আমরা বরং, এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার শেষে, পপুলিজম কেন বিপজ্জনক সেটা বোঝার চেষ্টা করি। স্বাভাবিক বুদ্ধিতে পপুলিজম ব্যাপারটা মোটেই খুব একটা খারাপ বলে মনে হয়না। হাজার হোক, গণতন্ত্রের তো উদ্দেশ্যই মানুষের কথা আরো বেশি করে তুলে আনা, তাঁদের অভাব অভিযোগ গুরুত্বসহকারে ভাবা। একরকমভাবে এলিট শাসকদলের এইসব অভাব অভিযোগ সম্পর্কে ঔদাসীন্যই তো পপুলিস্ট বা তোষণের রাজনীতির কারণ। কিন্তু বিভিন্ন দেশে পপুলিস্ট দল বা নেতৃত্বের উত্থান এবং ঘটনাপরম্পরা খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় বিপদটা কোথায়। আরো স্পষ্ট হয় ক্যারিশম্যাটিক জনপ্রিয় নেতাদের কার্যকলাপ দেখলে। সেখানে একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন আছে। ... ...
ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করাকালীন সেখানকার এক রসায়নের ছাত্রের সাথে আমার প্রায়ই গল্প হতো। ছেলেটি ব্রাজিলের, তখন সে ডক্টরেট করছে। ব্রাজিল বললেই আমার মন চিরকাল উচাটন হয়। রিও বা সাও পাওলোর ছবি, টিভির পর্দায় বা নেটে যেমন দেখেছি, ভেসে ওঠে। সিটি অফ গডের দৃশ্যাবলী, ফুটবল মাঠের ম্যাজিক স্টিলগুলো, অসংখ্য খেলোয়াড়ের নাম, তাদের নিয়ে মাতামাতি, বিশ্বকাপে কলকাতার চালচিত্র ---এইসব অজস্র ছবির কোলাজ। কিন্তু সেই ছেলের কাছে আমি অন্য এক ব্রাজিলের আঁখো দেখি গল্প শুনতাম। ছেলেটির বাবা একজন নামকরা সার্জেন, অগাধ পয়সা। এমনিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্কলারশিপ ছাড়া পড়া খুবই খরচসাপেক্ষ। সেই ছেলে খুবই অপরাধবোধ নিয়ে বলেছিলো, তার বাবার কাছে ঐসব খরচ গায়েই লাগেনি। একেবারে হাইস্কুল থেকে ছেলেটি তাই মার্কিন মুলুকের বাসিন্দা। স্কুল কলেজের পড়াশুনোয় তাকে কোনদিন কোন কাজ করতে হয়নি, অথচ তার বেশিরভাগ বন্ধুরাই নানারকম ছোটখাটো কাজ করতে বাধ্য হয়েছে পড়ার পাশাপাশি। ব্যক্তিগত প্রিভিলেজ, পারিবারিক বৈভব, ব্রাজিলের আর্থিক বৈষম্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (পৃথিবীর অন্যত্রও) ক্রমশ বেড়ে চলা "ট্রাম্পিয়ানা" তাকে বিষন্ন করতো। ... ...

অনেক রোগী খুপরিতে ঢুকে প্রথমেই স্যানিটাইজারের বোতল থেকে দু-চার ফোঁটা তরল বসার চেয়ার, আমার টেবিলে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আজ এক ভদ্রমহিলা গঙ্গাজল এর মত আমার গায়ে কয়েক ফোঁটা স্যানিটাইজার ছিটিয়ে দিলেন। মানে চেয়ার-টেবিলের সাথে তিনি ডাক্তারকেও স্যানিটাইজ করে নিলেন। ওদিকে রোগীর সংখ্যা রোজই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অধিকাংশই জ্বরের রোগী। জ্বর আসলেই এখন অনেকে গন্ধ শুঁকছেন। একজন বললেন, 'ডাক্তারবাবু, খাবার-দাবারের গন্ধ পাচ্ছি না। কিন্তু ডেটলের গন্ধ, ডেনড্রাইটের গন্ধ এগুলো দিব্যি পাচ্ছি।' একজন রোগী দুদিন আগেই দেখিয়ে গেছেন। জ্বর কমছে না। আবার এসেছেন। তার পুরোনো প্রেসক্রিপশন পুরো সাদা। আমি অবাক হয়ে বললাম, 'এ কি? আমি কোন ওষুধপত্র লিখিনি নাকি?' উনি বিব্রত মুখে জানালেন, 'হ্যাঁ লিখেছিলেন। কিন্তু বাড়ি গিয়ে প্রেসক্রিপশন স্যানিটাইজ করতেই সব লেখা উবে গেছে।' ... ...

সেই যে সব প্রাণ একটি একটি করে বেঁচে গেল, তার মধ্যে আমিও বাঁচলাম, বেঁচে রইল আমার হিরামনও। সে এখন বেশ ডাগরডোগর। বাঁকানো লাল ঠোঁট, চকচকে সবুজ পালক। আমার কাঁধে বসে থাকে। এখনও বসে আছে। তাকে কাঁধে নিয়েই আমি চলেছি। মেহরাউলির পথে। শুধু আমি একা নই। গোটা শাহজাহানাবাদ আমার সঙ্গে চলেছে। আমার সঙ্গে চলেছে বললে ভুল বলা হবে। চলেছে সব বাদশার সঙ্গে। বলতে গেলে শাহজাহানাবাদ আজ ফাঁকা। বাদশা সাজগোজ করে চতুর্দোলা সাজিয়ে মেহরাউলির পথে চলেছেন। বাদশা চলেছেন তাঁর প্রিয় উৎসবে। শুধু বাদশার নয়, তামাম শাহজাহানাবাদের বড়ো খুশির তেওহার। ফুলওয়ালো কি সয়ের। সয়ের এ গুলফারোশাঁ। ফুল ব্যবসায়ীদের মোচ্ছব। চারিদিকে শুধু রং আর রং। ... ...

সংক্রামক রোগীকে সমাজ-বিচ্ছিন্ন রাখার জন্যে চালু হয়েছিল কোয়ারেন্টাইন প্রথা। তার জন্যে রোগীকে রাখা হত লোকালয়ের বাইরে কোন কোয়ারেন্টাইন হাউজে। চিকিৎসা বা শুশ্রূষার পরিবর্তে সেখানে যে কী অমানবিক আচরণ জুটত তার বরাতে তার প্রমাণ মেলে অসমের বরাক উপত্যকায় শিলচরের এক পুরনো বিবরণে। কলেরা রোগীকে কোয়ারেন্টাইন হাউজে নিয়ে আসার সময় ও সুযোগ হত না। কলেরায় আক্রান্ত রোগী অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংক্রমণের ২৪ ঘন্টার মধ্যে মারা যেত। কিন্তু গুটিবসন্তের আক্রমণ হলে রোগীকে কয়েকদিন ভুগতে হত। গুটিবসন্তে আক্রান্ত কোন বেওয়ারিশ রোগী পেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ ওই রোগীকে কোয়ারেন্টাইন হাউজে পাঠিয়ে দিতেন। সাধারণত গুটিবসন্তের রোগী রাখা হত বলে ঘরটার নামই হয়ে গেল 'গুটিঘর'। ... ...

শিকড় তো অনেক গহীনে। সেখানে প্রবেশ করবে কী করে রেখা। সে ছিল নিরূপায় নিরালম্ব এক মানবী, খালেকও কি তাই নয়? খালেক--পোকার রক্তে যে শৈশব রয়েছে তাকে সে এড়াতে পারে না। তাকে সে ভোলে নি। টিপু ভাইজান, মনি ভাইজান, ছবিদি, ইস্কুল, পা ভাঙ্গা শালিক...... কী অপূরব এক শৈশব এঁকেছেন মাহমুদুল হক। সেই শৈশবই খেয়েছে তার প্রাণমন। সেই ফেলে আসা গ্রাম, মানুষজন। ১৯৪৭-এর কথা তা। তখন বালকের বয়স আট হবে বড় জোর। ক্লাস টু। তার দাদা টিপু কলেজে ভর্তি হয়েছে। মনি ভাইজান ক্লাস নাইন হবে কি? সেই বালকের অমল শৈশবই এই উপন্যাসের আধার। এই উপন্যাসের প্রাণ। ছোট ছোট এমন অনুষঙ্গে ভরে আছে এই উপন্যাস যে পড়তে পড়তে বুক মুচড়ে যায়। দেখতে পাই আমার জন্মের আগের পৃথিবী। উপন্যাস তো আমাকে জাতিস্মর করে তোলে। দেখতে পাই সেই সময়কে। ... ...

গলা খাঁকড়িয়ে ইবন, মুখে দুটো লবঙ্গ ফেলে বললেন, সে এক আশ্চর্য ব্যাপার দেখলাম, বুঝলেন! সবে চিন দেশ ছেড়েছি। সমুদ্রের কোন অজানা অঞ্চল দিয়ে চলেছি মাঝিমাল্লার দল বুঝতেই পারছে না। শোঁ শোঁ হাওয়া। আকাশ কালো অন্ধকার। দশ দিন সূর্যের মুখ দেখিনি। বেঁচে থাকবো কি না বুঝতেই পারছি না! জাহাজের সবাই আবার চিন দেশে ফিরে যেতে চাইলো কিন্তু তখন তা আর সম্ভব নয়। বিয়াল্লিশ দিন সমুদ্রে আমাদের এইভাবেই কাটল। অনিশ্চিত। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না কী হতে চলেছে। তেতাল্লিশ দিনে দূর থেকে একটা পাহাড় দেখা গেল। পাহাড়! মানে ডাঙা! বাতাসের বেগ আমাদের সেই দিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। জলের মধ্যে পাহাড়! অভিজ্ঞ নাবিকের দল বলাবলি করতে লাগলো, এরকম কোনো ধারণাই তাদের নেই। কোথাও মস্ত বড় কিছু ভুল হচ্ছে! ... ...

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাড় পাঁজরা বেড়িয়ে গেছে। কোভিড রোগীদের তো বটেই, অন্যান্য রোগেও চিকিৎসা পেতেও জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠেছে।এটা হওয়ারই ছিল। মিডিয়া ও সরকারের পক্ষ থেকে যথারীতি ভঙ্গুর পরিকাঠামোকে চাপা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে। মানুষেরা আমাদের গালি দিয়ে মনের ঝাল মেটাচ্ছে। কর্পোরেট হাসপাতালগুলি জনস্বাস্থ্যের এই দুর্যোগের সময়েও ব্যবসায়িক মনোভাব থেকে বেরোতে পারেনি। তারা নানা রকম করোনা প্যাকেজ চালু করেছে। তা সাধারন মানুষ তো বটেই, আমার মতো মধ্যবিত্ত চিকিৎসকেরও সামর্থ্যের বাইরে। সরকার সে সব দেখে শুনেও চুপচাপ। ... ...

প্রথম যেদিন সাকিনা মেজদিকে ওইরকম থুতনি নিয়ে দেখল এবং মেজদির মুখে শুনল যে ওর ক্যানসার হয়েছে সে কী কান্না বুড়ির। শুধু বলে, “ও মা, তাহলে তো তুই বাঁচবি না রে মেয়ে৷” মেজদিই বরং ওকে সান্ত্বনা দিত। এরপরই সাকিনা বিবি এমন একটা কাজ করেছিল যা আমি কোনোদিন ভুলব না। মেজদিকে, যবেই আসত গোটা তিনেক করে ডিম দিত খেতে। পয়সা নিত না। কিছুতেই নিত না৷ বলত, “তোর শরীর খারাপ রে মেয়ে৷ রোজ খাবি একটা করে। দিশি ডিম। উপকার হবে৷” অবাক হতাম। এক হতদরিদ্র গ্রাম্য মহিলা কোন্ মনের জোরে এমন কাজ করতেন!! ... ...

ইন্ডিয়ান মেডিকেল গেজেটে প্রকাশিত একটি হিসেবে জানা যায় ১৮১৭ থেকে ১৮৩১ সালের মধ্যে শুধু অবিভক্ত বঙ্গে এক কোটি ৮০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়েছিল কলেরায়। মৃতদের মধ্যে এক বিরাট অংশ ছিল ব্রিটিশ সেনা। তবে তার আগেও প্রতি বছর হাজারে হাজারে মানুষ মারা গেছে কলেরায়। কলেরার আতঙ্ক ইউরোপিয়ানদের মধ্যেও যে কতটা জাঁকিয়ে বসেছিল তার চমকপ্রদ সাক্ষ্য মেলে পৃথক এক ব্রিটিশ সরকারি নথিতে। ১৭২০ সাল নাগাদ জনৈক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ডানকান ওলাবিবি মন্দির তৈরি করার জন্যে দিয়েছিলেন চার হাজার টাকা। হাওড়ার শিবপুর অঞ্চল তখন ছিল গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলে ওলাবিবি রূপে পূজিত পাথরের ঢিপিকে ডানকানের টাকায় তৈরি হওয়া মন্দিরে স্থানান্তরিত করে শিলাখন্ডটির ওপরে এক দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী কালে শিবপুরে বন কেটে বসতের প্রসার ঘটলে স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় ওলাবিবির মন্দিরের জনপ্রিয়তা লোকমুখে আরও ছড়িয়ে পড়ে। ... ...

এর আগের পর্বে কয়লাখনি নীলাম ও তাতে বিশাল বনভূমি ধ্বংসের কথা লিখেছি। লিখেছি কী ভাবে কর্পোরেটের সামনে থালায় সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে এদেশের সমস্ত খনিজ ও বনজ পদার্থ। যাতে তাদের কোনো অসুবিধে না হয়, সেজন্য আইন পালটে যাচ্ছে দেদার। অতিমারির অছিলায় শুধু ভিডিও কনফারেন্স করে পরিবেশ সম্পর্কিত অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যদি আসামের বাঘজান তৈলকূপ ও বিশাখাপত্তনমের গ্যাস লিক আমাদেরকে কিছু শিক্ষা দিয়ে থাকে তাহলে তা হওয়া উচিত ছিল এইরকম- এদেশের মাটিতে পরিবেশের সর্বনাশ আটকাতে হলে আমাদের চাই ইন্ডাস্ট্রির তুমুল খিদেকে বশে রাখবার জন্য যথোপযুক্ত পলিসির আশ্রয় নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? ... ...
পপুলিজমের বৈশিষ্ট্য, যেখানে সঠিক-বেঠিকের হিসেবের থেকেও মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা বেশি প্রয়োজনীয়। কন্তের বিরুদ্ধে একগাদা বিতর্ক, মূলত তাঁর সিভিতে যেসব ডিগ্রির উল্লেখ আছে সেগুলো নিয়ে। মোদীর entire political science-এর মতো মোটা দাগের মিথ্যা না, মমতা ব্যানার্জির জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হাস্যকর দাবি নয়, সুচারু অর্ধসত্য আর মিথ্যা দিয়ে সাজানো কন্তের ফোলানো সিভি। অন্যদিকে স্পেনের পাবলো ইগলেশিয়াসের Podemos পার্টি আঞ্চলিক রাজনীতি (যার শিকড় কিনা ভাষা ও সংস্কৃতিগত ভাবে স্বীয় স্বীয় অঞ্চলের এবং আলাদা) হাইজ্যাক করে নির্বাচনে কিস্তিমাত করেছে। তারা এখন তৃতীয় বৃহত্তম দল। যেসব আঞ্চলিক, প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভোট নিজেদের দিকে টেনে এনে তারা জিতেছে সেই ইস্যুগুলো তাদের নিজস্ব কর্মসূচির নয়, সেই আন্দোলনগুলিতে তারা কস্মিনকালেও অংশ নেয়নি। ... ...

সোনালী কাবিন কাব্যে ছিল যে তীব্র প্রেম আর আদিমতা, আল মাহমুদ আসলে সেই কবিই। রক্তমাংসের এমন নোনা গন্ধ বাংলা সাহিত্যে বিরল নিশ্চয়। আল মাহমুদের গল্প সেই গল্পই। নর নারীর জৈবিক প্রেম, আদিমতার সাহসী উচ্চারণ যেমন তাঁর কাব্যে দিয়েছিল অচেনা এক সুষমা, গল্পেও তাই। পানকৌড়ির রক্ত, কালো নৌকো, রোকনের স্বপ্নদোলা, নীল নাকফুল, বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা… আল মাহমুদ যে গল্প লিখেছেন, সেই গল্পে সোনালী কাবিনের কবিকে চেনা যায়। চেনা যায় তীব্র প্রেম, যৌনতা, আদিমতার এক অচেনা রূপ। আমি যতবার পড়েছি পানকৌড়ির রক্ত কিংবা জলবেশ্যা, পেয়েছি নতুন মাত্রা। জলবেশ্যার কথা নতুন করে বলি। নতুন করে বলি পেঁয়াজ, রসুন, লঙ্কার গন্ধ জড়ান মেঘনা তীরের লালপুর হাটের কথা। সেই হাট আমার অচেনা। আমি দেখিনি। মেঘনা ফেলে এসেছি ওপারে, লালপুর হাটও। কী করে চিনব? চিনেছি আল মাহমুদ এ। ... ...
ব্যক্তিগত সমস্যায় জর্জরিত থাকলেই মানুষের অসহিষ্ণু হয়ে যাওয়াকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে, এরকম নয়। আর সবাই যে দাঙ্গার জিগিরে প্রভাবিত হয়ে রয়েছেন, বা অতি দক্ষিণপন্থীর রাজনৈতিক চাল বুঝতে পারছেন না এমনটা নয়। এই নেতাদের সহিষ্ণুতা ও অসহিষ্ণুতার ফাঁকি, এলিট অবস্থানে থেকে এলিটিজম বিরোধিতা—এসব অসততা সমর্থকদের কাছে ধরা পড়ছে না এমন নয়। এখন প্রশ্ন হল, এই অসততা কি এতই মূল্যহীন যে অতি দক্ষিণপন্থার ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া সমর্থকেরা সেসব বুঝলেও উপেক্ষা করছেন? এর উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের ভেবে দেখতে হবে লিবেরালিজমের অসংগতিগুলো। ... ...

ফার রাইট বা উগ্র দক্ষিণপন্থী দলের অ্যাজেন্ডায় যা আছে, সেইসব দলের মুখ্যনেতৃত্ব প্রথাগত লিবারাল সমাজের প্রতি যেসব অভিযোগগুলি করেছেন, বা নিজ নিজ দেশে তাঁরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন ও হচ্ছেন, সেগুলোর সবই মিথ্যাচার বা অতিরঞ্জন নয়। যেমন অর্থনৈতিক সংকট ও তজ্জনিত ধুঁকতে থাকা কর্মসংস্থান, উদ্বাস্তু সমস্যা, সেন্ট্রিস্ট আদর্শের মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্নীতি, বা একরকমের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ, যা নিজদেশে মানুষকে পরবাসী করে দিচ্ছে। এগুলোর কোনোটাও গালগল্প নয়, সাধারণ মানুষ বলে যে বহুস্তরীয় পদার্থটিকে নেতারা ভোটব্যাংক ভাবেন, তারা এইসব সমস্যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখতে পায়। কেন এই সমস্যাগুলি তাদের জীবনে মূর্তিমান উপদ্রবের মতো আসছে সে কথা ভাবতে গিয়ে তাদের অনেক সময়ই মনে হয় এইসব সমস্যার অনেকগুলোই জনবিস্ফোরণের ফল। ... ...

প্রথম হল বাবুর্চি। বাবুর্চির সঙ্গে কথা কইতে আসতেন হেকিম। ওই মোঘলশাহীর মতোই। বাবুর্চি হেঁশেলের বড়বড় রান্নাগুলো প্রচুর পরিমানে করত। এরপরে আসছে রকাবদার। এরা হচ্ছে রসিক রসুইকর। এদের কাজ রান্না নিয়ে গবেষণা ও অল্প পরিমাণে খাবার বানানো প্রকৃত খাদ্য রসিকের জন্য। গান্ডে পিন্ডে গিলবার জন্য না। রান্না হয়ে যাবার পর তার সাজ সাজাওট, তাকে গয়না নোলক মুকুট টায়রা পরানোর কাজও তাদের করতে হোত। রাঁধুনিদের সবথেকে তলায় ছিল নানফুস যারা নান, কুলচা, রোটি, শিরমল, তাফতান এইসব বানাতো। এছাড়া বাসন ধুত একদল, মশালচিরা মশল্লা তৈরি করত, খাবারের ট্রে বয়ে আনত মেহরি রা। শুধু এখানেই শেষ হয়ে গেলো না। এর ওপর ছিল দারোগা। আজ্ঞে হ্যাঁ ! দারোগা এ বাওয়ারচি। ... ...

মহামারীর প্রাদুর্ভাব নতুন কিছু নয়। বেদ-বাইবেল-পুরাণের যুগ থেকে শুরু করে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে নানান কালান্তক রোগের সংক্রমণ পীড়িত করেছে মানব সভ্যতাকে। দেশ-বিদেশের সমাজ রোগের অভিঘাত মোকাবিলা করেছে বিচিত্র ভঙ্গিতে। চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি ঘটেছে, তবে তারই পাশাপাশি এলিজাবেথান ইংল্যান্ড বা ঔপনিবেশিক বঙ্গে রোগকে ঘিরে উৎপত্তি হয়েছে কৌতুককর ঘটনার, পাখা মেলেছে মানুষের অন্ধবিশ্বাস, আধিপত্য বিস্তার করতে, চলেছে কৌশলী রাজনীতির খেলা। আর নিরুপায় সাধারণ মানুষ আশ্রয় খুঁজেছে দৈব নির্ভরতায়। পাঁচ পর্বের এই লেখাটিতে মহামারীকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে পাঁচটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণ থেকে। কোথাও যেমন সমকালীন সাহিত্যে তার প্রতিফলন খোঁজা হয়েছে, তেমনি কোথাও আবার উঠে এসেছে রোগের বিচিত্র চিকিৎসা-পদ্ধতি এবং মারী -কেন্দ্রিক রঙ্গ-রসিকতা। ঔপনিবেশিক বঙ্গে জাতীয়তাবোধের উন্মেষের সন্ধান করতে গেলে তারও একটি সূত্র মিলবে দেশজ চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যার আগ্রাসী ছায়া বিস্তারে। আবার কলেরার হানায় ব্রিটিশদের আতঙ্ক প্রকাশ পেয়েছে তিনশ বছর আগে হাওড়া ও কলকাতায় খোদ ব্রিটিশ সওদাগরের অর্থে ওলাবিবির মন্দির গড়ে ওঠার ঘটনায়। আর করোনা আতঙ্ক থেকে বাঁচতে এই একুশ শতকে লৌকিক দেবদেবীর তালিকায় নবতম সংযোজন করোনা মাতা। ... ...

২০১৪ সালের অক্টোবর নাগাদ তুরস্কে যখন যাই তখনও ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠেনি। যদিও দক্ষিণ পূর্ব সীমায় অবস্থিত নিমরুত পাহাড় থেকে পাঁচ ছ ঘন্টার মধ্যে এসে পড়েছে আইসিস, সীমান্তে জোর যুদ্ধ চলছে। আমাদের শেষ পর্যন্ত আর নিমরুত অবধি যাওয়া হয়নি, যুদ্ধ কাঁটাতার টপকে এদিকে চলে আসতে পারে এই আশঙ্কায়। উষ্ণ প্রশ্রবণ আর চোখ ধাঁধানো পুরাতত্ত্বের পামুক্কালে থেকে দিনভর গাড়িতে মৌলানা জালালুদ্দীন রুমির স্মৃতিবিজড়িত কোনিয়া যাওয়ার পথে এক গ্রামে গাড়ি দাঁড়ালে হঠাৎ করেই চোখে পড়েছিলো পথের পাশে বইয়ের দোকান। সেখানে মোল্লা নাসিরুদ্দীন (তূর্কীতে নাসিরুদ্দীন হোজা) তাঁর প্রিয় গাধার পিঠে চেপে বইয়ের মলাটে হাজির। আকসাহির বলে যে ছোট শহরে তাঁর মৃত্যু হয় ও সমাধি, তার খুব কাছে এসে পড়েছি আমরা। নাসিরুদ্দীন এমন এক চরিত্র, যাঁর মধ্যে ইতিহাস ও কিংবদন্তী মিলেমিশে এমনভাবে জট পাকিয়ে আছে যে একটার থেকে অন্যটা আলাদা করা যায়্না। ... ...

মোড় থেকেই বিশ্বনাথ মন্দিরে যাওয়ার লোহার রেলিং-ঘেরা হাঁটার রাস্তা, লোকে ডালি-ফালি নিয়ে লাইন দিয়ে চলেছে। এদিকে একইরকম আরও একটা রাস্তার মসজিদে ঢোকার মুখে, যদিও সেখানে কেউ নেই। পাশে কয়েকজন পুলিশ জটলা করছে। পূর্বঅভিজ্ঞতা থেকে বুঝলাম জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। তাই হেলতে দুলতে ওই রেলিং-ঘেরা জায়গাটা দিয়ে চলতে শুরু করলাম। কয়েকপা এগোতেই জটলাকারী পুলিশের দল ছুটে এসে জেরা শুরু করে দিল। ততক্ষণে বেশ রাগ হচ্ছে। কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন এসবের উত্তরে বললাম আর্কিওলজিকাল সাইট, তাই দেখতে এসেছি। খুব বিশ্রীরকম সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে, যাওয়ার নিয়ম নেই, বলে ভাগিয়ে দিল ওখান থেকে আমাদের। ... ...

ঘাটের কিনারায় আস্তানা গাড়া হলো। একেবারে ফেলু মিত্তিরের কাশীবাসের মতই পরের দিন সকালেই আলাপ হয়ে গেল একজন অদ্ভুত লোকের সাথে। ভদ্রলোক বাঙালী, দক্ষিণ কলকাতায় বাড়ি, তন্ত্রসাধনা সম্পর্কিত বই লেখেন। বয়সে আমার থেকে কয়েক বছরের বড়, শিবপুর বা যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একদা বহুজাতিকে চাকরি করেছেন। এখন সেসবে মন নেই। সংসারী মানুষ, কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময় আজ হিমালয় তো কাল কাশী এইসব করেন। বললেন কয়েকটা বই বেরিয়েছে, ছদ্মনামে (আমি খুঁজে দেখেছি, ঐ নামে লেখক ও তন্ত্র ইত্যাদির বই আছে, তবে একই লোক নাও হতে পারে)। এরপর ভদ্রলোক আমায়, বললে বিশ্বাস করবেন না, ভোরবেলার স্নিগ্ধ রোদে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে, কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট নিয়ে চাট্টি ভাট দিলেন। ... ...