• প্রথম পাতা
  • ভাটিয়া৯
  • টইপত্তর
  • বুলবুলভাজা
  • হরিদাস পাল
  • খেরোর খাতা
  • শ্রেণীবদ্ধ
  • প্রকাশনা
  • আমাদের কথা
  • গুরুভার
  • গুরুসন্ধান
গুরুচণ্ডা৯
লগ ইন

এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
Guruchandali
Guruchandali
Guruchandali
Guruchandali
Guruchandali
Guruchandali
গুরুর নিজস্ব ঠেক ও ঠিকানা - ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্য সেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ১২ (পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের উল্টোদিকে)!
ফোন/ হোয়াটসঅ্যাপঃ +৯১৯৩৩০৩০৮০৪৩
  • টইপত্তর  বইপত্তর

  • মলয়ের লেখাপত্তর

    pi
    বইপত্তর | ২৪ মার্চ ২০১২ | ৫৪২২৭৬♦ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা : ৫৬৭৮৯১০১১১২১৩১৪১৫
  • মুনিরা চৌধুরী | ৩০ আগস্ট ২০২১ ১২:৪৮734914
  • মুনিরা চৌধুরীর কবিতা

     

    মৃতের মাতৃমঙ্গল

    দু’ চোখের পাথর ছিদ্র করে গড়িয়ে পড়ে জল

    পৃথিবীর প্রাচীন কবরে

    হায়! এ-আনন্দধারায় আমিও জেনে যাই- বর্ষা এসেছে, তাজা জলে ডুব দেবে কঠিন কাছিম…

    .

    পাতিহাড়ে পড়ে বৃষ্টির ফুল, চকিত হরিণ ভয় নেই তোমার

    আদি বর্ষায় জল আর গহীন জঙ্গলে আমরা ছিলাম আদি ভাই বোন…

    সর্বদা মানুষ থাকি না তাই

    অর্ধেক চাতক, চাতকিনী…

    প্রতিঅঙ্গে বৃষ্টির গজল মাখি আমি আর মৃত ঠাকুর মা (সঙ্গে তাঁর ধর্মান্তরিত প্রেমিক)

    .

    হায় বর্ষা! জীবিত আর মৃতের

    অনন্ত মাতৃমঙ্গল…

    .

    ২.

    পৃথিবীর জানালায় ভর দিয়ে দেখছি

    গাছের পাতাগুলো কাঁপছে, পাতার আড়ালে স্বর্গের ফল ঝুলে আছে

    নদীতে নেমে-যাওয়া সেই রাস্তাটায় ঝিরঝির হাওয়ার মুখ ভেসে ভেসে ডুবে যায়…

    অনেকটা ডুবন্ত মানুষের চোখে দ্রুত সরে যাচ্ছে জলের প্রবাহ

    .

    এভাবেই

    রোকমচিন্তাহীন, ভাবেই এক জীবন…

    .আবছা গোধূলির আলো ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই কেউ প্রথম বাতিটি জ্বালিয়ে দিলো

    সে আলো জ্বলজ্বল করছে আয়নায়

    যেন মহারাত্রির অপেক্ষায় একটি জোনাকিপোকা।

    ৩.

    এবার সত্যি সত্যি বিদ্যুত চমকায়

    খাঁচা থেকে পাখিগুলো বেরিয়ে আসে

    বিদ্যুতের ছিদ্রে পাখিগুলো ঘুমিয়ে পড়ে আবার জেগে ওঠে।

    ক্রমে পালক ঝরছে, পাতা ঝরছে, শিশির ঝরছে…

    কতিপয় মানুষ পাখির শরীরে প্লাস্টিকের পালক লাগিয়ে দিয়ে যায়

    পৃথিবীতে আবার ঝড় আসে

    আর প্রতিটি ঝড়ের শেষে ভোর বেলা দেখি

    ধর্মবিদ্যালয়ের আলখাল্লা পরা সেই ছাত্রদের মত পাখিগুলো আমার উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে I .

    ৪ .

    ফ্লাক্সের মধ্যে তরল চা-বাগান লুকিয়ে রেখেছিলাম

    এখন আফিমের গন্ধ পাচ্ছি; পান করছি পরমায়ু…

    .বারান্দার মাথায় রঙিন কাচের স্কাইলাইট

    ছায়াচিত্রটি ক্রমে মুছে যায়

    টবে-ঝোলানো বারান্দা স্থায়ী হয়ে যায় ধূসর দেয়ালে দেয়ালে

    ঘরের মধ্যভাগ ছিদ্র করে এক বাটি আলো স্থির পড়ে থাকে মেঝেতে।

    বেতের চেয়ারে তুমি বসে আছো, স্বর্গ পলাতক

    বাদামি চুলে যেনো পুরনো এক ফটোগ্রাফের পূর্ণিমা, পরিষ্কার হাওয়ার কোলাহল…

    আর আমি হতে চাই সেইজন

    যে তোমার অভিনয় আর গলার স্বরের ওপারে যেতে পারে।

    .৫ .

    সবুজ-সন্ত্রাসের অধিকার অপন করেছো

    নিজের মতো করে

    নিজের ভেতরে…

    রক্তের পাশে ঝলসানো হৃৎপিণ্ড

    এলোমেলো চাঁদের মাংস আর

    আগুন-লাগা রক্তজবার যৌবন বাড়িয়ে দিয়েছো বহুবর্ষ।

    .কে তুমি মহাকাল, ১৯১৭…

    বঙ্গোপসাগর ছুঁয়ে চাওয়া নিম্মচাপ আজ বড়ই প্রবল…

    কেনো এক বসন্তদিনে শুনেছিলাম, রাজপুত্র আসবে ঘোড়া-টানা-গাড়িতে করে…

    সেই রাজপুত্র কোনোদিন আসেনি

    প্রিয় রাক্ষস এসেছে, যার জন্ম হয়েছে আমার করোটী থেকে

    .

    ৬ .

    স্বপ্নেরও হাত আছে, চোখ আছে, ঠোঁট আছে…

    দু’বছর আগের সেই শিউলি-ফোটা ভোরেরও অবয়ব ছিল

    আজ গোপন পাঁজর খুলে দেখলাম

    আমার জীবনের সেই একটা মাত্র ভোরের মুখখানা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে…

    .আমি সঙ্গপনে ঠাকুর মা’র পিতলের কৌটা থেকে শরৎকাল বের করে নিয়ে আসি

    স্বর্গের শিশির দিয়ে ধুয়ে দেই ভোরের দুইচোখ, মথুরা বৃন্দাবনের ঘুমসমগ্র।

    .

    ৭ .

    আজ এই পূর্ণিমার রাতে

    পূর্বপুরুষের নিঃশ্বাস ফেটে যাচ্ছে গলিত কফিনের ভেতর

    কাগজের পরতে নড়ে উঠছে জিরাফের মাথা, গোপন রক্তপ্রবাহ

    প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা সাদা কাগজের মুখ মিলিয়ে যাচ্ছে গহীন কুয়াশায়।

    .

    স্থির দাঁড়িয়ে থাকি

    গ্রহণ করি কুয়াশার কামড়…

    .

    একসময় সূর্য উঠে

    কষ্টিপাথরের গন্ধ ফেটে পড়ে গর্ভবতী মায়ের জঠরে

    জবাই-হওয়া শব্দের গলা বেয়ে সাদা রক্ত ঝরছে তো ঝরছে…

    অবশিষ্ট তারা ফাঁসির জন্য ছটফট করে।

    .শব্দের ফাঁসি দেবো বলে

    কাগজ কলমের বদলে বিস্মৃতির মেহেকানন্দা নদী নিয়ে আসি

    শব্দের বদলে ঝুলে পড়ে ঈশ্বরের গলা।

    .

    ৮.

    আমার ডায়রিতে একটুও জায়গা নেই

    ব্লেড দিয়ে কাটা-রাত আর নার্ভ থেকে ঝরা-রক্ত চারদিকে।

    কিছু রক্ত আবার পুড়ছে। কাটা-মাংস হতে শূকরের আর্তচিৎকার ভাসমান…

    ছিলে-তোলা চাঁদের খোসা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে…

    .

    ডায়রিতে আছে হরিণের মাথা, কাক ও পেন্সিল, আমার প্রেমিকের কলিজা ও পাতিহাড়

    মৃত ঈশ্বরের কবর ও চিতা পাশাপাশি

    .আজ একপাল মৃত পাখি উড়ে এসেছে ব্যাবিলন থেকে, আরও একবার আত্মাহুতি দেবে বলে।

    .আমি ডায়রির ভেতর লুকিয়ে পড়েছি

    ছায়া ও শব্দের ছাইদানীর ভেতর ছাই হচ্ছি, ছাই।

    .

    ৯.

    আমি জেগে থাকি

    কাটা-হাতখানা অন্য-হাতে নিয়ে সারারাত জাগি

    অনন্ত ভোরের দিকে হাতের গহীনে জ্বলে ওঠে হাতের চিতা

    .

    হাড়-গলা গরম ঘন হয়ে এলে কেবল শীত শীত লাগে… ঘুম লাগে

    .

    এইসব মুনিরা ঘুমের ঘোরে কোথাও কোনো জানালা নেই; সই সই নয় দরজার বাতাস…

    .১০.

    ছায়া ছায়া, অন্ধকারে ডুবে হাওয়া, মুখ দেখা যাচ্ছে না কিছুতেই

    ছায়ার ভেতর মিশে যাওয়া দু’টি আবছা ছায়ামূর্তি

    একই রকম অথচ কত আলাদা

    একটি শরীর নিষ্ক্রিয়, নির্দোষ, নিস্পৃহা আর চরম উদাসীনতা নিয়ে চলছে মাটির ওপর…

    আর

    অন্যটি সামান্য ঝুঁকে, আবর্জনা আর ঝোপঝাড়ের ওপর দিয়ে নিয়ে চলার চেষ্টায় হাঁপাচ্ছে…

    .

    মাঝে-মধ্যে থেমে থেমে নি:শ্বাস নেয়ার চেষ্টা

    তারপর আবার আরো ঝুঁকে টেনে টেনে চলে তার বোঝাখানি

    হতচকিত হয়ে দেখতে পেলো কী সামান্য পথই না পের হয়েছে!

    .ছায়া ডুবে গেলে

    ঘরের ভেতরে ঘর আর চোখের ভেতরে চোখ ঘুমিয়ে পড়ে

    হয়তো জোনাকী পোকার ভেতর পৃথিবীর অবশিষ্ট আলো জেগে আছে!

    .

    ১১.

    পাতার পরত বেয়ে বেয়ে ঝরে-পড়া ঝর্ণার আওয়াজ

    হাড় হতে হাড়ের ভেতরে…

    গাছের বুক হতে পাখিদের বুক বেয়ে ধাবমান, বৃষ্টির বিলাপ।

    বিক্ষুদ্ধ

    বাতাসের গান…

    .

    বাতাসের হাত-পা-আঙুল আমাদের কাঁচের জানালায় ডুবে ডুবে যায়

    গ্রীষ্মের এই গহীন সন্ধ্যায়

    .

    অগ্নিকালো আকাশের নিচে দীর্ঘ দাঁড়াই

    আমি আর আমার ছোটবোন আত্নহত্যা

    .এখন কি পরিস্কার হলো তোমাদের আয়নার কুয়াশার আবরণ!

    .

    ১২.

    চোখ জোড়া যেনো ঘুমের মধ্যে গলে যায়…

    উঁচু উঁচু বিশাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে নৌকা চালাই

    নৌকায় আমার মৃত ঠাকুরমা আর মহাশূন্যের একটি পিঙ্কি বিড়াল

    '

    চোখবিহীন ঘুমের সর্বত্র শুধু ঘুম

    কপালের দু’পাশে সাগরের ঢেউয়ের মতই নাড়ি টিপটিপ করে

    মনে হয় দুই খন্ড ভাবনার সমুদ্র

    .

    এরপর কি হলো?

    না, এর আগে কি হয়েছিলো?

    অবশ্য আগে-পরে বলে কিছু নেই

    যাত্রা সবসময়ই বর্তমানের

    নৌকা, মৃত ঠাকুরমা আর পিঙ্কি সবকিছুই বর্তমান মুহূর্তের অস্তিত্বশীল

    সবকিছুই স্থিরীকৃত

    স্থির আবার চলমান

    ঘুমের বিপুল ননীর মধ্যে সবকিছু দোলে…

    .

    মুখে চোখ নেই, চোখের তারা নেই

    আছে কেবল সর্বব্যাপী ঘুম

    দুই চোখের পাতা জুড়ে ঘুমের প্রপাত I

    হেমন্তে রচিত হেমলক

    ১ মহাকালের ছবি দেয়ালে টাঙিয়ে ছিলাম সেই কবেকার ঘোরগ্রস্ত ভোরে, সেলাই করে করে... সেইসব ছায়া-চেহারাগুলো এখন ঝাপসা হয়ে গেছে... ছাদের উপর বৃষ্টির আঙুলগুলো ফেটে পড়ছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে না কি কান্নায়- ঠিক বুঝতে পারি না... কৈশোরে কাগজের নৌকা ভাসিয়েছিলাম পুকুরে... ভেবেছিলাম- নৌকাগুলো বড় হবে একদিন, দেখা হবে মেহেকসমুদ্রে...

    আমার পাখিরা আর উড়াল দিলো না... দূর অতীতে পাখিদের ডানা কেটে দিয়েছিলাম পাখিদের ডানা রেখে দিয়েছিলাম ছোটবেলার অ্যালবামে...

    ২ এখন নৈঃশব্দের শব্দরা ঘুমিয়ে পড়েছে... চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে... মরুভূমিতে একা একা টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছি বালির নৌকো

    দূরতম জানালার পাশে দেখি- চিরচেনা কারো ছায়া ভেসে ভেসে ডুবে যায় আয়নাগুলো গলে গলে যায়...

    চক্ষু খুলে দেখি- কোথাও চক্ষু নেই, ছায়া নেই, বিম্ব-প্রতিবিম্ব নেই শূন্য কুঠরিতে পড়ে আছে মৃত সব মুনিরামায়া আমার অগ্নিমায়া...

    ৩ নরকের নীল আগুনের চারপাশে লেলিহান জিহ্বাগুলো উড়ছে উড়ন্ত জিহ্বায় গেঁথে যাচ্ছে আর্তনাদের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি আমি যাই নি কোথাও আমার পাণ্ডুলিপি থেকে সবগুলো লেখা চলে গেছে

    হাতখানি যে রক্তে ডুবে আছে... কী করে লিখি কথা ও মুনিরাকথা, নদী ও মেহেকানন্দার জল তবু- স্ফটিকের পাখি প্রত্নকলম তুলে দিচ্ছে হাতে

    আমায় ক্ষমা করো পাখি, পাখির পালক, আমায় ক্ষমা করো নদী, নদীর দুইপাড় আমায় ক্ষমা করো ক্ষমা করো ক্ষমা করো ক্ষমা করো ক্ষমা করো রক্তকরবী আমি যে পাথর কুচি...

    ৪ ভেবে নাও তুমি- মঙ্গলরূপ কিছুটা পুড়ে গেছে পুড়ে-যাওয়া জলের ছোবলে ভোর বেলার আলোয় কোনো কমলা-রঙ নেই, ছাই-রঙা বালিকার গুড়া গুড়া শরীর ব্যতিরেকে ভাঙ্গা মন্দিরের পাশে আমাদের ভাঙ্গা-শঙ্খের আওয়াজ ভাঙছে তো ভাঙছে সখা হে, মমি হয়ে শুয়ে আছি অগ্নিঝর্ণার নিচে

    আর জাগবো না আর জাগবো না

    কেনো জাগাতে চাও তবে কেনো জাগাতে চাও ঘুমিয়ে-পড়া মৌমাছির ঝর্ণা

    এই মমি আবার কি মানবী হবে মথুরা বৃন্দাবনে।

    মেহেরকান্দার কবিতা

    আয়নার দাগ


    আয়না হতে পিছলে পড়েছে মুখগুলো

    আজ তোমার মুখের গভীরে দেখি ভেঙে-যাওয়া সেই আয়নার দাগ।

    বিবর্ণ থৈ থৈ

    বিধবার শাদা চোখের মতো চারদিক…

    হে দিন, হে রাত্রি, হে বসন্ত, হেমন্ত মৌসুম

    হে প্রজাপতির ডানা, পাখির পালক, হে বৃন্দাবনের সিঁদুর

    কোথাও কোনো রঙ নেই

    আমাদের মেহদীবাগান কালো কুয়াশার নিচে ঢাকা পড়ে আছে।

    শুনেছি পাথরে মেহদীপাতা ঘষলে রঙের হলাহল বের হয়ে আসে

    আমি আজ হৃৎপিণ্ডকে পাথর বানিয়ে নিয়েছি।


    মৃত্যু, মুনিরাহেনা…


    আজ এই শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ ফেটে গিয়ে

    নীল-বর্ণ আলো ঝরছে

    নরক প্রদেশে।

    নরকের নয় দরজা খুলে বসে আছি আমি আর একটা অন্ধ হরিণী…

    দু’চোখ ছিদ্র করে

    গলিত চোখের রঙে চন্দ্রের পিঠে এঁকে দিয়েছি গাছের ছবি

    এই গাছ স্বর্গের গাছ

    এক একটা শিশু মৃত্যুর পর সেই গাছে একটা করে ফুল ফোটে

    ওহ ঈশ্বর

    সময় হলে কি তুমি দেখে যাবে

    সেই গাছে অনেক অনেক ফুল ফুটেছে

    তুমি কি একবারও শুঁকে যাবে না হাসনাহেনা অথবা মুনিরাহেনার গন্ধ!


    নয় দরজার নদী


    ১.

    তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল নয় বছর আগে

    এই নয় বছরে নয়-দরজার-নদী তৈরি করেছি

    তুমি কি একবার সময় করে আসবে

    জলের জানালাগুলো লাগিয়ে দিয়ে যাবে!

    ২.

    সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ছিপছিপে এক মাতামুহুরী নদী

    নদী পেরিয়ে যাচ্ছে সময়

    হাতের নীলবর্ণ রেখায় এ-কার ছায়া দেখা যায়!

    ছাদের উপর বৃষ্টির গুঞ্জন থামছে না কিছুতেই

    তানপুরার হৃৎপিণ্ডে আঙুল ফেটে গেলে বুঝতে পারি না

    এ-কান্না উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের নাকি মাতামুহুরীর

    ঘরের জানালা কিছুতেই বন্ধ হয় না

    আমাদের জানালায় আটকে রয়েছে নদীর দরজা।

    ৩.

    চাঁদের শরীর থেকে বের হচ্ছে ধূয়া ও শিশির

    দুই হাজার বছর আগেকার রাত ছাই হবে দুই হাজার সতের সালে

    দু’চোখের অন্ধ ছায়া উড়ে যাচ্ছে অন্ধকারে

    পাখিরা নৌকা চালায় বাতাসের নদে

    নিঃশ্বাস ফেটে যাচ্ছে ধীরে

    গাছের

    মানুষের…

    ফাটা-নিঃশ্বাসে তুমি কি একবারও আত্নহত্যা করতে আসবে না!

    ৪.

    বিষ পান করছি নাকি বিষের নিঃশ্বাস নিচ্ছি

    পান করছি পরমায়ু

    প্রজাপতির ডানা লাগিয়ে দিয়েছি

    ধীরে চলো

    ধীরে চলো

    নিমাই সন্ন্যাসীর গ্রাম যে বহু দূর

    ঐ দূরত্বে

    নিভে যাচ্ছে অতলান্ত এক আত্মার ছায়া…

    ৫.

    কে যেন আমার কন্ঠস্বর থেকে

    নিদ্রাতুর কিছু শব্দ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় নিধুয়া পাথারে

    অতঃপর কাচের করাত দিয়ে শব্দগুলো কুচি কুচি করে ভাসিয়ে দেয়

    আড়িয়াল খাঁ’র বুকে

    ভাসে গলাকাটা নদী

    ভাসে নারী

    ভাসে গলাকাটা নক্ষত্র

    শকুনের ডানায় চিৎকার ভাসে জল ও স্থলভূমে…

    মৃত্যুর গন্ধ চৌদিকে

    দূরে যাই

    দূরে যাই

    পৃথিবীর কোনো এক রান্নাঘরে আলু-পটল কাটতে ভুলে যাই

    আমি আমাকে কেটে ফেলতে ভুল করি না

    ওহ পাখি, পরমাত্মা…

    আট দরজার আগুন

    সবুজ-সন্ত্রাসের অধিকার আপন করেছো

    নিজের মতো করে

    নিজের ভেতরে...

    রক্তের পাশে ঝলসানো হৃৎপিণ্ড

    এলোমেলো চাঁদের মাংস আর

    আগুন-লাগা রক্তজবার যৌবন বাড়িয়ে দিয়েছো বহুবর্ষ।

    কে তুমি মহাকাল, ২০১৭...

    বঙ্গোপসাগর ছুঁয়ে-যাওয়া নিম্নচাপ আজ বড়োই প্রবল...

    কেনো এক বসন্তদিনে শুনেছিলাম, রাজপুত্র আসবে ঘোড়া-টানা-গাড়িতে করে...

    সেই রাজপুত্র কোনোদিন আসে নি

    প্রিয় রাক্ষস এসেছে, যার জন্ম হয়েছে আমার করোটী থেকে

    দিনান্তে

    এ-যে কবিতা এক, চম্পাবতী নদীতীরে কেশর উড়িয়ে দেওয়া

    বোবার না-বলা কথাগুলো টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসা, তারপর

    পাখিদের ঠোঁটে তুলে দেওয়া…

    হায়!

    .

    শব্দ বদল হতে হতে পাখির সঙ্গে পাখা বদল করে কবিতা…

    .

    নদীতীরে বটগাছের গর্তে কাঁচা-পাকা সময় বেড়ে উঠছে ধীরে

    দুলছে শীর্ণ তরুলতা, সাপের বাচ্চা

    .

    দিনান্তে পাখি উড়ে যায়

    নদীতীরে পড়ে থাকে মানুষের পালক। দিনান্তে

    এ-যে কবিতা এক, চম্পাবতী নদীতীরে কেশর উড়িয়ে দেওয়া

    বোবার না-বলা কথাগুলো টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসা, তারপর

    পাখিদের ঠোঁটে তুলে দেওয়া…

    হায়!

    .

    শব্দ বদল হতে হতে পাখির সঙ্গে পাখা বদল করে কবিতা…

    .

    নদীতীরে বটগাছের গর্তে কাঁচা-পাকা সময় বেড়ে উঠছে ধীরে

    দুলছে শীর্ণ তরুলতা, সাপের বাচ্চা

    .

    দিনান্তে পাখি উড়ে যায়

    নদীতীরে পড়ে থাকে মানুষের পালক।

     

    মেহেকনন্দা নদীতীরে

    এক.

    আত্মহারা আমি— বেঁচে থাকবো নাকি মরে যাব

    কে ডাকছে আমায়! তুমি না স্বয়ং ঈশ্বর!

     

    পিয়ানোবাদক মঞ্চে এসে বসলেন। একটু কায়দা করে কাশলেন। এরপর একমুহূর্তের জন্য ধ্যানমগ্ন হলেন। ঘর আলো করা উজ্জ্বল ঝাড়বাতিটি একসময় ম্লান হয়ে একটা নরম আলোয় এসে থামে। আর স্তব্ধতার মধ্য থেকে জেগে ওঠে একটি সুরধ্বনি, ক্রমে যা সংযত ও পরিমিত বিস্তারের সঙ্গে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে।

     

    ‘মোৎসার্ট কি?’ ভাবি। যথারীতি প্রোগ্রামটা চাইতে ভুলে গেছি। ‘মোৎসার্ট বোধহয়, নাকি স্কারলাট্টি?" গানের ব্যাপার এত কম জানি! অবশ্য এমন নয় যে, গান বুঝি না বা ভালোবাসি না। শৈশবে পিয়ানো শেখার আবদার তো আমি-ই করেছিলাম। যে বছর শিখতে শুরু করেছিলাম সে বছরই ছেড়ে দিলাম। ছেড়ে দেবার কারণটি যেমন সোজা, তেমনি লজ্জারও।

     

    কিছুতেই স্বরগ্রামের ‘মা’ ধ্বনিটি শিখে উঠতে পারিনি। কিছুতেই না। বুঝি না ‘মা’ এর পর কেন আর কিছুই মনে থাকে না। এই দেখে মা এর কী রাগ! না জানি কতটা কষ্ট পেয়েছেন! মেয়েটা অপদার্থ! তাই অপদার্থ হিসেবে দেখাই তার সহজ মনে হয়েছিল।

     

    আমি আর কষ্ট করতে পারি না। কোনো লাভ নেই। থাকগে ও নিজের মতো পড়াশোনা না করলে নাই করুক। ওর যদি ভূতের গল্প শুনতেই ভালো লাগে, তাই সই। ষোলো বছরেও যদি পুতুল খেলতে চায়, খেলুক ও পুতুল নিয়ে।

     

    না হলো পুতুল খেলা, না হলো পড়াশোনা। মূর্খ হওয়ার কী আনন্দ!

     

    দুই.

    আজ আমার কোনো কর্ম নেই

    মেহেকানন্দা নদীতীরে কেবলই রোপণ করছি বৃষ্টি ও কৃষ্ণদাগ...

     

    হঠাৎ শরীরটা কোনো একটা বিন্দুতে আটকে গেলে সে পেছন ফিরে তার পা দুটো ধরে দাঁত কামড়ে শক্ত মাটির ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে ঢালু জমিন ধরে চলতে লাগলো। টেনে নেয়া শরীরের মাথাখানি এদিক-ওদিক দুলছিল, যেন সে অবস্থান পাল্টানোর জন্য আনন্দ প্রকাশ করছে। হঠাৎ বাঁক নেয়া একখানা গাড়ির আলোর ঝলক আবর্জনা, ঝোপ আর আসমান ভূমির ওপর পড়ে চারপাশ উজালা করে তুললো। লোকটি তখন চট করে শুয়ে পড়ে অপরজনের পাশে। এক মুহূর্তের জন্য দুটো মুখের বৈশিষ্ট্য যেন আঁকা হয়ে রইলো, একটি ভয়ে নীলবর্ণ, অপরটি ধুলোয় ভরা, অনুভূতিহীন। আবার অন্ধকার গ্রাস করে নেয় দুজনকে। লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে আরও কিছুদূর টেনে নিয়ে গেল বোঝা, পথ রোধ করে দাঁড়ানো উঁচু ঝোপগুলো পর্যন্ত। তারপর আবর্জনা আর শুকনো ডালপাতা দিয়ে ঢেকে দিলো। যেন সে ভাগাড়ের দুর্গন্ধ আর আসন্ন বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে চাইছে। অতঃপর একটু থেমে কপালের ঘাম মুছে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে শব্দ করে থুথু ফেলে। এমন সময় শিশুর কান্নার শব্দে সে চমকে ওঠে। আবর্জনার মধ্য থেকে উঠে আসা ক্ষীণ চাপা কান্না, যেন তার নিচে চাপা পড়া মানুষটিই শিশুর রূপ ধরে কেঁদে উঠে অভিযোগ জানাচ্ছে।

     

    সে পালাতে গিয়েও থেমে যায়। বিজলি চমকানোর আলোয় অন্ধকারে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো পুলের লোহার মাস্তুল; আর সে হতচকিত হয়ে দেখতে পেল, কী সামান্য পথই না পার হয়েছে। পরাজয়ের গ্লানিতে তার মাথা নত হয়ে আসে। সে হাঁটু গেড়ে বসে গন্ধ শুঁকে শুঁকে সেই একঘেয়ে ক্ষীণ কান্নার উৎসের দিকে এগিয়ে চলে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে এক দলা শাদা বস্তু। হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে সে কিছুক্ষণ। তারপর চলে যাবার জন্য ইতস্তত কয়েক পা এগিয়েও বেশিদূর যেতে পারলো না। কান্নার শব্দ তাকে পেছনে টেনে ধরে রাখলো। সে একটু একটু করে আবার ফিরে এলো, ঘন ঘন শ্বাস পড়তে থাকলো তার। আরেকবার হাঁটু গেড়ে বসলো সে, তখনো দ্বিধান্বিত। তারপর দু`হাত বাড়িয়ে দিলো। সেই শাদা পিণ্ডের মোড়কটি নড়েচড়ে ওঠে। সেখানে ছোট্ট এক মানবশিশু কতগুলো খবরের কাগজের পাতার মধ্যে যুদ্ধ করছে। লোকটি তাকে কোলে তুলে নেয়। তার ভাবভঙ্গি অনিশ্চিত, অনেকটা যেন প্রবৃত্তি তাড়িতের মতো, যেন সে কী করছে নিজেই জানে না, অথচ না করেও পারছে না। সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। যেন তার এই আচমকা অপ্রত্যাশিত কোমল ভাবাবেগের জন্য নিজের ওপর বিরক্ত সে; তারপর নিজের অজ্ঞাতেই গায়ের জ্যাকেট খুলে সেই জলে ভেজা কান্নারত শিশুটির গায়ে জড়িয়ে দেয় এবং হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দিয়ে অনেকটা দৌড়োনোর ভঙ্গিতে সে ওই কান্নাকে সঙ্গে নিয়ে ভাগাড় থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

     

    অস্তিত্ব বিলীন হলো

    অন্য কোনো সঙ্গ বা অনুষঙ্গে নয়

    আমরা এক সঙ্গেই মারা যাব...

     

    তিন.

    কৃষ্ণদাগ ঘন হচ্ছে

    খা খা করছে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া দুটি আবছা ছায়ামূর্তি

    মুখ দেখা যাচ্ছিল তো দেখা যাচ্ছিল না...

    একই রকম অথচ কত আলাদা

    একটি শরীর নিষ্ক্রিয়, নির্দোষ, নিস্পৃহা আর চরম উদাসীনতা নিয়ে চলছে মাটির ওপর দিয়ে...

    অন্যটি সামান্য ঝুঁকে তাকে আবর্জনা আর ঝোপঝাড়ের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে চলার কষ্টে হাঁপাচ্ছে। মাঝে-মধ্যে থেমে দম নেবার চেষ্টা

    তারপর আরো ঝুঁকে টেনে চলে বোঝাখানি।

    হাজামজা নালার পচা জলের গন্ধে চারদিক ক্রমে আরো দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে ভাগাড়ের মরচে ধরা জঞ্জাল আর মৃত প্রাণীর গলিত মাংসের বদবুতে, বাজে আবহাওয়ার দিনের মতো এই পচা থিকথিকে গন্ধই যেন ঝেড়ে ফেলতে চাইছে থেকে থেকে মুখ মোছার ভঙ্গি করে। ঘন ঝোপের গায়ে জড়াজড়ি করে পড়ে থাকা রুপালি ইস্পাত কিংবা কাঁচের টুকরোর ঘষা লেগে উদ্ভুত একঘেয়ে ভুতুড়ে সংগীত দুজনের কারোরই কানে যাবার কথা নয়। মাটির নিচ থেকে ভেসে ওঠা নগরের চাপা গুঞ্জনের শব্দও নয়। এমনকি যাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই নরম শরীরের সঙ্গে মাটি, ঝরাপাতা, কাগজের টুকরো, ছেঁড়া জুতো, দোমড়ানো টিনের প্যাটরা ও নুড়ি পাথরের ঘষটানোর শব্দও নয়। মাঝে মাঝে কোনো উঁচু পাথর কিংবা গাছের ডালে তার কাঁধ ঠেকে যাচ্ছিল। সে এখন গা ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছিলো, মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল ক্রুদ্ধ আওয়াজ, অনেকটা বিশাল বোঝা বয়ে নিয়ে যাওয়া মুটেদের মুখ নিঃসৃত বায়বীয় ‘হাঁ’ ধ্বনির মতো। বোঝাখানি নির্ঘাৎ ভারি উঠছিল ক্রমশ। তবে শুধু নীরব প্রতিরোধই নয়, যতশীঘ্রি সম্ভৱ কার্যোদ্ধারের তাড়াতে সমস্ত শক্তি যে ক্ষয়ে যাচ্ছে সেটাও ভীত করে তুলছিল।

     

    প্রথমে সে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলছিল। রাত্রি এতটা মেঘে ঢাকা না থাকলে কারোও চোখে পড়তো কোনো উদ্ধারকার্যের ওল্টানো নেগেটিভের মতো দু`জোড়া হাতের যুগল বন্দি। কৃষ্ণদাগ ঘন হচ্ছে করুণ কান্না ও কীর্তনের সুর...

     

    আজ কোনো কর্ম নেই

    মেহেকানন্দা নদীতীরে কেবলই রোপণ করছি বৃষ্টি ও কৃষ্ণদাগ…


    ছায়াচিত্র

    ১.

    দূর শৈশবে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে

    কাচের টুকরো কুড়িয়ে পেয়েছিলাম

    কাচের ভেতরে নিজের চেহারা লুকিয়ে রেখেছিলাম।

     

    নিজের চেহারা লুকিয়ে রেখেছিলাম বাবা-মা, ঠাকুর মা, চন্দ্র-সূর্য্য হতে বহুদূর

    দূরতম কোনো গ্রহের গভীরে...

     

    তিরিশটি বছর ঘুমঘোরে ছিলাম

     

    ঘুম-ভেঙ্গে দেখি-

    আমি সেই কাচের টুকরো হারিয়ে ফেলেছি

    আমি আপন চেহারা হারিয়ে ফেলেছি।


    ২.

    ফ্লাক্সের মধ্যে তরল চা-বাগান লুকিয়ে রেখেছিলাম

    এখন আফিমের গন্ধ পাচ্ছি; পান করছি পরমায়ু...

     

    বারান্দার মাথায় রঙিন কাচের স্কাইলাইট

    ছায়াচিত্রটি ক্রমে মুছে যায়

    টবে-ঝোলানো বারান্দা স্থায়ী হয়ে যায় ধূসর দেয়ালে দেয়ালে

    ঘরের মধ্যভাগ ছিদ্র করে এক বাটি আলো স্থির পড়ে থাকে মেঝেতে।

    বেতের চেয়ারে তুমি বসে আছো, স্বর্গ পলাতক

    বাদামি চুলে যেনো পুরনো এক ফটোগ্রাফের পূর্ণিমা, পরিষ্কার হাওয়ার কোলাহল...

    আর আমি হতে চাই সেইজন

    যে তোমার অভিনয় আর গলার স্বরের ওপারে যেতে পারে।

    কীর্তন

    ১

    মুনিরায়ানা কীর্তনীয়া সুরে

    বাজে বাঁশি, করুণ বাঁশের বাঁশি, বাজে হাড়ের বাঁশি...

    আয় তবে হাড় ভেঙ্গে ফেলি, নদীর দুই পাড় ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়।

    .

    বাঁশির রসে এমন পূর্নিমাসুন্দরী ভাসে

    ঘৃতকুমারীর বনে

    .

     

    সখা হে

    আয়, মাঝ দরিয়ায় ভাঙ্গা তক্তা ও আমাদের কলিজার নৌকা ডুবিয়ে ফেলি

    চিরতরে

    চিরতরে।

    ‘

    অহ সুর!

    মুনিরায়ানা কীর্তনীয়া সুরে

    মৃত্যু ও প্রেম একাকী দাঁড়িয়ে রয়

    পৃথিবীর অনন্ত ভোরে।

    ২

    নয়নে আনন্দ-বিষাদ, মরা নদীর জল...

    ওহে মধুমূর্তি

    নয়নের গভীরে বসো একবার

    বসো কাঙ্গালের সভায়

    .

    আসিবে, আশায় হৃদি-পদ্মাসন পাতিয়া রাখিয়াছি

    ধোয়াবো চরণ নয়নের জলে...এমন তো নয়

    .

    মুনিরাকথা

    ঈশ্বর হও

    তুমি কবি হও

    পৃথিবীর যত গান, এইসব কবিতাবলী

    গীত হোক, গীত হোক মৃতের সন্মানে…

    মুনিরাকথা

    বৃষ্টির সাথে কোনো এক নাইওরি এসেছিলো মেঘে-ঢাকা গ্রামের ঐপার থেকে

    ভেজা চুলের বন্ধন খুলে বসেছিলো

    আমার বারান্দায়...

    উপরের দিকে তাকিয়ে বললো

    সিন্দু মা, আকাশের গর্তগুলো ঝরে পড়ছে কেনো, খসে পড়ছে কেন নরম নাভীগুলো

    আমি তবে কোথায় গিয়ে থাকবো!

    তারপর সে নিমিষে নাই হয়ে যায়

    দিন যায়

    বছর যায়

    নাইওরি আর আসে না...

    আর আমার বুকের বারান্দায়

    চিরদিনের জন্য লেগে থাকে নাইওরির গন্ধ, মৃত্যুর মতো...

    ২.

    আয়না হতে পিছলে পড়েছে মুখগুলো

    আজ তোমার মুখের গভীরে দেখি ভেঙে যাওয়া সেই আয়নার দাগ।

    বিবর্ণ থৈ থৈ

    বিধবার শাদা থানের মতো চারদিক...

    হে দিন, হে রাত্রি, হে বসন্ত, হেমন্ত মৌসুম

    হে প্রজাপতির ডানা, পাখির পালক, হে বৃন্দাবনের সিঁদুর

    কোথাও কোনো রঙ নেই

    আমাদের মেহদীবাগান কালো কুয়াশার নীচে ঢাকা পড়ে আছে-

    শুনেছি পাথরে মেহদীপাতা ঘষলে রঙের হলাহল বের হয়ে আসে

    আমি আজ হৃৎপিণ্ডকে পাথর বানিয়ে নিয়েছি।

    ৩.

    কালো জ্বরে মৃত্যু হবে না হে পুত্র!

    আমার মৃত্যু হবে বেঁচে থাকাতে…

    নাইওরি

    বৃষ্টির সাথে কোনো এক নাইওরি এসেছিল মেঘে-ঢাকা গ্রামের ঐ পাড় থেকে

    ভেজাচুলের বন্ধন খুলে বসেছিল

    আমার বারান্দায়…

    উপরের দিকে তাকিয়ে বললো

    সিন্ধু মা, আকাশের গর্তগুলো ঝরে পরছে কেন, খসে পড়ছে কেন নরম নাভীগুলো

    আমি তবে কোথায় গিয়ে থাকবো!

    তারপর সে নিমিষে নাই হয়ে যায়

    দিন যায়

    বছর যায়

    নাইওরি আর আসে না…

    আর আমার বুকের বারান্দায়

    চিরদিনের জন্য লেগে থাকে নাইওরির গন্ধ, মৃত্যুর মতো…

    পাখি-পল্লি

    এবার সত্যি সত্যি বিদ্যুৎ চমকায়

    খাঁচা থেকে পাখিগুলো বেরিয়ে আসে

    বিদ্যুতের ছিদ্রে পাখিগুলো ঘুমিয়ে পড়ে আবার জেগে ওঠে।

    ক্রমে পালক ঝরছে, পাতা ঝরছে, শিশির ঝরছে…

    কতিপয় মানুষ পাখিদের শরীরে প্লাস্টিকের পালক লাগিয়ে দিয়ে যায়

    পৃথিবীতে আবার ঝড় আসে

    আর প্রতিটি ঝড়ের শেষে ভোর বেলা দেখি

    ধর্ম বিদ্যালয়ের আলখাল্লা পরা সেই ছাত্রদের মতো

    পাখিগুলো আমার উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

    ভবানীপুরের কবিতা

    রক্তের ভেতর একটা নদী থেকে আরও একটা নদী

    বিস্মৃতির ভবানীপুরে বৃষ্টি দিচ্ছে…

    বৃষ্টি দিচ্ছে

    বৃষ্টি দিচ্ছে

    চোখ-ফাটা বৃষ্টির কান্না কোলে নিয়ে বসে আছি

    আমার সিতানের বালিশের টুকরোগুলো এলোমেলো

    ঘুম আসে…

    ঘুম দাঁড়াতে পারে না কোথাও

    ঘুম দৌড়াতে পারে না কোথাও

    ঘুম বসতে পারে না কোথাও

    ঘুম ঘুমুতে পারে না কোথাও

    অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে এলোমেলো আয়নার মুখ

    মেহেকানন্দা কাব্য

    ১.

    পুরনো বইয়ের পাতা উল্টে চোখে পড়লো

    মমি হয়ে আছে কয়েকটা মাছি ও অচিন বৃক্ষের পাতা...

    মমি হয়ে আছে পাতার স্পন্দন আর মাছির উড়াল

    সাঁতার কাটি

    নয়'শ বছরের পুরনো সমুদ্রে একা...

    এ-কোন বিস্মৃতির জল কেবল ফেটে ফেটে যায়

    এ-কোন কাহিনী গাঁথা- শবযাত্রী, সানাই আর ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ

    স্বর্গের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে

    চুম্বন শেষে কেন তারা ঠোঁটগুলো ছুঁড়ে দিলো নরকের দিকে!

    দু'চোখ ঝাপসা হয়ে আসে

    দু'চোখে জন্ম নেয় অজস্র রক্তের ডালপালা...

    মেহেকানন্দা নদীতীরে অহ ঈশ্বর

    কোনো এক কুয়াশাভোরে তুমি কি রক্তডুমুরের ডালগুলো কেটে দেবে!

    ২.

    কে যেন রাস্তার পাশে মলিন চাঁদটাকে রেখে গেছে

    চাঁদের গায়ে হোচট খেলাম

    শুধু পা নয়, সমস্থ "আমি" ভেঙ্গে গেলে চাঁদের শরীর থেকে চাঁদনী ও আগুন বের হয়...

    জন্ম হয় দাউ দাউ চিতার...

    মহাআনন্দে পুড়তে থাকি পৃথিবীর প্রথম মানুষ

    ওহে শ্রীমতি. ঠাকুর মা আমার

    আমিও চিতা জ্বালানোর কৌশল শিখে গেছি।

    ৩.

    আয়না হতে পিছলে পড়েছে মুখগুলো

    আজ তোমার মুখের গভীরে দেখি ভেঙ্গে-যাওয়া সেই আয়নার দাগ।

    বিবর্ণ থৈ থৈ

    বিধবার শাদা থানের মতো চারদিক...

    হে দিন, হে রাত্রি, হে বসন্ত, হেমন্ত মৌসুম

    হে প্রজাপতির ডানা, পাখির পালক, হে বৃন্দাবনের সিঁদুর

    কোথাও কোনো রঙ নেই

    আমাদের মেহদীবাগান কালো কুয়াশার নীচে ঢাকা পড়ে আছে।

    শুনেছি পাথরে মেহদীপাতা ঘষলে রঙের হলাহল বের হয়ে আসে

    আমি আজ হৃৎপিণ্ডকে পাথর বানিয়ে নিয়েছি।

    ৪.

    আজ এই শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ ফেটে গিয়ে

    নীল-বর্ণ আলো ঝরছে

    নরক প্রদেশে।

    নরকের নয় দরজা খুলে বসে আছি আমি আর একটা অন্ধ হরিণী...

    দু'চোখ ছিদ্র করে

    গলিত চোখের রঙে চন্দ্রের পিঠে এঁকে দিয়েছি গাছের ছবি

    এই গাছ স্বর্গের গাছ

    এক একটা শিশু মৃত্যুর পর সেই গাছে একটা করে ফুল ফোটে

    ওহ ইশ্বর

    সময় হলে কি তুমি দেখে যাবে

    সেই গাছে অনেক অনেক ফুল ফুটেছে

    তুমি কি একবারও শুঁকে যাবে না হাস্নাহেনা অথবা মুনিরাহেনার গন্ধ!

    ৫.

    চাঁদের শরীর থেকে বের হচ্ছে ধূয়া ও শিশির

    দুই হাজার বছর আগেকার রাত ছাই হবে দুই হাজার পনেরো সালে

    দু'চোখের অন্ধ ছায়া উড়ে যাচ্ছে অন্ধকারে

    পাখিরা নৌকা চালায় বাতাসের নদে

    নিঃশ্বাস ফেটে যাচ্ছে ধীরে গাছের, মানুষের

    ফাটা-নিঃশ্বাসে তুমি কি একবারও আত্মহত্যা করতে আসবে না!

    ৬.

    সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ছিপছিপে এক মাতামুহুরী নদী

    নদী পেরিয়ে যাচ্ছে সময়

    হাতের নীলবর্ণ রেখায় এ-কার ছায়া দেখা যায়!

    ছাদের উপর বৃষ্টির গুঞ্জণ থামছে না কিছুতেই

    তানপুরার হৃৎপিণ্ডে আঙুল ফেটে গেলে বুজতে পারি না

    এ-কান্না উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে নাকি মাতামুহুরীর

    ঘরের জানালা কিছুতেই বন্ধ হয় না

    আমাদের জানালায় আটকে রয়েছে নদীর দরজা।

  • বাসব রায় | ৩০ আগস্ট ২০২১ ১২:৫১734915
  • বাসব রায় : মলয়ের জায়গা

     

    এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আত্মীয়-পরিজনের বাইরে আমি যাঁর নাম প্রথম শুনেছি, তিনি, মলয় রায়চৌধুরী। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ নন, মলয় রায়চৌধুরী। আমি যখন বড় হচ্ছি, ওই ১৯৬৬ থেকে, চারপাশে শুধু একজনের কথাই চর্চিত, তিনি, মলয় রায়চৌধুরী। ১৯৬৪ সালে মলয় নেমে আসছেন ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সিঁড়ি দিয়ে, একা। আর ধীরে ধীরে তিনি চর্চায় চলে আসছেন কলকাতা সন্নিহিত অঞ্চলের। তখন বেহালা, যেখানে আমার ছোটবেলা কেটেছে, কলকাতার মধ্যে ছিল না। বেহালার সাবর্ণপাড়ার দ্বাদশ মন্দিরের চাতালে কিংবা শখেরবাজার মোড়ের আড্ডায় শুধুই মলয়।

    তো আমি মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে বড় হয়েছি বললে সম্ভবত অত্যুক্তি হয় না। ইস্কুলে যাই, সেখানে শিক্ষকরা আলোচনা করেন মলয়কে নিয়ে ; ঘরে ফিরি, দাদা-কাকারা আলোচনা করেন মলয়কে নিয়ে ; একটু সন্ধ্যায় পাড়ার কালভার্টেও আলোচনার একটাই বিষয় - মলয়।

    মলয়-বাসুদেব-ফাল্গুনী-শৈলেশ্বর-সুবো-সুবিমল-দেবী-অবনী-প্রদীপ প্রমুখ তখন আমাদের ঘরের ছেলে। তাঁদের লেখা যেখান থেকে হোক সংগ্রহ করে পড়ছেন বয়োজ্যেষ্ঠরা। এই আবহে আমি বড় হয়েছি। আর তাই মূলধারার সাহিত্যের প্রতি কখনো আগ্রহ বোধ করিনি। ১৪-১৫ বছরের মধ্যেই আমি পড়ে নিয়েছি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ বা ‘চর্মরোগ’। এবং সেখান থেকেই এই প্রতীতী সম্ভবত জন্মে যায় যে সাহিত্য বলতে এসবই, বাস্তবতা-জীবন-অন্ত্যজ-প্রান্তিক স্বর ছাড়া সাহিত্য হয় না।

    এর বেশ কিছু পড়ে যখন আনন্দবাজারীয় লেখালিখি পড়তে গেছি, হাসি পেয়েছে। বাজারি আনন্দের প্রকাশিত সাহিত্য ওই সুখী মধ্যবিত্তের জন্য। সেখানে একটা কৃত্রিম ভাষা, নাটকীয় কিছু শব্দের সমাহার। সেখানে জীবন, অন্তত আমি, কখনো খুঁজে পাইনি। অথচ শিক্ষিত বাঙালি ওইসব পড়েই নিজেকে এলেমদার, পণ্ডিত মনে করেছে, করে।

    আর ঠিক এখানেই মলয় ধাক্কা মারেন। বাংলা গদ্যের রীতি ঠিক কী হবে তা সম্ভবত ঠিক হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, যে লিখলে ওই জোব্বা পরা বুড়োর মতোই লিখতে হবে। এবং এরপর যাঁরা লিখতে এসেছেন, যেমন শরৎ-তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-শরদিন্দু থেকে হালের সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশরা, কেউ ওই গদ্যের বাইরে যেতে পারেননি। বিষয় যাঁর যেমনই হোক, গদ্যের রীতি বা ভাষার আঙ্গিক ও প্রকরণ সেই রাবিন্দ্রিক। এবং বাজার বা বাংলা সাহিত্যের কলকাত্তাইয়া প্রতিষ্ঠান এই গদ্যকেই প্রমোট করেছে। পাঠকও খুশি থেকেছেন এই গদ্য পড়ে। এর বাইরে না লেখক না পাঠক কেউই ভাবতে পারেননি।

    মলয় রায়চৌধুরী ঠিক এই জায়গাটাকেই ধাক্কা দিয়েছিলেন। তাঁর বহুচর্চিত কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ থেকে হালের ‘ছোটলোকের ছেলেবেলা’ লেখাতেও ওই ধাক্কা স্পষ্ট। লেখালিখিতে বাস্তবতা-জীবন যেমন মলয় রায়চৌধুরী প্রথম বাংলা সাহিত্যে এনেছেন, ঠিক তেমনই গদ্যের ভাঙচুর তাঁর লেখাতেই আমরা প্রথম দেখতে পেয়েছি। আর এজন্যই প্রতিষ্ঠান তাঁকে ব্রাত্য করে রেখেছিল, হয়তো-বা এখনও করেই রেখেছে।

    মলয়ের প্রথম প্রকাশিত বই সম্ভবত ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’। সেখানে মলয় কী লিখেছেন তা এখানে আলোচ্য নয়। বলার কথা হল, মলয় হাফ লিটারেট সাহিত্যিক নন, পড়াশোনা করেই লিখতে এসেছিলেন। আর সেজন্য মলয়ের লেখালিখি যতটা না আবেগের তার চেয়ে অনেক বেশি মেধাজারিত। কোনো এক সাক্ষাৎকারে মলয় জানিয়েছেন যে বৈদ্যুতিক ছুতার লিখতে লেগেছিল তিন মাস। কেন? না, প্রতিটি শব্দ অনেক চিন্তা করে বসাতে হয়েছে।

    তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম

    এই লাইন মলয়কে লিখতে হয়েছে, বাংলাভাষাকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য। আর কে না জানে ‘ভাষাকে যে আক্রমণ করে সে-ই ভাষাকে বাঁচায়।’ মিথ্যে না বলতে কী, রক্তরস কমে যাওয়া বাংলাভাষাকে ওই মলয় রায়চৌধুরীই প্রথম আক্রমণ করেন। তাঁর সেই শক্তি ছিল বলেই প্রতিষ্ঠান তাঁকে উঠোনে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। বরং মলয়দের শক্তি পাঠক-সহ-প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে নিতে পারে ভেবেই তাঁরা সম্মিলিত আক্রমণের সামনে পড়েন। যার ফলশ্রুতি কিছু বই নিষিদ্ধ, মামলা, মলয় দোষী সাব্যস্ত এবং তারপর ১৯৬৭ সালে মামলায় জয়।

    এর ফলে মলয়ের কী হয়েছে সে বিচার অন্যরা করবেন, বাংলাভাষার যে বিপুল ক্ষতি হয়ে গেল তা অনস্বীকার্য। কেননা মলয় তো বটেই, ইদানীং অজিত রায়-রবীন্দ্র গুহ-রণবীর পুরকায়স্থরা তুলে আনছেন যে নিচুতলার সংস্কৃতি, জীবনযাপনের শৈলী, আচার-আচরণ, ক্রোধ-আনন্দ, প্রেম-ভালোবাসা... অসম্ভব দরকারি ছিল বাংলা সাহিত্যে। এগুলো বাদ দিয়ে সাহিত্য যেন একেবারে ম্যাড়ম্যাড়ে। মলয় রায়চৌধুরী প্রথম এই ভাবনা এনেছিলেন বাংলা সাহিত্যে। কী? না, নিজেকে সাংস্কৃতিক জারজ ঘোষণা করে সরাসরি বলেছিলেন, অন্ত্যজ-প্রান্তিক স্বর উঠে আসা উচিত সাহিত্যে। এবং তা হবে সরাসরি। সেখানে কোনো ফাঁকি থাকবে না। আর তাই, মলয় রায়চৌধুরীর, ঠিক এই জায়গায় কাল্ট ফিগারের সম্মান প্রাপ্য।

    মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, ভবিষ্যতেও লিখবেন, মলয় হলেন বাংলা সাহিত্যের জায়মান কিংবদন্তি, যাঁকে আনগ্ন শুষে নিলেও শেষ হয় না। কবি-প্রাবন্ধিক-উপন্যাসকার যেভাবেই তাঁকে অভিহিত করা হোক না কেন, কোনোটাই মলয় সম্পর্কে শেষ কথা নয়।

    আর তাই একটা লেখায় সমগ্র মলয় রায়চৌধুরীকে ধরা আমি তো আমি, শিবের বাপেরও অসাধ্য কাজ! আর তাই আমি অন্য দু-একটি কথা বলি।

    মলয়ের উদ্যোগে হাংরি আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সকলে একে অচ্ছু্ৎ ঘোষণা করেছিলেন। আজ হাংরি আন্দোলনকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী আন্দোলনের মর্যাদা পাচ্ছে। আর তাই বিখ্যাতরা যেভাবেই হোক হাংরির ঝোল নিজের কোলে টানতে ব্যস্ত।

    শৈলেশ্বর ঘোষ হাংরি-মামলার পর মুচলেকা দিয়েছিলেন, সবাই জানেন। পরে তিনিই হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে কলার তুলে হাঁটতে শুরু করেন, আমি দেখেছি।

    আপাত-ঋষি শঙ্খ ঘোষ এমনভাবে এতদিন লেখালিখি করেছেন যে হাংরি শব্দটাই শোনেননি বা শুনলে তাঁর হার্টফেল হবে। তো তিনি সম্প্রতি একটি হাংরি সংকলনে নিজের কবিতা রেখে যার-পর-নেই আহ্লাদিত। সৌজন্য শৈলেশ্বর ঘোষ।

    সাহিত্যিক-সততায় মলয় রায়চৌধুরীর পক্ষে আদালতে কথা বলে অনেকটা আলো পেয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তো তিনিই আমাকে রেকর্ডেড ইন্টারভিউতে বললেন ২০০৬ সালে যে ‘হাংরি আন্দোলনের জন্য মলয় ঠিক আমার আমেরিকা-বাসের সময়টাই বেছে নিয়েছিল।’ তো তাতে কী হল? সুনীল, ‘আমি থাকলে ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই আমার হাতে থাকত।’ এখান থেকে বোঝা যায়, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যেভাবেই হোক নাম জড়ানোর কী আকুল প্রচেষ্টা সুনীলের! ছো...

    আর এই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ই কৃত্তিবাস-এ মলয়ের কবিতা ছাপাননি। সাহিত্যিক সততা আর কাকে বলে!

    যে কোনো আন্দোলনের একটা প্রকরণ আছে। আছে একটা স্ফুলিঙ্গ। আন্দোলনকে যত দমিয়ে রাখা হয় ততই আন্দোলনের অন্তঃশক্তি বাড়ে। আর সেটা হাংরি মুভমেন্টের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। আজও যখন কেউ ‘ছোটলোক’-এর সংস্কৃতি তুলে আনেন কবিতায়-গদ্যে, আমরা বলি বাঃ তুই তো হাংরিদের মতো লিখছিস।

    এবং সত্তরের অরুণেশ, আটের অজিত রায়, নয়ের রাজা সরকার, শূন্য দশকের বিকাশ সরকার, প্রথম দশকের তিস্তা রায়, কিংবা বেশ আগের রবীন্দ্র গুহ, নবারুণ ভট্টাচার্য (যদিও কৃত্রিম ভাষা), দেবীপ্রসাদ সিংহ, সমরজিৎ সিংহ (গদ্য), আফসার আহমেদ, দুলাল ঘোষ, অলোক গোস্বামী, এমনকি স্বপ্নময় চক্রবর্তীও ; হালের কান্তারভূষণ নন্দী, মৃণাল দেবনাথ, ধীরাজ চক্রবর্তীরাও জেনে বা না-জেনে সেই হাংরিদের লিগ্যাসি হয়ে উঠেছেন। এঁরা ভেঙে ফেলেছেন মূলধারার বাংলা সাহিত্যের যাবতীয় ফর্ম, তাঁদের লেখায় উঠে আসছে অন্ত্যজ জীবনযাপন, প্রেম-ক্রোধ-দুঃখ-আনন্দের কথা। এখানেই মলয় রায়চৌধুরী অমর হয়ে যান।

  • একজন ডাইনি | ১৮ অক্টোবর ২০২১ ১৯:২১735048
  • কে, মলয় রায়চৌধুরী ? আর বলবেন না ! লোকে ওনার সম্পর্কে নানা কথা বলে ! নিজেই পড়ে দেখুন :

     

    ১. ( সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমিতাভ ঘোষাল - ‘গদ্য-পদ্য সংবাদ’ পত্রিকায় ১৯৮৬ অক্টোবরে প্রকাশিত :-

    সুমিতাভ : ষাটের দশকের হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ কতোটা ?

    সুনীল : হাংরি আন্দোলনে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। আমি তখন কৃত্তিবাস নামে একটা পত্রিকার সম্পাদনা করতুম। কৃত্তিবাসের থেকে কয়েকজন এই আন্দোলন শুরু করে। এদের মধ্যে প্রধান ভূমিকা প্রথমে নিয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী, সে ছিল আমার বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর ছোটো ভাই। সমীর রায়চৌধুরী কৃত্তিবাসের একজন লেখক এবং ওই গোষ্ঠীরই একজন। মলয়েরও কিছু কিছু লেখা কৃত্তিবাসে বেরিয়েছিল।

    সুমিতাভ : আচ্ছা শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো... ( কথায় বাধা দিয়ে )

    সুনীল : হ্যাঁ, তারপরে মলয় প্রথমে শুরু করার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাতে যোগ দেয় এবং পরে উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও পরিচিতদের মধ্যে অনেকে আসেন। এইভাবে হাংরি আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু এই আন্দোলনের কোনো ইস্তাহার বা কোনো ব্যাপারে আমার কোনো নাম ছিল না বা আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না।

     

    ২ ( Snehasis Roy : “হাংরির উত্থান ১৯৬২ সাল, মলয় ১৯৬১ সালের যে গল্প ফেঁদেছেন নকল ইস্তেহার বানিয়ে সেন্টুর তোরঙ্গ থেকে নাকি উদ্ধার হয়েছে পরে, এ-সব আসলে গাঁজাখুরি গল্প।

    মলয়ের কবিতা তো হয়ই না, গদ্য, অনুবাদ ও কিছু ভালো প্রবন্ধ লিখেছেন, সমস্যা হল, সুভাষ ও শৈলেশ্বরের ভূত লোকটার পিছু ছাড়ে না। শম্ভু রক্ষিতকে নিয়ে লিখছেন বা অন্য কোনো কবিকে নিয়ে সেখানে হঠাৎ অবান্তরভাবে শৈলেশ্বর, সুভাষকে দায়ি করছেন তাঁর জেল হওয়ার জন্য।(মলয় বোঝাতে চান, ইস্, তোমরা শৈলেশ্বর ঘোষ,সুভাষ ঘোষের লেখা পড়ো, এদের জন্য আমিহাংরিস্রষ্টা, আমার জেল হয়েছে!

    সাহিত্যের জন্য জেল হয়েছে এমন আসামীর লেখা পড়ো তোমরা, মুচলেকা দানকারীদের লেখা কেন পড়বে! আমি বীর, সারা পাড়ার সামনে কোমরে দড়ি দিয়ে আমায় ধরে নিয়ে গেছে, ভ্যাঁ...........এসব বলে পাঠকের সিমপ্যাথি আদায় করার চেষ্টা)

    ভাবটা এমন জেল যেন তাঁর একারই হয়েছিল, অথচ হাংরি সংক্রান্ত লেখালেখির কারণে প্রথম জেলে হয় শৈলেশ্বরের, পরে সুভাষেরও। লোকটা এমন চুতিয়া অরুণেশকে দু-রকম হাতের লেখায় চিঠি লেখে, সুভাষ ঘোষকেও তাই, সুভাষকে চিঠিতে জানায় আমার যারা সমালোচনা করে তাঁদের দেখে নেব। সেসব চিঠি সব আছে আমাদের কাছে। সময় ও জায়গা মতো প্রকাশিতও হবে।

    মলয়ের 'আমি' 'আমি' করার পাশাপাশি বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত হাংরি জেনারেশন আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। তাঁদের মুখপত্র ছিল 'ক্ষুধার্ত' পত্রিকা। মোট সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম তিনটি সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী এবং পরের চারটি সংখ্যা শৈলেশ্বর ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।”

     

    ৩. ( উপরোক্ত Snehasis Roy : “হাংরির উত্থান ১৯৬২ সাল, মলয় ১৯৬১ সালের যে গল্প ফেঁদেছেন নকল ইস্তেহার বানিয়ে সেন্টুর তোরঙ্গ থেকে নাকি উদ্ধার হয়েছে পরে, এ-সব আসলে গাঁজাখুরি গল্প।

    মলয়ের কবিতা তো হয়ই না, গদ্য, অনুবাদ ও কিছু ভালো প্রবন্ধ লিখেছেন, সমস্যা হল, সুভাষ ও শৈলেশ্বরের ভূত লোকটার পিছু ছাড়ে না। শম্ভু রক্ষিতকে নিয়ে লিখছেন বা অন্য কোনো কবিকে নিয়ে সেখানে হঠাৎ অবান্তরভাবে শৈলেশ্বর, সুভাষকে দায়ি করছেন তাঁর জেল হওয়ার জন্য।(মলয় বোঝাতে চান, ইস্, তোমরা শৈলেশ্বর ঘোষ,সুভাষ ঘোষের লেখা পড়ো, এদের জন্য আমিহাংরিস্রষ্টা, আমার জেল হয়েছে!

    সাহিত্যের জন্য জেল হয়েছে এমন আসামীর লেখা পড়ো তোমরা, মুচলেকা দানকারীদের লেখা কেন পড়বে! আমি বীর, সারা পাড়ার সামনে কোমরে দড়ি দিয়ে আমায় ধরে নিয়ে গেছে, ভ্যাঁ...........এসব বলে পাঠকের সিমপ্যাথি আদায় করার চেষ্টা)

    ভাবটা এমন জেল যেন তাঁর একারই হয়েছিল, অথচ হাংরি সংক্রান্ত লেখালেখির কারণে প্রথম জেলে হয় শৈলেশ্বরের, পরে সুভাষেরও। লোকটা এমন চুতিয়া অরুণেশকে দু-রকম হাতের লেখায় চিঠি লেখে, সুভাষ ঘোষকেও তাই, সুভাষকে চিঠিতে জানায় আমার যারা সমালোচনা করে তাঁদের দেখে নেব। সেসব চিঠি সব আছে আমাদের কাছে। সময় ও জায়গা মতো প্রকাশিতও হবে।

    মলয়ের 'আমি' 'আমি' করার পাশাপাশি বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত হাংরি জেনারেশন আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। তাঁদের মুখপত্র ছিল 'ক্ষুধার্ত' পত্রিকা। মোট সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম তিনটি সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী এবং পরের চারটি সংখ্যা শৈলেশ্বর ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। “)

     

    ৪. ( উপরোক্ত Snehasis Roy - “শৈলেশ্বরকে লেখা অরুণেশের প্রায় ৮০টির মতো দীর্ঘ চিঠি( INLAND LETTER CARD) উদ্ধার হল।

    'সৃষ্টিক্ষমতাহীন কুকুরের দল এই ঘেউঘেউ চিরদিনই করে এসেছে'র পাশাপাশি অরুণেশ চাইছেন 'আত্মমগ্ন গর্ভবতীর মতো নিজেকে নিয়ে থাকতে'।

    তাঁর সঙ্গে মিলারের লেখালিখির হাস্যকর তুলনা প্রসঙ্গে অরুণেশের মনে পড়ে যাচ্ছে জীবনানন্দকে ইয়েটস্ এর অনুকারক এমনকি পাশাপাশি রেখে উভয়ের লাইন তুলে মেলানোর প্রাণপণ চেষ্টার কথা!

    আর্থিক সংকট, বেশ্যা ও না-বেশ্যা অসংখ্য সংগমে তিনি কি না-প্রেমিক। না, এসবের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতার সঙ্গে সহবাস করতে চাইছেন।

    দেশ, আনন্দবাজার, আজকাল প্রভৃতি বাজারি কাগজ সম্পর্কে একহাত নিতে ছাড়ছেন না এবং কৃষ্ণ ধর ও অমিতাভ দাশগুপ্তকে হিজড়ে লেখক বলতে রেয়াত করছেন না।

    হাংরি জেনারেশন সাহিত্য, রাজনীতি, কলকাতার সাহিত্য, পাণ্ডুলিপি করে শৈলেশ্বরকে পাঠানো। 'রোবট'(সম্পাদক : জীবতোষ দাশ) নিয়ে ভয়াবহ আবেগ।নিজের কাগজ 'জিরাফ' নিয়ে চিন্তাভাবনা। বাবার অসুখ। চিকিৎসকদের 'মাগী' বলা, টাকাও ধ্বংস করে রোগীও মারে।

    উত্তরবঙ্গের তৎকালীন অন্যান্য পত্রিকার রাজনীতি। এমনকি নাম নিয়ে রাজা সরকারের(সম্পাদক : কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প) ঈর্ষা ও কূটনীতি সত্ত্বেও তাঁকে শোধরানোর চেষ্টা। আরও কত কী কথা বলেছেন চিঠিতে শৈলেশ্বরকে।

    এই চিঠিগুলো নিয়েই একটা সাংঘাতিক বই হয়ে যায়।

    একটা সময়, দীর্ঘ কবিতাযাপন, জৈব আততি ও ঐতিহাসিক দলিল তো বটেই।

    বোমাটা ফেলব নাকি!” ]

     

    ৫. : ( দুই ফরেনারের কথাবার্তা : বেলাল চৌধুরী ও চয়ন খায়রুল হাবিব

    চঃ এটা মজার, কৃত্তিবাসের একটা প্রধান অংশই সুনীলকে না জানিয়ে হাংরি আন্দোলনে জোগ দিয়েছিল।শক্তি, সন্দীপনও চলে গিয়েছিল।কিন্তু ঐসব ঈস্তাহারত পড়া যায় না, এতই পচা।সুনীলকে ওরা জানায় নি কেন?

    বঃ ইর্ষা, ভয়।সমির আবার সুনীলদার বন্ধু ছিল।“ধর্মে আছি, জিরাফে আছি” নিয়ে শক্তির তখন সাঙ্ঘাতিক অবস্থা, এক বসায় দশটা কবিতা লিখে ফেলছে। ও বুঝে গিয়েছিল সমির, মলয়দের হাতে লেখা নেই।ও বুঝেছিল যে হাংরিদের সাথে থাকলে ওর কবিতা ধ্বংশ হয়ে ্যাবে।খুব সম্ভবত সেই প্রথম শক্তি সুনীলদার কবিতার ক্ষমতাও বুঝতে পেরেছিল।ও আবার কৃত্তিবাস বলয়ে ফিরে আসে।টাইম ম্যগাজিন বিটদের কথা বলতে গিয়ে হাংরিদের সম্পর্কে বলেছিল।ঐটুকুই। লেখা কই?বোগাস।

    চঃ যে সুনীলকে ওরা ওদের সাথে ডাকেনি, জ়েলে নেবার পর তাকেই অনুনয় করছে আদালতে গিয়ে ওদের কবিতার পক্ষ্যে সাফাই গাইতে!

    বঃ মলয় ওটা করেছিল।সুনীলদাকে নিজে গিয়ে ও সাক্ষ্য দিতে বলেছিল।ওর জ়েল দন্ড ঠেকাতেই সুনীলদা ওর কবিতাকে উত্তির্ন না মনে করলেও বলেছিল “সার্থক কবিতা”।

    চঃ শক্তি কি করেছিল?

    বঃ সমির, মলয়দের এক বোনের সাথে প্রেম করেছিল।ওদের অনেকগুলো বোন ছিল।

    চঃ নাম কি বোনটার?

    বঃ শিলা।

    চঃ শিলা রায় চৌধুরি!শক্তির প্রেমিকা!হো হো হো. )

     

    ৬. : ( সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : মলয় রায়চৌধুরী খুব অদ্ভূত মানুষ। তিনি আমাকে উৎসর্গ করে একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাটি পোষ্ট দিয়ে বললেন, ‘দুলাল, তোমার সাথে আমার ছবি নেই কেনো’?

    তাঁর সাথে জীবনে কোনো দিন দেখা হয়নি। তিনি থাকেন বোম্বে আর আমি টরন্টোতে। ছবি থাকবে কি ভাবে? মলয় দা’র সাথে দেখা-সাক্ষাৎকার না হলেও তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ২০১৪ সালে, আমার ‘সাতদিন’ ওয়েব পত্রিকার জন্য। )

    ৭. ( সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : ভালো লাগা কবিতা : মলয় দা, মলয় রায়চৌধুরী এক অদ্ভূত মানুষ। ৮২ বয়সেও ২৮ বছরের তরুণ কবিদের মতো তারুণ্য লালন করেন। আমি তাঁর এক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তার জবাবে আরো তা টের পেয়েছি। তাঁর সাথে আমার দেখা হয়। বাংলাদেশে কবিদের দৌঁড় কলিকাতা পর্যন্ত। আমার মতো সাধারণ কবির পক্ষে কি স্বর্গীয় দিল্লি যাওয়া তো কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমার কবিতায় মলয় দা ঢুকে গেছেন, আবার মলয় দা আমাকে নিয়েও কবিতা লিখেছেন, ফেইসবুক লাইভে আমার কবিতা পাঠ করেছেন।

    কি সব অদ্ভূত কাণ্ডই না করেন মলয় দা। গুণ দা'র মতো তাঁর পাগলামির শেষ নাই। শাশুড়িকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেন। প্রেমিকাকে বলনে- ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো’। আমি বলেছিলাম, মাথা নাকি নুনু? তিনি যে জবাব দিয়েছিলেন, তাতেও টাশকি খেয়েছি। ‘১৯৬০-এর দশকের হাংরি আন্দোলন হাংরিয়ালিজম— তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক ১৯৬০-এর দশক থেকেই ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার জন্যে রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন।

    সম্প্রতি তাঁর একটি কবিতা পড়ে থ মেরে যাই। সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং দেশ বিভাগ নিয়ে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। কিন্তু মলয় রায়চৌধুরীর এই কবিতার অসাধারণ মর্মান্তিক এবং ভায়াবহ চিত্রকল্প চমকে দেয়! ফাঁসিতে ঝুলন্ত লাশ ঝুলতে ঝুলতে এক বার পাকিস্তান আবার হিন্দুস্থানের দিকে ঝুলছে!</span></li></ul><ul class='list-group my-2 shadow rounded-0 d-print-none'><li class='list-group-item small'><img src=বিশ্বজিত সেন | ২০ অক্টোবর ২০২১ ১২:৪৩735054

  • বিশ্বজিত সেন : মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা

    বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা ভাবাভাবি করেন, তাঁদের কিছু মজার প্রবণতা আছে। তাঁরা কবিতাকে গদ্য থেকে একেবারে আলাদা করে দেখেন, ও সেই দেখা চিরস্হায়ি করতে নানাবিধ সাংস্কৃতিক প্রপেরও আয়োজন রয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেরই নাম--- কবিপ্রণাম। রবীন্দ্রনাথকে মূলত দেখা হয় কবি হিসাবে। গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ তেমন গুরুত্বপূর্ণ লোক নন। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলব, গল্পলেখক রবীন্দ্রনাথই আমার কাছে সর্বাধিক গ্রাহ্য। যদিও রবীন্দ্রনাথের গল্প লেখার দর্শন আমার কাছে একেবারেই গ্রহণীয় নয়, তবু 'কবি' রবীন্দ্রনাথের চেয়ে, এই লোকটি আমার চোখে ঢের বাস্তব।

    কবিতাকে আলাদা করে দেখা, তাকে সুউচ্চ বেদিতে বসিয়ে রাখা, অহরহ গুজগুজ-ফিসফিস, আরে আজও যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে বাংলা সাহিত্যে ও মধ্যবিত্ত জনজীবনে। এ নিয়ে চিন্তা করেছি, আজও মাঝে-মাঝে করি। এ ভাবনার উৎস কোথায়?কিছুটা কি "ভারতীয় অতীত"- এর ব্যাপার রয়েছে এর মধ্যে। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত--- সবই কবিতায়। কবিকে রহস্যময় মানুষ মনে করা হত, যিনি নিজের চিন্তা-ভাবনাকে ছন্দবদ্ধ করতে সক্ষম। মনে করা হত স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর কাছে বার্তা পাঠিয়ে থাকেন। ভগবানের স্পেশাল মেসেঞ্জার তিনি, 'নট টু বি টেকন লাইটলি'। তার বহু পরে, 'ভক্তি' যুগে ভারতীয় সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবিকে সাধক বানিয়ে কুলুঙ্গিতে লাল শালু মুড়ে রেখে দেওয়া হল।কবীর, দাদু, নানক, সুরদাস, রহিম, জয়দেব, চণ্ডীদাস। তুলসীদাসকে 'গোঁসাই' বানিয়ে তাঁরও একই হাল করা হল।'রামচরিতমানস'কে ধর্মগ্রন্হ মনে করে গদগদ আপামর হিন্দিভাষী জনসাধারণ। তার দোহায় দোহায় শব্দের যে অদ্ভুত খেলা, ভাষাকে কাদার মতো ব্যবহার করে তা থেকে বিচিত্র নানা মূর্তি গড়ে তোলা, সেদিকে দুচারজন ক্রিটিক ছাড়া কারো নজরই যায়নি প্রায়। হিন্দি সাহিত্য ঐশ্বরিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে কবে একাজে হাত দেবে জানি না। আজকে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, এ-কাজ করার সময় এসে গেছে।

    ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল কিন্তু কবিকে অনেক সহজভাবে নিয়েছিল। কথক ও কবিয়াল ছিলেন, কবিগান ছিল। যাত্রার, পালার আসর ছিল, চণ্ডীতলা ছিল। অবশ্যই কবিকে স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ লোক মনে করা হত; তবে সাউক বা অবতার, বা ভগবান নয়। কবির লড়াইতে তো কবিতা তৈরি হত সর্বসমক্ষে, মুখে-মুখে। আর হারজিতও ছিল। কাজেই রহস্যের সেখানে কোনো ভূমিকাই ছিল না। কবি স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ বলে তাঁদের আদর-আপ্যায়নও হত, তবে তাঁকে একটি বেদিতে বসিয়ে তাঁর মুখের ওপর স্পটলাইট জ্বেলে রাখা ? নাঃ ! ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে তা করা হত না।

    ইংরাজরা আসার পর বাংলা সাহিত্যে কবিতার রহস্যের আমদানি হয়। নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে ইংরাজদের কিছু ছিল না। যাকে তারা নিজের সংস্কৃতি বলত, তার খুঁটিগুলো সবই ছিল গ্রিস, রোম থেকে ধার করা। গ্রিসে 'বার্ড' বা ভ্রাম্যমান কবিদের নিয়ে রহস্য গড়ার অভ্যাস প্রচলিত ছিল। ভক্তি যুগের আদলেই প্রায় বলা যায়, তাঁদের 'ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা', ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী, ইত্যাদি মনে করা হত। হোমারের স্হান গ্রিক মানসে প্রায় ঋষির জায়গাতেই ছিল, দাড়ি-টাড়ি সমেত। শেকসপিয়রও আরও কয়েকশো বছর আগে জন্মালে ঐ জায়গাতেই পৌঁছে যেতেন। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি পরে জন্মানোর দরুন বিশ্বসাহিত্য একটি নিদারুণ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিল।

    রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, সাহিত্যিক জীবনের পরবর্তীপর্বে, কবিতার বিশেষত্বের জায়গা থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন। যাকে সাহিত্যের বিশেষজ্ঞরা 'গদ্য কবিতা' বলেন, তা তাঁর এই বোধের সাক্ষ্য দেয়। তাঁর কিছু গদ্য কবিতা গল্পকেন্দ্রিক। সাহিত্যকর্ম ইশাবে অনেক উঁচু দরের কাজ সেগুলো। মোদ্দা ব্যাপার হল, আজ পাড়াব-পাড়ায় 'কবি প্রণাম' সত্ত্বেও সাহিত্যের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির মাঝখানের দেওয়াল ধ্বসিয়ে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাঁকে বাঙালি এত বেশি 'কবি' বানিয়ে ফেলেছিল যে হাত খুলে এই কাজটি করা সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। তবে কাজের মধ্য দিয়ে ঠারে-ঠারে যতটা পেরেছেন, করেছেন। বিশেষ করে ছবি আঁকার মাধ্যমে।

    কবিতাকে বা কবিকর্মকে ঘিরে একটা রহস্য সৃষ্টি করে রাখলে কবিতা কখনই সামাজিক পরিস্হিতির দলিল হয়ে উঠতে পারে না। কবিতার মিস্টিসিজমের প্রথম অসুবিধে এটা। কবিতা যদি সামাজিক পরিস্হিতির দলিল না হয়, তবে তাকে ড্রইংরুম সাজানোর ডলপুতুল বা অশ্রুমোছার রুমাল হয়ে থাকতে হয় কেবল।সেটা অবশ্য অনেকেরই মনঃপূত, বিশেষ করে যাঁরা 'সমাজ-টমাজ'কে দশ হাত দূরে রাখতে চান। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যেও লড়াই আছে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ আছে। একটি পক্ষের বিশেষ দর্শন এটাই। কবিতার গায়ে গরম হাওয়ার ঝাপটা যেন না লাগে।

    কবিতার মিস্টিসিজমের দ্বিতীয় অসুবিধে ভাষার স্তরে। ভাষা তো একটি নদী বিশেষ। একূল-ওকূল দুকূলই সে ভাসায়। তাকে সিমিলি, মেটাফর, ছন্দবৃত্ত, মাত্রা, পয়ার ইত্যাদির গণ্ডীর মধ্যে সর্বদা বেঁধে রাখা যায় না। কবিতার নিয়মানুবর্তিতা থেকেই কবিতার মিস্টিসিজমের জন্ম। এই নিয়মানুবর্তিতার দরুনই, একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন অনুভূত হয়, যে কবিতা 'লিখতে পারে'। যে 'পারে না', তাকে দূর করো, দাঁড় করিয়ে রাখো দরজার বাইরে। তার ভাষাটিও ব্রাত্য।

    তাই, কবিতার স্বার্থেই, কবিতার রহস্যময়তাকে ভাঙা অত্যন্ত প্রয়োজন।

    বাংলা সাহিত্যের সিরিয়াস পাঠক সম্প্রতি নড়ে-চড়ে বসেছেন। ষাটের দশকে, যে একটি তুমুল ওলোট-পালোট ঘটে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে--- সেদিকে নজর গেছে তাঁদের। দেরিতে হলেও, এটাই কাম্য ছিল।'হাংরি আন্দোলন' নিয়ে ইতিপূর্বে 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' গোছের কথাবার্তা হয়েছে। 'হাংরি আন্দোলনকারীদের' গভীর মননশীল পঠন-পাঠন ছিল, যাকে বলা যায় ওভারভিউ। হাংরির পরেও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এসেছে, তবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঝাঁকুনি হিসাবে হাংরিই ছিল "প্রথম"। বাংলা সাহিত্যের অবস্হা, হাংরি আন্দোলনের আগে ছিল অকালবৃদ্ধ আফিংখোরের মতো। রবীন্দ্র ঐতিহ্য পুঁটুলি বেঁধে কোলে নিয়ে বসে ঝিমোনো আর মাঝে-মাঝে চটকা ভেঙে, "অ্যাই, গোল কোরো না বলচি, পড়াশুনো করো, পড়াশুনো..."। অথচ দেশে-বিদেশে তখন ঘটছে যুগান্তকারী ঘটনা। 'গ্রানমা' জাহাজে চড়ে বিপ্লব করতে আসা কয়েকজন যুবক হঠাৎ জয়ী হয়েছেন। ওয়াশিংটন থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে দেখা দিয়েছে বিদ্রোহের পতাকা। ওদিকে ঠাসবুনোট সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্রমে ঠোঙা বানাবার কাগজ বই আর কিছু নয়। স্হিতাবস্হাকামী বাণিজ্যিক সংবাদপত্র গোষ্ঠীর প্রচণ্ড একমাত্রিক দাপট বাংলা সাহিত্যে। তার দোরগোড়ায় মাথা না ঠুকলে কেউ মানুষই হবে না, সাহিত্যিক হওয়া তো দূরে রইল।

    এইরকম সময়ে বাংলা সাহিত্যের 'পীঠস্হান' কলকাতা থেকে দূরে, পাটনা শহরে, যেখানে ঐশ্লামিক ধর্মশাস্ত্র পড়তে গিয়েছিলেন রামমোহন রায়, আর বেশ কয়েক বছর চাকরি করে গেছেন দীনবন্ধু মিত্র, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি অপরিচিত গরিব পরিবারের যুবক মলয় রায়চৌধুরী আই আন্দোলনটির ছক কষেন। দাদা সমীর রায়চৌধুরী কলকাতায় সিটি কলেজে পড়েন, সেই সুবাদে যুবা বাঙালি লেখক-কবিদের সাথে আলাপ-পরিচয়। দেশ-দুনিয়ে জুড়ে উথালপাথাল সত্ত্বেও কলকাতা, ব্রিটিশের প্রিয় 'কালকুত্তা' তখনও শীতল। বামপন্হী দলগুলোর বিরুদ্ধে গান্ধীবাবার কংগ্রেস প্রতিপালিত গোপাল পাঁঠা, ইনু মিত্তিরদের দাপাদাপি; কলকাতা শীতল। কবিতা ভবন (!) থেকে 'কবিতা' বেরোয়। বুদ্ধদেব বসুর পরিশীলিত আঙুল কবি বাছাই করে, ফতোয়া দেয়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সেই উপস্হিতি। এককালে...'না না অমন বলবেন না। সুকান্তও কবি। ছন্দ বোঝে। এই দেখুন আমি দেখাচ্ছি --- পতা/কায় পতা/কায় ফেরমিল/আনবে ফেব্রু/য়ারি। দেখলেন ?

    অট্টহাসি উদ্রেক করা সেই সময়। সমীর রায়চৌধুরীর 'পাটনাই' হওয়ার দরুন কলকাতার যুবক কবিদের পাটনায় আনাগোনা। এঁদের মধ্যে অন্যতম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। যাঁর বিষয়ে বাসব দাশগুপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মলয় বলেছেন, "শক্তির কবিতা সম্পূর্ণ নিজস্ব ও অসাধারণ। কেননা তিনি পাঁড় অশিক্ষিত, কোনো লেখাপড়া করেন না, এবং দর্শন, ইতিহাস, সমাজবোধ এসব ছিটেফোঁটা তাঁর মধ্যে নেই। নিজের খাঁটি বোধ থেকে তিনি লেখেন, তখন তাঁকে জীবনানন্দের পরের প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন মনে হয়।" মনে রাখা প্রয়োজন, এই সাক্ষাৎকারটি যখন দিচ্ছেন মলয়, তখনও হাংরি আন্দোলনের স্মৃতি, তজ্জনিত তিক্ততা, সব কিছু মলয়ের মস্তিষ্ককোষে উপস্হিত। কিছুই ক্ষমা করেননি। অথচ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে মলয়ের চোখা, টান-টান মূল্যায়ন। ব্যক্তিগত তিক্ততা সেখানে ছায়া ফেলেনি।

    হাংরি আন্দোলনের পরিকল্পনাপর্বে এই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে মলয় সঙ্গে পেয়েছিলেন, আর পেয়েছিলেন দেবী রায় ( হারাধন ধাড়া) কে। পাটনার সুবিমল বসাক এসে যোগ দেন কিছুকাল পরে।একটি সাহিত্য আন্দোলন, যা বাংলা সাহিত্যের হাল-হকিকত পালটে দিয়েছিল, কত সামান্যভাবে শুরু হয়েছিল, ভাবলে অবাক লাগে। প্রেস পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই মিষ্টির দোকানের বাকসো যে জব প্রেস ছাপতো, সেখানেই ছাপতে হয় হাংরি বুলেটিন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে মলয় তখন লোয়ার গ্রেড কেরানির চাকরিতে, কত মাইনে পেতেন জানা নেই, তবে প্রায় সম্পূণফ মাইনেটাই মনে হয় হাংরি বুলেটিনের পেছনে ঢালতে হত। বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম কাগজ বেরোনোর আরম্ভটা এইরকম। 'শতভিষা' পত্রিকার তুলনায় 'কৃত্তিবাস' ও নিজেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজই বলত, তবে হাংরি বুলেটিনের সাথে তার ছিল মৌলিক প্রভেদ। 'কৃত্তিবাস' ছিল সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খীদের কাগজ। তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে সুরে সুর মিলিয়ে। প্রতিষ্ঠান কখন যশ, প্রতিপত্তি, বৈভব, টাকাকড়ি, সামাজিক সুবিধার কাজে লেগে যায়, বলা তো যায় না। হাংরি বুলেটিনের উদ্দেশ্যই ছিল যুদ্ধ। আপসের জন্যে সেখানে কোনও জায়গাজমি রাখা হয়নি।

    অনেকের মতে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি গিমিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন রাতারাতি খ্যাত হবার জন্য, যেমন শাদা দিস্তা কাকজ, জুতোর বাকসো ইত্যাদি রিভিউএর জন্য পাঠানো, টপলেস প্রদর্শনীর আয়োজন ( টপলেসের অর্থ যে মুন্ড বা মস্তিষ্কবিহীনও হয়, এই বোধটুকু কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের হয়নি), জীবজন্তু-জোকারের মুখোশ বিলি ইত্যাদি। 'হাংরি কিংবদন্তি'তে মলয় উদ্ধৃত করেছেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের যে মন্তব্য, তা এ-প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে।কিন্তু মলয় বা তাঁর সঙ্গীরা কি জানতেন না যে প্রতিষ্ঠান ও প্রসাশন কতদূর হিংস্র হতে পারে? এ জানা সত্ত্বেও একজন চাকুরিজীবী ( মলয় ) নিজেকে এই ঝুঁকির সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন কেন ? শুধুই প্রচারের জন্য? না কি কিছু মূল্যবোধের ব্যাপারও ছিল ? মলয় তাঁর 'সাক্ষাৎকারমালা'র এক জায়গায় বলেছেন, 'ষাট দশকের সুস্হতা স্বাভাবিক ছিল না।' এই অস্বাভাবিক সুস্হতাকে ভালোমতো একটা ঝাঁকুনি দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। তার জন্য দুহাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি পরে চোর-ডাকাতের সঙ্গে সার বেঁধে পাটনা শহরের রাস্তায় অতিপরিচিতজনের মাঝে হাঁটা, চাকুরি থেকে সাসপেন্ড হওয়া, পঁয়ত্রিশ মাস প্রতি সপ্তাহে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো--- সবই। প্রচার পাওয়ার জন্য যদি এত করতে হয়, তাহলে তো মুশকিল। এর চেয়ে সহজ রাস্তা তো কতই ছিল। বিশেষত, 'কৃত্তিবাস' গোষ্ঠীতে তাঁর দাদার বন্ধুরাই যখন সর্বেসর্বা। সমসাময়িক অন্যান্যদের মতন একটু মিঠে ব্যবহার রাখলেই আর দেখতে হচ্ছিল না। আর, 'কৃত্তিবাস'ও তেমন-তেন বৈশিষ্টহীন ও লুপ্ত হবার পথে এগিয়েছে। সাহিত্য আন্দোলন সম্পর্কে 'কৃত্তিবাসীয়'দের সততার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে ?

    ( দ্রষ্টব্য: কবিতীর্থ, মাঘ ১৪১০)

    বলা যেতে পারে যে 'কৃত্তিবাস' যদি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে না টিকে থাকে তবে 'হাংরি বুলেটিন'ও তো টেকেনি। হ্যাঁ, হাংরি বুলেটিন উঠে গিয়েছিল মামলা-মকদ্দমার দরুন, অন্তর্কলহের দরুন। কিন্তু হাংরিদের ঝগড়াঝাঁটি ছিল খোলাখুলি, তাতে মধ্যবিত্তের চাপ-চাপ ঢাক-ঢাক ছিল না। মামলা-মকদ্দমার ভয়ে কেউ রাজসাক্ষী হয়েছিলেন ( সুভাষ ঘোষ,শৈলেশ্বর ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ ), কেউ ভেবড়ে গিয়ে কলকাতার বাইরে কেটে পড়েছিলেন ( প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য প্রমুখ )। সেগুলোকে দেখার কোনও অর্থ হয় না।'হাংরি বুলেটিন' বন্ধ হবার পর অগনণ পেশিবহুল বাহু এগিয়ে এসেছে আন্দোলনের পতাকা তুলে নিতে।জেব্রা, উন্মার্গ, ফুঃ, স্বকাল, ক্ষুধার্ত খবর, জিরাফ, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, ওয়েস্ট পেপার, চিহ্ণ, প্রতিদ্বন্দী ইত্যাদি পত্রিকাও হাংরি বুলেটিনই। মলয় কোনোদিন বলেননি যে হাংরি আন্দোলনের কপিরাইট একমাত্র তাঁর। হ্যাঁ, আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও দার্শনিক প্রতিনিধি হিসাবে তাঁর কিছু বক্তব্য থাকতেই পারে, যা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পাঠকদের সামনে রেখেছেন।এই অধিকার থেকে তো আর তাঁকে বঞ্চিত করা যায় না। মলয়ের পরবর্তীকালীনরা হাংরি মতাদর্শকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।এটিও একটি আন্দোলনের প্রাণশক্তির প্রমাণ। মলয়, হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পর, পড়ালেখার নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছেন, মন দিয়ে এবং চুটিয়ে বিভিন্ন শহরে চাকরি করেছেন, সংসার করেছেন, ভারতীয় জনজীবনকে দেখেছেন, জীবন থেকে শিখেছেন। আজ গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধের যে হতচকিত-করা ফসল তিনি আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তা সম্ভব হতে পেরেছে এরই দরুন। বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের গদি-আঁটা চেয়ারে বসে আঙুলে চাবির রিং ঘোরাননি মলয়। এর জন্য তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। অন্তত একটি আকাশ এমন রয়েছে, যাকে ঢেকে ফেলতে পারেনি কালো মেঘ।

    মলয়কে 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটির দরুন মামলায় পড়তে হয়। কবিতাটি বর্তমানে বহুল প্রচারিত, তাই তাকে আর সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করার প্রয়োজন নেই। তবে এই কবিতাটিকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা, যদি ধরেও নেওয়া যায় যে এর পেছনে কোনো অসূয়া কাজ করছিল না, একটি কৌতুকপ্রদ মাইন্ডসেট-এর দিকে ইঙ্গিত করে। এই মাইন্ডসেটটি তদানীন্তন বুদ্ধিজীবী বাঙালির, যিনি পুজোর ছুটিতে সস্ত্রীক খাজোরাহো দেখতে যান। তাহলে মলয়ের কবিতা কেন গ্রহণীয় নয় ? মজা কেবল এই জায়গাটুকুতে নয়, অন্যত্রও আছে। "আমরা যখন অসভ্য ছিলুম তখন ওইগুলো বানিয়েছি। এখন আমরা সভ্য, এখন তো আর এসব চলতে দেওয়া যায় না। " এও মানলাম, কিন্তু মাই ডিয়ার, ব্যাপারটা যে আদপে তা নয় একেবারেই। ব্যাপার আগাগোড়া অন্যরকম। যৌন রূপকল্প, দ্যোতক ও বিম্ব কেবল ব্যবহার করেছেন মলয়, সেগুলির মাধ্যমে নিজের কথা বলেছেন। এও চলবে না ? তাহলে শিবলিঙ্গ তুলে দিন, গৌরীপট্ট নাকচ করুন, অম্বুবাচী ব্যান করুন। কামাখ্যা মন্দিরে মা-কামাখ্যার মাসিক যেন আর না হয়। কি বলেন ? যাঁরা "অশ্লীল অশ্লীল" চিল্লিয়েছিলেন, তাঁরা সম্ভবত 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার-এর এই লাইনগুলো নজর করে দেখেননি--

    ১.

    জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে

    আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই

    মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না

    তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে কিছুকাল ঘুমোতে দাও শুভা

    শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও

    ২.

    হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা

    আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ

    মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না

    তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহ্যতায়

    সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব

    শিল্পর জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোবো

    কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই...

    ৩.

    এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়

    আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই

    এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে

    মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে

    আমি মরে যাব...

    ৪.

    ৩০০০০০ লক্ষ শিশি উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে

    ঝাঁকেঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়

    এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে

    হিপ্নটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়

    ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখী আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি

    কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি

    এই পঙক্তিগুলো একটু মন দিয়ে পড়লে বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর পক্ষে বোঝা দুষ্কর ছিল না যে নিছক যৌনতা নয়, আরো গূঢ় কোনো বোধের দ্যোতনা এই পঙক্তিগুলোয় রয়েছে।'সাত বছর আগের একদিন' কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন, "অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয় আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে। আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত ক্লান্ত করে। লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই..."। এই পঙক্তিগুলোকে উদ্ধৃত করে জীবনানন্দকে শবসাধক সাব্যস্ত করা অবশ্যই উচিত হবে না, অথবা ঘোর অঘোরপন্হী। তেমনই হাস্যকর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ যৌনতার বহিঃপ্রকাশ খোঁজা। আসলে মলয়ের বিরুদ্ধে যখন ষাটের দশকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার মকদ্দমা দায়ের করা হয়, তখন ষাটের দশকের 'অস্বাভাবিক সুস্হতা' রাজত্ব করছে পুরোদমে।'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে প্রবোধকুমার সান্যালের 'দেবতাত্মা হিমালয়' আর মেট্রো সিনেমার ফুটে রিফিউজি যুবতীদের শরীর নিয়ে চলছে অবাধ বাণিজ্য! পায়ের চটি ঘষটাচ্ছে রিফিউজি যুবক, 'মাই ওন সিসটার স্যার, ভেরি সুইট, ওনলি সিক্সটিন'। অথচ বাঙালি পাঠক 'কত অজানারে'র বারবেল সাহেব আর 'সখী সংবাদ' এর মিষ্টিদিদি, নতুন দিদি, এদের নিয়েই মুগ্ধ। সমাজ কোথাও নেই; সমাজের জ্ধবলাপোড়া, আর্তি, চিৎকার এগুলোও কোথাও নেই। বামপন্হীরা 'পরিচয়' পত্রিকা চালাচ্ছেন, তাতেও এন্ট্রি পারমিট নিয়ে ঢুকতে হয়। এইরকম এক সময়ে 'হাংরি বুলেটিন' এর দরকার ছিল, প্রয়োজন ছিল 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এর। মূল্যবোধ ভেঙে খানখান হওয়ার যে হরর, শিল্পপ্রতীক জোলো হয়ে যাওয়ার যে শক, তাকে যথার্থ ফুটিয়ে তুতে গেলে এই কবিতাই তো লিখতে হবে। মলয় তাই করেছিলেন।

    অবশ্য বিপদ চেনার ব্যাপারে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের সূক্ষ্মদৃষ্টির প্রশংসা করতেই হয়। কেই বা পড়ে তখন 'হাংরি বুলেটিন', কটা লোক ? পাটনার দুই যুবক, একজন হাওড়ার, একজন বিষ্ণুপুরের, একজন শান্তিনিকেতনের, এদের বুলেটিন বেরোয়। তার জন্যও আবার এই প্রেস, ওই প্রেসের হাতে-পায়ে ধরাধরি। তাহলে? এমন কী ক্ষমতাসম্পন্ন এরা, যে ক্ষেপে উঠল গোটা কলকাতার বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রশাসন ? মলয়ের বিরুদ্ধে কেবল মামলাই নয়, তাঁকে ও অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করে অপমান করা হল চরম, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন এই জাতীয় প্রবণতা মাথা তোলার হিম্মত না করে।

    বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন যে সমাজকে বুঝতেন না তা নয়, ভালোমতোই বুঝতেন। তাঁরাও জানতেন যে, যে-বদমায়েশি তাঁরা শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতির সর্বত্র বিছিয়ে রেখেছেন, তা মানুষের জন্য নয়। তবে শ্রেণী স্বার্থে এর প্রয়োজন তাঁদের ছিল। যেমন ইংরেজরা, আই.সি.এস.কে লৌহ কাঠামো হিসাবে গড়ে তুলতে ছেয়েছিল, তেমনই উত্তর-স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় পুঁজিবাদ, আমলাতন্ত্র ও তার মিডিয়া-খানসামাদের লক্ষ ছিল একটি জড়, নির্বোধ, সংবেদনহীন মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তোলা। তাদের রুচি, জীবনযাপন, মূল্যবোধ, সব কিছু হবে ছাঁচে ঢালা, সিনথেটিক। তারা হাসবে, কাঁদবে, গাইবে, সঙ্গম করবে একটি বিশিষ্ট কায়দায়। 'হাংরি প্রজন্ম'এর হুড়মুড় করে এসে পড়ায় এই গোটা গেমপ্ল্যানটি ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। মলয় এবং অন্যান্যদের ওপর আক্রমণ সেই কারণেই।

    প্রজাপতি-আঁকা বিয়ের কার্ডে হাংরি প্রজন্ম ধ্বনি তুলেছিল, "গাঙশালিক কাব্যস্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো"। এই ধ্বনিটিতে অন্তর্নিহিত ছিল তদানীন্তন কাব্যধারার প্রতি বিবমিষা।

    প্রকৃতি, নিসর্গ এই ব্যাপারগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলো বাংলা কবিতার কলোনোয়াল রোগবিশেষ। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ ছিল একটা কমপালশান, যেমন লেখালিখি ছিল তাঁর কমপালশান। সেজন্য তাঁর লেখায় প্রকৃতি, নিসর্গ বিশেষভাবে উপস্হিত--- কবিতায়, নাটকে, উপন্যাসে। আঁকার সময়ে তিনি এগুলো বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে, বাংলা কাব্যধারায় এই ব্যাপারগুলো প্রয়োজনীয় অনুপান হয়ে ওঠে। এবং অনুপানেরও অধিক, অভ্যাস।জীবনানন্দ লেখেন 'রূপসী বাংলা'। তাতেও নিসর্গ ছিল; তবে সেই নিসর্গ, প্রকৃতির প্রতিটি কমপোনেন্ট আবহমানের বাঙালিজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিল।মানুষের সাথে সম্পর্কবিহীন ছিল না সেই নিসর্গ, সেই প্রকৃতি।সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, "একদা আষাঢ়ে এসেছি এখানে, মিলের ধোঁয়ায় পড়ল মনে; কালবৈশাখী নামবে যে কবে আমাদের হাত-মেলানো গানে"। এখানে মানুষের সংগ্রামকে আঁকা হয়েছে প্রাকৃতিক ঘটনার রং-তুলিতে। কিন্তু বাংলা ভাষার সেইসব কবিরা (গাঙশালিক কাব্যস্কুল) সৃষ্টি করছিলেন মনুষ্যবিহীন নিসর্গ, মানুষকে মাইনাস-করা প্রকৃতি। এ ছিল একজাতীয় পলায়নবাদ। শংকরের 'কত অজানারে' যেমন বাঙালি যুবকের বেকারত্ব থেকে পলায়ন করতে চেয়ে বারবেল সাহেবের মহানতায় বুঁদ হয়ে থাকা, বিমল মিত্রের মিষ্টি দিদি, নতুন বৌদি, ছোট বৌঠান যেমন নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনসম্পর্ক ফেস করতে না চাওয়ার যুক্তি, তেমনই 'গাঙশালিক কাব্যস্কুল' ছিল মানুষের দুঃখ, শোক, রোগ, ঘা-পাঁচড়া এগুলোকে দেখতে না চেয়ে স্টুডিওর পর্দায় আঁকা চাঁদ, তারা, নদী, ফুলে বিভোর হয়ে থাকা। ঠিক তখনই মানুষের জীবনধারণ কতদূর দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল, তা দেখতে পাওয়া যায় ঋত্বিক ঘটকের ফিলমগুলোতে। সেই দৈন্য, দুর্দশা, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের প্রতিফলন এই কবিতাগুলোতে কোথাও ছিল না। কেন ? কেননা, তা করার অসুবিধে ছিল। তা করতে গেলে দীর্ঘ একটা লাফ দিতে হত, বিশেষ করে ভাষার ক্ষেত্রে।ঋত্বিক যেমন 'মেঘে ঢাকা তারা' বা 'কোমল গান্ধার' -এ গোটা ইডিয়মটিকেই ভেঙেচুরে ফেলেছিলেন, তেমনই ষাটের দশকের বঙ্গসমাজ ও মানুষেকে তুলে আনতে গেলে বাংলা কবিতার গোটা ইডিয়মটিকেই ভাঙতে হত। খানিকটা শ্রেণী পরিপ্রেক্ষিত আর কিছুটা গাড্ডায় পড়ে যাওয়ার ভয়, উভয়ে মিলে এ-কাজ করতে দেয়নি বাংলা ভাষার কবিদের। অতএব চাঁদ, তারা, নদী, ফুল, মৌমাছি...

    আরেকটি প্রশ্নও ছিল। কবি কি কেবল কবিতাই লিখবেন, না সামাজিক ভাষ্যকারও হবেন ? রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি নন, সামাজিক ভাষ্যকারও ছিলেন। জীবনানন্দও তাই ( জীবনানন্দকে নিবীঢ়ভাবে পড়লে এই ব্যাপারটি ধরা পড়ে)। কিন্তু উত্তরোত্তর সামাজিক ভাষ্যের ব্যাপারটি বাংলা কবিতা থেকে উঠে যেতে থাকে। "কবিতা কবিতাই। সামাজিক ভাষ্যটাষ্য আবার কী?" এ-জাতীয় একটী প্রবণতা বাংলা কবিতাকে পেয়ে বসতে থাকে। একে ক্রমাগত হাওয়া দিতে থাকে স্বার্থান্ধ বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান।

    খুব স্বাভাবিকভাবেই নভেম্বর ১৯৬১-এর প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি প্রজন্ম এই প্রবণতার বিরুদ্ধে ছিল। সেই দিন থেকে আজ অব্দি মলয়, সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি কোনোদিনই হাতছাড়া করেননি। 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'এ যেমন সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ে তাঁর তীব্র বিবমিষা, তামনই আজও। তাঁর হালের একটি কবিতা নেওয়া যেতে পারে, 'যা লাগবে বলবেন' সংকলন থেকে। কবিতাটির নাম 'ক্ষুধার্ত মেয়ে':

    আমার আসক্তি নেই কোনো

    চলে যা যেখানে যাবি

    যার সঙ্গে শুতে চাস যা

    আমি একা থাকতে চাই

    ক্ষুধার্ত বা পেটুক মহিলা

    যে ঘোরে সবার হাতে

    খড়কুটোময় সংসারে

    তার কোনো প্রয়োজন নেই।'

    কবিতাটিতে জড়িয়ে আছে একটা ঈষৎ বোহেমিয়ান বাচনভঙ্গী। পড়লে মনে হবে কেউ একজন লিখছেন তাঁর শয্যাসঙ্গিনীর উদ্দেশ্যে। এটি কিন্তু কবিতার প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তরে কবিতা ও সমাজ সম্পর্কে মলয়ের দার্শনিক বোধ সন্নিহিত। শয্যাসঙ্গিনী মহিলাটি আসলে কবিতাই। অথচ সবার হাতে ঘোরার প্রবণতা তার, সে হাত স্মাগলারের হোক বা বিপ্লবীর।কবিতার লয়ালটি সন্দিগ্ধ। ওদিকে সংসার অনিত্য, অতএব তার প্রয়োজন কিসের ?

    'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতায় যে-কথা বলার জন্য মলয়কে অনেক বেশি জায়গা ব্যবহার করতে হয়েছে, 'যা লাগবে বলবেন' গ্রন্হে সেই কথাই তিনি বলেছেন অনেক সংক্ষিপ্ত পরিসরে। 'হাংরি আন্দোলন' থেকে সরে এসে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ইন্সপেক্টিং অফিসার হিসেবে ভারতের গ্রামে-গঞ্জে শহরে শহরে ঘোরা, তারপর এ.আর.ডি.সি. ও নাবার্ডের গ্রামোন্নয়ন বিশেষজ্ঞের উচ্চপদে। যদিও মলয় তাঁর এই পরিবর্তিত জীবনশৈলী নিয়ে 'হাংরি কিংবদন্তি' গ্রন্হের শেষে মশকরাও করেছেন, "ছাই-এর জায়গায় আসে টুথপেস্ট, কয়লার উনুনের বদলে গ্যাস, সর্ষের তেলের বদলে সূর্যমুখী, শার্ট-প্যান্টের বদলে সাফারি, মাদুরের স্হানে বিছানা, ঢাবার বদলে রেস্তরাঁ, দিশির জায়গায় স্কচ, কলেজস্ট্রিট ও বইপাড়ার বদলে বাংলার গ্রামশহর।" কিন্তু তবু জীবনের এই অধ্যায়টিও যে কবি হিসেবে মলয়কে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

    'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ বাঁধন-ছেঁড়া রাগ ছিল মলয়ের কবিতার পরিচিত চিহ্ণ। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে জীবনের বহু কিছু দেখে-শুনে মলয়ের কন্ঠস্বর তেতো, অম্লকষায়, আর তার সাথে এসে জুটেছে আয়রনির অধুনান্তিক পরিহাসও। তবু তা মলয়ের কবিতাকে সর্বজনগ্রাহ্যও করে তোলে বটে।'যা লাগবে বলবেন'-এর আরও একটি কবিতাকে নেওয়া যেতে পারে, যেমন 'দ্রোহ':

    এ-নৌকো ময়ূরপঙ্খী

    তীর্থযাত্রী

    ব্যাঁটরা থেকে যাবে হরিদ্বের

    এই গাধা যেদিকে দুচোখ যায় যায়

    যাযাবর

    ঘাট বা আঘাটা যেখানে যেমন বোঝে

    ঘুরতে চাই গর্দভের পিঠে

    মাথায় কাগুজে টুপি মুখে চুনকালি

    পেছনে ভিড়ের হল্লা।

    ব্যাস! কবিতা এইটুকুই। অথচ বাঙালি সমাজের যে একটি বিশেষ প্রবণতা, কবিকে বেদিতে বসিয়ে রাখার, তাকে কত সার্থক ভাবে ভাঙঅ হয়েছে এখানে। পাটনার অন্ত্যজ মহল্লাগুলোতে হোলির দুতিন দিন আগে থেকে চোখে-পড়া একটি সুপরিচিত দৃশ্যকে ব্যবহার করেছেন মলয়, প্রশ্নাতীত দক্ষতাসহ। তার সাথে মিশিয়েছেন তীর্থযাত্রার জন্য বাঙালি হিন্দুর চিরাচরিত আতুরতাটিকে, যাতে পোস্টমডার্ন পরিহাস আরও তীব্র হয়। আর... হাংরি মামলার সময়ে তাঁকে যে-সামাজিক অবমাননা সইতে হয়েছে, তাও উঠে এসেছে। মাত্র কয়েকটি পঙক্তির মধ্যে কত প্রসঙ্গ যে এসেছে, অথচ বলার ভঙ্গিটি এত সহজ যে ভাবাই যায় না।

    এই সংগ্রহের আরেকটি কবিতা 'যে পার্টি চাইছেন সে পার্টিই পাবেন'।

    বিশ্বাস এক দুর্ঘটনা

    বুকপকেটে শ্রেণী

    প্রতিরোধী থাকেন জেলে

    কাজু-ফলের ফেনি

    বরং ভালো

    ভুল অঙ্কের ডানা।

    ...মোড়ল দলের পাড়ার কেউ বা

    আওড়ায় বেঘোরে

    ছাদ ঢালায়ের সমরবাদ্য

    কর্তাবাবার জানা

    মেলাবেন তিনি অন্তরীক্ষে

    মোক্ষ একখানা।

    কবিতার শেষ দুটি পঙক্তিতে অমিয় চক্রবর্তীর 'মেলাবেন তিনি মেলাবেন', এই শান্ত, স্হিত, প্রায় ব্রাহ্ম, উত্তর-রাবীন্দ্রিক বিশ্বাসের আদলটি একেবারে বিপরীত অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পার্টি আমলাতন্ত্রের যে প্রবল দাপত, যার দরুণ তেলে-জলে মিশ খেয়ে একেবারেই একাকার, পুতুল নাচের সুতোর শেষ প্রান্তটি ব্যক্তিবিশেষের হাতে, সেটিতে যেমন-যেমন টান পড়ছে, কাঠের পুতুলগুলো তেমন-তেমনই নাচছে; এই গোটা পরিবেশটি উঠে এসেছে কয়েকটি মাত্র পঙক্তির মাধ্যমে। মলয় বুঝিয়েছেন, যা বোঝাতে গেলে অন্তত কয়েকশো পাতার বই দরকার। আর? বিরোধীপক্ষ বলতে কিছু নেই আর। যারা বিরোধ করছে, তারাও বস্তুত নিজের-নিজের ছাদই ঢালাই করছে। সেই ছাদ ঢালাই-এর বাজনাকে মানুষ মনে করছে সমরবাদ্য।

    এত সূক্ষ্ম যাঁর ভাষার পরিমিতিবোধ, তিনি কিন্তু 'চিৎকারসমগ্র' গ্রন্হে এসে আবার অন্যরকম হয়ে যান। দড়ি ঢিলে দেন একটু, যাতে তাঁর সংবাদবাহক ঘুরতে পারে জায়গা-বেজায়গায়। 'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতাটির অংশ পড়া যেতে পারে এই প্রসঙ্গে:

    হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া সেই প্রৌঢ় নদী

    নাচছে দুর্গাবোঙার ফরসা কোমর জড়িয়ে

    শহর-পুরুতের গামছা কাঁধে

    তাককা হুরে

    আরে হুরে তাককা হুরে

    বোঙা আদিবাসী দেবতা-অপদেবতার সর্বনাম। দুর্গা বাঙালির আবহমানের দুর্গতিনাশিনী। তারই কোমর জড়িয়ে নাচছে হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া প্রৌঢ় নদী, কাঁধে শহর-পুরুষের গামছা। তাককা হুরে, আরে হুরে তাককা হুরে, শহুরে মাস্তানদের উল্লাসধ্বনি।

    ভাঙনের ছায়াগাছ। এই ভাঙনকে সর্বদা দেখতে পাওয়া যায় না, অথচ সে তার কাজ করে চলেছে। ভাঙন বস্তুত একটি সার্বিক প্রক্রিয়া। এর দরুন সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মজাদার মিলমিশ। বুর্জোয়ার বক্তব্য আশ্রয় করে লুমপেনের ভাষাকে।লুমপেন অ্যাডপ্ট করে বুর্জোয়ার চালচলন। এর সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে ওর উঠোনে। ওর 'রোনাধোনা'য় শোনা যায় এর অনুরণন।

    চিৎকার করতে-করতে পড়ছে জলপ্রপাত চুলে

    ঢাউসপেট পোয়াতি অফিস-বারান্দায় আইল হাতে

    থ্যাতলানো ট্যাক্সিচালক হাওড়া স্টেশানে

    যেখানে সাপের ফণা জমা রাখতে হয়

    শহর বিষদাঁত খুলে নেয় প্রত্যেকের। ছোবলানো তো চলবেই না, ফোঁস করাও নয়। অফিস বারান্দায় ফাইল হাতে গর্ভিনী। কী প্রসব করতে চলেছে সে ? তারই মধ্যে ঝরে যেতে থাকা কেশপাশের চিৎকার। আলুলায়িত কেশপাশ বাঙালির আবহমানের সৌন্দর্য-মিথের অংশ।

    মেঝেময় ছড়িয়ে-থাকা গোঙানির টুকরো তুলে

    তারা বদলায়নি তবু আদল পালটেছে

    হে নাইলন দড়ি বাড়িতে এখন কেউ নেই

    কিন্তু বাইরে হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর

    কবিতাটি পড়তে-পড়তে বহু পুরোনো টার্কিশ ফিলম 'কংকারার্স অফ দি গোলডেন সিটি'র কথা মনে পড়ে। নিষ্পাপ একটি গ্রাম্য পরিবার শহরে এসে সব কিছু ধিরে-ধিরে হারাল। তার মেয়েরা হয়ে গেল বেশ্যা, পুরুষেরা অপরাধি। হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর--- গোল্ডেন সিটি। সোনার শহর। নারকেল দড়ির বদলে নাইলন দড়ি, সভ্যতার অগ্রগতি। বাড়িতে কেউ নেই, শূন্যতা অপরিসীম।

    কবিতাটির শেষ স্তবকে এসে মলয় দুর্বার ছুট লাগান--- এমন ছুট যে কবিতা ব্যাপারটাই দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

    কচি বালক-পাছার নধরমাংস দেবদূত

    মাখনমাখা ব্রয়লার যার শেষ খদ্দের

    চলে গেছে তিন বছর তার ব্লাউজে সেফটিপিনগাঁথা হৃদয়

    স্লুইস দরজা খুলে আলোর নারীশরীর

    যে জীবন বুকের সামনে উঁচিয়ে অচেনা পিস্তল

    তখনই সিঁড়িতে সাদা ছড়ির আওয়াজ তুলে

    গামছায় মুখ ঢেকঢ গাঁও বালিকার কান্না

    কেঁপে উঠেছে শিশুর গায়ে হাত ঠেকলে

    ভাঙন যখন সব কিছুকেই ভাঙছে, তখন কবিতাকেও সে ভাঙবে। ভাঙতে-ভাঙতে কবিতাও মুক্ত হয়ে যাবে। তখনই বোধহয় বিদ্যুৎ ঝলকের মত এক অন্য কবিতার সৃষ্টিমুহূর্ত।'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতায় আমরা সেই প্রক্রিয়াটি দেখতে পাচ্ছি, চাক্ষুষ।মলয় রায়চৌধুরী থেকে বোধ হয় এক নতুন কবিকুলের সৃষ্টি হল, যাঁরা কেবল কবি নন, আপোষহীন সামাজিক ভাষ্যকারও বটে। "ঘুম-ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত" এর ব্যকরণ ভেঙে চুরমার, পর্বত শিখরে সূর্যোদয়ের মতো শোনা যাচ্ছে সেই নতুন কবিতার বজ্রনির্ঘোষ।

    'হাংরি সাক্ষাৎকারমালা'য় মলয় বলছেন বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে, "যতদিন বেঁচে থাকা ততদিন কবিতা ও গদ্যের চাকুতে একনাগাড় পালিশ দেওয়া দরকার।" হাংরি আন্দোলন ফুরোবার পর মলয় কেবল প্রথাগত জীবন যাপনই করেননি, একনাগাড়ে অনুশীলনও করেছেন। এই অনুশীলন ও পঠন-পাঠন ছিল একলব্য সদৃশ, অথচ সামনে ছিল না দ্রোণের মূর্তি।মলয়ের সাধনা এরকমই। তার ফলে 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' ও তাঁর আজকের কবিতার মধ্যে গড়ে উঠেছে লক্ষণীয় দূরত্ব। 'লক্ষণীয়' বললাম, কারণ মলয়ের 'হাততালি' কবিতাটিতে এমনই কিছু পরীক্ষা ও নিরীক্ষা জ্বলজ্বল করছে। রেলওয়ে ট্র্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে যেমন ট্রেনের আলো-আঁধারি কামরাগুলো ঝটিতি চোখের সামনে দিয়ে বহুমাত্রিক অর্থময়তায় সরে-সরে যেতে থাকে, তেমনই এই কবিতার অজস্র ছবি, চিত্রকল্প, ইশারা এরা দ্রুত ছুটে চলেছে:

    তারপর পলিতকেশ কাশফুলে

    পইপই বারনের পুশতুভাষী দুর্যোধন বেরিয়ে পড়েছে

    দগদগে রোদে

    চন্দন রক্তের পাথর-পোশাক রক্ষীদের সরিয়ে

    অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে এনেছেন সকালের বিকল্প

    কাঁচা নরকের উদাত্ত অনুভব

    হাহ

    রোগা পৃথিবীর শিয়রে রাতজাগা নেশুড়ে

    হরতালের দরুণ ক্রুশকাঠ থেকে নামতে পারেনি হাততালি

    চোখে জলসুদ্দু হেসেছে শিশুরা

    'হাততালি' প্রাথমিক স্তরে উল্লাসের বহিপ্রকাশ। প্রশ্ন উঠছে, সমাজ যখন পচছে-গলছে, তখন কবি এত উল্লসিত কেন ? কিসের এ-উল্লাস ? কেন উল্লাস ? বিশৃঙ্খলার মহোল্লাস ?

    যা অচল, যা জড়, তাকে একদিন না একদিন ভেঙে জেতেই হবে। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন নতুন কিছু গড়ে উঠবে না, উঠতে পারে না। মানুষের ভাবনাচিন্তা কার্যকলাপের ইতিহাসে এই উল্লাস অন্যত্রও দেখা গেছে। তন্ত্রসাধনার যে দিকগুলো, বামাচারের যে চালচলনগুলোকে 'বিকৃতি' বলে মনে করা হয়েছে, বস্তুত তা ছিল বর্ণাশ্রমপন্থী ছুঁৎমার্গপ্রবণ সনাতন হিন্দুধর্মের গড়া বিভিন্ন আগড় ভেঙে ফেলার উল্লাস। ভিন্ন 'অন্ত্যজ' বা অস্পৃশ্য জাতির নারীদের সাধনসঙ্গিনী করা, এই উল্লসিত বিদ্রোহের একটি দিক। নালান্দা জেলার কিংবদন্তি অনুযায়ী বৌদ্ধতন্ত্রের ভিক্ষু 'পদ্মসম্ভব' একজন অন্ত্যজ নারীকে নিয়ে ইলোপ করেছিলেন, ও দীর্ঘকাল নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের দায়িত্ব থেকে উধাও ছিলেন।দাহসংস্কারকে নানা কর্মকাণ্ডে মুড়ে সনাতন হিন্দুরা চেয়েছিলেন, মানুষ যেন অতীতকে খুঁটিয়ে না দেখে। শবসাধনা ও অঘোরপন্থা ছিল পরোক্ষে এর বিরুদ্ধচারণ। অতীতকে বিশ্লেষণ করা ও তার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, এই ছিল নানা তান্ত্রিক আচারের পেছনের অস্ফুট উত্তেজনা ও মহোল্লাস। মলয়ের 'হাততালি' কবিতার শিরোনাম ও ও প্রথম স্তবক এই আশ্চর্য নানার্থময় উল্লাসে মুখর। পুশতুভাষী দুর্যোধনের পৌরাণিক প্রাসঙ্গিকতাও আছে। একেবারে আলটপকা নয় এই অভিব্যক্তি। গান্ধার, কান্দাহার, পুরুষপুর, পেশাওয়ার, ভারত-পুরাণের এই অতিদীর্ঘ ছায়াবৃত যাত্রাপথের দূরত্ব নির্দেশকারী সংকেতগুলো মলয় ব্যবহার করেছেন স্হপতির নিপুণতায়, ইউক্লিডের নির্দেশ অমান্য করে। চন্দনরক্তের পাথর-পোশাক রক্ষীদের সরিয়ে। হিন্দুর পূজাসামগ্রী রক্তচন্দন। তাকে উল্টে চন্দনরক্ত। রক্ষীদের পোশাক পাথরের। অজর অনড় সনাতনী অতীত ভারত দেশের। অতীতকে না হয় মুছে ফেলা গেল, কিন্তু তারপর ?

    "অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে এনেছেন সকালের বিকল্প/কাঁচা নরকের উদাত্ত অনুভব/হাহ"। যে নতুন পৃথিবী তৈরি হয়েছে তা নারকীয়। অতীতের বিকল্প গড়ে তোলার নামে কেবল নরকই তৈরি হয়েছে, অন্য কিছু নয়।

    আধুনিকতার লাফঝাঁপ আজ হাস্যকর।

    আধুনিকতার হাতে গড়া সামাজিক প্রতিবাদের নানা যোগাড়যন্ত্র প্রতিবাদকে ব্যহতই করেছে, আর কিছু করেনি।"হরতালের দরুণ ক্রুশকাঠ থেকে নামতে পারেনি হাততালি", তথাপি "চোখে জলসুদ্দু হেসেছে শিশুরা।" কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে মনুষ্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা কোনটি, তবে আমি কিন্তু বলব না, 'পরমাণু বোমা আবিষ্কার'। বলব না 'ঔপনিবেশিকতা'। বলব না কলম্বাস অথবা ভাস্কো ডা গামার জন্ম। আমার উত্তর "মনুষ্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা মার্কসবাদ ও জুডিও ক্রিশ্চিয়ানিটির সমার্থক হয়ে যাওয়া।" মার্কস একেবারে চাক্ষুষ দেখে ছিলেন বিশ্ব পুঁজিবাদের উদয়। সেই দেখা ছিল নিখুঁত। তাঁর অভুতপূর্ব মেধা খুঁজে পেয়েছিল সেই উদয়ের কারণগুলোকে। কিন্তু এক জীবনে তাঁকে করতে হয়েছিল বিপুল পরিমাণ কাজ।করাল দারিদ্রের সাথে প্রতিনিয়ত যুঝে, একমাত্র বন্ধো ও সহযোদ্ধা এঙ্গেলসের সাহায্যে, তাঁকে সমাজবাদী দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্হাপন করতে হয়েছিল। তাই ইউরোপীয় সমাজের বাইরে বড় একটা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি তাঁর দৃষ্টি। তবু ভারতবর্ষকে বোঝবার চেষ্টা তিনি করেছিলেন, উল্লেখ করেছিলেন 'এশিয়াটিক মোড অফ প্রডাকশানে' এর কথা। যদি এই মোডকে বোঝাবার সময় তাঁর হাতে থাকত, তবে হয়ত, হয়ত কেন, অবশ্যই, পরবর্তীকালীন যান্ত্রিকতা থেকে মার্কসবাদের মুক্ত থাকার সম্ভাবনা হত অনেক বেশি প্রবল।তা না হবার দরুন, পরে জুডিওক্রিশ্চান নিয়তির সাথে মার্কসবাদও জড়িয়ে পড়ে। যেমন খ্রিস্টধর্ম দরিদ্র ইহুদি ক্রীতদাসের ধর্ম হিসাবে যাত্রা শুরু করে, পরে রোমক সম্রাটদের ধর্ম হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনিই, মার্কসবাদ, কাউটস্কি প্রমুখ সুবিধাবাদীর হাতে পড়ে অচিরেই ইউরোপীয় পুঁজিতন্ত্রের সেবাদাসের কাজে লেগে যায়।

    মার্কসবাদের সামাজিক বিকাশের নিয়মটিকে তার দ্বান্দ্বিক অন্তর্বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমনই একটি যান্ত্রিক সিদ্ধান্তে পরিণত করা হয়েছিল যে, বলা হল, "ধাপে-ধাপে এগিয়ে পুঁজিবাদই সমাজবাদ (!) হয়ে উঠবে"--- এই হয়ে ওঠে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের দলগোলুর ধারণা।লেনিন, রোজা লুক্সেমবুর্গ প্রমুখেরা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে তৃতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে সৃষ্টিশীল মার্কসবাদের গোড়াপত্তন না করলে, পরে মার্কসবাদকে পুঁজিবাদের দর্শন থেকে আলাদা করে আর চেনাই যেত না। তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, লেনিন ছিলেন অধুনান্তিক রাজনীতিবিদ, যিনি আধুনিকতার প্রবক্তা কাউটস্কির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কাউটস্কি প্রমুখরা মার্কসবাদকে অক্ষরসর্বস্ব করে তুলেছিলেন।কিন্তু যান্ত্রিকতা বোধহয় মানুষের একটি স্বাভিক ঝোঁক। পরে লেনিন-শিষ্যরাই আবার যান্ত্রিক হয়ে ওঠেন; রুশ মডেলটিকে ব্যবহার করতে থাকেন যত্রতত্র সর্বত্র। ভারতের মার্কসবাদীরাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বেশি যান্ত্রিক।

    'ইতিহাস' ভদ্রলোকটি নানাবিধ পরিহাসে যে ভালোরকম সিদ্ধহস্ত, তাতে আর সন্দেহ নেই। মলয়ের 'হাততালি' কবিতার ( এটি একটি দীর্ঘকবিতা ) দ্বিতীয় স্তবকের দ্বিতীয় পঙক্তিতে আছে, "যাত্রীডুবির খবরে ডুকরে উঠেছেন লালশালু নৌকার হাততালি।" পরিস্হিতি বারবার ওলোটপালোট করে দিচ্ছে মার্কসবাদীদের কষা ছক। এর ঠিক আগের পঙক্তিতে আছে, "একথোকা অন্ধকারে জোর করে দেখানো স্বপ্নে...।" মার্কসবাদীরা ভবিষ্যতের একটি মনমোহক স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আপামর জনসাধারণকে। সেই ছবি বাস্তবসম্মত ছিল না। তাই ছক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হতপ্রভ মার্কসবাদী ভাবুক শিবির। "না খেতে পাওয়া হলুদ শীতে/গরম আলকাতরায় ফোটা ফরসা রজনীগন্ধা।" ওদিকে শোষণও অব্যাহত। তারই হাড়ে-মাংসে তৈরি হচ্ছে নবতম 'নন্দনতত্ত্ব'। "কাঁধে চাঁদ নিয়ে ভররাত শাসিয়েছে শ্যাওলাধরা করোটি।" অতীতের দুঃসহ চাপ আর বারবার সেই চাপের কাছে নতিস্বীকার... "জ্বরগরম কপাল ছুঁইয়েছে তাঁর পশুপশম নাভিতে।" এরপর গুটিয়ে-রাখা একটি প্রাচীন, কীটদষ্ট মানচিত্র খোলার মতো একখানা গোটা উপমহাদেশ মলয় খুলে ধরেন আমাদের চোখের সামনে। সেই উপমহাদেশকে নষ্ট করেছে সাম্রাজ্যবাদ আর সামন্তবাদ। তাদের রূপক দ্যোতক প্রতীকগুলো বর্শাফলকের মতো বিদ্ধ হয়ে আছে উপমহাদেশটির হৃদয়ে।

    "ব্যাবিলনের শাদা নরকহুরি/উত্রমুখো নকশিমেঘের ওষুধবড়ি গিলিয়েছে/রেড়িপ্রদীপে ঝুঁকে ঘুরঘুরে শুঁটিপোকা/

    এলোচুলে ঢাকা রাজকন্যার মুকুট থেকে গানের টুকরো/

    পায়ে রক্তমাখা রাজহাঁস/যখন-তখন চেয়েছে বাড়িফেরত সৈন্যের বসন্তকাল/সাজিয়েছে খেলাচ্ছলে মারা চরমযুবার মা-বাপের সবুজকাঁথা ধানক্ষেত/তুঁতেরঙা কুয়াশা এগিয়েছে সিংহচামড়া শিকারীর গোপন ঘাসপথে/বিবাহযোগ্য ঘুড়সওয়ার হাততালি/হেই হো"। এই নষ্ট প্রক্রিয়াটির বিরুদ্ধে দানা বাঁধেনি, বাঁধতে পারেনি যথার্থ বিদ্রোহ, যদিচ দেখতে বিদ্রোহের মতন, এমন অনেক কিছুই ঘটেছে।"আগুন যখন ধোঁয়া থেকে আলাদা হচ্ছে/যেটুকু সময়ে/আলজিভ/দুই হৃৎস্পন্দনের মাঝে তেতো হয়ে ওঠে/জলপথে এসে আক্রমণ করেছে জ্বরবিদ্রোহী/গাছে-গাছে ঝড়কালীন পলাশের লাল সক্যতা/ঠিক যেন চিড়িয়াখানার ভবিষ্যৎহীন/শেষ হাওয়ায়/পটকা ফাটিয়েছে রাংতাপাড় মেঘ/যেন এক্ষুনি এসে পড়ল বলে হাততালি।" একটি নষ্ট প্রক্রিয়া, তার বিরুদ্ধে 'গড়ে ওঠা' বিপ্লবী আন্দোলনের দেউলেপনা, সবকিছু মিলে বিচিত্র এক পরিস্হিতি। বিপ্লবী আন্দোলনের সেই সততা নেই যে নিজের দেউলেপনা স্বীকার করে নেবে।"কবরে পাওয়া গেছে ভাত খাবার কাঁসি/অত্যাচারিতের কাতরানিতে পড়েছে হাড়ের খিলান/কেউ সুখি নয়/কেমন আছো জানতে চাইলে বলেছে /ভালো/পাকের পর পাক কাঁটাতার কোমর থেকে খুলে দিয়েছে"।

    ভারতবর্ষে বিহারসদৃশ যে কয়টি আভ্যন্তরীণ উপনিবেশ আছে, সেখানে অবস্হা আরও ভয়াবহ।এই আভ্যন্তরীন উপনিবেশগুলোকে নিয়ে বিপ্লবীদের ভড়ংএরও শেষ নেই।"ওদিকে হাততালিবাদক/ভগ্নস্বাস্হ্য আকাশে/পাখিদের গান শুধরে দিতে চেয়েছে/তারা দপদপে অন্ধকারে/

    বালিশ-জড়ানো বর্ষায়/পালামৌ জেহানাবাদ রোহুতাসে কাদাপেছল মাগুরের আঁশটে হাঁপানি/শামুক থুতনি বুড়ির চোখের পাতায় ধূসর সোরাগন্ধক।"

    সবকিছুর শেষে, সমস্তকিছুর পরিণামে খিদে। খেতে চাইছে মানুষ আর নিরন্তর খাদ্য হয়ে যেতে হচ্ছে তাকেই। আর তার এই খাদ্য হয়ে যাওয়াকে নানা অং বং চং দিয়ে মহিমা মন্ডিত করা হচ্ছে। মলয় এই বিচিত্র প্রক্রিয়াকে প্রস্ফূট করতে গিয়ে ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন রূপকল্প, যাতে এই পরিস্হিতির দ্বৈততা যথার্থ ব্যাখ্যাত হয়। যে ক্ষুধার্ত, সে-ই খাদ্য। "এদিকপানে মুখ করে দাঁড়িয়েছে ছোকরা সূর্যমুখী/ গরম তেলে লাল দুহাত উড়িয়ে স্বাস্হ্যবতী কাঁকড়া/ভাতের হাঁড়িতে নেচেছে সফেদ-মসলিন নরম অপ্সরা/তখন অন্ধকারে কেঁদে নিয়ে আলোয় হেসেছে হাততালি/হাসপাতালের বিছানায় লোহার শেকলে বাঁধা শুনেছে/ টেবিল ঘড়িতে সারারাত গ্রেপ্তারের ঠক ঠক ঠক ঠক।"

    আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যাঁরা ঔৎসুক্য রাখেন, তাঁদের অবশ্য পঠনীয় একটি বই "দি নিউ ক্লাস", লেখক মিলোভান জিলাস। জিলাসের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া আবশ্যক।মিলোভান জিলাস, তদানীন্তন যুগোস্লাভ কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্হানীয় নেতাদের একজন, স্ট্যালিন ও টিটোর অন্তরঙ্গ, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের 'কমিনফর্ম' পর্যায়ের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। পরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা ত্যাগ করেন ও এই বইটি ও আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই লেখেন, যেমন "কনভারসেশানস উইথ স্ট্যালিন" লেখেন। "দি নিউ ক্লাস" লেখার অপরাধে টিটো জিলাসকে সশ্রম কারাদন্ডে দম্ডিত করেন। দি নিউ ক্লাস বইটিতে জিলাস সমাজবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে একেবারে নতুন একটি অবদান রাখেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মিনস অফ প্রোডাকশানের মালিকানা স্বত্ব কাগজে-কলমে না থাকলেও সমাজতন্ত্রী দেশগুলোতে একটি নিউ ক্লাস বা নতুন শ্রেণির উদয় হয়েছে, যারা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস সংগ্রহ করতে সক্ষম। এই শ্রেণীটি ক্রমশ নিজেদের হাতে প্রভূত অর্থ ও ক্ষমতা কেন্দ্রিত করেছে, এবং পার্টি, শাসনতন্ত্র, সমস্তকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। জিলাসকে সেই যুগে সাম্রাজ্যবাদীর দালাল উত্যাদি আখ্যায় বদনাম করা হয়েছিল। তিনি কারাবাস করেন, এবং ধিরে-ধিরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। পরে যখন সোভিয়েট দেশ ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ধ্বস নামে, এক কালীন পার্টি আমলারাই সি.পি.এস.ইউ.কে ভোগে দিয়ে দেন, এবং রাতারাতি বিশাল-বিশাল কল-কারখানার মালিকের চেয়ারে জাঁকিয়ে বসেন, তখন আবার জিলাসকে খোঁজা আরম্ভ করেন যথার্থ মার্কসবাদীরা। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল বহুবছর বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকার ফলে আমলাতন্ত্রের যে অভ্যুদয় ঘটেছে, তাকে যথাযথ বুঝতে যাঁরা চান, তাঁরা এই বইটির সাহাজ্য নিতে পারেন।

    'কৌণপের লুচিমাংস' কাব্যগ্রন্হের ভূমিকায় মলয় বলেছেন, "বর্তমান কালখন্ডের বঙ্গসমাজটি অধিবাস্তব। আমি চেষ্টা করেছি তাকে উপস্হাপনের। সেকারণে কোথাও-কোথাও পঙক্তি এবং ছবিকে মনে হতে পারে জটপাকানো। আমার প্রতিভা দ্বারা কবিতাগুলোর সৃজন হয়েছে মনে করা ভুল।আমিই বরং সৃজিত হয়েছি কবিতাগুলোর দ্বারা। ভাষাসমাজের দ্বারা।"মলয়ের এই বক্তব্যটি কবিত্বের ধারণাটিকেই পালটে দেয় মূল থেকে। গলায় গাঁদাফুলের মালা, স্কুল-শিশুদের উদ্দেশ্যা নরম গলা, 'নারীত্বের' প্রতি সম্ভ্রমশীল, চোখ ঢুলুঢুলু, ভুলো মন, জীবন সম্বন্ধে উদাসীন--- স্বল্পকথায় একটি প্রবল নন্দনতাত্ত্বিক তালগোলের যে চিত্রটি চোখে ভেসে ওঠে 'কবি' শব্দটি উচ্চারণ করতেই, তা থেকে মলয় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন কিছুটা জোর করেই হয়ত। মলয় বলছেন, 'কোথাও-কোথাও পঙক্তি এবং ছবিকে মনে হতে পারে জটপাকানো'। এও বলছেন, একটি অধিবাস্তব সমাজকে উথ্থাপন করতে গিয়েই হয়ত এই জটিলতার সৃষ্টি। কৌনপ একজন পৌরাণিক রাক্ষস, যে কুনপ অর্থাৎ শব খেয়ে বেঁচে থাকে। 'কৌনপের লুচিমাংস' রাজনৈতিক কবিতার সংগ্রহ। সর্বসাকুল্যে বত্রিশটি কবিতা আছে সংকলনে। কবিতাগুলির প্রত্যেকটিই একটি করে হাহাকার। আজকের পশ্চিমবঙ্গ, তার সমাজ, তার সংস্কৃতি, তার পচন, সবকিছু নিয়ে হাহাকার; যদিও ওই একই ভূমিকায় মলয় বলেছেন, 'এই গ্রন্হের পাঠবস্তু আসলে বাঙালির পচনের হোলিখেলা'। কিন্তু মলয়ের কষ্ট ও বেদনা প্রতিটি কবিতায় প্রস্ফূট। তার আঙ্গিকটি যদিও উল্লাসের, হোলিখেলার। ব্যাপারটা কিছুটা চার্লি চ্যাপলিনের ফিলমের মত বলা যায়।অধুনান্তিক। 'রাঁঢ়বাজারে শততম প্রেমিকের আবির্ভাব হল/ অথচ ফুলের টবে মাটি নেই শেকড়ে-শেকড়ে ছয়লাপ সংসার'। রাঁঢ়বাজার শব্দটি প্রণিধানযোগ্য। মলয় বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পরিস্হিতিকে 'রাজনীতিবিদ বনাম জনতা' এভাবে নিচ্ছেন না কিন্তু। আগেও বলেছি, সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি মলয় কখনই হাতছাড়া করেননি। সেই ভূমিকাটিই তাঁকে উৎসাহিত করেছে পশ্চিমবঙ্গের কলোনিয়াল অতীতকে খুঁটিয়ে দেখতে। তাঁর লেখা বহু গল্পে ও প্রবন্ধে এই দেখা খুব স্পষ্ট। মলয়ের অধুনান্তিক ধ্যান-ধারণার উৎপত্তিও বস্তুত এখান থেকেই। উপনিবেশবাদ পশ্চিমবঙ্গের মনোজগৎকে ভালো রকম ধামসে দিয়েছে বহু আগেই। তার ফলে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ফলাও রাঁঢ়বাজার, যেখানে কেবল প্রেমিক যায় আর আসে। বর্তমান কালখণ্ডের ক্যাডাররা সেই রাঁঢ়বাজারের শতশত প্রেমিক। ফুলের টবে মাটি নেই, অথচ শেকড় সেঁদিয়ে গেছে ভেতরে, প্রায় অতল পর্যন্ত।অনন্ত পর্যন্ত নানা কায়েমিস্বার্থ চারিয়ে দিয়েছে শেকড়।

    সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি অত্যন্ত সিরিয়াসলি নেয়ার দরুনই মলয় খুঁটিয়ে দেখেন গলদ কোথায় ছিল আর আছে। কমিউনিস্ট-বিরোধীরা যেমন গোটা ব্যাপারটিকেই "আরে ও শালারা অমনধারাই" বলে সেরে নেন, মলয় কিন্তু তা করেননি। তিনি খু#টিয়ে দেখেন, জানতে এবং জানাতে চান।তার ফলে তাঁর চোখে ধরা পড়ে বহু বিচ্যুতি, যেগুলো হয়ত অনেকেই দেখেও দেখেননি। 'কাউন্টার ডিসকোর্স' কবিতায় মলয় বলছেন, "খাটের দুপাশ দিয়ে আলাদা বয়ে যাচ্ছিল মজুরের নদী কৃষকের নদী। যে কড়াকড়িতে সারাদিনে সূর্য শুধু একবারই ওঠে আর মিলিয়ে যায়।"

    অক্টোবর বিপ্লবের সময় সহসা আবিষ্কৃত হয় যে বলশেভিক পার্টির হাতে কৃষক শ্রেণির জন্য কোনো আলাদা প্রোগ্রাম বা কর্মসূচী নেই। অথচ বিপ্লবের কর্মকান্ডে কৃষক শ্রেণির সহযোগীতা অপরিহার্য। লেনিন দ্বিধাহীনভাবে এস.আর. (শ্পেশাল রিভলিউশানারি)-দের প্রোগ্রামটিকেই সরকারের তরফ থেকে অ্যাডপ্ট করে নেন। কয়েকটি পার্টির যে যুক্তফ্রণ্ট অক্টোবর বিপ্লব ঘটাতে চলেছিল, তাদের মধ্যে এস.আর. দলটিও ছিল, তাই এই কাজটি কারো অবিপ্লবী মনে হয়নি। নিজের পার্টির ত্রুটি মেনে নেওয়া, স্বীকার করা, পরিমার্জনা করার ব্যাপারে লেনিন তো, প্রায় বলা চলে তুলনাহীনই ছিলেন। আজকের ভারতবর্ষের, আরও বিশদভাবে বলতে গেলে, আজকের নানা রঙের বামনেতাদের মাইন্ডসেট কি একটুও এরকম? পুঁজিবাদী সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ওলোটপালোট ঘটাতে গেলে যে-দুটি শ্রেণীর হাত মেলানো প্রয়োজন, তারা দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ আলাদা-আলাদা অবস্হানে।শ্রমিক ও কৃষকের উঠোন একেবারেই ভিন্ন। আবার মজুরদের বমধ্যেও পি.এস.ইউ.এর মজুর আর আনঅর্গানাইজড সেক্টরের মজুরের আলাদা হাঁড়ি। কৃষকদের মধ্যেও এই জাতীয় নানা ভাগাভাগি। অথচ এ নিয়ে 'মার্কাসবাদী' তাত্ত্বিকদের মাথাব্যথা আছে, ঔপচারিক বুকচাপড়ানো ছাড়া, এমন তো মনে হয় না। তাহলে রদবদলটা ঘটবে কীভাবে ?

    রদবদলের আশা করাটাও কী উচিত ? যখন বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপ এক হিমশীতল রুটিন মাত্র, তার রন্ধ্রে-রন্ধে বাসা বেঁধেছে নানা সাইজের ঘুঘু, পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রগামী দর্শনটি এক অকিচিঞ্চিৎকর উপচারে পর্যবসিত, তখন সত্যিই কি কোনো আশা কোথাও রয়েছে যে একদিন সব কিছু বদলাবে ? "শেষ ট্রেনের নাম তত্ত্ববিশ্ব" কবিতায় বলছেন মলয়, "আর ভাটার দুলুনি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক ক্লান্ত স্টিমলঞ্চ/হাড়ে-হাড়ে টের পাওয়া হাড়গুলো দাঁতনদেঁতো প্যাংলার দুর্ভাবনায়/ডেরা ডেলে চুলখোলা বারান্দায় চোখ বুজে দেখবে এক তিন ঠেঙে বেড়াল/শ্যাল-চাদর মুড়ি দেয়ে/প্রতিধ্বনি নকল করতে ওস্তাদ তলপেট-ফোলা বোল্ডার/পিঁপড়ের খনি-টানেলে জড়ো করেছে টুসকি নির্দেশে/নামিয়ে-আনা তত্ত্ববিশ্ব।" তবু মানুষের আশা...। ধন্য আশা কুহকিনী। এখনও সে আশা রাখে রেলিতে যায়, ব্রিগেড জমায়েতে যায়। এখনও পার্টিদাদার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে যে তার আশা-হতাশার কথা দাদা শুনবেন। এখনও...। "খোঁড়া বরের টোপর" কবিতায় মলয় বলছেন, "দূরে শোনা যাচ্ছে/ নারকেল-পাতায় উড়ন্ত ঘোড়ার খুরধ্বনি/ বর আসছে বর আসছে বর আসছে একঠেঙে/ কাছিম-টেকো মাথায় ফর্দাফাঁই লালটোপর।"

    "কৌনপের লুচিমাংস" সংগ্রহে এসে মলয়ের কবিতায় আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল ঘটেছে বলে আমার ধারণা। এই কথাটি মলয় নিজেও স্বীকার করেছেন সংগ্রহের ভূমিকায়, "বাঁকবদলের জন্যেই তো নতুন কাব্যগ্রন্হ, নইলে একঘেয়ে একের পর একের কোনো মানেই হয় না।" মলয়ের ভাষা আশ্চর্য দ্যুতিমান হয়ে উঠেছে এই সংগ্রহে এসে। "ভূমিপুত্রের জন্মস্হান বদলের দরখাস্ত" কবিতাটিতে মলয় বলছেন, "দাদু, কেন্দ্র কই, সেই গর্মাগরম ষাঁড়িত জান্তব সিংহাসন ?/এ তো দেখছি গ্যাংগ্রিনের শাশ্বত নালি ঘা!" দুটি মাত্র পঙক্তি। তার মধ্যেই বিধৃত একটি সমাজের গোটা ইতিহাস, তার অতীত, তার বর্তমান, আর বোধকরি তার ভবিষ্যতও। কি আশ্চর্য দক্ষতায় মলয় দেখিয়ে দেন সবকিছু; মাত্র দুটি পঙক্তিতে কত কথাই যে বলেন। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের আজকের হাল-হকিকত বোঝাতে...."এই একপশলা সন্ধ্যায় ট্রানজিসটারে লকাপ লোচ্চার লিট্যানি শুনতে/গুটিপোকার সবুজ দেহতরঙ্গের তুলতুলে গানে গাছের কোটরে/সঙ্গীত খুঁজছে কাঠঠোকরা তার নিলাম-ডাকা মেশিন ঠোঁটে/পিটিয়ে-মারা শেষ শেয়াল পঞ্চায়েতকে উন্নীত করেছে জেলাসদরে/ড্যাশবোর্ডে থ্যাঁতামাথা কুষ্ঠ-সাম্রাজ্যের সোনাজল ভোটার/ঠায় বসে আছেন কাদা-কুঁজোর কায়দায় ঘুরন্ত চাকে।"( ফ্রান্তস ফ্যানঁ )। অথবা..."আমি যে কিনা কুহকঠুঁটো মেয়েদের মাঝে ছিলুম ট্রিগারলিঙ্গ যুবা/খড়খেতের সোঁদা-সোনালি চামচমকানো মকাইগুঁফো চাষার ছেলে/একটা চুল টানতেই বেরিয়ে পড়েছে রক্তপচা আঁতের ঝুরি/জ্ঞাতিদের মুখে পাঁঠার গলায় নেমে আসা খাঁড়ায় আঁকা চোখের কান্না/ দেখছি আর ভাবছি কি মজা শবশকটে আগে চড়িনি কক্ষুনো" (রূপসী বাংলার ভাতার )

    অথবা..."আমি কিন্তু কুঁড়ে টাইপের বিকেলবেলায় যখন বেহেড/পাকস্হলি নিয়ে ফিরছি/ভুল সময়ে আগত শীতে বদন-বেচুনিদের চৌরঙ্গি স্যামপেলের ডেরায়/ম্যাপ খুলে দেখাবে, হ্যাঁ, ওই যে ওই তো ইউজারফ্রেন্ডলি বসন্তঋতু/ চিলের পেছন-পেছন উড়ে ব্লো-আপ হিরোর গায়ে/হাত ছুঁইয়ে ভিককে চাইছে/আমি কিন্তু অতীতকে নতুন করে গড়ে ফেলেছি জলফোঁটায় বেঁধে-বেঁধে/প্রকৃতি কি আর ভাবছেন জানত না লাশ গোঁজড়াতে একসেট অমাবস্যা চাই/তাই তো জলের ক্যাঁদরায় খুকি-পোনাদের ভাসিয়ে নিয়ে/চলল জোয়ার-বুড়ো" (ক্যাটাক্রিসিস)।

    প্রথম-যৌবনে কবিতা লেখার জন্য লাঞ্ছিত ও নিন্দিত, পরে বহু বছর নৈঃশব্দের অতলে, আর আজ বাংলা কবিতার মধ্যগগনে সূর্যের মত ভাস্বর মলয় রায়চৌধুরী এখন পরিণত বয়স্ক। আয়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই মানুষের; শোনা যায় মলয়ের শরীরও খুব একটা সুস্হ নয়।বাংলা ভাষার যে অপরিমেয় সম্ভাবনা আছে, তার ঠাহর মলয়ের মত আর কারো হয়ত নেই। বাংলা ভাষার শব্দগুলোকে তিনি দিয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এক আয়তন, তাকে আজকের পৃথিবীর যোগ্য করে তুলেছেন।মলয়ের কবিতা নিয়ে কথাবার্তার এক নতুন পর্ব আরম্ভ হবে বলে প্রতীক্ষা করছি আমরা। সেই কবে কৃত্তিবাস ওঝা দ্বিধাজড়িত হাতে লেখা আরম্ভ করেছিলেন, "গোলকে বৈকুন্ঠপুরী সবার উপর।/ লক্ষ্মীসহ তথায় আছেন গদাধর।/তথায় অদ্ভু বৃক্ষ দেখিতে সুচারু।/যাহা চাই তাহা পাই নাম কল্পতরু।। দিবানিশি তথা চন্দ্র-সূর্যের প্রকাশ।/তার তলে আছে দিব্য বিচিত্র আবাস।।/নেতপাট সিঙহাসন উপরেতে তুলি।/বীরাসনে বসিয়ে আছেন বনমালী।।/মনে মনে প্রভুর হইল অভিলাষ।/এক অংশ চারি অংশ হইতে প্রকাশ।।" তেলের প্রদীপের আলোয় সামনের দিকে নুইয়ে পড়ে তিনি লিখেছিলেন। বাইরে চরাচরব্যাপী অন্ধকার। সেই অন্ধকারে হয়ত বা জ্বলছিল-নিভছিল গুটিকয় জোনাকি। অশ্বথ্থের নিষের অমান্য করে হঠাৎ-হঠাৎ হাওয়া বইছিল। অসংখ্য কান প্রতীক্ষা করছিল বাংলা কবিতার জন্মের প্রথম কান্নাটি শুনবে বলে। খাগের কলমের খসখস শব্দ উঠছিল তুলোট কাগজে। তারপর দীর্ঘপথ। কত রাজত্ব, সাম্রাজ্যবাদের উথ্থানপতন। ধুলোয় গড়াগড়ি কত মুকুট, রাজদণ্ড। রক্তাপ্লুত, কাঁটা-বেঁধা পায়ে কেবল হেঁটেছে বাংলা কবিতা। হেঁটেছে, হেঁটেছে আর হেঁটেছে। এখনও চোখ খুললে সেই মানুষদের দেখতে পাওয়া যায় সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে, যাঁরা সেই শিশুটিকে বয়স্ক করে তুলতে অসহ্য দুঃখ স্বীকার করেছেন। সকল পার্থিব সুখ-সুবিধা তুচ্ছে করেছেন তাঁরা, নিজের জীবন, যৌবন, মান-সম্মান, সব কিছু ব্যয় করেছেন বাংলা কবিতার জন্য। যেদিন মলয় কবিতা লেখার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিনই, সবার অলক্ষ্যে, এই মানুষদের একজন হয়েগিয়েছিলেন তিনি। ভুল করেছিল বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন। বাংলা কবিতার জন্য সর্বস্বপণ যোদ্ধাকে অট সহজে পরাভূত করা যায় না। জয় মলয়েরই হয়েছিল। সেই জয় আজ প্রতিধ্বনিত মলয়ের প্রতিটি কবিতায়।

    ( প্রবন্ধটি ২০০৩ সালে কবিতীর্থ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর বিভিন্ন পত্রিকায় পুনঃপ্রকাশিত হয়ে চলেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আবার আসিব ফিরে পত্রিকায়। )

    ----------------------------------------------------------------------------------

    বিশ্বজিত সেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। পার্টি বহু অংশে বিভাজিত হবার পর ও তাদের সদস্যদের নৈতিক পতনে আশাহত শ্রীসেন পার্টি ত্যাগ করেন।কিন্তু তিনি আজও নিজেকে একজন মার্কসবাদী ভাবুক বলে মনে করেন।তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্হ, গল্পগ্রন্হ ও প্রবন্ধের বই আছে।


     

  • ম. | ২০ অক্টোবর ২০২১ ১২:৪৬735055
  • হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়

    মলয় রক্ষিত

    ষাট দশকের সামাজিক ও রাজনৈতিক ধ্বস্ত পরিবেশ, অর্থনীতির ভাঙন এবং তারই ফলশ্রুতিতে তৈরি হওয়া সাংস্কৃতিক ব্যবধানের এলোমেলো চেহারাটা বাংলা কবিতায় আরেকরকম ভাবে এলো। আমি হাংরি, শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের কথা বলছি। ১৯৬১তে প্রকাশিত হলো হাংরি জেনারেশন এবং হাংরি-আন্দোলন সম্পর্কিত ইশতাহার। এই ইশতাহারগুলি পাঠ করলে বোঝা যায় হাংরিরা এই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন আমাদের ঔপনিবেশিক সূত্রে প্রাপ্ত নন্দনতাত্বিক বাস্তবতার যাবতীয় বোধ অথবা চিন্তাসূত্রকে আঘাতে আঘাতে চুরমার করে দিতে। হাংরি জেনারেশন ইশতাহার নং ১০-এ এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তৃতীয় সূত্রে লেখা হয়েছে----”ঠিক সেই রকম সৃষ্টি উন্মার্গে চালিত হতে হবে যাতে আগে থাকতে তৈরি পৃথিবীকে চুরমার করে পূনর্বার বিশৃঙ্খলা থেকে শুরু করা যায়।”

     

    এই ইশতাহার কবিতা বা সাহিত্যের যে-কোনো ধরণের সনাতন ঐতিহ্য বা পরম্পরাকে অস্বীকার করে, প্রত্যাখ্যান করে। যে-কোনো ধরণের মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ জানায়। কবিতার নন্দনতত্বের যাবতীয় সূত্রগুলিকে অস্বীকার করেই তাঁরা কবিতার ভিন্নতর এক পরিসর তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সে ছিল বাঙালির মনন ও চিন্তনের জগতে এমন এক ধাক্কা যার অনিবার্য পরিণতিতে হাংরি কবিদের রাষ্ট্রবিরোধী, অশ্লীল ইত্যাদি অভিযোগে গ্রেপতার হতে হয়।

     

    মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ তাই বৈদ্যুতিক শকের মতন আমাদের ধাক্কা দেয়, আমাদের যাপিত-জীবনের পচা-গলা-নোংরা চেহারাটা যেন আয়নার সামনে মেলে ধরে মলয় বলেন, “শাশ্বত অসুস্হতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফূলিঙ্গ/মা তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?” যখন মলয় প্রচণ্ড আত্মধিক্কারে উচ্চারণ করেন, “মরে যাবো কিনা বুঝতে পারছি না/তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়/সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাবো/শিল্পের জন্য সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোবো/কবিতার জন্য আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই”, কিংবা বিস্ফোরণের তীব্র আবেগেই যখন অসহ্য উচ্চারণ করেন, “কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?/কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি?/কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায়?”

     

    হাংরির সমস্ত কবিদের যাবতীয় কাউন্টার-কলোনিয়াল এসথেটিকস রিয়ালিটির পালটা কাউন্টার----তার গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসবার বিকল্প এক পরিসর তৈরির চেষ্টা, যেন বিদ্রোহ আর আত্মবিস্ফোরণে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে-যাওয়া সব চেহারা, ছটফটানি --- মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি সেসব কিছু ধারণ করে আছে। সমীর রায়চৌধুরী, সুবো আচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, অরুণেশ ঘোষ কিংবা শৈলেশ্বর ঘোষ ও মলয় রায়চৌধুরীরা, এঁরা আসলে কেউই ব্যক্তি-নাম নন, যেন সংঘবদ্ধ এক ডিসকোর্স, স্বাধীনতা-উত্তর ধ্বস্ত পচনশীল ভারতভূমির এক বিকল্প পরিসর, বিকল্প টেক্সট।

     

    সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই বিকল্প পরিসরের কোথাও ছিলেন না। সুভাষ পার্টিলাইনের ধুয়ো যেমন ধরেননি, তেমনি হাংরি শিবিরের ধারও কোনোদিন মাড়াননি। আবার ষাট দশকের ওই সর্বব্যাপী হতাশা, সঙ্গে চীনের কাছে যুদ্ধে গোহারান হারার লজ্জা থেকে উদ্ভূত আত্মলাঞ্ছনা তাঁকে বিচলিত করলেও কোথাও তিনি নিজেকে সময়ের হাতে সঁপে দেননি।

    [ অনুষ্টুপ গ্রীষ্ম-বর্ষা সংখ্যা, ১৪২২ ]

  • ম. | ২০ অক্টোবর ২০২১ ১২:৫০735056
  • কে, মলয় রায়চৌধুরী ? আর বলবেন না ! লোকে ওনার সম্পর্কে নানা কথা বলে ! নিজেই পড়ে দেখুন :

     

    ১. ( সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমিতাভ ঘোষাল - ‘গদ্য-পদ্য সংবাদ’ পত্রিকায় ১৯৮৬ অক্টোবরে প্রকাশিত :-

    সুমিতাভ : ষাটের দশকের হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ কতোটা ?

    সুনীল : হাংরি আন্দোলনে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। আমি তখন কৃত্তিবাস নামে একটা পত্রিকার সম্পাদনা করতুম। কৃত্তিবাসের থেকে কয়েকজন এই আন্দোলন শুরু করে। এদের মধ্যে প্রধান ভূমিকা প্রথমে নিয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী, সে ছিল আমার বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর ছোটো ভাই। সমীর রায়চৌধুরী কৃত্তিবাসের একজন লেখক এবং ওই গোষ্ঠীরই একজন। মলয়েরও কিছু কিছু লেখা কৃত্তিবাসে বেরিয়েছিল।

    সুমিতাভ : আচ্ছা শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো... ( কথায় বাধা দিয়ে )

    সুনীল : হ্যাঁ, তারপরে মলয় প্রথমে শুরু করার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাতে যোগ দেয় এবং পরে উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও পরিচিতদের মধ্যে অনেকে আসেন। এইভাবে হাংরি আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু এই আন্দোলনের কোনো ইস্তাহার বা কোনো ব্যাপারে আমার কোনো নাম ছিল না বা আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না।

     

    ২ ( Snehasis Roy : “হাংরির উত্থান ১৯৬২ সাল, মলয় ১৯৬১ সালের যে গল্প ফেঁদেছেন নকল ইস্তেহার বানিয়ে সেন্টুর তোরঙ্গ থেকে নাকি উদ্ধার হয়েছে পরে, এ-সব আসলে গাঁজাখুরি গল্প।

    মলয়ের কবিতা তো হয়ই না, গদ্য, অনুবাদ ও কিছু ভালো প্রবন্ধ লিখেছেন, সমস্যা হল, সুভাষ ও শৈলেশ্বরের ভূত লোকটার পিছু ছাড়ে না। শম্ভু রক্ষিতকে নিয়ে লিখছেন বা অন্য কোনো কবিকে নিয়ে সেখানে হঠাৎ অবান্তরভাবে শৈলেশ্বর, সুভাষকে দায়ি করছেন তাঁর জেল হওয়ার জন্য।(মলয় বোঝাতে চান, ইস্, তোমরা শৈলেশ্বর ঘোষ,সুভাষ ঘোষের লেখা পড়ো, এদের জন্য আমিহাংরিস্রষ্টা, আমার জেল হয়েছে!

    সাহিত্যের জন্য জেল হয়েছে এমন আসামীর লেখা পড়ো তোমরা, মুচলেকা দানকারীদের লেখা কেন পড়বে! আমি বীর, সারা পাড়ার সামনে কোমরে দড়ি দিয়ে আমায় ধরে নিয়ে গেছে, ভ্যাঁ...........এসব বলে পাঠকের সিমপ্যাথি আদায় করার চেষ্টা)

    ভাবটা এমন জেল যেন তাঁর একারই হয়েছিল, অথচ হাংরি সংক্রান্ত লেখালেখির কারণে প্রথম জেলে হয় শৈলেশ্বরের, পরে সুভাষেরও। লোকটা এমন চুতিয়া অরুণেশকে দু-রকম হাতের লেখায় চিঠি লেখে, সুভাষ ঘোষকেও তাই, সুভাষকে চিঠিতে জানায় আমার যারা সমালোচনা করে তাঁদের দেখে নেব। সেসব চিঠি সব আছে আমাদের কাছে। সময় ও জায়গা মতো প্রকাশিতও হবে।

    মলয়ের 'আমি' 'আমি' করার পাশাপাশি বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত হাংরি জেনারেশন আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। তাঁদের মুখপত্র ছিল 'ক্ষুধার্ত' পত্রিকা। মোট সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম তিনটি সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী এবং পরের চারটি সংখ্যা শৈলেশ্বর ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।”

     

    ৩. ( উপরোক্ত Snehasis Roy : “হাংরির উত্থান ১৯৬২ সাল, মলয় ১৯৬১ সালের যে গল্প ফেঁদেছেন নকল ইস্তেহার বানিয়ে সেন্টুর তোরঙ্গ থেকে নাকি উদ্ধার হয়েছে পরে, এ-সব আসলে গাঁজাখুরি গল্প।

    মলয়ের কবিতা তো হয়ই না, গদ্য, অনুবাদ ও কিছু ভালো প্রবন্ধ লিখেছেন, সমস্যা হল, সুভাষ ও শৈলেশ্বরের ভূত লোকটার পিছু ছাড়ে না। শম্ভু রক্ষিতকে নিয়ে লিখছেন বা অন্য কোনো কবিকে নিয়ে সেখানে হঠাৎ অবান্তরভাবে শৈলেশ্বর, সুভাষকে দায়ি করছেন তাঁর জেল হওয়ার জন্য।(মলয় বোঝাতে চান, ইস্, তোমরা শৈলেশ্বর ঘোষ,সুভাষ ঘোষের লেখা পড়ো, এদের জন্য আমিহাংরিস্রষ্টা, আমার জেল হয়েছে!

    সাহিত্যের জন্য জেল হয়েছে এমন আসামীর লেখা পড়ো তোমরা, মুচলেকা দানকারীদের লেখা কেন পড়বে! আমি বীর, সারা পাড়ার সামনে কোমরে দড়ি দিয়ে আমায় ধরে নিয়ে গেছে, ভ্যাঁ...........এসব বলে পাঠকের সিমপ্যাথি আদায় করার চেষ্টা)

    ভাবটা এমন জেল যেন তাঁর একারই হয়েছিল, অথচ হাংরি সংক্রান্ত লেখালেখির কারণে প্রথম জেলে হয় শৈলেশ্বরের, পরে সুভাষেরও। লোকটা এমন চুতিয়া অরুণেশকে দু-রকম হাতের লেখায় চিঠি লেখে, সুভাষ ঘোষকেও তাই, সুভাষকে চিঠিতে জানায় আমার যারা সমালোচনা করে তাঁদের দেখে নেব। সেসব চিঠি সব আছে আমাদের কাছে। সময় ও জায়গা মতো প্রকাশিতও হবে।

    মলয়ের 'আমি' 'আমি' করার পাশাপাশি বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত হাংরি জেনারেশন আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। তাঁদের মুখপত্র ছিল 'ক্ষুধার্ত' পত্রিকা। মোট সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম তিনটি সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী এবং পরের চারটি সংখ্যা শৈলেশ্বর ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। “)

     

    ৪. ( উপরোক্ত Snehasis Roy - “শৈলেশ্বরকে লেখা অরুণেশের প্রায় ৮০টির মতো দীর্ঘ চিঠি( INLAND LETTER CARD) উদ্ধার হল।

    'সৃষ্টিক্ষমতাহীন কুকুরের দল এই ঘেউঘেউ চিরদিনই করে এসেছে'র পাশাপাশি অরুণেশ চাইছেন 'আত্মমগ্ন গর্ভবতীর মতো নিজেকে নিয়ে থাকতে'।

    তাঁর সঙ্গে মিলারের লেখালিখির হাস্যকর তুলনা প্রসঙ্গে অরুণেশের মনে পড়ে যাচ্ছে জীবনানন্দকে ইয়েটস্ এর অনুকারক এমনকি পাশাপাশি রেখে উভয়ের লাইন তুলে মেলানোর প্রাণপণ চেষ্টার কথা!

    আর্থিক সংকট, বেশ্যা ও না-বেশ্যা অসংখ্য সংগমে তিনি কি না-প্রেমিক। না, এসবের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতার সঙ্গে সহবাস করতে চাইছেন।

    দেশ, আনন্দবাজার, আজকাল প্রভৃতি বাজারি কাগজ সম্পর্কে একহাত নিতে ছাড়ছেন না এবং কৃষ্ণ ধর ও অমিতাভ দাশগুপ্তকে হিজড়ে লেখক বলতে রেয়াত করছেন না।

    হাংরি জেনারেশন সাহিত্য, রাজনীতি, কলকাতার সাহিত্য, পাণ্ডুলিপি করে শৈলেশ্বরকে পাঠানো। 'রোবট'(সম্পাদক : জীবতোষ দাশ) নিয়ে ভয়াবহ আবেগ।নিজের কাগজ 'জিরাফ' নিয়ে চিন্তাভাবনা। বাবার অসুখ। চিকিৎসকদের 'মাগী' বলা, টাকাও ধ্বংস করে রোগীও মারে।

    উত্তরবঙ্গের তৎকালীন অন্যান্য পত্রিকার রাজনীতি। এমনকি নাম নিয়ে রাজা সরকারের(সম্পাদক : কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প) ঈর্ষা ও কূটনীতি সত্ত্বেও তাঁকে শোধরানোর চেষ্টা। আরও কত কী কথা বলেছেন চিঠিতে শৈলেশ্বরকে।

    এই চিঠিগুলো নিয়েই একটা সাংঘাতিক বই হয়ে যায়।

    একটা সময়, দীর্ঘ কবিতাযাপন, জৈব আততি ও ঐতিহাসিক দলিল তো বটেই।

    বোমাটা ফেলব নাকি!” ]

     

    ৫. : ( দুই ফরেনারের কথাবার্তা : বেলাল চৌধুরী ও চয়ন খায়রুল হাবিব

    চঃ এটা মজার, কৃত্তিবাসের একটা প্রধান অংশই সুনীলকে না জানিয়ে হাংরি আন্দোলনে জোগ দিয়েছিল।শক্তি, সন্দীপনও চলে গিয়েছিল।কিন্তু ঐসব ঈস্তাহারত পড়া যায় না, এতই পচা।সুনীলকে ওরা জানায় নি কেন?

    বঃ ইর্ষা, ভয়।সমির আবার সুনীলদার বন্ধু ছিল।“ধর্মে আছি, জিরাফে আছি” নিয়ে শক্তির তখন সাঙ্ঘাতিক অবস্থা, এক বসায় দশটা কবিতা লিখে ফেলছে। ও বুঝে গিয়েছিল সমির, মলয়দের হাতে লেখা নেই।ও বুঝেছিল যে হাংরিদের সাথে থাকলে ওর কবিতা ধ্বংশ হয়ে ্যাবে।খুব সম্ভবত সেই প্রথম শক্তি সুনীলদার কবিতার ক্ষমতাও বুঝতে পেরেছিল।ও আবার কৃত্তিবাস বলয়ে ফিরে আসে।টাইম ম্যগাজিন বিটদের কথা বলতে গিয়ে হাংরিদের সম্পর্কে বলেছিল।ঐটুকুই। লেখা কই?বোগাস।

    চঃ যে সুনীলকে ওরা ওদের সাথে ডাকেনি, জ়েলে নেবার পর তাকেই অনুনয় করছে আদালতে গিয়ে ওদের কবিতার পক্ষ্যে সাফাই গাইতে!

    বঃ মলয় ওটা করেছিল।সুনীলদাকে নিজে গিয়ে ও সাক্ষ্য দিতে বলেছিল।ওর জ়েল দন্ড ঠেকাতেই সুনীলদা ওর কবিতাকে উত্তির্ন না মনে করলেও বলেছিল “সার্থক কবিতা”।

    চঃ শক্তি কি করেছিল?

    বঃ সমির, মলয়দের এক বোনের সাথে প্রেম করেছিল।ওদের অনেকগুলো বোন ছিল।

    চঃ নাম কি বোনটার?

    বঃ শিলা।

    চঃ শিলা রায় চৌধুরি!শক্তির প্রেমিকা!হো হো হো. )

     

    ৬. : ( সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : মলয় রায়চৌধুরী খুব অদ্ভূত মানুষ। তিনি আমাকে উৎসর্গ করে একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাটি পোষ্ট দিয়ে বললেন, ‘দুলাল, তোমার সাথে আমার ছবি নেই কেনো’?

    তাঁর সাথে জীবনে কোনো দিন দেখা হয়নি। তিনি থাকেন বোম্বে আর আমি টরন্টোতে। ছবি থাকবে কি ভাবে? মলয় দা’র সাথে দেখা-সাক্ষাৎকার না হলেও তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ২০১৪ সালে, আমার ‘সাতদিন’ ওয়েব পত্রিকার জন্য। )

    ৭. ( সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : ভালো লাগা কবিতা : মলয় দা, মলয় রায়চৌধুরী এক অদ্ভূত মানুষ। ৮২ বয়সেও ২৮ বছরের তরুণ কবিদের মতো তারুণ্য লালন করেন। আমি তাঁর এক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তার জবাবে আরো তা টের পেয়েছি। তাঁর সাথে আমার দেখা হয়। বাংলাদেশে কবিদের দৌঁড় কলিকাতা পর্যন্ত। আমার মতো সাধারণ কবির পক্ষে কি স্বর্গীয় দিল্লি যাওয়া তো কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমার কবিতায় মলয় দা ঢুকে গেছেন, আবার মলয় দা আমাকে নিয়েও কবিতা লিখেছেন, ফেইসবুক লাইভে আমার কবিতা পাঠ করেছেন।

    কি সব অদ্ভূত কাণ্ডই না করেন মলয় দা। গুণ দা'র মতো তাঁর পাগলামির শেষ নাই। শাশুড়িকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেন। প্রেমিকাকে বলনে- ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো’। আমি বলেছিলাম, মাথা নাকি নুনু? তিনি যে জবাব দিয়েছিলেন, তাতেও টাশকি খেয়েছি। ‘১৯৬০-এর দশকের হাংরি আন্দোলন হাংরিয়ালিজম— তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক ১৯৬০-এর দশক থেকেই ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার জন্যে রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন।

    সম্প্রতি তাঁর একটি কবিতা পড়ে থ মেরে যাই। সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং দেশ বিভাগ নিয়ে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। কিন্তু মলয় রায়চৌধুরীর এই কবিতার অসাধারণ মর্মান্তিক এবং ভায়াবহ চিত্রকল্প চমকে দেয়! ফাঁসিতে ঝুলন্ত লাশ ঝুলতে ঝুলতে এক বার পাকিস্তান আবার হিন্দুস্থানের দিকে ঝুলছে!</span></li></ul><ul class='list-group my-2 shadow rounded-0 d-print-none'><li class='list-group-item small'><img src=মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:১৬735082

  • কেন লিখি

    মলয় রায়চৌধুরী

    কেন লিখি ভাবনাটা আমার পক্ষে খাটে না। বলতে হবে কেন লিখতে শুরু করলুম। তার পৃষ্ঠপট হিসেবে আমার শৈশবের কথা বলতে হয়। আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ ( ১১.জানুয়ারি ১৮৬৬ - ৮ আগস্ট ১৯৩৩) সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের উত্তরপাড়া শাখার বংশধর হলেও জীবিকা আরম্ভ করেছিলেন ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফার ও আর্টিস্ট হিসাবে; বেশির ভাগ সময় সপরিবারে কাটিয়েছিলেন আফগানিস্তান আর এখনকার পাকিস্তানে। হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দাদু পাটনায় মারা যান যার দরুন তাঁর ছয় ছেলে আর এক মেয়ের দায়ীত্ব বর্তায় ছেলেদের ওপর, যাঁরা কেউই স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ পাননি। দাদু ফারসি, আরবি, সংস্কৃত জানতেন। দাদুর মৃত্যুর পর বাবা রঞ্জিত ( ১৯১২ - ১৯৯১ ) পাটনায় ফোটোগ্রাফি এবং তা থেকে তৈলচিত্র আঁকার ব্যবসায় আরম্ভ করেন। ভাইরা সবাই মিলে স্ত্রীর গয়নাগাটি বেচে ইমলিতলা নামে পাটনার এক বস্তিতে বাড়ি করেন। মানে, আমি ছিলুম ইমলিতলা পাড়ায় কুড়িজনের একান্নবর্তি পরিবারের সদস্য । ইমলিতলা পাড়া ছিল গোলটালির চালাবাড়ি-ঘেরা বিহারি নিম্নবর্ণের অতিদরিদ্র পরিবার ও লখনউ নবাবের হারেমের গরিব শিয়া বংশধর অধ্যুষিত, যারা একই পোশাকে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিতো। পাড়ার লোকেরা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, পকেটমারি, বিড়ি তৈরি, দুধ বিক্রি, ডিম আর ছাগলবাচ্চা বেচে সংসার চালাতো। জাঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোন ছাড়া আমরা ছিলুম দুই ভাই। বড়োজেঠা দেড়শো টাকা দিয়ে এক বেশ্যার কাছ থেকে একটি শিশু কিনেছিলেন, সে ছিল আমাদের মেজদা, পাড়ার প্রভাবে গুণ্ডা হয়ে ওঠে আর কম বয়সে মারা যায়। ইমলিতলা পাড়ায় আমরা বাল্যকাল থেকে ইঁদুর-পোড়া, শুয়োর ও গোরুর মাংস, ছাগলের নাড়িভুঁড়ির বড়া, তাড়ি, দিশি মদ ও গাঁজা ফোঁকার সঙ্গে পরিচিত হই।

     

    পাটনার সম্ভ্রান্ত বাঙালিরা কেউই ইমলিতলায় আসতেন না ; আমার স্কুলের সহপাঠীরাও আসতো না, তার কারণ ইমলিতলা পাড়ার কুখ্যাতি। ফলে, আমরা ছিলুম বঙ্গসংস্কৃতির বাইরের মানুষ এবং আমাদের মনে করা হতো ‘ছোটোলোক’। অর্থাৎ শৈশব থেকেই প্রতিষ্ঠানের মোকাবেলা করতে হয়েছে। পাটনায় ম্যাট্রিক পাশ করার পর দাদাকে কলকাতায় সিটি কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন বাবা, যাতে ইমলিতলার কুসংসর্গে ‘খারাপ’ না হয়ে যান। দাদা উত্তরপাড়ার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের খণ্ডহর-বাড়িতে ঠাকুমার সঙ্গে থাকতেন। আমাদের বাড়িতে প্রথম স্কুল-কলেজে পড়া সদস্য ছিলেন দাদা। সংবাদপত্র-নাটক-উপন্যাস পড়া আর সিনেমা দেখাকে ইমলিতলার বাড়িতে মনে করা হতো অধঃপতনের নিদর্শন। ইমলিতলার বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ ছিলেন, কেননা বড়োজেঠা আর ঠাকুমা ব্রাহ্ম-বিরোধী ছিলেন। পাটনার বঙ্গসংস্কৃতির নিয়ন্ত্রকরা সেসময়ে ছিলেন ব্রাহ্ম। কলকাতায় গিয়ে দাদা সমীর রায়চৌধুরী ( ১৯৩৩ - ২০১৬ ) প্রথমে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন এবং পরে ১৯৬১ সালে আমার সঙ্গে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করেন ; নব্বুই দশকের প্রথম দিকে চাকুরি থেকে অবসরের পর দাদা কলকাতায় এসে “হাওয়া৪৯” পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন।

     

    আমিও ‘খারাপ’ হয়ে যাচ্ছি অনুমান করে বাবা দরিয়াপুর নামে পাড়ায় চালাঘর কিনে বাড়ি তৈরি করেন। আমরা সেখানে উঠে যাবার পর পাটনা শহরের বঙ্গসংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে।

    বস্তুত বঙ্গসংস্কৃতিতে জোর করে প্রবেশের জন্য আমি আর দাদা দুজনেই ইমলিতলার নিষেধগুলো উপেক্ষা করে সংবাদপত্র-নাটক-উপন্যাস পড়া আরম্ভ করেছিলুম। দাদা কলকাতা থেকে তিরিশের দশকের কবিদের বই আর খ্যাতিমান লেখকদের বই আনতেন। মায়ের জোরাজুরিতে আমাকে ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি করা হয়। এই স্কুলের গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তীর প্ররোচনায় আমি রবীন্দ্রনাথসহ বিভিন্ন ব্রাহ্ম ভাবুকদের বই বাড়িতে আনা আরম্ভ করেছিলুম। চাকুরিসূত্রে চল্লিশ বছর সারা ভারতের অজস্র গ্রাম ঘুরে-দেখে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের দাঁত-নখ প্রয়োগের ক্ষমতার সঙ্গে আমার ভালো পরিচয় হয়েছে।

     

    বঙ্গসংস্কৃতিতে প্রবেশের আগল ভাঙার জন্য লেখালিখি জরুরি হয়ে গেল। বাবা একটা ডায়েরি দিয়েছিলেন। আমি তাতে মনের কথা লিখতুম। হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হবার পর বুঝতে পারলুম যে কলকাতায় বিশেষ কিছু মানুষ নিজেদের মনে করেন বঙ্গসংস্কৃতির মালিক। সুতরাং কলকাতাতেও সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলা জরুরি হয়ে দেখা দিল। আমার লেখালিখি মূলত প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতার আধার। আমি টাকাকড়ি, পুরস্কার, সম্বর্ধনা ইত্যাদির জন্য লিখি না। লিখি প্রতিষ্ঠানের ঠেকগুলোর দেওয়াল ভেঙে ফেলার জন্য।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:১৯735083
  •  
    •  
     
     
     

    মলয় রায়চৌধুরী(Malay Roychoudhury)

    4.8 হাজার ফ্রেন্ডরা

    পোস্ট

     

    মলয় রায়চৌধুরী, Shalila RoyChoudhuri-এর সাথে আছেন।

    5 ঘণ্টা ·
    সবাই এর সাথে শেয়ার করা হয়েছে
    সবাই
     
     
    0:00 / 0:46
     
     
     
     

    কৌস্তুভ দে সরকার

    6 নভেম্বর, 2020 ·
    কবি মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে আমার কবিতা -
     
     
     

    1টি কমেন্ট

     

    •  
    Siddhartha Sankar Dhar
    Great
     
    ফুল-এর একটি ছবি হতে পারে
    •  
      • · 5 ঘণ্টা
      • ·
        আপডেট করা হয়েছে
     

    মলয় রায়চৌধুরী

    5 ঘণ্টা ·
    সবাই এর সাথে শেয়ার করা হয়েছে
    সবাই
    মলয় রায়চৌধুরী
    আভাঁ গার্দ ( Avant Garde ) কবিতা : চল্লিশ
    নিবেদিত : আবু’ল মুজ়ফ়্ফ়র মুঈনউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ ফ়ার্রুখ়-সিয়ার আলিম আকবর সনি ওয়ালা শান
    মফসসলের মর্গে পড়ে আছে বেচারা-যুবক চেয়েছিল কবি হতে
    কবেই তো রিগর মরটিস আরম্ভ হয়ে এখন ধরেছে পোকায়...
    আরও দেখুন
     
     
     

    0টি কমেন্ট

     

     

    মলয় রায়চৌধুরী

    6 ঘণ্টা ·
    সবাই এর সাথে শেয়ার করা হয়েছে
    সবাই
    https://sonchak.blogspot.com/
    সোনালী চক্রবর্তীর কবিতা ও গদ্য
    sonchak.blogspot.com
    সোনালী চক্রবর্তীর কবিতা ও গদ্য
    ফাত্রাতুন "শিবে রুষ্টে গুরুস্ত্রাতা গুরুরুষ্টে ন কশ্চন: ইতি কঙ্কালমালিনীতন্ত্রে..." শেষটুকু উচ্চারণের আগেই প্রা...
     
     
     

    0টি কমেন্ট

     

     

    মলয় রায়চৌধুরী

    7 ঘণ্টা ·
    সবাই এর সাথে শেয়ার করা হয়েছে
    সবাই
     
     
    0:01 / 0:46
     
     
     
     

    কৌস্তুভ দে সরকার

    6 নভেম্বর, 2020 ·
    কবি মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে আমার কবিতা -
     

    0টি কমেন্ট

     

     

    মলয় রায়চৌধুরী

    7 ঘণ্টা ·
    সবাই এর সাথে শেয়ার করা হয়েছে
    সবাই
    মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস সম্পর্কে সুরজিৎ সেন-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গৌতম সেনগুপ্ত
    গৌতম সেনগুপ্ত: মলয় কী এমন লেখক যে ওঁর লেখা পড়তে হবে ? মানে কেন পড়ব ?
    সুরজিৎ সেন: কী পড়ব, কেন পড়ব বা পড়ব না --- এটা পাঠকের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর অমুক জিনিস পড়তেই হবে, না পড়লে চলবে না --- এটা মডার্নিজমের সমস্যা। ইচ্ছে হলে পড়বেন, না হলে পড়বেন না।আর তাছাড়া আমি তো বাংলা সাহিত্যের জেলা-কমিটির মেম্বার নই যে গাইডলাইন অনুযায়ী ভালো-খারাপ বলতে না পারলে, আমায় কন্ট্রোল কমিশানের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তার চেয়ে একটা গল্প বলি শুনুন, দীপকদা, মানে দীপক মজুমদার, সমাজের প্রান্তবাসী অর্থাৎ মার্জিনালদের কথা বলতে গিয়ে আমায় গল্পটা বলেন। গল্পটা উনি শুনেছিলেন প্যারিসের এক ভবঘুরের কাছ থেকে। গল্পটা এরকম। দেবদূত কাথকাদ একদিন আকাশের গলিঘুঁজি পেরিয়ে, টাল খেয়ে, টপকে একটা আকাশছোঁয়া বাড়ির চুড়োয় গিয়ে দাঁড়াল। তারপর লাফ দিল নিচের অস্পষ্ট পৃথিবীর দিকে। নিচের পৃথিবী থেকে ভেসে এল অসংখ্য হাততালি, সেই সব দর্শকদের যারা ভেবেছিল এটা আত্মহত্যা। কাথকাদ ওই হাততালিকে অভিনন্দন বলে ভুল ভেবেছিল। এর পর সে আকাশচুড়ো থেকে লাফ দেয়াটাকে রীতিমত অভ্যাসে পরিণত করে ফেলল। ব্যাপারটা বুঝে শহরের মেয়র আঁতকে উঠলেন। এ-ধরণের জিনিস যদি শিশুরা নকল করতে শুরু করে ? কাথকাদকে গ্রেপ্তার করা হল। একটা দমবন্ধ-করা ঘরে রিসেপশানিস্টরা তাকে সেই চেয়ার এগিয়ে দিল, যেটা তার ডানা দুটো রাখার পক্ষে উপযুক্ত নকশায় তৈরি নয়। ইতিমধ্যে মেয়র ও শহরের অন্যান্য কর্তাবাবারা বিচার করে রায় দিল যে, কাথকাদ এক মহা চালিয়াত, তার ডানা দুটো আসলে তার পঙ্গুতারই নিদর্শন। সেই আত্মধিক্কার থেকেই লোকের নজর কাড়ার জন্যে সে এইসব কসরৎ দেখায়। সদ্ধান্ত হল: কাথকাদের গন্ডগোল আছে। ছয়ের দশকের শুরুতে মলয় কাথকাদের মতই লাফ মারেন বাংলা সাহিত্যের পৃথিবীর দিকে। ওই দশকের মাঝামাঝি বাংলা সাহিত্যের মেয়র ও অন্যান্য কর্তাবাবাদের কলকাঙিতে 'অশ্লীল' কবিতা লেখার দায়ে গ্রেপ্তার হন। এবং সিদ্ধান্ত হয় মলয়ের গন্ডগোল আছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যে. ছয়ের দশকের মাঝামাঝি, বাংলা সাহিত্য তখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ [ অবশ্য জীবনানন্দের উপন্যাসের কথা তখনও জানি না, কমলবাবুর উপন্যাস বা আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস তখনও লেখা হয়নি], বামপন্হী আন্দোলন তখন আন্তর্জাতিক তত্ত্বের কচকচিতে ভর্তি, শিল্প-সাহিত্য তখন ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের নিত্যনতুন থিয়রির চর্বিতচর্বণ। সব মিলিয়ে ভাবখানা এরকম, যে, পশ্চিমবাংলা মননের দিক দিয়ে ভারতের সবচেয়ে আধুনিক রাজ্য, ওদিকে সত্যজিৎবাবুরও রমরমা। কিন্তু মলয়ের গ্রেপ্তারের মধ্যে দিয়ে বোঝা গেল সমস্ত ব্যাপারটা কী সাংঘাতিক ভিকটোরিয়ান ছিল। আধুনিকতা-ফতা সব ফালতু। অনেকদিন আগে মলয়ের একটা কথা পড়েছিলাম যে, "আধুনিকতা এক ধ্রুপদী জোচ্চোর"। এর মানে আজ বুঝতে পারি। এ হল ইউরোপিয় এনলাইটেনমেন্ট প্রসূত আধুনিকতা--- যা দিয়ে শাসকপ্রভূদের কলোনিমনন তৈরির অন্যতম হাতিয়ার। যাতে প্রভূদের শিখিয়ে দেয়া গাইডলাইনের বাইরে কেউ কিছু না ভাবে। মলয় বাংলা ভাষায় লেখালিখির মধ্য দিয়ে ব্যাপারটায় একটা টোকা দেন। তাতেই হৈ হৈ ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত নকশালরা এই ব্যাপারটিকে ধাক্কা দেয়। পরে অবশ্য তারা আরেক ধরণের ভিকটোরিয়ানিজমের জন্ম দেয়। যা হোক, মলয় যে তখন থেকেই মেইনস্ট্রিমের বাইরেই রয়ে গেছেন --- মানে বুঝতেই পারছেন ছয়ের দশকের মেইনস্ট্রিম আর নয়ের দশকের মেইনস্ট্রিম --- এক নয়। এই জন্যেই মলয়ের লেখা পড়া দরকার।
    গৌতম সেনগুপ্ত: এত মেটাফরে কথা বললে তো খুব মুশকিল। মলয়ের গল্প-উপন্যাসের বৈশিষ্টটা কী ? যেখান থেকে ওই লাফ-টাফ বা কাথকাদের কথা আসছে।
    সুরজিৎ সেন: মেটাফরেই তো কথা বলতে হবে। জানেন না কোথায় বাস করছি ? যাকগে, যা বলছিলুম, শাসকপ্রভূরা আমাদের জন্য তৈরি করে দিয়ে গেছেন ভাষা-কাঙামো, পদ্ধতি, বিন্যাস। এই দিয়েই যাবতীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি। মলয় গল্প-উপন্যাসে শুরু থেকেই ওই মাস্টারদের তৈরি ল্যাঙ্গোয়েজ-জেল ব্রেক করে বেরোবার চেষ্টা করেছেন। কারণ লেখালিখির শুরুতেই যে ভাবেই হোক না কেন, বুঝতে পেরেছিলেন মলয়, যে, নেহেরুভিয়ান সরকারি খরচে যে বিশাল কেরানি-আমলা সমাজটির বাড়বাড়ন্ত, তাদের জন্যে উপনিবেশের ডিমটি ফেটে বেরিয়ে পড়েছেন কমার্শিয়াল কথাসাহিত্যিকরা, আধুনিকতার দুরারোগ্য ব্যাধি হিসেবে।এই মানচিত্রের বাইরে মলয় চলে যেতে পেরেছেন। অবশ্য তার মানে এই নয় যে মলয় কোনও নবদিগন্ত উন্মোচন করেছেন। কিন্তু কতকগুলো ব্যাপার আছে। লেখার ব্যাপারে মলয় কাউকে পরোয়া করেন না, এমনকি নিজেকেও নয়। লেখার মধ্যে দিয়ে তত্ত্ব বিক্রি করেন না, আর প্রগতিশীল বামপন্হী হবার লোভ কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। মলয় বোধহয় বাংলা ভাষার একমাত্র লেখক যাঁর বইয়ের কোনো কপিরাইট থাকে না। এটা উনি করতে পেরেছেন তার কারণ গল্প-কবিতা-উপন্যাস লিখে কোনওদিন কোনও লেখক-প্রতিষ্ঠা চাননি--- মানে লেখক নিজেই একটি ব্র্যান্ড নেম, তাঁর লেখার প্যাকেজিং, রিভিউ ডিজাইন, সেলেবিলিটি, মিডিয়া হাইপ--- মলয় এসব চাননি। সোজা কথায়, লিখে বাড়ি গাড়ি বউ রাঁঢ় ট্রাকটর এসব করতে চাননি। এরপর প্রশ্ন উঠবে, চাইলেই কি পেতেন ? জানি না। খুব বড় সরকারি চাকরি করতেন --- এসব নিয়ে যাতে ভাবতে না হয়। সেই মেধা, যোগ্যতা ওঁর ছিল। আর এই দুহাজার সালেও তো বাংলা গল্প-উপন্যাসের পাঠক হিসেবে ৬০ পেরিয়ে-যাওয়া মলয়ের উপরউ ভরসা করে আছি। অথচ আমি চাই আমার বয়সের (৩৮/৩৯) কোনও লেখকের উপর ভরসা করতে। পারছি কই ? কেউ তো নজরে পড়ছে না।
    গৌতম সেনগুপ্ত: এ তো গেল মলয়ের গদ্য ইন জেনারাল, কিন্তু 'নামগন্ধ'টা নিয়ে আলাদা করে…
    সুরজিৎ সেন: মলয়ের প্রথম উপন্যাস 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস', দ্বিতীয় উপন্যাস 'জলাঞ্জলি', তৃতীয় 'নামগন্ধ'--- একটা জার্নি 'ডুবজলে' শুরু হয়ে ভায়া 'জলাঞ্জলি' শেষ হচ্ছে 'নামগন্ধ'-এ। কিসের জার্নি ? না, অরিন্দম বলে একটি ছেলে খুব বড় সরকারি চাকরি করে পাটনায়, পাটনা থেকে বদলি হয়ে আসছে কলকাতায়। অবশ্য এর মানে এই নয় যে উপন্যাসগুলো আলাদা করে পড়া যাবে না। পড়া তো যাবেই; কারণ প্রতিটি উপন্যাসই স্বয়ংসম্পূর্ণ। অরিন্দম কলকাতায় আসার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের কথকতা শুরু হয়ে যায়। বালির ভোটবাগানে বজরং মার্কেটের (এশিয়ার বৃহত্তম স্ক্র্যাপ আয়রনের বাজার ) দখলদারির জন্যে একটা খুন দিয়ে উপন্যাসের শুরু। আর যা দলটি খুন করছে তাদের একজনের সবুজ টিশার্টে সাদা হরফে লাখা 'ভ্রূপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে'। মলয় কিন্তু আমাদের চারপাশের ভায়োলেন্সটাকে সব সময় লিখছেন। আর এই উপন্যাসে রিয়েলিটি আর প্রতীকের একটা নকশা তৈরি করেছেন। রিয়েলিটি হল, আদিত্য বারিক, যে, পুলিশের এ এস আই-এর চাকরি পেয়েছে, 'ওর আদর্শ হল রুণু গুহনিয়োগী নামে একজন প্রাক্তন অফিসার, যদিও তার সঙ্গে আদিত্যর পরিচয় নেই, কিংবদন্তি শুনেছে, কাগজে পড়েছে, আদালতে গিয়ে দেখেছে সহকর্মীদের সঙ্গে, জয়ধ্বনি করেছে, যখন অযথা বিচার চলছিল লোকটার। জ্যোতি বসুর মতন কর্মজীবী মুখ্যমন্ত্রী ওব্দি রুণু স্যারের কদর করে পদোন্নতির ধাপ একের পর এক এগিয়ে দিয়েছিলেন ওনার দিকে'। ( নামগন্ধ পৃ ৫ )। আপনি তো জানেন রুণু গুহনিয়োগী কে ? কী ব্যাপার ? আর প্রতীকটা হল ওই 'ভ্রূপল্লবে...', আশা করি বুঝেছেন। এখনকার পশ্চিমবঙ্গের সার সত্যটি মলয় জানিয়েছেন এই ভাবে, 'এ এস আই-এর চাকরি পেয়ে নিজেকে সুসজ্জিত করে তোলার অভ্যাসে কিছুটা রদবদল করেছে ও, আদিত্য। এখন ও জনসনের বেবি পাউডার, বাচ্চাদের সাবান, শ্যাম্পু, শিশুদের ক্রিম আর অলিভ অয়েল ব্যবহার করে। আগেকার এক আই জি, এখন দুটো কারখানার মালিক, শিখিয়ে ছিলেন জীবনদর্শনটা। নিষ্পাপ থাকার নিজস্ব গন্ধ আছে, বুঝলে হে, পুলিশ অফিসারের উচিত সেই গন্ধটাকে সবচেয়ে আগে দখল করা। ফি বছর পুজোয় অধস্তন অফিসারদের জন্য শিশুদের ব্যবহার্য সাবান-পাউডার-ক্রিম-শ্যাম্পুর সারা বছরের কোটা উপহার পাবার ব্যবস্হা করে দিতেন উনি...। আদিত্যর এখনকার চাকরিটা মাঙনায় হয়নি। দেড় লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছিল। বাড়ি বয়ে একজন প্যাংলা ডাকমাস্টার জানিয়ে গিয়েছিল কার সঙ্গে কখন দেখা করলে চাকরিটা হবে। ডাকমাস্টারহীন বাঙালিসমাজ ভাবা যায় না। এরা থানার জন্য টাকা তোলার অঞ্চলভিত্তিক ঠিকেদারি নেয়।পুলিশে ঢোকার আগে আদিত্য জানতোই না যা তথ্য আর সংস্কৃতির এরা বাঙালিজীবনে চাবিকাঠি' (নামগন্ধ পৃ ৭)। উপন্যাসের অন্যতম মহিলা চরিত্র খুশি, ভারতের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে যার বয়স পঞ্চাশ। খুশি তার নিজের দাদার বাড়ি চাকরানী হয়ে বন্দি। দাদা ভবেশ এখন গ্রামের রাজনীতির দন্ডমুন্ডের কর্তা। খুশির আজও বিয়ে হয়নি। প্রথম বিয়ের সম্বন্ধ হয় ১৯৭১ সালে, হবু বরের মুণ্ডহীন ধড় পাওয়া যায়--- সে নাকি নকশাল ছিল। দ্বিতীয় হবু বর সফল আড়তদার হঠাৎ পুড়ে মারা যায়। শেষ অবধি পূর্ব পরিচিত যিশু বিশ্বাস খুশির প্রেমে পড়ে তাকে দাদার হাত থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে ডাকাত সন্দেহে গণপ্রহারে মারা যায় গ্রামবাসীদের হাতে। খুশি যেন আমাদের ভারতবর্ষ। যারাই তাকে উদ্ধার করতে যায় তাদের কপালে বোধহয় অপঘাতে মৃত্যুই লেখা আছে। অরিন্দম বর্ণহিন্দু, আদিত্য নমশূদ্র, যিশু খ্রিস্টান। উপন্যাসের শুরুর খুনের পরেই আমরা দেখি ১৮/১৯ বছরের একটা ছেলেকে একদল লোক পিটিয়ে মেরে ফেলছে এবং তারপর 'ছেলেটা মরে গেছে নিশ্চয়। তবু ওকে পিটিয়ে যাচ্ছে লোকগুলো। মৃতদেহ পিটিয়ে তার জীবন্ত অতীতের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা খুঁজছে লোকগুলো। অরিন্দম পড়ে গেছে সেই ভাষাসন্ত্রাসের খপ্পরে'।(নামগন্ধ পৃ ৭)।আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসীরাও কিন্তু এই ভাষাসন্ত্রাসের খপ্পরে পড়ে গেছি। ইংরেজরা লুটে-পুটে খেয়ে, ভাষার কিছু প্রণালিবদ্ধ কাঠামো অন্যান্য উচ্ছিষ্টের সঙ্গে আমাদের জন্য রেখে যায়।যেমন ইংরেজি Bitter Experience শব্দটির বাংলা হল 'তিক্ত অভিঞ্জতা'। মানে খুব খারাপ কিছু প্রত্যক্ষ বা অনুভব করা। অথচ আমাদের বাঙালি জিভে উচ্ছে নিম করলা সুক্তো--- এই সব তিক্ত স্বাদ বা অভিঞ্জতা খুবই উপাদেয়। যেহেতু সাহেবরা Bitter Experience বলতে খারাপ কিছু বোঝায়, তাই আমাদের ভাষাবিদরাও খারাপ কিছু বলতে 'তিক্ত অভিঞ্জতা'ই বুঝেছেন। ছোটগল্প-উপন্যাস বলতে কী বোঝায়, অক্সব্রিজসরবনের সাহেবরা যেমন-যেমন বলে গেছেন, আমাদের শিক্ষকরা বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছেন। আজ সেই মৃত ভাষাটিকে হাজার পিটিয়েও তার জীবন্ত অতীতের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে না। মলয় তাঁর লেখালিখির শুরু থেকেই এটা ধরতে পেরে সেটাকে ফাঁসিয়ে দেবার চেষ্টা করে গেছেন বরাবর। 'নামগন্ধ'ও তার ব্যতিক্রম নয়। আর রসবোধ--- যেটা বাংলা লেখালিখিতে ক্রমশ বিরল হয়ে এসেছে, সেটার একটা চমৎকার সূক্ষ্ম ব্যবহার মলয় করেছেন তাঁর উপন্যাসগুলোয়। এমনিতে মলয়ের লেখার কোনো মডেল নেই। চরিত্ররা নিজেরা নিজেদের গুরুত্বহীনতায় ভোগে, ভঙ্গুর, টাল-খাওয়া, পোস্টকলোনোয়াল মতদ্বন্দ্বের, জটিলতার, আলাপচারিতা--- এই হল মলয়ের লেখা। এই ভঙ্গীটা আমাদের ভাষায় নেই বললেই হয়। আর এই জায়গা থেকেই জমে যায় মলয়ের উপন্যাস। 'হিমঘরের পিওনটাও চড়া দামে বন্ড কেটেছে ইউনিট ম্যানেজারের চোখের সামনে। পিওনটা গ্রুপ থিয়েটার করে। ওদের নাটক দলটার নাম প্রতিবাদী সভা। একাডেমিতে নীলদর্পণে ভালো অভিনয় করেছিল'--- ( নামগন্ধ পৃ ৯৫ ) ক্লাস।এই হিমঘর---আলু চাষির দুর্দশা---আলু পচে যাওয়া---বামপন্হীদের বদমাইসি--- এই সব পাবেন 'নামগন্ধ' উপন্যাসে। সত্যিই একটা নিষিদ্ধ পশ্চিমবঙ্গের ছবি। আম কেমন খেতে সেটা শোনার চেয়ে খেয়ে দেখা ভালো--- সোজা কথা, উপন্যাসটা পড়ে ফেলুন।
     
     
     
  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২১735084
  • পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর সাহিত্য
    মলয় রায়চৌধুরীর প্রধান দৃষ্টিকোণ ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার। আর সেই সঙ্গে মলয় ‘সাহিত্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মলয় রায়চৌধুরী মনে করেন, ‘প্রতিষ্ঠান একটা প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠান কোনো অরগানাইজেশান নয়। তা চাগিয়ে ওঠে শাসনের মূল্যবোধ থেকে। মলয় আরও বলেছেন, এই ইনট্রিনজিক ফ্যাসিজমই এসট্যাবলিশমেন্ট। ’ সব মিলিয়ে এটাই দাঁড়ায়,, মলয়ের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আসলে সামাজিক দায়বদ্ধতা। আর প্রতিষ্ঠান মানে শাসকের, শাসনের মূল্যবোধ। মলয় প্রতিষ্ঠান বলতে কোনও দল, আমলাতন্ত্র, চার্চ-মসজিদ, হিন্দুধর্মকেন্দ্র, শিক্ষাব্যবস্হা ইত্যাদিকে পৃথকভাবে নির্দিষ্ট করেন না ; করেন মূল্যবোধকে। শাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসমাজ ও জনসমাজ যে-মূল্যবোধ, তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যে দমননীতি-সম্মতির বিভিন্ন হাতিয়ারকে ব্যবহার করে, তাকেই মলয় প্রতিষ্ঠান ভাবেন, এবং তা একটি প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠান এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না, একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে তার কর্ষিকাগুলি ছড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্র থাকলে যেমন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থাকবে, সমাজ -- সে রাষ্ট্রীয় বা জন যাই হোক, থাকলেই প্রতিষ্ঠান থাকবে। আর প্রতিষ্ঠান থাকলেই তার কর্তৃত্ব থাকবে, যে-সমাজে প্রতিষ্ঠানটি শিকড় গাড়ে, শাঁসে-জলে বাড়ে, তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য হিংস্র ও অহিংস্র নানা উপায় সে অবলম্বন করে। এর বিরুদ্ধে লড়াই তাই মূল্যবোধের, চৈতন্যের। আর এ লড়াই সার্বিক ; ব্যক্তিগত ও বৃহত্তর মাত্রা উভয় স্তরেই।
    মলয়ের জীবনকাহিনির যেটুকু অংশ তাঁর লেখাতেই প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এই লড়াইয়ের একটা ছবি পাই। অবশ্য এ বৃত্তান্ত পরবর্তী সময়ের, ১৯৬১-১৯৬৫-এর মধ্যে তিনি তরতাজা যুবক হিসাবে কী ভাবতেন, তা জানা যায় না। সেই সময়ের দিনপঞ্জিকাটি থাকলে আরও বোঝা যেত। কারণ ওই যে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান একটা প্রক্রিয়া, একটি মূল্যবোধ, তাতেই স্পষ্ট ১৯৬১-৬৫-এর মলয় রায়চৌধুরী আর ২০০০ খ্রিস্টাব্দের মলয় রায়চৌধুরী যেমন এক নন, তেমনি সেই সময়ের প্রতিষ্ঠান আর এখনকার প্রতিষ্ঠান, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হুবহু এক নয়।
    ১৯৬৫ থেকে ২০০০-এর মধ্যে এখানে সময় খুব দ্রুত এগিয়েছে-পিছিয়েছে, একটা অপরিবর্তনীয় গতিতত্বে যেন নানা ওলটপালটের মধ্যে আবার আগের স্হিতাবস্হায় ফিরে গেছে, কিন্তু আরও চরিত্রহীন, আরও নপুংসক হয়ে। আমরা যারা মলয়ের সমবয়সী প্রায়, তাদের কাছে ১৯৬১-১৯৬৫-এর মলয়ের নৈরাজ্যিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, ওই সময়ে নঞর্থক মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল সামাজিক দায়হীন। কিন্তু আজকের অবসন্নতায় ওই
    বিদ্রোহকে সদর্থক মনে হয়। বিশেষ সময়ে অ্যানার্কিও তো সদর্থক বৈপ্লবিক হতে পারে।
    মলয় রায়চৌথুরীর ১৯৬০র দশকে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ও তারপরে নীরব থেকে ১৯৮০র দশকে অন্যভাবে দেখা দেওয়া, আমাদের মধ্যবিত্ত বিদ্রোহের এক প্রতীকি চিত্র। সেই ১৮২০-৩০এর দশকের ডিরোজিয়ানদের সময় থেকেই এই পরম্পরা আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেনিতে আছে। ওই বিদ্রোহটাও যেমন সত্যি আবার প্রতিষ্ঠানে ঢুকে যাওয়াও তেমনি সত্যি। উপনিবেশ ও ১৯৪৭-এর পরের অব-উপনিবেশের বাস্তবে ক্রিয়াশীল উৎপাদন সম্পর্কশূন্য বৃহত্তর জনসমাজ ও জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত এই বিদ্রোহ, এই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতাকে তুচ্ছ করা অনৈতিহাসিক, কারণ মধ্যশ্রেনির ইতিহাসের নিরন্ধ্র অবসন্নতা ও করুণ আত্মসমর্পণে, ট্র্যাজেডি নয় ফার্সে,
    এই ক্ষণস্ফূলিঙ্গগুলিই একমাত্র বাঁচবার ইঙ্গিত। এদের ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীগত ব্যর্থতা প্রায় অনিবার্যই ছিল। তবু, তারা যে কম্পন নিয়ে এসেছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হয়।
    মলয় রায়চৌধুরীর নিজের সাক্ষেই বোঝা যায়, একটা টানবাপোড়েন গোড়া থেকেই ছিল। মলয় দেখাতে চেয়েছেন তিনি প্রায় স্কুলে পড়াশুনা ন-করার ভূমি থেকে এসেছেন। তাঁর দাদা সমীরই তাঁদের বাড়ির প্রথম স্কুলে-পড়া, কলেজে-পড়া। অর্থাৎ যে ঔপনিবেশিক শিক্ষায় বাঙালি মধ্যবিত্ত জারিত, তার শেকড় তাঁদের পরিবারে ছড়ায়নি, তাঁর প্রজন্মেই এর সূত্রপাত। কিন্তু ওই প্রথম প্রজন্মেই এই শিক্ষার ধার তীক্ষ্ণ হয় ; ‘এদিকে মলয় আমার ছোটোভাই তখন অর্থনীতির স্নাতকোত্তর ক্লাসের শেষ বছরের ছাত্র। সারাদিন ঘাড় গুঁজে বিস্তর বই পড়ে ; সমাজ নিয়ে, পৃথিবী নিয়ে অনেক ভাবনা,
    কথায়-কথায় এঙ্গেলস, কিয়ের্কেগার্দ, মার্কস, স্পেঙ্গলার ইত্যাদি থেকে উদ্ধৃতি দেয়। পাটনায় গেলে আমাকে কেবলই বলে, “সাহিত্য এইভাবে এলোমেলো হয় না ; একটা পরিকল্পনা মতো এগোনো উচিত। কী বলতে চাও, করতে চাও, সবার আগে সেটা ঠিক করো, আন্দোলন চালাও। আন্দোলন দরকার।”...’
    সমীরের এই ছবিতে কোনও নৈরাজ্যবাদী মলয়কে পাই না। বরঞ্চ ইয়োরোপমুখী এক যুবককে, যে পরিকল্পনা চায়। এই যুবক অব-উপনিবেশের যুদ্ধ-দাঙ্গে-দুর্ভিক্ষ-দেশভাগ ধর্ষিত কলকাতায় এসে পালটায়, কলকাতা তাঁকে পালটায়। তাঁর অ-নাগরিক অভ্যাস কলকাতায় বেমানান -- কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত অ-নাগরিক অভ্যাসকে তিনি প্রলেতারিয় ভাবছিলেন। নিজেকে শ্রেনিচ্যূত করতে চাইছিলেন। আর এই জন্যই একটা জীবনযাপন বেছে নিয়েছিলেন যা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের পক্ষে দুঃসহনীয়। ঠিক যেমন একদা ডিরোজিয়ানরা বেছেছিলেন -- তখন মদ্যপান, গোমাংসভক্ষণ ছিল হিন্দু ভদ্রলোকের পক্ষে ক্রোধের কারণ, যদিও অনেক ভদ্রলোকই আড়ালে মদ্যপায়ী, বেশ্যাগমনে অভ্যস্ত। । কিন্তু ডিরোজিয়ানরা এসব করছিলেন প্রকাশ্যে, একটা বিদ্রোহের আদলে। মলয় নিজেদের অবস্হাকে বলেছেন ‘ষাট দশকীয় ফাটিচার’। কলকাতার সাহিত্য মহলে আর্টেমিস-ক্রেসিডা-ইউলিসিস এসব নামে অস্বস্তিবোধ করতেন তিনি, কিন্তু “আমাদের মগজে রেজিস দেবরে, আরনেসতো চে ভারা, ফিদেল কাসত্রো নামগুলো বরঞ্চ মিহিন ঘণ্টাধ্বনি শোনাচ্ছে। ”
    এঁরাও সকলেই বিদেশের -- তবে অন্য ভূবনের। ষাট দশকের কলকাতার বিপরীত টানেই পাটনার সিরিয়াস যুবক মলয় রায়চৌধুরী তাঁর প্রতিষ্ঠাবিরোধিতার নৈরাজ্যিক আকাশে মুক্তি চাইলেন। এই কলকাতাই তাঁকে বুঝিয়েছিল, ‘ষাটের দশকে সুস্হতা সত্যিই অবাস্তব ছিল।’ মলয়ের এই সিদ্ধান্ত ইতিহাস-বোধে উজ্বল। ষাটের দশকে যে সুস্হভাবে বাঁচা অবাস্তব ছিল, তার প্রমাণ সেই দশক জুড়ে নানা ধরনের বিদ্রোহ যার শীর্ষবিন্দু নকশাল অভ্যূথ্থান। মলয়দের আন্দোলন, নকশাল আন্দোলনের একদিকের পূর্বাভাস। তিনি দেবরে, গ্বেভারা, কাসত্রোর কথা বলেছেন, তাতে বোঝা যায় তাঁর অন্তরে তিনি, ব্যক্তিগত নানা ট্যাবু ভাঙার মধ্যেই, একটা রাজনৈতিক বীক্ষা বহন করতেন। ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ নামে বইও লিখেছিলেন। এই বীক্ষা তাঁর বিদ্রোহে সেইভাবে উপরিস্তরে আসেনি, কিন্তু অনেক হাংরি যে পরে নকশাল হয়েছিল, তার কারণ কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত কারাগার ভেঙে ফেলার আগ্রহ। মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন, তিনিও গুণ্ডা-মাস্তান হয়ে যেতেন, কবিতা না-লিখলে। নিজেকে কবিতা লেখার ক্রিমিনাল বলেও অভিহিত করেছেন। আর এক -এক করে সেই কবিদের নাম করেছেন যাঁদের জেলে বা জেলের বাইরে খুন করা হয়। মলয় নকশাল প্রসঙ্গ আনেন তাঁর ‘হাংরি কিংবদন্তি’ বইতে। ঠিকই করেন। মলয়ের বিদ্রোহ ছিল দক্ষিণ ও বাম দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই -- অন্তত মলয় তাঁর পঠন-পাঠন থেকে, বুদ্ধিগত জগৎ জগৎ কোনও সময়েই রাজনৈতিক বীক্ষার অন্তঃসলিলা স্রোতকে ফেলে দিতে পারেননি। জীবনযাপনের নৈরাজ্যের মধ্যেই একটা বুদ্ধিগত, মননগত স্তর তাঁর থেকেই গিয়েছিল। কবিতা ও সাহিত্যকে কেন্দ্রবিন্দু রাখায় ব্যক্তিক জীবনযাপনের তীব্র নেশাগ্রস্ত নৈরাজ্যই তাঁর কাছে বিদ্রোহের মূল ধরণ হয়ে ওঠে।
    এটাকে মেলাতে চান কবিতায়। কিন্তু হাংরি প্রজন্মের সাহিত্যগত কীর্তি কবিতায় নয়, গদ্যে। ওই কিংবদন্তি, ওই ছাপ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের মূল্যায়ন করলে, গদ্যই থাকবে ; অন্তত আমার মতো পাঠকের কাছে, যার চিন্তাভাবনাকে, নকশাল অভ্যূথ্থান, ব্যর্থ হলেও ওলোটপালট করে দিয়েছিল। ওই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা অবশ্যই স্পষ্ট, তবুও। তেমনি ষাটের দশকে একদল যুবকের ব্যক্তিক জীবনের নিরুদ্দেশযাত্রী হওয়ার তাৎপর্য এখন ধরা পড়ে। এই নিরুদ্দেশযাত্রার মূল্য অবশ্যই তাদের দিতে হয়েছে। তবে যেহেতু নকশাল বিদ্রোহ রাষ্ট্রকে খানিকটা ভীত করে তুলেছিল, তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জনসমাজের সমর্থনে এ-বিদ্রোহের ওপর ভয়াবহভাবে নেমে আসে। ওই বাস্তব অসহ্য-লাগা যুবকদের হত্যা করে, অনেককেই সারা জীবনের মতো পঙ্গু করে দেয়। এই বঙ্গে এ-আন্দোলন নির্মমভাবে দমিত হলেও, ওই প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ সম্পর্কে একটা প্রশ্ন, সংশয় ও আন্দোলন রেখে গেছে। তার আগের মলয়দের হাংরি আন্দোলন জেল-মামলাতেই শেষ হয়। মলয়ও সেই নকশালদের মতো, যাঁরা শেষ পর্যন্ত এই সমাজে, প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে আত্মস্হ হয়ে যান ; এমনকি ওই অতীতকে কাজে লাগিয়ে, পুঁজি করেন। এ সত্ত্বেও মলয় রায়চৌধুরীর ষাটের দশকের বিদ্রোহ মিথ্যা হয়ে যায় না,
    অন্তত তিনি তাকে তাঁর অন্যান্য বন্ধুদের মতো ( সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রমুখ ) প্রকাশ্যে পুঁজিও করেননি। এ-প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, মলয় রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানবিরোধি বিদ্রোহ যে পুলিশ-আদালত-জেল-মামলার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তার নিষ্পত্তি কিন্তু প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপেই হয়। তাঁর বন্ধুরা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ও মুচলেকা দিয়ে মুক্তিলাভ করেন। মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন, “লালবাজারে পুলিশ কমিশনার বললেন, তিনি আমাকে সাব ইন্সপেক্টরের চাকরি দিতে চান, কারণ সাজা হবার ফলে ( দুশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড ) আর কোথাও চাকরি হওয়া মুশকিল। পরে জেনেছি অ্যালেন গিন্সবার্গ পুপুল জয়াকরকে চিঠি লেখার পর জয়াকর তা ইন্দিরা গান্ধিকে জানান ; দিল্লির নির্দেশে কলকাতার বাঙালি পুলিশ তখন ফাঁপরে।” মলয় রায়চৌধুরীর পাশে এসে দিল্লির প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছিল, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক স্তরভেদ আছে। আর লক্ষণীয় গিন্সবার্গের ভূমিকা। তিনি কিন্তু ‘কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডাম’-এর পাণ্ডাদের
    সাহায্য চেয়েছিলেন -- আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রত্যাখ্যান করেন এ সাহায্যের আবেদন। প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলনের নেতার এরকম আশ্রয় থেকে বোঝা যায় মলয়দের নিয়ে এসট্যাবলিশমেন্ট খেলছিল। নকশাল-আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এই বঙ্গেও ওই খেলা নানাভাবে দেখা যায়। তার আগে সন্ত্রস্ত প্রতিষ্ঠান তাদের একের পর এক হত্যা করেছে -- আর সেই হত্যার এ-বঙ্গের প্রতিষ্ঠানের নায়করা পরবর্তী বাম-রাজত্বে থেকেছেন ; শুধু তা-ই নয়, উন্নতি করেছেন। যেমন, যে সোমেন চন্দকে নিয়ে আজ বামপন্হী মহল উচ্ছ্বসিত, যাঁর হত্যার বিরুদ্ধে ধিক্কার বারবার উচ্চারিত, তাঁর হত্যার ‘প্রকৃত ঘটনা হল এই যে, সোমেন চন্দ রেলওয়ে শ্রমিকদের নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে শুধু ফ্যাসিবিরোধী
    সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঢাকার নারিন্দাপুল পার হয়ে বটগাছের কাছেই আর. এস. পির ঘাতকবাহিনী ঘিরে ফ্যালে সোমেন চন্দকে। তারপর নির্মমভাবে হত্যা করে।’ এই আর.এস.পি এখন বামফ্রণ্টের শরিক ও মন্ত্রী। এরাই ফ্যাসিস্ট বাহিনীর মদতদাতা ছিল। প্রতিষ্ঠান কতো খেলাই খেলে, কতো রঙই বদলায়।
    মলয় রায়চৌধুরীও ওই খেলার পুতুল হয়ে ছিলেন। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় তিনি মামলা-আদালত জেল-জরিমানার যে ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন, প্রতিষ্ঠানই তার থেকে তাঁকে বাইরে নিয়ে আসে।
    অবশ্য মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে এসব কথা এখন অবান্তর। কারণ তাঁর সম্পর্কে এখন আমি যে লিখছি তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বা আদালত-মামলা জেল-জরিমানার বৃত্তান্তের জন্য নয়। মলয় নামক একজন কবি ও ঔপন্যাসিকই আমার আগ্রহের মূলে। তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার তাৎপর্যই এই সূত্রে বিবেচ্য। এক একজন পাঠক এক একজন লেখক ও আন্দোলনকে নিজের নিজের মতন করে দেখেন। আমার কাছে শুধু মলয়ই নয়, গোটা হাংরি জেনারেশনের লেখকদেরই গদ্য যতো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, কবিতাকে তেমন মনে হয়নি। যে-কোনও কারণেই হোক, কবিরা, বোধহয় ইয়োরোপ আমেরিকা কবিদের জীবনকাহিনি শুনে পঞ্চাশের দশক থেকে ব্যক্তিজীবনের হুল্লোড় ও নানারকম কাজ কারবারকে গুরুত্ব দিতে থাকেন, ফল হয় কবিতার অধঃপতন যা এখনও চলছে। মলয়ও তাই করেছিলেন। কিন্তু গদ্যে একেবারে বিপরীত।
    হাংরি আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে মলয় লিখেছেন, ‘স্হিতাবস্হা ভাঙার ভাষাই নয় কেবল, ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার চেষ্টাই চালিয়েছেন। ’ গদ্যে এটাই প্রকৃত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
    বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালার’ নামও করতে পারি। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে এটা আদৌ হয়নি। ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার কোনও লক্ষণই নেই। আর যেহেতু জীবনযাপন কবিতাকে চিৎ করে ফেলছিল, সেহেতু ওই জীবনযাপনের তাৎক্ষণিক অনুভূতি কবিতায় এমনভাবে অন্তত মলয়ের কবিতায় আসতে চাইছিল, যাতে কবিতার থেকে ওই অনুভূতিই বড়ো হয়ে ওঠে। জীবন কবিতাকে খেয়ে ফেললে মুশকিল, জীবনের ক্ষুধাকে কবিতার রসায়নে দাঁড়াতে হয়। আজ এই ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ভাবতে অবাক লাগে মলয়ের বেশ কাঁচা কবিতা
    ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ অতো হৈ-চৈ, অতো শিরঃপীড়ার কারণ কেন হয়েছিল। একেবারে মধ্যবিত্ত ভাষা জর্জরিত মধ্যবিত্ত কবিতা এটি :-
    “অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
    যোনিকেশরে কাচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্হতা
    আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
    আমি বুঝতে পারছি না কি জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
    শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
    কবিতার জন্য আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
    শুভা আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ করতে দাও
    দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
    বেসামাল হৃদয়বেত্তার স্বর্ণসবুজে”
    যে-নিম্নবর্গীয় ভাষার আক্রমণে ভাষার স্হিতিস্হাপকতাকে বিপন্ন করার ভাবনা মলয়ের, এই উদ্ধৃতিতে তার কি কোনও চিহ্ণ আছে ? যোনি, স্তন, বীর্য -এসবই সংস্কৃত শব্দ। এদের নিম্নবর্গীয় শব্দ মলয় ব্যবহার করেননি। এসব শব্দ এলিট পরম্পরায় বহু ব্যহৃত। আর ‘অশ্লীল’ এই ধারণাটির স্হান-কাল-পাত্র আছে। এখন আর তথাকথিত অশ্লীল দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ঘুম কাড়া যায় না, কারণ সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানই তো অশ্লীল --- অশ্লীল অর্থনীতি, অশ্লীল রাজনীতি, অশ্লীল সমাজ, রাস্তায় ঘাটে একেবারে মধ্যবিত্ত ছোকরাই দু-তিন-চার অক্ষরের শব্দ প্রকাশ্যে বলে। নিম্নবর্গীয়দের অশ্লীল শব্দের যে পেশলতা, যে চিত্রকল্প, যে জোর, তা এই অশ্লীলতায় নেই -- মলয়ের কবিতায় ‘পাজামায় শুকিয়ে যাওয়া বীর্যের’ মতোই সৃষ্টিহীন, অসুস্হ। আসলে ষাটের দশকে মলয় রায়চৌধুরী এক ধরনের আরোপিত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় মেতেছিলেন, অথচ তাঁর চৈতন্যে গভীর বোধ ছিল। সেই বোধ জীবনযাপনের তীব্রতায় হারিয়ে যেতে থাকে। তাঁর মনে হয়, অশ্লীলতা বুঝি শুধু যৌনতাবাচক শুধু কতকগুলি শব্দ। এটা যে সামগ্রিক মূল্যবোধ-জনিত, আর প্রতিষ্ঠান যে অশ্লীল হয়ে উঠেছে সব দিক দিয়ে, বাইরের পোশাকের আড়ালে অশ্লীল, সেটা হয়তো বুঝতে পারেননি। ১৯৬৫ সালের পর মলয় এর থেকে বেরিয়ে আসেন।
    মলয় তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার, প্রত্যাখ্যানের যথার্ধ পরিচয় রাখেন তখন, যখন তিনি ওই ষাটের দশকের জীবনযাপনের গণ্ডি থেকে সরে এসেছেন, আপাতদৃষ্টিতে যেন প্রচলিত মধ্যবিত্ত জীবনের মধ্যে এসেছেন। ‘তারপর দেড় দশক আমার লেখালিখি ছেড়ে যায়। জীবন কাটানোর ভাবনায় বন্ধুবান্ধবে আত্মপ্রকাশে আর্থিক অবস্হায় এই দেড় দশকে আমূল পরবর্তন ঘটে যায় আমার মগজে ও শরীরে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাসে। ’ ‘এখন তো আমার সেই সময়ের জীবনটাকে ভয়াবহ মনে হয়। এখন ভালো চাকরির পাতি-বুর্জোয়া আরামে প্রতিবাদ প্রতিরোধের লেখালিখি অনেক আরামদায়ক আর সহজ।’ ‘ক্রমশ একলা থাকার মধ্যেই নিজের আরাম আনন্দ
    শান্তি টের পাই। ’ অর্থাৎ এখন জীবনযাপন মলয়ের লেখাকে ছাপিয়ে যায় না।
    প্রতিবাদ-প্রতিরোধের লেখাই তো ষাটের দশকে মলয় লিখতে চেয়েছিলেন, তাতে পুলিশ, আদালত, অশ্লীলতার অভিযোগ, জেল-জরিমানা, লকাপে রাতকাটানো। এখন সেটা অনেক আরামদায়ক ও সহজ। কেন ? তবে কি প্রতিষ্ঠান তার মূল্যবোধ পালটেছে ? নাকি তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান, ও তাঁর সহযোগীরা ( এমনকি হাংরি আন্দোলনকারীরা ) খড়্গহস্ত হয়েছিল, লেখার জন্য নয়, জীবনযাপনের জন্য। তুলনা করছি না, ডিরোজিয়ানদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, তারাও ঔপনিবেশিক সরকারি উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন, এমনকি ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়নের অন্যতম উদ্যোক্তার জীবনীও তাঁরা পরবর্তীকালে লিখেছেন।
    সেই সময়ের জীবনটাকে ভয়াবহ মনে হয় -- এখানেও জীবনের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া। শিল্পের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া বোধহয় এটাই যে ওই জীবনযাপন থেকে সরে আসার পর, পাতি-বুর্জোয়া জীবনে লগ্ন হওয়ার মধ্যেই মলয় যথার্থ প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখা লিখলেন। আমার মতে কবিতায় নয়, গদ্যে। মলয় তাঁর শেষ জীবনে এখনও কোনও সরকারি-বেসরকারি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হননি, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সে-অর্থে হাত মেলাননি। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা আসলে একটা প্রত্যাখ্যান ( তিনি অকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন )।
    আমাদের অব-ঔপনিবেশিক বাস্তবে এখন এই প্রত্যাখ্যান বিশেষ জরুরি। মলয়ও জানেন, কোনও সামূহিকের সঙ্গে মেলা যায় না ; একলা হওয়া অনিবার্য মলয় ওই নিঃসঙ্গ প্রত্যাখ্যানের স্বপ্নে এখনও স্হির। দেড় দশক পরে যে কবিতা লেখেন, তাতে ওই প্রত্যাখ্যানের চেতনা, যা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার চেয়ে অনেক গভীরতলের :-
    ওগো স্তন্যপায়ী ভাষা পিপীলিকাভূক মুখচোরা
    শব্দগহ্বর খেয়ে নোকরশাহির রাজয় এনেছি এদেশে
    তথাকথিত অশ্লীলতা নেই, কিন্তু আছে নোকরশাহির চেতনা,
    আছে ভাষার প্রতিষ্ঠানকে ভাঙার ‘মুখচোরা’ সংকল্প।
    হাতের কাছেই রয়েছে মলয়ের উপন্যাস ‘নামগন্ধ’। প্রকাশিত ১৯৯৯ সালে। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার, প্রাতিষ্ঠানিক স্হিতাবস্হার মূল্যবোধের বিরুদ্ধের বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস। স্হিতাবস্হা ও ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার মূল্যবোধের এই উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বোঝা যায় মলয় রায়চৌধুরী এখন কোথায় দাঁড়িয়ে।
    “ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়ায়, গলির তলপেটের ঘিঞ্জি গলির ছমছমে অজানায়
    হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, বড়ো রাস্তায় পৌঁছোবার পথ খুঁজে পায় না ওরা,
    আদিত্য আর অরিন্দম, খুঁজে পায় না শহরের নির্লিপ্ত নাগরিকতায় গিয়ে মিশে
    যাবার দরোজাটাকে। টাকরা শুকিয়ে গেছে অনভ্যস্ত অরিন্দমের। পা চালানোর
    ফাঁকে ফাঁকে ডানদিকে, এস.কে.চ্যাটার্জি লেন লেখা রাস্তাটায়, গোটা তিরিশেক
    লোকের মাথা-গিজগিজে ভিড়, চলছে ঝাড়পিটের তুমুল।”
    একটি খুনের পটভূমিতে এই ভাষা বাঙময়, স্হিতাবস্হাকে টলিয়ে দেয় :
    ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়া, এই সময়ের রাজনীতির ছবি হয়ে ওঠে।
    ‘গলির তলপেট’ চিত্রকল্পটি ছমছমে, হনহনিয়ে শব্দ অর্থময় ; ‘চলছে ঝাড়পিটের তুমুল’ -- প্রায় কবিতার মতো ভাষা ধরিয়ে দেয় বাস্তবকে। মলয় শুরু করেন ওই রাস্তায় হত্যা ও উঁচু চাকরি-করা অরিন্দম ও পুলিশে চাকরি-করা আদিত্যকে দিয়ে, যাকে ‘ক্রনোটপ’ বলে, সেদিক থেকেও এই রাস্তা তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নামগন্ধ’ গত কয়েক দশকের এই বঙ্গের সার্বিক চরিত্রহীন হয়ে যাওয়ার বৃত্তান্ত। এ বৃত্তান্তে অরিন্দম ও যিশু বিশ্বাস দুটি দিক। এই চরিত্রহীনতার মধ্যে এর সাক্ষী হয়েও তারা স্হিতাবস্হার বাইরে যেতে চেয়েছিল দুই নারীকে নিয়ে। বস্তুত ওই দুটি নারী মধ্যবিত্ত ও সামাজিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে যেন চিত্রকল্প। মধ্য চল্লিশের যিশু বিশ্বাস পঞ্চাশ বছরের খুশিদিকে নিয়ে চলে আসতে
    চেয়েছিল। খুশি তার ‘দাদা’ ভবেশ মণ্ডলের হাতে যেন বন্দিনী। ভবেশ মণ্ডল পঞ্চাশ দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত সময়ের যেন বিবর্তনের প্রতিমূর্তি। বিদ্রোহ, অভ্যূথ্থানকারী ভবেশের পরিণতি তো এই সময়ের সাম্যবাদী দলেরই পরিণতি। এই পরিণতিতে খুশি বন্দী হয়ে যায়। যিশু যেন ওই বন্দিনীকে উদ্ধার করতে চায়। দীঘদিন পরে উধাও হয়ে যাওয়া ভবেশকাকে যিশু আবিষ্কার করে। পালটে যাওয়া ভবেশকাকা। আর তার হাতে বন্দি সেই খুশিদি, যে হয়তো শেষ বাঙালিনী। যিশু এই খুশির শরীরেই বাঁচতে চায়, এ কোনও শারীরিক টান নয়, এ যেন এক ঐতিহাসিক বাঁচবার আবেগ -- ভবেশকাকাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যিশুর হাত ধরে পাঠক পৌঁছে যায় এখনকার গ্রামীণ বাস্তবে --- আলু চাষ, হিমঘর, কিছুটা তাঁত, এসবের রাজনীতি-অর্থনীতিতে ধরা পড়ে এই সময়।
    আদিত্য নামক পুলিশ কর্মচারীর সূত্রে এই সময়ের শাসন, আমলা, এই বাস্তবের স্তরটি আসে। আদিত্যর ব্যক্তিগত বৃত্তান্তও দেখায় সময়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে। অন্য দিকে প্রমে পড়ার বাতিকগ্রস্ত উচ্চপদের অরিন্দম মধ্যবিত্ত পচনকে সরাসরিভাবে দেখায়। এই পচনের নানাছবির মধ্যে শেওড়াফুলিতে পিসিমার বাড়ির যে-ছবি আঁকা হয়, তাতে এই শ্রেনির পচে যাওয়ার কদর্য রূপ প্রকট হয়ে ওঠে।
    “স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বড়ো বউদি, এমেবিয়েড, হাতে টলমলে গেলাস, ফর্সা,
    ভারিক্কি গতরকে একত্রিত করে পাছ-ঘেঁষটে উঠে বসে আর বাঁহাতে অরিন্দমের
    গলা আঁকড়ে, নিজের কানা ভরা গেলাস দাঁতে দাঁত অরিন্দমের ঠোঁটের ওপর উলটে দিলে।
    খাবিনে মানে, তোর গুষ্টি খাবে, জানিস আজ আমার জন্মের সুবর্ণজয়ন্তী।
    বিশাল বুকের মধ্যে অরিন্দমের মাথা ঠাশা। ”
    তারপর শুরু হয় অশ্লীল গল্প বলার পর্ব। লেখকের মন্তব্য :
    ‘আমরা সবাই মিথ্যাগ্রস্ত মাতাল। বাঙালি মধ্যবিত্তের এ এক অদ্ভুত যাযাবর হামাগুড়ি।’ এই হামাগুড়ির প্রাক ইতিহাসও বলা হয় : এখন নোংরা নোংরা মোদো চুটকিতে মধ্যবিত্তের খোঁয়ারি উঠছে। অধ্যাপিকা ছুটকিও মাতাল, কোকা-কোলার সঙ্গে রাম ভালোবাসে। অরিন্দমের কোলে পা, অরিন্দম আলতা পরায়। সমগ্র মধ্যবিত্ত ল্যাংটো হয়ে যায় বিবরণে।
    ‘নামগন্ধ’ এই বিবিধ পচনের প্রতিবাদ -- যিশুর খুশিদি আর অরিন্দমের কেটলিউলি সেই প্রতিবাদের, মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের, গত চার-পাঁচ দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার নারী। এরা মধ্যবিত্ত সীমার বাইরের। দু-জন এদের মধ্যেই মধ্যবিত্ত প্রতিষ্ঠানেরই মূল্যবোধের কারাগার ভাঙতে চেয়েছিল। এই দুই নারীকে অবলম্বন করে এরা পেরিয়ে যেতে চেয়েছিল তাদের শ্রেনিকে, ওই ভবেশকাকা তথা এই সমাজের ক্রিয়াকে। ওই শেওড়াফুলিতে প্রতিবিম্বিত
    মধ্যবিত্ত বাস্তবকে। কিন্তু পারল না। আকস্মিক দুর্ঘটনায় রিন্দম-কেটলিউলি আর ডাকাত-ডাকাত চিৎকারে যিশু বিশ্বাসের মৃত্যু হয়। আপাত আকস্মিক এই ঘটনা দুটি এই সময়ের গর্ভে স্বাভাবিক। যেমন স্বাভাবিক উপন্যাসের শুরুর হত্যাটি। আর শেষে আরেক ইতিহাসের স্তর আবিষ্কৃত। খুশি ভবেশ কাকার বোন নয়। যিশুর মৃত্যুর সময় একটা পুরোনো হলদে কাগজের পাতা উড়তে থাকে, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ। এক নাতনির হারিয়ে যাবার বিজ্ঞাপন, দিয়েছেন দাদু মিনহাজুদ্দিন। মেয়েটির নাম খুশবু। ডাক নাম খুশি। ভয়ংকর শব্দে ইতিহাস ফেটে পড়ে -- ইতিহাসের গন্ধ, ‘নামগন্ধ’ ছড়ায় --
    খুশি, পঞ্চাশ বছরের খুশি হয়ে ওঠে অর্ধশতাব্দীর সময়, ইতিহাস, আবেগ, শরীর। তাকে আমরা পাই না -- সময়ের আকস্মিক মোচড় হত্যা করে নানাভাবে। প্রতিষ্ঠান খেয়ে ফেলে তাদের। আর এর বিরুদ্ধে কবি মলয় রায়চৌধুরী দাঁড়ান এই গদ্যেই। কী অনবদ্য কবিতা উঠে আসে যিশুর আবিষ্কারে :-
    “খালি পায়ে, বাগানের ঘাসপথ বেয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়ায় যিশু। আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে বাতাস। বাতাসের ডাঁটো স্ট্যাচু যেন। সব স্হির। ডানপাড়ের বিশাল গাছে তেঁতুলপাতাও কাঁপছে না। বাঁধানো ঘাটে বয়ঃসন্ধির বালিকার মতন একধাপ ওপরে তো একধাপ নীচে খেলা করবার পর ক্লান্ত হয়ে গেছে টলমলে পুকুর।”
    কিংবা :-
    “জনশ্রুতির মতন বাতাস বইছে।...মদগর্বিত ষাঁড়। মদিরেক্ষণা মৌমাছি।
    ভিজে চিলের মতন ডানা ঝুলিয়ে রয়েছে ঝিমন্ত কলাগাছগুলোর ছেঁড়া পাতা।
    কঞ্জুস হাওয়ার তাপে বাবলাগাছগুলোর গায়ে কাঁটা দিয়েছে। পথিপার্শ্বে উইপোকাদের বিজয়স্তম্ভ। মার্জিত চেহারার খেজুর গাছ, গলায় খেজুর ছড়ার মালা।”
    অথবা :-
    “চাঁদ ঢাকা পড়ে গেছে কালবৈশাখির ছেতরানো মেঘে, কিন্তু পূর্ণিমার আগাম আভায় নির্জন বধির অন্ধকারকে মনে হয় হাস্যোজ্বল। নিরলস সাধনায় মগ্ন স্হির সন্ধ্যাবাতাস আচমকা হাওয়ার জন্য অপেক্ষমান। নেশাগ্রস্তের মতন মাথা ঝুঁকিয়ে আছে গাছগুলো। বুনো সুগন্ধ ছড়াচ্ছে সিসলকাঁটার গুড়িসুড়ি ঝোপ।”
    এই উদ্ধৃতিগুলিতে, উপমা-চিত্রকল্পে, ভাষার স্বাতন্ত্র্যে, যে-কবিতাময়তা, তাতে থাকে ভাষার স্হিতিস্হাপকতাকে আক্রমণ, অথবা নতুন স্হিতিস্হাপকতা গড়া। খুশি ও কেটলিউলি হিন্দু অরিন্দম আর খ্রিস্টান যিশুর, মধ্যবিত্তের বাঁচবার পথ, কেটলিউলি-মেয়েটার শরীর জুড়ে প্রাচীন নিষাদকুলের নাচ লুকিয়ে আছে যেন। এর চাউনি রৌদ্রোজ্জ্বল। চিরপ্রদোষ-মাখা শ্যামাঙ্গিনী। আর খুশিদিকে দেখে যিশুর মনে হয়, চাষি মেয়ের শ্রমসোহাগী পেশল বাহু ঝুলে আছে। ওই প্রাচীন নিষাদকুল, ওই শ্যামলিনী, চাষি মেয়ের পেশল বাহুই আমাদের প্রতিষ্ঠানের, কবন্ধ মূল্যবোধের বাইরে আনতে পারে। এ সম্ভাবনার দরোজা কি খুলবে ? মলয় রায়চৌধুরীর এ-প্রশ্নকেই রেখে দেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার তাৎপর্য এখানেই। মলয় এভাবেই ষাটের দশক থেকে পালটেছেন -- যেতে চাইছেন সময়ের গভীরে, তার নাভিকেন্দ্রে।
     
     
     

     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২১735086
  • পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর সাহিত্য
    মলয় রায়চৌধুরীর প্রধান দৃষ্টিকোণ ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার। আর সেই সঙ্গে মলয় ‘সাহিত্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মলয় রায়চৌধুরী মনে করেন, ‘প্রতিষ্ঠান একটা প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠান কোনো অরগানাইজেশান নয়। তা চাগিয়ে ওঠে শাসনের মূল্যবোধ থেকে। মলয় আরও বলেছেন, এই ইনট্রিনজিক ফ্যাসিজমই এসট্যাবলিশমেন্ট। ’ সব মিলিয়ে এটাই দাঁড়ায়,, মলয়ের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আসলে সামাজিক দায়বদ্ধতা। আর প্রতিষ্ঠান মানে শাসকের, শাসনের মূল্যবোধ। মলয় প্রতিষ্ঠান বলতে কোনও দল, আমলাতন্ত্র, চার্চ-মসজিদ, হিন্দুধর্মকেন্দ্র, শিক্ষাব্যবস্হা ইত্যাদিকে পৃথকভাবে নির্দিষ্ট করেন না ; করেন মূল্যবোধকে। শাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসমাজ ও জনসমাজ যে-মূল্যবোধ, তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যে দমননীতি-সম্মতির বিভিন্ন হাতিয়ারকে ব্যবহার করে, তাকেই মলয় প্রতিষ্ঠান ভাবেন, এবং তা একটি প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠান এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না, একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে তার কর্ষিকাগুলি ছড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্র থাকলে যেমন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থাকবে, সমাজ -- সে রাষ্ট্রীয় বা জন যাই হোক, থাকলেই প্রতিষ্ঠান থাকবে। আর প্রতিষ্ঠান থাকলেই তার কর্তৃত্ব থাকবে, যে-সমাজে প্রতিষ্ঠানটি শিকড় গাড়ে, শাঁসে-জলে বাড়ে, তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য হিংস্র ও অহিংস্র নানা উপায় সে অবলম্বন করে। এর বিরুদ্ধে লড়াই তাই মূল্যবোধের, চৈতন্যের। আর এ লড়াই সার্বিক ; ব্যক্তিগত ও বৃহত্তর মাত্রা উভয় স্তরেই।
    মলয়ের জীবনকাহিনির যেটুকু অংশ তাঁর লেখাতেই প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এই লড়াইয়ের একটা ছবি পাই। অবশ্য এ বৃত্তান্ত পরবর্তী সময়ের, ১৯৬১-১৯৬৫-এর মধ্যে তিনি তরতাজা যুবক হিসাবে কী ভাবতেন, তা জানা যায় না। সেই সময়ের দিনপঞ্জিকাটি থাকলে আরও বোঝা যেত। কারণ ওই যে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান একটা প্রক্রিয়া, একটি মূল্যবোধ, তাতেই স্পষ্ট ১৯৬১-৬৫-এর মলয় রায়চৌধুরী আর ২০০০ খ্রিস্টাব্দের মলয় রায়চৌধুরী যেমন এক নন, তেমনি সেই সময়ের প্রতিষ্ঠান আর এখনকার প্রতিষ্ঠান, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হুবহু এক নয়।
    ১৯৬৫ থেকে ২০০০-এর মধ্যে এখানে সময় খুব দ্রুত এগিয়েছে-পিছিয়েছে, একটা অপরিবর্তনীয় গতিতত্বে যেন নানা ওলটপালটের মধ্যে আবার আগের স্হিতাবস্হায় ফিরে গেছে, কিন্তু আরও চরিত্রহীন, আরও নপুংসক হয়ে। আমরা যারা মলয়ের সমবয়সী প্রায়, তাদের কাছে ১৯৬১-১৯৬৫-এর মলয়ের নৈরাজ্যিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, ওই সময়ে নঞর্থক মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল সামাজিক দায়হীন। কিন্তু আজকের অবসন্নতায় ওই
    বিদ্রোহকে সদর্থক মনে হয়। বিশেষ সময়ে অ্যানার্কিও তো সদর্থক বৈপ্লবিক হতে পারে।
    মলয় রায়চৌথুরীর ১৯৬০র দশকে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ও তারপরে নীরব থেকে ১৯৮০র দশকে অন্যভাবে দেখা দেওয়া, আমাদের মধ্যবিত্ত বিদ্রোহের এক প্রতীকি চিত্র। সেই ১৮২০-৩০এর দশকের ডিরোজিয়ানদের সময় থেকেই এই পরম্পরা আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেনিতে আছে। ওই বিদ্রোহটাও যেমন সত্যি আবার প্রতিষ্ঠানে ঢুকে যাওয়াও তেমনি সত্যি। উপনিবেশ ও ১৯৪৭-এর পরের অব-উপনিবেশের বাস্তবে ক্রিয়াশীল উৎপাদন সম্পর্কশূন্য বৃহত্তর জনসমাজ ও জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত এই বিদ্রোহ, এই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতাকে তুচ্ছ করা অনৈতিহাসিক, কারণ মধ্যশ্রেনির ইতিহাসের নিরন্ধ্র অবসন্নতা ও করুণ আত্মসমর্পণে, ট্র্যাজেডি নয় ফার্সে,
    এই ক্ষণস্ফূলিঙ্গগুলিই একমাত্র বাঁচবার ইঙ্গিত। এদের ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীগত ব্যর্থতা প্রায় অনিবার্যই ছিল। তবু, তারা যে কম্পন নিয়ে এসেছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হয়।
    মলয় রায়চৌধুরীর নিজের সাক্ষেই বোঝা যায়, একটা টানবাপোড়েন গোড়া থেকেই ছিল। মলয় দেখাতে চেয়েছেন তিনি প্রায় স্কুলে পড়াশুনা ন-করার ভূমি থেকে এসেছেন। তাঁর দাদা সমীরই তাঁদের বাড়ির প্রথম স্কুলে-পড়া, কলেজে-পড়া। অর্থাৎ যে ঔপনিবেশিক শিক্ষায় বাঙালি মধ্যবিত্ত জারিত, তার শেকড় তাঁদের পরিবারে ছড়ায়নি, তাঁর প্রজন্মেই এর সূত্রপাত। কিন্তু ওই প্রথম প্রজন্মেই এই শিক্ষার ধার তীক্ষ্ণ হয় ; ‘এদিকে মলয় আমার ছোটোভাই তখন অর্থনীতির স্নাতকোত্তর ক্লাসের শেষ বছরের ছাত্র। সারাদিন ঘাড় গুঁজে বিস্তর বই পড়ে ; সমাজ নিয়ে, পৃথিবী নিয়ে অনেক ভাবনা,
    কথায়-কথায় এঙ্গেলস, কিয়ের্কেগার্দ, মার্কস, স্পেঙ্গলার ইত্যাদি থেকে উদ্ধৃতি দেয়। পাটনায় গেলে আমাকে কেবলই বলে, “সাহিত্য এইভাবে এলোমেলো হয় না ; একটা পরিকল্পনা মতো এগোনো উচিত। কী বলতে চাও, করতে চাও, সবার আগে সেটা ঠিক করো, আন্দোলন চালাও। আন্দোলন দরকার।”...’
    সমীরের এই ছবিতে কোনও নৈরাজ্যবাদী মলয়কে পাই না। বরঞ্চ ইয়োরোপমুখী এক যুবককে, যে পরিকল্পনা চায়। এই যুবক অব-উপনিবেশের যুদ্ধ-দাঙ্গে-দুর্ভিক্ষ-দেশভাগ ধর্ষিত কলকাতায় এসে পালটায়, কলকাতা তাঁকে পালটায়। তাঁর অ-নাগরিক অভ্যাস কলকাতায় বেমানান -- কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত অ-নাগরিক অভ্যাসকে তিনি প্রলেতারিয় ভাবছিলেন। নিজেকে শ্রেনিচ্যূত করতে চাইছিলেন। আর এই জন্যই একটা জীবনযাপন বেছে নিয়েছিলেন যা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের পক্ষে দুঃসহনীয়। ঠিক যেমন একদা ডিরোজিয়ানরা বেছেছিলেন -- তখন মদ্যপান, গোমাংসভক্ষণ ছিল হিন্দু ভদ্রলোকের পক্ষে ক্রোধের কারণ, যদিও অনেক ভদ্রলোকই আড়ালে মদ্যপায়ী, বেশ্যাগমনে অভ্যস্ত। । কিন্তু ডিরোজিয়ানরা এসব করছিলেন প্রকাশ্যে, একটা বিদ্রোহের আদলে। মলয় নিজেদের অবস্হাকে বলেছেন ‘ষাট দশকীয় ফাটিচার’। কলকাতার সাহিত্য মহলে আর্টেমিস-ক্রেসিডা-ইউলিসিস এসব নামে অস্বস্তিবোধ করতেন তিনি, কিন্তু “আমাদের মগজে রেজিস দেবরে, আরনেসতো চে ভারা, ফিদেল কাসত্রো নামগুলো বরঞ্চ মিহিন ঘণ্টাধ্বনি শোনাচ্ছে। ”
    এঁরাও সকলেই বিদেশের -- তবে অন্য ভূবনের। ষাট দশকের কলকাতার বিপরীত টানেই পাটনার সিরিয়াস যুবক মলয় রায়চৌধুরী তাঁর প্রতিষ্ঠাবিরোধিতার নৈরাজ্যিক আকাশে মুক্তি চাইলেন। এই কলকাতাই তাঁকে বুঝিয়েছিল, ‘ষাটের দশকে সুস্হতা সত্যিই অবাস্তব ছিল।’ মলয়ের এই সিদ্ধান্ত ইতিহাস-বোধে উজ্বল। ষাটের দশকে যে সুস্হভাবে বাঁচা অবাস্তব ছিল, তার প্রমাণ সেই দশক জুড়ে নানা ধরনের বিদ্রোহ যার শীর্ষবিন্দু নকশাল অভ্যূথ্থান। মলয়দের আন্দোলন, নকশাল আন্দোলনের একদিকের পূর্বাভাস। তিনি দেবরে, গ্বেভারা, কাসত্রোর কথা বলেছেন, তাতে বোঝা যায় তাঁর অন্তরে তিনি, ব্যক্তিগত নানা ট্যাবু ভাঙার মধ্যেই, একটা রাজনৈতিক বীক্ষা বহন করতেন। ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ নামে বইও লিখেছিলেন। এই বীক্ষা তাঁর বিদ্রোহে সেইভাবে উপরিস্তরে আসেনি, কিন্তু অনেক হাংরি যে পরে নকশাল হয়েছিল, তার কারণ কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত কারাগার ভেঙে ফেলার আগ্রহ। মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন, তিনিও গুণ্ডা-মাস্তান হয়ে যেতেন, কবিতা না-লিখলে। নিজেকে কবিতা লেখার ক্রিমিনাল বলেও অভিহিত করেছেন। আর এক -এক করে সেই কবিদের নাম করেছেন যাঁদের জেলে বা জেলের বাইরে খুন করা হয়। মলয় নকশাল প্রসঙ্গ আনেন তাঁর ‘হাংরি কিংবদন্তি’ বইতে। ঠিকই করেন। মলয়ের বিদ্রোহ ছিল দক্ষিণ ও বাম দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই -- অন্তত মলয় তাঁর পঠন-পাঠন থেকে, বুদ্ধিগত জগৎ জগৎ কোনও সময়েই রাজনৈতিক বীক্ষার অন্তঃসলিলা স্রোতকে ফেলে দিতে পারেননি। জীবনযাপনের নৈরাজ্যের মধ্যেই একটা বুদ্ধিগত, মননগত স্তর তাঁর থেকেই গিয়েছিল। কবিতা ও সাহিত্যকে কেন্দ্রবিন্দু রাখায় ব্যক্তিক জীবনযাপনের তীব্র নেশাগ্রস্ত নৈরাজ্যই তাঁর কাছে বিদ্রোহের মূল ধরণ হয়ে ওঠে।
    এটাকে মেলাতে চান কবিতায়। কিন্তু হাংরি প্রজন্মের সাহিত্যগত কীর্তি কবিতায় নয়, গদ্যে। ওই কিংবদন্তি, ওই ছাপ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের মূল্যায়ন করলে, গদ্যই থাকবে ; অন্তত আমার মতো পাঠকের কাছে, যার চিন্তাভাবনাকে, নকশাল অভ্যূথ্থান, ব্যর্থ হলেও ওলোটপালট করে দিয়েছিল। ওই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা অবশ্যই স্পষ্ট, তবুও। তেমনি ষাটের দশকে একদল যুবকের ব্যক্তিক জীবনের নিরুদ্দেশযাত্রী হওয়ার তাৎপর্য এখন ধরা পড়ে। এই নিরুদ্দেশযাত্রার মূল্য অবশ্যই তাদের দিতে হয়েছে। তবে যেহেতু নকশাল বিদ্রোহ রাষ্ট্রকে খানিকটা ভীত করে তুলেছিল, তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জনসমাজের সমর্থনে এ-বিদ্রোহের ওপর ভয়াবহভাবে নেমে আসে। ওই বাস্তব অসহ্য-লাগা যুবকদের হত্যা করে, অনেককেই সারা জীবনের মতো পঙ্গু করে দেয়। এই বঙ্গে এ-আন্দোলন নির্মমভাবে দমিত হলেও, ওই প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ সম্পর্কে একটা প্রশ্ন, সংশয় ও আন্দোলন রেখে গেছে। তার আগের মলয়দের হাংরি আন্দোলন জেল-মামলাতেই শেষ হয়। মলয়ও সেই নকশালদের মতো, যাঁরা শেষ পর্যন্ত এই সমাজে, প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে আত্মস্হ হয়ে যান ; এমনকি ওই অতীতকে কাজে লাগিয়ে, পুঁজি করেন। এ সত্ত্বেও মলয় রায়চৌধুরীর ষাটের দশকের বিদ্রোহ মিথ্যা হয়ে যায় না,
    অন্তত তিনি তাকে তাঁর অন্যান্য বন্ধুদের মতো ( সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রমুখ ) প্রকাশ্যে পুঁজিও করেননি। এ-প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, মলয় রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানবিরোধি বিদ্রোহ যে পুলিশ-আদালত-জেল-মামলার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তার নিষ্পত্তি কিন্তু প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপেই হয়। তাঁর বন্ধুরা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ও মুচলেকা দিয়ে মুক্তিলাভ করেন। মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন, “লালবাজারে পুলিশ কমিশনার বললেন, তিনি আমাকে সাব ইন্সপেক্টরের চাকরি দিতে চান, কারণ সাজা হবার ফলে ( দুশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড ) আর কোথাও চাকরি হওয়া মুশকিল। পরে জেনেছি অ্যালেন গিন্সবার্গ পুপুল জয়াকরকে চিঠি লেখার পর জয়াকর তা ইন্দিরা গান্ধিকে জানান ; দিল্লির নির্দেশে কলকাতার বাঙালি পুলিশ তখন ফাঁপরে।” মলয় রায়চৌধুরীর পাশে এসে দিল্লির প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছিল, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক স্তরভেদ আছে। আর লক্ষণীয় গিন্সবার্গের ভূমিকা। তিনি কিন্তু ‘কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডাম’-এর পাণ্ডাদের
    সাহায্য চেয়েছিলেন -- আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রত্যাখ্যান করেন এ সাহায্যের আবেদন। প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলনের নেতার এরকম আশ্রয় থেকে বোঝা যায় মলয়দের নিয়ে এসট্যাবলিশমেন্ট খেলছিল। নকশাল-আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এই বঙ্গেও ওই খেলা নানাভাবে দেখা যায়। তার আগে সন্ত্রস্ত প্রতিষ্ঠান তাদের একের পর এক হত্যা করেছে -- আর সেই হত্যার এ-বঙ্গের প্রতিষ্ঠানের নায়করা পরবর্তী বাম-রাজত্বে থেকেছেন ; শুধু তা-ই নয়, উন্নতি করেছেন। যেমন, যে সোমেন চন্দকে নিয়ে আজ বামপন্হী মহল উচ্ছ্বসিত, যাঁর হত্যার বিরুদ্ধে ধিক্কার বারবার উচ্চারিত, তাঁর হত্যার ‘প্রকৃত ঘটনা হল এই যে, সোমেন চন্দ রেলওয়ে শ্রমিকদের নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে শুধু ফ্যাসিবিরোধী
    সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঢাকার নারিন্দাপুল পার হয়ে বটগাছের কাছেই আর. এস. পির ঘাতকবাহিনী ঘিরে ফ্যালে সোমেন চন্দকে। তারপর নির্মমভাবে হত্যা করে।’ এই আর.এস.পি এখন বামফ্রণ্টের শরিক ও মন্ত্রী। এরাই ফ্যাসিস্ট বাহিনীর মদতদাতা ছিল। প্রতিষ্ঠান কতো খেলাই খেলে, কতো রঙই বদলায়।
    মলয় রায়চৌধুরীও ওই খেলার পুতুল হয়ে ছিলেন। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় তিনি মামলা-আদালত জেল-জরিমানার যে ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন, প্রতিষ্ঠানই তার থেকে তাঁকে বাইরে নিয়ে আসে।
    অবশ্য মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে এসব কথা এখন অবান্তর। কারণ তাঁর সম্পর্কে এখন আমি যে লিখছি তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বা আদালত-মামলা জেল-জরিমানার বৃত্তান্তের জন্য নয়। মলয় নামক একজন কবি ও ঔপন্যাসিকই আমার আগ্রহের মূলে। তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার তাৎপর্যই এই সূত্রে বিবেচ্য। এক একজন পাঠক এক একজন লেখক ও আন্দোলনকে নিজের নিজের মতন করে দেখেন। আমার কাছে শুধু মলয়ই নয়, গোটা হাংরি জেনারেশনের লেখকদেরই গদ্য যতো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, কবিতাকে তেমন মনে হয়নি। যে-কোনও কারণেই হোক, কবিরা, বোধহয় ইয়োরোপ আমেরিকা কবিদের জীবনকাহিনি শুনে পঞ্চাশের দশক থেকে ব্যক্তিজীবনের হুল্লোড় ও নানারকম কাজ কারবারকে গুরুত্ব দিতে থাকেন, ফল হয় কবিতার অধঃপতন যা এখনও চলছে। মলয়ও তাই করেছিলেন। কিন্তু গদ্যে একেবারে বিপরীত।
    হাংরি আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে মলয় লিখেছেন, ‘স্হিতাবস্হা ভাঙার ভাষাই নয় কেবল, ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার চেষ্টাই চালিয়েছেন। ’ গদ্যে এটাই প্রকৃত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
    বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালার’ নামও করতে পারি। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে এটা আদৌ হয়নি। ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার কোনও লক্ষণই নেই। আর যেহেতু জীবনযাপন কবিতাকে চিৎ করে ফেলছিল, সেহেতু ওই জীবনযাপনের তাৎক্ষণিক অনুভূতি কবিতায় এমনভাবে অন্তত মলয়ের কবিতায় আসতে চাইছিল, যাতে কবিতার থেকে ওই অনুভূতিই বড়ো হয়ে ওঠে। জীবন কবিতাকে খেয়ে ফেললে মুশকিল, জীবনের ক্ষুধাকে কবিতার রসায়নে দাঁড়াতে হয়। আজ এই ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ভাবতে অবাক লাগে মলয়ের বেশ কাঁচা কবিতা
    ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ অতো হৈ-চৈ, অতো শিরঃপীড়ার কারণ কেন হয়েছিল। একেবারে মধ্যবিত্ত ভাষা জর্জরিত মধ্যবিত্ত কবিতা এটি :-
    “অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
    যোনিকেশরে কাচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্হতা
    আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
    আমি বুঝতে পারছি না কি জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
    শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
    কবিতার জন্য আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
    শুভা আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ করতে দাও
    দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
    বেসামাল হৃদয়বেত্তার স্বর্ণসবুজে”
    যে-নিম্নবর্গীয় ভাষার আক্রমণে ভাষার স্হিতিস্হাপকতাকে বিপন্ন করার ভাবনা মলয়ের, এই উদ্ধৃতিতে তার কি কোনও চিহ্ণ আছে ? যোনি, স্তন, বীর্য -এসবই সংস্কৃত শব্দ। এদের নিম্নবর্গীয় শব্দ মলয় ব্যবহার করেননি। এসব শব্দ এলিট পরম্পরায় বহু ব্যহৃত। আর ‘অশ্লীল’ এই ধারণাটির স্হান-কাল-পাত্র আছে। এখন আর তথাকথিত অশ্লীল দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ঘুম কাড়া যায় না, কারণ সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানই তো অশ্লীল --- অশ্লীল অর্থনীতি, অশ্লীল রাজনীতি, অশ্লীল সমাজ, রাস্তায় ঘাটে একেবারে মধ্যবিত্ত ছোকরাই দু-তিন-চার অক্ষরের শব্দ প্রকাশ্যে বলে। নিম্নবর্গীয়দের অশ্লীল শব্দের যে পেশলতা, যে চিত্রকল্প, যে জোর, তা এই অশ্লীলতায় নেই -- মলয়ের কবিতায় ‘পাজামায় শুকিয়ে যাওয়া বীর্যের’ মতোই সৃষ্টিহীন, অসুস্হ। আসলে ষাটের দশকে মলয় রায়চৌধুরী এক ধরনের আরোপিত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় মেতেছিলেন, অথচ তাঁর চৈতন্যে গভীর বোধ ছিল। সেই বোধ জীবনযাপনের তীব্রতায় হারিয়ে যেতে থাকে। তাঁর মনে হয়, অশ্লীলতা বুঝি শুধু যৌনতাবাচক শুধু কতকগুলি শব্দ। এটা যে সামগ্রিক মূল্যবোধ-জনিত, আর প্রতিষ্ঠান যে অশ্লীল হয়ে উঠেছে সব দিক দিয়ে, বাইরের পোশাকের আড়ালে অশ্লীল, সেটা হয়তো বুঝতে পারেননি। ১৯৬৫ সালের পর মলয় এর থেকে বেরিয়ে আসেন।
    মলয় তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার, প্রত্যাখ্যানের যথার্ধ পরিচয় রাখেন তখন, যখন তিনি ওই ষাটের দশকের জীবনযাপনের গণ্ডি থেকে সরে এসেছেন, আপাতদৃষ্টিতে যেন প্রচলিত মধ্যবিত্ত জীবনের মধ্যে এসেছেন। ‘তারপর দেড় দশক আমার লেখালিখি ছেড়ে যায়। জীবন কাটানোর ভাবনায় বন্ধুবান্ধবে আত্মপ্রকাশে আর্থিক অবস্হায় এই দেড় দশকে আমূল পরবর্তন ঘটে যায় আমার মগজে ও শরীরে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাসে। ’ ‘এখন তো আমার সেই সময়ের জীবনটাকে ভয়াবহ মনে হয়। এখন ভালো চাকরির পাতি-বুর্জোয়া আরামে প্রতিবাদ প্রতিরোধের লেখালিখি অনেক আরামদায়ক আর সহজ।’ ‘ক্রমশ একলা থাকার মধ্যেই নিজের আরাম আনন্দ
    শান্তি টের পাই। ’ অর্থাৎ এখন জীবনযাপন মলয়ের লেখাকে ছাপিয়ে যায় না।
    প্রতিবাদ-প্রতিরোধের লেখাই তো ষাটের দশকে মলয় লিখতে চেয়েছিলেন, তাতে পুলিশ, আদালত, অশ্লীলতার অভিযোগ, জেল-জরিমানা, লকাপে রাতকাটানো। এখন সেটা অনেক আরামদায়ক ও সহজ। কেন ? তবে কি প্রতিষ্ঠান তার মূল্যবোধ পালটেছে ? নাকি তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান, ও তাঁর সহযোগীরা ( এমনকি হাংরি আন্দোলনকারীরা ) খড়্গহস্ত হয়েছিল, লেখার জন্য নয়, জীবনযাপনের জন্য। তুলনা করছি না, ডিরোজিয়ানদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, তারাও ঔপনিবেশিক সরকারি উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন, এমনকি ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়নের অন্যতম উদ্যোক্তার জীবনীও তাঁরা পরবর্তীকালে লিখেছেন।
    সেই সময়ের জীবনটাকে ভয়াবহ মনে হয় -- এখানেও জীবনের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া। শিল্পের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া বোধহয় এটাই যে ওই জীবনযাপন থেকে সরে আসার পর, পাতি-বুর্জোয়া জীবনে লগ্ন হওয়ার মধ্যেই মলয় যথার্থ প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখা লিখলেন। আমার মতে কবিতায় নয়, গদ্যে। মলয় তাঁর শেষ জীবনে এখনও কোনও সরকারি-বেসরকারি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হননি, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সে-অর্থে হাত মেলাননি। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা আসলে একটা প্রত্যাখ্যান ( তিনি অকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন )।
    আমাদের অব-ঔপনিবেশিক বাস্তবে এখন এই প্রত্যাখ্যান বিশেষ জরুরি। মলয়ও জানেন, কোনও সামূহিকের সঙ্গে মেলা যায় না ; একলা হওয়া অনিবার্য মলয় ওই নিঃসঙ্গ প্রত্যাখ্যানের স্বপ্নে এখনও স্হির। দেড় দশক পরে যে কবিতা লেখেন, তাতে ওই প্রত্যাখ্যানের চেতনা, যা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার চেয়ে অনেক গভীরতলের :-
    ওগো স্তন্যপায়ী ভাষা পিপীলিকাভূক মুখচোরা
    শব্দগহ্বর খেয়ে নোকরশাহির রাজয় এনেছি এদেশে
    তথাকথিত অশ্লীলতা নেই, কিন্তু আছে নোকরশাহির চেতনা,
    আছে ভাষার প্রতিষ্ঠানকে ভাঙার ‘মুখচোরা’ সংকল্প।
    হাতের কাছেই রয়েছে মলয়ের উপন্যাস ‘নামগন্ধ’। প্রকাশিত ১৯৯৯ সালে। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার, প্রাতিষ্ঠানিক স্হিতাবস্হার মূল্যবোধের বিরুদ্ধের বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস। স্হিতাবস্হা ও ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার মূল্যবোধের এই উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বোঝা যায় মলয় রায়চৌধুরী এখন কোথায় দাঁড়িয়ে।
    “ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়ায়, গলির তলপেটের ঘিঞ্জি গলির ছমছমে অজানায়
    হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, বড়ো রাস্তায় পৌঁছোবার পথ খুঁজে পায় না ওরা,
    আদিত্য আর অরিন্দম, খুঁজে পায় না শহরের নির্লিপ্ত নাগরিকতায় গিয়ে মিশে
    যাবার দরোজাটাকে। টাকরা শুকিয়ে গেছে অনভ্যস্ত অরিন্দমের। পা চালানোর
    ফাঁকে ফাঁকে ডানদিকে, এস.কে.চ্যাটার্জি লেন লেখা রাস্তাটায়, গোটা তিরিশেক
    লোকের মাথা-গিজগিজে ভিড়, চলছে ঝাড়পিটের তুমুল।”
    একটি খুনের পটভূমিতে এই ভাষা বাঙময়, স্হিতাবস্হাকে টলিয়ে দেয় :
    ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়া, এই সময়ের রাজনীতির ছবি হয়ে ওঠে।
    ‘গলির তলপেট’ চিত্রকল্পটি ছমছমে, হনহনিয়ে শব্দ অর্থময় ; ‘চলছে ঝাড়পিটের তুমুল’ -- প্রায় কবিতার মতো ভাষা ধরিয়ে দেয় বাস্তবকে। মলয় শুরু করেন ওই রাস্তায় হত্যা ও উঁচু চাকরি-করা অরিন্দম ও পুলিশে চাকরি-করা আদিত্যকে দিয়ে, যাকে ‘ক্রনোটপ’ বলে, সেদিক থেকেও এই রাস্তা তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নামগন্ধ’ গত কয়েক দশকের এই বঙ্গের সার্বিক চরিত্রহীন হয়ে যাওয়ার বৃত্তান্ত। এ বৃত্তান্তে অরিন্দম ও যিশু বিশ্বাস দুটি দিক। এই চরিত্রহীনতার মধ্যে এর সাক্ষী হয়েও তারা স্হিতাবস্হার বাইরে যেতে চেয়েছিল দুই নারীকে নিয়ে। বস্তুত ওই দুটি নারী মধ্যবিত্ত ও সামাজিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে যেন চিত্রকল্প। মধ্য চল্লিশের যিশু বিশ্বাস পঞ্চাশ বছরের খুশিদিকে নিয়ে চলে আসতে
    চেয়েছিল। খুশি তার ‘দাদা’ ভবেশ মণ্ডলের হাতে যেন বন্দিনী। ভবেশ মণ্ডল পঞ্চাশ দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত সময়ের যেন বিবর্তনের প্রতিমূর্তি। বিদ্রোহ, অভ্যূথ্থানকারী ভবেশের পরিণতি তো এই সময়ের সাম্যবাদী দলেরই পরিণতি। এই পরিণতিতে খুশি বন্দী হয়ে যায়। যিশু যেন ওই বন্দিনীকে উদ্ধার করতে চায়। দীঘদিন পরে উধাও হয়ে যাওয়া ভবেশকাকে যিশু আবিষ্কার করে। পালটে যাওয়া ভবেশকাকা। আর তার হাতে বন্দি সেই খুশিদি, যে হয়তো শেষ বাঙালিনী। যিশু এই খুশির শরীরেই বাঁচতে চায়, এ কোনও শারীরিক টান নয়, এ যেন এক ঐতিহাসিক বাঁচবার আবেগ -- ভবেশকাকাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যিশুর হাত ধরে পাঠক পৌঁছে যায় এখনকার গ্রামীণ বাস্তবে --- আলু চাষ, হিমঘর, কিছুটা তাঁত, এসবের রাজনীতি-অর্থনীতিতে ধরা পড়ে এই সময়।
    আদিত্য নামক পুলিশ কর্মচারীর সূত্রে এই সময়ের শাসন, আমলা, এই বাস্তবের স্তরটি আসে। আদিত্যর ব্যক্তিগত বৃত্তান্তও দেখায় সময়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে। অন্য দিকে প্রমে পড়ার বাতিকগ্রস্ত উচ্চপদের অরিন্দম মধ্যবিত্ত পচনকে সরাসরিভাবে দেখায়। এই পচনের নানাছবির মধ্যে শেওড়াফুলিতে পিসিমার বাড়ির যে-ছবি আঁকা হয়, তাতে এই শ্রেনির পচে যাওয়ার কদর্য রূপ প্রকট হয়ে ওঠে।
    “স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বড়ো বউদি, এমেবিয়েড, হাতে টলমলে গেলাস, ফর্সা,
    ভারিক্কি গতরকে একত্রিত করে পাছ-ঘেঁষটে উঠে বসে আর বাঁহাতে অরিন্দমের
    গলা আঁকড়ে, নিজের কানা ভরা গেলাস দাঁতে দাঁত অরিন্দমের ঠোঁটের ওপর উলটে দিলে।
    খাবিনে মানে, তোর গুষ্টি খাবে, জানিস আজ আমার জন্মের সুবর্ণজয়ন্তী।
    বিশাল বুকের মধ্যে অরিন্দমের মাথা ঠাশা। ”
    তারপর শুরু হয় অশ্লীল গল্প বলার পর্ব। লেখকের মন্তব্য :
    ‘আমরা সবাই মিথ্যাগ্রস্ত মাতাল। বাঙালি মধ্যবিত্তের এ এক অদ্ভুত যাযাবর হামাগুড়ি।’ এই হামাগুড়ির প্রাক ইতিহাসও বলা হয় : এখন নোংরা নোংরা মোদো চুটকিতে মধ্যবিত্তের খোঁয়ারি উঠছে। অধ্যাপিকা ছুটকিও মাতাল, কোকা-কোলার সঙ্গে রাম ভালোবাসে। অরিন্দমের কোলে পা, অরিন্দম আলতা পরায়। সমগ্র মধ্যবিত্ত ল্যাংটো হয়ে যায় বিবরণে।
    ‘নামগন্ধ’ এই বিবিধ পচনের প্রতিবাদ -- যিশুর খুশিদি আর অরিন্দমের কেটলিউলি সেই প্রতিবাদের, মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের, গত চার-পাঁচ দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার নারী। এরা মধ্যবিত্ত সীমার বাইরের। দু-জন এদের মধ্যেই মধ্যবিত্ত প্রতিষ্ঠানেরই মূল্যবোধের কারাগার ভাঙতে চেয়েছিল। এই দুই নারীকে অবলম্বন করে এরা পেরিয়ে যেতে চেয়েছিল তাদের শ্রেনিকে, ওই ভবেশকাকা তথা এই সমাজের ক্রিয়াকে। ওই শেওড়াফুলিতে প্রতিবিম্বিত
    মধ্যবিত্ত বাস্তবকে। কিন্তু পারল না। আকস্মিক দুর্ঘটনায় রিন্দম-কেটলিউলি আর ডাকাত-ডাকাত চিৎকারে যিশু বিশ্বাসের মৃত্যু হয়। আপাত আকস্মিক এই ঘটনা দুটি এই সময়ের গর্ভে স্বাভাবিক। যেমন স্বাভাবিক উপন্যাসের শুরুর হত্যাটি। আর শেষে আরেক ইতিহাসের স্তর আবিষ্কৃত। খুশি ভবেশ কাকার বোন নয়। যিশুর মৃত্যুর সময় একটা পুরোনো হলদে কাগজের পাতা উড়তে থাকে, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ। এক নাতনির হারিয়ে যাবার বিজ্ঞাপন, দিয়েছেন দাদু মিনহাজুদ্দিন। মেয়েটির নাম খুশবু। ডাক নাম খুশি। ভয়ংকর শব্দে ইতিহাস ফেটে পড়ে -- ইতিহাসের গন্ধ, ‘নামগন্ধ’ ছড়ায় --
    খুশি, পঞ্চাশ বছরের খুশি হয়ে ওঠে অর্ধশতাব্দীর সময়, ইতিহাস, আবেগ, শরীর। তাকে আমরা পাই না -- সময়ের আকস্মিক মোচড় হত্যা করে নানাভাবে। প্রতিষ্ঠান খেয়ে ফেলে তাদের। আর এর বিরুদ্ধে কবি মলয় রায়চৌধুরী দাঁড়ান এই গদ্যেই। কী অনবদ্য কবিতা উঠে আসে যিশুর আবিষ্কারে :-
    “খালি পায়ে, বাগানের ঘাসপথ বেয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়ায় যিশু। আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে বাতাস। বাতাসের ডাঁটো স্ট্যাচু যেন। সব স্হির। ডানপাড়ের বিশাল গাছে তেঁতুলপাতাও কাঁপছে না। বাঁধানো ঘাটে বয়ঃসন্ধির বালিকার মতন একধাপ ওপরে তো একধাপ নীচে খেলা করবার পর ক্লান্ত হয়ে গেছে টলমলে পুকুর।”
    কিংবা :-
    “জনশ্রুতির মতন বাতাস বইছে।...মদগর্বিত ষাঁড়। মদিরেক্ষণা মৌমাছি।
    ভিজে চিলের মতন ডানা ঝুলিয়ে রয়েছে ঝিমন্ত কলাগাছগুলোর ছেঁড়া পাতা।
    কঞ্জুস হাওয়ার তাপে বাবলাগাছগুলোর গায়ে কাঁটা দিয়েছে। পথিপার্শ্বে উইপোকাদের বিজয়স্তম্ভ। মার্জিত চেহারার খেজুর গাছ, গলায় খেজুর ছড়ার মালা।”
    অথবা :-
    “চাঁদ ঢাকা পড়ে গেছে কালবৈশাখির ছেতরানো মেঘে, কিন্তু পূর্ণিমার আগাম আভায় নির্জন বধির অন্ধকারকে মনে হয় হাস্যোজ্বল। নিরলস সাধনায় মগ্ন স্হির সন্ধ্যাবাতাস আচমকা হাওয়ার জন্য অপেক্ষমান। নেশাগ্রস্তের মতন মাথা ঝুঁকিয়ে আছে গাছগুলো। বুনো সুগন্ধ ছড়াচ্ছে সিসলকাঁটার গুড়িসুড়ি ঝোপ।”
    এই উদ্ধৃতিগুলিতে, উপমা-চিত্রকল্পে, ভাষার স্বাতন্ত্র্যে, যে-কবিতাময়তা, তাতে থাকে ভাষার স্হিতিস্হাপকতাকে আক্রমণ, অথবা নতুন স্হিতিস্হাপকতা গড়া। খুশি ও কেটলিউলি হিন্দু অরিন্দম আর খ্রিস্টান যিশুর, মধ্যবিত্তের বাঁচবার পথ, কেটলিউলি-মেয়েটার শরীর জুড়ে প্রাচীন নিষাদকুলের নাচ লুকিয়ে আছে যেন। এর চাউনি রৌদ্রোজ্জ্বল। চিরপ্রদোষ-মাখা শ্যামাঙ্গিনী। আর খুশিদিকে দেখে যিশুর মনে হয়, চাষি মেয়ের শ্রমসোহাগী পেশল বাহু ঝুলে আছে। ওই প্রাচীন নিষাদকুল, ওই শ্যামলিনী, চাষি মেয়ের পেশল বাহুই আমাদের প্রতিষ্ঠানের, কবন্ধ মূল্যবোধের বাইরে আনতে পারে। এ সম্ভাবনার দরোজা কি খুলবে ? মলয় রায়চৌধুরীর এ-প্রশ্নকেই রেখে দেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার তাৎপর্য এখানেই। মলয় এভাবেই ষাটের দশক থেকে পালটেছেন -- যেতে চাইছেন সময়ের গভীরে, তার নাভিকেন্দ্রে।
     
     
     

     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২১735085
  • পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর সাহিত্য
    মলয় রায়চৌধুরীর প্রধান দৃষ্টিকোণ ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার। আর সেই সঙ্গে মলয় ‘সাহিত্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মলয় রায়চৌধুরী মনে করেন, ‘প্রতিষ্ঠান একটা প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠান কোনো অরগানাইজেশান নয়। তা চাগিয়ে ওঠে শাসনের মূল্যবোধ থেকে। মলয় আরও বলেছেন, এই ইনট্রিনজিক ফ্যাসিজমই এসট্যাবলিশমেন্ট। ’ সব মিলিয়ে এটাই দাঁড়ায়,, মলয়ের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আসলে সামাজিক দায়বদ্ধতা। আর প্রতিষ্ঠান মানে শাসকের, শাসনের মূল্যবোধ। মলয় প্রতিষ্ঠান বলতে কোনও দল, আমলাতন্ত্র, চার্চ-মসজিদ, হিন্দুধর্মকেন্দ্র, শিক্ষাব্যবস্হা ইত্যাদিকে পৃথকভাবে নির্দিষ্ট করেন না ; করেন মূল্যবোধকে। শাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসমাজ ও জনসমাজ যে-মূল্যবোধ, তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যে দমননীতি-সম্মতির বিভিন্ন হাতিয়ারকে ব্যবহার করে, তাকেই মলয় প্রতিষ্ঠান ভাবেন, এবং তা একটি প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠান এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না, একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে তার কর্ষিকাগুলি ছড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্র থাকলে যেমন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থাকবে, সমাজ -- সে রাষ্ট্রীয় বা জন যাই হোক, থাকলেই প্রতিষ্ঠান থাকবে। আর প্রতিষ্ঠান থাকলেই তার কর্তৃত্ব থাকবে, যে-সমাজে প্রতিষ্ঠানটি শিকড় গাড়ে, শাঁসে-জলে বাড়ে, তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য হিংস্র ও অহিংস্র নানা উপায় সে অবলম্বন করে। এর বিরুদ্ধে লড়াই তাই মূল্যবোধের, চৈতন্যের। আর এ লড়াই সার্বিক ; ব্যক্তিগত ও বৃহত্তর মাত্রা উভয় স্তরেই।
    মলয়ের জীবনকাহিনির যেটুকু অংশ তাঁর লেখাতেই প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এই লড়াইয়ের একটা ছবি পাই। অবশ্য এ বৃত্তান্ত পরবর্তী সময়ের, ১৯৬১-১৯৬৫-এর মধ্যে তিনি তরতাজা যুবক হিসাবে কী ভাবতেন, তা জানা যায় না। সেই সময়ের দিনপঞ্জিকাটি থাকলে আরও বোঝা যেত। কারণ ওই যে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান একটা প্রক্রিয়া, একটি মূল্যবোধ, তাতেই স্পষ্ট ১৯৬১-৬৫-এর মলয় রায়চৌধুরী আর ২০০০ খ্রিস্টাব্দের মলয় রায়চৌধুরী যেমন এক নন, তেমনি সেই সময়ের প্রতিষ্ঠান আর এখনকার প্রতিষ্ঠান, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হুবহু এক নয়।
    ১৯৬৫ থেকে ২০০০-এর মধ্যে এখানে সময় খুব দ্রুত এগিয়েছে-পিছিয়েছে, একটা অপরিবর্তনীয় গতিতত্বে যেন নানা ওলটপালটের মধ্যে আবার আগের স্হিতাবস্হায় ফিরে গেছে, কিন্তু আরও চরিত্রহীন, আরও নপুংসক হয়ে। আমরা যারা মলয়ের সমবয়সী প্রায়, তাদের কাছে ১৯৬১-১৯৬৫-এর মলয়ের নৈরাজ্যিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, ওই সময়ে নঞর্থক মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল সামাজিক দায়হীন। কিন্তু আজকের অবসন্নতায় ওই
    বিদ্রোহকে সদর্থক মনে হয়। বিশেষ সময়ে অ্যানার্কিও তো সদর্থক বৈপ্লবিক হতে পারে।
    মলয় রায়চৌথুরীর ১৯৬০র দশকে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ও তারপরে নীরব থেকে ১৯৮০র দশকে অন্যভাবে দেখা দেওয়া, আমাদের মধ্যবিত্ত বিদ্রোহের এক প্রতীকি চিত্র। সেই ১৮২০-৩০এর দশকের ডিরোজিয়ানদের সময় থেকেই এই পরম্পরা আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেনিতে আছে। ওই বিদ্রোহটাও যেমন সত্যি আবার প্রতিষ্ঠানে ঢুকে যাওয়াও তেমনি সত্যি। উপনিবেশ ও ১৯৪৭-এর পরের অব-উপনিবেশের বাস্তবে ক্রিয়াশীল উৎপাদন সম্পর্কশূন্য বৃহত্তর জনসমাজ ও জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত এই বিদ্রোহ, এই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতাকে তুচ্ছ করা অনৈতিহাসিক, কারণ মধ্যশ্রেনির ইতিহাসের নিরন্ধ্র অবসন্নতা ও করুণ আত্মসমর্পণে, ট্র্যাজেডি নয় ফার্সে,
    এই ক্ষণস্ফূলিঙ্গগুলিই একমাত্র বাঁচবার ইঙ্গিত। এদের ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীগত ব্যর্থতা প্রায় অনিবার্যই ছিল। তবু, তারা যে কম্পন নিয়ে এসেছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হয়।
    মলয় রায়চৌধুরীর নিজের সাক্ষেই বোঝা যায়, একটা টানবাপোড়েন গোড়া থেকেই ছিল। মলয় দেখাতে চেয়েছেন তিনি প্রায় স্কুলে পড়াশুনা ন-করার ভূমি থেকে এসেছেন। তাঁর দাদা সমীরই তাঁদের বাড়ির প্রথম স্কুলে-পড়া, কলেজে-পড়া। অর্থাৎ যে ঔপনিবেশিক শিক্ষায় বাঙালি মধ্যবিত্ত জারিত, তার শেকড় তাঁদের পরিবারে ছড়ায়নি, তাঁর প্রজন্মেই এর সূত্রপাত। কিন্তু ওই প্রথম প্রজন্মেই এই শিক্ষার ধার তীক্ষ্ণ হয় ; ‘এদিকে মলয় আমার ছোটোভাই তখন অর্থনীতির স্নাতকোত্তর ক্লাসের শেষ বছরের ছাত্র। সারাদিন ঘাড় গুঁজে বিস্তর বই পড়ে ; সমাজ নিয়ে, পৃথিবী নিয়ে অনেক ভাবনা,
    কথায়-কথায় এঙ্গেলস, কিয়ের্কেগার্দ, মার্কস, স্পেঙ্গলার ইত্যাদি থেকে উদ্ধৃতি দেয়। পাটনায় গেলে আমাকে কেবলই বলে, “সাহিত্য এইভাবে এলোমেলো হয় না ; একটা পরিকল্পনা মতো এগোনো উচিত। কী বলতে চাও, করতে চাও, সবার আগে সেটা ঠিক করো, আন্দোলন চালাও। আন্দোলন দরকার।”...’
    সমীরের এই ছবিতে কোনও নৈরাজ্যবাদী মলয়কে পাই না। বরঞ্চ ইয়োরোপমুখী এক যুবককে, যে পরিকল্পনা চায়। এই যুবক অব-উপনিবেশের যুদ্ধ-দাঙ্গে-দুর্ভিক্ষ-দেশভাগ ধর্ষিত কলকাতায় এসে পালটায়, কলকাতা তাঁকে পালটায়। তাঁর অ-নাগরিক অভ্যাস কলকাতায় বেমানান -- কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত অ-নাগরিক অভ্যাসকে তিনি প্রলেতারিয় ভাবছিলেন। নিজেকে শ্রেনিচ্যূত করতে চাইছিলেন। আর এই জন্যই একটা জীবনযাপন বেছে নিয়েছিলেন যা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের পক্ষে দুঃসহনীয়। ঠিক যেমন একদা ডিরোজিয়ানরা বেছেছিলেন -- তখন মদ্যপান, গোমাংসভক্ষণ ছিল হিন্দু ভদ্রলোকের পক্ষে ক্রোধের কারণ, যদিও অনেক ভদ্রলোকই আড়ালে মদ্যপায়ী, বেশ্যাগমনে অভ্যস্ত। । কিন্তু ডিরোজিয়ানরা এসব করছিলেন প্রকাশ্যে, একটা বিদ্রোহের আদলে। মলয় নিজেদের অবস্হাকে বলেছেন ‘ষাট দশকীয় ফাটিচার’। কলকাতার সাহিত্য মহলে আর্টেমিস-ক্রেসিডা-ইউলিসিস এসব নামে অস্বস্তিবোধ করতেন তিনি, কিন্তু “আমাদের মগজে রেজিস দেবরে, আরনেসতো চে ভারা, ফিদেল কাসত্রো নামগুলো বরঞ্চ মিহিন ঘণ্টাধ্বনি শোনাচ্ছে। ”
    এঁরাও সকলেই বিদেশের -- তবে অন্য ভূবনের। ষাট দশকের কলকাতার বিপরীত টানেই পাটনার সিরিয়াস যুবক মলয় রায়চৌধুরী তাঁর প্রতিষ্ঠাবিরোধিতার নৈরাজ্যিক আকাশে মুক্তি চাইলেন। এই কলকাতাই তাঁকে বুঝিয়েছিল, ‘ষাটের দশকে সুস্হতা সত্যিই অবাস্তব ছিল।’ মলয়ের এই সিদ্ধান্ত ইতিহাস-বোধে উজ্বল। ষাটের দশকে যে সুস্হভাবে বাঁচা অবাস্তব ছিল, তার প্রমাণ সেই দশক জুড়ে নানা ধরনের বিদ্রোহ যার শীর্ষবিন্দু নকশাল অভ্যূথ্থান। মলয়দের আন্দোলন, নকশাল আন্দোলনের একদিকের পূর্বাভাস। তিনি দেবরে, গ্বেভারা, কাসত্রোর কথা বলেছেন, তাতে বোঝা যায় তাঁর অন্তরে তিনি, ব্যক্তিগত নানা ট্যাবু ভাঙার মধ্যেই, একটা রাজনৈতিক বীক্ষা বহন করতেন। ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ নামে বইও লিখেছিলেন। এই বীক্ষা তাঁর বিদ্রোহে সেইভাবে উপরিস্তরে আসেনি, কিন্তু অনেক হাংরি যে পরে নকশাল হয়েছিল, তার কারণ কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত কারাগার ভেঙে ফেলার আগ্রহ। মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন, তিনিও গুণ্ডা-মাস্তান হয়ে যেতেন, কবিতা না-লিখলে। নিজেকে কবিতা লেখার ক্রিমিনাল বলেও অভিহিত করেছেন। আর এক -এক করে সেই কবিদের নাম করেছেন যাঁদের জেলে বা জেলের বাইরে খুন করা হয়। মলয় নকশাল প্রসঙ্গ আনেন তাঁর ‘হাংরি কিংবদন্তি’ বইতে। ঠিকই করেন। মলয়ের বিদ্রোহ ছিল দক্ষিণ ও বাম দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই -- অন্তত মলয় তাঁর পঠন-পাঠন থেকে, বুদ্ধিগত জগৎ জগৎ কোনও সময়েই রাজনৈতিক বীক্ষার অন্তঃসলিলা স্রোতকে ফেলে দিতে পারেননি। জীবনযাপনের নৈরাজ্যের মধ্যেই একটা বুদ্ধিগত, মননগত স্তর তাঁর থেকেই গিয়েছিল। কবিতা ও সাহিত্যকে কেন্দ্রবিন্দু রাখায় ব্যক্তিক জীবনযাপনের তীব্র নেশাগ্রস্ত নৈরাজ্যই তাঁর কাছে বিদ্রোহের মূল ধরণ হয়ে ওঠে।
    এটাকে মেলাতে চান কবিতায়। কিন্তু হাংরি প্রজন্মের সাহিত্যগত কীর্তি কবিতায় নয়, গদ্যে। ওই কিংবদন্তি, ওই ছাপ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের মূল্যায়ন করলে, গদ্যই থাকবে ; অন্তত আমার মতো পাঠকের কাছে, যার চিন্তাভাবনাকে, নকশাল অভ্যূথ্থান, ব্যর্থ হলেও ওলোটপালট করে দিয়েছিল। ওই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা অবশ্যই স্পষ্ট, তবুও। তেমনি ষাটের দশকে একদল যুবকের ব্যক্তিক জীবনের নিরুদ্দেশযাত্রী হওয়ার তাৎপর্য এখন ধরা পড়ে। এই নিরুদ্দেশযাত্রার মূল্য অবশ্যই তাদের দিতে হয়েছে। তবে যেহেতু নকশাল বিদ্রোহ রাষ্ট্রকে খানিকটা ভীত করে তুলেছিল, তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জনসমাজের সমর্থনে এ-বিদ্রোহের ওপর ভয়াবহভাবে নেমে আসে। ওই বাস্তব অসহ্য-লাগা যুবকদের হত্যা করে, অনেককেই সারা জীবনের মতো পঙ্গু করে দেয়। এই বঙ্গে এ-আন্দোলন নির্মমভাবে দমিত হলেও, ওই প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ সম্পর্কে একটা প্রশ্ন, সংশয় ও আন্দোলন রেখে গেছে। তার আগের মলয়দের হাংরি আন্দোলন জেল-মামলাতেই শেষ হয়। মলয়ও সেই নকশালদের মতো, যাঁরা শেষ পর্যন্ত এই সমাজে, প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে আত্মস্হ হয়ে যান ; এমনকি ওই অতীতকে কাজে লাগিয়ে, পুঁজি করেন। এ সত্ত্বেও মলয় রায়চৌধুরীর ষাটের দশকের বিদ্রোহ মিথ্যা হয়ে যায় না,
    অন্তত তিনি তাকে তাঁর অন্যান্য বন্ধুদের মতো ( সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রমুখ ) প্রকাশ্যে পুঁজিও করেননি। এ-প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, মলয় রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানবিরোধি বিদ্রোহ যে পুলিশ-আদালত-জেল-মামলার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তার নিষ্পত্তি কিন্তু প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপেই হয়। তাঁর বন্ধুরা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ও মুচলেকা দিয়ে মুক্তিলাভ করেন। মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন, “লালবাজারে পুলিশ কমিশনার বললেন, তিনি আমাকে সাব ইন্সপেক্টরের চাকরি দিতে চান, কারণ সাজা হবার ফলে ( দুশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড ) আর কোথাও চাকরি হওয়া মুশকিল। পরে জেনেছি অ্যালেন গিন্সবার্গ পুপুল জয়াকরকে চিঠি লেখার পর জয়াকর তা ইন্দিরা গান্ধিকে জানান ; দিল্লির নির্দেশে কলকাতার বাঙালি পুলিশ তখন ফাঁপরে।” মলয় রায়চৌধুরীর পাশে এসে দিল্লির প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছিল, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক স্তরভেদ আছে। আর লক্ষণীয় গিন্সবার্গের ভূমিকা। তিনি কিন্তু ‘কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডাম’-এর পাণ্ডাদের
    সাহায্য চেয়েছিলেন -- আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রত্যাখ্যান করেন এ সাহায্যের আবেদন। প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলনের নেতার এরকম আশ্রয় থেকে বোঝা যায় মলয়দের নিয়ে এসট্যাবলিশমেন্ট খেলছিল। নকশাল-আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এই বঙ্গেও ওই খেলা নানাভাবে দেখা যায়। তার আগে সন্ত্রস্ত প্রতিষ্ঠান তাদের একের পর এক হত্যা করেছে -- আর সেই হত্যার এ-বঙ্গের প্রতিষ্ঠানের নায়করা পরবর্তী বাম-রাজত্বে থেকেছেন ; শুধু তা-ই নয়, উন্নতি করেছেন। যেমন, যে সোমেন চন্দকে নিয়ে আজ বামপন্হী মহল উচ্ছ্বসিত, যাঁর হত্যার বিরুদ্ধে ধিক্কার বারবার উচ্চারিত, তাঁর হত্যার ‘প্রকৃত ঘটনা হল এই যে, সোমেন চন্দ রেলওয়ে শ্রমিকদের নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে শুধু ফ্যাসিবিরোধী
    সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঢাকার নারিন্দাপুল পার হয়ে বটগাছের কাছেই আর. এস. পির ঘাতকবাহিনী ঘিরে ফ্যালে সোমেন চন্দকে। তারপর নির্মমভাবে হত্যা করে।’ এই আর.এস.পি এখন বামফ্রণ্টের শরিক ও মন্ত্রী। এরাই ফ্যাসিস্ট বাহিনীর মদতদাতা ছিল। প্রতিষ্ঠান কতো খেলাই খেলে, কতো রঙই বদলায়।
    মলয় রায়চৌধুরীও ওই খেলার পুতুল হয়ে ছিলেন। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় তিনি মামলা-আদালত জেল-জরিমানার যে ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন, প্রতিষ্ঠানই তার থেকে তাঁকে বাইরে নিয়ে আসে।
    অবশ্য মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে এসব কথা এখন অবান্তর। কারণ তাঁর সম্পর্কে এখন আমি যে লিখছি তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বা আদালত-মামলা জেল-জরিমানার বৃত্তান্তের জন্য নয়। মলয় নামক একজন কবি ও ঔপন্যাসিকই আমার আগ্রহের মূলে। তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার তাৎপর্যই এই সূত্রে বিবেচ্য। এক একজন পাঠক এক একজন লেখক ও আন্দোলনকে নিজের নিজের মতন করে দেখেন। আমার কাছে শুধু মলয়ই নয়, গোটা হাংরি জেনারেশনের লেখকদেরই গদ্য যতো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, কবিতাকে তেমন মনে হয়নি। যে-কোনও কারণেই হোক, কবিরা, বোধহয় ইয়োরোপ আমেরিকা কবিদের জীবনকাহিনি শুনে পঞ্চাশের দশক থেকে ব্যক্তিজীবনের হুল্লোড় ও নানারকম কাজ কারবারকে গুরুত্ব দিতে থাকেন, ফল হয় কবিতার অধঃপতন যা এখনও চলছে। মলয়ও তাই করেছিলেন। কিন্তু গদ্যে একেবারে বিপরীত।
    হাংরি আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে মলয় লিখেছেন, ‘স্হিতাবস্হা ভাঙার ভাষাই নয় কেবল, ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার চেষ্টাই চালিয়েছেন। ’ গদ্যে এটাই প্রকৃত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
    বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালার’ নামও করতে পারি। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে এটা আদৌ হয়নি। ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার কোনও লক্ষণই নেই। আর যেহেতু জীবনযাপন কবিতাকে চিৎ করে ফেলছিল, সেহেতু ওই জীবনযাপনের তাৎক্ষণিক অনুভূতি কবিতায় এমনভাবে অন্তত মলয়ের কবিতায় আসতে চাইছিল, যাতে কবিতার থেকে ওই অনুভূতিই বড়ো হয়ে ওঠে। জীবন কবিতাকে খেয়ে ফেললে মুশকিল, জীবনের ক্ষুধাকে কবিতার রসায়নে দাঁড়াতে হয়। আজ এই ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ভাবতে অবাক লাগে মলয়ের বেশ কাঁচা কবিতা
    ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ অতো হৈ-চৈ, অতো শিরঃপীড়ার কারণ কেন হয়েছিল। একেবারে মধ্যবিত্ত ভাষা জর্জরিত মধ্যবিত্ত কবিতা এটি :-
    “অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
    যোনিকেশরে কাচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্হতা
    আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
    আমি বুঝতে পারছি না কি জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
    শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
    কবিতার জন্য আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
    শুভা আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ করতে দাও
    দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
    বেসামাল হৃদয়বেত্তার স্বর্ণসবুজে”
    যে-নিম্নবর্গীয় ভাষার আক্রমণে ভাষার স্হিতিস্হাপকতাকে বিপন্ন করার ভাবনা মলয়ের, এই উদ্ধৃতিতে তার কি কোনও চিহ্ণ আছে ? যোনি, স্তন, বীর্য -এসবই সংস্কৃত শব্দ। এদের নিম্নবর্গীয় শব্দ মলয় ব্যবহার করেননি। এসব শব্দ এলিট পরম্পরায় বহু ব্যহৃত। আর ‘অশ্লীল’ এই ধারণাটির স্হান-কাল-পাত্র আছে। এখন আর তথাকথিত অশ্লীল দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ঘুম কাড়া যায় না, কারণ সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানই তো অশ্লীল --- অশ্লীল অর্থনীতি, অশ্লীল রাজনীতি, অশ্লীল সমাজ, রাস্তায় ঘাটে একেবারে মধ্যবিত্ত ছোকরাই দু-তিন-চার অক্ষরের শব্দ প্রকাশ্যে বলে। নিম্নবর্গীয়দের অশ্লীল শব্দের যে পেশলতা, যে চিত্রকল্প, যে জোর, তা এই অশ্লীলতায় নেই -- মলয়ের কবিতায় ‘পাজামায় শুকিয়ে যাওয়া বীর্যের’ মতোই সৃষ্টিহীন, অসুস্হ। আসলে ষাটের দশকে মলয় রায়চৌধুরী এক ধরনের আরোপিত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় মেতেছিলেন, অথচ তাঁর চৈতন্যে গভীর বোধ ছিল। সেই বোধ জীবনযাপনের তীব্রতায় হারিয়ে যেতে থাকে। তাঁর মনে হয়, অশ্লীলতা বুঝি শুধু যৌনতাবাচক শুধু কতকগুলি শব্দ। এটা যে সামগ্রিক মূল্যবোধ-জনিত, আর প্রতিষ্ঠান যে অশ্লীল হয়ে উঠেছে সব দিক দিয়ে, বাইরের পোশাকের আড়ালে অশ্লীল, সেটা হয়তো বুঝতে পারেননি। ১৯৬৫ সালের পর মলয় এর থেকে বেরিয়ে আসেন।
    মলয় তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার, প্রত্যাখ্যানের যথার্ধ পরিচয় রাখেন তখন, যখন তিনি ওই ষাটের দশকের জীবনযাপনের গণ্ডি থেকে সরে এসেছেন, আপাতদৃষ্টিতে যেন প্রচলিত মধ্যবিত্ত জীবনের মধ্যে এসেছেন। ‘তারপর দেড় দশক আমার লেখালিখি ছেড়ে যায়। জীবন কাটানোর ভাবনায় বন্ধুবান্ধবে আত্মপ্রকাশে আর্থিক অবস্হায় এই দেড় দশকে আমূল পরবর্তন ঘটে যায় আমার মগজে ও শরীরে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাসে। ’ ‘এখন তো আমার সেই সময়ের জীবনটাকে ভয়াবহ মনে হয়। এখন ভালো চাকরির পাতি-বুর্জোয়া আরামে প্রতিবাদ প্রতিরোধের লেখালিখি অনেক আরামদায়ক আর সহজ।’ ‘ক্রমশ একলা থাকার মধ্যেই নিজের আরাম আনন্দ
    শান্তি টের পাই। ’ অর্থাৎ এখন জীবনযাপন মলয়ের লেখাকে ছাপিয়ে যায় না।
    প্রতিবাদ-প্রতিরোধের লেখাই তো ষাটের দশকে মলয় লিখতে চেয়েছিলেন, তাতে পুলিশ, আদালত, অশ্লীলতার অভিযোগ, জেল-জরিমানা, লকাপে রাতকাটানো। এখন সেটা অনেক আরামদায়ক ও সহজ। কেন ? তবে কি প্রতিষ্ঠান তার মূল্যবোধ পালটেছে ? নাকি তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান, ও তাঁর সহযোগীরা ( এমনকি হাংরি আন্দোলনকারীরা ) খড়্গহস্ত হয়েছিল, লেখার জন্য নয়, জীবনযাপনের জন্য। তুলনা করছি না, ডিরোজিয়ানদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, তারাও ঔপনিবেশিক সরকারি উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন, এমনকি ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়নের অন্যতম উদ্যোক্তার জীবনীও তাঁরা পরবর্তীকালে লিখেছেন।
    সেই সময়ের জীবনটাকে ভয়াবহ মনে হয় -- এখানেও জীবনের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া। শিল্পের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া বোধহয় এটাই যে ওই জীবনযাপন থেকে সরে আসার পর, পাতি-বুর্জোয়া জীবনে লগ্ন হওয়ার মধ্যেই মলয় যথার্থ প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখা লিখলেন। আমার মতে কবিতায় নয়, গদ্যে। মলয় তাঁর শেষ জীবনে এখনও কোনও সরকারি-বেসরকারি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হননি, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সে-অর্থে হাত মেলাননি। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা আসলে একটা প্রত্যাখ্যান ( তিনি অকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন )।
    আমাদের অব-ঔপনিবেশিক বাস্তবে এখন এই প্রত্যাখ্যান বিশেষ জরুরি। মলয়ও জানেন, কোনও সামূহিকের সঙ্গে মেলা যায় না ; একলা হওয়া অনিবার্য মলয় ওই নিঃসঙ্গ প্রত্যাখ্যানের স্বপ্নে এখনও স্হির। দেড় দশক পরে যে কবিতা লেখেন, তাতে ওই প্রত্যাখ্যানের চেতনা, যা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার চেয়ে অনেক গভীরতলের :-
    ওগো স্তন্যপায়ী ভাষা পিপীলিকাভূক মুখচোরা
    শব্দগহ্বর খেয়ে নোকরশাহির রাজয় এনেছি এদেশে
    তথাকথিত অশ্লীলতা নেই, কিন্তু আছে নোকরশাহির চেতনা,
    আছে ভাষার প্রতিষ্ঠানকে ভাঙার ‘মুখচোরা’ সংকল্প।
    হাতের কাছেই রয়েছে মলয়ের উপন্যাস ‘নামগন্ধ’। প্রকাশিত ১৯৯৯ সালে। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার, প্রাতিষ্ঠানিক স্হিতাবস্হার মূল্যবোধের বিরুদ্ধের বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস। স্হিতাবস্হা ও ভাষার স্হিতাবস্হা ভাঙার মূল্যবোধের এই উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বোঝা যায় মলয় রায়চৌধুরী এখন কোথায় দাঁড়িয়ে।
    “ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়ায়, গলির তলপেটের ঘিঞ্জি গলির ছমছমে অজানায়
    হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, বড়ো রাস্তায় পৌঁছোবার পথ খুঁজে পায় না ওরা,
    আদিত্য আর অরিন্দম, খুঁজে পায় না শহরের নির্লিপ্ত নাগরিকতায় গিয়ে মিশে
    যাবার দরোজাটাকে। টাকরা শুকিয়ে গেছে অনভ্যস্ত অরিন্দমের। পা চালানোর
    ফাঁকে ফাঁকে ডানদিকে, এস.কে.চ্যাটার্জি লেন লেখা রাস্তাটায়, গোটা তিরিশেক
    লোকের মাথা-গিজগিজে ভিড়, চলছে ঝাড়পিটের তুমুল।”
    একটি খুনের পটভূমিতে এই ভাষা বাঙময়, স্হিতাবস্হাকে টলিয়ে দেয় :
    ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়া, এই সময়ের রাজনীতির ছবি হয়ে ওঠে।
    ‘গলির তলপেট’ চিত্রকল্পটি ছমছমে, হনহনিয়ে শব্দ অর্থময় ; ‘চলছে ঝাড়পিটের তুমুল’ -- প্রায় কবিতার মতো ভাষা ধরিয়ে দেয় বাস্তবকে। মলয় শুরু করেন ওই রাস্তায় হত্যা ও উঁচু চাকরি-করা অরিন্দম ও পুলিশে চাকরি-করা আদিত্যকে দিয়ে, যাকে ‘ক্রনোটপ’ বলে, সেদিক থেকেও এই রাস্তা তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নামগন্ধ’ গত কয়েক দশকের এই বঙ্গের সার্বিক চরিত্রহীন হয়ে যাওয়ার বৃত্তান্ত। এ বৃত্তান্তে অরিন্দম ও যিশু বিশ্বাস দুটি দিক। এই চরিত্রহীনতার মধ্যে এর সাক্ষী হয়েও তারা স্হিতাবস্হার বাইরে যেতে চেয়েছিল দুই নারীকে নিয়ে। বস্তুত ওই দুটি নারী মধ্যবিত্ত ও সামাজিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে যেন চিত্রকল্প। মধ্য চল্লিশের যিশু বিশ্বাস পঞ্চাশ বছরের খুশিদিকে নিয়ে চলে আসতে
    চেয়েছিল। খুশি তার ‘দাদা’ ভবেশ মণ্ডলের হাতে যেন বন্দিনী। ভবেশ মণ্ডল পঞ্চাশ দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত সময়ের যেন বিবর্তনের প্রতিমূর্তি। বিদ্রোহ, অভ্যূথ্থানকারী ভবেশের পরিণতি তো এই সময়ের সাম্যবাদী দলেরই পরিণতি। এই পরিণতিতে খুশি বন্দী হয়ে যায়। যিশু যেন ওই বন্দিনীকে উদ্ধার করতে চায়। দীঘদিন পরে উধাও হয়ে যাওয়া ভবেশকাকে যিশু আবিষ্কার করে। পালটে যাওয়া ভবেশকাকা। আর তার হাতে বন্দি সেই খুশিদি, যে হয়তো শেষ বাঙালিনী। যিশু এই খুশির শরীরেই বাঁচতে চায়, এ কোনও শারীরিক টান নয়, এ যেন এক ঐতিহাসিক বাঁচবার আবেগ -- ভবেশকাকাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যিশুর হাত ধরে পাঠক পৌঁছে যায় এখনকার গ্রামীণ বাস্তবে --- আলু চাষ, হিমঘর, কিছুটা তাঁত, এসবের রাজনীতি-অর্থনীতিতে ধরা পড়ে এই সময়।
    আদিত্য নামক পুলিশ কর্মচারীর সূত্রে এই সময়ের শাসন, আমলা, এই বাস্তবের স্তরটি আসে। আদিত্যর ব্যক্তিগত বৃত্তান্তও দেখায় সময়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে। অন্য দিকে প্রমে পড়ার বাতিকগ্রস্ত উচ্চপদের অরিন্দম মধ্যবিত্ত পচনকে সরাসরিভাবে দেখায়। এই পচনের নানাছবির মধ্যে শেওড়াফুলিতে পিসিমার বাড়ির যে-ছবি আঁকা হয়, তাতে এই শ্রেনির পচে যাওয়ার কদর্য রূপ প্রকট হয়ে ওঠে।
    “স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বড়ো বউদি, এমেবিয়েড, হাতে টলমলে গেলাস, ফর্সা,
    ভারিক্কি গতরকে একত্রিত করে পাছ-ঘেঁষটে উঠে বসে আর বাঁহাতে অরিন্দমের
    গলা আঁকড়ে, নিজের কানা ভরা গেলাস দাঁতে দাঁত অরিন্দমের ঠোঁটের ওপর উলটে দিলে।
    খাবিনে মানে, তোর গুষ্টি খাবে, জানিস আজ আমার জন্মের সুবর্ণজয়ন্তী।
    বিশাল বুকের মধ্যে অরিন্দমের মাথা ঠাশা। ”
    তারপর শুরু হয় অশ্লীল গল্প বলার পর্ব। লেখকের মন্তব্য :
    ‘আমরা সবাই মিথ্যাগ্রস্ত মাতাল। বাঙালি মধ্যবিত্তের এ এক অদ্ভুত যাযাবর হামাগুড়ি।’ এই হামাগুড়ির প্রাক ইতিহাসও বলা হয় : এখন নোংরা নোংরা মোদো চুটকিতে মধ্যবিত্তের খোঁয়ারি উঠছে। অধ্যাপিকা ছুটকিও মাতাল, কোকা-কোলার সঙ্গে রাম ভালোবাসে। অরিন্দমের কোলে পা, অরিন্দম আলতা পরায়। সমগ্র মধ্যবিত্ত ল্যাংটো হয়ে যায় বিবরণে।
    ‘নামগন্ধ’ এই বিবিধ পচনের প্রতিবাদ -- যিশুর খুশিদি আর অরিন্দমের কেটলিউলি সেই প্রতিবাদের, মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের, গত চার-পাঁচ দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার নারী। এরা মধ্যবিত্ত সীমার বাইরের। দু-জন এদের মধ্যেই মধ্যবিত্ত প্রতিষ্ঠানেরই মূল্যবোধের কারাগার ভাঙতে চেয়েছিল। এই দুই নারীকে অবলম্বন করে এরা পেরিয়ে যেতে চেয়েছিল তাদের শ্রেনিকে, ওই ভবেশকাকা তথা এই সমাজের ক্রিয়াকে। ওই শেওড়াফুলিতে প্রতিবিম্বিত
    মধ্যবিত্ত বাস্তবকে। কিন্তু পারল না। আকস্মিক দুর্ঘটনায় রিন্দম-কেটলিউলি আর ডাকাত-ডাকাত চিৎকারে যিশু বিশ্বাসের মৃত্যু হয়। আপাত আকস্মিক এই ঘটনা দুটি এই সময়ের গর্ভে স্বাভাবিক। যেমন স্বাভাবিক উপন্যাসের শুরুর হত্যাটি। আর শেষে আরেক ইতিহাসের স্তর আবিষ্কৃত। খুশি ভবেশ কাকার বোন নয়। যিশুর মৃত্যুর সময় একটা পুরোনো হলদে কাগজের পাতা উড়তে থাকে, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ। এক নাতনির হারিয়ে যাবার বিজ্ঞাপন, দিয়েছেন দাদু মিনহাজুদ্দিন। মেয়েটির নাম খুশবু। ডাক নাম খুশি। ভয়ংকর শব্দে ইতিহাস ফেটে পড়ে -- ইতিহাসের গন্ধ, ‘নামগন্ধ’ ছড়ায় --
    খুশি, পঞ্চাশ বছরের খুশি হয়ে ওঠে অর্ধশতাব্দীর সময়, ইতিহাস, আবেগ, শরীর। তাকে আমরা পাই না -- সময়ের আকস্মিক মোচড় হত্যা করে নানাভাবে। প্রতিষ্ঠান খেয়ে ফেলে তাদের। আর এর বিরুদ্ধে কবি মলয় রায়চৌধুরী দাঁড়ান এই গদ্যেই। কী অনবদ্য কবিতা উঠে আসে যিশুর আবিষ্কারে :-
    “খালি পায়ে, বাগানের ঘাসপথ বেয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়ায় যিশু। আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে বাতাস। বাতাসের ডাঁটো স্ট্যাচু যেন। সব স্হির। ডানপাড়ের বিশাল গাছে তেঁতুলপাতাও কাঁপছে না। বাঁধানো ঘাটে বয়ঃসন্ধির বালিকার মতন একধাপ ওপরে তো একধাপ নীচে খেলা করবার পর ক্লান্ত হয়ে গেছে টলমলে পুকুর।”
    কিংবা :-
    “জনশ্রুতির মতন বাতাস বইছে।...মদগর্বিত ষাঁড়। মদিরেক্ষণা মৌমাছি।
    ভিজে চিলের মতন ডানা ঝুলিয়ে রয়েছে ঝিমন্ত কলাগাছগুলোর ছেঁড়া পাতা।
    কঞ্জুস হাওয়ার তাপে বাবলাগাছগুলোর গায়ে কাঁটা দিয়েছে। পথিপার্শ্বে উইপোকাদের বিজয়স্তম্ভ। মার্জিত চেহারার খেজুর গাছ, গলায় খেজুর ছড়ার মালা।”
    অথবা :-
    “চাঁদ ঢাকা পড়ে গেছে কালবৈশাখির ছেতরানো মেঘে, কিন্তু পূর্ণিমার আগাম আভায় নির্জন বধির অন্ধকারকে মনে হয় হাস্যোজ্বল। নিরলস সাধনায় মগ্ন স্হির সন্ধ্যাবাতাস আচমকা হাওয়ার জন্য অপেক্ষমান। নেশাগ্রস্তের মতন মাথা ঝুঁকিয়ে আছে গাছগুলো। বুনো সুগন্ধ ছড়াচ্ছে সিসলকাঁটার গুড়িসুড়ি ঝোপ।”
    এই উদ্ধৃতিগুলিতে, উপমা-চিত্রকল্পে, ভাষার স্বাতন্ত্র্যে, যে-কবিতাময়তা, তাতে থাকে ভাষার স্হিতিস্হাপকতাকে আক্রমণ, অথবা নতুন স্হিতিস্হাপকতা গড়া। খুশি ও কেটলিউলি হিন্দু অরিন্দম আর খ্রিস্টান যিশুর, মধ্যবিত্তের বাঁচবার পথ, কেটলিউলি-মেয়েটার শরীর জুড়ে প্রাচীন নিষাদকুলের নাচ লুকিয়ে আছে যেন। এর চাউনি রৌদ্রোজ্জ্বল। চিরপ্রদোষ-মাখা শ্যামাঙ্গিনী। আর খুশিদিকে দেখে যিশুর মনে হয়, চাষি মেয়ের শ্রমসোহাগী পেশল বাহু ঝুলে আছে। ওই প্রাচীন নিষাদকুল, ওই শ্যামলিনী, চাষি মেয়ের পেশল বাহুই আমাদের প্রতিষ্ঠানের, কবন্ধ মূল্যবোধের বাইরে আনতে পারে। এ সম্ভাবনার দরোজা কি খুলবে ? মলয় রায়চৌধুরীর এ-প্রশ্নকেই রেখে দেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার তাৎপর্য এখানেই। মলয় এভাবেই ষাটের দশক থেকে পালটেছেন -- যেতে চাইছেন সময়ের গভীরে, তার নাভিকেন্দ্রে।
     
     
     

     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২৩735087
  • Prof Nissim Ezekiel : The Hungry Generation
    The Hungry Generation Movement in Bengali literature, which took Calcutta by surprise in 1961, and became instantaneously known through TIME magazine, has withstood all odds, and is now a historical and cultural force to reckon with. The movement has grown to uncontrollable proportions. All sorts of groups have emerged at various places in West Bengal claiming to be of Hungry Strain.
    The major Hungry Generation writers and poets are in their late forties now: Subimal, Malay, Basudeb, Subhas, Saileswar, Pradip and others. They have always been at the receiving end from the media due to their uncompromising stand. Except for Debi Ray, who broke with the Hungries quite early, none of them are invited to participate in the national or regional TV and radio programmes, official workshops/seminars/recitals/readings.
    The Hungry writers, better known as the Hungry Generation, are immensely popular among students and young writers today, as they are considered the voice of conscience in a Bengali society shattered by internecine political struggles of the post-partition years. Interesting, though, the Hungry Generation writers, poets and artists do not function as a group any more. But they remain the only avant garde figures in Bengali literature, always experimenting, always questioning, expressing themselves in ultimate terms. “The Movement”, as the renowned critic Dr Uttam Das has said, “is an important event in the history of Bengal”.
    Malay Roychoudhury(b. 1939), the towering avant garde poet who pioneered the Hungry movement in Bengali literature, is a legend by himself. Still uncompromising, and therefore not supported by the Bengali media, all his collections have so far been published by his friends and relatives. Despite being hailed by TIME magazine as an outstanding poet, he remains as controversial as he was in 1961 when he entered the literary scene in Calcutta with a whiff of liberated form, and an uninhibited approach towards expression of Indian thought concerning self and society, love and destruction, politics and despair.
    Malay had given up writing sometime in 1966 after some of his friends has betrayed and testified against him. But he returned with a vengeance in 1983, and took the Bengali scene by storm. His poems have been translated into almost all Indian languages as well as into Spanish, German, French, Russian and Italian. He has translated Ginsberg, Lorca and Neruda into Bengali. Malay’s collection of verse includes Shoytaner Mukh, Jakham, Kabita Sankalan, and the recently published collection revealing violence, fear and agony, in Medhar Batanukul Ghungur.
    Although once the leader of the fierce Hungry Generation movement, Malay now lives the life of a recluse in Bombay. The poets of the younger generation look at him with awe and inspiration. We feel he is the ultimate representative of his kind of poetry.
    (Courtesy: Prof Nissim Ezekiel, Editor, The Indian P.E.N., Mumbai, 1987)
  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২৪735088
    • মলয় রায়চৌধুরীর ডুবজলে,জলাঞ্জলি, নামগন্ধ উপন্যাসত্রয়ী : সমীর সেনগুপ্ত
      যাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি, আর যাকে চিনি না — তাদের কাজ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, বা এমনকি ভাবতে গেলেও — দৃষ্টিভঙ্গীতে একটা তুলনাত্মক পরিবর্তন এসে যেতে বাধ্য। আজ যদি আমাকে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা নরেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পর্কে লিখতে বলা হয়, আমার রচনা কিছু পরিমাণে নিরঙ্কুশ হবেই — কারণ এঁদের কাউকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতুম না, এঁদের কাজ বিষয়ে আমার হাতে আছে শুধুই এঁদের কাজ, আর হয়তো কিছি দ্বৈতীয়িক তথ্য, মানুষটিকে আমার জানা নেই। অর্থাৎ একটি বিন্দুতে আছি আমি, আর একটি বিন্দুতে আছে তাঁর কাজ — সম্পর্কটা দ্বিমাত্রিক ; কিন্তু যে-মুহূর্তে আমি মানুষটিকে জানছি সেই মুহূর্তে সম্পাদ্যটি তৃতীয় একটি আয়তন পাচ্ছে, তাঁর কাজ সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন প্রভাবিত হচ্ছে আমার মনের মধ্যে নির্মিত তাঁর ভাবমূর্তির দ্বারা। সঙ্গে সঙ্গেই অনেক জটিল হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা।
      মলয় রায়চৌধুরীকে আমি চিনি — ঘনিষ্ঠতা যাকে বলে হয়তো নেই, কিন্তু মানুষটিকে জানি, এবং পছন্দ করি, তাঁর কাণ্ডজ্ঞান অত্যন্ত সূক্ষ্ম বলে এক ধরণের শ্রদ্ধাবোধও আছে ভিতরে ভিতরে l তাছাড়া অনেক বিষয়েই মলয়ের পড়াশোনা ও অন্তর্দৃষ্টি আমাকে বিস্মিত করে, এবং লেখা পড়ে মনে হয় দুনিয়াদারির অভিজ্ঞতাতেও মলয় রায়চৌধুরী আমার চেয়ে এগিয়ে — কিন্তু মলয়ের কাজ আমি সাধারণভাবে পছন্দ করি না। মলয়ের সঙ্গে কোথাও আমার একটা আদর্শগত দূরত্ব আছে বলে মনে করি, এবং সে দূরত্ব অসেতুসম্ভব। তফাতটা সাহিত্যসংক্রান্ত বোধের, এবং রুচির। দীর্ঘ দিন ধরে, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা আমাকে এক দিকে নিয়ে গেছে, মলয়কে সম্পূর্ণ অন্য দিকে। ফলে, মলয় যাকে কবিতা বলে মনে করেন, আমার কাছে তা অগ্রাহ্য, মলয়ের যা সাহিত্যিক আদর্শ, আমার কাছে তা মনোযোগের যোগ্য নয়, এবং আমার বিচারে যা সাহিত্যের ধ্রুবপদ, মলয়ের বিচারে — মলয়ের লেখা পড়ে মনে হয়, তা শুচিবায়ুগ্রস্ত, উচ্চমন্য, গজদন্তমিনারবাসীদের জন্য, গজদন্তমিনারবাসীদের দ্বারা রচিত। এই যেখানে পরিস্হিতি, সেখানে মলয় রায়চৌধুরীর লেখার আলোচনার প্রস্তাব আমার বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করা উচিত ছিল। কারণ বিরুদ্ধ আলোচনা স্বাগত হলেও, পক্ষপাতপূর্ণ আলোচনা না করাই উচিত। আর, মলয়ের লেখা আমার ভালো লাগে না, এটা এমনকিছু একটা জরুরি কথা নয় যে, ভুরি পরিমাণ কালি-কাগজ খরচ করে সে-কথাটা বলে বেড়াতে হবে।
      কিন্তু আসল ব্যাপারটা অতো সরল নয়। মলয় রায়চৌধুরীর লেখা আমার ভালো লাগে না এতে কোনও ভুল নেই ঠিকই, কিন্তু বোধহয় কুড়ি বছর পর আমি একটি উপন্যাস রাত জেগে পড়ে উঠলাম, সেটি মলয় রায়চৌধুরীর ‘জলাঞ্জলি’। রাত সাড়ে বারোটায় বইটা হাতে করে শুতে গিয়েছিলাম, যখন শেষ করে উঠলাম, তখন কাক ডাকতে আরম্ভ করেছে। এবং পড়তে পড়তে মনে পড়ল, বছর কয়েক আগে মলয় ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপহার দিয়েছিলেন, সেটি পড়তে আরম্ভ করেও সেদিন আপিস-টাপিস বাদ দিতে হয়েছিল।
      কারণ মলয় প্রথম থেকেই এমন এক জগতে আমাকে নিয়ে প্রবেশ করেন, যা আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত — শুধু অপরিচিত নয়, অচিন্ত্যনীয়। এ কোন পৃথিবী যা বাতিল নোটের দুর্গন্ধ-স্তূপকে ঘিরে ঘিরে আবর্তিত হয় — বাস্তব সেখানে ওই টাকর ভাগাড়ের ভিতর থেকে ভাপের মতো ধোঁয়াতে থাকে। টাকা — কারেন্সি নোট, যা আমাদের সমস্ত সুখের-দুঃখের, প্রাপ্তির-অপ্রাপ্তির, সার্থকতার-অসার্থকতার জগদ্দল প্রতীকমাত্র, ওগুলোর মধ্যে চিরন্তনতা নেই। নেই যে, সেটা আমরা বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারলেই, কথাটা আমাদের উপলব্ধিকে স্পর্শ করে না। যেমন দশ কোটি টাকা মানে কত টাকা আমি বুদ্ধি দিয়ে বুঝি, কিন্তু পুরোপুরি বুঝি না, তেমনি কারেন্সি নোটের নশ্বরতার ব্যাপারটাও, মলয় না-বোঝালে, কোনও দিন সত্যি-সত্যি বুঝতে পারতুম কিনা সন্দেহ। আমরা সবাই জানি কারেন্সি নোট হাতে হাতে ঘুরে একদিন নোংরা হয়, ধারগুলো এবড়োখেবড়ো হয়ে যায়, কাগজ ল্যাতপেতে হয়ে যায়, ভাঁজে ভাঁজে মাঝখানটা ফুটো হয়, ক্রমে সেই ফুটোটা বড় হতে হতে নোটতা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যায়। তারপর কী হয় ? নিশ্চয়ই কোনও না কোনও ভাবে নষ্ট করে ফেলা হয় নোটখানা। কিন্তু সেই কোনও না কোনও ভাবে ব্যাপারটা যে কী ব্যাপার সেটা কখনই জানতে পারতুম না, মলয় রায়চৌধুরীর লেখা না পড়লে। ‘কারেন্সি’ মানেই আমরা জানি যেটা আছে, যেটা কারেন্ট অর্থাৎ বর্তমান, যেটা আমি ও আমার প্রতিবেশীর মধ্যে যোগসূত্র। এবং এইরকম একটা বিভ্রান্তি আমাদের মনে, ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়ে যায় যে, আজ যেটা বর্তমান আছে কালও সেটাই বর্তমান থাকবে। আমরা যারা টাকার বাজারের প্রত্যন্তসীমায় জীবন কাটাই, হঠাৎ হাতে এক গোছা চকচকে নোট এসে পড়লে তাদের মনটা খুশি হয়ে ওঠে, তাদের বউয়েরা সেগুলো পাট করে আলমারির ভেতরের দিকে রেখে দেয়, অথচ কোনও তো কারণ নেই, তেলতেলে অর্ধগলিত নোটের চেয়ে তার তো ক্রয় ক্ষমতা বেশি নয়। তাহলে কেন গ্রেশাম সাহেবের নিয়ম সারা পৃথিবী ভরে সত্য, নতুন নোট হাতে পেতে কেন সারা পৃথিবীর মানুষ লালায়িত ? জানি না।
      আর মলয় যে মানুষগুলির বর্ণনা করেন, তারা ওই গলিত নোটের মতোই বহুব্যবহৃত পুরোনো ভাবনাচিন্তার জগতের মানুষ। তারা যা ভাবে, যেভাবে ভাবে তা বহু বহু পুরুষ ধরে তাদের পূর্বজরা ভেবে এসেছে। কিন্তু মলয় রায়চৌধুরীর লেখার তলায় তলায় এই বার্তা থাকে, যে এই ভাবনাটাই শেষ কথা নয়, ধ্রুব নয়, নতুনভাবেও চিন্তা করা সম্ভব — মলয় রায়চৌধুরীর অতনু হঠাৎ গলিত নোট গোনার আরামের চাকরি ছেড়ে, গ্যাজেটে ক্যাসেটে সাজানো ফ্ল্যাট ফেলে রেখে একদিন উধাও হয়ে যায়, অনেকদিন পর তার খোঁজ পাওয়া যায় গভীর জঙ্গলের মধ্যে রেডবুক থেকে মন্ত্র পড়ে নকশাল তরুণতরুণীদের গণবিবাহ দিচ্ছে। পুরোনো নোট ধ্বংস করে ফেলবার পদ্ধতিটা মলয় দেখান, নতুন নোট তৈরি হওয়ার পদ্ধতিটা দেখান না — সেটা আমাদের আন্দাজ করে নিতে হয়। মলয়ের উপন্যাসের জগতেও, বাতিল ভাবনার মানুষেরা রাজত্ব করে, মনে হয় তারাই রাজত্ব করে যাবে — কিন্তু না, অতনুরাও তাদের মধ্যে থাকে, তাদের রাজত্ব তলায় তলায় টলমল করছে। পুরোনো নোটের মতো তারাও একদিন বাতিল হয়ে যাবে — এটাই কি মলয় রায়চৌধুরীর বার্তা ?
      কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয় রাত জেগে মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস পড়ে ওঠার।
      আমাদের ঘটনাহীন মধ্যবিত্ত জীবনের সবচেয়ে নীরস নীরক্ত নির্বর্ণ অংশ আমাদের চাকরিজীবনের কাহিনি। মলয়ও চাকরিটা করতেন একঘেয়ে ঘটনাহীন — ব্যাঙ্কের নিস্তরঙ্গ চাকরি। কিন্তু মলয় আরও একবার প্রমাণ করলেন, যে বেড়াতে জানে, তার কাছে লিলুয়াভ্রমণও রোমাঞ্চকর হতে পারে ; যে দেখতে জানে, তার কাছে ব্যঙ্কের আপিসঘর হয়ে উঠতে পারে আমাজন অববাহিকার চেয়েও রহস্যময়। চরিটপগুলি, শুধু জীবন্ত বললে কিছুই বলা হয় না, বাঁধা বুলি হয়ে গেছে– স্পন্দমান, তাদের কথোপকথন স্পষ্ট শোনা যায় এতো বেশি জীবন্ত। মলয়ের লেখা পড়তে পড়তে স্পষ্ট দেখতে পাই সেই সব যুবক যুবতীদের, যারা রাত জেগে পড়াশোনা করে, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ভালো ফল দেখিয়ে, প্রতিযোগীতামূক পরীক্ষায় অন্যদের হটিয়ে, অবশেষে একটা গালভরা ডেজিগনেশনওয়ালা চাকরিতে ঢুকলো। এবার যুবকটি একটি নারী সংগ্রহ করবে, যুবতীটি একটি পুরুষকে — তারপর একটা বাড়ি, তারপর সন্তান — অন্য পাঁচ সাধারণ মানুষ যেভাবে জীবন কাটায়, মানুষের পক্ষে যে-জীবন স্বাভাবিক বলে সামাজিকভাবে সীকৃত, সে-জীবনের মূলস্রোতের শরিক হবার পথে কঠিনতম বাধাটি অতিক্রম করল সে। কিন্তু কী চাকরি ? না, দিনের পর দিন একটা বন্ধ ঘরে বসে পুরোনো নোংরা নোট গোনা, সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিন, দিনে সাত-আট ঘণ্টা, আর কোনও কাজ নেই, শুধু নোংরা নোট বাণ্ডিল বেঁধে বেঁধে, গর্ত করে করে, পোড়াবার জন্য পাঠানো। এর চেয়ে অবাস্তব কোনও অবস্হার কথা কল্পনা করা কঠিন।
      কাজ মানে এমনকিছু যা মানুষের সত্যিকারের বেঁচে থাকার পদ্ধতিটার সঙ্গে যুক্ত। কুমোর যখন হাঁড়ি গড়ে তখন হাঁড়িটার সঙ্গে মানবসমাজের যোগাযোগের সূত্রটি সে খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পায় — হয়তো জিগ্যেস করলে বুঝিয়ে দিতে পারে না, কিন্তু নিজে বোঝে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু টাকা, কারেন্সি নোট — আধুনিক মানবসমাজের এই অপরিহার্য উপজাত, এর সঙ্গে মানুষের উপভোগের, অথবা প্রয়োজনের নিবৃত্তির, কোনও প্রত্যক্ষ যোগ নেই, কারণ এটি আদৌ কোনও ভোগ্যপণ্য নয়। টাকা চিবিয়ে খিদে মেটে না, টাকা গায়ে জড়ালে শীত কাটে না — পুড়িয়ে আগুন করলে খানিকটা কাটতে পারে হয়তো। অথচ খিদের সময়ে খাবার পেলে যত খুশি হই, টাকা হাতে পেলে ততটাই খিশি হই — কারণ টাকাটার সাহায্যে পৌঁছোনো যাবে পছন্দমতো খাবারের কাছে। ব্যাপারটার অন্তর্গত হেত্বাভাস যে কত সত্য তা টের পাওয়া যায় ঘটনাটাকে চরমে টেনে নিয়ে গেলে — ধরা যাক সেই ‘অশনিসংকেত’ ছবিতে — ভিখারিনী মেয়েটি যখন অনাহারে মৃত্যুপথযাত্রী, যখন তার শরীরে আর খাদ্যসন্ধানের বল অবশিষ্ট নেই, তখন তার পাশে এক বাণ্ডিল টাকা রেখে গেলে যা হতো। কিন্তু টাকা ও খাদ্যের পার্থক্যটা বুঝতে চাইলে ক্ষুধায় অমন মৃত্যুপথযাত্রী হতে হয় — যে অভিজ্ঞতা জীবনে, অন্তত মলয়ের গল্পের পাঠকদের জীবনে, ঘটবার সম্ভাবনা খুব বেশি বলে মনে হয় না।
      আমি যে চাকরিটা করতাম সেটাও খুব বর্ণহীন চাকরি — কিন্তু সত্যিকারের বর্ণহীন চাকরি বলতে কী বোঝায় মলয়ের লেখা পড়ে তা বুঝতে পারলাম। আসলে আমরা তথাকথিত লেখাপড়া শিখে যেসব শাদা কলারের চাকরি করি তার কোনওটার সঙ্গেই তো আসলে বেঁচে থাকা ব্যাপারটার কোনও যেগ নেই, কাজেই তার মধ্যে থেকে কৃত্রিমতার কটূ স্বাদ ছাড়ানো যায় না কোনও মতেই। মনে আছে একবার ওপরওয়ালার সঙ্গে নিষ্ফল ঝগড়া করে নিজের ঘরে ফিরে এসে ভাবছিলাম কাল থেকে আর আপিসে না এলে কী হয়। ভাবতে ভাবতে জানলার পর্দা সরাতে দূরে ভারত ব্যাটারির কারখানার চিমনিটায় চোখ পড়ল। একটা লোক এই বৈশাখের ভরা দুপরে তেতে থাকা চিমনিটা বেয়ে উঠে যাচ্ছে। আমি দেখতে লাগলাম। ক্রমেই উঠে যাচ্ছে লোকটি, তারপর মাটি থেকে প্রায় একশো ফুট ওপরে দাঁড়িয়ে চিমনি সাফ করতে লাগল। নিয়নের আলো জ্বালা পর্দাটানা ঠাণ্ডা ঘরে বসে বসে আমি ভাবতে লাগলাম, ও লোকটি কি চাকরি ছেড়ে দেবার কথা ভাবে কখনও ?
      আর, শুধুই তো নোট গোনা নয়, ব্যবহারযোগ্য নোটে আলাদা করে, অব্যবহার্যগুলো বাণ্ডিল বেঁধে, সই মেরে, ফুটো করে পোড়াতে পাঠানো নয় ( এ পর্যন্ত তবু তো আমরা আন্দাজ করতে পারি ), তার মধ্যে থেকেও মানুষের বেঁচে থাকার বিচিত্র প্রয়াস কাজ করে যেতে থাকে। কীভাবে বিকট বিকারের ভিতর দিয়েও জীবন তার মূল ছন্দে ফিরে আসার চেষ্টা করে তার অসম্ভব বর্ণনা আমরা মলয়ের লেখা থেকে পেয়ে যাই।
      ‘…শিমুলতলা দেওঘর থেকে ফেরার পর দিনই, অতনুর সেকশনে, ঝপাং শব্দে ডাইস মেশিনে গর্ত করে নোট নষ্ট করছিল রসিক পাসওয়ান, চাপরাশি। ব্যস্ততার মাঝে, অতনুর কপালে এসে ছিটকে লাগল রসিকের তর্জনীর কাটা ডগাটা, লেগে, ওর কপালে রক্তের টিপ পরিয়ে, ওরই টেবিলে পড়ল। বুঝে ওঠামাত্র ও স্তম্ভিত। পেটে মোচড় দিয়ে বমি উঠে আসছিল আরেকটু হলে। পকেট থেকে রুমাল বার করে প্রায়-নির্বিকার রসিক জড়িয়ে নিলে আঙুলে আর আঙুলের টুকরোটা দেখাতে গেল খাজাঞ্চিকে। সুশান্ত জানিয়েছিল, ওদের আঙুলটাঙুল বীমা করিয়ে রেখেছে অফিস। দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে বীমা করানো থাকে। আঙুলকাটার অঢেল ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। তর্জনীর জন্যে মোটা টাকা পাবে। …
      ….বরাদ্দ ছুটির শেষে রসিক পাসওয়ান কাজে যোগ দিলে সুশান্ত জানতে চেয়েছিল, “কী গো, আঙুলের ঘা শুকিয়ে গেছে তো ? কাটলে কেন আঙুলটা, জেনেশুনে ?”
      “…নাতনির বিয়ে দিলুম। ছুটিও পেলুম, টাকাও। ” রসিক পাসওয়ান অমায়িক।
      এই ঘটনার পর অতনু লক্ষ করেছে, সুখচৈতি রাম, হরবিলাস, টাঙোয়া মাহতো, রামপুজন সিং, খলিল আহমেদ সকলেরই একটা বা দুটো আঙুল কাটা। …’
      ( ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, পৃ. ৩১ )
      ঘটনাটা যে লক্ষ করছে, অতনু, তাকে লাক্ষণিকভাবে সুকুমার, বাঙালি মধ্যবিত্ত চরিত্রের প্রতিনিধি করে তুলে মলয় চমৎকার নাটকবোধের পরিচয় দিয়েছেন। অতনু এমনই এক যুবক, ‘নিজের মাইনের টাকা ওব্দি অন্যের সামনে গুনতে লজ্জা করে অতনুর। চাকরির প্রথম মাইনের একটা পাঁচ টাকার প্যাকেট, লুকিয়ে গুনতে গিয়ে, পায়খানায় পড়ে গিয়েছিল। ’ খাঁটি বাঙালি মধ্যবিত্ত চরিত্র, এই চরিত্রটিকে আমরা এতো ভালো করে চিনি যে বলার নয়। যে নিজের স্বার্থের গুরুতর হানি ঘটাতে রাজি আছে, কিন্তু নিজের সুকুমারত্ব বিসর্জন দিতে রাজি নয়। টাকা যে দিচ্ছে, তার সামনে গুনে না-নিলে গোনা না-গোনা সমান, এ-কথা ইকনমিকসের স্নাতকোত্তর দুনিয়াদারির মেধাবী ছাত্র অতনু বোঝে না এমন নয়, কিন্তু এই অনুশাসন পালন করতে তার মধ্যবিত্ত পারিপার্শ্বিকে বেড়ে ওঠা মূল্যবোধে ভয়ংকরভাবে আটকায়। তার চোখের সামনেই রসিক পাসওয়ানের আঙুল বিসর্জন দেবার ঘটনাটি ঘটে যায় বলে মলয়ের পাঠক, আমরা যারা মনে মনে অতনুর সগোত্র, ধাক্কাটা আমাদের আরও বেশি করে লাগে। আর টাকা গুনতে অতনুর কেমন লাগে তারও চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন মলয় :-
      ‘…রোজ সাড়ে দশটায় অফিসে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে ভেজা ভেজা হতদরিদ্র নিকষ নোটের বিষণ্ণ আমন্ত্রণ অতনুকে ছেয়ে ফ্যালে, ধূসর বিষাদমুখো নোটের ভেষজ অন্ধকূপে ও চাকরি করে চলে ভারাক্রান্ত, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, ঝেঁপে আসে নোটের খাঁ-খাঁ করা দুর্গন্ধ, ম ম করে ন্যাতানো শ্বাসরুদ্ধকর ছাতাপড়া নোট। যেন ওৎ পেতে থাকে হাড়হাভাতে নোটেরা। ’
      কিন্তু এই গদ্যভঙ্গী আমার পছন্দ নয়, অনেক শব্দের ব্যবহার আমার রুচিতে আটকায়, ‘হাড়হাভাতের’ ব্যবহার জীবনানন্দের ভুল প্রয়োগ বলে মনে হয়। তা ছাড়া, আমি ভেবে পাই না নোটের গন্ধ কী করে ‘ঝেঁপে আসে’, দুর্গন্ধ কেমন করে ‘খাঁ খাঁ’ করতে পারে ? কিন্তু এটাও সেই সঙ্গে মানতে হয় যে মলয় রায়চৌধুরীর অভ্যাসবিরোধী শব্দব্যবহার দিয়ে, শালীন বাংলার অচলিত বাক্যগঠন দিয়ে, মলয় একটা কোথাও পৌঁছোতে পারেন। কিন্তু সেটা কতখানি মলয়ের ভাষাব্যবহারের কারণে আর কতখানি মলয়ের অচেনা অভিজ্ঞতার, মলয়ের অজ্ঞাত জগতের কাহিনির অমোঘ আকর্ষণে তা নিয়ে তর্ক থেকে যেতে পারে। মলয় যেন প্রতিজ্ঞা করে কোমর বেঁধে বসেন যে রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত বাংলা রচনাশৈলী কিছুতেই ব্যবহার করবেন না। তা মলয় না করুন, তবে চেষ্টাটা নতুন নয়, মলয়ের আগে অনেকে করেছেন এবং করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন — এবং মলয়ের পদ্ধতিতে আটপৌরে কথোপকথন রচনার কতখানি সাফল্য পাওয়া সম্ভব তা নিয়ে আমার সন্দেহ যায় না। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, মলয় রায়চৌধুরীর ভাষা এমনিতেই যথেষ্ট লক্ষ্যভেদী, তাকে দুশ্চেতার দ্বারা আরও বেশি চোখা করবার কোনও তো দরকার দেখি না। কেন মলয় ‘ঠিক আছে’কে ‘ঠিকাছে’ লিখবেন, কোনও দরকার তো নেই। বাংলা উচ্চারণে আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে, হলন্ত ব্যঞ্জনের পর স্বরবর্ণ থাকলেই, সন্ধির সামান্যতম সুযোগ থাকলেই তাকে সন্ধি করে উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু লেখার সময় আমরা সেগুলো করি না। লিপিনির্দিষ্ট ভাষার একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ চেহারা আছে, প্রাদেশিক উচ্চারণ যাই হোক, লিপিকে তা প্রভাবিত করে না ; করলে অকারণ নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। আর খুব নতুনও নয় চেষ্টাটা — আজ থেকে একশো বছর আগে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘করলে’ পরিবর্তে ‘কল্লে’ চালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন, এমনকি তাঁর সাহিত্যিক পুত্রও, অন্তত এ-ব্যাপারে তাঁকে অনুসরণ করেননি। মলয় কোথাও কথ্য উচ্চারণকে অনুসরণ করে অনাকাঙ্খিত সন্ধি করেছেন, কোথাও করেননি। ওই একই অনুচ্ছেদে আগের বাক্যেই ‘কুকুরের ল্যাজ’কে ‘কুকুরের্ল্যাজ’ করেননি, বা ‘কন্ঠস্বর শুনে’কে ‘কন্ঠস্বর্শুনে’ করেননি, বা পরের বাক্যে ‘ওর কাছে’কে ‘ওর্কাছে’ করেননি। এসব করে পাঠককে শুধু প্রতিহতই করা হয়। মলয় যদি বলেন উনি পাঠক টানতে চান না, তাহলে সম্পূর্ণ নিজের ডিকশন তৈরি করুন, যেমন করেছিলেন কমলকুমার মজুমদার তাঁর ‘সুহাসিনীর পমেটম’-এ — শ্রেষ্ঠ উদাহরণটাই দিলুম। মলয় রায়চৌধুরীর হাতে অস্ত্র আছে, অন্তত যে পাঠক ‘একালের রক্তকরবী’তে প্রকাশিত তাঁর ‘জলাঞ্জলি’ উপন্যাস পড়বেন, তাদের ঘায়েল করার। যখন মলয় গ্রামে কাজ করতে যাওয়া শহুরে ছেলেমেয়েদের বিষয়ে লেখেন :-
      ‘…চাষের জমিতে দাঁড়িয়ে গম-যবের তফাৎ করতে পারে না। রবি-খরিফ জানে না। জানে না কদ্দিনে আখ হয়, পাট হয়। অড়রডাল গাছ দেখতে কেমন। এক হেকটরে কত জয়াধান সম্ভব। কত ঘণ্টার শ্রম লাগে এক কুইন্টাল টমাটো কিংবা চন্দ্রমুখী আলু তুল;তে। জলবিভাজক কাকে বলে। খাল আর নালার তফাৎ।…পানচাষে অনুখাদ্য মিশ্রণ কতটা হবে, কেমনভাবে পুঁততে হয় আলফা আলফা গাছ, নাবি বোনা আমন ধান কখন পাশকাঠি ছাড়ে, স্বর্ণকুমারী জাতের ধানে খোলপচা রোগ হলে কী করা উচিত।…’
      যে-পাঠকের উদ্দেশে এসব মলয় লিখেছেন, সে পাঠক তালগাছ আর নারকেল গাছে তফাৎ করতে পারে না, কাক শালিক ছাড়া পাখি চেনে না, চেহারা দেখে হাসাহাসি আলাদা করতে পারে না — তার কাছে প্রত্যেকটি মন্তব্য টাইসনের আপার কাট।
      অথবা সেই অতনু, অতনু চক্রবর্তী, পায়খানায় লুকিয়ে মাইনের নোট গুনতে গিয়ে যার একতাড়া পাঁচ টাকার নোট নোংরায় পড়ে গিয়েছিল, সুখের চাকরি আর সাজানো ফ্ল্যাটবাড়ি ফেলে রেখে যে উধাও হয়ে গিয়েছিল একদিন, তাকে তার সহকর্মী আবিষ্কার করে হাজারিবাগে, হাণ্টারগঞ্জের কাছে ( সত্যি কি হান্টারগঞ্জ জায়গা আছে কোনও ? থাকতে পারে, জানি না ; এটুকু জানি ‘একালের রক্তকরবী’র বেশির ভাগ পাঠকই জানে না। আমার অবস্হান আমি গোপন করবার চেষ্টা করছি না, পাঠক লক্ষ করবেন ) গভীর জঙ্গলের মধ্যে ছয়-সাত জোড়া কিশোর-কিশোরীর গণবিবাহ দিচ্ছে।
      ‘…বিয়ের কোনও দশকর্মের ব্যাপার নেই। পুরুতও তো নে। খদ্দরের ঘি-রঙা পাঞ্জাবি, নোংরা শাদা পায়জামা, পায়ে কেডস, ঘাড় ওব্দি উস্কোখুস্কো চুল, একজন লোক একটা ছোট্ট লাল মলাটের বই থেকে মন্তর পড়ছে আর বর কনেরা সবাই মিলে তা আউড়ে যাচ্ছে। লোকটার মাথার ওপর মশার ঘূর্ণায়মান হ্যালো। উৎকর্ণ হতে, অরিন্দম বুঝতে পারল, আরে, সংস্কৃত তো নয়, বিয়ের মন্তর নয়। লোকটাতো ইংরেজিতে মন্তর পড়ছে, পরিষ্কার ভালো ইংরেজিতে আর আবোল তাবোল উচ্চারণে সেগুলো তারস্বরে ওগরাচ্ছে হবু স্বামী-স্ত্রী।
      …ইংরেজিতে কী পাঠ করছে কান পেতে শোনে অরিন্দম আর স্তম্ভিত হয়ে যায়। চীনে ছাপানো রেডবুক থেকে উদ্ধৃতি পাঠ করছে, বিখ্যাত সব কোটেশান, জানে ও।’
      সত্যি বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে খুব, কিন্তু অবিশ্বাস করাটা রক্তে বসে গেছে। মলয় রায়চৌধুরী কি সত্যি কথা বলছেন ? তাহলে মলয়ের সব কৌণিকতা ক্ষমার্হ, সকল চালিয়াতি অবহেলার যোগ্য। এই কারণেই ক্ষমার্হ, যে মলয় আমাদের, এই দুর্ভাগা কলকাতাবাসী জন্মস্নবদের, বিশ্বাসহীনতার পাকা দেয়ালে একটা ফুটো করতে পেরেছেন। মলয়ের লেখা পড়ে মুহূর্তের জন্যও মনে হয়, এমন কেন সত্যি হয় না, আহা। সত্যের একটা গরম হাওয়া বয়ে যায় আমাদের মিথ্যের সাজানো বাগানের ওপর দিয়ে, আমাদের সযত্নলালিত কালচেসবুজ গাছপালা পলকে শুকিয়ে ওঠে। শুধু মনে হয়, এই কথাগুলো যদি পুরোপুরি আমাদের চেনা ও বিশ্বাস্য ভাষায় বলতেন মলয় ! মলয়ের কাহিনি ও মলয়ের পাঠকের মাঝখানে ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকে মলয়ের দেহরক্ষী মাস্তান মলয়ের বাংলাভাষা, তার কোমরে গোঁজা চেম্বার গুরুপাঞ্জাবির তলা থেকে উঁচু হয়ে আছে, তার বীরাপ্পনের মতো চৌগোঁফা স্পষ্ট দেখা যায়। পাঠককে উঁকিঝুঁকি দিতে দেখলেই সে কড়া গলায় বলে, ‘ভিড় বাড়াবেন না দাদা, নিজের কাজে যান…’
      আর, মলয় রায়চৌধুরীর কোনও উপন্যাসেরই শেষটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, অবশ্য। প্রথম যখন ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ পড়েছিলাম, জুডি ও জুলিকে বিশ্বাসের অযোগ্য বলে মনে হয়নি, বিশেষ করে ‘ভালোবাসা চিরকাল ক্ষণস্হায়ী’ জাতীয় মন্তব্যের সঙ্গে। মলয়ের বর্ণনার গুণ হচ্ছে ডিটেলের কাজ চমৎকার — যা দিয়ে একটা ঘটনা বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। চারুলতা যে বিশ্বাসযোগ্য হয়েছিল, তার জন্য ভূপতির খবরের কাগজের হরফগুলো অবধি তার সময়ের সপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছে। শুনেছি, শতরঞ্জকে খিলাড়িতে যে আগ্নেয়াস্ত্রগুলো দেখানো হয়েছিল, যোধপুররাজের অস্ত্রাগার থেকে নিজের হাতে বেছে সেগুলোকে নির্বাচন করেছিলেন পরিচালক — আর কিছু নয়, বন্দুকের কুঁদোয় রিভলভারের হাতলে তৈরির তারিখটা লেখা থাকে, সেটা ১৮৫৮ বা তার আগেকার তারিখ হওয়া চাই। সে তারিখ কেউ পড়তে পারুক বা না পারুক। ডিটেলের ব্যাপারে মলয় রায়চৌধুরীও সেই একই পথের পথিক। চমৎকার ডিটেলের কাজ মলয়ের, বর্ণিত বিষয় ছবির মতোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুয়েকটা উদাহরণ দিই, মলয়ের লেখা যাঁরা পড়েননি, তাঁদের জন্যে, ‘নামগন্ধ’ থেকে :-
      ‘…ক্যামাক স্ট্রিট ভিড়ে ভিড়াক্কার। রাস্তার দুপাশে পুলিশের জিপ, লরি, খাকি, লাঠি, রেব্যান, খইনি, এলাহি। আদিত্যকে দেখতে পেল। আদিত্য যিশুকে আসতে দেখে, রেব্যান চশমা পরে নিলে। হাতে বেটন। বুকে নামের তকমা। গটগটিয়ে রোয়াব। প্রোমোশান পেয়ে গেল নাকি, ওপরওলাদের টাকা খাইয়ে। ওঃ, তুই তো একদম উত্তমকুমারের পাইরেটেড ভার্সান…’
      অথবা, পাটনার বারিপথের বর্ণনা, ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’-এ। কোনও রাস্তার এমন জীবন্ত বর্ণনা, অন্তত বাংলায় ক্বচিৎ পড়েছি :-
      ‘…বারিপথের দুপাশে সমস্ত ফাঁকা জায়গায় বাঁশের খুঁটি পুঁতে চট টাঙিয়ে অ্যালুমিনিয়াম হাঁড়িকুড়ির ষষ্ঠীপূজক ছটমাইয়ার সংসার, ভাত, ডাল, রুটির দোকান, চুলকাটার, তাড়ির, গাঁজার, জুয়ার, চেলেভাজার, খাজা আর বেসনলাড্ডুর, রিকশ আর ঠ্যালা রাখার, বাঁশ আর শালখুঁটির, টিপ-সিঁদুর-চুড়ির পশরা-দোকান, নানান দেবী-দেবতার মিনিমন্দির। বারিপথের সমান্তরাল, গঙ্গার পাশ দিয়ে, পশ্চিমে পাটনা সাহেব থেকে পুবে খগোল ওব্দি এগিয়ে গেছে, দুপাশে ঝকমকে দোকানপশরা, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল টাউনহল গোলঘর সাজিয়ে অশোক রাজপথ। সারা পাটনা শহর দেখা যায় গোলঘরের টঙ থেকে, দুর্ভিক্ষের শস্যভাঁড়ার ছিল মন্বন্তরে, এখনও তাই, গর্ভগৃহে চেঁচালে তেইশবার প্রতিধ্বনি হয়। পায়ে পায়ে ক্ষয়ে গর্ত হয়ে গেছে গোলঘরের একশো চুয়াল্লিশটা সিঁড়ি। মেরামতের টাকা ফি-বছর ভাগাভাগি হয়। রাস্তা সারাবার বরাদ্দও তাই, নালি-নর্দমা পড়ে আছে কন্ঠরুদ্ধ হয়ে…’
      ডিটেলের কাজে এর চেয়ে ভালো পথবর্ণনার একমাত্র দৃষ্টান্ত, বাংলায়, যা আমার মনে পড়ছে, তা হল সকাল বেলাকার চিৎপুর রোডের সেই বর্ণনাটি :-
      ‘… সকালবেলাকার প্রথম সূর্যকিরণ পড়িয়াছে শ্যাকরাগাড়ির আস্তাবলের মাথায়, আর এক সার বেলোয়াড়ি ঝাড়ওয়ালা মুসলমানদের দোকানের উপর। গ্যাসল্যাম্পগুলোর গায়ে সূর্যের আলো এমনি চিকমিক করিতেছে, সেদিকে চাহিবার জো নাই !…ম্যুনিসিপালিটির শকট কলিকাতার আবর্জনা বহন করিয়া অত্যন্ত মন্হর হইয়া চলিয়া যাইতেছে। ফুটপাথের পার্শ্বে সারি সারি শ্যাকরাগাড়ি আরোহীর অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া ; সেই অবসরে অশ্বচর্মাবৃত চতুষ্পদ কঙ্কালগুলো ঘাড় হেঁট করিয়া অত্যন্ত শুকনো ঘাসের আঁটি অন্যমনস্কভাবে চিবাইতেছে ; তাহাদের সেই পারমার্থিক ভাব দেখিলে মনে হয় যে, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া তাহারা তাহাদের সম্মুখস্হ ঘাসের আঁটির সঙ্গে সমস্ত জগৎসংসারের তুলনা করিয়া সারবত্তা ও সরসতা সম্বন্ধে কোনো প্রভেদ দেখিতে পায় নাই। দক্ষিণে হৃতচর্ম খাসির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কতক দড়িতে ঝুলিতেছে, কতক খণ্ড খণ্ড আকারে শলাকা আশ্রয় করিয়া অগ্নিশিখার উপরে ঘুষ খাইতেছে এবং বৃহৎকায় রক্তবর্ণ কেশবিহীন শ্মশ্রুলগণ বড়ো বড়ো হাতে মস্ত মস্ত রুটি সেঁকিয়া তুলিতেছে।…’
      কলকাতায় এত সাহিত্যিকের ভিড়, আজ পর্যন্ত কালীঘাটের মন্দিরে যাবার রাস্তাটার এরকম একটা বর্ণনা দিলেন না কেউ।
      কিন্তু কথা হচ্ছিল মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাসের শেষ করার পদ্ধতি নিয়ে। ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ পড়ে চমক লেগেছিল, মনে হয়েছিল খুব ঔচিত্যময় সমাপ্তি। কিন্তু ‘নামগন্ধ’ পড়ে খটকা লাগল একটা। কোথায় যেন একটা মিল আছে শেষটায়, আগের বইখানার সঙ্গে। খুশির সঙ্গে জুডি-জুলির একটা মিল আছে এটা মাথার পেছন দিকটায় মনে হচ্ছিল, কিন্তু মিলটা কোথায় ঠিক ধরতে পারছিলাম না। ‘জলাঞ্জলি’ পড়ে উঠে পরিষ্কার হয়ে গেল ব্যাপারটা। উপন্যাসের শেষে মলয় রায়চৌধুরী একটা রগরগে মোচড় দিতে ভালোবাসেন।
      যে-উপকরণ, যে-দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে মলয় রায়চৌধুরী সাহিত্যে এসেছেন, সেই ঋদ্ধতা কম মানুষের থাকে। মলয়ের যা পশ্চাৎপট, মলয়ের স্মৃতিকথা পড়ে বুঝতে পারলাম, তা সাধারণ কলকাতাবাসী ঘটি বা বাঙাল মধ্যবিত্তের কল্পনার অতীত। উত্তরপাড়ার পড়ন্ত আভিজাত্যের বিলীয়মান ছায়া ছেড়ে পাটনার নিম্নমধ্যবিত্ত বস্তিপাড়া ঘুরে মলয় যেখানে পৌঁছোলেন তা ধারণায় আনতে পাঠকের কয়েক জন্ম কেটে যাবে।
       
       
       
       
  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২৬735089
  • Pijush Biswas
    বাংলা সাহিত্যকে যদি নির্ভীক ও সততার বিচারে দেখা যায়, তাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মলয় রায়চৌধুরীর কাছে ঋণী থাকবে। বাংলা ভাষায় উনি কিছু দিয়েছেন। নিজস্ব চিন্তা, মৌলিকতা ও আন্দোলন। ব্যক্তিগত ভাবে অনেকেই হয়তো পছন্দ করেন না। যে ভাবে কবিকুলের অনেকেই অনুপম মুখোপাধ্যায়কে পছন্দ করেন না। তারা বলে থাকেন, ওদের নাক উঁচু। অপরকে আঘাত করে কথা বলেন।
    আমি, মনে করি, আজকাল মানুষ একটু বেশী সেন্টিমেন্টাল। নিজের অপরের সমালোচনা করবেন। ভুল ধরবেন। উপদেশ দিতে আসবেন। এবার আপনি যদি, কোন এনালাইসিস দিয়ে কোন সত্য ব্যাখ্যা করে দেন, ওই হলো গিয়ে গণ্ডগোল। সেই হয়ে গেলো, বিরুদ্ধতা। অবমাননা।
    সেই কারণে, ব্যক্তিগত মনুষ্যচরিত্র দুমিনিট সাইডে রেখে একবার দেখা যাক, বাংলা ভাষার জন্য, সাহিত্যের জন্য একজন কবি কি কন্ট্রিবিউশন। সেইটা মানুষ দেখেন না। কেন কি, সেখানে দেওয়া নেওয়ার কোন চিত্রকল্প নাই। পোস্টমডার্ণ সাহিত্যে মলয় রায়চৌধুরী অবশ্যই ফ্রন্ট রানার। এবং অনলাইন সাহিত্যে বাক্‌ এর সাফল্যের কথা কোন বাঙালি অস্বীকার করতে পারবে না। আমি, ব্যক্তিগত ভাবে, পুনরাধুনিক নিয়ে তত ভেবে দেখিনি, তবে এইটুকু বুঝতে অসুবিধা হয়না যে সেটা ভেবে চিনতে করা একটা প্রকল্প, হাওয়া থেকে পড়েনি। আধুনিক শব্দটা আমার নিজস্ব সমস্যার কথা আমি অন্য জায়গায় লিখেছি ও বিস্তারিত লেখার আরো সুযোগ রয়েছে।
    আর। অনলাইন সাহিত্য নিয়ে বঙ্গপ্রদেশের মেজরিটির এখনো সমস্যা আছে। সেটা টেকনোলজীর সমস্যা না। বাঙ্গালির আলস্য। ডিজিটাল মাধ্যম আমাদের ভবিষ্যৎ, বাংলা পিছিয়ে আছে। আমাদের নিজস্ব আর্কাইভ গড়ে তোলা উচিত। আগামীতে যদি বঙ্গপ্রদেশ এই নিয়ে কোন কাজে না হাত দেয়, দিল্লি থেকে আমি কাজটা করবো। আমার কাজগুলি, প্যাটেন্ট করার জন্য জমা করা আছে। সেগুলির একটা উপসংহার হলেই, আমার কাজগুলি পাবলিক ডোমেনে আনা হবে।
    ধন্যবাদ অনুপম, বাংলাভাষায় এতোটা কন্ট্রিবিউট করার জন্য। আপনার সঙ্গে আমার যদিও কোন দিন কথা বা দেখা হয়নি, মলয় রায় চৌধুরীর সংগেও আমার কোনদিন কথা হয়নি। তবু কেন মনে হয়, একাডেমী / জ্ঞানপীঠ পাওয়ার ম্যাটেরিয়াল দুজনের মধ্যেই আছে। আমি বললাম বটে এবং এতে আমার ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ নেই।
  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২৮735090
    • বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর ডিটেকটিভ উপন্যাস ‘অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস বা নোংরা পরির কংকাল প্রেমিক’-এর আলোচনা
      উপন্যাস এর নামটা আমাকে বুঝতেই দেয় নি ভিতরের খনিজের উপস্থিতি। প্রচ্ছদে যুবতীর ছবি দেখে মনে হয় কোনো রগরগে রবিবাসরীয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছি। বুঝি নি এই অতি সংক্ষিপ্ত উপন্যাসের প্রতিটি লাইন এক বিরল জীবনদর্শনের মুখোমুখি করে দেবে আমাকে। এক অন্যধরণের সত্যানুসন্ধান, সাধারণ খুনের মামলার প্রেক্ষাপটে যা এক যুবক যুবতীর উৎকেন্দ্রিক আরণ্যক ভালোবাসা থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে। তেলেগুতে এনক্রিপ্টেড, বাংলায় লেখা, সিডিতে সংরক্ষিত ডায়রিলেখনে বন্দী হয়ে থাকে সেই জীবনকাহিনী। আর কংকাল প্রেমিক এর জীবন ও মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয় নোংরা পরীর হাতে।
      নোংরা পরী, ববিটাইজিং ভীতির কার্যকারিতা আর সারল্যের সংজ্ঞা
      নোংরা পরী বেরিয়ে এসেছে Edith Wharton এর বর্ণিত The Age of Innocence এর পর্দা কেটে। ইন্সপেক্টর রিমা খান অপরাধীর চোখের গতির ভিত্তিতে ক্রিমিনাল ঠ্যাঙায়। যে ক্রিমিনালরা জেরা করার সময়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের দু-ডিগ্রি, যারা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের থার্ড ডিগ্রি। বুকের দিকে তাকিয়ে থাকারা নাকি তুলনামূলক ভাবে স্বাভাবিক, রিমা খানের ভাষায় তারা প্রকৃতির মাদার-সান-ইন্সটিংক্ট মেনে চলে। তাদের ঠেঙিয়ে কথা আদায় করে না, সাবইন্সপেক্টারের ওপর ছেড়ে দেয়।
      রিমা খানকে উপন্যাসের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নাম দিয়েছে "নোংরা পরি"। নোংরা- কারণ সে সিমেন-দি-বভার সেকেণ্ড-সেক্স হতে রাজী নয়। সে আদ্যোপান্ত পুলিশ, প্রফেশনাল সমস্ত অর্থে, এমনকি ছুটকো ঘুষ নেবার ক্ষেত্রেও। সে দুর্দান্ত, দুঁদে। তার ভয়ে তার অঞ্চলের ক্রিমিনালরা লোক্যালিটি বদলে ফেলে।
      বেটি ফ্রিড্যান যে ফেমিনিন-মিস্টিক কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তা এখনো আজকের সমাজেও পৃথিবী জুড়ে বর্তমান। এই নারীত্বের রহস্য শতকের পর শতক কখনো চীনে মেয়েদের পা জুতোয় ঢুকিয়ে ছোটো করতে বাধ্য করে, আফ্রিকার উপজাতির মেয়েদের মরাল গ্রীবাকে দীর্ঘায়িত করতে ধাতব বালায় বালায় বরবাদ করে দেয় ঘাড়ের মাথাকে ধরে রাখার কার্যকারীতাটুকু। এই নারীত্বের সন্ধানে ইউরোপের শিক্ষিতা মহিলা প্রেমপত্রে বানান ভুল করে, পদার্থবিদ্যার ডিগ্রি না নিয়ে পড়তে চায় সুললিত আর্টস।
      রিমা খানের মধ্যে সেই সারল্যটুকু নেই, সভ্যতা যে সারল্য শেখায় মেয়েদের, কাঁচের-পাথরবাটির মতো। যে শিক্ষিত সারল্যে মেয়েরা দুই বাচ্চার মা হয়ে গিয়েও সেক্সটকের অধিকার পায় না, বলে "ইস ছি ছি ছি", আজকের জমানাতেও। রিমা খান বিন্দাস গালিগালাজ করে। রিমা আবিষ্কার করে ফেলেছে যে ববিটাইজ করার ভয় দেখালে আবালবৃদ্ধ-ক্রিমিনাল খুব আকুল হয়ে পড়ে। তাতে অরগ্যাজম হয় রিমা খানের। এখন যে যুগ এ জিন্স এর সঙ্গে এক-হাত লাঠি-চুড়ি পরে মডার্ন ফেমিনিন ঘুরে বেড়ায়, স্ট্রিপটিজ দেখে আবার সন্তোষীমা-ও করে, সেখানে এই ডিলডো প্রেমী পুলিস অফিসারটি নোংরাও বটে পরীও বটে। তাকে কোথাও প্লেস করা যায় না, কোনো গ্রাফ এ ফেলা যায় না ! তার উলঙ্গ সত্ত্বায় কোনো কালো-দস্তানা-মোজা পরা লজ্জার ভেজাল ভঙ্গিমাও নেই। তাই সে মানুষী নয়। মানুষের ভোগ্যাও নয় হয়তো। বাঘিনী বাঘের জন্যে ভার্জিনিটি-টুকু বাঁচিয়ে রেখে ছিল। তা চারদিকে তো শুধুই ছাগল গবাদি পশু তার। তাই কুমারীত্ব ঘোচেনি কোনোদিন। এক ব্যতিক্রম কংকাল প্রেমিক।
      যে কংকাল সে শুধু প্রেমিক
      প্রেম কয়প্রকারের হয়ে থাকে ? বহু প্রকারের হয়ে থাকে প্রেম। মেয়ে মাকড়শার সামনে পুরুষ মাকড়শার সুইসাইডাল প্রেম, মক্ষীরাণীর সামনে খুদে মৌমাছি শ্রমিকের প্রেম, রেপিস্ট হাঁসের প্রতি হংসিনীর প্রেম, ডলফিনের হরণ বা অপহরণ মূলক প্রেম, সতী নারীর পতিপ্রেম, বড়োলোকের বেশ্যাপ্রেম এবং সমান্তরাল ভাবে সন্তানের মায়ের প্রতি প্রেম এমন অনেক রকমের।
      আমাদের কংকাল, যিনি কিনা ইন্সপেক্টর রিমা খানের আবার চাকরি ফিরে পাবার পাসপোর্ট, তিনি ছিলেন গণিতবিদ। এখানে মলয় রায়চৌধুরী বোধ হয় গণিতের অবতারণা করেছেন কুয়াসাহীন শুদ্ধচিন্তার প্রতীক হিসেবে। নিরঞ্জন, ওরফে কঙ্কাল, বুঝে গিয়েছিলেন তিনি বহুগামী। তাই কোন মহিলাকে এবং নিজেকে সমস্যা না দিতে চেয়ে, বিয়ে টিয়ে না করে, শুদ্ধ গণিত ও শুদ্ধ যৌনতার চর্চা করেছেন প্রেমে পড়ার আগে অব্দি। মলয় রায়চৌধুরী দেখিয়েছেন তাঁর দুরকম প্রেম।
      নিম্নগামী প্রেমটি (মস্তিষ্ক থেকে শীষ্ণ হয়ে এসে হৃদয়ে যা ইকুইলিব্রিয়াম পেলো, মাসিকের আবর্তনে মাপলো সময় )
      একজন জীবন খুঁজতে পালিয়েছিল, অন্যজন গিয়েছিল শুধু পলায়নপরাকে দেখে। মায়া পাল পুরোদস্তুর আধুনিক যুবতী, যিনি কুড়ুমুড়ে ইংরেজী বলতে বলতে অনায়াসে উচ্চপদের চাকরি পেতে পারেন, তিনি সুপুরুষ গণিতবিদের হাত ধরে বললেন "চলুন পালাই"। আর কামুক বিশ্বামিত্র ও তাঁর সঙ্গিনী চললেন অরূপের সন্ধানে, অন্ধ্রপ্রদেশের ব্যারাইটস খনি অঞ্চলে। তাঁদের অতিপ্রাকৃত ও অতিপ্রাকৃতিক প্রেম সেই অরণ্যে যাপিত হয়। অতিপ্রাকৃতিক কারণ মলয় রায়চৌধুরী এখানে খুঁজতে চেয়েছেন প্রকৃতির সঙ্গে মিথোজীবী ভাবে যাপিত জীবনের দিকটি। বাছুরকে দুধ থেকে বঞ্চিত না করে, মুরগীর ছাল ছাড়িয়ে না নিয়ে, ভেড়ার লোম কেটে না নিয়ে বাঁচার পদ্ধতি। মায়ার এনভায়রনমেণ্টালিজম, জীবপ্রেম।
      মলয় রায়চৌধুরী এখানে মনে করিয়ে দেন আমাদের ভুলে যাওয়া নারী পুরুষের প্রেমের রূপটিও। এখানে এক মানুষীর গায়ের গন্ধটি প্রেমিক চেনেন। প্রেমিক প্রেমিকাকে আলিঙ্গন করতে থাকেন মনের তাপে, আর রোজ আলিঙ্গন করতে করতে বুঝতে পারেন তাপের তারতম্য, ডিম্বাণুর আবির্ভাব। তাঁরা প্রেমটুকু চেয়েছিলেন, বীজটুকু নয়। তাই নিরোধ প্রক্রিয়া, অদ্ভুত আত্মনিয়ন্ত্রণ। মায়া নিরঞ্জনকে সেই প্রেম শেখান যাতে শরীর বড় হয়েও ওঠে না অযথা, ছোটও হয় না। যতটুকু আসে সহজে আসে। এই প্রথম নিরঞ্জন কোনো নারীর আলিঙ্গনে উত্তেজিত না হয়ে শান্ত হন।
      এখানে খুব সুন্দর ভাবে দেখানো হয়েছে দুজন মানুষের একে অন্যকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকার আনন্দ। এখানে নিরঞ্জন ঘড়ির অভাবে মায়ার মাসিক বা ঋতূস্রাব এর দিন গুলিকে গাছের গুঁড়িতে খোদাই করে রাখেন। আর হিসেব রাখেন দিন মাস বছরের। "Metaformic theorists also discuss how cultures, like the Romans and Gaelic used the same words for menstruation and the keeping of time, while the Mayan calendar was directly influenced by women's menstrual cycles."(উইকিপিডিয়া থেকে উদ্ধৃত) উইকিপিডিয়া আর গুগল আমাদের বলে দেবে, মহাজাগতিক ক্যালেণ্ডারটি অনেক ক্ষেত্রেই কিভাবে প্রাচীন কালে নারীর শরীরের ঋতূচক্রের দিকে তাকিয়ে বানানো হয়েছিল। কখনো উনত্রিশ কখনো ত্রিশ দিনের বিরতিতে।
      এই প্রেমে এক মানুষী বলেন আমি সবটুকু দেব, আর পুরুষটি বলেন আমি সবটুকু নেব। আর ঋতূস্রাবের পরে প্রেমিক ধুইয়ে দেন পরম আদরে প্রেমিকার রসস্থল, আরণ্যক দিনে।
      ঊর্ধ্বগামী ভালোবাসা (সখীর জন্যে বীজ শুয়ে আছে বরফে)
      শরীরের ভালোবাসাকে আমরা মাঝে মাঝেই একটু নিম্নমানের বলি, পর্দা তুলে দিই। "রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম, কামগন্ধ নাহি তায়"। যেন কামগন্ধ খারাপ বস্তু। যেন আমাদের সব্বার উৎস্য লজ্জার। এই ক্রিশ্চান ওরিজিন্যাল-সিন এর পাপবোধ যা আমাদের উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, যে পাপবোধ থেকে আজ বহু মেয়ের অঙ্গ কেটে দেওয়া হয় যাতে তারা "শয়তানি আনন্দ" উপভোগ না করে শুধু সন্তান প্রসবের যন্ত্র হিসেবে নিজেদের বহন করতে পারে, সেখানে মিলি একদমকা খোলা হাওয়া। মিলি কিশোর আনাড়ি নিরঞ্জন কে "ভালোবাসতে" শেখায়। তারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিজেদের শরীর নিয়ে খেলে, জানতে পারে যান্ত্রিক ভঙ্গীতেই বিভিন্ন আনন্দের উৎস্যমুখ। সে তো সেতার বাজাবার আগে টুংটাং টুকু না করলেই নয়।
      মিলি ভালোবেসেছিল কংকালকে। নিরঞ্জন ভালোবাসেননি সেই অর্থে। তিনি তখন-ও পুরুষ নন। বৃন্দাবনবিলাসী কিশোর, যে পালিয়ে যাবে, পালিয়ে গেছে। কিন্তু মিলি বিয়ে করেন নি। আর নিরঞ্জনের সন্তান পাওয়ার জন্যে জোরাজুরিও করেছেন বহু বছর পরে দেখা হলে।
      নিরঞ্জন ভালোবেসেছেন মায়াকে। কিন্তু মিলির জন্যে মৃত্যুর আগে রেখে গেছিলেন শুক্র, ডাক্তারের কাছে।
      মিলি সন্তান চেয়েছিল, মায়া চায়নি। এখানে শিষ্ণ থেকে উঠে গেছে ভালোবাসা হার্ট এ। কি মন্ত্রে কে জানে।
      এক্ষেত্রে মলয় রায়চৌধুরীর একটি ইণ্টারভিউ মনে পড়ে গেল Alexander Jorgensen কে দেওয়া। " Alex: If you could walk a mile in whatever circumstance, where would you choose to do it ?
      Malay : I would go to the bank of river Ganges, at the place where I had kissed my Nepali classmate Bhuvanmohini Rana. My first and memorable kiss. I do not know where she is now. Must have become old or might have died ; she was two years older than me. I would sit at the same spot at the same time of autumn evening to revisit her tenderness."। আমার যেন মনে হয় ভুবনমোহিনী কোথাও মিলি, তার সমস্ত কোমলতা নিয়ে, যেখানে নিরঞ্জনের কৈশোর আটকে আছে।
      মায়ার সত্যি নিরঞ্জনের সত্যি, মায়ার জীবনদর্শন
      কাহিনীটি তো ডিটেকটিভকে নিয়ে। সত্যানুসন্ধান ! Akira Kurosawa র Rashomon যেমন দেখিয়ে দেয়, বিষয়গত তথ্য আর বিষয়ীগত সত্য এক নয়, প্রেমিক নিরঞ্জন ও প্রেমিকা মায়ার সত্যিও আলাদা।
      মায়া আধুনিক, কিন্তু পুনরাধুনিক। তিনি জানতে চেয়েছেন জীবনের যাপনগত সত্যটা। মানুষ ঠিক কোন আঙ্গিকে সভ্য, জীবহত্যার ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃতির সঙ্গে মিথোজীবীতার মাধ্যমে বাঁচা যায় কিনা, তাই দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই দুধের শিশুকে ছেড়ে, স্বামীর ও সমাজের দেওয়া অসহিষ্ণুতা ও অপমান থেকে পালিয়ে যেতে, তিনি "খপ করে" নিরঞ্জনএর হাত ধরে বলেছিলেন "চলুন পালাই "।
      “No, it is impossible; it is impossible to convey the life-sensation of any given epoch of one’s existence--that which makes its truth, its meaning--its subtle and penetrating essence. It is impossible. We live, as we dream--alone.” -- Joseph Conrad এই জাতীয় উক্তি কে মেনে নিতে পারেননি ইংরাজির ছাত্রী মায়া পাল। নিরঞ্জন লিখেছেন, "সে আমাকে টমাস হবস, জোসেফ কনরাড, অ্যান্টনি বারজেস, উইলিয়াম গোলডিং আরো কারা কারা যেন, প্রতিটি নাম মনেও নেই এতদিন পর, এনাদের লেখালিখির কথা শোনাতো। তার জীবনের অতীতসূত্র কেবল এই সাহিত্যদর্শনকে ঘৃণা। তার অতীত সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু জানি না, সে বলতে চায়নি। বলত ওনারা জীবনের ভুল ব্যাখ্যা করে গেছেন। ওনারা নাকি বলে গেছেন একজন মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত, সে একাকী, কেউ নেই তার, যত বৈভব থাক না কেন সে প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র, পঙ্কিল, কদর্য, অশ্লীল, জঘন্য, স্হূল, পাশবিক, অশিষ্ট ও বর্বর। সে বলত, জীবনের এই আশাহীন দৃষ্টিকোণ অসত্য। "
      কিন্তু নিরঞ্জন এর সত্য আলাদা। তিনি মূলতঃ প্রেমিক। তিনি নিজেকে দেখেন এইভাবে -"মায়ার পাশে বসে একই ভাবনা ঘুরছিল আমার মগজে, যা বহুকাল থেকে বাসা বেঁধে আছে। তা এই যে, আমি একজন কুকুর। যে মালকিনির হাতে পড়েছি, সে যেরকম চেয়েছে, যেরকম গড়েছে, তা-ই হয়েছি : প্রেমের কুকুর, কাজের কুকুর, সেবার কুকুর, গুপ্তচর কুকুর, ধাঙড় কুকুর, কুরিয়ার কুকুর, প্রেডাটার কুকুর, পাহারাদার কুকুর, মানসিক থেরাপির কুকুর, অনধের কুকুর, শোনার কুকুর, শোঁকার কুকুর, চাটার কুকুর, রক্ষক কুকুর, গাড়িটানার কুকুর, আদরের কুকুর, এই কুকুর, ওই কুকুর ইত্যাদি। কিন্তু আমার লেজটা জন্মের সময়ে যেমন আকাশমুখো ছিল, আজও তেমনই আছে। থাকবে। এখন টাইপ করতে বসেও জানি, লেজটা অমনই রয়েছে। " এই আকাশমুখী লেজ এই গণিতবিদের জীবনচেতনা।
      নিরঞ্জনের জীবনচেতনার অন্য একটি দিক দেখা যায়, তাঁর চেতনায় "পবিত্র" শব্দটির অভিঘাতে। নিরঞ্জন লিখছেন - "আমার দিকে না তাকিয়েই মায়া বলেছিল, আমরা সারা জীবন নিজেদের সম্পর্ক আপনি-আজ্ঞের পবিত্র গভীরতায় রাখব। তুমি-তুমি ওগো-হ্যাঁগোর ছেঁদো নোংরা রুটিনে বাঁধা পড়ব না। বলেছিলুম, পবিত্র ? এই ধরণের অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করবেন না প্লিজ। "
      নিরঞ্জন এক জমির মতন পড়ে থাকেন সমস্ত জীবন। নানান মেয়ে, মহিলা তাঁর উপর দিয়ে বয়ে যান, তাঁকে উর্বর করেন, তাঁকে ভেঙ্গে দেন। তাঁর ল্যাণ্ডস্কেপ পালটে দেন। এভাবেই মানবজমিনের চাষ করে গেছেন নিরঞ্জন। শেষ দিন অবধি। তিনি কোনো মহিলা কে "ডিমিন" করেন নি কখনো। দেহ ব্যবসায়িনীর "গিগলিং" টুকুকেও নয়। "পৃথিবী নামের ছোট্টো দ্বীপটায়, নারী ছাড়া আমি একা, নিঃসঙ্গ, অন্তরীণ। জীবনে নারী নেই ভাবলেই মনে হয় মরে যাবো, মরে যাচ্ছি, মরে গেছি ; ফাঁকা, ফোঁপরা, খালি। জানতেই পারতুম না আহ্লাদ কি, আঘাত কি, বেদনা কি, হাহাকার কি। " - নিরঞ্জন এমনই ভাবেন, বলেন, বাঁচেন। এই নারীসঙ্গ ইচ্ছা সামগ্রিক শারীরীক কাম নয় একেবারে। তিনি শেষ বয়সেও ‘শেষনীর’ সঙ্গ চান উত্থানরহিত অবস্থায়। যেমন "অ্যালিস ইন দ্য ওয়াণ্ডার ল্যাণ্ড" এর লেখক লুই ক্যারল এর স্নেহের ডাকে খোকারা সুবিধে করে উঠতে পারতো না। তিনি খুকিদের বলতেন গল্প শুনতে আসতে। আর বলতেন ভাইদের ঘরে রেখে এসো। যে তার যে সুরে বাজে, সে তার সেই সুরেই বাজে। অন্যথা পচে যায়, যেমন আমরা পচে যাই অহরহ।
      সত্যানুসন্ধান কি? ভিলেন কারা কারা ? কাঠগড়ার এপারে ওপারে।
      ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কাকাবাবু সন্তু এই সব্বার থেকে আলাদা নোংরা পরী, ডিটেকটিভ রিমা খান। ১) তিনি পুলিশ, সখের গোয়েন্দা নন ২) তিনি মহিলা, প্রথম, একমাত্র মহিলা সত্যানুসন্ধানী বাংলা উপন্যাসের। তিনি ক্ষমতাশালী, ইনফর্ম্যার কনস্টেবল ইত্যাদি প্রয়োগে সমর্থ। যদিও তিনি সাসপেণ্ডেড। ববিটাইজ-করার ভয় দেখাবার প্রক্রিয়ায় নোংরা।
      রাষ্ট্রই ভিলেন নম্বর ওয়ান
      এই উপন্যাসে, প্রথম বাংলা উপন্যাসে আমরা দেখতে পেলাম অপরাধ জগতের ব্যক্তিনির্ভরতার ঊর্ধ্বে সিস্টেমটাকে। আমরা দেখতে পেলাম রাষ্ট্র কোথায় অপরাধী। কিভাবে তুরুপ উপজাতির মানুষদের উৎখাত করে ফেলে খনি-মাফিয়া খনির লোভে। কিভাবে ক্যাপিটালিজম এর, ব্যবসায়িক উদারনীতির, শিকার হয় অরণ্যের মানুষ। যাদের রাষ্ট্র কিচ্ছু দেয় না, যাদের "সমাজ" ব্যবস্থা, নীতি ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র স্বীকারই করে না, যাদের ভোটাধিকার নেই, পৌরসুবিধা নেই, তাদের কিভাবে অনায়াসে একটি মাত্র পুলিশ চৌকির অন্তর্গত করে ফেলে রাষ্ট্র। মায়া ও নিরঞ্জন যখন তুরুপ গোষ্ঠীর বাচ্চাদের শিক্ষিত করতে থাকেন, কিভাবে সেই মানবিক প্রচেষ্টাকে পুলিশ অবলীলায় বলে "উপজাতিদের পড়াশুনা শিখিয়ে তোমরা যে এই অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট করছিলে সে সংবাদ আছে আমাদের কাছে। " এই ভারসাম্য ফেরত আসে, যখন সমস্ত আদিবাসী অরণ্য ছাড়া হয়ে খনি শ্রমিকে পরিণত হয়। কনজিউমার সোসাইটির প্রয়োজন তো সত্যই, কিন্তু আরণ্যক উপজাতির সত্যটুকুর কোনো দাম থাকে না রাষ্ট্রের চোখে। সবুজ নষ্ট হয়ে যায়। মাটিতে বড় বড় হাঁ করা গর্ত তৈরি হয়। কারণ খুঁড়েছে মাফিয়া, কোন বিবেকবান রাষ্ট্র নয়।
      মায়ার "আচ্ছা চলি"র পিছনে রাষ্ট্র নামক ভিলেনের কি অবদান তা বোঝার জন্যে পড়ে দেখুন উপন্যাসটা
      ভিলেন নম্বর দুই
      বলব না। তাহলে আর কী পড়ে দেখবেন। কিন্তু রিমা বুঝতে পেরেছিলেন ভিলেন কে। কংকাল প্রেমিকের ঘাতক কে। আর সেই ভিলেন কে বানিয়েছিল মধ্যবিত্ত সমাজের হাশহাশ নীতি, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। যারা ভালবাসা দেখতে পায় না। ভালবাসার অভাব দেখতে পায় না। পবিত্র বিবাহগ্রন্থির নীচে চেপে রাখতে চায় সব রকম অতৃপ্তির চিৎকার। আর গ্রন্থিমুক্ত হতে চাইলে আঘাত করে সেই মানুষটিকে সুপরিকল্পিত ভাবে।
      ভিলেনের স্মৃতিসৌধ
      মায়ার "আচ্ছা চলির" পরে, মায়ালিঙ্গার পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হবার পরে, তুরুপ প্রজাতির জঙ্গুলে মানুষই পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে আনে নিরঞ্জনকে। মায়া ছিলেন তাদের জন্য শিক্ষিকা, মাতৃরূপিণী, জীবন্ত দেবী, আম্মা। আর মায়াগারু সেই দেবীর জীবনের অঙ্গ। তুরুপ গোষ্ঠীর এই মানুষদের সমাজচেতনা আলাদা। তারা মায়া-নিরঞ্জনকে গ্রহণ করেছিল খুব সহজ ভাবে, বর্তমানে নির্ভর করে, তাদের অতীত না খুঁড়ে। তাঁদের চলে যাওয়ার পরে তারা কুঁড়ে ঘরটাকে মন্দিরের সম্মান দেয়। কোন বিগ্রহহীন মন্দির। কিন্তু মায়ার আকস্মিক প্রস্থানের জন্য দায়ী ক্ষমতা গোষ্ঠী, কুঁড়েটাকে ধর্মের দোকান বানিয়ে ফেলে অচিরেই। বহু পরে রিমা খান অকুস্থলে গিয়ে দেখতে পান, এক অদ্ভুত মূর্তি সহকারে মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে মায়া পাল-এর ভাবমূর্তি বেচে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে খনি-মাফিয়ার দল বেশ দু পয়সা আয়ও করে নিচ্ছে।
      এভাবেই আমাদের দেশে সতী প্রথা থেকে শুরু করে অনার-কিলিং অব্দি বিভিন্ন ভাবে একটি মেয়ের সত্ত্বা ও অস্তিত্ব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর তাকে "ধার্মিক" প্রমাণ ক'রে, দেবী প্রমাণ ক'রে, তার ব্যক্তিসত্তা ছিনিয়ে নিয়ে সমাজ তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয় নিজের মধ্যে।
      যৌনতার অর্ধেক আকাশ, যান্ত্রিক ও মানবিক অরগ্যাজম, অশ্লীল মলয় রায়চৌধুরী
      মায়া
      মলয় রায়চৌধুরী সেই অর্থে অশ্লীল যে অর্থে ডি এইচ লরেন্স বা গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মারকেজ অশ্লীল ছিলেন। যখন 'লেডি চ্যাটার্লিস লাভার্স-এ কনির মনে হয় নারীকে তার নারীত্ব থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে আজকের পুরুষ আর সমাজ, বহু বায়বীয় কথার মধ্যে দিয়ে তার শরীরী রহস্য আর দেহোত্তীর্ণতা দুটোকেই নষ্ট করছে, তখন কংকাল প্রেমিক পরম যত্নে ধুইয়ে দেন প্রেমিকার অঙ্গ প্রেমিকার অনুজ্ঞায়, ঋতূস্রাবের পর। এই স্পর্শ আমাদের পরিচিত যৌনতার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। এখানে ভালোবাসা যে-কোনো ইজমকে অতিক্রম করেছে। লজ্জা ঘৃণা ভয় ত্যাগ করেছেন কৃষ্ণ এখানে, শুধু রাধা বা গোপিনীর দল নয়। এই ভালোবাসায় নিরঞ্জন নিষিক্ত হতে থাকেন মায়ার সঙ্গে, সভ্যতা-ছেঁকে পাওয়া সভ্যতায়।
      মিলি
      মেয়েদের যৌনতাকে সমাজ সাধারণতঃ অশ্লীল মনে করে। এই উপন্যাস-এ লেখক সেই ঢেকে যাওয়া অর্ধেক আকাশকে টেনে নিয়ে এসেছেন অনেকখানি। নিরঞ্জনের কৈশোরে মিলি, তাদের খেলাধূলোয় কেবল কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা দেখায় না। সে আগে নিজে তৃপ্ত হয়ে নেয় নিরঞ্জনের মাধ্যমে। তারপর নিরঞ্জনকে নিয়ে যায় শিখরে। এই দেয়া নেয়ার সহজ হিসেবটুকু এই টেণ্ডারনেসের সঙ্গে আমি সচরাচর পাই নি কোন বাংলা উপন্যাসে। এই প্রসঙ্গের অবতারণা যখনই হয়েছে, কিছু বিকৃতির সঙ্গে করা হয়েছে। আবার লরেন্সের থেকে ভাবটি উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করে- স্পর্শ ছাড়া কিই বা টিকে থাকে, শেষ পর্যন্ত দেহে মনে অস্তিত্বের শিকড়ে ? যদি স্পর্শ তেমন স্পর্শ হয়।
      রিমা খান
      RACHEL P. MAINES এর "The Technology of Orgasm "Hysteria," the Vibrator, and Women's Sexual Satisfaction" রচনা যেটি Johns Hopkins University Press থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, তার প্রথম পরিচ্ছেদের নাম হলো " THE JOB NOBODY WANTED " যে-কাজটি-কেউ-চায়নি। শতকের পর শতক মেয়েরা তাদের যৌন চেতনাকে ঢেকে রেখেছে, সেবামূলক ও প্রদান-ভিত্তিক মিলনের আড়ালে। তাই তার চেপে রাখা "হিস্টিরিয়া" টুকুকে কখনোই অনুরণনে পরিণত হতে দেয় নি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। সেটা শুধু চিকিৎসা-সাপেক্ষ গোঙ্গানি হয়ে থেকে গেছে। তাই রিমা খান যখন ডিলডো ব্যবহার করে খুশী হয়, তৃপ্ত হয়, ফুরফুরে হয়, আমি তখন আবার উদ্ধৃত করি " When the vibrator reemerged during the 1960s, it was no longer a medical instrument; it had been democratized to consumers to such an extent that by the seventies it was openly marketed as a sex aid. Its efficacy in producing orgasm in women became an explicit selling point in the consumer market. The women's movement completed what had begun with the introduction of the electromechanical vibrator into the home: it put into the hands of women themselves the job nobody else wanted. " RACHEL P. MAINES এর রচনা থেকে।
      আমি এই "অশ্লীল", নারীবাদী, মানবতাবাদী লেখককে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।
      উপন্যাসের ফর্ম, Anachronism, সাহিত্যের ডিটেকটিভদের টাইম ট্রাভেল, রাজনৈতিক গণহত্যা ও ডিটেকটিভ বিলাসিতা
      টাইম ট্রাভেল ও ডিটেকটিভ দের চোখে সামাজিক অবক্ষয়
      এই উপন্যাসে বেশ কটি মজার পয়েণ্ট রয়েছে। Anachronism বা সময়ের হেরফের ব্যবহার করে দিল্লিতে আন্তর্জাতিক ডিটেকটিভ কনফারেন্সে মলয় রায়চৌধুরী আবির্ভূত করেছেন দেশ বিদেশের বহু সত্যান্বেষীকে, সাহিত্যের পাতা থেকে উঠিয়ে তাদের জীবন্ত করে তুলে, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাতে চেয়েছেন আজকের সমাজে ডিটেকটিভদের অপ্রাসঙ্গিকতাটুকু।
      দিল্লিতে আন্তর্জাতিক ডিটেকটিভ কনফারেন্সে "প্রায়ভেট ডিটেকটিভ এসেছিলেন চেন কাও, ডেভিড স্মল, নিও উল্ফ, ভি আই ওয়ারশসস্কি, শন স্পেনসার, স্যাম স্পেড, শার্লক হোমস, কিনসে মিলোনে, এরকিউল পয়েরো, লিউ আর্চার, পল আর্টিজান, লিন্ডসে গর্ডন, জো ক্যানোলি, রেক্স কার্ভার, এলভিস কোল, হ্যারি ড্রেসডেন, ড্যান ফরচুন, ডার্ক জেন্টলি, এলেনি কুইন, এমারসন কড, কেট ব্যানিংগান, ক্লিফ হার্ডি, মাইক হ্যামার, টমাস ম্যাগনাম, ভেরেনিকা মার্স, ফিলিপ মারলো, জিম রকফোর্ড, জন শাফ্ট আর ম্যাথিউ শাডার। " দেবেন্দ্রবিজয়, অরিন্দম, বাংলাদেশের কিশোর পাশা, মাসুদ রাণা আর মুসা আমন; আমাদের হুকাকাশি, কল্কেকাশি, নিশীথ রায়, ইন্দ্রনাথ রুদ্র, জয়ন্ত-মাণিক-সিন্দরবাবু জুটি, গুপি-পানু-ছোটোমামা জুটি, গোন্ডালু, কিকিরা, পাণ্ডব গোয়েন্দা, ট্যাঁপা-মদনা জুটি, গোগোল এরাও সবাই দেখা দিয়েছেন কনফারেন্সে।
      এঁরা সব্বাই একবাক্যে বলেছেন, যেখানে দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পচছে, রাজনৈতিক ফুসলানিতে তৈরী দাঙ্গায় মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ, সেখানে খুচরো দু একটা খুনের কিনারা করতে গোয়েন্দা পোষা, বিলাসিতা মাত্র, সরকারের ধুলো দেয়া জনতার চোখে। এইভাবে সাহিত্যের গোয়েন্দাদের মাধ্যমে সাহিত্যের সমালোচনা অভিনব ও বেনজির।
      সংক্ষিপ্ত উপন্যাস এর সুবিশাল গণ্ডী
      এই উপন্যাসটি অত্যন্ত চটি, টানটান। এটি সম্ভব হয়েছে একটি বিশেষ ফর্মের কারণে। সেটা হলো, ফ্ল্যাশব্যাক বা ডায়রি-লিখনের মাধ্যমে উপন্যাস এর বেশীরভাগ অংশ বর্ণিত হয়েছে। কঙ্কাল প্রেমিকের অতীত, রিমাখানের বর্তমান, এই দুই এর মধ্যে ঘুরেছে সমস্ত ঘটনা। অতি স্বল্প পরিসরে ভালোবাসা, সামাজিক সমস্যা, রাজনৈতিক কূটকচালি আর একটা লোমহর্ষক গোয়েন্দাকাহিনী এক সাথে বর্ণিত হয়েছে। লেখকের "অরূপ তোমার এঁটোকাটা " উপন্যাসেও ডায়রি লিখনের মাধ্যমে খুব স্বল্প পরিসরে অনেকটা ক্ষেত্র দেখানো গিয়েছিল। এই পদ্ধতিটি বেশ অভিনব বাংলা সাহিত্যে, যদিও কিছু কিছু এমন নজির আছে (যেমন "স্ত্রীর পত্র" শুধু পত্র লিখনের মাধ্যমে জীবনের সত্যিটুকু তুলে ধরতে পেরেছিল )।
      পুলিশের গোয়েন্দাগিরির পদ্ধতিটাও খুব ভালো ভাবে ধরা পড়েছে এখানে, যে পদ্ধতি শখের বা প্রাইভেট গোয়েন্দার পদ্ধতির চেয়ে অনেক আলাদা। ইনফরম্যার-এর ব্যবহার, ছিঁচকে অপরাধীকে ভয় দেখিয়ে ছোটখাটো কাজ করিয়ে নেওয়া, ফরেনসিক অ্যানথ্রপলজিস্ট এর মতামত নিয়ে আইনতঃ প্রমাণ সাজানো, দরকার পড়লে অনিচ্ছুক লোকের বাড়ির ফোনের তার কেটে টেলিফোন কোম্পানির লোক সেজে ঢুকে পড়ার ফিকির ইত্যাদি অনেক রকম উপায় সম্পর্কে আমরা অবহিত হই।
      আবার কোন একটি কেস হঠাত করে পুলিশের কাছে দরকারি হয়ে পড়ে কেন, জমির বা রিয়াল এস্টেটের মাফিয়া কেন চায় যে একটা কোন সম্পত্তি দুর্নাম মুক্ত হোক, তা সে সত্যি বার করেই হোক বা বিশ্বাসযোগ্য সত্যি ক'রে, এই নানান জটিলতা ধরা থাকে এই উপন্যাসে।
      মলয় রায়চৌধুরী নিজেই এই উপন্যাসের একটি চরিত্র হয়ে শেষ দৃশ্যে উদয় হন ; কাহিনির সত্যতাকে পাঠকচেতনায় সংশয়ে রাখার প্রয়াসে। আর উপন্যাসের শেষে, অন্ততঃ একজন অপরাধীর উত্তরণ দেখা যায় মানুষ হিসেবে।
      শেষকথা
      সবটুকু মিলিয়ে বলা যায় যে এরকম প্রেমের উপন্যাস, যা কিনা অনেকগুলি বহুমুখী সত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা বহুভূজের মধ্যে আমাদের এক অন্যরকম জীবনচেতনার মুখোমুখি করে দেয়, খুব বেশী লেখা হয় নি বাংলা ভাষায়। বিষয় বৈচিত্র ও সাহসী মনোজ্ঞ বর্ণনায় এই উপন্যাসটি বড্ড আলাদা, উৎকেন্দ্রিক, ঠিক এর লেখকের মতোই। পড়ে দেখতে পারেন সময় করে। মনের জটগুলো খুলে যাবে (অন্ততঃ আমার তো গেছে ), আলো আসবে মনে।
       
       
       
  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৩১735092
  • অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ অনেকান্ত কথকতা
    মলয় রায়চৌধুরীর ৪৬ পাতার নভেলা- অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা। উপন্যাসের চারটি কথক। লেখক মলয় রায়চৌধুরী, বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের এক সদস্য চিত্রকর নির্মল এর পিতা, সরকারী চাকুরে ও অতলান্ত প্রেম-বিলাসী শিশির ও বেনারসে মন্দির-ব্যবসা-সফল সাহসিনী কেকা। শুরুতে লেখক কথকতাটা নিজেই করেন, কাহিনীর চরিত্রগুলি ও সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। এরপর বাকী তিন কথক তিনটি ভিন্ন সময়ে এই আখ্যান লিখে যাবেন। তিনজনই ডায়েরী লেখক। বলা ভালো একটিই ডায়েরী। মানে একই খাতা। আর তার কাগজে তিনটি ভিন্ন সময়ে তিন কথক আঁচড় কেটে রাখেন। তাই নিয়েই এগোয় আখ্যান। ডায়েরীটির প্রাথমিক এবং আসল মালিকানা বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের সদস্য নির্মল এর পিতার। এঁর কথকতাটি মূলত প্রাবন্ধিক ধাঁচার দিনলিপি। রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের র‍্যান্ডম নোট্স্‌। ডায়েরীটি হাতবদল হয় কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র শিশির মারফৎ। মানে শিশির ডায়েরীটি হাতসাফাই করে। নির্মলের বাবার নোট্স্‌ের খাঁজে খাঁজে ফাঁকা পাতা। সেই ফাঁকা স্পেইস- আর তা ভরে ওঠে শিশিরের বারানসী বসবাসের প্রায়-প্রাত্যহিক দিনলিপিতে। যা মুখ্যত দুই নারী- ভাইকিং বংশজাতা আমেরিকান তরুণী ম্যাডেলিন ও কেকা নাম্নী অন্ত্য-ত্রিশের বাঙ্গালিনীর সাথে তার শৃঙ্গার ও সঙ্গমের এরোটিক কলমদিহি।
    এই ডায়েরী-পাতায় মলয়ের কথকরা পাঠকের সাথে কথা বলে চলেন। মনোলগের ঢং তাতে। সেই কথা তাদের নিজেদের সাথেও। নির্মলের বাবার চরিত্রটি গড়ে তোলেন না লেখক। তিনি নেহাতই ইতিহাসের কথক। এর বেশী তার সম্পর্কে কোন তথ্য লেখক আমাদের দেননা। যাত্রা-ফর্মের বিবেকের মত এই কথকের সংযোজনে এক ব্রেশটীয় বিচ্ছিন্নতা তাই আমদানী সম্ভব হয়েছে। শৃঙ্গার, রতিক্রিয়ায় ভরপুর পাল্প-ফিকশনের ধাঁচায় যে ‘কজালিটির’ খেলা চলতে থাকতে পারত, তাকে প্রথমেই ভাঙ্গার কাজটি করছে এই বিচ্ছিন্নতার উপপাদ্য। যাকে পরে আরও ভাঙছে উপন্যাসটির উদ্দেশ্যমূলক ‘এরোটিকা’। যা নির্মাণের উদ্দেশ্য- ‘মধ্যবিত্তের নীতিমুলে’ শৈল্পিক লাথ। কামসূত্রের দেশে, পোস্ট-কলোনিয়াল গো-মল আর গোমূতের ছানবিন, আর কলোনি-পুর্ব মোজা পরা ভিক্টোরীয় সমাজ-পুলিশীর লিগাসিকে মলয় প্রশ্ন করেছেন ষাটের দশক থেকেই।হাংরিদের এটি মুখ্য এজেন্ডাও বটে। কিন্তু বাংলাবাজারে সেক্সকে ট্যাবু-মুক্ত করতে লেখালিখিতে সেক্সিস্টও আখরও কেটে রেখেছেন। দুর্দান্ত প্রাবন্ধিক মলয়ের গদ্য-পদ্যের এটিই সর্বাপেক্ষা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এই উপন্যাসেও তা চোখে পড়েছে, তবে তা ছাপিয়ে ওঠার মত শান্‌-দার অধুনান্তিক মেহ্‌ফিলটিও তিনি রচনা করে দিয়েছেন।
    এবং উপন্যাসের ধাঁচাটি ক্রমে বিশ্ব-স্থানিক, বহু-কথক, এক্সটিক লোকেল, এরোটিকা ও তার বিনির্মান এসবের আন্তর্জাল থেকে বহুস্বরিক হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে এইভাবে বহুস্বরিক হয়ে ওঠার বা তার অবসর নির্মান করার ক্র্যাফটটি তেমন জনপ্রিয় নয়।
    “আমার কোন স্থির কেন্দ্র ছিলনা।”
    স্থির কেন্দ্র, ঘুর্ননের আপাত স্থির বিন্দু- যাকে জন অ্যাশবেরী ‘আ হিম টু পসিবিলিটি’ বলে থাকেন, তা এই নভেলাতে ঘেপ্‌টে আছে জটিল এক কেমোফ্ল্যাজে।
    তিনটি ভিন্ন ডেমোগ্রাফির তিন কথককে উপস্থিত করে যে আখ্যানের বুনন তার স্থির কেন্দ্র দুটিঃ এক- পোস্ট কোলোনিয়াল ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত। ভারতবর্ষ, তরুণতর মেধাবী বাঙ্গালীর রাজনৈতিক সচেতনতা আর তার উত্তাল অভিমুখ; দুইঃ গ্লোবাল কানেকশন- আমেরিকার হিপ্সটার আন্দোলনের তরঙ্গ। সেই তরঙ্গ মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছিল, ষাট থেকে সত্তরের প্রথম ভাগে- নেপাল থেকে বারানসী। গুরু থেকে গাঞ্জা। বেলাগম সেক্স। তুলকালাম মাদক। অব্যর্থ শূন্যের ভেতর অনিশ্চিত জীবনের মানে খোঁজা। ভারত তখন হয়ে উঠেছে ঘরছাড়া হিপিদের হতাশ-নিরঞ্জন অভয়াক্ষেত্র- ইহমুক্তি খুঁজতে আসা শয়ে শয়ে মার্কিনি তরুন-তরুণী বারানসীর গলিতে গলিতে। এই বেনারসকেই বেছে নিয়েছেন মলয় তার নভেলার স্থানিক পট হিসেবে। কলকাতা থেকে বিকেন্দ্রীকরণ। আবার কলকাতা ও প্রবাস, বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র ও প্রান্তিক, এই দুই বাইনারি ছাপিয়ে তা মলয়ের আত্মজৈবনিক প্রয়াসও। ষাটের দশক। সত্তরের প্রথম ভাগ। সারা আমেরিকা উদ্বেল, অসংযত। যৌন-মুক্তি, ভালবাসায় বিভোল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পোর্টল্যান্ড, কলোরাডো থেকে নিউ ইয়র্ক। মাথায় ফুল লাগানো তরুণীরা, যুদ্ধবাজ মার্কিনি নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। ভিয়েতনামের নামে প্রতিবাদে উচাটন হচ্ছে বার্কলি থেকে প্রগতিশীল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। মানবিক হত্যার কাছে আস্থা হারিয়ে ভালবাসা খুঁজতে জড় হয়েছেন হেইট অ্যাশবেরিতে। ‘ভালবাসার একটি গ্রীষ্ম’ তাদের আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে, তারা ঘর ছাড়তে শিখেছেন বহর্বিশ্বের ডাকে। যেমন বীটরা। আমেরিকা জুড়ে তখন তেমনই চূড়ান্ত চলছে বীট আন্দোলন।
    বীটরা এসে যাবেন, কারণ- মলয় ও হাংরিদের বিট-কানেকশন ও মিথ পর্যায়ের। মলয় আমাকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন- হাংরিরা নয়, বরং বীটরাই অনেকভাবে হাংরিদের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন।
    আমি ডেনমার্কে বিট সাহিত্য সেমিনারে সেই সাক্ষাৎকার দেখাই। সন্ধ্যের পানশালায় মারিহুয়ানা ফুঁকতে ফুঁকতে নস্টালজিক হয়ে যেতে বসা অ্যালবয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরেনসন আমাকে রামকৃষ্ণের মত হাতের ভঙ্গিমা করে বল্লেন- কে কার থেকে কি নিল, তাতে কিবা এসে যায়। ভারতে যাওয়ার আগেই বীটরা স্বমহিমায়। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি- মলয় সম্ভবত বলতে চান যে ভারত থেকে ফিরে গিন্সবার্গ যেসব রচনা লিখছিলেন- কথ্য ভাষা সাহিত্যের আদলে, তাতে হাংরিদের প্রভাব আছে। তবে হাংরিদের ওপরও বিট-প্রভাবের আস্তরণ ছিল বা মলয়ের ওপর, তার একটি বড় লক্ষণ- তার হিপিবেলা, কারণ পুরো হিপি আন্দোলনের ওপরই বিটদের চূড়ান্ত প্রভাব ছিল। মলয় নিজেই তার মেময়ারকে ‘হিপিবেলা’ নাম দিয়েছেন। আর তা রাজনীতি হোক বা বীট বা বীটহীন হিপি- ঝড়টা আসলেই বহির্বিশ্বের।এরোটিকা লিখতে বসে, এই বহর্বিশ্বের ঝড়কে উপেক্ষা মলয়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ তা ফলিত হচ্ছে সমানুপাতিক ভাবে। একদিকে মাও এর রাজনীতি, অন্যদিকে হিপি সংস্কৃতি। ভারতে উত্তর উপনিবেশকালে, চীনের চেয়ারম্যানের নামে প্রলেতারিয়েত সমাজ গঠনের শপথ থেকে, মার্কিনি দাদাগিরিতে হতাশ, দেহ, নেশা, মুক্তি, ভালবাসার খোঁজে উত্তাল একাংশ মার্কিন সমাজের হাউই-বাতাস, উভয়ই মলয়কে পুষ্টি দিচ্ছে।
    সানফ্রানসিস্‌কো রেনেসান্স, ষাটের বৈপ্লবিক হিপি চরাচর ও ভালবাসার গ্রীষ্ম, বীটদের সাইকেডেলিক আন্দোলন, হিপিদের ভারত-অনুসন্ধান পর্ব ছাড়া এ উপন্যাসের প্রেক্ষিতই গড়ে উঠতনা।
    এসব জড়িবুটি পেরিয়ে মলয়ের কাছে চ্যালেঞ্জ হল- তার এই কেন্দ্র থেকে সরে এসে তাকে লিখতে হবে এরোটিকা, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালির ভিক্টোরিয় নৈতিক পাছার ফুটো দেখিয়ে- অ্যাস্‌হোল ঘোমটা-যৌনতার নিধন করা। আর শেষমেশ সেটি একটি প্রেমের আখ্যানই হবে- নয়তবা সিডাকশন, নিও-শৃঙ্গার-শাস্ত্র। আর ধুমাধার সেই দুয়েন্দেতে- অব্যর্থ ভাবে সফল এই পলিফনি। ভিন্ন ভিন্ন ডেমোগ্রাফির কোলাজ-কথন।
    “Depart from the tune” – বিযুক্ত কর
    পড়ছিলাম অ্যান লডেরবাক্‌। দেখছি তিনি বলেন- “Depart from the tune” – বিযুক্ত কর, ফর্মকে ভেঙ্গে যে ফর্ম, তার মধ্যে বিশ্বকে খোঁজো’। আবার বীটরা আসিয়া যাইতেছেন। বারোজে যেমন দেখি ন্যারেটিভ, ফ্যান্টাসি, স্বপ্ন, হ্যালুসিনেশন খেলা করে। এই উপন্যাসেও মারিহুয়ানা, কেমিক্যাল ড্রাগস ছাড়াও ‘নেকেড লাঞ্চ’ এর মতই উপন্যাসের নামকরণে ফুড-মেটাফর এনেছেন মলয়। এঁটোকাঁটা আর ব্রাহ্মসাহিত্যের মত ‘অরূপে’র ক্লাসিক সহাবস্থান, ভারতীয় যৌথ মনোনীতিতে গুরু আর চণ্ডালের অমসৃণ মিলনের মত। পৌষ্টিক ক্ষুধা, মাংস, রুটি, সুরা এবং শৃঙ্গার ও কাম-ক্ষুধার কেমোফ্ল্যাজ-
    মেঝেয় নামিয়া দুইজনে, আদিম মানব মানবীর ন্যায় পোশাকহীন, রুটি-মদ্য-মাংস খাইলাম। লঙ্কা দেয় নাই বলিয়া, মাংস, যদিও নরম, ছিঁড়িয়া-ছিঁড়িয়া খাইল ম্যাডেলিন, ছাড়া কাপড় টানিয়া হাত-মুখ পুঁছিল। ওই একই পরিত্যক্ত পোশাকে আমিও হাত-মুখ পুঁছিলাম।
    বীটদের মত সাইকেডিলিক ফ্যান্টাসি ও নেশার অদেখা জগতও এসে পড়ছে- যদিও তেমন জোরালো নয় : –
    “গাঁজার ধোঁয়ায় মগজে কত যে খেলা তৈরি হয় ! আমি তাহলে অক্ষয়-অব্যয় অপ্সরা, মধুবালা আর মাধুরী দীক্ষিতের মতন সমুদ্র মন্হন থেকে উঠেছি, তপস্যা নষ্ট করতে এক্সপার্ট। ” —- কেকা উবাচ
    আর শিশিরের জবানীতে,
    “শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি। মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে। ম্যাডিই প্রস্তাব দিয়াছিল, সজ্ঞানে তো বহুবার হইল ; মাদকের অপার্থিব জগতে প্রবেশ করিয়া অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা উচিত আমার। বালকসুলভ যৌনতার সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হইবে তদ্বারা।
    সে কি আলো বিচ্ছুরণ ! নিঃশব্দ ফুলকির বৃষ্টিফোঁটা রূপান্তরিত হইয়াছে নানা প্রকার ফুলে। ম্যাডিকে কখনও মনে হইয়াছে পালক, কখনও মাখন, কখনও অশরীরী অট্টালিকা, যাহার ভিতর প্রবেশ করিয়া পথ হারাইয়া সাঁতার কাটিতেছি। ”
    সারা উপন্যাসে এটুকুই মাত্র সাইকিডেলিক আয়োজন। আর তার বিবরণও নেহাতই নগণ্য। সেই দিক থেকে এটি মুখ্যভাবে সাইকুডেলিক ন্যারেটিভের চরিত্র ও গঠন বজায় রাখছেনা। যদিও মাদক ও ড্রাগস ও তার সেবন প্রথম দৃশ্য থেকেই প্রায় পুরো বারানসী বৃত্তান্তে ছড়িয়ে আছে। হাংরীরা বারবারই জানিয়েছেন যে তারা কেমিক্যাল ড্রাগস এর নেশায় ছিলেননা, বীটদের মত। তাই বীট বা অন্যান্য সাইকিডেলিক রচনার সাথে এ উপন্যাসের মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। বর্ননা যেটুকু আছে তা গড় সাইকিডেলিক মোটিফ বা সিম্বলের সাথে বিশেষ মেলেনা। আলো ও ফুলের মোটিফটি ছাড়া। সেদিক থেকে পাঠককে নিয়ে এসেও মাদকের অপার্থিব স্তরে ভ্রমণ করাতে মলয় নিতান্তই কাঞ্জুশি করেছেন বলব।
    ফিরে আসি ফর্মের আলোচনায়- তিনজন কথকের ডেমোগ্রাফি ভিন্ন। তাই বাক্যান্যাসের ব্যাপারে লেখক যত্নবান হয়েছেন। বাখতিন তার The Dialogic Imagination এ একথা উল্লেখ করেছেন যে – ‘পৃথ্বীটা পলিগ্লট অর্থাৎ বহুভাষক, হয়ে গেছে। আর উপন্যাস খুব সক্রিয়ভাবেই এই পলিগ্লট বিশ্ব নির্মান করতে সক্ষম’। ভাষার ভিন্নতা বা বহু ভাষা বলতে এখানে আমি ‘স্বর’ বোঝাতে চাইছি। তা মূলত ডেমোগ্রাফির ভিন্নতার কারণে। এবং একই ঘটনার বা প্রেক্ষিতের দুটি পৃথক উপস্থাপনার কারণে। কিউবিজমের ধাঁচায়- দুটি বয়ান- একটি শিশিরের অপরটি কেকার।
    উত্তম বচনে লেখা এই দিনলিপি আখ্যানে কেকা ও শিশির একটিই ন্যারেটিভের দুইটি পার্সপেক্টিভ দেওয়ার কাজ করে বা পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে। এখানে যেমন শিশিরের বয়ানে পাচ্ছি-
    “প্রাতঃকালের নয়টা-দশটা হইবে। লাল তাঁতের শাড়ি-ব্লাউজ পরিহিত, সম্পূর্ণ সিক্ত, চুল হইতেও জল ঝরিতেছে, এক ভারতীয় রমণী ঘরে প্রবেশ করিয়াই খিল তুলিয়া দিল। গঙ্গায় ডুব দিয়া ভিজিয়া গিয়াছি, শুকাইতে হইবে, বলিয়া এক-এক করিয়া সবকিছু পরিত্যাগ করিল, এবং আমার তোয়ালে লইয়া গা-মাথা পুঁছিতে লাগিল। …এতই বিস্ময়াহত হইলাম যে, উঠিয়া, স্হিতি বোধগম্য হইতে সময় লাগিল। আত্মস্হ হইলে কন্ঠ হইতে নির্গত হইল, কেকা বোউদি, করিতেছেন কী, করিতেছেন কী ! কেকা বলিল, বউদি শব্দটি বাদ দাও, এবং এগুলি ছাদে শুকাইয়া দিয়া আইস, তারপর বলিতেছি। শুকাইতে দিয়া ঘরে ফিরিয়া দেখিলাম, অতুলের স্ত্রী বিছানায় শুইয়া সিগারেট ফুঁকিতেছে। নারীর বহু পোশাক ঘরে মজুত। অথচ সে নগ্ন, কোনো লজ্জা-সংকোচ নাই। বুঝিতে পারিলাম আমার কন্ঠ শুকাইয়া গিয়াছে, মুখ দিয়া কথা ফুটিতে সময় লাগিবে। ”
    এই একই ঘটনা আবার লিপিবদ্ধ হতে দেখি কেকার জবানীতে, এক পুরুষত্বহীন স্বামী, আরেক লম্পট প্রেমিকের যৌন প্রত্যাখ্যানে অনশনক্লিষ্ট, যৌবনময়ী সে বেঁচে নিতে চায় জীবন-
    “প্রথম দিনের ব্যাপারটা লিখতে গিয়ে শিশির কিছুটা বাদ দিয়ে ফেলেছে, বোধহয় উত্তেজনার বশে কিংবা নেশার ঘোরে লিখেছে বলে। আমার মনে হয়, ও হুহু করে লিখে গেছে, তারপর আর পড়ে দেখেনি। তার ওপর মাস্টারি-মার্কা বাংলা। ও যখন ঘরে ঢুকে খাটের পাশে এসে দাঁড়ালো, মুখচোখ দেখে বুঝলুম ভীষণ অপ্রস্তুত, কী করবে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। একেবারে অস্হিরপঞ্চক। ওকে স্বাভাবিক করে তুলতে আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় পর-পর দুটো রিং ওর দিকে উড়িয়ে বললুম, এই নাও বরমাল্য, তোমায় স্বয়ম্বর-সভায় বরণ করে নিচ্ছি। শিশির কিছুটা স্বাভাবিক হল, কিন্তু জিগ্যেস করে বসল, তুমি আর গান গাও না ? এরকম গাড়লপুরুষ যে হতে পারে জানতুম না। সামনে শুয়ে রয়েছে এক নগ্ন মহিলা, সেদিকে নজর দেবে, প্রশংসা করবে, তা নয়, গান ! তবে বুঝে নিতে অসুবিধা হল না যে বঙড়শিতে মাছ আটকে পড়েছে, এখন যদি আমি মুখ থেকে বঁড়শি খুলে নিই তবেই ছাড়া পাবে, নয়তো আটকে নিয়ে খেলাবো, খেলাতে থাকবো। পুরুষরা ভাবে যে তারাই বুঝি ছিপ ফেলে গিঁথে তুলতে পারে।”
    এরপরই ডায়েরী মালিকের ক্লাসিক-জবানীতে প্রায় গোদারীয় জাম্পকাট। কেকার জবানী থেকে পাঠক এসে পড়ছে নির্মলের বাবার দিনলিপির পাতায়। তার বচনে-
    “উৎপাদন ব্যাপারটা হয়ে উঠেছে সতত পরিবর্তনরত। আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের কারণে, প্রাযুক্তিক দ্রুতির কারণে, শ্রমের তুলনায় পুঁজি থেকে সর্বাধিক লাভের কারণে, এবং অবশ্যই ভোগ্যবস্তুর বিশ্বায়নের কারণে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের আদলটাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। বহুজাতিক সংস্হা ও তার মালিকদের স্বদেশ বলে কিছু থাকছে না। আবির্ভাব হয়েছে বিশ্বব্যাপী মাফিয়া-ভাতৃত্বের। বাজারের কতৃত্ব হয়ে চলেছে বিকেন্দ্রিত। অথচ বহুজাতিকগুলোর কর্মকাণ্ড কেবলমাত্র পুঁজি, মাল এবং উৎপাদনের আনাগোনায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক নকশাগুলোর হেরফেরকারীও বটে। ব্যক্তিমালিকের পক্ষে আর ঊৎপাদনের বিশাল কারবার চালানো সম্ভব নয় বলে, সমাজ-সম্প্রদায়-রাষ্ট্রের হাতে উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত। নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম, নীতি এক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়ায় টলমলে। সেহেতু সংস্কৃতির সনাতন ভৌগলিক বাঁধন আলগা হয়ে যায়। সংস্কৃতি হয়ে যায় ভাসা-ভাসা। সংস্কৃতি হয়ে গেছে ধাবমান ও যাযাবর। ক্লাব, সমিতি, গোষ্ঠী, যারা সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে নিজেদের মনে করে, আসলে তারা উত্তরদার্শনিকতার প্রতিভূ।
    উৎপাদনের আন্তঃরাষ্ট্রিকতা একযোগে হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব বিশ্ব একতার সুত্র, আবার পুঁজিবাদের ইতিহাসে অচিন্ত্যনীয় ভঙ্গুরতার উৎস। পুঁজিবাদের এখনকার জায়মান গল্পটি আর ইউরোপীয় ইতিহাসের প্রসারিত গল্প নয়। এই গল্পের আর কেন্দ্র থাকছে না। অর্থনৈতক ভঙ্গুরতার শক্তিবিকিরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসেছে সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা বা বহুসাংস্কৃতিকতা। এর ফলে ঘটছে সাংস্কৃতিক দেশান্তরণ, সীমানাগুলোর ( ভাষা, দেশ, জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ ইত্যাদি ) অপলকাভাব, পার্থক্য ও অসাম্যের তৃণমূল পর্যন্ত প্রসার, সমাজের ভেতরে-বাইরে ওই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সমরূপী হবার চাপ, স্হানিক ও বিশ্বের পরস্পরের মধ্যে অনুপ্রবেশ। এগুলো উত্তরদার্শনিকতার লক্ষণ। ”
    ক্লাসিক প্রবন্ধের কেত্‌দার, চোস্ত্‌, আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ। প্রাবন্ধিক মলয় যিনি উপন্যাসের কলমে নির্মলের বাবা, এই বচনের কথক। এতে এসে গাড়ি জুতছেন কেকা।
    “একে তো কামুক ভোঁদাটা বিটকেল বাংলায় নিজের কাশীবাসের স্মৃতি লিখেছে, তাও আবার এমন ইজগুড়ি-বিজগুড়ি হাতের লেখায় যে তরতর করে পড়া যায় না ; তার ওপর মাঝে-মধ্যে ঢোকানো নির্মলের বাবার জ্ঞানবাক্যি ! হাতসাফাই যখন করলি, তখন ফাঁকা দেখে একটা খাতা নিতিস। নয়তো ছিঁড়ে ফেলে দিতিস নির্মলের বাবার লেখা জ্ঞানবাক্যির পাতাগুলো। ওনার দুয়েকটা পাতা পড়লুম। কী যা মাথামুন্ডু কিছুই তো বুঝলুম না। শিশির যেমন বাংলায় মাস্টারি ফলিয়ে কাব্যি করেছে, উনি তেমনি নিজেই নিজেকে জ্ঞান দিয়েছেন। ”
    লেখকের সূত্র অনুযায়ী ইনিই ডায়েরী মালিক। এই মূল অথরের ডায়েরিতে ঢুঁসো মেরে ঢুকে পড়ছে শিশির। কিন্তু পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছেনা। প্রাথমিক অথরকে মারছেনা। রেখে দিচ্ছে ফাঁকা, সাদা পাতা ইতস্তত। কোন পরিকল্পনা ছাড়া। সেখানে জমে উঠবে কেকা’র ‘আত্মনং বিদ্ধি’- তার নিজস্ব বাক্যশৈলীতে, যা জীবন-তরতরে- প্রচলিত অভিজ্ঞান মতে- চটুল ও অ-ক্লাসিক। স্বেদ,ঘাম ও হমজায়েদী। এভাবেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে- কোলাজ-কথন।
    “ফাঁকে-ফাঁকে যেখানটায় লেখা হয়নি, শিশির আর নির্মলের বাবা যে পাতাগুলো ছেড়ে দিয়েছে; হয়ত আমার জন্যেই। সেখানে আমার কথাগুলো ঢোকাবো। ”
    মলয়ের পরীক্ষা-নিরিক্ষায় বাংলা সাহিত্যে এই বহু কথকের, একে অপরকে নির্মান-বিনির্মানের অধুনান্তিক ফর্মটি সাফল্যের সাথে থেকে গেল।
    দেহ,মন, অপর
    ‘আমি শিশিরের প্রেমিকা নই। শিশির আমার প্রেমিক ছিল না। তাহলে আমরা পরস্পরের কী ? আমি শিশিরের দেহটাকে ভালোবেসেছি। শিশির আমার দেহটাকে ভালোবেসেছে। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা দুজনে যে-যার নিজেকে ভালবেসেছি। অথচ আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা নই। এরকম কাণ্ড তো সিনেমাতেও সম্ভব নয়। দেখাতেই পারবে না। আমি সত্যিই অপ্সরা, ঝড় দিয়ে গড়া অপ্সরা। আর শিশির হল বরফের মতন ঠান্ডা অন্ধকার দিয়ে গড়া বিশ্বামিত্র। ’
    ওপরের জবানীটি কেকার। কাহিনীতে বারানসীর দুইটি মুখ্য নারী চরিত্র- ম্যাডেলিন ও কেকা। কিন্তু মলয়কাপল-ফর্মেশন ঘটাচ্ছেননা। এদের মধ্যে প্রেম বা বিবাহ সম্পর্ক হয়না। দেহ ও মনকে ব্যবচ্ছেদ করে, দেহ ও মনের এই কামরা-ভাগ, প্রেমিক ও যৌন সঙ্গীর আলাদায়ন, এই নবীনতা, পোস্ট-আধুনিক অগ্রসরতা, বাংলা কেন তামাম সাউথ এশিয়ায় যথেষ্ট কষ্ট-মুমকিন, ভুলে যাবেননা উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে ষাটের শেষ গোড়ায়, সত্তরে।
    আবারো কথা হোল – মলয়, শিশিরের চরিত্রকে, কামরাজ-কাম-সাধু (কেকার উক্তিতে, বিশ্বামিত্র) গোছের এক সমসত্ব শিশির ভেজা রস-মণ্ড তৈরি করতে চেয়েছেন। শিশির নামক এই কথক চরিত্রটির হাতে জাদু আছে। সে জানে কামকলার ছলা। সে নারী শরীরের প্রতিটি আহ্লাদ-বিন্দুকে জাগিয়ে তুলতে পারে। আগাগোড়া দুটি নারী চরিত্রের সাথেই তার সঙ্গমের যে কামশস্ত্র মূলক রচনা, তাতে কামের, শৃঙ্গারের কলা পারদর্শিতায় পুরুষের ভূমিকাই মুখ্য। ম্যাডেলীন ও কেকা উভয়ই শিশিরের কামকলায় তৃপ্ত হয়। কিন্তু তাদের যৌনমুক্তির বা অরগ্যাজম বা উদ্দীপনের সুতোটি শিশিরের হাতে বাঁধা থাকে। মানে দাঁড়াচ্ছে- শিশির বা তার মত কোন পুরুষই পারে নারী শরীরকে বাজিয়ে তুলতে, (প্রসঙ্গতঃ নারীর সমসাময়িক যৌনচেতনা একথা স্বীকার করবেনা, এনিয়ে বিস্তরআলোচনার অবকাশ আছে, এই আলোচনায় তার বিস্তৃতি ঘটালাম না ) যেমন জিমি হেনড্রিক্সঃ
    “ওঃ, জিমি হেনড্রিক্স ! ইনডিয়ায় আসিয়া এই প্রথম একজন ভারতীয়ের কন্ঠে জিমি হেনড্রিক্সের নাম শুনিলাম। গিটার তাঁহার হাতে যৌনতায় উত্তেজিত রমণীদিগের ন্যায় হইয়া উঠে ; যেনবা গিটারের অরগ্যাজম ঘটে ! শরীরে আনন্দের ঢেউ তুলিয়া ম্যাডেলিন কহিল। তদ্ব্যাতীত, অরগ্যাজম শব্দটি শুনিয়া প্রীত হইলাম। ইতোপূর্বে কোনো নারীর কন্ঠে এই শব্দটি শুনি নাই; বস্তুত, ভাষার ভিতরে যে আরাম প্রদানের ক্ষমতা হাছে তাহা মাঝে-মধ্যে অন্যের কন্ঠস্বর নিঃসৃত শব্দে অনেকসময়ে ফুটিয়া উঠে। ”
    (বিদেশিনী নারী চরিত্র ম্যাডেলিন )
    মানে যৌনতায় উত্তেজিত হতে গেলে জিমিকে বা জিমির মত কাউকে বাজাতে হয়। লেখক নারীর চাহিদায় সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছেন, কেকাকে কথক হিসেবে খাড়া করে আখ্যান বুনেছেন। নারী শরীরকে পরম মমতায় যত্ন করতে চেয়েছেন। কিন্তু নারীর যৌনতাকে পুরুষের কেন্দ্র থেকে চালনা করার ইচ্ছাও বার বার প্রকাশ করেছেন। এমনকি তা যখন নারী চরিত্রটির জবানীতেও বসানো হচ্ছে। উপন্যাসে নারীর যৌনতৃপ্তির পক্ষে সহমর্মীতা আছে। তবে দুটি নারীর ক্ষত্রেই সে প্যাসিভ গ্রহীতা। সবটুকু চালনা করে শিশির। আর অনাকাঙ্ক্ষিত হোল-
    “তুমি নায়কের ভূমিকা পালন করিবে, খলনায়ক হহিতে পারিলে আরও ভালো, তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। ”
    অথবা,
    সিক্ত তোয়ালেতে কান্তা সুগন্ধী ছিটাইয়া ভালোভাবে পুঁছিলাম ম্যাডেলিনের দেহ। চোখ বুজিয়া শীতল স্পর্শের আরাম লইতে-লইতে বলিল, ব্রেকফাস্ট করিয়া, একটি অটুলস ফ্যাগ ফুঁকিয়া পরস্পরকে চতুষ্পদের মত রেপ করিবার লড়াই করিব, কী বল ?
    রেপের ধারণায় মলয় রায়চৌধুরী এতো মশগুল কেন তা আমার বোঝাতীত।
    ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ থেকেই এর ধারাবাহিকতা মলয় রেখে চলছেন। শৃঙ্গার, যৌনতার সাথে রেপের কি সম্বন্ধ একথা তার মত বিদগ্ধ মানুষ কেবলই গুলিয়ে গেলেন বলে আশ্চর্য হতে হয়। দুঃখিতও। রেপ একটি জঘন্য ঘোরতর ক্রাইম। রেপ থেকে চূড়ান্ত শারীরিক জখম এমনকি মৃত্যু হয়। রেপের মূল রয়েছে পানিশমেন্টের মারমুখী, খুনী, ক্ষতি-ইচ্ছা। অ্যাগ্রেসিভ-সেক্স বা ডমিনেটেড হওয়ার ফ্যান্টাসিকে ‘রেপ’ না বলে অন্য শব্দের কোন প্রতিস্থাপন তিনি খুঁজে পেলেননা না পেতে চাইলেননা, সেটি খোলসা করার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।
    পুরুষ লেখক, কথক হিসবে তিনি নারী চরিত্রের সংলাপেও তা হাজির করছেন। নারী সত্যিই কি চান- কোন নারী দুর্মর, বাধাহীন অরগ্যাজম্‌ পেতে চাইলে রেপড্‌ হতে চাইবেন কেন? হ্যাঁ, পরিসংখ্যান পাওয়া যায়- নারীরা সাবমিসিভ হতে চেয়ে বা পুরুষকে শরীরের বল প্রয়োগ করতে নির্দেশ দিয়ে শৃঙ্গার করতে চাইছেন। তাকে ‘রেপ-ফ্যান্টাসি’ বলার এক অদ্ভুত কিমাশ্চর্জম চলও লক্ষ্য করা যায়। যারা এটা করেন তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে চান না – রেপটা কোন ফ্যান্টাসি নয়- সেটা ক্রাইম!
    মৃগাঙ্ক গাঙ্গুলিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলাম- শুভা নিয়ে দুয়েক কথা বলতে পারি, আমার বিশ্লেষণ। আমি শুভা হলে মলয়দা কে এক হাত নিতাম অথবা শুভার হয়ে।
    একই জিনিশ লক্ষ্য করেছি সাম্প্রতিক অবন্তিকার ক্ষেত্রেও। মেল-গেজিও বলেও না। পুরোপুরি, এক ধরণের পাওয়ার-প্লে আছে। মলয়দাকে যেটুকু জানি, কথা বলেছি, মলয়দার মত লিবেরাল মানুষ এটা কেন এনেছিলেন, আনেন, জানতে ইচ্ছে হয়।
    যেমন সম্প্রতি ”অবন্তিকার শতনাম’ কবিতাটি।
    “ওষ্ঠের নাম আফ্রিকান সাফারি, পাছা দুটির নাম- গোলাপসুন্দরী…”
    এ জিনিশ এর আগে নিম্ন- উচ্চ-মধ্য কোন মেধার বাঙ্গালী কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব হয়নি। মলয় চূড়ান্ত প্রেমিক, অবন্তিকাকে দুর্বার প্রেম ও অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিন্তু কথা হইল পাছা তো অবন্তিকার। স্তন ও তার। সে কি এইরূপ নাম পাইয়া খুশী হইয়াছে? সে কি নাম রাখার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছে? এই কথা মলয় রায়চৌধুরী আমাদের কখনওই জানান না।
    ফলে ‘Sex is Shameful’- এই ধারনাকে ভাঙলেও কিন্তু মেয়েদের যৌনমুক্তি বা স্বাধীনতার যে ক্ষেত্র তাতে পুরোপুরি কাজে আসছেনা হাংরিদের কলম। এনিয়ে অন্য পরিসরে বলাই ভালো। উপন্যাসে ফিরি। এই উপন্যাসে অবশ্য মলয়কে স্বীকারোক্তিতে যেতে দেখি। শিশির যে চরিত্র, যার সাথে মলয় রায়চৌধুরীর হিপিবেলার উপাদান অনুযায়ী আত্মজৈবনিক মিল আছে ধারনা করছি, তার জবানীতেই এই আত্ম-উন্মোচনঃ –
    “রাজগীরের কুণ্ডের চারিধারে খালি গায়ে বসেছিল, আর আমরা, কলেজিয়ানরা, দুচোখ মেলে দেখছিলুম, যতক্ষণ ওরা স্নান করেছে ততক্ষণ “মেল-গেজ” দিয়ে গিলেছি। ”
    যৌথ ডায়েরি- স্পেস, মেটাফর, মুক্তাঞ্চল
    প্রকাণ্ড শিবলিঙ্গ। তার নীচে কেকার আখড়া। মন্দির খুলে বসে কেকার আয় দুরন্ত। চিহ্নের পোস্টাপিস এই পোস্ট উত্তর-আধুনিকতাকালে তামাদি হইয়া গেছে। কিন্তু তামাদি হয়ে গেলেও চলচ্চিত্রের মানুষ এই কলমচীর সিগ্নিফায়ার ও সিগ্নিফায়েডের সংগম মাথায় চলে ফেরে। আর কেবলই মানের জন্ম হইতে থাকে।
    শিবলিঙ্গ, মন্দিরের মেটাফরও এখানে আরেকটি ইস্যু-ভিত্তিক স্তর আমদানী করছে- ধর্ম ও তার ভণ্ডামির গার্বেজ। কেকা বৌদির শিবের লিঙ্গ প্রতিস্থার মেটাফর, যা প্রজনন কাল্টের প্রতীক, যোনী ও লিঙ্গের সঙ্গমের প্রকাশ্য সনাতনী ইন্সটলেশন ( যা বারানসী না হলেও একিভাবে বার্তাবহ হত, কিন্তু বারানসী শিবস্থান, লিঙ্গ পূজার মহাপীঠ, তাই মেটাফরের খেলা এখানে জমে ওঠে অব্যর্থ ) তাকে ঘিরে জমে উঠছে ব্যবসা। ধর্মের। যে ধর্মে যৌনতা ছিলাটান ট্যাবু। সেখানেই ট্যাবু ভাঙ্গার আখ্যানে শান দিয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা প্রাচীন চলমান সভ্যতা। সত্তরের বারানসীতে মলয় তাই এখানেই নিও-কামশাস্ত্র লিখতে পারেন উত্তাল বারুদ্গন্ধে। দেহ, যা ঘিরে মৌতাত পায় যৌন-উৎসব। দেহধারী স্বপ্নময় চোখ- যা চেয়েছিল সমাজবদল, সেই দেহকেই ধ্বংস হতে হচ্ছে, খুন হয়ে যাচ্ছে তরুণ সমাজ। স্বপ্নময় সত্তরের বিপ্লব আয়োজন। আয়োজক সেই দেহ গুলিকে নিঃশেষ করা হচ্ছে। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হচ্ছে নকশাল উল্লাসের, ফেক এনকাউন্টারে।
    দেহ, দেহজ আনন্দ, মৃত্যুর ভেতর দেহ বর্জন এই দেহদর্শন বার বার মীনের মত পাক খাচ্ছে ন্যারেটিভে। মলয় একে নাটকীয় করছেন। সম্পর্কের এক জ্যামিতিক বিন্যাস ঘনিয়ে তুলছেন। তার মধ্যে দুটি নারী শরীরের সাথে তার শৃঙ্গার-লীলাকে মহিমান্বিত করে মলয় এরোটিকা নির্মান করেছেন। সেখানে যৌন মিলনের মধ্যে একের ফেলে যাওয়া অন্তর্বাস, অপরের কাম-জাগানিয়া প্রসাধনে সাহায্য করছে। আদার ও আত্ম’র বাইনারিকে গুলিয়ে দিতে গ্লোব্যাল-লোক্যাল, শ্বেত ও বাদামীর, উচ্চবিত্ত ও নিম্নের ইন্টারসেকশনালিটির উঠোনটি প্রশস্ত হচ্ছে।
    উপন্যাসে যৌথ ডায়েরিটিই এক জাদু-স্পেস। এবং সেটিই এখানে হয়ে ওঠে সিক্রেট-গার্ডেন। গোপন উদ্যান। অন্তত এরোটিকার পার্টটি যেখানে লেখা হচ্ছে। চিলেকোঠার ছাদ। যার গা দিয়ে গঙ্গা বহতা। ভারতীয় যৌথ-মনস্তত্বে সে পাপমোচী। কলুষনাশী। কাদাখানার সফেদ্‌দারী তার কর্ম। এই ‘লোকেলে’ মলয় খেলে দিয়েছেন পাল্টা ছক- উত্তর উপনিবেশে, বজরাঙ্গ-দল-পুর্ব্ব উত্তর প্রদেশে। তার সফেদ্দারী এখানে এক জোরালো লাথ- যেখানে গঙ্গা, তার বহতা বায়ু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভিক্টোরীয় শুচিবায়ুতা। আর তিনি শুখরিয়া আদা করছেন- ট্যাবু ভাঙ্গানিয়া মাদকের।
    ‘শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি। মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে। ’
    একিভাবে বহুস্বর ও কথকের বিষয়ে লেখক মলয় উদার। এবং বায়াসহীনও। অন্যস্বর গুলিকে স্পেস করে দেন তিনি একই ন্যারেটিভে কথা বলার। ভিন্ন পার্সপেক্টিভ রাখার। তাতে কেকা চরিত্রটি নায়ক শিশিরকে খাটো করতে চাইলেও লেখক মলয় কেকাকে এই সুযোগ দেন। বোঝা যায় যে এ লেখকের এক আত্মবিশ্লেষন, কারণ মলয় রায়চৌধুরীর আত্মজৈবনিক উপাদান খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- শিশির মলয়ের অল্টার ইগো।
    কিন্তু এরোটিকা লিখতে বসেছে শিশির। সত্তরের দশকের নিও-কামশাস্ত্র। শৃঙ্গার মালা। মাঝে ধ্যানস্থ হাইফেনের মত নির্মলের পিতার কাল-কথনের মহাকাল বাণী- এই হল কাঠামো। তার ভেতর অতি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত নারীর আত্মনং বিধি- ‘জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই, যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো ‘ ( কেকা উবাচ)। অথবা বিত্তশীল দেশের অস্থির সমাজের জীবনদর্শন- ” যাহা ইচ্ছা করি, যে দেশে ইচ্ছা যাই, যাহাকে ভালো লাগে তাহার সহিত শুই, খাইতে ভালোবাসি বলিয়া প্রতিটি দেশের খাদ্য খাই ” ( ম্যাডেলিন উবাচ)।
    চূড়ান্ত আধুনিক ভাঙ্গা ফর্ম-চিহ্ন ও ভদ্রাসন ভেঙ্গে ফেলবার মেটাফরে বারানসী তাই চরম নির্বাচন।
    লেখক এখানে লোক্যাল-গ্লোব্যাল, প্রেম-প্রেমহীন শৃঙ্গার আত্ম ও অপর মারহাব্বা খেলে দিয়েছেন। তা সত্য এরোটিকার নির্মানের চেষ্টায়ও। দেহ এরোটিক ‘আদার’কে খোঁজে। ইন্টিমেসি সেই ”আদার” কে তার অবস্থানকে গলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কথকেরা রতিক্রিয়ায় অন্যের দেহগুলিকে যত্ন করতে শেখেন। একই সাথে চলে নারীর দেহের ভিস্যুয়াল কনসাম্পশন, স্কোপোফিলিয়া,। কেকার জবানীতে এই ভ্যয়ার-কে অতিক্রম করার সুযোগ ছিল। কিন্তু লেখক পুরুষ- তার ভয়ারিজম এখানে কেকার নারী-গেজকে ছাড়িয়ে যায়। এরোটিক ট্র্যাডিশনে সাধারণত এ খেলা সমানেই চলতে থাকে।
    তার পাশাপাশি ভাষাতত্বের লুডো-বোর্ডে সাপ-লুডোর মত স্ল্যাং ও ধ্রুপদী নামা ওঠা করছে। ছড়িয়ে পড়ছে।
    ডায়রি লেখক- ধ্যানস্থ, শিশির এর ভাষা ধ্রুপদী সাধু, কেকার- লোকজ ফিচেল। কিন্তু তার চটুলতা ম্যানিকিওর্ড ফ্ল্যাট-বাড়ি বা বহুতলের বাজার-উপন্যাস মার্কা চরিত্রের মত ভুসো-চটকা নয়।
    বহুদিন আগে তার প্রেমিক লর্ড আলফ্রেড বোসি ডগ্‌লাসকে লেখা অস্কার ওয়াইল্ডের অমূল্য কিছু চিঠি-চাপাটি পড়েছিলাম। ঝিম লাগানো সুন্দর সেসব প্রেমালাপ।
    বারানসীর সাব্‌-আর্বান, অনাধুনিক শহুরে প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসটিও ঝিম লাগানো সুন্দর। রহস্যময়ী প্রাচীন নগরী। তাতে ঘটে চলে বিষাদ আর মিলনের আনন্দ বিলাপ, ফ্যান্টাসি, গেইম। বোমা ও পিস্তলের মাঝে কয়েক মানবিক মুহুর্ত। চলন্ত, জাগ্রত এক উৎসব। যৌনতার উৎসব। তার আয়োজন আছে। সামান্যই। কিন্তু আন্তরিক।
    ম্যাডেলিন এর নিঃস্পৃহ বিষাদ, ট্রান্সন্যাশানাল দৃষ্টিপথ, শঙ্খ লেগে যাওয়া পাকে পাক। আর কেকার স্বেদ মাখা, সস্তা দামের লিপস্টিক ওষ্ঠ, অধর, সস্তার অগুরু ও কান্তা। নিম্ন মধ্যবিত্তের ছাপা আঁচল। অদম্য বাঁচার ইচ্ছা, বেঁচে নেওয়া। শরীরকে আবিষ্কারের আনন্দ, আর টাবুর পাছায় গরম কশাঘাত। বাঙ্গলা সাহিত্যে এই অ্যাডাল্টারির বন্দনায় মনে পড়ল অ্যাডাম বেইগলি’র ‘আপডাইক’ কেও। টাইম ম্যাগাজিন কাভার স্টোরি করে বলেছিল- ‘He is also credited with making suburban sex sexy’। বাঙ্গালীর ধর-তক্তা ফুল-ফুল সেক্স-কাব্যকে সত্যিই পরিণত সেক্সি করে ফেলা উপন্যাসটির চলন তরতরে, ঘোরলাগা। মায়াময়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এটি মলয় রায়চৌধুরীরও প্রিয় উপন্যাস। যদিও এ বিষয়ে তার মতামত আমার জানা হয়নি।
    সত্তর একটা হাওয়া। হাওয়াটা উপন্যাসে বইছে- হাওয়ায় বারুদ গন্ধ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহ, সমাজ পাল্টানোর তীব্র জেদ আর শরীরী ট্যাবু ভাঙ্গার ঘোরলাগা, অনুপম মাদকতা। এর মধ্যে উপন্যাসে শৃঙ্গার, এরোটিকের প্রাণটিই সর্বাপেক্ষা অরূপ, মায়াময়। জীবনকে বেঁচে নেয়া। যেমনি অরূপ এই সুসফল ফলন্ত জীবন, তেমনই অরূপ তার এঁটোকাঁটাও।
    “জীবনটা যে মাংসের উৎসব তা কেন মেনে নেয় না লোকে। আমার শরীরের রক্তমাংসে আমি উৎসব ঘটাব তো তাতে কার কী করার আছে ! বেঁচে থাকা ব্যাপারটা হল এই উৎসবকে সারা জীবন ধরে পালন করে যাওয়া। অবিরাম, অবিরাম, অবিরাম। মনের শান্তি এছাড়া কেমন করেই বা পাবো, কেউ বোঝাক আমাকে। জীবন তো একবারই। তাহলে নিজের জন্যে বাঁচব না কেন ? পল থেকে পল, সবসময় নতুন ; শিশির দেখিয়ে গিয়েছিল সেই পথটা, যে পথটা আমি জানতেই পারিনি শিশিরকে পাবার আগে। ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা। উন্মাদিনীরা ছাড়া ভালোবাসার কথা আর কেউ বলতে পারে না। নিজেকে ভালবাস, হ্যাঁ, নিজেকে নিজেকে, আর অমন ভালবাসার জন্যে যা ইচ্ছা হয় করো ; ভালবাসার জন্যে বেপরোয়া হতে হবে। ” —- কেকা উবাচ
    খাজুরাহোর দেশে, বাৎস্যায়নকে পুঁথি লেখার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছিলো কিনা জানা যাচ্ছেনা। তবে তার সহস্রাধিক বছর পরে এই দেশে চুমু আন্দোলন করার প্রয়োজন হয়েছে। নেতা বলিয়াছেন- উহা ইম্পোর্টেড !! সব মিলিয়ে গোদারের ‘জে. এল. জি বাই জে. এল. জি‘র কথা মনে পড়ল-
    “First there was Greek civilization. Then there was the Renaissance. Now we are entering the age of the Ass.”
    অতএব এই কেকা-উবাচ- “জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই, যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো” — ইহা এক জীবনমুখী সহজিয়া দর্শনের উল্লাস। সারা উপন্যাসে তারই আয়োজন।
    ইতিহাস, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, ক্র্যাফট ও কৌশলের নিরিখে এটি, হতে পারে, মলয় রায়চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ ফিকশন কাজ। আপনি থাকছেন স্যার।
    _____________________________________
     
     
     
    • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৩১735091
    • অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ অনেকান্ত কথকতা
      মলয় রায়চৌধুরীর ৪৬ পাতার নভেলা- অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা। উপন্যাসের চারটি কথক। লেখক মলয় রায়চৌধুরী, বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের এক সদস্য চিত্রকর নির্মল এর পিতা, সরকারী চাকুরে ও অতলান্ত প্রেম-বিলাসী শিশির ও বেনারসে মন্দির-ব্যবসা-সফল সাহসিনী কেকা। শুরুতে লেখক কথকতাটা নিজেই করেন, কাহিনীর চরিত্রগুলি ও সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। এরপর বাকী তিন কথক তিনটি ভিন্ন সময়ে এই আখ্যান লিখে যাবেন। তিনজনই ডায়েরী লেখক। বলা ভালো একটিই ডায়েরী। মানে একই খাতা। আর তার কাগজে তিনটি ভিন্ন সময়ে তিন কথক আঁচড় কেটে রাখেন। তাই নিয়েই এগোয় আখ্যান। ডায়েরীটির প্রাথমিক এবং আসল মালিকানা বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের সদস্য নির্মল এর পিতার। এঁর কথকতাটি মূলত প্রাবন্ধিক ধাঁচার দিনলিপি। রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের র‍্যান্ডম নোট্স্‌। ডায়েরীটি হাতবদল হয় কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র শিশির মারফৎ। মানে শিশির ডায়েরীটি হাতসাফাই করে। নির্মলের বাবার নোট্স্‌ের খাঁজে খাঁজে ফাঁকা পাতা। সেই ফাঁকা স্পেইস- আর তা ভরে ওঠে শিশিরের বারানসী বসবাসের প্রায়-প্রাত্যহিক দিনলিপিতে। যা মুখ্যত দুই নারী- ভাইকিং বংশজাতা আমেরিকান তরুণী ম্যাডেলিন ও কেকা নাম্নী অন্ত্য-ত্রিশের বাঙ্গালিনীর সাথে তার শৃঙ্গার ও সঙ্গমের এরোটিক কলমদিহি।
      এই ডায়েরী-পাতায় মলয়ের কথকরা পাঠকের সাথে কথা বলে চলেন। মনোলগের ঢং তাতে। সেই কথা তাদের নিজেদের সাথেও। নির্মলের বাবার চরিত্রটি গড়ে তোলেন না লেখক। তিনি নেহাতই ইতিহাসের কথক। এর বেশী তার সম্পর্কে কোন তথ্য লেখক আমাদের দেননা। যাত্রা-ফর্মের বিবেকের মত এই কথকের সংযোজনে এক ব্রেশটীয় বিচ্ছিন্নতা তাই আমদানী সম্ভব হয়েছে। শৃঙ্গার, রতিক্রিয়ায় ভরপুর পাল্প-ফিকশনের ধাঁচায় যে ‘কজালিটির’ খেলা চলতে থাকতে পারত, তাকে প্রথমেই ভাঙ্গার কাজটি করছে এই বিচ্ছিন্নতার উপপাদ্য। যাকে পরে আরও ভাঙছে উপন্যাসটির উদ্দেশ্যমূলক ‘এরোটিকা’। যা নির্মাণের উদ্দেশ্য- ‘মধ্যবিত্তের নীতিমুলে’ শৈল্পিক লাথ। কামসূত্রের দেশে, পোস্ট-কলোনিয়াল গো-মল আর গোমূতের ছানবিন, আর কলোনি-পুর্ব মোজা পরা ভিক্টোরীয় সমাজ-পুলিশীর লিগাসিকে মলয় প্রশ্ন করেছেন ষাটের দশক থেকেই।হাংরিদের এটি মুখ্য এজেন্ডাও বটে। কিন্তু বাংলাবাজারে সেক্সকে ট্যাবু-মুক্ত করতে লেখালিখিতে সেক্সিস্টও আখরও কেটে রেখেছেন। দুর্দান্ত প্রাবন্ধিক মলয়ের গদ্য-পদ্যের এটিই সর্বাপেক্ষা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এই উপন্যাসেও তা চোখে পড়েছে, তবে তা ছাপিয়ে ওঠার মত শান্‌-দার অধুনান্তিক মেহ্‌ফিলটিও তিনি রচনা করে দিয়েছেন।
      এবং উপন্যাসের ধাঁচাটি ক্রমে বিশ্ব-স্থানিক, বহু-কথক, এক্সটিক লোকেল, এরোটিকা ও তার বিনির্মান এসবের আন্তর্জাল থেকে বহুস্বরিক হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে এইভাবে বহুস্বরিক হয়ে ওঠার বা তার অবসর নির্মান করার ক্র্যাফটটি তেমন জনপ্রিয় নয়।
      “আমার কোন স্থির কেন্দ্র ছিলনা।”
      স্থির কেন্দ্র, ঘুর্ননের আপাত স্থির বিন্দু- যাকে জন অ্যাশবেরী ‘আ হিম টু পসিবিলিটি’ বলে থাকেন, তা এই নভেলাতে ঘেপ্‌টে আছে জটিল এক কেমোফ্ল্যাজে।
      তিনটি ভিন্ন ডেমোগ্রাফির তিন কথককে উপস্থিত করে যে আখ্যানের বুনন তার স্থির কেন্দ্র দুটিঃ এক- পোস্ট কোলোনিয়াল ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত। ভারতবর্ষ, তরুণতর মেধাবী বাঙ্গালীর রাজনৈতিক সচেতনতা আর তার উত্তাল অভিমুখ; দুইঃ গ্লোবাল কানেকশন- আমেরিকার হিপ্সটার আন্দোলনের তরঙ্গ। সেই তরঙ্গ মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছিল, ষাট থেকে সত্তরের প্রথম ভাগে- নেপাল থেকে বারানসী। গুরু থেকে গাঞ্জা। বেলাগম সেক্স। তুলকালাম মাদক। অব্যর্থ শূন্যের ভেতর অনিশ্চিত জীবনের মানে খোঁজা। ভারত তখন হয়ে উঠেছে ঘরছাড়া হিপিদের হতাশ-নিরঞ্জন অভয়াক্ষেত্র- ইহমুক্তি খুঁজতে আসা শয়ে শয়ে মার্কিনি তরুন-তরুণী বারানসীর গলিতে গলিতে। এই বেনারসকেই বেছে নিয়েছেন মলয় তার নভেলার স্থানিক পট হিসেবে। কলকাতা থেকে বিকেন্দ্রীকরণ। আবার কলকাতা ও প্রবাস, বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র ও প্রান্তিক, এই দুই বাইনারি ছাপিয়ে তা মলয়ের আত্মজৈবনিক প্রয়াসও। ষাটের দশক। সত্তরের প্রথম ভাগ। সারা আমেরিকা উদ্বেল, অসংযত। যৌন-মুক্তি, ভালবাসায় বিভোল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পোর্টল্যান্ড, কলোরাডো থেকে নিউ ইয়র্ক। মাথায় ফুল লাগানো তরুণীরা, যুদ্ধবাজ মার্কিনি নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। ভিয়েতনামের নামে প্রতিবাদে উচাটন হচ্ছে বার্কলি থেকে প্রগতিশীল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। মানবিক হত্যার কাছে আস্থা হারিয়ে ভালবাসা খুঁজতে জড় হয়েছেন হেইট অ্যাশবেরিতে। ‘ভালবাসার একটি গ্রীষ্ম’ তাদের আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে, তারা ঘর ছাড়তে শিখেছেন বহর্বিশ্বের ডাকে। যেমন বীটরা। আমেরিকা জুড়ে তখন তেমনই চূড়ান্ত চলছে বীট আন্দোলন।
      বীটরা এসে যাবেন, কারণ- মলয় ও হাংরিদের বিট-কানেকশন ও মিথ পর্যায়ের। মলয় আমাকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন- হাংরিরা নয়, বরং বীটরাই অনেকভাবে হাংরিদের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন।
      আমি ডেনমার্কে বিট সাহিত্য সেমিনারে সেই সাক্ষাৎকার দেখাই। সন্ধ্যের পানশালায় মারিহুয়ানা ফুঁকতে ফুঁকতে নস্টালজিক হয়ে যেতে বসা অ্যালবয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরেনসন আমাকে রামকৃষ্ণের মত হাতের ভঙ্গিমা করে বল্লেন- কে কার থেকে কি নিল, তাতে কিবা এসে যায়। ভারতে যাওয়ার আগেই বীটরা স্বমহিমায়। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি- মলয় সম্ভবত বলতে চান যে ভারত থেকে ফিরে গিন্সবার্গ যেসব রচনা লিখছিলেন- কথ্য ভাষা সাহিত্যের আদলে, তাতে হাংরিদের প্রভাব আছে। তবে হাংরিদের ওপরও বিট-প্রভাবের আস্তরণ ছিল বা মলয়ের ওপর, তার একটি বড় লক্ষণ- তার হিপিবেলা, কারণ পুরো হিপি আন্দোলনের ওপরই বিটদের চূড়ান্ত প্রভাব ছিল। মলয় নিজেই তার মেময়ারকে ‘হিপিবেলা’ নাম দিয়েছেন। আর তা রাজনীতি হোক বা বীট বা বীটহীন হিপি- ঝড়টা আসলেই বহির্বিশ্বের।এরোটিকা লিখতে বসে, এই বহর্বিশ্বের ঝড়কে উপেক্ষা মলয়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ তা ফলিত হচ্ছে সমানুপাতিক ভাবে। একদিকে মাও এর রাজনীতি, অন্যদিকে হিপি সংস্কৃতি। ভারতে উত্তর উপনিবেশকালে, চীনের চেয়ারম্যানের নামে প্রলেতারিয়েত সমাজ গঠনের শপথ থেকে, মার্কিনি দাদাগিরিতে হতাশ, দেহ, নেশা, মুক্তি, ভালবাসার খোঁজে উত্তাল একাংশ মার্কিন সমাজের হাউই-বাতাস, উভয়ই মলয়কে পুষ্টি দিচ্ছে।
      সানফ্রানসিস্‌কো রেনেসান্স, ষাটের বৈপ্লবিক হিপি চরাচর ও ভালবাসার গ্রীষ্ম, বীটদের সাইকেডেলিক আন্দোলন, হিপিদের ভারত-অনুসন্ধান পর্ব ছাড়া এ উপন্যাসের প্রেক্ষিতই গড়ে উঠতনা।
      এসব জড়িবুটি পেরিয়ে মলয়ের কাছে চ্যালেঞ্জ হল- তার এই কেন্দ্র থেকে সরে এসে তাকে লিখতে হবে এরোটিকা, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালির ভিক্টোরিয় নৈতিক পাছার ফুটো দেখিয়ে- অ্যাস্‌হোল ঘোমটা-যৌনতার নিধন করা। আর শেষমেশ সেটি একটি প্রেমের আখ্যানই হবে- নয়তবা সিডাকশন, নিও-শৃঙ্গার-শাস্ত্র। আর ধুমাধার সেই দুয়েন্দেতে- অব্যর্থ ভাবে সফল এই পলিফনি। ভিন্ন ভিন্ন ডেমোগ্রাফির কোলাজ-কথন।
      “Depart from the tune” – বিযুক্ত কর
      পড়ছিলাম অ্যান লডেরবাক্‌। দেখছি তিনি বলেন- “Depart from the tune” – বিযুক্ত কর, ফর্মকে ভেঙ্গে যে ফর্ম, তার মধ্যে বিশ্বকে খোঁজো’। আবার বীটরা আসিয়া যাইতেছেন। বারোজে যেমন দেখি ন্যারেটিভ, ফ্যান্টাসি, স্বপ্ন, হ্যালুসিনেশন খেলা করে। এই উপন্যাসেও মারিহুয়ানা, কেমিক্যাল ড্রাগস ছাড়াও ‘নেকেড লাঞ্চ’ এর মতই উপন্যাসের নামকরণে ফুড-মেটাফর এনেছেন মলয়। এঁটোকাঁটা আর ব্রাহ্মসাহিত্যের মত ‘অরূপে’র ক্লাসিক সহাবস্থান, ভারতীয় যৌথ মনোনীতিতে গুরু আর চণ্ডালের অমসৃণ মিলনের মত। পৌষ্টিক ক্ষুধা, মাংস, রুটি, সুরা এবং শৃঙ্গার ও কাম-ক্ষুধার কেমোফ্ল্যাজ-
      মেঝেয় নামিয়া দুইজনে, আদিম মানব মানবীর ন্যায় পোশাকহীন, রুটি-মদ্য-মাংস খাইলাম। লঙ্কা দেয় নাই বলিয়া, মাংস, যদিও নরম, ছিঁড়িয়া-ছিঁড়িয়া খাইল ম্যাডেলিন, ছাড়া কাপড় টানিয়া হাত-মুখ পুঁছিল। ওই একই পরিত্যক্ত পোশাকে আমিও হাত-মুখ পুঁছিলাম।
      বীটদের মত সাইকেডিলিক ফ্যান্টাসি ও নেশার অদেখা জগতও এসে পড়ছে- যদিও তেমন জোরালো নয় : –
      “গাঁজার ধোঁয়ায় মগজে কত যে খেলা তৈরি হয় ! আমি তাহলে অক্ষয়-অব্যয় অপ্সরা, মধুবালা আর মাধুরী দীক্ষিতের মতন সমুদ্র মন্হন থেকে উঠেছি, তপস্যা নষ্ট করতে এক্সপার্ট। ” —- কেকা উবাচ
      আর শিশিরের জবানীতে,
      “শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি। মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে। ম্যাডিই প্রস্তাব দিয়াছিল, সজ্ঞানে তো বহুবার হইল ; মাদকের অপার্থিব জগতে প্রবেশ করিয়া অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা উচিত আমার। বালকসুলভ যৌনতার সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হইবে তদ্বারা।
      সে কি আলো বিচ্ছুরণ ! নিঃশব্দ ফুলকির বৃষ্টিফোঁটা রূপান্তরিত হইয়াছে নানা প্রকার ফুলে। ম্যাডিকে কখনও মনে হইয়াছে পালক, কখনও মাখন, কখনও অশরীরী অট্টালিকা, যাহার ভিতর প্রবেশ করিয়া পথ হারাইয়া সাঁতার কাটিতেছি। ”
      সারা উপন্যাসে এটুকুই মাত্র সাইকিডেলিক আয়োজন। আর তার বিবরণও নেহাতই নগণ্য। সেই দিক থেকে এটি মুখ্যভাবে সাইকুডেলিক ন্যারেটিভের চরিত্র ও গঠন বজায় রাখছেনা। যদিও মাদক ও ড্রাগস ও তার সেবন প্রথম দৃশ্য থেকেই প্রায় পুরো বারানসী বৃত্তান্তে ছড়িয়ে আছে। হাংরীরা বারবারই জানিয়েছেন যে তারা কেমিক্যাল ড্রাগস এর নেশায় ছিলেননা, বীটদের মত। তাই বীট বা অন্যান্য সাইকিডেলিক রচনার সাথে এ উপন্যাসের মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। বর্ননা যেটুকু আছে তা গড় সাইকিডেলিক মোটিফ বা সিম্বলের সাথে বিশেষ মেলেনা। আলো ও ফুলের মোটিফটি ছাড়া। সেদিক থেকে পাঠককে নিয়ে এসেও মাদকের অপার্থিব স্তরে ভ্রমণ করাতে মলয় নিতান্তই কাঞ্জুশি করেছেন বলব।
      ফিরে আসি ফর্মের আলোচনায়- তিনজন কথকের ডেমোগ্রাফি ভিন্ন। তাই বাক্যান্যাসের ব্যাপারে লেখক যত্নবান হয়েছেন। বাখতিন তার The Dialogic Imagination এ একথা উল্লেখ করেছেন যে – ‘পৃথ্বীটা পলিগ্লট অর্থাৎ বহুভাষক, হয়ে গেছে। আর উপন্যাস খুব সক্রিয়ভাবেই এই পলিগ্লট বিশ্ব নির্মান করতে সক্ষম’। ভাষার ভিন্নতা বা বহু ভাষা বলতে এখানে আমি ‘স্বর’ বোঝাতে চাইছি। তা মূলত ডেমোগ্রাফির ভিন্নতার কারণে। এবং একই ঘটনার বা প্রেক্ষিতের দুটি পৃথক উপস্থাপনার কারণে। কিউবিজমের ধাঁচায়- দুটি বয়ান- একটি শিশিরের অপরটি কেকার।
      উত্তম বচনে লেখা এই দিনলিপি আখ্যানে কেকা ও শিশির একটিই ন্যারেটিভের দুইটি পার্সপেক্টিভ দেওয়ার কাজ করে বা পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে। এখানে যেমন শিশিরের বয়ানে পাচ্ছি-
      “প্রাতঃকালের নয়টা-দশটা হইবে। লাল তাঁতের শাড়ি-ব্লাউজ পরিহিত, সম্পূর্ণ সিক্ত, চুল হইতেও জল ঝরিতেছে, এক ভারতীয় রমণী ঘরে প্রবেশ করিয়াই খিল তুলিয়া দিল। গঙ্গায় ডুব দিয়া ভিজিয়া গিয়াছি, শুকাইতে হইবে, বলিয়া এক-এক করিয়া সবকিছু পরিত্যাগ করিল, এবং আমার তোয়ালে লইয়া গা-মাথা পুঁছিতে লাগিল। …এতই বিস্ময়াহত হইলাম যে, উঠিয়া, স্হিতি বোধগম্য হইতে সময় লাগিল। আত্মস্হ হইলে কন্ঠ হইতে নির্গত হইল, কেকা বোউদি, করিতেছেন কী, করিতেছেন কী ! কেকা বলিল, বউদি শব্দটি বাদ দাও, এবং এগুলি ছাদে শুকাইয়া দিয়া আইস, তারপর বলিতেছি। শুকাইতে দিয়া ঘরে ফিরিয়া দেখিলাম, অতুলের স্ত্রী বিছানায় শুইয়া সিগারেট ফুঁকিতেছে। নারীর বহু পোশাক ঘরে মজুত। অথচ সে নগ্ন, কোনো লজ্জা-সংকোচ নাই। বুঝিতে পারিলাম আমার কন্ঠ শুকাইয়া গিয়াছে, মুখ দিয়া কথা ফুটিতে সময় লাগিবে। ”
      এই একই ঘটনা আবার লিপিবদ্ধ হতে দেখি কেকার জবানীতে, এক পুরুষত্বহীন স্বামী, আরেক লম্পট প্রেমিকের যৌন প্রত্যাখ্যানে অনশনক্লিষ্ট, যৌবনময়ী সে বেঁচে নিতে চায় জীবন-
      “প্রথম দিনের ব্যাপারটা লিখতে গিয়ে শিশির কিছুটা বাদ দিয়ে ফেলেছে, বোধহয় উত্তেজনার বশে কিংবা নেশার ঘোরে লিখেছে বলে। আমার মনে হয়, ও হুহু করে লিখে গেছে, তারপর আর পড়ে দেখেনি। তার ওপর মাস্টারি-মার্কা বাংলা। ও যখন ঘরে ঢুকে খাটের পাশে এসে দাঁড়ালো, মুখচোখ দেখে বুঝলুম ভীষণ অপ্রস্তুত, কী করবে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। একেবারে অস্হিরপঞ্চক। ওকে স্বাভাবিক করে তুলতে আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় পর-পর দুটো রিং ওর দিকে উড়িয়ে বললুম, এই নাও বরমাল্য, তোমায় স্বয়ম্বর-সভায় বরণ করে নিচ্ছি। শিশির কিছুটা স্বাভাবিক হল, কিন্তু জিগ্যেস করে বসল, তুমি আর গান গাও না ? এরকম গাড়লপুরুষ যে হতে পারে জানতুম না। সামনে শুয়ে রয়েছে এক নগ্ন মহিলা, সেদিকে নজর দেবে, প্রশংসা করবে, তা নয়, গান ! তবে বুঝে নিতে অসুবিধা হল না যে বঙড়শিতে মাছ আটকে পড়েছে, এখন যদি আমি মুখ থেকে বঁড়শি খুলে নিই তবেই ছাড়া পাবে, নয়তো আটকে নিয়ে খেলাবো, খেলাতে থাকবো। পুরুষরা ভাবে যে তারাই বুঝি ছিপ ফেলে গিঁথে তুলতে পারে।”
      এরপরই ডায়েরী মালিকের ক্লাসিক-জবানীতে প্রায় গোদারীয় জাম্পকাট। কেকার জবানী থেকে পাঠক এসে পড়ছে নির্মলের বাবার দিনলিপির পাতায়। তার বচনে-
      “উৎপাদন ব্যাপারটা হয়ে উঠেছে সতত পরিবর্তনরত। আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের কারণে, প্রাযুক্তিক দ্রুতির কারণে, শ্রমের তুলনায় পুঁজি থেকে সর্বাধিক লাভের কারণে, এবং অবশ্যই ভোগ্যবস্তুর বিশ্বায়নের কারণে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের আদলটাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। বহুজাতিক সংস্হা ও তার মালিকদের স্বদেশ বলে কিছু থাকছে না। আবির্ভাব হয়েছে বিশ্বব্যাপী মাফিয়া-ভাতৃত্বের। বাজারের কতৃত্ব হয়ে চলেছে বিকেন্দ্রিত। অথচ বহুজাতিকগুলোর কর্মকাণ্ড কেবলমাত্র পুঁজি, মাল এবং উৎপাদনের আনাগোনায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক নকশাগুলোর হেরফেরকারীও বটে। ব্যক্তিমালিকের পক্ষে আর ঊৎপাদনের বিশাল কারবার চালানো সম্ভব নয় বলে, সমাজ-সম্প্রদায়-রাষ্ট্রের হাতে উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত। নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম, নীতি এক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়ায় টলমলে। সেহেতু সংস্কৃতির সনাতন ভৌগলিক বাঁধন আলগা হয়ে যায়। সংস্কৃতি হয়ে যায় ভাসা-ভাসা। সংস্কৃতি হয়ে গেছে ধাবমান ও যাযাবর। ক্লাব, সমিতি, গোষ্ঠী, যারা সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে নিজেদের মনে করে, আসলে তারা উত্তরদার্শনিকতার প্রতিভূ।
      উৎপাদনের আন্তঃরাষ্ট্রিকতা একযোগে হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব বিশ্ব একতার সুত্র, আবার পুঁজিবাদের ইতিহাসে অচিন্ত্যনীয় ভঙ্গুরতার উৎস। পুঁজিবাদের এখনকার জায়মান গল্পটি আর ইউরোপীয় ইতিহাসের প্রসারিত গল্প নয়। এই গল্পের আর কেন্দ্র থাকছে না। অর্থনৈতক ভঙ্গুরতার শক্তিবিকিরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসেছে সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা বা বহুসাংস্কৃতিকতা। এর ফলে ঘটছে সাংস্কৃতিক দেশান্তরণ, সীমানাগুলোর ( ভাষা, দেশ, জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ ইত্যাদি ) অপলকাভাব, পার্থক্য ও অসাম্যের তৃণমূল পর্যন্ত প্রসার, সমাজের ভেতরে-বাইরে ওই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সমরূপী হবার চাপ, স্হানিক ও বিশ্বের পরস্পরের মধ্যে অনুপ্রবেশ। এগুলো উত্তরদার্শনিকতার লক্ষণ। ”
      ক্লাসিক প্রবন্ধের কেত্‌দার, চোস্ত্‌, আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ। প্রাবন্ধিক মলয় যিনি উপন্যাসের কলমে নির্মলের বাবা, এই বচনের কথক। এতে এসে গাড়ি জুতছেন কেকা।
      “একে তো কামুক ভোঁদাটা বিটকেল বাংলায় নিজের কাশীবাসের স্মৃতি লিখেছে, তাও আবার এমন ইজগুড়ি-বিজগুড়ি হাতের লেখায় যে তরতর করে পড়া যায় না ; তার ওপর মাঝে-মধ্যে ঢোকানো নির্মলের বাবার জ্ঞানবাক্যি ! হাতসাফাই যখন করলি, তখন ফাঁকা দেখে একটা খাতা নিতিস। নয়তো ছিঁড়ে ফেলে দিতিস নির্মলের বাবার লেখা জ্ঞানবাক্যির পাতাগুলো। ওনার দুয়েকটা পাতা পড়লুম। কী যা মাথামুন্ডু কিছুই তো বুঝলুম না। শিশির যেমন বাংলায় মাস্টারি ফলিয়ে কাব্যি করেছে, উনি তেমনি নিজেই নিজেকে জ্ঞান দিয়েছেন। ”
      লেখকের সূত্র অনুযায়ী ইনিই ডায়েরী মালিক। এই মূল অথরের ডায়েরিতে ঢুঁসো মেরে ঢুকে পড়ছে শিশির। কিন্তু পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছেনা। প্রাথমিক অথরকে মারছেনা। রেখে দিচ্ছে ফাঁকা, সাদা পাতা ইতস্তত। কোন পরিকল্পনা ছাড়া। সেখানে জমে উঠবে কেকা’র ‘আত্মনং বিদ্ধি’- তার নিজস্ব বাক্যশৈলীতে, যা জীবন-তরতরে- প্রচলিত অভিজ্ঞান মতে- চটুল ও অ-ক্লাসিক। স্বেদ,ঘাম ও হমজায়েদী। এভাবেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে- কোলাজ-কথন।
      “ফাঁকে-ফাঁকে যেখানটায় লেখা হয়নি, শিশির আর নির্মলের বাবা যে পাতাগুলো ছেড়ে দিয়েছে; হয়ত আমার জন্যেই। সেখানে আমার কথাগুলো ঢোকাবো। ”
      মলয়ের পরীক্ষা-নিরিক্ষায় বাংলা সাহিত্যে এই বহু কথকের, একে অপরকে নির্মান-বিনির্মানের অধুনান্তিক ফর্মটি সাফল্যের সাথে থেকে গেল।
      দেহ,মন, অপর
      ‘আমি শিশিরের প্রেমিকা নই। শিশির আমার প্রেমিক ছিল না। তাহলে আমরা পরস্পরের কী ? আমি শিশিরের দেহটাকে ভালোবেসেছি। শিশির আমার দেহটাকে ভালোবেসেছে। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা দুজনে যে-যার নিজেকে ভালবেসেছি। অথচ আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা নই। এরকম কাণ্ড তো সিনেমাতেও সম্ভব নয়। দেখাতেই পারবে না। আমি সত্যিই অপ্সরা, ঝড় দিয়ে গড়া অপ্সরা। আর শিশির হল বরফের মতন ঠান্ডা অন্ধকার দিয়ে গড়া বিশ্বামিত্র। ’
      ওপরের জবানীটি কেকার। কাহিনীতে বারানসীর দুইটি মুখ্য নারী চরিত্র- ম্যাডেলিন ও কেকা। কিন্তু মলয়কাপল-ফর্মেশন ঘটাচ্ছেননা। এদের মধ্যে প্রেম বা বিবাহ সম্পর্ক হয়না। দেহ ও মনকে ব্যবচ্ছেদ করে, দেহ ও মনের এই কামরা-ভাগ, প্রেমিক ও যৌন সঙ্গীর আলাদায়ন, এই নবীনতা, পোস্ট-আধুনিক অগ্রসরতা, বাংলা কেন তামাম সাউথ এশিয়ায় যথেষ্ট কষ্ট-মুমকিন, ভুলে যাবেননা উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে ষাটের শেষ গোড়ায়, সত্তরে।
      আবারো কথা হোল – মলয়, শিশিরের চরিত্রকে, কামরাজ-কাম-সাধু (কেকার উক্তিতে, বিশ্বামিত্র) গোছের এক সমসত্ব শিশির ভেজা রস-মণ্ড তৈরি করতে চেয়েছেন। শিশির নামক এই কথক চরিত্রটির হাতে জাদু আছে। সে জানে কামকলার ছলা। সে নারী শরীরের প্রতিটি আহ্লাদ-বিন্দুকে জাগিয়ে তুলতে পারে। আগাগোড়া দুটি নারী চরিত্রের সাথেই তার সঙ্গমের যে কামশস্ত্র মূলক রচনা, তাতে কামের, শৃঙ্গারের কলা পারদর্শিতায় পুরুষের ভূমিকাই মুখ্য। ম্যাডেলীন ও কেকা উভয়ই শিশিরের কামকলায় তৃপ্ত হয়। কিন্তু তাদের যৌনমুক্তির বা অরগ্যাজম বা উদ্দীপনের সুতোটি শিশিরের হাতে বাঁধা থাকে। মানে দাঁড়াচ্ছে- শিশির বা তার মত কোন পুরুষই পারে নারী শরীরকে বাজিয়ে তুলতে, (প্রসঙ্গতঃ নারীর সমসাময়িক যৌনচেতনা একথা স্বীকার করবেনা, এনিয়ে বিস্তরআলোচনার অবকাশ আছে, এই আলোচনায় তার বিস্তৃতি ঘটালাম না ) যেমন জিমি হেনড্রিক্সঃ
      “ওঃ, জিমি হেনড্রিক্স ! ইনডিয়ায় আসিয়া এই প্রথম একজন ভারতীয়ের কন্ঠে জিমি হেনড্রিক্সের নাম শুনিলাম। গিটার তাঁহার হাতে যৌনতায় উত্তেজিত রমণীদিগের ন্যায় হইয়া উঠে ; যেনবা গিটারের অরগ্যাজম ঘটে ! শরীরে আনন্দের ঢেউ তুলিয়া ম্যাডেলিন কহিল। তদ্ব্যাতীত, অরগ্যাজম শব্দটি শুনিয়া প্রীত হইলাম। ইতোপূর্বে কোনো নারীর কন্ঠে এই শব্দটি শুনি নাই; বস্তুত, ভাষার ভিতরে যে আরাম প্রদানের ক্ষমতা হাছে তাহা মাঝে-মধ্যে অন্যের কন্ঠস্বর নিঃসৃত শব্দে অনেকসময়ে ফুটিয়া উঠে। ”
      (বিদেশিনী নারী চরিত্র ম্যাডেলিন )
      মানে যৌনতায় উত্তেজিত হতে গেলে জিমিকে বা জিমির মত কাউকে বাজাতে হয়। লেখক নারীর চাহিদায় সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছেন, কেকাকে কথক হিসেবে খাড়া করে আখ্যান বুনেছেন। নারী শরীরকে পরম মমতায় যত্ন করতে চেয়েছেন। কিন্তু নারীর যৌনতাকে পুরুষের কেন্দ্র থেকে চালনা করার ইচ্ছাও বার বার প্রকাশ করেছেন। এমনকি তা যখন নারী চরিত্রটির জবানীতেও বসানো হচ্ছে। উপন্যাসে নারীর যৌনতৃপ্তির পক্ষে সহমর্মীতা আছে। তবে দুটি নারীর ক্ষত্রেই সে প্যাসিভ গ্রহীতা। সবটুকু চালনা করে শিশির। আর অনাকাঙ্ক্ষিত হোল-
      “তুমি নায়কের ভূমিকা পালন করিবে, খলনায়ক হহিতে পারিলে আরও ভালো, তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। ”
      অথবা,
      সিক্ত তোয়ালেতে কান্তা সুগন্ধী ছিটাইয়া ভালোভাবে পুঁছিলাম ম্যাডেলিনের দেহ। চোখ বুজিয়া শীতল স্পর্শের আরাম লইতে-লইতে বলিল, ব্রেকফাস্ট করিয়া, একটি অটুলস ফ্যাগ ফুঁকিয়া পরস্পরকে চতুষ্পদের মত রেপ করিবার লড়াই করিব, কী বল ?
      রেপের ধারণায় মলয় রায়চৌধুরী এতো মশগুল কেন তা আমার বোঝাতীত।
      ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ থেকেই এর ধারাবাহিকতা মলয় রেখে চলছেন। শৃঙ্গার, যৌনতার সাথে রেপের কি সম্বন্ধ একথা তার মত বিদগ্ধ মানুষ কেবলই গুলিয়ে গেলেন বলে আশ্চর্য হতে হয়। দুঃখিতও। রেপ একটি জঘন্য ঘোরতর ক্রাইম। রেপ থেকে চূড়ান্ত শারীরিক জখম এমনকি মৃত্যু হয়। রেপের মূল রয়েছে পানিশমেন্টের মারমুখী, খুনী, ক্ষতি-ইচ্ছা। অ্যাগ্রেসিভ-সেক্স বা ডমিনেটেড হওয়ার ফ্যান্টাসিকে ‘রেপ’ না বলে অন্য শব্দের কোন প্রতিস্থাপন তিনি খুঁজে পেলেননা না পেতে চাইলেননা, সেটি খোলসা করার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।
      পুরুষ লেখক, কথক হিসবে তিনি নারী চরিত্রের সংলাপেও তা হাজির করছেন। নারী সত্যিই কি চান- কোন নারী দুর্মর, বাধাহীন অরগ্যাজম্‌ পেতে চাইলে রেপড্‌ হতে চাইবেন কেন? হ্যাঁ, পরিসংখ্যান পাওয়া যায়- নারীরা সাবমিসিভ হতে চেয়ে বা পুরুষকে শরীরের বল প্রয়োগ করতে নির্দেশ দিয়ে শৃঙ্গার করতে চাইছেন। তাকে ‘রেপ-ফ্যান্টাসি’ বলার এক অদ্ভুত কিমাশ্চর্জম চলও লক্ষ্য করা যায়। যারা এটা করেন তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে চান না – রেপটা কোন ফ্যান্টাসি নয়- সেটা ক্রাইম!
      মৃগাঙ্ক গাঙ্গুলিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলাম- শুভা নিয়ে দুয়েক কথা বলতে পারি, আমার বিশ্লেষণ। আমি শুভা হলে মলয়দা কে এক হাত নিতাম অথবা শুভার হয়ে।
      একই জিনিশ লক্ষ্য করেছি সাম্প্রতিক অবন্তিকার ক্ষেত্রেও। মেল-গেজিও বলেও না। পুরোপুরি, এক ধরণের পাওয়ার-প্লে আছে। মলয়দাকে যেটুকু জানি, কথা বলেছি, মলয়দার মত লিবেরাল মানুষ এটা কেন এনেছিলেন, আনেন, জানতে ইচ্ছে হয়।
      যেমন সম্প্রতি ”অবন্তিকার শতনাম’ কবিতাটি।
      “ওষ্ঠের নাম আফ্রিকান সাফারি, পাছা দুটির নাম- গোলাপসুন্দরী…”
      এ জিনিশ এর আগে নিম্ন- উচ্চ-মধ্য কোন মেধার বাঙ্গালী কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব হয়নি। মলয় চূড়ান্ত প্রেমিক, অবন্তিকাকে দুর্বার প্রেম ও অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিন্তু কথা হইল পাছা তো অবন্তিকার। স্তন ও তার। সে কি এইরূপ নাম পাইয়া খুশী হইয়াছে? সে কি নাম রাখার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছে? এই কথা মলয় রায়চৌধুরী আমাদের কখনওই জানান না।
      ফলে ‘Sex is Shameful’- এই ধারনাকে ভাঙলেও কিন্তু মেয়েদের যৌনমুক্তি বা স্বাধীনতার যে ক্ষেত্র তাতে পুরোপুরি কাজে আসছেনা হাংরিদের কলম। এনিয়ে অন্য পরিসরে বলাই ভালো। উপন্যাসে ফিরি। এই উপন্যাসে অবশ্য মলয়কে স্বীকারোক্তিতে যেতে দেখি। শিশির যে চরিত্র, যার সাথে মলয় রায়চৌধুরীর হিপিবেলার উপাদান অনুযায়ী আত্মজৈবনিক মিল আছে ধারনা করছি, তার জবানীতেই এই আত্ম-উন্মোচনঃ –
      “রাজগীরের কুণ্ডের চারিধারে খালি গায়ে বসেছিল, আর আমরা, কলেজিয়ানরা, দুচোখ মেলে দেখছিলুম, যতক্ষণ ওরা স্নান করেছে ততক্ষণ “মেল-গেজ” দিয়ে গিলেছি। ”
      যৌথ ডায়েরি- স্পেস, মেটাফর, মুক্তাঞ্চল
      প্রকাণ্ড শিবলিঙ্গ। তার নীচে কেকার আখড়া। মন্দির খুলে বসে কেকার আয় দুরন্ত। চিহ্নের পোস্টাপিস এই পোস্ট উত্তর-আধুনিকতাকালে তামাদি হইয়া গেছে। কিন্তু তামাদি হয়ে গেলেও চলচ্চিত্রের মানুষ এই কলমচীর সিগ্নিফায়ার ও সিগ্নিফায়েডের সংগম মাথায় চলে ফেরে। আর কেবলই মানের জন্ম হইতে থাকে।
      শিবলিঙ্গ, মন্দিরের মেটাফরও এখানে আরেকটি ইস্যু-ভিত্তিক স্তর আমদানী করছে- ধর্ম ও তার ভণ্ডামির গার্বেজ। কেকা বৌদির শিবের লিঙ্গ প্রতিস্থার মেটাফর, যা প্রজনন কাল্টের প্রতীক, যোনী ও লিঙ্গের সঙ্গমের প্রকাশ্য সনাতনী ইন্সটলেশন ( যা বারানসী না হলেও একিভাবে বার্তাবহ হত, কিন্তু বারানসী শিবস্থান, লিঙ্গ পূজার মহাপীঠ, তাই মেটাফরের খেলা এখানে জমে ওঠে অব্যর্থ ) তাকে ঘিরে জমে উঠছে ব্যবসা। ধর্মের। যে ধর্মে যৌনতা ছিলাটান ট্যাবু। সেখানেই ট্যাবু ভাঙ্গার আখ্যানে শান দিয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা প্রাচীন চলমান সভ্যতা। সত্তরের বারানসীতে মলয় তাই এখানেই নিও-কামশাস্ত্র লিখতে পারেন উত্তাল বারুদ্গন্ধে। দেহ, যা ঘিরে মৌতাত পায় যৌন-উৎসব। দেহধারী স্বপ্নময় চোখ- যা চেয়েছিল সমাজবদল, সেই দেহকেই ধ্বংস হতে হচ্ছে, খুন হয়ে যাচ্ছে তরুণ সমাজ। স্বপ্নময় সত্তরের বিপ্লব আয়োজন। আয়োজক সেই দেহ গুলিকে নিঃশেষ করা হচ্ছে। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হচ্ছে নকশাল উল্লাসের, ফেক এনকাউন্টারে।
      দেহ, দেহজ আনন্দ, মৃত্যুর ভেতর দেহ বর্জন এই দেহদর্শন বার বার মীনের মত পাক খাচ্ছে ন্যারেটিভে। মলয় একে নাটকীয় করছেন। সম্পর্কের এক জ্যামিতিক বিন্যাস ঘনিয়ে তুলছেন। তার মধ্যে দুটি নারী শরীরের সাথে তার শৃঙ্গার-লীলাকে মহিমান্বিত করে মলয় এরোটিকা নির্মান করেছেন। সেখানে যৌন মিলনের মধ্যে একের ফেলে যাওয়া অন্তর্বাস, অপরের কাম-জাগানিয়া প্রসাধনে সাহায্য করছে। আদার ও আত্ম’র বাইনারিকে গুলিয়ে দিতে গ্লোব্যাল-লোক্যাল, শ্বেত ও বাদামীর, উচ্চবিত্ত ও নিম্নের ইন্টারসেকশনালিটির উঠোনটি প্রশস্ত হচ্ছে।
      উপন্যাসে যৌথ ডায়েরিটিই এক জাদু-স্পেস। এবং সেটিই এখানে হয়ে ওঠে সিক্রেট-গার্ডেন। গোপন উদ্যান। অন্তত এরোটিকার পার্টটি যেখানে লেখা হচ্ছে। চিলেকোঠার ছাদ। যার গা দিয়ে গঙ্গা বহতা। ভারতীয় যৌথ-মনস্তত্বে সে পাপমোচী। কলুষনাশী। কাদাখানার সফেদ্‌দারী তার কর্ম। এই ‘লোকেলে’ মলয় খেলে দিয়েছেন পাল্টা ছক- উত্তর উপনিবেশে, বজরাঙ্গ-দল-পুর্ব্ব উত্তর প্রদেশে। তার সফেদ্দারী এখানে এক জোরালো লাথ- যেখানে গঙ্গা, তার বহতা বায়ু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভিক্টোরীয় শুচিবায়ুতা। আর তিনি শুখরিয়া আদা করছেন- ট্যাবু ভাঙ্গানিয়া মাদকের।
      ‘শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি। মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে। ’
      একিভাবে বহুস্বর ও কথকের বিষয়ে লেখক মলয় উদার। এবং বায়াসহীনও। অন্যস্বর গুলিকে স্পেস করে দেন তিনি একই ন্যারেটিভে কথা বলার। ভিন্ন পার্সপেক্টিভ রাখার। তাতে কেকা চরিত্রটি নায়ক শিশিরকে খাটো করতে চাইলেও লেখক মলয় কেকাকে এই সুযোগ দেন। বোঝা যায় যে এ লেখকের এক আত্মবিশ্লেষন, কারণ মলয় রায়চৌধুরীর আত্মজৈবনিক উপাদান খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- শিশির মলয়ের অল্টার ইগো।
      কিন্তু এরোটিকা লিখতে বসেছে শিশির। সত্তরের দশকের নিও-কামশাস্ত্র। শৃঙ্গার মালা। মাঝে ধ্যানস্থ হাইফেনের মত নির্মলের পিতার কাল-কথনের মহাকাল বাণী- এই হল কাঠামো। তার ভেতর অতি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত নারীর আত্মনং বিধি- ‘জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই, যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো ‘ ( কেকা উবাচ)। অথবা বিত্তশীল দেশের অস্থির সমাজের জীবনদর্শন- ” যাহা ইচ্ছা করি, যে দেশে ইচ্ছা যাই, যাহাকে ভালো লাগে তাহার সহিত শুই, খাইতে ভালোবাসি বলিয়া প্রতিটি দেশের খাদ্য খাই ” ( ম্যাডেলিন উবাচ)।
      চূড়ান্ত আধুনিক ভাঙ্গা ফর্ম-চিহ্ন ও ভদ্রাসন ভেঙ্গে ফেলবার মেটাফরে বারানসী তাই চরম নির্বাচন।
      লেখক এখানে লোক্যাল-গ্লোব্যাল, প্রেম-প্রেমহীন শৃঙ্গার আত্ম ও অপর মারহাব্বা খেলে দিয়েছেন। তা সত্য এরোটিকার নির্মানের চেষ্টায়ও। দেহ এরোটিক ‘আদার’কে খোঁজে। ইন্টিমেসি সেই ”আদার” কে তার অবস্থানকে গলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কথকেরা রতিক্রিয়ায় অন্যের দেহগুলিকে যত্ন করতে শেখেন। একই সাথে চলে নারীর দেহের ভিস্যুয়াল কনসাম্পশন, স্কোপোফিলিয়া,। কেকার জবানীতে এই ভ্যয়ার-কে অতিক্রম করার সুযোগ ছিল। কিন্তু লেখক পুরুষ- তার ভয়ারিজম এখানে কেকার নারী-গেজকে ছাড়িয়ে যায়। এরোটিক ট্র্যাডিশনে সাধারণত এ খেলা সমানেই চলতে থাকে।
      তার পাশাপাশি ভাষাতত্বের লুডো-বোর্ডে সাপ-লুডোর মত স্ল্যাং ও ধ্রুপদী নামা ওঠা করছে। ছড়িয়ে পড়ছে।
      ডায়রি লেখক- ধ্যানস্থ, শিশির এর ভাষা ধ্রুপদী সাধু, কেকার- লোকজ ফিচেল। কিন্তু তার চটুলতা ম্যানিকিওর্ড ফ্ল্যাট-বাড়ি বা বহুতলের বাজার-উপন্যাস মার্কা চরিত্রের মত ভুসো-চটকা নয়।
      বহুদিন আগে তার প্রেমিক লর্ড আলফ্রেড বোসি ডগ্‌লাসকে লেখা অস্কার ওয়াইল্ডের অমূল্য কিছু চিঠি-চাপাটি পড়েছিলাম। ঝিম লাগানো সুন্দর সেসব প্রেমালাপ।
      বারানসীর সাব্‌-আর্বান, অনাধুনিক শহুরে প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসটিও ঝিম লাগানো সুন্দর। রহস্যময়ী প্রাচীন নগরী। তাতে ঘটে চলে বিষাদ আর মিলনের আনন্দ বিলাপ, ফ্যান্টাসি, গেইম। বোমা ও পিস্তলের মাঝে কয়েক মানবিক মুহুর্ত। চলন্ত, জাগ্রত এক উৎসব। যৌনতার উৎসব। তার আয়োজন আছে। সামান্যই। কিন্তু আন্তরিক।
      ম্যাডেলিন এর নিঃস্পৃহ বিষাদ, ট্রান্সন্যাশানাল দৃষ্টিপথ, শঙ্খ লেগে যাওয়া পাকে পাক। আর কেকার স্বেদ মাখা, সস্তা দামের লিপস্টিক ওষ্ঠ, অধর, সস্তার অগুরু ও কান্তা। নিম্ন মধ্যবিত্তের ছাপা আঁচল। অদম্য বাঁচার ইচ্ছা, বেঁচে নেওয়া। শরীরকে আবিষ্কারের আনন্দ, আর টাবুর পাছায় গরম কশাঘাত। বাঙ্গলা সাহিত্যে এই অ্যাডাল্টারির বন্দনায় মনে পড়ল অ্যাডাম বেইগলি’র ‘আপডাইক’ কেও। টাইম ম্যাগাজিন কাভার স্টোরি করে বলেছিল- ‘He is also credited with making suburban sex sexy’। বাঙ্গালীর ধর-তক্তা ফুল-ফুল সেক্স-কাব্যকে সত্যিই পরিণত সেক্সি করে ফেলা উপন্যাসটির চলন তরতরে, ঘোরলাগা। মায়াময়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এটি মলয় রায়চৌধুরীরও প্রিয় উপন্যাস। যদিও এ বিষয়ে তার মতামত আমার জানা হয়নি।
      সত্তর একটা হাওয়া। হাওয়াটা উপন্যাসে বইছে- হাওয়ায় বারুদ গন্ধ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহ, সমাজ পাল্টানোর তীব্র জেদ আর শরীরী ট্যাবু ভাঙ্গার ঘোরলাগা, অনুপম মাদকতা। এর মধ্যে উপন্যাসে শৃঙ্গার, এরোটিকের প্রাণটিই সর্বাপেক্ষা অরূপ, মায়াময়। জীবনকে বেঁচে নেয়া। যেমনি অরূপ এই সুসফল ফলন্ত জীবন, তেমনই অরূপ তার এঁটোকাঁটাও।
      “জীবনটা যে মাংসের উৎসব তা কেন মেনে নেয় না লোকে। আমার শরীরের রক্তমাংসে আমি উৎসব ঘটাব তো তাতে কার কী করার আছে ! বেঁচে থাকা ব্যাপারটা হল এই উৎসবকে সারা জীবন ধরে পালন করে যাওয়া। অবিরাম, অবিরাম, অবিরাম। মনের শান্তি এছাড়া কেমন করেই বা পাবো, কেউ বোঝাক আমাকে। জীবন তো একবারই। তাহলে নিজের জন্যে বাঁচব না কেন ? পল থেকে পল, সবসময় নতুন ; শিশির দেখিয়ে গিয়েছিল সেই পথটা, যে পথটা আমি জানতেই পারিনি শিশিরকে পাবার আগে। ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা। উন্মাদিনীরা ছাড়া ভালোবাসার কথা আর কেউ বলতে পারে না। নিজেকে ভালবাস, হ্যাঁ, নিজেকে নিজেকে, আর অমন ভালবাসার জন্যে যা ইচ্ছা হয় করো ; ভালবাসার জন্যে বেপরোয়া হতে হবে। ” —- কেকা উবাচ
      খাজুরাহোর দেশে, বাৎস্যায়নকে পুঁথি লেখার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছিলো কিনা জানা যাচ্ছেনা। তবে তার সহস্রাধিক বছর পরে এই দেশে চুমু আন্দোলন করার প্রয়োজন হয়েছে। নেতা বলিয়াছেন- উহা ইম্পোর্টেড !! সব মিলিয়ে গোদারের ‘জে. এল. জি বাই জে. এল. জি‘র কথা মনে পড়ল-
      “First there was Greek civilization. Then there was the Renaissance. Now we are entering the age of the Ass.”
      অতএব এই কেকা-উবাচ- “জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই, যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো” — ইহা এক জীবনমুখী সহজিয়া দর্শনের উল্লাস। সারা উপন্যাসে তারই আয়োজন।
      ইতিহাস, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, ক্র্যাফট ও কৌশলের নিরিখে এটি, হতে পারে, মলয় রায়চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ ফিকশন কাজ। আপনি থাকছেন স্যার।
      _____________________________________
       
       
       
      • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৩৩735094
      • কৌস্তুভ দে সরকার ( চেতনা পত্রিকার সম্পাদক) :
        "মলয় রায়চৌধুরী শিশুর মতন একজন বয়স্ক, খুব সহজ সরল জটিল একটি মানুষ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্বনামধন্য একমাত্র জীবোন্মৃত কুখ্যাত এক অতি সাধারণ আন্তর্জাতিক মানের কবি সাহিত্যিক।
        একাই জ্বলে থাকা অনেকের ভেতরের আগুন।
        তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই বলার মতো থাকলেও সেরকম কিছুই বলতে পারবোনা আমি;
        কারণ তিনি নিজে সমস্ত বলা কওয়ার ঊর্ধ্বে।
        তার থেকে পাওয়ার ভাগটা কমের মধ্যে বেশি।
        এখনও তিনি খুব জঘন্যতম ভালো লিখে যাচ্ছেন। শারদীয়ায় কতগুলো কাগজে লিখলেন জানতে চাইলে বললেন সম্ভবত: একটিতেই।
        হয়তো চূড়ান্ত মিথ্যের মতো এটিও একটি সত্য কথা তার। নিজেই বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন প্রচারবিমুখ তার আত্মপ্রচার। হয়তো এভাবেই মলয়দা একদিন চলে যাবেন সমস্ত থেকে যাওয়ার মধ্যে। তার মুহূর্তকথারা একেকটা উপন্যাস হয়ে কবিতা লিখতে বসবে রাত্রি জেগে। অনেকান্তিক নারীদের মাঝে তার একটিমাত্র নারী নিয়ে জীবন কাটানোর মতো এত কিছুর মাঝেও কোনো পুরস্কার তিরস্কার না নিয়ে মলয়দা নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন অতীত দিনের প্রজ্ঞার ভেতর অত্যাধুনিক প্রয়োগের কথা। বললেন, "আমার জন্ম-শতবর্ষটা ইংরেজি তারিখেই করিস মনে করে!"
      • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৩৩735093
      • কৌস্তুভ দে সরকার ( চেতনা পত্রিকার সম্পাদক) :
        "মলয় রায়চৌধুরী শিশুর মতন একজন বয়স্ক, খুব সহজ সরল জটিল একটি মানুষ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্বনামধন্য একমাত্র জীবোন্মৃত কুখ্যাত এক অতি সাধারণ আন্তর্জাতিক মানের কবি সাহিত্যিক।
        একাই জ্বলে থাকা অনেকের ভেতরের আগুন।
        তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই বলার মতো থাকলেও সেরকম কিছুই বলতে পারবোনা আমি;
        কারণ তিনি নিজে সমস্ত বলা কওয়ার ঊর্ধ্বে।
        তার থেকে পাওয়ার ভাগটা কমের মধ্যে বেশি।
        এখনও তিনি খুব জঘন্যতম ভালো লিখে যাচ্ছেন। শারদীয়ায় কতগুলো কাগজে লিখলেন জানতে চাইলে বললেন সম্ভবত: একটিতেই।
        হয়তো চূড়ান্ত মিথ্যের মতো এটিও একটি সত্য কথা তার। নিজেই বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন প্রচারবিমুখ তার আত্মপ্রচার। হয়তো এভাবেই মলয়দা একদিন চলে যাবেন সমস্ত থেকে যাওয়ার মধ্যে। তার মুহূর্তকথারা একেকটা উপন্যাস হয়ে কবিতা লিখতে বসবে রাত্রি জেগে। অনেকান্তিক নারীদের মাঝে তার একটিমাত্র নারী নিয়ে জীবন কাটানোর মতো এত কিছুর মাঝেও কোনো পুরস্কার তিরস্কার না নিয়ে মলয়দা নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন অতীত দিনের প্রজ্ঞার ভেতর অত্যাধুনিক প্রয়োগের কথা। বললেন, "আমার জন্ম-শতবর্ষটা ইংরেজি তারিখেই করিস মনে করে!"
      • গোবিন্দ ধর | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৩৮735095
      • কবি সাহিত্যিক মলয় রায়চৌধুরী মুখোমুখি কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর

         
        কবি সাহিত্যিক মলয় রায়চৌধুরী
        মুখোমুখি
        কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
         
         
        মলয় রায়চৌধুরী (জন্ম: অক্টোবর ২৯, ১৯৩৯) কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাংবাদিক, গণবুদ্ধিজীবি এবং সর্বোপরি ১৯৬০-এর দশকের হাংরি আন্দোলন—হাংরিয়ালিজম—তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক এবং এ কারণে ১৯৬০-এর দশক থেকেই ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার" কবিতার জন্যে রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। মলয় রায়চৌধুরির রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য সাহিত্যের সনাতন ধারা অনুশাসনের বিরুদ্ধাচারণ। এ বিষয়ে স্বপ্ন পত্রিকায় লিখিত প্রবন্ধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান তরুণ মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, 'সাহিত্যের সনাতন অনুশাসনগুলির বিরুদ্ধে মলয় রায়চৌধুরীর বিদ্রোহ তাঁর রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য'। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতের অধিক। তাঁর ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ১০টি উপন্যাস, দুটি ডিটেকটিভ উপন্যাস, একটি ইরটিক নভেলা, ১২টি সমালোচনা গ্রন্থ, চারটি জীবনী এবং বহু অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্হের মধ্যে শয়তানের মুখ, জখম, ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস,নামগন্ধ, চিৎকার সমগ্র, কৌণপের লুচিমাংস, মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো, বাউল-কবিতা সিরিজ ডোমনি, অ্যালেন গিন্সবার্গের হাউল ও ক্যাডিশ কাব্য-গ্রন্থের অনুবাদ প্রভৃতি। তিনি বিট মহিলা কবিদের রচনার অজস্র অনুবাদ করেছেন, পরাবাস্তব কবিদের অনুবাদ করেছেন এবং জাঁ জেনের সমস্ত কবিতা অনুবাদ করেছেন। লোকনাথ ভট্টাচার্যের পর তিনি দ্বিতীয় বাঙালি যিনি জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো'র নরকে এক ঋতু এবং ইল্যুমুনেশান্স অনুবাদ করেছেন। বুদ্ধদেব বসুর পর প্রথম বাঙালি যিনি বোদলেয়ারের সমগ্র কবিতা অনুবাদ করেছেন। বিদেশি কবি ওকতাভিও পাজ, আরনেস্তো কার্দেনাল, অ্যালেন গিন্সবার্গ, ডেইজি অ্যালডান প্রমুখ ভারতে এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। পেঙ্গুইন র‌্যাণ্ডাম হাউস থেকে তাঁকে নিয়ে 'দি হাংরিয়ালিস্টস নামে একটি গ্রন্হ প্রকাশিত হয়েছে, যা লিখেছেন মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী। তাঁর কবিতা নিয়ে পিএইচডি করেছেন হিডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্যানিয়েলা ক্যাপেলো, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিষ্ণুচন্দ্র দে এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদয়শঙ্কর বর্মা। ২০০৩ সালে অনুবাদ সাহিত্যে তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
        মা অমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
         
        গোবিন্দ :
        আপনি প্রচুর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। দুটি সংকলন আছে আপনার সাক্ষাৎকারের। কিন্তু বেশিরভাগ প্রশ্নকর্তা হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন। আপনার জীবন ও গ্রন্হাবলী নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন কেউ করেননি। আমি সেই ধরনের প্রশ্ন করতে চাই, যা অন্যেরা করেনি। আপনার শৈশব কেটেছে পাটনার ইমলিতলা নামে এক অন্ত্যজ বস্তিতে, সেখানে কৈশোরে কুলসুম আপা নামের এক কিশোরীর সঙ্গে আপনার জীবনে যৌনতার প্রথম পরিচয়। তা কি প্রেম ছিল ? আপনার ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ হিসাবে কি কাজ করেছিল ঘটনাটা ?
         
        মলয় :
        না, তা প্রেম ছিল না। উনি আমাকে গালিব আর ফয়েজের কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আর নিজেই এগিয়ে এসে সংসর্গ পাতিয়েছিলেন। ইমলিতলা পাড়া ছিল চোর,ডাকাত, পকেটমার অধ্যুষিত গরিবদের পাড়া, তাদের বাড়িতে অবাধে ঢুকে পড়া যেতো। কুলসুম আপাদের বাড়িতেও, এমনকী ওদের মসজিদের ভেতরেও খেলা করার সময়ে ঢুকে লুকিয়েছি। এখন ভারতীয় সমাজ এমন স্তরে পৌঁছেচে যে অমন বাল্যকাল অভাবনীয় মনে হবে। আমার ধর্মনিরপেক্ষতা বা ব্যাপারটাকে যা-ই বলো, ওই পাড়াতেই সূচিত হয়েছিল। দাদা সমীর রায়চৌধুরী এই অভিজ্ঞতাকে বলেছেন একলেকটিক। রামমোহন রায় সেমিনারি ব্রাহ্ম স্কুলে পড়ার সময়ে আমার ক্রাশ ছিলেন গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী, যাঁর প্রভাবে আমি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলুম। আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে এনার নাম সুমিতা চক্রবর্তী।
         
         
        ভাই সমীর রায়চৌধুরী ও বৌদি বেলা রায়চৌধুরী
         
        গোবিন্দ :
        সেই পাড়ায় আপনারা নাকি পোড়া ইঁদুর, শুয়োরের মাংস, ছাগলের নাড়িভূঁড়ির কাবাব, তাড়ি, দিশি মদ, গাঁজা ইত্যাদি খেতেন। বাড়িতে তার জন্য পিটুনি খেতেন না ?
         
        মলয় :
        দাদা বলতো বাড়িতে বলবি না, মৌরি খেয়ে নে। কিন্তু মুখে গন্ধ শুঁকে মা টের পেয়ে যেতেন আর বকুনি দিতেন। কিন্তু পাড়ার লোকেদের টানে আবার অমন কাণ্ড করতুম। এই সমস্ত কারণে দাদা ম্যাট্রিক পাশ করার পর বাবা ওনাকে কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন আর নিজে একটা ঝোপড়ি কিনে দরিয়াপুর নামে পাড়ায় বাড়ি করেন। আমি সেই বাড়িতে একা থাকতুম। আমার বাল্যস্মৃতি ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ আর ‘ছোটোলোকের যুববেলা’ পড়লে জানতে পারবে নানা ঘটনা। সিটি কলেজে দাদার সহপাঠী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। চাইবাসা আর ডালটনগঞ্জে দাদা মৎস্য বিভাগে পোস্টেড থাকার সময়ে প্রচুর মহুয়ার মদ খেয়েছি। দাদা হরিণের মাংস খাবারও ব্যবস্হা করে দিতেন। কতো রকমের মাছ যে খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই ; গেঁড়ি-গুগলির বিরিয়ানিও খেয়েছি।
         
        গোবিন্দ: :
        আপনারা হাংরিরা শুনেছি যৌনকর্মীদের পাড়ায় যেতেন। কৃত্তিবাসের কবি-লেখকরাও যেতেন অথচ তা স্বীকার করেননি নিজেদের জীবনীতে। আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন। বিদেশে গিয়ে যৌনকর্মীদের পাড়ায় গেছেন ?
        উৎপল চাটার্জি'র আঁকা পোট্রের্ট
         
        মলয় :
        না, কেবল সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, হাংরি বুলেটিনে। আমার পিসেমশায় যাওয়া আরম্ভ করেন। ওনার দেখাদেখি ওনার বড়ো ছেলে অজয় বা সেন্টুদা ঢুঁ মারা আরম্ভ করেন। সেন্টুদা আমাকে ওই পাড়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। দুপুর বেলায় রেট কম থাকে বলে সেন্টুদা দুপুরে আমাকে নিয়ে যেতেন। হাংরিদের মধ্যে শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, অবনী ধর রেগুলার যেতো, প্রৌঢ় বয়সেও, ওদের পরস্পরের চিঠিতে পাবে ওদের প্রিয় যৌনকর্মী বেবি, মীরা, দীপ্তির নাম। সবচেয়ে ভীতিকর হল কোনও যৌনকর্মীর প্রেমে পড়া। এখন তো আলো ঝলমলে অন্য চেহারা নিয়ে ফেলেছে এলাকাটা। আধুনিকা যৌনকর্মীরা জিনস-স্কার্ট পরে রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন, স্টাইলে সিগারেট ফোঁকেন। বিদেশে গিয়ে যৌনকর্মীদের পাড়ায় গিয়ে দেখে বেড়িয়েছি কিন্তু কারোর সঙ্গে শুইনি কেননা যৌনরোগকে আমার ভীষণ ভয়। বোদলেয়ারের জীবনী পড়ে আরও আতঙ্কিত হই। বিদেশিনীদের কাছে সারা পৃথিবী থেকে খদ্দেররা যায়। ভিয়েৎনামের যুদ্ধের কারণে থাইল্যাণ্ড হয়ে গিয়েছিল যৌনকর্মীদের বিরাট বাজার ; কাঁচের দেয়ালের ওইদিকে মেয়েরা বুক খুলে আর জাঙিয়া পরে খদ্দের ডাকতো। আমস্টারডামে একটা পাড়া ছিল যার গলিগুলোতে বিশাল কাচের জানলার সামনে প্রায় উলঙ্গ মেয়েরা ফিকে লাল আলোয় বসে থাকতো আর নীল আলো জ্বললে বুঝতে হতো সমকামীদের ডাকছে।
         
         
        স্ত্রী ও মলয় রায়চৌধুরী
         
        গোবিন্দ :
        আপনার আত্মজীবনীতে এসব এসেছে ?
         
        মলয় :
        হ্যাঁ, ‘ছোটোলোকের শেষবেলা’তে এসেছে। তাছাড়া ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে আমি ওই সময়ের সবাইকে আর ঘটনাগুলোকে তুলে এনেছি। উপন্যাসটা প্রতিভাস প্রকাশিত ‘তিনটি নষ্ট উপন্যাস-এর অন্তর্ভুক্ত। মামলার সময়ে আমার শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে যেতে পাটনায় ফিরে গিয়েছিলুম আর আমাদের পারিবারিক ডাক্তার অক্ষয় গুপ্ত সংবাদপত্র পড়ে ধরে নিয়েছিলেন যে আমার যৌনরোগ হয়েছে আর বরাদ্দ করেছিলেন পেনিসিলিন ইনজেকশান। জানতে পেরে পরের দিনই কমপাউণ্ডারকে বলেছিলুম, আর দিতে হবে না, ও-রোগ আমার হয়নি।
         
        গোবিন্দ :
        অর্থাৎ আপনি গ্রামের মানুষ নন, শহরের মানুষ। তবু আপনার উপন্যাসে, যেমন ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, নামগন্ধ, জলাঞ্জলি, ঔরস ইত্যাদি উপন্যাসে গ্রাম এসেছে বিপুলভাবে। কেমন করে আপনি বর্ণনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুললেন ? ঔরস উপন্যাসে আপনি অবুঝমাঢ়ের মাওবাদী এলাকা ডিটেলে বর্ণনা করেছেন।
        মলয় : চাকুরিসূত্রে সারা ভারতের গ্রামগঞ্জ ঘুরেছি, চাষি, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমোর, খেতমজুর, নৌকোর ছুতোর আর নিম্নবর্ণের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি ক্ষেত্রসমীক্ষায়। অধিকাংশ চরিত্র পেয়েছি সমীক্ষার সময়ে। যখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কে চাকুরি করতুম তখন সহকর্মীদের গ্রামে গেছি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছেড়ে এআরডিসিতে গেলুম, সেখান থেকে নাবার্ড। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকুরিটা ছেড়েছিলুম গ্রামের জীবন আর মানুষ দেখার লোভে। এখন তো আমার যা পেনশন তার চেয়ে বেশি পেনশন পায় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পিওন। তবে প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছিলুম তখন। পশ্চিমবাংলায় সিপিএমের ভয়ে অনেকে কথা বলতে চাইতো না বলে দাড়ি বাড়িয়ে অবাঙালি এম আর চৌধারী হয়ে গিয়েছিলুম, হিন্দিতে কথা বলতুম।
         
        গোবিন্দ :
        কোনও বিশেষ কোন স্মৃতি?
         
        মলয় :
        প্রচুর স্মৃতি জমে আছে, লিখেছিও কিছু-কিছু। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো হিমালয়ের তরাইতে খাঁটি ভারতীয় গরু আছে কিনা তার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক মরা বাঘিনীর স্মৃতি, যার রক্তাক্ত যোনিও আকর্ষণ করেছিল। স্হানীয় লোকেরা, সকলেই হিন্দু, বাঘিনীর মাংস-হাড় ইত্যাদি সংগ্রহের জন্যে কাড়াকাড়ি করেছিল। একজন আমাকে আর আমার সহকর্মীকে রেঁধে খাইয়েছিল। ইঁদুর খেয়েছি শৈশবে, বাঘ খেলুম যৌবনে। ঘোরাঘুরির চাকরির আগে জানতুম না কতোরকমের গরু, ছাগল, শুয়োর, মুর্গি, হাঁস, চাল, আলু ইত্যাদি হয়। জলসেচের কতোরকমের ব্যবস্হা আছে আর কোন ফসলে কখন কীরকম জলসেচের দরকার হয় কিছুই জানতুম না।
         
        গোবিন্দ :
        কলকাতায় কবিদের কাছে খালাসিটোলার এতো নামডাক। আপনি যেতেন ?
         
        মলয় :
        ওখানেও প্রথমবার গেছি সেন্টুদার সঙ্গে। পরে লেখক বন্ধুদের সঙ্গে। অবনী ধর একটা টেবিলে উঠে জীবনানন্দের জন্মদিনে নেচেছিল, সেটা ‘অমৃত’ পত্রিকায় আর ‘দি স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রে খবর হয়েছিল। ক্লিন্টন বি সিলি ওনার জীবনানন্দ বিষয়ক ‘এ পোয়েট অ্যাপার্ট’ বইতে ঘটনাটার উল্লেখ করেছেন। তখনকার দিনে খালাসিটোলার বাইরে গাঁজা-চরস-আফিমের একটা সরকারি দোকান ছিল ; সেখান থেকে একটা পুরিয়া কিনে এগোতেই কমলকুমার মজুমদারের সামনাসামনি হই ; টাকার টানাটানি আর মামলার খরচ জানতে পেরে উনি আমাকে একটা একশো টাকার নোট দিয়েছিলেন। সুভাষ ঘোষ অবশ্য খালাসিটোলার বদলে পছন্দ করতো সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে ‘অম্বর’ বার।
         
        গোবিন্দ :
        আপনি জীবনী লিখেছেন বা জীবন ও শিল্প বিশ্লেষণ করেছেন এবং অনুবাদ করেছেন বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, পল ভেরলেন, সালভাদোর দালি, পল গঁগা, জাঁ জেনে, মায়াকভস্কি, জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ইসলাম, দস্তয়েভস্কি, জাঁ-লুক গোদার প্রমুখের। মনে হয় আপনি যেন এঁদের প্রতি আকৃষ্ট, আপনার জীবন ও চরিত্র ও লেখালিখির সঙ্গে এনাদের মিল আছে বলে ? তা কি স্বীকার করেন ?
         
        মলয় :
        এটা ঠিক যে এনারা আমাকে আকর্ষণ করেছেন। বোদলেয়ারের আর জীবনানন্দের মতন আমিও একজন পথচর, যদিও করোনা ভাইরাসের কারণে আজকাল আর বেরোই না, কিন্তু আমি জেমস জয়েস, মার্সেল প্রুস্ত, হেনরি মিলার, হুলিও কোর্তাজার, ফুয়েন্তেস, শিবনারায়ণ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আনা আখমাতোভা, ওসিপ ম্যানডেলস্টাম, পিকাসো, মার্কেজ, সিলভিয়া প্লাথ,মালার্মে, পাবলো নেরুদা, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ প্রমুখকে নিয়েও লিখেছি ; এমনকী আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান গল্পকার হায়মেওস্ট স্টর্মকে নিয়েও লিখেছি। শৈলেশ্বর ঘোষ সম্পর্কে আমার প্রবন্ধে কিন্তু গালমন্দ করিনি, যেমনটা উনি আমাকে প্রাণ ভরে দিয়ে গেছেন।
         
        গোবিন্দ :
        শৈলেশ্বর ঘোষ যে হাংরি রচনা সংকলিত করেছেন তা থেকে আপনি, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, আলো মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই পমুখদের বাদ দিয়েছেন। আপনিও নাকি ওনাদের বাদ দিয়েছেন ?
         
        মলয় :
        না, আমি কাউকে আমার সম্পাদিত সংকলন থেকে বাদ দিইনি। বস্তুত হাংরি বুলেটিন আর জেব্রা পত্রিকা ছাড়া আমি কোনও হাংরি সংকলন সম্পাদনা করিনি। আসলে শৈলেশ্বর-সুভাষ আমার মামলায় রাজসাক্ষী হবার দরুন অপরাধবোধে ভুগতেন, এটা কমন ক্রিমিনাল সাইকোলজি।
         
        হাংরি আন্দোলনের সময়
         
        গোবিন্দ :
        বাঙালি মহিলা কবিদের প্রতি আপনার পক্ষপাত দেখা যায়। আপনি যশোধরা রায়চৌধুরী, সোনালী চক্রবর্তী, বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায়, সোনালী মিত্র, জয়িতা ভট্টাচার্য, মিতুল দত্ত, শ্রীদর্শিনী মুখোপাধ্যায়, আসমা অধরা, মুনীরা চৌধুরী প্রমুখের নাম উল্লেখ করেন, কয়েকজনের বইয়ের ভূমিকাও লিখেছেন। তরুণ পুরুষ কবিদের নিয়ে আপনি আশাবাদী নিশ্চয়ই। কিন্তু পিঠ চাপড়ানোর একটা রেওয়াজ চলছে। এতে সাহিত্যের লাভক্ষতি কি তেমন হচ্ছে?
         
        মলয় :
        পিঠ চাপড়ানি তো ভালোই। আমার মামলার সময়ে পিঠচাপড়ানি পেলে কাজে দিতো। তার বদলে আমি পেয়েছিলুম কেবল টিটকিরি, আক্রমণ, বিদ্বেষ। সংবাদপত্রগুলো যা ইচ্ছে তা-ই লিখতো। বুদ্ধদেব বসু আমার নাম শুনেই আমাকে ওনার দরোজা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আবু সয়ীদ আইয়ুব আমার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা চিঠি লিখেছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গকে। এমনকী বন্ধুরাও আমাকে অপছন্দ করতো। শৈলেশ্বর ঘোষ মারা যাবার পর ওর শিষ্যরা আমার বিরুদ্ধে লিখে চলেছে। ঢাকায় একটা বই বেরিয়েছে কবি প্রকাশনী থেকে, তাতে মোস্তাফিজ কারিগর আর সৌম্য সরকার নামে দুজন আমাকে আক্রমণ করেছেন, আমার বইপত্র না পড়েই। তরুণরা তো নানা রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, নতুন ভাবনা নতুন আঙ্গিক আনার প্রয়াস করছে, যদিও বয়সের কারণে আমি এখন আর পড়ার অবসর পাই না। আমার পছন্দ হলে আমি প্রশংসা করি ; তা অন্যের পছন্দ নাও হতে পারে। মুনীরা চৌধুরীর কবিতা পড়েছ ? অসাধারণ প্রতিমাভাঙনের কাজ আছে ওনার কবিতায়।
         
        গোবিন্দ :
        প্রায় সকল প্রকাশক, লেখক যখন পাঠক-শূন্যতা টের পান তখন কেউ কেউ একেকটি মেলায় কোনও কোনও বইয়ের দ্বিতীয় তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ হওয়ার বিজ্ঞাপন দেন। এটা তাহলে পাঠকশূন্যতা নয় ? নাকি অন্য কোন যাদুবলে একজন লেখক পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠেন? কিংবা একজন প্রকাশক পাঠকের চাহিদা সত্যি সত্যি অগ্রীম ধরে নিতে পারেন?
         
        মলয় :
        অনেকের বই বিজ্ঞাপনের জোরে বিক্রি হয়, অনেকের বই পাঠকের মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের বই আবার সাংস্কৃতিক রাজনীতির কারণে বিক্রি হয় না। প্রকাশককে হুমকি দেয়ায় অনেকের বই আটকে যায়। পাঠকের অভাব আছে বলে আমার মনে হয় না। যাঁরা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা থেকে বই প্রকাশ করেন তাঁদের অসুবিধা হলো কলেজ স্ট্রিটে বিক্রির ব্যবস্হা না থাকা। যাঁরা কলকাতার বাইরে থাকেন তাঁদের তো একেবারে সুযোগ-সুবিধা নেই। তবু তাঁদের প্রকাশ করা বইয়েরও পাঠক আছে। দাদা ‘হাওয়া৪৯’ পত্রিকা প্রকাশ করার সময়ে যে বইগুলো বের করেছিল সেগুলোর ভালোই চাহিদা ছিল। এখন ‘হাওয়া৪৯’ সম্পাদনা করে মুর্শিদ। ও আবিষ্কার প্রকাশনী খুলেছে, ওর বের করা বইগুলো ভালোই বিক্রি হয়, ও বিভিন্ন মেলাতেও অংশ নেয়।
         
        গোবিন্দ :
        পারিবারিক কোনও স্মৃতি?
         
        মলয় :
        আমাদের বসতবাড়ি ছিল হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। আমরা সাবর্ণ রায়চৌধুরী বলে বাড়ির নাম ছিল সাবর্ণ ভিলা, তিনশো বছরের পুরোনো বাড়ি। অবশ্য আদি নিবাস বলতে হলে লক্ষীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা বলতে হয়, যিনি যশোরে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য ছিলেন, মোগলদের কাছ থেকে রায়চৌধুরী উপাধি আর কলকাতার জায়গিরদারি পেয়ে চলে আসেন। সাবর্ণ ভিলা হয়ে গিয়েছিল খণ্ডহর। আমার খুড়তুতো বোন পুটিকে ওর বাবা প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে অনুমোদন না করার দরুন পুটি সবচেয়ে বড়ো ঘরের কড়িকাঠ থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করে নিয়েছিল। আর তার পরদিনই ঘরটা তার ওপরের স্ট্রাকচারসহ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। বস্তুত ব্যাপারটা ছিল যেন সাবর্ণ ভিলার আত্মহত্যা। পুটির আত্মহত্যা আমি ভুলতে পারিনি। এক্ষুনি তোমাকে পিসেমশায়ের কথা বলছিলুম, উনিও মাঝরাতে আহিরিটোলার বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন ; ওনার পকেটের চিরকুটে লেখা ছিল ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভূবনে’। বিশাল বাড়িটা ভাঙাচোরা অবস্হায় থাকার দরুণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে দাদার বন্ধুদের পরামর্শে কয়েকজন শিক্ষার্থী মুক্তিযোদ্ধাকে ঠাঁই দিতে সুবিধা হয়েছিল।
         
        গোবিন্দ :
        আপনার কলেজ জীবনের গল্প বলুন? তখনকার বিশেষ স্মৃতি?
         
        মলয় :
        আমি পড়তুম পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আইএ পড়ার সময়ে যোগ দিয়েছিলুম ন্যাশানাল ক্যাডেট কোর-এ, বন্দুক-পিস্তল চালানো আর নানা জায়গা দেখার লোভে। থ্রিনটথ্রি আর বাইশ বোরের রাইফেল চালিয়েছি। তখনকার পিস্তলগুলো বেশ ভারি হতো। থ্রিনটথ্রিতে প্রতিবার বুলেট ভরতে হতো, এখন কালাশনিকভ থেকে বুলেট বেরোয় চেপে রাখা পেচ্ছাপের মতন।
         
        স্ত্রী পুত্র মেয়েসহ
         
        গোবিন্দ :
        পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন?
         
        মলয় :
        পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা কবি-লেখকদের আশ্রয় দেয়া আর লুকিয়ে রাখাকে যদি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যোগাযোগ মনে করো, তাহলে ছিল।
         
        গোবিন্দ :
        আপনার গল্প উপন্যাসে দেশভাগ,মুক্তিযুদ্ধ কিরকম এসেছে?
         
        মলয় :
        দেশভাগ এসেছে আমার কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে। ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে পাবে দেশভাগে চলে আসার পর একজন বামপন্হীর দ্রোহ আর শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তন। ‘ঔরস’ উপন্যাসে পাবে ১৯৭১-এর বীরাঙ্গনা আর সন্তানকে কেমনভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন, বিয়ে করেছিলেন এক স্কুল শিক্ষক। ‘নখদন্ত’ কাহিনির পোস্টমডার্ন স্ট্রাকচারে পাবে। বহু কবিতায় পাবে।
         
        গোবিন্দ :
        আপনার সাহিত্যে দেশ ভাগের প্রভাব কতটুকু?কিংবা এই বিষয়টি কেমন করে আসে?
         
        মলয় :
        নিজস্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া আমি লিখতে পারি না, যদিও চেষ্টা করি। সেজন্য দেশভাগ যেটুকু এসেছে তা দেখে। আমি তো পূর্ববঙ্গের মানুষ নই। পঞ্চাশের দশকে শেয়ালদায় উদ্বাস্তুদের ভয়ঙ্কর অবস্হা নিজের চোখে দেখার দরুনই আমি আর দাদা আন্দোলনের কথা ভেবে ছিলুম। দেশভাগে যে নিম্নবর্ণের উদ্বাস্তুরা এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে মিশেছি হিমালয়ের তরাইতে, মানা ক্যাম্পে, ছত্তিসগঢ় আর মধ্যপ্রদেশে, মোতিহারিতে, মহারাষ্ট্রে। এনারা এসেছেন আমার লেখায়।
         
        গোবিন্দ :
        পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন?
        মলয় :
        পরিবার বলতে তো বাবা-মা-দাদা আর আমি। কেউই সরাসরি যুক্ত ছিলুম না।
         
        গোবিন্দ :
        বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিরা এত আন্তরিক কেন ছিলো?
         
        উত্তর :
        সিমপল। বাঙালি বলে।
         
        গোবিন্দ :
        দেশভাগের ফলে আমাদের বাংলা সাহিত্যের উপর কিরকম প্রভাব পড়ে?
         
        মলয় :
        আমার মনে হয় সেইভাবে পড়েনি যেমনটা বিশ্বযুদ্ধ, সোভিয়েত শাসন ফেলেছে ইউরোপের লেখায় বা লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ফেলেছে স্প্যানিশ সাহিত্যে।
         
        গোবিন্দ
        :বাঙালি জাতির জীবনে কাঁটাতার নিশ্চয়ই খণ্ডিত জাতিসত্তার জন্ম দিয়েছে? নাকি এর প্রভাব শুধু শিল্পসাহিত্যেই বাস্তবে কিছুই নয়?
         
        মলয় :
        বলা কঠিন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ক্রমশ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, মূলত সউদি আরব, পাকিস্তান, তুর্কি ইত্যাদি দেশের প্রভাবে। এপার বাংলায় আর ত্রিপুরায় বিজেপি জিতলেও বাঙালিরা সেইভাবে হিন্দুত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। লেখকরা অবশ্য একটা পৃথক মিলক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছেন।
         
        গোবিন্দ :
        হাংরি উত্থানের দিনগুলোর অর্জন বলুন?
         
        মলয় :
        আমি আর কী বলব। লেখক-পাঠক হিসাবে এই বিশ্লেষণ তো তোমাদের করা দরকার।
         
        গোবিন্দ:
        আপনার তো কবিতা লেখে সাহিত্যে হাতেখড়ি। আড্ডার দিনগুলোর কথা শুনবো?
         
        মলয় :
        না, আমি প্রথমে প্রবন্ধ লেখা আরম্ভ করেছিলুম। আমার ধারাবাহিক গদ্য ‘ইতিহাসের দর্শন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর লিখি ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’। এই বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা হতো না। দাদার বন্ধুদের সঙ্গে হতো, দীপক মজুমদার আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সিপিএম সরকারে আসার পর সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত রাজনীতিতে আগ্রহী হয়।
         
        গোবিন্দ :
        কি করে মনে হলো কবিতার পাশাপাশি গল্প উপন্যাসও আপনার বিষয়?
         
        মলয় :
        না, না। উপন্যাস আর গল্প লেখা আরম্ভ করেছি বেশ দেরিতে। গল্প আশির দশকে আর উপন্যাস নব্বুই দশকে। আমার প্রথম উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’। তবে আমি সব জনারের উপন্যাস লিখেছি, এমনকী ডিটেকটিভ আর ইরটিক উপন্যাসও।
         
        গোবিন্দ :
        এ যাবৎ পেয়েছেন অনেক সম্মান।লিখেছেন অনেক গল্প।প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কোন জায়গায়?
         
        মলয় :
        সম্মান আবার কোথায় পেলুম ? কেবল তো জুতো-লাথি খেয়েছি। বাংলা সাহিত্যের অবস্হান খুবই উঁচু জায়গায়। দুর্ভাগ্যবশত অনুবাদকের অভাব। রবীন্দ্রনাথকেও নিজে অনুবাদ করে ইউরোপীয়দের পড়াতে হয়েছিল।
         
        গোবিন্দ :
        প্রেম নিয়ে আপনার ভাবনা?
         
        মলয় :
        যা জয়দেব, বিদ্যাপতি, ভারতচন্দ্রের, বোদলেয়ারের।
         
        গোবিন্দ :
        আপনার প্রেমিকাদেরকে নিয়ে অনেক কবিতা আছে।বলুন।
         
        মলয় :
        হ্যাঁ। কীই বা বলব। সবই তো রোমিও বলে দিয়েছিল জুলিয়েটকে আর বোদলেয়ার বলেছিলেন জাঁ দুভাল, মাদাম সাবাতিয়ে, মাদাম দোব্রুঁকে।
         
        গোবিন্দ :কী লিখি কেন লিখি?
         
        মলয় :
        যা ইচ্ছা হয় লিখি। কী, কেন ইত্যাদি ভাবি না। তবে কী পড়ি আর কেন পড়ি তা বলা যায়।
         
        গোবিন্দ :
        হাংরি আন্দোলন কি সে অর্থে সফল বলে সমীর রায়চৌধুরী কিংবা আপনিও মনে করেন?
         
        মলয় : এসব তোমরা ভাববে।
         
        গোবিন্দ ::
        এই সময় দাঁড়িয়ে কি মনে হয় হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজন ছিলো?
         
        মলয় :
        ছিল নিশ্চয়ই, তা নয়তো হলো কেন ?
         
        গোবিন্দ :
        কবিতায় শ্লীল অশ্লীল শব্দোচ্চারণের সুস্পষ্ট কোন নিধি নিষেধ হয়?
         
        মলয় :
        ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রে শ্লীল-অশ্লীলের উল্লেখ বা বর্গীকরণ নেই। ওটা ইসলাম আর প্রোটেস্ট্যান্ট ভিকটোরিয় খ্রিস্টধর্মীদের আমদানি। মনে হয় তা থেকে আমরা শামুকের গতিতে মুক্ত করতে পারছি আমাদের কাজগুলোকে।
         
        গোবিন্দ :
        হাংরি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবিতার বাঁক বিশ্লেষণ করেন প্লীজ?
         
        মলয় :
        আমার যে সাক্ষাৎকারের বই বেরিয়েছে প্রতিভাস থেকে, তাতে পাবে। তালিকাটা দীর্ঘ।
         
        গোবিন্দ :
        হাংরি আন্দোলনে কারা যুক্ত হয়েছিলেন?এখনো কি তাদের উচ্চারণে হাংরি আন্দোলনের ছাপ আছে?
         
        মলয় :
        অনেকে। অনেকে। তিরিশ-চল্লিশজন। এখনও লেখায় টিকে আছি আমি। আর যে দুয়েকজন বেঁচে আছেন, তাঁরা লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছেন বা স্বাস্থের কারণে লিখতে পারেন না।
         
         
      • অজিত রায় | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৪১735096
      • একটা জিনিশ মার্ক করেছি, মলয়দাকে নিয়ে, ইভন আমাকে নিয়েও, যাঁরাই লেখালেখি করেছেন, তাঁদের কেউই আমার বা মলয়ের 'কালচারাল হাইব্রিড'-বোধের ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করেননি, বা, সেটাকে হাইলাইট করেননি। অনেকে হয়ত অজ্ঞানে, বা কলকাতাকেন্দ্রিক অনুশাসনিক ভাবুকতার কারণে সজ্ঞানে বাদই দিতে চেয়েছেন ব্যাপারটিকে। অথচ আমাদের দুজনেরই তামাম জীবন, পড়াশোনা, লেখাচর্চা, রাগ, ঘৃণা, তিক্ততা, আক্রমণের টার্গেট, বেঁচে থাকার বজহ বা অজুহাত, বেস, হয়ে ওঠা ইত্যাদির মূলে এই সাংস্কৃতিক দো-আঁশলাপনার বোধই যুগপৎ সুপ্ত ও মুখর থেকেছে। আজন্ম তথাকথিত 'বহির্বঙ্গে' লালিত এবং বহির্বঙ্গ-ফেরত মূল সংস্কৃতিতে বহিরাগত না-হলে হয়ত আমাদের লেখার নিজস্ব চিন্তাবিশ্বই গড়ে উঠত না। বিগ্রহ বা প্রতিষ্ঠান ভাঙা, প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে মাস্তানি ফুটপথিয়া বিহারি ভাষায় মলয়ের কবিতায় দুর্যোধন চ্যালেঞ্জ জানায়, দ্যাখো তোমরা -----
        "আব্ববে পাণ্ডবের বাচ্চা যুধিষ্ঠির
        বহুতল বাড়ি থেকে নেবে আয় গলির মোড়েতে
        নিয়ায় ল্যাঙবোট কৃষ্ণ ভীম বা নকুল কে কে আছে
        পেটো হকিস্টিক ক্ষুর সোডার বোতল ছুরি সাইকেল চেন
        বলে দে দ্রৌপদীকে আলসে থেকে ঝুঁকে দেখে নিক
        আমাদের সঙ্গে আজ কিছু নেই কেউ নেই ....
        কবিতা বা অন্যবিধ লেখালেখিতে কোনো পূর্বাদর্শ বা বিশুদ্ধতার চর্চা না করে মলয় আগাগোড়া নিজের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টা সহ নিজের আহরিত জ্ঞান, মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক রাজনীতিক আর্থিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্বগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং আধুনিকতার এইসব উপাদানের অসারতা প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে সীমানা ভাঙার কাজ করে এসেছেন বলেই আজ তিনি মনোযোগ ও বিতর্কের বিষয়। আর এসবের পেছনে স্বাভাবিক ও পরোক্ষ ভিত্তি হিশেবে, অনুঘটকের কাজ করেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন ও প্রোঢ়ত্ব জুড়ে বিহার ও ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষা-সংস্কৃতির রাজ্যে সুদীর্ঘ যাপন। এই যাপনই তাঁকে দো-আঁশলা সাংস্কৃতিক জীব হিশেবে নিজেকে দেখার স্বচ্ছতা ও অকপটতা দিয়েছে ভাবলে ভুল হবে না।
        বিহার-বাংলার যৌগ-সংস্কৃতি থেকে উঠে এসেছিলেন বলে, দুষ্কৃতী অধ্যাসিত বস্তিতে প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলে, এবং ক্ৰমে-ক্ৰমে বঙ্গসংস্কৃতির বদলায়মান স্বরূপ জলবৎ দেখে ফেলেছিলেন বলে, বাংলা কবিতা ও আখ্যান সাহিত্যে কলকাতার ঔপনিবেশিক প্রভুমুখী দাসত্ব লক্ষ করেছিলেন বলেই, চেতোমান মলয় প্রথম থেকেই তাঁর লেখায়, বিশেষত কবিতায়, সন্ত্রাস অথবা তাঁর স্বীয় ভাষায় 'ছুরি চাকু চালানো' রপ্ত করেছেন। তাঁর বহু কবিতায় ওই সেলাখানার বিবরণ আছে, এবং সেই সন্ত্রাসী চিত্রকল্প। আর এইসব চিত্রকল্পের ধারাবাহিক অনুশীলনে তাঁকে স্বাভাবিক ভাবেই সাহায্য করেছে তার বাস্টার্ড কালচার। তাঁর আশৈশব-আহরিত প্রায় হাজার খানেক অঘোরি ছোটলোকি অশ্লীল কুৎসিৎ কুচেল অসৎ অভাগা দুর্ব্যবহৃত শব্দাবলি ও তার অভ্যন্তরীণ ইথস। বর্তমানের প্রতিফলনের দরুন সন্ত্রাসী ইমেজ, যা নিছক জান্তব বা যৌন নয়, এ এক মলয় রায়চৌধুরীর কবিতাতেই মেলে। যৌগ-সংস্কৃতির ডামাডোল অবস্থান থেকে সীমালঙ্ঘনের, বিগ্রহ ও মসনদ ভাঙার, যৌক্তিকতা ও আধুনিকতার দর্শনকে এভাবে গুমখুন পাল্টাখুন করার কাজটি, ফালগুন রায়কে মনে রেখেও বলা যায় ---- ইতিপূর্বে বাংলা কবিতায় অন্য কেউ করেছেন বলে মনে হয় না। যৌগ-সংস্কৃতিতে মানসিক দীর্ঘ যাপনের কারণেই, বাংলার তাবৎ শব্দাবলিতে তাঁর নিবাস থাকা সত্ত্বেও, তিনি যখনই কিছু লেখেন, ওই দোআঁশলা সাংস্কৃতিক নিবাসটি তাঁর সদরে এসে কড়া নাড়ে। এই সততা, এই অকপটতা আমরা আর কার মধ্যে দেখেছি?
        আসলে, আমার মনে হয়, যে-কথা আজিজুল হকও বলেছেন, মলয় রায়চৌধুরী এক অন্য পেরিফেরির জীব। মলয়ের হার্ট খুব স্ট্রং, রক্তে দুর্নিবার তেজ। মলয়ের চাইতে অনেক গুণ বড়ো ভাবুক ও মেধাবান চরিত্র ছিলেন সমীর রায়চৌধুরী। কিন্তু, আমার মনে হয়, মলয় আগাগোড়াই 'হয়ে উঠতে' চেয়েছেন। এই হয়ে-ওঠা সবার 'বশের' কথা নয়। হয় ক্ষমতার অভাব, নয় তষ্টির। মলয়ের ফলাফলটা বিলকুল যাকে বলে, রেস্পন্সিবল ইরেন্সিবলিটি। এই সূত্রেই একটা না-তোলা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যে, মলয় রায়চৌধুরী কীসের জোরে নিজেকে হয়ে ওঠালেন, বিগ্রহের বিরুদ্ধে দাঁড় করালেন, হাতুড়ি চালালেন --- সেই মানসিক, চেতনিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটটি সমগ্রতার আলোকে অনুসন্ধানের তাগিদ একটা তাই থেকেই যাচ্ছে গবেষকদের কাছে। আর কিছুদিন সময় নিচ্ছি। হয়ত ২০২১-এর শেষদিকে এই নিয়েই আমার একটি গদ্যগ্রন্থ আসবে। তাতে আমার এই গর্ব অবশ্যই নথি থাকবে, যে, একদিকে জাঁদরেল মূর্খ প্রতিষ্ঠান, ব্রিটিশ গুরুর বীর্যিত পচাগলা মূল্যবোধে আকণ্ঠ বাঙালি বুদ্ধিজীবী-আলোচকের কেরবালা যাঁকে বুঝতে না পেরে, বা সভয়ে, এড়িয়ে রয়েছেন, মুখ ফিরিয়ে, তাঁকে সহ্য করতে না-পারা রঙরুট বন্ধুদের রিসালা, তাঁদের সম্মিলিত করাল মেঘের সামনে একটি সেলাই-না-পড়া লেখকের দ্বারা এই অঘটন তাঁদের দিনদাহাড়ে চাক্ষুষ করতে হবে।
        জনম দিন মুবারক বস্!
      • স্নেহা গুহ | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৪৫735097
      • ইমলিতলায় ছিলুম বামুনবাড়ির মহাদলিত কিশোর।দেখি খুল্লমখুল্লা লেখার চেষ্টা করে কতোটা কি তুলে আনতে পারি। উপন্যাস লিখতে বসে ঘটনা খুঁড়ে তোলার ব্যাগড়া হয় না জীবনেকচ্ছা লিখতে বসে কেচ্ছা-সদিচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ ধরে খেয়ে যেতে পারে তার কারণ আমি তো আর বুদ্ধিজীবি নই জানি যে মানুষ ঈশ্বর গণতন্ত্র আর বিজ্ঞান হেরে ভুত।"
        এরকম অত্যাচারীত কথাবার্তা বলার হিম্মত দেখানো ছুতারের আজ ৮১তে পা,তাঁকে নিয়ে অসম্ভব রকমের রিসার্চ,অণুপ্রেরণা,হ্যানো-ত্যানো প্রচুর হয়েছে,হবেউ …আফটারঅল ৬০এর আগুনে দশকে বাংলা কবিতার খোলনলচে জুতোর বাস্কে ভরে পার্সেল করতে পেরেছিলেন যে তিনিই…হাংরি আন্দোলনের উদগাতা…কনট্রোভার্সিয়াল,লার্জার দ্যান লাইফ ক্যারেক্টার হয়ে স্বমহিমায় বিরাজ করছেন তিনি এখনো…অনবরত প্রতিআক্রমণ হয়েছে,তিনি সরে এসেছেন বারবার তার লেখার স্টাইল পাল্টে--দুর্দান্ত ক্রাফ্টসম্যান তিনি…
        সম্ভবত আমি বাংলায় আভাঁ গার্দ নিয়ে পরিচিত হয়েছি প্রথম তাঁর লেখা পড়েই,একটি পত্রিকার লেখাটা(উৎসর্গীকৃত জর্জ গর্ডন বাইরন,ষষ্ঠ ব্যারন বায়রন)
        "কে বলতো তুমি? দেখি আবার ডাক দেও! আমরা তার কাছে নাগিয়া খালি হাসিতাম। মজার বিষয় হইল আম্মুর ফোনে প্রথম দিকটায় কনফিউজ যাইতো,কার সাথে কথা বলতেছে সে।আরো অনেক ফোনালাপে আমরা দুজনেই অংশগ্রহণ করছি কিন্তু অপর‌ প্রান্তের লোকগুলা বুঝতোনা।"
        এইধরনের বিষয়হীনতা লেখার মধ্যে ভাসতে ভাসতে জাম্পকাট করে সোশ্যাল ডিলেমা বিশেষায়িত একটা পরম্পরা তার নতুন লেখাগুলোয়…
        (কিছু পরে ওই সেম লেখাতে পাওয়া যাচ্ছে)
        "সেও শরীরে যতদিন তার রস ফেলে আমাকে নিংড়েছে, ততদিন আমাকে তার নিচে চেপে নিষ্পেষণ করেছে, তারপর নতুন কচি ফুল পেতে চলে গেছে…তাতে কিন্তু কারুর একটাও কোঁকড়ানো বাল ছেঁড়া যায় নি। আর আমার একটা বড় মাই (আপনাদের ভাষায়) দেখে আপনাদের প্যান্ট ফেটে যাচ্ছে। আজ আমার সাজানো সাজঘরে কালো আঁধারবিদাগ।"
        কি বিলকুল সুন্দর জিহ্বায় উচ্চারিত পরপর দৃশ্যগুলো,ইনসাইড,আউটসাইড ডজ করে ওভারল্যাপিং…হ্যাঁ হাংরি শুরুর দিকে লেখায় এবং তারোপর এসোব লেখা তাঁর ছিল না,তাই আমাকে ভাবায় আরো কিভাবে তিনি নিজের চরিত্রের অণ্বেষণ করে গ্যাছেন,কোনোরকম ডিপ্লোম্যাসির ধার না ধারা অবয়ব ফুটফুটে ইস্ট্রোজেন।আমি এই লেখাটা কমপ্লিটলি অ্যাবসেন্স অব মাইন্ডে টুকছি,বন্ধুর দেওয়া কয়েকটা কবিতার দুর্বিসহ ইলাস্ট্রেশন যন্ত্রণার খোশগল্পে সীমাহীন মলয়ালম,আহা কি খাসা,ঠাঁসা ঠাঁসা…
        তাঁর কবিতা একেবারেই নয় যা তিনি তার আমেজের ৮০ভাগ হয়তো তার উপন্যাসেই আছে,সরজমিনে তদন্তের খাশনবিশি,তবুও মলয় রায়চৌধুরী বাংলা কবিতার প্যারাসিটামল,আর তাঁর গদ্য-প্রবন্ধ অনবরত ইস্তেহার,এসোব আমার একটা বিকট থিসিস লেখার আগে ওনার সাথে চাকনার কাজ করুক,সিঙ্গেল মল্ট ইজ দ্য ক্লোজেস্ট থিঙ্গ টু হিজ হার্ট,খাবেন তাহলে,লাভ ইউ মলয় রায়চৌধুরী
      • সোনালী মিত্র | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৪৮735098
      • মলয় রায়চৌধুরীর জন্মদিন
        প্রিয় মানুষ, প্রিয় কবি, অজস্র সৌরবছর তোমার জন্মদিনের উৎসব আলোক বর্তিকা হয়ে ফুটে থাকুক প্রতিটি সাহিত্যমননে।প্রেম জেনো, শ্রদ্ধা জেনো,প্রণাম জেনো, ভালোবাসা জেনো। কিই বা দিতে পারি!বারবার উৎসর্গ হোক কলম তোমার পায়ের কাছে।
        ক্রমশ উর্দ্ধ সত্তরের প্রেমে ডুবে যাচ্ছে বসন্তবর্ষীয় আয়ু,
        সারসার দিয়ে রক্তকীট ...বাস্তুতন্ত্রের বিষাক্তফণা ধেয়ে গেল
        গঠনপক্ত মধ্যে তিরিশের দিকে, তাদেরও
        হারিয়ে দিতে পারে বুকে লাটখেয়ে যাওয়া
        তোমার সাদা চুলের ঘোড়া।
        ছুটছে, ছুটছে ছত্রপতি শিবাজি চত্বর পেরিয়ে মহানভারত দরজায়
        উড়িয়ে দিচ্ছে সবুজ পতাকার স্নেহ।
        পতাকার দন্ডে আত্মমৈথুনরত সাহিত্যচেতনা।
        থ্রিজি নেটওয়ার্কেও কেন গিলে নিতে পারছি না সমগ্র তুমিকে!
        পিচ্ছিলজাত পরমান্নে ফসকে যাওয়ার খেলা।
        উফ! আর পারছি না কেন!জ্বলে যাচ্ছে সৃষ্টিশীল তুরুপ?
        কেন ডুবে যাচ্ছি তোমার মধ্যে?
        তোমার থেকে তোমার আগুন জ্বলানো বীর্যক্ষয়ী শব্দের শরীরে?
        সেখানে আউসের শীষে সোনালী শিল্পের ক্ষণজন্ম তেমন ভাবে
        জরুরী কি?
        সেখানে আমাদের মত সহস্র তামাটে চামড়ার ছড়াছড়ি
        যারা চিচিং ফাঁক মেলে ধরে সিঁধিয়ে নিয়েছিল ছয় ফুট
        আট ইঞ্চির আত্মঘাতী ধাতব সমীকরণ ...
        দশেরার রাবণ মারতে মারতে আমিও পুরুষ বিরোধী
        হয়ে উঠছি সময়?
        আমিও সেঁটে নিচ্ছি তকমা !নারীবাদী হলে
        কতটুকু লাভ চেটেপুটে নেওয়া যায় ক্যালকুলেশনে বইয়ে দিচ্ছি
        ফেসিয়ালে লোমতোলা মোম ত্বক!
        আমার শিরায় -প্রতিশিরায় একশ ছিনে জোঁক বাসা
        বাঁধবে বলে নি,
        আমার জঙ্ঘার মধ্যবিত্ত গুহায় ঘোলা রসে তোমার নাম নিয়ে
        প্যান্টি ভিজিয়ে যাবে এমন ও ঘটে নি প্রিয় পুরুষ।
        তবুও তোমার প্রেমে পড়া যায়!
        গত এককুড়ি রমনীর মত
        বুকের ওড়না সরিয়ে বলতেই পারি আমিই বা কম কিসে!
        যারা তোমার শীতঘুম ভাঙণের অহরহ নায়িকা, চোখ তুলে
        দেখ নব্বই মিলিয়ন উষ্ণতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি শূন্যদশকের
        খাতা জুড়ে।একশ শ্বাপদ হামলে পড়েছে নারীর
        রাসালো খাদ্যের দিকে। সন্ধ্যারতি থেকে ভোরের নামাজে
        তক ছুড়ে দিচ্ছে মুঠোমুঠো উপঢৌকন উপাচারে।
        আমি ওদের পাত্তা দিই না....
        তোমার কথা ভেবে,বালিসে চুমু খেতে খেতে এটা তো জানি
        কগজের গায়ে উষ্ণতা দিতে সক্ষম বলেই আমার আগে ও পিছের
        রাধাবিন্দুর একচ্ছত্র সম্রাট তুমি।
        অগ্রজ "শুভা"মহলক্ষ্মী হলে তুমি শঙ্খ -চক্র -গদা - পদ্মে তেভাগার
        নারায়ন,
        রূপের পরে কয়েকটা শূন্য বসালেই জলন্ত সূর্যের তাপ ক্রমশ হ্রাস।
        তখন কাকে আগ্রাধিকার দিয়ে বলবে প্রিয়
        তোর শ্রীমুখ ঐশ্বর্যের উপর অন্নপূর্ণা!
        ঐশ্বর্যের উপর নিটোল ফিগার এঞ্জেলিনা তথাস্ত ঠোঁটের আগমন!
        না মশাই কেবল রূপের মহিমা নই...
        সন্ন্যাসী এবং শরীরখোড় ঈশ্বর এলেও তরতর করে
        লিখে যেতে পারি বিশ্বাসঘাতিনী শব্দ।
        তোমার মত একচাদরের নীচে নারী ও শিল্পকে সঙ্গমরত করে
        বলতে পারি নারী ও শিল্পের মত বিশ্বাসঘাতিনী আর কিছু নেই.
        প্রেমিকার চোখের দিকে চোখ রেখে জেগে ওঠা পুরুষাঙ্গের মত
        অস্থির কলমের দিব্যি -ঘাড়ের নীচে কামড়ে ধরে থাকা ক্ষুদার্থ
        বাঘিনীরদল
        তোমার শিরদাঁড়া ভাঙা জন্তুটাকেও নাড়িয়ে চাড়িয়ে
        তারাও বলতে পারে-
        যৌবন থেকে শিল্প পযর্ন্ত গল্পকে টেনে নিয়ে যাওয়াও একটা আর্ট,
        যৌনতা থেকে কবিতা পর্যন্ত সৃষ্টিকে সফলতা দেওয়াও একটা আর্ট।
        শুধু সেখানেই তুমি-আমি কি সফল!
        "ওরা"বলে, নষ্ট শব্দের কচকচি ঘাঁটার চেয়ে তোমার
        আর্থ্রাইটিস ভোগা অঙুল ঢের বেশি ভাল।
        যাদের জড়িয়ে বলতে পারি, যে
        শিশুদের জন্ম দিয়েগেল বাতক্ষয়িত আঙুল তারা তোমার বীর্যের
        চেয়েও দামী।
        শ্লেষ্মা কষ্টে হৃদপিণ্ড জাগা বুকে শেষ বারের মত ভরে নাও
        বিশুদ্ধ অক্সিজেন আর একবার তোমার নীচে
        আরাম গ্রহণকারিনী নারীটিকে ভেবে ছড়িয়ে দাও বীর্য
        ৩০০০০০০ শিশু উড়ে যাক গ্রিক মিথোলজির দিকে
        সাবর্ণ লাম্পট্য আমপ্লিফিয়ার ছিঁড়েখুড়ে
        নারীর পরম মমতার দিকে বেঁচে থাক মাইলের পর মাইল
        নায়িকা ও পুরুষের পুনমিলনের পরে সৃষ্টি ইতিহাস।
        সোনালী
         
      • Howard McCord | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৫৪735099
      • Prof Howard McCord, Washington State University
        Hungry Generation Movement : Poetry of Chaos and Death.
        Every attitude has its poetry, and a small, neat nation may, in one age, present a singularly unified attitude and its poetry to the world, as did England in the last sixteenth century. But such a tidy clarity is impossible for India. No country in the world offer greater extremes or variety in the total experiences which shape poets. Every social ordering from the most primitive to the most sophisticated, may be found; every major religion and most of the minor ones are practiced: the world views and value structures of India are nearly endless and expressed in 723 languages. The only area in the world that offers even remotely an equivalent complexity and confusion is the whole of Africa. Two things give the country what unity it has: the first is false generalization---that there is an Indian temperament, discernable both in the North and the South, composed of egoism, agility of mind, quickness to violence, a penchant for vaporous theories and an honest material avarice; the second is a terrible truth---that nowhere else is there such an omnipresent doom, of the implacable approach of absolute disaster and collapse.
        India produces many kinds of poetry; I am familiar only with that in English, and it falls roughly into three categories. The first is simply bad: the sentimental outpourings of the young or heartsick; formal and bombastic occasional verse; a gauche and florid romanticism: grotesque prayers and pious exhortations, and such like, all of which suffer from banality, false emotion, and technical incompetence. The second is compromised and serious, often well-written poems which sometimes move me but most often seem too dependent on the poetic traditions of England a generation or more ago, and the bland and inoffensive taste of the upper middle class. These works exist in the limbo of the lukewarm, and represent a timid art that dares neither to hate nor love too much. Like our own academic verse, these poems reflect calm intelligence, tamed passion and the polite despairs of gentlemen born into a world they never made. The poems are cultured, introspective, sensitive, and are most true to the plight of the Indian estranged from his own culture by his mastery of English, but whose situation is tolerable, and who would not admit that poetry is a criminal occupation. These are sincere and harmless poems, and aside from a little local colour, could have been written in Leeds or Philadelphia. The denatured cosmopolitanism that infects the poetry of the West prevails in India as well, and few of the poems carry any sense of place, or the sound of a man speaking, or the rasping smell of cow-dung fires. The academic poets of India have yet to grasp the vernacular and all that implies.
        The poetic vision of the Hungry Generation erupted in Bengal five years ago, and has rapidly spread to such cities like New Delhi, Bombay and Allahabad. This kind of poetry is dangerous and revolutionary, cleanses by violence and destruction, unsettles and confounds the reader. This is the poetry of the disaffected, the alienated, the outraged, the dying. It is a poetry which alarms and disgusts the bourgeois, for it describes their own sickened state more clearly than they wish to hear, and exposes the hypocrisy of their decency. One reaction of good citizens has been to accuse the poets of hysteria and obscenity. The long and painful persecution of Malay Roychoudhury, ending in his conviction on 28th December 1965 on charges of obscenity, indicates the virulence and depth of the fear which these poets have uncovered.
        The energy of the poets is hysterical: the imagery of the poem is obscene. It is meant to be. But I take obscenity to be a just and natural reaction to a vile existence.. Obscenity is the desperate music of poets who dare speak out against the rape of mind and soul that marks our demented and vicious civilization. Obscenity is the last attempt by honest men to speak their agony to those who torture them. Obscenity is a moral weapon with which to attack the degrading and filthy use of power that characterizes our age, and assert contempt for the managers of our lives.
        These poets say what poets and prophets have said for a hundred years---that our civilization is desperately sick, that our consciousness is polluted, our values murderous. They are outraged at the cruel and deliberate waste of beauty and intelligence that world culture represents, and sickened by the perversions of life our societies demand. Their poems record the ugly, numbing truth that most men delight in these horrors, lust after their own destruction, and fear life insanely. The poets are nihilists. They are pessimists. And most will die before their time. But each of them has a vision of what man ought to be, and should be, and their poetry stems from the sad knowledge of what he is. I value their work most because it is an honest response to the reality of life in India. And India endures now what will come to us all before long. Pound said that poets were antennae of the race, and they are---but they are also gotten on Cassandra, and will not be believed until too late, when the vacuous mouthings that pass as earthly wisdom are known by all to be empty, dreadful lies and the hideous future we have let to be prepared for us arrives. We will not be saved. This is the obscenity their poetry must celebrate.
        Malay Roychoudhury, a young Bengali poet, has been a central figure in the Hungry Generation’s attack on the Indian cultural establishment since the Movement began in the early sixties. The Indian press believes to this day that the group’s origins can be traced to the 1962 Indian visit of Allen Ginsberg, Peter Orlovsky, and Gary & Jeanne Snyder. But however stimulating the visit of these American poets, however inspired by such writers as Artaud, Genet, Michaux, Burroughs, Miller, and Celine, I believe the Movement is autochthonous and stems from the profound dislocations of Indian life.
        There was little notice of the Movement in the United States until 1963 when City Lights Journal carried news of the group; In 1964 the Hungrealist Manifestoes appeared in KULCHUR#15, and EL CORNO EMPLUMADO and EVERGREEN REVIEW printed letters telling of the Movement’s legal difficulties. For in the autumn of 1964, as many learned from a November issue of TIME, six poets of the Hungry Generation, Malay Roychoudhury, Saileswar Ghosh, Subhas Ghose and Pradip Choudhuri, had been arrested and charged with conspiring to produce and distribute an obscene book in violation of Section 292 of the Indian Penal Code. The book was an anthology of their writings, and STARK ELECTRIC JESUS was Malay Roychoudhury’s contribution. At their arrest, all were suspended from their jobs, and when I saw them in June 1965, they had been out of work nearly ten months. Later that summer charges were dropped against five, but the prosecution of Malay Roychoudhury continued. On 28 December 1965 he was found guilty by a Calcutta court and sentenced to a fine of 200 rupees or one month’s imprisonment. The poem was banned. He has not been reinstated in his job, and life, as he writes, “has become hard and difficult…I am more or less living on alms”.
        In spite of prosecution and harassment, the Hungry Generation has continued to produce and publish poetry and prose. Acid, destructive, morbid, hallucinatory, nihilistic, outrageous, obscene, mad, shrill---these characterize the terrifying and cleansing visions that the Hungrealists insist Indian literature must endure. With few exceptions, contemporary Indian literature is school master’s stuff: pallid, otiose, and dull. It is timid and moralistic, and when it is not politely realistic, it is romantic and aimlessly and endlessly philosophical. Bhabani Bhattacharya and Ruth Prawer Jhabvala are among the exceptions, the one possessing a dank tartness like that of Albert Cossery, the other the lucid wit of Jane Austin. But only the Hungry Generation, excluded from the academies and the literary aristocracy, can the fullness of urgency and despair be seen, for they more than any other group have realized that there is very possibly no hope for India, that what lies ahead is chaos and collapse. They are not revolutionaries, only mourners. Revolution is pointless when betrayal has been so deep. All that remain is to protest, scream, love everything to foolishness---especially India---then nod wisely and callously at death.
        (Courtesy: Tribal Press, Washington DC. 1965)
         
      • অনুপম মুখোপাধ্যায় | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:০০735101
      • অনুপম মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে ১টি পুনরাধুনিক কাজ
        এই মুহূর্তে, অর্থাৎ ২০১৯-এর পশ্চিমবঙ্গে এই যে উত্তপ্ত মে মাস চলছে, লোকসভা নির্বাচনের দামামাকে দূরাগত ঢক্কানিনাদ মনে হচ্ছে, যেন আমরা যে ট্রাইবের অন্তর্গত তার বিরাট পরবটি এসে পড়েছে, ঠিক এখনই, এই ভূতের নাচের মধ্যে, অশীতিপর মলয় রায়চৌধুরীকে আমার ভারতের একমাত্র বাংলাভাষী আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক বলে মনে হয়। আজ তিনিই একমাত্র জীবিত আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ভারতীয় বাংলা ভাষায়। এটা আবেগ থেকে বলছি না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকেও বলছি না। এটা ঘটনা। ষাটের দশক থেকে আজ অবধি মলয় রায়চৌধুরীর সারাজীবনের সাহিত্যিক কাজকর্ম দেখলেই সেটা বোঝা যাবে। এই মুহূর্তেও তিনি প্রচুর লিখছেন, কিন্তু, মৃত্যুচেতনার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করছেন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে এই বয়সে এসে একরকম অনিশ্চিত হতাশাও হয়ত তাঁকে ঘিরেছে। কিছুদিন আগে আমাকে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে লিখেছেন- ‘আমাকে নিয়ে তো কেউ লেখে না! কী হল এত লিখে?’ এই জিজ্ঞাসার ন্যায্য হতাশা হয়ত শেষ জীবনে সবারই প্রাপ্য থাকে। যদি খুব ভুল না করে থাকি, রবীন্দ্রনাথও তাঁর শেষ জীবনে এই বোধটা থেকে মুক্তি পাননি। এটা বাংলাদেশ। এখানে বড় গাছগুলোকে আগাছারা আড়াল করতে পারে, কী করে পারে সেটা একটা দীর্ঘ প্রবন্ধের বিষয় হতে পারে, এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
        তাছাড়া এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি পচে যাওয়া মাখনের মতো। তার বিশ্লেষণ হয়, কিন্তু ব্যাখ্যা হয় না। মলয় রায়চৌধুরীও সেই ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে অসফল। তাই, যেটা তাঁর সফলতা, শেষ অবধি সেটা তাঁর কবি আর গল্পকার সত্বার জয়। প্রাবন্ধিক মলয়ের নয়। মলয় রায়চৌধুরী সেই ধুরন্ধর সাহিত্যিক যিনি জানেন সারা পৃথিবীতে কী লেখা হয়েছে, কী লেখা হচ্ছে, এবং সেই অনুসারেই তিনি জানেন আর কী লেখা যেতে পারে। কোন লেখা তাঁর অপেক্ষায় আছে, লিখতে বাকি আছে, এই মোক্ষম সচেতনতা ব্রিটিশ ভারতে বাঙালি সাহিত্যিকদের অনেকের মধ্যে ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ছিল, কারণ তখন কলকাতা ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর, উপমহাদেশের রাজধানী, সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর, রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ডিরোজিও-মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের শহর, তখন সারা ভারতের মধ্যে কোনো চিন্তা প্রথম জাগ্রত হত বাঙালির ধূসর পদার্থে। আজ যা পরিস্থিতি, মলয় রায়চৌধুরীর মতো একজন লেখকের লেখা বোঝার লোক খুব কমে গেছে। তিনি জনসাধারণের জন্য লেখেন না, এটাই যদি সাধারণ চিন্তা হয়, সেটা আমি মেনে নিতে পারি না। মলয়ের কবিতার মধ্যে ‘পিপল’স পোয়েট’ হয়ে ওঠার শক্তি এখনকার যে কোনো কবির চেয়ে বেশি। মানুষ যে তাঁর কবিতা পড়ল না, তার একমাত্র কারণ তাঁর কবিতাকে মানুষের কাছে যেতে দেওয়া হল না। তাঁর উপন্যাস বেস্ট সেলার লিস্টে পাকাপাকিভাবেই থাকত, যদি তিনি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা বিকোতেন, অথবা, প্রতিষ্ঠান তাঁর জন্য নিজের দিশা বদলাত, যদি তার আদৌ কোনো দিশা থেকে থাকে।
        আজ সেই লংকা নেই, কারণ অন্যরূপে রাবণ থাকলেও তার দশ মাথা নেই, অথচ যেদিকে তাকাবেন দেখবেন রাবণ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে, এই হয়ত মলয় রায়চৌধুরীর ব্যাখ্যাকৃত পোস্টমডার্ন পরিসর। যদিও, আমার মতে, যেমন আমি আমার পুনরাধুনিক বিষয়ক গ্রন্থে দেখিয়েছি, এই পরিসর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেই কলকাতায় এসে পড়েছিল। মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরী সেটাকে শনাক্ত করেন নব্বইয়ের দশকে, কিন্তু এমনভাবে করেন যেন সেটা সেই মুহূর্তেই প্রকটিত হল। জীবনানন্দ দাশ বা সমর সেনই যে তিরিশের দশকেই বাংলা কবিতার পোস্টমডার্ন এনে ফেলেছিলেন, মোটেই ৯০ দশকীয় কোনো পত্রিকার কাজ সেটা নয়, এটা কেন বলে ওঠেননি, আমার কৌতূহল আছে। ষাটের দশকে মলয়েরই নেতৃত্বাধীন হাংরি আন্দোলন কি প্রথম পোস্টমডার্ন সাহিত্য আন্দোলন নয় বাংলা ভাষার? অবিশ্যি পোস্টমডার্নে কোনো নেতা তো থাকতে পারে না। তাতে আর অসুবিধা কোথায়? ওই আন্দোলনের অন্তর্ভুক্তজনেদের মধ্যে অধিকাংশই তো মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁদের নেতা আজ আর মানেন না, তাঁকে হেয় করেন, তাঁদের কার কারও সন্তানরাও মলয়ের প্রতি বিদ্বিষ্ট, এমনকি এমন অনেকেই আছেন যাঁরা মলয়কে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস থেকে বাদ দিয়ে স্বস্তি পেতে চান। শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়েই কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে, সেই চেষ্টাটাও ভেরি মাচ পোস্টমডার্ন, তাই নয় কি? হাংরি আন্দোলনের শত্রুরাই আজ ঠিক করে দিচ্ছে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস, এ এক প্যারাডক্স। আবার এটাও ঠিক, মলয় এগুলো নিয়ে না ভাবলেই পারেন। হাংরি আন্দোলন নিয়ে তিনি এই ২০১৯-এও বেশ অবসেসড্‌। ৫০ বছর আগে ফেলে আসা আন্দোলনটিকে তিনি আজও ভুলতে পারেননি। নিজেই ব্লগ বানিয়ে তার আর্কাইভ করেন। আজও হাংরি নিয়ে গদ্যের পর গদ্য লেখেন। এই অবসেসন তাঁর সাম্প্রতিক সাহিত্যকর্মে কিছুটা হলেও ছায়া ফেলে থাকবে, এমন আশঙ্কা মাঝেমধ্যে আমার মাথায় এসেছে। আত্মবিস্মৃত বাঙালিকে তিনি কি কিছুটা পটাতে চাননি এই একটা ব্যাপারে? এই একটাই ব্যাপারে?
        দিল্লিতে ভারতের রাজধানী চলে যাওয়ার পরে, দেশভাগের দ্বারা বাঙালিকে ২ টুকরো করে দেওয়ার পরে, কংগ্রেস-নকশাল-সিপিএম-মাওবাদ-তৃণমূল-বিজেপি বিন্দুগুলিকে স্পর্শ করে করে আজ বাঙালি ভারতের একটি প্রান্তিক রাজ্যের অবহেলিত ফতুর জনসাধারণে পুনরায় রূপান্তরিত হয়েছে, পলিটিক্স সাহিত্য আর সংস্কৃতির দিক থেকে বাঙালি আজ অধঃপতিত হয়েই চলেছে, যেমন অবস্থায় সে প্রাক্‌-ব্রিটিশ যুগে ছিল, কোনো মোগল সম্রাটের তখন বাংলাদেশে পা রাখার প্রয়োজনই হত না, আজ পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রীয় মূল্য ৪২টা লোকসভা আসনেই চুকিয়ে ফেলা যাচ্ছে। তার ফলেই সিনেমা বা সাহিত্যের চেয়ে পলিটিক্স আজ অনেক বেশি অন্তঃসারশূন্য ও দক্ষিনী সিনেমার চেয়েও এন্টারটেইনিং। মন খারাপ হলে মুখর নেতা বা মুখরা নেত্রীর স্ট্যান্ড আপ কমেডি ভিডিও দেখে নেওয়া যাচ্ছে ইউটিউবে গিয়ে, এবং হা হা হো হো করে নেওয়া যাচ্ছে। মলয় রায়চৌধুরী এটাকেই পোস্টমডার্ন পরিসর বলবেন, যথার্থই বলবেন, কিন্তু এই পরিসর তাঁকেও যথেষ্ট হেনস্থা করছে, কারণ, তাঁকে এখানে অনেকেই বুঝতে পারছে না, না বুঝে রিঅ্যাক্ট করছে, বুঝেও চুপ করে থাকছে, তাঁরই ব্যাখ্যা করা পরিসরে তিনি স্বয়ং কি যথেষ্ট বেমানান নন? সেটা না হলে তিনি বড় নন।
        মলয় রায়চৌধুরীর স্বাভাবিক বিরোধাভাসটা এই যে, তিনি নিজেকে ছোটলোক ইত্যাদি দাবি করেও, বাঙালির সামগ্রিক হড়কে যাওয়ার কবন্ধ শরিক হননি, বিশেষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক খুড়োর কলে নিজেকে জুড়ে ফেলেননি, বরং নিজেকে সারা পৃথিবীর সাপেক্ষে জায়মান লেখক করে তুলতে পেরেছেন। তাঁর উপন্যাস এবং কবিতা এবং প্রবন্ধকে প্রাদেশিক চেতনার বাইরে দাঁড়িয়ে পড়া যায়। এটা এই মুহূর্তে জীবিত দ্বিতীয় কোনো বাঙালি সাহিত্যিক সম্পর্কে আমি বলতে পারছি না। এটা আমার অজ্ঞতাপ্রসূত হলেও, দৃঢ় ধারণা, এবং কোনো প্রশংসাবাক্য নয়। একজন লেখকের জীবনে প্রায়ই এটা ঘটে যে, তিনি নিজের জন্য একটি লাগসই ভাবমূর্তি বেছে নিলেন, কিন্তু নিজেকে সেই মাপে ঢালতেই পারলেন না। মলয় রায়চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। তিনি নিজেকে বিহারের ইমলিতলা থেকে উঠে আসা ছোটলোক হিসাবে পেশ করতে চাইলেন, কিন্তু হাড়ে হাড়ে বোঝা গেল এই লেখকটি সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বংশপরিচয়েই অধিক মানানসই, কারণ, মলয়ের মধ্যে যে আভিজাত্য আছে, যে আত্মসচেতন উদাসীনতা আছে, তা গত ১০০ বছরের বাংলা সাহিত্যে যথেষ্ট দুর্লভ, তাঁর মধ্যে অস্তিত্বের উৎকণ্ঠা থাকলেও বাংলা বাজারের ইতরতা নেই, প্রান্তিকতা যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা স্বরচিত। তাঁর আচরণের মানবিক স্তরটিতে আছে এক আশ্চর্য খেঁকুরেপনা, অমরত্বের অদ্ভুত উদাসীন বাসনা আর দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমারের মিশ্রণ, যেটা তিক্ত যোদ্ধাকে মানায়, ব্যর্থ প্রেমিককে মানায়, প্রতিষ্ঠার ভিখারী বা প্রতিষ্ঠানের দালালদের কিন্তু মানায় না। মলয় নিছক ছোটলোক নন। তিনি একজন অভিজাত ছোটলোক। ছোটলোক অভিজাত নন। বলা বাহুল্য এখানে আমি জাতপাতের কথা বললাম না।
        মলয় রায়চৌধুরী যে শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায় বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়দের চেয়ে ঢের বড় মাপের সাহিত্যিক এটাও মুক্তকন্ঠেই বলতে চাই। কারণ এঁদের মতো তিনি বিগত শতাব্দীর কবিলেখক নন। তিনি একবিংশ শতাব্দির সঙ্গে তুমুলভাবে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, তাঁর উপন্যাস থেকে বাংলা সিরিয়াল হবে না। সিনেমাও হওয়া মুশকিল। তাঁর কবিতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে উদাত্ত আবৃত্তি করা চলবে না। মলয় মেজর সাহিত্যিকের ধারণাকে অস্বীকার করেন, সেটা তাঁর কিছুটা গড়ে তোলা এবং কিছুটা আমদানিকৃত তত্ববিশ্বের ব্যাপার। আমি মলয় রায়চৌধুরীর তত্বকে মলয়ের কবিতা আর উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা খুব জরুরি মনে করি না। আমি মেজর সাহিত্যিকের ধারনায় কঠিনভাবে বিশ্বাস করি, এবং, মলয় রায়চৌধুরীকে একজন যথার্থ মেজর সাহিত্যিক বলে মনে করি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বলেছিলাম কবি হিসেবে শঙ্খ ঘোষের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল না, বাঙালি কাউকে দিতেই হলে ওটা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে দেওয়া যেত। আমার এই উক্তিতে ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ে যায়, এবং অনেকের দ্বারা আক্রান্ত হই। তাঁদের মধ্যে একজন বদমেজাজি সম্পাদক বলেছিলেন আমি মলয় রায়চৌধুরীর নাম কেন করলাম না জ্ঞানপীঠের যোগ্য প্রাপক হিসেবে। সম্ভবত এই উক্তি যিনি করেছিলেন আমাকে তিনি মলয় রায়চৌধুরীর নিকটস্থ গুণমুগ্ধ একজন ঠাউরেছিলেন এবং ভেবেছিলেন মলয়ের নাম না করাটা আমার অবস্থানের ভণ্ডামি ধরিয়ে দেবে। মজার ব্যাপার হল, সেদিন দেখলাম মলয় রায়চৌধুরী ওই ব্যক্তির ওই উক্তিকে নিজের ব্লগে সযত্নে জায়গা দিয়েছেন, অর্থাৎ গুরুত্ব দিয়েছেন, যদিও নিজে কোনো মন্তব্য করেননি।
        আজ এই লেখায় স্পষ্ট বলতে চাইব, মলয়কে আমি এই মুহূর্তের বাংলাভাষায় একমাত্র আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক মনে করলেও শুধু জ্ঞানপীঠ কেন অন্য যে কোনো ভারতীয় পুরস্কারের প্রাপক হিসাবেই মলয়ের নাম কল্পনা করতে পারি না। পুরস্কার সর্বদাই উপর থেকে আসে, এবং হাত পেতে সেটা নিতে হয়। সেই পুরস্কারই নেওয়া চলে যেটার উচ্চতা লেখকের চেয়ে বেশি, এবং সেটায় তাঁর কোনো গ্লানি নেই। রবীন্দ্রনাথকে নোবেল প্রাইজে মানায়, রবীন্দ্র পুরস্কার তাঁর নেওয়া চলে কি? জ্ঞানপীঠও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মানাত, তিনি পেয়েওছিলেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মানাত না। মলয় রায়চৌধুরীকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার দেওয়ার অর্থ তাঁর স্তরকে মাঝারিয়ানায় নামিয়ে এনে তাঁর জায়মানতাকে খতম করে দেওয়া। মলয়ের মতো সাহিত্যিকরা পুরস্কৃত হতে জন্মান না। পুরস্কার তাঁদের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দ্যায়। যে কোনো সাহিত্যিকেরই বারোটা বাজায় একটা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার, কিন্তু তাতে সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের খুব একটা ক্ষতি হয় না। মলয় রায়চৌধুরীকে পুরস্কৃত করলে, কোনো সাহিত্যসভায় ধরে নিয়ে গিয়ে ফিতে কাটালে, কোমর নুইয়ে প্রদীপ জ্বালালে মলয়ের ব্যক্তিগত ক্ষতি কী হবে সে তো বললামই, বাংলা সাহিত্যের অনেক কিছুই ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে, সেই বিচ্ছিরি জট আর খোলা যাবে না।
        প্রতাপশালী কোনো প্রতিষ্ঠানের দেওয়া মুকুট পরলেই যে ওঁর মাথাটি হাতছাড়া হয়ে যাবে, মলয় সেটা নিজে খুব ভাল জানেন। যে কোনো মুকুটই আসলে একটি সাব্লিমেটেড টুপি। উনি যদি কাউকে মাথা কেটে পাঠান, সেটা প্রেমের উপহার হবে, লোভের নয়। সম্প্রতি ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাসে উনি লিখেছেন- ‘প্রতিষ্ঠান কখন আপনাকে টুপি পরিয়ে দেবে আপনি বুঝতেই পারবেন না।’ সম্ভবত এই উক্তি উনি শৈলেশ্বর ঘোষের প্রসঙ্গে করে থাকবেন, এটা আমার অনুমান, কারণ মাথায় শীতের টুপি পরে প্রয়াত শৈলেশ্বর ঘোষ কোনো একটা সাহিত্যমেলা উদ্বোধন করছেন, এমন একটা ছবি সেই সময়ে ফেসবুকে ভেসে উঠেছিল। মলয় এভাবেই খোলাখুলি কথা বলতে পারেন এই বৃদ্ধ বয়সেও, এমনকি, নিজের তথাকথিত রাইভ্যালদের নিয়ে খিল্লি করতেও উনি কোনো দ্বিধা দেখান না। আমার মনে হয়, এটা শিক্ষণীয়। সোনার হরিণের প্রতি এই বেপরোয়া সাহিত্যিকের কোনো লোভ নেই, কারণ তিনি জানেন সোনার হরিণ হয় না, সেটার পিছনে অবশ্যই কোনো মায়াবী ফাঁদ লুকিয়ে থাকে, অনেক বড় কিছু কেড়ে নেওয়ার জন্য। বঙ্কিম পুরস্কার, আকাদেমি পুরস্কার পেয়ে মলয়ের আখের কিছুই গোছানো হবে না। যেটার প্রতি ওঁর আসল লোভ, সেই ইতিহাস তাহলে ভড়কে যাবে। মলয় তাই নিজেকে ইতিহাসে রাখার দায়টা নিজেই নিয়েছেন, এবং ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ ব্যবহার করে নিতে। ইন্টারনেটকে মলয় রায়চৌধুরী যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা শিক্ষণীয়। এটা তাঁর কাছে বাঙালির শেখার আছে।
        একটা কথা মলয়ের বিরোধিরা প্রায়ই বলে থাকেন, যে মলয় খুব আত্মপ্রচার করেন। নিজের ব্লগ, নিজের উইকিপিডিয়া, নিজের সমস্ত লেখার সংরক্ষণের ব্যাপারে উনি সর্বদা যত্নশীল। নিজের লেখা নিজেই গিয়ে লোককে পড়তে বলেন। নিজের লেখার লিংক কেউ না চাইলেও তার ফেসবুক টাইমলাইনে গিয়ে পোস্ট করে আসেন। বলা বাহুল্য, একজন কিংবদন্তি সাহিত্যিকের কাছে বাঙালি এই আচরণ আশা করে না, এটা বাঙালির অভ্যাস আর প্রত্যাশার বাইরের ব্যাপার। আমি আগেই বলেছি মলয় রায়চৌধুরী অমরত্বের বাসনা রাখেন, ইতিহাসে থাকতে চান নিজের মর্জি অনুসারী ইমেজে। সেটাকে লোভ বললেও কি খুব খারাপ হয়? আমার মতে, মলয়ের অতীতচারিতা অর্থাৎ হাংরি-অবসেসন যদি বাদ দিই, একজন সাহিত্যিকের অমরত্বের বাসনা, যশের আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত, সে বঙ্কিম যাই বলে থাকুন, সাহিত্যক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সফলতার লোভ খুবই প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। লেখক কোনো সন্ন্যাসী তো নন! কাম ছাড়া যেমন পরিবার হয় না, ক্রোধ ছাড়া যুদ্ধ হয় না, সঠিক লোভ ছাড়া একজন শিল্পীর অগ্রগতি হয় না। ‘অগ্রগতি’ শব্দটাও মলয় রায়চৌধুরীর তত্ববিশ্বে বেমানান। কিন্তু আমার প্রিয়। পরিমিত ও সুনির্বাচিত লোভের দিকে একজন স্রষ্টা এগোবেন, এটা আমি সমর্থন করি। সেই লোভ বাঘের, তাজা রক্ত আর গরম মাংস নিজের সামর্থে লাভ করার, সেই লোভ হায়নার নয় যে যে কোনো একটা মৃতদেহ হলেই চলে যাবে। কেন একজন লেখক তাঁর লেখা একজন পাঠকের সামনে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেবেন না? কেন একজন পাঠককে শিকার করবেন না তিনি! বাঘ যেভাবে তার হরিণকে ধরে, একজন লেখকেরও কাজ তাঁর পাঠককে ধরা, দাঁত এবং নখের সার্বিক প্রয়োগ করে। সভ্যতা ভব্যতা প্রোটোকল এসব ছাপোষা আর ক্রীতদাসদের মানায়, কবিকে নয়।
        এবং মলয় জানেন, তিনি হাংরি আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ হলেও, তাঁর উপরে অজস্র লেখালেখি হলেও, গবেষণা হলেও, তাঁকে নিয়ে কাজ করে পিএইচডি নিয়ে কেউ কেউ ঘুরে বেড়ালেও, তিনিই স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র জেলখাটা কবি হলেও, সাধারণ বাঙালি তাঁর নামই আজ অবধি জানে না। তারাই মলয়ের নাম জানে যারা স্বয়ং লেখালেখি করে, অথবা বাংলা সাহিত্যের হার্ডকোর পাঠক। আজ থেকে প্রায় বছর পনের আগে আমি প্রথম মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আলাপিত হই একজন বিখ্যাত সাহিত্যিককে বিশেষ দরকারে ফোন করতে গিয়ে রং নাম্বার ডায়াল করে ফেলায়। মলয় বুঝতে পেরেছিলেন আমি কাকে ফোন করতে গিয়ে তাঁকে ফোন করেছি। কিন্তু আমি লজ্জিত হলেও, তিনি রাগ করেননি। বরং সাগ্রহে আমার মতো একজন আনকোরা ছোকরাকে জানিয়েছিলেন তাঁর নাম মলয় রায়চৌধুরী, এবং ‘তিনিও’ লেখালেখি করে থাকেন। আমার মনে হয়েছিল নিজের এই পরিচয় তাঁকে দিতে হয়, নিজের পরিচয় নিজেই দিতে তিনি অভ্যস্ত, কারণ তাঁর সঙ্গে জনসাধারণের পরিচয় করে দেওয়ার এজেন্সি তাঁর কাছ থেকে কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান নেয়নি, তিনিও দেননি। এটা শিক্ষণীয়। আমি তাঁর কাছে এটা শিখেছি। আমি যে আজ নিজের ঢাক বাজাতে কোনো দ্বিধা করি না, কারণ আমিই প্রথম নই, আমার আগে মলয় আছেন। পোস্টমডার্ন মলয় নন। বাঘ মলয়।
         
         
         

         

      • সোনালী মিত্র | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:০৩735102
      • সোনালী মিত্র : মলয় রায়চৌধুরীর প্রেমের কবিতা
        মলয় রায়চৌধুরীর প্রেমের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যে প্রজ্ঞা ও আত্মসংযমবোধের গভীরতা, অভিজ্ঞতা ও উন্মেষ দরকার, তা হয়তো আমার নেই। ষাট দশকের বিবর্তিত কবিতা-ধারার পুরোধা যিনি, তাঁর প্রেমের কবিতাও যে স্বতন্ত্র এবং পাঠকের আত্মস্থগ্রন্থিকে অন্য রকমের স্বাদ দেবে, আজকে আর বলার প্রয়োজন আছে কি ! বিশ শতকের ষাট দশকের সেই চিরযুবক মলয় রায়চৌধুরী একুশ শতকের দ্বিতীয় অধ্যায় জুড়েও যে প্রেম ও কবিতা-প্রেমিকা নিয়ে রাজত্ব করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ও একান্ত ব্যক্তিগত ভঙ্গিমায় তিনি যা লেখেন, তাতে সনাতন চিন্তাধারার ধ্যানধারণা ভেঙে যায়, গুঁড়িয়ে যায় শালীন – অশালীন গণ্ডী। তিনি অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই হয়তো বলেন, হয়তো একটু চিৎকার করেই বলেন, কিছু কথা হয়তো চিৎকার করেই বলতে হয় !
        আসলে সত্যের সামনে একজন ঋষি, একজন কবি ও একজন ঈশ্বর সমান। সত্য যেহেতু সর্বদা সত্য এবং তার গ্রহণযোগ্যতা বাস্তবধর্মী, তাই সাধারণ মানুষ সবসময় সেই সত্যের সম্মুখীন হতে সাহস পায় না। দ্বিধাযুক্ত মানুষ মানিয়ে চলতে চলতে এক সময় থেমে যায়। মলয় এই ব্যাপারে আপোষহীন। নিজের রহস্যময় অভিজ্ঞতা ও কবিতা-ভাবনাকে শব্দানুভাবের মধ্যে দিয়ে প্রকাশের ব্যাপারে তিনি দ্বিধাহীন।
        আটপৌরে সামাজিক মানুষের চিন্তাভাবনার স্থিরতা নেই, নির্দিষ্ট কোনও দিশাও নেই। আজকে যে সম্পদ ডাস্টবিনে প’ড়ে আছে, আগামীদিনে হয়তো সেটাই শোবার ঘরে শোভা বৃদ্ধি করবে। আত্মবিস্মৃতির মানুষ খুব বেশিদিন এক অবস্থানে থাকতে পারে না। তাই মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা বর্তমানে কিছু-কিছু পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও একদিন যে হবে না, এমন জোর করে বলার মানুষটিও কি আছে ? এখন ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি বারংবার প্রকাশিত হয়, এবং বলার প্রয়োজন হয় না যে সেটি কে কবে রচনা করেছিলেন।
        আমার সমকালীন সহকর্মী কবিদের নিয়ে লেখা মলয়ের প্রেমের কবিতা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব যখন এসেছিল, একটু ভয়ই পেয়েছিলাম ! (অবশ্য শুধু সমকালীন কবিদের নিয়েই নয়, নামহীন কল্প-প্রেমিকাদের নিয়েও প্রেমের কবিতা লিখেছেন কবি ; হয়তো তাঁরা তাঁর জীবনে কখনও অনুপ্রবেশ করেছিলেন, আমরা জানি না, তাঁর গোপন জীবনের প্রতিটি ঘটনা জানা সম্ভবও নয়। তাই, প্রেম এখানে অনির্বাণ আগুন, শুধু পোড়ায় না, দগ্ধ হতে হতে শুদ্ধও করে। ) কারণ, ওনার প্রেমের কবিতা নিয়ে কিছু বলতে চাওয়া মানে, নারী হিসাবে, পাঠিকা হিসাবে, নিজেকে ভেঙে আয়নার সামনে দাঁড়ানো। এই একাকী দাঁড়ানোর মধ্যে নগ্নতা আছে, আছে চোখকে অন্তরের মধ্যে স্থাপন করার প্রস্তাবনা। সমকালীন কবিদের নিয়ে লেখা তাঁর নিরীক্ষামূলক ( হয়তো পোস্টমডার্ন আঙ্গিকে রচিত ) প্রেমের কবিতার মধ্যে ধ্রুপদ আত্মসমর্পণ আছে, কিন্তু সেই আত্মসমর্পণে দুঃখ নেই, সারস ঠোঁটের মতো বীক্ষণের গভীরতা আছে। এই গভীরতায় মধ্যে ডুবে যেতে পারলে কবিতা সোনার খনিতে পরিণত হয়ে ওঠে, পাঠক হয়ে ওঠে সোনার কারিগর।
        এখানে আলোচ্য আমার পঠিত প্রেমের কবিতাগুলি প্রধানত এই সময়ের লেখা কবিতা। সত্তর উত্তীর্ণ কবির প্রেম ও তৃষ্ণা কবিতার উপত্যকা জুড়ে ঘন সবুজ পাইনের মতো ঋজু ও স্বতন্ত্র হয়ে বিরাজ করছে। অমায়িক বাতাসে শিরশিরানির আ্‌হ্বান, আহ্লাদী ধানের গুচ্ছের মতো ঢলে পড়ছে এ-ওর গায়ে। ‘তানিয়া চক্রবর্তীর জন্য প্রেমের কবিতা’ কবিতাটা নিয়েই প্রথমে দেখা যাক। প্রেম যেন এখানে ভূমি, সেই ভূমি মরুভূমিই হোক বা সমতলের দোয়াস ভূমি হোক ! সমস্ত ভূমিই আসলে মা ! প্রতিটা মায়ের মধ্যেই আছে সন্তান উৎপাদনের সেই প্রভূত সম্ভাবনা। সেই উৎপাদন সম্ভাবনায় তো ভূমিকে মায়ের ভূমিকা দিয়েছে। কবিতার শুরুতেই সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন কবি –
        ”কী নেই তোর ? মরুভূমির ওপরে আকাশে পাখিদের তরল জ্যামিতি
        প্রতিবার — বিপদের ঝুঁকি — সম্ভাবনা — বিরোধ — সমাক্ষরেখা —
        আমি তো লাল-ল্যাঙোট সাধু, আমি বাস্তব, তুই বাস্তবিকা ”
        সত্যিই তো, কী নেই তোর ! কী নেই- এর মধ্যেই রয়েছে সবকিছু। একটু খুঁজে দেখলে যেকোনও বস্তুর মধ্যেই প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। তাই ‘কী নেই তোর’ এর মধ্যেও কবি খুঁজে পেয়েছেন সেই শাশ্বত প্রেমের বৈদিক অঙ্গীকার। এই কবিতার মধ্যে চিরকালীন যুবা কবি স্বপ্ন ও সাধের সেই সেতুটিকে খুঁজতে চেয়েছেন, যে সেতু দিয়ে আফ্রোদিতি ও সরস্বতীর নিত্য চলাচল। যে সেতু দিয়ে উপনিষদের ঋষিপুত্র পালিত গাভীর মুখে সবুজ ঘাস তুলে ধরবার জন্য ছুটে চলেন বছরের পর বছর ! এই চাওয়ার মধ্যে পরাজয়ের ভীতি নেই, নেই আত্মগরিমা হারানোর ভয় ! মহাভারতের সেই মৎস্যগন্ধা তরুণীটির কথা মনে পড়ে।
        ”টের পাই কালো বিশ্ববীক্ষায় আমার নামের স্থায়িত্ব নেই
        আমি তো সাধু-প্রেমিক তোর, পৃথিবীর নাম দিসনি কেন ?”
        এই লাইনের মধ্যে যখন দেখি ব্যক্তিগত চাওয়াগুলি মহাবিশ্বের মধ্যে বিলীন ক’রে কবি সাধুর ভূমিকায় নতজানু দাঁড়িয়েছেন প্রেমের সামনে ! এই প্রেম যেন সাধনা ! প্রত্যাশাবিহীন এই সাধনার মধ্যে কবির অন্তর প্রেমের কাছে সমর্পিত ক’রে শূন্য হাতে দাঁড়িয়েছেন মহা আনন্দের দিকে। যেন তাঁর নেওয়ার কিছু নেই, যেন তাঁর প্রত্যাশা পূরণের চাপ নেই। শুধু সেই অনাদি প্রেমের নৌকায় মহাবিশ্বে ভেসে বেড়ান আছে।
        বোধ এবং বোধি একাত্ম হতে পারলেই একটা সময়ের পরে প্রেম ও পূজা একাকার হয়ে যায় ! যদিও মলয় যাঁদের নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেছেন, তাঁরাও কেউ কেউ কবি। এই সময়ে নিজের ঢাক নিজে বাজানোর বাজারে প্রত্যেকেই যখন আত্মকে বলিদান দিয়ে নাম-প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত, তখনই কবি-মলয় এই কবিদের যাপনকেও তাঁর ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। ”সোনালী মিত্র’র জন্য প্রেমের কবিতা” পড়লে কিছু লাইনে এসে চোখ আটকে যায়।
        ”সোনালী প্রেমিকা ! তুইই বুঝিয়েছিলিস : হুদোহুদো বই লিখে
        বিদ্বানের নাকফোলা সাজপোশাক খুলে দেখাও তো দিকি
        কালো জিভ কালো শ্লেষ্মা কালো বীর্য কালো হাততালি”
        উন্নাসিক সময়ের মানুষের প্রতি কবির শ্লেষ ঝ’রে পড়েছে ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে। নিজের নবরসের অলঙ্কারগুলিকে বলছেন কালো। তিনি কি শ্রীকৃষ্ণ ? তিনি কি ওথেলো? কাউকে ভালোবাসা মানে তো শুধু তাকে ভালোবাসা নয়, তার দর্শন, তার নৈতিক বিস্তারকে ভালোবাসা। কাউকে ভালোবাসা মানে তার সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলিকে আত্মস্থ ক’রে মনের মহিমা দিয়ে তাকে স্পর্শ করা। বোধের বাইরে থেকে অন্ধের মতো কাউকে ভালোবাসার চেয়ে, তার সৃষ্টির প্রতি সম্মানিত থেকে তাকে সমর্থনের মধ্যে দিয়েও যে ভালোবাসার জন্ম হয়, মলয়ের কবিতায় সেই মগ্নচৈতন্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
        আত্মসচেতন কবি স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে যে প্রেমকে ধরতে চেয়েছেন, রক্তমাংসের প্রেমের মধ্যে সেই প্রেম হয়তো-বা নেই ! সাধারণভাবে প্রেমের যে আবেগ আমরা অন্যান্য প্রেমের কবিতায় এতকাল দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, এই প্রেমের কবিতার মধ্যে সেই আবেগ আছে, কিন্তু সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো ! পাঠক সেই লাভাস্রোতের সন্মুখীন হবার আকাঙ্খায় নিজেকে প্রস্তুত রাখতে বাধ্য। প্রকৃত অনুভবের কোনও পাঠক সোনারকাঠি ছুঁইয়ে সেই আগ্নেয়গিরির ঘুম ভাঙালেই যেন জেগে উঠবে সংবেদনের লাভাস্রোত, তারপরে মনকে ভস্ম করে দেবে।
        চিরাচরিত ঔৎসুক্যের বাইরে যে আকাঙ্খা বিরাজ করে, তার খোঁজ পায় না সাধারণ মানুষেরা। আকাঙ্ক্ষা হল পাকা ও মিষ্টি ফলের মতো। যে ফলের দিকে চোখ ও ক্ষুধা হাপিত্যেশ করে ব’সে থাকে। আকাঙ্ক্ষাকে দমন না করতে পারলে আগাছার মতো বৃদ্ধি পেতে পেতে প্রকৃত ফসলকে নষ্ট করে দেয়। মলয় তাঁর প্রেমের কবিতায় এই আকাঙ্ক্ষাকে নির্মূল করেননি, কিন্তু বাড়তেও দেননি প্রকৃত পরিচর্যার মধ্যে দিয়ে। তাই অতিরিক্ত আবেগের লাগামহীন ঘোড়া পেরিয়ে যায়নি রেসকোর্স ময়দান, অন্যের আস্তানায় ঢুকে চুরি করেও খায়নি খুদকুঁড়ো। তাই তো ”ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়-এর জন্য প্রেমের কবিতা’ য় যখন কবি লেখেন –
        ”অসহ্য সুন্দরী, আমার নিজের আলো ছিল না
        তোর আলো চুরি করে অন্ধকারে তোরই ছায়া হয়ে থাকি
        তোর আর তোর বরের নাঝে শ্বাসের ইনফ্যাচুয়েশানে
        অসহ্য সুন্দরী, বেহালার কোন তারে তোর জ্বর, তা জানিস ?”
        আসলে ভালোবাসার মধ্যে থাকাটাই জরুরি ! কীভাবে আছি সেটা বড় কথা নয়। আছি, ছিলাম, এটাই জরুরি ! এককেন্দ্রিক ভালোবাসার মধ্যে যে জগত আছে, সেই জগতের অধিপতি একবার হতে পারলে না-পাওয়ার ব্যর্থতা আর জড়িয়ে ধরতে পারে না। ভালোবাসা প্রধানত নিজের রক্তের গতিকে সচল ও ঠিক রাখার হাতিয়ার ! আমি তোমাকে ভালবাসছি মানে নিজের অস্তিত্বকে সতেজ রাখছি। প্রতিটি ভালোবাসায় মনে হয় আগে নিজেকে ভালো রাখার সেই বর্ম, যে বর্ম পরেছিলেন কর্ণ। ভালোবাসা সেই বর্মের কাজ করে, যে বর্ম রক্ষা করে ব্যক্তিগত দুঃখ, শোক, গ্লানি, ক্ষোভ, অসহায়তা থেকে। তাই মলয়ের প্রেমের কবিতায় দেখা যায় প্রেমিকা যেই হন না কেন, তাঁর সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, সেটা প্রধান নয়। স্বামী, পুত্র, সংসার রইলই বা সেই প্রেমিকার, তাকে কবির কিছুই এসে যায় না ; তিনি তো শ্রীকৃষ্ণের মতন প্রেমে ও কুরুক্ষেত্রে সমান দরদি। তিনি তো প্রেমিকার আলোয় নিজেকে বিকশিত করতে চাইছেন। আলোকে তো আর বন্দি করে রাখা যায় না, ফাঁকফোকর গ’লে ঠিক অন্ধকারের দিকে এগিয়ে আসে। কবি মুখগহ্বরের বিশ্বরূপ-দেখানো আলোর বন্যায় নিজেকে ও সবাইকে উদ্ভাসিত করতে চেয়েছেন, হয়েওছেন উদ্ভাসিত।
        মলয় রায়চৌধুরী কবি-প্রেমিকের বয়সকে বেঁধে রেখেছেন সুনির্দিষ্ট একটা বয়সের মধ্যে। কিংবা কবি-প্রেমিকের বয়স বলেও কিছু হয় না, যেমন হয়নি রবীন্দ্রনাথের, জীবনানন্দের, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। বয়স একটা সংখ্যা ছাড়া যেন আর কিছু নয়। বয়স আমাদের মরতে শেখায়, কিন্তু ভালোবাসা শেখায় জীবনকে উপভোগ করতে ! আয়ু একটা শ্বাসের নাম, শ্বাস ফুরলে আয়ু ফুরিয়ে যায়। কিন্তু ফুরিয়ে যাওয়ার আগে কি ফুরিয়ে যাওয়া মানায় ! ভালোবাসা বাদ দিয়ে পৃথিবীতে এসে মানুষ যেটুকু অর্জন করেছে তা হল, হিংসা, দ্বেষ, লোভ, ও ক্ষয়। দেহের সঙ্গে এইসব কিছুই যাবে না জেনেও মানুষ ক্রমশ ভালোবাসা থেকে দূরে যত সরেছে, তত বেশি করে জড়িয়ে ধরেছে এইসব রিপু-জনিত ক্ষয় ! তাই মলয় রায়চৌধুরী সজ্ঞানেই, শার্ল বোদলেয়ার, পাবলো নেরুদা, এমিলি ডিকিনসন, জন কিটস, মায়া অ্যাঞ্জেলু, সিলভিয়া প্লাথ, টমাস হার্ডি প্রমুখ ইউরোপীয় ভাষার কবি-প্রেমিকদের মতো একইভাবে ভালোবাসার মধ্যে প্রবেশ করেছেন, আর এই ভালোবাসা চক্রব্যূহ নয়। এই ভালোবাসার মধ্যে প্রতিদিন পাখি জন্মায়, পাখি সভ্যতার মধ্যে দিয়ে কবি এগিয়ে যান চিরকালীন সেই প্রেমসত্যর দিকে। তাই তো কবি ”অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর জন্য প্রেমের কবিতা”য় উচ্চারণ করতে পারেন –
        ”মনে থাকে যেন, রাজি হয়েছিস তুই, হাত ধরে নিয়ে যাবি নরকের খাদে
        রাবণের, কর্ণের, ভীষ্মের, দুর্যোধনের আর আমার জ্যান্ত করোটি
        হাজার বছর ধরে পুড়ছে অক্ষরে, বাক্যে, ব্যকরণে, বিদ্যার ঘৃণায়
        মনে থাকে যেন, শর্ত দিয়েছিস, আমার সবকটা কালো চুল বেছে দিবি”
        এই গন্তব্যর শেষ নেই। এই এগিয়ে চলার মধ্যেই আছে জীবনের পূর্ণতা। আজকের দিনটা ভালো করে যদি বাঁচা যায়, আগামী দিনগুলি গোলাপের মতো ফুটে ওঠে। কবি এই উন্মাদ প্রেমের মধ্যে দিয়ে বাস্তব ও অধিবাস্তবের সেই নীল সীমানায় পৌঁছতে চান যেন, যেখানে জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো যেতে চেয়েছিলেন। সেখানের কোন পাহাড়ি ঝর্নার জলে একবার দেহমন ডুবিয়ে তিনি চাক্ষুষ করতে চান মায়াপ্রেমের অলৌকিক সেই প্রত্যয়।
        এতক্ষণ সমকালীন কবিদের নিয়ে লেখা প্রেমের কবিতা নিয়ে কিছু কথা বলেছি। এবার যদি একটু পেছনের দিকে তাকাই, ফেলে আসা দিনে প্রেম কীভাবে এসেছিল কবির জীবনে দেখা যাক। ১৩৯২ সালে প্রকাশিত ‘ বাজারিণী’ কবিতাটা নিয়ে দেখা যাক, যেখানে কবি লিখেছেন –
        ”ত্রিশ বছরের পর এলে তুমি। তোমার আদুরে ভাষা পালটে গিয়েছে
        বারবার। জানি তুমি শুভ্রা রায় নও। ওরকমভাবে একঠায়ে
        সারাদিন মাথানিচু করে বসে থাকো। আমার চুলেতে পাক
        ধরে গেছে। শেখাও তোমার ভাষা এইবার। দেখি কীরকম
        ঠোঁট নড়ে। না্ভি খিল-খিল কেঁপে হেসে কুটি হয়। যুবকেরা
        ঘিরে থাকে বহুক্ষণ তোমায় আড়াল করে। কিসের কথা যে এতো হয়
        কিছুই বুঝি না। অন্তত কুড়ি বছরের ছোট হবে তুমি। ”
        ”তুমি শুভ্রা রায় নও” তো কে তুমি ? শুভ্রা রায় যদি নাই হয় কাকে খুঁজছেন কবি ? এই পর্বের প্রেমের কবিতাগুলি অনেক বেশি রক্তমাংসের ! অনেক অভিজ্ঞতার আঘাত ও রক্তপাতের উত্থান-পতনের সঙ্গী। ত্রিশ বছর পরে কবি কোন পুরনো শুভ্রা রায়কে খুঁজে পাননি, পেয়েছেন আজকের শুভ্রা রায়কে, যে শুভ্রা রায় অন্তত কুড়ি বছরের ছোট। মলয় তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন তাঁর চেয়ে প্রায় দুই দশক ছোটো মমতা অবস্হী নামে এক তরুণীর কথা, যিনি তাঁকে বিবাহিত জেনেও বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, এবং তরুণীটি তাঁর স্ত্রীকেও জানিয়েছিলেন যে তিনি মলয় রায়চৌধুরীকে বিয়ে করতে চান ; তার অন্যথা হলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। সেই তরুণী শেষ পর্যন্ত টয়লেটের অ্যাসিড পান করে আত্মহত্যা করেন। মলয় রায়চৌধুরীর প্রেমের কবিতাগুলিতে সেই ক্ষত ও হাহাকার লুকিয়ে থাকে।
        প্রেম হল ঋতুফসল ! ঋতুফসলকে দূর থেকে একইরকম দেখতে লাগে, একই অনুভূতিতে যেন তা ভরা থাকে। খুব নিকটে গিয়ে পর্যবেক্ষণ না করলে হয়তো ধরাও যায়নি যে প্রতিটি ফসলই স্বতন্ত্র। তাই তো আজকে যাকে খুঁজে পেয়েছেন কবি তিনি শুভ্রা রায় নন, তিনি মমতা অবস্হী, হয়তো ঋতুফসলের মতো একই অনুভূতি জাগছে, তবুও এই শুভ্রা আলাদা এক মমতাময়ী ! প্রেমের এই চিরন্তন যাওয়া-আসা থাকে, পুরনোকে সরিয়ে নতুন আসে। তাই তো জীবন ও মনের যৌথযন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত আমাদের কল্প-প্রেম-বাস্তবতা এসে জাগিয়ে রাখে, জাগিয়ে রাখে ঘুম থেকে। ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর মধ্যে দিয়ে যে শুভাকে প্রত্যক্ষ করেন পাঠক সেই নায়িকা কিন্তু আর তার পরের কবিতাগুলোয় এত তান্ডব নিয়ে ফিরে আসে না।যারা আসেন তাদের আবেদনে গড়িয়ে পড়ে সুরম্য লস্য, মমতাময়ীর রহস্য। মলয় রায়চৌধুরীর এই পর্বের লেখাগুলি যেন ‘ঘুম-স্বপ্ন-বাস্তব’ এই তিন আত্মনিষ্ঠুরতার অবস্থানের মধ্যে থেকে লেখা হয়েছে। প্রেম থেকে দূরত্ব গভীর হলে প্রতিটি কম্পাস ভুল সংকেত দেয়। আর একটা কবিতা একটু দেখা যাক-
        ”জরায়ুটা বাদ দিয়ে অমন আনন্দ কেন অবন্তিকা
        তাও এই গোরস্হানে দাঁড়িয়ে গাইছিস তুই
        মৃত যত প্রেমিকের গালমন্দে ঠাসা ডাকনাম
        যারা কৈশোরে তোর বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে
        ভুতুড়ে কায়দায় ঝুঁকে প্রেম নিবেদন করেছিল ?”
        জরায়ুহীন অবন্তিকাকে আমরা কি কেউ দেখিনি ? মলয় রায়চৌধুরী তাঁর ‘হাততালি’ কবিতটি যাঁকে উৎসর্গ করেছেন, তিনি মীরা বেণুগোপালন, মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিনই তাঁকে বলেছিলেন যে তাঁর জরায়ু নেই ! সেই মহিলার সঙ্গে মলয়ের সম্পর্ক কেমন হয়েছিল, কতোদিন ছিল, আমরা জানি না, কিন্তু সেও যে কোনো এক অবন্তিকার আড়ালে লুকিয়ে নেই তা কবিতার অন্তর্ঘাত থেকে পাঠক বুঝে যান।
        হাজার হাজার অবন্তিকা আমাদের খুশি রাখার জন্য রাত জাগেন, কনডোম পরিয়ে দেন যত্ন ক’রে। রেলব্রিজের তলা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কোনও অবন্তিকা হোক, বা নোংরা ঘরের মধ্যে এক হাতে মদ অন্য হাতে জলের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার অবন্তিকাকে তো জয়ায়ুহীন অবস্থায় দেখে অভ্যস্ত। জরায়ু থেকেও যাদের জরায়ু থাকে না, সেইসব অবন্তিকার কাছে কবি হাঁটুমুড়ে অভিবাদন জানান।
        ”যারা কৈশোরে তোর বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে
        ভুতুড়ে কায়দায় ঝুঁকে প্রেম নিবেদন করেছিল ?”
        এই তথাকথিত যারা একদিন ‘ভুতুড়ে’ কায়দায় প্রেম নিবেদন করেছিল, তাদের প্রতি কবি উষ্মা প্রকাশ করেন। এই অবন্তিকা তো শাশ্বত প্রেমিকা, মদের গ্লাসের সঙ্গে সঙ্গে যাদের প্রেমিক পরিবর্তন হয়। মলয় রায়চৌধুরী এইসব নগণ্য প্রেমিকাদের প্রতি যেন দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁর মনে সঞ্চারিত হয়েছে মানবীপ্রেমের। এই প্রেমের জয়পরাজয় নেই, মোহনার দিকে ভেসে যাওয়া আছে। সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে সময়কে চুমু খাওয়া সোজা ব্যাপার নয়। প্রেম হল সময়ের এক অঙ্গীকারপত্র। সেই প্রেমকে প্রকৃত কবিই গ্রহণ করতে পারেন, যদি তাঁর অন্তরের মন্দিরে জ্বালিয়ে রাখতে পারেন প্রদীপ।
        নামহীন বা নামযুক্ত নায়িকার প্রতি লেখা কবিতাই হোক না কেন, কোথাও যেন এসে মনে হয় এই তানিয়া, সোনালী, অনামিকা, কৃতী, অথবা অবন্তিকা সবাই যেন কোনো এক অদৃশ্য যোগসূত্রে গাঁথা একটি মালারই ফুল, যেন স্তরে স্তরে সাজানো একটিই প্রেমস্বরের বিভিন্ন সুর। অথচ কবি প্রতিটি কবিতায় বা বলা ভালো, প্রতিটি প্রেমিকার ক্ষেত্রে ন্যারেটিভ টেকনিক বা ভিন্ন আঙ্গিকের নিরীক্ষা করেছেন, যেন কবিতাই তাঁর আসল প্রেমিকা। প্রকৃতভাবে কবিকে চিনতে গেলে তাঁর কয়েকটি কবিতা নয়, বিচরণ করতে হয় একটি সম্পুর্ণ গোলক।
        মলয়ের উপন্যাসগুলোতে যে ভাবে তাঁর ব্যক্তিগত রহস্যময় জীবনের নারীচরিত্ররা ছায়া ফেলেছে, ঠিক সেভাবেই কবিতাও জারিত হয়েছে একই সম্মোহনে। “ভালবাসার উৎসব” কাব্যনাট্য বা “অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস” পড়লে দেখা যায়, যে-নায়িকারা রয়েছেন তাঁরা একজন আধচেনা পুরুষের হাত ধরেও বলতে পারেন,’চলুন পালাই’। সেই মমতা অবস্হীর ছায়া, যিনি মলয়ের হাত ধরে কোনো দূরপাল্লার বাস ডিপোতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘চলুন পালাই’।
        এই হাওয়াটাই দোলা দিয়ে গেছে তাঁর প্রেম সিরিজের কবিতাগুলোর মধ্যে। অদ্ভুতভাবে বাস্তবায়িত নায়িকা চরিত্রগুলোকে হাটে-মাঠে-ঘাটে এমন কি পাঠকের বুকের ভিতর খুবলে এনে হাজির করেছেন কবি তাঁর কবিতায়। এঁরা যেন কবির নিজস্ব সম্পত্তি নয়। কবি নিজেই কোথাও বলেছেন,অবন্তিকা একটি স্বনির্মিত প্রতিস্ব। এর আগে রামী, বনলতা, নীরা, সুপর্ণা ইত্যাদি ছিল কবিদের নিজস্ব নারী। অবন্তিকা সে রকম নারী নয়, সে স্বাধীন, হয়তো মীরা বেণুগোপালনের মতো। সে পাঠকের কাছে, আলোচকের কাছে, নির্দ্বিধায় হেঁটে যায়। অবন্তিকা কবির স্লেভগার্ল নয়। কবির লেখা ‘চলুন পালাই’ পর্ব থেকে প্রেম যত নির্লিপ্তির পথ ধরে যেতে চেয়েছে [ কবি স্বীকার করেছেন কখনো কখনো তাঁর জীবনে এই রোম্যান্টিক স্বত্ত্বাই তাঁকে বিপদে ফেলেছে বারবার] ততই যেন প্রেম আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে বাকশিল্পের মধ্যে দিয়ে নির্গমনের পথ খুঁজেছে কবিত্বের নির্বিবাদ আত্মা।
        মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা নিয়ে আলোচনার জন্য ক্ষুদ্র পরিসর যথেষ্ট নয়। আবার তা যদি প্রেমের কবিতা হয়, তাহলে তো আরও যথেষ্ট নয়। ঋতু বিবর্তনের মতোই ভালোবাসা বিবর্তনের মধ্যে চলা এই সময়ে, সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তার নষ্ট পরিবেশে মানুষকে ভালোবাসার কাছে ফেরত পাঠানো মোটেও সহজ নয়। মলয় এই পরমাণু-গন্ধ সময়ে, বয়সকে দুই তুড়ি মেরে সেই ঐশ্বরিক ভালোবাসার কাছে সঁপেছেন আত্মাধ্বনিকে। তারপরে ফাঁসির আসামীর মতো বয়ে নিয়ে চলেছেন ভালোবাসার সেই নবজন্ম ঐতিহ্যকেই। একদিন একদিন করতে করতে মানুষের বয়স বেড়ে যায়। আর দেখতে পায়, তার সঙ্গে জড় হয়েছে পার্থিব সম্পদ। কিন্তু নিঃশব্দে ভালোবাসা দূরে সরে গিয়েছে মানুষের থেকে। মলয় রায়চৌধুরী সেই ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন জীবনের মধ্যে, দিতে চেয়েছেন বাঁচার প্রকৃত স্বাধীনতা, কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের সামনে শ্রীকৃষ্ণের মুখগহ্বরের আলোকোজ্বল বার্তা।
         
         
         

         

      • কলিম খান | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:০৭735103
      • মলয় রায়চৌধুরী : এক রাজদ্রোহী রাজকুমারের কাহিনি : কলিম খান
        প্রথম পর্ব : ষড়যন্ত্র : মারণ
        ( কোরাণ ও গীতা : পুনঃপাঠ )
        মহম্মদ কহিলেন : হে আবুবক্কর ! মদিনা হইতে এই বিশাল সৈন্যবাহিনী লইয়া যে উদ্দেশ্যে হেথায় আসিয়াছি, তাহা বুঝি আর সফল হইল না। দেখো, সন্মুখসমরে আজ আমারই কোরেশ বংশের বংশজগণ। আর দেখো, উভয় সেনার মধ্যে আমারই পিতৃব্যগণ পিতামহগণ আচার্য্যগণ মাতুলগণ ভাতৃগণ পুত্রগণ পৌত্রগণ মিত্রগণ শ্বশুরগণ সুহৃদগণ অবস্হান করিতেছেন। আমি কাহাকে হত্যা করিব ? হে আবুবক্কর ! যুদ্ধেচ্ছু এই সকল স্বজনদিগকে সন্মুখে অবস্হিত দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন হইতেছে এবং মুখ শুষ্ক হইতেছে। ইহা সত্য যে, ৩৬০টি প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়া ইহারা যুগযুগান্ত ধরিয়া আরববাসীগণকে প্রতারিত করিতেছে, আর ওই প্রতীকগুলির সাহায্যে পুরাতন জীবনব্যবস্হায় তাহাদিগকে মোহগ্রস্হ করিয়া রাখিয়াছে, তাহাদের ধনসম্পদ ভোগ করিতেছে। ইহাও সত্য যে, আমি এই বংশেরই এক কনিষ্ঠতম ও অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার। তথাপি এক্ষণে ইহাদিগকে সমরাঙ্গনে সন্মুখস্হ দেখিয়া আমার হস্তপদ অবসন্ন হইয়া আসিতেছে।
        আবুবক্কর কহিলেন : অয় মুহম্মদ ! এই সঙ্কট সময়ে স্বর্গহানিকর অকীর্তিকর তোমার এই মোহ কোথা হইতে উপস্হিত হইল ? এ যুদ্ধ স্বার্থপ্রণোদিত নহে, ইহা জেহাদ, ধর্মযুদ্ধ। হে পরন্তপ ! তুচ্ছ হৃদয়ের দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও ! জেহাদ অপেক্ষা ইমানদার মোমিনের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছুই নাই। হে ধনঞ্জয় ! এই যুদ্ধ জগৎপিতার নিয়মে স্বয়ং উপস্হিত হইয়াছে। ইহা আমাদের নিমিত্ত জন্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করিবে। অতএব যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও। অন্যথায় মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয়বশত যুদ্ধে বিরত হইতেছ, দয়াবশত নহে। সুতরাং যাহারা তোমাকে বহু সন্মান করেন, তাহাদিগের নিকট তুমি লঘুতাপ্রাপ্ত হইবে। তোমার শত্রুরাও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া অনেক অবাচ্য কথা বলিবে। তাহা অপেক্ষা অধিক দুঃখকর আর কী আছে ? এক হস্তে অধর্মের বিনাশ ও অপর হস্তে ধর্মের প্রতিষ্ঠা নিমিত্ত তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ধর্মভ্রষ্টদিগকে হত্যা করিতে দ্বিধা কিসের ? সুতরাং হে সব্যসাচী, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া উথ্থান করো।
        সব্যসাচী কহিলেন : ইহা সত্য যে, ইহারা ধর্মভ্রষ্ট। এই কৌরবগণ আমাদিগের ন্যায় ইক্ষাকু বংশজ হইলেও ইহারা ধর্মের অমর্যাদা করিয়াছে। প্রজাপালন বিষয়ে ইহাদিগের দুঃশাসনের কোনও সীমা নাই। ইহাও সত্য যে, আমরা এই বংশেরই অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এই রাজবংশের দুয়ো-রাজকুমার এবং ইহারা আমাদিগকে আশৈশব প্রবঞ্চনা করিয়া আসিতেছে, সাধারণ প্রজাদিগের তো কথাই নাই। সেই হেতু ধর্মপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই ইহাদিগকে ক্ষমতাচ্যুত করা প্রয়োজন। কিন্তু এতৎসত্বেও, স্বজন ও গুরুজনদিগকে বধ করিয়া কীরূপে প্রাণধারণ করিব, এইরূপ চিন্তাপ্রযুক্ত হইয়া চিত্তের দীনতায় আমি অভিভূত হইতেছি। প্রকৃত ধর্ম কী, এ বিষয়ে আমার চিত্ত বিমূঢ় হইতেছে। ধর্মপ্রতিষ্ঠার নিমিত্ত এ আমি কাহার হত্যাকারী হইতে চলিয়াছি ? অতএব হে কৃষ্ণ ! যাহাতে শুভ হয়, আমাকে নিশ্চিত করিয়া তাহা বলো !
        শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন : প্রকৃতপক্ষে তুমি কাহারও হত্যাকারী নহ। স্বজন বা গুরুজন যাহাই হউন, যাহারা অন্যায়কারী, প্রজাবৃন্দের প্রতি নির্দয়, অচলায়তন রূপে সমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাঁহারা ধর্মভ্রষ্ট হইয়াছেন। কাল সমুপস্হিত হইলে স্বয়ং শিব ধর্মভ্রষ্টদিগের মহিমাহরণ করিয়া তাহাদিগকে হনন করিয়া রাখেন। এক্ষেত্রেও তাহাই হইয়াছে, তুমি নিমিত্তমাত্র। সত্যের জন্য, ধর্মের জন্য, স্বজন ও গুরুজনদিগের উপর বাণনিক্ষেপ করিলে কদাচ অধর্ম হয় না। সুতরাং, তুমি নিঃসংশয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। যাহারা সত্যের নিমিত্ত ধর্মের নিমিত্ত পিতৃব্য ও পিতামহ প্রভৃতি স্বজনগণকে নিকেশ করিতে দ্বিধা করেন না, তাহারাই প্রকৃত ধার্মিক। ইতিহাস তাহার সাক্ষী। অতএব, হে পাশুপতধারী মোমিন ! হে দুয়ো-রাজকুমার ! হে বংশদ্রোহী! তুমি যুদ্ধ করো।
        দ্বিতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : মোহন
        ( দেবীপুরাণ : পুনঃপাঠ )
        ঋষিগণ কহিলেন : হে পণ্ডিতপ্রবর ! যথার্থ পথপ্রদর্শক নেতাই গুরুপদবাচ্য। তাঁহাকে সম্যকরূপে অবগত না-হইয়া তাঁহার অনুসরণ করা উচিত নহে। ইহা জানিয়াও অসুরগণ কী প্রকারে ভুল নেতৃত্বের দ্বারা প্রবঞ্চিত হইলেন, এক্ষণে সে বিষয়ে আমাদিগের কৌতূহল নিবারুণ করুন।
        বৈশ্যম্পায়ন কহিলেন : বৃহস্পতি ও শুক্রাচার্য উভয়েই ভৃগুর সন্তান হইলেও তাঁহাদের অভিমত ভিন্ন ছিল। সেই কারণে সুরাসুর সংগ্রামে তাঁহারা যথাক্রমে দেবতা ও অসুরগণের পরামর্শদাতারূপে তাহাদের গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন।
        একদা অসুরগণকে সংযত থাকিতে বলিয়া শুক্রাচার্য্য তপস্যার উদ্দেশ্যে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করিলেন। একথা জানিতে পারিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি স্বল্পকাল অতিবাহিত হইলে শুক্রাচার্য্যের রূপ ধারণপূর্বক তথায় উপস্হিত হইলেন। তাঁহাকে সমুপস্হিত দেখিয়া অসুরগণ তাঁহাদিগের গুরুদেব প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন, এইরূপ প্রত্যয় করিল এবং তাঁহাকে পাদ্য অর্ঘ্য দানে যথাবিহিত সন্মান প্রদর্শনপূর্বক তাঁহার উপদেশের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল। অনন্তর শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি তাহাদিগকে বলিলেন, বৈরিতা কুলক্ষয়ের কারণ। বৈরিতার কারণ বাসনা, অতএব বাসনা পরিত্যাগ করো। বাসনা না থাকিলে কেহই তোমাদিগকে বশীভূত করিতে পারিবে না। অতএব তোমরা বাসনামুক্ত হও, মস্তকমুণ্ডনকরতঃ গৈরিক বস্ত্র ধারণ করিয়া আচারনিষ্ঠ হও। আচারনিষ্ঠগণকে দেবতাও জয় করিতে পারিবে না। গুরুদেবের আদেশ শিরোধার্য করিয়া অসুরগণ তাহাই করিতে লাগিলেন। ইহার ফলে তাহাদিগের হৃদয় হইতে অসূয়াভাব ক্রমে তিরোহিত হইতে লাগিল।
        ইট্যবসরে, দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্য তাঁহার তপস্যা সমাপনান্তে তথায় সমাগত হইলেন। দেবগুরু বৃহস্পতিকে অসুরগণের গুরুপদে অধিষ্ঠিত দেখিয়া তিনি যারপরনাই বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া অসুরগণকে কহিলেন--- এ কাহাকে তোমরা আমার আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছ ? ইনি যে দেবগুরু বৃহস্পতি, তাহা কি তোমরা উপলবদ্ধি করিতে পারো নাই ? তোমাদিগকে বিপথগামী করিবার জন্য আমার অনুপস্হিতির সুযোগ গ্রহণ করিয়া এ প্রবঞ্চক তোমাদিগের সহিত প্রতারণা করিয়াছে। ইনি আমাদিগের ন্যায় স্বর্গদ্রোহী নহেন। তোমাদের নেতার আসন গ্রহণ করিয়া তোমাদের সংগ্রামকে ধ্বংস করাই এই প্রতারকের একমাত্র উদ্দেশ্য।
        ইহা শুনিয়া শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি কহিলেন : হে অসুরগণ! অবধান করো ! আমার উপদেশে তোমরা অজেয় হইতে চলিয়াছ দেখিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি তোমাদিগকে প্রতারণা করিবার উদ্দেশ্যে এক্ষণে আমার রূপ ধারণ করিয়া তোমাদিগের সন্মুখে উপস্হিত হইয়াছেন। ইনি দেবগুরু বৃহস্পতি। অবিলম্বে ইহার মুখে চুনকালি দিয়া গর্দভের পৃষ্ঠে আরোহন করাইয়া পশ্চাতে হ্ল্লা লাগাইয়া দাও এবং বিতাড়ন করো। অসুরগণ তাহাই করিল।
        কিয়ৎকাল অতিবাহিত হইলে, অসুরগণ একদিন হৃদয়ঙ্গম করিল, তাহারা প্রবঞ্চিত হইয়াছে। কিন্তু তখন তাহাদিগের আর কিছুই করিবার রহিল না।
        এইভাবে অসুরগণ ছদ্ম-দেবদ্রোহীকে তাহাদের নেতারূপে বরণ করিয়া মোহগ্রস্ত হইয়াছিল এবং সম্পূর্ণরূপে প্রবঞ্চিত হইয়াছিল।
        তৃতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : স্তম্ভন
        ( মুক্তধারা : পুনঃপাঠ )
        এক যে ছিল রাজা। তার ছিল দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। সুয়োরানি সুখে থাকে রাজপ্রাসাদে আর দুয়োরানি থাকে বনের প্রান্তে, ছোট নদীর ধারে, কুঁড়ে ঘরে। দুয়োরানির ছেলে সেই নদীতে নৌকাবায়। পারানির কড়িতে তাদের দিন কাটে। কিন্তু একদিন তার সাধের নদী শুকিয়ে গেল। কারণ, দেশের রাজ-বিভূতি বাঁধ বেঁধেছেন। কেবল জলধারা নয়, ঈশ্বরের করুণার সকল ধারার সামনেই বাঁধ বেঁধেছেন তাঁরা। লোকে বিস্বাসই করতে পারল না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন, কোনও মানুষ তা বন্ধ করতে পারে। কিন্তু বন্ধ হল, করুণাধারার সব শাখাই ক্রমশ শুকোতে লাগল, আর প্রজাদের জীবন উঠল অতীষ্ঠ হয়ে। এদিকে একদিন দুয়োরানির ছেলে জানতে পারল সে রাজপুত্তুর। সে গেল রাজার কাছে, বললে, রাজপুত্রের অধিকার চাইনে। কেবল ঈশ্বরের করুণাধারার সামনে দেয়া তোমাদের ওই বাঁধগুলো খুলে দাও, এই প্রার্থনা। শুনে সুয়ো-রাজপুত্রেরা অবাক হলো। তারা সেপাই ডাকল, সান্ত্রী ডাকল। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে রাজবাড়ি থেকে বার করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায়।
        ধুলো ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর গেল শিবতরাইয়ের প্রজাদের কাছে। সেখানে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। সে দেখল, ধনঞ্জয় বৈরাগীর ছদ্মবেশে সুয়োরানির এক ছেলে। আর, তার পেছনে শিবতরাইয়ের মানুষগুলো চলেছে মুক্তধারার বাঁধ ভাঙতে। তখন সেই দুয়ো-রাজকুমার সবাইকে ডেকে বলতে লাগল, ওই বৈরাগী আসল বৈরাগী নয়, ও তো ছদ্মবেশী সুয়ো-রাজকুমার, ও তোমাদের ঠকাবে। এক নদীর মুখেই ওরা বাঁধ বাঁধেনি। সর্বহারার মুখেই ওরা বাঁধ বেঁধেছে। সেগুলি ভাঙতে হলে, তাদের রহস্য জানতে হবে। সেসব আমি জেনে এসেছি। আমার কথা শোনো। কিন্তু দু'চারজন আধপাগলা ছাড়া কেউ তার কথায় কান দিল না।
        কথাটা গেল মিথ্যে-বৈরাগীর কানে, সে বললে -- ওটা বদ্ধ পাগল। ছন্নছাড়া। খেতে পায়না, হাংরি, তাই মিথ্যে কথা বলে। ওর মুখে চুনকালি মাখিয়ে গর্দভের পিঠে চড়িয়ে পিছনে ভিড়ের হল্লা লাগিয়ে দাও। মজা পেয়ে প্রজারা তাই করলে।
        এরপর গাধার পিঠে সওয়ার দুয়ো-রাজকুমারের আর কিছুই করার রইলো না। তাই সে কেবল চিৎকার করে। চিৎকারের জন্য চিৎকার। চিৎকারের ভিতরে চিৎকার। চিৎকার করতে করতে একদিন সে বিস্মৃতিলোকে চলে গেলো।
        তারপর অনেকদিন কেটে গেলে, শিবতরাইয়ের প্রজারা বুঝল তারা ঠকেছে। অতএব, তারা খোঁজ করতে লাগল সেই দুয়ো-রাজকুমারের, যে জানত সব বাঁধের রহস্য। কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না। তখন যে আধপাগলারা সেসময় তার কথা শুনেছিল মন দিয়ে, তাদেরকে ধরা হলো। বাঁধ ভাঙার রহস্য ওই আধপাগলারা দুয়ো-রাজকুমারের কাছ থেকে জেনে-বুঝে নিয়েছিল কি না, সেটা জানার জন্য। কিন্তু কেউই সেসব কথা ঠিকঠাক বলতে পারল না।
        রাজপ্রাসাদ থেকেও দুয়ো-রাজকুমারের খোঁজখবর করা হলো। কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না, পাওয়া গেল তার গাধাটাকে। তাকেই নিয়ে এসে ফুলমালা দিয়ে চন্দনের টিপ পরিয়ে রাজসভায় আনা হলো। রাজা সেই গাধাটাকেই শিরোপা দিলেন আর রাজপুরোহিত দিলেন আশীর্বাদ। সবাই বলে উঠল -- সাধু, সাধু !
        চতুর্থ পর্ব : ষড়যন্ত্র : বিদ্বেষণ
        ( অভিচারতন্ত্র : পুনঃপাঠ )
        মানুষের উপর মানুষের চড়ে বসাকে বলা হয় 'অভিচরণ' বা 'অভিচার'। আদিকালে সর্বপ্রথম যে-পদ্ধতির সাহায্যে এই কর্মটি করা হতো, তাকে বলা হতো 'শ্যেনযাগাদি' অর্থাৎ অন্য গোষ্ঠীর লোকেদের উপর দলবদ্ধ লুঠতরাজ বা ছিনতাই। তবে সে সবই ছিল সাময়িক। তার সাহায্যে বহুকালের জন্য বা চিরকালের জন্য কারও উপর চেপে বসা যেত না। সেই উদ্দেশ্যে একদিন ভারতবর্ষ আবিষ্কার করে এক অভিনব প্রক্রিয়া ---'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ'। এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে সমাজের স্বাভাবিক জ্ঞানপ্রবাহের উপর বাঁধ বাঁধা হয় ও বৈদিকযুগের সূত্রপাত করা হয়। এটিই পৃথিবীর প্রথম বাঁধ ও আদি বাঁধ। ঈশ্বরের করুণার অন্যান্য ধারাগুলিকে বাঁধ বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করার কথা তখনও ভাবা হয়নি।
        তা সে যাই হোক, সেই 'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ' উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি বলে এখনও আমরা 'বড়ো শত্রুকে উঁচু পিঁড়ি' দিই ; যার সর্বনাশ করা দরকার তার মূর্তি গড়ে পূজা করি ও তার নীতি অমান্য করি এবং এভাবেই আমরা আজও শিব রাম গান্ধী মার্কস রবীন্দ্রনাথের পূজা করি ও তাঁদের নীতি অমান্য করে থাকি।
        দুষমনকে 'পূজা করে মেরে ফেলার' এই বৈদিক নীতির বিপরীতে একসময় তান্ত্রিক নীতিরও জন্ম হয় এই ভারতবর্ষেই। 'নিয়ন্ত্রণসাধন'কে তখন বলা হতিও যন্ত্র, যা দিয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হতো, ঘাড়ের উপর চেপে বসা ক্ষমতাকে উৎখাত করার চেষ্টা চালানো হতো। তান্ত্রিকেরা শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় হিসেবে ছয় রকম 'নিয়ন্ত্রণসাধন' বা যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন--- মারণ, মোহন, স্তম্ভন ( শত্রুকে স্ট্যাগন্যান্ট করে দেয়া ), বিদ্বেষণ ( ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল ), উচ্চাটন ( স্বদেশভ্রংশন বা শত্রুকে তার কনটেক্সট থেকে উৎখাত করে দেয়া ) ও বশীকরণ। এই যন্ত্রগুলি প্রধানত বাঁধ ভাঙার কাজেই ব্যবহৃত হতো। বৈদিকদের পূজা করে মেরে ফেলার বিপরীতে তান্ত্রিকেরা এই ছয় রকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন বলে, বৈদিকপন্হীদের কালচারে এই 'ষড়যন্ত্র' ঘৃণ্য ও নিন্দাজনক হয়ে যায় এবং আধুনিক যুগে পৌঁছে পরিণত হয় 'কন্সপিরেসি'তে, যদিও তান্ত্রিক কালচারে 'ষড়যন্ত্র' যথারীতি প্রশংসাযোগ্য ও গৌরবজনক হয়েই থেকে যায়। অর্থাৎ কিনা, ভারতের তান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসারে ষড়যন্ত্রের প্রয়োগ অত্যন্ত ভালো কাজ এবং তা আদৌ কন্সপিরেসি নয়।
        তবে নিয়ন্ত্রণসাধনের এই চর্চা এখানেই থেমে থাকেনি। যুগ বহুদূর এগিয়ে চলে এসেছে, যন্ত্রকে করে তোলা হয়েছে 'মোস্ট সফিসটিকেটেড', ক্ষমতা হয়েছে নিরঙ্কুশ। শাসক ও বিদ্রোহীর হাতে ওইসকল যন্ত্রের বিপুল বিকাশ ঘটেছে। বিকাশ ঘটেছে শাসক এবং বিদ্রোহীরও। এখন শাসকের বহু রূপ, বহু সুয়ো ; বিদ্রোহীরও বহু রূপ, বহু দুয়ো। বহু ক্ষেত্রে শাসকই বিদ্রোহীর পোশাক পরে নেয়, কোনও কোনও দুয়ো ভুয়ো-বিদ্রোহী হয়ে সুয়োর দলে ভিড়ে যায়। তাছাড়া, এখন বাঁধের সংখ্যাও প্রচুর, যত ধারা ততো বাঁধ, বাঁধের নিচে বাঁধ, উপরে বাঁধ, সাপোর্টিং বাঁধ, কতো কী ! এমনকি লোকদেখানো মিথ্যে বাঁধও রয়েছে, বিদ্রোহী জনগণের আক্রোশ যার উপর ফেটে পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, ডায়লুট ও ডাইভার্টেড হয়ে যেতে পারবে, অথচ প্রকৃত বাঁধটা থেকে যাবে অক্ষত।
        আরও আছে, এখনকার প্রতিটি বাঁধের পাথরপ্রতিমার রূপগুণও ভিন্ন ভিন্ন, পৃথক পৃথক স্পেশালিস্ট বা দক্ষ বিভূতিদের দিয়ে বানানো। এসব বাঁধ ভাঙতে গেলে বিদ্রোহীদেরও ভিন্ন ভিন্ন শাখার স্পেশালিস্ট হতে হয়, দক্ষ হতে হয়, অনেক তপজপ করতে হয়। কেননা এমন ব্যবস্হা করে রাখা হয়েছে যাতে কৃষিবিজ্ঞানী সাংস্কৃতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন, জীববিজ্ঞানী রাজনৈতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন...ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ প্রতিটি বাঁধই সেই সেই বিষয়ের প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে গড়া। তাই, একালে একজন দুয়ো-রাজকুমারে কিছুই হবার নয়। যতোগুলি বাঁধ, বলতে গেলে ততোজন দক্ষ দুয়ো-রাজকুমার লাগে সেগুলি ভাঙবার আয়োজন করতে।
        তাই একালে দুয়ো-রাজকুমারের সংখ্যাও খুব কম নয়। এর ভিতর আবার জালি দুয়ো-রাজকুমার তো রয়েছেই। তার ওপর, কখনও বা কোনও কোনও দক্ষ দুয়ো-রাজকুমারকে রাতারাতি ফুটপাত বদল করতেও দেখা যায়। অবশ্য তার জন্য তাদের ফ্ল্যাট নিতে হয় 'কনখল'-এ। 'কনখল' সেই বিখ্যাত কমপ্লেক্স, যেখানে দাঁড়িয়ে আদি দক্ষ বলেছিল, 'কৌ ন খল অর্থাৎ কে খল নহে ? সব্বাই খল। অতএব আমিও কেন খল হবো না ?' এই বলে, সেও খল হয়ে যায়। সেই জন্য, সেই ভিত্তিভূমির নাম হয়ে যায় 'কনখল'। এলাকার ফুটপাত-বদল-পারদর্শী দক্ষেরা সেই কমপ্লেক্সে আশ্রয় নিয়ে ঘোষণা করে, 'কে খল নহে ? সব্বাই খল। কেউ কথা রাখেনি। অতএব আমিও কথা রাখব না। ' ---এই বলে তারা সুযোগ পাওয়া মাত্রই সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে যায়। তাই প্রকৃত বিদ্রোহী দুয়ো-রাজকুমারকে চিনতে পারা এযুগের এক কঠিন সমস্যা।
        আবার বাঁ৭ ভাঙার ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা। পালটা প্রতীকের পাথরপ্রতিমা না বসিয়ে বাঁধের বর্তমান পাথরকে সরানোর কোনও উপায় রাখা হয়নি। আর সেটা করতে গেলেই নতুন প্রতীকের বাঁধ নির্মিত হয়েযায়। ফলে, যে ভাঙতে আসে, দেখা যায়, পাকে চক্রে সে আগের বাঁধ ভেঙে তার স্হানে নতুন আর একটা বাঁধ বেঁধে ফেলেছে নিজের অগোচরেই।
        এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে, সাম্প্রতিক কালের অধুনান্তিক ( পোস্টমডার্ন ) তান্ত্রিক বিদ্রোহীরা একটি অভিনব পন্হা উদ্ভাবন করেছেন। বাঁধের উৎখাতযোগ্য পাথরপ্রতিমাকে অত্যন্ত স্বল্পায়ু প্রতীক দিয়ে সরিয়ে ফেলা। এ যেন মানববোমা। উদ্দিষ্ট প্রতীকটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নিজেও মরে যাবে। এমন জ্ঞানের ব্যবহার, যা পুরোনো জ্ঞানকে মেরে ফেলবে অথচ নতুন 'জ্ঞানের বোঝা' হয়ে দেখা দেবে না।
        পঞ্চম পর্ব : যড়যন্ত্র : উচ্চাটন
        ( অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং : অ্যান আইটি এক্সপ্লোর )
        সবাই জানেন কমপিউটারের দুনিয়ায় উইনডোর নানা ভারশন প্রকাশিত হয়েছে। উইনডো ৯৫, উইনডো ০৭, উইনডো ৯৮ ভারসন ১, উইনডো ৯৮ ভারসন ২, উইনডো মিলেনিয়াম ভারসন ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে যেটা অনেকেই নজর করেননি, তা হল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতারও অনেকগুলি ভারসন আমাদের মার্কেটে চালু আছে। প্রতিটি ভারসনের আবার অনেকগুলি করে এডিশন রয়েছে। যার যেটা পছন্দ তিনি সেটা কেনেন, ব্যবহার করেন। ক্রেতার অবগতির জন্য এখানে কয়েকটি ভারসনের একটি করে এডিশন-এর অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হল।
        ষষ্ঠ পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ১
        ( লঞ্চড বাই শিবশম্ভু পাষণ্ড/সনাতন এডিশন )
        ইট ইজ আ প্রিমিটিভ এডিশন অ্যান্ড প্রেজেন্টলি নট অ্যাভেলেবল ইন দ্য মার্কেট।
        সপ্তম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ২
        ( লঞ্চড বাই বাল্মীকি/চণ্ডাশোক এডিশন )
        ১) শাসক...ব্রাহ্মণ
        ২) শাসিত...ক্ষত্রিয় বৈশ্য শুদ্র ও অন্যান্য ম্লেচ্ছ সম্প্রদায়
        ৩) বিরোধের কারণ...সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ
        ৪) বাঁধের কারিগর...কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস ও তাঁর শিষ্যগণ
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...সামাজিক প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...রাবণ অ্যাসোশিয়েটস
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...বিভীষণ
        ১০) বিদ্রোহের নেতা...দাশরথীগণ
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...রাম নাম সত্য হ্যায়
        ১৩ ) আধপাগলা...জটায়ু
        ১৪ ) গাধা...হনুমান
        অষ্টম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৩
        ( লঞ্চড বাই কে.ডি.বেদব্যাস/রিঅ্যাকটিভ এডিশন )
        ১) শাসক...দেবগণ
        ২) শাসিত...অসুরগণ
        ৩) বিরোধের কারণ...সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ
        ৪) বাঁধের কারিগর...বিশ্বকর্মা
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...সামাজিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...গন্ধর্বগণ
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...শঙ্করাচার্য
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...কুমারিল ভট্ট
        ১০ ) বিদ্রোহের নেতা...জরৎকারুপুত্র আস্তীক
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১২ ) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...চাতুর্ব্বর্ণ্যব্যবস্হানং যস্মিন দেশে প্রবর্ততে। আর্যদেশঃ স বিজ্ঞেয়
        ১৩ ) আধপাগলা...লোমশ মুনি
        ১৪ ) গাধা...যাদবগণ
        নবম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৪
        ( লঞ্চড বাই কার্ল মার্কস/প্যারি কমিউন এডিশন )
        ১) শাসক...সহস্রমুখ বুর্জোয়া
        ২) শাসিত...সর্বহারা শ্রমিক কৃষক পেটিবুর্জোয়া শ্রেণি
        ৩) বিরোধের কারণ...কেবলমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধগুলি
        ৪) বাঁধের কারিগর...যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...বন্দুকের নল। পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...সাম্রাজ্যবাদী নবীন বুর্জোয়া/প্রতিবিপ্লবী
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...ডিক্লাসড ( অবক্ষিপ্ত ) বুদ্ধিজীবী
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...পাতিবুর্জোয়া
        ১০ ) বিদ্রোহের নেতা...কমিউনিস্ট বিপ্লবী
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...অতিবিপ্লবী
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...ইনকিলাব জিন্দাবাদ/জাগো জাগো জাগো সর্বহারা
        ১৩) আধপাগলা...কমিউনিস্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মী
        ১৪ ) গাধা...একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট কর্মী ( শ্রমিক কৃষক )
        দশম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৫
        ( লঞ্চড বাই রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোর/সেকেন্ড ওয়র্ল্ড ওয়ার এডিশন। )
        ১) শাসক...রাজা রণজিৎ
        ২) শাসিত...উত্তরকূট ও শিবতরাইয়ের প্রজাবৃন্দ
        ৩) বিরোধের কারণ...মুক্তধারার উপর নির্মিত বাঁধ
        ৪) বাঁধের কারিগর...যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...ছিদ্রস্হানে আঘাত
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...'স্বজনবিদ্রোহী' খুড়ো বিশ্বজিৎ ও যুবরাজ অভিজিৎ
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১০) বিদ্রোহের নেতা...ধনঞ্জয় বৈরাগী
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...বাঁধ ভেঙে দাও বাঁধ ভেঙে দাও দাআআআআও
        ১৩) আধপাগলা...গণেশ
        ১৪ ) গাধা...সঞ্জয়
        একাদশতম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৬
        ( লঞ্চড বাই পবং এক্সক্লুসিভস / লেটেস্ট এডিশন )
        ১) শাসক...প্রগতিশীল ( মার্কসবাদী, কমিউনিস্ট, বিপ্লবী)
        ২) শাসিত...জনগণ
        ৩) বিরোধের কারণ...সর্বহারার মুখে নির্মিত বাঁধসমূহ
        ৪) বাঁধের কারিগর...প্রত্যেক ধারার নিজ-নিজ যন্ত্ররাজ বিভূতি ও তত্তদ সন্ন্যাসীর দল
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...তত্তদ ধারার নিজস্ব প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...ছিদ্রস্হানে আঘাত। সেই ধারার পালটা প্রতীক দিয়ে প্রতীকবদল।
        ৭ ) সুয়ো-রাজকুমার...বাবুবংশের উত্তরাধিকারীগণ, বাবুভায়াগণ
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী, নকশাল, বিচ্ছিন্নতাবাদী, পোস্টমডার্ন ইত্যাদি
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী
        ১০) বিদ্রোহের নেতা...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী, অতিবিপ্লবী, উগ্রপন্হী
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...কে চেল্লায় শালা, কে চেল্লায় এই ভোরবেলা
        ১৩ ) আধপাগলা...শম্ভু রক্ষিত অ্যান্ড অ্যাসিসিয়েটস
        ১৪ ) গাধা...সেকেন্ড লাইন হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী ও নকশাল এবং ফোর্থ লাইন মার্কসবাদী
        দ্বাদশতম পর্ব : 'প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : মিলেনিয়াম ভারসন'
        ( দিস প্রডাক্ট ইজ নাউ অ্যাবানডন্ড। অ্যাকর্ডিং টু কমপিউটার ইনজিনিয়ার্স, দ্য এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং ইজ বিকামিং অবসলিট ইন দ্য প্রেজেন্ট কনটেক্সট। )
        বলে রাখা ভালো, এই অ্যান্টি-এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং স্বভাবতই ভালনারেবল। কোনো অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবস্হাই একে বাঁচানোর ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি। অর্থাৎ এই প্রোগ্রাম আদৌ ভাইরাসপ্রুফ নয়। যখন তখন ক্র্যাশ করে যায়। এই প্রোগ্রামিং যে আজকাল আর তেমন বিকোচ্ছে না, সেটাই তার অন্যতম কারণ।
        আরও কারণ আছে। আজকের মানবসমাজ একাকারের যুগে পা রেখে ফেলেছে। ফলে, শাসক-শাসিতের অ্যান্টাগনিজম ক্রমশ কমপ্লিমেন্টারির দিকে টাল খেয়ে যাচ্ছে। গোটা ব্যবস্হাটা, তার সমগ্র প্রেক্ষাপট, সবই 'এফেক্টিভ ফ্যাক্টর' রূপে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মানবসমাজ, জীবজগৎ ও জড়জগৎকে নিয়ে যে-সমগ্রব্যবস্হা, সেটি ঠিক থাকছে কি না, মানব সভ্যতার অস্তিত্বের পক্ষে অনুকূল থাকছে কি না, সেসব কথাও আজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ প্রচলিত ধনতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্হাগুলি এই পরিস্হিতির তুলনায় সেকেলে হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান-এর মতে, ...neither greedy capitalists nor dogmatic communists have sufficient respect for the larger system of which we are merely a part. স্বভাবতই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংগুলিও আজকের প্রেক্ষিতে সেকেলে হয়ে গেছে। সন্মুখস্হ পরিস্হিতির বিচার বিবেচনা করে আজকের দিনের পোস্টমডার্ন চিন্তাবিদরা এমন অদ্বৈত প্রোগ্রামিং-এর কথা ভাবতে শুরু করেছেন, যা বদ্ধধারাগুলিকে কেবল মুক্তধারাতেই পরিণত করবে না ; সমগ্র ব্যবস্হাটিকেও আরও সুসংহত করবে। আর, সেটা করতে গিয়ে তাঁরা বিগত যুগের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংসমূহের সমস্ত অর্জনগুলিরও সারসংগ্রহ করে নিচ্ছেন।
        সংগৃহীত ও সারে কী রয়েছে ? শাসক-শাসিতের ( পুরুষ-প্রকৃতির, কনটেন্ট-ফর্মের ) দ্বৈতাদ্বৈত অস্তিত্বের পরিবর্তনের মূল যে-কারিকা, তার সরবরাহ ঘটে শাসিতের তরফ থেকে নয় ; শাসকের তরফ থেকেই। শাসিত তো শাসকের বিরোধী হয়ে থাকেই। কিন্তু তাতে কিছু হয় না। যে গোপন কথাগুলির ওপর ক্ষমতা টিকে থাকে, তার সব কথা শাসিতেরা কখনও জানতে পারে না বলেই শাসন সম্ভব হয়। জানতে পারে তারাই যারা ওই প্রাসাদের অংশ, উত্তরাধিকারী। সেই কারণে দলছুট প্রাসাদত্যাগী দুয়ো-রাজকুমারেরা বিদ্রোহীর দলে যোগ না দিলে কোনও রাজপ্রাসাদেরই পতন সম্ভব নয় ; এটাই ছিল এতদিনের অঙ্ক। তাই শাসনের সমস্ত খেলাই এতদিন ছিল ওই বিদ্রোহী রাজকুমারের আসনটিকে ঘিরে। কারণ তার ভূমিকার ওপরই নির্ভর করত ব্যবস্হাটি বদলাবে কি না। সেই কারণে দুয়ো-রাজকুমারের তপস্যা ভেস্তে দেওয়ার খেলা, তার ভূমিকাকে নানাভাবে বিগড়ে দেয়ার খেলাই ক্ষমতার অন্যতম খেলা ছিল। সেই কারণে, বিদ্রোহী নেতা ও দুয়ো-রাজকুমারকে আগেভাগে গুমখুন করে তার আসনটি শাসকই ছদ্মবেশীদের বসিয়ে দখল করে রেখে দিত। কিন্তু সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সির ডাক দিয়ে বিশ্বের সমস্ত দুয়ো-রাজকুমারেরা ক্ষমতার সেই সব খেলাই ভেস্তে দিয়েছে, দিচ্ছে। এখন কেবল ডিসক্লোজ করে যাও। কেবল মেলে ধরা, যাতে সবাই সবকিছি দেখতে পায়। এতে শাসক-শাসিতের পরিচালক-পরিচালিতে উন্নীত না হয়ে কোনও উপায়ই থাকে না। শাসন অবসানের এযুগের এই পথ।
        ত্রয়োদশতম পর্ব : 'ষড়যন্ত্র : বশীকরণ'
        ( শেষ দুয়ো-রাজকুমারের কলাপ : এক ডক্টরেরটকামী ছাত্রের থিসিস থেকে )
        বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুয়ো-রাজকুমার ঠিক কী কী করেছিলেন, তা জানার জন্য আমি তাঁর বিষয়ে অনুসন্ধান চালাই। এক সময় জানতে পারি, তিনি যাদের সঙ্গে থাকতেন, সেই আধপাগলা মানুষগুলি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। তাঁর অনেক নথিপত্রও নাকি তাঁদের কাছে রয়েছে। একথা জানতে পারার পর, আমি সেই আধপাগলা মানুষগুলির খোঁজখবর করি এবং অনেক তেল পুড়িয়ে অবশেষে তাদের দু;জনকে খুঁজে বার করতে সক্ষম হই। তাঁদের সঙ্গে আমার যে কথোপকথন হয়েছিল, তা নিম্নে বর্ণিত হল :
        আমি : শুনেছি, আপনাদের সঙ্গে দুয়ো-রাজকুমারের ক্লোজ রিলেশান ছিল?
        আধপাগলা ১ : ক্লোজ রিলেশান কোথায় দেখলে ? ও তো ডিসক্লোজ রিলেশান। যতো পারো ডিসক্লোজ করে দাও। কোনও আবরণ যেন না থাকে। আবরণেই তো বাধা। আটকা আটকি। ঢেকে চেপে রাখা। অন্ধকার করে রাখা। অন্ধ করে রাখা। অন্ধকারে কী হয় জানো ? জানো না ? শ্বাপদেরা বাসা বাঁধে।
        আমি : বলছিলুম কী, দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে ?
        আধপাগলা ২ : সে অনেক কথা। পেথম সে এসেচিল ভোলানাথ সেজে। আমার ঠাকুদ্দার বাবার বাবাদেরও আগে, অনেকেই তাকে দেখেছিল।
        আমি : তার কথা আমি জানতে চাইছি না। যার সঙ্গে মুক্তির দশক এবং তারপরেও আপনাদের দেখা হয়েছিল, তার কথা বলুন। তার সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে, ঘনিষ্ঠতা হল কেমন করে ?
        আধপাগলা ২ : ঘনিষ্ঠতা আর হল কই ? ঘন হবার আগেই তো ইষ্টদেবতা বাধ সাধলেন। গাধা এলো, গাধার টুপি এলো, চুনকালি মাখানো হল, তারপর সব হাহা হিহি হয়ে গেল। তাতে ইষ্ট ছিল না অনিষ্ট ছিল সে তো আর ঠাহর করা গেল না।
        আধপাগলা ১ : যতদূর জানি, ও এসেছিল অঙ্গদেশের পাটলিপুত্র থেকে। শুনেছি বাবুকালচারের যে দুয়োরানি বাংলার বাইরে প্রত্যন্ত শহরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছিল, ও তাদেরই এক সন্তান। সাবর্ণ চৌধুরী নামে কলকাতার যে-বিখ্যাত বাবু রাজবংশের প্রতিষ্ঠা, ও সেই বাবুকালচারের একজন অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার।
        আমি : শুনেছি, ওই দুয়ো-রাজকুমার যাচ্ছেতাই গালাগালি করত, অশ্লীল ভাষায় কথা বলত, অশালীন গান গাইত, গাঁজা ভাঙ খেতো, নোংরা জীবন যাপন করত -- এসব ক সত্যি ?
        আধপাগলা ১ : আমরা তো সবাই বস্তিতে থাকি, থাকি গণ্ডগাঁয়ে, আর ও তো আমদের সাথেই থাকত। আমাদের জীবন যাপন যেরকম, সেরকমই থাকত। সেটা অশ্লীল কি অশ্লীল নয়, সে আপনারাই জানেন। আর গালাগালির কথা যদি বলেন, সে তো আপনি থাকলেও করতেন। নিজের ভাই হয়ে সুয়ো-রাজকুমাররা ওর সাথে কোন মন্দ ব্যবহারটা করতে বাকি রেখেছিল শুনি ? ও যে ডেলি দু'চারটা খুনখারাবি করেনি, কেবল শালা-বাঞ্চোৎ করেছে, সেটাই তো অনেক ভদ্র ব্যবহার।
        আমি : শুনেছি, সেপাইরা ওকে যখন জেলখানায় নিয়ে যায়, তখন এক-দু'জন সুয়ো-রাজকুমারই ওর হয়ে সত্যিমিথ্যে সাক্ষ্য দিয়েছিল, বলেছিল. 'কই, ও তো রাজার মাকে ডাইনি বলেনি, যে ওটাকে ছেড়ে দে। ' কথাটা কি ঠিক ?
        আধপাগলা ২ : আরে সেটাই তো কাল হল। যে এক-দু'জন দুয়ো রাজকুমার 'কনখল' কমপ্লেক্সে ফ্ল্যাট কিনে সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে গিয়েছিল, তারাই ওরকম সাক্ষ্য দয়েছিল। তাই, ওর মনের এক কোণায় একটা বিশ্বাস থেকে গেল যে, সকল সুয়ো-রাজকুমার সমান শয়তান নয়, এক-দু'জন ভালো হয়। কিন্তু 'কনখল'-এর বাসিন্দা মাত্রেই যে 'সচ্ছল' ( সচ-ছল বা সৎ সেজে ছলনাকারী ) হয়, সেটা সে খেয়াল করেনি। অনেকে বলে, ওই বিশ্বাসের জন্যেই ও নাকি হেরে গেল।
        আমি : সাংস্কৃতিক-বাঁধ ভাঙার কলাকৌশল সে নাকি খুব ভালোভাবেই জানত, আর সে-রহস্য আপনাদেরকে সে নাকি বলে গিয়েছে। কথাটা কি সত্যি ?
        আধপাগলা ২ : আমাকে ওসব বলেনি বাবা। আমি সেসব কতা শুনিনি। বিশ্বাস করো ভাই, ওসব কতা আমি এক্কেরে শুনিনিকো। রাজার দেয়া বাঁধ বলে কতা। ভাঙব বললেই হল। সেপাই আচে না, সান্ত্রী আচে না।
        আধপাগলা ১ : দেখো বাছা। প্রত্যেক বাঁধের একটা না একটা ছিদ্র থাকে। সেটা সে জেনেছিল। সেখানে যন্ত্রাসুরকে আঘাত করলেই বাঁধটা ভেঙে পড়ে। কিন্তু কোন বাঁধের কোথায় ত্রুটি সেসব কথা আমার জানা নেই। যে দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আমার দেখা হয়েছিল, সে কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতির বাঁধের রহস্যগুলো বলত। তার সব কথা ভালো বোঝাও যেত না। তার দেওয়া একটা কাগজ আছে আমার কাছে, সেটায় সেসব সে লিখেও দিয়েছিল। তার কোনো কথাই আমার মাথায় ঢোকেনি। দেখো, তুমি বুঝতে পারো কি না।
        শেষ পর্ব : ম্লেচ্ছিতবিকল্প
        সাহিত্য সংস্কৃতির সাবলীল ধারার সামনে ওরা বাঁধ বেঁধেছে অজস্র প্রতীকের পাথর দিয়ে। সেগুলিকে সাময়িক প্রত্যয়ের পাথরপ্রতিমা দিয়ে রিপ্লেস করে ফেলা দরকার। বাঁধটা যেহেতু বিশাল, অজস্র পাথর গেঁথে গেঁথে তৈরি, তাই এই ভেঙে ফেলার কাজটাও বিশাল। এটা সফল করবার জন্য আরও অনেকের হাত লাগানো দরকার। আমি আমার সধ্যমতো এই রিপ্লেসমেন্টের কাজগুলো করার চেষ্টা করে থাকি এইভাবে :-
        ১) শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা ( একালের ) কবিতা রচনার প্রধান শর্ত।
        ২) আমার রচনা বাংলা ভাষার একটি বিশেষ কাঠামোকে সর্বজনীন করে তোলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রতিবাদ সংস্কৃতি পিটিয়ে কলকেতিয়া করে তোলার বিরুদ্ধে।
        ৩) পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকরা ঐতিহ্যের যে মানদণ্ড গড়ে ফেলেছেন তাকে অস্বীকার করাটা যেন তাঁদেরই অপমান করার উদ্দেশ্যে, এমন একটা ধুয়ো আজ সর্বজনস্বীকৃত। তাই শিল্প বানাবার বাঙালি চেতনা থেকে কবিতাকে মুক্ত করার চেষ্টাকে ভালো চোখে দেখা হয় না। ওদিকে কবিতা থেকে সিমবলিস্ট এবং সুররিয়ালিস্ট চাপ বাদ দেবার আইডিয়া আমার মাথায় ঘুরঘুর করছিল।
        ৪) আমি মনে করি, কবিতায় ভাষার খেলা, ইমেজ গেম, রিদম গেম, মেটাফিজিক্স গেম অবশ্য বর্জনীয়, কেননা ওগুলির সাহায্যে মানুষের অসহায়তা নিয়ে জোচ্চুরি করা হয়।
        ৫) আমি তো সিমবলিস্ট কবি নই যে একটা চিত্রকল্পকে কোনো কিছুর পপতীক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করব। ( বিষয়, আঙ্গিক, উপমা, ছন্দ, প্রতীক, রূপক, অলঙ্কার -- সর্বত্রই অ্যাটাক )।
        ৬) একদিকে চিৎকার, বিপরীতে ফিসফিসানি -- এই দিয়ে আমি কবিতার আধুনিক স্বরকে ভেঙে দিই।
        ৭) প্রেম ও অপ্রেম, শরীর ও মন ইত্যাদি যুগ্মবৈপরীত্য যেভাবে বাংলা কবিতায় তোয়াজ করা হয়েছে এতাবৎ এবং তার অন্তর্গত সন্ত্রাসটিকে কবিরা এতকাল যে-চেতনা প্রয়োগে বানচাল করেছেন, আমি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রেমকে সেনসরহীন স্বরূপে উপস্হাপন করি। প্রেম বা কবিতা এখন বিনোদন নয়।
        ৮ ) আমি ষাটের দশকের শুরু থেকেই অলঙ্কার বর্জনের কথা বলে আসছি। অধুনান্তিক চেতনাটি নিরাভরণ। আমার কবিতায় কবিত্বের সন্ত্রাসকে উৎসাহিত প্ররোচিত করার প্রয়াস যাথার্থ দিতে চায় অলঙ্কারহীনতাকে। আমার কবিতা দার্শনিক স্তরে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-আর্থিক-নৈতিক স্হিতাবস্হার বিরুদ্ধে একটি স্ব-স্বীকৃত দ্রোহতর্ক।
        ৯ ) আমি সত্যিই শিল্পের বিরুদ্ধে ও সংস্কৃতির স্বপক্ষে বলতে চেয়েছিলুম। পরাবাস্তববাদের আদলে শিল্পবিরোধিতার পালটা শিল্পের কথা বলিনি।
        ১০) সমস্ত কবিতার ক্ষেত্রে এক নিয়ম হতে পারে না। কনটেক্সট অনুসারে প্রত্যেকটির বয়নই তার মতো। এমন কবিতাও অতএব হতে পারে, যেখানে 'আলো' প্রতিনিধিত্ব করে না কান্টিয় বা বৈদিক আলোর। কেননা এমন পরিস্হিতি তো দেখাই যাচ্ছে যেখানে 'আলো' নামক লোগোটি ঘৃণ্য হয়ে গেছে। রেললাইনে হাত-পা বাঁধা যে পড়ে আছে, তার কাছে আগন্তুক আলো কী ? কিংবা যে আগুনের পরশমণি থানার সেপাইদের জ্বলন্ত সিগারেট হয়ে কয়েদি চাষির লিঙ্গে ছ্যাঁকা হয়ে লাগে, তাকে কী বলা হবে ? এসব ক্ষেত্রে প্রথাবাহিত সাংস্কৃতিক অনুমানগুলিকে আমার কবিতা নস্যাৎ করতে চায়। কবির কন্ঠস্বর নামক বদল্যারীয় জীবনানন্দীয় তর্কটি এর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং উত্তরাধিকারমুক্ত করা হয় কবিত্বকে।
        ১১ ) গতানুগতিক কবিতার অনুশাসনকে ছন্দের তেল চটচটে আঙ্গিকেই ভেঙে ফেলতে চাই বলে আমি কখনও কখনও ভাষার অনচ্ছ বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে থাকি, যাতে এমন একটা আদল পাওয়া যায়, যা বর্তমান অসম্বদ্ধতাকে অসংলগ্নতাকে আকস্মিকতার সন্নিবেশকে স্বতঃস্ফূর্ত করতে পারে। সেক্ষেত্রে তাই আমার কবিতার পাঠকৃতিটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছেতরানো, ছেঁড়াখোঁড়া, তাপ্পিমারা, বহুরঙা ও আসক্তিবিরোধী।
        ১২ ) ইংরেজরা বিদেয় হবার পর এবং দিল্লির দরবারে অজস্র জোকারের আবির্ভাবের ঘনঘটায় যে-ইতিহাসোত্তর কালখণ্ডটির হামলায় শব্দজগৎ ও ভাষাপৃথিবী আক্রান্ত, কবিতার ওই প্রোটোকলবর্জিত প্রতীকবাদবিরোধী এলাকাটির দখল নেয়া জরুরি।
        ১৩ ) 'সত্য' যে সর্বজনীন নাও হতে পারে, সে কথাটা বলা দরকার বলেই বলি।
        ১৪ ) আমি মনে করেছিলুম যে, একজন কবি হিসেবে মন ও দেহের যুগ্মবৈপরীত্যের তত্বটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো দরকার আর সেটাই আমি করেছি, যেখানে পেরেছি।
        ১৫ ) বাস্তবের তৈরি অবাস্তবতায়, স্হিরতার গড়া অস্হিরতায়, মুহূর্ত দিয়ে গড়া কালপ্রবাহে, অগতি থেকে উৎসারিত গতিতে, অবজেক্ট/সাবজেক্ট বিভাজনটি ভেঙে পড়ে।
        ১৬ ) দাঙ্গাকে প্রান্তিকের ওপর চাপিয়ে দেয় কেন্দ্র অথচ তা মসনদের চাকুমালিকদের অন্দরমহলের গল্প। তারা যেহেতু ক্ষমতার কেন্দ্রে, সত্যের নিয়ন্তা তারাই। শাসক মাত্রেই আধিপত্যবাদী, তা সে যে-তত্বেরই মালিক হোক।
        ১৭ ) কবিতায় ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ির ভাঙা দরজার মেলবন্ধন তখনই সম্ভব যখন বাস্তবে আধিপত্যবাদী শর্তগুলো মেনে নেওয়া হচ্ছে। আমার রচনার গেম-প্ল্যান মূলত সেই আদি সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা থেকে উপজাত। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অবিদ্যমান যুদ্ধ'-এর মতো যা অবর্তমান সেইটেই আমার রচনায় উপস্হিত হয়ে দশ পঙক্তির খেলা করে। খেলাটি সমাপ্ত হিসাবে ঘোষিত হবে তখনই, যখন ধাঁধাটির সমাধান হবে। নয়তো চলতে থাকবে মর্মার্থ-সঙ্কটাপন্ন শব্দাবলীর ঝোড়ো হাওয়া। মাত্রাতিরিক্ত মিলের মাত্রাতিরিক্ত নাটুকেপনা চলতে থাকবে।
        ১৮ ) ছবিগুলি ভাষার সাংস্কৃতিক নির্দেশের অন্তর্গত এবং তা দাঙ্গার সন্ত্রাসের বাইরেকার 'আমির' আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে। দাঙ্গার সন্ত্রাস স্ট্রাকচার্ড হয়। রাজপথে পড়ে থাকা সন্ত্রাস-পরবর্তী টুকিটাকি প্রকৃতপক্ষে অবাস্তব ঘটনাবলীর সত্য।
        ১৯ ) প্রত্যন্তকে, আধুনিকতা যে নান্দনিক সন্ত্রাসে নিয়ে গিয়ে আছড়েছে, স্বগতোক্তি ছাড়া সমস্ত শব্দ এবং ধ্বনি সেই চত্বরে অর্থহীন। সন্ত্রাসের উপাদান এক্ষেত্রে স্তব্ধতা, শিশির, ঝিঁঝি, নক্ষত্র, শীত, পাথর ইত্যাদি যা সনাতনি কবিতায় তথাকথিত সৌন্দর্য বানাবার কাজে লাগে। মাত্রা গুনে-গুনে যে ধরণের ডিজিটাল কবিতা বাজারচালু, সেই ডিজিটাল যান্ত্রিক কবিত্ব ভাঙা হয়েছে। ছন্দের ভেতরে ভেতরে কোনও মানে ঢোকানো নেই, যা কিছু মানে তা উপরিতলেই ভাসছে।
        ২০ ) ছয়ের দশকেও বাংলা কবিতায় থাকত চিত্র, চিত্রকল্প। আমি ব্যবহার করি উপচিত্র। রূপক নয়, লক্ষণগুলোই আমার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
        ২১ ) লিরিকের জমিতে রোমান্টিক চেতনার চাষ ভালো হয়, কেননা লেখকের কোনো নৈতিক দায় থাকে না। আমি কবিতায় ভঙ্গুরতা আগাগোড়া বজায় রাখি কাঠামোটিকে 'অ্যান্টিলিরিক' করে তোলার জন্য। একদিকে লিরিকের অচলাবস্হা থেকে এবং অপরদিকে ক্ষমতার তাত্বিক খবরদারি থেকে দূরে থাকা দরকার। লেখাকে তাই কাউন্টার-হিগেমনিক করে তোলা দরকার।
        ২২ ) প্রতিষ্ঠিত ফর্ম মাত্রেই প্রতিষ্ঠানের কুক্ষিগত, তাই তাকে ভাঙা জরুরি। জরুরি প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় মনোভাবের অবিনির্মাণ। পাঠকৃতি যেন স্বেচ্ছায় আত্মদীর্ণ, অসমতল, দ্বন্দ্ব-আবিল, অক্ষহীন, দলছুট, আপত্তিসূচক, উভমুখী, অসংহত, ঘরাণা-বহির্ভূত এবং চোরা-আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। কারণ কবি মানেই তো 'চোরাযোদ্ধা'।
        ২৩ ) অত্যন্ত বেশি ব্যাকরণবোধ থেকে সাজানো-গোছানো সমাজের ধান্দার দরুন পয়দা হয় ওদের স্তালিন ও আমদের সঞ্জয় গান্ধির আদর্শ। শুভর কুহকে আত্মসমর্পণ করে নাৎসিরা অশুভর রাজপথ উদ্বোধন করেছিল। সবাইকে পিটিয়ে সমান করার ব্যাষ্টিবাদের শুভত্ব মূলত একটি মৌলবাদী জবরদস্তি যা গদ্য কবিতাকেও ঢোকাতে চায় ছন্দের তালিবানি জেলখানাণ এবং আধমাত্রা সিকিমাত্রার বেয়াদপিকে শায়েস্তা করতে চায় অ্যাকাডেমিক গেস্টাপোদের নাকচের অস্ত্র দ্বারা। আমার রচনা তা মানে না এবং না-মানার ঝুঁকি নেয়।
        ২৪ ) কবিতায় আমি আপইয়েলিং ঢোকাই। আপওয়েলিং কোনো নির্মাণ নয়, সৃজনশীলতা নয়, পুনরাবৃত্তি নয়, ভাষাবয়ন নয়। ফ্রেম থেকে যাতে উপচিত্রগুলো বেরিয়ে যায়, তাই তাদের মধ্যে কোনও বার্তা পুরে দিই না। তারা অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন। যা চোখের সামনে তুলে ধরা যায় না, তাকেই তুলে ধরা। বিজ্ঞানীরা যেমন বলেন, যা চোখে দেখা যায় তার অস্তিত্ব নির্ভর করে, যা চোখে দেখা যায় তার ওপর। যেটা উপস্হিত।
         
      • কলিম খান | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:০৭735104
      • মলয় রায়চৌধুরী : এক রাজদ্রোহী রাজকুমারের কাহিনি : কলিম খান
        প্রথম পর্ব : ষড়যন্ত্র : মারণ
        ( কোরাণ ও গীতা : পুনঃপাঠ )
        মহম্মদ কহিলেন : হে আবুবক্কর ! মদিনা হইতে এই বিশাল সৈন্যবাহিনী লইয়া যে উদ্দেশ্যে হেথায় আসিয়াছি, তাহা বুঝি আর সফল হইল না। দেখো, সন্মুখসমরে আজ আমারই কোরেশ বংশের বংশজগণ। আর দেখো, উভয় সেনার মধ্যে আমারই পিতৃব্যগণ পিতামহগণ আচার্য্যগণ মাতুলগণ ভাতৃগণ পুত্রগণ পৌত্রগণ মিত্রগণ শ্বশুরগণ সুহৃদগণ অবস্হান করিতেছেন। আমি কাহাকে হত্যা করিব ? হে আবুবক্কর ! যুদ্ধেচ্ছু এই সকল স্বজনদিগকে সন্মুখে অবস্হিত দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন হইতেছে এবং মুখ শুষ্ক হইতেছে। ইহা সত্য যে, ৩৬০টি প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়া ইহারা যুগযুগান্ত ধরিয়া আরববাসীগণকে প্রতারিত করিতেছে, আর ওই প্রতীকগুলির সাহায্যে পুরাতন জীবনব্যবস্হায় তাহাদিগকে মোহগ্রস্হ করিয়া রাখিয়াছে, তাহাদের ধনসম্পদ ভোগ করিতেছে। ইহাও সত্য যে, আমি এই বংশেরই এক কনিষ্ঠতম ও অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার। তথাপি এক্ষণে ইহাদিগকে সমরাঙ্গনে সন্মুখস্হ দেখিয়া আমার হস্তপদ অবসন্ন হইয়া আসিতেছে।
        আবুবক্কর কহিলেন : অয় মুহম্মদ ! এই সঙ্কট সময়ে স্বর্গহানিকর অকীর্তিকর তোমার এই মোহ কোথা হইতে উপস্হিত হইল ? এ যুদ্ধ স্বার্থপ্রণোদিত নহে, ইহা জেহাদ, ধর্মযুদ্ধ। হে পরন্তপ ! তুচ্ছ হৃদয়ের দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও ! জেহাদ অপেক্ষা ইমানদার মোমিনের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছুই নাই। হে ধনঞ্জয় ! এই যুদ্ধ জগৎপিতার নিয়মে স্বয়ং উপস্হিত হইয়াছে। ইহা আমাদের নিমিত্ত জন্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করিবে। অতএব যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও। অন্যথায় মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয়বশত যুদ্ধে বিরত হইতেছ, দয়াবশত নহে। সুতরাং যাহারা তোমাকে বহু সন্মান করেন, তাহাদিগের নিকট তুমি লঘুতাপ্রাপ্ত হইবে। তোমার শত্রুরাও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া অনেক অবাচ্য কথা বলিবে। তাহা অপেক্ষা অধিক দুঃখকর আর কী আছে ? এক হস্তে অধর্মের বিনাশ ও অপর হস্তে ধর্মের প্রতিষ্ঠা নিমিত্ত তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ধর্মভ্রষ্টদিগকে হত্যা করিতে দ্বিধা কিসের ? সুতরাং হে সব্যসাচী, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া উথ্থান করো।
        সব্যসাচী কহিলেন : ইহা সত্য যে, ইহারা ধর্মভ্রষ্ট। এই কৌরবগণ আমাদিগের ন্যায় ইক্ষাকু বংশজ হইলেও ইহারা ধর্মের অমর্যাদা করিয়াছে। প্রজাপালন বিষয়ে ইহাদিগের দুঃশাসনের কোনও সীমা নাই। ইহাও সত্য যে, আমরা এই বংশেরই অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এই রাজবংশের দুয়ো-রাজকুমার এবং ইহারা আমাদিগকে আশৈশব প্রবঞ্চনা করিয়া আসিতেছে, সাধারণ প্রজাদিগের তো কথাই নাই। সেই হেতু ধর্মপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই ইহাদিগকে ক্ষমতাচ্যুত করা প্রয়োজন। কিন্তু এতৎসত্বেও, স্বজন ও গুরুজনদিগকে বধ করিয়া কীরূপে প্রাণধারণ করিব, এইরূপ চিন্তাপ্রযুক্ত হইয়া চিত্তের দীনতায় আমি অভিভূত হইতেছি। প্রকৃত ধর্ম কী, এ বিষয়ে আমার চিত্ত বিমূঢ় হইতেছে। ধর্মপ্রতিষ্ঠার নিমিত্ত এ আমি কাহার হত্যাকারী হইতে চলিয়াছি ? অতএব হে কৃষ্ণ ! যাহাতে শুভ হয়, আমাকে নিশ্চিত করিয়া তাহা বলো !
        শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন : প্রকৃতপক্ষে তুমি কাহারও হত্যাকারী নহ। স্বজন বা গুরুজন যাহাই হউন, যাহারা অন্যায়কারী, প্রজাবৃন্দের প্রতি নির্দয়, অচলায়তন রূপে সমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাঁহারা ধর্মভ্রষ্ট হইয়াছেন। কাল সমুপস্হিত হইলে স্বয়ং শিব ধর্মভ্রষ্টদিগের মহিমাহরণ করিয়া তাহাদিগকে হনন করিয়া রাখেন। এক্ষেত্রেও তাহাই হইয়াছে, তুমি নিমিত্তমাত্র। সত্যের জন্য, ধর্মের জন্য, স্বজন ও গুরুজনদিগের উপর বাণনিক্ষেপ করিলে কদাচ অধর্ম হয় না। সুতরাং, তুমি নিঃসংশয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। যাহারা সত্যের নিমিত্ত ধর্মের নিমিত্ত পিতৃব্য ও পিতামহ প্রভৃতি স্বজনগণকে নিকেশ করিতে দ্বিধা করেন না, তাহারাই প্রকৃত ধার্মিক। ইতিহাস তাহার সাক্ষী। অতএব, হে পাশুপতধারী মোমিন ! হে দুয়ো-রাজকুমার ! হে বংশদ্রোহী! তুমি যুদ্ধ করো।
        দ্বিতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : মোহন
        ( দেবীপুরাণ : পুনঃপাঠ )
        ঋষিগণ কহিলেন : হে পণ্ডিতপ্রবর ! যথার্থ পথপ্রদর্শক নেতাই গুরুপদবাচ্য। তাঁহাকে সম্যকরূপে অবগত না-হইয়া তাঁহার অনুসরণ করা উচিত নহে। ইহা জানিয়াও অসুরগণ কী প্রকারে ভুল নেতৃত্বের দ্বারা প্রবঞ্চিত হইলেন, এক্ষণে সে বিষয়ে আমাদিগের কৌতূহল নিবারুণ করুন।
        বৈশ্যম্পায়ন কহিলেন : বৃহস্পতি ও শুক্রাচার্য উভয়েই ভৃগুর সন্তান হইলেও তাঁহাদের অভিমত ভিন্ন ছিল। সেই কারণে সুরাসুর সংগ্রামে তাঁহারা যথাক্রমে দেবতা ও অসুরগণের পরামর্শদাতারূপে তাহাদের গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন।
        একদা অসুরগণকে সংযত থাকিতে বলিয়া শুক্রাচার্য্য তপস্যার উদ্দেশ্যে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করিলেন। একথা জানিতে পারিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি স্বল্পকাল অতিবাহিত হইলে শুক্রাচার্য্যের রূপ ধারণপূর্বক তথায় উপস্হিত হইলেন। তাঁহাকে সমুপস্হিত দেখিয়া অসুরগণ তাঁহাদিগের গুরুদেব প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন, এইরূপ প্রত্যয় করিল এবং তাঁহাকে পাদ্য অর্ঘ্য দানে যথাবিহিত সন্মান প্রদর্শনপূর্বক তাঁহার উপদেশের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল। অনন্তর শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি তাহাদিগকে বলিলেন, বৈরিতা কুলক্ষয়ের কারণ। বৈরিতার কারণ বাসনা, অতএব বাসনা পরিত্যাগ করো। বাসনা না থাকিলে কেহই তোমাদিগকে বশীভূত করিতে পারিবে না। অতএব তোমরা বাসনামুক্ত হও, মস্তকমুণ্ডনকরতঃ গৈরিক বস্ত্র ধারণ করিয়া আচারনিষ্ঠ হও। আচারনিষ্ঠগণকে দেবতাও জয় করিতে পারিবে না। গুরুদেবের আদেশ শিরোধার্য করিয়া অসুরগণ তাহাই করিতে লাগিলেন। ইহার ফলে তাহাদিগের হৃদয় হইতে অসূয়াভাব ক্রমে তিরোহিত হইতে লাগিল।
        ইট্যবসরে, দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্য তাঁহার তপস্যা সমাপনান্তে তথায় সমাগত হইলেন। দেবগুরু বৃহস্পতিকে অসুরগণের গুরুপদে অধিষ্ঠিত দেখিয়া তিনি যারপরনাই বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া অসুরগণকে কহিলেন--- এ কাহাকে তোমরা আমার আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছ ? ইনি যে দেবগুরু বৃহস্পতি, তাহা কি তোমরা উপলবদ্ধি করিতে পারো নাই ? তোমাদিগকে বিপথগামী করিবার জন্য আমার অনুপস্হিতির সুযোগ গ্রহণ করিয়া এ প্রবঞ্চক তোমাদিগের সহিত প্রতারণা করিয়াছে। ইনি আমাদিগের ন্যায় স্বর্গদ্রোহী নহেন। তোমাদের নেতার আসন গ্রহণ করিয়া তোমাদের সংগ্রামকে ধ্বংস করাই এই প্রতারকের একমাত্র উদ্দেশ্য।
        ইহা শুনিয়া শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি কহিলেন : হে অসুরগণ! অবধান করো ! আমার উপদেশে তোমরা অজেয় হইতে চলিয়াছ দেখিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি তোমাদিগকে প্রতারণা করিবার উদ্দেশ্যে এক্ষণে আমার রূপ ধারণ করিয়া তোমাদিগের সন্মুখে উপস্হিত হইয়াছেন। ইনি দেবগুরু বৃহস্পতি। অবিলম্বে ইহার মুখে চুনকালি দিয়া গর্দভের পৃষ্ঠে আরোহন করাইয়া পশ্চাতে হ্ল্লা লাগাইয়া দাও এবং বিতাড়ন করো। অসুরগণ তাহাই করিল।
        কিয়ৎকাল অতিবাহিত হইলে, অসুরগণ একদিন হৃদয়ঙ্গম করিল, তাহারা প্রবঞ্চিত হইয়াছে। কিন্তু তখন তাহাদিগের আর কিছুই করিবার রহিল না।
        এইভাবে অসুরগণ ছদ্ম-দেবদ্রোহীকে তাহাদের নেতারূপে বরণ করিয়া মোহগ্রস্ত হইয়াছিল এবং সম্পূর্ণরূপে প্রবঞ্চিত হইয়াছিল।
        তৃতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : স্তম্ভন
        ( মুক্তধারা : পুনঃপাঠ )
        এক যে ছিল রাজা। তার ছিল দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। সুয়োরানি সুখে থাকে রাজপ্রাসাদে আর দুয়োরানি থাকে বনের প্রান্তে, ছোট নদীর ধারে, কুঁড়ে ঘরে। দুয়োরানির ছেলে সেই নদীতে নৌকাবায়। পারানির কড়িতে তাদের দিন কাটে। কিন্তু একদিন তার সাধের নদী শুকিয়ে গেল। কারণ, দেশের রাজ-বিভূতি বাঁধ বেঁধেছেন। কেবল জলধারা নয়, ঈশ্বরের করুণার সকল ধারার সামনেই বাঁধ বেঁধেছেন তাঁরা। লোকে বিস্বাসই করতে পারল না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন, কোনও মানুষ তা বন্ধ করতে পারে। কিন্তু বন্ধ হল, করুণাধারার সব শাখাই ক্রমশ শুকোতে লাগল, আর প্রজাদের জীবন উঠল অতীষ্ঠ হয়ে। এদিকে একদিন দুয়োরানির ছেলে জানতে পারল সে রাজপুত্তুর। সে গেল রাজার কাছে, বললে, রাজপুত্রের অধিকার চাইনে। কেবল ঈশ্বরের করুণাধারার সামনে দেয়া তোমাদের ওই বাঁধগুলো খুলে দাও, এই প্রার্থনা। শুনে সুয়ো-রাজপুত্রেরা অবাক হলো। তারা সেপাই ডাকল, সান্ত্রী ডাকল। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে রাজবাড়ি থেকে বার করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায়।
        ধুলো ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর গেল শিবতরাইয়ের প্রজাদের কাছে। সেখানে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। সে দেখল, ধনঞ্জয় বৈরাগীর ছদ্মবেশে সুয়োরানির এক ছেলে। আর, তার পেছনে শিবতরাইয়ের মানুষগুলো চলেছে মুক্তধারার বাঁধ ভাঙতে। তখন সেই দুয়ো-রাজকুমার সবাইকে ডেকে বলতে লাগল, ওই বৈরাগী আসল বৈরাগী নয়, ও তো ছদ্মবেশী সুয়ো-রাজকুমার, ও তোমাদের ঠকাবে। এক নদীর মুখেই ওরা বাঁধ বাঁধেনি। সর্বহারার মুখেই ওরা বাঁধ বেঁধেছে। সেগুলি ভাঙতে হলে, তাদের রহস্য জানতে হবে। সেসব আমি জেনে এসেছি। আমার কথা শোনো। কিন্তু দু'চারজন আধপাগলা ছাড়া কেউ তার কথায় কান দিল না।
        কথাটা গেল মিথ্যে-বৈরাগীর কানে, সে বললে -- ওটা বদ্ধ পাগল। ছন্নছাড়া। খেতে পায়না, হাংরি, তাই মিথ্যে কথা বলে। ওর মুখে চুনকালি মাখিয়ে গর্দভের পিঠে চড়িয়ে পিছনে ভিড়ের হল্লা লাগিয়ে দাও। মজা পেয়ে প্রজারা তাই করলে।
        এরপর গাধার পিঠে সওয়ার দুয়ো-রাজকুমারের আর কিছুই করার রইলো না। তাই সে কেবল চিৎকার করে। চিৎকারের জন্য চিৎকার। চিৎকারের ভিতরে চিৎকার। চিৎকার করতে করতে একদিন সে বিস্মৃতিলোকে চলে গেলো।
        তারপর অনেকদিন কেটে গেলে, শিবতরাইয়ের প্রজারা বুঝল তারা ঠকেছে। অতএব, তারা খোঁজ করতে লাগল সেই দুয়ো-রাজকুমারের, যে জানত সব বাঁধের রহস্য। কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না। তখন যে আধপাগলারা সেসময় তার কথা শুনেছিল মন দিয়ে, তাদেরকে ধরা হলো। বাঁধ ভাঙার রহস্য ওই আধপাগলারা দুয়ো-রাজকুমারের কাছ থেকে জেনে-বুঝে নিয়েছিল কি না, সেটা জানার জন্য। কিন্তু কেউই সেসব কথা ঠিকঠাক বলতে পারল না।
        রাজপ্রাসাদ থেকেও দুয়ো-রাজকুমারের খোঁজখবর করা হলো। কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না, পাওয়া গেল তার গাধাটাকে। তাকেই নিয়ে এসে ফুলমালা দিয়ে চন্দনের টিপ পরিয়ে রাজসভায় আনা হলো। রাজা সেই গাধাটাকেই শিরোপা দিলেন আর রাজপুরোহিত দিলেন আশীর্বাদ। সবাই বলে উঠল -- সাধু, সাধু !
        চতুর্থ পর্ব : ষড়যন্ত্র : বিদ্বেষণ
        ( অভিচারতন্ত্র : পুনঃপাঠ )
        মানুষের উপর মানুষের চড়ে বসাকে বলা হয় 'অভিচরণ' বা 'অভিচার'। আদিকালে সর্বপ্রথম যে-পদ্ধতির সাহায্যে এই কর্মটি করা হতো, তাকে বলা হতো 'শ্যেনযাগাদি' অর্থাৎ অন্য গোষ্ঠীর লোকেদের উপর দলবদ্ধ লুঠতরাজ বা ছিনতাই। তবে সে সবই ছিল সাময়িক। তার সাহায্যে বহুকালের জন্য বা চিরকালের জন্য কারও উপর চেপে বসা যেত না। সেই উদ্দেশ্যে একদিন ভারতবর্ষ আবিষ্কার করে এক অভিনব প্রক্রিয়া ---'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ'। এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে সমাজের স্বাভাবিক জ্ঞানপ্রবাহের উপর বাঁধ বাঁধা হয় ও বৈদিকযুগের সূত্রপাত করা হয়। এটিই পৃথিবীর প্রথম বাঁধ ও আদি বাঁধ। ঈশ্বরের করুণার অন্যান্য ধারাগুলিকে বাঁধ বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করার কথা তখনও ভাবা হয়নি।
        তা সে যাই হোক, সেই 'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ' উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি বলে এখনও আমরা 'বড়ো শত্রুকে উঁচু পিঁড়ি' দিই ; যার সর্বনাশ করা দরকার তার মূর্তি গড়ে পূজা করি ও তার নীতি অমান্য করি এবং এভাবেই আমরা আজও শিব রাম গান্ধী মার্কস রবীন্দ্রনাথের পূজা করি ও তাঁদের নীতি অমান্য করে থাকি।
        দুষমনকে 'পূজা করে মেরে ফেলার' এই বৈদিক নীতির বিপরীতে একসময় তান্ত্রিক নীতিরও জন্ম হয় এই ভারতবর্ষেই। 'নিয়ন্ত্রণসাধন'কে তখন বলা হতিও যন্ত্র, যা দিয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হতো, ঘাড়ের উপর চেপে বসা ক্ষমতাকে উৎখাত করার চেষ্টা চালানো হতো। তান্ত্রিকেরা শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় হিসেবে ছয় রকম 'নিয়ন্ত্রণসাধন' বা যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন--- মারণ, মোহন, স্তম্ভন ( শত্রুকে স্ট্যাগন্যান্ট করে দেয়া ), বিদ্বেষণ ( ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল ), উচ্চাটন ( স্বদেশভ্রংশন বা শত্রুকে তার কনটেক্সট থেকে উৎখাত করে দেয়া ) ও বশীকরণ। এই যন্ত্রগুলি প্রধানত বাঁধ ভাঙার কাজেই ব্যবহৃত হতো। বৈদিকদের পূজা করে মেরে ফেলার বিপরীতে তান্ত্রিকেরা এই ছয় রকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন বলে, বৈদিকপন্হীদের কালচারে এই 'ষড়যন্ত্র' ঘৃণ্য ও নিন্দাজনক হয়ে যায় এবং আধুনিক যুগে পৌঁছে পরিণত হয় 'কন্সপিরেসি'তে, যদিও তান্ত্রিক কালচারে 'ষড়যন্ত্র' যথারীতি প্রশংসাযোগ্য ও গৌরবজনক হয়েই থেকে যায়। অর্থাৎ কিনা, ভারতের তান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসারে ষড়যন্ত্রের প্রয়োগ অত্যন্ত ভালো কাজ এবং তা আদৌ কন্সপিরেসি নয়।
        তবে নিয়ন্ত্রণসাধনের এই চর্চা এখানেই থেমে থাকেনি। যুগ বহুদূর এগিয়ে চলে এসেছে, যন্ত্রকে করে তোলা হয়েছে 'মোস্ট সফিসটিকেটেড', ক্ষমতা হয়েছে নিরঙ্কুশ। শাসক ও বিদ্রোহীর হাতে ওইসকল যন্ত্রের বিপুল বিকাশ ঘটেছে। বিকাশ ঘটেছে শাসক এবং বিদ্রোহীরও। এখন শাসকের বহু রূপ, বহু সুয়ো ; বিদ্রোহীরও বহু রূপ, বহু দুয়ো। বহু ক্ষেত্রে শাসকই বিদ্রোহীর পোশাক পরে নেয়, কোনও কোনও দুয়ো ভুয়ো-বিদ্রোহী হয়ে সুয়োর দলে ভিড়ে যায়। তাছাড়া, এখন বাঁধের সংখ্যাও প্রচুর, যত ধারা ততো বাঁধ, বাঁধের নিচে বাঁধ, উপরে বাঁধ, সাপোর্টিং বাঁধ, কতো কী ! এমনকি লোকদেখানো মিথ্যে বাঁধও রয়েছে, বিদ্রোহী জনগণের আক্রোশ যার উপর ফেটে পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, ডায়লুট ও ডাইভার্টেড হয়ে যেতে পারবে, অথচ প্রকৃত বাঁধটা থেকে যাবে অক্ষত।
        আরও আছে, এখনকার প্রতিটি বাঁধের পাথরপ্রতিমার রূপগুণও ভিন্ন ভিন্ন, পৃথক পৃথক স্পেশালিস্ট বা দক্ষ বিভূতিদের দিয়ে বানানো। এসব বাঁধ ভাঙতে গেলে বিদ্রোহীদেরও ভিন্ন ভিন্ন শাখার স্পেশালিস্ট হতে হয়, দক্ষ হতে হয়, অনেক তপজপ করতে হয়। কেননা এমন ব্যবস্হা করে রাখা হয়েছে যাতে কৃষিবিজ্ঞানী সাংস্কৃতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন, জীববিজ্ঞানী রাজনৈতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন...ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ প্রতিটি বাঁধই সেই সেই বিষয়ের প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে গড়া। তাই, একালে একজন দুয়ো-রাজকুমারে কিছুই হবার নয়। যতোগুলি বাঁধ, বলতে গেলে ততোজন দক্ষ দুয়ো-রাজকুমার লাগে সেগুলি ভাঙবার আয়োজন করতে।
        তাই একালে দুয়ো-রাজকুমারের সংখ্যাও খুব কম নয়। এর ভিতর আবার জালি দুয়ো-রাজকুমার তো রয়েছেই। তার ওপর, কখনও বা কোনও কোনও দক্ষ দুয়ো-রাজকুমারকে রাতারাতি ফুটপাত বদল করতেও দেখা যায়। অবশ্য তার জন্য তাদের ফ্ল্যাট নিতে হয় 'কনখল'-এ। 'কনখল' সেই বিখ্যাত কমপ্লেক্স, যেখানে দাঁড়িয়ে আদি দক্ষ বলেছিল, 'কৌ ন খল অর্থাৎ কে খল নহে ? সব্বাই খল। অতএব আমিও কেন খল হবো না ?' এই বলে, সেও খল হয়ে যায়। সেই জন্য, সেই ভিত্তিভূমির নাম হয়ে যায় 'কনখল'। এলাকার ফুটপাত-বদল-পারদর্শী দক্ষেরা সেই কমপ্লেক্সে আশ্রয় নিয়ে ঘোষণা করে, 'কে খল নহে ? সব্বাই খল। কেউ কথা রাখেনি। অতএব আমিও কথা রাখব না। ' ---এই বলে তারা সুযোগ পাওয়া মাত্রই সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে যায়। তাই প্রকৃত বিদ্রোহী দুয়ো-রাজকুমারকে চিনতে পারা এযুগের এক কঠিন সমস্যা।
        আবার বাঁ৭ ভাঙার ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা। পালটা প্রতীকের পাথরপ্রতিমা না বসিয়ে বাঁধের বর্তমান পাথরকে সরানোর কোনও উপায় রাখা হয়নি। আর সেটা করতে গেলেই নতুন প্রতীকের বাঁধ নির্মিত হয়েযায়। ফলে, যে ভাঙতে আসে, দেখা যায়, পাকে চক্রে সে আগের বাঁধ ভেঙে তার স্হানে নতুন আর একটা বাঁধ বেঁধে ফেলেছে নিজের অগোচরেই।
        এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে, সাম্প্রতিক কালের অধুনান্তিক ( পোস্টমডার্ন ) তান্ত্রিক বিদ্রোহীরা একটি অভিনব পন্হা উদ্ভাবন করেছেন। বাঁধের উৎখাতযোগ্য পাথরপ্রতিমাকে অত্যন্ত স্বল্পায়ু প্রতীক দিয়ে সরিয়ে ফেলা। এ যেন মানববোমা। উদ্দিষ্ট প্রতীকটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নিজেও মরে যাবে। এমন জ্ঞানের ব্যবহার, যা পুরোনো জ্ঞানকে মেরে ফেলবে অথচ নতুন 'জ্ঞানের বোঝা' হয়ে দেখা দেবে না।
        পঞ্চম পর্ব : যড়যন্ত্র : উচ্চাটন
        ( অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং : অ্যান আইটি এক্সপ্লোর )
        সবাই জানেন কমপিউটারের দুনিয়ায় উইনডোর নানা ভারশন প্রকাশিত হয়েছে। উইনডো ৯৫, উইনডো ০৭, উইনডো ৯৮ ভারসন ১, উইনডো ৯৮ ভারসন ২, উইনডো মিলেনিয়াম ভারসন ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে যেটা অনেকেই নজর করেননি, তা হল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতারও অনেকগুলি ভারসন আমাদের মার্কেটে চালু আছে। প্রতিটি ভারসনের আবার অনেকগুলি করে এডিশন রয়েছে। যার যেটা পছন্দ তিনি সেটা কেনেন, ব্যবহার করেন। ক্রেতার অবগতির জন্য এখানে কয়েকটি ভারসনের একটি করে এডিশন-এর অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হল।
        ষষ্ঠ পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ১
        ( লঞ্চড বাই শিবশম্ভু পাষণ্ড/সনাতন এডিশন )
        ইট ইজ আ প্রিমিটিভ এডিশন অ্যান্ড প্রেজেন্টলি নট অ্যাভেলেবল ইন দ্য মার্কেট।
        সপ্তম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ২
        ( লঞ্চড বাই বাল্মীকি/চণ্ডাশোক এডিশন )
        ১) শাসক...ব্রাহ্মণ
        ২) শাসিত...ক্ষত্রিয় বৈশ্য শুদ্র ও অন্যান্য ম্লেচ্ছ সম্প্রদায়
        ৩) বিরোধের কারণ...সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ
        ৪) বাঁধের কারিগর...কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস ও তাঁর শিষ্যগণ
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...সামাজিক প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...রাবণ অ্যাসোশিয়েটস
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...বিভীষণ
        ১০) বিদ্রোহের নেতা...দাশরথীগণ
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...রাম নাম সত্য হ্যায়
        ১৩ ) আধপাগলা...জটায়ু
        ১৪ ) গাধা...হনুমান
        অষ্টম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৩
        ( লঞ্চড বাই কে.ডি.বেদব্যাস/রিঅ্যাকটিভ এডিশন )
        ১) শাসক...দেবগণ
        ২) শাসিত...অসুরগণ
        ৩) বিরোধের কারণ...সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ
        ৪) বাঁধের কারিগর...বিশ্বকর্মা
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...সামাজিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...গন্ধর্বগণ
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...শঙ্করাচার্য
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...কুমারিল ভট্ট
        ১০ ) বিদ্রোহের নেতা...জরৎকারুপুত্র আস্তীক
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১২ ) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...চাতুর্ব্বর্ণ্যব্যবস্হানং যস্মিন দেশে প্রবর্ততে। আর্যদেশঃ স বিজ্ঞেয়
        ১৩ ) আধপাগলা...লোমশ মুনি
        ১৪ ) গাধা...যাদবগণ
        নবম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৪
        ( লঞ্চড বাই কার্ল মার্কস/প্যারি কমিউন এডিশন )
        ১) শাসক...সহস্রমুখ বুর্জোয়া
        ২) শাসিত...সর্বহারা শ্রমিক কৃষক পেটিবুর্জোয়া শ্রেণি
        ৩) বিরোধের কারণ...কেবলমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধগুলি
        ৪) বাঁধের কারিগর...যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...বন্দুকের নল। পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...সাম্রাজ্যবাদী নবীন বুর্জোয়া/প্রতিবিপ্লবী
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...ডিক্লাসড ( অবক্ষিপ্ত ) বুদ্ধিজীবী
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...পাতিবুর্জোয়া
        ১০ ) বিদ্রোহের নেতা...কমিউনিস্ট বিপ্লবী
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...অতিবিপ্লবী
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...ইনকিলাব জিন্দাবাদ/জাগো জাগো জাগো সর্বহারা
        ১৩) আধপাগলা...কমিউনিস্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মী
        ১৪ ) গাধা...একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট কর্মী ( শ্রমিক কৃষক )
        দশম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৫
        ( লঞ্চড বাই রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোর/সেকেন্ড ওয়র্ল্ড ওয়ার এডিশন। )
        ১) শাসক...রাজা রণজিৎ
        ২) শাসিত...উত্তরকূট ও শিবতরাইয়ের প্রজাবৃন্দ
        ৩) বিরোধের কারণ...মুক্তধারার উপর নির্মিত বাঁধ
        ৪) বাঁধের কারিগর...যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...ছিদ্রস্হানে আঘাত
        ৭) সুয়ো-রাজকুমার...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...'স্বজনবিদ্রোহী' খুড়ো বিশ্বজিৎ ও যুবরাজ অভিজিৎ
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১০) বিদ্রোহের নেতা...ধনঞ্জয় বৈরাগী
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...বাঁধ ভেঙে দাও বাঁধ ভেঙে দাও দাআআআআও
        ১৩) আধপাগলা...গণেশ
        ১৪ ) গাধা...সঞ্জয়
        একাদশতম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৬
        ( লঞ্চড বাই পবং এক্সক্লুসিভস / লেটেস্ট এডিশন )
        ১) শাসক...প্রগতিশীল ( মার্কসবাদী, কমিউনিস্ট, বিপ্লবী)
        ২) শাসিত...জনগণ
        ৩) বিরোধের কারণ...সর্বহারার মুখে নির্মিত বাঁধসমূহ
        ৪) বাঁধের কারিগর...প্রত্যেক ধারার নিজ-নিজ যন্ত্ররাজ বিভূতি ও তত্তদ সন্ন্যাসীর দল
        ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...তত্তদ ধারার নিজস্ব প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
        ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...ছিদ্রস্হানে আঘাত। সেই ধারার পালটা প্রতীক দিয়ে প্রতীকবদল।
        ৭ ) সুয়ো-রাজকুমার...বাবুবংশের উত্তরাধিকারীগণ, বাবুভায়াগণ
        ৮) দুয়ো-রাজকুমার...হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী, নকশাল, বিচ্ছিন্নতাবাদী, পোস্টমডার্ন ইত্যাদি
        ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী
        ১০) বিদ্রোহের নেতা...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী
        ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী, অতিবিপ্লবী, উগ্রপন্হী
        ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...কে চেল্লায় শালা, কে চেল্লায় এই ভোরবেলা
        ১৩ ) আধপাগলা...শম্ভু রক্ষিত অ্যান্ড অ্যাসিসিয়েটস
        ১৪ ) গাধা...সেকেন্ড লাইন হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী ও নকশাল এবং ফোর্থ লাইন মার্কসবাদী
        দ্বাদশতম পর্ব : 'প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : মিলেনিয়াম ভারসন'
        ( দিস প্রডাক্ট ইজ নাউ অ্যাবানডন্ড। অ্যাকর্ডিং টু কমপিউটার ইনজিনিয়ার্স, দ্য এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং ইজ বিকামিং অবসলিট ইন দ্য প্রেজেন্ট কনটেক্সট। )
        বলে রাখা ভালো, এই অ্যান্টি-এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং স্বভাবতই ভালনারেবল। কোনো অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবস্হাই একে বাঁচানোর ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি। অর্থাৎ এই প্রোগ্রাম আদৌ ভাইরাসপ্রুফ নয়। যখন তখন ক্র্যাশ করে যায়। এই প্রোগ্রামিং যে আজকাল আর তেমন বিকোচ্ছে না, সেটাই তার অন্যতম কারণ।
        আরও কারণ আছে। আজকের মানবসমাজ একাকারের যুগে পা রেখে ফেলেছে। ফলে, শাসক-শাসিতের অ্যান্টাগনিজম ক্রমশ কমপ্লিমেন্টারির দিকে টাল খেয়ে যাচ্ছে। গোটা ব্যবস্হাটা, তার সমগ্র প্রেক্ষাপট, সবই 'এফেক্টিভ ফ্যাক্টর' রূপে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মানবসমাজ, জীবজগৎ ও জড়জগৎকে নিয়ে যে-সমগ্রব্যবস্হা, সেটি ঠিক থাকছে কি না, মানব সভ্যতার অস্তিত্বের পক্ষে অনুকূল থাকছে কি না, সেসব কথাও আজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ প্রচলিত ধনতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্হাগুলি এই পরিস্হিতির তুলনায় সেকেলে হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান-এর মতে, ...neither greedy capitalists nor dogmatic communists have sufficient respect for the larger system of which we are merely a part. স্বভাবতই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংগুলিও আজকের প্রেক্ষিতে সেকেলে হয়ে গেছে। সন্মুখস্হ পরিস্হিতির বিচার বিবেচনা করে আজকের দিনের পোস্টমডার্ন চিন্তাবিদরা এমন অদ্বৈত প্রোগ্রামিং-এর কথা ভাবতে শুরু করেছেন, যা বদ্ধধারাগুলিকে কেবল মুক্তধারাতেই পরিণত করবে না ; সমগ্র ব্যবস্হাটিকেও আরও সুসংহত করবে। আর, সেটা করতে গিয়ে তাঁরা বিগত যুগের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংসমূহের সমস্ত অর্জনগুলিরও সারসংগ্রহ করে নিচ্ছেন।
        সংগৃহীত ও সারে কী রয়েছে ? শাসক-শাসিতের ( পুরুষ-প্রকৃতির, কনটেন্ট-ফর্মের ) দ্বৈতাদ্বৈত অস্তিত্বের পরিবর্তনের মূল যে-কারিকা, তার সরবরাহ ঘটে শাসিতের তরফ থেকে নয় ; শাসকের তরফ থেকেই। শাসিত তো শাসকের বিরোধী হয়ে থাকেই। কিন্তু তাতে কিছু হয় না। যে গোপন কথাগুলির ওপর ক্ষমতা টিকে থাকে, তার সব কথা শাসিতেরা কখনও জানতে পারে না বলেই শাসন সম্ভব হয়। জানতে পারে তারাই যারা ওই প্রাসাদের অংশ, উত্তরাধিকারী। সেই কারণে দলছুট প্রাসাদত্যাগী দুয়ো-রাজকুমারেরা বিদ্রোহীর দলে যোগ না দিলে কোনও রাজপ্রাসাদেরই পতন সম্ভব নয় ; এটাই ছিল এতদিনের অঙ্ক। তাই শাসনের সমস্ত খেলাই এতদিন ছিল ওই বিদ্রোহী রাজকুমারের আসনটিকে ঘিরে। কারণ তার ভূমিকার ওপরই নির্ভর করত ব্যবস্হাটি বদলাবে কি না। সেই কারণে দুয়ো-রাজকুমারের তপস্যা ভেস্তে দেওয়ার খেলা, তার ভূমিকাকে নানাভাবে বিগড়ে দেয়ার খেলাই ক্ষমতার অন্যতম খেলা ছিল। সেই কারণে, বিদ্রোহী নেতা ও দুয়ো-রাজকুমারকে আগেভাগে গুমখুন করে তার আসনটি শাসকই ছদ্মবেশীদের বসিয়ে দখল করে রেখে দিত। কিন্তু সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সির ডাক দিয়ে বিশ্বের সমস্ত দুয়ো-রাজকুমারেরা ক্ষমতার সেই সব খেলাই ভেস্তে দিয়েছে, দিচ্ছে। এখন কেবল ডিসক্লোজ করে যাও। কেবল মেলে ধরা, যাতে সবাই সবকিছি দেখতে পায়। এতে শাসক-শাসিতের পরিচালক-পরিচালিতে উন্নীত না হয়ে কোনও উপায়ই থাকে না। শাসন অবসানের এযুগের এই পথ।
        ত্রয়োদশতম পর্ব : 'ষড়যন্ত্র : বশীকরণ'
        ( শেষ দুয়ো-রাজকুমারের কলাপ : এক ডক্টরেরটকামী ছাত্রের থিসিস থেকে )
        বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুয়ো-রাজকুমার ঠিক কী কী করেছিলেন, তা জানার জন্য আমি তাঁর বিষয়ে অনুসন্ধান চালাই। এক সময় জানতে পারি, তিনি যাদের সঙ্গে থাকতেন, সেই আধপাগলা মানুষগুলি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। তাঁর অনেক নথিপত্রও নাকি তাঁদের কাছে রয়েছে। একথা জানতে পারার পর, আমি সেই আধপাগলা মানুষগুলির খোঁজখবর করি এবং অনেক তেল পুড়িয়ে অবশেষে তাদের দু;জনকে খুঁজে বার করতে সক্ষম হই। তাঁদের সঙ্গে আমার যে কথোপকথন হয়েছিল, তা নিম্নে বর্ণিত হল :
        আমি : শুনেছি, আপনাদের সঙ্গে দুয়ো-রাজকুমারের ক্লোজ রিলেশান ছিল?
        আধপাগলা ১ : ক্লোজ রিলেশান কোথায় দেখলে ? ও তো ডিসক্লোজ রিলেশান। যতো পারো ডিসক্লোজ করে দাও। কোনও আবরণ যেন না থাকে। আবরণেই তো বাধা। আটকা আটকি। ঢেকে চেপে রাখা। অন্ধকার করে রাখা। অন্ধ করে রাখা। অন্ধকারে কী হয় জানো ? জানো না ? শ্বাপদেরা বাসা বাঁধে।
        আমি : বলছিলুম কী, দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে ?
        আধপাগলা ২ : সে অনেক কথা। পেথম সে এসেচিল ভোলানাথ সেজে। আমার ঠাকুদ্দার বাবার বাবাদেরও আগে, অনেকেই তাকে দেখেছিল।
        আমি : তার কথা আমি জানতে চাইছি না। যার সঙ্গে মুক্তির দশক এবং তারপরেও আপনাদের দেখা হয়েছিল, তার কথা বলুন। তার সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে, ঘনিষ্ঠতা হল কেমন করে ?
        আধপাগলা ২ : ঘনিষ্ঠতা আর হল কই ? ঘন হবার আগেই তো ইষ্টদেবতা বাধ সাধলেন। গাধা এলো, গাধার টুপি এলো, চুনকালি মাখানো হল, তারপর সব হাহা হিহি হয়ে গেল। তাতে ইষ্ট ছিল না অনিষ্ট ছিল সে তো আর ঠাহর করা গেল না।
        আধপাগলা ১ : যতদূর জানি, ও এসেছিল অঙ্গদেশের পাটলিপুত্র থেকে। শুনেছি বাবুকালচারের যে দুয়োরানি বাংলার বাইরে প্রত্যন্ত শহরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছিল, ও তাদেরই এক সন্তান। সাবর্ণ চৌধুরী নামে কলকাতার যে-বিখ্যাত বাবু রাজবংশের প্রতিষ্ঠা, ও সেই বাবুকালচারের একজন অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার।
        আমি : শুনেছি, ওই দুয়ো-রাজকুমার যাচ্ছেতাই গালাগালি করত, অশ্লীল ভাষায় কথা বলত, অশালীন গান গাইত, গাঁজা ভাঙ খেতো, নোংরা জীবন যাপন করত -- এসব ক সত্যি ?
        আধপাগলা ১ : আমরা তো সবাই বস্তিতে থাকি, থাকি গণ্ডগাঁয়ে, আর ও তো আমদের সাথেই থাকত। আমাদের জীবন যাপন যেরকম, সেরকমই থাকত। সেটা অশ্লীল কি অশ্লীল নয়, সে আপনারাই জানেন। আর গালাগালির কথা যদি বলেন, সে তো আপনি থাকলেও করতেন। নিজের ভাই হয়ে সুয়ো-রাজকুমাররা ওর সাথে কোন মন্দ ব্যবহারটা করতে বাকি রেখেছিল শুনি ? ও যে ডেলি দু'চারটা খুনখারাবি করেনি, কেবল শালা-বাঞ্চোৎ করেছে, সেটাই তো অনেক ভদ্র ব্যবহার।
        আমি : শুনেছি, সেপাইরা ওকে যখন জেলখানায় নিয়ে যায়, তখন এক-দু'জন সুয়ো-রাজকুমারই ওর হয়ে সত্যিমিথ্যে সাক্ষ্য দিয়েছিল, বলেছিল. 'কই, ও তো রাজার মাকে ডাইনি বলেনি, যে ওটাকে ছেড়ে দে। ' কথাটা কি ঠিক ?
        আধপাগলা ২ : আরে সেটাই তো কাল হল। যে এক-দু'জন দুয়ো রাজকুমার 'কনখল' কমপ্লেক্সে ফ্ল্যাট কিনে সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে গিয়েছিল, তারাই ওরকম সাক্ষ্য দয়েছিল। তাই, ওর মনের এক কোণায় একটা বিশ্বাস থেকে গেল যে, সকল সুয়ো-রাজকুমার সমান শয়তান নয়, এক-দু'জন ভালো হয়। কিন্তু 'কনখল'-এর বাসিন্দা মাত্রেই যে 'সচ্ছল' ( সচ-ছল বা সৎ সেজে ছলনাকারী ) হয়, সেটা সে খেয়াল করেনি। অনেকে বলে, ওই বিশ্বাসের জন্যেই ও নাকি হেরে গেল।
        আমি : সাংস্কৃতিক-বাঁধ ভাঙার কলাকৌশল সে নাকি খুব ভালোভাবেই জানত, আর সে-রহস্য আপনাদেরকে সে নাকি বলে গিয়েছে। কথাটা কি সত্যি ?
        আধপাগলা ২ : আমাকে ওসব বলেনি বাবা। আমি সেসব কতা শুনিনি। বিশ্বাস করো ভাই, ওসব কতা আমি এক্কেরে শুনিনিকো। রাজার দেয়া বাঁধ বলে কতা। ভাঙব বললেই হল। সেপাই আচে না, সান্ত্রী আচে না।
        আধপাগলা ১ : দেখো বাছা। প্রত্যেক বাঁধের একটা না একটা ছিদ্র থাকে। সেটা সে জেনেছিল। সেখানে যন্ত্রাসুরকে আঘাত করলেই বাঁধটা ভেঙে পড়ে। কিন্তু কোন বাঁধের কোথায় ত্রুটি সেসব কথা আমার জানা নেই। যে দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আমার দেখা হয়েছিল, সে কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতির বাঁধের রহস্যগুলো বলত। তার সব কথা ভালো বোঝাও যেত না। তার দেওয়া একটা কাগজ আছে আমার কাছে, সেটায় সেসব সে লিখেও দিয়েছিল। তার কোনো কথাই আমার মাথায় ঢোকেনি। দেখো, তুমি বুঝতে পারো কি না।
        শেষ পর্ব : ম্লেচ্ছিতবিকল্প
        সাহিত্য সংস্কৃতির সাবলীল ধারার সামনে ওরা বাঁধ বেঁধেছে অজস্র প্রতীকের পাথর দিয়ে। সেগুলিকে সাময়িক প্রত্যয়ের পাথরপ্রতিমা দিয়ে রিপ্লেস করে ফেলা দরকার। বাঁধটা যেহেতু বিশাল, অজস্র পাথর গেঁথে গেঁথে তৈরি, তাই এই ভেঙে ফেলার কাজটাও বিশাল। এটা সফল করবার জন্য আরও অনেকের হাত লাগানো দরকার। আমি আমার সধ্যমতো এই রিপ্লেসমেন্টের কাজগুলো করার চেষ্টা করে থাকি এইভাবে :-
        ১) শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা ( একালের ) কবিতা রচনার প্রধান শর্ত।
        ২) আমার রচনা বাংলা ভাষার একটি বিশেষ কাঠামোকে সর্বজনীন করে তোলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রতিবাদ সংস্কৃতি পিটিয়ে কলকেতিয়া করে তোলার বিরুদ্ধে।
        ৩) পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকরা ঐতিহ্যের যে মানদণ্ড গড়ে ফেলেছেন তাকে অস্বীকার করাটা যেন তাঁদেরই অপমান করার উদ্দেশ্যে, এমন একটা ধুয়ো আজ সর্বজনস্বীকৃত। তাই শিল্প বানাবার বাঙালি চেতনা থেকে কবিতাকে মুক্ত করার চেষ্টাকে ভালো চোখে দেখা হয় না। ওদিকে কবিতা থেকে সিমবলিস্ট এবং সুররিয়ালিস্ট চাপ বাদ দেবার আইডিয়া আমার মাথায় ঘুরঘুর করছিল।
        ৪) আমি মনে করি, কবিতায় ভাষার খেলা, ইমেজ গেম, রিদম গেম, মেটাফিজিক্স গেম অবশ্য বর্জনীয়, কেননা ওগুলির সাহায্যে মানুষের অসহায়তা নিয়ে জোচ্চুরি করা হয়।
        ৫) আমি তো সিমবলিস্ট কবি নই যে একটা চিত্রকল্পকে কোনো কিছুর পপতীক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করব। ( বিষয়, আঙ্গিক, উপমা, ছন্দ, প্রতীক, রূপক, অলঙ্কার -- সর্বত্রই অ্যাটাক )।
        ৬) একদিকে চিৎকার, বিপরীতে ফিসফিসানি -- এই দিয়ে আমি কবিতার আধুনিক স্বরকে ভেঙে দিই।
        ৭) প্রেম ও অপ্রেম, শরীর ও মন ইত্যাদি যুগ্মবৈপরীত্য যেভাবে বাংলা কবিতায় তোয়াজ করা হয়েছে এতাবৎ এবং তার অন্তর্গত সন্ত্রাসটিকে কবিরা এতকাল যে-চেতনা প্রয়োগে বানচাল করেছেন, আমি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রেমকে সেনসরহীন স্বরূপে উপস্হাপন করি। প্রেম বা কবিতা এখন বিনোদন নয়।
        ৮ ) আমি ষাটের দশকের শুরু থেকেই অলঙ্কার বর্জনের কথা বলে আসছি। অধুনান্তিক চেতনাটি নিরাভরণ। আমার কবিতায় কবিত্বের সন্ত্রাসকে উৎসাহিত প্ররোচিত করার প্রয়াস যাথার্থ দিতে চায় অলঙ্কারহীনতাকে। আমার কবিতা দার্শনিক স্তরে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-আর্থিক-নৈতিক স্হিতাবস্হার বিরুদ্ধে একটি স্ব-স্বীকৃত দ্রোহতর্ক।
        ৯ ) আমি সত্যিই শিল্পের বিরুদ্ধে ও সংস্কৃতির স্বপক্ষে বলতে চেয়েছিলুম। পরাবাস্তববাদের আদলে শিল্পবিরোধিতার পালটা শিল্পের কথা বলিনি।
        ১০) সমস্ত কবিতার ক্ষেত্রে এক নিয়ম হতে পারে না। কনটেক্সট অনুসারে প্রত্যেকটির বয়নই তার মতো। এমন কবিতাও অতএব হতে পারে, যেখানে 'আলো' প্রতিনিধিত্ব করে না কান্টিয় বা বৈদিক আলোর। কেননা এমন পরিস্হিতি তো দেখাই যাচ্ছে যেখানে 'আলো' নামক লোগোটি ঘৃণ্য হয়ে গেছে। রেললাইনে হাত-পা বাঁধা যে পড়ে আছে, তার কাছে আগন্তুক আলো কী ? কিংবা যে আগুনের পরশমণি থানার সেপাইদের জ্বলন্ত সিগারেট হয়ে কয়েদি চাষির লিঙ্গে ছ্যাঁকা হয়ে লাগে, তাকে কী বলা হবে ? এসব ক্ষেত্রে প্রথাবাহিত সাংস্কৃতিক অনুমানগুলিকে আমার কবিতা নস্যাৎ করতে চায়। কবির কন্ঠস্বর নামক বদল্যারীয় জীবনানন্দীয় তর্কটি এর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং উত্তরাধিকারমুক্ত করা হয় কবিত্বকে।
        ১১ ) গতানুগতিক কবিতার অনুশাসনকে ছন্দের তেল চটচটে আঙ্গিকেই ভেঙে ফেলতে চাই বলে আমি কখনও কখনও ভাষার অনচ্ছ বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে থাকি, যাতে এমন একটা আদল পাওয়া যায়, যা বর্তমান অসম্বদ্ধতাকে অসংলগ্নতাকে আকস্মিকতার সন্নিবেশকে স্বতঃস্ফূর্ত করতে পারে। সেক্ষেত্রে তাই আমার কবিতার পাঠকৃতিটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছেতরানো, ছেঁড়াখোঁড়া, তাপ্পিমারা, বহুরঙা ও আসক্তিবিরোধী।
        ১২ ) ইংরেজরা বিদেয় হবার পর এবং দিল্লির দরবারে অজস্র জোকারের আবির্ভাবের ঘনঘটায় যে-ইতিহাসোত্তর কালখণ্ডটির হামলায় শব্দজগৎ ও ভাষাপৃথিবী আক্রান্ত, কবিতার ওই প্রোটোকলবর্জিত প্রতীকবাদবিরোধী এলাকাটির দখল নেয়া জরুরি।
        ১৩ ) 'সত্য' যে সর্বজনীন নাও হতে পারে, সে কথাটা বলা দরকার বলেই বলি।
        ১৪ ) আমি মনে করেছিলুম যে, একজন কবি হিসেবে মন ও দেহের যুগ্মবৈপরীত্যের তত্বটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো দরকার আর সেটাই আমি করেছি, যেখানে পেরেছি।
        ১৫ ) বাস্তবের তৈরি অবাস্তবতায়, স্হিরতার গড়া অস্হিরতায়, মুহূর্ত দিয়ে গড়া কালপ্রবাহে, অগতি থেকে উৎসারিত গতিতে, অবজেক্ট/সাবজেক্ট বিভাজনটি ভেঙে পড়ে।
        ১৬ ) দাঙ্গাকে প্রান্তিকের ওপর চাপিয়ে দেয় কেন্দ্র অথচ তা মসনদের চাকুমালিকদের অন্দরমহলের গল্প। তারা যেহেতু ক্ষমতার কেন্দ্রে, সত্যের নিয়ন্তা তারাই। শাসক মাত্রেই আধিপত্যবাদী, তা সে যে-তত্বেরই মালিক হোক।
        ১৭ ) কবিতায় ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ির ভাঙা দরজার মেলবন্ধন তখনই সম্ভব যখন বাস্তবে আধিপত্যবাদী শর্তগুলো মেনে নেওয়া হচ্ছে। আমার রচনার গেম-প্ল্যান মূলত সেই আদি সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা থেকে উপজাত। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অবিদ্যমান যুদ্ধ'-এর মতো যা অবর্তমান সেইটেই আমার রচনায় উপস্হিত হয়ে দশ পঙক্তির খেলা করে। খেলাটি সমাপ্ত হিসাবে ঘোষিত হবে তখনই, যখন ধাঁধাটির সমাধান হবে। নয়তো চলতে থাকবে মর্মার্থ-সঙ্কটাপন্ন শব্দাবলীর ঝোড়ো হাওয়া। মাত্রাতিরিক্ত মিলের মাত্রাতিরিক্ত নাটুকেপনা চলতে থাকবে।
        ১৮ ) ছবিগুলি ভাষার সাংস্কৃতিক নির্দেশের অন্তর্গত এবং তা দাঙ্গার সন্ত্রাসের বাইরেকার 'আমির' আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে। দাঙ্গার সন্ত্রাস স্ট্রাকচার্ড হয়। রাজপথে পড়ে থাকা সন্ত্রাস-পরবর্তী টুকিটাকি প্রকৃতপক্ষে অবাস্তব ঘটনাবলীর সত্য।
        ১৯ ) প্রত্যন্তকে, আধুনিকতা যে নান্দনিক সন্ত্রাসে নিয়ে গিয়ে আছড়েছে, স্বগতোক্তি ছাড়া সমস্ত শব্দ এবং ধ্বনি সেই চত্বরে অর্থহীন। সন্ত্রাসের উপাদান এক্ষেত্রে স্তব্ধতা, শিশির, ঝিঁঝি, নক্ষত্র, শীত, পাথর ইত্যাদি যা সনাতনি কবিতায় তথাকথিত সৌন্দর্য বানাবার কাজে লাগে। মাত্রা গুনে-গুনে যে ধরণের ডিজিটাল কবিতা বাজারচালু, সেই ডিজিটাল যান্ত্রিক কবিত্ব ভাঙা হয়েছে। ছন্দের ভেতরে ভেতরে কোনও মানে ঢোকানো নেই, যা কিছু মানে তা উপরিতলেই ভাসছে।
        ২০ ) ছয়ের দশকেও বাংলা কবিতায় থাকত চিত্র, চিত্রকল্প। আমি ব্যবহার করি উপচিত্র। রূপক নয়, লক্ষণগুলোই আমার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
        ২১ ) লিরিকের জমিতে রোমান্টিক চেতনার চাষ ভালো হয়, কেননা লেখকের কোনো নৈতিক দায় থাকে না। আমি কবিতায় ভঙ্গুরতা আগাগোড়া বজায় রাখি কাঠামোটিকে 'অ্যান্টিলিরিক' করে তোলার জন্য। একদিকে লিরিকের অচলাবস্হা থেকে এবং অপরদিকে ক্ষমতার তাত্বিক খবরদারি থেকে দূরে থাকা দরকার। লেখাকে তাই কাউন্টার-হিগেমনিক করে তোলা দরকার।
        ২২ ) প্রতিষ্ঠিত ফর্ম মাত্রেই প্রতিষ্ঠানের কুক্ষিগত, তাই তাকে ভাঙা জরুরি। জরুরি প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় মনোভাবের অবিনির্মাণ। পাঠকৃতি যেন স্বেচ্ছায় আত্মদীর্ণ, অসমতল, দ্বন্দ্ব-আবিল, অক্ষহীন, দলছুট, আপত্তিসূচক, উভমুখী, অসংহত, ঘরাণা-বহির্ভূত এবং চোরা-আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। কারণ কবি মানেই তো 'চোরাযোদ্ধা'।
        ২৩ ) অত্যন্ত বেশি ব্যাকরণবোধ থেকে সাজানো-গোছানো সমাজের ধান্দার দরুন পয়দা হয় ওদের স্তালিন ও আমদের সঞ্জয় গান্ধির আদর্শ। শুভর কুহকে আত্মসমর্পণ করে নাৎসিরা অশুভর রাজপথ উদ্বোধন করেছিল। সবাইকে পিটিয়ে সমান করার ব্যাষ্টিবাদের শুভত্ব মূলত একটি মৌলবাদী জবরদস্তি যা গদ্য কবিতাকেও ঢোকাতে চায় ছন্দের তালিবানি জেলখানাণ এবং আধমাত্রা সিকিমাত্রার বেয়াদপিকে শায়েস্তা করতে চায় অ্যাকাডেমিক গেস্টাপোদের নাকচের অস্ত্র দ্বারা। আমার রচনা তা মানে না এবং না-মানার ঝুঁকি নেয়।
        ২৪ ) কবিতায় আমি আপইয়েলিং ঢোকাই। আপওয়েলিং কোনো নির্মাণ নয়, সৃজনশীলতা নয়, পুনরাবৃত্তি নয়, ভাষাবয়ন নয়। ফ্রেম থেকে যাতে উপচিত্রগুলো বেরিয়ে যায়, তাই তাদের মধ্যে কোনও বার্তা পুরে দিই না। তারা অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন। যা চোখের সামনে তুলে ধরা যায় না, তাকেই তুলে ধরা। বিজ্ঞানীরা যেমন বলেন, যা চোখে দেখা যায় তার অস্তিত্ব নির্ভর করে, যা চোখে দেখা যায় তার ওপর। যেটা উপস্হিত।
         
      • বিশ্বজিত সেন | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:১৩735107
      • মলয় রায়চৌধুরীকে নতুনভাবে দেখা :বিশ্বজিত সেন


         

        মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা
        বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা ভাবাভাবি করেন, তাঁদের কিছু মজার প্রবণতা আছে। তাঁরা কবিতাকে গদ্য থেকে একেবারে আলাদা করে দেখেন, ও সেই দেখা চিরস্হায়ি করতে নানাবিধ সাংস্কৃতিক প্রপেরও আয়োজন রয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেরই নাম--- কবিপ্রণাম। রবীন্দ্রনাথকে মূলত দেখা হয় কবি হিসাবে। গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ তেমন গুরুত্বপূর্ণ লোক নন। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলব, গল্পলেখক রবীন্দ্রনাথই আমার কাছে সর্বাধিক গ্রাহ্য। যদিও রবীন্দ্রনাথের গল্প লেখার দর্শন আমার কাছে একেবারেই গ্রহণীয় নয়, তবু 'কবি' রবীন্দ্রনাথের চেয়ে, এই লোকটি আমার চোখে ঢের বাস্তব।
        কবিতাকে আলাদা করে দেখা, তাকে সুউচ্চ বেদিতে বসিয়ে রাখা, অহরহ গুজগুজ-ফিসফিস, আরে আজও যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে বাংলা সাহিত্যে ও মধ্যবিত্ত জনজীবনে। এ নিয়ে চিন্তা করেছি, আজও মাঝে-মাঝে করি। এ ভাবনার উৎস কোথায়?কিছুটা কি "ভারতীয় অতীত"- এর ব্যাপার রয়েছে এর মধ্যে। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত--- সবই কবিতায়। কবিকে রহস্যময় মানুষ মনে করা হত, যিনি নিজের চিন্তা-ভাবনাকে ছন্দবদ্ধ করতে সক্ষম। মনে করা হত স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর কাছে বার্তা পাঠিয়ে থাকেন। ভগবানের স্পেশাল মেসেঞ্জার তিনি, 'নট টু বি টেকন লাইটলি'। তার বহু পরে, 'ভক্তি' যুগে ভারতীয় সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবিকে সাধক বানিয়ে কুলুঙ্গিতে লাল শালু মুড়ে রেখে দেওয়া হল।কবীর, দাদু, নানক, সুরদাস, রহিম, জয়দেব, চণ্ডীদাস। তুলসীদাসকে 'গোঁসাই' বানিয়ে তাঁরও একই হাল করা হল।'রামচরিতমানস'কে ধর্মগ্রন্হ মনে করে গদগদ আপামর হিন্দিভাষী জনসাধারণ। তার দোহায় দোহায় শব্দের যে অদ্ভুত খেলা, ভাষাকে কাদার মতো ব্যবহার করে তা থেকে বিচিত্র নানা মূর্তি গড়ে তোলা, সেদিকে দুচারজন ক্রিটিক ছাড়া কারো নজরই যায়নি প্রায়। হিন্দি সাহিত্য ঐশ্বরিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে কবে একাজে হাত দেবে জানি না। আজকে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, এ-কাজ করার সময় এসে গেছে।
        ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল কিন্তু কবিকে অনেক সহজভাবে নিয়েছিল। কথক ও কবিয়াল ছিলেন, কবিগান ছিল। যাত্রার, পালার আসর ছিল, চণ্ডীতলা ছিল। অবশ্যই কবিকে স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ লোক মনে করা হত; তবে সাউক বা অবতার, বা ভগবান নয়। কবির লড়াইতে তো কবিতা তৈরি হত সর্বসমক্ষে, মুখে-মুখে। আর হারজিতও ছিল। কাজেই রহস্যের সেখানে কোনো ভূমিকাই ছিল না। কবি স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ বলে তাঁদের আদর-আপ্যায়নও হত, তবে তাঁকে একটি বেদিতে বসিয়ে তাঁর মুখের ওপর স্পটলাইট জ্বেলে রাখা ? নাঃ ! ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে তা করা হত না।
        ইংরাজরা আসার পর বাংলা সাহিত্যে কবিতার রহস্যের আমদানি হয়। নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে ইংরাজদের কিছু ছিল না। যাকে তারা নিজের সংস্কৃতি বলত, তার খুঁটিগুলো সবই ছিল গ্রিস, রোম থেকে ধার করা। গ্রিসে 'বার্ড' বা ভ্রাম্যমান কবিদের নিয়ে রহস্য গড়ার অভ্যাস প্রচলিত ছিল। ভক্তি যুগের আদলেই প্রায় বলা যায়, তাঁদের 'ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা', ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী, ইত্যাদি মনে করা হত। হোমারের স্হান গ্রিক মানসে প্রায় ঋষির জায়গাতেই ছিল, দাড়ি-টাড়ি সমেত। শেকসপিয়রও আরও কয়েকশো বছর আগে জন্মালে ঐ জায়গাতেই পৌঁছে যেতেন। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি পরে জন্মানোর দরুন বিশ্বসাহিত্য একটি নিদারুণ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিল।
        রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, সাহিত্যিক জীবনের পরবর্তীপর্বে, কবিতার বিশেষত্বের জায়গা থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন। যাকে সাহিত্যের বিশেষজ্ঞরা 'গদ্য কবিতা' বলেন, তা তাঁর এই বোধের সাক্ষ্য দেয়। তাঁর কিছু গদ্য কবিতা গল্পকেন্দ্রিক। সাহিত্যকর্ম ইশাবে অনেক উঁচু দরের কাজ সেগুলো। মোদ্দা ব্যাপার হল, আজ পাড়াব-পাড়ায় 'কবি প্রণাম' সত্ত্বেও সাহিত্যের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির মাঝখানের দেওয়াল ধ্বসিয়ে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাঁকে বাঙালি এত বেশি 'কবি' বানিয়ে ফেলেছিল যে হাত খুলে এই কাজটি করা সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। তবে কাজের মধ্য দিয়ে ঠারে-ঠারে যতটা পেরেছেন, করেছেন। বিশেষ করে ছবি আঁকার মাধ্যমে।
        কবিতাকে বা কবিকর্মকে ঘিরে একটা রহস্য সৃষ্টি করে রাখলে কবিতা কখনই সামাজিক পরিস্হিতির দলিল হয়ে উঠতে পারে না। কবিতার মিস্টিসিজমের প্রথম অসুবিধে এটা। কবিতা যদি সামাজিক পরিস্হিতির দলিল না হয়, তবে তাকে ড্রইংরুম সাজানোর ডলপুতুল বা অশ্রুমোছার রুমাল হয়ে থাকতে হয় কেবল।সেটা অবশ্য অনেকেরই মনঃপূত, বিশেষ করে যাঁরা 'সমাজ-টমাজ'কে দশ হাত দূরে রাখতে চান। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যেও লড়াই আছে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ আছে। একটি পক্ষের বিশেষ দর্শন এটাই। কবিতার গায়ে গরম হাওয়ার ঝাপটা যেন না লাগে।
        কবিতার মিস্টিসিজমের দ্বিতীয় অসুবিধে ভাষার স্তরে। ভাষা তো একটি নদী বিশেষ। একূল-ওকূল দুকূলই সে ভাসায়। তাকে সিমিলি, মেটাফর, ছন্দবৃত্ত, মাত্রা, পয়ার ইত্যাদির গণ্ডীর মধ্যে সর্বদা বেঁধে রাখা যায় না। কবিতার নিয়মানুবর্তিতা থেকেই কবিতার মিস্টিসিজমের জন্ম। এই নিয়মানুবর্তিতার দরুনই, একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন অনুভূত হয়, যে কবিতা 'লিখতে পারে'। যে 'পারে না', তাকে দূর করো, দাঁড় করিয়ে রাখো দরজার বাইরে। তার ভাষাটিও ব্রাত্য।
        তাই, কবিতার স্বার্থেই, কবিতার রহস্যময়তাকে ভাঙা অত্যন্ত প্রয়োজন।
        বাংলা সাহিত্যের সিরিয়াস পাঠক সম্প্রতি নড়ে-চড়ে বসেছেন। ষাটের দশকে, যে একটি তুমুল ওলোট-পালোট ঘটে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে--- সেদিকে নজর গেছে তাঁদের। দেরিতে হলেও, এটাই কাম্য ছিল।'হাংরি আন্দোলন' নিয়ে ইতিপূর্বে 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' গোছের কথাবার্তা হয়েছে। 'হাংরি আন্দোলনকারীদের' গভীর মননশীল পঠন-পাঠন ছিল, যাকে বলা যায় ওভারভিউ। হাংরির পরেও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এসেছে, তবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঝাঁকুনি হিসাবে হাংরিই ছিল "প্রথম"। বাংলা সাহিত্যের অবস্হা, হাংরি আন্দোলনের আগে ছিল অকালবৃদ্ধ আফিংখোরের মতো। রবীন্দ্র ঐতিহ্য পুঁটুলি বেঁধে কোলে নিয়ে বসে ঝিমোনো আর মাঝে-মাঝে চটকা ভেঙে, "অ্যাই, গোল কোরো না বলচি, পড়াশুনো করো, পড়াশুনো..."। অথচ দেশে-বিদেশে তখন ঘটছে যুগান্তকারী ঘটনা। 'গ্রানমা' জাহাজে চড়ে বিপ্লব করতে আসা কয়েকজন যুবক হঠাৎ জয়ী হয়েছেন। ওয়াশিংটন থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে দেখা দিয়েছে বিদ্রোহের পতাকা। ওদিকে ঠাসবুনোট সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্রমে ঠোঙা বানাবার কাগজ বই আর কিছু নয়। স্হিতাবস্হাকামী বাণিজ্যিক সংবাদপত্র গোষ্ঠীর প্রচণ্ড একমাত্রিক দাপট বাংলা সাহিত্যে। তার দোরগোড়ায় মাথা না ঠুকলে কেউ মানুষই হবে না, সাহিত্যিক হওয়া তো দূরে রইল।
        এইরকম সময়ে বাংলা সাহিত্যের 'পীঠস্হান' কলকাতা থেকে দূরে, পাটনা শহরে, যেখানে ঐশ্লামিক ধর্মশাস্ত্র পড়তে গিয়েছিলেন রামমোহন রায়, আর বেশ কয়েক বছর চাকরি করে গেছেন দীনবন্ধু মিত্র, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি অপরিচিত গরিব পরিবারের যুবক মলয় রায়চৌধুরী আই আন্দোলনটির ছক কষেন। দাদা সমীর রায়চৌধুরী কলকাতায় সিটি কলেজে পড়েন, সেই সুবাদে যুবা বাঙালি লেখক-কবিদের সাথে আলাপ-পরিচয়। দেশ-দুনিয়ে জুড়ে উথালপাথাল সত্ত্বেও কলকাতা, ব্রিটিশের প্রিয় 'কালকুত্তা' তখনও শীতল। বামপন্হী দলগুলোর বিরুদ্ধে গান্ধীবাবার কংগ্রেস প্রতিপালিত গোপাল পাঁঠা, ইনু মিত্তিরদের দাপাদাপি; কলকাতা শীতল। কবিতা ভবন (!) থেকে 'কবিতা' বেরোয়। বুদ্ধদেব বসুর পরিশীলিত আঙুল কবি বাছাই করে, ফতোয়া দেয়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সেই উপস্হিতি। এককালে...'না না অমন বলবেন না। সুকান্তও কবি। ছন্দ বোঝে। এই দেখুন আমি দেখাচ্ছি --- পতা/কায় পতা/কায় ফেরমিল/আনবে ফেব্রু/য়ারি। দেখলেন ?
        অট্টহাসি উদ্রেক করা সেই সময়। সমীর রায়চৌধুরীর 'পাটনাই' হওয়ার দরুন কলকাতার যুবক কবিদের পাটনায় আনাগোনা। এঁদের মধ্যে অন্যতম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। যাঁর বিষয়ে বাসব দাশগুপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মলয় বলেছেন, "শক্তির কবিতা সম্পূর্ণ নিজস্ব ও অসাধারণ। কেননা তিনি পাঁড় অশিক্ষিত, কোনো লেখাপড়া করেন না, এবং দর্শন, ইতিহাস, সমাজবোধ এসব ছিটেফোঁটা তাঁর মধ্যে নেই। নিজের খাঁটি বোধ থেকে তিনি লেখেন, তখন তাঁকে জীবনানন্দের পরের প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন মনে হয়।" মনে রাখা প্রয়োজন, এই সাক্ষাৎকারটি যখন দিচ্ছেন মলয়, তখনও হাংরি আন্দোলনের স্মৃতি, তজ্জনিত তিক্ততা, সব কিছু মলয়ের মস্তিষ্ককোষে উপস্হিত। কিছুই ক্ষমা করেননি। অথচ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে মলয়ের চোখা, টান-টান মূল্যায়ন। ব্যক্তিগত তিক্ততা সেখানে ছায়া ফেলেনি।
        হাংরি আন্দোলনের পরিকল্পনাপর্বে এই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে মলয় সঙ্গে পেয়েছিলেন, আর পেয়েছিলেন দেবী রায় ( হারাধন ধাড়া) কে। পাটনার সুবিমল বসাক এসে যোগ দেন কিছুকাল পরে।একটি সাহিত্য আন্দোলন, যা বাংলা সাহিত্যের হাল-হকিকত পালটে দিয়েছিল, কত সামান্যভাবে শুরু হয়েছিল, ভাবলে অবাক লাগে। প্রেস পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই মিষ্টির দোকানের বাকসো যে জব প্রেস ছাপতো, সেখানেই ছাপতে হয় হাংরি বুলেটিন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে মলয় তখন লোয়ার গ্রেড কেরানির চাকরিতে, কত মাইনে পেতেন জানা নেই, তবে প্রায় সম্পূণফ মাইনেটাই মনে হয় হাংরি বুলেটিনের পেছনে ঢালতে হত। বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম কাগজ বেরোনোর আরম্ভটা এইরকম। 'শতভিষা' পত্রিকার তুলনায় 'কৃত্তিবাস' ও নিজেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজই বলত, তবে হাংরি বুলেটিনের সাথে তার ছিল মৌলিক প্রভেদ। 'কৃত্তিবাস' ছিল সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খীদের কাগজ। তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে সুরে সুর মিলিয়ে। প্রতিষ্ঠান কখন যশ, প্রতিপত্তি, বৈভব, টাকাকড়ি, সামাজিক সুবিধার কাজে লেগে যায়, বলা তো যায় না। হাংরি বুলেটিনের উদ্দেশ্যই ছিল যুদ্ধ। আপসের জন্যে সেখানে কোনও জায়গাজমি রাখা হয়নি।
        অনেকের মতে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি গিমিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন রাতারাতি খ্যাত হবার জন্য, যেমন শাদা দিস্তা কাকজ, জুতোর বাকসো ইত্যাদি রিভিউএর জন্য পাঠানো, টপলেস প্রদর্শনীর আয়োজন ( টপলেসের অর্থ যে মুন্ড বা মস্তিষ্কবিহীনও হয়, এই বোধটুকু কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের হয়নি), জীবজন্তু-জোকারের মুখোশ বিলি ইত্যাদি। 'হাংরি কিংবদন্তি'তে মলয় উদ্ধৃত করেছেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের যে মন্তব্য, তা এ-প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে।কিন্তু মলয় বা তাঁর সঙ্গীরা কি জানতেন না যে প্রতিষ্ঠান ও প্রসাশন কতদূর হিংস্র হতে পারে? এ জানা সত্ত্বেও একজন চাকুরিজীবী ( মলয় ) নিজেকে এই ঝুঁকির সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন কেন ? শুধুই প্রচারের জন্য? না কি কিছু মূল্যবোধের ব্যাপারও ছিল ? মলয় তাঁর 'সাক্ষাৎকারমালা'র এক জায়গায় বলেছেন, 'ষাট দশকের সুস্হতা স্বাভাবিক ছিল না।' এই অস্বাভাবিক সুস্হতাকে ভালোমতো একটা ঝাঁকুনি দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। তার জন্য দুহাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি পরে চোর-ডাকাতের সঙ্গে সার বেঁধে পাটনা শহরের রাস্তায় অতিপরিচিতজনের মাঝে হাঁটা, চাকুরি থেকে সাসপেন্ড হওয়া, পঁয়ত্রিশ মাস প্রতি সপ্তাহে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো--- সবই। প্রচার পাওয়ার জন্য যদি এত করতে হয়, তাহলে তো মুশকিল। এর চেয়ে সহজ রাস্তা তো কতই ছিল। বিশেষত, 'কৃত্তিবাস' গোষ্ঠীতে তাঁর দাদার বন্ধুরাই যখন সর্বেসর্বা। সমসাময়িক অন্যান্যদের মতন একটু মিঠে ব্যবহার রাখলেই আর দেখতে হচ্ছিল না। আর, 'কৃত্তিবাস'ও তেমন-তেন বৈশিষ্টহীন ও লুপ্ত হবার পথে এগিয়েছে। সাহিত্য আন্দোলন সম্পর্কে 'কৃত্তিবাসীয়'দের সততার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে ?
        ( দ্রষ্টব্য: কবিতীর্থ, মাঘ ১৪১০)
        বলা যেতে পারে যে 'কৃত্তিবাস' যদি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে না টিকে থাকে তবে 'হাংরি বুলেটিন'ও তো টেকেনি। হ্যাঁ, হাংরি বুলেটিন উঠে গিয়েছিল মামলা-মকদ্দমার দরুন, অন্তর্কলহের দরুন। কিন্তু হাংরিদের ঝগড়াঝাঁটি ছিল খোলাখুলি, তাতে মধ্যবিত্তের চাপ-চাপ ঢাক-ঢাক ছিল না। মামলা-মকদ্দমার ভয়ে কেউ রাজসাক্ষী হয়েছিলেন ( সুভাষ ঘোষ,শৈলেশ্বর ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ ), কেউ ভেবড়ে গিয়ে কলকাতার বাইরে কেটে পড়েছিলেন ( প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য প্রমুখ )। সেগুলোকে দেখার কোনও অর্থ হয় না।'হাংরি বুলেটিন' বন্ধ হবার পর অগনণ পেশিবহুল বাহু এগিয়ে এসেছে আন্দোলনের পতাকা তুলে নিতে।জেব্রা, উন্মার্গ, ফুঃ, স্বকাল, ক্ষুধার্ত খবর, জিরাফ, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, ওয়েস্ট পেপার, চিহ্ণ, প্রতিদ্বন্দী ইত্যাদি পত্রিকাও হাংরি বুলেটিনই। মলয় কোনোদিন বলেননি যে হাংরি আন্দোলনের কপিরাইট একমাত্র তাঁর। হ্যাঁ, আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও দার্শনিক প্রতিনিধি হিসাবে তাঁর কিছু বক্তব্য থাকতেই পারে, যা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পাঠকদের সামনে রেখেছেন।এই অধিকার থেকে তো আর তাঁকে বঞ্চিত করা যায় না। মলয়ের পরবর্তীকালীনরা হাংরি মতাদর্শকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।এটিও একটি আন্দোলনের প্রাণশক্তির প্রমাণ। মলয়, হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পর, পড়ালেখার নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছেন, মন দিয়ে এবং চুটিয়ে বিভিন্ন শহরে চাকরি করেছেন, সংসার করেছেন, ভারতীয় জনজীবনকে দেখেছেন, জীবন থেকে শিখেছেন। আজ গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধের যে হতচকিত-করা ফসল তিনি আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তা সম্ভব হতে পেরেছে এরই দরুন। বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের গদি-আঁটা চেয়ারে বসে আঙুলে চাবির রিং ঘোরাননি মলয়। এর জন্য তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। অন্তত একটি আকাশ এমন রয়েছে, যাকে ঢেকে ফেলতে পারেনি কালো মেঘ।
        মলয়কে 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটির দরুন মামলায় পড়তে হয়। কবিতাটি বর্তমানে বহুল প্রচারিত, তাই তাকে আর সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করার প্রয়োজন নেই। তবে এই কবিতাটিকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা, যদি ধরেও নেওয়া যায় যে এর পেছনে কোনো অসূয়া কাজ করছিল না, একটি কৌতুকপ্রদ মাইন্ডসেট-এর দিকে ইঙ্গিত করে। এই মাইন্ডসেটটি তদানীন্তন বুদ্ধিজীবী বাঙালির, যিনি পুজোর ছুটিতে সস্ত্রীক খাজোরাহো দেখতে যান। তাহলে মলয়ের কবিতা কেন গ্রহণীয় নয় ? মজা কেবল এই জায়গাটুকুতে নয়, অন্যত্রও আছে। "আমরা যখন অসভ্য ছিলুম তখন ওইগুলো বানিয়েছি। এখন আমরা সভ্য, এখন তো আর এসব চলতে দেওয়া যায় না। " এও মানলাম, কিন্তু মাই ডিয়ার, ব্যাপারটা যে আদপে তা নয় একেবারেই। ব্যাপার আগাগোড়া অন্যরকম। যৌন রূপকল্প, দ্যোতক ও বিম্ব কেবল ব্যবহার করেছেন মলয়, সেগুলির মাধ্যমে নিজের কথা বলেছেন। এও চলবে না ? তাহলে শিবলিঙ্গ তুলে দিন, গৌরীপট্ট নাকচ করুন, অম্বুবাচী ব্যান করুন। কামাখ্যা মন্দিরে মা-কামাখ্যার মাসিক যেন আর না হয়। কি বলেন ? যাঁরা "অশ্লীল অশ্লীল" চিল্লিয়েছিলেন, তাঁরা সম্ভবত 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার-এর এই লাইনগুলো নজর করে দেখেননি--
        ১.
        জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
        আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
        মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
        তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে কিছুকাল ঘুমোতে দাও শুভা
        শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
        ২.
        হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
        আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
        মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না
        তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহ্যতায়
        সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
        শিল্পর জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোবো
        কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই...
        ৩.
        এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
        আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
        এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
        মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
        আমি মরে যাব...
        ৪.
        ৩০০০০০ লক্ষ শিশি উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
        ঝাঁকেঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
        এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
        হিপ্নটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়
        ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখী আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
        কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি
        এই পঙক্তিগুলো একটু মন দিয়ে পড়লে বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর পক্ষে বোঝা দুষ্কর ছিল না যে নিছক যৌনতা নয়, আরো গূঢ় কোনো বোধের দ্যোতনা এই পঙক্তিগুলোয় রয়েছে।'সাত বছর আগের একদিন' কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন, "অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয় আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে। আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত ক্লান্ত করে। লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই..."। এই পঙক্তিগুলোকে উদ্ধৃত করে জীবনানন্দকে শবসাধক সাব্যস্ত করা অবশ্যই উচিত হবে না, অথবা ঘোর অঘোরপন্হী। তেমনই হাস্যকর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ যৌনতার বহিঃপ্রকাশ খোঁজা। আসলে মলয়ের বিরুদ্ধে যখন ষাটের দশকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার মকদ্দমা দায়ের করা হয়, তখন ষাটের দশকের 'অস্বাভাবিক সুস্হতা' রাজত্ব করছে পুরোদমে।'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে প্রবোধকুমার সান্যালের 'দেবতাত্মা হিমালয়' আর মেট্রো সিনেমার ফুটে রিফিউজি যুবতীদের শরীর নিয়ে চলছে অবাধ বাণিজ্য! পায়ের চটি ঘষটাচ্ছে রিফিউজি যুবক, 'মাই ওন সিসটার স্যার, ভেরি সুইট, ওনলি সিক্সটিন'। অথচ বাঙালি পাঠক 'কত অজানারে'র বারবেল সাহেব আর 'সখী সংবাদ' এর মিষ্টিদিদি, নতুন দিদি, এদের নিয়েই মুগ্ধ। সমাজ কোথাও নেই; সমাজের জ্ধবলাপোড়া, আর্তি, চিৎকার এগুলোও কোথাও নেই। বামপন্হীরা 'পরিচয়' পত্রিকা চালাচ্ছেন, তাতেও এন্ট্রি পারমিট নিয়ে ঢুকতে হয়। এইরকম এক সময়ে 'হাংরি বুলেটিন' এর দরকার ছিল, প্রয়োজন ছিল 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এর। মূল্যবোধ ভেঙে খানখান হওয়ার যে হরর, শিল্পপ্রতীক জোলো হয়ে যাওয়ার যে শক, তাকে যথার্থ ফুটিয়ে তুতে গেলে এই কবিতাই তো লিখতে হবে। মলয় তাই করেছিলেন।
        অবশ্য বিপদ চেনার ব্যাপারে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের সূক্ষ্মদৃষ্টির প্রশংসা করতেই হয়। কেই বা পড়ে তখন 'হাংরি বুলেটিন', কটা লোক ? পাটনার দুই যুবক, একজন হাওড়ার, একজন বিষ্ণুপুরের, একজন শান্তিনিকেতনের, এদের বুলেটিন বেরোয়। তার জন্যও আবার এই প্রেস, ওই প্রেসের হাতে-পায়ে ধরাধরি। তাহলে? এমন কী ক্ষমতাসম্পন্ন এরা, যে ক্ষেপে উঠল গোটা কলকাতার বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রশাসন ? মলয়ের বিরুদ্ধে কেবল মামলাই নয়, তাঁকে ও অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করে অপমান করা হল চরম, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন এই জাতীয় প্রবণতা মাথা তোলার হিম্মত না করে।
        বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন যে সমাজকে বুঝতেন না তা নয়, ভালোমতোই বুঝতেন। তাঁরাও জানতেন যে, যে-বদমায়েশি তাঁরা শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতির সর্বত্র বিছিয়ে রেখেছেন, তা মানুষের জন্য নয়। তবে শ্রেণী স্বার্থে এর প্রয়োজন তাঁদের ছিল। যেমন ইংরেজরা, আই.সি.এস.কে লৌহ কাঠামো হিসাবে গড়ে তুলতে ছেয়েছিল, তেমনই উত্তর-স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় পুঁজিবাদ, আমলাতন্ত্র ও তার মিডিয়া-খানসামাদের লক্ষ ছিল একটি জড়, নির্বোধ, সংবেদনহীন মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তোলা। তাদের রুচি, জীবনযাপন, মূল্যবোধ, সব কিছু হবে ছাঁচে ঢালা, সিনথেটিক। তারা হাসবে, কাঁদবে, গাইবে, সঙ্গম করবে একটি বিশিষ্ট কায়দায়। 'হাংরি প্রজন্ম'এর হুড়মুড় করে এসে পড়ায় এই গোটা গেমপ্ল্যানটি ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। মলয় এবং অন্যান্যদের ওপর আক্রমণ সেই কারণেই।
        প্রজাপতি-আঁকা বিয়ের কার্ডে হাংরি প্রজন্ম ধ্বনি তুলেছিল, "গাঙশালিক কাব্যস্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো"। এই ধ্বনিটিতে অন্তর্নিহিত ছিল তদানীন্তন কাব্যধারার প্রতি বিবমিষা।
        প্রকৃতি, নিসর্গ এই ব্যাপারগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলো বাংলা কবিতার কলোনোয়াল রোগবিশেষ। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ ছিল একটা কমপালশান, যেমন লেখালিখি ছিল তাঁর কমপালশান। সেজন্য তাঁর লেখায় প্রকৃতি, নিসর্গ বিশেষভাবে উপস্হিত--- কবিতায়, নাটকে, উপন্যাসে। আঁকার সময়ে তিনি এগুলো বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে, বাংলা কাব্যধারায় এই ব্যাপারগুলো প্রয়োজনীয় অনুপান হয়ে ওঠে। এবং অনুপানেরও অধিক, অভ্যাস।জীবনানন্দ লেখেন 'রূপসী বাংলা'। তাতেও নিসর্গ ছিল; তবে সেই নিসর্গ, প্রকৃতির প্রতিটি কমপোনেন্ট আবহমানের বাঙালিজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিল।মানুষের সাথে সম্পর্কবিহীন ছিল না সেই নিসর্গ, সেই প্রকৃতি।সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, "একদা আষাঢ়ে এসেছি এখানে, মিলের ধোঁয়ায় পড়ল মনে; কালবৈশাখী নামবে যে কবে আমাদের হাত-মেলানো গানে"। এখানে মানুষের সংগ্রামকে আঁকা হয়েছে প্রাকৃতিক ঘটনার রং-তুলিতে। কিন্তু বাংলা ভাষার সেইসব কবিরা (গাঙশালিক কাব্যস্কুল) সৃষ্টি করছিলেন মনুষ্যবিহীন নিসর্গ, মানুষকে মাইনাস-করা প্রকৃতি। এ ছিল একজাতীয় পলায়নবাদ। শংকরের 'কত অজানারে' যেমন বাঙালি যুবকের বেকারত্ব থেকে পলায়ন করতে চেয়ে বারবেল সাহেবের মহানতায় বুঁদ হয়ে থাকা, বিমল মিত্রের মিষ্টি দিদি, নতুন বৌদি, ছোট বৌঠান যেমন নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনসম্পর্ক ফেস করতে না চাওয়ার যুক্তি, তেমনই 'গাঙশালিক কাব্যস্কুল' ছিল মানুষের দুঃখ, শোক, রোগ, ঘা-পাঁচড়া এগুলোকে দেখতে না চেয়ে স্টুডিওর পর্দায় আঁকা চাঁদ, তারা, নদী, ফুলে বিভোর হয়ে থাকা। ঠিক তখনই মানুষের জীবনধারণ কতদূর দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল, তা দেখতে পাওয়া যায় ঋত্বিক ঘটকের ফিলমগুলোতে। সেই দৈন্য, দুর্দশা, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের প্রতিফলন এই কবিতাগুলোতে কোথাও ছিল না। কেন ? কেননা, তা করার অসুবিধে ছিল। তা করতে গেলে দীর্ঘ একটা লাফ দিতে হত, বিশেষ করে ভাষার ক্ষেত্রে।ঋত্বিক যেমন 'মেঘে ঢাকা তারা' বা 'কোমল গান্ধার' -এ গোটা ইডিয়মটিকেই ভেঙেচুরে ফেলেছিলেন, তেমনই ষাটের দশকের বঙ্গসমাজ ও মানুষেকে তুলে আনতে গেলে বাংলা কবিতার গোটা ইডিয়মটিকেই ভাঙতে হত। খানিকটা শ্রেণী পরিপ্রেক্ষিত আর কিছুটা গাড্ডায় পড়ে যাওয়ার ভয়, উভয়ে মিলে এ-কাজ করতে দেয়নি বাংলা ভাষার কবিদের। অতএব চাঁদ, তারা, নদী, ফুল, মৌমাছি...
        আরেকটি প্রশ্নও ছিল। কবি কি কেবল কবিতাই লিখবেন, না সামাজিক ভাষ্যকারও হবেন ? রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি নন, সামাজিক ভাষ্যকারও ছিলেন। জীবনানন্দও তাই ( জীবনানন্দকে নিবীঢ়ভাবে পড়লে এই ব্যাপারটি ধরা পড়ে)। কিন্তু উত্তরোত্তর সামাজিক ভাষ্যের ব্যাপারটি বাংলা কবিতা থেকে উঠে যেতে থাকে। "কবিতা কবিতাই। সামাজিক ভাষ্যটাষ্য আবার কী?" এ-জাতীয় একটী প্রবণতা বাংলা কবিতাকে পেয়ে বসতে থাকে। একে ক্রমাগত হাওয়া দিতে থাকে স্বার্থান্ধ বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান।
        খুব স্বাভাবিকভাবেই নভেম্বর ১৯৬১-এর প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি প্রজন্ম এই প্রবণতার বিরুদ্ধে ছিল। সেই দিন থেকে আজ অব্দি মলয়, সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি কোনোদিনই হাতছাড়া করেননি। 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'এ যেমন সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ে তাঁর তীব্র বিবমিষা, তামনই আজও। তাঁর হালের একটি কবিতা নেওয়া যেতে পারে, 'যা লাগবে বলবেন' সংকলন থেকে। কবিতাটির নাম 'ক্ষুধার্ত মেয়ে':
        আমার আসক্তি নেই কোনো
        চলে যা যেখানে যাবি
        যার সঙ্গে শুতে চাস যা
        আমি একা থাকতে চাই
        ক্ষুধার্ত বা পেটুক মহিলা
        যে ঘোরে সবার হাতে
        খড়কুটোময় সংসারে
        তার কোনো প্রয়োজন নেই।'
        কবিতাটিতে জড়িয়ে আছে একটা ঈষৎ বোহেমিয়ান বাচনভঙ্গী। পড়লে মনে হবে কেউ একজন লিখছেন তাঁর শয্যাসঙ্গিনীর উদ্দেশ্যে। এটি কিন্তু কবিতার প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তরে কবিতা ও সমাজ সম্পর্কে মলয়ের দার্শনিক বোধ সন্নিহিত। শয্যাসঙ্গিনী মহিলাটি আসলে কবিতাই। অথচ সবার হাতে ঘোরার প্রবণতা তার, সে হাত স্মাগলারের হোক বা বিপ্লবীর।কবিতার লয়ালটি সন্দিগ্ধ। ওদিকে সংসার অনিত্য, অতএব তার প্রয়োজন কিসের ?
        'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতায় যে-কথা বলার জন্য মলয়কে অনেক বেশি জায়গা ব্যবহার করতে হয়েছে, 'যা লাগবে বলবেন' গ্রন্হে সেই কথাই তিনি বলেছেন অনেক সংক্ষিপ্ত পরিসরে। 'হাংরি আন্দোলন' থেকে সরে এসে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ইন্সপেক্টিং অফিসার হিসেবে ভারতের গ্রামে-গঞ্জে শহরে শহরে ঘোরা, তারপর এ.আর.ডি.সি. ও নাবার্ডের গ্রামোন্নয়ন বিশেষজ্ঞের উচ্চপদে। যদিও মলয় তাঁর এই পরিবর্তিত জীবনশৈলী নিয়ে 'হাংরি কিংবদন্তি' গ্রন্হের শেষে মশকরাও করেছেন, "ছাই-এর জায়গায় আসে টুথপেস্ট, কয়লার উনুনের বদলে গ্যাস, সর্ষের তেলের বদলে সূর্যমুখী, শার্ট-প্যান্টের বদলে সাফারি, মাদুরের স্হানে বিছানা, ঢাবার বদলে রেস্তরাঁ, দিশির জায়গায় স্কচ, কলেজস্ট্রিট ও বইপাড়ার বদলে বাংলার গ্রামশহর।" কিন্তু তবু জীবনের এই অধ্যায়টিও যে কবি হিসেবে মলয়কে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
        'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ বাঁধন-ছেঁড়া রাগ ছিল মলয়ের কবিতার পরিচিত চিহ্ণ। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে জীবনের বহু কিছু দেখে-শুনে মলয়ের কন্ঠস্বর তেতো, অম্লকষায়, আর তার সাথে এসে জুটেছে আয়রনির অধুনান্তিক পরিহাসও। তবু তা মলয়ের কবিতাকে সর্বজনগ্রাহ্যও করে তোলে বটে।'যা লাগবে বলবেন'-এর আরও একটি কবিতাকে নেওয়া যেতে পারে, যেমন 'দ্রোহ':
        এ-নৌকো ময়ূরপঙ্খী
        তীর্থযাত্রী
        ব্যাঁটরা থেকে যাবে হরিদ্বের
        এই গাধা যেদিকে দুচোখ যায় যায়
        যাযাবর
        ঘাট বা আঘাটা যেখানে যেমন বোঝে
        ঘুরতে চাই গর্দভের পিঠে
        মাথায় কাগুজে টুপি মুখে চুনকালি
        পেছনে ভিড়ের হল্লা।
        ব্যাস! কবিতা এইটুকুই। অথচ বাঙালি সমাজের যে একটি বিশেষ প্রবণতা, কবিকে বেদিতে বসিয়ে রাখার, তাকে কত সার্থক ভাবে ভাঙঅ হয়েছে এখানে। পাটনার অন্ত্যজ মহল্লাগুলোতে হোলির দুতিন দিন আগে থেকে চোখে-পড়া একটি সুপরিচিত দৃশ্যকে ব্যবহার করেছেন মলয়, প্রশ্নাতীত দক্ষতাসহ। তার সাথে মিশিয়েছেন তীর্থযাত্রার জন্য বাঙালি হিন্দুর চিরাচরিত আতুরতাটিকে, যাতে পোস্টমডার্ন পরিহাস আরও তীব্র হয়। আর... হাংরি মামলার সময়ে তাঁকে যে-সামাজিক অবমাননা সইতে হয়েছে, তাও উঠে এসেছে। মাত্র কয়েকটি পঙক্তির মধ্যে কত প্রসঙ্গ যে এসেছে, অথচ বলার ভঙ্গিটি এত সহজ যে ভাবাই যায় না।
        এই সংগ্রহের আরেকটি কবিতা 'যে পার্টি চাইছেন সে পার্টিই পাবেন'।
        বিশ্বাস এক দুর্ঘটনা
        বুকপকেটে শ্রেণী
        প্রতিরোধী থাকেন জেলে
        কাজু-ফলের ফেনি
        বরং ভালো
        ভুল অঙ্কের ডানা।
        ...মোড়ল দলের পাড়ার কেউ বা
        আওড়ায় বেঘোরে
        ছাদ ঢালায়ের সমরবাদ্য
        কর্তাবাবার জানা
        মেলাবেন তিনি অন্তরীক্ষে
        মোক্ষ একখানা।
        কবিতার শেষ দুটি পঙক্তিতে অমিয় চক্রবর্তীর 'মেলাবেন তিনি মেলাবেন', এই শান্ত, স্হিত, প্রায় ব্রাহ্ম, উত্তর-রাবীন্দ্রিক বিশ্বাসের আদলটি একেবারে বিপরীত অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পার্টি আমলাতন্ত্রের যে প্রবল দাপত, যার দরুণ তেলে-জলে মিশ খেয়ে একেবারেই একাকার, পুতুল নাচের সুতোর শেষ প্রান্তটি ব্যক্তিবিশেষের হাতে, সেটিতে যেমন-যেমন টান পড়ছে, কাঠের পুতুলগুলো তেমন-তেমনই নাচছে; এই গোটা পরিবেশটি উঠে এসেছে কয়েকটি মাত্র পঙক্তির মাধ্যমে। মলয় বুঝিয়েছেন, যা বোঝাতে গেলে অন্তত কয়েকশো পাতার বই দরকার। আর? বিরোধীপক্ষ বলতে কিছু নেই আর। যারা বিরোধ করছে, তারাও বস্তুত নিজের-নিজের ছাদই ঢালাই করছে। সেই ছাদ ঢালাই-এর বাজনাকে মানুষ মনে করছে সমরবাদ্য।
        এত সূক্ষ্ম যাঁর ভাষার পরিমিতিবোধ, তিনি কিন্তু 'চিৎকারসমগ্র' গ্রন্হে এসে আবার অন্যরকম হয়ে যান। দড়ি ঢিলে দেন একটু, যাতে তাঁর সংবাদবাহক ঘুরতে পারে জায়গা-বেজায়গায়। 'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতাটির অংশ পড়া যেতে পারে এই প্রসঙ্গে:
        হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া সেই প্রৌঢ় নদী
        নাচছে দুর্গাবোঙার ফরসা কোমর জড়িয়ে
        শহর-পুরুতের গামছা কাঁধে
        তাককা হুরে
        আরে হুরে তাককা হুরে
        বোঙা আদিবাসী দেবতা-অপদেবতার সর্বনাম। দুর্গা বাঙালির আবহমানের দুর্গতিনাশিনী। তারই কোমর জড়িয়ে নাচছে হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া প্রৌঢ় নদী, কাঁধে শহর-পুরুষের গামছা। তাককা হুরে, আরে হুরে তাককা হুরে, শহুরে মাস্তানদের উল্লাসধ্বনি।
        ভাঙনের ছায়াগাছ। এই ভাঙনকে সর্বদা দেখতে পাওয়া যায় না, অথচ সে তার কাজ করে চলেছে। ভাঙন বস্তুত একটি সার্বিক প্রক্রিয়া। এর দরুন সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মজাদার মিলমিশ। বুর্জোয়ার বক্তব্য আশ্রয় করে লুমপেনের ভাষাকে।লুমপেন অ্যাডপ্ট করে বুর্জোয়ার চালচলন। এর সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে ওর উঠোনে। ওর 'রোনাধোনা'য় শোনা যায় এর অনুরণন।
        চিৎকার করতে-করতে পড়ছে জলপ্রপাত চুলে
        ঢাউসপেট পোয়াতি অফিস-বারান্দায় আইল হাতে
        থ্যাতলানো ট্যাক্সিচালক হাওড়া স্টেশানে
        যেখানে সাপের ফণা জমা রাখতে হয়
        শহর বিষদাঁত খুলে নেয় প্রত্যেকের। ছোবলানো তো চলবেই না, ফোঁস করাও নয়। অফিস বারান্দায় ফাইল হাতে গর্ভিনী। কী প্রসব করতে চলেছে সে ? তারই মধ্যে ঝরে যেতে থাকা কেশপাশের চিৎকার। আলুলায়িত কেশপাশ বাঙালির আবহমানের সৌন্দর্য-মিথের অংশ।
        মেঝেময় ছড়িয়ে-থাকা গোঙানির টুকরো তুলে
        তারা বদলায়নি তবু আদল পালটেছে
        হে নাইলন দড়ি বাড়িতে এখন কেউ নেই
        কিন্তু বাইরে হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর
        কবিতাটি পড়তে-পড়তে বহু পুরোনো টার্কিশ ফিলম 'কংকারার্স অফ দি গোলডেন সিটি'র কথা মনে পড়ে। নিষ্পাপ একটি গ্রাম্য পরিবার শহরে এসে সব কিছু ধিরে-ধিরে হারাল। তার মেয়েরা হয়ে গেল বেশ্যা, পুরুষেরা অপরাধি। হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর--- গোল্ডেন সিটি। সোনার শহর। নারকেল দড়ির বদলে নাইলন দড়ি, সভ্যতার অগ্রগতি। বাড়িতে কেউ নেই, শূন্যতা অপরিসীম।
        কবিতাটির শেষ স্তবকে এসে মলয় দুর্বার ছুট লাগান--- এমন ছুট যে কবিতা ব্যাপারটাই দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
        কচি বালক-পাছার নধরমাংস দেবদূত
        মাখনমাখা ব্রয়লার যার শেষ খদ্দের
        চলে গেছে তিন বছর তার ব্লাউজে সেফটিপিনগাঁথা হৃদয়
        স্লুইস দরজা খুলে আলোর নারীশরীর
        যে জীবন বুকের সামনে উঁচিয়ে অচেনা পিস্তল
        তখনই সিঁড়িতে সাদা ছড়ির আওয়াজ তুলে
        গামছায় মুখ ঢেকঢ গাঁও বালিকার কান্না
        কেঁপে উঠেছে শিশুর গায়ে হাত ঠেকলে
        ভাঙন যখন সব কিছুকেই ভাঙছে, তখন কবিতাকেও সে ভাঙবে। ভাঙতে-ভাঙতে কবিতাও মুক্ত হয়ে যাবে। তখনই বোধহয় বিদ্যুৎ ঝলকের মত এক অন্য কবিতার সৃষ্টিমুহূর্ত।'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতায় আমরা সেই প্রক্রিয়াটি দেখতে পাচ্ছি, চাক্ষুষ।মলয় রায়চৌধুরী থেকে বোধ হয় এক নতুন কবিকুলের সৃষ্টি হল, যাঁরা কেবল কবি নন, আপোষহীন সামাজিক ভাষ্যকারও বটে।

         
         

         
         
         
      • বিশ্বজিত সেন | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:১৩735106
      • মলয় রায়চৌধুরীকে নতুনভাবে দেখা :বিশ্বজিত সেন


         

        মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা
        বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা ভাবাভাবি করেন, তাঁদের কিছু মজার প্রবণতা আছে। তাঁরা কবিতাকে গদ্য থেকে একেবারে আলাদা করে দেখেন, ও সেই দেখা চিরস্হায়ি করতে নানাবিধ সাংস্কৃতিক প্রপেরও আয়োজন রয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেরই নাম--- কবিপ্রণাম। রবীন্দ্রনাথকে মূলত দেখা হয় কবি হিসাবে। গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ তেমন গুরুত্বপূর্ণ লোক নন। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলব, গল্পলেখক রবীন্দ্রনাথই আমার কাছে সর্বাধিক গ্রাহ্য। যদিও রবীন্দ্রনাথের গল্প লেখার দর্শন আমার কাছে একেবারেই গ্রহণীয় নয়, তবু 'কবি' রবীন্দ্রনাথের চেয়ে, এই লোকটি আমার চোখে ঢের বাস্তব।
        কবিতাকে আলাদা করে দেখা, তাকে সুউচ্চ বেদিতে বসিয়ে রাখা, অহরহ গুজগুজ-ফিসফিস, আরে আজও যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে বাংলা সাহিত্যে ও মধ্যবিত্ত জনজীবনে। এ নিয়ে চিন্তা করেছি, আজও মাঝে-মাঝে করি। এ ভাবনার উৎস কোথায়?কিছুটা কি "ভারতীয় অতীত"- এর ব্যাপার রয়েছে এর মধ্যে। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত--- সবই কবিতায়। কবিকে রহস্যময় মানুষ মনে করা হত, যিনি নিজের চিন্তা-ভাবনাকে ছন্দবদ্ধ করতে সক্ষম। মনে করা হত স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর কাছে বার্তা পাঠিয়ে থাকেন। ভগবানের স্পেশাল মেসেঞ্জার তিনি, 'নট টু বি টেকন লাইটলি'। তার বহু পরে, 'ভক্তি' যুগে ভারতীয় সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবিকে সাধক বানিয়ে কুলুঙ্গিতে লাল শালু মুড়ে রেখে দেওয়া হল।কবীর, দাদু, নানক, সুরদাস, রহিম, জয়দেব, চণ্ডীদাস। তুলসীদাসকে 'গোঁসাই' বানিয়ে তাঁরও একই হাল করা হল।'রামচরিতমানস'কে ধর্মগ্রন্হ মনে করে গদগদ আপামর হিন্দিভাষী জনসাধারণ। তার দোহায় দোহায় শব্দের যে অদ্ভুত খেলা, ভাষাকে কাদার মতো ব্যবহার করে তা থেকে বিচিত্র নানা মূর্তি গড়ে তোলা, সেদিকে দুচারজন ক্রিটিক ছাড়া কারো নজরই যায়নি প্রায়। হিন্দি সাহিত্য ঐশ্বরিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে কবে একাজে হাত দেবে জানি না। আজকে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, এ-কাজ করার সময় এসে গেছে।
        ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল কিন্তু কবিকে অনেক সহজভাবে নিয়েছিল। কথক ও কবিয়াল ছিলেন, কবিগান ছিল। যাত্রার, পালার আসর ছিল, চণ্ডীতলা ছিল। অবশ্যই কবিকে স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ লোক মনে করা হত; তবে সাউক বা অবতার, বা ভগবান নয়। কবির লড়াইতে তো কবিতা তৈরি হত সর্বসমক্ষে, মুখে-মুখে। আর হারজিতও ছিল। কাজেই রহস্যের সেখানে কোনো ভূমিকাই ছিল না। কবি স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ বলে তাঁদের আদর-আপ্যায়নও হত, তবে তাঁকে একটি বেদিতে বসিয়ে তাঁর মুখের ওপর স্পটলাইট জ্বেলে রাখা ? নাঃ ! ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে তা করা হত না।
        ইংরাজরা আসার পর বাংলা সাহিত্যে কবিতার রহস্যের আমদানি হয়। নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে ইংরাজদের কিছু ছিল না। যাকে তারা নিজের সংস্কৃতি বলত, তার খুঁটিগুলো সবই ছিল গ্রিস, রোম থেকে ধার করা। গ্রিসে 'বার্ড' বা ভ্রাম্যমান কবিদের নিয়ে রহস্য গড়ার অভ্যাস প্রচলিত ছিল। ভক্তি যুগের আদলেই প্রায় বলা যায়, তাঁদের 'ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা', ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী, ইত্যাদি মনে করা হত। হোমারের স্হান গ্রিক মানসে প্রায় ঋষির জায়গাতেই ছিল, দাড়ি-টাড়ি সমেত। শেকসপিয়রও আরও কয়েকশো বছর আগে জন্মালে ঐ জায়গাতেই পৌঁছে যেতেন। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি পরে জন্মানোর দরুন বিশ্বসাহিত্য একটি নিদারুণ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিল।
        রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, সাহিত্যিক জীবনের পরবর্তীপর্বে, কবিতার বিশেষত্বের জায়গা থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন। যাকে সাহিত্যের বিশেষজ্ঞরা 'গদ্য কবিতা' বলেন, তা তাঁর এই বোধের সাক্ষ্য দেয়। তাঁর কিছু গদ্য কবিতা গল্পকেন্দ্রিক। সাহিত্যকর্ম ইশাবে অনেক উঁচু দরের কাজ সেগুলো। মোদ্দা ব্যাপার হল, আজ পাড়াব-পাড়ায় 'কবি প্রণাম' সত্ত্বেও সাহিত্যের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির মাঝখানের দেওয়াল ধ্বসিয়ে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাঁকে বাঙালি এত বেশি 'কবি' বানিয়ে ফেলেছিল যে হাত খুলে এই কাজটি করা সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। তবে কাজের মধ্য দিয়ে ঠারে-ঠারে যতটা পেরেছেন, করেছেন। বিশেষ করে ছবি আঁকার মাধ্যমে।
        কবিতাকে বা কবিকর্মকে ঘিরে একটা রহস্য সৃষ্টি করে রাখলে কবিতা কখনই সামাজিক পরিস্হিতির দলিল হয়ে উঠতে পারে না। কবিতার মিস্টিসিজমের প্রথম অসুবিধে এটা। কবিতা যদি সামাজিক পরিস্হিতির দলিল না হয়, তবে তাকে ড্রইংরুম সাজানোর ডলপুতুল বা অশ্রুমোছার রুমাল হয়ে থাকতে হয় কেবল।সেটা অবশ্য অনেকেরই মনঃপূত, বিশেষ করে যাঁরা 'সমাজ-টমাজ'কে দশ হাত দূরে রাখতে চান। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যেও লড়াই আছে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ আছে। একটি পক্ষের বিশেষ দর্শন এটাই। কবিতার গায়ে গরম হাওয়ার ঝাপটা যেন না লাগে।
        কবিতার মিস্টিসিজমের দ্বিতীয় অসুবিধে ভাষার স্তরে। ভাষা তো একটি নদী বিশেষ। একূল-ওকূল দুকূলই সে ভাসায়। তাকে সিমিলি, মেটাফর, ছন্দবৃত্ত, মাত্রা, পয়ার ইত্যাদির গণ্ডীর মধ্যে সর্বদা বেঁধে রাখা যায় না। কবিতার নিয়মানুবর্তিতা থেকেই কবিতার মিস্টিসিজমের জন্ম। এই নিয়মানুবর্তিতার দরুনই, একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন অনুভূত হয়, যে কবিতা 'লিখতে পারে'। যে 'পারে না', তাকে দূর করো, দাঁড় করিয়ে রাখো দরজার বাইরে। তার ভাষাটিও ব্রাত্য।
        তাই, কবিতার স্বার্থেই, কবিতার রহস্যময়তাকে ভাঙা অত্যন্ত প্রয়োজন।
        বাংলা সাহিত্যের সিরিয়াস পাঠক সম্প্রতি নড়ে-চড়ে বসেছেন। ষাটের দশকে, যে একটি তুমুল ওলোট-পালোট ঘটে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে--- সেদিকে নজর গেছে তাঁদের। দেরিতে হলেও, এটাই কাম্য ছিল।'হাংরি আন্দোলন' নিয়ে ইতিপূর্বে 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' গোছের কথাবার্তা হয়েছে। 'হাংরি আন্দোলনকারীদের' গভীর মননশীল পঠন-পাঠন ছিল, যাকে বলা যায় ওভারভিউ। হাংরির পরেও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এসেছে, তবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঝাঁকুনি হিসাবে হাংরিই ছিল "প্রথম"। বাংলা সাহিত্যের অবস্হা, হাংরি আন্দোলনের আগে ছিল অকালবৃদ্ধ আফিংখোরের মতো। রবীন্দ্র ঐতিহ্য পুঁটুলি বেঁধে কোলে নিয়ে বসে ঝিমোনো আর মাঝে-মাঝে চটকা ভেঙে, "অ্যাই, গোল কোরো না বলচি, পড়াশুনো করো, পড়াশুনো..."। অথচ দেশে-বিদেশে তখন ঘটছে যুগান্তকারী ঘটনা। 'গ্রানমা' জাহাজে চড়ে বিপ্লব করতে আসা কয়েকজন যুবক হঠাৎ জয়ী হয়েছেন। ওয়াশিংটন থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে দেখা দিয়েছে বিদ্রোহের পতাকা। ওদিকে ঠাসবুনোট সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্রমে ঠোঙা বানাবার কাগজ বই আর কিছু নয়। স্হিতাবস্হাকামী বাণিজ্যিক সংবাদপত্র গোষ্ঠীর প্রচণ্ড একমাত্রিক দাপট বাংলা সাহিত্যে। তার দোরগোড়ায় মাথা না ঠুকলে কেউ মানুষই হবে না, সাহিত্যিক হওয়া তো দূরে রইল।
        এইরকম সময়ে বাংলা সাহিত্যের 'পীঠস্হান' কলকাতা থেকে দূরে, পাটনা শহরে, যেখানে ঐশ্লামিক ধর্মশাস্ত্র পড়তে গিয়েছিলেন রামমোহন রায়, আর বেশ কয়েক বছর চাকরি করে গেছেন দীনবন্ধু মিত্র, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি অপরিচিত গরিব পরিবারের যুবক মলয় রায়চৌধুরী আই আন্দোলনটির ছক কষেন। দাদা সমীর রায়চৌধুরী কলকাতায় সিটি কলেজে পড়েন, সেই সুবাদে যুবা বাঙালি লেখক-কবিদের সাথে আলাপ-পরিচয়। দেশ-দুনিয়ে জুড়ে উথালপাথাল সত্ত্বেও কলকাতা, ব্রিটিশের প্রিয় 'কালকুত্তা' তখনও শীতল। বামপন্হী দলগুলোর বিরুদ্ধে গান্ধীবাবার কংগ্রেস প্রতিপালিত গোপাল পাঁঠা, ইনু মিত্তিরদের দাপাদাপি; কলকাতা শীতল। কবিতা ভবন (!) থেকে 'কবিতা' বেরোয়। বুদ্ধদেব বসুর পরিশীলিত আঙুল কবি বাছাই করে, ফতোয়া দেয়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সেই উপস্হিতি। এককালে...'না না অমন বলবেন না। সুকান্তও কবি। ছন্দ বোঝে। এই দেখুন আমি দেখাচ্ছি --- পতা/কায় পতা/কায় ফেরমিল/আনবে ফেব্রু/য়ারি। দেখলেন ?
        অট্টহাসি উদ্রেক করা সেই সময়। সমীর রায়চৌধুরীর 'পাটনাই' হওয়ার দরুন কলকাতার যুবক কবিদের পাটনায় আনাগোনা। এঁদের মধ্যে অন্যতম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। যাঁর বিষয়ে বাসব দাশগুপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মলয় বলেছেন, "শক্তির কবিতা সম্পূর্ণ নিজস্ব ও অসাধারণ। কেননা তিনি পাঁড় অশিক্ষিত, কোনো লেখাপড়া করেন না, এবং দর্শন, ইতিহাস, সমাজবোধ এসব ছিটেফোঁটা তাঁর মধ্যে নেই। নিজের খাঁটি বোধ থেকে তিনি লেখেন, তখন তাঁকে জীবনানন্দের পরের প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন মনে হয়।" মনে রাখা প্রয়োজন, এই সাক্ষাৎকারটি যখন দিচ্ছেন মলয়, তখনও হাংরি আন্দোলনের স্মৃতি, তজ্জনিত তিক্ততা, সব কিছু মলয়ের মস্তিষ্ককোষে উপস্হিত। কিছুই ক্ষমা করেননি। অথচ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে মলয়ের চোখা, টান-টান মূল্যায়ন। ব্যক্তিগত তিক্ততা সেখানে ছায়া ফেলেনি।
        হাংরি আন্দোলনের পরিকল্পনাপর্বে এই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে মলয় সঙ্গে পেয়েছিলেন, আর পেয়েছিলেন দেবী রায় ( হারাধন ধাড়া) কে। পাটনার সুবিমল বসাক এসে যোগ দেন কিছুকাল পরে।একটি সাহিত্য আন্দোলন, যা বাংলা সাহিত্যের হাল-হকিকত পালটে দিয়েছিল, কত সামান্যভাবে শুরু হয়েছিল, ভাবলে অবাক লাগে। প্রেস পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই মিষ্টির দোকানের বাকসো যে জব প্রেস ছাপতো, সেখানেই ছাপতে হয় হাংরি বুলেটিন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে মলয় তখন লোয়ার গ্রেড কেরানির চাকরিতে, কত মাইনে পেতেন জানা নেই, তবে প্রায় সম্পূণফ মাইনেটাই মনে হয় হাংরি বুলেটিনের পেছনে ঢালতে হত। বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম কাগজ বেরোনোর আরম্ভটা এইরকম। 'শতভিষা' পত্রিকার তুলনায় 'কৃত্তিবাস' ও নিজেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজই বলত, তবে হাংরি বুলেটিনের সাথে তার ছিল মৌলিক প্রভেদ। 'কৃত্তিবাস' ছিল সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খীদের কাগজ। তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে সুরে সুর মিলিয়ে। প্রতিষ্ঠান কখন যশ, প্রতিপত্তি, বৈভব, টাকাকড়ি, সামাজিক সুবিধার কাজে লেগে যায়, বলা তো যায় না। হাংরি বুলেটিনের উদ্দেশ্যই ছিল যুদ্ধ। আপসের জন্যে সেখানে কোনও জায়গাজমি রাখা হয়নি।
        অনেকের মতে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি গিমিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন রাতারাতি খ্যাত হবার জন্য, যেমন শাদা দিস্তা কাকজ, জুতোর বাকসো ইত্যাদি রিভিউএর জন্য পাঠানো, টপলেস প্রদর্শনীর আয়োজন ( টপলেসের অর্থ যে মুন্ড বা মস্তিষ্কবিহীনও হয়, এই বোধটুকু কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের হয়নি), জীবজন্তু-জোকারের মুখোশ বিলি ইত্যাদি। 'হাংরি কিংবদন্তি'তে মলয় উদ্ধৃত করেছেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের যে মন্তব্য, তা এ-প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে।কিন্তু মলয় বা তাঁর সঙ্গীরা কি জানতেন না যে প্রতিষ্ঠান ও প্রসাশন কতদূর হিংস্র হতে পারে? এ জানা সত্ত্বেও একজন চাকুরিজীবী ( মলয় ) নিজেকে এই ঝুঁকির সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন কেন ? শুধুই প্রচারের জন্য? না কি কিছু মূল্যবোধের ব্যাপারও ছিল ? মলয় তাঁর 'সাক্ষাৎকারমালা'র এক জায়গায় বলেছেন, 'ষাট দশকের সুস্হতা স্বাভাবিক ছিল না।' এই অস্বাভাবিক সুস্হতাকে ভালোমতো একটা ঝাঁকুনি দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। তার জন্য দুহাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি পরে চোর-ডাকাতের সঙ্গে সার বেঁধে পাটনা শহরের রাস্তায় অতিপরিচিতজনের মাঝে হাঁটা, চাকুরি থেকে সাসপেন্ড হওয়া, পঁয়ত্রিশ মাস প্রতি সপ্তাহে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো--- সবই। প্রচার পাওয়ার জন্য যদি এত করতে হয়, তাহলে তো মুশকিল। এর চেয়ে সহজ রাস্তা তো কতই ছিল। বিশেষত, 'কৃত্তিবাস' গোষ্ঠীতে তাঁর দাদার বন্ধুরাই যখন সর্বেসর্বা। সমসাময়িক অন্যান্যদের মতন একটু মিঠে ব্যবহার রাখলেই আর দেখতে হচ্ছিল না। আর, 'কৃত্তিবাস'ও তেমন-তেন বৈশিষ্টহীন ও লুপ্ত হবার পথে এগিয়েছে। সাহিত্য আন্দোলন সম্পর্কে 'কৃত্তিবাসীয়'দের সততার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে ?
        ( দ্রষ্টব্য: কবিতীর্থ, মাঘ ১৪১০)
        বলা যেতে পারে যে 'কৃত্তিবাস' যদি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে না টিকে থাকে তবে 'হাংরি বুলেটিন'ও তো টেকেনি। হ্যাঁ, হাংরি বুলেটিন উঠে গিয়েছিল মামলা-মকদ্দমার দরুন, অন্তর্কলহের দরুন। কিন্তু হাংরিদের ঝগড়াঝাঁটি ছিল খোলাখুলি, তাতে মধ্যবিত্তের চাপ-চাপ ঢাক-ঢাক ছিল না। মামলা-মকদ্দমার ভয়ে কেউ রাজসাক্ষী হয়েছিলেন ( সুভাষ ঘোষ,শৈলেশ্বর ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ ), কেউ ভেবড়ে গিয়ে কলকাতার বাইরে কেটে পড়েছিলেন ( প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য প্রমুখ )। সেগুলোকে দেখার কোনও অর্থ হয় না।'হাংরি বুলেটিন' বন্ধ হবার পর অগনণ পেশিবহুল বাহু এগিয়ে এসেছে আন্দোলনের পতাকা তুলে নিতে।জেব্রা, উন্মার্গ, ফুঃ, স্বকাল, ক্ষুধার্ত খবর, জিরাফ, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, ওয়েস্ট পেপার, চিহ্ণ, প্রতিদ্বন্দী ইত্যাদি পত্রিকাও হাংরি বুলেটিনই। মলয় কোনোদিন বলেননি যে হাংরি আন্দোলনের কপিরাইট একমাত্র তাঁর। হ্যাঁ, আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও দার্শনিক প্রতিনিধি হিসাবে তাঁর কিছু বক্তব্য থাকতেই পারে, যা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পাঠকদের সামনে রেখেছেন।এই অধিকার থেকে তো আর তাঁকে বঞ্চিত করা যায় না। মলয়ের পরবর্তীকালীনরা হাংরি মতাদর্শকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।এটিও একটি আন্দোলনের প্রাণশক্তির প্রমাণ। মলয়, হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পর, পড়ালেখার নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছেন, মন দিয়ে এবং চুটিয়ে বিভিন্ন শহরে চাকরি করেছেন, সংসার করেছেন, ভারতীয় জনজীবনকে দেখেছেন, জীবন থেকে শিখেছেন। আজ গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধের যে হতচকিত-করা ফসল তিনি আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তা সম্ভব হতে পেরেছে এরই দরুন। বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের গদি-আঁটা চেয়ারে বসে আঙুলে চাবির রিং ঘোরাননি মলয়। এর জন্য তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। অন্তত একটি আকাশ এমন রয়েছে, যাকে ঢেকে ফেলতে পারেনি কালো মেঘ।
        মলয়কে 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটির দরুন মামলায় পড়তে হয়। কবিতাটি বর্তমানে বহুল প্রচারিত, তাই তাকে আর সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করার প্রয়োজন নেই। তবে এই কবিতাটিকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা, যদি ধরেও নেওয়া যায় যে এর পেছনে কোনো অসূয়া কাজ করছিল না, একটি কৌতুকপ্রদ মাইন্ডসেট-এর দিকে ইঙ্গিত করে। এই মাইন্ডসেটটি তদানীন্তন বুদ্ধিজীবী বাঙালির, যিনি পুজোর ছুটিতে সস্ত্রীক খাজোরাহো দেখতে যান। তাহলে মলয়ের কবিতা কেন গ্রহণীয় নয় ? মজা কেবল এই জায়গাটুকুতে নয়, অন্যত্রও আছে। "আমরা যখন অসভ্য ছিলুম তখন ওইগুলো বানিয়েছি। এখন আমরা সভ্য, এখন তো আর এসব চলতে দেওয়া যায় না। " এও মানলাম, কিন্তু মাই ডিয়ার, ব্যাপারটা যে আদপে তা নয় একেবারেই। ব্যাপার আগাগোড়া অন্যরকম। যৌন রূপকল্প, দ্যোতক ও বিম্ব কেবল ব্যবহার করেছেন মলয়, সেগুলির মাধ্যমে নিজের কথা বলেছেন। এও চলবে না ? তাহলে শিবলিঙ্গ তুলে দিন, গৌরীপট্ট নাকচ করুন, অম্বুবাচী ব্যান করুন। কামাখ্যা মন্দিরে মা-কামাখ্যার মাসিক যেন আর না হয়। কি বলেন ? যাঁরা "অশ্লীল অশ্লীল" চিল্লিয়েছিলেন, তাঁরা সম্ভবত 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার-এর এই লাইনগুলো নজর করে দেখেননি--
        ১.
        জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
        আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
        মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
        তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে কিছুকাল ঘুমোতে দাও শুভা
        শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
        ২.
        হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
        আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
        মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না
        তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহ্যতায়
        সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
        শিল্পর জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোবো
        কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই...
        ৩.
        এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
        আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
        এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
        মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
        আমি মরে যাব...
        ৪.
        ৩০০০০০ লক্ষ শিশি উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
        ঝাঁকেঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
        এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
        হিপ্নটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়
        ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখী আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
        কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি
        এই পঙক্তিগুলো একটু মন দিয়ে পড়লে বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর পক্ষে বোঝা দুষ্কর ছিল না যে নিছক যৌনতা নয়, আরো গূঢ় কোনো বোধের দ্যোতনা এই পঙক্তিগুলোয় রয়েছে।'সাত বছর আগের একদিন' কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন, "অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয় আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে। আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত ক্লান্ত করে। লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই..."। এই পঙক্তিগুলোকে উদ্ধৃত করে জীবনানন্দকে শবসাধক সাব্যস্ত করা অবশ্যই উচিত হবে না, অথবা ঘোর অঘোরপন্হী। তেমনই হাস্যকর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ যৌনতার বহিঃপ্রকাশ খোঁজা। আসলে মলয়ের বিরুদ্ধে যখন ষাটের দশকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার মকদ্দমা দায়ের করা হয়, তখন ষাটের দশকের 'অস্বাভাবিক সুস্হতা' রাজত্ব করছে পুরোদমে।'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে প্রবোধকুমার সান্যালের 'দেবতাত্মা হিমালয়' আর মেট্রো সিনেমার ফুটে রিফিউজি যুবতীদের শরীর নিয়ে চলছে অবাধ বাণিজ্য! পায়ের চটি ঘষটাচ্ছে রিফিউজি যুবক, 'মাই ওন সিসটার স্যার, ভেরি সুইট, ওনলি সিক্সটিন'। অথচ বাঙালি পাঠক 'কত অজানারে'র বারবেল সাহেব আর 'সখী সংবাদ' এর মিষ্টিদিদি, নতুন দিদি, এদের নিয়েই মুগ্ধ। সমাজ কোথাও নেই; সমাজের জ্ধবলাপোড়া, আর্তি, চিৎকার এগুলোও কোথাও নেই। বামপন্হীরা 'পরিচয়' পত্রিকা চালাচ্ছেন, তাতেও এন্ট্রি পারমিট নিয়ে ঢুকতে হয়। এইরকম এক সময়ে 'হাংরি বুলেটিন' এর দরকার ছিল, প্রয়োজন ছিল 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এর। মূল্যবোধ ভেঙে খানখান হওয়ার যে হরর, শিল্পপ্রতীক জোলো হয়ে যাওয়ার যে শক, তাকে যথার্থ ফুটিয়ে তুতে গেলে এই কবিতাই তো লিখতে হবে। মলয় তাই করেছিলেন।
        অবশ্য বিপদ চেনার ব্যাপারে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের সূক্ষ্মদৃষ্টির প্রশংসা করতেই হয়। কেই বা পড়ে তখন 'হাংরি বুলেটিন', কটা লোক ? পাটনার দুই যুবক, একজন হাওড়ার, একজন বিষ্ণুপুরের, একজন শান্তিনিকেতনের, এদের বুলেটিন বেরোয়। তার জন্যও আবার এই প্রেস, ওই প্রেসের হাতে-পায়ে ধরাধরি। তাহলে? এমন কী ক্ষমতাসম্পন্ন এরা, যে ক্ষেপে উঠল গোটা কলকাতার বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রশাসন ? মলয়ের বিরুদ্ধে কেবল মামলাই নয়, তাঁকে ও অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করে অপমান করা হল চরম, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন এই জাতীয় প্রবণতা মাথা তোলার হিম্মত না করে।
        বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন যে সমাজকে বুঝতেন না তা নয়, ভালোমতোই বুঝতেন। তাঁরাও জানতেন যে, যে-বদমায়েশি তাঁরা শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতির সর্বত্র বিছিয়ে রেখেছেন, তা মানুষের জন্য নয়। তবে শ্রেণী স্বার্থে এর প্রয়োজন তাঁদের ছিল। যেমন ইংরেজরা, আই.সি.এস.কে লৌহ কাঠামো হিসাবে গড়ে তুলতে ছেয়েছিল, তেমনই উত্তর-স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় পুঁজিবাদ, আমলাতন্ত্র ও তার মিডিয়া-খানসামাদের লক্ষ ছিল একটি জড়, নির্বোধ, সংবেদনহীন মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তোলা। তাদের রুচি, জীবনযাপন, মূল্যবোধ, সব কিছু হবে ছাঁচে ঢালা, সিনথেটিক। তারা হাসবে, কাঁদবে, গাইবে, সঙ্গম করবে একটি বিশিষ্ট কায়দায়। 'হাংরি প্রজন্ম'এর হুড়মুড় করে এসে পড়ায় এই গোটা গেমপ্ল্যানটি ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। মলয় এবং অন্যান্যদের ওপর আক্রমণ সেই কারণেই।
        প্রজাপতি-আঁকা বিয়ের কার্ডে হাংরি প্রজন্ম ধ্বনি তুলেছিল, "গাঙশালিক কাব্যস্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো"। এই ধ্বনিটিতে অন্তর্নিহিত ছিল তদানীন্তন কাব্যধারার প্রতি বিবমিষা।
        প্রকৃতি, নিসর্গ এই ব্যাপারগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলো বাংলা কবিতার কলোনোয়াল রোগবিশেষ। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ ছিল একটা কমপালশান, যেমন লেখালিখি ছিল তাঁর কমপালশান। সেজন্য তাঁর লেখায় প্রকৃতি, নিসর্গ বিশেষভাবে উপস্হিত--- কবিতায়, নাটকে, উপন্যাসে। আঁকার সময়ে তিনি এগুলো বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে, বাংলা কাব্যধারায় এই ব্যাপারগুলো প্রয়োজনীয় অনুপান হয়ে ওঠে। এবং অনুপানেরও অধিক, অভ্যাস।জীবনানন্দ লেখেন 'রূপসী বাংলা'। তাতেও নিসর্গ ছিল; তবে সেই নিসর্গ, প্রকৃতির প্রতিটি কমপোনেন্ট আবহমানের বাঙালিজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিল।মানুষের সাথে সম্পর্কবিহীন ছিল না সেই নিসর্গ, সেই প্রকৃতি।সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, "একদা আষাঢ়ে এসেছি এখানে, মিলের ধোঁয়ায় পড়ল মনে; কালবৈশাখী নামবে যে কবে আমাদের হাত-মেলানো গানে"। এখানে মানুষের সংগ্রামকে আঁকা হয়েছে প্রাকৃতিক ঘটনার রং-তুলিতে। কিন্তু বাংলা ভাষার সেইসব কবিরা (গাঙশালিক কাব্যস্কুল) সৃষ্টি করছিলেন মনুষ্যবিহীন নিসর্গ, মানুষকে মাইনাস-করা প্রকৃতি। এ ছিল একজাতীয় পলায়নবাদ। শংকরের 'কত অজানারে' যেমন বাঙালি যুবকের বেকারত্ব থেকে পলায়ন করতে চেয়ে বারবেল সাহেবের মহানতায় বুঁদ হয়ে থাকা, বিমল মিত্রের মিষ্টি দিদি, নতুন বৌদি, ছোট বৌঠান যেমন নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনসম্পর্ক ফেস করতে না চাওয়ার যুক্তি, তেমনই 'গাঙশালিক কাব্যস্কুল' ছিল মানুষের দুঃখ, শোক, রোগ, ঘা-পাঁচড়া এগুলোকে দেখতে না চেয়ে স্টুডিওর পর্দায় আঁকা চাঁদ, তারা, নদী, ফুলে বিভোর হয়ে থাকা। ঠিক তখনই মানুষের জীবনধারণ কতদূর দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল, তা দেখতে পাওয়া যায় ঋত্বিক ঘটকের ফিলমগুলোতে। সেই দৈন্য, দুর্দশা, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের প্রতিফলন এই কবিতাগুলোতে কোথাও ছিল না। কেন ? কেননা, তা করার অসুবিধে ছিল। তা করতে গেলে দীর্ঘ একটা লাফ দিতে হত, বিশেষ করে ভাষার ক্ষেত্রে।ঋত্বিক যেমন 'মেঘে ঢাকা তারা' বা 'কোমল গান্ধার' -এ গোটা ইডিয়মটিকেই ভেঙেচুরে ফেলেছিলেন, তেমনই ষাটের দশকের বঙ্গসমাজ ও মানুষেকে তুলে আনতে গেলে বাংলা কবিতার গোটা ইডিয়মটিকেই ভাঙতে হত। খানিকটা শ্রেণী পরিপ্রেক্ষিত আর কিছুটা গাড্ডায় পড়ে যাওয়ার ভয়, উভয়ে মিলে এ-কাজ করতে দেয়নি বাংলা ভাষার কবিদের। অতএব চাঁদ, তারা, নদী, ফুল, মৌমাছি...
        আরেকটি প্রশ্নও ছিল। কবি কি কেবল কবিতাই লিখবেন, না সামাজিক ভাষ্যকারও হবেন ? রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি নন, সামাজিক ভাষ্যকারও ছিলেন। জীবনানন্দও তাই ( জীবনানন্দকে নিবীঢ়ভাবে পড়লে এই ব্যাপারটি ধরা পড়ে)। কিন্তু উত্তরোত্তর সামাজিক ভাষ্যের ব্যাপারটি বাংলা কবিতা থেকে উঠে যেতে থাকে। "কবিতা কবিতাই। সামাজিক ভাষ্যটাষ্য আবার কী?" এ-জাতীয় একটী প্রবণতা বাংলা কবিতাকে পেয়ে বসতে থাকে। একে ক্রমাগত হাওয়া দিতে থাকে স্বার্থান্ধ বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান।
        খুব স্বাভাবিকভাবেই নভেম্বর ১৯৬১-এর প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি প্রজন্ম এই প্রবণতার বিরুদ্ধে ছিল। সেই দিন থেকে আজ অব্দি মলয়, সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি কোনোদিনই হাতছাড়া করেননি। 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'এ যেমন সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ে তাঁর তীব্র বিবমিষা, তামনই আজও। তাঁর হালের একটি কবিতা নেওয়া যেতে পারে, 'যা লাগবে বলবেন' সংকলন থেকে। কবিতাটির নাম 'ক্ষুধার্ত মেয়ে':
        আমার আসক্তি নেই কোনো
        চলে যা যেখানে যাবি
        যার সঙ্গে শুতে চাস যা
        আমি একা থাকতে চাই
        ক্ষুধার্ত বা পেটুক মহিলা
        যে ঘোরে সবার হাতে
        খড়কুটোময় সংসারে
        তার কোনো প্রয়োজন নেই।'
        কবিতাটিতে জড়িয়ে আছে একটা ঈষৎ বোহেমিয়ান বাচনভঙ্গী। পড়লে মনে হবে কেউ একজন লিখছেন তাঁর শয্যাসঙ্গিনীর উদ্দেশ্যে। এটি কিন্তু কবিতার প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তরে কবিতা ও সমাজ সম্পর্কে মলয়ের দার্শনিক বোধ সন্নিহিত। শয্যাসঙ্গিনী মহিলাটি আসলে কবিতাই। অথচ সবার হাতে ঘোরার প্রবণতা তার, সে হাত স্মাগলারের হোক বা বিপ্লবীর।কবিতার লয়ালটি সন্দিগ্ধ। ওদিকে সংসার অনিত্য, অতএব তার প্রয়োজন কিসের ?
        'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতায় যে-কথা বলার জন্য মলয়কে অনেক বেশি জায়গা ব্যবহার করতে হয়েছে, 'যা লাগবে বলবেন' গ্রন্হে সেই কথাই তিনি বলেছেন অনেক সংক্ষিপ্ত পরিসরে। 'হাংরি আন্দোলন' থেকে সরে এসে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ইন্সপেক্টিং অফিসার হিসেবে ভারতের গ্রামে-গঞ্জে শহরে শহরে ঘোরা, তারপর এ.আর.ডি.সি. ও নাবার্ডের গ্রামোন্নয়ন বিশেষজ্ঞের উচ্চপদে। যদিও মলয় তাঁর এই পরিবর্তিত জীবনশৈলী নিয়ে 'হাংরি কিংবদন্তি' গ্রন্হের শেষে মশকরাও করেছেন, "ছাই-এর জায়গায় আসে টুথপেস্ট, কয়লার উনুনের বদলে গ্যাস, সর্ষের তেলের বদলে সূর্যমুখী, শার্ট-প্যান্টের বদলে সাফারি, মাদুরের স্হানে বিছানা, ঢাবার বদলে রেস্তরাঁ, দিশির জায়গায় স্কচ, কলেজস্ট্রিট ও বইপাড়ার বদলে বাংলার গ্রামশহর।" কিন্তু তবু জীবনের এই অধ্যায়টিও যে কবি হিসেবে মলয়কে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
        'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ বাঁধন-ছেঁড়া রাগ ছিল মলয়ের কবিতার পরিচিত চিহ্ণ। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে জীবনের বহু কিছু দেখে-শুনে মলয়ের কন্ঠস্বর তেতো, অম্লকষায়, আর তার সাথে এসে জুটেছে আয়রনির অধুনান্তিক পরিহাসও। তবু তা মলয়ের কবিতাকে সর্বজনগ্রাহ্যও করে তোলে বটে।'যা লাগবে বলবেন'-এর আরও একটি কবিতাকে নেওয়া যেতে পারে, যেমন 'দ্রোহ':
        এ-নৌকো ময়ূরপঙ্খী
        তীর্থযাত্রী
        ব্যাঁটরা থেকে যাবে হরিদ্বের
        এই গাধা যেদিকে দুচোখ যায় যায়
        যাযাবর
        ঘাট বা আঘাটা যেখানে যেমন বোঝে
        ঘুরতে চাই গর্দভের পিঠে
        মাথায় কাগুজে টুপি মুখে চুনকালি
        পেছনে ভিড়ের হল্লা।
        ব্যাস! কবিতা এইটুকুই। অথচ বাঙালি সমাজের যে একটি বিশেষ প্রবণতা, কবিকে বেদিতে বসিয়ে রাখার, তাকে কত সার্থক ভাবে ভাঙঅ হয়েছে এখানে। পাটনার অন্ত্যজ মহল্লাগুলোতে হোলির দুতিন দিন আগে থেকে চোখে-পড়া একটি সুপরিচিত দৃশ্যকে ব্যবহার করেছেন মলয়, প্রশ্নাতীত দক্ষতাসহ। তার সাথে মিশিয়েছেন তীর্থযাত্রার জন্য বাঙালি হিন্দুর চিরাচরিত আতুরতাটিকে, যাতে পোস্টমডার্ন পরিহাস আরও তীব্র হয়। আর... হাংরি মামলার সময়ে তাঁকে যে-সামাজিক অবমাননা সইতে হয়েছে, তাও উঠে এসেছে। মাত্র কয়েকটি পঙক্তির মধ্যে কত প্রসঙ্গ যে এসেছে, অথচ বলার ভঙ্গিটি এত সহজ যে ভাবাই যায় না।
        এই সংগ্রহের আরেকটি কবিতা 'যে পার্টি চাইছেন সে পার্টিই পাবেন'।
        বিশ্বাস এক দুর্ঘটনা
        বুকপকেটে শ্রেণী
        প্রতিরোধী থাকেন জেলে
        কাজু-ফলের ফেনি
        বরং ভালো
        ভুল অঙ্কের ডানা।
        ...মোড়ল দলের পাড়ার কেউ বা
        আওড়ায় বেঘোরে
        ছাদ ঢালায়ের সমরবাদ্য
        কর্তাবাবার জানা
        মেলাবেন তিনি অন্তরীক্ষে
        মোক্ষ একখানা।
        কবিতার শেষ দুটি পঙক্তিতে অমিয় চক্রবর্তীর 'মেলাবেন তিনি মেলাবেন', এই শান্ত, স্হিত, প্রায় ব্রাহ্ম, উত্তর-রাবীন্দ্রিক বিশ্বাসের আদলটি একেবারে বিপরীত অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পার্টি আমলাতন্ত্রের যে প্রবল দাপত, যার দরুণ তেলে-জলে মিশ খেয়ে একেবারেই একাকার, পুতুল নাচের সুতোর শেষ প্রান্তটি ব্যক্তিবিশেষের হাতে, সেটিতে যেমন-যেমন টান পড়ছে, কাঠের পুতুলগুলো তেমন-তেমনই নাচছে; এই গোটা পরিবেশটি উঠে এসেছে কয়েকটি মাত্র পঙক্তির মাধ্যমে। মলয় বুঝিয়েছেন, যা বোঝাতে গেলে অন্তত কয়েকশো পাতার বই দরকার। আর? বিরোধীপক্ষ বলতে কিছু নেই আর। যারা বিরোধ করছে, তারাও বস্তুত নিজের-নিজের ছাদই ঢালাই করছে। সেই ছাদ ঢালাই-এর বাজনাকে মানুষ মনে করছে সমরবাদ্য।
        এত সূক্ষ্ম যাঁর ভাষার পরিমিতিবোধ, তিনি কিন্তু 'চিৎকারসমগ্র' গ্রন্হে এসে আবার অন্যরকম হয়ে যান। দড়ি ঢিলে দেন একটু, যাতে তাঁর সংবাদবাহক ঘুরতে পারে জায়গা-বেজায়গায়। 'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতাটির অংশ পড়া যেতে পারে এই প্রসঙ্গে:
        হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া সেই প্রৌঢ় নদী
        নাচছে দুর্গাবোঙার ফরসা কোমর জড়িয়ে
        শহর-পুরুতের গামছা কাঁধে
        তাককা হুরে
        আরে হুরে তাককা হুরে
        বোঙা আদিবাসী দেবতা-অপদেবতার সর্বনাম। দুর্গা বাঙালির আবহমানের দুর্গতিনাশিনী। তারই কোমর জড়িয়ে নাচছে হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া প্রৌঢ় নদী, কাঁধে শহর-পুরুষের গামছা। তাককা হুরে, আরে হুরে তাককা হুরে, শহুরে মাস্তানদের উল্লাসধ্বনি।
        ভাঙনের ছায়াগাছ। এই ভাঙনকে সর্বদা দেখতে পাওয়া যায় না, অথচ সে তার কাজ করে চলেছে। ভাঙন বস্তুত একটি সার্বিক প্রক্রিয়া। এর দরুন সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মজাদার মিলমিশ। বুর্জোয়ার বক্তব্য আশ্রয় করে লুমপেনের ভাষাকে।লুমপেন অ্যাডপ্ট করে বুর্জোয়ার চালচলন। এর সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে ওর উঠোনে। ওর 'রোনাধোনা'য় শোনা যায় এর অনুরণন।
        চিৎকার করতে-করতে পড়ছে জলপ্রপাত চুলে
        ঢাউসপেট পোয়াতি অফিস-বারান্দায় আইল হাতে
        থ্যাতলানো ট্যাক্সিচালক হাওড়া স্টেশানে
        যেখানে সাপের ফণা জমা রাখতে হয়
        শহর বিষদাঁত খুলে নেয় প্রত্যেকের। ছোবলানো তো চলবেই না, ফোঁস করাও নয়। অফিস বারান্দায় ফাইল হাতে গর্ভিনী। কী প্রসব করতে চলেছে সে ? তারই মধ্যে ঝরে যেতে থাকা কেশপাশের চিৎকার। আলুলায়িত কেশপাশ বাঙালির আবহমানের সৌন্দর্য-মিথের অংশ।
        মেঝেময় ছড়িয়ে-থাকা গোঙানির টুকরো তুলে
        তারা বদলায়নি তবু আদল পালটেছে
        হে নাইলন দড়ি বাড়িতে এখন কেউ নেই
        কিন্তু বাইরে হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর
        কবিতাটি পড়তে-পড়তে বহু পুরোনো টার্কিশ ফিলম 'কংকারার্স অফ দি গোলডেন সিটি'র কথা মনে পড়ে। নিষ্পাপ একটি গ্রাম্য পরিবার শহরে এসে সব কিছু ধিরে-ধিরে হারাল। তার মেয়েরা হয়ে গেল বেশ্যা, পুরুষেরা অপরাধি। হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর--- গোল্ডেন সিটি। সোনার শহর। নারকেল দড়ির বদলে নাইলন দড়ি, সভ্যতার অগ্রগতি। বাড়িতে কেউ নেই, শূন্যতা অপরিসীম।
        কবিতাটির শেষ স্তবকে এসে মলয় দুর্বার ছুট লাগান--- এমন ছুট যে কবিতা ব্যাপারটাই দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
        কচি বালক-পাছার নধরমাংস দেবদূত
        মাখনমাখা ব্রয়লার যার শেষ খদ্দের
        চলে গেছে তিন বছর তার ব্লাউজে সেফটিপিনগাঁথা হৃদয়
        স্লুইস দরজা খুলে আলোর নারীশরীর
        যে জীবন বুকের সামনে উঁচিয়ে অচেনা পিস্তল
        তখনই সিঁড়িতে সাদা ছড়ির আওয়াজ তুলে
        গামছায় মুখ ঢেকঢ গাঁও বালিকার কান্না
        কেঁপে উঠেছে শিশুর গায়ে হাত ঠেকলে
        ভাঙন যখন সব কিছুকেই ভাঙছে, তখন কবিতাকেও সে ভাঙবে। ভাঙতে-ভাঙতে কবিতাও মুক্ত হয়ে যাবে। তখনই বোধহয় বিদ্যুৎ ঝলকের মত এক অন্য কবিতার সৃষ্টিমুহূর্ত।'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতায় আমরা সেই প্রক্রিয়াটি দেখতে পাচ্ছি, চাক্ষুষ।মলয় রায়চৌধুরী থেকে বোধ হয় এক নতুন কবিকুলের সৃষ্টি হল, যাঁরা কেবল কবি নন, আপোষহীন সামাজিক ভাষ্যকারও বটে।

         
         

         
         
         
      • পাতা : ৫৬৭৮৯১০১১১২১৩১৪১৫
      • মতামত দিন
      • বিষয়বস্তু*:
      • এস-আই-আর গুরুভার আমার গুরু গুরুতে নতুন? বন্ধুদের জানান
      • গুরুচণ্ডা৯-র বই দত্তক নিন
        কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এককালীন বা ধারাবাহিক ভাবে গুরুভার বহন করুন।
      • ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
      এই সাইটটি বার পঠিত
      • First slide
        Second slide
        Previous Next
      • uttar kolkata bookfair ad
      • First slide
        Second slide
        Previous Next
      • First slide
        First slide
        Second slide
        Previous Next
      • বুলবুলভাজা : সর্বশেষ লেখাগুলি
      • গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ : গুরুচণ্ডা৯
        (লিখছেন... দ, অমিতাভ চক্রবর্ত্তী, Ranjan Roy)
        মায়া-হরিণের টানে : স্বাতী রায়
        (লিখছেন... স্বাতী রায়, হীরেন সিংহরায়, Ranjan Roy)
        আশির আউনিবাউনি : স্মৃতি ভদ্র
        (লিখছেন... Sara Man)
        মধুবাতা ঋতায়তে : শারদা মণ্ডল
        (লিখছেন... দ, সোমা রায় কর্মকার, Sara Man)
        নজরুলের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব : পারভেজ আলম
        (লিখছেন... দীপ, দীপ, বিপ্লব রহমান)
      • হরিদাস পালেরা : যাঁরা সম্প্রতি লিখেছেন
      • খবর এইটুকুই : সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
        (লিখছেন... )
        হিমাচলের ইতি উতি - ৮ : দ
        (লিখছেন... )
        অথ: কুক্কুট - ডিম্ব সংবাদ। : Somnath mukhopadhyay
        (লিখছেন... Somnath mukhopadhyay, Ranjan Roy, Somnath mukhopadhyay)
        অমৃতকাল : সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
        (লিখছেন... ar)
        ভাগবত পুরাণ - ১/৬ : Kishore Ghosal
        (লিখছেন... )
      • টইপত্তর : সর্বশেষ লেখাগুলি
      • গ্রেট নিকোবর: একটি সবুজ দ্বীপের ভাগ্য, একটি সভ্যতার প্রশ্ন : সিংগল k
        (লিখছেন... শ্রাবণী , ক, দ)
        ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬  : ss
        (লিখছেন... ss, b, দ)
        গরীবের খোঁজ( অসম্পাদিত /সেল্ফ পাবলিশড) : বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত
        (লিখছেন... দ, হিজি-বিজ-বিজ )
        উচ্ছেদের ছবি  : চাক্ষিক
        (লিখছেন... )
        রাহুল গাঁধীর বক্তব্য  : রাগা
        (লিখছেন... ৎসুনামি)
      • কি, কেন, ইত্যাদি
      • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
      • আমাদের কথা
      • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
      • বুলবুলভাজা
      • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
      • হরিদাস পালেরা
      • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
      • টইপত্তর
      • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
      • ভাটিয়া৯
      • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
      • টইপত্তর, ভাটিয়া৯, হরিদাস পাল(ব্লগ) এবং খেরোর খাতার লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব, গুরুচণ্ডা৯র কোন দায়িত্ব নেই। | ♦ : পঠিত সংখ্যাটি ১৩ই জানুয়ারি ২০২০ থেকে, লেখাটি যদি তার আগে লেখা হয়ে থাকে তাহলে এই সংখ্যাটি সঠিক পরিমাপ নয়। এই বিভ্রান্তির জন্য আমরা দুঃখিত।
      গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected] ।


      মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
      • সকলকে জানান
      • উপরে যে কোনো বোতাম টিপে পরিচিতদের সঙ্গে ভাগ করে নিন
      ঠিক আছে
      গুরুচন্ডা৯ বার্তা
      গুরুতে নতুন?

      এত নামধাম দেখে গুলিয়ে যাচ্ছে? আসলে আপনি এতদিন ইংরিজিতে সামাজিক মাধ্যম দেখে এসেছেন। এবার টুক করে বাংলায়ও সড়গড় হয়ে নিন। কটা তো মাত্র নাম।

      গুরুর বিভাগ সমূহ, যা মাথার উপরে অথবা বাঁদিকের ভোজনতালিকায় পাবেনঃ

      • হরিদাসের বুলবুলভাজা : গুরুর সম্পাদিত বিভাগ। টাটকা তাজা হাতেগরম প্রবন্ধ, লেখালিখি, সম্ভব ও অসম্ভব সকল বিষয় এবং বস্তু নিয়ে। এর ভিতরে আছে অনেক কিছু। তার মধ্যে কয়েকটি বিভাগ নিচে।
        • শনিবারের বারবেলা : চিত্ররূপ ও অক্ষরে বাঙ্ময় কিছু ধারাবাহিক, যাদের টানে আপনাকে চলে আসতে হবে গুরুর পাতায়, ঠিক শনিবারের বারবেলায়।
        • রবিবারের পড়াবই : পড়া বই নিয়ে কাটাছেঁড়া সমালোচনা, পাঠপ্রতিক্রিয়া, খবরাখবর, বই নিয়ে হইচই,বই আমরা পড়াবই।
        • বুধবারের সিরিয়াস৯ : নির্দিষ্ট বিষয় ধরে সাপ্তাহিক বিভাগ। ততটা সিরিয়াসও নয় বলে শেষে রয়ে গেছে ৯।
        • কূটকচা৯ : গুরু কিন্তু গম্ভীর নয়, তাই গুরুগম্ভীর বিষয়াশয় নিয়ে ইয়ার্কি ফুক্কুড়ি ভরা লেখাপত্তর নিয়েই যতরাজ্যের কূটকচা৯। কবে কখন বেরোয় তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।
      • হরিদাস পাল : চলতি কথায় যাদের বলে ব্লগার, আমরা বলি হরিদাস পাল। অসম্পাদিত ব্লগের লেখালিখি।
      • খেরোর খাতা : গুরুর সমস্ত ব্যবহারকারী, হরিদাস পাল দের নিজের দেয়াল। আঁকিবুঁকি, লেখালিখির জায়গা।
      • টইপত্তর : বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। বাংলায় যাকে বলে মেসেজবোর্ড।
      • ভাটিয়া৯ : নিখাদ ভাট। নিষ্পাপ ও নিখাদ গলা ছাড়ার জায়গা। কথার পিঠে কথা চালাচালির জায়গা। সুতো খুঁজে পাওয়ার দায়িত্ব, যিনি যাচ্ছেন তাঁর। কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।

      লগিন করে থাকলে ডানদিকের ভোজনতালিকায় যা পাবেনঃ

      • আমার গুরুঃ আপনার নিজস্ব গুরুর পাতা। কোথায় কী ঘটছে, কে কী লিখছে, তার মোটামুটি বিবরণ পেয়ে যাবেন এখানেই।
      • খাতা বা খেরোর খাতাঃ আপনার নিজস্ব খেরোর খাতা। আঁকিবুকি ও লেখালিখির জায়গা।
      • এটা-সেটাঃ এদিক সেদিক যা মন্তব্য করেছেন, সেসব গুরুতে হারিয়ে যায়না। সব পাবেন এই পাতায়।
      • গ্রাহকরাঃ আপনার গ্রাহক তালিকা। আপনি লিখলেই সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকরা পাবেন নোটিফিকেশন।
      • নোটিঃ আপনার নোটিফিকেশন পাবার জায়গা। আপনাকে কেউ উল্লেখ করুক, আপনি যাদের গ্রাহক, তাঁরা কিছু লিখুন, বা উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটুক, জলদি পেয়ে যাবেন নোটিফিকেশন।
      • বুকমার্কঃ আপনার জমিয়ে রাখা লেখা। যা আপনি ফিরে এসে বারবার পড়বেন।
      • প্রিয় লেখকঃ আপনি যাদের গ্রাহক হয়েছেন, তাদের তালিকা।
      পুরোনো গুরুর লেখার কল
      পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন।