এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  নাটক

  • চাগ্রীর গপ্পো

    সে
    নাটক | ১৩ নভেম্বর ২০১৪ | ৩০৭৪৫ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সে | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৫:২৬652274
  • একদিন বিকেলের গেছি একটা সোনার গয়নার দোকানে। ঐ একই কাজ - পেমেন্ট আনতে। জায়গাটা ক্ষেত্র দাস লেন থেকে বেরিয়ে অলিগলিচলিরাম করে শেষে বড়ো রাস্তায় সম্ভবত বি বি গাঙ্গুলী স্ট্রীটে গিয়ে পড়েছে। হেয়ার স্ট্রীট থানার আন্ডারে। মাঝারি মাপের গয়নার দোকান। একজনও খদ্দের নেই তখন। মালিক ক্যাশবাক্সের পেছনে বসেছিলেন। পেমেন্ট দিলেন। আমি দিলাম কিছু কাগজপত্র।
    আবার সেই ঘিঞ্জি গলিগুলো পেরিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরছি। একটা জিনিস বুঝতে পারি নবাব্দা আমার কাজে তেমন সন্তুষ্ট নন। উনি ঠিক কী চান সেটা বুঝে উঠতে পারিনা। সমস্ত দিন টোটো করে ঘুরে বিজ্ঞাপন নিয়ে আসব? এটা কেমন করে সম্ভব? কোথায় যেতে হবে, কোন কোম্পানীতে যেতে হবে, সে সমস্ত বলে না দিলে হুটহাট যেকোনো জায়গায় গিয়ে বিজ্ঞাপন চাইলেই তারা দেবে নাকি? নাকি নবাব্দা ধরেই রেখেছেন যে আমার সব বড়ো বড়ো কোম্পানীতে অনেক চেনা জানা আছে, তাদের কাছে গেলেই তারা হাজার হাজার টাকার বিজ্ঞাপন দেবে? এরকম হয় নাকি? এরকম যদি হোতো, তবে তো নিজের জন্যেই একটা কোনো ব্যবস্থা করে ফেলতাম। অ্যাড্‌হিয়ার অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সীর অ্যাকাউন্ট্‌স্‌ এক্‌জেকিউটিভ ওরফে ফেরিওয়ালার চাকরি কে করতে আসত? যে অফিসে আমার নিজের বসবার একটা চেয়ার পর্যন্ত নেই। একটা ভিজিটিং কার্ড পর্যন্ত দিতে পারিনা কোনো ক্লায়েন্টকে। নামের জায়গা ফঁকা রাখা কিছু কার্ড আছে - সেখানে নামটা লিখে দিই। নাকি নবাব্দার ধারনা এইরকম যে মেয়েরা গিয়ে অ্যাড চাইলে পাবেই। জানিনা। আমার না আছে কোনো চেনাশুনো, না আছে কোনো ম্যাজিক্যাল পাওয়ার। সেই সিএম্‌সি এনে দিয়েছিলাম, তার পরে ছোটোখাটো দুয়েকটা- ব্যাস। পনেরো দিনের ওপর হয়ে গেছে এর বেশি পারিনি। একে তো শরীর দুর্বল। মন আরো বেশি দুর্বল। সেইসঙ্গে রয়েছে পার্শিয়াল লস অফ মেমরি। কত জিনিস যে ভুলে গেছি। ও নিয়ে ভাবতেও চাই না। যেমন চলছে চলুক।
    গলিঘুঁজি পেরিয়ে একটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গা। একচিলতে পার্কের মতন। ঘাস ফাস কিছুই নেই যদিও। রাস্তার একপাশে অনেকগুলো লোহালক্কড়ের দোকান। তারা রাস্তা জুড়ে লড়ি দাঁড় করিয়ে লম্বা লম্বা রড লোড করছে। আরেকপাশে গরীবমানুষদের জন্যে ভুজিয়াওয়ালার দোকান। শুকনো বালিতে ভাজা ছোলা মটর ছাতু মুড়ি। কয়েকজন ঠেলাওয়ালা বসে বসে খাচ্ছে ফুটপাথের এককোণে। এই অঞ্চলটা পেরিয়ে এলেই আমি ক্ষেত্রদাস লেনে ঢুকতে পারব। আবার সেই ছোট্টো এয়ারক্ডিশান্ড অফিস ঘর। আবার বসবার জন্যে সেই বাক্সের মতো বেঞ্চিটা। অবশ্য যদি ফাঁকা পাই। হয়ত আবার কোথাও পাঠাবে, নয়ত অসন্তুষ্ট্মুখে তাকাবে আমার দিকে নবাব্দা।
    গলির মুখটায় ঢুকতেই দেখলাম একটা ভাতের হোটেলের পাশে বেঞ্চিতে তপন বসে আছে। ওখানে বিকেলের দিকে চা ও বানায়।
    তুই কি ঐ সোনার দোকানে গিয়েছিলি নাকি?
    হ্যাঁ। পেমেন্ট নিয়ে আসছি।
    তপন উঠে কী একটা কাজে চলে গেল।
    পেমেন্টের চেকটা হাতে নিয়ে সেই মইয়ের মতো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই দেখি নবাব্দা এক্কেবারে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে।
  • সে | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৫:৫৩652275
  • চেক দিয়ে দিয়েছে? বেশ। একটা কাজ করুন তো, নরেশ বেরিয়েছে আর অন্য কেউ নেই বাসবী ছাড়া। একজন গেস্ট এসেছেন। আপনি চট করে একটু চা নিয়ে আসুন।
    চা?
    হ্যাঁ ঐ গনেশচন্দ্র অ্যাভিনিউয়ে পড়লেই বাঁ হাতে গাছতলায় চায়ের দোকান। এখানে আমাদের জন্যে তিন কাপ, আর আপনি নিজে যদি খেতে চান তো চার কাপ। আর ভাঁড় নয়, গ্লাস। একটু তাড়াতাড়ি আনবেন।

    চেকটা হাতে ধরিয়ে নীচে নেমে বড়ো রাস্তায় বাঁহাতে সেই গাছতলা। ওখানে দুটো কেটলিতে সবসময় চা থাকে। পড়ন্ত বিকেলের খদ্দেররা এসে গেছে। বসবার কোনো জায়গা নেই এখানে। সবাই দাঁড়িয়ে খায়। বয়ামে আছে বিস্কুট।
    চারগ্লাস চা চাইলাম।
    কীকরে নিয়ে যাবেন?
    এইরে! এটাতো এতক্ষণ মাথায় খেলেনি। আসলে ভাবনাগুলো এত এলোমেলো হয়ে রয়েছে যে ছোটোখাটো জিনিস নিয়ে তেমন ভাবিও না। কতলোকে কত কী বলছে, বলেই চলেছে, সমস্ত শুনবার কোনো দরকার তো নেই। কিন্তু দুহাতে চারগ্লাস গরম চা কীকরে নিয়ে যাব? আচ্ছা ধরা যাক আমি খেলাম না। যদি তিনগ্লাস নিই? তাহলেও সমস্যা। অবশ্য ওরা আমার থেকে এই সমস্যার সমাধান চায় ও নি। নিজেরাই একটা ছোটো কেটলিতে চা ঢেলে দিলো এবং হাতে ধরিয়ে দিলো চারটে খালি কাঁচের গেলাস।
    এগুলো ফেরৎ দিয়ে যাবো কখন?
    ও ফেরৎ নিতে বাচ্চা যাবে। অ্যাড্‌হিয়ার তো?
    হ্যাঁ।
    বাচ্চা আসবে গেলাস, চায়ের দাম, কেটলি এসব নিতে। বাচ্চা তখন খুব ব্যস্ত। অনেক কাস্টমার। ওর কোনো নাম নেই। সকলেই ওকে বাচ্চা বলে ডাকে।
    চা গেলাসে ঢেলে দিলাম প্রত্যেককে। গেস্ট যিনি এসেছেন এক মধ্যবয়স্ক মানুষ। বেশ অধ্যাপক অধ্যাপক চাপ চেহারায়। ইনি কপিরাইটিং করেন।
    একটা জিনিস আগেও লক্ষ করেছি সেদিনও করলাম - সেটা হচ্ছে মানুষ সময় বিশেষে চোখে ফিল্টার লাগিয়ে রাখে। দেখেও দেখে না। এই যে আমি নবাব্দার কেবিনে দুগ্লাস চা নিয়ে টেবিলের ওপরে রাখলাম, সেটায় কপিরাইটারবাবুর সঙ্গে নবাব্দার আলোচনায় কোনো ব্যাঘাত ঘটালো না। হয়ত নরেশ যখন চা দিতে যায় তখনো এইরকমই হয়। কিংবা বাচ্চা যখন চায়ের কেটলি নিয়ে অন্যান্য অফিসে ঘোরে সকালবেলায়, তখনো এরকমটিই ঘটে। আসলে আমি কোনোদিন এরকম কাজ বেশি করিনিতো আগে। খুব কম অভিজ্ঞতা আমার। ঐ কপিরাইটারের সঙ্গে একই টেবিলের পাশে অন্য একটা চেয়ারে বসলে তখন উনি আমায় লক্ষ করতেন, হাই হ্যালো নমস্কার এইসব। যে মুহূর্তে আমার কাজটা হবে চা দেবার, তৎক্ষণাৎ হাই হ্যালো নমস্কার ধন্যবাদ সমস্ত উধাও হয়ে যাবে।
  • সে | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:১৮652276
  • বাচ্চার কোনো নাম নেই। আমারো কোনো নাম নেই। চা দিতে ঢুকেছিলাম যখন কেবিনে কোনো কথা হোলো না, আমার সঙ্গে আলাপও করিয়ে দিলো না কেউ। এটাই নিয়ম। এতে এখন আমার কিছুই এসে যায় না।
    ভাবলাম বেরিয়ে যাই। বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
    নরেশ নেই, দেবরূপও ফেরেনি। বাসবী কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রি করে চলেছে। একটু পরে পরেই সে প্রিন্ট আউট নেয়, ডট্‌ ম্যাট্রিক্স প্রিন্টারে। ক্র্যার্‌র্‌ ক্র্যার্‌র্‌ করে আওয়াজ হয়।
    কাজরী একটু পরে হৈ হৈ করে ফিরে আসবে।
    নীচে নামতেই তপনের সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল।
    কোথায় যাচ্ছিস আবার?
    এমনি একটু ঘুরে আসি। সন্ধ্যে হয়ে গেল। আর দু ঘন্টা। তারপরে ছুটি।
    চল আমার সঙ্গে এক জায়গায়। যাবি?
    চল।
    তপন আমাকে নিয়ে যায় ধর্মতলা স্ট্রীটে অনেক অনেক বছর আগে যে বাড়ীটার ইস্‌কাসের অফিস ছিলো, সাইনবোর্ড ঝুলত আরো অনেকবছর ধরে, সেই বাড়ীটায়। নয়ত তার পাশের বাড়ী, বা পাশের পাশের বাড়ী। কে জানে হয়ত একশো দেড়শো বছর বয়েস হবে এই বাড়ীগুলোর। গাড়ীবারান্দাওয়ালা। দোতলায় একটা স্টুডিও। ফোটো স্টুডিও। অনেকটা বোর্ণ অ্যান্ড শেফার্ডের মতো। কিন্তু সেরকম নামকরা কিছু নয়। মানে দলে দলে লোক এখানে এসে ফোটো তোলায় বলে মনে হয় না।
    দোতলায় ভেতরের বারান্দায় একটা পাশে অনেক নতুন বই স্ট্যাক করে রাখা। কোনো পাবলিশিং হাউস ও আছে সম্ভবত এই বাড়ীরই অন্য কোথাও। যে ঘরটায় আমরা ঢুকি সেটা আগের দিনের উঁচু সিলিংওয়ালা। সিলিংএ কড়ি বরগা রয়েছে। সিমেন্টের মেঝে ফাটাফাটা। বড়োবড়ো জানলা আর দরজার বাইরে সেই লম্বা বারান্দা। ঘরের মধ্যে আদ্যিকালের ঢাউশ সেক্রেটারী টেবিল। গোটা কয়েক পুরোনো কাঠের চেয়ার। একটার সঙ্গে অন্যটার কোনো মিল নেই। ঘরে পূবদিকটা ঢাকা আছে একটা কালো পর্দা দিয়ে। মানে পর্দাটা এককালে হয়ত কালো ছিলো, এখন রং চটে গিয়ে ফ্যাকাশে মেরে গিয়েছে। এছাড়া রয়েছে রাজ্যের কাগজপত্র দেয়াল আলমারীতে। সেখানে ধুলো জমেছে। আর রয়েছে ভারী ভারী দুটো আলোর স্ট্যান্ড। এরকম আলোর স্ট্যান্ড আমি সিনেমার স্টুডিওতে আগে দেখেছি।
    আলো জ্বলছে, পাখা চলছে। অথচ ঘরে কেউ নেই।
  • সে | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:৫৮652277
  • প্রায় মিনিটখানেক আমরা ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকি। তারপরে তপন হাঁক দেয় - মণিদা আছেন নাকি?
    কালো পর্দার ওপার থেকে উত্তর আসে।
    আসছি। বোসো।
    আপনি ব্যস্ত থাকলে পরে আসছি।
    বোসো বোসো।

    আমি তপনের দিকে তাকাই। ওদিকটায় কী আছে রে?
    তপন মুচকি মুচকি হাসে।
    আরেকটা ঘর?
    ওদিকটায় কেয়ামৎ আছে।
    মানে?

    পর্দা সরিয়ে মণিদা ঢোকেন। প্রৌঢ় ভদ্রলোক। টাক ও ইতস্তত কিছু কাঁচাপাকা চুল।

    আপনি কি এখন ফোটো তুলছিলেন?
    আরে না না। চলো ওদিকেই চলো।
    এরপরে আমার দিকে তাকান মণিদা। আমরা পর্দা সরিয়ে কেয়ামতের দিকটায় ঢুকি।
    এটাই আসল স্টুডিও যেখানে ফোটো তোলা হয়। একটাদিকের দেয়ালে প্রচুর স্বল্পবসনা মেয়ের ফোটো। ক্যালেন্ডারে যেমন থাকে। এই ফোটোগুলো এইঘরেই তোলা হয়েছে।
    ইনি কে? আলাপ করাও।
    তপন আলাপ করায়।
    আমি প্রথমে ভাবলাম তোমাদের কোনো মডেল হবে হয়ত। কিছু মনে করবেন না যেন।
    না না, মনে করব কেন?
    তপনের কী সব যেন ফোটো নেবার ছিলো সেগুলো তৈরী হয়নি এখনো। মণিদাকে তাড়া দিতে এসেছিলো বোঝা যায়।

    ওখান থেকে বেরিয়ে তপন বলে, যে ফোটোগুলো দেখলি টাঙানো ছিলো, সমস্ত মণিদার তোলা। সোনার গয়নার যত অ্যাড থাকে এখানেই ফোটোগুলো তোলা হয়।
    ঐ কালো পর্দার আড়ালে?
    হ্যাঁ। তারপরে হাতে এঁকে আমরা ফিনিশিং টাচ দিই। ঐ ফোটোগুলো যখন তোলা হয় তখন বাইরের লোকেদের ভেতরে ঢোকা নিষেধ।
    বুঝেছি।
    ছাই বুঝেছিস।
    কেন? অনেক দামী গয়না থাকে। ন্যাচারালি।
    সেতো থাকেই। তার ওপোরে মডেলদের আপার বডিতে গয়না ছাড়া আর কিচ্ছু থাকে না। ফোটোয় গয়নার সঙ্গে যতটুকু দরকার রেখে বাকীটা বাদ দিয়ে দেয়। তারপরে আমরা স্প্রে পেন্টিং করে যেখানে যতটা দরকার সেরকম টাচ দিই।
    আমি শুনে যাই।
    এই মডেল সাপ্লাই করবারও চ্যানেল আছে। নবাব্দার কাছে আসেন এক ভদ্রমহিলা। সল্টলেকে থাকেন। উনি মেয়ে সাপ্লাই করেন। মানে দালাল বলতে পারিস।
  • সে | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৭:১৮652278
  • কী ভাগ্য আমাদের! তপনের সঙ্গে অফিসে ফিরতে না ফিরতেই দেখা হয়ে গেল মিসেস মজুমদারের সঙ্গে। ভারী গড়ন। বয়স পঞ্চাশের ওপারে। পরেছেন চমৎকার ঢাকাই শাড়ী। চন্দন রঙের খোলের ওপরে মেরুন সুতোর কাজ। খুব ছিমছাম সাজগোজ। ল্যাভেন্ডারের গন্ধ। গদোগদো হয়ে নবাব্দাকে বোঝাচ্ছেন, কতো নতুন নতুন মুখ এসেছে।

    বাসবী আমায় দেখেই আড়চোখে ইশারা করে হাসল।

    মিসেস মজুমদারের অবশ্য খুব তাড়া। এদিকেই কোথায় যেন এসেছিলেন, সেই ফাঁকেই নবাব্দার সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছেন। গাড়ী দাঁড়িয়ে রয়েছে নীচে। উঃ আজকাল এত ঝামেলা হয় না পার্কিং স্পেস পেতে। তার ওপরে সন্ধে বেলায় তো অসম্ভব ট্র্যাফিক জ্যাম। মেয়েগুলোর মুখ এত ফ্রেশ, এত ফ্রেশ, এত ইনোসেন্ট লুক যে তিনি বুঝিয়ে উঠতে পারছেন না। কিছু ফোটো অবশ্য এনেছেন সঙ্গে কিন্তু স্টকে আরো ফ্রেশ মুখ আছে। এখনি বুক করে না রাখনে, পরে হয়ত পাওয়া যাবে না। তাই উনি নবাব্দাকে জানাতে এসেছিলেন আরকি।
  • সে | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৮:০০652279
  • দেবরূপ বলল, তুই কোন দিক দিয়ে বাড়ী যাবি?
    আমার কোনো ঠিক নেই, যেদিন যেমন খুশি।
    আমার সঙ্গে চল নিউমার্কেট। টাই কিনব।
    নিউমার্কেট নয়, রাবার স্ট্রীটের ফুটপাথের ওপরে এক ফেরিওয়ালার থেকে ষাট টাকা দিয়ে একটা টাই কিনল দেবরূপ।
    আড়াআড়ি স্ট্রাইপ স্ট্রাইপ। নীল ও সাদায়। হুবহু এরকম একটা টাই নবাব্দা পরেন। সেটাই বললাম ওকে।
    অন্য কিছু কেন। এটাতো অবিকল নবাব্দার টাইয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে।
    অবিকল সেম টু সেম টাইই তো চাচ্ছি। এরপরে একজোড়া জুতো কিনতে হবে। এই জুতোটা ক্ষয়ে গেছে।
    আজই কিনবি?
    আজ টাকা কোথায়? দুর্গাপুর থকে ফিরে এসে কিনব।
    দুর্গাপুরে যাবি নাকি?
    সেকি? নবাব্দা তোকে বলে নি? তুইও তো যাচ্ছিস আমার সঙ্গে।
    কবে?
    ডেটটা এখনো ফিক্স্‌ড্‌ হয় নি। ডিএস্‌পি। দুর্গাপুর স্টীল প্লান্ট।
    ওটা গর্মেন্টের না?
    গর্মেন্টের হলেই বা কী? ঘুরতে যাবো। ব্যস্‌।

    আমরা হেঁটে হেঁটে দেশপ্রিয় পার্ক অবধি পৌঁছে যাই। তারপরে ও পশ্চিমমুখো যায় আমি পূবে।

    পরেরদিন নবাব্দা বলেন - আপনার কি টাকাপয়সার টানাটানি যাচ্ছে?
    কেন বলুন তো?
    না মানে দেবরূপ বলছিলো আপনি রোজ হেঁটে বাড়ী ফেরেন অতদূর।
    আমার এমনিই হাঁটতে ভালো লাগে।

    এদিন আমি নিজেই সকালবেলা বাসে করে পৌঁছে যাই শিশুমঙ্গল হাসপাতালটার কাছে। কিছু ঠিক নেই। এমনিতেই। ভাবি এখানে তো কতো অফিস টফিস রয়েছে, জিগ্যেস করে দেখি যদি কেউ দেয়। একটা অ্যাড পেলেও তো কিছু পাওয়া।
    বড়োরাস্তা থেকে পূবদিকে একটা রাস্তা সেখানে একটা মেডিক্যাল সেন্টার। হার্ট রিসার্চ না কি যেন লেখা। ঢুকতে গেলাম। চটি খুলে ঢুকতে হবে। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ভেতরে। রিসেপশানে জিগ্যেস করি, আমি অ্যাড্‌হিয়ার থেকে আসছি আপনাদের মালিক বা অ্যাড্‌ভার্টাইজিং ডিপার্টমেন্টের কেউ যদি থাকেন।
    ওয়েট করুন।
    মেয়েটা ফোন করে ভেতরে।
    বসে থাকি। একঘন্টার ওপরে। এরমধ্যে অন্ততঃ পঞ্চাশ ষাটজনের নাম ডাকে তারা সব নিজেদের টেস্ট ইত্যাদি করাতে চলে যায়। ইসিজি, এমারাই, আল্ট্রাসাউন্ড, সিটিস্ক্যান আরো কতো কি সব।
    শেষকালে মালিকের সঙ্গে দেখা হয়। তিনিও ডাক্তার। নাগোরী।
    প্রতি বেষ্পতিবার তিনি সকালে লক্ষ্মীনারায়ন মন্দিরে ঝাড়ু দেন। সেইসব করে তারপরে আসছেন।
    আমি বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে বলি।
    নাগোরী অন্যরকমের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিতে বিশ্বাসী। ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন। ঘুরে ঘুরে ক্লায়েন্ট ধরে আনা। ক্লায়েন্ট মানে রোগী। উনি নিজেই আমাকে এরকম একটা কাজ অফার করেন।
    দারুন তো। কিন্তু মাইনে কত দেবেন?
    আপনি কমিশন বেসিসে কাজ করুন। স্যালারী কেন নিবেন? কমিশন বেসিসে কাজ করলে স্কাই ইজ্‌ দা লিমিট।
  • সে | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৮:১৪652280
  • স্কাই ইজ্‌ দা লিমিট। স্কাই মানে আকাশ এবং লিমিট মানে যেখানে ওর‌্যাক্‌ল্‌ সেভেন শেখায়। শিখতে পারলেই চাকরি। আচ্ছা, এই পাড়াটা কীরকম চেনা চেনা লাগছে। বিশেষ করে ঐ পাশের গলিটা দিয়ে হাজরা রোডে যেই পড়লাম মাথার মধ্যে অনেক কিছু কেমন যেন মনে পড়ে যায়। এই পাড়ায় আমি আগেও এসেছি।
    ক পা পিছিয়ে ফের গলির মধ্যে একটা তিন চার তলা বাড়ি। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে বুঝি রেসিডেনশিয়াল কম্প্লেক্স, কিন্তু না, ঐ বাড়ীটায় দোতলাতে একটা অফিস আছে। দেখিতো মিলিয়ে ঠিক মনে পড়ছে কিনা।
    বাড়ীটার দোতলায় পৌঁছতেই অনেক কিছু মনে পড়ে যায়। এরা প্রাইভেট ফিক্স্‌ড্‌ ডিপোজিট বিক্রি করে। ঐতো তিনটি মেয়ে। সাউথ ইন্ডিয়ান। আমি ভেতরে ঢুকে ফিক্স্‌ড্‌ ডিপোসিটের অফারগুলো নেড়ে চেড়ে দেখি, ডানকান, আইটিসি, ব্রুক বন্ড, অশোক লিল্যান্ড, সব মনে পড়ে যাচ্ছে। আমারো আছে কিছু ফিক্স্‌ড্‌ ডিপোসিট্‌। কিন্তু কোন কোম্পানীর সেটা মনে নেই। আরো মনে পড়ছে যে এদের চেক এ পেমেন্ট করতে হয়। তার মানে আমারো একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে। চেক বই ও থাকার কথা। এটিএম কার্ডো ছিলো। লাল রঙের। ব্যাঙ্কের নামটা কী? কোথায় সেই ব্যাঙ্কটা? মনে পড়ছে না। কিচ্ছু মনে পড়ছে না।
  • de | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ১০:২৭652281
  • দমবন্ধ হয়ে আসে আপনার লেখা পড়লে -
  • kiki | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৩:৫৬652282
  • ঃ(
  • Atoz | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ২৩:৩৪652284
  • কী ভয়ঙ্কর! ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কথা ভুলে যাওয়া!!!!!
  • Arpan | ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ২৩:৫০652285
  • এইমাত্র মনে পড়ল আমার প্রথম চাকরীর প্রথম স্যালারি অ্যাকাউন্ট না বন্ধ করেই চলে এসেছি। পাঁচশো মত টাকাও ছিল বোধহয়। সে এটিএম পূর্ব সময়ের কথা। লাইনে দাঁড়িয়ে সেল্ফ চেক লিখে টাকা তুলতে হত।

    অ্যাদ্দিন ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম!
  • সে | ০৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৩:১১652286
  • অফিসে এসে দেখি সেই বাক্স-বেঞ্চিতে বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। পাশে রাখা আছে তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ। মন দিয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ছেন। বাসবী চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে। কেউ আলাপ করিয়ে দিলো না। ভাবলাম পাশে গিয়ে বসব কিনা। কিন্তু জায়গা কম সেখানে।
    ভেতরে সরু গলির মতো জায়গাটায় গেলাম তপন যেখানে কাজ করে।
    অর্জুনদার বান্ধবী এসেছে, দেখেছিস?
    অর্জুনদা মানে যিনি অ্যাড্‌হিয়ারের অর্ধেক মালিক?
    শিলিগুড়ি অফিসের। অর্জুনদা এখন কোলকাতায় এসেছে। অর্পিতাদি অবশ্য কোলকাতাতেই থাকে। ক্রম্পটন গ্রীভ্‌সের ইঞ্জিনিয়ার। অর্জুনদার সঙ্গে এখানে দেখা করতে এসেছে।

    বুঝলাম। সেইজন্যেই সব কিছু এত চুপচাপ। ইঞ্জিনিয়ার? ক্রম্প্টন গ্রীভ্‌স্‌? কোথায় তাদের অফিস? আমিও তো ইঞ্জিনিয়ার। আমিও তো চাকরির দরখাস্ত করতে পারি। কিন্তু কোথায় করব? তপনকে বলি, জানিস আমিও ইঞ্জিনিয়ার?
    আচ্ছা?
    তপন আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। সম্ভবত বিশ্বাস করে না।
    শোন্‌না, বলছিলম কি ঐ অর্পিতাদিকে জিগ্যেস করবি ওদের অফিসে কীকরে অ্যাপ্লাই করতে হয়?
    তপন চুপ করে থাকে। তারপরে একটু হাসিহাসি মুখে বলে তুই নিজেই জিগ্যেস করতে পারিস।
    যাবো?
    দাঁড়া। উনি কিন্তু যাদবপুর থেকে বিই পাশ। বিকলেজও হতে পারে।
    জিগ্যেস করব?
    দাঁড়া না। অর্জুনদা এই কোম্পানীর পার্টনার। পার্টনারের হবু বউয়ের কাছে চাকরি চাইতে যাবি?
    তাইত!
    মানে সেটা ভালো দেখাবে কি? অর্পিতাদি যদিও খুব ভালো মেয়ে। আসলে তুই তো অ্যাড্‌হিয়ারে কাজ করছিস। এখন তুই যদি অন্য চাকরি খুঁজিস সেটাকি অর্জুনদা বা ধর যদি নবাব্দার কানে যায়, তখন কী হবে সেটা ভেবে দেখেছিস?
    বলব না তাহলে?
    সেটা তুই ভালো বুঝবি। ভেবে দ্যাখ।

    আমি উঁকি মেরে ওদিকটায় একটু দেখি। অর্পিতাদি বাসবীর সঙ্গে কথা বলছেন দেখতে পাই। আমি ওদিকে যাই। বাসবী খুব হেসে হেসে কথা বলছে। এবার আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়। অর্পিতাদি চোখের কোণ দিয়ে অল্প একটু দেখেন আমাকে। আর কিছু নয়। মাথা নামিয়ে ফের ঐ ম্যাগাজিনে।
    আপনি ইঞ্জিনিয়ার?
    আমার প্রশ্নে চোখ তুললেন অর্পিতাদি।
    এবার বাসবী গড়গড় করে বলে যায়, হ্যাঁ অর্পিতাদি তো বিইকলেজের ইঞ্জিনিয়ার। ক্রম্প্টন গ্রীভ্‌সে আছেন, আরো অনেক কিছু বলতে থাকে।
    আপনাদের ওখানে কীভাবে অ্যাপ্লাই করতে হয় চাকরির জন্যে?
    কোথায়?
    ভুরু তুলে তাকান অর্পিতাদি।
    আপনাদের কোম্পানীতে।
    আপাদমস্তক আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলেন, আমি জানিনা।
    তাহলে কীভাবে জানা যায়? মানে কোথায় গেলে জানা যাবে...
    কেন?
    খুব বিরক্তির সঙ্গে এই "কেন" বেরিয়ে আসে ওঁর মুখ থেকে।
    আমি বলতে চেষ্টা করি - আমার জন্যে। কিন্তু অর্পিতাদি সেটা শুনতে পান না। কারণ আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় নি।
    এই বাসবী, প্লীজ আরেকবার ওকে একটু ফোন করবে?
    অর্পিতাদি অধৈর্য হয়ে উঠেছেন অর্জুনদার জন্যে। আমার দিকে ফিরেও তাকান না। ঐ যে বাসবী পরিচয় করিয়ে দিলো আমি সেলসে কাজ করি। ইনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। আমার উত্তরও শুনতে চাইবেন না। ঘনঘন ঘড়ি দেখেন অর্জুনদার আসার অপেক্ষায়।
    কীরকম একটা অপমানিত মতো লাগে।
    ঘরের বাইরে ঐ মইয়ের মতো সিঁড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি, অনেক টাকা মাইনে দেয় ক্রম্প্টন গ্রীভ্‌স্‌? ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করলে আমিও অমন দাম্ভিক হয়ে যাব? সেলসের কোনো ছেলে বা মেয়ে এলে উপেক্ষায় ভুরু তুলে ওভাবে তাকাবো? বেছে বেছে স্টেটাস বুঝে বুঝে লোকের সঙ্গে কথা বলবো? কক্‌খনো না।
  • সে | ০৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৪:০০652287
  • এই মনখারাপ করাটা সেদিন বিকেলে পুরো হাওয়া হয়ে গেল। অর্জুনদা অর্পিতাদি পর্ব শেষ হতে না হতেই এলেন উত্তমদা। চকচকে টাকমাথা রোগা পাতলা মধ্য ত্রিশের সেল্‌স্‌ম্যান। আমাদের মতোই আরেকটা অ্যাড্‌ভার্টাইজিং এজেন্সীতে কাজ করেন। রিষড়া বা কোন্নগর দুটোর মধ্যে একটা জায়গায় থাকেন অন্যটায় ওঁর শ্বশুরবাড়ি। বৌ ও দুটো বাচ্চা। ছোটোছোটো।
    তপন যে ভাতের হোটেলে সেদিন বসে ছিলো ওখানে উত্তমদাও দুপুরে খান। মাছ ভাত, বা ভাত আন্ডাকারি, সব্জি। কোনোকোনো দিন একটু ডেসার্ট - টক দই ও বোঁদে।
    উত্তমদা এখন কম্পিউটার শিখছেন মৌলালীর মাথায় যুবকেন্দ্রে। খুব সস্তায় ওখানে কম্পিউটার শেখানো হয়। ওটা শিখে ফেললেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে। তবে ওখানে ভর্তি হতে পারা খুব শক্ত। বিরাট লাইন। অনেক কাগজপত্র লাগে কাঠখড় পোড়াতে হয়। এর সই আমো, ওর থেকে চিঠি লিখিয়ে আনো, পার্টির থেকে রেকমেন্ডেশান। উত্তমদা সেসব পেরেছেন। তাইতো এখন সপ্তাহে দুদিন সন্ধেবেলা কম্পিউটারে হাতেখড়ি হচ্ছে।
    গড়গড় করে কথা বলে চলেন উত্তমদা। কোনো অহংকার নেই। আবার হাত দেখতেও পারেন।
    কাজরী এসেছে। সেও এসবে খুব বিশ্বাস করে। হাত দেখাবে। ভালোভালো ভবিষ্যৎবানী শুনতে চায়।
    কাজরী খুব চেঁচাচ্ছে আজ আনন্দে। এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট এনে ফেলেছে প্রায়। অনেক চেনা জানা ওর। এখন যে লোকটা কন্ট্র্যাক্টে সই করবে, তাকে একটু খুশি করতে পারলেই অ্যাড্‌হিয়ার মোটা টাকার একটা কন্‌ট্র্যাক্ট পেয়ে যাবে। লোকটাকে ভালো খানাপিনা করাতে হবে। নবাব্দা সেটাকা বাসবীর হাতে দিয়ে দিলেন। বাসবী হয়ত সিনেমা দেখাবে লোকটাকে। ওর প্ল্যান ও ই জানে। সিনেমার টিকিট কিনতে যাবে, কিন্তু উত্তমদা হাত দেখে দিতে এত দেরি করছে।
    তুইও চল আমার সঙ্গে, টিকিট আনতে। কাজরী চায় আমি ওর সঙ্গে যাই।
    ও উত্তমদা হাতটা দেখে দিন না।
    কাজরী ছটফট করে।
    আরে দাঁড়াও দাঁড়াও। এসব জিনিস কি অত তাড়াহুড়ো করে হয়?
    তাড়াহুড়ো কোথায়? আগে আমার হাতটা দেখে দিন তারপরে অন্যদেরটা দেখবেন।
    কী দেখে দেবো?
    যা দেখবেন। যেমন টাকা পয়সা হবে কিনা।
    তোমাদেরতো আসল জিনিসটা বিয়ে কেমন হবে।
    মোটেই না।
    কাজরী হাসে।
    তাহলে বিয়েটা বলব নাতো? ঠিক আছে ওটা বাদ দিয়েই বলছি।
    না না, সব কিছুই বলবেন।
    ওরা হা হা হি হি করে সময় নষ্ট করেই চলেছে।
    শেষমেশ হাত দেখা হয়ে গেলে আমরা বেরোচ্ছি। তখন উত্তমদা আমার হাতটা দেখতে চাইলেন।
    আমি দেখাবো না।
    দেখাতে হবে না। দূর থেকে একটু দেখি।
    আমি দুহাত খুলে দেখাই।
    ব্যাস্‌ ওতেই হবে। হাত ভালো।
    ভালো?
    হ্যাঁ শুধু আগামী তিন বছরের মধ্যে বিয়ের যোগ নেই।

    আমরা দুরদাড় করে নেমে যাই সিঁড়ি দিয়ে। এখন দৌড়ে দৌড়ে পৌঁছতে হবে ওরিয়েন্ট সিনেমায় টিকিট কাটতে।
  • s | ০৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:২৭652288
  • দারুন দারুন। আমি তো বরাবরই সে'র বিরাট ফ্যান। গুরুতে আমার অন্যতম প্রিয় লেখিকা।
    বিক্কলেজের অর্পিতা কম্পটন গ্রীভসে চাকরি করে (মেকানিকাল?) এটা কি কল্পিত চরিত্র। না কি একটু অনুসন্ধান করব।
  • bip | ০৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ২২:০১652289
  • লেখাটা পড়ে সজোর উপলদ্ধি হইল, বাংলা, বাঙালী সমাজ, কোলকাতা আসলে এসব আমি কিছুই চিনি না। আগে ও না। এখনো না। তবে সে কে ধন্যবাদ। বাংলার সাথে আমার লিংকটা কত দুর্বল আরেকবার মনে করানোর জন্য।
  • সে | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৪:৫২652290
  • অনেক দূর থেকেই পোস্টারে দেখা যাচ্ছে শ্রীদেবী অনিল কাপুর আরো কিছু চেনা মুখ। সাইকেলের দোকানটার সামনে এসে আমরা চেষ্টা করি রাস্তা পার হয়ে সিনেমাহলের দিকটায় পৌঁছতে। প্রচুর গাড়ী যাচ্ছে। শোকেসে নানান রকমের সাইকেল। আমার খুব শখ একটা হিরোর সাইকেল কিনবার। এখন নয়, পরে কিনব।
    খুব রিস্ক নিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপারে পৌঁছলে কাজরী কিন্তু মোটেই টিকিট কাউন্টারের দিকে যায় না। এখন ইভনিং শো চলছে - হাউস ফুল। জুদাই। ম্যাটিনি, ইভনিং, নাইট - সব ফুল। কিন্তু আমাদের দরকার অ্যাড্ভান্স বুকিং। কাজরী হলের পাশ ঘেঁষে আরেকটা দরজার দিকে এগিয়ে যায়, সেটা আধখোলা কোল্যাপ্সিব্‌ল্‌ গেট, গেটে দারোয়ান।
    ওপরে যাব।
    এখন বন্ধ আছে।
    ওপরে যাব, সাহেবের কাছে। কী একটা নাম বলে কাজরী, এত আস্তে যে আমি শুনতেই পাই না।
    দারোয়ান গেট ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। আমরা ভেতরে ঢুকে সামনেই সোজা যে সিঁড়িটা ওপরে উঠে গেছে সেটা দিয়ে দোতলায় চলে যাই। দোতলায় পৌঁছেই একটা মাঝারি কেবিনের মতো অফিস। সেখানে দরজা ঠেলে ঢুকে যায় কাজরী।
    ভেতরে একজন বসে আছে বিতাট টেবিলের ওপারে। তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর বয়স।
    আর্‌রে ওয়াহ! ওয়াট অ্যা সারপ্রাইজ!
    কাজরী হিহি করে হাসে।
    অ্যাই তুই ভেতরে আয়।
    আমিও সে ঘরে ঢুকি। সেই লোকটার মুখোমুখি দুটো চেয়ার দখল করি আমরা দুজনে। সামনে প্রকান্ড টেবিল, গোটা তিনেক টেলিফোন। লোকটার শার্টের বুকপকেটেও মোবাইল ফোন ফুলে উঁচু হয়ে আছে। কপালে খুব হালকা টিপের ছপ, গলায় মোটা সোনার চেন, হাতেও অনেক সুতোটুতো বাঁধা।
    ওরা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চুপচাপ হাসে। যেন কম্পিটিশান লেগেছে কে কত পরে কথা বলবে। কিংবা দুজনেরই দুজনের কাছে অনেক জবাবদিহি আছে, কে আগে শুরু করবে এ যেন তারই প্রস্তুতি।
    তো?
    তো ক্যা?
    ইউ সে।
    ওয়াট?
    কেয়া ওয়াট?
    কেয়া ওয়াট মানে?
    ইউ কেম হিয়ার টু ভিজিট মী, রাইট?
    দ্যাট্‌স্‌ ট্রু।

    এরকম কথার তরজা চলে বেশ কিছুক্ষণ। তারপরে লোকটার সঙ্গে আমায় ক্যাজুয়ালি আলাপ করায় কাজরী। দু বোতল ফান্টা আসে। আমি চুপচাপ খেতে থাকি কোল্ড ড্রিঙ্ক।
    ওরা অনেক হাসি ঠাট্টা খুনসুটি করে। অনেক দিন সুইমিং এ যাওয়া হয় নি, একটা প্ল্যান করতে হবে সব বন্ধুরা মিলে, আরো মেয়ে জোগাড় করতে হবে, নইলে সুইমিং এর মজা মিলবে না, তারপরে রাইচক এ যাবার প্ল্যান। আরো অনেক খুচরো আলাপ করতে থাকে ওরা।
    এরপরে কাজের কথায় আসে কাজরী। সিনেমার টিকিট চাই রবিবারের। ম্যাটিনি শো।
    হাউ মেনি টিকেট্‌স্‌?
    তুই টিকিট নিবি তো?
    আ.. আ.. মি?
    নিয়ে নে। কটা নিবি? দুটো?
    কাজরী এমন করে বলে যেন টিকিট দেবার অথরিটি ও নিজেই।
    আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিই। বোঝা যাচ্ছে ফ্রিতে পাওয়া যাচ্ছে টিকিট।
    ওকে, ফোর টিকেট্‌স্‌। বাট সেপারেট রোস্‌।
    ওকে ওকে, আন্ডারস্টুড।
    লোকটা হাসে। তারপরে বেল টিপে বেয়ারাকে ডেকে ড্রেস সার্কেলের চারটে টিকিট দুটো সাইডে, দুটো সেন্টারে নিয়ে আসতে বলে।
    আমাদের ফান্টা শেষ হবার আগেই টিকিট এসে যায়।
    তো ফির? হোয়েন শুড উই প্ল্যান ফর সুইমিং?
    কাঁহা?
    দা সেম প্লেস ইয়ার। হোটেল হিন্দুস্তান।
    ও ইয়েস, আই লাভ দ্যাট পুল। আইল কল ইয়ু সুন।
    ওকে।
    চল বাই।
    বাই।

    শোয়ের তিনচারদিন আগেই সিনেমার টিকিট জোগাড় হয়ে গেল। কাজরী এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের সেই লোকটাকে নিয়ে রবিবার সিনেমা দেখতে আসবে ওরিয়েন্ট সিনেমায়। আমিও দুটো টিকিট পেয়েছি। তক্ষুনি ঠিক করে ফেলেছি একজনকে সঙ্গে নিয়ে আসবো সিনেমা দেখতে। শ্রীদেবী, অনিল কাপুর, আর ঐ মেয়েটা কে যেন? ঊর্মিলা মাতোন্ডকর।
    আমরা এখন যে যার বাড়ী ফিরব।

    এই লোকটা কে ছিলো রে?
    কোন লোকটা?
    যে টিকিট দিলো। ওকি ঐ হলের ম্যানেজার?
    না। ও ওন করে হলটা।

    কাজরী গর্বের সঙ্গে একথাটা বলে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়।
  • সে | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৫:৫২652291
  • পরদিন সকালে এসে দেখি নরেশ অপিসঘরে ঝাড়ু দিচ্ছে। কম্পিউটার প্রিন্টার সমস্ত তখনো ঢাকনা পরানো। আমি বাসবীর চেয়ারটাতে গিয়ে বসি। এতে নরেশের সুবিধে হবে মেঝেতে ঝাঁটা বোলাতে। ওর চোখদুটো খুব লাল।
    নরেশ তোমার চোখে কিছু হয়েছে নাকি?
    না। কাল রাত্রে ঘুম হয় নি।
    নরেশ হাই তোলে।
    শ্মশানে গেছলাম। রাত তিনটের সময় ফিরেছি।
    শ্মশানে!
    না না, আপনি যা ভাবছেন সেরম কিছু নয়।
    নরেশ দাঁত বের করে হাসে।
    আমাদের ওদিকে লোক মারা ফারা গেলে আমরা যাই। কাল খুব লম্বা লাইন ছিলো।
    তোমার নিজের কেউ নয়।
    না। আমি শ্মশানবন্ধু। মাসে তিনটে চারটে এরকম ডাকে। সকালের দিকে তো ডিউটি থাকে। সকালের দিকে ডাকে না। সন্ধের দিকে হলে যাই। মাসে তিন চারটে শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন বাঁধা।
    পরিশ্রম হয় না সারাদিন অফিস করবার পরে?
    আজকাল তো তাও অনেক কমে গেছে। সবাই কাচের গাড়িতে নিয়ে যায়। তাও অনেকে খাটিয়ায় যেতে চায়। মরবার আগে হয়ত বলে গেল কাঁধে চেপে যাবো। মানে যেরম শখ থাকে অনেকের। আবার কেউ হয়তো গাড়ীর খরচ পারবে না। সবার অবস্থা তো সমান নয়।
    আমি অবাক হয়ে শুনি।
    এরকম সময়ও গেছে, একটা বডি পুড়িয়ে ফিরে আবার কোমরে গামছা বেঁধে দৌড়তে হয়েছে। মনে করুন এখন যেমন শীতকাল। ডবল চান করতে হয়েছে।
    ঠান্ডা লাগে না? জ্বর হয়ে যেতে পারে তো।
    সেসবের ওসুধ আছে। আমাদের শ্মশানবন্ধুদের জন্যে বোতল দিতেই হবে। যতক্ষন ধরুন বডিটা পুড়ছে আমরা গা গরম করে নিই। টাকা পয়সা কক্ষনো নিই না। ঐ যে যেরকম পারবে বোতল দেবে।

    আমি টেলিফোন ডিরেক্টরিটা খুলে দেখি। আচ্ছা, পুষ্পিতাকে বললে হয় না? ওদের কোম্পানী কত বড়ো এয়ারকন্ডিশানিং কোম্পানী। তারাও নিশ্চয় বিজ্ঞাপন দেয়। যদি আমাদের এজেন্সীর থ্রু কাজটা হয়। বের করে ফেলি ওদের নম্বর। তৎক্ষণাৎ ফোন করি পুষ্পিতাকে।
    আরে বাবা তুমি!
    হ্যাঁ আমি।
    তুমি তো জাস্ট নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে। কোনো খবর দিলে না। কোথায় আছো? কী করছো? সেই ওখানেই থাকো নাকি?
    গল্‌গল্‌ করে কতো প্রশ্ন করে যায় পুষ্পিতা।
    আমি এখন অ্যাড্‌হিয়ার অ্যাড্‌ভার্টাইজিং এজেন্সীতে চাকরি করছি। অ্যাকাউন্ট্‌স্‌ এক্জেকিউটিভ।
    তাই নাকি? দারুন খবর তো? কোথায় তোমার অফিস?
    ক্ষেত্র দাস লেন?
    কোথায় বলোতো?
    ডিরেক্শান দিলাম।
    তুমি এদিকে এলে আমার সঙ্গে দেখা করবে। তোমার ফোন নম্বরটা দাও।
    এটা অফিসের নম্বর। এই নাও। কিন্তু আমি তো অফিসে থাকি না। ঘুরে ঘুরে কাজ।
    ন্যাচারালি। সেলসের কাজ যখন। তোমার নতুন আস্তানায় ফোন নেই।
    আছে একটা।
    সেই নম্বরটা দাও। তোমার সঙ্গে যোগাযোগটা থাকবে।
    তোমাদের অফিসের অ্যাড্‌ভার্টাইজিং ডিপার্টমেন্ট আছে নিশ্চয়ই।
    বুঝেছি। তুমি তোমার কাজের স্বার্থে ফোন করেছো। আমার জন্যে নয়।
    আরে না না!
    শোনো আমাদের স্যার তো এখন কোলকাতায় নেই। বাইরে গেছেন। তুমি দিন সাতেক পরে একবার খবর নাও।

    নবাব্দা সেদিন আর এলেন না।
    বাসবী দেরি করে এলো।
    ওমা তুমি জানো না? নবাব্দা অর্জুনদা আর স্টেটস্‌ম্যানের সেই ভদ্রলোক, কী নাম যেন..
    রায়দা কি?
    হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই বলেছো। ওরা তিনজনে তো কাল সন্ধেবেলা শিলিগুড়ি চলে গেল।
    শিলিগুড়ি?
    হ্যাঁ ব্যবসার কাজে। ঐ ভদ্রলোকের অনেক কন্ট্যাক্ট্‌স্‌ আছে তো। ওখান থেকে সিকিম যাবে।
    কবে ফিরবে?
    সোমবার ফিরে আসবে মনে হয়। যাবার সময় ট্রেনে যাচ্ছে। ফিরবে ফ্লাইটে।

    আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। আজ অন্ততঃ কিছুক্ষন অফিসে বসতে পারব। অন্যান্য দিন তো অফিসে বসা যেন একটা অপরাধ। আজ একটু চা খাবো। তারপরে কয়েকটা জায়গায় ফোন করে দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ বেরোবো। ওরকম রোজ রোজ হুট করে কোনো প্ল্যান ছাড়া বের করে দিলে কি ব্যবসা আনা যায় নাকি?
  • সে | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৬:৩৭652292
  • তপন ঢুকল অফিসে বিশাল ঢাউশ একটা প্যাকেট নিয়ে। ওর মধ্যে আছে ওর আঁকা অয়েল পেন্টিং। এটা ওর ফরমায়েসি ছবি। যে বাড়ীটায় আমাদের অফিস, সেটার মালিক হচ্ছেন দাদু বা নবাব্দা বলেন কাকু। সবাই আড়ালে বড়ে বুড়ো। সেই কাকু/দাদু/বুড়োর ছেলে থাকে আলিপুরে নাকি নিউআলিপুরে। তারও বিজনেস পাশেই। প্রচুর পয়সাওয়ালা। তা সেই ছেলের খুব শখ হয়েছে হাতে আঁকা অয়েল পেন্টিং দিয়ে বাড়ীর দেয়াল সাজাবে। নামকরা আর্টিস্টের আঁকা পেন্টিং কিনতে গেলে প্রচুর খরচ এবং কোন পেন্টিং ভালো কোনটা তেমন ভালো নয় সেটা বুঝবার ক্ষমতা নেই - সেজন্য তপনকে ধরেছিলেন - তুমি একটা ভালো কিছু এঁকে দাও, আমি দাম দিয়ে কিনে নেবো।
    তপন জিগ্যেস করেছিলো, কী আঁকবো বলুন? কোনো বিশেষ সাবজেক্টের ওপরে?
    না না, তুমি যা ভালো বোঝো।
    সেজন্য তপন এঁকেছিলো স্টীল লাইফ। পেছনে গাঢ় মেরুন পর্দা, সামনে টেবিলের ওপরে ফ্লাওয়ার ভাজে এলোমেলো চন্দ্রমল্লিকা, গাঢ় রঙের টেবিল ক্লথ, একপাশ থেকে আলো এসে পড়ছে। গোটা কয়েক আখরোট পড়ে আছে টেবিলে।
    ছবিটা কয়েকদিন আগেই এনে আমাদের দেখিয়েছিলো। আমরা মুরুব্বির মতো এক্স্‌পার্ট্স্‌ কমেন্টারী দিয়েছিলাম। ব্যাকগ্রাউন্ডটা আরেকটু ডার্ক কর। টেবিল ক্লথের রঙটা স্লাইট খেলো দেখাচ্ছে, আলো আরেকটু কমিয়ে দে ঘরে, ফুলগুলো বড্ড বেশি চেয়ে চেয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন প্লাস্টিকের ফুল, এই সমস্ত হাবিজাবি কমেন্ট।
    সেসব ফীডব্যাক তপন সযত্নে মন দিয়ে শুনেছে, আরো রঙ চাপিয়েছে ছবিটায়, শুকিয়ে গেলে ভার্নিশ করে টরে ফ্রেমে ঢুকিয়ে নিয়ে এসেছে আজ আমাদের দেখাবে বলে।
    সব মিলিয়ে তিনফুট বাই চারফুট সাইজ। সকালবেলার ট্রেনে বালীউত্তরপাড়া লাইনের ঐ ভীড়ে অক্ষতভাবে এতবড়ো একটা ক্যানভাস কোনো কেরামতিতে ও বয়ে এনেছে সেই ভেবে আমরা সব তাজ্জব হয়ে যাই।
    কাজরী বাসবী দেবরূপ সকলেই উপস্থিত।
    একহাতে গরম চায়ের কেটলি নিয়ে অন্য হাতে খুরি নিয়ে চুড়ান্ত নিপুণতায় মই-সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে বাচ্চা। খালি পা, ছেঁড়া পুলোভার, ফাটা হাফপ্যান্ট।
    এখন আমরা সবাই চা খাবো।
  • সে | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৬:৫৭652293
  • চা খেতে খেতে আমরা ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। তপনের গোঁফের কোণে স্যাটিস্‌ফ্যকশানের মৃদু হাসি।
    দামী সোনালী ফ্রেম লাগিয়েছে। কাঠের দিলেও চলত। কিন্তু বড়োলোকের ড্রইংরুমের দেয়ালের মধ্যিখানে যে অয়েলপেন্টিং শোভা পেতে চলেছে, সেটার জন্যে গাঁটের কড়ি খরচ করে একটু বেশি দামী ফ্রেমই কিনে ফেলেছে তপন। এটা ওর প্রথম ফরমায়েসি ছবি যেটা বিজ্ঞাপনের জন্যে নয়।
    মাঝে মাঝেই আক্ষেপ করত - সর্বক্ষণ ব্রা প্যান্টির অ্যাডের ছবিতে ব্রাশের কাজ করতে করতে নিজের ওপরে একটা ঘেন্না হয়। হয় গয়নার অ্যাডের ছবিতে মেয়েদের বগলের লোম পরিষ্কার করা, নয়ত স্প্রে পেন্টিং করে বুকের খাঁজ বাড়ানো - এইসব করবার জন্যে এতগুলো বছর আর্ট কলেজে পড়েছি? নিজেকে থুতু দিতে ইচ্ছে করে। এসব কিছু বাদ দিলে আছে কায়দা করে করে তুলি দিয়ে লেখা। কির্লোস্কারের শক্তি গ্রামে গ্রামে চাষীভাইদের জন্যে। তুমুল ঘেন্না হয় নিজের ওপরে।
    আজ তপনের মুখে অন্যরকমের পরিতৃপ্তি।
    ছবিটা কিছুক্ষণ হেলান দেয়া রইল বাক্স-বেঞ্চির ওপরে। ওটার ওপর সম্মান জানিয়ে আমরা কেউ বসতে চাইনি। দাঁড়িয়ে চা খেয়েছি। চা খেয়েই ও ছবি নিয়ে পৌঁছে দিয়ে এলো বুড়োর ছেলেকে।
    কী বলল রে ছবিটা দেখে? পছন্দ হয়েছে?
    ফোনে কথা বলছিলো, আমাকে ইশারায় বললো রেখে যেতে।
    তপন খুব এক্সাইটেড। বুড়োর ছেলের রিয়্যাকশান কেমন হবে বুঝতে পারছে না। ঘনঘন পায়চারি করছে।

    দেবরূপ আমাকে বলল, তুই কি কাজরীর সঙ্গে বেরোবি আজ? আমার কয়েকটা পেমেন্ট আনবার আছে আমি বেরিয়ে যাচ্ছি।

    আমি কাজরীর সঙ্গে বেরোলাম সামান্য পরে। মাত্র দুস্টপ বাসে করে গিয়েই গ্র্যান্ড হোটেল। আবার সেই গ্র্যান্ড হোটেল। এবার যদিও সামনের দরজা দিয়ে।
  • সে | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৭:১৪652296
  • ইডেনে সম্ভবত কোনো খেলা চলছে নয়ত অন্য কিছু হবে। মোটকথা কাজরী রিসেপশানে গিয়েই ওর চেনা একটা মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। ওর খুড়তুতো/মামাতো/মাসতুতো/পিস্‌তুতো কোনো একটা বোন সে। গ্র্যান্ডে রিসেপশানে কাজ করে। কিন্তু সে তখন নেই। অন্য কোথাও আছে বা পরে আসবে। ক্রিকেট প্লেয়াররা রয়েছে বলে কাজরী জিগেসও করল একজন প্লেয়ারের নাম, ত্সে আছে কিনা।
    সদুত্তর পেলো না। যার নাম করল, সে আগে টেস্ট ম্যাচ ওয়ান ডে সমস্তই খেলেছে। এবারে বোধহয় প্রথম এগারোজনের লিস্টে নেই। কিন্তু আছে, মানে এই হোটেলে আছে। সে ব্যাপারে কাজরী শিওর।
    চল একটু ঘুরে আসি।
    এবার আবার বাস নিলাম। ও কক্ষনো নিজে টিকিট কাটে না। বলে - দুটো থিয়েটার রোড কাট, কিংবা দুটো লিন্ডসে স্ট্রীট। অফিসে গিয়ে চাইবি, ফেরৎ পেয়ে যাবি।
    আমিও ওর প্রতি কৃতজ্ঞ। কি সুন্দর দুটো সিনেমার টিকিট দিয়েছে।
    ক্যামাকস্ট্রীট নাম করেছে অবনীন্দ্রনাথ টেগোর সরণী। এইটা আগে লক্ষ্য করিনি তো! লোকে পারবে এত বড়ো একটা নাম উচ্চারণ করতে? অবনীন্দ্রনাথটুকু বলতেই জিভ জড়িয়ে যায় কত লোকের। সেই অবনীন্দ্রনাথ টেগোর সরণীতে উঁচু উঁচু বেশ কিছু বিল্ডিং হয়েছে। অল্প চিন্তা ভাবনা করে তারই একটায় ঢুকল কাজরী। আমি পেছন পেছন।
    লিফটে করে কয়েকতলা উঠেইএকটা অফিস। ইনাডু।
    ভেতরে ঢুকবার আগে কাজরী আমাকে অল্প ব্রীফ করে দেয়। এটা হচ্ছে অন্ধ্রপ্রদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ পেপার। সার্কুলেশনে আনন্দবাজারের লেভেলের। নাম শুনিসনিতো আগে? এখন শুনে রাখ। এখানে আমার চেনা একটা ছেলে আছে। মালটাকে যদি আজ অফিসে পাই তাহলে... বেরিয়েও যেতে পারে, বারোটা বেজে গেছে তো, দ্যাখা যাক। মুখ হাঁ করে থাকবি না। হাসি হাসি মুখ করে বসে থাকবি।
  • সে | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৫:৩২652297
  • কাজরীর সেই বন্ধুটার নাম আলু। আলু হচ্ছে আলুর দমের শর্ট ফর্ম। আলুর দম এসেছে অরিন্দম থেকে। আলু ওকে দেখেই পালাচ্ছিলো কিন্তু কাজরীর দৃষ্টি খুব শার্প। সে অবিলম্বে ডাকল -অ্যাই আলু! কীরে তুই এখনো অফিসে? আজ বেরোস নি?
    শ্‌শ্‌শ্‌ আস্তে। চেঁচাচ্ছিস কেন?
    চেঁচাইনিতো। লাঞ্চ করতে যাবিতো? খাওয়া। আগের দুটো খাওয়া পাওনা আছে। না না, তিনটে।
    আলু ইতস্তত করে। একবার আমার দিকে তাকায়। মুখে করুণ হাসি। আমি মুখটা হাসি হাসি করে ফেলেছি।
    তোর টেকো বস আছে? ভেতরে?
    আছে। তুই একটু বোস। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।
    আমাদের বসিয়ে রেখে পালাবি না কিন্তু।

    এরপরে আমরা আলুর টেকোবসের ঘরে যাই। খুবই সামান্য টাক সামনের দিকে। বেশ বড়ো সড়ো ঘর। ইনিই সম্ভবত এই অফিসের সর্বেসর্বা। কাজরী এঁকেও চেনে।
    আমরা দুজনেই ঢুকলাম তাঁর ঘরে। ঢুকেই কাজরী টেবিলের ওপর থেকে পছন্দের পেপার ওয়েট, ভালো একটা পেন, এসব নিজের হাতে তুলে নিলো।
    অ্যাই অ্যাই ওটা নিও না।
    আলুর টেকো বস বাধা দেন।
    কেন? এটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমার ব্যাগে রাখব।
    ওটা তো পেপারওয়েট, ওটা ব্যাগে রাখবে কেন?
    সুন্দর দেখতে। এটা আমি নিচ্ছি।
    তাহলে ঐ পেনটা দাও ওটা দিয়ে আমি লিখি তো।
    অন্য পেন দিয়ে লিখবে। এইতো আরো কতো পেন রয়েছে। কতো দিন পরে এলাম বলোতো? একটা পেন দিতেও তোমার মুখ ব্যাজার?
    না তা নয়। কী খাবে? চা না কফি?
    কিচ্ছু খাবো না। এখন তো লাঞ্চ টাইম, আলুর সঙ্গে বেরোচ্ছি লাঞ্চে। আর তোমাদের সব খবর বলো।
    টেকোবস অনেক রকম খবরাখবর দিতে থাকেন ও সেই ফাঁকে ফাঁকে কাজরী বিভিন্ন জিনিস তুলে তুলে ব্যাগে ভরতে থাকে।
    ইশ্‌ এটা কি মিষ্টি! (একটা ছোটো রাইটিং প্যাড, অল্প ব্যবহৃত)
    এ বাবা এটা কি কিউট! (রঙীন পেপারক্লিপ)
    ইত্যাদি।
    একটাই দরকারি খবর দেন টেকোবস। আলুর বিয়ে সামনেই। আলু অবশ্য কারোকে বলেনি কিন্তু ওর হবু শ্বশুরমশাই তাঁ হবু জামাইয়ের চাকরিস্থলে এসেছিলেন নাকি খোঁজ খবর করতে। চাকরি পাকা কিনা, মাইনে পত্র কেমন, কোন পোস্ট, স্বভাব চরিত্র কেমন এইসমস্ত।
    টেকোবস ক্লীনচিট দিয়েছেন। এই খবরটা তিনি কাজরীকে ( আমি ছিলাম তাই আমাকেও) দিয়ে দিলেন।
    অফিস থেকে বেরোতেই কাজরী চেপে ধরল আলুকে - পিটার ক্যাটে চল।
    এই নারে! আজ অত ক্যাশ নেই সঙ্গে।
    তোর ক্রেডিট কার্ড আছে না?
    না, ক্রেডিট কার্ডও সঙ্গে নেই। বিশ্বাস কর।
    সে ওয়ালেট খুলে দেখানোর ভঙ্গী করে।
    কই দেখি দেখি দেখি.. ঐ তো। ওটা কী?
    ওটা অন্য কার্ড। ওটা ইউজ করিনা। ওটায় অনেক খরচ হয়ে গেছে।
    তুই খাওয়াবি না তাহলে?
    চল আরেকদিন বসি। শনিবার আয়।
    শনিবারে পিটারক্যাটে খাওয়াবিতো?
    পাক্কা।
    তাহলে এখন বাইরে থেকে খাওয়া। তোর একটা সিক্রেট খবর কিন্তু আমি জানি।
    আলু একটু চুপ্‌সে যায়। তারপরে রাস্তা ক্রস করে ফুটপাথের চাউমিনওয়ালার থেকে সে তিনপ্লেট ভেজ চাউমিন অর্ডার করে।
    আমি ভেজ নেবো না, আমি এগ চাউ নেবো। সঙ্গে চিলি চিকেন। তুই না খুব কিপ্টে হয়ে গেছিস। তোর বিয়ের পর বউতো পালাবে এমন কিপ্টেমি করলে।
    তুই কোত্থেকে জানলি?
    ...
    ওদের কথাবার্তা চলতে থাকে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজ চাউ খাই ক্যামাক স্ট্রীটের ফুটপাথে। অনেক কিছু মনে পড়ে যায়। আরেকটা চাকরির কথা। তখন যদিও জানতাম না যে রাস্তাটার নাম পাল্টে গিয়েছে। ভরদুপুরে লোকজন গাড়ীর আওয়াজ সব ঝাপসা ক্ষীণ হয়ে যায়। মনে পড়ে অবন ঠাকুরের লেখাগুলো। মনে পড়ে যায় ভূত্‌পত্‌রীর দেশ। আর মনে পড়ে বুড়ো আংলা কে।
  • সে | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:০৭652298
  • একটু পরেই দেখি খাবারের দাম চুকিয়ে আলু হন্‌হনিয়ে চলে যায় কোথায়। কাজরী বলে দোকানদারকে আরেকটু ঝোল দিতে। চিলি চিকেনের ঝোল। আমরা আরো কিছুক্ষণ সময় নিয়ে খাই। তারপরে হাঁটতে থাকি দক্ষিণমুখো।
    উঃ বাবা, কি হিসি পেয়েছে। কোথায় যাব এখন?
    চল তাড়াতাড়ি বাস নিয়ে অফিসে ফিরে যাই।
    ধূর।
    একটু হেঁটেই আমরা পৌঁছে যাই আরেকটা বড়ো রাস্তার ওপরে। ওপারে কাছাকাছির মধ্যেই রয়েছে হোটেল হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশানাল।
    কাজরী স্মার্টলি ওখানেই ঢোকে।
    আমি ও ওর সঙ্গে।
    ঢুকেই বাঁ হাতে অল্প ভেতরে হাঁটলেই চমৎকার বাথরুম। দেয়ালে আয়না বসানো। পরিষ্কার হাত ধোবার জায়গা। ও তো এখানে সুইমিং করতে আসে। এই হোটেল ও চেনে। সুগন্ধী লিকুইড সোপ দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ওখানেই ক্রীম টিম মেখে চুল আঁচড়ে মেকাপ করে নিলো কাজরী। ব্যাগ খুলে লিপস্টিক মাখল। ম্যাটেড।
    এটা বাইরের জিনিস। একেকটা লিপস্টিকের দাম সাড়ে তিনশো টাকা। আমার এরকম তিনটে আছে।

    হোটেল থেকে বেরিয়ে ও আমাকে বলল, তুই এখন চলে যা। আমি অন্য জায়গায় যাবো।
    আমি বাস নিয়ে ধর্মতলা চলে যাই। আজ তো নবাব্দা নেই। অফিসে গেলে কেউ বের করে দেবে না।
    কটা লেখা লিখেছিলাম এর মধ্যে। তপনকে দিয়েছিলাম। ও বলেছিলো পড়া হয়ে গেলে বলবে কেমন লেগেছে।
    এখনও অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে কিন্তু হাতের কাছে কাগজ নেই কলম নেই। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কি কিছু লেখা যায়?
    এমন এক চাকরি হয়েছে যেখানে একদণ্ড বসতে দেবে না। হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে চরকি কাটিয়ে মারবে।
    কী লাভটা হোলো আজ সারাটাদিন কাজরীর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে? জোরজার করে একজনের পয়সায় লাঞ্চ খাওয়া? সে প্রবল অনিচ্ছায় নিমরাজি হয়ে ব্যাজার মুখে খাওয়াচ্ছে। তবুও সেটা খেতে হবে। এতো মন থেকে আগ্রহ নিয়ে নিমন্ত্রণ নয়। একে বলে হ্যাংলামো। বাথরুমে যাবার জন্যে ফাইভস্টার হোটেলে প্রায় উঞ্ছবৃত্তি। নাহয় মেয়েদের জন্যে কোনো বাথরুম নেই এই শহরে। কিংবা এটাই এখানকার নিয়ম। তুমি নিতান্ত প্রয়োজনে কোথাও যাও, ড্রিঙ্ক অর্ডার করো, তোমায় সেখানে বসতে দেবে না। বের করে দেবে। দেখেই মালুম হচ্ছে কিনা, যে তোমার দামী কাপড় নেই। আবার ঠিকঠাক ঘোঁৎঘাত জানা থাকলে ফাইভস্টারের বাথরুম ফ্রীতে ইউজ করো। সাবান মাখো, হ্যান্ড লোশান লাগাও। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজোগোজো মেকাপ করো। কেউ কিচ্ছুটি বলতে সাহস পাবে না। সবাই মাথা নোয়াবে। ইয়েস ম্যাডাম ইয়েস ম্যাডাম করবে।
    আসল জিনিস যা দেখলাম সেটা হচ্ছে দাপট। তেজ। তোমার ভেতরে কী আছে কী নেই কেউ দেখতে যাচ্ছে না। বাইরেটায় কতটা গ্ল্যামার সেটা দিয়েই ম্যাক্সিমাম হিসেব নিকেশ।
  • সে | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:২৩652299
  • তপন আমার লেখাগুলো পড়েছে। একটা লেখা একটু বড়ো ছিলো। সবই প্রায় সেভাবে দেখলে পূর্বজন্মের গল্প। পূর্বজন্মই তো। ভিন্ন দেশ। ভিন্ন পটভূমিকা। ভিন্ন মানুষজন। ভিন্ন আমি।
    জীবন এতটাই অবিশ্বাস্য যে এখনো মনে হয় হয়তো স্বপ্নের মধ্যেই রয়েছি। একটু পরেই ঘুম ভেঙে যাবে। ঘুম ভেঙে গেলে দেখব যা এখন ঘটছে বলে ভাবছি সব ছিলো মিথ্যে। কিন্তু স্বপ্নটা ভাঙে না।
    আমি যা লেখার বিভিন্ন কাগজের টুকরোয় ডটপেনে লিখি। কোনো খাতা নেই। এখন লিখি বাংলায়। গতবছর একটা গোটা রাইটিং প্যাড প্রায় ভরে এসেছিলো লেখায়। সেটা খোয়া যায়। সেই লেখা আবার নতুন করে লেখা সম্ভব নয়। কত কী লিখেছিলাম। সব মনেও পড়ে না।
    তপন, তুই পড়েছিস লেখাগুলো?
    আজই পড়লাম সবকটা। একদিন তো ছবিটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।
    কেমন লাগল রে?
    তুই তো ভালো ই লিখিস। কোথাও দিয়েছিস মানে ছাপিয়েছিস?
    পূর্বজন্মটা নিয়ে আর ভাবি না। সটান উত্তর দিই, না না ছাপাবো কীকরে? এতো জাস্ট অগোছালো কিছু লেখা। এ একেবারেই ওসব মানে ছাপানোর কথা কখনো ভাবিই নি।
    কেন? ভাল লিখিস তো। আজ বিকেলে তুই তো আছিস। এক কাজ কর। আমি তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো।
    কোথায়?
    আগে চল্‌ই না। তোর লেখাটা একজনকে দেখাতে হবে।
  • সে | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:৪৮652300
  • সেই নো এন্ট্রি ফর লেডিস বারটার পাশ ঘেঁষে আরো খানিকটা হেঁটে একটা গলির মধ্যে বাঁহাতে উঁচু একটা বাড়ী। এ গলির অন্য বাড়িগুলোর তুলনায় বেশি চকচকে বেশি আলো। এইটা হচ্ছে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রীট। আনন্দবাজার পত্রিকার অফিস।
    ভেতরে ঢুকেই সামনে ডানহাতে আড়াআড়ি কাচে ঢাকা রিসেপশান ডেস্ক। সেখানে বড্ড ভীড়। বসবার কোনো জায়গা নেই। সবাই বড্ড বেশি কথা বলছে। স্টেট্‌স্‌ম্যান অফিসের মতো সুন্দর নয়। কেমন যেন একটা চাঁচাছোলা ব্যাপার। সাদা আলো টিউব লাইটের। বড্ড বেশি আলো যেন।
    তপন কাকে যেন চেনে ভেতরে। ওরাতো বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে এখানে আসে। নাম লিখিয়ে ঢুকতে হবে। স্লিপ সিস্টেম। তারপরে ঐ রিসেপশান থেকে ফোন করে ভেতরে খবর দেবে, তারপরে ঢুকতে দেবে। বাঁদিকে সিঁড়ি রয়েছে। লিফ্‌ট্‌ রয়েছে।
    আমাদের খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয় না। আমরা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যাই। ঐ তলাতেই দেশ, সানন্দা, আনন্দমেলার অফিস। এক ঝলক দেখতে পাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। ঐটুকুই।
    আমাদের আরো ভেতরের দিকে হেঁটে যেতে হয়, তরপরে ডানহাতে একটা বড়ো ঘর। সেই ঘরে ভেতর দিয়ে আরেকটা ঘর। আনন্দমেলার অফিস।
  • সে | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৭:৩৩652301
  • সেই ভদ্রলোকের নাম আমার এক্কেবারেই মনে নেই। কিন্তু অভিজ্ঞতাটা মোটামুটি মনে আছে। বড়ো ঘরটায় কেউ ছিলো না। ভেতরের ঘরটায় গিয়ে ঢুকলাম সেখানে সেই ভদ্রলোক যাঁর নামের স্লিপ লিখিয়ে তপন আমায় এখানে এনেছে।
    খুবই ব্যস্ত মানুষ। মধ্য বয়সী। চোখে সম্ভবতঃ চশমা। তপনকে দেখে ছোট্টো করে হাসলেন। আমাকে দেখেও সৌজন্যসূচক মৃদু হাসির মতো।
    তপন প্রথমে অনেক কথা বলে গেল, কেমন আছো, কী করছো।
    এরপরে ওঁর ফিরিস্তি কাজের চাপ ইত্যাদি। আনন্দমেলা যে আরো কতো ভালো হয়ে উঠছে কিশোরদের জন্যে, স্কুল পড়ুয়াদের জন্যে, সেই নিয়ে কিছুক্ষণ চলল। খুব বেশি সময় তিনি দেন নি আমাদের।
    একটু পরেই কাজের কথায় চলে এলো তপন।
    এই মেয়েটা আমাদের অফিসে আছে সেলসে।
    ভদ্রলোক আমার দিকে সটান তাকান। একটু কুঞ্চিত ভুরু।
    না না, তোমার কাছে চাকরির জন্যে আসিনি।
    এবার ভুরুদুটো আবার আগের মতো হয়ে গেল।
    আসলে ও একটু লেখে টেখে। কয়েকটা লেখা আমায় পড়িয়েছে। দেখে মনে হোলো তোমার কাছে নিয়ে আসি।
    আপনি আগে কোথাও লেখা ছাপিয়েছেন?
    না। মানে অনেক আগে কিছু লেখা এদিক ওদিক।।।
    হুঁ।
    তপন ব্যগ্র হয়ে বলে লেখাটা কি তোমার কাছে রেখে যাবো?
    কী লেখা? বাচ্চাদের কিছু?
    তপন আবার বলে, এটা অনেকটা ভ্রমনকাহিনি টাইপ।
    হ্যাঁ। ক্যাটেগোরিটা জানতে হবে। কত শব্দ?
    এইরে! কত শব্দ সেতো গুনিনি!
    শব্দসংখ্যা তো গুনিনি, গুনে বলে দেবো?
    না না। এখন গুনতে হবে না। ছবি আছে?
    আমার ছবি?
    আপনার ছবি হতে পারে, মানে ভ্রমণ কাহিনির সঙ্গে সেই জায়গার ফোটো লাগবে তো। একটা বড়ো লেখা ছাপাতে হলে তিন থেকে চারটে ফোটো লাগবে। আপনি ধরুন গোটা দশ পনেরো ফোটো দিলেন, সেখান থেকে আমরা বেছে বেছে গোটা তিন চার ফোটো লেখাটার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়ে দেবো।
    ফোটোতো নেই।
    কেন? এ আবার কেমন কথা? একটা জায়গায় বেড়াতে গেছেন ফোটো তোলেননি?
    তপন আবার আমাকে প্রোটেক্ট করতে আসে, আসলে ও তো অনেকদিন ওখানে ছিলো। তাই সেভাবে ফোটো তুলে রাখেনি। মানে অল্পদিনের জন্যে বেড়াতে গেলে হয়ত ফোটো তুলত।
    ফোটো ছাড়া কীকরে হবে? এখন কালার্ড ফোটো দিচ্ছি। কিশোর কিশোরীরা যখন একটা লেখা পড়বে, তখন তাদের মনে কত প্রশ্ন জেগে ওঠে। ফোটো দেখে একটা ধারণা হবে। সেই দেশটা সম্বন্ধে নলেজ বাড়বে। আনন্দমেলা তো শুধু একটা গল্প কবিতা মিশিয়ে একটা ম্যাগাজিন নয়, এর মধ্যে অনেক কিছু আছে। স্কুলের পড়াশুনোর বই ছাড়াও এই পত্রিকাটা থেকেই কিশোররা যাতে অর্রো অনেক কিছু শিখতে পারে। ভূগোল, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অঙ্ক, আউটনলেজ, কুইজ, সঙ্গে চাই ছবি, যাতে ওরা জিনিসটা ভিজুয়ালইজ করতে পারে।

    ভদ্রলোক লেখাটা একটিবারের জন্যেও পড়ে দেখতে চাইলেন না। আমার লেখার সঙ্গে কোনো ফোটো দিতে পারিনি একথা প্রমাণ করবার জন্যে যে ঐ দেশটায় আমি ছিলাম। ওটা একটা অন্য দেশের গল্প। অন্য দেশের অভিজ্ঞতা। কিশোরদের জন্যে দরকারি কোনো নতুন তথ্য ফোটোসহ ঐ লেখায় নেই। তাই কেউই এই ম্যানুস্ক্রীপ্ট পড়ে দেখবে না।
    অবশ্য আমি তো আনন্দবাজারে আসতে চাই নি। তপনই আনল। ও একটু লজ্জা পেয়েছে। ওর খারাপ লেগেছে।
    তুই মন খারাপ করিস না তপন। আমিতো এসব লেখা ছাপিয়ে লেখক হবার কথা কোনোদিনো ভাবিনি। তোর সঙ্গে এলাম। একটা অভিজ্ঞতা হলো।
    আজকাল কতোলোক বই ছাপাচ্ছে। তুই লেখ। অনেকগুলো লেখ। তারপরে ছাপাবি।
    নারে, আমার ওসব ইচ্ছে নেই।
    কেন? লোকে তো আজকাল নিজেরা টাকা খরচ করে করে বই ছাপায়। কতো লোকের সঙ্গে দেখা হয় রোজ তাদের অনেকেই বই ছেপেছে। লেখকে কবিতে গিজগিজ করছে এখন। তোর অবশ্য পয়সা নেই। তুই তো আর টাকা খরচ করে ছাপাতে পারবি না।
    কে কেনে এত বই?
    জানি না। সব হয়ত কেনে না। নিজেদের বন্ধু আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিলি করে হয়তো। ভালো বই হলে আবার লোকে হয়ত কিনবেও। রিস্কি লাইন। সবাই তো আর সুনীল গাঙ্গুলী নয়।
    কথায় কথায় বুঝি তপনের মন থেকে অস্বস্তিটা কেটে যাচ্ছে। ও আমার উপকার করতে গিয়ে খামোখা অপ্রস্তুত হয়েছে।
    কিন্তু একটা জিনিস মনের মধ্যে খচ্‌খচ্‌ করে। সমস্ত লেখার সঙ্গে ছবি চাই? ফোটো ছাড়া কোনো লেখা কিশোরেরা পড়ছে না? নাকি এরা ছাপাচ্ছে না। সবসময় ফোটোরই বা দরকার কেন? শিশুদের কিশোরদের কোনো কল্পনাশক্তি নেই নাকি? কল্পনাগুলোকে ফোটোর ফ্রেমে বেঁধে দিতে হয় বুঝি?
  • সে | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৮:৩৬652302
  • পরদিন দেবরূপের সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। সিয়েমসিতে যাবার ছিলো আরো কী কী অ্যাড ওরা দেবে সেসব জানতে। তারপরে দুয়েকটা টুকিটাকি। দুপুরে নন্দন চত্ত্বরে গেলাম। সিনেমা চলছে। পুরোনো ফিল্ম। আন্দ্রেই তারকোভ্‌স্কির সোলিয়ারিস। ইংরিজি সাবটাইটেল দেওয়া। হলে খুব কম লোক। আস্তে আস্তে আরো কমে গেল। ছবির শেষে যখন হল থেকে বেরোচ্ছি, আমাদের নিয়ে মোট তিন কি চারজন।
    আমি খুব মন দিয়ে দেখছিলাম। আগে একবার দেখেছি, তাও। দেবরূপের খুবই বোরিং লেগেছে। সেতো লাগবেই। ভাষা নী বুঝতে পারলে শুধু সাইবটাইটেল দিয়ে সেভাবে তো এনজয় করা যায় না।
    এ ছবিতে সেক্স নেই, ভালোলেন্স নেই। কেবল কথা। তার মধ্যে কোনটা বাস্তব, কোনটা বাস্তব নয় সেসবও গুলিয়ে একাকার হয়ে যায়।
    কি অদ্ভুতভাবে অফিসের টাইমে লুকিয়ে সিনেমা দেখলাম আমরা। একটা অপরাধবোধ তো কাজ করছেই। নবাব্দা নেই তাই ফাঁকি দিচ্ছি। দেবরূপ নাকি মাঝে মধ্যেই সিনেমা দেখে। বিশেষ করে গরমকালে। গরমে কাঁহাতক বাইরে বাইরে ঘোরা যায়? তার বদলে সিনেমাহলে এসির মধ্যে আড়াই ঘন্টা ভালো রেস্ট হয়। নন্দনের টিকিটের দাম তো বেশি নয়।
    তাও আমরা একটু কাজের ব্যাপারে গেলাম। ভবানীপুরে। মেট্রো স্টেশনের গা ঘেঁষে একটা শাড়ীর দোকানে। এরা নাকি আগে অনেক অনেক অ্যাড দিতো। কাগজে, রেডিওয়ে, পোস্টার, প্ল্যাকার্ড। এখন দেয় না প্রায়। দিলেও খুব কম।
    এখন তো বিয়ের মরশুম। শাড়ী তো বিক্রি অবারই কথা। কিন্তু দোকানে একজনও খদ্দের নেই।
    সাদা চাদর বিছোনো। তিনদিক ঘিরে কাচের দেয়াল আলমারি ভর্তি শাড়ি। দোকানের মধ্যে আলো কম। হয়ত খদ্দের আসেনি বলেই হবে।
    প্রৌঢ়, প্রায় বৃদ্ধ মালিক চশমা খুলে একদিকে চেয়ে বসে কী যেন ভাবছিলেন। আমরা ঢুকবার পরে যেন তাঁর হুঁশ ফিরল।
    আমরা তো খদ্দের নই, তাই আপ্যায়ন আশা করা উচিৎ নয়। তা সত্ত্বেও খুব যত্ন করে বসতে বললেন। দেবরূপ আগেও এ দোকানে এসেছে। এরা বিজ্ঞাপন দেয় না। দেবেও না। তবুও এসেছি। ভদ্রলোক অনর্গল কথা বলে চলেন। অনেক কথা। কথা বলতে বলতে ওঁর খেই হারিয়ে যায়। আবার খেই ধরিয়ে দিতে হয়। একালের কথা, সেকালের কথা। সেই যখন ব্যবসায় নেমেছিলেন, তারো আগে, তারপরে কেমন কেমন করে বিজ্ঞাপন দেয়া হোতো। বলতে বলতে কোন এক স্বপ্নের জগতে চলে যান দোকানের মালিক।
    আমরা এবারে উঠে আসতে চাই। উনি বলেন। যাবার আগে এইটে শুনে যাও, রেডিওয়ে আমার দোকানের বিজ্ঞাপন কেমন করে দিতো। শুনবে? তবে শোনো।
    এই বলে তিনি চেঁচিয়ে বলেন- কুঠি! কুঠি! বেনারসী কুঠি!
    দোকান থেকে বেরিয়ে এসে দেবরূপ বলে- মাঝে মাঝে আসি এখানে। ছেলের মৃত্যুর পরে বড্ড একা হয়ে গেছেন ভদ্রলোক।
  • aranya | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৯:১৪652303
  • বড় ভাল লেখেন সে
  • de | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ১০:৩০652304
  • পাথরে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে চলা পাহাড়ী নদীর মতো সাবলীল গতি - চলুক!
  • সে | ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ২৩:৪১652305
  • অফিসে ফিরতেই বাসবী দারুন উত্তেজিত হয়ে বলে, তোমরা জানো আজ কে এসেছিলো আজ এখানে?
    কে?
    কে এসেছিলো? নামকরা কেউ?
    হুঁ হুঁ কল্পনাও করতে পারবে না। এনি গেস?
    কটা চান্স?
    তিনটে।
    জ্যোতি বোস?
    দুটো বাকি রইল
    শারুখ খান
    ফাজলামি নয়, লাস্ট চান্স
    দাঁড়া ভেবে বলছি
    ভাবো ভাবো, তবে পারবে না।
    পারবো না। বলে দে।
    বাসবী নামটা বলে। ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমের সেই প্লেয়ার। যদিও এবারে প্রথম এগারো জনের মধ্যে নেই।
    ঢপ দিচ্ছিস।
    বিশ্বাস না হয় নরেশকে জিজ্ঞাসা করে দেখো।
    নরেশ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
    কী করে হলো? কেন এসেছিলো এখানে?
    অ্যাড দেবে নাকি!
    না। কাজরী নিয়ে এসেছিলো সঙ্গে করে। মিনিট পাঁচেক ছিলো। ঐ বাক্স-বেঞ্চিতে বসল একটু। তারপরে দুজনে বেরিয়ে গেল।
    আমরা হাঁ হয়ে যাই।
    সরু জায়গাটা থেকে তপন বেরিয়ে এসে বলে, আমিও দেখেছি ওদের যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলো।
    ঐ দ্যাখো আরেকজন সাক্ষী।
    কেসটা কী হচ্ছে বলতো?
    হুঁহুঁ।
    কাজরীর এতরকম কানেক্শান দেখে আমরা সকলেই স্তম্ভিত।
    বাসবী আমায় বলে, আজ আমার বর আসবে না নিতে। তোমার সঙ্গে আজ বাড়ী ফিরব।
    তুমি তো চেতলায় থাকো।
    হ্যাঁ, প্রথমে একটু হাঁটব তোমার সঙ্গে তারপরে মেট্রো করে রাসবিহারী। দাঁড়াও কম্পিউটারটা শাট ডাউন করে দিই। একটা ঝামেলা হচ্ছে কম্পিউটারে। কাল একবার প্রলয়দাকে ফোন করব ভাবছি।
    প্রলয়দা এই কোম্পানীর সফট্‌ওয়ারটা বানিয়েছেন। সেটাতেই ডেটা এন্ট্রি করে বাসবী। প্রলয়দার একটা অদ্ভুত গুণ আছে। ওঁকে মোবাইলে ফোন করলে উনি কোনো তাড়া দেন না। ঠান্ডা মাথায় কাস্টমারের কথাগুলো শোনেন। ইন্‌কামিং কলের চার্জ নিয়ে ওঁর কোনো মাথাব্যাথা নেই।
  • সে | ০৯ ডিসেম্বর ২০১৪ ০০:৩৩652307
  • সাতটা বাজতে না বাজতেই আমরা বেরিয়ে পড়ি। অফিসে তখন আরেকজন এসেছেন, ঘোষবাবু। উনি অ্যাকাউন্টস্‌টা দেখে দেন। ট্যাক্স্‌ কন্‌সাল্টেন্ট। বেলেঘাটার সেল্স্‌ ট্যাক্স অফিসে ওঁর চেনা জানা আছে।
    নিউমার্কেটের উল্টোফুটের ফিক্স্‌ড্‌ শপ একটা দোকান থেকে বেশ দরদাম করে বাসবী দুটো কলারওয়ালা টিশার্ট কিনল বরের জন্যে। স্ট্রাইপ স্ট্রাইপ। দুশো আড়াইশো করে প্রাইস। এর পাশের দোকানটাতেই একবার ভিকি আমায় দেখিয়েছিলো একটা ম্যানিকুইন। সেই স্বপ্নের মতো শার্ট।
    আমরা আরো হাঁটি। এস্‌প্ল্যানেডের মেট্রোর এন্‌ট্র্যান্স্‌গুলো এত ভীড়, এবং আমাদের পথেও পড়বে না, তাই আমরা হাঁটি লিণ্ড্‌সে স্ট্রীট পেরিয়ে চৌরঙ্গীর ফুটপাথ ধরে। পার্কস্ট্রীট থেকে মেট্রো নেবো।
    অনেক গল্প করি আমরা। বাসবী তার শ্বশুরবাড়ীর দুর্ব্যবহারের গল্প করে। শাশুড়ী কেমন করে বেলন ছুঁড়ে মেরেছিলো, লুচি গোল করে বেলতে পারছিলো না নতুন বউ, সেই অপরাধে। মাথাটা তখন সময় বুঝে সরিয়ে না নিলে কী হত কে জানে। সেইজন্যেই সে বাপের বাড়ী চলে এসেছে। একটা হেস্তনেস্ত না হলে সে ফিরবেই না ও বাড়ী। জেদ করে কম্পিউটার শিখেছে। ব্রেনওয়্যারে। তারপর এখন নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। চাকরি করছে। এমনিতে বাইরে থেকে দেখলে কে বলবে শাশুড়ি অমন করতে পারে? বাইরের লোকজনের সঙ্গে ভীষন মিষ্টি কথার মানুষ।
    আসলে কী জানো? বাইরের লোকে বুঝতে পারে না। যার শাশুড়ী, সে ই বোঝে।
    এশিয়াটিক সোসাইটির সামনে থেকে রাস্তা ক্রস করে আমরা পার্কস্ট্রীট মেট্রো স্টেশনের গেটের দিকটায় হাঁটছি পাশাপাশি, ঠিক এমনি সময় একটা লোক হন্‌হন্‌ করে আমাদের দিকে হেঁটে এসে বাসবীর ওপর আক্রমনের মতো ভঙ্গীতে জঘন্যভাবে ওর গায়ে হাত টাত দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে চলে গেল।
    ব্যাপারটা চকিতে হলেও, আমিও ধাক্কা খেয়েছি, বাসবীকে এতটাই জোরে ঠেলেছে লোকটা। এসমস্ত করে সে সাধারন স্পীডে হেঁটে চলে যাচ্ছে পার্কস্ট্রীটের ভেতরে।
    বাসবী নিজেকে সামলাচ্ছে। ওর ভ্যানিটি ব্যাগ, শপিংএর ব্যাগ, এসব কিছুই খোয়া যায় নি। ওসবে হাত দেয় নি লোকটা। লোকটাকে দৌড়ে গিয়ে ধরি?
    বাসবী আমায় আটকে দেয়।
    আমি ধরছি বদমাশটাকে।
    না না। চলো। কীরকম বিশ্রীভাবে ধাক্কা দিলো, তাই না?
    এর নাম বিশ্রীভাবে ধাক্কা দেওয়া? ওতো তোমার গায়ে হাত দিলো!
    না না, গায়ে হাত দেয় নি তো।
    কীবলব এর পরে? যে ভিক্টিম সে নিজেই অস্বীকার করছে।

    রাসবিহারীতে মেট্রো থেকে বেরোবার পথে দেখা হয়ে গেল কাজরীর সঙ্গে। তখন প্রায় নটা বাজে। মেট্রোর ভীড় কমে আসছে। আমরা বেরিয়েছি, ও তখন ঢুকছে। ওর সঙ্গে শপিং এর ব্যাগ। সারাদিন ঘুরেছে খুব মনে হয়, ক্লান্ত মলিন চেহারা। আর ওর সঙ্গে আরো একজন রয়েছে। আগে বাসবীর মুখে না শুনলে হয়ত চিনতে পারতাম না। এই সেই ক্রিকেটার। মাঝারি হাইট। ভীড়ে মিশে যাবার মতো চেহারা।
    কাজরী গর্বের সঙ্গে হাসে। হাসে সেই ক্রিকেটারও। কিন্তু ওদের তাড়া রয়েছে। দমদমের দিকের গাড়ী প্রায় এলো বলে।

    মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়েই বাসবী বলে, চলো না দৌড়ে ঐ মিউজিকের দোকানটায়। নটা বাজলেই বন্ধ করে দেবে। দোকানটা এখনো হয়ত খোলা আছে।
    আপনাদের ঐ সিডিটা এসেছে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের?
    কোনটা বলছেন, অনেকগুলো আছে তো।
    না না, ঐ যেটায় ঐ গান গানটা আছে না, আহা পেটে আসছে মুখে আসছে না.. বলছি এক্ষুনি.. আমি বেলফুল ফিরি করি পাড়ায় পাড়ায়।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন