
জীবনভোর পাহারাদারের হানার মাঝে বেড়ে ওঠা এক জীবন বঞ্চনার স্বাদ জানে। একসময় ঘুরে জবাব দিতে শেখে কিন্তু প্রতিপক্ষ চিহ্নিতকরণে তার ভুল হয়ে যায়। প্রমাণ হয়ে আসলে মেয়েরাই মেয়েদের প্রতিপক্ষ। তারাই চায় না মেয়েদের উন্নতি হোক। এইটি এক নিঃসাড় যুক্তি প্রবঞ্চকের, তাতে কোনো ভুল নেই।তারপর আসে সফল নারীর কথা। যার সব অর্জন ই তার শরীর ও তার ফ্লেক্সিবিল আচরণের ফসল। এই এক সুপরিচিত সুপারফিসিয়াল স্টেট্মেন্ট যা থেকে রেহাই নেই মেয়েদের।জেনারালাইজ করেই বলি পুরুষের অর্জন তার নিজস্ব আর নারীর অর্জন তার শরীর ও মুখশ্রীর কায়দার ফল। প্রকারান্তরে সে বারবণিতা। পদে পদে অভিযোগকারিণী, প্রতিরোধকারী আসলে মানসিক ভাবে অসুস্থ মানে সাইকো। সে পুরুষশাসিত ও পরিচালিত সমাজের ব্যাখ্যা বুঝতে ও তার যথার্থতা নির্ধারনে অক্ষম। মুর্শিদাবাদের এক বিখ্যাত গাইনোকলজিস্ট তার স্বামীকে অন্য সম্পর্কের অভিযোগে বাড়ী থেকে বিতাড়িত করলে তার বিরুদ্ধে ওথেলো সিন্ড্রুম এই মানসিক রোগে আক্রান্ত বলে স্বামী অভিযোগ করেন। প্রতিবাদ করলেই সেই মহিলার মানসিক সুস্থতা নিয়ে কথা এসেই যায়। সমাজে এ এক চিরাচরিত বিশ্বাসের বীজ। ... ...

আমি কেনো 'নারী দিবস' নিয়ে এতসব বলছি?? আসলে আমার মা বছর দেড়েক আগে চলে গেছেন, বউ আছে, দিদি আছে। ছোট পারিবারিক বৃত্তের মধ্যে এরা আমাকে ঘিরে থাকা মানুষ এবং 'নারী'। এর বাইরেও বৃহত্তর পারিবারিক গন্ডীতে, বন্ধু বা চেনা-জানার মধ্যে আছেন আরো অনেক মানুষজন যারা আদতে 'নারী', এদেরকে অস্বীকার করে তো আমার জীবন হতে পারে না। এরা এবং সারা পৃথিবীজুড়ে আরো অন্য নারীরা প্রায় চিরকাল যে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয় প্রতিনিয়ত, যে শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার বা পারিপার্শ্বিক অসহনশীলতার শিকার হয় প্রত্যহ, অহরহ, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা আমারও। তাকে স্বীকার না করলে আমি নিজেই একজন পিছিয়ে পড়া মানুষ!! ... ...

ম্যাম, আই হ্যাভ ভেরি গুড নিউজ। - মাত্র কদিন হল কাজে লেগেছো মা, বলে বলে হয়রান হয়ে যাই, ঠিক করে লিটারেচার রিভিউ অব্দি শুরু করলে না, গুড নিউজ কিসের? অনুজা যা বলে তার মর্মার্থ এই রকম-তার স্বামী পুনে (বা বরোদা বা নাগপুরে) বিশাল চাকরি পেয়েছে, বিশাল বাংলো, বিশাল গাড়ি, আয়া, বাবুর্চি ইত্যাদি, ইত্যাদি। অনুজা কাল থেকে আসবে না। - তা কী করে হয়, নিয়মানুযায়ী নোটিস দিতে হবে।রুলস পড়ে দেখো। - ওসব নিয়মটিয়ম আপনি দেখুন ম্যাডাম। আমি আমার স্বামীর সঙ্গে যাব, এখানে আবার নিয়ম কিসের? আর, আমার তিন মাসের স্যালারিটা দিয়ে দিন। স্পর্ধা দেখে হিড়িম্বা অবাক হতে ভুলে যান। - যতটা লিটারেচার জোগাড় করেছো,গুছিয়ে লিখে দাও আগে, তারপর স্যালারির কথা ভাবা যাবে। - কী বলছেন? আমাকে এখন প্যাকিং শুরু করতে হবে, যাওয়ার আগে কত কাজ, এখন আমি লিখতে বসব? পিসিতে আছে, দেখে নেবেন। - কাজটার প্রতি কোন আগ্রহই নেই বোঝা যাচ্ছে,এসেছিলে কেন? - ওহ, এমএসসি করে কি ঘরে বসে থাকব? একটু টাইম পাস, হাতখরচ এসবও তো লাগে। টাকাটা কখন পাব? - এখনও তো ঘরে বসতেই যাচ্ছ। - নিজের সংসারে বসা আর বাপের বাড়িতে বসা এক হল? ... ...

"ওঃ দিদুন! তুমি না ইনকরিজিবল! আমাদের চিড়িতন, হরতন, ইসকাবনের মতন দেখতে লাগে?"" কী জানি! আমার তো বয়স হচ্ছে – চোখে হাই পাওয়ারের চশমা – আমার চোখে তো সব এক ধাঁচের লাগে! ওই যে সেদিন তোর তুলিদিদির এনগেজমেন্টের পার্টি ছিল, আমি তো এক জায়গায় বসে বসে দেখছিলাম – সবাই কেমন একই রকমের ঢেউ খেলান চুল, একই রকমের মেকআপ, ঝকঝকে দামি শাড়ি- গয়না পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল – আমার তো সবাইকেই এক রকম লাগছিল। সবই ছিল – সবার ঝকঝকে মুখ, তকতকে চেহারা – কিন্তু কেমন মেকিয়ানা, নকলনবিশি - নিজস্বতা ব্যাপারটা খুঁজে পেলাম না রে!"" তুমি না আমার সব কেমন ঘেঁটে দিচ্ছ! তুমি বলছ আমরা কসমেটিক্স কোম্পানি গুলোর অন্ধ অনুসরণ করি!""একদম। আর জানিস-ই তো কস্মেটিক্স তৈরি করতে, তাঁর টেস্টিং করতে কত কত নিরীহ প্রাণী মারা যায়। তারপরেও তোরা তাদের বয়কট করিস না। অবশ্য শুধু কসমেটিক্স কোম্পানিই তো নয়, সে দলে আছে সব গয়নার কোম্পানি, জামা কাপড়ের, অ্যাক্সেসরীজের ব্র্যান্ড, হেয়ার স্টাইলিং এর ব্র্যান্ড – সবাই। একজন বলল, হীরে হল মেয়েদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু – ব্যস অমনি সবার হীরের গয়না কেনার হিরিক পড়ে গেল। ... ...

অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবি মহিলারা এই ছুটি পাবেন না –প্রথমদিকে এই যুক্তির ব্যবহার দেখে একটু হাসি পেলেও পরে এর বহুল ব্যবহার দেখে মনে হল নাঃ এই নিয়েও দুই কথা বলা দরকার। হ্যাঁ একদম ঠিক কথা, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবি মহিলারা এফওপি লিভ পাবেন না। ঠিক যেমন তাঁরা আসলে কোনওরকম ‘লিভ’ই পান না, ‘সিক-লিভ’ বা ‘মেটার্নিটি লিভ’ও নয়, তেমনি এটাও পাবেনই না ধরেই নেওয়া যায়। তেমন অসুস্থ হলে সবজিওয়ালিমাসি বাজারে বসতে পারেন না, বিকল্প কেউ বসবার না থাকলে তাঁর অনুপস্থিতি আসলে তাঁর বেরোজগারি হয়ে দাঁড়ায়। একই কথা প্রযোজ্য দিনমজুর, ইটভাঁটার কর্মী ইত্যাদিদের জন্যও। পরিচারিকাদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে একটু ভাল। তাঁরা ছোটখাট অসুস্থতায় সবেতন ছুটি পান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, তবে সন্তানধারণকালে যতদিন পারেন কাজ করেন এবং যখন পারেন না, চেষ্টা করেন পরিচিত কাউকে কাজটি দিয়ে যেতে যাতে ফিরে এসে আবার পাওয়া যায়। প্রসবকালীন ছুটির পয়সা খুব কমক্ষেত্রেই পান। আমার পরিচিত গৃহকর্মসহায়িকাদের মধ্যে (সংখ্যাটি একশোর উপর) মাত্র ৪ জন এই সুবিধা তাঁদের নিয়োগকারি গৃহ থেকে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। সত্যি বলতে কি অনেক বাড়িতে একটু বয়স্ক কিম্বা নিতান্ত অল্পবয়সী পরিচারিকার খোঁজ করা হয়, যাতে দুম করে সহায়িকাটি প্রসবকালীন ছুটি চেয়ে না বসেন। অসুস্থতাও যদি দীর্ঘকালীন এবং/অথবা খরচসাপেক্ষ হয়, পরিচারিকার কাজটি যাবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কারণ এখানেও ‘আনপেইড লিভ’ বলে কিছু হয় টয় না। একজন পরিচারিকার আর্থারাইটিস বা চোখে ছানি পড়লে তাকে বিদায় করে আরেকজনকে রেখে নেওয়া হয়। তা এগুলো তো আমাদের সব সুযোগসুবিধার সাথেই দিব্বি সহাবস্থান করছে। কিছুক্ষেত্রে এমনকি অফিসে কর্মরত মহিলাটি নিজের গৃহকর্মসহায়িকাটির কাছে বছরের ৩৬৫ দিনই উপস্থিতি আশা করেন উইকডেজে তিনি বেরিয়ে যান এবং ছুটির দিনগুলি তাঁর একমাত্র বিশ্রামের সময় বলে। তো এই অসঙ্গতিগুলি চোখের সামনে দেখলেও আমরা কখনো ভদ্রতার খাতিরে, কখনো বা অন্যের ব্যপারে মাথা না গলানোর সুশিক্ষায় বিশেষ কিছু বলি না। তাহলে অফিসে কর্মরত মহিলাটি যদি এফওপি লিভ পান এবং তাঁর পরিচারিকাটি না পান, তাহলে খুব নতুন কিছু বৈষম্যের সৃষ্টি হবে না। বরং অসংগঠিত ক্ষেত্রের দাবিদাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে এই দাবিটিও জুড়ে নেওয়া যায়, নেওয়া উচিৎ। ... ...

নারীদিবসের গোলাপি শুভেচ্ছা, সুললিত শুভেচ্ছাবাণীতে ফেসবুক ভরপুর। গয়নার দোকানের বিজ্ঞাপন, দোকানে দোকানে নারীদিবসের ভর্তুকিতে দামি জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, খুব আনন্দ করছে অনেকে, কেউ আবার বিরাগ পোষণ করছে, অনেক পুরুষরা লঘু রসিকতাও করছেন। আমার প্রতিনিয়ত মনে পড়ে দীর্ঘ কর্মজীবনে দেখা অন্তরালের বিজয়িনীদের কথা। তখন তো এত কিছু ছিলো না, থাকলে হয়তো কেউ তাঁদের সম্বর্ধনা দিতো। সে তো অন্যরকম সময় ছিল। দেশভাগের ক্ষত, মুক্তিযুদ্ধ, সপ্নদর্শী আত্মঘাতীর দল চারদিকে, ক্ষুৎকাতর সাহিত্য, সব মিলিয়ে এক আশ্চর্য গোধূলি, ভালো কি মন্দ বোঝা যায়না। তারই মধ্যে মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে সংসারের হাল ধরতে, সবার বাড়িতেই পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু আত্মীয়, দিশাহারা সময়। সেই অলাতচক্র ভেদ করেছেন যে সব মেয়েরা, যাঁরা করতে পারেননি, সবার কথাই মনে পড়ে, এইসব দিনে আরো বেশি। ... ...

আজ থেকে বছর পঁচিশ আগেও মফস্বল শহরগুলো অন্যরকম ছিল। তখন সাজগোজ বলতে চোখের তলায় কাজল, হাল্কা লিপস্টিক আর কপালে টিপ। প্রায় সব কিশোরীরই তখনও লম্বা ঢালা চুল থাকত। ভেজা চুলের নিচের দিকে আলগোছে বিনুনী বেঁধে তারা ইশকুলে যেত। মায়ের অত্যাচারে অথবা কারো কারো ক্ষেত্রে নিজের শখেই মুসুরডাল বাটা কি দুধের সরের প্রলেপ পড়ত মুখে মাঝেসাঝে। এর চেয়ে বেশি কেউ করতও না। যারা করার কথা ভাবত তাদের যেন একটু দূরেই সরিয়ে রাখা হত। যে রূপচর্চা করে তার লেখাপড়ায় মন নেই এমন নিদান দেওয়া একেবারেই বিরল ছিল না। আমার জীবনও এভাবেই চলছিল। পরিবারের সদ্য বিয়ে হয়ে আসা যুবতীটির নিখুঁত ভ্রূযুগল দেখে কখনও হয়ত ইচ্ছে জাগত নিজেরটিও অমন হোক। কিন্তু সে ইচ্ছা আর বাস্তবের মাঝে "সাজগোজে মন চলে গেছে, এর আর লেখাপড়া হবে না" জাতীয় মন্তব্যের উঁচু দেওয়াল থাকত। তখন ভাবতাম, শুধু মফস্বলের বাংলা মিডিয়ামেরই বুঝি এমন কপাল পোড়া। কলকাতার কলেজে পড়তে এসে বেশির ভাগ সহপাঠিনীর অসংস্কৃত ভুরু দেখে সে ব্যাথার খানিক উপশম হল। লম্বা বিনুনী, তেলতেলে মুখ, এবড়োখেবড়ো ভুরু আর লোমশ হাত-পা নিয়েই কলেজ জীবন পেরিয়ে গেল। এমনকি প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এই অমার্জিত রূপ বিশেষ বাধার সৃষ্টি করেছিল সেরকম খবর নেই। ... ...

একথা কারো আর অজানা নেই যে, হাজার হাজার কৃষক সুদূর নাসিক থেকে ২০০ কিমি মিছিল করে আসছে শিল্পনগরী মুম্বাই এর রাজপথের দখল নিতে। সেই মিছিল দেখার জন্য তাড়াহুড়ো করে বিকেল ৫ টা নাগাদ ভিকরোলি তে পৌঁছতে দেখা গেল স্রেফ ১০-১২ জন মানুষ মাথায় গেরুয়া টুপি পরে দাঁড়িয়ে। মিছিল টা তো বামপন্থীদের। আরও অনেক বড় হবার কথা। নাসিক থেকে যত এগোচ্ছে, সংখ্যা নাকি তত বাড়ছে। আর ফেসবুক ফিড বা মিডিয়ার ছবিতে যা দেখেছি, লাল পতাকায় ছয়লাপ। এ তাহলে কী? ... ...

হিন্দুস্তানবাসী এই অধার্মিক শাসনকে সহজে মেনে নেয়নি। বাবর মারা যেতেই আর এক ধার্মিক বীর সুর শাহ দেহলি দখল করে নেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তৈরি করেন হিন্দুস্তানের প্রথম হাইওয়ে, জিটি রোড। এই প্রকল্পের আদলেই পরবর্তীতে স্বর্ণ চতুর্ভুজ সড়ক মহাযোজনার সূত্রপাত হয়। দুঃখের কথা এই, যে, এই হিন্দু মহাপুরুষ বেশিদিন রাজত্ব করতে পারেননি। কালিঞ্জর দুর্গের কাছে সন্ত্রাসবাদীরা তাঁকে গান পাউডার দেগে হত্যা করে। পৃথিবীতে সেই প্রথম সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ। রাজস্থানের মরুভূমির এক মরুদ্যানের কাছে এই হামলা হয়েছিল বলে এর নাম ছিল ওয়েসিস অ্যাটাক। নাম বদলে এখন একেই বলা হয় আইসিস আক্রমণ। আইসিসের আক্রমণের প্রথম শহীদ সুর শাহ অযোধ্যার মন্দির পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। কিন্তু খুবই রামভক্ত ছিলেন বলে তাঁর স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয় সাসারামে। সুর শাহের বংশধররাও গুজরাতে চলে যান। মোদী বংশের মত শাহ বংশও সেখানে খুব বিখ্যাত হয়। পরবর্তীকালে এই দুই বংশধররাই বাবরি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে সমস্ত পরাজয়ের শোধ তোলেন। গুজরাতি এবং হিন্দি ভাষায় লিখিত 'বাল অমিত' গ্রন্থে এই দিগ্বিজয়ের সম্পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায়। ... ...

- মা যখন আমাকে মনে করে কাঁদেন, সেই নি:শব্দ তরঙ্গরাশি থৈ থৈ করে খুঁজে ফিরে আমাকে-সুধীজন পাঠাগার, শ্রমকল্যাণ, সায়াম প্লাজা, গলাচিপা, কলেজ রোড।তারপর চারারগোপ পার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কুমুদিনীর পাড় ঘেসে শীতলক্ষ্যা নদীর খালে। তখন আমি যদি শীতলক্ষ্যার জলে না থাকি, তবে যে মায়ের বুকের হাহাকার সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরে আমায়।শহরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। গাছের পাতারা বিষন্ন হয়ে নড়তে ভুলে যায়। রাস্তা গুলো এলোমেলো হয়ে ছুটে যায়, কে কোথায়! সমস্ত হাইরাইজ ভবন, ভবনের দরজা-জানালা, জানালার কাঁচ ও পর্দা, পর্দার রং ও সেলাই সব মলিন হয়ে থরথর কাঁপতে থাকে ভীষণ।লোকে ভাবে ভূমিকম্প। আমি জানি, মায়ের বুক যখন কান্নায় ভেঙে ভেঙে যায়, তখন এমন কম্পন উঠে শহর জুড়ে। শীতলক্ষ্যার তলে আমাকে খুঁজে পেতে কষ্ট হবে না। আর এই পথ এখন মায়ের কান্নার খুব চেনা পথ। কতো কান্না যে জমে আছে নদীর পলিতে! দেখতে পাচ্ছোনোতো! দেখবে কি করে! লোভী ব্যবসায়ীরাতো নদীর জল কেমিক্যাল আবর্জনায় নোংরা-কালো করে আড়াল করে ফেলেছে সব।এখন নদীর তল ডুবুরিরাও দেখতে পাবেনা। ... ...

রাষ্ট্রের বয়ান অনুযায়ী PMS হল ‘শিক্ষার ক্ষম তা য়নের জন্যে ভারত সরকারের একক বৃহত্তম হস্তক্ষেপ’। ১৯৪৪ সালে ঔপনিবেশিক সরকারের আমলে PMS স্কিম চালু হয়েছিল শুধু তফশিলি জাতির (এস সি) ছাত্রদের জন্যে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল দলিত ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার জন্যে আর্থিক সাহায্য প্রদান। এই সাহায্যের সূচনা হয়েছিল রক্ষণাবেক্ষণের বৃত্তি হিসেবে, যার অঙ্ক ছিল খুবই কম। স্বাধীনতার পরে, ১৯৪৮ সালে এই অনুদান সম্প্রসারিত হয় ত ফ সিলি উপজাতির জন্যে (এস টি)। ১৯৯৮ সালে অন্যান্য অনগ্রসর জাতিকে ( ওবিসি) ও সংযুক্ত করা হয় এই লিস্টে। তফশিলি জাতিউপজাতিদের জন্য পিএমএস চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া হলেও ওবিসি দের জন্য ক্ষেত্রে এটা উপলব্ধ সীমিতসংখ্যক কিছু স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে। রাজ্যগুলি থেকে পিএমএস সহায়তা খুবই কম এবং অনিয়মিত। রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রকল্পগুলির কোন পর্যালোচনা ও সংস্কার হয়নি। PMS সহায়তা প্রকল্পের শেষ সংস্কার হয় ৭-৮ বছর আগে, ২০১০ এ। পিএমএস এর ক কভারেজ এসসি এসটি দের ক্ষেত্রে ওবিসিদের থেকে আলাদা। কোর্সের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে পিএমএস চার ভাগে বিভক্ত। ... ...

আ! ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবস, হা! হা! এই হা-হা আমার নয়। ‘বেটি বঁচাও’ শ্লোগানেরই তলানিটুকু এই হাসি। পুরুষ যেদিন ঘুম থেকে উঠেই তাঁর অধিকৃত নারীর প্রতি কটাক্ষ ছুঁড়ে বলতে পারে, আজ তো তোমাদের দিন ! ওয়েল, সেই দিনটিকে উপভোগ করার জন্য নারী তার প্রাত্যহিক কর্মযজ্ঞের কোটা মিটিয়ে হয়তো-বা কোনও এক টেবিলের একপ্রান্তে লিখতে বসবে তার নিজস্ব লেখা, হ্যাঁ সেলফ-সেন্সরশিপ সমেত। নারী যাবে কোনও সভায়, মেয়েদের চোখের তলার ক্লান্তি তথা দৈনন্দিনতার সাতকাহন গেয়ে একচিলতে স্বস্তি পেতে। নারী, ছোট-ছোট কন্যাসন্তান্দের নিয়ে অনুষ্ঠান বানাবে আর ঘন ঘন ঘড়ি দেখবে, সূর্য ডোবার আগেই এই শ্বাপদসংকুল শহরে কিংবা গ্রামে, এদের নিরাপদে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে তো! যদিও আন্তর্জাতিক নারীদিবসে, বাৎসরিক শ্রেষ্ঠ রসিকতা এই এইটেই যে, সাত থেকে সত্তর বছর বয়সের রমণীরা, তাদের নিজেদেরকেই নির্বিঘ্নে, রেপড না হয়ে, ঘরে ফেরানোর গ্যারান্টি কি দিতে পারছে, আজকের এই উত্তর-আধুনিক সভ্য পিতৃতন্ত্রের দিনকালে? ... ...

যেমন বলি উনিশ বছরের কালো অল্প পোড়া মেয়ে সুখবাঁশির কথা। এমন রোমান্টিক নাম তার বাপ মা কি ভেবে রেখেছিল কে জানে, কিন্তু আটবোনের এক বোন সে ছোটবেলায় ধানসেদ্ধ করার উনোনে পড়ে গিয়ে অল্প পুড়ে যায়। তাতে তার দীঘল চোখ বা সরল মনের কোথাও কোন কমতি হয়নি, কেবল পাত্রপক্ষের তাকে নিতান্ত অযোগ্য ভাবা ছাড়া। তাই ক্লাস এইট অব্দি পড়বার পর গরীব বাপমা তার বিয়ে দেয় নিজেদের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে ! ৮০ হাজার টাকা, কাঁসার বাসন, গয়না দেবার পরও বিছানাপত্র দেওয়া হয়নি বলে তাকে শুতে হত মাটিতে। বিয়ের পর সুখবাঁশি প্রেগন্যান্ট হলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জেলাশহরের এক মেডিক্যাল সেন্টারে। সেখানে 'ছবি' তোলা নির্বিঘ্নে সাঙ্গ(কি করে হয় কে জানে !) হলে তার সব সুখ উবে যায়। স্বামী, শাশুড়ির উগ্র মূর্তিতে হতভম্ব মেয়েটি প্রতিবেশীর কাছে জানতে পারে তার পেটে রয়েছে যমজ বাচ্চা এবং তারা মেয়ে। অত্যাচার চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছলে একদিন তাকে ফ্যানে ঝুলিয়ে দেবার চেষ্টা সে কি করে ব্যর্থ করে বাপের ঘরে পালিয়ে আসে সেকথা এখন নিজেও ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারেনা। ... ...

এসব তথাকথিত দুষ্টূমির সঙ্গে মাখা সন্দেশের মত ছিল আমাদের প্রেম। প্রেমে পড়া, প্রেম করা। এক তরফা প্রেম তখনো প্রচুর। কয়েকটা ঠিকঠাক লেগে গেলে দু তরফা হত। তার আবার নিয়ম ছিল। অলিখিত। তিন মাস ঘুরলে একটা চুমু। তখনো জীবনের প্রথম চুমু খাওয়ার জায়গা ছাতের ধার, ট্যাঙ্কের পেছনদিক। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আসছে মেয়েবন্ধু ছেলেবন্ধুদের মেলামেশা। অ্যাসেক্সুয়ালের ভেতর যৌনতার চোরাটান, তবু যেন লুপ্ত নাশপাতির মত নির্বীজ ও নিষ্পাপ। ক্যান্টিনের বেঞ্চি ভাগাভাগি করে গায়ে গা ঠেকিয়ে বসার পর্ব। কিন্তু শরীরী নয় তবু। এক আধখানা কেচ্ছাকাহিনি ঘোরে বাতাসে। অমুককে অমুকের সংগে সন্ধে অব্দি কলেজের পেছনে জলের ট্যাংকের ওপরে দেখা যায় (যাকে ডিরোজিওর কবর বলে ডাকতাম আমরা)। তমুক অমুকের হোস্টেলে ঢুকে বিছানায় সেঁধিয়েছে। ‘শোয়া’ শব্দ কীভাবে জানি তখন থেকে আমাদের জবানিতে একটি সংকীর্ণতর অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকবে। ... ...

আজ সকাল থেকে পুলিস-পিসিকে মনে পড়ছে। পুলিস-পিসি আমাদের বাগবাজারের বাড়ির প্রতিবেশি ছিলেন। পুলিস-পিসি লালবাজারে কর্মরতা ছিলেন।সে আমলে মানে সত্তরের দশকের শুরুতে মহিলা পুলিস সচরাচর দেখা যেত না।আমাদের চারপাশে অন্তত ঐ একজনই ছিলেন।পুলিশ-পিসি ছিলেন অবিবাহিত, কড়া ধাঁচের মানুষ। আমরা পাড়াসুদ্ধ কচিকাঁচারা ওকে ভয় পেতুম।শুধু ছোটরাই নয়, পাড়ার বড়রাও, এমনকি মুরুব্বিরাও পুলিস-পিসিকে বেশ সমঝে চলত।মহিলারা ওর সঙ্গে খানিকটা সম্ভ্রম আর খানিকটা ‘আহা বেচারী, বিয়ে হোল না’ গোছের অনুভূতির মিশেল এক দূরত্ব বজায় রাখতেন।আজ মনে হয়, আমাদের সেই গোপীমোহন দত্ত লেনের সাবেকি পাড়ার জীবনে পুলিস-পিসিকে খানিক ব্রাত্যই করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু কেন পুলিস-পিসি পাড়ায় থেকেও এমন ‘আলাদা’ থেকে গেলেন?আর শুধু কি পাড়ায়? তাঁর নিজের পরিবারেও কি তিনি মূলস্রোতের বাইরে ছিলেন না? পুলিস-পিসি বাস করতেন তার বাবার বাড়িতে, এক মাঝারি সাইজের একান্নবর্তী পরিবারে।রোজ ঘড়ি ধরে সকাল নটায় পুলিস-পিসি কাজে বেরোতেন। পিসি কাজে বেরোনো অবধি নিজের প্রাত্যহিক রুটিনে চলতেন আর কাজ থেকে ফিরেই সেতার বাজাতে বসে যেতেন নিজের ঘরে। পরিবারের সঙ্গে তার লেনাদেনা ছিল নিতান্ত কেজো এবং নিক্তিতে মাপা। সংসারে থেকেও তিনি ছিলেন সংসারের বাইরে। ... ...

কিন্তু ঘটা করে এই একটা দিন কীসের উদযাপন? কেন উদযাপন? গত এক বছরে প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সকালটা তেতো হয়েছে এক বা একাধিক ধর্ষণের খবরে। চার থেকে আশি - কেউ তো বাদ নেই 'ধর্ষিতা' পরিচয়ে শিরোনাম হতে। হিসেব বলছে নাকি এক দিল্লিতেই গড়ে দিনে পাঁচটা ধর্ষণের 'কেস' পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হয়। তাহলে 'কিন্তু-তবু-যদি-লোকে কী বলবে'র গেরোয় হাঁসফাঁস করা বাকি 'কেস'গুলোর খতিয়ান কেমন, ভাবুন তো! ধর্ষণ- শারীরিক নিগ্রহ আর ভারতীয় উপমহাদেশের যা বিয়ের কনসেপ্ট অর্থাৎ সম্পূর্ণ অচেনা (হালে অবিশ্যি ফোনে দু'দন্ড বাক্য বিনিময়ের পর বাপ-মায়ের দ্বারা বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক এর একখান গালভরা নাম দেওয়া গেছে : 'অ্যারেন্জ্ঞড কাম লাভ ম্যারেজ', এক্কেরে আচ্ছেদিন মার্কা ব্যাপারস্যাপার আর কী। রাজা বলেছেন দিন এসছে, উহাকে তোমরা, নালায়ক প্রজাগণ, সোচ্চারে বল 'আচ্ছে দিন' এবং ভাব, ভাবা প্র্যাকটিস কর যে এর থেকে আচ্ছেদিন তুমি জীবনেও দেখনি, দেখবে ঠিক love হবে, লাভ এই লাভ তো এটাও সেরকমই একখান ব্যাপার) একজনের গলায় সোনা-দানা-খাট-পালঙ্ক (ইহাদের পণ বলে না, ইহারা হল গিয়ে 'আপনার মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে দেবেন' এর কড়ি আঙুলে ফেলা ক্যারিকেচার)নিয়ে ঝুলে পড়ার পর শারীরিক-মানসিক ট্রমার রুটিনে এই একদিন আলতো শো-পিস পরানোর নামই কি উদযাপন?প্রথম মহিলা মহাকাশচারী, মহিলা রাষ্ট্রপতি, মহিলা পর্বতারোহী...এসব সাধারণ জ্ঞানের অসাধারণ মেয়েদের কথা তো সবার অল্পবিস্তর জানা অতএব অজানা কয়েকজন অতি সাধারণ মেয়ের কথাই না'হয় এখন বললাম। ... ...

শহর বা আধাশহরের পরিবারগুলোতে কাজ করতে আসা গৃহ পরিচারিকাদের একটা বড় অংশই আসে শহরের থেকে দূরে কোন গ্রাম মফঃস্বল থেকে। শহরতলির বস্তি থেকেও আসে কিন্তু তার সংখ্যা গ্রাম থেকে আসা মেয়েদের তুলনায় বেশ কম। যারা দূর থেকে রোজ ট্রেনে করে আসেন শহরে কাজ করতে তাদের দিন শুরু হয় মধ্য রাত্রি থেকেই। বাড়ির কাজ রান্না ইত্যাদি করে রেখে তারা ভোরের ফার্স্ট সেকেন্ড ট্রেনগুলো ধরেন, যেগুলোর নামই হয়ে গেছে ‘ঝি-লোকাল’। তারপর সকালের আলো ফোটার সাথে সাথেই তাদের কাজের জায়গায় পৌঁছে কাজ শুরু। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময়েই জোটে না সকালের চা জলখাবারও। এনেকেই বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসেন। সেটাই দস্তুর। খাবার দেওয়া দূর কি বাত, বাড়ির বাথরুম ব্যবহার করতে দেয় না এদের। লুকিয়ে যেতে হয় অথবা স্টেশন চত্ত্বরেই সেরে রাখতে হয় সব শৌচ কর্ম। তাতেও সমস্যা বাড়িতে লুকিয়ে বাথরুম ব্যবহার করলে যদি বুঝতে পারে তাহলে অপমান। এভাবেই নিত্যদিন অভ্যস্ত এরা। এভাবেই একের পর এক বাড়ির কাজ সেরে আবার বিকেলের দিকে ট্রেন ধরে ফেরা নিজেদের বাড়ি। অনেক সময়েই এই মেয়েদের ট্রেনে বাসে আমাদের সহযাত্রী হিসেবে পেতে হয় যারা ট্রেনের সীটে না বসে দরজার কাছে পা মেলে ‘আরাম করে’ (!) মুড়ি খেতে খেতে বা গল্প করতে করতে যান। অনেক অফিসযাত্রী মহিলাদের সাথেই ট্রেনে দাঁড়ানোর জায়গার অভাবের জন্য এই নিয়ে অনেক ক্ষোভও দেখতে পাওয়া যায়। আসলে পরিচারিকাদের সাথে কথা বললেই বোঝা যায় ওই ট্রেনের যাতায়াতের পথটুকু বাদ দিলে প্রায় বসার বা ঝিমোবার সময় তারা না বাড়িতে পান, না কাজের ক্ষেত্রে। এ তো গেল যারা দূর থেকে আসেন তাদের কথা। আর যারা শহরের আশেপাশে বস্তিতে থাকেন? তারা কেমন আছে জানতে চাইলে ঢুঁ মারতে হবে ঢাকুরিয়া বস্তিতে কিংবা, বিধাননগর বস্তিগুলোতে। শহরতলিতে বাস করে বাজারের আগুন দামে পাল্লা দিয়ে জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখতে অবস্থা জেরবার। মাথা ওপর একটুকরো আশ্রয়ের ভরসা নেই অথচ তাকে উদয়াস্ত শ্রম দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয় অন্যের সাজানো সংসার। ... ...

যদিও ২০০০ সাল নাগাদ প্রকাশিত হচ্ছে, গল্পগুলি পড়লে বোঝা যাচ্ছে আরো বছর পনেরো কুড়ি আগে লেখা। বোঝা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে বড় করে কৃষি বনাম শিল্প বিতর্ক শুরুর কিছুটা আগেই, অনেক পুরোনো একটি বিষয়ের অবতারণা করার প্রয়োজন অনুভব করছেন অসীম। বাঁকুড়া এবং বীরভূমের গ্রামে যাঁর পারিবারিক শিকড় রয়েছে, যিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ভারী শিল্প নগরীতে বড় হচ্ছেন, তাঁকে শিল্পনগরের যন্ত্র এবং উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনজীবন, নতুন রকমের সমাজ এবং বিচিত্র মানুষকে নিয়েই তাঁর রোজগেরে বাস্তব, কিন্তু কৃষির সঙ্গে জড়িত মানুষ কী ভাবে যন্ত্র জিনিসটার মুখোমুখি হচ্ছেন, তার প্রায় কয়েকশো বছরের পুরোনো প্রায় শিল্প বিপ্লবের সময়কার সংঘাতটা তাঁকে ভাবাচ্ছে। বা বলা ভালো এক দেড় দশক পরেকার আমাদের রাজ্যের সম্ভাব্য সংঘাতও প্রতিভাত হচ্ছে। হারাধন মন্ডলের গল্প তে দেখা যাচ্ছে, "হারাধন মন্ডল - দি ওয়েল্ডার, মেড ইন পাথরঘাটা - এ ভিলেজ নিয়ার শান্তিনিকেতন", বিচিত্র ঠোঁটকাটা আমোদ গেঁড়ে, হাতের কাজে উৎকর্ষের সীমানায় পৌছনো, ‘লোহায় লোহায় বিবাহ’ দেওয়া শ্রমিক, মুক্তধারার যন্ত্রবিদের মত যন্ত্রের জয়ের গান না গেয়েই প্রায় বিনা বাক্যব্যয়ে, শেষ পর্যন্ত ফিরে যা্চ্ছে তার গ্রামে। এবং বাসে গান গেয়ে পয়সা জোটানো বাউল, যে নিজে চিরায়ত জীবন দর্শন চর্চার বিশুদ্ধতার দাবী বিশেষ করছে না, গান বাঁধছে শুধু, "চাগরি যদি করবি চাষা আজব কলে বাঁধরে বাসা চাষা পরাণ বলে বুদ্ধি খাসা ফিরতে তোমার চাই জানা।" অথচ বাউল ও হারাধন, দুজনেই যেন কোথাও একটা ভবিতব্যকে অস্বীকার করতে পারছে না, তাদের চোখের সামনেই "একপেট স্কিলড আনস্কিল্ড ওয়ার্কার নিয়ে বাস ছুটে চলে দুর্গাপুরের দিকে", সকলের ফেরার পথটি জানা আছে কিনা জানা নেই, বাস রাস্তার অবিশুদ্ধ বাউলের গানে সমাধান বিশেষ নাই। ... ...

একটি জানা গল্প আবার বলতে ইচ্ছে করছে। গল্পটা আফ্রিকা মহাদেশের। বান্টু অঞ্চলের। একজন নৃতত্ববিদ একটা মজার খেলা আমদানী করলেন ৷ একটা গাছের ডালে একঝুড়ি আপেল ঝুলিয়ে দিলেন ৷ দূরে একটা দাগ দিলেন। দাগ ধরে সাতটি বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে দৌড়বে বলে। শর্ত হল, যে আগে পৌঁছতে পারবে সব কটা আপেল তার। সাহেবের যে দেশে জন্ম সেখানে বাচ্চাদের এরকম খেলা দিলে তারা হয়ত হৈ হৈ করে দৌড়াত এবং একজন প্রথমে ছুঁতো। সবকটা ফল সেই পেত। এটা-ই তো খেলার শর্ত। কিন্তু এই বাচ্চারা যে দেশে জন্মেছে তাদের উচিৎ অনুচিত বোধ একেবারেই আলাদা। বাচ্চাগুলি সকলে মিলে হাত ধরাধরি করে একই সাথে ঝুড়ির কাছে হাজির হলো। সাহেব তো অবাক - শুনি নাই কভু, দেখি নাই কভু অবস্থা। জানতে চাইলেন এরকম তারা কেন করতে গেল। উবন্তু। উত্তর দিল সবাই মিলে ৷ বুঝিয়ে দিল সাহেবকে উবন্তু কথাটির মানে, উবন্তু বলতে কী বোঝায় ৷ তাদের কথা এই যে যদি আর সকলে দুঃখ পায় তবে একজন কি করে আনন্দ পাবে। সবাই একসাথে ভোগ করতে না পারলে সেটা আনন্দ নয়। সবাই আছে তাই আমি আছি - এই হল ওই বাচ্চাগুলির শিক্ষা। এত অল্প বয়সে ওরা এটা জানে না আজকের এগিয়ে থাকা, স্মার্ট, বিজ্ঞানমনস্ক সভ্যতায় আতিপাতি করে খুঁজলেও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না বাচ্চাদের সহজাত সদ্ভাবনায়। এই শিক্ষার অস্তিত্ব আধুনিকতায় আর মোবাইল অ্যাপে হারিয়ে গেছে। একেবারে গোড়া ধরে নাড়া দেয় আজকের মূল্যবোধে, জীবনচরিতে, জোটবদ্ধ হওয়ার ফাঁকা আওয়াজে আর মৌলিক ভাল-মন্দ বোধে। ... ...

থেকে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে কেন কাজ? এর উত্তর অন্তর্জালে রাখা কোনো সরকারী দলিলে খুঁজে পাইনি। কিছু ব্যাখ্যা আছে Coordination for Democratic Rights (CDRO) - এর Living in the shadow of Terror নামক ২০১৩ সালের একটি রিপোর্টে। তাঁরা জানাচ্ছেন, "আশীর দশকে এই প্রজেক্টে জমির ক্ষতিপূরণের অঙ্কটি নির্ধারিত হয়েছিল ১৯১৬-১৭ র একটি জরিপের ভিত্তিতে। ইতিমধ্যে যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে তা হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অর্থাৎ অনেক কম মানুষ ক্ষতিপূরণের হকদার হতে পেরেছেন। ১৯৭৪ এ একর প্রতি ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ধার্য হয়েছিল ১৪০০০ টাকা। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত কেবল নির্ধারিত জনসংখ্যার অর্ধেক ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। স্থানান্তরিত মানুষদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়েছিল রামদার-মির্দায়, ভাণ্ডারিয়ার জেলা সদর থেকে ৪ কিমি দূরে। ... ...