
আমি নাড়ানাড়ি করছি একটা দূরবীন নিয়ে। দূরবস্তুর দর্শন সাধন যন্ত্রবিশেষ, টেলিস্কোপ। যার কাজই হ্ল দূরস্থিত বস্তুকে দৃশ্যতঃ নিকটস্থ বা বর্ধিত করা। গালিলেওর দূরবীন বলে চালানোর চেষ্টা করছে নাকি বিক্রেতা? না না, তা নয়। আমি যন্ত্রটির গুণাগুণ পরীক্ষার ছলে প্রথমেই বিক্রেতা যুবকের মুখের ওপর ফোকাস নিবন্ধ রাখলাম। সে আমার সামনে অনেক বড় হয়ে প্রতিভাত হ’ল। ঈষৎ লালচে দাড়ি। দাড়ির লোমকূপগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাঁ ঠোটের কোণে হসন্তের মত সামান্য কাটা দাগ। কোথকার মানুষ সে? ফ্রান্স? জার্মানী? স্পেন? পর্তুগাল? বুলগেরিয়া? রোমানিয়া? হাঙ্গেরি না কিরঘিজস্থানের? নাকি সিরিয়া ইরাক ইরান তুরষ্ক আফগানিস্থান মিশরের? ভারতীয়ও তো হতে পারে। কেননা আজ যারা ইউরোপের ভবঘুরে, জিপসী, রোমানী, এককালে তারা ছিল ভারতীয়ই। ... ...

আমাদের একতলার ছাদ। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ছে সেই ছাদে। আর ছাদটাকে আমার মনে হচ্ছে যেন একটা তেপান্তরের মাঠ! অথচ চারপাশে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা বহুতল আমাদের এই ছাদটাকে কেমন গায়েব করে রেখেছিল। জানো আব্বা, ইদানিং আমি ছাদে উঠলে খুব অসহায় বোধ করতাম। আকাশ দেখতে পাই না বলে নিজেকে মানুষ ভাবতে পারতাম না। দিগন্ত দেখতে পাই না বলে আমার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত। তাই পারত পক্ষে আমি আর ছাদে উঠতাম না। কিন্তু এখন মায়ের খোঁজে এসে এ কী দেখছি আমি? ছাদটা যেন আমাদের ছাদ নয়, সত্যিকারের একটা তেপান্তরের মাঠ হয়ে বিরাজ করছে। আমার অদ্ভূত লাগছে। ... ...

সত্যি বলতে কি, আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে সবচেয়ে বড় অদ্ভুত ব্যাপার হল আমাদের ঘন ঘন চেহারা (ভূমিকা) বদলানোর প্রবণতা। বিশ্বের কাছে বেশির ভাগ সময়ে, আমরা সহোদর ভাই-বোনের মত; সারাক্ষণ বাবার নেকনজরে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে বাবা বেড়াতে নিয়ে যায় কি একটা খেলনা কিনে দেয় কি আরো ভালো হয় যদি হাতখরচের পরিমাণটা একটু বাড়িয়ে দেয়। আর বাকি সময়ে আমরা বিবাহবচ্ছিন্ন দম্পতির মত, একসঙ্গে থাকছি, সারাক্ষণ পরস্পরের পেছনে লাগছি, পরস্পরকে দোষারোপ করছি যে কার জন্য একসঙ্গে থাকা যাচ্ছে না, কিন্তু কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছি না যে আমরা আর একসঙ্গে নেই আর সেইমত সমঝোতাতেও আসতে পারছি না। মনে হয় যেন আমাদের ভাগাভাগির ক্ষত এখনও এত জীবন্ত, এত যন্ত্রণাদায়ক যে আমরা যে ছেড়ে এসেছি তা ওরা মেনে নিতে পারে না, আর ওরাই যে আমাদের ছেড়ে আসতে বাধ্য করেছে আমরাও এটা মেনে নিতে পারি না। এইরকম একটা ক্ষেত্রে আমরা শুধু এই ভেবেই শান্তি পেতে পারি যে অন্যজনও আমার মতই আহত হয়েছে; সর্বপ্রকারে সেই চেষ্টা করাই এখন আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। ... ...

পার্কসার্কাসের ধাঙড় বাজারের সার্কাস হোটেল। সামনের ফুটপাথে একটা হাইড্রেন, তার থেকে মুখ খুলে হোসপাইপ লাগিয়ে কর্পোরেশনের লোক রোজ ভোরে রাস্তা ধুয়ে দেয়। সময়টা যে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি। তোড়ে যে জল বেরিয়ে আসে তা কিন্তু গঙ্গার ঘোলা জল, আর ফুটপাথে থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠলেই খোলা উনুন বসানো। সেখানে ঝকঝকে শিকে গেঁথে পোড়ানো হচ্ছে মশলা মাখা লালচে হলুদ রঙের মাংসের টুকরো। তৈরি হচ্ছে শিককাবাব। তার পাশেই দু'জন ময়দা মেখে লেচি বানিয়ে সেঁকছে রুমালি রুটি আর ভেজে তুলছে পরোটা। ... ...

১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে বাংলা একাডেমী আয়োজিত বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে দুটো ব্যানার হোর্ডিং-এর লেখা শ্লোগান পড়ে খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম—“শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলুন”, “শুদ্ধ বানানে বাংলা লিখুন”। তখনই মনে কয়েকটা প্রশ্নের উদয় হয়েছিল। শুদ্ধ ইংরেজি বলা বা লেখার জন্য আমরা যতটা আগ্রহ বোধ করি এবং যত্ন নিই, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে তার অভাব কেন? আমরা সকলেই কি বেশিরভাগ সময় শুদ্ধ বাংলা বলি বা লিখি? অথবা ব্যাপারটা কি এরকম যে বাংলা ভাষায় সব রকম বানানই চলে, এবং, শুদ্ধতার কথা বলা এক রকম স্পর্শকাতরতা বা ছুতমার্গ? নাকি, আমরা যে অনেক সময়ই ভুল বলি বা লিখি তা নিজেরাও জানি না বলেই এই সব ভাবি? ... ...

যেখানে প্রথাগত সাংবাদিকতা ব্যর্থ,যুদ্ধের ময়দানে অনুপস্থিত, নির্দিষ্ট মিডিয়া হাউসের রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী খবরকে বিকৃত উপায়ে পরিবেশন করতে বাধ্য,সেখানে স্বাধীন আমজনতার সাংবাদিকতা এখন ভবিষ্যতের নূতন প্রহরী। নাজি জের্ফের মত এই সমস্ত স্বাধীন দেশপ্রেমী সাংবাদিকরা সংবাদের দুনিয়ায় গণতন্ত্র বজায় রাখছেন। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রবিরোধীদের ভূমিকার তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রস্তুত করছেন। সরকার এবং বিদ্রোহীরা যাতে গণতান্ত্রিক অবস্থান বজায় রাখে এবং আরও স্বছ ভাবে কাজ করতে বাধ্য হয় তার জন্য নিরলস কাজ করছেন। আর মধ্য প্রাচ্যের এই নূতন মিডিয়ার দুনিয়ায় নাজি জের্ফ এক অনবদ্য ব্যক্তিত্ব। আজকের দুনিয়া যেখানে জনসেবা ক্রমশ ক্ষীয়মাণ এবং সাংবাদিকতার চরিত্র পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে দ্রুত,সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের এই সমস্ত স্বাধীন নাগরিক সাংবাদিকদের গ্রুপ, ক্রমে আরও বেশি বিশ্বস্ত, বেশি নিরপেক্ষ এবং প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক মতামত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ক্রমশ নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। অন্তত মধ্যপ্রাচ্যে নাগরিক সাংবাদিকতা প্রথাগত মিডিয়ার জায়গা সক্ষম ভাবে প্রতিস্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছে। নাগরিক সাংবাদিকতার এই হটাৎ বিস্ফোরণ সাময়িক কোন ঘটনা নয় বরং এইটাই ভবিষ্যতের ছবি হতে চলেছে। নাজি জের্ফ যেমন বলেছিলেন “To defeat us, they would have to shut down the Internet. And they can’t do that because all of them use the Internet.” ... ...

অরণ্য তার অগণন সন্ততীদের জন্য যুগ-যুগান্ত ধরে সাজিয়ে রেখেছে খাদ্য তথা পুষ্টি-সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য-সুরক্ষার ঢালাও আয়োজন। কাঁকের-নারায়ণপুরের গ্রামগুলিতে বনৌষধি হিসেবে কাজে লাগে আম, আমলকি, হত্তুকী, ভেলওয়া, বজ্রদন্তী, পাঠ-জড়ী, ফলসা, বকফুল, রসনা, ভাসাম-পাত্রী, ভরহা, পোটর, হলুদ ফুল, ভুঁইনিম, নিমপাতা, মোগ্রালাটা, কুমড়ো-পাতা, ভালু-মুএসলি, সাদা মুএসলি, চার, লাসা, ফুটু, বোডা, অর্জুন গাছের ছাল, বেল, লেজোমররা, ভুঁইকুমড়ো, পৈরা-ফুটু ও নানাবিধ ব্যাঙের ছাতা, পোকামাকড়ের শুকানো মাংস প্রভৃতি থেকে তৈরী হয় নানাবিধ ওষুধ। উপশমের উপাচারও নানাবিধ। কয়েকটা উদাহারণ দেখা যাক ... ...

গোণ্ডি ভাষায় বিয়ে মানে মারমীং। বস্তারের গোঁড় জনজাতির মধ্যে নানান ধরণে বিয়ে প্রচলিত। বিভিন্ন দ্রাবিড়-গোষ্ঠির মত এইখানেই মামা-ভাগ্নীর বিয়ে বহুলপ্রচলিত। মানা হয়, মামার ঔরসে প্রথম সন্তান ধারণের অধিকার ভাগ্নীর। অবশ্যই, বিবাহোত্তর। পিসতুতো ভাই বোনেদের বিয়েও এইখানে সামাজিক স্বীকৃতি ও সমাদর পেয়েছে। এই এণ্ডোগ্যামি-কে ‘সমাজে দুধ ফেরানো’ ধরা হয়। অবশ্য সমস্ত বিয়েই যে এইরকম হয় না নয়। আপন আপন জীবনসঙ্গী চয়ন করে নেওয়ার সম্পুর্ণ সামাজিক অধিকার রয়েছে বস্তারের যুবক-যুবতীদের। বিভিন্ন ধরণের বিয়ে হলেও, প্রথাগত ভাবে মূল রূপরেখা একই রকমের। প্রথমে বরপক্ষ কন্যা পক্ষের বাড়ি যায় তত্ত্ব নিয়ে (কোনো কোনো প্রথায় এর উল্টোটাও হয়)। তত্ত্বে থাকে ফল, গুড়, মহুয়া, সালফি ইত্যাদি। সন্ধ্যে বেলা দুই পরিবারের মানুষেরা আর গ্রামের জ্যেষ্ঠরা বসে, খানা-পিনা চলে দেদার, সূচিত হয় বিবাহবন্ধনের প্রথম ধাপ। এর পর আরো দুইতিনবার এইভাবে তত্ত্ব নিয়ে যাওয়ার পর দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়। তারপর বিয়ে। বস্তারের বিভিন্ন ধরণের বিয়ের মধ্যে প্রধান ধরণগুলো নিয়ে একটু জেনেশিখে নেওয়া যাক। অবক্ষয়ের মুখে এই জানাশেখাগুলোই তো সম্বল। ... ...

এই সব পড়ে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে যুবকবৃন্দ হাজির হল পাশের গ্রামের গাইতার কাছে। তার আশীর্বাদ নিয়ে হাজির হল সেই পাশের গ্রামের ঘোটুলে – এইবার চলল সারারাত দেদার গানের পালা। সেই গ্রামের ঘোটুলের লেয়া, মানে যুবতীরা-রা গানের মাধ্যমে হেঁয়ালী কৌতুকের প্রশ্নশেলে বিঁধতে থাকলো লেয়োর, মানে পাশের গ্রামের ঘোটুলের যুবকদের, আর সেই লেয়োরেরা গানে গানেই জবাব দিতে লাগল, উত্তর প্রত্যুত্তরে জমে উঠলে রাতের মৌতাত, রঙ্গকৌতুকের ফোয়ারা। এই গানের লড়াইয়ের নাম ‘দ্রার’। নাচে গানে সকাল হল। এ’বার বেরোনোর পালা। নাচিয়ে গাইয়ের দল আবার চলল গাইতার বাড়ির উঠোনে – এইবারের নাচের নাম ‘দেউর তেররুহানা’। নর্তকেরা একে অপরের কাঁধে চড়ে বানিয়ে তুললো মানব-মীনার – তারিফ ও আশীর্বাদ কুড়োলো গ্রামবাসীর, গাইতার। এইবার সাদরে খাওয়ানো হবে নাচিয়ে-গাইয়েদের, তারপর আবার সেই গ্রামের গাইতা-পত্নীর থেকে ‘শেষা’ বিদাই গ্রহণের পালা। ... ...

যে সময়কার কথা, তখন না ছিলো মাইন, না ছিলো রাষ্ট্র, না ছিলো এ-কে ৪৭। এইসবের অনেক অনেক আগে, কুয়াশাঢাকা কোন গণোনোত্তর অতীতে, থাকত সাত ভাই। সাত ভাই বড় হতে থাকল সেই গাঁয়ের বনে ঢাকা শান্ত ছায়ায়। বড় ছয় ভাই ছিলো দামাল দুরন্ত অরণ্যসন্তান। ছোটোটি ধির-স্থির, শান্ত-শিষ্ট, জ্ঞানগম্ভীর। তার গভীর কাজলচোখে ছায়া পড়ে অরণ্যের, আকাশের ও মননের আয়নায় ফুটে ওঠে প্রজ্ঞাঋদ্ধ তারারাজি। আর তার রক্তে রক্তে বইতো গানের তরঙ্গলহরী বুঝি। এক সাথে বারো রকমের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারত সে। বনের গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড়েরাও বুঝি শান্ত হয়ে শুনতো সেই বাজনা, ভেসে যেতো সুরের প্রবাহে। বাকি ছয়ভাই খেত-খামারের কাজ করতে লাগল দিনভর, বয়ঃক্রমে ঘর বাঁধলো, বিয়ে করল। পড়ে রইলো লিঙ্গো। অথচ তার গান-বাজনায় এতই মুগ্ধ ছিলো তার দাদাবৌদিরা, যে তাকে ঘরের কাজ, বনের ফল-কাঠ-বীজ-শিকার জোগাড়, খেতি-বাড়ির কাজ, এমনকি রান্না-বান্নার কাজ করার জন্য বকুনি দিতে মন সইতো না কারুরই। সে এ’সবের ধার ধারতো না, শুধুই গাইতো আর বাজাতো। ক্রমে ক্রমে তিক্ত হয়ে উঠলো তার ছয় দাদার গৃহী মন। ... ...

এমনভাবে দুহাতের অঞ্জলি ভরে দেবার ক্ষমতা যাঁর করায়ত্ত তিনি কেন মুঠি কৃপণ করে রাখলেন? আর এও মনে হয়, যে জন্য রাখলেন, তা কি সফল হয়েছে কোথাও? তিনি যাঁদের হয়ে সওয়াল করে গেলেন, অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাইরে তাঁদের কোনো কাজে কি আসবে নবারুণের লেখা? কোনো কবি বা কোনো কবিতা তো শেষ কথা বলে না! কোনো প্রতিক্রিয়াও কি আনে? শেষ অব্দি আকাশের বোমারু বিমানকে পরম বিশ্বাসে পাখির ঝাঁক ভেবে নেওয়া মানুষরাই তো আমরা। ... ...

নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখার সঙ্গে সহবাস আমার কাছে সাধারণত খুব স্বস্তিদায়ক হয় না। ঠিক যেরকম চ্যাপলিনের ছবি দেখাটা – মানে ঐ মজা, হাসি, ব্যঙ্গ, কৌতুক, খিস্তি খাস্তার আড়ালে থাকা যে বাস্তবের চাবুকটা আছড়ান এঁরা, সেটার শব্দ যাঁরা শুনতে পান… তাদের পক্ষে এই পাঠগুলো খুব সহজ হয় কিনা জানিনা… কিন্তু আমার অস্বস্তি হয়। তারপরে অনেকক্ষণ বা অনেকদিন নানা ভাবে এই আখ্যানগুলোর চরিত্ররা তাদের নানা ঘটনা নিয়ে ঘুরে ফিরে যাতায়াত করে মগজে, মনে… অস্বস্তি হয়। ... ...

বিস্ফোরণ ঘটছিল, আর তা নবারুণের মধ্যেই। বদলাচ্ছিলেন কবি। কবি নবারুণ ভটাচার্যের পরিচয় বদলে যাচ্ছিল কবি পুরন্দর ভাটের মধ্যে। যেমন সাহিত্যসম্রাট ঔপন্যাসিক বঙ্কিম মন খুলতেন আফিংখোর কমলাকান্তের মুখোশের আড়ালে – হয়তো তেমনিভাবেই পুরন্দর ভাট ছদ্মনামটাই আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সময়দীর্ণ নবারুণের। কবি নবারুণ সিরিয়াস – তার থেকে শতযোজন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছ্যাবলামোভরা গদ্যকার নবারুণ। কিন্তু ধীরে ধীরে দুইধারা মিলেমিশে গেছে। তাই ২০১২ সালে ‘ভাষাবন্ধন প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত ‘পুরন্দর ভাটের কবিতা’-তে কোথাও নেই নবারুণ ভট্টাচার্য! সেখানে ফিক্ফিক্ হেসে কপিরাইটের দাবি করেন ফ্যাতাড়ু ও চোক্তারেরা! সেখানে উৎসর্গ পত্রে লেখা থাকে – ‘সব খচ্চর ও হারামিদের’! ... ...

বহুদিন আগে বইমেলায় নবারুণের প্রেম ও পাগল নামের একটি বই কিনেছিলাম। সেখানে সম্ভবতঃ ‘জনৈক নৈরাজ্যবাদীর সংবাদ’ (বইটি কোনো বন্ধুজনে চক্ষুদান করেছেন, তাই একটু সন্দেহ রয়েই গেলো) নামের একটি আখ্যান ছিলো। একটি নৈরাজ্যবাদী পিওন গোপনে তার নাশকতা ছড়াচ্ছে বিড়ির টুকরো (কারণ বিড়ির কোনো স্টাম্প বা বাট হয় না।) পোস্টবক্সের মধ্যে ফেলে। পরেরদিন চিঠির গায়ে ছোট্ট ছোট্ট পোড়া দাগ। এবং আমার ধারণা হয় যদি আমরা একাধিকজনে বিড়ির টুকরোগুলো পোস্টবক্সে ফেলি, হয়তো একদিন তা সর্বগ্রাসী অগ্নিকান্ড হবে। পুড়ে যাবে গোপন সংকেতবার্তা। পুড়ে যাবে সামরিক তথ্য। কে জানে এই সব ছোট ছোট বিড়ির আগুনের মতো ব্যক্তিগত বিপ্লব একদিন সমষ্টিগত রূপ নেবে। ... ...

থাপ্পড় মেরেছেন নবারুণ। হ্যাঁ, একদম কষে সপাটে থাপ্পড় মেরেছেন। বাঙ্গালির চিরকালের শুয়ে বসে আরাম করে প্রেম-থ্রিল-কমেডির কাহিনি ও কবিতা পড়ার অভ্যাসের মূলে আঘাত করেছেন তিনি। এবং একদম ঠিক করেছেন। প্রথমেই একটা স্বীকারোক্তি আছে। আমি জানিনা মহিলা পাঠক বলে কোনো আলাদা বিভাগ আছে কিনা, তাই স্বভাবতই মহিলা পাঠকের বিচারে নবারুণের লেখার বিশ্লেষণ করতে আমি অক্ষম। আমি বরং একজন সাধারণ পাঠক হিসাবে নবারুণকে দেখব। মানে তার এই থাপ্পড় আমার কেমন লেগেছে আর কি! ... ...

অথচ সেই মুহূর্তে বাস্তব তার ‘ইন্টারোগেশন’ নিয়ে তাঁর সমস্ত ইচ্ছেকে ধূসরিত করছে, না মানলেও রাষ্ট্রদ্রোহিতার কলঙ্ক লাগানো শহীদদের প্রতি বর্বরোচিত আক্রমণের নগ্নতায় বিপন্নতা দেখা দিচ্ছে। কবিতাকে সশস্ত্র করছেন আদিবাসীর বল্লম, চর দখলের সড়কি, বর্শা, তীক্ষ শর, বন্দুক ও কুরকি দিয়ে। আবার কয়লাখনির মিথেন অন্ধকারে হিরের মতো জুলন্ত চোখের শাসানির যে ভয় শাসককে দেখালেন তা দেশকালের সীমানার বাইরে চির প্রতিস্পর্ধী এক কবির। নবারুণ স্থির থাকবেন কী করে, তিনি যে দেখেছেন তরাই থেকে সুন্দরবনের সীমা সারা রাত্রি কান্নার পর শুষ্ক দাহ্য হয়ে আছে। (এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না) ... ...

কিন্তু, অধিগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটাই যে বেআইনি ছিল, এই ব্যাপারে উনি কোনো সন্দেহ রাখেননি। ওনার মতে, যেহেতু আগেই জমি চিহ্নিত হয়েছিল, ও ক্যাবিনেট মিটিঙে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছিল, সেহেতু চাষিদের অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে থাকা অসন্তোষ, অভিযোগের বা আপত্তির, তৎকালীন ল্যান্ড-কালেক্টর কোনো বিচার করেননি, আর, মেকানিকালি উপেক্ষা করেছেন, বা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আগে থেকেই নিয়ে ফেলা সিদ্ধান্তের ওপর সিলমোহর ফেলতে একটা আই-ওয়াশ বা ছলনার মাধ্যমে চাষিদের ও জমির মালিকদের অভিযোগের বিবেচনা করা হয়েছিল, যার অন্তিম পরিণতি, সেই অভিযোগগুলির উচিত বিবেচনা না হওয়া। কমপেনসেশন বা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যেভাবে ঠিক হয়েছে সে নিয়েও উনি প্রশ্ন তুলেছেন। অতএব, ওনার মতে, জমি অধিগ্রহণ জনস্বার্থে হয়ে থাকলেও, অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি। ... ...

'হায়দার'-এর রিস্কগুলি আখেরে ছবিটিকে উতরেছিল না ডুবিয়েছিল তা নিয়ে তর্ক থাকবে। কিন্তু বিশালের ওই মারাত্মক ডিপার্চারটি অঞ্জনের ভালো লাগেনি – হায়দার খুররমকে হত্যা করতে পারে না। আমি তো আগেই বলেছি 'হায়দার'-এর প্রোজেক্টই ছিল মূল প্লটের নিষ্পত্তিকে বিপর্যস্ত করা, মায়ের ইন্টারভেনশনে। আর একটা পয়েন্ট ভাবুন - সেই ছেলেবেলায় জেনেছি হ্যামলেট procrastinator, সে ভাবে খালি, অ্যাক্ট করতে পারেনা। বিশাল কি করলেন? হ্যামলেটকে সেই সংজ্ঞাতেই ফ্রিজ করে দিলেন। তার অ্যাক্টের আর কোনো মূল্যই থাকলো না। বরং কাকা-ভাইপো একটা ভূতগ্রস্থ পরিবারের অবশিষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়াবে উপত্যকাময় যাদের আত্মীয়তার সূত্র হল একজন নারীর প্রতি তাদের প্রেম, যে নারী আর দেশ এখন একাকার হয়ে গেছে রক্তে-মাংসে-বরফে। এই রিস্কগুলো, এই ডিপার্চারগুলো নতুন ইন্টারপ্রিটেশন হয়ে অবলম্বনে মূল্য বাড়ায়। আর অতিরিক্ত আবেগ তৈরি করে। 'হেমন্ত'-এ সেই আবেগ নেই; 'হেমন্ত' বড্ড sane ও যৌক্তিক। ... ...

ভয় পেয়ে গিয়েছিল ছোট্ট মেয়েটা। অনেক লোকের মাঝে তাকে সকাল থেকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। এই পাড়াতে, এইরকম বাড়িতে আগে কোনোদিন আসেনি সে। তার বাড়ির লোকেরাও কোনোদিন আসেনি। তাকে আসতে দিতেও মন চায়নি তাদের। প্রায় জোর করেই চলে এসেছে ছোট্ট মেয়েটি। কারণ সে জানে তার ওপর এবার সংসারের অনেকটা দায়িত্ত্ব। কিছুদিন আগেই বাবা মারা গেছেন। মাকে সঙ্গে নিয়ে তাকে উঠে আসতে হয়েছে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখানে সারাদিন, সারা রাত অমানুষিক পরিশ্রম করেও বাড়ির লোকের মন পায়নি তারা। চলে আসতে হয়েছে সেই অপমানকর আশ্রয় থেকেও। মায়ের সেই দুঃখ ছোট্ট মেয়েটি ভুলতে পারেনি কোনোদিন। ভুলতে পারেনি পড়শিদের সেই কানা-ঘুষো। আসলেই যাকে বাবা বলে ডাকতো, আদতে সেই কি ছিল তার বাবা? নাকি মায়ের অন্য কেউ...? লজ্জায় রাঙা হয়ে যেত ছোট্ট সেই মেয়েটার মুখ। দারিদ্র্য ছিল। কিন্তু দারিদ্র্যের সাথে সম্মানবোধ ছিল খুব তীব্র। ছোট্ট মেয়েটা মনে মনে পণ করেছিল আর যাইহোক দিদি, মা, এই সংসারটাকে সে কোনোদিন ভেসে যেতে দেবে না। সবাই যাতে দুবেলা খাবার পায়, পড়ার কাপড় পায়, মাথা গোঁজার জায়গা পায়, সন্মানের সাথে জীবন নির্বাহ করতে পারে তার জন্য ছোট্ট মেয়েটা নিজের সমস্ত শখ, আহ্লাদ, নিজের ছোটবেলাটা বিসর্জন দিয়ে একলা একলা প্রতীক্ষা করছে। অনেক আলো, অনেক যন্ত্রপাতি আর বেশ কিছু রঙ-চঙে মানুষের মাঝে। মনে হচ্ছে আজ তার অগ্নি পরীক্ষা। হ্যাঁ, এই ছোট্ট বয়সেই। ... ...

বিগত এক দশকের বাংলা ছবি (মানে, কাগজের ভাষায়, তথাকথিত "মননশীল" বাংলা ছবি) দেখলে একটা কথা খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, বাংলা সিনেমার সাথে আন্তর্জাতিক সিনেমার সম্পর্ক, যা সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক একদা স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন, এখন প্রায় পূর্ণতঃ ছিন্ন হয়েছে। বাংলা সিনেমা, অধুনা, তার নির্মাণে ও মেজাজে, পরিপূর্ণ মধ্যবিত্ততার একটি পঙ্কিল আবর্তে পাক খেতে খেতে, একমনে, নিজেই নিজেকে ক্রমাগত ধ্বংস করে চলেছে। বিশ্বসিনেমার ভাষা যতই বদলে যাক না কেন, যতই জটিল হয়ে উঠুক না কেন তার অন্তর্গত আখ্যানের বুনন, বা সেই আখ্যানের সঙ্গে বহির্বাস্তবের লেনদেন ও টানাপোড়েন, বাংলা ছবি, তবুও, দৃশ্যের মাধ্যমে একটি নিটোল, নাটকীয় অথচ অন্তঃসারশূন্য গপ্প বলাকেই তার পবিত্র কর্তব্য ঠাউরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে ব্যস্ত থাকবে। এমনকী, ছবির ভাষা নিয়ে মাথা ঘামানো ছেড়ে, শুধু যদি এটুকুই প্রত্যাশা করি যে সেই গল্প, আদতে, মধ্যবিত্তের কোন গূঢ় আস্তিত্বিক সংকট বা জটিল স্ববিরোধকে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত করবে, তাহলেও আশাভঙ্গের শিকার হতে হয়। কেননা, মধ্যবিত্তের হাঁচি-কাশি-টিকটিকি-প্রেম-অপ্রেম-আমাশার গল্পকে, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে, সভ্যতার সংকট হিসেবে উপস্থাপিত করাই, এখন তার নতুন দস্তুর। এবং এই অন্তঃসারশূন্যতাকে আড়াল করার জন্যে রয়েছে আরোপিত কেতা, যা, বস্তুতপক্ষে, ষাট-সত্তরের দশকের আভাঁ-গার্দ ছবির থেকে ধার করা, পরবর্তীতে মিউজিক ভিডিওর জমানায় ব্যবহৃত হতে-হতে বাসি মাংসে পরিণত হওয়া, ক্যামেরা বা সম্পাদনার কৌশলমাত্র। বিশ্বসিনেমার কথা বাদ দিলেও, কেবল যদি হিন্দি বা মারাঠী সমান্তরাল ছবির কথাই ধরি, তাহলেও বোঝা যায়, বাংলা সিনেমা ঠিক কোন গর্তে গিয়ে মুখ লুকিয়েছে। ... ...