
এটা সত্যি আমি বড় বেশি কাঁদি আশা মৃত হলে কাঁদি অন্যের কান্না দেখে কাঁদি অথচ সেদিন আমার চোখে জল এলো না। তখন দিনের আলো নেভে নেভে সূর্য ছিল না তবু পাঁচ যুবকের চোখে কালো চশমা কঠিন সাদা মুখে বেপরোয়া বোহেমিয়ানা পা গুলো জাপটে আছে ময়লা নীল জিন গায়ে ঢোলা চামড়ার জ্যাকেট এক হাতে সিগারেট অন্য হাতে বিয়ারের ক্যান ... ...

"ফিরলেন? উইক এন্ডে কী করছেন?" এই অনিবার্য প্রশ্ন আসতেই আমি মনে মনে হেসে ফেলি। এক গতে বাঁধা সবকিছু। এতটুকু বৈপরীত্য নেই একটা দৃশ্যের সাথে আরেকটা দৃশ্যের। এই নিপুন অভিনয়ের পুনরাবৃত্তি আমাকে কম বয়েসের একটা পাগলামির কথা মনে করিয়ে দেয়। বক্সঅফিস-হিট হিন্দি সিনেমা দেখতে যাচ্ছি মফঃস্বলী সিনেমা হলে। পরপর তিনবার। তিনবারই আলাদা করে রিকোয়েস্ট এসেছে শুধু আমার জন্য। কারণ, আমি স্মার্ট, আমি কথা বলতে জানি। ওদের ভাষায় বললে, আমি 'অ্যাকটিং ভালোই জানি।' এসব ক্ষেত্রে কী করে অজুহাতকে প্রায়োরিটি হিসাবে সেট করতে হবে তা আমার জানা। কোন গলি দিয়ে অভিসারিকাকে নিয়ে গেলে সবচেয়ে কম লোক দেখবে, কোন চায়ের দোকানের পিছনে নিভৃত গুমটি আছে, মেলার মাঠের কোন দিকটার লাইটপোস্টের আলোটা জনস্বার্থে ভাঙা থাকে এসব নিগূঢ় তথ্য সাপ্লাই করে মফঃস্বলের প্রধান দূতী হয়ে উঠেছি তাই, এইসব গোপন অভিসারে আমি ফার্স্ট চয়েস। এ বিষয়ে অন্য ছেলেপিলেরা চেষ্টা করেও বিশেষ সুবিধা করতে পারত না। ... ...

বড়রাস্তার ধারের মাচানে কয়েকজন ওম নিচ্ছে গুটিসুটি। একপাশ দিয়ে যে সরু রাস্তা বেঁকেছে ওদিকে এগোলেই গ্রাম- কাঁপতে কাঁপতে কেউ একজন বলে দিল। আমরা গলা ভিজিয়ে বাঁক নিলাম। রাস্তার কাজ হয়নি কোনোদিন অথবা হয়েছিল দায়সারা এখন খারাপ হয়ে গেছে। হোঁচট খাচ্ছি আটকে যাচ্ছি। দেখেশুনে যেতে হচ্ছে। কেউ একজন আসছে টুংটাং টুংটাং। -এখানে ধুমগাঁ কতদূরে? -ওই সাঁকো দেখছেন। ওটা পেরিয়ে বাঁক নেবেন। দুপাশে ক্ষেত। আর একটু গেলে একটা পুরনো মড়া গাছ পাবেন। তাবিজ কবজ গুপ্তরোগ চিকিৎসার চিরকুট চেটানো আছে ওর গায়ে স্থানীয় সংবাদ আছে যুদ্ধের খবর আছে নিখোঁজ আর কে কবে কী করেছিল তার বিজ্ঞাপন। গাছের পাশ দিয়ে যে আলপথ ওটা ধরে এগোলেই গাঁ। ধন্যবাদ জানিয়ে গতি বাড়ালাম। ... ...

এই স্রোত, এই ক্ষয়, এই আয়ু, এই সীমা ওই জল, জানলা খুললেই অনন্ত যুদ্ধক্ষেত্র চিতা এই অক্ষর, মেদ, রক্তমাংসমেদমজ্জাহাড় নিয়ে জুয়ো খেলতে বসে ঘরদোরউঠোনরান্নাঘর মায় সকল আত্মীয়পরিজনপাড়াপ্রতিবেশী হারিয়েছি। ... ...

প্যারাসেলসাস বলেছিলেন, “Only the dose makes a thing not a poison”, অর্থাৎ শুধু মাত্রার তফাত-ই ঠিক করে দেয়, কোনটা বিষ, আর কোনটা বিষ নয়। আজকের দিনে এই কথাটার তাৎপর্য বোঝা বোধহয় আরও একটু বেশিই দরকারি হয়ে পড়েছে আমাদের সবার জন্যেই, কারণ বিজ্ঞাপন কিংবা মিডিয়া থেকে শুরু করে খবরের বিভিন্ন সূত্রে প্রায়-ই শোনা যায় ভয়-ধরানো সব বিশেষণ, “সাঙ্ঘাতিক বিষ”, “দ্য মোস্ট টক্সিক সাবস্ট্যান্স” ইত্যাদি প্রভৃতি। যা থেকে আমাদের মনে হয় যেন আসলে প্রকৃতিতে একটা দুর্দান্ত বাইনারি ব্যবস্থা আছে - কিছু পদার্থ বিষাক্ত আর বাকি সব নির্বিষ। কিন্তু আরেকটু তলিয়ে দেখলে বোধহয় প্যারাসেলসাসের মতই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো খুব কঠিন না। আরও সহজ করে বললে, যত বিষাক্ত পদার্থই হোক না কেন, যদি তার একটিমাত্র অণু, একটি মলিকিউল প্রবেশ করে কারুর শরীরে, বাজি রেখে বলা যায় তার কিস্যু হবে না, আবার অন্য দিকে মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে, এমন কী জল-ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। আর তাই, আজকের আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা দূষকের মাত্রা পার্টস পার বিলিয়ন অর্থাৎ পিপিবি এককে মাপতে পারছি যখন, আবার-ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন ‘বিষবিজ্ঞানের জনক’ প্যারাসেলসাস। মাত্রা তবে মাপবো কী করে? কাকে বলে বায়ো-অ্যাসে, অথবা ডোজ-রেস্পন্স কার্ভ? কাকেই বা বলে LD-50? সেই সব গল্পে আসতে গেলে আমাদের রেনেসাঁ পেরিয়ে এসে অপেক্ষা করতে হবে সেই ১৯৩৫ অব্দি। ওহায়োর স্প্রিংফিল্ডের একজন সাধারণ কিন্তু অসামান্য মানুষ চেস্টার ব্লিসের গল্প বলবো। ব্লিসের গল্পে আসবেন ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট, আসবে গ্রেট ডিপ্রেশন, রোনাল্ড ফিশার এবং স্তালিন-জমানার লেনিনগ্রাদের গল্প। এবং একটু অঙ্ক, আর নির্বিষ অঙ্কের সাথে একটু বিষাক্ত ইতিহাস। ... ...

চাকুরীর সন্ধানে আসানসোলে গিয়েছিলাম। তখন আলাপ হল। এই পাঁচ বছরে সম্বন্ধটা আরো গভীর হয়েছে, সহজ হয়েছে। অনেকদিন থেকে ভেবেছি ওর কথা লিখে রাখবো। কেননা আমার জীবনের অনেকখানি, বিশেষ করে চরমতম ট্রাজেডি ও হতাশার সেই দিনগুলোতে ও আমাকে জুগিয়েছে অনেক কিছু --- সাহসের মতো দুর্লভ কিছু, সাহচর্যের মতো ভরাট কিছু এবং অত্যন্ত স্থুল কিন্তু সেকালে নিতান্ত প্রয়োজনীয় যা সেই-- অভাবে অর্থ সাহায্য। লিখবো লিখবো করেও লেখা হয়নি। প্রত্যেকবার ভেবেছি ধীরে সুস্থে, প্রচুর সময় নিয়ে খুঁটিনাটি সবকিছু লিখে রাখবো। শুধু ঘটনা নয় আমার মানসিক চিন্তার সব আলোড়ন, স্থিতি এবং টানাপড়েন। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি। যেহেতু সেই সুস্থতা ও সময় কখনো পাইনি। আজও লেখা হবে না সবটুকু। তবু সূচনাটুকু লিখে রাখি, কি জানি আর যদি কখনো সময় না পাই, তবে হয়তো লেখাই হবে না কোনদিন। অন্তত এই মুখবন্ধ টুকুই আমাদের পরিচয়ের অভিজ্ঞান হয়ে থাকবে, ভবিষ্যতে যদি কখনো লেখা নাই হয় আর। ... ...

মানুষ গায়ের জোরে কেড়ে নেয়। গোরু মোষ ছাগল ভেড়ার দুধ লুঠ করে নেয়। ক্ষমতার জোরে। সামান্য খাবার দিয়ে। প্রাণীরা তাঁদের সন্তানের জন্য এসব রাখতে চান। আমি তো দেখেছি, বাছুরকে বেঁধে রেখে পিতলের বালতিতে দুধ দুয়ে নিতে। এই দুধ হতো গরম ফেনাময়। মুরগি হাঁস তেমন ডিম পেড়ে তা দিত, যাতে বাচ্চা জন্মায়। ... ...

হ্যাঁ, নটরাজনকে মাত্র ৩ টাকা ওভারড্রাফটের চার্জ লাগিয়ে সাস্পেন্ড করা হয়, যদিও সেটা ওর ক্যাশিয়ার মহিলার ভুলের ফসল। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট জানত যে নটরাজন বিধবা বাঙালি সহকর্মীটির প্রেমে পড়েছে। সে মেয়েটিকে ফাঁসাবে না। তাই হল, নটরাজন সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিল এবং দশমাস সাস্পেন্ড হল। এক ইনক্রিমেন্ট স্টপের শাস্তি পেল। শেষে বোর্ডে আপিল করে রেহাই পায়। তো সচ্চিদানন্দ একেবারে কড়া। কমিশন দূর কী বাত, কোন বিজনেসম্যানের থেকে দীপাবলীর মিঠাইয়ের বাক্সও নেয় না। স্টাফদের বিলিয়ে দেয়। ওর দোষ বড্ড মুহফট। যা ভাবে তাই বলে ফেলে। বর্তমান জিএম ওকে চেনেননি। বারবার দূত পাঠাচ্ছেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এবং ইশারায় একটাই বার্তা। ... ...

এই উপন্যাস আবর্তিত হয়েছে নজরুলকে কেন্দ্রে রেখে, যাঁর কর্মজীবন ব্যাপ্ত হয়েছে বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশক জুড়ে। বস্তুত, এই আখ্যানের নায়ক এই সময়কাল। লেখকের নিজের কথাতে - "রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়াও সমাজ শিল্প এবং সাহিত্যের নানা আন্দোলনের কারণে গত একশো বছরের ভারতীয় ইতিহাসে এই সময়কাল বিশিষ্ট। উপন্যাসটির নায়ক এই সময়কালই।" পাঠক সমাদৃত ৪৮ পর্বের উপন্যাসটির প্রথম ২৫ পর্ব নিয়ে গত বছর প্রকাশিত হয়েছিল, প্রথম খণ্ড। এবার বাকি পর্বগুলি নিয়ে প্রকাশিত হতে চলেছে দ্বিতীয় খণ্ড। দত্তকের জন্য যোগাযোগ করুন। ... ...

কমনরুমে জনা ছয়েক চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পরে কৌশিকবাবু গলা খাঁকারি দিলেন, ‘'তাহলে কী করা যায়? ডিআই অফিস থেকে তো কিছুই বলতে পারছে না।” এ ওর মুখের দিকে তাকায়, পলাশ আস্তে বলে আমরাই নাহয় মাসে মাসে কিছু করে দিয়ে মৃন্ময়দের আসতে বলি। কৌশিকবাবু চিন্তিত মুখে বলেন তাতে আবার আদালত অবমাননার দায়ে পড়ব না তো…। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মৃন্ময় শ্রীলা তাহমিনাসহ ছয়জনের চাকরি গেছে এই স্কুল থেকে। ... ...

আমার শৈশব খেলা করে গোমতীর তীরে। নদীতট, ফেরিঘাট, জারুলের বন, পাথর কুড়িয়ে রাখা, হাওয়ার আদর মাখা, উড়ে যাওয়া মেঘেদের অচেনা মনকেমন। জেলে ডিঙি ভেসে চলে অনন্তের দিকে পাখির ডানায় মাখা গোধূলি-আবির, ... ...

তিন বছর বাড়ি থেকে কাজ করার পর হঠাৎ অফিস সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছে। সপ্তাহে দু দিন। কিন্তু লোকজনের গড়িমসি। অভ্যাস হয়ে গেছিল। ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে এতদিনে তাও তারা দুদিন করে আসতে শুরু করেছে। সামনের বছর থেকে শোনা যাচ্ছে সপ্তাহে তিনদিন আসতে হবে। অফিসে আরো অনেককিছু এতদিনে বদলে গেছে। সেখানে ঢোকার মুখে একটা ক্যামেরা। তার পাশে একটি পাতলা টিভি স্ক্রিনে যদি মাথার চারপাশে সবুজ একটা বর্গক্ষেত্র ফুটে ওঠে, অফিসে ঢোকা যাবে। লাল বর্গক্ষেত্র ফুটে ওঠা মানে শরীর ঠিক নেই, জ্বর, সেদিন বাড়ি ফিরে যাওয়া দরকার। ভেতরে দেওয়ালে দেওয়ালে স্যানিটাইজার ডিস্পেন্সার। চ্যাটচ্যাটে আঠালো তরলে জমে আছে বুদ্বুদ। হাত নিচে নিয়ে গেলেই একদলা ছ্যাত করে হাতে পড়ে। ভুল করে সেই সান্দ্র আঠায় ধোয়া হাতের আঙ্গুল ঠোঁটে বা জিভে লেগে গেলে তেতোভাব। ... ...

পকেট শূন্য। কোথা থেকে সেদিনের অন্ন জুটবে ভাবতে ভাবতে নিউ ইয়র্কের পথে হাঁটছেন, দেখেন রাস্তায় মাটি খোঁড়া হচ্ছে। শারীরিক পরিশ্রমে কখনো কুণ্ঠিত ছিলেন না, এগিয়ে গিয়ে বললেন তিনিও কাজ করতে চান। মজুরদের সর্দার টেসলার পরিচ্ছন্ন পোশাক দেখে অট্টহাসি হাসলেন, তারপর বললেন, ঠিক আছে, সাদা শার্টের হাতটা গুটিয়ে নিয়ে এই গাড্ডায় নেমে কোদাল চালাও। দিনের শেষে দু ডলার মজুরি পেলেন। দিন যায়। মজদুরদের সর্দার তাঁকে ঠিকই চিনেছিলেন। কদিন বাদে দুপুরে একপাশে ডাকলেন, নিজের খাবার ভাগ করে নিয়ে বললেন, ‘ তুমি তো এ কাজ করার জন্য জন্মাও নি। এখানে ভিড়লে কেন? অভাবে? চলো আমার সঙ্গে।’ ... ...

আমরা আপনাদের কাছে ডাক পাঠিয়েছিলাম তাদের খপ করে ধরে ফেলে, ঝপ করে লিখে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে। এসে গেছে তারা। আগামী কয়েকদিন ধরে রোজ দুটি-তিনটি করে তারা এসে হাজির হবে বুলবুলভাজার পাতায় - টাটকা ভাজা, গরমাগরম। পড়তে থাকুন। ভাল লাগলে বা না লাগলে দুই বা আরো অনেক লাইন মন্তব্য লিখে জানিয়ে দিন সে কথা। মন চাইলে, গ্রাহক হয়ে যান লেখকের। ... ...

অনেক মানুষের ভিড়। ওলাই চণ্ডী বস্তির মানুষেরা এসেছে, এসেছে নতুন পাড়ার নেপালিরা, বেলগাছিয়া ট্রামলাইনের ওপারে মুসলমানপাড়ার লোকেরা, রাজা মণীন্দ্র রোডের ২১নং বস্তি, শহীদ কলোনি, সরকার বাগান, প্রচুর বিহারী মানুষজন, রানী রোড, খিলাৎবাবু লেন, বেশির ভাগ মহিলা। ভিড় সামলাতে মাকে ঘরের বাইরে উঠোনে বার করা হল, মায়ের গায়ে যাতে রোদ না লাগে, সেইজন্য মাথার উপরে শাড়ি দিয়ে সামিয়ানার মত করে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হল। তৃণমূল কংগ্রেস, সি পি এম ও কংগ্রেসের নেতারা মালা দিয়ে মাকে সম্মান জানিয়ে গেছে। চিৎপুর থানার বড়বাবু মাথার টুপি খুলে স্যালুট দিয়ে, একটা বড় মালা দিয়ে সম্মান জানিয়ে গেছে। কয়েকটি ক্লাবের ছেলেরা এসে মালা দিয়ে গেছে। শুধু ফুল আর ফুল। ফুলের মধ্যে মা যেন ঘুমিয়ে আছে। অনিমেষ ভাবছিল, এত মানুষকে খবর কে দিল। খবরটা বাতাসের মতো, ঝড়ের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ও অনুভব করল, বেঁচে থাকা, জীবন যেন শান্ত, ছন্দ সুর তাল লয় নিয়ে সংগীতের মত। আর বেদনা ভয়ঙ্কর। অশান্ত সমুদ্রে ভয়ঙ্কর ঢেউয়ের মত। অনিমেষ পুনরায় মায়ের পায়ে হাত রেখে ভাবতে থাকে, মাকে এত কাছে পেয়ে মায়ের কাজকর্ম, মায়ের চিন্তাভাবনা, আমি যে অন্তরঙ্গ লাভ করেছি, মায়ের জীবন দর্শনের অনুভূতি সম্প্রসারণে আমি ঋদ্ধ হয়েছি, অভিজ্ঞতালব্ধ সম্পদ, সংগ্রাম, আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। মায়ের জীবন দর্শনকেই আমার দর্শন করে আমি এগিয়ে চলেছি। ... ...

আমাদের বাড়িতে সেহরি হোক বা ইফতার, আয়োজন খুব সামান্য। রাত্রের জন্য যে ভাত/রুটি ও তরকারি করা হতো প্রথমেই তার থেকে কিছু অংশ তুলে রাখা হতো সেহরির জন্য। ভোর রাত্রে সেই খাবার স্টিমে গরম করে নিতেন মা। কিন্তু গ্ৰামের আত্মীয়দের মুখে শুনতাম তাঁদের রাত্রি দুটো আড়াইটায় উঠে নতুন করে রান্না চাপাতে হতো। ভাত, রুটি, তরকারি যে যেমন খাবে সব টাটকা রান্না করে দিতে হবে বাড়ির বৌদের। এক সহকর্মীর মুখে শুনেছিলাম তাঁদের বাড়ির পুরুষরা নাকি এগরোল সহ মোগলাই, বিরিয়ানি ইত্যাদি খাবার খেতে চান। বান্ধবীর মা-দাদি তাই করে দেন রাত জেগে। অথচ রমজান সংযমের মাস। ... ...
আমনদীপ জানে, এখানকার সমস্ত গ্রামগুলোতে যারা উচ্চশিক্ষার বিপুল খরচ যোগাতে পারে না, খেতিবাড়ির কাজ শেখার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাছে আর তিনটে পথ খোলা থাকে– বড় হলে আর্মিতে জয়েন করা, ড্রাইভারি, নয়ত টাকা কামাবার জন্য বিদেশ যাওয়া। তা শেষেরটা তো এখন প্রায় বন্ধ। এজেন্টকে প্রচুর টাকা দিয়ে যারা ভিনদেশী সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের হাতে পায়ে শেকল পরিয়ে প্লেনে তোলার দৃশ্য গায়ের রক্ত ঠান্ডা করে দিয়েছে। ড্রাইভারির কথা সে আর কী বলবে! যত লোক ড্রাইভিং জানে, তত গাড়ি আছে নাকি এই জেলায়! নেই। তাহলে পড়ে রইল শুধু দেশের জন্য জান কবুল করা। কিন্তু এখন বাপ দাদার আমল পালটে গেছে। পুরোদস্তুর সোলজার নয়, লোকে এখন অগ্নিবীর বনতে পারে। চারা সালা দা সিপাহি, চার বছরের সেপাই। পাঁচ বছরে পা দিয়ে ঘরে ফিরে বসে গেলে দেশ কেন, নিজের বৌ-ও দেখবে কিনা সন্দেহ। তবু আর উপায় না দেখে আমনদীপ ঠিক করল সে অগ্নিবীরই হবে। যাই হোক না কেন বীর শব্দটা তো আছে পেছনে। ওটার আকর্ষণ তার বয়সী শিখ সর্দারের কাছে অমোঘ। আর হাত একেবারে খালি থাকার চাইতে, কিছু তো থাকা ভালো। ... ...

মাদারিহাটে দিন তিনেক চলল সার্ভের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস মেনে ছাত্রছাত্রীরা দুরকম সার্ভেই শেখে - অর্থাৎ একদিকে যন্ত্র সহযোগে প্রাকৃতিক পরিবেশের জরিপ, আর অন্যদিকে কোন গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে নানা বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব। সাংবাদিকেরা কারোর জীবন সম্পর্কে জানতে হলে টেপ রেকর্ডার অন করে মানুষের সঙ্গে গল্প করেন - আর সেই গল্প থেকেই উঠে আসে প্রয়োজনীয় তথ্য। ... ...

কাটোয়ার গিধগ্রামের শিবমন্দিরে ‘দাস’ সম্প্রদায়ের মানুষজন স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর নিজেদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতা পেলেন। পুলিশ প্রশাসনের উপস্তিতিতে গ্রামের অস্পৃশ্য চামাররা মন্দিরে ঢুকলেন, সংবিধানের আর্টিকেল ২৫ এ ন্যাস্ত ধর্মাচরণের অধিকার পেলেন পাশাপাশি ৩৫০ বছরের প্রথা ভাঙলেন। তালিকা এইখানেই শেষ নয়। ‘রবিদাসীয়া মহাসঙ্ঘ’ তরফ থেকে সম্প্রতি একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়, সেখানে বলা হয় কেতুগ্রামের গঙ্গাটিকুরি শিবমন্দির, বিল্লেশ্বর শিবমন্দির, নদীয়ার কালিগঞ্জে একই পরিস্থিতি। প্রাথমিক ভাবে নিজেদেরকে প্রগতিশীল দাবী করা বাঙালি নিজেদের ইমেজ বাঁচাতে গিধগ্রামের মতো কোন এক অজ পাড়াগাঁয়ের এই ঘটনাকে ভদ্রলোকী কায়দায় নিছকই বিছিন্ন বলে উড়িয়ে দিতে শুরু করে। কিন্তু তালিকা লম্বা হতে শুরু করতেই নবজাগরনের উত্তরসূরি কলকাতার বাবুদের বেশ চিন্তা; ‘জাতপাত এসব তো বিহার উত্তরপ্রদেশের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গে এসব এলো কবে!’ ক্যালকাটা হাই কোর্টের এক মহামান্য বাঙালি বিচারপতি নদীয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, ‘বাংলায় তো এসব ছিল না। এখনও এই ধরনের সমস্যা বাংলায় নেই বলেই বিশ্বাস করি’। এই সাম্প্রতিক মন্তব্যের একই সুর শোনা গেছিল সেই ১৯৮০ সালে মণ্ডল কমিশনের প্রতিক্রিয়ায়। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে শুধুমাত্র দুটি জাত, ধনী এবং দরিদ্র’। রাজ্য যে জাতপাত মুক্ত এই বিশ্বাস কি একদিনে জন্মেছে? নাকি গঠনতান্ত্রিক উপায়ে বাংলা যে জাত প্রশ্নে ব্যতিক্রম সেটা নির্মাণ করা হয়েছে? আজকে এই লেখায় একটু বিনির্মাণের চেষ্টা করবো। ... ...

বিপাশাদের বাড়ী শ্যামলদের পাড়াতেই। বা বলা যায় বিপাশাদের বাড়ী ছিল শ্যামলদের পাড়াতেই। শ্যামলের মেজো বোন ইলার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত মেয়েটা। তখনও পাড়াগুলোয় বিভিন্ন রকম বাড়ীতেই থাকতো। তখনো পাড়ায় পাড়ায় বহুতলের চল হয়নি। কেউ ভাড়া বাড়িতে, কেউ নিজের বাড়িতে। কেউ নতুন বাড়িতে, আবার কেউ নতুন বাড়ি করার স্বপ্ন নিয়ে পুরনো ভাঙা বাড়িতে। তখনও নতুন, পুরনো, ভাঙা, আধাতৈরি বিভিন্ন প্যাটার্নের বাড়ি নিয়ে এক একটি পাড়া তৈরি হত। বিপাশাদের বাড়িটা ছিল শ্যামলদের পাড়ার একেবারে শেষ মাথায়। দাশগুপ্ত বাড়ী।। ... ...