( ৩৩ ) অশোক পালের ব্যবসা মোটেই ভাল চলছে না। এসব কাজ শহরে না চলারই কথা। সাগরের দোকানে বসে সেদিন বলল, ' গৌহাটিতে চইল্যা যাব ভাবত্যাসি। এহানে কিসু হবার নয় এসব ... ' সাগর বলল, ' না না... চলে যাবে কেন ? ওটা থাক। তার সঙ্গে অন্য কিছু কর ... ' --- ' কি করব বল তো ... ' --- ' আচ্ছা ... আমাকে দু একদিন ভাবতে দাও। দেখছি আমি ... ' --- ' দ্যাহ দেহি ... কি করন যায় ... ' --- ' আমার কিন্তু মনে হয় তোমার ওই রেইকির ব্যাপারটা ভাল চলবে। লোকে একটু জেনে গেলে মনে হয় পসার হবে তোমার ... ' --- ' কি জানি ... আমার কপালের উপর আমার কোন ভরসা নাই। সাগর, তোমার কাছে একশ'টা টাকা হইব ? ' --- ' অ্যাঁ ... কি বললে ... একশ টাকা ? ' --- ' হ্যাঁ, হাতে একটা পয়সা নেই। ক'টা ওষুধ কিনতে হবে ... দিয়ে দেব ... ...
( ৩২ ) কলেজ স্ট্রিট চত্বরে ছাত্র পরিষদ আর এস এফ আই-এর মধ্যে হঠাৎ বিরাট ধস্তাধস্তি লেগে গেল। সে এক ধুন্ধুমার কান্ড। ওর মধ্যেই ইউনিভার্সিটির গেটের একপাশে একটা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী বক্তব্য রাখতে লাগল। ওদিকে এস এফ আই- এর ওরা প্রেসিডেন্সি কলেজের ওদিকে টুল পেতেছে। লক্ষী সেন বলে একজন ছাত্রনেতা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে তারস্বরে গরম গরম কথা বলতে লাগল। প্রেসিডেন্সির ওখানে জমাট ভিড় ছাত্রছাত্রীদের। বক্তৃতার মাঝে মাঝে তুমুল আওয়াজ তুলছে বক্তার সমর্থনে। তুলনায় প্রিয়রঞ্জনের জমায়েতে মনে হচ্ছে ভাঁটার টান। বিক্ষিপ্ত সমর্থন ধ্বনি উঠে তারপর ঝিমিয়ে যাচ্ছে। এইসময়ে রাস্তার ওপারে কলেজ স্কোয়্যারের গেটের মুখে মহীনের ঘোড়াগুলি বলে ... ...
( ৩১ ) প্রায় পনের দিন পরে সাগর একবার দেখা করতে এল অলোকেন্দু মিত্রের সঙ্গে। অলোকেন্দুবাবু তার নিজের ঘরে সেই পুরনো আর্মচেয়ারটায় বসে বসেছিলেন হাতে দৈনিক স্টেটসম্যান কাগজটা ধরে। তার চোখ রয়েছে খবরের কাগজের পাতায়। কিন্তু কতটুকু পড়ছেন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। সাগর ঘরে ঢুকে মৃদুস্বরে বলল, ' স্যার ... ' অলোকেন্দু চোখ তুলে তাকালেন। ----- ' আরে এস এস ... তোমার কথাই ... ...
( ৩০ ) আর দুদিন পরে অলোকেন্দু মিত্র শেষ পর্যন্ত সত্যিই একা হয়ে গেলেন। অর্ধ শতাব্দী ধরে তাকে আগলে রাখার মানুষটি তাকে ফেলে রেখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। রবিবারের দুপুরবেলা। অনুরোধের আসর চলছে। বাসন্তীদেবীর প্রাণের ট্রানজিস্টর নিস্তব্ধ নিস্তরঙ্গ, খাটের ওপর একলাই পড়ে আছে। এ বাড়িতে সে বাড়িতে দুঃখী কন্ঠে সতীনাথের গান বেজে চলেছে ... জানি একদিন আমার জীবনী লেখা হবে ... আকাশে মেঘ আর রোদ্দুরের খেলা চলছে সকাল থেকে। বাসন্তীদেবীর শরীর নামান হল বাড়ির ... ...
( ২৯ ) মোনা মজুমদার সাগরের দোকানে এসে বসল। অশোক পাল মশায়ও সেই সময়ে দোকানে বসে ছিলেন। সাগর বলল, ' এস এস ... ক'দিন ছিলে কোথায় ? ইলেকশানের প্রিপারেশান নিচ্ছ নাকি ? এখনও তো প্রায় একবছর দেরি আছে ... ' --- ' আরে না না ... ইলেকশন নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমি কোন নেতা নই। যাদের মাথা ঘামাবার তারা ঘামাক। আমি ক'দিনের জন্য হাসনাবাদে গিয়েছিলাম একটু জমিজমার ... ...
( ২৮ )অশোক কুমার পাল মশায় নলিন সরকার স্ট্রিটে একটা ঘর নিলেন। তেমন আহামরি কিছু না, মাথা গোঁজার মতো একটা জায়গা হল আর কি। একটা হল আর কি। সাগরই ব্যবস্থা করে দিল। অশোকবাবু পরিবারকে নিয়ে এলেন। একটাই ঘর। ওই ঘরেই একপাশে রান্নাবান্না। শৌচাগার ঘরের বাইরে। পালমশাই এতে খুশি।বললেন, ' আর কি চাই ... এই যথেষ্ট। এই রকম জায়গা ... খুব সুবিধা হইল বোঝলেন ... এত কম ভাড়া ... আপনের জন্যই হইল ... 'সাগর আর অশোক পাল পরস্পরকে কখনও কখনও তুমি, কখনও আপনি বলে। কোন ঠিক নেই।সাগর বলল, ' হ্যাঁ তা বুঝলাম। তবে এটাও জেনে রেখ, তুমি যে ভেল্কি দেখিয়ে এলে ... ...
( ২৭ )বছর শেষ হয়ে ছিয়াত্তর সাল এসে গেল। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি এখন। দুদিন ধরে ঠান্ডার কামড়টা কম মনে হচ্ছে। বিভূতিবাবু অনেকদিন নাটক দেখেননি। সিনেমাও দেখেননি বছর দুয়েক। সিনেমা থিয়েটার নিয়ে মেতে থাকার সেই দিনগুলো খুব মনে পড়ে আজকাল। নিতাইবাবুর শালা দীনবন্ধুকে নিয়ে কত থিয়েটার দেখতে গেছেন তিনি। মিনার্ভা থিয়েটারে অঙ্গার দেখেছিলেন। কিছু সিনেমাও দেখেছেন। খুব ভাল কাটত দিনগুলো। সেই দীনবন্ধু এখন কোথায় কে জানে। এখন আর কোন কিছু ভাল লাগে না। রেডিওয় খবরটা শোনেন, ব্যস। কোন কিছু নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান না। জন্মেজয়বাবুর ছেলে অখিলরা এখান থেকে চলে গেছে গার্ডেন রিচের ওদিকে। ওখানে থাকলেই নাকি ওদের সুবিধে। কি সুবিধে ... ...
( ২৬ ) সাগর দেখল তিন চারজনে মিলে কি আলোচনা করছে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। গলায় কন্ঠি পরা একজন সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরা মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক একপাশে আলাদা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাগর তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল ' কি হয়েছে দাদা ? ' ভদ্রলোক সাগরের মুখে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, ' গিন্নীমার অসুখ হয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে ... ' ---- ' গিন্নীমা মানে, অলোকেন্দু স্যারের ... এ ... ' --- ' হ্যাঁ হ্যাঁ ... ' ---- ' ওহ্ ... হঠাৎ কি করে ... ...
( ২৫ ) সাগর পটলের দোকানে গেল বিকেল চারটে নাগাদ। --- ' কি হয়েছে রে ? মাণিক এসেছিল নাকি ? ' পটল কাজ ফেলে বাইরে এল। --- ' হ্যাঁ হ্যাঁ ... মোনা মজুমদারের সঙ্গে প্রতাপ ধরের লোক নাকি কি ঝামেলা করেছে ... ' --- ' কি করেছে ? ' --- ' কাল নাকি চাকু চালিয়েছিল ... লাগেনি ...' --- ' কখন ... কোন জায়গায় ? ' --- ' মাণিকদা বলল গ্যালিফ স্ট্রিটের ওদিকে ... খালপারে ... ...
( ২৪ ) ইন্দ্রাণী যা ছিল এখনও মোটামুটি তাই আছে। সাগরের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে সৌদামিনীর ঘরে গেল। বলল, ' এই যে ... সাগর, নাম শুনেছেন হয়ত। আমার সঙ্গে ছোটবেলা থেকে চেনা। তখন খুব ক্যাবলা ছিল। এখনও তাই আছে। তবে ওর কিন্তু খুব সাহস ... সেই ছোটবেলায় একবার তিনটে বজ্জাত ছেলে ... ' সাগর থাকতে না পেরে বলল, ' আঃ ... কি হচ্ছে। গাড়ি একটু ... ...