
দোলকবিতা: ২০১১ ... ...

সেই কজনের ভিড়ে আমি ছিলাম খানিক আবিন্যস্ত। ভিড়ের মধ্যে একজন তো, তাতেই হবে। ঐকতানের মাধ্যে হলেও ঠিক আলাদা আওয়াজটি তার চিনছি তাতেই ফিনকি দিয়ে রঙ ছড়ালো শব্দগুলো। আবীর প্যাকেট হাতেই ছিল। নিজের কাছে অচেনা তাও তোমার কাছাকাছি ছিল। রোদ্দুরে সব ঝলসে ওঠা অভ্রকুঁচি চোখ ধাঁধিয়ে, সেই সুরে এক ডুবতে থাকা খুব অচেনা আবেশ ছিল। ইচ্ছে বলে কিছু একটা অল্প আবীর দিতে চাওয়া অনেকাদিনের স্বপ্ন ছিল। সেই আবেশে ভেসে গিয়ে ভুল ঠিকানায় ঠিক কথাটা স্রেফ একটিবার বলার ছিল। হাজার হাজার রঙের ফোঁটার সেই একটাই জীবন ছিল। ... ...

রামকিঙ্করময় ছেলেবেলা নিভৃতে পথ হেঁটেছিল যেদিন মায়াসার চুপকথা পার হয়ে উপত্যকা বনানীর জালিকাবিন্যাসে বিনষ্টপ্রায় শুকনোধারা নদীর ভাঙতে থাকা পাড় ধরে চলে যায় চলে যায় নিরভ্র দ্যুতি নিরন্তর বিস্তার উপেক্ষা করে ... ... ...

একমুখ ধোঁয়া গাল ফুলিয়ে গিলে ফেলে জবাব দিল দীপ্তেন, হ্যাঁ, বলতে পারিস। আসলে ভুবনেশ্বরের কিছু টিপিকাল ব্যাপার আছে। একেকটা রাস্তার মোড়কে এরা "ছকো' বলে রেফার করে। মানে সাদা বাংলায় চক্। চক্-এর ওড়িয়া হল ছক। আর ওড়িয়ারা তো যে কোনও অ-কারান্ত শব্দের শেষেই একটা করে "অ' লাগায়, তাই ছকঅ। এমনি আছে মেফেয়ার ছকঅ, মানে মেফেয়ার হোটেলের সামনের মোড়, জয়দেব বিহারঅ ছকঅ, ওমফেড ছকঅ, পাটিয়া ছকঅ ইত্যাদি। পাটিয়া চকের মোড়ে সন্ধ্যেবেলায় বাজার বসে, ঐ এলাকার লোকজন সন্ধ্যেবেলায় ওখান থেকেই সব্জিবাজার টাজার করে আর কি। ... ...

কমলাদেবী মেয়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার শোক বেশিদিন বুকে ধরে রাখতে পারেননি। একদিন হঠাৎই ঘাট থেকে ফেরার সময় আমবাগানের মধ্যে পড়ে যান তিনি। সঙ্গে তখন কেউ ছিল না। পরে একজন ভিস্তিওয়ালা দেখতে পেয়ে চিনতে পারে কমলা দেবীকে। এসে খবর দেয় বাড়িতে। বিশ্বনাথ আর শ্যামাসুন্দরী আর সুখময়ী ছাড়া বাড়িতে তখন আর কেউ নেই.. বিধবার দল তো আর কমলা দেবীকে ঘাট থেকে তুলে আনতে পারবেন না.. তাই বিশ্বনাথ আর সুখময়ী মৃত ঠাকুমার দেহ ঘাট থেকে টেনে হিঁচড়ে দাওয়ায় নিয়ে এসে ফেলে। সুখময়ী নাড়ী টিপে দেখার আগেই যে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল! কমলা দেবীর ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়িতে ২০০ ব্রাহ্মণ খাওয়ানো হয়েছিল। দশ জোড়া গোদান করা হয়েছিল। শ্যামাসুন্দরী সেই কথা বর্ণনা করে লিখছেন (পৃষ্ঠা ১৫০) "এমন জাঁক জমক সুখময়ীর বিয়েতে করলে আমার আত্মার শান্তি হত। মৃত মানুষের জন্য আমাদের সমাজে শোকের থেকে আনন্দ বেশি।' সেই সময়ে একজন গ্রাম্যবধুর কলম থেকে এরকম কথা যে বের হয়েছিল সেটা ভাবতেই আমার সমস্ত শরীরে শিহরণ জেগেছিল। ! শুধু নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি নয়। শ্যামাসুন্দরী প্রকৃত অর্থে একজন চিন্তাশীল এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্না মহিলা ছিলেন। ওনার ডায়েরি শুধু তখনকার মহিলাদের কথাই ব্যক্ত করেনি। বরং সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে আমার কাছে ধরা দিয়েছে। ওই ডায়েরির মধ্যে নিহিত শুধুই একজন নির্যাতিত বাংলার বধূ নয়। ওই ডায়েরি সে সময়ের সমাজের ইতিহাসের সাক্ষ্যও বটে। ... ...

কে না জানে "এরা যত বেশী জানে, তত কম মানে'। স্বামী চান না, শাশুড়ি চান না, সমাজ চায় না এই মেলামেশার মধ্য দিয়ে ওই নির্দিষ্ট বাড়ির নির্দিষ্ট মান্যতাসংস্কৃতির শান্ত পুকুরে এমনকি পলকা ঢেউও উঠুক। হাজার বছরের পাখিপড়া শিক্ষায় মেয়েরা এত পোক্তভাবে আয়ত্ত করেছেন এই শিক্ষা যে শিক্ষককে আর পাহারাও দিতে হয় না, তারা নিজেরাই বলেন সই থাকার মত খারাপ কাজের ধার তারা ধারেন না, "পাখির শিক্ষা এখন পুরা হইয়াছে'। যারা ঘরের বাইরের কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত না (৯২.৭%) তাদের পক্ষে তো বাড়ি আর পাড়ার বাইরে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। এমনকি গ্রামের যে মহিলারা চাকরি করছেন তাদেরও বান্ধবী নেই, বা থাকলেও ওই মহিলারাই সেই স্বীকৃতি দেন না জনসমক্ষে। কারণ গ্রামের মেয়েদের চাকরীতে যাওয়ার লড়াইটা এখনো সমাজ-সংসারকে এই বুঝ দেবার পর্যায়ে আছে যে সে নেহাত বাধ্য হয়ে, পরিবারের প্রয়োজনে "বাড়তি' টাকা উপার্জনে বের হচ্ছে, কাজের বাইরে আর কোন সম্পর্ক তার নেই পৃথিবীর সাথে, তাই বান্ধবী যদি থেকেও থাকে সেই থাকাকে প্রকাশ করার সামর্থ্য সে অর্জন করেনি এখনো। এখনো সে নিজেকে এবং পারিপার্শ্বিক সবাইকে আশ্বস্তই করতে চায় যে সমাজ নির্দিষ্ট বিবাহিত সম্পর্কসমূহের বাইরে তার অন্য কোন জগত নেই। স্বামী-সংসারেরও এই আশ্বস্তিটুকু প্রয়োজন। ... ...

চলচ্চিত্রেও এই বাক্যের আগেই একাধিকবার দেখেছি আমরা বৃন্দাবনকে ঠাকুরঝির প্রতি একটা সস্নেহ প্রশ্রয় নিয়ে একটা আগলে রাখার ক্রিয়ায়। তাই কোনও অসুখী দাম্পত্য থেকে যে পরিপূরণের বা ক্ষতিপূরণের মত করে নিতাইয়ের প্রতি ঠাকুরঝির আগ্রহ এসেছিল তা নয়, এসেছিল ওই যাদু-উপাদান থেকে, ""কই এমনি মুখে মুখে বেঁধে গান করুক দেকি?'' এর পরের কিছু বাক্যেও একাধিকবার এসেছে "কবি' নিতাইয়ের প্রতি ঠাকুরঝির এই বিস্ময়। পরেও এসেছে। নিতাই একটা কিছু পারে যা সাধারণ নয়, অন্যরকম। নিতাইয়ের সেই অন্যরকমত্বটাকে গোড়া থেকেই সম্মান দিয়ে আসছে কেবল দুইজন, রাজন আর ঠাকুরঝি। ঠাকুরঝি তাকে সবসময়েই ডাকে "কবিয়াল' বলে। "কবি' উপন্যাসে যেমন, চলচ্চিত্রেও তেমনি, কবিকে গোড়া থেকেই কবি বলে চিনে আসছে ঠাকুরঝির এই প্রেম। বারবার ঠাকুরঝিকে নিয়ে বাঁধা পংক্তি চলে আসছে কবিগানে, "ছটায় ছটায় ঝিকিমিকি তোমার নিশানা' বা "কাল যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে' এই দুই গানেরই আবিষ্কারের আধার ঠাকুরঝি। আমরা পরে দেখব, এই গানগুলি এতটাই ব্যক্তিগত ঠাকুরঝির কাছে যে নিতাই সেটা কবিগানের আসরে গাওয়ায় ঠাকুরঝি তাকে মন্দ লোক বলে ডাকবে। আমি এটা বলতে চাইছি না যে দাম্পত্য অসুখ থেকে সঞ্জাত প্রেম প্রেম হত না, এটাই বলতে চাইছি যে এই প্রেমটা বরং একটা বাড়তি কিছুর দ্যোতক, চিহ্নিত করছে কবিয়ালের কবিগান গাওয়ার ওই বাড়তি ক্ষমতাকে। ... ...

এইটুকু বুঝতে বাকি ছিল না যে শ্যামাসুন্দরী বিয়ের পরে ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। অর্থাৎ যদি ৬ বছর বয়সে ওনার বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে ৭/৮ বছর বয়সে প্রথম ডায়েরি লেখা শুরু। ডায়েরির প্রথম পাতায় যে "শিশু' শব্দটি আছে.. তা যে লেখিকার স্মৃতি রোমন্থন তাও বুঝতে অসুবিধা হলো না। ভাবতে অবাক লাগে যে সেই সময় শ্যামাসুন্দরী নিজে একটি ৮ বছরের শিশু তবুও তিনি তার লেখার মধ্যে তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব কে খুঁজে বেরিয়েছেন। ওই ফুরিয়ে যাওয়া শৈশবের সঙ্গে যে একবুক নি:সঙ্গতা যে হাহাকার তাও ধরা দেয় ওই সাদা পাতায়। শুধুই শৈশব তার সঙ্গে আর কিচ্ছুই নেই! হয়ত ভাবতে চান নি লেখিকা.. হয়ত মনে রাখার মত ছেলেবেলাও ছিল না ওনার। তাই হয়ত সাদা পাতায় শুধুই ওই একটি শব্দ। পরের পাতার খাট, উনুন, ঝাঁটা, এই সব যখন এঁকেছেন তখন বুঝেছি পলক ফেলার আগেই শৈশব পেরিয়ে মাত্র ৮ বছর বয়সেই তিনি সংসার সংগ্রামে নেমেছেন। খাট, উনুন, ঝাঁটা এই সবই তো মধবিত্ত গ্রাম্য সংসারের একটা প্রতীক.. তাই হয়ত ওইগুলি তখন তার জীবনের বেঁচে থাকার উপকরণ! আর বাইরের জগৎ তো তখন দেখতে শেখার বয়স হয় নি.. সমাজ তখন তাকে সেই সম্মতিও দেয় নি.. যত পড়ছিলাম ততই Radice র কথা গুলো কানে বাজছিল। "Arthur Symons felt that the Impressionist in verse should record his sensitivity to experience, not the experience itself; he should express the inexpressible' ... শ্যামাসুন্দরী সেই inexpressible কেই তুলে ধরেছেন। তার এই ডায়েরি পড়বার জন্য ভাষার দরকার হয় না। দরকার একটা মননের।! ... ...

মুসলমান অংশে ঢুকতে সাহায্য করলেন এক মেয়ে, মর্জিনা বেগম, বড়-বাড়ির বোন, বেচারির মনে শান্তি নেই, স্বামী তার নতুন বিয়ে করেছেন অথচ কোলে তার ফুটফুটে ছেলে। ভাইদের বাড়িতে থাকেন, ছেলে কোলে নিয়ে তার মাঠে-ঘাটে চলতে বাধা নেই। তবুও তার কোন সই নেই। এই বাড়ির বউরা বেশ পর্দানশীন। কেউ বাড়ির বাইরে যান না। বাড়ির বড়-বউ বি.এ. পাশ কিন্তু তার কোথাও যাওয়ার "হুকুম নাই'। বেশ কাতর গলায় জানালেন: হ, আবার সই ! পুষ্করিণীতেই যাইতে পারি না, গোসলখানায় পানি দিয়া যায়, হেই পানিতে গোসল সারি। ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর মাইয়ারাও এই বাড়িতে ডোকতে পারে না। ... লণ্ডন কি খুব সুন্দার ? ... আর বউরা তো ছোড, মুই তো মুরুব্বি, মোরডে কেউ হাস-তামসাও করে না। ... মোর ছবি তো তোলতে পারবেন না, মোর মাইয়্যার এউক্ক্যা ফডো তোলেন। দোয়া করবেন আপা যেন মোর মাইয়াউগ্য একদিন আমনের মতো অইতে পারে, দ্যাশ-বিদ্যাশ যাইতে পারে। ... ...

আর পাঁচটা সমবয়েসী ছেলের মত নয় ওদের জীবনযুদ্ধ। কারণ ওরা আলাদা। ওরা ছেলে হয়েও পুরোপুরি ছেলে নয়। কেউ জানেনা কে বেঁধে দিয়েছে পুরুষ ও নারীর লিঙ্গনির্দেশিত ও সমাজনির্দিষ্ট ছক কাটা আচরণবিধি। তবে এটুকু বোঝা গেছে সেই সংহিতা অনুসারে এই ছেলেদের চলাফেরা বাচনভঙ্গী - সবই জ্ঞমেয়েলিঞ্চ। অতএব এদের নিয়ে মজা লোটাই যায়। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে কোণঠাসা করাই যায়। ওদের সামনে তখন আর কোন পথ খোলা থাকে না অনিবার্যের কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া। আইনকে বুড়োআঙুল দেখিয়ে অশিক্ষিত দাই বা হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে গোপনে লিঙ্গচ্ছেদন (castration) করিয়ে বেশ কিছু ছেলে ভিড়ে যায় ওদের নিজেদের লোকের দলে - তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষের সমাজ যাদের "হিজড়ে' বলে ডাকে। সমীক্ষা বলছে হাতুড়ে চিকিৎসকের হাতযশে এদের মধ্যে পঞ্চাশ শতাংশই অকালে পৃথিবীকে বিদায় জানায়। আর বাকিরা মেয়ের পোষাকে নাচের দলে যোগ দিয়ে খুঁজে পেতে চায় নিজেদের মুক্তির পথ। অর্কেস্ট্রা কোম্পানিগুলো ভাড়া নেয় এদের। চুক্তিতে লেখা থাকে একটা মোটা টাকার অঙ্ক। সাথে খাকা-খাওয়া ফ্রি। কিন্তু সেই টাকার খুব সামান্য অংশই এরা নিজের চোখে দেখতে পায়। ইউপি-বিহারের বিয়েতে বিয়েতে এদের ভাড়া খাটিয়ে কম টাকা রোজগার করে না এদের অন্নদাতারা। তবু এদের নির্ভর করতে হয় প্রতিটা নাচের শেষে বকশিসের ওপর। তিনমাস ধরে টানা নেচে রোজগার হয় হাজার ছয়েক মত। তার ওপর যদি ভাগ্য থাকে ভালো, যদি চেহারা হয় সুন্দর, নাচের ঠমকে যদি জাগে নেশা - তাহলে এই ছয়টা কখনো কখনো বারো হয়ে যেতে পারে। তবে মেহনতের এই রোজগারে এদের নিজের ভাগ খুবই সামান্য। এমনকি শূন্য হাতে বিদায় নেওয়াও বিরল নয়। বিয়ের মরসুম শেষ হলে দল ভাঙার পালা। যারা সদ্য পেশায় ঢুকেছে তারা প্রথম রোজগারের স্বাদ নিয়ে ঘরে ফেরে। অভিজ্ঞ নাচিয়েরা থেকে যায়। ইউপি-বিহার ছেড়ে এবার তারা দেশের অন্যান্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় পরিযায়ী পাখির মত। স্থানীয় নাচাগানায় অংশ নেয়। মনোরঞ্জনের বিকিকিনি চলে সেখানেও। ... ...

"কিছু মনে কোরোনা, তুমি বাঙালী বলেই বলছি। এসব জায়গা কোনো ভদ্র মেয়েদের কাজের উপযুক্ত নয়। মেয়েদের পক্ষে ঐ ইস্কুল বা কলেজে কাজ করাই ঠিক আছে। তোমার বাড়ির লোকই বা কী ধরণের, মেয়েকে এরকম একটা চাকরি করতে পাঠিয়েছে। তা আজকাল কম্পিউটার টম্পিউটার কম্পানি খুলছে তো কলকাতা দিল্লী বম্বেতে শুনি। তুমি তো সেসব জায়গায় চাকরি খুঁজলেও পারতে।" স্থান : পশ্চিমবঙ্গে স্থিত একটি সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট। কাল: উপরোক্ত ঘটনার একবছর পর। পাত্র: ট্রেনিং শেষে জয়েন করতে আসা উল্লিখিত দুটি মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারের একটি। যে লোকটি এরকম সুমধুর সম্ভাষণে প্রথম দিন মেয়েটিকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন তিনি ঐ প্রজেক্টের মেন্টেনান্স বিভাগের প্রধান। মেয়েটি এরকম অভ্যর্থনায় নির্বাক, প্রথম কাজ শুরু করার আগে বিভাগীয় প্রধানের এধরণের উৎসাহ প্রদানের বহরে মনে একরাশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব। তবু মরিয়া হয়ে জানায় যে তার ইচ্ছা এরকম জায়গায় কাজ করা, পড়াতে তার ভালো লাগেনা। প্রচুর বিরক্তিতে ভদ্রলোক খুঁজে পেতে একটি অদরকারী বিভাগে মেয়েটিকে পাঠালেন মুখ দিয়ে অনর্গল বিরক্তিসূচক নানা শব্দ বার করতে করতে। তারপরের কাহিনী, দীর্ঘ লড়াইয়ের, বারে বারে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা। জরুরী কাজের পারমিট হাতে নিয়ে টেকনিশিয়ান ও মজদুরকে ডাকতে গেছে ফিল্ডে যাবার জন্য, সেখানে তাদের বক্তব্য, "আপনার লিখিত অর্ডার টা দেখি এই গ্রুপে পোস্টিংয়ের, নাহলে আপনার সাথে কাজ করতে যাব না। কিছু গণ্ডগোল হলে তো মেয়েছেলেকে কেউ কিছু বলবেনা, আমাদেরই ধরবে।" ... ...

পায়ে পায়ে মিছিল এগিয়ে চলেছে, কলকাতার রাস্তা দিয়ে। হাজরার মোড় থেকে কালীঘাট হয়ে দেশপ্রিয় পার্ক। প্রায় তিনশো জন নারী, হাতে মোমবাতি, মুখে স্লোগান - ""৮ই মার্চ দিচ্ছে ডাক পিতৃতন্ত্র নিপাত যাক''। এই বছর, ২০১০ সালে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের একশো বছর পূর্ণ হল। ঐ মিছিলের শেষের দিকে কিছু অল্পসংখ্যক মেয়ে, তারা বয়ে নিয়ে চলেছে রামধনু পতাকা। গলা মেলাচ্ছে মিছিলের বাকি মেয়েদের সঙ্গে। কিন্তু মাঝে মাঝে ওরা আরো বলে উঠছে - ""তোমার আমার অংশীদারী, সমকামী তবুও নারী''। সেই সুরে সুর মেলায় মিছিলের শেষের দিকের সকল নারী। রাস্তার দু'ধারের মানুষেরা অবাক চোখে দেখতে থাকে সবাক সমকামী নারীদের। মিডিয়ার ক্যামেরার বিশেষ নজর কাড়ে ওরা। ... ...

নতুন নারী-নির্মাণের কাজটি বাঙালি হিন্দুরা এর একশো বছর আগে করেছিলেন। আকিমুন এই তথ্যটি দিলেও তার ইতিহাসটি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছেন। শিক্ষিত সহধর্মিণীর জন্য এক প্রজন্মের পুরুষের চাহিদা তৈরি হওয়া মাত্র হিন্দু পরিবারের গুরুজনেরা তাঁদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে, তাদের জন্য মেম গভর্নেস রেখে বিটোফেন সম্পর্কে শিখিয়ে, খোলা গাড়িতে স্বামীর পাশে বসে হাওয়া খাওয়ার উপযুক্ত করে তুলেছিলেন - এ চিত্র আদৌ ঐতিহাসিক নয়। একটু মনোযোগ দিয়ে ইতিহাস পাঠ করলেই আকিমুন বুঝতেন যে অন্দরমহল থেকে মহিলাদের সদরে আসার পথ তৈরি করার জন্য কয়েক প্রজন্মকে হিন্দু সমাজের নানান অর্গল ভাঙতে হয়েছে। সে লড়াই যে সব সময়ে পুরুষের উদারতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল, তাও নয়। ... ...

প্রথমে চলচ্চিত্রে প্রসঙ্গটা কিভাবে এল সেটা দেখে নেওয়া যাক। প্রথমে রাজনের মন্তব্যে ইঙ্গিত আছে সেই অতিনির্ণয়ের, আগেই যেটা আমরা দেখেছি, আধুনিকতার পেশা থেকে জীবিকা অর্জন আর ঐতিহ্যের সক্রিয়তা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেটা নয়, কৌতূহলটা অন্য জায়গায়। এই একমাত্র জায়গা "কবি' চলচ্চিত্রের যেখানে খুব স্পষ্ট একটা নির্মাণের গরমিল পেয়েছি আমি, এবং যা একটুও ছিল না "কবি' উপন্যাসে। এতটাই বেমানান লেগেছে এটা অবশিষ্ট চলচ্চিত্রটা তৈরির সুচারু সুপরিকল্পিত রকমের সঙ্গে যে, "কবি' চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজনও কেউ যদি আজও বেঁচে থাকেন, এবং তার স্মৃতিতে থেকে থাকে এই খুঁটিনাটি তো সেটা আমি জানতে আগ্রহী। গরমিলটা কোথায় সেটা আগে দেখে নেওয়া যাক উপন্যাস থেকে। ... ...

ঠাণ্ডা হাওয়ায় প্রতীক কবরস্থানের নিশুতি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। গুটি শুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে ঘন ঘাসের উপর। লম্বা লম্বা চারকোলগুলি মাথার চাপে ভেঙে গেছে। নাকে মুখে কালো রঙ লেগেছে। কার্টিস পেপারগুলো হাওয়া হাওয়ায় ফর ফর করে ওড়ে। সঙ্গে ওড়ে দীর্ঘ একটি চুল। চুলে জবাকুসুম। অগ্রভাগ সামান্য বাঁকা। লোটাসের চুল। লোটাস নসু কাকার মেয়ে। স্কুল পাস করেছে। সাইকেলে যায়। ওর লাল দোপাট্টা মল মল করে ওড়ে। হি হি করে হাসে। বলে, আমার নাম লোটাস নয়কো। পদ্ম--পদ্মরাগমণি। পদ্মপুকুরে বাড়ি। তোমার লগে আড়ি। ... ...

অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস ঘোষণার প্রাক্মুহূর্তে প্রকাশিত হল একটি বুলবুলভাজা, চলচ্চিত্রচঞ্চরী। আগের কিস্তির সূত্র ধরে ফিরে আসি টলিউডে। লেখার একদম শেষের দিকে উল্লেখ করেছিলাম যে সত্তর দশকেও আমরা পেয়েছি "নিশিপদ্ম', "থানা থেকে আসছি', "এখানে পিঞ্জর', "ধন্যি মেয়ে'র মতন সিনেমা যেগুলি তথাকথিত আর্টহাউস্ ফিল্ম না হয়েও পেয়েছিল সমালোচকদের প্রশংসা এবং সাথে বক্স-অফিস সাফল্য। সত্তরের "এখানে পিঞ্জর' (প্রফুল্ল রায়), "শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' (বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় ), আশির "দাদার কীর্তি'র (শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) মতন প্রভূত জনপ্রিয় সিনেমাগুলি স্বনামধন্য সাহিত্যিকদের কালজয়ী ছোট গল্প বা উপন্যাস আবলম্বনে তৈরি। "নিশিপদ্ম' বা "ধন্যি মেয়ে'র চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন অরবিন্দ মুখার্জ্জী যিনি নিজে সাহিত্যিক ছিলেন এবং "দেশ' বা "নবকল্লোল'এ তাঁর একাধিক ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। সাহিত্যিকদের রূপোলী পর্দার জগতে বিচরণের যে ট্র্যাডিশন প্রেমেন্দ্র মিত্র-শৈলজানন্দরা তৈরি করে দিয়ে গেছিলেন, সত্তর-আশির দশকে সেটাই বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন অরবিন্দ। যাই হোক্, মূল প্রসঙ্গে ফিরি - বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লের-ই রমরমা, অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে সেভাবে এল কই? সত্যজিৎ রায় থেকে তপন সিনহা, অগ্রদূত থেকে তরুণ মজুমদার - জনপ্রিয় সিনেমাগুলি প্রায় সব সময়েই অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লের ওপর তৈরি। ... ...

-- উনি কি জানতেন যে বিংশ শতাব্দীতে রণজিৎ গুহ- গায়ত্রী স্পিভাক চক্রবর্তিরা মিলে একটা অন্যরকমের ইতিহাস, ধোপা-নাপিত-কামার-কুমোরের ইতিহাস লেখার জন্যে গজল্লা করবেন? তবে এইটা লিখেছেন যে জ্যেঠা রাজকৃষ্ণ অত্যন্ত ধার্মিক ও ""নামে রুচি,জীবে দয়া, ভক্তি ভগবানে'' গোছের লোক ছিলেন। খরা-বন্যা-মহামারীর সময় প্রজাদের জন্যে ধানের গোলা খুলে দিতেন, যে যা চাইত ধার দিতেন, হিসেব রাখতেন না। দিয়ে খুশি হতেন। একেবারে টিমন অফ এথেন্স! ফলটাও হাতে হাতে পেলেন। লোকে ধার শোধ করতে ভুলে গেল। আস্তে আস্তে ওনার তালুকদারীর নৌকোয় ফুটো হতে লাগল। ফলে দশবছর বয়সে পিতৃহীন গগনচন্দ্রকে ইংরেজি স্কুলে পড়ার জন্যে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে রেঁধে বেড়ে খেয়ে থাকার শর্তে নওয়া-যশোদল যেতে হল। সেখানে আবার স্কুলে স্ট্রাইক ও হয়েছিল, ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে, স্কুল বন্ধ হল, তার ব্যাপক গল্প আছে। হে-হে, বংশের ধারা যাবে কোথায়? আম্মো না নাকতলা স্কুলে ১৯৬৬তে স্ট্রাইক করিয়েছিলাম। --ঢের হয়েছে। এবার একটা চুটকি গল্প বলে শেষ কর, খালি প্যারাবলের মত শেষে কোন মর্যালিস্ট লেকচার দিও না। ... ...

দীর্ঘদিন পাহাড়ে, বনে-বাদাড়ে, আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ঘুরে জেনেছি, এ দেশে সাধারণভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা হত-দরিদ্র প্রধান প্রধান আদিবাসী গোষ্ঠিগুলোর (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন, মনিপুরী, গারো, সাঁওতাল ও খাসিয়া) প্রত্যেকেই নিজেস্ব ভাষা ও নিজ ভাষার বর্ণলিপি অনেক সমৃদ্ধ। আবার কয়েকটি আদিবাসী গোষ্ঠির নিজেস্ব বর্ণমালা না থাকলেও তাদের রয়েছে রোমান বর্ণমালায় ভাষা চর্চার ঐতিহ্য। কিন্তু চর্চার অভাবে এ সব বর্ণমালার সবই এখন বিলুপ্ত প্রায়। এরফলে নতুন প্রজন্মের আদিবাসীরা নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও নিজেস্ব ভাষায় তারা একেবারে প্রায় অজ্ঞ। অথচ মাত্র চার দশক আগেও পরিস্থিতি এতোটা বিপন্ন ছিলো না। তখন নিজ মাতৃভাষা লিখিত চর্চার পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে শিশুশিক্ষায় ভাষাটির বর্ণপরচিয়ও চলতো। চাকমা রাজা ব্যরিস্টার দেবাশীষ রায় আলাপকালে বলেন, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সারাদেশের শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে আদিবাসী শিশুর ঝরে পড়ার হার অনেক বেশী। এর একটি কারণ- ভাষাগত বাধা। আদিবাসী শিশু বাসায় যে ভাষায় কথা বলছে, স্কুলে সে ভাষায় লেখাপড়া করছে না। বাংলা বুঝতে না পারার কারণে শিশুমনে পাঠ্যবই কোনো দাগ কাটছে না, স্কুলের পাঠ গ্রহণ করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ... ...

মজা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন অসমিয়াকে বাংলা বলে ভুল করছিলেন তখন অসম বৃহৎ বাংলারই এক প্রান্তীয় অঞ্চল ছিল। আজ যখন অসমিয়া পণ্ডিতেরা ওই একই পথ ধরে সিলেটিকে অসমিয়া বলে প্রচার করে থাকেন তখন সিলেটিদের বাস্তবতা হলো তাদের এক বড় ভাগ অসমের প্রান্তীয় তিনজেলা কাছাড়-করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দির সংখ্যালঘু বাসিন্দা। কামতাপুরিরা অসম, পশ্চিমবাংলা দুই প্রদেশেরই সংখ্যালঘু বাসিন্দা। তাই তাদের ধরে দু'পক্ষই দড়ি টানা টানির খেলা খেলে থাকেন। বাংলাদেশেও রয়েছেন তারা, কিন্তু সংখ্যাতে এতো অল্প যে ওদের কথা কেউ ভুলেও মুখে আনেন না। সেখানে চাকমা হাজংদের কবে বাঙালি বলে মানানো যাবে তার জন্যে কিছু বাংলাভাষাপ্রেমীদের রাতের ঘুম হয় না ভালো করে। সম্ভবত ২১ ফেব্রুয়ারীর সকালে শহীদ বেদির তলায় গিয়েও তারা তাদের প্রার্থনা জানাতে ভুল করেন না। যে দেশের উদ্যোগে ২১এর দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায় সে দেশে এখনো বাংলার বাইরে কোনো ভাষার রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি নেই এর চে' লজ্জার কথা আর কী-ই বা হতে পারে! অথচ এক দুটি নয় সে দেশে প্রায় পয়তাল্লিশটি ছোট বড় অবাঙালি নৃগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত পঁচিশটিরও বেশি ভাষা রয়েছে। ... ...

একদিন বঙ্কা পড়াশোনা শেষ করে খুব ক্লান্ত হয়ে ছাদে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল, অ্যাকসিডেন্টালি বা ইনসিডেন্টালি তার মুখটা ছিল পাকিস্তান বর্ডারের দিকে ফেরানো। উইংয়ের ছেলেরা এর থেকে দল বেঁধে সহজ পাটিগণিত সমাধান করে ফেলে এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখে সেদিন সারারাত ছাদ থেকে তারস্বরে, পাকিস্তান বর্ডারের দিকে মুখ করে আমরা গেয়েছিলাম, একটাই লাইন : আন তবে বীণা, আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ, আন তবে বীণা, আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ ... সে যে কী অপূর্ব শুনতে হয়েছিল, কী বলব। ... ...