
অকস্মাৎ গুম গুম গুম শব্দে অমোঘ পাহাড় কাঁপিয়া উঠিল। চমকিত বিশাখ দুই পদ পিছাইয়া আসিলেন। হেরিলেন বজ্রপ্রস্তর নির্মিত বেদী সহ জ্বলমণির বিশাল প্রস্তর মূর্তি মৃত্তিকায় প্রোথিত হইতেছে। স্থাণুবৎ মহারাজ দেখিলেন মণি মাণিক্য খচিত দেবগৃহ অতলে চলিয়া যাইতেছে। অপরূপ কারুকার্যখচিত স্তম্ভ, বংশ পরম্পরায় নিপুণ শিল্পীদের সাধনার ফল। নিমেষে নিমেষে মন্দির ভূমিতে গহ্বর সৃষ্ট হইতেছে, যেন নরক ভৈরবীর আদিগন্ত মুখ ব্যাদান। এক এক গ্রাসে বিলুপ্ত করিতেছে নাটমন্দির, দেবশিখর, উপচার গৃহ, বৃন্দবাদনের প্রাঙ্গন। সুদূর পর্বত শিখর হইতে প্রস্রবিনী শঙ্খশুভ্রা নির্মল জলধারা,যা একদিন ধৌত করিত মহাদেবতার চরণ দুটি, সহসা শুকাইয়া গেলো। পুণ্য দির্ঘীকার পূত সলিল ফোয়ারার ন্যায় ঊর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হইলো। দগ্ধ হইলো মন্দির উদ্যানের পুষ্পবীথি। অবশেষে মন্দিরের শীর্ষ কলসও বিলীন হইলো। ... ...

যাহা ষোল তাহাই আঠেরো। রইল আঠেরোজন কবির ষোড়শোপচার। ... ...

শ্যাম লালের একটি নিকনেম চালু ছিল গাজিয়াবাদের আদালতে। সাজা লাল। দীর্ঘ বিচারকজীবনে, কখনও কোনও অভিযুক্তই নাকি তাঁর বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তি পায় নি। প্রত্যেকেই শাস্তি পেয়েছে তাঁর জাজমেন্টে। শ্যাম লাল নিজে যদিও দাবি করেন অনেকেই তাঁর রায়ে মুক্তি পেয়েছেন বা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, কিন্তু এ রকম একটা কেসের রেফারেন্সও তিনি দিতে পারেন নি। আরুষি হত্যাকাণ্ডের কেস তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল সম্ভবত এই কারণে, ন্যায় প্রদানের থেকেও এই কেসে তাঁর কাছে জরুরি ছিল এই কেসের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পালন করে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম তোলার। “শেষ পর্যন্ত” কথাটি অবশ্যই ব্যঞ্জনামূলক, কারণ, শেষ করার জন্য কোনও চাপ তাঁর ওপর ছিল না, চাপটা ছিল তাঁর নিজের কাছেই। আরুষি হত্যার রায় প্রকাশের ছদিন পরেই শ্যাম লাল অবসর নেন। দেশের সমস্ত মিডিয়া যখন গভীর আগ্রহের সঙ্গে এই কেসটা ফলো করছিল, একটা সঠিক বিচার হওয়া খুব দরকার ছিল, কিন্তু শ্যাম লালের হাতে বেশি সময় ছিল না। অবসর নেবার আগেই তাঁকে মামলার শুনানি শেষ করে জাজমেন্ট শুনিয়ে যেতে হত। শ্যাম লাল চাইলেই কেসটি আরও শুনানির জন্য পরবর্তী বিচারকের হাতে ছেড়ে যেতে পারতেন, শেষ করার জন্য কোনও চাপ ছিল না, কিন্তু তিনি সে পথে হাঁটেন নি। ... ...

২০১০ সালের শেষদিকে, সিবিআই ইনভেস্টিগেটিং অফিসার কৌল মোটামুটি ছক কষেই ফেলেছেন এই ঘটনাকে অনার কিলিং-এর তকমা লাগিয়ে সলভ করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, ক্রিমিনাল কেসে তদন্তের ফলাফল আগেই ভেবে রাখলে সেই অনুযায়ী ঘটনাক্রমকে সাজাতে হয়। এখন সরাসরি তথ্যপ্রমাণ, যেগুলো বা যারা কথা বলে না, যেমন বালিশের ওয়াড়, বিছানার চাদর, কিংবা বোতলে বা গ্লাসে আঙুলের ছাপ, সিঁড়িতে রক্তের দাগ – এদের বয়ান তো বদলে ফেলা যায় না, এরা যে অবস্থায় রেকর্ডেড হয়েছিল, সেইভাবেই রেকর্ডেড থাকে। এর চেয়ে অনেক সহজ, সাক্ষীদের বয়ান বদলে ফেলা। তা, সে ব্যাপারে কৌল খুবই সফল হচ্ছিলেন, একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের বয়ান ততদিনে বদল হয়ে আসছিল, কিন্তু কৌল পড়লেন স্বয়ং নূপুর তলওয়ারকে নিয়ে। মৃত আরুষির শরীর ঢাকা ছিল একটি সাদার ওপর গোল ডিজাইন করা চাদর দিয়ে। কৌল সেটিকে দাবি করেন সাদা চাদর, এবং সেই সম্বন্ধে বিস্তারিত গল্প ফাঁদতে গিয়ে তিনি নূপুরের ওপর চাপ দিতে শুরু করেন, যাতে নূপুর স্বীকার করেন, চাদরের ব্যাপারে তিনি কৌলকে আগে “মিথ্যে কথা” বলেছিলেন। নূপুর অস্বীকার করেন – তিনি প্রথম থেকেই চাদরের সঠিক বর্ণনা দিয়েছিলেন, সে চাদর বেশ কয়েকবার টিভি চ্যানেলে দেখানোও হয়ে গেছে, এখন কৌল সাদা বললেই নূপুরকে তা মেনে নিতে হবে কেন? নূপুর পরিষ্কার জানান, তিনি বয়ান বদল করবেন না, তিনি মিথ্যে বলেন নি কখনওই। কৌল, এমনকি নূপুরকে ভয় দেখান যে, তিনি নূপুরের বিরুদ্ধে কুড়িজন সাক্ষী দাঁড় করিয়ে দেবেন নূপুরকে মিথ্যেবাদী প্রমাণিত করার জন্য। ... ...

আরও একটা ফ্যাক্টর কাজ করে। সেটা হল অনিশ্চয়তা আর রহস্যময়তা। কথক এমন ভাবে তার কথকতার জাল ছড়াতে থাকেন, সাদামাটা ঘরোয়া দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বাইরে যেন একটা জাদুকরি কুহকজড়ানো বাতাস বইতে থাকে কথকতার আসরজুড়ে। রোজকার ঘামঝরানো পরিশ্রমের বাইরে কথক হয়তো এক জাদুগালিচার গল্প বলেন। হয়তো এক সন্তের গল্প বলেন যার কৃপায় বোবা কথা বলে, কাটামুন্ড জোড়া লেগে যায়। এমন জুতোর গল্প বলেন যেটা পায়ে দিয়ে ইচ্ছেমত দেশভ্রমণ করা যায়। এ অভিজ্ঞতা তো আপনাদের সবার আছে। মানুষের বুকের ভেতরে যে অসম্ভব বাসনাগুলো গোপনে লুকিয়ে থাকে, যে ফ্যান্টাসি আমরা গোপনে লালন করি, গল্পের রহস্যময়তা তাকে স্পর্শ করে। যেন ভারচুয়াল রিয়ালিটির ভেতর দিয়ে আমাদের বাসনার নিবৃত্তি হয়। এই আধো বুঝতে পারা, আধো বুঝতে না পারার ভেতরে স্ট্রেস থাকে। এই স্ট্রেস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যে গল্প শোনে, সে না-বোঝা রহস্যময়তার ভেতর থেকে আরও গল্প নিজের মত করে বিনির্মাণ করে নেয়। আর, অনিশ্চয়তা তো থাকবেই। কথক যদি কী হতে পারে, আসলে সেটা বিশাল একটা সাপ নয়, একটা মোটা দড়ি, কুমির নয়, শেষ পর্যন্ত দেখা গেল একটা গাছের গুঁড়ি – এসব আগেই বলে দেন, তবে তো সেটি আর গল্প থাকে না, সাংবাদিকসুলভ নিছক ঘটনার বিবরণ হয়ে ওঠে। নীরস সেই গল্প যেন ফোটোগ্রাফিক রিয়েলিটির মত কঠিন সত্য, গল্পের যে মাধুরী মানুষকে চিরকাল আবিষ্ট করে রেখেছে, সেই প্রাণলাবণ্যটুকু আর থাকে না। ... ...

সাধারণভাবে কোনও বই পড়া শুরু করার আগে আলাদা করে কোনও মানসিক প্রস্তুতি নেবার দরকার হয় না – কিন্তু এই বইটা পড়ার আগে আমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়েছিল। বইটা পড়ার জন্য হয় তো আগে থেকে ঘটনাটার কিছু না জানলেই ভালো হত, একটা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে বইটা পড়ে একটা মতামতে পৌঁছনো যেত। কিন্তু এটা কোনও কাল্পনিক গল্পের বই নয়, কঠিন বাস্তবের ন্যারেশন। এই ন্যারেশনের একটা অংশ আমি জানি, জানতাম, ঘটনার শুরু থেকেই আমি নজরে রেখেছিলাম, নিজের মত করে খবর জোগাড় করতাম, পড়তাম, ফলে নিজের অজান্তেই একটা মত – সহজ ইংরেজিতে যাকে বলে ওপিনিয়ন, আমার তৈরি হয়ে ছিল। ফলে পুরোপুরি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এই বই পড়া আমার পক্ষে আর কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। আমি জানতাম, বইটা পড়ে ফেলার পরে আমি ঠিক আগের মত স্বাভাবিক থাকতে পারব না, বইটা আমাকে ধাক্কা মারবে জোরে, আর হন্ট করে চলবে অনেকদিন ধরে। পড়বার পরে বুঝেছিলাম, আমার এই ধারণা অমূলক ছিল না। ... ...

তবে উপায়? বিকাশ প্রথমে ওয়াটার থেরাপির ধান্দা করলেন। দিনে আট গেলাস জল পেটে ঢুকতে লাগলো, মদ্যপান বন্ধ, আর প্রতি ঘন্টায় দুচোখে জলের ঝাপটা। এতে করে কোনও লাভ হল না, বার বার বাথরুম যাবার প্রয়োজন পড়ল, ঝাপটা দিতে গিয়ে জামা ভিজে একশা হল, সন্ধ্যায় ইয়ারবক্সীরা 'উল্লাস' বলার একটি সাথী আপাততঃ হারিয়ে সামান্য বিমর্ষ হলেন। রাতে ঘুম এল না। ঘুম আসার জন্য সানন্দায় কানে কানে পড়তে গিয়ে মাথাটা শেষে খেলল। বিকাশবাবু গোপনে ওনার সহধর্মিনীর প্রসাধন সামগ্রী হাঁটকে শসা, লেবু ইত্যাদি প্রাকৃতিক ভেষজ দেওয়া ক্রিম চোখে লাগাতে শুরু করলেন ও কদিনের মধ্যেই ক্রিম সরাতে গিয়ে ধরা পড়লেন। লাগিয়ে ফল হল কচু, হাতি আর ঘন্টা। চৌর্যের কোনও কারণ বাৎলানো দায় হল, গৃহিনীর মুখনাড়া সার হল, বিবিজান লবেজান করে দিলেন। কিছুতেই কিছু হল না দেখে মরিয়া বিকাশ খুব ভোরে উঠে আদা-মধু আর কল ওঠা ছোলা মুখে ফেলে দু-আঙুলে টেনে টেনে চোখের চামড়ার ব্যায়াম আরম্ভ করলেন। এতে তাঁর জীবনযাত্রা পূর্বের চেয়ে স্বাস্থ্যকর হল, তর্জনীর গাঁটে ব্যথা হল, কিন্তু চোখের কোনও রদবদল ঘটল না। হতাশ, ভগ্ন, ভীত, রোগগ্রস্ত বিকাশ সেন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। ... ...

পৃথিবীতে একটা মাত্র ডাইনোসর আছে যার সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত নাম সাধারণ মানুষের মুখে মুখে চলে, জীনাস নেম, স্পিসিস নেম - দুটোই একসাথে উচ্চারিত হয়। আজ অবধি আর কোনো ডাইনোসর বিজ্ঞানীমহলের বাইরে এতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। তার নামের মধ্যেই তার একচ্ছত্রাধিপত্যের পরিচয়, সে ডাইনোসরের রাজা, 'অত্যাচার-সম্রাট' টাইর্যানোসরাস রেক্স। জীনাস Tyrannosaurus, অর্থাৎ অত্যাচারী টিকটিকি, স্পিসিস rex, অর্থাৎ king। স্থলচর মাংসাশী ডাইনোসরদের মধ্যে টী-রেক্স সর্ববৃহৎ নয়, জাইগ্যানোটোসরের মতো কেউ কেউ তার চেয়ে বড়। কিন্তু আকারটাই তো রাজকীয়তার শেষ কথা নয়। রেক্স ছাড়া টাইরানোসরাসের আরও অনেক প্রজাতি আছে, টাইরানোসরাস বাদেও অনেক বাঘা বাঘা জাত-শিকারী ডাইনোসর আছে। Carcharodontosaurus আছে,Velociraptor আছে। ভেলোসির্যাপটরকে আমরা একরকমভাবে চিনি, 'জুরাসিক পার্ক'-এর র্যাপটর এরাই। এরা সবাই থেরোপড। থেরোপডদের মধ্যে থেকেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও আধুনিক ডাইনোসররা উঠে এসেছিল। এদের একটা শাখা এখনও পৃথিবীতে মজুত আছে। তাদের আমরা বলি 'পাখি'। ... ...

দ্বিতীয় লাইনটি ফলো করলেই নোটিফিকেশানের লিস্টে কারা অন্তর্ভুক্ত জানা যায় শুধুমাত্র মুসলমান শব্দটিকে বাদ দিলেই। যারা জানেন তারা জানেন যে ইমিগ্রান্টস দের মধ্যে শরণার্থী আর অনুপ্রবেশকারীর বিভাজন সংঘপরিবারের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় রাজনীতির উপাদান। নোটিফিকেশানের মাধ্যমে তাকেই আইনী বৈধতা দেওয়া হল, যে নোটিফিকেশনের একমাত্র প্যারামিটার হচ্ছে ধর্মীয় নির্যাতন। যে বিশাল সংখ্যক দরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতিত মুসলিম জনগণ জীবনধারণের আশায় ঢুকে পড়ছে ভারতবর্ষে,এখন থেকে সরকারীভাবে তাদের অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করা হবে। কিন্তু যারা শরণার্থী, তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি সরকারীভাবে বিবেচিত হলো কি? এই নোটিফিকেশনে তার উত্তর মেলেনা। ... ...

এই গুলিয়ে ফেলা থেকে আরো বড় বিভ্রান্তি জন্ম নেয়। মধ্য যৌনতায় (খেয়াল করবেন, ‘মধ্যলিঙ্গ’ বলি নি) অবস্থানকারী মানুষরা যেহেতু ‘ট্রান্সজেণ্ডার’ এর অংশ, তাই কেউ কেউ সমকামিতা আর অন্তর্বর্তী লিঙ্গকে একসূত্রে ফেলে দেয়। এদের উৎপাতেই ফেসবুকে ‘গে শি-মেল হিজড়ে’ নামের একাধিক পেজ অবস্থান করছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সমানাধিকার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ লেখা থাকে, কিন্তু সাইটটাকে সাজানো হয় অন্তর্লিঙ্গ মানুষদের ছবি দিয়ে। অন্তর্লিঙ্গ ও সমপ্রেম দুটোই যেহেতু গোঁড়াদের বক্রদৃষ্টির আওতায়, তাই উদারপন্থীরা হিজড়ে ও সমকামীদের এক মঞ্চে বসিয়ে তাঁদের পক্ষে সওয়াল করেন। চেতনা উদযাপক লেখায় অনেকে রূপান্তরিত, রূপান্তরকামী, ইউনাক, অ্যাণ্ড্রোজিনাস, বৃহন্নলা সব্বার কথা লিখে যান। বুঝি যে, তাঁরা দরদ দিয়ে লিখছেন, সমবেদনাও জাগাচ্ছেন পাঠকদের মধ্যে, কিন্তু উল্লিখিত নামগুলোর মধ্যে একের সাথে আরেকের পার্থক্য কিছুই বোঝাতে পারছেন না। ফলে ঠেলাগাড়ির ঠেলা খেয়ে সবাই গিয়ে পড়ছে ‘ট্রান্স’ বর্গে। ... ...

ভারতেও অবস্থাটা ছিল একই রকমের ভয়ঙ্কর। ডঃ রিচারিয়ার প্রতিটি ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গেল। বিশিষ্ট ধান উৎপাদনকারীদের একটি টাস্ক ফোর্স লক্ষ্য করেন যে “উচ্চ ফলনশীল জাতের প্রচলন গাল মিজ, বাদামি শোষক পোকা, পাতা মারা পোকা, হোর ম্যাগট প্রভৃতি ক্ষতিকর পোকার চরিত্রে পরিবর্তন আনে। বেশিরভাগ বাজারে আসা উচ্চ ফলনশীল জাতের মেজর পেস্ট দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে যাতে করে ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ অবধি ফসলের ক্ষতি হতে পারে।” বেশিরভাগ উচ্চ ফলনশীল জাত তৈরী হয়েছে টি এন ১ ও আইআর ৮ থেকে এবং সেজন্যই বেঁটে করার জিন ডিজিওগেন বহন করে। এই ক্ষুদ্র জিন ভাণ্ডার বিপজ্জনক রকমের সমরূপতা সৃষ্টি করে পেস্ট ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়িয়েছিল। বাজারে আসা বেশিরভাগ জাতই উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো জমি, যেগুলি একত্রে দেশের মোট ধান জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ, সেই ধরনের জমির পক্ষে উপযুক্ত নয়। ... ...

প্রসঙ্গ - টাকার খেলা কে কে খেলেছে। আমাদের জানা নেই। তবে টাকার খেলা ছাড়াও অনেক ঘটনাই ঘটা সম্ভব। মামলায় অপরাধী দোষী সাব্যস্ত হলে পুলিশের ক্রেডিট মেলে, সরকারি আইনজীবীরও। এই পরিস্থিতিতে সহজে যাকে দোষী প্রমাণ করা যায়, পুলিশের তাকেই পছন্দ হবে। ফ্ল্যাটবাড়িতে খুন হয়ে সিকিউরিটি এজেন্সি যদি চাপে পড়ে থাকে, তারা পুলিশকে সাহায্য করবে নিজের স্বার্থেই। আর আদালত এই মামলার রায়ে নিজেই বলেছে - মেয়েদের উপর আক্রমণ বেড়ে চলেছে, বহু দোষী ছাড়া পেয়ে যায়, সমাজ সুবিচার চায়, তার আকুতিতে সাড়া দেওয়ার দায় আছে আদালতের, ধনঞ্জয়ের শাস্তিবিধান হয়েছে এইসব বিবেচনা করে। অর্থাৎ যে-খেলা এই মামলায় চলেছে, তা এই সব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লজিকের দৈনন্দিন খেলা। ধনঞ্জয়ের জন্য বিশেষ করে এবং অর্থব্যয় করে এর আয়োজন হয়েছিল এমন নাও হতে পারে। ... ...

এখানেই এই উপাখ্যান শেষ হতে পারত। কিন্তু মানুষের মৃত্যর পরও তার ছায়া থেকে যায়, আর উপসংহারের পরেও থেকে যায় পরিশিষ্ট। ২০১৩ সালে শঙ্কর কিষ্ণরাও খাড়ে বনাম স্টেট অফ মহারাষ্ট্র মামলায় রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট তার পূর্বতন মৃত্যুদন্ডের সিদ্ধান্তগুলি খতিয়ে দেখে। ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় মামলা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সেই মামলার রায়ের কিয়দংশ উদ্ধৃত করা হয়। এটা কোনো আপতিক ঘটনা নয়, যে, আমরা আগের পরিচ্ছেদে ওই মামলার যেদুটি অনুচ্ছেদ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি, সুপ্রিম কোর্টও উদ্ধৃত করে সেই দুটি অনুচ্ছেদ থেকেই। এবং তারপর এক লাইনে মন্তব্য করা হয়, “Prima facie, it is seen that criminal test has not been satisfied, since there was not much discussion on the mitigating circumstances to satisfy the ‘criminal test’.” খুব ছোটো করে এর মানে এইরকম, যে, ধনঞ্জয়ের শাস্তিদানের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সেই পারিপার্শ্বিকতাগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা দন্ডদানের পরিমাপ বাড়ায় (অ্যাগ্রাভেটিং সারকমস্ট্যানসেস)। যাতে দন্ডদানের পরিমাপ কমে, সেই পারিপার্শ্বিকতা (মিটিগেটিং সারকমস্ট্যানসেস) কে দেখা হয়নি। দার্শনিকভাবে দেখলে, এও এক পূর্বনির্ধারিত আখ্যানের একরকম স্বীকৃতি, যার চাপে কিছু পারিপার্শ্বিকতাকে উপেক্ষা করা হয়, আর কিছু পারিপার্শ্বিকতাকে দেওয়া হয় অধিকতর গুরুত্ব। ... ...

এবং এখান থেকেই শুরু হয়ে যায় এই কাহিনীর অসঙ্গতি। সলিল বসুচৌধুরির সঙ্গে এই অভিযানের অন্যতম সঙ্গী ছিলেন ছাতনা থানার তৎকালীন সাব-ইনস্পেক্টর প্রণব চ্যাটার্জি। তিনিও আদালতে এই অভিযানের একটি বর্ণনা দেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ীও তাঁরা ধনঞ্জয়ের বাড়ি পৌঁছন মাঝরাতের পরে এবং পাশাপাশি তিনটি বাড়ি সার্চ করেন। ধনঞ্জয়কে কোথায় পাওয়া যায়? তাঁর বর্ণনানুযায়ী একটা খড়ের চালের বাড়ির সামনে ছিল একটা খড়ের চালের বারান্দা। ধনঞ্জয় লুকিয়ে ছিল সেই বারান্দার ছাদে। বারান্দার ছাদ আর খড়ের গাদার পিছন নিশ্চয়ই এক জায়গা নয়। তাহলে ধনঞ্জয়কে গ্রেপ্তার আসলে কোথায় করা হয়েছিল? যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাকে জিজ্ঞাসা করলে কি আসল উত্তরটা পাওয়া সম্ভব? আদালতে ধনঞ্জয়কে এই প্রশ্নটি করা হয়েওছিল, যে, সে কি জ্যাঠার বাড়ির খড়ের গাদার পিছনে লুকিয়ে ছিল এবং সেখান থেকেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে? ধনঞ্জয় তার উত্তরে স্পষ্ট করেই জানায়, সেটা ঘটনা নয়। সে ছিল তার বাড়িতে। তার স্ত্রীও ছিল সঙ্গে। ... ...

বিষয়টা একটু অদ্ভুতই। বস্তুত ধনঞ্জয়ের উকিলই যখন ধনঞ্জয়ের বয়ানের উল্টো কথা বলেন, তখন মনে হয়, এ যেন শুধু নিয়মরক্ষার খেলা। আখ্যানটি পূর্বনির্ধারিতই আছে। যারা এই আখ্যানের বিরোধিতা করছেন, সে শুধু বিরোধিতা করার জন্য। আসলে তাঁরাও অন্য কোনো আখ্যানে বিশ্বাস করেননা। এবং বিরোধিতাটাও শুধু নিয়মরক্ষার্থে এবং সেটাও পূর্বনির্ধারিত এই আখ্যানেরই অংশ। এই সেই আখ্যান যেখানে উকিল ধনঞ্জয়ের পক্ষের সমর্থন করতে গিয়ে এমন কথা বলবেন, যা, ধনঞ্জয়ের বয়ানকেই মিথ্যে প্রমাণ করে সরকারি আখ্যানের ভাষ্যকে জোরদার করবে। দুজন প্রধান প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানের অসঙ্গতিগুলিকে উপেক্ষা কিংবা সম্পাদনা করে এমন মাপে নিয়ে আসা হবে, যাতে তারা খাপে খাপে মিলে যায় আদালত-স্বীকৃত আখ্যানের সঙ্গে। যেন জিগস পাজল মেলাতে বসা হয়েছে হাতে একটি র্যাঁদা নিয়ে। এখানে সমাধানটি পূর্বনির্ধারিত। যদি কোনো টুকরো না মেলে, তাকে হয় ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে, কিংবা ছেঁটে করে নেওয়া হবে মাপমতো। বিরোধিতাটাও হতে হবে, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থে। কিন্তু সেটাও মাপমতো, যাতে সেটা মূল আখ্যানের পক্ষে যায়, বা সরাসরি পক্ষে না গেলেও মূল আখ্যানকে চ্যালেঞ্জ করার মতো বিপজ্জনক না হয়। বিপজ্জনক স্ববিরোধিতাগুলি কেউ কেউ গুরুত্বই পাবেনা আদালত চত্বরে। ... ...

আশ্চর্যজনক ভাবে পুলিশ আগমনের কয়েক ঘন্টার মধ্যে লিখে ফেলা এই প্রতিবেদনের সঙ্গে রামধনির খারিজ হওয়া বয়ান হুবহু মিলে যায়। এই মিল আপতিক বা সাজানো হওয়া কঠিন, কারণ সংবাদপত্রের প্রতিবেদকের পক্ষে বহুদিন পরে রামধনি আদালতে গিয়ে কী বলবেন সেটা আন্দাজ করা অসম্ভব। যেটা সম্ভব, সেটা হল, রামধনি হয়তো আদালতে সত্যি কথাই বলছিলেন। এটি অবশ্য একটি সম্ভাবনাই, কিন্তু সেটা ফেলে দেবার মতো নয়। এবং আদালতে সংবাদপত্র প্রসঙ্গটি আসেইনি। রক্তের দাগের প্রসঙ্গটি অবশ্য এসেছিল। হাইকোর্টে ধনঞ্জয়ের কৌঁসুলী প্রশ্ন তোলেন, যে, এই নৃশংস খুনের(হেতালের শরীরে ২১ টি আঘাত ছিল) পরেও কোনো সাক্ষীই কেন ধনঞ্জয়ের হাল্কা রঙের জামাকাপড়ে কোনো রক্তের দাগ দেখতে পায়নি? সরকারপক্ষের আখ্যানে এর কোনো উত্তর নেই। বিচারক রায়দানের সময় এই ধাঁধার সমাধান করেন এই ভাবে, যে, যেহেতু খুনের আগে ধর্ষণ হয়েছে, তাই খুনের সময় ধনঞ্জয়ের শরীরে জামাকাপড় ছিলনা। এবং সেখানে রক্তের দাগ লাগার তাই কোনো প্রশ্নই নেই। ... ...

তো, আমারো কি এখন থেকে পরিবারের কথা মেনে সাবধান হওয়া উচিৎ? আমাকে কতল কাল কখন, কোথায় হবে? ডিউটি সেরে বাড়ি ফেরার সময় রাতের বেলা গলির মুখে কি ঘাপটি মেরে থাকবে কোনো মৌলবাদের নাতি? নাকি সকাল, সকালই নূরানী লেবাসের চাপাতিতন্ত্র বাসার সামনে ঝাপিয়েঁ পড়বে আমার ওপর? অথবা তারা আমার শোবার ঘরেই সদলবলে ঢুকে কুপিয়ে জিহাদ কায়েম করে গেল, এমনো তো হতে পারে? তারা আমার গলা কাটার আগে আমি কি তাদের মুখগুলো একনজর দেখার সময় পাবো? আর অনিবার্য প্রশ্ন এই, তখন কি হবে আমার অনুভূতি? ... ...

বাবা একদিন মরে পরে রইলেন চেয়ার মধ্যে। যে কাঠের চেয়ারটায় রোজ বসে থাকতেন বারান্দা, একদিন দেখা গেলো মাথাটা হেলে আছে চেয়ারের কাধে, মুখ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে…। খুব বড় আয়োজন করে বাবার কুলখানি করলেন বড় ভাই। আমাদের ডালডা আর তেলের কারখানাটা বড় ভাইই চালান। ভাবী আমাদের এখানে থাকতে চান না বলে উত্তরায় ফ্ল্যাট কিনে ভাই-ভাবী সেখানেই থাকেন। এই বাড়িতে এখন আমি একা। পুরো একটা বাড়িতে একা থাকতে আমার একটুও একা লাগে না। কেন লাগে না জানি না। স্বপন যে ঘরটাতে ফাঁস দিয়েছিল সেঘরটা তালা দেয়া থাকে। মাঝে মাঝে খুলে ভেতরে ঢুকি। চেষ্টা করি স্বপনের কোন অস্তিত্ব অনুভব করতে। আজ ২২ বছর স্বপন নেই! মণীশ জ্যাঠার যেমন বয়স আটকে আছে মহাকালের ফ্রেমে, স্বপনও সদ্য যৌবনের চেহারা নিয়ে এ্যালবামে আটকে আছে। কি অদ্ভূত, মণীশ জ্যাঠা এ বাড়ির মায়া আজো কাটাতে পারলেন না কিন্তু স্বপনকে কতদিন প্রত্যাশা করেছি শুধু একবার দেখবো…। কিন্তু স্বপন যে দূর কোন দেশের অধিবাসী। স্বপন চলে গিয়ে আর ফিরে আসেনি…। ... ...

তাই সবকিছুর পরেও এই বই সেই মানুষদের গল্প বলে, সেই ভূখণ্ডের গল্প বলে, আধিপত্যবাদের নিষ্পেষণে গুঁড়িয়ে যেতে যেতেও যা তুমুল জীবনের উদযাপনে বাঁচতে চায়। গ্রামের স্থানীয় মসজিদে গিয়ে সৌদির ক্যাম্প থেকে ফেরা কট্টর ইসলামিস্ট ছোকরা যখন চোখ-মুখ পাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে ‘কবীরন কবীরা’ (শ্রেষ্ঠ কে?) তার উত্তরে কেউ ‘আল্লাহু আকবর’ চেঁচিয়ে ওঠে না, বরং একে অন্যের মুখ চাওয়া-চায়ী করে। চেঁচাবে কি করে? আরবি জানলে তো! ছেলেপুলের কাছে তুমুল প্যাঁক খেয়ে চোখমুখ লাল করে সেই ইসলামিস্ট বুঝিয়ে দেয় যা এই স্লোগানের উত্তরে আল্লাহু আকবর বলাটাই নিয়ম। তারপর আব্বার চেঁচিয়ে ওঠে ‘কবীরন কবীরা”। দুই একজন মিনমিন করে বলে ওঠে ‘আল্লাহু আকবর’। প্রোগ্রাম সুপারফ্লপ হবার পর এক বছর ধরে সেই ছোকরা আওয়াজ খেতে থাকে গ্রামের অন্য ছেলেপুলের কাছে। ততদিনে কিন্তু ধর্মের হাত ধরে রেজিস্টান্স পৌঁছে গেছে কাশ্মীরের ঘরে ঘরে। পণ্ডিতদের মাস এক্সোডাস ঘটে গেছে, শ্রীনগরের রাস্তা উজিয়ে উঠছে আজাদ কাশ্মীরের দাবীতে, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে নিখোঁজ এবং ঘরছাড়া। কিন্তু জীবন যেখানে যেটুকু চেটেপুটে নেবার, নেবেই। আগ্নেয়গিরির চূড়ায় বসে পিকনিক করার নাম-ই কাশ্মীর, বারবার মনে করিয়ে দেয় এই বই। ... ...

দিল্লী থেকে ফিরে এসেছি অনেকদিন হয়ে গেল। এর মধ্যে আমেরিকায় গে ম্যারেজ লিগাল হয়ে গেছে। সামাজিক সাম্যের লক্ষ্যে একটা বড় পদক্ষেপ। কিন্তু অনেকেই বলছেন যে এটা একটা আপাত সাম্য, হেটেরোনর্মাটিভ সমাজের ছুঁড়ে দেওয়া রুটির টুকরো। অনেকে মনে করছেন, সম্পর্কের বহু রঙ কে অস্বীকার করে এটাও একধরনের চাপিয়ে দেওয়া কপি পেস্ট। আমেরিকার সুপ্রীমকোর্টের রায়ের শেষ অনুচ্ছেদ পড়লে তাদের বক্তব্যকে অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ওই রায়ে বলা হচ্ছে, “No union is more profound than marriage, for it embodies the highest ideals of love, fidelity, devotion, sacrifice, and family. In forming a marital union, two people become something greater than once they were.” অর্থাৎ, বিবাহের থেকে গভীর আর কোনো সম্পর্ক নেই। আমার প্রশ্ন, কি করে কোনো তৃতীয় ব্যাক্তি ঠিক করে দিতে পারে কোন সম্পর্কটা প্রোফাউন্ড আর কোনটা নয়? কোন নিক্তিতে মাপা যেতে পারে, সুখের ভালবাসা কার জন্য বেশী গভীর, আমার জন্য না কি তার নতুন প্রেমিকের জন্য? অবয়বহীন ভালবাসার কি গভীরতা মাপা যায়? যারা ভাবতে পারেন “বিয়ের প্রয়োজন যার হয় তার হয়, আমার হয় না”, তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা মাপতে যাওয়ার আমরা কে? ... ...