
প্রথমদিন হাঁড়ি দুটো কথকের বাড়ির পাশে রক্তকরবী গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হল। তাদের খাবার দেওয়া হল দু-ঘটি জল আর দুমুঠো মাটি। টিভিতে শুনে তারা হিন্দি গান পটাপট গলায় তুলে ফেলল। কয়েকদিন পর তাদের স্থান হল মাটির হাঁড়ি থেকে অ্যালুমিনিয়ামের ডেচকিতে। সুষম খাদ্য তালিকা অনুযায়ী তাদের খাবার দেওয়া হতে থাকল। ভুজু ডিবরা গ্রামে ফিরে যাওয়ার সময় কথককে অনুরোধ করে গেল ‘গাঁইয়া ভূত’ বলে তাদের যেন অনাদর না করেন, সর্বদা যেন সন্তান স্নেহে ‘মানুষ’ করেন। সত্যিকারের কোনো দোষ করলে আচ্ছা করে কানমলা দিয়ে শাস্তি দিতেও যেন না ভুলে যান। ... ...

সারি মস্ত আবার তৈরি হয়েছে – কিন্তু সে কি পারে মানুষকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে? তিন বছরের গৃহযুদ্ধ বিনষ্ট করেছে পাঁচশো বছরের সহাবস্থান। ক্রোয়াট ও বসনিয়াক ছেলেমেয়েরা একই স্কুলে যায়, কিন্তু আগের মতো এক ঘরে একই ক্লাসে বসে না: সিলেবাস এক, ভাষা এক। কিন্তু ক্রোয়াট ও বসনিয়াক ছেলে মেয়েদের স্কুলে ঢোকার গেট আলাদা – মাঝে কাঁটাতারের বেড়া। ক্লাসরুম আলাদা। এক নতুন বৈষম্য। ... ...

কাজিদা, গান্ধীজী আর গুরুদেবের জোড়াসাঁকোর বাড়ির আলোচনার কথা তুমি তো জানই, গান্ধী তখন তাঁর অসহযোগিতার উপযোগিতা রবীন্দ্রনাথকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অনেক কম বয়েসে জমিদারি চালাবার কাজ নিয়ে কবি যখন শিলাইদহে যান তখনই তিনি আমাদের দেশের গ্রামীণ দুর্দশার কারণ সম্যক বুঝেছিলেন। সেই কারণটাই তিনি বুঝিয়েছিলেন এল্ম্হার্স্ট সাহেবকে: এক, গ্রামের মানুষ এখন হারিয়েছে তার আত্মবিশ্বাস, সে নিজেই বিশ্বাস করে না যে তার বর্তমান দুর্দশার পরিবর্তন সম্ভব; আর দুই, তাদের বর্তমান অবক্ষয় রুখে দিয়ে প্রগতির পথে তাদের ফিরিয়ে আনতে হলে ফাঁকা রাজনৈতিক শ্লোগানে কাজ হবে না; দুর্দশার প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাহায্যে দুর্দশার মূল কারণ নির্ধারণ করে একমাত্র প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির প্রয়োগই এই দুর্দশা বদলাতে পারে। ... ...

কিছু ব্যতিক্রম বাদে কোনো ক্ষেত্রেই কোনো বিশেষজ্ঞ বা বিশিষ্ট ব্যক্তি এই সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত নয়। ব্যতিক্রম হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রাক্তন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা ডক্টর বিজয় রাঘবন এবং জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান কস্তুরিরঙ্গন প্রমুখের নাম নেওয়া যেতে পারে। ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি জগতের কিছু বড় নাম সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু অন্য সব ক্ষেত্রে এই সরকার সম্পূর্ণভাবে বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চের একজন প্রাক্তন সদস্য হিসেবে আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, যে নিম্নস্তরের মানুষ আজ এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রবেশ করেছে, তা আগে কখনও ঘটেনি। ... ...

— ঠাকুমা বলেছিলেন যে, প্রতি সন্ধেবেলাতেই বাড়ির দুর্গামন্ডপে বয়স্ক জ্ঞানীগুণী লোকেরা আসতেন। চা, তামাক, জলখাবার চলত। তারিণী বসে গড়গড়া টানতেন। আর সকলে মিলে নানা বিষয় আলোচনা হত। একদিন সেই সভায় তারিণী বৌমাকে রান্নাঘর থেকে ডেকে পাঠালেন, সবার সঙ্গে বসতে বললেন। বৌমা এত গুরুজনদের সঙ্গে বসবে কী, লজ্জায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে রইল। তারিণী বললেন, 'এই লজ্জা সংকোচ ভাঙতে হবে বৌমা, তোমাকে মেয়েদের ইস্কুলের ভার নিতে হবে। নতুন ইস্কুলের দরখাস্ত করা হচ্ছে।' — তখন ঠাকুমা কী করল? — ওরে ঠাকুমা পণ্ডিত বাড়ির মেয়ে, বাড়িতে টোল, চতুষ্পাঠী - এসব জন্ম থেকে দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু নিজে কীকরে করবে, এই ভেবে পা কাঁপছিল, বুকের ভেতর ভয় করছিল। — তারপর? ... ...

সবচেয়ে বড় দ্বীপের মাথাটা মাপ নেওয়ার জন্য সুপ্রশস্ত। আমরাও সুযোগের সদব্যবহার করলাম - এখান থেকে লম্বা-চওড়া হ্রদ ও তাকে ঘিরে থাকা সুউচ্চ পর্বতমালাটি ভালভাবে দেখা যাচ্ছিল। এখান থেকে উত্তর-ঈশান কোণে রামাতা পাহাড় - সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। অগ্নি কোণ আর দক্ষিণ অগ্নিকোণের মাঝবরাবর কাতাঙ্গা কেপ, সেন্টাকেয়ী পূর্ব-অগ্নি কোণে; পূর্ব আর পূর্ব-ঈশান কোণের মাঝখানে মাগালা; মুজিমুর দক্ষিণ-পশ্চিম বিন্দুটি দক্ষিণ দিক বরাবর, মুজিমু দ্বীপের উত্তর বিন্দুটি দক্ষিণ-অগ্নি দিকে। ... ...
সময় বদলে গেছে। সন্দীপ দত্তের মতো লিটল ম্যাগাজিনের জন্য জীবনপাত করার লোক চারপাশে আর দেখি কই! টেমার লেনের লাইব্রেরিটির ভবিষ্যৎও অজানা। বিপুল ও দুর্লভ সব পত্রিকার দেখভাল করবেন কে এবার? সন্দীপ দত্ত চলে গেলেন। আমাদের কাছে রেখে গেলেন স্মৃতি ও প্রশ্ন। বেশ-কিছু দায়ও, যা হয়তো পালন করতে পারব না কোনোদিনই। শুধু গর্বের সুযোগ ফিরে-ফিরে আসবে— ‘আমরা সন্দীপ দত্তকে চিনতাম।’ ... ...

ভারত জোড়ো অভিযান বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে প্রতীক্ষিত সেতুবন্ধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি প্রথমবার নয় যেখানে অদলীয় রাজনৈতিক গঠন গড়ে তোলা হচ্ছে। সূচনা পর্বেই আমি উল্লেখ করেছি সেতুবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা: “আন্দোলন থেকে আসে গভীরতা, পার্টি দেয় ব্যাপ্তি। আন্দোলন ইস্যুর জোগান দেয়, পার্টি সেগুলিকে কার্যকরী ফলাফলে পরিণত করে।” আমি বিশেযভাবে আবেদন জানিয়েছিলাম “প্রতিরোধের অদলীয় রাজনীতির” উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে বর্তমান আক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে কিন্তু কোনও একটি বিরোধী দলের পক্ষপাতমূলক স্বার্থে আবদ্ধ না হয়ে। ... ...

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনসুখ মান্ডাভিয়া রাহুল গান্ধিকে ‘কোভিড নির্দেশিকা’ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে একটি চিঠি লেখেন এবং তাঁকে “কোভিড মহামারী থেকে দেশকে বাঁচাতে জাতীয় স্বার্থে ভারত জোড়ো যাত্রা স্থগিত করার” অনুরোধ করেন। বেচারা ভুলে গিয়েছেন, যে চিঠিটি লেখার সময় দেশে কোনও কোভিড নির্দেশিকা কার্যকর ছিল না। এমনকি দু’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ত্রিপুরায় একটি বড় জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। রাজস্থান বিজেপি ১ ডিসেম্বর থেকে সেরাজ্যে ‘জন আক্রোশ যাত্রা’ করেছে। মন্ত্রীর চিঠির পরেই বিজেপি দিল্লিতে ঘোষণা করেছিল যে তারা জাতির স্বার্থে রাজস্থানে যাত্রা স্থগিত করছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই রাজস্থানের বিজেপি জানিয়েছে, এই যাত্রা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে – কোভিড সংক্রমণ ভারত জোড়া যাত্রায় হয়, তবে বিজেপির যাত্রায় নয়। ... ...

উফফ্ দু-দন্ড যে একটু শান্তিতে দিন কাটাবো তার যো নেই। হতভাগাগুলো আবার “দাও দাও” আবদার শুরু করেছে। হ্যাঁ রে অনামুখোর দল, এই যে তোদের কথামত ৩৭৭ সরালুম, তাতেও তোদের আশ মিটল না। না, মানে আমরা সরিয়েছি তা নয়, সুপ্রীম কোর্ট সরিয়েছে, কিন্তু আমরা কি তাতে কিছু বলেছি? হুঁ হুঁ বাবাসকল, এ হল অমৃতকাল, সবকা বিকাশ না করে ছাড়ব না। এই যা, বাবাসকল বলে দিলাম, তোদের তো আবার কে বাবা আর কে মা তার ঠিকঠিকানা নেই। আজকে দাড়িগোঁফওয়ালা শাড়ি পরে ঘুরছে তো কাল আরেকজন মেয়ে থেকে ছেলে হয়ে যাচ্ছে। এরকম ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল চলতে থাকলে আমরা কী আর তাল রাখতে পারি? যাক গে, যাক। যে কথা বলছিলাম। ৩৭৭ গেল কি গেল না, তোরা এসে উপস্থিত হলি বে করব বায়না নিয়ে। বলি বিয়ে কি ছেলের হাতের মোয়া না নোটবন্দী যে চাইলেই করে ফেলবি? এ হল অতি গুরুতর বিষয়, সমাজের হিত, দেশের ভিত, আর ঐতিহ্যের মিথ সব এতে মিলেমিশে আসে। অমন বিয়ে করব বললি আর অমনি আমরা অনুমতি দিয়ে দিলাম, এ আবার হয় না কি? ... ...

অবশেষে পোস্টার থেকে সরে দাঁড়ালেন আসল রাহুল গান্ধি। যাঁর রয়েছে গভীর আত্মবিশ্বাস। যিনি সত্যিকারের অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সাম্যের সাংবিধানিক আদর্শে বিশ্বাস করেন। একজন চিন্তাবিদ যিনি দেশ এবং বিশ্বের সমস্যাগুলি কেবল তুলে ধরেন না, বরং এক সংবেদনশীল মনের অধিকারী ব্যক্তি যিনি সমস্যার মোকাবিলা করতে পারেন। একজন মানবিক নেতা যিনি ক্রমাগত সহমর্মিতাকে অনুসরণ করেন, যিনি ঘৃণাকে জয় করতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। একজন রাজনীতিবিদ যিনি ক্ষমতার জন্য ক্ষুধার্ত নন। একজন সোজাসাপ্টা ব্যক্তি যিনি নাটক এবং মিথ্যাকে পরিত্যাগ করেছেন। বিপরীতে নরেন্দ্র মোদি যেটা করতে অপারগ। ... ...

'দুষ্কালের আখ্যানমালা'র গল্পগুলো পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে একটা ট্রেনে করে যেতে যেতে জানলা দিয়ে আচমকা কয়েকটি চরিত্রের ঝলক এবং কিছু দৃশ্য দেখছেন, আর এই যাত্রাপথে ট্রেনটা আসলে এগিয়ে যাচ্ছে এক দুষ্কাল থেকে আরেক দুষ্কালের দিকে। চরিত্রগুলোকে পড়তে পড়তে আসলে আমরা যখন এই সামগ্রিক যাত্রাপথের কথা অল্প সময়ের জন্য বিস্মৃত হই, তখনই মাঝে মাঝে দিনের বেলা আচমকা সূর্যগ্রহণের মত এই সমস্ত দুষ্কালের ছায়া নেমে আসে চরিত্র এবং দৃশ্যাবলীগুলির ওপর। ... ...

শ্রেণি বিভাজনে আজ যদি প্রলেতারিয়েত, লুম্পেন-প্রলেতারিয়েত, লুম্পেন-বুর্জোয়া, বুর্জোয়া, পেটি-বুর্জোয়া ইত্যাদি বলা হয় তাহলে মানুষ যার পর নাই বিরক্ত হবেন। আবার সেইসব বস্তাপচা বিশেষণ! এসব বিংশ-শতাব্দীর ব্যাপার, একবিংশ শতাব্দীতে এইসব চলে না। একবিংশ শতাব্দী হল উত্তরাধুনিকতার যুগ এবং উত্তরাধুনিকতা বামপন্থা বা মার্কসবাদকে আধিপত্যকামী বা হেজিমনিক মনে করে ও বিরোধিতা করে। ব্যাপার যে এখন আরও অনেক জটিল এবং উক্ত বিশেষণগুলি যে এখন আর এদের সম্যক পরিচয় বহন করে না জগার মত সিন্ডিকেট-বস বা বিউটি (দেশান্তরিত ও অত:পর স্বামী কর্তৃক বিক্রিত), মালাদের মত একবিংশ শতাব্দীর শহুরে যৌনকর্মীদের দেখলে অবশ্যই বোঝা যায়। সত্য বিউটিদের সঙ্গে জগা গণেশ এবং চাঁদু সোমাদের সঙ্গে সুধাময়দের পরিবার - দুটি আলাদা উলম্বে স্থাপিত। ... ...

মংলুমামা ছিলেন পেটুক মানুষ। কতক্ষণে খাবার সময় হবে তার আর সবুর সইছে না। একটু নিরিবিলি হতেই তাড়াতাড়ি একটা টুলে চড়ে শিকলি খুলে, চুপিচুপি খাটের তলা থেকে হাঁড়িটা টেনে নিয়ে মস্ত এক খাবলা দই মুখে পুরেই পরিত্রাহি চিৎকার! আসলে সেটা তো দই-ই ছিল না, ছিল পানে খাবার চুন। আবার নতুন চুনের ঝাঁঝ খুব বেশি হয়। কাজেই মংলুমামার যে কী দশা হল তা তো বুঝতেই পারা যাচ্ছে। দই খাওয়াও হল না, তার ওপর চুরি করে খেতে গিয়ে ধরা পড়ার লজ্জা! রায় পরিবারে সুখাদ্যের প্রতি আকর্ষণের শুরুটা হত একেবারে জন্মাবার পর থেকে। সুকুমারের ছোট ভাই নানকু অর্থাৎ সুবিমল সবে জন্মেছে। সে যখন মাত্র কয়েকদিনের, দুপুরে মা তাকে পাশে নিয়ে একটু ঘুমিয়েছেন। হঠাৎ চকাৎ চকাৎ শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখেন, পাঁচ বছরের কন্যা টুনি পান্তুয়া খেতে খেতে ফোঁটা ফোঁটা রস টিপে টিপে ভাইয়ের মুখে দিচ্ছে আর ভাই দিব্যি চকচক করে খাচ্ছে। ... ...

সারাদিনে এই একটা সময় যখন ঠাকুমার ডাকে আমার সারা দিতে ইচ্ছা হয় না। এই সময়ে ঠাকুমাও খুব কঠোর। আমার সকল অনিচ্ছাকে অবহেলা করে নির্দ্বিধায় আমার হাতে ধরিয়ে দেয় পেতলের ছোট গ্লাসে শেফালি পাতার রস আর চিরতার রস। চোখ ভরা অভিমান আর নি:শ্বাস আটকে আমি শেষ করি সেই তিতকুটে রস। ফাঁকা গ্লাস ঠাকুমার হাতে পৌঁছে যেতেই আমি আবার ফিরে পাই আমার সেই ঠাকুমাকে, যে ঠাকুমা কারণে অকারণে আমার হাত ভরে দেয় আনন্দ আর আস্বাদে, - ও ঠাকুমা, কোথায় পেলে রাঘবসই? দাদু এনেছে? ... ...

— চট্টগ্রামের জালালাবাদের যুদ্ধে তিনি মাস্টারদার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। ওঁর ভাই টেগরা সেই যুদ্ধেই মারা যায়। আমরা ওঁর বাড়িতে প্রায়ই যেতাম। শিখাদির মা তখন বেঁচে ছিলেন, ভীষণ আমুদে একজন দিদা। ঐ বাড়িতে লোকনাথ বলের একটা বড় অয়েল পেন্টিং ছিল। ছোটবেলায় দেখলে গায়ে কাঁটা দিত আমার। — ওঃ আর কাউকে জানো? — পারিবারিক সূত্রে লেডি অবলা বসুর গল্প জানেন, এমন মানুষের সান্নিধ্যে এসেছি। — কী বলছ মা? বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী? — বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী বটে, তবে সেটাই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। — তাহলে? ... ...

একটা ব্যাপার আমার কাছে স্পষ্ট। আর আমার ধারণা ডাক্তারও তাই মনে করেন। স্যার স্যামুয়েল বেকারকে আলবার্ট এন'ইয়ানজার দৈর্ঘ্য অক্ষাংশ বরাবর ২° যদি বা নাও হয়, ১° কমাতেই হবে। এই বহু পরিচিত অভিযাত্রীটি হ্রদটিকে রুয়ান্ডাদের এলাকার অনেকটা বেশি ভিতরদিকে করে দেখিয়েছেন। আর রুয়ান্ডাকে দেখিয়েছেন তার পূর্ব দিকে। আসলে কিন্তু রুয়ান্ডার পুরোটা না হলেও একটা বড় অংশই হ্রদের উত্তরাংশ জুড়ে, তাঁর মানচিত্রে তিনি সেই জায়গাটাকে উসিগে বলে বর্ণনা করেছেন। ... ...

রাস্তার ধারে ঝুপসি গাছপালাগুলো অব্দি কুয়াশার কম্বল মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটু বাতাস বইলে দেখায় বিশাল দৈত্যের মাথা নাড়ার মতো। ধোঁয়া-ওঠা বুক নিয়ে এলিয়ে পড়ে থাকা নদীর দিক থেকে কেমন একটা গোঁওওও শব্দ ভেসে আসে, যেন কেউ কাঁদে, কষ্টে গা মোচড়ায়, নিজের গলায় নিজের দশ আঙুল চেপে ধরে। তাতে গা শিরশির করলেও অষ্টমী ভালোই জানে আসল বিপদ লুকিয়ে আছে পেছন বাগে। সে বিপদ যে কখন বিদ্যুতের মতো ঘাড়ের ওপর অব্যর্থ লাফিয়ে পড়বে কেউ জানে না। সে এক আশ্চর্য হলদে আগুনের শিখা, তাকে দেখার আগেই নিজের কানেই শুনতে পাবে নিজের ঘেঁটি ভাঙার মট মট শব্দ, আর কিছু বোঝার আগেই এতো আলহাদের শরীরখানা তেনার কষে ঝুলতে থাকবে। যেন তুমি আর মানুষ নও হে, দাঁত বার করা মরা বেড়াল একটা। শিউরে উঠে অষ্টমী তার কালো ফাটা হাতখানি কোঁকড়া চুলে ঢাকা ঘাড়ের ওপর আলগোছে বুলিয়ে নেয়। রক্ষে কর সোনার বন্ন বনবিবি, মা আমার! ভয় তাকে পেড়ে ফেলে, হঠাৎ এমন কাঁপুনি দেয় যে শরীরের সমস্ত রোঁয়া খাড়া দাঁড়িয়ে ওঠে। ... ...

তা এই বাড়ির কোনকিছুই ওর নিজস্ব মনে হয় না, হয়ও নি কোনোদিন। আর শুধু বাড়ির কেন, এই পৃথিবীতে কোথায়ও কি ওর নিজস্ব কিছু আছে আদৌ! চাকরিটা বাবার জন্য শুরু করতে হয়েছিল, বিয়ের পরেও ছাড়তে পারে নি রমেনের জন্য। দাদার জন্যই লাইব্রেরীর চাকরি করেও পূর্বাঞ্চল সাংস্কৃতিক সঙ্ঘের হয়ে গণসঙ্গীত গেয়ে নাটক করে বেড়াতে পেরেছে। সেইটুকুই ছিল ওর নিজের আনন্দে বাঁচা। বাবা মায়ের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতো দাদা। সেই দাদাটাও অমন করে চলে গিয়ে পম্পাকে একেবারে শূন্য করে দিয়ে গেল। সেই যে ওর বুকের মধ্যে একটা আস্ত মরুভূমি ঢুকে গেল, সে কেবলই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে একটু একটু করে প্রাণরস শুষে নিয়ে ওকে এমন তব্দাধরা কাঠের পুতুল বানিয়ে দিল। ফুলশয্যার রাত থেকে রমেন হিসহিস করে বলত ‘দ্রৌপদী! দ্রৌপদী এসছে আমার ঘাড়ে!’ পম্পাকে ব্যবহার করত ঠিক বাথরুমের মত। ওই করেই দুই ছেলে হল দেড় বছরের তফাতে। ... ...
