

কুলদা রায়ের সাহিত্য নিয়ে একটি লাইভ আলোচনায় আমন্ত্রিত হয়ে কিছু কথা বলার সুযোগ হয়েছিল স্বয়ং লেখকের উপস্থিতিতে। তার থেকে অনেক বেশি কথা না বলা থেকে গিয়েছিল, সময় সংক্ষেপের কারণে। সেই বলা এবং না বলা কথা, যা ছিল ঐ আলোচনার একটি প্রস্তুতি পর্বের নোট, পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। ... ...

প্রাচীনকাল থেকেই সম্মোহন বিদ্যা প্রচলিত রয়েছে মানব সমাজে। সেকালে এই বিদ্যাকে যাদুবিদ্যা, বশীকরণ বিদ্যা বা অলৌকিক ক্ষমতা বলে মানুষ বিশ্বাস করা হতো। অষ্টাদশ শতকে সম্মোহন বিদ্যার নামকরণ হয় ‘মেজমেরিজম’। অষ্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের ড. ফ্রাঞ্জ ফ্রেডরিখ অ্যানটন মেসমার সম্মোহন বিদ্যার চর্চা শুরু করেন। ফলে এর ব্যাপক প্রচার শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘মেজমেরিজম’। ... ...

বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয়সংগীতের ঘরানাটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাড়ির টান। যদুভট্টের শিক্ষা থেকে পালিয়ে বেড়ানো বালকটি কি নিজেও জানত, পরবর্তীতে তার গানে ছায়া ফেলে যাবে মল্লভূমের আকাশ? রবীন্দ্রসংগীতে বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রভাবকে খুঁজে দেখাই এ লেখার উদ্দেশ্য। প্রসঙ্গত, লেখক নিজেও বিষ্ণুপুর ঘরানার শাস্ত্রীয়সংগীতে আজীবন শিক্ষিত। ... ...

আপনি চান আপনার হাজার ডলার। রাশিয়া বলছে দেবো না বলিনি, রুবেলে দেবো বলেছি। আপনি নেবেন না। অতএব আপনি বাজারে খোঁজ খবর করলেন। যে বন্ডের কাগজটি আপনি যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছিলেন সেটা রাশিয়ানরা না হোক অন্য কেউ কি কিনবে? যাঁদের মারফত আপনি এই মহামূল্য বন্ডটি কিনেছিলেন সেই জে পি মরগান বা গোল্ডম্যান জাখসকে ফোন করলেন। অবশ্যই আপনার টাকা বাঁচল কি ডুবল তাতে এঁদের কিছু এসে যায় না। আপনি প্রাপ্ত বয়স্ক নিবেশক – চোখ খুলে, জান বুঝকে টাকা লাগিয়েছিলেন। এখন তাদের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করলে তারা শুনবে কেন? তার মানে কি এঁরা হাত উলটে বসে থাকবেন? তা কখনো হয়? আপনি তাঁদের খদ্দের, খরিদ্দার প্রভুর সমান লেখা দেখেন নি কলকাতার দোকানে দোকানে? শ্যামবাজারে মায়ের সঙ্গে শাড়ি কিনতে গিয়ে কতবার দেখেছি। ... ...

চার্লি দুটি ছবি দেখালেন – বাবা মায়ের সঙ্গে তিন ছেলে মেয়ের, সুখের দিনের। তারপরে বললেন, এদের ঘর সংসার ছিল, বাড়ির সামনে পরশে গাড়ি না হোক, কাজ চালাবার মতন যান ছিল, আই ফোন না হোক, সস্তার চিনে আন্দ্রয়েদ ফোন ছিল। আপনার আমার মতন জীবন ছিল। বাবার কাছে খারকিভ স্টেশনে বিদায় নিয়ে এসেছে, সে বিদায় কি সাময়িক? কে বোঝাবে এই শিশুদের? ধন্য এই মায়েরা যারা বাঘিনীর মতো ছেলে মেয়েদের আগলে সামলে অদৃষ্টের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন (চ্যালেঞ্জিং দি ডেস্টিনি)। ... ...

নয়ই নভেম্বর উনিশশ উনননব্বুই : কাস্তে নয়, হাতুড়ি দিয়ে এমনকি খালি হাতে জনতা যখন বার্লিন বিভাজক প্রাচীরটি ধ্বংসের প্রয়াসে উন্মত্ত, ভ্লাদিমির পুতিন নামক এক কে জি বি অফিসার পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা এজেন্সি স্টাজিকে ফোন করে পাঁচ ট্রাক ভর্তি ফাইল আনিয়ে পেট্রল সহ তাতে অগ্নি সংযোগ করছেন। তার আগে অবিশ্যি (আপন ভাষ্য অনুযায়ী) মস্কোয় ফোন করেছিলেন। গভীর বেদনার সঙ্গে পুতিন বলেন, মস্কো নিশ্চুপ ছিল সেদিন। সেই পুতিন দশ বছরের ভেতরে রাষ্ট্রপতি হয়েই বলেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিনাশ বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড়ো ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়। ... ...

ড্রেসনার ব্যাঙ্কে ট্রেনিঙের সময় কিছু মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছিলো যারা কিশোর বয়েসে সারা রাত শুনেছেন শত্রু বিমানের, অ্যান্টি এয়ার ক্র্যাফট গানের, বোমার আওয়াজ। ভোরের আলো ফুটলে দেখেছেন নিজেদের, পাড়া পড়শির বাড়ির চাল, দেওয়াল উড়ে গেছে। রাস্তায় কলের পাইপ ফেটে জলের ফোয়ারা বইছে। সকাল হতেই শহরের পথে পথে পৌর সভার দমকল বাহিনী, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, কলের মিস্ত্রিরা বেরিয়ে পড়েছেন, পাইপ সারাচ্ছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ করেছেন। নুরেমবেরগের হেলমুট বলেছিলেন বেলা নটার ভেতরে কলে জল আর ঘরের বিদ্যুৎ বাতি চালু হয়ে যেতো। জন জীবন প্রায় স্বাভাবিক! আমেরিকানরা দখল নেওয়ার পরে বোমায় বিধ্বস্ত নুরেমবেরগে এক মাস কলের জল বা বিজলি বাতি কোনটাই পাওয়া যায় নি। ... ...

ব্যাঙ্কাররা হরফান মউলা। কোনটাই ভালো ভাবে বোঝেন না। কিন্তু লোককে বোঝানো যে আমাদের কাজ নইলে ফি আসে কোত্থেকে? আমার খুঁজি সেলিং পয়েন্ট। এই বিশাল পরিমাণ ঋণের প্রস্তাব নিয়ে আমরা যখন লন্ডন ফ্রাঙ্কফুর্ট প্যারিসের বিভিন্ন হোটেলের কনফারেন্স গৃহে পথসভার আয়োজন করেছি তখন আমাদের গল্পটি এই- প্রমাণিত গ্যাসের সঞ্চয় বহু ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার, সুদূর সাইবেরিয়া থেকে চেক বা ইউক্রেন অবধি গ্যাস পাঠানো হয় তাদের নিজস্ব পাইপ লাইনে, ইউরোপে সেই গ্যাস কেনার জন্যে হামলে পড়েছেন খ্যাতনামা কোম্পানিরা যাদের সঙ্গে তাবৎ ইউরোপীয় ব্যাঙ্কের নিত্য ওঠা বসা। তৎকালীন হিসেবে এই বিরাট অঙ্কের অর্থ যোগাড় করতে আমাদের বিশেষ অসুবিধে হয় নি। ফ্রাঙ্কফুর্টে সেই ঋণে সই সাবুদের অনুষ্ঠানে কলার উলটে ঘোরাঘুরি করেছি। ... ...

দক্ষিণ পশ্চিম ইউক্রেনের ঝাপোরিঝিয়াতে আছে ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। পৃথিবীর দশটির একটি। তেরো বছরের মেয়ে একাতেরিনাকে (ক্যাথরিন) নিয়ে অলিয়েনা ঝাপোরিঝিয়া থেকে ট্রেনে দু রাত্তির কাটিয়ে পোল্যান্ড পৌঁছেছিলেন। একটি ক্যাথলিক গিরজেতে তিন রাত্তির বাসের অনুমতি পাওয়া গেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ ভিসার খোঁজ নেই। এবার কোথায় যাবেন? কিছু বন্ধু বান্ধবের সূত্রে খবর পান সুইডেনের গোয়েটেবর্গে সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা আছে। ... ...

পোল্যাণ্ডের প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালকদের অন্যতম আন্দ্রে ভাইদার দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনের শেষ দুটি ছবি ছিল বায়োপিক। প্রথমটি পোল্যাণ্ডের বিখ্যাত সলিডারিটি আন্দোলনের নেতা লেখ ওয়ালেসাকে নিয়ে। দ্বিতীয়টি পোল্যাণ্ডের আভাঁ গার্দ চিত্রশিল্পের এক পুরোধা ব্যক্তিত্বকে নিয়ে। এই দুটি ছবি শুধু সময়ের দলিল নয়-- জীর্ণ, প্রাণহীন এবং মানবিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক তথাকথিত সমাজতন্ত্রের ধারণার বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ ঘোষণার পক্ষেও বটে। একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের নির্মাণ যদি ঘটাতে হয় তাহলে এই ভুলগুলি সম্পর্কে সচেতন হওয়া, তাদের ধিক্কার জানানো ঠিক ততটাই জরুরী, যতটা জরুরী এই মুহূর্তে বিকল্প সমাজব্যবস্থা নির্মাণের পথে যাত্রা। আন্দ্রে ভাইদার এই ছবি দুটি আমাদের সেই সুযোগ করে দেয়। ... ...

কেবল সিরিয়া ইরাক আফঘানিস্তান নয়, আপন দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে উৎপীড়িত অন্য অনেক দেশের মানুষজন ব্রিটেনে আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছেন। এঁদের মধ্যে কিছু এসেছেন এল সালভাদোর থেকে। বিগত তিরিশ বছর যাবত সেদেশে চলেছে গ্যাং ওয়ারফেয়ার, বিভিন্ন দলের মধ্যে সশস্ত্র লড়াই। শাসন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। সে দেশের সঙ্গিন আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সালভাদোরিয়ান শরণার্থীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেবার কথা ব্রিটিশ সরকার বিবেচনা করছেন। ইতিমধ্যে তাঁদের বসবাসের ব্যবস্থা হচ্ছে দেশের নানা জায়গায়। তাঁদের কেস খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। ... ...

প্রথম দলকে আপনি রোজ চোখে দেখেন, মুখ চেনেন, কিন্তু প্রায় কারোরই নাম জানেন না। দ্বিতীয় দলকে আপনি প্রায় কখনোই দেখতে পান না, জীবনে কখনো পাবেনও না – কিন্তু তাদের নাম আমি, আপনি সবাই জানি। কারণ, এই এক শতাংশ দেশবাসীর হাতে আছে দেশের মোট সম্পদের ৭০ শতাংশ। আর তার পরের ধাপের কুড়ি শতাংশ ভাগ্যবানের হাতে আছে প্রায় উনিশ শতাংশ সম্পদ। তাহলে হাতে রইল কি? পেনসিল? না দাদা – এগারো শতাংশ। ভাগীদার কজন? দেশের প্রায় আশি শতাংশ মানুষ ... ...

তেমনই আমরা জানতে পারব না এলেন কেন উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হলেন। কেন আর দশটা ইউরেশিয়ান মেয়ের মত একটু পড়তে শেখা, একটু সেলাই-ফোঁড়াই, একটু নাচতে শেখা এই যা সব নিয়ে সাধারণ ইউরেশিয়ান মেয়েরা সন্তুষ্ট থাকত,এলেন কেন তার সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে তাকাতে চাইলেন? তখনকার সাধারণ চাকুরিজীবি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বাড়িতে কি খুব পড়াশোনার চর্চা ছিল, বিশেষত মেয়েদের মধ্যে? ১৮৮২ সালের তথ্য থেকে পাই তার থেকে দেখা যায় যে ইউরোপিয়ান আর ইউরেশিয়ানদের মধ্যে, অন্তত কলকাতায়, প্রাইমারি বিভাগে মেয়েদের ভর্তির হার ছেলেদের প্রায় দ্বিগুণ। খুবই আশ্চর্য তথ্য। তবে মিডল স্কুলে গিয়েই এই অনুপাত উলটে যাচ্ছে। বিভিন্ন আংলো-ইন্ডিয়ান স্মৃতিকথার টুকরো-টাকরা যা হাতে এসেছে, তার থেকে এও ধারণা করা যায় যে ইউরেশিয়ান মেয়েদের অক্ষরজ্ঞান দরকার এই অবধি ঠিক আছে, তবে তার থেকে খুব বেশি শিক্ষার দরকার বলে কেউ ভাবেন নি সেই সময়। ওই প্রাইমারি স্কুলই ঢের। অবশ্য এই জনগোষ্ঠীর ছেলেরাও যে খুব বেশি দূর পড়াশোনা করতেন এমন তো নয়। আলাদা করে শ্রেণিবিভাগ করা থাকত না বলে একদম সঠিক করে বলা শক্ত, তবে এলেন যে বছর এন্ট্রান্স বা এফ এ পাস করেছেন সেই সেই বছরের তার সহপাঠীদের তালিকায় কিন্তু সাহেবি নামের ছাত্রের সংখ্যা নেহাতই হাতে গোণা। ... ...

দুটো জিনিস নিয়ে আজকাল খুব কনফিউশন। এক, গুডি পাড়বার দিন অনেকে বাংলা হরফে হিন্দু নববর্ষ উইশ করছেন। দুই, বাংলাদেশের ১৪ই এপ্রিলটা সঠিক পয়লা বৈশাখ না পশ্চিমবঙ্গের ১৫ই এপ্রিল, সেই নিয়ে বিবাদ। সেখানেও হিন্দু মুসলমান চলে আসছে। ... ...

কোনো দেশ দখলের মহান ব্রতে যখন সৈন্য বাহিনী পথে নামে তাদের পিছু পিছু চলে সরবরাহ বাহিনী – রাঁধুনি খানসামা থেকে আরম্ভ করে মুচি মেথর। সৈন্যরা যেমন যেমন দুর্বার বেগে এগিয়ে যায় তার সঙ্গে তাল রেখে ডাল ভাত এমনকি দাঁত খোঁটার খড়কে কাঠিটি পর্যন্ত যোগান দেবার কনভেয়র বেল্টটি চালু থাকে। অভুক্ত সৈন্য বাহিনী যুদ্ধ জেতে না। আপন আপন রাশিয়া অভিযানের কালে নাপোলেওঁ এবং হিটলার এই সার সত্যটি অনুভব করেছিলেন। ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে শূন্যের পনেরো ডিগ্রি নিচে নেমে যাওয়া ঠাণ্ডায় যে জার্মান বাহিনী স্টালিনগ্রাদে লড়াই করছিল, তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের দশ শতাংশ পৌঁছে দিতে অক্ষম হয় গোয়েরিঙের লুফতভাফে। ফলাফল আমাদের জানা। ... ...

বাংলায় যদি একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, তাহলে সমাজমাধ্যমে কী হয়? এখন যা হচ্ছে। সরকারপক্ষ, হয় চেপে যায়। নইলে বলে, দোষ আমাদের কেন হবে? মদ খেয়ে যদি কেউ খুন-ধর্ষণ কিছু একটা করে, তাহলে দোষ তো তাড়ির, তাড়ির না হলে নির্ঘাত খেজুর গাছের। পুলিশ তো আর গাছকে গ্রেপ্তার করতে পারেনা, ভারতীয় দন্ডবিধিতে তেমন ধারা নেই, তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। যদি প্রশ্ন করেন, কিন্তু খুনটা তো আর গাছ এসে করে দেয়নি, খুনিকে ধরলেন না কেন? তখন তাঁরা অম্লানবদনে বলবেন, আরে খুন হয়েছে জানবে, তবে তো। আইন আইনের পথে চলবে। আগে অভিযোগ, তারপর তদন্ত। খুন হবার আগে, সেই বেটি থানায় এসে অভিযোগ করেনি কেন? কোথাও কেউ প্রপার প্রসিডিওর ফলো করবেনা, আর সব দোষ হবে প্রশাসনের? মামার বাড়ি? সংখ্যাগুরু বিরোধীরা, সেই শুনে বলবেন, দেকেচ, আগেই বলেছিলাম, হিন্দু খতরেমে। খেজুর গাছের দোষ সরকার তো দেখতে পাবেইনা, ও গাছ তো আরব থেকে এসেছে। এরা সমুদ্রের নাম দিয়েছে, আরব সাগর, এদের পুলিশ আরবী ঘোড়া চড়ে, এদের একমাত্র দাওয়াই হল কেন্দ্র। কেন্দ্র থেকে তিনশছাপ্পান্ন লাও, দিল্লি থেকে সিবিআই। মারবে এখানে, বডি পড়বে তিহারে। জ্যায় শ্রীরাম। যদি মিনমিন করে প্রশ্ন করেন, কিন্তু এদিকে তো বঙ্গোপসাগর, তাছাড়া ওদিকেও তো হাথরাস-টাথরাস কীসব হয়েছে, তখন সিবিআই ঠিক কী করছিল? রেডিমেড জবাব, বড়-বড় কথা বলবেন না, আপনি কি সেকু-মাকু না লিবারবাল? কাশ্মীরে যখন পন্ডিতদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন আপনি কোথায় ছিলেন? যখন আফগানিস্তানে বুদ্ধমূর্তি ভাঙা হচ্ছিল, আপনি কী করছিলেন? যখন নাইন-ইলেভেন হল, তখন... ইত্যাদি প্রভৃতি। ... ...

আমার বাবাকে শেরপুরের মানুষ ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলে মনে করতেন। সাধারণ মানুষ আব্বাকে চিনত এমন না, কিন্তু যারা এই ধারায় আছে তারা সবাই এক নামেই চিনত। শহরের বড় বড় মসজিদের ইমাম, ইসলাম বুঝে জানে এমন লোকজন আব্বাকে মান্য করত। আব্বার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে দেখেছি অনেকেই। কোন মসজিদ বা মাদ্রাসায় আব্বার নাম বললে উনার নাম শুনা মাত্র নড়েচড়ে বসত সকলেই। আব্বা আমাদের এলাকার মসজিদে নামাজ পড়তেন না, কারণ এখানে যে নামাজ পড়ায় তিনি অল্প বয়সই, আব্বা তৃপ্তি পেতেন না তার পিছনে নামাজ পড়ে। হেঁটে দূরের এক মসজিদে যেতেন শুধু মাত্র সেই ইমাম সাহেবকে আব্বার মনে হত উনার মাপের, যার সাথে কথা বলা যায়, আলাপ করা যায়। সেই ইমাম সাহেব আমাকে অনেকবার আমার কাছে আব্বার প্রাণ খোলা প্রশংসা করেছেন। এক বাক্যে স্বীকৃতি দিছেন যে আব্বার মত ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানী মানুষ তিনি খুব কমই দেখেছেন। তিনি পরে শেরপুরের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা ও মসজিদের ইমাম হয়ে ছিলেন, এবং তখনও উনার আব্বার প্রতি মুগ্ধতা কাটেনি। আব্বা যখন অসুস্থ, বিছানায় পড়ে গেছেন। তখনও আমি দেখতাম কোথা থেকে কোথা থেকে মানুষ আসত, উদ্দেশ্য আব্বার সাথে দেখা করা আর একটু আলোচনা, ইসলামের নানা বিষয় নিয়ে গল্প। আমি আব্বার এই দিকের কথা কেন বলছি? কারণ আমি আব্বাকে কোনদিন নববর্ষের বিরোধিতা করতে দেখি নাই। আব্বা নিশ্চয়ই মঙ্গল শোভা যাত্রায় অংশ নেয় নাই। কিন্তু মেজোপা যখন নববর্ষ উপলক্ষে একটা পাঞ্জাবি বা ফতুয়া এনে দিত তখন তিনি আগ্রহ নিয়েই পরতেন, খুশিতে চোখ নেচে উঠত উনার। বাব্বাহ! আমার জন্য আনছ, বলে হাতে নিতেন, হাসতেন। আমি যখন ঢাকায় ছিলাম তখন ফোন দিয়ে বলতাম, আব্বা, শুভ নববর্ষ, তিনিও সাথে সাথেই শুভেচ্ছা জানাতেন নববর্ষের। নববর্ষ উপলক্ষে ভাল মন্দ রান্না হয়েছে কি না তার খোঁজ নিতেন, আগ্রহ নিয়ে খেতেনও। আমি আমার সমস্ত জ্ঞান বাজি রেখে আপনাদের বলতে পারি যে কাঠ মোল্লা জাহান্নাম যাওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন গলা ফাটাইয়া, আমার বাবা তার চেয়ে বেশি জানতেন, ধর্ম, ইসলাম, সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র সম্পর্কে। ... ...

যে দেশে কিছু না করেই অল টাইম দৌড়ের উপরে থাকতে হয় হিন্দুদের, যে দেশে তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবে পরিকল্পিত ভাবে ম্যাসাকার করা হয় এবং যার কোন বিচার হয় না, যে দেশে নিয়ম করে প্রতিমা ভাঙা হয়, যে দেশে গুজবের উপরে ভর করে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয় কোন বিচার হয় না, সেই দেশে কেউ হিজাব পরার অপরাধে মারছে! কোন মাপের মগজহীন মানুষ হলে এইটা বিশ্বাস করা সম্ভব? ... ...

মার্চের মাঝে কলকাতা থেকে ফিরে দেখি আমাদের বাস ভবন ত্রাণ সামগ্রীর বৃহৎ গুদামে পরিনত হয়েছে। বাড়িতে তিল ধারণের জায়গা হয়তো আছে কিন্তু আমার নিজের স্থান অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। চতুর্দিকে ছড়ানো কালো প্লাস্টিকের ব্যাগ, পেল্লায় সুটকেস। এখানে ওখানে শুকনো খাবারের প্যাকেট এমনকি দশ কিলো বাসমতী চালের বৃহৎ ব্যাগ! প্রতিদিন আসেন আরও মানুষ, দিয়ে যান ত্রাণ সামগ্রী। এখুনি নিকটবর্তী গ্রাম অ্যাশ ভেল থেকে দুজন এলেন – বব এবং পলিন, এখানে ত্রাণ সংগ্রহ হচ্ছে খবর পেয়েছেন কোথাও থেকে। ববের বয়েস আশি, ছিলেন ব্রিটিশ আর্মিতে (মালয়, সাইপ্রাস, জার্মানি) পলিন আটাত্তর, আর্মিতে নার্স। তাঁদের বিয়ে হয় হানোভারে, পুরনো আউডি চালিয়ে হনিমুনে গেছেন জালতসবুরগ। ... ...