এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

  • বিজ্ঞান-মনস্কতার অ-আ-ক-খ # এক

    Ashoke Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | ১১২৩৯ বার পঠিত
  • ফেসবুকে বছর দুয়েক আগে একটা খবর পড়ে চমকে উঠেছিলাম। বিহারের একটি গ্রামে বাবা-মা তাদের দুই যমজ কন্যার একজনকে পুড়িয়ে মেরেছে আর একজনকে সুস্থ করে তোলার অভিপ্রায়ে। সন্তানদুটি দীর্ঘদিন ধরে অসুখে ভুগছিল। কিছুতেই ভালো হচ্ছিল না। শেষে তারা নিরুপায় হয়ে এক তান্ত্রিক বাবার কাছে যায়। সে পরামর্শ দেয়, ভগবান নাকি কোনো কারণে সেই বাবা-মার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে এদের ফেরত চাইছে। তাই ওরা ভালো হচ্ছে না। হবেও না। অন্তত একজনকে ভগবানের কাছে ফেরত দিতে হবে। তাহলেই একমাত্র অপর সন্তানটি সুস্থ হয়ে উঠবে। তারপরেই একদিন বড় সড় আয়োজন করে হোমানল জ্বালিয়ে গায়ে তেল ঢেলে একটি মেয়েকে পুড়িয়ে মারে সেই অশিক্ষিত বাবা আর মা নিজের হাতে। লোকজন জানাজানি হতেই কেলেঙ্কারির এক শেষ। তান্ত্রিক বাবা তারপর থেকে ফেরার হয়ে যায়। অথবা হয়ত মন্ত্রবলে অদৃশ্য?

    অনেক রাত বলে সেদিন দুই চোখ কচলে ভালো করে খবরটা আরও কয়েকবার পড়েছিলাম। তারপর দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে দৃষ্টি ফেলে দেখলাম। না। ঠিকই আছে। ২০১৪। একবিংশ শতাব্দের বেশ ভেতরেই ঢুকে এসেছি আমরা। অথচ . . .

    [ক] বিজ্ঞানমনস্কতা?

    তখন মনে হয়েছিল, বিজ্ঞান-মনস্কতা নিয়ে বিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মী হিসাবে প্রকাশ্য দরবারে আবার দুচার কথা বলার চেষ্টা করা উচিৎ। হয়ত কিছু কাজ হতে পারে। মানুষের মধ্যে নতুন করে ভাবনা চিন্তা শুরু হতে পারে।

    তবে সেই সঙ্গে একথাও মনে হল, বিজ্ঞান-মনস্কতা কাকে বলে এই প্রশ্ন এখনকার দিনের একটা বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের পত্রিকার পাতায় উত্থাপন করা বেশ বিপজ্জনক। পাঠকরা যথেষ্ট মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন। উত্তেজিত হয়ে বলতেই পারেন, “আরে মশাই, আজকাল আমরা ভূত-প্রেত মানি না, ঠাকুর দেবতা মানি না, প্রায় কোনো আচার-বিচারে নেই, বন্ধুদের খেতে বসে জাতপাত বিচার করি না, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা করি না, ল্যাপটপ মোবাইল ডাটাকার্ড দিয়ে সারা দুনিয়ার সঙ্গে সর্বক্ষণ যোগাযোগ রাখি, আর আমাদের আপনি এখন বিজ্ঞানমনস্কতা শেখাতে বসেছেন? যান যান, ফালতু নিজের আর আমাদের কাজের সময় নষ্ট করবেন না। এর থেকে বরং সোনা ব্যাঙ নিয়ে কিছু লিখুন। বাচ্চাদের কাজে লাগতেও পারে।”

    এটা তেমন ভুল কথাও কিছু তো নয়। উপর থেকে দেখলে মনে হয়, ভারতীয় সমাজ মনে হয় বেশ আধুনিক হয়ে উঠেছে। আধুনিক হয়ে ওঠার সাথে বিজ্ঞান-মনস্ক হওয়ারও যে একটা সিধা-সম্বন্ধ আছে তা তো আর কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। অসুখবিসুখ হলে আজকাল সাধারণত অজ পাড়াগাঁয়ের লোকেও জল-পড়া তেলপড়ার দিকে যায় না। সরকারি হাসপাতালেও যায় না। শহরের নামিদামি প্রাইভেট হাসপাতালেই ছোটে। ডাক্তারবাবুদের পরামর্শ মতো নানারকম টেস্ট করায়, অন্তত করাতে আপত্তি করে না। প্রচুর ভিজিট দিয়ে নামডাকওয়ালা স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখায়। তাঁদের প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী দামি দামি ওষুধপত্র কেনে। শুধু ট্যাক্সিওয়ালা বা অটোওয়ালা নয়, রিকশাওয়ালার হাতেও আজাকাল মোবাইল দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, শুধু ভিভিআইপি-রাই নয়, আমাদের মতো সাধারণ ছাপোষা গেরস্ত লোকেরাও এখন জীবনের প্রতিটি ইঞ্চিতে প্রতিটি মুহূর্তে বিজ্ঞানকে জড়িয়ে এবং মানিয়ে নিয়েছে। এরকম অবস্থায় শিক্ষিত মানুষদের সামনে যদি বলি বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে কিছু বলব, তাঁরা ভালোমন্দ কিছু মনে তো করতে পারেনই। তার জন্য তাঁদের কাউকে দোষ দেওয়া উচিৎ না।

    কিন্তু আবার কিছু টুকরো টুকরো ঘটনার স্মৃতি এমনভাবে মনে ভিড় করে আসে, তাদেরকেও তাড়ানো যায় না যে। ওই বিহারের ঘটনাটা যেমন। কিংবা এই যে তার কিছুদিন আগে, সেই বছর, ডাঃ নরেন্দ্র দাভোলকর মহারাষ্ট্রে আততায়ীদের হাতে নৃশংসভাবে প্রকাশ্য রাজপথে খুন হয়ে গেলেন। তাঁর অপরাধ, তিনি বহুদিন ধরে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে শুধু আন্দোলন করছিলেন তা নয়, রাজ্য সরকারকে দিয়ে একটা কুসংস্কার বিরোধী আইন প্রবর্তন করাতেও চেষ্টা করছিলেন যাতে মন্ত্রতন্ত্র বুজরুকি দিয়ে লোক ঠকানো না যায়। যাতে বিহারের মতো—

    [খ] বাংলা কিন্তু এগিয়ে

    বিহারে অমনটা ঘটতে পারে। মহারাষ্ট্রেও সম্ভব। তাই বলে বাংলায়? কদাচ নয়, কুত্রাপি নয়। অন্তত বেশ কিছু শিক্ষিত মানুষকে আমি এরকম কথা বলতে শুনেছি। তাঁরা সত্যিই বিশ্বাস করেন, বাংলা অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় শিক্ষায় চেতনায় যুক্তিবোধে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে আছে। প্রয়োজনের তুলনায় তা কম হতে পারে। কিন্তু কুসংস্কারের নিরিখে আমরা বাঙালিরা সামান্য হলেও বৈজ্ঞানিক মনোভাবনার দিকে এগিয়ে রয়েছি।

    তাই কি? এই আপত্তিটা আবার আমি মানতে পারলাম না। কেন তা বলবার জন্যই এত ধানাই পানাই করছি। একে তো কুসংস্কারের কোনো অভাব নেই আমাদের চারপাশে, বাড়িঘরে, আত্মীয় স্বজন পরিচিতদের মধ্যে। ভাদ্র বা পৌষ মাসে বিয়ে করেন, ছেলের পৈতে দেন, বাচ্চার মুখেভাত হয়—এমন ঘটনা আজ অবধি আমার পোড়া চোখে পড়েনি। শুধু বিহার নয়, বাংলারও মফস্বল বা গ্রামগঞ্জের রাস্তায় গাড়ি নিয়ে চলতে চলতে এপার থেকে ওপারে রাস্তা ডিঙিয়ে বেড়াল চলে গেলে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করেন না, এরকম গাড়িওয়ালা মালিক এবং/অথবা ড্রাইভার খুব বেশি দেখেছি বলে আমি দাবি করতে পারব না। আর সর্বোপরি, বিজ্ঞানমনস্কতা মানে তো শুধু কুসংস্কার থেকে মুক্তি নয়, জীবনের আরও নানা আনাচে-কানাচে যুক্তি ও বিজ্ঞানবোধের প্রয়োগ। সেই হিসাব করলে আমরা কোথায় পড়ে আছি দেখা উচিৎ না?

    কয়েক বছর আগে গিয়েছিলাম কলকাতার আশেপাশের মফস্বলের একটা বড় স্কুলে। বিজ্ঞান অবিজ্ঞান কুসংস্কার ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে বক্তৃতা দেবার কর্মসূচি ছিল। অনেক দিন ধরে এসব নিয়ে আমি বিজ্ঞান আন্দোলনের একজন কর্মী হিসাবে নানা জায়গায় বক্তৃতা দিতে গিয়েছি। ঘন্টা দেড় দুই সময় পেলে এই বিষয়ে খুব জমিয়ে বলতে পারি, যেখানে যাই একেবারে চুটিয়ে বলি, বলার মাঝখানে এবং শেষে শ্রোতাদের তরফে প্রচুর হাততালি পাই। সভার শেষে নিজের ভেতরে একটা কেমন তৃপ্তিবোধ কাজ করে, মনে হতে থাকে, দেশের যাবতীয় কুসংস্কারকে যেন একেবারে হিটলারি ব্লিতস্ক্রিগ-কায়দায় যুদ্ধ করে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছি।

    সেদিনও আমার সেরকমই মনে হয়েছিল। দিনটা ছিল কৃষ্ণা পক্ষের চতুর্থী, সন্ধের দিকে যখন আমরা বেরতে যাচ্ছি, তখনও চাঁদমামা পুবাকাশে আকাশে উদিত হননি। কিছুই না ভেবে খুব সাদামাটা ভাবে কাছাকাছি একজন ছাত্রকে দেখতে পেয়ে জিগ্যেস করলাম, পুব দিকটা কোন দিকে। ছেলেটি আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। মুখের ভাবে মনে হবে ওকে আমি রাজা আলেকজান্দারের জন্মদিন কবে জিগ্যেস করেছি। যা তার জানার কথা নয়। আর এটা যে তার জানার কথা নয় তা আমার তো অন্তত জানা থাকার কথা। অতঃপর সে একজন শিক্ষক মহাশয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, যদি কোনো হাত পা মাথার নড়াচড়ার ইসারায় কিছু আভাস পাওয়া যায়। না, হল না। কোনো শিক্ষকই এতটা ছেলেমানুষি ব্যাপারে নিজেকে জড়াতে চাইলেন না। নিজেকে কেমন যেন উজবেক মনে হল। কুসংস্কার-টুসংস্কার নিয়ে যাদের জন্য এত লড়াই করলাম, সেই সব সৈন্যসামন্তরা যে পূর্বদিক কোনটা এখনও তাই জানে না।

    একজন শিক্ষিকা এগিয়ে এসে আমাকে তাড়াতাড়ি বললেন, “না স্যর, আসলে ছাত্ররা তো কেউ আর এতক্ষণ স্কুলে থাকে না। তাই স্কুল ক্যাম্পাসে চাঁদ কোন দিকে ওঠে দেখেনি। ইন ফ্যাক্ট, আমরা কেউই তা দেখিনি বা লক্ষ করিনি।”

    তা বটে। অকাট্য যুক্তি! স্কুলের ছাত্ররা কিংবা শিক্ষকরা যদি কখনও স্কুলের ক্যাম্পাসে চাঁদ উঠতে না-ই দেখে থাকে, তাহলে স্কুলের ক্যাম্পাসের পূর্ব দিক চিনবে কী করে?

    . . . একজ্যাক্টলি!

    যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকবৃন্দ, আপনারা এবার মনে মনে যা ভাবছেন, আমি বুঝেছি। আমিও এই প্রশ্নে আপনাদের সঙ্গে পুরোপুরি একমত।

    দিনের বেলায় সূর্যকে দেখে তো পুব দিকটা চেনার কথা। চাঁদের জন্য তো আর আলাদা কোনো পূর্ব দিক নেই। তাও কি ছাত্ররা দেখেনি? সেই সব মাস্টারমশাই এবং দিদিমনিরা দেখেননি? সেই দেখার কথা মনে পড়ল না? কিন্তু এক ধরনের কাপুরুষোচিত লজ্জায় এই প্রশ্নটা কেন জানি না কিছুতেই আমি সেদিন ওনাদের কাউকে উদ্দেশ করে আমি আর জিগ্যেস করে উঠতে পারলাম না। আমার ধারণা, আপনারাও কেউ তখন ওখানে থাকলে করতে পারতেন না। আমার মতোই আপনাদেরও অনেকের চোখের সামনে ভেসে উঠত আমাদের স্কুলগুলোতে ভূগোল শিক্ষার নিত্যকর্মপদ্ধতি। পুস্তক পাঠ। লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠের মতন করে পঠন এবং তারই ভিত্তিতে পরীক্ষণ। ক্লাশে মৌখিক প্রশ্নোত্তর। পরীক্ষার খাতায় লিখিত উত্তর। টিক ক্রস হ্যাঁ না ঠিক ভুল। শূন্যস্থান পূরণ। সেই অনুযায়ী নম্বর। ভালো রেজাল্ট, মাঝারি ফল, খারাপ নম্বর। নদী পাহাড় পশ্চিম বঙ্গ এশিয়া আফ্রিকা কৃষ্ণ সাগর আন্টারকটিকা সাহারা নায়াগ্রা—সব আমরা ছাত্ররা উত্তরপত্রে লিখে দিয়ে থাকি কিছুই স্বচক্ষে না দেখে, না বুঝে। না, সব জায়গায় গিয়ে গিয়ে চাক্ষুস দেখার প্রশ্নই ওঠে না। আমি সে কথা বলছি না। কিন্তু মানচিত্রে বা ছবিতেও তো দেখা যায়। দেখানো যায়। তাও দেখিনি। আজও কেউ দেখে না। দেখানো হয় না। দরকার হয় না। সূর্য যে পুব দিকে ওঠে তা বলা বা জানা বা খাতায় লেখার জন্য পুব দিক কোনটা না জানলেও যে চলে—এই মহৎ উপলব্ধিই আমাদের ভূগোল শিক্ষার প্রথম ও প্রধান কথা। এমনকি শেষ কথাও।

    প্রাথমিক স্তরের স্কুলপাঠ্য ভূগোলে খানিকটা জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটা বুনিয়াদি পরিচয় দেওয়া থাকে। বছরের বিভিন্ন সময়ে এক আধবার ছাত্রদের সন্ধ্যা বা রাতের আকাশ দেখানোর উদ্যোগ নিয়ে বইতে পড়া জিনিসগুলোকে, কৃত্তিকা শ্রবণা কালপুরুষ ধ্রুব তারা মঙ্গল বৃহস্পতি শুক্রকে চিনিয়ে দেওয়া, খুব কষ্টকর নয়। কিন্তু সেটুকুও হয় না। যে বাবা-মা স্কুলে ক্লাশ না হওয়া নিয়ে মাস্টারমশাইরা ভাল করে পড়াচ্ছেন না বলে প্রতিবাদে সমালোচনায় সোচ্চার, তাঁরাও এই ব্যাপারে চুপচাপ। বাড়িতে প্রাইভেট টিউটর এসে ভূগোল পড়ালে তিনিও সন্তানকে আকাশ চেনাচ্ছেন কিনা তা নিয়ে তাঁরা আদৌ ভাবিত নন। মাথা উপরে তুলে কিছু দেখা নয়, মাথা নিচু করে টেবিলের উপরে বই খাতার পৃষ্ঠায় নজর দিতেই তাঁরা ছেলেমেয়েকে শেখাতে চান। সাধে কি আর আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের অনেকের নজরই নীচের দিকে চলে যায়?

    আর এইজন্যই আমরা প্রায় কেউই জানি না আমরা যাকে আমাদের ডান হাত বলি সেটা কেন দক্ষিণ হস্ত। বাঁ হাতকে কেন দক্ষিণ হস্ত বলা হল না? তা কি নিতান্তই কাকতালীয়?
    চলুন, এবার একটা অন্য দৃশ্যপটে যাওয়া যাক।

    এক বন্ধুর বাড়িতে গেছি। তাঁর পুত্র, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, মন দিয়ে সোচ্চারে ইতিহাসের পড়া মুখস্থ করছিল, “আলেকজান্দার বন্দি রাজা পুরুকে প্রশ্ন করিলেন, আপনি আমার নিকট কীরূপ ব্যবহার আশা করেন? পুরু বীরের মতো উত্তর দিলেন, একজন রাজা আর একজন রাজার সহিত যেরূপ ব্যবহার আশা করিয়া থাকে। এই কথা শুনিয়া আলেকজান্দার খুশি হইয়া পুরুকে মুক্তি দিলেন এবং ভারতবিজয় সফল করিয়াও তা অধিকার না করিয়াই দেশে ফিরিয়া গেলেন।” মনে পড়ে গেল, আমরাও ছোট বেলায় এই রকম ইতিহাস কাহিনি মুখস্থ করেছি, পরীক্ষার খাতায় লিখেছি, ভালো নম্বরও পেয়েছি। অনেক কাল পরে কিঞ্চিত বুদ্ধিশুদ্ধি হওয়ার পর আমার মনের মধ্যে একটা নিরীহ প্রশ্ন জেগেছিল, এ কি সত্যিই সম্ভব? হাজার হাজার মাইল রাস্তা ঠেঙিয়ে—আর রাস্তা মানে তো এখনকার মতো বাঁধানো পাকা সড়ক নয়, বনজঙ্গল নদী পাহাড় মালভূমির ভেতর দিয়ে কোনোরকম পায়ে চলার সরু পথ—তার মধ্য দিয়ে সুদূর ম্যাসিদনিয়া থেকে পঞ্জাব পর্যন্ত কষ্ট করে এসে স্রেফ পুরু রাজের বীর কাব্যরসে মুগ্ধ হয়ে গিয়ে একজন দিগ্বিজয়ী রাজা নব অর্জিত ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যাবে? এল কেন তবে এ্যাদ্দুর? এ কি বিশ্বাসযোগ্য?

    তখন আবার আমার মনে হয়েছিল, না, ইতিহাস পড়তে হলে, পড়ে বুঝতে হলে, হাতের সামনে সংশ্লিষ্ট ভূগোল বইও খুলে রাখতে হবে। আলেকজান্দার কেন চলে গিয়েছিল বুঝতে হলে পশ্চিম এশিয়ার, ভূমধ্যসাগর থেকে শতদ্রু নদীর পাড় পর্যন্ত, ভৌত মানচিত্রটা খুলে দেখতে হবে। তখন সন্দেহ দেখা দেবে, সেই প্রাচীন কালে অতদূর থেকে ওই মানচিত্রওয়ালা জায়গাগুলো পেরিয়ে ম্যাসিদনিয়ার সিংহাসনে বসে পারস্য আফঘানিস্তান ধরে রেখে পঞ্জাব শাসন করা গ্রিকদের পক্ষে আদৌ সেইকালে সম্ভব ছিল কিনা। আর এইভাবে ইতিহাস পড়তে শিখলে তখন বোঝা যাবে, পুরুর সেই বহুপঠিত সংলাপটি সাহিত্যের ইতিহাসের পক্ষে অতি উপাদেয় উপচার হলেও ইতিহাস সাহিত্যের পক্ষে একেবারেই কোনো লোভনীয় উপাদান নয়। এতে আমাদের জাতীয় আবেগে সুড়সুড়ি দিতে সুবিধা হয় ঠিকই, কিন্তু বুদ্ধির গোড়ায় ধুনো দেওয়ার ধুনুচির আগুন শিক্ষাজীবনের একেবারে শুরুতেই নিবিয়ে দেওয়া হয়।

    এইভাবে ইতিহাস পাঠ করতে শিখলে তবেই বোঝা যাবে, কেন সুলতান বা মোগল আমলের সম্রাটরা দিল্লি থেকে এগিয়ে পূর্বদিকে যতটা রাজ্য বিস্তার করেছে, দক্ষিণ দিকে ততটা যায়নি কেন। স্থলপথ ধরে সাম্রাজ্য বিস্তার বা রক্ষা যে সুবিধাজনক নয়, নদী বা সমুদ্রপথ ধরে এগোনোই যে তখনকার পক্ষে সুবিধাজনক ব্যবস্থা ছিল, এবং সেই অনুযায়ীই যে বিহার বা বাংলার দিকে যত সহজে তারা আসতে পেরেছে, দক্ষিণে তত সহজে যেতে পারত না—এটা বোঝা যাবে।

    সোজা কথায় বলতে গেলে, ইতিহাস ভূগোলও আমাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পড়া এবং পড়ানো উচিৎ, কিন্তু আমরা পড়িও না, পড়াইও না। বিজ্ঞানমনস্কতা এখানেও প্রতিদিন মার খেয়ে চলেছে।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | ১১২৩৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • sm | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৭:০১51378
  • এটা কিন্তু বেশ ব্যতিক্রম; অন্তত ইউরোপ আর আমেরিকায়। বরঞ্চ ইন্ডিয়ান দের সঙ্গে কালো মানুষদের মিশ্রণ বেশি ঘটেছে আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ এসব জায়গায়। কারণ সেখানে অপশন কম ছিল।
    সত্যি কথা বলতে কি সাদা মেয়ে/ছেলে র সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করতে পারলে ইন্ডিয়ান লোকেদের সামনে কদর একটু হলেও বাড়ে কিন্তু কালোদের সঙ্গে হলে কেস একেবারে কেঁচিয়ে যায়।
    পরিবারে লোক জনের অখুশি,পাড়া প্রতিবেশীর মুখ টিপে হাসি,এসব সহ্য করা বেশ কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়।
  • কুমড়োপটাশ | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৭:০৩51379
  • ভাদ্র হোক কি অন্যমাস, আপনি বিজ্ঞানমনস্কতার প্রবন্ধে পৈতে দেবার কথাটা তুললেন কীকরে? পৈতে বিজ্ঞানমনস্কেরা দেয়? নাকি ভাদ্রমাসে না দিলে সে যথেষ্ট বিজ্ঞানমনস্ক নয়?
  • কুমড়োপটাশ | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৭:০৬51380
  • আমার সেই দাদাবৌদি নর্থ ক্যারোলিনায় থাকেন। ওঁদের পুত্র আমার চেয়ে কিছু ছোট। অন্য একটা বাংলাওয়েবসাইট থেকে আলাপ হয়েছিল ওঁদের সঙ্গে। এরকম লোক আরো আছে।
  • একক | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০১:১৬51383
  • আপনার কাছে যদি "ক্ষণের শুভ -অশুভ হয়না " এইটা বিষয় হয় , তাহলে উত্তর হ্কছে ক্ষণের শুভ -অশুভ হয়ালেই হয়, বিলক্ষণ হয় :)

    পৈতে থাক।

    আমি বল্লুম মাঘের শুরুর অমুক অমুক দিন বিবাহের জন্যে মঙ্গলজনক। এতে কী ঘটল ? লোকে ওই দিন মেনে বিয়ে রিকোয়েস্ট সেন্ড করতে থাকলো। সঙ্গে সঙ্গে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি থেকে ফুলোয়ালা - সতরন্চীয়য়ালা সবাই ঐরকম ডেট ধরে জড়ো হতে থাকলো। যেই একটা নির্দিষ্ট সময়ে প্রচুর স্টক রিকয়ারমেন্ট হলো অমনি স্টোরেজ এর চাহিদা বেড়ে গ্যালো। মাছ জমিয়ে রাখতে মানিকতলায় কয়েক লরি বরফ চলে এলো। মিষ্টিওয়ালা ওই সীসন মাথায় রেখে মিষ্টি বানালো। লেপওয়ালা লেপ বানালো। একটা পুরো সিস্টেম গড়ে উঠলো ওই নির্দিষ্ট সীসন কে কেন্দ্র করে।

    এরপরেও, লেপের তলায় হাম্পটিদম্পতি ও বছর্ঘুরতে নাম্বার গেম আবার একটা নির্দিষ্ট মাস জুড়ে সেই হিসেব ধরছিই না।

    শুধু এইটুকুই বলার, যে আপাত কারণহীন ভাবে একটা নির্দিষ্ট সময়ের ওপর "শুভ" নির্ধারিত করে দেওয়ায় কীভাবে মার্কেট ডাইনামিক্সএ প্রভাব পড়ে এবং তার শুভফল সবাই মিলে ভোগ করে। কাজেই ওই কারন টা "সু " না "কু " ও দিয়ে কিস্যু যায় আসেনা। ফলাফল কু হলে কু নইলে নো প্রবলেম।
  • দীপঙ্কর | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০১:২১51384
  • শুধু পৈতে নিয়ে পড়ে থাকলেই হবে ? বিয়ের ব্যাপারে কি বলবেন ? পৈতের ক্লেশ তো তার কাছে নস্যি। আর বিয়ে তো সংস্কারের মতই, সু বলে কিছু হয়না। সু-কু ভাগ করলেই লোকে নিজের বিয়ের মধ্যে মরিয়া হয়ে সু আবিষ্কার করার চেষ্টা করে।
  • কুমড়ো | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০১:৪১51385
  • এইজন্যই আমি বিয়ের এগেইন্সটে। এস্পেশালি যেকোনো ধার্মিক আচার মানা বিয়ে। প্রত্যেকটায় কুসংস্কার গিজগিজ করছে। ভার্জিন কনের হোয়াইট ড্রেস। সেকেনটাইম বিয়ে হলে হোয়াইট নট্যালাউড।
  • sm | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:০১51386
  • এতক্ষনে ঠিক কথা বলার লোক পাওয়া গেলো। বিয়ের এগেনস্টে। খুব ভালো কথা। পসন্দ আপনা আপনা।কিন্তু বিয়ে বদল যদি লিভ টুগেদার হয়; সেইডা কতটা ভালো? নাকের বদলে নরুন না নরুনের বদলে নাক।
  • π | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:০৪51387
  • লোকে লিভ টুগেদারে আচার খায় না মাথায় মাখে ?
  • sm | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:০৬51388
  • আমার তো পৈতে খুব ভালো লেগেছিলো। কৃচ্ছ সাধন কিছুই না। খালি তিন দিন নিরামিষ হবিষ্যি খাওয়া। আর কান ফুটানো বলে একটা ব্যাপার ছিল। তা আজকাল কার দিনে ট্যাটু তে যা কষ্ট তার কাছে নস্যি।
    প্রচুর গিফট পেয়েছিলাম। প্রচুর গল্পের বই। তিনদিন পড়া বন্ধ। বিভিন্ন গপ্পের বই পড়ে,
    প্রচুর আনন্দ পেয়েছি।
    কুসংস্কার কিছু লক্ষ্য করিনি।
  • sm | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:০৮51389
  • পাই এর প্রশ্ন ভালো করে বুঝলাম না।
  • সিকি | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:৩২51390
  • ইন ফ্যাক্ট, ঐ বয়েসে আমিও কিছু কুসংস্কার লক্ষ্য করি নি। "অব্রাহ্মণ" সামনে এলে সামনে গেরুয়া ভেল্‌ ঝুলিয়ে দেওয়া যাতে সে আমার মুখ দেখতে না পায়, কেবল "ব্রাহ্মণ"দের সামনেই ঘোমটা তুলে থাকা যেত, কী যে ফানি ছিল সেই সময়ে এইসব ... :)
  • ashoke mukhopadhyay | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:৪৫51391
  • নামের সমস্যা নিয়েও দু চার কথা বলা দরকার। জাতিভেদ দূর করার ক্ষেত্রে নাম থেকে পদবী ছেঁটে দিলেই কাজ হয়ে যাবে—এরকম একটা সরল ধারণা থেকে আর্যসমাজীদের একটা অংশ উত্তর ভারতে অনুরূপ উদ্যোগ নিয়েছিল। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমি যদি অশোক কুমার নাম ধারণ করে ব্রাহ্মণ্য আচার এবং আচরণ সমস্তই ধরে রাখি, জাতির গায়ে সুড়সুড়িও লাগবে না। পক্ষান্তরে যেটা প্রধান কথা, নাম যাই হোক, আচার এবং আচরণে যদি, যেখানেই সুযোগ আসবে, ব্রাহ্মণ্য রীতিকে বর্জন ও আঘাত করি, তাহলেই একমাত্র এই যুদ্ধে দু এক মিলিমিটার করে হলেও অগ্রগতি ঘটবে। এই কাজটা আমরা করি না বলেই জাতিভেদ আজও সমাজে দৃঢ়মূল হয়ে বসে আছে।

    দুটো ঘটনার কথা বলি (লিঙ্ক দিতে পারব না, আগেই জানিয়ে রাখি): কংগ্রেসের কোনো এক অধিবেশনে পেরিয়ার প্রশ্ন তুলেছিলেন, গান্ধী অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে কত কথা বলছেন, অথচ, তাঁর উপস্থিতিতেই ভোজনের সময় প্রতিনিধিদের ধর্ম ও জাতির ভেদাভেদ মেনে পংক্তি রচনা করে খাওয়া দাওয়া চলছে—এরকম হবে কেন? গান্ধীর বক্তব্য ছিল, এ না হলে সবাইকে ধরে রাখা যাবে না। পেরিয়ার কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আজাদ হিন্দ বাহিনীতে সুভাষচন্দ্র নিয়ম করেছিলেন, ভোজনের মেনু যার যাই হোক, এক ঘরে পাশাপাশি বসে খেতে হবে। সুভাষ বসুর পাশে সবচাইতে ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন কিছু মুসলিম ও শিখ যোদ্ধা।

    একটা কুসংস্কার ভাঙলেই তবে তার বিকল্প একটা সভ্য রীতি গড়ে উঠতে পারে। সেটা নাম বদলে হবে না, কাজে বদলাতে হবে।
  • | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:৪৬51392
  • কাবলিদা,

    খেয়াল করি আগে আপনার মন্তব্য। যাই হোক, ইউটিলিটি জানি তো। আপনি যে অ্যাসাম্পশান থেকে ভাবছেন যে ইউটিলিটিগুলো হয়তবা জানি না, সেই অ্যাসাম্পশানটা সম্ভবতঃ ভুল। :-)
    আরো টুক্লটাক ইউটিলিটি আছে। মশারির দড়ি ছিঁড়ে গেলে একরাত চালিয়ে দেওয়া, হঠাৎ কিছু বাঁধতে হবে পৈতে খুলে বেঁধে নেওয়া। এমনকি স্কুল যাওয়ার পথেই চটি ছিঁড়ে গেছে, পৈতে খুলে চটিটাকে পায়ের সাথে সাপটে বেঁধে নেওয়া (এই কম্মটা আমার ভাইয়ের এবং এটা এখনও আমাদের আত্মীয় পরিজনেরা গালে হাত দিয়ে বলে থাকেন)

    যাই হোক, পৈতে বা বিয়ের মন্ত্র হেলথ রিজনে ইমপ্লিমেন্ট করা হয়েছিল এবং লোককে মানানোর জন্য ধর্মের মোড়ক দেওয়া হয়েছিল, এইটা ভাবতে পারলাম না চেষ্টা করেও। আর যদি হতও তাহলে এখন তো আর ঐটের কোনও ইউটিলিটি নেই, তাই না? তাহলে বাদ দেওয়াই ভাল না? যেমন কালীঠাকুরের সামনে নরবলি দেওয়া বাদ হয়ে গেছে, তেমনি? কী বলেন?
  • sm | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:৫৬51393
  • আমার বাড়িতে এমনি কোনো পর্দা প্রথা ছিল বলে মনে করতে পারছি না।বরঞ্চ ব্রহ্মচারী এসবের উর্ধে; এই রকম ফিলিং ছিল। এমনিতে তো ব্রহ্মচারী হলো গিয়ে একজন ভিক্ষুক।সে সবার কাছে ভিক্ষে চেয়ে বেড়াচ্ছে।বড়োরা এসে প্রণাম করেছে। কারণ এটা পার্ট অফ ঠিক ধর্ম/লোকাচার। অন্ধকার ঘরে তিন দিন থাকতে হতো।বোধহয় নারীর মুখ দেখা বারণ ছিল।তা, যদি মুখ না দেখে তো কার কি এসে গেলো?,
    সিকি যদি কালকে গিয়ে বলে, বসের মুখ দেখবেনা বা ভেল ঝুলিয়ে দেখবে, তো, বসের কি এসে যাবে? সিকির এসে যেতে পারে।
  • sm | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৫:০৯51394
  • অশোক বাবু অনেক যুক্তি দিলেন,দেখালেন ধর্মীয় রীতিনীতি,সংস্কার এসব কত বর্জ্যনীয়।পৈতে/সারনেম কতটা পরিত্যাজ্য। সব কিছুই অনস্বীকার্য্য। তো সারনেম দিয়ে বোঝা তো যাচ্ছে,আপনি বা অন্য কেউ ব্রাম্হন।আপনি প্লেসহোল্ডার।
    তা,পদবি মেনশন না করা বা তুলে দেওয়া টা প্রাথমিক কর্তব্য হওয়া উচিত নয় কি?এতো ইংরেজ চলে গেছে কিন্তু টাই জুতো ফেলে গেছে ;এরম ব্যাপার।
  • ashoke mukhopadhyay | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১২:৪১51381
  • [১] পৈতে দেওয়া মানেই একটা কুসংস্কার মেনে চলা। পঞ্জিকা দেখে শুভ মাস দিন ক্ষণ দেখে দেওয়াই হোক, আর ভাদ্র মাসেই হোক। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম, আজ অবধি দিন ক্ষণের শুভাশুভ বলে যে কিছু হয় না, এটাও আমরা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একটা বিরাট অংশ এখনও বুঝে উঠতে পারিনি।

    [২] সংস্কার মাত্রই কু। অন্তত আমার ধারণা এই রকম। একটা সংস্কারের সঙ্গে আরও পাঁচটা সংস্কার জড়িয়ে থাকে। যেমন পৈতের সঙ্গে শুভাশুভক্ষণের ধারণা। যারা এই সব অনুষ্ঠানে সমবেত হন, তাঁরা এই সব ধারণাগুলোকে নিয়ে আরও চর্চা করেন। কার কবে কোন উপচার মানায় ভুল করে ফেলায় কী বিপদ হয়েছিল—তার নানা রকম গল্প করেন। যার পৈতে হয়, তাকে বেশ কিছু আচার পালনের মধ্য দিয়ে শারীরিক ও মানসিক ক্লেশ সহ্য করতে হয়, অনেক সময়ই ইচ্ছার বিরুদ্ধে, পারিবারিক চাপে। ফলত, কারোর কোনো ক্ষতি না করে সংস্কার মানা সম্ভব বলেই আমার মনে হয় না। এই অর্থেই কুসংস্কার।

    [৩] একবার সংস্কারগুলিকে ‘কু’ ও ‘সু’-তে ভাগ করার সুবিধা দিলে, প্রত্যেকেই যে যেটা মেনে চলেন, তার মধ্যে সু-আবিষ্কার করতে শুরু করবেন। গোবরে ব্যাক্টিরিয়া নিধন (ডঃ অসীমা চ্যাটার্জী), অশৌচ পালনে জীবাণু ধ্বংস (ডঃ বিশ্বরঞ্জন নাগ), বেড়াল রাস্তা পেরলে গাড়ি থামানোতে দুর্ঘটনা হ্রাস, সাপের দুগ্ধপানে বিশ্বাস করলে সর্প নিধন বন্ধ—এই রকম আর কি। আর মানসিক শান্তির একটা সর্বজনীন গল্প তো আছেই। তখন আর কুসংস্কার বলে কিছুই থাকবে না। ক্যালেন্ডার থেকে আমরা এক ধাক্কায় হাজার দেড়েক বছর বাতিল করে দিতে পারব।

    [৪] সর্বোপরি, এই সব কুসংস্কার পালন বা সমর্থনের মধ্যে এক ধরনের অবৈজ্ঞানিক মনন মানসিকতার পরিঘটনা আছে। যা সত্যের অনুসন্ধান ও উপলব্ধিতে বাধা দেয়। যা এমনকি অনেক সময়েই সমাজের ভালোমন্দের ব্যাপারেও ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দিতে থাকে। এরই ভিত্তিতে বিবেকানন্দ গান্ধী ও রাধাকৃষ্ণান জাতিভেদ প্রথার ভেতরে প্রাচীন সমাজের এক উন্নত ও আদর্শ শ্রম বিভাজনের খবর পেয়েছিলেন। তাই সমস্ত কুসংস্কারের বিরুদ্ধেই আমাদের প্রচার চালাতে হবে।
  • avi | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১২:৫০51382
  • সহমত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন