
২ নম্বর মিথকথাঃ সহবাস সম্মতির বয়স কমিয়ে ১৬ করা হলে ধর্ষণ,বেশ্যাবৃত্তি ও নারী চালান আরো বেড়ে যাবে। ঘটনাঃ এই সম্মত সহবাসের আইনী বয়স কিন্তু ১৬ বছরই ছিল, সেই ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু করে একটানা ৩০ বছর। হঠাৎ করে, মাত্র নয় মাস আগে, কোনো রকম আলাপ, আলোচনা বা বিতর্কের মধ্যে না গিয়েই সরকার একটি নতুন আইন চালু করেন, Protection of Children from Sexual Offences Act, May 2012 নামে এবং কলমের এক খোঁচায় সম্মতির বয়স বাড়িয়ে ১৮ করে দেন। JVC কমিটি এই সংশোধনী ধারাটির বিরোধিতা করেন ও সম্মতিসুচক সহবাসকারীদের অযথা দণ্ডনীয় অপরাধী হিসেবে গণ্য না করার সুপারিশ করেন। না, সম্মতিসুচক সহবাসের বয়স ১৬তেই ধরে রাখার মানে এইই নয় যে অল্প বয়সে বা বিয়ের আগেই যৌনসংসর্গকে অনুমোদন করা বা উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কোনো ভাবেই এই আইন অপ্রাপ্তবয়স্কদের কোনো শিক্ষা দিচ্ছে না। বরং এই আইন মোতাবেকে এইটাই ঘটছে যে, সম্মতিসূচক সহবাসের জন্য কোনো কিশোর কিশোরীকেই তৎক্ষণাৎ অপরাধী মেনে গারদে ঢোকানো হচ্ছে না। এই ‘সম্মতির বয়স’এর মানে এইটাই যে কোনো কোনো কিশোর বর্তমানে ১৮ বছরের কমবয়েসি কোনো মেয়ের সাথে সহবাস করলেই সে অপরাধী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এবং ঘটনাটিকে বিধিসম্মত ভাবে ধর্ষণের আওতাতেই ফেলা হচ্ছে। ভারতীয় সমাজ আদৌ চায় না যে এইসব অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েদের সম্মতিসূচক যৌন সংসর্গের জন্যও অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হোক বা কোনো কিশোরকে এইজন্য ধর্ষক হিসেবে সাজা পেতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক তরুণই এর ফলে জেলে যেতে পারেন। কেউ কোনো নালিশ ঠুকলেই এইসব ছেলে মেয়েরা শুধুমাত্র সম্মত সহবাসের দরুনই গারদে বা কোনো ‘হোম’এ আটকা পড়ে যাবে। ... ...

সম্প্রতি অমর্ত্য সেন আনন্দবাজারে ও এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলে খাদ্য ও পেট্রোপণ্যে ভর্তুকি নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।দুটো সাক্ষাৎকারের ব্যাপ্তিই ভর্তুকির বাইরে গেছে। তবে আমরা এই আলোচনায় কেবল ভর্তুকিতে নজর রাখব। তার কারণ কেন্দ্রীয় সরকার ডিজেলে ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেবে, মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়া সেরকম ইঙ্গিত দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, সংসদে খাদ্য নিরাপত্তা আইন পেশ করা হবে, এরকম একটা গুজব শোনা যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা আইনের ভর্তুকির চাপ নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে। ... ...

অনভ্যস্ত ফার্স্ট ইয়ার আমাদের পক্ষে বুঝে ওঠা সত্যিই কষ্টকর যে ইউনিয়ন না থাকা মানে দিন দিন আমাদের কথা বলার ন্যূনতম অধিকার চলে যাওয়া। প্রেসিডেন্সির ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য সাতচল্লিশ থেকে সত্তর পেরিয়ে আজও প্রাসঙ্গিক, তাকে রক্ষার দায় যদি নাও বোধ করি, তাও, নিজেরা হেসেখেলে নিজেদের ক্যাম্পাসটায় বেঁচে থাকার জন্যই বোধয় একটা সুস্থ স্টুডেন্ট’স বডি প্রয়োজন। যা হচ্ছে হোক যদি চলতে থাকে, তেমন হাল হবে নাতো, নীম্যোলার যেমন বলে গেছিলেন, ওরা যখন ধরতে আসবে তখন কেউই থাকবে না যে প্রতিবাদ করবে . . ... ...

অবশ্য আরও একটা কারণও থাকতে পারে। এত অস্থির হবার। আসলে সব ছাপিয়ে আরও একটা কথা মনে পড়ছে। মেয়েটা সেই রাতে সিনেমা দেখে ফিরছিল। লাইফ অফ পাই। সে তো আমিও এই সেদিন দেখে এলাম। বৌ-বাচ্চা নিয়ে। পপকর্ন খেলাম। আমার পরিচিত মেয়েটি, মেয়েরা, অনেকেই তো দেখেছে, যারা দেখেনি দেখবে সিনেমাটা। কে জানে কোনদিন তাদের কেউ খবরের কাগজে "ধর্ষিতা" হয়ে যাবে কিনা। নাম অবশ্য জানা যাবেনা এই বাঁচোয়া, কারণ, আব্রু রক্ষার্থে সেসব আমরা চেপে রাখতে জানি। আমরা ভদ্র ও সভ্য হয়েছি। লোকলজ্জা থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা ভিক্টিমের নাম মিডিয়ায় উচ্চারণ করিনা। আমাদের ধর্ষিতাদের কোনো নাম হয়না। ... ...

সরকার কোনও চেষ্টা করে নি আমজনতার মধ্যে এই ক্ষোভ প্রশমিত করার। নিজের নিজের নিরাপদ সিকিওরিটির ঘেরাটোপের মধ্যে তাঁরা ব্যস্ত থেকেছেন ধর্ষণ সংক্রান্ত বিল নিয়ে কবে আলোচনায় বসা যায়, তাই নিয়ে, কিংবা অন্য কোনও বিষয় নিয়ে। সরকারপক্ষের এই নীরবতাই এক বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল গত বাইশ আর তেইশে ডিসেম্বরের বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের। গত শনিবার সকাল থেকেই দেখেছিলাম দলে দলে ছেলেমেয়ের দল, যাদের বয়েস সতেরো থেকে পঁচিশের মধ্যে, দলে দলে চলেছে ইন্ডিয়া গেটের দিকে। কোনও নেতা ছিল না তাদের। নিজেরাই চলেছিল। হাতে ব্যানার, পোস্টার, তাতে কালো আর লাল অক্ষরে লেখা তাদের ঘৃণা আর ছিছিক্কারের ভাষা। এর আগেও দিল্লির রাস্তায় ছাত্রদের, যুবকদের, এনজিওদের মিছিল দেখেছি, সেই মিছিলের মুখগুলো আমার লাগত এক রকমের। বিষয় হয় তো কোনও ঘটনা বা নিয়মনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কিন্তু প্রতিবাদের আগুন থাকত না মিছিলকারীদের চোখেমুখে। সামনের লাইনের দু তিনজন শ্লোগান বা “নারা-বাজি”তে ব্যস্ত থাকতেন, বাকি পেছনের সারির লোকজন নিজেদের মধ্যে হাসি তামাশা করতে করতে পথ হাঁটতেন। কখনও সামনে মিডিয়ার ক্যামেরা দেখা গেলে সোৎসাহে হাত নেড়ে নিজের অস্তিত্ত্ব প্রকাশ। মিছিলের মুখপাত্র যখন রাগী রাগী মুখ করে নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করতেন বাড়ানো মাইক্রোফোনের সামনে, তখনও ব্যাকড্রপে দেখা যেত অগুনতি উৎসাহী মানুষের হাসিমুখ আর তাদের হাত নাড়া। আমরা সবাই টিভিতে অনেক দেখেছি এই ধরণের ক্লিপিং। এই প্রথম, গত শনিবারে, একটা নয়, অন্তত তিন চারটে মিছিল দেখলাম, কমবয়েসী ছেলেমেয়ের দল, তাদের কারুর মুখে হাসি নেই, নিজেদের মধ্যে ঠাট্টাতামাশা নেই। গনগনে রাগ মুখে মেখে তারা চলেছে ইন্ডিয়া গেটের দিকে। হাতে পোস্টার। ... ...

অসুস্থ সভ্যতার চিকিৎসা চাই -- কিছু জমায়েতের টুকরো টাকরা ... ...

জনসচেতনতা থেকে কী ভাবে জন-আন্দোলন গড়ে ওঠে তার অভিনব নিদর্শন পাওয়া যায় এখানে—শুরু থেকে শহীদ হাসপাতালের প্রচারের বর্ষামুখ ছিল ডায়রিয়ায় মৃত্যুর বিরুদ্ধে। এই প্রচারে জনসাধারণ ডায়রিয়া-প্রতিরোধে যথাযথ পানীয় জলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হন। ছত্তিশগড় মাইন্স শ্রমিক সংঘ ও ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা এই সচেতন মানুষদের নিয়ে পানীয় জলের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলে তার চাপে ১৯৮৯-এ স্থানীয় প্রশাসন ও ভিলাই স্টীল প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ দল্লী-রাজহরা ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে ১৭৯টা নলকূপ বসাতে বাধ্য হয়। ... ...

এটা ধর্মের ব্যাপার নয় - এটা পুরোটাই ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। ধর্ম এখানে একটি অজুহাত মাত্র। যদি এই লোকগুলি নিরীশ্বরবাদী হতো তাহলেও এই হিংসার ঘটনা ঘটতো। এই সব হিংসার জন্য শুধু ধর্মকেই দায়ী করতে গিয়ে তারা ভুলে যাচ্ছেন যে মানুষকে নিজের দখলে আনতে হলে সব ইডিওলজিকেই হিংসার পথ ধরতে হয়েছে, অবশ্যই ধর্ম তার থেকে বাদ নেই। এটা শুধু কোনো ধর্মের দোষ নয়।নিশ্চয়ই এটা নিয়ে তর্ক ও আলোচনার সুযোগ রয়েছে কিন্তু শুধু ধর্মকে কাঠগড়ায় চাপালে মূল কারণটাকে আমরা বাদ দিয়ে ফেলব। বিশেষত; যখন আমাদের বোঝাতে হবে পাকিস্তানের আম জনতাকে যে এটা আমাদের এক যুদ্ধ। যেটা পরিষ্কার করে বলতে হবে যে টিটিপি যা করছে তা ধর্ম নয়, এটা ধর্মের বিকৃতি। আরো যেটা বোঝানো জরুরি যে টিটিপি এখন ধর্মকে ব্যবহার করছে, কেন না সেটা এখন তাদের পক্ষে সুবিধাজনক। ... ...

পৃথিবীর সমস্ত রবিবারেরাই খুব বুদ্ধিমান। কেননা একমাত্র তারাই মানুষকে অনেকটা সময় ধরে দেখে। একটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস। ঘুম ভাঙার মধ্যে দিয়ে দেখা শুরু হল। তারপর,মানুষটার সমস্ত একাত্মতায়,নিজস্বতায়,ভাবালুতা এবং আবেগ বর্জিত বাস্তবতা ও কাজের মধ্যে দিয়ে এই দেখাটা চলতেই থাকল। এভাবেই মানুষদের সবচেয়ে বেশি করে চিনে নিল রবিবার। সমস্ত দুর্বলতা ও খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে জেনে নিল আমরা কে কেমন,আমাদের বেঁচে থাকা,একাকিত্ম, ও নিজস্ব অভিনয়গুলো ভাল না খারাপ। আমরা এত কিছু বুঝলাম না। শান্তি ও আনন্দ ভেবে নিতে রবিবারই সবচেয়ে প্রিয় হল আমাদের। আর,সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর থেকে ভাললাগা,খারাপ লাগা ধার নিয়ে ক্রমশ তরল,অজৈব এবং জলীয় হয়ে উঠল সে। ফেসবুক তোলপাড় করছে একটা ছবি। মালালা ইউসুফজাই। তার শরীরে ঢাকা দেয়া চাদরটা রক্তে ছোপানো। মাথায় পট্টি। শুয়ে রয়েছে চোদ্দ বছরের বিদ্রোহী বাচ্চা মেয়ে। এক বন্ধু ছবি দেখে বলল,এই পরিস্থিতিতে আমরা এই রকম হতে পারতাম না। সাহসে কুলাতো না। আমরা এ'রকম হতে পারিনা। সবাই সবকিছু পারেনা। তবে আজকাল জানতে ইচ্ছে করে যে আমরা কী পারি। ধর্ষণে ধর্ষণে ক্লান্ত পশ্চিমবঙ্গ! মেয়েদের ওপর অত্যাচারে,বধূহত্যায়,ভ্রূণহত্যায় -সবখানেই আমাদের পা। বছর দুই আগে সল্টলেকে এক আইটি ইঞ্জিনিয়ার দুর্ঘটনায় মারা গেলেন -অফিস থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে - অনেক মানুষ ঘিরে দাঁড়িয়েছিল,কেউ জলটুকুও দেয়নি। ক'দিন আগে পুলিশের ডাকাতি করার গল্প পড়লাম। কই,আমাদের তো মেরুদন্ডে কোথাও কোন শিরশিরানি নেই। এই কলকাতাই আমার কলকাতা নাকি ! চিনতে পারিনা কেন তবে! চিনবার চেষ্টাটা আসলে একটা আশ্রয়ের খোঁজ - বয়স হচ্ছে তো। বয়স হচ্ছে ভেবে নিলে একটা সুবিধাও আছে - পরের প্রজন্মের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো যায়। ... ...

বামপন্থী দলগুলোও স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে আন্দোলনের বিষয় হিসেবে নিয়েছেন এমনটা নয়—অথচ বহু ডাক্তার বামপন্থী দলগুলোর সদস্য বা সমর্থক হিসেবে ছিলেন বা আছেন। তাঁদের কাছ থেকে উচ্চ হারে লেভি নেওয়া, তাঁদের দিয়ে সংগঠনের সদস্য-সমর্থকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করানো, কখনও সখনও তাঁদের দিয়ে আন্দোলনের সময় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় চিকিৎসা শিবির চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে দলগুলো। তাঁদের স্বাস্থ্য আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে ব্যবহার করা হয় নি বললেই চলে। স্বাস্থ্য ভিক্ষা নয়, অধিকার—সেই অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে হবে—এই ধারণা থেকে আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে ৭০ দশকের মাঝামাঝি, ৮০-র দশকের শুরু থেকে। ভারতের নানা কোণে চলা এই সব আন্দোলনগুলো নিয়ে এই আলোচনা—উদ্দেশ্য আন্দোলনগুলোর ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’-এর লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। ... ...

আসলে, নিজের জীবনের বাইরে একটা লাইন-ও না লেখার সমস্যা এটাই। এক সময়ে ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তির আবর্তে বাঁধা পড়তে হয়। সেটাকে তখন চালাতে হয় ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে। নাহলে 'রুবি কখন আসবে' লেখার পরে 'এখন আমার কোনো অসুখ নেই' লেখার কোনো মানে হয়না। পাড়ার বেকার ছেলের সাথে কিশোরী কন্যার পালিয়ে যাবার কাহিনি 'কুকুর সম্বন্ধে'তে লিখে দেবার পর 'রিক্তের যাত্রায় জাগো'তে লেখার দরকার পড়ে না। তাও এক-ই রকম ভংগীতে। 'স্বর্গের নির্জন উপকুলে' উপন্যাসটাই অদরকারী হয়ে পড়ে। আবার 'কুকুর সম্বন্ধে' আর 'আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি' লেখার পর 'ভারতবর্ষ' লেখার কোনো দরকার পড়ে না। যদিও বুট পরা শ্রীরামচন্দ্রের পদধ্বনি নিয়ে না লিখলে সমাজ সচেতন হওয়া যাবে না, বা ব্যর্থ বিপ্লব নিয়ে না লিখলে, এরকম ভাবনা অপরাহ্নের সন্দীপনকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল কিনা জানি না। 'হিরোশিমা মাই লাভ'কে অনেকে সন্দীপনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে, কেন জানা নেই। সেটা কি এই কারণে যে একমাত্র এই উপন্যাসেই রাজকুমারের তরবারী নামিয়ে রেখে চলিত জং ধরা সাহিত্যভাষার অনেক কাছাকাছি এসেছিলেন, যাতে মানুষ আইডেন্টিফাই করতে পারে সহজে? আর, এই সম্ভাবনার কথা মাথায় আসলে সন্দীপন নিজেই হয়ত মাথায় কালির দোয়াত ঠুকে আত্মহত্যা করতেন। ... ...

এভাবে চলতে চলতে একদিন চাঞ্চল্যকর একটি তথ্য প্রকাশ পায়। ফুটোস্কোপ যেহেতু পূর্বজন্মের উদ্ভাবিত আগলপাগল তত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং তদানিন্তন প্রযুক্তি যথেষ্ট কুশলী নয়, ওটিতে ব্যবহৃত একটি লেন্স যথেষ্ট মজবুত ভাবে লাগেনি, ফলে ওটি খসে যায়। পরজন্মের যন্ত্র ব্যাপারি পরজন্মোচিত তত্পরতায় লেন্সের স্থলে একটি ভাঙ্গা আয়নার টুকরো বসিয়ে দেয়ে। পরজন্মের অবজার্ভার পরজন্মোচিত আচরনবিধি অনুসারে আনুপুঙ্খিক নিরীক্ষণ ছাড়াই যন্ত্রটি বীক্ষণের কাজে ব্যবহার করেন। ফলত মননগ্রামটি পরজন্মের প্রতিবিম্ব হয়ে পড়ে। এই অবসরে কটি জীববৈজ্ঞানিক সংকেত পরিচিত হওয়া যাক। ক) হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স : হসস, খ) হোমো স্যাপিয়েন্স সুপিরীয়রো : হসসু, গ)পূর্ব জন্ম : পূজ, ঘ)পরজন্ম : পজ। যাই হোক হোসসু-এর আবির্ভাব বিষয়ে সুমেরিকার জ্ঞানী সমাজে কোনোও দ্বন্দ্ব নেই, শুধু নথি হিসেবে মননগ্রামের একটি অনুলিপি রাখা দরকার। ডেড লাইনও নির্দ্দিষ্টকৃত। ফুটোস্কোপ মেরামতির পরিকল্পনাও শেষ। সে বিশদ অন্যত্র। ইতিমধ্যে পূজ-র সাপুরে খবরওলা যে খেলা দেখাতে এসে পজ-কে খবর সরবরাহ করত, পজর আদালত তাকে জেলে পাঠিয়েছেন। নির্বিষ রাখা পজ-এ জামিন অযোগ্য অপরাধ। কার্য্যত ঝাঁপি বন্ধ আজ। ... ...

এবার শুরু নতুন ধারার শ্রমিক ইউনিয়ন তৈরীর কাজ। এ যাবৎ ট্রেড ইউনিয়ন বলতে লোকে বুঝত শ্রমিকদের আর্থিক দাবী-দাওয়া আদায়ের সংগঠনকে, যা বেতনবৃদ্ধি-বোনাস-ছুটি-চার্জশিটের জবাব ইত্যাদি নিয়ে আন্দোলন করার সংগঠন। অর্থাৎ ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিক-জীবনের এক-তৃতীয়াংশ, আট ঘন্টার সংগঠন, যে আট ঘন্টা শ্রমিক কলে-কারখানায় কাটান। নিয়োগী শ্রমিকদের খন্ড-বিখন্ড মানুষ হিসেবে দেখতেন না, দেখতেন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে, যে মানুষ উৎপাদনের কাজ ছাড়াও পরিবারে-সমাজে থাকে—খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের সমস্যা, নিজের অবসর বিনোদন, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার জন্য যাকে ভাবতে হয়, যাকে সম্পর্ক রাখতে হয় সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে। নিয়োগীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন ইউনিয়নের কর্মসূচীতে সামিল হল আর্থিক দাবীর লড়াইয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্য-শিক্ষা-সংস্কৃতি-পরিবেশ-ইতিহাস চেতনা-নারী মুক্তি-সমাজের অন্যান্য শোষিত অংশের মুক্তি, নিপীড়িত জাতিসত্ত্বার মুক্তির মত বিষয়গুলি। ... ...

এই বাহাত্তর সালেই বরফির সাথে শ্রুতি ঘোষ, অধুনা মিসেস সেনগুপ্তের দেখা। দার্জিলিংয়ের রাস্তার। বরফি তখন দামাল দস্যি যুবক, সাইকেলে বিহার করে, গাড়ির কাচে চুল আঁচড়ায়, বাচ্চা ছেলের চকলেট কেড়ে খেয়ে নেয়, বগল বাজিয়ে নাচে, ঘন্টাঘরের ডগায় চড়ে কাঁটা ঘোরায়। কী কিউট না? এমন ছেলের প্রেমে না পড়ে কি থাকা যায়? অ্যাঁ? শ্রুতি দার্জিলিংয়ে আসা ইস্তক বরফি তার পিছনে পড়ে ছিলো। টয় ট্রেনে যেতে যেতে, খাওয়ার প্লেটে কল্পনার গোলাপ রেখে, চিঠি লিখে বরফি তার প্রেম নিবেদন করলো। তারপর দুজনে বন্ধু হয়ে গেলো এবং ঘোড়ায় চেপে ঘুরতে বেরোলো। এরপরে তারা সাইকেলে এবং টয়ট্রেনেও চেপেছিলো। তারপর একদিন শুভলগ্ন দেখে চুমু খেয়ে তারা পাকাপাকি ভাবে প্রেমে পড়ে গেলো। ... ...

গত চৌত্রিশ বছর ধরে আমরা ঐ 'সুদিন'-কেই 'বিপ্লব' বলতে শিখেছি, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার নাম বদলে হয়েছে 'সুদিন'। নাম যা-ই হোক, সুদিন বা বিপ্লব আমাদের কাছে এক স্ট্যাটিক বা স্থির ক্যাটেগরি, অনেকটা তিথি মেনে আসা পুজো-আচ্চা-র মত। ফলে, আমাদের ভাবনা, চিন্তা, দায়বোধ, রাজনীতি সবই আপাতত-র জন্য। যবে 'সুদিন' আসবে তবে আমাদের ভাবনা-চিন্তাও ঠিক বদলে যাবে, এই বিশ্বাসের শিকড় অত্যন্ত গভীর। আজকের আপাতত-র ভাবনা, রাজনীতি যদি সেই সুদিনকে সক্রিয়ভাবে পিছিয়ে দেবার কাজ করে চলে, তাহলেও সেই বিশ্বাসের ভিত টলানো যায় না। ... ...

সরকারি দৃষ্টির দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে উন্নততর গভর্নেন্স-এর দাবি উঠেছে, যা দেখে মনে হয় যেন মিশেল ফুকো-র মৃতদেহের সৎকার-গাথা। অসংগঠিত শ্রমিক, কৃষক, আরো অন্যান্য সকলকে সরকারি পরিচয়পত্র দেওয়া হবে, যায়গায় যায়গায় ক্যামেরা লাগিয়ে আর আরো সব প্রযুক্তির সাহায্যে, উন্নত ম্যানেজমেন্ট-জ্ঞানের সাহায্যে সরকার (বা সরকারের হয়ে বরাত পাওয়া অন্য কেউ) নজরদারি করবে, চোখে চোখে রাখবে। তাতে নানান স্তরে দুর্নীতি কমবে। দক্ষতা দিয়ে সমানাধিকার উৎপন্ন করার এ এক অসাধারণ কল, তা সে কল চলুক আর না-ই চলুক। প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে দুর্নীতি দূর করার প্রত্যয়ের ভিতটি যে নড়বড়ে শুধু তা-ই নয়, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার panopticon বানিয়ে এক দক্ষতর controlled society বানানোর তোড়জোড় আমাদের চিন্তার দৈন্যের এক চোখ-ধাঁধাঁনো প্রকাশ। ... ...

মার্কসবাদী হই বা না হই, আমরা যখন আমাদের খসড়া নীতিমালাটি তৈরি করি, তখন ঠিক এই ‘আশু’ কর্তব্যের কথাটিই আমাদের মাথায় ছিল। অন্য কিছু না। আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গবাসী হন, আপনি ডান হোন বা বাম, ব্যবস্থাপন্থী বা ব্যবস্থাবিরোধী, প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী, কিছু ন্যূনতম জিনিস বোধহয় এখনই করা যায়, যা এই ব্যবস্থার মধ্যেও মানুষকে কিছু স্বস্তি দেবে। এবং সেই কাজ করা যায় এই ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে, বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য নির্বিশেষে। আমাদের খসড়ায় ঠিক সেই টুকুই আছে। এর পরে বাকি কথোপকথনের চিন্তা, বাকি তাত্ত্বিক আদানপ্রদান তো করাই যাবে। সে প্রস্তাবও খসড়াতেই আছে। অর্পিতা এই আদানপ্রদানে অংশগ্রহণ করেছেন এবং করছেন। সেজন্য তাঁকে ধন্যবাদ। ... ...

স্বাধীনতার ছয় দশক বাদে, গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা ওড়াতে ওড়াতে, আজ আমরা ঠিক কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? ভারত জন্ম থেকেই ছিল ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, আর পাকিস্তান, যার সৃষ্টি হয়েছিল ইসলামের নামে, ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানপ্রধান অংশগুলোকে কেটে নিয়ে, ১১ই আগস্ট ১৯৪৭-এ কায়েদ-এ আজম জিন্নার ভাষণ অনুযায়ী তারও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে চলার কথা হয়েছিল। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোনও বিরোধ নেই, মানুষ তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং পছন্দমত মন্দিরে, মসজিদে বা গির্জায় যাবে। তিনি আরও বলেছিলেন যে পাকিস্তানের পতাকায় সাদা রঙ সংখ্যালঘুদের জন্য উৎসর্গীকৃত। তবুও, ধর্মীয় ভেদাভেদের বীজ আগে থেকেই বোনা ছিল সে-দেশের সিস্টেমে। যতই সেকুলার ভাষণ দেওয়া হোক না কেন সমাজের অচলায়তন তাতে একচুলও নড়ে না। সাম্প্রদায়িকতা ধীরে ধীরে তাই ছড়িয়ে পড়ল পাকিস্তানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এবং সত্তরের দশকের শেষ দিকে, জিয়া-উল হক এবং মৌলানা মাউদুদির নেতৃত্বে ধর্মান্ধ মোল্লারা ক্ষমতার অলিন্দে আসতে শুরু করল। এই মোল্লা আর মিলিটারির আঁতাত, সঙ্গে আমেরিকার ইন্ধন, সমস্ত একসাথে লঙ্ঘন করতে লাগল জিন্নার সেই ধর্মীয় স্বাধীনতার বাণী, এতটাই লঙ্ঘন করল যে আজ মুসলিম ধর্মের মধ্যেই শিয়া বা আহমদীয়া গোষ্ঠীর মত সংখ্যালঘুরাও সাম্প্রদায়িক হিংসার শিকার হতে লাগল পাকিস্তানে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে থাকল পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে। ... ...

২০ বছরে কিছু পাল্টালো কি? সেদিন একটা বড় কাগজ জনমত নির্ধারণের চেষ্টা করত, আজ করে অনেকগুলো গণমাধ্যম। জনতা কি পুরোটাই এর পিছনে দৌড়ে বেড়ায়? না। একটুও কি প্রভাবিত হয় না? হয় নিশ্চয়। তবু, বয়স আমার, তোমার এবং সবার মুখের রেখায় ত্রিকোণমিতি শেখায়, এস, আমরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ত্রিকোণগুলোর কৌণিক পরিমাপগুলো করার চেষ্টা করি, পুরোটা সম্ভব হবে না জেনেও। চিনি আর বোঝার চেষ্টা করি মম চিত্তে শিলাদিত্যের স্রষ্টাকে.. হ্যাঁ, ওটাই আমার এখনকার রিং টোন। আজ বিশে আগস্ট, দুহাজার বারো। আঠারো বছর আগে, সুমনের জন্যে কোমরে রিভলভার তুলেছিলাম, ব্যস্ত মফস্বলের দিন দুপুরে, ওরা সুমনকে মারবে বলেছিলো, আমাদের অর্গানাইজ করা সুমনের প্রোগ্রামে। ছ ঘরা। দেশি। খুব রিস্কি। সুমন জানতেন না। আজও জানেন না। তখনো আমাদের স্বপ্ন দেখার কাল শেষ হয়নি, যদিও জেনে যাচ্ছি যে এ রাজনীতির গোলকধাঁধা থেকে বিপ্লব বেরবে না। কিন্তু তবু স্বপ্ন দেখছি, কেন না জেনে গেছি, ‘অন্ধকারের তবু আছে সীমানা’। ... ...

পাকিস্তানে ধনীলোকের অভাব নেই। একটা বিত্তবান সমাজই আছে যাদের কোনদিক দিয়ে কোনকিছুরই অভাব নেই। দেশের যাবতীয় সুযোগসুবিধা এঁরা স্রেফ কিনে ফেলতে পারেন। তার পরেও ফেলে ছড়িয়ে এঁদের পয়সার কমতি হয়না। দেখেছি চীনের মডেল মেনে চলার জন্য এঁরাই সবচেয়ে বেশি গলা ফাটান। এঁদের কাছে তো পড়াশোনা বা চিকিৎসা কিংবা অন্য সবরকম নাগরিক সুবিধা শুধু পয়সা দিয়ে কিনে আনা যায় এমনই কোন ব্যপার। যাদের পয়সা নেই তারা কীভাবে এই জিনিষগুলো পাবে সে নিয়ে এঁরা কোনদিন মাথা ঘামান না। পাকিস্তান যদি একটা সংগঠিত দেশ হিসেবে থাকতে চায় তাহলে কখনোই চীনের রাস্তায় হাঁটলে তার চলবে না। চীনের উদ্ধত পার্টি হয়তো মনে করেন যে তাঁরা যা ভালো বোঝেন দেশের জন্য সেটাই ঠিক। আমাদের মতো দেশের পক্ষে ঐ পন্থা কোনমতেই ঠিক নয়। আর যাতে ঐ ব্যবস্থা এদেশে না চালু হয় তার জন্য আমাদের সবার চেষ্টা করা উচিৎ। কোন রাজনৈতিক পার্টি ঠিক করে দেবে যে সারা দেশের জন্য কী ঠিক আর কী ভুল, এ কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। আমি চাই আমাদের দেশে একটা স্থায়ী টেঁকসই অর্থনীতি থাকুক। কালই বিশাল বড়লোক হয়ে গিয়ে পরশুই আবার কাঙাল হয়ে যাবার অর্থনৈতিক মডেলের আমি সবরকম ভাবে বিরোধিতা করি। ... ...