https://www.facebook.com/share/p/17AeWkLfcX/
নীলাঞ্জন মিশ্র লিখছেন—
বাঁদিকে সয়াবিন আর ডানদিকে তার ছিবড়ে বা বর্জ্য। সয়াবিন থেকে তেল বার করে নেওয়ার পর তার ছিবড়েটাকে কারখানায় প্রসেস করে নানারকম প্রিজার্ভেটিভ দিয়ে বাজারে সেই ছিবড়েকে গরীবের প্রোটিন বলে বিক্রি করা হয়। দেশের অনেক বাপ আছে। তারাই ঠিক করে কে ধনী কে গরীব। কোনটা ধনীর প্রোটিন হবে কোনটা গরীবের। এই সয়াবিন ছিবড়ার প্যাকেটের গায়ে দেখা যায় দেশের বাবাদের নাম বড় বড় অক্ষরে লেখা। তিন দশক আগেও কোনও পরিবার এই ছিবড়া বর্জ্যের কথা জানতো না। এই বর্জ্য বা ছিবড়া ছাড়াই অজস্র পুষ্টিকর খাবার বাংলার গ্রামে গ্রামে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিলো আছে থাকবে। বাংলার পুষ্টির জন্য "পনীর রাজমা চাভোল ছোলে চানা" বা সয়াবিনের নামে সয়াবিনের বর্জ্য বা ছিবড়ার দরকার নেই। বাংলার অজস্র শাক, সবজি, শতাধিক মাছের প্রজাতি, নিজস্ব নানা জাতের মুরগি ও তার ডিম, নানারকম দেশী ফল, নানা জাতের দেশী ডাল, তৈলবীজ, নানাধরণের মিলেট, নানা জাতের অসাধারণ দেশী ধান ছিলো। এখনও আছে তবে অনেকটাই সবুজ বিপ্লবের কুপ্রভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। বাংলাকে, সারা দেশকে তার বিপুল খাদ্যবৈচিত্র্য থেকে বঞ্চিত করেছে মুনাফা ও ইন্ডাস্ট্রিনির্ভর বেসরকারী নানা উদ্যোগ। যেসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কোনওভাবেই মানুষের ভালো করা নয়। মানুষের পুষ্টি বলতে এখানে ভাবা হয় রেশনের চাল, এদিক সেদিক থেকে আনা ডাল, চরম ভেজাল তেলমশলা, আলু, চালানি মাছ আর হরমোন অ্যান্টিবায়োটিক ঠাসা কোম্পানীর গ্যাদগ্যাদে মুরগির মাংস৷ মানুষও সেসব মাথা নীচু করে মেনে নিয়ে পা থেকে মাথা অবধি রোগ ভরে চলেছে হেলেদুলে। নানা জায়গায় টিকি বাঁধা আছে নানা ডাক্তার আর হাসপাতালে আর আছে জীবন যৌবন এক করে রোজগার করা কিছু টাকা। সেই টাকা এহেন জীবনযাত্রার অনিবার্য পরিণতির পায়ে নিবেদিত। এইতো চোস্ত জীবন! এইজন্যেই তো মানুষ হয়ে জন্মানো!
ভাবতে হবে যারা লোহালক্কড় থেকে ডেটা সব বেচে, তারা হঠাৎ খাবার আর ওষুধ কেনাবেচা ধরলো কেন? লোহালক্কড়, ইলেকট্রনিক্স, ডেটা এসবে ব্যবসা হচ্ছিল না? গোটা দেশের নদী সমুদ্র পাহাড় আদিবাসী জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে "সিল্পো" করেও তাদের মুনাফা হচ্ছিল না? হঠাৎ তারা চাল বেচবে, ডাল বেচবে, বিদেশের তেলবীজ কিনে এনে কাউকে না জানিয়ে ভিটামিন ফর্টিফিকেশন করে তেল বেচবে, পামতেল সয়াতেল দিয়ে বিস্কুট আইসক্রিম সহ নানা খাবার বানাবে, সর্ষের তেল বেচবে, আবার নানারকম হাইলি হ্যাজার্ডাস বা ব্যাপক ক্ষতিকর পেস্টিসাইডের ব্যবসাও করবে, দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ও ক্যানসার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকবে আর মানুষ ভাববে কোন জেলা রাজ্য কটা ক্যান্সার হাসপাতাল পেলো, কত দ্রুত সেই হাসপাতালে মর্গে বা শ্মশানে দৌড়ে যেতে পারলো, সেটাকেই উন্নয়ন বলে।
পোল্ট্রিতে কী দুর্গন্ধ। সারাদিন মুরগি ঝিমায়। সেই স্ট্রেসড হরমোন ঠাসা রোগগ্রস্ত মুরগির মাংস আমাদের কাছে কী উপাদেয়! সয়া মূলত হাজার হাজার হেক্টরে চাষ হয় পশুখাদ্য উৎপাদনের জন্য। অবশ্যই কিছুটা তেল মানুষের জন্যও বিক্রি হয়। সেই তেল বার করার পর সয়াবীনের ছিবড়া দিয়ে এই অদ্ভুত বিস্বাদ পাউডার মাখা খাবার তৈরী হয়। দেশে গরীব থাক। গরীবরা সয়াবিনের ছিবড়ে খাক। দেশের ফসল ও ফসল বৈচিত্র্য চুলায় যাক। মাইলের পর মাইল এক ফসল চাষ হোক। সেই চাষ টিকিয়ে রাখতে গ্যালন গ্যালন মাটির তলার সুপেয় জল তোলা হোক। টন টন কীটনাশক দেওয়া হোক। কিছু বললেই বলবে এত লোকসংখ্যা খাওয়াবো কীকরে? সেই এক পুরানো ঢপের যুক্তি। এদিকে দেশের সরকারী খাদ্যভান্ডার থেকে ১৮-২০ লক্ষ মেট্রিক টন চাল গম পচে যাবে। প্রচুর সবজি নষ্ট হবে। ১.৫৫ লক্ষ কোটি টাকার খাবার এক বছরে নষ্ট হবে অথচ ৪০% এরো বেশি মানুষ দেশে দুবেলা পেট ভরে খেতে পাবেনা। দেশ hunger index-এ ১০২, food security তে ৬৬-৬৮ র্যাংক করবে!
সাধারণ মানুষও কোনও খোঁজ না নিয়ে লেখাপড়া না করে এসব যুক্তি মেনে নেবে। নিজেদের টাকায় কেনা খাবারের প্যাকেট পড়ে দেখবে না। পালিশমারা চাল ডাল, ইচ্ছেমতো বানানো আজেবাজে ভেজাল ভরা তেল, দুর্গন্ধ পোল্ট্রির হরমোন ঠাসা ডিম মাংস, চালানি মাছ এসব খেয়ে ঢেঁকুর তুলে পোগোতির পথে এগিয়ে যাবে। দেশের ধান মিলেট যব, নানা জাতের ডাল, তৈলবীজ সহ যাবতীয় বৈচিত্র্য ধ্বংস করে একইধরণের কিছু প্রোডাক্ট, যা সব খেতে বিস্বাদ বা স্বাদহীন, সেইসব যেমন প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরা পনীর, বাজারি বাঁজা বীজে তৈরী প্রিম্যাচিওর ধান ডাল তেল এসব খাইয়ে মানুষের মা বাপ হয়ে থাকা যাবে। কে অত তলিয়ে খোঁজ নেবে যেখানে চাষ হচ্ছে সেখানকার মানুষ জল মাটি বাতাস জীববৈচিত্র্যের কী অবস্থা?
একটাই জীবন, মাথা নীচু করে সব মেনে নিয়ে, গলায় মোটা বেল্ট বেঁধে সকাল থেকে রাত দু চার মুঠো ওষুধ, ইঞ্জেকশন নিয়ে কোনওক্রমে কাটিয়ে একদিন টেঁসে গেলেই তো হলো। এত জীবনজ্বালার চেয়ে প্রসেসড ফুড খেয়ে যত দ্রুত টাঁসা যায় ততই মঙ্গল।
এই পানীর রাজমা ছোলে চাভোল সয়াবিনছিবড়ের জীবন কি অত সহজ নাকি!!!