পরীবন নামখানা সার্থক। পাইন আর দেওদার একদম ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে এমনভাবে মাথা তুলেছে যে আলো আর ছায়া কখনো কাটাকুটি খেলছে তো কখনো লুকোচুরি। পাইনের গাঢ় গন্ধ, দেওদারের ঘন বোতলসবুজ রঙ, আলোছায়ার চিকিমিকি আর হঠাৎ নেমে যাওয়া তাপমাত্রায় গায়ে শিরশিরানি ধরানো ঠান্ডায় ঘোর লাগে। মনে হয় ওই তো কুয়াশারঙা পরী ফুরুৎ করে ভেসে গেল। ওই ওওই যে পরীর ঝিকমিকে ডানাজোড়া নীচের আপেলবাগানের দিকে উড়াল দিল বুঝি বা। ... ...
পাইপ টপকে এগিয়ে দেখি মাটি আর বালি মেশানো রাস্তাগোছের কিছু একটা নদীগর্ভের দিকে নেমে গেছে। লোকজন ঘাড়ে পিঠে বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে সেদিকে নেমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যাচ্চলে! এটা তো সিলেবাসে ছিল না! বাঁপাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা বেশ উঁচু মাটিলেপা চওড়া ধাপ, বাঁশের খুঁটি মাথায় টিনের চাল। ভেতরে একটা পাথরের বেঞ্চমতও আছে। বোধহয় চায়ের দোকান ছিল বা এমনিই বিশ্রামস্থল, আপাতত পরিত্যক্ত। ... ...
আশেপাশে ঘোরার ব্যপারে প্রয়োজনীয় খবরাখবর নিয়ে বাইরে বেরোতেই আলো আর হাওয়া দুভাইবোন হইহই করে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। হাওয়া বলে তুমি না চালাল যাবে, চল চল শীগগির। বললাম দাঁড়া বাপু এককাপ কফি না খেয়ে কোথাও যেতে পারবো না। গুগল বলেছে হোস্টেলের কাছেই রিভারসাইড ক্যাফে। ম্যাপ ধরে পৌঁছে দেখি নদীর ধারের ছাউনিটা বন্ধ। ... ...
একটা বেশ বড়সড় রাস্তার মাঝে দাঁড় করিয়ে ছোকরা বলে নামো, এসে গেছি। অ্যাঁ! হোটেল কই? (বোর্ড আছে কিন্তু তার পাশে তো গভীর শুন্য) এই তো নীচেই। কই কই? এই তো পাশের সিঁড়ি দিয়ে অল্প একটু নামলেই… অগত্যা সীমন্তিনী আর ইমনবাবুকে টা টা করে সেদিকে এগোলাম। তা দেখলাম MMTতে প্রায় ঠিকই লিখেছে। গাড়ি হোটেলের দরজা অবধিই যায় বটে তবে মাঝে সাতষট্টিটা সিঁড়ি আছে। মানে হোটেল আর রাস্তা একই তলে অবস্থান করলে সামনাসামনিই হত, ব্যপারটা 2D থেকে 3D হয়ে যাওয়াতেই একটু ইয়েমত হয়ে গেছে। ... ...
এঁর তীব্র প্রতিবাদে সঙ্গে সঙ্গে সরি বলে দুই কান ধরে মাথা নীচু করেছে। অন্যজনও গর্জে ওঠেন, আগে তাঁর কানে এসেছে সাধারণভাবে মেয়েদের সম্পর্কে কিছু ডেরোগেটরি মন্তব্য। খানিকটা বিরক্ত হয়েই তিনি দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই প্রতিবাদটাও বেরিয়ে আসে। দুজনের দাপটে উল্টোদিকের টয়লেটের লোকটি পায়ে পায়ে পিছিয়ে গেছে বেশ খানিকটা আর এ তো মাথা নীচু করে সরি বলে চলেছে। রাস্তায় নেমে দুজনে বলাবলি করেন প্রতিবাদের কোন বিকল্প নেই। এই লোক নিশ্চয়ই এটা করে অভ্যস্ত। আর অনেকেই রুখে উঠতে পারে না। এবার থেকে কিছুদিন অন্তত অপরিচিত মানুষের গায়ে হাত দেবার আগে দুবার ভাববে। ... ...
ভোর সাড়ে তিনটেয় অ্যালার্ম বাজলেই যাঁরা লাফিয়ে উঠে পড়েন তাঁরা নমস্য ব্যক্তি। অসসি ঘাটে যেতে হবে। তার জন্য বড়রাস্তা অবধি পৌঁছে অটো ধরতে হবে। যদিও সবাই ভরসা দিয়েছেন কাশীতে সারারাত অটো চলে, কিন্তু সে এই একটেরে গাইঘাটে পাওয়া যাবে কিনা কে জানে! এইসব সাতপাঁচ ভেবে দুজনে উঠেই পড়েন। তৈরী হয়ে বেরোতে চারটে পঁচিশ। আকাশ ঘোর অন্ধকার, গলিপথ শুনশান। এমনকি ষাঁড় বা কুকুরেরাও অনুপস্থিত। আর ঝকঝকে পরিস্কার, একফোঁটাও নোংরা, প্ল্যাস্টিক কিচ্ছু নেই। তার মানে রাত্রে এসে পরিস্কার করে যায় আর সকাল হতেই লোকে নোংরা করতে শুরু করে। ... ...
এটা একজন সাহসী মেয়ের সত্যি গল্প। সেই মেয়ে সাহস করে অত্যাচারী বর, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। সে আমাকে তার জীবনের ঘটনা বলে অনুরোধ করেছিল আমি যেন পরিচয় গোপন করে ওর কথা আমার পরিচিত সবাইকে জানাই। পরিচয় গোপনের কারণ ও জেনেছে শর্মাজিদের জাল সারা ভারতে ছড়ানো, তাই ভয় পায়। ভয় পায় সনৎকেও আজও। আমি মেয়েটির এবং বাকীদের নাম বাসস্থান বদলে দিলাম। খুব খুশী হব যদি সুনন্দিনীর কামব্যাক স্টোরি প্রদীপের মত ছুঁয়ে আলো জ্বালাতে পারে ওরই মত মার খাওয়া মেয়েদের জীবনে। মার খেয়ে, শারীরিক মানসিক অত্যাচার সয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িতেচগে, জীবনের ঝুঁটি পাকড়ে ধরে নিজের হাতে নিয়েছে জীবনের দায়িত্ব এমন বারোজন সাহসিনীর সত্যি কাহিনী নিয়ে জয়ঢাক থেকে ২০২৫এর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল দ্বাদশ ফিনিক্স বইটি। এই বারোজন ফিনিক্সপাখীর একজন সুনন্দিনী। ও ছাড়াও বাকী এগারোজনের অনেককেই আমি চিনি, জানি তাদের লড়াই, জেদ, হতাশা, ভাঙতে ভাঙতে কোনরকমে সবটুকু শক্ত জড়ো করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। গার্হস্থ্য হিংসার আগুন থেকে বেরিয়ে আসা এই বিজয়িনীদের কাহিনিগুলো ছড়িয়ে যাক বাংলাভাষী মানুষের ঘরে ঘরে। ... ...
এতদিনে তাহলে ভাগাড়পাড়া স্কুল থেকে একেবারে ছুটি। আর যেতে হবে না ঐ গন্ধের মধ্যে দিয়ে, আর পশ্চিম থেকে হাওয়া বইলে দম আটকে বসে থাকতে হবে না, আর দেখা হবে না ধোপার পুকুরভর্তি বেগুনী রঙের চুড়োমত কচুরিপানার ফুল, মিনুদির মস্ত মস্ত দাঁত আর মস্ত চওড়া সিঁথি, শোনা হবে না টীচার্সরুমের বড় বড় জানলার লোহার রডের ফাঁক দিয়ে কাক ঢুকে দিদিমণিদের কারোর রসগোল্লা বা শিঙাড়া নিয়ে গেলে সমবেত হইহই চীৎকার, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আগে ক্লাস নাইনের ঘরে শান্তিদির রিহার্সাল করানো, নাকে আসবে না ভাঁটফুল আর আশশেওড়া পাতার জংলা গন্ধ। ... ...
ইলিনয় টকাটক উঠতে শুরু করলে কোন্নগর হাঁচড় পাঁচড় করে তাঁর পেছনে ওঠেন। উঠেই সামনে রাখা দাগ কেটে বানানো অর্ধচন্দ্রাকৃতি সূর্যঘড়ি। রাত বারোটা থেকে দুপুর ১১.৫৯ অবধি প্রথমে। একটা পিলারের ওপাশে আবার দুপুর বারোটা থেকে রাত ১১.৫৯ অনুযায়ী দাগ কাটা। ছায়ার অবস্থান দেখে সময় নির্নয় করা যায়। গুণে দেখা গেল ছায়ার অবস্থান অনুযায়ী ১.৪০ বাজে, হাতঘড়ি বলছে ১.৫০। দশটা মিনিট কোথায় লুকালো রে ভাই? ... ...
ঘাটের ধার বরাবর হাঁটাহাঁটি ... ...