
আমার সৌভাগ্য যে স্বামীহারাদের সংগঠন আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে তাদের সাহায্য করতে। এর ফলে আমি, মণিপুর রাইফেলস ও পুলিশের লোককে জেরা করবার সুযোগ পেয়েছিলাম, দিল্লি আর ইম্ফল, দুই জায়গাতেই। আমি যখন ইম্ফল যাই ২০১৩র মার্চ মাসে, তখন সাক্ষাত হয়েছিলো বাবলু লয়টংবাম নামে এক আইনজীবির সাথে। উনি কয়েকজন জেদী আইনজীবির একটি ছোটো গ্রুপকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এই এনকাউন্টারের শিকার হওয় মানুষগুলির স্বজনদের আইনি সাহায্য দিতে। শয়ে শয়ে স্বামীহারা মহিলারা এই কমিশনের শুনানি চলাকালীন হাজিরা দিতেন। কমিশনের মাথায় ছিলেন বিচারপতি হেগড়ে। আমি,আমার অভিজ্ঞতায়, এই প্রথম একটা কমিশনে হাজির ছিলাম যেখানে কমিশন একেবারে হৃদয় দিয়ে তদন্তে নেমেছিলেন। আমরা ইম্ফলে ছিলাম ছয়দিন আর নয়াদিল্লিতে চারদিন। আর মার্চের শেষেই কমিশন তার রিপোর্ট পেশ করেন। ... ...

তা' গড়পড়তা বাঙালী যে মাদার-ফিক্সেশনে ভোগে সে কথা তো অনেকেই মনে করেন। তাই তারা বৌ আনতে যায় না, বলে - মা, তোমার জন্যে দাসী আনতে যাচ্ছি। (আজকের কোলকাতার প্রজন্ম নিয়ে কথা বলছি না, বলছি পূর্ব প্রজন্ম ও আজকের গ্রামীণ সমাজকে সামনে রেখে।) তবু রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিতে চাই, উনি হলেন ইউরোপীয় তথা আধুনিক শহুরে সংস্কৃতির পথিকৃৎ। বাংলা সাহিত্যে ও মননে পরিশীলিত রোম্যন্টিক প্রেমের কাঠামো নির্মাণের বিশ্বকর্মা। এ নিয়ে নীরদ সি চৌধুরি মশায় ওনার "বাঙালি জীবনে রমণী' বইটিতে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। দেখিয়েছেন বংকিমের ইংরেজি উপন্যাস "রাজমোহন'স ওয়াইফ"এ পুকুরে স্নান সেরে ফেরা ভিজে কাপড়ের মেয়েদের দেখে সরস মন্তব্য করা পুরুষরাই বাঙালির তৎকালীন সমাজের সিংহভাগ। তাই হেমেন মজুমদারের নিজের স্ত্রীকে মডেল করে আঁকা সিক্তবসনার ছবির এত কাটতি। তাই "চলে নীল শাড়ি নিঙারি নিঙারি পরাণ সহিত মোর" বা একটু পরিশীলিত "নীলাম্বরি শাড়ি পরি নীল যমুনায়, কে যায়!" একেবারে বাঙালির প্রাণের গান। নীরদ দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের সফিস্টিকেটেড "বিধি ডাগর আঁখি যদি দিয়েছিলে" নয়, ভারতচন্দ্রের "দেখিলাম সরোবরে কোন এক কামিনী, কোনমতে মোর সনে বঞ্চে এক যামিনী' আমাদের পুরুষমানসিকতার সঠিক প্রতিফলন। ... ...

দেবতাদের মধ্যে সমযৌনতা খুব একটা অপ্রচলিত নয়, যদিও অনেক সময় এগুলি সঙ্গমের চিত্র বহন করে না, বরং আচারে প্রকাশ পায়। অগ্নি অন্য দেবতার বীর্য গ্রহণ করে। যদিও তিনি স্বাহার স্বামী, তিনি সোমের(চাঁদ) সঙ্গে রমণ করেন, কেননা তিনি মুখ দিয়ে পৃথিবীর উৎসর্গ স্বর্গে বসে পান করেন। হিন্দু শাস্ত্র বলে এটি আসলে মিথুন ভঙ্গিমা, যেখানে অগ্নির মুখ যোনির কাজ করে। রামায়ণ আর শৈব পুরাণে যখন পার্বতী আর শিব উপগত হন, তখন দেবতাদের আশঙ্কা হল এই অনন্ত কাল ধরে চলা সঙ্গমে বিশ্বে প্রলয় আসন্ন। এবং তাঁরা বিশ্ব পিতামাতার মিলনে বাধা দান করে। উচ্ছ্রিতদণ্ড রাগান্বিত শিব স্বর্গে উপগত তাঁর অস্খলিত বীর্য কোনও দেবতাকে ধারন করার নির্দেশ দিলে, অগ্নি সেই বীর্য ধারণ করে পান করেন। তবে কথাসরিৎসাগরে বলা হয়েছে শিব অগ্নিকে এটি পান করতে বাধ্য করেন। বেদে মিত্রা আর বরুণের বহু অন্তরঙ্গতার গল্প রয়েছে। ভগবৎপুরাণে এদের দুজনের এক অযোনিসম্ভূত সন্তানের কথা বলা হয়েছে। বরুণের বীর্য বল্মীক স্তুপের ওপর পড়লে বাল্মিকির জন্ম হয়। উর্বশীকে দেখে মিতা এবং বরুণ বীর্য স্খলন করে জলে পড়লে অগস্ত্য আর বশিষ্ঠ্যর জন্ম হয়। ... ...

তবে ভেবে দেখতে গেলে, সংস্কৃত সভ্যতার ব্যাপকতর প্রভাব সম্যকরূপে অনুধাবন করা গেছে একমাত্র ভৌগোলিকদের মাধ্যমে। কলকাতার পুরনো নামটির কথাই ধরা যাক না কেন - এখনকার নাম তো বিদেশি। প্রাচীন বঙ্গে প্রথিতযশা সম্রাট বিজয়ের একমাত্র পুত্র ছিলেন রাজকুমার জয়। তিনি একবার সুতানুটির তীরে অপরূপ বাঙালি বৌদিদের গঙ্গাবক্ষে স্নানদৃশ্য দেখে বিহ্বল হয়ে তাঁর রসোপলব্ধি দুই ঠোঁটের ফাঁকে বায়ুর গতায়াত সংকুচিত করে তীক্ষ্ম ধ্বনিতে প্রকাশ করেন। তখন থেকে সেই এলাকার নাম হয় সিটি অফ জয়। সাগর পেরিয়ে বহু বিদেশেও সেই নামকরণের চিহ্ন বিদ্যমান। দক্ষিণ আমেরিকায় সংস্কৃতভাষী ভারতীয় নাবিকদের অজস্র অর্জুন গাছ লাগানোর স্মৃতি আজও বয়ে বেড়ায় আর্জেন্টিনা। অভ্রের খনি সমৃদ্ধ সুন্দরী অভ্রিকা আজ এক বিশাল মহাদেশ। ... ...

আজ-ও খেলছে সে। বার্তার অফিসে ঢুকে যখন সে ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামালো তখন একটা শ্রান্তি গ্রাস করলো তাকে। আসতে হয়েছে বাসে। রাস্তাটা বেশ খারাপ। ট্রেনে আসতে পারেনি। তার কোমরে যে বস্তুটা এখন গোঁজা থাকে তা নিয়ে ট্রেনে উঠলে বিপদ। রেল পুলিশ যদি চেকিং করতে গিয়ে ধরে তাহলে বেশ হ্যাপা। লাইসেন্সবিহীন মাল। আর এখন ওটা ছাড়া চলে না। ব্যাগটা রেখে রিশেপসন টেবিলে রাখা জলের বোতলটার দিকে হাত বাড়ালো সে। সিকিউরিটি হাসলো। তারা দুজনেই জানে এখন তাকে আরো পনেরো মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। নিত্যপ্রিয় ফোন করেছিল তাকে একটু আগেই। নির্দেশ পেয়ে গিয়েছে সে। তরু দত্ত মিটিং করছেন এ অফিসে আজ। রিসেপশন টেবিলের সামনের সারি সারি চেয়ারের একটাতে বসল সে। কোমরটা একটু আলগা করে নিল। যন্তরটা কোমরে ঠেকে আছে অনেকক্ষণ। দাগ হয়ে গিয়েছে নিশ্চই। ... ...

১৩ বছর চা বাগান বন্ধ। সরকার থেকে আসা সমস্ত রকমের ভাতা এপ্রিল থেকে বন্ধ। এবং এত কিছু বন্ধের মধ্যে অনাহারে গন্ধ না শুঁকে, লোকদেখানো চিল্লিমিল্লি না করে নীরবে সরকারি হাসপাতাল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে (নাকি উপেক্ষা করে!) চিকিৎসাহীন মারা যাচ্ছেন শ্রমিকরা। হয়তো দয়ার বা ভিক্ষার দান আর নেবেন না মনস্থির করেছেন। বাগান শ্রমিক স্বপন মজুমদার জানিয়েছেন, ‘– কেন আমাদের সব সময় সবকিছু চেয়ে নিতে হবে। এসব কি দয়ার দান নাকি ? –’ অধিকার সচেতন শ্রমিকদের মৃত্যু কেড়ে নিচ্ছে প্রশাসনের রাতের ঘুম। ... ...

আমি একজন সারভাইভর। আমি আমাকে ধর্ষণ করার জন্য কাউকে অনুরোধ করি নি, আমি ধর্ষণ উপভোগও করি নি। এটা ছিল আমার জীবনে সহ্য করা সবচেয়ে কষ্টকর অত্যাচার। কোনও ধর্ষণ কখনও কোনও মেয়ের দোষে ঘটে না। ধর্ষণকে নিয়ে আমাদের সমাজে পালন করে চলা অদ্ভুত নীরবতা আর অবাস্তব কাল্পনিক মিথকে ছিন্নভিন্ন করে দেবার উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা। আমি এই লেখার মাধ্যমে শুধু এইটুকু সবাইকে জানাতে চাই যে মেয়েরা কোনও সহজলভ্য ভোগসামগ্রী নয়, ধর্ষণের মত অপরাধ একজন মেয়েকে, মানুষ হিসেবে, সামাজিক ও মানসিকভাবে সবচেয়ে একা করে দেয়। ... ...

বারাসাতের কামদুনি গ্রামটিতে গণধর্ষণ আর হত্যা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর, কলকাতার কিছু রাজনৈতিক কর্মী, আর অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের আন্দোলনের সংহতিতে গ্রামটিতে গিয়েছিলাম গত ১৬ জুন। মমতার কামদুনি সফরের ঠিক একদিন আগে। নিচের লেখায় তারই একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ ধরা থাকল। ... ...

আমাদের পিটিশনটি প্রাথমিকভাবে তৈরি হয়ে আছে এই দুটি জায়গায়। অনুরোধ, এই পিটিশনটিকে আপনার আরও পরিচিতজনেদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া, যাতে পিটিশনটি আরও বেশি সই সংগ্রহ করতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর আগে আমরা যত বেশি সংখ্যক সই সংগ্রহ করতে চাই। আর সেটা করতে চাই খুব তাড়াতাড়ি।... আমরা সবাই মিলে একসাথে প্রতিবাদ না জানালে, এ অন্ধকার কাটবে কী করে? ... ...

আফজল আহমেদ সৈয়দ। উর্দু কবি ও অনুবাদক। জন্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষের গাজীপুরে। ১৯৪৬ সালে। ১৯৭৬ থেকে বসবাস পাকিস্তানের করাচিতে। পেশায় কীটপতঙ্গ বিশারদ। উর্দু নাজম-এর অন্যতম আধুনিক কবি। নাজম লেখা হয় ছন্দোবদ্ধভাবে এবং মুক্ত বা গদ্যছন্দেও। তাঁর উর্দু নাজমের অনুবাদ প্রকাশিত হয় ইংরিজিতে। ... ...

আজকে এখানে এত দূরে বস্টনে বসেও কোথায় যেন আমি তোর সাথে এক হয়ে যাচ্ছি। তোর আর আমার অপরাধ যে একই, তুই আর আমি দুজনেই যাদের ভালবাসি তাদেরকে আমাদের পরিবার-সমাজ মেনে নেয় না। নিজের ভালবাসাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বাবা-মার পছন্দ করে দেওয়া জীবনসঙ্গীকে তুইও মানতে পারলি না, আমিও মানতে পারব না। আমাদের দুজনেরই চুলের মুঠি ধরে আমাদের বাবা-মা-ভাই-দাদা-বন্ধুরা বলে, হয় আমাদের বানিয়ে দেওয়া নিয়ম মেনে ভালবাস অথবা সরে যাও, মুছে যাও। আমি জানি না, আমার সমপ্রেমকে তুই মেনে নিতে পারতিস কি না, আমি জানি না, আমার প্রিয় দিদিরা মেনে নিতে পারবে কি না। আমার ভয় লাগে, যেদিন জানতে পারবে আমার দিদিরাও কি তোর দাদার মত হয়ে যাবে? ভুলে যাবে, আমাকে পায়ে করে ওরা ঘুম পাড়াতো, আমার মেয়ে সাজার ইচ্ছে হলে ছোটবেলায় ওদেরই লিপ্স্টিক-কাজল দিয়ে ওরা আমাকে মেয়ে সাজিয়ে দিত? ... ...

আমার বন্ধু বলল, “যখনই সরকার বুঝবে ঐ পেপার স্প্রে দিয়ে আর কাজ হচ্ছে না, দেখিস তখন “সাইলেন্ট গার্ড” কিনবে বিদেশ থেকে।” তাকসিম স্কোয়ার থেকে চুখুরিয়েম কাদেসিতে বন্ধুর বাড়ীর দিকে দিকে তখন রওনা হয়ে গেছি। মাইলখানেক দূরেও বেশ টের পাওয়া যায় মরিচের ঝাঁঝালো গন্ধ। চোখ, নাক, গলায় একটা জ্বলুনি ভাব। প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেলো তাকসিম স্কোয়ারে নিয়মিত এই মরিচের স্প্রে চালানো হয়েছে, আমার বন্ধু বেচারা মরিচের ঝাঁঝ ছাড়া নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেছে। আর তার এটাও মনে নেই কোন ম্যাজিকে হাজারে হাজরে লোক জমায়েৎ হয়েছিল গেজি পার্ক আর তাকসিম স্কোয়ারে। “সামান্য কয়েকটা গাছে”র বদলে পার্কের ভিতরে শপিং মল বানানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কীভাবে একটি একনায়কের শাসনের বিরুদ্ধে সারা দেশের প্রতিবাদ হয়ে উঠল সেটাও আশ্চর্যের। প্রধানমন্ত্রী তায়িপ এর্দোগানের হিংস্র পুলিসের অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে ঐ আন্দোলন ছাড়িয়ে গেল দেশের সর্বত্র। ... ...

ডঃ জয়ন্ত দাসের সঙ্গে আমার কথা শুরু হয় এবছরের মার্চে। নিতান্ত ব্যক্তিগত শোকের প্রেক্ষিতে শুরু হয়েছিল কথা চালাচালি – অনুসন্ধিৎসাই ছিল তার মূলে – প্রথমে, ডঃ দাসের সঙ্গেই। ডঃ বিশ্বরূপ চ্যাটার্জী এলেন তার পরে। আলাপন, যা মূলতঃ হাসপাতাল থেকে আসা সংক্রমণ বিষয়ে প্রশ্নোত্তর- চলেছিল ই মেইলে; ভাষা কখনও বাংলা ছিল, কখনও ইংরিজি। আলাপনের ভঙ্গি ও কালানুবর্তিতা অটুট রেখে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথাকে ব্যক্তিগতর গণ্ডী টপকে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। ... ...

খাবার হবে পরিমাণ মত - তবে হ্যাঁ, পরিমাণ কেমন হবে সেটাকে সরলীকরণেরও বিপদ আছে। যারা আমেরিকান খাদ্য সংস্কৃতির সাথে পরিচিত তাঁরা কথাটির অর্থ আশা করি বুঝতে পারবেন। আমেরিকান রেষ্টুরান্টে ৩-কোর্স ডিনার আমার মত খানেবালার কাছে প্রহসনের মত। স্টার্টার শেষ করেই আমার পেট ভরে যায়, বাকি দুই পদ তো দূর অস্ত। এই প্রসঙ্গে আমার আর এক জ্যেঠতুতো ভাই পিকুলের লাইফের ট্রাজেডির কথাটা বলে নিই। ও তরকারি খেতে এত ভালোবাসে যে আজ পর্যন্ত কোন নিমন্ত্রণ বাড়িতে মাছ-মাংসের পদ পর্যন্ত পৌঁছতে পারলনা। শাক, ডাল, চচ্চড়ি দিয়েই তার খাবার শেষ। রান্নাঘরে তরকারি হাতড়াতে গিয়ে ও বহুবার ধরা পড়েছে। ওই জন্যই বলে আপ্ রুচি খানা। ... ...

কাল রাতে যথারীতি মদটা বেশি খাওয়া হয়ে গিয়েছে। এই জন্যে বৌ রেগে যায়। কিন্তু অমিতাভ কী করবে! অনুরাগ আর জয়ন্তর সঙ্গে আগে রাতে বসতো যখন তখন অন্য রকম ব্যাপার ছিল। জয়ন্ত খুব নিয়ম মানা ছেলে। ঠিক সময়ে থেমে যেত। আর খেতে বসতো জয়ন্তর বাড়িতেই। তাই বেশি বাড়া যেত না। জয়ন্তর বৌ একটু হেসে মনে করিয়ে দিত বাড়ি যেতে হবে। সে আর অনুরাগ বেরিয়ে পড়ত। তার গাড়িতে আগে অনুরাগকে ছেড়ে সে ফিরতো। এখন তো আর তা না! জয়ন্ত পার্ক স্ট্রীট-এ আসে না। অনুরাগ কিছুদিন হল আলাদা। অবশ্য তারা জেনেবুঝেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনিই কিছুদিন ধরে কাজের চাপ বাড়ছিল। তারপরে এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট লাইসেন্স হয়ে যাওয়াতে আর চায়নার মাল আসতে শুরু করাতে আর কিছু করার ছিল না। অনুরাগ বললো ও কম্পিউটারটা দেখবে। চায়নায় সারে সারে শহরে ছোট ছোট ইউনিট করে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ তৈরী হচ্ছে। তারা আনছে। এখানে অ্যাসেম্বল করছে। মেড ইন ইন্ডিয়া ছাপ দিয়ে আলিবাবা কম্পিউটার ব্র্যান্ড করে বেচে দিচ্ছে। ... ...

কিন্তু শাহবাগে যে স্বতঃস্ফুর্ত গণজাগরণ হয়েছে তা তো কোনো দলের নয়, কোনো একটি পত্রিকার নয়; গোটা দেশের। সারা বিশ্বের সকল বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে শাহবাগের ডাক। মতি ভাই ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণআন্দোলনের মাঠের সৈনিক। কিন্তু ২০১৩-এর গণজাগরণে তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও দেখি নি। কেন? এমন তো নয় মতি ভাইয়ের অনেক বয়স হয়ে গেছে, কোথাও যান না। বরং পত্রিকার স্বার্থে অনেক অগুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও তাকে যেতে দেখি। মতি ভাইদের গণঅভ্যুত্থান অনেক মহৎ ছিল। গণঅভ্যুত্থানের বছর জন্ম বলে আমি অনেক গর্ব করি। কিন্তু তাই বলে আমাদের নতুন প্রজন্মের গণজাগরণের মহত্বও তো কম নয়, অন্তত মতি ভাইয়ের না যাওয়ার মতো অত খারাপ না। ... ...

শিল্প আর শিল্পী নাকি আলাদা। এই আবেগ ভ্যাদভ্যাদে মৃত্যুদিনে সেসব কথা ভাবতে ভালো লাগেনা। এ সব ব্যক্তিগত অনুভূতি বড়ই ব্যক্তিগত। ফিল্ম টিল্ম গোল্লায় যাক, গোল্লায় যাক শিল্পের শবসাধনা, কবিতার বদলে ট্রামে ছেঁচড়ে যাওয়া জীবনানন্দের ডেডবডি মনে পড়ে। সেই দশকে নাকি ওটাই ছিল একমাত্র ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যু। তাকে আপতিক ভাবতে অসুবিধে হয়, যেমন অসুবিধে হয় ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে একজন সফল ফিল্ম মেকারের মৃত্যু। আসলে তো তাঁকে নেই করে দেওয়া হল। টিভিতে, খবরের কাগজে, সোশাল মিডিয়ায় যত কলকাকলি আর হাহুতাশ দেখি, সব শুধু সিনেমা। সিনেমা সিনেমা আর সিনেমা। লোকটা কোথাও নেই। কিন্তু আজ তো সিনেমার দিন না। একটা লোক মারা গেছে। একজন ব্যক্তি মারা গেছেন। সে শুধু সিনেমা নয়। নিজের আইডেন্টিটিকে সে কখনও সিনেমা দিয়ে ঢাকেনি। মেয়েলি দোপাট্টা পরে কানে দুল ঝুলিয়ে টিভি শোতে এসেছে। যত বয়স হয়েছে তত নরম হয়েছে তার গলার আওয়াজ, আর তীব্রতর হয়েছে তার আইডেন্টিটি। নমনীয়তাকে, নরম স্বরে কথা বলাকে আমরা পুরুষের দুর্বলতা বলে ধরে নিই। কিন্তু ঋতুপর্ণ জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, ব্যাপারটা অতো সোজা নয়। যতগুলো নতুন পুরস্কার ঝুলিতে ঢুকেছে, ততই মেয়েলি হয়েছেন তিনি। ততই নরম হয়েছে তাঁর কণ্ঠস্বর। মেয়েলিপনাকে শক্তি দিয়ে আগলে রেখেছেন। ছুঁড়ে দেওয়া ইঁটগুলোকে, "লেডিস ফিংগার" তাচ্ছিল্য আসবে জেনেও, আঁকড়ে ধরেছেন ওই মেয়েলি আলখাল্লাকে। সেই নরম সাহস, সেই এফিমিনেট দৃঢ়তা ছাড়া ঋতুপর্ণ নেই। হয়না। ... ...

সব চরিত্র কাল্পনিক দেখে এক সময় আমায় বোঙায় ধরেছিল। সে কথা এই মায়াপাতার লোকজন কিছু কিছু জানেন। তারও আগে রেইনকোটের ভেজা বিষাদ। কিম্বা দোসর-এর সেই সাদা -কালোর নিষ্ঠুর মায়া। মৃত্যু-অপ্রেম আর ভালোবাসার বেঁচে থাকার গিঁট-পড়া কাটাকুটির মধ্যে বিষাদ তার থাবা নামাচ্ছে। বিষাদ, স্নেহময়, তার নখ বসাচ্ছে।কর্তব্য,পূর্বনির্ধারিত। পৃথিবীর কোনো গানের সুর-কোনো জলের স্বাদ,পাতালের কোনো ভোগবতীর ধারা, ফলের রসালতা, পৃথিবীর কোনো ওষুধ, কোনো অ্যালপ্রাজোলাম-ফ্লুওক্সেটিন-সিটালোপ্রাম এই মহৎ বিষণ্ণতার শালপ্রাংশুমহাভুজ শরীরে একটি আঁচড়ও কাটতে পারে না। এই বিষণ্ণতার রাস্তা ধরে ঐ তৃতীয় মানুষটি হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। পাহাড়ী রাস্তার মেঘ-কুয়াশা-তিস্তাজলের মধ্য দিয়ে। সখী হাম মোহন অভিসারে যাঁউ... ... ...

ছকে বাঁধা জীবনে আমি পারিনি মানাতে। আমি যা চাই, যা পছন্দ করি তা সমাজ পছন্দ করে না। কারণ আমার মন বললেও আমার শরীরের গঠন অনুযায়ী আমার জীবনযাপনের পদ্ধতি সমাজের বাঁধাধরা নিয়মকে আঘাত করে। এক জনের শরীর দেখে তাকে বিচার করা সমাজের কাছে যতটা সহজ, এক জনের অবয়বহীন মানস দেখে তাকে বিচার করা ততটাই কঠিন। আমার শরীরটা একজন নারীর। সমাজ চায় না আমি ছোট করে ছেলেদের মতন চুল রাখি। আমার বিনুনি বাঁধা উচিত। আমি কোন পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি তাতে সমাজের কিছু আসে যায় না। আমাকে নিয়মের মধ্যে থাকা উচিত। সমাজ চায় না আমি জিন্স প্যান্ট পরি, আমার পোশাক হওয়া উচিত সালোয়ার আর শাড়ি। সমাজ চায় না আমি সাইকেল-বাইক চালাই, চায় কারুর বাইকের পিছনে আমি বসি। সমাজ চায় না আমি বাড়ির বাইরে বেরোই, কাজ করি। চায় আমি রান্না বান্না আর সন্তান জন্ম দিয়ে তাদের দেখাশুনা করি। চায় না আমি মাঠে ঘাটে গিয়ে খেলাধূলা করি, শরীরচর্চা করি। চায় আমি বাড়ির উঠোনে স্কিপিং করি আর শাহ্রুকের রোমান্টিক ফিল্ম দেখি। চায় না আমি কোন ‘নারী’কে সঙ্গিনী হিসাবে বেছে নি। কারণ শরীরের উপর ভিত্তি করে যে সকল নিয়ম কানুন গড়ে উঠেছে, এ সব কিছু তারই অংশ বিশেষ। মন বা মানসের কোন স্থান এখানে নেই। ছত্তিরিশটা বছর ধরে মোটা কাপড়ের নীচে শরীরটাকে আষ্টেপৃষ্টে ঢাকা দিয়ে বাড়ির বাইরে বার হই, লোকের সাথে মিশি। বাড়ি ফিরে বিবস্ত্র হয়ে আয়নার সামনে যখন দাঁড়াই, কুঁকড়ে যাই। যাঁরা আমাকে চেনেন জানেন তাঁদের কাছে আমি কোন আলোচনার বস্তু না, কিন্তু যাঁরা আমাকে চেনেন না, আমাকে নতুন দেখলেন তাঁরা শুধু আমাকে বিস্ময়সূচক দৃষ্টি নিয়ে আপাদমস্তক পরীক্ষা করে গেলেন। আমি চলে গেলে পিছন থেকে কিছু অস্পষ্ট কথা শুনতে পাই, ‘এটা কে? ছেলে না মেয়ে?’ ... ...

আমি এখানে যা লিখছি তা আদৌ মাওবাদী রণদামামার ‘জাস্টিফিকেশন’ নয়, বরং যা ঘটছে, তা কেন ঘটছে, কেন এমনটাই ঘটছে, অমনটা নয় — সেটা ‘এক্সপ্লেন’ করার সামান্য চেষ্টা। যদিও আমি সবজান্তা বা শেষ কথা নই। অর্থাৎ আমি যদি বলি যে অমুক যে অকালে জিভের ক্যান্সারে মারা গেল তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই, অত সিগ্রেট খেলে অন্যরকম না হওয়াটাই স্বাভাবিক, — তখন আমি আসলে বলতে চাই যে সিগ্রেটের নেশার বিরুদ্ধে কিছু না করে শুধু কেমোথেরাপি/ সার্জারি/রেডিয়েশন দিয়ে জিভের ক্যান্সারের রোগিকে বাঁচানো বা ক্যান্সার নির্মূল করা, কোনটাই সম্ভব নয়। তাই মাওবাদী এজেন্ডার বিরুদ্ধে বললেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সমর্থক, আত্মসুখী চাটুকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বলতে গেলেই necessarily মাওবাদী এজেন্ডার সমর্থক — এই “আমরা-ওরা”র বাইরে নিশ্চয়ই কোন স্পেস আছে, সেটা খুঁজছি। ... ...