r2h | 165.*.*.* | ০৮ জুন ২০২৬ ২১:৩০
হুঁ, আমার ইনফ্যক্ট মনে হয় সোচ্চার ও উগ্র চাড্ডিপনায় বাঙালী বেশ কয়েক দশক একটু পিছিয়ে ছিল- এখন দ্রুত ক্যাচ আপ করবে, এমনকি উত্তর ভারতকে ছাপিয়ে গেলে অবাক হবো না।
বাঙালি তো আজ থেকে চাড্ডি নয়, এ ব্যাপারে তার ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো। আর উত্তর ভারত চাড্ডি হওয়ার অনেক আগে উগ্র চাড্ডিপনার সেরা নিদর্শন হিন্দু কলেজের আগুনখেকো বিপ্লবী রাজনারায়ণ বসু।
বাঙালির ২০০ বছরের চাড্ডিপনার সামান্য কিছু নমুনা :
১. ...যেমন রূপালঙ্কারবতী সাধ্বী স্ত্রীর হৃদয়ার্থবোদ্ধা সুচতুর পুরুষেরা দিগম্বরী অসতী নারীর সন্দর্শনে পরাঙ্মুখ হন তেমনি সালঙ্কারা শাস্ত্রার্থবতী সাধুভাষার হৃদয়ার্থবোদ্ধা সৎ পুরুষেরা নগ্না উচ্ছৃঙ্খলা লৌকিক ভাষা শ্রবণমাত্রেতেই পরাঙ্মুখ হন।
— কথ্য ভাষা বা ‘ইতর’ বাংলা সম্পর্কে পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার (আনু. ১৭৬৩-১৮১৯)
২. কয়েক শতাব্দী ধরে হিন্দুস্থানের বৃহত্তর অংশ মুসলমান শাসনের অধীনে ছিল, [ফলে] এ দেশের মূল অধিবাসীদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্রমাগত পদদলিত হয়েছিল... কিন্তু মুসলমান শাসকদের রাজত্বকালে বাংলার অধিবাসীরা দৈহিক অপটুতা ও সক্রিয় পরিশ্রমের অনীহা হেতু শাসকদের প্রতি একান্তভাবে বিশ্বস্ত ছিল, যদিও তাদের ধনসম্পদ প্রায়শই লুণ্ঠিত হয়েছে, ধর্মের অবমাননা হয়েছে এবং যথেচ্ছভাবে তাদের হত্যাও করা হয়েছে। অবশেষে অশেষ করুণাময় জগৎপিতা, সেই অত্যাচারীদের কবল থেকে নিপীড়িত বাংলার অধিবাসীদের উদ্ধার করে নিজের তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করার জন্য ইংরেজদের অনুপ্রাণিত করেন। এসব বিষয়গুলি বিবেচনা করে এবং এ দেশের কল্যাণের জন্য [ইংরেজদের] সচেষ্ট হওয়ার কথা মনে রেখে... আপনার কর্তব্যপরায়ণ প্রজাবৃন্দ ইংরেজদের কখনও বিজয়ী দল হিসেবে দেখেনি, বরং পরিত্রাণকর্তা হিসেবে দেখেছে; মহারাজকে কেবল একজন শাসক হিসেবেই দেখেনি, পিতা ও রক্ষক হিসেবেও দেখেছে।
— রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)
৩. এই ভারতবর্ষে প্রায় নয় শত বৎসর হইল যবন সঞ্চার হওয়াতে তৎসমভিব্যাহারে যাবনিক ভাষা অর্থাৎ পারসী ও আরবীভাষা এই পুণ্যভূমিতে অধিষ্ঠান করিয়াছে অনন্তর ক্রমে যেমন যবনদের ভারতবর্ষাধিপত্য বৃদ্ধি হইতে লাগিল তেমন রাজকীয় ভাষা বোধে সর্বত্র সমাদর হওয়াতে যাবনিক ভাষার উত্তরোত্তর এমত বৃদ্ধি হইল যে অন্য সকল ভাষাকে পরাস্ত করিয়া আপনি বর্ধিষ্ণু হইল এবং অনেক অনেক স্থানে বঙ্গভাষাকে দূর করিয়া স্বয়ং প্রভুত্ব করিতে লাগিল বিষয় কর্মে বিশেষত বিচারস্থানে অন্য ভাষার সম্পর্কও রাখিল না তবে যে কোন স্থলে অন্য ভাষা দেখা যায় সে কেবল নাম মাত্র। সুতরাং আমাদের বঙ্গভাষার তাদৃশ সমাদর না থাকাতে এইক্ষণে অনেক সাধুভাষা লুপ্তপ্রায়া হইয়াছে এবং চিরদিন অনালোচনাতে বিস্মৃতিকূপে মগ্না হইয়াছে যদ্যপি তাহার উদ্ধার করা অতি দুঃসাধ্য তথাপি আমি বহুপরিশ্রমে ক্রমে ক্রমে শব্দ সঙ্কলন করিয়া সেই বিদেশীয় ভাষাস্থলে স্বদেশীয় সাধু ভাষা পুনঃ সংস্থাপন করিবার কারণ এই পারসীক অভিধান সংগ্রহ করিলাম।
— জয়গোপাল তর্কালঙ্কার (১৭৭৫-১৮৪৬)
৪. ...বঙ্গদেশস্থ সমস্ত বাঙ্গালি প্রজা নিতান্ত প্রভুভক্ত, ইহারা নিরন্তর কেবল শ্রীশ্রীমতী রাজ্যেশ্বরীর প্রতুল প্রত্যাশা করে, যাহাতে রাজপুরুষদিগের রাজলক্ষ্মী ভারতবর্ষে চিরস্থায়িনী হয়েন, একাগ্র চিত্তে তাহারি অভিলাষ করে, স্বপ্নেও কখনো অমঙ্গল চিন্তা করে না, কারণ ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের অধীনতায় অধুনা দুর্বল ভীরু বাঙ্গালি ব্যূহ যেরূপ সুখ সচ্ছন্দতা সম্ভোগ পূর্বক সানন্দে বাস করিতেছে, কস্মিন্কালে তদ্রূপ হয় নাই, রামরাজ্য আর কাহাকে বলে? এই রাজ্যইতো রাম রাজ্যের ন্যায় সুখের রাজ্য হইয়াছে, আমরা যথার্থরূপ স্বাধীনতা সহযোগে পদ, মান, বিদ্যা, এবং ধর্ম, কর্মাদি সকল প্রকার সাংসারিক সুখে সুখি হইয়াছি; কোন বিষয়েই ক্লেশের লেশমাত্র জানিতে পারি না, জননীর নিকট পুত্রেরা লালিত ও পালিত হইয়া যদ্রূপ উৎসাহে ও সাহসে অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া অন্তঃকরণকে কৃতার্থ করেন, আমরাও অবিকল সেইরূপে পৃথিবীশ্বরী ইংলণ্ডেশ্বরী জননীর নিকটে পুত্রের ন্যায় প্রতিপালিত হইয়া সর্বমতে চরিতার্থ হইতেছি।
— ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯)
৫. এই দেশ যখন দুরন্ত যবনজাতি দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিল তৎকালে ঐ দুর্বৃত্তজাতির দৌরাত্ম্যে আমাদিগের সুখসম্পত্তির একেবারেই লোপাপত্তি হইয়াছিল। কেহ ইচ্ছানুসারে নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করিতে পারিত না। ...দুশ্চরিত্র যবনজাতির ভয়ে স্ত্রীলোকদিগের প্রকাশ্য স্থানে গমনাগমন ও বিদ্যানুশীলন সম্পূর্ণরূপে স্থগিত হইয়া গেল। সকলেই আপনাপন জাতি প্রাণ কুলশীল লইয়া শশব্যস্ত, স্ত্রীজাতিকে বিদ্যা দান করিবেক কি পুরুষদিগেরও শাস্ত্রালোচনা মাথায় উঠিল। তদবধি স্ত্রীদিগের অন্তঃপুরনিবাস ও বিদ্যাভ্যাস নিরাশ হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে জগদীশ্বরের কৃপায় আমাদিগের আর সে দুরবস্থা নাই, অত্যাচারী রাজা নাই। শুভদিন পাইয়া সকল শুভকর্মেরও অনুষ্ঠান করিতেছি। আমাদিগের লুপ্তপ্রায় অন্যান্য সদ্ব্যবহার সকল পুনরুদ্ধার করিতেছি। অতএব এমত সুখের সময়ে সংসার সুখের নিদানভূত আপন আপন পুত্র কলত্র কন্যাদিগকে কি বিদ্যারসে বঞ্চিত রাখা উচিত?
— মদনমোহন তর্কালঙ্কার (১৮১৭-১৮৫৮)