
জোনাকির গ্রামে আজ পর্যন্ত বাসের রাস্তা তৈরি হয়নি। কোথাও যেতে হলে বেশ খানিকটা হেটে বড় রাস্তায় এসে বাসের জন্যে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। ধুলো ও বর্ষার কাদামাখা পা খানা বট গাছের তলায় চাপা কলের জলে ধুতে ধুতে বার বার ঘাড় উঁচু করে দেখতে হয় জোনালি নামে গুয়াহাটি যাওয়ার বাসটা আসছে কি না ! কোন কারনে জোনালি এসে না পৌঁছালে ম্লানমুখে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। বাসে বসার কথা কেউ ভাবে না। হাঁস-মুরগি,শুকনো মাছ, মাগুর-কই মাছের টিন, শুকনো পাটের দম বন্ধ করা বাসে দাঁড়াতে পারাটাই পরম সৌভাগ্যের বিষয়। অবশ্য বিশেষ কাজ না থাকলে কেউ ই গ্রামের বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তাও করে না। ... ...

এক যে ছিল ভীষণ কেবলী মেয়ে, টিঙটিঙে রোগা, থাকার মধ্যে মাথায় ঘন চুল, মুখচোরা আর প্র্যাকটিকালে ভয়। কেমিস্ট্রী ছাড়া সবকিছু পড়তে ভালবাসে, পাকপাড়া থেকে বেলগাছিয়া এসে ট্রামে করে কলেজ যায়। আর ছিল এক ডাক্তারীর ছাত্র, বেজায় গম্ভীর, নেহাত দরকার না পড়লে কথাটথা কয় না, সবসময় রামগরুড় মুখ করে ঘোরে কিন্তু পেটে শয়তানি বুদ্ধি গিসগিস করে। সেদিন ডিসেম্বর মাস, অসময়ে প্রবল বৃষ্টি। হাঁচতে হাঁচতে কেবলী কলেজে চলেচে, বগলে তিনটে প্র্যাকটিকাল খাতা, এক হাতে তোয়ালেরুমাল, অন্য হাতে বাসের রড, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। ... ...

- এক থাপ্পড় লাগাব অসভ্য মেয়ে, সিনিয়ারদের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় জাননা ? - যাব্বাবা, আমি কোথায় ভাল মনে বলতে গেলাম, তোমার জীন্সটা ফ্যান্টা, আর তুমি চমকে দিলে ? দেখ, সিনিয়ার বলে অত এয়ার নিওনা, মোটে তো দুবছরের বড় – - চমকে দিলাম আবার কী ভাষা, ঠিক করে কথা বল। আমাকে কী বলে ডাকলে তুমি ? আমার নাম শুচিস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ছোট করে, স্মিতা। বুঝলে ? - কী করে জানব দিদিভাই, দুনিয়ার লোক তোমায় শ্যামা বলে ডাকে শুনি, তাই আমিও বললাম, শ্যামাদি। খুব অন্যায় করেছি না? পায়ে ফায়ে ধরতে হবে নাকি? ... ...

কিন্তু, আসল ব্যাপারটা মোটেই এরকম নয়, এই ‘অহিংস’ ঘটনা ঘটার দিন বিকেলে প্রেসিডেন্সির বন্ধ গেটের বাইরে সাধন পাণ্ডে মহাশয়ের নেতৃত্বাধীন জনসভার বক্তব্য থেকে আসল ব্যাপার পরিস্ফুট হয়। ‘চক্রান্ত’-এর অন্ধকার কেটে আলোর দ্যাখা পান ডিরোজিয়ানরা এবং অন্যান্য মূঢ় ব্যক্তিবর্গ। আসলে তৃনমূল ছাত্র পরিষদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে প্রেসিডেন্সি থেকে বেরিয়ে ছাত্রছাত্রীরা হামলা করে, যে জন্য মিছিলে উপস্থিত লোকজন বাধা দিতে বাধ্য হন। যে কারণে পরের দিন প্রেসিডেন্সির হাজারে হাজারে ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-কর্মচারী-প্রাক্তনী যখন পথে নামেন, তখন প্রেসিডেন্সির ছাত্র দেবর্ষি চক্রবর্তী এবং প্রেসিডেন্সি প্রাক্তনী ছন্দক চ্যাটারজির বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের করে টি এম সি পি, ১৪৭, ১৪৮ ও ১৪৯ নং ধারায়, দাঙ্গা বাধানো এবং উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগে। এই দেবর্ষি চক্রবর্তী আগেরদিন হাসপাতালে গেছিলেন আহত হয়ে ? ও সে তো নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে গিয়ে লেগে গেছিল। আরেকজন ছাত্রকেও হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল না? ওরা দুজন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিল। সিম্পিল। ... ...

কিন্তু বিজ্ঞান ব্যাপারটা কী? কাকে বলব বিজ্ঞান আর কেই বা না-বিজ্ঞানের দলে? কিভাবে ঠিক হবে তাদের সীমা, সীমানা? এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ, বিজ্ঞান কি আর তার বৈশিষ্ট্যই বা কি, এটা না বুঝলে বিজ্ঞানের আধিপত্যের রাজনীতিটা বোঝা মুশকিল। এই প্রশ্নটা নতুন নয়, আদতে বেশ পুরোনো দার্শনিক প্রশ্ন। এখন একটু দেখে নেওয়া যাক বিজ্ঞানের বিশেষত্বকে প্রশান্ত/অতলান্তের অপর পাড়ের পন্ডিতেরা কিভাবে দেখেছেন, ভেবেছেন। ... ...

মৃত্যুর ওপার নিয়ে মানুষের জিজ্ঞাসা আজকের নয়। এই প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসা হওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। সংবেদনশীল এবং কৌতূহলী মানুষেরা এই প্রশ্ন উথথাপন করবেন এবং নিজেদের মত করে তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা চালাবেন – এটা তাই প্রত্যাশিত বলেই ধরে নেওয়া যায়। প্ল্যানচেটের মাধ্যমে এপারের সঙ্গে ওপারের সেতুবন্ধনের প্রয়াস তারই একটা অংশ। বিভিন্ন যুগের কিছু বিশিষ্ট মন এ পথে আকৃষ্ট হয়েছে। এখানে তেমন কয়েকটি উদাহরণ রইল মাত্র। অতীত বর্তমান মিলিয়ে এই তালিকা আসলে দীর্ঘ। এবং পুনরাবৃত্তি যদি ইতিহাসের ধর্ম হয়, সম্ভবতঃ ভবিষ্যতেও এই পথে সন্ধানী পথিকের অভাব হবে না। ... ...

শাহবাগ জনতার সেই চেতনা, যে-চেতনা অনুমান করেছিলো জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের কোন আঁতাত তৈরি হয়েছে। ট্রাইবুন্যাল-রূপী প্রহসনের নাটকে জনগণের দাবীর যে অপমান ঘটেছে শাহাবাগ তারই বহিঃপ্রকাশ। শাহবাগ আওয়ামী লীগ সৃষ্টি করেনি, কিন্তু শাহবাগে আওয়ামী লীগ একটা নেতৃত্বকে চাপিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতি বাকিদেরও সন্দ্বিগ্ধতার কারণে এরাও আবার একক নেতৃত্ব হতে পারেনি, কিছুটা হলেও যৌথ নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছিলো। বাকিরা যেহেতু সংগঠিত ছিলো না, তাই চাপিয়ে দেয়া নেতৃত্বের অগণতান্ত্রিকতা আর অস্বচ্ছতাও যথাসময়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। নীতিনির্ধারণী সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তও বদলে ফেলার মত গুরুতর ঘটনা শাহবাগে ঘটেছে। আবার, নেতৃত্বের যে কোন আপোষের ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র সাধারণ জনতা ও কর্মীরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তাও নেতৃত্বের ভূমিকাকে বহুভাবে প্রভাবিত করেছে। ... ...

যাত্রামুখে দেখি চোখ বড়ো করা কালো মেঘ গায়ে লালাভা মেখে ওত পেতে আছে, শিলাপাতের সম্ভাবনাসহ, ‘আকাশের শিলাস্তূপ থেকে তিনি বর্ষণ করেন শিলা, আর এ দিয়ে তিনি যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন’, শঙ্কা জাগে মনে, আমার খেতের গর্ভিণী ধানের ছড়া, আমার গাছের আমের যত বোল, আমার খড়ের প্রিয় চালাঘর, এ যাত্রা সর্বনাশের সামনে দাঁড়িয়ে গেল তাহলে, হঠাৎ এ-ও মনে হয়ে যায় যে ‘...আর যাকে ইচ্ছা তার ওপর থেকে এ অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন’, সহসাই এরকম বিশ্বাস জেগে ওঠে মনে যে আমার ওপর থেকে তা ফিরে যাবে অন্যদিকে, হ্যাঁ, যাবেই ফিরে ইচ্ছাশক্তির বলে, এ বিশ্বাস আমাকে দেন ভারতবর্ষীয় কৃষি ও আবহাওয়াবিদ খনা, তাঁর ‘ধলা মেঘে গলা পানি/ কালা মেঘে ছাগল দৌড়ানি’ আর্যাযোগে, ঝরঝরে লাগতে থাকে নিজেকে, মেঘের দিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলি দুটোই একযোগে তুলে ধরি, বলি যে, দুটোর যেকোনোটা খুশি ঢুকিয়ে বসে থাক, শান্তি পাবে, বেচারা মেঘের লালচোখ মুহূর্তে নত হয়ে যায়, ব্রেভো, গর্বে আবারও সাঁইজির চরণ জাগে পোড়া মুখে, কেন যে জাগে, ‘মানুষে মানুষের বিহার/ মানুষ হলে সিদ্ধ হয় তার/ সে কি বেড়ায় দেশ-দেশান্তর/ যেজন পিড়েয় পেরুর খবর পায়’, বারকয় চরণটি ভাঁজতে ভাঁজতেই আমার বোরাক এসে পৌঁছায় কদমতলে, এ কদম সেদিন যে সে কদম ছিল না, নিচে তার ছিল যথেচ্ছ প্রশ্রয়, কামনার ইঙ্গিত ... ...

আশা করি কাল কলকাতায় কোনো প্রতিবাদ হবে না। প্রতিবাদ হলে কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব, প্রতিবাদকারীদের ধরে চোখ উপড়ে হাঁটু ভেংগে পেটের নাড়িভুঁড়ি বার করে দিতে হবে! সবথেকে ভাল হয় লাশগুলো রাস্তার ওপর সাজিয়ে রাখলে, বা ত্রিফলা ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে দিলে। যাতে প্রতিবাদের প্রতিবাদ করার আগে মানুষের গায়ের রক্ত একবার হিম হয়ে যায়। আশা রাখি, বিপুল জনাদেশে জিতে আসা মুখ্যমন্ত্রী আমাদের এই গণতান্ত্রিক দাবিটুকু পূরণ করবেন। অবশ্য এই দাবিটুকু করতে গিয়েও ‘কুমীর তোর জলকে নেমেছি’ বলে ফেললাম কি না, এখনই ঠিক বুঝতে পারছি না। ... ...

আইন অমান্য করলে জেল, জমবে এবার আইপিএল। ... ...

মশলার কথা শুনেছিলাম ব্যাঙ্গালোরে থাকতে, করিমের মুখে। করিম কিছুকাল বস্টনে ছিল, তারপর এ ফর আলাস্কা থেকে জেড ফর জিম্বাবোয়েতে কাটিয়ে অবশেষে ব্যাঙ্গালরে পৌঁছয়। ছোট ছোট করে কাটা চুল, দারুন ম্যানলি চেহারা আর তার সাথে একটা সাঙ্ঘাতিক ইচ্ছাকৃত কন্ট্রাস্টে কানে গোঁজা কাঠগোলাপ ফুল, এই হচ্ছে করিম। আমি বস্টনে আসব শুনে ও আমাকে বস্টন মশালার সাথে যোগাযোগ করতে বলল। আমি বস্টন মশালাকে ইন্টারনেটে খুঁজলাম, এম ডি এইচ থেকে লাস ভেগাসের ইন্ডিয়ান স্ট্রিপ শো সব পেলাম খালি বস্টনের সাউথ এশিয়ান এলজিবিটি গ্রুপ মশালার খোঁজ পেলাম না। কারণটি অত্যন্ত সহজ, কিন্তু আমার মোটা মাথায় ঢুকতে একটু সময় লাগল। আমি জানি আপনারা আমার থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান, এর মধ্যেই ধরে ফেলেছেন গোলমাল কোথায়, তাই সে কথায় পরে আসছি। ... ...

একবার কেউ অঞ্জলি এলা মেনন'কে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলেন, তাঁর ছবি সর্বোচ্চ দামে বিকোবার সুখে। অঞ্জলি বলেছিলেন, ছবি বিক্রির দাম দিয়ে উৎকর্ষ বিচার করাটা মূর্খতা। হতে পারে তাঁর একটা ছবি বাজারে অত্যন্ত মহার্ঘ মূল্য পেয়েছে, কিন্তু এটা জেনে রাখা দরকার গণেশ পাইনের আঁকা ছবির মূল্য নির্ধারন হয় প্রতি বর্গ ইঞ্চির হিসেবে। শিল্পী হিসেবে তাঁর সিদ্ধির কাছাকাছি অতি সামান্য ক'জনই আসতে পারেন। দীর্ঘদিন তাঁর তেল রং কেনার সামর্থ্য ছিলোনা। মন্দার মল্লিকের স্টুডিওতে অ্যানিমেশনের কাজ করতেন। সেই উপার্জনে জলরঙে ছবি আঁকতেন। সেভাবেই ওয়াশ থেকে গুয়াশ এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর সিদ্ধির আসন পাতা হয় টেম্পেরা মাধ্যমে। অত্যন্ত স্বল্প মাত্রায় ছবির জন্ম হতো তাঁর হাতে। একার ক্যানভাসে একটা প্রদর্শনী ভরা যেতোনা, তাই ঐ মাপের শিল্পী হয়েও গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে ছবি দেখাতেন। তিরিশ চল্লিশ লাখে এক একটা ছবি বিকোনো খুব মামুলি ব্যাপার ছিলো তাঁর কাছে। সতীর্থ ও বন্ধুরা তাঁর এই সাফল্যে ঈর্ষাপর হয়ে পড়ায় আশির দশকে বেদনাবশে দীর্ঘকাল ছবি আঁকেননি। একান্ত অন্তর্মুখী ও প্রচারবিমুখ শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁর আঁকা সত্তর দশকের টালমাটাল সময়ের চিত্রকাব্য দেখে মকবুল ফিদা হুসেন মুম্বাইয়ের একটি পত্রিকায় গণেশের মুক্তবন্ধ প্রশংসা করেন। কলকাতার সীমাবদ্ধ শিল্প বাজারের থেকে তাঁর ছবি এইভাবে বিশ্বের দরবারে হাজির হয়। তার পর আর ফিরে তাকাননি তিনি। সত্যি কথা বলতে ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর সেই সর্বনেশে সত্তরের ক্যানভাসমালা দেখেই মন্ত্রবন্দী হয়ে পড়েছিলুম। একদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক পৃথিবীর 'গভীর, গভীরতর অসুখ', অধ্যাপক আর ট্র্যাফিক পুলিশ হত্যার বিপ্লব। অন্যদিকে এশিয়ার মুক্তিসূর্যের হাতে জরুরি অবস্থার 'অনুশাসন পর্ব'। মানুষের শুভবুদ্ধি আর বিবেকী আয়োজনের নাভিশ্বাস। সেই সময়ের পটপ্রেক্ষায় গণেশের ক্যানভাস মানুষের কষ্ট, যুদ্ধ ও প্রতিবাদের একটা সেরিব্রাল দলিল হয়ে উঠেছিলো। ... ...

সাত কি আট শতাব্দীর যে লিগ্যাসি আজ ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ-বরিশালের রাস্তায় আগুন হয়ে জ্বলছে, সেই অগ্নি নির্বাপণের সদুত্তর আমাদের কারো কাছেই নেই। বাঙালীর প্রদোষকাল আজো শেষ হয় নি। শওকত আলী আমাদের সেই মহত্তম লেখকদের একজন যিনি শ্যামাঙ্গ ও লীলাবতীর এই সংলাপের ভেতর দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আত্ম-পরিচয়ের সঙ্কট তুলে ধরেছেন। এই বই দুই বাংলার বাঙালী হিন্দু ও বাঙালী মুসলিম উভয়ের অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। বাঙালী মুসলিমের যে অংশ আজ এদেশকে আফগানিস্থান বানানোর স্বপ্নে দিশাহারা, তাকে পড়তে হবে আত্ম-পরিচয়ের প্রশ্নে। যে বাঙালী হিন্দু ওপারে গিয়ে সর্বভারতীয় আশ্রয়ে কোনমতে মাথা গুঁজে আত্মতৃপ্ত হয়ে ভাবছেন, ‘যাক, ওপারের মুসলিম গুন্ডাদের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচেছি’ তারও এই বই পাঠ জরুরি আত্ম-বিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধির জন্য। দু’জনকেই দু’জনের সঙ্কট-সমস্যা বুঝতে হবে। তবেই মিলতে পারবে শ্যামাঙ্গ আর লীলাবতীর ধর্মান্তরিত ও অ-ধর্মান্তরিত সন্তানরা। কারণ মা প্রকৃতি ত’ আমাদের চেহারায় এমন ছাপ দিয়েইছেন যা কিছুতেই মালা-দাড়ি, তিলক-টুপিতে ঢাকার যো নেই। ... ...

দেখা যাচ্ছে, “পারাপার”-এর নির্যাতন এ গল্পে এসে বিস্তৃত হয়েছে আরো তৃণমূল পর্যায়ে। হয়ে উঠেছে আরো বেশি নির্মম; প্রাণঘাতী। তাই “এই সময়”-এ এসে জহিরকে লিখতে হয়েছে, পাড়ার মাস্তাদের (তিন ভাই—আবু, হাবু, শফি) হাতে নিহত মোহাম্মদ সেলিম নামের এক কিশোরের কথা। একটি অসম বয়সী কিশোর-যুবতীর প্রেমের ট্রাজেডীর আড়ালে জহির এই গল্পে যে ম্যাসেজটি দিয়েছেন তা হলো, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ষোলকলা-পূর্ণ হয়েছে। কারণ, স্বাধীনতা বিরোধী মওলানা জব্বার (জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদু মওলানার এক্সটেনসশন), এরশাদ সাহেব, মালেকা বানু আর মেজর ইলিয়াস, সবাই আজকে গাঁটছড়া বেঁধেছে। ... ...

বলা ভালো, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে 'ব্লগ', 'ব্লগার', 'ফেসবুক' ইত্যাদি এখন সাধারণজনের কাছে অনেক পরিচিত শব্দ। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তরুণরা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শাহবাগ মোড়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। অভূতপূর্ব এই গণজাগরণটি খুব শিগগিরই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কারণ ৪২ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া তথা ১৯৭১ এর অমিমাংসিত অধ্যায়টির যৌক্তিক মিমাংসা না হওয়া জনমনে ব্যপক ক্ষোভের সঞ্চার করেছিলো। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় না হওয়ায় এটি গণবিস্ফোরণে পরিণত হয়। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তারুণ্যের এই জাগরণ। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালে প্রধান যুদ্ধাপরাধী ও জামাতে ইসলামের তৎকালীন আমীর গোলাম আজমের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠন এবং তাকে প্রতীকী ফাঁসির রায় দিয়ে চলমান আন্দোলনটির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন। ... ...

অনন্তর,পরিশেষে বলা জরুরি,ভৌগলিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দূর্ভাগ্য এই যে,বাংলাদেশের প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহে সাম্প্রদায়িক সংকট যথেষ্ট প্রকট। অন্তত এই বিবেচনায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি যথেষ্ট ভালো। কিন্তু এর অবনতি ঘটিয়ে যারা ফায়দা হাসিলে সচেষ্ট তারাই যে এই সাম্প্রদায়িক অপরাধটি সংঘটিত করেছে তা বুঝতে বাড়তি কোনো বিদ্যেবুদ্ধি কিংবা তথাকথিত বুদ্ধিজীবি হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। এটা সত্যি যে,রামুতে কতিপয় মুসলিম সন্ত্রাসির নেতৃত্বে যে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও হামলা হয়েছে নোয়াখালির দাঙ্গার পর সন্দেহ নেই এটিই সবচে' বড় কলঙ্কজনক ঘটনা। ধর্মান্ধ মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিকে উস্কে দিয়ে সুকৌশলে যারা এই সাম্প্রদায়িক অপরাধ সংঘটনে পরিকল্পনা এবং ষড়যন্ত্র করেছে অবশ্যই তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ইতোমধ্যে রামু নিয়েও শুরু হয়েছে পরস্পর দোষারোপের সেই নোংরা রাজনীতি। তবে কি অচিরেই আমরা রামুর এই সহিংস ঘটনাটিকেও বিস্মৃতির অতলেই হারিয়ে যেতে দেখবো? আর সেটি কি আদৌ আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক হবে? আর কতকাল সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিশেবে বিবেচিত হবে? সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক রাজনীতিকরা স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধিতে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা জংগিবাদের ধুয়ো তুলে খাল কেটে কি কুমিরকেই আমন্ত্রণ জানিয়ে যাবে? এদেশের অসাম্প্রদায়িক প্রকৃত মুসলিমদের কি কিছুই করণীয় নেই? তারা কি শুধুই হাত গুটিয়ে বসে বসে দেখবে আর ইসলামের মহত্বই প্রচার করে যাবে? একজন নির্যাতিত বাংলাদেশি বৌদ্ধের তুলনায় একজন নির্যাতিত রোহিঙ্গা কিংবা ফিলিস্তিনি মুসলিমের প্রতি এদেশীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের মমতা কি আসলেই বেশি? হ্যাঁ,এইসব,সবকিছুই বিবেচনাপূর্বক রামু ট্র্যাজেডির সুষ্ঠু সমাধানকল্পে একটি স্বচ্ছ বিচারবিভাগীয় তদন্ত এই মুহূর্তে সত্যিই ভীষণ জরুরি। তা না হলে যে সভ্যতার পোড়াঘ্রাণে বারম্বারই অসহ হয়ে উঠবে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমি বাংলাদেশ। তাই নয় কি? ... ...

মেডিকাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া ২০০২ সালে কোড অফ এথিকস-এ বলেছে ডাক্তারদের যথাসম্ভব জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশন লেখা উচিত। বিভিন্ন সময় সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে সরকারি ডাক্তারদের ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করতে বারণ করেছে। তাহলে ব্র্যান্ড নামে ওষুধ উৎপাদন হচ্ছে কেন? বাজারজাত হচ্ছে কেন? একদিকে সরকার ব্র্যান্ড নামের ওষুধ, অযৌক্তিক নির্দিষ্ট মাত্রার মিশ্রণ (irrational fixed dose combinations), ক্ষতিকর ওষুধ, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরি করতে দেবে আর ডাক্তারদের বলবে এসব লেখা যাবে না — এমনটা হয় নাকি! সরকারের সদিচ্ছা থাকলে তেমনটা করত যেমন করেছিল আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশের সরকার — অযৌক্তিক নির্দিষ্ট মাত্রার মিশ্রণ (irrational fixed dose combinations), ক্ষতিকর ওষুধ, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ নিষিদ্ধ করে। ... ...

২ নম্বর মিথকথাঃ সহবাস সম্মতির বয়স কমিয়ে ১৬ করা হলে ধর্ষণ,বেশ্যাবৃত্তি ও নারী চালান আরো বেড়ে যাবে। ঘটনাঃ এই সম্মত সহবাসের আইনী বয়স কিন্তু ১৬ বছরই ছিল, সেই ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু করে একটানা ৩০ বছর। হঠাৎ করে, মাত্র নয় মাস আগে, কোনো রকম আলাপ, আলোচনা বা বিতর্কের মধ্যে না গিয়েই সরকার একটি নতুন আইন চালু করেন, Protection of Children from Sexual Offences Act, May 2012 নামে এবং কলমের এক খোঁচায় সম্মতির বয়স বাড়িয়ে ১৮ করে দেন। JVC কমিটি এই সংশোধনী ধারাটির বিরোধিতা করেন ও সম্মতিসুচক সহবাসকারীদের অযথা দণ্ডনীয় অপরাধী হিসেবে গণ্য না করার সুপারিশ করেন। না, সম্মতিসুচক সহবাসের বয়স ১৬তেই ধরে রাখার মানে এইই নয় যে অল্প বয়সে বা বিয়ের আগেই যৌনসংসর্গকে অনুমোদন করা বা উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কোনো ভাবেই এই আইন অপ্রাপ্তবয়স্কদের কোনো শিক্ষা দিচ্ছে না। বরং এই আইন মোতাবেকে এইটাই ঘটছে যে, সম্মতিসূচক সহবাসের জন্য কোনো কিশোর কিশোরীকেই তৎক্ষণাৎ অপরাধী মেনে গারদে ঢোকানো হচ্ছে না। এই ‘সম্মতির বয়স’এর মানে এইটাই যে কোনো কোনো কিশোর বর্তমানে ১৮ বছরের কমবয়েসি কোনো মেয়ের সাথে সহবাস করলেই সে অপরাধী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এবং ঘটনাটিকে বিধিসম্মত ভাবে ধর্ষণের আওতাতেই ফেলা হচ্ছে। ভারতীয় সমাজ আদৌ চায় না যে এইসব অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েদের সম্মতিসূচক যৌন সংসর্গের জন্যও অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হোক বা কোনো কিশোরকে এইজন্য ধর্ষক হিসেবে সাজা পেতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক তরুণই এর ফলে জেলে যেতে পারেন। কেউ কোনো নালিশ ঠুকলেই এইসব ছেলে মেয়েরা শুধুমাত্র সম্মত সহবাসের দরুনই গারদে বা কোনো ‘হোম’এ আটকা পড়ে যাবে। ... ...

তো বস্টনের গপ্পো বলতে গেলে প্রথমেই যেটা বলতে হবে তা হল আমার অ্যাপার্টমেন্টের কথা। পয়সা বাঁচাতে (থুড়ি সেন্ট বাঁচাতে) আমি একটা পাঁচজনের সঙ্গে শেয়ার করা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি। যেহেতু এটা আমার প্রথমবার দেশের বাইরে তাই চেয়েছিলাম একটা মিশ্র সংস্কৃতির বাড়িতে থাকতে। তো ভগবান/জেসাস আমার ইচ্ছে অপূর্ণ রাখেন নি। আমাদের বাড়িতে আমরা দুজন মেয়ে তিনজন ছেলে, তিনজন স্ট্রেট, একজন গে একজন লেসবিয়ান, দুজন কাপল, একজন ভারতীয়, চারজন আমেরিকান, একজন হিন্দু, দুজন খ্রিস্টান, দুজন ইহুদি, আর আমি যাকে আমার সম্ভাব্য বয়ফ্রেন্ড হিসেবে দেখছি সেই পাকিস্তানি মুসলিম ছেলেটিকে ধরলে একেবারে সর্বধর্মসমন্বয়। এবার এই বাক্যটা আরেকবার মন দিয়ে পড়লেই বুঝে যাবেন আমিই আমাদের বাড়ির বস্টনে বং-গে। ... ...

শাহবাগের মোড়– প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনটি একটি বারুদের স্তুপে স্ফুলিংগ সংযোগ সূচনায় গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার আন্দোলন। সেখান থেকে গণজাগরণ, গণ বিস্ফোরণটি ঘটে। প্রথমদিকে আন্দোলনটি শুধু কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠে। ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তরুণদের আহ্বানে খুব শিগগিরই এতে ব্যপক সাড়া মেলে; কারণ সচেতন নাগরিকরা কাদের মোল্লার মতো চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, শীর্ষ জামাত নেতার শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় মেনে নিতে পারেননি। তরুণরা এই আন্দোলনটিতে পথ দেখালেও শিগগিরই ছাত্র-জনতা সকলেই এতে যোগ দেন; দেশের জেলা শহরগুলোতে তো বটেই, এমনকি উপজেলা পর্যায়েও গণদাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। জনমত তৈরি হয়, শুধু কাদের মোল্লা নয়, সব যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি –ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনটি দানা বাঁধে। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশী, বাঙালি ও সমমনারাও খুব শিগগিরই ১৯৭১ এর মানবতা বিরোধী অপরাধ বিরোধী আন্দোলনটির সঙ্গে একাত্নতা প্রকাশ করতে থাকেন। এই নয়া বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ হয়ে শাহবাগের চেতনা ছড়াতে থাকে দেশে দেশে। ... ...