এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  নাটক

  • চাগ্রীর গপ্পো

    সে
    নাটক | ১৩ নভেম্বর ২০১৪ | ৩০৭৩৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • - | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৯:৫৯652441
  • দিলীপ সিনহা।
  • - | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১০:০২652442
  • মোস্ট প্রোব্যাবলি ১৯৯৫-এর পরের গপ্প।
    সেই সব অ্যাফিলিয়েশন ...
  • সে | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৪:১৬652443
  • বাঃ পার্ক স্ট্রীটেও এমন একটা কম্পাউন্ডওয়ালা ছিমছাম বাড়ী আছে বুঝি? ডেকার্স লেনের সেই অফিসটার তুলনায় অনেক সুন্দর এই একতলা অফিসটা। এখন আমার কাছে রেফারেন্স আছে কথা শুরু করবার জন্যে। জিগ্যেস করলেই বলব, ডেকার্স লেন থেকে পাঠিয়েছে। হাতে লেখা দরখাস্ত সঙ্গে করে নিয়েই এসেছিলাম। আজকাল হাতে লেখা দরখাস্ত কয়েকটা করে সঙ্গে রাখি। কোম্পানীর নামটা আর তারিখের জন্যে কিছুটা জায়গা ফাঁকা থাকে, সময় বুঝেই সেটা ভরে ফেলি। রিসেপশানে দাঁড়িয়ে আসবার উদ্দেশ্য জানাতে রিসেপশানিস্ট আমায় অপেক্ষা করতে বললেন, আমিও খশ্‌খশ্‌ করে দরখাস্তের ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করে ফেললাম। ডেকার্স লেনে তো দাঁড়াতেই দিচ্ছিলো না, দরখাস্ত ফরখাস্ত অনেক পরের ব্যাপার। এরা কী পড়ায় এখানে? খুব শক্ত কিছু কি? আগে দেখাই যাক ভেতরে ঢুকে।
    ডাক এসেছে ভেতরে। একজন অল্পবয়সী ভদ্রলোক, হয়ত আমার থেকে কিছু বড়ো হবেন বসে আছেন। আমি তাঁকেই গ্রীট করলাম। ওঁর হাতে দরখাস্ত ধরিয়ে দিয়ে চুপ করে বসে রয়েছি। উনি কাগজটা পড়েই চলেছেন। মাত্র তো কয়েক ছত্রের একটা চিঠি যাতে লেখা রয়েছে গতে বাঁধা দুটো কথা, তা পড়তে এত সময় লাগছে কেন? আমি ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের ভেতরটা ভালো করে দেখে নিই। বেশ ছিমছাম সুন্দর অফিস, সব কিছুই নতুন আর ঝকঝকে। এমন একটা অফিসে চাকরি পেলে বড়াই করে লোকজনকে বলা যায়।
    চিঠি পড়া হয়ে গেছে। ভদ্রলোক আমার দিকে এর মধ্যে কয়েকবার তাকিয়েছেন, কিন্তু কোনো কথা বলেন নি। এরপরে প্রথম প্রশ্নটা করলেন।
    ভাবছি নামটা এখানে লেখা ঠিক হবে কিনা। না, লিখব না। একজন মানুষের নাম উল্লেখ করে জিগ্যেস করলেন, আমি তাঁকে চিনতাম কি না। আমার সমস্ত প্রস্তুতি গুলিয়ে গেছে। রেফারেন্স তো একটা মনে মনে তৈরী করে এনেছিলাম, ঐ ডেকার্স লেনের ভদ্রলোকের নাম। কিন্তু যাঁর নাম প্রশ্নকর্তা উল্লেখ করলেন তিনিতো প্রায় চোদ্দ বছর আগেই গত হয়েছেন। আর ইনি জানতে পারলেন কেমন করে যে, চোদ্দো বছর আগে ঐ ব্যক্তিকে আমি চিনতাম কি না? প্রশ্নকর্তাকেও তো কখনো এর আগে দেখেছি বলে মনে হয় না। চোদ্দো বছর অগে যদি ইনি আমায় দেখেও থাকেন, মনে রাখা অসম্ভব। আমি কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারি না।
    প্রথম প্রশ্ন এবং ঐ একটাই প্রশ্ন আমার ইন্টারভিউয়ে।
    আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি।
    আমার মায়ের আপনার কথা শুনেছি।
    এঁর মা আবার কে? আবার হিসেব গুলিয়ে যায়। আমার মনের প্রশ্নটা ইনি বুঝে যান সহজেই।
    আপনি আমাদের বাড়ী আসতেন, মা বলেন। একদিন আসুন না। মা খুব খুশি হবেন।
    এতক্ষনে একটু একটু করে রহস্যটা পরিষ্কার হয় মনের ভেতরেই।
    আপনার মা কি সেই আগের ঠিকানাতেই আছেন?
    হ্যাঁ। রবিবার আসুন না দুপুরে। মাকে বলে দেব।
    বেশ।
    আপনার নিমন্ত্রণ রইল।
  • সে | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৪:১৮652444
  • আমার মায়ের কাছে* আপনার কথা শুনেছি।
  • sch | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৬:৩৮652445
  • সে যখন লেখাতে কোনো নাম দিচ্ছেন না - মাঝে মাঝে বিবেকের মতো উদয় হয়ে কেউ কেউ (না কি একই কেউ) না না নামে তার নাম বলে দিচ্ছেন - এটাতে লাভ কি হচ্ছে? এটা তো গল্পের টই- গেসিং গেমের না
  • :X | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৭:০২652446
  • ক্ষতিটাই বা কি হচ্ছে। গার্জেনি করার অভ্যাস এবার ছাড়লে হয় না? সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। সকলেই জানে সে কি করছে।
  • . | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৮:১৯652447
  • এইবার গালি খাবেন - Sch কা গুসসা হরব্খত আতা হ্যায়।।
  • সে | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৮:৩৬652448
  • উঠে বেরিয়ে আসছি, সেই ভদ্রলোক পিছু ডাকেন।
    শুনুন, মাকে একবার ফোন করবেন?
    করব
    নম্বরটা দেবো?
    মনে আছে।
    না একটু পাল্টেছে, এখন আর সিক্স ডিজিট নয় সেভেন ডিজিট।
    পাল্টে যাওয়া সংখ্যাগুলো শুনে নিয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে আসি বাইরে। কয়েকজন আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। ওহ্‌ খেয়াল করিনি চোখ দিয়ে ক্রমাগত জল পড়ে যাচ্ছে যে।
    সমস্ত কিছু ভণ্ডুল হয়ে গেল। সমস্ত প্রস্তুতি প্ল্যান। এখানে চাকরির উমেদারি করতে পারব না। ঝাপসা চতুর্দিক আর চোদ্দো বছর আগের স্মৃতি সঙ্গে করে টেনে টেনে হেঁটে চলেছি পার্ক স্ট্রীটের ফুটপাথে।
    ফোন নম্বর মনে আছে। ফোনও করে নেবো। তারপরে রবিবার দুপুরে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যেতে হবে স্মৃতির রাস্তা ধরে ধরে। এত শক্ত শক্ত কাজ কেন করতে হয় আমাকে?
  • সে | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৯:২৪652449
  • বি লেভেলের ছাত্রদের পরপর তিন সপ্তাহ পড়ানো হয়ে গেছে। প্রথমদিনে যতটা ভয় পেয়েছিলাম এখন তেমন ভয় নেই। ওরা চেষ্টা করলে সকলেই আমার মডিউলে পাশ করে যাবে। তবে প্রশ্নপ্তর কেমন আসে সেসব যদিও জানিনা। অন্য কোথা থেকে যেন সাজেশান জোগাড় করে আনে, সেসব থেকে যা বুঝতে অসুবিধে হয় জিগ্যেস করে বুঝে নেয়। মোটকথা ছাত্ররা কেউ বোকা নয়, হয়ত অল্প বিস্তর ফাঁকিবাজ আছে দুয়েকজন। এভাবে চললে সিলেবাস আরামসে শেষ করে দিতে পারব সে আস্থা আছে।
    আরেকটা ব্যাপার শুরু হয়েছে, এই চোদ্দো পনের জন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেশ অনেকের সঙ্গে সপ্তাহের অন্যান্য দিন রাস্তায় বাসে মেট্রোয় দেখা হয়ে যায়। ওরা এগিয়ে এসে কথা বলে, ভীড়ে মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যায় না। এ এক অন্যরকম ভালোলাগার অনুভূতি। এর মধ্যে একদিন কী কারনে যেন ক্লাস হোলো না। সম্ভবতঃ কারেন্ট ছিলো না। ঐ বাড়ীর কিছুটা অংশে সম্পূর্ণ অন্ধকার। তাও আমরা সকলে সেই অন্ধকার হাতড়ে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উঠেছি, প্রত্যেকেই পৌঁছেছি ক্লাসরুম অবধি। তবুও অখিলদা এসে বলে গেলেন, আজ ক্লাস বন্ধ। আমরা সবাই বেরিয়ে এলাম নীচে। সবাই মিলে প্ল্যান করছে নন্দনে যাবার, বাড়ী ফেরার ইচ্ছে অধিকাংশেরই নেই। আর আমিও ওদের বন্ধুই বলা যায়। নন্দন চত্তরে গিয়ে সকলে বসেছি। অত সকালে কোনো সিনেমা নেই। ওখানেই কিছুক্ষন পড়া পড়া খেলা চলল। খেলার নিয়ম হচ্ছে, খাতাবই খোলা এক্কেবারে নিষেধ। শুধু মন থেকে ভেবে ভেবে মুখে মুখে পড়া বলা।
    এই যে একটা দিন বাদ পড়ল, সেটার জন্যে অতিরিক্ত কোনো দিন কিন্তু দেয় নি ওরা। অথচ পেমেন্ট দেবার সময়, হিসেব হয়েছিলো মোট পাঁচ সপ্তাহের। যেদিন কারেন্ট ছিলো না, সেদিনের টাকা ওরা দেয় নি। পাঁচ ইন্টু দুশো মোট হাজার টাকা যেদিন নিতে গেছলাম সেটা অন্য একটা দিন। পড়ানোর দিন নয়। সেদিনই মাদার টেরেসা মারা গিয়েছিলেন খবরে শুনেছিলাম।
    এরও বেশ কিছু পরে আমার নামে সরকারি খামে চিঠি আসে রেজিস্টার্ড পোস্টে। চিঠি যখন এসেছিলো তখন বাড়ীতে ছিলাম না, ফলে আমার অনুপস্থিতিতে যিনি চিঠি নেবেন তাঁর সই অ্যাটেস্ট করে অথারাইজ করা চিঠি রাখা ছিলো, যাতে পোস্টম্যান চিঠি দিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু পোস্টম্যান চিঠি রেখে গেলেন না। পরের দিন পোস্ট অফিসে গেলাম চিঠি নিতে। মনে অসম্ভব উত্তেজনা। এতদিন পরে তবে ইন্টারভিউয়ে ডাকছে আমায়? পোস্টম্যান তো আমায় চিঠি দেবেনই না। আমিই যে আমি সেটা প্রমাণ করতে হবে আমাকেই। ভোটার আইডি কার্ড চাই। তা আমার নেই। পাসপোর্ট দেখিয়েও সুবিধে হচ্ছে না। অনেক যুক্তি সত্ত্বেও কিছুতেই তিনি আমার আইডেন্টিটি স্বীকার করতে চাননি। সরকারি খাম বলে কথা। শেষে আড়ালে ডেকে টাকা চাইলেন। দিতেই হোলো। চিঠি হাতে পেয়ে সন্তর্পনে খাম খুলে দেখি এতো ইন্টারভিউয়ের চিঠিই বটে! এন্টালীর কাছে একটায় ঠিকানায় যেতে বলেছে। কেবল তারিখটা পেরিয়ে এসেছি তিন দিন আগে।
  • সে | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৯:২৫652451
  • এই পর্বটা এখানেই শেষ। এখন ছোট্টো বিরতি।
  • সে | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০১:১৮652452
  • সকাল হয়েছে অনেকক্ষন, কিন্তু আমায় কেউ ওঠায় নি ঘুম থেকে। প্রায় আটটা নাগাদ নিজেই ধড়মড় করে উঠে পড়ে আপাত অচেনা পরিবেশে ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল। বাথরুম থেকে ফিরবার পথে দেখি রোহিনীদি খবরের কাগজ পড়ছেন নিজের ঘরে। আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখছি। তিনিও মুখ তুলে চাইলেন আমার দিকে। তারপরে এগিয়ে এলেন খবরের কাগজ হাতে।
    তোমার জন্যে একটা জিনিস খুঁজে রেখেছি।
    আমি জিজ্ঞাসার চোখে তাকাই ওঁর দিকে। মুখে কিছু বলতে হয় না।
    এই দ্যাখো। এই বিজ্ঞাপনটা দ্যাখো। আজই যেতে হবে এগারোটা থেকে তিনটের মধ্যে।
    আমি ঝুঁকে পড়ে বিজ্ঞাপনটা দেখতে চেষ্টা করি। গোলপার্কের কাছে একটা ঠিকানা। মডেলিং এর জন্যে মেয়ে খুঁজছে তারা।
    মডেলিং রোহিনীদি!
    হ্যাঁ।
    মডেলিং?
    কেন? তুমি পারবে না?
    আমি তো কখনো...
    আগে কখনো করোনি। আগে কখনো তো অনেক কিছুই করোনি। আমি বলছি। সব মিলিয়ে দেখেছি।
    আমি!
    গিয়েই দ্যাখো না। যদি সিলেক্টেড হও, মন্দ কী?
    আমি মেনে নিই। সত্যিই তো কতো কিছু করবার আছে। কতো কিছুই তো করা যায়। ঠিকানাটা বুঝে নিই মনে মনে।
    কিন্তু, আমার তো কোনো ট্রেনিং নেই, রোহিনীদি-
    তাতে কী হয়েছে? তুমি চা খাবে তো?
    হ্যাঁ, কিন্তু দুধ ছাড়া।
    লাল চা?
    হাসি মুখে এটুকু বলে আমার পাশ কাটিয়ে চলে যান সত্যজিতের সিনেমার নায়িকা।
  • সে | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৫:৪৫652453
  • কীরকম যেন একটা লাগছে আমার। একটার পর আরেকটা ঘটনা ঘটে চলেছে দ্রুত। একটার রেশ শেষ হবার আগেই অন্যটা ঢুকে পড়ছে রঙ্গমঞ্চে। যদি ফ্রন্ট রো তে বসতাম মাথা উঁচু করে খুঁটিয়ে দেখতে পারতাম প্রত্যেক অভিনেতার অভিব্যক্তি। শেষ সারির টিকিট থাকলে হয়ত সংলাপে মনোযোগ দিতাম বেশি। কিন্তু মুশকিলটা হয়েছে অন্যখানে। যে অদ্ভুত নাটকটা শুরু হয়ে গেছে এবং চলছে তো চলছেই, সেটা দেখতে খুবই ইচ্ছে করছে অথচ দেখবার কোনো উপায় নেই। অনভ্যস্থ আড়ষ্ট একটা চরিত্র আমি সরাসরি স্টেজের ওপরে, কোনো সংলাপ জানি না, স্টেপস্‌ জানিনা, আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আর চেয়ে দেখবার জন্যে সামনে অনন্ত অন্ধকার অডিটোরিয়াম। চিন্তা ভাবনা করবার তেমন কোনো অবকাশ নেই। শুধু রোলটা প্লে করে যেতে হবে। একটা জিনিস আন্দাজ করে ফেলেছি, এটা একটা রোমহর্ষক এবং মজার নাটক। যেখানে সবচেয়ে হাস্যকর চরিত্র আমি নিজে। বাকি সব কুশীলবেরাও নিপুণভাবে কাজ করে চলেছে, কিন্তু যেহেতু কোনো প্রস্তুতি রিহার্সাল ছাড়াই আমায় নামিয়ে দেয়া হয়েছে স্টেজের মধ্যিখানে, আমি এখন যেটা করব সেটাই মজা দেবে দর্শকদের।
    যেমন ধরুন একটু আগের যে দৃশ্যটা ছিলো, সেটা দিন তিনেক আগের ঘটনা। একটা খুনের পরিকল্পনা। সেটাই সীন। ব্যাপারটা এইরকম। আমি খুন হবো এরকম একটা প্ল্যান। ফাইনালি যদিও খুন হচ্ছি না। হলে পরের সীনে আমার এন্ট্রি থাকত না। তা সেই খুনের পরিকল্পনা আমার সামনেই করা হচ্ছিলো। এমনকি মেরে ফেলবার পরে মৃতদেহটা কেমন করে বস্তায় পুরে ভারি ভারি ওজনের বাটখারা বেঁধে গভীর এক লেকের জলে ফেলে দেওয়া হবে, তা ও আমি বসে বসে শুনেছি। বাকি যারা পরিকল্পনা করছে, তাদের একজনের হাতে খাবারের থালা। সে কথা বলছে না, গম্ভীর মুখে লুচি বেগুনভাজা খাচ্ছে এবং চুপচাপ শুনে যাচ্ছে প্ল্যান। চারকাপ দুধ দেয়া চা রয়েছে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলেছে এই আলোচনা। লক্ষ্য করে দেখুন আমার জন্যে কোনো চা কিন্তু নেই সেই দৃশ্যে। কারন সবকটা কাপেই দুধ দেয়া চা। যাকে খুন করা হবে, তার জন্যে আলাদা করে লাল চা বানানোর প্রসঙ্গই ওঠে না। এই পার্টটায় আমিও খুব মনোযোগ দিয়ে ডেডবডি ফেলে দেবার খুঁটিনাটি (যে ডেডবডিটা আমার নিজেরই হবার কথা) শুনতে থাকি। চিন্তা করি একটা বাঁধা বস্তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবার সম্ভাব্য কৌশল কী কী হতে পারে। যদি সঙ্গে লুকোনো একটা ধারালো ছুরি থাকে। ছোটো সাইজের। সেটা দিয়ে আস্তে আস্তে করে বস্তাটা কেটে ফেলে জলের মধ্যে বস্তা থেকে বেরিয়ে পড়ব। কিন্তু এই প্ল্যানে দুটো ভুল আছে। এক, আমি সাঁতার জানি না। দুই, মৃতদেহ কেমন করে ধারালো ছুরি দিতে বস্তা কাটবে?
    এই দৃশ্যগুলোর প্রতিক্রিয়া কানে আসে। দর্শকের হাসি। বুঝতে পারি নাটক জমে উঠেছে। তাই আমাদেরো চলে যেতে হয় দৃশ্যান্তরে। এমনি করে চলতে চলতে এসে পড়েছি মডেলিং এর দৃশ্যে। এটাতেও দর্শকেরা মজা পেতে পারে।
  • সে | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:১০652454
  • নাটকের নাম দিয়েছি চাগ্রীর গপ্পো, অথচ সীন দেখাচ্ছি খুনের প্ল্যান - এটা কি ঠিক হচ্ছে? মূল গল্পের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে কি? হুট্‌ করে দেখলে মনে হবে খাপ খাচ্ছে না। এরকম ভুলভাল প্রসঙ্গ এনে ফেলএ দর্শক কি ছেড়ে দেবে? আওয়াজ দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিতে পারে, নয়ত হল থেকে বেরিয়ে গিয়ে টিকিটের পয়সা ফেরৎ চাইতেও পারে, কোনোটাই অসম্ভব নয়। তবু কেন এই অবান্তর প্রসঙ্গের অবতারণা? কারনটা আর কিছুই নয়, গল্পের পটভূমিকাটা বোঝানোর চেষ্টা। বিরতির আগের দৃশ্য ছিলো ম্যাদামারা বোরিং গোছের, তাই চেষ্টা চলছে দর্শকের মনোযোগ আকর্ষনের। সেইসঙ্গে বুঝিয়ে দেওয়া, কেন এই মডেলিং এর কাজটা এত জরুরী হয়ে পড়েছে আমার জন্যে।
    খুনের পরিকল্পনার পরেও আরো গোটা দুই তিন দৃশ্য পার হয়ে গেছে, সেগুলো সাধারন এলেবেলে গোছের। এবার আমায় প্রস্তুত হতে হবে মডেলিং এর ইন্টারভিউয়ে যাবার জন্যে। যাবার আগে আমি এক কাপ লাল চা খেয়ে ফেলেছি। সময় সকাল দশটা। আগামীকাল দোল। আমার পরণে একটা সাদা খোলের প্রিন্টেড সিল্কের শাড়ী। রোহিনীদির বাড়ী থেকে বেরিয়ে কিছুটা হাঁটলেই মেট্রো স্টেশন, সেখান থেকে মেট্রো ধরে কিছুদূর গিয়ে, ফের বাসে করে আমায় পৌঁছতে হবে গোলপার্ক।
  • সে | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:৫৫652455
  • একটা বুটিকের ঠিকানা। সেখানেই জমা পড়ছে সমস্ত দরখাস্ত। দেখবার মতো জিনিস এক একটা। প্রত্যেকের হাতে একটা করে ফাইল ফোল্ডার। একে বলে পোর্টফোলিও। সেইটে খুললে দেখা যাবে ভেতরে রয়েছে একটা ফুলস্কেপ কাগজে অ্যাপ্লিক্যান্টের ব্যক্তিগত তথ্য। নাম, ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর, বয়স, উচ্চতা ইত্যাদি ভাইটাল স্ট্যাটিস্‌টিক্স্‌, আগে কোথায় কোথায় কাজ করেছে সেসবের বিবরণসহ লিস্টি। এ ছাড়া থাকে দাঁড়িয়ে বসে কাৎ হয়ে শুয়ে বিভিন্ন পোজে বড়ো বড়ো সাইজের ফোটোগ্রাফ। রঙীন বা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। বুটিকে তো অনেক কাপড় জামা ঝোলানো রয়েছে। কিন্তু কাস্টমার কেউ নেই এত সকালে। ক্যাশিয়ারের চেয়ারে বসে একজন মোটাসোটা অল্পবয়সী যুবক অ্যাপ্লিক্যান্টদের থেকে পোর্টফোলিও জমা নিচ্ছেন। শুধু মেয়ে নয়, ছেলে অ্যাপ্লিক্যান্টও এসেছেন কয়েকজন। একটা লম্বা খাতায় প্রত্যেকের নাম ও টেলিফোন নম্বর লেখা হতে থাকে। আমি কাপড় জামার শোকেসের পাশে দাঁড়িয়ে এদের পোর্টফোলিওয় উঁকি মেরে মেরে দেখি। আমার সঙ্গে কিচ্ছু নেই। না আছে ফোটো, না আছে পোর্টফোলিও। কোমরে গোঁজা আছে একটা লেডিস রুমাল, তাতে গিঁট দিয়ে বাঁধা আছে গোটা কুড়ি টাকা। তাই দুটো হাতই খালি। একের পর এক পোর্টফোলিও জমা হয়ে যেতে দোকানঘরও ক্রমশ খালি হয়ে যায়, ফলে ক্যাশিয়ারের চেয়ারে বসা যুবকটি আমার দিকে তাকান।
    আপনিও কি অ্যাপ্লিকেশন জমা দেবেন?
    আমার সঙ্গে কোনো ফোটো নেই।
    ফোটো আনেন নি? বাকি ডিটেল্‌স্‌ এনেছেন কি?
    না, আমি কিছুই আনিনি।
    বুঝেছি। একেবারেই নতুন।
    হ্যাঁ।
    হাইট কত?
    হাইট বলি।
    আচ্ছা, একটু ঐদিকে গিয়ে দাঁড়ান।
    আমি একটু দূরে সরে দাঁড়াই, সেই যুবক টুকটাক কীসব লিখে নেন নিজের খাতায়। তারপরে আমার নাম ও কন্‌ট্যাক্ট ফোননম্বর জিগ্যেস করেন। আমি রোহিনীদির ফোননম্বরটাই বলে দিই।
    ঠিক আছে। আমরা পরে জানিয়ে দেবো।
    বুটিক থেকে বেরিয়ে এসে আমার কেমন হাসি পেয়ে যায়। এ কদিন ধরে মন্ত্রচালিতের মতো একটার পর একটা সীনে অ্যাপিয়ার হচ্ছি। আমার নিজের ইচ্ছে মতামত এসবের সাময়িক অবলুপ্তি ঘটেছে। শুধু ঘটনাগুলো চমকপ্রদ। এই প্রায় খুন হয়ে যাচ্ছি তো, এই খুনের পরে বস্তা কেটে কেমন করে বেরোবো সেই মতলব ভাঁজছি, হয়ত দুম করে কোথাও ঘুরে এলাম টু পাইস রোজগারও হয়ে গেল, আবার দোলের আগের দিন সাদা খোলের সিল্কের শাড়ী পরে রাস্তায় বেরোনোর আগে দুবার ভাবছি না, একটু আগে খালি হাতে মডেলিংএর ইন্টারভিউ পর্যন্ত দিয়ে ফেলেছি। চান্স যে পাবো না সে ব্যাপারে শিওর, কিন্তু সব মিলিয়ে যাকে বলে ঘটনার ঘনঘটা। ভাগ্যিস খুন হয়ে যাই নি!
  • সে | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৭:২০652456
  • বড্ড গরম পড়েছে আজ। চেনা শহরটাই কেমন নতুন নতুন লাগছে। শরীরটা খুব হাল্কা মতন হয়ে গেছে। হয়ত আনন্দে। ওরা ভাগ্যিস আমার বয়স জিগ্যেস করেনি। যারা সব এসেছিলো ষোলো থেকে বড়োজোর কুড়ি। আমি তো ওদের চেয়ে অনেক বড়ো। অ্যাপ্লিকেশনের কাগজ ছিলোনা সঙ্গে, সে ও ভালোই হয়েছে একদিক দিয়ে। বয়স লিখতে হোতো সেখানে, আরো অনেক ব্যক্তিগত ইনফরমেশন। সেসব লিখলে আর দেখতে হোতো না।এখন আর বাস ট্রাম মেট্রো এসব করতে ইচ্ছে করছে না। সোজা হেঁটেই মেরে দেবো পথটা। কতক্ষন আর লাগবে নর্থ ক্যালকাটা যেতে?
    পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর দুটো পেরিয়ে যায়। গিয়েই শুনি আমার নাকি ফোন এসেছিলো। ফ্যাশন শো এর রিহার্সালে যেতে হবে সন্ধেবেলায়।
    তার মানে?
    তার মানে তুমি সিলেক্টেড।
    তার পর?
    মাথার ওপরে একটা মোটা বই রেখে হাঁটা প্র্যাক্টিস করো।
    কেন?
    ওভাবেই হাঁটে। তাকে বলে ক্যাটওয়াক্‌।
    রোহিনীদি একদম সিরিয়াস।
  • | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৭:১০652457
  • কিন্তু সেই বি লেভেল? তারা কি পাশ করল?
  • সে | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৭:১১652458
  • খোঁজ নিইনি।
  • | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ১৭:১৫652459
  • এরাই এখন টেকনো ইন্ডিয়া হয়ে সর্বত্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চালাচ্ছে জানেন তো?

    আমি কখনও ভাগারপাড়ার সেকেন্ড পার্ট লিখলে এদের নামধাম দিয়েই লিখবো।
  • kiki | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ২০:২৮652460
  • কখন ও কেন! ভাগারপাড়ার সেকেন্ড পার্ট টাই তো বেশি জরুরি হত। তাড়াতাড়ি আসুক।
  • kiki | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ২০:২৯652462
  • সে,
    খুব মন দিয়ে পড়ছি, বলা যায় গিলছি।
  • kiki | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ২০:৩১652463
  • ইসে, সাহসের সঙ্গে লড়াইটা, নাটক টাটক নয় কিন্তু।(ঘাবরানো স্মাইলী)
  • ranjan roy | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ২৩:২৬652464
  • কী লাইফ! কী লাইফ!
  • vuktovogi | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০১:১০652466
  • ১৯৯৭ তে এমন পরীক্ষা দিয়ে NIIT থেকে ৮৫% স্কলারশীপের ও কোর্স কম্প্লিশনে নিশ্চিত চাকরির আশ্বাসের ফোন পেয়ে তখন প্রায় কপর্দকশূন্য বাবা জীবনের শেষ সম্বল ফিক্সড ডিপোজিট গুলো ভেঙে প্রায় ২৬০০০ টাকা দিয়ে আমায় ভর্তি করাতে ছুটছিল। মা না আটকালে সেদিন কি সর্বনাশ হত আজ ভাবি।
  • vuktovogi | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০১:১০652465
  • ১৯৯৭ তে এমন পরীক্ষা দিয়ে NIIT থেকে ৮৫% স্কলারশীপের ও কোর্স কম্প্লিশনে নিশ্চিত চাকরির আশ্বাসের ফোন পেয়ে তখন প্রায় কপর্দকশূন্য বাবা জীবনের শেষ সম্বল ফিক্সড ডিপোজিট গুলো ভেঙে প্রায় ২৬০০০ টাকা দিয়ে আমায় ভর্তি করাতে ছুটছিল। মা না আটকালে সেদিন কি সর্বনাশ হত আজ ভাবি।
  • সে | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৩:০৬652467
  • রোহিনীদির মেয়ে এবার এমে পরীক্ষা দেবে। আমার চেয়ে বেশ ক বছরের ছোটো। সে ই আমায় দেখিয়ে দিচ্ছে বেড়ালের মতো হাঁটা। নিজে হাঁটছে না অবিশ্যি। গত কয়েক রাত তার সঙ্গেই শুয়ে শুয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়েছি। সেসব গল্প শুধু আমাদের দুজনের। অন্য কারোকে বলবার নয়। সে আমায় বলছে মাথা থেকে কাঁধ অবধি স্থির থাকবে হাঁটার সময়ে। পা দুটো কেমন করে ফেলতে হবে। দু তিন পা হাঁটতে গেলেই বইটা স্লিপ করে পড়ে যায়। আবার তুলে নিই, আবার হাঁটি, আবার পড়ে যায়, আবার, আবার... এমনি করতে করতে দেখি বই আর পড়ছে না। তখন বই সরিয়ে রেখে হাঁটা। সোজাসুজি হেঁটে এসে অল্প দাঁড়ানো, মুখটা সমান্তরাল তলে অল্প ঘোরানো, চোখ, ঠোঁটের কোণে ধরা যাবে না এমন হাসি, হাত অল্প তুলে বুকের কাছে কি বড়ো জোর গলা অবদি আনা যেতে পারে। তারপরে অ্যাবাউট টার্ণ করে সেই বেড়াল ভঙ্গীতে হেঁটে ফিরে যাওয়া। বারবার প্র্যাক্টিস করলে খুব কিছু শক্ত নয়। প্রাথমিক প্রস্তুতিটুকু সম্বল করে আমি চলে যাই বালীগঞ্জ গার্ডেন রোডের একটা বাড়ীতে। সেখানে উপস্থিত হয়েছে আরো দুজন মেয়ে ও দুজন চেলে। আমায় মিলিয়ে পাঁচজন। আর রয়েছে সেই মোটাসোটা ছেলেটা যে আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলো এবং তার বয়ফ্রেন্ড, একে সকালে দেখিনি। এরা দুজনেই অর্গ্যানাইজ করছে এই ফ্যাশন শো। অ্যা বিগ্‌ রেইঞ্জ অফ্‌ ঘাগরা কালেকশান। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজবে মৃদু মিউজিক। আপাতত ঐ ছেলেটির বাড়ীতেই আমরা রিহার্সাল দেবো, ছাদে।
    বাকিরা সবাই এর আগে ফ্যাশন শো করেছে। ঐন্দ্রিলা, সাহানা, রাজ, টনি। ছেলেদের হাঁটার ব্যাপারটা অন্যরকম। মেয়েরা যেমন একটা লাইনের ওপরে হাঁটে, ছেলেরা তেমন করে হাঁটে না। এরা দুপাশে হাত দুলিয়ে সমান্তরাল দুটো রেখার ওপরে পা ফেলে ফেলে হাঁটে। হাত দুটো পকেটেও থাকতে পারে।
    একজোড়া জুতো আমার দরকার। প্ল্যাটফর্ম হিল। অন্ততঃ চার ইঞ্চি। জীবনে কোনোদিনো হিল তোলা জুতো পরিনি, কিন্তু ফ্যাশন শোয়ে হিলজুতো হচ্ছে মাস্ট। এই শোয়ের জন্যে আমরা প্রত্যেকে পাবো পাঁশো টাকা করে। হাতে আর দুটো সপ্তাহ। তারপরেই অনুষ্ঠিত হবে এই শো, হিন্দুস্থান ক্লাবের র‌্যাম্পে।
    ঐন্দ্রিলা কাছেই থাকে। ছুটে গিয়ে নিজের বাড়ী থেকে একজোড়া এক্স্‌ট্রা প্ল্যাটফর্ম হিল নিয়ে এলো। আমাদের দুজনেরই পায়ের সাইজ বাটার ছয়। নতুন নয়, ব্যবহৃত জুতো, হলদে রঙের। স্ট্র্যাপ দেওয়া। সেইটে পরে দাঁড়াতেই মনে হয় শরীরের ভারকেন্দ্র যেন টলে গেল। তার পরে সদ্য সদ্য শেখা সেই ক্যাট্‌ওয়াক্‌।
    মোটাসোটা ছেলেটা যার নাম ববি, সে খুবই খুঁতখুঁতে এবং ছটফটে। সর্বক্ষণ খুঁটিনাটিতে নজর রাখছে। কোনো কিছুই তার মনোমতো হয় না। সেতুলনায় তার বয়ফ্রেন্ড অনেক রিল্যাক্স্‌ড্‌। সে ছাদের কার্নিশে হেলান দিয়ে সিগারেট খায়, দূর থেকে দেখে এই হাঁটাহাঁটি। ক্বচিৎ এগিয়ে এসে অল্প কিছু কমেন্ট করে। ঘুরবার সময়ে হাতদুটো জড়ো করে থুতনির কোন পাশে কতোটা অ্যাঙ্গেলে রাখলে ভালো দেখাবে, এই সমস্ত। হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ফোস্কা পড়ে যায়।
    ঐন্দ্রিলা আমার কাছে এসে ফিস্‌ফিসিয়ে বলে তার পায়েও অনেক ফোস্কা আছে, ফোস্কা হয়, শুকিয়ে যায়, আবার নতুন করে হয়। ফ্যাশন শোয়ে কেউ তোমার পায়ের ফোস্কা দেখতে পাবে না।
    আমার দরকার গ্রুমিং। সেটা কী গো? সেটা হচ্ছে অনেক কিছু। যেমন তোমার দুটো হাতেই ওয়াক্সিং করতে হবে। যতই মেকাপ করো না কেন, র‌্যাম্পের ওপরে যখন আলো এসে পড়বে বাহুদুটো যেন দেখায় মাখনের মতো মসৃণ।
    ববির খুব ইচ্ছে আমাদের মেকাপ করাবে নবীনকে দিয়ে। সে অল্প বয়সী ছেলে, শিশির স্টুডিওতে মেকাপ করায়, তাকে ডাকলে বেশ হয়। ওর হাত নাকি অসম্ভব ভালো।
  • সে | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৫:৩০652468
  • সেরাতে আমি চলে গেলাম ঝুলনদির বাড়ি। রোহিনীদির মেয়ের সামনেই পরীক্ষা, অত রাত জেগে গল্প করি আমরা, তাতে পড়ার ক্ষতি হয়। ভোর ভোর ঘুম ভাঙে না। ঠিকই তো।
    ব্যাগ হাতে করে ঝুলনদি ও তার বরের সঙ্গে বাসে করে হাওড়া স্টেশন, সেখান থেকে বালী। বালী স্টেশনে নেমে রাস্তা অবধি যাবার পথটা এবড়ো খেবড়ো ঢালু। তারপরে সোজা হাঁটা পথ। অন্ধকার অন্ধকার মতো। জায়গাটার নামও অদ্ভুত। খট্‌খটিবাগান।
    কত নম্বর বাড়ী তোমাদের?
    বাড়ীর তো নম্বর নেই।
    তবে আমি চিনব কেমন করে? কাল থেকে তো একা একাই আসব যাব।
    কাল তো দোল। দোলের দিন বেরোবি কেন?
    দিনের বেলা তো দোল, আমায় তো যেতে হবে বিকেলে।
    ভূতনাথবাবুদের ফ্ল্যাট বললেই লোকে দেখিয়ে দেবে।
    কী অদ্ভুত! বাড়ীর নম্বর নেই। যেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার, তেমনি ভূতুড়ে ঠিকানা। কাল অবশ্য আমায় বালীগঞ্জ গার্ডেনের ঐ বাড়ীটায় যেতে হচ্ছে না। কাল অন্য ভেন্যু। ববির সেই বন্ধু সঞ্জয়ের বাড়ী। টল ডার্ক হ্যান্ডসাম সঞ্জয়। ববি নিজেই ড্রেস ডিজাইন করে। সঞ্জয় উপদেষ্টা মাত্র। ববির বাড়ির লোকজন রোজ রোজ এরকম রিহার্সাল করা অ্যালাও করবে না, অথচ ওর বাড়ীটায় হলে সকলেরই সুবিধে হতো। ঐন্দ্রিলার, সাহানার। বাকি ছেলেদুটো কোথা থেকে আসে জানিনা। ওরা খুব চুপচাপ। সঞ্জয় আমাদের ওর ঠিকানা বুঝিয়ে দিয়েছে। নিউ বালীগঞ্জ। বিজন সেতু পেরিয়ে সোজা হেঁটে বাঁদিকে যে এলাকাটায় নতুন নতুন বাড়ীগুলো গজিয়ে উঠছে সেই জায়গাটারই নাম হয়েছে নিউ বালীগঞ্জ। বালী, বালীগঞ্জ গার্ডেন, নিউ বালীগঞ্জ।

    দোলের দিন বিকেলে বিজন সেতু থেকে নেমে খুঁজে পেয়ে যাই সেই বাড়ীটা। এর মধ্যে একটুও প্র্যাকটিস করবার সময় পাই নি। ঝুলনদি খুব যত্ন আত্তি করছে আমায়। কিন্তু সময় কোথা দিয়ে কেটে গেছে আড্ডা দিতে দিতে। আজ যদি আবার ভুল করি, দু সপ্তাহ মানে তো আর পুরো দু সপ্তাহ নয়। মেরে কেটে আট দিন পাবো। এর মধ্যে আমাদের মাপ নিয়ে নিয়ে ঘাগরাগুলো স্টিচ্‌ করা হবে। শিখতে হবে কুড়ি তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে কাপড় বদলানোর কৌশল। মোট পাঁচজন আমরা। রোটেশানে পরপর ঢুকব বেরোবো র‌্যাম্পে। একজন বেরোনোর ঠিক আগের মুহূর্তেই পরের জনকে ঢুকে পড়তে হবে। মাথা পিছু পাঁচটা ঘাগরা হবে না চারটে, এই নিয়েও কনফিউশান আছে। ছেলেরা পরবে শেরওয়ানী কুর্তা। দুজন ছেলেরও তাহলে আট দুগুণে দশ কি চার দুগুণে আটটা শেরওয়ানী কুর্তা চাই। সেটা দাঁড়াচ্ছে মূল সমস্যা। অতগুলো সম্ভবতঃ নেই। আছে, কিন্তু ভ্যারাইটি কম। সেই নিয়েই ববি ও সঞ্জয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। ববি গম্ভীর হয়ে রয়েছে। চা খায় নি। কেন? না সঞ্জয় তাকে খোঁটা দিয়েছে, বলেছে- পারিনা, হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন রোহিত বাল।
  • সে | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৫:৫১652469
  • খট্‌খটিবাগান টু নিউবালীগঞ্জ আপ ডাউন করতে করতে ঠিক আসল অনুষ্ঠানের সন্ধ্যা এসে গেল মন্দ মন্থরে। কিন্তু মধ্যিখানে আয় করে ফেলেছি টুপাইস।
    সাতুই মার্চ - বেষ্পতিবার।
    হালকা করে ব্যাকগ্রাউন্ডটা বলে নিই।
    ১৯৯৬ এর জানুয়ারীতে পশ্চিমবঙ্গে একটা অস্ত্রপাচার উৎপাত হয়েছিলো। ঘটনাটার নাম পুরুলিয়া আর্ম্‌স্‌ ড্রপ কেস।
    সংক্ষেপে ব্যাপারটা এইরকম, যে ১৯৯৬ র কোনো এক রাতে একটা ভাড়া করা বিমানে ব্রিটিশ অস্ত্রপাচারকারী যার নাম কিনা কিম ডেভি (আরো অনেক নাম আছে তার, কোনটা আসল কোনটা নকল তা বিতর্কিত) পুরুলিয়ায় আনন্দমার্গীদের অস্ত্র সরবরাহ করতে গিয়ে ভুল জায়গায় অস্ত্র ফেলে দেয়। সম্ভবতঃ স্থানীয় লোকেরা সেই শীতের রাতে আগুন ফাগুন জ্বালিয়ে তাপ নিচ্ছিলো, সেটা বিমান থেকে দেখে সেই কিম্‌ ডেভি মনে করে যে ওটাই আনন্দমার্গীদের সিগ্‌নাল, ওখানেই অস্ত্রগুলো ফেলে দেয়া যাক। পাইলটদের (মোট চারজন পাইলট, সকলেই রাশিয়ান) যে জোর করতে থাকে মাল অফলোড করতে। অন গান পয়েন্ট। অস্ত্র অফলোড হলে পাইলটেরা ঘাবড়ে যায় এবং চেষ্টা করে ব্যাপারটা পুলিশকে জানাতে। পারে না। দমদমে ফ্লাইট নিয়ে আসে, ল্যান্ড করতেই কিম ডেভি জাস্ট নির্বিকারে হেঁটে বেরিয়ে ভিড়ে মিশে যায়, ওদিকে পাইলটের পোশাক পরা চারজনে অ্যারেস্টেড হয় তৎক্ষণাৎ, কারণ পুরুলিয়ায় তখন হৈ চৈ পড়ে গেছে আকাশ থেকে এত অস্ত্র পড়তে দেখে।
    সেই পাইলটদের মধ্যে যিনি প্রধান ( নাম আলেকসান্দার ক্লিশিন) তাঁর বৌ (ওল্‌গা ক্লিশিনা) লাৎভিয়া থেকে উড়ে চলে এসেছেন কলকাতায় - স্বামীকে বাঁচাতে। ওল্‌গা একটিমাত্র ভাষা জানেন - রাশিয়ান। তাই দোভাষী খুঁজছেন। বাংলা-রাশিয়ান, রাশিয়ান-বাংলা। সিন্‌খ্রোনাস্‌ ইন্টারপ্রেটার। থেমে থেমে ভেবে ভেবে বললে চলবে না, সঙ্গে করে ঘুরতে হবে, সময় খুব কম। কাজটা আমি নিয়ে নিলাম। এই কাজের খবর আমায় দিয়েছিলেন রোহিনীদির স্বামী।
    আমার ঘন্টা প্রতি রেট ঠিক করে নিলাম, যদ্দূর মনে পড়ে ঘন্টায় ৭৫ বা ১০০ টাকা।
    কুইন্‌স্‌ ম্যানশনের বেঙ্গল চেম্বার অফ্‌ কমার্সের গেস্ট হাউসে গিয়ে উপস্থিত হলাম সকাল নটা দশটা নাগাদ। ওল্‌গা সেখানেই ছিলেন।
    একা। উপেক্ষিত। ঘৃণার চোখে তাকে দেখছে সকলে। দেখে মনে হয় মধ্য চল্লিশ।
    প্রথমে আমাদের গতব্য কিরণশঙ্কর রায় রোড, হাইকোর্টের কাছেই উকিলপাড়া। ক্রিমিনাল লইয়ার খুঁজতে হবে। অদ্ভুত ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা।
    রাস্তাটা নোংরা। ঘিঞ্জি। তারই মধ্যে খুঁজতে হলো উকিলের ঠিকানা। বাক্সের মতো ঘর, চেম্বার। এসি। উকিল কথা বলতে নিলেন ৩৫০০টাকা, মাত্র দশ পনেরো মিনিট। তারই মধ্যে ওল্‌গাকে চোখ দিয়ে চাটা চললো। নানান মন্তব্য। সেসব আমি অনুবাদ করে দিইনি ওল্‌গাকে। ওর থেকে টাকা নিয়েছি, কিন্তু সব কথা অনুবাদ করে দিইনি।
    উকিলের অফিসে এরকমও শুনেছি - ওর স্বামী জেল খাটুক না, ওর চিন্তা কি, এখানেই জুটে যাবে কেউ।
    ওকে পয়সা নিয়ে এত চিন্তা করতে বারণ করে দিন, এখনো যা চেহারা আছে, ভালোই কামিয়ে নেবে।
    হ্যাঁ এইভাবেই ওরা বলছিলো সেদিন।
    ওল্‌গা আমার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো অনুবাদের আশায়; আমি মিথ্যে কথা বলে যাচ্ছিলাম তাকে। মিথ্যে অনুবাদ।
    ওখান থেকে কিছু পয়েন্ট কাগজে লিখে নিই, কারণ এরপরে আমাদের অজান্তেই তো টিকটিকি ঘুরবে আমাদের পেছন পেছন। দুপুর দুপুর পৌঁছে গেছি প্রেসিডেন্সী জেল। আলেকসান্দার ও তার বাকি চারজন সহকর্মী সেখানেই রয়েছেন।
    এদিকে রিগায় ওদের বড়ো মেয়ের বিয়ের দিন ঠিক হয়ে রয়েছে। সামনেই বিয়ে - এই মার্চেই।
    ওলগা বলে চলে, টাকা ধার করে সে এসেছে। বাকি তিনজন সহকর্মীর বৌয়েরা টাকা তুলেছে ধারধোর করে, এদেশে আসবার টিকিট, ভিসা, থাকা খাওয়া ঘোরার খরচ, উকিলের খরচ, সমস্ত এই থেকেই চালাতে হবে।
    ওর থেকে টাকা নিতে আমার ইচ্ছে হয় না, তবু আমি নিরুপায়। মেয়ের বিয়ের জন্যে অল্প কিছু শপিং করতে চায়। সাদা সিল্কের ড্রেস মেটিরিয়াল কিনবে, এমনি ইচ্ছে। ভারতের সিল্ক তো দুনিয়া বিখ্যাত।
    আমি বলি, জেল থেকে ফেরবার পথে সময় থাকলে নিউমার্কেটে নিয়ে যাবো কেমন?
    প্রেসিডেন্সী জেলে বেষ্পতিবার হচ্ছে "দেখা করবার" দিন। বিকেলে। সাইডের গেট দিয়ে ঢুকে সেই ঘাসহীন মাঠটায় একটা গাছতলায় দাঁড়াই। বড্ড গরম সেদিন। উল্টো দিকে একটা চাতালে অপেক্ষা করবার শেড। তার দেয়াল বেঞ্চি ছাদ সমস্তই সিমেন্টের। দেয়ালে জলের কল। সেই জল ওল্‌গা খেতে পারবে না।
    সময় হলে আমাদের সবার আগে ডেকে নেয় ভেতরে। হাই প্রোফাইল কেস্‌।
  • সে | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:০০652470
  • সবার আগে বিপদে পড়ি আমি।
    ১। কেন আমি অনুবাদকের কাজ নিয়েছি?
    ২। কেন একজন দেশদ্রোহীর হয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি।।।
    ৩। কোথায় থাকি আমি?
    ৪। ভাষা শিখলাম কোথায়?
    এবং সবশেষে "ভেতরের খবর" যেন ওদের দিই।
    ওল্‌গা এসবের কিছুই জানলো না। এই সময়ের সমস্ত খরচ ওকেই দিতে হবে, ওর "ভেতরের খবর" আমি বলে দেবো কর্তৃপক্ষকে - তার খরচ ও ওল্‌গার।

    প্রশগুলোর উত্তর যথাসম্ভব সংক্ষেপে দিই।
    ১ নং প্রশ্নের উত্তর - টাকার জন্যে।
    ২ নং প্রশ্নের উত্তরে জানাই - দেখুন এরা অপরাধ করেছে সেটা কি প্রমান হয়ে গিয়েছে? হয় নি তো এখোনো। আর "দেশদ্রোহী" কথাটা বলবেন না প্লীজ - আমাকে কি আপনার দেশদ্রোহী মনে হচ্ছে? অনুবাদ করাটা পাপ?
    ৩। থাকি বালীতে। তখন প্রশ্ন ৩ক) কোন বালী? উত্তরপাড়া বালী? উত্তর ৩ক) হ্যাঁ।
    তখন প্রশ্নকর্তা ( তিনিই সর্বোচ্য ব্যক্তি) বলেন - আমিও তো উত্তরপাড়ায় থাকি।
    আমি হেসে ফেলি।
    ৪। ভাষার ব্যাপারটা খুব খুব সংক্ষেপে বলি।

    ভেতরে হেঁটে গিয়ে দেখি একটা বড়োসড়ো উঠোনের সাইজের (মাঠ?) জায়গা, সেখানে সব খেলছে, ঘুরছে, কথা বলছে। পাশের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন ওঁরা চারজনে, তখনো পাইলটের পোষাক।
    সবাই মিলে সেই সামনের বড়ো ঘরটায়, সেই অফিস ঘরটায় বড়ো টেবিলের পাশে চেয়ার নিয়ে বসি।
    এখন তো ওল্‌গা কথা বলবে তার স্বামীর সঙ্গে, এখন তো আমার অনুবাদের কাজ থাকতেই পারে না।
    তবু থাকে।
    আমায় বাধ্য করা হয়। ওরা কী বলছে বলুন, কান পেতে শুনে বলুন।
    ওরা হাঁ করে চেয়ে থাকে আমার মুখের দিকে। ওল্‌গা আলেকসান্দারের দিকে না তাকিয়ে আমি ওদের বলে যাই বাংলায়, যা শুনছি।
    ওরা তো সংসারের কথা বলে, মেয়ের বিয়ের কথা, কে কে টাকা দিলো আসতে, কে কে দেয় নি, হবু জামাই কী বলেছে, আলেকসান্দার বলে - আমার কোমরের মাফ সরু হয়ে গেছে, বেল্ট নিয়ে এসো পরেরবার সরু দেখে।
    আমিতো এগুলোই বলে যাচ্ছি ক্রমাগত - বাংলায়।
    একটু ভেবে বলবার ও অবকাশ পাচ্ছি না।
    ওরা অধৈর্য হয় - অস্ত্র পাচারের কথা বলছে না? ওদের দলের পালের গোদা টা কোথায় গেল বলছে না?
    কিম্‌ ডেভির ব্যাপারে আলেকসান্দার সত্যিই কিছু জানে না। সে পুরোপুরি প্রতারিত। প্রাইভেট প্লেনের পাইলট হয়েছিলো ভেশি অর্থ উপার্জনের জন্যে। বউয়ের সামনে সে হুহু করে কাঁদে। ফাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকে।
    এইসমস্ত অনুবাদ পছন্দ হয় না এদের। এরা তথ্য চায়। আমি তথ্য বানাতে পারি না। যা যা বলে হুবহু অনুবাদ করে দিই।

    সন্ধ্যে প্রায় ঘনাবে এমন সময় বেরিয়ে যাই আমরা, বেরোনোর আগে ওল্‌গা ও আলেকসান্দার চুমু খায়।
    একজন কর্মচারী বলে - এসব এখানে অ্যালাউ করা হয় না, ওদের স্পেশাল ছাড় দেয়া হয়েছে, বুঝলেন?

    ভাবখানা এমন, আমি যেন ওদের পক্ষের লোক।

    সেদিন আর নিউমার্কেটে যাই না, গেস্ট হাউসে ফিরিয়ে দিই ওল্‌গাকে, গুনে গুনে নিই আমার রোজগারের টাকা।
    ফের আসতে হবে পরের দিন সকালে।

    পরের দিন।
    আরো সব দেখা সাক্ষাৎ। খুব বেশি কাজ নয়। শপিং।
    দিনশেষে টাকা গুনে নিতে নিতে প্রশ্ন করি আচ্ছা তোমাদের দেশ, তোমাদের সাহায্য করে না?
    - দেশ! কোনটা দেশ আমার?
    - কেন লাৎভিয়া? না না, রাসিয়া।
    - রাসিয়া আর দেশ নেই; দেশ ভাগের সময় আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের নাগরিকত্ব।
    - তাহলে লাৎভিয়ার নাগরিক হিসেবে, তারা কি কিছু...
    - লাৎভিয়ার নাগরিক হিসেবে একজন রাশিয়ানের কী অধিকার থাকতে পারে? কিচ্ছু নেই।

    আর কী বলব? একটু বাণী দিই। কাঁদিস না ওল্‌গা। তোর স্বামী নিরপরাধ সেটা জানি। কিন্তু তা প্রমাণ করতে কত সময় যে লেগে যাবে - তবু জানবি সত্যের জয় হবেই।

    ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ওল্‌গা। ব্যাগ গুছোতে হবে তাকে। অসহায় মেয়েটা। একবার ভাবি ওকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? ওকে তো উকিলরা ঠকিয়ে লুটে নেবে, যা দেখে এলাম। নয়ত ছিঁড়ে খাবে। ও মোটেই নিরাপদ নয় এই শহরে, ওর ফিরে যাওয়াই উচিৎ।
    এরপরে আর দেখা করিনি। জীবিকার তাগিদে তার পর দিন থেকেই নিয়মিত হই আমার ক্যাট ওয়াকে।
    কেবল বার বার মনে হতো আলেকসান্দারদের গিয়ে দেখে আসবো প্রেসিডেন্সী জেলে? ওদের তো দেশের কেউ নেই এখানে আমি ছাড়া। তারপরেই চটক ভাঙতো, কী ভুলভাল ভাবছি। আমার দেশ তো এটা। ওরা বিদেশী।
    ভয়ও পেতাম। স্বার্থপরতার ভয়। কী জানি যদি ওরাই দোষী সাব্যস্ত হয়, তখন আমি বিপদে পড়ে যাবো। কোনোদিনো যাইনি দেখা করতে।
    হাইকোর্টে যখন কেস ওঠে, ওরা চেয়েছিলো ইন্টারপ্রিটেশন করে দিই। আমি পালিয়ে গেছলাম সেসব ঝামেলা থেকে।
    বিনাদোষে দশ বছর জেল খাটে ওরা। ছাড়া পায়। অথচ কিম্‌ ডেভির আজও পাত্তা নেই।

    (ভুল লিখেছি, পুরুলিয়া আর্ম্‌স্‌ ড্রপটা হয়েছিলো ১৯৯৫ এর ডিসেম্বরে, কিন্তু এ ঘটনাটা একটু পরের - মার্চ ১৯৯৬। এই ঘটনাটা অন্যত্র লিখেছি, কিন্তু এ ও তো একরকমের চাগ্রীরই গপ্পো, বাদ দিই কেমন করে? থাকুক।)
  • সে | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:৪৭652473
  • এই পর্ব এখানেই শেষ। পরের পর্ব বিরতির পরে।
  • সে | ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৬:৪৭652471
  • হ্যাঁ। ক্যাট্‌ওয়াক। এটাই আসল সীন।
    আমরা সবাই প্রস্তুত। নির্দিষ্ট দিনে সকলে উপস্থিত হয়েছি, ল্যান্স্‌ডাউন রোডের সেই ক্লাবে। মাত্র পনের কি বড়ো জোর কুড়ি মিনিট বরাদ্দ হয়েছে এই শোয়ের জন্যে। আরো অনেক কিছু হবে হয়ত আগে পরে, সে নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। নবীনকে পাওয়া যায় নি, সে ব্যস্ত। অন্য একজন মেকাপ আর্টিস্ট এসেছেন। আমাদের নির্লোম বাহুর ওপরে পড়ছে মেকাপের প্রলেপ, আগে থেকে শ্যাম্পু করে আসা চুল টেনে টেনে সোজা করা হচ্ছে আবার কিছুটা স্প্রীঙের মতো বাঁকিয়ে তুলে স্প্রে দিয়ে দিয়ে শক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। তবে বড়ো আয়নার অভাব। এটাতো আর স্টুডিওর মেকাপ রুম নয়। পুরো বিয়েবাড়ীর মেজাজ। কনে সাজানোর অ্যাট্‌মস্‌ফেয়ার, তবে তফাৎ একটাই, কনে একাধিক। এবং তারা চুপচাপ বসে থাকার পাত্রী নয় কেও। আমাদের শো স্টপার ঐন্দ্রিলা। তার জন্যে একটু বিশেষ ব্যবস্থা থাকবেই। ভুরুর আকার ঠিকমতো খাপ না খেলে ব্লেড দিয়ে হালকা করে চেঁছে সাইজ করার ক্ষমতা রাখেন মেকাপ শিল্পী। তাড়াহুড়ো করে ঘাগরা বদলানো কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হয় ব্লাউজ বদলাতে। সে কথা ভেবেই এই সন্ধায় পরব আমরা ডীপ কাট স্লীভ লেস ব্লাউজ। ভেতরে কোনো ব্রা পরা যাবে না। পায়ের আঙুলে গোড়ালিতে আরো যতখানে গলে যাওয়া ফোস্কার ঘা শুকোয় নি, সেসব ঢেকে ফেলা হয়েছে ব্যান্ড এইড দিয়ে।
    আমার জন্যে এই শো এর মূল উদ্দেশ্য টাকা রোজগার, কিন্তু বাকি চারজনের কাছে টাকাটা আসল নয়, তারা এগিয়ে যেতে চায় ফ্যাশনের দুনিয়ায়, কিংবা হয়ত কাজ করতে চায় টিভি সিরিয়ালে। সাহানা তেমন রোগা নয়, কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গী ঐন্দ্রিলার গায়ে যেন শুধু হাড়ের ওপরে চামড়া। গ্যাস্ট্রিক পেইনের জন্যে সে ওষুধ খেয়ে নেয়।
    শেষমেশ ঠিক হয়েছে সবারই চারটে করে ড্রেস। ব্যতিক্রম শেষের রাউন্ডের জন্যে। তখন ঐন্দ্রিলা পরবে পাঁচ নম্বর ঘাগরা।
    শো চলতে লাগল। ব্যাকগ্রাউন্ডে লো ভলিউমে বাজছে ইলা অরুণের সেই ফেমাস গান। মারো ঘাগরো। পোশাক বদলে ফিরবার সময়, তৃতীয় রাউন্ডে ঐ সাড়ে চার ইঞ্চি হিল নিয়ে পা মচকালাম। বেশি লাগেনি। সামলে নিয়েছি। ব্যাথা পায়েই উৎরে দিয়েছি লাস্ট রাউন্ড। দর্শকদের দিকে তেমন তাকিয়ে দেখা যায় না। আমার নিজের কোনো চেনা বন্ধু বাড়ীর লোক কেউ নেই এই দর্শকদের মধ্যে।
    ব্যাস্‌, এইবারে শেষ হয়ে আসছে শো, গানের ভলিউম অল্প বাড়িয়ে দেওয়া হোলো, ববির হাত ধরে ঐন্দ্রিলা এগিয়ে যাচ্ছে র‌্যাম্পের ওপর দিয়ে, পেছনে সার দিয়ে দাঁড়িয়েছি আমরা।
    কায় বোলি? তু কায় বোলি?
    মুহুর্মূহু হাততালি
    মারো দেল্লি সহরমে মারো ঘাগরো...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন