'দাগ আচ্ছে হ্যায়!'
ঝুমা সমাদ্দার।
ভারতবর্ষের দেওয়ালে দেওয়ালে গান্ধীজির চশমা গোল গোল চোখে আমাদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে 'স্বচ্ছ ভারত'- এর 'স্ব-ভার' নিয়ে। 'চ্ছ' এবং 'ত' গুটখা জনিত লালের স্প্রে মেখে আবছা। পড়া যায় না।
চশমা মনে মনে গালি দিতে থাকে, "এই চশমায় লেখার আইডিয়াটা কার ছিল, কাকা ? এটুকু বোধ নেই, আমরা মানুষ ? আমরা দ্বিনেত্র শ্রেনীর প্রাণী ? তায় 'মহান ভারত'বাসী। একসঙ্গে দুটি জিনিস আমরা দুই চোখে দেখতে পাই না।
আমরা হয় 'স্বচ্ছ' দেখতে পাই, নয়তো 'ভারত' দেখতে পাই। 'স্বচ্ছ ভারত' কথাট ... ...
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপণে।'
না, কেবল মুখই ঢাকে না। বুদ্ধিশুদ্ধিও ঢেকে যায়। কর্পোরেট জগৎ, বিজ্ঞাপণ জগৎ যখন যে ভাবে আমাদের ভাবাতে চায়, আমরাও সেভাবেই ভেবে চলি।
কবছর আগে ধুঁয়ো তোলা হোলো, 'লেটস্ সেলিব্রেট ওমেনস্ ডে'। আমরাও নেচে উঠলুম।
'চলো।'
'লেটস... '।
ওমেনস্ ডে-র হদ্দমুদ্দ করে ছাড়লাম। পথে-ঘাটে নেমে, টেলিভিশনে, খবরের কাগজে জিগির তুলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন জ্বেলে - সে কী রইরই ব্যপার! এমনকি, গয়নার মজুরীতে কিম্বা শাড়ীকাপড়ে ওই দিন 'বিশেষ ছাড়ে'র বন্দোবস্তও করা হল।
আবার এব ... ...
বুড়ু'র পাখপাখালী'রা
ঝুমা সমাদ্দার।
"জানিস, আজ এখানে আকাশ'টা কুয়াশার কাছে দশ গোল খেয়ে বসে আছে।" সক্কাল বেলাতেই ফোনের ওপারে বন্ধু।
মনের জানালা খুলতেই স্পষ্ট ফুটে উঠল, সে দেশের মেঘলা আকাশ,ঝিরঝিরে বৃষ্টি, পাগলা হাওয়ায় শিরশিরে শীত।
বাবা বলতেন - "অঘ্রানে বৃষ্টি...চাষের বড় ক্ষতি।"
কী জানি কী একটা ইংরিজি বই হাতে নিয়ে উল্টোতে উল্টোতে চোখেমুখে দুশ্চিন্তা নিয়ে মাথা নাড়তেন বাবা। বাবার সঙ্গে দূর-দুরান্তেও চাষের কোনো সম্পর্ক নেই, তবু বাবার এমন দুশ্চিন্তার কারণ ঠাহর হোতো না মোটেই। ... ...
সেইসব দিনগুলি…
ঝুমা সমাদ্দার
…...তারপর তো 'গল্পদাদুর আসর'ও ফুরিয়ে গেল। "দাঁড়ি কমা সহ 'এসেছে শরৎ' লেখা" শেষ হতে না হতেই মা জোর করে সামনে বসিয়ে টেনে টেনে চুলে বেড়াবিনুনী বেঁধে দিতে লাগলেন। মা'র শাড়িতে কেমন একটা হলুদ-তেল-বসন্তমালতী'র গন্ধ। কাজল পরাতে গেলে 'উঁ' ‘উঁ' শব্দে তীব্র প্রতিবাদ।
"একদম চুপ করে বোসো। চোখ ডলে ডলে, দেখো, সমস্ত গালময় কালি করে ফেললে।" খেলতে পাঠিয়ে দিয়ে মা 'গা-ধুতে' যাবেন।
বড়দিদিদের সঙ্গে খেলতে গেলে তারা চোখ মটকে ঈশারা করে, বলে ‘দুধ-ভাত'। কক্ষনো সে ... ...
পবিত্র ভীমরতি। ( ‘ঝালাপালা' অনুসরণে)
ঝুমা সমাদ্দার।
কেষ্টা। ……… - “গোরু অত্যন্ত পবিত্র জীব, তার ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে, তাই তাকে জাতীয় পশু করা উচিত-” মানে কি ?
পন্ডিত। 'গো'- গয়ে ওকার গো- গৌ গাবৌ গাবঃ, ইত্যমরঃ, 'রু' - 'রোদনং' অর্থাৎ কিনা 'কাঁদিতেছে' - গরু কাঁদিতেছে - কেন কাঁদিতেছে - না তাঁকে জাদুকর বলা হয়েছে - তাকে 'জাদুর ক্ষমতা' দেখিয়ে ভোটে জিততে হবে - তবেই সে 'জাতীয়' হতে পারবে, নইলে সে 'বিজাতীয়' - তাই না দেখে 'গো'- 'রু' অর্থাৎ গোরু কেবলই কান্দিতেছে - [ ঘটির বিকট হাস্য]
পন্ ... ...
"......., ল্লুক আস...."
ঝুমা সমাদ্দার।
মনে পড়ছে, বেশ কিছুদিন আগে একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখেছিলাম।আফ্রিকার ইথিওপিয়ার মুরসি উপজাতির মানুষজনের উপরে ডকুমেন্টারি তৈরী করতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন কিছু ভিনদেশী মানুষজন।
সেখানকার মহিলাদের উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত। নানা রঙের পুঁতির মালা ঝুলছে গলায়। নিম্নাঙ্গে সামান্য বসন রয়েছে। তাদের দেখতে পাওয়া মাত্র ক্যামেরা বাগিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন 'সভ্যতা'র আঁচে সুসিদ্ধ মানুষজন।
সেই সব মহিলারা ক্যামেরার সামনে প্রথমটা খানিক হকচকালেও, ক্রমশ বুঝতে পার ... ...
ইমোশনাল ভিমরতি
ঝুমা সমাদ্দার
আমাদের নাকি আজকাল আর ইমোশন নেই ! আমরা নাকি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছি। বললেই হোলো ! এখন আমাদের বলে 'ডুয়্যাল ইমোশন' যুগ !‘অঃ' ইমোশন আর 'হিঁইইক' ইমোশন। এই দুই ইমোশনে মিলে দেখছি প্রায় কাত করে ফেলেছে আজকাল আমাদের।
"কাশ্মীরে জঙ্গী সন্দেহে মৃত চার গ্রামবাসী। "
- অঃ ! কা..আ..শ্মীরে...ও তো হবেই। (টিভি'টা কেমন ছোট ছোট লাগছে না ? পাল্টাতে হবে। )
“বিবেকানন্দ সেতুতে দুর্ঘটনায় মৃত্যু চার পথচারীর। "
- অঃ ! তা সরে যেতে পারল না ? চোখ বন্ধ করে হাঁটে, নাকি ? ... ...
বিসর্জন
ঝুমা সমাদ্দার
পড়ে রইল রাফখাতার শেষ পৃষ্ঠার এলোমেলো আঁকিবুকি... হলুদ প্লাস্টিকের ঝুটো দুল... চুলের তেলের গন্ধওয়ালা মাথার বালিশ...বেলতলার লাল কাঁকুড়ে পথ ... পড়ে রইল স্কুল ... আমগাছের নীচের বাঁধানো বেদী... পড়ে রইল হাসি-গল্প- ঝগড়া- খুনসুটি... বেগুনী পুটুস ফুল-বনকলমী -হলুদ শিয়ালকাঁটার ফুল... আধ কাঁচা পেয়ারা …টিয়ার ঝাঁক... পড়ে রইল "উবু, দশ, কুড়ি "...পড়ে রইল, “ এ মা !সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেতে নেই"... মিষ্টি গন্ধের সজনে ফুল ... পড়ে রইল 'টেস্ট পেপার' ...পড়ে রইল রেল লাইন...ধোঁয়া ওড়ানো ‘ ... ...
গান-ভাষী
ঝুমা সমাদ্দার
কানের পেছনে এক ঝলক ঠান্ডা ঠান্ডা মিষ্টি গন্ধের হাওয়ার ঝাপটা। হাল্কা …. শুকনো… মিহি ধুলো ওড়ানো। 'লছমনন্ ঝুউলা’... 'লছমনন্ ঝুউলা’... বলে গেল হাওয়াটা, তিন্নির কানে কানে, ফিস ফিস করে। কেমন সুন্দর নাম ! উচ্চারণ করলেই যেন বাজনা বাজে ! তিন্নিরা যাবে দিন কয়েক বাদে। বাবা বলেছে। শুনে অবধি তিন্নি বার বার উচ্চারণ করে নামটা মনে মনে। শুনেছে সেখানে পাহাড় আছে। পাহাড়ের সুরটা কি ওই রকম ?
ঝিরর্ ! মাথায়, হাতে গোটা কতক হলদে রঙের নিমের পাতা ঝরে পড়ল। কতক আবার উ ... ...
ভক্তিমূলক ভীমরতি
ঝুমা সমাদ্দার
জমিয়ে তুলোধোনা চলছে। কে নাকি একজন এক ধর্মের লোক হয়ে অন্য ধর্মের ভক্তিগীতি গেয়ে ফেলেছে। ধর্মের মহামহিম ব্যবসায়ীগন বেশ ক্ষেপে উঠেছেন। গান গাওয়ার দোষে তাঁর সাত চৌদ্দং তিপ্পান্ন পুরুষের স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই না দেখে বটু বড়ই বিচলিত। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, ধর্মই বলো বা রাজনীতি, দেশই বলো আর মানুষ …. ভক্তি ব্যাপারটা কোন লেভেলের গোলমেলে চিজ ? বেশ গম্ভীর মতো মুখ করে চায়ের দোকানের আড্ডায় গিয়ে সে জিজ্ঞেস করে বসে পাড়ার বড়দা মনো ... ...