
ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রবাস কালে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার এক প্রণম্য পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছিল। দেবিন্দর কাপুর তখন আমাদের টোরোনটো অফিসের অধ্যক্ষ। কাজে এসেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট। আমাদের মতো কয়েকজন তরুণ অফিসারের সঙ্গে বাক্যালাপ করে কিছু আদেশ ও উপদেশ দিলেন। তার মধ্যে একটি বেশ মনে আছে। আজকাল প্রায় শোনা যায় প্ল্যান এ বা প্ল্যান বি। দেবিন্দর কাপুর বলেছিলেন বৎস গণ, সর্বদা জোব্বার ভিতরে একাধিক পরিকল্পনা রাখিও। অবস্থা বুঝিয়া তাহা বাহির করিও। এক লাইনের একই পরিকল্পনা একই প্রভুকে বারংবার দেখাইও না – যথাসম্ভব জটিল ভাবে ইহা পেশ করিবে যাহাতে তিনি কোন মতে বুঝিয়া না উঠিতে পারেন - কোন সহজ সূত্র দিবে না। চলিতে চলিতে পরিকল্পনা পরিবর্তন করিতে থাকিও। কোন বিচক্ষণ ব্যক্তি একটি বিশেষ প্ল্যানকে বলপূর্বক আজীবনের জন্য আলিঙ্গনবদ্ধ করেন না। শেষ করলেন এই বলে- বেটে চলতে রহো, সোচতে রহো, বদলতে রহো! আগে বড়োগে! সেই সুপরামর্শটি মনের ভেতর উদিত হল উল্কার মত। আমাদের কাজে মানে এই বাজারি লগ্নিদার খোঁজা বা সিনডিকেশানের কথা শুনলেই কর্তা ব্যক্তিরা জানতে চাইবেন আমার সমর কৌশল কি? ঠিক কি ভাবে আমরা মায়দান -এ- জংগে নামব? কাদের আমরা কম বেশি চিনি? কার কাছে ভিক্ষায় যাবো? কেন যাবো? ... ...

সোভিয়েত ও চীনা মডেলের মিশ্রণে সংসদীয় পথে সমাজতন্ত্র কায়েম নেহরুর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বিফলে যাচ্ছে, চীন অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীন তাদের এলাকা বলে দখল করে নেওয়ায়। আকসাই চীন নিজেদের কবলে রাখলেও পরে অরুণাচল প্রদেশ থেকে সেনা সরিয়ে নেয় চীন। এই যুদ্ধ ঘিরে উগ্র জাতীয়তাবাদ তীব্র হয়ে ওঠে। কমিউনিস্টদের দেশদ্রোহী বলা শুরু হয়। কোথাও কোথাও গায়ে হাত দেওয়া হয়। জেলে পোরা হয়। আর আমাদের গ্রামাঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি তখনও তত শক্তিশালী নয়, কিন্তু বাবার এলাকায় প্রভাব ছিল প্রচুর। সম্পত্তি, পরোপকার এবং খেলাধুলা যাত্রা ইত্যাদি নানা জনসংযোগের কারণে। ওই সময় বাবাদেরও চীনা দালাল বলে টিপ্প নি শুনতে হয়। চৌষট্টিতে বলে মাকু। এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি মার্ক্সবাদী -- 'না এক ভাই/ না এক পাই বলে' বলে শ্লোগান তোলে। তাতে খুব নিন্দা রটে। খবরের কাগজে এবং রেডিওতে তুলোধুনো করা হয় কমিউনিস্টদের। বেশ কিছু কমিউনিস্ট নয় এমন মুসলিম নেতাকে ১৯৬৫তে কারাবন্দি করা হয়। প্রখ্যাত বাগ্মী সৈয়দ বদরুদ্দোজাও নিপীড়ন থেকে ছাড় পাননি। তিনি তখন সাংসদ। আগে কমিউনিস্টদের চীনা দালাল বলা হচ্ছিল এবার বলা হলো মাকু চীনা পাকি। কুশপুত্তলিকা দাহ হলো বহু জায়গায় জ্যোতি বসুর। ব্রাত্য বসুর 'উইঙ্কল টুইঙ্কল' নাটকে দেবশঙ্কর হালদারের একটা অসাধারণ সংলাপ আছে এই নিয়ে। বাবার সামনে ছেলে গান্ধীবাদী বাবার নাম ধরে বলছেন, আমি কমিউনিস্ট। তীব্র সমালোচনা নিন্দা এবং অপপ্রচারের মুখেও কমিউনিস্টদের পিছু হঠতে দেখা যায় নি। ... ...

কালিদাসের জীবনের প্রেক্ষাপটে হিন্দি নাট্যকার মোহন রাকেশ (১৯২৫-১৯৭২) ১৯৫৮ সালে ‘আষাঢ় কা এক দিন’নাটকটি রচনা করেন। এই নাটকটি হিন্দি ভাষার প্রথম আধুনিক নাটক হিসেবে স্বীকৃত হয়। পরের বছর ১৯৫৯ সালে সেরা নাটক হিসেবে ‘সঙ্গীত নাটক একাডেমী পুরস্কার’ লাভ করে। এই নাটকটি থেকে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মনি কাউল (১৯৪৪-২০১১) ১৯৭১ সালে নির্মাণ করেন ‘আষাঢ় কা এক দিন’ ছবিটি। কাউল মনে করতেন ইউরোপের রেনেসাঁর পর শিল্প সম্পর্কে বিশেষত ভিস্যুয়াল কালচারের ব্যাপারে আমাদের উপলব্ধিতে প্রভূত পরিবর্তন আসে। বলা-বাহুল্য ভিস্যুয়াল কালচারের চৌহুদ্দিতে চলচ্চিত্র নবতম, রেনেসাঁর সময় তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। রেনেসাঁর সময় এক নতুন ধরনের পারস্পেক্টিভ বা দৃষ্টিকোণের জন্ম হয়। এই দৃষ্টিকোণ স্থানকে নতুন রূপে আত্মস্থ করে, যেখানে ফোরগ্রাউন্ড মিডলগ্রাউন্ড ব্যাকগ্রাউন্ডের হাত ধরে বাস্তবতার এক নতুন ধরনের অর্থের জন্ম হয়। এমনকি সঙ্গীত ও সাহিত্যেও পরিবর্তন আসে। বহু পূর্বের গ্রীক সাহিত্যে যেমন একটা নতুন ফর্ম ছিল - যাকে বলা হয় যুক্তি, প্রতি-যুক্তি থেকে সমাধান। আমাদের দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার জন্য যেমন দুটি সমান্তরাল সরলরেখাকে আমরা শেষে দূরে মিলিত হতে দেখি, এই সমাধান বা ক্লাইম্যাক্সও বহুদিন ধরে লালিত ঐ-রকম একটি শৈল্পিক ধারণা। ... ...

ইংরেজ পূর্ব আফ্রিকায় প্রথমে উগান্ডায় ঘাঁটি গেড়েছিল; চমৎকার সবুজ দেশ, হ্রদে ভরা: চার্চিল বলেছিলেন এ এক রূপকথার দেশ। হাজার মাইল দূরের সমুদ্র বন্দর মোমবাসা থেকে কাম্পালা অবধি রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৯৬ সালে; এই রেল প্রকল্পে অর্থ লগ্নির বিতর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হেনরি লাবুশেরে ওপরে উদ্ধৃত তির্যক মন্তব্যটি করেছিলেন! ততদিনে ব্রিটিশ রাজ ভারতে বিশ হাজার মাইল রেললাইন পেতে ফেলেছে তাতে লাভ হয়েছে প্রচুর কিন্তু আফ্রিকায় সেটা কতটা সঙ্গত হবে এনিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেদিন লন্ডনের ওয়েস্টমিনসটারে বসে একে পাগলের লাইন মনে হলেও ভবিষ্যতে পাঁচ মিলিয়ন পাউন্ডের লগ্নির আয় দ্বিগুণ হবে এই আশায় ব্রিটিশ সরকার প্ল্যান মঞ্জুর করেছিলেন। কোনো অজ্ঞাত কারণে সেই রেলপথ থেমে যায় লেক ভিক্টোরিয়ার কূলে, কিসুমুতে কিন্তু রেল লাইন বরাবর জনপদগুলি জুড়ে গিয়ে দেখা দিলো একটি নতুন দেশ, কেনিয়া! রেল নির্মাণ কর্তৃপক্ষ মাঝ পথে কর্ম বিরতির জন্য একটি ক্যাম্প বানিয়েছিলেন, কালে সেটি এক জনপদে পরিণত হল, আজ সেটি পূর্ব আফ্রিকার বৃহত্তম শহর, নাইরোবি(মাসাই শব্দ- শীতল জল, কুল ওয়াটার)! তখনকার পূর্ব আফ্রিকার ব্রিটিশ কমিশনার চার্লস এলিওট বলেছিলেন, “কোনো দেশে রেলওয়ে বানানো আশ্চর্য কিছু নয় কিন্তু কোন রেলওয়ে থেকে একটা দেশ বনে গেল সেটা নিঃসন্দেহে আশ্চর্যের কথা”। মোমবাসা জুড়ল পাঁচশ মাইল দূরের কিসুমুর সঙ্গে- কেনিয়ার জন্ম হলো। ... ...

সিনেমার ওপরে লেখা থাকতো অনন্যা, অজন্তা। ওগুলো যে হলের নাম পরে বুঝেছি। আমি ভাবতাম লেখিকার নাম। ভাবতাম, এই বই তিনজন চারজন লিখেছে? কাউকে জিজ্ঞেস করতেও পারতাম না, লজ্জায়। একটা বিজ্ঞাপন ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শট গান। পাখি মারার ছররা বন্দুক। ৬০ টাকা দাম। ডাকযোগে পাঠানো হয়। শোনা গেল, দু একজন ঠকেছে। অন্যজায়গার। শুধু পাইপ এসেছে। ... ...

আমরা সকলেই নিজ-নিজ সংসার-পরিবারের প্রতি বিশ্বস্ত। আমাদের নিয়মিত নিশ্চিন্ত উপার্জনের প্রতি আমরা বিশ্বস্ত। রাজধানী এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে কিছুটা প্রতিপত্তি উপভোগ এবং তার ফলে উপরি কিছু সুযোগ-সুবিধে লাভের প্রতি আমরা বিশ্বস্ত। আমাদের এই বিশ্বস্ততা অটুট থাকলে – আমরা রাজ্যের প্রতি তো বটেই – যে কোন রাজার প্রতিও সর্বদা বিশ্বস্ত থাকব। আমাদের এই সকল বিশ্বস্ততায় যদি কোনভাবেই হাত না পড়ে – তাহলে রাজার সিংহাসনে কখন কে বসল। কিংবা কখন কে উলটে গেল – তাতে কিছু কী যায় আসে আমাদের? আর আমাদের এই প্রভাব-প্রতিপত্তির সুবিধায় যদি কোনদিন টান পড়ে, বিপ্লবী হয়ে উঠতে আমাদের কতদিন লাগবে? ... ...

পড়েছিলাম, খানিকটা পড়েছিলাম, বলে উল্কি। লেকের মোটামুটি পূবে বলিভিয়া আর পশ্চিমে পেরু; পৃথিবীর উচ্চতম নাব্য সরোবর, দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম, বিরাট বড় জাহাজও অক্লেশে চলতে পারে। মুড়কি বলেছে যেদিকেই তাকানো যাক জল ছাড়া আর কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। এই লেকের ওপর ছোটবড় অন্তত একচল্লিশটা দ্বীপ আছে, কাজেই তার মধ্যে যে কোন একটা দ্বীপে মুড়কিকে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে। ... ...

ভালোয় মন্দয় মিলিয়ে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে অনেক বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে, তবে এবার যা হলো তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের আরেক প্রস্থ কফির অর্ডার দিয়ে ইস্তভান কিছু লিখলেন একটা কাগজে, তার পর বললেন ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে তিনি সিটি ব্যাঙ্ককে একটি আন্তর্জাতিক ঋণের মৌখিক ম্যানডেট দিতে আগ্রহী। আমরা যদি তাঁদের শর্ত মেনে নিই, ইস্তভান তাঁর বোর্ডের সম্মতি বিধায় আমাদের ফর্মাল চিঠি দেবেন, তাতে কিছু সময় লাগতে পারে। এবার তিনি তাঁর টেবিলে লেখা চিরকুটে চোখ রেখে উইশ লিস্ট, চাহিদার তালিকা জানালেন- এক। কাম্য ঋণের পরিমাণ তিরিশ মিলিয়ন ডলার। দুই। মেয়াদ তিন বছর, আসলটা শোধ দেওয়া হবে ঋণচুক্তি সই করার তিন বছর বাদে, কোনো কিস্তিতে নয়। তিন। সুদ প্রত্যর্পণ করা হবে প্রতি ছ মাস অন্তর। চার। সুদের হার লন্ডনের ইন্টার ব্যাঙ্ক অফার রেট বা লাইবরের ওপরে ২% (সে সময় ৪% প্লাস ২=৬%), ফিক্সড নয়, ফ্লোটিং, ছ মাস অন্তর নির্ধারিত হবে। পাঁচ। আমাদের পারিশ্রমিক তিরিশ মিলিয়ন ডলারের ওপরে ১% অথবা ৩০০,০০০ ডলার, সেটি ঋণচুক্তি সই হবার দিনে দেয়, আপ ফ্রন্ট। সুখবর ! খদ্দেরের আজ্ঞাপত্র বা ম্যানডেট পেতে কত যে ঘোরাঘুরি করতে হয়, জুতোর সুখতলা খোয়াতে হয়! টাটা স্টিলের বর্তমান অধ্যক্ষ কৌশিক চাটুজ্জে তার সাক্ষী। তাঁর কোম্পানির ইংল্যান্ডের কোরাস স্টিল অধিগ্রহণের ডিলের সন্ধানে বম্বে হাউসের লবিতে, প্রয়াত রতন টাটার স্নেহধন্য সতত বিচরণরত কুকুরগুলিকে পাশ কাটিয়ে লিফটে চড়ে তিনতলায় কৌশিকের অফিসে কতদিন যে হত্যে দিয়ে বসে থেকেছি (তাঁর তৎকালীন সুযোগ্য সহকারী সন্দীপ অবশ্য আমাদের আপ্যায়নের কোন ত্রুটি রাখে নি)। এই বুদাপেস্ট ব্যাঙ্ক পয়লা মিটিঙেই বললেন, চরৈবেতি? মানে আমাদের কপালে ডিল নাচছে, না আমরা বোকার মতন বীরদর্পে কোন গভীর গাড্ডার দিকে এগুচ্ছি? চ্যালেঞ্জের তালিকা নিম্নরূপ: পূর্ব ইউরোপের বাজার খুলেছে সবে কিন্তু এই কয়েক বছরে কোনও দেশের কোনো ব্যাঙ্কই আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারে আসে নি। ব্যাঙ্কের বয়েস সাত বছর, ব্যবসার ফলাফল ভদ্রসমাজে বড়ো গলা করে বলার মতন নয়; লাভের মুখ কখনো দেখেনি, দেখছে লোকসানের মুখ। মালিকানা সরকারি, জানি। কিন্তু ঋণের অনাদায়ের অপরাধে হাঙ্গেরি সরকারকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না। সরকারের একটি কবচ-কুণ্ডল থাকে, তার নাম সভারেন ইমিউনিটি, সরকার অবধ্য। ঋণের দর কি হবে ব্যাঙ্ক নিজেই স্থির করে দিয়েছে। সেটা তাদের ইচ্ছে, পাবলিক সেটা মানবে? বেচব কাকে? কোনো তুলনামূলক বাজারি দর আমাদের অজ্ঞাত, ওয়াল স্ট্রিটের কেতাবি ভাষায় যার নাম মার্কেট রিড। মার্কেট কোনও ডিলই দেখে নি অতএব কোনো কিছু রিড করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব! জিজ্ঞেস করব কাকে? পশ্চিমে ঋণের বাজারে হাঙ্গেরি ও বুদাপেস্ট দুইই অপরিচিত। ... ...

হ্যাঁ, আমাদের চোখের সামনেই, বলে ফল্গু, তারপর আগের দিন সকালে যতটুকু দেখেছে সবটাই বলে। শুনে, ফিনিগান বললো, আমরা পুলিশের মর্গ থেকেই আসছি এখানে সোজা। আপনারা যা দেখেছেন সেটা পুলিশকে বলবেন নাকি? হয়তো ওদের তদন্তে সুবিধে হবে। ... ...

এক ভদ্রলোকের কথা মনে আছে। এলেন। বছর ত্রিশেক বয়স। দিন কুড়ি থাকলেন। সন্ধ্যা বেলায় বিচিত্র গল্প শোনালেন। তারপর একদিন একটা চাদর নিয়ে চলে গেলেন। আর একজনের কথা খুব মনে আছে। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় মার্কা চেহারা। দক্ষিণ ২৪ পরগণার মানুষ। কামারশালা বসাতেন আমাদের বৈঠকখানার পাশে। রাতে থাকতেন বৈঠকখানায়। হাঁড়িকুঁড়ি ঝালাই করতেন। তামার হাঁড়ি পাতিল নিকেল করতেন। রিপিট মারতেন কড়াই বা বালতিতে। কাজ ছিল চমৎকার। বেশ কয়েকবছর এসেছিলেন। তাঁরা বেগুন দিয়ে একটা তরকারি করতেন। বেড়ালের পায়খানার মতো রঙ হতো। গোলমরিচের হাল্কা ঝাল থাকতো। আহা অমৃত। আমি তো সারা সন্ধ্যা কোনও মতে একটু পড়ে কামারশালেই বসে থাকতাম। ওই আগুনে রঙ, হাপরটানার কায়দা, নিপুণভাবে ঝাল করা, আমাকে মুগ্ধ করে দিত। ইচ্ছে হতো, হাপর টানি। দুয়েক বার চেষ্টা করেছি। সুবিধা হয় নি। গণদেবতা তখন পড়ে ফেলেছি। আমার তাঁকে অনিরুদ্ধ কামার মনে হতো। ... ...

বাড়ি ফিরে সদ্যজাতা শিশুকে প্রথম কোলে নিয়ে তার চোখে জল চলে এসেছিল। সে অশ্রু আনন্দের না কষ্টের – সে কথা আজও সে বুঝতে পারেনি। প্রথম সন্তানের বাবা হওয়ার আনন্দ তো ছিলই। কিন্তু কষ্টও ছিল। নিজের প্রথম সন্তানের জন্মের মতো আশ্চর্য এক ঘটনার মুহূর্তে সে উপস্থিত থাকতে পারেনি। হুল এবং মায়ের চরম উদ্বেগের সময় পাশে থেকে পিতৃসুলভ কোন কর্তব্যই সে পালন করতে পারেনি। ... ...

আলোর অপেক্ষায় থাকা আঁধারের দিনগুলোয় সতর্কতা ছিল, ভয় ছিল, রোমাঞ্চও ছিল। আশা ছিল – আলো আসবে, আলো আসছে। কিন্তু, আলোর উল্টো পথে চলে যে আঁধারে পৌঁছে যাওয়া, আলোর সম্ভাবনাগুলোকে ধ্বংস করে আঁধারের সমুদ্রে যে ক্রম-নিমজ্জন, আমাদের বোধের জগতে সে বড় ভয়াবহ, সে বড় মর্মান্তিক অভিঘাত নিয়ে এসেছিল। সেই শেষ নয় যদিও। বস্তুত জীবন দীর্ঘ হলে আমরা বারেবারেই কালের ঘড়ির দোলকের এই প্রান্ত বদলের মধ্য দিয়ে যাই। তাই আলোর দিনে যথা সাধ্য প্রস্তুতি নিই আগামীর অন্ধকারের জন্য। আর, অন্ধকারের দিনে মনে রাখতে চেষ্টা করি, সমস্ত অন্ধকার যুগ কাটিয়ে একসময় আলোর দিন আসে, পরের অন্ধকারের আগে। আর হাতে ধরা বাতি হোক কি তারার আলোয়, এমনকি নিকষ কালো অন্ধকারেও, আলোর পথযাত্রীরা এগিয়ে চলে, কেউ কেউ পড়ে যায়, তবু এগিয়ে চলা থামেনা। ... ...

অন্যের জীবনে যদি কেউ একটা বিষাক্ত ক্ষত খুঁজে পায়, জানি না কেন, কিছু লোক সেটাকেই খুঁচিয়ে বড়ো আনন্দ পায়…”। ... ...

মুড়কি বোঝবার চেষ্টা করে সে কোথায় আছে। হাসপাতাল তো নয়, কোন বাড়িই হবে। তাহলে ফল্গুদি আর উল্কিদি কোথায়? আর এই লোকগুলোই বা কারা? তারপর মনে পড়তে শুরু করে তার। মিস্টার শ্যাভেজের সঙ্গে কক-অব-দ্য-রক দেখে ফিরছিল তারা নৌকোতে। পারের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে যখন তখন জোরে একটা শব্দ হলো, তারপর কেউ একটা চেপে ধরলো ওর গলা। তারপর আর মনে নেই কিছু। ... ...


এই অকিঞ্চিৎকর কিঞ্চিতের কাছে একটি প্রাগৈতিহাসিক স্বপ্ন / এ পাড়ায় কি আমি একাই জেগে আছি / বা এই গ্রামে বা শহরে বা দেশে বা পৃথিবীতে / খানিকটা ধোঁয়ার মাঝে রাঙা বউ হারিয়ে যাওয়ার আগে / কুয়াশার মাঝে চোখের জ্যোতি হারিয়ে যাওয়ার আগে / ফানুশের পিছনে বাবা হারিয়ে যাওয়ার আগে / যেভাবে হালকা বাতাসে ভেসে উঠেছিল আমাদের সারাৎসার / আর থমথমে রাত্রি যাপন থেকে দেখে ছিলাম / ক্ষমারও এক সীমাবদ্ধতা আছে / সে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে পারে / এমনকি মহাজাগতিক সময় ... ...

দিন দুয়েক কাটলো, এক একদিন কাটে আর পাহাড় প্রমাণ টেনশন বাড়তে থাকে, পরীক্ষা চলে এলো। সার্জারী একটা সাগর, medicine একটা সাগর। কি কি করে পেরবো, যদি বা উৎরে যাই, biostat বই চাপা পড়ে বোধয় গত জন্মে মরেছিলাম, কিছুতেই মাথায় ঢোকেনা। হোস্টেল থেকে বেরোনো বন্ধ, লোকজনের মুখ দেখিনা, ফুট খানেক দাড়ি হয়েছে, সেই নিয়েই সাপ্তাহিক অন কল করতে যাই। তার আবার সুবিধে ও আছে! সেই বাসি দাড়ির শোনা গল্প; আমাদের এক সিনিয়র ডিউটিতে, সেদিন নার্সিং হোম এ তুলকালাম শুরু হয়েছে কি একটা কারণে, আগুন টাগুন লাগিয়ে দেয় আর কি! কই ডাক্তার, শুয়োরের বাচ্চা ডাক্তার কোথায়! এইসব হাকডাক চলছে। সেই দাদা হেলথ সার্ভিস করা লোক, বাঘা বাঘা জায়গায় একা নাইট ডিউটি করে এসেছে, যেখানে দিনের বেলা লোকে দল বেঁধে চলে সমাজবিরোধীদের ভয়ে। তাকে এই শহুরে শখের ঝামেলাবাজরা কি করবে? তো সেই দাদা, শার্ট টার্ট আউট করে, চুল উস্কো খুস্কো করে, ১৫ দিনের না কাটা দাড়ি নিয়ে লিফট দিয়ে না নেমে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করবে যেই, দেখছে হুড়হুড় করে বানের জলের মত বিষখ্যাত জায়গার লোক ঢুকছে ওয়ার্ডে। হাতে পেলে একটা মার ও মাটিতে পড়বেনা, কার ভুল, কি গন্ডগোল, কিচ্ছু বলার জো নেই। বেশ কিছু লোক সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে সেই দাদাকে দেখলো বটে, দামী শার্ট প্যান্ট, যদিও আউট করা। কিন্তু ওই যে বাঁচিয়ে দিল ১৫ দিনের অশৌচ মার্কা দাড়ি। ... ...

"ও কাকিমা, ওরা আমায় কিছুতেই ঢুকতে দিচ্ছে না, তুমি একটু বলে দাও না।" ছেনুর মা ভেতরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কথা বলছিলেন, হঠাৎ পিছন থেকে এরকম ডাক শুনে অবাক হয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখেন কাঁদো কাঁদো মুখে হাফপ্যান্ট পরা একটা বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, ছেনুর মতো একই বয়স বা এক দু বছর বড় হবে হয়তো। ছেনুর মা, তাকে ডেকে বললেন, কি হয়েছে? তোমার নাম কি? সে আরো কাঁদো কাঁদো মুখে জানাল, তার নাম চন্দন। তার কথা থেকে জানা গেল প্যান্ডেলের সামনে হুটোপাটি করে খেলাধুলোর সময় ছেনু নাকি তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে, এবং সে টাল সামলাতে না পেরে পড়বি তো পড় প্যান্ডেলের ওপর গিয়ে পড়েছে। এবং সেই পতনের ফলে প্যান্ডেলের এক জায়গার কাগজের সাজসজ্জা ফর ফর করে ছিঁড়ে যায়। প্যান্ডেলের লোকজন সেই অবস্থায় দেখতে পেয়ে চেপে ধরে বকাবকি করে, কিন্তু চন্দন পেছনে মুখ ঘুরিয়ে দেখে আসল অপরাধী পগারপার। ফলে এক তরফা সব বকুনি তাকেই শুনতে হয় আর প্যান্ডেলের ডেকোরেশন নষ্ট করার জন্য প্যান্ডেলের কাছে খেলাও বারণ হয়ে যায়। আজ যেই সে ওখানে খেলতে গেছিল, ওমনি ডেকরেটরের লোকজন হাতুড়ি নিয়ে তাড়া করেছে। ... ...

নয়ের দশকের প্রারম্ভ থেকে পূর্ব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলির শিল্প বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশ্বের বাজারে অর্থ সংগ্রহের অভিযানে সিটি ব্যাঙ্ক ছিল পথিকৃৎ। আমার ডায়েরিতে তাই বারে বারে আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণ কেনা বেচার কথা এসেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঋণ গ্রহীতা উন্নয়নশীল দেশের বাসিন্দা আর ঋণ দাতা অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশের লগ্নিকারক; আজকে যাকে নর্থ সাউথ ডিভাইড বলা হয়ে থাকে (পরে আমরা সাউথ সাউথ বা গ্লোবাল সাউথকে একত্রিত করেছি, যেখানে এক উন্নয়নশীল দেশ অন্য দেশে অর্থলগ্নি করেছে )। সে সময়ে আমরা উত্তরের ধন দক্ষিণে বণ্টন করেছি, অবশ্যই উপযুক্ত সুদ এবং মানানসই পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। দেশ কাল ও খদ্দেরের ক্রেডিট রেটিং ভেদে এই বাণিজ্যের খানিকটা ইতর বিশেষ হয়; বদলে যায় সুদের হার, পারিশ্রমিকের বহর। ... ...

গ্রামে আগে ছেলেদের প্রচুর কাজ ছিল। চাষে সাহায্য করা পড়াশোনা করা ছাড়াও ক্লাব করা ফুটবল খেলা, হাডুডু কবাডি নুনচিক / গাদি/ জাহাজ খেলা, শীতে ভলিবল খেলা, ডাংগুলি পেটানো, মার্বেল খেলা, ভাটা খেলা, নিদেন পক্ষে দাবা চাইনিজ চেকার লুডো বা বাগ বন্দি বা তাস খেলা। নাহলে আড্ডা দেওয়া। যাত্রা নাটকের মহলা দেওয়া। সবাই নাটক যাত্রা না করলেও মহলা দেখতে বা শুনতে ভিড় করতেন। নানা ধরনের খেলার দর্শক হতেন। আড্ডায় গিয়ে কথা শুনতেন। মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েরা বিকেলে পাড়া বেড়াতেন। এ ওর চুল বেঁধে দিতেন। কেউ নতুন কোনও সেলাই ফোঁড়াই কুটুম বাড়ি গিয়ে শিখে এলে শিখতে যেতেন। ... ...