
"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ১০ … মঠ প্রাঙ্গণের বাইরে এসে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে থাকা ভগ্নস্তুপে খানিক পায়চারি করি। সামান্য যে কয়েকজন দর্শক এসেছিল তারা সবাই চলে গেছে। এখন এলাকাটা একদম নির্জন। খাড়া সিঁড়ি ধরে গড়ির প্রাচীরে চড়ে ওপর থেকে চারপাশে চেয়ে দেখি। প্রায় হাজার বছর আগে এই গড়ির পরিবেশ তখন আশ্রমিকদের উপস্থিতিতে কেমন প্রাণবন্ত ছিল তা এখন শীতের এই নির্জন বিকেলের মরা আলোয় অনুভব করা কঠিন। আশ্রম কাছেই তাই ফেরার তাড়া নেই। ফিরতেও ইচ্ছে করছে না। গড়ির দুজন সিকিউরিটি গার্ডের সাথে মঠ চত্বরে অনেক গল্প হয়েছে। ওরা আসছে মেন গেট বন্ধ করতে। আমায় পাঁচিলের মাথায় বসে থাকতে দেখে হেসে বলে, চলে আসুন স্যার, ছটায় গেট বন্ধ হবে। নেমে গেট পেরিয়ে হাঁটতে থাকি আশ্রমের দিকে। একপাল গরু মোষের দল গলায় ঘন্টা বাজিয়ে ঘরে ফিরছে। দু একটা বাছুর শৈশবের চাপল্যে খানিক লাফালাফি করছে। বয়স্কদের চলার ছন্দে দীর্ঘ দোহনের, নিত্য জাবর কাটার ভাবলেশহীন শ্রান্তি। দাঁড়িয়ে যাই। এ দৃশ্য বহুবার দেখেও আশ মেটে না। ... ...

সামনের জলে সেই প্রতিফলনের ছবি সুস্পষ্ট! চৌখাম্বা, মন্দানি, সুমেরু, খর্চাকুন্ট আর কেদার – বাকি শৃঙ্গরা ঢাকা পড়েছে ওক, দেওদার, রডোডেনড্রনের বনানীর পেছনে, তার-ও ছায়া জলে। আমাদের দেখাদেখি আরও চার-পাঁচজন পর্যটক এসে জড়ো হন সেই জায়গায়। সকলেই আমরা নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে সেই স্নিগ্ধ ভোরের অলৌকিক দৃশ্যটুকু শরীর-মনের অলিন্দে পূর্ণ করে নিতে থাকি। তবু এই পূর্ণতার কি সীমা আছে! না শেষ আছে! “অসীম কালসাগরে ভুবন ভেসে চলেছে। অমৃতভবন কোথা আছে তাহা কে জানে।। হেরো আপন হৃদয়মাঝে ডুবিয়ে, একি শোভা! অমৃতময় দেবতা সতত বিরাজে এই মন্দিরে, এই সুধানিকেতনে।।“ ... ...

উখীমঠের কিছু আগে থেকে রাস্তার চড়াই শুরু হল। এখান থেকে গুপ্তকাশীর রাস্তাও চলে গেল নদী পার হয়ে ওপারে। কেদারের পথ ঐদিকেই মন্দাকিনী বরাবর। এপাশ থেকে আমরা দেখলাম অপর পাশে পাহাড়ের গায়ে স্তরে স্তরে বাড়ি-ঘর নিয়ে সেজে ওঠা গুপ্তকাশী, ঠিক যেন কেউ আঠা দিয়ে খেলনা কিছু ঘরবাড়ি বসিয়ে দিয়েছে, এমন ঝুলে আছে বলে মনে হচ্ছে সেগুলো! আর পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে চাষ-বাসের উদ্যোগ। সবুজ উপত্যকা মাঝে মাঝেই বেশ কিছুটা পাহাড়ি ঢাল জুড়ে। আমরা ফেরার পথে উখীমঠ দেখবো, এখন সোজা চোপতা যেতে হবে। উখীমঠ থেকে চোপতার রাস্তার সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়। অপরাজিত-এ অপুর প্রণবকে লেখা চিঠির কথা মনে পড়ে “I enter it by the Ancient way, Through the Ivory Gate and Golden”! এই পথ ঐতিহাসিক পথ, এই পথ পুরাণের-ও পথ। ইতিহাস আর পুরাণ এসে মিলে যায় যেন এই পথে। শিব মহিষের রূপ ধরে পালিয়ে বেড়ান পঞ্চকেদারের পথে, পঞ্চপান্ডব তাড়া করে ফেরেন তাঁকে ধরবেন বলে, উমাপ্রসাদ, প্রবোধকুমার, জলধর সেনরা জীবনকে নতুন করে খুঁজে বেড়ান, মানুষ দেখেন, ইতিহাসকে জানার চেষ্টা করেন, জানিয়ে দেন আমাদের। আর আমরা ফিরে ফিরে এসে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি সেসব বারবার, মানুষ, ইতিহাস, পুরাণ আর সর্বোপরি হিমালয়ের অতুলনীয় সৌন্দর্য-সম্পদ। তীর্থযাত্রার বা ধর্মকর্মের উদ্দেশ্যে বের হইনি, কিন্তু হিমালয় নিজেই যে তীর্থ, সে স্থান-মাহাত্ম্যে আর সৌন্দর্যে প্রতি মুহূর্তে মালুম হয়। ... ...


"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ৯ … বলি, কিছু মনে করবেন না হাফিজভাই, মুসলিম হয়েও আপনি তো এই হনুমান মন্দির সম্পর্কে অনেক খবর রাখেন! উনি বলেন, এখানে হিন্দু মুসলিম ভেদভাব নেই। বহুদিন ধরে আমরা মিলেমিশে আছি। এই দেখুন না খবর পেলাম ঐ মন্দিরে বার বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গতকাল পর্ষদের ইলেকট্রিসিয়ানকে ধরে খুঁজে বার করলাম এক জায়গায় লুজ কনেকশন ছিল। দাঁড়িয়ে থেকে তা ঠিক করালাম। তারপর উনি কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেন, ছোটবেলা থেকে এই মন্দিরের কথা অনেক শুনেছি। স্থানীয়রা এই হনুমানজীকে খুব জাগ্ৰত বলে মানে। ... ...

এই দিকের গেটের একটু পাশেই ভোপাল ইন্টারস্টেট বাস স্ট্যান্ড। সোজা জাতীয় সড়ক ৪৬ চলে গেছে ওবাইদুল্লাগঞ্জ হয়ে সাতপুরা জাতীয় উদ্যান, পাঁচমারি ইত্যাদি হয়ে হোসাঙ্গাবাদের দিকে। ওবাইদুল্লাগঞ্জের পরেই ডানদিকে কিছুটা বেঁকে গিয়ে বিন্ধ্য পর্বতের কোলে রাতাপানী ব্যাঘ্র প্রকল্পের মধ্যে ভীমবেটকা। মহাভারতের ভীম বনবাসের সময় নাকি কিছুদিন এখানে ছিলেন, সেই ভীমের বৈঠক থেকে জায়গার নাম স্থানীয়দের মতে ভীমবেঠকা। ভীমের জন্য নয়, জায়গাটা আদিম মানুষদের গুহাচিত্রের জন্য বিখ্যাত। আদিম মানুষ এখানে গুহায় রাত্তিরবেলা থাকত, সকালবেলা বাইরে বেরিয়ে শিকার করত, হান্টার গ্যাদারার তারা চাষবাস শেখেনি তখনও। একসময় তারাই সেখানকার পাহাড়ের আশ্রয়গুলোর দেওয়ালে আঁকতে শুরু করে। প্রথমে সরলরেখায়। কাঠির মাথায় আলুর দম। আলতামিরায় বা ফ্রান্সের ল্যাসকো, শোভে ইত্যাদি গুহাগুলোতে রঙিন টানা স্কেচের মত যেসব ছবি দেখা যায় তার থেকে ভীমবেটকার ছবি অনেকটা আলাদা। দশহাজার বছর আগে তারা জ্যামিতি না জানলেও পরিষ্কার ত্রিভুজ, বর্গক্ষেত্র ইত্যাদি আঁকতে পারত। ভীমবেটকা ছাড়াও এই রকম নব্য প্রস্তর যুগের গুহাচিত্র পাওয়া গেছে আশেপাশের সাতধারা, জাওরা এবং পাঁচমারিতে। ... ...

রুদ্রপ্রয়াগ থেকে অগস্ত্যমুনির দিকে গাড়ি এগনোর সাথে সাথেই চারপাশের পাহাড়গুলো কেমন হঠাৎ ক’রে উঁচু হতে হতে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছিল, ঘিরে ফেলছিল পাঁচিলের মত, বাঁক নেওয়ার মুহূর্তে মনে হচ্ছিল এরপর আর রাস্তা আছে তো? অলকানন্দার বাঁদিক ধরে চলতে চলতে অগস্ত্যমুনি পৌঁছনোর একটু আগে গাড়ির কাঁচে হঠাৎ একঝলক দুধসাদা পাহাড়ের অংশ, একেবারেই হতবাক করে দিয়ে আবার মিলিয়ে গেল। মেঘ বলে ভুল করার কোনো উপায় নেই, চারটে কোণ আর শিখরদেশের ট্রাপিজিয়ামের আকৃতিতে ওই এক ঝলকেই চিনিয়ে দিয়ে গিয়েছে সে নিজেকে; হ্যাঁ, চৌখাম্বা দর্শন দিয়েই তাহলে এ’যাত্রার শুরু; তখনো জানিনা, এরপর এ-যাত্রা যেখানেই যাই আকাশের গায়ে চৌখাম্বা লেগে থাকবে সফেদ-শুভ্র শিখরশ্রেণীর কিরীটে কোহিনূর-এর মতো! কিন্তু ওই একবারই, অগস্ত্যমুনির কাছে এসে বাঁদিকে কেদারের গিরিশ্রেণী দৃশ্যমান হলেও সামনের উঁচু পাহাড়-প্রাচীরে চৌখাম্বা আবার অদৃশ্য উখিমঠের কাছাকাছি আসা পর্যন্ত। পাহাড় কিভাবে প্রাচীর হয়ে তার ভয়ঙ্কর সুন্দর চেহারা নিয়ে দিগবিদিক জুড়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, গাড়োয়ালের হিমালয় তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ! ... ...

"৮৭৬ সালে, মাঘ মাসের উজ্জ্বল অর্ধের দ্বিতীয় দিনে সবাই এই মন্দিরে সমবেত হয়েছে যা ভৈলবভট্টের ছেলে আল্লা ২৭০ হস্ত দৈর্ঘ্য এবং ১৮৭ হস্ত প্রস্থের ওপর বানিয়েছেন। এছাড়াও একটা ফুলের বাগানের জন্য পুরো নগর অর্থ দান করেছে যাতে এই মন্দিরের পুজোর জন্য দিনে ৫০টা করে ফুলের মালা তৈরী হতে পারে।" [১ হস্ত ~ ৪৫ সেন্টিমিটার] গণিতজ্ঞ ব্রহ্মগুপ্ত এর প্রায় দুশো বছর আগে পাটিগণিতের নিয়মগুলো লিখে ফেলেছিলেন। ১৯৩১ সালে ৬৮৩ সালের ক্যাম্বোডিয়ার একটা মন্দিরের লিপিতে শূন্য পাওয়া যায়। আপাতত সেটাই পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন শূন্য। গ্বলিয়র দ্বিতীয় স্থানে। আরেকটা প্রাচীন শূণ্য পাওয়া গেছে পাকিস্তানের বাকশালী পুঁথির বার্চ গাছের ছালের পাণ্ডুলিপিতে, যেটা রাখা আছে অক্সফোর্ডের বোডলেইন লাইব্রেরীতে। শূন্যের ইতিহাসে আগে যদি কোনোদিন গ্বলিয়র শিলালেখের উল্লেখ দেখে থাকেন তাহলে বুঝে নেবেন এটাই সেই জায়গা। ... ...

একদিকের সবুজ ঘাসেভরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ভাই অনেকটা উঠে গিয়েছিল, পেছন পেছন আমিও। মা নীচ থেকে আমাদের নাম ধরে পরিত্রাহী চীৎকার শুরু করে নেমে আসার জন্য। সেজমামার হইহই হাসি, ছোট্ট বোনটার একদিকে আমাদের সাথে যাবার ইচ্ছে আরেকদিকে বাবা মা’কে ছেড়ে উপরে ওঠার দ্বিধা, প্রথম বরফ দেখার উচ্ছাসে কলকল করে সবাই মিলে একসাথে কথা বলা। দুপুর পার করে মানালি ফিরে কোথাও ভাত না পেয়ে হোটেলের দোতলার বারান্দার গা লাগোয়া আপেলগাছ থেকে আপেল পেড়ে কচমচিয়ে খেয়ে ফেলা, গোল্ডেন আপেলও সেই প্রথম চেনা ...চৌত্রিশ বছর আগের দিনটা তার তীব্র ঠান্ডা হাওয়া, ঝলমলে রোদ্দুর, সরুমোটা গলার আওয়াজ, হইহই হাসি, সব সঅব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আজ। ... ...

"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ৮ … এটাকে চান্দেরী ভ্রমণ বৃত্তান্তের পুনশ্চঃ বলা যায় ....আমার প্রশ্ন শুনে করণ করুন ভাবে আমতা আমতা করে। করণের মতো মানুষের জীবনে বিশেষ কিছু না জেনেও দিব্যি চলে যায় তাই যেখানে এতদিন আছে সেই স্থানের নামটির তাৎপর্য জানার কৌতূহলও হয়নি ওর। শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত কোট - যা রোমিও জুলিয়েট না পড়েও কোথাও উদ্ধৃতি পড়েই জেনেছি - “What's in a name? That which we call a rose by any other name would smell just as sweet.” মনে হয় এমন খামচা মারা জানার আগ্ৰহ ওর নেই। ... ...

মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলা রাজপুতরা ছিল চান্দেলদেরই মত আরেকটি রাজপুত রাজাদের বংশ, এক বিন্দু রক্ত থেকে যাদের জন্ম বলে বংশের নাম বুন্দেলা। মধ্যযুগে চান্দেলদের পতনের পরে বুন্দেলাদের রাজ্যের এলাকা পরিচিত হয়ে ওঠে বুন্দেলখন্ড নামে। টিকমগড়ের কাছে গড় কুন্দর ছিল বুন্দেলা রাজপুত বংশের রাজধানী। এই সিরিজে মধ্যপ্রদেশের খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ নদী বেত্রবতীর কথা আগেও এসেছে। যমুনার এই উপনদীর ধারেই আছে উজ্জয়িনী ইত্যাদি প্ৰাচীন জনপদ। পনেরোশো সালে রুদ্র প্রতাপ সিং জঙ্গলের মাঝে বেত্রবতী নদীর ধারে ওরছার পত্তন করেন এবং রাজধানী সেখানে সরিয়ে আনেন। ওরছা শব্দের অর্থ গোপন। কালক্রমে সংস্কৃত বেত্রবতী নামটা বুন্দেলি ভাষায় অপভ্রংশে বেতওয়া হয়ে যায়। ... ...

"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ৭ … শুধু ঐতিহ্যময় শাড়ি নয়, ঐশ্বর্যময় অতীতও জড়ানো তার সর্বাঙ্গে। চারদিকে পাহাড়, কয়েকটি হ্রদ, শহরের প্রান্তে নির্জন সবুজ, বড় একটি কেল্লা, নানা ঐতিহাসিক স্মারক তার অলঙ্কার। বুন্দেলখন্ডের এই প্রাচীন নগরী ভ্রমণে অভিজ্ঞতার প্রাপ্তি ছাপিয়ে যেতে পারে পর্যটকের প্রত্যাশা। লেখাটি ২০১৯এ প্রকাশিত হয়েছিল বাণিজ্যিক 'ভ্রমণ' পত্রিকায়। তবে তাদের পছন্দ low carb, low fat, high protein Dukan diet সদৃশ। তাই সেভাবেই লিখেছিলাম। সংক্ষিপ্ত আকারে। লেখার ল্যাজে ছিল কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন গোছের টীকা। তবে অমন ফাস্টফুড রান্নার মতো লিখতে ভালো লাগে না। তবু ওখানে দুটো লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আরো দুটো কম্পোজ হয়ে প্রতীক্ষায় ছিল। অনুমেয় কারণে প্রকাশিত হয়নি। এটা মন খুলে লিখলাম। 'ভ্রমণ' পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাটি যদি হয় কিশোরী, ৫৭টি বাছাই করা ছবিতে সজ্জিতা এটি পূর্ণ যুবতি.. ... ...

আঠেরোশোতে আলেক্সান্ডার কানিংহ্যাম, তারপর জন মার্শাল, হ্যারল্ড হারগ্রিভস হয়ে সারনাথে শেষ খোঁড়াখুঁড়ি করেছেন দয়ারাম সাহানি। এখানে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে বারোশো শতাব্দীর সময়কালীন একগাদা বিহার, স্তুপ, মন্দির, লিপি, মূর্তি পাওয়া গেছে। জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক ফ্রিডরিখ অস্কার ওয়ের্টেল সারনাথের অশোক স্তম্ভ আবিষ্কার করেন ১৯০৫ সালের মার্চ মাসে। এত এত জিনিস পাওয়া যাচ্ছিল দেখে ১৯১০ সালে জন মার্শাল উদ্যোগ নিয়ে সেসব জিনিস রাখার জন্য অর্ধেক বৌদ্ধ সংঘারামের মত ধাঁচে সারনাথ সংগ্রশালা বানানোর নির্দেশ দেন। জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে নিজস্বী তোলার ভিড় কমাতে এখন সারনাথ সংগ্রহশালায় মোবাইল নিয়ে ঢোকা বারণ। বাইরে বিনামূল্যে ব্যাগ এবং মোবাইল জমা রাখার লকার আছে। ... ...

গুগল ম্যাপ অনুযায়ী আমাদের ঘন্টা তিন চারের মধ্যেই পৌঁছানোর কথা। কিন্তু পৌঁছাতে রাত সাড়ে সাতটা বেজে গেল। মূলত আগস্টে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও ধ্বসের ফলে কুলু মানালি অঞ্চলে যে নির্মম ধ্বংসলীলা চলেছে তাতে চারলেনের হাইওয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। নতুন করে তৈরী হওয়া সরু একফালি রাস্তায় দুই লেনে আপ ও ডাউন গাড়ি যাওয়া আসা করছে, ফলে যানবাহনের গতি ধীর। ধ্বংসের চেহারা দেখে হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। মানালির ভলভো বাসের স্ট্যান্ড, শহরের গাড়ি ট্যাক্সি পার্কিং এলাকা ভেঙেচুরে বিপাশা নদী খলখলিয়ে বয়ে যাচ্ছে। হাড় পাঁজরা বের করে কটা নিরূপায় গাড়ি, একটা ভলভোবাস বেঁকেচুরে উল্টেপাল্টে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র বড় মাঝারি বোল্ডারের মধ্যে। ... ...

"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ৬ - - - তেমাথায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি। কী খুঁজছেন? কমল মিত্রর মতো রাশভারী গলা শুনে ঘুরে তাকাই। বছর পঞ্চাশের প্রশ্নকর্তার লম্বা চওড়া সুঠাম চেহারা, ব্যক্তিত্বময় মুখ, মর্মভেদী দৃষ্টি। বলি, হনুমান মন্দির। কোত্থেকে আসছেন? নিক্ষিপ্ত হয় দ্বিতীয় প্রশ্নবাণ। কলকাতা। ধেয়ে আসে তৃতীয় মিসাইল, ওখানে কী দরকার? অচেনা কারুর এহেন অবাঞ্ছিত প্রশ্নমালা শুনে ভ্রু কুঁচকে যায়। ভাবি ইনি কেন এতো সওয়াল করছেন? মন্দিরে কেন যায় লোকে? বাজার করতে নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু তখনই একটু খটকা লাগে। অজনবীর ভাবিত মুখে পড়েছে অন্য ছায়া - স্বগতোক্তির ঢঙে বিড়বিড় করেন, ক ল কা তা! পরক্ষণেই আবার দারোগার মতো সওয়াল, আপনি কী বাঙ্গালী? ভাবি কলকাতা কী কিরিবাতি আইল্যান্ডের মতো দূরবর্তী না বাঙ্গালী নর্থ সেন্টিনেলীসদের মতো দুর্লভ? কলকাতা শুনে, বাঙ্গালী ভেবে অবাক হওয়ায় কী আছে? সাহারা থেকে সাইবেরিয়া - খুঁজলে দু এক পিস বাঙালি কোথায় নেই। সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি। প্রশ্নকর্তার দৃষ্টি নরম হয়। এগিয়ে আসে একটা বলিষ্ঠ হাত। ... ...

'নগর' স্টাইলে মন্দিরগুলো কোনো গাঁথুনি ছাড়াই শুধু পাথরের ব্লক বসিয়ে বসিয়ে বানানো। প্রায় সব পূর্ব মুখী, সূর্যোদয়ের দিকে। অধিষ্ঠান হচ্ছে মন্দিরগুলোর কমন ভিত্তি। তার ওপরে ধীরে ধীরে অর্ধ মন্ডপ, মন্ডপ, মহামন্ডপ, অন্তরাল এবং সবশেষে গর্ভগৃহ। সূর্য ওঠার সময় সূর্যের আলো ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে ঢুকে গর্ভগৃহের মূর্তির ওপর পড়বে, মন্দির স্থাপত্যগুলো সেভাবেই তৈরী। গর্ভগৃহের চারদিকে প্রদক্ষিণ করার জায়গা। গর্ভগৃহের ওপরে মন্দিরের বাইরের দিকে প্রধান মিনারটাকে শিখর এবং ছোট ছোট মিনারগুলোকে উরুশৃঙ্গ বলে। শিখরের একদম ওপরে বসানো থাকে একটা কলসী। মন্দিরগুলোর বাইরের এবং ভেতরের বেশিরভাগ মূর্তিই কোনোরকম যৌন অনুষঙ্গ ছাড়া তৎকালীন সাধারণ জীবনযাপনের গল্প। এছাড়াও মন্দিরগুলোর গায়ে কিছু কিছু জায়গায় আছে ব্রহ্মার মূর্তি যেটা অন্য কোথাও দেখা যায় না। ... ...


"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ৫ - - - যেন একটি শিশু কোনো আব্দার করেছে। সরল হেসে নিজের নামটি লেখেন আমার দেওয়া কাগজে। বলি, এটা আমি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখতে পারি? মৃদু হেসে বিহারীলাল বলেন, বেশ তো, রাখুন। ... ...

"একা বেড়ানোর আনন্দে" - সিরিজের পর্ব ৪ - - - বিড় বিড় করে অস্পষ্টভাষী নন্দনবাবা নন্দী মাহাত্ম্য দিয়ে শুরু করে সমুদ্র মন্থনে পাক মেরে বিশ্বরূপ দর্শন ছুঁয়ে কী যে ঘন্ট পাকালেন মাথায় কিছুই ঢুকলো না। মহিলাটি শোনার চেয়ে বাবার বক্তব্য মোবাইলে রেকর্ড করতে ব্যাগ্ৰ। ব্যাটারি ডাউন হয়ে তাও বন্ধ হয়ে গেল। আমি মুখ নীচু করে হাসি চাপি। এক দশক কুয়েতবাসী মহিলা বাবাকে অতক্ষণ বকিয়ে, বাবামৃত আংশিক রেকর্ড করে বাবার ATMএ রাখলেন মাত্র দশটি টাকা! বাবা চকিতে দৃষ্টিপাত করেন আমার দিকে। তারা চলে যেতে আমার দিকে মর্মভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝোপড়ার সামনে খোলা আকাশে দু হাতে ফ্রেমের ভঙ্গি করে বলেন, LCD স্ক্রিন মে ইয়ে ড্রামা ক্যায়সা লাগা? বলি, য্যায়সা অনোখা সওয়াল এ্যাসেহী লা-জবাব জবাব। অস্পষ্টভাষী বাবা হাসেন প্রাণ খুলে। ... ...

"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ৩ - - - জানতে চাই, ওখানে যেতে পারি? চুরি ছিনতাই বা বণ্যজন্তুর ভয় নেই তো। কথা বলে বুঝি, প্রায় চার কিমি দুর, শ তিনেক ফুট উঁচু পাহাড়ে ওঠার পথে কিছুটা সিঁড়ি আছে বাকিটা গিরিশিরা ধরে উঠতে হবে। হাঁটায় বা ওঠায় আমার অসুবিধা নেই। লোকজন কেউ যায়না, তাই লুটবেটা কাকে? ফলে চোর ছ্যাঁচোরও নেই। পান্না টাইগার রিজার্ভ থেকে কচিৎ কখনো ডোরাদা বা দিদিমণি হাওয়া খেতে এদিক ওদিক গেলেও এতোটা আসেন না, ভর দুপুরে তো নয়ই। সুতরাং বাস্তবিক বিপদের কোনো ভয় নেই। ... ...