
পোয়েটস কর্ণারটা একটু অন্যরকমের। এখানেও কবি ও কবিতা নিয়ে আলোচনা হত। তবে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হত অংশগ্রহণকারী কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের উপর। এরকম আসরে আমি প্রায়ই যেতাম এবং মাঝে মাঝে অংশ নিতাম। নিজের কবিতা পড়তাম। একবার এমনই এক আসরে গিয়ে একটা নতুন কিছু পেলাম যা আমাকে চমক দিয়েছিল। এখানে কয়েকজন তরুণ তরুণী কবির সঙ্গে আলাপ হল। তাদের এক অভিনব কর্মকান্ড দেখে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। ... ...

বন্ধু ভাস্কর দত্ত আনন্দবাজার পত্রিকার বাদল বোসের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। একদিন এক আড্ডায় বাদল বোস আমাকে বলল কলকাতার পাব্লিশার্স গিল্ড লন্ডনে বই মেলার আয়োজন করছে। আমি যদি ওদের বইগুলো আমার বাড়িতে রাখতে দিই তাহলে ওদের খুব উপকার হয়। আমি সানন্দে রাজী হলাম। যথাসময়ে বেশ কয়েক বাক্স বই আমার বাড়িতে এসে হাজির। এর কিছুদিন বাদে কলকাতা থেকে গিল্ডদের পক্ষ থেকে অনিল আচার্য্য ও শ্রীবিন্দু এলো লন্ডনে। ক্যামডেন টাউন হলে পূজা মণ্ডপে বই সাজানো হল। আমি ও অনু প্রতিদিন সব বইয়ের বাক্স আর অনিল ও শ্রীবিন্দুকে নিয়ে গাড়ী করে ক্যামডেন টাউন হলে যেতাম। গাড়ী থেকে বাক্স বাক্স বই নিয়ে টেবিলে সাজানো সবই আমাদের নিজে হাতে করতে হত। লন্ডনে কুলি মজুর বা কোন সাহায্যের লোক পাওয়া যেত না। তারপর টেবিলে বসতাম ও বই বিক্রি করতাম। ... ...

ভারতের প্রথম বেতার সম্প্রচার শুরু হয়েছিল কলকাতা থেকে, এবং এই অসামান্য কাজটি করেছিলেন শিশিরকুমার মিত্র। ১৯২৬ এর ২৬ আগস্ট। এই আগস্ট মাসে কার্যত ভারতে বেতার সম্প্রচারের একশো বছর। কিন্তু কোথাও কোনও হেলদোল নেই। কলকাতার পর বেসরকারি উদ্যোগে বোম্বাই, কলকাতা ও মাদ্রাজে রেডিও ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৭ সালে 'ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (IBC)' বোম্বে স্টেশন থেকে বেতার সম্প্রচারের শুরু করে। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার দেখলেন এত শক্তিশালী মাধ্যম। দখল নিলেন বেতার সম্প্রচারের। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হল সরকারের প্রতিষ্ঠান। ১৯৩৬এ নাম পরিবর্তন করে 'অল ইন্ডিয়া রেডিও'। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর নাম দেন আকাশবাণী। ... ...

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ওপাশের ফিরতি পথের জিপ থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে, কিছু দেখতে পেলেন ভাই? আমার ভ্রাতুষ্পুত্রের চটজলদি জবাব শুনে চমকে যাই - হ্যাঁ হ্যাঁ গাছে গাছে বুনো পিঁপড়ে দেখলাম প্রচুর। দুই জিপেই হাসির রোল ওঠে। হাসির রেশ শেষ হবার আগেই উল্টোমুখে চলতি জিপ দুটি পরস্পরের থেকে অদৃশ্য হয়। মনে ভাবি পুরোটাতো রসিকতা নয়। জঙ্গলকে বুঝতে হলে শুধু বড় বড় জন্তুজানোয়ার দেখাটাই সব নয়। বড় গাছ, ছোট গাছ, ঝোপঝাড়, লতাপাতা, কীটপতঙ্গ, পশুপাখি সবাইকে নিয়ে পুরো সংসারটাকেই অনুভব করতে হবে। ... ...

একটা বিরাট পাখি, উচ্ছে বলে, অসুখ করে একা-একা শুয়ে আছে বিন্ধ্য পাহাড়ে, কিন্তু সেখানে সে এল কোথা থেকে? রাবণকে চেনে এমন একটা পাখি, সীতাকে চুরি করে রাবণের আকাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া দেখেওছে, তার বাড়ি কীভাবে যেতে হবে তা-ও জানে, এত কিছুর পেছনে একটা গল্প নেই? ... ...

সেটা বোধ হয় ১৯৮৭ সাল। দু একটা ছোটখাট কাজ পাচ্ছি। অনেকে আশ্বাস দিল তাদের নতুন প্রোজেক্ট শুরু হবে, তার কিছু কাজ আমাকে দেবে। আমি আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। এমন সময় হঠাৎ পৃথিবীর অর্থনৈতিক বাজারে কালোমেঘ দেখা দিল। ১৯৮৮ সালে আমেরিকার স্টক মার্কেট ক্র্যাশ করল। আর তার জের সুনামির মত ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে ছড়িয়ে পড়ল। সব কোম্পানির অবস্থা খারাপ। আমাকে যারা কথা দিয়েছিল তাদের নতুন প্রজেক্টের কাজ আমাকে দেবে তারা সব পেছিয়ে পড়ল; বলল, আপাতত সে সব প্রোজেক্ট স্থগিত, ফ্রিজে রেখেছে সেগুলো সকলে। ... ...

আজ রিমিনিতে যেখানে উত্তর-দক্ষিণ পথ (কারদো) আর পূর্ব-পশ্চিম পথ (দেকামেনুস) এসে মিলেছে, সেখানে ছিল আরিমিনুম শহরের রোমান ফোরাম। রুবিকন পেরিয়ে সিজার তাঁর ফৌজ সহ ঘণ্টা দেড়েক বাদে সেইখানে পৌঁছুলেন। তিনি জানতেন রোমের আইন তিনি একা ভাঙেননি, তাঁর সঙ্গে ছ-হাজার লিজিওনেয়ার রোমের চোখে সেই একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবে। রোমের শপথ নিয়ে তাঁরা সৈন্য বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, এবার সিজারের সাথি হয়ে রোমের বিরুদ্ধেই বিশ্বাসঘাতকতা করবেন (আমাদের আজাদ হিন্দ ফৌজের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল)। সেদিন আরিমিনুম ফোরামে পৌঁছে একটি প্রস্তরখণ্ডের ওপরে দাঁড়িয়ে তাঁর লিজিয়নকে সম্বোধিত করে বলেছিলেন, আমাদের অভিযান রোমের পানে, গৃহ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী কিন্তু আমরা বিজয়ী হবো। ... ...

যেদিন মমতার ঘরে ঢোকার কথা সেদিন দুপুরে মধ্যদিনের আহার শেষ করে উপরের ঘরে আমি নিদ্রাছন্ন। হঠাৎ নীচের থেকে শোরগোল ও চিৎকারের শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মমতা চীৎকার করে বলছে “মিস্টার বিশ্বাস, কাম ডাউন কুইকলি।” আমি তাড়াতাড়ি নিচে গিয়ে দেখি, ছোটন, খোকনের ছেলে, সেই ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইল ক্যামেরাতে ওদের ছবি তুলছে। আমি যেতে মমতা আমাকে উত্তেজিত ভাবে অভিযোগ করল। বলল, “ দেখুন, এই ছেলেটি আমাদের ঘরে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে। বলছে এ বাড়িতে মামলা চলছে। তোমরা এ ঘরে ঢুকতে পারবে না। ... ...

হঠাৎ একদিন কিছু বদলাতে শুরু করল। ১৯৭৯ সালে জুলিয়ানো গ্রামের কিছু উদ্যোগী মানুষ একটি মেলার আয়োজন করলেন। কোনও খোলা মাঠে নয়, সেটি বসবে এই গ্রামের গলিতে, বাসিন্দারা তাঁদের ঘরের দুয়োর খুলে দেবেন। ভালোবাসা এবং সাদর অভ্যর্থনা ছাড়া দেওয়ার কিছু নেই, তবে হাতে হাতে বানাবেন পাস্তা, পিৎজা, গ্লাসে ভরে দেবেন কিয়ান্তি। একেই আজকাল স্ট্রিটফেয়ার বলে। রিমিনির সভ্য মানুষজন সেতু পেরিয়ে এই অবধি আসতে কুণ্ঠিত হয়েছিলেন; দিনে ডাকাতি না হোক পকেটমারের অভাব কি! সব দুশ্চিন্তা কাটিয়ে আগস্ট মাসের এক উজ্জ্বল দিনে দেখা গেল সান জুলিয়ানোর অলিতে গলিতে সুখী জনতার ভিড়, শিশুদের কলরব। গ্রামের লোকেরা যে যেখানে পেরেছেন দুটো চেয়ার পেতে দশজন মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যদি হও সুজন তেঁতুল পাতায় কত জন! ... ...

অর্জুন বিশ্বস্ত, অনুগত ও করিৎকর্মা ছেলে। অনেক বছর ধরেই কলকাতায় ও-ই আমার সব কাজকর্ম করে দেয়। অর্জুনকে বলে দিয়েছিলাম ও যেন গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে। গাড়ি নিয়ে সল্টলেকের বাড়ির সামনে নেমে অবাক হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। ঠিক দেখছি তো? অর্জুন আমাদের ভুল ঠিকানায় নিয়ে আসেনি তো? সল্টলেকের বাড়িটা চারিদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, গ্যারেজের দিকে একটা বড় লোহার গেট, সেই গেট পেরিয়ে সদর দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকতে হয়। দেখি সেই গেটে একটা ভারী তালা ঝুলছে। দিনক্ষণ জানিয়ে খোকনকে একটা মেল করে দিয়েছিলাম। সুতরাং খোকন জানত আমরা আসছি। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে ওকে ডাকলাম, কোনও সাড়া নেই। দেশের টেলিফোন আমার নেই। অর্জুনের ফোন নিয়ে আমার বোন খুকু ও জামাই দিলীপকে ফোন করলাম, বললাম, “মেজদাকে বল দাদারা নিচে অপেক্ষা করছে। দরজা খুলে দিতে।” কিছুক্ষণ পরে দিলীপ ফোন করে বলল, ‘মেজদা বলছে, দরজা খুলবে না।‘ আমি হতভম্ব। খুকু বিচলিত। খুকু দিল্লিতে হাঁদিকে ফোন করল। হাঁদির কথাও শুনল না খোকন। ... ...

মুড়কি দিদির পড়ার টেবিলে সেদিন দুখানা মোটা মোটা বই দেখল উচ্ছে। মুড়কি দিদি ঘরে ছিল না, বই দুটো সে উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করে। এখন সে বানান না-করেও বাংলা পড়তে শিখেছে, দেখল একটা বইয়ের নাম কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্যটা বাল্মিকী রামায়ণ। বাল্মিকী রামায়ণে লেখা আছে সারানুবাদ রাজশেখর বসু। কথাটার মানে বুঝতে পারল না উচ্ছে। তা ছাড়া, বইটা এমনিতেও বিচ্ছিরি, একটাও ছবি নেই! এবার কৃত্তিবাসী রামায়ণটা খোলে সে, খুলতেই পাতার পর পাতা রংচঙে ছবি। রামায়ণের গল্প সে জানে, মা'র কাছে শুনেছে। পাতা উলটিয়ে ছবিগুলো যখন দেখছে সে, হঠাৎ দেখল, কখন যেন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে তার পিছনে দাঁড়িয়েছে মুড়কি দিদি। ... ...

নগাধিপতি হিমালয়। তার পাদদেশে ডুয়ার্সের প্রকৃতি যে এত সুন্দর, যে চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয়না। ঢেউ খেলানো জমিতে চা বাগান, মধ্যে মধ্যে কাঁচা মাটির পথ, ছোট ছোট গ্রাম, আর তরাইয়ের জঙ্গল। নীল আকাশ ঝুঁকে পড়ে সবুজ চা বাগানের সঙ্গে কত কী কথা বলে। হাওয়ায় কান পাতলে শোনা যায়। কলেজ থেকে যতবার এদিকে ফিল্ড সার্ভেতে এসেছি, জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে, আকাশ সবসময় মেঘে ঢাকা পেয়েছি। লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ গেলাম দুবার। চারিপাশ শুধু সাদা, হিমালয়ের শ্রেণী দেখা তো দূর, নিজেকে দেখা দায়। সেবার পেলিং গিয়েও একই দশা। পর্বত দুহিতা উমা তো আমাদের ঘরের মেয়ে, আবার মাও বটে। তাই গিরিরাজ আমার একরকম অভিভাবকই হলেন। ... ...

সেই খোকন, আমি দানপত্রে সই করার কিছুদিন পর থেকে আমার সঙ্গে ওর আচার ব্যবহার, কথাবার্তার রূপ বদলে গেল। ও আমার সমকক্ষ, আমার মত ও-ও এ বাড়ির মালিক। এ বাড়িতে কিছু করতে চাইলে ওর সম্মতি নিতে হবে, তা সে নতুন ইলেকট্রিক লাইন হোক বা এয়ারকন্ডিশন মেশিন বসানো হোক। আমি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। এ কি হল? আমি আর এ বাড়ির একক মালিক নই? ... ...

ইতিমধ্যে আমি ইংল্যান্ডে এসেছি, সল্টলেকের কথা ভুলে গেছি। একদিন হঠাৎ খোকনের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। সরকার জানিয়েছে সল্টলেকে আমি জমি পেয়েছি। আমি ও খোকন একইসময়ে একইসঙ্গে আবেদন পত্র পাঠিয়েছিলাম এবং আমাদের দু’জনেরই আবেদন সফল হয়েছিল। আমরা দুজনেই জমি পেয়েছিলাম। আমি যথাসময়ে নির্ধারিত টাকা জমা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে নিলাম। এ ব্যাপারে খোকন আর অন্যান্য ভাইরা এবং মা যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। সল্টলেকে বাড়ি করার উদ্যোগ ও উৎসাহ সব চেয়ে বেশি মা-র। একবার বাড়ি হারানোর পর আবার যে কোনোদিন নিজের বাড়ি হবে তা বোধহয় মা কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি। ... ...

যাত্রার উদ্দেশ্য যাই হয়ে থাক না কেন, রিমিনি শুধু সান মারিনো পৌঁছানোর পথের হাওড়া স্টেশন নয়। তার ইতিহাস দু হাজার বছরের বেশি পুরনো, আদ্রিয়াতিকের কূলে রোমান সাম্রাজ্যের বাণিজ্য বন্দর। সাম্রাজ্যের উত্তরাপথ মিশে যায় দক্ষিণাপথের সঙ্গে। সেই সম্মানে তৈরি হয়েছিল সম্রাট আগাস্টাসের তোরণ, সেখান থেকে শহরের মাখখান দিয়ে চলে যায় করসো দা’ গুসটো, শেষ হয় টিবেরিয়াসের পাঁচ খিলানের সেতু পেরিয়ে। ... ...

ট্যুরিস্ট লজ থেকে পাকা সড়ক ধরে গাড়ি চলল মূর্তি নদীর দিকে মুখ করে। পুব থেকে পশ্চিম অভিমুখে চলেছি তাই ডানহাতে হিমালয়ের বরফ ঢাকা শ্রেণীও রয়েছে সঙ্গে। কিন্তু বেশি দূর নয় বড় জোর দু তিন কিলোমিটার পরেই আমাদের গাড়ি কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়ল। দুপাশে গাছের সারি। জিজ্ঞাসা করে জানলাম আমরা খয়েরবাড়ি জঙ্গলে ঢুকে পড়েছি। ... ...

ইরান এখন অপেক্ষাকৃত শান্ত। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আস্তে আস্তে ফিরে আসছে। ইউনিভার্সিটি এখনো বন্ধ। ঠিক করলাম এই সুযোগে সকলে মিলে ইরান ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। দিলীপ দামলে একা থাকে। আমরা যাচ্ছি শুনে ও আমাদের সঙ্গী হল। আমি, অনু, বুবাই, গৌতম ও দিলীপ, আমরা পাঁচজন বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য – ইরানের কয়েকটা শহর দেখা। আকাশপথে যাত্রা নয়। মাটির সঙ্গে মিতালি করে মরুভূমির পথ ধরে চলা। আমরা কোচে করে মরুভূমির মধ্য দিয়ে ইরান ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথম গন্তব্য শিরাজ। আবাদান থেকে কোচ ছাড়ল সূর্য ডুবে যাওয়ার পর। যেতে যেতে অন্ধকার নেমে এলো। মরুভূমির রাস্তা দিয়ে ঘন কালো অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আমাদের কোচ ছুটে চলেছে। চারিদিকে নিকষ কালোর আবরণ। হঠাৎ দূরে কখনো কখনো দেখা যায় দুচারটা টিম টিমে আলোর আভাষ; বোধ হয় কোনো বেদুইনদের তাঁবু। আর মাঝে মাঝে দেখা যায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ভেদ করে লেলিহান অগ্নিশিখা গগন স্পর্শ করছে। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চারিভিতে আলোর রোশনাই। সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। আশ্চর্য, মরুভূমিতে এমন অগ্নিযজ্ঞ কেন? ... ...

আগে গ্রামে চারটে কাগজ আসতো। যুগান্তর দুটো। আনন্দবাজার একটা। সত্যযুগ একটা। সান্ধ্য গণশক্তি আসতো গোপীনাথপুরে বাদশা চাচার বাড়ি হয়ে আমাদের বাড়ি। আর চলতো পাঁচটি সাপ্তাহিক দেশহিতৈষী কাগজ। এই কাগজ আমার খুব উপকার করে। সারা সপ্তাহের খবর এক জায়গায় থাকতো। দেশ রাজ্য এবং আন্তর্জাতিক একটা আলাদা পাতা। স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী সুধাংশু দাশগুপ্ত ছিলেন সম্পাদক। ১৯৮৯ থেকে আমি তাঁর স্নেহ পেয়েছি। অল্প বয়সেই আমাকে দিয়ে বেশ কিছু লেখা তিনি ও হাওড়ার অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিয়েছেন। আগে সব মিলিয়ে দশ। ওভারল্যান্ড একাই হলো এবার ১০টা। যে বাড়িতে কোনওদিন কাগজ ঢুকতো না, সেখানে পড়ার পাতার জন্য কাগজ ঢুকে গেল। মাসে নয় টাকা। ... ...

কয়েক মাসের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া উত্তাল হয়ে উঠল। ক্রমশঃ জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষের সংখ্যা বাড়তে থাকল। বড় বড় শহরগুলোতে শান্তি রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। দোকানে বাজারে সিনেমায় আগুন জ্বলল। রাস্তায় গলিতে এখানে সেখানে মৃতদেহ দেখা যেতে লাগল। সাধারণ নাগরিক আর স্বাধীন ভাবে চলা ফেরা করা নিরাপদ মনে করল না। আস্তে আস্তে সব যানবাহন বন্ধ হয়ে গেল। গুজব ছড়াল এয়ারপোর্টও বন্ধ হয়ে যাবে শীঘ্রই। তবুও তখনো দেয়াল ঘেরা আবাদানে তেমন কিছু অশান্তির আঁচ পড়েনি। ... ...

চার দশক আগে প্রথমবার বার্সেলোনা আসি তার সত্তর কিলোমিটার উত্তরে কাতালুনিয়ার বিচ রিসর্ট ইওরেত দে মার হতে। ইংল্যান্ডে বুক করা স্প্যানিশ প্যাকেজ হলিডে - আহা কি দিন ছিলো, আমাদের টাকায় আসা যাওয়া দু সপ্তাহ থাকা খাওয়া সহ খরচ মাথা পিছু পাঁচ হাজার টাকা, তার সঙ্গে কিছু বাড়তি ব্যয়ে সাইট সিইং - যেমন বার্সেলোনার বাস ট্রিপ, সে অনেক রুক্ষ পাহাড় পেরিয়ে। ... ...