
চাকুরীর সন্ধানে আসানসোলে গিয়েছিলাম। তখন আলাপ হল। এই পাঁচ বছরে সম্বন্ধটা আরো গভীর হয়েছে, সহজ হয়েছে। অনেকদিন থেকে ভেবেছি ওর কথা লিখে রাখবো। কেননা আমার জীবনের অনেকখানি, বিশেষ করে চরমতম ট্রাজেডি ও হতাশার সেই দিনগুলোতে ও আমাকে জুগিয়েছে অনেক কিছু --- সাহসের মতো দুর্লভ কিছু, সাহচর্যের মতো ভরাট কিছু এবং অত্যন্ত স্থুল কিন্তু সেকালে নিতান্ত প্রয়োজনীয় যা সেই-- অভাবে অর্থ সাহায্য। লিখবো লিখবো করেও লেখা হয়নি। প্রত্যেকবার ভেবেছি ধীরে সুস্থে, প্রচুর সময় নিয়ে খুঁটিনাটি সবকিছু লিখে রাখবো। শুধু ঘটনা নয় আমার মানসিক চিন্তার সব আলোড়ন, স্থিতি এবং টানাপড়েন। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি। যেহেতু সেই সুস্থতা ও সময় কখনো পাইনি। আজও লেখা হবে না সবটুকু। তবু সূচনাটুকু লিখে রাখি, কি জানি আর যদি কখনো সময় না পাই, তবে হয়তো লেখাই হবে না কোনদিন। অন্তত এই মুখবন্ধ টুকুই আমাদের পরিচয়ের অভিজ্ঞান হয়ে থাকবে, ভবিষ্যতে যদি কখনো লেখা নাই হয় আর। ... ...

মানুষ গায়ের জোরে কেড়ে নেয়। গোরু মোষ ছাগল ভেড়ার দুধ লুঠ করে নেয়। ক্ষমতার জোরে। সামান্য খাবার দিয়ে। প্রাণীরা তাঁদের সন্তানের জন্য এসব রাখতে চান। আমি তো দেখেছি, বাছুরকে বেঁধে রেখে পিতলের বালতিতে দুধ দুয়ে নিতে। এই দুধ হতো গরম ফেনাময়। মুরগি হাঁস তেমন ডিম পেড়ে তা দিত, যাতে বাচ্চা জন্মায়। ... ...

মাদারিহাটে দিন তিনেক চলল সার্ভের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস মেনে ছাত্রছাত্রীরা দুরকম সার্ভেই শেখে - অর্থাৎ একদিকে যন্ত্র সহযোগে প্রাকৃতিক পরিবেশের জরিপ, আর অন্যদিকে কোন গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে নানা বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব। সাংবাদিকেরা কারোর জীবন সম্পর্কে জানতে হলে টেপ রেকর্ডার অন করে মানুষের সঙ্গে গল্প করেন - আর সেই গল্প থেকেই উঠে আসে প্রয়োজনীয় তথ্য। ... ...

আরেকজন মাস্টারমশাই ছিলেন লক্ষ্মীবাবু। তখন তাঁকে তাঁর গ্রামের নাম ধরে বলা হতো। মাস্টারমশাইদের নাম ধরে বলা আমাদের গ্রামের সংস্কৃতি ছিল না। শম্ভুনাথ থান্দার কাষ্ঠকুড়ুম্বার মাস্টারমশাই। আমাদের গ্রাম থেকে বহু দূরে। মনে মনে কতবার যে ওই গ্রামে গিয়েছি। মাস্টারমশাইয়ের ছায়াসঙ্গী ছিলাম। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় স্যারের বিয়ে হয়। আমাদের গ্রামেই। মনে মনে আশা ছিল, আমাকে অন্তত নেমন্তন্ন করবেন। সঙ্গত কারণেই করতে পারেননি। করলে সব ছেলে মেয়েকেই করতে হতো। কিন্তু আমার এই দুঃখ বহুদিন ছিল। ... ...

শীত এলেই এই শহরে পিকনিকের ধুম পড়ে যায়। অবশ্য শীত কালটা হয়ও খুব সুন্দর। কনকনে ঠান্ডা রাত্রি, ঝলমলে রোদের দিন, ঝকঝকে নীল আকাশে ভাসে দূর পাহাড়ের বরফ চূড়া। আগে তো শীতের শুরুতেই হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়ে, রেজাল্ট বেরোতো ক্রিসমাসের ছুটির আগে। ছুটিটা তাই মজায় ভরা থাকত, এমনিতে ক্যাম্পাসে একটু সাহেবিয়ানা বেশী বেশী, লোকে হরদম বিদেশ যাচ্ছে পড়তে বা পড়াতে, বিদেশী ছাত্রছাত্রীও আছে বেশ কিছু, তাই ক্রিসমাসের শুরুতেই সেজে ওঠে ঘর বাড়ি রাস্তা। এর ওপরে আবার এই শহর জুড়ে আছে বেশ কয়েকটা পুরনো নামী চার্চ। ঝিমলিদের স্কুলের চ্যাপেলও সেজে ওঠে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই, সাজানোর কাজে সিস্টারদের সাহায্য করে ছাত্রীরা যারা আর্টস আর ক্রাফটে ভালো, অনুর মত। আর অনু যেখানে সেখানে ঝিমলি থাকবেই। প্রতি বছরই ওরা খুব ভালোবেসে টাইনি টটের সিস্টাররা যারা এর দায়িত্বে থাকে তাদের সঙ্গে হাত মেলায়। ক্লাস টেনের পর থেকে তো ওদের পরীক্ষার সময়গুলো সব উল্টোপালটা হয়ে গেছে, এসময় ওদের ছুটি, আর ছুটির পরে প্রিবোর্ড, তাই এই দু বছর আর ওরা ক্রিসমাস ডেকরেশনে নেই, এমনকী ছুটি পড়ার দিনের সকালে যে প্রোগ্রামটা হয় প্রতি বছর সেটাও বোধহয় আর এ জন্মে দেখা হবেনা। গত বছর থেকে ওদের ক্লাসের সরিতা আর সান্টা সাজেনা, শুনছিল, ছোটরা নাকি সান্টার বদলটা ঠিকমত বুঝতে না পেরে, জিজ্ঞেস করেছে, “সান্টা দিদি, তুমি এত রোগা হয়ে গেছ কেন?” ... ...

মুসলিম এলাকাগুলোতেও তবলিগ জামায়াতের শুক্রবার শুক্রবার ঘোরা শুরু হল। দ্বীনের পথে আসুন। মসজিদে শুক্রবার অন্তত চলুন। জুম্মার নামাজ পড়তে। তাঁদের সঙ্গে বাইরে থেকে আসা নানা উচ্চবর্গের লোকজনদের দেখা যেতে লাগল। চল্লিশ দিন জামাতের সঙ্গে নিজের পয়সায় ঘোরাকে চিল্লা বলা হতো। তাতে কিছু সংখ্যা যোগ হল। এই দুটো বিষয় নিয়েই না ছাত্র সংগঠনে না পার্টিতে কোনও হেলদোল দেখা গেল! দুর্গাপূজার সংখ্যা ও চাকচিক্য বাড়ল। চন্দননগরের শ্রীধরের আলোর সুনাম ছড়াচ্ছে। সেই মতো চমকানো আলো এবং প্যান্ডেল হলে ভিড় বাড়ছে। পুরাতন দেবী শীতলা ওলাইচণ্ডী দেবী ওলাবিবিরা পিছু হঠতে লাগলেন। ... ...

ইতালিয়ান বৈজ্ঞানিক আসকানিনো সবরেরো নাইট্রো গ্লিসারিন নামক বিস্ফোরক পদার্থের বিধ্বংসী শক্তির বিষয়ে অবগত ছিলেন কিন্তু একে পোষ মানিয়ে সঠিক ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে পারেননি। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং ততজনিত প্রাণহানির পরে আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল সেটিকে নিরাপদ প্রতিপন্ন করে তাকে সেটি বাক্স বন্দি ও দেশে দেশে রপ্তানি দ্বারা প্রভূত অর্থ উপার্জন করলেন – এর নাম ডিনামাইট। শেষ বয়েসে তিনি একদিন খবরের কাগজে পড়লেন কে বা কারা তাঁকে ‘মৃত্যুর ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়েছে। নোবেল স্থির করলেন তাঁর অর্জিত বেশির ভাগ ধন সম্পত্তি (সাত মিলিয়ন ডলার,আজকের হিসেবে অনেক বিলিয়ন) তিনি তুলে দেবেন সুইডিশ নোবেল ইনসটিটিউটের হাতে। এই অর্থের সুদ হতে ইনসটিটিউট প্রতি বছর পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সফল মানুষদের সম্মানে দান করবেন চারটি পুরষ্কার, তার চয়ন ও প্রদানের দায়িত্ব নেবে সুইডিশ নোবেল সংস্থা। কিন্তু এই সঙ্গে তিনি আরেকটি ক্লজ জুড়ে দিলেন- বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ করার এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তুলে শান্তিকে নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেছেন এমন মানুষকে সম্বর্ধিত করার জন্য দেওয়া হবে নোবেল শান্তি পুরষ্কার, তার প্রাপক নির্বাচন করবেন নরওয়ের পার্লামেন্ট দ্বারা বেছে নেওয়া পাঁচ জনের একটি কমিটি। মনে রাখা দরকার সময়টা উনবিংশ শতকের শেষ দশক, নরওয়ে তখন সুইডেনের অধীনে একটি অঙ্গরাজ্য মাত্র; তাঁদের পার্লামেন্ট আছে বটে কিন্তু সুইডেনের রাজা থাকেন তার মাথার ওপরে। কেন যে আলফ্রেড নোবেল তাঁর নামাঙ্কিত এবং ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত পুরস্কারের সঙ্গে অসলো তথা নরওয়েকে জুড়ে দিলেন তার কোন সঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। নরওয়ে সে সময়ে মাঝারি আয়ের ছোট দেশ, ইউরোপে তার স্থান অনেকেরই পিছনে, এমনকি ১৯৩৬ সালে রোমানিয়ার পেছনে। অসলোর জনসংখ্যা আমাদের শ্যামবাজার আর বরানগরের মাঝে গুঁজে দেওয়া যায়। ... ...

মনে পড়ছে সত্তর দশকের ১৯৭১-এ ইনফ্যান্ট বা শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমরা বলতাম ইনফিন। ক্লাস টু পর্যন্ত নিজেদের বসার আসন বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে হতো। ইনফিনে ছিলাম ১৫৭ জন। বেশিরভাগ জন স্কুলে আসতো না। শুধু শনিবার খুব ভিড় হতো। ওইদিন আমেরিকার সরবরাহ মাইলো গম রান্না করে খাওয়ানো হতো। কখনও গুড় থাকতো কখনও নয়। বেশিরভাগ ছেলে মেয়ে থালা নিয়ে আসতো খাবার বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। পরে অবস্থা বুঝে আমার প্রধান শিক্ষক মামা মাইলো রান্না না করেই বাড়িতে দিতে থাকেন। কত গরিব পরিবার যে মাইলো খেয়ে বেঁচেছে। ... ...

এই মরুভূমিতে হালদার আমার মরুদ্যান। সময় পেলে ওর সঙ্গে বসে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও রবীন্দ্রচর্চা করতাম। … কোনো মানুষকে আমি অশ্রদ্ধা করিনা। বরং আমি জানি তথাকথিত উপরতলার মানুষগুলোর থেকে এদের মধ্যে মনুষ্যত্বের অংশ বেশী। এই মানুষগুলো স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই কৃতি ও দক্ষ। এরা মুখ্যতঃ টাকা আর মেশিন ছাড়া আর কিছু জানে না। এদের কাছে পৃথিবীর অন্য কিছুর অস্তিত্ব সপ্রমাণ করতে গেলে এরা বাঁকা হাসি হেসে এমন ভাবে তাকায় যেন মনে হয় আমি একটা নির্বোধ, এখনো সার বস্তু জানতে পারিনি বলে কৃপার যোগ্য। বুঝি পৃথিবী জুড়ে এই দারুন অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগে শিক্ষা, রুচি,সংস্কৃতি --- এগুলো শুধু কথার কথা, প্রহসনের নামান্তর। কিন্তু তবুও আমি বুঝতে পারছি না। প্রতি মুহূর্তে আমি চেষ্টা করছি এই অমিলটাকে মানিয়ে নিতে আর প্রতি মুহূর্তেই হারছি। ভয় হচ্ছে ক্রমশঃ এই হারটা আমার চরিত্রের উপর একটা কুৎসিত স্ফোটক হয়ে দেখা দেবে। হয়ত সিনিক হয়ে যাব, মানুষের উপর শ্রদ্ধা ভালবাসা হারাব, নির্লজ্জ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে সুরুচি সবকিছু বর্জন করব। হয়ত এমন কিছু হব যা এখন অকল্পনীয় তখন অনিবার্য। ... ...

মনে পুরোনো দিনের কথা আসে। আমার কন্যা স্কুলে যাবে। তার ভবিষ্যত ভালো হবে, অনেক আশা নিয়ে বেসরকারী ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তাকে ভর্তি করেছি। পড়ানোর অনেক খরচ। সকালে খুব তাড়াহুড়োয় স্কুল ব্যাগে বই গোছাতে বসি। রুটিনে আজ ভূগোল আছে দেখে স্কুল অ্যাটলাসটা ব্যাগে পুরে দিই। ... ...

দেওয়ালিতে এবার তার বাজি পোড়ানো বারণ, ঝিমলির তাই মুখ বেজার। সেই টেনের বোর্ডের আগে থেকে এ এক আপদ শুরু হয়েছে। এবার তো আবার তার সাথে কলেজে ভর্তির সব পরীক্ষা, বারো ক্লাস বলে কথা, কত দায়দায়িত্ব, বাজিটাজিতে হাত পুড়ে কিছু একটা হলে! কলেজে উঠে যাও তারপরে যত খুশী আশ মিটিয়ে বাজি পোড়াও, দোল খ্যালো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারো, আমরা কিচ্ছু বলতে যাবনা। কথার ওপর কথা বলতে গেলে মা বলবে সবকিছুতে ঝিমলির নাকি যত কুযুক্তি, আর নিজেদের এইসব যুক্তি তাহলে কী? কলেজে উঠে গেলে বন্ধুরা তখন কে কোথায় থাকবে তার কোনো ঠিকানা আছে, নিজেই বাড়িতে আর থাকবে কিনা কে জানে! দেখছে তো অন্যদের অবস্থা, সিনিয়রদের সবাইকে। কার কখন ছুটি হয় কে কখন বাড়ি আসছে, কোনো ঠিক নেই, এর সেমিস্টার একসময় শেষ হয় তো ওর প্রজেক্ট তখন মাঝখানে। ... ...

হিমালয়ঘেরা এই শহরটাতে পুজো আসার সাথে সাথে চারদিক থেকে হিমেল হাওয়ার দল উঁকিঝুঁকি মারে।সারাদিন নানা শোরগোলে আর লোকের ভিড়ে, পুজোমন্ডপের চারধার বেশ সরগরম থাকলেও সন্ধ্যে হতে না হতেই ঠিক শীত না, তবে হিম ভাব। আরতি শেষে ফাংশন শুরু হলে প্রথম দিকটায় ভিড়টা চারিদিকে মাঠের ঘাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও আস্তে আস্তে ঘন হয়ে আসে শামিয়ানার নীচে। একটু রাতে বাড়ি ফেরার সময় হাল্কা একটা পাতা পোড়ার গন্ধ মেশে হাস্নুহানার মাতাল গন্ধে। টুপটাপ হিম ঝরে গন্ধরাজের পাতায়, আর ঝিমলির মন কেমন করে, কারণ ভালো বোঝা যায়না, তবু করে। অন্তত ওই সরস্বতী মন্দির থেকে বাড়ির আধো অন্ধকার পথ চলার ক্ষণে তো করেই। পুজোয় তার তেমন কিছু করার ছিলনা। এমনিতেও সে কোনো বছরই পুজোর ফাংশনের দিকে ঘেঁসেনা খুব একটা, ওই অনন্ত রিহারসাল পর্ব তার মোটেই পছন্দ নয়। আসলে বাঁধাধরা সময়ে কোন কিছু করতেই ঝিমলির ভালো লাগেনা। সেই কারনে এতকাল কোথাও ঠিকমত টিউশনই পড়ে উঠতে পারল না। এবার বারো ক্লাস বলে জোর করে শরাফ স্যরের কাছে অংক করতে পাঠানো হচ্ছে, খুব নিমরাজী হয়েও যাচ্ছে, এন্ট্রান্সের গরজ বালাই! ... ...

ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন। একদিন বিকাল বেলা গোলাগুলির শব্দ শুনে আমরা অনেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। দেখি কয়েকটা গাড়ী এক সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এতদিন পরে স্পস্ট মনে পড়ছে না, তবে আবছা মনে হছে দেখেছিলাম একটা পতাকা, তাতে লেখা ছিল – আর সি পি আই (R C P I – Revolutionary Communist Party of India)। গাড়ী গুলো ভর্তি মানুষ। সকলের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, রাইফেল বা রিভলবার। সব বাড়ি থেকে লোক বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়, তাই একটা ছোটখাট ভীড়। আমাদের দেখে একটা গাড়ি থেকে এক যুবক নামল – হাতে রাইফেল। আমাদের সামনে এগিয়ে এসে উঁচু স্বরে বলল – আপনারা সকলে বাড়ির ভিতরে চলে যান। আপনাদের কোন ভয় নেই। আমি অবাক হয়ে দেখলাম সেই যুবক আমাদের তারাপদদা। গাড়ি গুলো কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হল। পরে শুনেছিলাম এরা বসিরহটের কোর্ট কাছারি ট্রেজারী থানা দখল করে বন্দুক গোলা গুলি হস্তগত করে, বসিরহাটকে স্বাধীন ঘোষনা করে এগিয়ে গেছে। কলকাতা যাওয়ার পথে প্রায় পয়ত্রিশ মাইল দূরে ডানলপ ফ্যাক্টরি অধিকার করে ও সেখানকার এক স্বেতাংগ ফোরম্যানকে জ্বলন্ত ফারনেসের মধ্যে ফেলে দেয়। এ ঘটনা সেসময় দেশে খুব উত্তেজনার সৃস্টি করে। বলা বাহুল্য, অচিরেই এই উত্থানকে দমন করে তারাপদদা সহ সব বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করে সরকার। এদের নেতা পান্নালাল দাসগুপ্ত অবশ্য পলাতক হন এবং প্রায় দুবছর আত্মগোপন করে ছিলেন। সরকারের গোয়েন্দারা কিন্তু বসিরহাটের ক্লাব আর যুবকদের উপর সর্বদা নজর রেখেছিল। আমি যখন কলকাতায় স্কটিশচার্চ কলেজের ছাত্র তখন কেন যেন আমার মনে হত কেউ যেন আমায় চোখে চোখে রেখেছে। ... ...

হোস্টেলের মন্টুদা বিডিও হয়েছিল। গণিতের। দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে ইংরেজির নামী শিক্ষক। সদ্য অবসর নিল। প্রজিত পড়ায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিহাস। অনাথ ইংরেজিতে ভালো ছাত্র। আমার জীবনে বহু মানুষের অবদান। দেবাশিসদা আমার শক অ্যাবজরবার। অনাথ আমি খেতে না গেলে খাবার নিয়ে এসে থাকতো। আমি ওদের সঙ্গে খেতাম। টিউশন করে আমি পাঁচ লিটারের একটা হকিন্স প্রেসার কুকার কিনেছিলাম ১৯৮৪ তে। ২২০ টাকা দামে। কিস্তিতে। প্রথমে ৬০ টাকা তারপর প্রতি মাসে ২০ টাকা। ... ...

এরিক ফান রিবেকের ডাচ অনুগামীরা সিদ্ধান্ত নিলেন ওই দ্বীপে জেলখানা বানিয়ে শাস্তি প্রাপ্ত অপরাধী, অবাঞ্ছিত, পূর্ব এশিয়া, মাদাগাস্কার ও কেপ কলোনির রাজনৈতিক বন্দিদের যদি সেখানে নির্বাসন দেওয়া হয় তাহলে ডাঙ্গায় ইট গেথে কাঁটা তার ঘিরে জেলখানা বানানো ও ডজন ডজন প্রহরী পোষার খরচাটা বাঁচে। রোবেন আইল্যান্ড কেপ টাউন থেকে দূরে নয়, বাইনোকুলার দিয়ে নজর রাখা যায়, কিন্তু পথ দুর্গম; তার আশে পাশে অজস্র মগ্ন মৈনাক, ঝোড়ো হাওয়ায় আকস্মিক উচ্ছলিত আটলান্টিকের জলরাশি, পালাবার পথ নাই। অন্তত দু ডজন জাহাজ ডুবেছে এখানে নোঙর বাঁধতে গিয়ে। কারাগারে পাহারাদার লাগবে কম। ওই দ্বীপ থেকে কেউ সাঁতরে কেপ টাউন পৌঁছুতে তো পারবেই না বরং হাঙরের মেনুতে পরিণত হবে। চিন্তাটি সঠিক। তিনশো বছরে নৌকা যোগে মাত্র দুটি সফল পলায়নের কাহিনি জানা যায়, তবে কোন বন্দীর সাঁতরে কেপ টাউন পৌঁছুনোর রেকর্ড নেই। ... ...

আমি ভূগোলের প্রেমে পড়েছিলাম পঞ্চম শ্রেণীতে, সেই যেবার নিবেদিতা ইস্কুলের ছোট বাড়ি মানে প্রাথমিক বিভাগ পেরিয়ে বড় বাড়িতে অর্থাৎ মাধ্যমিক বিভাগে এলাম। কাকলিদি ভূগোল পড়াতেন। সেই সময় প্রথম জানলাম ক্লাসের ঘণ্টা পড়লেই দিদি আসার আগে ব্ল্যাকবোর্ডের হুকে মানচিত্র টাঙিয়ে রাখতে হয়। আর ভূগোল ক্লাসে খাতা আনতে ভুলে গেলে তাও কোনোদিন ক্ষমা পেতেও পারি, কিন্তু চণ্ডীচরণের ম্যাপ বই না আনলে ক্ষমা নেই। ... ...

নদীর নাম ইছামতী। খুব বড় নদী নয়, খুব ছোটোও নয়; এপার ওপার দুপারই পরিষ্কার দেখা যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে এই শান্ত নদী মাতাল হয়ে উঠে। কালবৈশাখী ঝড়ে এর রূদ্র রূপ চমক লাগায়। বর্ষায় এ হয়ে উঠে ভয়ংকর – পাড়ের জমি ভেঙ্গে পড়ে নদীর বুকে, গাছপালা বাড়ী ঘর কারো রেহাই নেই। বসিরহাটে আমাদের বাড়ী ছিল এই নদীর ধারে। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়ীর সামনে বেশ বড় একটা বাগান, গাছ পালা ভর্তি। সেই বাগানে আমরা খেলাধুলা করতাম। বাগানের শেষে নদীর পাড়। প্রতি বছরই ইছামতী এই বাগানের ভাগ নিত একটু একটু করে। প্রতি বর্ষায় নদীর পাড় ভাঙত; ইছামতী গ্রাস করত জমি। নদীর ধারে একটা বকুল গাছ ছিল। গ্রীষ্ম কালে প্রচণ্ড গরমে গুমোট ঘরে থাকা যেত না; পড়ায় মন বসত না। সন্ধ্যাবেলা এই বকুল গাছের নীচে মাদুর বিছিয়ে হারিকেনের আলোতে পড়শুনা করতাম। নদীর ধারে মৃদু হাওয়া শরীর জুড়িয়ে দিত --- কি অভাবনীয় প্রশান্তি! একদিন সকালে উঠে দেখি সেই বকুল গাছটার শিকড় উপড়ে গেছে; পদচ্যুত বৃক্ষ মুখ থুবড়ে ইছামতীর জলে পড়ে আছে। মনটা আমার খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। পরে সরকার নদীর পাড় বাঁধাবার কাজে উদ্যোগী হয়েছিল। ইছামতী করুণা করে আমদের বাড়ী গ্রাস করে নি; কিন্তু মানুষ করেছিল। মানুষের হাত থেকে আমরা রেহাই পাই নি। ... ...

“মা বাইরে তাকিয়ে দ্যাখো না, বৃষ্টি হচ্ছে?” “হচ্ছে, কিন্ত জোরে নয়, উঠে পড়।“ “আর পনের মিনিট, মা। তুমি দশ মিনিট পরে আবার জানালায় যেও। যদি দেখ প্রাইমারির ছেলেমেয়েরা ফিরছে, তাহলে ডেকো না, তাহলে রেনি ডে। যদি না ফেরে তাহলে ডেকো। “রেনি ডে হলেই বা কী? সকাল সকাল উঠে পড়, বাড়িতেই পড়বি। আর এক মাস পরে তোর ফার্স্ট টার্ম না? এ কথার জবাব দিতে গেলে সকালের মিষ্টি আলতুসি ঘুমটা মাটি হয়। ঝিমলি মুখের ওপর চাদরটা টেনে দিয়ে পাশ ফিরে শুল। মা গজগজ করতে করতে মশারি খুলতে থাকে। ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভের পড়া, এত কম পড়ে কী করে হয় কে জানে। স্কুলটুকু বাদ দিলে সারাদিনই তো হয় ঘুরে বেড়াচ্ছে নয় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, অথবা গল্পের বইয়ে মুখ দিয়ে বসে আছে। এত বন্ধু যে কোত্থেকে আসে? আবার কারুর না কারুর জন্মদিনের পার্টি লেগেই আছে। আজকাল নাকি এরপরে সব আলাদা হয়ে যাবে বলে, জন্মদিন পালনের বেশী ঘটা। রাত্রি দশটা এগারোটায় সবাই ঘুমোতে গেলে, তিনি আলো জ্বালিয়ে বই খাতা নিয়ে নাকি পড়তে বসেন। অত রাতে কী ছাই পড়া হয় অমন করে কে জানে! ... ...

আমার দাদুকে বেশ ভাল মনে আছে। দাদু দীর্ঘায়ু ছিলেন, এক শত বছর এ ধরাধামে জীবন কাটিয়ে দেহ রেখেছিলেন। দাদু ছিলেন সুপুরুষ এবং সৌখীন। আমি যখন দেখেছি বার্ধক্য তখন দাদুকে ছুঁয়েছে। ধবধবে ফর্সা পক্ককেশ কালোপাড় শান্তিপুরী ধুতি পাঞ্জাবীতে ভূষিত সেই মানুষটিকে দেখলে আপনিই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। মায়ের কাছে দাদুর গল্প শুনেছি। দাদুর যখন বয়স পনেরো-ষোল তখন পিতা আনন্দ মোহন পরলোকগমন করেন। দাদু বংশের জ্যেষ্ঠ সন্তান ও উত্তরাধিকারী। ভায়েরা সব অল্পবয়সী নাবালক। একান্নবর্তী পরিবারের দায় দায়িত্ত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের গুরুভার দাদুর উপরেই। সেই সঙ্গে জমিদারি ও তার তত্বাবধান। বিত্তবান অল্পবয়সী জমিদারের তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষী ও উপদেস্টার অভাব হয় নি। আমাদের সে সময় কলকাতার ট্যাংরা অঞ্চলে একটি বড় বাগানবাড়ি ছিল। বাড়িটি প্রধানত: জমিদারের বিনোদনের জন্যই বব্যহৃত হত। মোসাহেবের অভাব ছিল না --- তাদের নিয়ে নাচ গান বাজনার আসর বসতো। সেই বাড়ি দেখাশুনাআর জন্য এক দম্পতি ছিল। বাবা তাদের বাগানের খুড়িমা বাগানের খুড়ো বলতেন। দাদুর সঙ্গে বেশী নগদ টাকা থাকত না। নাচ গানের আসরে বখশিস বা মুজরো দেওয়ার দরকার হলে বাগানের খুড়োর কাছ থেকে তৎক্ষণাৎ টাকা নিতেন। টাকা দিয়ে খুড়ো এক টুকরো কাগজ দিত এগিয়ে দাদুর দিকে। দাদু তখন আসরে মশগুল, সরল মনিবের মত সেই কাগজে সই করতেন। কিছুকাল পরে সেই বাগানের খুড়ো খুড়িমা বাগান বাড়িটা দখল করে নিল। অজুহাত দিয়েছিল দাদু নাকি অনেক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। প্রমান স্বরূপ তদের কাছে দাদুর সই করা কাগজগু্লো আছে। ... ...

কলকাতার রয়াল হোটেলে লোকে খুব শখ হলে বিরিয়ানি খেতে যায় বা নিউ মার্কেটে আমিনিয়ায়। রয়াল হোটেল তখন খুব নামী। সেখানে ত্রিশ টাকা প্লেট খাসির বিরিয়ানি। লোকে মাটন বিরিয়ানি বলতো না। চিকেন তখনও মুরগি ছিল। কথায় কথায় এত ইংরেজিয়ানা ছিল না। আমরা পরিকল্পনা করলাম, ত্রিশ টাকা দাম নিচ্ছে! হোস্টেলে তখন মিল চার্জ এক টাকা আশি পয়সা হলেই ধুন্ধুমার বেধে যায়। অডিট হয়। এত কী করে হলো? ... ...