
তরঙ্গার বিদায়গাথা শুনতে পেয়ে সমুদ্রের দেবতা টাঙারোয়া জেলি ফিশ, সমুদ্রের ফেনা, আর সমুদ্রের শৈবালকে পাঠিয়ে দিলেন শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য | তারা তাকে নিয়ে গেল শিশুটির পূর্বপুরুষ টামানুই-টে-রা’য়ের দেশে | সেখানকার লোক শিশুটিকে বাঁচিয়ে তুলল। তারপর টামানুই মাউইকে অদেখা জগতের কত রহস্যই না শেখালেন। মাউই পাখিদের সঙ্গে কথা বলতে শিখল, পাখিরা তাকে দিল ওড়ার ক্ষমতা। মাছেরা তাকে দিল শ্বাস, মাছেদের সঙ্গে সে সাঁতার কেটে বেড়াত। হাওয়া তাকে দিল স্বর, মাটি তাকে দিল আপন পরিচয়, তারারা তাকে দিল দিকনির্ণয়ের ক্ষমতা, আর আকাশের কাছে সে পেল উচ্চাভিলাষ। যখন সে বড়ো হল, একদিন টামানুইয়ের সঙ্গে তার যুদ্ধ হল, সে-যুদ্ধে তার বজ্রের মতন দণ্ড দিয়ে সে আঘাত করল টামানুইকে, টামানুই পড়ে গেলেন। এখন মাউই হল নেতা। তখন টামানুই মাউইকে বললেন, “দ্যাখো, তুমি তো পৃথিবীকে টাঙারোয়ার দেওয়া উপহার। এবারে তুমি নিজেকে নিজে খুঁজে পাও, যাও বেরিয়ে পড়ো, সর্বত্র তোমার নাম প্রচারিত হোক মাউই-টিকি-টিকি-আ-তরঙ্গা বলে।” ... ...

লকডাউনের প্রথমদিকে রোগীর চাপ কম ছিলো। একটা যুদ্ধ যুদ্ধ আবহাওয়া ছিলো। খারাপ লাগছিলো না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত অবসাদে ডুবে যাচ্ছি। করোনার বাড়বাড়ন্ত অবসাদকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ এক মহা জ্বালা। যুদ্ধে গো হারান হেরে গেছি। তবু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। রোজই একাধিক পরিচিত চিকিৎসকের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাচ্ছি। একাধিক চিকিৎসক মারাও যাচ্ছেন। যে কোনো কারণেই হোক মৃত্যুহার আমাদের মত খুপরিজীবী চিকিৎসকদের মধ্যে অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসক মৃত্যু হাফসেঞ্চুরি পেরিয়েছে। তার মধ্যে অন্তত চল্লিশ জন প্রাইভেট প্রাকটিশনার। সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনায় মৃত্যু হার ২% এর কম, আর খুপরিজীবী চিকিৎসকদের মধ্যে ২০% এর বেশি। ... ...

পরলোকের জীবনকে পান-ভোজনের মাধ্যমে উদযাপনে বিশ্বাস করত এট্রাস্কানরা, তাই কফিনের ঢাকনা আর দেয়ালচিত্র দুই জায়গাতেই এই ছবি। যৌনতা ও নাচগানের দেয়ালচিত্রও সমাধিগৃহে থাকত। দুই, নারী-পুরুষের বৈষম্যও এট্রাস্কান সমাজে কম ছিল। কীভাবে বোঝা যায়? এই ধরনের পানভোজনের দৃশ্যে, গ্রীক সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষকে কখনওই একসাথে দেখা যেত না। গ্রীক নারী ছিল মূলতঃ অন্তঃপুরবাসিনী- রাজনীতি ও সমাজে তার ভূমিকা ছিল সীমিত। অতএব গ্রীক কুমোরশিল্পে গোষ্ঠীগত পানভোজনের দৃশ্যগুলোতে পুরুষেরাই একে অপরের সাথে থাকত। রোমানরাও এই ব্যাপারে গ্রীকদের থেকে খুব আলাদা ছিল না। অন্যদিকে এট্রাস্কানদের পানভোজনের দৃশ্যে নারী-পুরুষ একত্রে সামাজিকতা করত। ... ...

সেই প্রথম চিত্রকরের ঘরে প্রবেশ। রঙের ভিতরে প্রবেশ। তাঁর সেই ঘরখানিতে ছিল যেন রঙিন বাতাস। আমাদের বন্ধুর দাদা শ্যামল বরণ বালক লাল্টু ওই ঝিলের জলে ডুবে গিয়েছিল ক’বছর আগে, তার নামে একটি পাঠগার করব, শুধু ছোটদের বই থাকবে সেখানে, তিনি যদি একটি ছবি এঁকে দেন বা পোস্টার। তিনি তো এঁকে দিলেন, পয়লা বৈশাখের সকালে এসে উদ্বোধন করলেন সেই পাঠাগার। আমাদের সঙ্গে মিশে গেলেন বালকের মতো। সেই আমার প্রথম আড্ডা বড় মানুষের সঙ্গে। ... ...

দরবেশ শাহ্ হেমন্তকে দেখে খুব খুশি, ওর ধারণা ছিলো হেমন্ত বুঝি স্টীল প্লান্টেই চাকরি করছে, সেরকমই তো কথা ছিলো, তাই বুঝি যোগাযোগ রাখার সময় পায় না। জয়মালিকাকে দেখে অবাক ও, হেমন্তর মেয়ে এত বড়! তারপর অবিশ্যি হিসেব-টিসেব করে বললো, না এমনই তো হবার কথা! ও যে নিজেই বুড়ো হয়ে গেছে সেকথা ওকে মনে করিয়ে দেবার কেউ নেই, তাই ওর সব কিছু গুলিয়ে যায় এখন! কী প্রয়োজনে এসেছে জয়মালিকার কাছে শুনে ও পিঠ চাপড়ে দিলো জয়মালিকার। এ-হি তো চাই, খুব স্মার্ট তোমার মেয়ে হেমন্ত, কোথায় কোথায় সুযোগ আছে দু চোখ মেলে দেখতে জানে! এমনটা যদি তুমি হতে আমার পুরো কারবারটা আজ তোমারই হতো! ... ...

গোলেনুর দাদীর ডাকে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াতেই নাকে ধাক্কা দেয় বেশ অপরিচিত একটি ঘ্রাণ। উনুনের গনগনে আগুনের পাশে গোলেনুর দাদীর ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। কালো লোহাড় কড়াইয়ের বলক আসা জলে ডুমো করা কাটা ওলকচু ফেলেই গোলেনুর দাদী আমার দিকে এগিয়ে আসে। ঠাকুমার জন্য কয়েকটা কাঁচামিঠা আম রাখছি, নিইয়্যা যাস। আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে গোলেনুর দাদীর ঘর লাগোয়া আমগাছটার দিকে তাকাই। আমার চোখ আটকে যায় বারান্দায় জলচৌকিতে বসে থাকা মানুষটার সাথে। লম্বা জোব্বা পড়া মানুষটির দাড়িগুলো কী সুন্দর মেহেদী রঙা। লোকটির পাশে বসে সুমী পোড়াদহের গল্প শুনছে, জানো বু' পোড়াদহে কত্ত বড় মেলা হয়? কত্তরকমের মিষ্টি পাওয়া যায়, জানো? সেসব মিষ্টি কত্ত বড় হয় দেখবা? দু'হাত প্রসারিত করে মানুষটি দেখায় মিষ্টির বিশালতা। দাদাজান, পুতুল পাওয়া যায় না? বড়-কনে পুতুল? ... ...

একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবেন, টেকাপো শুধু ক্রাইস্ট চার্চ থেকে শুরু করলে তবেই পথে পড়বে, পুকাকি হ্রদ আপনি যে পথেই আসুন দেখতে পাবেন। পুকাকি থেকে ৫০ কিলোমিটার সড়কপথে মাউন্ট কুক, হাইওয়ে ধরুন। তবে পারলে আর কারও হাতে স্টিয়ারিং-এর ভার তুলে দিন, কারণ বাঁদিকে লেক পুকাকি পড়বে একটু পরেই, আর তার পর সারাটা পথ জুড়ে শুধু মাউন্ট কুক দেখতে পাবেন। সে এক অপার্থিব মনভোলানো দৃশ্য, এক গগনচুম্বী পর্বতমালা আপনার গোটা পথের সামনেটায়, একপাশে লেক পুকাকি, তারপর দু-পাশে উঠেছে অজস্র পাহাড়ের সারি, তাদের কারও কারও মাথায় বরফের চাদর, কোথাও খরস্রোতা নদী আর ব্রিজ পেরিয়ে একসময় আদিগন্ত বিস্তৃত উপত্যকার মাঝখান দিয়ে গাড়ি চলে দাঁড়াবে মাউন্ট কুক শহরের মাঝখানে। ... ...

কালিবাড়ির মোড় পেড়িয়ে বাড়ির রাস্তা ধরতেই আমার আবদার, দাদু রঙিন কাঠি লজেন্স নেবো। মোল্লা দাদুর দোকান থেকে আনারস আঁকা কাগজে মোড়ানো কাঠি লজেন্স হাতে নিয়ে দাদুকে পেছনে ফেলে আমি প্রায় দৌড়ে আমাদের তাঁতঘরের সামনে চলে আসি। ততক্ষণে প্রায় ফাঁকা আইনুল চাচার মোষের গাড়ি। দাদুকে রাস্তার কোণায় দেখা যেতেই আমি কাঠি লজেন্স মুখে পুড়ি, দাদু বস্তা আরোও আছে কিন্তু। আমি দাদুর হাত ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই বাড়ির উঠোনে মাষকলাই আর সরিষা গায়ে গা লাগিয়ে পড়ে আছে। আর বাটি ভরা মুড়ি, মুড়কি, গুড় নিয়ে আইনুল চাচা লাল বারান্দায় বসে আছে। ঠাকুমা গ্লাস ভরে চা এনে দিতেই আইনুল চাচার লাল দাঁতগুলো ঝিলিক দেয়, মা একটা পান দিয়েন। ... ...

মনে রেখো, এ এমন এক দেশ যেখানে বেশি মেধা দেখাতে যাওয়ার চেয়ে বিপজ্জনক আর কিছুই হতে পারে না। কেউ তোমাকে বুঝবে না। কেউ তোমার প্রতি সহানুভূতি দেখাবে না। সবাই মিলে তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তোমাকে পিষে দলে ছিবড়া করে দিতে চাইবে। তোমার এমন হাল করবে যে, তোমার নিজের প্রতিই আর কোনো আস্থা থাকবে না। পাগল বা ভিখিরি হয়ে তোমাকে গোটা জীবন কাটাতে হবে। এখানে কম মেধা নিয়ে জন্মানো আশীর্বাদের মতোই... অচ্যুৎ লম্বা হয়ে শুয়ে বাবার পায়ে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করল। ... ...

সকালের আলোয় নন্দাদেবী, ত্রিশূল অন্নপূর্ণা লালে লাল হয়ে বলে ওঠে, আজ যে হোলি। আমি অমনি শুনতে পাই পাহাড়ে ঢোলের আওয়াজ। দূর থেকে ভেসে আসছে। আজ তেওহার। এখানে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবাই রং মাখায়। সবাই একজায়গায় জড়ো হয়ে একে অন্যকে রং লাগিয়ে দিচ্ছে। কেউ তোমাকে জোর করে রং দেবে না। হাতে হাতে মিঠাই, আঙুর। মিঠাই-এর কথায় মনে হল, আজ হোলি। ঘরে কিছু মিছু আনিয়ে রাখা দরকার। অবিশ্যি কেই বা আসবে আমার বাড়ি। কিন্তু আয়োজনটি যে সম্পূর্ণ হওয়া চাই। যদি আমায় পড়ে তাহার মনে …। ভালো মিষ্টি কিনতে হলে আলমোড়া যেতে হবে। এই জায়গাটা তো একেবারেই গ্রাম। আলমোড়া বাজারে খিম সিং মোহন সিং রোউতালার দোকান থেকে বালমেঠাই, চকোলেট আর সিঙ্গোরি কিনে আনতে হবে। সিঙ্গোরি ভারী মজার। ... ...

হাওড়ায় এক নতুন জগতের মধ্যে এসে পড়লো যদুগোপাল। এতদিন পর্যন্ত সারিখোল গ্রাম আর নবদ্বীপের বাইরের জগৎ সম্বন্ধে কোন ধারণাই ছিলো না তার, এই তার প্রথম নাগরিক জীবন। শশধর বেদান্তবাগীশের বাড়িটি পাকা, চওড়া রাস্তার উপর ত্রিতল ইমারত। বাড়ির নীচের তলার সামনের অংশে, একেবারে রাস্তার উপর তাঁর দু কামরার চতুষ্পাঠী বা টোল। সাইনবোর্ডে লেখা শশধর শাস্ত্রীয় সংস্কৃত শিক্ষালয়। ঘর দুটোয় দুটো করে দরজা, কোনাকুনি। একটার সামনে দাঁড়ালে অন্যটা পেরিয়ে চোখ যায় না। একটা রাস্তার সঙ্গে সংযোগ করে, অন্যটা অন্দরের সঙ্গে। সেই দরজা পেরিয়ে অন্দরে ঢুকলে দেখা যাবে আরও তিনটে ঘর, সামনে টানা বারান্দা। বারান্দার সামনে উঠোন, পেরিয়ে রান্নাঘর। এই ঘর তিনটের একটা ব্যবহার করা হয় টোলের আবাসিক ছাত্রদের বাসস্থান হিসেবে, টানা চৌকিতে যেখানে শুতে পারে পাঁচ-ছ জন ছাত্র। বাকি ঘর দুটোর মধ্যে একটার ব্যবহার ভাঁড়ার ঘর হিসেবে, যে ভাঁড়ার উল্টো দিকের রান্নাঘরে ব্যবহৃত হয়। ... ...

২০১৭ সালের ঐ রায় কিন্তু মাইনিং কোম্পানিগুলিকে সতর্ক করে দিয়েছিল। ওই বিপুল ক্ষতিপূরণ উঠে এসেছিল কেবল উড়িষ্যার তিনটে জেলা থেকে, তাও শুধুমাত্র লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ আকরিক বেআইনি ভাবে নিষ্কাশনের জন্য। অন্য রাজ্যে অন্য আকরিকের জন্য এই হারে ক্ষতিপূরণ ধার্য হলে সরকারি কোষাগারে কত টাকা জমা পড়ত? এই রায় দেখিয়ে যারা ক্রমাগত বে আইনি খননে ব্যস্ত, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা যেত না? কিন্তু গেরুয়া ভারতে তা না করে অবাধ লুন্ঠনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে। আর তা করা হচ্ছে ভীষণ তাড়াহুড়ো করে। যেন এই অতিমারির পর্দা সরে যাবার আগেই ঘোলা জলে মাছ ধরে ফেলতেই হবে। ... ...

আমি গেলেই ডাকতেন, ও খোকা, মিত্তিরবাবুর বাড়ির ছেলে না ? হ্যাঁ, বলতে তাঁর একের পর এক প্রশ্ন ধেয়ে আসত আমার দিকে। “ভাত খেয়েচ? কী দিয়ে ভাত খেলে ? মাছ খেইলে ? কী মাছ। মাছের কালিয়ায় কি ফুলকপি ছিল। টমটমের চাটনি ছিল কি ? ক্ষীর খেয়েচ কাঁটাল দিয়ে। মাংস কবে খেয়েচ খোকা…” এখন বুঝতে পারি ক্ষুধার্ত মানুষের জিজ্ঞাসা ওসব। গরিব কাহার পাড়ার মানুষের না ছিল জমি, না ছিল কাজ। অন্ন সংস্থান হবে কী করে ? ভোটো কাহার রিকশা করেছিল, তা তার নিজের না অন্য কারোর টাকায় কেনা তা জানতাম না। গ্রামের বাঁড়ুজ্যে বামুনের সঙ্গে ভোটো কাওরার খুব বিবাদ ছিল। রিকশায় চেপে তিনি এক টাকা ভাড়া হলে আট আনা দিতেন। আট আনা বাকি থাকল। বাকিটা শোধ দিতেন না। বাঁড়ুজ্জ্যে মশায়ের ছেলেদের নাম ছিল, ধরুন, অমলকিশোর, বিমলকিশোর, কমলকিশোর, কুনালকিশোর...। ভোটো কাহার কী করল, তার ছেলেদের নাম সব বদলে অমলকিশোর, বিমলকিশোর...। করে দিল। সেই নামে ডাকা শুরু করল। বাঁড়ুজ্জ্যে মশায় রেগে কাঁই। একদিন বেজায় খাপ্পা হয়ে রাস্তায় ঝগড়া, তাঁর ছেলের নামে নিজের ছেলের নাম রেখেছে কেন ভোটো ? ভোটো উদাসীন হয়ে জবাব দিয়েছিল, নাম কি কারোর নিজের সম্পত্তি। মেয়ের নামও বাঁড়ুজ্জ্যে মশায়ের মেয়ের নামে রেখেছিল, ছায়া, মায়া... ... ...

আজ খুব বেশী রান্না হবে না। দুপুরের খাওয়া সেড়ে আজ মুড়ির ধান বানা হবে যে। আজ বাজারের ব্যাগ নিয়ে কোনো রিক্সাওয়ালাও তাই আসবে না। রান্নাঘরের মাচার নীচে রাখা সবজির ধামার তলানিতে যা আছে তা দিয়েই দুপুরের পর্ব সারা হবে। ঠাকুমা কালো পাথরের বাটি হাতে বড়ঘরের দিকে যেতেই আমি পিছু পিছু হাঁটা ধরি, ও ঠাকুমা নেলপলিশের রঙটা কত সুন্দর দেখছো? ঠাকুমা পেছনে ফেরে না, ওসব রঙ ভাল না; আমার দিদি তো রঙ ছাড়াই সুন্দর। আমি থেমে যাই। লাল বারান্দায় বসে ভাবি, কাল ফেরিওয়ালা এলে সব ফিরিয়ে দেবো। ... ...

শুধুমাত্র ছবি আঁকার জোরে টাকা-পয়সা আয় করে কলকাতায় কাটিয়ে এসেছে জয়ি কয়েক মাস, শিল্পী-সাহিত্যিকদের অনেককেই চেনে সে এখন, জয়ি এখন স্বাভাবিক নেতা ওর বন্ধু-বান্ধবীদের। সবাই মিলে ঠিক হয়েছে পরের সংখ্যা থেকে শাম্ব ছাপানো হবে, আর হাতে-লেখা নয়। রাঁচি থেকে শ্যামলিমা-অরুণিমাও এলো; দুজন সম্পাদক, অরুণিমা আর জয়ি। তুলি প্রস্তাব দিয়েছিলো শাম্বর ঠিকানাটাও বদলিয়ে এখন কলকাতায় জেঠুর বাড়ির ঠিকানা দেওয়া হোক, সে প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেলো। জয়ি বললো কলকাতার হাজারো লিট্ল্ ম্যাগাজিনের মধ্যে শাম্ব হারিয়ে যাবে, এখানকার ঠিকানাই ভালো। ... ...

তারপর প্রথম পৃষ্ঠায় সবুজ কালিতে লিখল, ‘আজ প্রথম সর্বশক্তিমানকে দেখলাম। ইনি কাউকে জোর করেন না। কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দেন না। তাঁর কাছে গেলে তাঁর শক্তির কিছুই টের পাওয়া যায় না। তাঁর ব্যবহার অতি মধুর। এই মাধুর্য দিয়েই তিনি সবাইকে জয় করে নেন। আমাকেও তিনি জয় করে নিয়েছেন। একটা সকালেই আমার জীবন বদলে গেছে। এখন প্রতি মুহূর্তে আমার ওপরে তাঁর অপরিসীম প্রভাব আমি টের পাচ্ছি। সম্মোহিত হয়ে আছি আমি। তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। যাদের শক্তি থাকে না, তারা প্রতি মুহূর্তে নিজেদের শক্তিকে জাহির করে। তিনি সর্বশক্তিমান, নিজের শক্তিকে তাই তিনি অনাবশ্যকভাবে টের পেতে দেন না।’ ... ...

অথচ উল্টোটাই হওয়া উচিত ছিল। মিডিয়ায় উল্টো ঘটনা দেখে আমরা অভ্যস্ত। ভরসার বিষয় মিডিয়ার বাইরেও একটা জগত আছে। বিশাল জগত। সেখানকার মানুষেরা হাজার প্রলোভন সত্বেও খুব খারাপ নন। কোন ঘটনা ঘটলেই চিকিৎসককে দলবেঁধে পেটাতে আসেন না। ক্ষতিপূরণের জন্য ঘনঘন “সিপিএ”তে কেস করেন না। ... ...

পক্ষীরাজের বয়েস হচ্ছিল। কলকব্জা গুলো বিগড়োচ্ছিল একে একে। এর মধ্যে অনিমেষ একটা বাস কিনে ফেলেছে৷ ৩বি /৩ডি ৩ডি/১ হয়ে সেই বাস আমাদের পাড়া থেকেই ছাড়ে রোজ৷ পক্ষীরাজ আর চলতে পারলো না ছিয়ানব্বুই এর গোড়া থেকেই৷ স্থায়ী ঠিকানা হল দত্তবাগান মোড় এর পেট্রল পাম্প৷ অনিমেষ ভাবে থাক ওখানেই। বিক্রী করবে না৷ কিন্তু লোক আসতে থাকে ওর কাছে। পক্ষীরাজকে স্ক্রাপ হিসেবে কিনতে চায় তারা। অনিমেষ রাজী হয় না৷ তারপর একদিন আসেন এক কালোয়ার। অনিমেষ তাকেও বলে ও বিক্রী করবে না পক্ষীরাজকে। সেই কালোয়ার ভদ্রলোক তখন এমন একটি কথা বলেন অনিমেষকে যে অনিমেষ তাঁকেই বিক্রী করে দেয় নিজের পক্ষীরাজকে। উনি বলেছিলেন - স্যার, আপনি তো এই গাড়িটাকে নিজের বাড়ির লোকের মত দেখেন। তো আপনার বাড়ির কেউ মারা গেলে কী তাকে বাড়িতেই রেখে দেন? ... ...


যাঁরা কোলকাতায় ক্লাসে বসে ছাত্রছাত্রীর কাছে শিক্ষাতত্ত্ব (education theory) পরিবেশন করছেন আর যে মানুষটি রোজ ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে উঠে তিনঘণ্টা দৌড়ে স্কুলে পৌঁছে একটা ছোটো বাচ্চার ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে সাধনা করছেন তাঁদের দর্শন এবং মতামত কিন্তু আলাদা। ভাগ্যবশত দু-বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের কিছু জেলার বহু শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে মতামত আদানপ্রদানের সুযোগ পেয়েছিলাম, সীমিত সুবিধা, সীমিত সংস্থান, সীমিত অর্থ সংস্থানের মধ্যেই, প্রত্যহ অনেক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই করেই তাঁদের অপ্রতিহত যাত্রা এবং সাফল্য। সেখানে পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল যে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা ও উন্নত পরিকাঠামো অবশ্য প্রয়োজন। শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে আমার আলোচনার একটা বড়ো অংশ জুড়েছিল, ‘Authentic learning'-এর প্রসঙ্গ, এই প্রক্রিয়ায় স্কুলে শ্রেণিকক্ষে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে inquiry based learning, project based learning কীভাবে প্রয়োগ করা যায়? ... ...