//১ দর্শনে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ!
হেগেল আর ফয়েরবাখ, ইউনিটি অফ অপোজিট, নেগেশন অফ নেগেশন--খালি শব্দগুলো জানি।//
রঞ্জন স্যার, দেখুন, হেগেল সম্পর্কে বাট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, "সহজ ভাষায় ফিলোসফিকে ব্যাখ্যা করা কেন ওনাকে কেউ শেখাতে পারেননি?" খুব সত্যি কথা। হেগেল বোঝা অতি দুঃসাধ্য। এবার মোটমাট কথা হলো জার্মানির ক্ষতবিক্ষত অবস্থা ও গঠনগত পরিবর্তন আনতে না পারা ফলে ইন্টেলিজেন্সিয়ার পতন ওনাকে ব্যথিত করেছিলো। তাই একটা ষ্ট্রং সেন্ট্রালাইজেশনের দিকে ওনার মন এগিয়ে চলেছিলো। এবার হেগেলের মূল বক্তব্য বা ডায়ালেক্টিকাল মেথড মার্কস গ্রহণ করেন। কিন্তু অপরদিকে মেটেরিয়ালিজম ওনার নিজস্ব তত্ত্ব। এখানে বক্তব্য হচ্ছে প্রতিটি বস্তুর মধ্যে দুটি বিপরীত সত্ত্বা কাজ করছে। সেই দুটি অপোজিশন যখন একত্রে আসে তার পরিণতি ঘটে উত্তরণের দিকে। এটা পরে জোসেফ ষ্টালিন বলেছিলেন রুশ বিপ্লবের ব্যাখ্যায়। যে যা যা জায়মানভাবে বেড়ে চলেছে, তা বৈপরীত্যকামী ক্ষয়িষ্ণুতার সঙ্গে সংঘর্ষে আসতে বাধ্য ও দুটির সংঘাত ঘটবে। তখন রাশিয়ায় ও সমগ্র ইউরোপে বেড়ে চলেছিলো শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা, অসন্তুোষ ও জীবনযাপনের অবনমন। তাই ক্রমবর্ধমান শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থের সংঘাত দেখা যায়। নারদনিয়া ভলিয়্যা কিন্তু ব্যর্থ হয়। এর মানে এই নয় যে যারা সবচেয়ে গরীব তারাই বিপ্লবে জয়যুক্ত হবে। তাহলে তো ভিখারী বা ভবঘুরেরা আগে হওয়ার কথা। বৈপরীত্যযুক্ত ক্রমঅগ্রসর শ্রেণী এটা করে।
হেগেলের তত্ত্বের মূল ধারণার একটা স্তম্ভ এই নেগেশন অফ নেগেশন। যেটিকে মার্কস তত্ত্বের ধারণায় ব্যবহার করেন। খুব সোজা কথায় একটা গাছের বীজ হতে পারে (থিসিস), বীজ অঙ্কুরিত হয়ে গাছ জন্মালো ও ফুল ফল ধরলো (অ্যান্টিথিসিস) ফল বিদীর্ণ হয়ে আবারনতুন বীজ পাওয়া গেলো (সিন্থেসিস) শ্রমের মূল্য থেকেই বর্তমান ক্যাপিটালিষ্ট সভ্যতার উন্নতি, কিন্তু সেখানে শ্রমিকের মূল্যহীনতা ও শোষণ অ্যান্টিথিসিস। যখন নতুন সমাজকাঠামোয় শ্রমিক তার যোগ্য মূল্য ও সম্মান পাবে সেটা হবে সিন্থেসিস। নেগেশন ইন নেগেশন খুব সহজ কথায় বলা যায়, অ্যালজেব্রায় (-) × (-) = (+) অথবা
কাল আমার কলেজ যাওয়া হবে না। (আমি কলেজ যাবো না)
কাল আমার কলেজ না যাওয়াটা হবে না। (অবশ্যই আমাকে কলেজ যেতে হবে)
এখন হেগেলের চিন্তাধারার দুটি বিভাজন আছে, কনজারভেটিভ হেগেলিয়ান যথা ফয়েরবাখ ও র্যাডিকাল হেগেলিয়ান যথা মার্কস। ফয়েরবাখের বক্তব্য হিউম্যানিষ্ট, ইকোনমিস্ট ততোটা নয়। ধরুন 'এলিয়েনেশন' ব্যাপারটা। ফয়েরবাখ বলছেন যে যখন একটা মানুষ তার বাস্তব চাহিদা (অর্থনৈতিক, সামাজিক এগুলির ) পরিতৃপ্তি না পায়, সে নিজেকে বিছিন্ন করে ও কাল্পনিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। এটি নিজের কাছ থেকে পালানোর পন্থা। মার্কসের ধর্ম ও ঈশ্বর বিষয়ে ধারণা সুবিশাল, সে আলোচনার সবটা আমার জানা নেই এখানে করছিও না। তবে একটা কথা বলবো, বাঙালিরা যে 'রিলিজীয়ন হচ্ছে অপিয়াম" বলে ছেড়ে দেয়, কথাটি কিন্তু ওইটুকু নয়।
" Religion is the sigh of oppressed creatures, heart of the heartless condition, soul of the soulless condition and opium of the masses."
আফিম তো নেশাদ্রব্য কেবল না। ব্যথা সারানোর ওষুধও বটে। ধরে নিন, এক কৃষকের স্ত্রীকে এলাকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দাদারা তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করলো। পুলিশ অভিযোগ নিলো না। বললো, "প্রমাণ কী?"
-- আমার ভাই নিজের চোখে দেখেছে।"
তারা খিক করে হেসে বললো, "যদি বলি পয়সা দিয়েই করছিলাম? তোর ভাই দেখে ফেলায় বউ লজ্জা বাঁচাতে মিথ্যে বলেছে?"
সে জানে কেউ নেই। কাউকে বলার নেই। পরিশ্রান্তদেহে একটু চৌধুরীবাড়ির কৃষ্ণমন্ডপে যাওয়া যাক। সব পাপ আর যন্ত্রণার বাইরে মনটা ঠাকুরের নাম শুনে শান্ত হবে। সেটাই কিন্তু আফিমের তাপহরণ গুণ। আর 'পুতুলনাচের ইতিকথায়' তো যাদব পন্ডিত ও ওনার স্ত্রীর আফিম খেয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুর কেসটা শশী ডাক্তার বলেই বুঝতে পেরেছিলো। কিন্তু সিঁদুর মালা ঢাকঢোলের আফিমসম হট্টগোলের মধ্যে একা সে কিছুই করতে পারেনি। মানিকবাবু সত্যি আফিম আর ধর্মের আফিম মিলিয়েছেন এইভাবেই না?