
সম্প্রতি অমর্ত্য সেন আনন্দবাজারে ও এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলে খাদ্য ও পেট্রোপণ্যে ভর্তুকি নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।দুটো সাক্ষাৎকারের ব্যাপ্তিই ভর্তুকির বাইরে গেছে। তবে আমরা এই আলোচনায় কেবল ভর্তুকিতে নজর রাখব। তার কারণ কেন্দ্রীয় সরকার ডিজেলে ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেবে, মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়া সেরকম ইঙ্গিত দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, সংসদে খাদ্য নিরাপত্তা আইন পেশ করা হবে, এরকম একটা গুজব শোনা যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা আইনের ভর্তুকির চাপ নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে। ... ...

অনভ্যস্ত ফার্স্ট ইয়ার আমাদের পক্ষে বুঝে ওঠা সত্যিই কষ্টকর যে ইউনিয়ন না থাকা মানে দিন দিন আমাদের কথা বলার ন্যূনতম অধিকার চলে যাওয়া। প্রেসিডেন্সির ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য সাতচল্লিশ থেকে সত্তর পেরিয়ে আজও প্রাসঙ্গিক, তাকে রক্ষার দায় যদি নাও বোধ করি, তাও, নিজেরা হেসেখেলে নিজেদের ক্যাম্পাসটায় বেঁচে থাকার জন্যই বোধয় একটা সুস্থ স্টুডেন্ট’স বডি প্রয়োজন। যা হচ্ছে হোক যদি চলতে থাকে, তেমন হাল হবে নাতো, নীম্যোলার যেমন বলে গেছিলেন, ওরা যখন ধরতে আসবে তখন কেউই থাকবে না যে প্রতিবাদ করবে . . ... ...

তিনটি কিশোর, একই গ্রামের ছেলে। প্রায় সমবয়স্কও বটে। কিন্তু তিনটে জীবন পৃথক হবে। শিক্ষালয়ের ছাঁচে পড়ে দুটি কাছাকাছি থাকবে, আরেকটির সঙ্গে তাদের দূরত্ব খুব কমবে না। এ কি শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা? নাকি কিশোরদের যে বংশে জন্ম তার শিক্ষা-দীক্ষার সুবিধা-অসুবিধে? নাকি আদতে শাসনই শিক্ষাকে সেই ছাঁচটাই বানাতে সাহায্য করছে যা খুব বেশি গভীরে যেতে অসমর্থ? এই দুই প্রাজ্ঞ ঋষি মেনে নিয়েছেন একে সত্য বলে যে দুটি বীজ পৃথক বলে দু-তরফের শিক্ষাও পৃথক হবে। শিক্ষা পৃথক হলে সমাজে তাদের অবস্থানও পৃথক হবে। কিন্তু পাঞ্চালের আর এক গুরু কৃপবর্মার ভগিনীপতি নিজে কিন্তু তা মানেননি। তাই তাঁর সঙ্গে বিরোধ হয়েছে পাঞ্চালের রাজার। সেই বিরোধ তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এখন। তিনি অসম অবস্থাকে অতিক্রম করে পাঞ্চালের রাজার সমতায় পৌঁছে দেখাতে চান এ সত্য না। তাই তাঁর কাছে যখন গাঙ্গেয়র দূত পৌঁছল তখন কালবিলম্ব না করেই তিনি রওনা দিলেন হস্তিনাপুরের পথে। পাঞ্চালে তিনি গুরু-ও নন এখন, আর হস্তিনাপুরে তাঁর করায়ত্ত্ব হতে পারে সব। গো শকটে সমস্ত তল্পিতল্পা তুলে দিয়ে, নিজে চললেন পায়ে হেঁটে। অন্তত পাঞ্চাল দেশ তিনি হেঁটেই পেরোবেন। এ তাঁর জন্মভূমি। আজ যাচ্ছেন, কবে ফিরবেন তা তাঁর জানা নেই। হাতে একমুঠো ধুলো নিয়েছেন নিজের পৈতৃক ভিটের। ... ...

উনি বললেন, শুনুন তবে। আমাদের ডিভিশনের এক কাস্টমার ভুটান বাম্পার লটারিতে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে। টিকিটটা সে আমাদের দিয়ে গেছে, প্রোসীড্স কালেক্ট করতে। এদিকে ইনসিয়োর্ড পোস্ট করতে গিয়ে জিপিও বলছে, দেশের বাইরে ইনসিওর হয়না। আমি বললাম, হ্যাঁ, তাও তো বটে, ভুটান তো অন্য দেশ। গাঙ্গুলী সাহেব বললেন, তখন সবাই আলোচনা করে ঠিক হল, আমাদেরই একজন চলে যাবে টিকিট নিয়ে। তখন দত্ত যাবে বলে ঠিক হ’ল, তার প্লেনের টিকিট ফিকিটও কাটা হয়ে গেল, তারপর শুরু হ’ল ঝামেলা। ঘোষ এসে বলল, ও কেন যাবে? আমাদের কাডারের কেউ যাবে। দত্তই বা ছাড়বে কেন, এই নিয়ে তুলকালাম। দুটো দল হয়ে গেল ডিভিশনে। যত বোঝাই, মশাই, এটা প্লেজার ট্রিপ নয়, সোজা গিয়ে কাজ ফুরোলেই চেক নিয়ে রিটার্ন। এতে এক দিনও বাড়তি নেই, যে একটু ঘুরেঘারে দেখবেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আসলে দু পক্ষেরই জেদ চেপে গেছে, কেউ ছাড়বেনা। ব্যাপারটা এমন হ’ল, যে বাইরে বেরোলে দেখে নেব টাইপের জায়গায় চলে গেল। এদিকে আমারও জেদ চাপতে শুরু করল, তবেরে, দুদলের কাউকেই পাঠাবনা। এদিকে দিন তো বসে থাকবেনা, সোমবার হচ্ছে টিকিটের প্রাইজ মানি ক্লেম করার শেষ দিন। তাই তো বলি, এবার রামনাম জপতে জপতে কোনও রকমে আপনি প্লেনে চেপে- আমি বললাম, দাঁড়ান স্যার, সবই তো বুঝলাম কিন্তু এর মধ্যে আমি এলাম কোত্থেকে? আমি তো আপনাদের এপাড়ার লোক নই, এই দু দলের কোনওটাতেই বিলং করিনা, তবে? ... ...

এখনো সেই মানছি না, মানব না? বামপন্থী হয়েও আপনার স্ট্রীট কালচারের ওপর রাগ? খেয়াল করছেন না এখন ইতিহাসে সমাজতত্ত্বে সাব-অল্টার্ন নিয়ে কথা বলা ইন-থিং? স্ট্র্রীট কালচারটাই মেইন স্ট্রীম হয়ে যাচ্ছে? নতুন নন্দনতত্ত্ব তৈরি করছে মানুষ। মহারাষ্ট্রের দলিত সাহিত্য পড়েছেন। ওরা 'নীরস -তরুবর -পুরতভাগে" না লিখে " শুষ্কং-কাষ্ঠং-তিষ্ঠতি-অগ্রে"টাই লিখছে। ফুলন দেবীকে নিয়ে শেখর কাপুরের ফিলিমটা দেখেছেন? যেখানে ফুলনকে ধর্ষক বাবু লোহারের খপ্পর থেকে বের করে আনা প্রেমিক ডাকাতটি ওকে গুলি চালাতে শেখাচ্ছে? মায়ের গালিটি কেমন আদর মাখানো উচ্চারণে বলে ফুলনকে সম্বোধন করছে? শুনুন, যারা হানি সিং এর গান ব্যান করতে চাইছে আর যারা বিহারীরাই ধর্ষক বলছে তারা একই রাশির লোক, একই নক্ষত্রে জন্মেছে। মূল বিতর্কের ট্র্যাক বদলে দিচ্ছে। এরা আসলে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আড়াল করতে চায়, বদলাতে চায় না। হানির গানে যদি তাৎকালিক চটকের বেশি কোন নান্দনিক আবেদন না থাকে তো কদিন বাদে বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে। আজ ক'জন বাবা সায়গল শোনে? ওসব ছেড়ে শীলা দীক্ষিতের বাড়ির দিকে ধর্ণায় যাবেন তো বলুন। আমি যাচ্ছি। ... ...

অবশ্য আরও একটা কারণও থাকতে পারে। এত অস্থির হবার। আসলে সব ছাপিয়ে আরও একটা কথা মনে পড়ছে। মেয়েটা সেই রাতে সিনেমা দেখে ফিরছিল। লাইফ অফ পাই। সে তো আমিও এই সেদিন দেখে এলাম। বৌ-বাচ্চা নিয়ে। পপকর্ন খেলাম। আমার পরিচিত মেয়েটি, মেয়েরা, অনেকেই তো দেখেছে, যারা দেখেনি দেখবে সিনেমাটা। কে জানে কোনদিন তাদের কেউ খবরের কাগজে "ধর্ষিতা" হয়ে যাবে কিনা। নাম অবশ্য জানা যাবেনা এই বাঁচোয়া, কারণ, আব্রু রক্ষার্থে সেসব আমরা চেপে রাখতে জানি। আমরা ভদ্র ও সভ্য হয়েছি। লোকলজ্জা থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা ভিক্টিমের নাম মিডিয়ায় উচ্চারণ করিনা। আমাদের ধর্ষিতাদের কোনো নাম হয়না। ... ...

সরকার কোনও চেষ্টা করে নি আমজনতার মধ্যে এই ক্ষোভ প্রশমিত করার। নিজের নিজের নিরাপদ সিকিওরিটির ঘেরাটোপের মধ্যে তাঁরা ব্যস্ত থেকেছেন ধর্ষণ সংক্রান্ত বিল নিয়ে কবে আলোচনায় বসা যায়, তাই নিয়ে, কিংবা অন্য কোনও বিষয় নিয়ে। সরকারপক্ষের এই নীরবতাই এক বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল গত বাইশ আর তেইশে ডিসেম্বরের বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের। গত শনিবার সকাল থেকেই দেখেছিলাম দলে দলে ছেলেমেয়ের দল, যাদের বয়েস সতেরো থেকে পঁচিশের মধ্যে, দলে দলে চলেছে ইন্ডিয়া গেটের দিকে। কোনও নেতা ছিল না তাদের। নিজেরাই চলেছিল। হাতে ব্যানার, পোস্টার, তাতে কালো আর লাল অক্ষরে লেখা তাদের ঘৃণা আর ছিছিক্কারের ভাষা। এর আগেও দিল্লির রাস্তায় ছাত্রদের, যুবকদের, এনজিওদের মিছিল দেখেছি, সেই মিছিলের মুখগুলো আমার লাগত এক রকমের। বিষয় হয় তো কোনও ঘটনা বা নিয়মনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কিন্তু প্রতিবাদের আগুন থাকত না মিছিলকারীদের চোখেমুখে। সামনের লাইনের দু তিনজন শ্লোগান বা “নারা-বাজি”তে ব্যস্ত থাকতেন, বাকি পেছনের সারির লোকজন নিজেদের মধ্যে হাসি তামাশা করতে করতে পথ হাঁটতেন। কখনও সামনে মিডিয়ার ক্যামেরা দেখা গেলে সোৎসাহে হাত নেড়ে নিজের অস্তিত্ত্ব প্রকাশ। মিছিলের মুখপাত্র যখন রাগী রাগী মুখ করে নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করতেন বাড়ানো মাইক্রোফোনের সামনে, তখনও ব্যাকড্রপে দেখা যেত অগুনতি উৎসাহী মানুষের হাসিমুখ আর তাদের হাত নাড়া। আমরা সবাই টিভিতে অনেক দেখেছি এই ধরণের ক্লিপিং। এই প্রথম, গত শনিবারে, একটা নয়, অন্তত তিন চারটে মিছিল দেখলাম, কমবয়েসী ছেলেমেয়ের দল, তাদের কারুর মুখে হাসি নেই, নিজেদের মধ্যে ঠাট্টাতামাশা নেই। গনগনে রাগ মুখে মেখে তারা চলেছে ইন্ডিয়া গেটের দিকে। হাতে পোস্টার। ... ...

অসুস্থ সভ্যতার চিকিৎসা চাই -- কিছু জমায়েতের টুকরো টাকরা ... ...

বিদুর বালকের চোখে দেখলেন এক ঝলসানো ক্রোধ! অর্জুন সোজা তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। রেখাটা গাঢ় হল মাত্র। বিভাজন ঠেকানো সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। কৌরব বংশ একত্রিত হলে যা হতে পারতো তা শুধু কষ্টকল্পনা এখন থেকে। ওই বালকের ক্রোধ বলে দিচ্ছে গৃহযুদ্ধের দামামা বেজে গেল। এখন এই বালককে আপ্তবাক্য শুনিয়ে লাভ কি? অথচ তিনি বিদুর। দুর্যোধন তাঁরও ভ্রাতুষ্পুত্র, ঠিক এঁদেরই মতন। মহারাজ পাণ্ডু আর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের বিবাদেও তিনি কিন্তু পক্ষ নেননি কোনো। শুধু পাণ্ডবদের ন্যায্য অধিকারের জন্যই কুরুসভায় দাঁড়িয়েছিলেন। তাহলে এখন তাঁকেও কি পক্ষ নিতেই হবে? গাঙ্গেয়র মতন তিনি যে এড়িয়ে যেতে পারছেন না। গাঙ্গেয় তাঁর মতন সম্পর্কের, মোহের অথবা প্রেমের বাঁধনে যে বাঁধা নেই। তিনি, ধর্মবেত্তা বিদুর যে প্রথম প্রেমের কাছে সদা সমর্পিত, তাঁর কী হবে? ... ...

আমার বন্ধু সন্দীপ একটা কবিতার কাগজ বার করে। বেশ কিছুদিন ধরেই বলছে, পরের সংখ্যার জন্য অন্তত গোটা দশেক পদ্য ওর চাই। বড়ো অস্থির সময় যাচ্ছে আজ। কতোবার বসার চেষ্টা করলুম, কতো খসড়া। কতো বার প্রথম দু ' তিনটে লাইন লেখার পরে নিরাশ ছিঁড়ে ফেলা। অথচ কতো কথা বলার বাকি থেকে যাচ্ছে, কতো চমক দেওয়া শব্দবন্ধ মাছির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে মাথার চারিধারে। কিন্তু শাদা কাগজে কালো অক্ষরে তারা ধরা দিতে চাইছে না। মাঝে মাঝে হয় এমন। সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়। নিজেকে বাহুল্য বোধ হতে থাকে। গানের কাছে যাই, মানুষের কাছে যাই, বইয়ের কাছে যাই, কিন্তু শব্দ বাঁধার রেশ গুলো খুঁজে পাইনা। প্রিয় কবিদের প্রচুর পদ্য বারবার পড়ি, কতো জাদুর মতো প্রতীক, তৈরি শব্দের মায়া মাথায় ঝিলিক দিয়ে পালিয়ে যায়। পদ্যের শরীরে যদি প্রাণটাই প্রতিষ্ঠা না করা গেলো তবে তার অলঙ্কার কী প্রয়োজন। মৃতদেহের মাথায় হিরের মুকুট ? ... ...

জনসচেতনতা থেকে কী ভাবে জন-আন্দোলন গড়ে ওঠে তার অভিনব নিদর্শন পাওয়া যায় এখানে—শুরু থেকে শহীদ হাসপাতালের প্রচারের বর্ষামুখ ছিল ডায়রিয়ায় মৃত্যুর বিরুদ্ধে। এই প্রচারে জনসাধারণ ডায়রিয়া-প্রতিরোধে যথাযথ পানীয় জলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হন। ছত্তিশগড় মাইন্স শ্রমিক সংঘ ও ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা এই সচেতন মানুষদের নিয়ে পানীয় জলের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলে তার চাপে ১৯৮৯-এ স্থানীয় প্রশাসন ও ভিলাই স্টীল প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ দল্লী-রাজহরা ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে ১৭৯টা নলকূপ বসাতে বাধ্য হয়। ... ...

আমাকে মোটামুটি ঠেলে গুঁতিয়েই পাঠিয়ে দিল। ক্যাশ মেমো কাটার পর বলল, মনে কর না স্কুলতুতো এক দাদা তোর সিক্সটিফাইভ মেরে দিল। ওটা জলে গেছে ধরে নে। তবে যাওয়ার আগে আসল কথাটা শুনে যা। বাটা কিছু জুতো এক্সপোর্ট করে। তাদের কোয়ালিটি আমাদের দেশের দোকানে রাখা জুতোর থেকে অনেক ভাল। কতটা ভাল, পরে বুঝবি। তারই কিছু সারপ্লাস এখানে মাঝে মাঝে আসে। ভারতের কোনও শহরের অন্য কোনও বাটার দোকানে এগুলো পাবি না। এখানেও সব সময়ে পাবি না। ইস্কুলের ছেলে বলে ডেকে গছালাম। বাড়ি গিয়ে গালি দিস। ... ...

আজ তিনদিনের রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন শেষ হলো। রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এই চারদিক খোলামেলা প্রাঙ্গনে, পাশেই জুবিলি পার্ক, হুহু করে শীতহাওয়া ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। শীতহাওয়া, কিন্তু তাজা, তৃপ্ত স্পর্শ তার, চোখ মুখ স্নিগ্ধ করে দেয় তার স্নেহ। ভিড় পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছি। ... ...



ক্যাপ্টেন সোহরাবকে দিয়ে শেখ আব্দুর রহমানকে বলান যে সে যদি প্রাণে বাঁচতে চায় তাহলে যেন জোরে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগান দেয়। জিপের পেছনে রহমান পরিষ্কার সোহরাবকে বলে বাজান আমার যে পুত্র নাজিরের খালের ঘাটলায় ৫০ সালে পানিতে ডুবে মরেছে সে থাকলে এখন তোমার মত হইত, এই মুহূর্তে কেন জানিনা তোমারে মোর তার মত মনে হইল, তবে বাজান ওই শ্লোগান দেওয়া আমার পক্ষে সোম্ভব না। সোহরাব আবারও অনুরোধ করে বাজান আপনে আমার ধর্মের বাপ, আমারে পাপের ভাগী করবেননা শ্লোগানডা দেন। আব্দুর রহমান কঠোর আরও, সোহরাবের দিকে না তাকিয়ে বলে সোম্ভব না। ক্যাপ্টেন সিপাহীদের ইঙ্গিত করেন পুকুর পাড়ে দাঁড় করাতে। পুকুরের দিকে মুখ করে দাঁড় করাতে গেলে শেখ আব্দুর রহমান ফিরে যায় এবং বলে পিঠমে নেহি বুকমে গুলি চালাও এবং তারপর তার ওই উর্দু- বাংলা মিশ্রণে বলে সে নবীজীর বংশ তার বুকে নবীজীর চুম্বন রয়েছে, তোমাদের গুলি পিছলে যাবে। এই ঘটনা শ্রোতারা এমনভাবে শুনতে থাকে যেন তারা ’৭১ সালের আব্দুর রহমানের ওই ঘটনার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। গল্পকারের সহকারী তার ওস্তাদকে ইশারা করতে থাকে ওস্তাদ যেন তার আসল কাজ শুরু করে। সহকারী গল্পের মাঝে আরও দু’একবার ইশারা করেছিল, ওস্তাদ থামেনি। এবারেও তার ওস্তাদ গল্পকার থামেনি, বরং সহকারীর উদ্দেশ্যে গল্পকার শ্রোতাদের বলে দেয় যে ছোড়াটা চির-কৃমির বড়ি বিক্রি শুরু করে দিতে বলে এবং বড়ি বিক্রির পরে নাকি লাগলে আবার শুরু করা যাবে। কোন গল্পের মাঝ পথে তা থামিয়ে ক্যানভেসারের বড়ি বিক্রির রীতি সম্পর্কে যাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে তারা হতাশ হয় কেনোনা গল্পটি চির-কৃমির বড়ি বেচার মধ্যে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ওস্তাদ তার সহকারী ও শ্রোতাদের সাফ কথা জানিয়ে দেয় সে কৃমির বড়ি আজ বিক্রি করবে না। শ্রোতারা ফিরে যেতে চায় তাদের গল্পে। গল্পকার চমক দেয় তার গল্প বলায় একথা বলে তাহলে বড়ি বিক্রি নাই যখন কিসসাটাও ক্ষান্ত দেই। শ্রোতারা এর প্রতিবাদে গরম মিছিল-শ্লোগানের মত প্রতিবাদ করেন। সত্য কিন্তু তাদের মুখ-ভঙ্গিতে হতাশার দৃশ্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ... ...

ঘন জঙ্গলের মধ্যে বজ্রযোগিনীর মন্দির থেকে তখনো কাঁসরঘন্টার আওয়াজ ভেসে আসছিল বাতাসে। দিগন্তজোড়া গাছগাছালির মধ্যেকার ফাঁকফোকর দিয়ে অতি অল্প যেটুকু দৃশ্যগোচর হয়, তাতে কেবলমাত্র মন্দিরের আকৃতি টুকুই বোঝা যায়। সন্ধ্যার অন্ধকারে নাটমন্দিরের জ্বলন্ত প্রদীপমালায় কিছু দুর্বোধ্য অক্ষরের আভাস পাওয়া যায়। সন্ধ্যারতির সময় কিছু ভক্তসমাগম হয়, নারী পুরুষ, বালক, বালিকা সকলেই আসে, ভক্তিভরে অঞ্জলিপ্রদান করে তারা যে যার ঘরে ফিরে যায়। তারপরে শুরু হয় দেবদাসীদের পিশাচিনী নৃত্য। মন্দিরের অনতিদূরে মৃতদেহ সৎকার করতে আসা আত্মীয় পরিজন রা অতি সম্ভ্রমে দূর থেকে এই ডাকিনী নৃত্য দর্শন করে। কখনো বা মৃতদেহ সৎকার সম্পুর্ণ না করেই পালিয়েও যায়। কিছুক্ষন আগেই যে এই সব দেবদাসীরা স্বাভাবিক ভাবে ভক্তবৃন্দের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো তা বিশ্বাস করাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। তাদের দু এক প্রহর আগেও দেখলে মনে হতে পারে তারা আপন আপন গৃহস্থী সামলাতেই ব্যাস্ত। তারা সকলেই কৃশকায়, পরনের লালপেড়ে সাদা শাড়িটি রাঢ় বঙ্গের রীতি অনুসারে পরা। নদীমাতৃক বঙ্গভূমিতে শাঁখ ঝিনুক ইত্যাদির অভাব নেই তাই তাদের আভরণেও শঙ্খের প্রাধান্য। কদাচিৎ বিশেষ তিথিতে পোড়ামাটির গয়নায় সর্বাঙ্গ ঢেকে এই যুবতীরা একসাথে শ্মশানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীবক্ষে নগ্নিকা নৃত্য করে। কিছু নিজ অভিজ্ঞতা কিছু জনরব আর বাকীটা কল্পনার পাঁচমিশেল-- এই সবে মিলে এই বজ্রযোগিনীর মন্দিরটি চূড়ান্ত রহস্যজালের সৃষ্টি করে সাধারণ গ্রামবাসীর কাছে ... ...

রুণাবৌদি বালিগঞ্জের মেয়ে. সহুরে জীবন যাপনের মধ্যে বড় হয়েছেন. হিন্দুস্তানপার্কের এই বাড়িটা দাদুর করা. ছোটবেলায় দাদুর কাছে গল্প শুনেছেন তখন নাকি হিন্দুস্তান পার্কে শেয়ালের ডাক শোনা যেত. আশেপাশে অনেকটা জায়গা নিয়ে একএকটা বাড়ি হচ্ছে. রাসবিহারী এভিন্যুর মাঝখান দিয়ে ট্রাম লাইন পাতা হচ্ছে. রাস্তার মাঝ বরাবর একটু উঁচু করে ঘেসো জমি, তার ওপর দিয়ে ট্রাম লাইন. এ জিনিস কলকাতায় তখন বিরল. রুণাবৌদি তাঁর জ্ঞান থেকেই দাদুকে শয্যাশায়ী দেখে এসেছেন. প্যারালিসিস হয়ে বিছানাতেই থাকতেন সব সময়, একটা চারদিকে জানলাওলা বিশাল ঘরে দাদু থাকতেন। ঘরের সামনে বারান্দার ওপর দরজা। বাকি তিন দিকেই বাগান, দাদু নিজের থাকার জন্যে ঘরটা এই ভাবেই প্ল্যান করে নিয়েছিলেন. রুণাবৌদিরা; বোনেরা মাঝে মাঝে দাদুর বিছানার পাশে এসে বসতেন. স্পষ্ট ভাবে দাদু কথা বলতে পারতেন না, কেমন এলিয়ে এলিয়ে বলতেন. তাই খুব বেশি কথা দাদুর সঙ্গে কখনও হয়েছে মনে করতে পারেন না. দাদু মারা যান তখন রুণার বয়স সাত. খুব ছোটবেলার কথাও ওনার মনে আছে কিছু কিছু. বাবার কথা ছোটবেলায় কেউ কিছু বলতে চাইত না. কালেভদ্রে বাড়িতে আত্মীয়রা কেউ কেউ আসত. মা বলে দিতেন: ইনি তোমার অমুক পিসি বা জ্যেঠু. কিন্তু পরের বার যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হত, সে মুখ একদম অচেনা লাগত বৌদির. ... ...

কিছু হলদে পাতা।সাদা পাতা হলে এদ্দিনে তা হলদে হয়েই যেত বোধহয়। হলদে পাতা হলদে হলে টের পাওয়া দায়। হলদে পাতারা পুরোনো হয় না। লেখাগুলো পুরানো। টুকরো টুকরো কিছু স্টিকি হলুদ পাতায় টুকরো টুকরো কিছু লেখা। কিছু আঁচড়। অনেক কিছু কথা, যা বলতে পারিনি, কিছু কিছু কথা, যা বলব ভেবেছিলাম, বা অল্প কিছু কথা, যা বলেছিলাম। বলতে পেরেছিলাম। টুকরো টুকরো ক’রে। আমি তাদের জমিয়ে রাখতে থাকি। ফ্রেমে। ... ...

রাস্তার দু'ধারে ভয়ে-ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে টাওয়ারগুলো। একটা বিল্ডিং কত তলার পর ওপরে উঠে টাওয়ার হয় ? টাওয়ার হয়ে উঠলেই তাদের ভয় করতে থাকে। আমার মনে হয় উনিশতলা পর্যন্ত তারা টিন এজার থাকে। টাওয়ারগুলো ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে এই জন্য যে কখন কোন গৃহবধু কোনো বিশাল কাচের জানলা বা বারান্দা বা ছাদে গিয়ে হাওয়ায় দুহাত ভাসিয়ে দেবেন। এরকমই ঘটছে কয়েক মাস যাবত। এক গৃহবধু তার দুই ছেলেকে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলে দিলেন আর তারপর নিজে লাফ মারলেন। কারণ ? শ্বশুরবাড়ির লোকেদের দুর্ব্যবহার। আরকটি গৃহবধু কোলে ছেলেকে নিয়ে লাফিয়ে পড়লেন। কারন সেই একই। কিন্তু একজন গৃহবধু, সংবাদপত্র অনুযায়ী, ছেলেপুলে স্বামী শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে সুখেই ছিলেন, লাফ মারলেন হঠাৎই। সবাই ডাইনিং টেবিল ঘিরে খেতে বসেছিলেন। তিনি উঠে গেলেন, কাচের জানালা খুললেন। পরিবারের সদস্যরা ভাবলেন তিনি একটু সামুদ্রিক বাতাস উপভোগ করতে চাইছেন। কেউ বোঝার আগেই তিনি হাওয়ায় দুহাত ভাসিয়ে দিলেন। টাওয়ারগুলো তাই ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সামুদ্রিক বর্ষার প্রচণ্ড ঝড়েজলেও। ... ...