
১৯৪৭ এর এক সন্ধ্যায় লেখকের মা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি স্কুলে যেতে চাও?’ পরিবারে তাঁর দাদা ওয়ালেশ মোয়াঙ্গি এবং কয়েকজন তুতো ভাই অতীতে স্কুলে গেছে, কিন্তু পয়সার অভাবে দু এক বছর বাদেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। মেয়েদের অবস্থা তো আরও করুণ, তাঁরা কেউই এক বছরও ক্লাস করে উঠতে পারত না। বাড়িতে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করতো যাতে অন্তত বাইবেলটা পড়তে পারে। তাই মা যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন তিনি বিহ্বল বোধ করেন। যখন তিনি কোনও মতে সম্মতি প্রকাশ করেন, মা তাঁকে জানিয়ে দেন যে তাঁরা গরীব, এবং তাঁর দুপুরের খাবার নাও জুটতে পারে। ‘কথা দাও ক্ষুধা বা কষ্টের কারণে তুমি কখনো পড়াশোনা ছাড়বে না। এবং তুমি সব সময় তোমার সেরাটা দেবে।‘ স্কুল এবং ইউনিফর্মের খরচ তাঁর মা খেতের ফসল বাজারে বিক্রি করে যোগাড় করলেন। একটি দোকানে পোশাক কিনতে গিয়ে নয় বছর বয়সি বালক দেখল দেয়ালে চশমা পরা এক ভারতীয়ের ছবি টাঙান রয়েছে। কয়েক বছর বাদে জানলেন তিনি এম কে গান্ধী যাঁর সাথে ১৯২১ সালে গঠিত ‘ইস্ট আফ্রিকান এ্যাসোসিয়েশন’-এর নেতা হ্যারি থুকু সংযোগ স্থাপন করেছিলেন এবং সেই সূত্রে স্থানীয় ভারতীয় ও তাঁদের নেতা মণিলাল এ দেশাই-এর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে ছিলেন। ... ...

তখনো আই সি এল পুরোপুরি ভারতীয়করণ হয়নি। আই সি এল-স্বার্থ লন্ডনের হেড অফিসই দেখাশুনা করত। ভারতীয়করণের পর একদিন ভারতবর্ষের আই সি এল স্বাধীন হল। ম্যানেজমেন্ট সব ভারতীয়, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর এক পার্সী ইঞ্জিনীয়ার, প্রেম শিবদাসানী। কিন্তু লন্ডন আই সি এল তখনও ভারতীয় ব্যবসায়ের বড় অংশীদার এবং ভারতীয় আই সি এল দেখাশুনা করে। লন্ডনে আই সি এল-র ইন্ডিয়া অফিসের ডাইরেক্টর মিঃ জ্যাকসন। ইন্ডিয়া অফিস বা ইন্ডিয়া ট্রেডিং-র ম্যানেজার অমলেন্দু বিশ্বাস, আমি। এই পদের ক্ষমতা বেশি ছিল না কিন্তু মর্যাদা ছিল অনেক। সেই সঙ্গে ছিল অনেক দায়িত্ব ও কাজ। দুই দেশের ব্যবসায়িক আদান প্রদান এই অফিস তথা আমার মাধ্যমেই হত। ... ...

আসলে আমাদের সামনে তেমন ভালো এবং নিয়মিত পাঠচক্র ছিল না। কয়েক বছরের ব্যবধানে একটা দুদিন বা তিনদিনের রাজনৈতিক ক্লাস হতো। তাতে বক্তারা মিনিট পনেরো পরই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ এইসব ছেড়ে সহজ টার্গেট কংগ্রেসে চলে যেতেন। তবে বিনয় কোঙার আধ ঘণ্টা পর্যন্ত বিষয়ে ছিলেন। আর একটা উপকার করেছিলেন, দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করে। পড়ি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা নীললোহিত খুব টানতো। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভালো লাগে, বলা অন্যায় মনে হতো। নয়ের দশকের শুরুতে সুভাষ চক্রবর্তী টাউন হল ময়দানের এক সমাবেশে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্যরচনার খুব প্রশংসা করলেন। মনোভাব বদলাল। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ছিল খুবই প্রিয়। যেকোনো প্রতিযোগিতায় তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হতো। আমি এই বই, শিবনারায়ণ রায়ের বই, একাধিক সংখ্যায় পেয়েছি। যদিও এই দুজন ছিলেন পার্টিতে অপ্রিয়। ... ...

রাম। রাক্ষসপুরীর যাবতীয় ক্লেশ এবং অপমান যেন সীতা ভুলে গেলেন এই আশ্রমে অবতারণের সঙ্গে সঙ্গেই। সেই যে তাপসীরা সঙ্গে করে বিভিন্ন কুটীর-অভ্যন্তরে পরিক্রমা করাচ্ছেন তাঁকে, কেউ ডাকছে সখী, কেউ জানকী, কেউ বা বধূ আর নাম ধরেও কেউ যে সীতা সম্ভাষণ করছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা আর যেন শেষই হচ্ছে না তাঁর! (অন্দরের দিকে তাকিয়ে) ঐ যে আসছেন। তাপসী। এই নাও তোমার স্বামী, এত লড়াই করে তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে এল, আহা, শ্যামবর্ণ যেন কালি! ... ...

মধুসূদনের প্ল্যান অনুযায়ী মাদারিহাটে সমীক্ষা ও জরিপের ফাঁকে একদিনের আধবেলা রাখা হয়েছিল জলদাপাড়ার জঙ্গল ঘোরার জন্য। ঠিক একমাস আগে এই অরণ্যে এসেছিলাম বাড়ির লোকের সঙ্গে। সেবার হাতির পিঠে চড়ে ঘুরেছিলাম। কিন্তু এবারে আর হাতি সাফারি নয়, জিপে করে ঘোরা। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষিকা সব মিলিয়ে দলের সদস্য একচল্লিশ। একদিনে ভোর থেকে তিনবার হাতি সাফারি হত তখন। তখন মানে সালটা ২০১৮। ... ...

লন্ডনের বিভিন্ন ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিক লোন সিন্ডিকেশন বিভাগের অধিপতিদের মাসে একবার সমবেত হয়ে গল্প-গুজব মতান্তরে পারস্পরিক এস্পিওনাজ করার জন্য একটি আনঅফিশিয়াল সংস্থান দীর্ঘদিন যাবত ধুনো জ্বালিয়ে রেখেছে, যার নাম সিন্ডিকেট ম্যানেজার’স ফোরাম। আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো পালা করে এ মাসে এক ব্যাঙ্কের অফিসে পরের মাসে আরেক ব্যাঙ্কের খাবার ঘরে। যে বার যাদের ব্যাঙ্কে মিটিং তারা সেদিন আমাদের বরযাত্রী সুলভ আদর আপ্যায়ন করতো, দেখে শুনে হাম ভি কম নহি বলে একাধিকবার আমাদের বোর্ড ডিরেক্টরদেরও হাজির করেছি! এই এ বাড়ি ও বাড়ি আসা যাওয়ার ব্যাপারটা ক্লান্তিকর হয়ে গেলে একবার স্থির হলো আমাদের একটা আউটিং হোক, দূরে কোথাও চলে যাই। স্যান্ট্যান্ডার ব্যাঙ্কের আউসিন্দে বললে, “চলো বার্সেলোনা!” গৌরি সেনের পয়সায় দু’দিন চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে, সেই সঙ্গে শহর ঘুরে দেখা। ততদিনে আমার বার্সেলোনা বার তিনেক ঘোরা হয়ে গেছে। তাতে কি, এক গুনাহ আউর সহি! ... ...

একদিন সন্ধ্যায় আমার শ্বশুর মহাশয়ের মৃত্যুর খবর এল। অনু কান্নাকাটি করছে, আমার মনটাও ভারাক্রান্ত। পর দিন সকালে অফিসে গেছি– মুখে একটা বিষাদের ছায়া আছে যা লুকানো যায় না। মিস্টার ফ্রেন্ড প্রতিদিন সকালে সকলকে “গুড মর্নিং” করেন, সেদিনও করলেন। আমার ডেস্কের কাছে এসে একটু দাঁড়িয়ে বললেন, “কী হয়েছে তোমার? মুখটা এত শুকনো কেন?” আমি বললাম কী হয়েছে। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, তারপরে দুঃখ প্রকাশ করে চলে গেলেন। লাঞ্চের পর তিনি আবার এলেন আমার কাছে। বললেন, তিনি আমার স্ত্রী ও দুই পুত্রের জন্য তিনটি টিকিটের ব্যবস্থা করেছেন, কলকাতা যাওয়ার জন্য। বলা বাহুল্য এর জন্য আমায় কোনো মূল্য দিতে হবে না। সে যুগে সদ্য-আসা আমার মতো কোনো বঙ্গসন্তানের তিনটি টিকিট কেনার মতো সামর্থ্য থাকত না। খবরটা শুনে আমার চোখে প্রায় জল আসে। কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাবো তা ভেবে পেলাম না। ভারি গলায় শুধু বললাম, “থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার ফ্রেন্ড।” আশ্চর্য মানুষ! নতুন কাজে আমার তখনও ছ’মাস হয়নি সুতরাং আমার কোনো ছুটি নেই। অনুকে তাই দুটি ছেলেকে নিয়ে একাই যেতে হবে। ... ...

ইন্দিরার জেল হল কদিনের জন্য। এবং এই ঘটনাই মানুষের মধ্যে সহানুভূতির বান ডাকল। তার কিছুদিন আগে, আমিও পোস্টার মেরেছি, স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধীর শাস্তি চাই। সেটা মারতে দেখে আমার কংগ্রেস নেতা বড় মামা বলেন, বড়ভাই ম্যাট্রিক পাস করেছে, এটা তাও করবে না। বাপের মতো পার্টি করে বেড়াবে। এবং আমার প্রিয় বন্ধু বড় মামার বড় ছেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হল, মেশা যাবে না। এতে ফল উল্টো হল। আমার মামাতো ভাই বাবাকে খুব ভয় পেলেও মনে মনে এবং কাজে কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক হয়ে গেল। এবং এতে ক্ষুব্ধ বড় মামা মেরে পা ভেঙ্গে দিলে সে ১৯৭৮ এ পঞ্চায়েত ভোটের দিন মামার প্রিয় বন্ধু কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমাদের বুথে সারাদিন বসে রইল। ইতিহাস আশ্চর্য। ... ...

বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি সারা হল। বেশি জিনিসপত্র নেওয়ার ইচ্ছা নেই – আমার কিছু নেইও। দু-একটা শীতের জামাকাপড় আর আমার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। একটা বড় স্টিলের ট্রাঙ্ক আর আমার বন্ধুদের দেওয়া সেই স্যুটকেস। অনু বলল ওর হারমোনিয়াম আর তানপুরাও নিতে হবে। বুবাই তখন একেবারে শিশু। বললাম, এত সব আমি সামলাব কী করে? অনু বলল, তানপুরা আর হারমোনিয়াম না নিয়ে গেলে ও-ও যাবে না। বুঝলাম হারমোনিয়াম-তানপুরা ছাড়া ও স্বর্গে যেতেও রাজি নয়। সুতরাং একরাশি গানের খাতা, বই আর তানপুরা, হারমোনিয়ামও আমাদের সঙ্গী হল। ... ...

নতুন দেশ, নতুন জীবন। আবার সব প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। জীবন ধারণের জন্য অর্থ উপার্জন, আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণ, মা-ভাই-বোনদের সংসারের চিন্তা -আমার সমস্ত সময় ও শক্তি লুটে নিয়েছিল। দেশের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেল। তবু মাঝে মাঝে দু-একজনের চিঠি পেতাম। আর দেশে গেলে দেখা হতো। শুধু দীপু একমাত্র ব্যতিক্রম। চিঠি, টেলিফোন ও নিয়মিত সাক্ষাৎকার মিলিয়ে আমাদের হৃদ্যতা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকল যা জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসেও অটুট আছে। দীপুকে প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। দেশ ছাড়ার পর দেশে যাইনি অনেক বছর। ও কেমন আছে, কী করছে কিছু ভালো করে জানতাম না। কফি হাউসের সেই অনার্সের বই বিক্রি করার ঘটনার পর দীপুর বিষয়ে কোনো সঠিক ধারণা ছিল না। কিছুদিন পরে শুনেছিলাম দীপু বাচ্চুকে (রীণা) বিয়ে করেছে। ... ...

চুনিয়া নদীর নুড়ির উপর অনেক ময়ুর নাচছে। ছেলেমেয়েরা ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নদী পেরিয়ে এইবার একটা এবড়ো খেবড়ো বনবিভাগের রাস্তা পাওয়া যায়। রাস্তা ধরে চলেছি চুনিয়াবস্তি ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। কাছাকাছি ভুটান বস্তি এলাকায় হিমালয়ের গা সাত রঙে রঙীন। ওখানে আগে পিকনিক হত। কিন্তু হৈ হল্লা, প্লাস্টিক দূষণের কারণে বনদপ্তর সেসব বন্ধ করে দিয়েছে। খুব ভালোই করেছে। ... ...

সূত্রধার। বিরতির সময় দর্শকরা কী বলাবলি করছিল আর্যে ? নটী। মনে হয় দর্শকরা একাত্ম হয়ে গেছেন নাটকটির সঙ্গে, ভরতের দুঃখে তাঁরা অশ্রুপাত করছেন, কৈকেয়ীর ওপর মারমুখী হয়ে আছেন একদল দর্শক। ... ...

মধ্যযুগীয় ডাবলিন দেওয়াল সীমার বাইরে, লিবার্টিজের প্রায় লাগোয়া ফিনিক্স পার্ক আয়তনে নিউ ইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্কের ডবল, কলকাতার ফুসফুস গড়ের মাঠের তিন গুণ, লন্ডন হাইড পার্কের পাঁচগুণ বড়ো। এগারো কিলোমিটারের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা পরিসীমার ভেতরে এই ফিনিক্স পার্কের কোন তুলনা ইউরোপে নেই। কোথাও নাগরিক জীবনের মাঝখানে এমন সবুজের সৌরভ দেখিনি; এটি একাধারে নেচার পার্ক, বনস্থলী, এখানে দিগন্ত বিস্তৃত শান্তি, প্রসন্ন উদার। কোথাও ফুটবল রাগবির গোল পোস্ট দেখবেন না, হাঁটতে পারেন এ মুড়ো হতে ও মুড়ো (ঘণ্টা তিনেক লাগে) দিনে রাতে যখন খুশি। হরিণের আনাগোনা আছে, সাক্ষাৎ হবে পথে, লন্ডনের রিচমন্ড পার্কের মতো। এই শান্ত নিরিবিলি সবুজ প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে বোঝার উপায় নেই মাত্র দশ মিনিট দূরে রাজধানী ডাবলিনের জন ও যানযাত্রা চলছে অবিরাম। পার্ক মানে সবুজ উদ্যান, সেখানে কোন পাকা বাড়ি বানানো সাধারণত বারণ; যেমন আমাদের কলকাতা ময়দানে যত দূর জানি ইট পাথর গাঁথা যায় না (আমার সময়ে তাই ছিল), ইউরোপের পার্কেও মোটামুটি একই নিয়ম। লন্ডনের হাইড পার্কের ভেতরে পাকা বাড়ি নেই কিন্তু সেই একই ইংরেজ প্রভু তাদের উপনিবেশে অন্য আইন জারি করে ফিনিক্স পার্কের মাঝে বানিয়েছিল দুটি বিশাল বাস ভবন; একটি তাদের রাজশক্তির প্রতিভূ ব্রিটিশ লেফটেন্যান্টের স্থায়ী বসতবাড়ি অন্যটি ব্রিটিশ চিফ সেক্রেটারির। এই কলোনির দুই প্রধান পরিচালক শলা পরামর্শ করেছেন একত্রে। ব্রিটিশ লেফটেন্যান্টের বাড়িটি এখন আইরিশ রাষ্ট্রপতির সরকারি আবাস (যেমন আমাদের ময়দানের একধারে গভর্নর জেনারালের অট্টালিকা এখন রাজ্যপালের বাড়ি)। ব্রিটিশ চিফ সেক্রেটারির সাবেক বাসভবনটি বর্তমানে এ দেশের আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের আবাস। তার হয়তো একান্ত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে – আমেরিকার দু ডজন প্রেসিডেন্টের বাপ ঠাকুরদা বা ঊর্ধ্বতন কোন পুরুষ একদা আয়ারল্যান্ড থেকে ভাগ্যের সন্ধানে নতুন মহাদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। আইরিশ হেরিটেজ সম্বলিত রাষ্ট্রপতির তালিকাটি দীর্ঘ - যেমন ইউলিসিস গ্রান্ট, অ্যান্ড্রু জ্যাকসন, উড্রো উইলসন, হ্যারি ট্রুম্যান, জন কেনেডি, লিন্ডন জনসন, রিচার্ড নিক্সন, জেরাল্ড ফোর্ড, জিমি কার্টার, রোনাল্ড রেগান, বুশ পরিবার, জো বাইডেন। এই ছোট দ্বীপ থেকে গিয়ে আইরিশরা আমেরিকাকে দিয়েছে কেবল তাদের মুখের বুলি নয়, বহু রাষ্ট্রপতিও। ... ...

আমরা তখন রোমান্টিক শব্দ শুনেছি। রোমান্টিকতা মানে যে নিজের মনের বাইরে আরেকটি গুহামন তৈরি-- জানতাম না। রোমান্টিক রিভাইভাল এইসব শব্দবন্ধও শুনিনি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ যে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স পরস্পরের শত্রু এটা ভেবে বেঁচে থাকার বিরোধী তাও জানতাম না। ফ্রান্সের বিপ্লবকে সম্মান জানিয়ে লিখেছেন 'সলিটারি রিপার' কবিতা, তাও অজানা। ... ...

ঐ নির্বাচনে প্রচলিত গণমাধ্যম, যাঁদেরকে পরিভাষায় আমরা গোদী মিডিয়া বলে থাকি, তাঁরা এই সত্যিটা বুঝতে পারছে, যে তাঁদের প্রোপাগান্ডা আর মানুষকে আকৃষ্ট করছে না এবং এই ধরনের ইউটিউব চ্যানেলগুলো বন্ধ করার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে বেশী বেশী দর্শক যে আঞ্চলিক এবং হিন্দি ভাষার ইউটিউব চ্যানেলগুলো দেখছেন, তা যেনতেন প্রকারে বন্ধ করতে হবে। শুধুমাত্র সরকারি আইন দিয়ে যদি বন্ধ না করা যায়, তাহলে বিকল্প পদ্ধতি নিতে হবে। প্রয়োজনে ঐ ইউটিউবারদের চ্যানেলগুলোকেই উড়িয়ে দিতে হবে, এবং তার জন্য যদি ইউটিউবকেও কাজে লাগাতে হয়, বা অন্য যেকোনো পদ্ধতি নিতে হয়, নিতে হবে। এক্ষেত্রে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল বা এএনআই এবং প্রেস ট্রাষ্ট অফ ইন্ডিয়া বা পিটিআই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। এই দুটি সংবাদ সংস্থাই মূলত সরকারের সবরকম খবর করে থাকে, তাঁদের থেকেই অন্যান্য সংবাদমাধ্যম খবর সংগ্রহ করে থাকে। যাঁরাই ঐ খবর সংগ্রহ করেন, তাঁরা স্বত্ব বাবদ বেশ কিছু টাকা দিয়ে থাকেন এএনআই এবং পিটিআইকে। এটাই নিয়ম। অনেক ইউটিউবার যারা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের বিষয়বস্তু তৈরি করেন তারা অভিযোগ করেছেন যে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) অনুমতি ছাড়াই পরবর্তী ক্লিপগুলি ব্যবহার করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যুক্তি এবং কপিরাইট আইনের উভয় দিকই দেখা প্রয়োজন। ... ...

গল্পের চরিত্রগুলি যেমন সৃষ্টিকর্তার জবাবদিহি দাবি করে, একই ভাবে মর্ত্যে নামাবলী গায়ে যারা ধর্মের ধামাধরা তাদেরকেও লেখিকা নিন্দা, সমালোচনায় বিদ্ধ করেন। ‘ব্ল্যাক কোবরা’ গল্পে জুলেখা, এক আলোকপ্রাপ্ত নারী, আশরফকে বলে নবীর নিজের কন্যা সন্তান ছিল। বিবি ফতিমা তাঁর জান ছিলেন। শোনো, শুধুমাত্র যুদ্ধের সময় যখন অনেক পুরুষ মারা যায়, কিংবা কারো স্ত্রী যদি কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, কিংবা বন্ধ্যা হয়, কিংবা স্ত্রী যদি তাকে সন্তুষ্ট না করতে পারে, তবেই সে চারটে বিয়ে করতে পারে। করলেও তাকে সব স্ত্রীকে সমান সুবিধা দিতে হবে, অর্থাৎ একজনের জন্য বাড়ি বানিয়ে দিলে, শাড়ি কিনলে, অন্যজনের জন্যও সেটা করতে হবে। আশরফ এত কিছু চায় না, সে শুধু তার রুগ্ন শিশুর চিকিৎসার জন্য কিছু পয়সা চায়। ... ...

ইতিমধ্যে ভারতীয়করণের ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর পরিচালনা ভারতীয়দের হাতে চলে আসে। (এ বিষয়ে আমি অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করেছি)। সেদিনের বাংলায় বড় বড় বিদেশি কোম্পানিদের মধ্যে ছিল জেসপ, ডানলপ, জি কে এন, ব্রেথওয়েট, বার্ড এন্ড কো প্রমুখ সংস্থাগুলি। নানা কারণে সেই সময়ে টিটাগড় ও বাংলার জুটমিলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভারতীয় শিল্পপতিরা সেগুলো কিনে নিচ্ছিল। সেই জুটমিলগুলো রূপান্তরিত হয়ে অন্য পণ্য উৎপাদন করতে শুরু করেছিল। এইরকম একটা রূপান্তরিত জুটমিলের নতুন মালিকেরা এক ইংরেজ কোম্পানির কোলাবোরেশনে সেখানে স্প্রিং ও নানা রকম ওজনের যন্ত্র নির্মাণ শুরু করল। সে কোম্পানি জর্জ সল্টার। এই কোম্পানির এক গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করতাম আমি। আমি তাই খুব কাছ থেকে অনেক কিছু দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। ... ...

হিমাংশু বলছেন এক হাড় হিম করা কাহিনি। না, গল্প কথা নয়। দেশে ঘটমান বাস্তবের কথা, হিমাংশু বর্ণনা করেছেন। আপাত নিরাবেগ, নির্লিপ্ত তাঁর কণ্ঠস্বর, যে নির্লিপ্তি আসলে এক ভিন্নতর প্রতিবাদের ভঙ্গী, যন্ত্রণাকে আড়ালে রেখে যন্ত্রণাকে তুলে ধরা। হামলা হচ্ছে আদিবাসীদের ওপর, দেশের নানা প্রান্তে, তার মধ্যে ছত্তিশগড়ের আদিবাসীরা বিশেষভাবে আক্রমণের লক্ষ্য। তাদের হত্যা করা হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০০৫ সালে ছত্তিসগড়ে বিজেপি সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গেই একশটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে, কর্পোরেটদের হাতে জমি হস্তান্তর করার জন্য। সালওয়া জুডুমের সময় যেমন লক্ষ লক্ষ আদিবাসিকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, এ ঠিক তেমনি। সরকার বলছে, মাওবাদী এবং নকশালবাদীরা সংবিধান বিরোধী। তাই মাওবাদী দমন করার প্রক্রিয়া চলছে সাধারণ মানুষের শান্তির জন্য। হিমাংশু বলছেন, যেখানে নকশাল নেই, মাওবাদী নেই সেখানে কি জনসাধারণের ওপর হামলা হয় না? দেশের অন্য প্রান্তে যেখানে নকশালদের চিহ্নমাত্র নেই, সেখানে কী দমনপীড়ন হচ্ছে না? সিআরপিএফ, পুলিশ, বাকি যে আধা-সামরিক বাহিনী আছে, সেগুলি শুধু মাওবাদীদের জন্য বানানো হয়েছে? সারা দেশজুড়েই যেখানে রাষ্ট্রীয় হামলা জারি আছে আদিবাসীদের ওপর, সেখানে নকশালবাদীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া কি অসততা নয়? বরং দেখা যাচ্ছে যে এলাকা মাওবাদী-শূন্য সেখানেও জনগণের ওপর রাষ্ট্রের হিংসার প্রভাব সমানভাবে প্রকট। ... ...

সেটা বোধ হয় ১৯৫৮ সাল। ঠিক মনে নেই, দু এক বছর এদিক ওদিক হতে পারে। মহম্মদ আলি পার্কে বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের বিরাট আয়োজন। বোধহয় তৃতীয় দিন। সে দিন এক দুর্ঘটনা ঘটল। সারা প্যান্ডেল আগুনের গ্রাসে ধুলিসাৎ হয়ে গেল। কর্মকর্তাদের মাথায় হাত। আবার নতুন করে সাজাতে হবে সব- প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন। একটা আকর্ষণীয় কিছু করা দরকার যা সেই সময় অভাবনীয় এবং অর্থাগমের উপায় হবে। ওঁরা শিশির ভাদুড়ীর দ্বারস্থ হলেন। ভাদুড়ী মহাশয় তখন বৃদ্ধ- অভিনয় প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন, স্টেজে নামেননি অনেক কাল। ওঁদের অনুরোধে রাজী হলেন। কাগজে খবরটা দেখে আমি উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। শিশিরবাবুর কথা এত পড়েছি এত নাম শুনেছি। নিউ ইয়র্কে সীতা নাটক করে সাড়া ফেলেছিলেন। কিন্তু ওঁর অভিনয় কখনো দেখিনি। নিজের চোখে শিশির বাবুকে দেখব, নিজের কানে শিশির বাবুর কন্ঠস্বর শুনব সে তো ভাবতেই পারিনি। এমন লোভ সামলাতে পারলাম না। ... ...

প্রতিমাগৃহমন্দিরের সামনে মন্দির চত্বরেই প্রহরী ও সুধাকর, সুধাকরের হাতে ঝাঁটা, কাঁধে গামছা।মন্দিরের সামনে রাজপথ। মঞ্চে অভিনয়ের জন্য গভীরতার দিক থেকে মঞ্চটিকে দুভাগে ভাগ করা। যেতে পারে; এক-তৃতীয়াংশ সামনের দিকে এবং দুই-তৃতীয়াংশ পিছনের দিকে। সামনে এক-তৃতীয়াংশে রাজপথটি, এবং পিছনের দুই-তৃতীয়াংশে মন্দির-চত্বর ও মন্দির-অভ্যন্তর। ... ...