
আমরা তখন রোমান্টিক শব্দ শুনেছি। রোমান্টিকতা মানে যে নিজের মনের বাইরে আরেকটি গুহামন তৈরি-- জানতাম না। রোমান্টিক রিভাইভাল এইসব শব্দবন্ধও শুনিনি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ যে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স পরস্পরের শত্রু এটা ভেবে বেঁচে থাকার বিরোধী তাও জানতাম না। ফ্রান্সের বিপ্লবকে সম্মান জানিয়ে লিখেছেন 'সলিটারি রিপার' কবিতা, তাও অজানা। ... ...

ঐ নির্বাচনে প্রচলিত গণমাধ্যম, যাঁদেরকে পরিভাষায় আমরা গোদী মিডিয়া বলে থাকি, তাঁরা এই সত্যিটা বুঝতে পারছে, যে তাঁদের প্রোপাগান্ডা আর মানুষকে আকৃষ্ট করছে না এবং এই ধরনের ইউটিউব চ্যানেলগুলো বন্ধ করার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে বেশী বেশী দর্শক যে আঞ্চলিক এবং হিন্দি ভাষার ইউটিউব চ্যানেলগুলো দেখছেন, তা যেনতেন প্রকারে বন্ধ করতে হবে। শুধুমাত্র সরকারি আইন দিয়ে যদি বন্ধ না করা যায়, তাহলে বিকল্প পদ্ধতি নিতে হবে। প্রয়োজনে ঐ ইউটিউবারদের চ্যানেলগুলোকেই উড়িয়ে দিতে হবে, এবং তার জন্য যদি ইউটিউবকেও কাজে লাগাতে হয়, বা অন্য যেকোনো পদ্ধতি নিতে হয়, নিতে হবে। এক্ষেত্রে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল বা এএনআই এবং প্রেস ট্রাষ্ট অফ ইন্ডিয়া বা পিটিআই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। এই দুটি সংবাদ সংস্থাই মূলত সরকারের সবরকম খবর করে থাকে, তাঁদের থেকেই অন্যান্য সংবাদমাধ্যম খবর সংগ্রহ করে থাকে। যাঁরাই ঐ খবর সংগ্রহ করেন, তাঁরা স্বত্ব বাবদ বেশ কিছু টাকা দিয়ে থাকেন এএনআই এবং পিটিআইকে। এটাই নিয়ম। অনেক ইউটিউবার যারা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের বিষয়বস্তু তৈরি করেন তারা অভিযোগ করেছেন যে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) অনুমতি ছাড়াই পরবর্তী ক্লিপগুলি ব্যবহার করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যুক্তি এবং কপিরাইট আইনের উভয় দিকই দেখা প্রয়োজন। ... ...

গল্পের চরিত্রগুলি যেমন সৃষ্টিকর্তার জবাবদিহি দাবি করে, একই ভাবে মর্ত্যে নামাবলী গায়ে যারা ধর্মের ধামাধরা তাদেরকেও লেখিকা নিন্দা, সমালোচনায় বিদ্ধ করেন। ‘ব্ল্যাক কোবরা’ গল্পে জুলেখা, এক আলোকপ্রাপ্ত নারী, আশরফকে বলে নবীর নিজের কন্যা সন্তান ছিল। বিবি ফতিমা তাঁর জান ছিলেন। শোনো, শুধুমাত্র যুদ্ধের সময় যখন অনেক পুরুষ মারা যায়, কিংবা কারো স্ত্রী যদি কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, কিংবা বন্ধ্যা হয়, কিংবা স্ত্রী যদি তাকে সন্তুষ্ট না করতে পারে, তবেই সে চারটে বিয়ে করতে পারে। করলেও তাকে সব স্ত্রীকে সমান সুবিধা দিতে হবে, অর্থাৎ একজনের জন্য বাড়ি বানিয়ে দিলে, শাড়ি কিনলে, অন্যজনের জন্যও সেটা করতে হবে। আশরফ এত কিছু চায় না, সে শুধু তার রুগ্ন শিশুর চিকিৎসার জন্য কিছু পয়সা চায়। ... ...

ইতিমধ্যে ভারতীয়করণের ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর পরিচালনা ভারতীয়দের হাতে চলে আসে। (এ বিষয়ে আমি অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করেছি)। সেদিনের বাংলায় বড় বড় বিদেশি কোম্পানিদের মধ্যে ছিল জেসপ, ডানলপ, জি কে এন, ব্রেথওয়েট, বার্ড এন্ড কো প্রমুখ সংস্থাগুলি। নানা কারণে সেই সময়ে টিটাগড় ও বাংলার জুটমিলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভারতীয় শিল্পপতিরা সেগুলো কিনে নিচ্ছিল। সেই জুটমিলগুলো রূপান্তরিত হয়ে অন্য পণ্য উৎপাদন করতে শুরু করেছিল। এইরকম একটা রূপান্তরিত জুটমিলের নতুন মালিকেরা এক ইংরেজ কোম্পানির কোলাবোরেশনে সেখানে স্প্রিং ও নানা রকম ওজনের যন্ত্র নির্মাণ শুরু করল। সে কোম্পানি জর্জ সল্টার। এই কোম্পানির এক গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করতাম আমি। আমি তাই খুব কাছ থেকে অনেক কিছু দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। ... ...

হিমাংশু বলছেন এক হাড় হিম করা কাহিনি। না, গল্প কথা নয়। দেশে ঘটমান বাস্তবের কথা, হিমাংশু বর্ণনা করেছেন। আপাত নিরাবেগ, নির্লিপ্ত তাঁর কণ্ঠস্বর, যে নির্লিপ্তি আসলে এক ভিন্নতর প্রতিবাদের ভঙ্গী, যন্ত্রণাকে আড়ালে রেখে যন্ত্রণাকে তুলে ধরা। হামলা হচ্ছে আদিবাসীদের ওপর, দেশের নানা প্রান্তে, তার মধ্যে ছত্তিশগড়ের আদিবাসীরা বিশেষভাবে আক্রমণের লক্ষ্য। তাদের হত্যা করা হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০০৫ সালে ছত্তিসগড়ে বিজেপি সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গেই একশটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে, কর্পোরেটদের হাতে জমি হস্তান্তর করার জন্য। সালওয়া জুডুমের সময় যেমন লক্ষ লক্ষ আদিবাসিকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, এ ঠিক তেমনি। সরকার বলছে, মাওবাদী এবং নকশালবাদীরা সংবিধান বিরোধী। তাই মাওবাদী দমন করার প্রক্রিয়া চলছে সাধারণ মানুষের শান্তির জন্য। হিমাংশু বলছেন, যেখানে নকশাল নেই, মাওবাদী নেই সেখানে কি জনসাধারণের ওপর হামলা হয় না? দেশের অন্য প্রান্তে যেখানে নকশালদের চিহ্নমাত্র নেই, সেখানে কী দমনপীড়ন হচ্ছে না? সিআরপিএফ, পুলিশ, বাকি যে আধা-সামরিক বাহিনী আছে, সেগুলি শুধু মাওবাদীদের জন্য বানানো হয়েছে? সারা দেশজুড়েই যেখানে রাষ্ট্রীয় হামলা জারি আছে আদিবাসীদের ওপর, সেখানে নকশালবাদীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া কি অসততা নয়? বরং দেখা যাচ্ছে যে এলাকা মাওবাদী-শূন্য সেখানেও জনগণের ওপর রাষ্ট্রের হিংসার প্রভাব সমানভাবে প্রকট। ... ...

সেটা বোধ হয় ১৯৫৮ সাল। ঠিক মনে নেই, দু এক বছর এদিক ওদিক হতে পারে। মহম্মদ আলি পার্কে বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের বিরাট আয়োজন। বোধহয় তৃতীয় দিন। সে দিন এক দুর্ঘটনা ঘটল। সারা প্যান্ডেল আগুনের গ্রাসে ধুলিসাৎ হয়ে গেল। কর্মকর্তাদের মাথায় হাত। আবার নতুন করে সাজাতে হবে সব- প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন। একটা আকর্ষণীয় কিছু করা দরকার যা সেই সময় অভাবনীয় এবং অর্থাগমের উপায় হবে। ওঁরা শিশির ভাদুড়ীর দ্বারস্থ হলেন। ভাদুড়ী মহাশয় তখন বৃদ্ধ- অভিনয় প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন, স্টেজে নামেননি অনেক কাল। ওঁদের অনুরোধে রাজী হলেন। কাগজে খবরটা দেখে আমি উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। শিশিরবাবুর কথা এত পড়েছি এত নাম শুনেছি। নিউ ইয়র্কে সীতা নাটক করে সাড়া ফেলেছিলেন। কিন্তু ওঁর অভিনয় কখনো দেখিনি। নিজের চোখে শিশির বাবুকে দেখব, নিজের কানে শিশির বাবুর কন্ঠস্বর শুনব সে তো ভাবতেই পারিনি। এমন লোভ সামলাতে পারলাম না। ... ...

প্রতিমাগৃহমন্দিরের সামনে মন্দির চত্বরেই প্রহরী ও সুধাকর, সুধাকরের হাতে ঝাঁটা, কাঁধে গামছা।মন্দিরের সামনে রাজপথ। মঞ্চে অভিনয়ের জন্য গভীরতার দিক থেকে মঞ্চটিকে দুভাগে ভাগ করা। যেতে পারে; এক-তৃতীয়াংশ সামনের দিকে এবং দুই-তৃতীয়াংশ পিছনের দিকে। সামনে এক-তৃতীয়াংশে রাজপথটি, এবং পিছনের দুই-তৃতীয়াংশে মন্দির-চত্বর ও মন্দির-অভ্যন্তর। ... ...

কলকাতা থেকে, মধ্যবয়স্ক এক শৌখিন অ্যাডভোকেট একবার সস্ত্রীক বক্সা জয়ন্তী বেড়াতে আসেন। দুদিন ঘোরার পরে, তাঁর তরুণী প্রগলভা স্ত্রী মুকুলকে বলেন তোমাদের জঙ্গল ফালতু, একটাও জন্তু দেখা যায়না। কথাটা মুকুলের আঁতে লাগে। সে বোঝানোর চেষ্টা করে, জন্তুরা আড়ালে থাকতে পছন্দ করে, তাদের কথা বেশি না ভেবে ঘন গাছপালা, যারা আশ্রয় দেয়, অক্সিজেন দেয়, তাদের সঙ্গ উপভোগ করুণ। তরুণী সে কথায় আমল না দিয়ে তর্ক চালিয়ে যান। ... ...

ডাবলিনের কেন্দ্রস্থল, স্টিফেন্স গ্রিনের অদূরে দেশের প্রাচীনতম বিদ্যায়তন ট্রিনিটি কলেজের ক্যাম্পাসটি বিশাল, সেখানে একটি কলেজ। আমার মতন মানুষের অহেতুক কৌতূহল মেটানোর জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি সুবন্দোবস্ত করেছেন। জুন-জুলাই-আগস্ট এই তিন মাস কিছু দক্ষিণার বিনিময়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে রাত্রিবাস করা যায়, রীতিমত বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট, যার নামই হল ফুল আইরিশ ব্রেকফাস্ট (ডিম, সসেজ, মাশরুম, টমেটো, ব্ল্যাক পুডিং, প্রচুর আলু এমনকি আলুর পিঠে বা প্যানকেক)! জানলা খুললেই সবুজ লন, পাথর বাঁধানো চত্বর, ট্রিনিটি কলেজের নানান ফ্যাকাল্টির ঐতিহাসিক বাড়ি, বেল টাওয়ার (কাম্পানিলে)। মনে হয় এই বুঝি ঘণ্টা পড়বে, পণ্ডিত মশায়ের ক্লাস, নর, নরৌ, নরাঃ। ... ...

সাংঘাতিক ঘরকুনো হওয়ার সুবাদে মিছিল নগরীর বাসিন্দা হলেও মিছিলের পাশ দিয়ে হাঁটা এই প্রথম, তাও তালেগোলে ঘটে গেছে। খিদে টিদে ভুলে গেলাম। এদিক ওদিক করে গুচ্ছের ছবি, ভিডিও তুলতে তুলতে এলাম। এবং বুঝলাম দলবদ্ধ হওয়ার কি মহিমা! মিছিলের উন্মাদনার অনুভূতি নিয়ে বাংলায় গাদা গুচ্ছ লেখা আছে। লেখা পড়ে অনেকেই নিশ্চই বোঝে, অনুভব করে। স্পষ্টত, আমি একেবারেই বুঝিওনি, অনুভবও করিনি। ফলে, আজকেই আমি বুঝলাম খুব ধীরে হেঁটেও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া কেমন করে ঘটে। হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম হাসি মুখের মানুষদের। ভুভুজেলা, সেই ছেলেবেলার মেলার ঝুমঝুমি জাতীয় অনেক কিছুই বাজছে। স্লোগান নেই। কারণ প্রতিবাদ মুখে নয়, হাতে উঁচিয়ে ছিল। স্লোগান ব্যাপারটা আমি একটু কমই শুনেছি এখানে। বেশি দেখেছি মাইক নিয়ে গান, বাজনা বাজানো। ... ...

একমাস পেরিয়ে গেছে, ৩ এপ্রিল (২০২৫) শীর্ষ আদালতের এক সিদ্ধান্ত বয়ে এনেছে গভীর সামাজিক অভিঘাত। বিপুল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জন্য বাতিল হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনকৃত (এসএসসি) ২০১৬-র পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই। পাঁচ বছরেরও বেশি চাকরি করার পর রাতারাতি চাকরিচ্যুত হতে চলেছেন ২৫৭৩৫ জন শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী। জালিয়াতিতে অভিযুক্ত রাজ্য সরকারের অতি উচ্চতর পদাধিকারীরা। সংশ্লিষ্ট (সাবেক) মন্ত্রীসহ তাঁরা জেলে বন্দি রয়েছেন। নানান সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের নির্যাস– এসএসসি, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বিপুল দুর্নীতির কারণে এবং কমিশনের অসহযোগিতায় জালিয়াত বা দোষী এবং নির্দোষী নিয়োগপ্রাপ্তদের বাছাই করার তথ্যপ্রমাণ ছিল না, তাই সমগ্র প্যানেল বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে আদালত। সম্প্রতি রাজ্য সরকার রিভিউ পিটিশনের মাধ্যমে রায়টি ফের পর্যালোচনার জন্য আবেদন জানিয়েছে সর্বোচ্চ আদালতে। ... ...

১৯৪৬ সাল। আমার মা তখন ভিক্টরিয়া ইনস্টিটিউশন এ প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কলেজ ছাড়া বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক অল্পই। তাও যাতায়াত পর্দা ঢাকা ঘোড়ার গাড়িতে। আগের বছর মেজ মামা বিয়ে করেছেন এক বাঙালি ক্রিশ্চিয়ান মহিলাকে। চিঠি মারফত শুধু ওই খবরটুকুই দিয়েছেন বাবা মাকে, এবং এ তরফ থেকে "বউ নিয়ে তুমি বাড়ি এসো" জাতীয় কোন চিঠি যায়নি। এর মধ্যে ১৯৪৬ এর আগস্ট মাসে নৌ সেনা মেজো মামার কন্যার জন্মের দশ দিনের মাথায় হঠাৎ যুদ্ধে ডাক পড়ল। স্থির করল কচি মেয়েকে নিয়ে খিদিরপুরে মেজ মামিমার বাপের বাড়িতে ওদের রেখে আসবে। কিন্তু হাওড়া স্টেশনে আসতেই সমস্ত ট্যাক্সি বলল লক্ষ টাকা দিলেও ওদিকে যাবে না। দাঙ্গাকারীরা শুধু ওদের নয়, দুধের শিশু, তার মা কাউকেই ছাড়বে না। মেজমামা তখন "আমার মা কিছুতেই ফেরাবেন না" দৃঢ় বিশ্বাসে শ্যামপুকুরে দাদুর বাড়িতে এসে মেয়ে বউকে রেখে গেলেন। নতুন বউ, নতুন নাতনি সবকিছুর আনন্দ খুবই ক্ষণস্থায়ী হলো, কারণ পরদিনই সকালে বাড়ির সামনে দেখা গেল পাড়ার ছেলেরা, যাদেরকে বড়জোর মস্তান বলা যায়, এতদিন পর্যন্ত গুন্ডা বলা যেত না, তারা একটা মুসলমান মজুর কে পিটিয়ে মারছে। বেচারি লুকিয়ে ছিল তিন দিন, পেটের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে খাবার খুঁজতে বেরিয়েছিল। এই বীভৎসতা সহ্য করতে না পেরে দাদু বললেন অন্তত আমার বাড়ির সামনে থেকে সরে যা তোরা। ... ...


খেরোর খাতায় লেখা দেওয়ার বিস্তারিত পদ্ধতি। ছবিসহ বুঝিয়ে বলা আছে এখানে। ... ...

সারাদিনের অতিরিক্ত পরিশ্রমে যাত্রা শুরু হওয়ার কিছু পরেই চোখ খুলে রাখা দায় হতো। বড়দের বলে রাখতাম, যুদ্ধের দৃশ্য, আমাদের ভাষায়, সিন, এলেই জাগিয়ে দিতে। কেরিচু কেরিচু ক্যাঁ বলে একটা বাজনা বাজতো। আর তলোয়ার নিয়ে সে কী লড়াই। একটু পড়তে পারার পর থেকেই যাত্রার বইগুলো আমার মুখস্থ হয়ে যেতো। কোন বই ( যাত্রা) এবার ধরা হবে, সে-নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে যেত মাঘ মাসের যাত্রা শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই। কিন্তু মহলা সেই আশ্বিন কার্তিক মাসে। তার আগে কত পালা দেখা পড়া চলতো। বই পড়া আর তার সঙ্গে রোজ সন্ধ্যায় মহলা দেখা-- এই নিয়ে বই তো মুখস্থ হবেই। ... ...


গত কয়েকদিন ধরেই, বিশেষ করে গতকাল রাত থেকে প্রায় সমস্ত মূলধারার মিডিয়া, ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপে (ট্যুইটার/এক্স, ফেসবুক, হোয়াটস-অ্যাপ ইত্যাদি) নাগাড়ে ভুয়ো খবর ছড়ানো হয়েছে। সেইগুলি ছড়ানোর কাজ শুরু করেছে মূলধারার মিডিয়া এবং তাদের প্রচার করা খবর সত্যি বলে ধরে নিয়ে সেগুলিকে দাবানলের মত সারাদেশে ছড়িয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে অভূতপূর্ব আতঙ্ক (এবং কোনোক্ষেত্রে উল্লাস)। এই ভুয়ো খবরের যুদ্ধে ভারতের মূলধারার মিডিয়া, যা বহুদিন ধরেই শুধুমাত্র প্রোপাগাণ্ডা মেশিন, যেমন দুষ্ট, তেমনি দুষ্ট পাকিস্তানি ফেক নিউজের কারখানাগুলিও। যুদ্ধবিক্ষত গাজা বা অন্যান্য অঞ্চলের ফুটেজ তো আছেই, তার সাথে খুঁড়ে বের করা হয়েছে কোথায় গ্যাস সিলিণ্ডার ফেটে পুরনো বিস্ফোরণের ভিডিও, কোথায় পুরনো এয়ারপ্লেন ক্র্যাশের ভিডিও, কোথাও আবার ভিডিও গেম সিমুলেশনের ছবি। এইগুলি দুইদেশের মিডিয়া অজান্তে, দুর্ঘটনাবশত করে ফেলেনি, করেছে রীতিমত পরিকল্পনা করে এবং সম্ভবত অনেকে মিলে, এবং কো-অর্ডিনেটেড ভাবেই, এক একটি মিডিয়া দখল করেছে এক-একটি অঞ্চল, কেউ শিয়ালকোট, কেউ লাহোর, কেউ করাচি, কেউ ইসলামাবাদ। ভুয়ো খবরের লক্ষ্যবস্তুগুলিও যথাসম্ভব আলাদা আলাদা করার উদ্দেশ্য মানুষ এবং ফ্যাক্ট-চেকিং এজেন্সিদের আরও আরও দিশেহারা করে দেওয়া, আর কিছু নয়। ... ...

হয়তবা, প্রতিটি যুদ্ধের খবর আমাদের তৃপ্তি দেয়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, খুঁজে খুঁজে আমরা পড়ি সে-সব, দেখি, আলোচনা করি, গালি দেই, আমাদের দুর্বল হৃদয়গুলো তেতে ওঠে, আমাদের নিজের নিজের রায়ে ঘোষিত অপরাধীদের ধ্বংস কামনায় আমরা একাত্ম হই। প্রাগৈতিহাসিক সমবেত আক্রমণের উল্লাস-ধ্বনি আমাদের ফিরিয়ে দেয় - যুদ্ধ, আহা যুদ্ধ! ... ...

বেশির ভাগ এক তলা বাড়িতে ভরা দিঘড়ি পাল পাড়া আর আগের মতো স্বাভাবিক নয়। এই অঞ্চলটায় আর্থিক অসাচ্ছল্যের চিন্হ চারপাশে। পাল পরিবার বারোই এপ্রিল সন্ধে বেলা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, বাড়ি চড়াও হবার ঘটনার ঘন্টা পাঁচেক বাদে বি এস এফের লোকজন তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ফাঁকা বাড়িগুলোর জন্যেই যেন এলাকায় থমথমে ভাব। লোকে ভয়ে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। জেলাটার নাম মুর্শিদাবাদ, জেলাওয়ারি মুসলিম জনসংখ্যায় দেশে বৃহত্তম - দুহাজার এগারোর জনগণনা অনুযায়ী সাতচল্লিশ লক্ষ। এই সংখ্যাটা জেলার মোট জনসংখ্যার দুইতৃতীয়াংশ। মুসলিম জনগোষ্ঠীর লোকে ওয়াকফ ( সংশোধনী ) বিল ২০২৫ পাশ করে পাঁচই এপ্রিল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সই দেওয়ার পরই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল। প্রতিবাদীরা পথে - রাজপথে পুলিশের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ায় আর সরকারী সম্পত্তির ক্ষতি করে। আগের দিন সন্ধেতে কয়েক কিলোমিটার দূরে পুলিশের গুলিতে দুজন মুসলিম যুবক মারাত্মক আহত হয়। তা বলে দিঘড়ি, জাফরাবাদ, রানিপুল আর বেদবনাতে কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি যে বাড়ি আক্রমণ হতে পারে। এখানে, হিন্দু আর মুসলিম এতো গা ঘেষাঘেষি করে থাকে যে না জানা থাকলে বাইরে থেকে দেখে বোঝা মুশকিল কোন বাড়ি হিন্দুর আর কোনটা মুসলিমের। সবাই শান্তিতে বসবাস করে। কিন্তু এই সব বসতিতে বারোই এপ্রিল উন্মত্ত জনতা এসে বেছেবেছে হিন্দু বাড়িগুলোতেই চড়াও হলো। ... ...

প্রতিমানাটক নামে মহাকবি ভাসের একটি নাটক আছে। আমাদের এই নাটকটি ভাসের নাটকের বঙ্গানুবাদ নয়। এর পরিণতি ভিন্ন। প্রথম অঙ্কের প্রেক্ষাপটটি ভাসের অনুসারী এবং প্রেক্ষাপটের যুক্তিতেই কয়েকটি সংলাপ প্রায়-অনুবাদ। তাঁর নিজের সময়ে ভাস ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী নাট্যকার; আমি ভাবতে ভালোবাসি, আজকের দিনে লিখলে ভাসের নিজের নাটকটিও হয়তো এই ধরণের কোন পরিণতি পেতে পারতো। মহাকবির মূল নাটকটি ছাড়াও এ নাটক রচনায় আমি শ্রদ্ধেয় রাজশেখর বসুর বাল্মিকী রামায়ণের সারানুবাদটি ব্যবহার করেছি। যাঁরা এই রামায়ণটি পড়েছেন তাঁরা জানেন বাংলায় চলিত ভাষার ভঙ্গীতে সাধু ভাষার ব্যবহারে রাজশেখর বসু শুধুমাত্র সিদ্ধহস্তই ন'ন, কোন কোন জায়গায় তাঁর ভাষার কোন বিকল্পই হয় না, ফলত সে রকম দু-একটি জায়গায় আমার নাটকের সংলাপ প্রায় রাজশেখরের রচনা থেকে হুবহু নেওয়া হয়েছে। কৃতজ্ঞতা জানাবার প্রশ্ন নেই, তাঁর ভাষাটি এখন আমাদের উত্তরাধিকার। নাটকের শেষ অঙ্কে দূতের দুর্মুখ নামটি ভবভূতির উত্তররামচরিত থেকে নেওয়া। ... ...