
এখন যখন আমরা পত্রিকার পাতায় পড়তে বাধ্য হই তিন দিনের সদ্যজাত শিশুকে ডাস্টবিন হতে তুলে বাঁচাল ক্ষুধার্ত কুকুর, তখন আমাদের মনে পড়ে যায় ৬১ বছর আগে লেখা হাসান আজিজুল হকের ‘শকুন’ নামের গল্পটির কথা। যদিও সেই গল্পে কাদু শেখের বিধবা বোনকে চিহ্নিত করা গিয়েছিল, চিহ্নিত করা গিয়েছিল শকুনদের, কিন্তু এই ২০২১ সালে যখন নগরের ডাস্টবিনে বা নালায় মাঝে মধ্যেই সদ্যজাত শিশুকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তখন সেই মা-দের আর চিহ্নিত করা যায় না। চিহ্নিত করা যায় না শকুনদেরও। এই ৬১ বছরের ব্যবধানে দেশটা ছেয়ে গেছে কাদু শেখের বিধবা বোন আর অসংখ্য শকুনে! কিন্তু হাসান আজিজুল হক আর নেই! ... ...

‘চাঁপাডাঙার বউ’ উপন্যাস ভাঙনের কাছাকাছি গিয়ে আবার এক হয়ে যাওয়ার কাহিনি। নয় বছর বয়সে বিয়ে হয়ে বাড়িতে এসেছিল ‘বড়বউ’। দেওর মহাতাপ তখন আট বছরের বালক। তাই তারা পরস্পরের বাল্যসঙ্গী। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক নিবিড় ভালোবাসা ও ভরসার সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল। সেই ছিল ছোটবউ মানদার রাগের কারণ। গ্রামের পাঁচজনে বউদি-দেওর সম্পর্ক নিয়ে পাঁচ কথা বলতে শুরু করায় সেতাবেরও মনে সন্দেহ জাগে। একথা শুনে বড়বউ রাগ করে তার স্বামীকে বলত, ‘ইতর’। বলত, পটোয়ারি-জালিয়াতি বুদ্ধিতে এই সম্পর্কের হিসেব বোঝা যায় না। ... ...

... এই লাইনে এ লেখার সমালোচনা হওয়া খুবই সম্ভব ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। হয়নি, সেটাই এই লেখার উপজীব্য। হয়নি, কারণ, একটা বড় অংশের লোক, যাঁরা হইচই করছেন, তাঁরা উপন্যাস এবং গল্প, কোনোটাই পড়েননি। কী পড়েছেন? না, ফেসবুক আর আনন্দবাজারের চিঠি। কনিষ্কর অভিযোগ, শ্রীজাতর উত্তর। হয় প্রোফাইলে গিয়ে পড়েছেন, কিংবা তাও নয়, স্ক্রিনশট পেয়েছেন, হাতের গোড়ায়, এবং চোখ বুলিয়ে উদ্ধার করেছেন। এরকমও লোকজন গর্ব করে বলছেন, যে, দু’পক্ষের বক্তব্যই পড়লাম, অমুকেরটা আমার বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। অতএব অমুক চোর (অথবা নয়)। এ যেন, “জানলার বাইরে কি বৃষ্টি পড়ছে?” – এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি বলছেন, “গুগল আর ইয়াহু দু’জনেরই বক্তব্য পড়লাম। আমার জানলার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে কিনা, এ ব্যাপারে ইয়াহুর বক্তব্যই অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে হল”। ... ...

আসলে, মেধা-যুক্তি-বিতর্কের সঙ্গে কায়েমি স্বার্থ কোনওদিনই পেরে ওঠে না। তখন, সব কালে, একটি পথই অনুসৃত হয়। চরিত্রহনন আর কুৎসা রটনা। একেবারে, এক জিনিস ঘটেছিল খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রীক দার্শনিক এপিকিউরিয়াসের সঙ্গে। মূলতঃ লুক্রেশিয়াসের রচনা থেকে তাঁর দর্শন রেনেসাঁসের সময় ইওরোপ জানতে পারে। এবং পরম শক্তিশালী, জ্ঞানবিপণির চাবিকাঠির রক্ষক চার্চ, তাঁর দর্শন - যার সঙ্গে যাবজ্ জীবং সুখং জীবেৎ - এর আশ্চর্য মিল - কে অসংযত বেলেল্লাপনার সমার্থক বলে দেগে দেয়। ইংরিজিতে এপিকিউরিয়ান বলতে লাগামছাড়া ইহসুখবাদী (হেডনিস্ট) এক মানুষকে বোঝানো হয় আজও। ... ...

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ – ১৫ নভেম্বর ২০২১) সাহিত্যকর্মের হিসাব দিতে গেলে আমরা সাধারণত তিনটি উপন্যাসের নাম বলি – ‘আগুনপাখি’ (২০০৬), ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ (২০১৩) এবং ‘শামুক’ (২০১৫)। এর মধ্যে ‘আগুনপাখি’ সর্বাধিক আলোচিত, ‘শামুক’ প্রায় অনালোচিত। আপাতদৃষ্টিতে ‘আগুনপাখি’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হলেও ‘শামুক’ লেখা হয়েছে ১৯৫৭ সালে এবং এক সময়ের বহুল আলোচিত পত্রিকা ‘পূর্বমেঘ’-এ ১৯৬২ সালে সেটির তিন কিস্তি প্রকাশিতও হয়েছিল, কিন্তু পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় কেবল ২০১৫ সালে। এসব তথ্য নিয়ে কথা বলার সময় যে সত্যটিকে উপেক্ষা করা হয় সেটি হচ্ছে, হাসান আজিজুল হকের পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হচ্ছে ‘লাল ঘোড়া আমি’। ... ...

বিতর্ক আর আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই ত্রয়ীর নাম ডেভিড কার্ড, জশুয়া আনগ্রিস্ট এবং গিডো ইম্বেন্স। পুরস্কারের অর্ধেক কার্ডের এবং অর্ধেক বাকি দুজনের। এঁদের কর্মক্ষেত্র যথাক্রমে ক্যালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলে, এম আই টি এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। একাডেমির বিবৃতিতে বলা হয়েছে এঁদের বিশেষ অবদান যথাক্রমে শ্রম বিষয়ক অর্থনীতি (labour economics) ও কার্যকারণ সম্পর্ক বিশ্লেষণের পদ্ধতিতে (analysis of causal relationships)। তিনজনেই করেন পরিসংখ্যান (data) ভিত্তিক গবেষণা (empirical research)। চারপাশের দৈনন্দিন ঘটনাবলী আসলে একেকটি স্বাভাবিক পরীক্ষা (natural experiment)। তাকে বুঝতে হলে এবং তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে তার কারণ ও ফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ... ...

দুই তিন বছর আগের কথা। মেয়ের পাঠ্য বইগুলি নাড়াচাড়া করতে করতে প্রথম হাতে এল ‘সহজ পড়া’ প্রথম পর্ব, লেখক সুদেষ্ণা মৈত্র। বইটা মেয়েকে পড়াতে পড়াতে কেমন ভালো লাগতে শুরু করল। তারপরেই শিশু সাহিত্য সংসদের ক্যাটালগ খুঁজে সংগ্রহ করলাম ‘সহজ পড়া’ দ্বিতীয় পর্ব। এইবার আরো মুগ্ধ হলাম। সেই ১৯৯৭ সালের এক ডিসেম্বর মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সুদেষ্ণা মৈত্রের ‘সহজ পড়া ’ বইটির দুটি খণ্ড। প্রকাশক শিশু সাহিত্য সংসদ। আপাতভাবে শিশুপাঠ্য এই বইদুটি বিভিন্ন বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার অন্তর্গত। কিন্তু এই দুটি বই পাঠ্যতালিকার গুরুগম্ভীর গণ্ডি পেরিয়ে শিশুদের এক আশ্চর্য কল্পনার ভুবনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। ... ...

গামছা-সুকানকে চিনতে হলে আপনি হাওড়া থেকে বর্ধমানের মেন লাইনের লোকালে চেপে বসুন। মেমারির গায়ে গায়ে একটি ছোট স্টেশন নিমো। আগে ছিল দুটো লাইন – আপ-ডাউন প্ল্যাটফর্ম, ইদানীং মাঝে একটা তিন নম্বর শুরু হয়ে লোকের ভোগান্তি বেড়েছে। কারণ, পুরুষানুক্রমে যে স্টেশন মাস্টারের দায়িত্ব সামলায়, সে হরদম অন্যমনস্ক হয়ে ভুল প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা করে। আর শেষ মুহুর্তে তার কোর্স-কারেকশনের পাল্লায় পড়ে বুড়োবুড়ি-মেয়েমদ্দ সবার হেনস্থা, দৌড়োদৌড়ি। তাই দৌড়তে দৌড়তে বাউরি বউ চেঁচিয়ে ঘোষণা করে – এবার গোপালকে ক্যাল দিতে হবে। নিমো গ্রামের গল্প - পড়লেন রঞ্জন রায়। ... ...

জাঞ্জিবার এমন একটা জায়গা যেখানে যারা দাস ছিল তারা নিজেরাই দাসব্যবস্থাকে সমর্থন করত, ‘প্যারাডাইস’ উপন্যাসের এক চরিত্র এরকমটাই বলছে। এই দ্বীপপুঞ্জে ভারত মহাসাগরের নীল নোনা জল খেলা করে যার মধ্যে অবস্থিত প্রাচীন, ভগ্নপ্রায় বহু বন্দর যেখানকার নোঙর করা ভাসমান যানগুলি থেকে এখনো শোনা যায় শৃঙ্খলিত দাসদের মর্মান্তিক আর্তনাদ, হাহাকার। এটি তানজানিয়ার অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল যা ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্ত আব্দুলরাজাক গুর্নাহর কল্পনার আঁতুড়ঘর। ... ...

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় এর "প্রাগিতিহাস - ভারতবর্ষে পরিযান ও জাতিগোষ্ঠী গঠন" সম্বন্ধে বিশিষ্ট জিন-তাত্ত্বিক অধ্যাপক পার্থ পি মজুমদার বলেছেন, “এটি মানব-বিবর্তন, মানুষের পরিযান এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক নিয়ে বাংলা ভাষার প্রথম বই। বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে লেখা নির্ভরযোগ্য এবং অসাধারণ পাঠ যোগ্য এই বই।” সেই বইয়ের আলোচনা করলেন জয়ন্ত দাস। ... ...

রমাপদ চৌধুরীর লালবাঈ ও লীলা মজুমদারের সুকুমার - দুটি বই নিয়ে আলোচনা করলেন দিব্যেন্দু সিংহ রায়। ... ...

এটি পড়া বই বিভাগের বিশেষ একটি প্রকাশনা। একটি একটি সাক্ষাৎকার, কিন্তু লেখা নয়। দৃশ্য শ্রাব্য। নিয়েছেন ইন্দ্রাণী দত্ত। যাঁরা শুনতে বা দেখতে চান, চালিয়ে দেখে বা শুনে নিন। ... ...

তেমনই বুদ্ধদেব গুহ, থিম্যাটিকালি না হলেও, বাঙালি শহুরে, উচ্চবিত্ত আর ধনী চরিত্রদের বাংলা মূলধারার সাহিত্যে আনলেন। বুদ্ধদেব গুহর বাইরে মূলধারায় উচ্চবিত্ত চরিত্র সেরকমভাবে এসেছে কি? তার একটা কারণ অবশ্যই আমাদের সাহিত্যিকরা ব্যক্তিগত জীবনে মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীরা ধনী ঘরের সন্তান ছিলেন। তাঁদের গল্পে উচ্চবিত্ত ও ধনী চরিত্র এসেছে সময়ে সময়ে, কিন্তু শরৎচন্দ্র থেকে হালফিলের যে উপন্যাস পড়ি, সেখানে উচ্চবিত্ত চরিত্র খুব কম ক্ষেত্রেই মূল চরিত্রের স্থান পেয়েছে ওই কারণে। ... ...

‘সন্দীপন পাঠশালা’র আগে তারাশঙ্কর তাঁর ছোটগল্পে শিক্ষক-মহাশয়দের কথা অল্প অল্প তুলে ধরেছেন। ১৯৩৩ সালে বঙ্গশ্রীর অগ্রহায়ণ সংখ্যায় ‘মধু মাস্টার’, ১৯৩৬ সালে দেশ পত্রিকার চৈত্র সংখ্যায় ‘পণ্ডিত মশাই’ এবং ১৯৪১ সালে প্রবাসীর বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘হরি পণ্ডিতের কাহিনি’। ‘পণ্ডিত মশাই’এর যতীন চাটুজ্জে এবং ‘হরি পণ্ডিতের কাহিনি’র হরিনাথ চাটুজ্জে যে একই ব্যক্তি তা বুঝতে পাঠকের অসুবিধা হয় না। দুজনেই পল্লীগ্রামের পণ্ডিত। দুজনেরই পাঠশালা বসে জমিদারের কাছারি বাড়িতে। ছেলে পড়ানোর চাকরির অঙ্গ হিসেবে দুজনকেই গ্রাম দেবতার পুজো করতে হয় এবং জমিদারের আগমন হলে রাঁধুনির ভূমিকা পালন করতে হয়। এঁদের দুজনেরই কাজে প্রবল নিষ্ঠা। খেটেখুটে একেকটি ছেলেকে এঁরা তৈরি করেন বৃত্তি পরীক্ষার উপযুক্ত করে। আর পার্শ্ববর্তী পাঠশালা সেই ছাত্রকে লোভ দেখিয়ে ভাঙিয়ে নিয়ে যায় পরীক্ষার আগেই। তাই এঁদের পাঠশালা সরকারের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকে। যতীন অথবা হরি পণ্ডিতকে এই কারণে লোকে ‘কাক-পণ্ডিত’ বলে। চিরকাল কাকের মতো তাঁরা অপরের বাচ্চাকে উপযুক্ত করেই যান। ... ...

ইউভাল নোয়াহ হারারির দুটি বিখ্যাত বই 'স্যাপিয়েন্স' এবং 'হোমো দিউস' যথাক্রমে মানবসভ্যতার ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের ওপর আধারিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বই 'টুয়েন্টি ওয়ান লেসন্স টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি'তে তিনি বর্তমান এবং নিকট ভবিষ্যতের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমি তাঁর মতামতের একটা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করব কয়েকটি পর্বে। ... ...

মাটি ভাগ হয়, দেশ ভাগ হয়, মানুষ, পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজন, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জন্ম জন্মান্তর ধরে গড়ে ওঠা গ্রাম, ঝিল, পুকুর, বনবাদাড়, ঘরবাড়ি বিদীর্ণ করে দেয় দিল্লির শাসকের কাঁচি। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী আসিফ সামিনার পরিবার এপার-ওপার হয়ে যায়, তাদের সদ্য প্রস্ফুটিত প্রেমের মাঝে রাষ্ট্র খুঁটি পুঁতে দেয়। প্রবল ঝুঁকি নিয়ে তারা খণ্ডিত হয়ে যাওয়া নাজির বিলের কাছে দেখা করে, সুখী দাম্পত্যের স্বপ্ন দেখে, তারপর একদিন সীমান্তরক্ষীর গুলিতে দুই উজ্জ্বল তরুণ তরুণী পাচারকারীর লাশ হয়ে যায় .... সম্পাদক বিমল চক্রর্তীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, কারণ ত্রিপুরার দেশভাগের গল্প একসাথে গ্রন্থিত হয়েছে এরকমটা অন্তত এই প্রতিবেদকের আগে কখনো নজরে আসেনি। সেদিক থেকে এই সংকলনটি অনন্য ... ... ...

দেবেশ রায়, এডোয়ার্ড সয়িদ-এর কালচার অ্যান্ড ইমপিরিয়ালিজম বই থেকে তুলে এনেছেন ইতিহাসের এক নৈর্ব্যক্তিক সত্য – “সাম্রাজ্য বস্তুত এক প্রলম্বিত নৈতিক কর্তব্য।” সেই কর্তব্য পালনের জন্যেই অধীনস্থ, নীচ, পশ্চাৎপদ জাতিগুলিকে শাসন করতে হবে। আর এই ‘নৈতিক কর্তব্য’ সাধন করতে গিয়েই ব্রিটিশ শাসকেরা উপমহাদেশের ক্ষমতালোভী কতিপয় রাজনৈতিক নেতার যোগসাজশে ঘটিয়ে তুলতে পারল এমন এক অভাবিতপূর্ব ঘটনা – দেশভাগ। ভারত-চেতনার হত্যা ঘটাতে তারা ঠেলে দিল আমাদের গৃহযুদ্ধে, দাঙ্গায়। রক্তপাত, অবিশ্বাস, ঘৃণার লাভাস্রোতে ছাই হয়ে গেল সাধারণ কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন আর ভবিষ্যৎ। এমন চিরস্থায়ী সেই অভিঘাত যে, সাত দশক পার হয়েও সেদিনের স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে আমাদের লেখায়, চেতনায়। ... ...

কেন্দ্র রাজ্যের পুনর্বিন্যাসের দাবিতে রাজ্যে গড়ে উঠল আন্দোলন। জ্যোতি বসু প্রমোদ দাশগুপ্ত অশোক মিত্র তাকে অন্য ভাষা দিলেন। জ্যোতি বসু বললেন, খানিকটা যেন মুজিবের স্বরেই, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে টাকা ছাপানোর মেশিন আছে। ওদের যখন ইচ্ছে টাকা ছাপিয়ে নেয়। রাজ্য সরকারকে ভাগ দেয় না। আর রাজ্য সরকারের হাতে টাকা ছাপানোর মেশিনও নেই।' স্বর আরেকটু উঁচু পর্দায় যেতে পারত। গেলে দেশের মঙ্গল হতো। গেল না। কারণ সর্বভারতীয় হতে চাওয়ার দায়। অমল সরকার লিখেছেন: কংগ্রেস, বিজেপি যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, রাজ্যগুলিকে শোষণ করেছে। রাজ্যগুলিকে একদিকে রাজস্বের ভাগ কমিয়ে দিয়ে বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার সীমা স্থির করে দেওয়ার পাশাপাশি নানা শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার যে হাজার হাজার কোটি টাকা ( এখন লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা; গত সাত বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ বেড়েছে ৪৯ লাখ কোটি থেকে বেড়ে এক কোটি দুই লাখ কোটি টাকা) ঋণ নিচ্ছে তা নিয়ে জবাবদিহির বালাই নেই। ... ...

The Economics of Biodiversity: The Dasgupta Review সেই সচেতনতা শিক্ষণের পাঠ নিয়ে এসেছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে প্রকাশিত এই রিপোর্টটি জীববৈচিত্র্যের অর্থনীতি বিষয়ে একটি পথপঞ্জী। প্রথম যে বইটি হাতে নিয়ে পরিবেশের অর্থনীতি শিখতে শুরু করেছিলাম, তার নাম The Control of Resources, লেখক পার্থ দাশগুপ্ত। তারপর ওঁর অনেক লেখা পড়েছি, বক্তৃতা শুনেছি। ইংল্যান্ডবাসী স্যার পার্থ দাসগুপ্ত পরিবেশের অর্থনীতি চর্চায় একটি অনিবার্য নাম। ব্রিটিশ সরকারের জন্য তৈরি এই রিপোর্টটি তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অসীম মনীষার স্বাক্ষর বহন করে। বর্তমান সংকটের মুহূর্তে এই রিপোর্টটি দিগ্দর্শন করে, মানবজাতিকে এগিয়ে চলার পথ দেখায়। ... ...

মুর্শিদাবাদের একটি বর্ণাঢ্য ইতিহাস ছিল। একসময় দিল্লিকে পাল্লা দেবার ক্ষমতা রাখত মুর্শিদাবাদ। ব্যাংকিং হাউস হিশেবে তার এতো প্রতিপত্তি ছিল যে খোদ দিল্লির বাদশা তার দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সুরম্য সৌধ মিনার অট্টালিকা, নহবতের সুর, আড়ম্বর বিলাসব্যসন নিয়ে যে একটি জবরদস্ত জনপদ গড়ে উঠছিল ভাগীরথীর তীরে তার ছায়া বিলীনপ্রায়। সংরক্ষণের অভাব কেড়ে নিচ্ছে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। সংরক্ষণের জন্য সচেতনতার অভাব তার থেকে অনেকগুণ বেশি। কত মূল্যবান স্মারক এইভাবেই আমরা হারাতে বসেছি এককালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে। ... ...