
কোনো পাঠক যদি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত জুল ভের্নের অনুবাদ গল্পগুলি পড়েন, তিনি বুঝবেন এই অনুবাদ আসলে কতখানি রূপতৃষ্ণা নিয়ে ওই বিখ্যাত লেখকটির রচনার প্রত্যেক শব্দকে নিজের জন্যই যেন সাজাচ্ছে, যেন জুল ভের্নের মধ্যে আছে এক আশ্চর্য জগতের চাবিকাঠি এবং মানবেন্দ্র প্রত্যেক দুটি শব্দের মধ্যবর্তী ফাঁকে সেই চাবিকাঠিকেই খুঁজছেন, আর সঙ্গে নিয়েছেন নিজের পাঠককে, যে পাঠকের মধ্যে ঠিক তাঁর মতোই এক বিস্ময়পাগল চিরকিশোর লুকিয়ে আছে। ... ...

একবার সাত আটদিন এ ঠেক ও ঠেকে কাটিয়ে সোজা ইউনিভার্সিটি গেছি। চুল-দাড়ি জট পাকিয়ে বীভৎস দেখাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার মুখে আমাকে দেখেই খপাত করে পাকড়াও করলেন। “খালাশিটোলাতেই গড়াগড়ি খাওয়া হচ্ছিল বুঝি!” সঙ্গের বান্ধবীটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওর বাপ কী করে? এত পয়সা পায় কোত্থেকে মাল খাওয়ার?” তারপর ট্যাঁক খালি শুনে পয়সা দিয়ে পাঠালেন চুল-দাড়ি কাটতে। নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিলেন—আমি শ্মশ্রুগুম্ফহীন হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে খুব খুশি হয়ে বাড়ি গেলেন। আমাকে কোনোদিন একবারের তরেও বলেননি খালাশিটোলায় যেও না। বরং হিজলিতে চাকরি করার সময় কবি শক্তি চাটুজ্জে একবার কেমন ওঁর বুকে চেপে বসে গলা টিপে মাল খাওয়ার পয়সা আদায় করেছিলেন সে গল্প শোনাতেন রসিয়ে। ... ...

উনি শেষ পর্যন্ত যখন ‘দ্য মেটামরফোসিস' পাঠটিতে এলেন আমি তখন এটুকু জেনে গেছি যে কিছুই আগে জানা হয়নি আমার। যত দূর মনে হয়, এই ছোটোগল্প পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেই বোধহয় কাফকার উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’-ও পড়িয়ে দিয়েছিলেন। ওটা পাঠ্য ছিল না বলে পড়বার দরকার নেই এমন তো না। এ যুগের স্যারেদের মতো বেশি তথ্য দিলাম ফলে সব জমিয়ে রাখা জ্ঞানটুকু খরচ হয়ে গেল সেই ভয় ওনার ছিল না। জীবনদর্শনই ছিল জানা ও জানানোর। সিলেবাসে যা আছে, যতটা পড়ানোর কথা, তার থেকে সবসময় বেশি পড়িয়ে দিতেন। অনেক পরে দেখেছিলাম মেপে কাজ করা, মিতব্যয়িতা ও যৌক্তিকতা এইসব সামান্য খোপের মধ্যে আটকে পড়ে থাকার মতো মানুষ উনি নন। ... ...

স্মৃতিরোমন্থনের এই মুহূর্তে মনে আসছে তায়েব সালিহ্-র ‘A season of Migration to the North’ বা ‘উত্তরে দেশান্তরিত হবার মরশুম’ নামের ছোটো উপন্যাসটির কথা, মানববাবুর কথায়, “উত্তরে দেশান্তরিত হবার মরশুম প্রধানত সন্ধানের কাহিনি: অন্য একজন মানুষের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে কী করে একজন শেষপর্যন্ত, নিজেকেই খুঁজে পেল।” এই উপন্যাসের শেষে উপন্যাসের কথক নদীর জলে ডুবতে গিয়েও, জীবনকে বেছে নেয়, সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করে ওঠে। তায়েব সালিহ্-র এই কথকের মতোই আমরা অনেকে নিজেকে খুঁজতে থাকি মানববাবুর লেখার মধ্যে। অনুবাদের জন্য যে টেক্সটকে নির্বাচন করেছেন, তার সঙ্গে আমরাও ঘুরেছি—উত্তর থেকে দক্ষিণে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তে বা বলা যায় বিভিন্ন জানা-অজানা প্রান্তে। দেশ থেকে দেশান্তরে ঘোরার এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে, ভাষার বহুত্বকে অনুভব করলে বোঝা সম্ভব মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মকাণ্ডের স্বরূপকে। ... ...

অনুবাদের পাশাপাশি এইসমস্ত অসামান্য প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের দেখাতে থাকেন লাতিন আমেরিকার রক্তাক্ত ইতিহাস ও তার থেকে নতুন এক লাতিন আমেরিকাকে গড়ে তোলার স্বপ্ন কীভাবে সেখানকার সাহিত্যে ভাষা পাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার বিদ্রোহী কবি কথাকারেরা ইউরোপীয় আখ্যান জগৎ থেকে সচেতনভাবে স্বতন্ত্র হতে চেয়েছেন। সেটা রচনার বিষয় ও প্রকৃতি উভয় দিক থেকেই। তাঁদের লেখায় রয়েছে এক বিশেষ ধরনের রাজনৈতিকতা, যা তাদের লেখার বিষয়বস্তু ও রীতিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তাঁরা লাতিন আমেরিকার ইতিহাস জুড়ে যে শোষণ চলেছে ঔপনিবেশিক ও নয়া ঔপনিবেশিক যুগে, তাকে ও তার প্রতিক্রিয়াকে নানাভাবে ধারণ করতে চান তাঁদের গল্প উপন্যাসে। সম্পদের লুঠতরাজ, শ্রম শোষণ, স্বৈরতন্ত্র এবং সে সবের প্রতিক্রিয়াজাত দ্রোহ রাজনীতির ব্যাপারটি লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে কীভাবে উঠে আসছে অনুবাদ ও প্রবন্ধের মাধ্যমে বাঙালি পাঠককে তার সাথে নিরন্তর পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মানববাবু। ... ...

তখন আমি সবে মাধ্যমিক, কিন্তু বাংলা আকাডেমিতে দিব্য যাতায়াত, লাইব্রেরির থেকে Esperanto-র ওপর একটা বই নিয়ে বাবার ঘরে বসে বসে পড়ছি। বাবার সঙ্গে তখন একজন ঝকঝকে মানুষ তরতর করে অনেক গল্প করছেন, আমি কিছু শুনছি, কিছু বইতে মন। যাই হোক, একটা ছটফটে বাচ্চা মেয়েকে এস্পেরান্তো পড়তে দেখে তাঁর আমাকে খুব মজাদার লেগেছিল, সেদিনই প্রথম তাঁর মুখে শুনেছিলাম স্প্যানিশরা J কে খ বলে, আর উনি তার মানে খাদবপুরের অধ্যাপক! ... ...

প্রেমিকাকে বিরল দুধরাজনাগ সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে সাপ-পাগল এক যুবার সর্পদংশনে মৃত্যু স্থানীয় হাসপাতালে অ্যান্টিভেনাম সিরাম না থাকায়। কল্পধন্বন্তরির আশায় মৃতদেহ মঞ্জুষে শুইয়ে মনসার ভাসান গাইতে গাইতে গ্রামবাসীর নদীপথে যাত্রা। আশাভঙ্গে অবশেষে মৃতকে গঙ্গায় অর্পণ। তিন দশক আগের মালদা-সন্নিহিত নদীবহুল উত্তরবঙ্গের পটভূমিতে রচিত আখ্যান। অভিজিৎ সেনের নতুন উপন্যাস নাগমঙ্গল। পাঠ করলেন শিক্ষাবিদ ও লেখক অমিয় দেব ... ...

কোভিড অতিমারির বিশ্ব জুড়ে যা তৈরি হবে, তা সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৯১৮ সালের ‘যুদ্ধকালীন কমিউনিজম’-এর নতুন একটি সংস্করণ। লিখেছেন স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্লাভোই জিজেক। তাঁর সাম্প্রতিক বই প্যান্ডেমিক। পড়লেন সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় ... ...

বিজান এলাহি। আজকের ফারসি সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় কবি ও সাহিত্য-তরজমাকার। জীবনের শেষ তিরিশ বছর ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। জীবৎকালে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশ করতে পারেননি বারদুয়েক চেষ্টা করেও। ২০১০ সালে প্রয়াণের পর জনসমক্ষে আসা শুরু হয়েছে তাঁর কবিতার ও তরজমার বিপুল ভাণ্ডার। লিখছেন ইরানি কবি, তরজমাকার, সাহিত্যের গবেষক ও এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকার প্রাবন্ধিক মাহদি গঞ্জভি ... ...

শব্দ সরস্বতী। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মহানদী তীরের নারীসাহিত্য-প্রতিভাদের নিয়ে রচিত একটি বিরল গ্রন্থ। এবং এ গ্রন্থ শুধু সেই প্রতিভাদের লেখালিখির আলোচনাতেই সীমিত নয়, অবরুদ্ধ অন্দর থেকে শুরু করে আজ নারী যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে, তার একটা রুটম্যাপ যেন। রচিত ওড়িয়া ভাষায়। লেখক মনোরমা বিশ্বাল মহাপাত্র। বাংলা তরজমা করেছেন ভারতী নন্দী। পড়লেন লেখক ও তরজমাকার তৃষ্ণা বসাক ... ...

বিগত একদশকে প্রকাশিত বাংলাদেশের চারজন লেখকের চারটি জরুরি বই—দুটি উপন্যাস, একটি ছোটোগল্প সংকলন ও একটি ভ্রমণকাহিনি সংকলন। পড়লেন লেখক জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ ... ...

বঙ্গের প্রাচীন রাঢ় অঞ্চল দীর্ঘকাল ছিল নাচ-গান-বাজনা-ছড়ায় গমগমে এক অঞ্চল। এখন সেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিবর্ণ প্রায়। তবুও রয়ে গিয়েছে কিছু রেশ। তাই নিয়েই একটি সাম্প্রকিত বই। পড়লেন লোকসংস্কৃতি গবেষক রামামৃত সিংহ মহাপাত্র ... ...

পুস্তকপরিচিতিগুলি লিখেছেন রন্তিদেব রায় ... ...

১৯৪৭ আর্থ' এ একটা দৃশ্য ছিল অমৃতসর থেকে লাহোরের দিকে আসা উদ্বাস্তু পরিপূর্ণ একটা ট্রেন লাহোর স্টেশনে এসে যখন দাঁড়িয়েছিল, লাহোরের আত্মীয়স্বজনরা ট্রেনের ভেতর থেকে কেউ বেরোচ্ছে না দেখে যখন উঁকি মেরে দেখতে যায়, এক ঝলক দেখেই আতঙ্কে বাইরে ছিটকে সরে আসে, কেউ কেউ বা ওখানেই বমি করে দেয়। ট্রেনটা ভর্তি ছিল শুধু ছিন্নভিন্ন লাশে। একজনও কেউ জীবিত ছিল না ট্রেনে। লাহোর থেকে যখন অমৃতসরে ট্রেন যায় এদিকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে, তখন সেই ট্রেনটাও পালটা লাশে ভরে ওঠে। অমৃতসর স্টেশনের আত্মীয় স্বজনরাও ঠিক একইভাবে আতঙ্কে সিঁটিয়ে উঠেছিল। সিনেমায় ওই দৃশ্যটা দেখে মনে মনে ভয় পেয়েছিলাম। পরে ভেবেছিলাম সিনেমার প্রয়োজনে অনেক কিছুই তো দেখাতে হয়, তাই এটাও হয়ত বানানো। এরকম যে বাস্তবে হতে পারে কখনো মাথাতেও আসে নি। অনেক অনেক পরে মান্টো পড়ার সময় বুঝেছিলাম এরকম কেন, এর থেকেও অনেক সাঙ্ঘাতিক জিনিস মানুষ করতে পারে। উন্মাদনার চরম সীমায় মানুষ যে কী করতে পারে আর কী করতে পারে না, তা মানুষ নিজেও জানে না। গুরুচণ্ডালী পাবলিকেশনের 'দময়ন্তী'র লেখা 'সিজনস অব বিট্রেয়াল' আবার সেই উন্মাদনার দিনগুলোতে নিয়ে ফেলছিল যেন। ... ...