
টাকার চিন্তায় যখন পাগল পাগল লাগে, তখন মনে হয়, আমি বোধ হয় কাকীদিদা হয়ে যাচ্ছি। কাকীদিদা আমার মায়ের কাকীমা - প্রথমদিকে সত্যি টাকার দরকার ছিল, পরের দিকে ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত, মা কে তারা দিব্যি যত্নেই রেখেছে - তখনও দুপুরবেলায় বেরিয়ে পড়ত কাকীদিদা - বাসে চেপে, রিক্সায় এর বাড়ি তার বাড়ি- 'দিবি রে পঞ্চাশটা টাকা? খুব দরকার। সামনের মাসেই দিয়ে দেব'। অদ্ভূতভাবে মারা গিয়েছিল। কাকীদিদার ছোটো বাড়ি - একতলাই ছিল, বহুবছর পরে ছাদে একখানা ঘর তুলেছিল। বড়মেয়ের বিয়ে হচ্ছিল সেই ছাদে ; কে যেন বলেছিল, মেয়ের বিয়ে দেখতে নেই না কি -কাকীদিদা তাই ছাদের লাগোয়া ঘরেই বসে ছিল, ছাদের দিকে দুটো জানলায় পর্দা টানা। ওদিকে বিয়ের আসরে মালাবদল, শুভদৃষ্টির সময় ছবি তুলছে সবাই; হঠাৎই কাকীদিদার এক বোনপো 'একি একি মেজমাসি জানলায় উঠে কী করছ' বলে চেঁচিয়ে উঠতে কাকীদিদা জানলার রড ছেড়ে ঘরের মেঝেয় ধড়াম করে পড়ল। ... ...

ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ঠিক আমার আগে লাইনে দাঁড়ানো সেই বোরকা পরিহিতা নারীদের একজন ও তাঁর পরিবারকে দীর্ঘক্ষণ ধরে যেভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্নের ধাক্কা সামলাতে দেখি, একটু নার্ভাসই লাগে। আমার কপালে কী প্রশ্ন আছে কে জানে? ডাক পড়ে। কাউন্টারের ওপাশে পাথুরে মুখ। পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিই। ফরফর করে পাতাগুলো ওলটান। ইরানি ভিসার ঠিক আগেই মার্কিন ভিসা। এখনও ভ্যালিড। দুটোর মধ্যে আবার আশ্চর্য সাদৃশ্য। এক পলক আটকে যান। বুক ঢিপঢিপ। এক পলকই মাত্র। পাতা উলটান। ইরানি ভিসা। বার কয়েক আঙুল বোলান। একটু মোড়েন। আর একবার আঙুল বোলান। স্ট্যাম্প। পাসপোর্ট ফিরে আসে। পাথরে মৃদু হাসির ভাজ— বহ্ ইরান খুশ-আমদিদ! ... ...

কখনও পূর্ণচাঁদের আলোয়, কখনও সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে একটা ঘোড়া ছুটে যায়। ঘোড়ার পিঠে দীর্ঘকায় এক পুরুষ। তার হাতে বন্দুক, আর তার কোলে নাকি এক সুন্দরী নারী বসে থাকে। ঘোড়াছুটেযাওয়া ওই পথের দুপাশ জুড়ে ছড়িয়ে যায় জমাটবাঁধা অসংখ্য ধূলিপিন্ড। প্রতিটি খন্ডের ভেতরে গল্প শোনা যায়। সেই গল্প কাঁধে তুলে নেয় কোনও পাগল কিংবা প্রেমিক। লোকজীবনের হাটেমাঠে, সিদলমাখা গরম ভাতের সঙ্গে, পালাগানের আসরে সেই গল্প শোনে জাপান ঘোষ, পূর্ণিমা বর্মন, ইছুপ মন্ডল। ... ...

ঠিক তখনই মেঘ ফেটে যায় দুভাগে। ঝলমলিয়ে চাঁদ ওঠে আর দৃশ্যমান হয় সারা জগত, কাঁসাইয়ের ধারের প্রাচীন মন্দির, সাদা ফেনার হুল্লোড়, ধানের ক্ষেত আর বাতাসে মাথা নাড়ানো গাছের দল। কালো পর্দা সরিয়ে হঠাতই আবির্ভূত হয় এইসব আর রহস্যময় শতাব্দী প্রাচীন রূপের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চরাচর। কানু বৌকে ডাকতে ভুলে যায়, হয়তো ভুলেই থাকতো যদি না তার চোখে পড়তো নদীর মাঝখানে সাদা চরের কালো পলিথিন কুঁড়ের সামনে কার যেন আবছা ছায়া। প্রথমেই সে ভাবলো মাছচোর। বাবা ভৈঁরোনাথের দিব্বি, আজ ওকে ধরবই, এ কথা ভাবতেই লাঠিটা ঘরে রেখে এসেছে বলে দারুণ দুঃখ হলো কানুর। তবু হেই হেই থাম থাম চিৎকারে সাজোয়ান পা-জোড়া ছুটে চললো এক পাথর থেকে আর এক পাথরে, পড়তে গিয়ে টাল সামলে নিলো কতোবার। ... ...

আজকের সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের আলো অনেক বাদামি মিহি ধুলো-ধুলো হয়ে একদিন ছিল পুরোনো পৃথিবীর গায়ে, যখন এই এলাকায় কয়লার একটা খনি বেরিয়ে পড়ে, আর সেকারণেই গুরুত্বপূর্ণ যেদুটো মূল রেললাইন তার মাত্র কয়েকবছর আগেই পাতা হয়েছিল পুবে বকুলপুর আর পশ্চিমে গড়ানডাঙা দিয়ে, ব্রিটিশ সাহেবরা তাদেরকে জুড়ে দেয় একটা মিটারগেজ লাইনের সাহায্যে এবং ঝিনঝিনতলার উত্তরদিকে নদীর তীরে একটা বাংলোও বানানো হয় তখন। কিন্তু এখানকার কয়লা এত নিম্নমানের যে কিছুদিনের মধ্যেই সেই হুজুগ একদম ফুরিয়ে যায়, পরে স্মরণযোগ্য কালের ভেতর আর মাত্র একবারই ঐ মিটারগেজ লাইনটা ব্যবহার করা হয়েছিল যখন একটা ৪-৬-০ ইঞ্জিনে চড়ে ম্যাকফার্লঙ সাহেব এসে পৌঁছান এই বুড়ো ঝিনঝিনতলায়; অবশ্য তখনও বুড়ো ঝিনঝিনতলার নাম ঝিনঝিনতলা হয়নি, সে বুড়োও হয়নি। কোনো একদিন যখন বিকেলের হাওয়া খেতে বুড়ো ঝিনঝিনতলার কানাসাদা মেঘগুলো নদীর ওপর গিয়ে জমা হয়েছিল দলে দলে, সেরকম সময়ে সাহেব এসে পৌঁছেছিলেন এই অক্ষাংশে, দ্রাঘিমার পাড়ে, যেন এইসব পথে, পথের বাতাসে উত্তরসাগরের লবণাক্ত স্বাদ নিয়ে এলেন তিনি, আর নদীর ধারের বাংলোটা তখন জায়গায় জায়গায় একটু জীর্ণ হয়ে গেলেও দিব্যি বাসযোগ্য, সেইখানের নির্জনতা ম্যাকফার্লঙ সাহেবকে মুগ্ধ করল। ... ...

রাস্তায় এক অদৃষ্টপুর্ব দৃশ্য দেখে সে বিস্ময়ে স্থাণু হয়ে গেল। “গ্রে এ এ এ ট পামেলা সারকাস,গ্রে এ এ এ ট পামেলা সারকাস-----” রিকশায় বসে মুখে মাইক ধরে খুব হাসি হাসি মুখে এইরকম বলতে বলতে সিড়িঙ্গে রোগা কিন্তু এই মোটা গোঁপওলা একটা কাকু যাচ্ছে। তার লাল নীল বেগুনী সবুজ হলুদ খয়েরী জামাটা দেখে কুমু মোহিত না হয়ে পারল না,হ্যাঁ, জামা হবে এইরকম। তার বাবা কাকাদের সাদা নীল ছাই ইত্যাদি বিচ্ছিরি রঙের ওগুলো আবার জামা নাকি? কাকুর পাশে জায়গা থাকলেও দুটো প্যাংলা মত ছেলে রিকশার পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলেছে,কাকুর জামার ঘাড়ের কাছে একতাড়া পাতলা কাগজ গোঁজা,সেই কাগজ থেকে একটা দুটো টেনে টেনে নিচ্ছে আর রাস্তার লোকদের হাতে দিচ্ছে। ... ...

আমরা আগে জানতাম যে শিল্পী প্রতিভা নিয়ে জন্মায়, আজকের দিনের কথা হচ্ছে যে, শিল্পী তৈরি করা হয়, শিল্পী কিছু নিয়ে জন্মায় না। শিল্পীকে বানিয়ে তোলা হয়। একটা দল, দলের কতগুলি ভাবনা, শৃঙ্খলা আছে, সেই শৃঙ্খলা দিয়ে শিল্পীকে তৈরি করা হয়। An artist been made, been born না, সেই ‘মেড’ যেহেতু তখন তার নিশ্চয় কোনো শৃঙ্খলা থাকবে, কার্যকারণ থাকবে, সেই কার্যকারণ দিয়ে শিল্পী তৈরি করা হয়। ... ...

এটা কিন্তু প্রথম টাইম মেশিন, হ্যাঁ মশায়। ” প্রোফেসর জনসন বেশ একটু গর্বের সঙ্গে তাঁর দুই সহকর্মীকে বললেন, “মডেলটা একটু ছোট করেই বানালাম, যদিও। তিন পাউন্ড পাঁচ আউন্সের বেশি ভারি জিনিসের ওপর এ পরীক্ষা চলবে না, আর অতীত বা ভবিষ্যতে বারো মিনিটের বেশি দূরে পাঠানোও যাবে না। তবে, এতে সত্যিই কাজ হয়। ” ছোট্ট জিনিসটা দেখতে অনেকটা ডাকঘরের সেই চিঠি ওজন করার যন্ত্রের মতন, তফাত শুধু এই যে, এক্ষেত্রে ওজন করার পাটাতনের নিচের অংশে খান দুই ডায়াল আছে। প্রোফেসর জনসন ধাতুর তৈরি একটা ছোট্ট ঘনক হাতে তুলে নিলেন। “একটা পেতলের ঘনক, এর ওজন এক পাউন্ড এবং দুই দশমিক তিন আউন্স। আমাদের পরীক্ষাটা হবে এর ওপরেই, প্রথমে আমি একে পাঁচ মিনিট ভবিষ্যতে পাঠিয়ে দেখাব। ” ... ...

ওরা থাকাকালীন শেষের দিকে প্রায় প্রতিরাতে শোনা যেত চেঁচামেচি। ওর বউয়ের অভিশাপ, মেয়ের অভিযোগ, কান্না। সেই সব অসুখী উচ্চারণে বাইরের স্ট্রিটল্যাম্পের পান্ডুর আলোয় রাত গ্রাউল করে, শ্বাপদের মত। মিগুয়েলের বিরুদ্ধে খুব সম্ভবতঃ এই পৃথিবীর সব আক্রোশ জমা হয়ে আছে তাদের। একসময়ে ভালো না বাসলে এই রকম ঘেন্নাও করা যায়না। ... ...

ব্রজঠাকুর তো ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে থাকেন। সামান্য জমি জিরেত। কিছু ফলের গাছ। দোকানটা চালায় ভাগ্নে মোহন, আর সংসার চালায় মোহনের বিধবা মা শান্তি। শান্তিবালা আর ছেলে মোহন, বড়ো ভালো মানুষ ওরা। তবে এও ঠিক কোন অকূলে ভেসে যেতো যদি ব্রজগোপাল ঠাঁই না দিতো। তা ব্রজঠাকুরেরও তো বয়স হল। কে দেখে সংসার? হাঁপানি আর ভগবানের চিন্তা -এই নিয়েই জীবন। ব্রজঠাকুর বলেন তাঁর অলৌকিক দর্শনের কথা, চুপচাপ শুনে যান শান্তি। তাঁর মাথার উপর ছাদ। ছেলেটার খাওয়া দাওয়ার কষ্ট নেই। ব্রজঠাকুর বেলাবেলি খেয়ে শুয়ে পড়েন। বলেন আমি যোগনিদ্রা দেই। তো বেশ। দুপুরে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে বাড়ী আসে মোহন। মায়ে পোয়ে খায়। জীবনে এতো শান্তি কখনো পায় নি শান্তিবালা। স্বামী ঘর থেকে বার করে দিলে ছোটো ছেলে নিয়ে লোকের বাড়ী বাস। এর বাড়ী, তার বাড়ী। বারবার ঠাঁই বদল। আশ্রিতের জীবন। অনিশ্চয়। দুর্ভাবনা আর অপমান। ... ...

প্রতিবারই এটিএম থেকে টাকা তোলার পর আচমকাই নিজে থেকে কিছুটা সতর্ক হয়ে যায় সুজয়। জায়গাটা এমনিতে দিনমানে জমজমাট বেশ কয়েকটা ব্যাঙ্ক ও তাদের এটিএম রয়েছে। সামনে অনেকটা পার্কিঙ এর জায়গা। ব্যাঙ্ক গুলো ছাড়াও বেশ কিছু বীমা কোম্পানি, শেয়ার কোম্পানির অফিস, মোবাইলের ঝকঝকে দোকান এমনকি ভালো রেস্তোরাঁও রয়েছে এখানে। কিন্তু সুজয়ের টাকা তোলার সময়টায় জায়গাটা বড় শুনশান হয়ে যায়। অফিস থেকে ফেরার পথে এখানে গাড়ি থামিয়ে টাকা তোলার সময় পার্কিং এ একটাও গাড়ি থাকে না। কচ্চিত একটা দুটো এটিএমে নড়বড়ে সিক্যুরিটি গার্ড থাকে, তারা গরমের দিনে এটিএমের মধ্যেই টুলে বসে ঝিমোয়। খুব একটা রাত্তির নয় যদিও, শহরে রাত সাড়ে ন’টা মানে সন্ধ্যাই। বাজার এলাকা এইসময়ে জমজমাট। এদিকের অফিস পাড়া যেন বড় বেশি ফাঁকা। ... ...

এই বাড়ির সামনের গলিটা থেকে বেরিয়ে বড়োরাস্তা ধরে একটু এগোলে রাস্তাটা আড়াআড়িভাবে আরেকটা রাস্তা কেটে দিয়ে বেরিয়ে গেছে, ঐ চৌমাথা জায়গাটা একটু বাজার মত, চায়ের দোকান, মুদিখানার দোকান, সেলুন, ডাক্তারখানা — এইসব আছে, ডাক্তারখানাটার পাশে 'সুহাসিনী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের' লাগোয়া একটা ছোট্টো কালী মন্দির; দুবেলা ঐখানে গিয়ে একটু ফুল-বাতাসা দিয়ে আসা — ব্যাস, এইটুকুই জয়প্রকাশের কাজ সারাদিনে, এইকাজটাই তিনি গত পঞ্চাশ বছর ধরে করে আসছেন। এছাড়া আর কোনো পার্থিব ব্যাপারের সঙ্গে তাঁর কোনো সংস্রব নেই, লোকেও মাঝেসাঝে যদি পুজোটুজো দিতে আসে তো এল, এছাড়া তাঁকে কেউ পাত্তা দেয়না। পুজোও কমে গেছে মন্দিরটায়, নমো নমো করে টিকে আছে; মন্দিরটার পিছনে একটা বটগাছ মাথার ওপর ঝাঁকড়ে রয়েছে ছাতার মতো, ফলে মন্দিরটার সারা গায়ে শ্যাওলা, অযত্নের ছাপ, দেয়ালগুলোর চুনখসে ইঁটের পাঁজরা বেরিয়ে পড়েছে এখানে-সেখানে, মফস্বল শহরের অন্যান্য বড়ো বড়ো চমৎকার মন্দিরগুলোর তুলনায় নেহাতই একটা উপদ্রব মাত্র। লোকের আর দোষ কি, খামখা পুজো দিতে আসবে কেন? তবু ঐখানটাতেই সারাজীবন জয়প্রকাশ পুরোহিত হয়ে রয়ে গেলেন, ঐখানটাতেই ঘন্টা নেড়ে টুং টুং করে গেলেন — ছেলের কথাটা মনে পড়ল তাঁর — লোকের কারোর মুরোদ বেশি হয়, কারোর কম, কিন্তু তা বলে তোমার মত নিমুরুদে বাপ যদি একপিস দেখেছি মাইরি! ... ...

মনোনকে হোক বা যাই হোক ওপরে যেতেই হবে, ব্যাগ নিতে হবে, আরও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করত হবে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। ওপরের ল্যান্ডিংএ পৌঁছনোর আগেই মনে হল সবাই সরে গেল, সামনের ঘরের দরজাটা আলতো করে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে ঢুকে তাতামির ওপর শুয়ে পড়লাম, ঘড়িতে সকাল ছটার এলার্ম দিয়ে রাখলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার এত আতঙ্কের মধ্যেও ঘুমিয়েও পড়লাম। সকাল হল, বাইরে বের হয়ে গ্রামের একটি লোককেও দেখলাম না। বাস ঠিক সাতটায় এল। গতকালেরই চালক, সে যেন আমাকে দেখে আশ্চর্য হল না, হেসে বলল, ‘সুপ্রভাত’। ... ...

আমি রবি ঠাকুরের কবিতাও গড়্ গড়্ করিয়া বলিয়া যাইতে পারি। যেমন, ছপ্পড় পর কৌঁয়া নাচে ও আর কত কাল একা থাকব। এরূপ ভীষণ স্মরণশক্তি আজিকালকার বাঙ্গালীদের মধ্যে দেখা যায় না। শুনিয়াছিলাম মহাপুরুষ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের এইরূপ ভীষণ স্মরণশক্তি ছিল। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মহাশয় বাঘের ন্যায় গর্জ্জন করিতে পারিতেন। এ কারণে লোকে তাঁহাকে বাঙ্গালার বাঘ বলিত। তিনি একবার অত্যাচারী বৃটিশ শাসকের বাড়িতে গিয়া এইরূপ ভয়ানক গর্জ্জন করিয়াছিলেন যে অত্যাচারী বৃটিশ শাসক ভয় পাইয়া তাঁহার নামে একটি অট্টালিকা লিখিয়া দেয়। সেই অট্টালিকাতে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মহাশয় একটি কলেজ স্থাপন করেন। সেই কলেজ অধুনা আশুতোষ কলেজ নামে খ্যাত। এইরূপ আরো বহু ঘটনার কথা আমি নানা দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থে পড়িয়াছি। এইভাবে নানা দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের পর গ্রন্থ পড়িতে পড়িতে আমি বর্ত্তমানে একজন কেও-কেটা হইয়াছি। আমার সহিত এখন আর কেহই পাল্লা টানিতে পারিবে না। ... ...

আর দেখুন, রবীন মণ্ডল তো কলকাতার লোক কেনে নি। কিনেছে দিল্লী আর মুম্বাইয়ের বায়াররা। লাস্ট ফোর-ফাইভ ইয়ার্স, দে আর বায়িং টু বিল্ড আপ দেয়ার স্টক। এরপর কী হবে? মার্কেটে যা পড়ে আছে, ওরাই কিনে নেবে - দরকার হলে, বেশী দামে হলেও। দেন, দে উইল ক্রিয়েট আ ডিমান্ড, আ ক্রাইসিস - প্রাইস চড়চড় করে বাড়বে। দিস হ্যাপেনড উইথ সুজা অ্যান্ড টেক মাই ওয়ার্ডস, দ্য সেম ইজ গোয়িং টু হ্যাপেন উইথ রবীন মণ্ডল। বেশ কথা। শাঁসালো কালেক্টর কদ্দূর সহমত হলেন, বলতে পারি না। আমার শুধু মনে পড়ে গেল, রবীন মণ্ডল চেয়েছিলেন, তাঁর ছবি দেখে দর্শক যেন দর্পণের মুখোমুখি হন। কে সেই দর্শক? দর্পণের মুখোমুখি হয়ে ডিজাইনার হেয়ার-সালোঁ থেকে ছেঁটে আসা চুলটুকু গুছিয়ে নেওয়া বাদে সেই ধনী মানুষটি আর কী করবেন? ... ...

এনআরসি, ক্যা, এনপিয়ার - সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল এখন এদেরি দখলে। বড়দিন, নববর্ষে পালাপার্বণের ভরা মোচ্ছবের বাজারেও। এরকম গম্ভীর বিষয় নিয়েও ইয়ার্কি, ফাজলামি, খোরাক, খিল্লি, ব্যংগবিদ্রূপে ছেয়ে যাচ্ছে ফেসবুক ট্যুইটার ফেসবুকের দেওয়াল, রাস্তায় নেমে যুদ্ধের সংগে সমানতালে চলছে মায়াদুনিয়ায় পোস্ট আর পোলের লড়াই। সেসব যুদ্ধেরই কিছু আঁচ, দেয়ালের কিছু ভেংচি কাটা ছবির টুকরো, রইল এই সংকলনে।আপনাদের নজরে মণিমুক্তো কিছু এলে পাঠান এই ঠিকানায়, পরবর্তী দেয়াল লিখনের জন্য, [email protected] ... ...

ছুটতে ছুটতেই দারিয়ানাসু লুকোনো দরজার দূরত্ব মনে মনে মেপে নেয়, মনে মনেই একবার হাসে। নিশ্চিন্ত হবার হাসি, পেছনে ছোটা ঘোড়সওয়ারদের বোকা বানানোর হাসি। আরও পিছনে হৈ-হৈ করতে থাকা লোকগুলোকে এখন দেখা যাচ্ছে না, টিলার আড়ালে হারিয়ে গেছে। ঘোড়সওয়ারদেরও দারিয়ানাসু আগেই বোকা বানিয়ে দিতে পারত, হরিণের মতো ছুটতে পারে সে, কিন্তু পিঠের দামি বোঝাটা ফেলে দিতে চায়নি। অবশ্য তাতে কিছু ক্ষতি হয় নি তার, আর বিশবার শ্বাস নিতে-না-নিতেই সে পৌঁছে যাবে লুকোনো গোল দরজার পাশে। ব্যাস, তারপর একটা ছোট্ট লাফ, তারপর দু’পলকে দরজার ফাঁকটুকু বুজে যাবে। হাঃ হাঃ হাঃ, ঘোড়সওয়ারগুলো বুঝতেই পারবে না কোথায় ভ্যানিস হল তাদের শিকার। ছাউনিতে গিয়ে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদবে অন্যদের কাছে, বলবে ভুতুড়ে মানুষের কথা, যাদের দেখা যায় কিন্তু ধরা যায় না। ... ...

বাঙালি মাত্র বিদেশে গেলেও দেশের খাবার খোঁজে। দিল্লী স্টেশনের বাইরে বাংলা সাইনবোর্ড যারা দেখেছেন তারা জানেন। মালিক হতে পারে রাজস্থানি, দুটো বাঙালিকে কাজে রেখে দিব্বি দু পয়সা করে খাচ্ছে। আমিও এতে দোষের কিছু দেখিনা। কথাতেই বলে, আপ রুচি খানা। যা পছন্দ হবে খাও, কে কি বলবে হ্যা ! তো, ওই গাইডগিরি করার সময়, কানে কানে ফিসফিস করে সাদেক মিয়ার হোটেলের (মানে ওই, রেস্টুরেন্ট, আমরা ওটাকেই হোটেল বলি) কথা বলে দিতুম। এই সাদেক মিয়ার কথা আগেও বলেছি, এনার মাইয়ারে আমি বাংলা পড়ানোর নাম করে গল্পগুজব করতুম হফতায় দুদিন। টুরিস্টদের বলতুম, দেশের কথা মনে পড়ে যাবে, ফেরার টিকেট দু দিন এগিয়ে আনতে হবে, এতো ভালো এর খাবার। ... ...

সত্যি বলতে কি, উৎসবের মিষ্টি কিন্তু লৌকিক মিষ্টিগুলোই। লৌকিক মানে যার তেমন বাজার মূল্য নেই। একসময় প্রচুর চলত। এখন পুজোআচ্চার সঙ্গে জুতে গিয়ে কোনও ক্রমে মান বজায় রেখেছে। অথবা ঘরোয়া ভাবে মাঝে মাঝে উদয় হয়ে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। যেমন মালপোয়া। এখন অবশ্য কিছু কিছু মিষ্টির দোকানেও মালপোয়া তৈরি করে। ধানেরও সাধ দেয়। বাংলায় যাকে বলে নল দেওয়া। আশ্বিন মাসের শেষ দিনে ধান জমিতে নল দেওয়া হয়। নল দেওয়া মানে ধানগাছকে সাধভক্ষণ করানো। এই সময়ে ধানগাছে শিস ধরতে শুরু করে। ধানের সবুজ খোলকের ভেতরে তখন সাদা তরল। চাষিরা বলেন, ধানের দুধ। মানে ধানগাছ গর্ভবতী হয়েছে। ধানের সবুজ খোসা যত সোনালি হবে এই দুধ তত শক্ত হবে। শেষে চাল। ধানে দুধ এলেই চাষিরা সাধভক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ... ...

আমার একরত্তি একাদশী দিদিমা, ঘটিবাড়ির মেয়ের বাঙাল ঘরে বিয়ে হয়ে আসাটা যেন তার জীবনের ভোল পাল্টে দিয়েছিল রাতারাতি। ঐটুকুনি মেয়ে বিয়ের কি বোঝে! সে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল গ্রাম্য পরিবেশের মাধুর্য্য। গাছের ফলপাকড়, টাটকা শাকসব্জী, নদী-পুকুর থেকে মাছ ধরে আনা সেই বিবাহিতা কিশোরীর কাছে যেন বিস্ময় তখন। শহর বরানগর তখন অনেকটাই আটপৌরে গেঁয়োপনা ছেড়ে সবেমাত্র শহুরে হতে শিখেছে। কাজেই প্রকৃতি, সবুজের মাঝে অবাধ বিচরণ সেই কিশোরীর জীবনে অধরা ছিল। শ্বশুরবাড়িতে সকাল হতেই ঘি অথবা কাঁচা সরষের তেল ছড়িয়ে আতপ চালের ফেনাভাত খাওয়া তার কাছে অপার আনন্দ বয়ে আনত। বরানগরে তিনি শিখেছিলেন সকালের প্রাতরাশ হিসেবে পাঁউরুটি-মাখন খাওয়া অথবা লুচি-পরোটা কিম্বা রুটি তরকারী। বাংলাদেশে এসে সেই ফেনাভাত তার কাছে অবাক করা এক ব্রেকফাস্ট সেই মুহূর্তে। দুপুর হলেই পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা ছিল তার কাছে এক আশ্চর্য্যের বিষয়। ... ...