যে চিহ্নের উপরে ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে অয়ন মুখোপাধ্যায় ১আজকে জানলাম, আমাদের জানালার সামনে যে নিমগাছটা আছে,সেটা আসলে আমার মায়ের পুরোনো চিরুনি।ঝড় উঠলেই সে চুল আঁচড়ায়, আর ধুলোর ভেতরপড়ে থাকে বিকেলের মিহি গন্ধ। ২পুকুরের জল তখন আর কোনো কাঁচ নয়, এক বৃদ্ধ অন্ধকার—তার ভিতরে বসে আছে যেখানে মাছেরা নীরবে সেলাই করে যাচ্ছে।আমি বসে আছি, অথচ আমার ছায়া রয়েছে অনেক দূরে,আম গাছের নিচে ... ...
একটি ব্যবহৃত জীবনের খসড়া অয়ন মুখোপাধ্যায় আজকাল আমি আলো কে খুব একটা বিশ্বাস করি না সে খুব সহজেই রং বদলায়।বরং অন্ধকারের পাশে এসে বসি—সেখানে মদ গন্ধমাখা, পুরোনো,কিন্তু বিশ্বস্ত। আমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই তখন মনে হয়,আমি নই, অন্য কারও ব্যবহৃত অবয়ব পরে বসে আছি। তখন মনে হয় এই জীবনটা যেনো একটা ছেঁড়া প্যাকেটযা ছিল, একে একে সব কিছু পড়ে গেছে রাস্তায়। এখানে তাই ভালোবাসা আমার কাছে একটা ভাঙা সিঁড়ির মতন, কখন ওপরে উঠতে উঠতে হঠাৎ কুয়াশায় মিলিয়ে গেছে। আমি জানতে পারিনি, তারপর শুধু বাতাস আর বাতাস,আর নীচে পড়ে থাকে অনেক পুরোনো ডাক। রাত নামলেই আমি টের পাই,শূন্যতাও আসলে একটা নেশা।একবার গলায় ঢাললেমানুষ আর সহজে সকাল বলতে পারে না। ... ...
নামহীন কোনো অন্ধকারের কাছেঅয়ন মুখোপাধ্যায়আমি আজকাল দৃশ্যের চেয়ে অদৃশ্যকে বেশি বিশ্বাস করি।যে চেয়ারটায় কেউ বসে নেই, সেখানেই সবচেয়ে বেশি শরীরের উষ্ণতা থাকে।জানালার বাইরে যে গাছ, সে আসলে গাছ নয়—একটা দীর্ঘশ্বাস, মাটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ভিতরে প্রতিদিন একটু একটু করে সন্ধ্যা নামে,যা কেউ দেখতে পায় না, শুধু পুরোনো শব্দেরা কাকের মতো জীবন থেকে উড়ে যায়।আমি তাদের ডাকি না, তবু তারা ফিরে আসে—যেন আমারই ভাঙা ছায়া, অন্য কারও উঠোনে জুড়ে পড়ে আছে।এই জীবনে খুব সম্ভবত আমার জন্য কেউ কোনও স্পষ্ট বাক্য লিখে রেখে যায়নি,বরং মুছে যাওয়া কালির ওপর হাত বোলালে যে অন্ধকার উঠে আসে,আমি হলাম তাই। ভালোবাসা আমার কাছে বহুদিন হলো এক দরজাহীন বাড়ি,ভিতরে ... ...
টুইট, ঘোষণা আর আইনের প্রশ্নঅয়ন মুখোপাধ্যায়রাজনীতিতে আচমকা ঘোষণা করা কোনো নতুন কিছু ঘটনা নয়। কিন্তু ঘোষণারও একটি আইনি কাঠামো থাকে। সম্প্রতি মমতা ব্যানার্জির ডিএ-সংক্রান্ত ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আইনি প্রশ্নটাই এখন সবার সামনে চলে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী টুইটারে জানিয়েছেন, বকেয়া ডিএ দেওয়া হবে। কিন্তু একটি টুইট কি সরকারি সিদ্ধান্ত? সরকারি অর্ডার কোথায় ?মানুষের মনে স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্ন উঠছে। এটা কোনো গিমিক নয় তো ?ভোটের আগের কোন চমক নয় তো?কারণ প্রশাসনিক বাস্তবতা খুব পরিষ্কার। সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে একটি সরকারি আদেশনামা বা গভর্নমেন্ট অর্ডার (GO) জারি করতে হয়। সেই আদেশনামার ভিত্তিতেই ... ...
জলছাপের মতো বেঁচে থাকাঅয়ন মুখোপাধ্যায় দুপুরের রোদ যখন বাগানের এক কোণে এসে একটু জিরিয়ে নেয়,তখন আমার মনে পড়ে তোমার হাত—আর ঠোঁটের সেই সামান্য কাঁপন,যা একবার ছুঁয়েছিল চায়ের কাপ,আর একবার আমার নির্জনতা। আমাদের গ্রামগুলো তখন অন্যরকম ছিল—ঠিক আমাদের মতোই একটু কাঁচা,একটু অনভিজ্ঞ। মাঠের ওপর দিয়ে হাওয়া যেভাবে নরম ঘাস ছুঁয়ে যায়,আমরাও সেভাবেই ছুঁয়ে যেতাম আমাদের দিনগুলোকে। আমরা তো কোনোদিন অমরত্বের চুক্তি করিনি।বরং ভাগ করে নিয়েছিলামএকটুখানি বোকামিআর একটু বেশি জেদ—যেন পৃথিবীটা খুব ছোট,আর সময়টা আমাদেরই। আজকের ভিড়ে তুমি হয়তো অনেকটাই বদলে গেছ।চশমার ফ্রেম বদলেছে,বদলে গেছে দেখার ভঙ্গি।ঠোঁটে লেগেছে নতুন কোনো হাসি,নতুন কোনো অভ্যেস। তবুও এই ধুলোমাখা গলির মোড়ে দাঁড়ালেবাতাসে হঠাৎ তোমার রেখে যাওয়া গন্ধ টের পাই।মনে হয়—কোনো এক ... ...
রাষ্ট্রের বিনয়ী প্রশ্নপত্র ১ নথি।...... অফিসার বললেন—আপনার নথি কোথায়?আমি একটা ফাইল বাড়িয়ে দিলাম। ভেতরে স্কুলের সার্টিফিকেট,ভোটার কার্ড,রেশন কার্ড,আর কিছু পুরোনো কাগজ। অফিসার সব দেখে বললেন—হুম। তারপর খুব নরম গলায় বললেন—আরও কিছু থাকলে ভালো হত। আমি জিজ্ঞেস করলাম—কি ধরনের? তিনি বললেন—যেগুলো হারিয়ে যায়নি। ২ দাদুর গল্প.......... লাইনে দাঁড়িয়ে একজন বলছিলেন—তার দাদু নাকি নদী পার হয়ে এখানে এসেছিলেন। তখন নদীটা ছিল চওড়া।দেশটা ছিল নতুন। তিনি বললেন—দাদুর কাছে তখন কোনো কাগজ ছিল না। পাশের লোকটি বলল—তাহলে? লোকটি একটু ভেবে বলল— দাদু সম্ভবত নাগরিক ছিলেনকিন্তু প্রমাণটা রেখে যাননি। ৩ বানান........ অফিসার বললেন—আপনার বাবার নামের বানানএখানে একটু আলাদা। আমি বললাম—গ্রামে সবাই এভাবেই কথা বলে। অফিসার বললেন—কিন্তু কাগজে তো আলাদা কথা বলছে। আমি বললাম—কাগজের ভাষা আর মানুষের ভাষাসব সময় এক হয় না। অফিসার মাথা নাড়লেন।কারণ ... ...
বরণের ভাষা: শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য ও বাংলার প্রথম আত্মসমর্পণ। অয়ন মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ভেতর ভক্তি আন্দোলনের যে স্রোত একদিন নীরবে ঢুকে পড়েছিল, তার একটি বড় ফলাফল মালাধর বসুর লেখা শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য। কাব্যগ্রন্থটি কে আমরা শুধুমাত্র অনুবাদ কাব্য বলবো না বরং বইটি ছিল সেই যুগের মানসিকতার দলিল বাংলা ভাষার বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়। এক সামাজিক পরিবর্তনের চিহ্ন। এক ধর্মীয় জাগরণের নতুন ভাষ্য। বলা যেতে পারে বাংলা ভাষা যখন নিজস্ব ভঙ্গিতে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে, সেই নতুন পরিবর্তনের বাঁকেই এই কাব্যর জন্ম। সুতরাং শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্যগ্রন্থের একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। পঞ্চদশ শতক। বাংলার সমাজ বদলাচ্ছে। গ্রাম বাড়ছে। বাজার তৈরি হচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষা শক্ত হচ্ছে। সংস্কৃত পুঁথি ... ...
রাগ, পুনর্গঠন ও পার্টির আত্মা অয়ন মুখোপাধ্যায় রাগ আছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: এই রাগটা কাদের বিরুদ্ধে? পার্টির বিরুদ্ধে, নাকি পার্টির ভেতরে জমে ওঠা কিছু বিকৃতির বিরুদ্ধে? যে সংগঠন কেবল একটি নির্বাচনযন্ত্র নয়, যে সংগঠনের যে পার্টির ইতিহাসে, রক্ত, ত্যাগ আর মতাদর্শের দীর্ঘ অনুশীলন আছে—তার বিরুদ্ধে রাগ সহজে জন্মায় না। রাগ জন্মায় তখনই, যখন প্রত্যাশা ভাঙে। যখন দেখা যায়, আদর্শের জায়গায় ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে; তাত্ত্বিক চর্চার জায়গায় কৌশলী নীরবতা; সংগঠনিক গণতন্ত্রের জায়গায় গোষ্ঠীসর্বস্ব আধিপত্য।দীর্ঘ সময় সরাসরি যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট দেখেছি—গত দুই দশকে পার্টির নেতৃত্বের একাংশ ক্রমশ মতাদর্শিক দৃঢ়তা হারিয়েছে। রাজনৈতিক শিক্ষা কমেছে, তাত্ত্বিক আলোচনার ক্ষেত্র ... ...
বলাগড় : একটি নীরবতার খসড়া অয়ন মুখোপাধ্যায় ১পুকুরের জলে আমার অবয়ব ভেসে উঠলে মুখটা আকাশের দিকে সরে যায়— জল নিচে, আকাশ ওপরে, আমি মাঝখানে একটা অস্পষ্ট নথি নিয়ে এসআইআর এর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি। যেন কোথাও কিছুই ঘটেনি কোনোদিন—এইভাবেই নিচু স্বরে বলাগড়ে বিডিও অফিসে বিকেল নামে, ২ এইখানে একটি গাছ ছিল। এখন সেটা নেই, তার জায়গায় আলো পড়ে সোজাসুজি।আচমকা কাটা পড়লে মাটির ভেতর গাছেদের দীর্ঘশ্বাস জমে থাকে—যেন ভূগর্ভস্থ কোনো সাক্ষ্য। শেকড়ের ভাঙা শব্দ বলাগড়ের মাটি তাড়াতাড়ি শুষে ... ...
সিলেবাসের ভেতর সিলেবাসের বাইরে অয়ন মুখোপাধ্যায় ক্লাস ইলেভেনের লাস্ট পিরিয়ড ঘরটা অদ্ভুতভাবে জেগে ছিল। কালো বোর্ডে চক-এর ধুলো লেগে আছে, জানালার বাইরে গাছের পাতায় বিকেলের আলো আটকে পড়েছে। কয়েকজন জানালার দিকে ঝুঁকে, কেউ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, কেউ আবার বেঞ্চে নখ আঁচড়াচ্ছিল—শেষ পিরিয়ডের সেই চেনা অস্থিরতা। ক্লাসে ঢুকতেই রাহুল জিজ্ঞেস করল,— স্যার, পড়াশোনা করে কী হবে? চাকরি তো আর কেউ পাচ্ছে ... ...