
এইখানে কিছু জিনিস ক্লীয়ার করে নিতে হবে। হীরো কিন্তু মূলত ভূমি উদ্ধারের জন্য এসেছে। তাকে উদ্ধার করে সেই তৃতীয় পার্সনের হাতে তুলে দিতে হবে। মানে হাবাপনার চোদ্দগুষ্টি আর কী! সেটে ব্যাপারটা অনেকবার অনেকে আপত্তি করেছে, কিন্তু পেলেদা শুনতে চাননি। ওঁর একটাই দাবী। সেটা হ’ল, যত বেশী গোঁৎ, তত বেশী ফোঁৎ। সুতরাং দর্শকের নিডপূরণ ও ন্যাপকিনের কথা মাথায় রেখেই হীরোর এই উদারীকরণ। তার বেশী কিছু না। অতএব প্ল্যান অনুযায়ী হীরো বিয়ে ভন্ডুল করবে। তারপর নায়িকাকে নিয়ে পালাবে। তিস্তার দিক দিয়ে পালানোটা বেটার। সাদা সুমো করে। ব্রিজের ওপারে তৃতীয় পান্ডব লাল সুমো নিয়ে অপেক্ষা করবেন। একটা ট্রেন থাকবে। সেটা চললেও কোনো অসুবিধে নেই। কোনটা ভারত বাংলাদেশ বর্ডার সেটা নিয়ে দর্শককে মাথা ঘামাতে দিলে চলবে না। দৈবাৎ কেউ যদি ঘামিয়েও ফেলে তবে তার জন্যে রয়েছে নির্ভেজাল মুগ্ধবোধ। ... ...

এমন এক বিচিত্র সময়ে কী করছিলেন নবারুণ? যে মৃত্যু উপত্যকাকে নিজের দেশ বলে মানতে তীব্র অস্বীকার করেছিলেন তিনি, সেই মৃত্যু উপত্যকাই তাঁর সাহিত্যের জরুরি মোটিফ হয়ে রইল সারা জীবন। বহু ব্যর্থতা, অনাচার, জীর্ণ পোকায় কাটা অস্তিত্ব দেখেও আমরণ বামপন্থায় আস্থা হারাননি তিনি। তাঁর সাহিত্যের পাত্ররা তাই সময়মতো পাল্টে নিয়েছে নিজেদের একটু একটু করে। হারবার্টের বিনুর মতো তারা আর গুলি খেয়ে মরার মতো বোকামি করে না। ভূতের সঙ্গে কথা বলে বলে ক্লান্ত হারবার্ট কবজির শিরা কেটে বরফ জলে হাতটা ডুবিয়ে দিয়েছিল। তার বিছানার নীচে রাখা ডিনামাইট চুল্লির ভিতর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কী হুলুস্থূল বাধিয়ে দিল তা আর দেখে ওঠা হয়নি হারবার্টের। অতখানি কল্পনাশক্তিও ছিল না তার। ... ...

‘কাঙাল মালসাট’ সম্পর্কে এই আত্মপ্রচারটুকুর নিতান্ত প্রয়োজন ছিল কারণ ‘কাঙাল মালসাট’ হাপিত্যেশ করা হাহাকারে ভরা নষ্ট ভ্রষ্ট চরিত্র বাঙালির জন্য। চাকতির বোম্বাচাক কিম্বা সেক্স ভকিলের অবাধ উল্লেখ ছলমাত্র অর্থাৎ পেঁয়াজের একটি খোসা অথবা পরত সে যে নামেই তাকে ডাকা যাক না কেন, নামে কি-বা আসে যায়। অর্থটি বোধগম্য হওয়া নিয়ে কথা। উপন্যাস(!)টিকে বুঝতে গেলে মালসাট অর্থাৎ ডুবোজাহাজের মতোই কিম্বা ডুবুরির মতো অর্থের অনেক গভীরে যেতে হবে যা বোধহয় আমারও সাধ্যাতীত। আমি নিজেও তো মনে হয় কিছুই বুঝিনি। যা বুঝেছি তা এই — কাঙাল শব্দটি দ্ব্যর্থক — গরীব অথবা ভিখিরি। বাঙালি এখন দুটোই। সিনেমা সিরিয়াল প্রযোজনা করছেন অবাঙালি। নৃত্য-সঙ্গীত পরিচালকও তাই। রামোজি সিটি সেখানে রমরমিয়ে সিটি বাজাচ্ছে, বাঙালি হিন্দী সংস্কৃতির কাছে বুলি মেলে বসে আছে হাপিত্যেশ করে। আর মালসাটের অর্থ যদি ডুবোজাহাজ হয় তাহলে ভ্রমেও ভাবিবেন না এটি submerine। এটি সেই ডুবন্ত জাহাজ যাকে আজ টেনে তুলে উদ্ধার করা বোধহয় অলীক কল্পনা। ... ...

আশা ছিল সকলেই নিজেদের জানা নবারুণ-পাঠিকাদের লিখতে উৎসাহী করবেন, এবং জরুরি, যারা চেষ্টা করেও নবারুণ-পাঠিকা হয়ে উঠতে পারেননি, তাদেরও। কেন একজনের লেখা একেবারেই আকর্ষণ করছে না - এটাও ত লেখার। এই জায়গাটা দেখেছি একেবারেই ধরা পড়ে না কোথাও। অথচ বর্তমান বাংলা ভাষার একজন মেজর লেখক হিসেবে তিনি চিহ্নিত হচ্ছেন। বিরূপ পাঠপ্রতিক্রিয়া ও তো লিখে ফেলা যায়। কেন এগনো যাচ্ছে না লেখার মধ্যে, কোথায় কীভাবে আটকাচ্ছে। ইন্টারভিউও তো ভালো অপশন। ইন্টারভিউ নিয়ে কেউ কোথাও কিছু লিখেছে বলে জানিনা। যে, ইন্টারভিউর মধ্যে দিয়ে মানুষটা কীভাবে বেড়িয়ে আসছেন, কিভাবে তাঁকে নিজের মতো একরকম বুঝে নেওয়া যাচ্ছে। চেয়েছিলাম নিজের কথাও লিখবেন কেউ কেউ, ওঁর লেখা পড়তে পড়তে কীভাবে রিয়্যাক্ট করছেন, রিলেট করছেন বা করছেন না, থট প্রসেস পাল্টে যাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গী পালটে যাচ্ছে বা যাচ্ছে না। কতটা পারা গেল, এই সংকলনটিই তার সাক্ষ্য দেবে। ... ...

যাঁরা নানা কারণে লিখতে পারলেন না নবারুণারী তে, ফেসবুক ও গুরুচন্ডা৯ সাইটে তাদের নতুন-পুরোনো পোস্ট থেকে কিছু মতামত, কিছু আলাপ-আলোচনার নির্যাস রাখা রইল এই অংশে। এর অনেকগুলোই ভাটিয়া৯ অংশে অনেকের সাথে আলোচনার অংশ হিসেবে লেখা বলে এখানে একত্রে একটি লেখা হিসেবে পড়তে খানিক অদ্ভুত লাগতে পারে। সামান্য কিছু এডিটও করতে হল কথোপকথন থেকে বক্তব্য ও সময়কালের সাযুজ্য বজায় রেখে লেখাগুলো আলাদা করতে, তবু, যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের মনোভাব আর বক্তব্যের সারবত্তা ধরে রাখা জরুরি মনে হাওয়ায় এবং অন্য কোন উপায় না থাকায় এগুলি এভাবেই রইল। আশা রাখি পরবর্তীতে এঁরা অন্যত্র কখনো নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তারিত লিখবেন। যাঁরা লিখলেন না আত্রেয়ী মিঠু সায়নী সিনহা রায় সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায় সুচেতা মিশ্র শুচিস্মিতা সরকার মীনাক্ষী মন্ডল পারমিতা দাস ... ...

‘হারবার্ট’ আর ‘কাঙাল মালসাট’। ‘হারবার্ট’ আমার মতে বাংলা ভাষার উপন্যাসের একটা মাইলস্টোন। সাধারণত মার্কামারা স্ত্রীপাঠ্য উপন্যাসের মধ্যে পড়ে বলে মনে হয় না। প্রসঙ্গত, ‘স্ত্রীপাঠ্য’ শব্দটি আমার গালাগাল হিসেবে ব্যবহৃত বলেই মনে হয়। কারণ আপনারা সম্ভবত জানেন, আর সন্দেহ থাকলেও সেকথা পরে হবে। এখন ‘হারবার্ট’ যে আমার বেশ সুখপাঠ্য লাগে এবং তাকে সেই লজিকে ‘স্ত্রীপাঠ্য’ এর দলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল কিনা সে আপনারা ঠিক করুন। হারবার্টের মতো কোন লোকের কাছাকাছি আসার ভাগ্য আমার হয় নি তাই সত্য-মিথ্যা-কল্পনার তুলনা দিতে পারবো না। ব্যক্তিগতভাবে বামপন্থী, যুক্তিবাদী পরিবেশে বড় হয়েছি, চিরকাল যুক্তিবাদীদের দলের পাল্লাই ভারী করেছি। কিন্তু হারবার্ট-এ যুক্তিবাদীদের অসংবেদনশীলতা ছাপ রেখে যায় আমার মনে। পাঞ্চলাইন ‘কখন কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তা কে ঘটাবে সে সম্বন্ধে জানতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনও বাকি আছে’ –র থেকেও বেশি। হারবার্ট নিয়ে আবার কথা হবে। ... ...

কিন্তু দ্বিতীয় ও সচেতন পাঠে আমি দেখতে পাই এই সব ক্রিয়াকর্ম। ঠিক যেভাবে ছোটবেলায় আস্বাদন করে, প্রায় চেখে চেখে চেটে চেটে পড়া উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনির গল্প-এর বাঘের বাচ্চাদের মেরে কেটে ঝুলিয়ে রেখে তেলের মধ্যে টপ টপ রক্ত পড়ার ছ্যাঁক ছোঁক আওয়াজ ও বাইরে বসে বাঘ বাবাজির সে আওয়াজে পিঠে ভাজা হচ্ছে ভাবার ঘটনা, আজকের আমার সচেতন দৃষ্টিতে, পরিবেশপ্রীতি ও পশুপ্রীতির দৃষ্টিতে বিষম, অসহ্য, পলিটিকালি ইনকারেক্ট, গ্রহণীয় নয়। ঠিক যেভাবে প্রায় অধিকাংশ রসালো প্রাচীন কাহিনি আজ হয় পাগল, নয় শারীরিকভাবে অক্ষম, নয় কোন না কোন ভাবে শোষিত মানুষের অ-সংবেদনশীল বিবরণের কারণে পরিত্যাজ্য হয়ে যাচ্ছে। ... ...

সেই জায়্গা থেকে বিস্ফোরণ ও তৎসংক্রান্ত দর্শনকে তুচ্ছ লাগা হয়তো একদম ধৃষ্টতাই - হারবার্ট পড়ার এত বছর পরে আজ আর বিস্ফোরণকে তেমন তীব্রও মনে হয় না অথচ এত দিন পরেও একটা দৃশ্যকল্প কেমন জ্বালায় - ঐ শেষ পরিচ্ছেদের একটা দৃশ্যকল্প - হারবার্টের সেই সাইনবোর্ড বেলুন বন্দুকওলা কিনে নেয় এবং এর ওপরে কাঁটা পেরেক ঝুলিয়ে বেলুন ঝোলাবার ব্যবস্থা করে - সব বেলুন ফেটে গেলে পেরেকের মধ্যে হয়তো বা চোখে পড়বে, উল্টো হরফ - 'মৃতের সঙ্গে কথোপকথন' প্রোঃ হারবার্ট সরকার - ... ...

তোমাকে পড়ছি রাষ্ট্রদ্রোহী, তোমাকে খুঁড়ছি নিরন্তর যাওয়া-আসা সেও চলতেই থাকে, পুড়ে যায় পোড়ো মাটির ঘর ... ...

হুট করে লিখতে বললেই কি পাট করে প্রবন্ধ নেমে যায়? সব সময় হয়তো না। কিন্তু, কিছু কিছু বলার মতো কথা তো থাকেই যা অন্তত না বলে থাকা অনুচিত। অনুরোধ একান্তই ফেরাতে পারেননি যাঁরা, তাঁদের দু-কলম অনন্যোপায় লেখা এখানে একসঙ্গেই থাকল, নাহোক নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করার অছিলাতেই। ... ...

তা-ও তো, তখনও হারবার্ট পড়িনি। ফ্যাতাড়ুদের বৃত্তান্ত তো নয়-ই! হারবার্ট পড়তে দিল আমারই হাতিবাগান পাড়ার কোনও এক বন্ধু। পড়লাম আর শিউরে-শিউরে উঠলাম। এই বেস্-এর ওপর দাঁড়িয়ে, আমি লিখব কী করে? কোন কনভিকশন নিয়ে ? লিখব, আর ভুশ করে ডুবে যাব তো ছাইগাদায়। ব্যবহৃত হব, আধো-অন্ধকার, পুরনো বাড়ির কলতলায় বাসন-মাজার আঁশটে কাজে। বাড়িগুলি প্রোমোটারের হাতে চলে গেলে, কাঁসা-পিতল বাতিল হয়ে গেলে, সে-কাজেও লাগব না আর ! ... ...

মনের ভাবপ্রকাশের জন্য মানুষ যা সৃষ্টি করেছে নিজের বাগ্যন্ত্রের মাধ্যমে, তা-ই হয়ে উঠেছে সাহিত্য। নিজের মনের ভাব অপরে জানুক, মনে রাখুক, তার ভাবপ্রকাশেও যেন আমারই ভাবের ছায়া পড়ে – এই আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। হয়তো ব্যক্তিত্বের উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই এই স্বকীয়তার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে মানব মননে। তখন থেকেই ভাষা গঠনের পর পরই ভাব প্রকাশের বাহ্যিক, প্রকাশিত রূপকে সংরক্ষণের চেষ্টাও শুরু, হয়তো। এই সংরক্ষণ করতে গিয়ে মানুষ বুঝল। সেইসব প্রকাশ্য রূপই সে মনে রাখতে পারছে, যেগুলি সে ঝোঁক দিয়ে বলছে, বলছে, ছন্দে, বলছে অন্ত্যমিলে। মৌখিক সাহিত্যের পরম্পরায় আমরা এর প্রমাণ পাই। এরই সঙ্গে আসছে ভাষার লিখিত রূপ, লিপি। কিন্তু মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে সেই লিপি, বা ভাষার লেখ্য রূপ খুব কম সংখ্যক মানুষেরই আয়ত্ত ছিল। লিপিকরের সংখ্যাও ছিল অপ্রতুল। সংখ্যাগুরু মানুষ তাই সাহিত্যরস আস্বাদন করতে নির্ভর করেছেন মৌখিক সাহিত্যের ওপরেই। ... ...

এসব বলে বেঁচে থাকা বামন। শোনে এক নতুন লোক - উইন্ডচিটার, যে তাদের পানীয় জলের শুদ্ধধারা দেখিয়ে দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে প্রথমে। এমনকি খেলনানগরে লুকোনো সোনার কথাও সত্যি, বলে সে। ‘৮’ এবং ‘৯’ ভাবে ওই সোনাবেচা টাকা দিয়ে আবার কারখানা খুলবে। তারা কারখানা-প্রাঙ্গন খুঁড়ে পাথরের স্ল্যাব বের করে, কিন্তু উইন্ডচিটারের দেওয়া ঘুমপাড়ানি ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে হাতকাটার দল ওদের দেখতে পায় [কে ওদের খবর দিল?] এবং গর্তের মধ্যে সোনার মুদ্রা থাকায়, যেটা উইন্ডচিটারই রেখে দিয়েছিল, ওরা চোর সন্দেহে ‘৮’ ও ‘৯’ কে উলঙ্গ করে পিটিয়ে মেরে ছাদের ওপর উল্টো করে ঝুলিয়ে দ্যায় একটি অস্বাভাবিক বড় মৃত শকুনের পাশে। সেটি প্রকৃতপক্ষে ওই ধ্বংসকারী ক্যাপিটালিস্ট শ্রেণির খবর পাচারকারীর কাজ করত। ... ...

আজন্ম পরিচিত কিন্তু ছুঁয়েও না দ্যাখা তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, খোয়াবনামা যেভাবে আলমারিতে এসেছিল, হারবার্ট সেভাবে আসেনি। হারবার্টকে আনা হয়েছিল নিজের হাতে, সচেতনে। নতুন শিখতে থাকা পাখিপড়া তত্ত্বজ্ঞানের বুদবুদ মাথায় নিয়ে,অন্যের পরামর্শে হারবার্ট পড়তে বসা হয়েছিল আট বছর আগে। উদ্দেশ্য নিয়ে হারবার্ট পড়ার কারণ হলো, এতে নাকি মূলধারার বাইরের প্রথাবিরোধী প্রতিষ্ঠানবিরোধী উত্তরাধুনিক নানা জ্ঞানের সমাহার রয়েছে। তাছাড়া, নবারুণের ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ লাইনটি সংসদ থেকে ফুটপাথ, ডান থেকে বাম, সবাই যে যার সুবিধামতন যেভাবে মুখস্থ আওড়ায় তাতে মনে হয়েছিল সে বেশ কেওকেটা লেখক হয়ে থাকবে! নাম দেখে অনুবাদ বই বলে ভুল করা মহাজ্ঞানী ‘আমি’ উপন্যাসের কোত্থাও কোনো তত্ত্বের উল্লেখ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ি। বড় বড় তত্ত্ব শেখার উদ্দেশ্য নিয়ে বসে, আনকোরা অনভিজ্ঞ মাথা আর বাছা বাছা মজার খাবার খাওয়া জিবে সোয়াদ নিলে কোন বই থেকে কতখানিই বা শেখা যায়! ... ...

এইখানে একটু নবারুণের বহুচর্চিত রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা। আমৃত্যু মার্ক্সবাদে বিশ্বাস গচ্ছিত রেখেছেন নবারুণ। শ্রেণীমুক্তি মানেই লিঙ্গ নিরপেক্ষ মুক্তি। সর্বজনের। তাই সংগ্রাম যতই রূপকধর্মী হোক না কেন, তার মূল লক্ষ্য শ্রেণীমুক্তি। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের অনুরূপ একটি ক্ষমতার পাকা কাঠামো যে পিতৃতন্ত্রে অবিচ্ছেদ্য এবং সাম্রাজ্যবাদ দূর হটলেও সে যেমন তেমনি থাকে এ নিয়ে ভাবনা আশু লক্ষ্য প্রাপ্তির চেষ্টার কাছে গৌণ মনে হওয়াই স্বাভাবিক। লিঙ্গ বৈষম্য ও যৌন হেনস্থা শুধু ধনতান্ত্রিক সমাজের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এবং সব প্রান্তিক মানুষ একই শ্রেণীতে পড়েন এইরকম চিন্তার উল্টো পিঠটা নেড়েচেড়ে লিঙ্গ বৈষম্যের অনন্যতা ধরতে চেষ্টা করেছেন ধ্রুপদী মার্কসবাদে বিশ্বাসী নবারুণ এইরকম মনে হয় না। ... ...

জিহাদীদের সিরিজ খুনের চাপাতির কোপ "নাস্তিক ব্লগার" এর পরিধি ছাড়িয়ে শিগগিরই বিদেশি, ভিন্ন ধর্মালম্বী, অধ্যাপক, হোমিও চিকিৎসক, সমকামী, এমনকি মসজিদের ইমাম, শিয়া ও পুলিশ পর্যন্ত গড়ালে শেষমেষ সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসেন। ঢাকাসহ দেশের বেশ কিছু স্থানে অভিযানে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় আইন-শৃংখলা বাহিনী। অভিযানে ধরা পড়ে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী-জঙ্গি। অবশ্য আমরা মুক্তমনারা আগেই সরকারকে সতর্ক করে বলেছিলাম, ব্লগার খুন হচ্ছে জিহাদের সূচনা মাত্র; খেলাফত, তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার খোয়াবে মশগুল মুজাহিদরা শিগগিরই হত্যার পরিধি বিস্তৃত করবে। রাষ্ট্র দখল করাই যেহেতু তাদের লক্ষ্য, তাই তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর আঘাত হানবে শিগগিরই। আর সরকারি উদাসিনতায়, বলা ভালো, জিহাদীদের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের হত্যাযজ্ঞ দেশজুড়ে ছড়াতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ... ...

২০১০ সালের অক্টোবর মাস। বুরহান ওয়ানি - তখন ১৬ বছরের - তার বড় ভাই খালিদ ওয়ানি ও আরেক বন্ধুর সাথে বাইকে চেপে ঘুরতে বেরিয়েছিল তাদের ট্রাল এলাকায়, যেমন এই বয়সী ছেলেরা করেই থাকে যে কোন জায়গায়। জম্মু আর কাশ্মীর পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের একটা পিকেটে তাদের আটকানো হয়, এবং বলা হয় সিগারেট নিয়ে আসতে। খালিদ যায় সিগারেট আনতে, বুরহান ও তাদের অপর সাথী অপেক্ষা করে থাকে। সিগারেট দেওয়ার পর কোন কারণ ছাড়াই ট্রুপের লোকজন ছেলে তিনজনের উপর চড়াও হয়। তাদের মারধোর করা হয়, খালিদের প্রিয়তম বাইকটা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। খালিদ এরপর অজ্ঞান হয়ে যায়। সেদিন হয়তো সবথেকে বেশি আহত হয়েছিল ১৬ বছরের বুরহান, তবে সেই আঘাত অদৃশ্য - এমন এক আঘাত যেটা হয়তো যে কোন সেলফ-রেসপেক্টিং তরুণই বোধ করবে যদি তাকে অকারণে মার খেতে হয়। ... ...

অবশ্য তাতে তাঁর কিছু যায় আসে বলে মনে হয় না। কারণ তিনি নিশ্চিতভাবেই জানেন, আজ থেকে কয়েক দশক পরে যখন পূর্ব কলকাতার এই জলাভুমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, যখন এই শহরটাও আর বাসযোগ্য থাকবেনা, তখন ঠাঁইনাড়া মানুষ তাঁর লেখা পড়ে জানবে এই আশ্চর্য বাস্তুতন্ত্রের কাহিনি। এও এক সত্যি রূপকথা। সত্যিই কি তাই হবে? সত্যিই কি আন্তর্জাতিক রামসর স্বীকৃতি পাওয়া এই জলাভূমি সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে? আমি জানি না। আমি কেবল স্বপ্ন দেখতে পারি। আমি স্বপ্ন দেখি, তাঁকে মাথায় রেখে গড়ে উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক মানের ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট, যেখানে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিয়ে হাতেকলমে গবেষণা করছে ছাত্রছাত্রীরা। দেশ বিদেশের বিভিন্ন শহর থেকে প্রতিনিধি দল আসছে এই মডেল রূপায়ণের জন্য। রাজ্যের নানান প্রান্ত থেকে স্কুলের ছেলেমেয়েরা আসছে শিক্ষামূলক ভ্রমণে। আমি স্বপ্ন দেখি, এই জলাভূমি মুক্ত রাখার জন্য এক বিশাল মিছিল, যাতে পা মিলিয়েছে সেই তরুণ প্রজন্ম যারা সেদিন ক্যাম্পাস মুক্ত রাখার জন্য পথে নেমেছিল। এবারের বইমেলার থিম কান্ট্রি হয়েছে রাস্তার অন্য পারে পূর্বকলকাতার জলাভূমি, আমি স্বপ্ন দেখি, বিশাল মাল্টিমিডিয়া প্যাভিলিয়ান। হাতুড়ি ঠুকে মেলার উদ্বোধন করছেন জলাভূমির একনিষ্ঠ ভাষ্যকার। কলকাতার নতুন লোগোয় হাওড়া ব্রিজ, ভিক্টোরিয়া আর শহিদ মিনারের বদলে এখন থেকে জলজমিনের ছবি। ... ...

বন্দনা মহাকুর, বয়েস ১৫ বছর। বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন। হতদরিদ্র বাবা মার ৫ মেয়ে, অথচ গায়ে কাজ নেই। তাই কলকাতায় সব মেয়েকেই কাজে পাঠানো। ছোট মেয়ে বন্দনাকে দমদম শেঠবাগান এর শ্রাবণী সাহা সঞ্জয় সাহার বাড়িতে ২৪ ঘণ্টার বাচ্চা দেখার কাজে দেয় মাস ছয়েক আগে। মাইনে পাওয়ার কথা ছিল পনেরো’শ। কাজে ঢোকার দেড় মাসের মাথায় একবারই কলকাতার বাসন্তি কলোনিতে মেজোদিদির বাড়ি এসেছিল বন্দনা। দিদির সাড়ে চার বছরের ছেলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে- একদিনের জন্য। মাইনেও মিলেছে মাত্র একমাসের। একটা মেয়ের পেটের চিন্তা করতে হচ্ছে না তাতেই খুশি ছিল গরীব বাবা মা। কিন্তু গত মাসে হঠাত ফোন, বাবা-মা-দিদিকে ডেকে শ্রাবণী সাহা জানায়, তোমাদের মেয়ে দেড় লাখ টাকার সোনার গয়না চুরি করে তোমাদের দিয়ে এসেছে। ... ...

যত ঘুরছি, কথা বলছি, জানছি, শিখছি, একটা বিষয় পরিস্কার হচ্ছে। ফৌজি-কৃত ভায়োলেন্স এবং মাইনিং-এর মধ্যে একটা আলবাৎ-কোরিলেশান রয়েছে। যে সব জায়গায় মাইনিং আরম্ভ হয়, সেই সব অঞ্চলে তার আগ-আগ দিয়ে বন-বাদাড় সাফ করে গড়ে ওঠে আধাসামরিক ক্যাম্প। ক্যাম্প বলতে মূলতঃ কাঁকের ও নারায়ণপুর জেলায় বর্ডার সিক্যুরিটি ফোর্স এবং সশস্ত্র সীমা বল এবং বস্তার, দান্তেওয়াড়া, সুকমা, বীজাপুর জুড়ে সি-আর-পি-এফ, মূলতঃ তাদের ‘এলিট’ শার্প-শ্যুটার কোব্রা ব্যাটেলিয়ন। বস্তার সম্ভাগ দেশের কোনো বর্ডারের ধারেকাছে নয়, তাই বি-এস-এফ বা সশস্ত্র সীমা বল এ’খানে কি করছে তা সভ্রেনেরই মালুম। ... ...