
এ'লেখাটি কোনও 'ম্যানিফেস্টো' নয় জানবেন। এটি একটি শোকে ভেজা ছেঁড়া তমসুক মাত্র। প্রলাপ। আগুন, সে আর যথেষ্ট কই ধরাবার? এখন তো প্রিয় সব শবদেহ'ই অর্ধদগ্ধ! ... ...


সবেমাত্র চল্লিশের চৌকাঠ পেরিয়েছেন কেপলার। 'প্রবাবিলিটি' শব্দটা তখনও কেবলই লুডোর ছক্কাতেই সীমাবদ্ধ। গণিতশাস্ত্রের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থায়ী জায়গা করে নেয় নি। 'স্ট্যাটিস্টিক্সও' গণিতগর্ভের অঙ্কুর। ... ...

কতটা বিভক্ত এই দেশ? তেল আভিভ হতে ডেড সী যাবার মোটরওয়েতে বারবার চোখে পড়বে বড়ো অক্ষরে লেখা A B C : এটি কোন বর্ণ পরিচয়ের পাঠশালা নয়। এই অক্ষর মালা নির্দেশ করে কোন অঞ্চল কার তাঁবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরেও ব্রিটিশ ফরাসি আমেরিকা এই তিন মিত্র শক্তি শাসন করেছে পশ্চিম বার্লিন। আপনি হাঁটছেন, হঠাৎ দেখলেন একটা মানুষের সাইজে সাইনবোর্ড – তাতে লেখা ‘আপনি ফরাসি সেক্টর পরিত্যাগ করিলেন’। এবার আপনাকে আরেকটি সাইনবোর্ড আমেরিকান সেক্টরে আপনাকে স্বাগত জানায়। মিত্র শক্তির এই দফায় দফায় দেওয়া নোটিসে আপনার চলা ফেরার কোন অসুবিধে হতো না কারণ কেউ আপনার পাসপোর্ট ভিসা পরীক্ষা করতে চায় নি ( যদিও সে ক্ষমতা তাদের ছিল। এক সেক্টর ছেড়ে অন্য সেক্টরে প্রবেশ করলে কোন পরিবর্তন চোখে পড়ে না, কেবল পুলিশের, সৈন্যের পোশাকটা বদলে যায়। মুশকিল ছিল সোভিয়েত সেক্টর নিয়ে, সেখানে উঁচু দেওয়াল। ... ...

প্রথম প্রথম পরীক্ষা শেষে ঘটনাটা ঘটলেও, এক সময় এর ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ল। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতেও মামার সাথে ঘুমোতে যাবার আবদার থাকতো মোরসালিনের! তবে লিটন নামের এই যুবকটি কিন্তু তার আপন মামা ছিল না। মায়ের এত দূর সম্পর্কের ভাই ছিল যে, মোরসালিন মনে রাখত পারত না ক্রমটা। লিটন মামা একটা বইয়ের দোকনে চাকরি করত, আর থাকত পুরনো ঢাকার একটি স্যাঁতসেতে মেসে, যার দোতলায় উঠতে উঠতে পিচ-কালো নোনা-ধরা দেয়াল, কড়িবর্গায় রাজত্ব করা ধুলোর পুরু আস্তর, আর পলেস্তরা খসে শ্যাওলা গজানো ইটের কংকালে উঁকি মারা অবশ্য দ্রষ্টব্য ছিল যে কোন পরিদর্শকের জন্য। এছাড়া রয়েছে কাঁথা বালিশের ম্যাড়মেড়ে বাসী গন্ধ। একটা পুরনো দিনের এলিয়ে পড়া আলনা, আর হাঁটু-ভাঙা রঙ-উঠা চৌকির তলা চেপে ধরা একটা ফেটে পড়া বিরস-বিবর্ণ ট্রাঙ্ক। সব মিলিয়ে দমবন্ধ অবস্থা! ... ...

মিষ্টির ক্ষেত্রে বঙ্গ ও কলিঙ্গদেশ বাকি উপমহাদেশের তুলনায় আলাদা। এই দুই জাতি ছাড়া ভারতের আর কেউ বড়ো একটা (বা আদপেই) মিঠাইতে ছানার ব্যবহার করে না। আমাদের জিভে সঞ্চারিত রসের ওপর যদি ঐকান্তিক বিশ্বাস রাখা যায় তাহলে মানব সভ্যতার ইতিহাসের অনেক সত্য আপনি উন্মোচিত হতে পারে। কারণ রসনা এমন এক জায়গা যেখানে আমি আপনি সম্পূর্ণ নগ্ন। এই শিল্প আস্বাদনের ক্ষেত্রে কোন ভন্ডামি চলে না। আপনি লুচি, আলুর দম আর রসগোল্লা খেয়ে খাঁটি বাঙালিয়ানার ঢেঁকুর তুলবেন ভাবলেন – তা হবে না। আপনার বাঙালিয়ানার উদগারের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াবে পর্তুগীজ আর ওলন্দাজরা। রসগোল্লা আবিষ্কার নিয়ে এই যে উড়িষ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের এত লড়াই ঝগড়া – অথচ তার মূল উপাদান এসেছে ইউরোপের ভিয়ান থেকে। খাঁটি দেশজ কালচার হিসেবে আর যারাই দাবী তুলুক, বাংলার অত্যন্ত গর্বের মিষ্টি চর্চা সেই অঙ্গীকার করতে পারে না। কারণ মিষ্টিতে বাঙালি তার স্বাতন্ত্র্যের জন্যে ইউরোপের কাছে ঋণী। (বাকি রেনেসাঁস থেকে কমিউনিজম – ভিনদেশী না বাঙালি বলেই সম্ভব তা বিদ্বজ্জনেরা বলবেন।) ... ...

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপে এক কোটির বেশি ইহুদির বাস ছিল, মূলত পোল্যান্ড ইউক্রেন লিথুয়ানিয়া হাঙ্গেরি রোমানিয়াতে। হলোকষ্টে ষাট লক্ষ প্রাণ দিয়েছিলেন। প্রাণে যারা বাঁচলেন তাঁরা গেলেন ইসরায়েল এবং আমেরিকায়। আজ ইসরায়েলে বাস করেন সত্তর লক্ষ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ষাট লক্ষ। ফ্রান্স বাদ দিলে বাকি ইউরোপে বাস করেন অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক ইহদি, খুব বেশি হলে লাখ দুয়েক। নাৎসি আমলে খুন খারাবি শুরু হওয়ার আগে অবধি ইহুদিরা অনেক লাঠি ঝাঁটা খেয়েও ইউরোপে বাস করেছেন দেড় হাজার বছরের বেশি, বাসজমির খোঁজে অন্য মহাদেশের উদ্দেশ্যে নৌকো বা জাহাজে চড়েন নি। ইউরোপ তাঁদের সর্বদা দূরে রেখেছে, কখনো শরণাপন্ন প্রতিবেশী হিসেবে নয়। ১২৯০ সালে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ড ঝাড়ে বংশে ইহুদি উৎপাটন এবং বহিষ্কারের প্রথাটি বলবত করেন- সোজা রেড কার্ড ! ... ...

মণিমালা নীচু হয়ে সুখশয্যায় শোয়া সুকান্তের মুখের সামনে হাত নিয়ে ঢেলে দিল ভাজা মৌরি। সুকান্ত মুখ বন্ধ করে জড়িয়ে ধরল মণিমালাকে, টেনে নিল নিজের বুকের ওপর। সুকান্তর বুকে মণিমালার বুক থেপসে গেল। একটুও আগুন জ্বলল না ঠিকই, কিন্তু সুকান্ত পুড়ে ছাই হতে লাগল। ছাড়ো, ছাড়ো আমার এখনো রাজ্যের কাজ বাকি। আমার পাশে শোয়াটাও তোমার একটা কাজ। ছাই কাজ। ঠিক তাই, সেই থেকে পুড়ে পুড়ে আমি ছাই হচ্ছি। ইস, আমি এখন তাহলে এসে ছাইয়ের গাদায় শুলাম? ছাইয়ের গাদা, উঁ, ছাইয়ের গাদা, দেখাচ্ছি কেমন ছাইয়ের গাদা। নরম ও আরামের সুখশয্যার ওপর সুকান্ত চেপে ধরল আগুনতপ্ত মণিমালাকে। তারপর মণিমালার মুখের কাছে মুখ নামিয়ে বলল মশলা খাবে? মণিমালার দু চোখে সর্বনাশের ডাক, তার আঁখিপাখি পাখা ঝাপটিয়ে বলল, খাবো। ... ...


করুণাদের বাড়ির দুদিক জুড়ে পুকুর আর সামনে বিশ্বাসদের আদিম উদোম বাড়ি। বাড়িটার জায়গায় জায়গায় পলেস্তেরা খসে গেছে। সেই বাড়ির ভেতর থেকে কখনো ভেসে আসে শরিকি খেউর, কখনো টেলিভিশনের সস্তা চটুল গান। এই বিশ্বাস বাড়ির চৌহদ্দিটুকুকেও কত্তারা ছাড়েনি। খুপরি ইটের ঘর বানিয়ে ভাড়া বসিয়েছে। ননা, মনি, সতুদের মত দিন আনা দিন খাওয়া লোকেরা ভাড়া নিয়েছে সেসব ঘর। ননার মা রাতদিনের কাজ করে, মনির বাপটা মিলে কাজ করত, এখন মিল বন্ধ। এখন কেবল নিয়ম করে মনির মাকে পেটায়। সতুর বাপ মুদির দোকানে মাল মাপে, ওরাই এখনো একটু ভালো আছে, গেরস্ত মতো। ... ...

পরীক্ষকের মুখে কোন বাক্যি নেই, পাতা ওলটাচ্ছেন। আমি বললাম আমার ইসরায়েলি ভিসার কাগজটা ওর ভেতরেই আছে আর যদি ব্রিটিশ ভিসা খুঁজছেন আমি সেই পাতাটা খুলে দেখাতে পারি। নিরুত্তরে চোখ তুলে তাকিয়েই আবার পাসপোর্টে মনোনিবেশ করলেন। এতো মন দিয়ে আমি দস্যু মোহন বা দীপক চ্যাটারজির বিশ্বচক্র সিরিজের বই পড়ি নি। পিছনের ভদ্রমহিলাকে আমার সুটকেসটি দিয়েছিলাম আমার অনুমতির অপেক্ষা না রেখে তিনি সেটি খুলে দেখেছেন। ... ...
হিন্দুস্থানের তাজ সেই দমদার পেহলোয়ানের দঙ্গলে কেন মেয়েরা থাকবে আর উত্তর দিয়েছে মেয়েরাই, তারাও হয়েছে সমান পেহলোয়ান। বসে আছে পেহলোয়ানের দল সারি দিয়ে। বেইজ্জতির মাহোলে বেইজ্জত হয়েছে কোন মেয়ে কুস্তিগির। সুরত উল ফজরের আভায় সত্যি দেখতে দেখতে যেন সত্যিই দেখা যাচ্ছে নাইনসাফির ক্ষত। একটু বেলা হতে তাজমহলের রূপটাও একটু অন্যরকমের খোলে। সেই রূপটাকে কোরানের আয়াতে বলল সুরত উল দোহা। তাজা সূর্যের চনমনে রূপ আবার সারিসারি কুস্তিগিরের ওপর দিয়ে ঠিকরে গিয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের ঐসব তাজদের বিপন্ন মুখ দেখা গেলেও তারা বেশ চনমনে এমনটা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে। তারপর দুপুর বারোটা একটা নাগাদ সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর আর গনগনে দেখা যাচ্ছে, রোজ এই সময় -তাজমহলও তার রূপ বদলে নেয়। এইরূপে তাজমহল হল সুরত উল সামস। একইভাবে কুস্তিগীরদের সারটাও দেখা যাচ্ছে বদলে গিয়েছে। এরপর মধ্য আকাশে সূর্য সরে যায়। তার জায়গা নেয় দুরন্ত মেঘেরা। ... ...

ভৌত ধর্মের নিয়মে সে ক্ষয়ে যাচ্ছে টের পায় তিতাস। তিতাস বন্দোপাধ্যায়। তার ৫ফুট ১১ ইঞ্চির শরীর থেকে একটু একটু করে চুন বালি সুরকির আস্তরণ খসে পড়ছে সে বুঝতে পারে। গভীর রাতে সে জেগে ওঠে। আর তখন তার তীব্র জলতেষ্টা পায়। ক্ষয়প্রাপ্ত বাড়ির মতো তার শরীর খুব জল টানে। জোর হাওয়া দিলে ধুলো ওড়ে। জানলা দিয়ে সে দ্যাখে রাতের অন্ধকার ভেদ করে মিটমিটে আলো জ্বেলে প্লেন উড়ে যাচ্ছে দিল্লি কিংবা জয়পুরের দিকে। কতদিন সে প্লেনে চড়েনি! মনে পড়ে না তিতাসের। আর কতদিন? এভাবে চলবে? ... ...

বাংলা ভাষা একটি মিশ্র ভাষা। তার মধ্যে বৈদিক, সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষার অবদান যেমন আছে, তেমনি আছে খেরওয়াল বা সাঁওতালী সহ বেশ কিছু মুণ্ডা ভাষার অতি গুরূত্বপূর্ণ অবদান। বাংলা ভাষার ওপর বৈদিক, সংস্কৃত ও প্রাকৃতের মতো আর্য ভাষার প্রভাবের দিকটি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অস্ট্রো এশিয়াটিক, দ্রাবিড় ও সিনো টিবেটিয়ান ভাষারও যে কম বেশি প্রভাব আছে বাংলা ভাষার গঠনে – তাই নিয়ে আলোচনা তেমন দেখা যায় না। অথচ ভাষাপ্রকৃতির দিক থেকে বিচার করলে বাংলা ভাষার গঠনে মুণ্ডা সহ এসব ভাষার প্রভাবের দিকটি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ... ...


“শুনুন, এটা অনুসন্ধানের ইসরায়েলি কায়দা ! প্রথম জন আপনার সঙ্গে কথা বলে দ্বিতীয় জনকে পাঠাবার আগে রিপোর্ট দিয়েছে, আপনি কি বললেন। সেই লিস্টি মিলিয়ে দ্বিতীয় জন আপনাকে চেক করে। থিওরি হচ্ছে আপনি সত্যি বললে প্রতিবার তাই বলবেন, কোন ক্রিয়া পদ বিশেষ্য বিশেষণ একটু ওদিক হতে পারে,আপনার কণ্ঠস্বরে উষ্মা দেখা দিতে পারে। কিন্তু পর পর তিন বার ধারাবাহিক ভাবে মিথ্যে বলাটা শক্ত কাজ। নিরাপত্তার লোকেদের মনে সন্দেহ হলে আপনাকে পাঁচবারও প্রশ্ন করতে পারে। হিথরোতে আপনি ক্লিন চিট পেয়েছেন। যখন বেন গুরিওন হাওয়াই আড্ডায় নামলেন, আপনি একেবারে কোশার মানুষ ! এখন আপনি আমাদের অফিস কেন, এই উলটোদিকের পার্লামেন্টে গিয়ে একবার উঁকিঝুঁকি দিয়ে আসুন না !” ... ...

Tame birds sing of freedom, wild birds fly.... হাওয়াবিহীন দিনগুলিতে আকাশকে চুপসানো বেলুনের খণ্ড মনে হয় - ফ্রেমে আটকানো; যেদিন বাতাস ওঠে, নীল বেলুনের টুকরো ঢাউস শামিয়ানা হয়ে উড়তে থাকে, মেঘ আর ডানারা মোটিফ তৈরি করে - সাদা কালো লাল নীল মেঘ ছেনে ছোটো ডিঙি, বড় বড় পালতোলা নৌকো, বিশাল সব দুর্গ, হাতি, উট আর বুড়ো মানুষ। তার ওপর ঘুড়িরা লাট খায়, জেট চলে যাওয়ার ঘন সাদা লাইন ফিকে হতে হতেই একগুঁয়ে উড়োজাহাজরা উড়ে যায় আচমকা। পাখিরা চক্কর কাটে আর চক্কর কাটে, শেপ ফর্ম করে - ভি, ওয়াই, এম, এ, ডব্লিউ; কখনও তারা মানুষের কাছাকাছি নেমে আসে এমন, যেন ডানার কথা ভুলেই গিয়েছে। ঘাসের ওপর শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি- ডান হাত মাথার নিচে, বাঁ হাত শুরু হয়েই শেষ হয়ে গিয়েছে, কাঁধের খুব কাছেই চেটো- তাতে তিনটে আঙুল। যেন ডানা। আমি হৃদয়রাম, পঁয়ত্রিশ বছরের এক্ট্রোড্যাকটাইলি পেশেন্ট। উড়তে পারি না অথচ বাঁ কাঁধে কারো হাত ঠেকলে খাঁচায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় পাই। আসলে এ'সবই ডানার গল্প। ... ...

উপত্যকার দিকে তাকিয়ে বেবাক পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কবি। মাথার ওপর যখন চাঁদ ওঠে তখন হাব্বা খাতুন পাহাড়ের বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সেই মেয়ে, জুন বা জুনি যার নাম ছিল, হঠাৎ কেঁদে ওঠে সে। সেই কান্না অথৈ জল হয়ে কিসেনগঙ্গার রূপ নিয়ে বয়ে চলে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কত রঙে সেজে ওঠে সেই পাহাড়। এখনও অপেক্ষায় আছে সে! ... ...