
এর আগে তাঁর নারী সংসর্গের অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি ব্রহ্মচর্য্য পালন করেছেন চিরকাল। কিন্তু মাতৃআজ্ঞা পালন করতে বাধ্য তিনি। তখন তিনি জেনেছিলেন সংস্কৃতভাষী সমাজের নারীর অবস্থা। দুই কন্যাই তাদের চরিত্র এবং সুনাম অক্ষুণ্ন রাখা একদিকে,অন্যদিকে কৌরব বংশের কঠিন শাসনে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে রমণে,কিন্তু সে অবশ্যই স্বচ্ছন্দ ছিল না। তাদের দুর্ভাগ্য এই যে তাদের সন্তান ধৃতরাষ্ট্র এবং পান্ডুর জন্মকালীন অসুস্থতা তাদের কলঙ্কিত করেছে। কিন্তু এ তাদের অপরাধ নয়। ব্যাস পরে অনেক ভেবে দেখেছেন এ হতে পারে একমাত্র বিচিত্রবীর্য্যের থেকে রোগ সংক্রমণের কারণে। কিন্তু মাতা একথা জানতেন কিনা তা তিনি এখনো বোঝেন নি। তবে সন্তানদ্বয়ের জন্মের পরে তিনি মহর্ষি চ্যবনের গোষ্ঠীর সহায়তা নিয়েছিলেন আত্মচিকিৎসায়। সংক্রমণ তাঁকে বয়ে যেতে যেন না হয় এই কারণে। কিন্তু হস্তিনাপুরের প্রতাপ এমনই যে এই সন্তানদ্বয়ের অক্ষমতার দোষ গিয়ে পরলো ওই রাজকন্যাদ্বয়ের স্কন্ধে। সত্যি, কী মহিমা প্রচারের! তবে তিনি সেই কালে একবারই প্রকৃত সঙ্গমের স্বাদ পেয়েছিলেন এক দাসীর কাছ থেকে, যার গর্ভে জন্মেছে তাঁর সেই সন্তান যাঁকে নিয়ে তিনি কিছুটা গর্ব বোধ করতেই পারেন। বিদুর তাঁর মন কেড়েছে গুণে-বিনয়ে-স্বভাবে। ... ...

যে কোনও সিম্পটম নিয়ে খনির কাছে গেলে খনি কিছু টিপিক্যাল প্রশ্ন করতেন, আর কিছু ওষুধ দিতেন। বেশি দিতেন ব্রুফেন নামে এক পেইনকিলার। আমার রুমমেট কে-কে একবার কাশি হয়েছিল বলে খনির কাছে গিয়েছিল ওষুধ আনতে, খনি তাকেও ঐ একই কোশ্চেন করেছিল : সিগারেট খাও? খারাপ পাড়ায় টাড়ায় যাও? অত:পর একপাতা ব্রুফেন হাতে দিয়ে বিদায়। এই জন্য ছেলেপুলে খনির ওপর একইসঙ্গে রেগেও থাকত, আর খনিকে নিয়ে মজাও করত। শোনা যায় একবার ওভালে খেলতে গিয়ে একটা ছেলের প্রচুর কেটে গিয়ে রক্তপাত হয়েছিল। তাকে ধরাধরি করে খনির কাছে নিয়ে যাওয়া হলে পরে, খনি তাকে দেখে আঁতকে উঠে বলেছিলেন, "এখানে কেন? এখানে কেন? ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও!' অত:পর একপাতা ব্রুফেন। ... ...

অধিকরণ থেকে বেরিয়ে নিজের রথে চড়লেন। রথ পথের ধুলো আর রাতের নৈ:শব্দ্যকে খণ্ড খণ্ড করে চিরে চলল হস্তিনাপুরের প্রান্তের দিকে। চোরাদুয়ারের কাছে এসে রথ ছেড়ে দিলেন বিদুর। এখান থেকে যে রাস্তাটি যাচ্ছে সেই রাস্তাটি একটি জঙ্গলের মধ্যে ঢুকবে। রথ এখান থেকে ফিরে যাবে নগরীর পশ্চিম প্রান্তে। এই পূর্বপ্রান্তের জঙ্গলটি ধরে কিছুটা গেলে একটি মন্দির আছে। সেই মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন বিদুর। ভোর হতে আর বাকী সামান্যই। মন্দিরের ভিতরে খুব সামান্য একটি আলো জ্বলছে। কিন্তু এত নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে সেই আলোই মনে হচ্ছে অনেক। আলোক লক্ষ্য করে এগোলেন তিনি। বুকের ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনা। কেমন একটা লাগছে নিজেকে! কিছুটা অচেনা। হঠাৎ করে যেন ফিরে গেছেন তাঁর নবযৌবনের দিনগুলোতে। যখন ধর্মাত্মা বিদুর গভীর রাতে একটি কালো অশ্বের পিঠে সওয়ার হতেন এবং এই জঙ্গলের মধ্যে এসে তাকে বেঁধে রেখে প্রায় ছুটতে ছুটতে পৌঁছে যেতেন এই মন্দিরে। এক রমণী সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। ... ...

তবে পরাশরের আগে কাউকে সঁপে দেননি নিজেকে। পুরুষ এসেছে, উত্তেজিত হয়েছে, ফাঁদে পরা বাঘের মত বা শিয়ালের মত ছটফট করেছে, কিন্তু তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। অনেক কম বয়স থেকে নৌকা পারানির কাজে লেগেছেন। বলা যেতে পারে তাঁর পিতা চেয়েছিলেন তিনি এ কাজে লেগে থাকুন। মেয়ের রূপ পিতার চোখেও পড়েছিল। জেলেবস্তিতে এ মেয়ের জন্য পাত্র খোঁজা মানে বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা হবে। তিনি নিজে ছিলেন জেলে সমাজের মাথা। কাজেই তাঁর অজানা ছিলনা জেলে পুরুষদের দৌড়। তিনি চেয়েছিলেন মেয়ে একাজে থাকলে কালে কালে অন্য সমাজের পুরুষের চোখে পড়বে এবং তাতে তার একটা সদ্গতি হতে পারে। তবে তিনিও এতটা আশা করেননি। ... ...

আমরা দুই বিরহী প্রেমিক চার বছরের মাথায় সেই সকালে প্রথমবারের জন্য মর্নিং ওয়াক করতে বেরোলাম। চা-বাগানের মাথায় হাল্কা লেপের মত জড়িয়ে আছে কুয়াশা, তার বুক চিরে হুশ্-হুশ করতে করতে বেরিয়ে গেল আসামগামী কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন, কিংবা কে জানে, কামরূপ বা তিস্তা-তোর্সা ঢুকল বোধ হয়। আমরা লেডিজ হস্টেলের দিকের রাস্তাটা ধরলাম। সারা ক্যাম্পাস ঘুমিয়ে, কেউ দেখবে না, কেবল কিছু স্বাস্থ্যসচেতন প্রফেসরদের সাথে দেখা হয়ে যাওয়া ছাড়া, তা, তাতে আর কবে ফোর্থ ইয়ার ভয় পেয়েছে! ... ...

এই কি ধর্মগ্রন্থ? এই কি ধর্ম? এ যদি ধর্ম হয় তাহলে অধর্ম কি? অগঠিত একটা দেশকে নিয়ে লেখা খুব কঠিন কাজ। গার্সিয়া মার্কেজের ভূমিটির ইতিহাস এখনো নবীন। আমাদের ঘাড়ে কয়েক হাজার বছরের দায়। একশো না দশ সহস্র বছরের নির্জনতায় আমরা স্থাপিত। কন্ঠস্বর খুঁজে পেতে গেলে নির্মাণ চাই। সেই নির্মাণ আমাকে দিতে পারে একমাত্র মহাভারত, মহা ভারবাচ্য চ বলে না, দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতির যুদ্ধক্ষেত্র বলে। সেই ক্ষেত্র থেকে কি পাই তা জানতেই এই প্রয়াস। ভূমিকা তাই ভূমিকার মতন হল না, আমার মতন অপন্ডিতের ব্যাক্তিগত পাঠের সামান্য খসড়া। মার্জনা করবেন পাঠক আমার এ অক্ষমতা। এই মহাকথাকে জানতে বসেছি। তার লিখিত-অলিখিত সকল চেহারায়। তাই আমার গমনাগমন ডায়নামিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে। কল্পনার পাখায় একটি লৌকিক পাঠ নির্মাণ আমার উদ্দেশ্য মাত্র। মহাভারতের এবং মহা ভারতের বিপুল পরিসরের ব্যাস বংশের নির্মিত এবং সংগৃহিত আখ্যানের প্রতিটি প্রান্তকে যথাসাধ্য মন্থন করেই চেষ্টা করেছি এই রূপ প্রস্তুত করতে। কোনো নির্দিষ্ট পাঠের এটি ব্যাখ্যা না, টিকা-টিপ্পনী না, স্বতন্ত্র মহাভারত রচনাই এ ক্ষুদ্রের বিপুল স্পর্ধা। আসন পেতে বসলে পাঠারম্ভ। সর্বশেষ তিরস্কার-পুরস্কার নতমস্তকে স্বীকার্য। ... ...

ইনি নিজে অবশ্য কারো কথা ভাবেন বলে টের পাওয়া যায়না। ইনি চান্স পেলেই রাস্তায় হিসি করেন। মেট্রো রেলে থুথু ফেলেন। পুলিশ দেখলেই স্যার বলেন। কাউন্সিলার দেখলেই ধান্দা করতে দৌড়ন। ছিয়ে নিতে ইউনিয়ন করেন। ফ্ল্যাট বাগাতে পার্টি। শ্রমিক হলে শ্রেণীসংগ্রামের নামে কোম্পানি লাটে তোলেন। মালিক হলে কর্মসংস্কৃতির নামে শ্রমিককে ছিবড়ে করে দেবার তাল করেন। বাড়িওয়ালা হলে ভাড়াটের মাথায় গরম জল ঢালেন। ভাড়াটে হলে বাড়িওয়ালার দাড়ি ওপড়ান। বাঘা আঁতেল হলে দেরিদা কপচান। বিপ্লবী হলে শ্রমজীবি মানুষের দু:খে কেঁদে ভাসান। বাড়ির কাজের লোককে ছুটি দিতে হলে মুন্ডপাত করেন। এ-ওর মুন্ডু চেবান। উনি-একে চিমটি কাটেন। জল যেদিকে যায়, প্রাচীন ভেড়ার মতো সেই দিকেই ধাবিত হন। যে পক্ষ সুবিধা দেয়, ইনি তার প্রতিই প্রীত হন। কেবল ভোট এলেই সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ইনি "সাধারণ মানুষ' হয়ে যান। আর তাঁর দু:খ কেউ বোঝেনা বলে বিলাপ করেন। ... ...

একথা ভাবলে ভুল হবে, স্রেফ আঁতেল সাহিত্য আর গ্রুপ থিয়েটার নিয়েই নিউজ চ্যানেলের সমস্ত মাথাব্যথা। এই জাতীয় এলিটপনাকে কবেই নিউজ চ্যানেল ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। ভোটে যেমন, টিআরপিতেও তেমনই একজন দর্শকের একটিই ভোট। তিনি রোগা না মোটা, লম্বা না কালো, আঁতেল না হাড়হাভাতে, তাতে কিস্যু যায় আসে না। এই ব্যাপারে নিউজ চ্যানেল পরিপূর্ণ উত্তরাধুনিক। শিল্পের কোনো রকম হায়ারার্কিতেই তার বিশ্বাস নেই। তাই শুধু এলিট সাহিত্য বা শিল্প নয়, জনতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারও আজ বাংলা নিউজ চ্যানেলেরই হাতে। নতুন মোড়কে বাংলা লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ বিস্মৃতপ্রায় ফর্মকে তারা তুলে এনেছে জনতার দরবারে, যার নাম খেউড়। এবং এর অবিরত পরিবেশনায় বাঙালি দর্শককুলকে করে তুলেছে মুগ্ধ ও মোহিত। ... ...

দোকানগুলো অবধি নেমে এসেছে রাস্তায়। সরু রাস্তা আরও সরু হয়েছে। এবং সেখানে পিলপিল করছে লোক। রোগামোটালম্বাসরু। লাইন দিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে দিয়ে নানা রোমহর্ষক কায়দায় এঁকেবেঁকে অটো চলেছে। আমাদের ছোটো অটো চলে আঁকেবাঁকে। অফিস টাইমে তাতে টার্জান থাকে। বাসরা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। নড়েওনা চড়েওনা। কন্ডাক্টররা চিল্লাচ্ছে, রিক্সারা ভেঁপু বাজাচ্ছে, গাড়িরা তেড়ে হর্ন দিচ্ছে, আর বাকিরা শাপশাপান্ত করছে। রাস্তার হরেকরকম দেশি-বিদেশী গাড়ির ভিড়। সিগনালের বালাই নেই। একেকটা মোড়ে জনা ছয়েক করে পুলিশ আর হোমগার্ড আকাশের দিকে লাঠি উঁচিয়ে আছে। গাড়িরা খানিকটা সার দিয়ে চলেই যেখানে খুশি নাক গুঁজে দিচ্ছে। উল্টো দিকের রাস্তা থেকে তখন আরেকগুচ্ছ গাড়ি এসে হাজির হচ্ছে। সবাই মিলে হর্ন দিচ্ছে, খিস্তি করছে, আর যেখানে সেখানে নাক গুঁজে জটটা আরও খোলতাই করে তুলছে। ... ...

-- উনি কি জানতেন যে বিংশ শতাব্দীতে রণজিৎ গুহ- গায়ত্রী স্পিভাক চক্রবর্তিরা মিলে একটা অন্যরকমের ইতিহাস, ধোপা-নাপিত-কামার-কুমোরের ইতিহাস লেখার জন্যে গজল্লা করবেন? তবে এইটা লিখেছেন যে জ্যেঠা রাজকৃষ্ণ অত্যন্ত ধার্মিক ও ""নামে রুচি,জীবে দয়া, ভক্তি ভগবানে'' গোছের লোক ছিলেন। খরা-বন্যা-মহামারীর সময় প্রজাদের জন্যে ধানের গোলা খুলে দিতেন, যে যা চাইত ধার দিতেন, হিসেব রাখতেন না। দিয়ে খুশি হতেন। একেবারে টিমন অফ এথেন্স! ফলটাও হাতে হাতে পেলেন। লোকে ধার শোধ করতে ভুলে গেল। আস্তে আস্তে ওনার তালুকদারীর নৌকোয় ফুটো হতে লাগল। ফলে দশবছর বয়সে পিতৃহীন গগনচন্দ্রকে ইংরেজি স্কুলে পড়ার জন্যে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে রেঁধে বেড়ে খেয়ে থাকার শর্তে নওয়া-যশোদল যেতে হল। সেখানে আবার স্কুলে স্ট্রাইক ও হয়েছিল, ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে, স্কুল বন্ধ হল, তার ব্যাপক গল্প আছে। হে-হে, বংশের ধারা যাবে কোথায়? আম্মো না নাকতলা স্কুলে ১৯৬৬তে স্ট্রাইক করিয়েছিলাম। --ঢের হয়েছে। এবার একটা চুটকি গল্প বলে শেষ কর, খালি প্যারাবলের মত শেষে কোন মর্যালিস্ট লেকচার দিও না। ... ...

একদিন বঙ্কা পড়াশোনা শেষ করে খুব ক্লান্ত হয়ে ছাদে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল, অ্যাকসিডেন্টালি বা ইনসিডেন্টালি তার মুখটা ছিল পাকিস্তান বর্ডারের দিকে ফেরানো। উইংয়ের ছেলেরা এর থেকে দল বেঁধে সহজ পাটিগণিত সমাধান করে ফেলে এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখে সেদিন সারারাত ছাদ থেকে তারস্বরে, পাকিস্তান বর্ডারের দিকে মুখ করে আমরা গেয়েছিলাম, একটাই লাইন : আন তবে বীণা, আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ, আন তবে বীণা, আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ ... সে যে কী অপূর্ব শুনতে হয়েছিল, কী বলব। ... ...

বলার কী আছে? মোদ্দাকথাটা হল অন্নই ব্রহ্ম, আর কতবার বলবো? যুগে যুগে বিভিন্ন জনগোষ্ঠি অন্নের অনটন হওয়ায় এক বাসস্থান ছেড়ে নতুন জনপদের সন্ধানে ঘটিবাটি-বোঁচকাবুঁচকি বেঁধে বেরিয়ে পড়েছে। আবার নতুন করে আস্তানা গেড়েছে হয় কোন নদীর তীরে, নয় কোন পাহাড়ের নীচে। তোমাদের খানদানের ব্যাপারটাও ঠিক তাই। তোমারা আদতে বাঙাল নও। ছিলে রাঢ় বাংলার ইন্দ্র। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় অন্নচিন্তা চমৎকারা হলে লং মার্চ করে গঙ্গা পেরিয়ে গারোপাহাড়ের নীচে ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগ সাবডিভিসনের মেঘনা নদীর পাড়ে আঠারবাড়িয়া গ্রামে জঙ্গল সাফ করে বাঘ মেরে বসতি স্থাপন করলে। ইন্দ্র থেকে ক্রমশ: রায় হলে। ছিরু পাল থেকে শ্রীহরি ঘোষ:))))) ... ...

কলেজের তরফে কোনও প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না। কিন্তু ভার্সন শোনা যায় কিছু কিছু। সে জলপাইগুড়ি শহরেরই এক লোকাল মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের ছেলে লোকাল মেয়েকে "তুললে' সেটা শহরের এক ধরণের অপমান হয়ে দাঁড়ায়, কারণ আর যাই হোক, আমরা ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের ছেলেরা, আসলে কলকাতা বা তদ্সন্নিহিত অঞ্চল থেকে আসা একদল বহিরাগত গুণ্ডা অ্যান্টিসোশ্যাল প্রকৃতির ছেলে ছাড়া তো কিছু নয় টাউনের লোকেদের কাছে! সেই ছেলেদের কারুর প্রেমে পড়বে জলপাইগুড়ি টাউনের মেয়ে, এটা কী করে মেনে নেয় টাউনের এলিজিবল ব্যাচেলরের দল? শোনা যায়, অর্ঘ্যও টার্গেট হয়েছিল সেইভাবেই। মেয়েটিরও দেখা করতে আসার ছিল তিস্তার পাড়েই, তাকে কোনওভাবে ঘরে আটকে অন্যরা আসে, এবং একা অর্ঘ্যকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয় বর্ষার ভরা তিস্তার জলে। কোনও সাক্ষী ছিল না, কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই, কেস উঠেছিল, কিন্তু টেঁকে নি। কেবল মনে সন্দেহটা রয়ে গেছে। জলপাইগুড়ির বর্ষার কথা মনে পড়লেই এখনও অর্ঘ্যকে মনে পড়ে। ... ...

তার পরের ঘটনাগুলো ম্যাজিকের মত ঘটল। দেড়শো ছেলে একসাথে নেমে এল নিচে, প্রথমে হস্টেলের কোলাপসিবল গেট বন্ধ করে তালা মারা হল। তারপর ম্যাজিকের মত সকলের হাতে চলে এল অØষন। জিনিসগুলো এক্স্যাক্টলি আমাদের ঘরেই ছিল, কেউ জানতাম না, কী করে যে সেই মুহুর্তেই জেনে ফেললাম তাও মনে পড়ছে না, কেবল মনে আছে আমার ঘরেই লকারের মাথা থেকে বেরোল একটা হকিস্টিক, একটা চেন। আমি হকিস্টিকটা নিলাম, রুমমেট কে-কে নিল চেন। প্রায় পুরো হস্টেল এই রকম চেন রড হকিস্টিক ইত্যাদি জিনিস নিয়ে নিচে মেন গেটের সামনে লবিতে পজিশন নিল, কেবল মাষন একজন ফোর্থ ডান ব্ল্যাক বেল্টের মোকাবিলা করার প্রচেষ্টায়। ... ...

কিন্তু আজকে খেলার মাঠে দারোগাবাবুকে তো দেখছি না,ওই ছোঁড়াটা দৌড়ুচ্ছে, পেছনে ওর বাপ। ব্যাপারটা কি? ------- আর বলিস না। দারোগাবাবুর নালিশ শুনে বাপ তো ছেলেকে আচ্ছা করে কড়কে দিল। কিন্তু ছেলেটা এক্কেবারে যাকে বলে রেকটাম-রাইপ। আজ খেলার মাঠে বন্ধুদের তোল্লাই খেয়ে নিজের বাপকেই জিগ্যেস করেছে-- ' বাবা, আইজ ক্লাসে মাস্টারে জিগাইসে স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রয়ীর নাম। আমি দুইটা কইসি,--" লাল' আর" পাল '। আরেকটা নাম কি যেন? কী ""গঙ্গাধর তিলক''? ------ তারপর? ------- তারপর আর কী ! বাপের তেলেভাজার দোকান, তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে এসেছে, স্কুলের মাঠে এবারে নতুন প্লেয়ার শ্যাম থাপার খেলা দেখবে বলে।। রেগে গিয়ে বলেছে-- বানচোইৎ! জাননা কী গঙ্গাধর? ''বাল""! তারপর কী হচ্চে দেখতেই পাচ্ছিস। না, রঞ্জন কিছুই দেখছে না। ওর কানে বাজছে ওই দু-অক্ষরের শব্দটি। কালকেই ওর দলের একটি ছেলে বলেছে--- এইসব বালের নাটক করে কী হবে? পাড়াতেও এরকম কিছু টিপ্পনী কানে এসেছে। কী হবে? ও নিজেও জানেনা কী হবে। খালি জানে ওকে নাটক করতেই হবে। আজ নয়তো কাল। ... ...

শিলাবৃষ্টি ছিল তরাইয়ের শীতকালে উপরি পাওনা। এ শিল আবার আমাদের দক্ষিণবঙ্গের মত মিহি শিল নয়, যে ছাতা মাথায় কুড়োতে বেরিয়ে পড়লাম। রীতিমতো তাগড়া তাগড়া শিল, মাথায় পড়লে আর বেঁচে ফিরতে হবে না। বরফের বড় বড় চাঙড় পুরো। সেকেন্ড ইয়ারেই বোধ হয় দেখেছিলাম শ্রেষ্ঠ শিলাবৃষ্টি। আধঘন্টার মধ্যে হস্টেলের সামনে বিশাল ফাঁকা সবুজ ক্যাম্পাস পুরো সাদা হয়ে গেল। শিলের সাইজ দেখে কেউ বেরোতে সাহস পায় নি। একজন বোধ হয় বেরিয়েছিল, প্রথম শিলের আঘাতেই তার ছাতা ছিঁড়ে ফুটো হয়ে গেল। ... ...

ওই পূর্ব পাকিস্তান থেকে রিফিউজি হয়ে এসে তিনকামরার দাদুর দস্তানায় মাথা গোঁজা পার্কসার্কাসের ভাড়াবাড়িতে বাইশজনের এজমালি সংসার। তাতে এই ভদ্রলোক প্রত্যেক ঋতুতে তোদের ফল খাওয়ায়নি? অন্তত: প্রত্যেক ফল একবার করে? আর তোরা, অর্বাচীন অপোগন্ডের দল! ইংরেজি গ্রামারের শৌখিন, প্রতিদিন কবিতা পড়ার মত করে স্টেটস্ম্যানের এডিটোরিয়াল পড়া, ফেবার অ্যান্ড ফেবারের নিয়মিত বই কেনা, টি এস এলিয়ট ভক্ত এই ভদ্রলোককে নিয়ে মুচকি মুচকি হাসতিস্, পেটি বুর্জোয়া টেস্ট, তাই না? আসলে ওনার ভালোবাসার ক্ষমতা ছিল বিশাল। ভালবেসে ক্ষতি স্বীকার করতেও উনি কুন্ঠিত হতেন না। তোরা ভালবাসিস শুধু নিজেকে। ... ...

কলেজে পরীক্ষা হত, ঐ যেমন বললাম, বছরে দুবার মাত্র। মোটামুটি ক্লাস ফলো করলে আর পরীক্ষার আগে একমাস থেকে দেড়মাস ঘষলেই পরীক্ষার জন্য তৈরি হওয়া যেত। পরীক্ষা যে হেতু ছাত্রজীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, উত্তরণের একেকটা সিঁড়ির মতন, ফলে এই পরীক্ষার আগে অনেক ছাত্রই মনে মনে বা প্রকাশ্যে অনেক রকম সংস্কার মেনে চলে। ছোটখাটো বা বড়সড়। আমাদের ইয়ারের এক ছেলে প্রতি পরীক্ষায় একটা প্রায় ছিঁড়ে আসা জামাপ্যন্টের সেট পরে পরীক্ষা দিত। একবার বাড়ি থেকে আসার সময়ে সে সেই সেত নিয়ে আসতে ভুলে গেছিল বলে তাকে বাড়ির লোক কুরিয়ার করে সেই জামাপ্যান্ট পাঠিয়েছিল। সেটাই নাকি তার লাকি জামা প্যান্ট। সেটা না পরলে নাকি পরীক্ষা ভালো হয় না। ... ...

হেই লাইগ্যা তাইন, মানে ফকিরচন্দ্র একটা উঁচা টিলা দেইখ্যা তার উপর বাড়ি বানাইলেন। আটচালা বাড়ি। মাঝখানে ঊঠান। চাইরদিগে টানাবারান্দা আর তার গায়ে গায়ে ঘর। হেইডা করতে গিয়া বাঘ-সাপ-খাটাশ কিছু মাইর্যা কিছু তাড়াইয়া জঙ্গল সাফ করলেন। এইডা ছিল তাঁর প্রথম বছর। পরের বছর বাড়ির সামনে বিশাল পুষ্কুনি কাটাইলেন। লোকে কইতো দীঘি। সেই দীঘি পারাপার করা কঠিন ছিল। সারা বছ্ছর গভীর কালোজল। মাইয়ামাইনষে বুকে কলস লইয়া চেষ্টা করতো, কিন্তু পারাপার হইতো মা। সেই দীঘি আজও আছে। খালি তার মইধ্যে আইজ বাবর আলি মুন্সীর হাঁসেরা সাঁতার কাটে। যাউকগিয়া, তিনি উদ্যোগীপুরুষ ছিলেন। কয় বছরের মইধ্যে পাটের চাষ আর অন্য কৃষিকার্য কইর্যা সম্পত্তি বাড়াইলেন। আঠরবাড়িয়া-বাজিতপুর-ময়মনসিংহ সদরে বাড়ি করলেন। ... ...

ফর্ম ভর্তি হয়ে চলে এলে হস্টেলে কাজে নেমে পড়ত শিল্পীরা। আমিও এই শিল্পকর্মে নিযুক্ত থেকেছি অনেকদিন। শিল্পটা আর কিছুই না, একটা দেশলাই কাঠির ডগায় অল্প একটু তুলো লাগিয়ে, সেই তুলো জিওলিনে ভিজিয়ে সুক্ষ্ম হাতে যাওয়া এবং আসার তারিখদুটোকে মুছে দেওয়া। সবুজ কালি উঠে গিয়ে জায়গা দুটো ক্লোরিনের কল্যাণে একেবারে কোরা কাগজ হয়ে যেত। এইবার নিজেদের সবুজ কালিতে, সেই ভদ্রলোকের হাতের লেখার স্টাইলে নিজেদের পছন্দমত ডেট বসানো হত। সাধারণত পুজোর ছুটি পড়ত মহালয়ার দিন থেকে, থাকত ভাইফোঁটা পর্যন্ত। আমরা সেটাকে বাড়িয়ে নিতাম আগে পিছে এক থেকে দু সপ্তাহ মতন। মোটামুটি মহালয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকেই হস্টেল ফাঁকা হয়ে যেত, আবার ভর্তি হত ভাইফোঁটার পরের সোমবার। অনিচ্ছুক হবার কারুর উপায়ও ছিল না, কারণ মেজরিটি চলে যাবার ফলে মেস টেসও বন্ধ হয়ে যেত। বাইরে একদিন দু দিন খাওয়া যেত, কিন্তু দীর্ঘদিন বাইরে খাওয়া ছাত্রদের পক্ষে বেশ অসুবিধাজনক ছিল। ফলে, সেই বিশেষ দিনটিতে প্রায় দেড়শো দুশো ছাত্র একসাথে ট্রেনে চড়ত। ... ...