আমাকে জানাবেন অথবা এই আলোচনা ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে, তর্ক বিতর্ক বাড়ছে, এটার আপাত বিনাশ করা হোক। সিধে বাংলায়, ও প্রসঙ্গ এখন থাক। এই হাটে না তোলাই ভালো।আগে কহ আর। সারকল ব্যাক বাজারে বেজায় চালু। এক নয়, নানান অর্থ আছে, অবস্থান বুঝে !বস বললেন, এখন আলোচনার সময় কম, এ কথাটা পরে হবে, উইল সারকল ব্যাক টু ইউ। জানতে চাইলাম কেনিয়ায় ট্রেড ফাইনান্স ব্যবসা থেকে কতো ফি পাওয়া গেল গত কোয়ারটারে, তার উত্তর হল, একটু সময় লাগবে দেখে নিয়ে ‘আই উইল সারকল ব্যাক টু ইউ ‘। আগে বলতাম বা শুনতাম, একটু চেক করে বলছি, এখানে বৃত্ত এলো কোথা হতে ?ফিরে এসো চাকা। ডাবল চেক এবং ক্রস চেক দুটোই অবশ্য ভীষণ চালু আছে এ বাজারে। বার বার দেখো, হজার বার দেখো।রিচ আউট সুপ্রিয় গুপ্ত সাহেব বলতেন যান তো একবার নিমাই বাবুর কাছে গিয়ে জেনে নিন কেলভিন জুটের ষ্টক ভ্যালু কত দেখাচ্ছে। জো হলে বলতেন, ক্যান ইউ ফাইনড ইট আউট ? আজকের বড়ো সাহেব বলেন, রিচ আউট টু জন অ্যান্ড দেন সারকল ব্যাক টু মি !ক্রুশ বিদ্ধ যিশু প্রভু এদের কথা ভেবেই হয়তো বলেছিলেন, ফাদার ফরগিভ।মুভ দি নিডল বাড়িতে ইলেকট্রিকের বা গ্যাসের মিটার, গাড়ির মিটার চলে আইন মাফিক। সেই কাঁটার হেরাফেরি করাটা হারগিজ বেআইনি যদিও সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির ওডোমিটারের কাঁটা ঘুরিয়ে মাইলেজ কম দেখানোর চোরামির কায়দা বেশ পুরনো। কিন্তু কি আশ্চর্য, আজ মুভ দি নিডল ঠিক সেই অর্থ বহন করে, কাঁটা ঘোরাও, দক্ষতা, উৎপাদন বাড়াও। সত্যিকারের না শুধু কাগজে কলমে ? পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলিতে যেমন রোমানিয়াতে গমের উৎপাদন দেখানো হল গত বছরের দুশো গুণ বেশি, সবটাই কাগজি কারবাই। অতো গম হয়ে থাকলে তা রাখার জায়গা অকুলান হতো।কাঁটা ঘোরানোর খেলা।ডিপ ডাইভ গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও এই বুঝি তল পেলে, ফের হারালেডিপ ডাইভ শুনলে বাইশে শ্রাবণের গানটি অনিবার্য ভাবেই মনে পড়ে যায়। কোনো বিজনেস প্রোপোজাল, তদন্ত রিপোর্ট, ব্যাল্যান্স শিট – সেগুলি যত্নের সঙ্গে পড়া, দেখে শুনে বিচার বিমর্ষ করা, এদিক ওদিক, আশ পাশ, বাজারের চল চলন এগুলো বোঝার কোন প্রয়োজন নেই ? কিছু না দেখে একেবারেই ডুব ? নাকি তলিয়ে যাবার আগে অসম্ভব খুঁটিয়ে দেখা ?নেগেটিভ গ্রোথ দেশে থাকতে একটি কার্টুন দেখেছিলাম – সেলস ম্যানেজার বোর্ডে বিগত তিন কোয়ার্টারের সেলস ফিগারের গ্রাফ দেখাচ্ছেন, সেটি ক্রমশ নিম্নগামী। ক্রুদ্ধ বোর্ড ডিরেক্টর প্রশ্ন করলেন, সেলস তো ক্রমশ নিচেই নেমে যাচ্ছে, কি করতে চান, কি প্ল্যান আপনার ? সেলস ম্যানেজার বললেন বেস লাইনের নিচে আরেকটা কাগজ জুড়ে দিতে পারি।লন্ডন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কে ম্যানেজার ডেভিড মরগানের অফিসে গ্রুপ মিটিং হতো মাসে একবার; সকল ডিপার্টমেন্টের কর্তারা খানিকটা কল্পনা এবং অতি অল্প তথ্য সহযোগে সেখানে আপন বিজনেসের হাল হকিকত বয়ান করতেন। স্ট্রাকচারড ট্রেড দফতরের কর্তা পল শ্যাম্পেনের ইংরেজি, সুটের বাহার, সালভাতোরে ফেরাগামো টাইয়ের নট, শব্দ চয়ন সকলকে চমৎকৃত করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তাঁর ব্যবসার জৌলুস এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। পলের রেভেনিউ নাম্বার শুনে ডেভিড মরগান বললেন, পল, এটা ভালো ঠেকছে না। পল ভ্রুকম্প না করে একই সুরে বললেন, পারহাপস উই আর একসপিরিইয়েন্সিং এ নেগেটিভ গ্রোথ। ইংরেজি বড়োই মনোহর ভাষা। ক্রমশ  
    মাইসিনির কাঁটা ও ঘন্টা তিনেকের গল্প   - সুকান্ত ঘোষ | মাইসিনির কাঁটাখ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে গ্রিসের পেলোপনেসাস উপদ্বীপ। মাইসিনীয় সভ্যতার কারিগরেরা ব্রোঞ্জের একটা তার বাঁকিয়ে এমন একটা জিনিস বানালেন, যেটা দেখতে অবিকল আজকের দিনের সেই জিনিসটার মত যার গল্প আজকে করব। একটা সূচালো মাথা, একটা কুণ্ডলী-স্প্রিং, আর একটা আঁকশি যেখানে মাথাটা আটকে থাকে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা একে বলেন 'ফিবুলা'। প্রথম ধরনটার নাম 'ভায়োলিন-বো ফিবুলা', কারণ বাঁকটা বেহালার ছড়ের মতো চ্যাপ্টা। লাতিন 'ফিবুলা' মানে ব্রোচ। মজার কথা, আমাদের পায়ের হাড়টাকেও ফিবুলা বলা হয় কারণ সেটা দেখতে এই কাঁটাটার মতো। অর্থাৎ শরীরবিদ্যার পরিভাষা পোশাকের কাছ থেকে ধার করা।মাইসিনি থেকে ফিবুলা ছড়িয়ে পড়ল ক্রিট, সাইপ্রাস, সিসিলি, দক্ষিণ ইতালিতে। রোমানরা টোগা আটকাতেন ফিবুলা দিয়ে। এট্রুস্কানরা আটকাতেন আলখাল্লা। আর যেহেতু জিনিসটা সবার চোখে পড়ত, সেহেতু যা হওয়ার তাই হল - কাজের জিনিস ধীরে ধীরে দেখানোর জিনিস হয়ে উঠল। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের ফিবুলায় সিংহ আর স্ফিংক্সের সারি বসানো থাকত। একটা এট্রুস্কান ফিবুলায় হাঁসের নকশা। একটা ইরানি পিন মানুষের হাতের আকারে গড়া, দুটো সিংহ মাথা-লেজ করে বসানো। সোনা, রুপো, ব্রোঞ্জ।অর্থাৎ, এই কাঁটাটা জন্মমুহূর্ত থেকেই শ্রেণি চিহ্নিতকরণের সাথে জুড়ে গ্যাছে। কে দামি ফিবুলা পরতে পারে আর কে পারে না সেটাই ছিল প্রথম বিজ্ঞাপন। থরস্টাইন ভেবলেন উনিশশো সালের কাছাকাছি (দ্য থিয়োরি অফ দ্য লেজার ক্লাস, ১৮৯৯) যাকে বললেন 'কনস্পিকিউয়াস কনজাম্পশন' - অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিজের অবস্থান জাহির করা, ফিবুলা তার সবচেয়ে পুরনো নিদর্শনগুলোর একটা। মধ্যযুগে ফিবুলা রূপ বদলে ব্রোচ হল, আর ব্রোচ তো নিখাদ গয়না।কিন্তু একটা সমস্যা তিন হাজার বছর ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেল। ফিবুলাই হোক, ব্রোচই হোক, বা সাদামাটা সোজা পিন - কাঁটার ডগাটা সবসময় খোলা থাকত। আঙুল ফুটো হত, শিশুর গায়ে ফুটত। কেউ এটার সমাধান করেনি। মানুষ সিংহের নকশা কেটেছে, গ্র্যানুলেশনের কাজ শিখেছে, সোনার পাত বসিয়েছে, কিন্তু ডগাটা ঢাকার কথা কারও মাথায় আসেনি।সেই কাজটা করবেন নিউ ইয়র্কের এক আধপেটা মিস্ত্রি। সাড়ে তিন হাজার বছর পরে। মাত্র তিন ঘণ্টায়।কার কথা বলতে যাচ্ছি আজকে বুঝতে পেরেছেন? কার আবার! সেফটিপিন, সেই আপাত তুচ্ছ এক কাঁটা যা আমাদের মানব সভ্যতার সাথে প্রায় তিন হাজার বছর জাপ্টাজাপ্টি করে। প্রথম কখন সে জিনিস ব্যবহার করেছিলাম? সত্যি বলতে কি মনে নেই, আর মনে না থাকারই কথা কারণ সে মিশে গিয়েছিল আমার মত আমাদের প্রায় সবারই জীবনে কোন রকম আলাদা মনযোগের দাবী ছাড়াই। ব্যাগের ভেতরে, পার্সের ভাঁজে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে, শাড়ির আঁচলের কোণে, কখনও ব্লাউজের পাশে গোঁজা - যেন ওটা একটা অঙ্গ, ব্যবহার্য বস্তু নয়। জামার বোতাম ছিঁড়ে গেলে, ব্লাউজের হুক খুলে গেলে, কোনও পাজামার দড়ি হারিয়ে গেলে – সে আসবে উদ্ধার করতে প্রায় লুকানো কোন এক জায়গা থেকে, অনুচ্চারে। ঠাকুমার আঁচলে চাবির গোছা বাঁধা থাকত গিঁট ছাড়াও অনেক সময় সেফটিপিন দিয়ে। বাড়ির মেয়েদের কাছে সেফটিপিন ছিল পোশাকের ফ্যামিলি ডাক্তার। রোগ সারাত না, কিন্তু ব্যথাটা আপাতত ধরে রাখত। আর পুরুষদের কাছে? পুরুষদের কাছে সেফটিপিন ছিল সেই বস্তু, যেটা দরকারের সময় কখনও পাওয়া যায় না। ড্রয়ার হাতড়ে উনিশটা পেপার-ক্লিপ বেরোবে, একটা সেফটিপিন বেরোবে ন! এই রহস্যের কোনও সমাধান আজ পর্যন্ত হয়নি, এবং সম্ভবত হবেও না! সেদিনও দরকারের সময় অফিসে পেলাম না! অথচ এই যে জিনিসটা আমরা রোজ ব্যবহার করি এবং একবারও তাকিয়ে দেখি না, এর পেছনে সাড়ে তিন হাজার বছরের ইতিহাস আছে যেটার উল্লেখ করে এই লেখার শুরু করেছি। একজন উদ্ভাবকের হৃদয়বিদারক জীবন আছে, একটা পাংক বিপ্লব আছে। মিলানের একটা কালো পোশাক আছে যা এক অভিনেত্রীর জীবন বদলে দিয়েছিল। ব্রিটেনের রাস্তায় একটা রাজনৈতিক আন্দোলন আছে। আর কলকাতার ভিড়ে? বাহ! সবই কি আমি বলে দেব নাকি? নিজেরা একটু ভেবে নিন কলকাতার ভীড়ের সাথে সেফটিপিনের কি কি সম্পর্ক থাকতে পারে! দেখুন কোন তীক্ষ্ণ প্রতিবাদের কেস খুঁজে পান কিনা!চলুন, এবার তাহলে একটু ফিরে দেখা যাক সেফটিপিনের কেস যে তিন হাজার বছরের পুরানো সেটা আমরা জানলাম কিভাবে? কোন তথ্য প্রমাণ আছে নাকি মহাভারতের উড়োজাহাজ পুষ্পক রথের মত কেস! পিন-মানি, অথবা কাঁটার দামতার আগে একটা ছোট গল্প। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত পিন ছিল ব্যয়বহুল জিনিস। তার টেনে (ওয়্যার-ড্রয়িং) পিন বানানোর কৌশল তখন সবে এসেছে, উৎপাদন কম, দাম বেশি। ব্রুয়ার্স ডিকশনারি অফ ফ্রেজ অ্যান্ড ফেব্‌ল (১৮৭০) জানাচ্ছে, চতুর্দশ শতকে পিন-নির্মাতাদের বছরে মাত্র দু'দিন, পয়লা আর দোসরা জানুয়ারি, খোলা দোকানে পিন বিক্রির অনুমতি ছিল। সেই দু'দিন অভিজাত মহিলারা আর শহুরে গিন্নিরা দোকানে ভিড় করতেন। আর তার আগে স্বামীদের কাছ থেকে আদায় করতেন একটা নির্দিষ্ট টাকা, পিন কেনার টাকা।ইংরেজিতে তার নাম হয়ে গেল 'পিন-মানি'। কালক্রমে অর্থ পাল্টাল। আজ পিন-মানি মানে হাতখরচ, অপ্রয়োজনীয় খুচরো জিনিসের জন্য বরাদ্দ সামান্য টাকা। ভাষার ভেতরে একটা পুরানো শব্দবন্ধ রয়ে গেল, যার আসল মানে কেউ আর মনে রাখে না। বাংলায় আমরা বলি 'হাতখরচ'। কেউ যদি বলত 'পিন-খরচ', সেটা ইতিহাসের দিক থেকে বেশি সঠিক হত হয়ত। ওয়াল্টার হান্ট: এক অসফল প্রতিভাএবার সেই উদ্ভাবকের গল্প, অনেকে বলেন কিছুটা হৃদয়বিদারক। ১৭৯৬ সালের ২৯ জুলাই, নিউ ইয়র্ক রাজ্যের লুইস কাউন্টির মার্টিন্সবার্গ নামের এক ছোট খামারে ওয়াল্টার হান্টের জন্ম। তেরো ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বড়। এক-ঘরের স্কুলে সামান্য পড়াশোনা, কৈশোরেই ইতি। তারপর চাষবাস।কিন্তু ছেলেটার হাতে যন্ত্র এলেই কিছু একটা ঘটত। কাছের একটা তিসি-কলে (ফ্ল্যাক্স মিল) তাঁর পরিবারের অনেকে কাজ করতেন। সেখানে মালিক উইলিস হসকিন্স আর ঝিবা নক্স নামের এক কর্মীকে তিনি তিসি-কাটা মেশিন উন্নত করতে সাহায্য করলেন। মেশিনটা ভালো হল, পেটেন্ট হল, কিন্তু হান্টের নাম তাতে রইল না।বেশ দুঃখ পেলেন হান্ট, কিন্তু দমলেন না। নিজে আরও ভালো একটা তিসি-কল বানালেন, ১৮২৬-এ পেটেন্ট নিলেন। এবার নিজেই বানাবেন, বিক্রি করবেন, পরিবারের ভাগ্য ফেরাবেন। নিউ ইয়র্ক শহরে গেলেন বিনিয়োগকারীর খোঁজে। কেউ তাঁকে পাত্তা দিল না। গ্রামের ছেলে, প্রথাগত শিক্ষা নেই, কথা বলার ধরন আলাদা - ব্যাঙ্কের লোকেরা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে টাকার কথা ভাবতে পারল না। টাকা ফুরিয়ে এল। হান্ট পেটেন্টটা বেচে দিলেন। সেই টাকায় পরিবারকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে এলেন। ১৮২৭ সালে দ্বিতীয় পেটেন্ট: ঘোড়ার গাড়ির জন্য পা দিয়ে বাজানোর ঘণ্টা। একটা ছোট মেয়েকে গাড়ির তলায় চাপা পড়তে দেখে তাঁর মাথায় এসেছিল ব্যাপারটা। তখনকার গাড়িতে হর্ন বাজাতে গেলে একটা হাত ছাড়তে হত - বিপদের সময় সেটাই সবচেয়ে অসম্ভব কাজ। পা দিয়ে বাজানো ঘণ্টা সমস্যাটা মিটিয়ে দিল। জিনিসটার দরকার স্পষ্ট, উপযোগিতা স্পষ্ট, তবু বিনিয়োগকারী জুটল না, তাই হান্ট আবারও পেটেন্ট বেচে দিলেন। এবং এইভাবেই চলতে থাকল। উদ্ভাবন করো, টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হও, পেটেন্ট বেচো, পরেরটায় হাত দাও। ঝর্না-কলম, ছুরি-ধার দেওয়ার যন্ত্র, জাহাজের বরফ কাটার লাঙল, পেরেক বানানোর মেশিন, দড়ি পাকানোর মেশিন, উন্নত তেলের বাতি, কয়লার উনুন, কৃত্রিম পাথর, রিপিটিং রাইফেল।আর একটা বেশ ইন্টারেষ্টিং - 'অ্যান্টিপোডিয়ান অ্যাপারেটাস', ছাদে হাঁটার যন্ত্র। সাকশন-কাপ লাগানো জুতো, যাতে সার্কাসের কেউ দেওয়াল বেয়ে বা ছাদে উল্টো হয়ে হাঁটতে পারে। তিনি সেটা বিক্রি করেছিলেন এক সার্কাস কোম্পানিকে। পরের বার স্পাইডারম্যানকে দেওয়াল বেয়ে উঠতে দেখলে মনে রাখবেন, ভদ্রলোকের পেটেন্টের পূর্বপুরুষ উনিশ শতকের নিউ ইয়র্কে বসে ছিলেন এবং সেই লোকটাই স্পাইডারম্যানের পোশাক আটকানোর পিনটাও বানিয়েছিলেন। পনেরো ডলারের ঋণ, তিন ঘণ্টার আবিষ্কার১৮৪৯ সালের কথা, হান্টের বয়স তখন বাহান্ন। চার সন্তানের বাবা এবং যথারীতি, টাকা নেই। জে. আর. চ্যাপিন নামে এক ড্রাফটসম্যান তাঁর আগের কয়েকটা পেটেন্টের নকশা এঁকে দিয়েছিলেন। পেটেন্ট আবেদনের সঙ্গে ছবি লাগে, আর হান্ট নিজে ছবি আঁকতে পারতেন না। চ্যাপিনের পাওনা ছিল পনেরো ডলার। আজকের হিসেবে যা চারশো থেকে ছ'শো ডলারের মতো। বিরাট টাকা নয়, কিন্তু হান্টের কাছে তাও ছিল না। চ্যাপিন তাগাদা দিচ্ছিলেন। হান্ট যা করার তাই করলেন - বসে গেলেন আবিষ্কার করতে। এখানেই হান্টের সাথে আমার হালকা পার্থক্য আছে, বেশী চাপে পড়লে আমি ভাবে কিছু একটা করতে হবে - কিন্তু করতে বসি না, ফেসবুকে রীলস দেখতে বসি!হান্ট নিলেন একটা পিতলের তার, ইঞ্চি আটেক লম্বা। হাতে নিয়ে পাকাতে শুরু করলেন। মাঝখানে একটা কুণ্ডলী দিলেন - সেটা স্প্রিং হয়ে গেল, ছেড়ে দিলেই খুলে যায়। এক প্রান্ত ছুঁচলো করলেন। অন্য প্রান্তে একটা আঁকশি বানালেন, যার ভেতরে ছুঁচলো মাথাটা ঢুকে থাকে, লুকিয়ে থাকে, কারও আঙুল ফুটো করতে পারে না। গোটা জিনিসটা একটাই তার থেকে, কোনও কব্জা নেই, কোনও জোড়া নেই, ভাঙার মতো কিছু নেই। কথিত আছে, পুরো ব্যাপারটায় তাঁর তিন ঘণ্টা লেগেছিল। তিন হাজার বছরের সমস্যা, তিন ঘণ্টায় খেল খতম! আজগুবি গল্পের মত লাগে না? কিন্তু ঘটনা সত্যি। ১৮৪৯ সালের ১০ এপ্রিল তিনি মার্কিন পেটেন্ট নম্বর ৬,২৮১ পেলেন। কাগজে জিনিসটার নাম 'সেফটিপিন' নয় - 'ড্রেস-পিন'। পেটেন্টের ভাষা আশ্চর্য রকম স্পষ্ট। হান্ট লিখছেন, এই নকশার সুবিধে হল এতে ভাঙার মতো কোনও জোড়া নেই, ক্ষয়ে যাওয়ার মতো কোনও কব্জা নেই। আর সবচেয়ে বড় সুবিধে, যেটা আগের কোনও নকশায় ছিল না, এটা পোশাকে গোঁজা যায় পিন বেঁকিয়ে না ফেলে, আঙুলে না ফুটিয়ে। ফলে এটা সমান ভাবে ব্যবহার্য অলংকার হিসেবে, সাধারণ পোশাকে, এবং শিশুর যত্নে। শেষে একটা লাইন যোগ করেছেন, একই নীতি চুলের কাঁটাতেও খাটে।এবং এখানে পেটেন্টের কাগজটায় এমন একটা জিনিস আছে, যেটা ইন্টারনেটে সার্চ করতে গিয়ে কোনও লেখায় আমি উল্লেখ পাইনি, অথচ নথিটার একেবারে নিচে সাদা কালিতে ছাপা আছে। সাক্ষীর ঘরে দুটো নাম, জন এম. নক্স এবং জে. আর. চ্যাপিন।অর্থাৎ, যে লোকটার পনেরো ডলার শোধ করার জন্য এই আবিষ্কার, সেই পাওনাদারই পেটেন্টে সাক্ষী হিসেবে সই করলেন। ছবিটা কল্পনা করুন। সাধারণত বাড়িতে পাওনাদার এলে বলা হয় যাকে খুঁজতে এসেছে সে নেই, দরজা খোলা হয় না। ওয়াল্টার হান্ট পাওনাদারকে টেবিলের ওপাশে বসিয়ে, তাঁকে সাক্ষী রেখে, ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত পেটেন্টে সই করলেন। চারশো ডলার, এবং একটি ছোট রহস্যপেটেন্ট হাতে পাওয়ার পর হান্ট যা করলেন, তা তিনি সারা জীবনই করে এসেছেন। বেচে দিলেন চারশো ডলারে। সেখান থেকে চ্যাপিনের পনেরো ডলার শোধ করলেন, বাকি রইল তিনশো পঁচাশি। আজকের হিসেবে চারশো ডলার মানে হাজার এগারো থেকে হাজার পনেরো ডলারের মধ্যে। মোদ্দা কথা, একটা মাঝারি মোটরসাইকেলের দাম আমেরিকায়। তার বিনিময়ে তিনি পৃথিবীর প্রতিটি ড্রয়ারে পড়ে থাকে এখন এমন একটা জিনিসের স্বত্ব ছেড়ে দিলেন। কিন্তু বেচলেন কার কাছে?এখানেই মজা। ইন্টারনেটের প্রায় সব লেখা বলছে তিনি পেটেন্ট বেচেছিলেন ডব্লিউ. আর. গ্রেস অ্যান্ড কোম্পানিকে। কথাটা এত বার লেখা হয়েছে যে সেটা এখন সত্যি হয়ে গেছে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে টের পাওয়া যায়, ডব্লিউ. আর. গ্রেস অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৫৪ সালে, পেরুর কাইয়াও বন্দরে, উইলিয়াম রাসেল গ্রেস নামের এক তরুণ আইরিশ অভিবাসীর হাতে এবং তাদের প্রথম ব্যবসা ছিল পাখির বিষ্ঠা রপ্তানি। অর্থাৎ পেটেন্ট বিক্রির পাঁচ বছর পরে, অন্য মহাদেশে, সম্পূর্ণ অন্য ব্যবসা নিয়ে কোম্পানিটার জন্ম। ১৮৪৯ সালে তারা হান্টের কাছ থেকে কিছু কেনেনি, কারণ ১৮৪৯ সালে তারা ছিলই না!তাহলে কে কিনল? উত্তরটা পেটেন্টের কাগজেই লেখা, একেবারে প্রথম লাইনে, 'ওয়াল্টার হান্ট, নিউ ইয়র্ক নিবাসী, স্বত্ব হস্তান্তরকারী উইলিয়াম রিচার্ডসন ও জন রিচার্ডসনের প্রতি।' রিচার্ডসন ভাইয়েরা, কোনও কোনও সূত্র বলে, জোনাথন রিচার্ডসন নামে এক নির্মাতা।এটা ছোট্ট একটা ব্যাপার মনে হতে পারে। কিন্তু জিনিসটা একটা কথা মনে করিয়ে দেয়, সেটা হল ইন্টারনেট পুনরাবৃত্তি করে, যাচাই করে না। আর মূল নথিটা সারা জীবন অপঠিত থাকে, কেউ তাকে পড়ে না।আর একটা কথা। ওই একই বছর, ১৮৪৯-এর অক্টোবরে, ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে চার্লস রাউলি নামে একজন প্রায় একই রকম একটা পিনের পেটেন্ট নেন - সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে, হান্টের কথা না জেনেই। রাউলির পিন আজ আর তৈরি হয় না। ইতিহাস বড় নির্মম টিকে থাকার ব্যাপারে!  সেলাই মেশিনের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা সেফটিপিন হান্টের সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কার। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে মর্মান্তিক গল্পটা অন্য। ১৮৩৩-৩৪ সালের কাছাকাছি হান্ট বানিয়েছিলেন পৃথিবীর প্রথম কার্যকর সেলাই মেশিনগুলোর একটা - চোখ-ওয়ালা সূচ, বাঁকানো সূচ, শাটল, আর দুই-সুতোর লকস্টিচ। আজকের সেলাই মেশিনেও ওই লকস্টিচ চলে।তিনি পেটেন্ট নিলেন না।কেন? প্রচলিত গল্প এই যে তাঁর মেয়ে তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, এই মেশিন বাজারে এলে হাজার হাজার দর্জি-মহিলা কাজ হারাবেন। বাবা রাজি হলেন না মেশিনটা বাজারে আনতে। গল্পটা সুন্দর, কিন্তু বেশ সন্দেহজনক, কারণ পেটেন্ট না নিলেও হান্ট মেশিনটা বানানোর অধিকার জর্জ অ্যারোস্মিথ নামে এক ব্যবসায়ীকে বেচে দিয়েছিলেন। যিনি সত্যিই দর্জিদের বাঁচাতে চান, তিনি স্বত্ব বেচেন না! সম্ভবত আসল কারণটা আরও সাদামাটা - টাকা।তারপর ১৮৪৬-এ ইলায়াস হাউ নামে এক ভদ্রলোক প্রায় একই রকম একটা লকস্টিচ সেলাই মেশিনের পেটেন্ট নিলেন। আইজ্যাক সিঙ্গার সেটা নকল করে বিক্রি শুরু করলেন। হাউ মামলা ঠুকলেন। আর সিঙ্গার, হাউয়ের পেটেন্ট বাতিল করানোর জন্য, খুঁজে বার করলেন সেই ভুলে-যাওয়া মিস্ত্রিকে, ওয়াল্টার হান্ট, যিনি হাউয়ের অনেক আগে একই জিনিস বানিয়েছিলেন।হান্ট এবার নিজেই লড়লেন। পেটেন্ট অফিস রায় দিল, হ্যাঁ, ওয়াল্টার হান্টই আসল উদ্ভাবক। কিন্তু তিনি সময়মতো আবেদন করেননি, তাই পেটেন্ট থাকবে হাউয়ের কাছে। কেস বুঝুন তাহলে একবার!তারপর, ১৮৫৮ সালে, সিঙ্গার কোম্পানি আদালতের বাইরে হান্টের সঙ্গে রফা করল পঞ্চাশ হাজার ডলারে। আজকের হিসেবে প্রায় চোদ্দো লক্ষ ডলার। জীবনে প্রথমবার ওয়াল্টার হান্টের হাতে সত্যিকারের টাকা আসতে চলেছে। কিন্তু ওই যে! ১৮৫৯ সালের ৮ জুন, টাকাটা হাতে পাওয়ার আগেই, নিউমোনিয়ায় তিনি মারা গেলেন।আর তাঁর রাইফেল? 'ভলিশনাল রিপিটিং রাইফেল' তিনি বেচেছিলেন সেই অ্যারোস্মিথকেই। সেখান থেকে সেটা পৌঁছল হোরেস স্মিথ, ড্যানিয়েল ওয়েসন আর বেঞ্জামিন টাইলার হেনরির হাতে। তাঁরা নকশা উন্নত করলেন। জন্ম নিল হেনরি রাইফেল, যা মার্কিন গৃহযুদ্ধে বিখ্যাত হল। তারপর তার থেকে উইনচেস্টার রিপিটার, 'যে বন্দুক পশ্চিম জয় করেছিল'। ওয়াল্টার হান্ট এক পয়সা রয়্যালটি পাননি।তাঁকে কবর দেওয়া হয় ব্রুকলিনের গ্রিন-উড সমাধিক্ষেত্রে। কাকতালীয় ভাবে, ইলায়াস হাউয়েরও কবর সেখানেই। হান্টের কবরফলকটা নেহাত সাধারণ পাথর নয়, কিন্তু হাউয়ের বিশাল স্মৃতিস্তম্ভের পাশে সেটা প্রায় দেখাই যায় না।নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন তাঁর মৃত্যুর পর একটা ছোট লেখা ছাপে শোকজ্ঞাপন করে। সেখানে বলা হয়, চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন কলাশিল্পের এক পরীক্ষক; যন্ত্রকৌশল, রসায়ন, বিদ্যুৎ বা ধাতুর মিশ্রণ - সব বিষয়েই তিনি ছিলেন সমান সপ্রতিভ; এবং সম্ভবত অন্য যে কোনও উদ্ভাবকের চেয়ে বেশি পরীক্ষা তিনি করেছিলেন।এইখানে একটা হালকা প্রশ্ন থেকে যায় – এত প্রতিভাবান হান্ট পেটেন্টের ব্যাপারে এত বোকামো করতেন কেন বারবার বেচে দিয়ে?আমার মনে হয়, ব্যাপারটা বুদ্ধির নয় ঠিক – হয়ত উত্তরটা লুকিয়ে আছে পরিস্থিতিতে, হান্ট যার মধ্যে জড়িয়ে ছিলেন। তেরো ভাইবোনের বড়, স্কুল-ছুট, চার সন্তানের বাবা, শহরে নতুন - এই লোকটাকে কোনও ব্যাঙ্ক টাকা দেবে না। রয়্যালটির অপেক্ষা করার বিলাসিতা তাঁর ছিল না। রয়্যালটি একটা লম্বা রেস, আর লম্বা রেসে তারাই খোলা মনে খেলতে নামতে পারে যাদের পেটে ভাত আছে।ওয়াল্টার হান্টের গল্প সেই ভাবে দেখতে গেলে উদ্ভাবনের গল্প নয়, মনে হয় যেন দর কষাকষির ক্ষমতার গল্প। কে ভাবতে পারে, আর কে অপেক্ষা করতে পারে - এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস, আর পৃথিবী দ্বিতীয়টাকেই পুরস্কৃত করে অনেক সময়! কারখানার ভেতরে সেফটিফিনের সাথে কি হচ্ছে?আজকের সেফটিপিন বানানোর পদ্ধতিটা মোটামুটি কেমন সেই নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা যাক এবার। কাঁচামাল সাধারণত স্প্রিং-স্টিল - উচ্চ-কার্বন ইস্পাত, যাতে বাঁকিয়ে ছেড়ে দিলে আবার আগের আকারে ফিরে আসে। কখনও পিতল (দুই ভাগ তামা, এক ভাগ দস্তা), কখনও স্টেনলেস স্টিল। ইস্পাতকে ক্রমশ ছোট হতে থাকা ছিদ্রের ভেতর দিয়ে টেনে তার বানানো হয়, মাঝে মাঝে গরম করে নরম করা হয় (অ্যানিলিং), নইলে তার ভঙ্গুর হয়ে যাবে।কারখানায় সেই তারের রিল খোলা হয়, সোজা করা হয়, নির্দিষ্ট মাপে কাটা হয়। তারপর গ্রাইন্ডিং হুইলে এক মাথা ছুঁচলো করা হয়, খোঁচা-খাঁচা ঘষে তোলা হয়। এরপর আসে 'ফোরস্লাইড' মেশিন - চার দিক থেকে চাপ দিতে পারে এমন যন্ত্র। ১৮৬৪ সালে ই. জে. ম্যানভিল যে স্বয়ংক্রিয় ফোরস্লাইড বানিয়েছিলেন, আজকের মেশিনগুলো তারই বংশধর। এই মেশিন তারটাকে একটা দণ্ডের চারপাশে পাকিয়ে কুণ্ডলী বানায়, অন্য প্রান্তে আঁকশি বাঁকায়। পাশ থেকে ইস্পাতের পাত ঢুকে ডাই-কাট হয়ে ক্যাপ তৈরি হয়, তারপর সেই ক্যাপ আঁকশির গায়ে চেপে বসে।শেষে ইলেকট্রোপ্লেটিং - ইস্পাতের পিনে ক্রোম, পিতলের পিনে নিকেল। ধুয়ে, পালিশ করে, ডিটারজেন্টে কেচে, মোম মাখিয়ে প্যাকেটে ভরা হয়।একটা কারখানা দিনে ত্রিশ লক্ষ সেফটিপিন বানাতে পারে। বছরে প্রায় একশো কোটির কাছাকাছি। মজার কথা, একুশ শতকের গোড়ায় গোটা আমেরিকায় মাত্র দুটো কোম্পানি সেফটিপিন বানাত। বাকিটা আসত বাইরে থেকে।কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য তথ্য এই যে নকশাটা প্রায় পাল্টায়নি। ১৮৪৯ সালে হান্ট যা বানিয়েছিলেন, আজ আপনার ড্রয়ারে যেটা পড়ে আছে, সেটা কার্যত একই জিনিস। প্রকৌশলী হেনরি পেট্রোস্কি তাঁর 'দ্য এভোলিউশন অফ ইউজফুল থিংস' বইয়ে দেখিয়েছেন, জিনিস বদলায় কারণ জিনিস ব্যর্থ হয় - ব্যর্থতাই বিবর্তনের ইঞ্জিন। সেফটিপিন খুব একটা ব্যর্থ হয় না, তাই সে বদলায়ওনি! পাংক: কাঁটা যখন পতাকা১৯৭০-এর দশক। লন্ডন আর নিউ ইয়র্ক। মন্দা, বেকারত্ব, ছেঁড়া জামা। নিউ ইয়র্কে রিচার্ড হেল - টেলিভিশন আর ভয়েডয়েডস ব্যান্ডের লোক, নিজের ছেঁড়া জামা সেফটিপিন দিয়ে জুড়ে পরতেন। শখে নয়। ছেঁড়া জামা, ঠান্ডা হাওয়া, আর পকেটে কিছু নেই। ম্যালকম ম্যাকলারেন নিউ ইয়র্কে গিয়ে সেই চেহারা দেখলেন, এবং লন্ডনে ফিরিয়ে আনলেন। কিংস রোডের ৪৩০ নম্বরে ভিভিয়েন ওয়েস্টউডের সঙ্গে তাঁর দোকান 'সেক্স'। সেখান থেকে সেক্স পিস্তলস। সেখান থেকে গোটা প্রজন্মের পোশাক।কিন্তু কেউ কেউ সারা জীবন এই রোম্যান্টিক ব্যাখ্যা নাকচ করে এসেছেন। তাঁদের মতে পিনটা কোনও শিল্প-বিবৃতি ছিল না। প্যান্টের পেছন ছিঁড়ে গেলে যাতে পেছনটা বেরিয়ে না পড়ে, সেই জন্যেই পিন। ব্যস।কিন্তু এই ফাঁকেতে ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বিদ্রোহী ফ্যাশন-প্রতীকটার জন্ম হয়েছিল প্যান্টের ছেঁড়া দিকটার থেকে। তারপর যা হয়। শ্যারন হ্যানন তাঁর 'পাংকস' বইয়ে নিউ ইয়র্ক-ধাঁচের পাংক পোশাকের বর্ণনা দিচ্ছেন - কালো সরু প্যান্ট, কালো চামড়ার জ্যাকেট, খোঁচা খোঁচা চুল, আর ছেঁড়া টি-শার্ট সেফটিপিন দিয়ে জোড়া। ফ্যাশন-ইতিহাসবিদ শন কোল বলছেন, পাংক শুরু হয়েছিল স্বাধীন প্রকাশ হিসেবে, কিন্তু খুব দ্রুত সেটার একটা নির্দিষ্ট ব্যাকরণ তৈরি হয়ে গেল আর সেফটিপিন হয়ে উঠল সেই ব্যাকরণের অন্যতম চিহ্ন।আর তারপর কেস তো আরও জটিল হল। পিন কাপড় ছেড়ে চামড়ায় উঠল। গালে, কানে, নাকে, ভুরুতে। যে কাঁটার সমস্ত ইতিহাস ছিল 'না-ফোটার', সেই কাঁটা এখন ইচ্ছে করে ফুটল।যুগের নিয়ম কেমন পাল্টায় তারঅ একটা উদাহরণ আছে এখানে। আমাদের মায়েরা সেফটিপিন দিয়ে ছেঁড়া জায়গা ঢাকতেন, যাতে কেউ না দেখে। পাংকরা সেফটিপিন দিয়ে ছেঁড়া জায়গা দেখাতেন, যাতে সবাই দেখে। একই কাঁটা, একই ছেঁড়া জামা - শুধু লজ্জাটা কার, সেই প্রশ্নের উত্তর উল্টে গেল কালের তালেগোলে!  মিলান, লেস্টার স্কোয়ার, এবং একটি শাড়ি১৯৯৪-এর বসন্ত-গ্রীষ্ম সংগ্রহ। মিলান ফ্যাশন উইকে জিয়ান্নি ভার্সাচে। শো শুরু হল ভদ্রস্থ ভাবে – টেলর টেইলর করা দিনের পোশাক, স্কার্ট আটকানো একটামাত্র পিন দিয়ে। তারপর র‍্যাম্প যত এগোল, পিন তত বড় হতে লাগল, তত বেশি হতে লাগল। শেষে দাঁড়াল এমন পোশাক, যেগুলো আক্ষরিক অর্থেই সেফটিপিনে ঝুলছে!ভার্সাচে তাঁর অনুপ্রেরণা গোপন করেননি। মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামের প্রদর্শনীর ক্যাটালগে তিনি বলেছিলেন, ওই সংগ্রহের দুটো উৎস - পাংক উপসংস্কৃতি, এবং ভারতীয় শাড়ি। পিন এল পাংক থেকে; শরীর জড়িয়ে থাকা প্যাঁচানো সিলুয়েটটা এল শাড়ি থেকে।ভাবুন একবার - মিলানের র‍্যাম্পে ইউরোপের সবচেয়ে দামি পোশাকটা তৈরি হচ্ছে লন্ডনের বেকার ছেলেদের ছেঁড়া প্যান্ট আর ভারতীয় মেয়েদের শাড়ির প্যাঁচ মিলিয়ে। আর যে কাঁটাটা দিয়ে সেটা আটকানো, সেটা এসেছে এক দেউলিয়া মিস্ত্রির পনেরো ডলারের ধার থেকে।এবার ১৯৯৪-এর ১১ মে। লন্ডনের লেস্টার স্কোয়ার। 'ফোর ওয়েডিংস অ্যান্ড আ ফিউনারাল'-এর প্রিমিয়ার। হিউ গ্র্যান্টের সঙ্গী এলিজাবেথ হার্লি, তখন কার্যত অচেনা। কেউ তাঁকে পোশাক ধার দিতে চায়নি। গ্র্যান্ট পরে স্বীকার করেছেন, একের পর এক ডিজাইনার-হাউস মুখের ওপর বলে দিয়েছিল: 'আপনি কে?'ভার্সাচে রাজি হল। হার্লি পরে বলেছেন, ওটা ছিল প্রেস অফিসে ঝুলে থাকা শেষ পোশাকটা। কোনও ফিটিং নেই, বাছাবাছি নেই। কালো সিল্ক আর লাইক্রা। দু'পাশে গভীর কাটা। আর সেই কাটা জুড়ে রাখা - বিশাল, সোনালি সেফটিপিনের সারি।পরদিন সকালে গোটা পৃথিবী একটা নামই জানত, এবং সেটা হিউ গ্র্যান্টের নয়। ইংরেজি সংবাদপত্রে পোশাকটার নামই হয়ে গেল 'দ্যাট ড্রেস'। ২০০৮ সালে ডেবেনহ্যামসের একটা সমীক্ষায় তিন হাজার মহিলা লাল-গালিচার সবচেয়ে আইকনিক পোশাক হিসেবে এটাকেই বেছে নেন। ২০০৭-এ হ্যারডস-এ এর একটা প্রতিলিপি বিক্রি হয়েছিল দশ হাজার ছ'শো নব্বই পাউন্ডে।হার্লি পোশাকটা পরদিনই ফেরত পাঠিয়ে দেন। আর কোনওদিন পরেননি। বছর কয়েক আগে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, পোশাকটার নিজস্ব একটা কেরিয়ার আছে; ও দুনিয়া ঘুরে বেড়ায়।পনেরো ডলারের ধার শোধ করতে বানানো কাঁটা, দশ হাজার পাউন্ডের পোশাক ধরে রেখেছে। ওয়াল্টার হান্ট যদি শুনতেন! সংহতির পিন২০১৬ সালের ২৩ জুন, ব্রেক্সিট গণভোট। ফল বেরোনোর পরের কয়েক সপ্তাহে ব্রিটেনে বর্ণবিদ্বেষী ঘৃণা-অপরাধের রিপোর্ট হু হু করে বাড়ল - জাতীয় পুলিশ প্রধানদের হিসেবে সাতান্ন শতাংশ।২৬ জুন, লন্ডনে বসবাসকারী এক মার্কিন মহিলা, টুইটারে যাঁর নাম @cheeahs, আসল নাম অ্যালিসন, একটা ছোট প্রস্তাব দিলেন। কোটের কলারে একটা খালি সেফটিপিন লাগান। কিচ্ছু লেখা নেই, কোনও স্লোগান নেই, কোনও রং নেই। শুধু একটা পিন।মানে? মানে হল, বাসে যদি হিজাব পরা কোনও মহিলা ওঠেন আর কেউ তাঁকে হেনস্থা করে, তাহলে পিন-পরা লোকটা চুপ করে থাকবে না। পিনটা একটা সংকেত: আমার পাশের সিটটা নিরাপদ।হ্যাশট্যাগ #safetypin ছড়িয়ে পড়ল, হাজার তিরিশ বার শেয়ার হল কয়েক দিনে। অ্যালিসন বলেছিলেন, ভাবনাটা এসেছিল ২০১৪-র সিডনির #IllRideWithYou আন্দোলন থেকে। আর তিনি বারবার একটা কথা বলেছেন, এটা কোনও ব্যাজ নয়, এটা একটা প্রতিশ্রুতি। পিন পরলে হস্তক্ষেপ করতে হবে, রিপোর্ট করতে হবে। নিজেদের পিঠ চাপড়ে 'আমরা তো বর্ণবিদ্বেষী নই' বলার জন্য এই জিনিস নয়।সে বছরেরই নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর পিনটা আটলান্টিক পেরিয়ে আমেরিকায় গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কও শুরু হল। সমালোচকরা বললেন, এটা 'স্ল্যাকটিভিজম' — আলস্য-সক্রিয়তা। কোনও পরিশ্রম নেই, কোনও ঝুঁকি নেই, পকেট থেকে একটা পয়সা যাচ্ছে না, শুধু একটা পিন পরে নিজেকে ভালো মানুষ মনে করা। হাফিংটন পোস্ট প্রথমে প্রশংসা করল, তারপর অন্য একটা লেখায় বলল, এটা বিব্রতকর, এবং এর মূল কাজ হল শ্বেতাঙ্গদের মনে শান্তি দেওয়া।তাহলে কে ঠিক?আমার মনে হয়, দুই পক্ষই ঠিক, এবং সেটাই সেফটিপিনের চরিত্র। পিন কাপড় ধরে রাখে। মানুষ ধরে রাখবে কি না, সেটা পিনের ওপর নির্ভর করে না, যে পরছে তার ওপর নির্ভর করে। প্রতীকের দাম শূন্য - এটাই তার প্রতিভা, এবং এটাই তার দারিদ্র্য। একটা কাঁটা কাউকে সাহসী করে তুলতে পারে না। সে শুধু মনে করিয়ে দিতে পারে যে সাহসের প্রতিশ্রুতি আপনি দিয়েছিলেন। মেয়েদের অস্ত্রবিবিসির সাংবাদিক গীতা পাণ্ডে ২০২৩ সালে একটা লেখা লিখেছিলেন, যার শুরুটা এইরকম ছিল যে কলেজে পড়ার সময় কলকাতার গাদাগাদি বাসে আর ট্রামে তাঁরা ছাতা ব্যবহার করতেন। কেউ নখ বড় রাখতেন। কেউ স্টিলেটোর ছুঁচলো হিল দিয়ে পেছনের লোকটার পায়ে চাপ দিতেন। আর অনেকে ব্যবহার করতেন সেফটিপিন। তবে এখানে কলকাতা বলা বলেও, সেই একই কেস অনেক শহরেই দেখা যায়।একজন মহিলা, দীপিকা শেরগিল, বিবিসিকে বলেছিলেন তাঁর অফিস-বাসের গল্প। তিনি তখন কুড়ি। লোকটার বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি। ধূসর সাফারি স্যুট, খোলা চটি, চৌকো চামড়ার ব্যাগ। রোজ তাঁর পাশে এসে দাঁড়াত, ঝুঁকে পড়ত, ব্রেক কষলেই গায়ের ওপর পড়ত। মাসের পর মাস তিনি চুপ করে সহ্য করেছেন, কারণ তিনি ভীতু ছিলেন, কারণ কেউ তাঁর পাশে দাঁড়াবে কি না তিনি জানতেন না।তারপর একদিন তিনি পিনটা বার করলেন।২০২১ সালের একটা সমীক্ষায় ভারতের একশো চল্লিশটা শহরের ছাপ্পান্ন শতাংশ মহিলা জানিয়েছেন, গণপরিবহণে তাঁরা যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। পুলিশের কাছে গেছেন মাত্র দুই শতাংশ। আর সবচেয়ে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সংখ্যাটা হল এই যে বায়ান্ন শতাংশেরও বেশি মহিলা বলেছেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁরা পড়াশোনা বা চাকরির সুযোগ ছেড়ে দিয়েছেন।'সেফটিপিন' নামের সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা কল্পনা বিশ্বনাথ বলেন, প্রকৃত হিংসার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে হিংসার ভয়। মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের ওপর বিধিনিষেধ চাপাতে শুরু করে। আর সেই মুহূর্তে তারা সমান নাগরিকত্ব হারায়। এটা ভারতের একার সমস্যা নয়। বিশ্বনাথ জানাচ্ছেন, লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকার মেয়েরাও তাঁকে বলেছেন, তাঁরাও পিন সঙ্গে রাখেন।আর ইতিহাসের একটা টুকরো এখানে না বললেই নয়।১৯০৩ সালের ২৮ মে, নিউ ইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউ। ক্যানসাস থেকে বেড়াতে আসা তরুণী লিওটি ব্লেকার একটা ঘোড়ায় টানা স্টেজকোচে উঠলেন। ভিড় গাড়ি। পাশের সুবেশ, বয়স্ক, 'ভদ্রদর্শন' লোকটি ঝাঁকুনির অজুহাতে ক্রমশ ঘেঁষে আসতে লাগলেন। তারপর হাত রাখলেন তাঁর পিঠে।লিওটি নিজের টুপি থেকে হ্যাটপিনটা বার করলেন প্রায় এক ফুট লম্বা এবং লোকটার হাতে ঢুকিয়ে দিলেন। লোকটা চেঁচিয়ে উঠল। তিনি মুখের ভাব পাল্টালেন না। সাংবাদিককে পরে বলেছিলেন, নিউ ইয়র্কের মেয়েরা এসব সহ্য করতে পারে; ক্যানসাসের মেয়েরা করবে না।এরপর কী হল? এরপর সংবাদপত্র আতঙ্কিত হয়ে উঠল। নাম দিল 'হ্যাটপিন পেরিল', কাঁটার বিপদ। ১৯১০ সালে শিকাগো শহর আইন করল: ন'ইঞ্চির বেশি লম্বা হ্যাটপিন পরলে গ্রেফতার, পঞ্চাশ ডলার জরিমানা। হামবুর্গ আর প্যারিসের পুলিশপ্রধানরাও নাকি লম্বা মাপার কথা ভাবছিলেন। ভোটাধিকার আন্দোলনের মহিলারা প্রতিবাদ করলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল সহজ, আপনারা যে লোকটা হাত বাড়াচ্ছে তাকে আটকাচ্ছেন না, আপনারা কাঁটার দৈর্ঘ্য মাপছেন।একশো কুড়ি বছর, দুটো মহাদেশ, দুটো ভিন্ন সভ্যতা এবং হুবহু একই দৃশ্য। মেয়েরা কাঁটা হাতে তুলে নিচ্ছেন, আর কর্তৃপক্ষ কাঁটাটার মাপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।সেফটিপিন সেই অস্ত্র, যেটা তাদের হাতে আসে যাদের অস্ত্র রাখার অধিকার নেই। তাবিজ, ম্যারাথন, ও মায়ের সেলাই-বাক্সএবার একটু অন্য ব্যাপারে চোখ বোলানো যাক। ইউক্রেনে শিশুর জামার ভেতরের দিকে একটা সেফটিপিন গেঁথে দেওয়া হয় - অপদেবতা তাড়ানোর জন্য। মেক্সিকোয় গর্ভবতী মহিলার পেটের যতটা কাছে সম্ভব একটা পিন লাগানো হয়, যাতে গর্ভস্থ সন্তানের কোনও ক্ষতি না হয়। ফিলিপিন্সে শিশুর জামায় তাবিজ আটকানো হয় সেফটিপিন দিয়ে, দুর্ভাগ্য ঠেকাতে।আমাদের দেশেও পিন প্রজন্ম পেরোয়। ভারতে পিন আর সেলাইয়ের সূচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবহার করা হয়, মা মেয়েকে দিয়ে যান। পশ্চিমি লেখকের কাছে এগুলো হ্য়ত কৌতূহলের বিষয়, কিন্তু আমাদের কাছে এটা খুবই স্বাভাবিক।ন্যাপি-পিন, অর্থাৎ শিশুর ন্যাকড়ার ডায়াপার আটকানোর বিশেষ পিন, আজও তৈরি হয় - একটা অতিরিক্ত নিরাপত্তা-ঢাকনা লাগানো, যাতে শিশুর গায়ে না ফোটে। যদিও চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দেন, গিলে ফেলার আশঙ্কা থেকেই যায়।আর ম্যারাথন। পৃথিবীর যে কোনও বড় দৌড়ে, যেখানে জুতোয় কার্বন প্লেট, ঘড়িতে জিপিএস, রক্তে ল্যাকটেট মাপার যন্ত্র - সেখানে বুকের নম্বরটা আটকানো থাকে চারটে সেফটিপিন দিয়ে। রানার্স ওয়ার্ল্ড ইউকে-র সম্পাদক অ্যান্ড্রু ডিক্সন এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন নিতান্ত ব্যবহারিক ভাষায়: আঠালো লেবেল বৃষ্টিতে বা ঘামে খুলে যায়, পিন খোলে না। একুশ ফুট লম্বা কাঁটা১৯৯৯ সালে ভাস্কর ক্লেস ওল্ডেনবার্গ আর তাঁর স্ত্রী কোসিয়ে ফান ব্রুগেন একটা কাজ করলেন, যার নাম 'করিডর পিন, ব্লু'। স্টেনলেস স্টিল আর অ্যালুমিনিয়ামের একটা সেফটিপিন। নীল এনামেল করা। উচ্চতা একুশ ফুট। আসল সেফটিপিনের প্রায় আড়াইশো গুণ বড়। এবং সেটাকে দাঁড় করানো হয়েছে খাড়া ভাবে, যেভাবে আসল সেফটিপিন কোনওদিন দাঁড়াতে পারে না। একটা রাখা আছে সান ফ্রান্সিসকোর ডি ইয়ং মিউজিয়ামের ভাস্কর্য-বাগানে। যমজটা নিউ অর্লিন্স মিউজিয়াম অফ আর্টে।পপ আর্টের কাজটাই এই। যে জিনিসটার দিকে আপনি জীবনে একবারও তাকাননি, সেটাকে আড়াইশো গুণ বড় করে আপনার হাঁটাপথে বসিয়ে দেওয়া। আপনি এড়াতে পারবেন না। মাথা তুলে তাকাতেই হবে।শেষ কথা: যা ধরে রাখেসেফটিপিন একটা অদ্ভুত জিনিস, কারণ সে কখনও ভান করে না। বোতাম বলে, আমি জামার অংশ। জিপ বলে, আমি নকশার অংশ। সেলাই বলে, আমি স্থায়ী। কিন্তু সেফটিপিন কোনও দাবিই করে না। সে জানে সে সাময়িক। সে জানে, ছেঁড়াটা ছেঁড়াই থেকে যাবে, সে শুধু আপাতত ধরে রাখছে। এই সততাটাই তার সৌন্দর্য।'দি আটলান্টিক'-এ রিনা কাবাইয়ার একটা চমৎকার লেখা আছে, যেটা শুরু হয় তাঁর মায়ের কথা দিয়ে - স্কুলের জামার বোতাম গেলে মা ব্যাগ হাতড়ে পিন বার করতেন, এমন নিপুণ ভাবে আটকাতেন যে ক্লিপটা নিচে লুকিয়ে যেত, কিছু বোঝা যেত না। লেখাটা শেষ হয় এইভাবে: প্রতিটি সেফটিপিন কিছু না কিছু ধরে রাখে; আর তার সঙ্গে সে ধরে রাখে সময়টাকেও।ওয়াল্টার হান্ট মারা গিয়েছিলেন কিছু না রেখে, কিছু না পেয়ে। তাঁর নামে কোনও কোম্পানি নেই, কোনও ব্র্যান্ড নেই, কোনও মূর্তি নেই। ব্রুকলিনের কবরখানায় তাঁর পাথরটা প্রতিদ্বন্দ্বীর স্মৃতিস্তম্ভের ছায়ায় ঢাকা পড়ে আছে। অথচ পৃথিবীর প্রতিটি ড্রয়ারে, প্রতিটি হাতব্যাগে, প্রতিটি সেলাই-বাক্সে, প্রতিটি হাসপাতালের ওয়ার্ডে, প্রতিটি ম্যারাথনের বুকে - তাঁর তিন ঘণ্টার কাজটা পড়ে আছে। পনেরো ডলারের ধার শোধ করতে গিয়ে ভদ্রলোক দুনিয়াটাকে জুড়ে দিয়ে গেলেন, নিজে জোড়া লাগল না।সেই ভাবে ভেবে দেখলে আমাদের জীবনটাও তো তাই। কিছুই পুরোপুরি সেলাই করা নেই। সবটাই মনে হয় আসলে পিন দিয়ে আটকানো - সম্পর্ক, চাকরি, সংসার, বিশ্বাস। কোনটা কখন খুলে যাবে, কেউ জানি না! শুধু চাই, ক্লিপটা যেন ঢাকা থাকে। আর কাঁটাটা যেন কাউকে না ফোটে!বাকিটা? বাকিটা আপনার আমার ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা! 
  • জনতার খেরোর খাতা...
     রাজার নতুন শিক্ষানীতি: গেম থিওরি [উৎসর্গ : সমস্ত গুরু চাঁড়ালকে বিশেষ করে মানালি মা কে ] - albert banerjee | অধ্যায় ১: গেম থিওরি কী? — লিলি আর মিমির খেলার ঘরগল্প শুরু হয় লিলি আর মিমির খেলার ঘর থেকে। তারা মিলে একটা নতুন খেলা খেলার সিদ্ধান্ত নিল।লিলি বলল, "আমরা একটা খেলা খেলব। আমি একটা সংখ্যা ভাবব, তুই সেটা বলতে হবে। কিন্তু তুই যদি ঠিক বলিস, তুই জিতবি। আর যদি ভুল বলিস, আমি জিতব।"মিমি বলল, "এটা তো খুব সহজ! আমি ৫ ভাবছি?"লিলি বলল, "না, আমি ৩ ভাবছিলাম। আমি জিতলাম!"ঠিক তখন তাদের মা ঘরে এলেন। তিনি বললেন, "তোরা যে খেলা খেলছিস, সেটারই একটা গণিত আছে। তার নাম গেম থিওরি।"লিলি বলল, "গেম থিওরি? খেলার গণিত?"মা বললেন, "হ্যাঁ। গেম থিওরি শেখায়, কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে সেরা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেখানে একজনের লাভ আরেকজনের ক্ষতি, সেখানে কী করবে — এটাই গেম থিওরি।"মিমি বলল, "তাহলে শুরু করি?" গেম থিওরির মৌলিক ধারণামা তাদের গেম থিওরির মৌলিক ধারণাগুলো বলতে শুরু করলেন:১. খেলোয়াড় (Players) — যারা সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের খেলায় লিলি আর মিমি — দুই খেলোয়াড়।২. কৌশল (Strategies) — প্রতিটি খেলোয়াড়ের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত। লিলি ১ থেকে ১০ পর্যন্ত যেকোনো সংখ্যা ভাবতে পারে। মিমি ১ থেকে ১০ পর্যন্ত যেকোনো সংখ্যা বলতে পারে।৩. লাভ (Payoff) — প্রতিটি ফলাফলের জন্য প্রতিটি খেলোয়াড় যা পায়। লিলি জিতলে সে খুশি (১), মিমি জিতলে মিমি খুশি (১)।৪. খেলার ধরন (Game Type) — সহযোগিতামূলক না প্রতিযোগিতামূলক। আমাদের খেলা প্রতিযোগিতামূলক — একজন জিতলে অন্যজন হারে।লিলি লিখল:- খেলোয়াড় = সিদ্ধান্তগ্রহণকারী- কৌশল = সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত- লাভ = জয়ের পরিমাণমিমি বলল, "গেম থিওরি দিয়ে সব খেলাই বোঝা যায়?"মা বললেন, "শুধু খেলা না — অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা, এমনকি যুদ্ধবিদ্যাও গেম থিওরি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়।" জিরো-সাম গেমমা তাদের সবচেয়ে সহজ ধরনের গেম শেখালেন — জিরো-সাম গেম (Zero-Sum Game)।তিনি বললেন, "জিরো-সাম গেমে একজনের লাভ = অন্যজনের ক্ষতি। অর্থাৎ মোট লাভ সবসময় ০।"লিলি বলল, "আমাদের সংখ্যা ভাবার খেলায়, আমি জিতলে মিমি হারে — মোট লাভ ০।"মা বললেন, "ঠিক। ক্রিকেট ম্যাচেও এক দল জিতলে অন্য দল হারে — এটাও জিরো-সাম। কিন্তু ব্যবসায় দুই কোম্পানি একসাথে লাভ করতে পারে — সেটা নন-জিরো-সাম।"মিমি বলল, "তাহলে দুই ধরণের গেম আছে?"মা বললেন, "হ্যাঁ। জিরো-সাম আর নন-জিরো-সাম। আমরা প্রথমে জিরো-সাম শিখব।" পেমেন্ট ম্যাট্রিক্সমা তাদের পেমেন্ট ম্যাট্রিক্স (Payoff Matrix) শেখালেন। তিনি বললেন, "এটা একটা টেবিল, যেখানে প্রতিটি কৌশল কম্বিনেশনের জন্য লাভ দেখানো হয়।"লিলি আর মিমির সংখ্যা ভাবার খেলার জন্য পেমেন্ট ম্যাট্রিক্স:| লিলিমিমি | ১ বলে | ২ বলে | ৩ বলে ||-----------|-------|-------|-------|| ১ ভাবে | ০,০ | ১,-১ | ১,-১ || ২ ভাবে | -১,১ | ০,০ | ১,-১ || ৩ ভাবে | -১,১ | -১,১ | ০,০ |এখানে প্রথম সংখ্যা লিলির লাভ, দ্বিতীয় সংখ্যা মিমির লাভ।লিলি বলল, "যদি আমি ৩ ভাবি আর মিমি ৩ বলে, তাহলে দুজনেই ০ পায় — কেউ জেতে না?"মা বললেন, "ঠিক। কিন্তু যদি তুমি ৩ ভাবো আর মিমি ২ বলে, তাহলে তুমি জেতো (১), মিমি হারায় (-১)।"মিমি বলল, "এটা দেখে আমি বুঝতে পারি কোন কৌশল ভালো।" লিলির নিজের উদাহরণ — পাথর-কাঁচি-কাগজলিলি তার নিজের উদাহরণ দিল — পাথর-কাঁচি-কাগজ খেলা।পেমেন্ট ম্যাট্রিক্স (লিলি প্রথম):| লিলিমিমি | পাথর | কাঁচি | কাগজ ||-----------|-------|-------|-------|| পাথর | ০,০ | ১,-১ | -১,১ || কাঁচি | -১,১ | ০,০ | ১,-১ || কাগজ | ১,-১ | -১,১ | ০,০ |মিমি বলল, "এখানে কোনো কৌশলই সবসময় জেতে না — প্রতিটি কৌশলের উল্টো আছে!"মা বললেন, "ঠিক। এটাকে বলে মিশ্র কৌশল (Mixed Strategy) — এখানে সব কৌশল সমান সম্ভাব্য।"লিলি বলল, "তাই পাথর-কাঁচি-কাগজে কেউ নিশ্চিতভাবে জেতে না!" প্রভাবশালী কৌশলমা তাদের প্রভাবশালী কৌশল (Dominant Strategy) শেখালেন। তিনি বললেন, "একটা কৌশল প্রভাবশালী হয় যদি তা অন্য সব কৌশলের চেয়ে ভালো হয়, প্রতিপক্ষ যাই করুক না কেন।"উদাহরণ: ধরা যাক, দুটো কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।| কোম্পানি AB | বিজ্ঞাপন দেয় | দেয় না ||--------------|-------------|--------|| বিজ্ঞাপন দেয় | ৪,৪ | ৬,২ || দেয় না | ২,৬ | ৩,৩ |এখানে A-এর জন্য বিজ্ঞাপন দেয়া সবসময় ভালো — B যাই করুক। কারণ ৪ > ২ আর ৬ > ৩। তাই বিজ্ঞাপন দেয়া A-র প্রভাবশালী কৌশল।লিলি বলল, "মানে সবসময় যা ভালো, সেটাই প্রভাবশালী?"মা বললেন, "হ্যাঁ। এটা গেম থিওরির খুব গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।" ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামমা তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণা শেখালেন — ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম (Nash Equilibrium)। তিনি বললেন, "এটা এমন একটা অবস্থা, যেখানে কোনো খেলোয়াড় একা গিয়ে নিজের কৌশল বদলাতে চায় না। প্রত্যেকেই সেরা কৌশল বেছে নিয়েছে, অন্যরা যা করছে সেটা মেনে নিয়ে।"লিলি বলল, "মানে সবাই খুশি?"মা বললেন, "সবাই খুশি না, কিন্তু কেউ একা গিয়ে লাভ করতে পারে না।"উদাহরণ: বিজ্ঞাপনের গেমে (৪,৪) হলো ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম — দুটো কোম্পানিই বিজ্ঞাপন দেয়, আর কেউ একা গিয়ে কৌশল বদলাতে চায় না। কারণ A একা গিয়ে বিজ্ঞাপন না দিলে তার লাভ কমে যায় (৪ থেকে ২), আর B একা গিয়ে বিজ্ঞাপন না দিলে তার লাভ কমে যায় (৪ থেকে ২)।মিমি বলল, "এটা তো একটা ফাঁদের মতো!"মা বললেন, "ঠিক। ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম সবসময় সবার জন্য সেরা না, কিন্তু কারও একা গিয়ে লাভ করার সুযোগ নেই।"জন ন্যাশ এই ধারণার জন্য ১৯৯৪ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর জীবন নিয়ে 'A Beautiful Mind' সিনেমাও বানানো হয়েছে। কয়েদির দ্বিধামা তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত গেম থিওরি উদাহরণ দেখালেন — কয়েদির দ্বিধা (Prisoner's Dilemma)।গল্প: দুজন অপরাধীকে আলাদা ঘরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের কাছে দুই অপশন — স্বীকার করা আর না করা।পেমেন্ট ম্যাট্রিক্স (বছর কারাদণ্ড):| খেলোয়াড় ১২ | স্বীকার করে | করে না ||-------------|------------|--------|| স্বীকার করে | ৫,৫ | ১,১০ || করে না | ১০,১ | ২,২ |এখানে সংখ্যা মানে কারাদণ্ডের বছর — কম সংখ্যা ভালো।লিলি বলল, "দুটোই যদি স্বীকার না করে, তাহলে প্রত্যেকে ২ বছর পায় — সবার জন্য সেরা।"মিমি বলল, "কিন্তু প্রত্যেকের জন্য স্বীকার করা প্রভাবশালী — কারণ অন্য স্বীকার করলে তুই ১০ না পেয়ে ৫ পাবি, আর অন্য না করলে তুই ২ না পেয়ে ১ পাবি।"মা বললেন, "ঠিক। তাই দুজনেই স্বীকার করে — আর পায় ৫-৫ বছর। এটা ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম। কিন্তু সবার জন্য সেরা হলো (২,২) — যা ইকুইলিব্রিয়াম না।"লিলি বলল, "তাই কয়েদির দ্বিধা — ভালো করার ইচ্ছা থাকলেও সবাই খারাপ করে!"মা বললেন, "ঠিক। এই উদাহরণ গেম থিওরির সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ।" গেম থিওরির বাস্তব ব্যবহারমা তাদের গেম থিওরির কিছু বাস্তব ব্যবহার দেখালেন:১. অর্থনীতি — দুটো কোম্পানির মধ্যে মূল্য প্রতিযোগিতা। বিজ্ঞাপনের উদাহরণ আমরা দেখেছি।২. রাজনীতি — নির্বাচনে কৌশল। কোন ইস্যুতে জোর দিলে বেশি ভোট পাওয়া যায়।৩. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক — অস্ত্র প্রতিযোগিতা। দুটো দেশ অস্ত্র বাড়াতে থাকলে দুজনেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু কেউ একা থামতে চায় না।৪. জীববিজ্ঞান — বিবর্তন। প্রাণীদের মধ্যে সহযোগিতা আর প্রতিযোগিতা।৫. ক্রীড়া — পেনাল্টি শুটআউটে কোন দিকে শুট করবে, কোন দিকে গোলরক্ষক ডাইভ করবে — এটা গেম থিওরি।লিলি বলল, "গেম থিওরি আমাদের চারপাশে!"মিমি বলল, "হ্যাঁ। আমরা সবসময় কৌশল নিয়ে খেলছি, জানি না।" শোওয়ার আগেরাতে শোওয়ার আগে লিলি আর মিমি তাদের আজকের পড়া রিভাইজ করল।লিলি লিখল:- গেম থিওরি = কৌশলের গণিত- খেলোয়াড়, কৌশল, লাভ — মৌলিক ধারণা- জিরো-সাম গেম = একজনের লাভ অন্যজনের ক্ষতি- পেমেন্ট ম্যাট্রিক্স = লাভের টেবিল- প্রভাবশালী কৌশল = সবসময় ভালো- ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম = কেউ একা গিয়ে বদলাতে চায় না- কয়েদির দ্বিধা = ব্যক্তি ভালো, সামগ্রিক খারাপমিমি লিখল:- পাথর-কাঁচি-কাগজ = মিশ্র কৌশলের উদাহরণ- বিজ্ঞাপনের গেম = প্রভাবশালী কৌশল- ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম জন ন্যাশ আবিষ্কার করেন- বাস্তব ব্যবহার: অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কলিলি বলল, "কাল আমরা গেম থিওরির আরও উদাহরণ শিখব।"মিমি বলল, "মানে আরও জটিল গেম?"লিলি বলল, "হ্যাঁ।"তারা ঘুমিয়ে পড়ল।টিপসতোমরাও লিলি আর মিমির মতো গেম থিওরি শিখে ফেললে। এখন তুমি জানো, কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে সেরা সিদ্ধান্ত নিতে হয়।তোমার চারপাশ থেকে গেম থিওরির উদাহরণ বের করতে পারো। যেমন:- তুমি আর তোমার বন্ধু একসাথে কোনো কাজ করলে — কে বেশি করবে? সহযোগিতা না প্রতিযোগিতা?- দোকানে দুই কোম্পানির পণ্য — কোনটা কিনবে? দাম আর মানের মধ্যে কৌশল।- খেলায় কোন কৌশল নেবে — আক্রমণাত্মক না প্রতিরক্ষামূলক?- স্কুলে কোন বিষয়ে বেশি সময় দেবে — ভালো নম্বর পেতে?এভাবে প্রতিদিন ৫টা করে গেম থিওরি উদাহরণ বের করার অভ্যাস করো।মনে রাখার মূল কথা:- গেম থিওরি = কৌশলের গণিত- জিরো-সাম = একজনের লাভ অন্যজনের ক্ষতি- ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম = কেউ বদলাতে চায় না- কয়েদির দ্বিধা = ব্যক্তি ভালো, সামগ্রিক খারাপ শেষ কথাএই অধ্যায়ে আমরা শিখলাম গেম থিওরির মৌলিক ধারণা। আমরা জানলাম, গেম থিওরি হলো কৌশলের গণিত — কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে সেরা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমরা শিখলাম জিরো-সাম গেম, পেমেন্ট ম্যাট্রিক্স, প্রভাবশালী কৌশল, ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম, আর কয়েদির দ্বিধা।লিলি আর মিমি তাদের নিজের জীবন থেকে অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছে — সংখ্যা ভাবার খেলা, পাথর-কাঁচি-কাগজ, বিজ্ঞাপনের গেম — সবকিছুর জন্য।পরের অধ্যায়ে আমরা গেম থিওরির আরও উদাহরণ শিখব — সিকোয়েন্সিয়াল গেম, মিশ্র কৌশল, আরও জটিল গেম।ততক্ষণে, তোমরা নিজেরা নিজেদের জীবন থেকে গেম থিওরির উদাহরণ বের করতে থাকো। 
    ভয় আউট ভক্তি ইন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস একরকম ছিল। এবার একদম পরমাণু কেন্দ্রের খবর ফাঁস। রয়টার রিপোর্ট করেছে, ভারতের সর্ববৃহৎ পরমাণুকেন্দ্র কোদানকালামের তথ্য ডার্কওয়েবে ফাঁস হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে সাড়ে আট লাখ ফাইল, তার মধ্যে ১৯০০০ 'সেন্সিটিভ', ১৪ জিবি ডেটা। পুরোটাই নাকি ডার্ক ওয়েবে।আপনারা জানেন, বেসরকারি হলেই পরিষেবা ভালো হবে। এনটিএ নাকি প্রচুর প্রাইভেট ভেন্ডরকে অনেক কিছু আউটসোর্স করেছিল। তাদের দু পয়সা আসত। তার সঙ্গে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুব "কর্মদক্ষ" সরকারি ব্যাপার তো ছিলই। এই ভেন্ডররা ছিল খুচরো। কিন্তু পরমাণুকেন্দ্র বলে কথা। এর নতুন ইউনিট তৈরি বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল খোদ নীল রক্তের রিলায়েন্সের উপরে। তাদের খপ্পর থেকেই এইসব ফাঁস হয়েছে।এই খবরটা ডিম্মিডিয়ায় পাবেন না। কারণ ওরা ডার্ক ওয়েব বা রয়টার দেখে না। শুধু ডিম ছোঁড়ার খবর পায়। তবে নিশ্চিন্ত থাকুন, বেওসার উন্নতির জন্য সরকার সবকিছু করছে। আপনার প্রশ্নপত্র টেলিগ্রামে উড়ছে তো কি, দুচাট্টি বেসরকারি কনট্রাক্টর তো পয়সা কামাচ্ছে। ইথানলে গাড়ি গোলমাল করছে তো কি, কিছু কোম্পানির তো আকাশছোঁয়া মুনাফা হচ্ছে। পরমাণুকেন্দ্রের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে তো কি, রিলায়েন্সকে তো দেখতে হবে। বেসরকারি হলে শুধু পরিষেবা ভালো হবে না, বেওসায়িরা দুচার পয়সা কামাবে, দেশ জুড়ে কর্মসংস্থানের বন্যা হবে। তার জন্য একটু আত্মত্যাগ তো করতেই হবে। এই জন্যই রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন, ওরে নরেন সবকিছু বেচে দিয়ে সন্নিসি হয়ে যা।ওদিকে উত্তরপ্রদেশের মাননীয় স্পিকার বলেছেন, যাঁরা যথেষ্ট ভক্তিভরে রামমন্দিরে প্রণামী দেননি তাঁদেরই প্রণামী চুরি হয়ে থাকবে। একদম ঠিক কথা। এই যুক্তিকে একটু টেনে লম্বা করলে পাই, যে, যাঁরা যথেষ্ট ভক্তি সহকারে ফর্ম ফিলআপ করেননি, তাঁদেরই অন্নপূর্ণায় গোলমাল হচ্ছে। যাঁরা স্রেফ পড়াশুনো করে, নিট বা সিবিএসই পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের ভক্তির অভাবেই প্রশ্নপত্রই ফাঁস হয়ে থাকবে। যাঁরা যথেষ্ট ভক্তিসহ গাড়ি চালাচ্ছেন না, কেবল তাঁদের গাড়িই ই২০ তে ঝামেলা পাকাচ্ছে। যে অর্থনীতিবিদরা ভক্তি আউট অর্থনীতি ইন করে পেপার লিখছেন, তাঁদেরই পাপে ডলার একশ ছুঁই ছুঁই। যে পরমাণু বিজ্ঞানীরা ভক্তি বাদ দিয়ে স্রেফ বিজ্ঞানের ভরসায় কোদাইকালাম চালাচ্ছিলেন, তাঁদের আহাম্মকিতেই তথ্য ফাঁস হয়েছে।উল্টোদিকে দেখুন, প্রবল ভক্তি থাকায় ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্য বেড়েই চলেছে। এতই বাড়ছে, যে, ভারতের উপরের ১০% লোকই রাষ্ট্রীয় আয়ের ৫৮% পকেটস্থ করছে। প্রচন্ড ভক্তি থাকায় অনেক বড়লোকেরই ঋন মকুব হচ্ছে। এমনকি চুরি-টুরি করলেও পাওয়া যাচ্ছে, বিদেশে আরামপ্রদ বসবাসের স্থায়ী পারমিট। কোনো সংগঠন না থাকা সত্ত্বেও, স্রেফ ভক্তির জোরেই, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুবীররা ক্ষমতা দখল করেছেন। স্রেফ ভক্তি আছে বলেই দলে দলে বিরোধী সাংসদ এবং বিধায়ক ভালো হয়ে যাচ্ছেন। ডিম মাথায় না পড়ে এখন বৃষ্টির মতো পাতে এসে পড়ছে।মোদ্দা কথা হল, ভয় আউট ভক্তি ইন। অনশন-টনশন করে ভয় দেখাবেন না। কী হয়ে যাবে বলা কঠিন। প্রণামী চুরি হতে পারে, গাড়ির চাকা বসে যেতে পারে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যেতে পারে। পাপ করার জন্য পুলিশে ধরতে পারে। কে জানে হয়তো জীবনটাই চুরি হয়ে গেল। তার চেয়ে ভক্তিতে আসুন। জীবন ফুলে ফলে পল্লবিত হবে। তবে হ্যাঁ, অফারটি সীমিত সময়ের জন্য এবং নানা শর্তসাপেক্ষে। নিচে খুদে অক্ষরে লেখা আছে, কোন গোত্রে, কোন গোষ্ঠীতে, কোন রাজ্যে থাকলে তবেও ওয়েস্ট ইন্ডিয়ার সুখের ইডেনে ঢুকতে পাবেন। বাকিরাও ভক্তি করতেই পারেন, কিন্তু হাতে-হাতে ফল না পেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী না।
    দধীচি।  - Sobuj Chatterjee | জলের ওপর দাগ কাটা যায়না, তাই তুমি জলে তুললে ঢেউ-ঢেউ আছড়ে পড়েছে রুক্ষ- শুষ্ক অগনন বেলাভূমিতে;সিক্ত করেছে অসঙ্কোচে মানব জমিন-উর্বর করেছে হৃদয় আর বোধ। তবু বুদ্ধির আড়ালে রয়ে গেছে মণীষা,ধীশক্তি। তোমার সংগ্রহে রয়েছে শ্রমের ফসল -ঈর্ষনীয় সে সব সম্পদ! বুদ্ধের মত সাহস তোমার-শান্ত সমাহিত এক ব্যক্তিত্ব! শক্তি আর তারুণ্যে ভরপুর তোমার চারপাশ। তোমার সততা তোমার জীবনকে করেছে তুচ্ছ;তোমার আদর্শ কোটি কোটি মনকে আকর্ষণ করে-আপোষহীন সংগ্রাম তোমার শোণিতে; তবুও কি দিশা পাবে এই প্রেক্ষিত!তবুও কি কাঙ্খিত মিহির কিরণ স্পর্শে কাটবে কুয়াশা! তোমার দর্শনে তোমার- বিজ্ঞানে মোহিত আপামর ;সংখ্যায় যারা নিতান্তই মুষ্টিমেয়-তুমি তাদেরই একজন। তোমাকে বড় বেশি করে প্রয়োজন আগামী প্রজন্মের। পশুদের কেবল ক্ষিধে থাকে, নীতি নেই-অপেক্ষায় থাকে শুধু মাংসের;আকাশে উড়ছে শকুননীচে ঘুরছে হায়না। বাতাসে অনশনের গন্ধ -দোহাই দোস্ত! আর নয়... আর নয়... পৃথিবী উত্তাল আজ ফুটবলে; তোমারই মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে প্লেন -গর্জন করতে করতে দেশের স্বার্থে! সময় নেই বন্ধু; পথ এখানে বন্ধুর!!
  • ভাট...
    commentManali Moulik | আজকাল আর প্রেমে তেমন গভীরতা নেই। ক‍্যাপিটালিজম, এক্সপ্লয়েটেশন আর চাকচিক‍্যের চক্করে আষাঢ় অপরাহ্ন কোথায় হারিয়ে গেলো?
    commentতরমুজ | না না সেটা আরও আগের ঘটনা। ঐ মেয়েটা খুব আলট্রা মডার্ন ছিল। এটা পরে। ঐ বড় মেয়েটার সাথে খুব ঝামেলা হয়েছিল। ওর আগের বয়ফ্রেন্ড আমাকে ক্যালাবে বলেছিল। আসলে কিছুই না। আমি মাঝখানের পার্ট টাইম প্রেমিক ছিলাম। আর সেও একটু এক্সপেরিমেন্ট করছিল। বাচ্চাদের সাথে প্রেম করতে কেমন লাগে!
    commentকৌতূহলী | @তরমুজ , সেই আপনার থেকে বয়সে বড় যে মেয়েটার প্রেমে পড়েছিলেন, যিনি আপনাকে বলেছিলেন ''তুমি খুব ফালতু ছেলে '' তার কথা বলছেন?
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত