
- এক থাপ্পড় লাগাব অসভ্য মেয়ে, সিনিয়ারদের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় জাননা ?
- যাব্বাবা, আমি কোথায় ভাল মনে বলতে গেলাম, তোমার জীন্সটা ফ্যান্টা, আর তুমি চমকে দিলে ? দেখ, সিনিয়ার বলে অত এয়ার নিওনা, মোটে তো দুবছরের বড় –
- চমকে দিলাম আবার কী ভাষা, ঠিক করে কথা বল। আমাকে কী বলে ডাকলে তুমি ? আমার নাম শুচিস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ছোট করে, স্মিতা। বুঝলে ?
- কী করে জানব দিদিভাই, দুনিয়ার লোক তোমায় শ্যামা বলে ডাকে শুনি, তাই আমিও বললাম, শ্যামাদি। খুব অন্যায় করেছি না? পায়ে ফায়ে ধরতে হবে নাকি?
নাম জিনিষটা খুব ডেঞ্জারাস। একবার রটে গেলে কোথা থেকে কোথায় চলে যায় কেউ বলতে পারেনা। এই যে সমাদ্দার সাহেব, কোথায় হ্যামিলটনগঞ্জ বলে নর্থ বেঙ্গলের এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বদলি হয়ে এলেন। ওঁর বাড়িও ঐদিকেই। কিন্তু এতদূর এসেও নিস্তার নেই। নতুন জায়গায় জয়েন করার পর এক হপ্তাও কাটেনি, কেবিন থেকে হলে বেরোলেই চার দিকে আওয়াজ, ভুতো - ভুতো – প্রথম প্রথম একটু সন্দেহ ছিল, এরা কি আমায় বলছে? যাঃ, সে নাম এতদূরে বারাসতে লোকজন জানবে কী করে – কোথায় উত্তরবঙ্গের হাসিমারা আর কোথায় চব্বিশ পরগনার বারাসত। কিন্তু সন্দেহ নিরসন হল অচিরেই। অবশ্য সমাদ্দার সাহেবের সঙ্গে শুচিস্মিতার কোনও পরিচয় নেই, কোনও সম্পর্কও নেই। একটাই কমন ফ্যাকটর – বারাসত।
ক্ষুদিরাম পল্লী থেকে বারাসত কলেজ কতই বা দূর, যাতায়াতেরও সুবিধে। কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা আছে। সেদিন ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েটার ওপর রেগে গিয়ে দুকথা বলায়, হ’ল আরো বিপদ। চতুর্দিকে এত ‘শ্যামাচরণ’ গজিয়ে গেল, যে কলেজ যাওয়াই এখন মুশকিল। ঐ যে, সেকেন্ড ইয়ারের হিস্ট্রির দেড়েলটা, হৃদয়পুর না কোত্থেকে যেন আসে। সেদিন হেঁড়ে গলায় শুরু করল, নেচে নেচে আয় মা স্যামাআআ – আমি মা তোর সঙ্গে যাব। স্মিতার কান ফান লাল হয়ে গেল। কিন্তু যেদিন ব্যাটাচ্ছেলে আরও এক ধাপ আওয়াজ তুলে শুরু করল, স্যামা মা কি আমার কালোরে, স্যামা মা কি আমার কালো – কালো রূঊঊপে দিগম্বোরি হিদিপদ্দো করে মোর আলো – স্মিতা ছুটে কলেজ থেকে বেরিয়ে এল।
স্মিতা বলল, বাপি, আমায় কোলকাতার কলেজে ভর্তি করে দাও, ইয়ার লস হলে হবে। বাপি বললেন, সেকিরে, তুই কোলকাতায় যাবি পড়তে ? মরে যাবি মা, ট্রেনে এখন কুম্ভমেলার ভিড়। জনসংখ্যা কী হারে বেড়েছে তুই জানিস ? আবার ট্রেন থেকে নেমে বাস। সরাসরি বাসেও অবিশ্যি যাওয়া যায়, কিন্তু তুই পারবিনা মা। মা বললেন, সব নষ্টের গোড়া তুমি। ‘শ্যামাপোকা’ নামটা কে দিয়েছিল শুনি? এখন সাধু সাজছ ? বাপি বললেন, আহা সে তো আমার আদরের নাম, সেটা সবাই জানবে কেন। কিরে মা, তোকে সবাই শ্যামাপোকা বলে নাকি? স্মিতা বলল, চুপ কর বাপি, পোকা ফোকা বলেনা এখন। কিন্তু বাকিটাই বা বলবে কেন। আমি বারাসত কলেজে পড়বনা ব্যাস।
মা বললেন, তোমার জন্য মেয়েটার কী সব্বোনাশ হ’ল বল দেখি। ওই রকম বিদ্ঘুটে নাম কেউ দেয় ? বাপি বললেন, কী আশ্চর্য, সে তো কোন ছোটবেলায় ও আলো দেখলেই ছুটে আসত বলে আমি আদর করে ডাকতাম। তোমার মনে নেই, সেবার ভাগলপুর থেকে বড়দি এল। বাংলার তেল মশলা সহ্য হয়নি, রাত্তিরে বারো চোদ্দবার বাথরুম গেছে। তা যতবার ওঘরের আলো জ্বলে আমার শ্যামাপোকা ততবার জেগে উঠে বারান্দায় বেরিয়ে যায়। মা বললেন, থামবে তুমি? আবার সেই অলুক্ষুণে নাম। মেয়েটা এক্ষুণি কেঁদে ভাসাবে। দরকার নেই ওর এখানে পড়ে। ও কোলকাতাতেই পড়বে।
কোলকাতার কলেজে এসেও কি শান্তি আছে ? সেদিন জিসেক অর্চনাদি বলল, অ্যাই শুচিস্মিতা, তুমি নাচতে পার? এবার আমাদের সোশালে কবিগুরুর ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য হচ্ছে, তুমি নাচবে তো ? প্রশ্নটা মোটেই ইনোসেন্ট নয়। অর্চনাদির মুখটা যে ফিচেল ফিচেল ছিল, তা ঠিক চোখে পড়েছে। স্মিতা সেদিন বাড়ি ফিরে বলল, বাপি, আমি আর পড়বনা। আমার বিয়ে দিয়ে দাও।
ব্যানার্জিবাবু বললেন, বিয়ে? সে তো খুব ভাল কথা মা, কিন্তু একটাও পাশ দিবিনা ? না না, তোকে চাকরি করতে হবে তা বলছিনা, তবে ইয়ে, মানে পাত্রপক্ষও তো আজকাল একটু লেখাপড়া চায়। তুই না হয় আবার কলেজ বদল করে – স্মিতা বলল, তুমি আমার বিয়ে দেবে কিনা। হ্যাঁ আর দেখো, পাত্র যেন প্রবাসী হয়। আমি ওয়েস্ট বেঙ্গলে থাকব না।
সাত সকালে দরজায় টিংটং। ব্যানার্জীবাবু হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলেই দেখেন হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা একটা মোটাসোটা হাসিহাসি মুখ। কে, কী বৃত্তান্ত, এসব জিজ্ঞেস করার আগেই বলে কিনা, ও মশাই, আপনার মেয়েটাকে আমার চাই। ব্যানার্জীবাবু একটু ঘাবড়েই গেলেন, বারাসত আজকাল জায়গা ভাল নয়। প্রায় রোজই কাগজে চোখ কপালে তোলা খবর। ভাগ্যি ভাল মেয়েটা কলেজ যাওয়া বন্ধ করেছে। না ফেরা ইস্তক যা চিন্তা – কিন্তু এরকম মোটাসোটা হাসিমুখ হাফবুড়ো কিডন্যাপার ? লোকটাকে কোনওদিন বারাসতে দেখেছি বলেও তো মনে হচ্ছেনা।
ব্যানার্জীবাবু ছ’খানা মাদুলি বাঁধা সিড়িঙ্গে হাতে বাইসেপ্স খুঁজে পেলেননা। স্যান্ডো গেঞ্জির ফাঁক দিয়ে তেত্তিরিশ ইঞ্চি বুকটাকে ফুলিয়ে ছত্তিরিশ করতে গেলেন, তাও হ’লনা। তবে কথা হ’ল, নিজের বাড়ি, এটা নিজের পাড়া, তার ওপর দিনের বেলা, মামদোবাজি নাকি? – কি ক্কি ক্কি ব্যাপার কী, মেয়েটাকে চাই মানে ? কী ভেবেছেন কী, দেশে আইন কানুন সব উঠে গেছে নাকি? যদিও এ ব্যাপারে খানিক সন্দেহ নিজেরও ছিল, তবু বললেন, সাহস তো কম নয় – মোটা লোকটা বলল, সে আপনি যাই বলেন, মামনিকে আমি নিয়ে যাবই। আজ প্রিলিমিনারি কথাবার্তা বলে গেলাম। আর একদিন আসব চা খেতে।
আবার চা খেতে আসবে বলছে। শ্যামাকে, থুড়ি স্মিতাকেই বোধহয় মামনি বলল, কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছেনা। ব্যানার্জীবাবু বললেন, তা সে চা নাহয় আজই খেয়ে যান, কিন্তু ব্যাপারটা – লোকটা বলল, আমি সমাদ্দার, ব্লক অফিসে সবে চার্জ নিয়েছি। আজ চাপাডালির মোড়ে বাস থেকে নামতে গিয়ে কাদা ভর্তি গত্তে পা পড়ে কি আছাড়টাই না খেলাম। চশমাটা কোথায় চলে গেল, কিচ্ছু দেখতেও পাচ্ছিনা, হঠাৎ দেখি একটা মেয়ে এসে আমায় তুলে ধরল, ওড়না দিয়ে কাদা মুছিয়ে দিল, আবার ডাক্তারখানায় নিয়ে গিয়ে ব্যান্ডেজ – না মশাই এ মেয়ে আমার চাই। তাবলে ছেলে আমার ফ্যালনা নয়, রীতিমত আর্কিটেক্ট, বরোদায় পোস্টেড। এই বৈশাখেই –
বাড়ি বয়ে সম্বন্ধ ? আবার এই মেয়েই চাই ? ওদিকে মেয়ে যেমনটি বলেছিল, ছেলে ওয়েস্ট বেঙ্গলের বাইরে – কার মুখ দেখে উঠলাম আজ, কিন্তু – কিন্ত, আমতা আমতা করে ব্যানার্জীবাবু বললেন, ইয়ে, মানে আজকাল এগুলো অনেকে মানেনা, তবে আমাদের আত্মীয়স্বজন একটু গোঁড়া বুঝলেন, মানে সমাদ্দার ফমাদ্দার – মোটা লোক রেগে গেল। ফমাদ্দার মানে? এইযে, এটা কী ? বলে জামার তলা থেকে খামচে একটা তেলচিটে পৈতে বের করল। নির্ভেজাল বামুন মশাই, রীতিমত ভরদ্বাজ। আপনি তো শান্ডিল্য, ওহ্একেবারে রাজযোটক মশাই। ব্যানার্জীবাবু তবু বললেন, ইয়ে মানে, এদেশি রাঢ়ী ফাঢ়ী নয় তো? সমাদ্দার বললেন, আরে মশাই ঢাকা অর্জিনাল। এই বৈশাখেই কিন্তু –
সমাদ্দার জুনিয়রের ভাল নাম অলকেন্দু, ডাক নাম আলো। জামাই দেখে তো ব্যানার্জী পরিবার থ। এতো সত্যি আলো করে আছে গো, আমাদের মেয়ের চেয়েও তো জামাই দেখতে ভাল। জামাইয়ের ছুটি শেষ, বরোদায় উড়ে গেল তারা। সেখানে আলোর সারাদিন কাজ আর কাজ, স্মিতার সময় আর কাটতে চায়না। বেশ রাত করেই ফেরে আলো। স্মিতা দৌড়ে গিয়ে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আদর খায়। দুষ্টুমি করে জামাই বলে, ও, আলো দেখলেই দৌড়ে আসো, তুমি আমার শ্যামাপোকা।
- খি ? খি ভললে থুমিঃ ? খি ভললেঃ ? নাকের পাটা ফুলে আছে, স্মিতা ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে – ছিটকে সরে যায়। আমি কালই বারাসত চলে যাব। এক সপ্তাহের মধ্যে উকিলের চিঠি পাবে তুমি – পেছন পেছন আলো দৌড়য়, আরে আরে হ’লটা কী, কী এমন বললাম – দড়াম করে মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। নাও এবার সোফায় ঘুমোও।
ব্যানার্জীবাবু বললেন, কিন্তু মা, সেই নামটা তো আলোর জানার কথা নয়, বরোদার লোক বারাসতের নাম জানবে কেমন করে, ওটা ও কিছু না ভেবেই – স্মিতা বলে, তুমি চুপ কর। আমার শ্বশুরের নাম ভুতো তুমি জান ? হ্যামিল্টনগঞ্জের নাম বারাসতের লোক জানল কী করে ? তুমি একটা ভাল উকিল দেখ। ব্যানার্জী বাবু বললেন, কী বিপদ, একটা বিয়ে দিতেই তো প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্ধেক বেরিয়ে গেল। যদি আবার দিতে হয় – আচ্ছা তুই না হয় ক’দিন একটু ভেবে নে। স্মিতা বলল, ভাবার কিছু নেই। তুমি উকিল ডাক, ডিভোর্সের কারণ দেখানো হবে, মেন্টাল টর্চার। ব্যানার্জীবাবু বললেন, কাউকে শ্যামাপোকা বললে মেন্টাল ইয়ের কেস দাঁড়াবে? মানে, আমিও ও তোকে আদর করে শ্যামাপো – স্মিতা দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
আট দিনের দিন একটা ফোন এল স্মিতার মোবাইলে –
- স্মিতা ফোন অন করল। ওদিক থেকে -
- হ্যালো – হ্যালো –
- এদিকে চুপ।
- হ্যালো, আমি আলো বলছি –
- হ্যাঁ দেখা যাচ্ছে, নামেই সেভ করা আছে।
- সাত দিন তো কেটে গেছে, উকিলের চিঠি পাইনি।
- এদিকে চুপ।
- ভাল উকিল কি পাওয়া গেছে? আমার চেনা একজন ছিলেন –
- ইয়ার্কি হচ্ছে? ফোন কেটে দেব কিন্তু –
- বলছি কি, চলে এলে হ’তনা? এখানে এসেও তো সেপারেশন চাওয়া যায়।
- আমার ভাল লাগছেনা –
- ভাল কি আমারই লাগছে –
- যদি ফিরে যাই, কী নামে ডাকবে আমায় ?
- ওই যে, আলোর সঙ্গে যে নাম ওতপ্রোত না কি যেন বলে, -শ্যামাপোকা -
স্মিতা গিয়ে বলল, বাপি আমায় প্লেনের টিকিট কেটে দাও প্লীজ, একটু খরচা হবে তোমার। তা দুবার বিয়ে দেয়ার চেয়ে তো অনেক কম।
রূপঙ্কর সরকার | ২০ এপ্রিল ২০১৩ ১২:১৩76006
kumu | ২০ এপ্রিল ২০১৩ ১২:২৬76007
সুকি | ২০ এপ্রিল ২০১৩ ১২:২৯76000
শুদ্ধ | ২৪ এপ্রিল ২০১৩ ০১:৫৩76009
রূপঙ্কর সরকার | ২৪ এপ্রিল ২০১৩ ০৫:০৩76010
jhumjhumi | ২৪ এপ্রিল ২০১৩ ০৫:১৯76011
রূপঙ্কর সরকার | ২৫ এপ্রিল ২০১৩ ০৪:১৭76012
Zink | ২৭ এপ্রিল ২০১৩ ১১:২২76013
রূপঙ্কর সরকার | ২৮ এপ্রিল ২০১৩ ০৫:২৪76014
কৃশানু | ২৮ এপ্রিল ২০১৩ ০৫:৩৯76015
Zink | ২৮ এপ্রিল ২০১৩ ০৫:৪৬76016
brc-slg | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০১:০৪76022
দ | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৪:১৫76023
রূপঙ্কর সরকার | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৫:৩৯76024
Zink | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৫:৫৬76025
কৃশানু | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৬:৪২76026
Zink | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৬:৪৯76027
কৃশানু | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:০১76028
রূপঙ্কর সরকার | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:০২76029
Zink | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:১২76030
কৃশানু | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:২০76032
Zink | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:২০76031
রূপঙ্কর সরকার | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:২৪76035
Zink | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:২৪76034
pi | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:২৪76033
Zink | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:২৬76036
Zink | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:৩০76037
কৃশানু | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:৩৩76038
কৃশানু | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:৩৫76039
pi | ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ০৭:৩৬76040