
রূপকথার পুরো জগতটা জুড়েই রাজপুত্তুর কোটালপুত্তুরদের সাথে সমান জাঁকিয়ে আছে এই সব না-মানুষরা। সে আমাদের দেশের গল্পেই বলুন আর অন্য দেশের কাহিনীতেই বলুন। রূপকথার জাদু দুনিয়ায় জন্তু জানোয়ার, পাখিপক্ষীরা যে মানুষের মতই কথা বলতে পারবে তাতে আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই। ভালুক এসে চাষীর সাথে ফসলের ভাগ নিয়ে ঝগড়া করবে, শেয়াল আর সারস এ ওর বাড়ি নেমন্তন্ন যাবে, খরগোশ আর কচ্ছপ দৌড়ের বাজি ধরবে এসব ওখানে হামেশাই হয়ে থাকে। কিন্তু আজ আমি সেই সব না-মানুষদের কথা বলব নানান দেশের রূপকথায় যারা এক্কেবারে মানুষের মত হয়েই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে আসুন দেখি আমাদের নিজেদের দেশের আঙিনায়। বাংলার রূপকথায় সেই যে ছিলো এক হীরেমন পাখি। এই হীরেমন দুনিয়ার সব প্রশ্নের উত্তর জানতো, তে¢ত্রশকোটি দেবদেবীর নাম বলতে পারতো। ... ...

একদিন একটা ভূত ছিল। ভূতটার অন্নপ্রাশন ছিল, মাংস আর খিচুড়ি রান্না করেছিল। ভূতের মা বলল, "তুঁই কিঁ চঁকলেঁট খেঁয়েঁছিঁস?' ভূত বলল, "হ্যাঁ, খেঁয়েঁছি।' ... ...

আঙুলের ছোঁয়া লাগছিল মুখে, কখনও চোখ, কখনও নাকের পাশে। আলগোছে। হাল্কা ছোঁয়া। অথচ শিরশির করছিল শরীর। সমস্ত শরীর। আঙুলের নখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল কানের পাশের গাল। আলতো। চন্দনের ঘ্রাণ আসছিল। চোখ বুজে আসছিল কপালে ঈষৎ সূচালো কিছুর স্পর্শে। সে স্পর্শ যেন অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গের মত কপালকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে। ও চোখ খুলতে চাইল। চোখের পাতা ভারি ঠেকল। সামনে দেখল হালকা কচি কলাপাতা রং, লাল পাড়ে ঘেরা। ... ...

বাতাসি জানে না আজ ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখ। শীত সামান্য কমে আসার ফলে এখন সে তার ছেঁড়া পোশাকেও খুব ভোরে বেরোতে পারে। সে ঠিক করেছিল আজ নতুন বাড়িগুলোর পেছনের গলিতে যাবে। সে ঠিক জানে এখনও ওদের দলের কেউ ওখানে যায়নি। ... ...

ছোট্ট দুটো হলদে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে এঘর থেকে ওঘর, ওঘর থেকে সেঘর। নদীর দিক থেকে হাওয়া আসছে। অশথ গাছের পাতায় আওয়াজ হচ্ছে ঝিরঝির ঝিরঝির। সামনের ঘাসছাড়া টুকরো মাঠটায় ধুলো উড়ে যাচ্ছে পাক খেয়ে। দোতলা বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে ভূতের মত। ... ...

স্বপ্নের মতো অন্তর্লীন কোন বিষণ্ন পৃথিবীর অধিবাসে সক্রীড়ক ক্লান্ত সময়। সে এক অনাদি নগরী ছিল। নগরী নয়। নগরপল্লী। টিলার পর্য্যঙ্কে স্থাপিত সুভিক্ষ নগরী। ভোগের, ব্যসনের, দ্যূতক্রীড়া ও অত্যুজ্জ্বল পানোৎসবের রাজধনী যে সুভিক্ষ নগরী, তারই বহির্রেখার অন্ধকারভাগে তার অবস্থান। তাই নগরী নয়, নগরতলি। লোকে ডাকে ধরন্ত পল্লী। ... ...

একটা লুক একটা বাসকোর ভিতরে ঢুইকা মরার প্র্যাকটিস করবার নুইছিল। এই সিন দেইখা একটা বিড়ালের বাচ্চা আইগিয়া আইয়া তারে কইল, তুমি মরবার চাউ ক্যা? লুকটা একটু ভুদাই হইল এবং কইল, তুই জানলি ক্যামনে? বিড়াল কয়, তুমার প্যাট্টিস দেইখাই বুজছি। ... ...

একটা বেওয়ারিশ কুকুরছানা, খুব বেশি হলে হয় তো কয়েক দিন বয়েস হবে, পৃথিবী সম্বন্ধে একেবারে অনভিজ্ঞ, ভরা মার্কেটের মাঝে ছোট্ট শরীরটা নিয়ে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল, আর দু'পা চলামাত্র হুড়মুড়িয়ে তার ওপর এসে পড়ল একটা সওয়ারি-বোঝাই রিকশা। পেছনের একটা চাকা চলে গেল কুকুরটার ঠিক গলার ওপর দিয়ে। একটা ক্ষীণ আওয়াজ বেরলো কি বেরলো না তার ছোট্ট গলাটা থেকে, সাথে সাথে বেরিয়ে এল তাজা লাল রক্ত। ছোটো শরীরটা ছটফটাতে লাগল তাতাপোড়া পিচের রাস্তার ওপর। ... ...

নীলের বাড়াবাড়িই। বাড়াবাড়ি তো সবই। বড়বড়ও। এক্স এক্স এল। এক্স এস খুঁজে পাওয়া দায়। আর এদিকে সব এক্সেস। যেদিকে তাকাও। উপরে তাকাও তো এক্সেল কাচা এক্সট্রা হোয়াইট মেঘ। মুখ তুলে তাকাও তো এক্সট্রা হোয়াইটেনিং টুথপেস্টচর্চিত স্মাইল। সামনে তাকাও তো সুপার স্বচ্ছ দরজা। দরজা যে আদৌ আছে তা-ই বোঝা দায়। প্রথম কদিন তো দুর্যোধনবাবুর ইন্দ্রপ্রস্থ ভ্রমণসমদশা। ... ...

এই ঢাকা তখন সেই ঢাকা ছিলো না। ফুলবাড়িয়াতে ছিলো রেল স্টেশন। রিকশাই ছিলো সর্বত্র জনপ্রিয় বাহন। ইপিআরটিসি'র লাল দোতলা বাস বিআরটিসি হইয়াছে মাত্র। বাবার হাত ধরিয়া সেই দোতলা বাসে চাপিয়া মিরপুর-ফুলবাড়িয়া ভ্রমণ করিয়া জীবনকে মনে হইয়াছিলো সার্থক। রমনা পার্কের দোলনায় আবার কবে চড়িবো, সেই ভাবনায় ছোট্ট শিশু মন কতই না রঙিন স্বপ্ন আঁকিয়াছিলো। ... ...

আমি শরৎ ভালোবাসি, অনেকে বলে শরৎকেই ভালোবাসি। জানালায় উঁকি মেরে অ্যাশট্রের গা ভরা রোদ, চারশো মিলিয়ন ইয়ার রোদও ভালোবাসি। একের পর এক ভালোবাসার ঝাপটায় তিনটে লাইনে পাঁচবার ভালোবাসি। ইয়ার এর কথায় মনে পড়ল অনেক ইয়ার ধরে আমি ইয়ারবাজ ছিলাম। ... ...

মা আসেন প্রতিবছর। মা জানতেও পারেন না দেশের কী অবস্থা, দশের কী হাল। তবুও দেশ ও দশ প্রতি অণুপল শুনতে থাকে মায়ের আগমনের প্রতিধ্বনি। এবার মা আসছেন বদলের বঙ্গে। সেটাই বড়কথা। মায়েরও হাওয়াবদল হবে আশা করা যায়। কিন্তু প্রতিবছরের মত বাজারের দাম বদলায়না। রাস্তাঘাট সারাই হয়না। রাজনীতির অশুভ আঁতাত, খরা-অতিবৃষ্টির টানাপোড়েনে রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি, প্লাসটিক না পেপার, পরীক্ষার পাশফেল, রিসেশান-ইনফ্লেশান চাপানউতোর সবকিছু চাপা পড়ে যায় কৈলাশ এন্ড কোং দের আগমনে। ওবামা-ওসামার উত্থান-পতনে, বিস্ফোরণে, দু:খের যজ্ঞে আহুতি দেয় দেশবাসী। ... ...

উজ্জ্বলকুমার দে চোর। সে যদি আজকে নবীনা সিনেমার ফুটে থাকতো, তাহলে মাজারের পাশের গলি দিয়ে দৌড়ে দশ গলির এক গলির মধ্যে লুকিয়ে পড়তে পারতো। নিদেনপক্ষে যদি যোগেশচন্দ্র চৌধুরী ল কলেজের সামনে থেকে বক্তিয়ারশা রোডে ঢুকে পড়তো, তাহলেও ধরা না পড়ার একটা আশা ছিলো। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, যে সে এর কোনওটাই করে উঠতে পারে নি। আর সময়টাও এমন, যে অসময়ে টিউশানি পড়তে আসা ছেলেপিলের বড্ড উপদ্রব। ... ...

খাজুরাহো মন্দিরের দেয়াল থেকে মাটিতে লাফাবার সময়, ঘুরঘুরে পোকার মুখে পাঠানো আদেশ তামিল করার জন্যে, বাতাসের মাঝপথে, নিজেকে পাষাণ মূর্তি থেকে রক্তমাংসের মানুষে পালটে নিয়েছিল কুশাশ্ব দেবনাথ নামে স্বাস্থ্যবান যুবকটি, যে কিনা হাজার বছরেরও বেশি চাণ্ডেলাবাড়ির একজন গতরি, ভারি-পাছা, ঢাউসবুক উলঙ্গ দাসীর ঠোঁটে ঠোঁট, যোনিতে লিঙ্গ, আর স্তনে মুঠো দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়েছিল। ... ...

প্রতিদিন খুব ভোরে, কাক ডাকারও আগে নীলিমার ঘুম ভাঙে। দিনের এই সময়টা আকাশ ঘন অন্ধকারে ঢাকা থাকে, ঘড়ি দেখে বুঝতে হয় ভোর হয়েছে। শীত আসছে, এখন রাত শেষ হতে দেরি হয় খুব। আজকাল ঘুম থেকে উঠে একটা হালকা চাদর গায়ে না দিয়ে বেরোনো যায়না, মফস্বলের এই দোতলা বাড়িটা, তার বাসিন্দাদের মতই সর্বাঙ্গে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকে। ... ...

আজকে ডকইয়ার্ড ভোঁভা - ছুটি। না, ঠিক ছুটি নয়, আজ স্ট্রাইক, অর্থাৎ ছুটিই। প্রায় সাড়ে-ছ বছর কাজ করছি, এই প্রথম এমন স্ট্রাইক হলো। কারণ? ... মারপিট। দুই দলের মধ্যে তুমুল মারপিট হলো গতকাল দুপুরে, আমি দেখলাম। অনেকেই দেখলো, দূর থেকে। মারপিট কেন হয়েছে, সেটা ঠিক জানিনা। বক্সীর দলের কোন ছেলে নাকি তোলাবাজীর তিন হাজার সাতশো টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছে (পরে জানা গেছে), সেটা প্রথমে বক্সী ধরতে পারেনি। ভেবেছে বাবলুর দলের সাথে ছেলেটার আঁতাত আছে। ... ...

ওটা আমার রোগ। টাইফয়েডের মতো ভুগি আমি... অফিসে, আড্ডায়, প্রেমে! প্রোজেক্ট ম্যানেজারকে ঠারেঠোরে শুনিয়ে দিই... এই যে তোমার কেলানো দাঁতের ছুরির ফলা এর ধার আমি জানি! পেছন ফিরলেই ড্রাকুলা হয়ে কামড়াবে আমার পিঠ। এই যে এতো নলেনগুড়ের গন্ধ, কথায় কথায় সব আমি জানি। আমার ঘাড়ে বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস আর তোমাদের শোবার ঘরে ট্রিংকাস-এর উল্লাস! ... ...

হয়তো আমাকে তুমি ততটা মনে রাখোনি কখনো। তোমার ছিল একান্ত গণ্ডীতে বাঁধা এক নিজস্ব জীবন। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলতে পারব না কোনদিনও। কারণ আমার সুখের ঘরের চাবিকাঠি ছিল তোমার হাতে, আমার শান্তির পারাবত উড়তো তোমারই হাতের ইশারায় ..! তবু তোমার মত এক নিকটজনকে হারাতে যে কী বেদনায় ছটফট করেছি, তা কেউ বুঝবে না। বড় কঠিন ছিল সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।... পারব কি...? হবে কি...? এমন নানান যুদ্ধ চলেছে মনের মধ্যে, কুরে কুরে খেয়েছে আমায় প্রতি পল। কিন্তু শেষ অবধি সই করেছি তোমার মৃত্যুর পরোয়ানায় ! রাজি হয়েছি অনেক দ্বিধার পর, কারণ দিনে দিনে তুমি হয়ে উঠছিলে দুর্মদ...অসহনীয়...কালান্তক...! ... ...

আমাদের ঘরে জিনিশপত্র স্তূপাকার হয়ে ওঠে। আমি শ্যানেলের পারফিউম, আরমানির শার্ট ও রোলেক্সের ঘড়ি ব্যবহার করতে থাকি নিয়মিত। আমার চামড়া ক্রমশ আরো চকচকে হয়ে ওঠে। চুল হয় ঘন। আর রেশমের মতো কোমল। একদিন অফিস যাওয়ার পথে আমার সঙ্গে একটি গাড়ির ধাক্কা লাগে। ড্রাইভারের মাথা ফাটে। ও পাঁজরের চারটি হাড় টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। অথচ, আমি অক্ষত থাকি। ও এতে আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। অফিসে সবাই আমাকে সম্বর্ধনা দ্যায়। ও কুর্নিশ করে। ... ...

এ সময় বিলের মাঝখান থেকে চাঁদ ওঠে। একটু জলে ভেজা। জলের গন্ধ পেয়ে ঝুপ করে লাফ মেরে ওঠে লবটুলি মাছ। মাছের পেটের কাছে লাল। কাটা দাগ। তাই দেখে বাঁশঝাড় থেকে দুটো পাতা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ঝরে পড়ল। দরিয়াবানু পাতা দুটো কুড়োয়। তক্ষকের ছায়া খসে পড়ে। দরিয়াবানু যত্ন করে ছায়াটি কুড়োয়। আকাশ থেকে শুয়াচান পাখির মায়া ঝরে পড়ে। দরিয়াবানু ঝিমুতে ঝিমুতে মায়াটুকু কুড়িয়ে নেয়। এই মায়ার মর্ম অপার। সোনাবরুর চোখেমুখে এই মায়াটুকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ধরণী, দ্বিধা হও গো মা জননী। এ প্রাণ রাখি কেমনে। ... ...