এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  বইপত্তর

  • মলয়ের লেখাপত্তর

    pi
    বইপত্তর | ২৪ মার্চ ২০১২ | ৫৪২২৭৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anamika Bandyopadhyay | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:২৫732391
  • মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস : "অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা"

    - নগ্ন ভোজ ও হলাহলঃ বারুদ চিহ্ন ও অনৈতিক লাথের দিনলিপি

    অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

    অনেকান্ত কথকতা

    মলয় রায়চৌধুরীর ৪৬ পাতার নভেলা- অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা । উপন্যাসের চারটি কথক। লেখক মলয় রায়চৌধুরী, বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের এক সদস্য চিত্রকর নির্মল এর পিতা, সরকারী চাকুরে ও অতলান্ত প্রেম-বিলাসী শিশির ও বেনারসে মন্দির-ব্যবসা-সফল সাহসিনী কেকা। শুরুতে লেখক কথকতাটা নিজেই করেন, কাহিনীর চরিত্রগুলি ও সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। এরপর বাকী তিন কথক তিনটি ভিন্ন সময়ে এই আখ্যান লিখে যাবেন। তিনজনই ডায়েরী লেখক। বলা ভালো একটিই ডায়েরী। মানে একই খাতা। আর তার কাগজে তিনটি ভিন্ন সময়ে তিন কথক আঁচড় কেটে রাখেন। তাই নিয়েই এগোয় আখ্যান। ডায়েরীটির প্রাথমিক এবং আসল মালিকানা বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের সদস্য নির্মল এর পিতার। এঁর কথকতাটি মূলত প্রাবন্ধিক ধাঁচার দিনলিপি। রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের র‍্যান্ডম নোট্স্‌। ডায়েরীটি হাতবদল হয় কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র শিশির মারফৎ। মানে শিশির ডায়েরীটি হাতসাফাই করে। নির্মলের বাবার নোট্স্‌ের খাঁজে খাঁজে ফাঁকা পাতা। সেই ফাঁকা স্পেইস- আর তা ভরে ওঠে শিশিরের বারানসী বসবাসের প্রায়-প্রাত্যহিক দিনলিপিতে। যা মুখ্যত দুই নারী- ভাইকিং বংশজাতা আমেরিকান তরুণী ম্যাডেলিন ও কেকা নাম্নী অন্ত্য-ত্রিশের বাঙ্গালিনীর সাথে তার শৃঙ্গার ও সঙ্গমের এরোটিক কলমদিহি।

    এই ডায়েরী-পাতায় মলয়ের কথকরা পাঠকের সাথে কথা বলে চলেন। মনোলগের ঢং তাতে। সেই কথা তাদের নিজেদের সাথেও। নির্মলের বাবার চরিত্রটি গড়ে তোলেন না লেখক। তিনি নেহাতই ইতিহাসের কথক। এর বেশী তার সম্পর্কে কোন তথ্য লেখক আমাদের দেননা। যাত্রা-ফর্মের বিবেকের মত এই কথকের সংযোজনে এক ব্রেশটীয় বিচ্ছিন্নতা তাই আমদানী সম্ভব হয়েছে। শৃঙ্গার, রতিক্রিয়ায় ভরপুর পাল্প-ফিকশনের ধাঁচায় যে 'কজালিটির' খেলা চলতে থাকতে পারত, তাকে প্রথমেই ভাঙ্গার কাজটি করছে এই বিচ্ছিন্নতার উপপাদ্য। যাকে পরে আরও ভাঙছে উপন্যাসটির উদ্দেশ্যমূলক 'এরোটিকা'। যা নির্মাণের উদ্দেশ্য- 'মধ্যবিত্তের নীতিমুলে' শৈল্পিক লাথ। কামসূত্রের দেশে, পোস্ট-কলোনিয়াল গো-মল আর গোমূতের ছানবিন, আর কলোনি-পুর্ব মোজা পরা ভিক্টোরীয় সমাজ-পুলিশীর লিগাসিকে মলয় প্রশ্ন করেছেন ষাটের দশক থেকেই।হাংরিদের এটি মুখ্য এজেন্ডাও বটে। কিন্তু বাংলাবাজারে সেক্সকে ট্যাবু-মুক্ত করতে লেখালিখিতে সেক্সিস্টও আখরও কেটে রেখেছেন। দুর্দান্ত প্রাবন্ধিক মলয়ের গদ্য-পদ্যের এটিই সর্বাপেক্ষা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এই উপন্যাসেও তা চোখে পড়েছে, তবে তা ছাপিয়ে ওঠার মত শান্‌-দার অধুনান্তিক মেহ্‌ফিলটিও তিনি রচনা করে দিয়েছেন।

    এবং উপন্যাসের ধাঁচাটি ক্রমে বিশ্ব-স্থানিক, বহু-কথক, এক্সটিক লোকেল, এরোটিকা ও তার বিনির্মান এসবের আন্তর্জাল থেকে বহুস্বরিক হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে এইভাবে বহুস্বরিক হয়ে ওঠার বা তার অবসর নির্মান করার ক্র্যাফটটি তেমন জনপ্রিয় নয়।

    "আমার কোন স্থির কেন্দ্র ছিলনা।"

    স্থির কেন্দ্র, ঘুর্ননের আপাত স্থির বিন্দু- যাকে জন অ্যাশবেরী 'আ হিম টু পসিবিলিটি' বলে থাকেন, তা এই নভেলাতে ঘেপ্‌টে আছে জটিল এক কেমোফ্ল্যাজে।

    তিনটি ভিন্ন ডেমোগ্রাফির তিন কথককে উপস্থিত করে যে আখ্যানের বুনন তার স্থির কেন্দ্র দুটিঃ এক- পোস্ট কোলোনিয়াল ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত। ভারতবর্ষ, তরুণতর মেধাবী বাঙ্গালীর রাজনৈতিক সচেতনতা আর তার উত্তাল অভিমুখ; দুইঃ গ্লোবাল কানেকশন- আমেরিকার হিপ্সটার আন্দোলনের তরঙ্গ। সেই তরঙ্গ মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছিল, ষাট থেকে সত্তরের প্রথম ভাগে- নেপাল থেকে বারানসী। গুরু থেকে গাঞ্জা। বেলাগম সেক্স। তুলকালাম মাদক। অব্যর্থ শূন্যের ভেতর অনিশ্চিত জীবনের মানে খোঁজা। ভারত তখন হয়ে উঠেছে ঘরছাড়া হিপিদের হতাশ-নিরঞ্জন অভয়াক্ষেত্র- ইহমুক্তি খুঁজতে আসা শয়ে শয়ে মার্কিনি তরুন-তরুণী বারানসীর গলিতে গলিতে। এই বেনারসকেই বেছে নিয়েছেন মলয় তার নভেলার স্থানিক পট হিসেবে। কলকাতা থেকে বিকেন্দ্রীকরণ। আবার কলকাতা ও প্রবাস, বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র ও প্রান্তিক, এই দুই বাইনারি ছাপিয়ে তা মলয়ের আত্মজৈবনিক প্রয়াসও। ষাটের দশক। সত্তরের প্রথম ভাগ। সারা আমেরিকা উদ্বেল, অসংযত। যৌন-মুক্তি, ভালবাসায় বিভোল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পোর্টল্যান্ড, কলোরাডো থেকে নিউ ইয়র্ক। মাথায় ফুল লাগানো তরুণীরা, যুদ্ধবাজ মার্কিনি নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। ভিয়েতনামের নামে প্রতিবাদে উচাটন হচ্ছে বার্কলি থেকে প্রগতিশীল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। মানবিক হত্যার কাছে আস্থা হারিয়ে ভালবাসা খুঁজতে জড় হয়েছেন হেইট অ্যাশবেরিতে। 'ভালবাসার একটি গ্রীষ্ম' তাদের আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে, তারা ঘর ছাড়তে শিখেছেন বহর্বিশ্বের ডাকে। যেমন বীটরা। আমেরিকা জুড়ে তখন তেমনই চূড়ান্ত চলছে বীট আন্দোলন।

    বীটরা এসে যাবেন, কারণ- মলয় ও হাংরীদের বীট-কানেকশন ও মিথ পর্যায়ের। মলয় আমাকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন- হাংরিরা নয়, বরং বীটরাই অনেকভাবে হাংরিদের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন।

    আমি ডেনমার্কে বীট সাহিত্য সেমিনারে সেই সাক্ষাৎকার দেখাই। সন্ধ্যের পানশালায় মারিহুয়ানা ফুঁকতে ফুঁকতে নস্টালজিক হয়ে যেতে বসা অ্যালবয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরেনসন আমাকে রামকৃষ্ণের মত হাতের ভঙ্গিমা করে বল্লেন- কে কার থেকে কি নিল, তাতে কিবা এসে যায়। ভারতে যাওয়ার আগেই বীটরা স্বমহিমায়। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি- মলয় সম্ভবত বলতে চান যে ভারত থেকে ফিরে গিন্সবার্গ যেসব রচনা লিখছিলেন- কথ্য ভাষা সাহিত্যের আদলে, তাতে হাংরিদের প্রভাব আছে। তবে হাংরিদের ওপরও বীট-প্রভাবের আস্তরণ ছিল বা মলয়ের ওপর, তার একটি বড় লক্ষণ- তার হিপিবেলা, কারণ পুরো হিপি আন্দোলনের ওপরই বীটদের চূড়ান্ত প্রভাব ছিল। মলয় নিজেই তার মেময়ারকে 'হিপিবেলা' নাম দিয়েছেন। আর তা রাজনীতি হোক বা বীট বা বীটহীন হিপি- ঝড়টা আসলেই বহির্বিশ্বের।এরোটিকা লিখতে বসে, এই বহর্বিশ্বের ঝড়কে উপেক্ষা মলয়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ তা ফলিত হচ্ছে সমানুপাতিক ভাবে। একদিকে মাও এর রাজনীতি, অন্যদিকে হিপি সংস্কৃতি। ভারতে উত্তর উপনিবেশকালে, চীনের চেয়ারম্যানের নামে প্রলেতারিয়েত সমাজ গঠনের শপথ থেকে, মার্কিনি দাদাগিরিতে হতাশ, দেহ, নেশা, মুক্তি, ভালবাসার খোঁজে উত্তাল একাংশ মার্কিন সমাজের হাউই-বাতাস, উভয়ই মলয়কে পুষ্টি দিচ্ছে।

    সানফ্রানসিস্‌কো রেনেসান্স, ষাটের বৈপ্লবিক হিপি চরাচর ও ভালবাসার গ্রীষ্ম, বীটদের সাইকেডেলিক আন্দোলন, হিপিদের ভারত-অনুসন্ধান পর্ব ছাড়া এ উপন্যাসের প্রেক্ষিতই গড়ে উঠতনা।

    এসব জড়িবুটি পেরিয়ে মলয়ের কাছে চ্যালেঞ্জ হল- তার এই কেন্দ্র থেকে সরে এসে তাকে লিখতে হবে এরোটিকা, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর ভিক্টোরীয় নৈতিক পাছার ফুটো দেখিয়ে- অ্যাস্‌হোল ঘোমটা-যৌনতার নিধন করা। আর শেষমেশ সেটি একটি প্রেমের আখ্যানই হবে- নয়তবা সিডাকশন, নিও-শৃঙ্গার-শাস্ত্র। আর ধুমাধার সেই দুয়েন্দেতে- অব্যর্থ ভাবে সফল এই পলিফনি। ভিন্ন ভিন্ন ডেমোগ্রাফির কোলাজ-কথন।

    “Depart from the tune" - বিযুক্ত কর

    পড়ছিলাম অ্যান লডেরবাক্‌। দেখছি তিনি বলেন- “Depart from the tune" - বিযুক্ত কর, ফর্মকে ভেঙ্গে যে ফর্ম, তার মধ্যে বিশ্বকে খোঁজো'। আবার বীটরা আসিয়া যাইতেছেন। বারোজে যেমন দেখি ন্যারেটিভ, ফ্যান্টাসি, স্বপ্ন, হ্যালুসিনেশন খেলা করে। এই উপন্যাসেও মারিহুয়ানা, কেমিক্যাল ড্রাগস ছাড়াও 'নেকেড লাঞ্চ' এর মতই উপন্যাসের নামকরণে ফুড-মেটাফর এনেছেন মলয়। এঁটোকাঁটা আর ব্রাহ্মসাহিত্যের মত 'অরূপে'র ক্লাসিক সহাবস্থান, ভারতীয় যৌথ মনোনীতিতে গুরু আর চণ্ডালের অমসৃণ মিলনের মত। পৌষ্টিক ক্ষুধা, মাংস, রুটি, সুরা এবং শৃঙ্গার ও কাম-ক্ষুধার কেমোফ্ল্যাজ-

    মেঝেয় নামিয়া দুইজনে, আদিম মানব মানবীর ন্যায় পোশাকহীন, রুটি-মদ্য-মাংস খাইলাম। লঙ্কা দেয় নাই বলিয়া, মাংস, যদিও নরম, ছিঁড়িয়া-ছিঁড়িয়া খাইল ম্যাডেলিন, ছাড়া কাপড় টানিয়া হাত-মুখ পুঁছিল। ওই একই পরিত্যক্ত পোশাকে আমিও হাত-মুখ পুঁছিলাম।

    বীটদের মত সাইকেডিলিক ফ্যান্টাসি ও নেশার অদেখা জগতও এসে পড়ছে- যদিও তেমন জোরালো নয় ঃ -

    "গাঁজার ধোঁয়ায় মগজে কত যে খেলা তৈরি হয় ! আমি তাহলে অক্ষয়-অব্যয় অপ্সরা, মধুবালা আর মাধুরী দীক্ষিতের মতন সমুদ্র মন্হন থেকে উঠেছি, তপস্যা নষ্ট করতে এক্সপার্ট। " ---- কেকা উবাচ

    আর শিশিরের জবানীতে,

    "শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি। মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে। ম্যাডিই প্রস্তাব দিয়াছিল, সজ্ঞানে তো বহুবার হইল ; মাদকের অপার্থিব জগতে প্রবেশ করিয়া অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা উচিত আমার। বালকসুলভ যৌনতার সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হইবে তদ্বারা।

    সে কি আলো বিচ্ছুরণ ! নিঃশব্দ ফুলকির বৃষ্টিফোঁটা রূপান্তরিত হইয়াছে নানা প্রকার ফুলে। ম্যাডিকে কখনও মনে হইয়াছে পালক, কখনও মাখন, কখনও অশরীরী অট্টালিকা, যাহার ভিতর প্রবেশ করিয়া পথ হারাইয়া সাঁতার কাটিতেছি। "

    সারা উপন্যাসে এটুকুই মাত্র সাইকিডেলিক আয়োজন। আর তার বিবরণও নেহাতই নগণ্য। সেই দিক থেকে এটি মুখ্যভাবে সাইকুডেলিক ন্যারেটিভের চরিত্র ও গঠন বজায় রাখছেনা। যদিও মাদক ও ড্রাগস ও তার সেবন প্রথম দৃশ্য থেকেই প্রায় পুরো বারানসী বৃত্তান্তে ছড়িয়ে আছে। হাংরীরা বারবারই জানিয়েছেন যে তারা কেমিক্যাল ড্রাগস এর নেশায় ছিলেননা, বীটদের মত। তাই বীট বা অন্যান্য সাইকিডেলিক রচনার সাথে এ উপন্যাসের মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। বর্ননা যেটুকু আছে তা গড় সাইকিডেলিক মোটিফ বা সিম্বলের সাথে বিশেষ মেলেনা। আলো ও ফুলের মোটিফটি ছাড়া। সেদিক থেকে পাঠককে নিয়ে এসেও মাদকের অপার্থিব স্তরে ভ্রমণ করাতে মলয় নিতান্তই কাঞ্জুশি করেছেন বলব।

    ফিরে আসি ফর্মের আলোচনায়- তিনজন কথকের ডেমোগ্রাফি ভিন্ন। তাই বাক্যান্যাসের ব্যাপারে লেখক যত্নবান হয়েছেন। বাখতিন তার The Dialogic Imagination এ একথা উল্লেখ করেছেন যে - 'পৃথ্বীটা পলিগ্লট অর্থাৎ বহুভাষক, হয়ে গেছে। আর উপন্যাস খুব সক্রিয়ভাবেই এই পলিগ্লট বিশ্ব নির্মান করতে সক্ষম'। ভাষার ভিন্নতা বা বহু ভাষা বলতে এখানে আমি 'স্বর' বোঝাতে চাইছি। তা মূলত ডেমোগ্রাফির ভিন্নতার কারণে। এবং একই ঘটনার বা প্রেক্ষিতের দুটি পৃথক উপস্থাপনার কারণে। কিউবিজমের ধাঁচায়- দুটি বয়ান- একটি শিশিরের অপরটি কেকার।

    উত্তম বচনে লেখা এই দিনলিপি আখ্যানে কেকা ও শিশির একটিই ন্যারেটিভের দুইটি পার্সপেক্টিভ দেওয়ার কাজ করে বা পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে। এখানে যেমন শিশিরের বয়ানে পাচ্ছি-

    "প্রাতঃকালের নয়টা-দশটা হইবে। লাল তাঁতের শাড়ি-ব্লাউজ পরিহিত, সম্পূর্ণ সিক্ত, চুল হইতেও জল ঝরিতেছে, এক ভারতীয় রমণী ঘরে প্রবেশ করিয়াই খিল তুলিয়া দিল। গঙ্গায় ডুব দিয়া ভিজিয়া গিয়াছি, শুকাইতে হইবে, বলিয়া এক-এক করিয়া সবকিছু পরিত্যাগ করিল, এবং আমার তোয়ালে লইয়া গা-মাথা পুঁছিতে লাগিল। ...এতই বিস্ময়াহত হইলাম যে, উঠিয়া, স্হিতি বোধগম্য হইতে সময় লাগিল। আত্মস্হ হইলে কন্ঠ ্‌ইতে নির্গত হইল, কেকা বোউদি, করিতেছেন কী, করিতেছেন কী ! কেকা বলিল, বউদি শব্দটি বাদ দাও, এবং এগুলি ছাদে শুকাইয়া দিয়া আইস, তারপর বলিতেছি। শুকাইতে দিয়া ঘরে ফিরিয়া দেখিলাম, অতুলের স্ত্রী বিছানায় শুইয়া সিগারেট ফুঁকিতেছে। নারীর বহু পোশাক ঘরে মজুত। অথচ সে নগ্ন, কোনো লজ্জা-সংকোচ নাই। বুঝিতে পারিলাম আমার কন্ঠ শুকাইয়া গিয়াছে, মুখ দিয়া কথা ফুটিতে সময় লাগিবে। "

    এই একই ঘটনা আবার লিপিবদ্ধ হতে দেখি কেকার জবানীতে, এক পুরুষত্বহীন স্বামী, আরেক লম্পট প্রেমিকের যৌন প্রত্যাখ্যানে অনশনক্লিষ্ট, যৌবনময়ী সে বেঁচে নিতে চায় জীবন-

    "প্রথম দিনের ব্যাপারটা লিখতে গিয়ে শিশির কিছুটা বাদ দিয়ে ফেলেছে, বোধহয় উত্তেজনার বশে কিংবা নেশার ঘোরে লিখেছে বলে। আমার মনে হয়, ও হুহু করে লিখে গেছে, তারপর আর পড়ে দেখেনি। তার ওপর মাস্টারি-মার্কা বাংলা। ও যখন ঘরে ঢুকে খাটের পাশে এসে দাঁড়ালো, মুখচোখ দেখে বুঝলুম ভীষণ অপ্রস্তুত, কী করবে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। একেবারে অস্হিরপঞ্চক। ওকে স্বাভাবিক করে তুলতে আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় পর-পর দুটো রিং ওর দিকে উড়িয়ে বললুম, এই নাও বরমাল্য, তোমায় স্বয়ম্বর-সভায় বরণ করে নিচ্ছি। শিশির কিছুটা স্বাভাবিক হল, কিন্তু জিগ্যেস করে বসল, তুমি আর গান গাও না ? এরকম গাড়লপুরুষ যে হতে পারে জানতুম না। সামনে শুয়ে রয়েছে এক নগ্ন মহিলা, সেদিকে নজর দেবে, প্রশংসা করবে, তা নয়, গান ! তবে বুঝে নিতে অসুবিধা হল না যে বঙড়শিতে মাছ আটকে পড়েছে, এখন যদি আমি মুখ থেকে বঁড়শি খুলে নিই তবেই ছাড়া পাবে, নয়তো আটকে নিয়ে খেলাবো, খেলাতে থাকবো। পুরুষরা ভাবে যে তারাই বুঝি ছিপ ফেলে গিঁথে তুলতে পারে।"

    এরপরই ডায়েরী মালিকের ক্লাসিক-জবানীতে প্রায় গোদারীয় জাম্পকাট। কেকার জবানী থেকে পাঠক এসে পড়ছে নির্মলের বাবার দিনলিপির পাতায়। তার বচনে-

    "উৎপাদন ব্যাপারটা হয়ে উঠেছে সতত পরিবর্তনরত। আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের কারণে, প্রাযুক্তিক দ্রুতির কারণে, শ্রমের তুলনায় পুঁজি থেকে সর্বাধিক লাভের কারণে, এবং অবশ্যই ভোগ্যবস্তুর বিশ্বায়নের কারণে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের আদলটাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে । বহুজাতিক সংস্হা ও তার মালিকদের স্বদেশ বলে কিছু থাকছে না। আবির্ভাব হয়েছে বিশ্বব্যাপী মাফিয়া-ভাতৃত্বের। বাজারের কতৃত্ব হয়ে চলেছে বিকেন্দ্রিত। অথচ বহুজাতিকগুলোর কর্মকাণ্ড কেবলমাত্র পুঁজি, মাল এবং উৎপাদনের আনাগোনায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক নকশাগুলোর হেরফেরকারীও বটে। ব্যক্তিমালিকের পক্ষে আর ঊৎপাদনের বিশাল কারবার চালানো সম্ভব নয় বলে, সমাজ-সম্প্রদায়-রাষ্ট্রের হাতে উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত। নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম, নীতি এক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়ায় টলমলে। সেহেতু সংস্কৃতির সনাতন ভৌগলিক বাঁধন আলগা হয়ে যায়। সংস্কৃতি হয়ে যায় ভাসা-ভাসা। সংস্কৃতি হয়ে গেছে ধাবমান ও যাযাবর। ক্লাব, সমিতি, গোষ্ঠী, যারা সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে নিজেদের মনে করে, আসলে তারা উত্তরদার্শনিকতার প্রতিভূ।

    উৎপাদনের আন্তঃরাষ্ট্রিকতা একযোগে হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব বিশ্ব একতার সুত্র, আবার পুঁজিবাদের ইতিহাসে অচিন্ত্যনীয় ভঙ্গুরতার উৎস। পুঁজিবাদের এখনকার জায়মান গল্পটি আর ইউরোপীয় ইতিহাসের প্রসারিত গল্প নয়। এই গল্পের আর কেন্দ্র থাকছে না। অর্থনৈতক ভঙ্গুরতার শক্তিবিকিরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসেছে সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা বা বহুসাংস্কৃতিকতা। এর ফলে ঘটছে সাংস্কৃতিক দেশান্তরণ, সীমানাগুলোর ( ভাষা, দেশ, জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ ইত্যাদি ) অপলকাভাব, পার্থক্য ও অসাম্যের তৃণমূল পর্যন্ত প্রসার, সমাজের ভেতরে-বাইরে ওই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সমরূপী হবার চাপ, স্হানিক ও বিশ্বের পরস্পরের মধ্যে অনুপ্রবেশ। এগুলো উত্তরদার্শনিকতার লক্ষণ। "

    ক্লাসিক প্রবন্ধের কেত্‌দার, চোস্ত্‌, আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ। প্রাবন্ধিক মলয় যিনি উপন্যাসের কলমে নির্মলের বাবা, এই বচনের কথক। এতে এসে গাড়ি জুতছেন কেকা।

    "একে তো কামুক ভোঁদাটা বিটকেল বাংলায় নিজের কাশীবাসের স্মৃতি লিখেছে, তাও আবার এমন ইজগুড়ি-বিজগুড়ি হাতের লেখায় যে তরতর করে পড়া যায় না ; তার ওপর মাঝে-মধ্যে ঢোকানো নির্মলের বাবার জ্ঞানবাক্যি ! হাতসাফাই যখন করলি, তখন ফাঁকা দেখে একটা খাতা নিতিস। নয়তো ছিঁড়ে ফেলে দিতিস নির্মলের বাবার লেখা জ্ঞানবাক্যির পাতাগুলো। ওনার দুয়েকটা পাতা পড়লুম। কী যা মাথামুন্ডু কিছুই তো বুঝলুম না। শিশির যেমন বাংলায় মাস্টারি ফলিয়ে কাব্যি করেছে, উনি তেমনি নিজেই নিজেকে জ্ঞান দিয়েছেন। "

    লেখকের সূত্র অনুযায়ী ইনিই ডায়েরী মালিক। এই মূল অথরের ডায়েরিতে ঢুঁসো মেরে ঢুকে পড়ছে শিশির। কিন্তু পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছেনা। প্রাথমিক অথরকে মারছেনা। রেখে দিচ্ছে ফাঁকা, সাদা পাতা ইতস্তত। কোন পরিকল্পনা ছাড়া। সেখানে জমে উঠবে কেকা'র 'আত্মনং বিদ্ধি'- তার নিজস্ব বাক্যশৈলীতে, যা জীবন-তরতরে- প্রচলিত অভিজ্ঞান মতে- চটুল ও অ-ক্লাসিক। স্বেদ,ঘাম ও হমজায়েদী। এভাবেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে- কোলাজ-কথন।

    "ফাঁকে-ফাঁকে যেখানটায় লেখা হয়নি, শিশির আর নির্মলের বাবা যে পাতাগুলো ছেড়ে দিয়েছে; হয়ত আমার জন্যেই। সেখানে আমার কথাগুলো ঢোকাবো। "

    মলয়ের পরীক্ষা-নিরিক্ষায় বাংলা সাহিত্যে এই বহু কথকের, একে অপরকে নির্মান-বিনির্মানের অধুনান্তিক ফর্মটি সাফল্যের সাথে থেকে গেল।

    দেহ,মন, অপর

    'আমি শিশিরের প্রেমিকা নই। শিশির আমার প্রেমিক ছিল না। তাহলে আমরা পরস্পরের কী ? আমি শিশিরের দেহটাকে ভালোবেসেছি। শিশির আমার দেহটাকে ভালোবেসেছে। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা দুজনে যে-যার নিজেকে ভালবেসেছি। অথচ আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা নই। এরকম কাণ্ড তো সিনেমাতেও সম্ভব নয়। দেখাতেই পারবে না। আমি সত্যিই অপ্সরা, ঝড় দিয়ে গড়া অপ্সরা। আর শিশির হল বরফের মতন ঠান্ডা অন্ধকার দিয়ে গড়া বিশ্বামিত্র। '

    ওপরের জবানীটি কেকার। কাহিনীতে বারানসীর দুইটি মুখ্য নারী চরিত্র- ম্যাডেলিন ও কেকা। কিন্তু মলয়কাপল-ফর্মেশন ঘটাচ্ছেননা। এদের মধ্যে প্রেম বা বিবাহ সম্পর্ক হয়না। দেহ ও মনকে ব্যবচ্ছেদ করে, দেহ ও মনের এই কামরা-ভাগ, প্রেমিক ও যৌন সঙ্গীর আলাদায়ন, এই নবীনতা, পোস্ট-আধুনিক অগ্রসরতা, বাংলা কেন তামাম সাউথ এশিয়ায় যথেষ্ট কষ্ট-মুমকিন, ভুলে যাবেননা উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে ষাটের শেষ গোড়ায়, সত্তরে।

    আবারো কথা হোল - মলয়, শিশিরের চরিত্রকে, কামরাজ-কাম-সাধু (কেকার উক্তিতে, বিশ্বামিত্র) গোছের এক সমসত্ব শিশির ভেজা রস-মণ্ড তৈরি করতে চেয়েছেন। শিশির নামক এই কথক চরিত্রটির হাতে জাদু আছে। সে জানে কামকলার ছলা। সে নারী শরীরের প্রতিটি আহ্লাদ-বিন্দুকে জাগিয়ে তুলতে পারে। আগাগোড়া দুটি নারী চরিত্রের সাথেই তার সঙ্গমের যে কামশস্ত্র মূলক রচনা, তাতে কামের, শৃঙ্গারের কলা পারদর্শিতায় পুরুষের ভূমিকাই মুখ্য। ম্যাডেলীন ও কেকা উভয়ই শিশিরের কামকলায় তৃপ্ত হয়। কিন্তু তাদের যৌনমুক্তির বা অরগ্যাজম বা উদ্দীপনের সুতোটি শিশিরের হাতে বাঁধা থাকে। মানে দাঁড়াচ্ছে- শিশির বা তার মত কোন পুরুষই পারে নারী শরীরকে বাজিয়ে তুলতে, (প্রসঙ্গতঃ নারীর সমসাময়িক যৌনচেতনা একথা স্বীকার করবেনা, এনিয়ে বিস্তরআলোচনার অবকাশ আছে, এই আলোচনায় তার বিস্তৃতি ঘটালাম না ) যেমন জিমি হেনড্রিক্সঃ

    "ওঃ, জিমি হেনড্রিক্স ! ইনডিয়ায় আসিয়া এই প্রথম একজন ভারতীয়ের কন্ঠে জিমি হেনড্রিক্সের নাম শুনিলাম। গিটার তাঁহার হাতে যৌনতায় উত্তেজিত রমণীদিগের ন্যায় হইয়া উঠে ; যেনবা গিটারের অরগ্যাজম ঘটে ! শরীরে আনন্দের ঢেউ তুলিয়া ম্যাডেলিন কহিল। তদ্ব্যাতীত, অরগ্যাজম শব্দটি শুনিয়া প্রীত হইলাম। ইতোপূর্বে কোনো নারীর কন্ঠে এই শব্দটি শুনি নাই; বস্তুত, ভাষার ভিতরে যে আরাম প্রদানের ক্ষমতা হাছে তাহা মাঝে-মধ্যে অন্যের কন্ঠস্বর নিঃসৃত শব্দে অনেকসময়ে ফুটিয়া উঠে। "

    (বিদেশিনী নারী চরিত্র ম্যাডেলিন )

    মানে যৌনতায় উত্তেজিত হতে গেলে জিমিকে বা জিমির মত কাউকে বাজাতে হয়। লেখক নারীর চাহিদায় সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছেন, কেকাকে কথক হিসেবে খাড়া করে আখ্যান বুনেছেন। নারী শরীরকে পরম মমতায় যত্ন করতে চেয়েছেন। কিন্তু নারীর যৌনতাকে পুরুষের কেন্দ্র থেকে চালনা করার ইচ্ছাও বার বার প্রকাশ করেছেন। এমনকি তা যখন নারী চরিত্রটির জবানীতেও বসানো হচ্ছে। উপন্যাসে নারীর যৌনতৃপ্তির পক্ষে সহমর্মীতা আছে। তবে দুটি নারীর ক্ষত্রেই সে প্যাসিভ গ্রহীতা। সবটুকু চালনা করে শিশির। আর অনাকাঙ্ক্ষিত হোল-

    "তুমি নায়কের ভূমিকা পালন করিবে, খলনায়ক হহিতে পারিলে আরও ভালো, তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। "

    অথবা,

    সিক্ত তোয়ালেতে কান্তা সুগন্ধী ছিটাইয়া ভালোভাবে পুঁছিলাম ম্যাডেলিনের দেহ। চোখ বুজিয়া শীতল স্পর্শের আরাম লইতে-লইতে বলিল, ব্রেকফাস্ট করিয়া, একটি অটুলস ফ্যাগ ফুঁকিয়া পরস্পরকে চতুষ্পদের মত রেপ করিবার লড়াই করিব, কী বল ?

    রেপের ধারণায় মলয় রায়চৌধুরী এতো মশগুল কেন তা আমার বোঝাতীত।

    'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' থেকেই এর ধারাবাহিকতা মলয় রেখে চলছেন। শৃঙ্গার, যৌনতার সাথে রেপের কি সম্বন্ধ একথা তার মত বিদগ্ধ মানুষ কেবলই গুলিয়ে গেলেন বলে আশ্চর্য হতে হয়। দুঃখিতও। রেপ একটি জঘন্য ঘোরতর ক্রাইম। রেপ থেকে চূড়ান্ত শারীরিক জখম এমনকি মৃত্যু হয়। রেপের মূল রয়েছে পানিশমেন্টের মারমুখী, খুনী, ক্ষতি-ইচ্ছা। অ্যাগ্রেসিভ-সেক্স বা ডমিনেটেড হওয়ার ফ্যান্টাসিকে 'রেপ' না বলে অন্য শব্দের কোন প্রতিস্থাপন তিনি খুঁজে পেলেননা না পেতে চাইলেননা, সেটি খোলসা করার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।

    পুরুষ লেখক, কথক হিসবে তিনি নারী চরিত্রের সংলাপেও তা হাজির করছেন। নারী সত্যিই কি চান- কোন নারী দুর্মর, বাধাহীন অরগ্যাজম্‌ পেতে চাইলে রেপড্‌ হতে চাইবেন কেন? হ্যাঁ, পরিসংখ্যান পাওয়া যায়- নারীরা সাবমিসিভ হতে চেয়ে বা পুরুষকে শরীরের বল প্রয়োগ করতে নির্দেশ দিয়ে শৃঙ্গার করতে চাইছেন। তাকে 'রেপ-ফ্যান্টাসি' বলার এক অদ্ভুত কিমাশ্চর্জম চলও লক্ষ্য করা যায়। যারা এটা করেন তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে চান না - রেপটা কোন ফ্যান্টাসি নয়- সেটা ক্রাইম!

    মৃগাঙ্ক গাঙ্গুলিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলাম- শুভা নিয়ে দুয়েক কথা বলতে পারি, আমার বিশ্লেষণ। আমি শুভা হলে মলয়দা কে এক হাত নিতাম অথবা শুভার হয়ে।

    একই জিনিশ লক্ষ্য করেছি সাম্প্রতিক অবন্তিকার ক্ষেত্রেও। মেল-গেজিও বলেও না। পুরোপুরি, এক ধরণের পাওয়ার-প্লে আছে। মলয়দাকে যেটুকু জানি, কথা বলেছি, মলয়দার মত লিবেরাল মানুষ এটা কেন এনেছিলেন, আনেন, জানতে ইচ্ছে হয়।

    যেমন সম্প্রতি ''অবন্তিকার শতনাম' কবিতাটি।

    "ওষ্ঠের নাম আফ্রিকান সাফারি, পাছা দুটির নাম- গোলাপসুন্দরী..."

    এ জিনিশ এর আগে নিম্ন- উচ্চ-মধ্য কোন মেধার বাঙ্গালী কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব হয়নি। মলয় চূড়ান্ত প্রেমিক, অবন্তিকাকে দুর্বার প্রেম ও অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিন্তু কথা হইল পাছা তো অবন্তিকার। স্তন ও তার। সে কি এইরূপ নাম পাইয়া খুশী হইয়াছে? সে কি নাম রাখার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছে? এই কথা মলয় রায়চৌধুরী আমাদের কখনওই জানান না।

    ফলে 'Sex is Shameful'- এই ধারনাকে ভাঙলেও কিন্তু মেয়েদের যৌনমুক্তি বা স্বাধীনতার যে ক্ষেত্র তাতে পুরোপুরি কাজে আসছেনা হাংরিদের কলম। এনিয়ে অন্য পরিসরে বলাই ভালো। উপন্যাসে ফিরি। এই উপন্যাসে অবশ্য মলয়কে স্বীকারোক্তিতে যেতে দেখি। শিশির যে চরিত্র, যার সাথে মলয় রায়চৌধুরীর হিপিবেলার উপাদান অনুযায়ী আত্মজৈবনিক মিল আছে ধারনা করছি, তার জবানীতেই এই আত্ম-উন্মোচনঃ -

    "রাজগীরের কুণ্ডের চারিধারে খালি গায়ে বসেছিল, আর আমরা, কলেজিয়ানরা, দুচোখ মেলে দেখছিলুম, যতক্ষণ ওরা স্নান করেছে ততক্ষণ “মেল-গেজ” দিয়ে গিলেছি। "

    যৌথ ডায়েরি- স্পেস, মেটাফর, মুক্তাঞ্চল

    প্রকাণ্ড শিবলিঙ্গ। তার নীচে কেকার আখড়া। মন্দির খুলে বসে কেকার আয় দুরন্ত। চিহ্নের পোস্টাপিস এই পোস্ট উত্তর-আধুনিকতাকালে তামাদি হইয়া গেছে। কিন্তু তামাদি হয়ে গেলেও চলচ্চিত্রের মানুষ এই কলমচীর সিগ্নিফায়ার ও সিগ্নিফায়েডের সংগম মাথায় চলে ফেরে। আর কেবলই মানের জন্ম হইতে থাকে।

    শিবলিঙ্গ, মন্দিরের মেটাফরও এখানে আরেকটি ইস্যু-ভিত্তিক স্তর আমদানী করছে- ধর্ম ও তার ভণ্ডামির গার্বেজ। কেকা বৌদির শিবের লিঙ্গ প্রতিস্থার মেটাফর, যা প্রজনন কাল্টের প্রতীক, যোনী ও লিঙ্গের সঙ্গমের প্রকাশ্য সনাতনী ইন্সটলেশন ( যা বারানসী না হলেও একিভাবে বার্তাবহ হত, কিন্তু বারানসী শিবস্থান, লিঙ্গ পূজার মহাপীঠ, তাই মেটাফরের খেলা এখানে জমে ওঠে অব্যর্থ ) তাকে ঘিরে জমে উঠছে ব্যবসা। ধর্মের। যে ধর্মে যৌনতা ছিলাটান ট্যাবু। সেখানেই ট্যাবু ভাঙ্গার আখ্যানে শান দিয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা প্রাচীন চলমান সভ্যতা। সত্তরের বারানসীতে মলয় তাই এখানেই নিও-কামশাস্ত্র লিখতে পারেন উত্তাল বারুদ্গন্ধে। দেহ, যা ঘিরে মৌতাত পায় যৌন-উৎসব। দেহধারী স্বপ্নময় চোখ- যা চেয়েছিল সমাজবদল, সেই দেহকেই ধ্বংস হতে হচ্ছে, খুন হয়ে যাচ্ছে তরুণ সমাজ। স্বপ্নময় সত্তরের বিপ্লব আয়োজন। আয়োজক সেই দেহ গুলিকে নিঃশেষ করা হচ্ছে। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হচ্ছে নকশাল উল্লাসের, ফেক এনকাউন্টারে।

    দেহ, দেহজ আনন্দ, মৃত্যুর ভেতর দেহ বর্জন এই দেহদর্শন বার বার মীনের মত পাক খাচ্ছে ন্যারেটিভে। মলয় একে নাটকীয় করছেন। সম্পর্কের এক জ্যামিতিক বিন্যাস ঘনিয়ে তুলছেন। তার মধ্যে দুটি নারী শরীরের সাথে তার শৃঙ্গার-লীলাকে মহিমান্বিত করে মলয় এরোটিকা নির্মান করেছেন। সেখানে যৌন মিলনের মধ্যে একের ফেলে যাওয়া অন্তর্বাস, অপরের কাম-জাগানিয়া প্রসাধনে সাহায্য করছে। আদার ও আত্ম'র বাইনারিকে গুলিয়ে দিতে গ্লোব্যাল-লোক্যাল, শ্বেত ও বাদামীর, উচ্চবিত্ত ও নিম্নের ইন্টারসেকশনালিটির উঠোনটি প্রশস্ত হচ্ছে।

    উপন্যাসে যৌথ ডায়েরিটিই এক জাদু-স্পেস। এবং সেটিই এখানে হয়ে ওঠে সিক্রেট-গার্ডেন। গোপন উদ্যান। অন্তত এরোটিকার পার্টটি যেখানে লেখা হচ্ছে। চিলেকোঠার ছাদ। যার গা দিয়ে গঙ্গা বহতা। ভারতীয় যৌথ-মনস্তত্বে সে পাপমোচী। কলুষনাশী। কাদাখানার সফেদ্‌দারী তার কর্ম। এই 'লোকেলে' মলয় খেলে দিয়েছেন পাল্টা ছক- উত্তর উপনিবেশে, বজরাঙ্গ-দল-পুর্ব্ব উত্তর প্রদেশে। তার সফেদ্দারী এখানে এক জোরালো লাথ- যেখানে গঙ্গা, তার বহতা বায়ু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভিক্টোরীয় শুচিবায়ুতা। আর তিনি শুখরিয়া আদা করছেন- ট্যাবু ভাঙ্গানিয়া মাদকের।

    'শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি। মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে। '

    একিভাবে বহুস্বর ও কথকের বিষয়ে লেখক মলয় উদার। এবং বায়াসহীনও। অন্যস্বর গুলিকে স্পেস করে দেন তিনি একই ন্যারেটিভে কথা বলার। ভিন্ন পার্সপেক্টিভ রাখার। তাতে কেকা চরিত্রটি নায়ক শিশিরকে খাটো করতে চাইলেও লেখক মলয় কেকাকে এই সুযোগ দেন। বোঝা যায় যে এ লেখকের এক আত্মবিশ্লেষন, কারণ মলয় রায়চৌধুরীর আত্মজৈবনিক উপাদান খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- শিশির মলয়ের অল্টার ইগো।

    কিন্তু এরোটিকা লিখতে বসেছে শিশির। সত্তরের দশকের নিও-কামশাস্ত্র। শৃঙ্গার মালা। মাঝে ধ্যানস্থ হাইফেনের মত নির্মলের পিতার কাল-কথনের মহাকাল বাণী- এই হল কাঠামো। তার ভেতর অতি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত নারীর আত্মনং বিধি- 'জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই , যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো ' ( কেকা উবাচ)। অথবা বিত্তশীল দেশের অস্থির সমাজের জীবনদর্শন- " যাহা ইচ্ছা করি, যে দেশে ইচ্ছা যাই, যাহাকে ভালো লাগে তাহার সহিত শুই, খাইতে ভালোবাসি বলিয়া প্রতিটি দেশের খাদ্য খাই " ( ম্যাডেলিন উবাচ)।

    চূড়ান্ত আধুনিক ভাঙ্গা ফর্ম-চিহ্ন ও ভদ্রাসন ভেঙ্গে ফেলবার মেটাফরে বারানসী তাই চরম নির্বাচন।

    লেখক এখানে লোক্যাল-গ্লোব্যাল, প্রেম-প্রেমহীন শৃঙ্গার আত্ম ও অপর মারহাব্বা খেলে দিয়েছেন। তা সত্য এরোটিকার নির্মানের চেষ্টায়ও। দেহ এরোটিক 'আদার'কে খোঁজে। ইন্টিমেসি সেই ''আদার" কে তার অবস্থানকে গলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কথকেরা রতিক্রিয়ায় অন্যের দেহগুলিকে যত্ন করতে শেখেন। একই সাথে চলে নারীর দেহের ভিস্যুয়াল কনসাম্পশন, স্কোপোফিলিয়া,। কেকার জবানীতে এই ভ্যয়ার-কে অতিক্রম করার সুযোগ ছিল। কিন্তু লেখক পুরুষ- তার ভয়ারিজম এখানে কেকার নারী-গেজকে ছাড়িয়ে যায়। এরোটিক ট্র্যাডিশনে সাধারণত এ খেলা সমানেই চলতে থাকে।

    তার পাশাপাশি ভাষাতত্বের লুডো-বোর্ডে সাপ-লুডোর মত স্ল্যাং ও ধ্রুপদী নামা ওঠা করছে। ছড়িয়ে পড়ছে।

    ডায়রি লেখক- ধ্যানস্থ, শিশির এর ভাষা ধ্রুপদী সাধু, কেকার- লোকজ ফিচেল। কিন্তু তার চটুলতা ম্যানিকিওর্ড ফ্ল্যাট-বাড়ি বা বহুতলের বাজার-উপন্যাস মার্কা চরিত্রের মত ভুসো-চটকা নয়।

    বহুদিন আগে তার প্রেমিক লর্ড আলফ্রেড বোসি ডগ্‌লাসকে লেখা অস্কার ওয়াইল্ডের অমূল্য কিছু চিঠি-চাপাটি পড়েছিলাম। ঝিম লাগানো সুন্দর সেসব প্রেমালাপ।

    বারানসীর সাব্‌-আর্বান, অনাধুনিক শহুরে প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসটিও ঝিম লাগানো সুন্দর। রহস্যময়ী প্রাচীন নগরী। তাতে ঘটে চলে বিষাদ আর মিলনের আনন্দ বিলাপ, ফ্যান্টাসি, গেইম। বোমা ও পিস্তলের মাঝে কয়েক মানবিক মুহুর্ত। চলন্ত, জাগ্রত এক উৎসব। যৌনতার উৎসব। তার আয়োজন আছে। সামান্যই। কিন্তু আন্তরিক।

    ম্যাডেলিন এর নিঃস্পৃহ বিষাদ, ট্রান্সন্যাশানাল দৃষ্টিপথ, শঙ্খ লেগে যাওয়া পাকে পাক। আর কেকার স্বেদ মাখা, সস্তা দামের লিপস্টিক ওষ্ঠ, অধর, সস্তার অগুরু ও কান্তা। নিম্ন মধ্যবিত্তের ছাপা আঁচল। অদম্য বাঁচার ইচ্ছা, বেঁচে নেওয়া। শরীরকে আবিষ্কারের আনন্দ, আর টাবুর পাছায় গরম কশাঘাত। বাঙ্গলা সাহিত্যে এই অ্যাডাল্টারির বন্দনায় মনে পড়ল অ্যাডাম বেইগলি'র 'আপডাইক' কেও। টাইম ম্যাগাজিন কাভার স্টোরি করে বলেছিল- 'He is also credited with making suburban sex sexy'। বাঙ্গালীর ধর-তক্তা ফুল-ফুল সেক্স-কাব্যকে সত্যিই পরিণত সেক্সি করে ফেলা উপন্যাসটির চলন তরতরে, ঘোরলাগা। মায়াময়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এটি মলয় রায়চৌধুরীরও প্রিয় উপন্যাস। যদিও এ বিষয়ে তার মতামত আমার জানা হয়নি।

    সত্তর একটা হাওয়া। হাওয়াটা উপন্যাসে বইছে- হাওয়ায় বারুদ গন্ধ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহ, সমাজ পাল্টানোর তীব্র জেদ আর শরীরী ট্যাবু ভাঙ্গার ঘোরলাগা, অনুপম মাদকতা। এর মধ্যে উপন্যাসে শৃঙ্গার, এরোটিকের প্রাণটিই সর্বাপেক্ষা অরূপ, মায়াময়। জীবনকে বেঁচে নেয়া। যেমনি অরূপ এই সুসফল ফলন্ত জীবন, তেমনই অরূপ তার এঁটোকাঁটাও।


    "জীবনটা যে মাংসের উৎসব তা কেন মেনে নেয় না লোকে। আমার শরীরের রক্তমাংসে আমি উৎসব ঘটাব তো তাতে কার কী করার আছে ! বেঁচে থাকা ব্যাপারটা হল এই উৎসবকে সারা জীবন ধরে পালন করে যাওয়া। অবিরাম, অবিরাম, অবিরাম। মনের শান্তি এছাড়া কেমন করেই বা পাবো, কেউ বোঝাক আমাকে। জীবন তো একবারই। তাহলে নিজের জন্যে বাঁচব না কেন ? পল থেকে পল, সবসময় নতুন ; শিশির দেখিয়ে গিয়েছিল সেই পথটা, যে পথটা আমি জানতেই পারিনি শিশিরকে পাবার আগে। ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা। উন্মাদিনীরা ছাড়া ভালোবাসার কথা আর কেউ বলতে পারে না। নিজেকে ভালবাস, হ্যাঁ, নিজেকে নিজেকে, আর অমন ভালবাসার জন্যে যা ইচ্ছা হয় করো ; ভালবাসার জন্যে বেপরোয়া হতে হবে। " ---- কেকা উবাচ

    খাজুরাহোর দেশে, বাৎস্যায়নকে পুঁথি লেখার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছিলো কিনা জানা যাচ্ছেনা। তবে তার সহস্রাধিক বছর পরে এই দেশে চুমু আন্দোলন করার প্রয়োজন হয়েছে। নেতা বলিয়াছেন- উহা ইম্পোর্টেড !! সব মিলিয়ে গোদারের 'জে. এল. জি বাই জে. এল. জি'র কথা মনে পড়ল-

    “First there was Greek civilization. Then there was the Renaissance. Now we are entering the age of the Ass.”

    অতএব এই কেকা-উবাচ- "জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই, যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো" -- ইহা এক জীবনমুখী সহজিয়া দর্শনের উল্লাস। সারা উপন্যাসে তারই আয়োজন।

    ইতিহাস, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, ক্র্যাফট ও কৌশলের নিরিখে এটি, হতে পারে, মলয় রায়চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ ফিকশন কাজ। আপনি থাকছেন স্যার।



    _____________________________________

  • মলয় রায়চৌধুরী | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:২৯732392
  • জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : নরকে এক ঋতু। অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    আগে কোনো এক সময়ে, যদি ঠিকমতম মনে থাকে, আমার জীবন ছিল ভুরিভোজের উৎসব যেখানে প্রতিটি হৃদয় নিজেকে মেলে ধরত, সেখানে অবাধে বয়ে যেতো সব ধরণের মদ।

    একদিন সন্ধ্যায় আমি সৌন্দর্য্যকে জড়িয়ে ধরলুম -- আর তাকে আমার তিতকুটে মনে হলো -- আর আমি ওকে অপমান করলুম।

    বিচারের বিরুদ্ধে নিজেকে করে তুললুম ইস্পাতকঠিন।

    আমি পালালুম। ওহ ডাইনিরা, ওহ দুর্দশা, ওহ ঘৃণা, আমার ঐশ্বর্য্য ছিল তোমাদের হেফাজতে।

    যাবতীয় মানবিক আশা আমি নিজের মধ্যে নষ্ট করে ফেলেছি। বিরূপ জানোয়ারের নিঃশব্দ লাফ নিয়ে আমি গলা টিপে মেরে ফেলে দিয়েছি প্রতিটি আনন্দ।

    আমি জল্লাদদের আসতে বলেছি ; আমি তাদের বন্দুকের নল চিবিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে চাই। আমি বালি আর রক্তে রুদ্ধশ্বাস হবার জন্য নিম্নত্রণ করেছি মহামারী রোগদের। দুর্ভাগ্য ছিল আমার ঈশ্বর। আমাকে পাঁকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে, আর নিজেকে শুকিয়ে নিয়েছি অপরাধাত্মক হাওয়ায়। আমি উন্মাদনার সীমায় নিজেকে নিয়ে গিয়ে মূর্খের খেলা খেলেছি।

    আর বসন্তঋতুর দিনগুলো আমাকে এনে দিয়েছে বোকার আতঙ্কিত হাসি।

    এখন কিছুদিন হলো, যখন আমি নিজেকে ভবিষ্যত অমঙ্গলের বার্তাবাহক হিসাবে আবিষ্কার করলুম, আমি ভাবতে লাগলুম পুরোনো দিনকালের ভোজনোৎসবের উৎসসূত্রের কথা, যেখানে আমি খুঁজে পাবো আবার নিজের বাসনার আকাঙ্খা।

    সেই উৎসসূত্র হলো সর্বজনে প্রীতি -- এই ধারণা প্রমাণ করে যে আমি স্বপ্ন দেখছিলুম !

    যে দানব একসময়ে আমাকে অমন সুন্দর আফিমফুলের মুকুট পরিয়েছিল, চিৎকার করে বলে ওঠে: “তুমি হায়েনা ইত্যাদি জানোয়ার হয়েই বেঁচে থাকবে”...। “মৃত্যুকে খুঁজবে তোমার আকাঙ্খাপুর্তির মাধ্যমে, আর যাবতীয় স্বার্থপরতা দিয়ে, আর সাতটি মারাত্মক পাপ দিয়ে।”

    আহ ! আমি সেসব অনেক সহ্য করেছি : তবু, হে প্রিয় শয়তান, অমন বিরক্তমুখে তাকিও না, আমি তোমার কাছে আবেদন করছি ! আর যতোক্ষণ অপেক্ষা করছি কয়েকটা পুরোনো কাপুরুষতার খাতিরে, কেননা তুমি একজন কবির মধ্যে সমস্ত রকমের চিত্রানুগ কিংবা নীতিমূলক স্বাভাবিকতার অভাবকে গুরুত্ব দাও, আমি তোমাকে এক অভিশপ্ত আত্মার রোজনামচা থেকে এই কয়েকটা অপবিত্র পৃষ্ঠা পাঠিয়ে দিচ্ছি।

    বদ রক্ত

    ফরাসি দেশের প্রাচীন অধিবাসী গলদের থেকে আমি পেয়েছি আমার ফিকে নীল চোখ, একখানা ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক, আর প্রতিযোগীতায় আনাড়িপনা। আমার মনে হয় আমার জামাকাপড় তাদের মতনই অমার্জিত।

    কিন্তু আমি চুলে তেল লাগাই না।

    সেই প্রাচীন অধিবাসী গলরা ছিল তাদের সময়ের অত্যন্ত মূর্খ চামার আর খড় পোড়ানোর দল। তাদের কাছ থেকে আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি : প্রতিমা-উপাসনা, আর যা-কিছু পবিত্র তাকে নোংরা করে দেবার প্রতি টান ; ওহ ! যতোরকমের কদভ্যাস হতে পারে, ক্রোধ, লাম্পট্য, -- ভয়ানক ব্যাপার, এই লাম্পট্য ; -- তাছাড়া মিথ্যে কথা বলা, আর সবার ওপরে আলস্য।

    যাবতীয় ব্যবসাপাতি আর কাজকারবার সম্পর্কে আমি বেশ আত্ঙ্কে ভুগি। কর্তাব্যক্তিদের আর খেটে-খাওয়া লোকেদের সম্পর্কে, ওরা সব্বাই চাষাড়ে আর মামুলি। যে হাত কলম ধরে থাকে তা লাঙল ধরে থাকা হাতের মতনই শুভ। -- হাতের ব্যাপারে একটা শতাব্দী বলা যায় ! -- আমি কোনোদিনও আমার হাত ব্যবহার করতে শিখবো না। আর হ্যাঁ, পারিবারিক ঝুঠঝামেলা তো আরও এক কাঠি বাড়া। ভিক্ষা চাওয়ার মালিকানা আমাকে লজ্জা দেয়। অপরাধীরা অণ্ডকোষহীন পুরুষদের মতোই নিদারুণ বিরক্তিকর : আমি আছি বহাল তবিয়তে, আর আমি কাউকে পরোয়া করি না।

    কিন্তু ! কে আমার জিভকে এতো বেশি মিথ্যা-সুদর্শনে ভরে তুলেছে, যা কিনা আমাকে এতোদিন পর্যন্ত পরামর্শ দিয়েছে আর অলস করে রেখেছে ? আমি তো আমার জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে শরীরকেও ব্যবহার করিনি। ঘুমন্ত কোলাব্যাঙের আলস্যকে ছাপিয়ে, আমি সব রকমের জায়গায় বসবাস করেছি। ইউরোপে এমন কোনো পরিবার নেই যাদের আমি চিনি না। -- পরিবার বলতে, আমি বোঝাতে চাইছি, যেমন আমার, যারা মানুষের অধিকারের ফতোয়ার জোরে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। -- আমি প্রতিটি পরিবারের সবচেয়ে বড়ো ছেলেকে চিনি!

    -------------------------------

    যদি ফ্রান্সের ইতিহাসের কোনো একটা সময়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকতো !

    কিন্তু তার বদলে, কিছুই নেই।

    আমি ভালো করেই জানি যে আমি চিরটাকাল এক নিকৃষ্টতর জাতির মানুষ। আমি দ্রোহ ব্যাপারটা বুঝতে পারি না। নেকড়ের পালের মতন কোনো জানোয়ারকে ছিঁড়ে খাবার জন্য, যা তারা নিজেরা মারেনি, আর লুঠপাচার বাদ দিলে, আমার জাতি কখনও উঠে দাঁড়ায়নি।

    খ্রিস্টধর্মের বাড়ির বড়ো মেয়ে ফ্রান্সের ইতিহাস আমার মনে আছে। পবিত্র ভূমির জন্যে ক্রুসেডে লড়তে, আমিও চলে যেতে পারতুম, একজন গ্রাম্য চাকর হিসাবে ; আমার মগজের ভেতরে ব্যাভেরিয়ার বনানীর ভেতর দিয়ে অজস্র পথ রয়েছে, বসফরাসের বাইজেনটিয়াম সাম্রাজ্যের ছবি, জেরুজালেমের কেল্লা ; মেরির পুজোপদ্ধতি, ক্রুশকাঠে ঝোলানো যিশুর সম্পর্কে দুঃখদায়ক চিন্তা, আমার মগজের ভেতরে হাজার অবজ্ঞায় পুলকিত হতে থাকে। -- রোদ্দুরের কামড়ে ধ্বসে পড়া দেয়ালের কিনারায়, ভাঙাচোরা মাটির বাসনকোসন আর বিছুটিবনের মাঝে আমি একজন কুষ্ঠরোগির মতন বসে থাকি। --- আর তাছাড়া, আমি একজন উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরে ভাড়াটে সৈনিক, জার্মান রাত্রির আকাশের তলায় সময় কাটাতুম।

    আহ ! আরেকটা ব্যাপার : বুড়ি আর বাচ্চাদের দলের সঙ্গে অত্যুজ্জ্বল লালচে ফাঁকা মাঠে আমি স্যাবাথছুটির নাচ নেচে চলেছি।

    আমি এই দেশ আর খ্রিস্টধর্মের বিষয়ে বিশেষ কিছুই মনে রাখতে পারিনি। আমি নিজেকে চিরটাকাল অতীতে দেখতে পাবো। কিন্তু সবসময়ে একা ; পরিবারহীন ; প্রকৃতপক্ষে, কোন সেই ভাষা, যাতে আমি কথা বলতুম ? আমি কখনও নিজেকে যিশুখ্রিস্টের পারিষদবর্গের সদস্য হিসেবে দেখি না ; সন্তদের সভাতেও নয়, -- যারা যিশুখ্রিস্টের প্রতিনিধি।

    এক শতক আগে আমি ঠিক কী ছিলুম : আজকে আমি কেবল নিজেকে খুঁজে পাই। টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো সেইসব লোকগুলো, ধূসর যুদ্ধগুলো উধাও হয়ে গেছে। নিকৃষ্ট জাতি চেপে বসেছে সবার ওপরে -- যাকে লোকে বলে জনসাধারণ, যুক্তিপূর্ণতা ; রাষ্ট্র এবং বিজ্ঞান।

    আহ ! বিজ্ঞান ! সমস্তকিছু অতীত থেকে নিয়ে আসা হয়। শরীর আর আত্মার জন্যে, -- শেষ আধ্যাত্মিক সংস্কার, -- আমাদের রয়েছে ওষুধ আর দর্শনতত্ব, বাড়িতে সারিয়ে তোলার টোটকা আর নতুনভাবে বাঁধা লোকগান। এবং রাজকীয় আমোদপ্রমোদ, আর যে সমস্ত খেলাধুলা রাজারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে ! ভূগোল, আকাশবিদ্যা, যন্ত্রবিদ্যা, রসায়ন !...

    বিজ্ঞান, নবতর আভিজাত্য ! প্রগতি। জগতসংসার এগিয়ে চলেছে !.... আর কেনই বা তা করবে না ?

    আমাদের রয়েছে গণিতের দৃষ্টিপ্রতিভা। আমরা এগিয়ে চলেছি প্রাণচাঞ্চল্যের দিকে। আমি যা বলছি তা অমোঘ রহস্যপূর্ণ এবং ধ্রুবসত্য। আমি বুঝতে পারি, আর যেহেতু আমি পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট শব্দাবলী ছাড়া নিজেকে প্রকাশ করতে পারি না, আমি বরং চুপ করে থাকবো।

    পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট রক্ত ফিরে বইতে থাকে শরীরে ! প্রাণচাঞ্চল্য এখন আয়ত্বে, যিশু কেন আমাকে সাহায্য করেন না, কেন আমার আত্মাকে আভিজাত্য আর স্বাধীনতা দেন না। আহ ! কিন্তু যিশুর উপদেশাবলী তো অতীতের ব্যাপার ! খ্রিস্টের উপদেশাবলী ! খ্রিস্টের উপদাশাবলী !

    আমি হাঘরের মতন ঈশ্বরের জন্যে অপেক্ষা করি। আমি চিরকালের জন্যে, চিরকালের জন্যে, এক নিকৃষ্ট জাতের মানুষ।

    আর এখন আমি উত্তরপশ্চিম ফ্রান্সের ব্রিট্যানির সমুদ্রতীরে। শহরগুলো সন্ধ্যায় তাদের আলোকমালা জ্বালিয়ে দিক। আমার দিনকাল ফুরিয়ে গেছে ; আমি ইউরোপ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। সমুদ্রের হাওয়া আমার ফুসফুসকে গরম করে তুলবে ; হারিয়ে-যাওয়া আবহাওয়া আমার ত্বককে পালটে ফেলবে চামড়ায়। সাঁতার কাটার জন্যে, ঘাসভূমি মাড়িয়ে চলার জন্যে, শিকার করার জন্যে, সবচেয়ে প্রিয় ধোঁয়াফোঁকার জন্যে ; কড়া মদ খাবার জন্যে, সে মদ গলিয়ে ফেলা লোহার মতন কড়া, -- আগুনের চারপাশে আমার প্রণম্য পূর্বপুরুষরা যেমন ভাবে বসে থাকতেন।

    আমি লোহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ফিরে আসবো, কালো ত্বক, আর রাগি দুটো চোখ : এই মুখোশে, ওরা সবাই মনে করবে আমি উৎকৃষ্ট জাতির মানুষ। আমার কাছে থাকবে স্বর্ণভাঁড়ার : আমি হয়ে উঠবো নৃশংস আর শ্রমবিমুখ। যে দুর্ধষ্য পঙ্গুরা গ্রীষ্মমণ্ডলের দেশ থেকে ফিরে আসে, তরুণীরা তাদের সেবা করে। আমি রাষ্ট্রনীতিতে জড়িয়ে পড়বো। বেঁচে যাবো।

    এখন আমি অভিশপ্ত, আমি আমার নিজের দেশকে অপছন্দ করি। সবচেয়ে ভালো হলো মাতাল অবস্হায় ঘুমোনো, চিলতেখানেক কোনো সমুদ্রতীরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়া।

    --------------------------

    কিন্তু কেউই ছেড়ে চলে যায় না। --- আরেকবার বেরিয়ে পড়া যাক আমাদের এলাকার পথে-পথে, আমার অধার্মিকতার ভার সঙ্গে নিয়ে, সেই অধার্মিকতা যা যুক্তিপূর্ণতার যুগ থেকে আমার অস্তিত্বে দুঃখকষ্টের শিকড় পুঁতে দিয়েছে -- স্বর্গ পর্যন্ত উঠে যাওয়া, আমাকে বিদ্ধস্ত করে, ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায়, আমাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যায়।

    চরম পাপহীনতা, শেষ মায়া। সবকিছু বলা হয়ে গেছে। পৃথিবীতে আমার জঘন্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার নয়।

    চলে এসো ! কুচকাওয়াজ করে, ভার কাঁধে তুলে, মরুভূমি, একঘেয়েমির বিরক্তি এবং ক্রোধ নিয়ে।

    কার কাছে গিয়ে ভাড়া করা মজুর হবো ? কোন সে জানোয়ারদের আদর করি ? কোন পবিত্র মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করি ? কেমনতর হৃদয়কে ভাঙি ? কোন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিই ? -- কোন সে রক্তের নদী হেঁটে পার হই ? বরং বিচার থেকে দূরত্ব রাখা ভালো। -- এক কঠিন জীবন, সুস্পষ্ট বিস্ময়, -- কফিনের ঢাকা তোলার জন্যে একটা শুকনো মুঠো, শুয়ে থাকো, আর দম বন্ধ হয়ে যাক। এইভাবে বার্ধক্যে পৌঁছোবার কথা নয়, কোনো বিপদ নেই : সন্ত্রাস ব্যাপারটা অ-ফরাসী।

    --আহ ! আমি এমন পরিত্যক্ত যে নিজেকে কোনও না কোনও স্মৃতিমন্দিরে গিয়ে নিখুঁত হবার আবেগ উৎসর্গ করব।

    ওহ আমার আত্ম-অস্বীকৃতি, আমার মনোমুগ্ধকর বিশ্বপ্রেম ! আমার নিঃস্বার্থপর ভালোবাসা ! অথচ তবু আমি এই তলানিতে !

    গভীর অতল থেকে কেঁদে উঠি, আমি আসলে একটা গাধা !

    ----------------------------------

    যখন আমি এক ছোট্ট শিশু ছিলুম, আমি সেই দণ্ডিত অপরাধীকে শ্রদ্ধা করতুম যার মুখের ওপর কারাগারের দরোজা সদাসর্বদা বন্ধ থাকবে ; আমি সেই সমস্ত মদের আসর আর ভাড়াদেয়া ঘরগুলোয় যেতুম যেগুলোকে তার উপস্হিতি পবিত্রতায় উন্নীত করেছে ; আমি তার চোখ দিয়ে নীলাকাশ আর ফুলে ছাওয়া মাঠের কর্মোন্মাদনা দেখতুম ; শহরের রাস্তায় আমি তার সর্বনাশা সুগন্ধকে অনুসরণ করেছি। তার ছিল সন্তদের চেয়েও বেশি ক্ষমতা, যেকোনো অনুসন্ধানকারীর চেয়েও বেশি বোধশক্তি -- আর সে, কেবল সে-ই ! নিজের মহিমা এবং নিজের ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষী ছিল।

    শীতের রাতের ফাঁকা রাস্তা-বরাবর, ঘরছাড়া, ঠাণ্ডায় কাতর, আর ক্ষুধার্ত, একটা কন্ঠস্বর আমার হিমায়িত হৃদয়কে আঁকড়ে ধরল : “দুর্বলতা হোক বা শক্তিমত্তা : তুমি টিকে আছো, তাইই হলো শক্তিমত্তা। তুমি জানো না তুমি কোথায় চলেছো কিংবা কেন তুমি কোথাও যাচ্ছো, যেদিকে চাও যাও, সবাইকে জবাব দাও। কেউই তোমাকে মেরে ফেলবে না, তুমি শবদেহ হলে যেরকম করতো তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। ” সকালবেলায় আমার চোখদুটো এতো বেশি ফ্যালফ্যালে হয়ে উঠেছিল আর মুখ শবের মতন ফ্যাকাশে, যে যাদের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছিল তারা যেন আমায় দেখতে পাচ্ছিল না।

    শহরগুলোয়, কাদার রঙ আচমকা বদলে গিয়ে লাল আর কালো হয়ে উঠল, পাশের ঘরে আলোর শিখা কাঁপলে আয়নায় যেমন হয়, জঙ্গলে গুপ্তধনের মতন ! আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, গুড লাক, আর আমি দেখতে পেলুম আগুনশিখার সমুদ্র আর ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে ; এবং বাঁদিকে আর ডানদিকে, কোটি-কোটি বজ্রবিদ্যুতের মতন সমস্ত ঐশ্বর্য্য বিস্ফোরণে ফেটে পড়ছিল।

    কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল পানোমত্ততা এবং নারীসঙ্গ ছিল আমার পক্ষে অসম্ভব। এমনকি কোনো বন্ধুসঙ্গও নয়। আমি দেখলুম আমি একদল রাগি মানুষদের সামনে পড়ে গেছি, ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি, তারা যে দুঃখে কাঁদছিল তা তারা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারছিল না, আর ক্ষমা করে দিচ্ছিল ! ঠিক যেন জোয়ান অব আর্ক ! -- “যাজকরা, অধ্যাপকরা আর ডাক্তাররা, আপনারা আমাকে আইনের হাতে তুলে দিয়ে ভুল করছেন। আমি কখনও আপনাদের একজন ছিলুম না; আমি কখনও খ্রিস্টধর্মী ছিলুম না ; আমি সেই জাতির মানুষ যারা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গায়; আমি তোমাদের আইনকানুন বুঝি না ; আমার নৈতিক জ্ঞানগম্যি আছে ; আমি ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য ; তোমরা একটা বড়ো ভুল করে ফেলছো…”

    হ্যাঁ, তোমাদের ঝলমলে আলোয় আমার চোখ বন্ধ। আমি একটি পশু, একজন কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু আমার পরিত্রাণ সম্ভব। তোমরা সব নকল কৃষ্ণাঙ্গ ; বাতিকগ্রস্ত, বুনো, কৃপণ, তোমরা সবাই। ব্যবসাদার, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; জজসাহেব, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সেনাপতি, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সম্রাট, বুড়ো চুলকানো-মাথা, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; তুমি শয়তানের হেফাজত থেকে যে মদ খেয়েছো তাতে কেউ কর বসায় না। -- এই দেশকে উৎসাহিত করে জ্বরের তাপ আর কর্কটরোগ। পঙ্গু আর বুড়ো মানুষেরা এতো বেশি শ্রদ্ধার পাত্র যে তারা চায় তাদের উষ্ণতাপে সেদ্ধ করা হোক। -- সবচেয়ে ভালো হবে এই মহাদেশ ছেড়ে বিদায় নেয়া, যেখানে এই হতভাগাগুলোকে প্রতিভূ সরবরাহ করার জন্যে পাগলামি জিনিশটা ঘুরঘুর করে বেড়ায়। আমি প্রবেশ করবো ক্যাম্বোডিয়ার সত্যকার চাম রাজার সন্তানদের দেশে।

    আমি কি প্রকৃতিকে বুঝতে পারি ? আমি কি নিজেকে বুঝতে পারি ? কোনও বাক্য আর আয়ত্বে নেই। আমি মৃত মানুষদের নিজের পাকস্হলিতে পুরে রাখি...হইহট্টোগোল, ঢোলঢোলোক, নাচো, নাচো, নাচো ! আমি সেই মুহূর্তের কথা চিন্তাও করতে পারি না যখন শ্বেতাঙ্গ মানুষরা পোঁছেচে, আর আমি শুন্যতায় তলিয়ে যাবো।

    পিপাসা আর ক্ষুধা, হইহট্টোগোল, নাচো, নাচো নাচো !

    -----------------------------

    শ্বেতাঙ্গরা তীরে নামছে। কামানের গোলার আওয়াজ ! এখন আমাদের নির্ঘাত খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হবে, পোশাক পরে তৈরি হও, আর কাজে বেরোও।

    আমার হৃৎপিণ্ডকে ঈশ্বরিক করুণায় বিদ্ধ করা হয়েছে। আহ ! আমি কখনও ভাবিনি যে আমার জীবনে এই ঘটনা ঘটবে !

    কিন্তু আমি কোনও অন্যায় তো করিনি। আমার দিনগুলো হয়ে উঠবে স্বস্তিময়, এবং পশ্চাত্তাপ থেকে আমাকে মুক্তি দেয়া হবে। যেখানে আনাড়ম্বর আলোকমালা শোকসভার মোমবাতির মতন আরেকবার জ্বলে ওঠে, আমাকে আধমরা আত্মার শুভত্বে পীড়ন করা হবে না। প্রথম সন্তানের অদৃষ্ট, সময়ের আগেই জন্মানো কফিন যা ঝিলমিলে কান্নাফোঁটায় ঢাকা। কোনও সন্দেহ নেই, ন্যায়ভ্রষ্টতা হলো বোকামি, কদভ্যাস হলো বোকামি ; পচনবিকারকে সদাসর্বদা দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু দেয়ালঘড়িকেও শিখতে হবে বিশুদ্ধ যন্ত্রণার সময়নির্দেশের চেয়ে বেশিবার কাঁসরঘণ্টা কেমন করে বাজাতে হয় ! এই সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে, আমাকে কি শিশুর মতন তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে স্বর্গোদ্যানে গিয়ে খেলা করতে পারি ! তাড়াতাড়ি করো ! সেখানে কি অন্যান্য জীবনও আছে ? -- বৈভবশালীদের পক্ষে শান্তিতে ঘুমোনো অসম্ভব। ঈশ্বর্য্য চিরকাল সবায়ের সামনে খোলামেলা থাকে। কেবল জ্ঞানের চাবিকাঠি দিতে পারে দেবোপম প্রেম। আমি তো দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতি একধরণের দয়ামায়ার প্রদর্শনী। বিদায় বিশপের আঙরাখায় ঢাকা আগুনের নিঃশ্বাস-ওড়ানো দানব, আদর্শবোধ আর ভুলভ্রান্তি।

    উদ্ধারকারী জাহাজ থেকে ভেসে আসছে দেবদূতদের উদ্দেশ্যময় গান : এ হলো দেবোপম ভালোবাসা। -- দুটি ভালোবাসা ! আমি জাগতিক প্রেমে মরে যেতে পারি, আনুগত্যের কারণে মরে যেতে পারি। আমি পেছনে ফেলে যাচ্ছি সেই সমস্ত প্রাণীদের, আমি চলে যাবার পর যাদের যাতনা ক্রমশ বাড়তে থাকবে ! বাতিলদের মধ্যে থেকে তুমি আমাকে বেছে নিয়েছো, যারা রয়ে গেলো তারা কি আমার বন্ধু নয় ?

    তাদের অমঙ্গল থেকে বাঁচাও !

    আমি নিমিত্তসিদ্ধির খাতিরে দ্বিতীয়বার জন্মেছি। জগৎসংসার বেশ শুভময়। আমি জীবনকে আশীর্বাদ করবো। আমি আমার ভাইবেরাদরদের ভালোবাসবো। বাল্যকালীন প্রতিজ্ঞার ব্যাপার আর নেই। বার্ধক্য আর মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার আশা নেই। ঈশ্বর আমার শক্তি, এবং আমি ঈশ্বরের বন্দনা করি।

    ----------------------------

    একঘেয়েমি-জনিত বিরক্তিকে আমি আর পছন্দ করি না। দুর্বার-ক্রোধ, বিকৃতকাম, উন্মাদনা, যাদের সব কয়টি স্পন্দনাঘাত আর দুর্বিপাকের সঙ্গে আমি পরিচিত, -- আমার সম্পূর্ণ ভার লাঘব হয়েছে। এবার আমার অপরাধশূন্যতার সীমাকে ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়ন করা যাক।

    প্রহারের সন্তুষ্টি চাইবার মতন অবস্হায় আমি আর নেই। আমি কল্পনা করি না যে আমার শ্বশুর যিশুখ্রিস্টের সঙ্গে আমি মধুচন্দ্রিমায় বেরিয়েছি।

    আমি আমার নিজের যুক্তিজালে আটক জেলবন্দি নই। আমি তো বলেছি। হে ঈশ্বর। আমি উত্তরণের মাধ্যমে স্বাধীনতা চাই : আমি কেমন করে সেই দিকে যাবো ? ছেলেমানুষির সেই স্বাদ আর নেই। আর দরকার নেই দেবোপম ভালোবাসার কিংবা কর্তব্যের প্রতি উৎসর্জন। আমি ছেলেবেলার আবেগ ও অনুভবের ত্রুটিকে দোষ বলে মনে করিনা। যে যার নিজের যুক্তিপূর্ণতায়, অবজ্ঞায়, সর্বজনপ্রীতিতে রয়েছে : শুভবুদ্ধির দেবদূতোপম সিঁড়ির সবচেয়ে ওপরের ধাপে নিজেকে রেখেছি আমি।

    আর যদি সুস্হিত আনন্দের কথা বলতে হয়, গার্হস্হ হোক বা না হোক...। না, আমি পারবো না। আমি বড়ো বেশি তুচ্ছ, অত্যন্ত দুর্বল। কর্মকাণ্ড জীবনকে কুসুমিত করে তোলে, ওটা পুরোনো ধ্যানধারণা, আমার নয় ; আমার জীবন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা কর্মকাণ্ডের থেকে দূরে লক্ষ্যহীন ভেসে চলে যায়, পৃথিবীর সেই তৃতীয় মেরুঅঞ্চলে।

    বুড়ি চাকরানি হয়ে যাচ্ছি আমি, মৃত্যকে ভালোবাসার সাহস হারিয়ে ফেলেছি !

    ঈশ্বর যদি আমাকে সেই দিব্যশান্তি দিতেন, নির্মল প্রশান্তি, এবং প্রার্থনা, -- প্রাচীনকালের সন্তদের মতন -- সেই সন্তরা ! তাঁরা ছিলেন শক্তিমন্ত ! নোঙোর, এমনই এক ধরণের শিল্পী যাঁদের প্রয়োজন আর আমাদের নেই !

    এই প্রহসনের কি এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন ? আমাকে কাঁদাবার জন্যে আমার শুদ্ধতা যথেষ্ট। জীবন নামের প্রহসনে সবাইকে খেলতে হবে।

    --------------------------

    এবার থামাও ! এটা তোমার শাস্তি। -- কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে যাও !

    আহ ! আমার ফুসফুস জ্বলছে, কপাল দপদপ করছে ! রাত্রি ঘনিয়ে আসছে আমার চোখে, এই সূর্যের তলায় ! আমার হৃদয়….আমার দুই হাত আর পাদুটো….

    আমরা কোথায় চলেছি ? যুদ্ধ করতে ? আমি বেশ দুর্বল ! অন্যেরা এগিয়ে চলেছে। যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র...আমাকে সময় দাও !

    গুলি চালাও ! আমাকে তাক করে গুলি চালাও ! নয়তো আমি তোমাদের হাতে ছেড়ে দেবো নিজেকে। -- ভিতুর দল ! -- আমি নিজেকে খুন করবো ! আমি নিজেকে ঘোড়ার খুরের তলায় নিক্ষেপ করবো !

    আহ !

    --আমি এ-সবে অভ্যস্ত হয়ে যাবো।

    সেটাই হবে ফরাসি উপায়, শৌর্যের পথ।

    নরকে এক রাত

    আমি এক্ষুনি মুখভরা ভয়ানক বিষ গিলে ফেলেছি। -- আমাকে যে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল তাতে আমি মহিমান্বিত, মহিমান্বিত, মহিমান্বিত ! -- আমার নাড়িভূঁড়িতে আগুন ধরে গেছে। বিষের ক্রিয়াক্ষমতায় আমার দুই হাত আর পাদুটো মুচড়ে উঠছে, পঙ্গু করে দিচ্ছে, মাটিতে থুবড়ে ফেলে দিয়েছে। তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে, আমি কাঁদতে পারছি না। এ হলো নরক, অনাদি-অনন্ত যন্ত্রণাভোগ ! দ্যাখো আগুনের শিখা কেমনভাবে ওপরে উঠে যাচ্ছে ! আমার যাওয়া উচিত, আমি জ্বলেপুড়ে মরছি। চালিয়ে যাও, হে শয়তান !

    আমি একবার শুভের সঙ্গে আর প্রকাশসৌষ্ঠভের সঙ্গে কথা কইবার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলুম, পাপের শাস্তি হিসাবে নরকভোগ থেকে মুক্ত। কেমন করেই বা আমি নিজের দৃষ্টিপ্রতিভা বর্ণনা করবো, নরকের বাতাস বন্দনাগান গাইবার পক্ষে বড্ডো গাঢ় ! সুসংবদ্ধ আত্মিক ঐকতান, বলিষ্ঠতা এবং শান্তি, অভিজাত উচ্চাশা, তাছাড়া জানি না আরও কি ছিল সেখানকার লক্ষ-লক্ষ পরমানন্দিত প্রাণীদের ?

    পরমানন্দের উচ্চাশা !

    কিন্তু তবু আমি বেঁচে আছি ! -- মনে করো নরকযন্ত্রণা হলো শাশ্বত ! একজন মানুষ যে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে চাইছে সে নিশ্চয়ই অভিশপ্ত, নয়কি ? আমার বিশ্বাস আমি নরকে রয়েছি, তার মানে আমি বেঁচে আছি। এই প্রশ্নোত্তরপর্বই কাজ করে চলেছে। আমি আমার খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত কেনা-গোলাম। তোমরা, আমার বাপ-মা, আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছো, আর নিজেদের জীবনও। বেচারা খোকা ! -- পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে নরক ক্ষমতাহীন। -- আমি তবু বেঁচে আছি! পরে, নরকযন্ত্রণার মহানন্দ হয়ে উঠবে আরও নিগূঢ়। একটা অপরাধ, দ্রুত, আর মানুষের আইনে দণ্ডাদেশ পাওয়া আমাকে শূন্যতায় তলিয়ে যেতে দাও।

    চুপ করো, তুমি কি চুপ করবে !...এখানে সবকিছুই লজ্জাকর আর কলঙ্কিত ; শয়তান বলছে যে আগুনটার কোনও মানে হয় না, বলছে যে আমার ক্রোধ হলো হাস্যকর এবং নির্বোধ। -- আহ, থামো দিকিনি !...কেউ ফিসফিস করে ওই ভুলগুলোর কথা বলেছে, ইন্দ্রজালের সন্মোহন, বোকা-বানানো গন্ধ, শিশুতোষ সঙ্গীত। -- আর এই কথা ভাবা যে আমিই সত্যের অধিকারী, যে আমার আয়ত্বে চলে আসতে পারে বিচারের দৃষ্টিপ্রতিভা : আমার নির্ণয় বিচক্ষণ আর দৃঢ়, নিখুঁত হয়ে ওঠার জন্যে আমি শ্রেষ্ঠগুণসম্পন্ন… গর্ববোধ। -- আমার করোটি চেপে বসছে। দয়া করো ! হে নাথ, আমি সন্ত্রস্ত ! জল দাও, আমার তেষ্টা পাচ্ছে, আমার তেষ্টা পাচ্ছে ! আহ, শৈশব, ঘাসভূমি আর বৃষ্টি, পথের পাথরে জমা জল, যখন রাত বারোটা বাজে তখনকার চাঁদের আলো….শয়তান দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘড়িমিনারের ছাদে, ঠিক এখনই ! মেরি। পবিত্র অক্ষতযোনি !...ভয়ংকর মূর্খতা।

    ওই দিকে তাকাও, ওরা কি মাননীয় মানুষ নয়, যারা আমার ভালো চেয়েছে ?...এসো...মুখের ওপরে বালিশ, ওরা আমাকে শুনতে পাবে না, ওরা তো কেবল প্রেত।

    যাই হোক, কেউ আর অন্য কারোর কথা ভাবে না। ওদের কাছে আসতে দিও না। আমার গা থেকে নিশ্চয়ই পোড়া মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে।

    আমার অলীকদৃশ্যগুলো অসংখ্য। এগুলোই আমাকে সব সময় সহ্য করতে হয়েছে : ইতিহাস সম্পর্কে আমার বিশ্বাসহীনতা, আদর্শগুলোকে উপেক্ষা। আমি এই বিষয়ে আর কোনও কথা বলব না : কবিরা এবং দ্রষ্টারা ঈর্ষা করবে। আমি সকলের চেয়ে ধনী, কয়েক হাজার গুণ, আর আমি তা সমুদ্রের মতন আগলে রাখবো।

    হে ঈশ্বর -- এক মুহূর্ত আগে জীবনের ঘড়ি থেমে গেছে। আমি আর পৃথিবীর অন্তর্গত নই। -- ব্রহ্মবিদ্যা সঠিক ; নরক নিশ্চয়ই নিচের দিকে -- এবং স্বর্গ ওপরদিকে। -- ভাবাবেশ, দুঃস্বপ্ন, ঘুম, আগুনের নীড়ের ভেতরে।

    দেশের মধ্যে কেমন করে অলস ঘুরে বেড়ায় মন...শয়তান, ফার্দিনান্দ, বুনো বীজের সঙ্গে উড়ে যায়...যিশুখ্রিস্ট ময়ূরপঙ্খী রঙের কাঁটার ওপর দিয়ে হেঁটে যান কিন্তু তাদের নত করেন না...যিশু হেঁটে যেতেন চঞ্চল সমুদ্রের ওপর দিয়ে। লন্ঠনের আলোয় আমরা ওনাকে সেখানে দেখেছি, শ্বেতবসনে, দীর্ঘ বাদামি চুল, পান্নারঙা এক ঢেউয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন।

    যাবতীয় রহস্যের চাদর আমি ছিঁড়ে ফেলবো : ধর্মের রহস্য হোক কিংবা প্রকৃতি, মৃত্যু, জন্ম, ভবিষ্যৎ, অতীত, সৃষ্টির উৎপত্তিতত্ব, এবং শূন্যতার রহস্য। আমি হলুম মোহাবিষ্ট চোখে-দেখা অলীক ছায়ামূর্তিদের মালিক।

    শোনো !...

    প্রতিটি কর্মদক্ষতাই আমার ! -- এখানে কেউ নেই, ওখানে কেউ রয়েছে : আমি আমার ঐশ্বর্য নষ্ট করতে চাইবো না। -- আমি কি তোমাকে আফরিকার বাঁশি শোনাবো, তলপেট-নাচিয়েদের ? আমি কি উধাও হয়ে যাবো, আমি কি চেষ্টা করবো গসপেল-কথিত আঙটি খুঁজে আনার। যাবো? আমি তৈরি করব সোনা আর ওষুধ।

    তাহলে, আমাকে বিশ্বাস করো। বিশ্বাস আরাম দ্যায়, তা পথনির্দেশ করে এবং সারিয়ে তোলে। তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, -- ছোটো বাচ্চারাও -- এসো তোমাদের সান্তনা দিই, তোমাদের সামনে আমার হৃদয়ের কথা মেলে ধরি -- আমার অলৌকিক হৃদয় ! -- হে দরিদ্রগণ, হে দরিদ্র শ্রমিকবৃন্দ ! আমি বন্দনাগান চাইছি না : তোমরা কেবল আমাকে বিশ্বাস করো, আর তাহলেই আমি আনন্দিত হবো।

    -- এবার, আমার কথা ভাবো। এই সবকিছু পৃথিবীকে হারানোর ব্যাপারে আমাকে তাড়িত করে না। আমি ভাগ্যবান যে আমাকে আর যন্ত্রণা পেতে হবে না। আমার জীবন, দুর্ভাগ্যবশত, মিষ্টি বোকামি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

    বাহ ! যতো রকমের কুৎসিত মুখভঙ্গী হতে পারে আমি তা করবো।

    আমরা জগৎসংসারের বাইরে, নিঃসন্দেহে। কোনও শব্দ নেই। স্পর্শের বোধশক্তি আমার চলে গেছে। আহ, আমার দুর্গভবন, আমার স্যাক্সনি, আমার উইলোবনানী ! সন্ধ্যা ও সকাল, রাত আর দিন...আমি কতো ক্লান্ত !

    আমার ক্রোধের জন্যে একটা বিশেষ নরক থাকা উচিত ছিল, একটা নরক গর্ববোধের জন্যে, -- এবং একটা নরক যৌনতার জন্যে ; নরকের এক পরিপূর্ণ ঐকতান-সঙ্গীত !

    আমি পরিশ্রান্ত, আমি মরে যাচ্ছি। এটাই কবর আর আমি কীটে পরিণত হয়ে চলেছি, আতঙ্ক ছাপিয়ে গেছে আতঙ্ককে ! শয়তান, ভাঁড় কোথাকার, তুই নিজের চমৎকারিত্ব দিয়ে আমাকে গলিয়ে ফেলতে চাইছিস। ঠিক আছে, আমি তাইই চাই। আমি তাই চাই। কোদালকাঁটা দিয়ে আমাকে গিঁথে ফ্যালো, আমার ওপরে আগুনের ফোঁটা ঝরাও।

    আহ ! জীবনে ফিরে যাওয়া ! আমাদের বিকলাঙ্গতার দিকে তাকিয়ে দ্যাখা। আর এই বিষ, এই শাশ্বত অভিশপ্ত আলিঙ্গন ! আমার দুর্বলতা, এবং জগতসংসারের নির্দয়তা ! হে ঈশ্বর, দয়া করো, আমাকে লুকিয়ে ফ্যালো, আমি নিজেকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না -- আমি আড়ালে রয়েছি, আর আমি নেইও।

    আর যেমন-যেমন অভিশপ্ত আত্মা জেগে উঠতে থাকে, ঠিক তেমনই আগুনও।

    প্রথম ডিলিরিয়াম : সেই বোকা অক্ষতযোনি মেয়ে

    নরকবাসী একজন পুরোনো বন্ধুর আত্মস্বীকৃতি শোনা যাক, “হে প্রভু, হে দিব্য বিবাহের বর, তোমার সবচেয়ে সমব্যথী পরিচারিকাদের আত্মস্বীকৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমি মাতাল। আমি অশুদ্ধ।

    এই কি জীবন !

    “ক্ষমা করো, স্বর্গের নিবাসী হে প্রভু, ক্ষমা করে দাও ! আহ ! ক্ষমা করো। এই কান্নার জল। এবং আরও যে অশ্রু পরে ঝরতে থাকবে, অনুমান করি !

    “পরে, আমি দিব্য বিবাহের বরের সঙ্গে দেখা করবো ! আমি তো জন্মেছিলুম তাঁর কেনা-গোলাম হবার জন্যে। -- ওরা এবার আমাকে পিটুনি দিতে পারে !

    “ঠিক এখনই, জগতসংসারের শেষ ! ওহ, মেয়েরা...আমার বন্ধুনিরা !...না, আমার বন্ধুনিরা নয়...আমি কখনও এমনতর অবস্হা সহ্য করিনি, ডিলিরিয়াম, পীড়নসমূহ, সমস্তকিছু...এটা এমন অর্থহীন।

    “ওহ ! আমি কাঁদছি, আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমি সত্যিই যন্ত্রণাভোগ করছি। তবু আমার যা ইচ্ছা করার অধিকার রয়েছে, যখন কিনা আমাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে সবচেয়ে অবজ্ঞেয় হৃদয়গুলোর অবজ্ঞা দিয়ে।

    “ঠিক আছে, আমাকে আত্মস্বীকৃতি করতে দেয়া তো হোক, যদিও আমাকে হয়তো তা কুড়িবার নতুন করে আওড়াতে হবে, -- এমনই নীরস, এবং এমনই গুরুত্বহীন !

    “আমি নারকীয় বিয়ের বরের একজন কেনা-গোলাম, সেই লোকটা যে বোকা অক্ষতযোনি মেয়েদের ফুসলিয়ে সতীত্বহানি করেছিল। ও একেবারে সেই রকমেরই শয়তান। ও মোটেই মায়াপুরুষ নয়, ও প্রেতও নয়। কিন্তু আমি, যে কিনা নিজের কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি, জগতসংসারের কাছে অভিশপ্ত আর মৃত, -- কেউই আমাকে খুন করতে পারবে না ! কেমন করে তোমার কাছে তার বর্ণনা করি ! এমনকি আমি কথাও বলতে পারছি না। আমি পরে আছি শোকের পোশাক, আমি কাঁদছি, আমি বেশ ভয়ার্ত। দয়া করো, হে প্রভু, একটু টাটকা বাতাস, যদি তোমার খারাপ না লাগে, দয়া করো !

    “আমি এক বিধবা…-- আমি এক সময় বিধবা ছিলুম…--ওহ, হ্যাঁ, তখনকার সময়ে আমি ভীষণ গম্ভীর থাকতুম, আমি কংকাল হয়ে ওঠার জন্য জন্মাইনি !...ও ছিল কচিখোকা কিংবা বলা যায় প্রায়...ওর কোমল, রহস্যময় চালচলন আমাকে পুলকিত করেছিল। ওকে অনুসরণ করতে গিয়ে আমি আমার সব কর্তব্য ভুলে গেলুম। কি যে এক জীবন আমরা কাটাই ! সত্যকার জীবনের অভাব রয়েছে। আমরা এই জগতসংসার থেকে নির্বাসিত, সত্যি -- ও যেদিকে যায় আমিও সেই দিকে যাই, আমাকে যেতেই হয়। আর বেশির ভাগ সময়ে ও আমার ওপর ক্ষেপে যায়, আমার প্রতি, বেচারা পাপিষ্ঠ। সেই শয়তানটা ! ও সত্যিই একটা শয়তান, তুমি জানো, এবং মোটেই মানুষ নয়।

    “ও বলে : “আমি মেয়েদের ভালোবাসি না। ভালোবাসাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে, আমরা তা জানি। মেয়েরা যা শেষপর্যন্ত চায় তা হল সুরক্ষা। একবার ওরা তা পেয়ে গেলে, প্রেম, সৌন্দর্য্য, সবই জানালার বাইরে কেটে পড়ে : যা তাদের কাছে রয়ে যায় তা হলো তাচ্ছল্য, আজকাল বিবাহ তার ওপরই টিকে থাকে। অনেক সময়ে আমি এমন তরুণীদেরও দেখেছি যাদের খুশি থাকার কথা, যাদের সাথে আমি সঙ্গলাভ করতে পারতুম, কিন্তু তাদের তো আগে থেকেই মাস্তানরা এমন গিলে খেয়েছে যেন কাঠের গুঁড়ি ছাড়া তারা আর কিছুই নয়…”

    “আমি ওকে শুনি, বদনামকে শৌর্যে পালটে ফেলছে, নিষ্ঠুরতাকে মায়ায়। “আমি প্রাচীন এক জাতির সদস্য : আমার পুর্বপুরুষরা ছিল ভাইকিং যোদ্ধা : তারা নিজেদের দেহ ফালাফালা করে ফেলতো, নিজেদের রক্ত পান করতো। ---আমি আমার সমস্ত শরীর ফালাফালা করে ফেলবো, উল্কি দেগে দেবো সারা শরীরে, আমি মোঙ্গোলদের মতন কুৎসিত হয়ে উঠতে চাই : তুমি দেখো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করতে চাই। আমি সত্যিই রাগে ফুঁসিয়ে উঠতে চাই। আমাকে হীরে-জওহরত দেখিও না ; আমি চার হাতেপায়ে জাজিমের ওপরে হামাগুড়ি দিয়ে দুমড়ে উঠবো। আমি চাই আমার ধনসম্পত্তি রক্তে জবজবে হয়ে উঠুক। আমি কখনও কোনো কাজ করবো না… “বহুবার, রাতের বেলায়, ওর দানব আমাকে কাবু করেছে, আর আমরা কুস্তির দাঁওপ্যাঁচে গড়াগড়ি খেয়েছি ! -- অনেক সময়ে রাতের বেলায় যখন ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যায় তখন ও রাস্তার আনাচে-কানাচে কিংবা দরোজার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, যাতে আমাকে ভয়ে আধমরা করে দিতে পারে। -- আমি নির্ঘাৎ আমার গলা কেটে ফেলবো ; তা কি বিরক্তিকর হবে।” আর, ওহ ! সেই দিনগুলো যখন ও খুনি হবার ভান করে !

    “অনেক সময়ে ও ওর দেশোয়ালি বুলিতে কথা বলে, তা একেবারে আবেগে ঠাশা, মৃত্যু সম্পর্কে, আর তা কেমন করে আমাদের অনুতপ্ত করে, এবং জগতসংসারে নিশ্চয়ই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ আছে, শ্রমে পরিশ্রান্ত, আর বিদায় জানাবার প্রসঙ্গ তোলে এবং তা কেমন করে তোমার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে ফ্যালে। যে নোংরা পানশালাগুলোতে ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যেতো, তখন আমাদের চারিপাশের লোকজনদের দেখে কাঁদতো -- যেন বস্তি-অঞ্চলের গোরুমোষ। অন্ধকার রাস্তায় মাতালদের তুলে নিতো। ছোট্ট খোকাদের জন্য নির্দয় মায়ের দয়ামায়া ছিল ওর। রবিবারের স্কুলের পথে এক ছোট্ট খুকির মতন মধুরস্বভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। ও ভান করতো যেন সবকিছুই জানে, ব্যবসাপাতি, শিল্প, ওষুধ। -- আর আমি সবসময় ওর সমর্থন করতুম, আমাকে করতে হতো !

    “ও নিজের কল্পনাজগতে যেসব ঝালর ঝুলিয়ে রাখতো তা আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম ; পোশাক-পরিচ্ছদ, কারিগরি, আসবাবপত্র….আমিই ওকে অস্ত্র ধার দিয়েছিলুম, আর মুখভঙ্গীতে রদবদল। ওকে যাকিছু প্রভাবিত করতো তা আমি টের পেতুম, ঠিক যেমনভাবে ও নিজেকে কল্পনা করে নিতো। যখনই ওকে মনে হয়েছে হতোদ্যম, আমি ওকে অদ্ভুত দুর্বোধ্য অভিযানে অনুসরণ করতুম, চলেছি তো চলেইছি, শুভ হোক বা অশুভ : কিন্তু আমি সবসময়ে জানতুম যে আমি ওর জগতের অংশীদার হতে পারবো না। ওর প্রিয় দেহের পাশে, শুয়ে থাকার সময়ে, জেগে থাকতুম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতের পর রাত, ভাবতে চেষ্টা করতুম যে কেন ও বাস্তব থেকে পালিয়ে যেতে চায়। এর আগে আর কোনো লোকের এই রকম ইচ্ছে হয়নি। আমি বুঝতে পেরেছিলুম, ওর সম্পর্কে বিনা ভয়ে -- যে, সমাজের পক্ষে ও ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ওর কি, হয়তো, এমন কিছু গোপন ব্যাপার ছিল যা ওর জীবনের নবীকরন ঘটাবে ? না, আমি নিজেকে বলেছি, ও কেবল সেগুলোকে অনুসন্ধান করছিল। কিন্তু তবু, ওর বদান্যতা এক সন্মোহনে আবৃত, এবং আমি তাতে বন্দী। আর কারোর অমন শক্তিক্ষমতা থাকতে পারে না -- হতাশার শক্তিক্ষমতা --- তা সহ্য করবার, ওর ভালোবাসা আর শুশ্রুষা সহ্য করার ক্ষমতা। তাছাড়া, অন্য কারো সাথে আমি ওকে কল্পনাও করতে পারি না : আমাদের সকলের রয়েছে নিজস্ব কালো-দেবদূতের চোখ, অন্য লোকেদের দেবদূতদের নয়, --- অন্তত আমি তাইই মনে করি। আমি ওর আত্মার ভেতরে বাসা বেঁধেছিলুম, যেন তা ছিল এক ফাঁকা প্রাসাদ যাতে সবচেয়ে অযোগ্য লোক হিসাবে তুমিই তাতে থাকো : ব্যাস এইটুকুই। আহ! সত্যি বলতে কি আমি ওর ওপর শোচনীয়ভাবে নির্ভর করতুম। কিন্তু আমার নিষ্প্রভ, আমার ভিতু অস্তিত্ব থেকে ও কিই বা চাইতো ? ও তো আমার উৎকর্ষসাধন করতে পারতো না, যদিও ও কখনও আমাকে মেরে ফেলার ব্যবস্হা করতে পারেনি ! আমি এমন ভেঙে পড়ি আর হতাশ হই : অনেকসময়ে আমি ওকে বলি: “আমি তোমাকে বুঝতে পারি।” ও তাতে কেবল কাঁধ নাচায়।

    “আর তাই আমার হৃদয়ের বেদনা বাড়তেই থাকলো, আর আমি দেখলুম যে বেশি করে ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছি -- আর সবাই তা হয়তো দেখতে পেয়েছে, নিশ্চয়ই, আমি যদি এতোটা অবজ্ঞেয় না হতুম তাহলে কেউই আর আমার দিকে তাকিয়ে দেখতো না ! আর তবু আমি ওর অনুরাগের জন্যে আকুল কামনা করেছি...ওর চুমুগুলো আর ওর বন্ধুত্বের আলিঙ্গন ছিল স্বর্গীয়-- অন্ধকার স্বর্গ, যার মধ্যে আমি প্রবেশ করতে পারতুম, আর যেখানে আমি চাইতুম আমাকে রেখে দেয়া হোক -- গরিব, বধির, বোবা, এবং অন্ধ। আমি ইতিমধ্যে ওর ওপর নির্ভর করা আরম্ভ করেছিলুম। এবং আমি কল্পনা করতুম যে আমরা দুজন সুখী বালক দুঃখের স্বর্গোদ্যানে স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমাদের মধ্যে ছিল চরম সামঞ্জস্য। গভীর সমবেদনায়, আমরা পাশাপাশি খেটেছি। কিন্তু তারপর, এক ছিঁড়েফেলা আলিঙ্গনের শেষে, ও বলে উঠবে : “কতো মজার মনে হবে এই সমস্ত কাণ্ড, যা তুমি সহ্য করেছো, যখন আমি আর এখানে থাকবো না। যখন তুমি তোমার কাঁধ ঘিরে আমার বাহু অনুভব করবে না, তোমার তলায় আমার হৃদয়কেও পাবে না, তোমার চোখের ওপর আমার এই মুখ। কেননা একদিন আমাকে চলে যেতে হবে, অনেক দূরে। তাছাড়া, অন্যদেরও তো আমার সহচর্যের প্রয়োজন : সেই জন্যেই আমি এখানে রয়েছি, যদিও আমি সত্যিই তা চাই না...প্রিয় হৃদয়…”আর সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে অনুভব করতে পারি, ও চলে যাবার পর, ভয়ে বিহ্বল, ভয়ঙ্কর কালোগহ্বরে তলিয়ে যাওয়া : মৃত্যুর দিকে। আমি ওকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করালুম যে ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না। এবং ও প্রতিজ্ঞা করলো, কুড়িবার ; প্রেমিকের মতন প্রতিজ্ঞা করলো। ব্যাপারটা যেন ওকে বলা আমার এই কথার মতন অর্থহীন “আমি তোমায় বুঝতে পারছি”।

    “ওহ, আমি কখনও ওর সম্পর্কে ঈর্ষান্বিত হইনি। ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না, আমি সে বিষয়ে নিশ্চিত। কিই বা ও করবে ? কোনো লোককেই ও চেনে না ; ও কোনও কাজও করতে পারবে না। ও ঘুমে-হাঁটা মানুষের মতন বাঁচতে চায়। ওর দয়া আর বদান্যতা কি বাস্তব জগতে ওকে ঠাঁই দেবে ? এমন মুহূর্তও আসে যখন আমি ভুলে যাই যে কোনও জঘন্য নোংরামিতে আমি জড়িয়ে পড়েছি : ও আমাকে শক্তি যোগাবে, আমরা দেশান্তরে যাবো, মরুভূমিতে শিকার করতে যাবো, অচেনা শহরের পথের ধারে ঘুমোবো, পিছুটানহীন আর মজায়। কিংবা হয়তো কোনোদিন জেগে উঠলুম আর -- ওর ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা যাবতীয় আইনকানুন ও নীতি-নৈতিকতায় বদল ঘটিয়ে ফেলেছে, -- কিন্তু জগতসংসার ঠিক আগেকার মতনই রয়ে যাবে আর আমাকে রেখে যাবে আমার আকাঙ্খা আর আমার আনন্দ আর আমার উদ্বেগহীনতায়।

    ওহ! অভিযানের সেই বিস্ময়কর জগৎ যা আমরা বাচ্চাদের বইতে পেতুম -- তুমি কি সেই জগৎ আমাকে দেবে না ? আমি অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, আমি একখানা পুরস্কারের যোগ্যতা রাখি। ওর তা নেই। আমি সত্যিই জানি না ও ঠিক কী চায়। ও বলে যে ওর রয়েছে নানাবিধ আশা এবং পশ্চাত্তাপ : কিন্তু সেসব ব্যাপার নিয়ে আমার কিছুই করার নেই। ও কি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা কয় ? আমারও উচিত ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলা। আমি অতলের তলানিতে, আর আমি ভুলে গেছি কেমন করে প্রার্থনা করতে হয়।

    “মনে করো ও আমাকে নিজের দঃখকষ্ট ব্যাখ্যা করলো, আমি কি তা ওর ঠাট্টা-ইয়ার্কি এবং অপমানের চেয়ে ভালো করে বুঝতে পারবো ? ও আমাকে আক্রমণ করে, ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে লজ্জায় ফেলার জন্য সেইসব ব্যাপার যা আমার কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নিয়ে বকে যায়, আর তারপর আমি যখন কাঁদি তখন ক্ষেপে যায়।

    “-- তুমি কি ওই সৌম্যকাক্তি যুবকটিকে দেখতে পাচ্ছো সুন্দর, শান্তিপূর্ণ বাড়িটায় ঢুকছে? ওর নাম দুভাল, দুফো, আরমান্দ, মরিস, যা তুমি মনে করো। ওখানে এক মহিলা আছেন যিনি ওই অশুভ প্রাণীটাকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়েছেন : উনি মারা গেলেন। আমি নিশ্চিত উনি এখন স্বর্গবাসী একজন সন্ত। তুমি আমাকে সেইভাবেই খুন করবে যেভাবে ও ওই মহিলাকে খুন করেছে। যাদের রয়েছে পরার্থবাদী হৃদয় তাদের এটাই ভবিতব্য…”। হে প্রিয় ! এমনও দিনকাল ছিল যখন ওর মনে হতো উদ্যমী মানুষেরা ওর গ্রটেস্ক উন্মাদনার খেলনা : ও তারপর ভয়ানকভাবে হাসতেই থাকবে, হাসতেই থাকবে। ---তারপর ও কমবয়সী মায়ের মতন বা বয়স্কা বোনের মতন অভিনয় করায় ফিরে যাবে। ও যদি অমন বুনো জিনিস না হতো, তাহলে আমরা বেঁচে যেতুম। কিন্তু ওর মধুরস্বভাবও সাঙ্ঘাতিক। আমি একজন কেনা-গোলাম। -- ওহ, আমি আমার চিন্তাক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি !

    “কোনও দিন হয়তো ও অলৌকিকভাবে লোপাট হয়ে যাবে, কিন্তু আমাকে তা নিশ্চিত করে বলে যাওয়া দরকার, মানে আমি বলতে চাইছি ও যদি স্বর্গে বা অন্য কোথাও ফিরে যেতে চায়, যাতে আমি গিয়ে এক মুহূর্তের জন্যে দেখতে পারি অক্ষতযোনি মেরির ঢঙে আমার সোহাগের খোকাটার স্বর্গারোহন।

    একটা নারকীয় গৃহস্হালী বটে !

    দ্বিতীয় ডিলিরিয়াম : শব্দের অপরসায়ন

    এবার আমার পালা। আমার উন্মাদনাগুলোর এক কাহিনি।

    অনেককাল যাবত আমি এই ভেবে দম্ভোক্তি করতুম যে সমস্ত সম্ভাব্য ভূদৃশ্যের আমি গুরু এবং আমি মনে করতুম যে আধুনিক তৈলচিত্র আর কবিতার মহান ব্যক্তিদের কাজগুলো হাস্যকর।

    যা আমি পছন্দ করতুম তা হলো : কিম্ভুতকিমাকার তৈলচিত্র, চৌকাঠের মাথার ওপরের ছবি, মঞ্চের সজ্জা, কার্নিভালের পশ্চাতপট, সাইনবোর্ড, রঙচঙে ছাপা ; পুরোনোদিনের সাহিত্য, গির্জার লাতিন, ভুল বানানে ভরা যৌনপুস্তক, যে ধরণের উপন্যাস আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা পড়েন, পরিদের গল্প, বাচ্চাদের বই, পুরোনো অপেরা, ফালতু পুরোনো গান, দেশোয়ালি গানের ঠুনকো তাল।

    আমি ক্রুসেডের স্বপ্ন দেখতুম, এমন আবিষ্কারযাত্রায় বেরিয়েছি যা কেউ কখনও শোনেনি, ইতিহাসহীন গণরাজ্য, মুছে-ফেলা ধর্মযুদ্ধ, নৈতিকতায় বিপ্লব, মহাদেশ ও জনজাতির প্রসারণ : আমি সমস্ত রকমের ইন্দ্রজালে বিশ্বাস করতুম।

    আমি প্রতিটি স্বরবর্ণের রঙ আবিষ্কার করেছি ! --A কালো, E শাদা, I লাল,O নীল, U সবুজ।

    ---আমি আঙ্গিকের নিয়ম তেরি করেছি এবং প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের বিচলন, এবং আমি নিজের অন্তরজগত থেকে ছন্দ আবিষ্কারের দম্ভোক্তি করতুম, এমনই এক ধরণের কবিতা যাকে প্রতিটি ইন্দ্রিয়, এখন হোক বা পরে, স্বীকৃতি দেবে। এবং কেবল আমিই হবো তার অনুবাদক।

    এটা আমি অনুসন্ধান হিসাবে আরম্ভ করেছিলুম। আমি নৈঃশব্দ আর রাতকে শব্দে পরিবর্তিত করে দিয়েছিলুম। যা উচ্চারণ করা যায় না, আমি তা লিখে ফেলতুম। আমি ঘুরন্ত পৃথিবীকে এক জায়গায় স্হির করে দিয়েছিলুম।

    ----------------

    ঝাঁকের থেকে দূরে, পাখিদের আর গ্রামের খুকিদের,

    ওই পাতা-সবুজের ভেতরে আমি কী পান করেছিলুম

    কচি বাদামগাছে ঘেরা

    দুপুরের উষ্ণসবুজ কুয়াশায় ?

    এই নতুন ওয়াজ নদী থেকে আমি কী পান করতে পারি

    --জিভহীন গাছেরা, ফুলহীন ঘাসভূমি, অন্ধকার আকাশ !--

    এই হলুদ কুমড়োখোসা থেকে পান করব, সেই কুটির থেকে দূরে

    যা আমি ভালোবাসতুম ? একটু সোনালি চুমুক যার দরুন আমি ঘামছি।

    আমাকে দেখে কোনো সরাইখানার সন্দিগ্ধ প্রতিনিধি মনে হতে পারতো।

    -- পরে, সন্ধ্যার দিকে, আকাশ মেঘেয় ভরা…

    বনের ভেতর থেকে জলধারা ছুটে চলেছে বিশুদ্ধ বালিয়াড়িতে,

    আর পুকুরের ওপরে স্বর্গীয় বাতাসে বরফের পুরু সর ;

    তারপর আমি দেখতে পেলুম স্বর্ণ, আর ফোঁপালুম, কিন্তু পান করা হলো না।

    গ্রীষ্মকালে, সকাল চারটের সময়ে

    ভালোবাসার খোঁয়ারি তখনও থেকে গেছে…

    ঝোপঝাড় ছড়িয়ে দিচ্ছে সুগন্ধ

    রাতের পানভোজনোৎসবের

    উজ্জ্বল নদীকন্যাদের ওইদিকে

    সূর্যের পশ্চিমা কারখানার মধ্যে,

    ছুতোরেরা তাড়াহুড়ো করছে -- শার্টের হাত গুটিয়ে --

    এবার কাজ আরম্ভ হবে।

    কাজ শুরু হয়ে গেছে।

    আর ফাঁকা, শেওলা-ওপচানো পাথুরে জমিতে

    তারা তাদের দামি জিনকাপড় মেলে ধরছে

    যেখানে শহর

    এঁকে দেবে এক ফোঁপরা আকাশ

    ছবি আঁকা নিয়ে সেইসব মনোরম শখের চর্চাকারীদের জন্যে

    যারা ব্যাবিলনের কোনো রাজার জন্যে পরিশ্রম করছে,

    ভিনাস ! একটু সময়ের জন্য ছেড়ে চলে যাও

    প্রেম-করিয়েদের উজ্বল হৃদয়।

    হে মেষপালকদের রানি !

    শ্রমিকরা যেখানে জিরোচ্ছে

    আর দুপুরের সমুদ্রে স্নান করছে

    সেখানে নিয়ে যাও ফলের বিশুদ্ধতম মদ।

    --------------------------

    আমার শব্দের অপরসায়নে পুরোনো দিনের কবিতার ক্ষয়ে-যাওয়া ধারণাগুলো গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

    আমি প্রাথমিক সন্মোহনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলুম : কারখানা দেখার বদলে আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম মসজিদ, দেবদূতদের ড্রামবাদকদল, আকাশের রাজপথে ঘোড়ার গাড়ি, ঝিলের জলের তলায় বৈঠকখানা ; দানবদের, আর রহস্যগুলো ; এক প্রমোদানুষ্ঠানের নামপত্র আমাকে শ্রদ্ধায় ভীত করেছিল।

    আর তাই আমি শব্দগুলোকে দৃষ্টিপ্রতিভায় বদলে দিয়ে আমার ঐন্দ্রজালিক কুতর্কগুলোকে ব্যাখ্যা করলুম !

    শেষ পর্যন্ত আমার মগজের বিশৃঙ্খলাকে আমি পবিত্র বলে মনে করতে লাগলুম। গা এলিয়ে শুয়ে থাকতুম, জ্বরে গিলে খেয়ে ফেলছে শরীর : আমি জানোয়ারদের শান্তিময়তাকে হিংসে করতে লাগলুম -- গুটিপোকা, যারা দ্বিতীয় শৈশবের পাপহীনতাকে সুস্পষ্ট করে তোলে, গন্ধমুষিক, অক্ষতযোনি মেয়েদের তন্দ্রাভাব !

    আমার মন বিষিয়ে উঠলো। আমি জগতসংসারকে গাথাসঙ্গীতের মতন কবিতায় বিদায় জানালুম :

    সবচেয়ে উঁচু মিনার থেকে গাওয়া একটি গান

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

    আমি বহুকাল অপেক্ষা করেছি

    যা আমি ভুলে যেতে পারি ;

    আর স্বর্গে রেখে দিতে পারি

    আমার ভয় ও পশ্চাত্তাপ।

    এক অসুস্হ তৃষ্ণা

    আমার শিরাগুলোকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে।

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

    তাই সবুজ মাঠ,

    অনেক ছড়িয়ে পড়েছে, ফুলে ছেয়ে গেছে,

    সুগন্ধ আর বুনোঝোপে

    আর নোংরা পোকাদের

    নিষ্ঠুর আওয়াজে।

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

    আমি মরুভূমিকে ভালোবাসতুম, পোড়া ফলবাগানকে, ক্লান্ত পুরোনো দোকান, গরম পানীয়। আমি নিজেকে দুর্গন্ধ গলির ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে গেলুম, আর দুই চোখ বন্ধ করে আমি সূর্যের কাছে, যিনি আগুনের দেবতা, নিজেকে উৎসর্গ করলুম।

    “সেনাধিপতি, যদি তোমার বিদ্ধস্ত পাটাতনের ওপরে একটা কামানও টিকে থাকে, আমাদের ওপরে শুকনো মাটি দিয়ে গড়া গোলা চালাও। দামি দোকানগুলোর আয়নাগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দাও ! এবং বৈঠকঘরগুলো ! শহরের মুখে তারই ধ্বংসধুলো ঢুকিয়ে দাও। মরচে পড়ে যেতে দাও ছাদের সিংহমুখো নালিগোলোয়। পদ্মরাগমণির আগুনগুঁড়ো দিয়ে বন্ধ করে দাও মহিলাদের গোঁসাঘরগুলো….”

    ওহ ! গ্রামের সরাইখানার পেচ্ছাপঘরের ছোট্ট মাছিটা, পচা আগাছার প্রেমে মশগুল, আলোর একটা রশ্মিতে ঝিমিয়ে পড়ে !

    ক্ষুধা

    আমি আমার হাড়ের ভেতরে কেবল খুঁজে পাই

    পৃথিবীর মাটি আর পাথর খাবার স্বাদ।

    যখন আমি খাই, আমি বাতাস খেয়ে টিকে থাকি,

    নুড়ি আর কয়লা আর আকরিক লোহা।

    পরিবর্তে, আমার ক্ষুধা। ক্ষুধা, খাওয়াও

    খেতভরা ভূষি।

    যতো পারো যোগাড় করো সেই উজ্বল

    বিষের আগাছা।

    একজন ভিখারির হাত দিয়ে ভাঙা পাথর খাও,

    পুরোনো গির্জার দেয়ালের পাথর ;

    নুড়িশিলা, বানভাসির শিশুরা,

    কাদায় পড়ে থাকা রুটি।

    ----------------------------------

    ঝোপের পেছনে ডেকে উঠবে এক নেকড়ে

    মোরগের মাংসখাবার উৎসবে

    ঝলমলে পালকগুলো ছিঁড়ে :

    ওরই মতন, আমি নিজেকে গিলে ফেলি।

    জড়ো করার জন্যে অপেক্ষা করে

    ফল আর ঘাস তাদের সময় কাটায় ;

    বেড়ায় যে মাকড়সা জাল বোনে

    শুধু ফুল খায়।

    আমাকে ঘুমোতে দাও ! আমাকে সেদ্ধ হতে দাও

    সলোমনের পূজাবেদির ওপরে ;

    আমাকে শুষে নিতে দাও ছাতাপড়া মাটি,

    আর বয়ে যেতে দাও কেন্দ্রনে।

    সব শেষে, হে যৌক্তিকতা, হে মহানন্দ, আমি আকাশ থেকে তার নীল সরিয়ে ফেলেছি যা আসলে অন্ধকার, আর আলোর প্রকৃতির সোনালি স্ফূলিঙ্গে বসবাস করেছি। আমার আনন্দের আতিশয্যে, আমি আমার মুখকে যতোটা পারি মজাদার আর আদিম করে তুলতে চেয়েছি:

    ওটা খুঁজে পাওয়া গেছে।

    কী ? -- অনন্তকাল।

    ঘুরন্ত আলোয়

    সমুদ্রের সূর্যে।

    হে আমার চিরকালীন আত্মা,

    আকাঙ্খা আঁকড়ে ধরে থাকো

    রাত হওয়া সত্ত্বেও

    এবং আগুনের দিন।

    তোমাকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে

    মানবের কঠোর সংগ্রাম থেকে

    আর জগতসংসারের সকলরব প্রশংসা থেকে

    তোমাকে উড়ে যেতে হবে যতোটা তুমি পারো….

    --চিরকালের আশা নেই

    নেই উথ্থানের অবকাশ।

    বিজ্ঞান আর ধৈর্য,

    যাতনা অবশ্যম্ভাবী।

    তোমার অন্তরের আগুন,

    মোলায়েম রেশম-অঙ্গার,

    আমাদের সমস্ত কর্তব্য

    কিন্তু কেউই তা মনে রাখে না।

    তা খুঁজে পাওয়া গেছে।

    কী ? অনন্তকাল।

    ঘুরন্ত আলোয়

    সমুদ্রের সূর্যে।

    -------------------

    আমি হয়ে উঠলুম নীতিকাহিনির অপেরা : আমি দেখলুম জগতসংসারে সকলেই আনন্দে দণ্ডপ্রাপ্ত। কর্মশক্তি প্রয়োগই জীবন নয় : তা কেবল ক্ষমতাকে বরবাদ করার একটা উপায়, স্নায়ুকে ধ্বংস করার নিমিত্তমাত্র। নৈতিকতা হলো মস্তিষ্কে ভরা জল।

    আমার মনে হয়েছে যে প্রত্যেকেরই আরও বেশ কয়েকটা জীবন থাকা উচিত ছিল। ওই লোকটা জানে না ও কি করছে : ও একজন দেবদূত। ওই পরিবারটা কুকুর-বাচ্চাদের গাদাঘর। কয়েকজনের ক্ষেত্রে, আমি অনেকসময়ে তাদের কোনো এক অপরজীবন থেকে চেঁচিয়ে কথা বলেছি। -- ওই সূত্রেই আমি একটা শুয়োরকে পছন্দ করেছিলুম।

    উন্মাদনার একটিও মেধাবী যুক্তিতর্ক নয়, -- যে উন্মাদনাকে তালাচাবি দিয়ে আটক করা হয়, -- আমি কি ভুলে গেছি : আমি আবার তার কোটর দিয়ে যেতে পারি, পুরো প্রণালীটা আমার হৃদয়ে খোদাই করা আছে।

    তা আমার স্বাস্হ্যে প্রভাব ফেলেছিল। সামনেই যেন সন্ত্রাস। আমি বারবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তুম, যা এক লপ্তে অনেকদিন স্হায়ী হতো, আর যখন আমি জেগে উঠতুম, আমার দুঃখি স্বপ্নগুলো বজায় থাকতো। মারাত্মক ফসল তোলার জন্যে আমি ছিলুম তৈরি, আর আমার দুর্বলতা আমাকে জগতসংসারের বিপজ্জনক রাস্তার কিনার পর্যন্ত নিয়ে যেতো, সিমেরিয়ার সমুদ্রতীর পর্যন্ত, ঘুর্নিঝড় আর অন্ধকারের স্বর্গে।

    আমাকে ভ্রমণ করতে হতো, যাতে মগজে জড়ো হওয়া জাদুগুলো উবে যেতে পারে। সমুদ্রের ওপরে, যা আমি এমন ভালোবাসতুম যে তা যেন আমার অশুদ্ধতা ধুয়ে দেবে, আমি দেখলুম দয়াময় ক্রুশকাঠ ওপরে উঠে এলো। আমি ছিলুম রামধনু দ্বারা শাপিত। প্রকাশসৌষ্ঠব ছিল আমার শাস্তি, আমার কুরে-খাওয়া মনস্তাপ, আমার কীট : তারপর আমার জীবন শক্তিমত্তা এবং সৌন্দর্যের তুলনায় অনেকটাই বড়ো হয়ে উঠবে।

    আনন্দধারা ! তার মারাত্মক মিষ্টতার হুল আমাকে কাকডাকা ভোরে জাগিয়ে তুলবে, --রাত বারোটায়, যিশুর পুনরুথ্থানের মুহূর্তে, -- বিষণ্ণতম শহরে :

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

    কোথায় আছে সেই নিখুঁত আত্মা ?

    আমি শিখলুম ইন্দ্রজাল

    আনন্দধারা, আমাদের সবাইকে সন্মোহিত করে।

    আনন্দধারা তোমাকে, জীবনের জয়গান করো

    যখনই ফরাসিদেশের কাক ডেকে উঠবে।

    এখন সমস্ত আকাঙ্খা বিদায় নিয়েছে :

    আমার জীবনকে তা নিজের করে নিয়েছে।

    সেই সন্মোহন প্রভাবিত করেছে আমার হৃদয় ও আত্মা

    আর প্রতিটি যোগ্যতাবিচারকে লণ্ডভণ্ড করেছে।

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

    আর, ওহ ! যেদিন তা মিলিয়ে যাবে

    সেইদিনই হবে আমার মৃত্যুর দিন।

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

    ----------------------

    তা সবই শেষ হয়ে গেছে। আজকে, আমি জানি সৌন্দর্যকে কেমন করে উদযাপন করতে হয়।

    সেই অসাধ্যসাধন

    আহ ! বালক হিসাবে আমার জীবন, প্রতিটি আবহাওয়ায় খোলা রাস্তার মতন ; আমি ছিলুম অস্বাভাবিকভাবে মিতাচারী, সবচেয়ে ভালো ভিখারির চেয়েও উদাসীন, কোনো দেশ না থাকার চেতনায় গর্বিত, বন্ধুহীন, তা যে কি বোকামি ছিল। -- আর আমি এখন তা উপলব্ধি করছি!

    -- বুড়ো লোকগুলো যারা আদর করার সুযোগ ছাড়ে না তাদের অবিশ্বাস করার ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম, আমাদের নারীদের স্বাস্হের গায়ে আর নির্মলতায় পরগাছা, যখন কিনা আজকে নারীরা আমাদের থেকে আলাদা এক জাতি।

    যা কিছু আমি অবিশ্বাস করতুম সে ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম : কেননা আমি পালিয়ে যাচ্ছি!

    আমি পালিয়ে যাচ্ছি !

    বলছি বিশদে।

    এমনকি কালকেও, আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছি : “ঈশ্বর ! এখানে এই তলানিতে আমাদের মতন প্রচুর অভিশপ্ত রয়েছে ! তাদের সারিতে আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট দুর্দশায় ভুগেছি ! আমি ওদের সবাইকে চিনি। আমরা পরস্পরকে চিনতে পারি ; আমরা পরস্পরকে বিরক্ত করি। আমাদের কেউই পরার্থবাদীতার কথা শোনেনি। তবুও, আমরা মার্জিত ; জগতসংসারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ নিয়মানুগ। ” তা কি অপ্রত্যাশিত ? এই জগতসংসার ! ব্যবসাদারের দল, আর মূর্খেরা ! -- এখানে থাকায় কোনো অসন্মান নেই। -- কিন্তু নির্বাচিত লোকজন, তারা আমাদের কীভাবে আপ্যায়ন করবে ? কেননা তেমন লোকজনও তো আছে, খুশমেজাজ লোকজন, নকলভাবে নির্বাচিত, কেননা তাদের সান্নিধ্যে যাবার জন্যে আমাদের সাহসী ও বিনয়ী হতে হবে। ওরাই প্রকৃত নির্বাচিত। মোটেই কপটাচারী সন্ত নয়, ওরা !

    যেহেতু দুই পয়সা দামের যুক্তিপূর্ণতা ফিরে পেয়েছি -- কেমন তাড়াতাড়ি তা চলে যায়! -- আমি দেখতে পাই যে আমার ঝঞ্ঝাটের উৎস হলো আগেই টের না পাওয়া যে এটা পাশ্চাত্য জগৎ। এগুলো পাশ্চাত্য জলাভূমি ! এমন নয় যে আলো ফিকে হয়ে গেছে, আঙ্গিক ক্ষয়াটে, কিংবা অগ্রগমন বিপথে চালিত...। ঠিক আছে ! প্রাচ্যের পতনের পর থেকে আমার মনের মধ্যে যে রদবদল ঘটেছে আমার মন এখন নিশ্চিতভাবে সেই সব নিষ্ঠুর ঘটনার মোকাবিলা করতে চায়...। আমার মনের সেটাই চাহিদা !

    ...আর সেখানেই আমার দুই পয়সা দামের যুক্তিবোধের সমাপ্তি ! নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মন, তা দাবি করছে যে আমি পাশ্চাত্যজগতেই থাকি। যেমনটা আমি চিরকাল চেয়েছি, আমি যদি এটা শেষ করে ফেলতে চাই তাহলে একে চুপ করিয়ে দিতে হবে।

    আমি আগে বলতুম, চুলোয় যাক শহিদদের করতল, শিল্পের যাবতীয় আলোকসঙ্কেত, আবিষ্কারকের গর্ববোধ, লুন্ঠনকারীর উত্তেজনা ; প্রাচ্যদেশে এবং মৌলিক, শাশ্বত জ্ঞানে আমার ফিরে যাবার কথা। কিন্তু এসবই নিঃসন্দেহে কলুষিত আলস্যের স্বপ্ন !

    আর তবুও আধুনিক যন্ত্রণাবোধ থেকে পালাবার ইচ্ছে আমার ছিল না। কোরানের মিশ্রিত পাণ্ডিত্য সম্পর্কে আমার গভীর কৌতূহল নেই। -- কিন্তু এই জ্ঞানে কি প্রকৃত পীড়ন নেই যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রদোষ থেকে, খ্রিস্টধর্ম, মানুষ নিজেকে মূর্খ প্রতিপন্ন করে চলেছে, যা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান তাকে প্রমাণ করতে চাইছে, বারবার প্রমাণ দেখিয়ে গর্বে বুক ফোলাচ্ছে, আর কেবল তা নিয়েই বেঁচে আছে ! এটা একরকমের সূক্ষ্ম, বোকা পীড়ন ; আর এটাই আমার আত্মিক অসংলগ্নতার উৎস। প্রকৃতি হয়তো এই সমস্ত ব্যাপার নিয়ে বিরক্ত ! যিশুর সঙ্গেই জন্মেছিলেন প্রুধোম।

    তা কি এই জন্যে নয় যে আমরা কুহেলিকার চর্চা করি ! জোলো শাকসবজির সঙ্গে জ্বরকে গিলে ফেলি। এবং মাতলামি ! আর তামাক। আর অজ্ঞানতা ! আর অন্ধ ধর্মবিশ্বাস ! -- এই সমস্তকিছুই কি প্রাচ্যের জ্ঞান, আমাদের আসল পিতৃভূমি, তার দর্শন থেকে দূরে নয় ? আধুনিক জগতসংসার নিয়ে কিই বা করার আছে, যদি অমন বিষ আবিষ্কার হয় !

    যাজকরা আর ধর্মোপদেশকরা বলবেন : নিশ্চয়ই। কিন্তু তুমি তো আদম আর ইভের নন্দনকাননের প্রসঙ্গ তুলছো। প্রাচ্য জাতিদের অতীত ইতিহাসে তোমার জন্য কিচ্ছু নেই...। সে কথা সত্যি। আমি নন্দনকাননের কথাই বলতে চাইছি ! প্রাচীন জাতিদের বিশুদ্ধতা কেমন করেই বা আমার স্বপ্নকে প্রভাবিত করবে ?

    দার্শনিকরা বলবেন : জগতসংসারের কোনো বয়স নেই। মানবতা স্হান থেকে স্হানান্তরে যায়, ব্যাস। তুমি একজন পাশ্চাত্য মানুষ, কিন্তু তুমি তোমার নিজস্ব প্রাচ্যে বসবাসের জন্য স্বাধীন, যতো পুরোনো তুমি চাও ততোই, -- আর সেখানে তুমি যেমন ইচ্ছে থাকতে চাও। হেরো হয়ে যেও না। দার্শনিকগণ, আপনারা পাশ্চাত্য জগতের পাকাপাকি অংশ !

    মন, সাবধান হও। উত্তরণের পেছনে পাগলের মতন ছুটো না। নিজেকে শিক্ষিত করো! --আহ!

    বিজ্ঞান আমাদের থেকে কখনও এগিয়ে থাকে না !

    --কিন্তু আমি দেখি আমার মন ঘুমিয়ে পড়েছে।

    এই মুহূর্ত থেকে যদি তা পূর্ণসতর্ক থাকে, আমরা দ্রুত সত্যকে পাবো, যা হয়তো এখনই ফোঁপাতে থাকা দেবদূতদের দিয়ে আমাদের ঘিরে রেখেছে !....-- যদি তা এই মুহূর্ত পর্যন্ত পূর্ণসতর্ক ছিল, তাহলে, অনেককাল আগেই, আমি তা নীচ প্রবৃত্তির কাছে সোপর্দ করতুম না !...--যদি তা চিরটাকাল পূর্ণসতর্ক থাকতো, আমি প্রজ্ঞায় ভাসতুম!...

    হে বিশুদ্ধতা ! বিশুদ্ধতা !

    এই জাগরণের মুহুর্তে, আমার ঘটে গেল বিশুদ্ধতার দৃষ্টিপ্রতিভা ! মনের মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোই !

    কী যে এক ঠুঁটো দুর্ভাগ্য !

    সৌদামিনী

    ----------------

    মানুষের শ্রম ! সেই বিস্ফোরণ আমার অতলকে সময়ে-সময়ে আলোকিত করে।

    “জ্ঞান আহরনের পথে : কোনো ব্যাপারই আত্মশ্লাঘা নয়!” চেঁচিয়ে বলে ওঠেন আধুনিক ধর্মপ্রচারকদল, যার অর্থ সব্বাই। আর তবুও বজ্জাত ও অলসদের চাপ গিয়ে পড়ে বাদবাকিদের হৃদয়ের ওপরে….। আহ ! তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি ওইখানে চলুন ; রাতের ওই পারে...ভবিষ্যতের সেই পুরস্কার, সেই শাশ্বত পুরস্কার...আমরা কি তা থেকে নিষ্কৃতি পাবো?

    ---এর থেকে বেশি আমি কিই বা করতে পারি ? শ্রমের কথা জানি ; এবং বিজ্ঞান বড়োই মন্হর। প্রার্থনা দ্রুতগামী আর আলোকমালার গর্জন...আমি তা ভালো করে জানি। ব্যাপারটা খুবই সহজ, আর আবহাওয়া বেশ তপ্ত ; আমাকে ছাড়াই তোমাদের চলে যাবে। আমার রয়েছে কর্তব্য ; একে একপাশে সরিয়ে রাখতে, আমি গর্ববোধ করবো. যেমন অন্যেরা করেছে।

    আমার জীবন নিঃশেষিত । ঠিকই, চলো ভান করা যাক, আমরা কোনো কাজই করবো না ! ওহ ! দুঃখদায়ক ! আর আমরা বেঁচে থাকবো, আর নিজেদের মনোরঞ্জন করবো, দানবিক প্রেম আর খেয়ালি জগতের স্বপ্ন দেখবো, পৃথিবীর আদল-আদরা নিয়ে অভিযোগ আর ঝগড়া করবো, দড়াবাজিকর, ভিখারি, শিল্পী, ডাকাত, -- যাজক ! আমার হাসপাতালের বিছানায়, ধুপকাঠির সুগন্ধ তীব্রভাবে আমার কাছে ফিরে এলো ; পবিত্র সৌরভের অভিভাবক, আত্মস্বীকৃতিকারী, শহিদ...।

    শৈশবের মলিন শিক্ষা সেখানে আমি চিনতে পারি। তারপর কী !...কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছোও: আমি কুড়িবছর পালন করবো, অন্য সকলে যদি তা করে...।

    না ! না ! এখন আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াচ্ছি ! আমার গর্ববোধের তুলনায় শ্রমকে মামুলি মনে হয় : জগতসংসারের কাছে আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়াটা আমার শাস্তির পক্ষে যৎসামান্য হবে। শেষ মুহূর্তে আমি আক্রমণ করব, একবার ডানদিকে, আরেকবার বাঁদিকে....।

    ---ওহ ! -- বেচারা প্রিয় আত্মা, তাহলে অমরত্ব হয়তো হাতছাড়া হবে না !

    সকাল

    আমার কি একসময় তেমন যৌবন ছিল না যা মনোরম, বীরোচিত, কিংবদন্তিপ্রতিম, যা সোনার কাগজে লিখে ফেলা যায় ? -- আমি ছিলুম খুবই ভাগ্যবান ! কোন সে অপরাধ, কোন ভুলের কারণে আমার ওপর বর্তেছে বর্তমান দুর্বলতা ? তোমরা যারা মনে করো যে জানোয়াররাও দুঃখে ফোঁপায়, অসুস্হরা বিষাদগ্রস্ত হয়, মৃতেরা খারাপ স্বপ্ন দ্যাখে, এবার আমার পতনের সঙ্গে আমার ঘুমের সম্পর্ক খোঁজো। যে ভিখারিটা পাখির মতন এবং প্রভুর বন্দনাগান গায়, আমি নিজেকে তার চেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি না। কীভাবে কথা কইতে হয় তা আমি আর জানি না !

    অথচ তবু, আজকে, আমার মনে হয় এই নরকের হিসাব আমি শেষ করে ফেলেছি। আর তা নরকই ছিল : সেই পুরোনোটা, যার সিংহদরোজা খুলে দিয়েছিল মানবপুত্র।

    সেই একই মরুভূমি থেকে, সেই একই আকাশপানে, আমার ক্লান্ত চোখ রূপালি নক্ষত্রের দিকে সবসময় চেয়ে থাকে, সব সময়ের জন্যে ; কিন্তু সেই তিন জ্ঞানী মানুষ একেবারও নিজেদের জায়গা থেকে নড়াচড়া করেন না, জীবনের মহারাজারা, হৃদয়, আত্মা, মন। আমরা যখন যাবো, পাহাড়ের ওপর আর সমুদ্রের তীরে, নতুন শ্রমের, নতুন জ্ঞানের জন্মের গুণগান করার জন্যে, অত্যাচারী এবং দানবরা পালাবে, কুসংস্কারের সমাপ্তি ঘটবে, -- আমরাই হবো প্রথম ভক্ত ! -- পৃথিবীর মাটিতে খ্রিস্টের জন্মোৎসব !

    স্বর্গসমূহের গান, রাষ্ট্রদের অগ্রগমন ! আমরা কেনা-গোলাম, জীবনকে অভিশাপ দেয়া আমাদের উচিত নয় !

    বিদায়

    হেমন্ত এসে গেছে ! -- আমরা যদি দৈব উজ্বলতা অনুসন্ধানের জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাহলে চিরকালীন সূর্যের জন্যে কেনই বা দুঃখপ্রকাশ করা, -- ঋতুবদলের সঙ্গে যাদের মৃত্যু হয় তাদের থেকে বহু দূরে।

    হেমন্ত। আমাদের নৌকা, ঝুলন্ত কুয়াশা থেকে উঠে এসেছে, বাঁক নেয় দারিদ্রের বন্দরের দিকে, দানবিক শহর, তার আকাশ আগুন আর কাদায় নোংরা। আহ ! সেইসব কটুগন্ধ কাঁথা, বৃষ্টিতে ভেজা রুটি, মাতলামি, আর হাজার প্রেম যা আমাকে ক্রুশকাঠে বিঁধেছে ! লক্ষকোটি মৃত আত্মা আর দেহের পিশাচিনী রানির দিন কি কখনও ফুরোবে না, আর কবেই বা তাদের সবায়ের বিচার হবে ! আমি নিজেকে আবার দেখতে পাই, নোংরায় আর রোগে আমার গায়ের চামড়া ক্ষয়ে গিয়েছে, মাথার চুলে আর বগলে পোকারা কিলবিল করছে, আর তাদের চেয়েও বড়ো-বড়ো পোকা চরে বেড়াচ্ছে আমার হৃদয়ে, আয়ূহীন, হৃদয়হীন, অচেনা আকারে ছেয়ে ফেলেছে...। আমি সেখানে অনায়াসে মরে যেতে পারতুম...। কি ভয়ানক স্মৃতি ! দারিদ্র্যকে আমি খুবই ঘেন্না করি।

    আর শীতকালকে আমি ভীষণ ভয় পাই কেননা তা বড়োই আরামদায়ক !

    ---অনেকসময়ে আমি আকাশে দেখতে পাই বালিছড়ানো সীমাহীন তীর শাদা উদ্দীপনাময় রাষ্ট্রে ছেয়ে গেছে। একটা সোনালি জাহাজ, আমার ওপরদিকে, সকালের হাওয়ায় নানা রঙের নিশান ওড়াচ্ছে। প্রতিটি ভোজনোৎসব, প্রতিটি বিজয়, প্রতিটি দৃশ্যকাব্যের আমি ছিলুম স্রষ্টা। নতুন ফুল, নতুন গাছপালা, নতুন মাংস, নতুন ভাষা আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলুম আমি। আমি ভেবেছিলুম আমি অর্জন করেছি অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা।

    হাঃ ! আমাকে আমার কল্পনা আর আমার স্মৃতিকে গোর দিতে হবে ! শিল্পী আর গল্পকার হিসাবে জমকালো কর্মজীবনের কেমনতর সমাপ্তি!

    আমি ! নিজেকে ম্যাজিশিয়ান, দেবদূত, নৈতিকতার বাঁধন থেকে মুক্ত বলে মনে করেছিলুম।

    আমাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে যাতে চাষের জমির প্রতি কৃতজ্ঞতা শোধ করতে পারি, বাহুতে মুড়ে নিতে পারি গ্রন্হিল বাস্তবতা ! একজন চাষি !

    আমি কি প্রতারিত ? পরার্থবাদিতা কি হয়ে উঠবে মৃত্যুর বোন, আমার জন্যে ?

    ঠিক আছে, মিথ্যা আশ্রয় করে বেঁচে থাকার জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নেবো। আর তাইই শেষ।

    কিন্তু বন্ধুত্বের একটাও হাত নেই ! আর কোথায়ই বা আমি সাহায্য খুঁজবো ?

    ¯¯¯¯¯¯¯¯

    সত্যি, নতুন যুগ রূঢ় ছাড়া আর কিছুই নয়।

    কেননা আমি বলতে পারি যে আমি একটা বিজয় পেয়েছি ; দাঁতের ওপর দাঁত চেপে, নরকের আগুনের ফোঁসফোঁসানি, দুর্গন্ধিত দীর্ঘশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে। আমার রাক্ষুসে স্মৃতি মিলিয়ে যাচ্ছে।

    বিদায় নিচ্ছে আমার শেষ আকাঙ্খাগুলো, -- ভিখারিদের, ডাকাতদের, মৃত্যুর বন্ধুদের, যে জগত পাশ দিয়ে চলে গেছে, তার সম্পর্কে ঈর্ষা। --- অভিশপ্ত আত্মারা, যদি আমি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পারতুম !

    চরম আধুনিক হওয়া দরকার।

    ধন্যবাদোৎসবের স্তবগানকে গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই : একবার যে ধাপে পা রেখেছো তা ধরে রাখো। এক দুঃসহ রাত ! আমার মুখের ওপরে শুকনো রক্তের ধোঁয়া, আর আমার পেছনদিকে ওই ছোট্ট বীভৎস গাছ ছাড়া আর কিছু নেই !...মানুষের সংগ্রামের মতনই আত্মার জন্য সংগ্রামও পাশবিক ; কিন্তু বিচারের আনন্দদর্শন কেবল ঈশ্বরের একার।

    তবু এটাই রাত্রিকালের জাগ্রদবস্হা। চলো আমরা নতুন শক্তিক্ষমতাকে, আর প্রকৃত প্রেমপরায়ণতাকে মেনে নিই। এবং সকালে, দীপ্তমান ধৈর্যকে বর্ম করে, আমরা মহিমান্বয়ের শহরগুলোয় প্রবেশ করবো।

    আমি কেন বন্ধুত্বের হাতের কথা বলেছিলুম ! আমার সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হলো যে মিথ্যায় ভরা পুরোনো ভালোবাসা আমি হেসে উড়িয়ে দিতে পারি, আর অমন প্রতারণাভরা যুগলকে কলঙ্কে দেগে দিতে পারি, -- সেখানে আমি নারীদের নরকের অভিজ্ঞতাও পেয়েছি ; -- আর এবার আমি একই দেহ ও একই আত্মায় সত্যকে ধারণ করতে সক্ষম হবো।

    [ রচনাকাল : এপ্রিল-আগস্ট, ১৮৭৩ ]

    [ অনুবাদ : ২০১৯ ]

  • জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : ইল্যুমিনেশন্স | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৩৩732393
  • জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : ইল্যুমিনেশানস

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    বানভাসির পর

    ইল্যুমিনেশান ১

    বানভাসির ধারনা শেষ হবার পরই, একটা খোরগোশ গোরুর গোয়ালে আর দুলতেথাকা ফুলগাছের কাছে থমকে দাঁড়িয়ে, মাকড়সার জালের ভেতর দিয়ে রামধনুকে প্রার্থনা শোনালো।

    ওহ ! যে দামি পাথরগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, -- ফুলগুলো নিজেদের চারিধারে তাকিয়ে দেখছিল। নোংরা রাজপথে দোকান বসেছিল, তারা নৌকোগুলোকে টেনে নিয়ে গেল পরতে-পরতে ফুলে ওঠা সমুদ্রের ঢেউয়ে ঠিক যেমন পুরোনো ছবিগুলোতে দেখা যায়।

    যে নীলদাড়ি লোকটা নিজের বউগুলোকে একের পর এক মেরে ফেলতো, তার বাড়িতে রক্ত বইতে লাগল --- সারকাসের কসাইখানায় ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা শাদা করে তুলছিল জানালাগুলোকে। রক্ত আর দুধ বইছিল।

    ভোঁদোড়েরা গড়েছিল। শুঁড়িখানায় কফির পেয়ালায় উঠছিল ধোঁয়া।

    চারাগাছের বিশাল কাচঘরে জলফোঁটা ঝরছিল তখনও, সুন্দর ছবিগুলোর দিকে চেয়েছিল শোকাতুর শিশুরা।

    দরোজার পাল্লার আওয়াজ, আর, গ্রামের সবুজে, এক খোকা দুই হাত নাড়ালো, বেগবান ঝর্ণার তলায়, সব জায়গাকার ঘণ্টাঘরের হাওয়ামোরগ আর আবহাওয়া নির্দেশকগুলো তা টের পাচ্ছিল।

    ম্যাডাম অমুক আল্পস পাহাড়ে একটা পিয়ানো বসালেন। গির্জার একশো হাজার বেদির ওপরে উদযাপন করা হচ্ছিল খ্রিস্টের নৈশভোজনোৎসব-পর্ব আর প্রথম ধর্মসংস্কার।

    চলে গেল মরুযাত্রীদল। আর বরফ ও মেরুরাত্রির বিশৃঙ্খলায় তৈরি করা হলো দীপ্তিশীল হোটেল।

    তারপর থেকে, সুগন্ধগুল্মের মরুভূমিতে শেয়ালের ডাক শুনতে পেল চাঁদ -- আর ফলবাগানে কাঠের জুতো পরে চারণকবিতাদের অসন্তুষ্ট বিড়বিড়ানি। তারপর, থইথই বেগনি জঙ্গলে, বনানীর উপদেবী আমাকে বললো যে এটা বসন্তঋতু।

    ঝিলপুকুর, ফুলে ওঠো : ফেনায়িত হও, সাঁকোর ওপর আর গাছের তলা দিয়ে গড়িয়ে চলে যাও: -- কালো ঝালর আর অবয়ব -- বজ্র ও বিদ্যুৎ উঠে দাঁড়াও আর ঝাঁপাও : -- জল এবং দুঃখ ওঠো আর আরেকবার বানভাসিকে তুলে আনো।

    জল নেমে গিয়েছিল বলে -- ওহ, দামি পাথরগুলো নিজেরা চাপা পড়ে গিয়েছিল আর ফুটে ওঠা ফুলের দল ! -- তা বড়োই ক্লান্তিকর ! আর সেই ডাকিনী রানি, যিনি পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরি পাত্রে আগুন জ্বালান, কখনও বলবেন না তিনি যা জানেন, আর আমরা কোন ব্যাপারে অবিদিত।

    শৈশব

    ইল্যুমিনেশান ২

    পূর্বপুরুষহীন কিংবা দরবারহীন প্রতিমা, কালোচোখ আর হলুদ-চুল, কিংবদন্তির চেয়েও সম্ভ্রান্ত, মেক্সিকোর কিংবা ফ্লানডার্সের : তার দেশ দুর্বিনীত সোনালি আর সবুজ, ঢেউয়ের নামে আঁকা সমুদ্রতীরকে পাক দেয়, জলপোতহীন, যাদের নাম ভয়ানকভাবে গ্রিক, স্লাভ, কেল্টভাষী।

    জঙ্গলের শেষে -- স্বপ্নেদেখা রুনুঝুনু ফুল : ফুটে ওঠে, ছড়িয়ে পড়ে -- কমলারঙা ঠোঁটের মেয়েটি, পশুচারণভূমি থেকে ছলকানো বানভাসির পরিষ্কার জলে হাঁটুমুড়ে, নগ্নতা ছায়ায় ঢাকা, তির্যক রামধনুর পোশাক পরানো ; ফুলের দল এবং সমুদ্র।

    সমুদ্রের ধারে ছাদের ওপরে যে নারীরা পায়চারি করেন : অনেকে খুকি আর বিশালদেহ, তামাটে শ্যাওলায় অসাধারণ কৃষ্ণাঙ্গী, তরুবীথিকার উর্বর মাটিতে সাজানো মণিরত্ন এবং ছোটোখাটো গলাতুষার বাগান -- তরুণী মায়েরা আর বড়োদিদিরা যাদের মুখময় তীর্থযাত্রার প্রলেপ, প্রজাপীড়ক সাজপোশাকে নবাবজাদীরা, রাজকন্যারা, ছোটোছোটো বিদেশী মেয়েরা আর সুশীল অসুখী জনসাধারণ।

    বড়োই একঘে্য়ে, ‘প্রিয়তম শরীর’ এবং ‘মহার্ঘ হৃদয়’ !

    এ তো সে, গোলাপঝাড়ের পেছনে, মৃত খুকিটা। -- কম বয়সী মা, মারা গেছে, সিঁড়ি দিয়ে নামে। -- খুড়তুতো ভাইয়ের গাড়ি বালির ওপরে খোনাস্বর আওয়াজ তোলে। -- ছোট্ট ভাই ( সে ভারতবর্ষে থাকে ! ) সেখানে, সূর্যাস্তের সামনে, কারনেশান ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে। দেয়ালের ফুলে ছেয়ে থাকা বাঁধের ওপরে বুড়োদের সোজা করে কবর দেয়া হয়েছে।

    সেনাপতির বাড়ির চারিপাশ ঘিরে আছে সোনালি পাতার ঝাড়। ওরা সবাই দক্ষিণে। -- তুমি লালরঙা পথ ধরে ফাঁকা সরাইখানায় পৌঁছে যাও। জমিদারের গ্রামের বাড়ি বিক্রি হবে : খড়খড়িগুলো ঢিলেঢালা। -- পাদরিসাহেব চাবি নিয়ে গির্জায় চলে গিয়ে থাকবেন। -- পার্কের কাছাকাছি পাহারাদারদের কুটিরগুলো ভাড়া দেয়া হয়নি। বেড়াগুলো এতো উঁচু যে তুমি গাছের মাথার ঘষটানি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না।

    চারণভূমিগুলো উঠে গেছে মুরগিবর্জিত গ্রামগুলোর দিকে, কামারের নেহাইও নেই। জলকপাট ওপরে তোলা। হে বনজঙ্গলের ক্রুশকাঠ আর হাওয়াকল, দ্বীপপূঞ্জ আর ধোঁয়া-চিমনির সারি।

    ম্যাজিক ফুলেদের গূঞ্জন। ঢালু জায়গা ওকে কোল দিয়েছিল। চারিদিকে ঘুরছিল রূপকথার বাহারঅলা প্রাণী। শাশ্বত উষ্ণ চোখের জলে তৈরি মেঘেরা জড়ো হচ্ছিল ফাঁকা সমুদ্রের ওপরে।

    বনের ভেতরে একটা পাখি রয়েছে, তার গান তোমাকে থামিয়ে দেয় আর আরক্তিম করে তোলে।

    একটা দেয়ালঘড়ি রয়েছে যা কখনও বাজে না।

    একটা গর্তে রয়েছে শাদা প্রাণীর বাসা।

    একটা গির্জা রয়েছে যা নামছে, আর একটা ঝিল যা ওপরে উঠছে।

    বেড়ার ঝাড়ের আড়ালে রাখা রয়েছে রাঙা ফিতেয় সাজানো ছোট্ট ঘোড়ারগাড়ি, কিংবা গলি ধরে দৌড়োচ্ছে,

    বনের আড়াল থেকে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে পোশাকপরা ছোটো অভিনেতাদের দল।

    শেষ পর্যন্ত, কেউ তো রয়েছে, যখন তুমি ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত, যে তোমাকে তাড়িয়ে দিলো।

    ছাদের ওপরে প্রার্থনারত আমিই সেই সন্ত --- যখন শান্তিময় জানোয়ারেরা প্যালেসটাইনের সমুদ্র পর্যন্ত চরে ঘাস খেতে গেছে।

    অন্ধকার আরামকেদারায় আমিই সেই পণ্ডিত। গ্রন্হাগারের জানালায় গাছের ডালপালা আর বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

    বেঁটে গাছের বনের ভেতর দিয়ে যে পথ দেখা যাচ্ছে, আমিই তার পর্যটক : আমার পদধ্বনিকে নিঃশব্দ করে দিচ্ছে খোলা জলকপাটের গর্জন। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখতে থাকি সূর্যাস্তের দুঃখি সোনালি প্রক্ষালন।

    আমি হয়তো সেই বালক যে সমুদ্রে ভেসে-যাওয়া জেটির ওপরে রয়ে গেছে, চাষিবাড়ির ছোটো ছেলে যে গলি ধরে হেঁটে যাচ্ছে তার চুলের ঝুঁটি আকাশ ছুঁয়েছে।

    পথগুলো অসমতল। ছোটো ঢিবিগুলো ঝাঁকড়াগাছে ঢাকা। হাওয়া নিশ্চল। পাখিগুলো আর ঝর্ণা আর কতো দূরে ! সামনে সেটাই হয়তো পৃথিবীর শেষপ্রান্ত।

    মাটির অনেক গভীরে -- রেখায় নকশাকাটা, চুনকামকরা, শেষের দিকের এই স্মৃতিস্তম্ভ ওরা আমায় ভাড়া দিক।

    টেবিলে হেলে পড়ি, লন্ঠনের আলো ঝলমল করে তুলেছে যে পত্রিকাগুলো সেইগুলো আমি বোকার মতন দ্বিতীয়বার পড়ি, অথচ বইগুলোতে আর আগ্রহ নেই।

    মাটির তলায় আমার বাসার ওপরে অনেক দূরে বাড়িঘরের ভিতপোঁতা, কুহেলিকা জড়ো হয়। মাটির রঙ লাল কিংবা কালো। দানবিক শহর, শেষহীন রাত !

    তলায় রয়েছে নর্দমা। পাশটা কেবল কাচের পাত্রের মতন পুরু। হয়তো স্হলবেষ্টিত আশমানি উপসাগর, আগুনের কুয়ো, উপসাগর। হয়তো এই স্তরে চাঁদ আর ধুমকেতু, সমুদ্র আর কিংবদন্তির সাক্ষাৎ ঘটে।

    তিক্ত মানসিকতার সময়ে আমি ধাতুর, নীলকান্তমণির গোলকের কল্পনা করি। আমি নৈঃশব্দের প্রভূ। ধনুকের মতন ছাদের কোনায় কেনই বা কাচফোকরের মতন দেখতে জায়গাটার আলো ফিকে হয়ে আসবে ?

    গল্প

    ইল্যুমিনেশান ৩

    মামুলি বদান্যতায় নিজেকে একবার দিয়ে ফেলা দক্ষতা সম্পর্কে একজন রাজপুত্র অত্যন্ত কূপিত ছিল। ভবিষ্যতে প্রেমের যে বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটবে তা ও দেখতে পাচ্ছিল, আর সন্দেহ করছিল যে ওর স্ত্রীদের রয়েছে বিলাসদ্রব্য আর আকাশের দেয়া সন্তোষ-উৎপাদন বাড়িয়ে তোলার চেয়েও বেশি চাহিদা। ও সত্য ঘটনা জানতে চাইছিল, আকাঙ্খা আর বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়োজন জানতে চাইছিল। তা স্বধর্ম থেকে বিপথগমন হোক বা নাহোক ও জানতে চাইছিল। ওর অন্তত ছিল যথেষ্ট জাগতিক ক্ষমতা।

    প্রতিটি নারী যে ওকে জানতো, খুন হয়ে যেতো গুপ্তঘাতকদের হাতে। সৌন্দর্যের বাগানে কি যে ব্যাপক ধ্বংস ! খাঁড়ার তলায় তারা ওকে আশীর্বাদ করেছিল। ও আর নতুন করে কাউকে চায়নি। --সেই নারীরা আবার দেখা দিলো।

    যারা ওকে অনুসরণ করেছিল তাদের, শিকারের পর কিংবা মদে মাতাল হয়ে, সবাইকে ও হত্যা করল। -- সবাই ওকে অনুসরণ করা বজায় রাখল।

    বিরল প্রাণীদের গলা কেটে নিজেকে ও আনন্দ দিতো। প্রাসাদগুলোয় ও আগুন ধরিয়ে দিলো। জনসাধারণের ওপর দিয়ে গিয়ে তাদের কুটিকুটি করে ফেললো। -- জনসাধারণ, সোনালি ছাদ, সুন্দর প্রাণীরা তবু বেঁচে রইলো।

    কেউ কি ধ্বংসে খুঁজে পায় চরমানন্দ, নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে নিজেকে আবার তরুণ করে তুলতে পারে ? জনসাধারণ টুঁ শব্দও করেনি। কেউ ওর দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করতে এগিয়ে যায়নি। এক সন্ধ্যায় ও গর্বে ঘোড়ায় বসে তাকে ছোটাচ্ছিল। এক ডাকিনী দেখা দিলো, অনির্বচনীয়া এমনকি লজ্জাময়ী সুন্দরী। রাজপুত্রের মুখ আর ইশারায় দেখা গেল বহুবার জটিল প্রেম করার পুর্বলক্ষণ, বলার অযোগ্য এমনকি অসহিষ্ণু আনন্দ ! রাজপুত্র আর ডাকিনী সম্ভবত অন্তরজগতের ক্ষমতার দ্বারা পরস্পরকে হত্যা করল। কেমন করেই বা তারা পরস্পরকে এইভাবে মরতে সাহায্য করলো? লোকে যেমন বলে থাকে, ওরা মারা গেছে।

    তবু রাজপুত্র নিজের প্রাসাদে বুড়ো হয়ে মারা গেল। রাজপুত্রই আসলে ডাকিনী ছিল। ডাকিনী ছিল রাজপুত্র।

    সূক্ষ্ম সঙ্গীত আমাদের চাহিদার তুলনায় কম ।

    প্যারেড

    ইল্যুমিনেশান ৪

    ভাঁড়গুলো বেশ পালোয়ান। অনেকে তোমার শব্দগুলোকে শোষণ করেছে। প্রয়োজনহীন, তোমার বিবেক সম্পর্কে ওদের বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষমতা নিয়ে খেলা করার কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

    কতো পাকতাড়ুয়া ওরা ! গ্রীষ্মরাতের মতন চোখদুটো হতবুদ্ধিময়, লাল আর কালো, তিনরঙা, ইস্পাতে সোনালি নক্ষত্র দেগে দেয়া ; আকৃতি বিকলাঙ্গ, সীসায় ভারি, ফ্যাকাশে, আগুনলাগা ; খসখসে গলার তড়িংবিড়িং নাচিয়েরা ! ফিকে হয়ে যাওয়া কারুকাজের নিষ্ঠুর দম্ভচলন ! --কেউ কেউ কমবয়সী--চেরুবিনোকে ওরা কোন দৃষ্টিতে দ্যাখে ? -- বিপজ্জনক সঙ্গতি আর আতঙ্ক-জাগানো কন্ঠস্বরের মালিক ওরা। শহরের রাস্তায় ওদের পাঠিয়ে দেয়া হয় খদ্দের ধরার জন্যে, বিরক্তিকর অলঙ্কারে সাজিয়ে

    ওহ পাগলামির ভেংচিকাটা নৃশংস পারিজাত ! তোমার ফকির আর নাটুকে ভাঁড়ামো থেকে দূরে।

    বিনা প্রস্তুতিতে তৈরি দুঃস্বপ্নে পাওয়া পোশাক পরে ওরা ডাকাতদের উপদেবতাদের রোমান্টিক, বিয়োগান্তক, আধ্যাত্মিক ধর্মকাহিনির নাটক করে যে ঘটনাগুলো আদপে কখনও ঘটেনি। চীনা, হটেনটট, ভবঘুরে, মূর্খ, হায়েনা, রক্তখেকো দেবতা, পুরোনো পাগলামি, ভয়ংকর রাক্ষস, জনপ্রিয় গৃহস্হ প্রবণতাকে পাশবিক ভঙ্গী আর আদরের সঙ্গে মিশিয়ে ফ্যালে। ওরা নতুন স্বরলিপি আর মিষ্টি গানের জন্যে অপেক্ষা করছে। ওস্তাদ ভোজবাজিকর, ওরা জনগণকে আর জায়গাকে বদলে ফেলে চৌম্বক মঞ্চপদ্ধতি দেখায়। ফুলে-ওঠা চোখে, রক্ত গান গায়, হাড় পুরু হয়ে ওঠে, চোখের জল আর গালের রুজ গড়িয়ে পড়ে। ওদের গরাদ আর সন্ত্রাস মুহূর্তের জন্যে বা কয়েক মাস বজায় থাকে।

    এই বর্বর প্যারেডের চাবিকাঠি আছে শুধু আমার হেফাজতে।

    সেকেলে

    ইল্যুমিনেশান ৫

    গ্রিক অধিদেবতা প্যান-এর করুণাময় ছেলে ! ধনুকের মতন তোমার ভ্রুযুগল ফুলের তোড়ায় ঢাকা আর চোখ যেন বৈঁচিফল, মহার্ঘ শ্রবণসঙ্গীত, এগিয়ে চলো। মদের বাদামি তলানির রঙে রাঙানো ; তোমার গালগুলো ভেতরে ঢোকা। তোমার চোখ-দাঁত ফ্যাকাশে। তোমার বুক এক বাদ্যযন্ত্র, তোমার ফ্যাকাশে হাতে তারগুলো বেজে ওঠে। তোমার পেটের ভেতরে স্পন্দন হয় যেখানে একজোড়া যৌনতা ঘুমোয়। রাতের বেলা, হেঁটে যাও, উরুকে সামান্য তুলে, তারপর অন্য উরু আর ওই বাঁ পা।

    শোভাময় হয়ে ওঠা

    ইল্যুমিনেশান ৬

    তুষারপাতের উল্টোদিকে, এক ঢ্যাঙা সৌন্দর্যের প্রতিমা। এই আদর-পাওয়া দেহকে মৃত্যুর বাঁশি আর ঘিরেফেলা মৃদু সঙ্গীত ফাঁপিয়ে তোলে, এমনভাবে ফুলে ওঠে আর কাঁপে যেন ভুত : অসাধারণ মাংস থেকে রক্তবর্ণ আর কালো ঘা ফেটে বেরোয়। জীবনের জন্য যুৎসই রঙগুলো গভীর হয়ে ওঠে, নাচতে থাকে আর গড়ে উঠতে-থাকা এই দৃষ্টিপ্রতিভা থেকে নিজেদের আলাদা করে ফ্যালে। কাঁপুনি তোলে আর আর্তনাদ করে যন্ত্রণায় আর এদের মদমত্ত সুগন্ধের প্রভাব ভরে দেয় সেই জাগতিক আর ভাসন্ত সঙ্গীতকে যা জগতসংসার, অনেক পেছনে, আমাদের সৌন্দর্যমাতার দিকে ছুঁড়ে মারে -- সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, দুই পায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ায়। ওহ, আমাদের হাড়ে পরানো হয়েছে এক নতুন প্রণয়োদ্দীপক দেহ ! ওহ, ফ্যাকাশে মুখশ্রী ; ঘোড়ার চুলে-সাজানো ঢাল, কেলাসিত বাহু ! গাছের জঙ্গল আর ওজনহীন বাতাসের ভেতর দিয়ে আমাকে কামান দাগতে হবে !

    জীবনসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ৭

    ওহ পবিত্রভূমির বিশাল অ্যাভেনিউগুলো, মন্দিরের চূড়াগুলো ! সেই ব্রাহ্মণের কী হলো যিনি আমাকে প্রবাদগুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন ? আমি সেই বুড়িকে এখনও দেখতে পাই, একই সময়ে আর জায়গায় ! নদীদের রূপালি সময় আর আলোকমালা আমার এখনও মনে আছে, কাঁধের ওপরে আমার সঙ্গীর হাত, পরস্পরের আদর মনে আছে যখন আমরা দুজনে মশলার গন্ধেভরা মাঠে দাঁড়িয়েছিলুম। -- আমার চিন্তাকে ঘিরে একদল রক্তবর্ণ পায়রা বকবকম করে। -- এখানে নির্বাসিত, প্রতিটি সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট নাটক অভিনয় করার জায়গা আমার ছিল। আমি তোমাকে দেখাতে পারতুম অজানা ঐশ্বর্য। তুমি যে ধনসম্পদ খুঁজে পেয়েছিলে তার ইতিহাসকে আমি চিহ্ণিত করেছি। এবার দেখব কী ঘটতে যাচ্ছে ! বিশৃঙ্খলার মতনই আমার প্রজ্ঞাকে অবজ্ঞা করা হয়। কীই বা আমার শূন্যতা, তোমার জন্যে অপেক্ষমান নিশ্চলতার তুলনায় ?

    আমার পূর্বজদের তুলনায় আমি একজন গুণসম্পন্ন আবিষ্কারক ; এমনকি, সঙ্গীতবিশারদ, যে প্রেমের সূত্রের মতন কিছু খুঁজে পেয়েছে। বর্তমানে, মনোরম আকাশের তলায় বিটকেল এক দেশের ভদ্রমানুষ, নিজের ভিখারিসূলভ শৈশবের স্মৃতির মাধ্যমে আমি বিচলিত হবার প্রয়াস করি, আমার শিক্ষানবীশি আর কাঠের জুতো পায়ে এখানে আসা, আমার তর্কপ্রিয়তা, আমার পাঁচ কি ছয়বারের বৈধব্য, আর আমার কয়েকবারের মহামাতলামি, যখন আমার বিচক্ষণ মগজ আমার বেরাদরদের হট্টগোলে অংশ নিতে বাধা দিয়েছিল। যেহেতু এই সন্দেহপ্রবণতা আর প্রয়োগ করা যাবে না, আর এমনিতেও আমি তরতাজা উদ্বেগে সমর্পিত -- আমি আশা করছি যে অত্যন্ত বিদ্বিষ্ট উন্মাদ হয়ে উঠবো।

    বারো বছর বয়সে আমি যে চিলেকোঠায় বন্দী ছিলুম, আমি জগতসংসারের বিষয়ে জানতুম, আমি মানুষের হাস্যকর অবস্হা বর্ণনা করেছিলুম। মাটির তলাকার মদের ভাঁড়ারে আমি ইতিহাস শিখলুম। উত্তরের শহরের কোনো এক রাতের ভোজনোৎসবে আমি পূর্বসূরী মহান তৈলচিত্রকরদের নারীদের অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা পেয়েছিলুম। প্যারিসের এক প্রাচীন গলিতে, আমাকে ধ্রুপদী বিজ্ঞান শেখানো হয়েছিল। প্রাচ্যদেশ দিয়ে ঘেরা এক চমৎকার জায়গায় আমি সম্পূর্ণ করেছিলুম আমার প্রচুর কাজ আর কাটিয়েছিলুম আমার সুবিখ্যাত অবসরযাপনের দিনগুলো। নিজের রক্তকে করে তুলেছিলুম চঞ্চল। আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে। সেই বিষয়ে আর ভাববারও দরকার নেই। আমি সত্যিই কবর অতিক্রম করে এসেছি, এবং কর্তব্য-বিষয়ে স্বাধীন।

    প্রস্হান

    ইল্যুমিনেশান ৮

    যথেষ্ট দেখা হলো। সমগ্র আকাশের তলায় দৃষ্টিপ্রতিভার সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ।

    অনেক পাওয়া হলো। শহরগুলোর আওয়াজ, সন্ধ্যাবেলা, এবং আলোয়, আর তা সদাসর্বদা।

    অনেক জানা হলো। জীবনের নির্ণয়গুলো। --হে দৃষ্টিপ্রতিভার ধ্বনিসমূচ্চয় !

    নতুন অনুরাগ এবং ধ্বনি লক্ষ্য করে সেইদিকে প্রস্হান !

    রাজকীয়

    ইল্যুমিনেশান ৯

    সুন্দর একটি দিনে, সুশীল মানুষদের মাঝে, চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন একজন মহিমান্বিত পুরুষ ও নারী : ‘বন্ধুগণ, আমি চাই ও রানি হোক !’ ‘আমি রানি হতে চাই !’ মহিলা হাসলেন আর কাঁপতে লাগলেন। পুরুষটি বন্ধুদের জানালেন রহস্যোদ্ঘাটনের কথা, কষ্টের জীবনের কথা। দুজনে পরস্পরের দেহে হেলান দিয়ে মূর্চ্ছা গেলেন।

    সত্যিই, তারা সারা সকাল রাজা হয়ে কাটালো, বাড়িগুলোয় ঝোলানো হলো গাঢ় লাল ফেস্টুন, আর সারা দুপুরও, তারা হেঁটে চলল পামগাছের বাগানের দিকে।

    যুক্তিযুক্ততার অভিমুখে

    ইল্যুমিনেশান ১০

    ড্রামের ওপরে তোমার একটা আঙুলের টোকায় সব আওয়াজ হারিয়ে যায় আর নতুন করে গড়ে তোলে ঐকতান।

    তোমার একটা পদক্ষেপ উদ্দীপ্ত করে নতুন মানুষদের আর তাদের সামনে দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

    তোমার মুখ অন্য দিকে তাকায় : নতুন প্রেম ! তোমার মুখ নিজের জায়গায় ফেরে -- নতুন প্রেম!

    ‘আমাদের অদৃষ্ট পালটে দাও, মহামারী শেষ করো’, মহাসময়ের তালে তাল মিলিয়ে এই শিশুরা তোমাকে গেয়ে শোনায়। ‘যেখানেই হোক না কেন, আমাদের বৈভব এবং ইচ্ছা লালিত হোক’, ওরা দয়াভিক্ষা করে।

    চিরকালীন থেকে তোমার আগমন, তুমি সব জায়গার জন্য প্রস্হান করবে।

    মদোন্মত্ত সকাল

    ইল্যুমিনেশান ১১

    হে আমার শুভ ! হে আমার সুন্দরী ! আমি ভয়ে পশ্চাৎপদ হই না এমন বর্বর তূর্যনিনাদ !

    সন্মোহিত আরাম ! প্রথম বারের খাতিরে, সুন্দর দেহ আর অজানা কাজের জন্য হুররে !

    আরম্ভ হয়েছিল বাচ্চাদের হাসিতে, শেষও হবে সেইভাবে। এই বিষ আমাদের শিরায় তখনও বইবে যখন তূর্যনিনাদ ফিরে আসবে, আমাদের আরেকবার পুরোনো বিশৃঙ্খলার হাতে তুলে দেয়া হবে। ওহ, আমরা এখন অমন দৈহিক শাস্তির উপযুক্ত, আমাদের দেহ আর আত্মাকে দেয়া মানবোত্তর প্রতিশ্রুতিকে সঠিক বুঝে উঠতে হবে : এই প্রতিশ্রুতি, এই পাগলামি ! সৌষ্ঠব, বিজ্ঞান, সন্ত্রাস ! ওরা অঙ্গীকার করেছে যে শুভ এবং অশুভর বৃক্ষকে অন্ধকারে পুঁতে ফেলা হবে, স্বৈরতান্ত্রিক সদগুণগুলোকে নির্বাসন দেয়া হবে, যাতে এখানে আমরা বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে আসতে পারি। এটা আরম্ভ হয়েছিল বিশেষ বিরক্তি নিয়ে এবং ফুরিয়েও গেলো -- আমরা এই শাশ্বতকে তক্ষুনি দখল করতে পারিনি বলে -- তা সুগন্ধের দাঙ্গায় শেষ হয়।

    শিশুদের হাসি, কেনা-গোলামদের বিচক্ষণতা, অক্ষতযোনি মেয়েদের আত্মসংযম, এখানকার মুখগুলো আর জিনিসপত্রের আতঙ্ক, সতর্কতার স্মৃতির দরুন তুমি পবিত্র। এটা আরম্ভ হয়েছিল

    মূর্খতার সঙ্গে, এবার দ্যাখো, শেষ হচ্ছে আগুন আর বরফের দেবদূতদের দ্বারা। ক্ষণকালের মদ্যপ পবিত্র সতর্কতা ! যদি তুমি কেবল মুখোশের জন্য আমাদের বরাদ্দ করে থাকো। সাধনপ্রণালী, আমরা তোমাকে সমর্থন করছি ! আমরা ভুলিনি কালকে তুমি আমাদের প্রতিটি শতককে মহিমান্বিত করেছিলে। বিষে আমাদের বিশ্বাস আছে। আমরা জানি কেমন করে প্রত্যেক দিন আমাদের সমগ্র জীবন দিয়ে দিতে হবে।

    এই কালখণ্ড হলো গুপ্তঘাতকদের।

    প্রবাদসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ১২

    আমাদের চারটে অবাক চোখের জন্যে এই জগতসংসারকে যখন ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে একটিমাত্র অন্ধকার জঙ্গলে -- দুটি অনুগত বাচ্চার জন্য একটি সমুদ্রতীরে -- আমাদের সুস্পষ্ট সমবেদনার জন্য সঙ্গীতের ঘরে -- আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো।

    এখানে তলায় কেবল একজনমাত্র বুড়ো লোক থাকুন, শান্ত আর সুন্দর, ‘অচেনা বিলাসে’ পরিবেষ্টিত -- আমি তোমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসবো।

    আমাকে তোমার স্মৃতিগুলো বাস্তবে পরিণত করতে দাও -- আমাকে যুবতী হতে দাও, যে তোমার গলা টিপে ধরবে -- আমি তোমার দম বন্ধ করে দেবো।

    যখন আমরা যথেষ্ট বলশালী -- কে-ই বা পশ্চাদপসরণ করবে ? যথেষ্ট মৌজমস্তিতে থাকলে -- কে-ই বা ইয়ার্কি করতে ছাড়ে না ? যখন আমরা সবচেয়ে বেশি অসূয়াপূর্ণ -- ওরা আমাদের কি-ই বা বানাতে পারে ? নিজেকে সাজিয়েগুজিয়ে তোলো, নাচো, হাসো। -- আমি কখনও ভালোবাসাকে জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারবো না।

    ভিখারিনী মেয়েটা, দানবী খুকি, আমার কমরেড ! তুমি এই হতভাগিনী নারীদের কতোটা মনোযোগ দাও, এই প্যাঁচপয়্জার, আর আমার সমস্যা। তোমার অসম্ভব কন্ঠস্বর দিয়ে নিজেকে আমাদের সঙ্গে বেঁধে ফ্যালো, সেই কন্ঠস্বরখানা ! এই জঘন্য বিষাদের একমাত্র আশা।

    জুলাই মাসের মেঘাচ্ছন্ন ভোর। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ছাইয়ের স্বাদ -- বনানীর ঘামের গন্ধ ঝরে পড়ছে উনানের কোনে -- ভিজে ফুলগুচ্ছ -- তৃণাঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ -- খেতের খালগুলো থেকে কুয়াশা -- তাহলে কেন খেলনাপাতি আর ধুপকাঠি নয় ?

    আমি এক ঘণ্টাঘর থেকে আরেক ঘণ্টাঘর পর্যন্ত দড়ি টাঙিয়েছি ; জানালা থেকে জানালা পর্যন্ত ফুলের মালা ; নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র পর্যন্ত সোনার শেকল ; আর আমি নাচছি।

    ওপরের ঝিল থেকে অবিরাম বাষ্প ওঠে। সফেদ সূর্যের বিপরীতে কোন জাদুনারীরা জেগে উঠবেন? কোন বেগুনি পাতার পর্ণরাজি ঝরে পড়বে ?

    জনগণের টাকা যখন ঢেলে দেয়া হচ্ছে ভাইবেরাদরদের ভোজনোৎসবে, মেঘের ভেতরে বাজতে থাকে গোলাপরঙা আগুন।

    চিনা কালির আকর্ষণ সুগন্ধকে গভীর করে তোলে, আমার নিশিপালনে ক্রমান্বয়ে ঝরে পড়ে কালোরঙের পাউডার। -- আমি গ্যাসের আগুন কম করে দিই, বিছানায় নিজেকে ছুঁড়ে ফেলি, আর ছায়াগুলোর দিকে ফিরে, দেখতে পাই তোমাদের, আমার কন্যারা, আমার রানিরা !

    শ্রমিকেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৩

    ওহ ফেবরুয়ারি মাসের সেই উষ্ণ সকাল ! আমাদের বিদকুটে অন্নবস্ত্রহীন স্মৃতি, আমাদের যৌবনের দারিদ্রদশা থেকে অসময়ের দখিনা বাতাস এসে জাগিয়ে তুললো।

    বাদামি আর শাদা চাককাটা সুতির স্কার্ট পরেছিল হেনরিয়েকা, গত শতকের ফ্যাশান, সন্দেহ নেই ; ফিতে বাঁধা শিরাবরণ, রেশমের স্কার্ফ। শোকসন্তাপের চেয়েও তা দুঃখজনক। আমরা শহরতলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। আবহাওয়া ছিল মেঘলা, আর ওই দখিনা বাতাস চঞ্চল করে তুলছিল বিধ্বস্ত বাগান আর শুকনো তৃণভূমি থেকে উড়ে আসা দুর্গন্ধকে।

    এটা আমাকে যতোটা বিরক্ত করেছে ততোটা আমার স্ত্রীকে করতো না। ওপরের দিকের রাস্তায় গতমাসের বানভাসি তৈরি করে গেছে জলের চাদর, ও আমাকে দেখালো তাতে কয়েকটা ছোট্ট মাছ।

    শহরটা, কারখানাগুলোর আওয়াজ আর ধোঁয়াসুদ্ধ, রাস্তা ধরে আমাদের পিছু নিয়েছিল। ওহ, অন্য জগতসংসার, আকাশ আর ছায়ায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত বসতি ! দখিনা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল দুর্দশাময় শৈশবের ঘটনাগুলো, আমার গ্রীষ্মের বিষাদ, ভাগ্য আমার থেকে সদাসর্বদা যে ভয়ংকর বিপুল শক্তিমত্তা ও জ্ঞান দূরে সরিয়ে রেখেছে। না ! আমরা এই কৃপণ দেশে গ্রীষ্ম কাটাবো না যেখানে আমরা বাগদত্ত অনাথ ছাড়া আর কিছুই হতে পারবো না। আমি এই শক্ত হাত দিয়ে প্রিয় দৃশ্যগুলোকে টেনে নিয়ে যেতে দেবো না।

    সেতুগুলো

    ইল্যুমিনেশান ১৪

    স্ফটিকের ধূসর আকাশ। সাঁকোগুলোর অদ্ভুত নকশা, কখনও সোজা, কখনও বেঁকা, আবার কোনোটা কোনাকুনি বেঁকে গিয়ে আগেরটার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, আর এই নকশাগুলো খালের আলোজ্বলা বাঁকগুলোয় আবার তেমন করেই পুনরাবৃত্তি করেছে, কিন্তু এতো দীর্ঘ আর হালকা যে নদীর তীর, গুম্বজের গুরুভারে, ডুবে গিয়ে ছোটো হয়ে আসে। এই সাঁকোগুলোর কয়েকটা এখনও চাদরে ঢাকা। অন্যগুলোয় রয়েছে মাস্তুল, সঙ্কেত, অপলকা নিচু পাঁচিল। পাতলা তারে মোড়া, আর মিলিয়ে গেছে ; তীর থেকে দড়িদড়া উঠে আসে। তুমি একটা লাল কোট দেখে চিনতে পারো, হয়তো অন্যান্য কোটও এবং সঙ্গীতযন্ত্র। এই জনপ্রিয় রেশগুলো কি, বিখ্যাত কনসার্টের টুকরো, জনগণের জাতীয়-সঙ্গীতের অবশিষ্টাংশ ? জলের রঙ ধূসর এবং নীল, সমুদ্রের বাহুর মতন চওড়া।

    একটা শাদা রশ্মি, অনেক ওপরে থেকে এসে, হাসির নাটককে লোপাট করে দ্যায়।

    শহর

    ইল্যুমিনেশান ১৫

    এক মহানগর যাকে এই জন্যে আধুনিক মনে করা হয় যে বাড়িগুলোর বাইরের দিক সাজানোয় আর নগরের পরিকল্পনায় প্রয়োগ করার জন্য পরিচিত উপলব্ধিগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ; তারই আমি এক ক্ষণজীবী আর তেমন বিচ্ছিন্ন নাগরিক নই। এখানে তুমি কুসংস্কারের একটিও স্মৃতিস্তম্ভের হদিশ পাবে না। সংক্ষেপে, নৈতিকতা আর ভাষাকে সরলতম প্রকাশে নামিয়ে আনা হয়েছে ! লক্ষাধিক এই লোকজন যারা পরস্পরকে জানার প্রয়োজন অনুভব করে না, নিজেদের শিক্ষাদীক্ষা, কর্মকাণ্ড, বার্ধক্যে এতো মিল যে তাদের আয়ু মহাদেশের গোলমেলে সংখ্যাতত্ব যা বলেছে তার চেয়েও বেশ কম। তাই, আমার জানালা দিয়ে, দেখতে পাই নতুন প্রেতরা শাশ্বত ঘন ধোঁয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে --- আমাদের বনানীঘেরা ছায়া, আমাদের গ্রীষ্মের রাত ! -- প্রতিহিংসর নতুন গ্রিক দেবতারা, আমার কুটিরের সামনে, যা আমার স্বদেশ, আমার সমগ্র হৃদয়, কেননা এখানে সবকিছুরই পরস্পরের সঙ্গে মিল আছে -- ক্রন্দনহীন মৃত্যু, আমাদের সক্রিয় কন্যা আর চাকরানি, রাস্তার কাদায় বেপরোয়া ভালোবাসা আর ফালতু অপরাধ ফুঁপিয়ে বেড়াচ্ছে।

    গাড়ির চাকার দাগ

    ইল্যুমিনেশান ১৬

    ডানদিকে বাগানের এই কোনে গ্রীষ্মের ভোর পাতাদের আর কুয়াশাকে এবং শব্দগুলোর ঘুম ভাঙায়, আর বাঁদিকের ঢালে স্যাঁতসেতে রাস্তায় বেগুনি ছায়ায় অগুন্তি দ্রুতগামী চাকার দাগ ধরে রাখে। ঐন্দ্রজালিক মিছিল। ওয়াগন, সত্যিই, ঝকমকে কাঠের তৈরি জানোয়ার তাতে, খুঁটি আর রঙবেরঙ চাঁদোয়া, কুড়িটা চিত্রবিচিত্র সার্কাস ঘোড়ার পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল, আর পুরুষেরা আর বাচ্চারা তাদের অদ্ভুত জানোয়ারের পিঠে -- কুড়িটা গাড়ি, ঢেউখেলানো, ঢাকাখোলা আর ফুলে সাজানো প্রাচীন ঘোড়ারগাড়ির মতন কিংবা যেমন পরীর গল্পে থাকে, শহরতলির যাত্রাভিনয় দেখতে যাবার পোশাক-পরা বাচ্চায় ঠাশা : -- এমনকি কফিনও, তাদের রাতের আচ্ছাদনের তলায়, জাঁকালো আবলুস পালকে, নীল-কালো মাদিঘোড়ার দৌড়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো।

    নগরেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৭

    শহরসমূহই বটে ! এই সেই লোকগুলো যাদের জন্যে স্বপ্নেদেখা উত্তর-আমেরিকার আলেঘানি পাহাড় এবং লেবানন মঞ্চায়িত হয়েছিল ! স্ফটিক আর কাঠের তৈরি রাখাল-কুটির যা অদৃশ্য রেললাইন আর কপিকলে চলে। গ্রিক সূর্যদেবের মূর্তি দিয়ে ঘেরা মরা আগ্নেয়গিরির হাঁমুখ, আর তামার তৈরি পামগাছেরা আগুনশিখায় সুরেলা ধ্বনি তুলছে। রাখাল কুটিরের পেছনে খালের ধারে ভালোবাসার পানোৎসব প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। গিরিসঙ্কটের ভেতরে শিকারের রুনুঝুনু বাজে। দৈত্যবৎ গায়কদের সমাবেশ ঘটে মধ্যযুগের ফরাসি রাজার সোনালি ঝিলমিলে পোশাকের মতন শীর্ষদেশের আলোয়।

    ঘুর্নিজলের ভেতরে পাটাতনের ওপরে, রাজা শার্লামেইনের বীরপুরুষেরা তাদের শৌর্যের ভেরীধ্বনি করে। অতলর ওপরের সাঁকোগুলোয়, আর সরাইখানার ছাদে, আকাশের তাপ মাস্তুলগুলোকে পতাকা দিয়ে ঢেকে ফ্যালে। দেবতাপ্রতিম ভঙ্গুর মূর্তিগুলো চারণভূমি দখল করে ফ্যালে যেখানে দেবদূততুল্য নারীসিংহীরা হিমানী-সম্প্রপাতে প্রবেশ করে। সর্বোচ্চ চূড়াগুলোর সারির ওপরদিকে, রয়েছে ভিনাসের শাশ্বত জন্মের ঝড়ঝাপটায় আক্রান্ত এক সমুদ্র, অরফিউসের ক্ষণস্হায়ী সঙ্গীতে উদ্বুদ্ধ আর দামি মুক্তো এবং শঙ্খধ্বনিতে মথিত -- সেই সমুদ্র জাগতিক বজ্রবিদ্যুৎকে অনেক সময়ে অন্ধকার করে তোলে। ঢালু জায়গায়, ফুলের ফসল, আমাদের তরোয়াল আর পেয়ালার মতন, নিচের দিকে। পিঙ্গলরঙা মোটা কাপড়ে স্বপ্নদায়িনী পরীরানিদের মিছিল। তাদের পা ঝর্ণায় আর বনগোলাপের ঝাড়ে, ওইখানে উঁচুতে মৃগয়ার অধিষ্ঠাত্রীদেবীর দুধ খাচ্ছে এক হরিণ। শহরতলির মাতালনারীরা ফোঁপাচ্ছে, আর চাঁদ জ্বলে যাচ্ছে আর শেয়ালেরা হুক্কাহুয়া করছে। ভিনাস সন্ন্যাসী আর স্যাকরাদের সঙ্গে প্রবেশ করছে গুহার মধ্যে। সারিসারি ঘণ্টাঘর গেয়ে উঠছে জনগণের অভিপ্রায়। হাড়ের তৈরি দুর্গ থেকে ভেসে আসছে অজানা সঙ্গীত। যাবতীয় কিংবদন্তির প্রকাশ ঘটছে আর শহরগুলোর ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে হরিণের দল। থেমে গেছে ঝড়ের পুণ্যালোক। রাতের পানোৎসবে অবিরাম নাচছে বর্বরেরা। এবং, একবার, আমি বাগদাদের রাস্তার গোলমালে নেমে পড়লুম, যেখানে ভিড়ের লোকেরা তরতাজা শ্রমের আনন্দ-গান গাইবার জন্য জড়ো হয়েছিল, নিস্তেজ হাওয়ায়, পাহাড়ের বিখ্যাত মায়াপুরুষদের এড়াবার জন্যে বিনা ক্ষমতায় পাক খাচ্ছিল। আমার তন্দ্রাভাব আর যৎসামান্য হেলডোল যে এলাকা থেকে আসে তা ফিরে পেতে কোন ধরণের অস্ত্র, কোন ধরণের মনোরম সময় প্রয়োজন ?

    ভবঘুরের দল

    ইল্যুমিনেশান ১৮

    সমব্যথী ভাই ! ওর কাছে আমার কোনও নৃশংস নিশিপালন আছে ! ‘আমি এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টাকে দখল করে নিতে বিফল হয়েছিলুম। আমি ওর অকর্মণ্যতা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলুম। যদি আমাদের নির্বাসনে যেতে হয়, কেনা-গোলমী করতে হয়, তা হবে আমার দোষ।’ অদ্ভুত দুর্ভাগ্য আর বোকামির জন্য ও আমার প্রশংসা করেছিল, আর তার সঙ্গে জুড়েছিল অশান্তিকর কারণ।

    এই শয়তান পণ্ডিতকে আমি বিদ্রুপ করে উত্তর দিয়েছি, আর জানালার কাছে গিয়ে তা শেষ করেছি। বিরল সঙ্গীতরেখার চালচলনের অপর পারের চারণভূমিতে আমি ভবিষ্যতের রাতের বিলাসের মায়াপুরুষ গড়েছি।

    এই অস্পষ্ট স্বাস্হবিধিসন্মত চিত্তবিক্ষেপের পর, আমি খড়ের মাদুরের ওপরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়তুম। এবং, বলতে গেলে প্রতি রাতে, যেই আমি ঘুমিয়ে পড়তুম, বেচারা ভাইটি উঠে পড়তো, মুখে দুর্গন্ধ, চোখে দেখতে পাচ্ছে না -- যেমন ও নিজের সম্পর্কে স্বপ্ন দেখতো -- আর নিজের নির্বোধ কান্নার স্বপ্নে বিভোর আমাকে ঘরের ভেতরে টানাটানি করতো !

    বাস্তবিক, সত্যি বলতে কি, আমি ওকে ওর সূর্যসন্তানের প্রাগৈতিহাসিক স্হতিতে ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছিলুম -- আর আমরা ঘুরে বেড়ালুম, গুহার মদে ভরণপোষণ করে, আর পথের বিসকিট খেয়ে, আমি পরিসর আর ফরমুলা খুঁজে পাবার জন্যে অধৈর্য।

    নগরসকল

    ইল্যুমিনেশান ১৯

    আধুনিক বর্বরতার অপরিমিত ধারণাকে ছাপিয়ে যায় সরকারি নগরায়ন। পরিবর্তনাতীত ধূসর আকাশ যে অনুজ্বল আলো ছড়াচ্ছে তা বর্ণনা করা অসম্ভব ; স্হাপত্যের রাজসিক রোশনাই, আর মাটিতে অনন্তকালীন তুষার। ধ্রুপদী স্হাপত্যের বিস্ময়কর কাজগুলোকে, একান্ত আতঙ্কজনক রুচিতে, ওরা আবার গড়েছে। হ্যাম্পটক কোর্টের চেয়ে কুড়িগুণ বড়ো মিউজিয়ামে তৈলচিত্রের প্রদর্শনী দেখি। মন্ত্রালয়ের সিঁড়িগুলোর নকশা তৈরি করেছিল নরওয়ের এক নেবুচাদনেজ্জার ; যে অধস্তন অধিকারীদের দেখেছিলুম তারা, যেমন হয় আরকি, ব্রাহ্মণদের থেকেও গর্বিত, আর বিশাল মূর্তিগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং এলাকার তত্ববধায়কদের দেখে আমি ভয়ে কেঁপে উঠছিলুম। চৌরাস্তার বাড়িগুলোর ঘেঁষাঘেঁষি, তাদের ছাদ, আর পাঁচিলঘেরা বারান্দা, তাদের ঘণ্টাঘরগুলো থেকে কোনঠাশা করে দিয়েছে। বিস্ময়কর শিল্পচর্চায় পার্কগুলোয় উপস্হাপন করা হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক প্রকৃতি। ভালো জায়গাগুলোয় রয়েছে অনির্বচনীয় চৌহদ্দি : সমুদ্রের শাখা, নৌকাবর্জিত, তার নীল রঙের ঘষাকাচকে ছড়িয়ে দেয় মোমের তৈরি বিশাল গাছে গুরুভার জাহাজঘাটার মাঝবরাবর। একটা ছোটো সাঁকো চলে গেছে সন্ত চ্যাপেলের গোলাকার গম্বুজের ঠিক নিচের সিংদরোজা পর্যন্ত। গম্বুজটা পনেরোহাজার ফিটের ইস্পাতের কলাকৃতি দিয়ে গড়া।

    তামার তৈরি সাঁকো, মাচান, সিঁড়ি যা আচ্ছাদিত বাজারকে পাক খেয়ে উঠেছে, কয়েকটা দৃষ্টিভঙ্গীতে, আমি ভাবলুম হয়তো শহরের ব্যাপ্তি বিচার করে দেখব ! তা ছিল মস্তোবড়ো ব্যাপার যার সম্পর্কে নির্ণয় নিতে পারলুম না : নগরদুর্গের ওপরদিকে আর নিচে যে এলাকাগুলো রয়েছে তাদের স্তর কেমনতর ? আমাদের দিনকালে পর্যটকদের পক্ষে দেখে বেড়ানোটা অসম্ভব। ব্যবসার চৌহদ্দি, সেকেলে গ্যালারিসহ, একই রকমের শৈলীর সার্কাস। কোনও দোকান চোখে পড়ছে না, কিন্তু পথের তুষারে মাড়িয়ে যাবার দাগ ; কয়েকজন নবাব, লণ্ডনের রবিবারের সকালে হাঁটার লোকেদের মতন বিরল, হীরের তৈরি ঘোড়ারগাড়ির দিকে এগোয়। কয়েকটা লাল মখমলের পালঙ্ক : মরুদেশের পানীয় বিতরন করা হচ্ছে, যার দাম আটশো থেকে আটহাজার টাকার মধ্যে পড়ে। সার্কাসের ভেতরে নাট্যালয় খোঁজার ধারণা সম্পর্কে আমি নিজেকে বললুম যে দোকানগুলোতে নিশ্চয়ই যথেষ্ট বিষণ্ণ নাটক অভিনীত হয়। আমার মনে হয় পুলিশও আছে ; কিন্তু আইনগুলো নিশ্চয়ই এমন অদ্ভুত যে অ্যাডভেঞ্চার করার ভাবনা আমায় এড়িয়ে যায়।

    শহরতলিগুলো, পারিসের যেকোনো সুন্দর রাস্তার মতন পরিচ্ছন্ন, সূর্যের আলোর সাদৃশ্যের আনুকূল্য পায় ; গণতান্ত্রিক উপাদানের সংখ্যা কয়েক হাজার আত্মা হবে। এখানেও, ঘোড়াগুলো সার বেঁধে নেই ; শহরতলিগুলো বিটকেলভাবে গাঁয়ের দিকে গিয়ে হারিয়ে যায়, যাকে বলে ‘প্রশাসনিক এলাকা’, যা ছড়িয়ে পড়েছে শেষহীন পশ্চিমদিকের জঙ্গল আর পাদপবাগান পর্যন্ত, যেখানে বর্বর কুলীনরা যে আলো নিজেরা তৈরি করেছে, সেখানে সংবাদ শিকার করতে বেরোয়।

    নিশিপালন

    ইল্যুমিনেশান ২০

    এই হলো আলোয় আস্হা, বিছানার ওপরে কিংবা মাঠে, জ্বরে নয়, অবসন্নতাতেও নয়।

    ইনি বন্ধু প্রদীপ্ত নন দুর্বলও নন। তিনিই বন্ধু।

    ইনি ভালোবাসবার ; যন্ত্রণা দেয়া হয়নি, এবং যন্ত্রণাদায়ক নন।

    চাওয়া হয়নি বাতাস এবং জগতসংসারকে। জীবন।

    --এটা কী, তাহলে ?

    --আর শীতল হয়ে যায় স্বপ্ন।

    মাঝখানের স্তম্ভে আলো ফিরে আসে। ঘরের দুই প্রান্তসীমা থেকে, একরকম মঞ্চই বলা যায়, মিলবিশিষ্ট দ্রোহীদের সাক্ষাৎ ঘটে। পাহারাদারের মুখোমুখি দেয়ালে কার্নিসের মতন কোনাকুনি জায়গায় মনস্তত্বের পারম্পর্য, আবহাওয়ার চাদর এবং ভূতাত্বিক ঢেউ -- গভীরভাবে অনুভুত গাঢ় এবং দ্রুত দলাদলি, যেখানে সব ধরনের প্রাণী তাদের যাবতীয় দর্শনানুপাত নিয়ে রয়েছে।

    নিশিপালনের লন্ঠন এবং চাদর, ঢেউয়ের শব্দ তোলে, রাতের বেলায়, জাহাজের কাঠামোর পাশে, হালকে ঘিরে।

    সমুদ্রের নিশিপালন যেন খেটে-খাওয়া অ্যামেলির স্তনযুগল।

    কারুকার্য-শোভিত পর্দাগুলো, কিছুটা ওপরদিকে তোলা, পান্নারঙা লেসের ঝালর, যাকে লক্ষ্য করে নিশিপালনের পায়রারা উড়ে যায়।

    কালো উনানের সামনের পাথর, সমুদ্রতীরের প্রকৃত সূর্য : আহ, ইন্দ্রজালের ঝর্ণা ; ভোরের একমাত্র দৃশ্য, ঠিক এখনই !

    অতীন্দ্রিয়

    ইল্যুমিনেশান ২১

    তীরের ঢালুতে দেবদূতেরা তাদের পশমের পোশাকে ইস্পাত আর পান্নার চারণভূমিতে পাক খায়।

    পাহাড়ের গোলাকার মাথার ওপরে লাফাতে থাকে আগুনশিখার মাঠ। বাঁদিকে খেতের আলগুলোকে পদদলিত করেছে পাক থেকে বেরিয়ে প্রতিটি হত্যা, প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি বিপর্যয়ের ধ্বনি। প্রান্তরেখার ওপারে ডানদিকে আরোহণরেখা, প্রগতির দিকে।

    এবং, যখন শীর্ষের কার্নিস দিয়ে গড়ে উঠছে ছবির মোচড় আর লাফিয়ে ওঠা মানবসমুদ্র আর রাত্রির শঙ্খধ্বনি।

    নক্ষত্র এবং আকাশের ফুলেল মিষ্টতা আর বাদবাকিরা নেমে আসে বাঁধের উল্টোদিকে, যেন চুবড়ির ভেতরে -- আমাদের মুখোমুখি, এবং গড়ে তোলে অতল মঞ্জরী এবং নিচের নীল।

    ঊষা

    ইল্যুমিনেশান ২২

    আমি গ্রীষ্মের ভোরকে গ্রহণ করে নিলুম।

    প্রাসাদগুলোর সামনে এখনও কোনোকিছুর নড়চড় নেই। জল মারা গিয়েছিল। বনানিঘেরা পথকে ভিড়ের ছায়া এখনও ছেড়ে যায়নি। আমি হাঁটছিলুম, তপ্ত শ্বাস নিচ্চিলুম, আর দামি পাথরগুলো ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলো, আর ডানাগুলো শব্দ না করে উড়লো।

    প্রথম অভিযানে, শীতল ফিকে আলোয় আগে থেকেই আলোকিত রাস্তায়, একটা ফুল আমাকে তার নাম জানালো।

    দেবদারু গাছে ঘেরা ফর্সা আলুলায়িত ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে হাসলুম : চাঁদির শীর্ষভূমির ওপরকার ঈশ্বরীকে চিনতে পারলুম।

    তারপর একের পর এক অবগুন্ঠন সরালুম। গলির ভেতরে ঢুকে, হাত নাড়ালুম। সমতলভূমিতে গিয়ে আমি মেয়েটিকে মোরগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করলুম। শহরে ঢুকে, মেয়েটি ঘণ্টাঘর আর গম্বুজের মাঝে পালিয়ে গেল, এবং, ভিখারির মতন শ্বেতপাথরের জেটি পেরিয়ে, আমি ওকে ধাওয়া করলুম।

    রাস্তার ওপর দিকে, জলপাই বনের কাছে, ওর অবগুন্ঠনসুদ্ধ ঘিরে ফেললুম মেয়েটিকে, আর অনুভব করলুম ওর বিশাল শরীর বেশ ছোটো। জঙ্গলের পাদদেশে পড়ে গেল ভোর আর বালকটি।

    ঘুম ভাঙতে, দুপুর।

    ফুলগুলো

    ইল্যুমিনেশান ২৩

    সোনার ছাদ থেকে -- রেশমের সুতো, ধূসর পাতলা কাপড়, সবুজ মখমল এবং স্ফটিকের চাকার মাঝে যা রোদ্দুরে ব্রোঞ্জের মতন কালো হয়ে যায় -- আমি লক্ষ্য করি চাঁদির সুতোর কারুকাজ-করা জাজিমের ওপরে ফেলেরাখা শেয়ালকাঁটা, চোখ এবং চুল।

    হলুদ সোনার টাকায় মণিরত্নের গুঁড়ো, পান্নার গম্বুজকে ধরে রেখেছে মেহগানি থাম, গোলাপজলকে ঘিরে সাদা সাটিনের টুকরো আর চুনীর মিহিন জল ছেটানো হয়েছে।

    বড়ো নীল চোখ আর তুষার-আঙ্গিকের কোনো দেবতার মতন, শ্বেতপাথরের ছাদে সমুদ্র ও আকাশ ডেকে আনছে কচি ও তরতাজা গোলাপগুচ্ছ।

    পার্থিব রাত্রি

    ইল্যুমিনেশান ২৪

    দেয়ালের প্রহসনমূলক ফাটল খুলে ফেলছে এক দমকা ঝড় -- ভাঙাচোরা ছাদগুলোর কড়িবরগাকে ঢেকে ফেলছে -- এলোমেলো করে দিচ্চে বাঁধের পাঁচিল -- অন্ধকার করে ফেলছে জানালাগুলো।

    দ্রাক্ষালতার থেকে দূরত্বে, সিংহমুখ নর্দমার ওপরে আমার পা রেখে --- আমি এই জুড়িগাড়িতে চাপলুম যার সময় সুস্পষ্টভাবে উত্তল কাচে লেখা, বাইরে বেরিয়ে আসা প্যানেল, আর ঢেউখেলানো বসার জায়গা। আমার তন্দ্রার শবযান, আলাদা করে দ্যায়, আমার বোকামির মেষপালকের কুঁড়েঘর, বাতিল রাজপথের মাটিতে আমার শকট বাঁক নেয় : এবং ঝাঁকুনির দরুণ ডানদিকের জানালায় ফিকে চাঁদনি আকারগুলো, গাছের পাতা, স্তন পাক খেতে থাকে।

    --একটা সবুজ আর একটা নীল, বেশ গভীর, দৃশ্যটাকে আক্রমণ করে। জোড়াতালি দেয়া নুড়িপথের ফলে ঘোড়ার বর্ম খুলে যায়।

    -- এখানে কেউ ঝড়ের জন্যে সিটি বাজায়, সোডোমের লোকজন আর জেরুজালেমের লোকজন, বন্য পশু এবং সৈন্যবাহিনী।

    ( -- ঘোড়ারগাড়ির চালক এবং স্বপ্নের প্রাণীরা কি আবার নিয়ে যাবে শ্বাসরুদ্ধকর ঝোপঝাড়ে, রেশমি বসন্তঋতুর চোখে আমাকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে। )

    --এবং আমাদের, চাবুক মেরে, লেহ্য জল আর ছড়িয়ে পড়া খরায়, কুকুরদের চিৎকারে গড়াগড়ির জন্যে পাঠানো হবে…

    --বাঁধের পাঁচিলগুলো এক নিঃশ্বাসে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

    সামুদ্রিক

    ইল্যুমিনেশান ২৫

    তামা ও চাঁদির রথ --

    চাঁদি ও ইস্পাতের জাহাজমুখ--

    সমুদ্রের ফেনায় লাঙল চালানো---

    কাঁটাগাছের খুঁটি ওপড়ানো।

    উষর প্রান্তরের বিস্তার,

    আর জোয়ার-ভাটায় আঁকা রেখা,

    পূর্বদিকে ঘুরতে-ঘুরতে বয়ে চলে যায়,

    জঙ্গলের থামগুলোর দিকে,

    জেটির খুঁটিগুলোর দিকে,

    যার লোহার বাতাগুলো আলোর ঘুর্ণিঝড়ে চূর্ণ।

    শীতকালের ভোজনোৎসব

    ইল্যুমিনেশান ২৬

    নাটুকে-মজার বস্তির পেছনদিকে আওয়াজের প্রপাত। গোলোকধাঁধার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা অ্যাভেনিউ আর বাগানে, চক্রাকার বাজি অনেকক্ষণ জ্বলে -- সূর্যোদয়ের সবুজ আর লাল। চুল-সাম্রাজ্যের বিনুনিতে হোরেসের কবিতার উপদেবীর দল -- গোলগাল সাইবেরিয় মহিলা, ফরাসি চিত্রকরের আঁকা ছবির মতন চিনা মেয়েরা।

    মানসিক যন্ত্রণা

    ইল্যুমিনেশান ২৭

    এরকম কি হতে পারে যে মেয়েটি আমাকে ক্ষমা পাইয়ে দেবে শাশ্বতভাবে বিধ্বস্ত উচ্চাকাঙ্খা থেকে-- বহুকালের দারিদ্র্যকে মেরামত করে আরামদায়ক সমাপ্তি ঘটাবে -- আমাদের মারাত্মক আলস্যের লজ্জায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে সাফল্যের দিন ?

    ( ও পামগাছ ! হীরক ! ভালোবাসা ! প্রাণশক্তি ! -- প্রতিটি আনন্দ ও গরিমার চেয়ে উচ্চতর !-- সবরকমের, সব জায়গায় -- রাক্ষস, দেবতা -- এখানে বসবাসের যৌবন ! )

    ঐন্দ্রজালিক বিজ্ঞান এবং সামাজিক ভাতৃত্বের আন্দোলনকে কি আদি স্বাধীনতার প্রগতিশীল পুনর্বাসন হিসাবে যত্নে পালন করা হবে ?...

    কিন্তু এই রক্তচোষা মেয়ে যে আমাদের শায়েস্তা করে সে হুকুম দেয় যে আমরা যেন ওর দেয়া খুদকুঁড়োয় নিজেদের মজায় রাখি, নয়তো আরও মজা চালিয়ে যাও।

    ক্লান্ত বাতাস এবং সমুদ্রের মাঝ দিয়ে জখমের গমন ; যন্ত্রণায়, খুনি জল এবং বাতাসের নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে ; হাসিমুখ অত্যাচারের মাঝ দিয়ে, তাদের কোলাহলপূর্ণ স্তব্ধতার দিকে।

    মেট্রপলিটান

    ইল্যুমিনেশান ২৮

    নীলাভ খাঁড়ি থেকে ওসিয়ানের সমুদ্র পর্যন্ত, গোলাপি ও কমলারঙের বালুকাবেলায়, মদের রঙের আকাশ যাকে ধুয়ে দিয়েছে, স্ফটিকের বীথি ওপরে উঠে গিয়ে আড়াআড়ি ভাগ করে ফেলেছে, যা তখনই দখল করে নিয়েছে গরিব কমবয়সী পরিবারেরা যারা ফলবিক্রেতাদের দোকানে কেনাকাটা করে। বৈভব নেই। -- এই নগর !

    আলকাতরার মরুভূমি থেকে, সরাসরি উড়াল দিয়ে কুয়াশার আতঙ্কজনক পরতগুলোর তলায় যে আকাশ বাঁক নেয়, পিছিয়ে যায়, নেমে যায়, তাকে গড়ে তুলেছে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া যা শোকার্ত সমুদ্র বিলিয়েছে, হেলমেট পরে পালিয়েছে, চাকা, জাহাজ, ঘোড়ার লেজের তলায় বাঁধা চামড়া -- সেই সংগ্রাম !

    মাথা তোলো : ওই ধনুকাকৃতি কাঠের সাঁকো ; সামারিয়ার শেষ সব্জি-উঠোন, শীতল রাতের দ্বারা কাঁপানো লন্ঠনের আলোয় উজ্বল মুখোশ ; আওয়াজ-তোলা পোশাকে বোকা জলপরী, নদীর তলদেশে ; মটরখেতে জ্বলজ্বলে করোটি -- এবং অন্যান্য অলীক ছায়ামূর্তির প্রবাহ -- গ্রামগুলো। রাস্তার দুই কিনারে রেইলিঙ আর দেয়াল, ঝোপঝাড়ের প্রসারণ থামাতে পারেনি, আর নৃশংস ফুলের দল যাকে তুমি বলবে আত্মা আর সহোদরা। একঘেয়েমি জাগানো নাটক-- রাইননদীর অতিঅভিজাতদের পরীদের গল্পের সম্পত্তি, জাপানি, প্যারাগুয়ের গুয়ারানি, ওরা প্রাচীনকালের সঙ্গীত বুঝতে পারার জন্যে এখনও যোগ্য -- সরাইখানা আছে যা আর সবসময় খোলা থাকে না-- আছে রাজকুমারীরা, আর যদি তুমি বেশি অভিভূত না হয়ে থাকো, নক্ষত্রদের অধ্যয়ন করো-- আকাশ।

    সকালে যখন, যুবতীটির সঙ্গে, তুমি তুষারের ফুলকির মাঝে লুটোলুটি খেয়েছিলে. সবুজ ঠোঁট, বরফ, কালো পতাকা আর নীলাভ আলোর রশ্মি, আর মেরু-সূর্যের বেগুনিরঙা সুগন্ধ -- তা তোমার জীবনীশক্তি।

    অমার্জিতের দল

    ইল্যুমিনেশান ২৯

    ঋতুদের আর দিনগুলোর অনেক পরে, লোকজন আর দেশগুলো, রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। )

    বীরত্বের পুরোনো তূর্যনিনাদ কাটিয়ে ওঠার পর -- আমাদের হৃদয়ে আর মাথায় আক্রমণ অব্যহত রেখেছে -- প্রাচীন গুপ্তঘাতকদের থেকে বেশ দূরে।

    --ওহ ! রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। )

    ভাবাবেশসমূহ !

    তুষারের ঝাপটায় ঝরছে আলোকচ্ছটা -- ভাবাবেশসমূহ ! -- জাগতিক হৃদয় থেকে ছোঁড়া হীরকের হাওয়ায় বৃষ্টিতে আগুন, আমাদের পোড়াবার জন্যে। -- হে জগতসংসার !--

    ( পুরোনো আশ্রয় এবং পুরোনো আগুনশিখা থেকে, যা তুমি শুনতে পাও আর অনুভব করো, )

    আলোকচ্ছটা এবং সামুদ্রিক ফেনা। সঙ্গীত, খাঁড়ির মন্থন আর নক্ষত্রে জমাটবাঁধা ঝুলন্ত তুষার।

    হে ভাবাবেশ, হে জগতসংসার, হে সঙ্গীত ! এবং এখানে, আকৃতি, ঘাম, চুল এবং দুই চোখ, ভেসে যায়। এবং শ্বেত অশ্রুজল, ফুটন্ত -- হে ভাবাবেশসমূহ ! -- এবং নারীকন্ঠস্বর পৌঁছে যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির তলদেশে এবং সুমেরুর গুহাগুলোয়।

    পতাকা...

    অভিক্ষিপ্ত সৈকতাংশ

    ইল্যুমিনেশান ৩০

    আমাদের গ্রামের বাড়ি আর তার বাগানের উল্টোদিকে সোনালি সকাল আর শিহরিত সন্ধ্যা খুঁজে পেল আমাদের দুই মাস্তুলঅলা পোত, সমুদ্র থেকে কিছুটা দূরে, তৈরি করে ফেলেছে শৈলান্তরীপ যা এপিরাসদেশ কিংবা গ্রিসের পেলোপনিজ, জাপানের প্রধান দ্বীপ, কিংবা আরবের মতন ছড়ানো!

    ফিরে-আসা তত্বে আলোকিত মন্দিরগুলো ; উপকূলের আধুনিক প্রতিরক্ষার অমেয় দৃশ্য ; উষ্ণমণ্ডলের ফুলদল আর গ্রিকদের আসবদেবতার নকশাকাটা বালিয়াড়ি ; কার্থেজের বড়ো খাল আর নোংরা ভেনিসের বাঁধ ; এটনা আগ্নেয়গিরির হালকা উদ্গীরণ, ফুলের আর গ্লেসিয়ারের জলের তৈরি তুষার-ফাটল ; জার্মান পপলার গাছে ঘেরা ধোপারঘাট ; জাপানি গাছের ঝাঁকড়া মাথায় ছাওয়া ঢালের ওপরে বর্ণনাতীত বাগান ; এবং স্কারবরো ও ব্রুকলিনের ‘রাজকীয়’ এবং ‘অভিজাতদের’ প্রাসাদের সামনেদিক ; আর তাদের দুই পাশে রেললাইন, খোঁড়াজমি, হোটেলের চড়াই, ইতালি, আমেরিকা, এশিয়ার সবচেয়ে মনোরম সবচেয়ে বিশাল নির্মাণ, বর্তমানে দামি আলোকমালায় ঝিলমিলে, পানীয় এবং মৃদুমন্দ বাতাস, ভ্রমণকারী ও সম্ভ্রান্তদের দ্বারা প্রভাবান্বিত-- যারা দিনের আলোয়, অনুমতি দ্যায়, সাগরতীরের দ্রুতলয়ী নাচিয়েদের -- এমনকি শিল্পের মঙ্গলময় অলঙ্কারের সঙ্গীতকে, যাতে প্রাসাদের সৈকতাংশের সামনেদিককে অবিশ্বাস্যভাবে সাজিয়ে তোলা যায়।

    দৃশ্যাবলী

    ইল্যুমিনেশান ৩১

    প্রাচীন মিলনানন্তক নাটক তার সমন্বয়কে অনুধাবন করে, তার রাখালিয়া কাহিনিকে বিভাজন করে : তক্তায় গড়া প্রশস্ত পথ।

    পাথুরে জমির ওপরে একদিক থেকে আরেকদিক পর্যন্ত কাঠের দীর্ঘ বাঁধ, যেখানে অসভ্য ভিড় পাতাহীন গাছের তলায় চলাফেরা করে।

    কালো পাতলা কাপড়ে তৈরি দরদালানগুলোয়, লন্ঠন-হাতে আর ফেলে যাওয়া পথচারীদের অনুসরণ,

    নাটুকে পাখি ঝাপট মেরে নেমে আসে রাজমিস্ত্রির তৈরি নৌকাসাঁকোয় যা দুলে ওঠে নামতে-থাকা দর্শকদের ভিড়ে ঢাকা দ্বীপপূঞ্জে।

    বাঁশি আর মদ্যপানে-ভরা গীতিকবিতামূলক দৃশ্য, ছাদের মাপের উঁচু ঢালের কোনাকুনি আধুনিক আড্ডার বৈঠকখানায় কিংবা প্রাচ্যদেশের প্রাচীন হলঘরে।

    ঝোপঝাড়ের ঝুঁটিতে ঘেরা অ্যামপিথিয়েটারের প্রান্তে ঐন্দ্রজালিক দৃশ্যাবলী কৌশল করে -- কিংবা সরে যায় এবং গ্রিসের বোয়েটিয়ানদের জন্যে সুর বাঁধে, দীর্ঘ গাছেদের সঞ্চরণশীল ছায়ায়, খেতের কিনারায়।

    শিলা-বিভাজনের কাছে মজার অপেরা আমাদের মঞ্চের ওপরে টুকরো হয়ে যায় যেখানে দশটা বিভাজক পরস্পরের সঙ্গে মেলে, যা গ্যালারি থেকে আলোর পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

    ঐতিহাসিক সন্ধ্যা

    ইল্যুমিনেশান ৩২

    যে সন্ধ্যাই হোক, বলতে গেলে, আমাদের আর্থিক আতঙ্ক থেকে যে পর্যটক ফিরে যাচ্ছেন, নিজেকে আবিষ্কার করেন, একজন গুরুর হাত চারণভূমির বীণাকে জাগিয়ে তোলে ; পুকুরের তলায় তাস খেলা হয়, আয়না, রানি আর অনুগতদের প্রিয় ; সেখানে রয়েছেন সন্তেরা, পালতোলা জাহাজ, ঐকতানের সূত্র, এবং সূর্যাস্তের কিংবদন্তিপ্রতীম সঙ্গীতময়তা।

    শিকারিদের আর দলবলকে দেখে ও ভয়ে কেঁপে ওঠে। নাটক ঝরে পড়ে তৃণাচ্ছাদিত ভূমির চাপড়ায়। এবং গরিব ও দুর্বলদের এই বোকামির স্তরে বড়োই অপর্যাপ্ত !

    ওর কেনা-গোলাম চোখে, জার্মানি চাঁদের দিকে মিনার তুলে উঠে যায় ; তার্তারদের মরুভূমিতে আলো জ্বলে ওঠে ; দিব্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে প্রাচীন বিদ্রোহ প্ররোচিত হতে থাকে ; সিঁড়ি আর পাথরের তৈরি আরামকেদারায় একটি ছোট্ট জগতসংসার, ফ্যাকাশে আর সমতল, তৈরি করা হবে। তারপর পরিচিত সমুদ্র ও রাত্রির নৃত্যানুষ্ঠান ; সদগুণহীন রসায়ন, এবং অসম্ভব সঙ্গীত।

    সেই একই বুর্জোয়া ইন্দ্রজাল যেখানে আমাদের ছোটো নৌকা নামিয়ে দ্যায় ! সবচেয়ে সাধারণ ডাক্তারও মনে করে যে ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে নিজেকে সমর্পণ করা আর সম্ভব নয়, এ হলো দৈহিক আত্মগ্লানির কুহেলিকা, যার নিরীক্ষণ ইতিমধ্যে এক দুর্দশা হয়ে উঠেছে।

    না ! বাষ্পঘরের মুহূর্ত, বাষ্পীভূত সমুদ্র, ভূগর্ভস্হ অগ্নিকাণ্ড, অনুবর্তী অগ্নিকাণ্ড, ঘুরে-বেড়ানো গ্রহ এবং তার ফলে উন্মূলন, বাইবেলে বর্ণিত যৎসামান্য ঈর্ষার নিশ্চয়তা এবং যে নিয়মশৃঙ্খলায় তা মৌলিক সাক্ষ্যপ্রদান করবে -- যাই হোক, তা কিংবদন্তির ব্যাপার নয় !

    বিচলন

    ইল্যুমিনেশান ৩৩

    জাঙ্গালের কিনারায় কারুকার্যময় ফিতের অবস্হানভঙ্গিমা,

    স্টিমারের পেছনদিকে খাঁড়ি,

    ঢালের দ্রুতি,

    স্রোতের বিস্তারিত দোল

    অসাধারণ আলোর মাঝ দিয়ে আকর্ষণ করে ভ্রমণকারীদের

    এবং রাসায়নিক পরিবর্তন

    উপত্যকার জলে পরিবেষ্টিত

    এবং ঝড়।

    এরা পৃথিবীকে জয় করেছে

    অন্বেষণ করেছে তাদের ব্যক্তিগত রাসায়নিক ধনসম্পদ ;

    তাদের ভ্রমণে সঙ্গ দ্যায় আমোদপ্রমোদ আর আরাম ;

    তারা নিজেদের সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে যায়

    জাতিদের সম্পর্কে, শ্রেনির এবং প্রাণীদের, এই জাহাজে

    বিশ্রাম করে এবং ঘুর্নি

    পাললিক আলোয়,

    অভীষ্টসন্ধানের ভয়ঙ্কর রাত্রিগুলোতে।

    কেননা জিনিসপত্র, রক্ত, ফুলদল, আগুন, রত্নাবলীর পারস্পরিক কথোপকথন থেকে,

    ধাবমান জাহাজের বারান্দায় উদ্বিগ্ন বিচার-বিবেচনা,

    --দেখতে পাওয়া যায়, জলের গতি দিয়ে চালিত পথের ওই দিকে খাতের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে

    দানবরা, অফুরান আলোয় আলোকিত করছে -- তাদের অভিষ্টসন্ধান ;

    নিজেদের সমন্বিত পরমানন্দের লক্ষ্যে,

    এবং আবিষ্কারের বীরত্বে।

    বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনার মধ্যে

    কমবয়সী যুগল জাহাজের কোনায় একা,

    --তা কি ক্ষমার যোগ্য আদিম লজ্জা ?-

    আর গান গাইছে ও পাহারা দিচ্ছে।

    তলদেশ

    ইল্যুমিনেশান ৩৪

    আমার মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে বাস্তব যেহেতু কন্টকময় --- তবু আমি নিজেকে আবিষ্কার করলুম, আমার প্রেয়সীর ডেরায়, তখন বেশ বড়ো এক নীল-ধূসর পাখি ছাদের আলসের দিকে উড়ে আসছিল কিংবা সন্ধ্যার ছায়ায় আমার ডানাকে অনুসরণ করছিল।

    বিছানার শিয়রের দিকের পায়ার কাছে, আমি তখন সামলাচ্ছিলুম, মেয়েটির আদরের মণিরত্ন এবং তার সেরা পার্থিব শিল্পকর্ম, বেগুনি মাড়ির এক বড়ো ভাল্লুক, লোমে দুঃখমাখানো, স্ফটিকের চোখ আর কনসোল-টেবিলের ওপরে রাখা চাঁদির বাসনপত্র

    তারা সব পরিণত হলো ছায়ায় এবং অগ্নিগর্ভ অ্যাকোয়েরিয়ামে।

    সকাল বেলায় -- জুনমাসের মারমুখো ভোর -- দৌড়ে চলে গেলুম মাঠে, যেন গাধা, যতোক্ষণ না ইতালির শহরতলির স্যাবাইন তরুণীরা এসে আমার ঘাড়ের ওপর পড়ছেন, আমার অভিযোগগুলো নিয়ে হাঁক পাড়লুম আর তড়পালুম।

    এইচ

    ইল্যুমিনেশান ৩৫

    যাকিছু দানবিক তা মালিনীর বিদকুটে অঙ্গভঙ্গীর অবমাননা করে। মেয়েটির একাকীত্ব হলো যৌনতার যন্ত্র ; ওর অবসন্নতা, প্রণয়োদ্দীপক কর্মশক্তি। শৈশবের দ্বারা কড়া নজরে রাখা, মেয়েটি ছিল, বিভিন্ন কালখণ্ডে, জাতিগুলোর অত্যুৎসাহী সুস্বাস্হবাহিকা। ওর দুয়ার গরিবিয়ানার জন্য অবারিত। সেখানে, যারা বেঁচে আছে তাদের নশ্বরতা মেয়েটির কামোচ্ছ্বাসে ও ক্রিয়ায় বিমূর্ত হয়ে ওঠে।

    --ওহ, রক্তে জবজবে মেঝেতে আনাড়ি প্রেমের ভয়ঙ্কর কাঁপুনি এবং স্বচ্ছ উদযানে খুঁজে পাবে মালিনীকে।

    প্রার্থনা

    ইল্যুমিনেশান ৩৬

    আমার সহোদরা ভোরিংঘেমের লুইজি ভানেনকে: -- উত্তর সমুদ্রের দিকে ফেরানো তার নীল খোঁপা। -- জাহাজডুবির কারণে।

    আমার সহোদরা লেওনি অবোয় দ্য’অ্যাশবিকে। ওটস দিয়ে তৈরি মদ ! -- গুঞ্জরিত, জঘন্য, গ্রীষ্মের ঘাস। -- মায়েদের এবং বাচ্চাদের অসুখের খাতিরে।

    লুলুকে -- রাক্ষসী -- যে ‘লেস অ্যামিস’ যুগের বাগ্মীতার প্রতি তার আকর্ষণ এখনও বজায় রেখেছে আর তার অসম্পূর্ণ শিক্ষার উদ্দেশে। পুরুষদের জন্য। --মাদাম অমুককে।

    যে বয়ঃসন্ধি আমার ছিল তার উদ্দেশে। এই বুড়ো সন্তকে, সন্ন্যাস কিংবা ধর্মপ্রচার। গরিবের প্রতিভাকে। এবং উচ্চপদস্হ যাজকদের।

    প্রতিটি ধর্মবিশ্বাসকে, ধর্মবিশ্বাসের স্মৃতিস্হানকে এবং সেই সমস্ত ঘটনা যার কাছে লোকে আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তের আকাঙ্খা অনুযায়ী কিংবা আমাদের নিজস্ব সঙ্কটপূর্ণ পঙ্কিলতার উদ্দেশে।

    এই সন্ধ্যায়, সুমেরুর তুষারচূড়ার সিরসেটোকে, মাছের মতন মোটা, আর দশ মাসের লালচে আলোর মতন ঝলমলে -- ( মেয়েটির হৃদয় পীতাভ তৈলস্ফটিক এবং স্ফুলিঙ্গসম ) -- আমার একমাত্র প্রার্থনা রাতের এলাকার মতন নিঃশব্দ এবং এই মরুঅঞ্চলের বিশৃঙ্খল সন্ত্রাসের চেয়েও দুঃসাহসী।

    যে কোনো মূল্যে এবং প্রতিটি পোশাকে, এমনকি আধ্যাত্মিক যাত্রাতেও। কিন্তু তারপর আর নয়।

    গণতন্ত্র

    ইল্যুমিনেশান ৩৭

    ‘পতাকা এগোয় অপরিচ্ছন্ন ভূদৃশ্যের মাঝে, আর আমাদের দেশোয়ালি বুলি ড্রামের আওয়াজকে মৃদু করে দ্যায়। দেশের মধ্যাংশে আমরা সবচেয়ে নিন্দিত বেশ্যালয়কে লালন করবো। যুক্তিপূর্ণ বিদ্রোহগুলোকে নির্বিবাদে নিকেশ করবো।

    মশলাদার এবং মদে বেহুঁশ দেশগুলোর উদ্দেশে ! -- সবচেয়ে দানবিক শোষণ, শিল্পোৎপাদনকারী বা মিলিটারি সেবার উদ্দেশে। এখান থেকে বিদায়, জানা নেই কোথায়। স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে আমরা গড়ে তুলব হিংস্র দর্শন : বিজ্ঞান সম্পর্কে অবিদিত, আমাদের আরামের জন্যে ছলনাময় : গলায় দড়ি দিক জগতসংসার। সেটাই আসল প্রগতি। ফরোয়ার্ড -- মার্চ !’

    পরী

    ইল্যুমিনেশান ৩৮

    নাক্ষত্রিক নৈঃশব্দে, হেলেনের জন্যে কুমারী ছায়ায় এবং অকম্পমান ঔজ্বল্যে সঞ্চারিত হচ্ছে প্রাণশক্তি। গ্রীষ্মের তাপ বোবা পাখিদের সোপর্দ করা হয়েছিল এবং অপরিহার্য আলস্য, একটা শোকাতুর দামের অতীত মৃত ভালোবাসা আর ডুবন্ত সুগন্ধের উপসাগরে এক বজরাকে উদ্দেশ্য করে।

    কাঠুরিয়াদের স্ত্রীদের চলনছন্দের পর, ধ্বংস হওয়া জঙ্গলের নীচের জলস্রোতের কলধ্বনিতে, এবং প্রতিধ্বনিত উপত্যকায় গোরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজে, আর নিষ্পাদপ প্রান্তরের কান্নায়।

    হেলেনের শৈশবের কারণে কেঁপে উঠতো ঝোপঝাড় আর ছায়ারা, গরিবের বুক, আর স্বর্গীয় কিংবদন্তি।

    আর ওর চোখদুটি এবং নৃত্য, দামি রশ্মির চেয়েও উন্নত, শীতের প্রভাব, আর মুহূর্তটির একক দৃশ্যের আনন্দ।

    যুদ্ধ

    ইল্যুমিনেশান ৩৯

    বাল্যকালে, আমার দর্শনানুপাতকে পরিশুদ্ধ করে দিয়েছিল বিশেষ আকাশ : যাবতীয় চরিত্রেরা আমার অবয়বে ছায়া ফেলেছিল। প্রপঞ্চরা সরে যেতো। এখন, মুহূর্তদের শাশ্বত সংক্রমণ

    এবং গণিতের অশেষ আমাকে এই জগতসংসারের মাঝ দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায় যেখানে আমি প্রতিটি নাগরিক সন্মানে আত্মসমর্পণ করি, অপরিচিত বাচ্চাদের দ্বারা এবং পরিব্যপ্ত অনুভূতির দ্বারা। আমি যুদ্ধের স্বপ্ন দেখি, যা সঠিক তার কিংবা শক্তিমত্তার, অভাবিত যুক্তি ছাড়াই। গানের একটা কলির মতন এটা অত্যন্ত সরল।

    দৈত্য

    ইল্যুমিনেশান ৪০

    ও হলো অনুরাগ এবং বর্তমান কেননা ও ফেনায়িত জলরাশির এবং গ্রীষ্মের শব্দাবলীর সামনে বাড়িটা গড়ে তুলেছে, ও যে কিনা খাদ্য আর পানীয়কে বিশুদ্ধ করেছে, ও যে কিনা অপসৃয়মান জায়গাগুলোর আকর্ষণ এবং সাময়িক নিবৃত্তির অতিমানবিক আনন্দ। ও হলো ভবিষ্যতের অনুরাগ, যে ক্ষমতা ও ভালোবাসায় আমরা, ক্রোধ ও ক্লান্তিকে ধরে রাখি, দেখি আমাদের পাশ কাটিয়ে পতাকাগুলোর মহোল্লাসের ভেতর দিয়ে ঝোড়ো আকাশের পানে চলে যাচ্ছে।

    ও হলো ভালোবাসা, নিখুঁত এবং পুনরাবিষ্কৃত পরিমাপ, দারুণ এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফলে, এবং অসীম-অনন্ত : মারাত্মক ক্ষমতার প্রিয়তম যন্ত্র। আমাদের নিজেদের এবং ওর আত্মসমর্পণের ত্রাস সম্পর্কে আমরা জানি : হে আমাদের স্বাস্হ্যের আনন্দ, আমাদের মৌলিক মানসিক শক্তির প্রেরণা, ওর জন্যে স্বার্থপর অনুরাগ ও আবেগ, ও যে কিনা ওর অনন্তকালীন জীবনে আমাদের ভালোবাসে…। এবং আমরা ওকে ডাকি আর ও সঙ্গ দেয় আমাদের...। এবং যদি আদর ফুরিয়ে যায়, তা অনুরণিত হয়, ওর প্রতিজ্ঞা প্রতিধ্বনিত হয় : ‘এই সমস্ত কুসংস্কার দূর হোক, এই পুরোনো দেহগুলো, এই বাড়িঘর এবং এই সমস্ত কালখণ্ড। আসলে এই নবযুগ অন্ধকার !’

    ও যাবে না ; ও আবার কোনো স্বর্গ থেকে নেমে আসবে না, ও নারীর ক্রোধ ও পুরুষের হর্ষকে, এবং যাবতীয় পাপের মুক্তি খুঁজে পাবে না : কেননা তা ফুরিয়ে গেছে, ওর অস্তিত্ব আছে, আর ওকে লোকে ভালোবাসে।

    হে ওর শ্বাসপ্রশ্বাস, ওর মস্তক, ওর ছুটে চলা : আঙ্গিক ও কর্মশীলতার পূর্ণতাপ্রাপ্তির অসম্ভব দ্রুতি!

    হে মননশক্তির এবং বিশ্বলোকের বিশালতার বহুপ্রসূতা !

    ওর দেহ ! স্বপ্নে দেখা উত্তরণ, নব্য-সন্ত্রাসের মুখোমুখি চুরমার ঐশ্বরিক করুণা !

    ওকে নাগাল পাওয়া, ওর নাগাল পাওয়া ! ও পাশ দিয়ে চলে গেলে পুরোনো হাঁটুগাড়া আর ব্যথা উধাও হয়।

    ওর আলো ! যাবতীয় নাকিসুর এবং অসহ্য কষ্ট গভীর সঙ্গীতে বিলুপ্ত হয়।

    ওর পদক্ষেপ ! প্রাচীন আক্রমণের তুলনায় প্রচরণশীলতা আরও অস্বাভাবিক।

    হে ও আর আমরা ! অন্যের পরিত্যক্ত সেবার চেয়ে গর্ববোধ বেশি দয়ালু।

    হে জগতসংসার ! এবং নতুন দুর্ভাগ্যের সুস্পষ্ট গান !

    ও আমাদের সবাইকে জেনেছে এবং ভালোবেসেছে। আজকের এই শীতের রাতে হয়তো আমরা জানতে পারবো, অন্তরীপ থেকে অন্তরীপে, বিক্ষুব্ধ মেরু থেকে জমিদারের পল্লীভবন পর্যন্ত, ভিড় থেকে বালিয়াড়ি পর্যন্ত, চাউনি থেকে চাউনি পর্যন্ত, শক্তি ও অনুভব ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কেমন করে ওকে অভিবাদন জানানো হবে আর দেখা হবে, এবং আবার পাঠিয়ে দেয়া হবে ওর যাত্রায়, আর জোয়ারের তলায় ও তুষারের মরুভূমির ওপরে, ওর দৃষ্টিপ্রতিভাকে অনুসরণ করে, ওর নিঃশ্বাস, ওর দেহ, ওর আলো।

    যৌবন

    ইল্যুমিনেশান ৪১

    রবিবার

    সমস্যা তো আছেই, আকাশ থেকে অবধারিত পতন আর স্মৃতির আগমন এবং একত্রিত ছন্দ বাসাকে দখল করে নেয়, মাথাকে আর জগতসংসারের মনকে।

    --বনানী আর খেত পেরিয়ে একটা ঘোড়া শহরতলির ঘাসে দৌড়োতে আরম্ভ করে, প্লেগের অঙ্গারে ঝাঁঝরা। কোনো নাটকে একজন দুস্হ মহিলা, জগতসংসারের কোথাও, পরিত্যক্ত হবার অসম্ভাব্যতায় দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে। বেপরোয়া লোকেরা ঝড়ের, মাতলামির আর আঘাতের জন্যে অপেক্ষা করে আছে। নদীর ধারে ছোট্ট বাচ্চারা অভিশাপের কন্ঠরোধ করে।

    এবার আমাদের সমীক্ষা আবার শুরু করা যাক যা জনগণের মাঝে জেগে-ওঠা ক্লান্তিকর কাজের দ্বারা জড়ো করা হয়েছে।

    সনেট

    স্বাভাবিক গড়নের পুরুষ, বাগানে ঝুলন্ত ফলের মাংসে তৈরি নয়, ওহ শৈশবের দিনগুলো ! দেহ হলো হেলাফেলায় নষ্ট করার ধনসম্পদ ; ওহ, প্রেমে, মননের দোষ না শক্তি ? রাজপুত্র এবং শিল্পীতে পৃথিবীর ঢালু অংশ ছিল উর্বর, এবং বংশধররা ও জাতি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অপরাধ ও শোকে : জগতসংসার, তোমার ভাগ্য ও তোমার বিপদ। কিন্তু এখন, সেই খাটুনির পুরস্কার, তুমি, তোমার হিসেবনিকেশ, তুমি, তোমার ধৈর্যহীনতা, তোমার নাচের ও কন্ঠস্বরের চেয়ে বেশি কিছু নয়, স্হিরীকৃত নয়, বলপ্রয়োগ করেও নয়, যদিও আবিষ্কার ও যুক্তির দ্বিগুণ সাফল্যের ফলাফলের দ্বারা, নিজেকে জাহির না করে এবং ভাতৃত্ববোধের মানবিকতায়, চিত্রহীন ভূমণ্ডলে -- শক্তিমত্তা ও অধিকার প্রতিফলিত করে সেই নৃত্য ও কন্ঠস্বরকে, যা কেবল এখনই প্রশংসিত...

    কুড়ি বছর

    নির্দেশক কন্ঠস্বর নির্বাসিত...দৈহিক অকপটতা তিক্তভাবে বাসি...ধীর লয়ের সঙ্গীত। আহ, বয়ঃসন্ধির অশেষ অহংকার, সাগ্রহ আশাবাদ : সেই গ্রীষ্মে, কতো ফুলে ভরা ছিল জগতসংসার ! বাতাস ও আদল শুকিয়ে যাচ্ছে...নপুংসকতা ও অনুপস্হিতিকে প্রশান্ত করার জন্যে গির্জার ঐকতান গায়কমণ্ডলী। কাচের ঐকতানমণ্ডলী রাতের সুর...সত্যিই স্নায়ুরা সত্বর শিকারে বেরোবে।

    তুমি এখনও অ্যান্টনির প্রলোভনে আকর্ষিত। ছেঁটে-ফেলা উৎসাহের সঙ, তুচ্ছ গর্ববোধের আক্ষেপ, দুর্বল হয়ে চলেছো, এবং সন্ত্রস্ত। কিন্তু তুমি নিজেকে কাজে লাগাবে : তোমার উচ্চাসনের চারিধারে যাবতীয় ঐকতানময় ও স্হাপত্যের সম্ভাবনা ঘুরে বেড়াবে। অদেখা নিখুঁত প্রাণীরা তোমার নিরীক্ষায় আত্মসমর্পণ করবে। তোমার চারিপাশে জড়ো হবে প্রাচীন জনগণের স্বপ্নালু কৌতূহল এবং অলস বৈভব। তোমার স্মৃতি এবং তোমার ইন্দ্রিয়েরা তোমার সৃষ্টির আবেগের খোরাক হয়ে উঠবে। আর যদি জগতসংসারের কথা বলো, তুমি উঠে দাঁড়াবে, তাতে কীই বা হবে ? কিচ্ছু নয়, যতোই যাই হোক, বর্তমানে যা আঁচ করা যাচ্ছে।

    বিক্রয়

    ইল্যুমিনেশান ৪২

    বন্ধকী কারবারিরা যা বিক্রি করেনি তা বিক্রয়ের জন্যে, আভিজাত্য ও অপরাধ যে অভিজ্ঞতা আস্বাদন করেনি, যা প্রেমের কাছে এবং জনসাধারণের নারকীয় সততার কাছে অজানা; তাকে সমসময় ও বিজ্ঞানের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই :

    কন্ঠস্বরগুলোর পুনর্গঠন হয়েছে ; তাবৎ ঐকতানীয় ও সুরসংযোজিত কর্মচাঞ্চল্য এবং তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োগ ; উপলক্ষ, একক, আমাদের ইন্দ্রিয়কে মুক্ত করার জন্য !

    দামের চেয়ে বেশি দরে দেহ বিক্রির জন্যে, অপরিচিত জাতির, জগতের, যৌনতার, কিংবা অধঃপতনের জন্য !

    প্রতি পদক্ষেপে ধনদৌলতের উৎসার ! হীরের অবাধ বিক্রি !

    জনগণকে বিক্রির জন্য নৈরাজ্য ; রসপণ্ডিতদের জন্য অদম্য আনন্দ ; প্রেমিক-প্রেমিকার জন্যে, অনুগতদের জন্যে নৃশংস মৃত্যু !

    বিক্রির জন্য রয়েছে বসত এবং স্হানান্তর, খেলধুলা, নিখুঁত পুলক ও আরাম, এবং শব্দাবলী, প্রণোদন ও যে ভবিষ্যৎ তারা গড়ে তুলবে !

    বিক্রির জন্যে রয়েছে শোনা যায়নি এমন গণনা ও ঐকতান-ধাবনের প্রয়োগ

    আকস্মিকতা আবিষ্কার করে অভাবিত স্হিতিকাল, তার তাৎক্ষণিক মালিকানাসহ।

    অদৃশ্য সমারোহ, অননুভবনীয় পরমানন্দের প্রতি আরণ্যক ও অশেষ আবেগ, সঙ্গে তাদের প্রতিটি পঙ্কিলতার জন্যে এবং ভিড়ের ভয়াবহ চালচলনের জন্যে পাগলকরা গোপনীয়তা।

    বিক্রির জন্য রয়েছে দেহ, কন্ঠস্বর, প্রচুর প্রশ্নাতীত ধনদৌলত, সবকিছুই যা কখনই বিক্রির জন্যে নয়। বিক্রেতারা এখনও পর্যন্ত তাদের মাল শেষ করতে পারেনি ! বহুদিন পর্যন্ত দোকানদাররা তাদের বেতন দাবি করতে পারবে না !

    [ রচনাকাল ১৮৭৩ - ১৮৭৫ ]

    [ অনুবাদ : ২০১৯ ]

    জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : ইল্যুমিনেশানস

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    বানভাসির পর

    ইল্যুমিনেশান ১

    বানভাসির ধারনা শেষ হবার পরই, একটা খোরগোশ গোরুর গোয়ালে আর দুলতেথাকা ফুলগাছের কাছে থমকে দাঁড়িয়ে, মাকড়সার জালের ভেতর দিয়ে রামধনুকে প্রার্থনা শোনালো।

    ওহ ! যে দামি পাথরগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, -- ফুলগুলো নিজেদের চারিধারে তাকিয়ে দেখছিল। নোংরা রাজপথে দোকান বসেছিল, তারা নৌকোগুলোকে টেনে নিয়ে গেল পরতে-পরতে ফুলে ওঠা সমুদ্রের ঢেউয়ে ঠিক যেমন পুরোনো ছবিগুলোতে দেখা যায়।

    যে নীলদাড়ি লোকটা নিজের বউগুলোকে একের পর এক মেরে ফেলতো, তার বাড়িতে রক্ত বইতে লাগল --- সারকাসের কসাইখানায় ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা শাদা করে তুলছিল জানালাগুলোকে। রক্ত আর দুধ বইছিল।

    ভোঁদোড়েরা গড়েছিল। শুঁড়িখানায় কফির পেয়ালায় উঠছিল ধোঁয়া।

    চারাগাছের বিশাল কাচঘরে জলফোঁটা ঝরছিল তখনও, সুন্দর ছবিগুলোর দিকে চেয়েছিল শোকাতুর শিশুরা।

    দরোজার পাল্লার আওয়াজ, আর, গ্রামের সবুজে, এক খোকা দুই হাত নাড়ালো, বেগবান ঝর্ণার তলায়, সব জায়গাকার ঘণ্টাঘরের হাওয়ামোরগ আর আবহাওয়া নির্দেশকগুলো তা টের পাচ্ছিল।

    ম্যাডাম অমুক আল্পস পাহাড়ে একটা পিয়ানো বসালেন। গির্জার একশো হাজার বেদির ওপরে উদযাপন করা হচ্ছিল খ্রিস্টের নৈশভোজনোৎসব-পর্ব আর প্রথম ধর্মসংস্কার।

    চলে গেল মরুযাত্রীদল। আর বরফ ও মেরুরাত্রির বিশৃঙ্খলায় তৈরি করা হলো দীপ্তিশীল হোটেল।

    তারপর থেকে, সুগন্ধগুল্মের মরুভূমিতে শেয়ালের ডাক শুনতে পেল চাঁদ -- আর ফলবাগানে কাঠের জুতো পরে চারণকবিতাদের অসন্তুষ্ট বিড়বিড়ানি। তারপর, থইথই বেগনি জঙ্গলে, বনানীর উপদেবী আমাকে বললো যে এটা বসন্তঋতু।

    ঝিলপুকুর, ফুলে ওঠো : ফেনায়িত হও, সাঁকোর ওপর আর গাছের তলা দিয়ে গড়িয়ে চলে যাও: -- কালো ঝালর আর অবয়ব -- বজ্র ও বিদ্যুৎ উঠে দাঁড়াও আর ঝাঁপাও : -- জল এবং দুঃখ ওঠো আর আরেকবার বানভাসিকে তুলে আনো।

    জল নেমে গিয়েছিল বলে -- ওহ, দামি পাথরগুলো নিজেরা চাপা পড়ে গিয়েছিল আর ফুটে ওঠা ফুলের দল ! -- তা বড়োই ক্লান্তিকর ! আর সেই ডাকিনী রানি, যিনি পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরি পাত্রে আগুন জ্বালান, কখনও বলবেন না তিনি যা জানেন, আর আমরা কোন ব্যাপারে অবিদিত।

    শৈশব

    ইল্যুমিনেশান ২

    পূর্বপুরুষহীন কিংবা দরবারহীন প্রতিমা, কালোচোখ আর হলুদ-চুল, কিংবদন্তির চেয়েও সম্ভ্রান্ত, মেক্সিকোর কিংবা ফ্লানডার্সের : তার দেশ দুর্বিনীত সোনালি আর সবুজ, ঢেউয়ের নামে আঁকা সমুদ্রতীরকে পাক দেয়, জলপোতহীন, যাদের নাম ভয়ানকভাবে গ্রিক, স্লাভ, কেল্টভাষী।

    জঙ্গলের শেষে -- স্বপ্নেদেখা রুনুঝুনু ফুল : ফুটে ওঠে, ছড়িয়ে পড়ে -- কমলারঙা ঠোঁটের মেয়েটি, পশুচারণভূমি থেকে ছলকানো বানভাসির পরিষ্কার জলে হাঁটুমুড়ে, নগ্নতা ছায়ায় ঢাকা, তির্যক রামধনুর পোশাক পরানো ; ফুলের দল এবং সমুদ্র।

    সমুদ্রের ধারে ছাদের ওপরে যে নারীরা পায়চারি করেন : অনেকে খুকি আর বিশালদেহ, তামাটে শ্যাওলায় অসাধারণ কৃষ্ণাঙ্গী, তরুবীথিকার উর্বর মাটিতে সাজানো মণিরত্ন এবং ছোটোখাটো গলাতুষার বাগান -- তরুণী মায়েরা আর বড়োদিদিরা যাদের মুখময় তীর্থযাত্রার প্রলেপ, প্রজাপীড়ক সাজপোশাকে নবাবজাদীরা, রাজকন্যারা, ছোটোছোটো বিদেশী মেয়েরা আর সুশীল অসুখী জনসাধারণ।

    বড়োই একঘে্য়ে, ‘প্রিয়তম শরীর’ এবং ‘মহার্ঘ হৃদয়’ !

    এ তো সে, গোলাপঝাড়ের পেছনে, মৃত খুকিটা। -- কম বয়সী মা, মারা গেছে, সিঁড়ি দিয়ে নামে। -- খুড়তুতো ভাইয়ের গাড়ি বালির ওপরে খোনাস্বর আওয়াজ তোলে। -- ছোট্ট ভাই ( সে ভারতবর্ষে থাকে ! ) সেখানে, সূর্যাস্তের সামনে, কারনেশান ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে। দেয়ালের ফুলে ছেয়ে থাকা বাঁধের ওপরে বুড়োদের সোজা করে কবর দেয়া হয়েছে।

    সেনাপতির বাড়ির চারিপাশ ঘিরে আছে সোনালি পাতার ঝাড়। ওরা সবাই দক্ষিণে। -- তুমি লালরঙা পথ ধরে ফাঁকা সরাইখানায় পৌঁছে যাও। জমিদারের গ্রামের বাড়ি বিক্রি হবে : খড়খড়িগুলো ঢিলেঢালা। -- পাদরিসাহেব চাবি নিয়ে গির্জায় চলে গিয়ে থাকবেন। -- পার্কের কাছাকাছি পাহারাদারদের কুটিরগুলো ভাড়া দেয়া হয়নি। বেড়াগুলো এতো উঁচু যে তুমি গাছের মাথার ঘষটানি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না।

    চারণভূমিগুলো উঠে গেছে মুরগিবর্জিত গ্রামগুলোর দিকে, কামারের নেহাইও নেই। জলকপাট ওপরে তোলা। হে বনজঙ্গলের ক্রুশকাঠ আর হাওয়াকল, দ্বীপপূঞ্জ আর ধোঁয়া-চিমনির সারি।

    ম্যাজিক ফুলেদের গূঞ্জন। ঢালু জায়গা ওকে কোল দিয়েছিল। চারিদিকে ঘুরছিল রূপকথার বাহারঅলা প্রাণী। শাশ্বত উষ্ণ চোখের জলে তৈরি মেঘেরা জড়ো হচ্ছিল ফাঁকা সমুদ্রের ওপরে।

    বনের ভেতরে একটা পাখি রয়েছে, তার গান তোমাকে থামিয়ে দেয় আর আরক্তিম করে তোলে।

    একটা দেয়ালঘড়ি রয়েছে যা কখনও বাজে না।

    একটা গর্তে রয়েছে শাদা প্রাণীর বাসা।

    একটা গির্জা রয়েছে যা নামছে, আর একটা ঝিল যা ওপরে উঠছে।

    বেড়ার ঝাড়ের আড়ালে রাখা রয়েছে রাঙা ফিতেয় সাজানো ছোট্ট ঘোড়ারগাড়ি, কিংবা গলি ধরে দৌড়োচ্ছে,

    বনের আড়াল থেকে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে পোশাকপরা ছোটো অভিনেতাদের দল।

    শেষ পর্যন্ত, কেউ তো রয়েছে, যখন তুমি ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত, যে তোমাকে তাড়িয়ে দিলো।

    ছাদের ওপরে প্রার্থনারত আমিই সেই সন্ত --- যখন শান্তিময় জানোয়ারেরা প্যালেসটাইনের সমুদ্র পর্যন্ত চরে ঘাস খেতে গেছে।

    অন্ধকার আরামকেদারায় আমিই সেই পণ্ডিত। গ্রন্হাগারের জানালায় গাছের ডালপালা আর বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

    বেঁটে গাছের বনের ভেতর দিয়ে যে পথ দেখা যাচ্ছে, আমিই তার পর্যটক : আমার পদধ্বনিকে নিঃশব্দ করে দিচ্ছে খোলা জলকপাটের গর্জন। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখতে থাকি সূর্যাস্তের দুঃখি সোনালি প্রক্ষালন।

    আমি হয়তো সেই বালক যে সমুদ্রে ভেসে-যাওয়া জেটির ওপরে রয়ে গেছে, চাষিবাড়ির ছোটো ছেলে যে গলি ধরে হেঁটে যাচ্ছে তার চুলের ঝুঁটি আকাশ ছুঁয়েছে।

    পথগুলো অসমতল। ছোটো ঢিবিগুলো ঝাঁকড়াগাছে ঢাকা। হাওয়া নিশ্চল। পাখিগুলো আর ঝর্ণা আর কতো দূরে ! সামনে সেটাই হয়তো পৃথিবীর শেষপ্রান্ত।

    মাটির অনেক গভীরে -- রেখায় নকশাকাটা, চুনকামকরা, শেষের দিকের এই স্মৃতিস্তম্ভ ওরা আমায় ভাড়া দিক।

    টেবিলে হেলে পড়ি, লন্ঠনের আলো ঝলমল করে তুলেছে যে পত্রিকাগুলো সেইগুলো আমি বোকার মতন দ্বিতীয়বার পড়ি, অথচ বইগুলোতে আর আগ্রহ নেই।

    মাটির তলায় আমার বাসার ওপরে অনেক দূরে বাড়িঘরের ভিতপোঁতা, কুহেলিকা জড়ো হয়। মাটির রঙ লাল কিংবা কালো। দানবিক শহর, শেষহীন রাত !

    তলায় রয়েছে নর্দমা। পাশটা কেবল কাচের পাত্রের মতন পুরু। হয়তো স্হলবেষ্টিত আশমানি উপসাগর, আগুনের কুয়ো, উপসাগর। হয়তো এই স্তরে চাঁদ আর ধুমকেতু, সমুদ্র আর কিংবদন্তির সাক্ষাৎ ঘটে।

    তিক্ত মানসিকতার সময়ে আমি ধাতুর, নীলকান্তমণির গোলকের কল্পনা করি। আমি নৈঃশব্দের প্রভূ। ধনুকের মতন ছাদের কোনায় কেনই বা কাচফোকরের মতন দেখতে জায়গাটার আলো ফিকে হয়ে আসবে ?

    গল্প

    ইল্যুমিনেশান ৩

    মামুলি বদান্যতায় নিজেকে একবার দিয়ে ফেলা দক্ষতা সম্পর্কে একজন রাজপুত্র অত্যন্ত কূপিত ছিল। ভবিষ্যতে প্রেমের যে বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটবে তা ও দেখতে পাচ্ছিল, আর সন্দেহ করছিল যে ওর স্ত্রীদের রয়েছে বিলাসদ্রব্য আর আকাশের দেয়া সন্তোষ-উৎপাদন বাড়িয়ে তোলার চেয়েও বেশি চাহিদা। ও সত্য ঘটনা জানতে চাইছিল, আকাঙ্খা আর বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়োজন জানতে চাইছিল। তা স্বধর্ম থেকে বিপথগমন হোক বা নাহোক ও জানতে চাইছিল। ওর অন্তত ছিল যথেষ্ট জাগতিক ক্ষমতা।

    প্রতিটি নারী যে ওকে জানতো, খুন হয়ে যেতো গুপ্তঘাতকদের হাতে। সৌন্দর্যের বাগানে কি যে ব্যাপক ধ্বংস ! খাঁড়ার তলায় তারা ওকে আশীর্বাদ করেছিল। ও আর নতুন করে কাউকে চায়নি। --সেই নারীরা আবার দেখা দিলো।

    যারা ওকে অনুসরণ করেছিল তাদের, শিকারের পর কিংবা মদে মাতাল হয়ে, সবাইকে ও হত্যা করল। -- সবাই ওকে অনুসরণ করা বজায় রাখল।

    বিরল প্রাণীদের গলা কেটে নিজেকে ও আনন্দ দিতো। প্রাসাদগুলোয় ও আগুন ধরিয়ে দিলো। জনসাধারণের ওপর দিয়ে গিয়ে তাদের কুটিকুটি করে ফেললো। -- জনসাধারণ, সোনালি ছাদ, সুন্দর প্রাণীরা তবু বেঁচে রইলো।

    কেউ কি ধ্বংসে খুঁজে পায় চরমানন্দ, নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে নিজেকে আবার তরুণ করে তুলতে পারে ? জনসাধারণ টুঁ শব্দও করেনি। কেউ ওর দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করতে এগিয়ে যায়নি। এক সন্ধ্যায় ও গর্বে ঘোড়ায় বসে তাকে ছোটাচ্ছিল। এক ডাকিনী দেখা দিলো, অনির্বচনীয়া এমনকি লজ্জাময়ী সুন্দরী। রাজপুত্রের মুখ আর ইশারায় দেখা গেল বহুবার জটিল প্রেম করার পুর্বলক্ষণ, বলার অযোগ্য এমনকি অসহিষ্ণু আনন্দ ! রাজপুত্র আর ডাকিনী সম্ভবত অন্তরজগতের ক্ষমতার দ্বারা পরস্পরকে হত্যা করল। কেমন করেই বা তারা পরস্পরকে এইভাবে মরতে সাহায্য করলো? লোকে যেমন বলে থাকে, ওরা মারা গেছে।

    তবু রাজপুত্র নিজের প্রাসাদে বুড়ো হয়ে মারা গেল। রাজপুত্রই আসলে ডাকিনী ছিল। ডাকিনী ছিল রাজপুত্র।

    সূক্ষ্ম সঙ্গীত আমাদের চাহিদার তুলনায় কম ।

    প্যারেড

    ইল্যুমিনেশান ৪

    ভাঁড়গুলো বেশ পালোয়ান। অনেকে তোমার শব্দগুলোকে শোষণ করেছে। প্রয়োজনহীন, তোমার বিবেক সম্পর্কে ওদের বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষমতা নিয়ে খেলা করার কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

    কতো পাকতাড়ুয়া ওরা ! গ্রীষ্মরাতের মতন চোখদুটো হতবুদ্ধিময়, লাল আর কালো, তিনরঙা, ইস্পাতে সোনালি নক্ষত্র দেগে দেয়া ; আকৃতি বিকলাঙ্গ, সীসায় ভারি, ফ্যাকাশে, আগুনলাগা ; খসখসে গলার তড়িংবিড়িং নাচিয়েরা ! ফিকে হয়ে যাওয়া কারুকাজের নিষ্ঠুর দম্ভচলন ! --কেউ কেউ কমবয়সী--চেরুবিনোকে ওরা কোন দৃষ্টিতে দ্যাখে ? -- বিপজ্জনক সঙ্গতি আর আতঙ্ক-জাগানো কন্ঠস্বরের মালিক ওরা। শহরের রাস্তায় ওদের পাঠিয়ে দেয়া হয় খদ্দের ধরার জন্যে, বিরক্তিকর অলঙ্কারে সাজিয়ে

    ওহ পাগলামির ভেংচিকাটা নৃশংস পারিজাত ! তোমার ফকির আর নাটুকে ভাঁড়ামো থেকে দূরে।

    বিনা প্রস্তুতিতে তৈরি দুঃস্বপ্নে পাওয়া পোশাক পরে ওরা ডাকাতদের উপদেবতাদের রোমান্টিক, বিয়োগান্তক, আধ্যাত্মিক ধর্মকাহিনির নাটক করে যে ঘটনাগুলো আদপে কখনও ঘটেনি। চীনা, হটেনটট, ভবঘুরে, মূর্খ, হায়েনা, রক্তখেকো দেবতা, পুরোনো পাগলামি, ভয়ংকর রাক্ষস, জনপ্রিয় গৃহস্হ প্রবণতাকে পাশবিক ভঙ্গী আর আদরের সঙ্গে মিশিয়ে ফ্যালে। ওরা নতুন স্বরলিপি আর মিষ্টি গানের জন্যে অপেক্ষা করছে। ওস্তাদ ভোজবাজিকর, ওরা জনগণকে আর জায়গাকে বদলে ফেলে চৌম্বক মঞ্চপদ্ধতি দেখায়। ফুলে-ওঠা চোখে, রক্ত গান গায়, হাড় পুরু হয়ে ওঠে, চোখের জল আর গালের রুজ গড়িয়ে পড়ে। ওদের গরাদ আর সন্ত্রাস মুহূর্তের জন্যে বা কয়েক মাস বজায় থাকে।

    এই বর্বর প্যারেডের চাবিকাঠি আছে শুধু আমার হেফাজতে।

    সেকেলে

    ইল্যুমিনেশান ৫

    গ্রিক অধিদেবতা প্যান-এর করুণাময় ছেলে ! ধনুকের মতন তোমার ভ্রুযুগল ফুলের তোড়ায় ঢাকা আর চোখ যেন বৈঁচিফল, মহার্ঘ শ্রবণসঙ্গীত, এগিয়ে চলো। মদের বাদামি তলানির রঙে রাঙানো ; তোমার গালগুলো ভেতরে ঢোকা। তোমার চোখ-দাঁত ফ্যাকাশে। তোমার বুক এক বাদ্যযন্ত্র, তোমার ফ্যাকাশে হাতে তারগুলো বেজে ওঠে। তোমার পেটের ভেতরে স্পন্দন হয় যেখানে একজোড়া যৌনতা ঘুমোয়। রাতের বেলা, হেঁটে যাও, উরুকে সামান্য তুলে, তারপর অন্য উরু আর ওই বাঁ পা।

    শোভাময় হয়ে ওঠা

    ইল্যুমিনেশান ৬

    তুষারপাতের উল্টোদিকে, এক ঢ্যাঙা সৌন্দর্যের প্রতিমা। এই আদর-পাওয়া দেহকে মৃত্যুর বাঁশি আর ঘিরেফেলা মৃদু সঙ্গীত ফাঁপিয়ে তোলে, এমনভাবে ফুলে ওঠে আর কাঁপে যেন ভুত : অসাধারণ মাংস থেকে রক্তবর্ণ আর কালো ঘা ফেটে বেরোয়। জীবনের জন্য যুৎসই রঙগুলো গভীর হয়ে ওঠে, নাচতে থাকে আর গড়ে উঠতে-থাকা এই দৃষ্টিপ্রতিভা থেকে নিজেদের আলাদা করে ফ্যালে। কাঁপুনি তোলে আর আর্তনাদ করে যন্ত্রণায় আর এদের মদমত্ত সুগন্ধের প্রভাব ভরে দেয় সেই জাগতিক আর ভাসন্ত সঙ্গীতকে যা জগতসংসার, অনেক পেছনে, আমাদের সৌন্দর্যমাতার দিকে ছুঁড়ে মারে -- সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, দুই পায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ায়। ওহ, আমাদের হাড়ে পরানো হয়েছে এক নতুন প্রণয়োদ্দীপক দেহ ! ওহ, ফ্যাকাশে মুখশ্রী ; ঘোড়ার চুলে-সাজানো ঢাল, কেলাসিত বাহু ! গাছের জঙ্গল আর ওজনহীন বাতাসের ভেতর দিয়ে আমাকে কামান দাগতে হবে !

    জীবনসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ৭

    ওহ পবিত্রভূমির বিশাল অ্যাভেনিউগুলো, মন্দিরের চূড়াগুলো ! সেই ব্রাহ্মণের কী হলো যিনি আমাকে প্রবাদগুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন ? আমি সেই বুড়িকে এখনও দেখতে পাই, একই সময়ে আর জায়গায় ! নদীদের রূপালি সময় আর আলোকমালা আমার এখনও মনে আছে, কাঁধের ওপরে আমার সঙ্গীর হাত, পরস্পরের আদর মনে আছে যখন আমরা দুজনে মশলার গন্ধেভরা মাঠে দাঁড়িয়েছিলুম। -- আমার চিন্তাকে ঘিরে একদল রক্তবর্ণ পায়রা বকবকম করে। -- এখানে নির্বাসিত, প্রতিটি সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট নাটক অভিনয় করার জায়গা আমার ছিল। আমি তোমাকে দেখাতে পারতুম অজানা ঐশ্বর্য। তুমি যে ধনসম্পদ খুঁজে পেয়েছিলে তার ইতিহাসকে আমি চিহ্ণিত করেছি। এবার দেখব কী ঘটতে যাচ্ছে ! বিশৃঙ্খলার মতনই আমার প্রজ্ঞাকে অবজ্ঞা করা হয়। কীই বা আমার শূন্যতা, তোমার জন্যে অপেক্ষমান নিশ্চলতার তুলনায় ?

    আমার পূর্বজদের তুলনায় আমি একজন গুণসম্পন্ন আবিষ্কারক ; এমনকি, সঙ্গীতবিশারদ, যে প্রেমের সূত্রের মতন কিছু খুঁজে পেয়েছে। বর্তমানে, মনোরম আকাশের তলায় বিটকেল এক দেশের ভদ্রমানুষ, নিজের ভিখারিসূলভ শৈশবের স্মৃতির মাধ্যমে আমি বিচলিত হবার প্রয়াস করি, আমার শিক্ষানবীশি আর কাঠের জুতো পায়ে এখানে আসা, আমার তর্কপ্রিয়তা, আমার পাঁচ কি ছয়বারের বৈধব্য, আর আমার কয়েকবারের মহামাতলামি, যখন আমার বিচক্ষণ মগজ আমার বেরাদরদের হট্টগোলে অংশ নিতে বাধা দিয়েছিল। যেহেতু এই সন্দেহপ্রবণতা আর প্রয়োগ করা যাবে না, আর এমনিতেও আমি তরতাজা উদ্বেগে সমর্পিত -- আমি আশা করছি যে অত্যন্ত বিদ্বিষ্ট উন্মাদ হয়ে উঠবো।

    বারো বছর বয়সে আমি যে চিলেকোঠায় বন্দী ছিলুম, আমি জগতসংসারের বিষয়ে জানতুম, আমি মানুষের হাস্যকর অবস্হা বর্ণনা করেছিলুম। মাটির তলাকার মদের ভাঁড়ারে আমি ইতিহাস শিখলুম। উত্তরের শহরের কোনো এক রাতের ভোজনোৎসবে আমি পূর্বসূরী মহান তৈলচিত্রকরদের নারীদের অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা পেয়েছিলুম। প্যারিসের এক প্রাচীন গলিতে, আমাকে ধ্রুপদী বিজ্ঞান শেখানো হয়েছিল। প্রাচ্যদেশ দিয়ে ঘেরা এক চমৎকার জায়গায় আমি সম্পূর্ণ করেছিলুম আমার প্রচুর কাজ আর কাটিয়েছিলুম আমার সুবিখ্যাত অবসরযাপনের দিনগুলো। নিজের রক্তকে করে তুলেছিলুম চঞ্চল। আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে। সেই বিষয়ে আর ভাববারও দরকার নেই। আমি সত্যিই কবর অতিক্রম করে এসেছি, এবং কর্তব্য-বিষয়ে স্বাধীন।

    প্রস্হান

    ইল্যুমিনেশান ৮

    যথেষ্ট দেখা হলো। সমগ্র আকাশের তলায় দৃষ্টিপ্রতিভার সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ।

    অনেক পাওয়া হলো। শহরগুলোর আওয়াজ, সন্ধ্যাবেলা, এবং আলোয়, আর তা সদাসর্বদা।

    অনেক জানা হলো। জীবনের নির্ণয়গুলো। --হে দৃষ্টিপ্রতিভার ধ্বনিসমূচ্চয় !

    নতুন অনুরাগ এবং ধ্বনি লক্ষ্য করে সেইদিকে প্রস্হান !

    রাজকীয়

    ইল্যুমিনেশান ৯

    সুন্দর একটি দিনে, সুশীল মানুষদের মাঝে, চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন একজন মহিমান্বিত পুরুষ ও নারী : ‘বন্ধুগণ, আমি চাই ও রানি হোক !’ ‘আমি রানি হতে চাই !’ মহিলা হাসলেন আর কাঁপতে লাগলেন। পুরুষটি বন্ধুদের জানালেন রহস্যোদ্ঘাটনের কথা, কষ্টের জীবনের কথা। দুজনে পরস্পরের দেহে হেলান দিয়ে মূর্চ্ছা গেলেন।

    সত্যিই, তারা সারা সকাল রাজা হয়ে কাটালো, বাড়িগুলোয় ঝোলানো হলো গাঢ় লাল ফেস্টুন, আর সারা দুপুরও, তারা হেঁটে চলল পামগাছের বাগানের দিকে।

    যুক্তিযুক্ততার অভিমুখে

    ইল্যুমিনেশান ১০

    ড্রামের ওপরে তোমার একটা আঙুলের টোকায় সব আওয়াজ হারিয়ে যায় আর নতুন করে গড়ে তোলে ঐকতান।

    তোমার একটা পদক্ষেপ উদ্দীপ্ত করে নতুন মানুষদের আর তাদের সামনে দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

    তোমার মুখ অন্য দিকে তাকায় : নতুন প্রেম ! তোমার মুখ নিজের জায়গায় ফেরে -- নতুন প্রেম!

    ‘আমাদের অদৃষ্ট পালটে দাও, মহামারী শেষ করো’, মহাসময়ের তালে তাল মিলিয়ে এই শিশুরা তোমাকে গেয়ে শোনায়। ‘যেখানেই হোক না কেন, আমাদের বৈভব এবং ইচ্ছা লালিত হোক’, ওরা দয়াভিক্ষা করে।

    চিরকালীন থেকে তোমার আগমন, তুমি সব জায়গার জন্য প্রস্হান করবে।

    মদোন্মত্ত সকাল

    ইল্যুমিনেশান ১১

    হে আমার শুভ ! হে আমার সুন্দরী ! আমি ভয়ে পশ্চাৎপদ হই না এমন বর্বর তূর্যনিনাদ !

    সন্মোহিত আরাম ! প্রথম বারের খাতিরে, সুন্দর দেহ আর অজানা কাজের জন্য হুররে !

    আরম্ভ হয়েছিল বাচ্চাদের হাসিতে, শেষও হবে সেইভাবে। এই বিষ আমাদের শিরায় তখনও বইবে যখন তূর্যনিনাদ ফিরে আসবে, আমাদের আরেকবার পুরোনো বিশৃঙ্খলার হাতে তুলে দেয়া হবে। ওহ, আমরা এখন অমন দৈহিক শাস্তির উপযুক্ত, আমাদের দেহ আর আত্মাকে দেয়া মানবোত্তর প্রতিশ্রুতিকে সঠিক বুঝে উঠতে হবে : এই প্রতিশ্রুতি, এই পাগলামি ! সৌষ্ঠব, বিজ্ঞান, সন্ত্রাস ! ওরা অঙ্গীকার করেছে যে শুভ এবং অশুভর বৃক্ষকে অন্ধকারে পুঁতে ফেলা হবে, স্বৈরতান্ত্রিক সদগুণগুলোকে নির্বাসন দেয়া হবে, যাতে এখানে আমরা বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে আসতে পারি। এটা আরম্ভ হয়েছিল বিশেষ বিরক্তি নিয়ে এবং ফুরিয়েও গেলো -- আমরা এই শাশ্বতকে তক্ষুনি দখল করতে পারিনি বলে -- তা সুগন্ধের দাঙ্গায় শেষ হয়।

    শিশুদের হাসি, কেনা-গোলামদের বিচক্ষণতা, অক্ষতযোনি মেয়েদের আত্মসংযম, এখানকার মুখগুলো আর জিনিসপত্রের আতঙ্ক, সতর্কতার স্মৃতির দরুন তুমি পবিত্র। এটা আরম্ভ হয়েছিল

    মূর্খতার সঙ্গে, এবার দ্যাখো, শেষ হচ্ছে আগুন আর বরফের দেবদূতদের দ্বারা। ক্ষণকালের মদ্যপ পবিত্র সতর্কতা ! যদি তুমি কেবল মুখোশের জন্য আমাদের বরাদ্দ করে থাকো। সাধনপ্রণালী, আমরা তোমাকে সমর্থন করছি ! আমরা ভুলিনি কালকে তুমি আমাদের প্রতিটি শতককে মহিমান্বিত করেছিলে। বিষে আমাদের বিশ্বাস আছে। আমরা জানি কেমন করে প্রত্যেক দিন আমাদের সমগ্র জীবন দিয়ে দিতে হবে।

    এই কালখণ্ড হলো গুপ্তঘাতকদের।

    প্রবাদসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ১২

    আমাদের চারটে অবাক চোখের জন্যে এই জগতসংসারকে যখন ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে একটিমাত্র অন্ধকার জঙ্গলে -- দুটি অনুগত বাচ্চার জন্য একটি সমুদ্রতীরে -- আমাদের সুস্পষ্ট সমবেদনার জন্য সঙ্গীতের ঘরে -- আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো।

    এখানে তলায় কেবল একজনমাত্র বুড়ো লোক থাকুন, শান্ত আর সুন্দর, ‘অচেনা বিলাসে’ পরিবেষ্টিত -- আমি তোমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসবো।

    আমাকে তোমার স্মৃতিগুলো বাস্তবে পরিণত করতে দাও -- আমাকে যুবতী হতে দাও, যে তোমার গলা টিপে ধরবে -- আমি তোমার দম বন্ধ করে দেবো।

    যখন আমরা যথেষ্ট বলশালী -- কে-ই বা পশ্চাদপসরণ করবে ? যথেষ্ট মৌজমস্তিতে থাকলে -- কে-ই বা ইয়ার্কি করতে ছাড়ে না ? যখন আমরা সবচেয়ে বেশি অসূয়াপূর্ণ -- ওরা আমাদের কি-ই বা বানাতে পারে ? নিজেকে সাজিয়েগুজিয়ে তোলো, নাচো, হাসো। -- আমি কখনও ভালোবাসাকে জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারবো না।

    ভিখারিনী মেয়েটা, দানবী খুকি, আমার কমরেড ! তুমি এই হতভাগিনী নারীদের কতোটা মনোযোগ দাও, এই প্যাঁচপয়্জার, আর আমার সমস্যা। তোমার অসম্ভব কন্ঠস্বর দিয়ে নিজেকে আমাদের সঙ্গে বেঁধে ফ্যালো, সেই কন্ঠস্বরখানা ! এই জঘন্য বিষাদের একমাত্র আশা।

    জুলাই মাসের মেঘাচ্ছন্ন ভোর। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ছাইয়ের স্বাদ -- বনানীর ঘামের গন্ধ ঝরে পড়ছে উনানের কোনে -- ভিজে ফুলগুচ্ছ -- তৃণাঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ -- খেতের খালগুলো থেকে কুয়াশা -- তাহলে কেন খেলনাপাতি আর ধুপকাঠি নয় ?

    আমি এক ঘণ্টাঘর থেকে আরেক ঘণ্টাঘর পর্যন্ত দড়ি টাঙিয়েছি ; জানালা থেকে জানালা পর্যন্ত ফুলের মালা ; নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র পর্যন্ত সোনার শেকল ; আর আমি নাচছি।

    ওপরের ঝিল থেকে অবিরাম বাষ্প ওঠে। সফেদ সূর্যের বিপরীতে কোন জাদুনারীরা জেগে উঠবেন? কোন বেগুনি পাতার পর্ণরাজি ঝরে পড়বে ?

    জনগণের টাকা যখন ঢেলে দেয়া হচ্ছে ভাইবেরাদরদের ভোজনোৎসবে, মেঘের ভেতরে বাজতে থাকে গোলাপরঙা আগুন।

    চিনা কালির আকর্ষণ সুগন্ধকে গভীর করে তোলে, আমার নিশিপালনে ক্রমান্বয়ে ঝরে পড়ে কালোরঙের পাউডার। -- আমি গ্যাসের আগুন কম করে দিই, বিছানায় নিজেকে ছুঁড়ে ফেলি, আর ছায়াগুলোর দিকে ফিরে, দেখতে পাই তোমাদের, আমার কন্যারা, আমার রানিরা !

    শ্রমিকেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৩

    ওহ ফেবরুয়ারি মাসের সেই উষ্ণ সকাল ! আমাদের বিদকুটে অন্নবস্ত্রহীন স্মৃতি, আমাদের যৌবনের দারিদ্রদশা থেকে অসময়ের দখিনা বাতাস এসে জাগিয়ে তুললো।

    বাদামি আর শাদা চাককাটা সুতির স্কার্ট পরেছিল হেনরিয়েকা, গত শতকের ফ্যাশান, সন্দেহ নেই ; ফিতে বাঁধা শিরাবরণ, রেশমের স্কার্ফ। শোকসন্তাপের চেয়েও তা দুঃখজনক। আমরা শহরতলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। আবহাওয়া ছিল মেঘলা, আর ওই দখিনা বাতাস চঞ্চল করে তুলছিল বিধ্বস্ত বাগান আর শুকনো তৃণভূমি থেকে উড়ে আসা দুর্গন্ধকে।

    এটা আমাকে যতোটা বিরক্ত করেছে ততোটা আমার স্ত্রীকে করতো না। ওপরের দিকের রাস্তায় গতমাসের বানভাসি তৈরি করে গেছে জলের চাদর, ও আমাকে দেখালো তাতে কয়েকটা ছোট্ট মাছ।

    শহরটা, কারখানাগুলোর আওয়াজ আর ধোঁয়াসুদ্ধ, রাস্তা ধরে আমাদের পিছু নিয়েছিল। ওহ, অন্য জগতসংসার, আকাশ আর ছায়ায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত বসতি ! দখিনা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল দুর্দশাময় শৈশবের ঘটনাগুলো, আমার গ্রীষ্মের বিষাদ, ভাগ্য আমার থেকে সদাসর্বদা যে ভয়ংকর বিপুল শক্তিমত্তা ও জ্ঞান দূরে সরিয়ে রেখেছে। না ! আমরা এই কৃপণ দেশে গ্রীষ্ম কাটাবো না যেখানে আমরা বাগদত্ত অনাথ ছাড়া আর কিছুই হতে পারবো না। আমি এই শক্ত হাত দিয়ে প্রিয় দৃশ্যগুলোকে টেনে নিয়ে যেতে দেবো না।

    সেতুগুলো

    ইল্যুমিনেশান ১৪

    স্ফটিকের ধূসর আকাশ। সাঁকোগুলোর অদ্ভুত নকশা, কখনও সোজা, কখনও বেঁকা, আবার কোনোটা কোনাকুনি বেঁকে গিয়ে আগেরটার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, আর এই নকশাগুলো খালের আলোজ্বলা বাঁকগুলোয় আবার তেমন করেই পুনরাবৃত্তি করেছে, কিন্তু এতো দীর্ঘ আর হালকা যে নদীর তীর, গুম্বজের গুরুভারে, ডুবে গিয়ে ছোটো হয়ে আসে। এই সাঁকোগুলোর কয়েকটা এখনও চাদরে ঢাকা। অন্যগুলোয় রয়েছে মাস্তুল, সঙ্কেত, অপলকা নিচু পাঁচিল। পাতলা তারে মোড়া, আর মিলিয়ে গেছে ; তীর থেকে দড়িদড়া উঠে আসে। তুমি একটা লাল কোট দেখে চিনতে পারো, হয়তো অন্যান্য কোটও এবং সঙ্গীতযন্ত্র। এই জনপ্রিয় রেশগুলো কি, বিখ্যাত কনসার্টের টুকরো, জনগণের জাতীয়-সঙ্গীতের অবশিষ্টাংশ ? জলের রঙ ধূসর এবং নীল, সমুদ্রের বাহুর মতন চওড়া।

    একটা শাদা রশ্মি, অনেক ওপরে থেকে এসে, হাসির নাটককে লোপাট করে দ্যায়।


    শহর

    ইল্যুমিনেশান ১৫

    এক মহানগর যাকে এই জন্যে আধুনিক মনে করা হয় যে বাড়িগুলোর বাইরের দিক সাজানোয় আর নগরের পরিকল্পনায় প্রয়োগ করার জন্য পরিচিত উপলব্ধিগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ; তারই আমি এক ক্ষণজীবী আর তেমন বিচ্ছিন্ন নাগরিক নই। এখানে তুমি কুসংস্কারের একটিও স্মৃতিস্তম্ভের হদিশ পাবে না। সংক্ষেপে, নৈতিকতা আর ভাষাকে সরলতম প্রকাশে নামিয়ে আনা হয়েছে ! লক্ষাধিক এই লোকজন যারা পরস্পরকে জানার প্রয়োজন অনুভব করে না, নিজেদের শিক্ষাদীক্ষা, কর্মকাণ্ড, বার্ধক্যে এতো মিল যে তাদের আয়ু মহাদেশের গোলমেলে সংখ্যাতত্ব যা বলেছে তার চেয়েও বেশ কম। তাই, আমার জানালা দিয়ে, দেখতে পাই নতুন প্রেতরা শাশ্বত ঘন ধোঁয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে --- আমাদের বনানীঘেরা ছায়া, আমাদের গ্রীষ্মের রাত ! -- প্রতিহিংসর নতুন গ্রিক দেবতারা, আমার কুটিরের সামনে, যা আমার স্বদেশ, আমার সমগ্র হৃদয়, কেননা এখানে সবকিছুরই পরস্পরের সঙ্গে মিল আছে -- ক্রন্দনহীন মৃত্যু, আমাদের সক্রিয় কন্যা আর চাকরানি, রাস্তার কাদায় বেপরোয়া ভালোবাসা আর ফালতু অপরাধ ফুঁপিয়ে বেড়াচ্ছে।

    গাড়ির চাকার দাগ

    ইল্যুমিনেশান ১৬

    ডানদিকে বাগানের এই কোনে গ্রীষ্মের ভোর পাতাদের আর কুয়াশাকে এবং শব্দগুলোর ঘুম ভাঙায়, আর বাঁদিকের ঢালে স্যাঁতসেতে রাস্তায় বেগুনি ছায়ায় অগুন্তি দ্রুতগামী চাকার দাগ ধরে রাখে। ঐন্দ্রজালিক মিছিল। ওয়াগন, সত্যিই, ঝকমকে কাঠের তৈরি জানোয়ার তাতে, খুঁটি আর রঙবেরঙ চাঁদোয়া, কুড়িটা চিত্রবিচিত্র সার্কাস ঘোড়ার পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল, আর পুরুষেরা আর বাচ্চারা তাদের অদ্ভুত জানোয়ারের পিঠে -- কুড়িটা গাড়ি, ঢেউখেলানো, ঢাকাখোলা আর ফুলে সাজানো প্রাচীন ঘোড়ারগাড়ির মতন কিংবা যেমন পরীর গল্পে থাকে, শহরতলির যাত্রাভিনয় দেখতে যাবার পোশাক-পরা বাচ্চায় ঠাশা : -- এমনকি কফিনও, তাদের রাতের আচ্ছাদনের তলায়, জাঁকালো আবলুস পালকে, নীল-কালো মাদিঘোড়ার দৌড়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো।

    নগরেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৭

    শহরসমূহই বটে ! এই সেই লোকগুলো যাদের জন্যে স্বপ্নেদেখা উত্তর-আমেরিকার আলেঘানি পাহাড় এবং লেবানন মঞ্চায়িত হয়েছিল ! স্ফটিক আর কাঠের তৈরি রাখাল-কুটির যা অদৃশ্য রেললাইন আর কপিকলে চলে। গ্রিক সূর্যদেবের মূর্তি দিয়ে ঘেরা মরা আগ্নেয়গিরির হাঁমুখ, আর তামার তৈরি পামগাছেরা আগুনশিখায় সুরেলা ধ্বনি তুলছে। রাখাল কুটিরের পেছনে খালের ধারে ভালোবাসার পানোৎসব প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। গিরিসঙ্কটের ভেতরে শিকারের রুনুঝুনু বাজে। দৈত্যবৎ গায়কদের সমাবেশ ঘটে মধ্যযুগের ফরাসি রাজার সোনালি ঝিলমিলে পোশাকের মতন শীর্ষদেশের আলোয়।

    ঘুর্নিজলের ভেতরে পাটাতনের ওপরে, রাজা শার্লামেইনের বীরপুরুষেরা তাদের শৌর্যের ভেরীধ্বনি করে। অতলর ওপরের সাঁকোগুলোয়, আর সরাইখানার ছাদে, আকাশের তাপ মাস্তুলগুলোকে পতাকা দিয়ে ঢেকে ফ্যালে। দেবতাপ্রতিম ভঙ্গুর মূর্তিগুলো চারণভূমি দখল করে ফ্যালে যেখানে দেবদূততুল্য নারীসিংহীরা হিমানী-সম্প্রপাতে প্রবেশ করে। সর্বোচ্চ চূড়াগুলোর সারির ওপরদিকে, রয়েছে ভিনাসের শাশ্বত জন্মের ঝড়ঝাপটায় আক্রান্ত এক সমুদ্র, অরফিউসের ক্ষণস্হায়ী সঙ্গীতে উদ্বুদ্ধ আর দামি মুক্তো এবং শঙ্খধ্বনিতে মথিত -- সেই সমুদ্র জাগতিক বজ্রবিদ্যুৎকে অনেক সময়ে অন্ধকার করে তোলে। ঢালু জায়গায়, ফুলের ফসল, আমাদের তরোয়াল আর পেয়ালার মতন, নিচের দিকে। পিঙ্গলরঙা মোটা কাপড়ে স্বপ্নদায়িনী পরীরানিদের মিছিল। তাদের পা ঝর্ণায় আর বনগোলাপের ঝাড়ে, ওইখানে উঁচুতে মৃগয়ার অধিষ্ঠাত্রীদেবীর দুধ খাচ্ছে এক হরিণ। শহরতলির মাতালনারীরা ফোঁপাচ্ছে, আর চাঁদ জ্বলে যাচ্ছে আর শেয়ালেরা হুক্কাহুয়া করছে। ভিনাস সন্ন্যাসী আর স্যাকরাদের সঙ্গে প্রবেশ করছে গুহার মধ্যে। সারিসারি ঘণ্টাঘর গেয়ে উঠছে জনগণের অভিপ্রায়। হাড়ের তৈরি দুর্গ থেকে ভেসে আসছে অজানা সঙ্গীত। যাবতীয় কিংবদন্তির প্রকাশ ঘটছে আর শহরগুলোর ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে হরিণের দল। থেমে গেছে ঝড়ের পুণ্যালোক। রাতের পানোৎসবে অবিরাম নাচছে বর্বরেরা। এবং, একবার, আমি বাগদাদের রাস্তার গোলমালে নেমে পড়লুম, যেখানে ভিড়ের লোকেরা তরতাজা শ্রমের আনন্দ-গান গাইবার জন্য জড়ো হয়েছিল, নিস্তেজ হাওয়ায়, পাহাড়ের বিখ্যাত মায়াপুরুষদের এড়াবার জন্যে বিনা ক্ষমতায় পাক খাচ্ছিল। আমার তন্দ্রাভাব আর যৎসামান্য হেলডোল যে এলাকা থেকে আসে তা ফিরে পেতে কোন ধরণের অস্ত্র, কোন ধরণের মনোরম সময় প্রয়োজন ?

    ভবঘুরের দল

    ইল্যুমিনেশান ১৮

    সমব্যথী ভাই ! ওর কাছে আমার কোনও নৃশংস নিশিপালন আছে ! ‘আমি এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টাকে দখল করে নিতে বিফল হয়েছিলুম। আমি ওর অকর্মণ্যতা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলুম। যদি আমাদের নির্বাসনে যেতে হয়, কেনা-গোলমী করতে হয়, তা হবে আমার দোষ।’ অদ্ভুত দুর্ভাগ্য আর বোকামির জন্য ও আমার প্রশংসা করেছিল, আর তার সঙ্গে জুড়েছিল অশান্তিকর কারণ।

    এই শয়তান পণ্ডিতকে আমি বিদ্রুপ করে উত্তর দিয়েছি, আর জানালার কাছে গিয়ে তা শেষ করেছি। বিরল সঙ্গীতরেখার চালচলনের অপর পারের চারণভূমিতে আমি ভবিষ্যতের রাতের বিলাসের মায়াপুরুষ গড়েছি।

    এই অস্পষ্ট স্বাস্হবিধিসন্মত চিত্তবিক্ষেপের পর, আমি খড়ের মাদুরের ওপরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়তুম। এবং, বলতে গেলে প্রতি রাতে, যেই আমি ঘুমিয়ে পড়তুম, বেচারা ভাইটি উঠে পড়তো, মুখে দুর্গন্ধ, চোখে দেখতে পাচ্ছে না -- যেমন ও নিজের সম্পর্কে স্বপ্ন দেখতো -- আর নিজের নির্বোধ কান্নার স্বপ্নে বিভোর আমাকে ঘরের ভেতরে টানাটানি করতো !

    বাস্তবিক, সত্যি বলতে কি, আমি ওকে ওর সূর্যসন্তানের প্রাগৈতিহাসিক স্হতিতে ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছিলুম -- আর আমরা ঘুরে বেড়ালুম, গুহার মদে ভরণপোষণ করে, আর পথের বিসকিট খেয়ে, আমি পরিসর আর ফরমুলা খুঁজে পাবার জন্যে অধৈর্য।

    নগরসকল

    ইল্যুমিনেশান ১৯

    আধুনিক বর্বরতার অপরিমিত ধারণাকে ছাপিয়ে যায় সরকারি নগরায়ন। পরিবর্তনাতীত ধূসর আকাশ যে অনুজ্বল আলো ছড়াচ্ছে তা বর্ণনা করা অসম্ভব ; স্হাপত্যের রাজসিক রোশনাই, আর মাটিতে অনন্তকালীন তুষার। ধ্রুপদী স্হাপত্যের বিস্ময়কর কাজগুলোকে, একান্ত আতঙ্কজনক রুচিতে, ওরা আবার গড়েছে। হ্যাম্পটক কোর্টের চেয়ে কুড়িগুণ বড়ো মিউজিয়ামে তৈলচিত্রের প্রদর্শনী দেখি। মন্ত্রালয়ের সিঁড়িগুলোর নকশা তৈরি করেছিল নরওয়ের এক নেবুচাদনেজ্জার ; যে অধস্তন অধিকারীদের দেখেছিলুম তারা, যেমন হয় আরকি, ব্রাহ্মণদের থেকেও গর্বিত, আর বিশাল মূর্তিগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং এলাকার তত্ববধায়কদের দেখে আমি ভয়ে কেঁপে উঠছিলুম। চৌরাস্তার বাড়িগুলোর ঘেঁষাঘেঁষি, তাদের ছাদ, আর পাঁচিলঘেরা বারান্দা, তাদের ঘণ্টাঘরগুলো থেকে কোনঠাশা করে দিয়েছে। বিস্ময়কর শিল্পচর্চায় পার্কগুলোয় উপস্হাপন করা হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক প্রকৃতি। ভালো জায়গাগুলোয় রয়েছে অনির্বচনীয় চৌহদ্দি : সমুদ্রের শাখা, নৌকাবর্জিত, তার নীল রঙের ঘষাকাচকে ছড়িয়ে দেয় মোমের তৈরি বিশাল গাছে গুরুভার জাহাজঘাটার মাঝবরাবর। একটা ছোটো সাঁকো চলে গেছে সন্ত চ্যাপেলের গোলাকার গম্বুজের ঠিক নিচের সিংদরোজা পর্যন্ত। গম্বুজটা পনেরোহাজার ফিটের ইস্পাতের কলাকৃতি দিয়ে গড়া।

    তামার তৈরি সাঁকো, মাচান, সিঁড়ি যা আচ্ছাদিত বাজারকে পাক খেয়ে উঠেছে, কয়েকটা দৃষ্টিভঙ্গীতে, আমি ভাবলুম হয়তো শহরের ব্যাপ্তি বিচার করে দেখব ! তা ছিল মস্তোবড়ো ব্যাপার যার সম্পর্কে নির্ণয় নিতে পারলুম না : নগরদুর্গের ওপরদিকে আর নিচে যে এলাকাগুলো রয়েছে তাদের স্তর কেমনতর ? আমাদের দিনকালে পর্যটকদের পক্ষে দেখে বেড়ানোটা অসম্ভব। ব্যবসার চৌহদ্দি, সেকেলে গ্যালারিসহ, একই রকমের শৈলীর সার্কাস। কোনও দোকান চোখে পড়ছে না, কিন্তু পথের তুষারে মাড়িয়ে যাবার দাগ ; কয়েকজন নবাব, লণ্ডনের রবিবারের সকালে হাঁটার লোকেদের মতন বিরল, হীরের তৈরি ঘোড়ারগাড়ির দিকে এগোয়। কয়েকটা লাল মখমলের পালঙ্ক : মরুদেশের পানীয় বিতরন করা হচ্ছে, যার দাম আটশো থেকে আটহাজার টাকার মধ্যে পড়ে। সার্কাসের ভেতরে নাট্যালয় খোঁজার ধারণা সম্পর্কে আমি নিজেকে বললুম যে দোকানগুলোতে নিশ্চয়ই যথেষ্ট বিষণ্ণ নাটক অভিনীত হয়। আমার মনে হয় পুলিশও আছে ; কিন্তু আইনগুলো নিশ্চয়ই এমন অদ্ভুত যে অ্যাডভেঞ্চার করার ভাবনা আমায় এড়িয়ে যায়।

    শহরতলিগুলো, পারিসের যেকোনো সুন্দর রাস্তার মতন পরিচ্ছন্ন, সূর্যের আলোর সাদৃশ্যের আনুকূল্য পায় ; গণতান্ত্রিক উপাদানের সংখ্যা কয়েক হাজার আত্মা হবে। এখানেও, ঘোড়াগুলো সার বেঁধে নেই ; শহরতলিগুলো বিটকেলভাবে গাঁয়ের দিকে গিয়ে হারিয়ে যায়, যাকে বলে ‘প্রশাসনিক এলাকা’, যা ছড়িয়ে পড়েছে শেষহীন পশ্চিমদিকের জঙ্গল আর পাদপবাগান পর্যন্ত, যেখানে বর্বর কুলীনরা যে আলো নিজেরা তৈরি করেছে, সেখানে সংবাদ শিকার করতে বেরোয়।

    নিশিপালন

    ইল্যুমিনেশান ২০

    এই হলো আলোয় আস্হা, বিছানার ওপরে কিংবা মাঠে, জ্বরে নয়, অবসন্নতাতেও নয়।

    ইনি বন্ধু প্রদীপ্ত নন দুর্বলও নন। তিনিই বন্ধু।

    ইনি ভালোবাসবার ; যন্ত্রণা দেয়া হয়নি, এবং যন্ত্রণাদায়ক নন।

    চাওয়া হয়নি বাতাস এবং জগতসংসারকে। জীবন।

    --এটা কী, তাহলে ?

    --আর শীতল হয়ে যায় স্বপ্ন।

    মাঝখানের স্তম্ভে আলো ফিরে আসে। ঘরের দুই প্রান্তসীমা থেকে, একরকম মঞ্চই বলা যায়, মিলবিশিষ্ট দ্রোহীদের সাক্ষাৎ ঘটে। পাহারাদারের মুখোমুখি দেয়ালে কার্নিসের মতন কোনাকুনি জায়গায় মনস্তত্বের পারম্পর্য, আবহাওয়ার চাদর এবং ভূতাত্বিক ঢেউ -- গভীরভাবে অনুভুত গাঢ় এবং দ্রুত দলাদলি, যেখানে সব ধরনের প্রাণী তাদের যাবতীয় দর্শনানুপাত নিয়ে রয়েছে।

    নিশিপালনের লন্ঠন এবং চাদর, ঢেউয়ের শব্দ তোলে, রাতের বেলায়, জাহাজের কাঠামোর পাশে, হালকে ঘিরে।

    সমুদ্রের নিশিপালন যেন খেটে-খাওয়া অ্যামেলির স্তনযুগল।

    কারুকার্য-শোভিত পর্দাগুলো, কিছুটা ওপরদিকে তোলা, পান্নারঙা লেসের ঝালর, যাকে লক্ষ্য করে নিশিপালনের পায়রারা উড়ে যায়।

    কালো উনানের সামনের পাথর, সমুদ্রতীরের প্রকৃত সূর্য : আহ, ইন্দ্রজালের ঝর্ণা ; ভোরের একমাত্র দৃশ্য, ঠিক এখনই !


    অতীন্দ্রিয়

    ইল্যুমিনেশান ২১

    তীরের ঢালুতে দেবদূতেরা তাদের পশমের পোশাকে ইস্পাত আর পান্নার চারণভূমিতে পাক খায়।

    পাহাড়ের গোলাকার মাথার ওপরে লাফাতে থাকে আগুনশিখার মাঠ। বাঁদিকে খেতের আলগুলোকে পদদলিত করেছে পাক থেকে বেরিয়ে প্রতিটি হত্যা, প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি বিপর্যয়ের ধ্বনি। প্রান্তরেখার ওপারে ডানদিকে আরোহণরেখা, প্রগতির দিকে।

    এবং, যখন শীর্ষের কার্নিস দিয়ে গড়ে উঠছে ছবির মোচড় আর লাফিয়ে ওঠা মানবসমুদ্র আর রাত্রির শঙ্খধ্বনি।

    নক্ষত্র এবং আকাশের ফুলেল মিষ্টতা আর বাদবাকিরা নেমে আসে বাঁধের উল্টোদিকে, যেন চুবড়ির ভেতরে -- আমাদের মুখোমুখি, এবং গড়ে তোলে অতল মঞ্জরী এবং নিচের নীল।

    ঊষা

    ইল্যুমিনেশান ২২

    আমি গ্রীষ্মের ভোরকে গ্রহণ করে নিলুম।

    প্রাসাদগুলোর সামনে এখনও কোনোকিছুর নড়চড় নেই। জল মারা গিয়েছিল। বনানিঘেরা পথকে ভিড়ের ছায়া এখনও ছেড়ে যায়নি। আমি হাঁটছিলুম, তপ্ত শ্বাস নিচ্চিলুম, আর দামি পাথরগুলো ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলো, আর ডানাগুলো শব্দ না করে উড়লো।

    প্রথম অভিযানে, শীতল ফিকে আলোয় আগে থেকেই আলোকিত রাস্তায়, একটা ফুল আমাকে তার নাম জানালো।

    দেবদারু গাছে ঘেরা ফর্সা আলুলায়িত ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে হাসলুম : চাঁদির শীর্ষভূমির ওপরকার ঈশ্বরীকে চিনতে পারলুম।

    তারপর একের পর এক অবগুন্ঠন সরালুম। গলির ভেতরে ঢুকে, হাত নাড়ালুম। সমতলভূমিতে গিয়ে আমি মেয়েটিকে মোরগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করলুম। শহরে ঢুকে, মেয়েটি ঘণ্টাঘর আর গম্বুজের মাঝে পালিয়ে গেল, এবং, ভিখারির মতন শ্বেতপাথরের জেটি পেরিয়ে, আমি ওকে ধাওয়া করলুম।

    রাস্তার ওপর দিকে, জলপাই বনের কাছে, ওর অবগুন্ঠনসুদ্ধ ঘিরে ফেললুম মেয়েটিকে, আর অনুভব করলুম ওর বিশাল শরীর বেশ ছোটো। জঙ্গলের পাদদেশে পড়ে গেল ভোর আর বালকটি।

    ঘুম ভাঙতে, দুপুর।

    ফুলগুলো

    ইল্যুমিনেশান ২৩

    সোনার ছাদ থেকে -- রেশমের সুতো, ধূসর পাতলা কাপড়, সবুজ মখমল এবং স্ফটিকের চাকার মাঝে যা রোদ্দুরে ব্রোঞ্জের মতন কালো হয়ে যায় -- আমি লক্ষ্য করি চাঁদির সুতোর কারুকাজ-করা জাজিমের ওপরে ফেলেরাখা শেয়ালকাঁটা, চোখ এবং চুল।

    হলুদ সোনার টাকায় মণিরত্নের গুঁড়ো, পান্নার গম্বুজকে ধরে রেখেছে মেহগানি থাম, গোলাপজলকে ঘিরে সাদা সাটিনের টুকরো আর চুনীর মিহিন জল ছেটানো হয়েছে।

    বড়ো নীল চোখ আর তুষার-আঙ্গিকের কোনো দেবতার মতন, শ্বেতপাথরের ছাদে সমুদ্র ও আকাশ ডেকে আনছে কচি ও তরতাজা গোলাপগুচ্ছ।

    পার্থিব রাত্রি

    ইল্যুমিনেশান ২৪

    দেয়ালের প্রহসনমূলক ফাটল খুলে ফেলছে এক দমকা ঝড় -- ভাঙাচোরা ছাদগুলোর কড়িবরগাকে ঢেকে ফেলছে -- এলোমেলো করে দিচ্চে বাঁধের পাঁচিল -- অন্ধকার করে ফেলছে জানালাগুলো।

    দ্রাক্ষালতার থেকে দূরত্বে, সিংহমুখ নর্দমার ওপরে আমার পা রেখে --- আমি এই জুড়িগাড়িতে চাপলুম যার সময় সুস্পষ্টভাবে উত্তল কাচে লেখা, বাইরে বেরিয়ে আসা প্যানেল, আর ঢেউখেলানো বসার জায়গা। আমার তন্দ্রার শবযান, আলাদা করে দ্যায়, আমার বোকামির মেষপালকের কুঁড়েঘর, বাতিল রাজপথের মাটিতে আমার শকট বাঁক নেয় : এবং ঝাঁকুনির দরুণ ডানদিকের জানালায় ফিকে চাঁদনি আকারগুলো, গাছের পাতা, স্তন পাক খেতে থাকে।

    --একটা সবুজ আর একটা নীল, বেশ গভীর, দৃশ্যটাকে আক্রমণ করে। জোড়াতালি দেয়া নুড়িপথের ফলে ঘোড়ার বর্ম খুলে যায়।

    -- এখানে কেউ ঝড়ের জন্যে সিটি বাজায়, সোডোমের লোকজন আর জেরুজালেমের লোকজন, বন্য পশু এবং সৈন্যবাহিনী।

    ( -- ঘোড়ারগাড়ির চালক এবং স্বপ্নের প্রাণীরা কি আবার নিয়ে যাবে শ্বাসরুদ্ধকর ঝোপঝাড়ে, রেশমি বসন্তঋতুর চোখে আমাকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে। )

    --এবং আমাদের, চাবুক মেরে, লেহ্য জল আর ছড়িয়ে পড়া খরায়, কুকুরদের চিৎকারে গড়াগড়ির জন্যে পাঠানো হবে…

    --বাঁধের পাঁচিলগুলো এক নিঃশ্বাসে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

    সামুদ্রিক

    ইল্যুমিনেশান ২৫

    তামা ও চাঁদির রথ --

    চাঁদি ও ইস্পাতের জাহাজমুখ--

    সমুদ্রের ফেনায় লাঙল চালানো---

    কাঁটাগাছের খুঁটি ওপড়ানো।

    উষর প্রান্তরের বিস্তার,

    আর জোয়ার-ভাটায় আঁকা রেখা,

    পূর্বদিকে ঘুরতে-ঘুরতে বয়ে চলে যায়,

    জঙ্গলের থামগুলোর দিকে,

    জেটির খুঁটিগুলোর দিকে,

    যার লোহার বাতাগুলো আলোর ঘুর্ণিঝড়ে চূর্ণ।

    শীতকালের ভোজনোৎসব

    ইল্যুমিনেশান ২৬

    নাটুকে-মজার বস্তির পেছনদিকে আওয়াজের প্রপাত। গোলোকধাঁধার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা অ্যাভেনিউ আর বাগানে, চক্রাকার বাজি অনেকক্ষণ জ্বলে -- সূর্যোদয়ের সবুজ আর লাল। চুল-সাম্রাজ্যের বিনুনিতে হোরেসের কবিতার উপদেবীর দল -- গোলগাল সাইবেরিয় মহিলা, ফরাসি চিত্রকরের আঁকা ছবির মতন চিনা মেয়েরা।

    মানসিক যন্ত্রণা

    ইল্যুমিনেশান ২৭

    এরকম কি হতে পারে যে মেয়েটি আমাকে ক্ষমা পাইয়ে দেবে শাশ্বতভাবে বিধ্বস্ত উচ্চাকাঙ্খা থেকে-- বহুকালের দারিদ্র্যকে মেরামত করে আরামদায়ক সমাপ্তি ঘটাবে -- আমাদের মারাত্মক আলস্যের লজ্জায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে সাফল্যের দিন ?

    ( ও পামগাছ ! হীরক ! ভালোবাসা ! প্রাণশক্তি ! -- প্রতিটি আনন্দ ও গরিমার চেয়ে উচ্চতর !-- সবরকমের, সব জায়গায় -- রাক্ষস, দেবতা -- এখানে বসবাসের যৌবন ! )

    ঐন্দ্রজালিক বিজ্ঞান এবং সামাজিক ভাতৃত্বের আন্দোলনকে কি আদি স্বাধীনতার প্রগতিশীল পুনর্বাসন হিসাবে যত্নে পালন করা হবে ?...

    কিন্তু এই রক্তচোষা মেয়ে যে আমাদের শায়েস্তা করে সে হুকুম দেয় যে আমরা যেন ওর দেয়া খুদকুঁড়োয় নিজেদের মজায় রাখি, নয়তো আরও মজা চালিয়ে যাও।

    ক্লান্ত বাতাস এবং সমুদ্রের মাঝ দিয়ে জখমের গমন ; যন্ত্রণায়, খুনি জল এবং বাতাসের নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে ; হাসিমুখ অত্যাচারের মাঝ দিয়ে, তাদের কোলাহলপূর্ণ স্তব্ধতার দিকে।

    মেট্রপলিটান

    ইল্যুমিনেশান ২৮

    নীলাভ খাঁড়ি থেকে ওসিয়ানের সমুদ্র পর্যন্ত, গোলাপি ও কমলারঙের বালুকাবেলায়, মদের রঙের আকাশ যাকে ধুয়ে দিয়েছে, স্ফটিকের বীথি ওপরে উঠে গিয়ে আড়াআড়ি ভাগ করে ফেলেছে, যা তখনই দখল করে নিয়েছে গরিব কমবয়সী পরিবারেরা যারা ফলবিক্রেতাদের দোকানে কেনাকাটা করে। বৈভব নেই। -- এই নগর !

    আলকাতরার মরুভূমি থেকে, সরাসরি উড়াল দিয়ে কুয়াশার আতঙ্কজনক পরতগুলোর তলায় যে আকাশ বাঁক নেয়, পিছিয়ে যায়, নেমে যায়, তাকে গড়ে তুলেছে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া যা শোকার্ত সমুদ্র বিলিয়েছে, হেলমেট পরে পালিয়েছে, চাকা, জাহাজ, ঘোড়ার লেজের তলায় বাঁধা চামড়া -- সেই সংগ্রাম !

    মাথা তোলো : ওই ধনুকাকৃতি কাঠের সাঁকো ; সামারিয়ার শেষ সব্জি-উঠোন, শীতল রাতের দ্বারা কাঁপানো লন্ঠনের আলোয় উজ্বল মুখোশ ; আওয়াজ-তোলা পোশাকে বোকা জলপরী, নদীর তলদেশে ; মটরখেতে জ্বলজ্বলে করোটি -- এবং অন্যান্য অলীক ছায়ামূর্তির প্রবাহ -- গ্রামগুলো। রাস্তার দুই কিনারে রেইলিঙ আর দেয়াল, ঝোপঝাড়ের প্রসারণ থামাতে পারেনি, আর নৃশংস ফুলের দল যাকে তুমি বলবে আত্মা আর সহোদরা। একঘেয়েমি জাগানো নাটক-- রাইননদীর অতিঅভিজাতদের পরীদের গল্পের সম্পত্তি, জাপানি, প্যারাগুয়ের গুয়ারানি, ওরা প্রাচীনকালের সঙ্গীত বুঝতে পারার জন্যে এখনও যোগ্য -- সরাইখানা আছে যা আর সবসময় খোলা থাকে না-- আছে রাজকুমারীরা, আর যদি তুমি বেশি অভিভূত না হয়ে থাকো, নক্ষত্রদের অধ্যয়ন করো-- আকাশ।

    সকালে যখন, যুবতীটির সঙ্গে, তুমি তুষারের ফুলকির মাঝে লুটোলুটি খেয়েছিলে. সবুজ ঠোঁট, বরফ, কালো পতাকা আর নীলাভ আলোর রশ্মি, আর মেরু-সূর্যের বেগুনিরঙা সুগন্ধ -- তা তোমার জীবনীশক্তি।

    অমার্জিতের দল

    ইল্যুমিনেশান ২৯

    ঋতুদের আর দিনগুলোর অনেক পরে, লোকজন আর দেশগুলো, রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। )

    বীরত্বের পুরোনো তূর্যনিনাদ কাটিয়ে ওঠার পর -- আমাদের হৃদয়ে আর মাথায় আক্রমণ অব্যহত রেখেছে -- প্রাচীন গুপ্তঘাতকদের থেকে বেশ দূরে।

    --ওহ ! রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। )

    ভাবাবেশসমূহ !

    তুষারের ঝাপটায় ঝরছে আলোকচ্ছটা -- ভাবাবেশসমূহ ! -- জাগতিক হৃদয় থেকে ছোঁড়া হীরকের হাওয়ায় বৃষ্টিতে আগুন, আমাদের পোড়াবার জন্যে। -- হে জগতসংসার !--

    ( পুরোনো আশ্রয় এবং পুরোনো আগুনশিখা থেকে, যা তুমি শুনতে পাও আর অনুভব করো, )

    আলোকচ্ছটা এবং সামুদ্রিক ফেনা। সঙ্গীত, খাঁড়ির মন্থন আর নক্ষত্রে জমাটবাঁধা ঝুলন্ত তুষার।

    হে ভাবাবেশ, হে জগতসংসার, হে সঙ্গীত ! এবং এখানে, আকৃতি, ঘাম, চুল এবং দুই চোখ, ভেসে যায়। এবং শ্বেত অশ্রুজল, ফুটন্ত -- হে ভাবাবেশসমূহ ! -- এবং নারীকন্ঠস্বর পৌঁছে যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির তলদেশে এবং সুমেরুর গুহাগুলোয়।

    পতাকা...

    অভিক্ষিপ্ত সৈকতাংশ

    ইল্যুমিনেশান ৩০

    আমাদের গ্রামের বাড়ি আর তার বাগানের উল্টোদিকে সোনালি সকাল আর শিহরিত সন্ধ্যা খুঁজে পেল আমাদের দুই মাস্তুলঅলা পোত, সমুদ্র থেকে কিছুটা দূরে, তৈরি করে ফেলেছে শৈলান্তরীপ যা এপিরাসদেশ কিংবা গ্রিসের পেলোপনিজ, জাপানের প্রধান দ্বীপ, কিংবা আরবের মতন ছড়ানো!

    ফিরে-আসা তত্বে আলোকিত মন্দিরগুলো ; উপকূলের আধুনিক প্রতিরক্ষার অমেয় দৃশ্য ; উষ্ণমণ্ডলের ফুলদল আর গ্রিকদের আসবদেবতার নকশাকাটা বালিয়াড়ি ; কার্থেজের বড়ো খাল আর নোংরা ভেনিসের বাঁধ ; এটনা আগ্নেয়গিরির হালকা উদ্গীরণ, ফুলের আর গ্লেসিয়ারের জলের তৈরি তুষার-ফাটল ; জার্মান পপলার গাছে ঘেরা ধোপারঘাট ; জাপানি গাছের ঝাঁকড়া মাথায় ছাওয়া ঢালের ওপরে বর্ণনাতীত বাগান ; এবং স্কারবরো ও ব্রুকলিনের ‘রাজকীয়’ এবং ‘অভিজাতদের’ প্রাসাদের সামনেদিক ; আর তাদের দুই পাশে রেললাইন, খোঁড়াজমি, হোটেলের চড়াই, ইতালি, আমেরিকা, এশিয়ার সবচেয়ে মনোরম সবচেয়ে বিশাল নির্মাণ, বর্তমানে দামি আলোকমালায় ঝিলমিলে, পানীয় এবং মৃদুমন্দ বাতাস, ভ্রমণকারী ও সম্ভ্রান্তদের দ্বারা প্রভাবান্বিত-- যারা দিনের আলোয়, অনুমতি দ্যায়, সাগরতীরের দ্রুতলয়ী নাচিয়েদের -- এমনকি শিল্পের মঙ্গলময় অলঙ্কারের সঙ্গীতকে, যাতে প্রাসাদের সৈকতাংশের সামনেদিককে অবিশ্বাস্যভাবে সাজিয়ে তোলা যায়।

    দৃশ্যাবলী

    ইল্যুমিনেশান ৩১

    প্রাচীন মিলনানন্তক নাটক তার সমন্বয়কে অনুধাবন করে, তার রাখালিয়া কাহিনিকে বিভাজন করে : তক্তায় গড়া প্রশস্ত পথ।

    পাথুরে জমির ওপরে একদিক থেকে আরেকদিক পর্যন্ত কাঠের দীর্ঘ বাঁধ, যেখানে অসভ্য ভিড় পাতাহীন গাছের তলায় চলাফেরা করে।

    কালো পাতলা কাপড়ে তৈরি দরদালানগুলোয়, লন্ঠন-হাতে আর ফেলে যাওয়া পথচারীদের অনুসরণ,

    নাটুকে পাখি ঝাপট মেরে নেমে আসে রাজমিস্ত্রির তৈরি নৌকাসাঁকোয় যা দুলে ওঠে নামতে-থাকা দর্শকদের ভিড়ে ঢাকা দ্বীপপূঞ্জে।

    বাঁশি আর মদ্যপানে-ভরা গীতিকবিতামূলক দৃশ্য, ছাদের মাপের উঁচু ঢালের কোনাকুনি আধুনিক আড্ডার বৈঠকখানায় কিংবা প্রাচ্যদেশের প্রাচীন হলঘরে।

    ঝোপঝাড়ের ঝুঁটিতে ঘেরা অ্যামপিথিয়েটারের প্রান্তে ঐন্দ্রজালিক দৃশ্যাবলী কৌশল করে -- কিংবা সরে যায় এবং গ্রিসের বোয়েটিয়ানদের জন্যে সুর বাঁধে, দীর্ঘ গাছেদের সঞ্চরণশীল ছায়ায়, খেতের কিনারায়।

    শিলা-বিভাজনের কাছে মজার অপেরা আমাদের মঞ্চের ওপরে টুকরো হয়ে যায় যেখানে দশটা বিভাজক পরস্পরের সঙ্গে মেলে, যা গ্যালারি থেকে আলোর পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।


    ঐতিহাসিক সন্ধ্যা

    ইল্যুমিনেশান ৩২

    যে সন্ধ্যাই হোক, বলতে গেলে, আমাদের আর্থিক আতঙ্ক থেকে যে পর্যটক ফিরে যাচ্ছেন, নিজেকে আবিষ্কার করেন, একজন গুরুর হাত চারণভূমির বীণাকে জাগিয়ে তোলে ; পুকুরের তলায় তাস খেলা হয়, আয়না, রানি আর অনুগতদের প্রিয় ; সেখানে রয়েছেন সন্তেরা, পালতোলা জাহাজ, ঐকতানের সূত্র, এবং সূর্যাস্তের কিংবদন্তিপ্রতীম সঙ্গীতময়তা।

    শিকারিদের আর দলবলকে দেখে ও ভয়ে কেঁপে ওঠে। নাটক ঝরে পড়ে তৃণাচ্ছাদিত ভূমির চাপড়ায়। এবং গরিব ও দুর্বলদের এই বোকামির স্তরে বড়োই অপর্যাপ্ত !

    ওর কেনা-গোলাম চোখে, জার্মানি চাঁদের দিকে মিনার তুলে উঠে যায় ; তার্তারদের মরুভূমিতে আলো জ্বলে ওঠে ; দিব্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে প্রাচীন বিদ্রোহ প্ররোচিত হতে থাকে ; সিঁড়ি আর পাথরের তৈরি আরামকেদারায় একটি ছোট্ট জগতসংসার, ফ্যাকাশে আর সমতল, তৈরি করা হবে। তারপর পরিচিত সমুদ্র ও রাত্রির নৃত্যানুষ্ঠান ; সদগুণহীন রসায়ন, এবং অসম্ভব সঙ্গীত।

    সেই একই বুর্জোয়া ইন্দ্রজাল যেখানে আমাদের ছোটো নৌকা নামিয়ে দ্যায় ! সবচেয়ে সাধারণ ডাক্তারও মনে করে যে ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে নিজেকে সমর্পণ করা আর সম্ভব নয়, এ হলো দৈহিক আত্মগ্লানির কুহেলিকা, যার নিরীক্ষণ ইতিমধ্যে এক দুর্দশা হয়ে উঠেছে।

    না ! বাষ্পঘরের মুহূর্ত, বাষ্পীভূত সমুদ্র, ভূগর্ভস্হ অগ্নিকাণ্ড, অনুবর্তী অগ্নিকাণ্ড, ঘুরে-বেড়ানো গ্রহ এবং তার ফলে উন্মূলন, বাইবেলে বর্ণিত যৎসামান্য ঈর্ষার নিশ্চয়তা এবং যে নিয়মশৃঙ্খলায় তা মৌলিক সাক্ষ্যপ্রদান করবে -- যাই হোক, তা কিংবদন্তির ব্যাপার নয় !

    বিচলন

    ইল্যুমিনেশান ৩৩

    জাঙ্গালের কিনারায় কারুকার্যময় ফিতের অবস্হানভঙ্গিমা,

    স্টিমারের পেছনদিকে খাঁড়ি,

    ঢালের দ্রুতি,

    স্রোতের বিস্তারিত দোল

    অসাধারণ আলোর মাঝ দিয়ে আকর্ষণ করে ভ্রমণকারীদের

    এবং রাসায়নিক পরিবর্তন

    উপত্যকার জলে পরিবেষ্টিত

    এবং ঝড়।

    এরা পৃথিবীকে জয় করেছে

    অন্বেষণ করেছে তাদের ব্যক্তিগত রাসায়নিক ধনসম্পদ ;

    তাদের ভ্রমণে সঙ্গ দ্যায় আমোদপ্রমোদ আর আরাম ;

    তারা নিজেদের সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে যায়

    জাতিদের সম্পর্কে, শ্রেনির এবং প্রাণীদের, এই জাহাজে

    বিশ্রাম করে এবং ঘুর্নি

    পাললিক আলোয়,

    অভীষ্টসন্ধানের ভয়ঙ্কর রাত্রিগুলোতে।

    কেননা জিনিসপত্র, রক্ত, ফুলদল, আগুন, রত্নাবলীর পারস্পরিক কথোপকথন থেকে,

    ধাবমান জাহাজের বারান্দায় উদ্বিগ্ন বিচার-বিবেচনা,

    --দেখতে পাওয়া যায়, জলের গতি দিয়ে চালিত পথের ওই দিকে খাতের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে

    দানবরা, অফুরান আলোয় আলোকিত করছে -- তাদের অভিষ্টসন্ধান ;

    নিজেদের সমন্বিত পরমানন্দের লক্ষ্যে,

    এবং আবিষ্কারের বীরত্বে।

    বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনার মধ্যে

    কমবয়সী যুগল জাহাজের কোনায় একা,

    --তা কি ক্ষমার যোগ্য আদিম লজ্জা ?-

    আর গান গাইছে ও পাহারা দিচ্ছে।

    তলদেশ

    ইল্যুমিনেশান ৩৪

    আমার মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে বাস্তব যেহেতু কন্টকময় --- তবু আমি নিজেকে আবিষ্কার করলুম, আমার প্রেয়সীর ডেরায়, তখন বেশ বড়ো এক নীল-ধূসর পাখি ছাদের আলসের দিকে উড়ে আসছিল কিংবা সন্ধ্যার ছায়ায় আমার ডানাকে অনুসরণ করছিল।

    বিছানার শিয়রের দিকের পায়ার কাছে, আমি তখন সামলাচ্ছিলুম, মেয়েটির আদরের মণিরত্ন এবং তার সেরা পার্থিব শিল্পকর্ম, বেগুনি মাড়ির এক বড়ো ভাল্লুক, লোমে দুঃখমাখানো, স্ফটিকের চোখ আর কনসোল-টেবিলের ওপরে রাখা চাঁদির বাসনপত্র

    তারা সব পরিণত হলো ছায়ায় এবং অগ্নিগর্ভ অ্যাকোয়েরিয়ামে।

    সকাল বেলায় -- জুনমাসের মারমুখো ভোর -- দৌড়ে চলে গেলুম মাঠে, যেন গাধা, যতোক্ষণ না ইতালির শহরতলির স্যাবাইন তরুণীরা এসে আমার ঘাড়ের ওপর পড়ছেন, আমার অভিযোগগুলো নিয়ে হাঁক পাড়লুম আর তড়পালুম।

    এইচ

    ইল্যুমিনেশান ৩৫

    যাকিছু দানবিক তা মালিনীর বিদকুটে অঙ্গভঙ্গীর অবমাননা করে। মেয়েটির একাকীত্ব হলো যৌনতার যন্ত্র ; ওর অবসন্নতা, প্রণয়োদ্দীপক কর্মশক্তি। শৈশবের দ্বারা কড়া নজরে রাখা, মেয়েটি ছিল, বিভিন্ন কালখণ্ডে, জাতিগুলোর অত্যুৎসাহী সুস্বাস্হবাহিকা। ওর দুয়ার গরিবিয়ানার জন্য অবারিত। সেখানে, যারা বেঁচে আছে তাদের নশ্বরতা মেয়েটির কামোচ্ছ্বাসে ও ক্রিয়ায় বিমূর্ত হয়ে ওঠে।

    --ওহ, রক্তে জবজবে মেঝেতে আনাড়ি প্রেমের ভয়ঙ্কর কাঁপুনি এবং স্বচ্ছ উদযানে খুঁজে পাবে মালিনীকে।

    প্রার্থনা

    ইল্যুমিনেশান ৩৬

    আমার সহোদরা ভোরিংঘেমের লুইজি ভানেনকে: -- উত্তর সমুদ্রের দিকে ফেরানো তার নীল খোঁপা। -- জাহাজডুবির কারণে।

    আমার সহোদরা লেওনি অবোয় দ্য’অ্যাশবিকে। ওটস দিয়ে তৈরি মদ ! -- গুঞ্জরিত, জঘন্য, গ্রীষ্মের ঘাস। -- মায়েদের এবং বাচ্চাদের অসুখের খাতিরে।

    লুলুকে -- রাক্ষসী -- যে ‘লেস অ্যামিস’ যুগের বাগ্মীতার প্রতি তার আকর্ষণ এখনও বজায় রেখেছে আর তার অসম্পূর্ণ শিক্ষার উদ্দেশে। পুরুষদের জন্য। --মাদাম অমুককে।

    যে বয়ঃসন্ধি আমার ছিল তার উদ্দেশে। এই বুড়ো সন্তকে, সন্ন্যাস কিংবা ধর্মপ্রচার। গরিবের প্রতিভাকে। এবং উচ্চপদস্হ যাজকদের।

    প্রতিটি ধর্মবিশ্বাসকে, ধর্মবিশ্বাসের স্মৃতিস্হানকে এবং সেই সমস্ত ঘটনা যার কাছে লোকে আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তের আকাঙ্খা অনুযায়ী কিংবা আমাদের নিজস্ব সঙ্কটপূর্ণ পঙ্কিলতার উদ্দেশে।

    এই সন্ধ্যায়, সুমেরুর তুষারচূড়ার সিরসেটোকে, মাছের মতন মোটা, আর দশ মাসের লালচে আলোর মতন ঝলমলে -- ( মেয়েটির হৃদয় পীতাভ তৈলস্ফটিক এবং স্ফুলিঙ্গসম ) -- আমার একমাত্র প্রার্থনা রাতের এলাকার মতন নিঃশব্দ এবং এই মরুঅঞ্চলের বিশৃঙ্খল সন্ত্রাসের চেয়েও দুঃসাহসী।

    যে কোনো মূল্যে এবং প্রতিটি পোশাকে, এমনকি আধ্যাত্মিক যাত্রাতেও। কিন্তু তারপর আর নয়।

    গণতন্ত্র

    ইল্যুমিনেশান ৩৭

    ‘পতাকা এগোয় অপরিচ্ছন্ন ভূদৃশ্যের মাঝে, আর আমাদের দেশোয়ালি বুলি ড্রামের আওয়াজকে মৃদু করে দ্যায়। দেশের মধ্যাংশে আমরা সবচেয়ে নিন্দিত বেশ্যালয়কে লালন করবো। যুক্তিপূর্ণ বিদ্রোহগুলোকে নির্বিবাদে নিকেশ করবো।

    মশলাদার এবং মদে বেহুঁশ দেশগুলোর উদ্দেশে ! -- সবচেয়ে দানবিক শোষণ, শিল্পোৎপাদনকারী বা মিলিটারি সেবার উদ্দেশে। এখান থেকে বিদায়, জানা নেই কোথায়। স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে আমরা গড়ে তুলব হিংস্র দর্শন : বিজ্ঞান সম্পর্কে অবিদিত, আমাদের আরামের জন্যে ছলনাময় : গলায় দড়ি দিক জগতসংসার। সেটাই আসল প্রগতি। ফরোয়ার্ড -- মার্চ !’

    পরী

    ইল্যুমিনেশান ৩৮

    নাক্ষত্রিক নৈঃশব্দে, হেলেনের জন্যে কুমারী ছায়ায় এবং অকম্পমান ঔজ্বল্যে সঞ্চারিত হচ্ছে প্রাণশক্তি। গ্রীষ্মের তাপ বোবা পাখিদের সোপর্দ করা হয়েছিল এবং অপরিহার্য আলস্য, একটা শোকাতুর দামের অতীত মৃত ভালোবাসা আর ডুবন্ত সুগন্ধের উপসাগরে এক বজরাকে উদ্দেশ্য করে।

    কাঠুরিয়াদের স্ত্রীদের চলনছন্দের পর, ধ্বংস হওয়া জঙ্গলের নীচের জলস্রোতের কলধ্বনিতে, এবং প্রতিধ্বনিত উপত্যকায় গোরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজে, আর নিষ্পাদপ প্রান্তরের কান্নায়।

    হেলেনের শৈশবের কারণে কেঁপে উঠতো ঝোপঝাড় আর ছায়ারা, গরিবের বুক, আর স্বর্গীয় কিংবদন্তি।

    আর ওর চোখদুটি এবং নৃত্য, দামি রশ্মির চেয়েও উন্নত, শীতের প্রভাব, আর মুহূর্তটির একক দৃশ্যের আনন্দ।

    যুদ্ধ

    ইল্যুমিনেশান ৩৯

    বাল্যকালে, আমার দর্শনানুপাতকে পরিশুদ্ধ করে দিয়েছিল বিশেষ আকাশ : যাবতীয় চরিত্রেরা আমার অবয়বে ছায়া ফেলেছিল। প্রপঞ্চরা সরে যেতো। এখন, মুহূর্তদের শাশ্বত সংক্রমণ

    এবং গণিতের অশেষ আমাকে এই জগতসংসারের মাঝ দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায় যেখানে আমি প্রতিটি নাগরিক সন্মানে আত্মসমর্পণ করি, অপরিচিত বাচ্চাদের দ্বারা এবং পরিব্যপ্ত অনুভূতির দ্বারা। আমি যুদ্ধের স্বপ্ন দেখি, যা সঠিক তার কিংবা শক্তিমত্তার, অভাবিত যুক্তি ছাড়াই। গানের একটা কলির মতন এটা অত্যন্ত সরল।

    দৈত্য

    ইল্যুমিনেশান ৪০

    ও হলো অনুরাগ এবং বর্তমান কেননা ও ফেনায়িত জলরাশির এবং গ্রীষ্মের শব্দাবলীর সামনে বাড়িটা গড়ে তুলেছে, ও যে কিনা খাদ্য আর পানীয়কে বিশুদ্ধ করেছে, ও যে কিনা অপসৃয়মান জায়গাগুলোর আকর্ষণ এবং সাময়িক নিবৃত্তির অতিমানবিক আনন্দ। ও হলো ভবিষ্যতের অনুরাগ, যে ক্ষমতা ও ভালোবাসায় আমরা, ক্রোধ ও ক্লান্তিকে ধরে রাখি, দেখি আমাদের পাশ কাটিয়ে পতাকাগুলোর মহোল্লাসের ভেতর দিয়ে ঝোড়ো আকাশের পানে চলে যাচ্ছে।

    ও হলো ভালোবাসা, নিখুঁত এবং পুনরাবিষ্কৃত পরিমাপ, দারুণ এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফলে, এবং অসীম-অনন্ত : মারাত্মক ক্ষমতার প্রিয়তম যন্ত্র। আমাদের নিজেদের এবং ওর আত্মসমর্পণের ত্রাস সম্পর্কে আমরা জানি : হে আমাদের স্বাস্হ্যের আনন্দ, আমাদের মৌলিক মানসিক শক্তির প্রেরণা, ওর জন্যে স্বার্থপর অনুরাগ ও আবেগ, ও যে কিনা ওর অনন্তকালীন জীবনে আমাদের ভালোবাসে…। এবং আমরা ওকে ডাকি আর ও সঙ্গ দেয় আমাদের...। এবং যদি আদর ফুরিয়ে যায়, তা অনুরণিত হয়, ওর প্রতিজ্ঞা প্রতিধ্বনিত হয় : ‘এই সমস্ত কুসংস্কার দূর হোক, এই পুরোনো দেহগুলো, এই বাড়িঘর এবং এই সমস্ত কালখণ্ড। আসলে এই নবযুগ অন্ধকার !’

    ও যাবে না ; ও আবার কোনো স্বর্গ থেকে নেমে আসবে না, ও নারীর ক্রোধ ও পুরুষের হর্ষকে, এবং যাবতীয় পাপের মুক্তি খুঁজে পাবে না : কেননা তা ফুরিয়ে গেছে, ওর অস্তিত্ব আছে, আর ওকে লোকে ভালোবাসে।

    হে ওর শ্বাসপ্রশ্বাস, ওর মস্তক, ওর ছুটে চলা : আঙ্গিক ও কর্মশীলতার পূর্ণতাপ্রাপ্তির অসম্ভব দ্রুতি!

    হে মননশক্তির এবং বিশ্বলোকের বিশালতার বহুপ্রসূতা !

    ওর দেহ ! স্বপ্নে দেখা উত্তরণ, নব্য-সন্ত্রাসের মুখোমুখি চুরমার ঐশ্বরিক করুণা !

    ওকে নাগাল পাওয়া, ওর নাগাল পাওয়া ! ও পাশ দিয়ে চলে গেলে পুরোনো হাঁটুগাড়া আর ব্যথা উধাও হয়।

    ওর আলো ! যাবতীয় নাকিসুর এবং অসহ্য কষ্ট গভীর সঙ্গীতে বিলুপ্ত হয়।

    ওর পদক্ষেপ ! প্রাচীন আক্রমণের তুলনায় প্রচরণশীলতা আরও অস্বাভাবিক।

    হে ও আর আমরা ! অন্যের পরিত্যক্ত সেবার চেয়ে গর্ববোধ বেশি দয়ালু।

    হে জগতসংসার ! এবং নতুন দুর্ভাগ্যের সুস্পষ্ট গান !

    ও আমাদের সবাইকে জেনেছে এবং ভালোবেসেছে। আজকের এই শীতের রাতে হয়তো আমরা জানতে পারবো, অন্তরীপ থেকে অন্তরীপে, বিক্ষুব্ধ মেরু থেকে জমিদারের পল্লীভবন পর্যন্ত, ভিড় থেকে বালিয়াড়ি পর্যন্ত, চাউনি থেকে চাউনি পর্যন্ত, শক্তি ও অনুভব ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কেমন করে ওকে অভিবাদন জানানো হবে আর দেখা হবে, এবং আবার পাঠিয়ে দেয়া হবে ওর যাত্রায়, আর জোয়ারের তলায় ও তুষারের মরুভূমির ওপরে, ওর দৃষ্টিপ্রতিভাকে অনুসরণ করে, ওর নিঃশ্বাস, ওর দেহ, ওর আলো।

    যৌবন

    ইল্যুমিনেশান ৪১

    রবিবার

    সমস্যা তো আছেই, আকাশ থেকে অবধারিত পতন আর স্মৃতির আগমন এবং একত্রিত ছন্দ বাসাকে দখল করে নেয়, মাথাকে আর জগতসংসারের মনকে।

    --বনানী আর খেত পেরিয়ে একটা ঘোড়া শহরতলির ঘাসে দৌড়োতে আরম্ভ করে, প্লেগের অঙ্গারে ঝাঁঝরা। কোনো নাটকে একজন দুস্হ মহিলা, জগতসংসারের কোথাও, পরিত্যক্ত হবার অসম্ভাব্যতায় দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে। বেপরোয়া লোকেরা ঝড়ের, মাতলামির আর আঘাতের জন্যে অপেক্ষা করে আছে। নদীর ধারে ছোট্ট বাচ্চারা অভিশাপের কন্ঠরোধ করে।

    এবার আমাদের সমীক্ষা আবার শুরু করা যাক যা জনগণের মাঝে জেগে-ওঠা ক্লান্তিকর কাজের দ্বারা জড়ো করা হয়েছে।

    সনেট

    স্বাভাবিক গড়নের পুরুষ, বাগানে ঝুলন্ত ফলের মাংসে তৈরি নয়, ওহ শৈশবের দিনগুলো ! দেহ হলো হেলাফেলায় নষ্ট করার ধনসম্পদ ; ওহ, প্রেমে, মননের দোষ না শক্তি ? রাজপুত্র এবং শিল্পীতে পৃথিবীর ঢালু অংশ ছিল উর্বর, এবং বংশধররা ও জাতি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অপরাধ ও শোকে : জগতসংসার, তোমার ভাগ্য ও তোমার বিপদ। কিন্তু এখন, সেই খাটুনির পুরস্কার, তুমি, তোমার হিসেবনিকেশ, তুমি, তোমার ধৈর্যহীনতা, তোমার নাচের ও কন্ঠস্বরের চেয়ে বেশি কিছু নয়, স্হিরীকৃত নয়, বলপ্রয়োগ করেও নয়, যদিও আবিষ্কার ও যুক্তির দ্বিগুণ সাফল্যের ফলাফলের দ্বারা, নিজেকে জাহির না করে এবং ভাতৃত্ববোধের মানবিকতায়, চিত্রহীন ভূমণ্ডলে -- শক্তিমত্তা ও অধিকার প্রতিফলিত করে সেই নৃত্য ও কন্ঠস্বরকে, যা কেবল এখনই প্রশংসিত...

    কুড়ি বছর

    নির্দেশক কন্ঠস্বর নির্বাসিত...দৈহিক অকপটতা তিক্তভাবে বাসি...ধীর লয়ের সঙ্গীত। আহ, বয়ঃসন্ধির অশেষ অহংকার, সাগ্রহ আশাবাদ : সেই গ্রীষ্মে, কতো ফুলে ভরা ছিল জগতসংসার ! বাতাস ও আদল শুকিয়ে যাচ্ছে...নপুংসকতা ও অনুপস্হিতিকে প্রশান্ত করার জন্যে গির্জার ঐকতান গায়কমণ্ডলী। কাচের ঐকতানমণ্ডলী রাতের সুর...সত্যিই স্নায়ুরা সত্বর শিকারে বেরোবে।

    তুমি এখনও অ্যান্টনির প্রলোভনে আকর্ষিত। ছেঁটে-ফেলা উৎসাহের সঙ, তুচ্ছ গর্ববোধের আক্ষেপ, দুর্বল হয়ে চলেছো, এবং সন্ত্রস্ত। কিন্তু তুমি নিজেকে কাজে লাগাবে : তোমার উচ্চাসনের চারিধারে যাবতীয় ঐকতানময় ও স্হাপত্যের সম্ভাবনা ঘুরে বেড়াবে। অদেখা নিখুঁত প্রাণীরা তোমার নিরীক্ষায় আত্মসমর্পণ করবে। তোমার চারিপাশে জড়ো হবে প্রাচীন জনগণের স্বপ্নালু কৌতূহল এবং অলস বৈভব। তোমার স্মৃতি এবং তোমার ইন্দ্রিয়েরা তোমার সৃষ্টির আবেগের খোরাক হয়ে উঠবে। আর যদি জগতসংসারের কথা বলো, তুমি উঠে দাঁড়াবে, তাতে কীই বা হবে ? কিচ্ছু নয়, যতোই যাই হোক, বর্তমানে যা আঁচ করা যাচ্ছে।

    বিক্রয়

    ইল্যুমিনেশান ৪২

    বন্ধকী কারবারিরা যা বিক্রি করেনি তা বিক্রয়ের জন্যে, আভিজাত্য ও অপরাধ যে অভিজ্ঞতা আস্বাদন করেনি, যা প্রেমের কাছে এবং জনসাধারণের নারকীয় সততার কাছে অজানা; তাকে সমসময় ও বিজ্ঞানের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই :

    কন্ঠস্বরগুলোর পুনর্গঠন হয়েছে ; তাবৎ ঐকতানীয় ও সুরসংযোজিত কর্মচাঞ্চল্য এবং তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োগ ; উপলক্ষ, একক, আমাদের ইন্দ্রিয়কে মুক্ত করার জন্য !

    দামের চেয়ে বেশি দরে দেহ বিক্রির জন্যে, অপরিচিত জাতির, জগতের, যৌনতার, কিংবা অধঃপতনের জন্য !

    প্রতি পদক্ষেপে ধনদৌলতের উৎসার ! হীরের অবাধ বিক্রি !

    জনগণকে বিক্রির জন্য নৈরাজ্য ; রসপণ্ডিতদের জন্য অদম্য আনন্দ ; প্রেমিক-প্রেমিকার জন্যে, অনুগতদের জন্যে নৃশংস মৃত্যু !

    বিক্রির জন্য রয়েছে বসত এবং স্হানান্তর, খেলধুলা, নিখুঁত পুলক ও আরাম, এবং শব্দাবলী, প্রণোদন ও যে ভবিষ্যৎ তারা গড়ে তুলবে !

    বিক্রির জন্যে রয়েছে শোনা যায়নি এমন গণনা ও ঐকতান-ধাবনের প্রয়োগ

    আকস্মিকতা আবিষ্কার করে অভাবিত স্হিতিকাল, তার তাৎক্ষণিক মালিকানাসহ।

    অদৃশ্য সমারোহ, অননুভবনীয় পরমানন্দের প্রতি আরণ্যক ও অশেষ আবেগ, সঙ্গে তাদের প্রতিটি পঙ্কিলতার জন্যে এবং ভিড়ের ভয়াবহ চালচলনের জন্যে পাগলকরা গোপনীয়তা।

    বিক্রির জন্য রয়েছে দেহ, কন্ঠস্বর, প্রচুর প্রশ্নাতীত ধনদৌলত, সবকিছুই যা কখনই বিক্রির জন্যে নয়। বিক্রেতারা এখনও পর্যন্ত তাদের মাল শেষ করতে পারেনি ! বহুদিন পর্যন্ত দোকানদাররা তাদের বেতন দাবি করতে পারবে না !

    [ রচনাকাল ১৮৭৩ - ১৮৭৫ ]

    [ অনুবাদ : ২০১৯ ]

  • ট্রাউজার-পরা মেঘ : মায়াকভস্কি | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৩৭732394
  • ট্রাউজার-পরা মেঘ : ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    প্রস্তাবনা

    তুমি ভাবলে,

    স্যাঁতসেতে এক মগজের কল্পনায়,

    এক তেলচিটে খাটে হাত-পা-ছড়ানো পেট-মোটা চাকরের মতন,--

    আমার হৃদয়ের রক্তাক্ত ছেঁড়া টুকরো নিয়ে, আমি আবার ঠাট্টা করব।

    যতক্ষণ না আমি উপেক্ষিত নই, আমি হবো নিষ্ঠুর আর পীড়াদায়ক।

    আমার চিত্তে আর দাদুসুলভ স্নেহশীলতা নেই,

    আমার আত্মায় আর ধূসর চুল নেই !

    আমার কন্ঠস্বর দিয়ে জগতকে ঝাঁকিয়ে আর কাষ্ঠহাসি হেসে,

    আমি তোমাদের পাশ দিয়ে চলে যাই, -- সৌম্যকান্তি,

    বাইশ বছর বয়সী।

    সুশীল ভদ্রমহোদয়গণ !

    তোমরা বেহালায় তোমাদের ভালোবাসা বাজাও।

    অমার্জিতরা তা ঢোলোকে তারস্বরে বাজায়।

    কিন্তু তোমরা কি নিজেদের অন্তরজগতকে বাইরে আনতে পারো, আমার মতন

    আর কেবল দুটো ঠোঁট হয়ে যেতে পারো পুরোপুরি ?

    এসো আর শেখো--

    তোমরা, দেবদূত-বাহিনীর ফুলবাবু আমলার দল !

    মিহি কাপড়ের বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে এসো

    আর তোমরা, যারা তোমাদের ঠোঁট পেতে দিতে পারো

    সেই রাঁধুনীর মতন যে নিজের রান্নার বইয়ের পাতা ওলটায়।

    যদি তোমরা চাও--

    আমি কাঁচা মাংসের ওপরে চারুশিল্পের শত্রুর মতন লালসিত হবো

    কিংবা সূর্যোদয় যে উদ্রেক ঘটায় তার রঙে পালটে দেবো,

    যদি তোমরা চাও---

    আমি হতে পারি অনিন্দনীয় সুশীল,

    মানুষ নয় -- কিন্তু ট্রাউজার-পরা এক মেঘ।

    আমি সুন্দর অঙ্কুরোদ্গমে বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করি !

    তা সত্ত্বেও আমি তোমাদের প্রশংসা করব, ---

    পুরুষের দল, হাসপাতালের বিছানার চাদরের মতন কোঁচকানো,

    আর নারীরা, অতিব্যবহৃত প্রবাদের মতন নির্যাতিত।

    প্রথম পর্ব

    তোমরা কি ভাবছ আমি ম্যালেরিয়ায় ভুল বকছি ?

    তা ঘটেছিল।

    ওডেসায়, তা ঘটেছিল।

    “আমি চারটের সময় আসব,” কথা দিয়েছিল মারিয়া।

    আটটা…

    নয়টা…

    দশটা…

    তারপর তাড়াতাড়ি,

    সন্ধ্যা,

    বিরাগ দেখানো,

    আর ডিসেম্বরসুলভ,

    জানালাগুলো ছেড়ে

    আর ঘন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

    আমার পেছন থেকে, আমি শুনতে পাই হ্রেষা আর হাসি

    ঝাড়বাতিগুলোর।

    তোমরা আমায় চিনতে পারতে না যদি আগে থেকে পরিচিত হতে :

    পেশীতন্তুর স্তুপ

    গোঙানি,

    স্নায়বিক অস্হিরতা।

    এরকম একজন বোকাটে কি চাইতে পারে ?

    কিন্তু একজন বোকাটে অনেক কিছু চায়।

    কেননা নিজের জন্য তা অর্থহীন

    তা তোমরা তামায় গড়া হও

    কিংবা হৃদয় হোক শীতল ধাতুর।

    রাতের বেলায়, তোমাদের দাবিকে জড়িয়ে নিতে চাইবে

    মেয়েলি কোনোকিছু দিয়ে,

    কোমল।

    আর এইভাবে,

    বিশাল,

    আমি কাঠামোর ভেতরে প্রতিষ্ঠিত হই.

    আর আমার কপাল দিয়ে, গলিয়ে ফেলি জানালার কাচ।

    এই ভালোবাসা কি অসাধারণ হবে নাকি গতানুগতিক ?

    তা কি বজায় থাকবে নাকি উপেক্ষিত হবে ?

    বিরাট কেউ এরকম দেহে আঁটবে না :

    একটু ভালোবাসা জরুরি, -- একটা শিশু, হয়তো,

    যখন মোটরগাড়ি হর্ন বাজায় আর আওয়াজ করে তখন এ ভয় পায়,

    কিন্তু ঘোড়ায়-টানা ট্র্যামের ঘণ্টি পছন্দ করে।

    আমি মুখোমুখি হলুম

    তরঙ্গায়িত বৃষ্টির সঙ্গে,

    তবু আরেকবার,

    আচ্ছা অপেক্ষা করো

    শহুরে ফেনার বজ্রপাতের গর্জনে ভিজে গেলুম।

    ছুরি নিয়ে পাগলের মতন বাইরে বেরিয়ে,

    রাত ওকে ধরে ফেললো

    আর ছুরি মেরে দিলো,

    কেউ দেখেনি।

    ঠিক মধ্যরাতে

    গিলোটিন থেকে খসা মুণ্ডুর মতন পড়ে গেলো।

    জানালার কাচে রুপোর বৃষ্টিফোঁটা

    জমিয়ে তুলছিল মুখবিকৃতি

    আর চেঁচাচ্ছিল।

    যেন নত্রে দামের পশুমুখো নর্দমাগুলো

    চেল্লানো আরম্ভ করে দিলো।

    ধিক্কার তোমাদের !

    যা ঘটেছে তাতে কি তোমরা এখনও সন্তুষ্ট নও ?

    কান্না এবার চারিধার থেকে আমার গলা কাটবে।

    আমি শুনতে পেলুম:

    আস্তে,

    বিছানার বাইরে রোগীর মতন,

    একটা স্নায়ু লাফালো

    নীচে।

    প্রথমে,

    পুরুষটা সরে যায়নি, প্রায়।

    তারপর, সন্দিগ্ধ

    আর সুস্পষ্ট,

    ও লাফাতে আরম্ভ করলো।

    আর এখন, ও আর আরও দুই জন,

    এদিক-ওদিক লাফাতে লাগলো, তিড়িঙ নাচ।

    একতলায়, পলেস্তারা তাড়াতাড়ি খসে পড়ছিল।

    স্নায়ুরা,

    বড়োগুলো

    ছোটোগুলো,--

    নানান ! --

    পাগলের মতন টগবগাতে আরম্ভ করলো

    যতক্ষণ না, শেষে,

    ওদের পা ওদের টানতে অক্ষম হলো।

    ঘর থেকে রাত টপটপ করে বেরিয়ে এলো আর ডুবে গেলো।

    চটচটে মাটিতে আটকে গিয়ে, চোখ তা থেকে পিছলে বের করতে পারলো না।

    হঠাৎ দরোজাগুলো দুমদাম করতে লাগলো

    যেন হোটেলের দাঁতগুলো কিড়মিড় করতে শুরু করেছে।

    তুমি প্রবেশ করলে,

    আচমকা যেন “এই নাও !”

    সোয়েড চামড়ার মোচড়ানো দস্তানা পরে, তুমি অপেক্ষা করলে,

    আর বললে,

    “তুমি জানো,--

    আমার শিগগির বিয়ে হবে।”

    তাহলে যাও বিয়ে করো।

    ঠিকই আছে,

    আমি সামলে নিতে পারবো।

    দেখতেই পাচ্ছো -- আমি শান্ত, নিঃসন্দেহে !

    কোনো শবের

    নাড়ির স্পন্দনের মতন।

    মনে আছে ?

    তুমি বলতে :

    “জ্যাক লণ্ডন,

    টাকাকড়ি,

    ভালোবাসা আর আকুলতা,”--

    আমি কেবল একটা ব্যাপারই দেখেছি :

    তুমি ছিলে মোনালিসা,

    যাকে চুরি করা জরুরি ছিল !

    আর কেউ তোমায় চুরি করে নিলো।

    ভালোবাসায় আবার, আমি জুয়া খেলা আরম্ভ করব,

    আমার ভ্রুর তোরণ আগুনে উদ্ভাসিত।

    আর কেনই বা নয় ?

    অনেক সময়ে গৃহহীন ভবঘুরেরা

    পোড়া বাড়িতেও আশ্রয় খোঁজে !

    তুমি আমাকে ঠাট্টা করছো ?

    “উন্মাদনার কেবল গুটিকয় চুনী আছে তোমার

    ভিখারির কয়েক পয়সার তুলনায়, একে ভুল প্রমাণ করা যাবে না !”

    কিন্তু মনে রেখো

    এইভাবেই পম্পেইয়ের শেষ হয়েছিল

    যখন কেউ ভিসুভিয়াসের সঙ্গে ইয়ার্কি করেছিল !

    ওহে !

    ভদ্রমহোদয়গণ !

    তোমরা অশুচি

    নিয়ে চিন্তা করো,

    অপরাধ

    আর যুদ্ধ।

    কিন্তু তোমরা কি দেখেছো

    ভয়ঙ্কর সন্ত্রস্ত

    আমার মুখ

    যখন

    তা

    নিখুঁত শান্তিময়তায় থাকে ?

    আর আমি অনুভব করি

    “আমি”

    আমাকে ধরে রাখার জন্য খুবই ক্ষুদ্র।

    আমার অন্তরে কেউ কন্ঠরুদ্ধ হচ্ছে।

    হ্যালো !

    কে কথা বলছে ?

    মা ?

    মা !

    তোমার ছেলের হয়েছে এক অত্যাশ্চর্য অসুখ !

    মা !

    ওর হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে !

    তার বোন, লিডিয়া আর ওলগাকে বোলো

    যে আর কোথাও কোনো লুকোবার জায়গা নেই।

    প্রতিটি শব্দ,

    মজার হোক বা অভদ্র,

    যা ও নিজের জ্বলন্ত মুখ থেকে ওগরায়,

    উলঙ্গ বেশ্যার মতন ঝাঁপিয়ে পড়ে

    জ্বলন্ত বেশ্যালয় থেকে।

    লোকেরা গন্ধ শোঁকে--

    কোনো কিছু পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

    ওরা দমকলকে ডাকে।

    ঝলমলে হেলমেট পরে

    তারা অবহেলাভরে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে।

    ওহে, দমকলের লোকদের বলো :

    বুটজুতো পরে ঢোকার অনুমতি নেই !

    গনগনে হৃদয় নিয়ে একজনকে বিচক্ষণ হতে হবে।

    আমিই তা করব !

    আমি আমার জলভরা চোখ ঢেলে দেবো চৌবাচ্চায়।

    আমাকে কেবল আমার পাঁজরকে ঠেলতে দাও আর আমি আরম্ভ করে দেবো।

    আমি লাফিয়ে পড়বো ! তোমরা আমাকে বাধা দিতে পারবে না !

    তারা বিদ্ধস্ত।

    তোমরা হৃদয় থেকে লাফিয়ে পড়তে পারবে না !

    ঠোঁটের ফাটল থেকে,

    এক অঙ্গার-আস্তৃত চুমু উৎসারিত হয়,

    জ্বলন্ত মুখাবয়ব থেকে পালিয়ে যায়।

    মা !

    আমি গান গাইতে পারি না।

    হৃদয়ের প্রার্থনাঘরে, আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল গায়কদের গায়ে !

    শব্দাবলী আর সংখ্যাসমূহের প্রতিমাদের

    খুলির ভেতর থেকে,

    জ্বলন্ত বাড়ি থেকে শিশুদের মতন, পালাতে থাকে।

    এইভাবে ভয়,

    আকাশে পৌঁছে, ডাক দেয়

    আর তুলে ধরে

    লুসিতানিয়ার আগুনে-বাহু আর উদ্বেগ।

    শত-চোখ আগুন শান্তির দিকে তাকালো

    ফ্ল্যাটবাড়ির দিকে, যেখানে লোকেরা ঘামছিল।

    এক শেষতম চিৎকারে,

    তুমি কি গোঙাবে, অন্তত,

    শতাব্দীগুলোকে প্রতিবেদন দেবার জন্য যে আমি অগ্নিদগ্ধ ?

    দ্বিতীয় পর্ব

    আমার মহিমাকীর্তন করো !

    প্রসিদ্ধরা কেউ আমার সমকক্ষ নয় !

    যাকিছু এপর্যন্ত করা হয়েছে তার ওপরে

    আমি ছাপ মেরে দিই “নস্যাৎ।”

    আপাতত, আমার পড়ার ইচ্ছে নেই।

    উপন্যাস ?

    তাতে কি !

    বইপত্র এইভাবে তৈরি হয়,

    আমি ভাবতুম :--

    একজন কবির আগমন হয়,

    আর নিজের ঠোঁট অনায়াসে খোলে।

    অনুপ্রাণিত, মূর্খটা বেমালুম গাইতে আরম্ভ করে--

    ওহ ক্ষান্তি দাও !

    দেখা গেলো :

    উৎসাহে গাইবার আগে,

    নিজেদের কড়া-পড়া পায়ে ওরা কিছুক্ষণ তাল ঠোকে,

    যখন কিনা কল্পনার ঘিলুহীন মাছেরা

    হৃদয়ের পাঁকে কাদা ছেটায় আর মাখামাখি করে।

    আর যখন, ছন্দে হিসহিসোচ্ছে, ওরা গরম জলে সেদ্ধ করে

    যাবতীয় ভালোবাসা আর পাপিয়া-পাখিদের ক্বাথের মতন ঝোলে,

    জিভহীন পথ কেবল কিলবিল করে আর কুণ্ডলী পাকায়---

    তাতে আর্তনাদ করার বা এমনকি বলার মতো কিছুই থাকে না।

    আমরা নিজের গর্ববশে, সারাদিন সৎমেজাজে কাজ করি

    আর ব্যাবেলের শহর-মিনারগুলোর আবার পুনরানয়ন হয়।

    কিন্তু ঈশ্বর

    গুঁড়িয়ে

    এই শহরগুলোকে ফাঁকা মাঠে পালটে ফ্যালেন,

    শব্দকে মন্হন করে।

    নৈঃশব্দে, রাস্তাকে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় দুর্দশায়।

    গ্রাসনলিকার পথে এক চিৎকার ঋজু দাঁড়িয়ে পড়ে।

    যখন মোটাসোটা ট্যাক্সি আর মোটরগাড়ি অন্তরায়ে স্হির,

    গলার ভেতরে আটকে থাকে।

    যেন ক্ষয়রোগের কারণে,

    নিষ্পিষ্ট বুক শ্বাস নেবার জন্য খাবি খাচ্ছিল।

    শহর, বিষাদে আক্রান্ত, তাড়াতাড়ি রাস্তা বন্ধ করে দিলো।

    আর তখন--

    তা সত্ত্বেও !--

    রাস্তাটা চৌমাথার মোড়ে নিজের ধকল উগরে দিলো কেশে

    আর গলা থেকে বারান্দাকে ঠেলে বের করে দিলো, শেষ পর্যন্ত,

    মনে হলো যেন,

    শ্রেষ্ঠশ্রেনির দেবদূতের গায়কদলের ধুয়ায় যোগ দিয়ে,

    সাম্প্রতিককালে লুন্ঠিত, ঈশ্বর তার তাপ আমাদের দেখাবে !

    কিন্তু রাস্তাটা উবু হয়ে বসে কর্কশকন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো :

    “খেতে যেতে দাও !”

    শিল্পপতি ক্রুপ আর তার আণ্ডাবাচ্চারা ঘিরে ধরে

    শহরে চোখরাঙানো ভ্রু আঁকার জন্য,

    যখন কিনা সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথে

    শব্দাবলীর লাশ এদিক-ওদিক ছড়ানো পড়ে থাকে,--

    দুটো বেঁচে থাকে আর মাথাচাড়া দ্যায়,--

    “শুয়োর”

    আর অন্যটা,--

    আমার মনে হয় “খাবার সুপ”।

    আর কবির দল, ফোঁপানি আর নালিশে ভিজে সপসপে,

    রাস্তা থেকে দৌড় লাগায়, বিরক্ত আর খিটখিটে :

    “ওই দুটো শব্দ দিয়ে এখন আর ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়

    এক সুন্দরী রমণী

    কিংবা ভালোবাসা

    কিংবা শিশির-ঢাকা ফুল।”

    আর কবিদের পর,

    অন্যান্য হাজার লোকের হুড়োহুড়ি আরম্ভ হলো :

    ছাত্রছাত্রীর দল,

    বেশ্যার দল,

    বিক্রেতার দল।

    ভদ্রমহোদয়গণ,

    থামুন !

    আপনারা তো অভাবগ্রস্ত নন ;

    তাহলে ভদ্রমহোদয়গণ কেন আপনারা ওগুলো চাইছেন !

    প্রতিটি পদক্ষেপে দালান অতিক্রম করে,

    আমরা স্বাস্হ্যবান আর অত্যুৎসাহী !

    ওদের কথা শুনবেন না, বরং ওদের পিটুনি দিন !

    ওদের,

    যারা মাঙনার বাড়তি হিসাবে সেঁটে রয়েছে

    প্রতিটি রাজন্য-বিছানায় !

    আমাদের কি নম্রভাবে ওদের জিগ্যেস করতে হবে :

    “সাহায্য করো, দয়া করে !”

    স্তবগানের জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করতে হবে

    আর বাগ্মীতার জন্য ?

    আমরা জ্বলন্ত স্তবগানের সৃষ্টিকারী

    কলমিল আর রসায়ানাগারের গুনগুনানির পাশাপাশি।

    আমি কেন ফাউস্তের কথা ভাবতে যাবো ?

    আতশবাজির লুন্ঠনে পরীদের প্রদর্শন করে

    ও মেফিসটোফিলিসের সঙ্গে নক্ষত্রপূঞ্জের নকশাকাটা পাটাতনে পিছলে চলেছে !

    আমি জানি --

    আমার বুটজুতোয় একটা পেরেক

    গ্যেটের কল্পনার চেয়ে বেশি ভয়াবহ !

    আমি

    সবচেয়ে সোনালী-হাঁমুখের

    প্রতিটি শব্দের সঙ্গে আমি দিচ্ছি

    দেহের এক নামদিবস,

    আর আত্মাকে এক পূনর্জন্ম,

    আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি :

    জীবজগতের কণাও

    আমি এই পৃথিবীতে যা কিছু করব তার চেয়ে অনেক বেশি !

    শোনো !

    বর্তমান যুগের জরাথুষ্ট্র,

    ঘামে ভিজে,

    তোমাদের চারিপাশে দৌড়োচ্ছে আর এখানে ধর্মপ্রচার করছে।

    আমরা,

    বিছানার কোঁচকানো চাদরের মতন মুখ নিয়ে,

    ঝাড়লন্ঠনের মতন ঝোলা ঠোঁটে,

    আমরা,

    কুষ্ঠরোগীর জন্য নির্দিষ্ট শহরে বন্দী,

    যেখানে, জঞ্জাল আর সোনা থেকে, কুষ্ঠরোগীদের ঘা দেখা দিয়েছিল,

    আমরা ভেনিসের নীলাভ সমুদ্রের চেয়ে পবিত্র,

    রোদ্দুরের মলম-রশ্মিতে ধোয়া।

    আমি সেই তথ্যে থুতু ফেলি

    যে হোমার আর ওভিদ সৃষ্টি করেননি

    গুটিবসন্তে ঢাকা ঝুল,

    আমাদের মতন সব মানুষদের,

    কিন্তু সেই সঙ্গে, আমি জানি যে

    সূর্য ফ্যাকাশে হয়ে যাবে

    যদি তা আমাদের আত্মার সোনালি খেতের দিকে তাকায়।

    প্রার্থনার তুলনায় পেশী আমাদের কাছে নির্বিকল্প !

    আমরা আর ভরতুকির জন্য প্রার্থনা করব না !

    আমরা--

    আমরা প্রত্যেকে--

    নিজেদের মুঠোয় ধরে রাখি

    জগতকে চালনা করার লাগাম !

    এ-থেকেই সভাস্হলগুলোয় গোলগোথার সূত্রপাত

    পেট্রোগ্রাড, মসকো, কিয়েভ, ওডেসায়,

    আর তোমাদের একজনও সেখানে ছিলে না যারা

    এইভাবে হাঁক পাড়ছিল না :

    “ওকে ক্রুসবিদ্ধ করো !

    ওকে উচিত শিক্ষা দাও !”

    কিন্তু আমার কাছে,--

    জনগণ,

    এমনকি তোমরা যারা জঘন্য ব্যবহার করেছ,--

    আমার কাছে, তোমরা প্রিয় আর আমি গভীরভাবে তোমাদের কদর করি।

    দেখোনি কি

    যে হাত তাকে পেটাচ্ছে সেই হাতকেই কুকুরটা চাটছে ?

    আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে

    আজকালকার দলবল।

    তারা তৈরি করেছে

    আমাকে নিয়ে

    একটা নোংরা পরিহাস।

    কিন্তু আমি সময়ের পাহাড়কে ডিঙিয়ে দেখতে পাই,

    ওনাকে, যাঁকে কেউ দেখতে পায় না।

    যেখানে মানুষের দৃষ্টিশক্তি পৌঁছোয় না,

    বিপ্লবের কাঁটার মুকুট পরে,

    ক্ষুধার্ত মানুষদের নেতৃত্ব দিয়ে,

    ১৯১৬ সাল ফিরে আসছে।

    তোমাদের মধ্যে, ওনার অগ্রদূত,

    যেখানেই দুঃখকষ্ট থাকবে, আমি থাকবো কাছাকাছি।

    আমি সেখানে নিজেকে ক্রুশবিদ্ধ করেছি,

    প্রতিটি অশ্রুফোঁটার ওপরে।

    ক্ষমা করার মতন এখন আর কিছু নেই !

    যে আত্মারা সমবেদনার অঙ্কুরের জন্ম দেয়, আমি পুড়িয়ে দিয়েছি তার ক্ষেত।

    তা অনেক কঠিন

    হাজার হাজার ব্যাষ্টিল আক্রমণের তুলনায়।

    আর যখন

    তাঁর আবির্ভাব ঘোষিত হয়,

    আনন্দে আর গর্বে,

    তোমরা এগিয়ে যাবে উদ্ধারককে অভ্যর্থনা জানাতে--

    আমি টেনে নিয়ে যাবে

    বাইরে আমার আত্মাকে,

    আর পায়ে পিষবো

    যতক্ষণ না তা ছড়িয়ে পড়ছে !

    আর তোমাদের হাতে তুলে দেবো, রক্তে লাল, পতাকা হিসাবে।

    তৃতীয় পর্ব

    আহ, কেমন করে আর কোথা থেকে

    ব্যাপারটা এই পরিণতিতে পৌঁছেছে যে

    উন্মাদনার নোংরা মুঠোগুলো

    আলোকময় আনন্দের বিরুদ্ধে বাতাসে তুলে ধরা হয়েছিল ?

    মেয়েটি এলো,--

    পাগলাগারদের চিন্তায়

    আর আমার মাথা ঢেকে দিলো বিষণ্ণতায়।

    আর যেমন ড্রেডনট যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসের বেলায়

    কন্ঠরুদ্ধ অঙ্গবিক্ষেপে

    সেনারা আধখোলা দরোজার ভেতরে লাফিয়ে পড়েছিল, জাহাজডুবির আগে,

    ভবিষ্যবাদী কবি বারলিয়ুক হামাগুড়ি দিয়ে এগোল, পেরিয়ে গেল

    তাঁর চোখের চিৎকাররত ফাঁক দিয়ে।

    তাঁর চোখের পাতাকে প্রায় রক্তাক্ত করে,

    উনি দেখা দিলেন হাঁটু গেড়ে,

    উঠে দাঁড়ালেন আর হাঁটতে লাগলেন

    আর উত্তেজিত মেজাজে,

    কোমলভাবে, অমন মোটা একজনের কাছে অপ্রত্যাশিত,

    উনি কেবল বললেন :

    “ভালো !”

    ব্যাপারটা ভালোই যখন পর্যবেক্ষণে এক হলুদ সোয়েটার

    আত্মাকে লুকিয়ে রাখে !

    ব্যাপারটা ভালোই যখন

    ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে, আতঙ্কের মুখোমুখি,

    তুমি চেঁচিয়ে বলো :

    “কোকো খাও -- ভ্যান হুটেন কোম্পানির !”

    এই মুহূর্ত,

    বাংলার আলোর মতন,

    বিস্ফোরণে ঝলসে,

    আমি কিছুর সঙ্গেই অদলবদল করব না,

    কোনো টাকাকড়ির জন্যও নয়।

    চুরুটের ধোঁয়ায় মেঘাচ্ছন্ন,

    আর মদের গেলাসের মতন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত,

    যে কেউ কবি সেভেরিয়ানিন-এর মতো মাতাল-মুখো হতে পারে।

    কোন সাহসে তুমি নিজেকে কবি বলো

    আর ধূসর, তিতির-পাখির মতন, নিজের আত্মাকে কিচিরমিচিরে ডুবিয়ে দাও !

    তখন

    পেতলের বাঘনখ দিয়ে

    ঠিক এই মুহূর্তে

    জগতের খুলিকে তোমায় চিরে ফেলতে হবে !

    তুমি,

    মাথায় শুধু একটিমাত্র ভাবনা নিয়ে,

    “আমি কি শৈলী অনুযায়ী নাচছি ?”

    দ্যাখো আমি কতো আনন্দিত

    তার বদলে,

    আমি,--

    সদাসর্বদা একজন ভেড়ুয়া আর জোচ্চোর।

    তোমাদের সবার কাছ থেকে,

    যারা মামুলি মজার জন্য ভালোবাসায় ভিজেছো,

    যারা ছিটিয়েছো

    শতকগুলোতে অশ্রুজল, যখন তোমরা কাঁদছিলে,

    আমি বেরিয়ে চলে যাবো

    আর সূর্যের একচোখ চশমাকে বসাবো

    আমার বড়ো করে খোলা, একদৃষ্ট চোখে।

    আমি রঙিন পোশাক পরব, সবচেয়ে অস্বাভাবিক

    আর পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবো

    জনগণকে খুশি দিতে আর তাতিয়ে তুলতে,

    আর আমার সামনে

    এক ধাতব দড়িতে গলাবাঁধা,

    ছোটো কুকুরবাচ্চার মতন দৌড়োবে নেপোলিয়ান।

    একজন নারীর মতন, শিহরিত, পৃথিবী শুয়ে পড়বে,

    আত্মসমর্পণ করতে চেয়ে, মেয়েটি ধীরে-ধীরে অবনত হবে।

    জীবন্ত হয়ে উঠবে সবকিছু

    আর চারিদিক থেকে,

    ওদের ঠোঁট তোতলা কথা বলবে :

    “য়াম-য়াম-য়াম-য়াম !”

    হঠাৎ,

    মেঘের দল

    আর বাতাসে অন্যান্য ব্যাপার

    আশ্চর্য কোনো উত্তেজনায় আলোড়িত,

    যেন শাদা-পোশাকে শ্রমিকদল, ওপরে ওইখানে,

    হরতাল ঘোষণা করেছে, সবাই তিক্ত আর আবেগে আক্রান্ত।

    বর্বর বজ্র মেঘের ফাটল থেকে উঁকি দিলো, ক্রুদ্ধ।

    নাকের বিশাল ফুটো থেকে ঘোড়ার ডাক দিয়ে, গর্জন করলো

    আর এক মুহূর্তের জন্যে, আকাশের মুখ তেবড়ে বেঁকে গেলো,

    লৌহ বিসমার্কের ভেঙচির মতন।

    আর কেউ একজন,

    মেঘের গোলকধাঁধায় জড়িয়ে,

    কফিপানের রেস্তরাঁর দিকে, হাত বাড়িয়ে দিলো এখন :

    দুটিই, কোমলতর,

    আর নারীমুখ নিয়ে

    আর একই সঙ্গে, কামান দাগার মতন।

    তুমি কি ভাবছো

    ওটা চিলেকোঠার ওপরে সূর্য

    কফিপানের রেস্তরারাঁকে আলতো আদর করতে চাইছে ?

    না, আবার এগিয়ে আসছে সংস্কারকামীদের কচুকাটা করতে

    উনি জেনেরাল গালিফেৎ !

    ভবঘুরের দল, পকেট থেকে হাত বের করে নাও--

    বোমা তুলে নাও, ছুরি কিংবা একটা পাথর

    আর কেউ যদি লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে ছুঁড়তে না পারে

    তাহলে সে চলে আসুক কেবল নিজের কপাল দিয়ে লড়তে !

    এগিয়ে যাও, ক্ষুধার্ত,

    গোলামের দল,

    আর নির্যাতিতরা,

    এই মাছি ভনভনে জঞ্জালে, পোচো না !

    এগিয়ে যাও !

    আমরা সোমবারগুলো আর মঙ্গলবারগুলোকে

    ছুটির দিনে পালটে দেবো, তাদের রাঙিয়ে দেবো রক্তে !

    পৃথিবীকে মনে করিয়া দাও তাকে আমি হীন প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলুম !

    রূঢ় হও !

    পৃথিবী

    রক্ষিতার মুখের মতন ফুলে উঠেছে,

    যাকে রথসচাইল্ড বেশি-বেশি ভালোবেসেছিল !

    গুলির আগুনের বরাবর পতাকাগুলো উড়ুক

    যেমন ওরা ছুটির দিনে করে, জাঁকজমকসহ !

    ওহে, রাস্তার লন্ঠনেরা, পণ্যজীবীদের আরও ওপরে তোলো,

    ওদের মড়াগুলোকে হাওয়ায় ঝুলতে দাও।

    আমি অভিশাপ দিলুম,

    ছুরি মারলুম

    আর মুখে ঘুষি মারলুম,

    কারোর পেছনে হামাগুড়ি দিলুম,

    তাদের পাঁজর কামড়ে ধরে।

    আকাশে, লা মারসেইলিজ-এর মতন লাল,

    সূর্যাস্ত তার কম্পিত ঠোঁটে মরণশ্বাস তুলছিল।

    এটা মানসিক বিকার !

    যুদ্ধ থেকে কোনো কিছুই বাঁচবে না।

    রাত এসে পড়বে,

    কামড়ে ধরবে তোমাকে

    আর বাসিই গিলে ফেলবে তোমাকে।

    দ্যাখো--

    আকাশ আরেকবার জুডাস-এর ভূমিকায়,

    একমুঠো নক্ষত্র নিয়ে কাদের বিশ্বাসঘাতকতায় চোবানো হয়েছিল?

    এই রাত

    তাতার যুদ্ধবাজ মামাই-এর মতন, আহ্লাদে পানোৎসব করে,

    উত্তাপে দগ্ধ করে দিলো শহরকে।

    আমাদের চোখ এই রাতকে ভেদ করতে পারবে না,

    দুই পক্ষের চর আজেফ-এর মতন কালো !

    শুঁড়ির আসরে চুপচাপ এক কোণে হেলান দিয়ে, আমি বসে থাকি,

    আমার আত্মায় আর মেঝেতে মদ চলকে পড়ে,

    আর আমি দেখি :

    কোনের দিকে, গোল চোখের প্রভা

    আর তাদের সঙ্গে, ম্যাডোনা চেবাচ্ছে হৃদয়ের কেন্দ্র ।

    এরকম মাতাল ভিড়ে অমন আনন্দবিচ্ছুরণ প্রদান করা কেন ?

    ওদের কিই বা দেবার আছে ?

    তোমরা দেখতে পাচ্ছ -- আরেকবার,

    ওরা কেন বারাব্বাসকে পছন্দ করে

    গোলগোথার মানুষটির তুলনায় ?

    হয়তো, ভেবেচিন্তে,

    মানবিক ভানে, কেবল একবার নয়

    আমি কি তরতাজা মুখ পরে থাকবো।

    আমি, হয়তো,

    তোমার ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে সৌম্যকান্তি

    সম্পূর্ণ মানবজাতিতে।

    ওদের দিয়ে দাও,

    যারা আহ্লাদে ডগমগ,

    এক দ্রুত মৃত্যু,

    যাতে ওদের ছেলেপুলেরা ভালোভাবে গড়ে ওঠে ;

    ছেলেরা -- পিতা হিসাবে

    মেয়েরা -- গর্ভবতী নারী হিসাবে।

    সেই জ্ঞানী মানুষদের মতন, নব্যপ্রসূতদের

    অন্তর্দৃষ্টি আর ভাবনাচিন্তায় ধূসর হয়ে উঠতে দাও

    আর ওরা আসবে

    শিশুদের নামকরণের অনুষ্ঠানে

    যে কবিতাগুলো আমি লিখেছি, তাদের।

    আমি যন্ত্রপাতি আর ব্রিটেনের শিল্পের গুণগান করি।

    কোনো মামুলি, সার্বজনিক ধর্মোপদেশে,

    হয়তো লেখা হয়ে থাকতে পারে

    যে আমিই ত্রয়োদশতম দূত।

    আর যখন আমার কন্ঠস্বর তারস্বরে ঘোষণা করবে,

    প্রতি সন্ধ্যায়,

    ঘণ্টার পর ঘণ্টা,

    আমার আহ্বানের অপেক্ষায়

    যিশুখ্রিস্ট, নিজে, হয়তো ঘ্রাণ নেবেন

    আমার আত্মার ফরগেট-মি-নট গুল্মের।

    চতুর্থ পর্ব

    মারিয়া ! মারিয়া !

    ভেতরে আসতে দাও, মারিয়া !

    আমাকে রাস্তায় ফেলে যেও না !

    তুমি অমন করতে পারো ?

    আমার গাল চুপসে গেছে,

    অথচ তুমি নিষ্ঠুরভাবে অপেক্ষা করাও।

    তাড়াতাড়ি, সবায়ের দ্বারা পরীক্ষিত,

    বাসি আর বিবর্ণ,

    আমি চলে আসবো

    আর বিনা দাঁতে তোতলাবো

    যে আজকে আমি

    “সাতিশয় অকপট।”

    মারিয়া,

    চেয়ে দ্যাখো--

    আমার কাঁধ দুটো আবার ঝুলে পড়ছে।

    রাস্তায়, লোকেরা

    তাদের চার-তলা পেটের চর্বিতে আঙুল বোলায়।

    ওরা চোখ দেখায়,

    চল্লিশ বছরের অবসাদে ক্ষয়িত, আর অস্হির---

    ওরা চাপা হাসি হাসে কেননা

    আমার দাঁতে,

    আবারও,

    আমি গত রাতের আদরগুলোর শক্ত-হয়ে-যাওয়া ধৃষ্টতা কামড়ে ধরে রেখেছি।

    বৃষ্টি ফুটপাথের ওপরে কেঁদে ফেললো,--

    ও তো জমা-জলে কারারুদ্ধ জোচ্চোর।

    রাস্তার লাশ, পাথরবাঁধানো পাথরের পিটুনি খেয়ে, নিজের কান্নায় ভিজে গেলো।

    কিন্তু ধূসর চোখের পাতাগুলো--

    হ্যাঁ !--

    ঝুলন্ত বরফের চোখের পাতা হয়ে উঠলো জমাট

    তাদের চোখ থেকে ঝরা অশ্রুজলে--

    হ্যাঁ !--

    ড্রেনপাইপগুলোর বিষাদভারাতুর চোখ থেকে।

    প্রতিটি পথচারীকে চাটছিল বৃষ্টির শুঁড় :

    পথের গাড়িগুলোয় ঝিকমিক করছিল খেলোয়াড়ের দল।

    ফেটে পড়ছিল জনগণ

    গাদাগাদি ভরা,

    আর তাদের চর্বি উথলে উঠছিল।

    ঘোলাটে এক নদীর মতন, মাটিতে স্রোত গড়ে উঠেছিল,

    তাতে মিশেছিল

    বাসি মাংসের রস।

    মারিয়া !

    কেমন করে আমি কোমল শব্দকে স্ফীত কানে আঁটাবো ?

    একটা পাখি

    ভিক্ষার জন্য গান গায়

    ক্ষুধার্ত কন্ঠস্বরে

    বরং ভালো,

    কিন্তু আমি একজন মানুষ,

    মারিয়া,

    আমি তো প্রেসনিয়ার নোংরা তালুতে অসুস্হ রাতের কাশি।

    মারিয়া, তুমি কি আমাকে চাও ?

    মারিয়া, আমাকে গ্রহণ করো, দয়া করো।

    কাঁপা আঙুলে আমি গির্জার ঘণ্টার লোহার গলা টিপে ধরবো !

    মারিয়া !

    রাস্তার চারণভূমিগুলো বুনো আর দর্শনীয় হয়ে গেছে !

    ওরা আমার গলা টিপে ধরেছে আর আমি প্রায় অজ্ঞান হতে চলেছি।

    খোলো !

    আমি আহত !

    দ্যাখো -- আমার চোখ খুবলে নেয়া হয়েছে

    মেয়েদের টুপির আলপিন দিয়ে !

    তুমি দরোজা খুলে দিলে।

    আমার খুকি !

    ওহ, ভয় পেও না !

    এই মহিলাদের দেখছো,

    আমার গলায় পাহাড়ের মতন ঝুলে রয়েছে,--

    জীবনভর, নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যাই

    কয়েক কোটি, প্রচুর, বিশাল, বিশুদ্ধ ভালোবাসাদের

    আর কোটি কোটি নোংরা, বিদকুটে ভাড়াপ্রেমিকাদের।

    ভয় পেও না

    যদি সততার

    প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হয়,

    হাজার সুন্দরী মুখ দেখে, আমি নিজেকে তাদের দিকে ছুঁড়ে দেবো--

    “ওরা, যারা মায়াকভস্কিকে ভালোবাসে !”

    দয়া করে বোঝো যে ওটাও হল

    রানিদের বংশ, যারা একজন উন্মাদ মানুষের হৃদয়ে সওয়ার হয়েছে।

    মারিয়া, কাছে এসো !

    নগ্ন আর লজ্জাহীন হও,

    কিংবা আতঙ্কে শিহরিত,

    তোমার ঠোঁটের বিস্ময়কে সমর্পণ করো, কতো নরম :

    আমার হৃদয় আর আমি কখনও মে মাসের আগে পর্যন্ত থাকিনি,

    কিন্তু অতীতে,

    শত শত এপ্রিল মাস জড়ো হয়েছে।

    মারিয়া !

    একজন কবি সারা দিন কল্পিত সুন্দরীর বন্দনায় গান গায়,

    কিন্তু আমি--

    আমি রক্তমাংসে গড়া,

    আমি একজন মানুষ --

    আমি তোমার দেহ চাই,

    খ্রিস্টধর্মীরা যেমন প্রার্থনা করে :

    “এই দিনটা আমাকে দাও

    আমাদের প্রতিদিনের রুটি।”

    মারিয়া, আমাকে দাও !

    মারিয়া !

    আমি ভয় পাই তোমার নাম ভুলে যাবো

    চাপে পড়ে কবি যেমন শব্দ ভুলে যায়

    একটি শব্দ

    সে অস্হির রাতে কল্পনা করেছিল,

    ঈশ্বরের সমান যার প্রভাব।

    তোমার দেহকে

    আমি ভালোবেসে যাবো আর তত্বাবধান করবো

    যেমন একজন সৈনিক

    যুদ্ধে যার পা কাটা গেছে,

    একা

    আর-কেউ তাকে চায় না,

    অন্য পা-কে সে সস্নেহে যত্ন করে।

    মারিয়া,--

    তুমি কি আমাকে নেবে না ?

    নেবে না তুমি !

    হাঃ !

    তাহলে অন্ধকারময় আর বেদনাদায়ক,

    আরেকবার,

    আমি বয়ে নিয়ে যাবো

    আমার অশ্রু-কলঙ্কিত হৃদয়

    এগোবো,

    কুকুরের মতন,

    খোঁড়াতে খোঁড়াতে,

    থাবা বইতে থাকে সে

    যার ওপর দিয়ে দ্রুতগতি রেলগাড়ি চলে গেছে।

    হৃদয় থেকে রক্ত ঝরিয়ে আমি যে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই তাকে উৎসাহ দেবো,

    আমার জ্যাকেটে ফুলের গুচ্ছ ঝুলে থাকে, ধূসরিত করে,

    সূর্য পৃথিবীর চারিধারে হাজার বার নাচবে,

    স্যালোম-এর মতন

    ব্যাপটিস্টের মুণ্ডু ঘিরে যে নেচে ছিল।

    আর যখন আমার বছরগুলো, একেবারে শেষে,

    তাদের নাচ শেষ করবে আর বলিরেখা আঁকবে

    কোটি কোটি রক্ত-কলঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে

    আমার পিতার রাজত্বের পথ

    আমি চড়ে বেরিয়ে আসবো

    নোংরা ( রাতের বেলায় গলিতে ঘুমিয়ে ),

    আর কানেতে ফিসফিস করে বলব

    যখন আমি দাঁড়িয়ে

    ওনার দিকে :

    শ্রীমান ঈশ্বর, শোনো !

    এটা কি ক্লান্তিকর নয়

    তোমার মহানুভব চোখদুটো মেঘেতে ডুবিয়ে দাও

    প্রতিদিন, প্রতি সন্ধ্যায় ?

    তার বদলে, এসো,

    বৃত্তাকারে পাক খাবার উৎসব আরম্ভ করা যাক

    শুভ আর অশুভের জ্ঞানবৃক্ষ ঘিরে !

    সর্বশক্তিমান, তুমি চিরকাল আমাদের পাশে থাকবে !

    মদ থেকে, মজাগুলো আরম্ভ হবে

    আর প্রেরিত দূত পিটার, যিনি সব সময়ে ভ্রুকুটি করেন,

    দ্রুত-লয়ের নাচ নাচবেন--- কি-কা-পু।

    আমরা সব কয়জন ইভকে ইডেন স্বর্গোদ্যানে ফিরিয়ে আনবো :

    আমাকে আদেশ করো

    আর আমি যাবো --

    বীথিকাগুলো থেকে, প্রয়োজনের সুন্দরী মেয়েদের বেছে নেবো

    আর তাদের তোমার কাছে আনবো !

    আনবো তো আমি ?

    না ?

    তুমি তোমার কোঁকড়াচুল মাথা কেন অভব্যভাবে নাড়াচ্ছো ?

    কেন তুমি তোমার ভ্রুতে গিঁট ফেলছো যেন তুমি রুক্ষ ?

    তুমি কি মনে করো

    যে এই

    যার ডানা আছে, সে কাছেই,

    ভালোবাসার মানে জানে ?

    আমিও একজন দেবদূত ; আগেও ছিলুম--

    শর্করায় তৈরি মেশশাবকের চোখ নিয়ে, আমি তোমার মুখগুলোর দিকে তাকালুম,

    কিন্তু আমি ঘোটকিদের আর উপহার দিতে চাই না, --

    সেভরে-পাড়ার সমস্ত অত্যাচারকে ফুলদানির রূপ দেয়া হয়েছে।

    সর্বশক্তিমান, তুমি দুটো হাত তৈরি করে দিয়েছো,

    আর তা সযত্নে,

    একটা মাথা গড়ে দিয়েছো, আর তালিকায় অনেককিছু রয়েছে--

    কিন্তু কেন তুমি তা করলে

    কেননা ব্যথা করে

    যখন কেউ চুমু খায়, চুমু, চুমু ?!

    আমি ভেবেছিলুম তুমিই মহান ঈশ্বর, সর্বশক্তিমান

    কিন্তু তুমি একজন ক্ষুদে মূর্তি, -- স্যুট-পরা একজন নির্বোধ,

    ঝুঁকে, আমি ইতিমধ্যে আয়ত্বে পেয়েছি

    সেই ছুরি যা আমি লুকিয়ে রেখেছি

    আমার বুটজুতোর ফাঁকে।

    তোমরা, ডানাসুদ্ধ জোচ্চোরের দল

    ভয়ে জড়োসড়ো হও !

    নিজেদের কাঁপতে-থাকা পালকগুলো ঝাঁকাও, রাসকেলের দল !

    তুমি, গা থেকে ধুপের গন্ধ বেরোচ্ছে, তোমাকে চিরে ফালাফালা করব,

    এখান থেকে আলাস্কা পর্যন্ত ধাওয়া করে।

    আমাকে যেতে দাও !

    তুমি আমাকে থামাতে পারবে না !

    আমি ঠিক হই বা ভুল

    তাতে কোনো তফাত হয় না,

    আমি শান্ত হবো না।

    দ্যাখো,--

    সারা রাত নক্ষত্রদের মাথা কাটা হয়েছে

    আর আকাশ আবার কোতলে রক্তবর্ণ।

    ওহে তুমি,

    স্বর্গ !

    মাথা থেকে টুপি খোলো,

    যখনই আমাকে কাছে দেখতে পাবে !

    স্তব্ধতা।

    ব্রহ্মাণ্ড ঘুমোচ্ছে।

    কালো, নক্ষত্রে- কানের তলায়

    থাবা রেখে।

    মেরুদণ্ড বেণু

    প্রস্তাবনা

    তোমাদের সকলের জন্যে,

    যারা কখনও আনন্দ দিয়েছিল বা এখনও দিচ্ছে,

    আত্মার সমাধিতে প্রতিমাদের দ্বারা সুরক্ষিত,

    আমি তুলে ধরব, মদের এক পানপাত্রের মতো

    উৎসবের অনুষ্ঠানে, খুলির কানায়-কানায় ভরা কবিতা।

    .

    আমি প্রায়ই বেশি-বেশি ভাবি :

    আমার জন্যে অনেক ভালো হতে পারতো

    একটা বুলেট দিয়ে আমার সমাপ্তিকে বিদ্ধ করে দেয়া।

    আজকের দিনেই,

    হয়তো বা,

    আমি আমার অন্তিম প্রদর্শন মঞ্চস্হ করছি।

    .

    স্মৃতি !

    আমার মগজ থেকে সভাঘরে একত্রিত হয়

    আমার প্রেমের অফুরান সংখ্যা

    চোখ থেকে চোখে হাসি ছড়িয়ে দ্যায়।

    বিগত বিয়ের ফেস্টুনে রাতকে সাজাও।

    দেহ থেকে দেহে ঢেলে দাও আনন্দ।

    এই রাত যেন কেউ ভুলতে না পারে।

    এই অনুষ্ঠানে আমি বেণু বাজাব।

    বাজাবো আমার নিজের মেরুদণ্ডে।

    .

    বড়োবড়ো পা ফেলে আমি মাড়িয়ে যাচ্ছি দীর্ঘ পথ।

    কোথায় যাবো আমি, নিজের ভেতরের নরকে লুকোবো ?

    অভিশপ্ত নারী, কোন স্বর্গীয় কার্যাধ্যক্ষ

    তার কল্পনায় তোমাকে গড়েছে ?!

    আনন্দে মাতার জন্য পথগুলো অনেক বেশি সঙ্কীর্ণ।

    ছুটির দিনের গর্ব আর শোভাযাত্রায় জনগণ বেরিয়ে পড়েছে রবিবারের সাজে।

    আমি ভাবলুম,

    ভাবনাচিন্তা, অসুস্হ আর চাপচাপ

    জমাটবাঁধা রক্ত, আমার খুলি থেকে হামাগুড়ি দিয়েছে।

    .

    আমি,

    যাকিছু উৎসবময় তার ইন্দ্রজালকর্মী,

    এই উৎসব বাঁটোয়ারা করার কোনো সঙ্গী নেই।

    এবার আমি যাবো আর ঝাঁপাবো,

    নেভস্কির পাথরগুলোতে ঠুকবো আমার মগজ !

    আমি ঈশ্বরনিন্দা করেছি।

    চিৎকার করে বলেছি ঈশ্বর বলে কিছু নেই,

    কিন্তু নরকের অতল থেকে

    ঈশ্বর এক নারীকে অবচিত করলেন যার সামনে পর্বতমালা

    কাঁপবে আর শিহরিত হবে :

    তিনি তাকে সামনে নিয়ে এলেন আর হুকুম দিলেন :

    একে ভালোবাসো !

    .

    ঈশ্বর পরিতৃপ্ত।

    আকাশের তলায় এক দুরারোহ পাআড়ে

    এক যন্ত্রণাকাতর মানুষ পশুতে পরিণত হয়ে বিদ্ধস্ত হয়েছে।

    ঈশ্বর হাত কচলান।

    ঈশ্বর চিন্তা করেন :

    তুমি অপেক্ষা করো, ভ্লাদিমির !

    যাতে তুমি জানতে না পারো নারীটি কে,

    তিনি ছিলেন, নিঃসন্দেহে তিনি,

    যিনি নারীটিকে একজন বাস্তব স্বামী দেবার কথা ভাবলেন

    আর পিয়ানোর ওপরে মানুষের স্বরলিপি রাখলেন।

    কেউ যদি হঠাৎ পা-টিপে-টিপে শোবার ঘরের দরোজায় যেতো

    আর তোমার ওপরের ওয়াড়-পরানো লেপকে আশীর্বাদ করতো,

    আমি জানি

    পোড়া পশমের গন্ধ বেরোতো,

    আর শয়তানের মাংস উদ্গীরণ করতো গন্ধকের ধোঁয়া।

    তার বদলে, সকাল হওয়া পর্যন্ত,

    আতঙ্কে যে ভালোবাসবার জন্য তোমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে

    আমি ছোটাছুটি করলুম

    আমার কান্নাকে কবিতার মুখাবয়ব দিলুম,

    উন্মাদনার কিনারায় এক হীরক-কর্তনকারী।

    ওহ, কেবল এক থাক তাসের জন্য !

    ওহ, মদের জন্য

    শ্বাসে বেরোনো হৃদয়কে কুলকুচি করার জন্য।

    .

    তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই !

    তোমাকে আমি চাই না !

    যাই হোক না কেন,

    আমি জানি

    আমি তাড়াতাড়ি কর্কশ চিৎকারে ভেঙে পড়ব !

    .

    যদি সত্যি হয় যে তোমার অস্তিত্ব আছে,

    ঈশ্বর,

    আমার ঈশ্বর,

    যদি নক্ষত্রদের জাজিম তোমারই বোনা হয়,

    যদি, প্রতিদিনকার এই

    অতিরক্ত যন্ত্রণা,

    তুমি চাপিয়ে দিয়েছ নিগ্রহ, হে প্রভু ;

    তাহলে বিচারকের শেকল পরে নাও।

    আমার আগমনের জন্য অপেক্ষা করো।

    আমি সময়কে মান্যতা দিই

    এবং এক দিনও দেরি করব না।

    শোনো,

    সর্বশক্তিমান ধর্মবিচারক !

    আমি মুখে কুলুপ দিয়ে রাখব।

    কোনো কান্না

    আমার কামড়ে-ধরা ঠোঁট থেকে বেরোবে না।

    ঘোড়ার ল্যাজের মতো ধুমকেতুর সঙ্গে আমাকে বেঁধে রাখো,

    আর ঘষটে নিয়ে চলো আমাকে,

    নক্ষত্রদের গ্রাসে ছিন্ন হয়ে।

    কিংবা হয়তো এরকম :

    আমার আত্মা যখন দেহের আশ্রয় ছেড়ে

    তোমার বিচারব্যবস্হার সামনে নিজেকে উপস্হিত করবে,

    তখন কটমট ভ্রু কুঁচকে,

    তুমি,

    ছায়াপথের দুই পাশে পা ঝুলিয়ে ছুঁড়ে দিও ফাঁসির দড়ি,

    একজন অপরাধীর মতন আমাকে গ্রেপ্তার করে ঝুলিয়ে দিও।

    তোমার ইচ্ছানুযায়ী যা হয় কোরো।

    যদি চাও আমাকে কেটে চার টুকরো করো।

    আমি নিজে তোমার হাত ধুয়ে পরিষ্কার করে দেবো।

    কিন্তু এইটুকু করো--

    তুমি কি শুনতে পাচ্ছো !---

    ওই অভিশপ্ত নারীকে সরিয়ে দাও

    যাকে তুমি আমার প্রিয়তমা করেছো !

    .

    বড়ো বড়ো পা ফেলে আমি মাড়িয়ে যাচ্ছি দীর্ঘ পথ।

    কোথায় যাবো আমি, নিজের ভেতরের নরকে লুকোবো ?

    অভিশপ্ত নারী, কোন স্বর্গীয় কার্যাধ্যক্ষ

    তার কল্পনায় তোমাকে গড়েছে ?!

    .

    উভয় আলোয়,

    ধোঁয়ায় ভুলে গিয়েছে তার রঙ ছিল নীল,

    আর মেঘগুলো দেখতে ছেঁড়াখোড়া উদ্বাস্তুদের মতো,

    আমি নিয়ে আসবো আমার শেষতম ভালোবাসার ভোর,

    কোনো ক্ষয়রোগীর রক্তবমির মতন উজ্বল।

    উল্লাসময়তায় আমি ঢেকে ফেলবো গর্জন

    সমাগমকারীদের,

    বাড়ি আর আরাম সম্পর্কে বিস্মৃত।

    পুরুষের দল,

    আমার কথা শোনো !

    পরিখা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরোও :

    তোমরা এই যুদ্ধ আরেকদিন লোড়ো।

    .

    এমনকি যদি,

    মদ্যপানের গ্রিক দেবতার মতন রক্তে লুটোপুটি খাও,

    এক মত্ত লড়াই তার শীর্ষে পৌঁছে গেছে--

    তবুও ভালোবাসার শব্দেরা পুরোনো হয় না।

    প্রিয় জার্মানরা !

    আমি জানি

    গ্যেটের গ্রেশেন নামের নারী

    তোমার ঠোঁটে উৎসারিত হয়।

    ফরাসিরা

    বেয়োনেটের আঘাতে হাসিমুখে মারা যায় ;

    মৃদু হাসি নিয়ে বিমানচালক ভেঙে পড়ে ;

    যখন তাদের মনে পড়ে

    তোমার চুমুখাওয়া মুখ,

    ত্রাভিয়াতা।

    .

    কিন্তু গোলাপি হাঁ-মুখের জন্য আমার আগ্রহ নেই

    যা বহু শতক এতাবৎ কামড়েছে।

    আজকে আমাকে জড়িয়ে ধরতে দাও নতুন পা!

    তুমি আমি গাইবো,

    লালমাথায়

    রুজমাখা ঠোঁটে।

    হয়তো, এই সময়কে কাটিয়ে উঠে

    যা বেয়োনেটের ইস্পাতের মতন যন্ত্রণাদায়ক,

    পেকে-যাওয়া দাড়িতে বহু শতক

    কেবল আমরাই থাকবো :

    তুমি

    আর আমি,

    শহর থেকে শহরে তোমার পেছন পেছন।

    সমুদ্রের ওই পারে তোমার বিয়ে হবে,

    আর রাতের আশ্রয়ে প্রতীক্ষা করবে---

    লণ্ডনের কুয়াশায় আমি দেগে দেবো

    তোমায় পথলন্ঠনের তপ্ত ঠোঁট।

    এক গুমোটভরা মরুভূমিতে, যেখানে সিংহেরা সতর্ক,

    তুমি তোমার কাফেলাদের মেলে ধরবে--

    তোমার ওপরে,

    হাওয়ায় ছেঁড়া বালিয়াড়ির তলায়,

    আমি পেতে দেবে সাহারার মতন আমার জ্বলন্ত গাল।

    .

    তোমার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলিয়ে

    তুমি চাউনি মেলবে

    আর দেখবে এক সৌম্যকান্তি বুলফাইটার !

    আর হঠাৎ আমি,

    এক মরণাপন্ন ষাঁড়ের চোখের জন্য,

    ধনী দর্শকদের দিকে আমার ঈর্ষা ছুঁড়ে দেবো।

    .

    যদি কোনো সেতু পর্যন্ত তুমি তোমার সংশয়াপন্ন পা নিয়ে যাও,

    এই ভেবে

    নিচে নামা কতো ভালো--

    তাহলে সে আমিই,

    সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সিন নদী,

    যে তোমাকে ডাকবে

    আমার ক্ষয়াটে দাঁত দেখিয়ে।

    .

    যদি তুমি, অন্য পুরুষের সাথে মোটর গাড়িতে দ্রুত চলে যাচ্ছো, পুড়িয়ে দাও

    স্ত্রেলকা-পাড়া বা সোকোলনিকি অঞ্চল--

    তাহলে সে আমিই, উঁচুতে উঠছি,

    চাঁদের মতন প্রত্যাশী আর আবরণমুক্ত,

    যে তোমাকে আকাঙ্খায় আকুল করে তুলবে।

    .

    তাদের প্রয়োজন হবে

    আমার মতো এক শক্তিমান পুরুষ--

    তারা হুকুম করবে :

    যুদ্ধে গিয়ে মরো !

    শেষ যে শব্দ আমি বলব

    তা তোমার নাম,

    বোমার টুকরোয় জখম আমার রক্তজমাট ঠোঁটে।

    .

    আমার শেষ কি সিংহাসনে বসে হবে ?

    নাকি সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে ?

    জীবনের ঝড়ের দাপটগুলোকে জিন পরিয়ে,

    আমি প্রতিযোগীতায় নেমেছি

    জগতের রাজত্বের জন্য

    আর

    দণ্ডাদেশ-পাওয়া কয়েদির পায়ের বেড়ি।

    .

    আমি জার হবার জন্য নিয়তি-নির্দিষ্ট--

    আমার মুদ্রার সূর্যালোকপ্রাপ্ত সোনায়

    আমি আমার প্রজাদের হুকুম দেবো

    টাঁকশালে ছাপ দিতে

    তোমার চমৎকার মুখাবয়ব !

    কিন্তু যেখানে

    পৃথিবী হিমপ্রান্তরে বিলীন হয়,

    নদী যেখানে উত্তর-বাতাসের সঙ্গে দরাদরি করে,

    সেখানে আমি পায়ের বেড়িতে লিলির নাম আঁচড়ে লিখে যাবো,

    আর কঠোর দণ্ডাদেশের অন্ধকারে,

    বারবার তাতে চুমু খাবো।

    .

    তোমরা শোনো, যারা ভুলে গেছ আকাশের রঙ নীল,

    যারা সেই রকম রোমশ হয়েছ

    যেন জানোয়ার।

    হয়তো এটাই

    জগতের শেষতম ভালোবাসা

    যা ক্ষয়রোগীর রক্তবমির মতন উজ্বল।

    .

    আমি ভুলে যাব বছর, দিন, তারিখ।

    কাগজের এক তাড়া দিয়ে নিজেকে তালাবন্ধ করে রাখব।

    আলোকপ্রাপ্ত শব্দাবলীর যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে,

    সৃষ্টি করব তোমায়, হে অমানবিক ইন্দ্রজাল !

    .

    এই দিন, তোমার কাছে গিয়ে,

    আমি অনুভব করেছি

    বাড়িতে কিছু-একটা অঘটন ঘটেছে।

    তোমার রেশমে কিছু গোপন করেছ,

    আর ধূপের সুগন্ধ ফলাও হয়ে ছড়িয়েছে বাতাসে।

    আমাকে দেখে আনন্দিত তো ?

    সেই “অনেক”

    ছিল অত্যন্ত শীতল।

    বিভ্রান্তি ভেঙে ফেলল যুক্তির পাঁচিল।

    তপ্ত ও জ্বরে আক্রান্ত, আমি হতাশার স্তুপে আশ্রয় নিলুম।

    .

    শোনো,

    তুমি যা-ই করো না কেন,

    তুমি শবকে লুকোতে পারবে না।

    সেই ভয়ানক শব্দ মাথার ওপরে লাভা ঢেলে দ্যায়।

    তুমি যা-ই করো না কেন,

    তোমার প্রতিটি পেশীতন্তু

    শিঙা বাজায়

    যেন লাউডস্পিকার থেকে :

    মেয়েটি মৃতা, মৃতা, মৃতা !

    তা হতে পারে না,

    আমাকে জবাব দাও।

    মিথ্যা কথা বোলো না !

    ( এখন আমি যাবো কেমন করে ? )

    তোমার মুখাবয়বে তোমার দুই চোখ খুঁড়ে তোলে

    দুটি গভীর কবরের ব্যাদিত অতল।

    .

    কবরগুলো আরও গভীর হয়।

    তাদের কোনো তলদেশ নেই।

    মনে হয়

    দিনগুলোর উঁচু মাচান থেকে আমি প্রথমে মাথা নামিয়ে লাফিয়ে পড়ব।

    অতল গহ্বরের ওপরে আমি আমার আত্মাকে টেনে বাজিকরের দড়ি করে নিয়েছি

    আর, শব্দদের ভোজবাজি দেখিয়ে, তার ওপরে টাল সামলাচ্ছি।

    .

    আমি জানি

    ভালোবাসা তাকে ইতিমধ্যে পরাস্ত করেছে।

    আমি অবসাদের বহু চিহ্ণ খুঁজে পাচ্ছি।

    আমার আত্মায় পাচ্ছি আমাদের যৌবন।

    হৃদয়কে আহ্বান জানাও দেহের উৎসবে।

    .

    আমি জানি

    আমাদের প্রত্যেককে এক নারীর জন্য চড়া দাম দিতে হবে।

    তুমি কি কিছু মনে করবে

    যদি, ইতিমধ্যে,

    তোমাকে তামাক-ধোঁয়ার পোশাকে মুড়ে দিই

    প্যারিসের ফ্যাশনের বদলে ?

    .

    প্রিয়তমাষু,

    প্রাচীনকালে যিশুর বার্তাবাহকদের মতন,

    আমি হাজার হাজার পথ দিয়ে হাঁটবো।

    অনন্তকাল তোমার জন্য এক মুকুট তৈরি করেছে,

    সেই মুকুটে আমার শব্দাবলী

    শিহরণের রামধনুর জাদু তৈরি করে।

    .

    হাতির দল যেমন শতমণ ওজনের খেলায়

    পুরুর রাজার বিজয় সম্পূর্ণ করেছিল,

    আমি তোমার মগজে ভরে দিয়েছি প্রতিভার পদধ্বনি।

    কিন্তু সবই বৃথা।

    আমি তোমাকে বিচ্ছিন্ন করে আনতে পারি না।

    .

    আনন্দ করো !

    আনন্দ করো,

    এখন

    তুমি আমাকে শেষ করে দিয়েছ !

    আমার মানসিক যন্ত্রণা এতোটাই তীক্ষ্ণ,

    আমি ছুটে চলে যাবো খালের দিকে

    আর মাথা চুবিয়ে দেবো তার অপূরণীয় গর্তে।

    .

    তুমি তোমার ঠোঁট দিয়েছিলে।

    তুমি ওদের সঙ্গে বেশ রুক্ষ ছিলে।

    আমি হিম হয়ে গেলুম ছুঁয়ে।

    অনুতপ্ত ঠোঁটে আমি বরং চুমু খেতে পারতুম

    জমাট পাথর ভেঙে তৈরি সন্ন্যাসিনীদের মঠকে।

    .

    দরোজায়

    ধাক্কা।

    পুরুষটি প্রবেশ করলো,

    রাস্তার হইচইয়ে আচ্ছাদিত।

    আমি

    টুকরো হয়ে গেলুম হাহাকারে।

    কেঁদে পুরুষটিকে বললুম :

    “ঠিক আছে,

    আমি চলে যাবো,

    ঠিক আছে !

    মেয়েটি তোমার কাছেই থাকবে।

    মেয়েটিকে সুচারু ছেঁড়া পোশাকে সাজিয়ে তোলো,

    আর লাজুক ডানা দুটো, রেশমে মোড়া, মোটা হয়ে উঠুক।

    নজর রাখো যাতে না মেয়েটি ভেসে চলে যায়।

    তোমার স্ত্রীর গলা ঘিরে

    পাথরের মতন, ঝুলিয়ে দাও মুক্তোর হার। ”

    .

    ওহ, কেমনতর

    এক রাত !

    আমি নিজেই হতাশার ফাঁস শক্ত করে বেঁধে নিয়েছি।

    আমার ফোঁপানি আর হাসি

    আতঙ্কে শোচনীয় করে তুলেছে ঘরের মুখ।

    তোমার দৃষ্টিপ্রতিভার বিধুর মুখাকৃতি জেগে উঠলো ;

    তোমার চোখদুটি জাজিমের ওপরে দীপ্ত

    যেন কোনো নতুন জাদুগর ভেলকি দেখিয়ে উপস্হিত করেছে

    ইহুদি স্বর্গরাজ্যের ঝলমলে রানিকে।

    .

    নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায়

    মেয়েটির সামনে যাকে আমি সমর্পণ করে দিয়েছি

    আমি হাঁটু গেড়ে বসি।

    রাজা অ্যালবার্ট

    তাঁর শহরগুলোকে

    সমর্পণের পর

    আমার তুলনায় ছিলেন উপহারে মোড়া জন্মদিনের খোকা।

    .

    ফুলেরা আর ঘাসভূমি, সূর্যালোকে সোনার হয়ে গেল !

    বাসন্তী হয়ে ওঠো, সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তির জীবন !

    আমি চাই একটিমাত্র বিষ--

    কবিতার একটানা গভীর চুমুক।

    .

    আমার হৃদয়ের চোর,

    যে তার সমস্তকিছু ছিনতাই করেছে,

    যে আমার আত্মাকে পীড়ন করে চিত্তবিভ্রম ঘটিয়েছে,

    গ্রহণ করো, প্রিয়তমা, এই উপহার--

    আর কখনও, হয়তো, আমি অন্যকিছু সম্পর্কে ভাববো না।

    .

    এই দিনটিকে উজ্বল ছুটির দিনে রাঙিয়ে দাও।

    হে ক্রুশবিদ্ধসম ইন্দ্রজাল,

    তোমার সৃষ্টি বজায় রাখো।

    যেমনটা দেখছো--

    শব্দাবলীর পেরেকগুচ্ছ

    আমাকে কাগজে গিঁথে দাও।

    .

    শোনো !

    শোনো

    যদি নক্ষত্রদের আলোকিত করা হয়

    তার মানে -- কেউ একজন আছে যার তা দরকার।

    তার মানে -- কেই একজন চায় তা হোক,

    কেউ একজন মনে করে থুতুর ওই দলাগুলো

    অসাধারণ।

    আর অতিমাত্রায় উত্তেজিত,

    দুপুরের ধুলোর ঘুর্নিপাকে,

    ও ঈশ্বরের ওপর ফেটে পড়ে,

    ভয়ে যে হয়তো সে ইতোমধ্যে দেরি করে ফেলেছে।

    চোখের জলে,

    ও ঈশ্বরের শিরাওঠা হাতে চুমু খায়

    কোথাও তো নিশ্চয়ই একটা নক্ষত্র থাকবে, তাই।

    ও শপথ করে

    ও সহ্য করতে পারবে না

    ওই নক্ষত্রহীন অদৃষ্ট।

    পরে,

    ও ঘুরে বেড়ায়, উদ্বেগে,

    কিন্তু বাইরে থেকে শান্ত।

    আর অন্য সবাইকে, ও বলে :

    ‘এখন,

    সবকিছু ঠিক আছে

    তুমি আর ভীত নও

    সত্যি তো ?’

    শোনো,

    যদি নক্ষত্ররা আলোকিত হয়,

    তার মানে - কেউ একজন আছে যার তা দরকার।

    তার মানে এটা খুবই জরুরি যাতে

    প্রতিটি সন্ধ্যায়

    অন্তত একটা নক্ষত্র ওপরে উঠে যাবে

    অট্টালিকার শীর্ষে।

    লিলিচকা

    তামাকের ধোঁয়া বাতাসকে গ্রাস করেছে।

    ঘরটা

    ক্রুচেনিখের নরকের একটা পর্ব।

    মনে রেখো --

    ওই জানালার ওদিকে

    রয়েছে প্রবল উত্তেজনা

    আমি প্রথমে তোমার হাতে টোকা দিয়েছিলুম।

    আজ তুমি এখানে বসে আছো

    লৌহবর্ম হৃদয়ে।

    আরেক দিন পরে

    তুমি আমাকে তাড়িয়ে দেবে,

    হয়তো, গালমন্দ করে।

    সামনের প্রায়ান্ধকার ঘরে আমার বাহু,

    কাঁপুনিতে ভেঙে গেছে আর শার্টের হাতায় ঢুকবে না।

    আমি বাইরে বেরিয়ে যাবে

    রাস্তায় নিজের দেহ ছুঁড়ে ফেলব।

    আমি প্রলাপ বকব,

    নিয়ন্ত্রণের বাইরে,

    বিষাদে চুরমার।

    তা হতে দিও না

    আমার প্রিয়া,

    আমার প্রিয়তমা,

    এখন দুজনে দুদিকে যাওয়া যাক।

    তা সত্বেও

    আমার প্রেম

    অত্যন্ত ভারি

    তোমার ওপরে

    তুমি যেখানেই যাও না কেন।

    আমাকে একবার শেষ চিৎকার করতে দাও

    তিক্ততার, আঘাতে জর্জরিত হবার চিৎকার।

    তুমি যদি একটা ষাঁড়কে খাটিয়ে নিরতিশয় ক্লান্ত করে দাও

    সে পালিয়ে যাবে,

    শীতল জলে গিয়ে নেমে যাবে।

    তোমার ভালোবাসা ছাড়া

    আমার

    কোনো সমুদ্র নেই

    আর তোমার প্রেম এমনকি চোখের জলে চাওয়া বিশ্রামটুকুও দেবে না।

    যখন এক ক্লান্ত হাতি শান্তি চায়

    সে তপ্ত বালির ওপরও রাজকীয় কায়দায় শুয়ে পড়ে।

    তোমার ভালোবাসা ছাড়া

    আমার

    কোনো সূর্য নেই,

    কিন্তু আমি এমনকি জানি না তুমি কোথায় আর কার সঙ্গে রয়েছো।

    এভাবে যদি তুমি কোনও কবিকে যন্ত্রণা দাও

    সে

    তার প্রেমিকাকে টাকা আর খ্যাতির জন্য বদনাম করবে,

    কিন্তু আমার কাছে

    কোনো শব্দই আনন্দময় নয়

    তোমার ভালোবাসাময় নাম ছাড়া।

    আমি নিচের তলায় লাফিয়ে পড়ব না

    কিংবা বিষপান করব না

    বা মাথায় বন্দুক ঠেকাবো না।

    কোনো চাকুর ধার

    আমাকে অসাড় করতে পারে না

    তোমার চাউনি ছাড়া।

    কাল তুমি ভুলে যাবে যে

    আমি তোমায় মুকুট পরিয়েছিলুম,

    যে আমি আমার কুসুমিত আত্মাকে ভালোবাসায় পুড়িয়েছিলুম,

    আর মামুলি দিনগুলোর ঘুরন্ত আনন্দমেলা

    আমার বইয়ের পাতাগুলোকে এলোমেলো করে দেবে…

    আমার শব্দগুলোর শুকনো পাতারা কি

    শ্বাসের জন্য হাঁপানো থেকে

    তোমাকে থামাতে পারবে ?

    অন্তত আমাকে তোমার

    বিদায়বেলার অপসৃত পথকে

    সোহাগে ভরে দিতে দাও।

    তুমি

    তুমি এলে--

    কৃতসঙ্কল্প,

    কেননা আমি ছিলুম দীর্ঘদেহী,

    কেননা আমি গর্জন করছিলুম,

    কিন্তু খুঁটিয়ে দেখে

    তুমি দেখলে আমি নিছকই এক বালক।

    তুমি দখল করে নিলে

    আর কেড়ে নিলে আমার হৃদয়

    আর তা নিয়ে

    খেলতে আরম্ভ করলে--

    লাফানো বল নিয়ে মেয়েরা যেমন খেলে।

    আর এই অলৌকিক ঘটনার আগে

    প্রতিটি নারী

    হয়তো ছিল এক বিস্ময়বিহ্বল যুবতী

    কিংবা এক কুমারী তরুণী যে জানতে চায় :

    “অমন লোককে ভালোবাসবো ?

    কেন, সে তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে !

    মেয়েটি নিশ্চয়ই সিংহদের পোষ মানায়,

    চিড়িয়াখানার এক মহিলা !”

    কিন্তু আমি ছিলুম জয়োল্লাসিত।

    আমি ওটা অনুভব করিনি --

    ওই জোয়াল !

    আনন্দে সবকিছু ভুলে গিয়ে,

    আমি লাফিয়ে উঠলুম

    এদিকে-সেদিকে উৎক্রান্ত, কনে পাবার আনন্দে রেডিণ্ডিয়ান,

    আমি খুবই গর্বিত বোধ করছিলুম

    আর ফুরফুরে।

  • Yezidi কবিদের কবিতা | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৪০732395
  • ইয়াজিদি ( Yezidi ) কবিদের কবিতা

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    আমি ইয়েজিদি

    আজি মেরশাউই

    আমি ৭৪টা গণহত্যার যন্ত্রণা বইছি

    আর কোটি বছরের ফোঁপানি।

    আমার পার্থক্যের চিহ্ণগুলো হলো

    এক বন্ধ মুখ আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত ইচ্ছাশক্তি।

    সৃষ্টিকর্তা আমার কথা জানে না

    আর কোনো পথ-মানচিত্র আমাকে ধারণ করতে পারে না।

    সবচেয়ে দয়ালু দেবদূতরা আমাকে ঘৃণায় পরিহার করে।

    অনুকূল কেউই আমার সমর্থনে কথা বলবে না

    আর কুরআনের আয়াত আমার দেয়ালকে সুরক্ষিত করবে না।

    আমি অন্যের স্বর্গোদ্যানে যাবার মসৃণ পথ।

    যারা আমাকে খুন করেছে তাদের সবায়ের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি

    যদি তারা শেষ পর্যন্ত স্বর্গে গিয়ে না পৌঁছে থাকে।

    যদি পৌঁছে থাকে, আমি আশা করব কৃতজ্ঞতা।

    মৃত্যুযন্ত্রণা আমার জিনকোষে সহজাত।

    যন্ত্রণা নিজের শিকড় বিছিয়ে রেখেছে আমার রক্তস্রোতে।

    আমার দেহের কোষগুলোয় বিষাদ বাসা বেঁধে আছে।

    বেঁচে থাকার জন্য আমি নিয়তি নির্দেশিত

    কেবল অন্যেরা যেমনভাবে চাইবে ;

    মরার জন্য আমি নিয়তি নির্দেশিত

    কেবল যখন অন্যেরা তার হুকুম দ্যায়---

    ঈশ্বরের স্মৃতির ধ্বংসাবশেষে ক্রুশকাঠে ঝোলানো

    জীবনের প্রাণবন্ত এলাকা থেকে একঘরে,

    যন্ত্রণাদায়ক ফাঁসির দড়ির মতন ছুঁড়ে ফেলে দেয়া

    বিস্মৃতির ধারালো ক্ষুরের ওপরে।

    আমার একমাত্র স্বদেশ রয়েছে আমার অশ্রুর চাকচিক্যে।

    আমার একমাত্র শোকজ্ঞাপন হলো আমার দুঃখের শঙ্খধ্বনি।

    আমার অন্তরে, কারারুদ্ধ, মানবিক ফোড়ার পুঁজের বন্যা।

    কোনো মধ্যস্হতা আমাকে ওই ভুলে যাওয়া

    ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যেতে পারবে না

    আর তার বদমেজাজি হুকুম থেকে

    আমার পালাবার কোনো পথ নেই।

    আমি ভয়ের হিমে বন্দি,

    নিরাশার আটার তালে আমি চটকানো

    ফোঁপানিতে মিশে, তিক্ততায়--

    হাহাকারের ঝোপজঙ্গলে

    আমার গলার আওয়াজ এক কন্ঠরুদ্ধ গোঙানি।

    ব্রহ্মাণ্ডের কানে খড় ঢোকানো আছে

    আর প্রভু নিজেকে অন্যান্য অভিরুচিতে ব্যস্ত রেখেছেন।

    যুদ্ধের রঙ

    দুন্যা মিখাইল

    দেয়ালে ডিজিটাল মানচিত্র ঝোলানো

    মার্কিন যুদ্ধ দেখাচ্ছে

    নানা রঙে :

    ইরাক বেগুনি

    সিরিয়া হলুদ

    কুয়েত নীল

    আফগানিস্তান লাল

    ভিয়েতনাম সবুজ।

    যুদ্ধ

    মানচিত্রে

    সুন্দর দেখায়

    রসবোধপূর্ণ

    আর রঙিন।

    স্বভূমি

    আমেল হসকান

    কল্পনা করো কেবল কল্পনা, আমি সতেরো বছরের মেয়ে। পরিবারের সঙ্গে আনন্দে সিঞ্জার নামে একটা জায়গায় থাকি, যেখানের পর্বতমালা রাজকীয় আর ক্ষেতগুলো সবুজ, যেখানে এক সময়ে ছিল ভালোবাসা আর শান্তি।

    আমার মা প্রতঃরাশ তৈরি করছে, বাবা কাজের জন্য তৈরি হচ্ছে, ছাদে ঘুমোচ্ছে ভাই, আমার বোন ফুলের বাগানে প্রজাপতিদের সঙ্গে নাচছে, প্রতিবেশিদের বাচ্চারা পাড়ায় খেলছে, আর তাদের হাসি পৌঁছোচ্ছে আকাশে।

    ন ইরবতা, শান্তি, সুরক্ষা, ভালোবাসা, হাসি, সৌন্দর্য।

    তখন আমি ভাবতুম আমি স্বর্গের অংশ, তা ছিল পৃথিবীর স্বর্গ।

    দাঁড়াও, শব্দ আসছে কোথা থেকে, কিসের !! মাকে ডাকলুম, মা আওয়াজ কিসের ? বাগানে গেলুম, আকাশ ধোঁয়ায় কালো হয়ে গিয়েছিল, ফুলগুলো মুর্ছিত, আমি সর্বত্র রক্তের গন্ধ পেতে লাগলুম।

    মাকে ডাকলুম, মা তুমি কোথায় ? বোন এখানে আছে তো, সে কোথায়? তুমি কোথায় ?

    তুমি সাড়া দিচ্ছ না কেন, তুমি কোথায় ?

    ওহ, আমার ভাই ছাদে ঘুমোচ্ছে, ও বলতে পারবে। আমি ভাইয়ের কাছে গেলুম।

    ভাই, উঠে পড় ; এই আওয়াজে তুই কেমন করে ঘুমোচ্ছিস, উঠে পড়, ভাই,ভাই।

    গন্ধটা ছিল আমার ভাইয়ের রক্তের, আমার ভাই বিছানায় খুন হয়েছে, আমার ভাইকে বিছানায় খুন করা হয়েছে। কেউ দয়া করে বলুক, এটা কি দুঃস্বপ্ন, বলুক এটা কি দুঃস্বপ্ন তাহলে জেগে যাবো।

    আমি কি করি ? আমি কি করব ?

    আমি পাহাড়ে যাবো। আমি শারফেদেন মন্দিরে যাবো, দুঃস্বপ্ন সেখানে শেষ হবে।

    বেরোবার জন্য দরোজা খুললুম, দেখলুম কারোর ধড় থেকে মাথা কাটা। না, না, না,না, উনি তো আমার বাবা, ওটা আমার বাবার মাথা, না, না। এমন দুঃস্বপ্ন শেষ হচ্ছে না কেন?

    আমি যন্ত্রণা আর কান্না নিয়ে পাহাড়ের দিকে দৌড়োলুম।

    দাঁড়াও, ওই কালো পতাকাগুলো রাস্তায় কেন দেখা যাচ্ছে ? এরা কারা কুৎসিত বিদেশি নোংরা দাড়ি ঝুলিয়ে ? দৌড়োই, ওরা আমাকে দেখতে পাবে না।

    দৌড়োচ্ছিলুম, পাথরে হোঁচোট খেয়ে তার ওপরে পড়লুম, দেখলুম তার তলায় একটা শিশু পাশে খালি বোতল, না খেয়ে মারা গেছে।

    শিশুটাকে দেখার অভিঘাতে আমি যখন বিস্মিত, ওরা আমাকে দেখতে পেলো, আমার সামনে দাঁড়ালো, হায় দেবতা, ওরা তো কাছে আসছে। আমি চিৎকার করতে লাগলুম, বাঁচাও, বাঁচাও, কেউ আমার কথা শুনতে পেলো না, কেউ সাহায্য করতে এলো না। আমাকে ছেড়ে দাও, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে। আমাকে ছেড়ে দাও...আমি কোথায় ? এতো অন্ধকার জায়গা কেন ? মা, তুমি এখানে রয়েছ, মা কথা বলছ না কেন ? মা !

    মা শুধু একটা কথা বারবার বলতে লাগল : তিনটে রাক্ষস তোর বোনকে আমার চোখের সামনে ধর্ষণ করেছে।

    তিনটে রাক্ষস তোর বোনকে আমার চোখের সামনে ধর্ষণ করেছে, তোর বোনকে ধর্ষণ করেছে, তোর বোনকে।

    মা ওরা আসছে, মা ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েদের বাজারে, ওরা আমাকে দশ ডলারে বেচে দেবে মা। মা ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে…

    ওটা কি? তরুণীভরা জেল, এই মেয়েটা কে, পরীর মতন ছোট্ট। জিগ্যেস করলুম, তোমার খাবার খাওনি কেন। জবাব দিল, আমি খেতে চাই না, যদি খাই তাহলে বড়ো হয়ে যাও আর ওরা আমাকে নিয়ে গিয়ে বেচে দেবে।

    তোমরা আমার মা কে ধরে এনেছো
    আমাকে মেরে ফ্যালো, এই মেয়েগুলোকে মেরে ফ্যালো।

    কিন্তু তোমরা আমার ধর্ম বদলাতে পারবে না, তা আছে আমার হৃদয়ে। তোমরা আমার স্বদেশকে লুকোতে পারবে না, আমরা এমন রাষ্ট্র যারা পরাজয় কাকে বলে জানে না, আমাদের শ্লোগান হলো শান্তি। আমরা ৭৪টা গণহত্যা দেখেছি। আমরা মরিনি, মরব না।

    আমাকে খুন করো, এই মেয়েগুলোকে খুন করো, কিন্তু আমার স্বদেশকে লুকোতে পারবে না।

    আমরা শিঞ্জার পাহাড়ে থাকবো শারফেনদেন মন্দিরে।

    মেয়েটি বুঝতে পারলো সে দুঃস্বপ্ন দেখছে না। তার সামনে রূঢ় বাস্তব।

    আমরা বেঁচে থাকবো, এই কথা বলে মেয়েটি ধর্ষিত হবার আগে আত্মহত্যা করে নিলো।

    ইয়াজিদি বোনেদের

    আইল্লা রুৎ

    আমি বই আর কবিতা লিখি

    দুর্দশা-আক্রান্ত নারীদের জীবন নিয়ে

    আর আমি নামকরা কবি

    আমার কলম আর কবিতার কারণে

    আমার একটা ওয়েবসাইট আছে

    যেখানে আমার কবিতা পড়া হয় আবৃত্তি হয়

    আমি পুরস্কার আর সম্বর্ধনা সংগ্রহ করি।

    তবু ওরা এখনও যন্ত্রণাভোগ করছে

    আমাদের মেয়েদের ধর্ষণ করা হচ্ছে

    আমাদের মেয়েদের শেকলে বেঁধে রাখা হচ্ছে

    আমাদের মেয়েরা তাদের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলেছে

    আমাদের মেয়েদের বোরখায় চাপা দেয়া হয়েছে

    আমাদের মেয়েদের বিক্রি করা হয়

    চিনাবাদামের দামে।

    কে তাদের মুক্ত করবে ?

    মায়েরা আর বাবারা কাঁদেন

    যতক্ষণ না অশ্রু ফুরিয়ে যাচ্ছে

    তাদের আর অশ্রূবিন্দু নেই

    কে শোনে কন্ঠরুদ্ধ চিৎকার ?

    ওই সুন্দর কালো চোখে

    কে দেখতে পায় সন্ত্রাসের ভয় ?

    একটি মেয়ের অসহায়তা

    যে শুধু নিজের জীবন কাটাতে চেয়েছে

    তার পরিবারের সঙ্গে

    তার বাড়িতে

    তার জনগণের মধ্যে

    আর তার দেশে

    কে তাদের উদ্ধার করবে ?

    স্বাধীন জগতের রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র

    তাদের বাঁচাবার জন্য

    অমন দানবতা থেকে

    তবু পাষাণ নৈঃশব্দ

    জগতের ঠোঁটে

    ছায়ায়

    পেশমেগরা নারীরা

    তাদের জমিজমা অন্ধকার থেকে

    আলোয় আনতে চাইছে

    ছায়ায়

    অনামা কর্মীরা

    ভালোবাসায় ভরা হৃদয়ে

    হাত আর শব্দ দিয়ে

    মুক্ত করতে চাইছে

    তারা কখনও সংবাদ হয় না

    কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায়

    অনেক সময়ে তারা মারা যায়

    শহিদের মৃত্যু

    যাদের সন্মানিত করে মরুভূমি

    কিংবা কোনো অলিভ গাছ।

    নাদিয়া মুরাদ

    কেন ?

    আমাকে বলো, কেন ?

    ইয়াজিদিদের এতো যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে ?

    ইতিহাসের মাটিতে পড়েছে চোখের জল।

    অস্বীকারের দেয়াল-পরদার পেছনে

    না-বলা প্রামাণিক সাক্ষপত্রগুলো উধাও হয়ে গেল, যতক্ষণ না…

    নাদিয়া মুরাদ মুক্ত এলাকায় পালিয়ে এলেন,

    আর নিজের গল্প বললেন।

    কালো বুটজুতো নেমে এলো

    ইরাকে তাঁর কোচো গ্রামে।

    পুরুষরা এলো ধর্ষণ আর হত্যা করতে-করতে।

    মেয়েটিকে করা হলো সাবাইয়া,

    যৌন ক্রীতদাসি।

    মেয়েটি বেঁচে রইলো,

    যাতে সবাইকে বলতে পারে।

    ভুলে যেও না,

    ভুলে যেও না।

    নাদিয়া মুইরাদ

    হবে শেষতম তরুণী !

    লড়বে আইসিসিসের বিরুদ্ধে।

    গণহত্যার বিরুদ্ধে।

    অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে নয়,

    কিন্তু শব্দ দিয়ে।

    ন্যায়বিচারের জন্য।

    আমরা সবাই বিশ্বনাগরিক।

    মেয়েটি কতো সাহসী, কতো দৃঢ়।

    ওর লড়াইকে বৃথা যেতে দিও না।

    আবার সবায়েরর জন্য সকাল আসুক।

    মেয়েটি আমাদের কন্ঠস্বর !

    আত্মপরিচয়

    হায়মান আলকারসাফি

    ওদের বলো যে আমি মরব না,

    ওরা লাঠি ভেঙে ফেললেও

    যা আমাকে ইতিহাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

    আমার শরীর শক্তি সঞ্চয় করে নেবে

    একগুঁয়েমিকে জয় করার জন্য।

    সঞ্চয় করে নেবে দুর্দশা সহ্য করার ক্ষমতা,

    আর শিশুদের স্বপ্নের কাচের ফলার ওপর দিয়ে

    আমি আমার বাড়ি ফিরব।

    ওদের বলো, ওরা ইঁদুরের মতন আমার সঙ্গে লড়েছে,

    কিংবা আমাকে কোতল করেছে,

    আমার আত্মপরিচয়কে তাদের চোয়ালের মাঝে আটক করে।

    এই পর্বতমালা প্রতিবেশির ছেলেকে জড়িয়ে নিয়েছে।

    ওদের বলো

    যে এগুলো কেবল ফিসফিস করে বলা কথা নয়

    কিংবা নকল দেশপ্রেমিকের কান্না -- তা আসলে

    আমার ব্যক্তিগত আত্মপরিচয়,

    আমার ইয়েজিদি অহং,

    আমার ভাষা,

    আমার সিঞ্জারি আত্মা---

    আমি বিভ্রান্ত হবো না।

    আমি এখনও বেঁচে আছি

    শিশুদের দেহে।

    আমি অনন্তকাল পর্যন্ত থাকবো,

    আমার হাতে শান্তি আর বিজয়ের পতাকা নিয়ে।

    বন্দি

    মুরাদ সুলেইমান আল্লো

    ভালোবাসার মরুযাত্রীদলে যোগ দাও আর আমার যাত্রীদলের চেয়ে এগিয়ে যাও,

    নাওয়াফেল প্রার্থনায় একটা চিঠি দিয়ে দিও।

    মৃত্যুর কালো মুখের সামনে সজোরে চিৎকার করো,

    আজকে পাপিয়াদের গান যথেষ্ট নয়।

    তুমি কোন প্রার্থনা পছন্দ করো, হে হ্যাজেল-চোখ নারী ?

    সিঞ্জারের শোকের কথা জানাও, প্রশ্ন কোরো না।

    সবসময় ময়ূরপঙ্খী দেবদূতকে বিশ্বাস করো, তিনি দেবদূতদের প্রধান,

    তাঁর নামে, তাঁর ক্ষমতায় আমি তোমার শেকল আর বন্ধন ছিন্ন করব।

    দয়েশদের বলো জিব্রিল দেবদূতকে নিজেদের সততার প্রশ্ন করতে।

    কবে থেকে নষ্ট অলসদের দেয়া হয়েছে খলিফাগিরি ?

    তোমরা আমার রক্ত যদি ঝরাও, তা কখনও শুকোবে না।

    কবে থেকে মরুভূমির বালি ফুরিয়ে গেছে ?

    তোমদের হত্যার ফরমান আমাদের ধ্বংস করতে সফল হবে না।

    ব্যাবিলনের সভ্যতাকে পুড়িয়ে তোমরা নষ্ট করতে পারোনো পারবেও না।

    প্রতিবেশিদের আপসে লড়িয়ে দেবার মধ্যে গৌরব নেই

    আর পোয়াতি নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার কোনো পুরস্কার নেই।

    তোমরা বলতে পারো যে তোমাদের আক্রমণ একটা ন্যায্য কাজ,

    যেমন একসঙ্গে ডাঁটিকে ঘিরে থাকে কাঁটারা।

    তোমরা অজ্ঞ মূঢ়, তোমাদের পোশাকের মতন হৃদয়ও কালো

    মরুভূমির অপদার্থ বারবনিতাপুত্র তোমরা, জঞ্জালের প্রতিভূ।

    আমরা দায়ুদ, মির্জা আর বাশার গৌরবকে আবার প্রতিষ্ঠা করব।

  • চিনুয়া আচেবের কবিতা | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৪৩732396
  • নাইজেরিয়ার উত্তরঔপনিবেশিক সাহিত্যিক

    চিনুয়া আচেবের কবিতা ( ১৯৩০ - ২০১৩ )

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    শকুনেরা

    ধূসরতায়

    আর এক পশলা বৃষ্টিতে এক হতাশ

    সকাল অগ্রদূতদের দ্বারা অনালোড়িত

    সূর্যোদয়ে এক শকুন

    অনেক উঁচু গাছের ভাঙা

    হাড়ের ডালে বসে

    কাছে ঘেঁষে বসল

    ওর সঙ্গীর মসৃণ

    চোট-খাওয়া মাথায়, একটা নুড়ি

    এক ডালে শেকড়-পোঁতা

    কুৎসিত পালকের জঞ্জালে

    আদর করে ঝুঁকলো

    শকুনির দিকে। কালকে ওরা পেয়েছিল

    জলভরা গর্তে একটা ফোলা লাশের

    দুটো চোখ আর নাড়িভুঁড়িতে

    যা ছিল তা খেয়েছিল। পেট

    ভরে খেয়ে ওরা বেছে নিলো

    ওদের বিশ্রামের দাঁড়

    বাকি ফাঁপা মাংসের দিকে

    শীতল চাউনির সহজ

    দূরবিন চোখের আওতায়…

    অদ্ভুত

    সত্যিই প্রেম কেমন অন্য

    উপায়ে এতো সুনির্দিষ্ট

    একটা কোনা তুলে নেবে

    শব রাখার ওই বাসায়

    সাজিয়ে-গুছিয়ের গুটিয়ে বসবে সেখানে, হয়তো

    ঘুমিয়েও পড়বে -- শকুনির মুখ

    দেয়ালের দিকে মুখ করে !

    ...এইভাবেই বেলসেন ক্যাম্পের

    কমাণ্ডান্ট দিনের শেষে বাড়ি

    গেলেন সঙ্গে পোড়া মানুষের

    ধোঁয়া বিদ্রোহ করে নাকের

    চুলে ঝুলে আছে যা থামবে

    রাস্তার ধারে মিষ্টির দোকানে

    একটা চকোলেট তুলে নেবে

    তার কচি খোকার জন্য

    বাড়িতে অপেক্ষা করছে

    বাবা কখন ফিরবে…

    বদান্য দূরদর্শিতার

    গুণগান করো যদি চাও

    যে এমনকি মানুষখেকো

    রাক্ষসকেও একটা ছোটো

    জোনাকি উপহার দ্যায়

    কোষে মোড়া কোমলতা

    নিষ্ঠুর হৃদয়ের তুষার গুহায়

    নয়তো সেই বীজানুর জন্যেই

    হাহুতাশ করো স্বজাতীয় প্রেমে

    যাতে চিরকালের জন্য

    প্রতিষ্ঠিত করে হয়েছে

    অমঙ্গল।

    জবাব

    শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেললুম

    সন্ত্রাসের ঝালর-বসানো মোহ

    যা আমার প্রাচীন চাউনিকে বেঁধে রাখে

    ওই ভিড়ের মুখগুলোর সঙ্গে

    যা লুটতরাজের আর দখল করে আমার

    অবশিষ্ট জীবন এক অলৌকিকতায়

    শাদা-কলার হাতের নির্দেশের মাঝে

    আর নাড়িয়ে দিলুম এক সস্তা

    ঘড়ির মতন আমার কানের কাছে

    আর আমার পাশে মেঝেয় ছুঁড়ে

    ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালুম। আমি

    তাদের কাঁধ আর মাথাকে

    ওপর-নিচ করালুম এক নতুন

    সিঁড়ি দিয়ে আর ঝুঁকলুম

    ওদের ঘেমো সারিতে

    আর উঠে গেলুম মাঝের হাওয়া পর্যন্ত

    আমার হাত কঠোরতার জন্য এতো নতুন

    পাকড়াও করতে পারলুম এক

    ঝঞ্ঝাটে দিনের বন্ধুরতা

    আর তেষ্টা মেটালুম উৎসের

    যা তাদের পাগুলোকে উথালপাথাল

    খাওয়াচ্ছিল। আমি এক নাটকীয়

    অবনমন আরম্ভ করলুম সেইদিন

    পেছন দিক ফিরে গুঁড়িমারা ছায়ায়

    ভাঙা মৌতাতের টুকরোয়। আমি

    খুলে ফেললুম অনেকদিনের বন্ধ জানালা

    আর দরোজা আর দেখলুম আমার চালাঘর

    ইন্দ্রধনুর ঝাঁটায় নতুন সাফসুথরো করা

    সূর্যের আলো আবার আমার বাড়ি হয়ে গেল

    যার নিয়তিনির্দিষ্ট মেঝেতে অপেক্ষা করছিল

    আমার গর্বিত চঞ্চল জীবন।

    উড়াল

    ( নিই ওসুনদারের জন্য )

    দ্রাঘিমায় কিছু-একটা ক্ষমতার লালসাকে প্রশ্রয় দ্যায়

    নিছক বাড়ির ছাদটুকু আমিরের জন্য যথেষ্ট

    বৈভবশালী পাগড়ির দামি পাক থেকে বিলিয়ে দেন

    ধুলোয় হামাগুড়ি দেয়া কৃষকদের

    বিরল দুর্বোধ্য মাথা নাড়া যা প্যাঁচানো থাকে

    রাজকুমারীয় বিষণ্ণতায়।

    আমিও জেনেছি

    ওই ঝলসানো আদিম ক্ষুধাবোধ,

    জীবন প্রকাশ করার দ্রুতি

    এক দীর্ঘ পিছুহটা প্রবৃত্তি।

    যদিও দড়িবাঁধা আর হাতকড়া পরানো

    সেই দিন আমি চূড়া থেকে হুকুম দিলুম।

    তিন তলা জগতের এক সেতু খাপ খেয়ে যায়

    আমার উন্মাদ গর্বিত মূর্তির সঙ্গে যা আমি হয়েছি।

    ভাসমান মেঘের এক ম্যাজিক লেপ

    নিজের শাদা কোমলতাকে ওড়ালো আর ঘষল

    আমার পায়ের তলায় পেশাদার পরীর আঙুলের মতন

    আর ব্যাণ্ডেজের কাপড়ের ছাঁকনি দিয়েঢ

    এক মহানগরের বিস্ময় প্রকাশ করল

    সে ম্যাজিক পরীর দেশের আয়তনের।

    চাউনিকে বিভিন্নভাবে মাপজোক করে

    আমি মেঘগুলোকে ভাসিয়ে দিলুম

    এক স্হির চারণভূমির ওপরে, মিনারের ওপরে

    আর মাস্তুল আর ধোঁয়া-পালক চিমনিতে ;

    কিংবা পৃথিবীটাকেই উল্টে দিলুম, ছেড়ে দিলুম

    তা থেকেই, এক ভবঘুরে ফেরারিকে

    অবিচল আকাশের তলায়। তারপর এলো

    জগতের ওপরে এক আচমকা ঔজ্বল্য,

    তা ছিল বিরল শীতের হাসি, আর আমার

    মেঘ-জাজিমের ওপরে একটা কালো ক্রশ আঁকা

    যা ইন্দ্রধনুর অক্ষিগোলকে আটক। যাতে এলো

    খ্রিষ্টজন্মের অসাধারণত্ব -- তাছাড়া কেই বা আসতো

    ধূসর অখেলোয়াড়সুলভ তর্ক, অবিশ্বস্ত

    বিদ্যাবাগিশের উৎসর্গ-করা টেকো অবাধ্য ঘোষণা ?

    কিন্তু কি তুলনাহীন সৌন্দর্য ! কি গতি !

    রাতের এক রথ নিয়েছে আতঙ্কের উড়াল

    সেই দিনের আচার-বিচার সম্পর্কে আমাদের

    রাজকীয় ঘোষণা থেকে ! আর আমাদের কল্পনার

    মিছিল ঘোড়ায় চেপে এগিয়েছে। আমরা এক প্রাচীন

    লোভকে দমিয়েছি যা যুগ যুগ পড়ে থেকে কুঁকড়েছিল

    যতক্ষণ না মহিমাময় শোভাযাত্রা দেখে ক্লান্ত চোখ

    ফিরে এলো বিশ্রাম নেবার জন্যে ওই ক্ষুদ্র

    কিংবদন্তিতে যা জীবনের পোশাককে টেনে নিয়ে গেল

    সব জায়গা ছেড়ে আমার আসনের তলায়।

    এখন আমি ভাবি আমি জানি কেন দেবতারা

    উচ্চতার ক্ষেত্রে পক্ষপাত করেন -- পাহাড়ের

    শীর্ষকে আর গম্বুজকে, গর্বিত ইরোকো গাছগুলোকে

    আর কাঁটার পাহারা-দেয়া বোমবাক্সকে,

    কেন মামুলি গৃহদেবতারা

    কঠিন কাঠের দাঁড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বসবেন

    ঝুরঝুরে কড়িকাঠ থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝোলানো

    চালাবাড়ির চালে যা আরামে বসে আছে

    পৃথিবীর নিরাপদ মাটিতে।

    প্রতিশ্রুতি-ভীতি

    হুররে ! তাদের জন্য যারা কিচ্ছু করে না

    কিছুই দেখে না অনুভব করে না যাদের

    হৃদয়ে বসানো আছে দূরদর্শিতা

    পাতলা ঝিল্লির মতন গর্ভের উন্মুখ

    দরোজায় যাতে বীর্যক্রোধের কলঙ্ক

    না ঢুকতে পারে। আমি শুনেছি পেঁচারাও

    জ্ঞানের গোলক পরে থাকে তাদের

    চোখের চারিধারে প্রতিরোধ হিসেবে

    প্রতিটি অসুরক্ষিত চোখ দ্রুত আড়াল পেতে চায়

    আলোর ছোঁড়া কাঁকর থেকে। অনেকদিন আগে

    মধ্য প্রাচ্যে পনটিয়াস পাইলেট

    সবার সামনে তাঁর শাদা হাতের অবদান

    ধুয়েছিলেন যা বিখ্যাত হয়েছিল। ( তাঁর আগের

    আর পরের রোমের কর্তাদের মধ্যে তাঁকে ছাড়া আর

    কাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছিল প্রতিটি

    রবিবার পাঠানো প্রচারকদের ধর্মবিশ্বাস ? ) আর

    প্রচারকদের কথা বলতে হলে সেই অন্য লোকটা

    জুডাস অমন মূর্খ ছিল না মোটেই ; যদিও

    বড়ো বেশি বদনাম হয়েছিল পরের প্রজন্মের

    লোকেদের দ্বারা তবু তথ্য তো থেকেই যায় যে

    তারই একা ওই নানা-পোশাক জমঘটে

    যথেষ্ট বোধবুদ্ধি ছিল এই কথা বলার

    একটা মারাত্মক আন্দোলন যখন ও দেখল

    আর তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল, একটা সুন্দর

    ছোটো পুঁটলি ওর কোটের পকেট ফুলিয়ে রেখেছে

    লেনদেনের ব্যাপারে -- ব্যাটা বেশ বিচক্ষণ।

    প্রেমচক্র

    ভোরবেলায় আস্তে আস্তে

    সূর্য নিজের কুয়াচ্ছন্ন দীর্ঘ

    বাহুর আলিঙ্গন ফিরিয়ে নেয়।

    খোশমেজাজ প্রেমিক-প্রেমিকারা

    প্রেমের ঘষাঘষি-কারবারের

    কোনোরকম স্বাদ বা ক্বাথ

    ফেলে যায় না ; পৃথিবী

    শিশিরে সুগন্ধিত

    সুবাসে জেগে ওঠে

    নরম-চোখ আলোর

    ফিসফিসানিতে…

    পরে যুবক তার

    গুণাবলীর সমতা খুইয়ে ফেলবে

    স্বর্গের বিশাল জমি চাষ করার

    সময়ে আর তার ফল ফলাবে

    যুবতীটির তপ্ত ক্রোধের

    ফুলকির ওপরে। বহুকাল যাবত

    অভ্যস্ত অমনধারা আবদারে

    যুবতীটি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে

    সন্ধ্যার জন্য যখন আরেক রাতের

    চিন্তাভাবনা যুবকটির প্রফুল্লতা

    পুনরুদ্ধার করবে

    আর যুবতীটির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা

    যুবকটির ওপরে।

    প্রজাপতি

    গতি হল উৎপীড়ন

    ক্ষমতা হল উৎপীড়ন

    ওজন হল উৎপীড়ন

    প্রজাপতি সুরক্ষা খোঁজে মৃদুতায়

    ভারহীনতায়, ঢেউখেলানো উড়ালে

    কিন্তু এক চৌমাথায় যেখানে নানারঙা আলো

    গাছেদের থেকে হঠকারী নতুন রাজপথে পড়ে

    আমাদের অভিসারী এলাকার সংযোগ ঘটে

    আমি দুজনের জন্য যথেষ্ট খাবার সঙ্গে করে আনি

    আর অমায়িক প্রজাপতি নিজেকে উৎসর্গ করে

    উজ্বল হলুদ আত্মবলিদানে

    আমার কঠিন সিলিকন ঢালের ওপরে।

    উদ্বাস্তু মা আর ছেলে

    কোনো ম্যাডোনা আর

    শিশু ছুঁতে পারবে না

    মায়ের কোমলতার ওই ছবিটিকে

    একজন ছেলের খাতিরে ওনাকে দ্রুত ভুলে যেতে হবে।

    বাতাস দুর্গন্ধে কটু হয়ে উঠেছিল

    না-ছোঁচানো শিশুদের আমাশার

    যাদের ক্ষয়ে যাওয়া পাঁজর আর শুকনো

    পাছা ফুলে ফাঁপা তলপেট নিয়ে

    দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল। অনেকেরই

    মা বহুকাল যাবত পালন করা বন্ধ

    করে দিয়েছে কিন্তু এর নয়। মা

    দাঁতের পাটির মাঝখানে ভুতুড়ে

    হাসি ধরে রেখেছিল আর দুই চোখে

    এক ভুতুড়ে মায়ের গর্ব যা আঁচড়ে দিচ্ছিল

    করোটিতে টিকে থাকা মরচেরঙা চুল

    আর তখনই --

    দুই চোখে গান নিয়ে -- যত্নে আরম্ভ করল

    সিঁথেকাটা...আরেক জীবনে এই কাজ

    হতো প্রতিদিনের ঘটনা যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ

    নয়, ওর সকালের খাবার আর স্কুলে যাবার

    আগে ; এখন মা

    একটা ছোটো কবরে

    ফুল রাখার মতন কাজটা করছিলেন।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৪৬732397
  • হাংরি আন্দোলন : এক সাহিত্যক উথালপাথাল যা অনেকে সহ্য করতে পারেন না

    মলয় রায়চৌধুরী

    এক

    চুঁচুড়া-নিবাসী মৃত্যুঞ্জয় চক্রবর্তী আমাকে জিগ্যেস করেছেন, “আপনাদের চিন্তাধারা যখন প্রবলভাবে সক্রিয়, তখন আমি কলেজ স্টুডেন্ট, ইংরেজিতে অনার্স সরকারি কলেজ, বাঘা বাঘা অধ্যাপক, কিন্তু তাঁরা কেউ হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে একটি কথাও উচ্চারণ করেন নি। গ্রামের ছেলে, ইংরাজি ভালো বুঝতাম না বলে বাংলার ক্লাসে গিয়ে আধুনিক কবিতা, তারপরের ট্রেন্ড সম্পর্কে কত কথা শুনলাম কিন্তু হাংরি আন্দোলন ----- মলয় রায়চৌধুরী, শম্ভু রক্ষিত, শৈলেশ্বর, সুভাষের নাম একবারও উচ্চারিত হ'তে শুনিনি। হ্যাঁ, স্যার, যদিও এখন আমার ষাট বছর বয়স কিন্তু স্মৃতিশক্তি ভালো আছে। আমি স্কুল শিক্ষক, আর ২৩ দিন বাকি আছে। স্কুলপাঠ্য একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও আপনাদের নাম এবং অবদানের কথা লেখা নেই, অথচ পড়তে পড়তে জানতে পারলাম আপনার লেখার ওপর গবেষণা করে অনেকে পি.এইচ.ডি. করেছেন।”

    মৃত্যুঞ্জয় যে প্রশ্ন তুলেছেন তা অনেকেরই। তা হল হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে বিদ্যায়তনিক ভীতি ; মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ আক্রান্ত হবার আতঙ্ক। অথচ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়েছে, কেবল পশ্চিমবাংলায় নয়, অন্যান্য ভাষাতেও, যেমন জার্মানিতে ড্যানিয়েলা লিমোনেলা করেছেন, আমেরিকায় ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন মারিনা রেজা। অবশ্য হাংরি আন্দোলন তবুও আলোচিত হয়, কিন্তু শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, নিমসাহিত্য একেবারেই আলোচিত হয় না।

    হাংরি আন্দোলনকারীদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতিও একটা কারণ, বিশেষ করে হাংরি মামলায় কয়েকজন রাজসাক্ষী হবার পর। উত্তরবঙ্গে হাংরি জেনারেশনের প্রসার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, হাংরি পত্রিকা ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ এর সম্পাদক অলোক গোস্বামী এই কথাগুলো লিখেছিলেন, তা থেকে যৎসামান্য আইডিয়া হবে :-

    “নব্বুই দশকে সদ্য প্রকাশিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বগলে নিয়ে এক ঠা ঠা দুপুরে আমি হাজির হয়েছিলাম শৈলেশ্বরের বাড়ির গেটে। একা। ইচ্ছে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি বসে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবো। যেহেতু স্মরণে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তাই আস্থা ছিল শৈলেশ্বরের প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব,যুক্তিবোধ তথা ভদ্রতাবোধের ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শৈলেশ্বর আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন এবং যৌথ আলোচনাই পারবে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন উদ্যমে একসাথে পথ চলা শুরু করতে। কিন্তু দুভার্গ্য বশতঃ তেমন কিছু ঘটলো না। বেল বাজাতেই গেটের ওপারে শৈলেশ্বর। আমাকে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন।

    --কী চাই!

    মিনমিন করে বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলবো।

    --কে আপনি?

    এক এবং দুই নম্বর প্রশ্নের ভুল অবস্থান দেখে হাসি পাওয়া সত্বেও চেপে গিয়ে নাম বললাম।

    --কি কথা?

    --গেটটা না খুললে কথা বলি কিভাবে!

    --কোনো কথার প্রয়োজন নেই। চলে যান।

    --এভাবে কথা বলছেন কেন?

    --যা বলছি ঠিক বলছি। যান। নাহলে কিন্তু প্রতিবেশীদের ডাকতে বাধ্য হবো।

    এরপর স্বাভাবিক কারণেই খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমার চেহারাটা যেরকম তাতে শৈলেশ্বর যদি একবার ডাকাত, ডাকাত বলে চেঁচিয়ে ওঠেন তাহলে হয়ত জান নিয়ে ফেরার সুযোগ পাবো না। তবে 'ছেলেধরা' বলে চেল্লালে ভয় পেতাম না। সমকামিতার দোষ না থাকায় নির্ঘাত রুখে দাঁড়াতাম।

    ভয় পাচ্ছি অথচ চলেও যেতে পারছি না। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে আরও খানিকটা জানা বোঝা জরুরি।

    --ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। তবে পত্রিকার নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে সেটা রাখুন।

    এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন শৈলেশ্বর।

    --কোন পত্রিকা?

    --কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।

    --নেব না। যান।

    এরপর আর দাঁড়াইনি। দাঁড়ানোর প্রয়োজনও ছিল না। ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি ব্যক্তি শৈলেশ্বর ঘোষকে চিনতে ভুল হয়নি আমাদের। আর এই সমঝদারি এতটাই তৃপ্তি দিয়েছিল যে অপমানবোধ স্পর্শ করারই সুযোগ পায়নি।”

    এরকম দুর্ব্যবহার সাহিত্য ও চিত্র আন্দোলনে নতুন কিছু নয়। পরাবাস্তববাদ আন্দোলনে আঁদ্রে ব্রেতঁর সঙ্গে অনেকের সম্পর্ক ভালো ছিল না, দল বহুবার ভাগাভাগি হয়েছিল, অথচ সেসব নিয়ে বাঙালি আলোচকরা তেমন উৎসাহিত নন, যতোটা হাংরি আন্দোলনের দল-ভাগাভাগি নিয়ে। দুই

    ১৯৫৯-৬০ সালে আমি দুটি লেখা নিয়ে কাজ করছিলুম। একটি হল ইতিহাসের দর্শন যা পরে বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যটি মার্কসবাদের উত্তরাধিকার যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুটো লেখা নিয়ে কাজ করার সময়ে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনটা আমার মাথায় আসে। হাংরি আন্দোলনের ‘হাংরি’ শব্দটি আমি পেয়েছিলুম ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম বাক্যটি থেকে। ওই সময়ে, ১৯৬১ সালে, আমার মনে হয়েছিল যে স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে জাতীয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তর ঔপনিবেশিক কালখন্ডে।

    উপরোক্ত রচনাদুটির খসড়া লেখার সময়ে আমার নজরে পড়েছিল ওসওয়াল্ড স্পেংলারের লেখা দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েষ্ট বইটি, যার মূল বক্তব্য থেকে আমি গড়ে তুলেছিলুম আন্দোলনের দার্শনিক প্রেক্ষিত। ১৯৬০ সালে আমি একুশ বছরের ছিলুম। স্পেংলার বলেছিলেন যে একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফুরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময়ে আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন। আমার মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয়। এখানে বলা ভালো যে আমি কলাকাতার আদি নিবাসী পরিবার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশজ, এবং সেজন্যে বহু ব্যাপার আমার নজরে যেভাবে খোলসা হয় তা অন্যান্য লেখকদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

    ওই চিন্তা ভাবনার দরুণ আমার মনে হয়েছিল যে কিঞ্চিদধিক হলেও, এমনকি যদি ডিরোজিওর পর্যায়েও না হয়, তবু হস্তক্ষেপ দরকার, আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন। আমি আমার বন্ধু দেবী রায়কে, দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে, দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আমার আইডিয়া ব্যাখ্যা করি, এবং প্রস্তাব দিই হাংরি নামে আমরা একটা আন্দোলন আরম্ভ করব। ১৯৫৯ থেকে টানা দুবছরের বেশি সে সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাদার চাইবাসার বাড়িতে থাকতেন। দাদার চাইবাসার বাড়ি, যা ছিল নিমডি নামে এক সাঁওতাল-হো অধ্যুষিত গ্রামের পাহাড় টিলার ওপর, সে-সময়ে হয়ে উঠেছিল তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা। ১৯৬১ সালে যখন হাংরি আন্দোলনের প্রথম বুলেটিন প্রকাশিত হয়, এবং ১৯৬২ সালে বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত, আমরা এই চারজনই ছিলুম আন্দোলনের নিউক্লিয়াস।

    ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের বনেদের ওপর অর্থাৎ আন্দোলনগুলো ছিল টাইম-স্পেসিফিক বা সময় কেন্দ্রিক। কল্লোল গোষ্ঠী এবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠী তাঁদের ডিসকোর্সে যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলোও ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক নন্দন-বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেননা সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্থনা নির্ভর এবং তাদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত। সময়ানুক্রমী ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, এবং স্থানিকতাকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে।

    ১৯৬১ সালের প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি আন্দোলন চেষ্টা করল সময়তাড়িত চিন্তাতন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ পৃথক পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্র গড়ে তুলতে। সময়ানুক্রমী ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে মননসন্ত্রাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ। ঠিক এই জন্যেই, ইউরোপীয় শিল্পসাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে যাচাই করলে দেখা যাবে যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখব যে পুঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে সমসাময়িক শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন। এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীও সীমিত হয়ে গেছে দুতিনজন মেধাস্বত্বাধিকারীর নামে। পক্ষান্তরে, আমরা যদি ঔপনিবেশিক নন্দনতন্ত্রের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবি, তাহলে দেখব যে পদাবলী সাহিত্য নামক স্পেস বা পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ; মঙ্গলকাব্য নামক-ম্যাক্রো-পরিসরে পাবো মনসা বা চন্ডী বা শিব বা কালিকা বা শীতলা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর। লক্ষণীয় যে প্রাকঔপনিবেশিক কালখন্ডে এই সমস্ত মাইক্রো-পরিসরগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তার রচয়িতারা নন। তার কারণ সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপীয় অধিবিদ্যাগত মননবিশ্বের ফসল। সাম্রাজ্যবাদীরা প্রতিটি উপনিবেশে গিয়ে এই ফসলটির চাষ করেছে।

    ইতিহাসের দর্শন নিয়ে কাজ করার সময়ে আমার মনে হয়েছিল যে স্পেস বা স্থানিকতার অবদান হল পৃথিবী জুড়ে হাজার রকমের ভাষার মানুষ, হাজার রকমের উচ্চারণ ও বাকশৈলী, যখন কিনা ভাষা তৈরির ব্যাপারে মানুষ জৈবিকভাবে প্রোগ্রামড। একদিকে এই বিস্ময়কর বহুত্ব; অন্যদিকে, সময়কে একটি মাত্র রেখা-বরাবর এগিয়ে যাবার ভাবকল্পনাটি, যিনি ভাবছেন সেই ব্যক্তির নির্বাচিত ইচ্ছানুযায়ী, বহু ঘটনাকে, যা অন্যত্র ঘটে গেছে বা ঘটছে, তাকে বেমালুম বাদ দেবার অনুমিত নকশা গড়ে ফ্যালে। বাদ দেবার এই ব্যাপারটা, আমি সেসময়ে যতটুকু বুঝেছিলুম, স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল লর্ড কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাঙালির ডিসকোসটি উচ্চবর্গের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায়, যার ফলে নিম্নবর্গের যে প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্স বাঙালি সংস্কৃতিতে ছেয়ে ছিল, তা ঔপনিবেশিক আমলে লোপাট হয়ে যাওয়ায়। আমার মনে হয়েছিল যে ম্যাকলে সাহেবের চাপানো শিক্ষাপদ্ধতির কারণে বাঙালির নিজস্ব স্পেস বা পরিসরকে অবজ্ঞা করে ওই সময়ের অধিকাংশ কবি লেখক মানসিকভাবে নিজেদের শামিল করে নিয়েছিলেন ইউরোপীয় সময়রেখাটিতে। একারণেই, তখনকার প্রাতিষ্ঠানিক সন্দর্ভের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের প্রতিসন্দর্ভের সংঘাত আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল প্রথম বুলেটিন থেকেই এবং তার মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রতিটি বুলেটিন প্রকাশিত হবার সাথে-সাথে, যা আমি বহু পরে জানতে পারি, ‘কাউন্সিল ফর কালচারাল ফ্রিডাম’-এর সচিব এ.বি.শাহ, ‘পি.ই.এন ইনডিয়ার অধ্যক্ষ নিসিম এজেকিয়েল, এবং ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা পুপুল জয়াকরের কাছ থেকে।

    আমনধারা সংঘাত বঙ্গজীবনে ইতোপূর্বে ঘটেছিল। ইংরেজরা সময়কেন্দ্রিক মননবৃত্তি আনার পর প্রাগাধুনিক পরিসরমূলক বা স্থানিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালি ভাবুকের জীবনে ও তার পাঠবস্তুতে প্রচন্ড ঝাঁকুনি আর ছটফটানি, রচনার আদল-আদরায় পরিবর্তনসহ, দেখা দিয়েছিল, যেমন ইয়ং বেঙ্গল সদস্যদের ক্ষেত্রে (হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিরী, রাধানাথ শিকদার, প্যারীচাঁদ মিত্র, শিবচন্দ্র দেব ও দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়) এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও আরও অনেকের ক্ষেত্রে। একইভাবে, হাংরি আন্দোলন যখন সময় কেন্দ্রিক ঔপনিবেশিক চিন্তাতন্ত্র থেকে ছিড়ে আলাদা হয়, উত্তর ঔপনিবেশিক আমলে আবার স্থানিকতার চিন্তাতন্ত্রে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছিল, তখন আন্দোলনকারীদের জীবনে, কার্যকলাপে ও পাঠবস্তুর আদল-আদরায় অনুরূপ ঝাঁকুনি, ছটফটানি ও সমসাময়িক নন্দন কাঠামো থেকে নিস্কৃতির প্রয়াস দেখা গিয়েছিল। তা নাহলে আর হাংরি আন্দোলনকারীরা সাহিত্য ছাড়াও রাজনীতি, ধর্ম, উদ্দেশ্য, স্বাধীনতা, দর্শনভাবনা, ছবি আঁকা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তাহার প্রকাশ করবেন কেন।

    হাংরি আন্দোলনের সময়কাল খুব সংক্ষিপ্ত, ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত। এই ছোট্ট সময়ে শতাধিক ছাপান আর সাইক্লোস্টাইল করা বুলেটিন প্রকাশ করা হয়েছিল, অধিকাংশই হ্যান্ডবিলের মতন ফালিকাগজে, কয়েকটা দেয়াল-পোস্টারে, তিনটি একফর্মার মাপে, এবং একটি (যাতে উৎপলকুমার বসুর ‘পোপের সমাধি’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি ছিল) কুষ্ঠিঠিকুজির মতন দীর্ঘ কাগজে। এই যে হ্যান্ডবিলের আকারে সাহিত্যকৃতি প্রকাশ, এরও পেছনে ছিল সময়কেন্দ্রিক ভাবধারাকে চ্যালেঞ্জের প্রকল্প। ইউরোপীয় সাহিত্যিকদের পাঠবস্তুতে তো বটেই, মাইকেল মধুসুদন দত্তর প্রজন্ম থেকে বাংলা সন্দর্ভে প্রবেশ করেছিল শিল্প-সাহিত্যের নশ্বরতা নিয়ে হাহাকার। পরে, কবিতা পত্রিকা সমগ্র, কৃত্তিবাস পত্রিকা সমগ্র, শতভিষা পত্রিকা সমগ্র ইত্যাদি দুই শক্ত মলাটে প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের এই নন্দনতাত্ত্বিক হাহাকারটিকে। পক্ষান্তরে, ফালিকাগজে প্রকাশিত রচনাগুলো দিলদরাজ বিলি করে দেয়া হতো, যে প্রক্রিয়াটি হাংরি আন্দোলনকে দিয়েছিল প্রাকঔপনিবেশিক সনাতন ভারতীয় নশ্বরতাবোধের গর্ব। সেই সব ফালিকাগজ, যারা আন্দোলনটি আরম্ভ করেছিলেন, তাঁরা কেউই সংরক্ষণ করার বোধ দ্বারা তাড়িত ছিলেন না, এবং কারোর কাছেই সবকটি পাওয়া যাবে না। ইউরোপীয় সাহিত্যে নশ্বরতাবোধের হাহাকারের কারণ হল ব্যক্তিমানুষের ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা প্রদান। যে ট্র্যাজেডি-ভাবনা গ্রেকো-রোমান ব্যক্তি এককের পতনযন্ত্রণাকে মহৎ করে তুলেছিল পরবর্তীকালের ইউরোপে তা বাইবেলোক্ত প্রথম মানুষের ‘অরিজিনাল সিন’ তত্ত্বের আশ্রয়ে নশ্বরতাবোধ সম্পর্কিত হাহাকারকে এমন গুরুত্ব দিয়েছিল যে এলেজি এবং এপিটাফ লেখাটি সাহিত্যিক জীবনে যেন অত্যাবশক ছিল।

    আমরা পরিকল্পনা করেছিলুম যে সম্পাদনা ও বিতরণের কাজ দেবী রায় করবেন, নেতৃত্ব দেবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সংগঠিত করার দিকটা দেখবেন দাদা সমীর রায়চৌধুরী, আর ছাপা এবং ছাপানোর খরচের ভার আমি নেব। প্রথমেই অসুবিধা দেখা দিল। পাটনায় বাংলা ছাপাবার প্রেস পাওয়া গেল না। ফলে ১৯৬১ সালের নভেম্বরে যে বুলেটিন প্রকাশিত হল, তা ইংরেজিতে। এই কবিতার ইশতাহারে আগের প্রজন্মের চারজন কবির নাম থাকায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় ক্ষুন্ন হয়েছিলেন বলে ডিসেম্বরে শেষ প্যারা পরিবর্তন করে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অংশগ্রহণকারীদের নামসহ এই ইশতাহারটি আরেকবার বেরোয়। ১৯৬২ সালের শেষাশেষি সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। দাদার বন্ধু উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যোগ দেন। আমার বন্ধু সুবিমল বসাক, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় যোগদেন। সুবিমল বসাকের বন্ধু প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরূপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত সুভাষ ঘোষ, সতীন্দ্র ভৌমিক, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, শৈলেশ্বর ঘোষ, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পান্ডা, মনোহার দাশ যোগ দেন। তখনকার দিনে বামপন্থী ভাবধারার বুদ্ধিজীবীদের ওপর পুলিশ নজর রাখত। দেবী রায় লক্ষ্য করেন নি যে পুলিশের দুজন ইনফর্মার হাংরি আন্দোলনকারীদের যাবতীয় বই পত্র, বুলেটিন ইত্যাদি সংগ্রহ করে লালবাজারের প্রেস সেকশানে জমা দিচ্ছে এবং সেখানে ঢাউস সব ফাইল খুলে ফেলা হয়েছে।

    এতজনের লেখালিখি থেকে সেই সময়কার প্রধান সাহিত্যিক সন্দর্ভের তুলনায় হাংরি আন্দোলন যে প্রদিসন্দর্ভ গড়ে তুলতে চাইছিল, সে রদবদল ছিল দার্শনিক এলাকার, বৈসাদৃশ্যটা ডিসকোর্সের, পালাবদলটা ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিসের, বৈভিন্ন্যটা কখন-ভাঁড়ারের, পার্থক্যটা উপলব্ধির স্তরায়নের, তফাতটা প্রস্বরের, তারতম্যটা কৃতি-উৎসের। তখনকার প্রধান মার্কেট-ফ্রেন্ডলি ডিসকোর্সটি ব্যবহৃত হতো কবিলেখকের ব্যক্তিগত তহবিল সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। হাংরি আন্দোলনকারীরা সমৃদ্ধ করতে চাইলেন ভাষার তহবিল, বাচনের তহবিল, বাকবিকল্পের তহবিল, অন্ত্যজ শব্দের তহবিল, শব্দার্থের তহবিল, নিম্নবর্গীয় বুলির তহবিল, সীমালঙ্ঘনের তহবিল, অধ:স্তরীয় রাগবৈশিষ্ট্যের তহবিল, স্পৃষ্টধ্বনির তহবিল, ভাষিক ইরর্যাশনালিটির তহবিল, শব্দোদ্ভটতার তহবিল, প্রভাষার তহবিল, ভাষিক ভারসাম্যহীনতার তহবিল, রূপধ্বনির প্রকরণের তহবিল, বিপর্যাস সংবর্তনের তহবিল, স্বরন্যাসের তহবিল, পংক্তির গতিচাঞ্চল্যের তহবিল, সন্নিধির তহবিল, পরোক্ষ উক্তির তহবিল, স্বরণ্যাসের তহবিল, পাঠবস্তুর অন্তঃস্ফোটিক্রিয়ার তহবিল, তড়িত বাঞ্জনার তহবিল, অপস্বর-উপস্বরের তহবিল, সাংস্কৃতিক সন্নিহিতির তহবিল, বাক্যের অধোগঠনের তহবিল, খন্ডবাক্যের তহবিল, বাক্যনোঙরের তহবিল, শীংকৃত ধ্বনির তহবিল, সংহিতাবদলের তহবিল, যুক্তিছেদের তহবিল, আপতিক ছবির তহবিল, সামঞ্জস্যভঙ্গের তহবিল, কাইনেটিক রূপকল্পের তহবিল ইত্যাদি।

    ইতোপূর্বে ইযংবেঙ্গলের সাংস্কৃতিক উথাল-পাথাল ঘটে থাকলেও, বাংলা শিল্প সাহিত্যে আগাম ঘোষণা করে, ইশতাহার প্রকাশ করে, কোন আন্দোলন হয়নি। সাহিত্য এবং ছবি আঁকাকে একই ভাবনা-ফ্রেমে আনার প্রয়াস, পারিবারিক স্তরে হয়ে থাকলেও, সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর মাধ্যমে হয়নি। ফলত দর্পণ, জনতা, জলসা ইত্যাদি পত্রিকায় আমাদের সম্পর্কে বানানো খবর পরিবেশিত হওয়া আরম্ভ হল। হাংরি আন্দোলনের রাজনৈতিক ইশতাহার নিয়ে প্রধান সম্পাদকীয় বেরোল যুগান্তর দৈনিকে। আমার আর দেবী রায়ের কার্টুন প্রকাশিত হল দি স্টেটসম্যান পত্রিকায়। হেডলাইন হল ব্রিৎস পত্রিকায়। সুবিমল বসারের প্রভাবে হিন্দি ভাষায় রাজকমল চৌধুরী আর নেপালি ভাষায় পারিজাত হাংরি আন্দোলনের প্রসার ঘটালেন। আসামে ছড়িয়ে পড়ল পাঁক ঘেটে পাতালে পত্রিকাগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে। ছড়িয়ে পড়ল বগুড়ার বিপ্রতীক এবং ঢাকার স্বাক্ষর ও কণ্ঠস্বর পত্রিকাগুলোর সদস্যদের মাঝে, এবং মহারাষ্ট্রের অসো পত্রিকার সদস্যদের ভেতর। ঢাকার হাংরি আন্দোলনকারীরা (বুলবুল খান মাহবুব, অশোক সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, শহিদুর রহমান, প্রশান্ত ঘোষাল, মুস্তফা আনোয়ার প্রমুখ) জানতেন না যে আমি কেন প্রথম হাংরি বুলেটিনগুলো ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলুম। ফলে তাঁরাও আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন ইংরেজিতে ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে।

    যার-যেমন-ইচ্ছে লেখালেখির স্বাধীনতার দরুন হাংরি আন্দোলনকারীদের পাঠবস্তুতে যে অবাধ ডিক্যাননাইজেশান, আঙ্গিকমুক্তি, যুক্তিভঙ্গ, ডিন্যারেটিভাইজেশান, অনির্ণেয়তা, মুক্ত সমাপ্তি ইত্যাদির সূত্রপাত ঘটে, সেগুলোর যথার্থ সার্থকতা ও প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকেন তখনকার বিদ্যায়তনিক আলোচকরা, যাঁরা বিবিধতাকে মনে করেছিলেন বিশৃঙ্খলা, সমরূপ হবার অস্বীকৃতিকে মনে করেছিলেন অন্তর্ঘাত, সন্দেহপ্রবণতাকে মনে করেছিলেন অক্ষমতা, ঔপনিবেশিক চিন্তনতন্ত্রের বিরোধীতাকে মনে করেছিলেন অসামাজিক, ক্ষমতাপ্রতাপের প্রতিরোধকে মনে করেছিলেন সত্যের খেলাপ। তাঁদের ভাবনায় মতবিরোধিতা মানেই যেন অসত্য, প্রতিবাদের যন্ত্রানুষঙ্গ যেন সাহিত্যসম্পর্কহীন। মতবিরোধিতা যেহেতু ক্ষমতার বিরোধিতা, তাই তাঁরা তার যে কোন আদল ও আদরাকে হেয় বলে মনে করেছিলেন, কেননা প্রতিবিম্বিত ভাবকল্পে মতবিরোধীতা অনিশ্চয়তার প্রসার ঘটায়, বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত করে বলে অনুমান করে নেয়া হয়, তা যদি সাহিত্যকৃতি হয় তাহলে সাহিত্যিক মননবিশ্বে, যদি রাজনৈতিক কর্মকান্ড হয় তাহলে রাষ্ট্রের অবয়বে। এখানে বলা দরকার যে, পশ্চিমবাংলায় তখনও রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেনি। তখনকার প্রতিবিম্বিত বিদ্যায়তনিক ভাবাদর্শে, অতএব, যারা মতবিরোধের দ্বারা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছিল, অর্থাৎ হাংরি আন্দোলনকারীরা, তারা অন্যরকম, তারা অপর, তারা প্রান্তিক, তারা অনৈতিক, তারা অজ্ঞান, তারা সত্যের মালিকানার অযোগ্য। বলাবাহুল্য যে, ক্ষমতা ও সত্যের অমনতর পার্থক্যহীন পরিসরে যাদের হাতে ক্ষমতা তাদের কব্জায় সত্যের প্রভূত্ব। অজ্ঞানের চিন্তাভাবনাকে মেরামত করার দায়, ওই তর্কে, সুতরাং, সত্য মালিকের।

    প্রাগুক্ত মেরামতির কাজে নেমে বিদ্যায়তনিক আলোচকরা হাংরি আন্দোলনের তুলনা করতে চাইছিলেন পাঁচের দশকে ঘটে যাওয়া দুটি পাশ্চাত্য আন্দোলনের সঙ্গে। ব্রিটেনের অ্যাংরি ইয়াং ম্যান ও আমেরিকার বিট জেনারেশনের সঙ্গে। তিনটি বিভিন্ন দেশের ঘটনাকে তাঁরা এমনভাবে উল্লেখ ও উপস্থাপন করতেন, যেন এই তিনটি একই প্রকার সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি, এবং তিনটি দেশের আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামো, কৌমসমাজের ক্ষমতা-নকশা, তথা ব্যক্তিপ্রতিস্ব নির্মিতির উপাদানগুলো অভিন্ন। আমার মনে হয় বিদ্যায়তনিক ভাবনার প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে সীমিত ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞতা, অর্থাৎ কেবলমাত্র বাংলা ভাষাসাহিত্য বিষয়ক পঠন-পাঠন। যার দরুণ সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের জীবনকে তাঁরা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন সাহিত্যের উপকরণ প্রয়োগ করে। যে-সমস্ত উপাদানের সাহায্যে কৌমসমাজটি তার ব্যক্তি এককদের প্রতিস্ব নির্মাণ করে, সেগুলো ভেবে দেখার ও বিশ্লেষণের প্রয়াস তাঁরা করতেন না। প্রতিস্ব-বিশেষের পাঠবস্তু কেন অমন চেহারায় গোচরে আসছে, টেক্সট-বিশেষের প্রদায়ক গুণনীয়ক কী-কী, পুঁজিপ্রতাপের কৌমকৃৎকৌশল যে প্রতিস্ব-পীড়ন ঘটাচ্ছে তার পাপে পাঠবস্ত-গঠনে মনস্তাত্ত্বিক ও ভাষানকশা কীভাবে ও কেন পাল্টাচ্ছে, আর তাদের আখ্যান ঝোঁকের ফলশ্রুতিই বা কেন অমনধারা, এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার বদলে, তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত ভালোলাগা (ফিল গুড) নামক সাবজেকটিভ খপ্পরে পড়ে পাঠক-সাধারণকে সেই ফাঁদে টানতে চাইতেন। যে কোনও পাঠবস্ত একটি স্থানিক কৌমসমাজের নিজস্ব ফসল। কৌমনিরপেক্ষ পাঠবস্ত অসম্ভব।

    কেবল উপরোক্ত দুটি পাশ্চাত্য সাহিত্যিক ঘটনা নয়, ষাটের দশকের বাংলা সাহিত্যে অন্যান্য যে আন্দোলনগুলো ঘটেছিল, যেমন নিমসাহিত্য, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী এবং ধ্বংসকালীন, তাদের সঙ্গেও হাংরি আন্দোলনের জ্ঞান-পরিমন্ডল, দর্শন-পরিসর, প্রতিপ্রশ্ন-প্রক্রিয়া, অভিজ্ঞতা-বিন্যাস, চিন্তার-আকরণ, প্রতীতি, বিশ্লেষণী আকল্প, প্রতিবেদনের সীমান্ত, প্রকল্পনার মনোবীজ, বয়ন-পরাবয়ন, ভাষা-পরাভাষা, জগৎ-পরাজগৎ, বাচনিক নির্মিতি, সত্তাজিজ্ঞাসা, উপস্থাপনার ব্যঞ্জনা, অপরত্ববোধ, চিহ্নাদির অন্তর্বয়ন, মানবিক সম্পর্ক বিন্যাসের অনুষঙ্গ, অভিধাবলীর তাৎপর্য, উপলব্ধির উপকরণ, স্বভাবাতিযায়ীতা, প্রতিস্পর্ধা, কৌমসমাজের অর্গল, গোষ্ঠীক্রিয়ার অর্থবহতা, প্রতাপবিরোধী অবস্থানের মাত্রা, প্রতিদিনের বাস্তব, প্রান্তিকায়নের স্বাতন্ত্র্য, বিকল্প অবলম্বন সন্ধান, চিহ্নায়নের অন্তর্ঘাত, লেখন-গ্রন্থনা, দেশজ অধিবাস্তব, অভিজ্ঞতার সূত্রায়ন-প্রকরণ, প্রেক্ষাবিন্দুর সমন্বয়, সমষ্টী পীড়াপুঞ্জ ইত্যাদি ব্যাপারে গভীর ও অসেতুসম্ভব পার্থক্য ছিল। ষাটের দশকের ওই চারটি আন্দোলনের সঙ্গে হাংরি প্রতিসন্দর্ভের যে-মিল ছিল তা হল এই যে পাঁচটি আন্দোলনই লেখকপ্রতিম্ব থেকে রোশনাইকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল পাঠবস্তর ওপর। অর্থাৎ লেখকের কেরামতি বিচার্য নয়, যা বিচার্য তা হল পাঠবস্তুর খুঁটিনাটি। লেখকের বদলে পাঠবস্তু যে গুরুত্বপূর্ণ, এই সনাতন ভারতীয়তা, মহাভারত ও রামায়ণ পাঠবস্তু দুটির দ্বারা প্রমাণিত।

    অনুশাসন মুক্তির ফলে, লিটল ম্যাগাজিনের নামকরণের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল হাংরি আন্দোলন, যে, তারপর থেকে পত্রিকার নাম রাখার ঐতিহ্য একবারে বদলে গেল। কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস, শতভিষা, উত্তরসূরী, অগ্রণী ইত্যাদি থেকে একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে হাংরি আন্দালনকারীরা তাঁদের পত্রিকার নাম রাখলেন জেব্রা, উন্মার্গ, ওয়েস্টপেপার, ফুঃ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ইত্যাদি। অবশ্য সাহিত্য শিল্পকে উন্মার্গ আখ্যাটি জীবনানন্দ দাশ বহু পূর্বে দিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও হাংরি আন্দালনের সময় পর্যন্ত তিনি তেমন প্রতিষ্ঠা পান নি। জেব্রা নামকরণটি ছিল পাঠকের জন্যে নিশ্চিন্তে রাস্তা পার হয়ে হাংরি পাঠবস্তুর দিকে এগোবার ইশারা। হাংরি আন্দোলন সংঘটিত হবার আগে ওই পত্রিকাগুলোর নামকরণেই কেবল এলিটিজম ছিল তা নয়, সেসব পত্রিকাগুলোর একটি সম্পাদকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। বুর্জোয়া মূল্যবোধ প্রয়োগ করে একে-তাকে বাদ দেয়া বা ছাঁটাই করা, যে কারণে নিম্নবর্ণের লেখকের পাঠবস্ত সেগুলোর পৃষ্ঠায় অনুপস্থিত, বিশেষ করে কবিতা। আসলে কোন-কোন রচনাকে ‘টাইমলেস’ বলা হবে সে জ্ঞানটুকু ওই মূল্যবোধের ধারক-বাহকরা মনে করতেন তাঁদের কুক্ষিগত, কেননা সময় তো তাঁদের চোখে একরৈখিক, যার একেবারে আগায় আছেন কেবল তাঁরা নিজে।

    ‘টাইমলেস’ কাজের উদ্বেগ থেকে পয়দা হয়েছিল ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ ভাবকল্পটি, যা উপনিবেশগুলোয় চারিয়ে দিয়ে মোক্ষম চাল দিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপ। এই ভাবকল্পটির দ্বারা কালো, বাদামি, হলদে চামড়ার মানুষদের বহুকাল পর্যন্ত এমন সম্মোহিত করে রেখেছিল সাম্রাজ্যবাদী নন্দনভাবনা যাতে সাহিত্য-শিল্প হয়ে যায় উদ্দেশ্যহীন ও সমাজমুক্ত, যাতে পাঠবস্তু হয়ে যায় বার্তাবর্জিত, যাতে সন্দর্ভের শাসক-বিরোধী অন্তর্ঘাতী ক্ষমতা লুপ্ত হয়, এবং তা হয়ে যায় জনসংযোগহীন। হাংরি বুলেটিন যেহেতু প্রকাশিত হতো হ্যান্ডবিলের মতন ফালিকাগজে, তা পরের দিনই সময় থেকে হারিয়ে যেত। নব্বইটির বেশি বুলেটিন চিরকালের জন্যে হারিয়ে গেছে। লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির পক্ষেও ও বুলেটিনগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি।

    যে কোন আন্দোলনের জন্ম হয় কোন না কোন আধিপত্য প্রণালীর বিরুদ্ধে। তা সে রাজনৈতিক আধিপত্য হোক বা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, নৈতিক, নান্দনিক, ধার্মিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক ইত্যাদি আধিপত্য হোক না কেন। আন্দোলন-বিশেষের উদ্দেশ্য, অভিমুখ, উচ্চাকাঙ্খা, গন্তব্য হল সেই প্রণালীবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলে পরিসরটিকে মুক্ত করা। হাংরি আন্দোলন কাউকে বাদ দেবার প্রকল্প ছিল না। যে কোন কবি বা লেখক, ওই আন্দোলনের সময়ে যিনি নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করেছেন, তাঁর খুল্লমখুল্লা স্বাধীনতা ছিল হাংরি বুলেটিন বের করার। বুলেটিনগুলোর প্রকাশকদের নাম-ঠিকানা দেখলেই স্পষ্ট হবে (অন্তত যে-কটির খোঁজ মিলেছে তাদের ক্ষেত্রেও) যে, তা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্নজন কর্তৃক ১৯৬৩-র শেষ দিকে এবং ১৯৬৪-র প্রথমদিকে প্রকাশিত। ছাপার খরচ অবশ্য আমি বা দাদা যোগাতাম, কেননা, অধিকাংশ আন্দোলনকারীর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসুও নিজের খরচে প্রকাশ করেছিলেন বুলেটিন। অর্থাৎ হাংরি বুলেটিন কারোর প্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না। এই বোধের মধ্যে ছিল পূর্বতন সন্দর্ভগুলোর মনোবীজে লুকিয়ে থাকা সত্ত্বাধিকার বোধকে ভেঙে ফেলার প্রতর্ক যা সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয়রা এদেশে এনেছিল। ইউরোপীয়রা আসার আগে বঙ্গদেশে পার্সোনাল পজেশান ছিল, কিন্তু প্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না।

    হাংরি আন্দোলনের কোন হেড কোয়ার্টার, হাইকমান্ড, গভর্নিং কাউনসিল বা সম্পাদকের দপ্তর ধরণের ক্ষমতাকেন্দ্র ছিল না, যেমন ছিল কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস ইত্যাদি পত্রিকার ক্ষেত্রে, যার সম্পাদক বাড়ি বদল করলে পত্রিকা দপ্তরটি নতুন বাড়িতে উঠে যেত। হাংরি আন্দোলন কুক্ষিগত ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারণাকে অতিক্রম করে প্রতিসন্দর্ভকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল প্রান্তবর্তী এলাকায়, যে কারণে কেবল বহির্বঙ্গের বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিক ছাড়াও তা হিন্দি, উর্দু, নেপলি, অসমীয়া, মারাঠি ইত্যাদি ভাষায় ছাপ ফেলতে পেরেছিল। এখনও মাঝে মধ্যে কিশোর-তরুণরা এখান-সেখান থেকে নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী ঘোষণা করে গর্বিত হন, যখন কিনা আন্দোলনটি চল্লিশ বছর আগে, ১৯৬৫ সালে ফুরিয়ে গিয়েছে।

    বিয়াল্লিশ বছর আগে সুবিমল বসাক, হিন্দি কবি রাজকমল চৌধুরীর সঙ্গে, একটি সাইক্লোস্টাইল করা ত্রিভাষিক (বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি) হাংরি বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন, তদানীন্তন সাহিত্যিক সন্দর্ভের প্রেক্ষিতে হাংরি প্রতিসন্দর্ভ যে কাজ উপস্থাপন করতে চাইছে তা স্পষ্ট করার জন্যে। তাতে দেয়া তালিকাটি থেকে আন্দোলনের অভিমুখের কিছুটা হদিশ মিলবে:

    ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে সুবিমল বসাকের আঁকা বেশ কিছু লাইন ড্রইং, যেগুলো ঘন-ঘন হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হচ্ছিল, তার দরুণ তাঁকে পরপর দুবার কফিহাউসের সামনে ঘিরে ধরলেন অগ্রজ বিদ্বজ্জন এবং প্রহারে উদ্যত হলেন, এই অজুহাতে যে সেগুলো অশ্লীল। একই অজুহাতে কফিহাউসের দেয়ালে সাঁটা অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা পোস্টার আমরা যতবার লাগালুম ততবার ছিঁড়ে ফেলে দেয়া হল। বোঝা যাচ্ছিল যে, কলোনিয়াল ইসথেটিক রেজিমের চাপ তখনও অপ্রতিরোধ্য। হাংরি আন্দোলনের ১৫ নম্বর বুলেটিন এবং ৬৫ নং বুলেটিন, যথাক্রমে রাজনৈতিক ও ধর্ম সম্পর্কিত ইশতাহারের, যাকে বলে স্লো বলিং এফেক্ট, আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, এবং আমাদের অজ্ঞাতসারে ক্রুদ্ধ করে তুলছিল মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের এসট্যাবলিশমেন্টকে। আজকের ভারতবর্ষের দিকে তাকিয়ে ইশতাহার দুটিকে অলমোস্ট প্রফেটিক বলা যায়। এরপর, যখন রাক্ষস জোকার মিকিমাউস জন্তজানোয়ার ইত্যাদির কাগুজে মুখোশে ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন’ বার্তাটি ছাপিয়ে হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে মুখ্য ও অন্যান্য মন্ত্রীদের মুখ্য ও অন্যান্য সচিবদের জেলা শাসকদের, সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদকদের, বাণিজ্যিক লেখকদের পাঠান হল, তখন সমাজের এলিট অধিপতিরা আসরে নামলেন। এ ব্যাপারে কলকাঠি নাড়লেন একটি পত্রিকা গোষ্ঠীর মালিক, তাঁর বাংলা দৈনিকের বার্তা সম্পাদক এবং মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের খোরপোষে প্রতিপালিত একটি ইংরেজি ত্রৈমাসিকের কর্তাব্যক্তিরা।

    ১৯৬৪ এর সেপ্টেম্বরে রাষ্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলুম আমি, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ এবং দাদা সমীর রায়চৌধুরী। এই অভিযোগে উৎপল কুমার বসু, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইসু হয়ে থাকলেও, তাঁদের প্রেপ্তার করা হয়নি। এরকম একটি অভিযোগ এই জন্যে চাপান হয়েছিল যাতে বাড়ি থেকে থানায় এবং থানা থেকে আদালতে হাতে হাতকড়া পরিয়ে আর কোমরে দড়ি বেঁধে চোরডাকাতদের সঙ্গে সবায়ের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। অন্তর্ঘাতের অভিযোগটি সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ থেকে মে ১৯৬৫ পর্যন্ত বজায় ছিল, এবং ওই নয় মাস যাবৎ রাষ্ট্রযন্ত্রটি তার বিভিন্ন বিভাগের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনকারীরূপে চিহ্নিত প্রত্যেকের সম্পর্কে খুটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছিল, এবং তাদের তখন পর্যন্ত যাবতীয় লেখালেখি সংগ্রহ করে ঢাউস-ঢাউস ফাইল তৈরি করেছিল, যেগুলো লালবাজারে পুলিশ কমিশনারের কনফারেন্স রুমের টেবিলে দেখেছিলুম, যখন কলকাতা পুলিশ, স্বরাষ্ট্র দফতর, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ ও ভারতীয় সেনার উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং পশ্চিমবঙ্গের অ্যাডভোকেট জেনারালকে নিয়ে গঠিত একটি বোর্ড আমাকে আর দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে কয়েক ঘন্টা জেরা করেছিল।

    অভিযোগটি কোন সাংস্কৃতিক অধিপতির মস্তিস্কপ্রসূত ছিল জানি না। তবে অ্যাডভোকেট জেনারেল মতামত দিলেন যে এরকম আজেবাজে তথ্যের ওপর তৈরি এমন সিরিয়াস অভিযোগ দেখলে আদালত চটে যাবে। তখনকার দিনে টাডা-পোটা ধরণের আইন ছিল না। ফলত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নিয়ে ১৯৬৫ সালের মে মাসে বাদবাকি সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কেবল আমার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হল, এই অভিযোগে যে সাম্প্রতিকতম হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত আমার ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি অশ্লীল। আমার বিরুদ্ধে মামলাটা দায়ের করা সম্ভব হল শৈলেশ্বর ঘোষ এবং সুভাষ ঘোষ আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেলেন বলে। অর্থাৎ হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে গেল। ওনারা দুজনে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মুচলেকা দিলেন, যার প্রতিলিপি চার্জশিটের সঙ্গে আদালত আমায় দিয়েছিল।

    প্রসিকিউশনের পক্ষে এই দুজন রাজসাক্ষীকে তেমন নির্ভরযোগ্য মনে হয়নি। তাই আমার বিরুদ্ধে সমীর বসু আর পবিত্র বল্লভ নামে দুজন ভুয়ো সাক্ষীকে উইটনেস বক্সে তোলা হয়, যাদের আমি কোন জন্মে দেখিনি, অথচ যারা এমনভাবে সাক্ষ্য দিয়েছিল যেন আমার সঙ্গে কতই না আলাপ-পরিচয়। এই দুজন ভুয়ো সাক্ষীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা। আমার কৌশুলিদের জেরায় এরা দুজন ভুয়ো প্রমাণ হবার সম্ভাবনা দেখা দিলে প্রসিকিউশন আমার বিরুদ্ধে উইটনেস বক্সে তোলে, বলাবাহুল্য গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে। ফলে আমিও আমার পক্ষ থেকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করাই জ্যোতির্ময় দত্ত, তরুণ সান্যাল আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। বহু সাহিত্যিককে অনুরোধ করেছিলুম, কিন্তু এনারা ছাড়া আর কেউ রাজি হননি। শক্তি এবং সুনীল, দুই বন্ধু, একটি মকদ্দমায় পরস্পরের বিরুদ্ধে, চল্লিশ বছর পর ব্যাপারটা অবিশ্বস্য মনে হয়। সবায়ের সাক্ষ্য ছিল বেশ মজাদার, যাকে বলে কোর্টরুম-ড্রামা।

    তেরটা আদালতঘরের মধ্যে আমার মকদ্দমাটা ছিল নয় নম্বর এজলাসে। বিচারকের মাথার ওপর হলদে টুনি বালবটা ছাড়া আলোর বালাই ছিল না জানালাহীন ঘরটায়। অবিরাম ক্যাচোর-ক্যাচোর শব্দে অবসর নেবার অনুরোধ জানাত দুই ব্লেডের বিশাল ছাদপাখা। পেশকার গাংগুলি বাবুর অ্যান্টিক টেবিলের লাগোয়া বিচারকের টানা টেবিল, বেশ উঁচু, ঘরের এক থেকে আরেক প্রান্ত, বিচারকের পেছনে দেয়ালে টাঙানো মহাত্মা গান্ধীর ফোকলা-হাসি রঙিন ছবি। ইংরেজরা যাবার পর চুনকাম হয়নি ঘরটা। হয়ত ঘরের ঝুলগুলোও তখনকার। বিচারকের টেবিলের বাইরে, ওনার ডান দিকে, দেয়াল ঘেঁষে, জাল-ঘেরা লোহার শিকের খাঁচা, জামিন-না-পাওয়া বিচারাধীনদের জন্যে, যারা ওই খাঁচার পেছনের দরোজা দিয়ে ঢুকত। খাঁচাটা অত্যন্ত নোংরা। আমি যেহেতু ছিলুম জামিনপ্রাপ্ত, দাঁড়াতুম খাঁচার বাইরে। ঠ্যাঙ ব্যথা করলে, খাঁচায় পিঠ ঠেকিয়ে।

    পেশকার মশায়ের টেবিলের কাছাকাছি থাকত গোটাকতক আস্ত-হাতল আর ভাঙা-হাতল চেয়ার, কৌঁসুলিদের জন্যে। ঘরের বাকিটুকুতে ছিল নানা মাপের, আকারের, রঙের নড়বড়ে বেঞ্চ আর চেয়ার, পাবলিকের জন্যে, ছারপোকা আর খুদে আরশোলায় গিজগিজে। টিপেমারা ছারপোকার রক্তে, পানের পিকে, ঘরের দেয়ালময় ক্যালিগ্রাফি। বসার জায়গা ফাঁকা থাকত না। কার মামলা কখন উঠবে ঠিক নেই। ওই সর্বভারতীয় ঘর্মাক্ত গ্যাঞ্জামে, ছারপোকার দৌরাত্মে, বসে থাকতে পারতুম না বলে সারা বাড়ি এদিক-ওদিক ফ্যা-ফ্যা করতুম, এ-এজলাস সে-এজলাস চক্কর মারতুম, কৌতুহলোদ্দীপক সওয়াল-জবাব হলে দাঁড়িয়ে পড়তুম। আমার কেস ওঠার আগে সিনিয়ার উকিলের মুহুরিবাবু আমায় খুঁজে পেতে ডেকে নিয়ে যেতেন। মুহুরিবাবু মেদিনীপুরের লোক, পরতেন হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, ক্যাম্বিশের জুতো, ছাইরঙা শার্ট। সে শার্টের ঝুল পেছন দিকে হাঁটু পর্যন্ত আর সামনে দিকে কুঁচকি পর্যন্ত। হাতে লম্বালম্বি ভাঁজ করা ফিকে সবুজ রঙ্গের দশ-বারটা ব্রিফ, যেগুলো নিয়ে একতলা থেকে তিনতলার ঘরে-ঘরে লাগাতার চরকি নাচন দিতেন।

    আমার সিনিয়র উকিল ছিলেন ক্রিমিনাল লয়ার চন্ডীচরণ মৈত্র। সাহিত্য সম্পর্কে ওনার কোন রকম ধারণা ছিল না বলে লেবার কোর্টের উকিল সতেন বন্দ্যোপাধ্যায়কেও রাখতে হয়েছিল। চাকরি থেকে সাসপেন্ডেড ছিলুম কেস চলার সময়ে, তার ওপর কলকাতায় আমার মাথা গোঁজার ঠাই ছিল না। খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।

    আদালত চত্বরটা সবসময় ভিড়ে গিজগিজ করত। ফেকলু উকিলরা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে “সাক্ষী চাই? সাক্ষী চাই? এফিডেফিট হবে।” বলে-বলে চেচাত মক্কেল যোগাড়ের ধান্দায়। সারা বাড়ি জুড়ে যেখানে টুলপেতে টাইপরাইটারে ফটর ফটর ট্যারাবেকা টাইপ করায় সদাব্যস্ত টাইপিস্ট, পাশে চোপসানো মুখ লিটিগ্যান্ট। একতলায় সর্বত্র কাগজ, তেলেভাজা, অমলেট, চা-জলখাবার, ভাতরুটির ঠেক। কোর্ট পেপার কেনার দীর্ঘ কিউ। চাপরাসি- আরদালির কাজে যে সব বিহারিদের আদালতে চাকরি দিয়েছিল ইংরেজরা, তারা চত্বরের খোঁদলগুলো জবরদখল করে সংসার পেতে ফেলেচে। জেল থেকে খতরনাক আসামিরা পুলিশের বন্ধ গাড়িতে এলে, পানাপুকুরে ঢিল পড়ার মতন একটু সময়ের জন্যে সরে যেত ভিড়টা। তারপর যে কে সেই। সন্দর্ভ ও প্রতিসন্দর্ভের সামাজিক সংঘাতক্ষেত্র হিসেবে আদালতের মতন সংস্থা সম্ভবত আর নেই।

    সাক্ষ্যাদি শেষ হবার পর দুপক্ষের দীর্ঘ বহস হল একদিন, প্রচুর তর্কাতর্কি হল। আমি খাঁচার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে। রায় দেবার দিন পড়ল ১৯৬৫ সালের আঠাশে ডিসেম্বর। ইতিমধ্যে আমেরিকার ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে সংবাদ হয়ে গেছি। যুগান্তর দৈনিকে ‘আর মিছিলের শহর নয়’ এবং ‘যে ক্ষুধা জঠরের নয়’ শিরোনামে প্রধান সম্পাদকীয় লিখলেন কৃষ্ণ ধর। যুগান্তর দৈনিকে সুফী এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় চন্ডী লাহিড়ী কার্টুন আঁকলেন আমায় নিয়ে। সমর সেন সম্পাদিত ‘নাউ’ পত্রিকায় পরপর দুবার লেখা হল আমার সমর্থনে। দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের সমর্থনে সমাজ-বিশ্লেষণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হল। ধর্মযুগ, দিনমান, সম্মার্গ, সাপ্তাহিক হিন্দুস্থান, জনসত্তা পত্রিকায় উপর্যুপরি ফোটো ইত্যাদিসহ লিখলেন ধর্মবীর ভারতী, এস. এইচ. বাৎসায়ন অজ্ঞেয়, ফনীশ্বর নাথ রেণু, কমলেশ্বর, শ্রীকান্ত ভর্মা, মুদ্রারাক্ষস, ধুমিল, রমেশ বকশি প্রমুখ। কালিকটের মালায়ালি পত্রিকা যুগপ্রভাত হাংরি আন্দোলনকে সমর্থন করে দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করল। বুয়েনস আয়ার্স-এর প্যানারোমা পত্রিকার সাংবাদিক আমার মকদ্দমা কভার করল। পাটনার দৈনিক দি সার্চলাইট প্রকাশ করল বিশেষ ক্রোড়পত্র। বিশেষ হাংরি আন্দোলন সংখ্যা প্রকাশ করল জার্মানির ক্ল্যাকটোভিডসেডস্টিন পত্রিকা, এবং কুলচুর পত্রিকা ছাপলো সবকটি ইংরেজি ম্যানিফেস্টো। আমেরিকায় হাংরি আন্দোলনকারীদের ফোটো, ছবি-আঁকা, রচনার অনুবাদ ইত্যাদি নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করল সল্টেড ফেদার্স, ট্রেস, ইনট্রেপিড, সিটি লাইটস জার্নাল, সান ফ্রানসিসকো আর্থকোয়েক, র্যামপার্টস, ইমেজো হোয়্যার ইত্যাদি লিটল ম্যাগজিন। সম্পাদকীয় প্রকাশিত হল নিউ ইয়র্কের এভারগ্রিন রিভিউ, আর্জেনটিনার এল কর্নো এমপ্লমাদো এবং মেকসিকোর এল রেহিলেতে পত্রিকায়। পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতায় টিটকিরি মারা ছাড়া আর কিছু করেন নি বাঙ্গালি সাহিত্যিকরা।

    ভুয়ো সাক্ষী, রাজ সাক্ষী আর সরকারি সাক্ষীদের বক্তব্যকে যথার্থ মনে করে আমার পক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্য নাকচ করে দিলেন ফৌজদারি আদালতের বিচারক। দুশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের কারাদান্ড ধার্য করলে তিনি। আমি হাইকোর্টে রিভিশন পিটিশন করার জন্যে আইনজীবির খোঁজে বেরিয়ে দেখলুম যে খ্যাতিমান কৌঁসুলিদের এক দিনের বহসের ফি প্রায় লক্ষ টাকা, অনেকে প্রতি ঘন্টা হিসেবে চার্জ করেন, তাঁরা ডজনখানেক সহায়ক উকিল দুপাশে দাঁড় করিয়ে বহস করেন। জ্যোতির্ময় দত্ত পরিচয় করিয়ে দিলেন সদ্য লন্ডন-ফেরত ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে। তাঁর সৌজন্যে আমি তখনকার বিখ্যাত আইনজীবি মৃগেন সেনকে পেলুম। নিজের সহায়কদের নিয়ে তিনি কয়েক দিন বসে তর্কের স্ট্রাটেজি কষলেন। ১৯৬৭ সালের ছাব্বিশে জুলাই আমার রিভিশন পিটিশানের শুনানি হল। নিম্ন আদালতের রায় নাকচ করে দিলেন বিচারক টি. পি. মুখার্জি। ফিস ইন্সটলমেন্টে দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন করুণাশঙ্কর রায়।

    হাংরি আন্দোলন চল্লিশ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। এখন শুরু হয়েছে তাকে নিয়ে ব্যবসা। সমীর চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি (আমার দাদার নামের মিলটা কাজে লাগান হয়েছে) ‘হাংরি জেনারেশন রচনা সংকলন’ নামে একটা বই বের করেছেন। তাতে অন্তর্ভূক্ত অধিকাংশ লেখককে আমি চিনি না। শক্তি, সন্দীপন, উৎপল, বিনয়, সমীর, দেবী, সুবিমল, এবং আমার রচনা তাতে নেই। অনিল, করুণা, সুবিমলের আঁকা ছবি নেই। একটিও ম্যানিফেস্টো নেই। বাজার নামক ব্যাপারটি একটি ভয়ংকর সাংস্কৃতিক সন্দর্ভ।

    তিন

    বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে অভিজিৎ পাল একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, এবাদুল হক সম্পাদিত ‘আবার এসেছি ফিরে’ পত্রিকায়, তা থেকে উল্লেখ্য অংশ তুলে দিচ্ছি এখানে :

    বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের ন্যায় আর কোনও আন্দোলন তার পূর্বে হয় নাই। হাজার বছরের বাংলা ভাষায় এই একটিমাত্র আন্দোলন যা কেবল সাহিত্যের নয় সম্পূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে আঘাত ঘটাতে পেরেছিল, পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। পরবর্তীকালে তরুণ সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের সাহস যোগাতে পেরেছে।

    ১ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিলেন। কেবল তাই নয় ; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন। তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা, ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন। পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায়। ফোলডারে স্কেচ আঁকতেন সুবিমল বসাক । ত্রিদিব মিত্র তাঁর ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজে আঁকতেন। পরবর্তীকালে দুই বাংলাতে তাঁদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

    ২ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। তাঁদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই। সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয় ; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার। নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী সরকার সত্বেও বামপন্হী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে নিষ্কৃতি পান নাই। শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই। তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগন ; উল্লেখ্য হলেন অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ। সুবিমল বসাকের পূর্বে ‘বাঙাল ভাষায়’ কেউ কবিতা ও উপন্যাস লেখেন নাই। হাংরি জেনারেশনের পরবর্তী দশকগুলিতে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব স্পষ্ট।

    ৩ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস। মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম পশ্চিমবাংলার সমাজে ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উথ্থাপন করেন। বামপন্হীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো। উল্লেখ্য তাঁর নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, গল্প ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ ইত্যাদি। তিনি বর্ধমানের সাঁইবাড়ির ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে লেখেন ‘আরেকবারে ক্ষুধিত পাষাণ’। বাঙাল ভাষায় লিখিত সুবিমল বসাকের কবিতাগুলিও উল্লেখ্য। পরবর্তী দশকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও লেখকদের রচনায় এই প্রভাব সুস্পষ্ট।

    ৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হলো পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হতো ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘পূর্বাশা’ ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘উন্মার্গ’, ‘প্রতিদ্বন্দী’ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছে। পত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কৃত হয়েছে।

    ৫ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল। ‘কবিতা’, ‘ধ্রুপদি’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিম্নবর্গের কবিদের রচনা পাওয়া যায় না। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিনগুলির সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন। এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক, জাহাজের খালাসি অবনী ধর, মালাকার পরিবারের নিত্য মালাকার ইত্যাদি। পরবর্তীকালে প্রচুর সাবঅলটার্ন কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল।

    ৬ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা, যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগতা বহুরৈখিকতা ইত্যাদি। তাঁদের আন্দোলনের পূর্বে টেক্সটে দেখা গেছে যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হতো একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা।

    ৭) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে লেখক-কবিগণ আশাবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবে। ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখতেন। বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন। হাংরি জেনারেশনের কবি অরুণেশ ঘোষ তাঁর কবিতাগুলোতে বামপন্হীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। হাংরি জেনরেশনের পরের দশকের কবি ও লেখকগণের নিকট বামপন্হীদের দুইমুখো কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে গিয়েছে, বিশেষ করে মরিচঝাঁপি কাণ্ডের পর।

    ৮ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবি-লেখকগণ মানেকে সুনিশ্চিত করতে চাইতেন, পরিমেয়তা ও মিতকথনের কথা বলতেন, কবির নির্ধারিত মানে থাকত এবং স্কুল কলেজের ছাত্ররা তার বাইরে যেতে পারতেন না। হাংরি জেনারেশনের লেখকগণ অফুরন্ত অর্থময়তা নিয়ে এলেন, মানের ধারণার প্রসার ঘটালেন, পাঠকের ওপর দায়িত্ব দিলেন রচনার অর্থময়তা নির্ধারণ করার, প্রচলিত ধারণা অস্বীকার করলেন। শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার সঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

    ৯ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে ‘আমি’ থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি ‘আমি’র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, ‘আমি’র পেডিগ্রি পরিমাপ করতেন আলোচক। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তাঁরা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ন ঘটালেন, লিমিন্যালিটি নিয়ে এলেন।

    ১০ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্ণিত করা হতো। বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিগণ শিরোনামকে বললেন রুবরিক ; শিরোনাম জরুরি নয়, রচনার বিষয়কেন্দ্র থাকে না, মালিকানা বিসর্জন দিলেন, ঘাসের মতো রাইজোম্যাটিক তাঁদের রচনা, বৃক্ষের মতন এককেন্দ্রী নয়। তাঁরা বললেন যে পাঠকই টাইটেল হোলডার।

    ১১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে। তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে করতেন প্রগতি। এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্হের কাহিনির অনুকরণে ; তাঁরা সময়কে মনে করতেন তা একটিমাত্র দিকে এগিয়ে চলেছে। আমাদের দেশে বহুকাল যাবত সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের। সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের ইতিহাস অবহেলিত ছিল। বহুরৈখিকতারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মহাভারত’। হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন। যেমন সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস, মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘জখম’, সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হ ‘আমার চাবি, ইত্যাদি। তাঁরা গ্রহণ করলেন প্লুরালিজম, বহুস্বরের আশ্রয়, দিকবিদিক গতিময়তা, হাংরি জেনারেশনের দেখাদেখি আটের দশক থেকে কবি ও লেখকরা বহুরৈখিক রচনা লিখতে আরম্ভ করলেন।

    ১২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে মনে করা হতো কবি একজন বিশেষজ্ঞ। হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী প্রজন্মে বিশেষজ্ঞ কবিদের সময় সমাপ্ত করে দিয়েছেন নতুন কবির দল এবং নবনব লিটল ম্যাগাজিন।

    ১৩ ) ঔপনিবেশিক প্রভাবে বহু কবি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতেন। ইউরোপীয় লেখকরা যেমন নিজেদের ‘নেটিভদের’ তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠত্ব, বিশেষ একজনকে তুলে ধরা, নায়ক-কবি, সরকারি কবির শ্রেষ্ঠত্ব, হিরো-কবি, এক সময়ে একজন বড়ো কবি, ব্র্যাণ্ড বিশিষ্ট কবি আইকন কবি ইত্যাদির প্রচলন ছিল। হাংরি জেনারেশন সেই ধারণাকে ভেঙে ফেলতে পেরেছে তাদের উত্তরঔপনিবেশিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করে। তারা বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা সরিয়ে দিতে পেরেছে, কবির পরিবর্তে একাধিক লেখককের সংকলনকে গুরুত্ব দিতে পেরেছে, ব্যক্তি কবির পরিবর্তে পাঠকৃতিকে বিচার্য করে তুলতে পেরেছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার কথা বলেছে। সার্বিক চিন্তা-চেতনা ও কৌমের কথা বলেছে। তাঁদের পরবর্তী কবি-লেখকরা হাংরি জেনারেশনের এই মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন।

    ১৪ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শব্দার্থকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলন ছিল। রচনা ছিল কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন। হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকরা বলেছেন কথা চালিয়ে যাবার কথা। বলেছেন যে কথার শেষ নেই। নিয়েছেন শব্দার্থের ঝুঁকি। রচনাকে মুক্তি দিয়েছেন আত্মমনস্কতা থেকে। হাংরি জেনারেশনের এই কৌম মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন পরবর্তীকালের কবি-লেখকরা। এই প্রভাব সামাজিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ১৫ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত ছিল ‘বাদ’ দেবার প্রবণতা ; সম্পাদক বা বিশেষ গোষ্ঠী নির্ণয় নিতেন কাকে কাকে বাদ দেয়া হবে । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ছিল “এলিমিনেশন”। বাদ দেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে তাঁরা নিজেদের আয়ত্বে রাখতেন। হাংরি জেনারেশনের সম্পাদকরা ও সংকলকরা জোট বাঁধার কথা বললেন। যোগসূত্র খোঁজাল কথা বললেন। শব্দজোট, বাক্যজোট, অর্থজোটের কথা বললেন। এমনকি উগ্র মতামতকেও পরিসর দিলেন। তাঁদের এই চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের সম্পাদক ও সংকলকদের অবদানে স্পষ্ট। যেমন অলোক বিশ্বাস আটের দশকের সংকলনে ও আলোচনায় সবাইকে একত্রিত করেছেন। বাণিজ্যিক পত্রিকা ছাড়া সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রে এই গুণ উজ্বল।

    ১৬ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত একটিমাত্র মতাদর্শকে, ইজমকে, তন্ত্রকে, গুরুত্ব দেয়া হতো। কবি-লেখক গোষ্ঠীর ছিল ‘হাইকমাণ্ড’, ‘হেডকোয়ার্টার’, ‘পলিটব্যুরো’ ধরণের মৌরসি পাট্টা। হাংরি জেনারেশন একটি আন্দোলন হওয়া সত্বেও খুলে দিল বহু মতাদর্শের পরিসর, টুকরো করে ফেলতে পারলো যাবতীয় ‘ইজম’, বলল প্রতিনিয়ত রদবদলের কথা, ক্রমাগত পরিবর্তনের কথা। ভঙ্গুরতার কথা। তলা থেকে ওপরে উঠে আসার কথা। হাংরি জেনারেশনের পরে সম্পূর্ণ লিটল ম্যাগাজিন জগতে দেখা গেছে এই বৈশিষ্ট্য এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব।

    ১৭ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত দেখা গেছে ‘নিটোল কবিতা’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ এলিটিস্ট কবিতা রচনার ধারা। তাঁরা বলতেন রচনাকারের শক্তিমত্তার পরিচয়ের কথা। গুরুগম্ভীর কবিতার কথা। নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক মডেলের কথা। যেমন সনেট, ওড, ব্যালাড ইত্যাদি। হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ নিয়ে এলেন এলো-মেলো কবিতা, বহুরঙা, বহুস্বর, অপরিমেয় নাগালের বাইরের কবিতা। তাঁদের পরের প্রজন্মের সাহিত্যিকদের মাঝে এর প্রভাব দেখা গেল। এখন কেউই আর ঔপনিবেশিক বাঁধনকে মান্যতা দেন না। উদাহরণ দিতে হলে বলতে হয় অলোক বিশ্বাস, দেবযানী বসু, ধীমান চক্রবর্তী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, প্রণব পাল, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের রচনা।

    ১৮ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল স্হিতাবস্হার কদর এবং পরিবর্তন ছিল শ্লথ। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ পরিবর্তনের তল্লাশি আরম্ভ করলেন, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপকে স্বীকৃতি দিলেন। পরবর্তী দশকগুলিতে এই ভাঙচুরের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন কমল চক্রবর্তী, সুবিমল মিশ্র, শাশ্বত সিকদার ও নবারুণ ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে ; তাঁরা ভাষা, চরিত্র, ডিকশন, সমাজকাঠামোকে হাংরি জেনারেশনের প্রভাবে গুরুত্ব দিতে পারলেন।

    ১৯ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে নাক-উঁচু সংস্কৃতির রমরমা ছিল, প্রান্তিককে অশোভন মনে করা হতো, শ্লীল ও অশ্লীলের ভেদাভেদ করা হতো, ব্যবধান গড়ে ভেদের শনাক্তকরণ করা হতো। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা সংস্কৃতিকে সবার জন্য অবারিত করে দিলেন। বিলোপ ঘটালেন সাংস্কৃতিক বিভাজনের। অভেদের সন্ধান করলেন। একলেকটিকতার গুরুত্বের কথা বললেন। বাস্তব-অতিবাস্তব-অধিবাস্তবের বিলোপ ঘটালেন। উল্লেখ্য যে বুদ্ধদেব বসু মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁর দ্বারে দেখামাত্র দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালের লিটল ম্যাগাজিনে আমরা তাঁদের এই অবদানের প্রগাঢ় প্রভাব লক্ষ্য করি।

    ২০ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল ইউরোপ থেকে আনা বাইনারি বৈপরীত্য যা ব্রিটিশ খ্রিস্টানরা হা্রণ করেছিল তাদের ধর্মের ঈশ্বর-শয়তান বাইনারি বৈপরীত্য থেকে। ফলত, দেখা গেছে ‘বড় সমালোচক’ ফরমান জারি করছেন কাকে কবিতা বলা হবে এবং কাকে কবিতা বলা হবে না ; কাকে ‘ভালো’ রচনা বলে হবে এবং কাকে ভালো রচনা বলা হবে না ; কোন কবিতা বা গল্প-উপন্যাস উতরে গেছে এবং কোনগুলো যায়নি ইত্যাদি। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা এই বাইনারি বৈপরীত্য ভেঙে ফেললেন। তাঁরা যেমন ইচ্ছা হয়ে ওঠা রচনার কথা বললেন ও লিখলেন, যেমন সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হগুলি। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন বহুপ্রকার প্রবণতার ওপর, রচনাকারের বেপরোয়া হবার কথা বললেন, যেমন মলয় রায়চৌধুরী, পদীপ চৌধুরী ও শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা। যেমন মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা ও ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাস। যেমন সুবিমল বসাকের বাঙাল ভাষার কবিতা যা এখন বাংলাদেশের ব্রাত্য রাইসুও অনুকরণ করছেন। হাংরি জেনারেশনের পরের দশকগুলিতে তাঁদের এই অবদানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, এবং তা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে।

    ২১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল আধিপত্যের প্রতিষ্ঠার সাহিত্যকর্ম। উপন্যাসগুলিতে একটিমাত্র নায়ক থাকত। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ আধিপত্যের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন তাঁদের রচনাগুলিতে। বামপন্হী সরকার থাকলেও তাঁরা ভীত হলেন না। হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সেকারণে ছিল খণ্ডবাদ বা রিডাকশানিজমের গুরুত্ব। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন কমপ্লেকসিটিকে, জটিলতাকে, অনবচ্ছিন্নতার দিকে যাওয়াকে। যা আমরা পাই বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, মলয় রায়চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ প্রমুখের গল্প-উপন্যাসে। পরবর্তী দশকগুলিতে দুই বাংলাতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

    ২২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভকে। হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন মাইক্রো ন্যারেটিভকে, যেমন সুবিমল বসাকের ‘দুরুক্ষী গলি’ নামক উপন্যাসের স্বর্ণকার পরিবার, অথবা অবনী ধরের খালাসি জীবন অথবা তৎপরবতী কঠিন জীবনযাপনের ঘটনানির্ভর কাহিনি। পরবর্তী দশকগুলিতে দেখা যায় মাইক্রোন্যারেটিভের গুরুত্ব, যেমন গ্রুপ থিয়েটারগুলির নাটকগুলিতে।

    ২৩ ) হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ নিয়ে এলেন যুক্তির ভাঙন বা লজিকাল ক্র্যাক, বিশেষত দেবী রায়ের প্রতিটি কবিতায় তার উপস্হিতি পরিলক্ষিত হয়। পরের দশকের লেখক ও কবিদের রচনায় লজিকাল ক্র্যাক অর্থাৎ যুক্তির ভাঙন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। যেমন সাম্প্রতিক কালে অগ্নি রায়, রত্নদীপা দে ঘোষ, বিদিশা সরকার, অপূর্ব সাহা, সীমা ঘোষ দে, সোনালী চক্রবর্তী, আসমা অধরা, সেলিম মণ্ডল, জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায়, পাপিয়া জেরিন, প্রমুখ।

    ২৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে রচনায়, বিশেষত কবিতায়, শিরোনামের গুরুত্ব ছিল ; শিরোনামের দ্বারা কবিতার বিষয়কেন্দ্রকে চিহ্ণিত করার প্রথা ছিল। সাধারণত বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত এবং সেই বিষয়ানুযায়ী কবি কবিতা লিখতেন। শিরোনামের সঙ্গে রচনাটির ভাবগত বা দার্শনিক সম্পর্ক থাকতো। ফলত তাঁরা মৌলিকতার হামবড়াই করতেন, প্রতিভার কথা বলতেন, মাস্টারপিসের কথা বলতেন। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ শিরোনামকে সেই গুরুত্ব থেকে সরিয়ে দিলেন। শিরোনাম আর টাইটেল হোলডার রইলো না। শিরোনাম হয়ে গেল ‘রুবরিক’। তাঁরা বহু কবিতা শিরোনাম র্বজন করে সিরিজ লিখেছেন। পরবর্তী দশকের কবিরা হাংরি জেনারেশনের এই কাব্যদৃষ্টির সঙ্গে একমত হয়ে কবিতার শিরোনামকে গুরুত্বহীন করে দিলেন ; সম্পূর্ণ কাব্যগণ্হ প্রকাশ করলেন যার একটিতেও শিরোনাম নেই।

    চার

    দেবেশ রায় প্রথম বলেছিলেন যে হাংরি আন্দোলন থেকে নকশাল আন্দোলনের দিকে সময় একটা বীক্ষার মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছিল, কিংবা এই ধরণের কোনো কথা, তারপর অনেকেই নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের ভাবনার একটা যোগসূত্র খুঁজতে চেয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে রফিক উল ইসলাম জিগ্যেস করেছিলেন যে দুটো আন্দোলনের নিজেদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। সুনীল বলেছিলেন যে নকশাল আন্দোলনে অনেক মহৎ আত্মত্যাগ হয়েছিল, অনেক তরুণ মারা গিয়েছিল।

    আমার মতে দুটোর মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল তা সময়-পরিসরের রেশের। হাংরি আন্দোলনের চিত্রকর অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় নকশাল আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন আর পুলিশ ওনাদের রাতের মিটিঙের কথা জানতে পেরে স্টুডিও ভাঙচুর করে যাবতীয় পেইনটিঙ নষ্ট করে দিয়েছিল। অনিল, করুণা আর ওদের ছবি আঁকার দলের যুবকরা আগেই খবর পেয়ে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল, অনিল দিল্লিতে আর তারপর এক মার্কিন যুবতীর সঙ্গে আমেরিকায় ; করুণা চুলদাড়ি কামিয়ে, চেহারা পালটিয়ে সপরিবারে পাটনায়, সেখানে দাদা করুণাকে একটা রঙিন মাছের দোকান খুলে দিয়েছিলেন। আমার কাকার মেয়ে পুটি উত্তরপাড়ার বাড়ির বড়োঘরের কড়িকাঠ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল, তার কারণ যে নকশাল যুবকটিকে পুটি ভালোবাসতো তাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে লোপাট করে দিয়েছিল।

    ব্যাঙ্কশাল কোর্টে আমার এক মাসের সাজা হয়ে গিয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর ১৯৬৫ আর কলকাতা হাইকোর্টে উকিলের খোঁজে আমি নানা লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করছিলুম। জ্যোতির্ময় দত্ত পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সদ্য লণ্ডন ফেরা ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে, ব্যাঙ্কশাল কোর্ট থেকে কপি নিয়ে যাবতীয় কাগজপত্র দিয়ে আসতে হচ্ছিল, তাঁর বাড়িতে, লোহাপট্টিতে, যাতে কলকাতা হাইকোর্টে রেজিস্ট্রারের দপতরে জমা দেয়া যায়। এদিকে কলকাতায় আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, নানা জায়গায় রাত কাটাই, পকেট ফাঁকা হয়ে যায় আদালতের কাজে আর দুবেলা খেতে। অনেককাল স্নান না করলে যে নিজের গা থেকে নিজেরই মাংসের গন্ধ বেরোয় তা তখন জেনেছিলুম। বন্ধুবান্ধবরা, সুবিমল বসাক ছাড়া, সবাই হাওয়া।

    তার মাঝেই ২২-২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬ খাদ্য আন্দোলনে সারা বাংলা বন্ধ ডাকা হয়েছিল, মনে আছে। তখনকার কলেজ স্ট্রিট এখনকার মতন ছিল না, একেবারে ফাঁকা থাকতো, দিনের বেলাকার মিছিল সত্বেও, সন্ধ্যে হলেই অন্ধকার। বস্তুত, পুরো কলকাতাই একেবারে আলাদা ছিল। রণবীর সমাদ্দারের একটা লেখায় পড়েছিলুম যে নকশাল আন্দোলনের প্রকৃত সময়টা হলো ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ ; আর কোলকাতা হাইকোর্ট আমার মামলা এক দিনেই সেরে ফেলেছিল, ২৬ জুলাই ১৯৬৭ তারিখে, আমার দণ্ডাদেশ নাকচ করে। তাই হয়তো কেউ-কেউ মনে করেন যে হাংরিরা ১৯৬৭-পরবর্তী কালখণ্ডকে নকশালদের হ্যাণ্ডওভার করে দিয়েছিল। সময়-পরিসরকে হ্যাণ্ডওভার করার প্রক্রিয়া চলে আসছে সেই ব্রিটিশ-বিরোধিতার সময় থেকে। প্রফুল্ল চক্রবর্তী ওনার ‘মার্জিনাল মেন’ বইতে লিখেছিলেন যে দেশভাগের পর বহু তরুণ লুম্পেন প্রলেতারিয়েত হয়ে ওঠে এবং তাদের থেকেই পশ্চিমবঙ্গে মাস্তানদের জন্ম। বস্তুত মাস্তানরও সময়-পরিসরকে ক্রমশ হ্যাণ্ডওভার করে চলেছে এখনকার জিঙ্গোবাদী রাজনীতিকদের করকমলে।

    ঔপনিবেশিক কালখণ্ডে স্বদেশি আন্দোলনের যে রেশ আরম্ভ হয়েছিল, সেই রেশ নানা বাঁক নিয়ে যখন দেশভাগের ঘুর্ণিতে পড়ল তখন তার চরিত্র পালটে গেল, তার আগে সেই রেশে তেমন অ্যাড্রেনালিন ছিল না বলা চলে। এই রেশটাই হাংরি আন্দোলনের উৎসভূমি। এই রেশকে প্রথমে কৃষক নেতারা এবং পরে তরুণ সমাজ নিয়ে যান নকশাল আন্দোলনে এবং এই রেশকেই কেন্দ্র করে বামপন্হীরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসেন। এই রেশই নন্দীগ্রামে পৌঁছোবার পর বামপন্হীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন আর তৃণমূল ক্ষমতা দখল করে। রেশটা থাকে জনগণের মাঝে। আমার মনে হয়, সব সময়েই থাকে,চিরকাল থাকে।

    হাংরি আন্দোলনের পরে-পরেই নকশাল আন্দোলন ঘটেছিল অথচ যাঁরা হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও পুলিশের কাছে নালিশ করেছিলেন তাঁরা কেন আসন্ন উথালপাথাল টের পাননি ? হাংরি আন্দোলনকারীরা সাহিত্যজগতের মূল্যবোধ-মালিক ও প্রকাশক-বাজারের জোতদারদের উৎখাত করতে চেয়েছিল, জন্তুজানোয়ারের মুখোশ পাঠিয়ে বিদ্যায়তনিক জোতদারদের টপলেস অর্থাৎ গলা কেটে ফেলতে চেয়েছিল, সাহিত্যিক ক্ষমতাকে দখল করে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনের মাঝে, জুতোর বাক্স রিভিউ করতে দিয়ে এবং শাদা ফুলস্কেপ কাগজকে ছোটোগল্প নামে বাজারি কাগজে জমা দিয়ে সাহিত্যিক জোতদারদের দলিদস্তাবেজ বেদখল করতে চেয়েছিল। এগুলো কোনোরকমের ইয়ার্কি বা প্র্যাঙ্ক ছিল না।

    যাঁরা নালিশ ঠুকেছিলেন তাঁদের মধ্যে বিদ্যায়তনিক প্রতিনিধিরাও ছিলেন যাঁদের হাংরি আন্দোলনকারীদের পাঠানো কার্ডে FUCK THE BASTARDS OF GANGSHALIK SCHOOL OF POETRY ঘোষণা পড়ে অপমানবোধ হয়েছিল, জানোয়ার ও দানবের মুখোশ পেয়ে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অথচ তার কয়েক বছর পরেই নকশাল তরুণরা শিক্ষকদের গলা কাটা আরম্ভ করলেন, জোতদারদের বাড়ি লুঠ করে দলিল-দস্তাবেজ পুড়িয়ে দিলেন, জমি দখল করে বিলিয়ে দিলেন ভাগচাষিদের। নকশাল আন্দোলনকারীরা জোতদারদের বেদখল করার সময়ে, বাড়িতে-খামারে আগুন ধরিয়ে দেবার সময়ে FUCK THE BASTARDS -এর পরিবর্তে বাংলা ও চোস্ত হিন্দি গালাগাল দিয়েছিল, জোতদার আর ভূস্বামীদের মুখোশ চামড়াসুদ্দু ছিঁড়ে উপড়ে নিয়েছিল।

    নকশাল তরুণরা এসে দেখিয়ে দিল যে হাংরি আন্দোলনকারীদের এই কাজগুলো ঠাট্টা-ইয়ার্কি করার ব্যাপার ছিল না, তা ছিল চোখে আঙুল ঢুকিয়ে বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার প্রক্রিয়া। জোতদারদের বিরুদ্ধে যে ইতর বুলি কথাবার্তায় প্রয়োগ করে ক্ষান্ত থেকেছিলেন নকশালরা, তা নিজেদের লেখায় নিয়ে এসেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীরা যাকে মধ্যবিত্ত পরিবারের বিদ্যায়তনিক ও গ্লসি পত্রিকার চাকুরে আলোচনাকারীরা বলে এসেছেন অশ্লীল ও অশোভন। আলোচকরা ভুলে গিয়েছিলেন যে ছোটোলোকদের ভাষা অমনই হয়। নকশাল আন্দোলনের কবিতা কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালির ভাষার আওতার বাইরে বেরোতে পারেনি বলেই মনে হয়।

    যেমন কৃষ্ণ ধর-এর ‘একদিন সত্তর দশকে’ কবিতাটি :-

    শিকারকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে

    অন্ধকারে মিলিয়ে যায় জল্লাদের গাড়ি

    শহরের দেয়ালে দেয়ালে পরদিন দেখা যায় তারই কথা

    সে নিদারুণ তৃষ্ণায় একবার জল চেয়েছিল

    যে যন্ত্রণায় নীল হয়ে একবার ডেকেছিল মাকে

    তবু স্বপ্নকে অক্ষত রেখেই সে

    বধ্যভূমিতে গিয়েছিল

    একদিন সত্তর দশকে।”

    স্বপন চক্রবর্তী লিখেছিলেন :-

    ‘আমরা সাহায্য চাইনি’

    আমরা সাহায্য চাইনি

    কারণ আমরা বদল চেয়েছি।

    চেয়েছি ক্ষিদের মানসিক যন্ত্রণার বিরুদ্ধে

    একটি সকাল, দুপুর, রাত সময়, কাল, অনন্ত সময়।

    .কোনদিনই আমরা কমিউনিস্ট হতে চাইনি।

    এখন সময়

    মানুষের জন্যে আমাদের মানুষের মত হতে শেখাচ্ছে।

    মানুষের জন্যে আমাদের মানুষের মত হতে শেখাচ্ছে।

    আমরা চাইনি ইজ্জত খুইয়ে ঘাড় হেঁট করে পেট ভরাতে।

    আমরা বদল চেয়েছি

    চেয়েছি ক্ষিদের যন্ত্রণার বিরুদ্ধে

    একটি সকাল, দুপুর, রাত সময়, কাল, অনন্ত সময়।”

    নির্মল ঘোষ তার ‘নকশালবাদী আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অনস্বীকার্য, নকশালপন্থী কাব্যচর্চায় আঙ্গিকের চেয়ে বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর এর ফলে বক্তব্যে বহুক্ষেত্রেই আবেগের প্রাধান্য দেখা গেল, যা শেষপর্যন্ত পাঠক মানসকে প্রায়শ প্রভাবিত বা প্রাণিত করতে সমর্থ হয়নি।’ পক্ষান্তরে, কবিতার শৈল্পিক মানের এ বিতর্কে অর্জুন গোস্বামী নকশালবাদী কবিতার পক্ষেই রায় দিয়েছেন, ‘এটা সত্তরের দশক। এই দশক প্রত্যক্ষ করেছে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিতশ্রেণীর লড়াই। এই দশকেই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রকে উপরে উপরে যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক না কেন আসলে তারা হলো কাগুজে বাঘ। স্বভাবতই এই দশকের মানুষের সচেতনতা অনেক বেশি। আমরা এমন কোন কবিতা পড়তে চাই না যাতে আছে হতাশা, আছে যন্ত্রণার গোঙানি। আমরা এমন কবিতা পড়তে চাই যাতে ধরা পড়বে শোষণের আসল স্বরূপ, যে কবিতা পড়ে অনুপ্রেরণা পাবেন লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ এবং যে কবিতা প্রকৃতই হবে শোষিতশ্রেণীর সংগ্রামী হাতিয়ার। আমাদের মধ্যে অনেকে বলেন কবিতা হলো এমন একটা জিনিস যা ঠিক স্লোগান নয়। আমাদের বক্তব্য হলো কবিতার বিষয় ও কবিতার আঙ্গিক এই দুটোর মধ্যে আগে বিষয়, পরে আঙ্গিক। বক্তব্যকে সাধারণের উপযোগী করে বলার জন্য কবিতা যদি কারুর কাছে স্লোগান বলে মনে হয় তবে সেই স্লোগানই হলো সত্তরের দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’

    হাংরি আন্দোলনের সময়ে আমিও বলেছিলুম, “কবিতা কেবল মঞ্চে বিড়-বিড় করে পড়ার ব্যাপার নয় ; উন্মাদের মতন চিৎকার করে না পড়লে প্রতিষ্ঠান কষ্ট-যন্ত্রণার গোঙানি শুনতে পায় না। ” বাসব রায়কে দেয়া ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন যে মলয়ের কবিতায় অত্যধিক অব্যয় থাকে, চিৎকার থাকে। এই প্রেক্ষিতে নকশালদের সঙ্গে হাংরিদের তুলনা করা চলে, যেমন ত্রিদিব মিত্রের বিখ্যাত কবিতা ‘হত্যাকাণ্ড’। হাওড়া স্টেশানের প্ল্যাটফর্মে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে ‘হত্যাকাণ্ড’ কবিতাটা পড়ে ভিড় জমিয়ে ফেলেছিল ত্রিদিব মিত্র।


    হাংরি আন্দোলনের গ্রন্হ রিভিউ করতে গিয়ে শৈলেন সরকার বলেছেন, “হাংরি-র পুরনো বা নতুন সব কবি বা লেখকই কিন্তু অনায়াসে ব্যবহার করেছেন অবদমিতের ভাষা। এঁদের লেখায় অনায়াসেই চলে আসে প্রকৃত শ্রমিক-কৃষকের দৈনন্দিন ব্যবহৃত শব্দাবলি। ভালবাসা-ঘৃণা বা ক্রোধ বা ইতরামি প্রকাশে হাংরিদের কোনও ভণ্ডামি নেই, রূপক বা প্রতীক নয়, এঁদের লেখায় যৌনতা বা ইতরামির প্রকাশে থাকে অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ বিবরণ— একেবারে জনজীবনের তথাকথিত শিল্পহীন কথা। অনেকেই প্রায় সমসময়ের নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনকে তুলনা করে এদের অরাজনৈতিক তকমা দেন, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক নিয়ে হাংরি জেনারেশন যে প্রশ্ন তুলেছিল তা ছিল নকশালদের তোলা প্রশ্নের চেয়েও অনেক বেশি মৌলিক। এমনকী তুমুল প্রচার পাওয়া এবং নিজস্ব অস্তিত্ব তৈরি করা সত্ত্বেও দলিত সাহিত্য আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত হাংরি আন্দোলনের থেকে পিছিয়েই রাখতে হয়।” শৈলেন সরকার যে বইটি আলোচনা করেছেন তাতে কোনো কারণে সম্পাদকমশায় হাংরি আন্দোলনের রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো অন্তর্ভুক্ত করেননি। করলে স্পষ্ট হতো যে হাংরি আন্দোলন অরাজনৈতিক ছিল না।

    প্রবুদ্ধ ঘোষ হাংরি আন্দোলন ও নবারুণ ভট্টাচার্য সম্পর্কে আলোচনা করার সময়ে বলেছেন, “বাড়ি ভেঙ্গে পড়ার শব্দ তখনই শোনা যায়, যখন তা শোনার জন্যে কেউ থাকে। সাহিত্যের কাজ কী? ক্যাথারসিস করা? মানে, মোক্ষণ? বরং হাংরিদের লেখা প্রতিমুহূর্তে ক্যাথারসিসের উল্টোদিকে হাঁটে। মোক্ষণ করা, শান্তি দেওয়া তাঁদের কাজ নয়, বরং আপাতশান্তির বোধটাকে আঘাত করাই মূল উদ্দেশ্য!” একটু আগে আমি যেকথা বলেছি, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান-সাহিত্যের জোতদারদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে চেয়েছিল হাংরি আন্দোলনকারীরা, তাদের কাজের দ্বারা, লেখার দ্বারা, ড্রইং দ্বারা, সেকথাই বলেছেন প্রবুদ্ধবাবু। তবে প্রবুদ্ধবাবু একটা কথা ভুল বলেছেন, যে হাংরি আন্দোলনকারীরা কেবল আত্মবীক্ষণ ও আত্মআবিষ্কারে আলো ফেলতে চেয়েছেন। হাংরি আন্দোলনকরীরা যদি তাই করতেন তাহলে যে কাজগুলোকে মধ্যবিত্ত আলোচকরা ‘অসাহিত্যিক’ ব্যাপার বলে তকমা দেগে দেন তা তাঁরা করতেন না, বিভিন্ন বিষয়ে ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করতেন না। নকশালরা যে মূর্তির গলা কেটে প্রতীকিস্তরে বিশেষ মূল্যবোধকে আক্রমণ করেছিল, শিক্ষকদের খুন করেছিল, তার সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ-খুনের আক্রমণাত্মক কাজগুলো তুলনীয়।

    সুবিমল বসাকের একটা কবিতা এখানে তুলে দিচ্ছি, যা হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল :-

    ‘হাবিজাবি’

    আমারে মাইরা ফেলনের এউগা ষড়যন্ত্র হইসে

    চারো কোনা দিয়া ফুসফুস আওয়াজ কানে আহে

    ছাওয়াগুলান সইরা যায় হুমকে থিক্যা

    অরা আমারে এক্কেরে শ্যায করতে সায়

    আমি নিজের ডাকাইতে্যা হাতেরে লইয়া সচেত্তন আসি

    কেউ আইয়া চ্যারায় দিশায় চ্যাবা কথা কয় না

    আমি সুপসাপ থাকি

    ভালাসির গুছাইয়া আমি কথা কইতে পারি না

    ২ কইতে গিয়া সাত হইয়া পড়ে

    ১৫ সাইলে ৯ আইয়া হাজির হয়

    ছ্যাব ফেলনের লাইগ্যা বিচড়াইতাসি অহন

    আহ, আমার দাঁত মাজনের বুরুশ পাইতাসি না

    বিশ্বাস করেন, কেউ একজনা আমার মুহের সকরা খাবার খাইসে।

    (হাংরি বুলেটিন নং ১৮ থেকে)

    প্রবুদ্ধবাবু বলেছেন “হাংরিদের ‘ক্ষুধা’ বিষয়ে তাঁদের নিজস্ব মতামত ছিল ; এই ক্ষুধা আসলে নিজেকে দগ্ধ করে সত্য আবিষ্কারের ক্ষুধা। সত্য, যা ক্রমাগতঃ এমনকি নিজেকেও ছিঁড়েখুঁড়ে উন্মোচিত করে চলে। তাকাই ফাল্গুনী রায়ের কবিতায়, “আমার বুকের ভিতর লোভ অথচ হৃদয় খুঁজতে গিয়ে বুকের ভিতরে/ রক্তমাংসের গন্ধ পাচ্ছি কেবল”। আজ স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; প্রকাশ্যে চুম্বন করে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাধানিষেধ ও সমাজের প্রচলিত ‘ট্যাবু’গুলিকে। এই বিদ্রোহ কিন্তু ’৬০ এর দশক থেকেই শুরু করে দিয়েছিলেন ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখকেরা। সমস্তরকম গোঁড়ামি এবং ‘ঢাকঢাকগুড়গুড়’ বিষয়ের ভিতে টান মেরেছেন। সাহিত্য বহু আগেই ভবিষ্যতের কোনো এক আন্দোলনের কথা স্বীকার করে যাচ্ছে- তার নিজের মত করে, নিজের প্রকাশে। না, নিশ্চিতভাবেই সাহিত্যের কাজ ভবিষ্যৎদর্শন নয়; কিন্তু হ্যাঁ, সাহিত্যের অন্যতম কাজ ভবিষ্যতের সামাজিক আন্দোলনের, সাহিত্য আন্দোলনের সূত্রগুলোর হদিশ দিয়ে যাওয়া। ফাল্গুনী রায় যখন কবিতায় বলেন, ‘শুধুই রাধিকা নয়, গণিকাও ঋতুমতী হয়’, তখন কি আজকের কথাই মনে হয় না? যেখানে, ঋতুমতী হওয়া কোনো ‘লজ্জা’র বিষয় নয়, ‘অশুদ্ধি’র বিষয় নয়, বরং তা স্বাভাবিক জৈবনিক প্রক্রিয়া। আর, প্রতিমুহূর্তের এই আত্মজৈবনিক বিষয়গুলিই উঠে আসে হাংরি জেনারেশনের লেখায়। বা, সগর্ব্ব মানুষ-প্রমাণ ‘আমি মানুষ একজন প্রেম-পেচ্ছাপ দুটোই করতে পারি’’। এগুলো তো দৈনন্দিন। এগুলো তো স্বাভাবিক। তাহলে? আসলে, ‘শুদ্ধতা’-র একটা অর্থহীন ধোঁয়াশাবোধ তো তৈরি করেই দেয় সমাজ, একটা বর্ডারলাইন। সাহিত্যের নায়ক রক্তমাংসের মতো হবে কিন্তু তার ক্ষুধা-রেচন ইত্যাদি থাকবে না বা পুরাণচরিত্রদের শারীরবৃত্তীয় কার্য নেই! এই ‘মেকি’ ধারণাসমূহ লালন করে আসা আতুপুতু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন হাড়-মজ্জা-বোধ জীবন্ত হতে দেখে তখন ‘অশ্লীল সংস্কৃতি’ ছাপ্পা মারে। সমাজের জড়তা, মধ্যবিত্ত ভণ্ডামির মুখোশগুলো খুলে দেয় টান মেরে। আর, তাই ‘নিষিদ্ধ’, অশ্লীল মনে হয় এদের লেখাগুলি। হাংরি-দের যেখানে মূল বক্তব্যই ছিল প্রতিটি লেখায় ও সাহিত্যযাপনে আত্মউন্মোচন, সেখানে এই বিষয়গুলি স্বাভাবিক বীক্ষাতেই উঠে এসেছে। এবং, ‘সাহিত্য বিক্রির জন্যে আরোপিত যৌনতা’ বনাম ‘শিল্প ও জীবনের সাথে সম্পৃক্ত যৌনতা’ এই বিতর্কের ডিস্‌কোর্স তৈরি করেছে।”

    প্রবুদ্ধবাবু আরও বলেছেন, “পণ্যসময়ে বেঁচে থেকে, কিচ্ছু না-পেয়ে বেঁচে থেকে, হতাশার অবিমৃষ্য বোধ তৈরি হয়। ’৬০-’৭০ র দশকের ক্রমাগত অর্থনৈতিক অবক্ষয়, মধ্যবিত্তের আশাহীনতার অভিঘাত নৈরাশ্যের জন্ম দেয়; এমনকি সাহিত্যেও। আর, সেই নৈরাশ্যকে এড়িয়ে গিয়ে কবিতা বা গদ্য লেখা যায় না। অরুণেশ ঘোষ তাঁর ‘কিচ্ছু নেই’ সময়কে লিখছেন- ‘১ পাগল এই শহরের চূড়ায় উড়িয়ে দিয়েছে তার লেঙ্গট/ ১ সিফিলিস রুগী পতাকা হাতে মিছিলের আগে/ ১ রোবট নিজেকে মনে করে আগামীকালের শাসক/ ১ মূর্খ ঘুমিয়ে থাকে শহর-শুদ্ধ জেগে ওঠার সময়... শীতের ভোর রাত্রে- মধ্যবিত্তের স্বপ্নহীনতার ভেতর/ আমাকে দেখে হো হো করে হেসে ওঠে বেশ্যাপাড়ার মেয়েরা’। এই স্বপ্নহীনতাকে বাড়িয়ে তোলে পুঁজিবাদের দমবন্ধ চেপে বসা। ভারতের তথা বাংলার অর্থনীতি-মডেলকে সাজানোর দোহাই দিয়ে বিদেশি শস্যবীজ এবং সবুজ বিপ্লবের সাথেই আমদানি হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। আর, নগরায়ণের মুখ খুলতে থাকে। ’৯০ র দশকের পরে যে বীভৎস হাঁ-তে ঢুকে যেতে থাকবে ভারতবর্ষের একের পর এক গ্রাম-মফস্বল।”

    ১৯৬৮ সালে বিনয় ঘোষ ‘কলকাতার তরুণের মন’ নামক প্রবন্ধে লিখছেন- “গোলামরা সব উঁচুদরের ঊর্ধ্বলোকের গোলাম, আগেকার কালের মতো তাঁদের হাত-পায়ের ডাণ্ডাবেড়ি দেখা যায় না। তাঁদের ‘স্টেটাস’ আছে, ‘কমফর্ট’ আছে, ‘লিবার্টি’ আছে। তাঁরা নানাশ্রেণীর ব্যুরোক্র্যাট টেকনোক্র্যাট ম্যানেজার ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার সেলস-প্রমোটার বা ‘অ্যাড-মেন’- যাঁরা যন্ত্রের মতো সমাজটাকে চালাচ্ছেন। ব্যক্তিগত ভোগ-স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতার একটা লোভনীয় মরীচিকা সৃষ্টি করছেন তাঁরা সাধারণ মানুষের সামনে এবং দিনের পর দিন বিজ্ঞাপনের শতকৌশলে নেশার পিল খাইয়ে সেই ভোগস্বাধীনতার স্বপ্নে তাদের মশগুল করে রাখছেন।”। ’৬০-’৭০ র অবক্ষয়ী অথচ পণ্যপ্রিয় ভোগসমাজের কথা সেইসময়ের মতন করেই লেখেন হাংরি আন্দোলনের গল্পকাররা। আর, ভবিষ্যতের পণ্যসমাজের একটা আভাসও থাকে। “আপাতত প্রতীয়মান ধূম্রজালে জড়ানো ধীরে ধীরে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর একজন দৈত্যভৃত্য বলে, ‘আপনার গোলাম, আকা কি হুকুম যা বলবেন যা চাইবেন জীবনে তাই হাজির... একটি সিগারেট। ...একটি সিগারেট। পাঁচ বছরে একটি টিভি সেট। দশ বছরে একটি গাড়ি আর বিশ বছরে সিগারেট খেতে খেতে একবার সারা দুনিয়ায় চক্কর দেব। বাতাস স্তব্ধ। অবাক হঠাৎ মেঘের আকাশ-কাঁপানো অট্টহাসি।”[ঘটনাদ্বয় ও তাদের সাজসজ্জাঃ রবিউল]

    বোর্দ্রিয়ারের মতে, উত্তর-আধুনিক সমাজে শ্রেণিবিভাগ আর শুধুমাত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকছে না, বরং তা এখন নির্ভর করছে ভোগের ওপর। কে কোন পণ্য ভোগ করছে, তার ‘ব্র্যাণ্ড’ এবং দামের ওপর নির্ভর করছে তার শ্রেণিঅবস্থান। অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, পণ্যকৌশলে ভুলিয়ে দিতে চাওয়া দেশকাল-ইতিহাস আর, এমনকি প্রকৃত যৌনতা, সামাজিকতা, সবকিছুরই মৃত্যু ঘটছে- তখনই অধিবাস্তব টেনে নিয়ে চলেছে ‘ভার্চ্যুয়াল’ জগতে, এই সত্য তো হাংরি আন্দোলনকারীদের লেখাতে উদ্ঘাটিত হয়েছে! বস্তুতঃ, তাঁদের লেখায় তাঁরা এটাকেই আক্রমণ শানাতে চেয়েছেন। আজকের মানুষের পরিসর-মাফিক রূপবদলের কথা আমি লিখেছি আমার ‘জিন্নতুলবিলাদের রূপকথা’ নামের অধিবাস্তব গল্পে আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ফাঁসিয়েছি ‘গহ্বরতীর্থের কুশীলব’ নামের অধিবাস্তব কাহিনিতে --- যা কিনা সময়-পরিসরের সঙ্গে অ্যাড্রেনালিনের রেশ এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রক্রিয়া।


    হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা-মকদ্দমা করে তাদের বিক্ষিপ্ত করে দেবার পর, প্রতিষ্ঠানের লেখকরা লেখালিখি করে দেখাতে চাইলেন, নকশাল আন্দোলন মধ্যবিত্ত রোম্যাণ্টিকতা ও কাঁচা প্রেমের মতো, বামপন্থা মানেই তা ভ্রষ্ট সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখায় এবং আসলে নিরাজনীতিই মানুষকে ‘মানুষ’ করে তোলে! হাংরিদের পর থেকে তাদের বিরুদ্ধতাকারী পঞ্চাশের ও পরবর্তী সাহিত্যিকরা এহেন ভাবনাগুলোকে সচেতন ভাবেই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। প্রবুদ্ধ ঘোষ বলেছেন “আশির দশকের বাংলা সাহিত্য থেকেই আর, ’৯০ পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক ও ‘এলিট’ পত্রিকার সাহিত্যগুলি কিছু অবয়ববাদী বা স্ট্রাক্‌চারালিস্ট ধাঁচা (স্টিরিওটাইপ) এনে ফেলল। যেমন, নকশাল ছেলেটি লেখাপড়ায় মারাত্মক ব্রিলিয়াণ্ট ছিল, ‘ভুল’ রাজনীতির পাল্লায় পড়ে গ্রামে গেল রাজনীতি শিখতে ও ডি-ক্লাস্‌ড হতে, তার প্রেমিকা উচ্চবিত্ত ঘরের এবং যৌনসম্পর্কের বিশদ অনর্থক বর্ণনা, পুলিশের গুলিতে বা অত্যাচারে পঙ্গু হল, আদতে লড়াইটা এবং মতাদর্শটা ব্যর্থ হল এবং অ্যাপলিটিক্সের ওপরে সমাজসেবার ওপরে ভরসা রাখল ব্যর্থ নায়ক! এই অবয়ববাদী ধাঁচায় ফেলে প্রতিষ্ঠানগুলি বিক্রি বাড়াতে লাগল তাদের সাহিত্যের। আর, তার সাথেই ক্রমে ‘সক্রিয় রাজনীতি’ ও বামপন্থা থেকে বিমুখ করে দিতে লাগল বিশ্বায়ন পরবর্তী প্রজন্মকে।

    প্রবুদ্ধবাবু বলেছেন, “হাংরি-দের গল্পের এবং গদ্যের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হচ্ছে, মুক্তসমাপ্তি। অর্থাৎ, কোনও স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন না লেখক; হয়তো স্থির সিদ্ধান্ত হয় না কোনও। অন্ততঃ, যে সময়ে তাঁরা লিখছেন, সেই সময়ে অচঞ্চল বিশ্বাস কিছু নেই, কোনও স্থিতি নেই, সিদ্ধান্তে আসার ভিত্তি নেই। বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘বমন রহস্য’ গল্পে আশাহীন এবং আলোহীন ভোগবাদী সমাজের প্রতি ঘৃণা ঠিকরে বেরোয়। গল্পের শেষ লাইন- “বমি করে যাই রক্তাক্ত পথের উপরে। সমস্ত চর্বিত মাংসের টুকরো, সমস্ত জীবন ভোর খেয়ে যাওয়া মাংসের টুকরো আমি বমি উগরে বার করতে থাকি। বমির তোড়ে আমার নিঃশ্বাস যেন আটকে আসে।”।

    আসলে মুক্তসূচনা এবং মুক্তসমাপ্তির জনক হলেন জীবনানন্দ দাশ। ‘মাল্যবান’ যেভাবে শেষ না হয়েও শেষ হয়েছে, তা থেকে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। এই শৈলী প্রয়োগে পাঠকের যথেচ্ছ স্বাধীনতা থাকে, জীবনের সাথে মিলিয়ে পরিণতি ভাবার; সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার দায় কবির বা লেখকের নয়। প্রবুদ্ধবাবুকে অবশ্য একথা বলার যে, নকশাল আন্দোলন বা ফিদেল কাস্ত্রোর আন্দোলনও ছিল মুক্তসমাপ্তির, আন্দোলনের পরে কি ঘটবে তা আগাম পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল না। নকশাল আন্দোলনকারীরা জানতেন নিশ্চয়ই যে পশ্চিমবঙ্গ বলতে ভারতবর্ষ বোঝায় না। চারু মজুমদার কি জানতেন না যে চীন আদপে তিব্বত দখল করার পর মাও-এর সাম্রাজ্যবদী দিকটাকে ফাঁস করে দিয়েছে ? এখন চীন যা করছে তার ভিত তো মাও-এর গড়ে দেয়া।


    প্রবুদ্ধ ঘোষ বলেছেন, “নবারুণ কবিতার সংজ্ঞাও একপ্রকার নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। ঠিক যেভাবে হাংরি-রা তাদের কবিতার ধারণা স্বতন্ত্র করে দিয়েছেন। নবারুণের কবিতা চিরাচরিত চাঁদ-ফুল-তারার রোম্যাণ্টিকতা অস্বীকার করে। কবিতা যে ‘লেখার’ নয়, বরং কবিতা ‘হয়ে ওঠার’ বিষয়, তা স্পষ্টতর হয় অস্থির সময়ে- “কবিতা এখনই লেখার সময়/ ইস্তাহারে দেওয়ালে স্টেনসিলে/ নিজের রক্ত অশ্রু হাড় দিয়ে/ এখনই কবিতা লেখা যায়...”। কবিতার আসন্ন সম্ভাবনাও লিখে রাখেন শেষ পংক্তিগুলিতে। “কবিতার জ্বলন্ত মশাল/ কবিতার মলোটভ ককটেল/ কবিতার টলউইন অগ্নিশিখা/ এই আগুনের আকাঙ্খাতে আছড়ে পড়ুক”। হাংরি আন্দোলনকারীরাই প্রথম বলেছিল যে কবিতা চাঁদ-ফুল-তারা ইত্যাদির ব্যাপার নয়। আমি আমার কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধে এ-কথা ষাটের দশকেই বলেছিলুম।

    প্রবুদ্ধবাবু বলেছেন, “এখানেই কবিতাকে নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়ার ভাবনার সাথে মিল পাওয়া যায় হাংরি-দের। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা থেকে প্রথম হাংরি বুলেটিন বেরোয় ইংরাজিতে। ‘Weekly manifesto of hungry generation’, যার সম্পাদক দেবী রায়, মুখ্যনেতা শক্তি চ্যাটার্জ্জী এবং ক্রিয়েটর মলয় রায়চৌধুরি। তার প্রথম অনুচ্ছেদ- “Poetry is no more a civilizing maneuver, a replanting of the bamboozled gardens; it is a holocaust, a violent and somnambulistic jazzing of the hymning five, a sowing of the tempestual Hunger.” কবিতা কোনো নিরপেক্ষতার মাপকাঠি নয়, কবিতা শুধুমাত্র ছন্দ-শব্দ দিয়ে বেঁধে রাখার নান্দনিকতা নয়। বরং, অসহ্য জীবনকে তার মধ্যে প্রতিটি ছত্রে রেখে দেওয়া, অনন্ত বিস্ফারের সম্ভাবনায়। আর, এখানেই মনে পড়ে মারাঠি কবি নামদেও ধাসালের লেখা। দলিত জীবনের আখ্যান এবং প্রতিটি পংক্তিতে উল্লেখযোগ্য ঘৃণা; এই ঘৃণাই আসলে জীবন, এখান থেকে ভালবাসার জন্ম।”

    এখানে উল্লেখ্য যে নবারুণ ভট্টাচার্যের বাবা-মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষিত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের, কলকাতার সংস্কৃতি জগতের মানুষ। অপরপক্ষে হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় এসেছিলেন চাষি পরিবার থেকে; এমনকি কলকাতার সাহিত্যিকদের টিটকিরি প্রতিহত করার জন্য তিনি পতৃদত্ত নাম হারাধন ধাড়া বর্জন করতে বাধ্য হন। সুবিমল বসাক এসেছিলেন তাঁতি পরিবার থেকে যাঁর বাবা স্যাকরার কাজ করতে বাধ্য হন এবং মোরারজি দেশাইয়ের গোল্ড কনট্রোলের দরুন দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেন। অবনী ধর ছিলেন জাহাজের খালাসি, বাড়ি ফিরে কলকাতার রাস্তায় হকারি করতেন, ঠেলায় করে কয়লা বেচতেন, ফুটপাতে ছিট কাপড় বেচতেন। এই ধরণের জীবনে জড়িয়ে হাংরি-দের লেখায় পরিপার্শ্বের প্রেক্ষিতে আত্ম-কে আবিষ্কার জরুরি হয়ে ওঠে, জীবনের কেন্দ্রের মূল উৎস গুলোয় ফেরা, সন্ধান করা অসুখের উৎসের। কবিতা থেকে কবিতাযাপন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। ক্রাইসিস-গুলোকে চিনে নিতে নিতে প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠা। কবিতা মানে বাস্তব থেকে দূরে সরার, অথবা কিছু মিথ্যে স্তোকবাক্য দিয়ে বাস্তবকে আড়াল করার চেষ্টা আর নেই; চাঁদ ফুল তারা নদী আর অতটাও সুন্দর নেই যে তারাই হয়ে উঠতে পারে ‘Aesthetics’-র মাপকাঠি। এস্থেটিক্‌স-ও নিয়ন্ত্রিত হয় পুঁজির দ্বারা, পুঁজির স্বার্থেই! সেই এস্থেটিক্‌স কে প্রবল বিক্ষোভে উপহাস করেন ফাল্গুনী রায়ও- “রাজহাঁস ও ফুলবিষয়ক কবিতাগুলি আমি মাংস রাঁধার জন্যেই দিয়েছিলাম উনোনে...”। বরং দৈনন্দিন যুদ্ধদীর্ণ ‘অসুস্থ’ জীবন থেকেই উঠে আসে ‘Aesthetics’-র সারবত্তা। আর, কবির নিশ্চয়ই দায়বদ্ধতা থাকে সমাজের প্রতি; হাংরি-দের সেই নিজেকে, ভাষাকে, কবিতাকে, নাটককে, ছিঁড়েখুঁড়ে সত্যের কাছাকাছি পৌছানোর উপলব্ধিকে ঔপনিষদীয় বলা ভুল হবে না।

    রাষ্ট্রের ভণ্ডামিগুলো, ‘আদার্‌’ অর্থাৎ’অপর’ ছাপ্পা মেরে দেওয়াগুলো, ‘নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নেওয়া’র গড্ডালিকা স্রোতগুলোর পালটা স্রোত সাহিত্যে-জীবনযাপনে আসে। আর, যতোটা ‘সংস্কৃতি’ ঠিক করে দেওয়া কর্তারা থাকবে, ততটাই থাকবে সেই ‘সংস্কৃতিকে’ প্রত্যাখ্যান। হয়তো সমান্তরাল, তবু থাকবে। প্রবলভাবেই। সমাজশাসকেরা বরাবরই নিজেদের মত করে হেজিমনি চাপিয়ে দেয়, শাসনের ডিস্‌কোর্সের অভিমুখে দাঁড় করাতে চায় সব্বাইকে। আর, যখনই তার বিরুদ্ধে স্বর ওঠে, তা সে সাহিত্যেই হোক বা রাজনিতিতে, তাকে দমিয়ে দেওয়া হয়। ব্রাত্য করে রাখা হয় ‘সংস্কৃতি’-র শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে। জাতীয় সাহিত্যের মাপকাঠিতে ‘অশ্লীল’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে প্রতিপন্ন হয় এই সাহিত্যগুলো ও রাজনীতিগুলো। হাংরি আন্দোলনকারীদের যেভাবে জেলে পোরার চক্রান্ত হয়েছিল, একইভাবে প্রতিষ্ঠানের আরও বৃহত্তর চক্রান্তে একের পর এক হত্যা করে নিশ্চিহ্ণ করা হয়েছিল নকশালদের, সমাজকে ‘শুদ্ধ’ করে তোলার জন্য।

    অরবিন্দ প্রধান সম্পাদিত ‘অপর : তত্ব ও তথ্য’ বইতে সমীর রায়চৌধুরী লিখেছেন, “নিজেদের রয়ালিস্ট, প্রকৃত খ্রিস্টিয়, প্রগতিবাদী ইত্যাদি নির্দিষ্টাত্মক বিশেষণের খপ্পরের ছাঁচে ফেলে দেওয়ার তোড়জোড়ে সাম্রাজ্যবাদী চেতনার জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছেন ঔপনিবেশিক শ্রেষ্ঠত্ববোধসম্পন্ন লেখকরা, ফলে তাঁদের টেক্সটে আশ্রিত হয়েছে চরম অপরত্ব-বোধ। দক্ষিণ আফ্রিকার ঔপন্যাসিক জে. এম. কোয়েতসে তাঁর ‘ওয়েটিং ফর দ্য বারবারিয়ানস’ গ্রন্হে দেখিয়েছেন কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য অপরায়নের প্রক্রিয়া কার্যকরী করে। এই প্রক্রিয়া তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব, এগিয়ে থাকা, সভ্যতাকে শ্রেয় এবং অপরের অসত্বিত্বকে হেয় করতে সাহয্য করে। কেবল টেক্সটে নয়, জীবনের সব এলাকাতে এভাবে স্ব-আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে ওঠে। ” বলা বাহুল্য যে হাংরি আন্দোলন আর নকশাল আন্দোলনকে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন ‘অপর’ তকমা দিয়ে সমাজ থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, যেমন আফ্রিকার আদিনিবাসদের মুছে ফেলতে চেয়েছিল ইউরোপের শাসক-সমাজ।

    নারায়ণ সান্যালের বিবরণীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার এক অজানা কথা উঠে আসে। “কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগর-মশায়ের মর্মরমূর্তির যেদিন মুণ্ডচ্ছেদ হয় তার মাসখানেকের মধ্যে সিপিএম (এম. এল) দলের এক নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্রনেতার সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়েছিল! ঘটনাচক্রে সে আমার নিকট আত্মীয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কট্টর নকশাল। আমার পেচকপ্রতিম বিরস মুখখানা দেখে সে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, ‘বিশ্বাস কর ছোটকাকু! মূর্তিটা যে ভেঙ্গেছে তাকে আমি চিনি। গত বছর হায়ার সেকেন্ডারিতে সে বাংলায় লেটার পেয়েছে। ওর সেই বাংলা প্রশ্নপত্রে প্রবন্ধ এসেছিল তোমার প্রিয় দেশবরেণ্য নেতা। ও লিখেছিল বিদ্যাসাগরের উপর।”

    অধিকাংশ আলোচক বলেন হাংরি আন্দোলন এবং নকশাল আন্দোলন দুটিই ব্যর্থ্য এবং তাদের ব্যর্থতার কারণও এক : প্রথমত, প্রশাসনিক আক্রমণ ; দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ ; তৃতীয়ত, আন্দোনের সদস্যদের মধ্যে বিভাজন ; চতুর্থত, তাঁদের কার্যকলাপ। আমি শুধু বলতে চাই যে দুটি আন্দোলনই বাংলার বৌদ্ধিক সমাজে ছাপ ফেলেছে এবং তা ‘ব্যর্থ্য’ তকমা দিয়ে চাপা দেয়া যায় না।

    পাঁচ

    হাংরি আন্দোলনকারীদের মত পরাবাস্তব আন্দোলনকারীদের মাঝেও ভাঙন ঘটত, সে কথাও জানিয়েছেন অভিজিৎ পাল।

    ১৯১৭ সালে গিয়ম অ্যাপলিনেয়ার “সুররিয়ালিজম” অভিধাটি তৈরি করেছিলেন, যার অর্থ ছিল বাস্তবের অতীত। শব্দটি প্রায় লুফে নেন আঁদ্রে ব্রেতঁ, নতুন একটি আন্দোলন আরম্ভ করার পরিকল্পনা নিয়ে, যে আন্দোলনটি হবে পূর্ববর্তী ডাডাবাদী আন্দোলন থেকে ভিন্ন। ত্রিস্তঁ জারা উদ্ভাবিত ডাডা আন্দোলন থেকে সরে আসার কারণ হল ব্রেতঁ সহ্য করতে পারতেন না ত্রিস্তঁ জারাকে, কেননা কবি-শিল্পী মহলে প্রতিশীল্পের জনক হিসাবে ত্রিস্তঁ জারা খ্যাতি পাচ্ছিলেন। আঁদ্রে ব্রেতঁ সুররিয়ালিজম তত্বটির একমাত্র ব্যাখ্যাকারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে আরম্ভ করেন। ১৯১৯ সালে ত্রিস্তঁ জারাকে কিন্তু ব্রেতঁ চিঠি লিখে প্যারিসে আসতে বলেছিলেন। একইভাবে ‘হাংরি’ শব্দটি মলয় রায়চৌধুরী পেয়েছিলেন কবি জিওফ্রে চসার থেকে। এই ‘হাংরি’ শব্দটি নেয়ার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তেমন কিছুই করা হয়নি আঁদ্রে ব্রেতঁ ও ত্রিস্তঁ জারা সম্পর্কে। মলয় রায়চৌধুরী হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ঘোষণা করেন ১৯৬৫ সালের পয়লা নভেম্বর একটি লিফলেট প্রকাশের মাধ্যমে।

    পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে, প্রথম থেকেই, আঁদ্রে ব্রেতঁ’র সঙ্গে অনেক পরাবাস্তববাদীর সদ্ভাব ছিল না, কিন্তু পরাবাস্তববাদ বিশ্লেষণের সময়ে আলোচকরা তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন না। আমরা যদি বাঙালি আলোচকদের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখব যে তাঁরা হাংরি জেনারেশন বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন বিশ্লেষণ করার সময়ে হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অত্যধিক চিন্তিত, হাংরি আন্দোলনকারীদের সাহিত্য অবদান নিয়ে নয়। ব্যাপারটা বিস্ময়কর নয়। তার কারণ অধিকাংশ আলোচক হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের বইপত্র সহজে সংগ্রহ করতে পারেন না এবং দ্বিতীয়ত সাংবাদিক-আলোচকদের কুৎসাবিলাসী প্রবণতা।

    আঁদ্রে ব্রেতঁ তাঁর বন্ধু পল এলুয়ার, বেনিয়ামিন পেরে, মান রে, জাক বারোঁ, রেনে ক্রেভালl, রোবের দেসনস, গিয়র্গে লিমবোর, রোজের ভিত্রাক, জোসেফ দেলতিল, লুই আরাগঁ ও ফিলিপে সুপোকে নিয়ে ১৯১৯ পরাবাস্তববাদ আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন। কিছুকাল পরে, রাজনৈতিক ভাবাদর্শের কারণে তাঁর সঙ্গে লুই আরাগঁর ঝগড়া বেধে গিয়েছিল। মার্সেল দ্যুশঁ, ত্রিস্তঁ জারা এবং আঁদ্রে ব্রেতঁ, উভয়ের সঙ্গেই ছিলেন, এবং দুটি দলই তাঁকে গুরুত্ব দিতেন, দ্যুশঁ’র অবাস্তব ও অচিন্ত্যনীয় ভাবনার দরুন।

    পরাবাস্তব আন্দোলনের আগে জুরিখে ডাডাবাদী আন্দোলন আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং আঁদ্রে ব্রেতঁ পরাবাস্তববাদের অনুপ্রেরণা পান ডাডা আন্দোলনের পুরোধা ত্রিস্তঁ জারার কাছ থেকে, কিন্তু ব্রেতঁ চিরকাল তা অস্বীকার করে্ছেন। ডাডা ছিল শিল্পবিরোধী আভাঁ গার্দ আন্দোলন ; অবশ্য প্রতিশিল্পও তো শিল্প। ডাডাবাদের রমরমার কারণে ত্রিস্তঁ জারার সঙ্গে ব্রেতঁর সম্পর্ক দূষিত হয়ে যায় ; একজন অন্যজনের নেতৃত্ব স্বীকার করতে চাইতেন না। ডাডা (/ˈdɑːdɑː/) বা ডাডাবাদ (দাদাবাদ নামেও পরিচিত) ছিল ২০ শতকের ইউরোপীয় ভিন্নচিন্তকদের একটি সাহিত্য-শিল্প আন্দোলন, যার প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ক্যাবারে ভলতেয়ার ( ১৯১৬ নাগাদ ) এবং নিউ ইয়র্কে (প্রায় ১৯১৫ নাগাদ)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ডাডা আন্দোলন গড়ে ওঠে সেইসব শিল্পীদের নিয়ে, যাঁরা পুঁজিবাদী সমাজের যুক্তি, কারণ বা সৌন্দর্যের ধারণা মানতেন না, বরং তাঁদের কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন আপাত-অর্থহীন, উদ্ভট, অযৌক্তিক এবং বুর্জোয়া-বিরোধী প্রতিবাদী বক্তব্য। আন্দোলনটির শিল্পচর্চা প্রসারিত হয়েছিল দৃশ্যমান, সাহিত্য ও শব্দ মাধ্যমে, যেমন- কোলাজ, শব্দসঙ্গীত, কাট-আপ লেখা, এবং ভাস্কর্য। ডাডাবাদী শিল্পীরা হানাহানি, যুদ্ধ এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন এবং গোঁড়া বামপন্থীদের সাথে তাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল।

    যুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রগতিবাদীদের মধ্যেই ডাডার শিকড় লুকিয়ে ছিল। শিল্পের সংজ্ঞায় পড়েনা এমন সব সৃষ্টিকর্মকে চিহ্নিত করার জন্য ১৯১৩ সালে "প্রতি-শিল্প" শব্দটি চালু করেছিলেন মার্সেল দ্যুশঁ। কিউবিজম এবং কোলাজ ও বিমূর্ত শিল্পের অগ্রগতিই হয়তো ডাডা আন্দোলনকে বাস্তবতার গন্ডী থেকে বিচ্যুত হতে উদ্বুদ্ধ করে। আর শব্দ ও অর্থের প্রথানুগত সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করতে ডাডাকে প্রভাবিত করে ইতালীয় ভবিষ্যতবাদী এবং জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টগণ। আলফ্রেড জ্যারির উবু রোই (১৮৯৬) এবং এরিক স্যাটির প্যারেড (১৯১৬-১৭) প্রভৃতি লেখাগুলোকে ডাডাবাদী রচনার আদিরূপ বলা যেতে পারে। ডাডা আন্দোলনের মূলনীতিগুলো প্রথম সংকলিত হয় ১৯১৬ সালে হুগো বলের ডাডা ম্যানিফেস্টোতে। এই ম্যানিফেস্টোর প্রভাবে পরবর্তিকালে ব্রেতঁ সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো লিখতে অনুপপ্রাণিত হন -- এই কথা শুনতে ব্রেতঁ’র ভালো লাগত না এবং সেকারণে তিনি বহু সঙ্গীকে এক-এক করে আন্দোলন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া ব্রেতঁ মনে করতেন ডাডাবাদীরা নৈরাজ্যবাদী বা অ্যানার্কিস্ট, যখন কিনা তিনি একজন কমিউনিস্ট।

    ডাডা আন্দোলনে ছিল জনসমাবেশ, মিছিল ও সাহিত্য সাময়িকীর প্রকাশনা; বিভিন্ন মাধ্যমে শিল্প, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি নিয়ে তুমুল আলোচনা হতো। আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্বরা ছিলেন হুগো বল, মার্সেল দ্যুশঁ, এমি হেনিংস, হানস আর্প, রাউল হাউসম্যান, হানা হৌক, জোহান বাডার, ত্রিস্তঁ জারা, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, রিচার্ড হিউলসেনব্যাক, জর্জ গ্রোস, জন হার্টফিল্ড, ম্যান রে, বিয়াট্রিস উড, কার্ট শ্যুইটার্স, হানস রিখটার এবং ম্যাক্স আর্নেস্ট। অন্যান্য আন্দোলন, শহরতলীর গান এসবের পাশাপাশি পরাবাস্তববাদ, নব্য বাস্তবতা, পপ শিল্প এবং ফ্লক্সেস প্রভৃতি গোষ্ঠীগুলোও ডাডা আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের অনেকে সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।

    পরাবাস্তববাদ আন্দোলনে যাঁরা ব্রেতঁর সঙ্গে একে-একে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম হলেন ফিলিপে সুপো, লুই আরাগঁ, পল এলুয়ার, রেনে ক্রেভাল, মিশেল লেইরিস, বেনিয়ামিন পেরে, অন্তনাঁ আতো,জাক রিগো, রবের দেসনস, ম্যাক্স আর্নস্ত প্রমুখ। এঁদের অনেকে ডাডাবাদী আন্দোলন ত্যাগ করে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে যোগ দেন চিত্রকর আঁদ্রে মাসোঁ ও ইভস তাঙ্গুই। ১৯২১ সালে ভিয়েনায় গিয়ে ফ্রয়েডের সঙ্গে দেখা করেন ব্রেতঁ। ফ্রয়েডের ধারণাকে তিনি সাহিত্য ও ছবি আঁকায় নিয়ে আসতে চান। ফ্রয়েডের প্রভাবে ব্রেতঁ বললেন, সুররিয়ালিজমের মূলকথা হল অবচেতনমনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্যকর সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করা। ডাডাবাদীরা যেখানে চেয়েছিলেন প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধকে নস্যাৎ করে মানুষকে এমন একটি নান্দনিক দৃষ্টির অধিকারী করতে যার মাধ্যমে সে ভেদ করতে পারবে ভণ্ডামি ও রীতিনীতির বেড়াজাল, পৌঁছাতে পারবে বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্যে; সেখানে পরাবাস্তববাদ আরো একধাপ এগিয়ে বলল, প্রকৃত সত্য কেবলমাত্র অবচেতনেই বিরাজ করে। পরাবাস্তববাদী শিল্পীর লক্ষ্য হল তার কৌশলের মাধ্যমে সেই সত্যকে ব্যক্তি-অস্তিত্বের গভীর থেকে তুলে আনা।

    সুররিয়ালিজমের প্রথম ইশতেহার প্রকাশ করেন ইয়ান গল। এ ইশতেহারটি ১৯২৪ সালের ১ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পরেই ১৫ অক্টোবর আঁদ্রে ব্রেতঁ সুররিয়ালিজমের দ্বিতীয় ইশতেহারটি প্রকাশ করেন। তিনি ১৯৩০ সালে এ ধারার তৃতীয় ইশতেহারটিও প্রকাশ করেন। ইয়ান গল ও আঁদ্রে ব্রেতঁ—দুজনে দু দল সুররিয়ালিস্ট শিল্পীর নেতৃত্ব দিতেন। ইয়ান গলের নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, ত্রিস্তঁ জারা, মার্সেল আর্লেন্ড, জোসেফ ডেলটিল, পিয়েরে অ্যালবার্ট বিরোট প্রমুখ। আন্দ্রে ব্রেতঁর নেতৃত্বে ছিলেন লুই আরাগঁ, পল এলুয়ায়, রোবের ডেসনোস, জ্যাক বারোঁ, জর্জ ম্যালকিন প্রমুখ। এ দুটি দলেই ডাডাইজম আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। অবশ্য ইয়ান গল ও আন্দ্রে ব্রেতঁ এই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশ্য-রেশারেশিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন থেকেই পরাবাস্তববাদীরা ছোটো-ছোটো গোষ্ঠীতে বিভাজিত হতে থাকেন, যদিও তাঁদের শিল্প ও সাহিত্যধারা ছিল একই। পরে আন্দোলনে যোগ দেন জোয়ান মিরো, রেমণ্ড কোয়েনু, ম্যাক্স মোরিজ, পিয়ের নাভিল, জাক আঁদ্রে বোইফার, গেয়র্গে মালকাইন প্রমুখ। জিয়োর্জিও দে চিরোকো এবং পাবলো পিকাসো অনেক সময়ে গোষ্ঠির কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন, তবে আন্দোলনের ঘোষিত সদস্য ছিলেন না।

    সুররিয়ালিজম বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ডাডাইজম থেকে নিলেও এই মতবাদটি, যে, ‘শিল্পের উৎস ও উপকরণ’ বিবেচনায় একটি অন্যটির চেয়ে স্বতন্ত্র্য। সুররিয়ালিজম আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রেতঁ। তিনি শিল্প রচনায় ‘অচেতন মনের ওপর গুরুত্ব’ দেওয়ার জন্যে শিল্পীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি মনে করতেন, ‘অচেতন মন হতে পারে কল্পনার অশেষ উৎস।’ তিনি অচেতন মনের ধারণাটি নিঃসন্দেহে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। ডাডাবাদী শিল্পীরা শিল্পের উৎস ও উপকরণ আহরণে ‘অচেতন’ মনের ধারণা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা এসে অচেতন মনের উৎস থেকে শিল্প রচনার প্রতি গুরুত্ব দেন এবং সফলতাও লাভ করেন।

    আঁদ্রে ব্রেতঁ মনে করতেন, ‘যা বিস্ময়কর, তা সবসময়ই সুন্দর’। অচেতন মনের গহীনেই বিস্ময়কর সুন্দরের বসবাস। তার সন্ধান করাই সাহিত্যিক-শিল্পীর যথার্থ কাজ। অচেতন মনের কারণেই সুররিয়ালিজমের কবি-শিল্পীরা গভীর আত্মঅনুসন্ধানে নামেন। মনের গহীন থেকে স্বপ্নময় দৃশ্যগুলো হাতড়ে বের করতে এবং মনের অন্তর্গত সত্য উন্মোচনে তাঁরা আগ্রহী ছিলেন। যার কারণে চেতন ও অচেতনের মধ্যে শিল্পীরা বন্ধন স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা অচেতন মনের সেই সব উপলব্ধিকে দৃশ্যে রূপ দিলেন যা পূর্বে কেউ কখনো করেনি। অচেতনের ভূমিতে দাঁড়িয়ে বাস্তব উপস্থাপনের কারণে খুব দ্রুতই এ মতবাদটি বিশ্ব শিল্পকলায় ‘অভিনবত্ব’ যোগ করতে সমর্থ হয়। এমনকী, পুঁজিবাদ-বিরোধী এই আন্দোলন থেকে উপকরণ সংগ্রহ করেছেন বহু বিখ্যাত বিজ্ঞাপন কোম্পানি।

    সুররিয়ালিজমকে ‘নির্দিষ্ট’ ছকে ফেলা কঠিন। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা একই ছাতার নিচে বসবাস করে ছবি আঁকলেও এবং কবিতা লিখলেও, তাঁদের দৃষ্টি ও উপলব্ধির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। ফলে এ মতবাদটি সম্পর্কে প্রত্যেকে ব্যাক্তিগত ভাবনা ভেবেছেন। ১৯২৯ সালে সালভাদর দালি এই আন্দোলনে যোগ দেন, যদিও তাঁর সঙ্গেও ব্রেতঁর বনিবনা হতো না। সালভাদর দালি মনে করতেন, ‘সুররিয়ালিজম একটি ধ্বংসাত্মক দর্শন এবং এটি কেবল তা-ই ধ্বংস করে যা দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ রাখে।’ অন্যদিকে জন লেলন বলেছেন, ‘সুররিয়ালিজম আমার কাছে বিশেষ প্রভাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কেননা, আমি উপলব্ধি করেছিলাম আমার কল্পনা উন্মাদনা নয়। বরং সুররিয়ালিজমই আমার বাস্তবতা।’ ব্রেতোঁ বলতেন, ‘ভাবনার যথাযথ পদ্ধতি অনুধাবনের জন্যে সুররিয়ালিজম আবশ্যক।’ এ ধারায় স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশ্রণ হয় বলে সুররিয়ালিজমকে স্বপ্নবাস্তবতাও বলা হয়ে থাকে।

    সুররিয়ালিজমের ঢেউ খুব অল্প সময়েই শিল্পের সবগুলো শাখায় আছড়ে পড়ে। কবিতা, গান থেকে শুরু করে নাটক, সিনেমা পর্যন্ত সুররিয়ালিস্টদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সুররিয়ালিজম ধারায় অন্তত ছয়টি সিনেমা নির্মিত হয়। এ ধারার প্রধান শিল্পীরা হলেন জ্যাঁ আর্প, ম্যাক্স আর্নেস্ট, আঁদ্রে মেসন, সালভাদর দালি, রেনে ম্যাগরেট, পিয়েরো রয়, জোয়ান মিরো, পল ডেলভাক্স, ফ্রিদা কাহলো প্রমুখ। এ ধারার চিত্রকর্মের মধ্যে ১৯৩১ সালে আঁকা সালভাদর দালির ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’ সবচেয়ে আলোচিত ছবি। এটি কেবল এ ধারার মধ্যেই আলোচিত চিত্রকর্মই নয়, এটি দালিরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভার নিদর্শন। ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’-তে দালি ‘সময়ের’ বিচিত্র অবস্থাকে ফ্রেমবন্দি করতে চেষ্টা করেছেন। ‘মেটামরফসিস অব নার্সিসাস’, ‘নভিলিটি অব টাইম’, ‘প্রোফাইল অব টাইম’ প্রভৃতি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

    সুররিয়ালিজম ধারার প্রধানতম চিত্রকর্মের মধ্যে রেনে ম্যাগরেটের ‘দ্য সন অব ম্যান’, ‘দিস ইজ নট এ পাইপ’, জর্জিও দি চিরিকো-এর ‘দ্য রেড টাওয়ার’, ম্যাক্স আর্নেস্টের ‘দি এলিফ্যান্ট সিলিবেস’, ইভ তঁগির ‘রিপ্লাই টু রেড’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে সুররিয়ালিজম আন্দোলন থেমে যায়। শিল্পবোদ্ধারা মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনটির অনানুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প আন্দোলনের মতো সুররিয়ালিজমের চর্চা বর্তমানেও হচ্ছে। বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনেও সুররিয়ালিজমের প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৯২৪ সালে প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো। মার্কসবাদের সঙ্গে আর্তুর র‌্যাঁবোর আত্মপরিবর্তনের ভাবনাকে একত্রিত করার উদ্দেশে ব্রেতঁ ১৯২৭ সালে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কিন্তু সাম্যবাদীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি। সেখান থেকেও তিনি ১৯৩৩ সালে বিতাড়িত হন। পরাবাস্তববাদীদের “উন্মাদ প্রেম” তত্বটি ব্রেতঁর এবং “উন্মাদ প্রেম” করার জন্য বেশ কিছু তরুণী সুররিয়ালিস্টদের প্রতি আকৃষ্ট হন। যৌনতার স্বেচ্ছাচারিতার ঢেউ ওঠে সাহিত্যিক ও শিল্পী মহলে ; পরাবাস্তববাদীদের নামের সঙ্গে একজন বা বেশি নারীর সম্পর্ক ঘটে এবং সেই নারীরা তাঁদের পুরুষ প্রেমিকদের নামেই খ্যাতি পেয়েছেন।

    তাঁর রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং অন্যান্য কারণে প্রেভের, বারোঁ, দেসনস, লেইরিস, লিমবোর, মাসোঁ, কোয়েন্যু, মোরিস, বোইফার সম্পর্কচ্ছদ করেন ব্রেতঁর সঙ্গে এবং গেয়র্গে বাতাইয়ের নেতৃত্বে পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করেন। এই সময়েই, ১৯২৯ নাগাদ, ব্রেতঁর গোষ্ঠীতে যোগ দেন সালভাদর দালি, লুই বুনুয়েল, আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি, রেনে শার এবং লি মিলার। ত্রিস্তঁ জারার সঙ্গে ঝগড়া মিটমাট করে নেন ব্রেতঁ। দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ইশতাহার প্রকাশের সময়ে তাতে সই করেছিলেন আরাগঁ, আর্নস্ট, বুনুয়েল, শার, ক্রেভাল, দালি, এলুয়ার, পেরে, টাঙ্গুই, জারা, ম্যাক্সিম আলেকজান্দ্রে, জো বনসকোয়েত, কামিলে গোয়েমানস, পল নুগ, ফ্রান্সিস পোঙ্গে, মার্কো রিসটিচ, জর্জ শাদুল, আঁদ্রে তিরিয়ঁ এবং আলবেয়ার ভালেনতিন। ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা বন্ধু ছিলেন সালভাদর দালি এবং লুই বুনুয়েলের, আলোচনায় অংশ নিতেন, কিন্তু সুররিয়ালিস্ট গোষ্ঠিতে যোগ দেননি। ১৯২৯ সালে তাঁর মনে হয়েছিল যে দালি আর বুনুয়েলের ফিল্ম “একটি আন্দালুসিয় কুকুর” তাঁকে আক্রমণ করার জন্যে তৈরি হয়েছিল ; সেই থেকে তিনি সুররিয়ালিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আরাগঁ ও জর্জ শাদুল ব্রেতঁ’র গোষ্ঠী ত্যাগ করেছিলেন রাজনৈতিক মতভেদের কারণে, যদিও ব্রেতঁ বলতেন যে তিনিই ওনাদের তাড়িয়েছেন।

    ১৯৩০ সালে কয়েকজন পরাবাস্তববাদী আঁদ্রে ব্রেতঁ’র একচেটিয়া নেতৃত্বে বিরক্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একটি প্যামফ্লেট ছাপিয়েছিলেন। পরাবাস্তববাদ আন্দোলন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৩৫ সালে ব্রেতঁ এবং সোভিয়েত লেখক ও সাংবাদিক ইলিয়া এরেনবার্গের মাঝে ঝগড়া এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছোয় যে প্যারিসের রাস্তায় তাঁদের দুজনের হাতাহাতি আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। এরেনবার্গ একটি পুস্তিকা ছাপিয়ে বলেছিলেন যে পরাবাস্তববাদীরা পায়ুকামী। এর ফলে পরাবাস্তববাদীদের ইনটারন্যাশানাল কংগ্রেস ফর দি ডেফেন্স অফ কালচার সংস্হা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। সালভাদর দালি বলেছিলেন যে পরাবাস্তববাদীদের মধ্যে প্রকৃত সাম্যবাদী হলেন একমাত্র রেনে ক্রেভাল। চটে গিয়ে ক্রেভালকে পরাবাস্তববাদী আন্দোলন থেকে বের করে দ্যান ব্রেতঁ। অঁতনা অতো, ভিত্রাক এবং সুপোকে পরাবাস্তববাদী দল থেকে বের করে দ্যান ব্রেতঁ, মূলত সাম্যবাদের প্রতি ব্রেতঁর আত্মসমর্পণের কারণে এই তিনজন বিরক্ত বোধ করেন।

    ১৯৩৮ সালে ব্রেতঁ মেকসিকো যাবার সুযোগ পান এবং লিও ট্রটস্কির সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দিয়েগো রিভেরা ও ফ্রিদা কালহো। ট্রটস্কি এবং ব্রেতঁ একটা যুক্ত ইশতাহার প্রকাশ করেছিলেন, “শিল্পের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা” শিরোনামে। লুই আরাগঁর সঙ্গেও ব্রেতঁর সম্পর্ক ভালো ছিল না। ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত ডাডাবাদীদের সঙ্গে আন্দোলন করার পর ১৯২৪ সালে আরাগঁ যোগ দেন পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে। অন্যান্য ফরাসী পরাবাস্তববাদীদের সঙ্গে তিনিও ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দ্যান এবং পার্টির পত্রিকায় কলাম ও রাজনৈতিক কবিতা লিখতেন। আরাগঁর সঙ্গে ব্রেতঁর বিবাদের কারণ হল ব্রেতঁ চেয়েছিলেন ট্রটস্কির সঙ্গী ভিকতর সার্জকে সন্মানিত করতে। পরবর্তীকালে, ১৯৫৬ নাগাদ, সোভিয়েত রাষ্ট্র সম্পর্কে নিরাশ হন আরাগঁ, বিশেষ করে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর যখন নিকিতা ক্রুশ্চভ আক্রমণ করেন জোসেফ স্তালিনের ব্যক্তিত্ববাদকে। তা সত্ত্বেও স্তালিনপন্হী আরাগঁ ও ট্রটস্কিপন্হী ব্রেতঁর কখনও মিটমাট হয়নি। কাট-আপ কবিতার জনক ব্রায়ন জিসিনকেও গোষ্ঠী থেকে বিতাড়ন করেন ব্রেতঁ ; ব্রায়ান জিসিনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ছিলেন বিট ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বারোজ। বিট আন্দোলনের প্রায় সকলেই সুররিয়ালিজম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিটদের যৌন স্বাধীনতার ভাবনা-চিন্তায় সুররিয়ালিস্টদের অবদান আছে।

    পরাবাস্তববাদই সম্ভবত প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন, যেখানে নারীকে দূরতম কোনো নক্ষত্রের আলোর মতো, প্রেরণা ও পরিত্রাণের মতো, কল্পনার দেবী প্রতিমার মতো পবিত্র এক অবস্থান দেওয়া হয়েছিল। নারী তাদের চোখে একই সঙ্গে পবিত্র কুমারী, দেবদূত আবার একই সঙ্গে মোহিনী জাদুকরী, ইন্দ্রিয় উদ্দীপক ও নিয়তির মতো অপ্রতিরোধ্য। ১৯২৯ সালে দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টোয় আদ্রেঁ ব্রেতঁ নারীকে এরকম একটি অপার্থিব অসীম স্বপ্নিল চোখে দেখা ও দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। পুরুষ শিল্পীদের প্রেরণা, উদ্দীপনা ও কল্পনার সুদীর্ঘ সাম্পান হয়ে এগিয়ে আসবেন নারীরা। হয়ে উঠবেন পুরুষদের আরাধ্য ‘মিউজ’ আর একই সঙ্গে femme fatale। সুদৃশ্য উঁচু পূজার বেদি উদ্ভাসিত করে যেখানে বসে থাকবেন নারীরা। তাঁদের স্বর্গীয় প্রাসাদে আরো সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে পুরুষ।

    ব্রেতঁ ছিলেন সেই সময়ের কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ। তাঁর সম্মোহক ব্যক্তিত্বে আচ্ছন্ন হননি তাঁর সান্নিধ্যে এসেও – এরকম কোনো দৃষ্টান্ত কোথাও নেই। উজ্জ্বল, সাবলীল, মেধাবী, স্বতঃস্ফূর্ত এবং নায়কসুলভ ব্রেতঁ একই সঙ্গে ছিলেন উদ্ধত, আক্রমণাত্মক ও অহমিকাপূর্ণ। নিজের তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে মাঝেমধ্যেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যেতেন। কিন্তু যদি তাঁর একবার মনে হতো যে কেউ তাঁর প্রভুত্বকে অগ্রাহ্য করছে, সর্বশক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করতেন। নেতৃত্ব দেওয়ার সব গুণ প্রকৃতিগতভাবেই ছিল তাঁর মধ্যে। মহিলাদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ছিল তরুণ প্রেমিকের মতো সম্ভ্রমপূর্ণ। তাঁর আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি, অভিজাত ভাষা – এসবের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই মেজাজ হারিয়ে সম্পূর্ণ লাগামহীন হয়ে পড়া আর দুর্বোধ্য জটিল মানসিকতার জন্য পারতপক্ষে অনেকেই ঘাঁটাতে চাইতেন না তাঁকে।

    নারী পরাবাস্তববাদীদের সংখ্যা কম ছিল না। কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখ্য ফ্রিদা কাহলো, আসে বার্গ, লিজে দেহামে, আইরিন হামোয়ের, জয়েস মানসোর, ওলগা ওরোজকো, আলেহান্দ্রা পিৎসারনিক, ভ্যালেনটিন পেনরোজ, জিসেল প্রাসিনস, ব্লাঙ্কা ভারেলা, ইউনিকা জুর্ন প্রমুখ। নারী চিত্রকররা সংখ্যায় ছিলেন বেশি। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য গেরট্রুড আবেরকমবি, মারিয়ন আদনামস, আইলিন ফরেসটার আগার, রাশেল বায়েস, ফ্যানি ব্রেনান, এমি ব্রিজওয়াটার, লেনোরা ক্যারিংটন, ইথেল কলকুহুন, লেনোর ফিনি, জেন গ্রাভেরোল, ভ্যালেনটিন য়োগো, ফ্রিদা খাহলো, রিটা কার্ন-লারসেন, গ্রেটা নুটসন ( ত্রিস্তঁ জারার স্ত্রী ), জাকেলিন লামবা ( আঁদ্রে ব্রেতঁ’র স্ত্রী), মারুহা মালো, মার্গারেট মডলিন, গ্রেস পেইলথর্প, অ্যালিস রাহোন, এডিথ রিমিঙটন, পেনিলোপি রোজমন্ট, কে সেজ ( ইভস তাঙ্গুইর স্ত্রী ), ইভা স্বাঙ্কমাজেরোভা, ডরোথি ট্যানিঙ ( ম্যাক্স আর্নস্টের স্ত্রী ), রেমেদিওস ভারো ( বেনিয়ামিন পেরের স্ত্রী ) প্রমুখ। ভাস্করদের মধ্যে উল্লেখ্য এলিজা ব্রেতঁ ( আঁদ্রে ব্রেতঁ’র তৃতীয় স্ত্রী ), মেরে ওপেনহাইম ( মান রে’র মডেল ছিলেন ) এবং মিমি পারেন্ট। ফোটোগ্রাফারদের মধ্যে উল্লেখ্য ছিলেন ক্লদ কাহুন, নুশ এলুয়ার, হেনরিয়েতা গ্রিনদাত, আইডা কার, দোরা মার ( পাবলো পিকাসোর সঙ্গে নয় বছর লিভ টুগেদার করেছিলেন ), এমিলা মেদকোভা, লি মিলার, কাতি হোরনা প্রমুখ। পুরুষ পরাবাস্তববাদীদের বহু ফোটো এই নারী ফোটোগ্রাফারদের কারণেই ইতিহাসে স্হান পেয়েছে।

    নারীদের নিয়ে পরাবাস্তববাদীদের এই স্বপ্নিল কাব্যময় উচ্ছ্বাস জোরালো একটা ধাক্কা খেল যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিম ইউরোপে দ্রম্নত বদলাতে থাকা পরিস্থিতির ভস্ম ও শোণিত স্নাত শোণিত আত্মশক্তিসম্পন্ন নারীরা তাঁদের ভারী বাস্তবতা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন সামনে। স্বপ্নে দেখা নারীর আয়না-শরীর ভেঙে পড়ল ঝুরঝুর করে আর বেরিয়ে এলো মেরুদ-সম্পন্ন রক্তমাংসের মানবী। সুররিয়ালিজম চেয়েছিল পুরুষের নিয়ন্ত্রণে নারীদের মুক্তি। কিন্তু যে গভীর অতলশায়ী মুক্তি দরজা খুলে দিলো নারীদের জন্য, সুররিয়ালিজম তার জন্য তৈরি ছিল না। মৃত অ্যালবাট্রসের মতো এই বিমূর্ত আদর্শায়িত ধারণা নারী শিল্পীদের গলায় ঝুলে থেকেছে, যাকে ঝেড়ে ফেলে নিজস্ব শিল্পসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা দুঃসাধ্য ছিল। সময় লেগেছে সাফল্য পেতে। কিন্তু দিনের শেষে হেসেছিলেন তাঁরাই। এমন নয় যে, পরাবাস্তবতার প্রধান মশালবাহক ব্রেতঁ চাইছিলেন যে পুরুষরাই হবেন এই আন্দোলনের ঋত্বিক আর দ্যুতিময় নারী শিল্পী এবং সাহিত্যিকদের কাজ হবে মুগ্ধ সাদা পালক ঘাসের ওপরে ফেলে যাওয়া এবং আকর্ষণীয় ‘গুজব’ হিসেবে সুখী থাকা। ১৯২৯ সালে দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশের পরবর্তী প্রদর্শনীগুলোতে নারী শিল্পীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু পুরুষ উদ্ভাবিত পরাবাস্তবতা থেকে তাঁদের ভাষা, স্বর ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বতন্ত্র। নিজেদের ভারী অসিত্মত্ব, শরীরী উপস্থিতি জোরালোভাবে জায়গা পেল তাঁদের ছবিতে।

    কিন্তু নারী শিল্পীদের কাছে আত্মপ্রতিকৃতি হয়ে উঠল একটি সশস্ত্র ভাষার মতো। নিজস্ব গোপন একটি সন্ত্রাসের মতো। এই আন্দোলনের মধ্যে নারীরা এমন এক পৃথিবীর ঝলক দেখলেন, যেখানে আরোপিত বিধিনিষেধ না মেনে সৃজনশীল থাকা যায়, দমচাপা প্রতিবাদের ইচ্ছেগুলোর উৎস থেকে পাথরের বাঁধ সরিয়ে দেওয়া যায়। নগ্ন ও উদ্দাম করা যায় কল্পনাকে। নোঙর নামানো জাহাজের মতো অনড় ও ঠাসবুনট একটি উপস্থিতি হয়ে ছবিতে নিজের মুখ তাঁদের কাছে হয়ে উঠল অন্যতম প্রধান আইকন। যে ছবি আত্মপ্রতিকৃতি নয়, সেখানেও বারবার আসতে থাকল শিল্পীর শরীরী প্রতিমা। ফ্রিদা কাহ্লোর (১৯০৭-৫৪) ক্যানভাস তাঁর যন্ত্রণাবিদ্ধ শান্ত মুখশ্রী ধরে রাখল। মুখের বিশেষ কিছু চিহ্ন যা তাঁকে চেনায় – যেমন পাখির ডানার মতো ভুরু, আমন্ড আকারের চোখ ছবিতেও আনলেন তিনি। রিমেদিওস ভারোর (১৯০৮-৬৩) ছবিতে পানপাতার মতো মুখ, তীক্ষন নাক, দীর্ঘ মাথাভর্তি চুলের নারীর মধ্যে নির্ভুল চেনা গেল শিল্পীকে। আবার লিওনর ফিনির (১৯১৮-৯৬) আঁকা নারীরা তাদের বেড়ালের মতো কালো চোখ আর ইন্দ্রিয়াসক্ত মুখ নিয়ে হয়ে উঠল ফিনিরই চেনা মুখচ্ছবি। ১৯৩৯ সালের ‘The Alcove : An interior with three women’ ছবিতে ভারী পর্দা টাঙানো ঘরে দুজন অর্ধশায়িত মহিলা পরস্পরকে ছুঁয়ে আছেন। আর একজন মহিলা দাঁড়িয়ে। তিনজনেই যেন কোনো কিছুর প্রতীক্ষা করছেন চাপা উদ্বিগ্ন মুখে। যে তিনজন নারীর ছবি, তাঁরা যে লিওনর ফিনি, লিওনারা ক্যারিংটন এবং ইলিন অগার – এটা ছবিটিকে একঝলক দেখেই চেনা যায়। এমনকি যখন অন্য কোনো নারীর প্রতিকৃতি আঁকছেন তাঁরা, সেখানেও তাঁদের বিদ্রোহের অস্বীকারের জোরালো পাঞ্জার ছাপ এই শিল্পীরা সেইসব নারীর মুখে ঘন লাল নিম্নরেখা দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হতে ১৯৩৯ সালে অধিকাংশ পরাবাস্তববাদী বিদেশে পালিয়ে যান এবং তাঁদের মধ্যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও বক্তব্য নিয়ে খেয়োখেয়ি বেধে যায়। অলোচকরা মনে করেন যে গোষ্ঠী হিসাবে পরাবাস্তববাদ ১৯৪৭ সালে ভেঙে যায়, প্যারিসে “লে সুররিয়ালিজমে” প্রদর্শনীর পর। যুদ্ধের শেষে, প্যারিসে ব্রেতঁ ও মার্সেল দ্যুশঁ’র ফিরে আসার পর প্রদর্শনীর কর্তারা সম্বর্ধনা দিতে চাইছিলেন কিন্তু পুরোনো পরাবাস্তববাদীরা জানতে পারলেন যে একদল যুবক পরাবাস্তববাদীর আবির্ভাব হয়েছে, যাঁরা বেশ ভিন্ন পথ ধরে এগোতে চাইছেন। যুবকদের মধ্যে উল্লেখ্য ছিলেন ফ্রাঁসিস বেকঁ, আলান দাভি, এদুয়ার্দো পোলোৎসি, রিচার্ড হ্যামিলটন প্রমুখ।

    সুররিয়ালিজমের উদ্ভব সত্ত্বেও ডাডার প্রভাব কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি, তা প্রতিটি দশকে কবর থেকে লাফিয়ে ওঠে, যেমন আর্পের বিমূর্ততা, শুইটারের নির্মাণ, পিকাবিয়ার টারগেট ও স্ট্রাইপ এবং দ্যুশঁ’র রেডিমেড বস্তু বিশ শতকের শিল্পীদের কাজে ও আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়ছিল। স্টুয়ার্ট ডেভিসের বিমূর্ততা থেকে অ্যান্ডি ওয়ারহলের পপ আর্ট, জাসপার জনসের টারগেট ও ফ্ল্যাগ থেকে রবার্ট রাউশেনবার্গের কোলাঝে -- সমসাময়িক সাহিত্য ও শিল্পের যেদিকেই তাকানো হোক পাওয়া যাবে ডাডার প্রভাব, সুররিয়ালিজমের উপস্হিতি। ১৯৬৬ সালে মৃত্যুর আগে, ব্রেতঁ লিখেছিলেন, “ডাডা আন্দোলনের পর আমরা মৌলিক কিছু করিনি। ডাডা ও সুররিয়ালিজম আন্দোলনকারীদের ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং কয়েকজন আত্মহত্যা করেন, যেমন জাক রিগো, রেনে ক্রেভেল, আরশাইল গোর্কি, অসকার দোমিংগেজ প্রমুখ। অত্যধিক মাদক সেবনে মৃত্যু হয় গিলবার্ত লেকঁতে ও অঁতনা আতোর।

  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি লেনোর কানডেল | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৫৩732398
  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি লেনোর কানডেল-এর কবিতা ( ১৯৩২ - ২০০৯ )

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    ঈশ্বরের/প্রেমের কবিতা

    ভালোবাসার অন্য কোনো পথ নেই/কিন্তু/সুন্দর/

    আমি তোমার সবকিছু ভালোবাসি

    আমি তোমাকে ভালোবাসি/তোমার শিশ্ন আমার হাতে

    পাখির মতন চঞ্চল হয়ে ওঠে

    আমার আঙুলগুলোয়

    যেমন যেমন তুমি ফুলে বেড়ে ওঠো আর কঠিন হও আমার হাতে

    বাধ্য করো আমার আঙুলগুলোকে খুলতে

    তোমার শক্ত শক্তি

    তুমি সুন্দর/তুমি সুন্দর

    তুমি এক শতবার সুন্দর

    আমি আমার প্রেমের হাত দিয়ে তোমাকে আলোড়িত করি

    গোলাপি-নখ দীর্ঘ আঙুল

    আমি তোমাকে সোহাগ করি

    আমি তোমাকে আদর করি

    আমার আঙুলের ডগা...আমার হাতের তালু…

    তোমার লিঙ্গ উঠে দাঁড়ায় আর আমার হাতে স্পন্দিত হয়

    এক চমকপ্রদ জ্ঞান/যেমন আফ্রোদিতি জানতেন

    একটা সময়ে দরবতারা পবিত্র ছিলেন

    /আমি মনে করতে পারি লতাকুঞ্জের মধ্যে রাতগুলো

    আমাদের রস মধুর চেয়েও মিষ্টি

    /আমরা একইসঙ্গে ছিলুম মন্দির আর দেবতা/

    আমি তোমার সঙ্গে নগ্ন

    আর আমি আমার মুখ তোমাতে দিচ্ছি শ্লথতায়

    আমি অপেক্ষা করছি তোমাকে চুমু খাবার জন্য

    আর আমার জিভ তোমাকে পুজো করছে

    তুমি সুন্দর

    তোমার দেহ আমার কাছে এগিয়ে আসে

    মাংসের সঙ্গে মাংস

    ত্বক পিছলে যায় সোনালি ত্বকে

    যেমন আমার তোমাতে

    আমার মুখ আমার জিভ আমার হাত

    আমার তলপেট আর পাদুটি

    তোমার মুখে তোমার ভালোবাসায়

    অবাধে...অবাধে…

    আমাদের দেহ আলাদা হয় আর জোড়া লাগে

    অসহ্যভাবে

    তোমার মুখাবয়ব আমার ওপরে

    যাবতীয় দেবতাদের মুখাবয়ব

    আর সুন্দর রাক্ষসদের

    তোমার চোখ

    ভালোবাসা ভালোবাসাকে ছোঁয়

    মন্দির আর দেবতা

    এক

    সন্মতির বয়স

    দেবদূতদের সঙ্গে কথা না বলে আমি সন্তুষ্ট হই না

    আমি দেবতার চোখ দেখতে চাই

    যাতে ব্রহ্মাণ্ডে অলৌকিকতার টোপ দেবার জন্য নিজেরটা প্রয়োগ করতে পারি

    যাতে শ্বাস ফেলতে পারি আর বিষ ওগরাতে পারি

    যাতে ওই দরোজাটার তালা খুলতে পারি যেটা আগেই খোলা আর ঢুকতে পারি বর্তমানে

    যা আমি কল্পনা করতে পারি না

    আমি তার জবাব চাই যে প্রশ্নগুলো করতে এখনও শিখিনি

    আমি আলোকপ্রাপ্তিতে প্রবেসের দাবি করছি, অলৌকিকতার সংমিশ্রণে

    অসহ্য আলোর উপস্হিতিতে

    হয়তো সেই ভাবেই যেভাবে গুটিপোকারা তাদের উড়ালের ডানা দাবি করে

    কিংবা ব্যাঙাচিরা দাবি করে তাদের ব্যাঙজীবন

    কিংবা মানবসন্তান দাবি করে তার বেরোনো

    উষ্ণ গর্ভের সুরক্ষা থেকে

    প্রথমে ওরা দেবদূতদের জবাই করলো

    ১.

    প্রথমে ওরা দেবদূতদের জবাই করলো

    তারের দড়ি দিয়ে তাদের রোগা শাদা পা বেঁধে

    আর

    তাদের রেশমের কন্ঠ শীতল ছুরি দিয়ে চিরে

    মুর্গির বাচ্চার মতন ডানা ঝাপটিয়ে তারা মারা গেল

    আর তাদের অবিনশ্বর রক্ত জ্বলন্ত পৃথিবীকে ভিজিয়ে দিলো

    আমরা মাটির তলা থেকে তা দেখলুম

    সমাধিফলক থেকে, কবরের গুপ্তঘরে

    আমাদের হাড়গিলে আঙুল চিবিয়ে

    আর

    পেচ্ছাপে দাগ-ধরা গোটাবার চাদরে কাঁপতে লাগলো

    বিদায় নিয়েছে উচ্চশ্রেনির দূতেরা আর স্বর্গীয় দূতেরা

    ওরা ওদের খেয়ে ফেলেছে আর মজ্জার লোভে হাড় ফাটিয়েছে

    ওরা নিজেদের পাছা পুঁছেছে দেবদূতদের পালকে

    আর এখন তারা পাথুরে রাস্তায় হাঁটছে

    আগুনের গর্তের মতন চোখ নিয়ে

    ২.

    দেবদূতদের ব্যাপারে কে শাসকদের খবর দিয়েছে ?

    কে যিশুর শেষ-ভোজের পেয়ালা চুরি করেছে আর তা বদলে দিয়েছে একজগ মদ দিয়ে?

    কে গ্যাব্রিয়েলের সোনালি শিঙকে লোপাট করেছে ?

    তা কি কোনো ভেতরের লোক করেছিল ?

    কে দেবতার মেষশাবককে পুড়িয়ে খেয়েছে ?

    কে সন্ত পিটারের চাবিগুলো উত্তর সাগরতীরের

    পায়খানার মধ্যে ফেলেছে ?

    কে সন্ত মেরিকে ঘরসামলাবার ছাপ মেরেছে ?

    তা কি কোনো ভেতরের লোক করেছিল?

    আমাদের অস্ত্রগুলো কোথায় ?

    আমদের গদাগুলো কোথায়, আমাদের আগ্নেয়তীর, আমাদের বিষ-গ্যাস

    আমাদের হাতবোমা ?

    আমরা বন্দুকের জন্যে হাতড়াই আর আমাদের হাঁটুতে গজায় ক্রেডিট কার্ড।

    আমরা বাতিল চেক বমি করি

    দুই পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকি চাপের সামনে সাবান-মাখা মুখে ফুঁপিয়ে

    আমাদের রেডিওঅ্যক্টিভ চোখে

    আর চিৎকার করি

    শেষতম রাইফেলের জন্য

    পয়গম্বরি কামান

    ইস্টারের বোমা

    নারীদের গর্ভ চিরে শিশুদের বের করে আনে

    বেয়োনেট দিয়ে

    অন্ধ নার্সদের চোখে রক্ত ছেটাতে থাকে

    তাদেরই তরোয়ালে তাদের কচুকাটা করার আগে

    পুরুষদের লিঙ্গ হয়ে উঠেছে নীল ইস্পাতের মেশিনগান,

    বুলেট বীর্যপাত হয়, মৃত্যুকে ওরা অরগ্যাজমের মতন ছড়িয়ে দ্যায়

    ঝোপের ভেতরে প্রেমিকরা একে আরেকের লিঙ্গ ওপড়াতে থাকে

    লোহার নখ দিয়ে

    টাটকা রক্ত খেতে দেয়া হয় স্বাস্হ্যের জন্য বীজানুহীন

    কাগজের কাপে

    ক্লাবের সিফিলিসে ভোগা মেয়েরা তা এক ঢোঁকে গিলে ফ্যালে

    পেপিয়ার মাশে মুখোশ পরে

    প্রত্যেকে মুখ হাতে রাঙানো হ্যামলেটের মা

    দশ বছর বয়সে

    আমরা মাটির তলা থেকে দেখি

    আমাদের চোখগুলো দূরবীনের মতন

    আমাদের আঙুল ছুঁড়ে দিই কুকুরদের দিকে লজেঞ্চুসের জন্য

    তাদের ডাক থামাবার উদ্দেশে

    শান্তি বজায় রাখার খাতিরে

    বন্ধুত্ব করা আর প্রভাবিত করার জন্য

    ৩.

    বোমা পড়লে আশ্রয় নেবার কোলাপসিবল ঘরগুলো আমরা কোলাপস করে দিয়েছি

    আমরা জীবন বাঁচাবার গোটাবার নৌকোগুলো গুটিয়ে ফেলেছি

    আর বারোটা বাজবার পর

    সেগুলো ভেঙেচুরে ইঁদুরের গুয়ে জমে পাহাড় হয়েছে

    সার হয়েছে বিষাক্ত ফুলের জন্য

    আর ভিনাসকুঁজো গাছের জন্য

    মাটির তলায় আমরা গুঁড়ি মেরে থাকি

    আমাদের ছ্যাঁদাকরা বুক জড়িয়ে ধরি ছাতাপড়া বাহু দিয়ে

    আমাদের ছিন্ন শিরা থেকে টপটপ রক্ত পড়ার আওয়াজ শুনতে থাকি

    আমাদের চেনলাগানো খুলির ব্রহ্মতালু উপড়ে তুলি

    মস্তিষ্কে হাওয়া খেলানোর জন্য

    ওরা আমাদের দেবদূতদের খুন করেছে

    কৌতূহলীদের কাছে আমরা আমাদের দেহ আর সময় বিকিয়ে দিয়েছি

    আমরা আমাদের শৈশব বেচে দিয়েছি ডিশওয়াশার আর মিলশহরের বিনিময়ে

    আর নুন ঘষেছি রক্তাক্ত স্নায়ুতে

    অনুসন্ধানের সময়ে

    আর ওরা দেবতার খোলা মুখে হেগেছে

    ওরা সন্তদের শেকল বেঁধে ঝুলিয়েছে আর ওরা

    পয়গম্বরদের ঘুমের ইনজেকশান দিয়েছে

    ওরা ক্রিস্ট আর শিশ্ন উভয়কেই অস্বীকার করেছে

    আর বুদ্ধকে বলেছে স্কিৎসোফ্রেনিবার রোগী

    ওরা যাযকদের আর পবিত্র পুরুষদের নপুংসক করে দিয়েছে

    এমনকি প্রেমের শব্দগুলোকে সেনসর করেছে

    প্রতিটি মানুষের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা!

    আর তারা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একজন অবমানবকে বেছেছে

    প্রতিটি গৃহিণীর জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা!

    প্রতিটি ব্যবসাদারের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা !

    শিশুদের প্রতিটি স্কুলের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা !

    আর তারা দেবদূতদের খুন করেছে

    ৪.

    এখন গলিগুলোতে উভলিঙ্গীরা জড়ো হয় কুষ্ঠরোগিদের ঘণ্টা বাজিয়ে যেমন করে ধুনুচি জ্বালিয়ে দেবতাদের ধর্ষণ করার উৎসবের তোড়জোড় করে

    যে চর্বি ওদের ঠোঁটে চকচক করে তা দেবদূতদের দেহের

    যে রক্ত তাদের থাবায় জমে থাকে তা দেবদূতদের রক্ত

    ওরা রাস্তায় জড়ো হচ্ছে আর দেবদূতদের চোখ নিয়ে দাবা খেলছে

    ওরা শেষ মানুষদের প্রলয়ের জন্য গড়ে তুলছে

    ৫.

    এখন ভোরবেলার পরে

    আমরা মাটির তলায় পাথর সরাচ্ছি, গুহার ভেতর থেকে

    আমরা ফণিমনসার আঠায় পাওয়া দৃষ্টিপ্রতিভায় চোখ বড়ো করে তুলেছি

    আর দাঁত মেজেছি গত রাতের মদে

    আমাদের বগল ঠুসে বন্ধ করেছি ধুলোয় আর ছুঁড়ে দিয়েছি

    আর তর্পণ করেছি একে আরেকের পায়ে

    আর আমরা রাস্তায় ঢুকবো আর তাদের মধ্যে হাঁটবো আর লড়াই করব

    আমাদের রোগা ফাঁকা হাত তুলে ধরব ওপরে

    আমরা জগতের আগন্তুকদের মাঝে তিক্ত বাতাসের মতন প্রবেশ করব

    আর আমাদের রক্ত গলিয়ে ফেলবে লোহা

    আমাদের শ্বাস গলিয়ে ফেলবে ইস্পাত

    আমরা খোলা চোখে মুখোমুখি দাঁড়াব

    আর আমাদের চোখের জল ঘটাবে ভূকম্পন

    আর আমাদের বিলাপ পাহাযগুলোকে উঁচু করে তুলবে

    সূর্যের পথচলা থামিয়ে দেবে

    ওরা আর কোনো দেবদূতকে খুন করতে পারবে না !

    সঙ্গমের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করা

    সঙ্গমের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করা

    ভালোবাসার সমস্ত উষ্ণতা আর আরণ্যকতা নিয়ে সঙ্গম করা

    তোমার মুখের জ্বর আমার তাবৎ গোপনীয়তা আর অজুহাত খেয়ে ফেলছে

    আমাকে রেখে যাচ্ছে বিশুদ্ধ জ্বলন্ত নিঃশেষে

    এই মিষ্টতা সহ্য করা কঠিন

    মুখ প্রায় ছুঁচ্ছে না মুখকে

    স্তনবৃন্তের সঙ্গে স্তনবৃন্ত আমরা ছুঁইয়েছি

    আর আমরা হয়ে গেছি সহসা অসাড়

    এক তেজোময়তার স্রোতে

    যা কিছু আমি এতোকাল জেনেছি তার অতিরিক্ত

    আমরা স্পর্শ করলুম

    আর দুই দিন পরে

    আমার হাত জড়িয়ে ধরল তোমার ধাতুরসাসিক্ত শিশ্ন

    আবার !

    তেজোময়তা

    বর্ণনাতীত

    প্রায় অসহনীয়

    প্রপঞ্চগুণহীন বস্তু আর প্রপঞ্চের মাঝের আড়াল

    অতিক্রম করে

    বৃত্ত সাময়িকভাবে পরিপূর্ণ

    ক্রিয়ার ভারসাম্য

    নিখুঁত

    একসঙ্গে পাসাপ[আশি, আমাদের দেহ ভালোবাসায় মজে যাচ্ছে

    যা কখনও মজেনি এর আগে

    আমি তোমার কাঁধে চুমু খাই আর তা থেকে লালসার গন্ধ বেরোয়

    কামদগ্ধ দেবদূতদরা নক্ষত্রদের সঙ্গে সঙ্গম করছে

    আর চিৎকার করে স্বর্গকে জানাচ্ছে তাদের অপ্রশমণীয় আনন্দ

    ধুমকেতুদের লালসা ধাক্কা খাচ্ছে অপার্থিব মৃগিরোগে

    স্ত্রীপুরুষ লক্ষণান্বিত দেবতারা পরস্পরের সঙ্গে

    অচিন্ত্যনীয় কাজ করছে

    চিৎকার করেসমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে আর তা অতিক্রম করে

    ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের আহ্লাদ

    আর আমরা পাসাপাশি, আমাদের দেহ ভিজে আর জ্বলন্ত,

    আর

    আমরা ফোঁপাই আমরা ফোঁপাই আমরা ফোঁপাই অবিশ্বাস্য চোখের জলে

    যা সন্তরা আর পবিত্র মানুষেরা ঝরিয়েছে

    তাদের নিজেদের জ্যোতির্ময় দেবতাদের সামনে

    আমি কানে কানে তোমার প্রতিটি রোমকূপে ভালোবাসা জানিয়েছি

    যেমন তুমি জানিয়েছ

    আমাকে

    আমার সমস্ত দেহ হয়ে উঠেছে যোনিমুখ

    আমার পা আমার হাত আমার তলপেট আমার বুক আমার কাঁধ আমার চোখ

    তুমি তোমার জিভ দিয়ে

    আমাকে অবিরাম সঙ্গম করো তোমার দৃষ্টি দিয়ে

    তোমার কথা দিয়ে তোমার উপস্হিতি দিয়ে

    আমরা অন্য মূর্তিতে বদলে যাচ্ছি

    আমরা কোমল উষ্ণ আর কম্পনরত

    নতুন সোনালি প্রজাপতির মতন

    তেজোময়তা

    বর্ণনাতীত

    প্রায় অসহনীয়

    রাতের বেলায় অনেক সময়ে আমি দেখি তোমার দেহ উদ্ভাসিত

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতা/কবিতা

    ভালোবাসার যুবক গ্রিক দেবতাকে প্রণাম যিনি তরুণীদের সঙ্গে সঙ্গম করেন!

    কেবল দেবতারাই অমন ঔদার্য্য পছন্দ করেন

    সবায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন সুষমা

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম ! যিনি সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসেন

    আর তা সর্বত্র পান

    হে ভালোবাসার গ্রিক দেবতা আমি তোমাকে আর তোমার দেবীদের দেখেছি

    ভালোবাসার কামনার কুয়াশায় মোড়া ফুলের মতন সত্য

    যা নিজের দিনে ফোটে আর বাতাসে হারিয়ে যায়

    আমি তোমার চোখ দেখেছি আহ্লাদে ধিকিধিকি জ্বলছে

    যখন তুমি তোমার সুন্দর জিভ দিয়ে মিষ্টি মননের সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসছিলে

    আর তারপর দেখেছি একই আহ্লাদের গভীরতায় ঝিকমিক করছে

    যখন কোমল রমণীরা তোমার বাহুতে শুয়েছিল

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম ! যিনি প্রেমকে সঞ্চয় করে রাখেন না

    বরং তা খরচ করে ফ্যালেন সোনালি ছাঁকনিতে জলের মতন

    ভাগাভাগি করে নেন নিজের কোমল খেয়ালি গরিমা

    সকলের সঙ্গে যারা তাঁর উপস্হিতিকে মান্যতা দেয়

    ফুলের মতন অবিশ্বস্ত, বাতাস-তাড়িত প্রজাপতির মতন চপল

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম, তিনি দেবতাদের বালক !

    যিনি কেবল সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসেন

    আর তা খুঁজে পান সর্বত্র

    ফিনিক্সের গান

    তাহলে আমি আর বড়ো হবো না

    যদি শিশু বলতে বোঝায় বিস্ময়ের বোধ

    আমার বৃষ্টিময় বাতাসে আমার মাথায় থাকে বৃষ্টি

    আমি সময়ের আগুনে উধাও হবো না

    বরং নিজেকে ফিনিক্স হিসাবে প্রমাণ করব

    ( নক্ষত্রের গুঁড়োর মতন ছাই )

    আবার জন্ম আর আবার আর আবার

    স্বৈরাচারীদের জন্য কবিতা

    সংবেদনশীল মানুষেরা অসংখ্য--

    আমি প্রতিজ্ঞা করেছি তাদের আলোকিত করব

    --বুদ্ধধর্মের প্রথম সঙ্কল্প

    মনে হয় তোমাকেও ভালোবাসতে হবে

    সুন্দরদের ভালোবাসা সহজ

    শিশুদের সকালের গরিমা

    সহজ ( যেমন যেমন সমবেদনা বৃদ্ধি পায় )

    অচেনাকে ভালোবাসা

    অনুধাবন করা আরও সহজ ( সমবেদনায় )

    তাতে যে ব্যথা আর সন্ত্রাস লুকিয়ে আছে

    যারা নিজেদের চারিপাশের জগতকে

    হিংস্রতার সঙ্গে পরিচালনা করেন এতো ঘৃণা

    কিন্তু ওহ আমি যিশুখ্রিস্ট নই যে

    আমাকে যারা ফাঁসি দেয় তাদের আশীর্বাদ করবো

    আমি বুদ্ধ নই কোনো সন্ত নই

    আমার সেই জ্যোতির্ময় ক্ষমতাও নেই

    বিশ্বাসে আলোকিত


    তবু তা সত্তেও

    তুমি একজন সংবেদনশীল মানুষ

    এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছ

    এমনকি আমিও একজন সংবেদনশীল মানুষ

    এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি

    চাইছি নিজের আলোকপ্রাপ্তি

    তোমার জন্যেও চাইতে হবে

    যদি আমার যথেষ্ট ভালোবাসা থাকে

    যদি আমার যথেষ্ট বিশ্বাস থাকে

    হয়তো আমি তোমার পথকে পার হতে পারবো

    আর তাকে বদলাতেও পারব

    আমাকে ক্ষমা করুন, তাহলে--

    আমি এখনও আপনাকে ভালোবাসতে পারব না

  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি ডায়ানে ডি প্রিমা | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৫৫732399
  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি ডায়ানে ডি প্রিমা-র কবিতা। অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    প্রথম তুষার, কেরহঙ্কসন

    অ্যালান-এর জন্য

    এটা, তাহলে, পৃথিবী আমাকে যা উপহার দিয়েছে

    ( তুমি আমাকে দিয়েছ )

    নরম তুষার

    কোটরে মুঠোমাপের

    পুকুরের জলের ওপরে পড়ে আছে

    দেখতে আমার দীর্ঘ মোমবাতির সমান

    যা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে

    যা সন্ধ্যায় জ্বলবে যখন তুষার

    ভরে তুলবে উপত্যকাকে

    এই কোটর

    কোনো বন্ধুই নেমে যাবে না

    কেউই মেক্সিকো থেকে বাদামি আসবে না

    ক্যালিফোর্নিয়ার সূর্যভূমি থেকে, মাদক নিয়ে

    তারা এখন ছড়ানো, মৃত বা নিঃশব্দ

    উন্মাদনায় ফাটানো

    আমাদের সমবেত দৃষ্টিচেতনার চিৎকাররত ঔজ্বল্য দিয়ে

    আর তোমার এই উপহার--

    শাদা নৈঃশব্দ্য ভরে তুলছে আমার জীবনের বর্ণালী-নকশা।

    নববর্ষের বৌদ্ধ গান

    আমি তোমাকে সবুজ মখমলে দেখলুম, ঝোলাহাতা পোশাক

    আগুনের সামনে বসে আছ, আমাদের বাড়ি

    কোনোরকমে করে তোলা হয়েছে আরও সৌষ্ঠবপূর্ণ, আর তুমি বললে

    “তোমার চুলে নক্ষত্র রয়েছে”-- এই সত্য আমি

    নিজের সঙ্গে নিয়ে এলুম

    এই প্যাচপ্যাচে আর নোংরা জায়গায় যাকে আমরা করে তুলব সোনালি

    করে তুলব দামি আর কিংবদন্তিপ্রতিম, এটা আমাদের স্বভাব,

    আর এটাই সত্য, যে আমরা এখানে এসেছি, আমি তোমাকে বললুম,

    অন্য গ্রহ থেকে

    যেখানে আমরা ছিলুম দেবীদেবতা, আমাদের এখানে পাঠানো হয়েছে,

    কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে

    যে সোনালি মুখোশ আমি আগে দেখেছিলুম, তা খাপ খেয়ে গেলো

    তোমার মুখে এতো সুন্দরভাবে, ফেরত দিলে না

    ষাঁড়ের মুখ তুমি যোগাড় করেছিলে সেটাও

    উত্তরের লোকজনদের মাঝে, যাযাবরের দল, গোবি মরুভূমি

    ওই তাঁবুগুলো আমি আর দেখিনি, ওয়াগনগুলোকেও নয়

    অত্যন্ত ঝোড়ো উপত্যকায় অত্যন্ত শ্লথ,

    এতো ঠাণ্ডা, আকাশে প্রতিটি নক্ষত্রের ভিন্ন-ভিন্ন রঙ ছিল

    আকাশ নিজেই একটা জট পাকানো রঙচঙে পর্দা, ঝলমল করছিল

    কিন্তু প্রায়, আমি সেই গ্রহ দেখতে পাচ্ছিলুম যেখান থেকে আমরা এসেছি

    আমি মনে করতে পারিনি ( তখন ) আমাদের উদ্দেশ্য কি ছিল

    কিন্তু মহাকাল নামটা মনে ছিল, ভোরবেলায়

    ভোরবেলায় শিবকে প্রত্যক্ষ করলুম, শীতল আলো

    মেলে ধরল “মননপ্রসূত” জগতগুলো, তেমনই সহজ,

    আমি দেখলুম তাদের প্রচার, বয়ে যাচ্ছে,

    কিংবা, সহজভাবে বললে, একটা আয়না আরেকটাকে প্রতিবিম্বিত করছিল।

    তারপর আয়নাগুলো ভেঙে ফেললুম, তোমাকে আর দেখতে পেলুম না

    কিংবা কোনো উদ্দেশ্য, এই নতুন কালোময়তার দিকে তাকিয়ে রইলুম

    মননপ্রসূত জগতগুলো বিদায় হলো, আর মন হয়ে গেল স্তব্ধ :

    এক উন্মাদনা, নাকি এক সূত্রপাত ?

    ভালোবাসার একটি অনুশীলন

    জ্যাকসন অ্যালেনের জন্য

    আমার বন্ধু আমার স্কার্ফ নিজের কোমরে বেঁধে রাখে

    আমি ওকে দিই চন্দ্রকান্তমণি

    ও আমাকে দেয় ঝিনুক আর সমুদ্রগাছালি

    ও আসে অনেক দূরের শহর থেকে আর আমি ওর সঙ্গে দেখা করি

    আমরা একসঙ্গে বেগুনচারা আর সেলেরিশাক পুঁতবো

    ও আমাকে কাপড় বুনে দেয়

    অনেকে উপহার এনেছে

    আমি সেগুলো ওর আনন্দের জন্য কাজে লাগাই

    রেশম আর সবুজ পাহাড়

    আর ভোরবেলার রঙের সারস

    আমার বন্ধু আলতোভাবে হাঁটে বাতাসে বোনার মতন

    ও আমার স্বপ্নগুলোকে আলো দেখায়

    ও আমার বিছানার পাশে বেদি তৈরি করে দিয়েছে

    আমি ওর চুলের গন্ধে জেগে উঠি আর মনে করতে পারি না

    ওর নাম, কিংবা আমার নিজের।

    জানালা

    তুমি আমার রুটি

    আর চুলের সিঁথে

    আওয়াজ

    আমার হাড়গুলোর

    তুমি প্রায়

    সমুদ্র

    তুমি পাথর নও

    কিংবা লাভায় গড়া শব্দ

    আমার মনে হয়

    তোমার হাত দুটো নেই

    এই ধরণের পাখি পেছন দিকে ওড়ে

    আর এই ভালোবাসা

    জানালার কাচে ভেঙে যায়

    যেখানে কোনো আলো কথা বলে না


    এখন সময় নয়

    জিভ জড়াবার

    ( বালি এখানে

    কখনও সরে না )

    আমার মনে হয়

    আগামীকাল

    তোমাকে ওর বুড়ো আঙুলে বদলেছে

    আর তুমি

    ঝকমক করবে

    ঝকমক

    আর ঝকমক

    যা খরচ হয়নি আর মাটির তলায়

    খুকি-ও’র গান, যার জন্ম হয়নি

    হৃদয়খুকি

    যষখন তুমি চিরে বেরোবে

    তুমি পাবে

    এখানে একজন কবি

    তেমন নয় যা কেউ বেছে নেবে।

    আমি কথা দেবো না

    তুমি কখনও ক্ষুধার্ত থাকবে না

    কিংবা তুমি কখনও দুঃখ পাবে না

    এই পোড়া

    ভাঙাচোরা

    ভূ-গোলকে

    কিন্তু আমি তোমাকে দেখাতে পারি

    খুকি

    যথেষ্ট ভালোবাস দিয়ে

    তোমার হৃদয়কে যা ভেঙে ফেলবে

    চিরকালের জন্য

    “মেয়েটিই বাতাস”

    মেয়েটিই বাতাস যাকে তুমি ছেড়ে যাবে না

    কালো বিড়ালকে তুমি মেরে ফেললে ফাঁকা গ্যারাজে, মেয়েটি

    গ্রীষ্মকালের ঝোপজঙ্গলের গন্ধ, এমন একজন যে

    উঁকি দেয় ছেলেবেলার খোলা আলমারিতে, মেয়েটি কাশে

    পাশের ঘরে, শিস দেয়, তোমার চুলের পাখির বাসায়

    সে ডিম পাড়ে

    জানালার দিকে মুখ করে

    মেয়েটি

    তোমার আগুনচিমনির বাঁশি, শ্বেতপাথরের প্রতিমা

    ম্যান্টলপিসে খোদাই-করা

    যে রাতের বেলায় অপেক্ষা করে।

    মেয়েটি প্রাচুর্যদায়িকা

    যে রাতে কাঁদে, মৃত্যুর বাঁধন

    তুমি ছিঁড়তে পারবে না, কালো সজল চোখ

    ঝোপের পেছনে উন্মাদ মেয়েরা ক্যারল গাইছে, মেয়েটি

    তোমার বিদায়গুলোর শিস।

    সবুজ মণীতে কালো কণা, আওয়াজ

    নিঃশব্দ প্রণাম থেকে, মেয়েটি

    পুড়ে যাওয়া দেয়ালপর্দা

    তোমার মস্তিষ্কে, আগুনরঙা আলখাল্লা

    পালকের তৈরি তোমায় নিয় চলে যায়

    পাহাড়ের বাইরে

    যখন তুমি আগুন হয়ে দৌড়োও

    নীচের দিকে

    কালো সমুদ্রে

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৮ আগস্ট ২০২০ ২০:৩১732486
  • বাসন মাজা

    ম ল য় রা য় চৌ ধু রী

    রবীন্দ্রনাথ, আপনি কখনও বাসন মাজেননি সেটা জানি

    কেননা আপনি তো গুরুদেব যাঁরা বল্মীকের ভেতরে থাকেন

    বুদ্ধদেব বসু মহাশয়, রান্নাপটু, উনিও মেজেছেন কিনা সন্দেহ

    জীবনানন্দ বউকে একই সঙ্গে ভালো ও খারাপ বাসতেন

    ডায়েরিতে আইনস্টাইনি ফরমুলায় বলেননি বাসন মাজার কথা

    এবং বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন দত্তেরা জানি না জানতেন কিনা

    কাজের মেমরা এসে কোথায় বাসন মাজেন ! অলোকরঞ্জন থাকেন

    অর্ধেক বিদেশে আর বাকি হাফ দেশে ; আলোক সরকারও

    হয়তো জানতেন না বাজারে এসে গেছে বাসন মাজাকে কবিতার চেয়ে

    সহজ করার জন্য ঝুরোসাবান তারের নানান জালিকা।

    মহিলা ও পুরুষ কবিদের এটাই তফাত — অনেকে জানে না।

    আমি আর দাদা শৈশব থেকে শিখেছি বাসন মাজার কারিকুরি

    এখন তা কাজে দিচ্ছে ; বুড়ি তো ঝুঁকতে পারে না, আমি পারি

    এই বয়সেও রোজই বাসন মাজি ফুলঝাড়ু দিই বুঝলেন আলবেয়ার ক্যামু

    গারসিয়া মার্কেজ — প্লেগ নয়, করোনা ভাইরাসের দিনে বুড়ো-বুড়ি প্রেম !

  • মলয় রায়চৌধুরী | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৯:৪২732851
  • আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশের দুর্ভোগ

    মলয় রায়চৌধুরী

    আমার কবিতার বইই কেবল নয়, আমার প্রথম বই বেরোনো নিয়েও বেশ ঝামেলা হয়েছিল। প্রথম বইটা ছিল ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ ; প্রকাশক শক্তি চট্টোপাধ্যায়, হ্যাঁ, প্রখ্যাত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। দ্বিতীয়টি কবিতার বই, ‘শয়তানের মুখ’ ; প্রকাশক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কৃত্তিবাস প্রকাশনী, হ্যাঁ, প্রখ্যাত কবি এবং ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দাদা সমীর রায়চৌধুরীর সিটি কলেজের সহপাঠী। এনারা দুজনে আমাদের পাটনার বাড়িতে অনেকবার এসেছেন, থেকেছেন, মায়ের হাতের রান্নার প্রশংসা করেছেন।


     

    দাদার চাইবাসার বাড়িতে ১৯৫৯ থেকে প্রায় আড়াই বছর ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তার কারণ দাদার শালি শীলা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রেম করতেন, এবং তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো শীলাকে পাওয়া ও না-পাওয়া নিয়ে। প্রেম করতেন বলে নিজেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতেন শক্তি, মহুয়ার মদ খাওয়া ও মাতলামি ছাড়া। দাদার মনে হয়েছিল, তাঁর নিকটবন্ধু শক্তি লোকটা ভালো ; তাই ওনাকে ভার দেন প্রকাশক খুঁজে বইটা কলকাতায় প্রকাশ করার। টাকা আমিই দিয়েছিলুম। শক্তি পাণ্ডুলিপিটা কোনও ছাপাখানায় দিয়ে তাদের বলেন ছাপা-বাঁধাই করে বইটা রেডি করে দিতে ; কেউই প্রুফ দ্যাখেনি, প্রচ্ছদ এঁকেছিল প্রেসের কোনো কর্মী। ফলে ১৯৬২ সালে আমার এই বইটা হয়েছিল ডিজ্যাসটার। আমি ক্রুদ্ধ হয়ে ওনার উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনে পেট্রল ঢেলে বইগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিই ; প্রচুর লোক জড়ো হয়ে গিয়েছিল এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই দৃশ্য দেখে সেখান থেকে কেটে পড়েছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে বলেছিলেন, “তুমি কি জানতে না শক্তি কেমন মানুষ?” প্রশ্নের ভেতরে যে উষ্মা লুকিয়ে ছিল, তা হল, ওনাকে বাদ দিয়ে কেন শক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হলো !


     

    দাদার চাইবাসার বাড়িতে পুরো কৃত্তিবাস গোষ্ঠী গিয়ে জড়ো হতেন, অবশ্যই দাদার খরচে। তাঁদের গল্প-উপন্যাসে সেখানকার ঘটনা প্রচুর পাওয়া যাবে। সুনীলের “অরণ্যের দিনরাত্রী”, সন্দীপনের “জঙ্গলের দিনরাত্রী” আর শক্তির “কিন্নর কিন্নরী” চাইবাসার ঘটনাবলী নিয়ে লেখা। প্রসঙ্গক্রমে বলি, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি চিঠি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে। যে চিঠিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক আদিবাসী যুবতীর শরীর ছুঁয়ে '‌মজা নেওয়া'‌র চেষ্টা নিয়ে রসিকতা করেছেন সন্দীপন। এবং সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেছেন ভিড় বাসে অল্পবয়সি মেয়েদের শরীর ছুঁয়ে থাকার। চিঠিটি পরিচিত এবং বহুল প্রচলিত। সন্দীপনের অন্তত দুটি চিঠিপত্রের সংকলনে সগর্বে জায়গা পেয়েছে সেটি। একথা এখানে বলে নিলুম পরের ঘটনাগুলোর খাতিরে।


     

    এবার আসি প্রথম কবিতার বইয়ের প্রসঙ্গে। ১৯৫৮ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর ‘একা এবং কয়েকজন’ বইটা দাদা নিজের টাকায় প্রকাশক হিসাবে ছাপিয়ে ছিলেন, প্রকাশনার নাম দাদা দিয়েছিলেন ‘সাহিত্য প্রকাশক’। আমি আমার কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপিটা প্রথমে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে দিয়েছিলুম ওনার মতামত জানার জন্য ; সন্দীপন বলেছিলেন “শয়তানের মুখ’ বদলে অন্য নাম দিতে। নামটা পালটাইনি, কেননা ক্যাথলিক স্কুলে পড়ার দরুন শয়তান-ঈশ্বরের বাইনারি অপোজিট তখনও আমার মগজে গিজগিজ করছিল। তাছাড়া প্রচ্ছদ তৈরি হয়ে গিয়েছিল, মেকসিকোর আঁকিয়ে কার্লোস কফিনের আঁকা, একেবারে নতুন ধরনের, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সেসময়ে আরজেনটিনা-নিবাসী লেখিকা ও সম্পাদিকা মার্গারেট রেনডাল। মার্গারেট লাতিন আমেরিকার সরকারবিরোধী আন্দোলনগুলোয় অংশ নেবার দরুন, আমেরিকার নাগরিকত্ব খুইয়েছিলেন ; এখন ফিরে পেয়েছেন।


     

    সন্দীপনকে পাণ্ডুলিপি পড়তে দেয়াটাই হয়েছিল ব্লাণ্ডার। প্রথমে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে প্রথম বইয়ের ভার দেয়া আর তারপর সন্দীপনকে পাণ্ডুলিপি দেয়া, যাঁর কিনা, সুনীলের মতে, কবিতা সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল না। বন্ধুদের ভেতরকার সাংস্কৃতিক রাজনীতি তখন বুঝতুম না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন যে বইটা উনি কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বের করবেন। আমার মনে হয় যে দাদা ওনার বই ছাপিয়ে দিয়েছিলেন বলে উনি প্রতিদান হিসেবে আমার বইটা কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বের করতে রাজি হলেন, তবে আমার খরচে। দাদার বই “ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি” এবং “আমার ভিয়েৎনাম” কাব্যগ্রন্হ দুটো উনি কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেছিলেন, বলা বাহুল্য, দাদার টাকায়। কৃত্তিবাস পত্রিকা প্রকাশ করার জন্যও দাদা আর্থিক সাহায্য করতেন, তা “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইটা পড়লেই জানা যাবে। সুনীল নিজেও “হাওয়া৪৯” পত্রিকায় দাদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেকথা স্বীকার করেছেন।


     

    ইতিমধ্যে “হাংরি আন্দোলন” আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, পাটনায় ১৯৬১ সালের নভেম্বরে একটি কবিতার ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমে টের পাননি যে এই আন্দোলন ক্রমশ উথালপাথাল ঘটাতে থাকবে। উনি ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন আর ব্যস্ত ছিলেন আয়ওয়া পোয়েট্রি ওয়র্কশপে যোগ দেবার কাগজপত্র-পাসপোর্ট-ভিসা ইত্যাদি নিয়ে। আমার কাব্যগ্রন্হ অনুমোদন করে উনি রওনা দিলেন আমেরিকা। এদিকে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার শুরু হয়েছিল বিভিন্ন এলিট মহলে ও কাগজপত্রে, যে, কলকাতার কোনও প্রেস আমার বইটা ছাপতে রাজি হচ্ছিল না, আমার নামটা তখন বেশ ভীতিকর। দাদার এক বন্ধু বহরমপুরে সমবায় প্রেস খুলেছিলেন, সিগনেস প্রিন্টিঙ, তিনি ঘটনা জানতে পেরে বললেন সবকিছু ওনাদের পাঠিয়ে দিতে, ওনারা বই রেডি করে রিপন স্ট্রিটে একজন প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে দেবেন। প্রকাশকের নাম ও তাঁর বাড়ির ঠিকানা ৩২/২ যোগীপাড়া রোড, কলকাতা - ২৮ দেখে ওনারা অবাক হন ; মণীশ ঘটক থাকতেন বহরমপুরে, উনিও অবাক হন।


     

    বই তো বেরিয়ে গেল, বিতরণও আরম্ভ করলুম বন্ধুদের ও তখনকার তরুণ কবিদের ; অনেকে পরে বইটার কপি বাড়িতে রাখেননি, পুলিশের ভয়ে, যখন আমার বিরুদ্ধে মামলা আরম্ভ হল। হাংরি আন্দোলনের সদস্যরা ভাবছিল মলয় ঢুকে পড়েছে কৃত্তিবাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে। আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বন্ধুরা ওনাকে চিঠি লিখে আমার বিরুদ্ধে নানারকম গল্প পৌঁছে দিচ্ছিলেন। তাঁর বন্ধুদের সেই সব চিঠিগুলো সুনীল তাঁর “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইতে কেন দেননি তা বোধহয় খোলোশা করার দরকার নাই। এই বইটায় কিন্তু সবচেয়ে বেশি সংখ্যক চিঠি আছে আমার, তবে আমার যে চিঠিটা পড়ে উনি রাগে রি-রি করে আমাকে আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখেছিলেন তা অন্তর্ভুক্ত করেননি।


     

    কলকাতায় যে কী ঘটছে সুনীল আঁচ করতে পারছিলেন না, আর ভাবছিলেন যে উনি যদি দ্রুত না ফেরেন তাহলে হাংরি আন্দোলন ওনার ইতিহাসের উড়ন্ত মাদুরটা কেড়ে নেবে। এতোটাই ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ ও আশঙ্কিত হয়েছিলেন যে নিজের অনুমোদন করা আমার কাব্যগ্রন্হটিকে উনি পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেননি। ব্যাপারটা বেশ মজার, কেননা, হাংরি আন্দোলনের খবরে উনি বেদম চটে গিয়েছিলেন, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার পত্রপত্রিকায় আমাদের আন্দোলনের সংবাদ ও ফোটো প্রকাশিত হচ্ছিল এবং সেই কাগজগুলো আয়ওয়ার গ্রন্হাগারেও যাচ্ছিল অথচ উনি কাউকে কিছুই বোঝাতে পারছিলেন না। উনিও আয়ওয়া থেকে বন্ধুদের চিঠিপত্র লিখছিলেন নিশ্চয়ই ; গবেষকরা তা খুঁজে পাবেন আশা করি, যদি না নষ্ট করে ফেলা হয়ে থাকে। আমি কোনও পত্রিকায় আমার বইটা রিভিউ করতে দিইনি। তখনকার দিনে লিটল ম্যাগাজিন বেশি ছিল না ; যাও বা ছিল সবই এলিট সম্পাদকদের নিয়ন্ত্রণে।


     

    আয়ওয়া থেকে লেখা সুনীলের চিঠিটার অংশ এখানে দিলুম। এখানে সুনীল আমার যে চিঠির উল্লেখ করেছেন তা স্বাভাবিক কারণে ওনার “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইতে নেই। এই চিঠিতে আমার বই সম্পর্কে ওনার কোনও আগ্রহ দেখাননি।

    আয়ওয়া, আমেরিকা, ১০ জুন ১৯৬৪

    মলয়,

    তুমি কলকাতায় কি সব কাণ্ডের বড়াই করে চিঠি লিখেছ জানি না। কী কাণ্ড করছ ? আমার বন্ধু-বান্ধবদের কেউ-কেউ ভাসা-ভাসা লিখেছে বটে কফিহাউসে কী সব গণ্ডোগোলের কথা।

    কিছু লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার লক্ষ্য বেশি। রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো? এসব কিছু না --- আমার ওতে কোনো মাথাব্যথা নেই। যত খুশি আন্দোলন করে যেতে পারো --- বাংলা কবিতার ওতে কিছু আসে যায় না। মনে হয় খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার। পেতেও পারো, বলা যায় না। আমি এসব আন্দোলন কখনো করিনি ; নিজের হৃৎস্পন্দন নিয়ে আমি এতই ব্যস্ত।

    আমি নিজে তো এখনও কিছুই লিখিনি, লেখার তোড়জোড় করছি মাত্র ; কিন্তু তোমার মতো কবিতাকে 'কমার্শিয়াল' করার কথা আমার কখনো মাথায় আসেনি। বালজাকের মতো আমি আমার ভোকাবুলারি আলাদা করে নিয়েছি কবিতা ও গদ্যে। তোমার প্রতি যতই আমার স্নেহ থাক মলয়, কিন্তু তোমার কবিতা সম্বন্ধে এখনো কোনোরকম উৎসাহ আমার মনে জাগেনি। প্রতীক্ষা করে আছি অবশ্য।

    অনেকের ধারণা যে পরবর্তী তরুণ জেনারেশানের কবিদের হাতে না রাখলে সাহিত্যে খ্যাতি টেকে না। সে জন্যে আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কেউ-কেউ একসময় তোমাদের মুরুব্বি হয়েছিল। আমি ওসব গ্রাহ্য করি না। নিজের পায়ে আমার যথেষ্ট জোর আছে, এমনকী একা দাঁড়াবার। আমার কথা হল : যে-যে বন্ধু আছ কাছে এসো, যে ভালো কবিতা লেখো কাছে এসো --- যে-যে বন্ধু নও, বাজে কবিতা লেখো, দূর হয়ে যাও কাছ থেকে। বয়সের ব্যবধান তোলা আমার কাছে অত্যন্ত ভালগার লাগে।

    চালিয়ে যাও ওসব আন্দোলন কিংবা জেনারেশানের ভণ্ডামি। আমার ওসব পড়তে কিংবা দেখতে মজাই লাগে। দূর থেকে। সাহিত্যের ওপর মৌরসি পাট্টা বসাতে এক-এক দলের অত লোভ কী করে আসে, কী জানি। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো। আমাকে দেখেছ নিশ্চয় শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ। আমি তাই-ই, যদিও গায়ে পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে। সুতরাং, তোমাদের উচিত আমাকে দূরে-দূরে রাখা, বেশি খোঁচাখুঁচি না করা। নইলে হঠাৎ উত্তেজিত হলে কী করব বলা যায় না। জীবনে ওরকম উত্তেজিত হয়েছি পৌনে এক বার। গত বছর। দুএকজন বন্ধুবান্ধব ও-দলে আছে বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশান গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সে ক্ষমতা রাখি, জেনে রেখো। তবে এখনও ইচ্ছে নেই ও-খেলাঘর ভাঙার।

    আশা করি শারীরিক ভালো আছ। আমার ভালোবাসা নিও। সুনীলদা

    একই সময়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠির অংশবিশেষ, যা থেকে স্পষ্ট যে আমার কাব্যগ্রন্হ সম্পর্কে তাঁর কোনও আগ্রহ না থাকলেও আমার সাহিত্যিক কাজকারবারের দিকে তিনি নজর রেখেছিলেন :-


     

    15 June 1964, 313 South Capital, Iowa City, Iowa, USA

    সন্দীপন,

    কী ভালো লেগেছিল আপনার চিঠি পেয়ে। বিশেষত লাল পেনসিলের অক্ষর। । আমার কবিতার জন্য আপনাকে ভয় করি না, কবিতা লেখার ক্ষমতার ওপর আমার বেশি আস্হা নেই, আপনি যেরকম কবিতা ভালোবাসেন, অথবা যাই হোক --- আমি সেরকম কখনও লিখব না। আমি কবিতা লিখি গদ্যের মতো, ওরকমই লিখে যাবো। ও সম্বন্ধে আমার কোনো দ্বিধা নেই। শক্তি অসাধারণ সুন্দর বহু লাইন লিখেছে। আমার চেয়ে অনেক বড়, আমি ওকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু শক্তির কবিতা মুণ্ডহীন, আমি ওরকম লিখতে পারব না, চাই না, কারণ আমি ওরকম ভাবে বেঁচে নেই। বরং উৎপলের কবিতা আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করছে।

    দু-দিন পর আজ সকালে আবার আপনার চিঠি পেলুম। কি সব লিখেছেন কিছুই বুঝতে পারলুম না। কেউ আমাকে কিছু লেখেনি। শরৎ ও তারাপদ কফিহাউসে কি সব গণ্ডোগোলের কথা ভাসা-ভাসা লিখেছে। সবাই ভেবেছে অন্য কেউ বুঝি আমাকে বিস্তৃত করে লিখেছে। কিন্তু আপনার চিঠি অত্যন্ত অস্বস্তিজনক। তিনবার পড়লুম, অস্বস্তি লাগছে।

    সন্দীপন, আপনি অনেকদিন কিছু লেখেননি, প্রায় বছরতিনেক। তার বদলে আপনি কুচোকাচা গদ্য ছাপিয়ে চলেছেন এখানে সেখানে। সেই স্বভাবই আপনাকে টেনে নিয়ে যায় হাংরির হাঙ্গামায়। আমি বারণ করেছিলুম। আপনি কখনও আমাকে বিশ্বাস করেননি। ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন। আমি শক্তিকে কখনও বারন করিনি, কারণ আর যত গুণই থাক --- শক্তি লোভী। শেষ পর্যন্ত উৎপলও ওই কারণে যায়। কিন্তু আমি জানতুম আপনি লোভী নন।

    হাংরির এই ইংরেজি মতলোব ছাড়া, বাংলা দিকটা আরও খারাপ। ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই। শর্টকাটে খ্যাতি বা অখ্যাতি পাবার চেষ্টা --- অপরকে গালাগাল বা খোঁচা দিয়ে। আপনি মলয়কে এত পছন্দ করছেন --- কিন্তু ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে, আপনি নিশ্চই মনে-মনে বিশ্বাস করেন না। আমি চলে আসার পরও আপনি হাংরির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন --- হিন্দি কাগজের জন্য আপনি কি একটা লিখেছিলেন --- তাতেও হাংরির জয়গান। ভাবতে খুব অবাক লাগে --- আপনার মতো অ্যাব্সট্র্যাক্ট লেখক কী করে ইলাসট্রেটেড উইকলিতে ছবি ছাপাটাও উল্লেখের মনে করে। এগুলোই হাংরির গোঁজামিল। এই জন্যেই এর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক থাকাতে বারবার দুঃখ পেয়েছি, দুঃখ থেকে রাগ, রাগ থেকে বিতৃষ্ণা। একটা জিনিশ নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আমি কখনও প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করিনি, ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করিনি। পারতুম। করিনি, তার কারণ, ওটা আপনাদের শখের ব্যাপার, এই ভেবে, এবং আপনারা ওটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করছিলেন কৃত্তিবাস বা সুনীলের প্রতিপক্ষ হিসেবে । সে হিসেবে ওটাকে ভেঙে দেওয়া আমার পক্ষে নীচতা হতো খুবই। বিশ্বাস করুন, আমার কোনো ক্ষতির কথা ভেবে নয়, আপনার অপকারের কথা ভেবেই আমি আপনার ওতে থাকার বিরোধী ছিলুম। এটা হয়তো খুব সেন্টিমেন্টাল শোনালো, যেন কোনো ট্রিক, কিন্তু ও-ই ছিল আমার সত্যিকারের অভিপ্রায়।

    এবারে নতুন করে কী ঘটলো বুঝতে পারলুম না। যে ছাপা জিনিসটার কথা লিখেছেন, সেটা দেখলে হয়তো বুঝতে পারতুম। এবং এটা খুবই গোলমেলে --- যে চিঠি আপনি চারজন বন্ধুকে এক সঙ্গে লিখেচেন, যেটা চারজনকে একসঙ্গে পাঠানো যায় না, সেটা হারাধন ধাড়াকে পাঠালেন কী জন্য, বুঝতে পারলুম না। কিংবা আমার বোঝারই বা কী দরকার ? আচ্ছা মুশকিল তো, আমাকে ওসব বোঝার জন্য কে মাথার দিব্যি দিয়েছে এই আষাড় মাসের সন্ধ্যাবেলা ? আমি কলকাতায় ফিরে শান্তভাবে ঘুমোবো, আলতো পায়ে গুরবো --- আমার কোনো সাহিত্য আন্দোলনের দরকার নেই। মলয় আমার চিঠি কেন ছাপিয়েছে ? আমার গোপন কিছু নেই--- বিষ্ণু দেকে আমি অশিক্ষিত বলেছি আগেও, কৃত্তিবাসের পাতায় ব্যক্তিগত রাগে, কারণ উনি ওঁর সংকলনে আমার কবিতা আদ্দেক কেটে বাদ দিয়েছেন বলে।

    কৃত্তিবাসে আপনার লেখা নিয়ে প্রচুর গণ্ডোগোল করেছি --- তবু, এবার কৃত্তিবাসে আপনার লেখা না দেখে মন খারাপ লাগলো। এখান থেকে কোনো জিনিস নিয়ে যাওয়ার হুকুম আছে আপনার কাছ থেকে ?

    ভালোবাসা। সুনীল

    এবার দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠির অংশ পড়া যাক, যাতে তিনি বলছেন যে মলয় কবিতা লিখতে জানে না। যদি তাইই হবে, তাহলে কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে সুনীল আমার কাব্যগ্রন্হটা প্রকাশ করলেন কেন ? মলয় নামের তরুণকে হাতে রাখার জন্য ?

    ৩২/২ যোগীপাড়া রোড, কলকাতা ২৮

    ৯/১১/১৯৬৫

    সমীর

    মলয়ের ৫ তারিখের মামলার বিস্তৃত বিবরণ নিশ্চয়ই ওদের চিঠিতে জানতে পারবি, বা জেনে গেছিস। সে সম্পর্কে আর লিখলাম না।

    অপরপক্ষে, মামলার রিপোর্ট কাগজে বেরুবার পর --- কফি হাউসের কিছু অচেনা যুবা, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাকে অভিনন্দন জানাতে আসে। আমি নাকি খুবই মহৎ ব্যক্তি--- হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে কখনো যুক্ত না থেকেও এবং কখনো পছন্দ না করেও যে ওদের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছি--- সেটা নাকি আমার পক্ষে পরম উদারতার পরিচয়।

    আমার স্ট্যান্ড আমি অনেক আগেই পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছি। আমি হাংরি জেনারেশন পছন্দ করি না ( সাহিত্য আন্দোলন হিসেবে )। মলয়ের দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না --- আমার রুচি অনুযায়ী এই ধারণা।

    সাক্ষীর কাঠগড়ায় মলয়ের কবিতা ( প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ) আমাকে পুরো পড়তে দেওয়া হয়। পড়ে আমার গা রি-রি করে। এমন বাজে কবিতা যে আমাকে পড়তে বাধ্য করা হল, সে জন্য আমি ক্ষুব্ধ বোধ করি--- আমার সময় কম, কবিতা কম পড়ি, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না --- এমন কবিতা পড়ে আমি মাথাকে বিরক্ত করতে চাই না। মলয়ের তিনপাতা রচনায় একটা লাইনেও কবিতার চিহ্ণ নেই। মলয় যদি আমার ছোট ভাই হতো, আমি ওকে কবিতা লিখতে বারণ করতাম অথবা গোড়ার অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করতে বলতাম। সুনীল

    কাঠগড়ায় দাঁড়াবার আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা পড়েননি ; কবিতাটা “শয়তানের মুখ” কাব্যগ্রন্হেও নেই। কিন্তু আমেরিকায় থাকতে তিনি লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির ‘সিটি লাইটস জার্নাল’-এর কবিতাটার ইংরেজি অনুবাদ পড়েছিলেন। পরে, এই কবিতাটা কলকাতা আর ঢাকা থেকে প্রকাশিত আমার কবিতসমগ্রতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০০৮ থেকে ঢাকার একটি সাইটে কবিতাটি নিয়ে অবিরাম বিতর্ক চলছে। ইউ টিউবে এগারোজন পাঠ করেছেন, একজন তরুণী কবিসহ। তরুণীরা আলোচনাও করেছেন, যেমন সোনালী মিত্র, তুষ্টি ভট্টাচার্য, পৃথা রায় চৌধুরী প্রমুখ। কবিতাটা বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, ফারসি ও আরবিকসহ। আমার প্রথম কবিতার বইয়ের প্রকাশক মৃত্যুর আগে এই সমস্ত ঘটনা জেনে গিয়েছিলেন। তবে পেঙ্গুইন রেনডাম হাউজ থেকে যে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস “দি হাংরিয়ালিস্টস” প্রকাশিত হয়েছে তা জেনে যেতে পারেননি।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৬ জুলাই ২০২১ ১৯:৩৮734718
  • ছোটোলোকের শেষবেলা


    মলয় রায়চৌধুরী


    এক

    ছোটোবেলা আর যুববেলার সবকিছু পালটে গেছে ; ইমলিতলা পাড়ার গোলটালির চালাবাড়িগুলো হয়ে গেছে ইঁটের দাঁত বেরোনো একতলা-দুতলা। আমাদের বাড়িটা চেনা যায় না। সামনের লাল রোয়াক, যার ওপরে বসে কপিলের দাদু বাচ্চাদের গালাগাল শেখাতেন, সেখান থেকেই দেয়াল উঠে গেছে ; যারা থাকে, তারা উঠোনে গরু পুষেছে, দেয়ালময় ঘুঁটে দেয়া, খোলা ছাদ নেই, ঘর উঠে গেছে, বাঁদরগুলোর দল শহর ছেড়ে চলে গিয়ে থাকবে। কপিলের প্রজন্মের কেউ বেঁচে নেই, আর নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা আমার নাম জানে ভুখি পিঢ়ি আন্দোলনের সংবাদ পড়ে। গলির ভেতরের চালাবাড়িগুলোও ইঁটের ; সব নতুন মুখ। চোর-ডাকাতদের শুয়োর মারবার আর গাঁজার ঝোপের বস্তিতে উঠেছে একতলা বাড়ি। মহাদলিতদের পাড়া দখল করে নিয়েছে মধ্যবিত্ত মধ্যজাত চাকুরে পরিবার। কুলসুম আপাদের বাড়ি ভেঙে শিয়া মুসলমান চারতলা আবাসন, মহিলারা বোরখায়। নাজিম-কুলসুম আপারা অন্য কোথাও চলে গেছে। কুলসুম আপা, আভাসে মনে হলো, আরব দেশে চলে গেছেন। মসজিদটায় কেউ আর খেলতে ঢোকে বলে মনে হলো না, কেমন যেন ঘিঞ্জি আর নোংরা, যদিও বিশাল মিনার উঠেছে। ইমলিতলায় বাবা-জেঠার প্রজন্মের কেউই নেই, আমার প্রজন্মেরও কেউ নেই। পুরোপুরি অপরিচিত আমার নিজের ছোটোবেলার পাড়া।

    ছোটোবেলার ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন রায় সেমিনারি হয়ে গেছে বিশাল, ইউনিফর্ম পরতে হয় ছাত্রছাত্রীদের, দুটো শিফট হয়, বাংলামাধ্যম উঠে গেছে, ব্রাহ্ম ধর্মের প্রভাব ফুরিয়ে গেছে ; ব্রাহ্ম কবি-লেখকদের বাংলা বই আর সম্পাদিত পত্রিকাগুলো আর নেই। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিভাগ আছে কেবল পিএইচডি করার জন্য।

    যুববেলার দরিয়াপুরও পালটে গেছে, আমাদের বাড়িটা তিনতলা পর্যন্ত দাদার বড়ো ছেলের ফোটোর জিনিসপত্রে ঠাশা, এখন বাবার স্টুডিও নেই, ক্যামেরায় ফোটোতোলার দিনকাল বিদায় নিয়েছে, ছোটো ক্যামরাও লাখ খানেকের বেশি দাম, বেশির ভাগ কাজ কমপিউটারে। বাবা এই পরিবর্তন দেখে যেতে পারলেন না। সামনের বারান্দা ভেঙে ফেলা হয়েছে। ওই বাড়িতে দাদার ছেলে থাকে না। শশুরের দেয়া ফ্ল্যাটে কদমকুঁয়ায় থাকে। আমার আর ছেলে-মেয়ের কোনোকিছুই সেখানে নেই। পাশের চুড়িঅলা, যার কাছে মা মুর্গি রাঁধতে শিখেছিলেন, জায়ফল দিয়ে, তার পরিবার চলে গেছে পাকিস্তানে। চুড়ির দোকানের ওপরে শিখ সরদার থাকতেন, যিনি প্রতি রাতে একজন বেশ্যাকে নিয়ে ফিরতেন, তিনি বহুকাল আগে মারা গেছেন। বাড়ির মালিক, যার পাশেই ছিল বাঁশের আড়ত, চারতলা বাড়ি তুলে ভাড়া দিয়েছে। সামনের কবরমাঠের জায়গায় সুন্নি মুসলমানদের বাড়ি আর দোকান। আল্লু মিয়াঁ আর ওর বারবার বিয়ে-দেয়া মেয়েদের খবর জানে না কেউ।

    উত্তরপাড়ার সাবর্ণভিলা ভেঙে আবাসন তৈরি হয়েছে। আমি, দাদা, বড়দি, ছোড়দি, ডলি, মনু আমাদের অংশ বিক্রি করে দিয়েছি। যারা থাকে তারা আমার দুর্নামের সঙ্গে পরিচিত বলে দেখতে এসেছিল। আমি কাউকেই চিনতে পারলুম না। কাকাবাবু, মানে বিশেখুড়োর কোতরঙের জমিজমা আর বাড়ি বেচে দিয়েছে ওনার পোষ্যকন্যা ; কে জানে কোথায় চলে গেছে ! পাণিহাটিতে মামার বাড়ির অর্ধেকের বেশি, পুকুর আর জমিজমাসুদ্দু, বেচে দিয়েছিলেন ছোটোমামা ; সেই জায়গায় আবাসন উঠেছে। ‘নিলামবাটি’ লেখা পাথরটা আছে, একটা বাড়ির দরোজার সামনে, কিন্তু সেটায় দাদামশায় থাকতেন না। দাদামশায় যে সমবায় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানকার দেয়াল থেকে ওনার ফোটো গুদামঘরে চালান করা হয়েছে। পাণিহাটির মোচ্ছবতলা, চৈতন্যদেব বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে খ্যাত, এখন মনে হয় বোষ্টমদের নিয়মিত উৎসবের প্রাতিষ্ঠানিক জমঘট। এখন পাণিহাটি থেকে ভুটভুটি যায়, কেবল ওপারে কোন্নোগরে নয়, বিভিন্ন জায়গায়। ছোটোবেলায় দাঁড়-বাওয়া নৌকো করে কোন্নোগর থেকে পাণিহাটি যেতুম। কোন্নগরে বড়জেঠিমার বাপের বাড়িতে কেউই আর নেই, তবে জগদ্ধাত্রী বারোমেসে মন্দির আছে ; সেখানকার কেউই চিনতে পারলো না আমাকে। ওনারাও অনেকটা জমি বিক্রি করে দিয়েছেন, যার ওপর আবাসন উঠেছে। বড়োজেঠিমার ভাইঝি আলো, সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, তাইই ছিল, দাদা বিয়ে করতে চায়নি, কেননা দাদা চাইবাসায় এক বিবাহিতা যুবতীকে ভালোবাসতো, পরে যার এক বোনকে দাদা বিয়ে করেছিল — ব্যাপারটা আছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর উপন্যাস ‘কিন্নর কিন্নরী’তে।

     

    আমি নাকতলার ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে এসেছি মুম্বাই। ওই পাড়ায়, ওই ফ্ল্যাটে, ওই পরিবেশে জীবন কাটানো, এই বয়সে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ছেলের এক বেডরুম ফ্ল্যাট আছে মুম্বাইতে। বুড়ো-বুড়ি চালিয়ে যাচ্ছি যেমন-তেমন। দাদা মারা গেছে। দাদার সাহিত্যিক বন্ধুরাও মারা গেছে। আমার ছোটোবেলার স্কুলের বন্ধু সবাই মারা গেছে, তরুণ শুর যুববেলাতেই লিউকোমিয়ায় মারা গিয়েছিল, বারীন গুপ্ত মারা গিয়েছিল মাথায় রক্তক্ষরণের দরুণ, সুবর্ণ উপাধ্যায়-এর সঙ্গে শেষ দেখা কলকাতায় পাঁচ বছর আগে – প্রোস্টেটের ভুল অপারেশনে রক্ত ঝরে, বলেছিল বেশিদিন বাঁচবে না। স্কুলের বন্ধু রমেণ ভট্টাচার্য আর অনিমেষ গুপ্ত নাকতলার কাছেই থাকতো, বাঁশদ্রোণী বাজারে দেখা হতো প্রায়ই, শুনেছি মারা গেছে। যুববেলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র কয়েকজন টিকে আছে। সাহিত্যিক সঙ্গীদের মধ্যে টিকে আছে সুবিমল বসাক, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, দেবী রায় আর ত্রিদিব মিত্র-আলো মিত্র।সুবিমল মাঝে-মধ্যে ফোন করে। স্ত্রী মারা যাবার পর সুবো আচার্য পুরোপুরি অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমের সেবায় লেগে আছে ; ‘নারী নরকের দ্বার’ বলে ছেলেদের বিয়ে দেয়নি। প্রদীপের স্ত্রী মারা গেছে ; প্রদীপের দুটো চোখই খারাপ। ত্রিদিব বাড়ি করেছে হাওড়ায়। সুবিমল বাড়ি করেছে বেলঘরিয়ায়, দুই ছেলে, নাতি-নাতনি নিয়ে থাকে। দেবী রায় ফ্ল্যাট কিনে হাওড়ায় কোথাও থাকে ; স্ত্রী মারা যাবার পর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। শৈলেশ্বর ঘোষ অপারেশান থিয়েটারে মারা গেছে, ওর স্ত্রী, মেয়ে-জামাই সবাই মারা গেছে, সুন্দর বাংলোবাড়ি একেবারে ফাঁকা, ভুতুড়ে। সুভাষ ঘোষ মারা গেছে ; এখন বাড়িতে ঢুকতেই সামনে সুভাষের বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো ছবি, আগে ছিল জ্যোতি বসুর ছবি। অবনী ধর আর বাসুদেব দাশগুপ্ত অশোকনগরে মারা গেছে। অরুণেশ ঘোষ জলে ডুবে মারা গেছে ; হয়তো আত্মহত্যাও করে থাকতে পারে। অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় মারা গেছে দিল্লিতে। উত্তরবঙ্গের হাংরি আন্দোলনকারী অলোক গোস্বামী আর রাজা সরকার কলকাতায়, দেবজ্যোতি রায় উত্তরবঙ্গেই আছে। ত্রিপুরা থেকে অরূপ দত্ত চলে এসেছে কলকাতায়।

    বড়দি-ছোড়দির বিশাল জমিদারি বাড়ি, ‘সিলভ্যান হাউজ’, গেট দিয়ে ঢুকতেই দুইধারে ছিল বকফুল গাছের সারি, ফুলের বাগান, সব উধাও। সেখানে বিশাল আবাসন উঠেছে। কোটিপতি হয়ে ভাগ্নে পাটনা ছেড়ে চলে গেছে বিহারের বাইরে, লালু যাদবের স্যাঙাতদের কিডন্যাপগ্যাঙের ভয়ে। ভাগ্নি জয়ার ছেলে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের চ্যানেল চালায়, নিজেও ভালো গায়।

    পিসেমশায় তিনকড়ি হালদার, ওনাকে নিয়ে আমার একটা গল্প আছে “অপ্রকাশিত ছোটোগল্প” বইতে, আহিরিটোলার বাড়ি শরিকরা বিল্ডারকে দিয়ে দেবার ফলে ওই বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন, পকেটে যে চিরকুট পাওয়া গিয়েছিল তাতে লেখা, “আনন্দধারা বহিছে ভূবনে”। পিসেমশায়ের ছেলেদের ঠাকুমা একটা জমি দিয়েছিলেন হিন্দমোটরে, সেখানে ভাইয়েরা একটা করে ঘরে থাকে, আর আরেকটা ঘর রান্নার কাজে লাগে। সবচেয়ে বড়ো ভাই অজয় হালদার মানে সেন্টুদার বিয়ে দিয়েছিল দাদা দ্বারভাঙ্গার এক ঘি ব্যবসায়ীর মেয়ের সঙ্গে ; ঘি আর দিশি বিহারি মদ ঠররা খেয়ে ঘরজামাই সেন্টুদা সেখানেই মারা গেছে। পরের দিকে দাদার সঙ্গে কোনো কারণে সেন্টুদার বনিবনা ছিল না বলে পাটনায় এলে সেন্টুদা উঠতো দিদিদের বাড়ি। ছোটোবেলা আর যুববেলার কলকাতার বহু রাস্তার নাম পালটে গেছে, মামলার সময়ে ঘুরে বেড়াতুম সেই সব রাস্তায়।

    নাগপুরে শশুরবাড়িও ভেঙে ফেলে তার মুসলমান মালিক, আমার মামাতো শালাদের মোটা টাকা দিয়ে, সেখানে হজ যাত্রীদের জন্য আশ্রয় তৈরি করছে, পাশেই নিজের জমিতে বিশাল মসজিদ তুলেছে যাতে এক সঙ্গে এক হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে। আমার স্ত্রীর এক মুসলমান বন্ধু, প্রতিবেশি বাড়ির মেয়ে, হিন্দু যুবককে বিয়ে করে নাম পালটিয়ে মুম্বাইতে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে থাকে। যে শালির আমি পাটনায় বিয়ে দিয়েছিলুম, সে, তার স্বামী পরপর মারা যাবার দরুন তাদের লেক গার্ডেনসের বাড়ি ভেঙে ফেলে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে।

    দুই

    আজকে, এখন, মুম্বাইতে এসে, আয়না দেখা ছেড়ে দিয়েছি, বাইরে বেরোলেও চুল আঁচড়াই না, পায়জামায় পেছনদিকে ছেঁড়া থাকলেও তাই পরেই বেরোই, কেননা কেউই আমার পেছন দিকে তাকানো দরকার মনে করে না, নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের গাড়ি পার্ক করার বেসমেন্টে অটোরিকশায় বসে টের পাচ্ছি যে স্মৃতি একেবারে ধুলোপড়া ত্যাবড়ানো, স্ফটিক-স্বচ্ছ নয়, আমার, আমার আসেপাশের মানুষদের, অনেকের দেহে শ্মশানে জলভরা হাঁড়ি পড়ার শব্দসহ, বিজলি-চুল্লীতে চর্বি ফাটবার শব্দসহ, হুকবোতামের ছেদ-যতি-সেমিকোলনসহ, বয়স্ক-অল্পবয়স্ক ঘটনা নিজস্ব চরিত্র নিয়ে উদয় হচ্ছে, আর যা ভুড়ভুড়ি কেটে ভেসে উঠছে, সেগুলোই, তড়িঘড়ি, উবে যাবার আগে, লিখে ফেলব, শাড়ির ভাঁজে পাট করে রাখা সুমিতা চক্রবর্তীর গ্রীষ্মশীত, রাতে ওনার বাগানের গাছেরা নিজেদের পরিচর্যা করতো, আমি ওনার সাম্যবাদী কিউবার লঝঝড় মোটরগাড়িতে, “আমি তোর অ্যামেচার বান্ধবী” ; তারপর যখন বুড়ি থুথ্থুড়ি, “কলকাতায় সবাই পার্টিকর্মী, দৃশ্য বা অদৃশ্য ঝাণ্ডা হাতে।” “শুধু কমিউনিস্টরাই বলতে পারবে কেন কমিউনিজম ফেল মারলো।” “মানববোমারা মরতেই থাকবে, এর আর শেষ নেই, দেখেনিস। ” “হিরোহিতোর সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করুন বা হিটলারের সঙ্গে, সুভাষচন্দ্র বোস আমার হিরো, আমার স্বপ্নের প্রেমিক। ” “লিখতে বসে সবচেয়ে আগে ভুলে যাবি তোর স্কুল-কলেজের ভাষা-শিক্ষকদের, নয়তো এগোতে পারবি না। ” “বাঙালি মার্কসবাদীরা, যারা নিহিলিজমের বিরোধিতা করতো, তারাই পশ্চিমবঙ্গে নিহিলিজম ডেকে আনলো।” “অনুসরণকারীরা পিঠে ছোরা মারে কেন জানিস ? তারা তো পিছন থেকে অনুসরণ করে।” “ভিতুরা ভয়ার্ত কবিতার তত্ব বানায় আর সেই তত্বকে সমর্থন করে পরাজিতরা।” “আত্মহত্যার কোনো কারণ হয় না।” এখন একমাত্র রুটিন হল রাতে টয়লেটে পেচ্ছাপ করতে যাওয়া, প্রস্টেটের ঘড়িধরা চাপে।

    নাড়ি তৈরির ম্যাজিক শুধু নারীই তো জানে। সেক্স করার সময়ে বার বার “আই হেট ইউ” বলার উপাদেয় রহস্য। আমি আগের জন্মে ঘুর্ণিঝড় ছিলুম পরের জন্মে গোরস্হান হবো। বহু ঘটনা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবে, যেতে দিতে হবে, পাশাপাশি গুরুত্বহীন ঘটনা হঠাৎই ঘা দিয়ে নিজেকে জাহির করবে, যাই হোক, সময়ের ধ্যাবড়া অনুক্রম জরুরি বলে মনে হয় না । চাকুরিসূত্রে ভারতের এতো গ্রাম আর শহর ঘুরেছি যে হাতির পিঠে চেপে কোন গ্রামে গিয়েছিলুম, কোথায় উটের দুধ খেয়েছিলুম যেমন স্মৃতি থেকে ঝরে গেছে, তেমনই কোন নদীর পাশ দিয়ে মাথার ওপর ট্যুরের ক্যাঁদরা চাপিয়ে কোন গঞ্জে গিয়েছিলুম, মনে করতে পারি না, অথচ ঘটনাগুলো ঝাপসা হয়নি আজও ; অমন অজস্র টুকরো-টাকরা, বহুগ্রাম জলহীন বলে কেমন করে শিখে গিয়েছিলুম টয়লেট পেপারের রোল সঙ্গে রাখতে, আলের ওপরে বসে হাগতে, জল না খেয়ে বহুক্ষণ টিকে থাকতে। কে বলেছিল, “মাতৃভূমিতে শুধু গরিবরাই মরে?” মনে নেই। কে বলেছিল, “রাস্তার কুকুরদের কান নিয়ে জন্মেছিস?” মনে নেই। কে বলেছিল, “তুই বামপন্হী? শুনলেই সন্দেহ হয় তোর বাপ সোভিয়েত রুবল খেয়েছে !” মনে নেই। কে বলেছিল, “তোর ডানদিকে সিঁথে কাটা উচিত।” মনে নেই। কে বলেছিল “ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে কিছু হয় না ?” মনে নেই। কে বলেছিল, “রাষ্ট্র চিরকাল লিবার্টি ইকুয়ালিটি ফ্র্যাটারনিটির বিরোধিতা করবে”, মনে নেই। কে বলেছিল, “লাথি না খেলে বিজ্ঞ হওয়া যায় না”, মনে নেই। কে বলেছিল, “ফাংশানাল লিঙ্গ না থাকলে জিনিয়াস হওয়া যায় না”, মনে নেই।

    ১৯৬৪ সালে যখন পুলিশ কমিশনারের কাছে জানতে পারলুম যে আমার বিরুদ্ধে নালিশকারীদের তালিকায় সন্তোষকুমার ঘোষ আর আবু সয়ীদ আইয়ুব আছেন, শুনে বুঝতে পারলুম যে ছিপে ঠিক-ঠিক বঁড়শিই বেঁধেছি। ১৯৬২ সালে কলেজ স্ট্রিটে একটা মিছিলে উৎপল দত্তের হাতে হাংরি বুলেটিন দিতেই উনি আঁৎকে বলে উঠলেন, “হাংগরি জিন্নাড়িশন”, লিফলেটটা দুমড়ে ফেলে দিলেন রাস্তায়, দেখে, অন্য একজন মিছিলকারী সেটা তুলে পড়তে আরম্ভ করলে, চেয়ে নিয়ে বললুম, আপনার জন্যে নয়। ১৯৬৩ সালে গল্পকার শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাওড়ার বাড়িতে গিয়েছিলুম। বললেন, “ওহে, একেবারে তোলপাড় করে ফেলেছ যে, ক্ষমতাবানদের চটিয়ে দিচ্ছ, তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে, জানো কি ?” বলেছিলুম, যা করার তা তো করে যেতে হবে, ডিরোজিও তো যা করার তাই করে গেছেন। জানি না কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকরা কেন শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেপে দিলে। উদয়ন ঘোষ, শান্তি লাহিড়ির মতন ওনারও দুর্বলতা ছিল সন্দীপন, শক্তি, সুনীলের সঙ্গে চিপকে থেকে আনন্দ পাবার।

    ১৯৭১ সালে শঙ্খ ঘোষ একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন, “শব্দ আর সত্য” শিরোনামে, ১৯৭১ সালে, রিমেম্বার ১৯৭১ সালে। কী লিখেছেন শুরুতেই তাঁর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক গদ্যে ? লিখেছেন, রিমেম্বার ১৯৭১ সালে, যে, “কবিতা লেখার অপরাধে এই শহরের কয়েকজন যুবককে যে একদিন হাজতবাস করতে হয়েছিল, এটা আজ ইতিহাসের বিষয়।” ২৮ ডিসেম্বর ১৯৬৫ সালে আমার এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়ে গিয়েছিল তা উনি ১৯৭১ সালে জানতেন না ! পঁয়ত্রিশ মাস ধরে আদালতের চক্কর কাটতে হয়েছিল, তা উনি ১৯৭১ সালে জানতেন না, জানতেন কেবল একদিনের হাজতবাস। কী বলব ? হাংরি আন্দোলনের যাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন, আবু সয়ীদ আইয়ুবের পর শঙ্খ ঘোষ, আর বাহুল্য বলা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম করতে হয়। শঙ্খবাবু শৈলেশ্বর ঘোষকে টেনে নিয়ে গেছেন প্রতিষ্ঠানের কয়েদখানা বাংলা অ্যাকাডেমিতে। শঙ্খবাবুর সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছে, ওই বাংলা অ্যাকাডেমিতেই, হ্যাণ্ডশেকের জন্যে হাত এগিয়ে দিয়ে বলেছিলুম, আমার নাম মলয় রায়চৌধুরী, শুনে, নিজের কানে মনে হল যেন বলছি, আমি মিশরের ফ্যারাও দ্বিতীয় র‌্যামাসেজ। আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকায় বসে ভাবছিলেন মলয়টা কলকাতার সবকিছু লুটেপুটে খেয়ে ফেললো আর আমেরিকা থেকে ফিরে ‘আত্মপ্রকাশ’ নামে একটা তড়িঘড়ি উপন্যাস লিখেছিলেন সাগরময় ঘোষের হুকুমে যাতে ভয়ের চোটে লেখেননি যে বেশ্যালয়ে গিয়ে কী করতেন আমি কিন্তু উকিলের জানলা দিয়ে দেখেছি ষাটের দশকে পুরো কৃত্তিবাসের দল ঢুকছে অবিনাশ কবিরাজ লেনে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় শকুনের কাঁধ উঁচু করে।

    ১৯৭২ সালে, চেন্নাইয়ের গিণ্ডিতে একটা জ্যান্ত কেউটে সাপকে আমার হাতে জড়াতে দিয়েছিল পার্ক কর্তৃপক্ষ, ওঃ কি ঠাণ্ডা, নিজের সম্পর্কে ইপিফ্যানির গর্ব হয়েছিল। তারপর একটা পাইথনকে গলায় ফেলে দিল উত্তরীয়ের মতন করে, কী যে আনন্দ হয়েছিল, এই হল আমার সম্বর্ধনার সত্যিকারের উত্তরীয়। আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলেছিল, ব্রাহ্মণ হয়ে জ্যান্ত সাপে হাত দিলেন, দেখুন বংশরক্ষা হয় কিনা। কী করেই বা কারাগারে আটক সাপদুটোর বংশরক্ষা হবে, বললুম তাকে, ছোবল দিয়ে। ১৯৭৫ সালে ফালগুনী রায়ের সঙ্গে শেষবার দেখা। পাটনায় অফিসে এসেছিল, তখন আমার লেখালিখি আঙুল ছেড়ে উধাও, বলল, সবাই আলাদা হয়ে গেছে, ও এখন দীপক মজুমদারের সঙ্গে, মাদক আর সোনাগাছি নিয়ে ভালোই আছে। হাংরি আন্দোলনের সময়ে প্রায়ই পাটনায় আসত ফালগুনী, ওর জামাইবাবু ছিলেন আমার ইকোনমিক্সের অধ্যাপক, অত্যধিক মোটা আর বেঁটে, রিকশায় চাপার আগে নাড়িয়ে দেখে চাপতেন, তা দেখে হাসতুম বলে চটা ছিলেন আমার ওপর, ফালগুনীর দিদি এসে আমার মাকে বলে গিয়েছিলেন যে, আমি ফালগুনীকে কুপথে নিয়ে গিয়ে নষ্ট করে দিয়েছি। ফালগুনীর প্রেমিকার বিয়ে হয়েছিল পাটনায়, ওর জামাইবাবুর বাড়ির কাছেই প্রেমিকা থাকতো লোহানিপুর পাড়ায়। আমরা দুজনে পাটনার গুলফি ঘাটে গিয়ে কিংবা গোলঘরের ওপরে বসে সরকারি দোকান থেকে কেনা গাঁজা-চরস ফুঁকতুম, মহেন্দ্রুঘাটে বসে ঠররা খেতুম। ফালগুনীর মৃত্যুর খবর পেয়েছিলুম লখনউ থাকতে।

    ১৯৮৯ সালে মেয়ে অনুশ্রীর গোদরেজ টাইপরাইটার খারাপ হয়ে যেতে অনেক খুঁজেপেতে একজন মেকানিকের বাড়ির ঠিকানা পেয়েছিলুম। তখন থাকতুম সান্টাক্রুজে আর মেকানিক থাকতেন জুহুর গোয়ানিজ কলোনিতে। এখন অবশ্য সেই সান্টাক্রুজ-জুহু আর নেই, ধনীদের বিশাল অট্টালিকা আকাশে উঠে গেছে সর্বত্র। মেকানিকমশায় যেদিন সারিয়ে দেবেন বলেছিলেন, সেই দিন আমি টাইপরাইটারটা নেবার জন্যে ওনার কুঁড়েঘরে গিয়ে অপেক্ষা করছিলুম, ওনার বুড়িবউ বললেন, এক্ষুনি এসে যাবে। আমার মুখ দাড়ি-গোঁফে ঢাকা, নাম এম আর চৌধারী। গাউনপরা বিশালবপু বুড়ি চুপচাপ বসেছিলেন। সামনের বাড়িতে গিটার বাজিয়ে হইচই গান গাইছিল যুবক-যুবতীরা। গোয়ানিজ বুড়ি হঠাৎ বলে উঠলেন, “এই প্রটেস্ট্যান্টগুলো আর হিন্দুগুলো, অত্যন্ত নোংরা আর ডিসিপ্লিনহীন, তাই তো দেশটার এমন অবস্হা, যখন ব্রিটিশরা ইনডিয়ায় ছিল আর পোর্তুগিজরা গোয়ায় ছিল তখন এদের এরকম দৌরাত্ম্য ছিল না। ” নিজেকে ফাঁস করলে বুড়ি মুষড়ে পড়বে ভেবে মুখ বুজে রইলুম। ২০০০ সালে কাণ্ডিভিলি মুম্বাইতে হার্ট অ্যাটাকের পর প্রতিদিন সকালে জগার্স পার্কে হাঁটতেযেতুম, সেখানে লাফটার ক্লাবের বুড়ো সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হল। সকলের মতন আমিও ওয়ান টু থ্রি হলেই ওপরে দুহাত তুলে জোরে-জোরে অকারণে হাসতুম, এছাড়া আর বুড়ো বয়সে হাসির সুযোগ নেই। একজন গুজরাটি আমার সঙ্গেই ফিরতেন, কী করেন জিগ্যেস করতে বলেছিলুম অবসর নিয়েছি, যা পেনশন পাই তাতেই চালাই। উনি কী করেন জিগ্যেস করতে বললেন যে, “সকালে-বিকেলে ক্লায়েন্টদের কুকুর হাগাতে নিয়ে যাই আর রাতের বেলায় মদ খেয়ে কবিতা লিখি, মাসে পঞ্চাশ হাজার হয়ে যায়।”

    —কুকুর হাগাতে ?

    —হ্যাঁ, কারোর তো সময় নেই, সবাই এ-শহরে টাকার ধান্দায় ছুটছে।

    —আপনি তাদের কুকুরগুলোকে সকাল-বিকেল হাগাতে নিয়ে যান ?

    —হ্যাঁ, সকাল পাঁচটা থেকে শুরু করি। কোন কুকুর কখন হাগতে প্রেফার করে প্রথম কয়েক দিনেই জেনে যাই, ক্লায়েন্টরাও আইডিয়া দেন ওদের হাগবার-মোতার সময়ের।

    —কিরকম চার্জ করেন ?

    —কুকুরের ব্রিডের ওপর নির্ভর করে। রটউইলার হলে হাজার পাঁচেক প্রোপোজ করি, তারপর তিন হাজারে সেটল করি। অন্য ব্রিডের হলে কম নিই। তবে আমি নিজেকে ডগ ট্রেনার বলি, কুকুরগুলোকে আধঘণ্টা খেলাতেও হয়।

    —একদিন আপনার কবিতা শুনব।

    —আসবেন, ড্রিংক করেন তো ?

    —না, আপাতত বন্ধ, হার্ট অ্যাটাক থেকে সবে উঠেছি ; হার্ট অ্যাটাকের সময়েও হাগা পায়, বীর্য বেরিয়ে আসে। আত্মহত্যাকারীদের যেমন হয়, গু আর বীর্য বেরিয়ে আসে। আত্মহত্যাকারিনীদের কি কিছু বেরিয়ে আসে ?

    কুকুর হাগানোর সঙ্গে কবিতার যোগাযোগ আছে জেনে বেশ ভাল্লাগলো। কবিদের রেটও ব্রিড অনুযায়ী।

    তিন

    ২০০৭ সালে আমস্টারডমের ডি ওয়ালেন খালপাড়ে গাইড মিস মারিসকা মাজুরের সঙ্গে আমরা একদল বিদেশী পর্যটক বেশ্যালয় দেখতে বেরিয়েছিলুম। মারিসকা এককালে নিজেও যৌনকর্মী ছিলেন। রেড লাইট শব্দটা এই বেশ্যালয় থেকেই ছড়িয়েছে। নেপোলিয়ানের আইনি অনুমতিপ্রাপ্ত বেশ্যালয়, মানুষের চেয়েও বড়ো কাচের শোকেসে লাল আলো জ্বেলে অপেক্ষা করছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এসে জড়ো হওয়া যৌনকর্মীরা, রেট, সময় এবং পদ্ধতি বাঁধা ; তার বাইরে কিছু করতে চাইলে দরাদরি করতে হবে। প্রতিটি ঘরে লাল আলো। যে ঘরে নীল রঙের আলো সেঘরে অপেক্ষা করছে পুরুষ যৌনকর্মী। খালপাড়ে নানা রকমের যৌনকর্মের আর যৌনবস্তুর দোকান, ঘুরে-ঘুরে দেখলুম। চাবুক, চেস্টিটি বেল্ট, লিঙ্গের আকারের সিটঅলা সাইকেল, পর্নোগ্রাফির বই আর ফিল্ম, গাঁজা ফোঁকার দোকান, আবসাঁথ খাবার রেস্তরাঁ ইত্যাদি। দেখতে-দেখতে এগোচ্ছিলুম। হঠাৎ একজন মধ্যবয়সী হোঁচোট খেয়ে পড়ল আমাদের সামনে, ওপরে মুখ তুলে চলার ফল। মারিসকা মাজুর তাকে দুহাত ধরে টেনে তুলে দেখালেন রাস্তার ওপর ব্রোঞ্জের একটা ভাস্কর্য, অজস্র মানুষের চলার দরুণ চকচকে হয়ে গেছে। ভাস্কর্যটা হলো একজন পুরুষের ডান হাত একটি যুবতীর বাঁদিকের মাই টিপছে, ব্যাস ওইটুকুই, হাত আর একটা মাই। মারিসকা বললেন, আগে এই ভাস্করের নাম জানা যায়নি, এখন জানা গেছে ওনার নাম রব হজসন, লুকিয়ে ভোররাতে পুঁতে দিয়ে গেছেন।

    ১৯৬১ সালে একবার খালাসিটোলায় পাশের লোকটা হাতে গেলাস নিয়ে কাঁদছিল দেখে আমারও কান্না পেয়ে গিয়েছিল ; পিসেমশায় খালাসিটোলায় গেলে নির্ঘাৎ কাঁদতেন, মা ওগো মা, বলে বলে কাঁদতেন; তারপর যেতেন সোনাগাছি। আমিও কেঁদে নিয়েছিলুম, পিসতুতো দাদা সেন্টুদার সঙ্গে অবিনাশ কবিরাজ লেনে গিয়েছিলুম; সেন্টুদা বলেছিল, এখানেও স্কুল ফাইনাল, বিএ, এমএ করতে-করতে এগোতে হয়, সব শিখিয়ে দেবো তোকে, নিরোধ জানিস তো নিরোধ, সঙ্গে নিয়ে আসবি, ঠোঁটে চুমু খাবি না, ওখানে চাটবি না, দিনে-দিনে আসবি, দিনে-দিনে চলে যাবি, কেউ দেখতে পাবে না, রেটও দুপুর বেলায় হাফ, তখন কেউ শ্যাম্পু করা চুল আঁচড়ায়, কেউ পায়ের নখে নেলপেলিশ লাগায়, কেউ বারান্দায় বসে হাই তোলে, দিল খুশ হয়ে যাবে, ইচ্ছে করলে তুই পায়ে নেলপালিশ লাগিয়ে দিতে পারবি, চুল আঁচড়ে দিতে পারবি, এমনকি সেক্স করার আগে যদি গিল্টি ফিল করিস তাহলে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিতে পারবি, কালবৈশাখির ঝড় উঠলে আহিরিটোলা ঘাটে নেমে দুজনে চান করার ভান করতে পারবি। ১৯৬৪ সালে যখন হাংরি মামলায় গ্রেপ্তার হলুম তখন বড়োজেঠিমা বলেছিলেন, যারা পরীর গপপো জানে, যারা দত্যিদানোর গপপো জানে, যারা পুরাণের ভগবানদের গপপো জানে, তাদের কাছে নোংরা বই, নোংরা গপপো বলে কিছু হয় না, কোনো বইকেই অচ্ছেদ্দা করা উচিত নয়, পুরাণের গপপো পড়লেই জানা যায় আমরা কোনো একজনের মতন ওই সব গপপোতে লুকিয়ে আছি, আমরা কি মহাভারতের গল্পতে নেই ? আছি, আছি রে আছি।

    ১৯৬৩ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ যখন পাটনায় আমাদের বাড়িতে ছিল, একটা শতচ্ছিন্ন বই পড়তে দিয়েছিল, ওর পড়া হয়ে গিয়েছিল বইটা, “জার্নি টু দি এন্ড অফ দি নাইট”, লুই ফার্দিনাঁ সেলিন-এর লেখা, কালো রঙের মলাট, দারুন উপন্যাস। পরে সেলিন সম্পর্কে খোঁজখবর করে জানতে পেরেছিলুম যে লোকটা ঘোর ইহুদি-বিদ্বেষী ছিল আর ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্যামফ্লেট ছাপিয়ে গালমন্দ করতো। গিন্সবার্গের বাবা-মাও ইহুদি, তবু, উপন্যাসটা অসাধারণ বলে, গিন্সবার্গের মনে হয়েছিল, আমার পড়া উচিত। বইটা সুভাষ ঘোষকে পড়তে দিয়েছিলুম তারপর কী হলো কে জানে, ওরা মুচলেকা লিখে, দলবেঁধে ক্ষুধার্ত, ক্ষুধার্ত খবর, ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ থেকে আমায় ভেন্ন করে দিলে, কেন কে জানে !। দলটার ত্রিদিব মিত্র নাম দিয়েছিল “মুচলেকাপন্হী”, ত্রিদিব আর আলো মিত্রকেও বাদ দিয়েছিল রাজসাক্ষীরা। আমিও ১৯৬৭ সালে কেস জিতে ছেড়ে দিলুম ওদের ‘গরিব-হওয়া-ভালো’ সঙ্গ। এই হওয়া, হয়ে-ওঠা যে কি জিনিস তা আজও বুঝুনি। ১৯৬৬ সালে বাসুদেব দাশগুপ্তকে দিয়েছিলুম লেনি ব্রুসের লেখা “হাউ টু টক ডার্টি অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল” বইটা। ১৯৬৮ সালে, যখন আমি লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছি, কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের পত্রিকা “গল্পকবিতায়” বাসুদেব দাশগুপ্ত লিখেছিল “লেনি ব্রুস ও গোপাল ভাঁড়কে”। বাসুদেবের লেখাটা আমার পড়া হয়নি। কোনো কিছুই আর পড়তে ভালো লাগে না।

    ১৯৯৪ সালে প্রথম উপন্যাস লিখলুম, “হাওয়া৪৯” পত্রিকার জন্যে, “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস”, পাটনাইয়া বন্ধুদের নিয়ে। আমি প্রুফ দেখতে একেবারেই পারি না। দাদা কৃষ্ণগোপাল মল্লিককে বললেন প্রুফ দেখে দিতে। কৃষ্ণগোপাল ডেকে পাঠালেন ওনার বাড়িতে, বললেন, “টাকার ব্যাগটা অতনু রেখেছিল আলমারির ওপরে, বাড়ি ছেড়ে যখন চলে যাচ্ছে, তখন ব্যাগটা খাটের তলায় গেল কি করে ?” বার-বার চোখ চলে যাচ্ছিল মেঝেয়, ওনার পড়াশুনার টেবিলের পাশে মাকে চেন দিয়ে বেঁধে রেখেছেন, তিনি মাটিতে বিছানায় শুয়ে, চেন বাঁধা। বললেন, “প্রথম এসেছো তো, তাই অবাক হয়ে গেছো, আমার মায়ের খাই-খাই ব্যারাম, তাই বেঁধে রাখতে হয়ে।” শুনে, গায়ের লোম বেয়ে শিরশিরে হাওয়া বয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমহার্স্ট স্ট্রিটে এসে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলুম।

    ওই সময় নাগাদই এডওয়ার্ড সাইদ এসেছিলেন কলকাতায়, নেতাজি ভবনে, সৌগত বসুর ডাকে, বক্তৃতা দিতে। বক্তৃতা দিতে-দিতে সাইদ বার বার প্রতিষ্ঠানবিরিধিতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করছিলেন। আমি বসে ছিলুম পেছনের সারিতে কেননা সামনের সারি ছিল কলকেতিয়া কেঁদোদের জন্য। আমন্ত্রিতরা, বলা বাহুল্য, সবাই ছিল কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চাঁই। প্রশ্নোত্তরের সুযোগ আসতেই আমি বললুম যে, “স্যার, আপনি এতোক্ষণ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলছিলেন, অথচ এখানে তো সামনের সারিগুলোয় বসে আছেন পশ্চিমবাংলার তথা ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তারা। ” সৌগত বসু, আশা করেননি যে এরকম একটা প্রশ্ন কেউ ছুঁড়ে দিতে পারে। উনি তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন যে, “এই কনট্রোভার্সি ডিসকাস করার মতো আমাদের হাতে সময় নেই, পরের বার উনি আসলে আমরা বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব। ”

    চার

    ১৯৮৮ সালে যখন নাকতলার ফ্ল্যাটটা কিনলুম, মাত্র দু লাখ টাকায়, তখন ওই মাপের ফ্ল্যাট মুম্বাইতে কম করে হলেও পঁচিশ লাখ, তাই লোকে যেভাবে আলুপটল কেনে, কিনে নিলুম, সাত পাঁচ না ভেবে। আসলে একটুকরো পশ্চিমবঙ্গ কিনেছিলুম, চারিদিক খোলা, অথচ কোনো বাড়ি থেকে কেউই দেখতে পাবে না যে আমি অনেক সময়ে ল্যাংটো হয়ে থাকি, সলিলা চেঁচামেচি করলেও ল্যাংটো থাকতে ভাল্লাগে। বাড়ির পেছনে পলাশের জঙ্গল, গাছে-গাছে কতো রকমের পাখি যাদের অধিকাংশকে চিনি না, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার পক্ষী সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি পাখিগুলোর নাম কী হতে পারে, পেছনে বিশাল পুকুর, পুকুরে মাছেরা চাঁদের আলোয় ঘাই মারে, দিনের বেলায় পানকৌড়িরা মাছ খেতে নামে, উড়ে গিয়ে নারকেল গাছে জাপানি পাখার মতন ডানা ছড়িয়ে শোকায়, অনেক সময়ে পলাশের বনে শেয়াল আসে, শেয়ালের ডাক শোনা যায় রাতে, প্রচুর বেঁজি, বাড়ির সিঁড়িতে সাপ লুকিয়ে থাকে, মশারির ওপর ফ্যানের ব্লেডে লেগে জোনাকিরা ঝরে পড়ে, দূরে দেখা যায় কালবৈশাখীর মেঘ এদিকেই আসছে। হায়, সব ক্রমশ উধাও হয়ে গেল, পলাশগাছগুলো কেটে ফেলা হল, পুকুর হয়ে গেল জঞ্জাল ফেলার ডোবা, তার পাশে বাঁশের আড়ত, মেট্রো রেল এলো, বাড়ির পর বাড়ির পর দেশলাই-বাড়ি, তারপর পশ্চিমবঙ্গের পাড়া-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় হলো একটু-একটু করে, বাড়ির সামনেই, প্রথম দিনেই, কচ্ছপ কেটে বেআইনি মাংস বিক্রি, কেনার জন্য কী ভিড় আর ঠেলাঠেলি, তারপর কমরেডরা এলেন পুজোর চাঁদা চাইতে, তাদের মনের মতন না হওয়ায়, একজন হুমকি দিয়ে গেল দুর্গাপুজো-কালীপুজোয় এই বাড়ির ছাদে চারটে লাউডস্পিকার লাগানো হবে।

    মেজমাসির সঙ্গে নিমতায় দেখা করতে গেলে বলেছিলেন, “ওখানে ফ্ল্যাট কিনেছিস ? আনওয়ার শা থেকে গড়িয়া পর্যন্ত তো রিফিউজিদের জঞ্জাল-পাবলিকে ঠাশা !” মেজমাসি রিফিউজিদের ওপর চটা ছিলেন কেননা তারা ওনার পুকুর থেকে মাঝরাতে মাছ ধরে নিয়ে চলে যেতো, সুপুরিগাছ থেকে সুপুরি আর নারকেল গাছ থেকে নারকেল পেড়ে নিয়ে যেতো। মেজমাসি মারা গেছেন ; ওনাদের জমিজিরেত পুকুর আর নেই নিমতায় ; ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে। ২০০০ সালে পাঁচ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট বেচে দিলুম, পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ফ্ল্যাট। বেচে, ১৯৮৮ সালে করা নিজের বোকামি থেকে মুক্ত হওয়া গেল। বেচার দু বছর পর গিয়েছিলুম ওই পাড়ায়, দেখলুম আর শুনলুম পাড়ার ছেলেরা ক্রেতার সঙ্গে আপোষ করতে না-পেরে বারান্দার কাচে ঢিল মেরে-মেরে ভেঙে দিয়েছে, যিনি কিনেছেন তিনি কাগজ সেঁটে রোদবৃষ্টি থামাচ্ছেন। ক্রেতা ‘সিপিএম করতেন’ ; হয়তো পালটি খেয়ে ঘাসফুলে যাননি।

    নাকতলায় অতিতরুণ কবি সুশান্ত দাশ আর কমরেড-কবি গৌতম নিয়োগী ১৯৯৫ সালে আমাকে ওদের পাড়ায় আবিষ্কার করে অবাক, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে মেলাতে পারছিল না আমাকে, ভেবেছিল শতচ্ছিন্ন পোশাকে একজন টিংটিঙে ভবঘুরেকে দেখবে, নাকে শিকনি চোখে পিচুটি, চামড়ায় চামউকুন, চুলে মৌমাছির চাক, দেখবে বাড়ি একেবারে আঁস্তাকুড়, কাকেরা শকড়ি খুঁটে খাচ্ছে। অফিসের বদান্যতায় কেনা সিনথেটিক কার্পেট, সোফা, টিভি ইত্যাদি দেখে আরও ঘাবড়ে গিয়ে থাকবে, রাজা সরকার আর অলোক গোস্বামীর মতন। তারপর যখন অফিস-প্রধানের কাজ করতে আরম্ভ করলুম, তখন অফিসের গাড়ি নিতে আসতো আর ফিরতুম তাতে। তবে গৌতম-সুশান্তর সঙ্গে পরিচয়ের পর পাড়ার লোকে আমাকে সিঁড়ির ওপরের পাদানিতে চাপিয়ে দিয়েছিল। সুশান্তর মা ছিলেন সিপিএম সমর্থক, দেয়ালে “গণশক্তি” সাঁটা হতো প্রতিদিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গদিতে বসার পর বললেন, সিপিএম তো আমাদের জন্য কিছুই করল না, সেই দেশভাগের সময়ের দুবেলা দুমুঠোর দারিদ্র্যেই পড়ে আছি। ভাতের হোটেল খুলে সংসার চালাতেন, আমরাও আনিয়ে খেতুম মাঝে-সাজে, রান্নার হাত খুবই ভালো।

    পশ্চিমবাংলার টেকটনিক প্লেটে যখন ধ্বস নামছিল, তখনই মুম্বাই চলে এলুম, শীতের পোশাক, বইপত্র আর আসবাব বিলিয়ে দিয়ে, গাড়িটা বেচে দিয়ে। বেচে, গাড়িকেনার বোকামি থেকে ছাড়ান পেলুম। বইপত্র নিতে কোনো লোকাল গ্রন্হাগার রাজি হল না, শেষে সপ্তর্ষি ভট্টাচার্য ওর অ্যামবাসাডর গাড়ির ডিকিতে ভরে-ভরে কয়েক খেপে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর মা-মাটি-মানুষ করতে গিয়ে সিনডিকেটের হাতে এমন প্যাঁদানি খেয়েছিল সপ্তর্ষি যে ভেলোরে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল; কিন্তু ভেলোরের প্রভাবে এখন যিশুখ্রিস্টের গুণগান করে বেড়ায়, কেউ-কেউ বলে খ্রিস্টান হয়ে গেছে। সিনডিকেটের লোকেরা আমার দেয়া বইগুলোও অন্য বইপত্রের সঙ্গে ছিঁড়েখুড়ে নষ্ট করে দিয়েছিল। নাকতলা, শ্রীপল্লী, যাদবপুরের যে লাইব্রেরিগুলোয় বই দিতে চেয়েছিলুম, তারা টিটকিরি মেরে বলেছিল, হেঁঃ হেঁঃ, কবিতার বই, এসব কে পড়ে মশায়, আপনি একটা র‌্যাক দান করলেও ওসব বই রাখার জায়গা আমাদের নেই। নবারুণ ভট্টাচার্য তাই বলেছিলেন এই চুতিয়াদের ‘দেশ’ আমার নয়, উনি বোধহয় স্তালিনের সোভিয়েত রাষ্ট্রকে নিজের দেশ মনে করতেন।

    শীতের পোশাক, ডবল-ব্রেস্ট স্যুট, সিঙ্গল-ব্রেস্ট স্যুট, থ্রিপিস স্যুট, টেরিউলের প্যাণ্ট, উলের সোয়েটারগুলো, ফুলশার্ট, সবই দিয়ে দিলুম পাড়ার বিহারি ধোপাকে। বললে, উঁচু জাতের লোকেরা এগুলো আমাদের গাঁয়ে পরতে দেবে না, ওদের মধ্যে যারা একটু গরিব তাদেরই বেচবো এগুলো। বেচে আমাদের পরার মতন সোয়েটার-চাদর কিনে মা আর বউকে দিয়ে আসবো। দোকান বন্ধ করে চলে গিয়েছিল পনেরো দিনের জন্যে, পাড়ার অনেকের জামা-কাপড় প্রেস করার জন্যে বাসায় রেখে কেটে পড়েছিল

    নিচেতলার ফ্ল্যাটমালিক ফণীবাবুর কাছে গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে গাড়িটা রাখতুম ; একদিন গ্যারাজ খুলে দেখি গাড়ি থই-থই-গুয়ে ভাসছে ; নিচেতলার ভাড়াটেরা স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলে-ফেলে গু বেরোবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। কর্পোরেশান বললে পার্টি অফিসে যান, কর্মিদের সেখানেই পাবেন। পার্টি অফিস যিনি সামলাচ্ছিলেন তিনি বললেন, বাড়ির ভেতরের কোনো কাজের দায়িত্ব আমাদের নয়, ধাঙড়দের দিয়ে পরিষ্কার করান, বাঁশদ্রোণী বাজারে ভোরবেলা যে ধাঙড়রা কাজ পাবার জন্যে বসে থাকে তারা বলল, ও কাজ আমাদের নয়, মেথরদের কাজ, গাঙ্গুলিবাগানে মেথর কলোনিতে গেলুম, বাসিন্দারা বলল, ওরা শুধু ম্যানহোলের কাজ করে, গুয়ের কাজ করে না। অগত্যা ডাণ্ডালাগানো দুটো সুইপার কিনে, আমি খালি গায়ে গামছা পরে, সলিলা ব্লাউজ-শায়া পরে, গুয়ের পাঁক ঠেলে-ঠেলে, তিনতলা থেকে জলের পাইপ নামিয়ে গুয়ের ইঞ্চি দুয়েক হলুদ-সবুজ-কালচে চাদরকে পথে বের করে নর্দমায় ঢোকালুম। শিবুর চায়ের দোকানে তখন বামপন্হী দর্শকের পাল, শিবু অবশ্য হাওয়া বুঝে তৃণমূলে চলে গিয়েছিল। নর্দমার মুখটা গ্যারেজের কোনেই ছিল বলে রাস্তা নোংরা করতে হয়নি। মানুষের গু ধোবার ধান্দায় সেদিন দুপুরে তো রান্না হয়নি, পার্ক স্ট্রিটে মোক্যামবোতে লাঞ্চ আর হুইস্কি খেতে গেলুম। জানি না আর কোনও সাহিত্যিকের দু-ইঞ্চি পুরু গু ধোবার অভিজ্ঞতা আছে কিনা। সেই যে হয়ে-ওঠা, এটা বোধ হয় মহাপুরুষ আর মহানারী হয়ে ওঠায় উত্তরণ।

    নাকতলার লেটারবক্স পাড়ার আরেকটা ঝামেলা ছিল যখন-তখন মোহোল্লা কমিটির এক কমরেড ক্লাবের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে, ভিয়েন বসিয়ে, লাউডস্পিকার লাগিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনুকুল ঠাকুরের শিষ্যদের দিয়ে বিটকেল বেসুরো গান গাওয়াতেন, খাবার জন্যে কি-ভিড় কি-ভিড়, তারপর মাঠময় স্টায়রোফোমের এঁটো থালা। এই গডম্যান জিনিসটা কিছুতেই বুঝতে পারি না ; যতোগুলো গডম্যানের কথা শুনি সকলেই তো পিঁজরেপোলের মালিক। বিজেপি এসে গডম্যানদের আর দ্যাখে কে ! মাঠের মাঝখানে একসময় পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের লেটারবক্স ছিল বলে পাড়াটার নাম লেটারবক্স, কোনো এক সময়ে মাঠের একপাশে কেবল আমাদের বিল্ডিঙটাই ছিল। হাংরি আন্দোলনের সুবো আচার্য গডম্যানের ওই প্রাতিষ্ঠানিক পিঁজরেপোলে ঢুকে চোপোররাত্তির অনুকুল ঠাকুরের গুণগান করে বেড়ায়। সুবোর বাড়ি বিষ্ণুপুরে গিয়েছিলুম আমি সুবিমল আর ত্রিদিব, তখন ও ত্রিপুরার গোপন ডেরা থেকে ফিরেছে, কেননা আমার বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়ে গেছে, সে ছিল এক ভিন্ন সুবো আচার্য, বিষ্ণুপুরে ঘোরাঘুরি করে ধানখেতের ভেতর দিয়ে ল্যাংটোপোঁদে চারজনে একটা নদী পার হয়েছিলুম মাথায় পোশাক চাপিয়ে, গাছতলায় ল্যাংটোপোঁদে চারজনে গাঁজা টেনেছিলুম। এখন সুবো অনিশ্চয়তাকে এতো ভয় পায় যে কথায় কথায় গুরুদেব গুরুদেব ভজন গায় অথচ আগে ওর গুরুদেব ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। “সুনীল বলেছে মলয় লিখতে জানে না”, সেকথা জানিয়েছিল আমাকে। প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল, ওটা সুবো আচার্যের ডিএনএতে রয়ে গেছে, গুরু, মন্ত্র, মনুসংহিতা, রক্ষণশীলতা ইত্যাদি, বংশানুক্রম অবদান।

    পাঁচ

    নাকতলায় একদিন টেলিফোন পেলুম, “মলয়, আমি উদয়ন বলছি, উদয়ন ঘোষ, আপনাদের পাড়ায় এসে গেছি, রিকশঅলাকে বলবেন ট্রান্সফরমার স্ট্যাণ্ড”। ২০০১ সালে আমার ছোটোগল্প নিয়ে একটা প্রবন্ধে উদয়ন লিখেছিলেন, “যত দিন যাচ্ছে, মলয়ের লেখা যত পড়ছি, ততই মনে হচ্ছে, তাঁকে নিয়ে মহাভারত লেখা যায়।” তখনও পর্যন্ত ওনার সঙ্গে আমার সামনাসামনি দেখা হয়নি। ভাবলুম, যাক, কেদার ভাদুড়ির মতন আরেকজনকে পাড়ায় পাওয়া গেল মোদো-আড্ডা দেবার জন্য। একটা পিটার স্কটের বোতল কিনে হাজির হলুম, দেখি উদয়ন শয্যাশায়ী, মন খারাপ হয়ে গেল। আমায় দেখে বিছানা থেকে ধড়মড় করে উঠতে যাচ্ছিলেন, বারন করলেন ওনার স্ত্রী। হাঁপানিতে ধরেছে, লিখতে পারছেন না বলে ডিপ্রেশান, নানা রকম যন্ত্রপাতি ওনার বিছানা ঘিরে। আড্ডা হল কিছুক্ষণ, আমি যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বই ছাপাবার টাকা দিয়েছিলুম, উনিও দিয়েছিলেন, আমাদের দুজনের একই অভিজ্ঞতা। মাঝে-মাঝে যেতুম, উনি শয্যাশায়ী। ওনার আর শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় আর শান্তি লাহিড়ীর একই অবস্হা, পঞ্চাশ দশকের তিনতিকুড়ি কবি-লেখকদের সঙ্গে চিপকে থেকে গর্ব বোধ করার দরুন নিজের লেখার সময় দুমড়ে ছোটো করে ফেলতে হয়েছিল। একদিন উদয়নের মেয়ের টেলিফোন পেলুম যে মারা গেছেন।

    ২০১৪ সালে যখন “নখদন্ত” বইটার নতুন সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন কাকে দিয়ে করানো হবে জানতে চাইলেন গুরুচণ্ডালীর কর্ণধার ঈপ্সিতা পাল, আমি বলেছিলুম, বইমেলায় যারা জিনিসপত্র ফিরি করে বেড়ায়, তাদের কাউকে দিয়ে। তেমনই একজনকে দিয়ে করিয়েছিলেন উনি। কলকাতায় থাকতে তরুণ কবিদের দেখেছি আগের দশকের কোনো টাকমাথা বা চুলে কলপদেয়া কাঁধে-চাদর কবি বা লেখককে দিয়ে “মোড়ক উন্মোচন”এর অনুষ্ঠান করিয়ে গদগদ হন, যেন ফুলশয্যায় কনডোমের প্যাকেট খোলাচ্ছে। আমার মনে হতো এইসব তরুণ কবি সারাটা জীবন অন্যের চিন্তাজগতে বসবাস করে কাটাবে, বেঁচে থাকার চারিদিকে যে সন্ত্রাস আর নোংরামি, তার সঙ্গে এদের পরিচয় হবে না কখনও। একজন ফিরিঅলাকে দিয়ে বইয়ের “মোড়ক উন্মোচন” করিয়ে কী যে আনন্দ কী বলব।

    ১৯৯৬ সালে নাকতলায় বেশ আনন্দ হয়েছিল পাটনার এক ফুচকাঅলাকে দেখে, ফুচকা ভেজে, মশলা নিয়ে রোজ ময়দানে বিক্রি করতে যেতো। “পাটনাইয়া ফুচকাই বেচো, নাকি মশলায় অদল-বদল ঘটিয়েছো?” জিগ্যেস করতে বলেছিল, মিষ্টি সামান্য বেশি খায় বাঙালিরা, বাদবাকি পাটনাইয়া, পুরো কলকাতায় যতো ফুচকাঅলা আছে সবাই ভোজপুরি, বিহার আর পূর্ব উত্তরপ্রদেশের, তাই যতো ফুচকা বিক্রি হয় সব পাটনাইয়া। আমাকে কেউ যদি জিগ্যেস করে আপনার কী খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে, তাহলে আমি ইলিশ-চিংড়ির কথা বলব না, ফুচকার কথা বলব। ফুচকায় আইরিশ ক্রিম ভরে খেতে দারুণ। যদি আমিষের কথা জিগ্যেস করে কেউ তাহলে বলব যে সুইডেনের আইকিয়ার মিট বল খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে, গোরু-শুয়োরের মাংসকে জানিনা কী ভাবে স্পঞ্জের মতন নরম করে তোলে, এক ইউরোতে দশটা মিট বল, এক প্লেট আলুভাজা, একটা তিনকোনা প্যাসট্রি আর কফি, প্রতি রবিবার সকালে, আহা, আহা, আহা, তারপর আর লাঞ্চ করার প্রয়োজন হয় না। তবে ইউরোপের মাংসের প্রিপারেশন ভালো লাগে না, মনে হয় কাঁচা, অনেক সময়ে রক্ত বইতেও দেখেছি প্লেটের ওপর। হাংরি আন্দোলনের সময়ে শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ গোরুর মাংস খেতে চাইত না, বেঁচে থাকলে বিজেপি দলের কর্মী হতে পারতো।

    ১৯৬৬ সালে অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায়কে তাক লাগিয়ে দেবার জন্যে দরিয়াপুরে আমার ঘরে একটা পেইনটিঙ তৈরি করে রেখেছিলুম ওরা দুজনে কাঠমাণ্ডু থেকে ফিরলে দেখাবো বলে, নাম দিয়েছিলুম “পেইনটিঙের ভাষাকে আক্রমণ”। কাজটা ছিল একটা সাদা কার্ডবোর্ডে আমার নুনুর চারিপাশের জমানো বাল, যাকে হিন্দিতে বলে ঝাঁট, আঠা দিয়ে সেঁটে তৈরি আমার আত্মপ্রতিকৃতি। ওরা দুজনে দেখেই থ, করুণা বললে, “শালা একেবারে ক্লাসিকাল আর্ট, যেন ইউলিসিস, বেনারস নিয়ে যাবো, হিপিগুলো দেখেই লেড়িয়ে যাবে, দশ-পনেরো ডলারে ঝেঁপে দেবো, বুঝলে, তোমার ইন্সটলেশান আর্ট পৌঁছে যাবে ইউউউউউ এসসসসসস এএএএএএএএ”। করুণা চুলগুলোতে উপযুক্ত রঙ লাগিয়ে মুখকে আকর্ষক করে তুলল। ওদের সঙ্গে আমিও গেলুম বেনারস, কোর্টে কেস কবে উঠবে ঠিক নেই, সুবিমল বসাক যোগাযোগ রেখেছে হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটের সঙ্গে। বেনারসে যাবার লোভ করুণাই দেখিয়েছিল, “গাঁজা-চরস-আফিম মিশিয়ে চারমিনারে পুরে ফোঁকো আর হিপিনীসেক্স করো, একজন মোটা হিপিনী আছে, যাকে কেউ সঙ্গিনী করতে চায় না, এক ব্যাটা হিপি তাকে বেনারসে ছেড়ে আরেকজনকে নিয়ে চলে গেছে, তাকে পাইয়ে দেবো, অনিল ওর নিউড আঁকতে ডাকবে, তখন চাক্ষুষ করে নিও।” দেখলুম মোটা হিপিনীকে, ম্যাডেলিন করিয়েট, পোশাকহীন, ঝলমলে হলুদ আলোয়, অনিলের স্টুডিওতে, আর আবার শুরু হল আমার লুচ্চাপ্রেমিক অ্যাডভেঞ্চার, “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা”। করুণা তিরিশ বছর আগে, অনিল দশ বছর আগে মারা গেছে।

    ১৯৪৭ সাল থেকে, কী খাবো আর কী খাবো না তা প্রকাশ করার স্বাধীনতা আমিও নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলুম। কুমড়ো, ঝিঁঙে, ধুঁধুল, কুচোপোনা, মৌরলা, ট্যাঙরা, বিউলির ডাল আমি ইমলিতলায় খেতুম না। দরিয়াপুরে রান্নার বউ রাখলুম ১৯৭০ সালে আর সবকিছুই খাওয়া আরম্ভ করলুম, কেননা রান্নার বউ ছিল বরিশালের আর আমি তাকে বলতুম ধুঁধুলে গোটা মশলা দাও আর কিমা দিয়ে রাঁধো, কুমড়োয় হিং ফোড়ন আর প্রচুর টোম্যাটো দাও, ঝিঁঙেতে রসুন দাও আর কাবলি ছোলা বাটা, বিউলির ডালে আস্ত রসুনকোয়া, বড়ি আর পালংশাক। সেই থেকে রান্নার রেসিপির একটা বই লেখার পরিকল্পনা মাথায় ঠাঁই করে নিয়েছে। ঠাকুমা ঠিকই বলতেন যে রান্নায় উচিত মশলা দিতে জানলে পাথরের টুকরোর তরকারিও খাওয়া যায়। আমি আসলে বেশ পেটুক। নোলা-সকসকে মানুষ বলতে যা বোঝায়। খিদে না থাকলেও ভালো খাবার দেখলে বা স্কচ বা সিঙ্গল মল্ট দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে। খিদে ব্যাপারটা মনের স্হিতি, পেটের নয়।

    ছয়

    ১৯৭৯ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে সিনিয়ার অ্যানালিস্ট হিসেবে অ্যাগ্রিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশানের লখনউ দপতরে যোগ দিয়ে কয়েকদিন স্টেশানের কাছে হোটেলে ছিলুম আর প্রতিদিন রাতে ওল্ড মংক খেয়ে পাঞ্জাবি সরদারের দোকানে পুরো চিকেন তন্দুরি খেতুম কুড়ি টাকায়। আরও চারজন সিনিয়ার অ্যানালিস্ট, সকলেই ধনী চাষিবাড়ির কৃষি-বিজ্ঞানী, আবদুল করিম, শেট্টিখেড়ে প্রভাকর, ডক্টর কুরকুটে আর মদন মোহন যোগ দিলে, যতোদিন না বাড়ি পাচ্ছি, আমাদের থাকার ব্যবস্হা হল উত্তরপ্রদেশ ভূমি বিকাশ ব্যাংকের গেস্ট হাউসে। রান্নার ব্যবস্হা নিজেদের। প্রভাকর সম্পুর্ণ শাকাহারি, পেঁয়াজ রসুনও খায় না, আর করিমের আমিষ না হলে চলবে না। সিদ্ধান্ত হল একদিন প্রভাকর রাঁধবে একদিন করিম। আমরা বাসন মাজবো, ঝাড়ু দেবো, পোঁছাপুছি করব চারটে ঘর আর ড্রইং রুম। এই চাকরিতে প্রথমেই যেতে হয়েছিল হিমালয়ের তরাইতে আর্টেজিয়ান কুয়োগুলোকে কাজে লাগাবার প্রজেক্ট তৈরির কাজে, তার আগে জানতুম না যে মাটির তলা থেকে কনকনে ঠাণ্ডাজল আপনা থেকে ফোয়ারার মতন বেরোতে থাকে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিটা না ছাড়লেই ভালো হতো ; ষাট হাজার টাকা পেনশন বেশি পেতুম।

    করিমের মাংস রাঁধা দেখে আমাদের মাংস খাওয়া টঙে উঠল। মাংস কিনে এনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জলে ভিজিয়ে রাখত যাতে শেষ রক্ত ফোঁটাও বেরিয়ে যায়, তবুও খেলুম মাংস, তাতে সজনে ডাঁটা মুলো বেগুন দেয়া। মাংসের সাম্বর, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর হালিম রাঁধা অন্ধ্রের আবদুল করিমের কাছে শিখলুম। ওকে তারিফ করে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর হালিম রাঁধায় টেনে নিয়ে গিয়ে আমাদের স্বস্তি। মুর্গি কিনে এনে করিম তাকে উনুনে ঝলসে নিতো যাতে রক্তের রেশ না থাকে। আর তার ফলে গ্যাসের উনুন থেকে আগুন বেরোনো চৌপাট হয়ে যেতো। অবসর নেবার পর নাভি পর্যন্ত পাকা দাড়ি নিয়ে করিম পাঁচবেলা নামাজ পড়তো, অন্ধ্রের গ্রামে একটা বাড়ি করেছিল সাতটা ঘরের, বিশাল বাংলো, ভেবেছিল বউ আর নাতিপুতি নিয়ে থাকবে, তা বউটাই মারা গেল ক্যানসারে। একটাই ছেলে হাসন্যায়েন হিন্দু মেয়ে বিয়ে করে থাকতে চায়নি বাপের সঙ্গে। লখনউ থাকাকালে করিম যেখানেই ট্যুরে যেতো, আমার ছেলের জন্য কোনো উপহার সেই জায়গা থেকে আনতো, নাকতলার ফ্ল্যাট বেচার সময়ে সবই পাড়ায় বিলি করে দিতে হয়েছে।

    প্রভাকর ব্রেকফাস্টে দোসা সাম্বর বা ইডলি বানিয়ে দিতো। দোসা ইডলি আর সাম্বর বানাতে শিখে গেলুম, শিখে ফেলার পুরস্কার হিসেবে ও কর্ণাটকে নিজের গ্রাম থেকে একটা দোসা বানাবার চাটু এনে দিয়েছিল, যা এতো ভারি যে এখন আর তুলতে পারি না। তিন মাস পরে ইন্দিরানগরে বাংলোবাড়ি পেয়ে নতুন আস্তানায় গিয়ে পাটনা থেকে সলিলা, ছেলে-মেয়ে আর জিনিসপত্র নিয়ে এলুম। যে বাংলো পেয়েছিলুম, তাতে প্রচুর সাহায্য পেলুম চার কৃষি বিজ্ঞানী বন্ধুর, নিজে চাষ করার, বাগান করার, এমনকি ঘাস লাগাবার। আর প্রচুর বই, চাষবাসের বই, কিছুই জানতুম না আগে। সেই থেকে আমার মস্তিষ্ক হয়ে গেছে ক্যালাইডোস্কোপিক। নতুন চাকরিটাও এমন যে গ্রামে-গ্রামে চাষের উন্নতির রিপোর্ট দিতে হতো। গোরু, ছাগল, মোষ, বলদ, ষাঁড়, শুয়োর, হাঁস, মুর্গির যে কতো রকম প্রজাতি হয় সেই প্রথম জানলুম। মোষ-ষাঁড়-শুয়োরের সিমেন বের করার টেকনিক, সেই সিমেন মাদিদের যোনিতে পোরার টেকনিক, দেখতে দেখতে বেশ উত্তেজনা হতো। তার আগে তো দূর থেকে বাজরা আর জোয়ার খেতের তফাত টের পেতুম না।এই নতুন চাকরির দরুন সাহিত্যের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। পাটনায় থাকতে তো চাষবাসের কিছুই জানতুম না, একটা গাছে এলাচ কোথায় হয় তা জানতুম না।

    ১৯৫০ সাল থেকেই ঠাকুমা গরমকালে কেবল একটা গামছা কোমরে জড়িয়ে উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে ঘুরে বেড়াতেন, ভাড়াটেদের সঙ্গে গ্যাঁজাতেন, ওনার মাইদুটো শুকিয়ে আমসি হয়ে গিয়েছিল। যখনই যেতুম কিংবা ঠাকুমা পাটনায় আসতেন, বলতুম, “তোমার মাই নিয়ে খেলবো”। ঠাকুমার মাইয়ের বোঁটা দুটো দুহাতে ধরে জুড়ে ছেড়ে দিতুম আর বলতুম, “ঝমমমম”। ঠাকুমা বলতেন, যথেষ্ট বয়েস হয়েছে তোর, “এবার বে-থা কর আর বউয়ের মাই নিয়ে ঝম ঝম কর দিকিনি।” বলতুম, “বউয়ের মাই তো আর তোমার মতন হবে না যে এক বোঁটার সঙ্গে আরেক বোঁটাকে মেলাবো।” ঠাকুমা বলতেন, “আমার মাইও এককালে তোর বড়োজেঠিমার চেয়ে পেল্লাই ছিল, বুঝেছিস, তোর দাদুর কতো গর্ব হতো।” ঠাকুমা মারা যাবার চার বছর পরে বিয়ে করলুম, নয়তো ওনাকে বলতুম, আমিও আমার বউয়ের মাই নিয়ে গর্ব করি, তোমাকে দেখাতে বলব একদিন।

    ২০১০ সালে মালাডের ইনঅরবিট মলের ফুড কোর্টে বসে অপেক্ষা করছিলুম এক দম্পতির, সেদিন তাদের বিবাহবার্ষিকী, খাওয়াবে বলে কয়েকজনকে ডেকেছে। প্রায় সকলেই পৌঁছে গিয়েছিলুম। একজন যুবতী এগিয়ে এলো আমার দিকে, দুহাতে বিয়ের মেহেন্দি, এক হাতে প্লাস্টিকের চালুনি, আরেক হাতে বাঙলা পাঁজি আর দামি ব্যাগ। ইংরেজিতে আমাকে বলল, স্যার আপনাকে বাঙালি বলে মনে হচ্ছে, আমি এই ফোরটিন গ্রিনস কিনতে বেরিয়েছি কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না, ক্রফোর্ড মার্কেটেও পাইনি; আপনি কাইন্ডলি বলতে পারবেন কি যে এই গ্রিনগুলো কোথায় পাবো ? জিগ্যেস করে জানলুম ও কানপুরের মেয়ে, বিয়ে করেছে বাঙালি যুবককে, শশুর-শাশুড়িকে ইমপ্রেস করার জন্য চোদ্দশাক খুঁজে বেড়াচ্ছে। চালুনিটা করওয়া চৌথের জন্যে। পাঁজি খুলে দেখলুম শাকের নাম দেয়া আছে, ওলপাতা, কেঁউ, বেতো, সরিষা, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাটপাতা আর সুষণী। বললুম, এই ফোরটিন গ্রিনসের কথা আমি নিজেই আগে জানতুম না, আমাদের বাড়িতে যে চোদ্দশাক হতো তাতে পালংশাকের সঙ্গে নটে, ধনে, সোয়া, লাউ, কুমড়ো, পালং, কলমি, যার কোনোটাই এই লিস্টে নেই। আমার স্ত্রী যুবতীটিকে বলল, পালংশাক কিনে নাও আর যা-যা গ্রিনস পাওয়া যাচ্ছে কিনে নাও আর তা শ্রেডিং করে রেঁধো, তোমার ইনলজ আনন্দিত হবেন। নিজেরা যে বাঙালিত্ব ছেড়ে দিয়েছি একজন অবাঙালী যুবতীকে তা করতে দেখে, করুণার ভাষায়, লেড়িয়ে গেলুম।

    মুম্বাই থেকে ফিরে সুভাষ ঘোষের বাড়ি চন্দননগরে গিসলুম ১৯৯৬ সালে, বহুকাল পর দেখা করার ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে পারিনি বলে, স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি সিপিএম-এর মিছিলে ঝাণ্ডা নিয়ে স্লোগান দিতে-দিতে যাচ্ছে সুভাষ ঘোষ, মন খারাপ হয়ে গেল। ওর বাড়ি গিয়ে দেখি বারান্দার এক কোণে সিপিএম-এর ঝাণ্ডার স্তুপাকার গোছা, ভেতরের ঘরে দেয়ালে ঝুলছে জ্যোতি বসুর ছবি, মনে হল ওর বাড়ি আসা বড্ডো ভুল হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ঢুকে গেছে প্রতিষ্ঠানের খাঁচায়। অবশ্য যখন ও মুচলেকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছিল, তখনই হদিশ পেয়েছিলুম যে ও একা লড়তে ভয় পায়, ওর চাই মিছিলের আশ্রয়, ওর চাই কফিহাউসের তরুণদের জমঘট। বলল, “মফসসলে থাকলে বুঝতে এসব না করে টিকে থাকা কতো কঠিন”। নিজের বউ কণক ঘোষকেও হাংরি আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে, যদিও কণক ঘোষের লেখার স্তর বাচ্চাদের । এদিকে সিপিএমের লুম্পেনরা তখন গ্রামে-গ্রামে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাচ্ছে, বাড়ি-ধানের গোলা পোড়াচ্ছে, মুণ্ডু নিয়ে ফুটবল খেলছে, পেট্রল ঢেলে মানুষ পোড়াচ্ছে, মানুষদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে দিচ্ছে, সুভাষের লেখায় তাদের দেখা মেলে না।

    মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৫ সালে প্রদীপ চৌধুরীর বাড়ি গিসলুম, দাদাকে আমাকে সলিলাকে শ্যাম্পেন খাওয়াবার নেমন্তন্ন করেছিল, শুনেছিলুম ফি বছর ফ্রান্সে কবিতা পড়তে যায়। শ্যাম্পেনের বোতলে ভরে দিশি বাংলা খাওয়ালো, ভেবেছিল আগে শ্যাম্পেন খাইনি কখনও। বহুকাল পর পুরোনো প্রদীপকে পেয়ে গেলুম, দেশ-বিদেশ ঘুরেও টসকায়নি, দি সেম ওল্ড কুমিল্লা ব্লোক, জিভের আড় ভাঙেনি। “হাওয়া ৪৯” পত্রিকায় প্রদীপ সম্পর্কে একটা লেখা লিখেছিলুম, প্রদীপের রাস্টিকেশানের যাবতীয় ডকুমেন্টসহ, প্রদীপ বলেছিল আমার গদ্যটার মতন আর কেউ ওকে বিশ্লেষণ করতে পারেনি। কিন্তু মুচলেকাপন্হীরা ওকে একঘরে করে দিতে পারে এই ভয়ে, লেখাটার সঙ্গে দেবার জন্যে একটা ফোটো তুলিয়ে দিয়ে গেল, যেন আমাকে লাথি দেখাচ্ছে। ওই ফোটোসহ ছেপে দিয়েছিলুম গদ্যটা। জানি না রাজসাক্ষীদের ও কেন এতো ভয় পেতো। তাদের অন্তর্ধানের পর পুরোনো প্রদীপ খোলোশ থেকে বেরিয়ে এসেছে। অভিমন্যু সিংহের সাইটে ইনটারভিউ দিয়ে যে ফোটো দিয়েছে তাতে প্রদীপের গলায় ঝুলছে বিজেপির পদ্মফুল।

    মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৬ সালে শৈলেশ্বর ঘোষের বাড়ি গিসলুম, বেশ অনেকখানি জায়গা নিয়ে বাড়ি, পাঁচিলের গা ঘেঁষে দেবদারুর সারি বসিয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও পত্রিকার মলাটে ভিকিরির ছবি কেন, জিগ্যেস করতে বলল, ‘পাতা ফুঁকবে নাকি’। আলমারি জুড়ে কেবল নিজের বই, সারি-সারি। মারা গেল অপারেশান থিয়েটারে। একে-একে মারা গেল ওর বউ, জামাই, মেয়ে। কিন্তু প্রচুর এনটিটি পয়দা করে গেছে ওর লেখাপত্তর সামলাবার।

    আমি তো চিনতুম না, তাই প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল শৈলেশ্বরের বাড়ি নিয়ে যাবে। যেদিন যাবার সেদিন গাপ মেরে শৈলেশ্বরকে আগাম খবর দিয়ে এলো, যাতে ও তৈরি থাকে। আমি আর দাদা ওর অপেক্ষায় গড়িয়ার বাস ডিপোয় দাঁড়িয়ে রইলুম ঘণ্টা দুয়েক। পরের দিন নিয়ে গিয়েছিল। মারা যাবার কয়েকদিন আগে শৈলেশ্বরের মেয়ে জীজা ঘোষ চিঠিতে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে লিখেছে যে, যে-পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরী আর সমীর রায়চৌধুরীর লেখা থাকবে তাতে যেন ওর বাবার লেখা প্রকাশ না করা হয়। মন্দ নয়, মারা যাবার আগে মুচলেকা-লেখক মেয়েকেও রাজসাক্ষ্যের দুর্গন্ধ মাখিয়ে যেতে পেরেছে। বেচারি। অনেক বকাসুর চেহারার অ্যাণ্ডাবাচ্চাও ছেড়ে গেছে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করার জন্য।

    মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৬ সালে অবনী ধরের গল্পগুলো নিয়ে একটা বই যাতে বেরোয় তার চেষ্টা করলুম। বাসুদেব, সুভাষ, শৈলেশ্বর, প্রদীপ কেন যে অবনী ধরের গল্পগুলো নিয়ে বই করতে চায়নি জানি না। অবনীও, সোনাগাছিতে বাসুদেবের সঙ্গে গিয়ে বেবি-মীরা-দীপ্তির সঙ্গে শোবার আর ধেনো টানার খরচাপাতি করেছে, বই বের করার কথা ভাবেনি। অবনীর বই বের করার প্রস্তাবটা দিতেই রাজি হয়ে গেল শর্মী পাণ্ডে, আমি একটা ভূমিকা লিখে দিলুম। বাচ্চা হচ্ছে না বলে শর্মী পাণ্ডের তখন বেজায় মন খারাপ, নানা হাসপাতালে নানা টেস্ট করিয়ে চলেছে, বেশ ব্যস্ত। তা সত্বেও আগ্রহ নিয়ে বের করে দিল বইটা। অবনী ধর এক কপি দিতে এসেছিল আমায়, বলল বইটার নাম “ওয়ান শট” এর বদলে “ওয়ান সট” হয়ে গেছে। বললুম শর্মীও বোধহয় আমার মতন ঘটি। বইটা বের করার পূণ্য হিসেবে একটা সুন্দর বাচ্চা পেয়েছে শর্মী, নাম রেখেছে “রূপকথা”। দারুণ। অবনী ধর যে মারা গেছে তা ওর ছেলের টেলিফোনে জেনেছিলুম।

    সাত

    ১৯৪৪ সালে ইমলিতলার গঞ্জেড়িরা কেউই বিশ্বাস করতে চায়নি যে ধবধবে শাদা শুয়োর হয় আর তার মাংস খেতে দিশি কালো শুয়োরের চেয়ে ভালো, ওরা ভেবেছিল আমি ইয়ার্কি করছি, “হাঃ হাঃ হমনিকে বুড়বক সমজ লইল কা ববুয়া”। আমি তাই আর ওদের ভুল ভাঙাইনি যে সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে না ; জানি ওদের নাতিরা স্কুলে যেতে আরম্ভ করলে পাকা ভুরু কুঁচকে বসে থাকবে।

    ১৯৬৫ সালে বেনারসে আমার “জখম” কবিতার হিন্দি অনুবাদ, যা কাঞ্চনকুমার করেছিল, তা লুকিয়ে সরকারি প্রেসে ছাপানোর ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন হিন্দি আর মৈথিলি ভাষার কবি নাগার্জুন। বাঁধানো অবস্হায় বইটা হাতে নিয়ে দেখলুম সাজাবার সময়ে কবিতার লাইন একেবারে ওলোট-পালোট হয়ে গেছে। এই-ই হল আমার কবিতার ফর্ম, বললুম নাগার্জুনকে, যেখান থেকে ইচ্ছে লাইন তুলে যেখানে চান বসিয়ে নিন, টোটাল কবিতায় কোনো হেরফের হবে না, আপনার বৌদ্ধধর্মের চত্বারি আর্যসত্যানি দুঃখই তো কবিতাটার বনেদ। ১৯৯৮ সালে মারা গেছেন নাগার্জুন।

    ১৯৯৯ সালে ঈশ্বর ত্রিপাঠী এসেছিলেন নাকতলার ফ্ল্যাটে, একহাজার টাকা নিয়ে, আমাকে পুরস্কৃত করতে চান, ‘প্রমা’ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার “উত্তরদার্শনিকতা” প্রবন্ধ পড়ে এতোই অভিভূত। আমি পুরস্কার নিই না বলে ওয়ান-টু-ওয়ান পুরস্কার দিতে এসেছিলেন, যাতে কেউ জানতে পারবে না, অথচ পুরস্কারও দেয়া হবে। টাকার তোড়াটা উনি সোফার কুশনের তলায় রেখে চলে যেতে চাইছিলেন। বললুম, আমি তো রামকৃষ্ণ নই, বইবাজারের কেষ্টবিষ্টুও নই, লেখার জন্যে পুরস্কার নিই না, সম্বর্ধনা নিই না। উনি মুষড়ে পড়লেন, তুলে নিলেন টাকাটা আর কোনো কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। ওনার মৃত্যুর খবর পেয়েছি বেশ দেরিতে। “কবিতা পাক্ষিক” পত্রিকার প্রভাত চৌধুরীও সম্বর্ধনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আবার বলতে হল যে, আমি এই সবেতে নেই। হয়তো ওনার পছন্দ হয়নি ; তারপর থেকে ওনার পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয় না।

    ইমলিতলার গঞ্জেড়িদের জমায়েতে ইঁদুর পুড়িয়ে খাওয়া হতো ; ১৯৪৫ সালে আমি পুরোটা খাইনি, বমি করে ফেলব আঁচ করে, তবু একটুকরো মুখে দিয়ে চেখেছিলুম, বিটকেল সোঁদা গন্ধ, চেখে বমি করলুম। দাদা খেয়ে দেখেছিল, তাড়ি দিয়ে। তাড়ি আর ঠররা খাবার ট্রেনিঙ তো ইমলিতলায়। এখন যারা থাকে তারা হয়তো আংরেজি শরাব খায়।

    ১৯৬২ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সহকর্মী শিউচন্দরের বাড়িতে ওর গ্রাম ছপৌলিতে গিয়েছিলুম। ওদের অনেক জমিজিরেত, ছাগল বলদ গোরু মোষ ঘোড়া। আমায় একটা ঘোড়ানীর পিঠে বসিয়ে, ঘোড়ানীর পিঠে জিন ছিল না, ঘোড়াটাকে শিস দিয়ে ওরা নিয়ন্ত্রণ করছিল, আমার লিঙ্গের তলায় ঘষটানি লেগে দাঁড়িয়ে গেল, ব্যাটারা জানতো কি হতে চলেছে, তাই শিস দিতে থাকলো, আর আমার বীর্যপাত ঘটা আরম্ভ হলে ঘোড়ানীর গলা জড়িয়ে ধরলুম, ঘোড়ানীর সঙ্গে এভাবে প্রেম করে ব্যক্তিগত প্রেমের ইতিহাস তৈরি করলুম। শিউচন্দর মারা গেছে কুড়ি বছর আগে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল নোটের বিষাক্ত গন্ধ আর ছোঁয়াচে রোগের জন্য।

    রাতে শিউচন্দরদের বারদেউড়ির যে ঘরে আমাকে শুতে দিয়েছিল, হঠাৎ তার মধ্যে একজন বিহারি যুবতীকে ঠেলে দিয়ে শিউচন্দরের বাবা বললে, “লে রে ববুয়া, দেশি ঘোড়ি পর চঢ়”। মেয়েটার গন্ধে আমার হাড়-হিম করা ভয় দেখা দিল, দরোজা খুলে বললুম, যাও এক্ষুণি পালাও। ভিতু ছিলুম বেশ। যৌনকর্মে নারীও ভীতির কারণ হতে পারে।

    ১৯৮৯ সালে মুম্বাইতে ফিয়াট গাড়ি কিনেছিলুম অফিস থেকে লোন নিয়ে। ড্রাইভ করতে বেরিয়ে রিভার্স করার সময়ে একটা ট্রাককে ধাক্কা মারলুম, গাড়ির পেছন দিক চুরমার। ডিলারের কাছে নিয়ে যেতে, বলল, প্রথম গাড়ি কিনে ড্রাইভ করতে বেরিয়ে শতকরা পঁচাত্তর ভাগ লোক অমন দুর্ঘটনা ঘটায়, আপনার ভাগ্য যে সামনে থেকে কাউকে ধাক্কা মারেননি।

    ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত সান্টাক্রুজের ফ্ল্যাট থেকে নারিমন পয়েন্ট পর্যন্ত প্রত্যেক দিন সকালে আধ ঘন্টায় পৌঁছে যেতুম, মেরিন ড্রাইভে বসে হাওয়া খেতুম। নানা জায়গায় বেড়াতে যেতুম। এখন মুম্বাইতে এতো গাড়ি যে চালানো অসম্ভব, এখন সান্টাক্রুজ থেকে নারিমন পয়েন্ট যেতে তিনচার-ঘণ্টা লাগে। ১৯৯৫ সালে কলকাতায় গিয়ে গাড়ি চালাতে বেশ মুশকিল হতো কেননা নাকতলায় থাকতুম গলির ভেতরে আর সিপিএম দলের পাবলিক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গ্যাঁজাতো, গাড়ি দেখেও সরে যেতো না, কেউ-কেউ বলতো, “বাঞ্চোৎ গাড়ি দেখাতে এসেছে”, অর্থাৎ রিফিউজিদের মার্কসবাদ ব্যাখ্যা, এরাই পুরো পশ্চিমবাংলাকে ডুবিয়ে দিয়েছে ; লোকগুলো বুঝতেই পারেনি যে কিছুদিনেই গদি থেকে উৎখাত হয়ে যাবে। প্রায়ই ক্লাচ খারাপ হতো। বেচে দিলুম গাড়ি।

    ২০০০ সালে নাকতলার ফ্ল্যাটও বেচে দিলুম, এমনই একজনকে যে নিজের নামের মাঝখানে “হার্মাদ” লিখে সিপিএম করতো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গদিতে বসতেই, সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে তৃণমূলে পালিয়েছে। বললুম, কি, শেষ পর্যন্ত হার্মাদকে হমদর্দ করে ফেললেন, তৃণমূলে যোগ দিলেন ; প্রত্যুত্তরে উনি হেঁঃ হেঁঃ দিয়ে নিজের ক্ষুদ্রতা মুখময় ছড়িয়ে দিলেন। বিল্ডিংটা ছিল পঞ্চাশ বছরের পুরোনো।

    ২০১৬ সালের ঘটনা, আরেকজন হার্মাদকে নিয়ে, তিনি চিরঞ্জীব বসু, নামের মাঝে ‘হার্মাদ’। জীবনানন্দের “অন্ধকার” কবিতা থেকে এই উদ্ধৃতি দিয়েছিলুম ফেসবুকে : “আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর।” চিরঞ্জীব মন্তব্য করলেন, “আপনি এতো আধুনিক কিন্তু বাল ‘ভিতর’ লেখেন কেন ?” আরও অনেকের মন্তব্য ছিল, সকলেই ভেবেছেন, লাইনটা আমার। বুঝতে অসুবিধে হল না যে জীবনানন্দকে পড়াও ছেড়ে দিয়েছে বাঙালি পাবলিক। মন্তব্যগুলো পড়ে “কল্কি” পত্রিকার তরুণী সম্পাদক কৃতী ঘোষের উক্তিটা মনে পড়ে গেল, ‘ঝাঁট জ্বলে যায়। আচ্ছা, মেয়েদের কি ঝাঁট হয় ? কেমন যেন আনরোমান্টিক। তার চেয়ে লোমনাশক লাগিয়ে জায়গাটায় আলতা মাখিয়ে রাখলে শরীর বেয়ে গান বইতে থাকবে।

    ২০০০ সালে মুম্বাইতে দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের পরে যখন নানাবতী হাসপাতালে থিতু হলুম, কার্ডিওলজিস্ট আমার স্ত্রীকে বললে, তিন লাখ টাকা তাড়াতাড়ি যোগাড় করুন, বাই পাস করতে হতে পারে। প্রথম হার্ট অ্যাটাকের পর অ্যানজিওপ্লাস্টি করিয়েছিলুম। তিন লাখ টাকা চাইলেই তো আর পায়খানা বা পেচ্ছাপের মতন হাসপাতালে জমা দেয়া যায় না। কলকাতা পাড়ি মারলুম। প্রভাত চৌধুরী আমার হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনে ভূমেন্দ্র গুহকে নিয়ে এলো, তার আগে আমার সঙ্গে ভূমেন্দ্র গুহর পরিচয় ছিল না। উনি এক মাসেই সারিয়ে তুললেন, বাংলায় প্রেসক্রিপশান লিখে দিতেন, আমার জন্য ওয়েইং স্কেল আর ব্লাড প্রেশার মেশিন কিনে এনে দিয়েছিলেন ; পরিবর্তে আমি মাছ ভাজা আর স্কচ খাওয়াতুম। প্রতি সপ্তাহে একবার দেখতে আসতেন। হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিলেন। হয়তো শরীর খারাপ হয়েছে ভেবে,ওনার বাড়ি গিয়েছিলুম, ভালো ব্যবহার করলেন না, প্রেসক্রিপশান-রিপোর্ট ইত্যাদি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। চুপচাপ ফিরে এলুম, মনখারাপ করে। একবার মদের ঘোরে বলেছিলেন যে সরকারি হাসপাতালে এক্স রে করে করে ওনার শুক্রকীটগুলো বাঁচে না, তাই আর বাচ্চা হয়নি। দাদা পরে খবর নিয়ে জানতে পারল যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছেন, “মলয়ের জন্য অতো করার কি আছে, ওর তো কোনো সাহিত্যিক গুণই নেই।” এই একই কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন মারাঠি লেখক-অনুবাদক অশোক সাহানেকে, মারাঠি নাট্যকার দিলীপ চিত্রেকে, ইংরেজি কবিতা লিখিয়ে আদিল জুসসাওয়ালাকে। আর অ্যালেন গিন্সবার্গকে তো বটেই।

    ভূমেন্দ্র গুহর মৃত্যুর খবর জেনেছি ফেসবুকে।

    ১৯৬২ সালে “ইল্লত” নামে একটা নাটক লিখেছিলুম, পড়ে প্রশংসা করেছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উনি “বহুরূপী” পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য দিলেন। বেশ কিছুকাল রেখে কুমার রায় বললেন, “আবোল-তাবোল হয়েছে, কোনো কল্পনা নেই, আধুনিকতার ছায়া নেই”। ফেরত নিয়ে “গন্ধর্ব” পত্রিকার নৃপেন সাহাকে দিলুম। উনি পড়ে বললেন ছাপবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাপলেন না, পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়ে আসার সময়ে দেখলুম ওর ওপরে চায়ের কাপ বা বিয়ারের বোতল রেখেছিলেন, টাকনা রেখেছিলেন। আমার পাণ্ডুলিপির প্রথম রিজেকশান। ফেরত নিয়ে নিজে একটা পত্রিকা বের করলুম, “জেব্রা” নামে, আর তাতে প্রকাশ করলুম। সুভাষ আর বাসুদেবের হিংসে হল নাটকটা পড়ে। আমার লেখা উতরেছে কিনা জানার প্রধান মাপকাঠি ছিল হাংরি আন্দোলনের চার-চৌকড়ির হিংসে। ওদের দাঁতক্যালানে হিংসুটে হাসি দেখে বুঝলুম যে নাটকটা তাহলে ভালোই লিখেছি।

    বহুকাল পরে, ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার সম্পাদক প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়, যিনি পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় নামে গল্প-উপন্যাস লেখেন, ‘গাঙচিল’ নামে এক প্রকাশন সংস্হার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার প্রকাশিত বইগুলো আরেকবার প্রকাশ করার তোড়জোড় করেছিলেন। কোন লেখাগুলো প্রকাশ করতে হবে আমি তার তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলুম। সংস্হার কর্ণধার অধীর বিশ্বাস ২০১৬ সালে একটা প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ করে, আর কোনও সংকলন প্রকাশ করলেন না। অথচ তিনি তিনটি উপন্যাস আর সাক্ষাৎকারসমগ্র ইতিমধ্যে কমপোজ করিয়ে ফেলেছিলেন। দেড় বছর ফেলে রাখার পর বললেন আর আমার বই বের করবেন না। প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় ডিটিপি করার খরচ দিয়ে সিডিগুলো কিনে নিলেন অধীর বিশ্বাসের কাছ থেকে। আমার বেশ অপমানজনক মনে হয়েছিল ব্যাপারটা। উনি আর প্রকাশ করতে চাইলেন না কেননা যেসব এনটিটি আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করার জন্য বকাসুর এণ্ডাবাচ্চা ছেড়ে গেছে তারা অধীর বিশ্বাসের ঘাড়ের ওপর পচা লাশের গন্ধ ছড়াতে আরম্ভ করেছিল। জানতে পারলুম, যে-সংবাদপত্র গোষ্ঠিকে লোকে প্রতিষ্ঠান বলে মনে করে, তাদের খোচরদের চাপে উনি আর এগোননি, এদিকে উনি সুবিমল মিশ্র, সুভাষ ঘোষের বই বের করতে কিপটেমি করেননি। একদিক থেকে এটাকেও রিজেকশান বলতে হবে। রিজেকশানও আনন্দদায়ক হতে পারে, কেননা তা লেখকের বিরুদ্ধে তৈরি প্রাতিষ্ঠানিক ঘোঁটকে সহজেই ফাঁস করে।

    ১৯৯০, ১৯৯৭, ২০০০ সালে সবসুদ্ধ তিনবার অ্যানজিওগ্রাফি করিয়েছি, ১৯৯৭ সালে একবার অ্যানজিওপ্লাস্টি। প্রতিবার নুনুর চারিধারের জঙ্গল পরিষ্কার করেছে একজন নার্স। তারপর অ্যানজিওগ্রাফি আর অ্যানজিওপ্লাস্টি করার সময়ে নুনু নিয়ে এদিক ওদিক নাড়াচাড়া করেছে কয়েকজন যুবতী নার্স। তাদের আচরণ দেখে মনে হতো যে নানারকম নুনু নিয়ে স্হাপত্য গড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। তাদের হাতে পড়ে নুনুর চরিত্রে বদল ঘটে গিয়েছিল, তা আর লিঙ্গ ছিল না ; হাসপাতাল থেকে ফিরে নুনুর লিঙ্গ হয়ে উঠতে কয়েকমাস লেগে গিয়েছিল।

    ১৯৯৭ সালে যখন কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলুম প্রায় কুড়ি দিন, সেখানে যে ধরণের কাণ্ডকারখানা হতো তা লিখেছি “নামগন্ধ” উপন্যাসে। আমি সেসময়ে অফিসপ্রধান ছিলুম, আর বিকেলে একজন অফিসারকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করানো হয়েছিল, হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত, তার স্বাস্হ্য কেমন আছে জানাবার জন্য মাঝরাতে অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ইনচার্জ ফোন করেছিল, ঘুমের ঘোরে ফোন তুলতে গিয়ে পড়ে গেলুম আর বাঁদিকের কানটা খাটের কোনায় লেগে রক্তারক্তি হয়ে গেল, রক্তচাপ নেমে গেল, সলিলা ট্যাকসি ডেকে ওই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিলে। কান সেলাইয়ের পর ডাক্তাররা বললেন, ইসিজি নেয়া হয়েছে, এনার হার্টে ব্লকেজ আছে মনে হচ্ছে। ফলে প্রথমে অ্যাঞ্জিওগ্রাফি আর তারপর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি। আই সি ইউতে, প্রত্যেকদিন কোনো-না-কোনো যুবতী নার্স লাঞ্চ আর ডিনার খাইয়ে যেতো, অতি যত্নে, হাসপাতালটায় মেয়েগুলোকে বলে সেবিকা। মুখের ভেতরে একজন কচি যুবতীর আঙুলের স্পর্শেই বোধহয় পনেরোদিনে চনমনে হয়ে গেলুম। মনে হতো, এদের জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকার মতন আনন্দ আর নেই, এদের সঙ্গে সেক্স করা যায় না, জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে ফোঁপানো যায়।

    ১৯৮৮ সালে মারাঠি কবি অরুণ কোলাটকর বলেছিলেন ওনার বাড়ি যে গলিতে তার মোড়ে একটা ‘নেকেড স্ট্যাচু’ আছে। বাস থেকে নেমে নেকেড স্ট্যাচু আর নংগা মুর্তি জিগ্যেস করে ঘণ্টাখানেক ঘুরেও যখন হদিশ পেলুম না তখন একজনকে জিগ্যেস করলুম অরুণ কোলাটকর কোথায় থাকেন ? সে বলল, মারাঠি কবি তো ? চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি। কোলাটকর মারা গেছেন ২০০৪ সালে। বিয়ে করেছিলেন একটি পার্সি যুবতীকে। বাচ্চা হলে সে অসুবিধায় পড়বে বলে বাচ্চা হয়নি ওনাদের। একটা ছোট্ট ঘরে থাকতেন। সবকিছু খাটের তলায়, টেনে বের করলে ডাইনিং টেবিল, লেখার টেবিল। ঘরের চৌকাঠে বসে কবিতা লিখতেন। কারোর সঙ্গে বিশেষ মিশতেন না।

    যে বছর জন্মেছিলুম, ১৯৩৯ সালে, সেই বছরে জন্মের এক মাস আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেছে, সংসারে টানাটানি, রাতে অন্ধকার। বাড়ির সবাই আমার জন্মকে দুষেছিল, দ্বিতীয় যুদ্ধ আর বোমার ভয় আর অনটন আনার জন্য, কলকাতা থেকে আত্মীয়-জ্ঞাতিরাও এসে উঠেছিল আমাদের বাড়িতে। বড়জ্যাঠা তখন থেকেই লুঙ্গির চারখুঁটে গিঁট বেঁধে মুসল্লাপুর হাট থেকে ঝড়টি-পড়তি সব্জি কেনা আরম্ভ করেছিলেন, সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে ঝুলিয়ে আনতেন। ইমলিতলার বাড়িতে বিজলিবাতি ছিল না, কলের জলও ছিল না। সকলকে রাস্তার কলে গিয়ে স্নান করতে হতো, খাবার জল ভরে আনতে হতো।

    ইমলিতলা পাড়া ছাড়ার কয়েক বছর পরে ওই পাড়ায় গেলে অনেকে আমাকে চিনতে পারছিল না, কিন্তু পাড়ার চারটে কুকুর, মোতি, টাইগার, ভুতুয়া, দিলের, বুড়ো হয়ে লোম প্রায় উঠে গেছে, আমাকে দেখেই ছুটতে-ছুটতে এসে ল্যাজ নাড়ানো আরম্ভ করে দিয়েছিল। চারটে কুকুরই মারা গেছে ; ওদের পুঁতে দেয়া হয়েছে গঞ্জেড়িদের মাটির উঠোনে। ১৯৬৬ সালে বড়োজ্যাঠা মারা যাবার পর কিছুদিন ইমলিতলার বাড়িতে একা ছিলেন বড়জেঠিমা, স্টোভে রান্না করতেন, হরি হে হরি হে হরি হে বলে বলে স্টোভে পাম্প করতেন, ১৯৭৯ সালে একদিন স্টোভ ফেটে বেশ পুড়ে গিয়েছিলেন। দশ বছর পর ইমলিতলায়, নিজের পরিচয় দেবার আগে, কপিলের চাচিকে জিগ্যেস করেছিলুম, এই বাংগালি লোগ কোথায় চলে গেল। কপিলের চাচি, চিনতে পারেনি আমাকে, বলেছিল, ভস্মাসুরের বংশ, সবাই নিজের দৃষ্টিতে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রাক্ষসের বংশ ! বাঙালিরা যাকে বলে ভস্মলোচন, তাকে বিহারিরা বলে ভস্মাসুর। ইমলিতলার বাড়িতে একটা ফোটো ছিল বড়ো জ্যাঠাইমার, দুহাতে ব্লাউজ দুদিকে মেলে আছেন, টপলেস দেখিয়ে, কেননা ওনার মাপের মাই আর কারোর ছিল না বাড়িতে, পাড়াতে শুধু কালুটুয়ার চাচির ছিল, তামাটে, জেঠিমার মতন গোলাপি-ফর্সা নয়। কে তুলেছিল জানি না, হয়তো বাবা, হয়তো কোনও কাকা, হয়তো মেজ-জ্যাঠা। ফোটোটা যদি সঙ্গে থাকতো তাহলে নন্দনতাত্ত্বিক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে দেখাতে পারতুম, “এই দেখুন স্যার, আমার বড়োজেঠিমা”। বুঝতে পারতেন আমি কেমনধারা পরিবারের প্রডাক্ট।

    আট

    আমি আরেকবার প্রেমে পড়ে দুর্ভোগের জাঁতিকলে আটকাতে চাইনি বলে সলিলার সঙ্গে পরিচয়ের তিন দিনের মাথায়, ১৯৬৮ সালে বলেছিলুম,আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, এ-ব্যাপারে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে। ও বলেছিল মামাদের সঙ্গে। মনোনয়নে ইপিফ্যানির গর্ব হল। ১৯৬৮ সালে সলিলাদের বাড়িতে সাজানো কাপ আর শিল্ড দেখে প্রশ্ন করে জেনেছিলুম, ওগুলো সলিলার, হকি খেলে পাওয়া, স্টেট প্লেয়ার ছিল, কালার হোল্ডার, ম্যাচ জিতলে কাপে রাম ভরে খেতো। বেশ আনন্দ হয়েছিল যে টিপিকাল বাঙালি মেয়ের মতন নয়।

    ইমলিতলার বাড়িতে মা বেশির ভাগ সময়ে রান্নাঘরে, দুটো মাটির উনোনে রান্না করছেন, বাসন-কোসনের বিশেষ শব্দ নেই। রান্নার কতো রকমের সুবাস। রাতে কেরোসিনের লম্ফ জ্বেলে রান্না, উনোনের আলোয় মায়ের গনগনে মুখ। ঝুলকালি ভুষো পড়ে রান্নাঘর এতো অন্ধকার যে ছয়মাস অন্তর রামরস দিয়ে রঙ করানো হতো। সব ঘরের চেয়ে রান্নাঘরকে মা বেশি ভালোবাসতেন। জ্যাকসন পোলকের বহু আগেই মা রান্নাঘরের দেয়ালে অমন তুলিহীন পেইনটিং এঁকেছিলেন’কড়াই থেকে দেয়ালে ছিটকে লাগা হলুদ-লংকার দরানি। কোনো ধার্মিক অনুষ্ঠান না হলে মা সিঁদুর পরতেন না, সলিলাকেও পরামর্শ দিয়েছিলেন যে প্রতিদিন সিঁদুর পরলে চুল পেকে যায় আর ঝরে পড়ে, তাই পরার দরকার নেই, শাঁখা-ফাঁকাও দরকার নেই। ফলে সলিলা সিঁদুর-শাঁখার পাট চুকিয়ে দিয়েছে বিয়ের পর-পরই। কিন্তু কোনো বাঙালি বামুন পরিবার আমাদের বাড়িতে ভিজিট দিতে আসছে শুনলেই একটা টিপ আর সিঁদুর পরে নেয়, কেননা কেউ-কেউ কথা শোনাবার সুযোগ ছাড়ে না।

    বউদির শালীরা, যারা দাদার বাড়ির কাছে বাঁশদ্রোণীতে থাকে, তাদের রক্ষণশীল টিটকিরির ভয়ে সলিলা বেশ কিছুকাল দাদার বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। যখন নাকতলার ফ্ল্যাট বেচা ফাইনাল করে ফেলেছি, তখন দাদাকে বলেছিলুম, তোমার ওপরতলাটা আমাদের ভাড়া দাও, আমি মার্কেট রেটই দেবো, তা বউদি বললেন, কোথাও একতলা ভাড়া করে থাকগে যাও। অগত্যা চলে এলুম মুম্বাই। দাদার ছোটো ছেলে বিটু দাদার কাছে জানতে চেয়েছিল যে কেন আমাদের ওপরতলাটা ভাড়া দেওয়া হয়নি, উত্তরে দাদা ওকে বলেছিল, পরে প্রবলেম হতো। দাদার বোধহয় ভয় ছিল যে যেহেতু পাটনার বাড়ির ওপর আমি আর আমার ছেলে-মেয়েরা কোনো দাবি-দাওয়া জানাইনি, তাই ওপরতলায় থাকলে হয়তো ছাড়তে চাইবো না। ওপরতলায় থাকলে দাদাকে বাজে মারোয়াড়ি হাসপাতালে ভর্তি হতে দিতুম না, তাড়াতাড়ি মৃত্যুর পথে যেতে দিতুম না।

    ১৯৫০ সালে রামমোহন রায় সেমিনারিতে ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি খেলায় আমার মাথা ফেটে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম, সেই দাগ এখনও আছে। আক্রান্ত হবার চিহ্ণ। বিরূপ সমালোচনা পড়ে কপালের দাগটায় হাত বুলিয়ে আলোচককে ভুলে যাই। বাবা যখন মারা গিয়েছিলেন, শ্রাদ্ধের সময়ে আমি ন্যাড়া হইনি। কিছুকাল পরে বাবার জন্য এতো মনকেমন করছিল যে একটা সেলুন দেখতে পেয়ে সোজা ঢুকে গিয়ে ন্যাড়া হয়েছিলুম, আর ফেরার সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কেঁদেছিলুম। পথচারীদের মাঝে দাঁড়িয়ে কেঁদে, ভালো লেগেছিল, যা সমবেত শোকের কান্নায় হয় না। আমি পাটনা থেকে লখনউ চলে যাবার পর দাদা সপরিবারে পাটনায় চলে এসেছিল। বড়ো ছেলে পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করতে পারেনি বলে তাকেই দোকানে বসিয়ে দিয়েছিল। বাবা আমার কাছে চলে এসেছিলেন লখনউতে। মা লখনউতে মারা যেতে বাবা পাটনায় কিছুদিনের জন্য ফিরে গিয়েছিলেন, তারপর কোতরঙের ভদ্রকালীতে ছোটোকাকা বা বিশেখুড়োর বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে শেষজীবন কাটাবেন ভেবে। ছোটোকাকা বেশ প্যাঁচালো মানুষ ছিলেন, বাবার কেনা জমিজিরেত ঠাকুমাকে দিয়ে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। শেষে পাটনার বাড়িও ছোটোকাকা বাবাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে পারেন আঁচ করে দাদা বাবাকে পাটনায় নিয়ে চলে যান। আমি বাবাকে মুম্বাইতে নিয়ে আসিনি এটা আমার জীবনের একমাত্র রিগরেট হয়ে থেকে গেছে।

    আমার বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী জন্মেছিলেন বর্তমান পাকিস্তানের লাহোর শহরে, ১৯১২ সালে। পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিংহ সম্পর্কিত গালগল্পে প্রভাবিত হয়ে ঠাকুমা বাবার অমন নাম রেখেছিলেন। রঞ্জিত সিংহ জন্মেছিলেন ১৩ই নভেম্বর ১৭৮০। বাবাও জন্মেছিলেন ১৩ই নভেম্বর। ছয় ভাই আর এক বোনের মধ্যে বাবা ছিলেন তৃতীয় বা সেজ ভাই। অন্যান্য ভাইদের পোশাকি আর ডাক নাম দুটিই থাকলেও, বাবার ওই একটি নামই ছিল, রঞ্জিত। ঠাকুর্দার আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। ১৭০৯ সালে উত্তরপাড়া শহরটির পত্তন করেছিলেন দাদুর পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী।

    ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী, পোরট্রেট আঁকতে পারতেন, এবং সেই সূত্রে তিনি বিভিন্ন রাজপরিবারের ডাকে সপরিবারে ভারতের এক রাজ দরবার থেকে আরেক রাজ দরবারে চলে যেতেন। লাহোরে গিয়ে তিনি ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরায় ফোটো তুলতে শেখেন, যাতে ফোটো তুলে তা থেকে ছবি আঁকতে সুবিধা হয় এবং রাজ পরিবারের মহিলাদের এক নাগাড়ে বসে থাকতে না হয়। সেসময়ে মেয়ো স্কুল অফ আর্টসের অধ্যক্ষ এবং লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার ছিলেন রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিঙ, যাঁর সঙ্গে পরিচয়ের ও তাঁর অধীনে কাজ করার সূত্রে তাঁর কাছ থেকেই তিনি ফোটো তোলা শেখেন। ফোটো তোলা হতো সরাসরি ব্রোমাইড পেপারে। পরে, কাচের প্লেটে নেগেটিভ ফিল্ম তোলা হতো, সেই নেগেটিভকে রসায়নে চুবিয়ে রেখে ফোটো গড়ে উঠত; তারপর সেই প্লেটের ওপর ফোটোর কাগজ রেখে, প্রয়োজনীয় আলো দেখিয়ে ফোটো প্রিন্ট করা হতো, আর সেই প্রিন্টকে রসায়নে চুবিয়ে, শুকিয়ে, স্হায়ীত্ব দেয়া হতো।

    ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরা ছিল বেশ ভারি ; বাইরে গিয়ে ফোটো তুলতে হলে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার লোক দরকার হতো। বাইরে তোলা হচ্ছে বলে একসঙ্গে অনেকগুলো তুলে যেটা ভালো হল সেটা থেকে ফোটো তৈরি করা হতো। ফোটো তোলা হতো ক্যামেরা স্ট্যাণ্ডের ওপরে ক্যামেরা রেখে। ফোটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে লেন্সের ঢাকনা খুলে, ‘স্মাইল প্লিজ’ বলে দু’এক সেকেণ্ডে আবার লেন্স পরিয়ে দেয়া হতো। স্টুডিওতে ফোটো তুলতে হলে প্রথম দিকে কুঁজোর মাপের হাজার-দুহাজার ওয়াটের বাল্বের আলোয় ফোটো তুলতে হতো, পরে অবশ্য বাল্বের মাপ ছোটো হয়। এখন প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে ড্যাগেরোটাইপের ঝঞ্ঝাটকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক। বাবা এই ডিজিটাল প্রযুক্তি দেখে যেতে পারলেন না। শৈশবে তাঁকে দেখতুম শহরের বাইরে ফোটো তুলতে যাচ্ছেন কাজের লোক রামখেলাওন সিংহের কাঁধে ক্যামেরার বাক্স চাপিয়ে, নিজে ক্যামেরা তিন-ঠেঙে স্ট্যান্ড আর মাথায় চাপা দেবার কালো মোটা কাপড়। বাবা মারা যাবার পর যখন পাটনার বাড়ি ছেড়ে চলে আসলুম, দেখেছিলুম তিনতলার একটা ঘরে থাক-থাক কাচের প্লেট, কড়িকাঠ থেকে র‌্যাকে সাজানো। ইতিহাসবোধ না থাকলে যা হয়, আমি বা দাদা আমরা কেউই সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়াস করিনি। দাদার ছেলেরা কাচঅলাকে ওজন দরে বিক্রি করে দিয়েছে।

    দাদুর ছেলেরাও ফোটো তোলা আর ছবি আঁকায় সড়গড় হলে দাদু ১৮৮৬ সালে ফোটোগ্রাফির ভ্রাম্যমান ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন, এবং সংস্হাটির তিনি নাম দেন ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’। হুগলি জেলায় গঙ্গা নদীর ধারে উত্তরপাড়ার পাশে এখন যেখানে বালি ব্রিজের সংলগ্ন ফ্লাইওভার, তখন একটা রাস্তা ছিল, সেখানে একটা দপতর খুলে নকাকাকে চালাতে বলেছিলেন। কিন্তু নকাকা তা সামলাতে পারেননি, স্ত্রীর সঙ্গে অবনিবনার দরুণ হঠাৎ বৈরাগ্যে আক্রান্ত হবার কারণে। দাদুর অমন ঘোরাঘুরির কারণে বড়জেঠা, মেজজেঠা, বাবা, পিসিমা আর নকাকার স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি। দাদু হঠাৎ মারা যাবার পর তাঁর ছেলেরা পাটনায় থিতু হতে বাধ্য হন এবং তখন নতুনকাকা আর বিশেখুড়ো মানে ছোটোকাকাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। নতুনকাকা নিয়মিত স্কুল করলেও ছোটোকাকার আগ্রহ না থাকায় তিনি পড়াশোনা ত্যাগ করেন। জেঠাকাকাদের যেটুকু পড়াশোনা হয়েছিল তা রাজদরবারগুলোর শিক্ষকদের অবদান। দাদু সংস্কৃত আর ফারসি লিখতে-পড়তে পারতেন। বাবা ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করে ফেলেছিলেন।

    দাদু বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার এবং পাকিস্তানের বাহাওলপুর, চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ও লাহোরে ছিলেন। আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর লাহোরে চলে যান। বড়জেঠার মুখে শুনেছি যে বাহাওলপুরের সেই সময়ের ডাকটিকিটে আমিরের পোরট্রেট ছিল দাদুর আঁকা। ওই অঞ্চলের ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস আর শুঁটকিমাংস খাওয়ার সঙ্গে ঠাকুমা আর বাবার ভাইরা নিজেদের মানিয়ে নিলেও বাবা পারেননি, এবং তিনি সারা জীবন শাকাহারী হয়ে যান। বাবার মুখে শুনেছি যে বাজারে ঝোলানো গোরু, মোষ, ইয়াক আর কাটা উটের মাংস দেখার পর উনি আর মাংস খেতে পারতেন না, তাই নিরামিশাষী হয়ে যান। দুম্বা একরকমের ভেড়া যার ল্যজের জায়গায় বাড়তি মাংস গজায়, আর বাড়তি লেজের মাংস, বড়জেঠার বক্তব্য অনুযায়ী, ছিল খুবই সুস্বাদু।

    ফোটোগ্রাফির সূত্রেই দাদুর সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগণার পাণিহাটি-নিবাসী আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়েছিল। কিশোরীমোহন ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের উৎস আবিষ্কারক রোনাল্ড রসের সহগবেষক। রোনাল্ড রস স্বদেশে ফিরে যাবার পর কিশোরীমোহন ম্যালেরিয়া রোগের কারণ ও তা প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ম্যাজিক লন্ঠনে স্লাইড দেখিয়ে প্রচার করতেন। এই স্লাইডগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন দাদু। কিশোরীমোহন তাঁর বড় মেয়ে অমিতার সঙ্গে বাবার বিয়ে দেন। বিয়ের সময়ে মায়ের বয়স ছিল ১৪ বছর আর বাবার ১৮ বছর। কিশোরীমোহন সম্পর্কে উইকিপেডিয়া আর নেটে অন্যত্র তথ্য আছে। বাবা নিজে শাকাহারী হলেও মাকে বাধ্য করেননি তাঁর আহারের রুচি অনুসরণ করতে ; আমি আর দাদা দুজনেই আমিষাশী। দাদু প্রতি বছর দুর্গা পুজোর সময়ে উত্তরপাড়া ফিরে যেতেন ; ছেলেদের বিয়ে দেয়ার কাজটাও সেরে নিতেন সেই সময়টুকুর মধ্যে।

    দ্বারভাঙ্গা মহারাজের পরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকার জন্য ডাক পড়লে দাদু সপরিবারে পাটনায় যান, আর সেখানেই হৃদরোগে মারা যান। পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল দাদুর ওপর ; তিনি মারা যেতে ঠাকুমা বিপদে পড়েন। পাটনায় তাঁরা একটি মাটির দেয়ালের ওপর টালির চালার বাসা ভাড়া করে বিভিন্ন উপায়ে টাকা রোজগারের চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুতেই সফল না হতে পারায় বাবা দাদুর প্রতিষ্ঠিত সংস্হা ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’ এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ছবি আঁকা আর ফোটো তোলার একটি স্হায়ী দোকান চালাবাড়ির কাছেই, বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে, খোলেন। ঠাকুমার জাঠতুতো ভাই কলকাতা মিউজিয়ামের সহকিউরেটার লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে বড়জেঠা পাটনা মিউজিয়ামে চতুর্থ বর্গের একটি চাকরি পান। পরে অবশ্য তিনি নিজের যোগ্যতার দরুন পদোন্নতি পেয়ে পাটনা মিউজিয়ামের ‘কিপার অব পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার’ হয়েছিলেন। বড়জেঠা মাটির মূর্তি তৈরি করায় আর অয়েল-পেইন্টিং আঁকায় দক্ষ ছিলেন। ছোটোবেলায় ছুটির দিনে আমি মিউজিয়ামের এক থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াতুম, চৌকাঠ ডিঙোতেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে মহেঞ্জোদরোয়, সেখান থেকে অশোকের রাজত্বে !

    দাদু মারা যেতে, ঠাকুমা উত্তরপাড়ার বসতবাড়িতে, যা অবহেলায় খণ্ডহরের চেহারা নিয়ে ফেলেছিল, থাকতে চলে গেলে, পরিবারের আর্থিক ভার পুরোপুরি এসে পড়েছিল বাবার কাঁধে। ঠাকুমা ছেলেদের আর তাদের বোউদের বলে দিয়ে যান যে আমার মা সংসারটাকে সামলাবেন। যেকোনো কারণেই হোক মেজজেঠা, নকাকা আর বিশেখুড়োর স্বভাব আর আচরণ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমরা শৈশবে শুনতুম যে এঁরা কিছুটা অপ্রকৃতিস্হ, আধপাগল। দোকানের কাজে তাঁদের তেমন আগ্রহ ছিল না ; তাঁরা প্রকৃতই শিল্পীচরিত্রের বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্ত অস্বাভাবিকতা পেয়েছিলেন। মেজজেঠা ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরবেলা, তারপর জলখাবার খেতেন কোনো দোকান থেকে লুচি আলুর তরকারি কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কখনও চুল আঁচড়াতেন না, বাড়ি ফিরে দাঁত মেজে স্নান করে বিকেলের দিকে দোকানে পৌঁছোতেন, এবং একটি ফোটোর সামনে বসে তাকে মাসখানেকে আঁকা অপূর্ব ছবিতে দাঁড় করাতেন। নকাকা অনেক ভোরে উঠতেন, সবাইকে, শিশুদেরও ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন, স্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না, জুতো পরার অভ্যাস ছিল না, কোরা ধুতি পরতেন, নিজের ধুতি-শার্ট নিজেই কাচতেন, কোনো এক ফাঁকে দোকানে গিয়ে বাড়িতে করার জন্য বাবার কাছ থেকে ‘কাজ’ চেয়ে আনতেন। ছোটোকাকা মাঝরাতে নিজের ঘরে ছোটোকাকিমার নানা আঙ্গিকের পোশাকহীন ফোটো তুলতেন আর দোকানে গিয়ে বাবাকে সাহায্য করার নাম করে ডার্করুমে ঢুকে সেই ‘অপ্সরা’ ফোটোগুলো প্রিন্ট করে নিতেন। উনি যখন উত্তরপাড়ায় পাকাপাকি চলে গেলেন তখন তাড়াহুড়োয় অ্যালবামগুলো নিয়ে যেতে ভুলে যান। আমি আর পিসতুতো দাদা সেগুলো আবিষ্কার করেছিলুম। ছোটোকাকা ৯০ বছর বয়সে মারা যান, নিঃসন্তান ; উত্তরপাড়ার বাড়ির অংশ ছোটো শালার প্রথম পক্ষের মেয়েকে দিয়ে গেছেন।

    নয়

    বাবা ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন বেশ রাত করে। ফোটো তোলা, জিনিসপত্র বিক্রি আর ডার্করুমের কাজ তাঁকে একা করতে হত বলে ভোরবেলা জলখাবার খেয়ে সোজা গিয়ে ডার্করুমে ঢুকতেন, তারপর রাতে দোকান বন্ধ করার পর আবার ঢুকতেন ডার্করুমে। বিহারে সেসময় তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, তাই কাজ পেতে অসুবিধা হতো না। মা আর বাবা দুজনের চরিত্রেই যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তা হল সবায়ের সঙ্গে মানিয়ে চলা। বাবা বাড়ির প্রধান রোজগেরে হলেও নিজের ভাইদের আর তাদের ছেলে-মেয়েদের, মানে আমাদের জাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনদের, সমান চোখে দেখতেন। বড়জেঠা ইমলিতলা বাড়ির ট্যাক্স দিতেন আর সবজি কিনতেন, বাবা বাদবাকি সমস্ত খরচ করতেন, ঠাকুমাকে টাকা পাঠাতেন, উত্তরপাড়ার বাড়ির ট্যাক্স দিতেন। চালগমের দোকানদারকে মাসে একবার, মায়ের তৈরি ফিরিস্তির কাগজ, দোকানে যাবার পথে বাবা দিয়ে যেতেন আর সে ইমলিতলার বাড়িতে পাঠিয়ে দিত। পরিবারের সদস্যদের পোশাকের জন্য বাবা দর্জিকে বলে রেখেছিলেন, তার দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে দিতে হতো, সে তৈরি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিত। একইভাবে ছিল জুতোর দোকানের সঙ্গে বন্দোবস্ত। চুল কাটার জন্য মাসে একবার নাপিত আসত, পরে বাবার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিত।

    ইমলিতলার বাড়িতে বাবা-মা-দাদা-আমি যে ঘরটায় থাকতুম সেটাই ছিল বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ঘর। লন্ঠনের আলোয় পড়াশুনা করতে হতো। চেয়ার-টেবিল ছিল না, দোকানের মালপত্র যে প্যাকিংবাক্সতে আসত তার ওপর চাদর পেতে বই রাখার ব্যবস্হা ছিল। পাড়ার কুসঙ্গ-কুখ্যাতির প্রভাব দাদার ওপর পড়তে পারে অনুমান করে ম্যাট্রিক পাশের পর ১৯৪৯ সালে দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল পাণিহাটিতে থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করার জন্য। কলকাতায় দাদা সিটি কলেজে ভর্তি হন। কলেজে বন্ধু হিসেবে পান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী প্রমুখ তরুণ কবিদের। দাদা বিহার সরকারের মৎস্য বিভাগে চাকরি পেলে তাঁর পোস্টিঙের জায়গায় বন্ধুরা একা বা দলবল নিয়ে পৌঁছোতেন। ছোটোবেলায় আমি একবার তাড়ি খেয়েছিলুম, মানে পাড়ার এক সর্বজনীন দাদু খাইয়ে দিয়েছিল। মুখে তাড়ির গন্ধ পেয়ে মা আমায় আমাদের ঘরে শেকল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ; বাবা রাতে বাড়ি ফিরলে শেকল খোলা হয়। মায়ের সব সময় আশঙ্কা ছিল যে আমরা দুই ভাইও মেজদার মতন অসামাজিক চরিত্রের মানুষ হয়ে যেতে পারি। পাড়ায় মেলামেশায় কোনো নিষেধাজ্ঞা কিন্তু ছিল না। ছোটোবেলায় চোর-পুলিশ খেলতে গিয়ে অনেকের শোবার ঘরে ঢুকে খাটের তলায় লুকোবার স্মৃতি আছে।

    ইমলিতলার বাড়িতে জলের কল ছিল না ; বড়জেঠা তো অফিস চলে যেতেন, জল ভরে এনে দেবার লোক না এলে দুপুরে বাবা যখন দোকান থেকে আসতেন, অনেক সময়ে নিজের স্নান করার জল নিজেই কল থেকে ভরে আনতেন। শীতকালেও ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন। দাদা আর আমি ইমলিতলায় রাস্তার কল থেকে জল ভরে এনেছি, রাস্তার কলে স্নান করেছি। বাবার নির্দেশ ছিল যে বাড়ির সব কাজ আমাদেরও করতে হবে, প্রয়োজনে কয়লা ভাঙা আর উনোন পরিষ্কার, জঞ্জাল ফেলে আসাও। বাবা রাস্তার কলে স্নান করতে লজ্জা পেতেন। ২০০৫ – ২০০৮ নাগাদ আমি কলকাতার রাস্তা থেকেও খাবার জল ভরে আনতুম পেপসির বোতলে করে, কেননা তিন তলায় কোনো ভারি জলের টিন নিয়ে বা মিনারাল ওয়াটারের বড়ো বোতল নিয়ে রিকশাঅলা উঠতে চাইত না। মাঝে-মাঝে দাদার বাড়ি গিয়ে দুটো থলেতে পেপসির বোতলে জল ভরে আমি আর আমার স্ত্রী সলিলা রিকশা করে নিয়ে আসতুম নাকতলার বাড়িতে। এই সমস্ত অসুবিধার জন্যেই নাকতলার ফ্ল্যাটটা বেচে মুম্বাইতে একরুমের ফ্ল্যাটে চলে আসতে হয়েছে।

    বাবা চিরকাল শাদা পাঞ্জাবি, ধুতি আর পায়ে পামশু পরতেন। তাঁর ভাইয়েরা শাদা ছাড়া অন্যান্য রঙের শার্ট বা পাঞ্জাবি পরলেও বাবার পোশাকের অন্যথা হতো না, শীতকাল ছাড়া, যখন উনি নস্যি রঙের শাল গায়ে দিতেন, বা ওই রঙের উলের পাঞ্জাবি পরতেন। দোকানে যাবার তাড়ায় বাবার দ্রুত হাঁটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। ইমলিতলায় থাকতে দুবার ওনার পা দোকানে যাবার পথে ভেঙে গিয়েছিল ; বাবার পা ভাঙা মানে আর্থিক দিক থেকে বেশ বিপজ্জনক অবস্হা ; দাদাকে গিয়ে দোকানে বসতে হত। উত্তরপাড়া থেকে চাকুরিহীন কোনো জ্ঞাতির ছেলেকে নিয়ে এলেও তাদের অবাঙালি পরিবেশে মানিয়ে নিতে এতই অসুবিধা হত যে কয়েক দিনেই তারা ফেরত চলে যেত। পরে দরিয়াপুরে গিয়ে বাবার যখন আরেকবার পা ভেঙেছিল তখন আমি দোকানদারি করেছি। গরিব হলে যা হয়, গতি কেবল সরকারি হাসপাতাল, সেখানে কিউ, কেননা প্রায়ভেটে কোনো নার্সিং হোম ছিল না সেসময়ে ; এখন তো প্রতিটি রাস্তায় একজন করে হাড়ের ডাক্তার। বড়জেঠির এক বান্ধবীর স্বামী ছিল ছুতোর ; ওনার পা ভেঙে যেতে, জেঠিমার বান্ধবীর কথামতো বাবার পায়ে বসাবার জন্য ছুতোরকে দিয়ে কাঠের খাপ তৈরি করিয়ে পায়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্হা হয়েছিল। প্রথমবার বানিয়ে দেয়া খাপটা দ্বিতীয়বার কাজে লেগে গিয়েছিল।

    বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল সেই বাড়ির মালিক উঠে যাবার নোটিস দিলে বাবা পড়েন মহাবিপদে। বিকল্পের সন্ধানে বেরিয়ে তিনি তখনকার বারি রোডে দরিয়াপুরে একটা চালাবাড়ি কেনেন ; সেটা ছিল একজন কামারের হাপর-বসানো ঘর, পেছনে আর পাশে সামান্য জমিতে গাঁজাগাছের ঝোপ। এই এলাকাটাও সেসময়ে গরিবদের পাড়া ছিল, ধারণার অতীত দুস্হ সুন্নি মুসলমানদের পাড়া। বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল তার মালিকের বিরুদ্ধে মামলা চলে বেশ কয়েকবছর ; সেই সুযোগে দরিয়াপুরে দোকানঘর তৈরি করে ফেলা হয়। তৈরি হয়ে গেলে পুরোনো দোকানের পাট গুটিয়ে বাবা চলে আসেন দরিয়াপুরে। ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’-এর খ্যাতির কারণে পুরোনো খদ্দেররা দরিয়াপুরে আসত। এখন এই সংস্হা চালায় দাদার বড় ছেলে হৃদয়েশ, জাপানি কোম্পানির প্রস্তাবমতো দোকানের নাম পালটে ফেলেছে।

    দরিয়াপুরে যখন দোকান তৈরি হচ্ছিল তখন আমি ওই বাড়িতে একা থাকতুম, কেননা ইমলিতলার প্রাত্যহিক মাতালদের চেঁচামেচি আর ঝগড়াঝাঁটির দরুন পড়তে বসে বেশ অসুবিধা হত। তাছাড়া দরিয়াপুরে ইলেকট্রিসিটি ছিল, কলের জল ছিল। ছোটোদের হাতখরচের জন্য বাবা টাকা দিতেন না ; বলতেন যার যা চাই জানিয়ে দাও, কিনে এনে দেব। স্কুলের বাৎসরিক ফলাফলের রিপোর্টে বাবা কখনও কাউকে ‘গুড’ দিতেন না। নব্বুইয়ের কোঠায় মার্কস পেলেও দিতেন না ; বলতেন আরও বেশি পেতে হবে। দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকলে আমার চরিত্রদূষণ ঘটতে পারে অনুমান করে বছরখানেক পরে মা আর বাবা রাতে শুতে আসতেন। মা টিফিন ক্যারিয়ারে করে রাতের খাবার আনতেন। দিনের বেলা ইমলিতলায় গিয়ে খেতে হতো। দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকার সময়ে বন্ধুদের নিয়ে কিঞ্চিদধিক চরিত্রদূষণ যে ঘটত না তা বলা যাবে না।

    বাবা আর মা দুজনেই মন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়া বা তীর্থকর্ম করা ইত্যাদিতে আগ্রহী ছিলেন না ; আমার মনে হয় কাজের চাপে উনি সংস্কারমুক্ত করে ফেলেছিলেন নিজেকে। পরে দোকানের কাজ ছেড়ে দেবার পর বাবা হিন্দুধর্ম আর ঈশ্বর দেবী-দেবতায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমি কখনও বাবা-মাকে তীর্থক্ষেত্রে বেড়াতে যেতে দেখিনি। জেঠা-কাকারাও কেউ আগ্রহী ছিলেন না ; পাটনার বাইরে যেতে হলে তাঁরা যেতেন কেবল দেশের বাড়ি, অর্থাৎ উত্তরপাড়ায়। তবে বাবা নিয়মিত পৈতে বদলাতেন, একাদশীর দিন লুচি খেতেন। কালীঘাটের কালী আমাদের পারিবারিক দেবতা, যেহেতু তা আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত, সেকারণে বাড়িতে পারিবারিক দেবতা আর তার সেবাযত্ন করার প্রয়োজন হতো না। গলায় মালার মতন ঝুলিয়ে পৈতে পরতেন বড়জেঠা আর ছোটোকাকা, যদিও খাওয়ার কোনো নিষেধ মানতেন না, মেজজেঠা কখনও পৈতে পরতেন আবার কখনও কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দিতেন। দাদার আর আমার ছোটোবেলায় পৈতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমরা বছর শেষের আগেই স্বরূপে এসে জলাঞ্জলি দিয়েছিলুম। পৈতেহীন হবার কারণে বাবা ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন বলে মনে হয় না ; এই প্রসঙ্গে কখনও কোনো কথা তোলেননি।

    মা, বাবা এবং শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দেয়, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান। প্রকৃত অর্থে আমি কোনো শিক্ষক সেই সময়ে পাইনি যখন তা জরুরি ছিল। প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক কনভেন্টে পেয়েছিলুম সিসটার আইরিনকে আর যাযক ফাদার হিলম্যানকে। শৈশবের বইতে বর্ণিত সমস্ত জিনিস যাতে নিজের চোখে দেখে যাচাই করতে পারি তার দিকে খেয়াল রাখতেন সিসটার আইরিন আর স্বদেশ আয়ারল্যাণ্ডে গেলে অনেককিছু সংগ্রহ করে আনতেন, স্কুল সংল্গন ফার্মে নিয়ে গিয়ে ফল, ফুল, গাছ, জন্তুতের চাক্ষুষ করাতেন। ফাদার হিলম্যানের সৌজন্যে আমি কনভেন্টে ভর্তি হয়েছিলুম ; উনি ফোটো তুলতে ভালোবাসতেন আর বাবার সঙ্গে ওনার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল, আমাকে দোকানে দেখতে পেয়ে সাড়ে তিন বছর বয়সে নিয়ে গিয়ে ট্রানজিশান ক্লাসে ভর্তি করে দেন; সপ্তাহে একদিন চার্চে বাইবেল ক্লাসে নিয়ে গিয়ে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের কাহিনি শোনাতেন। পরে যখন ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন সেমিনারিতে ক্লাস সিক্সে গিয়ে ভর্তি হলুম, কোনো শিক্ষকের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে উঠল না ; এই স্কুলে যিনি আমাকে বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী করলেন, তিনি গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী, আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসের সুমিতাদি।

    মা আর বাবার কাছ থেকে যা পেয়েছি তা হল সততা, নিজের বিশ্বাসের সমর্থনে একক লড়াই করার চারিত্র্য। বাবা দোকানদার হয়েও সৎ ছিলেন, যা আজকের দিনে অকল্পনীয়। কেবল সৎ নয়, তাঁর ছিল সৎসাহস। হাংরি আন্দোলনের সময়ে আদালতের মামলায় বন্ধুরা যখন আমার বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, আর লড়াইটা আমার একক হয়ে দাঁড়াল, তখন আমি আমার চরিত্রগঠনে মা আর বাবার অবদানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলুম। বাবা কলকাতায় লালবাজারে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন যে অমন মকদ্দমা কেন করা হয়েছে আর তখনই জানা যায় যে কলকাতার কয়েকজন সমাজকর্তা-বুদ্ধিজীবীর নালিশ কাজ করেছে এর পেছনে, যাদের বলা হয় এসট্যাবলিশমেন্টের ধারক-বাহক। মকদ্দমা চলার সময়ে বাবা কয়েকবার পাটনা থেকে দুএক দিনের জন্য দোকান বন্ধ করে কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে আসতেন। যারা আমার সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিল আর চামড়া বাঁচাবার জন্য রাজসাক্ষী বা সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেল তাদের পরিবারের কাউকে কোনো দিন আসতে দেখিনি কোর্টে ; অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের ছেলের সাহিত্যকর্মকে সমর্থন করতে পারেননি।

    বাবা আমাদের বাড়ির ক্ষমতাকেন্দ্র হলেও ছোটোদের কাউকে শাসন করতেন না। তাঁর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি বলতেন, “অ, ও শুধরে নেবে। ” তারপর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে বলতেন, “কী, শুধরে নিবি তো ? বড় হয়েছিস, শুধরে নিতে শেখ।” বড়জেঠা শাসন করতেন, নিজে থেকে নয়, জেঠিমা-কাকিমারা অভিযোগ করলে, কিন্তু অভিযোগ করলে তিনি বিরক্ত হতেন। বড়জেঠার দুই মেয়ের বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল। মেজজেঠা আর কাকাদের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্হা করেন বাবা, তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল। মেজজেঠার এক মেয়ে মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলে মেজজেঠা অমত জানান ; মেজজেঠার অমত হওয়ায় বাবা তাঁকে বোঝালেও তিনি রাজি হননি। বাবা তাঁর বিরুদ্ধতা করে মেজজেঠাকে অপমানিত করতে চাননি। শেষে আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন যে ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয়। আমার ছোটোশালী রমলা এক যুবককে বিয়ে করতে চাইলে নাগপুরে অভিভাবকরা রাজি হলেন না, তখন তার বিয়েও দরিয়াপুরের বাড়ি থেকে হল। রমলা ২০১৬ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে।

    দশ

    দাদা যখন চাইবাসায় পোস্টেড ছিলেন সেখানে সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে বেলার সঙ্গে পরিচয় হয়, আর দাদা পাটনায় গিয়ে বাবাকে বিয়ের কথা জানাতে তিনি তক্ষুনি রাজি হয়ে যান। দাদা আসলে ওই বাড়ির সাহিত্যানুরাগী বিবাহিতা যুবতী মন্টিদির প্রেমে পড়েছিলেন, মন্টিদি আর দাদা দুজনেই স্হিতাবস্হা বজায় রাখা মনস্হ করেন। পরিবারটির সঙ্গে যাতে চিরকালীন যোগাযোগ থাকে তাই দাদা বেলাকে বিয়ে করেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাস ‘কিন্নর কিন্নরী’তে বিস্তারিত লিখেছেন এ-ব্যাপারে।

    আমি অফিসের কাজে নাগপুরে গিয়ে কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় আর সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ওর অভিভাবকরা সেদিনেই সায় দেন। বাবাও টেলিগ্রামে অনুমোদন জানিয়ে দেন। কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই এই বিয়েকে মা আর বাবা বলতেন, “তোদেরটা বৈপ্লবিক বিয়ে, পরিবারদের মাথা গলাতে হল না, হপ্তার পর হপ্তা রোদ-বৃষ্টি ঠেঙিয়ে প্রেম করতে হল না, ব্যাস, একজন আরেকজনকে বললি বিয়ে করব, করে ফেললি। ”

    আমি লেখালিখির চেষ্টা করছি, মায়ের কাছে সেকথা জানতে পেরে ১৯৫৮ সালে বাবা আগফা-গেভার্ট কোম্পানির একটা দামি ডায়েরি দিয়েছিলেন, আর তাতেই আমি কবিতা মকসো করা শুরু করেছিলুম। বাড়িতে ইংরেজি ভাষার পছন্দের বইয়ের সংগ্রহ গড়তে চাই জানতে পেরে বাবা বলতেন বইয়ের তালিকা তৈরি করে দিতে। বইয়ের দোকানে গিয়ে বই পছন্দ করে নিতুম আর পেয়ে যেতুম। বাংলা বই, বিশেষ করে কবিতার বই দাদা কলকাতা থেকে নিয়ে আসতেন। পরে বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকেও প্রচুর বই আর পত্রিকা পেতুম। হাংরি আন্দোলনের সময়ে কলকাতার পুলিশ আমায় গ্রেপ্তার করতে এসে আমার বইগুলো নিয়ে সারা ঘরে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলেছিল। বাবার দোকানের কাচের আলমারি ভেঙে দিয়েছিল। মায়ের বিয়ের তোরঙ্গ ভেঙে লণ্ডভণ্ড করার সময়ে ওনার বিয়ের পুরোনো বেনারসি ভাঁজ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাকে যখন কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটিয়ে নিয়ে গেল পুলিশ, তখন বাবাকে বেশ বিচলিত দেখেছিলুম, যা উনি সচরাচর হতেন না। ছোটোবেলায় আমি বাড়ি থেকে বেশ কয়েকবার পালিয়েছি ; ফিরে এসে মনে হয়নি যে বাবা বিচলিত ; উনি আমাকে এই প্রসঙ্গে কোনো কথা জিজ্ঞাসাও করতেন না। পরে, আমার মেয়ের কাছে গল্প করেছিলেন যে আমি ওনাদের না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালাতুম।

    ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে অ্যালেন গিন্সবার্গ আমাদের দরিয়াপুরের বাড়িতে এসে ছিলেন কয়েক দিন। তিনি নানা শহরে ঘুরে বেশ কিছু ফিল্মে ফোটোম তুলেছিলেন আর সেগুলো বাবাকে দেন ডেভেলাপ করার জন্য। বাবা ডেভেলাপ করে দ্যাখেন গিন্সবার্গ কেবল নুলো, ভিখারি, দুস্হ, পথের পাশে অসুস্হ লোক, কুষ্ঠরোগি– এদের ফোটো তুলেছে। তখন গিন্সবার্গের সঙ্গে ওনার একচোট ঝগড়া হয়েছিল। বাবা গিন্সবার্গকে বলেছিলেন, “তোমরা যতই বড় কবি-লেখক হওনা কেন, আমাদের দেশটাকে এইভাবেই দেখাতে চাইবে ; কেন ? ফোটো তোলার আর কোনো বিষয় কি নেই !” গিন্সবার্গ সম্পর্কে যে গবেষকরা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁদের সবাইকে এই ঘটনার কথা জানালেও, কেউই নিজেদের লেখায় এই বিতর্কটা অন্তর্ভুক্ত করেননি। পরে, পাটনার বাড়িতে বা কলকাতায়, বিদেশিরা এলে আমি তাঁদের বলতুম যে ফোটো তুলে থাকলে দেশে ফিরে ডেভেলাপ আর প্রিন্ট করিও।

    আমার মায়ের জন্ম ১৯১৬ সালে, পানিহাটিতে। মায়ের ডাক নাম ভুল্টি। মায়ের বাবা, কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, পানিহাটির রামচাঁদ ঘাট রোডে ‘নিলামবাটী’ নামে এক একান্নবর্তি পরিবারের সদস্য ছিলেন। কিশোরীমোহন ছিলেন, কলকাতা ও সেকেন্দ্রাবাদে, ম্যালেরিয়া রোগের কারণ নির্ণয়কারী ও ১৯০২ সালে সেকালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ডাক্তার রোনাল্ড রস-এর সহকারী। তাঁর অবদানের জন্য ১৯০৩ সালে দিল্লি দরবারের সময়ে কিশোরীমোহনকে সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্বর্ণপদক দেয়া হয়েছিল। ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁদের ‘দি ফ্লাইং পাবলিক হেল্হ টুল : জেনেটিকালি মডিফায়েড মসকিটোজ অ্যান্ড ম্যালেরিয়া কন্ট্রোল’ ( সায়েন্স অ্যাজ কালচার, ল্যাংকাস্টার, ইউ কে ) গবেষণাপত্রে উলি বিজেল এবং ক্রিস্টোফ বোয়েট অধ্যাপকদ্বয় জানিয়েছেন যে উপনিবেশের নেটিভ হবার কারণে কিশোরীমোহনের নাম রোনাল্ড রসের সঙ্গে সুপারিশ করা হয়নি। সমাজ সেবার কাজে স্ত্রীর গয়না এবং পৈতৃক সম্পত্তি বেচে, আর সঞ্চয়ের পুঁজি খরচ করে তিনি দেউলিয়া হয়ে যান, আর মায়ের বিয়ের কয়েক বছর পরই মারা যান।

    সংসারের ক্ষমতা মায়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার পর মায়ের চরিত্রে লুকোনো কিশোরীমোহন বেরিয়ে আসে। প্রায়ই দেখতুম ইমলিতলার প্রতিবেশিরা এসে মায়ের কাছে নিজেরদের আর্থিক দৈন্য আর পারিবারিক দুর্দশার গল্প করছে, আর মা তাদের সাহায্য করছেন, পয়সাকড়ি দিয়ে তো বটেই, চাল-ডাল, পুরোনো বাসনপত্র আর ব্যবহৃত জামাকাপড় দিয়ে। মায়ের বোনেদের বিয়ে আরও গরিব পরিবারে হয়েছিল বলে পুজোয় পাওয়া শাড়ি-চটি ইত্যাদি নিজে না পরে বোনেদের বা নিলামবাটীর দুস্হ জ্ঞাতিদের পাঠিয়ে দিতেন বা যখন নিজে যেতেন তখন নিয়ে যেতেন। যদিও মা পরিবারের ডি ফ্যাক্টো কর্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ইমলিতলার বাড়িতে মা-বাবা-দাদা-আমি থাকতুম সবচেয়ে ছোটো ঘরটায়। লন্ঠনের আলোয় পড়াশোনা।

    সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকার চারিত্রবৈশিষ্ট্যের দরুণ বড়জেঠা সংসারের সমস্ত ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। আমার মনে আছে, ১৯৫১ সালে যে বছর প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, কোন দলকে ভোট দেয়া হবে তা নিয়ে আলোচনার শেষে মায়ের নির্ণয় সবাই মেনে নিয়ে ছিলেন, অর্থাৎ যার যে দলকে ইচ্ছে ভোট দেবে। কলকাতায় নাকতলায় থাকতে অবাক লাগত দেখে যে বাড়ির কর্তা যে দলের সমর্থক, পরিবারের সকলেই সেই দলকে ভোট দ্যায়, অথচ তারাই আবার ডাইন্যাস্টিক পলিটিক্সের তর্ক তোলে !

    স্কুলে ভর্তি হয়ে টের পাই যে মা শুদ্ধ হিন্দি জানেন না, ইমলিতলার ‘ছোটোলোকি’ বুলি দখল করে ফেলেছেন, আর তার বহু শব্দ যে শুদ্ধ হিন্দিতে অশোভন, এমনকি অশ্লীল, তা উনি অনেক পরে জানতে পারেন, যখন আমরা ইমলিতলা ছেড়ে দরিয়াপুরে সুন্নি মুসলমান পাড়ায় চলে যাই। পানিহাটিতে মেয়েদের স্কুল তখনও ছিল না বলে মা নিরক্ষর ; নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন দাদা স্কুলে ভর্তি হবার পর।

    ইমলিতলার বাড়িতে হিন্দুত্ব সামলাবার কাজ ছিল পুজারী বাড়ি থেকে আসা বড়-জেঠিমার। সেকারণে মা এবং কাকিমারা প্রতিদিনের ধর্মাচরণ থেকে নিজেদের আর আমাদের মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। জনৈক পাদরির আর্থিক সৌজন্যে প্রাইমারি স্তরে আমি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছিলুম ; মা ঘটিতে গরম জল ভরে আমার শার্ট-প্যান্ট আয়রন করে রাখতেন। আমার বাংলা বনেদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মায়ের নির্দেশে আমাকে ব্রাহ্ম স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করা হয়েছিল।

    দরিয়াপুরে পাকাপাকি চলে আসার পরও ইমলিতলার সদস্যদের দায়িত্ব মা ছাড়েননি ; সপ্তাহে এক দিন গিয়ে টাকাকড়ি আর চাল-ডাল-আনাজের ব্যাপারটা সামাল দিয়ে আসতেন। গোলা রোডের এক বানিয়ার দোকানে তালিকা দিলে সে যাবতীয় জিনিস ইমলিতলা আর দরিয়াপুরে পাঠিয়ে দিত। পুজোর সময়ে পোশাকের ভেদাভেদ মেটাতে সবায়ের জন্য ছিল একই কাপড়ের শার্ট আর ফ্রক, এমনকি জেঠা-কাকারাও সেই কাপড়ের শার্ট পরতেন। দাদা চাকরি পাবার পর দাদার চাকুরিস্হলে গিয়ে মা মাঝেমধ্যে সপ্তাহখানেকের ছুটি কাটিয়ে আসতেন। দরিয়াপুরের বাড়িতে কাজের মাসি রান্না করে দিত। নিম্নবর্ণের হাতে রাঁধা ভাত বাবা খেতেন না বলে ভাতটা আমিই বসিয়ে দিতুম। রান্নায় মাকে সাহায্য করতে হতো বলে ডাল-তরকারিও রাঁধতে শিখে গিয়েছিলুম।

    হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার আর আমার বন্ধুরা কোর্টে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে গেছেন শুনে মা, যিনি ছিলেন অত্যন্ত চাপা প্রকৃতির, নিজের ক্রোধ সামলাতে পারেননি। আমি তাদের চিঠি ইত্যাদি ছিঁড়ে ফেলছি দেখে বলেছিলেন, ‘সব নিয়ে গিয়ে গুয়ের ডাবায় ফ্যাল ; সব কটাই আহাম্মক, অকৃতজ্ঞ। ’ আমার আর দাদার লেখালিখি সম্পর্কে উনিই ছিলেন প্রধান উৎসাহদাত্রী। ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নামে যে কবিতাটা নিয়ে মকদ্দমা হয়েছিল সেটা মা-বাবা-ঠাকুমা সকলেই পড়েছিলেন। হৃদরোগের লক্ষণগুলোর সঙ্গে তখন আমরা ততটা পরিচিত ছিলুম না, মাও তাঁর কষ্টের কথা বলতেন না। লখনউতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮ই নভেম্বর ১৯৮২ মারা যান।

    ১৯৫০ থেকে চিনতুম ফণীশ্বরনাথ রেণুকে, হিন্দি ভাষার সাহিত্যিক, যখন তিনি নেপালের রাণাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আহত হয়ে ভর্তি ছিলেন পাটনার ভোমরপোখরের নার্সিং হোমে, বড়দিদের বাড়ির ঠিক সামনে, লতিকাদি সেখানে নার্স ছিলেন, লতিকা রায়চৌধুরী, রেণু ওনার প্রেমে পড়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে রাজেন্দ্রনগরের ফ্ল্যাটে থাকতেন, জানতেন না আমি লেখালিখি করি। ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার হবার পর জানলেন, আর হিন্দি পত্র-পত্রিকায় আমাদের নিয়ে নিয়মিত লিখলেন, যখন কিনা বাঙালা পত্র-পত্রিকা সেসময়ে আমাদের পোঁদে বাঁশ করে চলেছে। রেণু উদ্বুদ্ধ করলেন এস এইচ বাৎসায়ন অজ্ঞেয়কেও, আর উনিও আমাদের হয়ে কলম ধরলেন। রেণুর “বনতুলসী কা গন্ধ” বইতে “রামপাঠক কা ডায়েরি” নামের গদ্যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন হাংরি আন্দোলন নিয়ে। ওনার রাজেন্দ্রনগরের বাড়িতে প্রায়ই যেতুম সন্ধ্যায় মদ খেতে, আমি নিয়ে যেতুম গাঁজা, বেশ জমতো, আমাদের আড্ডা, অনেক তরুণ হিন্দি কবি-লেখকও আসতো। সকালে পৌঁছোলে তাড়ি খাওয়া হতো, তাড়ির ওপর এলাচগুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে। রেণু মারা গেছেন ১৯৭৭ সালে। লতিকাদিকে রেণুর প্রথম পক্ষের ছেলেরা গ্রামে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে মারা যান।

    ১৯৬৫ সালে হিন্দি কবি রামধারীসিং দিনকর ডেকে পাঠিয়েছিলেন ওনার বাড়ি, রেণুর বাড়ি যাবার পথেই ওনার বিশাল বাড়ি, ১৯৬৪ পর্যন্ত এম পি ছিলেন, সবে ফিরেছেন দিল্লি থেকে, বললেন, “আমি তোদের সম্পর্কে শুনেছি আর তোদের বিপ্লবকে সমর্থন করি।” বিপ্লব শব্দটা ব্যবহার করতে শুনে কিছুটা অবাক লেগেছিল, বুঝতে পেরে উনি বললেন, উনি একজন “খারাপ গান্ধীবাদী” কেননা যখন দ্রোহ দরকার তখন গান্ধীবাদে নিজেকে বেঁধে রাখলে চলে না। বলেছিলেন, যেখানে-যেখানে বক্তৃতা দিতে ডাকবে সেখানে-সেখানে তোদের সম্পর্কে বলব।” ওনার বক্তৃতার ফলে বহু হিন্দি পত্রিকায় আমার ফোটো আর হাংরি আন্দোলনের খবর বেরোতো। দিনকর মারা গেছেন ১৯৭৪ সালে।

    ১৯৬৪ সালে তারাশঙ্করের টালার বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলুম, তারাশঙ্করের মামারা পাটনার, ওনারা বলেছিলেন দেখা করতে, তারাশঙ্কর কথা বলতে চান আমাদের সঙ্গে। ওনাকে আমাদের বুলেটিনগুলো দিলুম। রেখে নিলেন। মেদিনীপুরে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে বলে এলেন। পরে যখন রামধারি সিং দিনকরকে তারাশঙ্করের বক্তৃতার কথা বলেছিলুম, দিনকর বলেছিলেন, “ওয়হ পুরানে খেয়ালাতকে হ্যাঁয়, জানতা হুঁ উনহে।”

    ১৯৭৫ নাগাদ কলকাতায় দেবী রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলে দেবী জানালো যে অন্নদাশঙ্কর রায় আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। জানি না ১৯৬৪-৬৫ সালে দেখা করতে চাননি কেন। আমি তখন লেখালিখি করতে পারছি না, মনেই আসতো না কোনো কথা গুছিয়ে লেখার। ওনার বাড়ি গেলুম। রফিক হায়দার নামে একজন বাংলাদেশী কবি ছিলেন ওনার বাড়িতে, কিন্তু মনে হল তিনি আমাদের আন্দোলনের কথা শোনেননি, সম্ভবত তখন কলকাতা থেকে আন্দোলন চলে গেছে উত্তরবঙ্গে আর ত্রিপুরায়। অন্নদাশঙ্কর নিজের কথাই বলে গেলেন, আমি আর দেবী শ্রোতা, কেন দেখা করতে চেয়েছিলেন বুঝতে পারিনি। ওনার কথাগুলো দেবী লিখে নিয়েছিল একটা খাতায়।

    ১৯৪৮ সালে, প্রথম নিল ডাউন হয়েছিলুম রামমোহন রায় সেমিনারিতে, হিন্দি স্যারের ক্লাসের বাইরে বারান্দায়, বৃষ্টিতে হিন্দি বই ভিজে চুপচুপে হয়ে গিয়েছিল বলে, বলেছিলেন, “রাষ্ট্রভাষাকা সন্মান করনা সিখো গধহা কঁহিকা। ” বারান্দার বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে, তখনও জানতুম না যে ওটা রাষ্ট্রভাষা নয়, সরকারি ভাষা। গাধাদের দেখেছি বটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে, আর ছাতামাথায় মানুষদের দিকে তাকিয়ে কান নাচিয়ে হাসছে।

    এগারো

    ১৯৮৮ সালে, ট্যুরে যাবো বলে লখনউয়ের বাস স্ট্যাণ্ডে অপেক্ষা করছিলুম ; হঠাৎ অধস্তন এক যুবতী অফিসার যার বয়স আমার অর্ধেক কোথা থেকে উদয় হয়ে আমার হাত ধরে বলে উঠল “চলুন পালাই”। বললুম, আমি রায়বরেলি গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড মিটিং অ্যাটেণ্ড করতে যাচ্ছি। যুবতী বলল, “তাতে কী হয়েছে, আমিও যাবো আপনার সঙ্গে, অপেক্ষা করব ওদের দপতরে, মিটিং শেষ হয়ে গেলে দুজনে উধাও হয়ে যাবো কোথাও, আমার কাছে যথেষ্ট টাকা আছে, তৈরি হয়েই বেরিয়েছি। ” শুনে, মাথায় আর রগে হাতুড়ির আওয়াজ শুনতে পেলুম। এই অফিসার আমারই বিভাগের, প্রায় প্রতিদিন বাংলা শাড়ি আর শাঁখা-রুলি পরে অফিসে আসে, বলল, “আপনাকে যে ভালোবাসি তা আপনার স্ত্রী জানেন। ” কোনো রকমে ছাড়ালুম। মেয়েটি আত্মহত্যা করে নিলে। নিজের কাপুরুষ চরিত্রের জন্য বেঁচে গেলুম, ওফ। বিয়ের পর আমি আর কোনো লফড়ায় ফাঁসাতে চাইনি নিজেকে, সুযোগ পেলেও, মনে হয়েছিল এবার শান্তি দরকার, তবুও নিজেই অশান্তি ডেকে এনেছি, ভেতরের লোচ্চা-লোফার কামড়ে ধরেছে।

    ১৯৯০ সালে,হিমালয়ের তরাইতে দেশি গোরুর সমীক্ষা করতে গিয়ে এক মরা বাঘিনীর প্রেমে পড়েছিলুম, মরা বাঘিনীর গোলাপি যোনি দেখে চাঞ্চল্য ঘটছিল লিঙ্গে। রাতের বেলায় বাঁশে চিৎ করে চার পা বেঁধে বাঘিনীকে রাখা হয়েছিল এক পাঞ্জাবি শিখের গ্যারাজে। প্রচুর ওল্ড মঙ্ক টেনে শুয়ে পড়েছিলুম বাঘিনীর বুকে, মাই চুষেছিলুম, আর কাঁদছিলুম, বাঘিনীকে ভালোবেসে, বীর্য ঝরিয়ে, উত্তরণের আরাম হল। কবিসন্মিলন পত্রিকার সহসম্পাদক শংকর চক্রবর্তী এই ঘটনা নিয়ে লেখা আমার কবিতা পড়ে ব্যোম ; মধ্যবিত্ত বাঙালির কল্পনাজগত আক্রান্ত হলে বুঝতে পারি অস্তিত্ব ফাটিয়ে চৌচির করে আত্মসন্দেহের নীহারিকাপূঞ্জ ভরে দিতে পেরেছি। আসলে তাদের অভিজ্ঞতা বেশ সীমিত, ভারতবর্ষকে দেখেছে পর্যটকের চোখ দিয়ে। এটা নিয়ে আমি একটা গল্প লিখেছিলুম, অজিত রায়ের ‘শহর’ পত্রিকায়, ‘দুধসন্দর্ভ’ নামে।

    ১৯৮০ সালে, কোমরের তলা থেকে বিকলাঙ্গ এক অপরূপ সুন্দরী তরুণী কেরানিকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে আয়া আসেনি একদিন, ও যেতো পেরামবুলেটারের মতন একটা গাড়ি করে, কী করা যায় ভেবে উঠতে পারছিলুম না, কেরানি আর বিভাগীয়প্রধানের শ্রেণি-বিভেদ বেশ দৃষ্টিকটু। অফিস ছুটির পর আরেকজন মুসলমান অফিসারই ছিলেন আমার সঙ্গে, তিনি হিন্দু তরুণীকে তুলতে চাইলেন না, বাবরি মসজিদ তখন ভাঙা হয়ে গেছে, আমি পাছার তলায় হাত দিয়ে তুলে নিলুম, মনে হল তরুণীটি ইচ্ছেকরে নিজের যোনিকে আমার লিঙ্গের সঙ্গে চেপে ধরল, ওর হুইলচেয়ার ঠেলাগাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবার সময় আমার প্রেমিকা-নিরপেক্ষ লিঙ্গ ফুলে উঠল, তরুণীর ইশারার জন্য আপশোষ হল। ঘটনাটা নিয়ে আমার একটা ছোটোগল্প আছে, সুকুমার চৌধুরীর ‘খনন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, ‘অনিশ্চয়তা নিয়ে দুটি গল্পের বিনুনি : একটি প্রেমের অন্যটি রঙ্গকৌতুকের’ শিরোনামে।

    ১৯৪৯ সালে, প্রথম স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ হয়েছিলুম, ইংরেজি ক্লাসে, ওয়র্ডসওয়র্থের ড্যাফোডিল্স কবিতা ব্যাখ্যা করার সময়ে আমি সিসটার আইরিনের দেয়া শুকনো ড্যাফোডিল্স ফুল দেখিয়ে বলেছিলুম, জানি স্যার, এই যে, বইয়ের ভাঁজ থেকে বের করে। শিক্ষক বলেছিলেন, “ইয়ার্কি মারবার জায়গা পাওনি, স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ।” উনি বুঝিয়েছিলেন যে কচুরিপানার বেগুনি রঙের ফুলকে বলে ড্যাফোডিল্স। যখন ইউরোপে গেলুম তখন পথের ধারে-ধারে দেখলুম ড্যাফোডিল্স ফুল, দেখলুম লাল রঙের ফুল যাকে ইউরোপীয়রা বলে পপি, অথচ যা পোস্তগাছের ফুল নয়। ১৯৪৯ সালে,দরিয়াপুর পাড়ায় সন্ধ্যায় মাতাল আর গঞ্জেড়ি মাস্তানদের মারামারি চেঁচামেচি চিৎকার শুরু হতো বলে, আমি তার চেয়েও জোরে চিৎকার করে পড়া মুখস্হ করার চেষ্টা করতুম। তার ফল হতো। বাইরের চেঁচামেচি বন্ধ হয়ে যেতো। দরিয়াপুরে আমাদের বাড়িটা ছিল একটা বাতিল গোরস্তানের ধারে ; গোরস্তানের কেয়ারটেকার আল্লু মিয়াঁ ঝুপড়ি তৈরি করে নিজের দুই মেয়েকে দিয়ে রাতের বেলায় ব্যবসা করাতো, তাদের বররা দালালের কাজ করতো, মাঝে-মাঝে টাকার বাঁটোয়ারা নিয়ে শশুর আর জামাইদের ভেতর ঝগড়া হতো, অকথ্য গালাগাল। সেটা ছিল ইমলিতলার পর আমার গালাগাল শেখার উঁচু ক্লাস।

    ১৯৯৪ সালে সলিলা চাকরি ছেড়ে দেবার পর ওকে সঙ্গে নিয়ে ট্যুরে যেতুম, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্যে। ১৯৯৫ সালে মালদায় গিয়ে স্তম্ভিত হলুম টেরাকোটা মসজিদ দেখে, তার আগে কেউ এই মসজিদগুলোর সংবাদ দেয়নি, সকলেই বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরের কথা বলতো। সুবো আচার্যের বাড়ি বিষ্ণুপুরে, যখন গিয়েছিলুম তখন টেরাকোটা মন্দির দেখেছিলুম, ষোলো থেকে উনিশ শতকের মাঝে তৈরি। মালদায় গিয়ে জানলুম যে মসজিদগুলো তার বহু আগের। আদিনা মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন সুলতান সিকন্দর শাহ ১৩৬৪ থেকে ১৩৭৫-এর মাঝে। লোটন মসজিদ তৈরি হয়েছিল ১৪৭৫ সালে। ১৪৮০ সালে মিরশাদ খান তৈরি করিয়েছিলেন তাঁতিপাড়া মসজিদ। ১৫৩১ সালে কদম রসুল মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন সুলতান নুসরত শাহ ; এই মসজিদের কেয়ারটেকার একটা পায়ের ছাপ দেখিয়ে বলেছিলেন যে ওটা হজরত মোহম্মদের, শুনে পিলে চমকে গিয়েছিল, দেওবন্দিরা জানতে পারলে আস্ত খেয়ে ফেলবে লোকটাকে, সে আবার প্রতি সকালে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে আসতো আর সন্ধ্যায় ফিরে যেতো। মসজিদগুলো দেখতে-দেখতে শৈশবের ইমলিতলা পাড়ার মসজিদের কথা মনে পড়ছিল, তার ভেতরেও আমাদের প্রবেশ অবাধ ছিল, এই মসজিদগুলোর মতন।

    ১৯৬৫ সালে কলেজ স্ট্রিটে ছাতার খোঁচা দিয়ে এক ভদ্রলোক বললেন, “এই, তোরা আমার বাড়ি আসিস না কেন রে”? সুবিমল বসাক ওনার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে “আমরা যাবো যে কোনো দিন”, বলার পর উনি বললেন, “সকালের দিকে আসিস।” উনি চলে যাবার পর সুবিমল বলল, “জানো কে ? জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী।” গেলুম ওনার বাড়ি, মানিকতলায় নেমে, তারপর ধানখেতের ভেতরে আলের ওপর দিয়ে দূরে একটা চালাবাড়ি, সেরকমই নির্দেশ দিয়েছিলেন। আলের ওপর দিয়ে হাঁটার সময়ে বুঝতে পারলুম যে রাতের বেলায় সাপের ভয়ে ছাতাকে ছড়ির কাজে লাগান। ওনার বাড়িতে পৌঁছোলে, জানতে চাইলেন আমি কি-কি করেছি যে সবাই এতো চটে গেছে। সবই বললুম ওনাকে, মুখোশ, জুতোর বাক্সের রিভিউ, ব্ল্যাংক কাগজে গল্প, বিয়ের কার্ড, স্টেনসিল করা ড্রইং ইত্যাদি। বেশ হাসছিলেন শুনে, যখন শুনলেন যে জুতোর বাক্স রিভিউ করতে দিয়েছিলুম, তখন একেবারে জোরে-জোরে হাসতে লাগলেন। বললেন, “মামলা ঠুকেছে বলে বন্ধ করিসনি, তোরা না করলে কে-ই বা মুখোমুখি প্রতিবাদ করবে।” এখন ওই ধানখেতে আবাসনের পর আবাসন। বেশ কয়েকজন নামকরা কবি থাকেন সেই আবাসন-হয়ে-যাওয়া-ধানক্ষেতে। জানি না ধানক্ষেতের উড়ন্ত বাতাসের সবুজ গন্ধ তাঁরা পান কিনা।

    ১৯৯৮ সালে কেদার ভাদুড়ির গাঙ্গুলিবাগানের বাসায় বসে মদ খাচ্ছি, একটি তরুণ প্রবেশ করতেই গম্ভীর হয়ে গেল কেদার, আমাকে বলল, পুরোটা চোঁচোঁ করে খেয়ে বাড়ি চলে যাও, কালকে আবার বসা যাবে। পরের দিন গিয়ে জানলুম তরুণটি কেদারের প্রথম পক্ষের ছেলে। টিউশানি করবার সময়ে কচি এক তরুণীর প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করে ফেলেছিল কেদার, তারপর তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল, প্রথম বউকে ডিভোর্স দিয়ে। প্রথম বউয়ের ছেলে প্রতিমাসে খোরপোষের টাকা নিতে আসতো। কেদারের তরুণী বউ কখনও আসতো না গাঙ্গুলিবাগানের বাড়িতে, প্রতিবেশীদের কেউ একজন বলেছিল, “ও মা আপনার নাতনিও আছে, বলেননি তো !” তরুণী বউয়ের একটা মেয়ে হয়েছিল, তাকেও আসতে বারণ করে দিয়েছিল কেদার। কয়েক পেগের পর বলতো, “বড়ো যন্ত্রণা হে, বড়ো কষ্ট, বড়ো দুঃখ, ও শূলযাতনা তুমি বুঝবে না, কবিতায় লুকিয়ে রেখেছি, কাকেই বা বলব, কবিতাকেই বলি। ” কেদারের একটা চল্লিশ পাতার সাক্ষাৎকারে দ্বিতীয় পক্ষের বউ আর তার সঙ্গে আকস্মিক প্রেমের ঘটনার উত্তর দিতে চায়নি কেদার। কেদারের মৃত্যুর কথা জেনেছিলুম উত্তম দাশের ফোনে।

    অশোক ফকিরের চম্পাহাটির চালাঘরে গিয়েছিলুম আমি আর সুবিমল ১৯৬৫ সালে, উনি পানের পাতায় আফিম চাটতে দিলেন, বেশ সুন্দরী বউ, অজন্তার দেয়ালে আঁকা নারীদের মতন বৌদ্ধ চোখ। ওই বউকে ফেলে অশোক ফকির এক বিদেশিনীর সঙ্গে আমেরিকায় হাওয়া। বিদেশিনী বউটা কিছুদিন আগে ইমেল করে নিজের জটাজুট সঙ্গে হরেকৃষ্ণ ছাপানো উত্তরীয় কাঁধে অশোক ফকির, ওর আর মন্দিরের ছবি পাঠিয়েছিল, গিন্সবার্গের লেখা চিঠি পাঠিয়েছিল যেগুলোর কপি আমেরিকায় অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠিয়েছিলুম। বিদেশিনী বউ বলেছিল অশোক ফকিরের আমেরিকাবাস নিয়ে একটা বই লিখেছে, কোনো পাবলিশার ছাপতে রাজি নয়। মার্কিন কনসুলেটে গিয়ে অশোক ফকির খবর যোগাড় করতো যে কারা-কারা কলকাতায় এসেছে আর কোন হোটেলে আছে। অশোক ফকিরের কারবার শুনে বাঙালি বউটার জন্যে মায়া হল। আমার লম্পট চোখ বুজলেই তার মুখ ভেসে ওঠে। আমেরিকাতেই মারা গেছে অশোক ফকির। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় অশোক ফকিরকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন শুনেছিলুম। অশোক ফকিরের দেয়া আফিম খেয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ওভারব্রিজের ওপর নেচেছিলুম আমি আর সুবিমল। অনেক রাত পর্যন্ত, সেসময়ে চম্পাহাটিতে এখনকার মতন নিত্যযাত্রীদের ভিড় ছিল না, একেবারে ফাঁকা স্টেশান, প্ল্যাটফর্মগুলোও ফাঁকা, অন্ধকারে ঢাকা। এখন চম্পাহাটিতে ট্রেন এলে নিত্যযাত্রীদের ঠেলাঠেলিতে অন্ধকার উধাও হয়ে যায়, ওরা সবাই যেন আফিম চেটে দৌড়োয়।

    ২০০৭ সালে ইউরোপে গিয়ে নানা রকমের ওয়াইন খেয়ে আমি কোনো তফাত টের পাইনি, নেশার মাত্রাটুকু টের পেয়েছি, মদের চরিত্র নয়। গীর্জাতেও যে ওয়াইন তৈরি হয় তা জানতুম না ; গীর্জার ওয়াইন আর ফরাসিদেশের নাস্তিকদের কোম্পানির ওয়াইনে তফাত টের পাইনি। এদেশে কোনো মন্দিরে মদ তৈরি হলে ধুন্ধুমার বেধে যাবে। আসলে ইমলিতলার আর খালাসিটোলার দিশি মদ ঠররা আর বাংলার কয়েকটা আস্তরণ জমে গেছে আমার জিভের ওপর। বাংলা মদকে পিসেমশায় বলতেন ধান্যেশ্বরী। ১৯৬৫ সালে বেনারসে একজন হিপি চরস দিয়ে হনুমান তৈরি করত আর তার ল্যাজ ভেঙে ফুঁকতে দিতো। আরেকজন হিপি গঙ্গাজলের ঘটিতে এল এস ডি মিশিয়ে আনতো, তার সামনে জিভ বের করলে সে কয়েক ফোঁটা ফেলে দিতো। গঙ্গা তখন থেকেই ভিষণ নোংরা অথচ হিন্দুরা হোলি গ্যাঞ্জেস বলে বলে দুয়েকজন হিপি ওই জলে স্নান করতো। তার আগে অ্যালেন গিন্সবার্গ ওই নোংরা জলে স্নান করে ফোটো তুলিয়ে হিপিদের জন্য পথ দেখিয়ে গেছে। পাটনায় গঙ্গার ধারে হিসি করতে বললে, গিন্সবার্গ বলেছিল, তোমার হোলি রিভার, আর তুমি বলছ তার তীরে হিসি করতে !

    ১৯৮১ সালে লখনউতে চম্বল অঞ্চলের ট্যুরে বাবা মুস্তাকিম নামে এক ডাকাতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যে আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল, “জিতে রহো”। ডাকাতের আশীর্বাদের দরুণ স্হানীয় কৃষি আধিকারিক বলেছিল, চম্বলে আর কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যে গ্রামে ইচ্ছে যেতে পারবেন। সত্যিই, বহুবার চম্বলে ট্যুরে গেছি, প্রতিটি গ্রামে লোকেরা বেশ আপ্যায়ন করেছে, জমিদাররা তাদের বাড়ির পায়খানায় হাগতে দিয়েছে। ১৯৮৩ সালে গোরখপুরে ট্যুরে গিয়েছিলুম, সেখানকার মন্দিরে শিবের পুজোয় ত্রিশূল উৎসর্গ করতে হয়, যা আমার অধস্তন অফিসার করতে চাইছিল। আমি বাইরে বাগানে ছায়ায় অপেক্ষা করছিলুম। আচমকা একজন জটাধারী সাধু, ঠোঁটের কোনে ছিলিমের ফেনা, জড়িয়ে ধরে বলে উঠেছিল, “জো তুমসে দুষমনি করেগা ওয়হ তুমসে পহলে মর জায়গা। ” কারোর মারা যাবার খবর পেলে তার সম্পর্কে সন্দেহ হয়, সাধুটার কথার জন্যে হয় না।

    ১৯৫৫ সালে ইনফ্যানট্রির ক্যাম্পে গিয়ে ভোর রাতে উঠে কুড়ি-তিরিশজন সবাই ল্যাংটো হয়ে হাগতে যেতুম, গোল হয়ে হাগতে বসতুম, পাদবার খেলা খেলতুম, ছোঁচাতুম চা খাবার অ্যালুনিমিয়াম মগ দিয়ে, যৌথভাবে উলঙ্গ হতুম, কোনো লজ্জা-বালাই নেই, প্রাগৈতিহাসিক কালখণ্ডে ফেরার সুযোগের জন্য সকলে মিলে হইচই করতুম। ১৯৬১ সালে অফিসের সহকর্মী সুশীল কুমার, মণিমোহন মুখোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায় আর আমি চারজনে মিলে গিয়েছিলুম শিমুলতলায়। রাতের বেলায় একটা পাহাড়টিলায় চারজনে উলঙ্গ হয়ে ওঠার প্রতিযোগীতা করেছিলুম। সম্ভবত সুশীল কুমার জিতেছিল। পরের দিন একটা ছোট্টো পুকুর বা হাঁটুজল ডোবায় আমি, সুশীল আর অরুণ তিনজনে জলের তলায় লুকিয়ে লিঙ্গ দাঁড় করিয়ে জলের ওপরে ভাসিয়েছিলুম ; মণিমোহন চেঁচিয়ে উঠেছিল, “সাপ সাপ জলে সাপ আছে”। মণিমোহনকে সেই থেকে বলা হোতো “চপড়গাণ্ডু”; জল থেকে উঠে মণিমোহনকে বলেছিলুম, আপনাকে ওয়াটার অর্কিড দেখাতে চাইছিলুম। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসে আছে ঘটনাটা। ওয়াটার অর্কিড প্রদর্শনীর কথা বুড়ো বয়সেও মনে রেখেছিল মণিমোহন। সুশীল লিভারের ক্যানসারে মারা গেছে, মণিমোহন কিডনির। অরুণ পাগলিয়ে গেছে ওর জামাইয়ের পাল্লায় পড়ে, ও অবশ্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক পাটনায় চাকরির সময়েও পাগলিয়ে ছিল, ঘটনাটা আছে আমার ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে। মণিমোহনের মেয়ের সঙ্গে দাদা নিজের বড়ো ছেলের বিয়ে দিয়েছিল। অরুণের সঙ্গে দাদা বিয়ে দিয়েছিল নিজের এক শালির।

    ১৯৯৫ সালে মুম্বাই থেকে ফিরে সন্দীপনের সঙ্গে দেখা করতে গিসলুম ওনার চেতলার ফ্ল্যাটে, কি-নোংরা কি-নোংরা, ঘরে বসে আছেন মেঝেয়, সামনে একটা জলচৌকি, পাশে একটা থলে থেকে “আজকাল” সংবাদপত্রে জড়ো হওয়া পাঠকদের চিঠিতে চোখ বোলাচ্ছিলেন আর বাছাই করছিলেন। বললুম, লেখালিখি না করে এসব ফালতু কাজে সময় নষ্ট করছেন কেন, সামান্য টাকার জন্যে। উনি বললেন গল্পের ম্যাটার পেয়ে যাই। ভেতরে গিয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন, স্ত্রী সেজেগুজে বেরিয়ে গেলেন। যেমন কিপ্টে ছিলেন তেমনই, জামা-প্যান্ট পরে নিয়ে, দরোজায় তালা ঝুলিয়ে, বললেন, “চলো, সুকৃতিতে গিয়ে চা খাওয়া যাবে”। ট্যাকসির ভাড়া আমিই দিলুম, চা-কাটলেটের পয়সা আমিই দিলুম। মনে হল, এই একবার আড্ডাই যথেষ্ট, ওনার সেই উইট ফুরিয়ে গেছে, সেই যখন হাওড়ায় সাইকেলে চেপে ভোরবেলায় দেবী রায়ের বাড়িতে হাংরি বুলেটিনের জন্যে লেখা দিতে আসতেন। সন্দীপন মারা গেছেন ২০০৫ সালে। এখন বুড়ো হয়ে টের পাই যে এই বয়সে পৌঁছে ঘরদোরের ধুলোবালি জমে থাকাটা কোনো গুরুত্বের ব্যাপার নয়।

    ১৯৬৪ সালে হাতকড়া পরাবার সময়ে, কোমরে দড়ি বাঁধার সময়ে, পুলিশের মুখময় আলো খেলা করছিল, যেন আধুনিকতার ওপর ওদের একচ্ছত্র অধিকার, যেন এনলাইটেনমেন্ট কাকে বলে ওরাই কেবল জানে। কোমরে দড়ি বাঁধা আর হাতে হাতকড়া পরানোর ব্যাপারটা এনলাইটেনমেন্টের সঙ্গেই এসেছিল। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, পাড়ার কুকুরগুলোও আমার পেছন-পেছন কৈলাশযাত্রায় হেঁটেছিল। ২০১১ সালে সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় “বাইশে শ্রাবণ” ফিল্মে গৌতম ঘোষকে একজন পাগল হাংরিয়ালিস্ট কবি হিসাবে তুলে ধরলে, নিবারণ, যার লেখা কোথাও কেউ ছাপতে চায় না, রবীন্দ্রনাথ নামে পুলিশের এক খোচরকে, যে আবার লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, মোবাইলে বারবার কবিতা ছাপানোর অনুরোধ করে, সেই চারশোবিশ ফিল্ম দেখে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিল শুভা। কেন ? হাংরি আন্দোলনের কবিকে সৃজিৎ বদনাম করে, তাকে দিয়ে বইমেলায় আগুন ধরিয়ে, ধ্বসিয়ে দিয়েছে, তাই। না, সৃজিৎ আমার বা অন্য কোনো হাংরি কবির অনুমোদন নেয়নি, সম্ভবত এসট্যাবলিশমেন্টকে খুশ করার জন্য হাংরি আন্দোলনের কবিকে অহেতুক ঢুকিয়েছে কাহিনিতে। কাহিনি লেখককে অত্যন্ত অসৎ বলা ছাড়া আর কীই বা করা যেতে পারে। ফিল্মটায় যাদের নাম উল্লেখ করেছিল পরমব্রত, তাতে শৈলেশ্বরের নাম ছিল না, ও নিজের টাকলা গুরুদেবকে ধরে সৃজিৎকে দিয়ে আন্দোলনকারী হিসেবে নামটা ঢুকিয়েছিল, অথচ আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুচলেকা দিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিল।

    সৃজিৎ ফিলমটায় একজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদককে পুলিশের খোচর হিসেবে দেখিয়েছে, এই ঘটনাটা সত্যি। পবিত্র বল্লভ নামে কুঁজো এক যুবক “উপদ্রুত” নামে একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করত, বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে বসত কফিহাউসে, সে ছিল পুলিশের ইনফরমার, হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন, বই ইত্যাদি গিয়ে জমা দিত লালবাজার প্রেস সেকশানে। বাসুদেব মাঝে-মাঝে বলত বটে যে মুখোশ পাঠানো ঠিক হয়নি, জুতোর বাক্স দেয়া উচিত হয়নি, স্টেনসিল-ড্রইং কফিহাউসে বিলোনো ঠিক দেখায় না, ইত্যাদি-ইত্যাদি, কিন্তু সেই কথাগুলো যে পবিত্র বল্লভের, তা জানতে পারি যখন পবিত্র বল্লভ পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বেমালুম বলে গেল যে সে আমাকে চেনে, কফিহাউসে আমার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছে, তার কাছে আমি লেখা চেয়েছি, ইত্যাদি।

    বারো

    ১৯৯২ সালের ৭ই ডিসেম্বর, তখন আমি মুম্বাইতে, ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেস থেকে ডান ডিকে টার্ন নিয়ে মাহিমে ঢুকবো, দেখি দু দল মানুষ লাঠি, তরোয়াল, বর্শা, বন্দুক নিয়ে মারামারি করছে, পুলিশের দেখা নেই, মানুষ তরোয়ালের আঘাতে লুটিয়ে পড়ছে দেখে আর এগোলুম না, সোজা ব্যাক করে বাড়িতে। তার আগের দিন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে বলে দুএক জায়গায় মারপিট হয়েছিল, কিন্তু এরকম খুনোখুনি আমি আগে দেখিনি। দাঙ্গা কাকে বলে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল। ভাগ্যিস গাড়িটা ছিল, তাই পালাতে সুবিধে হল, কেননা রাস্তায় বাস, অটো, ট্যাক্সি কিছুই দেখিনি ফেরার সময়ে, কেবল পলায়নকারীদের গাড়ি। কেন যে দাঙ্গা হয়, কেন একজন মানুষ ভিড়ের অংশ হতে রাজি হয়, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে কাটতে বেরিয়ে পড়ে, জানি না।

    ১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ, আমি ভিলে পার্লে বিল্ডিঙের অফিসের অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ইনচার্জ। অধস্তন অফিসার কয়েকজন, “বাড়িতে কাজ আছে”, বলে ছুটি নিয়ে কেটে পড়ল। একটু পরে মহিলা অফিসাররা এসে বলল যে শহরে গোলমাল চলছে স্যার আমরা বাড়ি যেতে চাই, কী গোলমাল জানে না, বললুম ঠিক আছে, যাও। তারপর শিব সেনা করে এমন একজন এসে বলল যে, স্যার শহরে পর-পর বোমা ফাটছে, কিছু একটা গোলমাল শুরু হয়েছে, হয়তো ট্রেন-বাস সব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। হেড অফিসে ফোন করে জানতে পারলুম যে, হ্যাঁ, পুলিশ থেকে জানিয়ে দিয়েছে নানা জায়গায় বোমা ফাটানো হয়েছে, অফিস ছুটি করে বন্ধ করে দিন। পরের দিন কাগজে পড়লুম যে সন্ত্রাসবাদীরা ষড়যন্ত্র করে বোমা ফাটিয়েছে, অনেক মানুষ মারা গেছে। তার কিছুদিন পরে জানলুম কাণ্ডটা দাউদ ইব্রাহিম নামে একজন মাফিয়ার চেলাদের, যারা ঘটনার আগেই দুবাই পালিয়েছে। ঘটনাটার কথা মনে পড়লে ভয়ার্ত মহিলাদের মুখগুলো মনে ভাসে, তাঁদের কয়েকজন বুড়ি হয়ে স্বাস্হ্যের অবনতির কারণে মারা গেছেন।

    আমাদের বাড়িতে, ইমলিতলায়, দরিয়াপুরে, উত্তরপাড়ায়, জোরে পাদা আর ঢেঁকুরতোলায় কোনো বিধিনিষেধ ছিল না, বড়ো-ছোটো নির্বিশেষে সকলেই জোরে পাদতো আর ঢেঁকুর তুলতো। আমি এখনও জোরে পাদি, চেপে যাই না। এই এখন লিখতে-লিখতে পাদলুম বলে ইপিফ্যানির গর্ব হলো। কলকাতায় যে সাহিত্যসভাগুলো হয়, তাতে কাউকে পাদতে শুনিনি, কেউ কেউ পোঁদ একপাশে উঁচু করে, কবিতার শ্বাস নিচ্ছে তা দেখেছি। ৩০শে এপ্রিল ২০০৪ সাহিত্য অকাদেমির টেলিগ্রাম পেলুম যে ওরা আমাকে পুরস্কৃত করেছে ধর্মবীর ভারতীর “সুরজকা সাতওয়াঁ ঘোড়া” অনুবাদের জন্যে। পেয়েই মাথা গরম হয়ে গেল, নিজেকে শুনিয়ে বললুম, “কোন ইডিয়ট আমার নাম সুপারিশ করেছে, স্কাউণ্ড্রেলরা তো জানে আমি এইসব সাহিত্যিক তিকড়মবাজিতে নেই”। তার আগে আর পরেও, বহু মানুষকে, যাদের ইনটেলিজেন্ট বলে চালানো হয়েছে, তাদের মনে হয়েছে স্টুপিড। প্রত্যাখ্যান করে সঙ্গে-সঙ্গে একখানা চিঠি দিলুম সাহিত্য অকাদেমিকে জানিয়ে যে, As a matter of priciple I do not accept literary and cultural prizes, awards, lotteries, grants, donations, windfalls etc. They deprave sanity. প্রত্যাখ্যান করে, ইপিফ্যানির গর্ব হল। পুরস্কার যে প্রত্যাখ্যান করেছি তা শঙ্খ ঘোষ জানতেন না, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, তাই বুঝি, আমি জানতাম না তো ! প্রণব আবার চটে গিয়ে একটা কপি পাঠিয়েছিল ওনাকে!

    ১৯৬৪ সালে পিসেমশায় যে উকিলকে হাংরি মামলার জন্যে বাছাই করেছিলেন, তার দপতর সোনাগাছির ঠিক উল্টো দিকে। উনি অঞ্চলের রেগুলার ভিজিটার ছিলেন বলে তাদের উকিলকে চিনতেন। পিসেমশায় বলেছিলেন, “এর মতন ফৌজাদরি উকিল সস্তায় পাবিনে।” উকিলের ঘরে বসে দেখতে পেতুম ফি শনিবার পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পুরো কৃত্তিবাস গ্যাঙ চলেছে ভেতরে। সেন্টুদা একবার বললেন, চল চল, ওরা যে বাড়িটায় ঢুকবে তার উল্টো দিকের বাড়ির বারান্দায় উঠে ওদের কারবার দেখতে পাবি। সত্যিই তাই। উল্টোদিকের বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম বুদ্ধদেব বসুর বদল্যার বইয়ের প্রভাব। অর্ধেক জীবন, সম্পূর্ণ জীবন, টুকরো জীবন ইত্যাদি স্মৃতিকথায় এনারা সবকিছু চেপে গেছেন।

    ১৯৭৬ সালে ট্যুরে যাচ্ছিলুম হাজারিবাগে, একটা গাড়ি ভাড়া করে, সঙ্গে আমার অধস্তন অফিসার। অফিসের এক পিওন, তার নাম “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” আর “জলাঞ্জলি” উপন্যাসে দিয়েছি রসিক পাসওয়ান। আসলে পিওনটা ছিল রাজপুত, গোপাল সিং, কিন্তু এক পাসওয়ান মেয়েকে বিয়ে করার ফলে উঁচু জাতের পিওনরা ওর সঙ্গে মিশত না, রাজপুত-ভূমিহার অফিসাররাও ওর সঙ্গে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। ও বলল ওকে ওর গ্রামে ড্রপ করে দিতে, আমাদের যাবার পথেই পড়বে। এক জায়গায় গাড়ি থামাতে বলে ও বলল, জঙ্গলের ভেতরে ওর গ্রামে যেতে। চললুম ওর সঙ্গে, এতো ভেতরে তো গ্রাম দেখিনি তখনও। একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে দেখলুম কিশোর-কিশোরীদের বিয়ে হচ্ছে। গোপাল সিং তখন জানালো যে ও “মালে পার্টি” করে। তখন মাওবাদীদের উদ্ভব হয়নি, মার্কসিস্ট-লেনিনিস্টদের সংক্ষেপে বলা হতো মালে। বলব না যে শুনে কিছুটা অস্বস্তি হয়নি। দেখলুম যে জোড়ায়-জোড়ায় কিশোর-কিশোরী আর যুবক-যুবতীরা বসে আছে আর তাদের বিয়ে দিচ্ছে একজন বাঙালি যুবক, ময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে ব্যাগ, যে বইটা থেকে মন্ত্র পড়ছে সেটা “রেড বুক”। আমি নেপাল থেকে “রেড বুক” কিনে এনেছিলুম বলে দেখেই টের পেলুম। আদিবাসী যুবক-যুবতীর বিয়ে হচ্ছে ইংরেজি মন্ত্র পড়ে। বিয়ে দিয়েই যুবকটি উধাও হয়ে গেল। গোপাল সিং ওর নাম বলতে চাইল না। আমি “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” আর “জলাঞ্জলি” উপন্যাসে এই যুবকটির নাম দিয়েছি অতনু চক্রবর্তী, অবশ্য অতনু চরিত্রে বহু পরিচিত বন্ধুসহ আমার নিজের জীবনের উপাদান আছে। গোপাল সিং ওই বিয়ের পর অফিসে ফেরেনি। আমিও অফিসে ফিরে চেপে গেলুম যে ওকে আমরা লিফ্ট দিয়েছি।

    ১৯৬৫ সালে ডেভিড গারসিয়া নামে এক হিপি এসেছিল, গ্রিসে জুতোর দোকানে কাজ করে টাকা যা জমিয়েছিল তা নিয়েই এসেছিল, বলল, বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চায়। দুদিনে কোথ্থেকে পাওয়া যাবে বাঙালি প্রেমিকা। অগত্যা সোনাগাছিতে ঢুঁ, কিন্তু দুপুরে নয়, ভিজিটিং আওয়ার সন্ধ্যায়। একটা কচি মেয়েকে পছন্দ হল ডেভিডের। মেয়েটার নাম মনে আছে, বেবি। বেবি বলল, ও বাবা, এতগুলো হাঘরেকে সামলাতে পারবো না, এই সায়েব আর কোনো একজন। সকলে প্রস্তাব দিল ফষ্টিনষ্টি করতে দিতে হবে। তাতে বেবি রাজি। ঘরে ঢুকে মাটিতে পাতা বিছানায় বেবি বসতেই বাসুদেব চকাচক চুমু খেয়ে নিল জড়িয়ে। বেবির অনুরোধে আনানো হল দু-বোতল বাঙলা। খেলুম সবাই মিলে, টনক গোলমেলে হয়ে উঠলে কে যে বেবির কোথায় হাত ঢোকাচ্ছিল তার ঠিক নেই। বিপদ দেখে বেবি বলল, তোমরা বেরোও, আমি সায়েবের সঙ্গে পিরিত করে নিই। ডেভিড বেরোলো পিরিত করে, বলল, সাচ এ টিনিউইনি কান্ট অ্যান্ড স্মল বুবস, ইট ওয়াজ ওয়ানডারফুল। বেবি বুকের ওপর আঁচল ফেলে দরোজার ফাঁক থেকে মুখ বের করে বলল, আরেকজন কে আসবে চলে এসো। ঘোষভাইদের মধ্যে একজন তড়াক করে ঢুকে গেল আর মিনিট পাঁচেকেই সেরে বেরিয়ে এলো। হাঘরেদের খরচটা আমি দিয়েছিলুম। পরে, বেবির ঘরে বাসুদেব-অবনী-শৈলেশ্বর প্রায়ই যেতো, বাসুদেবের চিঠিতে বেবির বাড়ি বদলের দুঃখও আছে।

    ডেভিড গারসিয়াকে নিয়ে দুমকা গিয়েছিলুম, দুমকায় দাদার বাড়িতে পায়খানার সামনে যে কাঁঠালগাছ ছিল তাতে এঁচোড়ের গা্য়ে প্যান্ট-শার্ট ঝুলিয়ে পায়খানায় ঢুকতে হতো। ডেভিড বলল ওদের গ্রামে ফিরে গিয়ে ও এই ধরনের বন্দোবস্ত করবে যাতে গাছে হয়ে থাকা ফলের গায়ে পোশাক ঝোলানো যায়। ভাঙের শরবত খেয়ে আমাদের সঙ্গে দোল খেলে ডেভিড জানতে চাইল এটা কি রিলিজিয়াস ফেসটিভাল। ওকে জানালুম যে হ্যাঁ, এটা একজন পলিগ্যামিস্ট ব্ল্যাক গডের স্প্রিং সিজন সেলিব্রেট করার ফেস্টিভাল।

    পালামৌয়ের সদর শহর ডালটনগঞ্জে দাদার বাড়িতে ছিলুম ১৯৬৭ সালে, হরিণের ঠ্যাং দিয়ে গেল একজন সাঁওতাল, বঁটি দিয়ে কেটে রান্না হলো আর মহুয়ার রুটিসহ মহুয়ার মদ দিয়ে খাওয়া হলো, আমি কলকাতা থেকে কেস জিতে পৌঁছে গিয়েছিলুম ডালটনগঞ্জে, তাই সেলিব্রেট করা হলো বিহারি স্টাইলে, যদিও এখন শহরটা ঝাড়খণ্ডে। ডালটনগঞ্জে পৌঁছেছি শুনে স্হানীয় কবিরা একটা আড্ডার ব্যবস্হা করেছিল, যাকে ওদের ভাষায় বলে “গোষ্ঠী”, তাতে আমি আর দাদা মহুয়ার মদ খেয়ে বেশ ভালো বক্তৃতা দিয়েছিলুম ; ওখানেই একটা প্রেসে ছাপিয়েছিলুম অশ্লীলতা সম্পর্কে ম্যানিফেস্টো, “ইন ডিফেন্স অফ অবসিনিটি” পরে যেটা নানা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, শুনেছি গবেষক ড্যানিয়েলা লিমোনেলার কাছে। ড্যানিয়েলা ইতালীয় ভাষায় আমাদের আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করছেন, তথ্য সংগ্রহ করতে কলকাতায় এসেছিলেন ২০১৪ সালে। ১৯৬৯ সালে আমি আর সলিলা গিয়েছিলুম ডালটনগঞ্জে, দাদা তখন অন্য একটা বাড়িতে, পিসতুতো দাদা সেন্টুদাও ছিল; আমাদের আপ্যায়ণের জন্যে গেঁড়ি-গুগলি দিয়ে বিরিয়ানি বানিয়েছিল, তা রাত জেগে খাওয়া হলো মহুয়ার মদ দিয়ে।

    ২০১৪ সালে বিবিসির পক্ষ থেকে ডোমিনিক বার্ন এসেছিলেন হাংরি আন্দোলন নিয়ে রেডিও প্রোগ্রাম করার জন্য। হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে উনি এতই ওয়াকিবহাল ছিলেন যে প্রশ্ন করলেন বঙ্গসংস্কৃতি, রবীন্দ্রনাথ, উনিশ শতক নিয়ে। পরে, ফোটোতে ওনার ঘামে ভেজা শার্ট দেখে সলিলা বলল, “এসিটা চালিয়ে নাওনি কেন ?” আসলে প্রতিটি ব্যাপারে অভ্যাস থাকা জরুরি। ১৯৭৯ থেকে গ্রামীণ উন্নয়নের ট্যুরে ইংরেজি-বাংলা-হিন্দিতে বক্তৃতা দিতে হতো। একটা গ্রামে বক্তৃতা দিচ্ছিলুম, একজন চাষি বলে উঠল, “ এই চিন্তাটা আগে আসেনি কেন মাথায়, তাহলে গ্রামের কাজ এগিয়ে যেতো, পড়ে থাকতো না বছরের পর বছর।” বলে ফেললুম, “আপেল কেন গেছ থেকে পড়ে, তা তো আমরা আগে জানতুম না, নিউটন নামে একজন সায়ের বলার পরে জানতে পারলুম।” চাষি বলল, আপেল কেন, আম, কাঁঠাল, নারকেল পেকে গেলে সবই আপনা থেকে পড়ে যায়, ভগবান সেরকমই নিয়ম করেছেন।” টের পেলুম যে নিউটন সর্বত্র চলে না, অভিকর্ষও সকলকে বোঝানো যায় না। বললুম,”ঠিকই বলেছো, যতক্ষণ না কোনো চিন্তায় পাক ধরছে ততোক্ষণ কেউই তার বিষয়ে জানতে পারে না। ”

    ১৯৬৫ সালে, সুবিমল বসাকের মাসির বাড়ি গিয়েছিলুম মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে। রাতে মশারি টাঙিয়ে শুয়েছিলুম, সকালে দেখি মশারির চালে একটা সাপ, মশারি বেশ ঝুলে এসেছে, আমাদের নড়াচড়া আর চেঁচামেচিতে সাপটা ফণা তুললো, মশারির ভেতরে হাংরি বুলেটিন ছিল কাগজে মোড়া, সেইটে দিয়ে সাপটাকে মশারি থেকে বাইরে ছিটকে ফেললুম। আমাদের চেঁচামেচি শুনে সুবিমলের মাসি আর অন্য আত্মীয়রা জড়ো হয়েছিলেন এসে, তাঁরা সাপটার পিছু নিলেন, সেটা ঢুকে গেল এক গর্তে। বেরোলুম মশারির বাইরে। এক বৃদ্ধা চিনির কৌটো নিয়ে এলেন আর কাঠপিঁপড়ে-ভরা গাছের কাছ থেকে সাপটা যে গাছের গোড়ায় ঢুকেছে সেখান পর্যন্ত লাইন করে চিনি ছড়িয়ে দিলেন, সাপের কোটরেও ছুঁড়লেন। দুপুরে ডেকে দেখালেন আধখাওয়া সাপ আর পিঁপড়ের ঝাঁক গাছের বাইরে, পিঁপড়েরা মাংসকণা নিয়ে নিজেদের বাড়ি নিয়ে যেতে অতিব্যস্ত। প্রেমিক-প্রেমিকার মতনই সাপ আর কাঠপিঁপড়েরা পরস্পরের নৈঃশব্দে আকৃষ্ট হয়।

    ১৯৭৯ সালে আমার লিঙ্গ দিয়ে পেচ্ছাপের বদলে রক্ত বেরিয়েছিল, রক্তচাপের দরুন, টাকার পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, ডাক্তার বললে ট্র্যাকিকার্ডিয়া, ছাতাপড়া-হিলহিলে-তেলচিটে নোটের পাহাড়, যা জ্বালিয়ে নষ্ট করতে হতো। তারপর দুমাস ছুটি নিয়ে দুবেলা ঘুমের ওষুধ খেতুম। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসে আমি টাকার পাহাড় জ্বালানোর মারপ্যাঁচ ব্যবহার করেছি। ১৯৯৩ সালে আমি একশো কোটি, দুশো কোটি, পাঁচশো কোটি টাকার চেক সই করতুম, কল মানি মার্কেটে অফিসের হয়ে বাড়তি টাকা খাটাবার জন্যে। অতো টাকার চেকে সই করে-করে মনে হতো রাজার কুর্সিতে বসে আছি। কোটি-কোটি টাকা নষ্ট করেছি এককালে, ১৯৯৩ সালে কোটি-কোটি টাকা খাটিয়ে আয় বাড়ালুম। পরির দেশের কোষাধ্যাক্ষের মতন দিনের পর দিন কোটি-কোটি টাকার চেক সই করতুম।

    ২০১০ সালে আমার বাঁ পা ফুলে গেল একদিন। ডাক্তারের কাছে দৌড়োলুম, ডাক্তার দেখে বলল, এই রোগ তো পুলিশ কন্সটেবল, ইশকুল-কলেজের টিচার আর ডাকপিওনদের হয়, আপনার হল কেমন করে। বললেন উরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত মোজা পাওয়া যায়, একজোড়া কিনে আজ থেকেই পরে থাকুন, কেবল শোবার সময়ে খুলে রাখবেন। ভেরিকোজ ভেইনস আক্রমণ করেছে পায়ে। সেই থেকে ভেরিকোজ ভেইনসের মোজা পরে থাকি, উরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত। স্বপ্নে অনেকের পোঁদে লাথি মারি, তাই হয়তো।

    ১৯৯৯ সালে প্রথম অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলুম বাঁশদ্রোণী বাজারে। পাবলিক আমাকে শাক-সবজির ওপর শুইয়ে মাছের জলের ঝাপটা দিতে জ্ঞান ফিরল। অনেকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্যে টানাটানি করছিল বলে সলিলা কেঁদে ফেলে থামালো। তার পরেও অজ্ঞান হয়েছি প্রায় সাত বার। মাথার এম আর আই করিয়েছি। নিউরোলজিস্ট বললে, মেডিটেশান করো। বাড়িতে বসে মেডিটেশান করায় একাগ্র হতে পারি না। মন উড়তে থাকে, নানা ভাবনায়, নানা মুখশ্রিতে, নানা সংবাদে, অতীতের ঘটনায়। মেডিটেশান ছেড়ে দিতে হল। ছোটো গল্প-লেখিকা ঝুমা চট্টোপাধ্যায় বলল, “সখা হে, সবসময় মাথাকে জাগিয়ে রাখলে অমন রোগ তো হবেই। ”

    ১৯৯৮ সালে, মুম্বাইতে আমার অফিস পুনম চেম্বার্সের ছাদ সাততলা থেকে একের পর এক যখন ভেঙে-ভেঙে সশব্দে নিচে নেমে আসছিল তখন আমার হাত ধরে কেবিন থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন একজন তরুণী, যিনি প্রথম পরিচয়ে আমাকে বলেছিলেন যে ওনার জরায়ু নেই। ১৯৯৭ সালে অবসর নেবার পর আমি আরেক অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম অথচ তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেনি মীরা। বাড়িটা পড়ার ফলে উনিশজন মারা গিয়েছিল। ইনিই একমাত্র মহিলা যাঁর সঙ্গে অশ্লীল গল্প করেছি, ব্যাপারটা অবশ্য তিনিই আরম্ভ করেছিলেন, “আজকে কলা কিনিনি, বেগুন কিনেছি, কোকোনাট অয়েল কিনেছি”, আমাকে হতবাক করে। নারীর সঙ্গে অশ্লীল কথাবার্তা ! ওর সঙ্গে কথা বলার সময়ে মনে হতো এই ধনী-তনয়াকে আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিতে পারলে ভালো হতো।

    তেরো

    ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৬৮ বিয়ের পর ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে হনিমুন করার পরিকল্পনা করলুম শিমলা যাবার, শুনে সহকর্মী সুশীল বলল ওর গ্রাম চণ্ডীগড়ের কাছে রোপড় হয়ে যেতে, রোপড় যাবার পর ও আর ওর বউ-বাচ্চা আমাদের সঙ্গ নিল। রোপড়ে মাঠে হাগতে হতো ; আমার তো এনসিসির সময়ে মাঠে প্রতিদিন হাগার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সলিলার ছিল না, কিন্তু নতুন অ্যাডভেঞ্চার মনে করে মাঠে গিয়ে ভোর রাতে হেগে নিয়েছিল যে কয়দিন ছিলুম। নতুন বউ মাঠে হাগতে যাচ্ছে, গ্রামীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের বউ বলে কথা। শিমলায় গিয়ে বাস থেকে নামতেই হাঁটু পর্যন্ত ঢুকে গেল তুষারে। বাসের ছাদে রাখা ছিল বেডিং আর স্যুটকেস, তার ওপর তিন ইঞ্চের তুষার। পিছল পথে গিয়ে উঠলুম হোটেলে, সেই হোটেলের ওপর তলায় আমাদের হনিমুন স্যুট, সেখান থেকে বেরোলেই রাস্তা। দুজনে মিলে দুটো ওল্ড মঙ্ক খেয়েও শীত গেল না, তখন জড়াজড়ি করে অবিরাম সঙ্গম করলুম সারা রাত। সুশীল আর ওর বউ একটা ঘরে ছিল, বেয়ারা বলল রাতভর ওরা ঝগড়া করেছে। শিমলা থেকে ফেরার পর সুশীলের বউ একজন পাঞ্জাবির সঙ্গে পালিয়ে গেল। লোকেদের বউ পালিয়ে যায় কেন ? মনে হয় দুর্বল যৌনতা তার মুখ্য কারণ। “কৌরব” পত্রিকার কমল চক্রবর্তীর বউও কারোর সঙ্গে পালিয়ে যাবার ফলে পত্রিকাটাই রোশনাই হারিয়ে ফেলল। কমল ওর পুরো যৌনতা লাগিয়ে দিয়েছিল পত্রিকায়, বউয়ের দিকে খেয়াল দেয়নি। তবে বউ পালিয়ে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেয়া সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে, বউয়ের বদলে পুরস্কার পেলুম টাক ডুমাডুম ডুম। এককালে কৌরবে লিখতুম। আর ডাক পাই না।

    শিমলা থেকে ফেরার পথে চণ্ডীগড়ে বাসস্ট্যাণ্ডে এসে একদল পাঞ্জাবি আর হিন্দি কবিলেখকরা ঘিরে ধরল কয়েকদিন থেকে যাবার জন্যে, ওরা আমার জন্যে সাহিত্যসভা করবে, ওরা যাকে বলে “গোষ্ঠী”, মদ-মুর্গি খাবার লোভে থেকে যেতে রাজি হলুম। এদিকে লেখালিখি তখন আমাকে ছেড়ে উধাও হয়ে গেছে, সঙ্গে কবিতাও নেই। হিন্দি আর পাঞ্জাবি পত্রপত্রিকায় ছবিসহ আমার সম্পর্কে খবর পড়ে ওদের উৎসাহ। নিজেরাই যোগাড় করে ফেলেছে আমার কবিতার হিন্দি অনুবাদ। গোষ্ঠীতে একজন যুবতী কবি মাতাল হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, চুমু খাবার উপক্রম করেছিলেন। স্ত্রী সলিলা বেজায় খাপ্পা, যুবতীকে বলল, “সাহিত্যসভা করছেন না অন্যকিছু !” সলিলার পজেসিভনেস দেখে আহ্লাদে আটখানা হলুম।

    ১৯৬৭ সালে হিন্দি আর মৈথিলি ভাষার কবি রাজকমল চৌধারী, ভর্তি ছিল পাটনার রাজেন্দ্র সার্জিকাল ব্লকে, অত্যধিক মদ আর মাদকের দরুণ শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। ওকে একটা আলাদা ঘরের ব্যবস্হা করে দিয়েছিল সরকার। হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে রাজকমল বলেছিল, “ডাক্তার বলেছে অপারেশান করা যাবে না, অপারেশান করলে পুরো হাসপাতালে গাঁজা আর চরসের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়বে।” মদ আর মাদকের লাইনে আমিই ওকে নিয়ে গিয়েছিলুম বলে প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে প্রায়ই সন্ধ্যায় ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতুম। একদিন ও বলল ওকে এক প্যাকেট কনডোম এনে দিতে। কনডোম কী করবে, শরীরের এই অবস্হায় ? বলল ওই তো নার্সকে জিগ্যেস করো, ও রাজি আছে। নার্স মাথা নেড়ে সায় দিল। পরের দিন কনডোমের প্যাকেট নিয়ে গিয়ে দেখি বিছানা খালি, নতুন চাদর আর বালিশের খোল, ওষুধ কিছুই নেই, ঘর ফাঁকা। সেই নার্সকে খুঁজে তাকে জিগ্যেস করতে সে বলল, আজ সকালেই উনি মারা গিয়েছেন, ওনার প্রথম পক্ষের স্ত্রী এসে শব নিয়ে গেছেন। কনডোমের প্যাকেটটা পাশেই গঙ্গায় ফেলে দিলুম।

    ১৯৮৫ থেকে যখন আবার লেখা আরম্ভ করলুম ঢাকা থেকে মীজানুর রহমান বললেন ওনার পত্রিকার জন্যে হাংরি আন্দোলন নিয়ে ধারাবাহিক লিখতে। লেখা আরম্ভ করলুম “হাংরি কিংবদন্তি”। প্রতিবছর আসতেন আমার নাকতলার ফ্ল্যাটে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট হলেও। মীজানুর যাতে লেখাটা আর না ছাপেন তাই শামসুর রাহমানের মাধ্যমে সুনীল, শক্তি, তারাপদ অনুরোধ করলেন মীজানুরকে। উনি ওনাদের বললেন, ঠিক আছে, আপনাদের কার্টুন আর ছাপবো না, তবে লেখাটা চলবে। শামসুর রাহমান ওনাকে বললেন, “প্লিজ, ঢাকা থেকে “হাংরি কিংবদন্তি” গ্রন্হাকারে প্রকাশ করবেন না। মীজানুর “হাংরি কিংবদন্তি” গ্রন্হাকারে প্রকাশ করলেন না কিন্তু আমার উপন্যাস “নামগন্ধ” প্রকাশ করলেন ঢাকা থেকে। আমাকে নিয়ে সাংস্কৃতিক রাজনীতি কেবল পশ্চিমবাংলাতেই হয় না, তা বাংলাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। মীজানুর রহমান মারা গেছেন দশ বছর হল। ঢাকা থেকে আরেকজন নিয়মিত আসতেন, তিনি বাংলাদেশের বিদ্যাসাগর সোসায়টির প্রধান। প্রতিবার এসে বলতেন যে তাঁকে হুমকি দেয়া হচ্ছে বন্ধ করে দেবার জন্য, বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশে বিদ্যাসাগরের প্রয়োজন নেই। জানি না ওনার কী হল। আমি কলকাতা ছাড়ার পাঁচ-ছয় বছর আগেই ওনার আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

    ২০০৪ সালের পর থেকে আমি এক ভ্যাবাচাকা মানসিকতায় ভোগা আরম্ভ করেছিলুম ; নিজের ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরোবার বিপজ্জনক আনন্দ ? যেন মানব-বোমা হবার জন্য তৈরি হয়ে আছি, উদ্দেশ্যহীন, কী বলব একে? রাস্তার ধারে ইঁটের ওপর বসে তেলমালিশ করাবার মতন নিঃসঙ্গতা এটা নয়। বা, হয়তো, বর্তমানে আমি সেই স্হিতিতে বসবাস করছি, যে পরিসরে একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা মিলেমিশে গেছে। আমি অস্তিত্ববাদী নই যে আমার এই একাকীত্ববোধকে ‘হিউমান কাণ্ডিশন’ হিসাবে মেনে নেবো ; হিন্দু পরিবারে জন্মে একাকীত্ববোধের খ্রিস্টধর্মী ‘হিউমান কন্ডিশন’ সম্ভব বলে মনে হয় না। কিয়ের্কেগার্দ, জাঁ পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কামু, মরিস মার্লো পন্টি, কার্ল জাসপার্স প্রমুখের ভাবনাচিন্তার সঙ্গে খাপ খায় না আমার ভাবনাচিন্তা। ১৯৯৭ সালে যে আরথ্রাইটিস হয়েছিল তার রেশ থেকে গেছে গাঁটে-গাঁটে, সবচেয়ে বেশি বুড়ো আঙুলে, যে কারণে কলম ধরে লিখতে পারি না। সইসাবুদের যাবতীয় কাজ আমার বুড়ি স্ত্রীকে করতে হয়, যে আমার চেয়ে মাত্র দু’বছরের ছোটো।

    এখানে বলে নিই, আমি একজন ইন্সটিঙ্কটিভ হিন্দু, কেননা দুর্গাপুজো দোল কালিপুজোর সময়ে আমার প্রবৃত্তিগতভাবে ভালো লাগে, অথচ আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, মনুস্মৃতিতে বিশ্বাস করি না, ঋগ্বেদের দেবী-দেবতায় বিশ্বাস করি না, কেননা ওটা আমার ভেতরে কাজ করে না, ওটা আপনা থেকে গড়ে-ওঠা ব্লকেজ। কমিউনিস্টদের মতন আমি ভেবেচিন্তে বা বই পড়ে দেয়াল তুলিনি, বলেছি তো আমি বুদ্ধিজীবি নই। কলকাতায় অনেককে দেখেছি, “আপনি কি হিন্দু” জিগ্যেস করলে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়, উত্তর দিতে পারে না, কেউ-কেউ বোবা সাজে, কেউ-কেউ ভেবেচিন্তে মরে যাবার পর দেহের গতি নিয়ে কথা বলে। মরে যাবার পর ? ডেড বডিও তাহলে চিন্তাভাবনা করে ! বুঝতে পারি যে তারা নিজের সম্পর্কে খতিয়ে দেখে না, নিজেকে যাচাই করে না, কেবল অন্যে কী করছে আর বলছে তা-ই নিয়ে কিচাইন।

    মৃত্যু সম্পর্কে, এই বয়সে যে ভীতি অনেকের হয়, তা দেখা দেয়নি এখনও। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সত্যিই ভীতি হয়েছিল, নাকি কবিতা লেখার জন্য মৃত্যুকে বিষয় করেছিলেন, মৃত্যু বিষয়ক কবিতা লিখেও তারপর চনমনে থাকতেন, মদ খাওয়াবার জন্যে আবদার করতেন। আমার তো যেন মনে হয় নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মিশে-যাওয়া আমার বর্তমান একাকীত্বটা সহজাত, অন্তর্মুখ, স্বকীয় আত্মজ্ঞানের স্বনির্মিত ডামাডোল কারাগার, উন্মাদ প্রেমে আটক ব্যক্তিএককের মতন ; আমি যেন পুনরুদ্ধারের অযোগ্য এমন কোনো আত্মপরিসরে নিরুদ্দেশ হয়ে রয়েছি, আমাকে কেউ আর খুঁজে পাবে না। আমি নিজের বানানো স্বপ্রেমের বেদনাময় জেলখানা থেকে বেরোবার চেষ্টা করি, কয়েক দিনের জন্যে বেরোই, আবার নিঃসঙ্গতাময় একাকীত্ব কাবু করে ফ্যালে আমাকে। ইনটারনেটের অধিবাস্তব জগতে তৈরি মানব-সম্পর্কের মাধ্যমে দূর করার চেষ্টা করি নিঃসঙ্গতার একাকীত্ব ; অথচ পাঁচ হাজার বন্ধুর কেউ তো বাস্তব নয়, রক্তমাংসের নয়। তাছাড়া রক্তমাংসের মানুষ তো রয়েছে আশে-পাশে, কই কোনো রদবদল তো ঘটছে না আমার সন্ত্রস্ত আত্মবোধে।

    নিঃসঙ্গতার সঙ্গে একাকীত্বের পার্থক্য হল যে নিঃসঙ্গতার স্হিতি স্বীকার করে নেয় যে ব্যক্তিএককের পাশে প্রচুর লোকজন রয়েছে, কয়েকজন স্বজনও রয়েছে। অর্থাৎ সেই স্হিতিটা সাময়িক, তাকে বদলে ফেলা যায়, অন্যান্য লোকজনের সঙ্গে অর্থবহ যোগাযোগের মাধ্যমে। এমনকি ব্যক্তিএকক নিঃসঙ্গতার আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু একাকীত্বকে সে উপভোগ করতে পারে না, তা আত্মপ্রেমের গিলোটিনে মাথা রাখার ফলে যন্ত্রণাদায়ক, দুর্দশাসৃষ্টিকারী, হাহাকারময়। একাকীত্বের স্হিতি ব্যক্তিএককের বাইরের নয় বলেই মনে হয় ; তা ব্যক্তিএককের মনে গড়ে ওঠে, কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। একা, আলাদা হয়ে বসে থাকার ব্যাপার নয় একাকীত্ব। একাকীত্ব হল ফোঁটায় ফোঁটায় সঞ্চারিত উপলব্ধি, বিপত্তিমূলক উপলব্ধি। শৈশব থেকে বাইরের সাময়িক নিঃসঙ্গতাগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, আর সেগুলো স্মৃতিকে খামচে ঘায়ের মতন রয়ে গেছে। বাইরের এজন্য বলছি যে সেসব নিঃসঙ্গতা ছিল সম্পর্কজনিত। ওই আত্মভঙ্গুর ঘটনাগুলোর কথা আমি মাঝে-মাঝে রোমন্হন করে নিরাময় খুঁজি, এখন স্মৃতির জাবর কেটে দেখি ট্রমা থেকে কতোটা নিরাময় ঘটে।

    আমি মনে-মনে ফিকশানগুলো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে ছকে নিই, যেমন চোর-ডাকাতরা রাতের বেলায় পরিকল্পনা করে, তারপর যখন লিখতে বসি তখন নিজেকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে আবিষ্কার করতে থাকি, ফিকশানের চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজের সমস্যা ভাগ-বাঁটোয়ারা করি, লিখতে বসার আগে নিজের ভেতরে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করি, তখন মনে হয় লেখালিখিই আমার প্রেমিকা, আমার লেখার শিকড় আমার চেতনায়, কেননা আমি একই ঘরে, একই বাড়িতে, একই পাড়ায়, একই রাস্তায়, একই শহরে, একই রাজ্যে সারা জীবন কাটাইনি। যখন গাঁজা-চরসের নেশা করতুম তখন নিজের আহ্লাদের জন্যেই করতুম, এখন লেখালিখির নেশা করি নিজের আহ্লাদের জন্যেই করি, পাঠক-পাঠিকাদের সঙ্গে সেই আহ্লাদের দুঃখ-কষ্ট ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিই। কেউ মনে রাখুক, এই ভেবে লিখি না। মরে যাবার পর আমার লেখার কি হবে তা নিয়ে চিন্তিত নই। লেখা শেষ হয়ে গেলে সাপের খোলোশ থেকে বেরিয়ে আসি টাটকা ত্বক নিয়ে।

    চোদ্দ

    আমি কবে জন্মেছিলুম, ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেটে ১৯৩৯ থাকলেও, জানি না, তার কারণ, পাটনার মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলার বাড়িতে বয়স্করা মনে করতেন, ব্যাপারটা যে জন্মেছে তার হর্ষোল্লাসের নয়, যিনি প্রসব করেছেন তাঁর ; সুতরাং প্রসবদিন বলে কিছু হতে পারে, জন্মদিন আবার কি ? যে জন্মেছে তার তো কোনো অবদান নেই যে তার জন্মদিন নিয়ে হুজুগ করতে হবে, সে কি নয় মাস কষ্টে ভুগেছিল, সে তো দিব্বি মায়ের পেটে হাত-পা ছুঁড়ে সাঁতার শিখেছে, চব্বিশঘণ্টা খেয়েছে, তারপর তার মায়ের প্রসব বেদনা উঠলে তার মা তাকে প্রসব করেছে। জীবনে কক্ষুনো সে মায়ের কষ্ট বুঝবে না। ঠিকই তো, নাড়ি শুধু মায়েদের গর্ভেই তৈরি হয়। প্রসবের জন্য বাড়ির বউরা যেতেন নিজের বাপের বাড়ি, প্রসবের দিনক্ষণের হিসেব রাখার দায়দায়িত্ব বাপের বাড়ির লোকেদের ; এখন তারা যদি মুকখু হয় তো কি আর করা যাবে ! তারা প্রসবের দিনটা লিখে রাখতে পারেনি।

    আমার বাবা ছিলেন ছয় ভাই, প্রমোদ, সুশীল, রঞ্জিত, অনিল, সুনীল আর বিশ্বনাথ, এবং এক বোন কমলা। ঠাকুমা প্রসবের সময়ে নিজের বাপের বাড়ি যেতেন, কলকাতার পটলডাঙায়, বিরাট আঁতুড়ঘর ছিল সেখানে, আর সেই আঁতুড়ঘরে তাঁর পরপর ছেলে হয়েছে, মেয়ে হচ্ছে না বলে যখন ঠাকুর্দার মনখারাপ, তখন ঠাকুমা ওই আঁতুড়ঘরে মেয়ে প্রসব করেন। আমাদের আদি নিবাস, বড়িশা-বেহালা হলেও, ১৭০৯ সাল থেকে আদি নিবাস গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় চলে এসেছিল ; সেখানে “সাবর্ণ ভিলা” নামে একটা জমিদারি বাড়ি তৈরি করেছিলেন পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী, যে বাড়িটি শরিকি অবহেলায় এমনই পোড়োবাড়িতে রূপান্তরিত হয়েছিল, অশথ্থের শেকড়ের আলিঙ্গনে হাড়গোড়-ভাঙা যে, আবাসন তৈরির জন্য প্রোমোটারকে দিয়ে দেয়া হয়, আমিও তার ভাগ পেয়েছিলুম, ষাট হাজার টাকা।

    বড়োজ্যাঠা, মানে প্রমোদের স্ত্রী নন্দরাণীকেও পাঠানো হয়েছিল বাপের বাড়ি হুগলি জেলার কোন্নোগরে। তাঁর মেয়ে হল, নাম রাখা হল সাবিত্রী বা সাবু। দ্বিতীয়বার প্রসবের জন্য গেলেন কোন্নোগর, আবার মেয়ে হল, ধরিত্রী বা ধাবু। ঠাকুমা হুকুম দিলেন যে নন্দরানীর আর বাপের বাড়ি গিয়ে প্রসব করা চলবে না, বড়োই অলুক্ষুণে ওনাদের আঁতুড়ঘর, ওদের বাড়ি ছেলে জন্মায় না। নন্দরাণীর ভাইয়ের বউ বাপের বাড়ি যাননি, কোন্নোগরের আঁতুড়ঘরেই পরপর দুটি মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন, আলো আর পূরবী, এবং তারপর আর সাহস করেননি, ভয়ে, যদি আবার মেয়ে হয়। নন্দরাণীও আর বাচ্চা প্রসব করতে রাজি হননি, কোন্নোগরে গিয়ে হোক বা ইমলিতলায়, যদি আবার মেয়ে হয়। সাবু-ধাবুর জন্মদিন বা নন্দরাণীর দুটি প্রসবের দিন মনে রাখা দরকার মনে করেননি ইমলিতলার বয়স্করা। ছেলে হল না বলে বড়োজেঠা একজন বেশ্যার কাছ থেকে দেড়শো টাকা দিয়ে মেজদাকে কিনেছিলেন।

    মেজজ্যাঠা, মানে সুশীলের স্ত্রী করুণা আমাদের আদিবাড়ি উত্তরপাড়ার মেয়ে, তিনি প্রসবের জন্য গেলেন নিজের বাপের বাড়ি। ঠাকুমা আপত্তি করেননি, প্রসবের সময়ে করুণা বাপের বাড়ি গেলে, তিনি গঙ্গাস্নানে যাবার সময়ে একবার করুণাকে দেখে যেতেন, মাগঙ্গাকে রিকোয়েস্ট করতেন যেন করুণা অন্তত বংশরক্ষা করেন। মা গঙ্গা রিকোয়েস্ট রিফিউজ করে দিয়ে করুণাকে দিয়ে মেয়ে প্রসব করিয়েছিলেন, তাও মৃত। ঠাকুমা যাকে বলে আতঙ্কিত। স্ত্রী করুণাকে নিয়ে মেজজ্যাঠা চলে গেলেন ছাপরায় থাকতে, সেখানে তাঁর জন্য একটা ফোটোগ্রাফির দোকান খুলে দেয়া হয়েছিল। মেজজেঠিমার যখন যক্ষ্মারোগ হল তখন দোকানপাট লাটে উঠিয়ে দুই মেয়ে ডলি আর মনুকে নিয়ে পাটনায় চলে এলেন।

    এরপর সেজভাই রঞ্জিতের স্ত্রী অমিতার পালা। ঠাকুমা নিষেধ করলেন না, কেননা আমার মায়ের বাপের বাড়ি ছিলই না, মায়ের বাবা কম বয়সে মারা যান, দিদিমা তিন ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে ওঠেন গিয়ে তাঁর বাপের বাড়ি, মানে মায়ের মামার বাড়ি। বাপের বাড়ি তো আর নয়, মামার বাড়ি, ওদের ঘরের আঁতুড় ঘরে ছেলের পর ছেলে হবার রেকর্ড আছে। এবং লো অ্যাণ্ড বিহোল্ড, মা একটি ছেলে প্রসব করলেন। মামার বাড়িতে দাদার নাম রাখা হয়েছিল বাসুদেব। মামাদের দেয়া নাম, যে মামারা নিজেরাই নিজের মামার বাড়িতে থাকতেন। অমন নাম ঠাকুমার পছন্দ হল না, দাদার নাম রাখা হল সমীর, আদর করে সবাই মিনু বলে ডাকতেন।

    বাড়ির পারিবারিক রাজনীতিতে মাকে অনেক ওপরে তুলে দিলেন ঠাকুমা, রান্নাঘর আর ভাঁড়ার ঘরের কর্তৃত্ব মায়ের, খরচের নির্দেশে দেবার অধিকার মায়ের। বলতেন, অজাতশত্রুদের মা। তখনও অজাতশত্রুর গল্প শুনিনি, লোকটা কে তাও জানতুম না, মানে বলা হয়েছিল, যার কোনো শত্রু নেই। আমরা শোত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে পৃথিবীতে এসেছি।

    আমাকে প্রসব করার সময়ে মায়ের মামার বাড়িতে আমাদের আর তেমন সামাজিক গুরুত্ব ছিল না। ইমলিতলার বাড়ি আর মহাদলিতদের কুঁড়েঘরের সারি, ওপচানো নর্দমা, পাড়ার বাচ্চাদের গলির নর্দমায় হাগা দেখে মায়ের ভাইদের, আর তাঁদের মুখে শুনে মায়ের মামাদের, আমাদের পরিবার সম্পর্কে ধারণাটা ঘা খেয়েছিল। ওনারা ভেবেছিলেন সাবর্ণ চৌধুরী পরিবার, বিরাট রোশনাই আর ঝালরঝোলানো ঝিকমিকে ব্যাপার হবে। সাবর্ণ চৌধুরীরা যে ষষ্ঠ শতকের অরিজিনাল সাবর্ণ চৌধুরী পুরুষটার পরের প্রজন্মে বিয়োতে বিয়োতে জ্যামিতিক লাফে তত দিনে তিরিশ হাজারে পৌঁছে গেছে, আর তাদের বেশিরভাগই দারিদ্দিরে পটকান্তি খেয়েছে, কেউ-কেউ রিকশা চালায়, মুটেগিরি করে, তা হদিশ করতে পারেননি ওনারা। মাকে দ্বিতীয়বার পাঠাতে রাজি হলেন না বাবা। মা আমাকে প্রসব করলেন হাসপাতালে, পাটনার প্রিন্স অব ওয়েল্স হাসপাতালে। ইমলিতলার বাড়িতে কোনো আঁতুড়ঘর ছিল না, মায়ের শরীরও, আমার কারণে, সুস্হ ছিল না। হাসপাতালের সেই বিলডিঙ, যে-হাসপাতাল বাড়িতে আমাকে মা প্রসব করেছিলেন, স্বাধীনতার পর তা ভেঙে ফেলে সেখানে রাজেন্দ্র সার্জিকাল ব্লক গড়ে উঠেছে। বড়োজ্যাঠা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হয়ে এই সার্জিকাল ব্লকে ছিলেন বেশ কয়েক মাস। আমার ছেলের মাথা ফাটলে কপালে স্টিচিঙের জন্যে গিয়েছিলুম এই হাসপাতালে।

    —তোমরা হাসপাতালের কাগজপত্র রাখোনি ? রাখলে তো তা থেকে জানা যেত কবে কোন সালে মা আমাকে প্রসব করেছিলেন।

    —ওসব কাগজপত্তর আবার বাড়িতে রাখে নাকি ? হাসপাতালের কাগজ, নার্সরা কতো রুগিকে ছুঁচ্ছে দিনভর, কাগজের সঙ্গে বাড়িতে আবার কোন ব্যামো ঢোকে তার কোনো নিশ্চয়তা আছে ?

    অন্তত আমার জন্মদিনের একটা পোক্ত প্রমাণের সম্ভাবনা ছিল ; কিন্তু জন্মদিনটা তো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রসবের রুগি ভালোয়-ভালোয় বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে, তাও দ্বিতীয়বারও কোলে ছেলে নিয়ে, এই তো যথেষ্ট।

    —তোর ভাগ্য ভালো যে মেয়ে প্রসব করেনি তোর মা।

    নককা, অনিলের বিয়ে হল কলকাতার ভবানীপুরের সেসময়ের আধুনিকা অমিয়ার সঙ্গে। প্রসবের জন্য তিনি গেলেন ভবানীপুরে। তাঁর মেয়ে হল, খুকু। দ্বিতীয়বার গেলেন। আবার মেয়ে হল, রাখি।

    নতুনকাকা সুনীলের বিয়ে হল উত্তরপাড়ার মেয়ে কমলার সঙ্গে। তিনি প্রসবের জন্য বাপের বাড়ি গেলেন। মেয়ে হল, পুটি।

    দাদা আর আমি জন্মাবার পর ঠাকুমা আর জোর দিতেন না ; ছেলেদের বলে দিয়েছিলেন যার যেখানে ইচ্ছে বউদের পাঠাও, ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, তোমরা নিজেরা বুঝো। নতুনকাকা ঠাকুমাকে বলেছিলেন, উনি অনেকগুলো বাচ্চা চান, প্রথম মেয়ের পর ওনার ছেলে তারপর মেয়ে, এইভাবে ছেলে-মেয়ের ছন্দ মিলিয়ে ছয়টা মেয়ে আর তিনটে ছেলে হল। ঠাকুমা বলেছিলেন এবার ক্ষান্তি দে, তিনটে ছেলে যথেষ্ট, এই উত্তরপাড়ার বারো ঘর-চার সিঁড়ির বাড়ি ভাগ-বাঁটোয়ারা হলে সকলের ভাগ্যে একটা করে নোনা ইঁট জুটবে।

    ছোটোকাকা বিশ্বনাথ বিয়ে করলেন, উত্তরপাড়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন গঙ্গোপাধ্যায় পরিবার, চিৎপুরের যাত্রা দলের ছোটো ফণী নামে যিনি খ্যাত ছিলেন, তাঁদের বড়ো মেয়ে কুচির সঙ্গে প্রেম করে। ওনাদের কোনো বাচ্চা হল না। ঠাকুমা বলেছিলেন, প্রেম করে বিয়ে করলে বাচ্চা হয় না, তার ওপর এক গোত্তরের বিয়ে ; ভাড়াটের মেয়ের তো আঁতুড়ঘরও নেই। প্রসবের দিন আর বাচ্চার জন্মদিনের হিসেব রাখার ঝক্কিঝামেলা পোয়াতে হল না ওনাদের। তবে বিয়ে হয়ে যাবার পর ঠাকুমা বেয়াইকে চব্বিশঘণ্টার নোটিস দিয়েছিলেন উত্তরপাড়ার বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে বাড়ি ভাড়া নিতে। ওনারা আদপে কোথাকার লোক ছিলেন জানি না, তবে উত্তরপাড়াতেই বিভিন্ন পাড়ায় বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন।

    ছোটোকাকার ছোটোশালী ক্ষ্যামাঙ্করী বা খেমি ফ্রকের ওপর তার উঁচু বুক আর ফ্রকের তলায় খোলতাই উরু নিয়ে গরমের ছুটিতে বেড়াতে আসতো ইমলিতলার বাড়িতে, জড়াজড়ির খেলা খেলে পরস্পরের চরিত্র আলোয় আলো করার এইটিই আমাদের প্রথম সুযোগ ছিল । গ্রীষ্মকালে, ইমলিতলার বাড়িতে, রাতের বেলায়, ছাদে মাদুর পেতে, গড়াগ্গড় শুতুম আমরা সবাই, মাঝরাত থেকে ঠাণ্ডার জন্য পায়ের কাছে গায়ে দেবার চাদর। আমার বয়স এগারো, খেমির তেরো। সবায়ের সামনে খেমিমাসি বলে ডাকতুম। ১৯৫০ সালে, মাঝরাতে, খেমির ঠেলা, কি রে, তোর বাপ তো রোজ-রোজ টাকা রোজগার করে, দাঁত মাজার মলম বেরিয়েছে আজকাল, তাই দিয়ে দুজনে দাঁত মাজবো, তাহলে গন্ধ হবে না। আমাদের দুজনের গায়ে একটাই চাদর, আর আমাদের হাত দুজনের শরীরের রহস্য খুঁজে বেড়াতে ব্যস্ত। আমার মাথা ওর ফ্রকের তলায়, ওর হাত আমার প্যান্টুলের ভেতর। তারপর একজন আরেকজনের ঠোঁট খাওয়া আরম্ভ করলুম, আপনা থেকেই ঘটে গেল প্রথম দিন, তাই খেমি বললে, মুখ মাজার মলমের ব্যবস্হা করতে। পাকা তালশাঁসের ঠোঁট। খেমির কথা বলার ঢঙ আর বেপরোয়াভাব আমি ব্যবহার করেছি আমার ‘অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস’ নামের ডিটেকটিভ উপন্যাসের মিলি চরিত্রে।

    কবে খেমি আবার গরমকালের ছুটিতে আসবে, এই আশায় থাকতুম। তিনবার তিন বছর এসেছিল, প্রতিবার বুকের তাপ আর তরাই বাড়িয়ে। তারপর খবর এলো যে খেমি মায়ের দয়ায় ভুগে মারা গেছে। মায়ের দয়া ! কোন মা ? শেতলাদেবী, দক্ষিণভারতে মারিআম্মান দেবী। রোগের বেলায় দেবী কেন জানি না, রোগ সারাবার বেলায় দেবতা। সাপে কামড়ালে, কিংবা যাতে না কামড়ায়, তাই মনসাদবীকে পুজো দাও। যাতে না মহামারী আরম্ভ হয় তাই ধূমাবতীর পুজো দাও, পর্ণশবরীর পুজো দাও। আর দেবতারা সকলের স্বাস্হ্য রক্ষা করে। অশ্বিনী যমজভাইরা, ধন্বন্তরী, ধাত্রীদেবতা আয়ুর্বেদের ডাক্তার ! খেমির মা ওকে আমার মায়ের আগে প্রসব করেছিলেন, তাই খেমি অনেক কিছু জানত, শিখিয়ে দিয়েছিল, যা পরে কাজে লেগেছে আমার, নিজেকে হাঁদা-গঙ্গারাম, যা খেমি আমাকে বলত, তা আর হতে হয়নি। খেমির জন্মদিন-মৃত্যুদিন জানা হল না আমার। কুচি-খেমির মায়ের নাম ছিল বিবসনা। ভাবা যায় এরকম অতিআধুনিক নাম, যার দেহে বসন নেই ? জানি না ইনি কোন পুরাণের দেবী। আমাদের দুজনের গা গরম হয়ে ওঠে, সেই গরমের যোগফল দুজনের গায়ের গরমের তিনচার গুণ বেশি। আকাশে তারায় তারা, দেখা যায় সপ্তর্ষি মণ্ডল, দেখা যায় চাঁদ। ইমলিতলা ছাড়ার পর অমন পরিষ্কার আকাশ কোথাও পাইনি আর ; খেমি ওই আকাশ নিয়ে গেছে নিজের সঙ্গে আর দিয়ে গেছে ধোঁয়াটে ডিজেলের কারখানার চিমনির শ্বাসের আকাশ। ফিসফিস করে, খেমি অর্থাৎ মিলি : এরকম হয় বুঝি ? এই ফুলে যাচ্ছে রে, গরমও হয়ে যাচ্ছে, আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে রে, বুক ঢিপঢিপ করছে ; তোর কিছু হচ্ছে না ? মানে এখানে নয়, যেটা ধরে আছি? মনের মধ্যে কিছু? কিংবা বুকে ? আমি হাত চালিয়ে দিতে ন্যাকড়া বাঁধা পেলুম। চাপা উত্তেজনায় বললুম, ও, নিজেরটা বেঁধে এনেছিস। কেন, চাস না যে হাত দিই ?

    খেমি বা মিলি : ধ্যাৎ বোকা, এখুন ধ্যাড়ানি চলছে, কালকে খুলব, তখন যতো ইচ্ছে হাত দিস।

    খেমি বা মিলি ন্যাকড়া ঢিলে করতে হাত ঢোকালুম, কীরকম চটচটে। আমার হাতটা নিজের ফ্রকে পুঁছে খেমি বলেছিল, দেখলি তো ! কালকের দিনটা অপেক্ষা করতে পারলি না। তুই কিন্তু সত্যিই ষাঁড়। বড়বাজারে গিসলুম একবার, তখন দেখেছিলুম একটা ষাঁড় ওই করছে। একদম গোলাপি। কেন বলতো? তুই তো ফর্সা।

    পরের দিন, মিলি বা খেমি আমার বাঁ হাতের মধ্যমা আঙুলটা নিয়ে বলেছিল, এইতে রাখ, শুধু রাখবি, নাড়াবি না কিন্তু, নাড়ালে কাল থেকে অন্য জায়গায় শোবো।

    আমি আঙুলটা নাড়াতে-নাড়াতে বলেছিলুম, নাড়ালে কী হয় ?

    মিলি বা খেমি আমার বোতাম-খোলা প্যান্টে হাত ঢুকিয়ে টিপে-তিপে ফোলাতে লাগল আর বলতে লাগল, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এটা আমার এটা আমার।

    —কালকে দিনের বেলায় একটু দেখতে দিস।

    —দেখে আবার কী করবি ? চুল দেখতে চাস ?

    খেমি দেখিয়েছিল, ছাদেতেই, দুপুর বেলায়, যখন সবাই ভাত খেয়ে ঝিমোচ্ছে। দেখেই বেশি ভালো লাগলো, হাত দেয়াদিয়ির চেয়ে। রগের কাছে দপদপানি।

    খেমির আগে, ইমলিতলা পাড়ায়, কুলসুম আপার সঙ্গে একই ধরনের ব্যাপারে, আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, আমি জানতুম যে বাড়াবাড়ি করলে ছড়ে গিয়ে কষ্ট হতে পারে ; ১৯৪৯ সালে, কুলসুম আপার সঙ্গে সম্পর্কের সময়ে আমার বয়স দশ। কুলসুম আপাদের ঘরটা ছিল অন্ধকার, ছাগল হাস মুর্গিদের ঘর, তাই দেখা হয়নি, তাছাড়া উনি ছিলেন বেশ কালো। কুলসুম আপার চরিত্র আমি ব্যবহার করেছি ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে। ওনারা ছিলেন শিয়া মুসলমান পরিবার. ওয়াজেদ আলি শাহের পতনের পর পাটনায় পালিয়ে এসেছিলেন, বেশ গরিব হয়ে গিয়েছিলেন, একই শতচ্ছিন্ন পোশাক দিনের পর দিন, বোরখা পরতেন না কেউ, বাড়ির বউরা বিড়ি বাঁধতেন, হাসের ডিম, মুর্গির ডিম, হাস, মুর্গি, ছাগলের বাচ্চা বিক্রি করতেন। আমাদের বাড়িতে মুর্গির ডিম সেসময়ে নিষিদ্ধ ছিল বলে ওনাদের বাড়ি থেকে হাসের ডিম আনতে যেতুম। কুলসুম আপা গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজ শোনাতে ভালোবাসতেন, আমার মতো নির্বাক মুগ্ধ শ্রোতা আর কোথায় পাবেন, যে ওনার কালো গভীর চাউনি গোল মোটা ঠোঁট গালে টোল দেখার নেশায় বুঁদ। ওনাদের বাড়িতে যে মাংস রাঁধা হচ্ছিল তার গন্ধে শ্রোতা মোহিত হয়ে খেতে চাইলে কুলসুম আপা বাটি করে এনে খাইয়েছিলেন, বলেছিলেন বাড়িতে কাউকে বলিসনি, পাড়ায় রটে যাবে। বলিনি কখনও যে গোরুর মাংস খেয়েছি। উনি জিভ দিয়ে আমার ঠোঁট পুঁছে দিয়েছিলেন। যেদিনই মাংস রান্না হয়েছে সেদিনই ব্ল্যাকমেল করেছি ঘষাঘষি খেলার আগে।

    একদিন হাস-মুরগির অন্ধকার ঘরে শ্রোতার প্যান্ট খুলে নামিয়ে দিলেন, নিজের চুড়িদার নামিয়ে দিলেন আর শ্রোতাকে কষে জাপটে ধরে নিজেকে ঘষতে লাগলেন। শ্রোতার ভালো লেগেছিল বেশ, তাই রোজ যেতো, যদিও রোজ হাসের ডিম কেনার দরকার হতো না। এ-ব্যাপারেও কুলসুম আপা বলেছিলেন, তোর বাড়িতে কাউকে বলিসনি যেন। একদিন কুলসুম আপা শ্রোতাকে এতো বেশি জাপটে ধরে কাঁপতে লাগলেন যে শ্রোতার নুনু ছড়ে গেল, হাঁটতে অসুবিধা হল দুদিন। ভয়ে শ্রোতা তারপর কুলসুম আপার বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। শ্রোতার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনরা ডিম কিনে আনতো। মেজজ্যাঠার ছোটো মেয়ে মনু জিগ্যেস করেছিল, “ছোড়দা, ওই কেলটে কালো কুচকুচে কুলসুমটা তুই কবে ওদের বাড়ি যাবি, জানতে চায় কেন রে ?”

    ‘আমদের জন্মদিন হয় না’ এই তত্ত্ব সম্ভবত ইমলিতলা বাড়ির সৃষ্টি। ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ ও তাঁর দুই ভাই হরিনারায়ণ এবং বৈকুণ্ঠ পর্যন্ত উত্তরপাড়ার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশলতিকা ১৯১১ সালে ‘বংশ পরিচয়’ নামে প্রকাশ করেছিলেন অমরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যেটি বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরী সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত । ঠাকুর্দার প্রজন্ম থেকে আমাদের আর্থিক ডামাডোল আরম্ভ হয়, আর ইমলিতলায় এসে তো আমরা একেবারে ফেকলু পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলুম। কাগজ দেখিয়ে ভারতীয় আম আদমির আত্মপরিচয় প্রমাণ করার প্রথা বোধহয় স্বাধীনতার পরই আরম্ভ হয়েছে। ঠাকুর্দার পরিচয় উইকিপেডিয়ায় আছে, তা থেকে জানা যায় উনি ১৯৩৩ সালে মারা যান, যে বছর দাদাকে মা প্রসব করেন। মানে, উনি নিজের বংশধরকে দেখে গিয়েছিলেন।

    ১৭০৯ সালে উত্তরপাড়া শহরের পত্তন করেছিলেন রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী, যিনি বড়িশার একান্নবর্তি জমঘট থেকে বেরিয়ে নিজের একটা আলাদা জমিদারি চাইছিলেন। সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা ভঙ্গ কুলীন ছিল, যাদের বাড়িতে খাঁটি-বামুনরা তাদের মেয়ের বিয়ে দিত না। রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী টাকা আর জমিদারির অংশ দিয়ে গরিব ব্রাহ্মণ যুবকদের ফুসলিয়ে জামাই করে এনেছিলেন উত্তরপাড়ায়। ছোটোবেলায় দেখেছি যে আমাদের চেয়ে তাদের রমরমা বেশি। ঠাকুমার কথায়, “তোর পূর্বপুরুষরা মাগিবাজি করে আর মদ খেয়ে সব তবিল উড়িয়ে দিয়েছে, ওরা কোম্পানির কাগজ কিনে-কিনে নিজেদের তবিল বাড়িয়ে নিয়েছে। ” কোম্পানির কাগজ যে কেন দামি তা জানতুম না। দাদুর প্রজন্মে পৌঁছে আমাদের তবিল ফাঁকা, বারোঘর চার সিঁড়ির খণ্ডহরের ইঁটে নোনা লাগা আরম্ভ, দিনে পায়রা রাতে চামচিকেতে ছয়লাপ । দাদু প্রথম সুযোগেই উত্তরপাড়া থেকে কেটে পড়েন। ওনার অন্য দুই ভাই খণ্ডহর ছেড়ে পালাননি, তাঁদের নাতিরা কেউ-কেউ হিন্দ মোটরে হাতুড়ি পেটার কাজে নেমে গিয়েছিল।

    এখানে একটা ঘটনার কথা বলি। স্বাভাবিক যে দাদাকে ঠাকুমা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। আমাকেও বাসতেন, তবে তা যে দাদার চেয়ে কম তা ওনার আচরণে টের পাওয়া যেতো। কলকাতার সিটি কলেজে পড়ার সময়ে দাদা ঠাকুমার সঙ্গে থাকতেন। হাংরি আন্দোলনে দাদার গ্রেপতারির সংবাদে ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঠাকুমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, আর তিন দিন কোমায় থাকার পর মারা যান। দাদার গ্রেপ্তারির কথা যাতে ওনার কানে না যায় তা বড়োজ্যাঠা আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রেপ্তারির পর ব্যাংকশাল কোর্ট থেকে জামিন নেবার ব্যাপারে বাবা-কাকা-জ্যাঠা-পিসেমশায় উত্তরপাড়ার বাড়িতে একত্রিত হয়েছিলেন। এতোজনকে দেখে ঠাকুমার সন্দেহ হয়। তাঁকে জানানো হয় মামলার কথা। শোনামাত্রই তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। ওনার শুকনো মাইয়ের বোঁটা ওপরে তুলে তার তলায় স্টেথোস্কোপ রেখে ডাক্তার ঘোষণা করেছিল, “ডেড”।

    ঠাকুমার মৃত্যুদিন মনে রাখার অসুবিধা হয় না, তার সঙ্গে জুড়ে আছে আমাদের কোর্টে দৌড়োনোর অভিজ্ঞতা। কিন্তু পরিবারের অন্য কারোর মৃত্যুদিনেরও, যেমন ঠাকুর্দার বা ঠাকুর্দার ভাইদের, জ্যাঠা-বাবার, কাকিমা-জেঠিমাদের, কোনো হদিশ নেই।

    —মৃত্যু দিনগুলো কেন মনে রাখোনি তোমরা ?

    —তুই বোকা না গাধা ; মৃত্যু দিন মনে রাখার আবার কি দরকার।

    —বাঃ, মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করবে না তোমরা ?

    —ওসব নাটোক-নবেলে হয়। পূর্বপুরুষরা মারা গেলে বছরে একটা দিনই তর্পণ করতে হয়, তিল-গঙ্গাজল দিয়ে, আত্মাদের অশান্তি করার মানে হয় নাকি, ওনারা যে যেখানে আছেন সেখান থেকে আমাদের সবাইকে আশির্বাদ করেন, তোকেও।

    তার মানে, আমাদের যেমন জন্মদিন হয় না, তেমনিই, মৃত্যুদিনও হয় না। ইমলিতলার বাড়ির তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা যেমন জন্মাই না, তেমনিই আমরা মরি না। আমরা অজাতশত্রু।

    অজাতশত্রু, জানা গেল, এই পাটনা শহরেরই লোক, রাজা ছিলেন, এই শহরের পত্তন করেছিলেন, তখন এই শহরের নাম ছিল পাটলিপুত্র। পাটলিপুত্রর ধ্বংসাবশেষ দেখতে বড়োজ্যাঠা নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের। গাইডের কাছে জানা গেল যে অজাতশত্রু ছিলেন মগধের রাজা, যিশুখ্রিস্টের জন্মের চারশো বছরেরও বেশি আগে গঙ্গার ধারে একটা ছোটো দুর্গ তৈরি করেছিলেন।

    —পাটলিপুত্র নাম কেন ?

    —পাটলি হল এক ধরণের চাল আর পুত্র মানে ছেলে।

    —চালের ছেলে ? অমন হয় নাকি ?

    —তা নয়, পাটলিপুত্র মানে পাটলির ছেলে, যিনি রাজা সুদর্শনের মেয়ের সন্তান।

    —যিশুখ্রিস্টের জন্মের তিনশো বছর আগে গ্রিক ইতিহাস-লেখক লিখেছিলেন যে পাটলিপুত্র বেশ বড়োসড়ো শহর।

    —এ তো দেখছি আমাদের জন্ম হয় না আমাদের মৃত্যু হয় না ধরণেরই গল্প, বড়োজ্যাঠা।

    —তবে আর ইতিহাস বলেছে কেন। তুই গাইডকে জিগ্যেস কর, অজাতশত্রু কবে জন্মেছিল, কবে মারা গিয়েছিল, বলতে পারবে না।

    আমি জিগ্যেস করা আরম্ভ করেছিলুম, গাইড আবার গল্প ফাঁদতে আরম্ভ করল ; পাটলিপুত্র ছিল একটা জলদুর্গ, গঙ্গা, গণ্ডক আর শোন নদীর তৈরি ত্রিভুজের মধ্যে, নন্দরাজত্ব, মৌর্যরাজত্ব, শুঙ্গরাজত্ব, গুপ্তরাজত্ব আর পাল রাজাদের রাজধানী। নানা জায়গা থেকে জ্ঞানীগুণিরা এখানে এসে জড়ো হতেন, যেমন এসেছিলেন চাণক্য।

    —তাদের ছেলেরা সব বাহুবলি,ডাকাত, খুনি, চোরছ্যাঁচোড় আর রাজনীতিক হয়ে জন্মাচ্ছে।

    বাবার ফোটোগ্রাফির দোকানের চাকর রামখেলাওন সিং ডাবর, দেয়ালে হেলান-দেয়া বড়জ্যাঠার সাইকেলের সিটে আমাকে বসিয়ে ধরে থাকে, আরি আমি, অজাতশত্রু, হাতির ওপরে বসে রাজ্য জয় করতে বেরোই, হাতে তরোয়াল, যা ডাবরই তৈরি করে দিয়েছে, ফিলমে পাকানো লাল কাগজ মুড়ে-মুড়ে, ছড়ির মতন । তরোয়াল ঘোরাই, হাতির পিঠে সামলাতে না পারলে রামখেলাওন সিং ডাবর হুকুম করে, ‘ঠিক সে বয়ঠিয়ে মহারাজ’।

    দাদা, দেখতে পেয়ে বলে ওঠে, ওঃ, আমাকে সিংহাসন দিয়েছিলেন ঠাকুমা, তুই বেদখল করে রাজত্ব চালাচ্ছিস, জানিস কি যে অজাতশত্রুর একটা হাতে কড়ে আঙুল ছিল না ; আর অজাতশত্রুর নাক উঁচু ছিল বলে প্রজারা ওনাকে বলতো পীনোন্নত।

    দাদার সঙ্গে আমার পাঁচ বছর বয়সের তফাত, ভয় দেখাবার অধিকার আছে মনে করে এড়িয়ে যেতে ডাবর বলে, ‘হাঁ, সচ্চিমুচ্চি, লোগ কহতে হ্যাঁয়, উ চার উংগলিকে রাজা থে; হমরে বৈশালি মেঁ সবকোই জানত হ্যায়।’

    ঠাকুমাকে জিগ্যেস করা যাবে না, উনি উত্তরপাড়া ফিরে গেছেন। ক্লাসে হিসি পেলে অজাতশত্রু কেমন করে পারমিশান চাইতো তাহলে, কাকে জিগ্যেস করি ? সিসটার আইরিনের ক্লাসে আমি তো ওই ভাবেই অনুমতি চাই। কনভেন্টে কেউই পীনোন্নতর বাংলা বলতে পারবে না, অজাতশত্রুর নামই শোনেনি হয়তো মাদার সুপিরিয়র, সিসটাররা, সিসটার আইরিন আর ফাদার হিলম্যান।

    ছোটোকাকাকে জিগ্যেস করলুম। তখনও উনি উত্তরপাড়া গিয়ে প্রেমে পড়েননি, বউ কুচিকে পাটনায় আনেননি। “আরে ধ্যুৎ, সব গাঁজাখুরি, রাজাদের নিয়ে ওদের দরবারিরা নানা গপপো ফাঁদে।”

    —আর উনি নাকি পীনোন্নত রাজা ছিলেন ?

    ছোটোকাকার হাসি, গমকে গমকে পেট চেপে ধরে হাসি, ডেকে আনল জেঠিমা আর মাকে। ছোটোকাকা ব্যাপারটা ওনাদের বোঝাতে, জেঠিমা বললেন, “নাক উঁচুদের উন্নাসিক বলে রে, আর যাদের মাইয়ের বোঁটা উঁচু, তাদের বলে পীনোন্নত, এই যেমন আমার, এই দ্যাখ, একে বলে পীনোন্নত, এখনও পীনোন্নত আছে। তুই তো অনেক কাল অব্দি পাড়ার বউদের মি খেয়ে বেড়িয়েছিস, পীনোন্নত জানিস না ?”

    —মি-এর উঁচু বোঁটাকে বলে পীনোন্নত ? সুদামিয়ার, কপিলের মায়ের, কৃষ্ণন্নার মায়ের, কালুটুয়ার চাচির, বিরজুর মায়ের, মুনসিজির বউয়ের সকলের মি-ই তো পীনোন্নত। দাদা আমাকে পিটুনি খাওয়াবার জন্যে বলেছে, তার মানে !

    আমার মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ হতো না বলে আমি পাড়ার নার্সিং মাদারদের কোলে পৌঁছে যেতুম ছোটো বেলায়। জেঠিমার কথায়, আমি ভোরবেলা উঠেও কান্না জুড়তুম, “মি খাবো, মি খাবো”, আর ছোড়দি, ধরিত্রী, কোলে করে নিয়ে যেতো পাড়ার কোনো বাড়িতে আর সঁপে দিত তার কোলে।

    অজাতশত্রুর কড়ে আঙুল ছিল কিনা তার ফয়সালা করার জন্য দুপুরে, বাবা যখন দোকানের কাজ সেরে লাঞ্চ খেতে এসেছেন, তখন জিগ্যেস করলুম ওনাকে। বাবা খেতে বসে গম্ভীর মুখে বললেন, “মা তোদের অজাতশত্রু খেতাব দিয়ে ভালো কাজ করেনি, অজাতশত্রুটা বাজে লোক ছিল, নিজের বাবা বিম্বিসারকে জেলে পুরে খুন করেছিল, কাকার রাজ্য কাশি আক্রমণ করে তাকে হারিয়ে দিতে, কাশির রাজা নিজের মেয়ের সঙ্গে অজাতশত্রুর বিয়ে দিয়ে দিলে, আর কাশি রাজত্বও দিয়ে দিলে, নিজের খুড়তুতো বোনকে বিয়ে করে নিলে, ছি ছি। ষোলো বছর যুদ্ধ করে গঙ্গার ওপারে লিচ্ছবিদের রাজত্ব দখল করে নিলে, এখন যাকে হাজিপুর বলে, নিজের ভাইদের রাজত্ব আক্রমণ করে সেগুলো দখল করে নিলে, অতো রক্তপাত ভালো নয়। ” বাবা শাকাহারি, তাই রক্তপাতের বিরুদ্ধে।

    ডাবর বলেছিল, হাজিপুরের কলাকে বলে চিনিয়া কেলা, সবচেয়ে ছোটো মাপের কলা, অজাতশত্রুর ভয়ে কলাগুলো নাকি ছোটো আর একটু টোকো হয়ে গিয়েছিল।

    —তাহলে বৈশালী আর মুজফফরপুরে এতো ভালো মিষ্টি লিচু কী করে হয় ?

    —চিন থেকে এনেছিল একজন পরিব্রাজক, তাই ওখানকার লিচুকে বলে শাহি লিচু, চায়না লিচু, আম্রপালী নামে একজন সুন্দরী ছিল, তার ছোঁয়া পেয়ে ওখানকার লিচু মিষ্টি।

    ঠাকুমা পাটনায় এলে বলেছিলুম, তুমি আমাদের অজাতশত্রু খেতাব ফেরত নাও ; বাবা বলেছে লোকটা বাজে ছিল। ঠাকুমা বললে, তোর দাদু তোর দাদাকে সমীর নাম দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে তোর নাম তোর বাপ রেখেছে মলয়, আর কি, এই নামেই বংশের মুখ উজ্জ্বল কর।

    —বংশের মুখ উজ্জ্বল ? সেটা কী ?

    —বড়ো হলে টের পাবি, অন্য লোকেরা যদি তোকে হিংসে করে তাহলে বুঝবি বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছিস। ।

    ঠাকুমা মারা গেলেন বলে আর বলার সুযোগ হয়নি যে, বড়ো হয়ে মুখ যা করেছি, বাড়ির লোকে তাকে মুখ উজ্জ্বল মনে করলেও, ব্যাঁকা মানুষরা তা মনে করে না। তারা নানারকম লেখালিখি করে, হিংসে করে।

    বলেছিলুম, তুমি তোমার ছেলেদের ডাকনাম রাখোনি কেন ? ঠাকুমা বললে, “কেন ? তোর জ্যাঠাকে খোকা বলে ডাকি এখনও, তোর মেজজ্যাঠাকে মেজখোকা বলি, তোর বাপকে রঞ্জা বলি, তারপর আর কারোর ডাকনাম রাখিনি। তোর বাপের নাম তো মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর নামে রেখেছিলুম, যখন তোর বাপকে প্রসব করেছিলুম, তখন লাহোরে থাকতুম, রঞ্জিত সিং এক-চোখ অন্ধ ছিল, ওর অনেকগুলো বউ ছিল, বাঁদিও ছিল, তাই বলে তোর বাপের রঞ্জিত খেতাব কি ফিরিয়ে নেবো ?

    —বাঁদি কি ?

    —যে বউদের লোকে বিয়ে করে না কিন্তু তাদের নিজের বাড়িতে বউদের মতন রাখে। অজাতশত্রুরও অনেকগুলো বউ আর বাঁদি ছিল।

    —দারুণ ব্যাপার ; আমিও বড়ো হলে অনেকগুলো বাঁদি রাখব ; বাচ্চা হলে বাঁদিদের দুধ খেতে পারব।

    —তা রেখো, কিন্তু আমার বারো ঘর চার সিঁড়ির সাবর্ণ ভিলায় এনোনি তাদের।

    আমার অজাতশত্রু হবার শখের এখানেই ইতি। ঠাকুমাকে বললুম, “অজাতশত্রু কতোদিন রাজত্ব করেছিল লোকে হিসেব রেখেছে, ওর বাবা বিম্বিসার কতোদিন রাজত্ব করেছিল তার হিসেব রেখেছে লোকে, কিন্তু ওদের জন্মদিনের আর মৃত্যুদিনের হিসেব রাখেনি। তুমিও কবে তোমার ছেলেদের প্রসব করেছিলে তার হিসেব রাখোনি।”

    পনেরো

    ঠাকুমা জেনে যেতে পারেননি যে এখন একজন লোক যে আসলে সেই লোকটাই, তা প্রমাণ করার জন্য কতো কাগজপত্র সামলে রাখতে হয়, হাসপাতালের বার্থ সার্টিফিকেট, কর্পোরেশানের বার্থ সার্টিফিকেট, ভোটার কার্ড, র‌্যাশান কার্ড, আধার কার্ড, টেলিফোনের বিল, পাসপোর্ট, ইলেকট্রিক বিল। ভাগ্যিস বিম্বিসার আর অজাতশত্রুর সময়ে ওসব বালাই ছিল না।

    বড়ো জ্যাঠা মারা যেতে জেঠিমার পেনশন তুলতে গিয়ে কি হ্যাঙ্গাম; হাতেখড়ির মতন কষ্ট করে শেখা কম বয়সের সইয়ের সঙ্গে বুড়ি বয়সের সই মেলে না, পঁয়তাল্লিশ টাকা পেনশন তোলার জন্য আদালতে গিয়ে এফিডেভিট করতে হয়েছিল যে উনিই নন্দরানি, বড়োজ্যাঠার বউ। আজকালকার মতন, কোনও কাগজে বড়োজ্যাঠাও জন্মাননি, বড়োজেঠিমাও জন্মাননি। বড়োজ্যাঠার চাকরি ছিল পাটনা মিউজিয়ামে মূর্তিদের আর পেইনটিঙগুলোর ঝাড়াই-পোঁছাই, যার জন্য কোনো কাগজের দরকার হয়নি, ধ্যুৎ ভাল্লাগে না বলে মাঝে চাকরি ছেড়ে দিলেও, কিউরেটার বাড়িতে লোক পাঠিয়ে বাবা-বাছা করে আবার চাকরিতে বহাল রেখেছিল, অথচ বড়োজ্যাঠা চাকরি পেয়েছিলেন ঠাকুমার জাঠতুতো দাদার সুপারিশে, তিনি কলকাতা মিউজিয়ামের অ্যাসিস্ট্যাণ্ট কিউরেটার ছিলেন, লেখক ছিলেন, ওনার নাম ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। ইংরেজরা যাবার পরে বড়োজ্যাঠার চাকরির নাম হয়ে গেল কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার, মাইনেও বেড়ে গেল, রিটায়ার করার সময়ে নব্বুই টাকা। মিউজিয়ামে বড়োজ্যাঠা একটা ঘর পেয়েছিলেন, গরমকালে ঘরের কল খুলে দিয়ে মেঝেয় জল ভরে দিতেন আর দুপুরে ইজি চেয়ারে শুয়ে নাক ডাকতেন। অফিস যেতেন পাঞ্জাবির ওপরে ধুতি, মাথায় হ্যাট, সাইকেলে তিন কিলোমিটার। আমার স্কুলের ছুটি পড়লে আমি ওনার সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বসে চলে যেতুম ওনার অফিসে, দুপুরে খাবার জন্য টিফিনের কৌটো নিয়ে। টিকিট না কেটেই সারা মিউজিয়াম ঘুরে বেড়াতুম। বড়োজ্যাঠা অনেকসময়ে আমাকে সঙ্গে করে ঘরগুলোয় নিয়ে গিয়ে দেখাতেন কোনটা কার মূর্তি, কোন জিনিস কতো হাজার বছর আগেকার। একজন অপ্সরার মাই আর একজন গলাকাটা পুরুষের মূর্তির নুনু চকচকে ছিল, কেন তা জানতে দেরি হয়নি, দেখি মহিলা দর্শকরা গলাকাটা মূর্তির নুনুতে হাত দিয়ে টুক করে কেটে পড়ছে, আর একই কাজ করছে পুরুষ দর্শকরা অপ্সরার মাইতে হাত বুলিয়ে। আমি অপ্সরার মাইতে হাত দিতে পারতুম না, কেননা আমার হাত পৌঁছোত না। খেমির মাই অপ্সরাদের চেয়ে ছোটো ছিল; কুলসুম আপার মাই অপ্সরাদের চেয়ে কালো।

    বড়োজ্যাঠার টয়লেটে গিয়ে প্যান্টুলের বোতাম খুলে দেখেছিলুম, শ্বেতপাথরের গলাকাটা মূর্তির চেয়ে আমার নুনু বড়ো। গলাকাটা মূর্তি, পরে বলেছিলেন বড়োজ্যাঠা, আলেকজাণ্ডারের। শুনে বেশ ভালো লেগেছিল ; তার মানে আমিও আমার নুনু নিয়ে পৃথিবী জয় করতে যেতে পারব। খেমি যদি বেঁচে থাকত তাহলে ওর মাইও হাতের পালিশ খেয়ে অপ্সরার মতন চকচকে আর বড়ো হতো, পীনোন্নত। কিন্তু ওর তো বিয়ে হয়ে যেত, ওর বরকে লুকিয়ে খেমির মাইয়ে হাত বোলাতুম, ওর ঠোঁট চেবাতুম, তালশাঁসের মতন খেতুম। বড়োজ্যাঠা মারা গেছেন, আমরা সেই দিনকার ঘটনা জানি। তবে তারিখটা কেউ মনে রাখেনি। বড়োজ্যাঠার জন্মদিন নেই, বড়োজ্যাঠার মৃত্যুদিন নেই। আলেকজাণ্ডারেরও নেই। বড়োজেঠা যেদিন মারা গেলেন, বাবা আমাকে অফিস থেকে ডেকে পাঠালেন জরুরি কাজ আছে, জানিয়ে। বাড়ি ফিরে দেখি কেবল নকাকিমা রয়েছেন, বললেন তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, তোকে এক্ষুনি দিদিদের বাড়ি যেতে হবে। খেয়ে নিয়ে দিদিদের বাড়ি ছোটালুম সাইকেল। গিয়ে দেখি বড়োজেঠাকে বাঁশের মাচানে বেঁধে ফেলা হয়েছে। আমাকে যেতে হবে মুখাগ্নি করতে। সেই প্রথম শবকে ঘি মাখানো, পুরুত সতীশকাকার হুকুম অনুযায়ী মন্ত্র বলা আর কুশকাঠি-শরকাঠিতে আগুন ধরিয়ে মুখাগ্নি করার অভিজ্ঞতা, চিতাকে ঘিরে কাঁধে হাঁড়ি নিয়ে ফেলে দেয়া। শ্মশানে দাঁড়িয়েই কান্না পেয়ে গেলো, কাঁদলুমও, সতীশকাকা বললেন, হ্যাঁ, একে বলে শ্মশানবৈরাগ্য। হিন্দু মারা গেলে তার জ্বলন্ত দেহ থেকেও শেষবারের মতন শব্দগুলো পোড়া কাঠের সঙ্গে আকাশে ওড়ে, যাদের শব গোর দেয়া হয় তারা এই শেষ শব্দের গুঞ্জনের আহ্লাদ থেকে বঞ্চিত।

    আমার এখন তিনটে জন্মদিন ; এগারোই কার্তিক, মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী। উনত্রিশে অক্টোবর, স্কুলের সার্টিফিকেট অনুযায়ী। দোসরা নভেম্বর, ফাদার হিলম্যানের নির্ণয় অনুযায়ী। তিনদিন শুভেচ্ছা পাবার জন্য জন্মদিনের আর কীই বা চাই।

    আমাদের বাড়িতে জন্মদিনকে উৎসব করায় আমার স্ত্রী সলিলার ভূমিকা আছে ; আমার মেয়ে হলে তার জন্মদিন পালন করা আরম্ভ হয়। তার আগে জন্মদিন যে অনুষ্ঠান হিসেবে আমোদ-আহ্লাদ করার দিন তা জানতেন না কেউ। মেয়ের জন্মদিন পালন করা আরম্ভ হলে দোসরা নভেম্বরকে আমার জন্মদিনের স্বীকৃতি দিয়ে খানাপিনার ব্যবস্হা আরম্ভ হয়। রেস্তরাঁয় গিয়ে ককটেল পার্টি করার সেই সূত্রপাত। এমনকি জন্মদিনে যে কেক কাটতে হয়, মোমবাতি নিভিয়ে হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গাইতে হয়, তারও।

    ষোলো

    বড়োজ্যাঠার দুই মেয়ে, সাবিত্রী আর ধরিত্রীর বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল, তার কোনো স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি। মেজজ্যাঠা আর কাকাদের মেয়ের বিয়ের ব্যবস্হা করেছিলেন বাবা, কেননা তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল। মেজজ্যাঠার ছোটো মেয়ে মনু বা মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইলে, মেজজ্যাঠা অমত জানান। মেজজ্যাঠার অমত হওয়ায়, বাবা তাঁকে বোঝানো সত্ত্বেও তিনি রাজি হননি ; তাঁর বিরুদ্ধতা করে বাবা নিজে অংশ নিতে চাননি, আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন, “ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে, সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয়।” সে এক মজার অভিজ্ঞতা, যেতে হয়েছিল খুসরুপুর নামে একটা ধাদ্ধাড়া গোবিন্দপুরের মন্দিরে, গিয়ে দেখি, সার বেঁধে বিয়ে হচ্ছে চত্ত্বরে। আমাকে একটা গোলাপি ধুতি দেয়া হয়েছিল, প্যাণ্ট খুলে পরে নিয়েছিলুম, তারপরে সম্প্রদান, বাঙালিদের বিয়ের মতন নয়, বা শহুরে বিহারিদের বিয়ের মতন নয়। ফেরার সময়ে পাটনা স্টেশানে নেমে রঙিন ধুতি খুলে প্যান্ট পরে নিয়েছিলুম।

    মা মারা যান লখনউতে আমার কাছে থাকার সময়ে, ১৯৮২ সালের ১৮ই নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। বাবা মারা যান পাটনায়, ১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর, তখন তিনি কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন আর দোকান চালানো আরম্ভ করেছে দাদার বড়ো ছেলে টোটোন বা হৃদয়েশ। আমার এটাই প্রধান রিগরেট যে বাবাকে আমি মুম্বাইতে নিয়ে আসিনি, তখন তো আমি মুম্বাইতে চাকরি করছি, বেশ বড়ো ফ্ল্যাট পেয়েছি সান্টাক্রুজে, আশেপাশে নামকরা হাসপাতাল। মায়ের মৃত্যু সম্পর্কেও রিগরেট থেকে গেছে যে প্রতিবেশী হায়দার আলিকে না জানিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করেছিলুম। নবাব পরিবারের হায়দার আলির প্রভাব ছিল সরকারি হাসপাতালে, আর লখনউতে সেসময়ে প্রাইভেট হাসপাতালের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি আধুনিক ছিল, ডাক্তাররা ছিল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।

    আমার চরিত্রগঠনে বা বিগঠনে খাঁটি অবদান মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলা ; সেখানকার অভিজ্ঞতা আমাকে শিক্ষিত করে তুলেছে, শিখিয়েছে মানসিক-ঔদার্য, সারগ্রাহীতা, তার প্রতিটি বাসিন্দা ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী, বেপরোয়া, গোলমালকারী, স্হিতাবস্হাবিরোধী, যারা নিজেদের বলতো “দুনিয়াকা নাসুর”, মানে পৃথিবীর এমন নালি-ঘা যা সারে না, প্রথমে বিদেশি ও পরে স্বদেশি সরকার তাদের জীবনযাত্রার লড়াইকে মনে করেছে প্রতিরোধ-প্রতিবাদ, মনে করেছে মৌরসি-পাট্টার শত্রু, তাদের মনে করেছে বিপজ্জনক, অথচ তা ছিল ওদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। জীবনকেচ্ছা প্রায় প্রতিদিনই ঘটতো ইমলিতলা পাড়ায় কিন্তু সেসব নিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের মতন কেউই খিক-খিকে হাসি হাসতো না।

    আর অবশ্যই বাড়ির-দোকানের দুই কাজের লোক, শিউনন্নি আর ডাবর। ১৯৫৫ সালে বি এন কলেজের ছাত্র ইউনিয়ানের জুলুসে আমি সামনের দিকে হাঁটছিলুম, আমার আর তরুণ শুরের হাতে ব্যানার, কোথা থেকে ডাবর ছুটে এসে আমার হাত ধরে বলল, “ই সব মত কিজিয়ে, মারে যাইয়েগা।” কয়েকদিন আগেই পুলিশের গুলিতে দীনানাথ পাণ্ডে নামে এক ছাত্র মারা গিয়েছিল, অকারণেই পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, কেননা ছাত্রদের দাবি ছিল বাসের সংখ্যা আর সময় বাড়ানোর। প্রতিবাদ করতে বেরিয়েছিলুম আমরা, দাবি ছিল জুডিশিয়াল এনকোয়ারির। শেষে নেহেরুকে এসে বক্তৃতা দিয়ে ছাত্রদের শান্ত করতে হয়েছিল ; মুখ্যমন্ত্রী এস কে সিং অবস্হা সামলাতে হেগে ফেলার পর। তখনই নেহেরুকে একেবারে সামনে থেকে দেখেছিলুম। হাবভাব দেখে মনে হয়েছিল বেশ উন্নাসিক মানুষ।

    আমি আমার সহ্যশক্তি আর যুঝে যাবার ক্ষমতা ইমলিতলা পাড়া থেকেই পেয়েছি : হাতকড়া, কোমরে দড়ি, জেলহাজত, শত্রুদল, কুখ্যাতি, অপমান, অপপ্রচার, বিরোধিতা, কটূ মন্তব্য, বিশ্বাসঘাতকতা। ইমলিতলাতেই জেনেছি, প্রতিটি নারীর দেহে নিজস্ব সুগন্ধ থাকে যা শহুরে মহিলারা পারফিউম মেখে নষ্ট করে ফ্যালে, পারফিউম জিনিসটা তাই আমার পছন্দও নয়, পাড়ার সকলের বাসার মতনই আমাদের বাড়িতেও কলিং বেল ছিল না, বাড়ির কারোর সঙ্গে দেখা করতে হলে তার নাম ধরে ডাকতে হতো, নাম ধরে ডাকার এই বাচনিক সম্পর্ক হারিয়ে গেল ইমলিতলা ছাড়ার পর, ইমলিতলার দিনগুলো নিজস্ব রঙে আর গন্ধে দেখা দিতো, রাতগুলো দেখা দিতো কেরোসিন লন্ঠন আর রেড়ির তেলের লম্ফর শিখায়। কাউকে কখনও সোনার গয়না পরতে দেখিনি ইমলিতলায়, রুপোর গয়না কেবল বিয়েতে। আমি সোনার আঙটি পেয়েছিলুম আমার উপনয়নে, যা আমি খুলে পরিয়ে দিয়েছিলুম আমার প্রথম আর শেষ রোমান্টিক প্রেমিকাকে, সে পরে ওই আঙটি পরিয়ে দিয়েছিল তার নতুন প্রেমিককে, যাকে সে বিয়ে করেছিল আর পরে ডিভোর্স দ্যায় ; জানিনা সেই আঙটির কী হল শেষ পর্যন্ত, কেননা ওর বর ছিল স্মাগলার। স্মাগলারকে বিয়ে করে ওর বিখ্যাত বক্তব্য মনে রেখেছি, “টাকা হল ডলারের বেজন্মা বাচ্চা”। ইমলিতলার মসজিদে লাউডস্পিকার ছিল না ; রমজানের সময়ে একজন ফকির ভোর রাতে গান গাইতে-গাইতে যেতো যাতে পাড়ার মুসলমান পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙে যায়। সেই ফকিরের এক হাতে সাপের মতন ব্যাঁকা ছড়ি আর অন্য হাতে লাউয়ের মোটা খোসা শুকিয়ে তাতে লোবানের ধোঁয়া।

    মা, বাবা আর শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দ্যান, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান। প্রকৃত অর্থে প্রাইমারি স্তরে কনভেন্ট ছাড়া, রামমোহন রায় সেমিনারি স্কুলে এবং পরে কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমি কোনো শিক্ষকের নৈকট্য এবং পথনির্দেশ ও বন্ধুত্ব পাইনি, সমাজে শিক্ষকের অবদানের অবনমন তখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়ে থাকবে। এখন তো শিক্ষকতা ব্যবসায়ের পর্যায়ে চলে গেছে। স্কুল শিক্ষকরা স্কুল ছেড়ে কোচিং আর প্রাইভেটে পড়ানোয় বেশি রোজগার করছেন। রামমোহন রায় সেমিনারিতে আমি ক্রমশ মূর্খ হয়ে যাচ্ছিলুম ; বেঁচে গিয়েছিলুম উঁচু ক্লাসের ছাত্রী আর স্কুলের লাঞ্চ পিরিয়ডের সময়ের গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তীর কারণে ; সিসটার আইরিনের পর উনিই আমার প্রকৃত শিক্ষক। সিসটার আইরিন আর নমিতা চক্রবর্তীকে মনে করলেই আঁচ করতে পারি যে ওনাদের অস্তিত্বে কোথাও অবিনশ্বরতা ছিল, যার কিছুটা ধুলো আমায় মাখিয়ে দিয়ে গেছেন ওনারা ।

    কনভেন্ট বা ক্যাথলিক ইশকুলে ভর্তি হবার ঘটনাটাও ঐন্দ্রজালিক কেননা স্হানীয় ক্যাথেড্রালের যাযক ফাদার হিলম্যান, যিনি প্রচুর ফোটো তুলতেন, প্রায়ই আসতেন বাবার ফোটোর দোকানে, ওনার তোলা ফোটো ডেভেলাপ ও প্রিন্ট করাবার জন্য আর উনি বলতেন ভারত হল রামধনুর সাতটি রঙের বিস্ফোরণ। বাবার সঙ্গে ওনার প্রায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। একদিন বাবা আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়েছিলেন, খেলছিলুম, অসিযুদ্ধ করছিলুম অদৃশ্য দৈত্য-দানবদের সঙ্গে, সেসময়ের বক্স ক্যামেরায় ব্যবহৃত ফোটোর নেগেটিভের আস্তরণ, লম্বা লাল রঙের কাগজ দিয়ে পাকানো লাঠি নিয়ে, যা বাবার দোকানের কাজের লোক রামখেলাওন সিং ডাবর তৈরি করে দিয়েছিল। সেসময়ে ডিজিটাল ফোটোগ্রাফি আবিষ্কার হয়নি, শৌখিন ফোটো-তুলিয়েরা ক্যামেরাগুলো দিয়ে সাধারণত বারোটা বা ষোলোটা সাদা-কালো ফোটো তুলতো। ফিল্মের রিলগুলো হতো কাচকড়ার আর তার ওপরে লাল কাগজের আস্তরন। ফাদার হিলম্যানের মতন ধবধবে ফর্সা মানুষ আমি তার আগে দেখিনি ; মানুষের গায়ের রঙ এরকমও হয়, জেনে অবাক লেগেছিল ; ওনার পোশাকও এমন যে পুরো শরীর শাদা কাপড়ে ঢাকা, শুধু হাত দুটো বেরিয়ে, চুল সোনালী, চোখ কটা, এরকম চুলও দেখিনি আগে।

    ফাদার হিলম্যান বাবাকে বলেন, “একে স্কুলে ভর্তি করেননি কেন এখনও ? এই বয়সে যা পড়বে স্মৃতিতে আজীবন থেকে যাবে। ” বাবা জানান, “কোনো স্কুলে তো এতো ছোটো বাচ্চাকে ভর্তি করা হয় না, আর কনভেন্টে পড়াবার সামর্থ আমার নেই, কেননা আমার আর আমার ভাইদের খরচের পর কিছুই বাঁচে না। আমার বড়ো ছেলে যে সরকারি স্কুলে পড়ে সেখানেই একে ভর্তি করব দুই বছর পরে।” ফাদার হিলম্যান বাবাকে বলেছিলেন. কনভেন্টে এতো ছোটো বাচ্চাদের একটা ক্লাস আছে, তার নাম ট্র্যানজিশান ক্লাস, আপনি কালকে একে নিয়ে আসুন আমি ভর্তি করে নেবো, নেভি ব্লু হাফপ্যান্ট, শাদা হাফ শার্ট আর নটিবয় শুজ কিনে নিন আজকে, টাই স্কুল থেকেই দেয়া হয়, ফিসের কথা ভাববেন না, মুকুব করার ক্ষমতা আমারই। সেদিনই বিকেলে স্কুলের ড্রেস কিনে দিলেন বাবা, এতো বাবুলাট পোশাক আগে পরিনি কখনও, জুতো পরে বাড়িতে গটগটিয়ে হেঁটে দেখালুম সবাইকে। রান্নাঘরের সারাদিনের কাজ সত্ত্বেও মা ঘটিতে গরম জল ভরে শার্ট-প্যান্ট ইস্তিরি করে দিতেন।

    পরের দিন সকাল নটায় গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলুম কনভেন্ট স্কুলে। জন্মদিন নির্ধারণ করলেন ফাদার হিলম্যান, দোসরা নভেম্বর। ভর্তি হয়ে টের পেলুম যে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বললে শাস্তি পেতে হয়। ইংরেজি কেন, আমি তখন বাংলা আর হিন্দিও ভালো করে বলতে পারতুম না। চুপ থেকে, মাথা নেড়ে, কাজ চালাতে চালাতে রপ্ত হল ভাঙা-ভাঙা ভাষা। ফাদার হিলম্যান ছিলেন জার্মান, কিন্তু ইংরেজি আর হিন্দিতে কথা বলতে পারতেন। ভর্তি করিয়ে বাবা বলেছিলেন, “দুপুরে রাম খেলাওন সিং ডাবর টিফিন নিয়ে আসবে, আর ছুটির সময়ে ওর সাইকেলে করে বাড়ি ফিরবি। রোজই রামখেলাওন নিয়ে আসবে আর নিয়ে যাবে, কাল থেকে টিফিন নিজের সঙ্গে আনবি। ” এই স্কুলটা দাদার পাটনা কলেজিয়েট স্কুল থেকে আলাদা ; দাদার স্কুলে ঢুকেই দুধারে দুতলা ক্লাসবাড়ি, মাঝখানে সোজা পিচরাস্তা, বাড়ির পেছন দিকে দুটো বিশাল খেলার মাঠ, যেখানে ফুটবল আর ক্রিকেট খেলা হয়, আমি ওই মাঠে স্কুটার চালাতে শিখেছিলুম। ক্যাথলিক স্কুলে ঢুকেই একজন বউয়ের পাথরের মূর্তি, তার কোলে বাচ্চা, পেছনদিকে একজন লম্বা-দাড়ি মানুষ দাঁড়িয়ে, তার পায়ের কাছে দুটো ভেড়ার বাচ্চা। পরে ফাদর হিলম্যান হিন্দিতে জানিয়েছিলেন যে মাদার মেরির কোলে যিশু আর পেছনে সেইন্ট জোসেফ। মাদার মেরি ভার্জিন আর যিশুর বাবা হলেন ঈশ্বর স্বয়ং, মাদার মেরির বিয়ে হয়নি কেননা ঈশ্বরের সঙ্গে তো বিয়ে হতে পারেনা। ভার্জিন বলতে যে কী বোঝায় তার জ্ঞান হয়েছিল পরের স্কুল রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে।

    কনভেন্টের গেটের ভেতর ঢুকলে বাঁদিকে একটা সবুজ ঘাসের মাঠ, ছাত্র-ছাত্রীরা খেলছে, ডানদিকে ফুলের বাগান। যে ছাত্র-ছাত্রীরা খেলছে, কয়েকজনের গায়ের রঙ ফাদার হিলম্যানের মতন ফর্সা, চুলও সোনালী, কালো তো নয়ই। কেউই ওই বাগানে যাচ্ছে না, ফুল তুলছে না দেখে অবাক লাগল। ইমলিতলার ছেলেরা দেখতে পেলে সব ফুল উজাড় করে তুলে নিয়ে গিয়ে দুর্গামাতার মন্দিরের সামনে বিক্রি করতে বসে যেতো, বিক্রি না করলেও চিবিয়ে মুচড়ে নষ্ট করে হাহা হিহি হাসতো সবাই মিলে। দাদার স্কুলে মাঠগুলো কনভেন্টের মাঠের চারগুণ বড়ো, তাতে বিশেষ ঘাস নেই। কনভেন্টের মাঠের মাঝখানে একটা গাছ, তার তলায় অজস্র ছোটো-ছোটো সাদা ফুল পড়ে রয়েছে, সেগুলোও কেউ তুলছে না। বাবা বলেছিলেন, ওটা বকুল ফুলের গাছ। তার আগে আমি বকুল ফুল দেখিনি ; ডানদিকের বাগানে যে ফুলগুলো হয়ে আছে সেগুলোও দেখিনি আগে। বাড়িতে দেখেছি শুধু গ্যাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলি, জবা আর জুঁইফুল, যখন বড়োজেঠিমা সত্যনারায়ণ পুজোর ব্যবস্হা করেন সংক্রান্তির দিন তখন; রামখেলাওন সেসব ফুল গিয়ে গঙ্গায় ফেলে আসে। কনভেন্টের ফুল গাছেই শুকিয়ে ঝরে যায়।

    ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজতেই, ছাত্র-ছাত্রীরা, কোথায় সবাই এতক্ষণ ছিল জানি না, ছুটে এসে ডানদিকের বকুলগাছের মাঠে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ; ছোটোরা সামনে আর বড়োরা পেছনে, পাঁচটা সারি। একজন সিসটার, তিনিও ধবধবে সাদা, আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে একটা সারির সামনের দিকে ছোটোদের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে দিলেন আর আমার হাত দুটো নিয়ে হাতজোড় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। সিসটাররা আর ফাদার হিলম্যান আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে মুখ করে ইংরেজিতে গানের মতন করে কথা বলা আরম্ভ করলেন আর ছাত্র-ছাত্রীরা সকলে তাঁদের সঙ্গে সেগুলো বলতে লাগল। প্রতিদিন শুনে-শুনে একসময়ে মুখস্হ হয়ে গেলে আমিও বলতুম, কিন্তু তখন মানে জানতুম না, জানতুম না যে একে বলে প্রেয়ার বা প্রার্থনা। না জেনে যে ঈশ্বরের বন্দনা গান গেয়েছি, জানার পর যাঁর সম্পর্কে আমি আজও কিছুই জানি না, তার প্রার্থনাটা এরকম :-

    আওয়ার ফাদার ইন হেভেন

    হোলি বাই ইয়োর নেম

    ইয়োর কিংডাম কাম

    ইয়োর উইল বি ডান অন আর্থ অ্যাজ ইন হেভেন

    গিভ আস টুডে

    আওয়ার ডেইলি ব্রেড

    অ্যাণ্ড ফরগিভ আস আওয়ার সিনস

    অ্যাজ উই ফরগিভ দোজ

    হু সিন এগেইনস্ট আস

    ডু নট ব্রিং আস টু দি টেস্ট

    বাট ডেলিভার আস ফ্রম ইভিল

    আমেন।

    প্রার্থনা শেষ হতেই সবাই নিজের ক্লাসের দিকে দৌড়োলো। আমাকে একজন সিসটার হাত ধরে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে সেই ঘরে যে সিসটার তখনই এসেছিলেন, তাঁকে কিছু বললেন।

    ‘সিন’ ব্যাপারটা যে কি তা তখন জানতে পারিনি, এখনও জানি না। এখন যা জানি তার নাম গিল্ট।

    স্কুলে আমার ট্র্যানজিশান ক্লাসের শিক্ষিকা ছিলেন সিস্টার আইরিন, আমার প্রথম ক্রাশ, যাঁকে পরে সেকেন্ড স্ট্যাণ্ডার্ডেও পেয়েছিলুম। উনি এসেছিলেন আয়ারল্যাণ্ড থেকে। ফাদার হিলম্যানের মতন উনিও ধবধবে ফর্সা, কিন্তু ওনার মাথা পুরোপুরি ঢাকা, শরীরও শাদা কাপড়ে ঢাকা। ওনার চোখের তারা কালো আর গভীর ছিল, দাঁত ঝকঝকে সাদা, ঠোঁট গোলাপি। প্রথমদিন উনি নিচু হয়ে আমার মুখের কাছে মুখ এনে যা বলেছিলেন তা আমি বুঝতে পারিনি ; মনে আছে সিসটার আইরিনের চোখের তারায় আমার প্রতিচ্ছবি। উনি কয়েকটা পুস্তিকা আর একটি বই দিলেন, সবই ব্রিটেনে ছাপা, কার্ডও দিলেন একগোছা। মনে আছে, সেগুলো ছিল যিশুখ্রিস্টের, মাদার মেরির আর সান্টাক্লজের। বইটিতে প্রায় প্রতিটি পাতায় ছবি আঁকা ছিল। অন্য একটা পুস্তিকায় প্রতিটি পাতায় একটা করে ইংরেজি অক্ষর ছিল, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে সবাই সময় কাটাচ্ছিল, সিস্টার আইরিন আমার হাত থেকে পুস্তিকাটা নিয়ে খুলে ইশারায় দেখালেন যে সবাই যা করছে আমিও যেন তাই করি। পাতা উল্টে অক্ষর আর সঙ্গের ছবিগুলো দেখলুম।

    পরে আরেকটা রঙিন পুস্তিকা খুলে সিসটার আইরিন নিজেই শোনাতে লাগলেন, পরের ক্লাসে যাকে নার্সারি রাইম বলে জেনেছি, “হে ডিডল ডিডল, দি ক্যাট অ্যন্ড দি ফিডল, দি কাউ জাম্পড ওভার দি মুন, দি লিটল ডগ লাফড টু সি সাচ স্পোর্ট, অ্যান্ড দি ডিশ র‌্যান অ্যাওয়ে উইথ দি স্পুন।” আরেকটা, “পিটার পিটার পাপ্মকিন ইটার, হ্যাড এ ওয়াইফ অ্যাণ্ড কুড নট কিপ হার, হি পুট হার ইন এ পাম্পকিন শেল, অ্যাণ্ড দেয়ার হি কেপ্ট হার ভেরি ওয়েল।” এই দুটো আমার মনে থাকার কারণ পরের ক্লাসেও এগুলো সবাই মিলে আবৃত্তি করতে হয়েছে, অভিনয় করে, আর তিন দশক পরে আমার মেয়েকে যখন এই স্কুলে ভর্তি করি, তখন তাকেও একই নার্সারি রাইম মুখস্হ করতে হয়েছে, অথচ ততদিনে পুরো স্কুলে কেরালিয় সিসটারদের নিয়ন্ত্রণ, বিদেশিনী কেউ নেই। পরের ক্লাসে এবিসিডি শিখতে হয়েছিল গেয়ে গেয়ে। ওয়ান টু থ্রি ফোরও গেয়ে। একটা নার্সারি রাইম মনে আছে, যেটা পরেও কাজে লাগত, “থার্টি ডেজ হ্যাথ সেপ্টেম্বর, এপ্রিল জুন অ্যাণ্ড নভেম্বর, থার্টি ওয়ান দি আদার্স ডেট, এক্সেপ্ট ইন ফেব্রুয়ারি টোয়েন্টি এইট, বাট ইন লিপ ইয়ার উই অ্যাসাইন, ফেব্রুয়ারি টোয়েন্টি নাইন।” তখন এগুলোর মানেই বুঝতে পারতুম না। নার্সারি রাইমের ছন্দ মনের ভেতরে বিরক্তির বীজ হয়ে থেকে গিয়েছিল, যে কারণে কবিতা লিখতে আরম্ভ করে ছন্দ ব্যাপারটাকে পছন্দ হতো না। দাদা শিখিয়েছিল গুণে-গুণে পয়ার ছন্দে লেখার কায়দা, কিন্তু তাতে আমি স্পিড বা গতি খুঁজে পাইনি।

    বাংলা “আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি, যদুমাস্টার শশুর বাড়ি, রেলকম ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম”, আমার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনেরা মাটিতে হাঁটুমুড়ে বসে খেলতো, হাঁটুতে চাপড় মেরেমেরে, এক একটা হাঁটু আউট হয়ে গেলে যার হাঁটু বাঁচতো সে জিতে যেতো। সেরকমই, “ঝাঁকড়া চুলে তালগাছ তুই দাঁড়িয়ে কেন ভাই, আমার মতো পড়া কি তোর মুখস্হ হয় নাই, দাঁড়িয়ে আছিস কান ধরে ঠায়, একটুখানি ঘুমায় না তোর পণ্ডিত মশাই”, এটাও ছিল ওদের খেলা, কে এক পায়ে কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যে সবচেয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো সে জিতে যেতো। এগুলো তাই আমার কখনও নার্সারি রাইম মনে হয়নি।

    কনভেন্ট স্কুলে, টিফিনের সময় গেটের কাছে ছোট্ট দরোজা দিয়ে রামখেলাওন আমাকে টিফিনকৌটো এগিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করল, “ইংরেজিতে কথা বলতে শিখে গেছেন তো, এবার থেকে আমার বাড়িতে টাকা পাঠাবার মানি অর্ডার আপনি ভরে দেবেন। ” আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়েছিলুম। স্কুলে টিফিন খাবার হলঘরে ঢুকে খালি জায়গা দেখে খেতে আরম্ভ করেছিলুম ; অন্য ছাত্ররা প্রায় সবাই ইংরেজিতে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একটা মেয়ে আমার পাশে এসে বসে ফিসফিসিয়ে বলল, হিন্দিতে, ও ইংরেজি বলতে পারে না, এমন করে হিন্দিতে কথাগুলো বলল, যে মনে হল বাঙালি, আমি বাঙলাতেই জিগ্যেস করলুম, “তোর নাম কী”। হাসি ফুটল ওর মুখে, ওর নাম নন্দিতা, ন্যানডি। আমিও আমার নাম বললুম। ন্যানডি বলেছিল, “ওঃ, তোর নাম ময়লা !” ফিসফিসিয়ে কথা বলার সম্পর্ক তৈরি হল আমাদের। এই সম্পর্ক বহুদিন বজায় ছিল, তার কারণ নন্দিতাও কনভেন্ট ছেড়ে আমার সঙ্গেই রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে ভর্তি হয়েছিল। সেখানে গিয়ে আমাকে ময়লা নামে ডাকার ফলে বেশ কয়েকজন সহপাঠী ময়লা বলে ডাকতো। ধনী পরিবারের ছিল নন্দিতা, হাইকোর্টের জজ ছিলেন ওর ঠাকুর্দা, টিফিনে আনতো অমলেট-টোস্ট আর স্যালাড, প্রতিদিন, তাই আমার আলুছেঁচকি বা আলুপটল বা টমেটো-কুমড়োর সঙ্গে রুটি ওর খেতে ভালো লাগত, যেমন আমার লাগত ওর অমলেট-টোস্ট-স্যালাড। আমরা দুজনে কনভেন্ট ছেড়েছিলুম আর রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি হয়েছিলুম একই কারণে, ভারত স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল আর আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, ইংরেজির দাপটে আমাদের জিভ থেকে খসে-খসে ভুল পথে চলে যাচ্ছিল।

    টিফিনের পরের ক্লাসে ফাদার হিলম্যান এসে আমাদের নিয়ে চললেন স্কুল সংলগ্ন গীর্জায়, বাইবেল ক্লাস করার জন্য। গীর্জার ছাদ অনেক উঁচু, বিরাট হলঘর, দুপাশে বসার বেঞ্চ আর সামনে টেবিল, চারিদিকের দেয়ালে সন্তদের ছবি, তাদের সকলের মাথার পেছনে গোল জ্যোতি, আরও ওপরে, রঙিন কাঁচ দিয়ে তৈরি ভেড়া, দাড়িওলা মানুষ, ঘোমটা-দেয়া বউ, আরও নানা রঙের নকশা। একেবারে সামনে একজন মানুষের মূর্তি, তার হাতে পেরেক মেরে আর দুই পা জোড়া করে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দেখে, সবচেয়ে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, এই ভাবে হাতে-পায়ে পেরেক ঠুকে কি একজন মানুষকে ঝুলিয়ে রাখা যায়, লোকটা কি খসে পড়বে না, লোকটা তো কাঠের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা নেই !

    ফাদার হিলম্যান একবার ইংরেজিতে, আরেকবার হিন্দিতে বুঝিয়ে বললেন যে যাঁকে অমনভাবে দেখা যাচ্ছে তাঁর নাম জিজাস খ্রাইস্ট, আর তার গল্প, তার বলা কথাগুলো, তিনি প্রতিদিন আমাদের শোনাবেন। যে কাঠে ওনাকে বিঁধে রাখা হয়েছে তার নাম ক্রস। আমাদের বললেন, হাতজোড় করে এক বুড়ো আঙুলের ওপর আরেক বুড়ো আঙুল রেখে ক্রস তৈরি করে টেবিলের ওপরে রেখে ওনার গল্প শুনতে। উনি একথাও বললেন যে টিফিনের পর সকলেরই একটু ঘুম পায়, তাই এই বাইবেলের গল্পের ক্লাস, ঘুম পেলেও ক্ষতি নেই। তারপর ওপরে রঙিন কাচে গড়া সন্তদের নাম বললেন ; প্রতিদিন বলতেন বলে মনে রয়ে গেছে, আরও মনে থেকে গেছে এইজন্য যে পাড়ার শিয়া মুসলমান পরিবারের মেয়ে কুলসুম আপাকে যখন কনভেন্ট স্কুলের আর সন্তদের বিষয়ে গল্প করেছিলুম, তখন উনি বলেছিলেন যে ওই সন্তরা ইসলাম ধর্মেও আছে, কিন্তু নামগুলো উচ্চারণ করা হয় আরবিতে, যেমন এনোখ হল ইদ্রিস, নোয়া হল নুহ, অ্যাব্রাহাম হল ইব্রাহিম, জেকব হল ইয়াকুব, অ্যারন হল হারুন, মোজেস হল মুসা, ডেভিড হল দাউদ, জোনা হল ইউনুস, জন হল ইয়াহায়া, জিজাস খ্রাইস্ট হল ইসা মসিহ। বেশ ভালো লেগেছিল শুনে, কনভেন্ট আমার আর কুলসুম আপাদের বাড়ির মাঝে সেতুবন্ধনের কাজ করেছে যেন।

    পরে আজব লাগত যে জেকব লোকটার নামেই পাকিস্তানের ইয়াকুব খান, জন লোকটার নামে পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান। ডেভিড লোকটার নামে মাফিয়া-নেতা দাউদ ইব্রাহিম। ফাদার হিলম্যান এসব গল্প জেনে যেতে পারলেন না। দাউদ ইব্রাহিম দাঙ্গা, ডাকাতি, র‌্যানসাম, হুমকি, চোরাচালান করেও হিরো, ফিলমের পর ফিলম হয়ে চলেছে, খবরের কাগজের পাতা জুড়ে, টিভির পর্দাজুড়ে তাকে নিয়ে হইহই রইরই, আর গরিবগুলো দুটো রুটি চুরি করলেই প্যাদানির নাম গঙ্গারাম, লকআপে মৃত্যু। আসলে নিজের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা খিদে প্রকাশ করার জন্যে শিক্ষা দরকার, চাকরি না পেলেও ক্ষতি নেই, যেমন দাউদ ইব্রাহিম, যৎসামান্য শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে পোঁদে বাঁশ করে দিতে পেরেছে। মানুষ “শব্দ” আবিষ্কার করেছে মৃত্যুদণ্ড লেখার জন্য ; তারপর মৃত্যুদণ্ড লিখে কলমের নিব ভেঙে ফেলার খেলা, এদিকে কলম কবেই তামাদি হয়ে গেছে, টিকে আছে কেবল মৃত্যুদণ্ড লেখার জন্য।

    সতেরো

    কুলসুম আপার গভীর প্রভাব থেকে গেছে আমার জীবনে ; কবিতার জগতে প্রবেশ ওনার মাধ্যমেই। কনভেন্টের গির্জায় গাওয়া গান যেমন শৈশবে বুঝতে পারতুম না, অথচ শুনতে ভালো লাগতো, তেমনি কুলসুম আপার বলা কবিতা বুঝতে পারতুম না, অথচ ওনার গলায় শুনতে ভালো লাগত। রামখেলাওন সিং ডাবর রহিম, দাদু, কবীরের কিছু-কিছু দোহা জানত আর আমাদের শাসন করার জন্য সেগুলো সময়মতন বলত ; শিউনন্দন কাহার বা শিউনন্নি নামে বাড়ির কাজের লোক তুলসীদাসের রামচরিতমানস মুখস্হ বলতে পারত, শিউনন্দনও রামচরিতমানস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শাসন করত আমাদের। শিউনন্নি বজরংবলীর ভক্ত ছিল, বিয়ে করেনি, পাড়ার আখাড়ায় গিয়ে কুস্তি লড়ত, মুগুর ভাঁজত, চেহারা ছিল কুস্তিগীরের, অনেক বয়সে বিয়ে করেছিল, যাকে বিয়ে করেছিল তার দুটো বাচ্চা ছিল আগের পক্ষের। শিউনন্নি আমাকে ওর কুস্তি লড়ার আখাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল আমার বয়সীদের সঙ্গে কুস্তি লড়ে স্বাস্হ ফেরাবার জন্য, কেননা আমি রোগাটে ছিলুম। কুস্তি শেখার ড্রেস, মানে ল্যাঙোট, মায়ের কাছ থেকে দাম চেয়ে নিয়ে কিনে এনেছিল শিউনন্নি। ল্যাঙোট পরা বেশ কঠিন ছিল ওই বয়সে, কয়েকবার পেছনে নিয়ে গিয়ে সামনে এনে বাঁধতে হয়। কুস্তি শিখতে অসুবিধা ছিল না, অসুবিধা হতো কুস্তির আখাড়ার গেরুমাটি গা থেকে ধুয়ে তোলবার জন্য রাস্তার কলে গিয়ে স্নান করার, পাড়ার বউদের জল ভরা হয়ে গেলে তারপর আমার পালা, যদিও শিউনন্নি আমাকে কলের তলায় ঠেলে দিত যাতে স্নানটা সেরে ফেলতে পারি। কয়েকটা রবিবারের পরই পালোয়ান হবার উচ্চাকাঙ্খা ছেড়ে দিতে হলো। কুস্তির প্যাঁচ কাজে দিত যখন পাড়ার কারোর সঙ্গে লাট্টু বা গুলি খেলা নিয়ে বচসা আরম্ভ হতো।

    সাঁতারও পুরো শেখা হয়ে ওঠেনি আমার। মামার বাড়িতে দাদা যখন ছিল, ১৯৫১ সালে,একবার পুকুরে শেখানোর চেষ্টা করেছিল, পুরো শেখার আগেই পাটনা ফিরতে হয়েছিল। দাদা মামার বাড়ি ছেড়ে উত্তরপাড়ায় থাকতে চলে গেলে, ১৯৫৩ সালে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে শেখানোর চেষ্টা করেছিল, তা সত্ত্বেও শেখা হয়ে ওঠেনি। আরেকটু হলে তলিয়ে যাচ্ছিলুম, তাই।

    ডাবর আর শিউনন্নির উদ্ধৃতি শুনতুম, কিন্তু পরোয়া করতুম না, কিন্তু গালে টোল ফেলে কুলসুম আপার কবিতা বলায় এমন আবহ গড়ে উঠত যেন উনি কবিতার মধ্যে দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়ে চলেছেন। ফয়েজ আহমদ ফয়েজ আর গালিব ছিল ওনার প্রিয় কবি। কুলসুম আপা ইশতিমালিয়তের কথা বলতেন, যা পরে জেনেছিলুম, সাম্যবাদ ; ইশতিরাকিয়াতের কথা বলতেন, যা পরে জেনেছিলুম, সমাজবাদ ; মাসাওয়াতের কথা বলতেন যা পরে জেনেছিলুম সকল মানুষকে সমান মনে করা। ওনাদের পরিবারের কারণেই ইমলিতলা পাড়ায় দেশভাগের দাঙ্গার কোনো প্রভাব পড়েনি। স্কুল থেকে পাওয়া দুটো কার্ড উনি চেয়ে নিয়েছিলেন, একটা মুসার অন্যটা ইসা মসির।

    কুলসুম আপার স্মৃতি জেগে উঠলেই ফয়েজের এই বিখ্যাত কবিতাটা মনে পড়ে যায়, যদিও কুলসুম আপা বেশির ভাগ প্রেমের কবিতা শোনাতেন :

    “মাতা-এ-লৌহ-ও-কলম ছিন গয়ি তো ক্যা গম হ্যায়

    কি খুন-এ-দিল মেঁ ডুবো লি হ্যায় উংগলিয়া ম্যায়নে

    জুবাঁ পে মোহর লগি হ্যায় তো ক্যা, কি রখ দি হ্যায়

    হর ইক হলকা-এ-জঞ্জির মেঁ জুবাঁ ম্যায়নে”

    যৌনতা ও স্পন্দিত ছোঁয়ার মাধ্যমে একজন কৌতূহলী বালকের মর্মে কবিতার গভীর ছাপ রেখে দেবার প্রথম শিক্ষাও কুলসুম আপার কাছে পেয়েছিলুম, আর বহুকাল পরে, তাঁর স্মৃতিতে, তাঁর খোঁজে ইমলিতলা পাড়ায় গিয়ে তাঁকে না পেয়ে, লিখেছিলুম এই কবিতাটা, “প্রথম প্রেম : ফয়েজ আহমদ ফয়েজ” শিরোনামে। কবিতাটার প্রথম লাইনটা মনে ছিল, এতোবার উনি শুনিয়েছিলেন, লেখার সময়ে ফয়েজের সংকলন থেকে বাকি অংশটা সংগ্রহ করেছিলুম :-

    গরমের ছুটিতে খালি-গায়ে যখন নাজিমদের বাড়িতে

    লুডো খেলতে যাই, কুলসুম আপা রাস্তা পেরোবার ঢঙে

    বাঁদিক-ডানদিক তাকিয়ে দুহাতে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দ্যান

    আমার অন্ধকার স্যাঁতসেতে ঘরে এক হ্যাঁচকায় টেনে নিয়ে।

    আমি বলি, ‘ভোজপুরি বলবেন, আমি উর্দু বুঝতে পারি না। ’

    উনি বলেন, ‘তুই চোখ বোজ, তাহলেই বুঝতে পারবি,

    এ তো খুব সহজ রে। ’ আমি চোখ বুজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি

    একগাদা হাঁসমুর্গির মাঝে।

    কুলসুম আপা বলেন, ‘মুঝে দে দে রসিলে হোঁঠ, মাসুমানা

    পেশানি, হসিঁ আঁখেঁ কে ম্যায় একবার ফির রঙ্গিনিয়োঁ মেঁ

    গর্ক হো জাউঁ…’

    আমি বলি, ‘ধ্যাৎ, কী করছেন কী, আমার লজ্জা করে।’

    উনি ওনার কালো মোটা ঠোঁটে বলতে থাকেন, ‘মেরি হস্তিকো

    তেরি ইক নজর আগোশ মেঁ লে লে হমেশা কে লিয়ে

    ইস দাম মেঁ মহফুজ হো জাউঁ জিয়া-এ হুস্ন সে জুল্মত-এ দুনিয়া

    মেঁ ফির না আউঁ…’

    আমি বলি, ‘আঃ, ছাড়ুন না, এরকম করছেন কেন আপা ?’

    উনি বলেন, ‘গুজিশতাঁ হসরতোঁ কে দাগ মেরে দিল সে

    ধুল জায়েঁ…’

    আমি বলি, ‘ না না না…’

    আপা ওনার ঘুমন্ত কন্ঠস্বরে, ‘ম্যায় আনে ওয়ালে গম কি

    ফিকর সে আজাদ হো জাউঁ মেরে মাজি ও মুস্তকবিল সরাসর

    মাভ হো যায়েঁ মুঝে ওয়হ ইক নজর, ইক জাভেদানিসি

    নজর দে দে। ’

    আমি বললুম, ‘রোজ রোজ এরকম করেন কেন ?’

    উনি বললেন, ‘তবে যে তুই বলছিলিস উর্দু বুঝতে পারিস না !’

    এখন জানি পেশানি মানে কপাল, গর্ক মানে ডুবে যাওয়া, রঙ্গিনিয়োঁ মানে অলঙ্কৃত, হস্তি মানে অস্তিত্ব, আগোশ মানে আলিঙ্গন, দাম মানে ফাঁদ, মহফুজ মানে সঞ্চিত, জিয়া-এ-হুস্ন মানে সৌন্দর্য্যের আলো, জুল্মত-এ-দুনিয়া মানে অত্যাচারী জগত, গুজিশ্তা মানে অতীত, হসরতে মানে দুঃখ প্রকাশ, মুস্তকবিল মানে ভবিষ্যত, মাভ মানে মুগ্ধতা, সরাসর মানে পুরোপুরি, জাভেদানি মানে অনন্তকালীন। কবিতা কিন্তু তখনও আমাকে আকৃষ্ট করেনি, আকৃষ্ট করেছিল কুলসুম আপার বড়ো-বড়ো চোখ, গালের টোল আর বুকের দেহতাপ। কবিতা বলতে বাড়িতে সকলের ধারণা ছিল গান। কবিতার কোনো বই ছিল না ইমলিতলার বাড়িতে, বস্তুত কোনো বইই ছিল না। উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে ফারসি আর সংস্কৃতভাষার বই ছিল, ঠাকুর্দার সময়কার। ঠাকুর্দার আগের পূর্বজদের তালপাতায় লেখে পুঁথি ছিল, আমাদের ইতিহাসবোধ না থাকায়, সেগুলো উত্তরপাড়া থেকে পাটনায় নিয়ে আসিনি, শরিকরা গেঁড়িয়ে বেচে দিয়া থাকবে।

    কুলসুম আপাদের বাড়িতে রাস্তার সামনে বিড়ি-সিগারেটের যে ঘুপচি দোকানঘর ছিল, সেখানে বসে পরিবারের সবাই বিড়ি বাঁধত। আমার বিড়ি বাঁধার শিক্ষাও ওনাদের পাশে বসে ওই ঘরে। আরেকটা ব্যাপার জেনেছিলুম, ওনাদের দোকানের ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো একটা মন্দিরের ছবি, আমি একদিন বলেছিলুম, তোমরা তো মুসলমান, মন্দিরের ছবি টাঙিয়েছ কেন ? কুলসুম আপার আব্বু বলেছিলেন, ওটা মন্দির নয়, ওটা আমাদের তীর্থক্ষেত্র কারবালা, পয়গম্বরের নাতি ইমাম হোসেনের সমাধি, যেমন তোদের কাশি। কুলসুম আপার দাদা মানে ঠাকুর্দা ওই তীর্থ করতে গিয়ে ছবিটা এনেছিলেন, নজাফ নামে একটা তীর্থ থেকে কারবালা পর্যন্ত তিরিশ ক্রোশ, মানে ষাট মাইল, হাঁটতে হয়েছিল, হাজার-হাজার তীর্থযাত্রীর সঙ্গে, রাতে রাস্তার ধারে ঘুমোতো সবাই। আরেকটা ছিল ফ্রেমে বাঁধানো সোনালী রঙের টিনের ডানাঅলা উড়ন্ত ঘোড়া, যার মুখটা মেয়েদের মতন ; ঘোড়াটার নাম ওনারা বলেছিলেন বুরাক, যাতে চেপে পয়গম্বর মক্কায় গিয়েছিলেন।

    কুলসুম আপাদের বাড়িতে সময় কাটাতে ভালো লাগত তার কারণ আমাদের বাড়িতে দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো, ওনার নিজের বন্ধুদের দল ছিল, বাঙালিদের পাড়া কদমকুঁয়ায়। মেজদা আমার চেয়ে তিন বছরের বড়ো, পাড়ার যে-সব ছেলেদের বখাটে বলে মনে করা হতো, মেজদার বন্ধু ছিল তারা, আমাকে তাই মেজদা পাত্তা দিত না। বড়োজ্যাঠার দুই মেয়ে আমার চেয়ে অনেক বড়ো, তাঁরা বিয়ে হয়ে শশুরবাড়ি চলে গিয়েছিলেন। অন্য বোনেরা সকলেই আমার চেয়ে বেশ ছোটো, ওরা নিজেদের মেয়েলি খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। বাড়িতে নিঃসঙ্গতা কাটাবার জন্য পাড়ার সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে চোর-পুলিশ, গুলি বা লাট্টু বা ড্যাঙগুলি খেলতুম কখনও-সখনও। গু আর পাঁকের নর্দমায় লাট্টু বা গুলি পড়ে গেলে তুলে নিয়ে কলের জলে ধুয়ে নিতুম, অনেক সময়ে জাঠতুতো বা খুড়তুতো বোনেরা দেখে ফেললে বড়োজেঠিমাকে নালিশ করতো আর শুদ্ধ হবার জন্যে আমাকে সন্ধ্যাবেলায় ঠাণ্ডাজলে চান করতে হতো।

    মনে পড়ছে, কুলসুম আপার সঙ্গে আমার যৌন সম্পর্কের কথা কেবল ঠাকুমাকে বলেছিলুম কেননা কেবল ওনার সঙ্গেই গোপন ব্যাপার শেয়ার করতে পারতুম। শুনে উনি বলেছিলেন, জীবনে আর কখনও একথা কাউকে বলিসনি, আমাকে বলেছিস বলেছিস, আর কারো কানে যেন না যায়। খেমির কথা চেপে গিয়েছিলুম ওনার কাছে, কেননা খেমির বেলায় কোনো অপরাধবোধ ছিল না। প্রথম রোমান্টিক প্রেমিকার বেলাতেও অপরাধবোধ ছিল না, তবুও ঠাকুমাকে বলিনি।

    আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে। পাঁচ বছর বয়সে মা আমাকে ইমলিতলার একটা ঘরে শেকল তুলে বিকেল থেকে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন, তার কারণ পাড়ায় আমাকে তাড়ি খাইয়ে দিয়েছিল, ‘পি লে পি লে, কুছ না হোতউ’ বলে। ইমলিতলার অন্য বিহারি বাচ্চাদের সঙ্গে আমিও দু-ঢোঁক খেয়েছিলুম, আর তাড়ির গন্ধে ধরা পড়ে গিয়েছিলুম। তাড়ি খাবার জন্য মা শাস্তি দেননি, দিয়েছিলেন যাতে আমি মেজদার মতন কুসঙ্গে পড়ে কুপথে না যাই। ইমলিতলায় বিজলিবাতি ছিল না। অন্ধকার ঘরে রাত দশটা পর্যন্ত একা বসেছিলুম এক কোণে। বাবা রাতে কাজ থেকে ফিরলে শেকল খোলা হয়েছিল। হয়তো এই ঘটনার আর এই রকম আরও কিছু ঘটনার চাপে আমি ক্রমশ অমিশুকে, হিন্দু-নাস্তিক, অন্তর্মুখ, অন্তেবাসী, সীমালঙ্ঘনকারী, দ্রোহী হয়ে গিয়ে থাকব ; গ্রন্হকীট হয়ে গিয়ে থাকব। আত্মসন্ত্রস্ত থাকার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বীজ পোঁতা হয়ে গিয়ে থাকবে মনের ভেতরে।

    ক্যাথলিক স্কুলে ফিরি। একদিন ক্লাসের সবাইকে রাস্তার অন্য পারে একটা বাগানে নিয়ে যাওয়া হল, সেটার নাম ফার্ম, সেখানে দেখলুম সাদা রঙের শুয়োরদের লোহার জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে একটা জায়গায়, তার আগে আমি সাদা রঙের শুয়োর দেখিনি, বাচ্চা শুয়োর যাদের আস্ত পুড়িয়ে ‘সাকলিং পিগ’ রান্না হয় ক্রিস্টানদের ভোজে। নন্দিতা বলেছিল, এই শুয়োরগুলো সিসটাররা খায়, এদের গা্য়ে এতো চর্বি যে চোখ বুজে আসছে, এর সসেজ খুব ভালো হয় খেতে, একদিন তোকে খাওয়াব। ইমলিতলায় গঞ্জেড়ি-জমঘটে কালো ছোটো মাপের শুয়োর এনে কানাগলির লোকেরা খায় জানি, পুড়িয়ে খায়, সেগুলোকে দেখে নোংরা লাগত। আমরা বাচ্চা শুয়োরদের সঙ্গে খেলার জন্য একটা আলাদা ঘেরায় ঢুকলুম, বেশ লাগছিল জড়িয়ে ধরতে, নাদুস-নুদুস ফর্সা শুয়োর। দেখলুম বিদেশি গোরু, কখনও দেখিনি আগে এতো বড়ো গোরু, বাঁটও অনেক বড়ো, দুধে ভর্তি মনে হল। তার মানে খাঁটি দুধ খায় সিসটার আইরিন আর ফাদার হিলম্যান ; আমাদের বাড়িতে রাজু গোয়ালা দুধ দিতে আসে যখন, মা ওকে জিগ্যেস করেন, আজকে কতোটা জল মিলিয়েছিস, জল মেলালে নোংরা জল মেলাবি না, কলের পরিষ্কার জল মেলাবি।

    ফার্মে দেখেছিলুম কালো রঙের, প্রায় শকুনের মতন মাথা, ততই বড়ো পাখি, ওড়ে না, জাল দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায়। ন্যানডি বলেছিল, ওগুলো টার্কি পাখি, খ্রিসমাসের বড়োদিনে যে ভোজ হয় তাতে খায়, বেশ নরম আর ভালো খেতে। ফার্মের মুর্গিগুলোও বড়ো মাপের। আমাদের ইমলিতলার বাড়িতে মুর্গির ডিম আর মুর্গি খাওয়া বারণ। নন্দিতার বাড়িতে কিছুই বারণ নয়। ওর টিফিনের দৌলতে প্রায় রোজই মুর্গির ডিমের অমলেট খেয়েছি।

    ফাদার হিলম্যানের কাছে যিশুখ্রিস্টের গল্প শুনে আমি একদিন প্যাকিং বাক্সের দুটো কাঠ পাড় দিয়ে বেঁধে ক্রুসকাঠ বানিয়ে ইমলিতলার সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে পাড়ার গলিতে ঘোরা আরম্ভ করেছিলুম। পছনে যারা অনুসরণ করছিল তারা নিজেরাই “হিপ হিপ হুররে” স্লোগান দেয়া আরম্ভ করল, কেননা পাড়ার ফুটবল দল, কাবাড্ডি দল বা কুস্তিগির জিতলে এই ভাবেই স্লোগান দেয়া হতো। স্লোগান দিতে-দিতে দলবল নিয়ে বিরজুর বাড়ির কাছে পৌঁছোলে দেখলুম ওর মা মুখ গোমড়া করে বসে আছে, অন্যদের মতন আমায় দেখে হাসলেন না, আমি কী হয়েছে জানতে চাইলে বললেন ওনার ছোটো ছেলে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে জেল খাটতে চলে গেছে, ছোলা ভেজে বিক্রি করার মতন কাঠ নেই। আমি ওনাকে ক্রুসকাঠ পিঠ থেকে নামিয়ে দিয়ে দিলুম, উনি জানতে চাইলে যতোটা পারি জিজাস খ্রাইস্টের গল্প বললুম, উনি শুনে বললেন, তুইই আমার ‘জিজুয়া’। স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিনই জিজাসের ‘জুলুস’ বের করতুম দুটো কাঠ দড়ি দিয়ে বেঁধে আর নানা গলি ঘুরে দিয়ে আসতুম বিরজুর মাকে।

    স্ট্যাণ্ডার্ড ফোরে উঠলুম ভারতের স্বাধীনতার সময়ে। কনভেন্টের মাঠে বিশাল সিল্কের ঝাণ্ডা টাঙানো হলো। সবাইকে এক প্যাকেট করে খাবার দেয়া হল। কিন্তু লক্ষ্য করলুম যে ফর্সা-সোনালী চুল ছাত্রীরা নেই, সিস্টার আইরিন আর ফর্সা সিসটাররা নেই, ফাদার হিলম্যানও নেই। বাড়ি ফিরে বাবাকে জিগ্যেস করতে উনি বলেছিলেন যে ওনারা আর ইনডিয়ায় থাকতে চান না, এতো দাঙ্গা আর গণ্ডোগোল হয়েছে আর চলছে, ওনারা নিরাপদ মনে করেননি, নিজেদের দেশে চলে গেছেন। শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কনভেন্টে আর ভালো লাগছিল না। বাবা-মা নির্ণয় নিলেন যে আমার বাংলা কথাবার্তায় বিটকেল ইংরেজি আর পাটনাই হিন্দি বুলি ঢুকে গেছে, আমকে এবার বাংলা মাধ্যম স্কুলে দেয়া হবে, দাদার স্কুলে নয়, দাদার স্কুলে হিন্দি আর ইংরেজিতে পড়ানো হয়। স্বাধীনতার পরের বছর ভর্তি হলুম গিয়ে রামমোহন রায় সেমিনারিতে।

    আঠারো

    বাংলা মাধ্যমের একটাই স্কুল ছিল পাটনায়, রামমোহন রায় সেমিনারি, ভর্তি হয়ে গেলুম। ভর্তির সময় আমার জন্মতারিখের কথা মনে পড়ল বাবা-মার, কেননা এই জন্মতারিখ ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেটে থাকবে। কনভেন্টে ভর্তির সময়ে জন্মদিন নিয়ে ভাবেনি কেউ ; ফাদার হিলম্যান জন্মতারিখ জানতে চেয়েছিলেন, বাবা ওনাকে বলেছিলেন, আমার বড়োছেলের পাঁচ বছর পর ও জন্মেছে, শীতকালে, বোধহয় তখন নভেম্বর মাস। ফাদার হিলম্যান আমার জন্মদিন ধার্য করলেন দোসরা নভেম্বর ১৯৩৯।

    রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হবার সময়ে সেই বছরের পাঁজি খুলে দেখা গেল যে দোসরা নভেম্বর পড়ছে অমাবস্যা, ১৯৩৯-এর বছর নয়, যে বছর ভর্তি হতে গেলুম সেই বছরের পাঁজি দেখে। ২৯ অক্টোবর সব দিক থেকে ভালো পাওয়া গেল, পুরুতমশায় সতীশ ঘোষালও বললেন, এই দিনটা অনেক শুভ। ব্যাস, আমার জন্মদিন ধার্য হয়ে গেল ২৯ অক্টোবর।

    কনভেন্টে ছিলুম স্ট্যাণ্ডার্ড ফোরে। ইংরেজিতে কথা বলতে পারার দরুন রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হয়ে গেলুম ক্লাস সিক্সে, বাংলা মিডিয়ামে। বড়ো হয়ে গিয়েছিলুম বলে ডাবরকে পৌঁছে দেবার আর নিয়ে আসার কর্তব্য থেকে মুক্তি দেয়া হল। বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় দেড় কিলোমিটার, হেঁটেই যাতায়াত করতে লাগলুম, কী শীত কী বর্ষা। বর্ষাকালে ভিজে-ভিজেই ইশকুলে যেতুম, তখন কিন্তু অমন ভিজলে জ্বর হতো না। জ্বরজারি হবার জন্যেও বোধহয় যৎসামান্য পয়সাকড়ি হওয়া দরকার। এই ইশকুলের কোনো ইউনিফর্ম ছিল না, এখন হয়েছে শুনি। তখন বাড়ির পোশাক পরেই স্কুলে যাওয়া যেতো ; ইচ্ছে হলে ইস্তিরি করা পোশাকে, নয়তো যার যেমন ইচ্ছে। আমার কনভেন্টের পোশাক যতোদিন চলেছিল ততোদিন ওই পোশাকেই যেতুম। ভর্তির সময়ে বাঙালি কেরানিবাবু, যাঁর ছেলে রতন আমাদের ক্লাসে পড়তো, বলেছিলেন, “এই স্কুল অনেক পুরোনো, ১৮৯০ সালে ব্রাহ্মসমাজের স্হাপন করা, ওপরে ওই দুই ছাত্রের ফোটো দেখছো, ওরা ১৯৪২ সালের অগাস্ট ক্রান্তির সময়ে রাজ্যের অ্যাসেমব্লি ভবনে জাতীয় পতাকা টাঙাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যায়, ক্লাস নাইনের উমাকান্ত প্রসাদ সিনহা আর রামানন্দ সিংহ, অমন ডাকাবুকো হতে হবে তোমাকেও।” ইশকুলে যাবার পথে আর ফেরার পথে রাস্তার ইঁটে নটি বয় শু দিয়ে লাথি মেরে-মেরে ডাকাবুকোপনা ফলাতুম।

    এই কেরানিবাবুর সামনে, ১৯৫১ সালে, শাস্তি পেয়ে, ওনার ঘরে, সারাদিন ঠায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল, দেয়ালে হেলান দেবারও অনুমতি ছিল না। এই শাস্তি ছিল আরেক ধরণের ডাকাবুকোভাব দেখাবার ফল। কয়েকজন সহপাঠী ক্লাসের একটি মেয়েকে বিরক্ত করছিল বলে আমি জিওমেট্রি বক্স খুলে কম্পাস হাতে মোকাবিলার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত করে দিয়েছিলুম দুজনকে। ইশকুল ছুটি হয়ে যাবার পর বিভিন্ন ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা চলে গিয়েছিল, সন্ধ্যাও নেমে এসেছিল, শীতের সন্ধ্যায় অন্ধকারও ঘনিয়ে আসছিল, কেরানিবাবু চলে গিয়েছিলেন, একাই দাঁড়িয়েছিলুম, ভয়াবহ একাকীত্বের মাঝে, তারপর হেডমাস্টার ক্ষেত্রমোহন পোদ্দার মশায় স্কুল সংলগ্ন কোয়ার্টার থেকে এসে বাড়ি যাবার অনুমতি দিলেন। কনভেন্টে নানরা কখনও একা বোধ করতে দেননি, যদিও ইংরেজিতে কাজ চালাবার মতন সড়গড় হতে সময় লেগেছিল, তবুও।

    রামমোহন রায় সেমিনারিতে, সবকটা ক্লাসঘরের বাইরে কালো বোর্ডে লেখা ছিল সেটা কোন ভাষার মিডিয়ামের কোন ক্লাস। আমি বাংলা মিডিয়ামের ক্লাস সিক্স বোর্ড দেখে পেছনের দিকে একটা সিটে বসতে যাচ্ছিলুম, একজন সহপাঠী বললে, তুই নতুন এসেছিস বোধহয়, এটা আমার সিট, তুই সামনের বেঞ্চে চলে যা। ক্লাসের দুটি সারিতে মেয়েরা, প্রায় সকলেই শাড়ি পরে, কয়েকজনের বয়স ছেলেদের তুলনায় বেশি। এই স্কুলে ঘণ্টা বাজলে ক্লাস ঘরেই প্রেয়ার আরম্ভ হল, বাংলায় প্রার্থনা, কাউকে হাত জোড় করতে হলো না, বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস ফোর থেকে পড়ছে বলে তাদের মুখস্হ, গাইতে অসুবিধে হলো না, গলা ছেড়ে গাইতে লাগল সবাই, মনে হচ্ছিল স্কুলবাড়িটাই যেন গাইতে আরম্ভ করেছে। এই গান সম্পর্কে পরে আমাকে বোঝান ক্লাস নাইনের নমিতা চক্রবর্তী, যিনি সেসময়ে স্কুলের বাংলা লাইব্রেরির গ্রন্হাগারিকের দায়িত্বও টিফিনের সময় পালন করতেন। জীবনে প্রথমবার, ক্লাস সিক্সে আমি রবীন্দ্রনাথের গান আর কবিতার কথা শুনলুম ওনার কাছে। এখন স্কুলটির দুটো ভাগ হয়ে গেছে, সিনিয়ার আর জুনিয়ার; শুনেছি যে কেবল জুনিয়ার বিভাগেই প্রার্থনাটি সীমিত :-

    আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর। ।

    মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগন মাঝে

    বিশ্বজগত মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে। ।

    গ্রহতারক চন্দ্রপতন ব্যাকুল দ্রুত বেগে

    করিছে পান, করিছে স্নান, অক্ষয় কিরণে। ।

    ধরণী পরে ঝরে নির্ঝর, মোহন মধুশোভা

    ফুলপল্লব-গীতবন্ধ-সুন্দর বরণে। ।

    বহে জীবন রজনীদিন চিরনূতন ধারা

    করুণা তব অবিশ্রাম জন্মে মরণে। ।

    স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি কোমল করে প্রাণ,

    কতো সান্ত্বন করো বর্ষণ সন্তাপ হরণে। ।

    জগতে তব কী মহোৎসব বন্দন করে বিশ্ব

    শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে। ।

    আমার পাশে দাঁড়িয়ে যে ছেলেটা গাইছিল, তার নাম তরুণ শূর, বেঁটে, দোহারা, কালো তেল চুকচুকে চেহারা, গলায় যেন কিছু আটকে আছে বলে মাঝে-মাঝে ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে, তার মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল, তাকে গানটা এতো খটমট কেন, আর গানটার মানে কী, জিগ্যেস করতে, বলেছিল, ওসব জেনে কী করবি, গাইতে হয় গেয়ে যা, এটা পরীক্ষায় আসে না, এটা বেমমোদের গান, রবিবাবুর লেখা।

    —রবিবাবু আবার কে ?

    —রবিবাবু জানিস না ? ওই যিনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন, লম্বা দাড়ি আর চুল।

    বুঝতে পারলুম, স্কুলটা ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত, তাই এই গান। এই প্রার্থনার মাধ্যমে আমি গলা ছেড়ে গান গাইবার সাহসও জুটিয়ে ফেলেছিলুম। আরও দুজন সহপাঠী বারীন গুপ্ত আর সুবর্ণ উপাধ্যায়, আমরা চারজন মিলে দরিয়াপুরের ফাঁকা বাড়িতে একসঙ্গে জড়ো হলে বাংলা হিন্দি গানের আসর বসিয়ে ফেলতুম। কিন্তু বড়োজ্যাঠা আর ঠাকুমা যদি জানতে পারেন যে আমি বেমমোদের স্কুলে ভর্তি হয়েছি, রবিবাবুর গান গাইছি, তাহলে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে স্নান করাবেন, বাবাকেও নির্ঘাত গঙ্গাস্নান করাবেন, নতুন পৈতে পরাবেন।

    ইমলিতলার বাড়িতে, পাটনায়, উত্তরপাড়ার বসতবাটিতে আর মামার বাড়ি পাণিহাটিতে, রবিঠাকুর নিষিদ্ধ ছিলেন ; তাঁর লেখা আর গানের প্রবেশাধিকার ছিলনা বাড়িতে। পাটনা আর উত্তরপাড়ায়, ঠাকুমা আর বড়োজ্যাঠা-জেঠিমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সাহস বয়স্কদেরও ছিল না। রবিঠাকুর লোকটি যে ঠিক কে, আর কেনই বা তাঁর নাম বা কাজ মুখে আনা যাবে না সে কৌতূহল নিরসনের প্রয়াস বড়োরাও করতেন না।

    রবিবাবু লোকটিই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তা আমরা ভাইবোনরা, ইমলিতলায় টের পাই, আমি এই ব্রাহ্ম স্কুলে ভর্তি হবার দরুণ। রবিবাবুদের সম্পর্কে উষ্মার বীজ দাদু-ঠাকুমা বয়ে এনেছিলেন রাওলপিণ্ডি লাহোর কোয়েটা কোনো এক শহর থেকে। প্রথম আভাস মেলে একটি গানকে কেন্দ্র করে। বড়দি-ছোড়দি পণ্ডিত বুলাকিলালের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতেন। বড়োজেঠিমা সংক্রান্তির দিন ইমলিতলার বাড়িতে সত্যনারায়ণের পুজো করতেন আর সেই উপলক্ষে ব্রাহ্মণ সমাবেশ হতো। পুরুতমশায় সতীশ ঘোষালের চাঁদ সদাগর হিতোপোদেশ শেষ হলে দিদিরা ঈশ্বর বন্দনার গান গাইতেন, ব্রজভাষা বা হিন্দি বা সংস্কৃতে। পুরুতমশায়ের অনুরোধে পণ্ডিত বুলাকিলাল একটা বাংলা ঠুংরি, সিন্ধু ভৈরবী রাগিনীতে, শিখিয়েছিলেন ছোড়দি সাবিত্রীকে। ছোড়দি সেতার বাজিয়ে গেয়েছিলেন, সঙ্গতে পণ্ডিতজি:-

    কে ভুলালে হায়

    কল্পনাকে সত্য করি জান, এ কি দায়,

    আপনি গড়হ যাকে

    যে তোমার বশে তাঁকে

    কেমনে ঈশ্বর ডাকে কর অভিপ্রায় ?

    কখনো ভূষণ দেও, কখনো আহার ;

    ক্ষণেকে স্হাপহ, ক্ষণেকে করহ সংহার।

    প্রভূ বলি মান যারে, সন্মুখে নাচাও তারে–

    হেন ভুল এ সংসারে দেখেছ কোথায় ?

    গান শেষ হলে বড়োজ্যাঠা আর পুরুতমশায় দুজনেই দুষলেন পণ্ডিতজিকে, অমন ম্লেচ্ছ গান শেখাবার জন্য। পণ্ডিতজি তর্ক দিয়েছিলেন যে শহরের বহু গণ্যমান্য পরিবারে তিনি এই গান শিখিয়েছেন। তাঁকে জানানো হয়েছিল যে তারা ম্লেচ্ছ। ইমলিতলা পাড়ার কাউকে কিন্তু কখনও ম্লেচ্ছ তকমা দেয়া হতো না। গানটা ভুলেই যেতুম, যদি না রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হতুম। এই স্কুলে প্রতিবছর ভাদ্রোৎসব হতো, কোনও এক রবিবারে, ছাত্রছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকারা নৃত্যগীত ও নাটকের সন্ধ্যানুষ্ঠানে অংশ নিতেন, এবং অভিভাবকদের বলা হতো সেই অনুষ্ঠান দেখার জন্য। আমাদের বাড়ি থেকে মা-কাকিমারা আর বড়দি-ছোড়দি ছিলেন দর্শকাসনে। তাঁদের স্তম্ভিত আর আনন্দিত করে এই গানটি গেয়ে অনুষ্ঠানের সূত্রপাত হয়েছিল। ক্ষেত্রমোহন পোদ্দার যতকাল হেডমাস্টার বা প্রিন্সিপাল ছিলেন, ততদিন এই অনুষ্ঠান হতো ; তাঁর অবসরের পর, হিন্দিভাষীদের সংখ্যাধিক্যে, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বসন্ত উৎসব।

    পুরুতমশায়-বড়োজ্যাঠার গানটি সম্পর্কে উষ্মার কারণ জানতে পারি বাবাকে জিগ্যেস করে। দাদু-ঠাকুমা যে-সময়ে লাহোর ইত্যাদি অঞ্চলে ট্যুর করে বেড়াচ্ছেন, সে-সময়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক নবীনচন্দ্র রায়ও ওই অঞ্চলে প্রচারে গিয়েছিলেন, এবং তাঁর মতাদর্শ, দাদু ও আরও কয়েকজন, বাঙালি ও পাঞ্জাবি, মেনে নিতে পারেননি। দাদু-ঠাকুমা নিজেদের গোঁড়ামি চাউর করে দিতে পেরেছিলেন বড়োজ্যাঠার মনে, আর বড়োজেঠিমা তো এসেইছিলেন পুরুতবাড়ি থেকে।

    আমার শৈশবে পাটনার অধিকাংশ বাঙালি এলিট পরিবার ছিলেন ব্রাহ্ম, আদিধর্মের ব্রাহ্ম। পণ্ডিত নবীনচন্দ্র রায় সেই অংশেরই প্রতিনিধি ছিলেন। দাদু যখন আপার ইনডিয়ায় ছিলেন, তখনই পাঞ্জাব হাইকোর্ট আর ব্রিটেনের প্রিভি কাউন্সিল রায় দিয়েছিল যে আদি ধর্মের বা ‘আনুষ্ঠানিক’ ব্রাহ্মরা হিন্দু নয়। কেশবচন্দ্র সেনের নববিধান ব্রাহ্মরা ছিলেন ‘আনুষ্ঠানিক’। প্রথমত, একান্নবর্তী পরিবারের গৃহকর্তা ও কর্ত্রীর ধার্মিক গোঁড়ামি এবং দ্বিতীয়ত বাঙালি এলিটসমাজ থেকে দূরত্বের কারণে, টুকরো হতে থাকা যাবতীয় ব্রাহ্মদের ‘বেমমো’ তকমা দিয়ে পরিত্যাজ্য করে দিয়েছিল ইমলিতলার বাড়ি। রামমোহন রায়ের লেখা ব্রহ্মসঙ্গীত সম্পর্কে সেকারণেই উষ্মা। ‘বেমমোদের’ হেয় করার বীজ আমার মাও এনেছিলেন পাণিহাটির ওনার মামার বাড়ি থেকে। তার কারণ সেকালের স্নাতকোত্তর, মায়ের মামারা বা আমার দাদুরা, ব্রাহ্মদের বিরোধীতা করতেন, কারণ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বিরোধিতা করে ব্রাহ্মসমাজের প্রায় প্রতিটি ট্রাস্টি ইংলণ্ডেশ্বরকে সমর্থন করে বিদ্রোহী সেপাইদের কড়া শাস্তি দাবি করেছিলেন ; ১৮৭১ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁরা প্রথমে ব্রাহ্ম, তারপর ভারতীয়। ১৮৭২এর ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী একজন ব্রাহ্মকে লিখে দিতে হয় যে, “আমি হিন্দু বা মুসলিম বা খ্রিস্টান বা ইহুদি নই। ” মায়ের মামার বাড়ির লাইব্রেরিঘরে উনিশ শতকের মনীষীদের ছবি টাঙানো থাকতো, কিন্তু নোবেল প্রাইজ পাবার পরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি টাঙানো হয়নি। মায়ের বড়োমামা অনাদিনাথ চট্টোপাধ্যায় বলতেন যে, “রবিবাবু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিকৃত করেছেন” ; যতোদিন তিনি বেঁচেছিলেন, ওই বাড়িতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের কদর হয়নি।

    বাবা দরিয়াপুরে চলে আসার পর, কালক্রমে কাকারা কোতরঙ আর উত্তরপাড়ায় চলে যাবার পর, মেজো জেঠিমাও তখন মারা গেছেন, ইমলিতলার বাড়ি প্রায় ভুতুড়ে হয়ে গিয়েছিল বলে বড়োজ্যাঠা আর জেঠিমা দিদিদের বাড়িতে থাকতে চলে গিয়েছিলেন। দিদিদের বাড়িতে প্রায়ই গানের আসর বসত। ক্লাস নাইনের পর আমি বড়ো একটা যেতুম না, ভাইফোঁটা ছাড়া। কেননা গেলেই দিদিরা বলতেন, তোর বিষয়ে অনেককথা কানে আসছে। বড়োজেঠিমা বলতেন, কুপথে যেওনি বাপু।

    একবার বড়োজ্যাঠা দিদিদের বাড়িতে ওনার পরিচিতদের ডেকেছিলেন সত্যনারায়ণ পুজোর সান্ধ্যবাসরে। গিয়ে দেখি হলঘরে কার্পেটে বসে গান গাইছে বড়ো ভাগ্নি মঞ্জু, ওর সামনে ‘গীতবিতান’ খোলা, ছোড়দি সেতার বাজাচ্ছেন, হারমোনিয়ামে বড়দি আর তবলায় সঙ্গত দিচ্ছেন বৃদ্ধ বুলাকিলাল। ইজিচেয়ারে চোখ বুজে গান শোনায় বিভোর বড়োজ্যাঠা। বড়োজেঠিমা দেয়ালে ঠেসান দিয়ে হাতজোড় করে বসে আছেন। গানটা এই, গীতবিতান পূজা পর্যায় থেকে, এখন সর্বত্র গেয়, ব্রহ্মসঙ্গীত :

    অন্তর মম বিকশিত করো

    অন্তরতর হে।

    নির্মল করো, উজ্জ্বল করো

    সুন্দর করো হে।

    জাগ্রত করো, উদ্যত করো,

    নির্ভয় করো হে।

    মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে।

    অন্তর মম বিকশিত করো

    অন্তরতর হে।

    যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে

    মুক্ত করো হে বন্ধ,

    সঞ্চার করো সকল মর্মে

    শান্ত তোমার ছন্দ।

    চরণপদ্মে মমচিত্ত নিস্পন্দিত করো হে,

    নন্দিত করো, নন্দিত করো,

    নন্দিত করো হে।

    অন্তর মম বিকশিত করো

    অন্তরতর হে।

    বাড়ির বয়স্কদের অজান্তে, রবীন্দ্রনাথ, রবিবাবু থেকে রবিঠাকুর হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে পৌঁছে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন। ভারতীয় সংবিধান লাগু হবার পর, সমাজে ক্রমশ ক্ষমতা-নকশায় রদবদল ঘটতে থাকে, পাটনার সমাজকর্তাদের আসন থেকে বিদায় নিতে থাকেন ব্রাহ্মরা। ব্রাহ্মমন্দির মেয়েদের স্কুল, যে স্কুলে আমার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনেরা পড়ত, তা বন্ধ হয়ে যায়, মন্দির ভেঙে মার্কেট কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে। বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত তাঁর বাবা-মায়ের নামাঙ্কিত মেয়েদের হাতের কাজ শেখার সংস্হা “অঘোর-কামিনী বিদ্যালয়” অবহেলায় ধুঁকতে থাকে। অথচ কেবল আমাদের আর আত্মীয়দের বাড়িতেই নয়, ব্রহ্মসঙ্গীত ওপরতলা থেকে চুয়ে গরিব বাঙালিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। পাণিহাটিতেও, একান্নবর্তী পরিবার যখন ভেঙে গেল, দাদুদের প্রজন্মের তিরোধানের পর, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। অবশ্য ততদিনে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে গিয়েছিল পণ্যায়নের অন্তর্গত।

    উনিশ

    আমাকে নিজেকে কিছু একটা হয়ে উঠতে হবে, সেই হয়ে ওঠার জন্যে থাকা প্রয়োজন দার্শনিক পরিকল্পনা এবং স্বপ্ন, তাকে বাস্তবায়িত করার মতন প্রজ্ঞা ও ক্ষমতা, এই ধরণের ভাবনাচিন্তা ভারতবর্ষে ইংরেজরা আসার আগে ছিল না। ব্যক্তির হয়ে ওঠার তত্ত্বটা ইউরোপের, খ্রিস্টধর্মের। অতীত বাঙালিসমাজের পৃষ্ঠভূমিতে যে নামগুলো আমরা পাই, এবং যাঁদের আমরা মনে করি “হয়ে উঠেছিলেন”, যেমন অদ্বয়বজ্র, ক্রমদীশ্বর, ইন্দ্রভূতি, অতীশ দীপঙ্কর, চৈতন্যদেব, জগৎমল্ল, জহুরি শাহ প্রমুখ, তাঁরা কেউই নিজেদের কিছু একটা “হয়ে ওঠার”, অথবা প্রতিস্ব নির্মাণের, অথবা সাবজেক্টকে অবজেক্ট জগৎ থেকে পৃথক ও স্বনির্ভর মনে করার, কিংবা ব্রহ্মাণ্ডপ্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি নামের কৃত্রিম জ্ঞানপরিধির কথা চিন্তা করেননি। তাঁদের তত্ত্ববিশ্বে তা সম্ভব ছিল না। তাঁদের আমরা যে কারণে জানি ও শ্রদ্ধা করি, ইউরোপীয় তত্ত্ববিশ্বে নির্মিত হলে তা সম্ভব হতো না।

    ব্যক্তিসৃজনশীলতা ও ব্যক্তিস্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্পর্কিত ইউরোপীয় মননবিশ্বের বাইরে বেরিয়ে, প্রজ্ঞাকে কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে আঁকড়ে না থেকে, ব্যক্তির কাজকে সমাজসৃজনরূপে কীভাবে আবার প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়, আমার পক্ষে, কলেজে ঢোকার সময়ে তো বটেই, এখন সাতাত্তর বছর বয়সে পৌঁছেও, ভেবে কুলিয়ে ওঠা অসম্ভব। প্রাক ইংরেজ যুগের প্রকৃতি ও প্রকৃতিসঞ্জাত অজস্র দেবীদেবতাকে তাঁদের সিংহাসন থেকে তুলে ফেলে দিয়ে, ব্যক্তিমানুষকে অস্তিত্বের কেন্দ্রে বসিয়েছে ইউরোপীয় দর্শন। গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে সারা ভারতে ঘোরাঘুরি করে, সাধারণ ভারতীয়দের দেখে এখন টের পাই কী ভয়ংকর সংকট তৈরি করে দিয়ে গেছে ইউরোপীয় দর্শন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সমাজ এখন ইউরোপীয় দর্শনে নির্মিত প্রতিস্বের ব্যক্তিএককে গড়া। আমার শৈশব যেহেতু ব্যক্তিএকক নির্মাণের কারখানায় গড়ে ওঠেনি, ইমলিতলা আর রামমোহন রায় সেমিনারি ইশকুলকে তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে পারি যে ব্যাপারটাকে আমি বেশ দূরত্ব থেকে অনুধাবন করতে পারি। তার মানে এই নয় যে আমি নিজস্ব একটা দার্শনিক স্হিতি গড়ে তুলেছি। আমার সাহিত্যকর্ম, সাহিত্যের প্রচলিত ধারণাকে ছাপিয়ে বৃহত্তর এলাকায় একারণেই প্রবেশ করে।

    সনাতন বাঙালিসমাজে যাঁরা কিছু হয়ে উঠেছিলেন বলে এখন আমরা মনে করি, যাঁদের নাম আমি একটু আগে উল্লেখ করেছি, কিংবা বাউল, ফকির, সন্ন্যাসী, যা ইউরোপে ছিল না, নেই, তাঁরা এবং তাঁদের কাজকর্ম, আমরা সমাজ বলতে এখন যা বুঝি, তার বাইরে ঘটেছে। অর্থাৎ নিজের সামনে “অপর” মানুষকে দাঁড় করিয়ে নিজেদের “হয়ে ওঠা” প্রতপন্ন করতে হয়নি তাঁদের। তার মানে ইউরোপীয় স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্যে আসেপাশে লোকজন দরকার। ঠিক যেমন নেতা “হবার” জন্যে সভায় বক্তৃতা জরুরি ; লেখক “হবার” জন্য পুরস্কার ; কবি “হবার” জন্যে সম্বর্ধনা।

    নিজের কাছে নিজে সৎ হওয়া ছাড়া আর কোনোকিছু কেনই বা হতে যাবে মানুষ ? অপরের জন্যে কিছু করা, এবং নিজের “হবে ওঠার” জন্যে নিজের সামনে অপর বা অপরদের দাঁড় করানো, দুটো একেবারে আলাদা ব্যাপার। অপরদের নিজের মালমশলা মনে করাটা মোনোসেন্ট্রিক, ইউনিপোলার, ইউনিলিনিয়ার। কেবল মানুষ নয়, সমস্ত ধারণাই দেখা যায় তাদের অপরের বিপরীতে নির্মিত। আমি বড়ো হয়ে “অমুক হবো” ভাবতে গেলে শৈশব থেকে আমার সামনে তমুক-তুসুক থাকা জরুরি। সবাই সৎ হলে কারোর আর আলাদা ভাবে সৎ হবার দরকার হয় না। ভাবনাটাই আসবে না মাথায়। সত্যি কথা বলতে কী, হয়ে ওঠার খপ্পরে পড়লে, বাঙালির আর সনাতন বাঙালিত্ব টেঁকে না।

    চাকরি করার সময়ে দেখেছি, একজন নবযুবক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সতত চিন্তিত থাকে কীভাবে ম্যানেজার “হবে”, ম্যানেজার “হয়ে গেলে” অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনেরাল ম্যানেজার, ডেপুটি জেনেরাল ম্যানেজার, জেনেরাল ম্যানেজার, চিফ জেনেরাল ম্যানেজার ইত্যাদি “হবার” চিন্তায় বিভোর থাকে। অবসরপ্রাপ্তি ঘটলেই যাবতীয় “হওয়াহয়ির” হাওয়া বেরিয়ে যায়। কবি-লেখকরা দেখি একইভাবে নানা পুরস্কারের সিঁড়ি বেয়ে কবি থেকে সুপারকবি “হবার” দিকে দৌড় দ্যান। প্রতিস্ব ব্যাপারটাই শেষে ফালতু হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে বলা চলে যে, ইংরেজরা আসার পর, বাঙালি ভাবুক ও শিল্পীসাহিত্যিক “চেতনা” নিয়ে যে সমস্ত গর্ব প্রদর্শন করেছেন, তার পৃষ্ঠভূমিটি ছিল দান-বিলোনো বলবান উপনিবেশবাদীর এবং অধীনস্হ সহজবশ্য গ্রাহীর। অনুশাসন কাঠামোটাই তো হেলেনিক। সে অনুশাসনের উৎসসূত্র ইউরোপের জ্ঞানভাণ্ডার, এবং ওই জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তাঁদের শাসনক্ষমতা। তাঁদের জ্ঞানকাঠামো দিয়ে, তাঁদের নির্মিত বাস্তব দিয়ে তাঁরা জ্ঞানী, মনীষী, পপতিভাবান, নায়ক, ভাবুক, দার্শনিক ইত্যাদি চিহ্ণিত করার নকশাজাল বানিয়ে দিয়েছিলেন। ওই সমস্তের কোনোকিছু “হবার” স্বপ্ন কারোর থাকলে, তাঁকে ক্ষমতাজালটিকে মেনে নিয়ে, নিজের প্রতিস্বকে সেইমত নথি করাতে হবে। বলাবাহুল্য যে আমি শৈশব থেকে ওই ক্ষমতাজালটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে গেছি, প্রান্তিক থেকেছি।

    প্রান্তিকতার কারণে, যা আমার “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে জানা যাবে, ইংরেজরা আর ভারতীয় জাতিয়তাবাদীরা ভূমিপুত্রদের পিটিয়ে নিজেদের প্রতিবিম্ব বানাবার যে বিশাল জাল ফেলেছিল, তাতে ধরা দিতে অস্বীকার করার প্রবৃত্তি আমার আপনা থেকেই গড়ে উঠেছিল। যে দার্শনিকতা সবাইকে পিটিয়ে সমান করতে চায়, সেখানে বাউল, ফকির, সাধু-সন্ন্যাসীর উদ্ভব ঘটে না। ইংরেজদের সরবরাহ করা বাঙালি আত্মপরিচয়ের জগৎটিতে, আমাদের ইমলিতলার একান্নবর্তী পরিবারটি, তার অদ্ভুত ও অযাচিত প্রান্তিকতার দরুণ, প্রবেশ করার সুযোগ পায়নি। তা ছিল “নতুন”, এবং যাঁরাই সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরাই আশ্রয় নিয়েছেন অবধারণাটিতে। অবধারণাটি বিশাল সময়প্রবাহে একটি প্রাথমিক মুহূর্ত চিহ্ণিত করতে চেয়েছিল, এবং তাতে শামিল হয়েছিলেন, কেন্দ্রস্হানীয় বাঙালি ; যখন কিনা আমাদের পরিবার ছিল প্রান্তিক।

    একজন মানুষের এই আকাঙ্খা যে, “আমি অমুক হবো”, অনিশ্চয়তার এলাকায় লুকিয়ে থাকে। কিছু একটা “হতে চেয়ে” সফল হতে হলে তো নিখুঁত হতে হবে। সর্বজনীনতার কারখানায় গড়া নিখুঁত। নিখুঁত হবার প্রধান বাধা অনিশ্চয়তা। আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে অমন অনিশ্চয়তার পরিমণ্ডলে। যা অনিশ্চিত তা অন্যরকম। যারা অন্যরকম তারা অপর। তারা ব্যবস্হাটিতে খাপ খায় না। অপর হতে হবে এই ভাবনা অপর লোকটি ভাবে না নিশ্চয়ই। আমি জানতুম যে আমি মিসফিট, গোলমাল সৃষ্টিকারী, স্হিতাবস্হার বিরোধী ; কিন্তু তাই বলে নিজেকে অপর ভাবিনি। কুলসুম আপাদের পরিবারকে অপর মনে হয়নি। পাড়ার মহাদলিতদের অপর মনে হয়নি। তারা নানা জীবিকার মাধ্যমে সংসার চালিয়েছে, যেমন বাবা ফোটোর দোকানের মাধ্যমে চালিয়েছেন ইমলিতলা, দরিয়াপুর আর উত্তরপাড়ার সংসার। ফলে আমার জীবনকে একটি ইউনিলিনিয়ার গল্পে বেঁধে ফেলা কঠিন। একজন মানুষের জীবনী সেহেতু বিভিন্ন লেখকের হাতে বিভিন্ন হতে বাধ্য। কেননা সময়প্রবাহ মালটিলিনিয়ার, এই ধারণা আমি ১৯৫৯ সালে পেয়েছিলুম অসওয়াল্ড স্পেংলারের “ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট” বই থেকে। কেন্দ্র থেকে বৃত্তপরিধির দিকে যে পরিবর্তনশীল রেখাগুলো টানা যায় তা অসংখ্য, তা গোনা যায় না। কেউ যদি হয়ে ওঠার বা আকাঙ্খাপূর্তির কাহিনি বাঁধতে চান, তাহলে ওই অজস্র পরিবর্তনশীল রেখা থেকে যে কোনো একটি বেছে নিয়ে বৃত্তের মাঝখান থেকে বেরিয়ে পরিধিতে পৌঁছোবার গল্প লিখতে হয়। অথচ যতোগুলো পরিবর্তনশীল রেখা সম্ভব ততোগুলো গল্প দিয়ে তো লোকটা গড়ে উঠেছে।

    ধরা যাক শৈশব থেকে আমি বহু প্রাণী ও বস্তুর দিকে কেবল তাকিয়েছি, তাকাই, কারণে-অকারণে। শুধুমাত্র তাকাবার ইতিহাস আছে আমার। শুধুমাত্র স্পর্শের ইতিহাস আছে। কথা বলার ইতিহাস আছে। শোনার ইতিহাস আছে। সাক্ষাতের ইতিহাস আছে। বহু বাড়িতে ঢোকার আর বেরোনোর ইতিহাস আছে। হাঁটার ইতিহাস আছে। পোশাক পরার ইতিহাস আছে। চুল কাটার ইতিহাস আছে। তা থেকে কী-কী ছাঁটাই করে আমি আমার “হয়ে ওঠার” গল্প লিখব ? যে গল্পই লিখি না কেন, তা হবে সময়ের প্রতি একচোখোমি। স্হান বা স্পেসকে গুরুত্বহীন করে দেবে, এমন গল্প।

    “হয়ে ওঠার” একটা পথ হিসাবে দাদা, কলকাতায় বহুকাল কাটিয়েছে, বলল কলেজে ইকোনমিক্স আর ম্যাথামেটিক্স নিয়ে পড়। কলেজে ভর্তি হয়ে গেলুম আর ভর্তি হয়ে বুঝলুম ম্যাথামেটিক্স ব্যাপারটা আমার আয়ত্বের বাইরে তো ছিলই, ইকোনমিক্সেও গণিত লুকিয়ে আছে, তার নাম ইকনোমেট্রিক্স।

    কুড়ি

    ১৯৫৬ সালে এই বেড়া টপকে বেরিয়ে ইকোনমিক্সে স্নাতক পড়তে ঢুকলুম। মুখস্হ করতে আমি কোনো কালেই পারি না, তাই একটা বই ধরে-ধরে পুরোটা কয়েকবার লিখে নিতুম যাতে মনে থাকে। এই লেখালিখির দরুণ আকর্যণ করতে পারলুম নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণা নামে মোটা কাচের চশমা পরা মোঙ্গোল সুন্দরীকে ; তার খাতাগুলো দরকার। দুজনে বন্ধু হয়ে গেলুম, আমার চুমু খাবার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল ভূবনমোহিনী, ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে যার নাম রাণো। ওর জন্যে ইংরেজিতে একটা কবিতা লিখেছিলুম, সেটাই আমার শেষ ইংরেজি কবিতা। মেয়েরাও যে মদ খায় তা ভূবনমোহিনীকে চুমু খেতে গিয়ে টের পাই। পরে ঘটনাটা হিন্দি লেখক ফণিশ্বরনাথ রেণুকে বলতে, উনি বলেছিলেন, কী করেছ কি, জানো কি রাণারা নেপালে কতো ক্ষমতাবান, জানতে পারলে তোমায় জ্যান্ত পুঁতে দেবে। আমি ভূবনমোহিনীকে তাড়ি খাইয়েছিলুম। চুমুর প্রতিদানে ওর জন্যে ‘এক্সচেঞ্জ এ কিস’ নামে এই কবিতাটা লিখেছিলুম :

    লেট ইওর পারফিউমড হ্যালো

    ফল ফর এ ফিউ সেকেণ্ডস

    টু এনাবল মি ইন পিকিং আপ

    দি মেমরি অফ ইওর গ্ল্যানসেস

    ইউ লেফ্ট ইন দি নোটস আই লেন্ট ইউ

    নট ফর নাথিং ! অ্যাট লিস্ট ইউ শুড

    এক্সচেঞ্জ এ কিস, ইভন ফ্লাইং উইল ডু।

    ভূবনমোহিনী রাণা একমাত্র যুবতী যে আমাকে চুমু খাবার প্রতিদানে চড় মেরেছিল, কষে চড়। ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে লিখেছি ঘটনাটা। ফরাসি যুবতীকে চুমু খাবার ইচ্ছে পুরো হলো না, ওদের চুমুতে ফরাসি ভাষার নাকিসুর বাজনা থাকে বলে জানিয়েছিল উলিয়াম গথ নামে এক হিপি, কাঁচা মাছের সুবাস থাকে, কাঠমাণ্ডুতে একজনও ফরাসী যুবতী হিপি পাইনি, নইলে নির্ঘাৎ চুমু খেতুম, কচি ডাবের জল খাবার মতন করে, যে ভাষার সঙ্গে পরিচয় নেই সেই ভাষার যুবতীদের যোনি থেকেও গোপন সঙ্গীত ভেসে বেড়ায়, এটা আমার অভিজ্ঞতা।

    স্নাতকস্তরে দ্বিতীয় হয়ে বেরোলুম ১৯৫৮ সালে। ১৯৫৯ সালে বাংলায় লেখা কবিতায় বাবার দেয়া ডায়েরির পাতা ভরে উঠেছিল, যা ইচ্ছে লিখছিলুম, বেপরোয়া হয়ে, ইমলিতলার বেপরোয়াভাব চলে এসেছিল কবিতা লেখাতেও। স্নাতকোত্তরে ইকোনমিক্সে স্পেশাল পেপার নিলুম মনিটারি থিয়োরি, আর সেখানেও গণিতের ভুত পিছু ছাড়লো না। ১৯৬০ সালে স্নাতাকোত্তরেও দ্বিতীয় হলুম। আমার মতন আমার প্রিয় দুই অধ্যাপক, ডক্টর আর এন ত্রিপাঠী আর ডক্টর জে এন সিনহার মনও খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার ফলাফলে। জীবনে পরীক্ষায় প্রথম হওয়া আর হলো না। নমিতাদির চাপানো মার্কসবাদ তখন মাথায় পোকা হয়ে ঘুরছে, হয়তো কুলসুম আপার প্রভাবও থাকতে পারে, ইমলিতলার জীবন তো বটেই। ডক্টর জে এন সিনহা একবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অফিসে এসেছিলেন জমিদারি বণ্ড ভাঙাবার জন্যে, আমাকে দেখে বললেন, “ইকোনমিক্স পড়ে শেষে এই কাজ করতে হচ্ছে!” ওই সময়টা, ১৯৫৬ সালে ইনটারমিডিয়েট পাশ করে বেরিয়ে স্নাতকোত্তর হওয়া পর্যন্ত, আমি জীবনকে যতোটা পারা যায় জটিল করে তোলার চেষ্টা করে গেছি, যৌনতা, মাদক,যৌনতা, মাদক,যৌনতা, মাদক, যৌনতা, যখন কিনা সহপাঠীরা সবাই স্নাতক পড়তে ঢুকেই আরম্ভ করে দিয়েছে আইপিএস আইএএস আইএফএস, নিদেন স্টেট সার্ভিস কমিশনে ঢুকে যেতে। অনেকেই মাঝপথে পড়ে ছেড়ে আইপিএস আইএএস “হয়ে” গেল, আমি যখন স্নাতকোত্তর পাশ করলুম তখন ওরা প্রায় সবাই ঘুষের প্রাসাদ খাড়া করে ফেলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরোজা দিয়ে বেরিয়েই ঘুষ নিতে পারা চাড্ডিখানি কথা নয়। আমার কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না, হবি ছিল না, পার্কে দৌড়োনো ছিল না, রোয়াকে বসে মেয়েদের সিটি বাজানো ছিল না। ছিল না ছিল না ছিল না ছিল না। অতীত জিনিসটাই যেন পচধরা। অতীতের কিছু ঘটনা থেমে যায়, কিছু ঘটনা চলতেই থাকে চলতেই থাকে চলতেই থাকে।

    কলকাতার পুলিশ কমিশনার আমাকে বলেছিলেন, “সো ইউ আর দি টপ ডগ”। তখন “টপ ডগ” এর মানে জানতুম না বলে খারাপ লেগেছিল, মনে করেছিলুম কুকুর বলছেন। উকিলকে কথাটা বলতে উনি যখন মানে বোঝালেন তখন মন্দ লাগেনি। তবে উকিল বলেছিলেন যে, “পুলিশ কমিশনারের কথা থেকে মনে হচ্ছে আপনাকে একাই কেস লড়তে হবে। ”

    দরিয়াপুরের দেয়াল আলমারি জুড়ে আমার ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার বন্ধুদের ঈর্ষার ব্যাপার হয়ে উঠল। বিরল বই থাকলে নানান কিসিমের বন্ধুরা জুটে যায়। পুস্তক মহল থেকে সাম্প্রতিক ইংরেজি বই কিনে আনতুম আর বাবা বিল পেমেন্ট করে দিতেন। আমার মামলার সময়ে আমার অনুপস্হিতিতে অনেক বই চুরি হয়ে গিয়েছিল, মার্কুইস ডি সাডের “হানড্রেড টৌয়েন্টি ডেজ অফ সোডোম”, হ্যাভলক এলিসের “কমপ্লিট ওয়র্কস”, জঁ জেনের “আওয়ার লেডি অফ দি ফ্লাওয়ার্স”, ম্যালকম এক্সের জীবনী, ডস্টয়েভস্কির “কমপ্লিট ওয়র্কস”, বিট আন্দোলনের পত্র-পত্রিকা, অভিধানগুলো, অনেক বই। অনেক জীবন একই সঙ্গে অনেক আমি, জিততে হবে অথচ জানি না কি জিততে হবে, পারতে হবে অথচ জানি না কি পারতে হবে, পৌঁছোতে হবে অথচ জানি না কোথায় পৌঁছোতে হবে, কারণ নেই, মগজে মৌমাছির ঘামগান, জীবনের মানে খুঁজতে চোখ বুজে লাফিয়ে-পড়া, হয়তো, হতে পারে, পোশাকের আগ্রহ ছিল না, নিয়মিত কাচার দরকার ছিল না, জুতোর আগ্রহ ছিল না, নিয়মিত পালিশের দরকার ছিল না, হাতঘড়ির আগ্রহ ছিল না, কেবল মনে হচ্ছিল দেশে-দেশে স্টুপিডরা রাষ্ট্রকে চালায়, ইমলিতলার লোকগুলো সপরিবারে গরিবই থেকে যাবে হাজার বছর। মনুস্মৃতির পাহাড় মাথায় চাপিয়ে লোকে কী করে সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখে জানি না, ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গীয় আঁতেলদের কোনো ধারণাই নেই, স্বাধীনতার ছয়টা দশক পেরিয়েও গ্রামগুলো জাতিপ্রথা দিয়ে ভাগবাঁটোয়ারা করা, জলভরার কুয়ো আলাদা, উঁচু জাতে প্রেম করলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয় বা কোতল করা হয়, কলেজে তারা ব্র্যাণ্ডেড জুতো, পোশাক, চশমা, পারফিউমসহ গেলে ধনী উঁচুজাতের আক্রমণে পড়ে, যুবতীরা নখপালিশ লাগিয়ে মুখ ব্লিচিং করে গেলে কুকথা শুনতে হয়। তাই আমার কাছে লেখালিখি আর সাহিত্য-শিল্প এক জিনিস নয়। আমি লেখালিখির শুরু থেকেই নিজেকে যাচাই করে নিয়েছিলুম।

    একুশ

    দরিয়াপুরে, রান্নাঘরে মায়ের কষ্ট কমাবো ভেবে, মা এবার জীবন উপভোগ করুন ভেবে, ইনডেন গ্যাস সিলিণ্ডার কিনে দিলুম, ফ্রিজ কিনে দিলুম যাতে রোজ না রান্না করতে হয়, যাতে ওনার প্রিয় মাছের স্টক করে রাখতে পারেন, রাইস কুকার কিনে দিলুম যাতে ভাতের দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে থাকতে না হয়, প্রেশার কুকার কিনে দিলুম যাতে রান্না তাড়াতাড়ি হয়। এই জিনিশগুলোকে রপ্ত করতে মায়ের অনেকদিন লেগে গেল, প্রায় বছর চারেক, ভয় পেতেন ওগুলোকে ; যুক্তি দিতেন যে ওগুলোর দরুণ রান্নায় স্বাদ হয় না। গ্যাস থাকতেও মা কয়লার উনুনের সামনে উবু হয়ে বসে রান্না করতে ভালোবাসতেন, পরে আমাকে বলতেন গ্যাসটা জ্বালিয়ে দিয়ে যা, নিভিয়ে দিয়ে যা। ফ্রিজ খুলতেন দূর থেকে একটা তোয়ালে দিয়ে হাতল ধরে, যদি শক মারে তার ভয়ে। প্রেশার কুকারের সিটির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পুড়িয়ে ফেলতেন। রাইসকুকার কোনোদিন ব্যবহার করলেন না। তবু মায়ের আনন্দ হল যে ওনার শ্রম কমাবার জন্য খেয়াল রেখেছি, বুড়ি বান্ধবীরা বেড়াতে এলে তাদের দেখাতেন। রান্নাঘর থেকে মাকে বের করে আনার জন্যে শেষে রান্নার বউ রাখতে হল, তারও যথেষ্ট বয়স হয়েছিল, তবু সিলিণ্ডারের গ্যাস, ফ্রিজ, প্রেশার কুকারে সড়গড়। পাটনা শহরে টিভি আসতেই, তখন শাদা-কালো, রঙিন হয়নি, মায়ের জন্যে একটা টেলিরামা টিভি কিনেছিলুম, প্রোগ্রাম সরকারি হলেও, দেখে আনন্দ পেতেন আর পাড়ার যতো বাচ্চারা, বেশিরভাগই দরিয়েপুরের মুসলমান পরিবারের, এসে জড়ো হতো ওনার চারিধারে মেঝের ওপর।

    মা বলেছিলেন, একটা গাড়ি কেন এবার, লোকেদের বাড়ি যাই। কিন্তু কেনা হয়নি, পাটনার বাড়িতে গ্যারাজ তৈরির জায়গা ছিল না। কিনলুম বটে, ফিয়াট, পরে মুম্বাইতে, নাবার্ডে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনেরাল ম্যানেজার হয়ে, অফিস থেকে লোন নিয়ে। মা আর বাবা দুজনেই তখন মারা গেছেন। যখন লখনউতে বদলি হয়ে গেলুম তখন লখনউয়ের হেড পোস্টঅফিসে গিয়ে প্রতি শনিবার মাকে এসটিডিতে ফোন করতুম; পোস্ট অফিসে বুক করে অনেকের সঙ্গে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হতো, আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে ডাক আসতো। এখনকার মতন মোবাইল হলে মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন দুবেলা কথা বলা যেতো।

    উত্তরপাড়ার চিলেকোঠার ঘরে, কলকাতায় পড়াশুনার সময়ে আস্তানা নিয়েছিল দাদা, বইয়ের স্তুপ, বন্ধুদের গ্যাঞ্জাম, সিগারেটের ধোঁয়া, আমি গিয়ে পড়েছি অনেক সময়ে, পরিচিত হয়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচির সঙ্গে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে হতো ঘরণী টাইপের মানুষ। তার আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাদের দরিয়াপুরের বাড়িতে এসে পাটনার ঠররা খেয়ে বারান্দায় বমি করে গেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলে গেছেন ওনাকে পাঠালে উনি আমার লেখা প্রকাশ করার ব্যবস্হা করবেন। দাদা চাকরি পাবার পর ধানবাদে থাকার সময়ে দীপক মজুমদারের সঙ্গে আড্ডায় উনি বলেন “ফিলজফি অফ হিসট্রি” পড়তে, দীপক মজুমদারকে দেখেছি ধানবাদে দাদার বাসন মাজছেন। দীপক মজুমদারকে মনে হয়েছে চাষি টাইপের মানুষ। ওনার বলা বিষয়ে বই পড়া আরম্ভ করি, আর লিখে ফেলি “ইতিহাসের দর্শন” যা পরে “বিংশ শতাব্দী” পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল, সম্পাদক যদি জেনে যেতেন আমার বয়স কতো তাহলে ছাপতেন কিনা সন্দেহ। তারপর নমিতা চক্রবর্তীর প্ররোচনায় আরম্ভ করলুম মার্কসবাদ নিয়ে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ, যা বিমান মজুমদারের ছেলে, দাদার বন্ধু বুজলুদাকে পড়তে দিলে, বললেন, বই করে ফেলতে পারিস।

    দাদা কলকাতার কলেজে পড়ার সময়ে প্রায়ই যেতুম উত্তরপাড়া, পাণিহাটি, কোন্নোগর আর আহিরিটোলা। পাণিহাটি থেকে আহিরিটোলা যেতে হলে শেয়ালদা স্টেশান হয়ে যেতে হতো। শেয়ালদা স্টেশান তখন উদ্বাস্তুদের ভাঙা সংসারে ছয়লাপ, কলকাতার রাস্তায় মিছিল, বাস-ট্রাম পুড়ছে, দেখে মনে হতো কেউ শোনার নেই। সেসময়ে সদ্য-সদ্য ট্র্যাজেডি থেকে জন্ম হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের, আর নিজেকে মনে হতো শেকসপিয়ারের ট্র্যাজেডিগুলোর ভাঁড়দের মতন, কিং লিয়ারের ফুল, হ্যামলেটের কবরখুঁড়িয়েরা, ওথেলোর ক্লাউন, ম্যাকবেথের পোর্টার, অ্যাজ ইউ লাইক ইটের টাচস্টোন, টুয়েল্থ নাইটের ফেসটে। কলকাতার ওই সময়ের দুর্দশার জোয়ারের ঢেউগুলোকে আমি ধরার চেষ্টা করেছি আমার ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে। মানুষের পীড়া দুর্ভোগ বাঁচার লড়াইয়ের যন্ত্রণা দেখে, তাদের অসহায় গোঙানি শুনে, নিজের ব্যর্থতা অনুভব করা সহজ হয়, টের পাওয়া যায় যে আমি একটা গাছের পাতাও নড়াবার সামর্থ রাখি না। শহরের হাওয়ায় তাদের বিলাপ আজও অভিশাপ হয়ে ভেসে বেড়ায়। নিজেকেই প্রশ্ন করি, কী করা যেতে পারে ? কলম দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় বিষের চোলাই !

    দাদার সব বন্ধুদের দেখেছি তো ! কাউকেই মনে হয়নি দাদার মতন আর আমার মতন মিসফিট, গোলমালকারী, স্হিতাবস্হাবিরোধী ইমলিতলা-মার্কা ইনসেন টাইপের ; ওনাদের উচ্চাকাঙ্খা সাহিত্যকে আঁকড়ে কেরিয়ার করার । অথচ আমার আর দাদার মতন ইমলিতলাপন্হী ইনসেন না হলে আন্দোলন গড়ে তোলা যাবে না। এনাদের বহু বাক্যের সঙ্গে মুখের দুর্গন্ধ লেগে থাকে, পায়োরিয়ার, বদহজমের, বায়ুর, দাঁতের ফাঁকে পচা ছাগলের, শব্দের অর্ধেক মানে তাতেই আটকে যায়। পরে এনাদের কাজকারবার দেখে পায়খানাগুলো পর্যন্ত লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা। আর সেই মোক্ষম দর্শন। টাকা হল ডলারের বেজন্মা বাচ্চা। ওনাদের সমবেত বা একক কাজকারবার দেখে মনে হয়েছে, আমি বোধহয় একরকম স্টুপিড গর্ববোধে ভুগি, সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে, যাকে অ্যালেন গিন্সবার্গ বলেছিল “নাঈভ”, যার দরুন পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্হান, প্রেমে লাথি, বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতা, জোচ্চুরি, টাকা হাপিশ। পৃথিবীর সঙ্গে আমিও পাক খাই। ওহ, বলতে ভুলে গেছি, দাদার রোলেক্স ঘড়িটা এক বন্ধু হাপিশ করে দিয়েছিল চাইবাসায়, তারপর থেকে দাদা ঘড়ি পরা ছেড়ে দিলো।

    পশ্চিমবঙ্গ কি সেই পঞ্চাশ-ষাটের ট্র্যাজেডি থেকে বেরোতে পেরেছে ? না, পারেনি, জানি না কখনও পারবে কিনা। তা থেকে গেছে, স্হায়ী বিশৃঙ্খলা, অকারণ ক্রোধ, অরাজকতা, নৃশংসতা, গণধর্ষণ, নারীপাচার আর ঘৃণা নিয়ে। ওপর থেকে চুয়ে-চুয়ে পৌঁছে গেছে নিচের তলায়, যেখানে সামান্য কিছু নড়ে উঠলেই মানুষ ভয়ে আঁৎকে ওঠে, আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, প্রতিপক্ষ থাকুক বা না থাকুক। যারা নায়ক হয়ে উঠতে চেয়েছিল তারাও কালক্রমে খোলোশ থেকে বেরিয়ে নির্মল জোকারের চেহারার সঙ্গে জনগণের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, জনগণ জোয়ারের সঙ্গে আসে ভাটার সঙ্গে যায়, তাদের জানা নেই যে শহর আর শহরতলিগুলো থেকে সৌন্দর্য্য কবেই পালিয়েছে, কেউই আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারে না, বহু পরিবার ওই ট্র্যাজেডিকে পারিবারিক স্মৃতির আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে, মাছের বদলে সেই আনন্দে তারা নিয়ে এসেছে বিরিয়ানি, স্টিউ, সসেজ, পাস্তা, হ্যামবার্গার, হটডগ — মাছেরাও বিদায় নিচ্ছে এক-এক করে, তৈরি হয়েছে চাষের মাছ, বিয়েতে টকটকে লাল ধুতি আর উত্তর ভারতের শেরোয়ানির মতন, যেগুলো কবি অজিত দত্তের মেয়ে শর্বরী দত্তের অবদান।

    বাইশ

    প্রথম উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ লেখার সময়ে নমিতা চক্রবর্তীকে যেমন দেখেছি তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলুম মানসী বর্মণ নামের চরিত্রে। ওই উপন্যাসেই বারীন গুপ্তের মহেন্দ্রু মোহোল্লার বাড়ি আর পাড়া ব্যবহার করেছি অতনু চক্রবর্তীর বেলায়। রাঘব আর রমা চরিত্র হল আমার সহকর্মী সুশান্ত চক্রবর্তী আর টেলিফোন অপারেটার রত্না আতর্থী। অরিন্দম চরিত্রটা সহকর্মী অরুণ মুখোপাধ্যায়ের আদলে, যে পরে দাদার শালিকে বিয়ে করে, ও সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিল বিবাহিতা মহিলার প্রেমে পড়ে, যে ওকে নিজের সঙ্গে শুতে দিলেও যৌনকর্ম করতে দিচ্ছিল না। মৌলিনাথ চরিত্রটা হল সহকর্মী মণিমোহন মুখোপাধ্যায়, যার মেয়ের সঙ্গে দাদার ছেলের বিয়ে হয়। আর আছে বিহারের জাতপাতের লড়াই, মাওবাদি-লেনিনবাদিদের লড়াই।

    ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে মিজোরামের উল্লেখ না থাকলেও, পার্থসারথী চৌধুরী, আইএএস, ধরে ফেলেছিলেন যে জুডি-জুলির সঙ্গে অতনুর যৌনজীবনের ঘটনা মিজোরামে ঘটেছে। আমাকে আরও জেরা করেছিলেন জানার জন্য যে ওগুলো আমার জীবনের ঘটনা কিনা। পার্থসারথী চৌধুরীর কসবার বাড়ি গিয়েছিলুম একবার, উনি ম্যাজিশিয়ান পি সি সরকারের জামাই। পাত্র বইপত্র পড়তে ভালোবাসে শুনে পি সি সরকার একঘর বইসুদ্দু একটা বাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন পার্থসারথীকে। সারাদিন বইয়ে মলাট দেয়া, নম্বর দিয়ে তালিকা তৈরি করা, আলমারি অনুযায়ী সাজানোয় এমন জড়িয়ে গিয়েছিলেন যে তাঁর লেখার অভ্যাস চলে গিয়েছিল। বলেছিলেন, তোমার লেখা কোনো বই কখনও দরকার হলে বোলো, সব আছে আমার কাছে। এতো তাড়াতাড়ি মারা গেলেন যে যখন রচনাসংগ্রহের জন্যে দরকার তখনই উনি নেই।

    ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ পড়ে একদিন লাল টিশার্ট আর জিনস পরে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এসে হাজির। নিজে ফিকশান লিখলেও, আমার উপন্যাসের ঘটনাগুলোকে সত্যি মনে করে ‘আজকাল’ দৈনিকের জন্য ফিচার লিখতে চান। বললুম বাঙ্গালোরে যান, পাবেন হয়তো, তখন অবশ্য বেঙ্গালুরু হয়নি। ফিরে এসে বললেন, কিছুই ঘটেনি ওখানের রিজার্ভ ব্যাঙ্কে। বললুম, আপনিও তো উপন্যাস লেখেন, আমি তো পড়ার পর খুঁজতে যাই না, কোনো পাঠকই যায়না। ক্রুদ্ধ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ‘আজকাল’ দৈনিকে লিখলেন, বিয়েতে উপহার দেবার জন্য ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপযুক্ত বই।

    স্নাতক পড়ার সময়ে সহপাঠী রাজনারায়ণ দাসের ডাকে গেলুম ওর চিলতে ঘরে, পাটনা মার্কেটের পেছনে, ঘরের আলো নিভিয়ে একটা টেলিস্কোপ দিয়ে বলল, দ্যাখো জানলা দিয়ে। দেখলুম দুজন চিনা যুবতী, ভারতীয় চিনা, পোশাক খুলে, এখন যাকে বলে, লেসবিয়ান প্রেম, তাই করছে। রাজনারায়ণ বলল, দেখলি তো, চিনা মেয়েদের স্লিট হরাইজনটাল হয়, ভারতীয় মেয়েদের মতন ভার্টিকাল নয়। আমি কেবল ওদের গোলাপি মাই আর চুলহীন যোনি দেখে উত্তেজনা সামলাচ্ছিলুম। রাজনারায়ন এম এ পড়া ছেড়ে দিয়ে আইপিএস হয়ে চলে গিয়েছিল, দ্বারভাঙ্গা বিলডিঙের গেটে সরকারি গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিত যে ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপরতলায় আর আমি তার বাইরে, ফেকলু, উচ্চাকাঙ্খাহীন।

    উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মুসলমান যুবতীর মুখ দেখার লোভে স্নাতক ক্লাসের বন্ধুনি ভূবনমোহিনী রাণাকে পটিয়েছিলুম, ওদের হোস্টেলে উম্মা হাবিবা নামে একজন সুন্দরী ধনী বাড়ির যুবতী আছে শুনে। উচ্চবিত্ত ছাত্রীরা সেময়ে বোরখা পরত। হোস্টেলের গেটের কাছে এসে উম্মা হাবিবা বোরখার নকাব মাথার ওপর তুলতে ওর লিপ্সটিক বোলানো ঠোঁট আর সুর্মামাখা গভীর চোখ দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলুম, বেশ ফর্সা, অত্যন্ত ফর্সা, বলেছিল, “দেখ লিয়া ?” আমি বলেছিলুম “জি”। আর মনে হয়েছিল, আহা, এই মেয়েটা যদি কুলসুম আপা হতো একে নির্ঘাৎ প্রেম নিবেদন করতুম, লিঙ্গের চামড়া ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই হয়ে গেলেও ছাড়তুম না একে, মার খেলেও, দাঙ্গা হলেও, ছাড়তুম না।

    ১৯৬৪ সালে লালবাজারে পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন, “আপনারা সাহিত্য করছেন নাকি হ্যাণ্ডবিলে দাঁতের মাজন বিক্রি করছেন। ” একফালি কাগজে কবিতা ছাপিয়ে যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিলি করা যায়, দাঁতের মাজনের প্রচারের মতনই, তা ওনার ধারণায় ছিল না। সেসময়ে কোনো সাহিত্যিকেরই ছিল না, ব্যাপারটা ওনাদের মতে “শিল্পের দেবীকে পথের মাঝে নামিয়ে আনা”। কেবল ভাষাকে আক্রমণ করিনি, তার প্রণালীকেও আক্রমণ করেছি।

    ২০০০ সালে ইমলিতলা পাড়ায় দাদার ছোটোবেলাকার বন্ধু বদ্রি পাটিকমার হয়ে গেল বাহুবলি, কেমন করে লোক যোগাড় করে লন্দিফন্দি করে রাজনৈতিক দলে সেঁদিয়ে ও পকেটমার থেকে নেতা হয়ে গেল সে এক রহস্য ; নেতারা নিজে কিছু করে না, ওকে দেখে টের পেয়েছি, সবকিছুর জন্য লোক আছে, পেঁদাবার, লোপাট করার, খুন করার, এমনকি ছুঁচিয়ে দেবার। আহা, বদ্রি পাটিকমারের সঙ্গে যদি জীবন অদল-বদল করে নেয়া যেতো। “হয়ে ওঠা” স্পষ্ট হতো।

    বুজলুদাকে জিগ্যেস করেছিলুম, কে পড়বে আমার বই ?

    —কেন ? রবীন্দ্রনাথ যেমন খামে ভরে-ভরে একে-তাকে বই পাঠাতেন, তুইও পাঠাবি।

    জনে-জনে পাঠাবার এই আইডিয়াটা বেশ ভালো লেগেছিল। হাংরি আন্দোলনের সময়ে কাজে লাগিয়েছিলুম, লিফলেট কার্ড আর প্যামফ্লেট ছাপিয়ে বিলি।

    বইয়ের জন্য, লেখালিখির জন্যে টাকা তো দরকার। শিলঙে একটা কলেজে দরখাস্ত করে অধ্যাপনার চাকরি পেলুম, ইকোনমিক্স পড়াবার জন্য। তখন “বঙাল খেদা” চলছিল, বাবা বললেন, ‘পাটনাতেও খুঁজে দ্যাখ না কোনো চাকরি পাওয়া যায় কিনা, এখানে তো তোর দাদাও নেই, তুইও চলে যাবি, আমাদের জ্বরজারি অসুখ-বিসুখ হলে কে দেখবে ?’ স্কুলের সহপাঠী নেপালের দাদা সমরেন্দ্র চক্রবর্তী, রামমোহন রায় সেমিনারিতে আমার চেয়ে দু’ক্লাস উঁচুতে, একদিন এসে বলল, ‘তুমি এই কাগজটায় সই করে দাও দিকিনি, চাকরির দরখাস্ত লিখেই এনেছি, আমার অফিসে লোক নেয়া হচ্ছে, নতুন অফিস খুলবে, বেশি লোকেরা জানে না, কাউকে বোলো না যেন। ’ আমার অফিস মানে রিজার্ভ ব্যাংক, উনিও নোট পোড়াবার দপতরে তখন, দুপুর বেলাতেই ছুটি হয়ে যায়, তারপর টিউশানি করে বেড়ান, সংসার ওনাকেই চালাতে হয়, বাবা ওনার ছোটোবেলায় আত্মহত্যা করেছিলেন, কোনো বিদেশি কোম্পানির ওষুধ জাল করে বিক্রির জন্য ধরা পড়েছিলেন।

    খড়ি-স্লেটের কৃষ্ণগহ্বরের আহ্লাদ শুষে নিচ্ছিল আমাকে, বইয়ের হাঙরেরা আমার ছাড়ানো দেহ থেকে মাংসের টুকরো ছিঁড়ে-ছিঁড়ে আনন্দে ভোগাচ্ছিল আমায়, অক্ষরের জোঁকেরা চামড়ায় বসে রক্ত চুষে আমার হরমোন বাড়িয়ে তুলছিল। চোখ, কান আর জিভ দিয়ে লেখা আরম্ভ করলুম। আর পড়া, বই বই বই বই বই বই, বাছবিচার নেই, এ-বই, সে-বই, অমুক বই, তমুক বই, জ্ঞান জ্ঞান জ্ঞান জ্ঞান। আরেক লাইন, আরেক বাক্য, আরেক প্যারা, বেঁচে থাকার আনন্দ আর দুঃখ, সারাজীবন বেঁচে থাকার ইচ্ছে। আমি শব্দপূঞ্জ আর অ্যাকশানের মাঝে ঝুলছিলুম, শান্তিময় আরামপ্রদ জীবন অসম্ভাব্যতার পথে ছুটতে লেগেছিল, জীবনের এক চতুর্থাংশ কাটিয়ে সব কিছুই জানা হয়ে গিয়েছিল, কৌতুহলে লুকোনো নোংরামি অনৈতিকতা অবৈধতা থেকে আরম্ভ করে অনিশ্চয়তার ভীতি পর্যন্ত, ফুরিয়ে গিয়েছিল অজ্ঞানতার পর্ব।

    বাবাকে তো প্রতিদিন দেখছিলুম, নিজেকে শিল্পী বলে মনে করছেন না, মনে করছেন, তাঁর কাজ হল মৃতদের প্রাণ দেয়া যা পেয়ে তাদের বংশধরদের আহ্লাদ হয়, কিন্তু এও দেখছিলুম যে শিল্পীদের মতন মানসিক-শারীরিক অসুস্হতায় আক্রান্ত হয়ে ওনার স্বাস্হ্য ভেঙে পড়ছে ক্রমশ। উনিও যেন প্রতিটি ছবিতে বিষের চোলাইকারীর ভূমিকা নিচ্ছেন, যা আমি তখন করছিলুম আমার ডায়েরিতে আর নোটখাতার পাণ্ডুলিপিতে। এখন যখন জীবনের বাঁকবদলগুলোর কথা ভাবি, মনে হয় যেন তা কয়েক বছর অন্তরই ঘটেছে।

    সিনেমা দেখার অভ্যাস ছেড়ে যেতে লাগল, কেননা সিনেমা তো দেখতুম যৌন আবেদনের জন্যে, শ্বেতাঙ্গিনীর উরু আর ক্লিভেজের আকর্ষণে, সত্যজিৎ রায় ঋত্বিক ঘটক মৃণাল সেন আকিরো কুরোসাওয়া ফগেদেরিকো ফেলেনি রোমান পোলানস্কি ইঙ্গমার বার্গম্যান জাঁ লুক গোদার লুই বুনুয়েল ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো ফেদেরিকো ফেলিনির জন্য নয়। সাবটাইটেল দেয়া ফিল্ম আমি দেখতে পারি না ; পড়া আর ফ্রেম দেখা আর শোনা এক সঙ্গে তিনটে ব্যাপার সম্ভব হয়নি কখনও।

    অড্রে হেপবার্ন, ব্রিজিত বার্দো আনা কারিনা মারিনা ভ্লাদি বেরুয়াদেতে লাফোঁ ক্লদ জেড জিন মোরেয়া ভেরগানো মারিয়ন কিকা মারখাম শার্লি আমাগুচি মিসা উয়েহারা অ্যানিটা একবার্গ জিউলিয়েতা মাসিনা সান্দ্রা মিলো ক্লদিও কার্দিনাল অনুক আইমি ক্যারোল বোক অ্যানজেলা মোলিনা ক্যাথারিন দেনেউভ সোফিয়া লোরেন এলিজাবেথ টেলর আরও কতো আরও কতো আরও কতো আরও কতো, তাদের ঠোঁট নড়া দেখলে আমি পায়ের ওপর পা রেখে লিঙ্গকে সামাল দিই।

    কাজলচোখ গাঢ় ভুরু মিষ্টি হাসি কাঁপানো ঠোঁট সুচিত্রা সেন সাবিত্রী দেবী সুপ্রিয়া চৌধুরী সন্ধ্যা রায় মাধবী মুখার্জি আরও কতো আরও কতো আরও কতো। নিজেকে সামাল দিই।

    স্তনের ভাঁজ কাঁচা গোলাপি ঠোঁট দীর্ঘ উরু শিফন শাড়ি মধুবালা মীনাকুমারী নিম্মি নার্গিস শ্যামা মীনা শোরে রেহানা কুলদীপ নায়ার গীতাবালি নূতন সুরাইয়া আশা পারেখ সাধনা মুমতাজ ওয়াহিদা রহমান হেলেন নলিনী জয়ন্ত বীনা রায় বৈজয়ন্তিমালা মালা রায় আরও কতো আরও কতো। নিজেকে সামাল দিই।

    ফিল্ম পরিচালকদের ভাবনাচিন্তার সঙ্গে আমার লেখালিখির কোনো যোগসাজস কখনও গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি, নিজের মগজে যা আসে তাই কলমে চলে আসে। কলম চাইলে মগজ তাকে ইরটিক হয়ে ওঠার বন্দোবস্ত করে দ্যায়। আমার তো বিশ্বাস নেই, যা আছে তা প্রত্যয়। সমসাময়িকদের বিরুদ্ধে আমি একাই দাঁড়িয়ে থেকেছি, কোনো ফিল্ম নয়, বই নয়, নির্দেশ নয়, তত্ত্ব নয়। জানতুম ইর্ষনীয়-গন্তব্যে শত্রুসংখ্যা বাড়বে, এও জানতুম যে লড়ে যেতে হবে। নমিতা চক্রবর্তী উত্তর দিতে পারেননি যখন ওনার দেয়া তোড়া-তোড়া পত্রিকা হাতে নিয়ে জানতে চেয়েছিলুম যে সোভিয়েত দেশের এতো চকচকে প্রচারের কাগজপত্র কেন, প্রপাগাণ্ডা কেন, গোপনীয়তা কেন ? তা সত্ত্বেও যেতুম ওনার ফ্ল্যাটে, প্রেম আমার জীবনের প্রধান সমস্যা বলে, ভালোবাসা পাবার ধান্দায় লালায়িত বলে। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর আকর্ষণ স্তালিনের ছাড়া গোখরোদের কামড়ে ততদিনে হাপিশ।

    তেইশ

    আমার যাবতীয় কাজকারবারের, যাকে কলকাতার লোকে সেসময়ে বলত বোহেমিয়ান জীবন, তার উৎস হল ইমলিতলা ; বাঙালির দৃষ্টিতে সকলেই সেখানে বোহেমিয়ান। ক্রোধ আর অসহায়তার আগ্নেয়গিরির উৎসও ইমলিতলা। ওই পাড়ার গড়ে দেয়া সামুরাইরা আমার মগজে যুদ্ধ আরম্ভ করে দিয়েছিল, উপলব্ধিদের ফাটিয়ে চৌচির করে বেরিয়ে পড়তে চাইছিল জীবন, বুঝে গিয়েছিলুম যে লেখালিখি ওপিনিয়নেটেড হওয়া জরুরি। বলতে হলে বলতে হয়, পৃথিবীর জন্মই তো হয়েছে বিশ্বজাগতিক সন্ত্রাস থেকে। আর আমার লেখালিখি তো আপামর জনসাধারণকে খুশি করার জন্য নয়। মৌমাছির কথা ভাবলে কেবল তার গুনগুন আর মধুর কথা ভাবলেই তো হবে না, তার হুলের কথাও মনে রাখতে হবে। আপনি যদি মনে করেন যে আপনার বিশ্বাসই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, তাহলে রক্তের বহু নদী বইতে থাকবে, আর তাতে ভেসে যাবে আপনার ঘৃণার শবের পর শবের পর শব।

    ইমলিতলা থেকে দরিয়াপুরে যাবার পর, দাদার বিয়ে হয়েছে, নতুন বউ এসে তো খাটা পায়খানায় হাগবে না, তাই ফ্লাশ-পায়খানা তৈরি হল, একতলা-দুতলায়, দাদা একতলার দরোজায় ভেতরের দিকে আয়না লাগিয়েছিল, যাতে হাগতে-হাগতে নিজেকে দেখা যায়, হাতেমাটির জন্যে গঙ্গামাটির বদলে লাক্স টয়লেট সাবান। বিহারি বন্ধুদের তো বটেই বাঙালি সহপাঠীদেরও অনেকের বাড়িতে খাটা পায়খানা ছিল বলে আমাদের পায়খানা দেখতে আসতো, একটু হেগে নেবার অনুমতি চাইতো। ইমলিতলার বাড়িতে হেগো হয়ে যাবার যে বিধিনিষেধ ছিল তা তামাদি হয়ে গেল, পোশাক পরেই হাগো, নো প্রবলেম, হেগো বলে গঙ্গাজল ছেটাবার আর দরকার নেই। একের পর এক সীমার পাঁচিল ভেঙে পড়ছিল, আপনা থেকেই, আর সেই ভাঙনের স্রোতে বাড়ির সবাই শামিল ছিলুম, মা, বাবা, দাদা, আমি, সবাই। মুর্গির ডিম, মুর্গির মাংস, বিনা-আঁশের মাছ, তাড়ি খেয়ে মদ খেয়ে গাঁজা টেনে বাড়ি ফেরা, যা-যা বারণ ছিল তা লোপাট হয়ে গেল। তরুণ শূরের টাকায় মহঙ্গুর দোকানে বসে চেবাতুম বটের, বগেড়ি, কোয়েল, চাহা পাখির দেহ, পায়রার ঠ্যাং। পায়রা খেয়ে তরুণ বলত এই মাংস বড্ডো গরম, আজকে শালা কয়েক বার হাত মারতে হবে গরম বের করার জন্যে।

    পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো অধ্যাপককে পেলুম না যিনি আমায় লেখালিখি করতে আগ্রহী করবেন। রামমোহন রায় সেমিনারীর চেয়েও গোলমেলে অবস্হা। যাঁরা বিভিন্ন কলেজে সেসময়ে বাংলা পড়াতেন, তাঁরা কেউই বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর ছিলেন না। সায়েন্স কলেজে রমাপতি ঘোষ ছিলেন রসায়নের শিক্ষক, বি এন কলেজে রঙিন হালদার ছিলেন মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক, পাটনা কলেজে ত্রিদিব চৌধুরী ছিলেন ইতিহাসের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের বাংলাভাষা আর সাহিত্য পড়াবার দায়িত্ব এই জন্যে দিয়েছিল যে প্রথমত তাঁরা বাঙালি, এবং দ্বিতীয়ত তাঁরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজের বিষয়টিতে স্নাতকোত্তর। যে বছর আমি বি এন কলেজে ভর্তি হলুম সে-বছর রামমোহন রায় সেমিনারি থেকে বিজয় কর্মকার বাংলার অধ্যাপক হয়ে এলেন। তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা দেয়াতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন, ব্রাহ্ম যুবক-যুবতীদের বিয়ে দেয়া, মাঘোৎসব-পৌষোৎসব তদারকি করা ইত্যাদি। কলেজে দ্বিতীয় বছরে বাংলার অধ্যাপক হয়ে এলেন জীতেন্দ্রনাথ ঘোষ, পণ্ডিচেরিপ্রেমি, যিনি ছাত্রদের জান্তব আস্ফালন দেখে প্রথম থেকেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, তিনি কতো তাড়াতাড়ি আমাদের চাষাড়ে কলেজ ছেড়ে ভদ্রছেলেদের কলেজে চলে যাবেন তাই নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। রবীন্দ্রনাথের পর যে তোলপাড় ঘটে গেছে বাংলা কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে তার সঙ্গে জীতেন্দ্রনাথ ঘোষ নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। সিলেবাস বানাতেন রমাপতি ঘোষ, রঙীন হালদার, ত্রিদিব চৌধুরী প্রমুখ, যাঁরা তিরিশের কবিদের পছন্দ করতেন না। পুলিশ যখন হাংরি আন্দোলনের কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করে তখন জীতেন্দ্রনাথ ঘোষ জনে-জনে বলে বেড়াতেন, “মলয় যে অধঃপতনে যাবে তা জানতাম।”

    বারীন চাকরি পেয়ে গেছে মার্টিন অ্যাণ্ড হ্যারিস নামে জিৎপল-সৎপলদের কোম্পানিতে, তরুণ শূর পেয়ে গেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে স্নাতক হবার পরেই। অধ্যাপক ত্রিপাঠি, যিনি আমার স্পেশাল পেপারের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন, বললেন পিএইচ ডি করতে, বসে থাকার চেয়ে ভালো, একটা সিনপসিস উনিই তৈরি করে দিয়েছিলেন ; ছেড়ে দিলুম। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিটা পেয়ে গেলুম, বেশ সহজেই। কিন্তু চাকরিতে ঢুকেই বুঝলুম প্রচণ্ড চাপের কাজ, যেখানে টাকার পাহাড় গোনা হয়, যেখানে অজস্র খুচরো পয়সা বেলচা দিয়ে থলের ভেতরে ঢুকিয়ে ওজন হয়। তবে চাকরি পেয়ে সুবিধা এই হল যা দাদার পোস্টিঙের শহরে যখন ইচ্ছে চলে যাওয়া যায়, বাবার কাছে টাকা চাইতে হয় না।

    চাইবাসায় দাদার চালাবাড়িটা ছিল একটা পাহাড়টিলার ওপরে, দেখা যেতো দূরের উপজাতি গ্রামগুলো, চালাবাড়ির সামনে নিচের পথ দিয়ে সার বেঁধে কাঁখে মাটির হাঁড়িতে জল ভরে নিয়ে যাচ্ছে উপজাতি যুবতীরা, রাতের বেলায় উড়ন্ত জোনাকিতে ভুতুড়ে পরিবেশ, শুকনো পাতার গন্ধ, রোরো নদীর জলপ্রবাহের শব্দ, মহুয়া ফুলের ফিকে সুবাস, টিলার ওপর রাখা কেরোসিনের লম্ফও অন্ধকারে হয়ে উঠতো চাঁদের সোডিয়াম ভেপার আলো, দূরে শালের জঙ্গল। একা বসে চিন্তা করার অফুরন্ত অবসর। এখানে আমি আমার পাণ্ডুলিপির গভীর কন্ঠস্বর শুনতে পেতুম। বসে-বসে মনে হতো, গুহানিবাসীরা তো জানতোই না কাকে বলে পঙ্কিলতা আর কাকে বলে বিশুদ্ধতা। ইমলিতলায় দেখেছি গরিব মানুষ ধনীর আনন্দকে ভয় পায়, যেন কোনো বৈভবশালীর বাড়িতে আচমকা ঢুকে পড়েছে ; তাদের কাছে আনন্দ বলতে ছিল সমাজ-বহির্ভূত হওয়ার আহ্লাদ। আসলে যারা বিপথগমণের কথা বলে তারা সঠিক পথের হদিশ দিতে পারে না। নিমডির টিলায় রাতের অন্ধকারে বসে আমি উপভোগ করতুম পেরুর মাচু পিচু, রোমের কলোসিয়াম, আথেন্সের পারথেনন, নালান্দার ধ্বংসাবশেষের আ্হ্লাদ।

    দাদার সঙ্গে, দাদার বিয়ের কয়েক বছর আগে থেকেই, ভারতবর্ষ আর পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতুম, নেহেরুর সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে, পশ্চিমবাংলার ডামাডোল নিয়ে। তখন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কৃষিসেচ পথঘাট নির্মাণ ছোটো আর মাঝারি ইনডাস্ট্রি থেকে সরে গিয়ে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শুরু হয়েছে অনেকটা বোম্বাই মডেলের দিকে, বড়ো ইনডাস্ট্রির দিকে, সমাজসেবার খাতে কমিয়ে দেয়া হয়েছে খরচ এদিকে কৃষি এলাকায় ব্যর্থতা আর খরার জন্য খাবার জিনিসের দাম চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে বড়ো ইনডাস্ট্রিগুলো ওপড়াতে আরম্ভ করেছে উপজাতিদের। উত্তরঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের ভয়াবহ ছবি গড়ে উঠছিল আমাদের সামনে। কলকাতা থেকে দাদার যে বন্ধুবান্ধব চাইবাসায় দাদার বাড়িতে ছুটি কাটাতে আসতো তারা সকলেই ছিল ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ মানসিকতার যুবক যা পরে জেনেছি বুদ্ধদেব বসুর কবিতাভবনের ফসল, স্হিতাবস্হাপন্হী। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই মতের মিল হতো না আমার।

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শংকর চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, দীপক মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ বাগচী প্রমুখের সঙ্গে দাদার মাধ্যমে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল আমার। শংকর চট্টোপাধ্যায় কালো ট্রাউজার আর কালো শার্টে মনে হতো জেমস বণ্ড টাইপের মানুষ। উৎপলকুমার বসুকে মনে হতো কর্পোরেট বোর্ডের সদস্য টাইপের। অরণ্যের দিনরাত্রী ফিল্মে রবি ঘোষ তারাপদ রায়ের ভূমিকায়, আমারও তাই মনে হয়েছে, রবি ঘোষের চরিত্র টাইপের। হাংরি আন্দোলনে গ্রেপ্তার হবার আগে একমাত্র শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় একটা পোস্টকার্ড লিখে আভাস দিয়েছিলেন যে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয়েছে।

    শক্তি চট্টোপাধ্যায় তর্কে অংশ নিতেন না নিজের ‘কুয়োতলা’ উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার ডায়েরির কবিতাগুলো সম্পর্কে পজিটিভ রেসপন্স দিলেন বলে দাদা কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে ওনাকে কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য কবিতা দিলেন, সেগুলো ১৯৫৯ সালে ছাপা হয়েছিল। আমি প্রচলিত কবিতার মতো লিখতে চাইছিলুম না, গতি আনতে চাইছিলুম, পরে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে পাঠিয়েছিলুম, বইয়ের নাম রেখেছিলুম “শয়তানের মুখ’ ওনার পছন্দ হয়নি, আসলে কনভেন্ট স্কুলের স্যাটান থেকে গিয়েছিল আমার মগজে, আসেপাশে লোকেদের দেখে আমার মনে হতো তারা শয়তানের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়। আমি ঔপনিবেশিক নন্দন-বাস্তবতা থেকে, মানে কলোনিয়াল ইসথেটিক রেজিম থেকে, বেরোতে চাইছিলুম।

    “মার্কসবাদের উত্তরাধিকার” নামে যে পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলুম, সেটা শক্তি চট্টোপাধ্যায় পাটনায় এলে ওনাকে দিয়েছিলুম আর টাকাও দিয়েছিলুম বইটা ছাপাবার জন্য। বইটার প্রূফ না দেখে উনি মাত্র কয়েক কপি বের করেছিলেন, দেখে আমার মেজাজ গরম হয়ে গিয়েছিল, আর ওনার উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলুম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দাদাকে বলেছিলেন, তুই আমাকে দিলেই পারতিস, শক্তির চরিত্র তো তুই ভালো করেই জানিস। “শয়তানের মুখ” কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বের করার জন্য রেখে নিলেন উনি, বললেন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দেবেন। “শয়তানের মুখ” বেরোবার পর উনি আমার বিরুদ্ধতা আরম্ভ করলেন, কেননা তখন হাংরি আন্দোলনের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র।

    দাদা আর আমি বুঝতে পারছিলুম যে কলকাতায় আমাদের পরিচিতি নেই বলে দাদার এই বন্ধুদের ওপর নির্ভর করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী খোলাখুলি প্রকাশ করা কঠিন, তাই নিজস্ব মুখপত্র দরকার। এরা সবাই আখের নিয়ে চিন্তিত, খ্যাতির জন্য লালায়িত, পরস্পরের বিরোধিতা করতে চায় না, বিতর্ক এড়িয়ে ভাই-ভাই ক্লাব গড়ে তোলে। একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, আরেকজন করে না, তবু তর্ক করে না।

    উত্তরঔপনিবেশিক ভারতে সময়ের তুলনায় স্হানিকতা যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ঔপনিবেশিক ইংল্যাণ্ডের পোঁ-ধরে থাকলে চলবে না, ভারতের সমাজের দিকে তাকিয়ে গড়তে হবে একটা গতিময় আন্দোলন, তা আমরা দু-জনে টের পাচ্ছিলুম, কিন্তু কলকাতায় আমাদের ঘাঁটি দরকার। দাদা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে রাজি করাতে পারলেন, সম্ভবত তখন শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাদার যে কোনো প্রস্তাবেই রাজি হয়ে যেতেন কেননা উনি দাদার শালি শীলার সঙ্গে গভীর প্রেমে পড়েছিলেন আর দাদার চাইবাসার বাড়িতেই থাকতেন, দাদা ট্যুরে গেলে দাদার শশুরবাড়িতে গিয়ে থাকতেন। একবার সুনীল-সন্দীপন চাইবাসায় শক্তির খোঁজে এসে দাদার শশুরবাড়িতে উনি ঘাঁটি গেড়েছেন দেখে বলে ওঠেন, “কিরে শালা, এখানে ইস্টিশান পুঁতে ফেলেছিস?”

    ১৯৬০ সালে একটি লিটল ম্যাগাজিনে আমি হারাধন ধাড়া নামে একজন তরুণ লেখকের নাম-ঠিকানা পেলুম আর মনে হল এই নামটির একটি নিজস্ব প্রতিভা আছে, এই ধরণের নামের কবি বা লেখক এখনও স্বীকৃতি পান না। ১৯৬১ সালে তাঁর হাওড়ার বাড়িতে, যা বস্তিবাড়ি ছিল, গিয়ে ডেকে আনলুম পাটনায়। দাদাও শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে ডেকে আনল পাটনায়। আমাদের চারজনের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় তুলনামূলকভাবে কলকাতায় বেশি পরিচিত। আমি আর দেবী রায় তো একেবারেই অখ্যাত ছিলুম।

    “ইতিহাসের দর্শন” আর “মার্কসবাদের উত্তরাধিকার” লেখার সময়ে আমি অসওয়াল্ড স্পেংলারের দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলুম। ততো দিনে স্তালিনের অত্যাচারের ঘটনাগুলো আশঙ্কা তৈরি করে ফেলেছে। চিনের সিংকিয়াং আর তিব্বত দখলও মার্কসবাদ সম্পর্কে সন্দেহের কারণ হয়ে উঠেছে। হাংরি আন্দোলন চলাকালীনই চীন ভারত আক্রমণ করে বসল, তাও বিভ্রান্ত করার জন্য ছিল যথেষ্ট। কলকাতায় তখন চীনকে সমর্থন করে মার্কসবাদীদের লেখালিখির চল, এখন তারা অনেকেই করে-কম্মে নিয়েছে, মার্কসবাদ গেছে চুলোয়, সকলেই বুঝে গেছে যে “প্রগতি” হল সবার চেয়ে ভূয়ো তত্ত্ব। প্রথমে দলের দুটো টুকরো হল, তারপর অজস্র ভাগাভাগিতে জড়িয়ে পড়ল, বোঝা গেল না যে একই স্বপ্নের এতোগুলো ন্যারেটিভ কেন। “ইতিহাসের দর্শন” লেখাটার ফাইল-কপি কলকাতা পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করতে এসে “রাষ্ট্রবিরোধী” রচনা মনে করে বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গিয়েছিল, কেননা আমার বিরুদ্ধে ১২০ ( বি ) ধারাতেও এফআইআর ছিল। এই ধারাটা যোগ করা হয়েছিল কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়ার সুবিধার জন্য।

    আমার বাবা নেহেরু আর গান্ধীকে পছন্দ করতেন না। তার রেশ শৈশব থেকে চুয়ে আমার মধ্যেও ঢুকে গিয়েছিল। খ্যাতিমানদের সন্দেহ করার বীজ বাবা পুঁতে দিতে সফল হয়েছিলেন আমার আর দাদার মনে। এমনকি যারা সোভিয়েত দেশে সোভিয়েত টাকায় গিয়েছিল, সে তারা যতোই নামকরা কবি-লেখক-নেতা হোক, সন্দেহ থেকে তাদের বাদ দিতে পারিনি। তারা যে “আশাবাদ”-এর বুকনি কপচাতো তাকে মনে হতো বই-পড়া মুখস্হ বুলি।

    দাদার সঙ্গে আলোচনা করেছিলুম স্পেংলারের দর্শন নিয়ে আর আন্দোলনের নামকরণ নিয়ে চিন্তা করছিলুম। স্নাতকস্তরে ইংরেজি কোর্সে জিওফ্রে চসার ছিলেন, তাঁর একটা লাইন বেশ স্ট্রাইক করেছিল, “ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম”। হারাধন ধাড়া আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় রাজি হলেন যে আমাদের আন্দোলনের নাম রাখা হোক “হাংরি জেনারেশন “ বা “হাংরি আন্দোলন”। ঠিক হল আমি আর দাদা খরচ দেবো, হারাধন ধাড়ার বাড়ির ঠিকানা দেয়া থাকবে যাতে আগ্রহীরা যোগাযোগ করতে পারেন। ঠিক হল এক পাতার বুলেটিন প্রকাশ করা হবে। বিলি করবে হারাধন ধাড়া, বিক্রি করা হবে না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বললেন, সুনীলকে আপাতত জানাবার দরকার নেই, উনি আঁচ করে নিয়েছিলেন যে আমার মতামতের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরোধ অনিবার্য, তা এড়াতে চাইছিলেন। বর্ষাকালে নদীরা যুবক হয়ে ওঠে, আর কোনো-কোনো লোক বৃষ্টি-বাদলার ভয়ে বুড়িয়ে যায়। কেবল মধ্যবিত্তরাই কেন কবিতা লেখে !

    চব্বিশ

    স্পেংলার বলেছিলেন যে একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈব-প্রক্রিয়া এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু ঠিক সেই সময় থেকে একটি সংস্কৃতির অবসান আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন। আমার মনে হয়েছিল, দেশভাগের পর এবং ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয়। বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতিতে একটা হ্যাঁচকা-টানের আন্দোলন জরুরি।

    “ইতিহাসের দর্শন” লেখার সময়ে এডওয়ার্ড গিবনের ‘দি হিসট্রি অফ দি ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অফ দি রোমান এমপায়ার’ বইয়ের এই কথাগুলো বেশ স্ট্রাইক করেছিল, যদিও তিনি রোম সাম্রাজ্যের পতনের কারণ দর্শিয়েছিলেন, কিন্তু কথাগুলো আমাদের সমাজের ক্ষেত্রেও লাগসই। সেগুলো হল, এক ) সম্পদ বৃদ্ধির বদলে বৈভব প্রদর্শনের আদিখ্যেতা ; দুই ) যৌনতার বিকৃতি আর অবসেশন ; তিন ) আর্ট ব্যাপারটা আকস্মিক হয়ে ওঠে, মন ভোলাবার চেষ্টা, সৃজনশীলতার দিকে দৃষ্টি দেয় না কেউ ; চার ) ধনী আর গরীবের মধ্যে অসেতুসম্ভব পার্থক্য ; এবং পাঁচ ) রাষ্ট্রকে চুষে জোঁকের মতন লিপ্টে থাকার নেশা।

    স্পেংলারের এই ভাবনা নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৬২ সালে, বিনয় মজুমদারের বই “সম্প্রতি” পত্রিকায় রিভিউ করার সময়ে “ক্ষুৎকাতর আক্রমণ” নামে একটা প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, কিন্তু তার আগেই দাদা সমীর রায়চৌধুরী ওই একই শিরোনামে অতুল্য ঘোষের পত্রিকা “জনসেবক”-এ একটা নিবন্ধ লিখেছিলেন, “জনসেবক” সংবাদপত্রের রবিবারে পাতার সম্পাদক ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ; দাদার এই নিবন্ধটা পরে হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল। শৈলেশ্বর ঘোষ, মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হবার পর নানা জায়গায় লিখে বেড়িয়েছিল যে আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আইডিয়া চুরি করে হাংরি আন্দোলনের তত্ত্ব গড়েছি। পরে বকাসুর চেহারার সব্যসাচী সেন নামে এক পাতিবুর্জোয়া ছোকরা, শৈলেশ্বরের শিষ্য, নানা পত্রিকায় এই ধুয়ো গে্য়ে চলেছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পড়াশুনা নিয়ে এনাদের জ্ঞান সম্পর্কে আমার বলার কিছু নেই, কেননা স্পেংলার সম্পর্কে এনাদের এলেম যে ইশকুল মাস্টারের পার্টিকর্মী হয়ে ওঠার চৌহদ্দিতে আটক তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ওলোটপালোট থেকে টের পাওয়া যায়।

    এখানে বলার যে ইউরোপের সাহিত্য আর ছবি আঁকার আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক বনেদের ওপর, অর্থাৎ আন্দোলনগুলো ছিল টাইম-স্পেসিফিক বা সময়কেন্দ্রিক। কল্লোল গোষ্ঠী এবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠী তাঁদের ডিসকোর্সে যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলোও ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক নন্দন-বাস্তবতার চৌহদ্দির ভেতরে, কেননা সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্হনা-নির্ভর, এবং তাদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত। সমায়ানুক্রমী ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে, তার সন্দর্ভগুলো পুর্বপুরুষদের তুলনায় নিজেদের উন্নত মনে করে, এবং স্হানিকতা ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে। যে কারণে হারাধন ধাড়ারা গ্রাহ্য হন না, তাঁদের এফিডেভিট করে দেবী রায় হতে হয়।

    পাটনায় বাংলা প্রেসগুলো কেবল বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পৈতে আর শ্রাদ্ধর কার্ড ছাড়া আর কিছু ছাপত না, আমার লেখা প্রথম বাংলা ম্যানিফেস্টো পাটনায় ছাপানো যাচ্ছে না দেখে আমি ইংরেজিতে একটা কবিতার ম্যানিফেস্টো লিখে ছাপালুম ১৯৬১ সালের নভেম্বরে আর তাড়া বেঁধে পাঠিয়ে দিলুম হারাধন ধাড়ার হাওড়ার বস্তিবাড়ির ঠিকানায়। নিজেও কয়েকজনকে ডাকে পাঠালুম। কলকাতায় বিলি করা মাত্রই হইচই আরম্ভ হল, যাকে বলা যায় আশাতীত প্রতিক্রিয়া।

    প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি আন্দোলন চেষ্টা করল “সময়তাড়িত চিন্তাতন্ত্র” থেকে সম্পূর্ণ আলাদা “পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্র” গড়ে তুলতে। সমায়ানুক্রমী ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে-মননসন্ত্রাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মধ্যে ইতিহাসগত স্হানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ। ঠিক এই কারণেই, ইউরোপীয় সাহিত্য আর ছবি আঁকার আন্দোলনগুলো খতিয়ে যাচাই করলে দেখা যাবে যে ব্যক্তিপপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখব যে পুঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে সমসাময়িক শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন ; কতো লজ্জার যে অলোক সরকার সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেলেন এখন ২০১৬ সালে ! প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীও সীমিত হয়ে গেছে দু-তিনজন মেধাস্বত্ত্বাধিকারীর নামে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর কৃত্তিবাসের ব্রাণ্ড নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি ওই পুঁজি আর দাপটের ভাগবাঁটোয়ারার ঝগড়া।

    প্রথম বুলেটিন থেকেই তখনকার প্রাতিষ্ঠানিক সন্দর্ভের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের প্রতিসন্দর্ভের সংঘাত আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং তার মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রতিটি বুলেটিন, স্টেনসিল-করা ড্রইং, পোস্টার, কোলাঝ, কার্ড, মুখোশ বিলি করার পর-পরই, যা আমি জানতে পারি বহু পরে, কাউনসিল ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর সচিব এ বি শাহ, পি ই এন ইনডিয়ার অধ্যক্ষ নিসিম এজেকিয়েল, এশিয়া সোসায়টির বনি ক্রাউন, ইলাসট্রেটেড উইকলির সম্পাদক খুশওয়ন্ত সিং, এবং ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা পুপুল জয়াকরের কাছ থেকে। আমার বিরুদ্ধে আবু সয়ীদ আইয়ুব যে ভীষণ খাপ্পা তা এ বি শাহ জানিয়েছিলেন, তাই দেখা করতে গিয়েছিলুম সয়ীদ সায়েবের সঙ্গে ; উনি এমন ভান করলেন যেন কিছুই জানেন না, এদিকে ওনার কাছে তখন অ্যালেন গিন্সবার্গের লেখা চিঠি একের পর এক পৌঁছে গেছে, যা ওনার মেজাজ আরও বিগড়ে দিয়েছিল। অ্যালেন গিন্সবার্গকে ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪ যখন আবু সয়ীদ আইয়ুব এই চিঠিটি লিখছেন তখন লালবাজার পুলিশ সাক্ষাীসাবুদ যোগাড় আর মামলা সাজানোয় ব্যস্ত :

    Dear Mr. Ginsberg,

    I am amazed to get your pointlessly discourteous letter of 13th. That you agree with the communist characterization of the Congress For Cultural Freedom as a fraud and bullshit intellectual liberal anti-communist syndicate, did not, however, surprise me ; for I never thought the Congress had any chance of escaping your contempt of everything ‘Bourgeois’ or ‘respectable’.

    If any Indian litteratur or intellectual come under police repression for their literary or intellectual work, I am sure the Indian Committee For Cultural Freedom would move in the matter without any ungraceful prompting from you. I am glad to tell you that no repression of that kind has taken place here currently. Malay Roychoudhury and his young friends of the Hungry Generation have not produced any worthwhile work to my knowledge, though they have produced and distributed a lot of self advertising leaflets and printed letters abusing distinguished persons in filthy and obscene language ( I hope you agree that the word “fuck” is obscene and “bastard” filthy at least in the sentence “Fuck the bastards of the Gangshalik School of poetry”, they have used worse language in regard to poets whom they have not hesitated to refer to by name ). Recently they hired a woman to exhibit her bosom in public and invited a lot of people including myself to witness this wonderful avant garde exhibition. You may think it as your duty to promote in the name of cultural freedom such adolescent pranks in Calcutta from halfway around the world. You would permit me to differ from you in regard to what is my duty.

    It was of course foolish of the police to play into the hands of these young men and hold a few of them in custody for a few days ( they have all been released now ) thus giving the publicity and public sympathy — publicity is precisely what they want to gain through their pranks.

    I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee For Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of American Beat Poetry. I respect your knowledge of European literature but can not permit myself to be guided by your estimation of writers in my language — a language of which you choose to remain totally ignorant.

    With all good wishes in spite of your grave disagreements and in admiration of some of your wonderful poems.

    Yours Sincerely

    Abu Sayeed Ayyub

    জবাবে অ্যালেন গিন্সবার্গের ৬ই অক্টোবর ১৯৬৪-এর চিঠিখানায় চোখ বোলান এবং আবু সয়ীদ আর অ্যালেনের চিন্তাপার্থক্য থেকে আঁচ করুন বাংলা সাহিত্য কেন ইউরোপের সাহিত্যকে টক্কর দিতে পারেনি রবীন্দ্রনাথের পর থেকে। আবু সয়ীদ আইয়ুবকে মিথ্যাবাদীও বলা চলে কেননা প্রথমত কারোর বিরুদ্ধেই মামলা তুলে নেয়নি পুলিশ তখনও পর্যন্ত, এবং দ্বিতীয়ত, কোনো নারীর টপলেস প্রদর্শনী করা হয়নি, টপলেস অর্থে মস্তিষ্কহীন কথাটা তাঁকে স্ট্রাইক করেনি সম্ভবত। বলা বাহুল্য আবু সয়ীদ, গিন্সবার্গের চিঠি পাবার পরও কুটোটি নাড়েননি, নাড়বেন কি করে যখন উনি নিজেই একজন নালিশকারী। তবে এটা ফাঁস হয়ে যায় যে আবুসয়ীদ আইয়ুব সায়েবদের কমিটির পত্রিকা ‘কোয়েস্ট’ আমেরিকার সিআইএর টাকা খায়, আর বদনাম হবার ফলে মামলার কাছাকাছি পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়।

    Dear Mr Sayeed,

    Obviously my note to you was stupidly peremptory or short witted and am sorry it got your goat, possibly or probably I deserve to be put down for the irritant discourtesy of my writing & the presumption in it, telling you what to do, etc. butting in where it is not my affair and possibly ignorant of the quality of the texts. And chiding a senior. For which I do wish to apologize, offering as excuse that I wrote in great haste — many letters on the same subject the same afternoon — and that the situation that I understand it is a little more threatening to the young scribes than you understand to be. May be it is settled a lot after I wrote. But from what I understood, from letters from Malay as well as Sunil Ganguly & Utpal Basu ( and the latter two seemed to be mature in judgement ) ( Malay I like as a person & do actually admire the liveliness of his englished manifestos — to my mind a livelier prose wit than any other Indian English writing ) ( tho I realise he is inexperienced & impetuous and part of the charm is the naivete of the manifestos, or better, innocence in them. ( this simply being a matter of gut taste preference intuition & certainly not the sort of literary matter to be settled by police action ) : the police situation at one time was that not only Malay but his brother Samir ( an excellent young philosopher ) as well as Debi Roy as well as two boys I never met Saileswar & Subhash Ghose were all arrested. Then let out on bail. In addition a general police investigation, and according to Utpal, “Those arrested are already suspended from their jobs & if they are convicted they may lose it.” Further Ananda Bazar Patrika, Jugantar, Janata and other Bengali papers fanned the fire against “obscene literary conspiracy.” Simultaneously the Supreme Court judgement of ‘Lady Catterley’ as obscene also, has, according to a clipping I read from Times of India “led many people to complain about the lewdness in the writings of many Bengali poets and novelists. Says Basu, “impossible to get another job if one is lost.” The arrested five were tied and locked up for one or two days each. Utpal Basu was detained by police and questioned for five hours. I understand also that Sunil was questioned by police. As far as I know it is still not decided whether or not the police will actually prosecute, and that decision will depend on the support given to the younger writers by older established writers and Cultural groups like Congress ( for Cultural Freedom ). Everyone I hear from has said the Congress has not spoken up in any way. All told, the situation, whether or not one approves of the literary quality of the texts, is much more threatening than I would gather from your letter. My own experience of the bureaucratic complications of police investigations in India — it’s endless and Kafkian grimness — led me to a much less light hearted view of the matter than yourself. As you may remember I was followed for months in Benares, visited by the police, threatened by Marxists, given a ten day quit India notice on vague charges of distributing obscene literature & corrupting the young. It took intervention by friends in Home Ministry in Delhi & a letter from Indian Consulate in NY to begin to straighten it out. So I have no confidence that a dismal legal process on literary matters once started, is so easily to be dismissed. Particularly where young apolitical inexperienced enthusiasts are concerned.

    I don’t agree with you at all in your evaluation as obscene and filthy the sentence “Fack the bastards of the Gangshalik school of Poetry.” Not that I even know which school that is. But it’s common literary parlance both in speech and published texts from cafes of Paris or Calcutta to old manifestos by Tristan Tzara. The style, the impetuousness, the slight edge of silly ill-will, the style of “Burn the libraries”, an old charming XX century literary cry. I don’t really feel very “shocked” to hear that they let a lady show people her breasts in public. Do you seriously find that offensive ? I suppose it’s a little bit against the law — of course they had a woman completely naked on the balcony last year of the Edinburgh Festival — brightest moment of the Fete I hear tell — Yes certainly I do approve. However, I didn’t think myself nor “promote” it from halfway around the world. And I don’t really think that mere publicity is the deepest motive one can find in such typical Dada actions. In that I think you are really doing them an injustice, however low you grade their literary productions. Because after all there is considerable difference of opinion, as to the literary quality. Ferlinghetti, who does not know these writers is publishing a self-translated section of writings by Malay, Sunil & Basu in his City Lights Journal. The texts were collected by Mrs Bonnie Crown of the Asia Society, who found them as interesting as any translated texts she had been able to collect. The magazine “Kulchur” here — which has considerable avantgarde circulation — also reprinted three of the Manifestos in question ( on prose, poetry and politics ) earlier this year. This is independent of my correspondence with anyone.

    In sum, what I do know of translation of the poetry & manifestos of Malay & the other poets arrested or questioned by the police, was pleasing. So, despite half a world difference, and acknowledging your greater familiarity with the literature, I must claim my prerogative as poet and also as critic ( since I edited and acted as agent here for such unpublished writers as Kerouac & Burroughs & Artaud as well as several differing schools of US poetry ) to stand by my intuition and say I do definitely see signs of modern life well expressed in their works. Not claiming they are geniuses or even great — simply that in certain precise areas dissatisfaction with their society, they do well reflect their thoughts, and reflect uniquely — their other contemporaries & seniors being more interested in classical piety or sociological “mature” formulations, Marxism Humanism etc. I don’t think it would be correct to term them Beatnick much less Beatnick imitators, since that’s primarily a journalistic stereotype that never even fit the US supposed “Beatnicks”.

    Regarding the Congress ( for Cultural Freedom ) I stand by my fear that it is 1) possibly supported by Foundation funds connected with US government, 2) Less alert to dangers of suppression within the Western world and allies than within the Iron Curtain. In the US we have been all these years undergoing a siege of legal battles over stage works, books, movies, poetry etc. which has nearly crippled the public activity of Avangarde. I contacted the US Committee head Mr A. Beichman who said himself, the Congress is only a skeleton group in the US now inactive. And this year I had to contact John Hunt from NY to move the Congress to defend Olympia Press in Paris. There is a lag. My criticism was more just than you will allow, the overstated.

    OK Best of Conscience —- Allen

    অমনধারা সংঘাত ইতোপূর্বে ঘটেছিল পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতিতে। ইংরেজরা সময়কেন্দ্রিক মননবৃত্তি আনার পর প্রাগাধুনিক পরিসরমূলক বা স্হানিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালি ভাবুকের জীবনে ও তার পাঠবস্তুতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি আর ছটফটানি, রচনার আদল-আদরায় পরিবর্তনসহ, দেখা দিয়েছিল, যেমন ইয়ং বেঙ্গল সদস্যদের ক্ষেত্রে, এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও আরও অনেকের ক্ষেত্রে। একইভাবে হাংরি আন্দোলন যখন সময়কেন্দ্রিক ঔপনিবেশিক চিন্তাতন্ত্র থেকে ছিঁড়ে আলাদা হলো, উত্তরঔপনিবেশিক আমলে আবার স্হানিকতার চিন্তাতন্তন্ত্রে ফিরে যাবার চেষ্টা করলো, তখন হাংরি আন্দোলনকারীদের জীবনে, কার্যকলাপে ও পাঠবস্তুর আদল-আদরায় অনুরূপ ঝাঁকুনি, ছটফটানি ও সমসাময়িক নন্দনকাঠামো থেকে নিষ্কৃতির প্রয়াস দেখা দিলো। তা নাহলে আমি সাহিত্য ছাড়াও রাজনীতি, ধর্ম, উদ্দেশ্য, স্বাধীনতা, দর্শনভাবনা, ছবি-আঁকা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তাহার প্রকাশ করব কেন !

    পঁচিশ

    হাংরি মামলার আগে থেকেই পত্র-পত্রিকায় আমাদের, বিশেষ করে আমাকে, লক্ষ্য করে নানা মন্তব্য, চুটকি, সংবাদ, কার্টুন বেরোতে আরম্ভ করেছিল, যুগান্তর, অমৃত, দর্পণ, জনতা, চতুষ্কোণ, আনন্দবাজার, স্টেটসম্যান ইত্যাদি। যাঁরা ওগুলো লিখেছিলেন, এখন বুঝতে পারি, তাঁদের পড়াশুনা তেমন ছিল না, বেশির ভাগই হাফলিটারেট সাংবাদিক যারা নিজেদের সবজান্তা মনে করে। বঙ্গসংস্কৃতিকে যে আক্রমণ করা হচ্ছে, এটুকু বুঝে উঠতে পারেননি এনারা।

    ‘দর্পণ’ পত্রিকায় গৌরকিশোর ঘোষেরও অংশীদারি ছিল শুনে ওনার সঙ্গে একটা ফয়সালা করতে গেলে, উনি ওনার বরানগরের বাড়িতে লুচি আলুরদম সহযোগে তর্কাতর্কির আহ্বান জানালেন। খবর দিয়ে গেলুম একদিন সকালে, আমি ত্রিদিব করুণা অনিল। ‘দর্পণ’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল যে আমাদের আন্দোলন বিদেশিচিন্তায় প্রভাবিত। ত্রিদিব করুণা অনিল তর্ক করে গেল সুররিয়ালিজমের প্রভাব, সনেট রচনা, কবিতা আর উপন্যাসের ফর্ম, চিত্রকল্প ইত্যাদি। আমি ওই তর্কে না গিয়ে কেবল আলুর দমের আলুর প্রশংসা করে গেলুম। কিছুক্ষণ পরে উনি বুঝতে পারলেন যে কোন দিকে তর্কটা নিয়ে যাচ্ছি, কাঁধে হাত রেখে বললেন, ভালো চাল দিয়েছো, এবার তোমাদের একদিন লাঞ্চ খাওয়াবো। আমি বললুম, হ্যাঁ দাদা, আলু আমাদের দেশের নয়, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আয়ারল্যাণ্ড গিয়ে সেখান থেকে ভারতে এসেছে বেশিদিন হয়নি, ওয়ারেন হেসটিংস প্রথম চাষ আরম্ভ করেছিলেন নৈনিতালে আর এখন তো আলু ছাড়া বাঙালির কোনো রান্না হয় না, আলুপোস্তও এই সেদিনকার।

    ‘জনতা’ পত্রিকার দপতরে গিয়েছিলুম একটা হেস্তনেস্ত করার জন্যে, কেননা ওই পত্রিকায় প্রথম পাতায় কয়েক সপ্তাহ জুড়ে “পুলিশের নাকের ডগায় হাংরিরা এই করছে ওই করছে” লিখে-লিখে তাতানো হচ্ছিল। ওদের দপতরে তখন ছাপার কাজ তদারক করছিল পেটমোটা একজন মধ্যবয়সী, তাকে বললুম যে সম্পাদক বা মালিকের সঙ্গে দেখা করতে চাই, আমার নাম মলয় রায়চৌধুরী। উনি বললেন, দাঁড়ান ডেকে দিচ্ছি, বলে চলে গেলেন। প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষার পরও উনি না আসায় প্রেসের এক কমপোজিটারকে জিগ্যেস করলুম, সম্পাদক কোথায় বসেন। সে বলল, উনিই তো সম্পাদক, আপনাদের দেখেই পালিয়েছেন।

    হাংরি আন্দোলনের কাউন্টার ডিসকোর্সের সঙ্গে তখনকার আধিপত্যবাদী ডিসকোর্সের সংঘাত গুরুতর হয়ে উঠেছিল ১৯৬৩ থেকে, যখন আমরা “হাংরি জেনারেশনের পক্ষ থেকে” “দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন” ছাপানো কাগজের মুখোশ, রাক্ষস, জোকার, জন্তু-জানোয়ার, মিকিমাউস, দেবতা ইত্যাদির, পাঠালুম বা বাড়িতে চিঠির বাক্সে ফেলে এলুম, মুখ্য ও অন্যান্য মন্ত্রীদের, মুখ্য ও অন্যান্য সচিবদের, জেলা শাসকদের, সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদকদের, বাণিজ্যিক লেখকদের, তখন বঙ্গসমাজের উচ্চবর্গীয় “সংস্কৃতিমান” অধিপতিরা আসরে নামলেন। এর পর তাঁদের মাথায় বোমা ফাটল যখন বিয়ের কার্ড পোঁছোলো তাঁদের ঠিকানায়, কোনায় হলুদ মাখানো, কার্ডে লেখা “ফাক দি বাস্টার্ডস অফ গাঙশালিক স্কুল অফ পোয়েট্রি”। যাঁদের পাঠানো হয়েছিল তাঁরা অনেকেই ভেবেছিলেন যে তাঁরাই গাঙশালিক স্কুল অফ পোয়েট্রির কবি বা ফেলোট্র্যাভেলার। মুখোশের আর কার্ডের আইডিয়া আর খরচ আমার, সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ কফিহাউসে আগেই গেয়ে রেখেছিল। এখন অনেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী তকমা দিয়ে আনন্দ পান, তাঁরা মন্ত্রী-আমলাদের অমন মুখোশ পাঠিয়ে দেখান না একটু। যাকগে, মুখোশ আর কার্ডের আইডিয়া আর খরচ আমার শুনে খচে বোম হয়ে গিয়েছিলেন, কে জানেন, সেই নিরীহ লোকটি, যাঁর নাম আবু সয়ীদ আইয়ুব। পুলিশ কমিশনার আমাকে আর আমার বাবাকে বলেছিলেন যে কলকাতার দুজন লোক জোর দিয়েছেন যাতে আমার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়া হয়, তাঁরা হলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব আর সন্তোষকুমার ঘোষ।

    অফিসের কাজে ১৯৬৩ সালের মাঝামাঝি থাকতে হয়েছিল কলকাতায় মাসতিনেক, ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের গেস্ট-হাউসে, বিকেলে যেতুম কফিহাউসে আড্ডা দিতে, তখনই, ১৯৬৩ সালে, সুভাষ আর শৈলেশ্বরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ১৯৬২ সালে। গেস্ট হাউসে থাকার দরুণ পুরো মাইনেটাই বেঁচে যেতো আর তা হাংরি বুলেটিন ইত্যাদি ছাপানোর কাজে লাগাতুম। ছুটিছাটায় যেতুম হিন্দি কবি-লেখক রাজকমল চৌধুরীর কাগজের অফিসে, হ্যাশিশ ফুঁকতে, রাজকমল পাশাপাশি বাংলা উপন্যাসও অনুবাদ করে রোজগার করতো, তার কারণ ওর বাবা যে মেয়েটার সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়েছিল তার আত্মীয়ের প্রেমে পড়ে দুটো এসট্যাবলিশমেন্ট চালাতে হচ্ছিল ওকে। অমন একদিন হ্যাশিশ ফুঁকে ট্রামে চেপে গড়িয়াহাটে নেমে সামনেই দেখি আমার প্রথমম প্রেমিকা, কাঁথাস্টিচ শাড়িতে, আমাকে দেখে চমকে সামলে নিয়ে এগিয়ে এলো। জানালো একজন স্মাগলারকে বিয়ে করেছে ; প্রথমে বলল ওর আস্তানা যাদবপুরে এইটবি বাস স্ট্যাণ্ডের পেছনে, তারপর ট্যাক্সি ডেকে ড্রাইভারটাকে বলল নিউ আলিপুর যেতে। গেলুম। রাতভর থাকলুম। স্মাগলিঙের সোনার বিসকুট দেখলুম। বিদেশী হুইস্কি খেলুম। একসঙ্গে শুলুম, কিন্তু আমার লিঙ্গ দাঁড়ালো না, অশেষ ভাগ্য, অশেষ ভাগ্য, ঠিক সময়ে লিঙ্গের প্রত্যাখ্যান। প্রেমিকার খেতাব পেলুম “এরেকটাইল ডিসফাংশানের প্রেমিক।”

    গেস্ট হাউসে থাকার দরুণ যে টাকা জমছিল, তাই দিয়ে মুখোশ কিনে, ছাপিয়ে, বিলি করা হল, পাঠানো হলো। বিয়ের কার্ডে “ফাক দি বাস্টার্ডস অফ গাঙশালিক স্কুল অফ পোয়েট্রি” ছাপিয়ে পাঠৈআনো হলো। যে লেখাগুলো জড়ো করেছিলুম সেগুলো একত্রিত করে হাংরি বুলেটিন প্রকাশিত হল, আমি কলকাতা ছাড়ার পর, প্রদীপ চৌধুরী ছাপিয়েছিল ওর চেনা প্রেসে, উডকাট দিয়ে প্রচ্ছদ তৈরি করে দিয়েছিল সুবিমল বসাক, পিসেমশায়ের বাড়ির ঠিকানায় দাদাকে প্রকাশক করে। যেমন বিনে পয়সায় বিলোনো হয়, তেমনই বিলোনো হল। কলকাতায় কার্পেট বমিং আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, এলিট কবি-লেখকদের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত শেয়ালজ্ঞানী ঠেকগুলোয় রীতিমতো হল্লাবোল।

    “যুগান্তর” সংবাদপত্রে ১৭ই জুলাই ১৯৬৪ “সাহিত্যে বিটলেমি” শিরোনামে একটা খবর বেরোয়, তাতে স্টাফ রিপোর্টার স্পষ্টভাবে পুলিশকে ওসকাতে চেয়েছিলেন। আমি যুগান্তর দপতরে গিয়েছিলুম ওই সাংবাদিকের খোঁজে, কিন্তু কেউই বলতে চাননি যে বানানো খবরটা কার লেখা। পরে কৃষ্ণ ধর পরপর দু’দিন প্রধান সম্পাদকীয় লিখেছিলেন হাংরি আন্দোলনের সমর্থনে। ওনাকে আমি বলেছিলুম, যদিও ইংরেজিতে, যে আমাদের সাহিত্যিক ক্ষুধা যৌনতার নয়, তা হল ন্যারেটিভের ডিক্যাননাইজেশানের, আঙ্গিকমুক্তির, যুক্তিভঙ্গের, ডিন্যারেটিভাইজেশানের, অনির্ণেয়তার, চিন্তার আকরণের, অপরত্ববোধের, প্রতাপবিরোধিতার, প্রতিস্পর্ধার, বাচনিক নির্মিতির, সত্তাজিজ্ঞাসার, প্রান্তিক-স্বাতন্ত্রের, উপস্হাপনের ব্যাঞ্জনার, অন্তর্ঘাতের।

    আমি গ্রেপ্তার হলুম ৪ঠা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, পাটনায়, কলকাতা থেকে দুজন শাদা পোশাকের পুলিশ অফিসার এসেছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে, ওরা আমার অফিসে এসে হাজির, অফিস প্রধানের ঘরে ঢুকতে উনি বললেন, আপনি এই দুই ভদ্রলোকের সঙ্গে বাইরে গিয়ে আলাপ করুন, আপনার সঙ্গে এনাদের কাজ আছে। নিচে রাস্তায় যেতেই দুজনে দুদিক থেকে আমার কাঁধ খামচে বলে উঠল, আপনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে, আপনার বাড়িতে নিয়ে চলুন। রিকশ ডেকে দুজনে দুদিক থেকে ধরে রইলো আমাকে, সম্ভবত ভাবছিল যে পালিয়ে যাবো। বাড়ি পৌঁছে দেখি স্হানীয় থানার পুলিশ ঘিরে ফেলেছে বাড়ি, পাবলিক জড়ো হয়ে গেছে মজা দেখতে। রিকশঅলাটা দাঁড়িয়েছিল, বাবা ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। আমার জান্তব প্রবৃত্তির বিকাশ সম্পর্কে বাবা সঠিক অনুমান করে ফেলেছিলেন বহু আগেই।

    পুলিশ অফিসারদের একজন, পরে যার নাম জেনেছি বারোড়ি, সে পেপারওয়েট তুলে আচমকা বাবার দোকানের আলমারির কাচ ভেঙে ফেলল ; বাবা বললে, ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ তো ওর ঘরে গিয়ে তল্লাসি করুন না, জবাবে বারোড়ি বললে, আমরা পুরো বাড়িতে তল্লাশি চালাবো। ওপরতলায় যেতে খাটের তলা থেকে মায়ের ট্রাঙ্ক টেনে তালা ভেঙে ফেলে লণ্ডভণ্ড করা আরম্ভ করল, মায়ের বিয়ের বেনারসি পুরোনো ভাঁজ থেকে ছিঁড়ে গেল, আর আমি দেখতে পেলুম শ্রেয়াকণার চিঠি আর ফুলটুকে দেয়া আমার কার্ড ছিটকে বেরিয়ে এলো। তিন তলায় গিয়ে উনিশ শতক থেকে সংগ্রহ করা ফোটোর প্লেটের একটা র‌্যাক একটানে ফেলে দিল, এখন ওসব ফোটো সংগ্রাহকদের কাছে বেশ দামি। অবশ্য পরে দাদার ছেলেরা অন্য তাকের প্লেটগুলোকে অকেজো মনে করে সের দরে বেচে দেবে।

    টানাহেঁচড়া করে পুলিশ আমার ঘরে ডাঁই করে জড়ো করে ফেলল অনেককিছু, যা পরে মামলায় লাগবে না আর যা ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আমাকে লেখা চিঠির দুটি ফাইল, একটায় ষাটটা অন্যটায় চল্লিশটা চিঠি ; আমার কবিতা নাটক ছোটোগল্পের পাণ্ডুলিপি ; আমার দুটো ডায়েরি, ইংরেজি আর বাংলা ; হাংরি আন্দোলনের বিভিন্ন বুলেটিনের বাণ্ডিল ; পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে সমালোচনা করে আমার পুস্তিকার বাণ্ডিল ; প্রচ্ছদে ব্যবহার করার জন্য দুটো ব্লক, মেকসিকোর চিত্রকরের আঁকা ; এভারগ্রিন রিভিউ-এর কপি ; সন্দীপনের উপহার দেয়া ‘বিজনের রক্তমাংস’ ; প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ‘স্বকাল’ ; ছোটোগল্প লেখা তিনটে খাতা ; প্রকাশিত ‘ইতিহাসের দর্শন’ লেখার ফাইল কপি ; যৌনতা সম্পর্কে একটি বই ; ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার কপি ; হিন্দি পত্রিকা ‘লহর’ যাতে আমার সম্পর্কে প্রবন্ধ বেরিয়েছিল ; একটা করোনা টাইপ রাইটার ; দাদা সমীর রায়চৌধুরীর কাব্যগ্রন্হ ‘জানোয়ার’-এর সব কয়টি কপি। এগুলোর মধ্যে কেবল আমার ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার পাণ্ডুলিপি আদালতে পেশ করেছিল সরকারি উকিল। বাকি সব নিপাত্তা। সাক্ষী হিসাবে রাস্তা থেকে তিনজন ঝাড়ুদারকে ধরে নিয়ে এলো কলকাতার পুলিশ।

    হাতে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশের দল রাতে নিয়ে চলল বাঁকিপুর বা পিরবহোর থানায়, সোজা লকআপে, অন্ধকার, আলো নেই, পাশের লকআপে বেশ্যার দলের চেঁচামেচি, লকআপে সাত-আটজন কয়েদি, নানা অভিযোগে, ডাকাতি আর খুনও। ফুলপ্যান্টের ভেতরে ইঁদুর ঢুকে এলো, পা ঝেড়ে বের করলুম, বাড়ি থেকে খাবার এসেছিল, কিন্তু একে অন্ধকার, তায়ে লকআপের অভিজ্ঞতা, খাওয়া গেল না। সকালে স্হানীয় খবরের কাগজে গ্রেপ্তারির খবর শুনে নমিতা চক্রবর্তী সাহস যুগিয়ে গেলেন, বহুদিন পর ওনাকে দেখলুম, চোখে চশমা, টিচারি শুরু করেছেন, আমার নকাকিমা যে স্কুলে পড়ান সেখানে। নমিতাদি বেঁচে থাকলে জানতে চাইতুম, ভেঙে পড়া সোভিয়েত রাশিয়ায় কোথা থেকে এতো মহাকোটিপতি আর মহাচোরাকারবারী আচমকা উদয় হল, এতো ভিকিরি, এতো ছিঁচকে চুনোপুঁটি !

    হাগবার জন্য কোমরে দড়ি পরিয়ে হাগতে পাঠানো হলো, ঘুড়ি ওড়ানোর মতন করে ঢিল দিয়ে লাটাই ধরে থাকলো একজন কন্সটেবল আর আমি হাগতে গেলুম, চারিদিকে কয়েদিদের গু, জল পড়ে চলেছে কল থেকে, পোঁদ এগিয়ে ছুঁচিয়ে নিলুম। আবার হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে কয়েদিদের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে ফৌজদারি আদালত। বাবা বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকে এনেছিলেন, যিনি হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন। কলকাতার পুলিস রিমান্ড চাইছিল। বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জামিন দিয়ে বললেন কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে আত্মসমর্পণ করতে। বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন লেখিকা এনাক্ষী ব্যানার্জি আর মীনাক্ষী মুখার্জির বাবা। বাড়ি এসে নিজেকে নবীকরণ করে পৌঁছোলুম উত্তরপাড়ায়, পেছন-পেছন বড়োজ্যাঠা আর বাবা। দাদাও চাইবাসায় গ্রেপ্তার হয়ে চাইবাসা থেকে এসে পৌঁছোলো। জমায়েত দেখে, দাদা গ্রেপ্তার হয়েছে শুনে ঠাকুমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। অন্যান্য জেঠা-কাকারা আর পিসেমশায় এসে পৌঁছোলেন।

    ব্যাংকশাল কোর্টে সারেন্ডার করে জানতে পারলুম দেবী রায়, সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষও গ্রেপ্তার হয়েছে। জামিনের পর আদালত বলল লালবাজারে গিয়ে প্রেস সেকশানে হাজিরা দিতে। লালবাজারে হাজিরা দিতে গিয়ে কফিহাউসে পুলিশ ইনফরমারদের কথা জানতে পারলুম, যারা হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন বই পত্রিকা এনে-এনে জড়ো করেছে প্রেস সেকশানে। আশ্চর্য যে মুখের দিকে তাকিয়েও কেন বুঝতে পারিনি যে অমুক লোকটা, যে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে সে ইনফরমার, তমুক যুবক যে আমার কাছ থেকে বুলেটিন চেয়ে নিয়ে গেল, সে পুলিশের খোচর। মামলার সময় যখন এরা কাঠগড়ায় আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ালো তখন টের পেলুম। সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষের মুখের দিকে তাকিয়েও কি কখনও জানতে পেরেছিলুম যে ওরা পিঠে ছুরি মারবে। অবশ্য আঁচ করা উচিত ছিল, কেননা ওরা দুজনেই লালবাজারে ইন্সপেক্টরের হম্বিতম্বিতে কেঁদে একশা, সেই ইন্সপেক্টর অনিল ব্যানার্জি, পরে নকশাল বিনাশে নাম করেছিল।

    আঘাত তো লোকে করবেই, কিন্তু সব আঘাতে আদর করে হাত বোলানো যায় না। বেশির ভাগ আঘাতের দাগ দেহের চামড়ায় পুষে রাখতে হয়।

    ছাব্বিশ

    মামলার সময়টা বেশ খারাপ গেছে, কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, সাসপেন্ড হবার দরুণ মামলার খরচ, যাতায়াতের খরচ আর খাবার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল। একই শার্ট-প্যাণ্ট প্রায় পনেরো দিন পরে চালিয়েছি। সবসুদ্ধ পঁয়ত্রিশ মাস মামলা চলেছিল। উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে থাকা যেতো কেসের ডেটের মাঝে হাতে সময় থাকলে, কেননা তখন সেরকমভাবে ইলেকট্রিক ট্রেন শুরু হয়নি আর প্যাসেঞ্জার ট্রেনের কোনো নির্ধারিত সময় ছিল না। সুবিমল বসাকের জেঠার স্যাকরার দোকানে বৈঠকখানা পাড়ায় থাকতুম মাঝেমধ্যে আর হাগতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে, রাস্তার কলগুলো এতো নিচু যে তার তলায় প্রায় শুয়ে স্নান করতে হতো। ফলে প্রতিদিন স্নানের অভ্যাস ছাড়তে হয়েছিল। শহরে যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তাদের কাছে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল হাগা, কোথায় গিয়ে হাগা যায়। তখন তো সুলভ শৌচালয় আরম্ভ হয়নি। আহিরিটোলায় রাতে থাকতে পেলে অন্ধকার থাকতে গঙ্গার পাড় ছিল সবচেয়ে সহজ। এটা সেন্টুদার শেখানো ; পিসেমশায়ের আটজন বাচ্চা আর একটা পায়খানা, গঙ্গার পাড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে হাগা পেলে পায়জামা বা প্যান্ট নামিয়ে হেগে নাও আর গঙ্গায় পোঁদ ঠেকিয়ে ছুঁচিয়ে নাও। হাগা পেলে হেগে নেওয়ার মতন আর কোনও আনন্দ নেই। সেন্টুদা পরামর্শ দিয়েছিল যে রাতে হোটেলে থাকার চেয়ে ভালো জায়গা হলো অবিনাশ কবিরাজ লেনের কোনো ঘরে কাউকে সারা রাতের জন্যে প্রেমিকার দাম দেয়া। কিন্তু সেখানেও তো ভোরবেলা উঠে হাগার সমস্যা। সেখানে রাত কাটালেও হাগতে ছুটতে হতো বড়োবাজারে হিন্দি পত্রিকা “জ্ঞানোদয়” এর সম্পাদক শরদ দেওড়ার মারোয়াড়ি গদিতে। এই গদিতে শুয়েও রাত কাটিয়েছি, যতো রাত বেড়েছে ততো শোবার লোকের ভিড় বেড়েছে, কেননা বাইরে থেকে যে ব্যাবসাদাররা কলকাতায় আসতো তারা মারোয়াড়িদের গদিতে শোয়া পছন্দ করতো।

    বাদবাকি সকলের বিরুদ্ধে আরোপ তুলে নিয়ে, ৩রা মে ১৯৬৫ আমার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করল পুলিশ। তার সঙ্গের নথিগুলো থেকে জানতে পারলুম হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্রব অস্বীকার করে মুচলেকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছে সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ, মামলা থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্য। এও জানলুম যে আমার বিরুদ্ধে পুলিশের হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর উৎপলকুমার বসু, এঁরাও নিজেদের হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্রব অস্বীকার করেছেন। উৎপল চাকরি খুইয়ে গিন্সবার্গের সুপারিশে ইংল্যাণ্ডে চাকরি পেয়ে চলে গেলেন। সুভাষ আর শৈলেশ্বর আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে ক্ষান্ত দেয়নি, একের পর এক লেখায় হাংরি আন্দোলনের ইতিহাসকে বিকৃত করে গেছে, সময়ের সঙ্গে তাল দিয়ে আমার প্রতি ঘৃণার মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে, এমনকি নিজের বউ-বাচ্চাদেরও এ-ব্যাপারে ট্রেনিং দিয়ে গেছে ; ফলে ওদের নিজেদের মরচে-পড়া ছোরাগুলোই অকালে রোগ হয়ে ওদের বুকে বিঁধেছে।

    দীপক মজুমদার আমার সমর্থনে একটা স্টেটমেন্ট লিখেছিলেন, এবং বহু সাহিত্যিকের কাছে গিয়েছিলেন তাতে সই করানোর জন্য। কেউ রাজি হননি। কেবল আনন্দ বাগচি সই করেছিলেন। “প্রথম সাড়া জাগানো কবিতা” সম্পাদনার সময়ে আনন্দ বাগচি আমার “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটা তাতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। উৎপলকুমার বসু থাকতেন রয়েড স্ট্রিটে, দোতলায়, সাজানো-গোছানো ঘর, কিন্তু রাতে শোবার অনুমতি দিতেন না। হাংরি আন্দোলনের দরুণ ওনার চাকরি চলে যাবার পর, গিন্সবার্গের সুপারিশে লণ্ডনে চাকরি পেয়েছিলেন। পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিকেশানের প্রয়োজনের কারণে হয়তো পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হয়েছিলেন। সম্প্রতি বিবিসি রেডিওর ডোমিনিক বার্ন ভারতে এলে তাকে সাক্ষাৎকারে নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী বললেও, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভয়ে, এবং সম্ভবত আনন্দ পুরস্কার আর অকাদেমি পুরস্কার পাবার জন্য, হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কবিতা “পোপের সমাধি” বাদ দিয়ে দিয়েছেন “শ্রেষ্ঠ কবিতা” থেকে।

    ৪ঠা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ থেকে ২৮শে ডিসেম্বর ১৯৬৫ পর্যন্ত কাফকায়েস্ক জগতে আমার চলছিল তারিখের পর তারিখ, পেশকারের সোনার দাঁত, উকিলের ফিস, ইনভেস্টিগেশান অফিসারের মুচকি হাসি, তারিখের পর তারিখ, পেশকারের সোনার দাঁত, উকিলের ফিস, ইনভেস্টিগেশান অফিসারের মুচকি হাসি, তারিখের পর তারিখ, পেশকারের সোনার দাঁত,উকিলের ফিস, ইনভেসটিগেশান অফিসারের মুচকি হাসি, তারিখের পর তারিখ, পেশকারের সোনার দাঁত, উকিলের ফিস, ইনভেস্টিঘেশান অফিসারের মুচকি হাসি, তারিখের পর তারিখ, পেশকারের সোনার দাঁত,উকিলের ফিস, ইনভেস্টিগেশান অফিসারের মুচকি হাসি, ক্ষয়ে যাওয়া সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামের ঘর্মাক্ত পরিশ্রম কখনও থামবে না এরকম এক পাগল করা প্রক্রিয়া।

    সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায় ছাড়া সকলেই কেটে পড়ল আমার পাশ থেকে। আমার বিরুদ্ধে সাক্ষীদের কথা কফিহাউসে চাউর হয়ে গেলে জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত আর তরুণ সান্যাল নিজেরা যোগাযোগ করে আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে রাজি হলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমে রাজি ছিলেন না, যেই শুনলেন যে শক্তি, সন্দীপন, উৎপল আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, উনি তক্ষুনি রাজি হয়ে গেলেন, ওনাদের উচিত শিক্ষা দেবার জন্য, কেননা সুনীলকে না জানিয়ে ওনারা হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সন্দীপনকে সুনীল এর জন্য ক্ষমা করতে পারেননি আর গোপনে আমার বিরুদ্ধে প্রচার করে গেছেন, ভারতে বা বিদেশে কেউ আমার কথা জানতে চাইলে “ও তো লিখতেই জানে না” বলে উড়িয়ে দিতেন।

    সুনীল যে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে কতো চটে গিয়েছিলেন তা ১০ই জুন ১৯৬৪ তারিখে আয়ওয়া থেকে আমায় লেখা চিঠির এই অংশটুকু থেকেই স্পষ্ট হবে: “চালিয়ে যাও ওসব আন্দোলন কিংবা জেনারেশনের ভণ্ডামি। আমার ওসব পড়তে কিংবা দেখতে মজাই লাগে। দূর থেকে। সাহিত্যের ওপর মৌরসি পাট্টা বসাতে এক-এক দলের অত লোভ কী করে আসে, কী জানি। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো। আমাকে দেখেছ নিশ্চয় শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ। আমি তা-ই, যদিও গায়ে পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে। সুতরাং, তোমাদের উচিত আমাকে দূরে-দূরে রাখা, বেশি খোঁচাখুঁচি না করা। নইলে হঠাৎ উত্তেজিত হলে কী করব বলা যায় না। জীবনে ওরকম উত্তেজিত হয়েছি পৌনে একবার। গত বছর। দু-একজন বন্ধুবান্ধব ও-দলে আছে বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশন গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সেক্ষমতা রাখি, জেনে রেখো। তবে এখনও ইচ্ছে নেই ও-খেলাঘর ভাঙার।”

    মনের ভেতরে সুনীলের যে বিষক্রিয়া চলছিল তা পাঁচ দিন পর ১৫ জুন ১৯৬৪ তারিখে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা এই চিঠির বিষাক্ত অংশটি থেকে টের পাওয়া যায়, “আপনি মলয়কে এত পছন্দ করছেন—কিন্তু ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে আপনি নিশ্চয়ই মনে-মনে বিশ্বাস করেন না। আমি চলে আসার পরও আপনি হাংরির পৃষ্ঠপোষকতা করছেন — হিন্দি কাগজের জন্য আপনি কি একটা লিখেছিলেন — তাতেও হাংরির জয়গান। ভাবতে খুব অবাক লাগে — আপনার মতো অ্যাবস্ট্র্যাক্ট লেখক কি করে ইলাসট্রেটেড উইকলিতে ছবি ছাপাটাও উল্লেখের ব্যাপার মনে করে। এগুলোই হাংরির গোঁজামিল। এই জন্যই এর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক থাকতে বারবার দুঃখ পেয়েছি, দুঃখ থেকে রাগ, রাগ থেকে বিতৃষ্ণা। একটা জিনিস নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আমি হাংরির কখনও প্রত্যক্ষ ভাবে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করিনি, ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করিনি। পারতুম। করিনি, তার কারণ, ওটা আপনাদের সখের ব্যাপার এই ভেবে, এবং আপনারা ওটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছিলেন কৃত্তিবাস বা সুনীলের প্রতিপক্ষ হিসাবে। সে হিসেবে ওটাকে ভেঙে দেওয়া আমার পক্ষে নীচতা হত। খুবই। বিশ্বাস করুন, আমার কোনো ক্ষতির কথা ভেবে নয়, আপনার অপকারের কথা ভেবেই আমি আপনার ওতে থাকার বিরোধী ছিলুম। এটা হয়তো খুব সেন্টিমেন্টাল শোনালো, যেন কোনো ট্রিক, কিন্তু ও-ই ছিল আমার সত্যিকারের অভিপ্রায়।” এই চিঠিটা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

    সন্দীপন যখন কফিহাউসে বসে বলতেন, ইনসাইড জব, ইনসাইড জব, ইনসাইড জব, তখন বুঝতে পারিনি কী বলতে চাইছেন। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে ১৯৬১ সালে জিগ্যেস করেছিলুম, “আপনার আর শক্তিদার মাথার পেছনটা চ্যাপ্টা অথচ সুনীলদার গোল কেন?” জবাবে উনি বলেছিলেন, “ওই বাড়তি অংশে ওর শাওলিন সিক্রেট আছে।” সন্দীপনের চেতলার বাড়িতে জিগ্যেস করেছিলুম, “শুধু মাগি-মরদ নিয়ে লেখেন কেন ? কর্পোরাশানের যে বিভাগে কাজ করেন তা তো ঘুষখোরদের আড়ত, সেসব দেয়া-নেয়া নিয়ে লেখেন না কেন ?” উনি বলেছিলেন, “তা লিখলে, পেনশান বন্ধ হয়ে যাবে।”

    সাতাশ

    সুনীলের আমাকে এতো ভয় পাবার কারণ আমি আজও ডেসিফার করতে পারিনি, আমি তো সেসময়ে ছিলুম একজন নাম-না-জানা প্রবাসী, হারাধন ধাড়া নামে যুবকটি তার চেয়ে বেশি অখ্যাত, তারা একটা আন্দোলনের আওয়াজ দিলো আর তাতেই ভয় পেয়ে গেলেন কৃত্তিবাসের সম্পাদক, ভাবলেন ব্যক্তিগত স্তরে তাঁকে বিস্হাপিত করার চেষ্টা হচ্ছে ! আমি নিশ্চিত যে সুনীল এই ধরণের চিঠি উৎপলকেও লিখে থাকবেন। আসলে একজন লোক কী ভাবছে তা শোনবার মতন ক্ষমতা তখনও পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারিনি।

    ২৮শে ডিসেম্বর ১৯৬৫ আমাকে দুশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে একমাসের কারাদণ্ড দিলেন প্রেসিডেন্সি ম্যাজিসট্রেট। আমার পক্ষের কোনো সাক্ষ্যকে পাত্তা দিলেন না তিনি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষ্যকেও নয় ; হয়তো তখন যদি পরবর্তী কালের মতন সুনীল সে সময়ে বিখ্যাত হতেন তাহলে জজ সায়েবের দ্বিধা হলেও হতে পারত। গুরুত্ব দিলেন আমার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য দিয়েছিল তাদের সাক্ষ্যকে। জজ সায়েব যে দুশো টাকা জরিমানা করেছিলেন তা ছিল সর্বোচ্চ। আমি চাকরিতে তখন মাইনে পেতুম ১৭০ টাকা, গ্র্যাজুয়েট ছিলুম বলে।

    জজ সায়েব “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটা নিজেই এভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন, বোঝা যায় সেসময়ে শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের সাহিত্যিক মূল্যবোধে, তা সে জজ অমলকুমার মিত্র হোন বা আবু সয়ীদ আইয়ুব, কোনও পার্থক্য ছিল না। জজ সায়েবের বক্তব্য পড়লে স্পষ্ট হবে : It appears to be per se obscene. In bizarre style it starts with restless impatience of a sensuous man for a woman obsessed with uncontrollable urge for sexual intercourse followed by a description of vagina, uterus, clitoris, seminal fluid, and other parts of female body and organ, beasting of man’s innate impulse and conscious skill as to how to enjoy a woman, blaspheming God and profaning parents accusing them of homosexuality and masterbation, debasing all that is noble and beautiful in human love and relationship. It is a piece of self analysis and eroticism in autobiographical or confessional vein when the poet engages himself in mercilessly obnoxious and revolting self-degradation and resorts to sexual vulgarity to a degree of perversion and morbidity far exceeding the customary and permissible limits of candour in description or representation. It is patently offensive to what is called contemporary community standards. Its predominant appeal to an average man considered as a whole is to prurient interest, in a shameful or morbid interest in nudity, sex and excretion. Considering its dominant theme it is dirt for dirt’s sake, or, what is commonly called, hard core pornography suggesting to the minds of those in whose hands it may fall stinking wearisome and suffocating thoughts of a most impure and libidinous character and thus tending to deprave and corrupt them without any rendering social or artistic value and importance. By no stretch of imagination can it be called, what has been argued, an artistic piece of erotic realism opening up new dimension of contemporary Bengali literature or a kind of experimental piece of writing, but appears to be a report of a repressed or a most pervert mind who is obsessed with sex in all its nakedness and thrives on, or revel, in utter vulgarity and profanity preoccupied with morbid eroticism and promiscuity in all its naked ugliness and uncontrolled passion for opposite sex. It transgresses public decency and morality substantially, rather at public decency and morality by its highly morbid erotic effect unredeemed by anything literary or artistic. It is an affront to current community standards of morality and decency. The writing viewed separately and as a whole treats with sex, that great motivating force of human life, in a manner that surpasses the permissible limits judged from our community standards, and as there is no redeeming social value or gain to society which can be said to preponderate, I must hold that the writing has failed to satisfy the time honoured test. Therefore it has got to be stamped out since it comes within the purview of Section 292 of Indian Penal Code. Accused is accordingly found guilty of the offence punishable under Section 292 of Indian Penal Code, is convicted thereunder and sentenced to pay a fine of Rs. 200/-, in default simple imprisonment for one month. Copies of the impugned publication seized be destroyed.

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও, যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত নিমরাজি হয়ে, দাদার অনুরোধে, ৫ই নভেম্বর ১৯৬৫ আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, সাক্ষ্য দিয়ে ফেরার পর দাদাকে ৯ই নভেম্বর যে চিঠিটা লিখেছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশটি জজ সায়েব আর আবু সয়ীদ আইয়ুবের সাহিত্যিক মানসিকতা থেকে ওনার বিশেষ পার্থক্য দেখি না : “সাক্ষীর কাঠগড়ায় মলয়ের কবিতা আমাকে পুরো পড়তে দেওয়া হয়। পড়ে আমার গা রি-রি করে। এমন বাজে কবিতা যে আমাকে পড়তে বাধ্য করা হল, সে জন্য আমি ক্ষুব্ধ বোধ করি — আমার সময় কম, কবিতা কম পড়ি, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না এমন কবিতা পড়ে আমি মাথাকে বিরক্ত করতে চাই না। মলয়ের তিন পাতা রচনায় একটা লাইনেও কবিতার চিহ্ণ নেই। ” বুড়ো বয়সে জানতে পেরেছিলেন নিশ্চয় যে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা বহু ওয়েবপত্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে, নেটে কবিতাটা নিয়ে দশ বছর যাবত তর্কাতর্কি চলছে।

    চিঠিটির পরের অংশে তিনি যা লিখেছিলেন তা আরও ভয়ঙ্কর : “যাই হোক, তবু আমি বেশ স্পষ্ট গলাতেই দুবার বলেছি ওর ঐ কবিতা আমার ভালো লেগেছে। এর কারণ, আমার কোনো মহত্ব নয়— আমার সাধারণ, স্বাভাবিক, সীমাবদ্ধ জীবন। যে কারণে আমি আনন্দবাজারে সমালোচনায় কোনো বাজে বইকে ভালো লিখি — সেই কারণেই মলয়ের লেখাকে ভালো বলেছি। ” দেশ-আনন্দবাজারে কতো-কতো বই তিনি আলোচনা করেছেন, সব আলোচনাই তাহলে গুয়েগোবরে ব্যাপার !

    সিটি লাইটস বুক স্টোরের মালিক ও বিট আন্দোলনের কবি লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি ওনার পত্রিকা সিটি লাইটস জার্নালে প্রকাশ করতে চাইছিলেন বলে ওনাকে একটা কপি পাঠিয়েছিলুম, পড়ে উনি ২৬ মার্চ ১৯৬৬ তারিকে এই চিঠিটা লিখেছিলেন আমাকে:-

    Dear Malay,

    I have received the legal decision on your case, and thank you very much for sending it. I find it laughable. I want to publish it together with your poem ‘Stark Electric Jesus’ in the next ‘City Lights Journal’ which will be out this coming summer, and I enclose a small payment immediately, since I know you must need it desperately. I am sending a copy of this letter to Howard McCord. Perhaps he knows the answers to the following questions and will send them to me rightaway since time is of the essence, and it may take some time to get a reply from you. I think it is a wonderful poem, and I will certainly credit McCord for having first published it. Bravo.

    Allen is in NY and his new address is 480 East, !0 Street ( Apt 4c ), New York, NY.

    I need to know the answers to the following questions : 1) Was the poem first written in Bengali and was it the Bengali or the English version which was seized and prosecuted ? 2) Is this your own translation, or whose is it ? 3) Do you wish me to use the typewritten copy of the poem which you sent me last year, or the version printed by McCord ? ( I find differences ).

    Let me hear as soon as you can. Holding the press. And good luck. I hope you are still able to survive. With Love

    Lawrence Ferlinghetti

    আমি কলকাতা হাইকোর্টে রিভিশন পিটিশান করলুম। হাইকোর্টের জন্য আমি পেলুম সদ্য ইংল্যাণ্ড থেকে ফেরা ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়কে, যিনি হাংরি আন্দোলনের মামলার সংবাদ লণ্ডনের কাগজগুলো থেকে পেয়েছিলেন। তিনি যোগাযোগ করিয়ে দিলেন বিখ্যাত ক্রিমিনাল লইয়ার মৃগেন সেনের সঙ্গে। হাইকোর্টে শুনানি হল ২৬ জুলাই ১৯৬৭ আর বেকসুর খালাস হলুম, এই আদেশে: I hold first that the substance of any offence under Section 292 IPC could not have been explained to the petitioner in this case, and secondly, that the finding of the learned Magistrate that the petitioner circulated any obscene matter is not based on any evidence whatsoever. This rule accordingly is made absolute. The order of conviction and sentence passed on the petitioner is set aside and he is acquitted. Fine, if paid, be refunded.।

    হাইকোর্টে রেহাইয়ের পর কেবল একজন সাহিত্যিকের চিঠি পেয়েছিলুম, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের, ৩০ জুলাই ১৯৬৭ তারিখে লেখা, আর কারো নয়, মুচলেকাপন্হীদের তো নয়ই, এই চিঠিটার জন্যে সন্দীপনকে ক্ষমা করে দিয়েছিলুম :

    প্রিয় মলয়,

    হাইকোর্টের রায় পড়ে তোমাকে মনে-মনে তৎক্ষণাৎ কনগ্র্যাচুলেট করেছি। একটা মামলা হওয়া দরকার ছিল, কাউকে না কাউকে এরকম মামলার আসামী হতেই হত। সীমাবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এর ফলাফল আধুনিক সত্য-সাহিত্যের পক্ষে যথেষ্ট ভালো হবে, মনে হয়।

    কৃতিত্ব সবটাই তোমার একার, তবু, লেখক নামের যোগ্য সকলেই একে পুরস্কার বলে মনে করবে ও ভাগ নিতে চাইবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি পুরস্কৃত হওয়ার আনন্দ পেয়েছি।

    প্রীতিসহ

    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

    আঠাশ

    ১৯৬৫এর ওই সময় থেকে ১৯৬৭এর রেহাই পর্যন্ত আমাকে ফ্যা-ফ্যা করে বেড়াতে হয়েছে। রেহাই পেয়ে চাকরি ফিরে পেলুম। চাকরি পেয়ে করুণাশঙ্কর রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টের ব্যারিস্টার মৃগেন সেন ও তাঁর টিমকে নগণ্য ফিস দিতে পারলুম। করুণাশঙ্কর রায় প্রদেয় ফিস প্রায় মুকুব করিয়ে দিয়েছিলেন, নয়তো মৃগেন সেনের যা ফিস ছিল তা আমার পক্ষে দেয়া অসম্ভব হতো।

    আমার মামলা যখন ব্যাংকশাল কোর্টে সাবজুডিস রয়েছে, সেসময়ে আগবাড়িয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকায় এই সম্পাদকীয়টি লিখলেন, দাদার মতে উনি এটা লিখেছিলেন আনন্দবাজার এসট্যাবলিশমেন্টকে সন্তুষ্ট করার জন্য, কেননা ব্যাংশাল কোর্টে মামলা চলার সময়ে তো বুলেটিন বেরোনো বন্ধ হয়ে গেছে, মুচলেকাপনন্হীরা যে-যার কেটে পড়েছে, আমার বিরুদ্ধে জোট বেঁধে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করেছে:

    “হাংরি জেনারেশান। অনেকেই প্রশ্ন করছেন বলে আমরা লিখিতভাবে জানাতে বাধ্য হলুম যে হাংরি জেনারেশান নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা আন্দোলনের সঙ্গে কৃত্তিবাস সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্কিত। ঐ প্রকার কোনো আন্দোলনে আমরা বিশ্বাস করি না। কৃত্তিবাসের নামও যুক্ত করতে চাইনি কখনও। ‘হাংরি’ নামে অভিহিত কোনো-কোনো কবি কৃত্তিবাসে লেখেন, বা ভবিষ্যতে অনেকে লিখবেন, কিন্তু অন্যান্য কবিদের মতোই ব্যক্তিগতভাবে, কোনো দলের মুখপাত্র হিসেবে নয়। সংঘবদ্ধ সাহিত্যে আমরা আস্হাশীল নই। পরন্তু বাংলাদেশের যে কোনো কবির প্রতিই কৃত্তিবাসের আহ্বান। হাংরি জেনারেশানের আন্দোলন ভালো কি খারাপ আমরা জানি না। ঐ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ বা পরিণাম সম্পর্কে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। এ-পর্যন্ত ওদের প্রচারিত লিফলেটগুলিতে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি চোখে পড়েনি। নতুনত্ব-প্রয়াসী সাধারণ রচনা। কিছু-কিছু হাস্যকর বালক ব্যবহারও দেখা গেছে। এছাড়া সাহিত্য সম্পর্কিত কয়েকটি ক্রিয়াকলাপ বিরক্তি উৎপাদন করে। পিজিন ইংরেজিতে সাহিত্য করার লোভ উনিশশো ষাট সালের পরও বাংলাদেশের একদল যুবক দেখাবেন — আমাদের কাছে কল্পনাতীত ছিল। তবে ঐ আন্দোলন যদি কোনোদিন কোনো নতুন সাহিত্যরূপ দেখাতে পারে — আমরা অবশ্যই খুশি হবি। ”

    ব্যাংকশাল কোর্টে আমার উকিল চণ্ডীচরণ মৈত্র সম্পাদকীয়টা পড়ে বলেছিলেন, একটা কনটেম্পট অফ কোর্ট মামলা ঠুকে দিতে। তা সম্ভব ছিল না, কেননা মনের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে জোঁক-কাঁকড়াবিছে পুষে রাখলেও উনি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

    পরেও, ইংরেজি ভাষার ভারতীয় ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষের স্ত্রী ডেবোরা বেকার যখন গিন্সবার্গ আর অরলভস্কিকে নিয়ে ‘দি ব্লু হ্যাণ্ড’ বইটা লেখার জন্যে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সুনীলের কাছ থেকে তথ্য চাইলেন, ডেবোরা বেকারকে আমাদের কাছে না পাঠিয়ে ভুলভাল তথ্য সরবরাহ করেন সুনীল, আমার সম্পর্কে তো বটেই। আমার ওপর ওনার রাগ বুড়ো বয়সেও যায়নি। কৃত্তিবাসের জন্যে আমার কাছে কবিতা চাননি কখনও। উনি পঞ্চাশ বছর আমার কাছে কবিতা চাননি

    মামলা চলার সময়ে, আর তার পরও অনেকে বলতো, আরে মামলা চলছে তো কি হয়েছে, অমন মামলা তো ফৌজদারি আদালতে চলতেই থাকে। জবাবে আমি বলতুম যে, বাঞ্চোৎ, কলকাতা শহরে বাড়ি আছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে, দুবেলা খাবার ব্যবস্হা আছে, তাই অমন কথা বলতে পারছিস। রাতে থাকার ঠাঁই নেই, পাইস হোটেলে খেয়ে-খেয়ে পেটের অবস্হা তথৈবচ, সকালে উঠে কোথায় হাগতে যাবো, খিদে পেলে জলখাবার খেয়ে বাসভাড়া খরচ করে কোর্ট পর্যন্ত হাঁটবো, দিনের পর দিন একটা শার্ট-প্যান্ট পরেই কাটাবো, ঘামে গেঞ্জির অবস্হা এমন যে খুলে জঞ্জালের গাদায় ফেলে দিতে হবে, সামলাবার জন্যে কাউকে ধরে খালাসিটোলায় ধেনো টানবো বা গাঁজা ফুঁকবো, এগুলো ফেস করতিস তো বুঝতিস। মামলার সময়ে দুজন কেবল সাহায্য করেছিলেন, কমলকুমার মজুমদার, খালাসিটোলার কাছে একটা একশো টাকার নোট দিয়ে, যদিও আমার সঙ্গে ওনার তেমন পরিচয় ছিল না, বলেছিলেন, “তুমি তো জুলিয়াস সিজার হে।” তখন ভেবেছিলুম যে কলকাতায় চারিদিকে আমাকে নিয়েই আলোচনা চলছে বলে কথাটা বললেন। মামলার সময়ে যখন বন্ধুরা সাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়ালো তখন টের পেলুম যে কেন বলেছিলেন জুলিয়াস সিজার। আরেকজন, অশোক মিত্র, আই এ এস, ওনার বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, সেই রাতের ভালোমন্দ খাবার খাওয়ার জন্যে।

    ব্যাংকশাল কোর্টে মামলা শেষ হবার আগেই বাসুদেব, সুভাষ, শৈলেশ্বর আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিল। সুবো আচার্য প্রদীপের সঙ্গে ত্রিপুরায় পালিয়ে গিয়েছিল ; প্রদীপ গ্রেপ্তার হতে ত্রিপুরার এক গ্রামে গিয়ে স্হানীয় কবির বাড়িতে লুকিয়ে ছিল সুবো। ব্যাংকশাল কোর্টে আমার দণ্ডাদেশ হবার পর ফিরেছিল। ত্রিদিব মিত্রর চিঠি থেকে জানতে পারলুম ওরা “ক্ষুধার্ত” নামে একটা পত্রিকা বের করার তোড়জোড় করছে যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাকে, দেবী রায়কে, ত্রিদিব মিত্রকে, আলো মিত্রকে, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, শম্ভু রক্ষিত আর সুবিমল বসাককে বাদ দেয়া। এদিকে বাসুদেব আর সুভাষ তখন “মানবতা” “সৌহার্দ্য” “বিশ্বপ্রেম” ইত্যাদি নিয়ে বুকনি ঝেড়ে বেড়াচ্ছে, অথচ নিজের পত্রিকা থেকে বন্ধুদেরই বাদ। জানিনা কেমনধারা মানবতাবাদ ছিল সেটা। পরে ওরা নিজেদের চারিপাশে অনেক চেলা যোগাড় করে ফেলেছিল, নিজেদের বউদেরও হাংরি আন্দোলনের অন্তর্গত করে ফেলেছিল। সম্ভবত ওদের মানবতাবাদ ছিল পরিবারতান্ত্রিক, যা কিছুকাল পরেই দেখা দিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। ঘোষভাইরা গোরু-শুয়োরের মাংস খেতে চাইতো না, আমরা খাবার পরিকল্পনা করলেই কেটে পড়তো। ১৯৬৪ সালে একবার হাওড়া স্টেশানে লোকাল থেকে শৈলেশ্বরকে নামতে দেখে চেঁচিয়ে ডাকলুম ওকে, ও আমাকে দেখতে পেয়েই প্ল্যাটফর্মের অন্য দিকে যে ট্রেনটা ছাড়ছিল তাতে উঠে পড়ল।

    হাইকোর্টে কেস ঝুলে থাকার সময়ে কলকাতা থেকে পাটনা ফিরলুম, কেননা রিভিশন পিটিশনের শুনানি কবে হবে তার নিশ্চয়তা নেই, একমাসে হতে পারে আবার চার বছরও লাগতে পারে। একাকীত্বকে সম্ভবত উপভোগ করা শুরু করেছিলুম, কিংবা তখন থেকে একাকীত্ব আমার মগজের দখল নিয়ে নিয়েছিল। জীবনানন্দ কী করে একাকীত্বকে সামলাতেন ? কবিতার পর কবিতা, উপন্যাসের পর উপন্যাসে লুকিয়ে ফেলতেন।

    শরীরও খারাপ হয়ে আসছিল, কলকাতায় কোর্ট আর এর বাড়ি তার বাড়িতে রাত কাটিয়ে, পাইস হোটেলে খেয়ে। জ্বর দেখা দিচ্ছিল মাঝে-মধ্যে। বাড়ির ডাক্তার অক্ষয় গুপ্তকে দেখাতে গেলুম। উনি স্হানীয় আর কলকাতার কাগজপত্রে আমার সম্পর্কে খবর পড়ে, ছবি দেখে, নাড়ি দেখার বা জিভ দেখার বা রক্ত পরীক্ষা করার কথা বললেন না। সোজা পেনিসিলিন অয়েল ইনজেকশান প্রেসক্রাইব করে দিলেন। যে কমপাউণ্ডারের কাছে একদিন অন্তর পোঁদে ইনজেকশান নিতে যেতুম সে জিগ্যেস করল, এই রোগ বাধালেন কী করে ?

    —এই রোগ মানে কী রোগ ?

    —যৌন রোগ ?

    —ওহ, আর ইনজেকশান দিতে হবে না।

    অক্ষয় ডাক্তার ধরেই নিয়েছিলেন যে আমি নির্ঘাৎ যৌন রোগ বাধিয়েছি।

    উনত্রিশ

    পাটনা ফিরেছি জানতে পেরে অফিসের দুই সহকর্মী এরিক পেজ আর মামুদ জোহের দেখা করতে এসে বলল, আরে, মন খারাপ করার কি আছে, কলকাতার বন্ধুরা ল্যাঙ মেরেছে তো কি হয়েছে, আমরা তো আছি, চল, আমরা যাচ্ছি ট্রিপে, তুই তো যাসনি কখনও, ভালো ছেলে সেজে এড়িয়ে যেতিস, চল, মন ভালো হয়ে যাবে। এরিক পেজ আর মামুদ জোহেরদের দলটার কথা আমি লিখেছি “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসে। ওদের একটা নারী-নারকো গ্যাঙ বা না-না গ্যাঙ ছিল। আমি ওদের কথায় রাজি হয়ে গেলুম অংশ নেবার জন্যে, কিন্তু জানিয়ে দিলুম যে আমি টাকাকড়ি দিতে পারব না, হালত একেবারে খাস্তা। অতনু চরিত্রের ওপর চাপিয়ে দিয়েছি এই ঘটনা সংক্রান্ত আমার নিজের অভিজ্ঞতা।

    মামুদ জোহেরের ছিল জানলায় সানফিল্ম লাগানো ফিকে নীল রঙের ম্যাটাডর ভ্যান, ড্রাইভারের পেছনে সানমাইকার দেয়াল। পেছনে কি চলছে দেখা যায় না। পেছনে, দুদিকের সিট টানলে সোফা কাম বেড। ম্যাটাডরে ফার্সট এইড বাক্সে অ্যালুমিনিয়াম পাত, চামচ, ডিস্টিলড জল, সুঁই নেবার পিচকিরি, কাঁচি, লাইটার, টয়লেট পেপার, তুলো, বিদেশি কনডোম। শনিবার-শনিবার ওদের দলটা হল্লাবোল করতে বেরোতো। কেরানি, অফিসার, নোট এগজামিনার অনেকে ছিল ওদের দলে। সন্ধে নাগাদ কোনো হাফগেরস্হ যুবতীকে এই কড়ারে তুলে আনতো যে কয়েকজন তার সঙ্গে ম্যাটাডরের বিছানায় রতিভ্রমণ করবে তারপর তার আস্তানায় ছেড়ে দেয়া হবে কাজ শেষে। আমি ওদের দলে এতোকাল যোগ দিইনি কেননা লেখালিখির পক্ষে ব্যাপারটা বেশ ডিসট্র্যাকটিং। লেখালিখি মগজ থেকে প্রায় উবে গিয়েছিল ; রাজসাক্ষী শৈলেশ্বর, সুভাষের প্রতি সেসময়ে ঘৃণায় কলম ধরার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিল। ক্রমশ লেখালিখিই ছেড়ে গেল, কেবল আমার নয়, ত্রিদিব মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়েরও। বেনারসের বাঙালিদের বাংলা বুলিতে করুণা “ক্ষুৎকাতর সানপাকু” নামে আত্মজীবনী লেখা আরম্ভ করেছিল। ১৯৭০ নাগাদ করুণা-অনিল যখন নকশাল আন্দোলনের দিকে ঝুঁকলো, তখন পুলিশ ওদের আস্তানা আর স্টুডিওর সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল, ওরা অবশ্য তার আগেই বেনারস ছেড়ে পালিয়েছিল।

    মামুদ জোহের ভোরবেলা ভ্যান নিয়ে হাজির, রাজগিরে সবাই মিলে যাওয়া হবে, “ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান” খেলতে আর মদমাংস খেয়ে হুল্লোড় করতে। গাড়ি চলল গোলঘরের দিকে, গোলঘরের পেছনে এক ঘিঞ্জি গলিতে, বেশ গরিব এলাকা দেখেই টের পাওয়া যায়, কালচে কাঠ, ফ্যাকাশে প্লাসটিক, ত্যাবড়ানো টিনের দেয়াল,পুরোনো বাঁশের খুঁটি, আধপচা কাতাদড়ি, খরখরে চুনবালি, চটের পর্দা, উদাসীন বুড়ো, টিন নিয়ে গঙ্গার পাড়ে হাগতে চলেছে যুবক, দাঁতনরত লাল ল্যাঙোট-পরা ষণ্ডা।

    “একজনকে পিক আপ করতে হবে”, বলে মামুদ জোহের চলে গেল বস্তিটার ভেতরে, আর মিনিট পনেরো পরে ফিরে এলো, কালো কাকেশ্বরী কুচকুচে, মানে এতো কালো এর আগে দেখেছি বলে মনে হয় না, ছিপছিপে এক যুবতীকে সঙ্গে নিয়ে, দুহাত ভরা প্লাসটিকের আসমানি চুড়ি, নাকে ফিরোজা পাথরের বা নকল ফিরোজার নাকছাবি, কালো শিফনের শাড়ি, আসমানি ব্লাউজ, চুলে চাঁপা বেলির মালা, চোখে কাজল বা আইলাইনার চোখ দুটোকে বড়ো দেখাবার জন্যে। সত্যিই, ব্যাংকশাল কোর্টে দিনের পর দিন হাজিরা দিয়ে আর শেষে সাজা পেয়ে, মনে হল যে এই মেয়েটার সঙ্গ কিছুক্ষণের জন্য আমার দরকার। এরকম একটা নোংরা বস্তিতে থেকেও মেয়েটা কতো টাটকা উচ্ছল প্রাণবন্ত সপ্রতিভ চনমনে, যা আমার সেসময়ে বড়োই দরকার ছিল।

    গাড়িতে ঢুকে আমাদের দুজনের মধ্যে ঝপাং করে বসে পড়ল মেয়েটা, ওর ছোঁয়াচে প্রাণপ্রাচুর্য নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অনুসন্ধিৎসু। মামুদ জোহের মেয়েটিকে হিন্দিতে বলল, ও বাঙালি, তুই ওর সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে পারিস।

    —আপনাকে দেখিনি তো আগে কখনো, কোলের ওপর উড়িষ্যার পিপলিগ্রামের ছিটকাপড়ের রঙিন কাঁধব্যাগ নামিয়ে বলল মেয়েটা, কথায় খাঁটি বিহারি টান।

    — না, ও এই প্রথমবার আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে, আগে আমাদের মনে করত লম্পট, এখন কলকাতায় নানা কাজকারবার করে আমাদের রাস্তায় চলে এসেছে, ওর নাম মলয়, মলয় রায়চৌধুরী, তুই তো মুকখু, কাগজ পড়িস না, নয়তো হিন্দি ধর্মযুগে আর এখানকার সার্চলাইট খবরের কাগজে ওর ফোটো আর খবর দেখতে পেতিস, বলল মামুদ জোহের, হিন্দিতে।

    — আর আমার নাম শেফালি, সবাই আমাকে টু বলে ডাকে। তারপর দুহাতে আমার বাঁ হাতটা ধরে বলে উঠল, আরে, তোমার হাত কতো নরম, তোমার কি হাত ঘামে ? মেয়েটার ছোঁয়ায় আমার প্রায় কান্না পেয়ে গিয়েছিল, সামলে নিলুম, বললুম, তোমার কথায় অমন হিন্দি টান কেন ?

    শেফালি বলল, ওর বাবা বিহারি আর মা বাঙালি, কলকাতার চটকলে ওর বাবা মজুর ছিল, বাবার সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল মা, তারপর যোগ করল, মা কিন্তু বামুন বাড়ির মেয়ে, হুঁ, বাবারা দেওঘরের বাউড়ি।

    —দেওঘরের বাউরিদের কথা জানি, পাণ্ডাদের ফাইফরমাস খাটতো, রান্নাবান্না করত আর যা বাঁচত তা খেতো, বললুম আমি। বললুম না যে কলকাতা থেকে যে সাব ইন্সপেকটার আমাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছিল সেও ছিল বাউরি বা বারোড়ি।

    —আর এখনকার দিনে তোমরা আমাদের খাও, না ? অদ্ভুত লাগল শুনে, এরকম ছটফটে মেয়ে তো কলকাতার বেবিও ছিল না, যার কাছে ডেভিড গারসিয়াকে নিয়ে গিয়েছিলুম আমরা।

    মামুদ জোহের বুঝতে পারল মেয়েটার কথা, জবাবে বলল, মিলনে পর খা লেতা হুঁ, সর সে পাঁও তক।

    “হুরররররররররে” বলে চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটা, আর আমাদের দুজনের কাঁধে হাত দিয়ে নিজের দিকে টানল। মামুদ জোহের বলল, কি করছিস কি, আরেকটু হলেই অ্যাকসিডেন্ট হতো।

    রাস্তার ধুলো জানলা দিয়ে এসে মেয়েটার মুখে চুলে ভুরুতে ছেয়ে গিয়েছিল। বললুম, তোমার ভুরু, চোখের পাতা আর চুলে ধুলো জমছে। আমার কথা পুরো হবার আগেই মেয়েটা ওর মুখ আর মাথা মুছে ফেলল আমার বুকে, আমি স্তম্ভিত, বলা যায় স্পর্শমুগ্ধ, জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে হচ্ছিল, চুমু খাবার ইচ্ছে হচ্ছিল, মেয়েটার মুখ থেকে মাছের গন্ধ পেলুম, মাছের গন্ধের চুমুর মতন চুমু হয় না। সামলাতে না পেরে, আচরণে যোগানো সাহসে, জড়িয়ে ধরে খেয়েই ফেললুম চুমু। একটা চুমুতেই যেন ব্যাংকশাল কোর্টের ভুত নেমে গেল।

    —নট অ্যালাউড, নট অ্যালাউড, বলে উঠল মামুদ জোহের, ইউ হ্যাভ টু উইন হার ইন টুডেজ গেম।

    —আনাড়ি হ্যায় বেচারা, জানে দো, জানে দো, মুঝে প্যার সে বহুত প্যার হ্যায়, জোহেরকে বলল মেয়েটা। তারপর আজকে কতোজন, কোথায় যাওয়া হচ্ছে, কোঅর্ডিনেটর কে ইত্যাদি জিগ্যেস করায় বুঝতে পারলুম যে না-না গ্যাঙের কাজকারবারের সঙ্গে মেয়েটা পরিচিত, প্রায়ই একে সঙ্গে নিয়ে ফুর্তি করতে বেরোয় মামুদ আর এরিক পেজরা। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইছিলুম কেমনতর হাফগেরস্হ যৌনকর্মী।

    —কি দেখছো গো অমন করে ? জিগ্যেস করে শেফালি বা টু আচমকা আমার নাকে নাক ঠেকিয়ে বলে উঠল, আমাকে দেখছো তো, কখনও এরকম কালো রঙের রাধা দ্যাখোনি, না ? এই নাও, দ্যাখো। তারপর বলে উঠল, তুমি প্রেম-টেম করোনি এখনো ?

    —আরে উ লন্দিফন্দি কা গুরু হ্যায়, এক নম্বরকা লুচ্চা-লফংগা। বলে উঠল মামুদ জোহের।

    —লন্দিফন্দি। চোখে চশমা, এরকম প্যাংলা চেহারা দেখে তো মনে হয় না তুমি লন্দিফন্দির মানুষ। দেখবো অখন একদিন, তোমার চান্সও আসবে, পালিয়ে তো আর যাচ্ছি না, বলল শেফালি।

    —আমরা কোথায় যাচ্ছি ? কেমনধারা বন্দোবস্ত ? জানতে চাইল কালো মেয়েটা, কৃষ্ণকলি কোনো মেয়ের নাম হলে এর নাম তার চেয়েও কালো কিছু হবে, এতো কালো তবু আমার নিরাময়ের কাজ করছিল মেয়েটা, ভুলিনি আজও, কাউকে-কাউকে নিখুঁত মনে থাকে, কৌমার্যের বিকার থেকে মুক্ত করে দ্যায় তারা, রক্ষণশীলতার ভয় থেকে যে ক্লীবত্ব জন্মায় তা থেকে ছাড়িয়ে আনে, যৌনবিকারই সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলে, তাই হয়তো জমিদারদের ছিল বৌবাজার, রক্ষিতা, সম্রাটদের ছিল বাঁদি, ক্রীতদাসী। আমার পক্ষে অ্যাডজাস্ট করা কঠিন হয়ে চলেছে চারিদিকের ঘটনার সঙ্গে।

    জোহের আগেই জানিয়ে দিয়েছিল যে প্রথমে রাজগিরে গিয়ে সবাই জড়ো হবে দেবেন্দরের বাবার পেল্লাই বাড়িতে, সেখানে এক রাত হইচই করে কাটিয়ে পরের দিন খেলতে যাওয়া হবে নালান্দার ধ্বংসাবশেষে। তখনও নালান্দার ধ্বংসাবশেষকে এখনকার মতন সাজিয়ে তোলা হয়নি। শেফালি ঢুকে যাবে আগে, তারপর পুরো দলটা ঢুকে ওকে খোঁজার চেষ্টা করবে। যে প্রথম খুঁজে পাবে তার সঙ্গেই রাতটা কাটাবে শেফালি, দেবেন্দরের রাজগিরের বাড়ির পালঙ্কে, অন্য সবাই মদ-মাংস খেয়ে মাতলামি করবে, কিংবা গ্রাম থেকে দেবেন্দর কয়েকজন বউকে এনে রেখেছে, ওদের বাড়ির পুরুষদের রাখেল, তাদের সঙ্গে ইচ্ছে করলে শুতে পারে।

    আমি মেয়েটার কাছ থেকে যা পাবার পেয়ে গিয়েছিলুম, নালান্দার ধ্বংসাবশেষের ভেতরে ঢুকে ছায়ায় বসে রইলুম আর দেখলুম সহকর্মীদের দৌড়ঝাঁপ, শেফালিকে খুঁজতে হন্যে হয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। অভিজিৎ জিতেছিল। আমি কেবল গেঁজিয়ে ছিলুম মেয়েটার সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে। পরের বার ওরা খেলতে গিয়েছিল শোনপুর মেলায়, আমি যাইনি, কেননা খেলাটা বেশ ক্লান্তিকর, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দুদিন ধরে হেদিয়ে বেড়ানো। শোনপুর মেলায় যে জিতেছিল সেই সহকর্মী যৌন-নৌকোবিহারের নৌকো থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল।

    তিরিশ

    হাতে তো অফুরন্ত সময়, ব্যাংকশাল কোর্টে সাজা আর হাইকোর্টে কেস ওঠার সময় পর্যন্ত। হাংরি আন্দোলন সূত্রেই পরিচয় হয়েছিল দুজন আর্টিস্টের সঙ্গে, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় আর অনিল করঞ্জাই। ওরা বেনারসে থাকত। ওদের ডাকে চলে গেলুম বেনারসে, হিপি-হিপিনীদের জমঘটে। গাঁজা, চরস, আফিম, এলএসডি মাখানো ব্লটিং পেপার। করুণানিধান বললে, হ্যাঁ-হ্যাঁ, হিপিনীদের, যাদের পুরুষ সঙ্গী নেই তাদের চুমু খাবার প্রস্তাব দিতে পারো, ওদের কাছে এলএসডি ক্যাপসুলও পাবে বাহাত্তর ঘণ্টার ট্রিপের, তখন তোমার সঙ্গে হিপিনীটা কী করছে টের পাবে না। আমি চাইছিলুম ফরাসি বা জাপানি কোনো যুবতীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে। করুণা বললে, সবকটা মার্কিন মেয়ে, যেসব ছেলেগুলো ভিয়েতনাম যুদ্ধ এড়াতে নানা ক্যারদানি করেছে তাদের সঙ্গে পোঁ ধরে এসেছে আর বদলা-বদলি করেছে বা ছেড়ে দিয়েছে। করুণার সুবিধে ছিল যে ও ইংরেজি জানতো না, হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে দোভাষী থেকে প্রেমিকে পালটে নিতে পারতো নিজেকে। দ্বিতীয়ত গাঁজা, চরস আর আফিম মিশিয়ে করুণা একটা কনককশান তৈরি করে চারমিনারে ভরে বেচতো হিপিদের, আর হিপিরা তা পাবার জন্যে ওর করায়ত্ত হয়ে গিয়েছিল বলা যেতে পারে। আমি এর কিছুটা হদিশ দিয়েছি “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে।

    নতুন ধরণের প্রেমের সঙ্গে পরিচিত হলুম, যেখানে দুপক্ষই জানে যে এই সম্পর্কের নিশ্চিত এক্সপায়ারি ডেট আছে, সারা জীবন বইতে হবে না, মন ভরে গেলে ছেড়ে দাও, বাতাসে যৌবনের মাংসল মাদকের গন্ধ। আমাকে এই পরিস্হিতি ক্রমশ গিলে ফেলতে আরম্ভ করেছিল, সাপের মতন একটু একটু করে গোলাপি অন্ধকারে, স্নান না করা দেহের সুবাস আর বহুদিন না-কাচা পোশাকের সোঁদা স্বর্গীয় সুষমা। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল একজন হিপিনীর বগলের সোনালী চুল ; আগে ধারণা ছিল না যে বগলের চুলও সোনালী হয়, চুলের গহ্বরে ভালোবাসার নাচ, গর্ভনোরিধক বড়ি না বেরোলে বোধহয় যুবতীরা হিপিনী হয়ে বাড়ি ছাড়তো না। হিপিনীসঙ্গ করে যে সারকথা মগজে ঢুকেছে তা হলো দুটো দেহের মাঝে পারফিউম ব্যাপারটা বিকৃতির দেয়াল।

    করুণা-অনিল যখন কাঠমাণ্ডু থেকে ফিরে আমাকে ওদের সঙ্গে বেনারসে নিয়ে গিয়েছিল, মোটা যুবতী ম্যাডেলিনের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, আর তার আগে কাঠমাণ্ডুতে ক্যারল নোভাকের সঙ্গে স্লিপিংব্যাগে ঢুকে বুঝতে পেরেছিলুম যে লেখালিখি সম্পর্কে হিপিদের তেমন আগ্রহ নেই যেমন ছিল বিটনিকদের, যদিও বিট আন্দোলনের ফলেই ওদের আবির্ভাব, সাইকেডেলিক সঙ্গীত, ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধীতা, যৌনবিপ্লব, মাদক বিশেষ করে গাঁজা, এল এস ডি আর ম্যাজিক মাশরুম, হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে আগ্রহ, খ্রিস্টধর্মকে পরিত্যাগ, ভালো খাওয়া, গান্ধির অহিংসা, সাংস্কৃতিক মতবিরোধ ইত্যাদির জন্যে সেসময়ের বেনারস আর কাঠমাণ্ডু ছিল উপযুক্ত শহর। শহরবাসীরা তাদের কাজকারবার নিয়ে চিন্তিত ছিল না, এমনকি রাস্তায় দাঁড়িয়ে চুমু খেলে, জড়িয়ে ধরলেও গা করতো না কেউ। এখন অবশ্য ভয়ংকর অবস্হা। সেসময়ে করুণা একজন যুবতীর সঙ্গে গঙ্গার অপর পাড়ে চড়ায় গিয়ে খড়ের ছাওয়া-পোঁতা বাঁশের খুঁটির কুটিরে থাকতো, দুজনেই একেবারে উলঙ্গ, “প্রিহসটরিক লাইফে”, অবাক হয়ে গিয়েছিলুম নৌকো থেকে নেমে। করুণা উলঙ্গ জীবনের ফোটোও তুলেছিল একাধিক, নিজের বউকেও দেখিয়েছিল সেসব। ওর বউ সম্ভবত বিরোধিতা করেনি, নিয়মিত রোজগার হচ্ছে মনে করে, কেননা করুণা তার আগে বইয়ের মলাট এঁকে টায়েটুয়ে সংসার চালাতো।

    কলকাতা থেকে, ব্যাংকশাল কোর্টে সাজা পেয়ে আর হাইকোর্টে রিভিশন পিটিশন করে, আমি পাটনায় ফিরে আসার কিছুদিন পর করুণা কাঠমাণ্ডু থেকে আহ্বান পাঠালো, “শিগগির চলে এসে অফুরন্ত চরস আর মেয়েছেলে, খামের ভেতরে কিছুটা আফগানি চরস আছে”। খামের ভেতরে ছিল হাই কোয়ালিটি চরস। এখন হলে তো জেল হয়ে যেতো। তখন সরকারি দোকানে সত্যমেব ছাপমারা পুরিয়াতে পাওয়া যেতো, অ্যালেন গিন্সবার্গ যখন এসেছিল, ওকেও নিয়ে গিয়েছিলুম সরকারি দোকানে।

    কাঠমাণ্ডু যাবার আগে রাজকমল চৌধুরী, হিন্দি কবি, আমাকে নিয়ে গিয়েছিল ওর গ্রামে মাহিষিতে। ফণিশ্বরনাথ রেণু বলেছিলেন, ওর গ্রামে ছিন্নমস্তাদেবীর পুজোর সময়ে যেও, একেবারে পাগল হয়ে যাবে। সত্যিই উন্মাদনা। পুজোর সময়ে মোষ বলি দেয়া হয়েছিল, যারা মানত করেছিল, সকলেই মোষ বলি দেবার জন্য এনেছিল, দেখে আমার বমি পাবার যোগাড়, রাজকমলের দেয়া পানীয় খেয়ে সামলালুম, আর সবাই মৈথিলি গান গাইতে-গাইতে গায়ে-মুখে রক্ত মেখে যেভাবে নাচছিল, আমিও দু’হাত তুলে নাচলুম। পানীয় আর নাচের দৌরাত্ন্যে সন্ধ্যাবেলা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম, এরকম সমবেত ফ্রি ফর অল নাচ, আগে নাচিনি কখনও।

    অ্যালেনের কথাটা আগে বলে নিই তারপর কাঠমাণ্ডুতে করুণার আস্তানায় যাবো। গিন্সবার্গ এসেছিল ১৯৬৩ সালের এপ্রিল মাসের গরমে, মাথায় সিঁদুরের টিপ, গঙ্গায় স্নান করে, কাঁধে গামছা, আর বাবাকে হিন্দিতে জিগ্যেস করেছিল, “মলয় হ্যায়”। রোদে পুড়ে ওর গায়ের রঙ তামাটে হয়ে গিয়েছিল বলে বাবা ভেবেছিলেন কোনো সন্ন্যাসী, কেননা মাঝে আনন্দমার্গের কয়েকজন সন্ন্যাসী এসে ঢুঁ মেরেছিল ওদের পত্রিকায় আমার লেখার জন্য, তখন তাদের ভাগিয়েছিলুম। বাবা আমাকে ডেকে পাঠালেন, অ্যালেন নিজের পরিচয় দিতে, নিয়ে গেলুম ওপরে আমার ঘরে। সত্যি বলতে কি তখনও পর্যন্ত আমি বিট আন্দোলনকারীদের বিষয়ে তেমন জানি না, গিন্সবার্গের নাম দাদার কাছে শুনেছি, কাগজে পড়েছি, কিন্তু “হাউল” কবিতার কথা শুনিনি। “হাউল” আর “ক্যাডিশ” আমাকে পাঠিয়েছিল লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, গিন্সবার্গ ফিরে যাবার পর, “ক্যাডিশ”এর লঙ প্লেইং রেকর্ডও পাঠিয়েছিল, যেটা শুনে অনুবাদ করতে সুবিধা হয়েছিল। ম্যাগাজিন ইত্যাদি পরে পাঠিয়েছিল হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড, আর সেই সূত্রে বেশ কয়েকজন সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গিয়েছিল যারা আমার লেখা প্রকাশ করা আরম্ভ করেছিল।

    গিন্সবার্গ যখন এসেছিল তখন আমাদের বাড়িতে ডাইনিং টেবিল আর বসবার সোফাসেট ছিল না। আমার ঘরে সিলিং ফ্যান ছিল না। মা ওকে মেঝেয় আসন পেতে খেতে দিতেন আর ওর সঙ্গে বাংলা-হিন্দিতেই কথা বলতেন, গরম বলে সামনে বসে হাতপাখায় হাওয়া করতেন। পাটনা দেখার জন্য রিকশা ভাড়া করলুম ; গিন্সবার্গ বলল, এই রিকশাঅলাটা আমার বাবার বয়সী, একে দিয়ে রিকশা টানিয়ে তাতে বসে থাকতে বেশ অপরাধ হচ্ছে। রিকশঅলাকে আমার পাশে বসিয়ে নিজেই রিকশ টানতে আরম্ভ করল, কিছুটা যাবার পর রাস্তায় একজন কন্সটেবলকে দেখে রিকশঅলা বলল, বাবু ওই দেখুন সামনে, আপনি চালাচ্ছেন দেখে ও যদি ধরে তাহলে লাইসেন্স তো যাবেই, হাজতেও পুরে দিতে পারে।

    আমরা স্তুপের আকারের গোলঘরে গেলুম ; স্তুপটা ২৯ মিটার উঁচু, ১২৫ মিটার চওড়া, ওপরে উঠতে ১৪৫টা সিঁড়ির ধাপ। গোলঘর তৈরি হয়েছিল ১৭৮৬ সালে, ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে লক্ষ-লক্ষ মানুষ বাংলা আর বিহারে মারা যাবার পর, চাল-গম রাখার জন্য, গিন্সবার্গ যখন এসেছিল তখনও চাল-গম মজুত করা ছিল গোলঘরের ভেতরে। এখন অবশ্য বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। গোলঘরের ভেতরে প্রথমে ঢুকতে দেয়নি কেয়ারটেকার। আমি বললুম যে উনি বিদেশী, তখন ঢুকতে দিল। গিন্সবার্গ ওর “সানফ্লাওয়ার সূত্র” কবিতাটা আবৃত্তি করল। গোলঘরের ভেতরে চেঁচালে একুশবার প্রতিধ্বনি হয়, অবাক গিন্সবার্গ বলল, টেপরেকর্ডার আনলে ভালো হতো। আমার কাছে ছিল না যে পরের দিন এসে রেকর্ড করব। আমাকেও আবৃত্তি করতে বলল আমার কবিতা। আমি আমার কবিতা মুখস্হ রাখতে পারি না। “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতার শেষ চার লাইন যতটুকু মনে ছিল আবৃত্তি করলুম। গিন্সবার্গ বলল, তোমার কন্ঠস্বর আবৃত্তির জন্য বেশ ভালো, রেকর্ড করো না কেন। বললুম না যে গ্যাঁটে তেমন কড়ি থাকে না। গোলঘরের ওপরে উঠলুম, গঙ্গা, গঙ্গার ওপার আর পুরো পাটনা শহর দেখল গিন্সবার্গ। ওপর থেকে বা বাইরে থেকে গোলঘরের ফোটো তুলল না কোনো। আমি নিজেকে কখনও তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করিনি বলে বিখ্যাত লোকেদের পাশে দাঁড়িয়ে ফোটো তোলানো হয়ে ওঠেনি।

    পরের দিন গেলুম গঙ্গার পাড়ে, মহেন্দ্রু ঘাটে, তখনকার দিনে বাচ্চাবাবুর জাহাজ ওই ঘাট থেকে ওপারে শোনপুরে যেতো, এখন তো গঙ্গার ওপর পোল তৈরি হয়ে গেছে, বাচ্চাবাবুর জাহাজও চলে গেছে অন্য কোথাও। কিছুক্ষণ জাহাজে ঘোরাফেরা করার পর ফেরার রাস্তায় ভিকিরিদের আস্তানাগুলোর ফোটো তোলা আরম্ভ করল গিন্সবার্গ, খোঁড়া, নুলো, জটাজুট, কুষ্ঠরোগি, রাস্তায় চিৎ হয়ে পড়ে থাকা প্যাংলা চেহারার লোক, ইত্যাদি। ফিরে, ফিল্মটা বাবাকে ডেভেলাপ করতে দিয়েছিল। বাবা ডেভেলাপ করার পর পুরো ছত্রিশটা ছবি দেখে খেপে গেলেন, গিন্সবার্গকে বললেন, তোমরা বিদেশিরা কবি হও বা ট্যুরিস্ট, ইনডিয়ায় এসে কেবল এই সবই দেখতে পাও, ভালো কিছু দেখতে পাওনা, ফিরে গিয়ে এগুলো নিয়ে ব্যবসা করবে। গিন্সবার্গকে পরে আমি বললুম যে এবার তোমার ফিল্ম অন্য দোকানে ডেভেলাপ প্রিন্টিং করতে দিও। গিন্সবার্গ ছবি তুলে ডেভেলাপ করিয়ে তাড়াগুলো পাঠিয়ে দিতো ওর সৎমাকে, তিনি ওর পাঠানো যাবতীয় জিনিস দেশ অনুযায়ী আলমারিতে সাজিয়ে রাখতেন, তাই কিউরেটার বিল মরগ্যান, যে আমার সঙ্গে নাকতলায় দেখা করতে এসেছিল, তার সুবিধা হয়েছিল। তবে বাবা যা আঁচ করেছিলেন দেখলুম তা সত্যি, ওর “ইনডিয়া জার্নালস” বইতে ওই সমস্ত নুলো, খোঁড়া, জটাজুটদের ফোটো পাতার পর পাতায়।

    তার পরের দিন ওকে নিয়ে গেলুম পাটনা মিউজিয়ামে, কতো বছর পর, মিউজিয়ামের ঘরগুলো আমার চেনা, এখানে বড়োজ্যাঠা চাকরি করতেন, গিন্সবার্গ ঘুরে-ঘুরে দেখলো। মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে খুদাবক্স লাইব্রেরি। হাতে লেখা ফার্সি বইগুলো দেখলো গিন্সবার্গ। অবাক হয়ে গেল দেখে যে আকবরের সমাধির বাইরে তিনটে মাছের দেহ আর তার একটা মাথার যে ড্রইং ও নিজের খাতায় তুলে এনেছে তা খুদাবক্স লাইব্রেরির একটা বইয়ের মলাটে রয়েছে, গ্রন্হাগারিক জানিয়েছিল যে বইটা আকবরের লেখা “দীন-ই-ইলাহি”। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলমান সহপাঠীরা আকবরের এই বইটার প্রসঙ্গ উঠলেই কটু সমালোচনা করত।

    পাটনায় ওকতাভিও পাজও এসেছিলেন, আমাদের বাড়ি, কিন্তু তাঁর সঙ্গে ডিসট্রিক্ট ম্যাজিসট্রেট আর পুলিশের গাড়ি থাকায় কোনো সাহিত্য আলোচনা হয়নি। উনি চা-বিস্কুটও খেতে চাইলেন না, হয়তো রাষ্ট্রদূতের প্রোটোকল। বাড়িতে পুলিশের গাড়ি আর কয়েকজন বন্দুকধারী দেখে পাড়ার লোকে ভেবেছিল, “ফির সে সরকারকে খিলাফ কুছ লিখা হোগা।” ওকতাভিও পাজ কলকাতায় গিয়ে আমাদের খোঁজ করেছিলেন। বাইরে থেকে কবি-লেখকরা কলকাতায় এলে কনসুলেটগুলো আনন্দবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ করত, আর সন্তোষকুমার ঘোষ তাদের পাঠিয়ে দিতেন নিজের পেটোয়া তরুণ কবি-লেখকদের কাছে; পরে এই একই ট্যাকটিক ধরেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নিজের একটা পেটোয়া ব্যাটালিয়ানই তৈরি করে ফেলেছিলেন।

    মুম্বাই যখন বোম্বে ছিল, তখন এদোয়ার্দো কার্দেনাল-এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ; উনি এসেছিলেন ভারত সরকারের অতিথি বিদেশি কবিদের দলের সঙ্গে। আমি কেবল ওনার নামই জানতুম। প্রথমে এয়ারপোর্টে আর তারপর ওনার হোটেলে গিয়ে দেখা করেছিলুম। বলেছিলেন লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির ‘সিটি লাইটস জার্নাল’-এ আমার কনট্রোভার্সিয়াল কবিতাটা পড়েছেন। ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার অনুবাদ ‘স্টার্ক ইলেকট্রিক জিজাস’ প্রকাশিত হয়েছিল আরও কয়েকটা কবিতার সঙ্গে। আমি তখনও ওনার কবিতা বিশেষ পড়ে উঠিনি। ভারত সরকারের প্রতিনিধি তাগাদা দিতে উঠে পড়তে হয়েছিল।

    আশির দশকে লখনউ-মুম্বাইতে থাকার সময়ে শিলিগুড়ির অলোক গোস্বামী আর রাজা সরকার যোগাযোগ করেছিলেন, জানিয়ে যে কলকাতায় মরে-যাওয়া হাংরি আন্দোলনকে তাঁরা উত্তরবঙ্গে জিইয়ে তুলেছেন, “কনসেনট্রেশান ক্যাম্প” আর “ধৃতরাষ্ট্র” পত্রিকার মাধ্যমে। উত্তরবঙ্গে তাঁরা দুজনে এবং মনোজ রাউত, সমীরণ ঘোষ. পল্লবকান্তি রাজগুরু, চন্দন দে, বিজয় দে, সমর রায়চৌধুরী, শ্যামল সিংহ, দিবাকর ভট্টাচার্য, ত্রিদিব চক্রবর্তী, দীপঙ্কর কর, প্রবীর শীল, রতন নন্দী, কিশোর সাহা, কুশল বাগচি, সুমন্ত ভট্টাচার্য, মলয় মজুমদার প্রমুখ বেশ হইচই ফেলে দিয়েছেন। তাঁরা যে হাংরি আন্দোলনের পালে নতুন হাওয়া আনছেন তা সহ্য হল না শৈলেশ্বর ঘোষের, উত্তরবঙ্গে গিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে পত্রিকাগুলোর বারোটা বাজিয়ে দিলে। শৈলেশ্বরের মনে হয়ে থাকবে যে উত্তরবঙ্গের যুবক কবি-লেখকরা সব লুটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে, হাংরি আন্দোলন বুঝি বেহাত হয়ে গেল। সুভাষ ঘোষকেও পিটুনি খেতে হয়েছিল শৈলেশ্বর ঘোষের চামচাদের হাতে, একই কারণে। মানে ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকাও দুই ভাগ হলো।

    যাক, এবার ফিরে আসি করুণার কাঠমাণ্ডু নিমন্ত্রণে। বাচ্চাবাবুর জাহাজে করে শোনপুর, সেখান থেকে ট্রেনে করে রকসওল। ট্রেনটা ছিল অন্ধকার, একজন হুঁশিয়ারি দিয়ে গেল ‘সবকোই আপনা সামান অপনে সাথ রখিয়ে’। সামান বলতে থলেতে দুটো প্যান্ট দুটো বুশশার্ট আর টুথব্রাশ-পেস্ট, চুমু খাবার সুযোগ পেলে রোজ দাঁত মাজতে হবে বলে, ওয়াচ পকেটে টাকা। সঙ্গে ছিল দাদা সমীর, সুবিমল বসাক আর বেনারসের কাঞ্চনকুমার মুখোপাধ্যায় যে পরে নকশাল আন্দোলনে যোগ দেবার ফলে প্রথমে বেনারসের আর পরে কলকাতা পুলিশের নেকনজরে পড়েছিল। ওর ছোটোভাই ছিল কলকাতা পুলিশে, ওর নকশাল সক্রিয়তার জন্য ভাইকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। হাংরি আন্দোলনের সময়ে যখন মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না তখন কাঞ্চনের ভাইয়ের পুলিশ কোয়ার্টারে, ভবানী ভবনের পেছনে, দু’রাত কাটিয়েছিলুম।

    একত্রিশ

    রকসওলে পৌঁছে এক্কাগাড়িতে চেপে আন্তর্জাতিক গেট পেরিয়ে ঢুকলুম বীরগঞ্জে ; কাঠমাণ্ডু যাবার বাসের টিকিট আগেই কিনে নেয়া হলো যাতে না পেছনে বসতে হয়। ভারতের দিকের রাস্তাটা একেবারে উবড়োখাবড়া, এখন জানি না কেমন। তবে নেপালে ঢুকে বোঝা গেল ওদের রাস্তাটা ভালো। হাতে সময় ছিল বলে গহওয়া মাই মন্দির দেখতে গেলুম, দুর্গার মন্দির ছিল সম্ভবত, সেখানে ছায়ায় বসে, বেরিয়ে রেস্তরাঁয় খেয়ে বাসে চাপলুম। শোনপুর থেকে ভোজপুরি বুলিতে কথা আরম্ভ হয়েছিল তা চলল বীরগঞ্জ পেরিয়ে অমলেখাগঞ্জ আর হেতারতা পর্যন্ত, সর্বত্র মারোয়াড়িরা ব্যবসা দখল করে ফেলেছে, কর্মচারীরা বিহারি, নেপালিদের কথায় মধেশি। বাসে কাঞ্চনের বমি হল কয়েকবার, ওর পেছনের একজন নেপালি বউ ওর কাঁধে হাত দিয়ে পেছন ফিরে হাঁ করতে বললে কাঞ্চন কোনো প্রশ্ন না তুলে বউটার দেয়া সাদা গুঁড়ো খেয়ে নিল, বউটা বলল, আর বমি হবে না। নেশার কিছু ছিল সম্ভবত, কেননা কাঞ্চন তারপর সারাটা পথ ঝিমিয়েছে, নদীর পাশ দিয়ে, ত্রিভূবন রাজপথের দৃশ্য দেখার সুযোগ পায়নি।

    করুণা অপেক্ষা করছিল বাসস্ট্যাণ্ডে, ওর পেছন-পেছন আমরা চললুম, গিয়ে ঢুকলুম একটা বিরাট চালাবাড়ি চত্ত্বরে, তিনতলা চালাবাড়ি চত্ত্বর, প্রায় একশো মিটার দৈর্ঘ্য আর পঞ্চাশ মিটার প্রস্হ, একটা সিংহদ্বার দিয়ে ঢুকতে হল, যেটা সব সময় খোলাই থাকে, কখনও হয়তো খোলা-বন্ধর রেওয়াজ ছিল। বাঁশের পাকানো সিঁড়ি দিয়ে উঠলুম দুতলায়, করুণা আগেই বন্দোবস্ত করে রেখেছিল একটা ঘর, মেঝেতে খড়ের ওপর চাদর পাতা বিছানা, বালিশ নেই, ভাড়া মাথাপিছু মাসে একটাকা। পাড়াটার নাম ঠমেল। চারিদিকে সরু-সরু গলি, বেরোতে আর ঢুকতে গোলমাল হয়ে যেতো অনেক সময়ে। বাড়ি চত্ত্বরে একশো জনেরও বেশি ভাড়াটে, তার মধ্যে হিপি-হিপিনীই বেশি। করুনা জানালো, হাংরি আন্দোলনের নাম করে নেপালি সাহিত্যিক বাসু শশীর সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়ে গেছে, আমাদের খাবার খরচ নেপালি সাহিত্যিকদের সংস্হা দেবে, থাকার খরচ আমাদের যার-যার। একটা রেস্তরাঁয় গিয়ে খেতুম আর রেজিস্টারে সই করে দিতুম। তবে প্রতিদিন রেস্তরাঁয় খাবার দরকার হতো না, কেননা পাটন, ভক্তপুর, ভরতপুর, পোখরা ইত্যাদি জায়গা থেকে কবিতা পাঠের বা আড্ডার নেমন্তন্ন আসতো, রাতে থেকেও যেতে হতো কখনও-সখনও।

    কাঠমাণ্ডু থেকে বিভিন্ন্ জায়গায় যাতায়াতের জন্যে পেয়ে গিয়েছিলুম একজোড়া হিপি-হিপিনী, তারা একটা ম্যাটাডর ভ্যান লিজ নিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের বিনি পয়সায় স্কুলে পৌঁছে দিতো, আমাদেরও পৌঁছে দিতো বিভিন্ন শহরে কবি-লেখকদের জমঘটে। পড়তুম “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার”-এর ইংরেজি অনুবাদ “স্টার্ক ইলেকট্রিক জিজাস” চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে। নেপালি ভাষায় অনুবাদও করেছিল রমেশ শ্রেষ্ঠ নামে একজন কবি, সে এখন ব্যাংককে থাকে, একজন থাই যুবতীকে বিয়ে করে। থাইল্যাণ্ডের খাবারের বেশ প্রশংসা করে অনেকে, আমার কিন্তু বিস্বাদ লাগে। তার চেয়ে মুম্বাইতে মহেশ লাঞ্চ হোমের অক্টোপাসের বড়া খেতে ভালো লাগে।

    কবিতা পাঠের আসরগুলোয় নানা রকমের চোলাই করা নেপালি আর নেওয়ারি দিশি মদ খাবার সুযোগ হয়েছে, খেয়ে মাতাল হবার সুযোগ। যেমন রাক্সি, বেশ নেশা হয়, ভোদকার মতন স্বচ্ছ, চাল পচিয়ে তৈরি, খেতে অনেকটা জাপানি সাকের মতন, জাপানে যাইনি যদিও, সাকে খেয়েছি থাইল্যাণ্ডে। তারপর আরা, চাল ভুট্টা গম পচিয়ে। আয়লা, চাল আর জোয়ার পচিয়ে। ছাং, জানি না কি পচিয়ে। তোংবা, জোয়ার পচিয়ে। আয়লা হল নেওয়ারি মদ, কবি পারিজাতের বাড়িতে খেয়েছিলুম, উনি নেওয়ারি, শিলিগুড়িতে ওনার মূর্তি আছে। মোষের কাঁচা মাংস খেয়েছি কয়েক জায়গায়, হরিণের মাংসের আচার। আর হ্যাশিশ তো বটেই, প্রায় প্রতিদিন, যে কোনো মন্দিরে সন্ধ্যাবেলায় গিয়ে বুড়োদের জমায়েতে বসলেই, ছিলিম ঘুরে চলে আসতো, তিনচার ফুঁক দিলেই আকাশে ওড়া আরম্ভ।

    সুবিমল বসাক, কাঞ্চন আর দাদা ফিরে যাবার পর আমি থেকে গিয়েছিলুম। করুণা বলেছিল ওদের চলে যেতে দাও, তোমার কথা এখানে চাউর করে রেখেছি, অনেকে টাইম ম্যাগাজিনের খবর জানে আর গিন্সবার্গের বন্ধু শুনে তোমার বসার সিংহাসন তৈরি করে রেখেছে। বাড়িটার সিঁড়ি এমন ছিল যে হ্যাশিশের নেশা করে ফিরে অনেক সময়ে টের পেতুম না কোন পাক দিয়ে কোন তলায় উঠে যাচ্ছি। একবার এরকম পাক দিয়ে উঠলুম আর নামলুম, কয়েকবার অমন ওঠানামার পর একটা ঘরের দরোজার নোংরা পর্দা থেকে একজন লাল-ব্লাউজ যুবতীর হাত আমায় ভেতরে টেনে বলল, প্রতিদিন দরোজা ওব্দি আসো আর ফিরে যাও কেন ; তার টানে আর আমার হ্যাশিশাক্ত টলমলে শরীর গিয়ে পড়ল স্বাস্হ্যবতী নেপালিনীর বুকের ওপর। দেখে বুঝলুম ওটা যৌনকর্মীদের দিশি মদের ঠেক ; মদ খাবার মতন অবস্হা ছিল না, যুবতীর গায়ের গন্ধে টেকা দায়, বুকে মুখ গুঁজে একটা নেপালি টাকা দিয়ে বেরিয়ে এলুম। মোঙ্গোলয়েড তরুণীদের আমার চিরকাল ভালোলাগে। পরের দিন হুঁশ এলে ঘরটা আর খুঁজে পাইনি, গোটাকতক সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করেও।

    করুণা পরিচয় করিয়ে দিল কয়েকঘর হিপি-হিপিনীর সঙ্গে, যারা গিন্সবার্গের আর ফেরলিঘেট্টির ভক্ত, ‘সিটি লাইটস জার্নাল’ এর কথা জানে। ওদের ঘরে আড্ডা মারার, হ্যাশিশ ফোঁকার আর এলএসডি ভেজানো ব্লটিং পেপার খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকার স্বাধীনতা পেয়ে গেলুম। একজন ছিল নিউমেরোলজিস্ট, সে বলল আমার নামের যোগফল হল এক, তাই সব ব্যাপারেই তুমি প্রথম সুযোগটা পাবে। সেইদিন রাতেই একটা স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে টেনে নিল আমাকে জনৈকা হিপিনী, তার নাম ক্যারল নোভাক, ঢুকে গেলুম আর একে আরেকের মাথার দিকে পা করে শুয়ে পড়লুম। এটাই আমার জীবনে বিদেশিনীর প্রথম মুখমেহন। করুণা আমাদের দুজনের জন্যে একটা ঘর ভাড়া করে দিলো, আমি আরেকবার হয়ে গেলুম “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসের শিশির দত্ত আর ক্যারল নোভাক হয়ে গেল ম্যাডেলিন করিয়েট। জীবনে যৌনতার আহ্লাদ শিখিয়ে গেছে ক্যারল নোভাক আর ম্যাডেলিন করিয়েট। “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে ম্যাডেলিন করিয়েটের মুখে রসুনের ট্যাবলেট খাবার গন্ধের কথা লিখতে ভুলে গেছি। রসুনের স্বচ্ছ ট্যাবলেট, প্রতিদিন একটা।

    মার্কিন যুবতীটি, ক্যারল নোভাক, আমার ‘ভালোবাসার উৎসব’ কাব্যনাট্যে অন্তর্ভুক্ত করেছি। হাংরি আন্দোলনে বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতার পর একজন বন্ধুনি পাওয়া গিয়েছিল, যার সঙ্গে করুণার ভাষায় ‘চিউউইংগামের মতন’ চিপকে যেতে পেরেছিলুম। দাদা, সুবিমল ওরা চলে গিয়েছিল বলে আরও ফ্রি ফিল করা শুরু করেছিলুম। ফেমিনিজম বা নারীবাদ ব্যাপারটা ওর কাছেই প্রথম জেনেছিলুম, বডিস পরত না, বলত “উওমেন অন টপ”। প্রেমহীন ভালোবাসা, অসাধারণ অভিজ্ঞতা, কোনো প্যানপানানি নেই। বাঙালি প্রেমিকা সংসর্গের সময়ে বলত, “ভালোবাসি, তোমায় ছাড়া বাঁচবো না, এরকম কথা বলো না কেন এই সময়ে, ভাল্লাগবে”। ক্যারল বলত, “জন্তুদের মতন জান্তব আওয়াজ করো না কেন, আমি যেমন করছি”। দুটোর কোনোটাই সম্ভব হয়নি আমার দ্বারা। বলতো, “চুমু খাবার মতন শ্বাসপ্রক্রিয়া আর দ্বিতীয়টি নেই, ঠিক যেন সার্জিকাল ভেন্টিলেটার। ”

    করুণা একজন আফ্রকান আমেরিকান যুবতীর সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়েছিল, যার পেইনটিঙের গ্যালারি ছিল, সেখানে প্রদর্শনী করলেও করুণার ছবি বিক্রি হয়নি, অনিলের কয়েকটা ছবি বিক্রি হয়েছিল। কেমন করে যে করুণা যুবতীদের আকর্ষণ করতে পারতো তার ক্লুটা জানতে পারিনি। করুণা ওর পেইনটিঙগুলো জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দিলে, সেই আগুন ঘিরে রাক্সি খেয়ে নাচলুম আমরা আর সমবেত হিপি-হিপিনীরা, করুণা সকলের কপালে ছাইয়ের তেলক কেটে দিল। সকলে মিলে এলভিসের ‘জেল হাউস রক’ গাইতে গাইতে ঠমেলে ফিরল, গানটার পঁয়তাল্লিশ আর পি এম রেকর্ড ছিল আফ্রিকান-আমেরিকান যুবতী গ্যালারিস্টের কাছে।

    ক্যারল দেশে ফিরে গেলে আমিও ফিরলুম, চিনে ছাপানো মাও-এর একখানা রেডবুক কিনে। ক্যারলের সঙ্গে হুটোপাটিতে আমার চশমা ভেঙে গিয়েছিল। অনিল-করুণা থেকে গেল আরও মাসখানেকের জন্যে। কাঠমাণ্ডুর গ্যাঞ্জামে আর জীবনকাটানোয় আমার লেখালিখি আমাকে প্রায় ছেড়ে চলে গিয়েছিল, হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। ক্যারলের সংস্পর্শে এটুকু তো জানলুম যে প্রেম সবসময় বিট্রে করে না, ভালোবাসা থেকে যতো পারা যায় শুষে নিয়ে নিজেকে সন্তুষ্ট করে তোলা যায়। সমস্যা হলো যে প্রথম যৌবনে, শরীরের মতন পেলেও, মনের মতন প্রেমিকা পাইনি, বোধহয় এই দুর্ভোগে প্রথম যৌবনে সকলেই ভোগে, তারপর শিক্ষিত হয়ে এগোয়। আসলে আমি কীভাবে বাঁচবো, কীভাবে থাকব, কীভাবে লিখব, তাতে তো কারোর মাথা গলাবার দরকার নেই।

    অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান কাঠমাণ্ডু থেকে পাটনা হয়ে বেনারস ফিরল, আমিও চুলের ইন্সটেলাশান আর্ট নিয়ে ওদের সঙ্গ নিলুম। আমার ভয় ছিল যে অনিল না আমায় একটা পেইনটিং উপহার দিয়ে বসে, কেননা দরিয়াপুরের বাড়িতে উপযুক্ত দেয়াল ছিল না, দোতলায় আমার ঘরে ছাদ থেকে জল চুয়ে দয়নীয় অবস্হা, তার ওপর সারাদিন ট্রাক আর বাস যাতায়াতের ধুলো। যাক, দেয়ালের অবস্হা দেখে অনিল বুঝতে পেরে গিয়েছিল যে মলয়কে ছবি দিলে বেশিদিন টিকবে না। বেনারসে পেইনটিং গোছা বেঁধে নিয়ে গেল বটে কিন্তু নকশাল আন্দোলনের প্রতি ওদের দুর্বার টানের ফলে স্টুডিওতে পুলিশ ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। অনিল পালালো দিল্লি হয়ে আমেরিকা আর করুণা দাড়িগোঁফ কামিয়ে সতীশ নাম নিয়ে ১৯৭১ সালে চলে এলো পাটনা ; দাদা ওকে একটা রঙিন মাছের দোকান খুলে দেবার পর বউ বাচ্চাকে নিয়ে চলে এসেছিল।

    সুবিমল বসাকের টেলিগ্রামে আর স্টেটসম্যান সংবাদপত্রে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা থেকে রেহাইয়ের খবর পেলুম। অফিস বলল, রায়ের কপি জমা দিতে। কলকাতা থেকে রায়ের কপি এনে অফিসে জমা দিলুম। মামলায় জিতে যাবার পর লেখালিখি প্রায় ছেড়ে গেল, অথচ মুচলেকাপন্হীরা তখনও প্রচার করে চলেছে যে, “মলয় লেখালিখিকে কেরিয়ার করতে চাইছে।”

    বত্রিশ

    চাকরি ফিরে পেয়ে সুবিধে এই হল যে ভিন্ন বিভাগে পৌঁছোলুম, গ্রামীণ উন্নয়নের বিভাগে, অবিরাম ট্যুর করার বিভাগে, আরম্ভ হল আমার নতুন অভিজ্ঞতা, তার আগে চাষবাস সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না আমার, জোয়ার আর বাজরা গাছের তফাত জানতুম না, দুটো বলদ না একটা পুং-মহিষ বেশি ওজন টানতে পারে জানতুম না, টিউবওয়েলের রকমফের জানতুম না, জলের গভীরতার সমস্যা জানতুম না, নদীর নিলামের কথা জানতুম না, বঁধুয়া মজুরের দয়নীয় অস্তিত্বের কথা জানতুম না, হাতের কাজে জাতিপ্রথার প্রভাব জানতুম না, তাঁতশিল্পের রাজনীতি জানতুম না, আলু সংরক্ষণের আর পচে নষ্ট হবার দলাদলি জানতুম না, চাষির আত্মহত্যার কারণ আর ফলাফল জানতুম না, বন্ধক জমিতে চাষ আর ফসল ভাগাভাগি জানতুম না, কফি চাষে যুবতীদের যৌনশোষণ জানতুম না, খনিজের কারণে উপজাতিদের উৎখাতের ফলাফল জানতুম না, কতো রকমের গোরু আর ছাগল হয় জানতুম না, মাছের জাল বোনা আর মহাজনদের প্যাঁচপয়জার জানতুম না, সিলকের শাড়ি বোনায় ধর্মের রাজনীতি আর কোরিয়া-চিনের চোরাচালান জানতুম না, বিডিও দপতরে গরিবদের ল্যাঙ মারার গলিঘুঁজি জানতুম না, ঠিকেদারদের বদমায়েসি কেবল কাগজে পড়েছিলুম প্রকৃতপক্ষে তা কী ভয়ানক জানতুম না, নদীতীরের বালিচুরির নেটওয়র্ক জানতুম না, গ্রামের মহাজনদের ঋণ দিয়ে ফাঁদে ফেলার টেকনিক কেবল গল্পের বইতে পড়েছিলুম কিন্তু তার সঙ্গে রাজনীতির যোগাযোগ জানতুম না, কিশোরীরা সকালে মাঠে হাগতে গেলে তাদের ধর্ষণ করা হয় আর তারা তা চেপে যেতে বাধ্য হয় জানতুম না, একজন যুবতীকে কিনে এনে বাড়ির সব কয়টা পুরুষের স্ত্রী করে রাখা হয় জানতুম না, আরও কতো কি জানতুম না, আকাট ছিলুম, আকাট, বই-পড়া আকাট। লেখালিখি ছেড়ে যাবার, বা বলা যায়, রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত হবার, এটাও একটা কারণ, যে, আমি নিজের মূর্খতার সামনাসামনি হলুম, বুঝতে পারলুম যে ভারতবর্ষকে জানি না, একেবারেই জানি না। অভিজ্ঞতার লাথি খেয়ে ক্রমশ অন্য মলয় রায়চৌধুরী হয়ে উঠলুম, বস্তুত লুকিয়েই ফেললুম নিজেকে, দাড়ি-গোঁফ বাড়িয়ে এম. আর. চৌধারী নামের মধ্যে।

    চাষিদের জীবন সম্পর্কে যেটুকু জানতুম তা সহপাঠীদের গ্রামে গিয়ে যতোটুকু জানা যায়, বুঝলুম যে লেখালিখি নিয়ে এতো বেশি শহুরে সময় কাটিয়েছি যে নিজের দেশে নিজেই আমি আগন্তুক, বই-পড়া জ্ঞানের বিভ্রমে আটক থেকে প্রকৃত ভারতবর্ষকে দেখা আর জানা হয়ে ওঠেনি, শহরে বসে কল্পনাজগতকে সীমিত রেখেছি শব্দে-বাক্যে, নিজেকে আবিষ্কার করা শুরু হলো, ছিটকে পড়লুম অপার বিস্ময়ের ব্রহ্মাণ্ডে। বই পড়ে পাওয়া জ্ঞানের সঙ্গে কোরিলেট করা আরম্ভ করলুম সমাজে ঘটতে থাকা চাপান-ওতোরের। আমার ফিকশান “নখদন্ত”, “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস”, “জলাঞ্জলি”, “নামগন্ধ”, “অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস”, “ঔরস” উপন্যাসগুলোর, এবং “অপ্রকাশিত ছোটোগল্প” বইয়ের কয়েকটা গল্পের বীজ, ঘোরাঘুরির চাকরি থেকে পাওয়া, প্রবন্ধ লেখার ধারাও পালটে গেল ঘোরাঘুরি থেকে পাওয়া ভারতীয় জীবনধারার সত্যকে উপলব্ধি করার পর। কমিউনিস্ট কর্মীরা আগেকার দিনে গ্রামে গিয়ে কাজ করতো বলে অনেককিছু জানতে পারতো, কিন্তু গ্রামে-গ্রামে দলটা পৌঁছে গিয়ে কর্মীদের চরিত্র পালটে ফেলল।

    লিখতে বসে ভুলে যেতে পারি, তাই প্রথমেই অবুঝমাড় নামে ছত্তিসগড়ের একটা ঘন জঙ্গলের কথা বলে নিই, যার পৃষ্টপট “ঔরস” উপন্যাসে ব্যবহার করেছি। নারায়ণপুর, বিজাপুর আর বস্তার এই তিন জেলার জঙ্গল এলাকা হল অবুঝমাড়। আমার সহযোগী অফিসারের কথায়, যে, ওই অঞ্চলে ‘সালফি’ নামে একরকমের মদ হয় যা ভারতে আর কোথাও পাওয়া যায় না, কেননা খেজুর গাছের মতন দেখতে যে গাছ থেকে সালফি নামানো হয়, সে-গাছ কেবল ওই জঙ্গলেই হয়, শুনে, সালফি খাবার লোভে যাবার ইচ্ছে হল, যদিও কয়েকজন সহকর্মী ভয়ও দেখিয়েছিল যে মাওবাদীরা কিডন্যাপ করে নিতে পারে। তাছাড়া, জানতে পারলুম, শহরে যাকে আমরা উন্নয়ন বলে মনে করি, তার কোনো প্রয়োজন গোঁড় আর মাড়িয়া উপজাতিদের নেই, বহু শব্দই নেই তাদের ভাষায়, যেমন আনন্দ, দুঃখ, গ্লানি, দারিদ্র্য, সফলতা; মাওবাদীরা ওদের জীবনে ঢুকে ছত্তিশগড়হি, হিন্দি আর তেলেগু শব্দ ঢোকাতে আরম্ভ করেছে। বিপ্লবের মার খেয়ে ভাষাও বিলুপ্ত হয়ে যায়।

    গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে বেরিয়ে, এমন একদল মানুষের কথা শুনলুম যাদের কোনো পার্থিব জিনিসের প্রয়োজন নেই। তীর, ধনুক, আর লাঠিই যথেষ্ট ছিল ; বাসা বলতে জঙ্গলের গাছের খুঁটিতে ডালপালা বিছিয়ে ঝুপড়ি। এখন অঞ্চলটা মাওবাদীদের দখলে, আমি যখন গিয়েছিলুম, মাওবাদীরা ছত্তিশগড়ে এতোটা ভেতরে ঢোকেনি। সরকারি কর্মী আর অফিসার ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্যে অবুঝমাড় ছিল নিষিদ্ধ এলাকা, কেননা আশির দশকে বিবিসি আদিবাসীদের ঘোটুলের ফিল্ম তুলে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিল, আর ভারত সরকার সেকারণে বেশ অপমানিত বোধ করেছিল। সেসময়ে ঘোটুল বা নগ্ন যুবক-যুবতীদের পারস্পরিক পরিচয়ের হলঘর ধরণের ঝোপড়ি ছিল, সঙ্গমের বাধানিষেধ ছিল না, তাদের মতে প্রেম বা যৌনতা কেনই বা একজনের সঙ্গে সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যে তারা বিয়ারবহোতি নামে একটা লাল টকটকে পোকা খায়, পরে কালেকটার বলেছিল ওই পোকার নাম ট্রমবিডাইডা, নারায়ণপুরের একআধটা দোকানে শুকনো পোকা পাওয়া যায়।

    এই ভারতবর্ষের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। অবুঝমাড়ে সবকিছুই বিনিময়ের মাধ্যমে, ইকোনমিক্সের কোনো অস্তিত্ব নেই, শব্দভাঁড়ার ছাড়া। রায়পুর এয়ারপোর্টে নেমে হোটেলে রাত কাটিয়ে পরের দিন নারায়ণপুরের বাস ধরেছিলুম, বাসটার নাম ছিল নৌকরওয়ালা বাস, কেননা দুটো ব্লক নিয়ে সদ্য তৈরি নারায়ণপুর জেলা সদরে যাদের পোস্টিং হয়েছিল তারা প্রায় সকলেই থাকত রায়পুরে। বাসের কনডাকটার সকলের কাছে অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার নিয়ে গিয়ে সই করিয়ে নিল, মাসের শেষে টাকাটা নেবে। আমরা দুজনেই কেবল বাসভাড়া দিলুম। নারায়ণপুরের রামকৃষ্ণ আশ্রমে থাকার ব্যবস্হা হয়েছিল ;ওনাদের ইশকুলের বীরবল মাড়িয়া নামে এক প্রাক্তন ছাত্রকে গাইড হিসেবে পেয়ে, তার মোটর সাইকেলের পেছনে বসে এগোলুম আমরা। কুরসুনার গ্রামের মুখে, জঙ্গলের ভেতরে ঢোকার আগে কেন্দ্রিয় রিজার্ভ পুলিশকে আমাদের আইডি আর কালকটরের অনুমতির চিঠি দেখাতে হলো।

    বীরবলের কথা অনুযায়ী অবুঝমাড়িয়াদের দেবী হল কাকসার, বস্তারের দেবী হল দান্তেশ্বরী, গোঁড়রা পুজো করে মেঘনাদকে— জানি না এই মেঘনাদ রামায়ণের মেঘনাদ কিনা— বৈগারা পুজো করে রাসনাভাকে ; যতোটা বুঝলুম, দান্তেশ্বরী ছাড়া অন্য দেবী-দেবতাদের নির্দিষ্ট প্রতিমা নেই। জঙ্গলটা চার হাজার একর জুড়ে, তিরিশটা জনবসতি আছে যাকে গ্রাম বলে চালানো যায়, ইংরেজদের সময়ে শেষ সারভে আর সেনসাস হয়েছিল। গ্রামগুলোয় বিজলি নেই, খাবার জল নেই, বাজার-দোকান নেই, শহুরে খাবার নেই, চাল-ডাল নেই, ইশকুল যেটা আছে তাকে বলা যায় মোবাইল, রামকৃষ্ণ আশ্রমের, কারোর অসুখ-বিসুখ হলে মৃত্যু ছাড়া কোনো বিকল্প চিকিৎসা নেই। মরে গেলে গোর দেয়া হয়, পিরামিডের আকারের কিন্তু ধাপ-দেয়া গোরের ওপর চিহ্ণ হিসেবে কাপড় বেঁধে দেয়া আছে, কয়েকটা লাল, সেগুলো মাওবাদীদের। পাকা রাস্তার পর দেখা গেল গেরুমাটির পথ, একটু এগিয়ে দেখলুম, একটা তোরণ, তাতে সবুজের ওপর সাদা দিয়ে লেখা, “ভারতীয় সেনা ওয়াপস যাও, বস্তরওয়াসি বাহরি নহিঁ হ্যায় : জঙ মত লড়ো।” তার পেছন দিকে লেখা, “বস্তরকে যুবায়োঁ, সরকারকে নাজায়জ জঙকে খিলাফ জনয়ুধ মে সামিল হো যাও।”

    যে জন্যে এসেছি, সেই সালফি মদের দেখা নেই, গ্রামবাসীদেরও দেখা নেই। আরেকটু এগিয়ে দুটো নিচু-ছাদ চালাঘরের দেখা মিলল, পেছনে খেজুর গাছের মতন একটা চাঁচা গাছে হাড়ি ঝুলছে দেখে বুঝলুম ঠিক জায়গায় এসে গেছি। রোগাটে কয়েকজন পুরুষ, প্রায় উলঙ্গ আর কায়েকজন নারী, বুকে কাপড়ের বালাই নেই, কয়েকটা বাচ্চা যারা কখনও চুল আঁচড়ায়নি, সকলেই সালফির নেশায় নিজস্ব জগতে। একজনের কাছে সালফির হাড়ি ছিল। বীরবল নিজেদের ভাষায় তাকে কিছু বলার পর একটা মিনারাল ওয়াটারের বোতলে সালফি ভরে নিল। আমি একটা কুড়ি টাকার নোট দিতে লোকটা হাত নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে কিছু বলতে বীরবল জানালো ও টাকা নেবে না, সালফি বিক্রির জিনিস নয়। আমরা আরও এগিয়ে হিকানোর গ্রাম আর পেণ্ডা খেতি বা ঝুম চাষ দেখে ফিরে এলুম, ফেরার পথে সালফি খেয়ে ঝিমোতে লাগলুম। সালফির নেশা একেবারে আলাদা, এর আগে যতো রকম নেশা করেছি, সালফি তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, বীরবল মাড়িয়ার কথায়, সালফি খাবার পর লোকে আকাশের মেঘ হয়ে যায়। রাতভর মেঘ হয়ে পড়ে রইলুম বিছানায়।

    দেশভাগের দরুণ নমঃশূদ্রদের যে কী নিদারুণ অবস্হায় পড়তে হয়েছিল, আর তার রেশ যে কবে শেষ হবে বলা কঠিন। নারায়ণপুরে গণেশচন্দ্র সরকার নামে এক স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যিনি আছেন আমার ‘ঔরস’ উপন্যাসে, মরিচঝাঁপির ৩১শে জানুয়ারি ১৯৭৯এর অত্যাচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন, বিয়ে করেছিলেন নিজের চেয়ে প্রায় সাত-আট বড়ো এক যুবতীকে, যাকে ১৯৭১ সালে রেপ করেছিল পাকিস্তানি রাজাকররা, আর তার বাচ্চাকে অ্যাবর্ট করতে দেননি, নারায়ণপুরের আগে মালকানগিরিতে থাকতেন। নমঃশূদ্র বাঙালিদের দেখেছি হিমালয়ের তরাই অঞ্চলেও, তাদের যে জমি দেয়া হয়েছিল তা দখল করে নিয়েছে পাঞ্জাবি জাঠরা, বাঙালিরা আবার ভিকিরি। একই অবস্হা দেখেছি বিহারের মোতিহারিতে, প্রায় বেশিরভাগ লোকই হয়ে গেছে বিহারি, রিকশ চালায় বা ঠেলাগাড়ি টানে বা দিনমজুরি করে। যে নমঃশুদ্রদের গড়চিরোলি, বালাঘাট, ভাণ্ডারা, রাজনন্দগাঁও পাঠানো হয়েছিল, তারা হয়ে গেছে মারাঠি। আমি ওই জায়গাগুলোয় গেছি বলে জানি, এ ছাড়াও ভারতে হয়তো বহু জায়গায় পাঠানো হয়েছিল তাদের। আমি একটা ব্যাপার কমিউনিস্ট দলটার বুঝতে পারি না, একদিকে নমঃশুদ্রদের আন্দামান দ্বীপে যেতে দেয়া হল না, আবার আরেক দিকে তাদের মরিচঝাঁপিতে বসত গড়তে দেয়া হল না, স্ট্রেঞ্জ।

    মুঙ্গের, যেখানে কাট্টা-তামঞ্চা তৈরি হয় ঘরে-ঘরে, সে শহরে গিয়েছিলুম চাষীদের অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে, তখন ইন্দিরা গান্ধির এমারজেন্সি চলছে। কৃষি বিভাগের অধিকর্তা আমাদের নিতে এসেছিল স্টেশানে, ওনার জিপে বসে থানার সামনে দিয়ে যেতে-যেতে দেখি সামনের বারান্দায় গোটা আষ্টেক মানুষকে ল্যাঙটো করে উল্টো টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশ এতোদিন ওদের গায়ে হাত দেয়নি স্হানীয় মাফিয়া বলে বেশ রমরমা ছিল ওদের। সুযোগ পেয়েই প্রতিশোধ নিতে নিমে পড়েছে। কৃষি অধিকর্তা বলল যে সরকারি গাড়িতে করে গ্রামে যাওয়া যাবে না, মানুষ এতো ভয়ে আছে যে সরকারি গাড়ি দেখতে পেলেই দূর থেকে পালাবে। কী আর করা যায় ! মহাজনদের একদিন ডেকে পাঠালুম আর বোঝাবার চেষ্টা করলুম, তারা মাথা নেড়ে গেল। পরের দিন ব্যাংক ম্যানেজার আর সহকারী কৃষিঋণ সমিতির সচিবদের ডেকে পাঠিয়ে বোঝালুম। তারাও মাথা নেড়ে চলে গেল। পরের দিন ফেরার সময়ে দেখলুম আরেকদল যুবককে একই ভাবে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। এইসব টাঙানো লোকগুলোই পরে লালু যাদবের দলে ভিড়েছে।

    মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে গিয়েছিলুম কৃষিঋণ সমিতির বন্ধক নেয়া জমিজমার খতিয়ান যাচাই করতে। গ্খাতা ওলটাতে-ওলটাতে দেখি তার মাঝে রাখা রয়েছে দাউদ ইব্রাহিম আর ওসামা বিন লাদেনের ছবি। মুখ না তুলে পাতা উল্টে গেলুম। সমিতির সচিব বললেন ‘আপুনাদের জইন্য চা আনি’, বলে কেটে পড়লেন। কারোর কাউকে ভালো লাগে যদি তো করার কিছু নেই। তখনও ওসামা বেঁচে।

    বিহারের বাঢ় শহরে গিয়েছিলুম ইন্সপেকশনে, নথি পরীক্ষা করছি, সামনের বারান্দায় একজন যুবতী সেজেগুজে নাচা আরম্ভ করে দিল, “অভি না যাও চোদ কর কি দিল অভি ভরা নহিঁ”। সামনের দরোজাটা বন্ধ করে দিতে বললেও কারোর কানে গেল না কথাটা। নিজেই বন্ধ করলুম উঠে। লাঞ্চের সময়ে নিচে নেমে একটা ছেঁদো হোটেলে ভাত-ডাল-আলুভাজা খাচ্ছি যখন, পিওনটা এসে ফিসফিস করে বলল, “স্যার ওই রণ্ডিটাকে শাখা অধিকর্তা আগে থেকে শিখিয়ে দিয়েছিল যে আপনারা ইন্সপেকশানে আসছেন, টোপ ফেলে আপনাদের মন অন্য দিকে ঘোরাতে চেয়েছে, অনেক ঘাপলা আছে শাখায়, চাষিরা এলে তাড়িয়ে দেয়।” যে হোটেলে সন্ধ্যাবালা উঠেছিলুম, সেখানেও কয়েকটা বেশ্যাকে নিয়ে হাজির। যখন বললুম যে “ওই রণ্ডিদের সঙ্গে শুয়েও আমি যা রিপোর্ট করার তাই করব”, তখন শাখা অধিকর্তা হাঁটু গেড়ে হাতজোড় করে কাঁদতে আরম্ভ করল। আত্মম্ভরিতা উপভোগেরও কষ্টের দিক আছে।

    ডিটেকটিভ বই “অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস” বইতে আমি কর্ণাটক-অন্ধ্রপ্রদেশের সীমান্তের একটা উপজাতি অধ্যুষিত জঙ্গল এলাকার উল্লেখ করেছি, যেখানে গিয়ে পরস্পরের অচেনা যুবক-যুবতী বাসা বাঁধে, আমি অফিসের কাজে গেছি ওই উপজাতিদের উন্নতি করার ধান্দায়। যুবকরা সাধারণত কলা পেঁপে লেবু ইত্যাদির চাষমালিকদের দিনমজুর, ঋতুতে, নয়তো বেকার। উচ্চাকাঙ্খীরা ব্যারেটাইস আর অন্যান্য খনিতে কাজ করতে গিয়ে রোগ নিয়ে ফেরে। জঙ্গলের অধিবাসীরা কেউ কখনও ভোট দেয়নি, কারোর কোনো আইডেনটিটি কার্ড নেই। কাঁঠালবিচি, কুমড়ো, কাঁচাকলা পুড়িয়ে খায়। আমার রিপোর্ট কোনো কাজে আসেনি, কেননা জঙ্গল আর বাগানগুলোর মাটির তলায় খনিজের আবিষ্কারের ফলে লোপাট হয়ে গেছে কলা কাঁঠাল লেবু পেঁপের বাগানগুলো।

    তেত্রিশ

    আমার আরেক ধাপ ওপরে ওঠা পাওনা হয়ে গিয়েছিল বলে অফিস পাঠালো নাগপুর অফিসে তিন মাসের জন্য। সেখানে আলাপ হকি খেলোয়াড় সলিলার সঙ্গে, আরেকজন যুবতী সুলোচনা নাইডুর মাধ্যমে, কয়েক দিনের পরিচয়ের পরই বললুম, আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, আপনার বাড়িতে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওর বাবা ওর শৈশবে দুই বোন আর পোয়াতি স্ত্রীকে ওদের মামার বাড়িতে রেখে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, সেই থেকে তিন বোন মামার বাড়িতে মানুষ। অতএব মামাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম। বড়োমামা, যিনি অভিভাবক, তিনি ছিলেন না, মেজমামা ছিলেন, তিনি আমার প্রস্তাবে কান দেওয়ার বদলে নিজের বন্দুকের আলমারি খুলে আটটা গান, রাইফেল দেখালেন, কয়েকটার নাম মনে আছে, মজার প্যাটার্ন বোল্ট অ্যাকশান রাইফেল, এসএমএলই প্যাটার্ন ব্রিটিশ রাইফেল, মোজিন ন্যাজেন্ট প্যাটার্ন বোল্ট রাইফেল, বারো গেজ পাম্প অ্যাকশান শটগান, সাবোট স্লাগ হানটিং গান ইত্যাদি, ওনার বাবার। দেয়ালে টাঙানো, হরিণ, লেপার্ড ইত্যাদির মাথা দেখালেন, শিকারের গল্প করলেন।

    বৈঠকখানায় দেখলুম থরে-থরে ইংরেজি পেপারব্যাক যার ওপর ধুলোর আস্তরণ, কেউ কখনও পড়তো হয়তো ওগুলো। কোনও বাংলা বই বা পত্রিকা নেই। আমি যে লেখালিখির সঙ্গে জড়িত তা সলিলাকে বলিনি, সুলোচনা নাইডু হিন্দি পত্রিকায় আমার সম্পর্কে সংবাদ আর ফোটো দেখিয়েছিল। ওদের বাড়িতে কেউই ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেননি। তবে পরে নাগপুরের কারোর সঙ্গে দেখা হলে তিনি জানতে চান, “এখনও রাইটিং করেন ? ইংলিশে লেখেন না কেন ? ইংলিশে লিখলে ইনকাম ভালো হয়। ” বলে ফেলি, “আমি কেবল স্কটল্যাণ্ডের মদ খাই, ওইটুকুই যা ইংলিশ জ্ঞান আমার।”

    পরের দিন আবার যেতে হলো, বড়োমামা-মেজমামা ইতিমধ্যে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিয়ে থাকবেন, আমাকে আমার উৎস প্রমাণের জন্য পাটনায় টেলিগ্রাম করতে বললেন। আমি পাটনায় বাবাকে আর চাইবাসায় দাদাকে টেলিগ্রাম করলুম। আমার দেদোল স্বভাবের সঙ্গে মা অতিপরিচিত ছিলেন, সুতরাং চাইছিলেন, যেকোনো একজন মেয়েকে বিয়ে করে হাজির হই। আমার টেলিগ্রাম পেয়ে পিসতুতো দাদা সেন্টুদাকে দাদার কাছে পাঠিয়ে দিলেন, একটা ইনটারেসটিং চিঠি দিয়ে, যে চিঠির প্রধান বক্তব্য ছিল “সিন্দুর পরিয়ে নিয়ে এস, বুঝলে”। লাইনটানা কাগজে লেখা তারিখহীন চিঠিটা দাদা “হাওয়া৪৯” পত্রিকার এপ্রিল ২০০১ সংখ্যায় মায়ের হাতের-লেখাসহ ছেপেছিল :

    কল্যানীয়

    বাশুদেব আশা করি তুমি ও বেলা নিশ্চয়ই গিয়ে পৌঁছিয়েছ তুমি দাঁড়িয়ে থেকে মলয়ের বিয়ে দাও এবং বাসি বিয়ে দিয়ে সিন্দুর পরিয়ে নিয়ে এস।

    কারণ এখানে মেজজাঠা তোমাদের শয্যাশায়ি তোমরা এলে দেখতে পাবে এবং বাবুর শরীর খুব খারাপ।

    অতএব তুমি সমস্ত কাজ সেরে বৌ নিয়ে এস তোমাদের আসার অপেক্ষায় রহিলাম। তোমরা সকলে আমাদের শুভ আশীর্ব্বাদ নাও। সিন্দুর পরিয়ে নিয়ে এসো বুঝলে ?।

    ইতি

    মা

    মা বলেছিলেন ‘সিন্দুর পরিয়ে নিয়ে এসো’, মানে বিয়ে করে না আনলেও যেন সিঁদুর পরে আসে। কিন্তু সলিলা সিঁদুর আর শাঁখা-পলা ইত্যাদি বিয়ের পর পরত না কখনও, হকি খেলোয়াড় ওর মধ্যে এমন ভাবে সেঁদিয়ে ছিল যে টিপিকাল মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহবধুর মতো আচরণ করতে পারেনি। পরে দেবী রায়ের স্ত্রী মালা একটা অষ্টধাতুর নোয়া তৈরি করিয়ে প্রেজেন্ট করেছিলেন, সেটাই পরে সারাজীবন চালিয়ে দিলে। মা আর বলতেন না কিছু, কেননা উনি নিজেই প্রতিদিন সিঁদুর পরতেন না, চুল উঠে যাবার ভয়ে।

    আমার টেলিগ্রাম যেদিন পাটনায় পৌঁছেছিল সেইদিনই মেজজ্যাঠা মারা যান। ছেলে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে চাইছে, এই সুযোগ যাতে হাতছাড়া না হয়ে যায়, তাই দাদাকে পাঠানোর ব্যবস্হা, নয়তো অশৌচ ইত্যাদির আচারে পড়লে দেরি হয়ে গেলে ছেলে হয়তো মত পালটে ফেলতে পারে, ভেবেছিলেন বাবা-মা। দাদা নাগপুরে এসে একদিনের দেখা দিয়ে চাইবাসা ফিরে গিয়েছিল বৌদি আর মেয়ে হনিকে আনতে, সেন্টুদার কাছ থেকে জেনে গিয়ে থাকবে মেজজ্যাঠার মৃত্যুর কথা। নাগপুরে সলিলার মেজ মামার মেয়ে বেলার বিয়ে আর কয়েক দিন পরেই হবার ছিল ; সলিলার ছোটো বোন রমলা চাইছিল যে আগে ওর বিয়ে হোক তারপর সলিলার, অর্থাৎ আমি রমলাকে বিয়ে করি। দুই বোনের ঝগড়ার মাঝে বড়ো মাইমা চাইলেন যে তাঁর বড়ো মেয়েকে আমি বিয়ে করি। আমি ভাবছিলুম যে পার্টিশানের আড়াল থেকে একটা সুন্দর মুখ উঁকি মেরে আমাকে দেখছিল, বেলার বোন নিলীমা, গণ্ডোগোল হলে তাকেই বিয়ে করে নিয়ে যাবো। আমি ওনাদের তর্কাতর্কি এড়াতে হোটেলে চলে এসেছিলুম, সলিলা এসে ডেকে নিয়ে গেল, ফাইনাল করার জন্যে। শেষ পর্যন্ত কার্ড ছাপানো হল আমার আর সলিলার বিয়ের, চোঠা ডিসেম্বর ১৯৬৮।

    বিয়ের দুদিন আগে দাদা, বৌদি আর মেয়ে হনির সঙ্গে নিজের শাশুড়িকে নিয়ে পৌছোলো। মামার মেয়ে বেলার বিয়ের পরে ওদের পিঁড়ি আর আগুন আমরা শেয়ার করে সংক্ষিপ্ত রিচুয়ালের বিয়ে করলুম। বিয়ে করে পাটনায় গেলুম না, গেলুম চাইবাসায় আর আমাদের ফুলশয্যা হল সেই ঘরটায় যে ঘরে শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রেমিকা শীলাকে অন্ধকারে চুমু খেয়েছিলেন, তার বর্ণনা আছে “কিন্নর কিন্নরী’সহ বেশ কয়েকটা গল্প-উপন্যাসে। চাইবাসা থেকে পাটনা রওনা দিলুম আমি দাদা বৌদি হনি আর সলিলা। পাটনায় গিয়ে মেজজ্যাঠার মৃত্যু সংবাদ পেলুম। মেজজ্যাঠার মেয়ে ডলি চলে এসেছিল কলকাতা থেকে, বলল, “তুমি আর সময় পেলে না, এতোকাল অকাজ-কুকাজ যা চেয়েছো নিজের ইচ্ছেতে করেছো, বাবা তোমায় কতো ভালোবাসতো, আর একটা বছর পরে বিয়ে করলেই পারতে।” ডলি এতোই চটে গিয়েছিল যে তারপর সম্পর্ক-বিচ্ছেদ করে দিয়েছে। যেদিন সলিলার বউভাত সেই দিনই মেজজ্যাঠার শ্রাদ্ধে ব্রাহ্মণ ভোজন। সকলেই শ্রাদ্ধ আর বিয়ের ভোজ একই দিনে খেয়ে গেলেন। মৃত্যু দিয়ে নতুন করে জীবন আরম্ভ করলুম। স্বাভাবিক যে চাইবাসা বা পাটনায় কোনো বিয়ের রিচুয়াল হয়নি ; সলিলার মতে, আমরা অর্ধেক বিয়ে-করা আর অর্ধেক লিভ-ইন।

    ১৯৭০ সালে সলিলা ওর কুকুর সুজিকে নিয়ে এলো পাটনায়, কেননা নাগপুর থেকে সবাই লিখছিল যে সুজিকে রাখা যাচ্ছে না, সলিলার অবর্তমানে ছোটো বোন রমলা ওকে সামলাতে পারছে না। পাটনার বাড়িতে সুজির খেলবার জায়গা ছিল না, সর্বত্র সিমেন্টের মেঝে, কুকুরটার মন খারাপ হয়ে কাঁদতো, আমি চান করিয়ে দিতুম পছন্দ হতো না, শেষে আবার নাগপুরে রেখে এলো সলিলা। নাগপুরে বছরখানেক থাকার পর একদিন উধাও হয়ে গেল, আর খুঁজে পাওয়া যায়নি, সলিলার বাবাকে যেমন আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

    ১৯৫৩ নাগাদ দরিয়াপুরের বাড়িতে একটা দিশি কুকুরের বাচ্চা এনেছিলেন ছোটোকাকার শালা যাঁকে বুজিদা বলে ডাকতুম, আমি কুকুরটার নাম দিয়েছিলুম রব, আর একটা পদবিও দিয়েছিলুম, লিংচিপুলু, ওকে ডাকতে হলে পুরো নামে, মানে রব লিংচিপুলু বলে ডাকতে হতো। পাঁচ-ছয় বছরেই বুড়ো হয়ে গিয়ে কুকুরটা উধাও হয়ে গেল একদিন। রব লিংচিপুলুর জন্যে পাঁঠার ছাঁট মাংস কিনে আনতুম, পাড়ায় একজন পাগল থাকতো, বাঙালি বাড়ির, তাকে বোধহয় মাংস খেতে দেয়া হতো না বাড়িতে, পোশাক দেখেই টের পেতুম যে লোকটা অবহেলায় ভুগছে, রব লিংচিপুলুর ছাঁট মাংস খেতে আসতো প্রতি রবিবার ; বাড়িতে রাঁধা মাংস দিলে খেতো না, বলত ওরকম টেস্টি মাংস খেতে পারি না। কোতরঙের বাড়িতে ফিরে বুজিদাও মারা গেছে তিরিশ বছর আগে ; সেই জমিটাও ঠাকুমার দেয়া।

    পাটনার চাকরি বদলে অ্যাগ্রিকালচারার রিফাইনান্স অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশানের লখনউ শাখায় চলে গেলুম, সেখানে যে বাংলো পেলুম, পেছনের জমিতে আরম্ভ করলুম চাষবাস, নিজের চোখে দেখার জন্য বেগুন, আলু, ঢ্যাঁড়স, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, কপি, ধনে, মৌরি, মুলো, গাজর আর পেয়ারা, কুল, কলা, পেঁপে, সজনে, লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে ইত্যাদি। সামনের জমিতে লাগালুম বারমুডা ঘাস যা কাটাকাটির বালাই নেই, কার্পেটের মতন, তার চারিধারে নানা রঙের গোলাপ, চাঁপা, বেলি, যুঁই আর হ্যাঁ, লজ্জাবতী লতা। চাষের জন্যে বই প্রচুর পড়তুম যাতে ট্যুরে গিয়ে বোকার মতন কথা না বলে ফেলি চাষিদের কাছে। “নামগন্ধ” উপন্যাসে পশ্চিমবঙ্গে আলুচাষীদের জীবন নিয়ে লিখতে গিয়ে কাজে দিয়েছে চাষের আর বইয়ের জ্ঞান। অফিসের অনেকে আসতো আমার বাগান দেখতে। বাবা-মা যখন এসেছিলেন, ওনাদের এতো ভালো লেগেছিল যে, বলেছিলেন, বাংলোটা কিনে নে, তারপর দাম শুনে মুষড়ে পড়েছিলেন। লখনউ থেকে বিভিন্ন কাজে ট্যুরে গেছি, মাটি থেকে আপনা থেকে বেরোনো আর্টেজিয়ান স্রোত যেমন দেখেছি, তেমনই তরাইয়ের বাঙালি উদ্বাস্তুদের দুর্দশা, হিমালয়ের জংলি গোরু যারা দুধ এতো কম দেয় যে পোষা যায় না, লোকে পাহাড় থেকে ধরে এনে খেতো, তাও তো এখন বন্ধ হয়ে গেছে।

    আমার মেয়ে আর ছেলে তখন ছোটো ছিল, ওরাও গাছেদের চরিত্র বোঝার চেষ্টা করত, খুরপি হাতে সাহায্য করতো আমাকে। মেয়ে নিজেই সাইকেল চালিয়ে ইশকুল যেতো আর ছেলের ইশকুল অনেক দূরে ছিল বলে রিকশায় গাদাগাদি করে যেতো আসতো। যে রিকশাঅলা ওদের ইশকুলে নিয়ে যেতো সে-ই ট্যুরে যাবার সময়ে আমাকে রাত-বিরেতে ট্রেনে তুলে দিতে নিয়ে যেতো, শিউনন্নির মতন পালোয়ান ছিল। সেসময়ে বহু জায়গায় ট্যুরে গেছি যেখানে হোটেল নেই ; বরইলিতে এক মুসলমান যুবকের বাড়ি ছিলুম, যতোদিন ছিলুম প্রতিদিন নিজের একটা করে মুর্গি জবাই করে আমাকে খাইয়েছে। আলিগড়ে যখন গিয়েছিলুম সদ্য দাঙ্গা থেমেছে, উঠেছিলুম বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে, আমার সহযোগী ভাবতো যে গোরুর মাংস খাইয়ে দিচ্ছে, তাই খাবার অসুবিধা হতো, একদিন বলতে বাধ্য হলুম যে মিস্টার শ্রীবাস্তবের জন্যে মুর্গি রাঁধলে ভালো হয়। লখনউতে উত্তম দাশ এসেছিলেন স্ত্রী মালবিকাকে নিয়ে, দেবী রায় সস্ত্রীক এসেছিলেন, পার্থসারথী এসেছিলেন, কলকাতার খবর নিয়ে। ওনাদের কথাবার্তা শুনে মনে হল যে কিছু মানুষ আমাকে চিরকাল ঘৃণা করবে, ঘৃণার মাধ্যমে মরণোত্তর আয়ু দিয়ে যাবে। শেষবেলায় টের পাই যে কলকাতায় থাকলে উন্মাদ হয়ে যেতুম।

    আমি দুটো গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ডাইরেকটর ছিলুম লখনউ থাকতে, রায়বরেলি আর ফৈজাবাদ। ফৈজাবাদে কর্মীরা ঘেরাও করেছিল মাইনে বাড়াবার দাবী জানিয়ে। রায়বরেলির বোর্ডে একজন টুপি-পরা কংগ্রেস নেতা ছিলেন যিনি প্রায়ই বলতেন কিছু দরকার থাকলে বলবেন, দিল্লিকে বলে করিয়ে দেবো, মানে গান্ধি পরিবারকে। ফৈজাবাদে গিয়ে রামের জন্মভূমি বা বাবরি মসজিদ দেখলুম, তখনও বিজেপি ওটা ভেঙে ফ্যালেনি, ভেতরে ঢোকার আগে পুলিশ কন্সটেবল বলল, চামড়ার বেল্ট আর জুতো খুলে ঢুকুন, অর্থাৎ পুলিশ কর্মীরও রাম সম্পর্কে ভীতি গড়ে উঠেছিল, ভেতরে একটা টেবিলের ওপর রাম-সীতার মূর্তি, তাতে গ্যাঁদাফুলের মালা, একটা থাম অবশ্য কালো পাথরের ছিল, কোনো পুরোনো স্ট্রাকচারের। যখন দেখেছিলুম তখন ধারণা করতে পারিনি যে কিছুকাল পরে ঝোপঝাড়ে ঘেরা এই পোড়ো বাড়িটা নিয়ে এতো হ্যাঙ্গাম হবে। একেবারে ফাঁকা ছিল, একজনকেও পুজো দিতে দেখিনি, তার চেয়ে অযোধ্যার অন্য মন্দিরগুলোয় প্রচুর লোক পুজো দিচ্ছে দেখলুম। আর চারিদিকে বাঁদরের দল। রামায়ণে বানরসেনা আছে বলে কেউ কি কখনও এই শহরে বাঁদরদের এনেছিলেন ? হনুমান আর কাঠবিড়ালি কিন্তু একটাও দেখতে পাইনি সেসময়ে।

    লখনউতে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে আমি সবাই মিলে সবজি কুটতুম, চিংড়ি মা্ছ বাছতুম। কলকাতার মতন মাছ কেটে পরিষ্কার করার ব্যাপার লখনউয়ের বাজারে ছিল না। প্রভাকর এসে যদি দেখতো যে মাছ কোটা-বাছা চলছে, তক্ষুনি নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পালাতো। আবদুল করিমের বাড়ি দিয়ে আসতো আমার ছেলে, মাছ বা মাংস রাঁধা হলে। করিম ট্যুরে গেলে আমার ছেলের জন্যে নানা জিনিস কিনে আনতো, এমনকি অ্যানটিক টেবিল, বই রাখার র‌্যাক ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত কোনো আসবাবই আর রইলো না, সবই বিলিয়ে দিয়েছি একের পর এক। এখন মনে হয়, বিদেশ থেকে আনা টুকিটাকি জিনিসগুলো কিনে আনা উচিত হয়নি, সবই ফালতু, ধুলোর চাদরে তাদের চেনা দায়। সাকিন পালটেছি আর যা পেরেছি বিদেয় করেছি।

    লখনউতেই মা মারা গেলেন, কী হয়েছে সঠিক বলতে পারতেন না, হৃদরোগের ডাক্তারও ধরতে পারেনি। সেসময়ে ডাক্তারির এতোটা উন্নতি হয়নি, আমাদের জ্ঞানও বেশ সীমিত ছিল, এখন বহু কিছু নিজের অসুখের জন্য জেনে ফেলেছি। তখন মুম্বাইতে থাকলে মায়ের সঠিক চিকিৎসা হতে পারতো হয়তো। মা হাসপাতালে মারা যেতে দাদাকে তক্ষুণি টেলিফোন করে দিয়েছিলুম, দাদা পাটনা থেকে এসে মুখাগ্নি করে ফিরে গেল। শ্মশানে পুরুতের দরকার হয়, কোনো বাঙালি পুরুতকে চিনতুম না, কেননা ধর্মকর্ম তো আমি বা আমার স্ত্রী কেউই করতুম না, ফলে পঞ্চানন ভট্টাচার্য বা চ্যাটার্জি নামে অফিসের এক কর্মীকে ডেকে এনেছিলেন আমার প্রতিবেশি হায়দার আলি, দাদা তার নির্দেশমতো মুখাগ্নি করল। বুঝতে পারলুম যে মৃত্যুর সঙ্গে আমার একটা সৃজনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

    খুবই অদ্ভুত যে মায়ের মৃত্যুতে আমার রাইটার্স ব্লক সেরে গেল আর ঠিক এই সময়েই ঢাকা থেকে একাধিক পত্রিকায় কবিতা দেবার অনুরোধ আসতে লাগল। আমার কাব্যগ্রন্হ, উত্তম দাশের মহাদিগন্ত প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল, “মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর”-এর প্রায় সব কবিতাই প্রথমে ঢাকার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই কাব্যগ্রন্হের প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। হাংরি আন্দোলনের সময়কার কবিতা থেকে একেবারে আলাদা, উত্তরপ্রদেশের খুংখার ঘটনায় প্রভাবিত কবিতা। আমার বই পড়বার ঝোঁকও নির্দিষ্ট রইল না, ভারতীয় সমাজকে বুঝতে পারার মতন বই বেশি পড়া আরম্ভ করলুম, অফিসেও প্রচুর সময় হাতে থাকত বই পড়ার, অধস্তন অফিসারদের বললে তারা বইপত্র যোগাড় করে এনে দিতো।

    লখনউ থেকে পৌঁছোলুম নাবার্ডের হেড অফিসে, মুম্বাইতে, তখন ছিল বোম্বে, কনট্র্যাক্ট কিলারদের, এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের আর কিলডদের শহর, যাদের দুপক্ষই একই কারণে শহরটাকে ভালোবাসে, টাকা টাকা টাকা টাকা উপভোগ উপভোগ উপভোগ উপভোগ, একেবারে অবাস্তবতার জগত, প্রতিটি সম্প্রদায় নিজেদের অতীতে ফিরে যেতে চাইছে, হত্যা আর লুটমারের গৌরবের কালখণ্ডে। এখন তা থেকে উতরোতে পেরেছে। এই শহরের গরিবদের অবস্হা অবর্ণনীয়। ইমলিতলায় আমরা গরিব ছিলুম, প্রতিবেশীরা আরও গরিব ছিল, কিন্তু কেউই তাকে দুর্ভাগ্য বলে মনে করত না, আমার মাকে কখনও দেখিনি কাউকে ঈর্ষা করতে। এই শহরে দুর্ভাগারা ভাগ্য ফেরাতে আসে, যুবক-যুবতীরা ভাগ্য ফেরাবার ধান্দায় ধর্ষণকেও মেনে নেয়। হ্যাঁ, যুবকরাও চাকরির জন্য ধর্ষিত হতে রাজি হয়।

    মেট্রপলিসগুলো শিখিয়ে দ্যায় কেমন করে ভিড় থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে আর আলাদা হবার প্রক্রিয়ায় কেমন করে নিজেকে দুর্ভেদ্য করে তোলা যায়। আমি টের পেয়ে গিয়েছিলুম যে আমি দুর্ভেদ্য, আমি সমগ্র মানবসভ্যতাকে নিজের ভেতরে নিয়ে ঘুরে বেড়াই ; মানবসভ্যতার জন্যে এটাই সবচেয়ে আনন্দের যে প্রকৃতিজগত মানবসভ্যতার তোয়াক্কা করে না। মুম্বাইয়ের সংবাদপত্রে ধনীদের অসুখের খবর এমনভাবে ছাপা হয় যেন অসুখও এক ধরণের বৈভবশালী প্রাণী। এদিকে গরিবরা হল অবহেলার ক্রীতদাস, মানুষ রাস্তার ধারে রেল লাইনের ধারে সকলের সামনে হাগতে বসে, তাতে কারোরই কিছু এসে যায় না, এই শহরে কতো রকমের যে “অপর” রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। গণতন্ত্র ব্যাপারটা এখানে অ্যাননিমাস।

    মুম্বাইতে এসেই বাস্তব জগতকে নিংড়ে ফিকশান বের করার কায়দা আবিষ্কার করলুম। এই শহরে প্রেম এমন পর্যায়ে পৌঁছেচে যে তা মানুষ-মানুষীর পরস্পরের অবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে ; যতদিন দৈহিক অবিশ্বাস ততোদিন ভালোবাসা, সম্পর্কের মাঝে চাই কনডোম সুরক্ষা, প্রেমিক জানে না প্রেমিকার দেহে কোন রাক্ষস আছে, তেমনই প্রেমিকা জানে না প্রেমিকের লিঙ্গে কোন রোগের রাক্ষস ওৎ পেতে আছে। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসের চরিত্ররা পাটনার হলেও জ্ঞান নিংড়ে পেয়েছি মুম্বাইতে। ‘জলাঞ্জলি” উপন্যাসে চরিত্রদের নিয়ে গেছি পাটনা থেকে কলকাতায়। “নামগন্ধ” উপন্যাসে চরিত্রদের কলকাতা থেকে নিয়ে গেছি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে, আলু চাষিদের দুর্দশা আর কোল্ড স্টোরেজে আলু রাখার রাজনীতি নিয়ে। “ঔরস” উপন্যাসে নিয়ে গেছি মাওবাদি অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড আর অবুঝমাড়ে। “আলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যা” ডিটেকটিভ উপন্যাসে কলকাতা থেকে নিয়ে গেছি অন্ধ্রপদেশ-কর্নাটকের সীমান্তের উপজাতি অঞ্চলে। এগুলো সবই ট্যুরের চাকরিতে পাওয়া অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেশানো কল্পনা। “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে বেনারস আর কাঠমাণ্ডুতে পাওয়া হিপিসঙ্গের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়েছি কল্পনা। “নখদন্ত” সাতকাহনে পাটচাষ আর চটকলের রাজনীতি নিয়ে পশ্চিমবাংলায় ট্যুরে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মিশেল দিয়েছি সংবাদপত্রে পাওয়া ঘটনা, নিজের নোটবইয়ের টুকরো-টাকরা, তখন হাতে কলম ধরে লিখতে পারতুম। এই বইগুলোর পর আমি কল্পনানির্ভর ফিকশান লেখা আরম্ভ করলুম, “জঙ্গলরোমিও”, “নেক্রোপুরুষ” আর “লাবিয়ার মাকড়ি”। আরেকটা উপন্যাস লিখেছিলুম “অমৃতলোক” পত্রিকায়, তার নাম আমি ভুলে গেছি, কপিটাও জোগাড় করতে পারিনি, উপন্যাসটা ছিল “জিন্নতুলবিলাদের রূপকথা” আর “গহ্বরতীর্থের কুশীলব”-এর ঢঙে, জাদুবাস্তব।

    “অমৃতলোক” পত্রিকার কথা মনে আসতে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল। ১৯৯৫ সালে কলকাতায় রটে যায় যে মলয় রায়চৌধুরী মারা গেছেন। ব্যাস লিটল ম্যাগাজিনে শোক প্রকাশ করার ঢেউ উঠলো, “অমৃতলোক” পত্রিকায় বেশ বড়ো করে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন সমীরণ মজুমদার। আমি মুম্বাই থেকে ফিরে তখন ছিলুম দাদার বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে। একদিন শক্তি চট্টোপাধ্যায় এসে হাজির, বললেন, “সংবাদটার সত্যতা যাচাই করতে এলাম, তুমি এখানে ইজিচেয়ারে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছো আর তোমার বন্ধুরা তোমার মৃত্যুর খবরে খালাসিটোলায় উৎসব করছে। যাক বেঁচেবর্তে আছো, সেলিব্রেট করার জন্য মদ খাওয়াও।” বললুম একদিন যাবো স্মিরনফ নিয়ে আপনার বাড়িতে। গিয়েছিলুম, দাদা আর প্রদীপও সঙ্গে। মীনাক্ষীও সঙ্গ দিলেন আমাদের, ওনার শ্যাম্পেন খাবার গেলাস এনে। ভালোমন্দ খাইয়েছিলেন শক্তি। সন্দীপনের মতন কিপটেমি করেননি।

    অনুবাদে হাত দিয়েছি বেশ দেরিতে। প্রথম অনুবাদ করেছিলুম “হাউল”, আমেরিকার একটা বাংলা পত্রিকার অনুরোধে, নাম ভুলে গেছি, অ্যালেন গিন্সবার্গ তখন ইউ ইয়র্কে। তারপর অনুবাদ করেছিলুম গিন্সবার্গের “ক্যাডিশ”। এই কবিতাটা অনুবাদ করতে সাহায্য নিয়েছিলুম গিন্সবার্গের নিজের আবৃত্তি-করা তেত্রিশ আর পি এম গ্রামোফোন রেকর্ডের, যাতে প্রতিটি লাইনের শ্বাসাঘাত ধরতে পারি, কেননা বাঙালির কথা বলার শ্বাসাঘাতের সঙ্গে মার্কিন ইংরেজির শ্বাসাঘাতের বেশ তফাত আছে। ২০০৯ সালে কলকাতা ছাড়ার সময়ে এই গ্রামোফোন রেকর্ডটা আর এজরা পাউণ্ডের কন্ঠে স্বরচিত কবিতা পাঠের রেকর্ড দিয়ে দিয়েছিলুম শুভঙ্কর দাশকে, ওরা স্বামী-স্ত্রী আমাকে পছন্দ করতো ; তবে ওদের মেয়ে রূপকথাকে আমি আর আমার স্ত্রী এখনও দেখিনি, শুনেছি বাচ্চাটা খুবই সুন্দর হয়েছে। আমেরিকা থেকে গিন্সবার্গ ট্রাস্টের বব রোজেনথাল আর গিন্সবার্গ আরকাইভের কিউরেটার বিল মরগ্যান গিন্সবার্গ সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতে কলকাতায় এলে শুভঙ্করকে বলেছিলুম গাইড করতে। নিজের আরকাইভ এক মিলিয়ন ডলারে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে বিক্রি করে দিয়েছেন গিন্সবার্গ, তার অর্ধেক সৎ-মাকে দিয়ে গেছেন।

    ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিবিসির জো হুইলার আর “নার্কোপলিস”এর লেখক জিত থাইল এসেছিলেন গিন্সবার্গ সম্পর্কে আমার সাক্ষাৎকার নিতে। কলকাতায় যাওয়া সম্ভবপর ছিল না বলে শান্তিনিকেতনের ইংরিজির ছাত্রী ঋতুশ্রী সেনগুপ্তকে বলেছিলুম টিমটাকে গাইড করতে। আমার নানা রোগের কথা শুনে জিত থাইল বললে, “ইওর ব্যাড কর্মা, ইট অলওয়েজ টেকস রিভেঞ্জ।” নিজে চিনাদের আফিমের আড্ডায় বাইশ বছর কাটিয়ে জ্ঞান দেবার মতন উপলব্ধি হয়েছে, আর বইটা বেস্ট সেলার হওয়ায় প্রচুর টাকা, বাড়ি, গাড়ি করে ফেলতে পেরেছে। অরবিন্দ প্রধান আমাকে বলেছিল, “আপনি বাংলায় লেখা ছেড়ে ইংরেজি ধরুন না।” ইংরেজিতে লেখার মতন শব্দভাঁড়ার তো নেই যে লিখব।

    আমি তাঁদেরই অনুবাদ করেছি আর সেই সব বিদেশি সাহিত্যিক আর ছবি-আঁকিয়ে সম্পর্কে লিখেছি যাঁদের ভেতরে ইমলিতলার ইনস্যানিটি ছিল, যাঁরা মিসফিট ছিলেন, যাঁরা আমার ইয়ারদোস্ত । পল গগাঁ আর দালির আত্মজীবনী অনুবাদ করেছি, জাঁ ককতোর দীর্ঘ কবিতা ‘ক্রুসিফিকেশান”, উলিয়াম ব্লেকের “স্বর্গ ও নরকের বিবাহ”, ব্লাইজি সঁদরার “ট্রান্সসাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস”, ত্রিস্তান জারার ডাডাবাদী কবিতা আর ডাডাবাদী ইশতেহার, স্যুররিয়ালিস্ট ইশতেহার অনুবাদ করেছি। শার্ল বদল্যার, জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো আর অ্যালেন গিন্সবার্গের জীবনী লিখেছি। আলোচনা করেছি জেমস জয়েস, মার্সেল প্রুস্ত, আনা আখমাতোভা, জাঁ জেনে, চার্লি চ্যাপলিন, আদুনিস, পাবলো পিকাসো, ওকতাভিও পাজ, কার্লস ফুয়েন্তেস, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ প্রমুখ সম্পর্কে। বিট মহিলা কবিদের অনুবাদ করেছি, যাঁদের সংবাদ এতোকাল বাংলা ভাষায় এসে পৌঁছোয়নি।

    ছেলে আর মেয়ে দুজনেই সপরিবারে বিদেশে, তাতে সুবিধা এই যে সিঙ্গল মল্ট, স্কচ আর আবসাঁথ নিয়মিত পাই, তবে করোনার কোপে তাদের আসা-যাওয়া আপাতত বন্ধ। বুড়ো-বুড়ি দুজনে মুম্বাইয়ের এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে একে আরেকজনকে ঠেকনো দিয়ে আছি। দেয়ালের পাপড়ি খসে পড়েছে, ঘায়ের পেইনটিঙ প্রতিটি দেয়ালে-সিলিঙে, হাইওয়ের ওপর বলে ধুলোয় ধুলো ; করা যাবে না কিছুই, উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি হাঁপানি, প্রোস্টেট, হার্নিয়া, হাই ব্লাডপ্রেশার, অ্যানজাইনার ব্যথা, ভেরিকোজ ভেইনস, গ্লকোমা, আঙুলে আরথ্রাইটিস, অজ্ঞান হবার সিনকোপি। চিকিৎসার জন্যে এক-একজন ডাক্তারের কাছে এক-একটি অঙ্গ দিয়ে দিয়েছি; যখন যার ডাক পাই তার কাছে গিয়ে হাজিরা দিই।

    আর তো কলম ধরে লিখতে পারি না। ব্যাঙ্কের চেকে সই করতে হয় স্ত্রীকে। এক আঙুলে টাইপ করে কমপিউটারে লিখে চলেছি যতো দিন পারি। ফেসবুকে অজস্র বান্ধবী, হাইপাররিয়াল, যারা অবিরাম লেখার জন্য উৎসাহিত করে, ছোটোলোকের শেষবেলায় যৌবন ফিরিয়ে আনতে প্ররোচিত করে, যেন সাহিত্য জগতের বাইরে ঈথারের মহাবিশ্ব, কোনও দেশের সীমাকে মান্যতা দিতে চায় না।

     
     


     

  • Abhyu | ০৭ জুলাই ২০২১ ০৩:০০734719
  • ছোটোলোকের শেষবেলা কেউ যদি প্রিন্ট আউট নিয়ে পড়তে চান তো এখানে আমার বানানো পিডিএফ ফাইল রইল https://tinyurl.com/f8hczzsw

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৮:০০734721
  • কফিহাউসে চেঙ্গিজদা, ল্যাঙড়াদা, গুলপিসি…

     

    চেঙ্গিজ খান : যাক তোরা সব আগেই এসে বসে আছিস দেখছি। জানিস তো, আমিই মহান খান, কিন্তু এই ল্যাঙড়া তৈমুরের মতন খান নই। আসলে আমার নাম ছিঙ্গিস খাং ছিল, ইংরেজ ব্যাটারা নিজেদের উপনিবেশগুলোতে খানের ছড়াছড়ি দেখে আমাকেও খান বানিয়ে দিয়েছে। আমি তো কাফের, নাস্তিক, তোদের মতন আস্তিকান্তরিত নই। তবু আমাকে মোঙ্গোলরা জাতির পিতা মনে করে। সবাইক খবর দিয়েছিস তো যে আজকে কফিহাউসে জব্বর আড্ডা হবে ? তুই তো শুনেছি নিউমোনিয়া আর প্লেগে ভুগে হেগে-হেগে মরেছিলিস! রাশিয়ানরা কবর খুঁড়ে তোর কঙ্কাল যাচাই করে দেখেছিল যে তুই সত্যিই ল্যাঙড়া ছিলিস আর ডান হাতের কব্জি কাটা ছিল।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : হায় মাওলা, কী করলা, তুমি মালাউন ? কী করব, তখন আমার সত্তর বছর বয়স, শীতকালের চিন, জানোই তো, আর টানতে পারিনি। তবে আমি কিন্তু কখনও খান পদবি ব্যবহার করিনি। হ্যাঁ, যতোজনকে পেরেছি, জানিয়েছি। ঋষিমুনিরা বলেছেন ম্লেচ্ছদের আড্ডায় আসবেন না ; আর বর্মায় সামরিক শাসন চলছে, তাই বাহাদুর শাহ জাফর হয়তো দেরি করে আসবেন। জাহাঙ্গির আর নুর জাহান আসবেন না ; পাকিস্তান সরকার ওনাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, কেননা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেই আর আই এস আই ক্লিয়ারেন্স দেয়নি। অন্য সবাই আসবে বলেছে।

    চেঙ্গিজ খান : তবে না তো কী ! প্রথমে আস্তিকান্তরিত হয়েছিল আমার নাতি। একজনমাত্র ঈশ্বরের ধর্ম নেয় জোচি খানের ছেলে বারকি খান। জোচি আমার বড় ছেলে। বাগদাদে হালাকু খানের অত্যাচারের খবর পেয়ে খাপ্পা হয়ে গিয়েছিল বারকি খান। ও এই বিষয়ে রাগ দেখিয়ে তখনকার মোঙ্গল সম্রাট উলু খাকান খান ই খানান কুবলাই খানের কাছে চিঠি লেখে।কুবলাই খান হালাকুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় বারকি খান রাজনৈতিক কূটচাল হিসেবে মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছিল। কুতুজের পক্ষে হালাকুকে থামানো সম্ভব হত না যদি না ও নিজের সমস্ত দৌলত, তাকত আর বুদ্ধি কাজে লাগাতো। টেরেক নদীতীরের যুদ্ধে হালাকুর বাহিনীকে আক্রমণ করেছিল বারকি খান আর ওর ভাইপো নোগাই খান। হেরে গিয়ে হালাকু খান পরের পাঁচ বছরে আর সিরিয়া-মিশরের দিকে হাত বাড়াতে সাহস পায় নি। আমি নাস্তিক ছিলুম, তারপর নাতিরা নানা আস্তিকতায় আস্তিকান্তরিত হয়ে আমাকে বিখ্যাত করে দিয়েছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি তো আর খাঁটি মোঙ্গোল নই, আমি উজবেক, তুর্কি, মোঙ্গোল, চাঘতাই, ইরানি মেশানো। অটোমানের সম্রাট বায়োজিদকে বন্দি করে রেখে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিলুম। টোটাল কতো লোককে মেরেছিলুম জানো ? একশো সত্তর লাখ, আর গোলাম বানিয়েছিলুম তার চেয়ে বেশি। তবু পৃথিবীতে মানুষ কমল না ;পয়দা হয়েই চলেছে।

    চেঙ্গিজ খান : তোর কফিন খুলে নাকি সোভিয়েত রাশিয়া একটা চিরকুট পেয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, যারা এই কফিন খুলবে তারা সেই দিনই ভয়ঙ্কর বিপদে পড়বে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : হ্যাঁ, সেই দিনই হিটলার ওদের আক্রমণ করেছিল।

     

    চেঙ্গিজ খান : তোতলা তুগলক পাগলা তুগলক, মোটা তুগলক, ঢ্যাঙা তুগলক, রাগি তুগলক, খোকা তুগলক, ফিরোজাবাদি তুগলক, দিল্লিওয়ালা তুগলককে আসতে বলেছিস ?

    তোতলা তুগলক : এই তো আমি গাজি মালিক সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুগলক শাহ। আআমরা আআপনার পেপেছনের টেবিবিলেই ববসে আআছি দাআআআদা। ককখনও দেদেখিনি তো আআপনাকে। ভাআআবছিলুম পপটি পলিটিককককসের লোলললকলসকর বুবুবুঝি। ভোভোভোটের গ্যাঁজানিনি চচচচলছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : যাক এসেছিস, আমিও তোদের চিনতে পারিনি। বংশধরদেরও সঙ্গে এনে ভালো করেছিস। ওদের সম্পর্কে লোকেরা এমন সব কথা বলে বেড়ায় ! তোরা চেয়ার টেনে এই টেবিল ঘিরে বোস।

    পাগলা তুগলক : গুড মর্নিঙ এভরিবডি ; আমিও আছি এখানে, সুলতান মোহম্মদ আদিল বিন তুগলক শাহ। কে কী বলে বেড়ায়, হারামিদের পাঠিয়ে দেবো দেবগিরিতে, তখন টেরটি পাবে মজা। আমি এই মোঙ্গোলদের মোটেই পছন্দ করতুম না। নেহাৎ আব্বাহুজুর বললেন, তাই এলুম।

    তোতলা তুগলক : গুগুগুরুরুরুজজজনননদেদের সাসাসামনে মুমুখ ফসসসসকে বাবাবাজে ককককথা ববববলিসনি। ওওওনাদের ককককথাগুলো ভালো ককককরে শোন। সসসসমাধির ভেতরে শুয়ে গগগগরমকালে গরররররম লাগগগগবে না, শীতকাকাকালে শীশীশীত কককককরবে না।

    ফিরোজ শাহ তুগলক : আমি মোটা তুগলক, এসেছি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি তো এই মোটা তুগলক মারা যাবার পর দিল্লি আক্রমণ করেছিলুম, স্পষ্ট মনে আছে। আমার আল-হিন্দ আক্রমণ তুগলকদের পতনেকে আরও তাড়াতাড়ি এনে দিয়েছিল। আমার ভয়ে সুলতান নাসিরুদ্দিন মামুদ দিল্লী ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, স্পষ্ট মনে আছে। আমার আক্রমণ দিল্লি সুলতানির ফোঁপরামিকে তুলে ধরেছিল। ফলে দিল্লি সুলতানির মর্যাদা আর পতিপত্তি মাটিতে মিশিয়ে যায়। প্রচুর সোনা-মণি-মুক্ত লুঠ করে আমি দিল্লির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিলুম। কিন্তু আমি আল-হিন্দে তুর্কি মোগল ইরানি উজবেক আফগানদের মতন সাম্রাজ্য বসাবার চেষ্টা করিনি। লোকে আমাকে ভয় আর ত্রাসের প্রতীক একজন লুণ্ঠনকারী মনে করে, সেটাই যথেষ্ট, সাম্রাজ্য বসানো বোকামি।

    তুগলক খান ইবন ফতেহ খান ইবন ফিরোজ শাহ সুলতান গিয়াস উদ দিন তুগলক শাহ : আমি ঢ্যাঙা তুগলকও এসেছি।

    সুলতান আবু বকর শাহ আবু বকর খান ইবন জাফর খান ইবন ফতেহ খান ইবন ফিরোজ শাহ: আমি রাগি তুগলক, এসেছি।

    মোহাম্মদ শাহ ইবন ফিরোজ শাহ সুলতান মোহাম্মদ শাহ : আমি খোকা তুগলক, এসেছি।

    হুমায়ূন খান সুলতান আলাউদ্দিন সিকান্দার শাহ : আমি শেষ তুগলক, এসেছি।

    মুহাম্মদ শাহ ইবন মুহাম্মদ শাহ সুলতান নাসির উদ দিন মুহাম্মদ শাহ তুগলক : ও শেষ তুগলক নয়, গুল মারছে, মোটে কয়েক মাসের জন্য সুলতান হয়েছিল।

    নুসরাত খান ইবনে ফাতেহ খান ইবনে ফিরোজ শাহ সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহ তুগলক: তুইও তো শুধু ফিরোজাবাদের সুলতান ছিলিস। আমি দিল্লির সুলতান ছিলুম। আমরা দুজনে ফিফটি-ফিফটি সুলতান ছিলুম।

    চেঙ্গিজ খান : ঠিক বলেছিস তোতলা। আজকালকার ছেলেপিলেগুলোর বিশেষ জ্ঞান নেই। সব ব্যাপারে মাথা গলায়।

    তোতলা তুগলক : তৈমুরেরররর ককককথা শুনলি তোতততোরা। এএএবারে মুমুমুউখ বন্ধ ককককরে গপ্পোপোপোপো শোশোশোশোন। অবশ্য একটা কথা বলে নিই। আমার ছেলেটাই আমাকে খুন করে সুলতান হয়েছিল।

    কফিহাউসের যক্ষ : রাজা-রাজড়াদের ফ্যামিলিতে অমন একটু-আধটু হয়। আমি তো সারাদিন দেখি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা কলমের খোঁচায় কাকে-কাকে মারবেন তার প্যাঁচ কষেন।

    পাগলা তুগলক : শাশ্বত মানবপ্রকৃতি বলে অবশ্যই একটা কিছু আছে। এটাই মূলত ভিত্তি: মোটামুটি সুস্থির একটা মানবপ্রকৃতি যদি না-থাকে তবে সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক উপলব্ধিতে পৌঁছানো আদৌ সম্ভব নয়। প্রতিটি সংস্কৃতিতেই আংশিক ও গুরুতর রকম খন্ডিত অভিজ্ঞতাগুচ্ছের ওপর নির্ভর করেও মানুষ কীভাবে তাদের মাতৃভাষা কেবল শিখতেই সক্ষম হন না, খুবই সৃজনশীলভাবে সেই ভাষা ব্যবহারও করতে পারেন? এর একটাই মাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে: মনের ভিত্তিস্বরূপ একটা জৈব-শারীরিক কাঠামো অবশ্যই বিদ্যমান, যা মানবপ্রজাতির সদস্য হিসেবে এবং সেইসাথে ব্যক্তিসত্তা হিসেবে, আমাদের বহুরূপ ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাগুচ্ছ থেকে একটি সুসমন্বিত ভাষায় পৌঁছাতে সক্ষম করে তোলে। আমাদের সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যক্তিক আচরণ পরিচালনাকারী এই বিপুল অনুপুঙ্খ-পরিকল্পনা বা সহজাত-বিন্যাস-নীতির সমগ্রককেই আমি মানবপ্রকৃতি বলে আখ্যায়িত করি। অর্থাৎ, জৈবিকসূত্রে প্রাপ্ত অপরিবর্তনীয় একটা কিছু আছে, যেটা আমাদের মানসিক সামর্থ্য দিয়ে যা-কিছু করি না কেন তার ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করে। মনে রাখবেন, বিয়ের আগে আমার মা হিন্দু, মানে কাফের ছিলেন।

    চেঙ্গিজ খান : বুঝলি, ল্যাঙড়া, বুঝলি তোতলা, আমি হলুম নির্ভেজাল খান।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : কী চেঙ্গিজদা, এসেই নিজের গুণগান আরম্ভ করে দিলে ? আমিও কম যাই না। আমার জীবনী পড়ে দ্যাখো, যদিও নিজে লিখিনি, আমি তো মুকখু ছিলুম, কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষদের আমি পছন্দ করতুম। আমার সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল এখনকার তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ, যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজিস্তান, পাকিস্তান, ভারতবর্ষ এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত। আমি সব জায়গা থেকে মাল লুটে নিজের দেশে নিয়ে যেতুম। লক্ষ-লক্ষ মানুষকে কচুকাটা করেছিল আমার সেনারা। বাগদাদের সবাইকে নিশ্চিহ্ণ করে দিয়েছিলুম আর দিল্লিতে এক লাখ মানুষের মাথা কেটে পাহাড় তৈরি করিয়েছিলুম।

    চেঙ্গিজ খান : তুই যে লোভী ছিলিস তা জানি। তার ওপর আবার নাস্তিকরা যে দেশেরই হোক, তাদের ফিনিশ করে দিতিস, বুক ফুলিয়ে তা বলে বেড়াতো তোর চেলারা। আমি মালাউন বলে ওই সব বিশ্বাস-অবিশ্বাসের হ্যাঙ্গাম ছিল না। আমি আফগানিস্তানে কতো লোককে মেরেছিলুম, বাড়িঘর মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলুম, যাকে এখন বামিয়ান অঞ্চল বলে। কিন্তু বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ভাঙিনি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমিও বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ভাঙিনি, যদিও আমি মূর্তিপুজোর ঘোর বিরোধী অথচ যেসব দেশের লোক আমাকে ভালোবাসে, সেখানেই আমার মূর্তি খাড়া করে দিয়েছে। বুজকাশি খেলাটা এখন বেশ পপুলার বটে, কিন্তু ওটা আমিই আরম্ভ করেছিলুম। বুজকাশি বা কোক-বোরু যাকে উজবেকরা বলে কোকবারি, মাথা-কাটা ছাগল, বাছুর বা ভেড়ার বডি নিয়ে মধ্য এশিয়ার ঘোড়সওয়ারদের খেলা, এখন আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান, পাকিস্তানের পাঠান এলাকায় খেলা হয়। জানো তো, খেলোয়াড়রা তাদের ঘোড়াগুলো দৌড় করায় আর ধড়টা তুলতে চেষ্টা করে। আমার সময়ে শত্রুপক্ষের মানুষের ধড় নিয়ে খেলতুম।

    চেঙ্গিজ খান : আরে তুই আমার ধারে-কাছে লাগিস না। তুই ভেড়া চুরি করতে গিয়ে পায়ে তির লেগে খোঁড়া হয়ে গিয়েছিলি। তোর জীবনীলেখকরা সবাই আস্তিকান্তরিত বলে তোর সম্পর্কে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে লিখে গেছে। যেমন ওই জালালুদ্দিনের পিসি, গুলবদন বেগম, ওর হুমায়ুনের জীবনী লিখতে বসে তোকে বাবরের পূর্বপুরুষ বাতলেছে, ওদের পরিবারের সব কেচ্ছা চেপে গেছে। বাবর নিজেও নাম কেনার জন্যে নিজেকে তোর বংশধর বাতলেছে ; ওরা তো চাঘতাই, গুরকানি। গুরকানি মানে ঘরজামাই। জানিস কি, মঙ্গোলিয়ার বেশির ভাগ লোক বৌদ্ধ আর তাদের অনেকেই যাযাবর। আমিও যাযাবর ছিলুম। আমার বউরা পঞ্চাশ একশো কোশ দূরে-দূরে চামড়ার তাঁবু খাটিয়ে সংসার পাততো। ঘোড়া হাঁকিয়ে যেতুম একবউ থেকে আরেক বউয়ের তাঁবুতে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি প্রচুর বৌদ্ধও মেরেছি। আমার পরে যারা বৌদ্ধ এলাকায় গেছে তারাও বৌদ্ধদের ফিনিশ করেছে। বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি কামান দেগে ভাঙার চেষ্টা করেছিল নাদির শাহ আর আওরঙজেব, কিন্তু ভাঙতে পারেনি। আফগান রাজা আব্দুর রহমান খান মূর্তির মুখ লোক লাগিয়ে ভেঙে দিয়েছিল। পরে তালিবানরা উড়িয়ে দিয়েছে বোমা মেরে। মজার ব্যাপার কী জানো ? আমি যে লাখ-লাখ কাফের-নাস্তিকদের দাস বানিয়ে তাড়িয়ে এনেছিলুম, তাদের আস্তিকান্তরিত করার পর তাদের নাতি আর নাতির নাতিরাই গোঁড়া তালিবানি আস্তিক হয়ে নাস্তিকদের ফিনিশ করছে ; ব্যাটারা জানেই না যে ওদের দাদু আর তার দাদুকে দাস বানিয়ে এনেছিলুম।

    কফিহাউসের যক্ষ : আপনারা তো স্নান করতেন না। আপনাদের মাথায় উকুন আর গায়ে কি চামউকুন হতো?

    চেঙ্গিজ খান : হতো হতো। সাধারণত যুদ্ধে বেরোবার সময়ে একজন বউকে সঙ্গে নিয়ে যেতুম। তাছাড়া, অনেকগুলো বউ ছিল, যুদ্ধ সেরে ফিরে, তাদের দিয়ে বাছাতুম। শক্তিশালী মোঙ্গোল পুরুষদের জন্য যেমন নিয়ম ছিল, আমার অনেক স্ত্রী আর রাখেল ছিল। আমি যে সাম্রাজ্য জয় করতুম সেখান থেকে বউ আর রাখেল পেতুম, এই মেয়েরা সাধারণত রাজকন্যা বা রানী হতো, যাদের বন্দী করা হয়েছিল বা উপহার হিসাবে আমাকে দেয়া হয়েছিল। সবসুদ্দু কতোজন বউ আর রাখেল ছিল বলতে পারব না। তবে, আমার সাতজন প্রধান বউ ছিল, বুঝলি। বোরতে, ইয়েসুজেন, ইয়েসুই, খুলান, মোগে, জুয়েরবিয়েসু আর ইবাকা বেকি। আমার প্রথম বউ বোরতেকে মেরকিটরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। আমি বোরতেকে ছাড়িয়ে এনেছিলুম আর তারপর ঠিক করি সারা জগত জুড়ে যুদ্ধ করব আর যখনই পাবো অন্যের বউকে তুলে আনবো। তারপর থেকে প্রতিটি বউ আর রাখেলের তাঁবুতে আমি পালোয়ান পাহারাদার মোতায়েন করা আরম্ভ করেছিলুম। লোকে আজও বলে চেঙ্গিস খান ছিলেন আপাদমস্তক একজন ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : খোজা পাহারাদার ?

    চেঙ্গিজ খান : আরে, না রে। খোজা তো তুর্কির সুলতানরা রাখতো। খোজারা ক্ষমতাশীল মানুষের হয়ে দাস হিসেবে কাজ করে, আমার তাদের দরকার হয়নি। তুর্কির সুলতানরা হারেমের পাহারাদারের কাজে খোজাদের রাখতো। এছাড়াও কর্মচারী, যোদ্ধা, গৃহস্থালির কাজ, সংগীতশিল্পী, সরকারি কাজকর্ম, ব্যক্তিগত রক্ষী ও চাকর হিসেবে খোজাদের ব্যবহার করা হতো। সুলতানরা ভাবতো খোজারা বেগমদের কাজে লাগবে না। বেগমরা কি অতো বোকা নাকি। হারেমে অতো বউ আর রাখেল রাখলে তাদের অরগ্যাজম যোগাবার কাজটা তো খোজারাই করতো।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমিও খোজা রাখিনি। কী দরকার ! বউ, দাসী-বাঁদি আর রাখেলদেরও তো সাধ আহ্লাদ আছে।

    চেঙ্গিজ খান : ভালো করতিস।

    কফিহাউসের যক্ষ : ভাগ্যিস আপনাদের দেশে জামাই ষষ্ঠীর ব্যাপার ছিল না।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি মাথায় হেলমেট পরতুম। এতো লড়াই করতে হতো যে চুলকোবার সময় পেতুম না। চামউকুন থেকে রেহাই পাবার জন্যে দেশে ফিরে গায়ে ঘোড়ার চর্বি মাখতুম। আমার তেত্রিশজন বউ আর রক্ষিতা ছিল । আমিও কোনও রাজ্য জিতলে সেখানকার রানি আর রাজকন্যাকে বিয়ে করে আনতুম কিংবা রক্ষিতা করতুম। আমার প্রধান বউরা ছিল তুরমিশ আগা, ওলজায় তুরখান আগা, সরায় মুলক খানুম, ইসলাম আগা, উলুস আগা, দিলশাদ আগা, তউমান আগা, চুলপান আগা, তুকাল খানুম, তোলুন আগা, মেংলি আগা, তোঘে তুরখান আগা, তুঘদি বে আগা, সুলতান আরে আগা, মালিকানশা আগা, খন্দ মালিক আগা, সুলতান আগা। রক্ষিতা বা উপপত্নী ছিল দৌলত তারখান আগা, বুরহান আগা, জানি বেগ আগা, তিনি বেগ আগা, দুরসুলতান আগা, মুনদুজ আগা, বখত সুলতান আগা, নওরুজ আগা, জাহান বখত আগা, নিগার আগা, রুহপরওয়ার আগা, দেলবেগ আগা, দিলশাদ আগা, মুরাদ বেগ আগা, পিরুজবখত আগা, খোশকেলদি আগা, দিলখোশ আগা, বরাতবে আগা, সেভিঞ্চ মালিক আগা, আরজু বে আগা, ইয়াদগার সুলতান আগা, খুদাদাদ আগা, বখত নিগার আগা, কুতলু বে আগা আর আরেকজন নিগার আগা। সবাইকে মনে রেখেছি, তোমার মতন ভুলে যাইনি। রোজ রাতে ওরা লটারি করে ঠিক করতো কে আমার সঙ্গে শোবে।

    চেঙ্গিজ খান : খোঁড়া হয়ে অতো বউ কেমন করে রাখতিস ? তোদের আস্তিকদের তো চারটে মোটে বউ অ্যালাউড। আমি নাস্তিক মানুষ অমন নিয়ম-কানুনের হ্যাপা ছিল না। তোদের চারটে ছাড়া বাদবাকি সবাই মুত্তা ! আজকাল শুনি পট্রোডলারের জোরে সেক্স-স্টার্ভড বুড়োরা আল-হিন্দের হায়দ্রাবাদ থেকে মুত্তা কিনে নিয়ে যায়। নিজামের অনেক রাখেল বাঁদি দাসী ছিলো তো, এখন গরিব হয়ে কীই বা করবে, তাদের মেয়েদের মুত্তা করে পাঠায় !

    কফিহাউসের যক্ষ : মুত্তা কী ব্যাপার স্যার ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : মুত্তা মানে যে বউ নিকা করা নয়। শব্দটা আরবি। । আরবি ‘মুত্তা’ শব্দের মানে হলো আনন্দ। ফূর্তির জন্য এই বিয়ে। আল-হিন্দে সেই কবে থেকে বাদশা, সুলতান আর নবাবদের মধ্যে মুত্তা প্রথা চলে আসছে অথচ তুমি জানো না ? কেমন তুমি কফিহাউসের যক্ষ ! অবশ্য মুত্তার নিয়মনীতি শিয়াদের মধ্যেই বেশি প্রচলিত ছিল। মোগলরা যদিও সুন্নি, তবে চারের বেশি বেগম ছিল তাদেরও। সেই বাবরের আমল থেকেই। বাবরকে বলেছি আসতে, ওদের কাছেই ডিটেইলড স্টোরি শুনতে পাবে। বাবরের বেগমের সংখ্যা দশ। এদের মধ্যে ছয়জনই ছিল ‘মুত্তা’ বেগম। হুমায়ুনের নিকা আর মুত্তা মিলিয়ে বেগম সংখ্যা নয়। আকবরের আট।

    চেঙ্গিজ খান : তাই তো তোকে বলি, আমি একজন আলাদা বিশ্বজয়ী খান। আমিও একটা মজার কথা বলি তোকে। মিশরের লোকেরা মনে করে ওরা খাঁটি আস্তিক। ওরা যে প্রাচীন ফ্যারাও রাজত্বের মানুষ, গ্রিক, ইতালিয়, আরব, ইরানি, তুর্কিদের মিশেল, তা ভুলে যায়। কতোরকমের নাস্তিকতার ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছে ভুলে যায়। এখন তো নাস্তিক ফ্যারাওদের মমি আর পিরামিড দেখিয়ে ভালো রোজগারপাতি করছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : জানি তো, চারজন বউ রাখতে হয় আর বাদবাকি মুত্তা। বুঝলে দাদা, মুত্তা হলেও, ওরা গর্ভবতী হয়ে যেতো। সে এক ফ্যাচাঙ। মুত্তাদের বাচ্চা হওয়া নিষেধ। আমি তৈমুর বিন তারাগাই বারলাস বলে কেউ বড়ো একটা আপত্তি করতো না।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : কিছু মনে করবেন না ; আমিও আফগানিস্তানের জামাই, গুরকানি। ল্যাঙড়ামিয়াঁ ইনভাইট করেছিল আসার জন্য। আমি আপনাদের মতোই বদনাম। আমার ছেলে দুর্যোধনের কাজকর্মের জন্যে লোকে আমাকে দোষ দেয়। সৎ ভাই পান্ডু যাবার পর দিল্লিতে রাজত্ব করতুম। কিন্তু আমি সত্যিকারের জন্মান্ধ, ধর্মান্ধ নই। কান্দাহারের রাজকুমারী গান্ধারীকে বিয়ে করেছিলুম। আমার একশো ছেলে আর এক মেয়ে। এছাড়া এক বৈশ্য দাসীর সঙ্গে শুয়েছিলুম বলে তার পেটে যুযুৎসু নামে আমার এক ছেলে জন্মেছিল। আমি আফগানিস্তান আক্রমণ করে রাজকন্যা গান্ধারীকে বিয়ে করেছিলুম। আমি জন্মান্ধ ছিলুম বলে গান্ধারী নিজের চোখ ঢেকে রাখত। গান্ধারী যখন প্রেগন্যান্ট তখন আমার সেবা করত ওই বৈশ্য চাকরানি। তার ছোঁয়ায় আমার সেক্স করার ইচ্ছে চাগিয়ে ওঠেছিল আর তাকে জড়িয়ে ধরে সেক্স করি। আমি তো অন্ধ। চাকরানি হেল্প করেছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুযুৎসু ছাড়া অন্য সব ছেলেরা পটল তুলেছিল। আমার একশো ছেলে আমার দোষেই গুণ্ডামি-জোরজুলুম করে বেড়াতো। শুনেছি তাদের বংশধররা পশ্চিমবাংলা নামে একটা এলাকায় সেই একই বজ্জাতি চালিয়ে যাচ্ছে। ভোট আসলেই তারা বোমা-বন্দুক ছোরা-ছুরি নিয়ে যে যার ঘর থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসে।

    চেঙ্গিজ খান : কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র, জন্মান্ধ হলে ক্ষতি নেই। ধর্মান্ধ হলে সর্বনাশ। আমি ধর্মান্ধ ছিলুম না, প্রচুর যুদ্ধ করেছি জীবনে। এই ল্যাঙড়া তৈমুর ধর্মান্ধ ছিল বলেই জন্মান্ধ। আমাদের ধর্ম ছিল আকাশ। যে মানুষই আকাশের তলায় থাকে সে আমাদের ধর্মাবলম্বী বলে মনে করি। তাই কারোর ধর্ম পালটাবার দরকার হয়নি কখনও।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : বৈশ্যা চাকরানি সৌবালির ছেলে যুযুৎসু আমার অন্য ছেলেদের মতন বজ্জাত ছিল না। ন্যায়পরায়ণ আর ধর্মনিষ্ঠ বলে ও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দুর্যোধনের পক্ষ ছেড়ে পাণ্ডবপক্ষে চলে গিয়েছিল। পাণ্ডবরা অভিমন্যুর ছেলে পরীক্ষিৎ-কে সিংহাসনে বসায় আর যুযুৎসু’র ওপর রাজ্যের ভার দিয়ে চার ভাই ওদের বউকে নিয়ে মহাপ্রস্থানে চলে গিয়েছিল। মহাপ্রস্হানের রাস্তাটা এখন চিনের দখলে, কে জানে কেমন আছে ওরা সবাই।

    ঢ্যাঙা তুগলক : আমদের ধর্মে অন্ধ হলে রাজা হওয়া নিষিদ্ধ। কাউকে টাইট দিতে হলে প্রথমেই তাকে অন্ধ করে দেবার রেওয়াজ।

    গজনির মামুদ : ল্যাঙড়ামিয়াঁ ডেকেছিলেন বলে আমিও এলুম। আমার নাম ইয়ামিনউদ্দৌলা আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে সবুক্তগিন, সাধারণভাবে মাহমুদ গজনভি, বা সুলতান মাহমুদ আর মাহমুদে জাবুলি নামে লোকে এক ডাকে চেনে। আমার আব্বাহুজুর আবু মনসুর সবুক্তগিন ছিলেন তুর্কিদের সামরিক দাস ; নিজের চেষ্টায় সুলতান হয়েছিলুম। আমি ছিলুম গজনভি সাম্রাজ্যের শাসক। গান্ধার নামটা আমিই লোপাট করে দিয়েছি। হাঃ হাঃ। তালিবানরা ছবি আঁকা অ্যালাউ করে না, অথচ আফগানিস্তান আমার ছবি দিয়ে ডাকটিকিট বের করেছে। অ্যানিওয়ে, আই ফিল ইলেটেড।

    খোকা তুগলক : মুলতানের গপ্পোটা বলো না আঙ্কেল, পিলিজ।

    গজনির মামুদ : মুলতানে রাজা জয়পাল আর তার ছেলে আনন্দ পাল আমার সঙ্গে যুদ্ধ করলেও আমার দুর্বার গতির সৈন্যদলের কাছে ওদের সৈন্যদল খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। ওই রাজপুতদের হাতি-বাহিনীর সৈন্যদল মূলত আমাদের ঘোড়ায় চড়া সৈন্যদের গতির কাছেই হেরে যায়, কারণ আমাদের সৈন্যদলের অপ্রতিরোধ্য গতি। জয়পালের কাছ থেকে ২,৫০,০০০ দিনার আর ৫০টা হাতি আদায় করেছিলুম, বুঝলেন। সোমনাথ মন্দিরে আক্রমণের কারণে এখনো মুসলিমদের কাছে আমি একজন ইসলাম প্রচারক বীর যোদ্ধা, ইনটারনেটে সার্চ করলে জানতে পারবেন। পাকিস্তানের জাতীয় পাঠ্যক্রমে আমার ভারত আক্রমণকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয়, ওদের তো নিজেদের ইতিহাস নেই। কীই বা করতুম, বলুন ? আমাকে শেখানো হয়েছিল যে নাস্তিক মূর্তিপূজকদের বিনাশ করলে জান্নাতুল ফিরদৌসে যাবো। এখন অবশ্য আমি রয়েছি জাহান্নমে, সেখানে শয়তান আমাকে ঘুমোতে দেয় না, কানে বাজপাখির পালক দিয়ে সুড়সিড়ি দেয়।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : থ্যাঙ্কইউ জনাব চেঙ্গিজ। আমি চলি। রকেটের জন্যে বলে রেখেছি ইসরোকে। পৃথিবীর চারিধারে এতো মরা-রকেটের জঞ্জাল পাক খাচ্ছে যে স্বর্গে যাতায়াতও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। আফগানিস্তান থেকে করিৎকর্মা যুবক-যুবতীরা ইউরোপে পালাচ্ছে, আপনিও কেটে পড়তে পারতেন।

    গজনির মামুদ : গেলে তো ভালোই হতো ; বুড়ো হয়ে গেছি, আর পারি না। একটু দাঁড়ান মহারাজা ধৃতরাষ্ট্রদেব । আমাকে প্যারাশুট-ক্যাপসুলে গজনিতে ড্রপ করে দেবেন। ওখানেই আমার কবর, সোমনাথ মন্দির থেকে এনে চন্দনকাঠের দরোজা বসিয়েছিলুম সমাধিতে ঢোকার জন্য, তালিবানরা পালটে সাধারণ দরোজা লাগিয়ে দিয়েছে, কাফেরদের দরোজা নাকি চলবে না, দরোজাটা নাস্তিক। ঠিক সময়ে না পৌঁছোলে তালিবানরা সমাধিতে তালা মেরে দিতে পারে। জানেন তো, কিছুদিন আগে গজনিতে ভীষণ ভূমিকম্প হয়েছিল। যার ফলে আমার কবর ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। আল-হিন্দের লোকেরা বলছিল পাপের শাস্তি। আমার পর আর আগেও তো কতোজন আল-হিন্দে লুটপাট করতে এসেছিল। নয়কি ? বলুন !

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : হ্যাঁ, অনেকে এসেছিল, নিয়েও গেছে ঘোড়ার পিঠে, খচ্চরের পিঠে, হাতির পিঠে, মানুষের পিঠে, তাই তো পথটার নাম হিন্দু কুশ, মানে হিন্দুর কাটা মাথা। আপনি তো সতেরোবার সোমনাথ মন্দিরে হামলা করেছিলেন, দুই মন সোনা আর মণিমুক্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। তবু আপনার দেশে, আই মিন আমার শশুরবাড়ির দেশে, গাঁয়ের মানুষ মাটির বাড়িতে থাকে কেন, কেমন যেন গরিব-গরিব মনে হয় ?

    গজনির মামুদ : আসলে আমাদের দেশটা তখন ইরানের ভেতরে ছিল। সব মালকড়ি ওরাই মেরে দিয়েছে। নাদির শাহ ময়ূর সিংহাসন নিয়ে গেল কতো সোনাদানার সঙ্গে, এমনই আকখুটে যে সামলে রাখতে পারেনি। সব মণিমুক্ত খুলে-খুলে বেচে দিয়েছে। আমরা অন্য দেশ দখল করতে শিখেছিলুম গ্রিকদের থেকে। জানেন তো গ্রিকো-ইন্ডিয়ান হেলেনীয় রাজ্য ছিল, এখনকার আফগানিস্তান জুড়ে, আর ভারতীয় উপমহাদেশের পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী কিছু অঞ্চল, মানে এখনকার পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত, যা যিশুর জন্মের পর, শেষ দুই শতাব্দী জুড়ে ত্রিশেরও বেশি গ্রিক রাজার শাসনে ছিল। তাছাড়া নাস্তিক বা কাফেরদের দেশ বলতে আপনাদের এই একটাই দেশ ছিল আক্রমণ করার মতন। আফ্রিকার নাস্তিকদের আমরা হাজার বছর আগেই আস্তিকান্তরিত করেছিলুম ; যে কটা ট্রাইব বেঁচে ছিল তাদের খ্রিস্টান্তরিত করে ফেললে ইউরোপের ক্যাথলিকরা।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : আমি তারও আগের রাজাধিরাজ। তবে আপনাদের দেশের লোকজন আর মেয়েদের দেখে সত্যিই মনে হয় যে গ্রিকরা নিজেদের বীর্য বিলিয়ে গেছে আপনাদের দেশে। ওদের মতন যেমন যুদ্ধবাজ আপনারা, তেমনই সুন্দরী আপনাদের মেয়ে-বউরা। আমরা অমন সুন্দর দেখতে ছিলুম না ; রাজা রবি বর্মা নামে একজন আঁকিয়ে আমাদের সুন্দর-সুন্দরী তৈরি করে দিয়ে গেছে।

    চেঙ্গিজ খান : রাজা রবি বর্মা কে ? আমি তো ওনার রাজ্যে লুটপাট চালাতে যাইনি। কোথায় ওনার দেশ ?

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : রাজা রবি বর্মা ওরফে কিলিমানোর কইল থাম্পুরান ছিলেন আল-হিন্দের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। আল-হিন্দের ইতিহাসের নানাক্ষেত্রে বিচরণের জন্য তাঁকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী হিসেবে গণ্য করা হয়। আল-হিন্দের ইতিহাস ধরে রেখে উনি ইউরোপীয় ধাঁচে ছবি এঁকে ভারতীয় চিত্রশিল্প জগতে এক অভূতপূর্ব রদবদল এনেছিলেন। এছাড়া উনি লিথোগ্রাফিতে অনেক দক্ষ ছিলেন যা তাঁকে আরো বেশি সুপরিচিত করে তোলে। তাঁর আঁকা ছবি দেখে পরে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এছাড়া হিন্দু দেব-দেবী আর পুরাণের ওপর ওনার সৃষ্টিকর্মগুলো ওনাকে আরো বেশি বিখ্যাত করেছে। রাজা রবি বর্মা ত্রিবাঙ্কোরের রাজ ঘরানার সদস্য ছিলেন। এখন ওনার ছবির দাম ময়ূর সিংহাসনের দামের কাছাকাছি। আল-হিন্দের নানা ভাষার ক্যালেণ্ডারে আপনি ওনার আঁকা সুন্দরীদের দেখতে পাবেন। তবে কেউ-কেউ গোলমালও করে দিচ্ছে আজকাল। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে জার্সি গাই বা হলস্টিন ফ্রিজিয়ান গোরু এঁকে ফেলছে।

    চেঙ্গিজ খান : রাজা রবি বর্মার নাম আর ওনার দেশের নাম শুনিনি আগে। আমি যদিও নাস্তিক মালাউন, আমাদের দ্বিতীয়বার জন্ম হয় না বলেই শুনেছি মা-বাবার কাছে, নয়তো আরেকবার জন্ম নিয়ে ওনাকে দিয়ে ছবি আঁকিয়ে আমার চোখ দুটো বড়ো আর নাকটা উঁচু করিয়ে নিতুম। তখনকার দিনে প্লাসটিক সার্জারি থাকলে দারুন হতো, কী বলেন ! আমি বেঁচে থাকতে কাউকে আমার ছবি আঁকতে দিইনি, কয়েনের ওপরেও নয়, মূর্তি গড়তে দিইনি। এখন মোঙ্গোলিয়া জুড়ে আমার মূর্তি বসানো হয়েছে। কোনো মানে হয়? নাক চেপটা, ছোটো চোখ, মোঙ্গোল চেহারার মূর্তি বানিয়ে আমার নামের লেবেল লাগানো হয়েছে। জাস্ট ডিসগাস্টিঙ।

    গজনির মামুদ : আমাদের দেশে গ্রিসের মিনানডার নামে একজন রাজা ছিল, সে নিজে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে সবাইকে বৌদ্ধ করে তুলেছিল। অনেকে মিনানডারকে মেনান্দ্রোস নামে চেনে, যিনি পালি বইগুলোতে মিলিন্দ নামে পরিচিত, উনি যিশুখ্রিস্ট জন্মাবার একশো পঞ্চাশ বছর আগে রাজত্ব করতেন ; পারোপামিসাদাই, আরাখোশিয়া আর পাঞ্জাব এলাকা শাসন করেন। তাঁর রাজ্য পশ্চিমে কাবুল নদী উপত্যকা থেকে পুবদিকে রাবি নদী পর্য্যন্ত আর উত্তরে সোয়াট নদী উপত্যকা থেকে দক্ষিণে আরাখোশিয়া পর্য্যন্ত ছড়ানো ছিল। পূর্বদিকে গাঙ্গেয় নদী উপত্যকা বরাবর পাটলিপুত্র পর্য্যন্ত সেনা অভিযান করেছিলেন। গ্রিক রক্ত আমাদের শিরায় ঢুকে মাথা গোলমাল করে দিয়েছে। তাই যুদ্ধ, নেশাখুরি আর মাগিবাজি করার জন্য আজও আমার দেশের পাবলিক ছোঁক-ছোঁক করে। অবশ্য এই ব্যাপারে ইরান, তুর্কি, রাশিয়া, আমেরিকা, আরব হেল্প করেছে নানা সময়ে। এখন পাকিস্তান হেল্প করে।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : আপনার শহর তো মুইজউদ্দিন মুহাম্মাদ ঘোরি দখল করে নিয়েছিল, ওনার আব্বাকে খুনের বদলা নেবার জন্যে। তারপর আল-হিন্দে জমিয়ে বসে গেল। আহমেদশাহ আবদালিও আটবার এসে লুটপাট চালিয়েছিল। ওরাও অনেক মালকড়ি নিয়ে গিয়েছিল, তবু আপনার লোকেরা আজও আফিম চাষ করে রোজগারপাতি করে কেন ?

    গজনির মামুদ : ঠিকই বলেছেন আপনি। মুইজউদ্দিন গজনি শহর দখল করে নেয়। আসলে উত্তর ভারতে অভিযানের জন্য এই শহরকে স্প্রিঙবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এ সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় বৃহত্তর খোরাসানের আধিপত্য নিয়ে খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্যের সাথে প্রতিযোগীতায় ও ওর ভাই গিয়াসউদ্দিনকে সাহায্য করেছিল। তারপর হামিদ লোদি রাজবংশের কাছ থেকে মুইজউদ্দিন মুলতান জয় করে নিলো। হামিদ লোদি পশতু ছিল, তবে ইসমাইলি শিয়াদের সাথে ওর সংযোগের কারণে মুরতাদ বা নাস্তিক হবার অভিযোগ উঠতো। এছাড়া ও লাহোরের গজনভি রাজ্যকে নিজের অধিকারে নিয়ে আসে। তা ছিল ওর সর্বশেষ পারস্যায়িত প্রতিপক্ষ। গিয়াসউদ্দিন মারা যাবার পর মুইজউদ্দিন ঘুরি ওদের সাম্রাজ্যের শাসক ছিল। তার কবজার এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল আফগানিস্তান, ইরান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, পাকিস্তান, আর আল-হিন্দ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যে ব্যাটারা বেশিদিন টেকেনি।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : এতো কাণ্ড করার পরও আফিম চাষ, চরস বিক্রি, বউদের ওপর কড়াকড়ি কেন?

    গজনির মামুদ : কী আর বলব, মহারাজা ধৃতরাষ্ট্রদেব । আফিম খাইয়ে পাবলিককে ভুলিয়ে রাখলে শান্তিতে শাসন করা যায়। জনাব মার্কস বলেছেন ধর্ম হলো আফিম, তা এই কারণেই। মুহাম্মদ ঘোরি আমার চেয়েও কট্টর ছিল। বৌদ্ধধর্মকে হাপিশ করার জন্যে সবাইকে আস্তিকান্তরিত করে ফেললে। আল-হিন্দে নিয়ে এলো আফিম। বাঙালিরা আলুপোস্তর তরকারি আর সর্ষেপোস্তর এতো ভক্ত অথচ তা যে আপনার শশুরবাড়ির লোকেদের অবদান তা ভুলে যায়। আমাদের পোস্তগাছের চাষ করতে শিখিয়েছিল গ্রিকরা। আলেকজাণ্ডার যতো দেশ জয় করেছিল সব দেশে পোস্তদানা দিয়ে গেছে। যাকগে চলুন, গ্যাঁজানোও আফিমের মতন নেশা। দেখছেন তো কফিহাউসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাঁজাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : চলুন। আমি জন্মান্ধ আর আপনি ধর্মান্ধ। আজকাল তো ধর্মান্ধের সংখ্যা দিন-কে-দিন বেড়েই চলেছে। বিরোধিদের নিকেশ করার যে-কোনও উপায়কেই ধর্মান্ধতা বলতে হবে, বুঝলেন গজনিমিয়াঁ। আমার ছেলেরা নিজেদের খুড়তুতো ভাইদের মনে করলো বিরোধী আর হিংসেতে নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা বাধিয়ে ফেলেছিল। একই ব্যাপার করেছিল পাক সার জমিন সাদ বাদ গাইয়েরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টুকুতে ওই গাইয়েদের খুনিরা প্ল্যান করে বাংলাদেশের জ্ঞানী-গুণী আর মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের খুন করেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে ওই গানের খুনিবাহিনী যখন বুঝতে শুরু করল যে তাদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়, তখন তারা নতুন দেশটাকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক আর শিক্ষাগত দিক থেকে দুর্বল আর পঙ্গু করে দেয়ার জন্য প্যাঁচ কষতে থাকে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী শীতের রাতে পাক সার জমিন সাদ বাদ গাইয়েরা তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর আর আল শামস খুনিদের মদতে দেশের শ্রেষ্ঠ লোকেদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর খুন করে। বন্দী অবস্থায় বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন জায়গায় খুন করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের ক্ষত-বিক্ষত আর বিকৃত লাশ রায়েরবাজার আর মিরপুরে পাওয়া গিয়েছিল। অনেকের লাশ শনাক্তও করা যায়নি, পাওয়াও যায়নি বহু লাশ।

    গজনির মামুদ : আসলে পাক-সাদ-বাদের উর্দু বলিয়েরা মনে করতো, এখনও করে,যে, বাঙালিরা নিম্নশ্রেণীর মানুষ। ওদের গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট তো বাঙালিদের তুলনায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমারিকার আর চিনের কাছে ফিবছর ভিক্ষা চায় বেচারারা। আপনাদের দেশভাগের সময়ে পাকিস্তানিরা ভাবতো যে কলমা পড়িয়ে নুনুর খোসা ছাড়িয়ে দিলেই মানুষ মুসলমান হয়ে যায়। ধর্ম অতো সহজ ব্যাপার নাকি। আজকাল তো কাওয়ালি-গায়কদের রঙচঙে পোশাক পরে আস্তিকান্তরিতরা ধর্মের উপদেশ বিলোয়। যাউকগিয়া, চলুন।

    শেষ তুগলক : রাজাকর আবার কী ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আল-হিন্দে, রাজাকার হলো একটা বাংলা গালি যা প্রধানত দেশদ্রোহীদের দেওয়া হয়। আল বদর হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে যারা সহায়তা করতো, সেই আধা-সামরিক বাহিনী। তাদের দলটাকে গড়া হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অখণ্ড রাখার উদ্দেশ্যে জনমত গঠন করার জন্য। পূর্বাঞ্চলীয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ইসলামিক ইতিহাসের বদর যুদ্ধকে আদর্শ করে এই বাহিনী গঠিত হলেও এদের আসল কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীর প্রচারযন্ত্র দৈনিক সংগ্রাম এর মাধ্যমে দেশপ্রেমীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ ও যুদ্ধের ডাক দিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করে, সে বাহিনীর আমীরের পদ নিয়ে নিলে, সেসময়ের ছাত্রসংঘের নেতা, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে আল শামস আর আল বদর বাহিনী গঠন করেছিল। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের আমীর আর পরে বাংলাদেশের মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী আল বদর আর আল শামস বাহিনীর আমীরের পদ নিয়েছিল, আর সারা বাংলাদেশে প্রচারণা, সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেছিল। ঢাকা নগর ছাত্রসংঘের আমীর আর পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদও এসব বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছিল। আবদুল কাদের মোল্লা সামরিক জিজ্ঞাসাবাদ আর মুক্তিযোদ্ধাদের আঙুল কাটার দায়িত্বে ছিল।

    চেঙ্গিজ খান : ছি ছি ছি ছি। নিজের লোকেদের মেরে ফেলার প্যাঁচ কষেছিল ব্যাটারা ? আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নাম শুনেছি বটে। লোকটা তো ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট জেনারেল। পূর্ব পাকিস্তানে শেষ গভর্নর আর সামরিক আইন প্রশাসক এবং পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক হাই কমান্ডের সর্বশেষ কমান্ডার। নিয়াজি আর রিয়ার এডমিরাল মুহাম্মদ শরীফ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধর সময়ে পূর্বাঞ্চলে সেনাদের দায়িত্বে ছিল। আত্মসমর্পণের জন্য ওকে পাকিস্তানে “বাংলার শেয়াল” বলা হয়। ওর সামরিক পদক আর সম্মানও কেড়ে নেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে নিয়াজি ওর পাঁচ ডিভিশন সেনা নিয়ে মুক্তি বাহিনী আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত থাকার জন্য ওকে অভিযুক্ত করা হয়। ব্যাটা আছে এখন কোথায় ? মুখ লুকিয়ে বাড়িতে বসে থাকে বোধহয় ?

    গজনির মামুদ : নিয়াজি তো গো হারান হেরে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেছিল।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : দলিলটা তোর কাছে আছে ? আচ্ছা, পড়ে শোনা তো।

    গজনির মামুদ : পড়ছি, শোনো। “পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী সহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্র সমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে। এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট-জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলীর অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া হবে।”

    চেঙ্গিজ খান : ধর্মের কল নাড়াতে গিয়েছিল ব্যাটারা, পড়েছে মুখ থুবড়ে। পাকিস্তানিদেরও দোষ। কেন গিয়েছিলি বাঙালিদের চটাতে। নিজেদের বিশুদ্ধ আর বাঙালিদের অশুদ্ধ ভাবতো। আরে তোদের গায়েও তো গ্রিক, তুর্কি, মোগোল, উজবেক, আফগান, ইরানি, রক্তের মিশেল ; অনেকের পূর্বপুরুষ ছিল আল-হিন্দের নাস্তিক।

    পাগলা তুগলক : হ্যাঁ, জনাবেআলা। পূর্ব পাকিস্তান আর নেই। এখন এলাকাটাকে আমরা বলি বাংলাদেশ। পাকিদের একটা গানও ছিল। আল-হিন্দের কিছু মানুষ মনে-মনে দুঃখ পায়, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেছে বলে। পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের অবস্হা খুবই খারাপ। পাকিস্তানের করাচি আর তার আশপাশেই আটকে থাকা বাঙালিদের বাস। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই তারা সেখানে বসতি গড়েছিল। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেলে, ওদের নাগরিকত্ব আটকে দেয় পাকিস্তান। করাচিতে ওদের জন্য তৈরি করা হয়েছে ক্যাম্প। সেখানে জঘন্য পরিস্থিতিতে বহু বাঙালি বাস করছে। আটকে-পড়া বাঙালিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টা প্রথম রিপোর্ট করে পাকিস্তানের সামা টিভি। তাতে জানানো হয় দেশটার নাগরিকত্ব যাচাইকরণ প্রোগ্রামের সংসদীয় কমিটি পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে আটকে পড়া বাঙালিদের বৈধ করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বাঙালিদের বৈধ করার বিষয়টা সহজ নয়। কারণ এ জন্য পাকিস্তানের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করতে হবে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে প্রায় তিরিশ লাখ বাঙালি আটকে থাকলেও তাদের মধ্যে পনেরো লাখ করাচি আর তার আশপাশে রয়েছে। বহু বছর সামরিক শাসনে থাকায় আটকে থাকা বাঙালিরা রাজনীতির শিকার হয়েছে। তাদের বেশ কয়েকবার নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এ জন্য সেখানকার বাঙালিদের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। করাচিতে প্রায় দেড়শো বাঙালি বস্তি রয়েছে।

    তোতলা তুগলক : আআআবার মুমুমুকে মুমুকে তততকককো ! বারন করেছি না ?

    গজনির মামুদ : জানি, পাকিরা গানটাকে বলে কওমি তরানা। হুমায়ুন আজাদের উপন্যাসে পড়েছিলুম কবরের আরামে শুয়ে।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : কওমি তরানাটা বুঝতে পারি না, তবে গানটা আল-হিন্দের জলন্ধর শহরের কবি হাফিজ জলন্ধরির লেখা ! জনাব গজনির মামুদ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নামে একজন শায়র ধর্মান্ধদের নিয়ে লিখে গেছেন, শোনাচ্ছি আপনাকে :

    যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ

    তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা।

    জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি

    ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে

    ক্রমশঃ উঠছে ফুটে ক্ষয়রোগ, রোগেরপ্রকোপ

    একদার অন্ধকারে ধর্ম এনে দিয়েছিল আলো,

    আজ তার কংকালের হাড় আর পচা মাংসগুলো

    ফেরি কোরে ফেরে কিছু স্বার্থাণ্বেষী ফাউল মানুষ-

    সৃষ্টির অজানা অংশ পূর্ণ করে গালগল্প দিয়ে।

    আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সে তো হেমলক বিষ।

    ধর্মান্ধের ধর্ম নেই, আছে লোভ, ঘৃণ্য চতুরতা,

    মানুষের পৃথিবীকে শত খণ্ডে বিভক্ত করেছে

    তারা টিকিয়ে রেখেছে শ্রেণীভেদ ঈশ্বরের নামে।

    ঈশ্বরের নামে তারা অনাচার করেছে জায়েজ।

    হা অন্ধতা! হা মুর্খামি! কতদূর কোথায় ঈশ্বর!

    অজানা শক্তির নামে হত্যাযজ্ঞ কতো রক্তপাত,

    কত যে নির্মম ঝড় বয়ে গেল হাজার বছরে!

    কোন্ সেই বেহেস্তের হুর আর তহুরা শরাব?

    অন্তহীন যৌনাচারে নিমজ্জিত অনন্ত সময়?

    যার লোভে মানুষও হয়ে যায় পশুর অধম।

    আর কোন দোজখ বা আছে এর চেয়ে ভয়াবহ

    ক্ষুধার আগুন সে কি হাবিয়ার চেয়ে খুব কম?

    সে কি রৌরবের চেয়ে নম্র কোন নরম আগুন?

    ইহকাল ভুলে যারা পরকালে মত্ত হয়ে আছে

    চলে যাক সব পরপারে বেহেস্তে তাদের

    আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে,

    দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায়

    আগামীর স্বপ্নে মুগ্ধ বুনে যাবো সমতার বীজ

    গজনির মামুদ : দারুন লিখেছে। পাক সাদ বাদ আমিও বুঝি না। আমার ভাষা তো তুর্কি আর ফারসি, আল-হিন্দে অনেকে ফারসি জানতো। আপনাদের আল-হিন্দের পতৌদির নবাবও আফগানিস্তান থেকে এসেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহায্যে পাতৌদি রাজ্যটা গড়া হয়েছিল। মারাঠা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইংরেজদের যুদ্ধে ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল বারাক উপজাতির আফগান পশতুন। উনি হন প্রথম নবাব । তাঁদের পূর্বপুরুষরা লোদি রাজবংশের সময়ে আফগানিস্তান থেকে আল-হিন্দে চলে এসেছিল। অষ্টম নবাব ইফতিখার আলী খান পাতৌদি ইংল্যান্ড আর আল-হিন্দ দুদেশের হয়ে ক্রিকেট খেলতো। ওনার ছেলে শেষ নবাবও ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিল। এখন ওরা নবাব নয়, তবুও নিজেদের নবাব বলে বলে নবাবি করে, অঢেল পারিবারিক সম্পত্তির মালিক তো, তাই। মাঝে নিজেদের প্রাসাদকে হোটেল করেছিল, কিন্তু কে-ই বা যাবে অমন জায়গায় থাকতে, উদয়পুর-যোধপুর ছেড়ে ! চলুন, যাওয়া যাক এবার।

    রাগি তুগলক : সব ধর্মের কেন্দ্রেই কতকগুলি স্বকীয় প্রত্যয় বর্তমান, এবং প্রত্যেক বিশেষ বিশেষ ধর্মের অনুরাগীরা দাবি করে থাকেন যে তাদের ধর্মের স্বকীয় প্রত্যয়গুলি অপ্ৰতর্ক, অনপেক্ষ, সর্বজনীন এবং স্বয়ংসিদ্ধ। এই দাবির সমর্থনে কোন যুক্তি প্রমাণ মেলে না; যখন কেউ কেউ যুক্তি খাড়া করবার চেষ্টা করেন, তখন বিশ্লেষণ করলেই চোখে পড়ে তা যুক্তি নয়, যুক্ত্যাভাস মাত্র। তথ্যসংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আবিষ্কার উদ্ভাবনের সূত্রে বিশ্বজগৎ এবং তার উপাদান ও পৃথিবীর অধিবাসী এবং তাদের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান গত তিন চার হাজার বছরের মধ্যে অনেক পরিবর্ধিত এবং পরিশ্রুত হয়েছে। কিন্তু এই বিশ্বজগতের আড়ালে তার স্রষ্টা, শাসক বা নিয়ামক হিসেবে ঈশ্বর আল্লা বা যিহােবা নামে যাকে বিভিন্ন ধর্মে কল্পনা করা হয়েছে তার সম্পর্কে ধর্মবিশ্বাসীদের প্রধান নির্ভর আপ্তবাক্য। শুধু বিনাবিচারে ঈশ্বর, আল্লা বা যিহােবর অস্তিত্ব মেনে নেওয়াই যথেষ্ট নয় ; তারই সঙ্গে ধার্মিকরা দাবি করেন যে বেদ অভ্রান্ত, বা ভগবদগীতা কৃষ্ণরূপী ঈশ্বরের নিজস্ব বাণী, বা যিহােবা মােজেসকে অথবা আল্লা মহম্মদকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর নির্দেশ প্রচারের জন্য, বা যীশু ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র, বা চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রমুখ ব্যক্তি এক-একজন অবতার-পুরুষ ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমনকি ঈশ্বর, আল্লা অথবা যিহােবা জাতীয় কাউকে যিনি আত্মসমর্থনে টানেন নি, সেই বুদ্ধ এমন পূর্ণজ্ঞান অর্জন করেছেন বলে দাবি করা হয়ে থাকে যে জ্ঞান প্রশ্নাতীত এবং প্রমাণাতীত।

    তোতলা তুগলক : তুতুতুইও গ্যাগ্যাগ্যান দিদিদিচ্ছিস !

    ল্যাঙড়া তৈমুর : যথার্থ বলেছ জনাব রাগি তুগলক। আমি ধর্মান্ধ ছিলুম না। আক্রমণ করার জন্যে কারণ দরকার তো ? ধর্মকেই কারণ বানিয়েছিলুম। গজনির মামুদটা কিন্তু পাক্কা ধর্মান্ধ ছিল, যদিও আওরঙজেবের মতন জিজিয়া চাপিয়ে দেয়নি। আবদালিটা আবার হাজার-হাজার শিখ কোতল করে ওদের স্বর্ণমন্দির ভেঙে দিয়েছিল। চিনের উইঘুরদের ধর্ম পালটে দিয়েছিল। আসলে আবদালির দুটো কানের লতি কেটে দিয়েছিল নাদির শাহ। বেচারা কানকাটা। এখন চিন ওদের ধরে-ধরে আবার পুরোনো অবস্হায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। যাকগে, হালাকু আবার কে ?

    ঢ্যাঙা তুগলক : আল-হিন্দেও মসজিদ হাপিশ করে রামমন্দির হচ্ছে। এখনকার পৃথিবীতে আদর্শগত শূন্যতা বিরাজ করছে এবং পুরোনো পরিত্যক্ত সব সংস্কার-বিশ্বাসের ও ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটছে। জনগণের জন্য মার্ক্সবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলা হয়েছে। ফলে এগুলো আর আদর্শ হিসেবে কার্যকর নেই। এ জন্যই সৃষ্টি হয়েছে আদর্শগত শূন্যতা। আদর্শের অবলম্বন ছাড়া চলমান অপব্যবস্থা, দুর্নীতি, জুলুম-জবরদস্তি ও অসামাজিক কার্যকলাপের মধ্যে মানুষ অসহায় বোধ করছে। আদর্শগত শূন্যতার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কেবল ধর্মের পুনরুজ্জীবন দেখে অনেকে উদ্বেগের সঙ্গে বলে আসছেন, ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে।

    তোতলা তুগলক : নানানাও, এ ব্যাটাতাতাতার মুমুমুমুখে ককককথা ফুফুফুফুটছে ; রারারাজ্য সাসাসাসামলাতে পাপাপারে না !

    চেঙ্গিজ খান : আরে ল্যাঙড়া, হালাকু জানিস না ? কেমন আস্তিক তুই ? হালাকু খান আমার ছেলে তোলুইয়ের ছেলে। ওর মা সোরগাগতানি বেকি ছিল একজন প্রভাবশালী কেরাইত শাহজাদি। সোরগাগতানি ছিল একজন নেস্টরিয়ান খ্রিষ্টান। হালাকু খানের বউ দকুজ খাতুন আর ওর ঘনিষ্ট বন্ধু সেনাপতি কিতবুকাও খ্রিষ্টান ছিল। মারা যাবার আগে হালাকু খান বৌদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বেশ কয়েকটা বৌদ্ধ মন্দির তৈরি করিয়েছিল। হালাকু খানের তিনটে ছেলে, আবাকা খান, তাকুদার আর তারাকাই। আবাকা খান ইরানের দ্বিতীয় ইলখান ছিল। এরপর তাকুদার ইলখান হয়েছিল। তারাকাইয়ের ছেলে বাইদু তারপর ইলখান হয়েছিল। হালাকু খানের ছেলের বউ আবশ খাতুনও শিরাজ শাসনের দায়িত্ব পেয়েছিল। তাহলে বুঝতেই পারছিস যে খান মানেই একই ধরণের আস্তিকান্তরিত মানুষ নয়। আর কুবলাই খান হল তলুই আর সরগাগতানি বেকির দ্বিতীয় ছেলে, মানে আমার নাতি। চীনের ইউয়ান রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিল আর প্রথম সম্রাট হিসাবে অনেককাল চীন শাসন করেছিল। কুবলাই খানেরই ভাই হালাকু খান, পারস্য জয় করে সেখানে ইলখানাত নামে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। বুঝলি তো ? খান মানেই আস্তিকান্তরিত নয়।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আর বাবর ?

    চেঙ্গিজ খান : মির্জা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বাবরকে ইনভাইট করেছিস, অথচ বাবরকে চিনিস না ? তোকে সাবধান করে দিচ্ছি, বাবর কিন্তু হোমোসেস্কসুয়াল। নিজের অটোবায়োগ্রাফিতে সেকথা লিখে গেছে। চাঘতাই তুর্কি ভাষায় লেখা। নাতি আকবরের সময় চাঘাতাই তুর্কি ভাষা পড়বার লোক বেশি না থাকায় ও এই বইয়ের ফার্সি অনুবাদ করিয়েছিল। আবদুর রহিম খান-এ খানান সেই কাজ করে। এখনকার কফিহাউসের কবি-লেখকদের অটোবায়োগ্রাফিতে অমন স্বীকার করার সাহস নেই। বাবর নামেই লোকে ওকে বেশি চেনে। বড্ডো গোঁড়া। কাফের, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আর শিয়াদেরও ঘেন্না করে। জন্মেছিল উজবেকিস্তানে, আসলে উজবেক, অথচ গুলবদন বেগম বাবরকে বানিয়ে দিয়েছে তোর মোঙ্গোল বংশধর। লোকটা আল-হিন্দ উপমহাদেশে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট। ও নাকি মায়ের দিক থেকে আমার বংশধর। ওর বাপের নাম মির্জা ওমর সাঈখ বেগ । পানিপথের যুদ্ধে দিল্লীর লোদি রাজবংশের সুলতান ইবরাহিম লোদিকে হারিয়ে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তার আগে বাবর লাহোর আক্রমণ করে শহরটাকে ফিনিশ করে দিয়েছিল। লোদি ব্যটা জানতে পারেনি ওরই কাকা বাবরকে ইনভাইট করেছিল আল-হিন্দ আক্রমণ করার জন্যে। বাবরের কাছে বন্দুক আর কামান ছিল ; লোদিকে চারিধার থেকে ঘিরে ওর সৈন্যদের কচুকাটা করে ফেললে, ইব্রাহিম লোদির মাথা আলাদা করে দিলে ধড় থেকে। বাবরের হুকুমে লোদির সব সেনার মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করে মুণ্ডুর পাহাড় তৈরি করে ফেলেছিল।ও সেসব ঘটা করে লিখেছে নিজের আত্মজীবনীতে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : লোকটার এলেম আছে, বলতে হবে।

    চেঙ্গিজ খান :ফতেপুর সিক্রি আক্রমণ করে ও অটোবায়োগ্রাফিতে লিখেছে, শত্রুকে পরাজিত করার পর আমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলাম এবং ব্যপকভাবে হত্যা করতে থাকলাম। আমাদের শিবির থেকে প্রায় দুই ক্রোশ দূরে ছিল তাদের শিবির। সেখানে পৌঁছে আমি, মুহাম্মদি ও আরও কয়েকজন সেনাপতিকে হুকুম দিলাম তাদের হত্যা করতে, কেটে দু’খানা করতে, যাতে তারা আবার একত্রিত হবার সুযোগ না পায়।” বাবর হুকুম দিলে, কাছাকাছি একটা পাহাড়ের কাছে সমস্ত নরমুন্ডকে জড়ো করে স্তম্ভ তৈরী করতে। অটোবায়োগ্রাফিতে নিজেই লিখেছে, সেই টিলার ওপর কাটা মুন্ডের একটি মিনার বানাতে হুকুম দিলাম। বিধর্মী ও ধর্মত্যাগীদের অসংখ্য মৃত দেহ পথে ঘাটে ছড়িয়ে ছিল। এমন কি দূর দেশ আলোয়ার, মেওয়াট আর বায়না যাবার পথেও বহু মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেল।” ইব্রাহিম লোদি হেরে গেল বলে ওকে ধর্মত্যাগী বলা উচিত হয়নি। জিতে গিয়ে বাবর অনেক লোককে ভয় দেখিয়ে আস্তিকান্তরিত করেছিল — তাদের বংশধররা এখন নিজেদের মনে করে খাঁটি আস্তিক। ইতিহাসের খেলা দেখলে ভিরমি খাবি রে।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : আমাদের সময়কার যুদ্ধে এই ধরণের ব্যাপার-স্যাপার করা হতো না। আমরা নোটিস দিয়ে শুধু দিনের বেলা যুদ্ধ করতুম।

    চেঙ্গিজ খান : বাবর মারা যাবার পর ওর ছেলে মির্জা হুমায়ুন সিংহাসন বসলো। আসলে পানিপথের যুদ্ধে বাবর প্রথম কামানের ব্যবহার করে জিতে গিয়েছিল। কিন্তু অন্য দেশে গিয়ে সিংহাসন বসবার কী দরকার, তুই বল আমাকে। আমি তো প্রধান মোঙ্গোল রাজনৈতিক-সামরিক নেতা ছিলুম। ইতিহাসও আমাকে একজন বিখ্যাত সেনাধ্যক্ষ আর সেনাপতি বলে। আমি আমার মোঙ্গোল গোষ্ঠীগুলোকে এককাট্টা করে মোঙ্গোল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেছিলুম। সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো সম্রাজ্য। জন্মেছিলুম ফালতু বোরজিগিন বংশে। তবে সাধারণ গোত্রপতি থেকে নিজের ক্যারদানিতে বিশাল সেনাবাহিনী তৈরি করেছিলুম। কিছু লোক লিখেছে যে আমি অতি নির্মম আর রক্তপিপাসু ছিলুম। মোঙ্গোলিয়ায় কিন্তু তোর চেয়ে বেশি মানুষ আমাকে বিশিষ্ট ব্যক্তি মনে করে, আমাকে মোঙ্গোল জাতির পিতা ঘোষণা করেছে।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : একবার যদি দাগ ইতিহাসে লেগে যায়, তা আর ছাড়ে না। দেখছেন তো আমাকে।

    চেঙ্গিজ খান : বাবর মরেছিল ইব্রাহিম লোদির মায়ের দেয়া বিষে। একজন বাঙালি কবি নাকি লিখেছে যে অসুস্হ হুমায়ুনের খাটের চারিধারে, নিরম্বু পাক খেয়ে মরেছিল বাবর।

    কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র : কবিরা অমন বানিয়ে-বানিয়ে লেখে, উনি গুলবদন বেগমের হুমায়ুননামা না পড়ে কবিতাটা লিখেছিলেন, সরকারি-বেসরকারি ইনামও পেয়েছেন। দেখছেন তো আমাকে। আমার সম্পর্কে কতো কি বানিয়ে লিখে গেছে ব্যাসদেব নামের এক কবি। যাকগে, আমি চলি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : চেঙ্গিজদা, তুমি আর তোমার সেনারা যে দেশ দখল করতে সেখানে ধর্ষণ চালাতে। তুমি তো অনেকগুলো বিয়ে করেছিলে, তবু আশ মেটেনি ? সিকন্দর, মানে আলেকজাণ্ডার, তোমার চেয়ে বেশি দেশ দখল করেছিল, কিন্তু ওরা তো অমন পাইকারি ধর্ষণ চালায়নি।

    চেঙ্গিজ খান : করেছে, করেছে। আমি মনে করি কোনো দেশ দখল করার প্রধান অস্ত্র হলো ধর্ষণ। তুই ল্যাঙড়া বলে কম ধর্ষণ করেছিস, জানি। ওই যে, যখন পাকিস্তানিদের থেকে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে বাংলাদেশ হলো, তখন টিক্কা খানের সেনারা আর রাজাকর, আল বদর, আল শামস, নিশ্চয়ই যে মেয়েকে সামনে পেয়েছে, তাকে ধর্ষণ করেছে। চল্লিশ বছর বয়সে আমি মোঙ্গোল জাতির পত্তন ঘটানোর পর বিশ্বজয়ে বের হই। প্রথমেই জিন রাজবংশকে হারাই। চীন থেকে আমি যুদ্ধবিদ্যা কূটনীতির মৌলিক কিছু শিক্ষা নিয়ে দখল করি পশ্চিম জিয়া, উত্তর চীনের জিন রাজবংশ, পারস্যের খোয়ারিজমীয় সম্রাজ্য আর ইউরেশিয়ার কিছু অংশ। অন্য দেশগুলোর এখনকার নাম হল গণচীন, মোঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া আর কুয়েত। আমি মারা যাওয়ার পর আমার ছেলে আর নাতিপুতিরা দেড়শো বছর ধরে মোঙ্গোল সম্রাজ্যে রাজত্ব করেছিল। আমরা ধর্ষণ চালাতুম বলে তুই এইসব দেশে আমার মতন কুতকুতে চোখের মানুষ দেখতে পাবি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : কুতকুতে চোখের মেয়েরা সুন্দরী হয়।

    চেঙ্গিজ খান : কফিহাউসে যে-ই আসে, দেখি নিজের ঢোলক পেটায়। কিন্তু আস্তিকান্তরিতের ঢোল পেটাসনি। জানিস আমরা মনে করতুম আকাশের চেয়ে বড়ো কিছু নেই। বব মাস্তান পলাশীতে জেতার পর আল-হিন্দে ওর স্যাঙাত ম্যাকোলে আর পাদ্রিরা এসে খোলনলচে পালটে দিলে। মূলধারার ইংরেজি ভাষার শিক্ষায় “উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শিক্ষার প্রান্তিককরণ” আর প্রথাগত ভারতীয় চিন্তাধারার থেকে সরে যেতে শিক্ষাবিদদের উৎসাহ দেওয়া হলো, আর তাদের মধ্যে “আত্ম-অবজ্ঞার চেতনা” প্ররোচিত করা হলো। বব মাস্তানের লোকেরা ভারতীয় ঐতিহ্যকে উপড়ে ফেলেছে, আর সেখানে গেড়েছে একটা বিদেশী ব্যবস্থা যা আল-হিন্দে কেউ চাইতো না। এছাড়াও, বব মাস্তানের কারণে বিদেশী চিন্তা পদ্ধতি আল-হিন্দের চিন্তা পদ্ধতিগুলোর চেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছিল। আমি কিন্তু এসব কিছুই করিনি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : নিজের ভালোমানুষীর ঢোল পেটাচ্ছো। আসতে দাও বাদবাকিদের।

    চেঙ্গিজ খান : তুইও পেটা। আমি তো বারণ করিনি। কিন্তু এটা মানতে হবে যে তুই মূর্খ ছিলিস। আমি সারা জীবন নিজেদের ধর্ম শামানে বিশ্বাসী করেছি। শামানরা আকাশ দেবতায় বিশ্বাসী ছিলো। যখন ঐক্যবদ্ধ মোঙ্গোলিয়ার নেতা নির্বাচিত হই তখন শামান ধর্মের প্রধান পুরোহিত কুকচু ঘোষণা করেছিল যে আকাশের দেবতাদের পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ছিঙ্গিস খাং পুরো পৃথিবী শাসন করার জন্যে এসেছে। বুঝলি ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : কফিহাউসে অনেকে জানে না আমার নাম তৈমুর বিন তারাগাই বারলাস, আর ল্যাঙড়া ল্যাঙড়া বলে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে। তোমার বংশধররা অক্কা পাবার পর আমি পশ্চিম আর মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকা দখলে এনে তৈমুরীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলুম। লোকে বলত আমি অপরাজেয় সমরবিদ। আমার কারণেই তৈমুরীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।। যুদ্ধ করতে বেরিয়ে অকেজো পা নিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়েছি। আমার সাম্রাজ্য ছড়ানো ছিল এখনকার তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজিস্তান, পাকিস্তান, ভারতবর্ষ এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত। তুমি আমাকে বলছ মূর্খ, আমি কিন্তু আত্মজীবনী রচনা করিয়েছিলুম, ‘তুজুক ই তৈমুরী’ নামে।

    চেঙ্গিজ খান : আমি ওসব আত্মজীবনী-টিবনি লেখাইনি ; দরকার হয়নি। ওই তো, বাবর এসে পড়েছে। আল-হিন্দ দখলের আগে ও ভেড়ার চামড়ার শায়া আর বুকে ঘোড়ার চামড়ার মেরজাই পরতো। এখন আল-হিন্দের সিংহাসনে বসে চেহারার খোলতাই হয়েছে দেখছি, সোনার গয়না, মুকুট পরে থাকে। আয় বাবর, বোস, বোস, এই যে ইনি তোর পূর্বপুরুষ ল্যাঙড়া তৈমুর, তোর নামই শোনেনি।

    মির্জা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর : আরে চেঙ্গিজদাদু, আপনাকে তো জানি ; তৈমুরদাদুকে কে না জানে, আমি তো ওনার বংশধর ! কিন্তু এনারা কে আপনার টেবিলে, চিনতে পারলুম না।

    কফিহাউসের যক্ষ : আমি এখানকার বেয়ারা, কফির অর্ডার নিই। বলতে পারেন, আমি কফিহাউসের মেঘ। কর্তব্যে অসাবধানতায় প্রভুর অভিশাপে যক্ষকে কফিহাউসে নির্বাসিত হতে হয়েছে। তাই ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এখানে বসে আষাঢ়ের প্রথম দিন নববর্ষায় আমাকে দেখে আমার মাধ্যমে অলকাপুরীর রম্যপ্রাসাদে ওর বিরহী প্রিয়ার উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠাবে বলে মনস্থির করেছে। বিরহের আতিশায্যে ও ব্যাটা জড় আর জীবের ভেদাভেদজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ও জানিয়েছে, কোন কোন নগর, নদী আর পর্বত পেরিয়ে আমাকে অলকায় পৌঁছতে হবে। ওর বর্ণনায় আল-হিন্দের এক অসামান্য ভৌগোলিক বিবরণ ফুটে উঠেছে, অথচ সুবে-বাংলার বর্ণনা নেই বলে এখানে এসেছি। এরপর আমি কুবেরপুরী অলকা আর ওর বিরহী প্রিয়ার রূপলাবণ্য দেখবো। ও আমাকে অনুরোধ করেছে ওর প্রিয়তমার কাছে ওর কুশল সংবাদ পৌঁছে দিতে।

    মালিক অম্বর : আমি একজন হাবশি যোদ্ধা। আমার নাম মালিক অম্বর। আমি যা-কিছু তৈরি করিয়েছিলুম, সবই আওরঙজেব নিজের নামে করিয়ে নিয়েছে। মোগলদের তো আমি ঢুকতেই দিইনি আমার এলাকায়। আমি মরলুম আর ওরা আমার ছেলেকে ভুলভাল বুঝিয়ে সেঁদিয়ে এলো।

    চেঙ্গিজ খান : ভাগ্যিস তুমি মালিক অম্বর। আরেকজন ছিল মালিক কাফুর। সে লজ্জায় আসবে না। আলাউদ্দিন খলজির সেনাপতি নুসরাত খান মালিক কাফুরকে দাস বাজার থেকে কিনে এনে সুলতানকে উপহার দিয়েছিল। মালিক কাফুর ছিল খোজা। হোমোসেক্সুয়াল সুলতান মালিক কাফুরকে রোজ উপভোগ করতো। সেই তালে কাফুর প্রোমোশান পেয়ে গেল সেনাপতির পদে। আলাউদ্দিন মারা গেলে তার ছেলে শিহাবউদ্দিন ওমরকে তার জায়গায় এক মাস বসিয়ে তার মাকে বিয়ে করে নিয়েছিল কাফুর, লেজিটিমেসি পাবার জন্য। নুনু তো ছিল না। ওই নাম কা ওয়াস্তে বিয়ে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ওগুলো পটি পলিটিকস। পলিটিশিয়ানরা অমন করে। ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ। এই যে আরেকজন আসছেন।

    ইমাদ-উল-মুলক : তৈমুরদাদু, আপনি ইনভাইট করেছিলেন, এলুম, যদিও, পাবলিক আমাকে বলে মুরতাদ নাস্তিক। আমি তৃতীয় গাজী উদ্দিন খান ফিরোজ জং বা নিজাম শাহাবুদ্দিন মুহম্মদ ফিরোজ খান সিদ্দিকী বায়াফান্দি, আমার লোকেদের কাছে আমি ইমাদ-উল-মুলক নামে পরিচিত। আসামের সুবেদার ছিলুম, জানেন তো। আমাকে পাবলিক মনে করে একজন প্রকৃত মোগল শাসক । আমি দ্বিতীয় গাজী উদ্দিন খান ফিরোজ জংয়ের ছেলে আর নিজাম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নিজাম উল মুলক আসফ জাহের নাতি। পাবলিক বলে আমি নাকি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। আমি মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরকে খুন করেছিলুম ঠিকই আর সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরকে জেলে পুরে অন্ধ করে দিয়েছিলুম। সম্রাটের পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের জন্য আমি সুপরিচিত। ইসলামী পন্ডিতরা আর দুররানী সম্রাট আহমদ শাহ আবদালি আমাকে মুরতাদ ঘোষণা করেছিল। তাতে কী ! আমার আব্বা মারা যাবার পরে নবাব সাফদার জঙ্গ আমাকে মীর বখশি, বা কর্মীদের মাইনে দেবার কর্তার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল আর আমির উল-উমারা, মানে প্রতিভাবানদের অন্যতম, আর ইমাদ উল-মুলক উপাধি দিয়েছিল। আবদালি ব্যাটা ভুলে যায় যে নাদির শাহ ওর কানের লতি কেটে নিয়েছিল।

    খোকা তুগলক : জনাবেআলা, মুরতাদ মানে কী ?

    তোতলা তুগলক : এইটুটূটূটূকু জাজাজানিস না ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : মুরতাদ শব্দের শাব্দিক অর্থ হল—- বিমুখ হয়েছে বা ফিরে গিয়েছে এমন। এর মূল মর্ম হল একটিমাত্র ঈশ্বরে বিশ্বাস ত্যাগ করা বা সেই বিশ্বাসের কোনও মৌলিক বিধানকে মানতে অস্বীকার করা, কিংবা তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা, অথবা সেই বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ের অবমাননা করা, যা অন্তরের ভক্তিশূন্যতা ও শ্রদ্ধাহীনতার ইঙ্গিত দেয়।

    কফিহাউসের যক্ষ : আমি বহুকাল যাবত কবি-লেখকদের কফি খাইয়ে আসছি। কাউকে অবমাননা করি না। আমার কিন্তু ক্লিওপেট্রাকে পছন্দ, যদিও উনি অনেক ভগবানে বিশ্বাস করতেন ; আমি তো ওনাকেই ভগবান বলে বিশ্বাস করি। ওনার বাবা মারা যাবার পর উনি দুই ভাই ত্রয়োদশ টলেমি ও চতুর্দশ টলেমির সঙ্গে মিলেমিশে রাজ্য শাসন করতেন। মিশরীয় ঐতিহ্য অনুসারে উনি তাদের বিয়েও করেছিলেন। একসময় ক্লিওপেট্রা মিশরের একক শাসক হন। ফারাও হিসেবে উনি রোমের শাসক সিজারের সাথে লিভটুগেদার সম্পর্ক গড়েছিলেন, যা মিশরের সিংহাসনে তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছিলো। পরবর্তীতে জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে ক্লিওপেট্রা তাঁর বড় ছেলের নাম রেখেছিলেন সিজারিয়ান। আমিও সিজারিয়ান হয়ে জন্মেছিলুম স্যার।

    চেঙ্গিজ খান : শুনেছি বটে ওই সুন্দরীর কথা। আমার আগেই উনি মারা গিয়েছিলেন, নয়তো বিয়ে করে মোঙ্গোলিয়ায় এনে আমার সাম্রাজ্যের রানি করতুম। ক্লিওপেট্রা ছিল মুরতাদ, আমিও মুরতাদ, তুমিও মুরতাদ। এই তালে এক রাউণ্ড কফি হয়ে যাক।

    ইমাদ-উল-মুলক : আমি মোটেই মুরতাদ নই। রাজা-মহারাজ-সম্রাটরা যা করে আমিও সেই কাজই করেছি। আহমদ শাহ আবদালির হাতে অনেক সৈন্যসামন্ত ছিল বলে যা ইচ্ছে প্রচার করেছে আর করিয়েছে। ইচ্ছে করলে আমিও দুররানির বিরুদ্ধে একটা বই লিখিয়ে ফেলতে পারতুম। ও তো শিখ গণহত্যায় কুখ্যাত হয়ে আছে, অমৃতসরে শিখদের পবিত্র স্বর্ণ মন্দিরে হামলা করে সেটা ধ্বংস করে দিয়েছিল। তা ছাড়া হাজার হাজার শিখকে খুন করে ভেবেছে কয়ামতের দিন ওকে জবাবদিহি করতে হবে না। নিশ্চয়ই জাহান্নমে বসে বিড়ি ফুঁকছে এখন। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল এসে। আর কি গ্যাঁজাবো কফিহাউসে বসে ! তার চেয়ে মানে-মানে কেটে পড়ি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : হ্যাঁ, যা তুই এখান থেকে।

    স্লাভয় জিজেক : আমি একজন দার্শনিক। সাম্যবাদী দার্শনিক। আজকাল আমিই সবচেয়ে বেশি পপুলার। প্যাঁচালো যুক্তি দিই বলে ছাত্রছাত্রীরা ডক্টরেট করার বিষয় পেয়ে যায়।

    নোবিলিআত্মন : আমি খ্রিস্টান্তরিকতার প্রচারক। ইনফিডেল বা হিদেনদের খ্রিস্টান্তরিত করার জন্য ইটালি থেকে অনেক হ্যাপা সহ্য করে এদেশে এসেছি। পর্তুগিজরা নাস্তিক ইনফিডেল কাফেরদের ঠিক মতো খ্রিস্টান্তরিত করতে পারছে না বলে আমি ন্যাড়া মাথায় টিকি রেখে গেরুয়া আলখাল্লা পরে, হাতে বেতের লাঠি আর কমণ্ডুলুতে জল নিয়ে হিন্দু সেজেছি। রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, চারটে বেদ সবই লুকিয়ে পড়েছি আর সেগুলো থেকে তর্ক দিয়ে ইনফিডেলদের প্রভূ যিশুর আশ্রয়ে নিয়ে আসি। জয় মা তারা, ব্রহ্মময়ী মাগো….!

    ভাস্কো দা গামা : আমার নাম ভাস্কো দা গামা : আমি পর্তুগিজ। আমি আল-হিন্দ আবিষ্কার করেছিলুম, যদিও মোগলদের পরে, ইউরোপীয়দের বলবেন না যেন প্লিজ। ওরা জানে আমিই আবিষ্কারক। নোবিলিআত্মন যে পর্তুগিজদের কথা বলছে তাদের দেশ থাকে তাড়িয়ে এখানে পাঠানো হয়েছে। ওরা জেল খাটছিল, রেহাই পাবার জন্যে এখানে এসেছে, আটবছর সেনায় থাকতে হবে। অন্যরা ছুতোর, চামার, ভিস্তিঅলা, চাকর, চাকরানির পেটে জন্মানো অভিজাতের বেজন্মা ছেলে, উন্নতি করার জন্য এসেছে। যদি ফিরতে চায় তাহলে জাহাজে খাবার দেয়া হয় বটে কিন্তু জল দেয়া হয় না। তাই কেউ ফিরতে চায় না। ক্রীতদাসী কিনে তাদের বাচ্চার বাপ হয়ে আস্তিকান্তরিতের সংখ্যা বাড়ায়। গরুর মাংস খেলে হিন্দুদের আর শুয়োরের মাংস খেলে মুসলমানদের ধর্ম চলে যায় বলে পর্তুগিজ ছোকরা-গুণ্ডাদের বলা হয়েছে রাতের অন্ধকারে গিয়ে জোর করে খাইয়ে দিতে আর চেঁচামেচি করে পাড়া মাথায় তুলতে। এইভাবে আমরা খ্রিস্টান্তরিতের সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে তুলেছি। দেখেছেন তো পুরো গোয়ার পাবলিক এখন ক্যাথলিক ধর্মের আস্তিকতম আস্তিক।

    নোবিলিআত্মন : সেনর ভাস্কো, আপনাদের কুকীর্তি এখন সবাই জানে।

    ভাস্কো দা গামা : কোন কুকীর্তির কথা বলছেন ? নাস্তিকদের খ্রিস্টান্তরিত করার জন্য একটু আধটু জোর খাটাতেই হয়। এখন যারা ভোটাভুটির সময়ে পার্টি করে, তারাও তো জুলুমবাজি করে লোকেদের দলে টানে, মেরে-টেরেও ফেলে পাঁচ-দশজনকে।

    নোবিলিআত্মন : আপনারা এদেশে এসে গোয়ায় ইনকুইজিশন চাপিয়ে দিয়েছিলেন। হিন্দুদের জীবন একেবারে নরক হয়ে গিয়েছিল– খ্রিস্টান মিশনারিরা হিন্দুদের নির্দিষ্ট করে গণহত্যা চালাত। পর্তুগিজ মিশনারিরা হিন্দুদের ‘অসভ্য’ ও ‘মূর্খ’ বলত, যারা নাকি রাক্ষসের মত দেখতে কালো মূর্তির পূজা করে ; পর্তুগিজরা হিন্দুদের ধর্ম ত্যাগ করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল আর জোর করে খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। গোয়ায় একটা ইনকুইজিশন দপ্তরও গড়ে তোলা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল যতটা সম্ভব, তত বেশি হিন্দুদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা। আমি পোপের দেশের মানুষ,অথচ তা করিনি। ইংরেজ, ফরাসি, ডাচরাও তা করেনি।

    ভাস্কো দা গামা : এদেশে আমরা অনেক কিছু দিয়েছি। ইনকুইজিশনের পাদ্রি আলফোনসোর নামে আম আমরাই দিয়েছি, যা রপ্তানি করে আল-হিন্দে অনেক টাকা আসে।

    মাও জে দং : আমার নাম মাও জে দং। আমি চিনের চেয়ারম্যান। আমি মানুষকে নাস্তিকতম নাস্তিক বানাই, সাকৃতিক বিপ্লব আর লম্বা লাফের সাহায্যে। আপাতত উইঘুর আর তিব্বতিদের নাস্তিকান্তরিত করে তুলছি। উইঘুরদের আস্তিকান্তরিত করেছিল কান-কাটা আহমেদ শাহ আবদালি আর তিব্বতিদের আস্তিকান্তরিত করেছিল অতীশ দীপঙ্কর। তাদের সুসভ্য আধুনিক করার কাজ চলছে।

    বাবর : অমন কাজ করছেন কেন ? আমি তো পেঁদিয়ে আস্তিকান্তরিত করেছি। নইলে কচুকাটা। অবশ্য এই ব্যাপারে বিখ্যাত মানুষ হলো ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজি। ইউনিভারসিটিসুদ্দু মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছিল।

    মাও জে দং : নাস্তিক্যবাদ বা নিরীশ্বরবাদ বা নাস্তিকতাবাদ একটা দর্শনের নাম যাতে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয় না এবং সম্পূর্ণ ভৌত এবং প্রাকৃতিক উপায়ে প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেয়া হয়। মূলত আস্তিক্যবাদ এর বর্জনকেই নাস্তিক্যবাদ বলা যায়। নাস্তিক্যবাদ বিশ্বাস নয় বরং অবিশ্বাস এবং যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাসকে খণ্ডন নয় বরং বিশ্বাসের অনুপস্থিতিই এখানে মুখ্য। শব্দটি সেই সকল মানুষকে নির্দেশ করে যারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই বলে মনে করে এবং প্রচলিত ধর্মগুলোর প্রতি বিশ্বাসকে ভ্রান্ত বলে তারা স্বীকার করে। দিনদিন মুক্ত চিন্তা, সংশয়বাদী চিন্তাধারা আর ধর্মগুলো সমালোচনা বৃদ্ধির সাথে সাথে নাস্তিক্যবাদেরও প্রসার ঘটছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম কিছু মানুষ নিজেদের নাস্তিক বলে পরিচয় দেয়়। পশ্চিমের দেশগুলোতে নাস্তিকদের সাধারণ ভাবে ধর্মহীন বা পারলৌকিক বিষয় সমূহে অবিশ্বাসী হিসেবে গণ্য করা হয়। কিছু নাস্তিক ব্যক্তিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মের দর্শন, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, প্রকৃতিবাদ, বস্তুবাদ ইত্যাদি দর্শনে বিশ্বাস করে। নাস্তিকরা মুলত কোনো বিশেষ মতাদর্শের অনুসারী নয় এবং তারা সকলে বিশেষ কোন আচার অনুষ্ঠানও পালন করে না। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ, যেকোনো মতাদর্শের সমর্থক হতে পারে, নাস্তিকদের মিল শুধুমাত্র এক জায়গাতেই, আর তা হল ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব কে অবিশ্বাস করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে আমাদের দেশ চালায় কমিউনিস্ট পার্টি। এখন আর কোনো দেশ সন্দেহ করে না যে আমাদের রাজনৈতিক আর আর্থিক কাঠামোই পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ।

    বাবর : ঠিক বুঝলুম না, শ্রেষ্ঠ কাঠামো তো জালালুদ্দিন আকবর তৈরি করেছিল।

    মাও জে দং : গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাজনীতি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোখানা একক কম্যুনিস্ট পার্টি অব চায়না দ্বারা পরিচালিত হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছে দলের সাধারণ সম্পাদক। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ভেতরে রাজ্যক্ষমতা থাকে কম্যুনিস্ট পার্টি, মন্ত্রি পরিষদ আর তাদের প্রাদেশিক ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের হাতে। এখন সারাজীবনের জন্যে বাছাই করা হয়েছে শি জিন পিঙকে। সবচেয়ে শুরুতে ছিলুম আমি। কয়েক দশকে আমেরিকা আমাদের পেছনের সারিতে চলে যাবে।

    চেঙ্গিজ খান : সেদিন খবরের কাগজে পড়ছিলুম, উইঘুর মিয়াঁ-বন্দিদের মুক্তির দাবিতে কবিতা লেখার অপরাধে প্রখ্যাত হুই মুসলিম কবি কুই চুই হাউজিন কে গ্রেফতার করেছেন আপনারা ?

    মাও জে দং : ফালতু বিতর্ক। আমরা কেবল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জন্য এই পদক্ষেপগুলো নিয়েছি। জিনজিয়াং প্রদেশের কোনো পুরনো মসজিদ সারাই-টারাই না করে সেই টাকায় পড়াশুনা করানো হয়। নতুন মসজিদ তৈরির খরচ স্কুল খোলায় খরচ করা হয়। আধুনিক স্হাপত্যের আদলে সংস্কার করার পরিকল্পনা করলে অবশ্য পুরনো মসজিদ সংস্কারের অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকাশ্যে ধর্মীয় চেঁচামেচি অনুৎসাহিত করা হয়। নামাজের জন্য মসজিদ নয়, বরং নামাজ ঘরে পড়ার জন্যে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। উইঘুর যুবকদের হান মেয়েদের বিয়ে করতে অর্থের অনুদান দেয়া হচ্ছে, কেননা হান মেয়েরা সুন্দরী। হান ছেলেদের সঙ্গে উইঘুর মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে যাতে তারা কমিউনিস্ট চিনের সত্যিকার অধিবাসী হতে পারে। হান ভাষা ইংরেজি ভাষাকে সরিয়ে দেবে কয়েক দশকের মধ্যেই।

    চেঙ্গিজ খান : হ্যাঁ, একথা মানতে হবে যে চিনেরা সুন্দরী হয়।

    মাও জে দং :উইঘুর শহর আর গ্রামের মাদরাসা ও হিফজখানায় আধুনিক শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। শিশু-কিশোররা যাতে ধর্মীয় জ্ঞানে সময় নষ্ট না করে তার ব্যবস্হা নেয়া হচ্ছে। তাই আঠারো বছরের নিচে, শিশু-কিশোরদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষায় অযথা সময় নষ্ট বন্ধ করা হয়েছে। উইঘুরদের বলা হয়েছে আহমেদ শাহ আবদালির চাপানো তুর্কি ভাষা ও আরবি বর্ণমালা ব্যবহার না করে হান ভাষা শিখতে, যাতে চাকরির সুবিধা হয়। কমপিউটারে হান ভাষা দরকার হয়। আমি মনে করি ধর্মের বাড়াবাড়ি সব দেশে বন্ধ করা উচিত। সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম স্পষ্টতই ধর্মপালনকে নিরুৎসাহিত করে। মার্কস বা লেলিন কখনই ধর্মপালনকে সমর্থন করেননি। ধর্মপালন ভালো নাকি খারাপ, এটা একটা আলাদা বিতর্ক। তবে ধর্মপালন কমিউনিস্ট আদর্শের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কার্ল মার্কস মনে করতেন, ধর্ম হচ্ছে ‘ক্লাস ডিভাইডেড সোসাইটি’ বা শ্রেণি বিভক্ত সমাজের একটি চেহারা। মার্কস ধর্মকে কর্তৃত্ববাদী শ্রেণির ‘আইডিয়োলজিক্যাল ওয়েপন’ বা ‘মতাদর্শগত অস্ত্র’ বলেছেন। ধর্ম গরিব-দুঃখী ও শোষিতদের ভুল পথে চালিত করে। ধর্ম তাদের বিশ্বাস করতে শেখায় যে, ইহকালের দুর্ভোগ হচ্ছে নিয়তি আর এর উত্তম প্রতিদান তারা পরকালে পাবে। নির্যাতিতদের এমন মনোভাব কর্তৃত্ববাদীদের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করে দেয়। আমাদের দেশে ধর্মের ভড়ং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

    পাগলা তুগলক : স্যার, একটা কথা বলি। আল-হিন্দে মার্ক্সবাদীরাই মার্ক্সবাদের সবচেয়ে বড়ো অপপ্রচারকারী হয়ে দেখা দিয়েছে ; তারা সেই ১৮-১৯ শতকেই আটকে আছে ; তার কারণ তারা মার্ক্সের নয়, লেনিনের আর আপনার ভক্ত। আর স্তালিন যা পেয়েছিলেন লেনিনের কাছ থেকে সেই অর্থনৈতিক মতাদর্শ কমিউনিস্ট দেশগুলোয় কমিনটার্নের মাধ্যমে চাউর করতে চেয়েছিলেন। ট্রটস্কিদের সব কমিউনিস্ট দেশেই খুন করা হয়েছে। মার্ক্স তো খুনোখুনির কথা বলে যাননি যা কাচিনের জঙ্গলে স্তালিন করেছিলেন, আপনি করেছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে, পলপট করেছিলেন দেশের খোলনলচে পালটে ফেলার জন্যে। মার্ক্স বলেছিলেন ডিকটেটরশিপ অফ দি প্রলেতারিয়েতের কথা, কিন্তু তথাকথিত কমিউনিস্ট দেশগুলোয় দেখা দিল এক-একজন মানুষ একনায়ক, যেন প্রলেতারিয়েত বলতে তাকেই বোঝায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা ডিকটেটরি করে গেছে ; কুর্সিতে বসে থাকার জন্য নাগরিকদের পেছনে এমন গোয়েন্দা লাগিয়েছিল যে কেউ ভয়ে ট্যাঁ-ফোঁ করতো না। প্রমোদ দাশগুপ্ত এই প্রক্রিয়ার শেকড় পশ্চিমবাংলায় পুঁতে গিয়েছিলেন, আর বামপন্হীরা আসন ছাড়ার পর সেই শেকড় থেকে নতুন-নতুন ঝোপঝাড় গজিয়ে চলেছে।

    তোতলা তুগলক : তোতোতোতোর এই স্বভাভাভাব গেগেগেগেল না।

    মাও জে দং : যা জানো না, সেই বিষয়ে কথা বোলো না। তোমার কাজ কফি খাওয়ানো, সেই কাজই করো।

    রাগি তুগলক : এখন তো মার্ক্সবাদ শুনলেই পশ্চিমবাংলার পেটমোটা নাড়ুগোপাল টাইপের নেতাদের মুখ ভেসে ওঠে, গ্রামে তিনতলা আধুনিক বাড়ি, শহরে ছেলের জন্যে নার্সিং হোম, মেয়ের জন্যে ইশকুল করে দিয়েছেন জনগণের গ্যাঁড়ানো টাকায় ; সেই সঙ্গে সাঁইবাড়ি হত্যা, মরিচঝাঁপি গণহত্যা, আনন্দমার্গীদের জ্যান্ত পোড়ানো, নানুর গণহত্যা, নন্দীগ্রাম গণহত্যা আর আরও নানান কেলোর কীর্তি। কিংবা সেই সব গালফুলো নেউলে লেখকদের মুখ ভেসে ওঠে যারা রাতারাতি জার্সি পালটে বামপন্হী শাসকদের লেজ ধরে পুরস্কার বা কুর্সি হাতিয়ে ফালতু বইকেও বেস্টসেলার করে ফেলেছিল। অথচ মার্ক্সবাদ বলতে যা বোঝায় তার সঙ্গে সংসদীয় গণতন্ত্রের কবলে আটক এই লোকগুলোর রাজনৈতিক কাজকারবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সেই কারণেই সম্প্রতি মার্ক্সের দ্বিজন্মশতবার্ষিকীতে, যতোটা বিশ্বকর্মা বা শেতলা পুজো নিয়ে হইচই হলো, মার্ক্সকে নিয়ে বিশেষ তক্কাতক্কি দেখা গেল না। পশ্চিমবাংলার বাঙালির মন থেকে মার্ক্সকে মুছে ফেলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে সেই লোকগুলো যারা নিজেদের মার্ক্সবাদী বলে চালাবার চেষ্টা করেছে, যেমন বামপন্হী দলগুলো, যেমন নকশালপন্হী নেতারা, যেমন জঙ্গলে বিপ্লব করার জন্য লুকিয়ে থাকা মাওবাদীরা।

    তোতলা তুগলক : এএএএবার ববববক্তিমে দেয়া ববববন্ধ ককককর দিদিদিকিনি।

    মাও জে দং : মাওবাদী নকশাল নেতারা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। তবে চারু মজুমদার আসেননি। নকশাল আন্দোলন নিঃসন্দেহে সফল হয়েছিল, কেননা তা নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস-কবিতা লেখা হয়েছে। অরুন্ধতী রায়ের বুকার পুরস্কার জয়ী “গড অব স্মল থিংস্” উপন্যাসে একটি চরিত্র নকশাল আন্দোলনে যোগ দেয়। মহাশ্বেতা দেবী তাঁর ‘’’হাজার চুরাশির মা’’’ উপন্যাসে নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন। এ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে ফিল্ম হয়েছে, নাম ছিল “হাজার চুরাশি কি মা”। সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কিন্নর রায় এবং আরও অনেকের উপন্যাসে নকশাল আন্দোলনের কথা রয়েছে। তাছাড়াও মানব চক্রবর্তীর “কুশ” উপন্যাসে নকশাল আন্দোলনের কথা আছে। নকশাল আন্দোলনের প্রভাবে ছোটগল্প, নাটক, গণসংগীত রচিত হয়েছিল যা বাংলার চিন্তাশীল মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। রাহুল পুরকায়স্হ নকশাল কবিতার সংকলন সম্পাদনা করেছেন। সাফল্যের জন্যে আর কী চাই!

    শেষ তুগলক : জানি না চারু মজুমদার কেমন করে অনুমান করেছিলেন যে পশ্চিমবাংলায় শিক্ষিত কিশোর-তরুণদের বিপ্লব হলে তা বহুত্ববাদী গোঁড়া-ধর্ম, কট্টর মৌলবাদ, জাতিপ্রথা ও বিচিত্র-বিশ্বাস, ভাষা এবং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে থাকা সারা ভারতের জনজীবনে ছড়িয়ে পড়বে ; আপনার চিনের স্প্রিং থাণ্ডার শুনে অনেকের মতো উনিও রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন, যদিও তার আগেই আপনারা ভারতের আকসাই চিন আর তিব্বত দখল করে নিয়েছিলেন। মাঝখান থেকে উনি পশ্চিমবাংলার কিশোর-তরুণদের ক্রিমি লেয়ারকে লোপাট করতে এমন সাহায্য করলেন যে বাঙালি মধ্যবিত্তের একটা পুরো প্রজন্ম নষ্ট হয়ে গেল। আর পশ্চিমবাংলার পিছিয়ে পড়ার সেটাই প্রধান কারণ। মার্ক্সের চালু করা বামপন্হীদের প্রিয় অভিধা অর্থাৎ প্রলেতারিয়েত আর বুর্জোয়ার মাঝে একটা বিরাট মধ্যবিত্ত বাফার শ্রেণি সব দেশেই গড়ে উঠেছে, যাদের আবির্ভাবের কথা মার্ক্স অনুমান করতে পারেননি, আর তারা বেশিরভাগই, যাকে বলে সার্ভিস ইনডাসট্রি, তা থেকে মোটা টাকা রোজগার করে, নিজেদের শ্রমিক বলে মনে করে না। এদের, যাদের বলা হয় মিলেনিয়াম জেনারেশন, তারা মার্ক্স পড়েনি, পড়ার আগ্রহও নেই।

    তোতলা তুগলক : এএএএরা বাবাবাবারন ককককরলেও শোশোশোনে না ; ততততক্কো ককককররররবেই।

    মাও জে দং : বাঙালিদের কথা আমায় বোলো না। ওরা নিজেদের কমরেড জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। জ্যোতি বসু কেরলের লোক হলে, হতে পারতেন। চিনের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, তাহলেই টের পাবে কেন জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত ছিল। কেতাবি মার্কসবাদে দেশ চলে না। মার্কসবাদ হলো তরল পদার্থ, পাত্র অনুযায়ী বদলাতে হয়। যেমন কেরলের মোপলারা ধর্ম নিয়ে মেতে রইলো ; ফলে বিদ্রোহ চলে গেল বিপথে।

    চেঙ্গিজ খান : মোপলারা কারা কমরেড ?

    মাও জে দং: মালাবারের ওয়ালুভানাদ আর এরনাদ তালুক জুড়ে দশ লক্ষ মোপলা চাষি সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল। ব্রিটিশ সেনাদের যুদ্ধে মোপলারা জংগলে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৮৮৫ সাল নাগাদ দ্বিতীয় মোপলা বিদ্রোহ হয় যা দমন করতে ব্রিটিশ সরকার তিন হাজার সৈন্য আর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে। তাদের দমন করা হয় ‘পিটুনি কর’ বসিয়ে ও দ্বীপান্তর পাঠিয়ে। ১৮৯৪ সালে তৃতীয় মোপলা বিদ্রোহ এবং ১৮৯৬ তে চতুর্থ মোপলা বিদ্রোহ ঘটে। সবকটি বিদ্রোহই দমন করা হয়। চতুর্থ মোপলা বিদ্রোহে শাসকগোষ্ঠী জমিদারদের বর্ধিত খাজনা ও মহাজনদের সুদ নিয়ন্ত্রণের করে। অতীতে আরব দেশ থেকে দক্ষিণ ভারতের মালাবার অঞ্চলে মোপলারা বসতি গড়েছিল। তাদের জীবিকা ছিল প্রধানত কৃষিকাজ। জমিদারদের কাছে বর্গাভিত্তিক চাষাবাদ করতো মোপলারা। দুর্ভাগ্যবশত তারা কমিউনিজমকে নিজেদের ধর্মবিরোধী মনে করেছিল।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : কমরেড মাও জে দং, আজিজুল হক কারাগারে আঠেরো বছর বন্দি ছিলেন। তাঁর জীবন কি ব্যর্থ গেল ? উনি বলেছেন, কারাগারে ১৮ বছর বইটা জেলখানায় বসেই মূলত লিখেছি। লেখাটি যখন পুলিশের মহাফেজখানায় যাবার অপেক্ষায় আমার বিছানার নিচে পড়েছিলো তখুনি আজকাল পত্রিকার সম্পাদক অশোক দাশগুপ্তের অসাধারণ মেধা আর একঝাঁক করিৎকর্মা সাংবাদিকের সহায়তায় তা জেলখানার ২৪ ফুট দেয়াল টপকে বাইরে বেরিয়ে আসে। খবরের কাগজে ছাপা হতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ৭০ দশকের জেলখানার ছবি জেলবন্দী ছাড়া অন্য মানুষদের বোঝানো প্রায় অসম্ভব। একদিকে অকথ্য দৈহিক নির্যাতন অন্যদিকে তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানসিক নির্যাতন। একইি দিনে সকালে লাঠির বাড়িতে ঘুম ভেঙ্গেছে দুপুরে পচাগলা খাবার, রাতে বিশেষ বিভাগের কর্তাদের মানসিক নির্যাতন। এর সঙ্গেই নিজের কমরেডদের খুন হয়ে যেতে দেখা। সেই দুঃসহ অবস্থার মধ্যে দিয়েই এগিয়েছে আমার জেলখানায় ১৮ বছরের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পৃষ্ঠা। এই বইটিতে আমি চেষ্টা করেছি জেলখানায় রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর নির্যাতনের এক প্রমাণ তুলে ধরতে। কারাগারে ১৮ বছর নিয়ে আমাকে বিস্তর আলোচনা সমালোচনা শুনতে হয়েছে। বইয়ের ভূমিকার একটা কথাই ফিরিয়ে বলি, তা হলো এই বইয়ের কাহিনী যে ইতিহাসের তাতে কুশিলব অনেকেই। এই বিশাল সেতু বন্ধনে লেখক হিসেবে আমার ভূমিকা একেবারে কাঠবিড়ালীর। রামলক্ষণ-সীতা আর হনুমানরা ইচ্ছে মতো দাপাদাপি করুন। ইচ্ছে হলে রাক্ষস খোক্কসদের নিমন্ত্রণ করে আনুন। আমি কেবল এক বরফশীতল সময়কেই আমার বইটিতে তুলে ধরতে চেয়েছি।

    মাও জে দং : আমি ঠিক বলতে পারব না। শি জিন পিঙ যদি কফিহাউসের আড্ডায় আসে, ওকে জিগ্যেস করতে পারো। আমাদের একটাই দল ছিল, সেটাই আছে এখনও।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ওনাদের বহুরৈখিকতা সম্পর্কে বলুন তাহলে।

    ফিরোজাবাদি তুগলক : চারু মজুমদার চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও জে দং এর অনুসারী ছিলেন। তিনি মনে করতেন ভারতের কৃষক আর গরিব মানুষদের মাও জে দং এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, শ্রেণিশত্রুদের চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা দরকার। তার কারণ তারাই সর্বহারা কৃষক শ্রমিকদের শোষণ করে। তিনি নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর লেখার মাধ্যমে। তাঁর বিখ্যাত রচনা হল ‘’’হিস্টরিক এইট ডকুমেন্টস্’’’ বা আট দলিল যা নকশাল মতাদর্শের ভিত্তি। বিশিষ্ট বামপন্থী বুদ্ধিজীবী সরোজ দত্ত শ্রেণিশত্রু খতমের রাজনীতির পক্ষে একাধিক প্রবন্ধ নকশালদের মুখপত্র ‘দেশব্রতী’ পত্রিকায় লিখেছিলেন। নকশালপন্থীরা পরবর্তীতে সিপিআই(এম) থেকে বেরিয়ে ‘’’অল ইন্ডিয়া কমিটি অব কমিউনিস্ট রেভুলশনারী’’’(এ আই সি সি সি আর) গঠন করে। ১৯৬৯ সালে এ আই সি সি সি আর থেকে জন্ম নেয় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। আসলে সবকয়টা নকশালবাদী দলেরই উদ্ভব হয়েছে সিপিআই(এম এল) থেকে। তবে “মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার্” নামে একটা ভিন্ন মতাদর্শের দল ছিল। তাদের উদ্ভব হয়েছিল “দক্ষিণদেশ গ্রুপ” নামে এক সংগঠন থেকে। পরবর্তীতে তারা “পিপলস ওয়ার গ্রুপ” এর সাথে যুক্ত হয়ে “কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া”(মাওবাদী) গঠন করে। এছাড়া ভিন্ন মতাদর্শের আর একটি দল হল “অন্ধ্র রেভুলশনারী কমিউনিস্টস্” এবং তারা “টি. নাগি রেড্ডি”-র “মাস লাইন” মতবাদের অনুসারী ছিল।

    তোতলা তুগলক : কোকোকোথ্থেকে জাজাজানলি ?

    দিল্লিওয়ালা তুগলক : বাকিটা আমি বলছি। ১৯৭০ সালের দিকে এ আন্দোলন অন্তর্দ্বন্দের কারণে কয়েকটি বিরোধী অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৮০ সালের দিকে প্রায় ৩০ টি নকশালবাদী দল সক্রিয় ছিল আর তাদের জনবল ছিল প্রায় ত্রিশ হাজার। এছাড়া অর্ন্তকোন্দলের কারণে আন্দোলনে ছেদ পড়ে। দলের একটি বড় অংশ চারু মজুমদারের নির্দেশিত পথের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ১৯৭১ সালে সিপিআই(এম-এল) ভেঙে দু টুকরো হয়ে যায়। চারু মজুমদারের দল থেকে সত্যনারায়ণ সিং বেরিয়ে যান। ১৯৭২ সালে চারু মজুমদার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং আলীপুর জেলে মারা যান। তাত্ত্বিক নেতা সরোজ দত্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি, সম্ভবত তাঁকে হত্যা করা হয়। পলিটব্যুরোর অন্যতম নেতা সুশীতল রায়চৌধুরী আত্মগোপন থাকা অবস্থায় মারা যান। প্রধান নেতৃবর্গের বড় অংশই জেল বন্দী হন। পরে নকশালপন্থী দল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) বহু ধারা-উপধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। অনেক বছর পরে অন্যতম প্রধান নেতা কানু সান্যাল ২০১০ সালের ২৩শে মার্চ পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ী থানার হাতিঘিষা গ্রামের নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

    তোতলা তুগলক : তুতুতুতুইও জাজাজাজানিস ; তাতাতাতাহলে রারারাজ্য সাসাসাসামলাতে পাপাপারলি না কেকেকেন ?

    চেঙ্গিজ খান : যাকগে, গম্ভীর আলোচনা বাদ দিন। বাবর, তুই তো খুব ধার্মিক মানুষ। এখনও নেশা-ভাঙ করিস ?

    বাবর : আজ্ঞে চেঙ্গিজদাদু, সম্রাট হবার পর ভালো মদ খেয়েছি আর আফিম খেয়েছি। সমরকন্দের মতন মদ আর আফিম আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমি উজবেকদের হাতে ওগুলো আনাই। তবে সমকাম ছেড়ে দিয়েছি। আপনি তো জানেন মাত্র বারো বছর বয়সে প্রথম ক্ষমতা পেয়েছিলুম, ফরগানার সিংহাসনে বসি। জায়গাটা এখন উজবেকিস্তান হয়ে গেছে। আমার কাকা অনবরত আমায় সিংহাসন থেকে ঢেকলে দেবার চেষ্টা করতেন আর আমার শত্রুও ছিল অনেক। একসময় আমাকে ঢেকলে ফেলে দিতে সফল হন। ফলে জীবনের বেশকিছু সময় আমাকে আশ্রয়হীন আর যাযাবর থাকতে হয়েছিল। এই সময় আমার সঙ্গে শুধুমাত্র বন্ধু আর চাষিদের যোগাযোগ ছিল। তখনই মদ আর আফিমের নেশা আরম্ভ করি ; আফিম আর চরসের সঙ্গে গুড় মিশিয়ে মাজুন তৈরি করে খাই। মাজুন খেয়ে সমরকন্দের উজবেক শহরে আক্রমণ চালাই আর ফটাফট দখল করে নিই। কিন্তু সঙ্গীসাথিরা কেটে পড়লে আমি সমরকন্দ আর ফেরগনা দুটোই হারাই। তখন নেশার মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। সারা দিনে চার-পাঁচটা মাজুনের মেঠাই খেতুম। আল-হিন্দে ভালো জিনিস কিছুই পাওয়া যায় না, একেবারে বাজে দেশ, নেহাত সিংহাসনটা সহজে পেয়ে গেলুম, নয়তো থাকার মতন জায়গা এটা নয়।

    তোতলা তুগলক : ও বাবাবাবাবা, এএএএ তোতোতো ড্রাগ অ্যাডিডিডিক্ট বাবাবাদশা !

    মাও জে দং : কিছু বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করবেই। মনে রাখবেন। এটা আমার অভিজ্ঞতা।

    চেঙ্গিজ খান : সমরকন্দ তো আমি ধ্বংস করে দিয়েছিলুম। আবার দাঁড়িয়ে গেছে ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : সমরকন্দকে আমার সাম্রাজ্যের রাজধানী বানিয়ে শহরটার আবার উন্নতি করেছিলুম। কিন্তু আমার আয়েসি বংশধরদের কারণে সাম্রাজ্যের পতন শুরু হলে উজবেকরা শহরটা দখলে করে নিয়েছিল। উজবেক শাসকেরা তাদের রাজধানী বোখারায় সরিয়ে নিলে সমরকন্দের গুরুত্ব কমে যায়। কী আর বলব ! আমার বউয়ের নামে বিবি খানম মসজিদ বানিয়েছিলুম দামী পাথর দিয়ে। নকশাটা আল-হিন্দ থেকে নেয়া। আল-হিন্দ থেকে কারিগর আর পাথর খোদাইকারী নিয়ে গিয়ে মসজিদের গম্বুজের নকশা তৈরি করিয়েছিলুম। আগে সমরকন্দের প্রায় সমস্ত বাসিন্দা ছিল জরাথ্রুস্টবাদী। এছাড়া অনেক নেস্টোরিয়ান এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীও শহরে বাস করত। সমরকান্দ দখলের পরে আমি শহরের বাসিন্দাদের আস্তিকান্তরিত করেছিলুম।

    চেঙ্গিজ খান : বাবর, তুই তো কড়া মেজাজের আস্তিক। শিয়াদেরও পাত্তা দিস না কেন ? তুই নিজেই ‘তাজুক-ই-বাবুরি’তে গর্ব করে লিখেছিস যে, যুদ্ধের পরে নাস্তিকদের মাথার খুলি দিয়ে মিনার তৈরি করতে ভালোবাসতিস। আমি কতো কি করেছি কিন্তু অমন কাজ করিনি রে।

    বাবর : শাহ ইসমাইলের পারস্য শিয়া মুসলিমদের একটা অভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছিল, আর ও নিজেকে সপ্তম শিয়া ঈমাম মূসা আল কাজিমের বংশধর হিসেবে দাবি করতে আরম্ভ করেছিল। তথন ওর নামে কয়েন চালু করা হয়েছিল আর মসজিদে খুত্‌বা পড়ার সময়ে ওর নাম নিয়ে পড়া হত। তাই আমি চটে গিয়েছিলুম। আর ছোটোবেলা থেকে শিখেছিলুম যে অবিশ্বাসীদের বিশ্বাসী করে তুলতে হবে, নয়তো নিকেশ করতে হবে।

    খোকা তুগলক : খুতবা কী, জনাবেআলা ?

    তোতলা তুগলক : এএএএটুকুও জাজাজাজানিস না ?

    বাবর : খুতবা শব্দটা আরবি। খুতবা হল মসজিদে মুসল্লিদের সামনে প্রদত্ত ধর্মীয় বক্তৃতা। জুমার নামাজ ও দুই ঈদের নামাজে খুতবা পড়া হয়। খুতবা প্রদানকারী ব্যক্তিকে বলা হয় খতিব। সাধারণত খুতবা আরবি ভাষায় পড়া হয়। তবে কিছু জায়গায় লোকাল ভাষায় খুতবা দেয়ার প্রচলন রয়েছে। আমাদের সময়ে শাসকের সার্বভৌমত্বের প্রকাশ হিসেবে খুতবায় তার নাম উচ্চারণ করা হত।

    চেঙ্গিজ খান : নিজেদের মধ্যে অমন ঘেন্নাঘিন্নির যুদ্ধ করে অতো সুন্দর সিরিয়া, ইরাক, লেবানন দেশগুলো পাঁপড়ের মতন গুঁড়িয়ে গেছে। মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে ঝূঁকি নিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গ্রিকদেশ হয়ে ইউরোপে চলে যাচ্ছে। ইউরোপের মানুষ তাদের চায় না কিন্তু উপায় নেই। নানা জাতির মানুষ ছিল সিরিয়ায়, সিরিয়ান আরব, গ্রীক, আর্মেনিয়ান, আসিরিয়ার, কুর্দি, কার্কাসিয়ান, মানডিয়ান্স আর তুর্কি সহ। ধর্মীয় গোষ্ঠীও ছিল অনেক, যেমন, সুন্নি, খ্রিস্টান, আলাউই, ডুরজ, ইসমাঈল, মান্দিয়া, শিয়া, সালাফি, ইয়াসীদ ও ইহুদিরা। অনেকে ছেলে-ছোকরা ইউরোপে পালাচ্ছে।

    নোবিলিআত্মন : বুঝেছি, আমরা যেমন প্রটেস্ট্যান্টদের নাস্তিক মনে করি। আমি কোনোরকম জোরজুলুম না করে আল-হিন্দের চার হাজার পরিবারকে খ্রিস্টান্তরিত করেছি। এবার টিকি কেটে মাথায় চুল গজিয়ে ফিরে যাচ্ছি ইটালিতে। আমাদের পারিবারিক নীতি অনুযায়ী মিলিটারিতে যোগ দেবো। শুনেছি মুসোলিনি নামে কেউ একজন আসতে চলেছে যে পুরো ইটালির মিলিটারিকে পালটে ফ্যাসিবাদি করে দেবে। আমার নাম আসলে রোবের্তো ডি নোবিলি, পবিত্র রোমান সম্রাট তৃতীয় অট্টোর আমি বংশধর। আসার সময়ে লিবিয়া, লেবানন, ইরাক, সিরিয়ে হয়ে এসেছিলুম। সিরিয়ার আলেপ্পো, দামাসকাস, এমেসা, হোমস, লাতাকিয়া, তারতুস, আসসুয়ায়দা, দেইর এজ-জোর, দারা, ইডলিব শহরগুলোর তুলনা হয় না।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ফ্যাসিবাদ আবার কী জিনিস ?

    নোবিলিআত্মন : মুলত রাষ্ট্রের সব মানুষকে একাত্ন করে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই কাজে তারা নির্ভর করে বিশেষ বাহিনী বা গোষ্ঠীর ওপর যারা আগে রাজনৈতিক মাঠে ততটা প্রভাবশালী ছিল না। যাদের এই কাজে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা থাকে তারাই রাষ্ট্র নেতৃতে অগ্রনী দায়িত্ব নেয়। সেই রাষ্ট্র তখন প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক অত্যাচার, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদকে অনুমোদন দেয়। সেই রাষ্ট্রের মতে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের জন্য এগুলো মৌলিক বিষয়। ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ অনুযায়ী উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী রাষ্ট্রের উচিত অন্য দুর্বল বা যাদের অর্থনীতি তেমনটা মজবুত নয় এমন রাষ্ট্র বা জাতিকে দখল করে স্থানচ্যুত করা। ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের জাতি ও সংস্কৃতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে। বলতে পারেন নতুন ধরণের আস্তিকতা। করোনা ভাইরাস যেমন মানুষকে ভয় দেখিয়ে আস্তিক করে তুলছে, ফ্যাসিবাদ আর সাম্যবাদও তাই।

    ভাস্কো দা গামা : ওহে কফিহাউসে যক্ষ, আমরা ক্রীতদাসদের জব্বর গালাগালি দিতুম। তোমাদের এখানকার ভাষায় তেমন শব্দ নেই বুঝি ?

    কফিহাউসের যক্ষ : আছে সেনর। ওই যে পিঠখোলা ব্লাউজ আর লাল শাড়ি পরে ফর্সা নারীরা বসে আছেন, দেখুন ওনাদের পিঠে লেখা আছে গুদ, বাঁড়া, ল্যাওড়া, বাঞ্চোৎ, বোকাচোদা…

    মাও জেদং : না, না, সাম্যবাদ আর ফ্যাসিবাদ এক নয় ; আর করোনা ভাইরাস আমাদের অবদান নয়।

    স্লাভয় জিজেক : মাও জেদং-এর সঙ্গে আমি একমত নই। কমিউনিজমের মৃত্যু হয়েছে চিনে। মানুষ এমন কোনো প্রজাতি নয়, আর তার গুরুত্বপূর্ণ কোনো অবস্থান নেই। বাকি প্রাণীদের মধ্যে মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ, এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে ভাইরাসের এই মহামারীর আকার ধারণের ক্ষেত্রে দায়ি চিন। সত্যতা গোপনের ফলেই বড় চেহারা নিয়েছে করোনা সংক্রমণ। কমিউনিজমের মৃত্যু হয়েছে চিনে।

    চেঙ্গিজ খান : করোনা আবার কী ব্যাপার ?

    স্লাভয় জিজেক : পশুপাখির রোগ যা মানুষের দেহে আশ্রয় নিচ্ছে আর লক্ষ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : পশুদের ধর্ষণ করে ?

    নোবিলিআত্মন : না পশুপাখিদের মাংস খেয়ে। চারপায়ে চলাফেরা করে এমন সমস্ত প্রাণী খায় চিনের লোকেরা।

    স্লাভয় জিজেক : কমিউনিজমের জয় হবে।

    বাবর : মনে পড়েছে। হিউয়েন সাঙ একবার ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে বলেছিল বটে যে আল-হিন্দের লোকেরা কতো বোকা। বাঁদর, হনুমান, কুকুর, বিড়াল, সাপ, কাঠবিড়ালি, বাদুড়, গুবরেপোকা, কাঁকড়াবিছে কিচ্ছু খায় না। আমি তখন বিশ্বাস করিনি ; হালাল করে কেমন করে। এখন তো যা শুনছি করোনাভাইরাসই সাম্যবাদ, সবাইকে সমান চোখে দেখছে।

    নোবিলিআত্মন : আমার সঙ্গে ফা হিয়েনের দেখা হয়েছিল। উনি আল-হিন্দ থেকে শেয়াল, ভোঁদড়, চামচিকে, গাধার মাংস আর চামড়া কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বললেন, ওই মাংস খেলে তুরীয়ভাব আসে, অথচ আল-হিন্দের মানুষ এতো মূর্খ যে খায় না।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আরে ! মোটু, তুই ? তাও আবার তোর অম্মিজানকেও সঙ্গে করে এনেছিস ?

    ওয়াজেদ আলি শাহ : শুনলুম, কফিহাউসে আজ তোমাদের মতন দিগগজরা জড়ো হবে, তাই আর নিজেকে সামলাতে পারলুম না, চলে এলুম। অম্মিজানকে নিয়ে এলুম কারণ প্যারিসের গোরস্তানে উনি একা শুয়ে শুয়ে পাগল হয়ে যাবার যোগাড়। গান শোনাই, কতো দিন গাইনি…..কেউ টুসকি মেরে তাল দিও না কিন্তু….

    বাবুল মোরা, নৈহর ছুটো যায়

    বাবুল মোরা নৈহর ছুটো যায়

    চার কহার মিল, মোরি ডোলিয়া সজাওয়ে

    মোরা অপনা বেগানা ছুটো যায়।

    আঙ্গনা তো পর্বত ভয়ো অওর দেহরি ভয়ি বিদেশ

    যায়ে বাবুল ঘর আপনো ম্যায় চলি পিয়া কে দেশ

    বাবুল মোরা, নৈহর ছুটো যায়…

    স্লাভয় জিজেক : একা কেন ? ওনার পাশে তো শুয়ে আছেন জিম মরিসন, এডিথ পিয়াফ, ফ্রেডেরিক শোপাঁ, বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিনের নাতি, অসকার ওয়াইল্ড, মার্সেল প্রুস্ত, নেপোলিয়ানের অবৈধ ছেলে, আরও কতো বিখ্যাত লোক। তোমার মা মলিকা কিশওয়ার জনাব-ই আলিয়ার তো একা অনুভব করার কারণ নেই।

    ওয়াজেদ আলি শাহ : ব্রিটিশরা যখন আমার লখনউয়ের মসনদ কেড়ে নিয়েছিল তখন একটা বিহিত চাইবার জন্যে অম্মিজান গিয়েছিলেন কুইন ভিক্টোরোয়ার সঙ্গে দেখা করতে। ভাবলেন যে ভিক্টোরিয়াও তো ছেলের মা, ওনার কষ্ট নিশ্চয়ই বুঝবেন। দেখা করে টের পেলেন যে কুইন ভিক্টোরিয়ার কোনো ক্ষমতা নেই বিহিত করার, উনি কেবল নৌকা আর ইংরেজদের বাড়ির কথা আলোচনা করলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দরখাস্ত দিয়েছিলেন অম্মি, তা নাকচ হয়ে গেল কেননা তা বড্ডো রাগ-দেখানো ভাষায় লেখা। তারপর ওরা বলল যে আমার অম্মি যদি ব্রিটিশ পাহারা চান তাহলে ওনাকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসাবে ঘোষণা করতে হবে।

    বাবর : তারপর ?

    ওয়াজেদ আলি শাহ : ইংরেজরা আরও চটে গেল যখন মহাবিদ্রোহ আরম্ভ হলো। অম্মিজান মন খারাপ করে ফেরার ব্যবস্হা করে ফেললেন, কিন্তু ওই তুষার-পড়া ঠাণ্ডায় ওনার শরীর এতো খারাপ হয়ে গেল যে প্যারিসে মারা গেলেন। ব্রিটিশরা শবদেহ গোর দেবার কোনো সন্মানজনক ব্যবস্হা করেনি ; যা করার করেছিল তুর্কি আর ইরানের সুলতানরা। আপনি যাদের নাম বললেন তাদের কবর অনেক সুন্দর। আমার অম্মির কবর আপনি খুঁজে পাবেন না ঝোপঝাড়ের মধ্যে। আমার ছোটো ভাই সিকন্দর হাশমত অম্মিজানের সঙ্গে গিয়েছিল, সে তো ইংল্যাণ্ডে মারা গেল, প্যারিসে নিয়ে গিয়ে অম্মিজানের পাশে তাকে কবর দেয়া হলো। সিকন্দর হাশমতের হিন্দু রাজপুত বিবির বাচ্চাটাও মারা গিয়েছিল, তাকে গোর দেয়া হয়েছিল কিলবার্নের গোরস্তানে। আমার ভাগ্য ভালো যে হিন্দুস্তানে মরেছি। সচিন তেন্দুলকর জিন্দাবাদ।

    চেঙ্গিজ খান : তোর বাঁ দিকের মাই বের-করা পোশাক পরার অভ্যাস আজো গেল না। তুই তো নিজের বিরাট একখানা নাম রেখেছিলিস। সেটাও কেড়ে নিয়েছে ফিরিঙ্গিরা ?

    ওয়াজেদ আলি শাহ : চেঙ্গিজদাদু, আমার পুরো নাম আবদুল মুজাফর নাসিরুদ্দিন সিকান্দর জা, বাদশা-ই-আবদুল কাইজার-ই-জামান, সুলতান-ই-আলম ওয়াজিদ আলি শাহ বাদশা। সবই কেড়ে নিয়ে আমাকে আটকে নিয়েছে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে, মানে গার্ডেনরিচে। আসলে ইংরেজরা ওদের দেনা না মিটিয়ে আমাকে কয়েদ করলো। পেনশন নিয়ে লখনউতে থাকলেই হতো। সাত হাজার সাঙ্গপাঙ্গ এনেছিলুম, কতোজন বিবি ছিল মনে নেই, রাখেলও ছিল অনেকগুলো, কেনাবাঁদি, গোখরো আর কেউটে সাপ, বাঁদর, ভাল্লুক, আঠারো হাজার পায়রা। আমার ‘দরিয়া-ই-তাশশুক’, কিংবা ‘বহার-এ ইশ্ক’ কেউ আর পড়ে না। কফিহাউসে এতো কবি জড়ো হয়, প্রেমের কবিতা লেখে অথচ জানেই না আমি প্রেমকে কতো গুরুত্ব দিয়েছি, যদিও প্রেম আমাকে দিয়েছে গনোরিয়া। হাবশি প্রেমিকা আজায়েব খানুমকে আমার খুবই পছন্দ হতো। কলকাতায় এসে পঞ্চাশটা বিবিকে তালাক দিয়েছি, কেননা খরচে পোষায় না।

    চেঙ্গিজ খান : আর তোর বেগম হজরতমহল ?

    ওয়াজেদ আলি শাহ : হজরতমহল লখনউতে থেকে গেল, ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করল। এখন যোগী নামে একজন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে অওধে, হয়তো জানে না যে আমি যোগী-মেলা করতুম, যাতে সবাই গেরুয়া পোশাক পরে আসতো। শাসন করার জন্যে একটা ম্যানুয়াল লিখেছিলুম ‘দস্তুর-ই-ওয়াজিদি’ নামে। আমার ভাই সিকন্দর হাসমতের সম্মানে এক জলসার আয়োজন করেছিলুম। আমার লেখা নাটক ‘রাধা কানহাইয়া কা কিস্সা’ মঞ্চস্থ করেছিলুম। এই কিস্সাই প্রথম আধুনিক উর্দু নাটক। কৃষ্ণ ছিল আমার রোল মডেল। যমুনাতীরে পূর্ণিমা রাতে গোপিনীদের সঙ্গে কৃষ্ণের লীলা আমার চিরকালীন অনুপ্রেরণা ছিল। জানেন তো কৃষ্ণের রাসলীলা থেকেই লখনউয়ে ‘রহস’-এর শুরু। আমার রহস আসলে অপেরা, যেখানে আমি ব্রজ অঞ্চলে কৃষ্ণের জীবন নিয়ে প্রচলিত নাচের সঙ্গে নিজের কত্থকের কম্পোজিশন মিলিয়েছিলুম। রহস নাটক হল নৃত্যনাট্য, যেখানে নির্দিষ্ট গল্প থাকত। লখনউয়ে নবাবির সময় আমি মোট চারটে জলসার আয়োজন করেছিলুম, আর মেটিয়াবুরুজে এসে অন্তত তেইশটা। মেটিয়াবুরুজে এসে নিয়মিত ‘রাধা কানহাইয়া কা কিস্সা’ মঞ্চস্থ করেছি, আরও পরিণত। আল-হিন্দে আসার আগে ফিরিঙ্গিগুলো ঠোঁটে চুমু খেতে জানতো না, এতোই অশিক্ষিত লোকগুলো।

    ঢ্যাঙা তুগলক : আচ্ছা, আপনার বিরিয়ানিতে আলু দেন কেন ? হায়দ্রাবাদের বিরিয়ানিতে তো দেয় না।

    তোতলা তুগলক : বারন করলুম, এরা কথা শোনে না।

    ওয়াজিদ আলি শাহ : জানো না বুঝি ? আমার এক ব্যাটা বাবুর্চিকে হায়দ্রাবাদের নিজাম অনেক ঘুষ দিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল বিরিয়ানি খাবে বলে। ওরা হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আরম্ভ করে দিলে। আমি তাই বাঙালি বিরিয়ানি চালু করে দিলুম। বাঙালিরা আলু খেতে ভালোবাসে। ব্যাস, বাংলার বিরিয়ানি মানে আস্ত একখানা আলু তোমার প্লেটে পড়বে। নিজাম আমার পোলাও, কোর্মা, জর্দালু, রোগনি রোটি, হালিম, রেজালা, শিরমল আর শাহি টুকরার রেসিপিও চুরি করে নিয়ে গেছে।

    মলিকা কিশওয়ার জনাব-ই আলিয়া : আসার সময়ে রাস্তায় খুব ভিড় দেখলুম। আজকে তো মহররম নয়।

    ভাস্কো দা গামা : সালমান খান নামে একজন ফিল্মস্টারের ফিল্ম রিলিজ হচ্ছে আজ, তাই ওয়াজিদ আলি শাহের বংশধররা সালমান খানের পোস্টার নিয়ে নাচতে-নাচতে মিছিল করছে। সালমান খানের মা হিন্দু আর বাবা মুসলমান। প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডেও একই রকম ভিড়ের জমায়েত হয়েছে। ওখানে টিপু সুলতানের বংশধররা থাকে। এখন বেশ গরিব হয়ে গেছে বংশের লোকগুলো, কেউ-কেউ রিকশা চালায়।

    বাবর : ইব্রাহিম লোদি, যে পানিপতের যুদ্ধে আমার কাছে হেরে গিয়েছিল, তার বাবা সিকন্দর লোদির মা হিন্দু ছিল। মানে কাফের ছিল। ওর মা ছিল সিরহিন্দের একজন হিন্দু স্যাকরার মেয়ে। সিকন্দর লোদি সেই জন্যে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতো, আর হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করত। অথচ গুলরুখি ছদ্মনামে সিকান্দার লোদি ফারসি কবিতা চর্চা করত।

    ওয়াজেদ আলি শাহ : আচ্ছা, আমি চলি। ফিরতে হবে সিবতানাবাদ ইমামবাড়ায় আমার গোরে। অম্মিজানকে ফেরত গিয়ে গোরে আরাম করতে হবে। শুনে ভালো লাগলো যে মোগলদের আগে থেকেই নবাব-সুলতানরা হিন্দু মেয়ে বিয়ে করত। আমি সঙ্গে করে অনেক কাফের মেয়েকেও এনেছিলুম। যাদের এনেছিলুম, তাদের বংশধররা এখন খিদিরপুর, মেটেবুরুজ, গার্ডেনরিচ, বটতলা, বাধাবরতলায় রাজত্ব করে। এখনকার নেতাদের কাছে ওদের খুব নাম ডাক।

    শাহজাহান : তোমার সঙ্গে কাদের এনেছো ?

    বাবর : তোর বেগমকে আনতে পারতিস সঙ্গে করে।

    ওয়াজিদ আলি শাহ : জানো না বুঝি ? তোমরা তো অনেক আগে মারা গেছ তাই জানো না। আমার বেগম হজরতমহল আমি কলকাতায় নির্বাসিত হয়ে আসার পর অওধের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়েছিল। মহাবিদ্রোহের সময় আমার বেগমও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়ে নেপালে আশ্রয় নিয়েছিল। কাঠমাণ্ডুতেই মারা গেল। আমার যাওয়া হয়নি। কলকাতা ছেড়ে ইংরেজরা আমাকে কোথ্থাও যেতে দিতে চায়নি। ওর কবর কাঠমান্ডুর একেবারে মাঝখানে জামে মসজিদের কাছে।

    মলিকা কিশওয়ার জনাব-ই আলিয়া : সিকন্দর লোদির মা হিন্দু ছিল ? তাও কোনো রাজকন্যা নয়। গরিব স্যাকরার মেয়ে ! কীক্কাণ্ড !

    স্লাভয় জিজেক : আমিও যাই। একটা বিতর্কসভায় অংশ নিতে হবে। এদেশে তো বিনা পয়সায় ইনটারভিউ দিতে হয় ; বক্তৃতা দেবারও টাকা পাওয়া যায় না। লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া কেউ আমার আলোচনা করে না ; শুধুমুদু কফিহাউসে বসে গ্যাঁজায়।

    শাহজাহান : আরে, ওয়াজিদ আলি শাহ, তুমি চললে ? আমি কফিহাউসে ঢোকার মুখে শুনলুম, তুমি এসেছো, তাই ওপরে উঠে এলুম। তোমার অবদান তো তুলনাহীন। মোগলরা তোমার কাছে খুবই তুচ্ছ। তোমার মেটিয়াবুরুজের দরবার যন্ত্রসংগীতেও তুলনাহীন। ‘তারিখ-ই-পরিখানা’-য় তুমি লিখেছ, বিখ্যাত সেতারি কুতুব আলি খানের কাছে সেতার শিখেছিলে। সেনি ঘরানার ওস্তাদ বসত খান মেটিয়াবুরুজে রবাব নিয়ে এসেছিলেন। সুরশৃঙ্গারও তাঁরই আনা, শুনেছি তুমি এই যন্ত্রটাকে পপুলার করেছিলে। বিখ্যাত বিনকার ও রবাবিয়া কাসিম আলি খান তোমার আসরে আসতেন। তোমার ডাকে কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় সুরবাহার বাজিয়েছিলেন। তোমার দরবারেই ওস্তাদ নিয়ামতুল্লা খান আধুনিক সরোদ সৃষ্টি করেন। এগারো বছর উনি তোমার কাছে ছিলেন। তুমি তবলাকেও এ শহরে জনপ্রিয় করেছো। সানাই, এসরাজের সঙ্গেও জড়িয়ে তোমার নাম। ইউ আর গ্রেট।

    ভাস্কো দা গামা : আর এখন ওনার আর টিপুর বংশধররা বলিউডের গান-বাজনা করে, মাঝরাস্তায় নাচে। ফিল্মের নায়কদের পোস্টার নিয়ে মিছিল করে। ওনাদের পোস্টার নিয়ে বেরোয় না কেউ।

    ওয়াজেদ আলি শাহ : শাহবুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ জাহানদাদা, আপনি যা-যা করে গেছেন তা হাজার বছরের বেশি থাকবে। এখানকার মানুষ মোগলদের মনে রাখবে আপনার জন্যে। আপনি প্রেমিক হিসেবেই জগতজুড়ে খ্যাতি পাবেন। আচ্ছা, আমি চলি, অম্মিজান, উঠে পড়ো। ওই দেখুন, আওরঙজেব ঢুকছে, নিশ্চয়ই শুনেছে আজকে চেঙ্গিজ খান, ল্যাঙড়া তৈমুর, বাবর সবাই কফিহাউসে জড়ো হবেন জবরদস্ত আড্ডা দেবার জন্য। যাকগে, আমি কেটে পড়ি।

    আওরঙজেব : কী রে ওয়াজিদ আলি শাহ, তুই চললি ? যা, যা। এখানে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন আমার নাম আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর, বাদশা গাজী, প্রথম আলমগীর। আমি গান-বাজনা একদম পছন্দ করি না, তাই ওয়াজিদ আলি শাহ কেটে পড়ছে। ব্যাটা সোজা জাহান্নমে যাবে। আব্বাহুজুর আবার প্রেমিক ? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাসনি ওয়াজেদ আলি শাহ। নিজের ভাইদের খুন করা ওনার কাছেই শিখেছিলুম। উনি শাহরিয়ার চাচাকে খুন করেছিলেন। দশ হাজার পর্তুগিজকে কচুকাটা করেছিলেন আর বাদবাকি পর্তুগিজদের আস্তিকান্তরিত করেছিলেন।

    ওয়াজেদ আলি শাহ : আমার সম্পর্কে বলছেন ? জানি, জানি। এখন হারিয়ে গিয়েছে মেটিয়াবুরুজের সেই গৌরব। আজকের মেটিয়াবুরুজ শুধুই এই শহরের কোণে পড়ে থাকা শিয়াদের থাকার জায়গা। গরিব দর্জিদের কাজের জায়গা। খিদিরপুর ডকের ঠিক পাশে হওয়ায় ক্রিমিনাল এলাকা হিসেবেই কুখ্যাত। এই শহরের অন্য অংশের বাসিন্দারাও ওই অঞ্চলে যাওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পায় না। আর আমাকে ? মনে রেখেছে শুধু আওধি বিরিয়ানি আর অসংখ্য বেগমের জন্য। অথচ এই মেটিয়াবুরুজের ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আমার তৈরি ইতিহাস। নবাবি আমলের কোনো স্থাপত্য বা তার ছিটেফোঁটা কোনো কিছুই আর রাস্তার দু’ধারে চোখে পড়বে না, যদিও মেটিয়াবুরুজকে বলা হতো দ্বিতীয় লখনউ। দূর থেকে ইমামবাড়ার বিশাল ফটক নজরে পড়বে। ইরান থেকে শিল্পী আনিয়ে ইমামবাড়া তৈরি করিয়েছিলুম। বিশাল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই প্রথমেই খোলা চত্বর। তারপর খোলা বারান্দা পেরিয়ে ইমামবাড়ার মূল বিল্ডিঙ।বারান্দা পেরিয়ে নামাজঘরে প্রবেশ করলে বাঁ দিকে গ্রিলঘেরা একটি অংশে আমি শুয়ে আছি। মেঝেতে কালো পাথরে আমার কবর । বাইরে দেয়ালে শ্বেত পাথরে খোদাই করে আমাদের বংশতালিকা টাঙানো। প্রতিবছর আমার মৃত্যুর দিনে অনুষ্ঠান হয়, তখন আমার বংশধররা আসে।

    ভাস্কো দা গামা : ওয়াজিদ আলি শাহ, আপনি শিয়া, তার ওপর হিন্দু দেবতা শ্রীকৃষ্ণের গুণগান করেন, তাই আওরঙজেব আপনাকে পছন্দ করেন না ; আপনাকে নাস্তিক মনে করেন।

    মালিক অম্বর : এই আওরঙজেব লোকটা আমার করা সবকিছু নিজের নামে করে নিয়েছে। খিড়কি শহর তৈরি করেছিলুম আমি, অথচ এই লোকটা তার নাম অওরঙ্গাবাদ করে নিয়েছে। শহরে জলের ব্যবস্হা করেছিলুম আমি, তাও লোকটা নিজের নামে করে নিয়েছে।

    আওরঙজেব : তুই তো হাবশি, এতো হামবড়াই কেন রে ? পড়তিস ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজির পাল্লায়, ঠেলা বুঝতে পারতিস।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজি লোকটা কে ? বাবরও বলছিল একটু আগে।

    আওরঙজেব : আরে, উনি আমার হিরো। তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি নালন্দা মহাবিহার পুরো ধ্বংস করে দিয়েছিল ; এই ঘটনা আল-হিন্দে শুধু বৌদ্ধ ধর্মেকে শেষ করে দিয়েছিল। আল-হিন্দকে দীর্ঘমেয়াদে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ছুঁড়ে দেবার নীল নকশা বলা যায়। ইরানের ইতিহাসবিদ মিনহাজ ‘তাবাকাত-ই-নাসিরি’ বইতে লিখেছেন যে, “হাজার হাজার বৌদ্ধ পুরোহিতকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল কিংবা মাথা কেটে ফেলা হয়; খিলজি এভাবে এই অঞ্চল থেকে বৌদ্ধধর্ম উৎপাটন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, মহাবিহারের লাইব্রেরিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে এত পরিমাণ বই ছিল যে তা পুড়তে তিন মাস সময় লেগেছিল”। নালান্দা ছাড়াও বিক্রমশীলা, জগদ্দল, ওদান্তপুর, তক্ষশীলা বৌদ্ধবিহার ছাড়া নদীয়া, গৌড়, লক্ষণাবতীও পুড়িয়ে ছারখার করেছিল। খিলজির সেনাবাহিনী এইসব প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, স্থাপনা, মন্দির, লাইব্রেরি, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আশ্রম ধ্বংস করে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, আগুনে পুড়িয়ে দেয়। লোকাল হিন্দু, বৌদ্ধরা প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে হাজারে হাজারে পালিয়ে যায় নেপালে, তিব্বতে, আল-হিন্দের অন্যান্য জায়গায় যে যেমন পেরেছে। যারা পালাতে পারেনি তারা সবাই নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিল বখতিয়ার বাহিনীর তরোয়ালের আঘাতে।

    তোতলা তুগলক : কিকিকিকিছুই বুবুবুবুঝি না।

    মালিক অম্বর : তাহলেই বুঝুন। এরকম একজন লোক ওনার হিরো।

    আওরঙজেব : তুই তো আস্তিক। তাহলে অবজেকশান নিচ্ছিস কেন ? জানিস কি দিল্লীর সাহায্য নিয়ে বখতিয়ার খলজি তার সেনাবাহিনী বড় করে বাংলায় পৌঁছোয়। বাংলার সেই সময়ের বুড়ো শাসক লক্ষ্মণ সেনের রাজ্য আক্রমণ করে। মাত্র আঠারো জন অশ্বারোহী যোদ্ধা ঘোড়া বিক্রেতার ছদ্মবেশে লক্ষ্মণ সেনের রাজপ্রাসাদে ঢুকে পড়ে। ভোগ বিলাসে মত্ত থাকা লক্ষ্মণ সেন তখন সবে দুপুরের আহার করতে বসেছে, এই সময়ে অতর্কিত আক্রমণে সে কোন রকম বাধা না দিয়েই পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। ইতিমধ্যেই পৌঁছে যায় তার বাকি সৈন্যরা। গৌড়, লক্ষণাবতী দখল করে বখতিয়ারের সেনাবাহিনী মেতে ওঠে রক্তের হোলি খেলায়। প্রাসাদের সব পুরুষদের খুন করে, শিশুদের আলাদা করা হয় দাস হিসেবে বেচার জন্য, আর প্রতিটি নারীকে গণধর্ষণ করে। বুঝলি, বোকা মালিক অম্বর, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজির জন্যেই লক্ষ-লক্ষ বাঙালি আস্তিকান্তরিত হয়েছিল। নইলে আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হতে পারতো না।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : একটু আগে ধৃতরাষ্ট্রদেব শর্মা নামে একজন মহারাজা এসেছিলেন। তিনি জন্মান্ধ। আল-হিন্দে জন্মান্ধ হয়েও যদি মহারাজা হওয়া যায়, তাহলে মোগলরা সম্রাট হবার জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অন্ধ করে দিত কেন ?

    বাবর : ধর্মের নিয়ম, তোমার সময়ে বোধহয় ছিল না। হুমায়ুনকে বলেছিলুম, ভাইদের কোনো ক্ষতি করিসনি। তবু হুমায়ুন সৎভাই কামরান মির্জাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। অনেক বউ ছিল কামরানের, গুলরুখ বেগম, মুহতারিমা খানুম, হাজারা বেগম, মিহর আফরোজ বেগা, দৌলত বখত আগাছা, মাহ চুচাক বেগম আর আবদুল্লাহ খান মুঘলের এক বোন; ছেলেপুলেও ছিল। কে জানে তাদের কী হলো শেষমেষ।

    চেঙ্গিজ খান : তুমি এদেশে না আসলে ছেলেটা অন্ধ হতো না, বউগুলোও বেওয়ারিশ হতো না।

    বাবর : আমার রক্তের দোষে শাহ আলমকেও অন্ধ করেছিল রোহিলার শাসক। ইংরেজ গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস, মোগল বাদশা শাহ আলমকে বাংলার রাজস্বের পরিমাণ দিতে অস্বীকার করেছিল। এই অবমাননার চেয়েও বেশি অপমান করেছিল রোহিলা শাসক গোলাম কাদির। লাল কেল্লার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গোলাম কাদির শাহ আলমকে তার জায়গায় সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছিল আরেকজন রাজপুত্রকে। শাহ আলমের ছেলে আর নাতিসহ রাজকীয় রক্তের রাজকুমারীদের ছেঁড়া পোশাক পরে রোহিলার সেনাদের সামনে নাচতে বাধ্য করা হয়েছিল। সম্রাট শাহ আলমের হারেমের মেয়েদের ছিনতাই করা হয়েছিল, আর ধর্ষণ করা হয়েছিল। মালিকা-ই-জামানী, আগের সম্রাটের এক প্রবীণ বিধবা, তাকে গরম রোদে ল্যাঙটো করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। রোহিলা ব্যাটা শাহ আলমের বুকে চেপে বসে,দুটো চোখ ছুরি দিয়ে উপড়ে অন্ধ করে দিয়েছিল। তবে এই কাজটা রোহিলার জন্য ছিল মৃত্যুদণ্ডের শামিল। মারাঠা সেনাপতি, মহাদজি সিন্ধিয়া বিশাল বাহিনী দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। গোলাম কাদির পালাতে গিয়ে খুব শীঘ্রই মথুরায় বন্দি হল। একটা খাঁচায় ঢুকিয়ে, তার কান, নাক, ঠোঁট আর পা কেটে ফেলা হয়েছিল। শেষে, শাহ আলম, যার রাজত্বকালে মোগলরা তাদের চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকার হারিয়েছিল, গোলাম কাদিরের চোখের মণিসুদ্দু সর্বশেষ উপহার পেলো।

    জাঁ দুভাল : আপনাদের টেবিলে কোনও মহিলা নেই, তবুও এলুম ; হাবশিদের সম্পর্কে অবমাননাকর কথা বলছেন দেখে আর সইতে পারলুম না।

    চেঙ্গিজ খান : কিন্তু তুমি কে ? আগে তো চোখে পড়োনি ?

    শাহজাহান : উনি তো বিখ্যাত একজন প্রেমিকা, জানেন না ওনাকে ? শার্ল বোদলেয়ার ওনার চুল নিয়ে একখানা দারুন প্রেমের কবিতা লিখে গেছেন।

    বাবর : চুল নিয়ে ? কোথাকার চুল ?

    শাহজাহান : আমি বালের কথা বলছি না সম্রাটদাদু। আমি মাথার চুলের কথা বলছি। তবে পুরন্দর ভাট নামে আল-হিন্দের এক বিখ্যাত কবি বাল নিয়ে কবিতা লিখেছেন, যেমন .

    “এবে শোন শালা পুলিশ পুঙ্গব

    আঁটি-বাঁধা কোঁকড়ার ঝাঁট

    মোরা তোরে ডরাই থোড়াই

    বলে কবি পুরন্দর ভাট”

    বাবর : দারুন লিখেছে।

    শাহজাহান : বাল নিয়ে পুরন্দর ভাটের আরও কবিতা শোনাই, বাল নিয়ে, শুনুন—

    . “ঘনাইছে মহাকাল

    চুল,… বলো বাংলায়

    হিন্দিতে হল বাল…।

    রান্নাঘরের ধনে

    হিন্দিতে ধনিয়া

    কত ধানে কত চাল

    বোঝো ঢনঢনিয়া।”

    বাবর : দারুন লিখেছে। শাহি তিজোরি খালি করে ইনাম দিয়ে দাও।

    ভাস্কো দা গামা : হাবশিদের বালও দারুণ হয়। যেমন ওদের মাথার চুল, তেমনই ওদের বাল। আরব কাস্টমাররা তো বালের জন্যে ওদের ধরে আনতে বলতো। তবে আপনি নাস্তিককে আস্তিকান্তরিত করার পরও তার বাল একই থাকে। পুরন্দর ভাট বোধহয় হাবশিদের আর মোগল বেগমদের বাল দেখার সুযোগ পাননি। আঠারো শতকে সারাহ বার্টম্যান নামে বাইশ বছরের এক হাবশি যুবতীকে আফরিকা থেকে কিনে ইউরোপে নিয়ে গিয়ে হটেনটট ভেনাস নাম দিয়ে এগজিবিশান করেছিল, তা জানেন কি ? চার ফিট লম্বা মেয়েটার পোঁদ তানপুরার চেয়েও অনেক উঁচু ছিল, কোঁচকানো বালে ঢাকা যোনিও বড়ো, আর মাইও বিশাল মাপের। ইউরোপীয়রা অমন পোঁদ, যোনি আর মাই আগে কখনও দ্যাখেনি। প্রায়-উলঙ্গ মেয়েটাকে দেখার জন্যে লাইন লেগে যেতো। হেনড্রিক সিজারস আর আলেকজান্ডার ডানলপ বার্টম্যানকে আফরিকা থেকে লন্ডনে নিয়ে আসে। সারাহ বার্টম্যানকে, হেনড্রিক সিজারস আর আলেকজান্ডার ডানলপ অবৈধভাবে এনেছিল দুটো আফ্রিকান ছেলের সঙ্গে, সম্ভবত কেপটাউনের দাস-বাজার থেকে। এগজিবিশান করে টাকা রোজগার করতো ওরা। তারপর ডানলপ পিক্যাডিলি সার্কাসের মিশরীয় হলে বার্টম্যানের এগজিবিশান করেছিল। ডানলপ ভেবেছিল যে লন্ডনবাসীদের অমন পোঁদ আর মাইয়ের আফ্রিকান যুবতীদের সাথে পরিচিতি না থাকায় এবং বার্টম্যানের বড় বড় নিতম্বের কারণে ও অঢেল টাকা রোজগার করতে পারবে, করেওছিল। লোকেরা মেয়েটাকে দেখতে যেতো মানুষ হিসাবে নয়, বরং প্রাকৃতিক বিশ্বের এক অংশের অদ্ভুত যৌন উদাহরণ হিসেবে।

    চেঙ্গিজ খান : সত্যি ?

    ভাস্কো দা গামা : হ্যাঁ। ১৮১৫ সালে সারা বার্টম্যান মারা যায়, তবে তার বডির এগজিবিশান অব্যাহত ছিল। তার মস্তিষ্ক, কঙ্কাল আর যৌনাঙ্গ ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত প্যারিসের যাদুঘরে প্রদর্শিত হতো। বেঁচে থাকতে তাকে ইউরোপে নানা জায়গায় -হাফ-উলঙ্গ প্যারেড করানো হয়েছিল, তার বিশাল পাছা দেখার জন্য জনতার ভিড় জমে যেতো। আজ তাকে বহু লোক ঔপনিবেশিক শোষণ আর বর্ণবাদ, কৃষ্ণাঙ্গদের উপহাস এবং পণ্যদ্রব্য উপস্থাপক হিসাবে দেখে। তার সঙ্গে অনেকে যৌন সম্পর্ক করে থাকবে, কেননা মেয়েটি সিফিলিসে মারা গিয়েছিল।

    শাহজাহান : জাঁ দুভালবেগম, তুমি চুলের কবিতাটা শোনাও। আমার দরবারে কতো কবি ছিল, কেউ কখনও বাল আর চুল নিয়ে কবিতা লেখেনি।

    চেঙ্গিজ খান : আরে, ওই তো ভাইপো আকবর, বালের শায়রি শুনছিলিস ! সঙ্গে ওই মেয়েটা কে ?

    রূপমতি : আমার নাম রূপমতি। প্রেমিকের জন্যে আমি জীবন দিয়েছি। প্রেম নিয়ে কথা হচ্ছে দেখে আর জাঁ দুভালকে এই টেবিলে দেখে, এলুম।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আচ্ছা, প্রেম নিয়ে এতো কথা হচ্ছে, কিন্তু ব্যাপারটা কী ? কী করে প্রেম দিয়ে ? তার সঙ্গে বালের আর চুলের কী সম্পর্ক।

    জাঁ দুভাল : আমার প্রেমিক শার্ল বোদলেয়ারের প্রেম। উনি শায়র ছিলেন। আমার চুল নিয়ে কবিতা লিখেছেন।

    শাহজাহান : আমি শোনাচ্ছি শায়রিটা, খুবই উমদা, দিল খুশ হয়ে যাবে।

    “আমাকে তোমার চুলের দীর্ঘ, দীর্ঘ সুগন্ধ নিতে দাও, ঝর্ণার জলে পিপাসার্তের মতন আমার মুখকে সম্পূর্ণ ডুবে জেতে দাও, সুবাসিত রুমালের মতন হাতে নিয়ে খেলতে দাও, বাতাসে স্মৃতিকে উড়িয়ে দিতে দাও।

    আমি যাকিছু দেখি তা তুমি যদি জানতে — যাকিছু আমি অনুভব করি — তোমার চুলে যাকিছু আমি শুনতে পাই ! অন্য লোকেদের আত্মা সঙ্গীতের প্রভাবে যেমন ভ্রমণে বেরোয় তেমনই আমার আত্মা ভ্রমণে বেরোয় এই সুগন্ধে।তোমার চুলে রয়েছে একটি পুরো স্বপ্ন, পাল আর মাস্তুলসহ ; তাতে রয়েছে বিশাল সমুদ্র, যেখানে অগুনতি মৌসুমীবায়ু আমাকে বয়ে নিয়ে যায় মোহিনী আবহাওয়ায়, যেখানে আকাশ আরও নীল আর আরও নিগূঢ়, যেখানে বাতাবরণকে সুগন্ধিত করে তুলেছে ফল, পাতা, আর মানুষের ত্বক।

    তোমার চুলের সাগরে, আমি দেখতে পাই দুঃখী গানে সমাহিত বন্দর, সব কয়টি দেশের কর্মঠ মানুষ সেখানে, যতো রকম হতে পারে ততো ধরণের জাহাজ, বিশাল আকাশের অলস শাশ্বত তাপের পৃষ্ঠভূমিতে তাদের স্হাপত্য দিয়ে দিগন্তকে তনূকৃত ও জটিল করে তুলেছে।

    তোমার চুলের সোহাগস্পর্শে আমি কাউচে শুয়ে কাটানো দীর্ঘ ধীরুজ সময়কে ফিরে পাই, সুন্দর জাহাজের একটি ঘরে, বন্দরের অনির্ণেয় ঢেউয়ের দ্বারা ক্রমান্বয়ে দোল খাওয়া, তাজা জলের জালা আর ফুলের টবের মাঝে।

    আগুনের পাশে রাখা কম্বলের মতন তোমার চুলে, আমি আফিম আর চিনির সঙ্গে মেশানো তামাকের শ্বাস নিই ; তোমার চুলের রাত্রিতে, আমি দেখতে পাই অসীম ক্রান্তিবৃত্তের নীলাভ ঔজ্বল্য; তোমার চুলের ঢালের কিনারায়, আমি আলকাৎরা, মৃগনাভি আর নারিকেল তেলের গন্ধে মাতাল হয়ে যেতে থেকি।

    আমাকে একটু-একটু করে খেয়ে ফেলতে থাকে তোমার তন্দ্রাতুর কালো বিনুনি। যখন তোমার স্হিতিস্হাপক, দ্রোহী চুল আমি চিবোতে থাকি, আমার মনে হয় আমি স্মৃতিগুলো খেয়ে ফেলছি।”

    বাবর : দারুন লিখেছে। আমিও চুল ভালোবাসতুম। যে বেগমের যতো চুল ততো সে চুলবুলি !

    ল্যাঙড়া তৈমুর : কিন্তু প্রেম ব্যাপারটা খোলসা করলে না তো ?

    জাঁ দুভাল : প্রেম হল ভালোবাসার সাথে সম্পর্কিত একটি উত্তেজনাপূর্ণ, যৌনতাপূর্ণ এবং রহস্যময় অনুভূতি। এটি হল কোন ব্যক্তির প্রতি যৌন আকর্ষণের সাথে সম্পর্কিত কোন আবেগীয় আকর্ষণ হতে উদ্বুদ্ধ একটি বহিঃপ্রকাশমূলক ও আনন্দঘন অনুভূতি। গ্রিক চারটি আকর্ষণের মধ্যে এটি আগেপ, ফিলিয়া কিংবা স্টরজ-এর তুলনায় ইরোসের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানী চার্লস লিন্ডহোমের সংজ্ঞানুযায়ী প্রেম হল এক প্রবল আকর্ষণ যা কোন যৌন-আবেদনময় দৃষ্টিকোণ হতে কাউকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে, এবং যাতে তা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মনোবাসনাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতে অপর ব্যক্তির প্রতি একইসাথে শক্তিশালী মানসিক এবং যৌন আকর্ষণ কাজ করে। প্রেমের সম্পর্কে যৌনতার তুলনায় ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি অধিক গুরুত্বের অধিকারী হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্কসমূহের সূচনাপর্বে প্রেমের অনুভূতি অধিকতর দৃঢ়ভাবে কাজ করে। তখন এর সঙ্গে এমন এক অনিশ্চয়তা এবং দুশ্চিন্তা অনুভূত হয় যে এ ভালোবাসা হয়তো আর কখনো ফিরে নাও আসতে পারে।

    তোতলা তুগলক : বুবুবুবুঝতে পাপাপারলুম না কিকিকিকিছুই।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ওহ, আমার তো এরকম হয়নি, তাই জানি না। রোজই তো আলাদা একটা মেয়ের সঙ্গে শুয়েছি। একজনের সঙ্গে দিনের পর দিন চালিয়ে যাওয়াটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না, কেমন যেন রেশনকার্ড নিয়ে রেশন তোলার মতন একঘেয়ে। যৌনতা ব্যাপারটা খোলোসা করলে ভালো হতো, জাঁ দুভালবেগম।

    জাঁ দুভাল : যৌনসঙ্গম, মানে যৌনমিলন, সঙ্গম, মৈথুন, রতিক্রিয়া, রতিমিলন; যৌন সংসর্গ, যৌন সহবাস, সহবাস এটসেটরা হলো একটি জৈবিক প্রক্রিয়া যা দ্বারা মূলত যৌনআনন্দ বা প্রজনন বা উভয় ক্রিয়ার জন্য একজন পুরুষের উত্থিত শিশ্ন একজন নারীর যোনিপথে অনুপ্রবেশ করানো ও সঞ্চালনা করাকে বোঝায়। অন্যান্য অন্তর্ভেদী যৌনসঙ্গমের মধ্যে রয়েছে পায়ুসঙ্গম, মানে লিঙ্গ দ্বারা মলদ্বারে অনুপ্রবেশ, মুখমৈথুন, অঙ্গুলিসঞ্চালন, মানে আঙ্গুল দ্বারা যৌন অনুপ্রবেশ, যৌনখেলনা ব্যবহার দ্বারা অনুপ্রবেশ, মানে বন্ধনীযুক্ত কৃত্রিম শিশ্ন। এই সব কাজকারবার মানুষেরা দুই বা তার বেশিজনের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক অন্তরঙ্গতা জনিত পরিতোষ লাভের জন্য এবং সাধারণত মানব বন্ধনে ভূমিকা রাখতে সম্পাদিত হয়ে থাকে। যৌনসঙ্গম বা অপরাপর যৌনকর্ম কীভাবে সংজ্ঞায়িত হয় তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, যা যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর উপর প্রভাব রাখতে পারে। যদিও যৌনসঙ্গম, নির্দিষ্টভাবে মৈথুন বলতে সাধারণত শিশ্ন-জরায়ুজ অনুপ্রবেশ ও সন্তান উৎপাদনের সম্ভাব্যতাকে নির্দেশ করা হয়, এর দ্বারা সাধারণভাবে অন্তর্ভেদী মুখমৈথুন ও বিশেষত শিশ্ন-পায়ুজ সঙ্গমকেও নির্দেশ করা হয়। এটি সাধারণত যৌন অনুপ্রবেশকে নির্দেশ করে, যেখানে অননুপ্রবেশকারী যৌনতাকে “বহির্সঙ্গম” নামে নামকরণ করা হয়, কিন্তু অনুপ্রবেশকারী যৌনকর্মকে যৌনসঙ্গম হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

    বাবর : আরে জাঁ দুভালবেগম ! পায়ুসঙ্গম তো আমি অনেক করতুম। অটোবায়োগ্রাফিতে লিখেছি।

    জাঁ দুভাল : আরও আছে, শুনুন। যৌনতা বা ইংরেজি ভাষায় সেক্স, প্রায়শই যৌনসঙ্গমের একটি সংক্ষিপ্ত ব্যবহৃত রূপ, যা দ্বারা যে কোন প্রকারের যৌনক্রিয়াকে বোঝানো হতে পারে। যেহেতু এসকল যৌনকর্মের সময়ে মানুষ যৌনবাহিত সংক্রমণের সংস্পর্শের ঝুঁকিতে থাকতে পারে, নিরাপদ যৌনচর্চার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে, যদিও অনাভেদী যৌনতায় সংক্রমণ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পেয়ে থাকে।বিভিন্ন আইনি বিধিমালা যৌনসঙ্গমের সামাজিক অনুমতিপ্রদানের জন্য বিভিন্ন আইন ও রীতিনীতির মাধ্যমে বৈবাহিক রীতির প্রবর্তন, প্রচলন ও সমর্থন করেছে এবং বেশ কিছু যৌনকর্মের বিপরীতে নিষেধাজ্ঞামূলক আইনকে স্থান দিয়েছে, যেমন বিবাহপূর্ব ব্যভিচার ও বিবাহপরবর্তী পরকীয়া, পায়ুকাম, পশুকাম, ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তি, অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌনচর্চা ও অজাচার। ধর্মীয় বিশ্বাসও যৌনসঙ্গমসহ অন্যান্য যৌনাচার বিষয়ক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে অন্যতম ভূমিকা পালন করে, যেমন কুমারীত্ব বিষয়ক সিদ্ধান্ত, অথবা আইনি বা সরকারী নীতিমালা সম্পর্কিত বিষয়াবলি। বিভিন্ন ধর্মভেদে ও একই ধর্মের বিভিন্ন বর্গভেদে যৌনতা সম্পর্কিত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও কিছু বিষয়ে অভিন্নতা রয়েছে, যেমন ব্যভিচারের নিষেধাজ্ঞা।

    পাগলা তুগলক : কারেক্ট, আই অ্যাগ্রি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : একটু আগে ধৃতরাষ্ট্রদেব শর্মা নামে একজন জন্মান্ধ মহারাজা এসেছিলেন। ওনার যৌন অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝলুম, অন্ধ হলেও যৌনসঙ্গম করতে অসুবিধে হয় না। ওনার বউ গান্ধারী যখন প্রেগনেন্ট তখন ওনার সেবা করত একজন চাকরানি। তার ছোঁয়ায় ওনার সেক্স চাগিয়ে ওঠে আর সেই চাকরানিকে জড়িয়ে ধরেন। তারপর গান্ধারীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে চাকরানির সঙ্গে সেক্স করেন। এই সেক্সের ফলে চাকরানিও গর্ভবতী হয়। চাকরানির গর্ভে মহারাজা ধৃতরাষ্ট্রদেব শর্মার ঔরসে যুযুৎসুর জন্ম হয়। মহারাজা ধৃতরাষ্ট্রদেব শর্মার এলেম ছিল বলতে হবে ; একরাতের কাজেই প্রেগনেন্ট করে দিলেন। এখনকার ছোঁড়াছুঁড়িরা আইভিএফ করে বাচ্চা পাবার জন্যে কত্তো খরচ করে।

    জাঁ দুভাল : ওনাদের সময়ে তো যৌনরোগের ভয় ছিল না।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : যাক বাবা, আমাদের সময়ে রোগবালাই ছিল না। তোমার ছিল নাকি ?

    জাঁ দুভাল : হ্যাঁ, আমার হয়েছিল বোদলেয়ারের সিফিলিস আর গনোরিয়া থেকে, ও একগাদা মেয়ের সঙ্গে শুতো। অথচ ও আমাকেই দোষ দিয়ে বলতো যে আমি অনেকের সঙ্গে শুয়ে ওকে রোগটা ধরিয়েছি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : এখন আর চিন্তা কীসের : এখন তো দুজনেই মরে অমর হয়ে গেছো।

    জাঁ দুভাল : আজকাল অনেকে যৌনরোগ বাধিয়ে অমর হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, অনেকেই যৌনরোগের জন্যে বিখ্যাত। এক নম্বর জেসিকা অ্যালবা, এই সুন্দরী হলিউড তারকার জেনাইটাল হারপিস রয়েছে যা তাঁর শরীরে সংক্রামিত হয় পার্টনার ডেরেক জেটারের থেকে। মারায়া ক্যারি, স্কারলেট জোহানসন থেকে শুরু করে হলিউডের বহু বিখ্যাত মহিলার শরীরেই যৌনরোগ সংক্রামিত করেছেন ডেরেক। দুনম্বর ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম, ডেভিড বেকহ্যামের পত্নী ও আক্রান্ত হার্পিসে। শোনা যায় অতীতের রকস্টার ভিক্টোরিয়া অনুগামীদের সঙ্গে যৌন মেলামেশা করেই এই রোগ ডেকে এনেছেন শরীরে।তিন নম্বর পল গগ্যাঁ, অবাধ যৌন সংসর্গ করে শেষমেশ সিফিলিসে মারা গিয়েছিলেন মাস্টার পেইন্টার পল গগ্যাঁ।চার নম্বর প্যারিস হিলটন, সুন্দরীর লাগামছাড়া জীবন তাঁর শরীরে হার্পিস সংক্রমণের কারণ। এর জন্য হিলটনদের উইল থেকে বাদ পড়েছে তাঁর নাম। পাঁচ নম্বর রবিন উইলিয়ামস, এই প্রয়াত হলিউড অভিনেতা অল্প বয়সে প্রোটেকশন ছাড়াই বহু যৌন সংসর্গ করতেন। ওঁর বিরুদ্ধে জেনাইটাল হার্পিস সংক্রমণের অভিযোগ আনেন এক মহিলা যার মীমাংসা হয় আদালতের বাইরে। ছয় নম্বর আর্থার অ্যাশ, টেনিস কিংবদন্তি আর্থার অ্যাশ মারা গিয়েছিলেন এইডসে। একবার অসুস্থতার সময়ে, চিকিৎসার গাফিলতিতে এইড্‌স সংক্রামিত রক্ত তাঁর শরীরে যায়। সাত নম্বর ম্যাজিক জনসন, চিকিৎসকের গাফিলতিতে, ইঞ্জেকশনের একই সিরিঞ্জ ব্যবহারের ফলে এই প্রতিভাবান বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের শরীরে এইড্‌স সংক্রমণ হয়। এই নিয়েই বার্সেলোনা অলিম্পিকে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। আট নম্বর প্যামেলা অ্যান্ডারসন, স্বামীর সঙ্গে সঙ্গমের ফলে তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল হেপাটাইটিস সি। বহু বছর ধরে তিনি লড়াই করছেন এই রোগের বিরুদ্ধে। নয় নম্বরে চার্লি শিন, হলিউড তারকা চার্লি শিন নিজে ঘোষণা করেছেন তিনি এইচআইভি পজিটিভ এবং তা যৌন সংসর্গের কারণেই।

    চেঙ্গিজ খান : আমি যখন আক্রমণে বেরোতুম তখন রোজই নতুন একজনের সঙ্গে শুতুম, সঙ্গে যে বউ থাকতো সে আপত্তি করতো না। কিন্তু আমার প্রথম বউয়ের জন্যে আমার খুবই টান আর মায়া ছিল। একবার আমার শাসনের আওতায় যারা এসেছে তারা অন্য যে কোনও জায়গার তুলনায় আমার অধীনে অনেক বেশী নিরাপদ, প্রগতিশীল, আর স্বাধীন ছিল। পৃথিবীর অন্যতম দূরদর্শী নেতা হিসাবে আমি নিজের শাসনামলে একটা দেশ, একটা ভাষা, ধর্মীয় আর রাজনৈতিক স্বাধীনতা, পোস্ট অফিস/পোনি সার্ভিস, লিখিত আইন ব্যবস্থা, টোল রোডের নেটওয়ার্ক আর অন্য অনেক নতুন জিনিষের গোড়াপত্তন করেছিলুম, বুঝলি ল্যাঙড়া। তুই তো শুধুই ভাঙচুর করে নাম কামালি।

    শাজাহান : কলম্বাস নামে একজন লোকের দলবল প্রথমে নিজের দেশে এনেছিল রোগগুলো। পনেরো শতকের শেষের দিকে সমুদ্রে অভিযান করে, তখন ওর নাবিকদের হাইতি দ্বীপে প্যাসিওলা হয়েছিল, যাকে এখন বলে ফিরিঙ্গিরোগ, উপদংশ, গর্মি, বা সিফিলিস রোগ। ওরা সংক্রামিত হয়ে ফিরিঙ্গি রোগের জীবাণু ইউরোপে নিয়ে গেল। ফরাসী সম্রাট অষ্টম চার্লস ইতালি আক্রমণ করলে ইতালিতে এই রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসি সৈন্য আর তাদের সহযাত্রীরা এই রোগের জীবাণু সমস্ত ইউরোপে নিয়ে গিয়েছিল। ইউরোপ থেকে তা পৌঁছে গেলো এশিয়া আর আফরিকার উপনিবেশে।

    নোবিলিআত্মন : জানি, জানি। ফরাসি মেয়েরা বড্ডো গায়ে পড়া। আমি ফরাসিদেশে গিয়ে ব্রহ্মচারী ছিলুম।

    জাঁ দুভাল : শুনলেন তো ? আমি উঠি তাহলে। আপনারা ম্যাসোচিস্টিক আর মিসোজিনিক গল্পগাছা বজায় রাখুন।

    রূপমতি : উঠছ কেন জাঁ দুভালবেগম ? তুমি আমার আর বাজ বাহাদুরের প্রেমের গল্প শুনে যাও। আমি ছিলুম কাফের হিন্দু, আর বাজ বাহাদুর মুসলমান। আপনারা তো লায়লা-মজনু, শিঁরি-ফরহাদ, প্যারিস-হেলেন, রোমিও-জুলিয়েট, ইউসুফ-জোলেখা, সাবিত্রী-সত্যবান, রাধা-কৃষ্ণ — ওনাদের প্রেমের কাহিনি শুনেছেন, তাই আমার জীবনের ট্র্যাজেডির কথাও শোনাতে চাই।

    চেঙ্গিজ খান : বলো, বলো। রূপমতিবেগম। কফি হাউসে চিকেন পকোড়া পেলে ভালো হতো।

    রূপমতি : বাজ বাহাদুর ছিলেন মান্ডুর শেষ স্বাধীন শাসক, তিনি বরাবরই সংগীতের খুব ভক্ত ছিলেন। একবার শিকারে বের হওয়ার পর বাজ বাহাদুর আমাকে দেখতে পান, আমি তখন ছাগল-ভেড়া চরাচ্ছিলুম আর বন্ধুদের সাথে খেলতে-খেলতে গান গাইছিলুম। আমাকে দেখে আর গান শুনে উনি আমাকে তাঁর সাথে রাজধানীতে যেতে অনুরোধ করেন। নর্মদা নদী দেখা যায় এমন এক প্রাসাদে আমি থাকতে রাজি, এই শর্তে মান্ডু যাই। এভাবেই মান্ডুতে রেওয়া কুন্ড তৈরি হয়েছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে এই মুসলিম রাজপুত্রের সঙ্গে আমার প্রেম ব্যর্থ হয়ে যায়। আপনি জালালুদ্দিন মোহম্মদ আকবর, মান্ডু আক্রমণ করে আমাকে আর বাজ বাহাদুরকে বন্দী করার সিদ্ধান্ত নেন। আপনি আকবর, মান্ডু দখল করার জন্য আদম খানকে পাঠান। বাহাদুর ওর ছোট সেনাবাহিনী নিয়ে মোকাবেলা করতে গিয়েছিল। আপনার বিরাট সেনাবাহিনীর সাথে কোনও তুলনাই হয় না, মান্ডু খুব সহজেই হেরে যায়। বাজ বাহাদুর সাহায্যের আশায় চিত্তোরগড়ে আশ্রয় নেয়।

    চেঙ্গিজ খান : আমার প্রথম বউও ভেড়া, গোরু, ঘোড়া চরাতো।

    রূপমতি : আমার গল্পটা শুনুন, মাঝখানে কথা বললে রেশ কেটে যায়। আদম খান লোকটা বজ্জাত। মান্ডু আসার সাথে সাথে আমাকে দেখে ফাঁদে ফেলে আটক করার চেষ্টা করেছিল। ওর ফন্দি ছিল আমাকে তুলে নিজের হারেমে নিয়ে যাবে। কিডন্যাপিঙ এড়ানোর জন্য আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করি, আর এভাবেই আমাদের প্রেম নষ্ট হয়ে যায়। সুলতান আমাকে হিন্দু আর মুসলমান দুই রীতিতেই বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর বাজ বাহাদুর আর আমার সুখের সংসার ভালোই চলছিলো। শিল্পপ্রেমী বাজ বাহাদুরের অন্য সুলতানদের সাথে ভালোই সম্পর্ক। তাই নির্ভাবনায় শিল্পসাধনায় আমাদের জীবন সুখেই কাটছিলো। আমার প্রশংসা ছড়িয়ে পড়লো সারা আল-হিন্দে। সম্রাট আকবর, আপনার কানেও গেল। আপনি বাজ বাহাদুর আর আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন দিল্লির দরবারে। বাজ বাহাদুর আমন্ত্রণ রক্ষা করলেন। আমি গান গেয়ে শোনালুম। কয়েকদিন দিল্লিতে থেকে বাজ বাহাদুর আমাকে নিয়ে ফিরে এলো মান্ডু। কিন্তু আপনি আকবর, কিছুতেই ভুলতে পারেননি আমাকে আর আমার গান। আপনি ভাবলেন কোথাকার কোন এক ছোট-খাট সুলতান বাজ বাহাদুর, তার কাছে আমি কেন থাকবো ! আপনি সেনাপতি আদম খানকে হুকুম করলেন বাজ বাহাদুরকে মেরে আমাকে তুলে নিয়ে আসতে। আমি যখন খবর পেলুম বাজ বাহাদুর হেরে গেছেন, আর আদম খান আমাকে ধরতে আসছে, আমি বাধ্য হলুম আত্মহত্যা করতে।

    জাঁ দুভাল : সব পুরুষ একই রকম। বোদলেয়ার ছাড়া আরও অনেকের সঙ্গে মিশেছি তো, জানি। বোদলেয়ার মনে করতো আমার থেকে ওর সিফিলিস হয়েছে। আমার উল্টোটা মনে হয়। বোদলেয়ার থেকেই আমার সিফিলিস হয়েছে। আফিমের শরবত আর হ্যাশিশের ধোঁয়া টানার পর ওর তো আর হুঁশ থাকতো না।

    শাহজাহান : আমার আব্বাহুজুর জাহাঙ্গীর অমন করতেন না। আমি তো ওনার হিন্দু রাজপুত বউ তাজ বিবি বিলকিস মাকানি-র ছেলে। শুনেছি যে দাদাহুজুর আমার আব্বাহুজুরকে আনারকলির সঙ্গে প্রেম করতে দেননি। কারণ আনারকলি ছিল একজন চাকরানির মেয়ে, দাদাহুজুরও মেয়েটাকে চাইতেন। জন্মসুত্রে ওর নাম ছিল নাদিরা বেগম বা শার্ফ-উন-নিসা। আনারকলি কোনও এক বণিক বহরের সঙ্গে ইরান থেকে লাহোরে এসেছিল। দাদাহুজুর বলেছিলেন চাকরানির মেয়েকে রাজপুত্রের ভালোবাসা অবৈধ। তাই দাদাহুজুর দুটো ইটের দালানের মাঝ জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন আনারকলিকে। আনারকলির ঘটনা ইচ্ছে করে ‘আকবরনামা, ’তুজক-ই-জাহাঙ্গীরী’, ‘হুমায়ুননামা’ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, মোগল সন্মান রক্ষা করার ধান্দায়। অথচ হারেমের হাবশি ক্রিতদাসীদের সঙ্গে শুতে কারোরই আপত্তি হয়নি।

    জাঁ দুভাল : এরকমই হয়। আমার জীবনও অনেক কষ্ট। এখন ক্রাচে হাঁটাচলা করতে হয়। যাই হোক, আমি এবার উঠি। অনেক দূর যেতে হবে। বোদলেয়ার আমাকে বলতেন কালো ভেনাস, বিপজ্জনক সৌন্দর্য, যৌনতা আর রহস্য’র মিশেল। আমাকে অমর করে দিয়ে গেছেন শাহজাহানের মমতাজ মহলের মতন। ওই যে আরেকজন মহিলা এই টেবিলের দিকেই আসছেন, আপনাদের মিসোজিনিক আলোচনায় বিঘ্ন ঘটাতে।

    ভাগমতি : তোমার কথা শুনতে পেয়েছি জাঁ দুভালবেগম। না আমি পিতৃতন্ত্রে বাগড়া দিতে আসিনি। আমিও নিজের প্রেমের কাহিনি শোনাতে এসেছি।

    ভাইপো আকবর : আমার নাম জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর, গুলবদন পিসির ভাইপো। ভুল করে নিউটাউন কফি হাউসে চলে গিয়েছিলুম। আজকে চেঙ্গিজদাদু, ল্যাঙড়াদাদু আর দাদাহুজুর আড্ডা দিতে আসছেন শুনে এলুম। প্রেমের গল্প কানে এলো। কার প্রেম কার সঙ্গে, আশা করি এই কাহিনির ভিলেন আমি নই। মোগল পরিবারে হিন্দু রাজপুত মেয়েদের বিয়ে করার চল আমিই তো আরম্ভ করেছিলুম। আর এখন তোরা আমাকে দোষ দিচ্ছিস যে আমি তোদের প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি। শ্যায়খুবাবা আসেনি ?

    ফিরোজাবাদি তুগলক : আপনিই আকবর ? আপনার কথা অনেক শুনেছি জনাবেআলা ! আপনার মালাউন প্রেম তো বিখ্যাত। আপনার দরবারে পারসি-মোগল-রাজপুত, প্রত্যেকের সমান মর্যাদা ছিল। তবে নির্ভরতা ছিল বেশি মালাউন রাজপুতদের ওপর। কারণ দরবারের আমির-ওমরাহদের মধ্যে অনেকেই তো ইরানের। ইরানের সম্রাটের প্রতি আপনাদের একটা দুর্বলতা ছিল। প্রভাবশালী ইরানি ও মোগল আমিররা ষড়যন্ত্রে যোগ দিতে কতক্ষণ! অন্যদিকে রাজপুতদের নিয়ে সে ভয় ছিল না। তারা বিশ্বাসী, বীর আর প্রভুভক্ত। যুদ্ধেও ওস্তাদ। আর যদি তারা ষড়যন্ত্র করেও, ইসলাম ধর্মাবলম্বী আমিরদের সমর্থন আদায় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। আপনি তাই সেনাবাহিনীর উঁচু পদে অনেক রাজপুতকে নিয়োগ করেছিলেন। মোগল সেনাবাহিনীতে রাজপুতদের এ দাপট দীর্ঘদিন বজায় ছিল। এর পেছনে কি যোধা বাঈয়ের কোনো প্রভাব ছিল জনাবেআলা ! যোধা বাঈ, মোগল হারেমের প্রথম রাজপুত বেগম। মোগল হারেমে হিন্দু আদব-কায়দা আর সংস্কৃতির শুরুয়াত তো ওনার হাত ধরেই। পরে রাজপুত বেগমদের সংখ্যা যত বেড়েছে, সংস্কৃতির মিশেলও ততই বেড়েছে। দেশীয় হিন্দু রাজাদের সঙ্গে সখ্যতার সময় সন্ধিপত্রে আপনি প্রথমেই যে শর্ত জুড়ে দিতেন তা হলো, রাজপুত রাজকন্যাদের ডোলি পাঠাতে হবে মোগল হারেমে। হেরে যাওয়া রাজাদের সেই সাহস কোথায় যে আপনার শর্ত অমান্য করে! অতএব আপনার হারেমে তখন অগুনতি রাজপুত বেগম। ইসলামি রীতি মেনে কলমা পড়ে যেমন এদের নিকা করেছেন, তেমনি হিন্দু রীতি-রেওয়াজ মেনে সাতপাক, মালা বদল, যাগযজ্ঞ—কিছুই বাদ যায়নি। রাজপুত বেগমদের মহলে পা রাখলে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে তা মোগল হারেমেরই অংশ। পুজোপাঠ থেকে পোশাক-আশাক, খাবারদাবার, তাদের সবকিছুতেই হিঁদুয়ানি বড় প্রবল। রাজপুত বেগম মহলে জাঁকজমকের সঙ্গে হোলির উৎসব হোতো আর আলোর দিওয়ালিও। বাদশারা সানন্দে যোগ দিতেন সেই উৎসবে। মোগল মিনিয়েচার ছবিগুলো সে কথাই বলে।

    তোতলা তুগলক : কে তোতোতোকে ববববলেছে, ওওওপরপড়া হয়ে খখখবর বিলোতে ?

    ভাইপো আকবর : এতো বড়ো সাম্রাজ্য চালাতে হলে বুদ্ধি খাটাতে হয়, বুঝেছো ? এ তো আর তোমার গণতন্ত্রের ভোটাভুটি নয় যে যখন যাকে ইচ্ছে নিজের সঙ্গে নিলুম আর হাজার-হাজার কোটি টাকা কামিয়ে তাকে জেলে পুরলুম বা তাড়িয়ে দিলুম। শ্যায়খুবাবা আসেনি ?

    দিল্লিওয়ালা তুগলক : আপনি যমুনা তীরে বাগানঘেরা সুন্দর মহল তৈরি করিয়েছিলেন। নাম রেখেছিলেন সোহাগপুরা। স্বামী-সোহাগের স্মৃতি আঁকড়ে বিধবা বেগম আর মুত্তারা শেষ জীবন কাটাবে এই মহলে, তাই এমন নাম রেখেছিলেন বোধহয়। জাহাঙ্গিরের মা মরিয়ম-উজ-জামানি ছাড়া বাকিরা আপনি মারা যাবার পর ছিলেন এই সোহাগপুরাতেই। মরিয়ম-উজ-জামানি, মানে যোধা বাই ছিলেন ছেলের প্রাসাদে। তালাকের ঘোর বিরোধী ছিলেন আপনি। আপনি মারা যাবার পর হারেম সুন্দরীরা অন্য পুরুষের বাহুলগ্না হবে, হিন্দুদের মতো এ ব্যাপারেও তীব্র আপত্তি ছিল আপনার। যাতে রাজপুত বেগমরা নিশ্চিন্তে সেখানে হিন্দু বিধবাদের মতো সাত্ত্বিক জীবন কাটাতে পারেন ! যদিও একটা অংশে মোগল বেগম ও মুত্তাদের থাকার ব্যবস্থাও ছিল। আপনার পর অবশ্য এই নিয়ম আর বজায় থাকেনি। জাহাঙ্গির ওর ভাই দানিয়েলের মৃত্যুর পর তার হারেমের মেয়েদের বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছিলেন আপনি। প্রশ্ন হলো তালাক কিংবা বেগমদের পুনর্বিবাহে কেন আপনার আপত্তি ! মালাউন সংস্কৃতির প্রভাবে বোধহয় ! মালাউন ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি বরাবর একটা কৌতূহল ছিল আপনার মনে। সেই কৌতূহল থেকেই রামায়ণ-মহাভারত অনুবাদের হুকুম দিয়েছিলেন। আগ্রহ ছিল সংস্কৃত ভাষার প্রতিও। মূল সংস্কৃত থেকে রামায়ণ অনুবাদের হুকুম দিয়েছিলেন বাদাউনিকে। সময় লেগেছিল চার বছর। আর নকিব খাঁ করেছিলেন মহাভারতের অনুবাদ। সাহায্য করেছিলেন বাদাউনিও এবং কয়েকজন হিন্দু পণ্ডিত। এর আগে বাদাউনি ফার্সি ভাষায় গদ্যে-পদ্যে অনুবাদ করে ফেলেছিলেন সংস্কৃত বই ‘বত্রিশ সিংহাসন’। বইটির অনুবাদ শেষ হলে নাম রাখা হয় ‘খিবদ্-আফজা’।

    তোতলা তুগলক : অঅঅঅনেক কিকিকিকিছু জাজাজাজানিস দেদেদেখছি, তাতাতাহলে রারারাজ্য সাসাসামলাতে পাপাপারিসনি কেকেকেন ?

    পাগলা তুগলক : মানবপ্রকৃতি ধারণাটা আমাদের সমাজে বিভিন্ন সময়ে কীরকম ভূমিকা পালন করেছে? আঠারো শতকের প্রাণীবিদ্যাসমূহের উদাহরণ টেনে বলা যায় নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কালে বিশেষ বিশেষ জ্ঞানকান্ডের অভ্যন্তরে ক্রিয়াতৎপর বর্গ-ধারণাসমূহ এবং ‘প্রাণ’ বা ‘মানবপ্রকৃতি’র মতো ইতিহাসোর্ধ ধারণাগত মাইলফলকগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে। আমার মতে, ইতিহাসোর্ধ ধারণাগুলো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকান্ডের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন সাধনে খুব সামান্যই ভূমিকা রেখেছে। আমার মতে, একজন ভাষাতাত্ত্বিক যা গবেষণার মাধ্যমে বাগধ্বনির রূপান্তরের নীতি আবিষ্কার করেছিলেন, কিংবা একজন ফ্রয়েড স্বপ্ন বিশেস্নষণের নীতি আবিষ্কার করেছিলেন, কিংবা একজন সাংস্কৃতিক নৃবৈজ্ঞানিক মিথ-এর কাঠামো আবিষ্কার করেছিলেন, সেটা প্রকৃতপক্ষে মানবপ্রকৃতি ছিল না। বলতে পারি, জ্ঞানের ইতিহাসে মানবপ্রকৃতি ধারণাটা বস্তুত ধর্মতত্ত্ব কিংবা প্রাণীবিদ্যা কিংবা ইতিহাসের সাপেক্ষে বা বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট ধরনের ডিসকোর্সকে প্রতিষ্ঠিত করতে জ্ঞানকান্ডীয় সূচকের ভূমিকা পালন করেছে।

    তোতলা তুগলক : এএএই পাপাপাগলাটা মামামাঝখানে অঅঅন্য ককককথা ববববলবেই।

    ভাস্কো দা গামা : লাহোরে আমি আনারকলির কবর দেখেছি। ওই ঘরেই এখন পাকিস্তানের পুরোনো নথিপত্রের মহাফেজখানা। উইলিয়াম ড্যালরিমপলও গবেষণার নথিপত্র যাচাই করার সময়ে দেখেছে আনারকলির কবর।

    শাহজাহান : ভাগমতিবেগম, এই প্রবীণ মহিলা কি তোমার সঙ্গে এসেছেন ?

    ভাগমতি : না তো ! উনি নিজেই এসেছেন আপনাদের টেবিলে।

    শাহজাহান : আর এই ফিরিঙ্গি ?

    ভাগমতি : উনিও আলাদা এসেছেন। আমার সঙ্গে নয়। আমি একাই এসেছি আপনাদের আমার জীবনের ঘটনা শোনাতে।

    পাগলা তুগলক : আধুনিক কালে শিল্প, সাহিত্য পাঠে এবং সিনেমা নাটকের বিশেষ চরিত্রের মনের অলি-গলিতে আলোকপাত করার জন্য যে কতগুলো শিল্প-সাহিত্যিক তত্ত্ব—যেমন সংগঠনবাদ, উত্তর সংগঠনবাদ, আধুনিকতাবাদ, উত্তর-আধুনিকতাবাদ, নিউ ক্রিটিসিজম, উপনিবেশবাদ ইত্যাদি সাহিত্য সমালোচনা—সমালোচকেরা ব্যবহার করে থাকেন তার মধ্যে সাইকো-এনালাইসিস একটা অপেক্ষাকৃত গূঢ় ও ক্যাথারসিস—আত্মবিশোধনমূলক তত্ত্ব। এই বিশেষ তত্ত্বটি বলে—যে টেক্সট লেখকের গোপন, আশা আকাঙ্ক্ষা তার উদ্বিগ্নতা, যা তার অজ্ঞান স্তরে জমা থাকে তা প্রকাশ করে দেয়। এটা আরো বলে যে একটা টেক্সট আর কিছু নয় লেখকের মনোজগতের ভাষা-বিবরণ ছাড়া। এর মাধ্যমে আমরা লেখকের বাল্যজীবনের ট্রমা, সেক্সচুয়াল কনফ্লিক্ট, অবসেশন ইত্যাদি জানতে পারি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আসে সরাসরিভাবে নয়, পরোক্ষভাবে। দাবিয়ে রাখা আবেগগুলো ছদ্মনামে, লিটেরেরি টেকনিক যেমন প্রতীক, মেটাফর ও মেটোনিমিতে প্রকাশিত হয়। কখনো তা প্রকাশ পেতে পারে কনডেন্সেড অবস্থায়, একটিমাত্র ছবিতে অথবা মিলেমিশে থাকায় বিশেষ অন্য একটি শব্দে বা ছবিতে। সাইকো-এনালাইসিস তত্ত্ব দিয়ে একটি টেক্সট পাঠ করলে পাঠকের কাছে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সেটি হলো লেখক/চরিত্রের ডিজায়ার বা তার অভাব।

    তোতলা তুগলক : আআআবার সেসেসেই দিদিদিদিল্লির ববববদলে দৌলতাতাতাবাদ। ওফ, পারা গেল না ছেলেটাকে নিয়ে !

    ঘসেটি বেগম : আমার নাম মেহের উন নিসা বেগম, আমি বাংলা, বিহার আর ওড়িশার নবাব আলীবর্দী খানের বড় মেয়ে। কফিহাউসে আজকে চেঙ্গিজদাদু, তৈমুরদাদু, বাবরদাদু আসবেন শুনে ওনাদের গল্প শুনতে এলুম। আমাকে এতো বদনাম দেয়া হয় কেন বুঝতে পারি না। অথচ আপনারা তিনজন তো হেন কাজ নেই যা করেননি। জগতশেঠ, উমিচাঁদ, কৃষ্ণচন্দ্র রায়রা দিব্বি পার পেয়ে গেলো। মহারাজা প্রতাপাদিত্যকে ধরিয়ে দিয়ে মানসিংহকে সাহায্য করার জন্য পুরস্কার হিসেবে ভবানন্দ মজুমদার সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে সন্মান লাভ করেছিল আর তার ফরমান পেয়ে নদীয়া, সুলতানপুর, মারুপদহ,মহৎপুর,লেপা,কাশিমপুর, কয়েশা মমুন্দ্রা এরকম চোদ্দটা পরগনার অধিকার পেলো | মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দেয়া চোদ্দটা পরগনার সনদসূত্রে নদীয়ার রাজা হলেন ভবানন্দ মজুমদার আর সেই সঙ্গেই নদীয়া রাজবংশের সূচনা করলেন | তাঁর বংশধররা ‘রাজা’ উপাধি ধারণ করে ফিরিঙ্গি শাসনের প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত নদীয়া শাসন করলেন | ভবানন্দের আসল নাম ছিল দূর্গাদাস সমাদ্দার, কিন্তু নদীয়া রাজপদে বসে ওনার নাম হলো ভবানন্দ মজুমদার ; তাঁর ছেলেরা রায় পদবি রাখলো | মোগোলদের ধ্বংস করে বব মাস্তানের কোম্পানি জনে-জনে রাজা-মহারাজা খেতাব বিলোলো। তার বেলায় ? শুধু আমাকেই কেন দোষ দেয়া হয় ?

    প্রতাপাদিত্য : আপনারা ডাকেননি, তবুও এসেছি। আমিই প্রতাপাদিত্য। মহারাজা প্রতাপাদিত্য,বাঙালি। নিজেকে মহারাজা বলেছি বলে আপনাদের আঁতে লেগেছে, জানি। কিন্তু আপনারা নিজেরা তো এদেশের মানুষের কাছে দুর্বোধ্য নাম নিয়েছেন, যেমন নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ুন, আবুল মোজাফ্ফর সাহিব উদ্দীন মোহাম্মদ সাহিব-ই কিরান শাহজাহান বাদশা গাজি, আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর বাদশা গাজী প্রথম আলমগীর, নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী, ইত্যাদি।

    ভাস্কো দা গামা: তোমার বক্তব্যটা কী ? ঘটনা জানতে চাই।

    প্রতাপাদিত্য : রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য আমি কিছু সময়ের জন্য উত্তর ভারতে গিয়েছিলুম। সেইখানে থাকার সময় আমি জানতে পারি মহারাণা প্রতাপসিংহের সাহসের কথা। আমি নিজে চিতোর দর্শন করেও আসি, যা আমার মনের স্বাধীনচেতা সত্ত্বাকে আলোড়িত করেছিল। এছাড়া, বিভিন্ন রাজপুত পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মোগল রীতি, আর খোশরোজের দিন হিন্দু নারীদের উপর অত্যাচারের কথা আমার মনে আপনাদের প্রতি বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছিল। যশোরে ফেরার কিছুদিন পরে আমার বাবা মহারাজা বিক্রমাদিত্যে মারা যান, আর আমার অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। রাজগুরু পণ্ডিত কমলনয়ন তর্কপঞ্চাননের কাছে শাক্ত মন্ত্রে দীক্ষা নিই।

    ভাস্কো দা গামা : তাই মোগলরা তোমার ওপর চটে গিয়েছিল ? ঠিক যেমন পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর চটা !

    প্রতাপাদিত্য : তার আগে আমি ছিলুম বৈষ্ণব। শাক্ত হয়ে যশোরেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করি। উৎকলবিজয় আমার শাক্ত বিশ্বাসকে আরো সুদৃঢ় করে। সেনাবাহিনীকে আরো শক্তিশালী আর পরাক্রমশালী করে তুলি। রাখাইনের মগ আর পর্তুগিজ দস্যুদের অত্যাচার প্রতিরোধ করি। দুর্গ তৈরি করাই। রাজধানী ধুমঘাটের দুর্গ ছাড়াও আরো তেরোটা প্রধান দুর্গ ছিল। এর বাইরেও আমার অসংখ্য দুর্গ ছিল, যার মধ্যে কলকাতার কাছেই সাতটা। আমার নৌবহরও ছিল ; কোনো কোনো নৌকায় চৌষট্টি বা তার বেশি দাঁড় ছিল, আর অবশ্যই অনেক নৌকায় কামান থাকত। আমার সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন ধরণের সৈন্য ছিল, যেমন ঢালী, অশ্বারোহী, তীরন্দাজ, গোলন্দাজ, নৌসেনা, গুপ্তসৈন্য, রক্ষীসৈন্য, হস্তিসেনা। আমার সেনাবাহিনীতে বাঙালি রায়বেঁশে, ঢালি ইত্যাদি সেনা ছাড়াও ছিল কুকি, পাঠান, পর্তুগিজ ইত্যাদি সেনা। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র আর আমার শত্রুদের নানারকম সাহায্য করেছিলেন বহু বাঙালি।

    চেঙ্গিজ খান : ভালো কাজই তো করছিলে। তুমি তো মনে হয় কোনও অভিযোগ নিয়ে কফিহাউসের এই আড্ডায় এসেছো। যা বলতে চাও, বলে ফ্যালো।

    প্রতাপাদিত্য : আমি বহিরাগত মোগলদের বশ্যতা অস্বীকার করে যশোরের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলুম। নিজের নামে মুদ্রার প্রচলন করেছিলুম। মোগলদের পক্ষে রাজা মানসিংহ ছিলেন বঙ্গদেশের দায়িত্বে। তিনি দাক্ষিণাত্য বিজয়ের জন্য শের খাঁকে রাজমহলে দায়িত্ব দিয়ে যান। সেই সময় আমার অমাত্য শঙ্কর চক্রবর্তী সেখানে উপস্থিত হন। শের খাঁ শঙ্করকে বন্দী করে, যদিও শঙ্কর সহজেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়। ফলে আমি আক্রমণ করে মোগলদের প্রথমবারের মতো হারিয়ে দিই। এরপরে মানসিংহের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি হয়। যুদ্ধ বেশ কিছুদিন যাবত চলেছিল। প্রথমে দু’দিন মানসিংহ হেরে গিয়েছিলেন। শেষদিন জয়ী হয়ে মানসিংহ স্বাধীনতার চিহ্ন পতাকা ও মুদ্রা বিলুপ্ত করবার আদেশ দিয়েছিলেন। আসলে নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষ ভবানন্দ মজুমদার আমাকে মান সিংহের কাছে ধরিয়ে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। শুনেছি, আমাকে খাঁচায় পুরে বন্দি করার পর, মোগল সেনাবাহিনী জিহাদ ও ‘মাল-এ-গনিমাত’ অনুযায়ী নির্মমভাবে যশোরে লুটপাট চালিয়েছিল। এমনকি মির্জা নাথনের মতো বুদ্ধিমান মানুষও তার নির্মম কৃতিত্ব নিয়ে গর্বিত। আমার ছেলে উদয়াদিত্য ওই মির্জাকে সোনা-মণিমুক্ত দিতে পারেনি বলে যশোরের ওপর ভয়াবহ প্রতিশোধ নিয়েছিল। মির্জা হুমকি দিয়েছিল যে লুটপাট বলতে কী বোঝায় তার অভিজ্ঞতা যশোরের মানুষ মনে রাখবে। মির্জা নাথন চার হাজার মহিলা, যুবতী ও বৃদ্ধকে বন্দী হিসাবে নিয়ে গিয়েছিল। কমিউনিস্ট শাসনের ৩৪ বছরে বাংলায় জাতীয়তাবাদী মনোভাব শুকিয়ে গেছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এখনকার বাঙালিরা আমাকে আর আইকন মনে করে না।

    চেঙ্গিজ খান : রাজা-বাদশাদের অমন খোচর থাকে। তাদের কাজের জন্য তাদের পুরস্কার না দিয়ে উপায় নেই।

    প্রতাপাদিত্য : ব্যাপারটা মিটে গেলেও, জাহাঙ্গির কিছুকাল পরে ইসলাম খাঁর নেতৃত্বে আবার সৈন্য পাঠান। যমুনা আর ইছামতি নদীর সঙ্গমে আমার বাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। আমি আত্মসমর্পণ করেছিলুম। তবু ইসলাম খাঁ আমাকে শেকলে বেঁধে খাঁচায় ঢুকিয়ে রাখলো আর যশোর প্রদেশকে মোগল সম্রাজ্যের অন্তর্গত করে নিলো। আপনাদের তো যে যার কবর আছে। কেউ-কেউ তার ওপর মহলও খাড়া করেছেন। আমার আর আমার ছেলের শবদেহের কী হলো ? কোথায় আমাকে দাহ করা হয়? আমার দেহাবশেষ কি আমার বংশধরদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল ? নাকি আমার স্মৃতিও দারা শুকোহ’র মতন লোপাট করে দেয়া হয়েছে ?

    ভাইপো আকবর : জাহাঙ্গির থাকলে হয়তো বলতে পারতো। ও কফিহাউসে আসতে পারবে না, পাকিস্তানের মিলিটারি ক্লিয়ারেন্স পায়নি। ইসলাম খাঁ আসবে বলে মনে হয় না। গুলবদনপিসি, তুমি কিছু জানো ? শ্যায়খুবাবা আসেনি ?

    গুলবদনপিসি : না রে ভাইপো। জাহাঙ্গীর ওর আত্মজীবনীতে ব্যাপারটা চেপে গেছে। আমি যতোটা জানি ঢাকায় বন্দী থাকবার কিছুদিন পরে আপনাকে খাঁচায় পুরে আগ্রায় পাঠানো হচ্ছিল। পথে কাশীতে আপনি মারা যান। বা হয়তো খাঁচার ভতরে মারা যাবার পর শবদেহ কাশীতে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনার শবদাহ সেখানেই করা হয়ে থাকবে, বংশধরদের অনুপস্হতিতে।

    প্রতাপাদিত্য : আমার প্রতিষ্ঠিত যশোরেশ্বরী কালী দর্শনের নাম করে সেনাপতি মান সিংহ আমার দুর্গের নকশা নিয়ে যান। পরে আক্রমণ করে মোগলরা সেটি জয়লাভও করে। কালীর বিগ্রহের সঙ্গে আমাকে আর আমার সেনাপতি ও পরামশর্দাতা শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়কে বন্দি করেন মান সিংহ।জমিদার বাড়ির মধ্যে অবস্থিত ছিল যশোরেশ্বরী কালী। সেই সময়ের জমিদার কালী মন্দিরের জন্য দুশো বিঘা জমি দান করেছিলেন। কিন্তু আজ প্রভাবশালী ভুমিদস্যুরা জাল দলিল তৈরি করে মায়ের মন্দিরের সব জমি দখল করে ভোগ করছে।আজ মন্দিরের ইঁটের দেওয়াল খসে পড়ছে। যাকগে, থ্যাংকস। মোগলরা আমার ভালোই ট্রিটমেন্ট দিয়েছিল। নিজেদের ভাই-ভাতিজা চাচা-আব্বাকে যারা হেনস্হা করে, অন্ধ করে, খুন করে, তাদের কাছ থেকে এইটুকু জোটাও ভাগ্যের ব্যাপার। মধ্যযুগে বাংলার শাসক হিসাবে বহিরাগত বাদশা আর নবাবরা যতটা গুরুত্ব পেয়েছেন, দেশীয় বাঙালি রাজারা তার সিকির সিকিও পাননি। এর একটি কারণ যদি হিন্দু শাসকদের হাত থেকে মুসলমান শাসকদের হাতে ক্ষমতার দখল চলে যাওয়া হয়ে থাকে, আর একটি কারণ আমাদের ঐতিহাসিক ও শিক্ষাবিদরা। তাই মহারষ্ট্রের শিবাজীকে নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখানো হলেও তাঁর প্রায় সমান রণকুশল আর অনেক বেশি প্রজাবৎসল হলেও বাংলার পাঠ্যপুস্তকে উল্লিখিত শুধু বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম হিসাবে, যিনি মোগলের বশ্যতা স্বীকার করেননি। শিবাজীর চেয়ে অগ্রজ হওয়া সত্ত্বেও আমাকে সম্মান জানাতে ব্যবহৃত হয় ‘বাংলার শিবাজী’ অভিধা, যেখানে বিপরীতটা হওয়াই সঙ্গত ছিল; কারণ আমার শৌর্যের খ্যাতি সারা ভারতে এতটাই ছড়ায়, যে সেই ক্ষমতার নেপথ্যে অলৌকিক দৈব আশীর্বাদের গল্পও জনশ্রুতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আর শিবাজীর জন্ম আমার জন্মের অনেক পরে।

    চেঙ্গিজ খান : বাঙালিদের কথা আর বোলো না। নিজেদের নায়কদের সন্মান জানাতে চায় না। এই একটু আগে মাও জে দং সেকথাই বলে গেলেন।

    প্রতাপাদিত্য : আমাকে নিয়ে উৎসবের সূচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড়ো বোন শ্রীমতী স্বর্ণকুমারী দেবীর ও শ্রী জানকীনাথ ঘোষালের মেয়ে শ্রীমতী সরলাদেবী চৌধুরানী। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শ্রী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় দ্বারা পরিচালিত একটি সাহিত্য সভাকে সরলাদেবী দেশাত্মবোধক ও বীরত্বব্যঞ্জক রূপ দিয়ে ‘প্রতাপাদিত্য উৎসবের’ সূচনা করেছিলেন। আমার ঘোড়া কলেজ স্ট্রিটে অপেক্ষা করছে। চলি। আপনাদের কিছু শোনাবার জন্য একজন ফিরিঙ্গি দাঁড়িয়ে আছেন।

    অষ্টম এডোয়ার্ড : আমি দাঁড়িয়েই আমার জীবনে প্রেমের কথা বলি। আপনারা সবাই প্রেমের আলোচনা করছেন বটে কিন্তু কেউই আমার মতন রাজসিংহাসন ত্যাগ করেননি প্রেমিকার জন্যে। দুবার তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে জীবনসঙ্গী করায় সিংহাসন ছাড়তে হয়েছিল ! আমার নাম এডওয়ার্ড আলবার্ট ক্রিশ্চিয়ান জর্জ অ্যান্ড্রু প্যাট্রিক ডেভিড। আমি রাজা পঞ্চম জর্জের বড়ো ছেলে। ভালোবাসার মানুষের জন্য সিংহাসন ছেড়ে মাটিতে নেমে গিয়েছিলুম সাধারণ মানুষের মধ্যে। আমার প্রেমিকার নাম ওয়ালিস সিম্পসন। জন্ম মার্কিন পরিবারে। ওয়ালিস আমাকে বিয়ে করেও রানি হতে পারেননি। পাননি কোনো সম্মানসূচক উপাধি। কারণ, ও দুবার তালাকপ্রাপ্ত। সেই সময়ে তালাক পাওয়া মেয়েদের আদালতে যাওয়ারই অধিকার ছিল না, আর আমাকে বিয়ে করে ব্রিটিশ রাজপরিবারে প্রবেশ করাটা তো অসম্ভব ছিল! দু’বার তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে এডওয়ার্ড বিয়ে করলে সরকার পদত্যাগ করবে, এমন হুমকি দেওয়া হলো।

    চেঙ্গিজ খান : কেন ? রাজারানি হবে, তাতে তালাকদেয়া মেয়ে হোক বা নাই হোক। তালাকদেয়া মেয়েদেরও তো বিয়ে করা যায়।

    অষ্টম এডোয়ার্ড :দুবার তালাকপ্রাপ্ত সাধারণ এক মার্কিন পরিবারের মেয়েকে ব্রিটিশ রাজার বিয়ে করার সিদ্ধান্তে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইংল্যান্ডের চার্চ, যখন কিনা রাজা নিজেই চার্চের প্রধান ! ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলে বল্ডউইনও আমার প্রেমের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেন। বল্ডউইন আমাকে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন—এক, ওয়ালিসকে বিয়ের চিন্তা বাদ দাও। দুই, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করা চলবে না। তিন, সিংহাসন ত্যাগ করো। চাপ সহ্য করতে না পেরে ওয়ালিস ফ্রান্সে চলে গিয়েছিল। ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবে না। কিন্তু জানতুম, সেটা ওর মনের কথা নয়। ওর মনের কথাটা বাস্তবে প্রতিফলিত করতেই বল্ডউইনকে জানিয়ে দিই, আমি তৃতীয় প্রস্তাবটিতে রাজি ! আমি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘অ্যাবডিকেশন-পত্র’ জমা দিই। পরদিন তা অনুমোদন করা হয়। মাত্র ৩২৬ দিনের মাথায় সিংহাসন ত্যাগ করে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম মেয়াদি রাজার তালিকায় নাম লিখিয়েছি। ওয়ালি সিম্পসনকে বিয়ে করে প্যারিসে বসবাস শুরু করি। আমার মতন আর কেউ কি প্রেম করেছে পৃথিবীতে ?

    চেঙ্গিজ খান : আপনার পেছনে ওই মোটা সাহেব ভুতটা কে ? আপনার সঙ্গে এসেছেন ? আমি ভাবলুম ওয়াজিদ আলি শাহ পোশাক পালটে এলো !

    অষ্টম এডোয়ার্ড : না, উনি উনস্টন চার্চিলের ভুত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

    সাহেব ভুত : চলুন ইয়োর হাইনেস। এই কালো বোকা লোকগুলোর জমায়েতে কেন এসেছেন ?

    কফিহাউসের যক্ষ : এই চার্চিল লোকটা নিজে সরাসরি বাংলার মন্বন্তরের জন্য দায়ী। ও একসময় বিদ্রূপ করে বলেছিল, দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী ভারতীয়রা, ওরা খরগোশের মতো বাচ্চা বিয়োয় ; তা ছাড়া খাদ্য সংকট এত তীব্র হলে মহাত্মা গান্ধী বেঁচে আছেন কীভাবে?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আরে এই প্রেতটা তো উইনস্টন চার্চিল। আমিও ভেবেছিলুম ওয়াজিদ আলি শাহ নতুন পোশাকে এলো। পঞ্চাশের মন্বন্তরে যখন সুবে-বাংলার মানুষ বেঘোরে মরছিল এই লোকটা তখন সাহায্যের জন্য হাত বাড়াবার বদলে গুটিয়ে নিয়েছিল।শুধু তাই নয়, অন্যেরা যেন দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে না আসে সে বিষয়েও ব্যবস্থা নিয়েছিল। চার্চিল নিজে সরাসরি বাংলার মন্বন্তরের জন্য দায়ী ছিল। একসময় বিদ্রূপ করে বলেছিল খাদ্য সংকট এত তীব্র হলে মহাত্মা গান্ধী বেঁচে আছেন কীভাবে?। চার্চিলের আল-হিন্দের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা ছিল। আল-হিন্দে যখন ‘ভারত ছাড়ো’ বা ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠছে তখন এ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কয়েক জাহাজ খাদ্যশস্য পাঠানোর মাধ্যমে চার্চিল অনায়াসে ভয়াবহ এ দুর্ভিক্ষ প্রতিহত করতে পারত। বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য খাদ্যশস্য পাঠানোর জন্য ভারতের দুই ভাইসরয়, চার্চিলের ভারত বিষয়ক সচিব এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত চার্চিলকে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু, চার্চিল তাদের কথায় গা করেনি। আল-হিন্দে আগে এরকম দুর্ভিক্ষ ছিল না। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সময় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। আর এর কারণ হলো— সে সময় এখান থেকে খাদ্যশস্য বৃটেনে রপ্তানি করা হতো কিংবা খাদ্যশস্যের বদলে চাষীদের নীল, পোস্ত বা পাট চাষে বাধ্য করা হতো। ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’, আদৌ কৃৃৃৃষির ব্যর্থতা জনিত খরা ছিল না, ছিল মনুষ্যসৃষ্ট আকাল।

    পাগলা তুগলক : জানা কথা।

    কফিহাউসের যক্ষ : কিন্তু স্যার, ১৯৫৩ সালে দ্বিতীয় রানী এলিজাবেথ ওনাকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। একই সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিল উইনস্টন চার্চিল।

    ভাইপো আকবর : ওসব নাইট-ফাইট আর নোবেল পুরস্কার সব ফালতু। আমি নবরত্নদের নোবেল পুরস্কারের দশগুণ মাসোহারা দিতুম। চার্চিল লোকটা মোটেই নবরত্ন হবার মেটেরিয়াল নয়। ওর মূর্তিও শুনছি ভেঙে ফেলার উপায় খুঁজছে ব্রিটেনের পাবলিক। সুবে-বাংলা আর আসাম উপত্যকাই ছিল হাজার বছরের শস্যভাণ্ডার। বাংলার দুর্ভিক্ষ নিতান্তই ব্রিটিশ দুঃশাসন, অব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে শেষের দিকে, উইনস্টন চার্চিলের আলহিন্দ-বিদ্বেষ আর যুদ্ধনীতির কারণে হয়েছিল। তাই আজ যেমন খোদ নিজের শহরেই ক্লাইভের বিশাল মূর্তি অপসারণের দাবি উঠেছে; একই দাবি উঠেছে বাংলায় ইতিহাসের মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের মরণোত্তর বিচারের, অন্তত ন্যায্য বিচারের জন্য ইতিহাসের নিরপেক্ষ পুনর্মূল্যায়নের। শ্যায়খুবাবা আসেনি ?

    সাহেব ভুত : আমি উইনস্টন চার্চিল, আমার দেশের লোক কিনা আমার মূর্তি ভেঙে ফেলে দিতে চাইছে।

    ইরাকি ভুত : দুঃখ করবেন না চার্চিলমিয়াঁ, আমিও অনেককে না খেতে দিয়ে মেরেছি। আমি সাদ্দাম হোসেন আবদুল মাজিদ আল তিকরিতি, আমার মূর্তিও আমার দেশবাসী ফিরদৌস স্কোয়ারে টেনে ফেলে দিয়েছে, মূর্তির মুণ্ডু ভেঙে দিয়েছে। জানেন তো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সর্বদা বিবাদমান বেশ কিছু জাতিগোষ্ঠী বাস করে। সবার মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রেখে দেশ পরিচালনা অনেক সময়ই সম্ভব হয়ে ওঠে না। দেশের অখন্ডতা বজায় রাখতে গিয়ে প্রায়ই শাসককে কঠোরভাবে সব বিদ্রোহ দমন করতে হয়। এসব বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে আমি যে পন্হা নিয়েছিলুম তাকে লোকে বলে নিষ্ঠুরতা, আর যে নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করেছিলুম তা নাকি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ভেবে দেখুন, ইরাকের অখন্ডতা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পেরেছিলুম, আর বাইরের শত্রুদের হাত থেকে দেশবাসীকে দীর্ঘদিন মুক্ত রাখতে পেরেছিলুম। এখন নিজেরা লড়ে মরছে, ইউরোপে পালাচ্ছে ।

    রুশি ভুত : আমি ভ্লাদিমির লেনিন। আমাকে বিশ শতকের প্রধান ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়েও, আমি ১৯৯১ সালে বিলোপ হওয়া অবধি সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে মরণোত্তরকালীন এক পরিব্যাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বিষয় ছিলুম। আমি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শিক ব্যক্তিত্ব ছিলুম আর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ওপর লক্ষণীয় প্রভাব ফেলেছিলুম। কিন্তু বিতর্কিত আর অত্যন্ত বিভাজক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমাকে আমার সমর্থকরা সমাজতন্ত্র আর শ্রমিক শ্রেণির চ্যাম্পিয়ন হিসাবে দেখলেও, অন্যদিকে বাম আর ডান উভয় দিকের সমালোচকরা আমাকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা হিসাবে আমার ভূমিকার ওপর জোর দেয়। তোমরা তো আমার মতন বিপ্লব আনোনি। আমি পুরো সমাজটা পালটে দিয়েছিলুম ; সবাই আনন্দে ছিল, অথচ আমার মূর্তিগুলো সব জায়গা থেকে ভেঙে ভেঙে ফেলে দিয়েছে ; এখনও কয়েক জায়গায় আছে। জানি না কদ্দিন থাকবে সেগুলো।

    জর্জিয়ার ভুত : আমি জোসেফ স্তালিন, আমার মূর্তিগুলোও দেশের লোকেরা উপড়ে ফেলে দিয়েছে। অথচ আমি একজন রুশ সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ আর ১৯২২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলুম। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসের সেই সময়ে আমার নেতৃত্বে প্রচলিত রাজনৈতিক মতবাদ “স্তালিনবাদ” নামে পরিচিত। শুরুতে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সচিব হিসাবে আমার ক্ষমতা সীমিত ছিল। ধীরে ধীরে আমি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নিয়ে দলের নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিই। আমি সোভিয়েত ইউনিয়নে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলুম। তার আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় সবটুকুই অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ছিল। আমার দ্রুত শিল্পায়ন আর কৃষিকার্যের যৌথীকরণের মাধ্যমে পুরো দেশ অল্প সময়ের মধ্যে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়। কিন্তু একই সময়ে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের দরুন বহু মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। ১৯৩০-এর দশকে আমি নিজের ক্ষমতা শক্ত করবার জন্য একটু-আধটু নিপীড়ন শুরু করেছিলুম, যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির শত্রু সন্দেহে বহু মানুষকে লোপাট করে দিই, কিংবা সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ার শ্রম শিবিরে নির্বাসিত করি। রাশিয়ার অনেক জাতিগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি থেকে উৎখাত করে অন্য জায়গায় সরিয়ে দিই। সবই তো মানুষের ভালোর জন্যে করেছিলুম ; কিন্তু এমন আহাম্মক ওরা যে আমার মূর্তি লোপাট করে দিচ্ছে।

    স্পেনের ভুত : আমি ক্রিস্টোফার কলম্বাস, আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলুম। মিনেসোটার সেইন্ট পলে আদি আমেরিকান বিক্ষোভকারীরা আমার দশ ফুট ব্রোঞ্জের মূর্তি দড়ি দিয়ে টেনে এর গ্রানাইটের ভিত্তি থেকে ফেলে দিয়েছে। ওরা বলেছে, বর্ণবাদ আর পুলিশের নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চিত্র এটা। ওদের দাবি, বর্ণবাদ, দাসপ্রথা বা দাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের মূর্তি প্রকাশ্যে রাখা যাবে না। যদি রাখতেই হয়, তবে সেগুলোকে জাদুঘরে স্থানান্তরিত করতে হবে। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ষোড়শ শতাব্দীতে আমেরিকায় এসে স্থানীয়দের দাস হিসেবে ব্যবহার করেছিলুম।অনেক স্কুলে আমাকে ‘নতুন পৃথিবীর আবিষ্কারক’ হিসেবে পড়ানো হয়। জানি, এই ঘটনার অনেকদিন ধরেই বিরোধিতা করে আসছিলেন আমেরিকার আদি অধিবাসীরা। ওদের মতে, আমার অভিযানই আমেরিকার ঔপনিবেশিক শাসনের আর আদি আমেরিকান অধিবাসীদের গণহত্যার কারণ। আমার আত্মা শান্তিতে ঘুমোতে পারছিল না বলে আপনাদের জমায়েতে নালিশ করতে এলুম।

    ব্রিটিশ ভুত : আমার নাম এডোয়ার্ড কলস্টোন। ব্রিস্টলে ব্রিটেনের ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ বিক্ষোভকারীরা আমার মূর্তি ভেঙে ফেলেছে। এতোদিন লোকে জানতো না আমি কে ! নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়েছিলুম স্ট্যাচু হয়ে, তাও থাকতে দিলো না।

    মামুনুল হক : আমি খেলাফত যুব মজলিসের নেতা। আমি মনে করি ধোলাইখালে শেখ মুজিবর রহমানের মূর্তি স্থাপন বঙ্গবন্ধুর আত্মার সঙ্গে গাদ্দারি করার শামিল। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করে, তারা বঙ্গবন্ধুর সু-সন্তান হতে পারে না। এর মাধ্যমে মসজিদের শহরকে মূর্তির শহরে পরিণত করার অপচেষ্টা চলছে। এ মূর্তি স্থাপন বন্ধ করুন। যদি আমাদের আবেদন মানা না হয়, আবারও তৌহিদি জনতা নিয়ে শাপলা চত্বর কায়েম হবে।

    সৌরভ হোসেন নিয়াম : আমি হেফাজতের হামলার শিকার হয়েছি, তার কারণ আমার নাম সৌরভ হোসেন সিয়াম। প্যান্ট খুলে নুনু দেখিয়ে, তাদের কাছে আমার পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়েছে। চার কালেমার দুই কালেমা মুখস্থ বলতে হয়েছে। কয়টা সুরা মুখস্থ তা জানাতে হয়েছে। নামের একটা অংশে সৌরভ থাকায় তারা আমাকে মালাউন মনে করেছিল। বিশ থেকে বাইশ মিনিট একটা গাছ কাটার করাত কলে আটক ছিলুম। চারদিকে ঘিরে ছিল দাড়ি-টুপিওয়ালা তৌহিদি জনতা। প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরতে পেরেছি এটাই অনেক। দুপুরে মাদানীনগর মাদ্রাসার সামনে হেফাজত কর্মীরা যখন বিক্ষোভ করছিল, তখন আমি ভিডিওতে ফোটো নিতে থাকলে তারা আমাকে ধরে মারধর শুরু করেন। সেসময় তারা আমার নাম জিজ্ঞেস করলে আমি সংক্ষেপে শুধু ডাক নাম “সৌরভ” বলি। এতেই তারা আমাকে মালাউন মনে করে ব্যাপক মারধর করে। কালেমা পাঠ করার পরও কুড়ি মিনিট আমাকে আটকে রাখেন। অন্য সাংবাদিকরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

    খোকা তুগলক : হেফাজত কী জনাবেআলা ?

    তোতলা তুগলক : আআআআবার প্রপপপপপশ্ন।

    জর্জ ফ্লয়েড : হেফাজত হল বজরং দলের আরেক নাম। বজরং দল হল হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী বিশ্ব হিন্দু পরিষদের যুব বাহিনী। আল হিন্দের উত্তর প্রদেশে দলটা প্রতিষ্টিত হয় এবং গোটা ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ দল হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। এই দলের লক্ষ্য হল গোহত্যা বন্ধ করা আর রাম এর জন্মভূমি আযোধ্যায় রামজন্মভুমি তৈরি। এছাড়াও ভারতের হিন্দুদের কমিউনিজমের প্রভাবমুক্ত করা, আর ধর্মান্তর হতে বিরত রাখা। বাংলা নববর্ষ এবং পয়লা বৈশাখকে বিজাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে প্রচার করে এর বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলাম। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় বক্ততা, গণমাধ্যমে বাঙালি জাতির মধ্যে বিভেদমূলক, বিদ্বেষমূলক ও ভিন্ন ধর্মের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান ও প্রচার করে থাকে। এখানে উল্লেখ্য, বাংলা নববর্ষ বাঙালিদের কাছে বাংলা বছরের প্রথম দিন হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হলো বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি সংগঠন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই সংগঠনটি বাংলাদেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে।কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা হয়েছে তা রীতিমত চমকে দেওয়ার মত ঘটনা। সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গনে আগুন দিয়েছে, সরকারি গ্রন্থাগারে আগুন দিয়েছে, রেললাইন উপড়ে ফেলেছে।

    মার্কিন ভুত : আমি জেফারসন ডেভিস, মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময়ে কনফিডারেটের প্রেসিডেন্ট ছিলুম। আমার মূর্তি উপড়ে ফেলে দিয়েছে স্বদেশবাসী। মন খারাপ হয়ে গেল কবরে শুয়ে। তাই আপনাদের জমায়েতে নালিশ করতে এলুম।

    চেঙ্গিজ খান : কনফিডারেট আবার কী ব্যাপার ?

    জর্জ ফ্লয়েড : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাতটা বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজ্য ক্রীতদাসপ্রথা বজায় রাখতে চাইছিল। সেই রাজ্যগুলোকে বলা হয় কনফেডারেট রাজ্য। কনফেডারেশন গঠিত হয়েছিল: দক্ষিণ ক্যারোলিনা, মিসিসিপি, ফ্লোরিডা, আলাবামা, জর্জিয়া, লুইসিয়ানা আর টেক্সাস নিয়ে। এই রাজ্যগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি-দক্ষিণ অঞ্চলের এলাকা। তাদের অর্থনীতি কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল – বিশেষত তুলো – আর প্ল্যানটেসান ব্যবস্থায়। তার জন্য তারা আফ্রিকান দাসদের ওপর নির্ভর করত। রিপাবলিকান প্রার্থী আব্রাহাম লিংকনের মার্কিন রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য আর দাসত্বের প্রতিষ্ঠানকে প্রতিরোধ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তা ছিল এমন এক প্ল্যাটফর্মে যেটা পশ্চিম অঞ্চলগুলিতে দাসত্ব প্রসারিত করার বিরোধিতা করেছিল। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় অনুগত রাজ্যগুলো ইউনিয়ন হিসাবে পরিচিতি লাভ করে, কনফেডারেশন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করে। কর্নস্টোন অ্যাড্রেস নামে পরিচিত এক বক্তৃতায় কনফেডারেটের সহ-সভাপতি আলেকজান্ডার স্টিফেনস তার আদর্শকে এইভাবে বর্ণনা করেছিল: “এই মহান সত্যের ভিত্তিতে আমরা গোষ্ঠীবদ্ধ যে নিগ্রোরা সাদা মানুষের সমান নয়; দাস রাখা, উচ্চতর জাতির অধিকার, তার প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক অধিকার। ”

    ল্যাঙড়া তৈমুর : মোঙ্গোলিয়াতে আমার একখানা পেল্লাই মূর্তি বসিয়েছে। কেউ আবার সেটা নিয়ে জল ঘোলা করবে না তো ?

    চেঙ্গিজ খান : না রে ! মোঙ্গোলিয়া নিয়ে পৃথিবীর অতো চিন্তা নেই।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমার দেশে দুর্ভিক্ষও হয় না। এতো পশু, তাদের থেকেই যথেষ্ট দুধ-চর্বি-মাংস পাওয়া যায়।

    গুলবদন পিসি : আবুল ফজল ওনার ‘আইন-ই-আকবরি’ বইতে লিখে গেছেন, মোগল যুগে কার্যত বাস্তবেই ছিল ‘লাঙ্গল যার জমি তার’ এই সুনীতি। ব্রিটিশদের নির্যাতনমূলক রাজস্ব নীতি, বিশেষ করে কুখ্যাত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’ সুবে বাংলার কৃষক পথে বসে, আর বেনিয়া মুৎসুদ্দিরা নিলামের জমি জলের দামে কিনে নিয়ে নতুন জমিদার সেজে বসে। তাদের হাতে ছিল নগদ টাকা। অথচ গৃহস্থদের কাছে ছিল জমি আর শস্য। ব্রিটিশরা ফসল দিয়ে রাজকর পরিশোধের হাজার বছরের নীতি পাল্টিয়ে নগদ অর্থে কর শোধের বন্দোবস্ত করায় অবস্থাপন্ন কৃষকরাও ভূমিহীন খেতমজুর হয়ে পড়ে, আর নতুন বেনিয়া মুৎসুদ্দিরা জমির মালিক হয়ে যায়। আল-হিন্দে আবাদ অনুযায়ী ভূমি করের চমৎকার আর বাস্তব বিধান চালু ছিল। যে নতুন চতুর মাড়োয়ারি ও বানিয়া বাবুশ্রেণী সমাজের নতুন হর্তাকর্তা হয়ে ওঠে তাদের ঘিরে সমাজের চিহ্নিত শোষক ঠগ ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীদের একটি অপবিত্র সংঘ গড়ে ওঠে, যার মধ্যে ছিল রাজানুগত আমলা, নায়েব, বেনিয়া, দাদনদার, সুদখোর, গোমস্তা, পাইকার, রাখিদার আর শ্রফ বা ব্যাংকার। এই নব্য সুবিধাখোর, সুদখোর চক্র ব্রিটিশ জবরদখলকে কায়েমি করে রাখে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে এসব শুনে।

    বাবর : শাহজাহান, তুই যেন কী বলতে চাইছিলিস ? শাহজাহান : আমি আমার বেগম আর প্রেমিকার জন্যে যে তাজমহল বানিয়েছি, তা আমাদের দুজনকে এমন অমরত্ব দিয়েছে যে পৃথিবীতে সে কথা বলে বেড়াতে হয় না।

    আওরঙজেব : ফালতু কথা। আব্বাহুজুর জানতেন যে নানা শহরে বিশাল আর সুন্দর নকশার অট্টালিকা তৈরি করে রেখে গেলে অমর হয়ে যাওয়া যাবে। আমিও একটা গুরুত্বপূর্ণ বই লিখিয়েছি, যার জন্য আমার ভক্তরা আমায় মনে রাখে। এদেশে ভুল কারণে হলেও, মনে রাখে। পাশের দেশের লোকেরা আমার জন্য গর্ব করে ; ছেলে আর নাতি হলে আমার নামে নাম রাখে। আব্বাহুজুর কতো অ্যান্টিপ্রপাগাণ্ডা করেছেন জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে যে উনি আসতেই চাইলেন না এই জমায়েতে, যখন কিনা আমার বিরুদ্ধে নানা লোকের নানা প্রপাগাণ্ডা সত্বেও এসেছি। জাহাঙ্গিরও নিজের ছেলে খুসরু মির্জার চোখ অন্ধ করে দিলেন আর আব্বাহুজুর অন্ধ লোকটাকে এতো ভয় পেতেন যে তাকে দুর্গের ভেতরেই খতম করে দিলেন। আব্বাহুজুর প্রায়ই অন্য ধর্মের সাধু-সন্তদের ধর্মকথা শোনার নাম করে আগ্রায় ডেকে আনতেন। ওনার ধর্মনিরপেক্ষতার ফাঁদে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে উনি তাদের আস্তিকান্তরিত হবার হুকুম দিতেন। যারা ঐ হুকুম মেনে নিয়ে আস্তিকান্তরিত হতো তারা বেঁচে যেতো। বাকিদের পরদিন সকালেই নানা রকম পৈশাচিক অত্যাচার করে খুন করা হত। সব থেকে বেশী অবাধ্যদের হাতির পায়ের তলায় পিষে মারা হত। তাছাড়া ওনার প্রাসাদের মধ্যে ঘন ঘন যৌন দাসীদের মিনা বাজার বসিয়ে সেখানে জোর করে ধরে আনা শয়ে-শয়ে কাফের মেয়েদের বেচা-কেনা চলতো, আব্বাহুজুরের জন্য ধরে আনা শয়ে-শয়ে কাফের মেয়েকে উপহার হিসেবে দেয়া, সরকারি খরচে বেশ কয়েকশো নৃত্যপটিয়সী যৌনদাসীর ভরণপোষণ, হারেম সুরক্ষার জন্য কয়েকশো খোজা প্রহরী, ইত্যাদির মধ্য দিয়ে কামুক আব্বাহুজুর ওনার কামনা ও লালসা চরিতার্থ করতেন। একবার আব্বাহুজুর ফতেপুর সিক্রি অবরোধ করে নির্মম অত্যাচারের মধ্য দিয়ে কাফের প্রজাদের সর্বস্ব লুট করেন আর অভিজাত হিন্দু মহিলাদের ধর্ষণ করার আর মাই কেটে ফেলার হুকুম দেন।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : সেটা কী ? বইয়ের নাম কী ?

    আওরঙজেব : ফতোয়ায়ে আলমগীরী, যাকে আমার ভক্তরা বলে ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া। বইটা ইসলামি আইন সংকলন, যা সেই থেকে এই দেশের আইন ছিল। সুন্নি হানাফি মাজহাবের ভিত্তিতে শরিয়া আইন এতে সংকলিত হয়েছে। অনেক আলেম এই বই লেখায় মদত দিয়েছেন। এতে কুরআন, সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুন্না আবু দাউদ ও জামি’আত-তিরমিযী থেকে সব লেখা ইনক্লুড করিয়েছিলুম। বইতে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতির সাপেক্ষে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, দাস, যুদ্ধ, সম্পদ, আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, বিনিময়, কর, অর্থনীতি ও অন্যান্য আইন আর আইনি নির্দেশনা দেয়া আছে। একশো হানাফি আলেম বইটা সম্পাদনায় অংশগ্রহণ করেছিল। সম্পাদক-মন্ডলীর সভাপতি ছিল শায়খ নিজামুদ্দিন। বইতে বড়-বড় অক্ষরে লেখা আছে তা ইমাম আবু-হানিফার মাজহাব।

    শাহজাহান : কিন্তু তোর ভাষা তাঁবাদি হয়ে গেছে। তুর্কি, ফারসি, হিন্দুস্তানি মিশিয়ে আমার দরবারে যে উর্দুভাষা চালু করেছিলুম, এখন লোকে সেই ভাষা বোঝে। বাহাদুর শাহ জাফর, গালিব, ফিরাক, ফয়েজ, জোশ মলিহাবাদি, মীর তাকি মীর, হোসেইন-উদ-দৌলা এই ভাষায় শায়রি করেছে।

    আওরঙজেব : যতোই যাই বলো, তোমার আর জাহানারার শাহজাহানাবাদ শহর তো ধ্বংস করে দিয়ে গেছে নাদির শাহ। যেটুকু টিকে ছিল, তাও ফিরিঙ্গিরা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। তোমার বাপ জাহাঙ্গির নিজের ছেলে খুসরু মির্জার সমর্থকদের শূলে চড়িয়ে মেরেছিল চাঁদনি চকের দুপাশে দাঁড় করিয়ে আর তা দেখার জন্যে খুসরুকে হাতির পিঠে বসিয়ে চাঁদনি চকে নিয়ে গিয়েছিল হাঁকিয়ে। জাহাঙ্গিরনামা পড়েছো তো ?

    শাহজাহান : জানি, জাহানারাকে হিংসে করিস, ও আমার সমর্থনে যুক্তি দেয় বলে। আমিও জানি, তুই ক্রীতদাসী হিরা বাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলিস আর মেয়েটা অল্পবয়সে মারা গেল বলে দিওয়ানা হয়ে গিয়েছিলিস। বুড়ো বয়সে মুত্তা রাখেল উদয়পুরী বাইয়ের কবজায় ছিলিস। উদয়পুরী বাই দারা শুকোহর রক্ষিতা ছিল বলে তুই ওই মেয়েটাকে নিজের বিছানায় তুলেছিলিস। ওরা তো ছিল নাস্তিক, তার বেলায় ? এদিকে বিবাহিত স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গ আস্তিকদের অনুমোদন করে না। তাই মুত্তা। ‘মুত্তা’ বা ‘মুত্তাই’ হচ্ছে অস্থায়ী বিয়ে। নিকার মতো আইনানুগ নয়, কিন্তু বিয়ে তো বটে। তা তুমি যত খুশি মুত্তা করো, কেউ কিচ্ছুটি বলতে আসবে না। এক মুত্তা বেগমের ওপর থেকে বাদশার দিল উঠে গেল তো তার বদলে নতুন কোনো হাসিন মুত্তা বেগমের আবির্ভাব হয় শাহি হারেমে।। নবাব আর শাহজাদাদের প্রথম চার বিবিই শুধু বেগম। বাকিরা মহল। বেগমদের জোর তাদের খানদান, মুত্তা বেগমদের সম্বল তাদের রূপ। তা উদয়পুরির রূপ ছিল আর অদাও। এ দিয়েই সে চুরি করেছিল তোর দিল। তুই ছিলিস উদয়পুরি অন্তঃপ্রাণ। যে অপরাধ করলে অন্য লোকের গর্দান যায়, উদয়পুরি দুষ্টুমি করে সেই কাজ করেছে তোর সামনেই।। মদ-মাদক নিষিদ্ধ করেছিলিস তুই। কিন্তু ফর্সা ত্বকের উদয়পুরির আবার দিন-রাত মদে ডুবে থাকা চাই। উদয়পুরিও ভালোবেসেছিল তোকে, দারার চিরশত্রুকে। দারা বেঁচে থাকতেই। সেই ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না, জানি। মুত্তা বেগম হলেও সাম্রাজ্যের আসলি সম্রাজ্ঞী ছিল উদয়পুরি, তোর বুড়ো বয়সের প্রেমিকা। তোর নয়নের মণি। তাই সন্তানধারণের অনুমতি পেয়েছিল। মুত্তা বেগম হওয়া সত্ত্বেও। মুহম্মদ কামবক্স, উদিপুরির আর তোর ছেলে। কামবক্সের যখন জন্ম, উদিপুরির বয়স তখন পঁচিশ কি ছাব্বিশ আর তোর পঞ্চাশ। সেই মুহম্মদ কামবক্সকে চিঠি লিখেছিলিস তুই। লিখেছিলিস, ‘তোমার অসুস্থ আম্মিজান আমার মৃত্যুর পর সানন্দে সতী হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে রাজি।’ মুত্তা উদয়পুরি বাই, সহমরণের দাবি করেছিল আর তুই কামবক্সকে চিঠি লিখে তা করতে বারন করেছিলিস। প্রেমে পড়া গুনাহ নয়। অন্য ছেলেদের পেছনে লেগেছিলিস কিন্তু মুহম্মদ কামবক্সকে ভালোবাসতিস।

    আওরঙজেব : আর তুমি কী করেছ ? জাহানারা আর রোশনারার বিয়ে দিলে জামাইরা-বেয়াইরা মিলে তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বাদশাহের সিংহাসন থেকে উৎখাত করে দিতো। তাই ওদের বিয়ে দাওনি। জাহানারা ওর আত্মজীবনীতে লিখেছে ও এক মালাউন সঙ্গীতশিল্পী রাজপুত যুবকের সঙ্গে প্রেমাবদ্ধ হয়েছিল। আত্মজীবনীতে জাহানারা আধুনিক ট্র্যাজিক নায়িকার মতো ব্যক্তিসত্ত্বার হাহাকার ও যন্ত্রণাকে লিপিবদ্ধ করেছে। তুমি পারমিশান দিলে বিয়ে করতে পারতো। ছেলেটা কাফের বলে দাওনি। তোমার ছোট মেয়ে চিমনি বেগমের সঙ্গে তোমার অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে দরবারে হাসাহাসি হতো। বড় মেয়ে জাহানারার সঙ্গেও তোমার অবৈধ সম্পর্ক ছিল। তুমি নিজেই তোমার সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যেই বলতে আর যুক্তি দেখাতে যে, গাছে ফল ধরলে বাগানের মালিরই অধিকার সবার আগে স্বাদ গ্রহণ করার। তুমি আমাকে ধর্মের আর প্রেমের গল্প শুনিও না।

    শাহজাহান : আকবর বাদশার হুকুম ছিল যে বাদশাদের মেয়েরা বিয়ে করবে না। ওনার নিজের ভগ্নিপতি ওনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, ভুলে গেলি ? আকবর সেই জন্য ওকে কোতল করার হুকুম দিয়েছিলেন। এমন আজগুবি তর্ক জুড়িস ! ওরা নিজেরাও বিয়ে করতে চায়নি, মনের মতন বর পায়নি বলে। জাহানারার সুফিসঙ্গ পছন্দ বলে বিয়ে করেনি। তুই ওকেও আমার সঙ্গে আগ্রার কেল্লায় বন্ধ করে রেখে দিলি। তোর আতঙ্কে দারা শুকোহ’র বউ নাদিরা বেগম আত্মহত্যা করে নিয়েছিল।

    আওরঙজেব : ওই ফিরিঙ্গিরা মহাবিদ্রোহের পর কী করেছে জানো ? তোমার কিলা-এ-মুবারক, যাকে এখন লাল কেল্লা বলে, সেখানকার বেগমদের আর রাখেলদের ধরে-ধরে ধর্ষণ করেছে। তাজমহলে বাজনা বাজিয়ে সাহেব-মেমরা সন্ধ্যাবেলা রোজ নাচতো। ওই গালিবই লিখেছে, লাল কেল্লা থেকে পাগলের মতন বেরিয়ে দৌড়োতে-দৌড়োতে সুন্দরী বেগম আর খাতুনরা ছেঁড়া জামাকাপড়ে চাঁদনি চকে কাঁদছে, ফিরিঙ্গিদের থেকে প্রাণে বাঁচার জন্য।

    শাহজাহান : তুইই তো দাক্ষিণাত্যে গিয়ে বসে রইলি, দিল্লিকে, আগ্রাকে, লাহোরকে কমজোর করে দিলি। শিবাজী তোর ফাঁদ কেটে উড়ে গেল বলে বুড়ো বয়েস পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যে বসে রইলি। তোর নাতিপুতিগুলো আরও কমজোর করে দিল। ফিরিঙ্গিরা ঢুকে পড়ল। হাতে বাজপাখি নিয়ে ছবি আঁকিয়ে ভেবেছিলিস, দাক্ষিণাত্যে বসে দিল্লি-আগ্রাকে সুরক্ষিত রাখবি।

    পাগলা তুগলক : আমার মনে হয় ইনব্রিডিঙের কারণে বংশধারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন: “যে সম্প্রদায়ের মহিলারা বাইরের কোন পুরুষকে বিবাহ করে না এবং পুরুষেরা বাইরের কোন মেয়েকে বিবাহ করে না, তাদের সন্তান হয় বোকা ধরনের। (আল ইনতিকা ফি ফাদায়িলিস ছালাছাতিল আয়িম্মাঃ ১/৯৮)। এছাড়া ইমাম গাজজালী পাত্রী পছন্দ করার ব্যাপারে যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, তার মধ্যে একটা হল– পাত্রী যেন নিকটবর্তী আত্মীয় না হয়। কেননা, তা তাদের জৈবিক কামনাকে কমিয়ে দেবে। (ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন:২/৪১)। নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজন যেমন-ফুফাতো, চাচাতো, মামাতো, খালাতো ভাই বোনদেরকে বিবাহ করলে সন্তান দুর্বল হয় বলে অনেক ইসলামিক স্কলারের অভিমত। সে জন্য বলা হয়, বিবাহ দূরবর্তীদের সাথে হলেই ভালো হয়। মোগলরা এতোশত মানতো না। আলীবর্দী খানের কোনও ছেলে ছিল না। তাঁর ছিল তিন মেয়ে। তিন মেয়েকেই তিনি নিজের বড়ভাই হাজি আহমদ-এর তিন ছেলে, নোয়াজেশ মোহাম্মদের সাথে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সাথে মেজ মেয়ে এবং জয়েনউদ্দিন আহম্মদের সাথে ছোট মেয়ে আমেনা বেগম-এর বিয়ে দেন। ঘসেটি বেগম এসেছেন আপনাদের জমায়েতে।

    তোতলা তুগলক : এএএ ছোঁছোছোড়াটা উউউপদেশ দেদেদেবেই। পাপাপারা গেগেগেলো না এএএকে নিনিবিবিয়ে।

    চেঙ্গিজ খান : আরে তোমরা বাপ-বেটায় ঝগড়া করছ কেন ? কোথায় আজকে সবাই মিলে মৌজমস্তি করবে, তা নয় ঝগড়া আরম্ভ করে দিলে।

    মালিক অম্বর : এই অওরঙজেব লোকটা নিজের বাপের তাজমহলের নকল একটা বাড়ি হাঁকিয়েছে। ওকেই জিগ্যেস করুন সেটা কেমন হয়েছে। লোকে দেখতে যায় আর ছি-ছি করে। ওর নামের রাস্তার নাম দিল্লিতে অলরেডি পালটে দেয়া হয়েছে। ওর নামে শহরের নামও দিনকতকে পালটে যাবে, দেখে নেবেন।

    আওরঙজেব : যাবে তো যাবে। আমি আমার কাজ কারবারের কারণে অনেকের মনের ভেতরে বংশপরম্পরায় থাকবো।

    শাহজাহান : তুই তো উদয়পুরি বাইকে ভালোবাসতিস। ওর সঙ্গে তো নিকা করিসনি, অথচ ওর ছেলের বাপ হলি। উদয়পুরি বাইও তোকে ভালোবাসতো, তার প্রমাণ আছে।

    মালিক অম্বর : শাহজাহান আমাদের রাজত্ব দখল করেছিলেন বলে আওরঙজেব সেখানে গিয়ে লাঠি ঘুরিয়েছিল। মোগল সম্রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তে আহমেদনগরের নিজামশাহী রাজ্য ছিল। আমি ছিলুম প্রধানমন্ত্রী। আমি মারা যাবার পর আমার ছেলে ফতেহ খান প্রধানমন্ত্রী হল। নিজামশাহী সুলতান মুর্তজা নিজাম গায়ে পড়ে আমার ছেলে ফতেহ খানের সঙ্গে ঝগড়া আরম্ভ করেছিল। রাজ্যের সুলতান মর্তুজার সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরম্ভ হলে, সুলতান মর্তুজা ফতে খানকে বন্দী করে জেলে পুরে দিলো। পরে উনি ফতে খানকে মুক্তি দেন। ফতে খান এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মোগলদের সঙ্গে ষড় করে, সুলতান মর্তুজাকে বন্দী করেছিল, আর ওনার নাবালক ছেলে হুসেন শাহকে সিংহাসনে বসিয়েছিল। ফলে ফতে খান রাজ্যের প্রকৃত সুলতানে হয়ে যায়। এই সময় শাহজাহান, আপনি, আহমেদনগর জয় করার সিদ্ধান্ত নেন। মোগল বাহিনী দৌলতাবাদ দুর্গ অবরোধ করে। ফতে খান দশ লক্ষ টাকা শাহজাহানকে ঘুষ দিয়ে ছাড়া পায় আর দুর্গটা মোগলদের দিয়ে দেয়। সুলতান হুসেন শাহকে গোয়ালিয়র দুর্গে পাঠানো হয়। আর ফতে খানকে মোগল সরকারের উচ্চপদ দেওয়া হয়।

    অওরঙজেব : তবে ? আমি কখনও ঘুষখোরি করিনি। আমি যা বলেছি, ঠিকই বলেছি। মোগল সম্রাটদের মধ্যে আব্বাহুজুর ছিলেন সবচেয়ে বিলাসী। আকর্ষণীয় স্থাপত্যের প্রতি ওনার শুধু ঝোঁকই ছিল না; বরং তা রীতিমতো এক নেশায় পরিণত হয়েছিল। ফলে আল-হিন্দ জুড়ে গড়ে উঠেছে এমন সব শৈল্পিক নিদর্শন, যা পর্যটকরা দেখতে আসে। আরজুমান আরা বেগমের সঙ্গে আব্বা হুজুরের প্রথম দেখা হয় ১৬০৭ সালে। তাঁর রূপে আর সেক্সুয়াল আকর্ষণে মোহিত হয়ে যান পনেরো বছর বয়সী আব্বাহুজুর। এরপর তড়িঘড়ি করে সেই বছরেই এঙ্গেজমেন্ট। আমার দাদাহুজুর জাহাঙ্গীরের বউ নূরজাহান ছিলেন আরজুমানের ফুফু। কিন্তু এঙ্গেজমেন্টের দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ১৬১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয় তাঁদের। আব্বাহুজুর তাঁর নামকরণ করেন ‘মমতাজ মহল’। তবে মমতাজ কিন্তু আব্বাহুজুরের একমাত্র স্ত্রী ছিলেন না। ওনার আরও বেগম ছিলেন, এমনকি মমতাজের পরও উনি আরেকটা বিয়ে করেছিলেন, এমনই সেক্সস্টার্ভড মানুষ। মমতাজের আগে একবার বিয়ে হয়েছিল, আব্বাহুজুরের ষড়যন্ত্রে সেই সম্পর্কের অবসান ঘটে। তাঁদের দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয় মাত্র উনিশ বছর। এই উনিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে অম্মিজানের কোলজুড়ে আসে চোদ্দটা বাচ্চা। ভেবে দেখুন আপনারা। মারা যান চোদ্দতম সন্তান প্রসবের সময়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে। আব্বাহুজুরেরে কাছে প্রেমের সংজ্ঞা ছিল বছরান্তে একটা করে সন্তান ! আব্বাহুজুরের সেক্সুয়াল চাহিদা উবে যায়নি। অম্মিজান মারা যাবার বছর পাঁচেক পর তাঁরই ছোট বোনের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

    ঘসেটি বেগম : বলছিস কী আওরঙজেব ভাইজান !

    আওরঙজেব : হ্যাঁ বেগম। ওনার পুরো নাম আবুল মুজাফফর শিহাবুদ্দিন মুহম্মদ শাহজাহান সাহিব কিরান-ই-সানী। আব্বাহুজুরের যেমন শৈল্পিক মন ছিল, তেমনি সেই শিল্পের জন্য অহংবোধও ছিল প্রবল। পরবর্তী সময়ে যদি সেসব শ্রমিকের হাত ধরে তাজমহলের মতো অন্য কোনো অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা পৃথিবীর কোনো প্রান্তে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে আব্বাহুজুরের নাম অনেকটা স্তিমিত হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় চরম বর্বরতার পথ বেছে নেন উনি, তাদের আঙুল কাটার হুকুম দেন। তাজমহলে শ্বেতপাথরের ফলকে ফলকে জগদ্বিখ্যাত যে কারুকার্য খচিত রয়েছে, তাতে শুধু শ্রমিকের ঘাম নয়, মিশে আছে তাজা রক্তও। এসব ছবি যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন তাজমহলকে প্রেমের নিদর্শন বলতে দ্বিধাবোধ কাজ করলে তা নিশ্চয়ই খুব একটা অযৌক্তিক হবে না। জীবনের শেষ দিকে তাই আমি আব্বাহুজুরকে বন্দী করে রেখেছিলুম। মারা যাবার সময়ে ওনার নাম ছিল ‘শাহানশাহ আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম, মালিক-উল-সালতানাত, আলা হযরত আবু’ল-মুজাফফর শাহাব উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ জাহান প্রথম, সাহেব-ই-কিরান-ই-সানী, পাদশাহ গাজী জিল্লু ‘ ল্লা, ফিরদৌস-আশিয়ানি, শাহানশাহ – ই – সুলতানন্ত উল হিন্দিয়া ওয়াল মুঘালিয়া’। কী দরকার ছিল অমন নাম নেবার?

    ঘসেটি বেগম : কিন্তু তাজমহল ছাড়াও দিল্লির জামা মসজিদ, পাকিস্তানে সিন্ধের শাহজাহান মসজিদ, লাহোরের মতি মসজিদ, লাহোরের শালিমার গার্ডেন, লাহোরের ওয়াজির খান মসজিদ, আগ্রার কেল্লা, লাহোরে নওলক্ষা দুর্গ, দিল্লির কেল্লায় দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, ময়ূর সিংহাসন উনিই তো তৈরি করে গিয়েছেন।

    আওরঙজেব : সেই কথাই তো তোমাদের বোঝাতে চাইছি। ইজ-উন-নিসা, হাসিনা বেগম, ফতেহপুরি মহল, মোতি বেগম, কুদসিয়া বেগম, আকবরাবাদি মহল — ওনাদের কেন অতোগুলো করে বাচ্চা হয়নি। হারেমে আরও কতো রাখেল, বাঁদি, ক্রীতদাসী ছিল। ওনার জন্যেই আমরা ভাইয়ে-ভাইয়ে আর বাপ-ছেলেতে খুনিখুনি করে মরলুম।

    শাহজাহান : তোর উচিত ছিল ফ্যানি হিল বইটা ফারসিতে অনুবাদ করিয়ে পড়া। প্রেম করেছিস আবার রোয়াবও দেখাচ্ছিস।

    ঘসেটি বেগম : ফ্যানি হিল কার লেখা ? ফারসি, তুর্কি, বাংলা, যে ভাষায় হোক অনুবাদ হলে আমাকে এক কপি দিও। লোকে ভাবে আমার হৃদয়ে প্রেম নেই।

    চেঙ্গিজ খান : তুই অমন করছিস কেন আওরঙজেব ? মশা কামড়াচ্ছে নাকি ?

    শাহজাহান : বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ফ্যানি হিলের মত উপন্যাস খুব কম আছে যা এত বার ছাপা হয়েছে। উনিশশো সত্তর সালের আগে উপন্যাসটার প্রকাশ আইনি স্বীকৃতি পায়নি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ব্রিটেন থেকে আমেরিকা, ফ্রান্স, আল-হিন্দ আর অন্যান্য বহু দেশে বইটার বেআইনি সংস্করণ ছাপা হয়েছে। প্রথম প্রকাশের ঠিক এক বছর পরে লেখক ক্লিল্যাণ্ডকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অশ্লীলতার দায়ে ব্রিটেনের প্রিভি কাউন্সিলের সামনে তাঁকে হাজির হতে হয়। সরকারি ভাবে প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বাজার থেকে উপন্যাসটা তুলে নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সব অভিযোগ কাটিয়ে উঠে, ধ্রুপদি সাহিত্যের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়েছে ফ্যনি হিল। পাঠক সমাজে উপন্যাসটার প্রভাব এত প্রবল ছিল যে লণ্ডনের বিশপ একবার ভূমিকম্পের জন্য বইটিকে দায়ী করেছিলেন।

    ফ্যানি হিলের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য, উপন্যাসটির ভাষা সম্পূর্ণ রূপে বিশুদ্ধ সাহিত্যের, কোনও ভাবেই তার গায়ে বটতলা সাহিত্যের তকমা দেগে দেওয়া যায় না। অক্ষতযোনি ফ্যানি যখন এক কুৎসিত কামুক বেশ্যাসক্ত ইংরেজকে অনুনয় করছে তাকে রেহাই দেওয়ার জন্য, তখন বিকৃত উত্তেজনার বদলে পাঠকের অন্তর ব্যথায় টনটন করে ওঠে। ‘…সে আবার আক্রমণ করছে ফ্যানিকে, জাপটে ধরছে,…উরু দুটিকে নিরাবরণ করছে… ’ – ফ্যানির এমন দুর্দশা পড়ে পাঠকের মনে কাম নয়, জেগে ওঠে করুণা, ক্রোধ।

    উপন্যাসটা মূলত ফ্যানির দুটি দীর্ঘ চিঠির উপর দাঁড়িয়ে। একটি চিঠি নিয়ে প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় চিঠি নিয়ে পরের খণ্ড। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে, বাবা-মাকে হারিয়ে, ল্যাঙ্কাশায়ারের একটি গ্রামের মেয়ে ফ্যানি, ক্রীতদাসীর চাকরির খোঁজে লণ্ডন শহরে পৌঁছয়। সেখানে তাকে ফুসলে নিয়ে যাওয়া হয় পতিতালয়ে, যেখানে তার সঙ্গে চার্লসের পরিচয় হয়। চার্লসের প্রেমে পড়ে যায় ফ্যানি। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের পাতায় পাতায় বর্ণিত হয়েছে চার্লস ও ফ্যানির প্রেমের সম্পর্ক। কখনও তা পৌঁছেছে কবিতার ভাষায়। ‘…চার্লস আমাকে দেখতে লাগল। আমার শরীরের সব ঐশ্বর্য তার দৃষ্টি ধীর ধীরে উপভোগ করছে। তার হাত দুটি একই সঙ্গে ব্যস্ত আমার শরীরের সর্বত্র।…আমার তাজা সুঠাম অবয়ব, আমার অঙ্গের নিজস্ব ভঙ্গি-ছন্দ, সব কিছু যেন ওকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে। কিন্তু এই শরীরের ওপর দিয়েই তো কিছুক্ষণ আগে আমারই উৎসাহে ঘটে গেছে ওর প্রবল প্রবাহ। এখন ও চাইছে ব্যথা ও ক্ষতর জায়গাগুলোকে মায়াময় চোখ দিয়ে দেখতে।…কিছুক্ষণ পরেই আবার নতুন উদ্যমে শুরু হল ঝড়।’

    ফ্যানি হিলের মত উপন্যাস বিশ্ব সাহিত্যে খুব বেশি নেই যার ভাষা, চরিত্রায়ন ইত্যাদি সব কিছু যৌনতার বর্ণনাকে নস্যাৎ করে সামগ্রিক ভাবে ক্লিল্যান্ডের সৃষ্টিকে অনেক উঁচু আসনে বসিয়েছে। পরবর্তী কালে ক্লিল্যান্ডের লেখা আরও দুটি উপন্যাস যথাক্রমে ‘দ্য সারপ্রাইজেস অফ লাভ’ বা ‘দ্য উওম্যান অফ অনার’ কিন্তু কখনও ‘ফ্যানি হিলের’ সমান উচ্চতায় উঠতে পারেনি। আসলে লেখক ফ্যানিকে সাধারণ বেশ্যাদের তুলনায় এক অন্য অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন যেখানে ফ্যানি, তার বেশ্যালয়ের যৌনকর্মের মধ্যে ব্যর্থতা বা অনুশোচনা বা হা-হুতাশ নয়, অনুভব করে এক চরম শারীরিক আনন্দ যার সঙ্গে এক অর্থে নারীর স্বাভাবিক ও ন্যায্য শরীরি মুক্তির কথাও অব্যক্ত হয়ে থাকে যা সেই সময়ের পাশ্চাত্য সমাজে ছিল কল্পনারও বাইরে। ‘আমার সুন্দর পুরুষটি তখন যেন আমার শরীরের সঙ্গে বিচিত্র প্যাঁচে পাকে-পাকে জুড়ে আছে, যাতে আমাদের শরীরের গোপন অন্দরমহল পরস্পরকে ছুঁতে পারে।…’

    ঘসেটি বেগম : দারুন, দারুন, আমাকে প্লিজ এক কপি যোগাড় করে দিন শাহানশাহ আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম, মালিক-উল-সালতানাত, আলা হযরত আবু’ল-মুজাফফর শাহাব উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ জাহান প্রথম, সাহেব-ই-কিরান-ই-সানী, পাদশাহ গাজী জিল্লু ‘ ল্লা, ফিরদৌস-আশিয়ানি, শাহানশাহ – ই – সুলতানন্ত উল হিন্দিয়া ওয়াল মুঘালিয়া।

    খোকা তুগলক : আমারও এক কপি চাই।

    তোতলা তুগলক : তুতুতুইই কীকী করবি ?

    চেঙ্গিজ খান : কী রে আওরঙজেব, কী হয়েছে ?

    আওরঙজেব : না চেঙ্গিজদাদু, এই ছোঁড়া-ছুঁড়িগুলো আমাকে বিরক্ত করছে :

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ছোঁড়া-ছুঁড়ি ? কোথায় ছোঁড়া ? কই ছুঁড়ি ? আসার সময়ে আফিমের শরবত আর মদ মিশিয়ে খেয়ে এসেছিস ? তুই তো ওসব ছেড়ে দিয়েছিস শুনেছিলুম।

    আওরঙজেব : দেখতে পাচ্ছেন না ? আমি তো স্পষ্ট দেখছি। অ্যাই, তোমরা বিরক্ত কোরো না। লেখা নেবার হলে অন্যদের কাছে যাও। আমি আর কবিতা লিখি না। ফরমান লিখি।

    রুহ : হিঁঃ হিঁঃ হিঁঃ, আমি দারা শুকোহ, চিনতে পারছিস না ভাইজান ! আমাকে কোথায় দাফন করেছিলিস রে? আল-হিন্দের প্রত্নতাত্বিকরা হুমায়ুন-মকবরায় তিনশো কবর খুঁড়ে, ডিএনএ জাঁচ করিয়ে, আমার হাড়গোড় পায়নি!

    রুহ : হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ, আমি জাহানারা, বাদশা বেগম। ভাইজান, ভুলে গেলি ?

    রুহ : কী রে ভাইজান, মনে পড়ছে না ? আমি মুরাদ বকশ। তুই আসবি শুনে আমরা দেখা করতে এসেছি।

    রুহ : কেমন আছো আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর বাদশা গাজী, প্রথম আলমগীর ? আমাকে চিনতে পারছ না ? আমি সম্ভাজি, মারাঠা রাজ্যের শাসক। নিজেও তো কতো বড়ো নাম হাঁকিয়েছিলে ?

    রুহ : আমাকে চিনতে পারলি না ? আমি নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর।

    রুহ : আমি শাহ সুজা। মনে পড়েছে ?

    রুহ : আমি আপনার ছেলে আকবর। মনে পড়ছে আব্বু ?

    জোড়া-রুহ : কী বুঢঢা ? আমরা দুজন বাচ্চা ছেলে, চিনতে পারছো ? আমাদের বাবার নাম গুরুগোবিন্দ সিংহ !

    রুহ : কী চাচাজান ? চিনতে পারছো ? আমি সুলেমান শিকোহ, দারা শুকোহ’র ছেলে। মনে পড়ছে কেমন করে আমায় খুন করেছিলে ?

    রুহ : আব্বাহুজুর ! আমি জেব-উন-নিসা, তোমার মেয়ে, নব্বুই বছর বয়স হয়ে গেল, এখনও গদি আঁকড়ে আছো ? মনে পড়ছে আমাকে ? সেলিমগঢ় দুর্গে সারাজীবন বন্দি করে রেখেছিলে ?

    চেঙ্গিজ খান : আরে, অমন করে পালালো কেন আওরঙজেব ? ময়ুর সিংহাসনে তো বসেছিল একবার !

    ভাগমতি : আপনারা আমার কথা শুনছেন না। ওই ভদ্রলোক বুড়ো হয়ে গেছেন, আত্মীয়স্বজন নেই, তাই হয়তো মাথাটা একটু বিগড়ে গিয়ে থাকবে।

    আওরঙজেব : দেখে নেবো। সব্বাইকে দেখে নেবো। আমাকে চেনো না। দেখাচ্ছি মজা। কফিহাউস থেকে বেরিয়ে নিচে এসো, টের পাবে কতো গমে কতো পরোটা। আমার চামচারা নিচে অপেক্ষা করছে তোদের আড়ং ধোলাই দেবার জন্য। খুলদাবাদ থেকে ট্রেন বাস বদল করে-করে অনেক কষ্টে আসতে হয়েছিল।

    মালিক অম্বর : এই লোকটার ফলোয়াররা পাশের দেশের বাঙালি-বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব,, ছাত্রনেতা শেখ কামাল, শেখ জামাল, তাদের নতুন বিয়ে-করা বউ সুলতানা কামাল আর রোজী জামালকে খুন করেছিল। তাদের হাতের মেহেদির রং বুকের তাজা রক্তে মিশে একাকার হয়ে গেল। তারা খুন করল মুজিবের ভাই শেখ আবু নাসেরকে, সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কর্নেল জামিলকে, যিনি নিরাপত্তা দেবার জন্য ছুটে গিয়েছিলেন। খুন করল ডিউটিতে থাকা পুলিশ অফিসার আর কর্মকর্তাদের। আর সব শেষে খুন করল শেখ রাসেলকে, যার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। ওদের ভাষায়, রাসেলকে মার্সি মার্ডার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে একই সময়ে তারা খুন করেছিল যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনিকে আর তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে। খুন করেছিল কৃষকনেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে, তাঁর তেরো বছরের মেয়ে বেবিকে। রাসেলের খেলার সাথি দশ বছরের আরিফকে। বড়ো ছেলে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বড়ো ছেলে চার বছরের সুকান্তকে, তাঁর ভাইয়ের ছেলে সাংবাদিক সেরনিয়াবাত নান্টুসহ পরিচারিকা আর আশ্রিত কয়েকজনকে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : সব দোষ আওরঙজেবের নয়। এর জন্য ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজিও অনেকটা দায়ি।

    চেঙ্গিজ খান : কী বলছ হে !!

    মালিক অম্বর : হ্যাঁ, চেঙ্গিজদাদু। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল তাঁরই মন্ত্রিপরিষদ সদস্য খন্দকার মোশতাক, রাষ্ট্রপতি হওয়ার খায়েশে। খুনিদের দলে ছিল কর্নেল রশিদ, কর্নেল ফারুক, মেজর ডালিম, হুদা, শাহরিয়ার, মহিউদ্দিন, খায়রুজ্জামান, মোসলেম গং।

    শাহজাহান : খুনোখুনির কথা শুনে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে। এবার প্রেমের কথাই শোনা যাক।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ঠিক আছে ভাগমতিদিদি, আপনার প্রেমের কথা বলুন। এখন প্রেম সম্পর্কে আমার সুস্পষ্ট আইডিয়া হয়েছে, যদিও আমার কোনও প্রেমিকা ছিল না।

    ভাগমতি : তখন আমার প্রেমিক মাত্র চোদ্দ বছরের রাজপুত্র। একদিন মুসা নদীর পাড় ধরে আনমনে যাচ্ছিলেন রাজপুত্র, তখন দেখলেন যে অনেকেই মুসা নদীর ওপর নড়বড়ে কাঠের সেতু পেরিয়ে চলেছে ওপারে।কৌতুহলের বশে কয়েকজন কে প্রশ্ন করে জানলেন যে নদীর উল্টোদিকের জায়গাটার নাম যুক্তপুরা। সেখানে একটা গ্রাম আছে চিচলাম বলে।এই গ্রামে রূপসী নর্তকী আছেন, অসাধারণ কুচিপুড়ি নাচ করেন। কোন মানবীর পক্ষে সেই স্বর্গীয় নাচ করা সম্ভব নয়। উনি নিশ্চয়ই কোন শাপভ্রষ্টা দেবী, স্থানীয় মন্দিরে আজ সেই দেবী নাচবেন। এঁরা চলেছেন তাঁর নাচ দেখতে। সেই মেয়েটাই আমি, ভাগ্যমতি, আমি নিজের ছন্দে নাচছিলুম। তখন আমর কুড়ি বছর বয়স, আমাকে দেখে রাজপুত্র আমায় ভালোবেসে ফেললেন। আমার নাচ দেখার জন্য আর কোনও লোকের অধিকার রইলো না। শুধু রাজপুত্রের জন্যই আমি নাচতুম। তাঁর বাবা রাজপুত্রের এই অভিসার বন্ধ করতে পারলেন না। একবার মুসা নদীতে ভয়ঙ্কর বান এসেছে শুনে পাগলের মতন ঘোড়া ছুটিয়ে আমার কাছে পৌঁছনোর জন্য ঘোড়া শুদ্ধ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন রাজকুমার।

    শাহজাহান : তারপর ? দারুন প্রেম তো !

    ভাগমতি : এ ঘটনার পরে সুলতান ইব্রাহিম ছেলের যাতায়াতের জন্য মুসা নদীর ওপর পাথরের সেতু তৈরি করান যার এখনকার নাম পুরানা পুল। সুলতান ইব্রাহিম মারা গেলে সিংহাসনে বসেন আমার প্রেমিক রাজকুমার মহম্মদ কুলি কুতুব শাহ। সকলের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ওনার থেকে বয়সে বড় আমাকে উনি বিয়ে করেন। আমাকে দেওয়া ওনার উপহার ছিল এক নতুন শহরের পত্তন— ভাগ্যনগর। আমি তো কাফের হিন্দু ছিলুম। ইসলাম ধর্ম নিয়ে আমার নাম রাখা হয় ‘হায়দার মহল’ আর নতুন শহরের নাম হয় হায়দরাবাদ। যে বছর আমার প্রেমিক-স্বামী কুলি কুতুব শাহ মারা গেলেন, সেই বছর আমিও মারা গেলুম। আমাকে আমার প্রেমিকের পাশে গোর দেয়া হয়নি ; ইতিহাস থেকে আমাকে লোপাট করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার মেয়ে হায়াৎবক্স বেগমের কবর আছে, আমার জামাই মুহম্মদ কুতুব শাহ, ওদের ছেলে আবদুল্লা কুতুব শাহের সমাধি আছে ; এমনকি আবদুল্লা কুতুব শাহের গায়িকা প্রেমিকা তারামতির কবর আছে। আমি রয়ে গেছি গল্প হয়ে।

    ঘসেটি বেগম : ভাগমতিদিদি, গল্পের জোর বেশি হয় কবরের চেয়ে। আমাকে দ্যাখো। আমার তো একটা নাম আছে। অথচ লোকে আমাকে ঘসেটি বেগম বলে বদনাম করে।

    ভাগমতি : আমি উঠি ঘসেটি বেগম আপা। আমার তো কবর নেই। আমাকে আমার গল্পে ফিরে যেতে হবে।

    ঘসেটি বেগম : আমারও তো কবর নেই। আমার আর ওসামা বিন লাদেনের জলকবর। জলের তলায় গিয়ে দেখি ওসামা বিন লাদেন ইউ টিউবে সুচিত্রা-উত্তমের ফিল্ম দেখছে। বলছিল, মালাউন মেয়েরা যে এমন সুন্দরী হয় তা জানতো না। যদি জানতো তাহলে বোমা-বন্দুক নিয়ে খুনোখুনি খেলতো না। অনেকে ছিল আমাদের সঙ্গে। ফর্সামনতন একজন বউ তার নাম শ্রীদেবী আর একজন কালো বউ তার নাম হুইটনি হুসটন, ওরা দুজনে নেশা করে স্নানের টবে ডুবে মারা গিয়েছিল। আর ছিল ব্রায়ান জোনস, লে কর্বুজিয়, হার্ট ক্রেন, ডেনিস উইলসন, অরুণেশ ঘোষ, আরও অনেকে, নানা দেশের পোশাকে।

    ভাগমতি : আহা গো !

    ঘসেটি বেগম : জানো তো ? বব ব্যাটা আর মীরজাফরের সঙ্গে পলাশীর যুদ্ধে গোপন চক্রান্তে হাত মিলিয়েছিলুম। বলেছিলুম যতো টাকা লাগে দেবো। বব ব্যাটা আর মীরজাফর তা বিশ্বাস করেছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা যুদ্ধে হেরে মরে গেল, আর মীরজাফরটা ববের হাতের পুতুল হয়ে মসনদে চড়ে বসলো। ক্ষমতায় প্রভাব ছড়ানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলুম তা দুঃস্বপ্ন হয়ে গেল বব ব্যাটার আধিপত্যের কারণে। মোটা টাকা দিতে পারিনি বলে মীরজাফর আর ওর ছেলে মীরমিরন আমার পোঁদে লাগলো। আমাকে বন্দী করে পাঠিয়ে দিলো পুরোনো ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদে। তবু আমি নানান প্যাঁচ কষেছিলুম। ব্যাটারা চটে গিয়ে ভাবলো ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে। মীরজাফরটা কুষ্ঠ রোগে ভুগে মরেছে, বেশ হয়েছে। মিরন কয়েকজন অনুচরকে পাঠিয়েছিল জিনজিরায়। মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাবার নাম করে আমরা দুই বোন আমেনা বেগম আর আমাকে, সিরাজের নিকটাত্মীয়দের, নৌকায় তুলে বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর ঠিক মাঝনদীতে ওদের প্ল্যান অনুযায়ী মিরনের অনুচর আসফ খাঁ নৌকার তলার খিলগুলো খুলে দিয়েছিল। সলিল সমাধি হয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদীতে সিরাজের মা আর খালার। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরে মীরজাফরের ছেলে মিরন ব্যাটা মাথায় বাজ পড়ে মরেছিল, বেশ হয়েছিল, যেমন কর্ম তেমনি ফল।

    চেঙ্গিজ খান : কী রে ল্যাঙড়া ! তুই বলেছিলিস অনেকে আসবে কফিহাউসে। দারুন একখানা জমঘট হবে। কিন্তু সবাই তো আসছে আর চলে যাচ্ছে। তার চেয়ে চল খালাসিটোলায় যাই, ওখানে নিশ্চয়ই অনেক মালখোরকে পাওয়া যাবে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : উতলা হচ্ছেন কেন চেঙ্গিজদা ? আসবে, আসবে, আমি গুলবদন বেগম, গালিব, বাহাদুর শাহ জাফর, জিনত উন নিসা, মোহম্মদ শাহ রঙ্গিলা, সেনোরা জুলিয়ানা ডা কোসটা, চঞ্চল বাই, সুরোশ বাই, ধ্যান বাই, নাদিরা বানু, বৈরাম খাঁ, মহব্বত খান, সাদুল্লা, মীরজুমলা আর শাহজাহানাবাদের অনেককে বলেছি যে চেঙ্গিজদা আসছেন কফিহাউসে।

    শাহজাহান : ততোক্ষণ ওই প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখুন, কেমন পরস্পর ফিসফিসানিতে মশগুল।

    চেঙ্গিজ খান : ওনারা কে ? চিনিস ?

    শাহজাহান : চিনি চেঙ্গিজদাদু। লুঙ্গিপরা বাবরিচুল লোকটা হল চণ্ডিদাসদা, তার সামনে বিনা ব্লাউজের মেয়েটি রামিদিদি। গোবেচারা জবুথবু ভদ্রলোক হলেন জীবনানন্দদা আর ওনার সামনের সুন্দরীর নাম বনলতা সেনদিদি। মোটা মতন লোকটা, চুলে কলপ সাদা জুলফি, ওনার নাম সুনীলদা তার সামনে মেয়েটা, যদিও বয়স অনেক কম, তার নাম নীরাদিদি। নিজের মনে কথা বলছেন ওই লোকটা বিনয়দা আর ওনার সামনে ন্যাড়ামাথা মেয়েটি গায়ত্রীদিদি। ওপরে দেখুন বারান্দায় ওই চশমা-পরা লোকটা ভাস্করদা আর ওঁর সামনে, আমাদের দিকে পেছন ফিরে ওই মেয়েটির নাম সুপর্ণাদিদি। ওদের পাশের টেবিলে চুপ করে বসে আছেন দুজনেই, শক্তিদা আর শীলাদিদি। তার পাশের টেবিলে যাঁরা, তাঁরা বাংলাদেশি আবুল হাসান আর সুরাইয়া খানম। হামিদুর রহমান আর নভেরা আহমেদ।

    বাবর : এখানে হোমোরা আসে ?

    শাহজাহান : হ্যাঁ, ওই তো। অ্যালেনদা আর অরলভস্কিদা। ওনারা বিদেশ থেকে এসেছেন। এদেশের কারা হোমো বলতে পারব না। রঙিন মিছিল বেরোয় তাতে তো কবি বা কবিনীদের দেখিনি কখনও।

    চেঙ্গিজ খান : শাহজাহানাবাদের কথা বলছিল ল্যাঙড়া তৈমুর। জায়গাটা কোথায় ?

    শাহজাহান : চেঙ্গিজদাদু, আপনি সেনর ভাস্কো দা গামার মুখে শুনুন, নয়তো নিজেরই গুণগান করা হবে।

    ভাস্কো দা গামা : এখনকার পুরোনো দিল্লির নাম শাহজাহানাবাদ, তৈরি হয়েছিল জাহানারাবেগমের প্ল্যান অনুযায়ী। এখন আল-হিন্দের রাজধানি দিল্লি শহরের অংশ। শাহজাহানবাদ নামে পাঁচিল ঘেরা শহর হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল । শাহজাহান, সে সময়ের মোগল সম্রাট, আগ্রা থেকে মোগল রাজধানী দিল্লিতে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শহরটা তৈরি করতে তিরিশ বছর লেগেছিল। আল-হিন্দের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে পতনের আগে পর্যন্ত শাহজাহানাবাদ ছিল মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী। সুন্দর মসজিদ আর বাগানে সাজানো ছিল। রাজপুত্রদের, আর সম্রাটের বাড়ির সদস্যদের ভবনে ভরা ছিল। আল-হিন্দের অন্য জায়গা থেকে আসা লোকেদের ঢেউয়ের ফলে এখন অত্যন্ত জনাকীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, এটা এখনও মহানগর দিল্লির প্রতীকী হৃদয় হিসাবে কাজ করে। আর বাজার, স্ট্রিট ফুড, শপিংয়ের জায়গা আর মোগল স্থাপত্যের জন্য পরিচিত; পুরানো শহরের মাঝে বিশাল দাঁড়িয়ে আছে শাহজাহানের তৈরি জামে মসজিদ। সেসময়ের মাত্র কয়েকটা হাভেলি টিকে রয়েছে । শাহজাহানাবাদের ঠিক মাঝখানে দিল্লির লাল কেল্লা। তবে সেই লাল কেল্লা আর নেই। আর মাঝখানের জায়গাটার নাম এখন চাঁদনি চৌক।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : চাঁদনি চক নাম কেন ?

    ভাস্কো দা গামা : চাঁদনী চৌক বা ‘মুনলিট স্কয়ার’ শাহজাহানের মেয়ে জাহানারা বেগম তৈরি করেছিলেন। শাহজাহানাবাদে বিবি কা সেরাইয়ের সামনে ছিল একটা ঝিল, চারপাশে ছিল বাড়ি, আর চাঁদনি রাতে, এই ঝিলে চাঁদনি প্রতিবিম্বিত হয়ে ভবনগুলোকে আলোকিত করত – তাই এর নাম চাঁদনী চৌক। এখন আবার চাঁদনি চৌককে পুরোনো দিনের জৌলুস দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। লাল কেল্লা আর ফতেহপুরী মসজিদটির দু’পাশে চাঁদনী চৌক বাজারের সামনে দেড় কিলোমিটার পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে যা হবে কেবলমাত্র পথচারীদের জন্য। মোগল-যুগের স্হাপত্যের অনুকরণে প্রশস্ত ওয়াকওয়ে, জলের ব্যবস্হা, এটিএম, টয়লেট কমপ্লেক্স আর রাস্তার পাশে বসার বন্দোবস্ত থাকবে।

    চেঙ্গিজ খান : কী রে ল্যাঙড়া ! মীরজাফর, সিরাজ, মীরান, মুর্শিদকুলি খান, আলিবর্দী খান, ওদের খবর দিয়েছিলিস যে আমি কফিহাউসে গ্যাঁজাতে আসবো ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : জানেন তো চেঙ্গিজদা, মির্জা মুহম্মদ সিরাজউদ্দৌলা হলো আলীবর্দী খানের দৌহিত্র আর জৈনুদ্দীন আহমদ খান আর আমিনা বেগমের ছেলে। জানতে চাইছিল কোন ঘাটে নেমে কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউসে পৌঁছোতে হবে, আর সেখান থেকে সোনাগাছি কতোদূরে ! ব্যাটা আমাদের মতন তরোয়াল চালাতে শিখবে, তা নয়, মাগিবাজি আর কচিকাঁচাদের পোঁদ মারায় সময় নষ্ট করে। এও ইনব্রিডিঙের ফসল।

    ঘসেটি বেগম : ওরা না এলেই ভালো। আমি তো ট্রেনে করে এসেছি। ওরা এসে তোমাদের মিসোজিনিস্ট আড্ডাকে আরও নোংরা করে দেবে। যত্তো সব পিতৃতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র।

    ঢ্যাঙা তুগলক : একটিমাত্র চোখ, হেমলকে প্রতিবিম্বিত চক্ষুসদৃশ, তাহার দিকেই, মিলন অভিলাষিণী নববধূর দিকে চাহিয়াছিল, যে চক্ষু কাঠের, কারণ নৌকাগাত্রে অঙ্কিত, তাহা সিন্দুর অঙ্কিত এবং ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাসে সিক্ত, অশ্রুপাতক্ষম, ফলে কোথাও মায়া রহিয়া গেল।

    তোতলা তুগলক : নিজের মনে বিড় বিড় করা তোর গেলো না রে ঢ্যাঙা !

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ওই যে কে একজন এলেন। আমি তো চিনি না। তুমি কে গো বাছা ?

    সাবিত্রী নামবুদিরি : আমার নাম সাবিত্রী নামবুদিরি, কেরালা থেকে আসছি, মানে কোচিন। চেঙ্গিজবাবু কলকাতার কফিহাউসে আসছেন আর জব্বর আড্ডা হবে শুনে থাকতে পারলুম না। আমার গল্প তো আপনারা জানেনই না। শুনে আপনাদের লবডঙ্কার লঙ্কা ঝুলে পড়বে !

    ভাস্কো দা গামা : কেরালায় তো অনেক মালায়ালিকে আমরা আস্তিকান্তরিত করেছিলুম, আপনি কি তাদের বাড়ির কেউ ?

    সাবিত্রী নামবুদিরি : না, আমি ঘোর নাস্তিক। ছেষট্টিজন আস্তিকের কাছা খুলে নিয়েছি। রসিয়ে রসিয়ে বলব কিন্তু। আমি একাই নবজাগরণ ঘটিয়ে দিয়েছি নামবুদ্রী বামুনদের সমাজব্যবস্হায়। এখনকার রাজনীতিতে তাই ওরা বেপাত্তা।

    চেঙ্গিজ খান : মানে ?

    সাবিত্রী নামবুদিরি : আমি কেরালার এক নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণের মেয়ে। আমার জন্মের সময় নক্ষত্ররা বিপদ সংকেত দিয়েছিল। জানেন তো নাম্বুদিরির পুরুষরা সব সময় বিশুদ্ধ থাকার ভান করে। নাম্বুদিরি মহিলাদের কাছে অমন বিশুদ্ধতা হলো অভিশাপ। তারা নির্দ্বিধায় চলাফেরা করতে পারে না, কারণ তাহলে অপরিচিতদের দৃষ্টিতে তারা অধঃপতিত হয়। পুরুষদের খাওয়ার আগে তারা খেতে পারে না, তবে রান্না করাটা তাদের দায়িত্ব। তারা সোনার কোনও অলঙ্কার পরতে পারত না, নাম্বুদিরি কনের জন্য কেবল পিতলের চুড়ি। অল্প বয়স্ক যুবকরা যখন নিয়ম মেনে চলত, তখন পুরানো নিয়মের কারাগারে আটকে পড়ত মেয়েরা । আমি ছিলুম অন্তরালবর্তিনী, পরদার বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। তাদের চোখ আছে তবে আনন্দের ব্যাপার দেখা বারন। তাদের পা আছে তবে তাদের চলাচল নিষিদ্ধ। বাড়ির মেয়ে আর বউরা যেন জেলখানার প্রাণী। তাদের তাজা বাতাসে শ্বাস নেয়া, পৃথিবী দেখার অনুমতি নেই। একজন নাট্যকার তো আমাদের জীবনকে নরকের স্বীকৃতি দিয়েছিল। “একজন অন্তরালবর্তিনী কাঁদতে-কাঁদতে জন্মেছে, কান্নায় তার বেঁচে থাকা, আর কেঁদে কেঁদে মরে যাওয়া”। নামবুদিরিদের, নিজেরা ছাড়া, কোনও ঈশ্বর ছিল না ; শ্রদ্ধার জন্য কয়েকশো দেবতা ছিল – উত্তরে দেবতা, দক্ষিণে দেবতা; পূর্ব এবং পশ্চিমে, ছাদে দেবতা, মন্দিরে দেবতা আর আগুনেও দেবতা। এই সমস্ত দেবতাদের অনেক দাবী। তাদের স্নান করাতে হবে – সকালে একটি স্নান এবং সন্ধ্যায় এক। আপনি বাসা থেকে বের হলে একটি স্নান, এবং কোনও যাত্রী দ্বার পেরিয়ে গেলে স্নান। যদি নিম্নবর্ণ আপনার পথে আসে, তবে স্নান করতে হবে। বিশুদ্ধতা ছিল লক্ষ্য, কিন্তু এটি ছিল আনুষ্ঠানিক নিপীড়নের উপায়। হাতে তারা হাতকড়া পরিয়ে দিল আর মনকে করা হলো দাস। রাজারা নামবুদিরি পুরুষদের প্রণাম করতেন, আর রাজার বোনরাও প্রণাম করতো। বউদের একমাত্র কাজ সন্তানদের জন্ম দেওয়া। আর পুরুষ যদি অন্য স্ত্রী আনে, তবে প্রথম স্ত্রীকে আনন্দ করতে হবে যাতে আরও একজন দাসত্বের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। দুইবার জন্মগ্রহণকারী প্রভুর নির্দেশে দেহ ও আত্মাকে স্বামীকে উপহার দেয় তারা।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : সাবিত্রীদিদি, আসল গল্পটা বলুন তো। আমি যে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি।

    সাবিত্রী নামবুদিরি : আঠারো বছর বয়সে আমাকে একজন বুড়ো নামবুদিরির সঙ্গে বিয়ে দেয়া হলো। তার তো লিঙ্গই দাঁড়াতো না। আমার থিয়েটার দেখতে ভালো লাগতো, কিন্তু বুড়ো বর কোথ্থাও নিয়ে যেতো না। একদিন আমি একজন কথাকলি অভিনেতার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলুম। কী যে আনন্দ, কী বলব ! লোকটা তখন কীচক সেজেছিল, যে অন্যের স্ত্রীকে পেতে চায়। ব্যাস রাস্তা খুলে গেল। আমি বহু পুরুষের সঙ্গে সেক্স করলুম। এমনকি নামবুদিরি পুরুষদের সঙ্গেও, যারা সবসময় পবিত্রতার ভান করে।

    চেঙ্গিজ খান : তারপর ?

    সাবিত্রী নামবুদিরি : বছরটা ছিল ১৯০৫, আর কেলেঙ্কারিটা সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশিত হলো। সমস্ত কেরালায় একই সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে আর নামবুদিরিদের বিরুদ্ধে লোকে রাগে ফেটে পড়ল। আধুনিকতার ঢেউ থেকে নামবুদিরিরা খুব দূরে থাকতো। হঠাৎ তাদের মহাবিশ্ব ডুবে যেতে লাগল। ওদের নৌকায় ইতিমধ্যে আমি ছ্যাঁদা করে দিয়েছিলুম যা বন্ধ করার উপায় ছিল না। আমাকে যখন রাজা জিগ্যেস করলেন, আমি বলেছিলুম “আমি একা আইন ভঙ্গ করিনি। যে লোকগুলো আমার শোবার ঘরে এসেছিল তাদেরও বিচার করা উচিত। আমি বিশ্বাসঘাতকদের তালিকা তৈরি করে প্রকাশ করে দিলুম। আমি যাদের সঙ্গে সেক্স করেছি তাদের নাম আর তারিখগুলো জানতুম, এমনকি তাদের পরিবারের নামও জানতুম। আরও অনেক বিবরণ – যেমন দেহের জন্মচিহ্ন, কোথায় জড়ুল বা একটি তিল আছে ইত্যাদি । ছেষট্টিজনের পুরো তালিকা দেখে ঢি-ঢি পড়ে গেল কেরালায়। তারপর থেকে নামবুদিরিরা অনেক পালটেছে। আমি চলে গিয়েছিলুম তামিলনাডুতে, নাম বদলে থাকতুম। সেখানেই আমার শবদাহ হয়েছিল।

    ভাস্কো দা গামা : নিচু জাতের অবস্হার সুযোগ আমরা যেমন নিয়েছি, তেমন ডাচ আর ব্রিটিশরাও নিয়েছিল। ১৮৭১ সালের মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি আদমশুমারির প্রতিবেদনে দাসত্ব সম্পর্কিত একটি নোটে, আদমশুমারি কমিশনার উল্লেখ করেছিল যে কোনোরকম ব্যতিক্রম ছাড়া পুরো নিম্নবর্ণ সম্প্রদায় উচ্চতর বর্ণের দাস ছিল, আর কৃষিক্ষেত্রের প্রায় সব চাষির একই রকম অবস্থা ছিল।সেসময়ে হিন্দু আইনের আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে পনেরো ধরণের দাসত্ব স্বীকৃত ছিল এবং স্পষ্টতই ব্রাহ্মণরা কখনও দাস হতে পারতো না। পর্তুগিজ বা ডাচ দাসব্যবসায়ীদের মতন অতো সক্রিয় না হলেও, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পরিবারসহ ছোট বাচ্চাদের কেনার জন্য দাক্ষিণাত্যে দুটি ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক বিপর্যয়ের পুরোপুরি সুযোগ গ্রহণ করেছিল। তানজোর আর মাদুরাইয়ের স্থানীয় শাসকদের কাছ থেকেও তারা দাস কিনে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে চালান করতো। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় অমন অনেক মানুষ পাবেন।

    ঘসেটি বেগম : আরে বাহ ! তুমি তো ভালো বদলা নিয়েছিলে। আমি বদলা নিতে পারিনি। ট্রেনে একজন জিগ্যেস করছিল আমি চিৎপুরের কোন যাত্রা কোম্পানিতে আছি, আর কোন ভূমিকায় অভিনয় করছি। বললুম ঘসেটি বেগমের। বিশ্বাস করতে চাইল না। বলল, ওই ভূমিকায় আপনাকে মানাবে না, আপনি বরং প্রথম রানি এলিজাবেথের ভূমিকায় অভিনয় করুন ; উনি ন্যাড়া হয়েছিলেন আর আপনার টাক মুকুটের তলায় দেখা যাচ্ছে। টাক কী আর আপনা থেকে পড়েছে ! কতো যে দুশ্চিন্তা আমার, কেউ বুঝলো না।

    সাবিত্রী নামবুদিরি : আপনারা ডাকেননি। তবু এসে আমার গল্প শুনিয়ে গেলুম। এখন যাই। কফিহাউসে আগে আসিনি কখনও।

    ভাস্কো দা গামা : আমার বাড়িও ওখানেই ছিল। পাশেই প্রাচীন সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ। ওই চার্চে আমাকে গোর দেয়া হলেও চোদ্দ বছর পর আমার কফিন তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পর্তুগালে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন আপনারা, চেঙ্গিজদা আর ল্যাঙড়াদাকে দেখার জন্যে কতো দূর থেকে কতো কষ্ট করে এসেছি। উঁচু জাতগুলোর কাজকারবারের জন্যে আনেককে খ্রিস্টান বানাতে আমাদের এতো সুবিধা হয়েছে যে কী বলব। রাজাটাও ছিল উঁচু জাতগুলোর ধামাধরা। ট্রাভানকোরের রাজারা মুলাক্কারাম নামে দলিত মহিলাদের উপর একটি স্তন ট্যাক্স আদায় করত। যে দলিত মহিলারা নিজেদের মাই আঁচল দিয়ে ঢাকতো, তাদের মাই ট্যাক্স দিতে হতো। উঁচু জাতের লম্পটদের কী যে মজা, সারাদিন মাই দেখে বেড়ায়। যাদের মাই যতো যত বড় হতো তত বেশি ট্যাক্স দিতে হতো। যাদের পয়সাকড়ি ছিল তারা মাই ঢাকতো আর ট্যাক্স দিতো। কিন্তু উঁচু জাতের মহিলারা তাদের মাই দুটো ঢেকে রাখতে পারত, রাষ্ট্রকে কোনও ট্যাক্স দেবার প্রয়োজন ছাড়াই। নাঙ্গেলি নামে এক গরিব দলিত মহিলা কর দিতে অস্বীকার করে। যখন কর আদায়কারী তাকে ধাওয়া করে, তার বাড়িতে ঢুকে মাই ঢাকা দেবার জন্য ট্যাক্স দাবি করল, তখন নাঙ্গোলি নিজের দুটো মাই ছুরি দিয়ে কেটে কলাপাতায় রেখে ট্যাক্স আদায়কারীর সামনে তুলে ধরল। সে ব্যাটা তো ভয়ে পালিয়ে গেল, আর নাঙ্গেলি ট্যাক্স আদায়কারীর বাড়িতে ঢুকে মুখ থুবড়ে পড়ে মারা গেল। তার স্বামী দুঃখে ক্লান্ত হয়ে নাঙ্গেলির শবের সঙ্গে লাফিয়ে পুরুষ-সতী হয়েছিল । এই করের অবসান ঘটাতে রাজা বাধ্য হয়। নাঙ্গোলি যে বাড়িতে থাকতো সে জায়গাটা মুলাচিপারাম্বু নামে এখন বিখ্যাত। সেই থেকে দলিতরা উঁচু জাতের ওপর যতো চটেছে আমরা ততো তাদের খ্রিস্টান্তরিত করেছি।

    নোবিলিআত্মন : আমি হিন্দু সন্ন্যাসী হয়ে মীনাক্ষী মন্দির ঘুরে দেখেছি, মন্দিরে বসে ইনফিডেলদের মতন ধ্যান করেছি। ইনফিডেল হিদেনদের কল্পনাই যেন বাস্তব জগত। তিনটে মাইয়ের মূর্তি আছে মন্দিরে। তামিলনাড়ুর পান্ডিয়ান রাজা মলিয়াধাজার মেয়ে জন্মেছিল তিনটে মাই নিয়ে। রাজা, ছিল শিবভক্ত, কিন্তু নিঃসন্তান, বছর তিনেক তপস্যা করার পরে মেয়ে হয়। আয়োনিজা নামে বাচ্চাটা জন্মেই রাজপরিবারকে হতবাক করে দেয় কারণ তার দুটির পরিবর্তে তিনটি স্তন রয়েছে। রাজা ভেবেছিলেন বোধহয় কোনও দৈত্যের দ্বারা অভিশাপিত হয়েছেন। শিবের কাছে প্রার্থনা করলেন, তখন তিনি জানালেন যে মেয়েটিকে একজন পুরুষের মতোই বড় করা উচিত আর যখন সে বিয়ে করবে, তখন তার তৃতীয় মাই অদৃশ্য হয়ে যাবে। মীনাক্ষী, এই ‘ত্রুটি’ সত্ত্বেও সুন্দরী হয়ে বেড়ে ওঠে। যখন সে শিবের সাথে দেখা করে, আর তার প্রেমে পড়ে যায়, তখন তার তৃতীয় স্তন অদৃশ্য হয়ে যায়। এখন তিনি তামিলনাড়ুর বিখ্যাত মীনাক্ষী মন্দিরের মীনাক্ষী হিসাবে পূজিত হন।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : বা্হ, মাই দেখে বেড়িয়েছো কাফেরের রূপ ধরে ?

    নোবিলিআত্মন : না, আমি প্রয়াগে পূর্ণকুম্ভতেও নাগা সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ল্যাঙটোপোঁদে দৌড়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছিলুম। নাগা সাধু দিগম্বর অখিলেশপুরীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি ওনাদের লিঙ্গ অকেজো করে দেওয়া হয়। তাই কোনো কামনা-বাসনা থাকে না। যারা যৌন কামনার প্রবল বেগকে সামলে নিতে পারে তারাই নাগা। উনি বললেন, সেই সিদ্ধি লাভ করে যে যৌনবাসনার বিরুদ্ধে জয়ী হয়। আল-হিন্দে এসে আমার যৌনবাসনা নষ্ট হয়ে গেছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : মাই নিয়ে ভাবো মনে হয়। আকার-প্রকার নিয়ে চিন্তা করো ?

    পাগলা তুগলক : আমি বলছি জনাবেআলা। আমরা এখন ভোগবাদী সমাজে বাস করি, আর কোনো চাকরি বা কাজের জন্য বুদ্ধিমতী হলেও, শারীরীক আকর্ষণ হল সফলতার একটা সিঁড়ি। সুন্দর মুখমণ্ডলের ও দৈহিক কাঠামোর নারীরা কাজের বাজারে বেশি সুযোগ পান। তবে অত্যন্ত বড়ো মাপের স্তন আবার এক্ষেত্রে ক্ষতিকারক হতে পারে, তখন শল্যচিকিৎসা করিয়ে স্তনের মাপ ছোটো করার পথ ধরতে হবে। এখনকার ফ্যাশানও হয়েছে বড়ো মাপের বর্তুল স্তন আর খাঁজ। পোশাকের ডিজাইনাররা সেইভাবেই সুন্দরীদের উপস্হাপন করেন। অত্যন্ত বড়ো মাপের বা অত্যন্ত ছোটো মাপের স্তন হলে বাজারে ব্রা পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়। সিলিব্রিটি সংস্কৃতির জগতে ছোটো মাপের স্তন নারীজগতে ঠাট্টা-ইয়ার্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় — স্তনের মাপ বাড়িয়ে তোলার এও একটা কারণ। খ্যাতি আর জনপ্রিয়তার ভোগবাদী বাজারে স্তন এখন গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র — শল্যচিকিৎসা নারীকে বহুকাল যৌবন ধরে রাখার সুযোগ করে দিয়েছে। মিডিয়া যেহেতু সেলিব্রিটিদের রোল মডেল হিসাবে তুলে ধরে, তরুণীরা তাঁদের পথ অনুকরণ করেন। পর্ন ফিল্মগুলোতে যাঁরা অভিনয় করেন তাঁদের স্তন বেশ বড়ো হয় এবং অনেকে অমন ফিল্মে অভিনয় করার জন্যও স্তনের মাপ অবিশ্বাস্যভাবে বড়ো করে তোলেন। সানফ্রানসিসকোতে বুক-খোলা মেয়েরা জুতো পালিশ করেন, বার-ডান্স করেন বুক খুলে। বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদের জন্য নারীরা বুক খুলে দাঁড়িয়ে পড়েন। স্তনের যৌনতা একই সঙ্গে আক্রমণের অস্ত্র আবার অনুরাগের ডাক দেবার কুহক।

    তোতলা তুগলক : ছেলেটা মাঝখানে কথা বলা ছাড়তে পারল না।

    ভাস্কো দা গামা : আর কী জানো মাইয়ের ব্যাপারে ?

    কফিহাউসের যক্ষ : স্যার, পোপ যখন পর্তুগাল আর স্পেনকে নির্দেশ দিলেন যে তারা যথাক্রমে পূর্ব আর পশ্চিম বিশ্বকে লুটপাটের জন্য ভাগাভাগি করে নিক, তার পর সমস্ত প্রাচীন সংস্কৃতি মূল থেকে ধ্বংস হয়ে গেছে — মিশরীয়, ইরানি, মেসোপটেমিয়ান, গ্রিক আর রোমান, আমেরিকার মায়া ও অ্যজটেক এবং আরও আদিম জীবন-পদ্ধতি। ভারতে তারপর আবির্ভাব হলো ইসলামি শাসকদের। নগ্নতাকে যৌন ‘পাপ’ হিসাবে দেগে দিয়েছে তারাই, এমনকী যৌনতাকেও তারা লজ্জাজনক পাপকর্ম হিসাবে চিহ্ণিত করে দিয়েছে বিভিন্ন উপনিবেশে। স্তন যেহেতু যৌন আহ্লাদ উদ্রেক করে, তাই স্তন ঢাকার চল শুরু হল তাদের আবির্ভাবের পর। অজন্তায় বুদ্ধের মা নিজের স্তন ঢেকে রাখেননি, আর তা সম্ভব হয়েছে ভারতে নগ্নতাকে লজ্জাজনক মনে করে হতো না বলে। দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু আদিবাসদীরা এখনও স্তনকে খোলা রাখেন — প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেকব জুমার নবম বিয়েতে তাঁর হবু স্ত্রী সমেত আগের বউরা আর কুড়িটা বাচ্চাদের মধ্যে মেয়েরা বুক খুলে নেচে ছিলেন। প্রাচীন ভারতে স্তনের সঙ্গে যেমন ফার্টিলিটির সম্পর্ক ছিল তেমনই ছিল যৌনতার। ধনী পরিবারের নারীর পরিধান ছিল উত্তরীয়, অন্তরীয় আর কোমরবন্ধ — উত্তরীয় এখনকার ওড়নির মতন যেটি দিয়ে বুক বাঁধা যেতো। অনেকে বাঁধতেন না, কেবল ঢেকে রাখতেন। মোগল বেগমরাও যে স্বচ্ছ মসলিনে ঢেকে রাখতেন তা এঁকে গেছেন মিনিয়েচার চিত্রকররা। জেনানা মহলে তাঁরা স্তনকে লুকোবার চিন্তায় ভুগতেন না তার কারণ খোজারা ছিল তাঁদের রক্ষী। কোনো কোনো বেগম, যাঁদের বিয়ে হতো না, তাঁরা স্তনে খোজাদের আদর নিতেন।

    ভাস্কো দা গামা : আমি জানতে চাইলুম, আর আমার দেশকেই দোষ দিচ্ছ।

    বাবর : মোগল বেগমদের ব্যাপারে যা বলেছে তা আমার কানেও এসেছে। কীই বা করবে। ওদেরও তো আনন্দ দরকার।

    চেঙ্গিজ খান : ল্যাঙড়া, তুই সম্রাজ্ঞী, বেগম, রানি, খাতুনদের ডাকিসনি ? মেয়েদের গল্পগুলো বেশি ইনটারেসটিঙ।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ডেকেছি তো চেঙ্গিজদা। কুতলুক নিগার আনাম, গুলবদন বেগম,খানজাদা বেগম,জিজি অনগা, মাহাম অনগা, দিলদার বেগম, বেগা বেগম, হামিদা বানু, সলমা সুলতান বেগম, মারিয়ম-উজ-জমানি, রোশনারা বেগম, আসিয়ান দৌলত বেগম, জিনত-উন-নিসা বেগম, জেব-উন-নিসা বেগম, গুলরুখ বেগম, গুলনার আগাচা, নারগুল আগাচা, চাঁদ বিবি, খুঞ্জা হুমায়ুন, বেগম সমরু সবাইকে বলে এসেছি। নুরজাহানকে বলার সাহস হয়নি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আরে, এ তো দেখছি আফজল খান আসছে, পেট থেকে নাড়িভূঁড়ি বেরিয়ে ঝুলছে, টপটপ করে রক্ত পড়ছে। ওর অবস্হার কথা জানতুম বলে বলিনি আসতে, তবুও এসেছে। কী রে আফজল, তুই আবার এলি কেন এই অবস্হায় ? প্রতাপগড় দুর্গের কবরে তো ভালোই ঘুমোচ্ছিলিস !

    আফজল খান : তোমরা আজ কফিহাউসে আসছো আড্ডা দিতে, তাই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি। :তোমরা তো জানো বিজাপুরের সুলতান শিবাজীকে দমন করার জন্য আমাকে পাঠিয়েছিলেন। বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে শিবাজীকে আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলুম। কিন্তু কী আর বলব ! শিবাজী আমার অভিসন্ধি টের পেয়ে গিয়েছিল। আলিঙ্গনের অজুহাতে যখন শিবাজীকে খুন করবার জন্য রেডি হয়েছি ঠিক তখনই শিবাজী গোপন হাতিয়ার বাঘনখ বের করে আমার পেটের নাড়িভূঁড়ি বের করে দিলে। তাতেই আমি অক্কা পেলুম। আমাকে বাঁচাতে আমার দেহরক্ষী কৃষ্ণানাজী ভাস্কর কুলকারনি তরোয়াল বের করে শিবাজীর দিকে তেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু শিবাজীর দেহরক্ষী রুস্তম জামান তরোয়াল চালিয়ে ওর হাত কেটে দিলে।

    পাগলা তুগলক : নাস্তিককে বাঁচাতে আস্তিক আর আস্তিককে বাঁচাতে নাস্তিক দেহরক্ষী।

    চেঙ্গিজ খান : এই অবস্হায় আসা তোর উচিত হয়নি। এমনিতেই চারিদিকে করোনার সাম্যবাদ ছড়িয়ে পড়েছে।

    আফজল খান : আচ্ছা যাই, তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভালো থেকো সবাই।

    কফিহাউসের যক্ষ: চলুন, আমি হেল্প করছি। আমার কফির ট্রেতে আপনার নাড়িভূঁড়ি রাখুন, তাহলে কষ্ট হবে না।

    ঘসেটি বেগম : আচ্ছা, মীরজাফরের বংশধরদের কী দোষ ? আজও ওরা পাবলিকের সামনে মুখ দেখাতে পারে না।

    কফিহাউসের যক্ষ : মীর জাফরের বংশধর এখনো মুর্শিদাবাদে বসবাস করেন। মীরজাফরের অষ্টম বংশধর হলেন মীর জাফর আলম খাঁ। আমি তাঁকে চিনি। পেশায় একজন শিক্ষক। বর্তমানে অবসরে আছেন। মীর জাফর খাঁর বাড়ির প্রধান ফটককে লোকে বলে নেমকহারাম দেউড়ি। এলাকাটার নাম জাফর গঞ্জ। মীর জাফর ইংরেজ বেনিয়াদের সাথে যুক্ত হয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বাধীন বাংলার পতন ঘটিয়ে ইংরেজদের হাতে দেশ তুলে দেয়াটা পাবলিক আজও মেনে নিতে পারেনি। যে বাড়িতে মীরজাফরের বংশধররা বসবাস করতেন তা দেখতে গিয়ে লোকজন বিশ্বাসঘাতকের বাড়ি বলে অহরহ গালাগালি করায় পূর্ব পুরুষের বিশ্বাসঘাতকতার গ্লানি আর লজ্জায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে না পারায় অনেক দিন হলো তারা সেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। মীর জাফরের বর্তমান প্রজন্ম খুবই ভদ্র নম্র হওয়া সত্বেও মানুষের কাছে সহজে উন্মুক্ত হতে পারছেন না। মীর জাফরের বিশ্বাসঘতকতার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলার পতন এবং ইংরেজদের হাতে দেশের স্বাধীনতা চলে যাওয়ায় আজো মানুষ মীর জাফরের নামটি ঘৃণাভরে উচ্চারণ করে। যার গ্লানি জন্ম জন্মান্তর ধরে এই বংশকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। বংশধরদের দোষ দেয়া কেন ? ইংরেজদের পা চেটে অনেকে নাম কিনেছে, তাদের কেন বিশ্বাসঘাতক বলা হবে না ?

    ভাইপো আকবর : ওই তো গুলবদনপিসি এসে গেছে। শ্যায়খুবাবা এলো না ?

    গুলবদনপিসি : আমি এসে গেছি। হজ করতে গিয়েছিলুম, সবে কদিন হলো ফিরেছি। নতুন সংস্করণের জন্যে হুমায়ুননামা ‘অর্ধেক জীবন’ বইটার প্রুফ দেখতে হবে। আগে হাতে কমপোজ হতো, পাণ্ডুলিপিতে ভুল থাকলে কমপোজিটাররা নিজেরা শুধরে দিতো। এখন কমপিউটার হয়ে, মুশকিল হয়েছে। কমপিউটার ভালো জানে, কিন্তু ভাষাটা ভালো জানে না বলে ভুল থেকে যায়। দুতিনবার করে প্রুফ দেখতে হয়। প্রথম সংস্করণে আমাদের পরিবারের কেচ্ছা সব বাদ দিয়েছিলুম ; এখন ভাবছি জুড়ে দেবো, তাহলে ভালো কাটতি হবে।

    পাগলা তুগলক : প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর প্রতিটি ধর্মই কায়েমি স্বার্থবাদীদের দ্বারা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হয়েছে। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বেলায়ও একই ধরনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ধর্মের কিংবা আদর্শের অবলম্বন ছাড়া চলতে পারে না। আদর্শহীন বাস্তবতায় ধর্মকে শেষ করে দেওয়ার জন্য যতই চেষ্টা করা হচ্ছে, মানুষ ততই ধর্মের আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে পুনর্গঠিত কিংবা নবায়িত করে সর্বজনীন গণতন্ত্রে রূপ দিলে এবং জনগণের জন্য প্রাণশক্তিসম্পন্ন আদর্শ রূপে সামনে আনা হলে ঘটনাপ্রবাহ সম্মুখগতি লাভ করবে।

    তোতলা তুগলক : এএএ ছোঁছোছোছোড়া মুমুমুখ ববববন্ধ রারারাখতে পাপারে না।

    বাবর : আমার রুশ রক্ষিতা গুলনার আগাচা আর নারগুল আগাচাকেও আসতে বলেছ ? ওরা এসে আমার গোপন খবরাখবর না ফাঁস করে দেয়। ওরা বলছিল যে আমার কবরটা আগ্রায় থাকলেই ভালো হতো। আমি ভেবেছিলুম কাবুল জায়গাটা সুন্দর। এখন তো প্রত্যেকদিন বোমা মারামারি চলছে সেখানে। কোনওদিন না আমার কবরটাই চাঘতাই উজবেকি মনে করে উড়িয়ে দেয়। অবশ্য উজবেকিস্তান আর কিরগিজস্তানের লোকেরা আমাকে শ্রদ্ধা করে আজও। বেগম সমরুকে বলেছিস? ও তো নাচনেওয়ালি ছিল, তায় আবার ক্যাথলিক খ্রিস্টান।

    শাহজাহান : আগ্রায় থাকলে আমি একটা নতুন ধরণের স্হাপত্য গড়ে দিতে পারতুম আপনার কবরের ওপর। কিন্তু আপনার কোন বেগমকে পাশে রাখতুম ? সেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াতো। মাহাম বেগম, আশিয়া সুলতান বেগম, জৈনাব সুলতান বেগম, মাসুমা সুলতান বেগম, বিবি মুবারিকা গুলরুখ বেগম, দিলদার বেগম — কে আপনার সবচেয়ে পছন্দের তা তো জানি না। আমি তাজমহল বানিয়েছি আমার সবচেয়ে পছন্দের বেগমের স্মৃতিসৌধ হিসেবে। আপনার কবর আগ্রায় থাকলে সেই স্মৃতিসৌধ দেখতে বহু পর্যটক আসতো। হুমায়ুনের কবর দেখতে কতো মানুষ আসে। অথচ ওনার দেহ প্রথমে দিল্লিতে রাজপ্রাসাদেই গোর দেয়া হয়েছিল। পরে খঞ্জর বেগ দেহাবশেষ নিয়ে যান পাঞ্জাবের সিরহিন্দে। বিধবা বেগম হামিদা বানু হুমায়ুন মারা যাবার নয় বছর পরে এই সমাধিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু করান। আপনার বেগমরা বোধহয় ততো ভালোবাসতেন না আপনাকে।

    বাবর : আরে তোকে কী বলব ! লোকে জানেই না যে আমার নয়টা ছেলে আর নয়টা মেয়ে ছিল। আমার দুই বউ মাহাম বেগম আর দিলদার বেগমের একটা করে আর গুলরুখ বেগমের দুটো ছেলে ছিল সে কথা তুইও ভুলে যাচ্ছিস। তুই হয়তো ভাববি গুলরুখের দুটো ছেলে ছিল বলে ওকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতুম। তোদের সময়ের মতন ভালোবাসাবাসি ছিল না আমাদের সময়ে। হুমায়ুনের সময় থেকেই ভাইয়ে-ভাইয়ে খুনোখুনি আরম্ভ হয়েছিল। কামরন মির্জা নিজেই চলে গেল হজ করতে, আসকারি মির্জাকে হুমায়ুন অন্ধ করে হজ করতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আর হিন্দল মারা গেল যুদ্ধ করতে গিয়ে। হুমায়ুনের সঙ্কটজনক অসুস্হ অবস্হায় আমি ওর খাটের চারপাশে তিন দিন অবিরাম পাক খেয়ে ওর জীবনের জন্যে প্রর্থনা করেছিলুম, এসব কেউ নির্ঘাৎ আফিমের শরবত খেয়ে কেউ লিখেছে। হুমায়ুন পটল তুলেছিল নেশা করার পর সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে, গুলবদন লিখেছে তো সেকথা হুমায়ুননামা নামের ‘অর্ধেক জীবন’ বইতে।

    শাহজাহান : ভুলে যাচ্ছেন কেন যে আবুল ফজলকে আব্বাহুজুর খুন করিয়েছিলেন। আবুল ফজল ওনার সিংহাসনে বসার বিরোধিতা করেছিলেন। তাই ওনার ষড়যন্ত্রে নারওয়ারের কাছে সরাই বীর আর অন্ত্রীর মাঝখানে কোনো এক জায়গায় বীর সিংহ বুন্দেলার হাতে তিনি খুন হন। ওনার কাটা মাথা এলাহাবাদে আব্বাহুজুরের কাছে পাঠানো হয়েছিল। আবুল ফজলকে অন্ত্রীতে গোর দেয়া হয়। আবুল ফজলের খুনি বীর সিংহ বুন্দেলা পরে ওরছার শাসক হয়েছিল আর ১৬০২ সালে আব্বাহুজুর জাহাঙ্গির নাম নিয়ে মোগল সিংহাসনে বসেছিলেন। পরে যদিও আব্বাহুজুর আবুল ফজলের ছেলে শেখ আবদুর রহমান আফজল খানকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। আমিও সিংহাসন দখল করেছি শত্রুদের সরিয়ে দিয়ে, যখন কিনা আমি কাফের মা রাজপুত হিন্দু জগত গোঁসাইয়ের ছেলে। আবুল ফজল আর গুলবদন বেগম দুজনেই রাজপুত হিন্দু বউদের আসল নাম লেখেননি ; লিখেছেন মোগলদের দেয়া নাম। আব্বাহুজুরের মায়ের নাম দিয়েছে মরিয়ম উজ জমানি, ওনার আসল নাম হরখা বাই গোপন করেছেন, বলিউডে যে ফিল্ম হয়েছে তাতে ওনাকে বলেছে যোধা বাই। হরখা বাইয়ের যে অনেকগুলো নিজের জাহাজ ছিল, আরবদেশে ব্যবসা করতে যেতো, হজযাত্রিদের নিয়ে যেতো, সেসব চেপে গেছে। আবদ-আল কাদির বাদায়ুনি তো আকবরের সংসারে এসে হরখা বাইয়ের হিন্দু পুজোপাঠ, বেদের হোমাগ্নি, শাকাহার, সূর্য আরাধনার বিরুদ্ধে রাগ উগরে গেছেন।

    ভাস্কো দা গামা : সেনর বাবর, আপনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে আল-হিন্দে খাবার মতো ফল নেই, দেখার মতন বাগান নেই, মানুষগুলোও বিদকুটে। তা আপনি আপনার দেশ থেকে নানা রকমের ফল এখানে এনে চাষ করাতে পারতেন। আমরা তো সুদূর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কতো ফল-ফুল-আনাজ এদেশে এনেছি যে এখানকার মানুষ ভাবে সেগুলো এই দেশেরই প্রডাক্ট।

    বাবর : আরে আমি হলুম বাদশা, পেটুক মানুষ, আর তোমরা এসেছো খ্রিস্টান্তরন করার উদ্দেশ্যে, আমরা মোগলাই খাবারের নতুন রেসিপি আরম্ভ করেছিলুম। আমার ছেলে হুমায়ুনের ইরানি বউ হামিদা জাফরান আর শুকনো ফল ব্যবহারের প্রচলন করেছিল। আকবরের রাজত্বকালে মুঘলাই খাবার বিকশিত হতে শুরু করেছিল ; ওর বহু বৈবাহিক জোটের কারণে, রান্নার রেসিপি আল-হিন্দের প্রতিটি কোণ থেকে এসেছিল, যেমন মুর্গ মুসললম, নবরতন কোর্মা, কাবাব, কোফতা,, পুলাও বা পাইলাফ, এবং তন্দুরি মুঘলই মুরগি, মুঘলই বিরিয়ানি, মুঘলই পরোটা, মালাই কোফতা, রেশমি কাবাব, মুঘলাই মিষ্টান্নগুলির মধ্যে নাম করতে হয় রুটির পুডিং, শাহি টুকরা, বরফি, কলাকান্দ আর ফালুদা। । পাঁঠার মাংস রান্নাঘরে এনেছিল আকবর। গোরুর মাংস আকবর নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। নিহারি রান্নাটা শাহজাহানের। ইব্রাইম লোদির সঙ্গে যুদ্ধে আমি আর সৈন্যরা ঘোড়া আর গোরুর শুকনো মাংস চর্বি মাখিয়ে পুড়িয়ে খেতুম।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ওই তো, আওরঙজেবের চামচা মীর জুমলা এসে গেছে। কী রে মীর জুমলা, এতো দেরি হলো তোর? তোকে তো খবর পাঠিয়েছিলুম যে আজকে চেঙ্গিজদা আর আমি কফিহাউসে গ্যাঁজাতে আসছি।

    মীর জুমলা : কী বলব তোমায় ল্যাঙড়াদা। আসামের দিকে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তো এগিয়েছিলুম। আসামের আবহাওয়া এমন যে প্রথমে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল, তারপর গড়গাঁও পর্যন্ত দখল করতে পেরেছিলুম। এরপর নেমে এলো আসামের বর্ষার ঢল। অতিবৃষ্টির কারণে আসামের রাস্তাঘাট ডুবে বন্যা সৃষ্টি হলো, সে তুমি ধারণা করতে পারবে না। আমার বাহিনী উঁচু জমিতে আটকা পড়ে গেলো। তখন রাজা জয়ধ্বজের সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। এমনকি আমাদের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। এর মাঝে সৈন্যরা জলের কারনে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে লাগলো। খাবারের অভাব আর রোগের প্রকোপে বেশিরভাগ সৈনিক মারা গেলে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে পিছপা হতে হলো আমাকে। বর্ষা শেষে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আসাম ছাড়লুম, কী লজ্জা, কী লজ্জা, আলমগীর জানলে মাথা কেটে নিতো। ব্যর্থ আসাম অভিযান শেষে বাংলায় ফিরে আবার যাত্রা শুরু করেছিলুম। তবে আসামের জলহাওয়ায় ভীষণ শরীর খারাপ হয়ে গেল। অসুস্থতার কারণে দুর্বল শরীরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। নৌকো করে ফেরার পথে খিজিরপুরে মারা গেলুম। সেই থেকে আসাম-মেঘালয় সীমায় ঠাকুরবাড়ি জেলার একটা টিলার কবরে শুয়ে আছি। কেউই খোঁজখবর নেয় না। জীবনে কতোকিছু করলুম ইরান থেকে এসে, পড়ে আছি অজ পাড়াগাঁয়।

    বাবর : আওরঙজেবটা তো তাই চটে থাকে কাফের নাস্তিকদের ওপর। ও জানে যে ওর শিরায় আছে কাফের বউদের নাস্তিক রক্ত। আসলে দোষটা আমারই, আমিই তো মোগল সিংহাসন বসিয়েছিলুম এই দেশে।

    গুলবদনপিসি : হ্যাঁ, আপনি আপনার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, শত্রুকে পরাজিত করার পর আমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলাম এবং ব্যপকভাবে হত্যা করতে থাকলাম। আমাদের শিবির থেকে প্রায় দুই ক্রোশ দূরে ছিল তাদের শিবির। সেখানে পৌঁছে আমি মুহাম্মদী ও আরও কয়েকজন সেনাপতিকে হুকুম দিলাম তাদের হত্যা করতে, কেটে দু’খানা করতে, যাতে তারা আবার একত্রিত হবার সুযোগ না পায়।” কত কাফের নাস্তিককে সেদিন হত্যা করা হয়েছিল তার হিসাব পাওয়া যায়না। বাবর হুকুম দিলেন, কাছাকাছি একটি পাহাড়ের কাছে সমস্ত নরমুন্ডকে জড়ো করে একটি স্তম্ভ তৈরী করতে। সেই টিলার উপর কাটা মুন্ডের একটি মিনার বানাতে হুকুম দিলাম। বিধর্মী ও ধর্মত্যাগীদের অসংখ্য মৃত দেহ পথে-ঘাটে ছড়িয়ে ছিল। এমন কি দূর দেশ আলোয়ার, মেওয়াট ও বায়না যাবার পথেও বহু মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেল।”

    চেঙ্গিজ খান : আমি কিন্তু ধর্ম-টর্মর কথা ভেবে কোনও দেশ দখল করিনি ; কারোর ধর্মও পালটাইনি। আমার বংশধররা নিজেরাই আস্তিকান্তরিত হয়ে মুসলমান বা বৌদ্ধ ধর্ম নিয়েছে বা কাফের নাস্তিক থেকে গেছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি কতো দেশ দখল করেছিলুম। আমার বংশধররা কেউ সেগুলো ধরে রাখতে পারেনি।

    গুলবদনপিসি : ল্যাঙড়াদা, তোমার আত্মজীবনী “তুজুক ই তৈমুরী”তে তুমি লিখিয়েছ ভারত অভিযানের তোমার দুটি উদ্দেশ্য ছিল। এক, বহুদেববাদ ও পৌত্তলিকতায় আচ্ছন্ন ভারতীয়দের সত্যধর্মে দীক্ষিত করা আর, দুই ভারতের অমিত ধন ঐশ্বর্য লুঠ করা। আসলে ভারতের বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করাই ছিল তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য। পৌত্তলিকতার বিনাশ অজুহাত মাত্র। মধ্য এশিয়া থেকে এত দূরদেশে অভিযানে আসতে তোমার সেনাবাহিনী ও আমির ওমরাহরা আপত্তি জানালে তুমি তাদের সামনে ধর্মের কথা তুলে ধরো।সমরখন্দ থেকে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সিন্ধু, ঝিলাম ও রাভি নদী অতিক্রম করে রাজধানী দিল্লির দিকে এগোও। পথিমধ্য দীপালপুর, ভাতনার, শীরসা, কৈথাল লুঠ করে আর বহু মানুষকে খুন করে দিল্লির উপকন্ঠে পৌঁছে যাও। দিল্লিতে প্রায় একলক্ষ মানুষকে খুন করো। দিল্লির সুলতান নাসিরউদ্দিন মহম্মদ ও তার প্রধানমন্ত্রী মল্লু ইকবাল তোমার কাছে হেরে যায়। মল্লু ইকবাল বরণ প্রদেশে আর সুলতান নাসিরউদ্দিন মহম্মদ গুজরাটে পালায়।

    পাগলা তুগলক : আমারও তাই মনে হয়।

    গুলবদন পিসি : এরপর দিল্লিতে ঢুকে টানা পনেরোদিন ধরে লুঠপাট আর খুন করতে থাকো। মানুষের কাটা মাথা দিয়ে সৌধ তৈরি করে তোমার সেনাদল উল্লাস প্রকাশ করে। শবগুলো মাংসাশী পশু ও পাখির খাবারে পরিণত হয়। এরপর তুমি অঢেল ধনরত্ন ও অসংখ্য বন্দীকে দাস বানিয়ে নিয়ে দেশে ফিরে যাও । দেশে ফেরার পথে ফিরোজাবাদ, মিরাট, হরিদ্বার ও জম্মু অঞ্চলে লুটপাট চালিয়ে আর শিবালিকা পাহাড়ের পথ ধরে উত্তরে যাওয়ার সময় কাংড়া দখল করো। বদাউনির মতন গোঁড়া লোকও লিখেছে, তোমার হাত থেকে যারা নিষ্কৃতি পেয়েছিল তারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রাণ হারায়। তোমার ভারত আক্রমণের ফলে সুলতানী শাসনের সামরিক বাহিনীর দৈন্য দশা ফাঁস হয়ে যায়। তোমার ভারত আক্রমণের পর গুজরাট, সামনা, বিয়ানা, কালপি, মাহাবা, মুলতান, পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রভুতি অঞ্চলে স্বাধীন রাজ্য গড়ে ওঠে। সুলতানী সাম্রাজ্য দিল্লি থেকে পালামের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্য সংকুচিত হয়ে পড়ে। হিন্দু মুসলমানদের মধ্য সম্প্রদায়গত যে বিরোধ তুমি সৃষ্টি করেছিলে তা জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবরও জুড়তে পারেননি।

    ভাইপো আকবর : হক কথা বলেছো পিসি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি তো অতোশত ভাবিনি। সব লুটেরারা যা করে আমিও তাই করেছিলুম। বাবরও করেছিল। বাবর সম্পর্কে গুরুনানক লিখেছেন, “হে সৃষ্টিকর্তা ভগবান, জীবন্ত যম হিসেবে তুমি কি দানবরূপী এই বাবরকে পাঠিয়েছ ? অমানুষিক তার অত্যাচার, পৈশাচিক তার হত্যা লীলা, অত্যাচারিতের বুক ফাটা আর্তনাদ ও করুন ক্রন্দন তুমি কি শুনতে পাওনা? তাহলে তুমি কেমন দেবতা ?” ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজির দোষ আরো বেশি। তুমি হয়তো বলবে ওরা আমার দেখানো পথ অনুসরণ করেছে।

    গুলবদনপিসি : হ্যাঁ, ল্যাঙড়াদা, আমি তাইই বলব। দেখছো তো, আল-হিন্দে বাবরের মসজিদ তো ভাঙাই হয়েছে, বাবরের নামের রাস্তারও অন্য নাম দেবার চেষ্টা চলছে। তুমি জানো না যে হিন্দু দর্শনে সর্বসৃজক ঈশ্বরে নয়, বরং প্রাচীন প্রার্থনাগাথা বেদকে মান্যকারী ব্যক্তি বা দল বা সম্প্রদায়কে আস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আস্তিক দর্শন অনুসারে বেদই হলো সমন্বয়বাদী হিন্দুধর্মের প্রাথমিক উৎস। এ সংজ্ঞানুসারে সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, পূর্ব মীমাংসা এবং বেদান্তকে আস্তিক দর্শনের শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

    ভাইপো আকবর : পিসি, তোমার তুলনা নেই। শ্যায়খুবাবা এলো না ?

    ঘসেটি বেগম : বিহারের বাসিন্দা হীরকচাঁদের মৃত্যুর পর তার ছোট ছেলে বিসেনচাঁদ জগৎশেঠ উপাধি পান। তার এক ছেলে ছিল কিসেনচাঁদ। লর্ড বেন্টিঙ্কের সময়ে তিনি ইংরেজ সরকার কর্তৃক জগৎশেঠ উপাধি পান। তার মৃত্যুর পর হীরকচাঁদের বড় ছেলে ইন্দ্রচাঁদ জগৎশেঠ হন। কোম্পানি তাকে বাৎসরিক ১,২০০ পাউন্ড পেনশন দিত। তিনি মারা গেলে তার দত্তক পুত্র গোপালচাঁদ জগৎশেঠ খেতাব পান। ১৮৪৩ সালে লর্ড অকল্যান্ড তাকে ৩০০ রুপি পেনসন দিতে চাইলে তিনি সেটা ফিরিয়ে দেন। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী প্রাণ কুমারী দেবী গোলাপচাঁদকে দত্তক নেন। তার চার ছেলে ছিল। বড় ছেলের নাম ফতেচাঁদ। ১৯১২ সালের ৭ই এপ্রিল তিনি কলকাতায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে সোবাগ চাঁদ জগৎশেঠ উপাধি পান। সোবাগ চাঁদ মহিমাপুরের বাড়িতে ডাকাতের হাতে মারা যান। তখন তার দুই ছেলে বর্তমান ছিল, জ্ঞান চাঁদ জৈন ও বিজয়চাঁদ। এদের পর আর জগৎশেঠ পরিবার সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯১২ সালের পর আর কেউ জগৎশেঠ উপাধি বজায় রাখেননি। এদের বংশধরদেরে খোঁজ করা হয় না কেন ?

    গুলবদনপিসি : সেনর ভাস্কো, আপনি ওমানি জাহাজি শেখ আহমেদ ইবন মজিদকে বোকা বানিয়ে, প্রচুর সোনাদানা দিয়ে, আপনার পাদরিদের গির্জায় তৈরি মদ খাইয়ে জাহাজে তুলে নিয়েছিলেন, নয়তো আল-হিন্দে আসতে পারতেন না, সেকথা ভুলে যাবেন না। আপনাদের ভাগ্য ভালো ছিল যে ইবন মজিদকে পেয়ে গিয়েছিলেন, আর তার দেখানো সমুদ্রপথে আল-হিন্দে এসেছিলেন তা সত্বেও আরবদের মুর বদনাম দিয়ে তাদের জাহাজ কামান দেগে ডুবিয়ে দিতেন আর বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের খ্রিস্টান বানাতেন। ইবন মজিদের কারণেই আপনারা আল-হিন্দ থেকে মশলা-রত্ন নিয়ে যেতেন — কালো মরিচ, জায়ফল, ছোটো এলাচ, লবঙ্গ, সুপুরি, দালচিনি, আদা, হলুদ। আরবদের থেকে জেনে গিয়েছিলেন মশলাগুলো গুঁড়িয়ে মাংসতে মাখালে তা সহজে পচে না, দুর্গন্ধও হয় না।

    ভাস্কো দা গামা : সেনর ল্যাঙড়া,: আপনারা এতো মানুষ মারলেন, এতো লুটপাট চালালেন, কিন্তু তার বদলে কিছু দিতে পারলেন না। আমরা এদেশে কি-কি দিয়েছি জানেন ? টম্যাটো, আলু, আনারস, আতা, পেঁপে, পেয়ারা, ঢেঁড়স, কাজুবাদাম, কাসাভা, চিনাবাদাম,ভুট্টা আর নানা রকম লঙ্কা। আগে এখানকার মানুষ গোলমরিচ ব্যবহার করতো আর তার জন্যেই আরব আর ইউরপীয় ব্যবসাদাররা লড়ে মরতো। আমরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে নানা রকমের ফলমূল অন্য দেশে নিয়ে গেছি। এদেশ থেকে নিয়ে গেছি আম। এখানকার আলফোনসো আম আমাদের অবদান। অবশ্য এদেশে তামাক আমরাই এনেছিলুম। আকবরের দরবারে বেশ জনপ্রিয় ছিল তামাক কিন্তু জাহাঙ্গির নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছিল। মেক্সিকো থেকে এনেছিলুম গাঁদাফুল। নানা রকমের লঙ্কা এনেছিলুম দক্ষিণ আমেরিকা থেকে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি ওদিকটায় যাইনি, নয়তো আমিও নিয়ে যেতুম।

    ভাস্কো দা গামা : চিকেন কারি, মাটন কারি, ফিশ কারি, ভেজিটেবল কারি শব্দগুলো কিন্তু আমরা পর্তুগিজরাই দিয়েছি তোমাদের।

    শাহজাহান : সেনর ভাস্কো, মোগল বাদশাহের দেওয়া শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি ছিল ‘মাহি মারাতিব’। মাহি, মানে মাছ ছিল একমেবাদ্বিতীয়ম রুই। অবশ্যই কাঁচা রুই মাছ নয়, ধাতুর তৈরি রুই মাছের প্রতিমূর্তি। এর চেয়ে বেশি আর কী ভাবে কোনও মাছকে গৌরবান্বিত, মহিমান্বিত করা সম্ভব! ইতিহাস বলছে, মোগল সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ছিল মাহি মারাতিব। এখন ভারতে ভারতরত্ন, ফ্রান্সে লিজিয়ঁ অফ অনার কিংবা ব্রিটিশ নাইটহুড যেমন—ঠিক সেই রকম। তবে মাহি মারাতিব একই সঙ্গে ছিল শৌর্য, বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রতীক। এই ব্যাপারে যাঁরা শ্রেষ্ঠ হিসেবে গণ্য, তাঁদেরই মোগল সম্রাটরা দিতেন এই সম্মান। সোনার দু’টি দণ্ডের উপর বসানো রুইমাছের ওই বিশাল ধাতব প্রতিকৃতিকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হত। মোগলরা আর লখনউয়ের নবাবরা রুই মাছ খেতে ভালো বাসতেন। লখনউতে নবাবদের গড়া ইমারতগুলোতে দেখতে পাবেন দুটো করে রুই মাছ।

    গুলবদনপিসি : সেনর ভাস্কো, লোকে যদি জানতো আপনাদের ওই কারিতে কী লুকিয়ে আছে তাহলে খেলেই বমি করতো সেনর। আপনারা কয়েকশো আরব জাহাজিকে নোংরা মুর হিসেবে দেগে দিয়ে তাদের কান, নাক, হাত কেটে কালিকটের জামোরিন শাসককে পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, এই নাও কারিল পাঠালুম। লোকে রান্নার ঝোলকে বলতো কারিল। সেটাকে ইংরেজরা করে দিয়েছিল কারি, বিলেতেও এদেশ থেকে নিয়ে গেল চিকেন কারি, মটন কারি। আপনারা সমুদ্রিকে করে দিয়েছিলেন জামোরিন।

    ভাস্কো দা গামা : না, সেনোরিটা, আমরা করিনি। ইংরেজরা করেছে। আমরা বলতুম সামোরিম, ওলন্দাজরা বলতো সামোরজিন, চিনেরা বলতো শামিথিশি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমি কতো দেশে লুটপাট চালিয়ে নিজের দেশে সোনাদানা টাকাকড়ি নিয়ে গিয়েছিলুম। সবই ফুরিয়ে গেছে। এখন সেই আগেকার অবস্হা। পশু চরাও আর ঘোড়ায় চেপে তীর-ধনুক চালাও।

    চেঙ্গিজ খান : আমিও কতো দেশ লুটেছিলুম। সব পয়সা খরচ করে ফেলেছে গুচ্ছের বংশধররা। একটা ব্যাপার ভালো হয়েছে যে বাইরের সৈন্য এসে আর আল-হিন্দ থেকে সোনাদানা টাকাকড়ি লুটে নিয়ে যায় না। এরা নিজেরাই লুটেপুটে বাইরে গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকে, সুন্দরীদের হারেম রাখে, ফিরতে চায় না। বিজয় মাল্য নামে একজন লুটেরার নাম শুনলুম সেদিন, ছবিও দেখলুম হাফল্যাংটো মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। শুনলুম ওর কচি গার্লফ্রেন্ড পিঙ্কি লালওয়ানিকে বিলেতে বিয়ে করেছে। ব্যাঙ্ক থেকে নয় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনে রয়েছে এই মদের ব্যবসাদার। আমি এদেশ থেকে নয় হাজার কোটি টাকার চেয়ে অনেক কম লুটে নিয়ে গিয়েছিলুম। আরও জানতে পারলুম ব্যাংক জালিয়াতির পান্ডা নীরব মোদি হীরাজহরতের ব্যবসায়ী ; মুম্বাইয়ে ঘাঁটি গেড়ে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের একটা শাখা থেকে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা জালিয়াতি করে বিদেশ পালিয়ে গেছে। তার সপ্তাহের মধ্যে তাঁর স্ত্রী, ভাইসহ ব্যবসার অন্য চাঁইয়েরাও দেশত্যাগী হয়েছে। ১০০ বিলিয়ন টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ে হর্ষদ মেহতাকে বম্বে উচ্চ আদালত এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দোষী সাব্যস্ত করার পর কম বয়সেই লোকটা মরে গেলো, আজব ব্যাপার। আল-হিন্দের সবচেয়ে বড়ো জালিয়াতি মামলায় সত্যম কর্ণধার বি রামালিঙ্গ রাজু দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। হায়দরাবাদ আদালত সাত বছরের কারাদণ্ড আর পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার নির্দেশ দিয়েছে তার বিরুদ্ধে। সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কলকাতা থেকে পালিয়ে যায়, তখনই সে সিবিআইকে লিখে যায় একটা চিঠি, আর তাতেই উল্লেখ করে যায় বাইশ জনের নাম, যারা সারদা গোষ্ঠীর পতনের মূলে ভূমিকা নিয়েছিল। রোজ ভ্যালি আর সারদা এই দুই চিট ফান্ড সংস্থার দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সেই সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে চিটফান্ড কেলেঙ্কারি। দুই চিটফান্ড সংস্থাই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতো। জমা দেওয়া টাকার অত্যধিক মূল্যে ফেরত দেওয়া হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত টাকা শোধ করতে ব্যর্থ হয় এই দুই সংস্থা। হাসান আলী খান নামে এক ঘোড়া ব্যবসায়ী টাকা পাচার করে সুইস ব্যাঙ্কে আট হাজার বিলিয়ন ডলার জমা করেছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : তাহলেই ভাবো। আমি তো সারা জীবন কতো দেশে কতো লুটপাট করলুম কিন্তু অতো হাজার হাজার টাকা চোখেই দেখিনি।

    চেঙ্গিজ খান : লোকটার নামে রেড কর্নার নোটিশ জারি হয়েছিল। নীরবের মামা মেহুল চোকসির বিরুদ্ধেও একইরকম অভিযোগ। সেও হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়ে বিদেশে পালিয়েছে। দীপক তলোয়ার নামে একজন হাওয়ালার মাধ্যমে প্রায় হাজার কোটি টাকা আর্থিক তছরুপ করে দেশ ছেড়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে গা ঢাকা দিয়েছে। সঞ্জয় ভাণ্ডারীর বাড়ি আর অফিসে থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন নথি মেলে। ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট অমান্য করে প্রায় ২৭ কোটি টাকা আর্থিক তছরুপের অভিযোগ রয়েছে সঞ্জয় ভাণ্ডারীর বিরুদ্ধে।সেও অন্য দেশে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। আরেকজন হলো ললিত মোদি ; দক্ষিণ আফ্রিকায় হওয়া আইপিএল-এ বেআইনি বিদেশি টাকা লেনদেন করেছিল। যে কোনও ধরনের তদন্ত থেকে রক্ষা পেতে লন্ডনের ঘাঁটি গেড়েছে ললিত মোদী। ওকে যখন গ্রেফতার করার সব প্রক্রিয়া শেষ তখন ও পালিয়ে গেল বিদেশে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে পালিয়ে মোদী এখন বহাল তবিয়েতে আছে। অথচ সবাই বলছে আমরা এদেশে কিছুই দিইনি। এই ডাকাতগুলো তো আমাদের পথ অনুসরণ করছে। তবে ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ল্যাঙড়া আম বোধহয় আমার আবিষ্কার, নয়তো ল্যাঙড়া বলবে কেন, সেনর ভাস্কো ? তবে আমাদের বাবর তৈমুর সংস্কৃতির চাঘির এনেছিল, ঠিক বলছি তো বাবর ? আপেল, নাসপাতি আর আঙুরের মদ। তুই এনেছিলিস মাজুম, যা তৈরি হয় আফিম আর গাঁজার বীজ মিশিয়ে, আখরোট, পেস্তাবাদাম, ছোটোএলাচ, মধু আর দুধ দিয়ে তৈরি বড়ি। ঠিক বলছি তো বাবর?

    ভাইপো আকবর : ওই সবের নেশাতেই আমার দুই ছেলে মুরাদ আর দানিয়েল অল্প বয়সে মরে গেল। ভাগ্যিস শ্যায়খুবাবা এই সবের নেশার চেয়ে যুবতীদের নেশায় মজেছিল, নয়তো আমার সিংহাসন নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যেতো। শ্যায়খুবাবা এলো না কেন ? আমাকেও পর্তুগিজগুলো গড়গড়া টানার অভ্যাস করাবার তালে ছিল। ওই ধোঁয়ায় তো কোনও নেশা হলো না। আমার দরবারে খাপ খায় না। কিন্তু আবুল ফজলের মাথা কেটে আমার ওপর রাগ ফলাবার চেষ্টা করে ভালো করেনি।

    ভাস্কো দা গামা : সেনর আকবর, আপনিও বৈরাম খানকে দিয়ে হেমু বিক্রমাদিত্যের গলা কাটিয়ে আফগানিস্তানে আপনার ফ্যামিলি মেম্বারদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, আর হেমুর দেহ একটা ফাঁসিকাঠে লটকে দিয়েছিলেন দিল্লিতে। ভেরি ব্যাড ফর ইয়োর রেপুটেশান।

    ভাইপো আকবর : হেমু ছিল বিপক্ষ পার্টিতে, আমার পার্টিতে থাকলে কাটাতুম না। শ্যায়খুবাবা এলো না ?

    গুলবদনপিসি : সেনর ভাস্কো, ল্যাঙড়াদার দেশে কিছুই হতো না অন্য দেশে নিয়ে যাবার মতন, ধর্মের নেশা আর নেশার ধর্ম ছাড়া।

    ভাস্কো দা গামা : আচ্ছা, ওনারা কারা ? চুল-দাড়ি সবই পেকে গেছে। বেশ সিরিয়াস কিছু আলোচনা করছেন বলে মনে হচ্ছে ?

    কফিহাউসের যক্ষ : আজ্ঞে ওনারা হলেন অগস্ত্য, অত্রি, ভরদ্বাজ, গৌতম, জমদগ্নি, বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্র। লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক। শিল্পসাহিত্য আর জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ে চলমান ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাধারা আর মতামত ব্যক্ত করার মুদ্রিত বাহনকে বলা হয় লিটল ম্যাগাজিন। ম্লেচ্ছদের সঙ্গে মেশেন না।

    সম্রাট অশোক : আমি ওই জানলার কাছের টেবিলে বসে আপনাদের আলোচনা শুনছিলুম। আপনাদের আলোচনার মাঝে ঢুকে পড়লুম বলে ক্ষমা করবেন। এখানে অনেকে সম্রাট বা সম্রাটদের বংশধর। আমি তৃতীয় মৌর্য সম্রাট ছিলুম, আমার বাবা বিন্দুসারের পর সিংহাসনে বসি। আমি কিন্তু বাইরে থেকে এসে সিংহাসন দখল করিনি। আমাকে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট বলা হয়। হয়তো শুনে জালালুদ্দিন মোহম্মদ আকবরের খারাপ লাগবে। দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ ছাড়া ভারতবর্ষের বেশিরভাগ অঞ্চল শাসন করেছি। আমাকে একজন সর্বভারতীয় সম্রাট বলতে পারেন। সাম্রাজ্যের বাইরেও আমি ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছিলুম। আধুনিক যুগে জীববৈচিত্র্য রক্ষার যে মনোভাব দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব যুগে বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক হিসেবে সে ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলুম। আমার চারজন বউ ছিল, আপনাদের মতন, তিশ্যারাক্ষ, পদ্মবতী, কারুভাকী আর বিদিশা। যে পরিবারে জন্মেছিলুম তারা আজীবিক ধর্মে বিশ্বাস করতেন। তা ছিল অন্যতম ভারতীয় ধর্ম। এই ধর্ম ২০০০ বছর ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল। এই ধর্মের মূল বিষয় ছিল নিয়তি অর্থাৎ ভাগ্য। এই ধর্ম মতানুসারে নিয়তি সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোনো পৌরুষাকার একে পরিবর্তন করতে পারে না।কিন্তু রক্তক্ষয়ী কলিঙ্গ যুদ্ধের পর আমার রাজনৈতিক আর নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে আমূল পরিবর্তন আসে। আমার নামে বসানো পাথর আর স্তম্ভলিপির মাধ্যমে প্রকাশ করেছি, কী করে কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তবন্যা আমাকে একজন নীতিবান মানুষে পরিণত করেছে। ওই সময় থেকেই আমি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিশ্বশান্তি আর ন্যায়নিষ্ঠ শাসন প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করি। জীবনের বাকি সময় অহিংস ধম্মই আমার পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। চেঙ্গিজ দেবশর্মা, ল্যাঙড়া দেবশর্মা, বাবর দেবশর্মা, আওরঙজেব দেবশর্মা, রাজত্ব বাড়িয়েও আপনারা কেন আত্মসমীক্ষা করলেন না তা ভাবতে ভাবতে আপনাদের টেবিলে উঠে এলুম।

    গুলবদনপিসি : সম্রাট অশোক, আমি আপনার কথা পড়েছি। জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর আপনার পথে হেঁটে সব ধর্মের মিলন ঘটাতে চেয়েছিলেন। দিন-ই-ইলাহি সম্রাট আকবর প্রবর্তিত একটি ধর্ম। তিনি ধর্মীয় বিষয়ে গবেষণার জন্য ফতেপুর সিক্রিতে একটা উপাসনা ঘর তৈরী করেছিলেন। যা’ধর্ম সভা’ নামে পরিচিত। সেখানে তিনি বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের কথা শুনতেন। শেষে, সব ধর্মের সারকথা নিয়ে উনি নতুন একটি নিরপেক্ষ ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ‘দিন-ই-ইলাহি’ নামে পরিচিত। সেই সময়ের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা এই ধর্মমতকে ভালভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। অনেক ঐতিহসিক দিন-ই-ইলাহীকে নতুন ধর্ম বলতে অস্বীকার করেন। এই ধর্মমত আকবরকে বিতর্কিতও করে তুলেছিল। ফলশ্রুতিতে এই ধর্মমত তেমন প্রসার লাভ করতে পারেনি। দিন-ই-ইলাহি ধর্মমতকে মেনে নিয়েছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন, যেমন বিরবল, জহাঙ্গির, আবুল ফজল ইবন মুবারক, যুবরাজ মুরাদ, কাশিম খান, আজম খান, শেখ মুবারাক, আবদুস সামাদ, মোল্লা শেখ মোহাম্মদ শাহাদাত, সুফি আহমেদ, মির শরিফ আমল, সুলতান খাজা, মির্জা সদরুদ্দিন, তাকি সুস্তার, শেখজাদা গোসলা বেনারসি, সদর জাহান, সদর জাহানের প্রথম ছেলে, সদর জাহানের দ্বিতীয় ছেলে, শেখ ফয়েজি, জাফর বেগ, এনারা সবাই। দারা শিকোহ ফার্সি ভাষায় ভগবত গীতা আর উপনিষদ অনুবাদ করেন।

    সম্রাট অশোক : আমার মনে হয় মানুষের পক্ষে কোনো ঈশ্বর বা ধর্ম ছাড়াই ন্যায় ও নীতিসম্পন্ন হওয়া সম্ভব। এখানে কখনোই মনে করা হয় না যে, মানুষ জন্মগতভাবে ভালো কিংবা মন্দ অথবা প্রকৃতির চেয়ে বড়ো কিছু৷ বরং মানবতাবাদী জীবনাদর্শে মানবতার রক্ষা এবং মানবিক সিদ্ধান্তের প্রতি দৃষ্টিপাত করাই একমাত্র দায়িত্ব।

    গুলবদনপিসি : আকবর চেয়েছিলেন তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মের কিছু উপাদানকে একীভূত করতে। এই উপাদানগুলো প্রাথমিকভাবে ইসলাম, হিন্দু ধর্ম এবং জোরোস্ট্রিয়ান ধর্ম, খ্রিস্টান, জৈন ধর্ম এবং বৌদ্ধধর্ম থেকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জনসাধারণ তা মানতে চায়নি। এখন প্রত্যেকটা লোক মনে করে তার ধর্মটাই বড়ো, যখন কিনা বেশির ভাগ মানুষই অন্য কোনো ধর্ম বা ধর্মহীনতা থেকে আস্তিকান্তরিত। আচ্ছা, আপনার টেবিলে এক যুবক আর এক যুবতী আপনার সঙ্গে গল্প করছিলেন, ওনারা কারা ?

    সম্রাট অশোক : ওহ ওরা ? ওরা বলিউডের অভিনেতা শাহরুখ খান আর কারিনা কাপুর খান। আমাকে নিয়ে একটা ভুলভাল ফিল্ম করেছে বলে ক্ষমা চাইতে এসেছে। শাহরুখ খান বিয়ে করেছে কাফের মেয়েকে আর কারিনা কাপুর নিজেই কাফের, পতৌদির নবাব বাড়ির ছেলেকে বিয়ে করেছে। ওদের ছেলের নাম রেখেছে তৈমুর । যাই, ওরা অনেকক্ষণ হলো এসেছে, আজকেই ফিরে যাবে। ওরা জানতো না যে আমাকে দেখতে খারাপ বলে আমার বাবা আমায় পছন্দ করতেন না। রাজা রবি বর্মার আঁকা আমার ছবি দেখে ওরা ভেবেছে আমাকে দেখতে গ্রিক দেবতাদের মতন।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আমার নামে ? দারুন। ওরা জানে তো যে আমি ল্যাঙড়া ছিলুম ?

    গুলবদনপিসি : ভুলভাল কেন : বাবরনামা, হুমায়ুননামা, জাহাঙ্গিরনামা, তৈমুরনামার মতন বই নেই আপনার সম্পর্কে ?

    সম্রাট অশোক : আছে, অশোকাবদান বা অশোকরাজাবদান নামে। দ্বিতীয় শতাব্দীতে লেখা বই, যেখানে আমার, মানে তৃতীয় মৌর্য্য সম্রাট অশোকের জীবন বর্ণনা করা হয়েছে। এই বইতে ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়াও বহু কল্পকাহিনী স্থান পেয়েছে। এই বইতে আমাকে একজন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, কেননা আমি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই ধর্ম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলুম। অশোকাবদান বইটা বহু বৌদ্ধ প্রবাদ ও কাহিনীর সংগ্রহ হিসেবে পরিচিত দিব্যাবদান বইয়ের অংশ বিশেষ। ফা-হিয়েন এই বইটাকে আ-ইয়ু ওয়াং চুয়ান নামে চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। আমার আধ্যাত্মিক টিচার বৌদ্ধ ভিক্ষু উপগুপ্তর কাহিনী দিয়ে এই বইটার শুরু। উপগুপ্তর পূর্ব-জন্ম আর মথুরা শহরে তার যৌবনের বর্ণনায় এই বইতে তার সঙ্গে নর্তকী বাসবদত্তার সাক্ষাৎ আর ভিক্ষুকত্ব নেবার গল্প বলা হয়েছে। এই বইতে আমার পূর্ব জন্মের কাহিনী আছে। সেই কাহিনী অনুসারে, পূর্ব জন্মে আমার নাম ছিল জয়। কৈশোরে জয়ের সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের সাক্ষাৎ হয়। জয় ধুলোকে খাদ্য জ্ঞান করে তাঁকে এক বাটি ধুলো দান করেন। তার মহাপরিনির্বাণের বহু বছর পরে এই বালক পরবর্তী কোন এক জন্মে পাটলিপুত্র নগরী থেকে চক্রবর্তী সম্রাট হিসেবে শাসন করবেন বলে গৌতম বুদ্ধ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। অশোকাবদান বইতে বলা হয়েছে যে, আমার বাবা বিন্দুসার আমার কুরূপের জন্য আমাকে অপছন্দ করতেন।

    গুলবদনপিসি : সিংহাসন দখলের জন্যে আপনাদের ভাইয়ে-ভাইয়ে বা কাকা-ভাইপোর মধ্যে মোগলদের মতন খুনোখুনি হতো না ?

    সম্রাট অশোক : হতো না আবার ! আরও বেশি করে হতো। আমি আমার সৎভাই, যে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিল, তার সঙ্গে শঠতা করে জ্বলন্ত কয়লা ভর্তি গর্তে ফেলে দিয়ে খুন করেছিলুম। আমি আমার মন্ত্রীদের বিশ্বস্ততার ওপর সন্দেহ করে পাঁচশো মন্ত্রীকে একের পর এক খুন করিয়েছিলুম। বন্দিদের থার্ড ডিগ্রি টর্চার করার জন্য একটি হলঘর তৈরি করিয়েছিলুম। এই সবই পালটে গেল, মানে আমি নিজেই পালটে গেলুম। দুঃখ কষ্টে সহনশীল এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আমি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে চুরাশি হাজার স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলুম।

    গুলবদনপিসি : আর কী আছে বইতে ? আমি ব্যাপারটা জানতে চাইছি যাতে হুমায়ুননামা বইটায় নতুন ইনটারেস্টিং কিছু অ্যাড করতে পারি।

    সম্রাট অশোক : বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারে আমার ভূমিকা এই বইতে বিশদে লেখা আছে। এই বই অনুযায়ী, আমি আমার ভাই বীতাশোককে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত করেছিলুম। এরপর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সম্মান করার জন্য মন্ত্রী যশসকে নির্দেশ দিই। তারপর উপগুপ্তকে সঙ্গে করে গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে জড়িত জায়গাগুলোতে তীর্থ করতে বেড়িয়ে পড়ি। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য আমি একটা পঞ্চবার্ষিকী উৎসবের প্রচলন করেছিলুম। এই উৎসবে আমার সঙ্গে পিন্ডোল ভরদ্বাজের দেখা হয়। আমার বউ তিষ্যরক্ষার ষড়যন্ত্রে আমার ছেলে কুণালের অন্ধত্বের কাহিনীও এই বইতে লেখা আছে। কুণাল পরবর্তীকালে অর্হত্ত্ব লাভ করে। বৌদ্ধ ধর্ম নেবার পরে দুটো ঘটনায় আমি চটে গিয়েছিলুম। একবার পুণ্ড্রবর্ধনের একজন লোক একটা ছবি এঁকে এনেছিল যাতে দেখানো হয়েছিল গৌতম বুদ্ধ নিগণ্ঠ ণাতপুত্তকের পা ছুঁয়ে প্রণাম করছেন। এক বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর অভিযোগ পেয়ে আমি তাকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিই আর পরে পুণ্ড্রবর্ধনের সমস্ত আজীবিক সম্প্রদায়ের মানুষদের মেরে ফেলার নির্দেশ দিই, যার ফলে প্রায় আঠারো হাজার মানুষ খুন হয়। কিছু সময় পরে, পাটলিপুত্র শহরের এক জৈন ধর্মাবলম্বী ওইরকম একটা ছবি আঁকলে আমি তাকে সপরিবারে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে মারার হুকুম দিই। যারা জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাটা মাথা এনে দিতে পারবে আমি তাদের রৌপ্য মুদ্রা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলুম। এই আদেশের ফলে ভুলক্রমে এক পশুপালক আমার ভাই বীতাশোককে জৈন সন্ন্যাসী ভেবে খুন করেছিল। আমার মন্ত্রীরা আমায় বলেন যে, এই হত্যাকাণ্ডগুলি জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যেও বেদনার সঞ্চার করেছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ রদ করে দিয়েছিলুম। অবশ্য এই গল্পগুলো বানানো, দেখাবার জন্যে যে আমি কতো খারাপ ছিলুম আর পরে কতো ভালো হয়ে গেলুম। তবে এটা ঠিক, অশোকাবদান বইয়ের বর্ণনা অনুসারে, শেষ জীবনে আমি আমার রাজকোষের সমস্ত সম্পদ সংঘগুলোকে দান করতুম। আমি সমস্ত সম্পদ দান করে দেবো এই ভয়ে আমার মন্ত্রীরা আমাকে রাজকোষে ঢুকতে দিতো না। তাই আমি নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ দান করে দিয়েছিলুম।

    গুলবদনপিসি : আপনি তো খুনোখুনির ব্যাপারে দেখছি মোগল, উজবেক, আফগান, ইরানি, তুর্কি সম্রাটদের চেয়ে কম যান না।

    সম্রাট অশোক : একটা যুদ্ধের পর আমি পুরোপুরি পালটে গিয়েছিলুম। তোমার মোগল, উজবেক, আফগান, ইরানি, তুর্কি সম্রাটরা তা পারেনি। আল-হিন্দের পূর্ব উপকূলে কলিঙ্গদেশ ছিল, এখন ওডিশা নামে পরিচিত। কলিঙ্গবাসীরা যুদ্ধ করলো বীরের মতো কিন্তু আমার পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীর সাথে পেরে উঠলো না। এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর জয়ী হলুম। এই সংগ্রাম আর বীভৎস অত্যাচার এত গভীরভাবে আমাকে আঘাত করলো যে, যুদ্ধ আর সব রকমের সামরিক কার্যকলাপের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা জন্মে গেল। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা দেখে নিজের ভেতর এক বিষাদ অনুভব করলুম। এত রক্তপাত আর হত্যাকান্ডের বদলে পাওয়া রাজত্বের প্রতি নিরাসক্ত বোধ করতে আরম্ভ করলুম। এরপর আমি আর যুদ্ধ করিনি। দক্ষিণের এক ক্ষুদ্র খন্ড বাদে সমস্ত ভারত ছিল আমার অধীন, আর এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডও আমি অনায়াসে জয় করতে পারতুম। গৌতম বুদ্ধের অহিংস নীতির প্রতি আকর্ষণ বোধ করতে লাগলুম, আর বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে বৌদ্ধধর্মের বাণী প্রচারের চেষ্টায় জীবন কাটালুম। আমার ধর্ম, মন্ত্র উচ্চারণ আর পূজা অর্চনায় ছিল না, মহৎ সামাজিক উন্নয়নের জন্য আমি মনোনিবেশ করলুম। দেশজুড়ে নির্মিত হলো বাগান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট। প্রজাদের সুপেয় পানীয়জল এর অভাব পুরণের জন্য নির্মাণ করা হলো অসংখ্য কুয়ো। নারীশিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হলো। বিশাল বিশাল চারটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হলো, সেখানে জ্ঞানের সর্বোচ্চ শাখার পাঠদান করা হতো। এমনকি পশুপাখিদের জন্যও আমি হাসপাতাল তৈরি করেছিলুম। এভাবে প্রজাদের উন্নতির জন্য কাজ করে, ছত্রিশ বছর রাজত্ব করে, মারা যাই।

    শাহজাহান : আমার বড়ো ছেলে দারা শুকোহ আর বড়ো মেয়ে জাহানারা অমন চরিত্রের ছিল। আওরঙজেব দুজনকেই সহ্য করতে পারতো না। আমি চেয়েছিলুম দারা শুকোহ সম্রাট হোক। আওরঙজেব ওকে খুন করে ওর গলা কেটে ফেললো। তারপর কাটা মাথাটা তরোয়াল দিয়ে থেঁতো করে আমার খাবার সময়ে পাঠিয়েছিল। দারা শুকোহকে হুমায়ুনের সমাধিতে কোথায় যে আওরঙজেব গোর দিয়েছিল তা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। দারার ছেলে সুলেমান শিকোহকেও একইভাবে খুন করেছিল।

    গুলবদনপিসি : সব পরিবারেই অবাধ্য সন্তান জন্মায়। আমাদের পরিবারে যেন বেশি জন্মেছে। আরে, ওই তো বাহাদুর শাহ জাফর আসছেন।

    বাহাদুর শাহ জাফর : অনেক কষ্টে এলুম তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে। বিদেশে নিয়ে গিয়েছিল ফিরিঙ্গিগুলো। এখন দেখে ভালো লাগছে মহাবিদ্রোহ সফল হয়েছে। এখানকার লোকেরা স্বাধীন হয়েছে। তবে আসার সময়ে শুনছিলুম চোর-ছ্যাঁচোড়ের সংখ্যা নাকি অনেক বেড়ে গেছে। যারা শাসক তারাই সিঁদ কাটছে। বেশি কথা বলতে পারি না, হাঁপিয়ে যাই। শায়রিও লিখতে পারি না।

    শাহজাহান : তোকে কী আর বলি বাহাদুর শাহ। আমি যে উর্দুভাষা তৈরি করেছিলুম, তুই আর গালিব ভালোবাসতিস, সেই ভাষা থেকে জন্মে গেল নতুন একদল মানুষ। তারা উর্দুভাষা নিয়ে একটা আলাদা দেশ বানিয়ে ফেললে। সেখানে পাসপোর্ট ছাড়া আমরা যেতে পারবো না। ওরা বলেছিল যে নাস্তিক কাফের মুরতাদদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে, অথচ ওই দেশেই যারা সুবেবাংলার ভাষায় কথা বলতো, তাদের ওপর এমন অত্যাচার করতে লাগলো যে তারা আলাদা হয়ে গেল। উর্দূদেশের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করছে। উর্দুদেশটায় সদাসর্বদা সামরিক চোখরাঙানি চলতেই থাকে।

    বাহাদুর শাহ জাফর : ভালোই হয়েছে। গালিবের কবর তো এই দেশে। সামরিক পাহারাদাররা এসেছে আমার সঙ্গে, যদি গালিবের কবরটা দেখতে দেয় তাহলে যাবো। শুনতে পেয়েছিলুম, তুমি বলছিলে, দারা শুকোহ’র কবর পাওয়া যায়নি, আওরঙজেব লোপাট করে দিয়েছে। নয়তো একবার যেতুম ওনার সমাধি দেখতে। দারা শুকোহর সমাধি আওরঙজেব লোপাট করেছিল আর আমার সমাধি লোপাট করেছিল ফিরিঙ্গিরা। ফিরিঙ্গিরা একটা পাথরের ফলক বসিয়েছিল, তাতে লেখা, “বাহাদুর শাহ, দিল্লির সাবেক রাজা। মৃত্যু রেংগুনে, নভেম্বর ৭, ১৮৬২। এই স্থানের কাছে সমাধিস্থ করা হয়”। কিন্তু সমাধির নির্দিষ্ট স্থান হারিয়ে গিয়েছিল। বর্মার লোকেরা কেবল জানতো যে শেদাগন প্যাগোডার কাছে আমার সমাধি আছে। ওই জায়গাতে মজুররা নর্দমা বানানোর জন্য মাটি খুঁড়ছিল। হঠাৎ বেড়িয়ে পড়ে পোড়া ইটের দেয়াল দেয়া এক কবর। ওপরে কিছু লেখা। সেই লেখা পড়ে ওরা জানতে পারে ওখানে আমি শুয়ে আছি। গড়ে ওঠে দরগাহ। পরে সেটা ট্যুরিস্টদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। বর্মার লোকেরা বলে, সম্রাট দরবেশের দরগাহ। মরে গিয়ে দরবেশ হয়ে গেছি।

    গুলবদনপিসি : হ্যাঁ, বাহাদুর শাহ, তুই দরবেশ হয়ে মোগলদের মুক্তি দিয়ে গেছিস।

    বাহাদুর শাহ জাফর : ওই যে, সামরিক পাহারাদাররা আসছে। উঠে পড়ি। নয়তো শু চি’র মতন চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাবে। যাবার আগে এই দু’লাইন শুনিয়ে যাই, হোলি তো এসে গেল :

    আজ বহুদিন পর হাতে পেয়েছি তোমায়, যেতে দেব না

    তোমার উত্তরীয় ধরে আটকে কৃষ্ণ হোলি খেলবো তোমার সাথে

    (বহোত দিনন মেঁ হাথ লাগে হো ক্যায়সে জানে দেউঁ

    আজ ম্যায় ফাগওয়া তা সও কানহা ফ্যায়তা পাকাড় কর লেউঁ)

    ভাইপো আকবর : বহুত খুব, বহুত খুব। শ্যায়খুবাবা আসবে না ?

    পাগলা তুগলক : বিনির্মাণবাদ হলো আপেক্ষিক সংশয়বাদী একটা ধারা যা কিনা ফেড্রিক নিটসের হাত ধরে ষাটের দশকে দারিদার কাছে এসে পরিপুষ্ট হয়েছে। সাহিত্য বা মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে বিনির্মাণবাদ একটা নতুন দরোজা খুলে দিয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, আমরা একটা নির্দিষ্ট পরিসরে সুনির্দিষ্টভাবে ভাষা ব্যবহার করি, চিন্তার জগতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। আর এক্ষেত্রে কোনও বিষয়ের লিখিত ও উপলদ্ধি-র মাঝে প্রায়শ ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকে। কাজেই কোন একটা টেক্সট পড়া দরকার টেক্সট হিসেবে। তাঁর বিনির্মাণবাদের মূলসূত্র তাই, “টেক্সট বা পাঠ প্রকৃতির বাইরে কিছু নেই”। আমরা এই ছোট্ট পরিসরে দারিদার এই নতুন দার্শনিক তত্ত্বের ব্যখ্যা নিয়ে আলোচনা করার সময় পাবো না, নয়তো দর্শন, সাহিত্য, সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্ম, এবং ইতিহাসের ওপর এর প্রভাব কতো গভীরে তা একটু তলিয়ে দেখার সুযোগ পেতুম। তার আগে যে সামাজিক ও দার্শনিক বাস্তবতার মধ্যে দারিদার এই তত্ব আত্মপ্রকাশ করেছিলো তার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে দু’চার কথা বলা দরকার ছিল, কিন্তু আজকের আড্ডা সিরিয়াস নয় বলে আর কিছু বলতে চাই না।

    তোতলা তুগলক : পাপাপাগলাটা এএএরককককমই রয়ে গেগেগেল ; দিদিদিল্লি থেকে দৌদৌদৌলতাবাদ। লোকেরা ওওওকে ঠিঢিঢিকমতন বুবুবুবুঝতে পাপাপারেনি।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : হ্যাঁ রে গুলবদন, হুমায়ুন এলো না ?

    গুলবদনপিসি : কোন হুমায়ুন ? হুমায়ুন আজাদ ? ওনাকে তো আলাউদ্দিন খলজির বংশধররা ভেড়া কাটার চপার মেরে মেরে খুন করে দিয়েছে। আর হুমায়ুন আহমেদ জেনানাঘরে বেগম আর খাতুনদের গপপো শোনাচ্ছেন।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : না, না। তুই যাকে নিয়ে হুমায়ুননামার ‘অর্ধেক জীবন’ লিখেছিস সেই নেশুড়ে হুমায়ুনের কথা বলছি।

    গুলবদনপিসি : ও তো তেহরানে পালিয়ে যাবার স্মৃতি থেকে মুক্ত হয়নি। হেলমেটে ঘোড়ার মাংস সেদ্ধ করছিল ভেড়ার চর্বি মাখিয়ে। বোধহয় খেয়েদেয়ে আসবে। আফিমের শরবতের নেশায় চুর থাকে সারাদিন। বাবর আর আকবরের নাম উজ্বল করতে পারবে না হুমায়ুন।

    চেঙ্গিজ খান : আচ্ছা ল্যাঙড়া, তুই একবার বলেছিলিস আল-হিন্দে অপ্সরারা থাকে, কই একজনকেও তো কফিহাউসে দেখছি না। সবাই কি পাথরের মূর্তি হয়ে গেল ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আপনি যেমন শুনেছেন, আমিও তেমন শুনেছি। অপ্সরাদের মধ্যে নামকরা হলো উর্বশী, মেনকা, রম্ভা, তিলোত্তমা, ঘৃতাচী, অলম্বুষা, মিশ্রকেশী্, জানপদী, বিদ্যুৎপর্ণা, অদ্রিকা, পঞ্চচূড়া, সোমা, মরীচি, শুচিকা, অম্বিকা, ক্ষেমা, অসিতা, সুবাহু, সুপ্রিয়া, সুগন্ধা, সুরসা, বিশ্বাচী, পূর্বচিত্তি, প্রম্লোচা, বর্গা, প্রমথিনী, কাম্যা, শারদ্বতী, গুণবরা, ঋতুস্থলা, বুদ্বুদা, সৌরভেয়ী, ইরা, চিত্রাসেনা, সমীচী, চারুনেত্রা, পুঞ্জিকস্থলা, শুচিস্মিতা, বিশালনয়না আরও কারা কারা যেন। ওই দিকের টেবিলে কয়েকজনকে তো অপ্সরা বলেই মনে হচ্ছে।

    ঘসেটি বেগম : না, না, ওরা অমন সেজে এসেছে। দেখছো না, ওরা একটা লোককে ঘিরে বসেছে। ওই লোকটার একটা কাগজ আছে, ফি-হপ্তায় নাকি পনেরো দিনে একবার বেরোয়। ওই লোকটাই বোধহয় বিশ্বামিত্র, ওরা তালে আছে ওনার কাগজটায় নিজেদের লেখা ছাপাবার। ছাপলে তবে অপ্সরায় প্রোমোশান। যতোদিন না ছাপছে ততোদিন রাক্ষসদলেই থাকবে। অনেকে শেষ পর্যন্ত পারে না, আমার আর ওসামা বিন লাদেনের মতন জলে ডুবে মরে।

    চেঙ্গিজ খান : এই রে, লোকটা তো চলে গেল। বোধহয় কাউকে পছন্দ হয়নি।

    গুলবদনপিসি : কিন্তু অন্য একজন বুড়ো আমাদের দিকে এতোক্ষণ তাকিয়েছিল, সে এদিকেই আসছে। বোধহয় আমাকেই অপ্সরা বলে মনে করছে। ওনার পেছন পেছন একজন যুবকও আসছে।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : তোকে তো দেখতে-শুনতে ভালোই। কতো আমির-ওমরাহ তোর জন্যে জান লড়িয়ে দিতো। তোকে হয়তো ওদের দুজনের ভালো লেগেছে। দ্যাখ, কাকে পছন্দ হয়।

    গুলবদনপিসি : দুজনকেই আমার পছন্দ।

    নাতিন্দ্রনাথ : কিছু মনে করবেন না। আপনাদের কথা শুনছিলুম। অপ্সরার কথা তুললেন বলে দেয়ালে টাঙানো ছবি থেকে নেমে এলুম আপনাদের কাছে। অপ্সরারা আমাদের ধ্যানেই আছে, কোনোখানেই তা বিষয়ীকৃত হয় নি, এ কথা মানতে কারোর ভালো লাগে না। তাই পুরাণে স্বৰ্গলোকের অবতারণা। যা আমাদের ভাবে রয়েছে অ্যাবস্ট্যাক্ট স্বর্গে তাই পেয়েছে রূপ। যেমন, ষে কল্যাণের পূর্ণ আদর্শ সংসারে রোজ দেখতে পাই নে, অথচ যা আছে আমাদের ভাবে, সত্যযুগে মানুষের মধ্যে তাই ছিল বাস্তবরূপে এই কথা মনে করে তৃপ্তি পাই। তেমনি এই কথা মনে করে আমাদের তৃপ্তি যে, নারীরূপের ষে অনিন্দনীয় পূর্ণতা আমাদের মন খোঁজে তা অবাস্তব নয়, স্বর্গে তার প্রকাশ উর্বশী-মেনকা-তিলোত্তমায়। সেই বিগ্রহিণী নারীমূর্তির বিস্ময় ও আনন্দ উর্বশী কবিতায় লিখেছি। অন্তত পৌরাণিক কল্পনায় এই উর্বশী একদিন সত্য ছিল, যেমন সত্য তোমরা আমরা। তখন মর্তলোকেও তার আনাগোনা ঘটত, মানুষের সঙ্গেও তার সম্বন্ধ ছিল ; সে সম্বন্ধ অ্যাবসট্র্যাক্ট নয়, বাস্তব। যথা পুরুরবার সঙ্গে তার সম্বন্ধ। কিন্তু কোথায় গেল সেদিনকার সেই উর্বশী। আজ তার ভাঙাচোরা পরিচয় ছড়িয়ে আছে অনেক মোহিনীর মধ্যে, কিন্তু সেই পূর্ণতার প্রতিমা কোথায় গেল ! ফিরিবে না, ফিরিবে না, অস্ত গেছে সে গৌরবশশী। একটা কথা মনে রেখো। উর্বশীকে মনে করে যে সৌন্দর্ষের কল্পনা কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে, লক্ষ্মীকে অবলম্বন করলে সে আদর্শ অন্যরকম হত ; হয়তো তাতে শ্রেয়স্তত্ত্বের উচ্চস্বর লাগত। কিন্তু রসিক লোকে কাব্যের বিচার এমন করে করে না। উর্বশী উর্বশীই, তাকে যদি নীতি-উপদেশের খাতিরে লক্ষ্মী করে গড়তুম তা হলে ধিক্কারের যোগ্য হতুম।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : দাদু, আমি তো কিছুই বুঝলুম না। বাদবাকি সবাই বুঝেছে কিনা জানি না।

    নাতিন্দ্রনাথ : তাহলে আরেকটা কথা বলি। যে প্রাণলক্ষ্মীর সঙ্গে ইহজীবনে আমাদের বিচিত্র সুখদু:খের সম্বন্ধ, মৃত্যুর রাত্রে আশঙ্কা হয়, সেই সম্বন্ধবন্ধন ছিন্ন করে বুঝি আর-কেউ নিয়ে গেল। যে নিয়ে যায় মৃত্যুর ছদ্মবেশে সেও সেই প্রাণলক্ষ্মী। পরজীবনে সে যখন কালো ঘোমটা খুলবে তখন দেখতে পাব চিরপরিচিত মুখশ্ৰী। কোনো পৌরাণিক পরলোকের কথা বলছিনে সে কথা বলা বাহুল্য, এবং কাব্যরসিকদের কাছে এ কথা বলার প্রয়োজন নেই যে বিবাহের অনুষ্ঠানটা রূপক। পরলোকে আমাদের প্রাণসঙ্গিনীর সঙ্গে ঠিক এইরকম মন্ত্র পড়ে মিলন ঘটবে সে আশা নেই। আসল কথা, পুরাতনের সঙ্গে মিলন হবে নূতন আনন্দে।

    ভাইপো আকবর : দাদু, এরা বুঝবে না। এরা জাহিল। আমার দীন-ই-ইলাহী বুঝতে না পেরে এরা কতো আমার খিল্লি উড়িয়েছিল। জানে না যে, জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক থাকাটাই যথেষ্ট নয়; তার সদ্ব্যবহারই প্রকৃত মানুষের কাজ। সকলে তাদের জ্ঞান-বিবেকের সদ্ব্যবহার করতে পারে না। কেউ সদ্ব্যবহার করতে সমর্থ হলেও কেউ আবার ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। শ্যায়খুবাবা এলো না কেন ?

    নাতিন্দ্রনাথ : সেই কথাই বলতে এসেছিলুম। যাক তুমি তো বুঝলে ? আমি যাই। সিঁড়ি দিয়ে নামতে আজকাল কষ্ট হয়। যেতে হবে জোড়াসাঁকো। দেখি উবের বা ওলা পাই কিনা। আমি আবার মোবাইল ঠিক মত হ্যাণ্ডল করতে পারি না। এই যুবক হয়তো নতুন করে বোঝাতে পারবে।

    ভাইপো আকবর : আপনারা পয়সাঅলারাই শুধু ব্রাহ্ম হলেন কেন ? চাকর-চাকরানি, মালি-মুদ্দোফরাসরা কী দোষ করেছিল। জমিদারির নমশুদ্র চাষিদের ব্রাহ্ম করতে পারতেন। আমাদের দেখুন, বাদশা থেকে ডোম-মেথর পর্যন্ত সবাই আস্তিকান্তরিত।

    নাতিন্দ্রনাথ : বাবামশায় বলতে পারবেন। উনি এখন উপাসনাঘরে।

    তিরিষ্ণুযুবক : আমি আমাদের উর্বশী আর গ্রিসের উর্বশী দুটোই হ্যাণ্ডল করেছি। গ্রিসের উর্বশীর নাম আর্টেমিস। দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আত্মস্থ করার পাশাপাশি আমি প্রথম থেকেই বিদেশিনীদের সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠি। তাই আমার জীবনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ প্রবেশ করেছে প্রথম থেকেই। বয়সের কারণে, জাহাঙ্গিরের মতন আমার মনেও প্রবেশ করেছে অনুরাগ, আবেগ ও নানান প্রেরণা। জাহাঙ্গিরের মতন মাত্র আঠারো বছর বয়সে আমি ইতিবাচকতা, হতাশা ও আশাবাদে প্রবলভাবে ভুগেছিলুম। উর্বশী আল-হিন্দে আমার অপরূপা সুন্দরী-প্রেমিকা। গ্রিসে আমার প্রেমিকা আর্টেমিস হলো বৃক্ষ ও অমাবস্যার দেবী, শিকারে পারদর্শী আর তরুণদের রক্ষা করতে অবিকল্প দেবী সে। অন্য দিকে সে দেবতাদের আলোর পথের দিশারি। এই দুই সুন্দরীকে নিয়ে আমি ঘর করেছিলুম। অপার রহস্যেঘেরা সৌন্দর্যের বাগানে শাহজাহানের মতন শৈল্পিক দাপট দেখিয়েছি। শাহজাহান আর জাহাঙ্গির জানবেন যে প্রেমকাতরতা আর বিলাপ যেন মানুষের জীবন থেকে ফুরোতেই চায় না। অপেক্ষা আর মনের চাঞ্চল্য মিলিয়ে আমার অনুভবে-ধরা প্রেমের এক অপরূপ প্রবাহকে। মায়া ও বিভ্রমের এই পৃথিবীতে আমি বারবার প্রেমিকাকে নিয়ে আশার সাগর তৈরি করতে চেয়েছি। অবসাদ থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়েছি প্রতিনিয়ত। আমি কল্পনায় সাজিয়েছি পৃথিবীর আদি ও অনন্ত রূপ। নারী-পুরুষের কম্পমান হৃদয়ে স্থান দিয়েছি কল্পনার রাজ্যের অপার আনন্দ

    শাহজাহান : বেশ ভালো লাগছে তোমার কথাগুলো যুবক। জাহাঙ্গির তো বহু নারীর সঙ্গে প্রেম করেছে, ও থাকলে তোমাকে শাহি দরবারে নিয়ে যেতো।

    ভাস্কো দা গামা : সেনর, আপনি শুধু ফর্সা, লাল ঠোঁট, পাতলা কোমর, উঁচু বুক, গোলাপি বোঁটা, প্রেমিকাদের নিয়েই ব্যস্ত আছেন? আমরা তো আফরিকা থেকে তুলে এনে কতো হাবশি মেয়ে এদেশে বিক্রি করেছি। আপনি একজনকে কিনে তাকে প্রেমিকা করে তুলতে পারতেন। তাদের মতন উঁচু বুক, উঁচু পাছা, চকচকে কালো ত্বক আপনি পাবেন না। জড়িয়ে ধরলে আপনি পাগল হয়ে যাবেন।

    নাতিন্দ্রনাথ : কালো মেয়ে নিয়ে আমি লিখেছি। এবার ছবির ভেতরে যাই, উবেরের ড্রাইভার ওপরে উঠে এসেছে।

    তিরিষ্ণুযুবক : না, তেমন সুযোগ হয়নি। পেলে ভালো হতো। প্রেমের নতুন পরিভাষা তৈরি করতে পারতুম। তবে সমস্যা হলো যে কলেজের ছাত্রছাত্রীরা আমার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতো। আপনাদের টেবিলে এসে ভালো লাগলো। যাই এবার। এই সময় আমার বাড়িতে বন্ধুবান্ধবরা এসে জড়ো হয়, সবাই মিলে এক-আধ পেগ মারি। ওই বুড়ো, যিনি একটু আগে এসেছিলেন, উনি বোধহয় যৌবনে একজন হাবশি মেয়েকে ভালোবেসেছিলেন। কেননা উনি লিখেছেন, “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে, কালো মেঘের কালো হরিণ-চোখ।ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে, মুক্তবেণী পিঠের ‘পরে লোটে।কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই, শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। পূবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে, ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা, মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।আমার পানে দেখলে কি না চেয়ে আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।এমনি করে কালো কাজল মেঘ জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।এমনি করে কালো কোমল ছায়া আষাঢ় মাসে নামে তমাল-বনে।এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আর যা বলে বলুক অন্য লোক।দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।মাথার ‘পরে দেয় নি তুলে বাস, লজ্জা পাবার পায় নি অবকাশ।কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।”

    ভাইপো আকবর : বহুত খুব, বহুত খুব। আমার নবরত্নদের কারোর সঙ্গে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেবো আমার পছন্দের হাবশি ক্রিতদাসীদের একজনকে। কোন হরিণের চোখের মেয়ে চাও ? বল্গা হরিণ, মায়া হরিণ, সম্বর হরিণ, চিত্রা হরিণ নাকি চাইনিজ ওয়াটার ডিয়ার, রেইনডিয়ার, এন্টিলোপ, এশিয়ার মাস্ক ডিয়ার, আর্দ্র ‌আফ্রিকার ওয়াটার চেভ্রোটেইন, কিংবা মাউস ডিয়ার, যেমন চোখের চাও, জানিও, পাঠিয়ে দেবো। শ্যায়খুবাবা এলোনা কেন ?

    কফিহাউসের যক্ষ : স্যার ওই লম্বাদাড়ি লম্বাচুল বুড়ে, যিনি একটু আগে ছবি থেকে নেমে এসেছিলেন, উনিও মাই নিয়ে একটা কবিতা লিখেছেন, কড়ি ও কোমল বইতে আছে ; তবে কবিতাটার নাম স্তন।

    চেঙ্গিজ খান : শোনাও শোনাও।

    কফিহাউসের যক্ষ : নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল,

    বিকশিত যৌবনের বসন্ত সমীরে

    কুসুমিত হয়ে ওই ফুটেছে বাহিরে,

    সৌরভ সুধায় করে পরান পাগল।

    মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল

    উথলি উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে।

    কী যেন​​ বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে

    বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়,

    সহসা আলোতে এসে গেছে যেন থেমে–

    শরমে মরিতে চায় অঞ্চল-আড়ালে।

    প্রেমের সংগীত যেন বিকশিয়া রয়,

    উঠিছে পড়িছে ধীরে হৃদয়ের তালে।

    হেরো গো কমলাসন জননী লক্ষ্ণীর–

    হেরো নারীহৃদয়ের পবিত্র মন্দির।

    ভাইপো আকবর : বহুত খুব বহুত খুব। শ্যায়খুবাবা এলো না কেন ?

    কফিহাউসের যক্ষ : স্যার ওই টেবিলে যে মেয়েটি বসে আছেন, ওনার নাম মিতুল দত্ত। উনিও স্তনের ওপর কবিতা লিখেছেন। ওনার কবিতার নাম দুর্বার জন্য কবিতা।

    চেঙ্গিজ খান : শোনাও শোনাও।

    কফিহাউসের যক্ষ : যেভাবে বুক দুটোকে বেঁধে রাখিস

    মনে হয় ওরা তোর মেয়ে

    একটুখানি ঢিলে দিলে বেয়াড়া অসভ্য হয়ে

    ডেকে আনবে পাড়ার ছেলেদের

    স্নানের সময় যেই খুলে দিস

    হুটোপাটি করে ওরা স্নান করে

    কেউ কাউকে একটু কষ্ট না দিয়ে

    যে যার মতো একা

    ভাইপো আকবর : বহুত খুব বহুত খুব। শ্যায়খুবাবা এলো না এখনও !

    নোবিলিআত্মন : মাই সম্পর্কে আর কী জানো ? ইটালিতে ফিরে যে আল-হিন্দ স্মৃতিকথা লিখব তাতে ইনক্লুড করে নিতে হবে।

    পাগলা তুগলক : আমি বলছি, আমি বলছি। মানুষই হল একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী যার যৌন উত্তেজনার সঙ্গে স্তনের সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত বড়ো মাপের স্তনের প্রতি পুরুষ বেশি আকর্ষণ অনুভব করে। নারী শরীরের অন্যতম নরম অংশ হল স্তন। এই কোমলতা পুরুষকে আকর্ষণ করে। ফলে স্তন স্পর্শ করতে, মুখ দিতে, মাথা রাখতে, এমনকী নারী দুই হাতে দুটি স্তনকে পরস্পরের সঙ্গে চেপে সঙ্গমছিদ্র তৈরি করলে পুরুষ আগ্রহ বোধ করে। নারী-স্তন পুরুষের কাছে অত্যন্ত আরামদায়ক। স্তনে মাথা রেখে বিশ্রাম নেওয়া তার সুপ্রাচীন অভ্যাস। জীবজগতে একমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে নারীর স্তন বয়সের সঙ্গে মাপে বড়ো হয়, যখন কিনা স্তন্যপায়ী পশুদের স্তনের মাপ বড়ো হয় তারা পোয়াতি হয়ে বুকে দুধ আসার পর ; বাচ্চা বড়ো হবার পর আবার আগের মতো হয়ে যায়। ঋতুর বয়সে পড়লে নারীর বুকে কেন চর্বি জমে অমন আকর্ষক পিণ্ড গড়ে ওঠে তার নানা রকম ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন গবেষকরা। কিন্তু প্রধান তর্ক হল যে তা পুরুষকে আকর্ষণের জন্য প্রকৃতির অবদান। ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘দি কেমিস্ট্রি বিটউইন আস : লাভ, সেক্স অ্যান্ড দি সায়েন্স অব অ্যাট্রাকশান’ বইতে ল্যারি ইয়াং ও ব্রায়ান আলেকজান্ডার জানিয়েছেন যে নারীর স্তন সম্পর্কে পুরুষদের অবশেসন ঘটে যখন সে মায়ের কোলে শুয়ে দুধ খায় এবং মায়ের অক্সিটোসিন হরমোন নির্গত হয় যার দরুন স্তনের সঙ্গে পুরুষের পাকা বাঁধন তৈরি হয়ে যায়, অবচেতনায় গেঁথে যায়। পুরুষ তার সঙ্গিনীর মধ্যে সেই একই বাঁধনযোগ্যতা খোঁজে আর তার জন্য সে বড়ো মাপের স্তনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যারা বেশ্যালয়ে যাতায়াত করে তারাও সুন্দর মুখমণ্ডলের বদলে বর্তুল স্তন আর খাঁজের খদ্দের হয়ে ওঠে। পুরুষ যখন চোখে দেখে, ছোঁয়, মুখ দেয়, টেপে, তখন তার অবচেতনায় শৈশবের ভালোলাগা স্মৃতি কাজ করে। বড়ো মাপের স্তনের প্রতি পুরুষের আকর্যণের কারণ হল অবচেতনে তারা স্তনকে দুধের ভাঁড়ার হিসাবে দ্যাখে ; যতো বড়ো স্তন ততো বেশি দুধ। সন্তান প্রসবের পর কোনো কোনো নারীর অত্যধিক দুধ হয় যা আগেকার কালে গেলে ফেলে দেবার চল ছিল ; এখন ডাক্তাররা বলেন যে তা সংগ্রহ করে অন্যান্য শিশুদের দিতে কিংবা তা স্বামী নিজেই স্তন থেকে পান করতে পারেন।

    তোতলা তুগলক : হ্যাঁ, এএএকটা দিদিদিল্লিতে, আআআরেকটা দৌদৌদৌলতাবাদে।

    ভাইপো আকবর : বহুত খুব বহুত খুব। আরে, একটা কমবয়সী মেয়ে হনহন করে এদিকেই আসছে ! অথচ শ্যায়খুবাবা এলো না।

    কৃপা খাতুন : আপনারা তখন থেকে মেয়েদের বুক নিয়ে ফালতু গ্যাঁজাচ্ছেন। আজকের একটা ঘটনা আপনাদের শুনিয়ে যাই। আজকে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, অটোতে পেছনের সিটে বসে বাড়ি ফিরছি। পেছনের সিটে অলরেডি তিনজন বসেছিল, তাই একটি স্কুল পড়ুয়া মেয়ে সামনের সিটে বসলো….

    অটোচালক একজন মধ্যবয়স্ক লোক, অটো চলতে শুরু করলো, আমরা যে যার নিজের ফোন ঘাঁটছি…

    হঠাৎ অটো কিছুটা চলার পরে সামনের সিটে বসে থাকা মেয়েটা চিৎকার করে উঠলো, অটো থামাতে বললো….

    আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম, হঠাৎ কি হলো কিছুই বুঝলাম না….

    মেয়েটা রাগে গজগজ করছে, সমানে চিল্লাচ্ছে…

    অটোচালক অটো থামালো, মেয়েটা অটো থেকে নেমে অটোচালকের কলার ধরে টেনে হিড়হিড় করে অটো থেকে নামানোর চেষ্টা শুরু করলো….

    অটোচালক কিছুতেই নামবে না, আমরা সবাই অটো থেকে নামলাম….

    আমি জিগ্যেস করলাম মেয়েটাকে কী হয়েছে বলো….

    মেয়েটা রীতিমতো চিল্লাতে চিল্লাতে বলছে,

    “যখন থেকে অটোতে উঠেছি, তখন থেকে লোকটা অসভ্যতামি করার চেষ্টা করছে। আমি প্রথমে ভাবলাম এত বয়স্ক মানুষ, হয়তো ভুল করে হাত লেগে গেছে বুকে….

    কিন্তু এই লোকটা ইচ্ছে করেই বারবার কনুই ঠেকাচ্ছে বুকে, আমার বাবার বয়সী একটা লোক কি অসভ্য, ছিঃ!

    একটু আগে এত জোরে কনুই দিয়ে বুকে আঘাত করলো, যে আমি আর সহ্য করতে পারলাম না তাই চিল্লিয়ে উঠলাম”….

    মেয়েটা এই কথাগুলো বলতে বলতে আশেপাশের প্রচুর লোকজন জোগাড় করে ফেলেছে….

    সবাই হাঁ করে মেয়েটার কথা শুনছে, মেয়েটার বুকগুলো দেখছে, অথচ কেউ এগিয়ে এসে লোকটাকে দুটো থাপ্পড় মারছে না, পুলিশ ডাকছে না….

    আমি মেয়েটাকে শান্ত করলাম, ওর চোখে মুখে জল দিয়ে দিলাম….

    আমি পুলিশকে ফোন করতে যাবো, ইতিমধ্যেই দেখলাম দুটো ছেলে এসে অটোচালককে রাস্তায় ফেলে মারছে…

    দুটো ছেলে বিশাল দামি কোনো শার্ট প্যান্ট পরেনি, দেখলেই বোঝা যায় অল্প শিক্ষিত ছেলে। ওঁরা পাশের গ্যারেজে কাজ করছিলো, জামায় কালিঝুলি মাখানো, চুল উস্কোখুস্ক, চুলের সামনের দিকে আবার লাল রঙ করা, চোখ মুখ শুকনো ভীষণ….

    মেয়েটার গলার চিৎকার শুনে ওঁরা ছুটে এসে লোকটাকে মারতে শুরু করেছে ততক্ষণে, আর যাঁরা তথাকথিত ভদ্র সভ্য শিক্ষিত (বাহ্যিক দিক থেকে) তারা হাত পা গুটিয়ে চুপচাপ তামাশা দেখছে….

    যাইহোক অটোচালক প্রথমে নিজের ভুল স্বীকার করছিলো না, তারপর ছেলে দুটোর মার খেয়ে স্বীকার করেছে নিজের নোংরামির কথা। মেয়েটার পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চেয়েছে….

    পড়াশুনোয় অল্প শিক্ষিত গ্যারেজে কাজ করা ছেলেদুটো মেয়েটার কাছে এসে বললো,

    “দিদি তুমি একদম কাঁদবা না, এই নোংরা লোকেদের জন্য আমাদেরকে সবাই খারাপ ভাবে দিদি। এই নোংরা লোকদের জন্য চোখের জল ফেলবা না”…..

    ইতিমধ্যেই ট্রাফিক পুলিশ এসে অটোচালককে নিয়ে যায় ওখান থেকে….

    মেয়েটাকে আমি বললাম, ওই নোংরা লোকটাকে এত সহজে ছেড়ে দিও না। উপযুক্ত শাস্তি দিও, পুলিশে অভিযোগ জানিও, আজকে তুমি ছেড়ে দিলে কালকে অন্য একটা মেয়ের সাথে ওই লোকটা আবার নোংরামি করবে, ওর কিন্তু জেল খাটা দরকার….

    গ্যারেজে কাজ করা ছেলে দুটো অন্য একটা অটো ডেকে এনে মেয়েটাকে তুলে দিলো অটোতে, নিজেই পকেট থেকে ভাড়া বার করে দিয়ে দিলো….

    মেয়েটা তারপর অন্য অটোতে চেপে বাড়ি ফিরেছে সুরক্ষিত ভাবে, মেয়েটার ফোন নম্বর নিয়েছিলাম, ফোন করে জানলাম। কালকে হয়তো অটোচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাবে….

    মেয়েটার বয়স বেশি নয়, ষোলো সতেরো হবে, তবুও যে ও এই প্রতিবাদটা করলো এত ছোট বয়সে, মেয়েটাকে কুর্নিশ…

    মেয়েটা কিন্তু প্রতিবাদ না করে পিছিয়ে আসতে পারতো, চুপচাপ সহ্য করতে পারতো, বেশিরভাগ মেয়েরা তাই করে, কিন্তু মেয়েটা প্রতিবাদ করেছে, এটাই আমার কাছে অনেক….

    আর ওই ছেলে দুটোকে প্রণাম জানাই….

    ওই ছেলে দুটোকে বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে মনে হবে পাড়ার মোড়ে বসে থাকা রকবাজ ছেলে। কিন্তু ওঁরাই আসল হীরে, সবসময় শিক্ষা পোশাকে থাকে না, শিক্ষা থাকে নিজের বিবেক বোধে….

    আমি আজ খুব খুশি, চারিদিকে এত কাঁচের মধ্যে আজ দুটো হীরের টুকরো ছেলের সাথে আলাপ হলো।

    ওই দুটো ছেলের কাছে আজীবন ঋণী থাকলাম, যাঁরা পড়াশুনোয় হয়তো বেশি শিক্ষিত নয়, কিন্তু মানবিক দিক থেকে আমাদের চেয়েও অনেক বেশি শিক্ষিত….

    এরকম ছেলে ঘরে ঘরে জন্মাক….

    মালিক অম্বর : চাইলেই জন্মায় না খাতুন, আব্বা-অম্মির ভালোবাসা দরকার !

    আসমাঅধরা খাতুন : আমার নাম ধরাছোঁয়ার বাইরের নীলাকাশ, তাই কয়েকটা কথা বলে যাই। কবি জানোতো, ঈশ্বর বন্দনা শেষে কানের পাশ ঘেঁষে যে ডেকে ওঠে সে শকুন, কোকিল নয়। চাঁদ পূজন শেষে সেই শকুনের মতই তারস্বরে ডেকে ওঠে অন্ধকার। ওঙ্কার, ভাষা আর উপভাষায় যাকেই ডাকবে পুঁথির মতো দুলে দুলে সুর তুলে, সে দেবতা ইন্দ্রিয়ের অতীত কোন সিন্ধু অথবা বিষাদের সাগরে ভাসিয়ে দিতেই অভ্যস্ত। এই সমস্ত চণ্ডাল রাহু কেতু পরিভ্রমণ শেষে সমস্ত উপাসনা সমাপ্ত হতেই দেখবে পুড়ে যাচ্ছো স্বশরীরে। অথচ, পৃথিবীর ছাপাখানায় যে কবিতার পাণ্ডুলিপি পাঠাও তাই, চৈতন্যের দোসর তোমার। এখানে ঈষদুষ্ণ লবঙ্গ জলে কিঞ্চিত নুন মিশিয়ে সেবন করে নিলেই অহেতুক ব্যথা কম হতে পারে, সে নশ্বরতার অভিশাপ নয়। কবি, তোমার কোমল ত্বক কি সইতে পারে আঘাত, যে আঘাতে মলম পট্টি করে দিলেই সেরে যায়! তবু, শ্রীকৃষ্ণ বাঁশী বাজালেই তুমি উতলা হয়ে ওঠো, ঘুঙুর বাঁধতেই ছুটে যাও বনপথে, ময়ূরের মত নাচতে নাচতে দেখো সেখানে পড়ে থাকে কেবল ঝরা পাতা- যে পাতা তোমারই পদতলে মুড়মুড় করে ভেঙ্গে যায়, সে পাতায় একটি ছোট কবিতা লিখে দেখাও তো কবি! কবিতা কি ভেসে যাচ্ছে না জলে? অশান্ত হচ্ছে না তোমার মনপুরার শান্ত অলকানন্দা? এসো বন্ধ করে দাও সমূহ অন্ধকার স্তুতিরূপ। কেবল নিজের কিয়দংশ ভরে রাখো নেফারতিতিয় রূপবন্দনা, তোমাদের অহমের অর্ধাংশও যদি নার্সিসিজম শিখে যায়, ভরে উঠবে খালি কবিতার খাতা, শূন্য গানের ঘর, পূর্ণ হবে অর্ধসমাপ্ত সমূহ গীতিকবিতা অথবা পাণ্ডুলিপি…

    ঢ্যাঙা তুগলক : আহা, আহা, খাতুন, আহা !

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ওই দ্যাখ, বাবরের মতন দেখতে একজন বুড়ো এদিকেই আসছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠে সোজা এদিকেই আসছে। কেউ চিনিস ওনাকে। মোগল বাদশা বলেই তো মনে হচ্ছে দেখে। বাবরের দাদু নাকি ?

    দাদুন্দ্রনাথ : না, আমি বাবরের দাদু নই। ওই বুড়ো যে একটু আগে ছবি থেকে নেমে এসে তোমাদের জ্ঞান দিয়ে গেল, আমি তার দাদু। আমি ব্রিটেনের কবরে শুয়ে থাকি, যদিও আমি কাফের, ইনফিডেল। আমার ছেলের বন্ধুবান্ধব আর নাতিরা মিলে তোমাদের আর খ্রিস্টানদের দেখাদেখি নতুন ধর্ম আরম্ভ করেছিল, যদিও এখন সবই ফক্কা হয়ে গেছে, ছেলেরা বউ পায় না, মেয়েরা বর পায় না, এমন অবস্হা। বাধ্য হয়ে কেউ তোমাদের বিয়ে করে, কেউ কাফের বিয়ে করে, কেউ খ্রিস্টান মেম বিয়ে করে।

    ভাইপো আকবর : আপনি বসুন, হাঁপাচ্ছেন দেখছি, জল খান, কফি আনিয়ে দিচ্ছি। শ্যায়খুবাবা এলো না কেন ?

    দাদুন্দ্রনাথ : আমাকে সবাই প্রিন্স বলে ডাকে। আমার তো হৃৎপিণ্ড নেই যে হাঁপাবো। যখন বিলেতে মারা গেলুম ওরা কেউ খোঁজখবর নেয়নি। আমাকে ওখানকার লোকেরা গোর দিয়ে দিলে। আমার ছেলে আর নাতিরা চিন্তায় পড়েছিল যে দাহ না করে গোর দেয়া উচিত হয়নি। ওরা লোক পাঠিয়ে গোর থেকে আমার হৃৎপিণ্ডটুকু কেটে এনে দাহ করেছিল। ওরা আমাকে পছন্দ করতো না। আমার বউও আমাকে পছন্দ করতো না, বিলেতের মেমদের সঙ্গে মেশামিশি করি বলে একঘরে করে দিয়েছিল। এখন আমার গোরটাকে সেখানের বাঙালিরা নতুন করে তৈরি করেছে, তাতে আমার মারা যাবার তারিখ আছে কিন্তু জন্মাবার সন-তারিখ লেখা নেই।

    বাবর : কেন ?

    দাদুন্দ্রনাথ : আমি ধীরুভাই হতে চেয়েছিলুম। সুবে বাংলাকে ধীরুভাইয়ের মতন বড়োলোকের দেশ করতে চেয়েছিলুম। কিন্তু ওদের পছন্দ হলো না। ওরা সারাদিন চোখ বুজে ধ্যান আর গান গাওয়া, শায়রি লেখাকে বড়ো কাজ মনে করতো।

    গুলবদনপিসি : ওই তো পরীবিবি আর বেগম সমরু আসছেন।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : ধীরুভাই লোকটা কে ?

    দাদুন্দ্রনাথ : চেনেন না ? ধীরুভাই তো দাউদের জাহাজে খেপে-খেপে মেশিন এনে পেটরলের পুরো কারখানা বসিয়ে ফেললো। আমি নিজের জাহাজ, রেল লাইন, প্রিন্সলি এসটেট, বীমা ব্যবসা, নীল ব্যবসা, আবাসন ব্যবসা আরম্ভ করেছিলুম। আমারই করা সম্পত্তি ওরা ভোগ করে আমাকেই পরিবার থেকে আলাদা করে দিলে। ধীরুভাইয়ের বড়ো ছেলে এখন এই দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী মানুষ। আমার নাতিপুতিরাও হতে পারতো। যাকগে, নাতির লেখা গান নিয়েই এখন সুবে বাংলার ব্যবসা চলছে। তবে কে একজন বন্দ্যোঘটি শুনেছি আমাদের বাড়ির কেচ্ছা বিক্রি করে ব্যবসা করছে। যদি আমি ধীরুভাই হতুম তাহলে এই সব ফালতু ব্যবসা করতে হতো না। হাওয়ায় ফিসফিস উড়ছিল যে কফিহাউসে তোমাদের আড্ডা হবে, তাই এসে বলে গেলুম নিজের দুঃখের কথা। আমার সময়ে তো কফিহাউস বা অকারণ আড্ডার ব্যাপার ছিল না, তাই খুঁজে বের করতে দেরি হয়ে গেল। সেই সকাল থেকে খুঁজছিলুম। এবার উঠি। আমার কবরে, কে আবার মরে গিয়ে তার ভেতর এসে শুয়ে পড়বে। আজকাল গোরের জায়গা সহজে পাওয়া যায় না। ভাগ্যিস তোমরা গোরের ওপরে মহল খাড়া করে গেছ, নইলে দেখতে বেদখল হয়ে গেছে। ওকে, গুড নাইট।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : তোমাকে নিয়ে টানাটানির আবার কী হলো ? তুমি তো পুরোনো ঢাকায় শায়েস্তা খানের তৈরি দুর্গের কবরে শুয়ে থাকো বলে জানি, গুয়াহাটিতে তো নয়। বেগম সমরু, কেমন আছিস ?

    পরীবিবি : আসলে আমি তো অহোম রাজকুমারী। অহম রাজা জয়ধাজ সিংহের একমাত্র মেয়ে আর অসমিয়া যোদ্ধা লাচিত বোর্ফুকনের ভাগ্নী রমনী গভারু। যখন আমার বয়স ছয় বছর তখন মীর জুমলার বাহিনীর কাছে মুক্তিপণ হিসাবে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমার সঙ্গে ছিল টিপম রাজার নাবালিকা মেয়ে। তাকেও মোগলদের হাতে দেয়া হয়েছিল মুক্তির মূল অংশ হিসেবে। মীর জুমলা অসুস্থ হয়ে পড়ে আর ঢাকায় যাওয়ার পথে মারা গিয়েছিল, আপনারা তো জানেন। ওনার সমাধি মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে। আমাকে সেসময়ে বাংলার রাজধানী ঢাকায় নিয়ে গিয়ে শায়েস্তা খানের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের আদেশে আমাকে ইসলামে ধর্মে আস্তিকান্তরিত করে রহমত বানু নাম দেওয়া হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের ছেলে আমাকে বিয়ে করে ১,৮০,০০০ টাকা যৌতুক নিয়েছিল। যদিও বাংলাদেশে আমি আমার জীবনের অন্য গল্পের ভেতরে বেঁচে আছি, সেই একই কবরে। ওরা মনে করে আমি শায়েস্তা খানের মেয়ে, যে আওরঙ্গজেবের ছেলে মুহম্মদ আজম শাহকে বিয়ে করেছিল। আমি মারা গেলে বেচারা বর, লালবাগ দুর্গটা পুরো করার আইডিয়া ছেড়ে দিয়ে আমাকে প্রাসাদেই সমাধিস্থ করেছিল। আমি নাকি খুবই সুন্দরী, তাই আমার বর আমাকে পরীবিবি বলে ডাকতো। এখানকার রিকশঅলারা দুর্গটার নাম দিয়েছে পরীবিবির কবর। তারা প্যাসেঞ্জার এনে তাদের বলে, পরীবিবির একজন প্রেতিনী, রাতে লালবাগ কেল্লায় ঘোরাঘুরি করে ? ভেতরে উঁকি মেরে দ্যাখো, পরীবিবি মিটকি মেরে পড়ে আছে। আমার ভাগ্য ভালো। কয়জনই বা একসঙ্গে দুটো দুরকম গল্পে বেঁচে থাকে, বলো ! চলি, খোদা হাফিজ। আমার কবর এমন ভাঙাচোরা যে সন্ধের আগে ভেতরে ঢুকে না পড়লে সাপখোপ আশ্রয় নেবে। বেগম সমরু, চললুম। আবার দেখা হবে। এসো একদিন পুরোনো ঢাকায়।

    জোয়ানা নোবিলিস সম্ব্রে : হ্যাঁ, যাবো রে পরীবিবি। ভালোই আছি ল্যাঙড়াদা। সেনর ভাস্কো ভালো আছেন তো ? কতোকাল দেখাসাক্ষাৎ কথাবার্তা হয়নি আপনাদের সঙ্গে।

    ভাস্কো দা গামা : ভালো লাগলো তোকে দেখে জোয়ানা নোবিলিস সম্ব্রে । তুইই তো এদেশে একমাত্র ক্যাথলিক শাসক ছিলিস, সম্পত্তিও করেছিলিস অঢেল।

    জোয়ানা নোবিলিস সম্ব্রে : আপনারা, ক্যাথলিকরাই শুধু আমাকে সন্মান করেন। কিন্তু হিদেন আর ইনফিডেলরা আমাকে নাচনেওয়ালি-নাচনেওয়ালি বলে-বলে বদনাম করে। বেগম সমরু বললেই, তার সঙ্গে নাচনেওয়ালি জুড়ে দ্যায়।

    বাবর : তুই তো ছিলিসই নাচনেওয়ালি।

    জোয়ানা নোবিলিস সম্ব্রে : আপনার নাতি জালালুদ্দিন আর জালালুদ্দিনের ছেলে সেলিম তো একই নাচনেওয়ালি আনারকলিকে পেতে চাইতো ; সেলিম আনারকলিকে পেয়ে গেল বলে জালালুদ্দিন মেয়েটাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিলে।

    ভাইপো আকবর : এই বেগম সমরু, মুখ সামলে কথা বলবি। তোর প্রাসাদে যে দুজন লোক আগুন লাগিয়েছিল, তুইও তাদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে দিয়েছিলি। আমি তো একটা চারদেয়ালে বন্ধ করে দিয়েছিলুম। শ্যায়খুবাবা এলো না ?

    চেঙ্গিজ খান : আরে ঝগড়া করছিস কেন। একটু বসুক, কফি-টফি খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিক, তারপর না হয় যে যার নিজের কথা বলিস।

    জোয়ানা নোবিলিস সম্ব্রে : আমাকে ল্যাঙড়া তৈমুর ডেকেছিল বলে এয়েছি। নইলে আসতুম নাকি অতোদূর থেকে এই নাস্তিকদের কফিহাউসে ! কতোকাল পরে তোমাদের সঙ্গে দেখা। সবাই বেশ ভালোই আছো দেখছি। কিন্তু তোমাদের কুতকুতে চোখ তো আল-হিন্দে হাজার বছরে হারিয়ে গিয়ে আবার যেমনকার তেমন হয়ে গেছে। সেনর ভাস্কোর লোকেরা, বব ক্লাইভের লোকেরা কতো মেয়ের সঙ্গে শুলো, তবুও জাতটা ফর্সা হলো কই। এই যদি আলেকজাণ্ডারের সৈন্যরা ধর্ষণ করতে-করতে আসতো তাহলে দেখতে, তুর্কি থেকে আল-হিন্দ পর্যন্ত মানুষেরা গ্রিক দেবী-দেবতার মতন দেখতে হয়ে যেতো।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : আলেকজাণ্ডারের সাইড নিচ্ছিস যে বড়ো। সারাজীবন সাইড-বদল আর বর পালটিয়ে তো রাজত্ব করলি। তোকে কে বলল আলেকজাণ্ডারের সৈন্যরা ধর্ষণ করতে-করতে এগোয়নি। যে-সমস্ত দেশ হয়ে আলেকজাণ্ডার আল-হিন্দ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, সেখানকার মানুষরা কতো ফর্সা আর তাদের নাক-নকশা কেমন গ্রিক দেবী-দেবতার মতন তা দেখেছিস। বেশিরভাগ মেয়েই তো রূপসী। তুই অমন বোঁচা নাক আর গালফোলা চেহারা পেয়েছিস বলে আমাদের দুষছিস কেন !

    জোয়ানা নোবিলিস সম্ব্রে : আলেকজাণ্ডার কোনো দেশে গিয়ে নিজের ধর্ম চাপিয়ে দেয়নি। কুড়ি বছর বয়সে বেরিয়ে হ্যাণ্ডসাম ছেলেটা কতো দেশ জয় করে ফিরে গেল।

    বাবর : ওদের সময়ে এখনকার মতন ধর্ম ছিল না, তাই চাপাবার মতন কিছুই ছিল না। তুইও তো নিজের ধর্ম পালটালি রাজনৈতিক প্যাঁচ কষবি বলে। তুই ছিলি নাচনেওয়ালি ফরজানা জেব উন নিসা, কাশ্মিরি রক্ষিতার মেয়ে, রাস্তায় রাস্তায় নাচতিস দুজনে। তা থেকে হয়ে গেলি পেশাদার প্রশিক্ষিত ভাড়াটে সেনাবাহিনীর প্রধান, তোর জার্মান লিভটুগেদার বুড়ো বয়ফ্রেণ্ড ওয়াল্টার রেইনহার্ট সোম্ব্রের কাছে শিখে। বাংলার নবাব তোর বুড়ো বরকে হুকুম দিলে কিছু ইংরেজকে খেতে ডেকে তাদের খতম করে দিতে। সেকাজ করে তোর বুড়ো বর নাম ভাঁড়িয়ে পালালো লখনউ, অবধের নবাবের চাকরিতে। তোর বুড়ো বরের আগেই একটা আল-হিন্দের বউ আর ছেলে ছিল। তোর বুড়ো বর যোগ দিলো মোগল শাহ আলমের সঙ্গে আর পেয়ে গেল মিরাটের কাছে সরধনার জাগির। সে যখন পটল তুললো তার পুরো সম্পত্তি, ভাড়াটে সেনার দল পেয়ে গেলি আর পাকড়াও করলি কম বয়সী এক ফরাসি ছোকরাকে। ধর্ম পালটালি কেননা ব্রিটিশ অফিসারদের সঙ্গে সেক্স করতে তোর অসুবিধে হচ্ছিল। তুই আঁচ করেছিলিস যে ব্রিটিশরা এবার সিংহাসনে বসতে চলেছে। ব্রিটিশ চিত্রকরদের দিয়ে নিজের ছবি আঁকালি, পাগড়ি পরে, হাতে গড়গড়া নিয়ে, বেগম সমরু।

    জোয়ানা নোবিলিস সম্ব্রে : নাচনেওয়ালি বলো বা বেগম সমরু বলো বা রক্ষিতার মেয়ে বলো। নেমন্তন্ন করে ডেকে পাঠিয়ে যতো ইচ্ছে অপমান করে নাও। মনে রেখো, আমি যে চার্চ তৈরি করিয়েছি, তা আজও বহাল আছে। ক্রিস্টানরা রোববার দিন জমায়েত হয় । যেদিন মরেছিলুম, ইংরেজরা মিলিটারি স্যালিউট দিয়েছিল। তোমাদের তো ঝাড়েবংশে নিকেশ করে দিয়েছে, শেষ বংশধরকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। চললুম। আমার কবর এদেশেই। এখনও খ্রিস্টানরা ফুলের তোড়া রেখে যায়।

    ভাইপো আকবর : যা, যা। নিজের জাগিরের কবরে গিয়ে শুয়ে থাক। শ্যায়খুবাবা এলো না এখনও?

    চেঙ্গিজ খান : মিছিমিছি চটিয়ে তাড়িয়ে দিলি মেয়েটাকে। একটু গল্পগুজব করা যেতো।

    ভাস্কো দা গামা : আপনাদের দেখছি মরবার পরও মোগলাই তেজ যায়নি।

    গুলবদনপিসি : সেনর ভাস্কো, আপনি দাবি করেন যে আল-হিন্দ আবিষ্কার করেছিলেন, পর্তুগিজরা গোয়া দখল করেছিল, কিন্তু আপনি হের্নান কোর্তেস, ভেলী দে ওয়াক্সাকার প্রথম মার্কেস-এর মতন গ্রেট এক্সপ্লোরার দখলদার হতে পারেননি। হের্নান কোর্তেস ছিলেন একজন স্পেনীয় দখলদার, যিনি ষোড়শ শতাব্দীতে একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন যার ফলে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত এজটেক সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং বর্তমান মেক্সিকোর বিশাল অঞ্চলগুলো স্পেনের ক্যাস্টিল রাজ্যের অধীনে আসে। ওনার খুড়তুতো ভাই ফ্রান্সিসকো পিসার্‌রো, যিনি পরবর্তীকালে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিমে অবস্থিত ইনকা সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন। কোর্তেস উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত আজটেক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্থানীয় অন্যান্য দেশজ জাতির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে বাজি মাৎ করেছিলেন। কোর্তেস দেশজ আমেরিকানদের সঙ্গে তাদের স্থানীয় ভাষা, কেচুয়া ভাষায় যোগাযোগ করার জন্য সেখানকার ডোনা মারিনা নামের একজন মহিলার সঙ্গে লিভটুগেদার করতেন আর সাহায্য নিতেন। ডোনা মারিনা পরবর্তীকালে কোর্তেসের এক ছেলের মা হন। আপনারা তো এদেশের রাজা-বাদশাদের ভয়ে কিছুই করতে পারেননি। এমনকি পর্তুগিজদের বলেছিলেন গোয়ার মেয়েদের সঙ্গে যেন লিভটুগেদার না করে। ঠিক কি না, বলুন ?

    ল্যাঙড়া তৈমুর : মোগলাই নয় সেনর ; বলুন তৈমুরি। আরেক রাউন্ড কফির অর্ডার দিই, কী বলিস গুলবদন ?

    গুলবদনপিসি : আমি তো হজ করে ফিরে টায়ার্ড হয়ে গেছি। এই ভাস্কোর লোকেরা সুরাটে আমাদের দলটাকে একবছর আটকে সময় নষ্ট করালো ; ওরা যাওয়া-আসার সামুদ্রিক ভিসা দিতে অনেক সময় নিয়েছিল। ওরা জাহাজ ভরে-ভরে কাকের মতন পোশাকে আর কালো টুপি-পরা পাদ্রিদের এনেছে। সঙ্গে এনেছে শুয়োরের টাটকা মাংস, আগুনের ধোঁয়ায় সেঁকা মাংস, সসেজ নামের লম্বাটে কিমা, শুকনো মাছ, নানারকম মদ, অলিভ তেল, শুকনো মাখন, পাকা ডুমুর, নানারকমের ফল। জ্যান্ত মুর্গি, ভেড়া, টার্কি, হাঁস, খরগোশ, জ্যাম, জেলিও এনেছে এদেশে খাবে বলে। ওদের জাহাজে বড়ো-বড়ো কামান। আসলে মোগলদেরও নৌবহর থাকা উচিত ছিল। বাবরের সময় থেকে তোমরা শুধু পাহাড় মরুভূমি সমতলভূমি দখলের ধান্দায় সমুদ্রের কথা ভুলে গেলে। আওরঙজেব বিষয়টা নিয়ে ভাবতে পারতো, ও তো সমুদ্রের ধারেকাছেই কতোদিন রইলো।

    চেঙ্গিজ খান : আরে আওরঙজেবের কথা ছাড়। মারাঠাদের পোঁদে লেগে জীবন নষ্ট করল, মোগল সাম্রাজ্যেরও বারোটা বাজিয়ে দিলে। তোর হজের গল্প কর বরং। বাহান্ন বছর বয়সে গেলি, ছয়-সাত বছর ধরে কতো ঘোরাঘুরি করলি, চাড্ডিখানি কথা নয়।

    গুলবদনপিসি : আমার আগে বেগা বেগম হজ করেছিলেন, ওনার কাছে খুঁটিনাটি জেনে নিয়েছিলুম। সুরাট বন্দরের কর্তা কুলিজ খান আন্দিজানি ছিল আমাদের সঙ্গে সব সময়। তাছাড়া সালিমা সুলতান বেগম, হিন্দলের বিধবা বউ সুলতানম, হাজি বেগম, গুলজার বেগম, উম কুলসুম, সলিমা খানুমকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলুম। চাকরানিরাও ছিল। মজার ব্যাপার হলো মৌলবাদী মৌলবীদের নির্দেশ অমান্য করে আকবর মোগল বেগমদেরও হজ করতে পাঠিয়েছে। নানা দেশ থেকে লোক আসে। অনেক দেশের বউরা চোখে কাজল লাগিয়ে আসে — ওখানে তো মুখ খোলা রাখতে হয়। পুরোনো পোশাক ফেলে দিয়ে সাদা ধবধবে পোশাক পরতে হয়। হজ সেরে গরিবদের মধ্যে টাকাকড়ি, মোহর বিলিয়ে দিলুম। যদিও শিয়াদের কাছে পবিত্র, তবু উটের ওপরে চেপে আমরা কারবালা, কোম আর মাশাদে গিয়েছিলুম। ফেরার পথে এডেনে জাহাজের দুর্ঘটনা হলো, এক বছর সেখানে কাটাতে হলো। আমাদের সঙ্গে অবশ্য মীর হজ আর খোয়াজা ইয়াহা ছিল।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : তুই তো আশি বছর বয়সে মারা গেলি। বেচারা আকবর সম্রাট হলে কী হবে ! কেঁদে ভাসিয়ে দিয়েছিল আর তোর জানাজা একাই গোর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। পরের বছর হামিদা বানুও মারা গেল। আকবর দাড়ি কামিয়ে ন্যাড়া হয়ে গেল।

    বাহাদুর শাহ জাফর : তোমরা নিজেদের নিয়ে মশগুল রয়েছো। আমার বংশধররা আজ কে কোথায় আছে জানো? আমাকে রেঙ্গুনে নির্বাসনের মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশরা মুঘল সাম্রাজ্যর চারশো বছরের শাসনের ইতি ঘটিয়েছিল। আমার কয়েকজন ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ফলে পরিবারের অনেকজন জীবন বাঁচাতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, হায়দ্রাবাদ, উদয়পুরে পালিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে অনেকেই নিজেদেরকে মুঘল বংশধর বলে দাবি করে। তবে বর্তমানে কয়েকজন মুঘল বংশধরের খোঁজ পাওয়া যায় যারা আল-হিন্দের বিভিন্ন জায়গায় করুণ অবস্থায় বেঁচে আছে। দিন এনে দিন খেয়ে জীবন পার করছে। সরকারের দেয়া সামান্য ভাতা দিয়ে সংসার চালাতে প্রতি মুহূর্তে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যেমন সুলতানা বেগম, যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ নবাব বাহাদুর শাহ জাফরের নাতবৌ। সুলাতানার স্বামী মির্জা বেদের বুকত ১৯৮০ সালে মারা যান। এরপর থেকেই তার জীবনে দারিদ্র্য নেমে আসে। সুলতানা সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ভাতা হিসেবে পায় ছয় হাজার টাকা। যা দিয়ে ছয় ছেলেমেয়েসহ পুরো সংসার চালাতে হয় তাকে। বর্তমানে কলকাতার বস্তি এলাকায় বসবাস করেন তিনি। দুই রুমের একটি ছোট্ট বাসায় পুরো পরিবার নিয়ে থাকছেন তিনি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলিতভাবে রান্নাঘর ব্যবহার করেন। রাস্তার কল থেকে জল ভরতে হয়, সেখানে কাপড় ধুতে হয়। তারপর জিয়াউদ্দিন তুসি, যিনি বাহাদুর শাহ জাফরের উত্তরাধিকারী বর্তমানে ভাড়া বাড়িতে থাকেন। উনি আর সরকারি ভাতা পান না। তারপর বেগম লায়লা উমাহানি, যাঁর বাবা মির্জা পিয়েরে ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফরের নাতি। তিনি এবং তার মা হাবিব বেগম হায়দ্রাবাদের ষষ্ঠ নিজাম মেহবুব আলী খান এর আত্মীয়। স্বামী ইয়াকুব মঈনউদ্দিন তুসি। পঁচিশটা পরিবহন রিকশা ভাড়া থেকে তাদের সংসার চলে। তবে এটাই বাস্তবতা।

    আলিবর্দী খান : আমার বংশধররা তো আর আল-হিন্দে থাকে না। লোকে তাদের খবর রাখে না। তারাও আমার বা সিরাজের সঙ্গে সম্পর্কের কথা গোপন রেখে জীবন কাটায়। ঢাকা শহরের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকেন নবাব সিরাজ উদ-দৌলার নবম বংশধরেরা। বর্তমানে তারা ঢাকা শহরের খিলক্ষেত এলাকার লেকসিটি কনকর্ড-এর বৈকালী টাওয়ারে বসবাস করছেন। লোকচক্ষুর আড়ালে, নীরবে নিভৃতে বাস করা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের বংশধরদের খবর অনেকেই জানেন না। শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সিরাজ উদ-দৌলার মৃত্যুর পর তার প্রিয়তমা স্ত্রী লুত্‍ফুননিসা একমাত্র শিশু কন্যা উম্মে জোহরা, নানা আলীবর্দী খানের স্ত্রী আশরাফুন্নেসা-সহ নবাব পরিবারের নারীদের ৮ বছর বন্দি করে রাখা হয়েছিল বুড়িগঙ্গা পাড়ের জিঞ্জিরা এলাকার একটি প্রাসাদে। স্থানীয় লোকজন ওই জরাজীর্ণ প্রাসাদটিকে এখনও জানে ‘নাগরা’ নামে। নবাব সিরাজ উদ-দৌলার মৃত্যুর পর থেকে তার ৫ম বংশধর পর্যন্ত কাউকে সরকারি কোনো চাকরি দেয়নি ব্রিটিশ সরকার। দেশভাগের সময়ে সপ্তম বংশধর সৈয়দ গোলাম মুর্তজা মুর্শিদাবাদ থেকে পূর্ব বাংলায় চলে যান। প্রথমে যান রাজশাহীতে, রাজশাহী থেকে খুলনা শহরে একটি বাড়ি কিনে স্থায়ী হন। এখনও এক ধরনের অজানা আতঙ্ক তাদের মাঝে। সম্ভবত সে আতঙ্ক থেকেই প্রচারবিমুখ হয়ে আছেন তারা। মিডিয়াকে এড়িয়ে চলেন, সমাজে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখেন।

    টিপু সুলতান : আমার বংশধরদেরও একই অবস্হা। আমার পরবর্তী সপ্তম প্রজন্মের উত্তরসূরী সংসার চালাতে রিকশা চালায়। স্ত্রী সন্তানদের মুখে ভাত তুলে দিতে প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের উপরে রিক্সার প্যাডেলে চাপ দেয় বেচারা। ভাগ্যের পরিহাসে এই রাস্তা যাঁর নামে‚ সেই প্রিন্স গুলাম মহম্মদ আনোয়ার শাহ ছিলেন তার প্রপিতামহ। আনোয়ার আলি-র বাকি ভাইরাও কেউ রিক্সা চালায়। কেউ সেলাইয়ের কাজ করে। কেউ ছোট কারবার চালায়। সবাই থাকে ঘিঞ্জি বস্তির ঘুপচি কামরায়। এঁদো পরিবেশ বসে ভাবে একদিন যাবেন মহীশূর। যেখানে একদিন সূর্যের আলোয় ঝকঝকিয়ে উঠত টিপু সুলতানের তরবারি। অথচ কলকাতাতেই রাজার হালে থাকার কথা তাদের। কারণ এই শহরে বিস্তর সম্পত্তি ছিল টিপু সুলতানের। আজকের রয়াল ক্যালকাটা গল্ফ ক্লাব‚ টালিগঞ্জ ক্লাব, সব ছিল মহীশূরের সুলতান টিপুর। কিন্তু এখন তার দেখভালের দায়িত্ব প্রিন্স গুলাম মহম্মদ ট্রাস্টের। নামমাত্র ভাড়ায় লিজ নিয়ে রেখেছে গল্ফ ক্লাব আর টালিগঞ্জ ক্লাব। এছাড়াও আজকের পার্ক স্ট্রিট‚ চৌরঙ্গি‚ থিয়েটার রোড আর দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ চাষ জমির মালিক ছিলেন টিপু সুলতান। কিন্তু তাঁর বংশধররা বঞ্চিতই থেকে গেছে। কলকাতায় টিপু সুলতানের বংশধররা সবাই যে দিন আনা দিন খাওয়া অবস্থায় আছে তা নয়। কেউ কেউ মধ্যবিত্ত জীবনও যাপন করছে। কিন্তু কারওর জীবনেই ‘রয়্যাল‘ শব্দটার ছিটেফোঁটাও নেই। অথচ ভারতে এখনও রাজবংশের উত্তরসূরীরা আছেন‚ যাঁরা‚ রাজত্ব চলে গেলেও প্রাসাদে আছেন। রাজার হালেই নবাবি করছেন। তফাৎটা হল‚ যাঁরা ব্রিটিশদের সঙ্গে আপস করে মাথা নুইয়েছিলেন ‚তাঁরা টিকে গেছেন। কিন্তু যাঁরা ব্রিটিশ শাসনের প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদের গরিমা ধুলোয় মিশে গেছে।

    কফিহাউসের যক্ষ : আচ্ছা স্যার, এতো জায়গা থাকতে আপনাদের কলকাতাতেই কেন এনে ফেলল ?

    টিপু সুলতান : কলকাতা ওদের রাজধানী ছিল আর ওরা জানতো যে বাঙালিরা ওদের সঙ্গে আছে, বিদ্রোহে যোগ দিচ্ছে না। ওয়াজেদ আলি শাহকে যখন এনেছিল, তখনই বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। ওকে প্রথমে কয়েদ করে রেখেছিল। তারপর থাকার জন্যে এতো ভালো ব্যবস্হা করে দিলে যে ও এখানে ছোটোখাটো লখনউ বসিয়ে ফেললো। ওয়াজেদ আলির প্রচারিত ও পৃষ্ঠপোষক লেখক এবং কবি ও মুশায়রা, গজল, মার্সিয়া, আর কাওয়ালি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ওনার পরীখানায় বা নৃত্যশিল্পীদের বাসায় নিয়মিত কথক নাচের অনুষ্ঠান হতো। মেটিয়াবুরুজের গানবাজনার আসর থেকে উপকৃত হয়েছেন স্থানীয় শিল্পীরা, পাথুরিয়াঘাট ঠাকুর পরিবারের রাজা সৌরিন্দ্রমোহন ঠাকুর, আর পণ্ডিত যদুভট্টের মতো সেই যুগের গুণী শিল্পীরা ছিলেন। বাংলার জমিদারবাবুরা প্রথমবার এসব দেখে নিজেদের জলসাঘর তৈরি করেছিল যেখানে নিয়মিত ঠুমরি বা কথকের অনুষ্ঠান হতো। ধনী বাঙালিরা শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর পাশাপাশি কেবল মেটিয়াবুরুজেই নয়, সারা শহর জুড়ে কয়েকশো বাইজির কোঠা বসিয়ে ফেলেছিল। তারপর ওয়াজেদ আলির দেখাদেখি বাগানবাড়িতে রাখেল রাখার চল হল, হারেমের মতন, মদ খাওয়া, মোসাহেবদের জড়ো করে মদ আর আফিমের আড্ডা।

    কফিহাউসের যক্ষ : বাঙালিরা শুধু বাইজি নাচালো ? বিদ্রোহে অংশ নিলো না ?

    বাহাদুরশাহ জাফর : বাংলাদেশের অধিকাংশ সমকালীন বুদ্ধিজীবীই সিপাহি বিদ্রোহকে সমর্থন করেননি, অংশ নেয়া তো দূরের কথা। বাংলাসাহিত্যে এ নিয়ে কোনো আবেগ, গান, কবিতা, নাটক—কিছুই তৈরি হয়নি। এমনকি, যখন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে, সিরাজউদ্দৌল্লার পরাজয় নিয়ে কাব্য নাটক লিখছেন, তখনও হয়নি। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও কোনো কবিতা বা গান নেই সিপাহি বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে। বিদ্রোহকে সেই সময়ের শিক্ষিত বাঙালি সমাজ সমর্থন করেনি; উপরন্তু তারা বিদ্রোহী সিপাহিদের ও বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত নেতানেত্রীদের ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছিল। শিক্ষিত বাঙালি সমাজ এই বিদ্রোহে বিদ্রোহীদের পরাজয় ও ব্রিটিশদের জয় কামনা করেছিল।

    কফিহাউসের যক্ষ : বাঙালিরা কেন সমর্থন করেনি জনাব ?

    আলিবর্দী খান : শিক্ষিত বাঙালি সমাজ বিভিন্ন কারণে সিপাহি বিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিল। মধ্যযুগীশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভয়ে শিক্ষিত বাঙালি সমাজ মনে করেছিল বিদ্রোহীরা জয়লাভ করলে ভারতে আবার মধ্যযুগীয় মোগল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। তারা মধ্যযুগীয় মোগল শাসনের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন।শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ছিল আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কারের সমর্থক। তারা মনে করেছিল বিদ্রোহীরা জয়ী হলে তাদের সামন্ততান্ত্রিক শাসনে আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কারের অবসান ঘটবে। আধুনিকতার অবসানের ভয়েও তারা সমর্থন করেননি। বিদ্রোহের প্রতি বাঙালি সমাজ সেই সময়ের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তীব্র বিদ্বেষ প্রকাশ করে। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজা রাধাকান্ত দেবের সভাপতিত্বে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা হয়। সভায় বিদ্রোহীদের নিন্দা করা হয়। রাজা রাধাকান্ত দেবের সভাপতিত্বে বিদ্রোহ-বিরোধী আরও একটা সভা হয় মেট্রোপলিটন কলেজে। এই সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ হলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ, কমলকৃষ্ণ বাহাদুর, হরচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। তারা সরকারকে সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সভায় প্রস্তাব পাস করেন আর সরকারের কাছে তা পেশ করেন। সংবাদ ভাস্কর, সংবাদ প্রভাকর আর নানা পত্রপত্রিকায় শিক্ষিত বাঙালি সমাজবিদ্রোহীদের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার সম্পাদকের সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লিখেছিলেন যে, ‘হে বিঘ্ন হর….. ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের জয়পতাকা চিরকাল সমভাবে উড্ডীয়মান কর। অত্যাচারি অপকারি বিদ্রোহকারি দুর্জনদিগকে সমুচিত প্রতিফল প্রদান কর। ” এছাড়াও বিভিন্ন গ্রন্থ সমূহেও বাঙালি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় নানাভাবে বিরোধিতা করেছিল।

    গুলবদনপিসি : শুধু বাঙালিদের দোষ দেয়া কেন, অযথা ? যে সব সামন্তদের স্বার্থে ঘা পড়েনি, যেমন সিন্ধিয়া, গায়কোয়াড়, হোলকার প্রমুখ মারাঠি সর্দাররা, হায়াদ্রাবাদের নিজাম, মহীশূর আর ত্রিবাঙ্কুরের রাজারা, রাজপুতরা, মায় ঝিন্দ আর পাতিয়ালার শিখ সর্দাররা, তাঁরা বিদ্রোহে সাড়া তো দেনইনি বরং এটা দমন করতে ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিলেন পুরো দমে।

    কফিহাউসের যক্ষ : কিন্তু বেগম, মহাবিদ্রোহ শুরু হয়েছিল সুবে বাংলার ব্যারাকপুর থেকে।

    বাহাদুর শাহ জাফর : বিদ্রোহ তো শুরু হয়েছিল ব্যারাকপুর থেকেই। দক্ষিণে মহারাষ্ট্রে সাতারা, কোলাপুর, নারগুন্ড, মাদ্রাজের বিক্ষিপ্ত কিছু অঞ্চলে এর স্ফুলিংগ দেখা দিয়েছিল। শুধু অগ্নিশিখা হয়নি বলেই তাকে খারিজ করা হবে ? তখন সেই সুদূর নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউনে কার্ল মার্কস স্বয়ং একে ভারতবাসীর জাতীয় সংগ্রাম বলতে পারলেন, আর আমাদের নিজেদের দেশের ঐতিহাসিকদের এই গৌরবময় ঐতিহ্য মানতে এতো কুন্ঠা কিসের ?

    গুলবদনপিসি : বেয়ারা দুটো বর্শা নিয়ে আসছে, তাতে এক-একজনের মাথা গেঁথা, মুখে লাল রঙ মাখানো। এটা আবার কী রে বাবা !

    কফিহাউসের যক্ষ : ম্যাডাম বেগম, এনারা এইভাবেই কফিহাউসে ঢুকছিলেন। আমি ভাবলুম হেল্প করি।

    ভাইপো আকবর : মাথা দুটো খুলে টেবিলের ওপর রাখো আর বর্শাগুলো চেয়ারে ঠেশান দিয়ে রাখো, ওনারা যখন যেতে চাইবেন, তখন বর্শার মাথায় পরিয়ে দেবো। আপনাদের নামটা জানতে পারি ? শ্যায়খুবাবা এলো না এখনও।

    প্রথম মাথা : আমিও একজন গুরকানি। কন্নড় ভাষায় জামাই বা গুরকানিকে বলে আলিয়া। আমি আলিয়া রাম রায়া নামে পরিচিত। বিজয়নগর সাম্রাজ্য আমার ভুলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

    চেঙ্গিজ খান : আপনার ভুলে ? কী হয়েছিল ? গুরকানিরা তো সহজে ভুল করে না।

    দ্বিতীয় মাথা : মাথা তো আমারও কেটেছিল ; নিজের বিশ্বস্ত লোকে। আপনার মাথা যারা কেটেছিল তারা আপনাকে বোকা বানিয়ে কেটেছিল আলিয়া রাম রায়া। আমার শত্রুরা নামে কুকথা রটিয়েছিল। ইংরেজগুলো আমার প্যাঁদানি খেয়ে অন্ধকূপ হত্যা নামে একটা গাঁজাখুরি গল্প চাউর করেছিল। যা নাকি সেনা হত্যাকাণ্ড, যা ব্রিটিশ আমলে সংঘটিত হয়েছিল। গল্পটা হল এই যে ব্রিটিশ সরকারের গড়া ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের ভেতরে জানালাবিহীন ছোট্ট একটি কামরায় একশো ছেচল্লিশজন ইংরেজকে বন্দী করে রেখেছিলুম। সেখানে দমবন্ধ হয়ে এক রাতের মধ্যে একশো তেইশ জনের মৃত্যু ঘটে। এই গপ্পোটা গেঁজিয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারী, পরবর্তীতে সেনাপতি, জন যেফানিয়াহ হলওয়েল, ওর বই ইন্ডিয়া ফ্যাক্টস্‌এ। মরে যাওয়া সাহেবদের স্মরণে দুর্গের পুবদিকের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিল, যা লর্ড হেস্টিংস ঘটনাটা গাঁজাখুরি জেনে ভেঙ্গে ফেলে। আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই কাহিনী লেখা ও প্রচারিত হয়েছিল। সেই সময়ের ইতিহাসে এই ঘটনার কোনও উল্লেখ দেখা যায় নি। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের অনেকেই আমাকে নির্দয়, উদ্ধত, স্বেচ্ছাচারী প্রতিপন্ন করতে যাচাই না-করেই হলওয়েল সাহেবের গাঁজাখুরি গল্পটা বলে আর লিখে বেড়িয়েছে।

    প্রথম মাথা : আমি হতে চেয়েছিলুম দাক্ষিণাত্যের জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর। সব ধর্মকে একই দৃষ্টিতে দেখতুম।

    ভাইপো আকবর : বাহ, ভালো কাজ করেছিলে। তাতে তো দোষের কিছু নেই। শ্যায়খুবাবা এলো না?

    প্রথম মাথা :আমি ছিলুম বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সেনাপতি আর রাজবংশের প্রতি বিশ্বস্ত । রাজা সদাশিব রায়ের বয়স কম ছিল বলে আমিই রাজ্য চালাতুম। দাক্ষিণাত্যের হুসেন নিজাম শাহ, আলী আদিল শাহ আর ইব্রাহিম কুতুব শাহ সুলতানরা একসঙ্গে আক্রমণে আমাকে হারিয়ে দিলো। সহজেই জিতে যেতুম। তার বদলে যুদ্ধটা হয়ে উঠল বিপর্যয়। আমার সেনাবাহিনীর দুই আস্তিক কমান্ডার বিশ্বাসঘাতকতা করল, আর দল বদল করে সেনাদের নিয়ে সুলতানদের দিকে চলে গেল। এর ফলে আমাকে ওরা আচমকা গ্রেফতার করে সেখানেই মুণ্ডু কেটে ফেললো। আমার কাটা মাথা তালিকোটার যুদ্ধের বার্ষিকীতে আহমেদনগরের পথে-পথে মিছিল করে পাবলিককে দেখানো হয়েছিল। সুলতানদের বংশধররা মুণ্ডুতে তেল আর লাল রঙ মাখিয়ে বর্শার মাথায় গিঁথে রেখে দিয়েছিল। ওরা পুরো বিজয়নগরকে ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দিলো আর প্রত্যেকটা বন্দীকে কচুকাটা করে খুন করেছিল। বিজয়নগর, যা ছিল একসময় বিখ্যাত ঐশ্বর্যের শহর, বিশাল সাম্রাজ্যের আসন, তা নির্জন ধ্বংসাবশেষ হয়ে ওঠেছে। জায়গাটা এখন সামান্য শহরতলী, হাম্পি নামে পরিচিত।

    গুলবদনপিসি : তোমার উচিত ছিল ওদের পরিবারের মেয়েদের বিয়ে করে এনে নিজের পরিবারের সদস্য করা ; যেমন আকবর রাজপুত পরিবারের মেয়েদের বিয়ে করা। অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানদের বেশিরভাগ মা ছিলেন রাজকীয় হারেমের উপপত্নী। তুমি যদি বংশধারা দ্যাখো, তাহলে টের পাবে। সুলতানদের সকলের মা তুর্কি ছিলেন না। যেমন, ওসমান প্রথম, তুর্কি। ওরহান, তুর্কি। মুরাদ প্রথম, গ্রীক। বায়েজিদ, গ্রীক। আমি, তুর্কি। মুরাদ দ্বিতীয়, তুর্কি। মেহমেদ দ্বিতীয়, তুর্কি। বায়েজিদ দ্বিতীয়, তুর্কি। সেলিম, গ্রীক। সুলেমান, গ্রীক। সেলিম দ্বিতীয়, পোলিশ। মুরাদ তৃতীয়, ইতালিয়ান (ভিনিশিয়ান)। মেহমেদ তৃতীয়, ইতালিয়ান (ভিনিশিয়ান)। আহমেদ, গ্রীক। মোস্তফা প্রথম, আবখাজিয়ান। ওসমান দ্বিতীয়, গ্রীক বা সার্বিয়ান। মুরাদ চতুর্থ, গ্রীক। ইব্রাহিম, গ্রীক। মেহমেদ চতুর্থ, ইউক্রেনীয়। দ্বিতীয় সুলেমান, সার্বিয়ান। আহমেদ দ্বিতীয়, পোলিশ। মোস্তফা দ্বিতীয়, গ্রীক। আহমেদ তৃতীয়, গ্রীক। মাহমুদ প্রথম, গ্রীক। ওসমান তৃতীয়, সার্বিয়ান। মোস্তফা তৃতীয়, ফরাসি। আব্দুলহামিদ প্রথম, হাঙ্গেরীয়। সেলিম তৃতীয়, জর্জিয়ান। মোস্তফা চতুর্থ, বুলগেরিয়ান। মাহমুদ দ্বিতীয়, জর্জিয়ান। আব্দুলমিসিড প্রথম, জর্জিয়ান বা রাশিয়ান। আব্দুলাজিজ প্রথম, রোমানিয়ান। মুরাদ পঞ্চম, জর্জিয়ান। আব্দুল হামিদ দ্বিতীয়, আর্মেনিয়ান বা রাশিয়ান। মেহমেদ পঞ্চম, আলবেনীয়। মেহমেদ ষষ্ঠ, জর্জিয়ান।

    দ্বিতীয় মাথা : তুমি বিয়ে করো বা যাই করো, যারা শত্রুতা করবে বলে প্যাঁচ কষে ফেলেছে, তারা সুযোগ পেলে তোমাকে ছাড়বে না। আমার সমাজে বিয়ে জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক নয় ; তা একটা জন্মের চুক্তি। আমাকে অনেকে বদনাম করে, অথচ ইতিহাসের খোঁয়াড়ে দুর্লভ রায়, জগত শেঠ, উমি চাঁদ, কৃষ্ণচন্দ্র রায়দের কেন ঘেরাও করা হয়নি? আমার আত্মীয়রা হারিয়ে গেল ! এদের বংশধররা কোথায় লুকিয়ে আছে ? কৃষ্ণচন্দ্র রায় ছিলেন একজন কূটকৌশলী ব্যক্তি। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হলে তিনি ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করেন। মীর কাশিম ওনাকে বন্দী করলেও ইংরেজদের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি লাভ করেন। কোম্পানি সরকার তার আনুগত্যের জন্য মহারাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। কোম্পানিকে তেল দিয়ে হয়ে গেল মহারাজা। তাঁর শাসনকালে বাংলায় ইংরেজ শাসন কায়েম হয় এবং মুসলমান রাজত্বের অবসান ঘটে। এ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে মিত্রতা করেন এবং ক্লাইভের পক্ষ নিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ত্বরান্বিত করেন। ইংরেজদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় নবাব মীর কাশিম তাঁকে বন্দি করে মৃত্যুদন্ড দিলে ইংরেজদের সহায়তায় তিনি মুক্তিলাভ করেন। ইংরেজদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের পুরস্কারস্বরূপ তিনি ইংরেজ কর্তৃক ‘মহারাজা’ উপাধিতে ভূষিত হন। তদুপরি ক্লাইভের নিকট থেকে উপঢৌকন হিসেবে পান পাঁচটি কামান। সে সময়ে বাংলায় যে বর্গীর আক্রমণ হতো তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি তাঁর রাজধানী ‘শিবনিবাস’ নামক স্থানে স্থানান্তরিত করেন। ওনার পূর্বপুরুষ নদিয়া রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ মজুমদার তিনি এই রাজবংশের সূচনা করেন। তাঁর বংশধররা ‘রাজা’ উপাধি ধারণ করে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত নদিয়া শাসন করেন। জানা যায়, ভবানন্দ প্রতাপাদিত্যের (বারো ভুইঞাদের অন্যতম) রাজধানীতে প্রবেশের গুপ্ত পথ দেখিয়ে এবং প্রয়োজনীয় রসদ দিয়ে তিনি দিল্লির শাসক জাহাঙ্গীরের সেনাপতি মানসিংহকে সাহায্য করেছিলেন; তাই জাহাঙ্গীর তাঁর এই কাজে খুশি হয়ে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে ফরমান জারি করে ভবানন্দকে মহৎপুর, নদিয়া, মারূপদহ, লেপা, সুলতানপুর, কাশিমপুর, বয়শা, মশুণ্ডা প্রভৃতি ১৪ টি পরগনা সনদসূত্রে দেন। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বাংলার নবাব ইসমাইল খাঁ ভবানন্দের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে কানুনগো পদে নিযুক্ত করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তাঁর জন্য সনদ ও মজুমদার উপাধি এনে দেন। ১৬৩১ সালে ভবানন্দ সম্রাটের কাছ থেকে ফরমানের মাধ্যমে বৃহৎ জমিদারি লাভ করেন। নদিয়া রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ মজুমদার তিনি এই রাজবংশের সূচনা করেন। তাঁর বংশধররা ‘রাজা’ উপাধি ধারণ করে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত নদিয়া শাসন করেন। জানা যায়, ভবানন্দ প্রতাপাদিত্যের (বারো ভুইঞাদের অন্যতম) রাজধানীতে প্রবেশের গুপ্ত পথ দেখিয়ে এবং প্রয়োজনীয় রসদ দিয়ে তিনি দিল্লির শাসক জাহাঙ্গীরের সেনাপতি মানসিংহকে সাহায্য করেছিলেন; তাই জাহাঙ্গীর তাঁর এই কাজে খুশি হয়ে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে ফরমান জারি করে ভবানন্দকে মহৎপুর, নদিয়া, মারূপদহ, লেপা, সুলতানপুর, কাশিমপুর, বয়শা, মশুণ্ডা প্রভৃতি ১৪ টি পরগনা সনদসূত্রে দেন। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বাংলার নবাব ইসমাইল খাঁ ভবানন্দের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে কানুনগো পদে নিযুক্ত করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তাঁর জন্য সনদ ও মজুমদার উপাধি এনে দেন। ১৬৩১ সালে ভবানন্দ সম্রাটের কাছ থেকে ফরমানের মাধ্যমে বৃহৎ জমিদারি লাভ করেন।নদিয়া রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ মজুমদার তিনি এই রাজবংশের সূচনা করেন। তাঁর বংশধররা ‘রাজা’ উপাধি ধারণ করে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত নদিয়া শাসন করেন। জানা যায়, ভবানন্দ প্রতাপাদিত্যের (বারো ভুইঞাদের অন্যতম) রাজধানীতে প্রবেশের গুপ্ত পথ দেখিয়ে এবং প্রয়োজনীয় রসদ দিয়ে তিনি দিল্লির শাসক জাহাঙ্গীরের সেনাপতি মানসিংহকে সাহায্য করেছিলেন; তাই জাহাঙ্গীর তাঁর এই কাজে খুশি হয়ে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে ফরমান জারি করে ভবানন্দকে মহৎপুর, নদিয়া, মারূপদহ, লেপা, সুলতানপুর, কাশিমপুর, বয়শা, মশুণ্ডা প্রভৃতি ১৪ টি পরগনা সনদসূত্রে দেন। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বাংলার নবাব ইসমাইল খাঁ ভবানন্দের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে কানুনগো পদে নিযুক্ত করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তাঁর জন্য সনদ ও মজুমদার উপাধি এনে দেন। ১৬৩১ সালে ভবানন্দ সম্রাটের কাছ থেকে ফরমানের মাধ্যমে বৃহৎ জমিদারি লাভ করেন।

    গুলবদনপিসি : কীই বা বলি বলো ! সবই সুবে বাংলার কপাল।

    দ্বিতীয় মাথা : তোমরা কি জানো এক সময় বাংলায় ছড়ি ঘুরিয়েছে বাঈজি বংশ ? আমার পরে তো সুবে বাংলায় শুরু হয়-বাঈজী বংশের শাসন। মীরজাফরের ঔরসজাত এবং বাঈজী মুন্নী বাঈর গর্ভজাত নজমউদ্দৌলাকে কোম্পানী বাংলার নবাব বানায়। বাঈজী বংশের দ্বিতীয় নবাব হন মুন্নী বাঈর অপর সন্তান সাইফউদ্দৌলা। বাঈজী বাবুবাঈও ভাগ্যবতী রমণী ছিলেন। সুবে বাংলায় পরবর্তী নবাব হন বাবুবাঈর গর্ভজাত সন্তান মোবারকউদ্দৌলা। পরে তারই ছেলে আর নাতিরা ধারাবাহিকভাবে বাংলার পুতুল নবাব হন।

    কফিহাউসের যক্ষ : স্যার সুবে বাংলা নিয়ে একটা কথা আমার মাথাতেও ঘুরঘুর করে, যদি অনুমতি দ্যান তো বলি।

    চেঙ্গিজ খান : অনুমতির দরকার নেই। যার যা মনে আসে সেসব কথা বলার জন্যই তো আজকের জমায়েত।

    কফিহাউসের যক্ষ : বাংলার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে বসলেই অধিকাংশ তথাকথিত প্রাজ্ঞজনের নজরে কেবল ঘোরাফেরা করেন শ্রী অরবিন্দ, চিত্তরঞ্জন দাশ, কিংবা আশুতোষ মুখার্জির মতন রাজনৈতিক চরিত্র। কিংবা রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর মশাইয়ের মতন সমাজ সংস্কারকদের কথা বলেন কেউ কেউ। সাহিত্যের আলোচনা হলে উঠে আসেন মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সব ঠিকই আছে। কিন্তু ইতিহাস তো একচোখো বিষয় নয়। বাংলার স্বর্ণযুগের ইতিহাসে যাদের উপস্থিতি নিয়ে কেউ কখনও কথা বলেন না অথচ আজও যাদের নিয়ে বাঙালি গর্ব বোধ করে তাদের একজন যেমন ডক্টর বর্মণ, যাঁর নামে ডাবর কোম্পানি, ঠিক তেমনি এই মহেন্দ্র দত্ত। বিখ্যাত এই ছাতা নির্মাতার কথা অবশ্য আপনি বাঙালির বাজার লব্ধ চরিতাভিধানে পাবেন না। গুগলে খুঁজতে গেলে উঠে আসবেন প্রকাশক মহেন্দ্র দত্তের কথা, কিংবা বিপ্লবী মহেন্দ্র দত্তের নাটকীয় কর্মসূচি, আর পাবেন স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্র দত্তের উল্লেখ। কিন্তু ছাতা নির্মাতা মহেন্দ্র দত্ত খুঁজলে আপনার সামনে ভেসে উঠবে গুগল ম্যাপ।

    ল্যাঙড়া তৈমুর : হক কথা। কিন্তু আমরা আক্রমণ করতে বেরিয়ে ছাতা জিনিসটা কখনও দেখিনি। তুমি বলছ এই শহরেই পাওয়া যায়। ফিরে যাবার সময়ে দুটো কিনে নিয়ে যাবো। একটা আমার, আরেকটা আমার ঘোড়ার।

    কফিহাউসের যক্ষ : আপনারা সবাই বিখ্যাত মানুষজন, দুর্ভাগ্য যে তুর্কি, ফার্সি, উজবেক, পর্তুগিজ, ফরাসি, ইংরেজি জানেন অথচ বাংলাভাষা জানেন না। আপনারা কি জানেন ? ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ খুলে মণীষী কলিম খান দেখতে পেলেন একই শব্দের অজস্র অর্থ এবং সেই শব্দের অর্থ খুঁজতে ডিক্সনারি বা থিসরাস মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শব্দের মানে। শব্দের বানানে যে বর্ণ বা ধ্বনিগুলি থাকে, সেগুলিই সেই শব্দের অর্থকে বহন করে। আমাদের মহাকাব্য ও বেদ-পুরাণের আপাত ধাঁধা ও জটিলতার জাল কেটে বেরোতে গিয়ে পেয়ে গেলেন ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থ তত্ত্ব। বলা ভালো পুনরাবিষ্কার করলেন। শব্দের অন্তর থেকে শব্দের অর্থ নিষ্কাশন একটি প্রাচীন ভারতীয় কৌশল। এই কৌশলের নাম ‘নির্বচন’। কলিম খান বলেন, এই কৌশলের আদি স্রষ্টা কে, তা জানা যায় না। ভারতবর্ষের সব বিদ্যার জনক যেহেতু সনাতন শিব, এই বিদ্যার স্রষ্টাও তিনিই হবেন। কথিত আছে, ‘১৪টি শিব স্ত্রোত্র’ এবং ‘মাহেশ্বর সূত্র’ অবলম্বন করেই পাণিনি তঁর বিখ্যাত ‘অষ্টাধ্যায়ী’ ও ‘শিক্ষা’ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এই কৌশল প্রথম লিপিবদ্ধ করেন যাস্ক ও পাণিনি। কলিম খান প্রাচীন কোনও চরিত্রকে ব্যক্তিচরিত্র ধরতে নারাজ। তাঁর মতে তখনও ‘ব্যক্তি’ গড়ে ওঠেনি। ফলত, যাস্ক ও পাণিনিও তাঁর মতে কোনও ব্যক্তিবিশেষ নয়, দুইটি পৃথক গোষ্ঠী। এইযুগের ভাষায় ‘ঘরানা’ বা ‘স্কুল অফ থট’ বলা যায়। এছাড়া বৌদ্ধযুগের ‘অমরকোষ’ও এই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে গেছে। শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করে সেই অভ্যন্তরস্থ অর্থটিকে বাক্যের সাহায্যেই প্রকাশ করা রীতি। পরবর্তী কোষকারগণ একই পদ্ধতি মেনেছেন। মহাত্মা হরিচরণও একই কাজ করেছেন তার ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ। কোনও ক্রিয়াই দৃশ্যমান নয়। কোনও কারক যখন সেই ক্রিয়াকে ধারণ করে, তখনই সেই ক্রিয়াকে দেখা যায়। ‘করণ’ বা ‘গমন’কে দেখা যায় না। কেউ কিছু করলে বা গমন করলেই ‘করণ’ বা ‘গমন’ দৃশ্যমান হয়। অর্থ কীভাবে শব্দের ভেতরে থাকে? কলিম খান উদাহরণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যেমন ‘কর’ শব্দ = ক্‌+অ+র্‌+অ = ‘কারককে রক্ষা করে যে’। এটি আপনার ‘হাত’ হতে পারে, দেশের রাজার চাপানো ‘খাজনা’ হতে পারে, ‘রবির কর’ও হতে পারে। যে-যে সত্তা কারককে রক্ষা করে তাদের প্রত্যেকেই ‘কর’ পদবাচ্য। ফলত, শব্দ অনড় অচল নয়, স্থির নির্দেশক কোনও মানেও তার নেই। এখানে সতর্কও করছেন কলিম। তাই বলে শব্দের অনন্ত অসীম মানেও হয় না। ক্রিয়াটির সীমার মধ্যে যে-যে পড়বে, তাদের প্রত্যেককেই সেই শব্দ দিয়ে চিহ্নিত করা যাবে। এই তত্ত্বই প্রয়োগ করে কলিম খান পড়ে ফেললেন রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ। তারপরেই ঘটে গেল ম্যাজিক! চিচিং ফাঁক হয়ে খুলে গেল অন্তর্নিহিত অর্থের বন্‌ধ্‌ দরওয়াজা। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস নতুন রূপে হাজির হল।সহযাত্রী হিসেবে পেলেন শ্রীরামপুর কলেজের ইংরাজি ভাষা-সাহিত্যের অধ্যাপক রবি চক্রবর্তীকে। পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি বিপুল পরিশ্রম ও নিষ্ঠায় যৌথভাবে লিপিবদ্ধ করলেন ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থের বৃহৎ দুই খণ্ড অভিধান ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’। শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে তৈরি করলেন ‘বঙ্গযান’ পত্রিকা। বঙ্গীয় অ্যাকাডেমিক মহল প্রত্যশা মতোই তাঁর ভাবনাকে স্বীকৃতি জানায়নি। তাতে কী, তাঁরা তো হরিচরণকেও স্বীকৃত দেন না। হরিচরণের জন্মের সার্দ্ধশতবর্ষ নমো-নমো করে সারেন, ভুলেও ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অবশ্যপাঠ্য বইয়ের তালিকায় আসতে দেন না! কারন কী? হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজ সামনে আনা মানেই বাংলা ভাষা ও বানানবিধি নিয়ে ছিনিমিনি-খেলা অনেক ‘ভাষাবিদ’-এর করেকম্মে খাওয়ার দিন শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া অ্যাকাডেমি-নিয়ন্ত্রক পুঁজি একই শব্দের বহু অর্থ স্বীকার করবে কেন? বাজার সবসময়ই একরৈখিকতার পক্ষে। শব্দের বহুরৈখিকতা তাই স্বীকার্য নয়। হরিচরণ তাই ব্রাত্যই থেকে যান। তাঁর সুযোগ্য শিষ্য কলিম খান বিষয়েও স্বভাবত অ্যাকাডেমি নীরব। কলিম খান যা বলেছেন বা যা-যা বলেছেন সবই অক্ষয় সত্য, এমত বালখিল্য দাবি কেউই করেন না, কিন্তু ‘বিকল্প’ ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে বাধা কোথায়? তার বদলে হিরণ্ময় ‘নীরবতা’ দিকে তাঁকে উপেক্ষা করার এই ‘অ্যাকাডেমিক মৌলবাদ’ এত সক্রিয় কেন? আলোচনা বা চর্চায় ভয় কেন? প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর অজানা।

    ভাইপো আকবর : শ্যায়খুবাবা এলো না ?

    কফিহাউসের যক্ষ : শ্যায়খুবাবা, শ্যায়খুবাবা করছেন কেন স্যার ? আপনার ছেলে সেলিম, মানে জাহাঙ্গির তো পাকিস্তানে মাটির তলায়। আনারকলিও সেখানে মাটির তলায়। দেখুন দুজনে মিলে কী করছে।

    ভাইপো আকবর : আমি জানতুম ও নিশ্চয়ই কোনো লন্দিফন্দি করছে। ছোকরা বয়সে সৎবোনের সঙ্গে লন্দিফন্দি করেছিল বলে আমি ওকে তার বুকের দুধ খেতে বাধ্য করেছিলুম। আদি গ্রন্হের লেখক পঞ্চম শিখ গুরু অর্জন দেবকেও খুন করিয়েছিল। নিজের আত্মজীবনীতে বেহায়াটা লিখেছে কী জানো ? লিখেছে, .. “ আমি নীলগাইয় মারার জন্য তাক করে ছিলুম, হঠাৎ করেই এক বর এবং দুজন পালকিবাহক কোথা থেকে এসে উপস্থিত হয়ে গেল আমার আর নীলগাইটার মাঝে। নীলগাই চিৎকার করে পালিয়ে গেলেও, বরটাকে সেখানেই খুন করার হুকুম দিলুম আর পালকিবাহক দুটোকে গাধার ওপরে চাপিয়ে শিবিরের চারপাশে প্যারেড করালুম, যাতে অন্য কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়। ” ভাঙ আর বিয়ার খাওয়া পাবলিকের জন্যে বন্ধ করে দিলেও নিজে তো আফিম আর দিশি মদের নেশা ছাড়তে পারল না, বইতে আবার লিখেওছে বুক ফুলিয়ে যে আঠারো বছর বয়স থেকে নেশা করছে আর মাতাল হবার আনন্দ নিয়েছে। এতো মদ খেতো যে ওর হাত কাঁপা আরম্ভ করেছিল, তখন ও চাকরদের বলত ওর গলায় মদ ঢেলে দিতে। একজন ডাক্তার ওর নাড়ি চেক করে বলেছিল যে ও ছয় মাসের বেশি বাঁচবে না। ডাক্তারের সামনেই মদের সঙ্গে দিশি মিশিয়ে আর আফিম খেয়ে নিজেকে প্রফুল্ল করে তুলেছিল। আরেকটা স্বীকারোক্তি করেছে, যা শুনলে অবাক হয়ে যাবে ; ওর ছেলে শাহজাহানকে তার জন্মদিনে জোর করে মদ খাওয়াবার চেষ্টা করেছিল। আমার বাপ হুমায়ুন ছিলেন ঘরকুনো, কারোর সঙ্গে মিশতে চাইতেন না, নেশাভাঙ করে সিংহাসনে পড়ে থাকতেন, আর শ্যায়খুবাবা সারাজীবন নেশা আর মাগিবাজিতে কাটিয়ে দিল। নুরজাহানকে সেই কারণেই বিয়ে করেছিল যাতে বেগম সিংহাসন সামলাবে আর উনি লন্দিফন্দি করে বেড়াবেন। নয়তো সাঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তেত্রিশ বছরের বিধবা বুদ্ধিমতী শিয়া মেয়েটাকে বিয়ে করবে কেন ?

    কফিহাউসের যক্ষ : এই দেখুন, কে একজন মহিলা ছায়ামূর্তি এসেছেন।

    ছায়ামূর্তি : আমাকে নুরজাহান বেগম পাঠিয়েছেন। আমার নাম বেনজির ভুট্টো, জুলফিকার আলি ভুট্টোর মেয়ে। আমিও ও সেখানেই মাটির তলায় আছি বটে, তবে আমার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল আপনাদের পাঠানো একজন মোহাজিরের ষড়যন্ত্রে, বোমা ফেটে। সে ছিল সেনাপতি, পরে রাষ্ট্রপতি। আমার আসতে অসুবিধা হয়নি, কেননা আমার তো ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট। নুরজাহান বেগম আমার আইকন। আমার মনে হয় উনি প্রত্যেক নারীবাদীর আইকন। আপনার শ্যায়খুবাবাও বহাল তবিয়তে আছেন। ওনার অম্মি, আপনার স্ত্রী তো ওখানেই আছেন মাটির তলায় জাহাঙ্গিরের তৈরি করা মসজিদে।

    ভাইপো আকবর : যাক, শুনে মনটা হালকা হলো। তা তোমার আইকন বলছ কেন ?

    ছায়ামূর্তি : সম্রাট জাহাঙ্গীর আর নুরজাহানের নাম লেখা স্বর্ণ এবং রৌপ্য মুদ্রা ছাড়ার পর সেসময়ের মুঘল রাজদরবারের লেখক, বিদেশি কূটনীতিক, বণিক এবং পর্যটকরা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলেনন যে মোগল সাম্রাজ্য পরিচালনায় বেগমের বিরাট প্রভাব। নুরজাহান একদিন রাজপ্রাসাদের ঝরোকা বা বারান্দায় দেখা দিয়েছিলেন। তা তাঁর আগে পর্যন্ত কেবল পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। তবে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নুর জাহানের এটিই একমাত্র বিদ্রোহ ছিল না। শিকারে বের হওয়া থেকে শুরু করে নিজের নামে রাজকীয় মূদ্রা এবং রাজকীয় ফরমান জারি, বড় বড় রাজকীয় ভবনের নকশা তৈরি, দরিদ্র নারীদের কল্যাণে ব্যবস্থা গ্রহণ, এরকম নানা কাজে নুর জাহান তার স্বাক্ষর রেখেছেন। যা ছিল সেকালের নারীদের মধ্যে ব্যতিক্রম। তাঁর স্বামীকে যখন জিম্মি করা হয়, তখন নুরজাহান তাঁকে রক্ষায় সেনাবাহিনীর অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় আর জনমানসে চিরদিনের জন্য স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে। প্রায়ই সম্রাটের সাথে বাঘ শিকারে যেতেন নুরজাহান। শক্তিশালী বাঘ শিকারি হিসেবে তার খ্যতি ছিল। তিনি ৬টি গুলি দিয়ে ৪টি বাঘ শিকার করেছিলেন। তাঁর বীরত্বের কবিতাও লিখেছিলেন সেসময়ের অনেক কবি। একসময় সম্রাটের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন এই নারী। জাহাঙ্গীরের নামে তিনি রাজ্য শাসন করতেন। তিনি নিজের আত্মীয়দের দরবারের উচ্চপদে চাকরি দিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধে জাহাঙ্গীর তাঁর ভাই আসফ খাঁকে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর পদ দিয়েছিলেন। তাঁর আগের পক্ষের মেয়ের সঙ্গে যুবরাজ শাহরিয়ারে বিবাহ দেন।

    ভাইপো আকবর : শাহজাহান তো নুরজাহানের ওপর বেশ চটা ছিল শুনেছি। নুরজাহানের নামের সব মুদ্রা গলিয়ে ফেলেছিল আর যাদের কাছে ছিল, তাদের হুকুম দিয়েছিল গলিয়ে ফেলার। এখনকার কয়েন কালেক্টারদের কাছে ওই কয়েনগুলোর দাম অনেক।

    ছায়ামূর্তি : আমার বর যেমন ঘুষখোর ছিল, তেমন নুরজাহানের বাবাও ছিল ঘুষখোর। ‘আমার রাজ্য আমি এক পেয়ালা মদ আর এক বাটি সুরুয়ার বিনিময়ে আমার প্রিয় রানীর কাছে বেচে দিয়েছি।’ এই উক্তিও আর কারও নয়, সম্রাট জাহাঙ্গীরের। তিরিশজন বউয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে প্রিয় বউ ছিলেন এই নূরজাহান। এত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও নূরজাহানের জীবনের শেষ বছরগুলো ভালো যায়নি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূরজাহান তড়িঘড়ি করে জামাই শাহরিয়ারকে সম্রাট ঘোষণা করতে চান। কিন্তু তাঁর ভাই আসফ খান নিজের মেয়ে মমতাজের স্বামী শাহজাহানকে সিংহাসনে বসাতে কৌশলে নুরজাহানকে বন্দী করেন। শাহজাহান এই সুযোগে নিজের ভাই শাহরিয়ারকে খুন করে করে সিংহাসন দখল করে নিয়েছিল আরোহণ করেন। অথচ সম্রাট বেঁচে থাকা আমলে নূরজাহানের বাবা ও ভাই অর্থ আত্মসাৎ ও বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তখন ঢাল হয়ে বাঁচিয়েছিলেন এই নুরজাহান। এমনকি তাঁদের পদোন্নতিতেও সাহায্য করেছিলেন তিনি। নিজের পরিবার পরিজনদের অনেককেই তিনি নিজের প্রভাব বলে প্রশাসন ও বিচার সম্বন্ধীয় উঁচু পদে বসিয়েছিলেন। জীবনের শেষ আঠারো বছর নুরজাহানের বন্দীদশাতেই কাটে। এই পুরো সময় তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে, তাঁর বাবার সমাধিতে দরগাহ তৈরির তদারকি করে ও কাব্যচর্চা করে দিন কাটিয়েছিলেন।

    ভাইপো আকবর : তোমাদের দেশে শুনেছি স্পেনের আদলে ইনকুইজিশন চলছে ? জানো তো ? ইউরোপীয় চার্চের দন্ডমুন্ডের কর্তা পোপ গ্রেগরির নির্দেশের ফলে পুরো ইউরোপে নেমে আসে ‘অন্ধকার যুগ’। তার ফলাফল ছিল ইনকুইজিশন। চার্চের কর্তৃত্ব ধরে রাখা আর বিরোধীদের দমনের জন্য রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বিরোধীদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। বিচারের সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে চালানো হত অমানবিক নির্যাতন। যদি কেউ এমন কথা বলতো যা চার্চ সঠিক নয় তাহলে তার সর্বচ্চো শাস্তি ছিলো জীবন্ত পুড়িয়ে মারা। ভয়াবহ নির্যাতন ও জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার পদ্ধতিটিই ‘ইনকুইজিশন’ নামে পরিচিত। এই ইনকুইজিশন শুধু খ্রিস্টধর্ম বিরোধীরাই নয়, অন্যান্য ধর্মের, বিশেষ করে ইহুদি, মুসলমান আর দক্ষিণ আমেরিকার আদিনিবাসী বহু নিরপরাধ পুরুষ, নারী ও শিশু নির্যাতন ভোগ করছে।

    ছায়ামূর্তি : জানি। শুনে অবাক হবেন যে আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পরিবার শিয়া ইসমাইলি মতের অনুসারী ছিল, যাদের এখন তালিবানিদের হাতে অত্যাচার ভোগ করতে হচ্ছে। জিন্নাহর ঠাকুর্দা ভারতের গুজরাতের কাঠিয়াওয়ারের গোন্ডাল রাজ্যের পানেলি মতি গ্রামের বানিয়া উপজাতের সদস্য ছিলেন। তিনি মাছের ব্যবসা করতেন, আর সেই কারণে তিনি তার হিন্দু লোহানা জাত থেকে বয়কট হন। তিনি মাছের ব্যবসা বন্ধ করে দেবার পরও তাঁকে জাতে ফেরার অনুমতি দেয়া হয়নি। ফলে, তাঁর ছেলে পুঞ্জলাল ঠাক্কর, যিনি জিন্নাহর বাবা, এতটাই অপমানিত ও ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি তাঁর এবং তাঁর চার ছেলের ধর্ম পরিবর্তন করে নেন, এবং ইসলাম ধর্মে আস্তিকান্তরিত হন। জিন্নাহর বাবা পুঞ্জাভাই জিন্নো খোজা ইসমাইলি ফিরকা বিশ্বাসের সাথে প্রথম প্রজন্মের মুসলমান ছিলেন, তবে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের বিশ্বাস শিয়া ইসলামের দিকে নিয়ে যায়। আমার দেশের লোকেরা এই ইতিহাস জানে।

    চেঙ্গিজ খান : আমি বলেছিলুম তো যে সব খান চেঙ্গিজ খান নয়।

    ছায়ামূর্তি : চরমপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যরা আমাদের দেশেও জাতপাতের সূচনা করেছে স্যার। তাদের লক্ষ্য হলো হিন্দু, খ্রিস্টান, শিয়া, বেরেলভি, সুফি, আহমাদিয়া আর দেওবন্দী। কয়েক হাজার শিয়া সুন্নি উগ্রপন্থী নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে মরেছে। খুনোখুনির উল্লেখযোগ্য দিক হ’ল চরমপন্হীরা তাদের আক্রমণের ধর্মীয় দিকগুলিকে জোর দেওয়ার জন্য উপাসনার জায়গাগুলোকে টার্গেট করে। সূফি মাজারেও হামলা হয়। এই নতুন জাতপাতের রেশারেশির ঝগড়ায় সিপাহ-ই-সাহাবা, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান, জুন্ডাল্লাহ, তেহরিক-ই-তালিবান দায় স্বীকার করেছে। মেয়েরা বোরখা না পরলে তালিবানরা তাদের মাথায় গুলি মেরে খুন করে।

    ভাইপো আকবর : তোমার ড্যাড নিজে প্রধানমন্ত্রী হবার ধান্দায় শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি, তাই দেশটা দুটুকরো হয়ে গেল, যুদ্ধ বাধলো। যুদ্ধে যে নব্বুই হাজার সেনা বন্দি হয়েছিল তারা কি তাদের অপমান ভুলতে পারে। তারা দল বেঁধে তোমার বাপকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দিলো।

    ছায়ামূর্তি : আমার ড্যাড আল-হিন্দের প্রধানমন্ত্রী মিস্টার নেহেরুর মতন ফ্ল্যামবয়েন্ট ছিলেন।

    চেঙ্গিজ খান : মিস্টার নেহেরু প্রায়ই এই গানটা টেলিফোনে একজনকে খাম্বাজ রাগে গেয়ে শোনাতেন–

    আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী।

    তুমি থাক সিন্ধুপারে ওগো বিদেশিনী॥

    তোমায় দেখেছি শারদপ্রাতে, তোমায় দেখেছি মাধবী রাতে,

    তোমায় দেখেছি হৃদি-মাঝারে ওগো বিদেশিনী।

    আমি আকাশে পাতিয়া কান শুনেছি শুনেছি তোমারি গান,

    আমি তোমারে সঁপেছি প্রাণ ওগো বিদেশিনী।

    ভুবন ভ্রমিয়া শেষে আমি এসেছি নূতন দেশে,

    আমি অতিথি তোমারি দ্বারে ওগো বিদেশিনী॥

    ল্যাঙড়া তৈমুর : হায় মাওলা কী করলা। আল-হিন্দের রোগ ওদেরও ধরেছে। আমার সময়ে তো এরকম জাতপাতের খুনোখুনি ছিল না, কে বড়ো আর কে ছোটো, তা নিয়ে কাটাকাটি-মারামারি হতো না ! মেয়েদের বোরখা পরতে হতো না।

    ভাইপো আকবর : বলছিলুম। নির্ঘাত নব্য-ইনকুইজিশন। আমার দরবারে নিরীশ্বরবাদীরাও আসতো। নিরীশ্বরবাদ আক্ষরিক অর্থে “ঈশ্বরের অনস্তিত্ব সংক্রান্ত ধারণা”, কিংবা “ঈশ্বরহীনতা সংক্রান্ত মতবাদ”। ঈশ্বর বা দেবতার অস্তিত্বে অবিশ্বাস হিন্দু দর্শনের একাধিক মূলধারার ও ব্যতিক্রমী ধারার শাখায় সুপ্রাচীন কাল থেকে স্বীকৃত হয়েছে।] ভারতীয় দর্শনের তিনটে শাখা বেদের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেছে। এই তিনটি শাখা হল জৈনধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও চার্বাক। এগুলোকেই ‘নাস্তিক’ দর্শন বলা হয়। নাস্তিক বা ব্যতিক্রমী ধারার দর্শনে যদিও ঈশ্বরে অবিশ্বাসের থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, বেদের কর্তৃত্ব অস্বীকার। এই শাখাগুলো সৃষ্টিকর্তা দেবতার ধারণাটিকেও প্রত্যাখ্যান করেছে। আমি নানারকম আলোচনা শুনতুম কিন্তু খুনোখুনি বরদাস্ত করতুম না। তোমার ভাবনা তোমার কাছে রাখো, অন্য সবায়ের ওপর চাপাবার কী দরকার ?

    গুলবদন পিসি : একদম।

    চেঙ্গিজ খান : সন্ধ্যা হয়ে গেল তো। এবারে চলো খালাসিটোলায়। বাদবাকি চর্চা সেখানেই মাতাল হয়ে করা যাবে। চল রে ল্যাঙড়া। মহিলারা ওখানে অ্যালাউড নয়। যারা-যারা যেতে চাও চলো। পরের আড্ডা পয়লা বৈশাখ হবে নিউ টাউন কফি হাউসে। গুড নাইট লেডিজ। সি ইউ সুন।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৮:০৬734722
  • খাজুরাহো ধ্বংস

    নাদির শাহ : দ্যাখ আবদালি, এটা ১৭৭৪ সাল। তোর দু’কানের লতি এই জন্যে কেটে দিলুম যে তুই চিরজীবন মনে রাখবি তুইই আমার ভাবশিষ্য ; আমার তো কোনও বংশধর নেই। মনে রাখিস যে আমি আর আমার মা উজবেক-তুর্কীদের দাস হিসেবে কাজ শুরু করেছিলুম কিন্তু আমি ওদের ফাঁদ কেটে পালাই। আমি তারপর সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়ে ক্রমশ প্রধান হয়ে উঠি। পৃথিবীকে কাফেরমুক্ত করার দায়িত্ব তোকে দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের স্লোগান মনে আছে তো তোর ? জান, জর, জমিন। মানে, মেয়েমানুষ, সোনা, এলাকাদখল। আমাকে ভালো করে কবর দিয়ে তুই কাজে এগো।

    আদিল শাহ আবদালি : মনে থাকবে সম্রাট ; আফগানদের নাম রওশন করব। কাফের বলতে তো ওই একটাই দেশ, আল-হিন্দ। তিব্বত আছে বটে, কিন্তু ওখানে সোনাদানা আর কাজের জমি পাওয়া যায় না। বাঁচলো চিন ; সেখানে চেঙ্গিজ খানের বৌদ্ধ বংশধরদের রাজত্ব, পেরে ওঠা যাবে না। খোয়াজা চিশতির আশীর্বাদ নিয়ে আমি তাহলে এগোই।

    নাদির শাহ : হ্যাঁ, বেস্ট অফ লাক।

    হজরত ইবলিশ : আপনি চিন্তা করবেন না হুজুর। আবদালিকে আমি গাইড করব। খাজুরাহোর সংবাদ ওকে জানতে দেবো না।

    নান্নুকা : ৮৩১ থেকে ৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমি ছিলুম ভারতের চান্দেলা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। আমি জেজকভূক্তি এলাকায়, যা এখন মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড, শাসন করতুম। আশ্চর্য যে চান্দেলাদের সম্পর্কে কাব্যিক গীতগুলিতে আমার কথা উল্লেখ করা হয়নি, আর তার বদলে চন্দেলা বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে “চন্দ্রবর্মণ” উল্লেখ করা হয়েছে। খাজুরাহোতে ওরা যে দুটো শিলালিপি পেয়েছে, তাতে আমার, মানে নান্নুকাকে, রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটা শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে আমি অনেক শত্রু জয় করেছিলুম আর অন্যান্য রাজকুমাররা আমাকে ভয় পেয়ে আমার আনুগত্য স্বীকার করেছিল। তাতে আরও বলা হয়েছে যে আমাকে দেখতে ছিল “প্রেমের দেবতার মতো”। খ্রিস্টীয় ১০০২-এর শিলালিপিতে আমাকে সূর্য আর আমার পরিবারের সদস্যদের মণি-মুক্তো হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আমার তীরন্দাজির দক্ষতা কিংবদন্তি নায়ক অর্জুনের সাথে তুলনা করেছে।সুতরাং, খাজুরাহো বেড়াতে এলে, কথাগুলো মনে রাখবেন।

    ঐতিহাসিক আর. কে, দীক্ষিত : চান্দেলার রেকর্ডে নান্নুকাকে দেওয়া খেতাবগুলোর মধ্যে রয়েছে নাপা, নরপতি আর মহাপতি। এগুলো খুব উঁচু স্তরের খেতাব নয়। তাই কয়েকজন আধুনিক ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন যে নান্নুকা কেবল একটি সামন্ত শাসক ছিলেন। বুন্দেলখণ্ডের স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে, চন্দেলারা প্রতিহারদের পরাধীন করার পরে সেই অঞ্চলের শাসক হয়েছিলেন।

     

    আবু রিহান আল বিরুনি : আমি আমার ভ্রমণকাহিনিতে লিখেছিলুম, তাই। নয়তো লোকে জানতে পারতো না যে খাজুরাহো ধ্বংসের কাজ প্রথম আরম্ভ করেছিল গজনির সুলতান মাহমুদও ভেবেছিল যে কাফেরদের মন্দির মানেই তাতে অঢেল সোনাদানা মিলবে। সপ্তাহখানেক ভাঙচুর করার পর কিছুই না পেয়ে ওর সেনারা যখন চটে লাল, তখন ওদের বোঝালো যে মূর্তিপূজকদের মূর্তিগুলো ভাঙা ওদের কর্তব্য। পঁচাশিটা মন্দির ছিল, সুলতানের সেনারা তিরিশটার মতন ভাঙার পর হাল ছেড়ে দিলে। এরকম মূর্তি আমি দুনিয়ার কোথাও দেখিনি।

    রমেশচন্দ্র মজুমদার : চান্দেলারা প্রথমে কন্যাকুবজার (কান্নৌজ) গুর্জারা-প্রতিহারদের সামন্ততন্ত্র হিসাবে শাসন করেছিল। দশম শতাব্দীর চান্দেলা শাসক যশোবর্মন কার্যত স্বাধীন হয়েছিলেন, যদিও তিনি প্রতিহারদের স্বীকৃতি অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরী ধঙ্গদেবের সময়কালে, চান্দেলারা সার্বভৌম শক্তি হয়ে উঠেছিল। তারা প্রতিবেশী রাজবংশ, বিশেষত মালওয়ার পরমার এবং ত্রিপুরীর কালাচুরিদের সাথে যুদ্ধ করার সাথে সাথে তাদের শক্তি হ্রাস পায়। একাদশ শতাব্দীর পর থেকে, চান্দেলারা গজনভি আর মুহম্মদ ঘুরিসহ মুসলিম শাসকদের কাফের-নিধন ধ্বংসযজ্ঞে অভিযানের মুখোমুখি হয়েছিল। চান্দেলা শক্তি কার্যকরভাবে তেরো শতাব্দীর শুরুতে চাহমন ও ঘুরি আক্রমণগুলির পরে শেষ হয়ে গিয়েছিল।

    বিজয়শক্তি : মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের চান্দেলা রাজবংশের নবম শতাব্দীর শাসক ছিলুম আমি। যদিও চান্দেলাদের নথিতে সাধারণত আমার বড় ভাই আর পূর্বসূরি জয়শক্তির সাথে আমার উল্লেখ পাওয়া যায়। আমরা দু’জনে মিলে ৮৬৫ থেকে ৮৮৫ পর্যন্ত শাসন করেছিলুম। আমি ছিলুম বাকপতির ছেলে আর আমার বড় ভাই জয়শক্তির স্থলাভিষিক্ত হন। আমাকে ভিজা, বিজয়া এবং বিজজাকা নামেও জানতো লোকেরা। আমার পর আমার ছেলে রাহিলা চান্দেলার শাসক হয়েছিল। খাজুরাহো হলো মন্দিরের দেশ, চান্দেলাদের দেশ। খাজুরাহোতে পা রাখা মানেই চান্দেলাদের রাজত্বে ফিরে যাওয়া। চোখের ওপর আশ্চর্য মন্দিরগুলির অলঙ্করণ শিল্প ফিরিয়ে আনবে ৯৫০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের বাতাবরণ। মন্দিরের গায়ে দেবদেবী, অপ্সরা, নর্তকী, মিথুন মূর্তিগুলোতে প্রাণস্পন্দন পাওয়া যাবে। এক্কেবারে শহরের কেন্দ্রে মন্দিরগুলোর অবস্থান। ফুলবাগিচায় সাজানো চত্বর জুড়ে কাণ্ডারীয় মহাদেব, লক্ষণ, জগদম্বা, চৌষটযোগিনী, চিত্রগুপ্ত প্রমুখ মন্দিরের রাজমালা। ভেবে দেখুন, বিদেশ থেকে এসে একদল ম্লেচ্ছ, যাদের কোনও শিল্পবোধ ছিল না, বেশিরভাগ স্হাপত্য গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। ওদের বংশধরদের কোনও লজ্জা-শরম নেই ; ধ্বংসের কথা বুক ফুলিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের পড়ায়।

    সবুক্তগিন : আমি তেমন বিখ্যাত নই। আমার ছেলে গজনির সুলতান মাহমুদ বেশি বিখ্যাত। আমি তো ক্রিতদাস ছিলুম। অবশ্য বলতে পারেন যে আমি গজনভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবু মনসুর সেবুক তিগিন। ৯৭৭ থেকে ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কুড়ি বছর রাজত্ব করেছিলুম। প্রথম জীবনে দাস হলেও আমি আমার মালিক আল্প তিগিনের মেয়েকে বিয়ে করেছিলুম। বুখারার সামানি সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রথমে আমার শশুর আর তারপর আমি স্বাধীনভাবে আফগানিস্তানের গজনির শাসক হই। আমরা নামে সামানিদের কর্তৃত্বকে স্বীকার করলেও আমার ছেলে মাহমুদ নিজেকে পুরোপুরি স্বাধীন বলে ঘোষণা করে।

    ঐতিহাসিক উমা চক্রবর্তী : কল্পিত কিংবদন্তীতে চান্দেলাদের উৎস অস্পষ্ট। রাজবংশের লিপিবদ্ধ রেকর্ডগুলির পাশাপাশি বালভদ্র-বিলাস এবং প্রবোধ-চন্দ্রোদয়ের মতো সমসাময়িক গ্রন্থগুলো থেকে বোঝা যায় যে চান্দেলরা কিংবদন্তি-কথিত চন্দ্রবংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। খ্রিস্টীয় ৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে খাজুরাহো শিলালিপিতে রাজবংশের প্রথম রাজা নান্নুকা ছিলেন চান্দেলা ঋষি চন্দ্রত্রেয়, যিনি ছিলেন আত্রির পুত্র। ১০০০ খ্রিস্টাব্দে খাজুরাহো শিলালিপিতে কিছুটা আলাদা বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে চন্দ্রাত্রেয়কে ইন্দুর (চাঁদ) পুত্র এবং আত্রির নাতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাঘারী শিলালিপি এবং ১২৬০ খ্রিস্টাব্দ অজয়গড় শিলালিপিতে অনুরূপ পৌরাণিক বিবরণ রয়েছে। বালভদ্র-বিলাস চন্দ্রের পূর্বপুরুষদের মধ্যে অত্রির নামও রেখেছিলেন। আর একটি খাজুরাহো শিলালিপিতে চান্দেলা রাজা ধঙ্গদেবকে যাদবদের বর্ধনী বংশের সদস্য হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে (যিনি চন্দ্র রাজবংশের অংশ হিসাবে নিজেকে দাবি করেছিলেন)।

    বাকপতি : ৮৪৫ থেকে ৮৬৫ সালে মধ্য ভারতের চান্দেলা রাজবংশের শাসক ছিলুম। চান্দেলার শিলালিপিতে আমার পদবী কেতিপা (“দেশের কর্তা”) হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খাজুরাহোর দুটো শিলালিপি থেকে জানা যাবে, আমার বাবা ছিলেন নান্নুকা। শিলালিপিতে আমাকে আমার সাহসিকতা, শালীনতা এবং জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত রাজা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শিলালিপিগুলোতে বলা আছে যে আমি বেশ কয়েকটি শত্রু দেশকে যুদ্ধে হারিয়েছিলুম আর আমি প্রজাদের প্রিয় ছিলেন।আমার জ্ঞান ও বাকশক্তির জন্য আমার নাম বাকশতীর সাথে তুলনা করা হয়, যিনি ছিলেন আমাদের বক্তৃতার দেবতা। শিলালিপিতে আরও বলা হয়েছে যে আমি বুদ্ধির সাথে সাহসের সংমিশ্রণে পৃথু এবং কাকুৎস্যের মতো কিংবদন্তী রাজাদেরকে অতিক্রম করে গিয়েছিলুম। ৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের একটা শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে বাকপতির “আনন্দ পর্বত” (ক্রিড়া-গিরি) ছিল বিন্ধ্যপর্বতে, যেখানে পদ্মের উপর বসে কিরাতা মহিলারা তাঁর সম্পর্কে গান গেয়েছিলেন, আর ময়ূররা জলপ্রপাতের শব্দে নেচেছিল।

    ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার : পূর্ব ভারতের পাল রাজা দেবপালার দক্ষিণ সম্প্রসারণকে বাকপতি সম্ভবত সমর্থন করেছিলেন। বাকপাতির দুটি পুত্র ছিল: জয়শক্তি (জেজা) এবং বিজয়শক্তি (বিজ)। তাঁর পরে তাঁর বড় ছেলে জয়শক্তি তাঁর উত্তরসূরি বিজয়শক্তি রাজ্য শাসন করেছিলেন।

    তসলিমা নাসরিন : ভারতের মধ্যপ্রদেশে একটি ছোট গ্রামের নাম খাজুরাহো। খেজুর হতো বলেই হয়তো খাজুরাহো নাম গ্রামটির। খাজুরাহোর জঙ্গলের মন্দিরগুলো চান্দেলা রাজপুত রাজারা বানিয়েছিলেন ৯৫০ সালের দিকে। ওরা রাজত্ব করেছিল দশম শতক থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত। মহারাজা রাও বিদ্যাধরের সময় শুরু হয়েছিল খাজুরাহোর মন্দির নির্মাণ। খাজুরাহোর জঙ্গলে ৮৫টি মন্দির ছিল। এখন আছে সাকুল্যে ২৫টি। বাকিগুলো ধ্বংস করেছে শত্রুসৈন্য। গজনির সুলতান মাহমুদ ছিলেন ধ্বংসকারীদের একজন। সেই প্রাচীনকালে যৌনতার যে চর্চা ছিল ভারতবর্ষে, তার কিছু নিদর্শন দেখতে পাই মন্দিরগুলোর গায়ে। আমি তো মুগ্ধ দেখে নারীপুরুষের কামশিল্প। কোনও সংকোচ নেই কারওর। নারীও পুরুষের মতো যৌনশিল্পে দক্ষ। কবে যে রক্ষণশীলতা গ্রাস করে ফেলেছে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ, জানি না। সম্ভবত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের ভিক্টোরিয়ান রক্ষণশীলতা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেওয়ার পর। মানুষের মগজধোলাই তো অনেকটাই হয়েছে। তা না হলে যৌনতার যে চিত্র আমরা ধর্মের মন্দিরে দেখি, সেই যৌনতা এত শীঘ্র এই অঞ্চলে ট্যাবু হয়ে যায় কী করে?! আজকাল তো হিন্দু আর মুসলিম— দুই ধর্মীয় মৌলবাদীই নারী স্বাধীনতাবিরোধী, খাজুরাহো মন্দিরের যৌনশিল্পের ঘোরবিরোধী তারা।কামসূত্রের অনেক আসনই দেখি মন্দিরের গায়ে। কামসূত্র ভারতবর্ষে লেখা হলেও জনপ্রিয় ভারতবর্ষের বাইরে, বিশেষ করে ইউরোপে। ভারতবর্ষের মানুষ কামসূত্রের চর্চা করে না বললেই চলে। যৌনতা, এখনকার সাধারণ হিন্দুরাও মনে করে, পাপ। গান্ধীও তো বলেছিলেন সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্য ছাড়া সুখভোগের উদ্দেশে যে সেক্স করে, সে পাপ করে।মন্দিরে নারী পুরুষের যৌনশিল্প আমাকে মুগ্ধ করলেও, পশুর সঙ্গে পুরুষের সঙ্গম আমাকে ভীষণ অস্বস্তি দিয়েছে। পশু-ধর্ষণ তাহলে প্রাচীনকাল থেকেই ছিল ! পশুরা নিশ্চয়ই মানুষের সঙ্গে সঙ্গম করতে চায় না, মানুষকে সঙ্গমের অনুমতি নিশ্চয়ই দেয় না তারা। তাহলে এই সঙ্গম সঙ্গম নয়, এ নিতান্তই ধর্ষণ। সেই প্রাচীনকাল থেকে পশুপাখিদের নির্যাতন করে আসছে মানুষ। তাদের হত্যা করেছে, বন্দি করেছে, যন্ত্রণা দিয়েছে। পশুপাখিরাও পুরুষের যৌন-নির্যাতনের শিকার।এখনও সব বয়সের নারী তা আছেই, দুধের শিশুরা, এমনকী পশুও পুরুষের যৌন নির্যাতন থেকে রেহাই পায় না। পুরুষ যে কবে মানুষ হবে ! জানি সব পুরুষই মন্দ নয়, সব পুরুষই ধর্ষক নয়, কিন্তু ভালো পুরুষের ওপর তো দায়িত্ব বর্তায় পুরুষ জাতটাকে মানুষ করার। ধর্ষণের বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ভালো পুরুষরা কেন সংগঠিত হচ্ছে না। তারা কিভাবে আন্দোলন করার দায়িত্ব শুধু ভিকটিমদের, তাদের নয়? সমাজটাকে কলুষমুক্ত করার, বৈষম্যমুক্ত করার, শুদ্ধ করার দায়িত্ব শুধু নারীদের, পুরুষদের নয়?

    গজনির সুলতান মাহমুদ : এটা সত্যি যে আমার বাবা ক্রিতদাস ছিলেন বলে আমি ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতুম আর দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করে নিজেকে সবার চেয়ে সুপিরিয়র মনে করতুম। গজনি আসলে বেশ গরিবদের রাজ্য ছিল। আমি নানা রাজ্য আক্রমণ করে সোনাদানা মণিমুক্ত আনতুম। যাদের যুদ্ধে হারিয়ে দিতুম তাদের রাজ্য থেকে অনেককে এনে দাস হিসেবে খাটাতুম। যেসব মেয়েদের তুলে আনতুম তাদের বিলিয়ে দিতুম আমার দরবারীদের মধ্যে। ৯৯৭ থেকে ১০৩০ সালে আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি পূর্ব ইরানিয় এলাকা আর ভারত উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম অংশ, বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তান, জয় করি। সাবেক প্রাদেশিক রাজধানী গজনিকে এক বৃহৎ সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধশালী রাজধানীতে পরিণত করেছিলুম। আমার সাম্রাজ্য বর্তমান আফগানিস্তান, পূর্ব ইরান ও পাকিস্তানের অধিকাংশ এলাকা জুড়ে ছিল। আমি সুলতান উপাধিধারী প্রথম শাসক যে আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করে নিজের শাসন চালু রেখেছিলুম। ১০২২ সালে আমি খাজুরাহো ধ্বংস করেছিলুম, কিন্তু সোনাদানা কিছুই পাইনি।

    তাপ্তী গুহঠাকুরতা : এটি সর্বজনবিদিত যে, ১১৯২ এর দুই শতাব্দীর আগে, যখন আদিবাসী ইন্দো-মুসলিম রাষ্ট্র এবং জনগোষ্ঠী উত্তর ভারতে প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল, ইরানি আর তুর্কিরা পরিকল্পিতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান নগর কেন্দ্রগুলিতে অভিযান চালিয়ে এবং লুটপাট করে, মন্দিরগুলো ভেঙে ফ্যালে এবং প্রচুর সোনা মণিমুক্ত দাস-দাসী ও তরুণীদের পূর্ব আফগানিস্তানে নিজেদের ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। রীতিটি শুরু হয়েছিল ৯৮৬ সালে, যখন গজনভির সুলতান সবুকতিগিন ( ৯৭৭-৯৯৭এর রাজত্বকালে) হিন্দু রাজাদের আক্রমণ করে হারিয়েছিল। তারা কাবুলের উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করতো। সুলতানের ছেলের একান্ত সচিব আবু নসর `উতবির মতে, সাবুক তিগিন লামঘান (কাবুলের তাৎক্ষণিক পূর্বে অবস্থিত) অভিমুখে যাত্রা করেছিল, এটি একটি বিশাল শক্তি ছিল সেই সময়ে আর সমৃদ্ধ শহর হিসাবে চিহ্নিত ছিল। সাবুকতিগিন এটি আক্রমণ করেছিল আর কাফেরদের বসবাসের আশেপাশের জায়গাগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর মূর্তি-মন্দির ভেঙে সাবুকতিগিন সেখানে ইসলামধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিল।

    ব্রিটিশ ইন্ডোলজিস্ট ভি. এ. স্মিথ : চান্দেরালরা ভর বা গোন্ডের কোন এক উপজাতি ছিল। আর সি সি মজুমদার সহ আরও কয়েকজন পণ্ডিত এই তত্ত্বকে সমর্থন করেছিলেন। চান্দেলারা মানিয়া নামে একটি উপজাতির দেবী উপাসনা করতেন, যার মন্দিরগুলি মহোবা এবং মানিয়াগড়ে রয়েছে। গোন্ডের সাথে সম্পর্কিত জায়গা গুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়াও, রানী দুর্গাবতী, যার পরিবার দাবি করেছিল যে চান্দেলা বংশোদ্ভূত গারহ-মন্ডলার একজন গন্ড প্রধানকে বিয়ে করেছিলেন। ঐতিহাসিক আর. কে. দীক্ষিত এই যুক্তিগুলি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে মানিয়া কোনও উপজাতি দেবতা ছিলেন না। এছাড়াও, গোন্ড অঞ্চলের সাথে রাজবংশের যোগসূত্রটি কোনও সাধারণ বংশোদ্ভূত হওয়ার ইঙ্গিত দেয় না। রাজবংশের পূর্বসূরিদের এই অঞ্চলগুলিতে শাসক পদে পোস্ট করা হতে পারে। গোন্ড প্রধানের সাথে দুর্গাবতীর বিবাহকে এক-কথায় খারিজ করা যেতে পারে। চান্দেলারা মূলত গুজর-প্রতিহারের প্রতিনিধি ছিল। নান্নুকা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। খাজুরাহোকে কেন্দ্র করে একটি ছোট রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

    চন্দ্রবর্মণ : সুলতানটা মূর্খ ছিল। ব্যাটা জানতো না শিল্প কাকে বলে। নিজের হারেমে হাজার খানেক বউ-বাঁদি-রাখেল নিয়ে রেলা করেছে সারাজীবন, আর মূর্তিগুলো দেখে ওর গায়ে জ্বর এলো, মাথা গণ্ডোগোল হয়ে গেল। মন্দিরগুলো গড়তে কতো শিল্পীকে দিনের পর দিন কাজ করতে হয়েছে, কতো শ্রমিককে সকাল-সন্ধ্যা পাথর বয়ে আনতে হয়েছে, তা খেয়াল করলো না। একশো বছর লেগেছিল, আর সুলতান ব্যাটা যখন দেখলো এখানে সোনাদানা নেই তখন তিন দিনে যতোটা পারলো মাটিতে মিশিয়ে কেটে পড়ল। যত্তোসব বহিরাগত ইডিয়ট।

    সিকন্দর লোদি : আসলে আমার মা ছিলেন হিন্দু স্যাকরার মেয়ে। সুন্নি আলেমরা আমাকে খুব হ্যাটা করতো। লুকিয়ে হাসাহাসি করে বলতো কাফারের বাচ্চা কোথাকার। আমি যখন খবর পেলুম যে খাজুরাহোতে অনেক মন্দির আছে তখন ভাঙচুর করতে বাধ্য হলুম। তাছাড়া আমি আব্বাসীয় খিলাফতকে মানতুম, কেননা নবী মুহাম্মদ এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে কুফায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে রাজধানী নিয়ে যান। আসল ভাঙাভাঙি করেছিল গজনির সুলতান মাহমুদ। ও ভেবেছিল সোমনাথ মন্দিরের মতন এখানকার মন্দিরেও সোনাদানা মণিমুক্ত পাবে। সেসব না পেয়ে ক্ষেপে গিয়ে আরও ভাঙাভাঙি করেছে। কিন্তু আমাকে পদে-পদে প্রমাণ করতে হয়েছে আমি খাঁটি মুসলমান। তাই আমি সালার মাসুদের বার্ষিক শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করেছিলুম আর হুকুম দিয়েছিলুম যে মেয়েরা কোনও সন্তের মাজারে যেতে পারবে না। মরবার দিন পর্যন্ত ভুলিনি যে আমার গায়ে মূর্তিপুজক কাফেরের রক্ত।

    হজরত ইবলিশ : এখন বুঝলি ? আমি তোদের সবায়ের ঘাড়ে চেপে আল-হিন্দে টেনে এনেছিলুম।

    জয়শক্তি : আমি বাবা বাকপাতির উত্তরসূরি। আমি জেজা বা জেজক নামেও পরিচিত। মহোবায় প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে চান্দেলা অঞ্চলটিকে (পরে বুন্দেলখণ্ড বলা হয়) আমার নামানুসারে “জেজকভূক্তি” রাখা হয়েছিল। চান্দেলার নথিগুলোতে আমার আর বিজয়শক্তি সম্পর্কে বেশিরভাগ তথ্য প্রকৃতির গৌরবময়, এবং অল্প ঐতিহাসিক গুরুত্বের, তার কারণ আমাদের রাজত্বে স্হপতি ও ভাস্কর অনেক ছিল কিন্তু লেখক বেশি ছিল না। এই নথিগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে আমরা আমাদের শত্রুদের ধ্বংস করেছিলুম, কিন্তু পরাজিত কোনও শাসকের নাম লেখকরা উল্লেখ করেনি। কালাচূড়ির রাজা কোক্কাল চান্ডেলার রাজকন্যা নাভ-দেবীকে বিয়ে করেছিলাম। বিষয়টা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ। ঐতিহাসিক আর সি সি মজুমদারের মতে এই রাজকন্যা জয়শক্তির কন্যা হতে পারেন। আবার ঐতিহাসিক আর. কে. দীক্ষিত বিশ্বাস করেন যে মেয়েটি সম্ভবত রাহিলার মেয়ে বা বোন ছিলেন।ওনারা মনে করেন আমি সম্ভবত উত্তরাধিকারী না রেখে মারা গিয়েছিলুম, যার কারণে আমার ছোট ভাই আমার সিংহাসনে বসেছিল।

    আবু রিহান-আল-বিরুনি : গজনির সুলতান মাহমুদের সঙ্গে আমি ছিলুম যখন ও খাজুরাহোর মন্দিরগুলো ভাঙছিল। ও বেটা ভেবেছিল এই মূর্তিগুলোর ভেতরে সোমনাথ মন্দিরের মতন অঢেল মণিমুক্ত সোনাদানা আছে। সোমনাথ মন্দিরে আক্রমণের কারণে এখনো মুসলিমদের কাছে মাহমুদ একজন ইসলাম প্রচারক বীর যোদ্ধা। পাকিস্তানের জাতীয় পাঠ্যক্রমে মাহমুদের ভারত আক্রমণকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয়। মাহমুদ বুঝতে পেরেছিল, হাজার হাজার হিন্দু সোমনাথে পুজো দেবার সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ দক্ষিণা হিসেবে মন্দিরে দিতো। ফলে সোমনাথ মন্দির ছিল ধন-সম্পদ, সোনা, রত্নের বিশাল ভাণ্ডার। মাহমুদের সতেরোতম আক্রমণ ছিল সোমনাথ মন্দিরে লুট করার উদ্দেশ্যে। রাজপুত সৈন্যবাহিনী সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করলেও সোমনাথ মন্দিরের শেষ রক্ষা করতে পারেনি। তিনদিন যুদ্ধের পর মাহমুদের বাহিনী মন্দিরে ঢুকে পড়ে, মন্দিরের সব মূর্তি এবং শিবলিঙ্গ ভেঙে ফেলে, সোনার মূর্তি, মূল্যবান পাথর, নগদ অর্থ, অলংকার যা ছিল সব নির্বিচারে লুট করে নিয়ে যায়, মূর্তি যেহেতু ইসলামে নিষিদ্ধ তাই মাহমুদ সোনার মূর্তি গলিয়ে ২ কোটি দিনার মুদ্রায় পরিণত করে। মাহমুদ সোমনাথ মন্দির লুটের সময় ৫০০০ রাজপুত সৈন্যকে মন্দিরের মধ্যেই ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিয়েছিল।

    হজরত ইবলিশ : আরে গজনির মাহমুদটা তো জাহিল। পাকিস্তানের আরেক নাম জাহিলিয়া, জানিস না ?

    দিল্লীর গার্গী কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক মীনাক্ষী জৈন : মাহমুদ সোমনাথ মন্দির এতটাই ধ্বংস করে দিয়েছিল যে ১০২৫ থেকে ১০৩৮ সাল পর্যন্ত সেখানে কোনও তীর্থযাত্রী যেতে পারেনি। তুর্কি-ইরানি সাহিত্যে মাহমুদের সোমনাথ মন্দিরে আক্রমণের ইতিহাসকে মহিমান্বিত করে উপস্থাপিত হয়। মাহমুদের আক্রমণে সোমনাথ মন্দিরের নগরী সৌরাষ্ট্রে ৫০,০০০ মানুষের মৃতদেহের যে স্তূপ জমে উঠে তা সৎকার করার মত অবশিষ্ট লোক পর্যন্ত ছিল না।

    হজরত ইবলিশ : ওর ঘাড়ে তো আমিই চেপে ছিলুম। এখন ব্যাটা জাহান্নমে গরম তেলেতে টগবগ করে ফুটছে।

    ইবন বাতুতা : কুতুবুদ্দিন আইবকও সুলতান মাহমুদের দেখাদেখি গিয়েছিল খাজুরাহোতে। ও বেটা মূর্তিগুলো ভেঙেছিল কেননা ওগুলো ওর যৌনতাকে চাগিয়ে তুলছিল অথচ মাঠের মধ্যে মেয়েদের ধরে-ধরে ধর্ষণ করতে পারছিল না ; সে কাজগুলো করছিল ওর সেনারা, ঘোড়ায় তুলে নিয়ে খোলা মাঠেই ধর্ষণ করছিল। কুতুব উদ্দিনের মূল কৃতিত্ব আসলে রাজ্য বিস্তারের থেকেও ইসলামের প্রচার আর প্রসার। কুতুবউদ্দিন আইবেক কমপক্ষে এক হাজার মন্দির ধ্বংস করে সেই ভিত্তির উপরেই নতুন করে মসজিদ নির্মাণ করেছিল। হিন্দুদের উপর ন্যক্কারজনক হত্যা, নিপীড়ন, তাদের মন্দির দখলের প্রক্রিয়া চলতেই থাকল শাসক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ মদতে আর ছত্রছায়ায়। দিল্লীর জামে মসজিদের পূর্বদিকের প্রবেশপথে কোরআনের আয়াত লেখা সোনার পাতগুলো বানানো হয়েছে বিভিন্ন মন্দির থেকে লুট করা সাতাশটা সোনার প্রতিমা গলিয়ে।

    হজরত ইবলিশ : তাহলেই বোঝো কেমন প্রজাবৎসল শাসক ছিল।

    কিশোরী শরণ লাল : কুতুবউদ্দিন আইবেকের মন্দির এবং প্রতিমা ভাঙার খ্যাতি অতীতের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তার সমসাময়িক বা পরেও মন্দির বা প্রতিমা ভাঙার ক্ষেত্রে তার ধারে কাছে কেউ নেই।তাদের ওসকাতে ইরান, আফগানিস্তান থেকে দলে আসতে লাগল সুফি দরবেশ, ইসলামী পণ্ডিত। রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় এবং পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় হিন্দুদের ইসলামের দাওয়াত দেয়া চলতে লাগল সমানতালে। পরিস্থিতি কেমন ছিল, একটা উদাহরণ দিলে হয়ত একটু বোধগম্য হবে, কুতুবউদ্দিন আইবক যখন কৈল/কালিঞ্জার, এখনকার আলীগড়ে পৌঁছায়, তখন যেসব সৈন্য বুদ্ধিমান এবং ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরেছিল, তারা দলে দলে ইসলাম কবুল করতে শুরু করে। আর যারা নিজেদের আবহমান কাল ধরে পিতৃপুরুষের প্রচলিত ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামের ছায়া তলে আসেনি তারা চিরতরে তলোয়ারের ছায়াতলে চলে যায়। আলীগড়ে মুসলমানের আধিক্য এই কারণেই আর ওরা সেই জন্যই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে পেরেছিল।

    কুতুবউদ্দিন আইবক : আমার পূর্বপুরুষেরা ছিল তুর্কি হাবশি । আমার একটা আঙুল কাটা । শৈশবে হাবশি দাস হিসেবে বিক্রি করা হলে আমাকে কেনে ইরানের খোরাসান অঞ্চলের নিসাপুরের প্রধান কাজী । কাজী আমাকে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছিল, আর ফার্সি এবং আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলে। সেই সঙ্গে আমাকে তীর চালানো আর ঘোড়ায় চড়া শিখিয়েছিল। কাজি মারা যাবার পরে ওনার ছেলে আমাকে আবারও এক দাস বণিকের কাছে বিক্রি করে দেয়। আমাকে এবার কিনে নেয় গজনির গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ ঘুরি। মুহাম্মদ ঘুরি আমাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয় আর নিজের সহচর হিসেবে নিয়োগ করে। আমিও ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতুম, আমার কাটা আঙুল, কেনা গোলাম আর গায়ের রঙ কালো বলে। হাসান নিজামী ঠিকই বলেছে যে আমার নির্দেশে হিন্দু মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা হত, যেমন স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ দিয়ে দিল্লির কুতুব মিনার কমপ্লেক্স এবং আজমিরের আধাই দীন কা ঝোপড়া তৈরি করা হয়েছে। আমি বেশিদিন রাজত্ব করিনি ; সুলতান হিসেবে ১২০৬ থেকে ১২১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, মাত্র চার বছর সুলতানগিরি করেছিলুম। ওইটুকু সময়েই খাজুরাহোর অনেকগুলো মন্দির ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলুম। কুতুব মিনার তৈরি করতে অনঙ্গপাল তোমারের দুর্গ ভেঙে তার মালমশলা ব্যবহার করেছিলুম। অনঙ্গপালের লোহার মিনার কুতুবমিনারের পাশেই আছে। দেখেছেন নিশ্চয়ই ?

    হজরত ইবলিশ : কুতুবউদ্দিন আইবক শাসক না হলে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভব হতো না ; ওখানে অতো ছাত্র-ছাত্রীর জমায়েত তো কাফেরদের ধর্ম পালটানোর কারণে।

    তসলিমা নাসরিন : খাজুরাহোর পুলিশদের একজনের নাম বিধু বিশ্বাস। আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলেছেন। পূর্ববঙ্গে ছিল তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি, ১৯৬৫ সালে বাবা মা চলে আসেন ভারতের মধ্যপ্রদেশে, এখানেই বাবার চাকরি হয়ে যায়, এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যান। বিধু বিশ্বাস কোনও দিন পূর্ববঙ্গে যাননি, ঢাকায় তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিও দেখেননি। নচিকেতার গান শুনেছেন ? জিজ্ঞেস করে টের পেলাম নচিকেতার নামই শোনেননি কখনও। বাংলাটা বলতে শিখেছেন বাড়িতে বাবা মা বাংলা বলতেন বলে, আর প্রতিবেশীদের অনেকে ছিলেন বরিশাল থেকে আসা, তাদের কাছ থেকেও শিখেছেন বাংলা। বাংলা পড়তে পারেন কি না জিজ্ঞেস করলে আমার আশঙ্কা হয় বিধু বিশ্বাস বলবেন যে তিনি বাংলা পড়তে পারেন না। এই উত্তরটি শুনতে ভালো লাগবে না বলেই জিজ্ঞেস করিনি। তাঁর বাবা নাকি একবার বলেছিলেন, ‘দেশের গাছ থেকে আম খেতাম, এত বড় বড় কাঁঠাল হতো কাঁঠাল খেতাম, পেয়ারা খেতাম, লিচু খেতাম, পুকুরের মাছ খেতাম, আহা কী সুখেই না ছিলাম! এ কোন দেশে এলাম, এখানে তো মাটি নেই, চারদিক শুকনো, কিছুই ফলে না, চারদিকে শুধু পাথর, শুধু পাথর।’ বিধু বিশ্বাস আমার মনে হয় তাঁর বাবার কথাগুলো শুধু শুনে গেছেন, অনুভব করতে পারেননি। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, সব মধ্যপ্রদেশে। মধ্যপ্রদেশের বাইরেও কোথাও যাননি। জানেন না বাংলা ঠিক কাকে বলে, কেমন দেশকে বাংলাদেশ বলে। তাঁকে বলি একবার ঢাকা ঘুরে আসতে। একবার দেখে আসতে তাঁর বাপ-দাদার ভিটেমাটি, দেখে আসতে গাছগাছালি, পুকুর নদী। মনে আছে নচিকেতা কেমন কেঁদেছিলেন পূর্বপুরুষের মাটিতে গিয়ে ! জানি না বিধু বিশ্বাস সেভাবে কাঁদবেন কি না। ধর্মের কারণে মানুষের উদ্বাস্তু হওয়াটা আমাকে কাঁদায়। ‘ফেরা’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলাম অনেক আগে, ওই উপন্যাসে লিখেছিলাম নিজের দেশের মাটি ত্যাগ করার কষ্টের কথা। আমার নিজের কিন্তু তখনও নির্বাসন দণ্ড হয়নি। তার আগেই মানুষের নির্বাসনের কষ্টটা কী করে অনুভব করেছিলাম জানি না। ধর্মের কারণে মানুষ নিষ্ঠুর হয়েছে, স্বার্থান্ধ হয়েছে। নিষ্ঠুরতা আর স্বার্থান্ধতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। বিধু বিশ্বাসের বাবার মতো কত মানুষ যে উদ্বাস্তু হয়েছে, নিজের ভাষা আর সংস্কৃতি থেকে দূরে সরতে বাধ্য হয়েছে! বিধু বিশ্বাসের ছেলে মেয়েরা কি নিজেদের বাঙালি বলে? হয়তো বলে না। কিন্তু বিধু বিশ্বাস ইচ্ছে করলে যেতে পারেন বাংলাদেশে, ঘুরে বেড়াতে পারেন ও দেশে। আমি পারি না। আমারই অনুমতি নেই বাংলাদেশে ফেরার। মাঝে মাঝে ভাবি ওরা অমুসলিম হয়ে যত অপরাধ করেছে, আমি অধার্মিক হয়ে তার চেয়েও বেশি অপরাধ করেছি। আসলেই কি আমরা অপরাধ করেছি? নাকি তারাই অপরাধী যারা আমাদের আদর্শ বা বিশ্বাসের কারণে আমাদের অত্যাচার করে, আমাদের ধর্ষণ করে, হত্যা করে, আমাদের জেলে পোরে, নির্বাসনে পাঠায়?

    রাহিলা : আমি বিজয়শক্তির ছেলে। আমার রাজত্বকাল ৮৮৫ সাল থেকে ৯০৫ সাল। অন্যান্য প্রারম্ভিক চান্দেলা শাসকদের মতো আমিও প্রতিহারের অধস্তন ছিলুম।আমি বহু সামরিক অভিযান চালিয়েছিলুম যার কথা পাওয়া যাবে আমার বংশধরদের লেখা দুটো খাজুরাহো শিলালিপিতে । শিলালিপিতে যোদ্ধা হিসাবে আমার প্রশংসা করা হয়েছে। ‘পরমালা রাসো’ কিংবদন্তিতে, আমার সামরিক অভিযানের বিবরণ আছে। প্রজাদের জন্য আমি বেশ কয়েকটা কাজ করেছিলুম। অজয়গড় মন্দিরের শিলালিপিতে আমার নাম আছে। মহোবার রহিল্য সাগর হ্রদ, যার তীরে একটা মন্দির আছে, তা আমার নামে। ‘পরমালা রাসো’ অনুযায়ী রাজাবাসিনী জনপদটা প্রতিষ্ঠা করেছিলুম, যা বাদৌসার কাছে এখন রসিন গ্রাম। এই গ্রামে চান্দেলা ধাঁচের মন্দির আছে।

    যশোবর্মণ : কোনও ব্যাটা নেড়ে রাজা-সুলতান মন্দিরগুলোর পেছনে যে কাহিনি আছে তা জানার চেষ্টা করেনি। গল্পটা এই রকম। বারানসীতে হেতম্বী নামে পরমা সুন্দরী এক ব্রাহ্মণ কন্যা ছিলেন। অল্প বয়সেই তিনি বিধবা হন। একবার গ্রীষ্মের এক জ্যোৎস্না আলোকিত রাতে তিনি যখন ঝিলের জলে স্নান করছিলেন, তখন স্নানরতা অবস্থায় তাঁকে দেখে চন্দ্রদেব মুগ্ধ হন ও তাঁকে কামনা করেন। চন্দ্র মানুষের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসেন এবং হেতম্বী ও চন্দ্রদেব মিলিত হন। শারীরিক মিলনের ফলে হেতম্বী গর্ভবতী হয়ে পড়েন ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে চিন্তিত হয়ে পড়েন। চন্দ্রদেব তখন ভবিষ্যৎবাণী করেন যে হেতম্বীর গর্ভে যে সন্তান আছে, সে হবে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী ও খাজুরাহোর প্রথম রাজা। হেতম্বী বারানসী ত্যাগ করে দূরে খেজুরবনে গিয়ে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের জন্মের পর হেতম্বী তাঁর নাম রাখেন চন্দ্রবর্মণ। পিতার মতোই সে সাহসী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চন্দ্রের আদেশে চন্দ্রবর্মণ ওই এলাকায় মন্দির নির্মাণ করেন ও মন্দিরগাত্রে চন্দ্রপ্রভাবিত মূর্তি খোদাই করেন। হেতম্বী আর চন্দ্রদেবের কাম ও প্রেমের নিদর্শন হিসেবেই খাজুরাহো মন্দির তৈরি করিয়েছিলুম। বেশিরভাগটাই দেবদেবীদের মিলন মুহূর্তের ছবি। নগ্ন শরীর, আর যৌনতা––প্রাচীন বা ভারতীয় ঐতিহ্যে বিভিন্ন সংস্কৃত কাব্যে দেখি যে এই সমস্তর অনুপুঙ্খ বিবরণ। অর্থাৎ প্রাচীনকালে ভারতীয় সংস্কৃতিতে মিলনের বর্ণনাকে অশ্লীল বলে চিহ্নিত করা হয়নি। তাই মন্দির জুড়ে শুধু যৌনতা আর কামের ছবি। চন্দ্রের ভবিষ্যৎবাণী ছিল এই মন্দির হেতম্বীকে তার পাপ থেকে মুক্তি দেবে। যাঁরা খাজুরাহো দেখতে আসেন তাঁরা নিজস্বপাপ মুক্তির জন্য আসেন।

    চন্দ্রবর্মণ : চন্দ্র দেবতা এবং এক রূপসী ব্রাহ্মণকন্যা হেমবতীর মিলনে এক পুত্র জন্মায়৷ নাম দেওয়া হয় চন্দ্রবর্মন৷ আমি সেই চন্দ্রবর্মন, যার হাতে চান্দেলা রাজবংশের জন্ম৷ খাজুরাহো ছিল চান্দেলা রাজপুত রাজাদের রাজধানী৷ চন্দ্রবর্মনের হাতে শুরু হয়ে ৯৫০ সাল থেকে ১০৫০ সাল পর্যন্ত একশো বছর ধরে বংশের নানা রাজার সময়ে বেলেপাথরের পঁচাশিটা মন্দির গড়ে ওঠে খাজুরাহোয়৷ তৈরি হয়েছে সৃষ্টিরক্ষার দেবতা বিষ্ণু ও সৃষ্টি-ধ্বংসের দেবতা শিবের এইসব মন্দির৷ অবস্থান হিসাবে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে খাজুরাহোর মন্দিররাজি : পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ। এক, অনবদ্য লক্ষ্মণ– পশ্চিমের মন্দির, বারোটা মন্দির নিয়ে৷ মিথুন মূর্তির আধিক্য ঘটেছে লক্ষ্মণ মন্দিরের নিম্নভাগে৷ দুই, যুদ্ধ জয়ের স্মারক– রয়েছে একত্রিশ মিটার উঁচু শিখরওয়ালা কাণ্ডারীয় মহাদেব মন্দির৷ খাজুরাহোর বৃহত্তম আর উচ্চতমও বটে। গজনির মাহমুদের সাথে যুদ্ধজয়ের স্মারক রূপে ১০৩০-এ মহারাজা বিদ্যাধরের তৈরি কান্ডারীয় মন্দির৷ তিন, পান্নার শিব জগদম্বা থেকে সামান্য উত্তরে পুবমুখী চিত্রগুপ্ত অর্থাৎ সূর্য মন্দির৷ অর্ধমণ্ডপ, মহামণ্ডপ, অন্তরাল ও সভাগৃহ–চার স্তরে তৈরি মন্দিরের ভাস্কর্য ৷ সিলিং-এর অলঙ্করণে অভিনবত্ব আছে৷চার, দুলাদেও– দুলাদেও অর্থাৎ নববধূ৷ দুলাদেও আর চতুর্ভুজ এই দুই মন্দির নিয়ে দক্ষিণমন্দির গোষ্ঠী৷ মূল চবুতরা থেকে দেড় কিলো মিটার দক্ষিণে দুলাদেও মন্দির৷

    হজরত আদম : খাজুরাহোর মন্দিরগুলোর আনাচে কানাচে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক কাহিনী। একটা গল্প পাপমোচনের আবার একটা অভিশাপের। হেতম্বী চন্দ্রদেবের সঙ্গে মিলনের পাপবোধে ভুগছিলেন। তাকে সেই পাপবোধ থেকে মুক্তি দিতেই তার সন্তান চন্দ্রবর্মন রতিক্রিয়ায় রত এই পঁচাশিটা মূর্তি নির্মাণ করান। সব মূর্তিতেই দেব-দেবীদের দেখানো হয়েছে। আরেকটি কাহিনী রয়েছে অভিশাপের। খাজুরাহো গ্রামে এক সাধু আসেন। তিনি তার শিষ্যদের সেখানে রেখেই যান কোথাও। সেই সময়েই তার শিষ্যরা এক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তবে গ্রামের কেউই তাদের সাহায্য করেনি ভেষজ বা জল দিয়ে। সাধু ফিরে এসে সেইসব কথা জানতে পেরে রেগে গিয়ে গ্রামবাসীদের অভিশাপ দিয়েছিলেন যে পাষাণের মতো কঠোর বাসিন্দারাও পাথর হয়ে যাবে। সেই থেকেই গ্রামবাসীরা নাকি পাষাণে পরিণত হয়েছে কামরত অবস্থায়। আবার অন্যদিকে এক মহিলা তাদের শুধুমাত্র অল্প সাহায্য দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। তার ভূমিকায় মুগ্ধ হয়ে সাধু তাকে বলেছিলেন পিছনে না তাকিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে। তবে কৌতূহলী মেয়েটি তার বিপরীত কাজটি করেছিল। কিছুদূর গিয়েও সাধুর আদেশ অমান্য করে পিছনে ফিরতেই সেও পাথর হয়ে যায়। সেই থেকেই এই মন্দিরে সন্ধের পর আর কেউ যায় না, পাথর হয়ে যাওয়ার ভয়ে।

    যশোবর্মণ : খাজুরাহো (খর্জুরবাহক) স্মারকগুলো রাজপুত বংশোদ্ভুত চান্দেল রাজবংশের অধীনে ৯৫০ ও ১০৫০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত। এই সময়টা ছিল আমাদের রাজবংশের শাসনের স্বর্ণযুগ। বর্তমানে এই স্মারকসমূহের যেগুলো অক্ষত অবস্থায় আছে সেগুলো যৌথভাবে হিন্দু ধর্ম এবং জৈন ধর্ম-এর স্থাপত্য। এগুলোতে নানান স্থাপত্যশৈলীর বিস্ময়কর মিশ্রণ দেখা যায়। এই স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কন্দারিয়া মন্দির। ছয় বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট মন্দিরপ্রাঙ্গণে নির্মিত পঁচাশিটা মন্দিরের মধ্যে মাত্র বাইশটা মন্দির এখনো টিকে আছে ; বাকিগুলো ভেঙে দিয়ে গেছে বহিরাগত ম্লেচ্ছ শাসকরা। মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত এই অঞ্চলটি ১৯৮২ সালের ১৫ অক্টোবর ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়। দ্বাদশ শতাব্দীর ম্লেচ্ছ-আক্রমণের আগে চন্দেলা সংস্কৃতির অনন্য এবং মৌলিক শিল্পকৌশলের নিদর্শন ও প্রমাণ এবং একটি সাংস্কৃতিক সম্পত্তি হিসাবে মন্দিরগুলো পৃথিবীর বিস্ময়।

    ঐতিহাসিক লীলা গান্ধি : অঞ্চলটা ঐতিহাসিকভাবে অনেক রাজ্য এবং সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। খাজুরাহোর এই অঞ্চলে সর্বাধিক পরিচিত শক্তি ছিল ভটসা। এই অঞ্চলে তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে মৌর্য, সুঙ্গাস, কুশান, পদ্মাবতীর নাগ, ভাকাতক রাজবংশ, গুপ্ত, পুষ্যভূতি রাজবংশ এবং গুজরা-প্রথর রাজবংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুপ্ত আমলে বিশেষত এই অঞ্চলে স্হাপত্য এবং শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল, আর তাদের উত্তরসূরীরা শৈল্পিক ঐতিহ্য অব্যাহত রেখেছিল। চান্দেলারা এই অঞ্চলটি নবম শতাব্দী থেকে শাসন করেছিলেন যদিও তারা গুজারা-প্রথারাসের অধীন ছিল। ধঙ্গদেবের রাজত্বকালে চান্দেলা স্বাধীন হয়েছিল এবং এই সময়ে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। ১১৮২ সালে শাকম্ভরীর চাহামানাসের পরে কুতুব উদ্দিন আইবক ১১০২ সালে চান্দেলাদের মারাত্মক আক্রমণ করে। চান্দলারা মহোবা, কালিনজর এবং অজয়গড়ের দুর্গে চলে যাওয়ার ফলে খাজুরাহো একটি ছোট্ট গ্রামে পরিণত হয়। ইবনে বতুতা খাজুরাহো ঘুরে দেখেছিল এবং মন্দিরের উপস্থিতি এবং কয়েকজন তপস্বীর বর্ণনা দিয়েছিল। কিছু মন্দির ১৪৯৯ সালে সিকান্দার লোদি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে খাজুরাহো একটি তুচ্ছ জায়গা হয়ে যায় এবং ১৮১৯ সালে সিজে ফ্রাঙ্কলিন (সামরিক সমীক্ষক) দ্বারা “পুনরায় আবিষ্কার” করার আগে এলাকাটি অবহেলিত ছিল। তবে খাজুরাহোকে বিশ্বের নজরে ফিরিয়ে আনার প্রকৃত অবদান টি.এস. বার্ট-এর (একজন ব্রিটিশ সেনা ক্যাপ্টেন) যিনি এটি ১৮৩৮ সালে পরিদর্শন করেছিলেন। পরবর্তী উল্লেখযোগ্য দর্শনার্থী ছিলেন ১৮৫২ থেকে ১৮৫৫ সালের মধ্যে আলেকজান্ডার কানিংহাম।

    ধঙ্গদেব : শিলালিপিতে আমি ধঙ্গদেব নামে খ্যাত, ভারতের চান্দেলা রাজবংশের একজন রাজা ছিলুম। আমি জেজকভূক্তি অঞ্চলে (বর্তমান মধ্য প্রদেশে বুন্দেলখন্ড) শাসন করতুম। আমি প্রতিহরদের অধীনতা অস্বীকার করে চান্দেলাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলুম। বিশ্বনাথ মন্দির সহ খাজুরাহোতে চমৎকারর মন্দিরগুলি গড়িয়েছিলুম। আমার বাবা ছিলেন যশোবর্মণ এবং তাঁর রানী পুপা (পুষ্প) দেবী। আমার রাজত্বকালে প্রথম শিলালিপি ৯৫৩-৯৫৪ সালের চতুরভুজ শিলালিপি। এর আগেই আমি সিংহাসনে আরোহণ করেছিলুম। আমার আরোহন বিতর্কিত ছিল, কারণ তাঁর ভাই কৃষ্ণকে রাজ্যের মালওয়া সীমান্ত রক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। আমার সময়ের অন্যান্য শিলালিপিগুলির মধ্যে রয়েছে নানারা (বা নানৌউরা) শিলালিপি, ৯৯৮ সালের এবং খাজুরাহোতে লালাজি শিলালিপি — ৯৯৯ সালের। বংশধরদের শিলালিপিতেও আমার নাম পাওয়া যাবে।

    ঐতিহাসিক বিশ্বনাথ দত্ত : পরবর্তী মধ্যযুগীয় গ্রন্থগুলো ছত্রিশটা রাজপুত বংশের মধ্যে চান্দেলাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে করে, যদিও সেই সময়কালে রাজপুত বলে কিছু ছিল না। তারা ষোড়শ শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়েছিল। এই ধরনের গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে মহোবা-খন্দ, বর্ণ রত্নাকারা, পৃথ্বীরাজ রাসো এবং কুমারপাল-চরিত। বংশের উৎসের মহোবা-কাণ্ড কিংবদন্তিটি এইরকম: বেনারসের গহরওয়ার রাজার পুরোহিত হেমরাজের এক সুন্দর কন্যা ছিল, যার নাম হেমাবতী। একবার, হেমাবতী যখন একটি পুকুরে স্নান করছিলেন, তখন চাঁদ দেবতা চন্দ্র তাকে দেখে তাঁর প্রতি প্রেম করেছিলেন। অবিবাহিত মা হওয়ার অসম্মান নিয়ে হেমাবতী উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু চন্দ্র তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তাদের পুত্র মহান রাজা হয়ে উঠবেন। এই শিশুটি ছিলেন রাজবংশের পূর্বসূরি চন্দ্রবর্মা। চন্দ্র তাঁকে একজন দার্শনিকের পাথর দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন এবং তাঁকে রাজনীতি শিখিয়েছিলেন। রাজবংশের নিজস্ব রেকর্ডগুলিতে হেমাবতী, হেমরাজ এবং ইন্দ্রজিৎ উল্লেখ নেই। এইরকম কিংবদন্তিগুলি পরে দরবারি কবিদের আবিষ্কার বলে মনে হয়। সাধারণভাবে, মহোবা-কাণ্ড ঐতিহাসিকভাবে অবিশ্বাস্য। এমনকি পৃথ্বীরাজ রসোও ঐতিহাসিকভাবে অবিশ্বাস্য হিসেবে বিবেচিত।

    হাসান নিজামি : আমার বই ‘তাজ-উল-মাসির-এ লিখেছি যে, সোমনাথ মন্দিরের ছাদ থেকে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি মূল্যবান রত্নাদিতে খচিত ছিল। পরবর্তীকালের লেখক ফিরিস্তার মতে, গজনির সুলতান মাহমুদ ফাঁপা পাথরে তৈরি বিগ্রহ ভেঙে ফেলে তার ভেতরে রাখা হীরা ও মণি-মাণিক্য হস্তগত করে। লিঙ্গদেবতাটি সম্পূর্ণরূপে নিরেট স্বর্ণের তৈরি ছিল। লোদি সুলতানরা মুসলমান ছিল এবং তাদের পূর্বসূরীদের মতো তারাও মুসলিম বিশ্বের উপর আব্বাসীয় খিলাফতের কর্তৃত্বকে স্বীকার করতো। যেহেতু সিকান্দার লোদির মা একজন হিন্দু ছিলেন, তাই সিকন্দার লোদি রাজনৈতিক সাফল্য হিসাবে শক্তিশালী সুন্নি গোঁড়ামির আশ্রয় নিয়ে তার ইসলামিক প্রমাণাদি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। ও হিন্দু মন্দিরগুলি ধ্বংস করেছিল আর আলেমদের চাপের মুখে একজন ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমতি দিয়েছিল, যিনি হিন্দু ধর্মকে ইসলামের মতো ভদ্র বলে ঘোষণা করেছিলেন। সিকন্দর লোদি মহিলাদের মধ্যে মুসলিম সাধুদের মাজার (সমাধি) দেখতে নিষেধ করেছিল এবং কিংবদন্তি মুসলিম শহীদ সালার মাসুদের বর্শার বার্ষিক মিছিল নিষিদ্ধ করেছিল।

    হজরত ইবলিশ : সিকন্দর লোদি বেজন্মা বলে পরিচিত ছিল, ওর সভাসদদের মাঝে।

    মুহম্মদ নাজিম : গজনির সুলতান মাহমুদ তার তলোয়ারের এক আঘাতে সোমনাথের শিবলিঙ্গটি ধ্বংস করেন। যদিও তিনি বিগ্রহ ধ্বংস করেন তা হলেও একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, বিগ্রহে রক্ষিত রত্নাদি অথবা এর গায়ে খচিত মণি-মাণিক্য ) সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই তিনি মূর্তি ধ্বংস করেন। স্বর্ণ ব্যতীত গজনভী মুদ্রা প্রস্তুত অসম্ভব বলেই সম্ভবত এটি করা হয়। মুহম্মদ হাবিব বলেন যে, সোনা এবং রূপার তৈরি বিগ্রহ গলিয়ে গজনভীর মুদ্রায় রূপান্তরিত করা হতো। ধ্বংস করেছিল কাফেরনিধনের উদ্দেশ্যে।

    হজরত আহনাফ : মুহম্মদ ঘুরির আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা খাজা মইনুদ্দিন চিশতীর পরামর্শে শেষ রাতের দিকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অতর্কিত আক্রমণে চৌহানের সেনাবাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। রাতের আঁধারে ঘোড়সওয়ারী তরোয়ালধারী ম্লেচ্ছ আফগান-তুর্কি সেনাদের যৌথ আক্রমণ প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ করেই বিপুল সৈন্যক্ষয় হয়ে যায়। ঘোড়ায় চড়া তীরের মত গতিবেগের ম্লেচ্ছ সেনাদের রুখতে পারে না চৌহানবাহিনী। শেষ রাত থেকে অভুক্ত অবস্থায় যুদ্ধ করতে করতে পৃথ্বীরাজের সেনাবাহিনী তখন ক্লান্ত, তাদের শেষ শক্তি ক্ষয় হয়ে আসছে, এদিকে যুদ্ধ চলছে একনাগাড়ে শেষরাত পেরিয়ে সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত। ইতিমধ্যে সেনাদের মাঝে সেনাপতি খাণ্ডেরাও মারা যাওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার ফলে তাদের মনোবল ভগ্নপ্রায় এবং অবিন্যস্ত। এরকম ছত্রভঙ্গ সেনাদের উপর নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল তরোয়াল হাতে দ্রুত গতির অশ্বারোহী ১২০০০ ম্লেচ্ছ সেনা। তাদের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তখন পৃথ্বীরাজের সেনাবাহিনীর আর অবশিষ্ট ছিল না। তারা বেঘোরে ম্লেচ্ছদের হাতে মারা পড়তে লাগল। এদিকে যুদ্ধ দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধের নতুন কৌশল নিয়ে আলোচনার জন্য ১৫০ জন ঊর্ধ্বতন সেনানায়ক এবং মিত্র রাজাদের নিয়ে পৃথ্বীরাজ চৌহান একটা গাছের ছায়ার নিচে দাঁড়ায়। তারা মরণপণ যুদ্ধের শপথ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরার আগেই তুর্কি আফগান ম্লেচ্ছ বাহিনী চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং একই সাথে চলতে থাকে বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ, তখনই আসলে বেজে গেছে মরণঘন্টা। তুর্কি এবং আফগান ম্লেচ্ছবাহিনীর আক্রমণে রাজপুতরা নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। শেষ মুহূর্তে চৌহান রাজপ্রাসাদের দিকে পালানোর চেষ্টা করলেও ঘুরির হাতে বন্দী হয়ে যায়। পৃথ্বীরাজ চৌহানকে বন্দী করেই মুহম্মদ ঘুরি চলে যায় রাজপ্রাসাদে রাণী সংযুক্তার খোঁজে। তখন সম্ভ্রম রক্ষায় সংযুক্তা তার দাসীদের নিয়ে জহরব্রত করার জন্য প্রস্তুতি নিলেও ততক্ষণে ঘুরি রাজপ্রাসাদে পৌঁছে যায় এবং তাকেও বন্দী করে নিয়ে আসে। বাইরে তখনো যুদ্ধ চলছে সমান তালে, এদিকে কিছুমাত্র সময় দেরী না করে পৃথ্বীরাজ চৌহানের সামনেই তার প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রী সংযুক্তাকে ধর্ষণ করে ঘুরি। পৃথ্বীরাজকে ইসলাম কবুল করার জন্য চাপ দিতে থাকে ঘুরি। কিন্তু চৌহান রাজি হয় না। আর এদিকে চলতে থাকে সংযুক্তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ। বন্দী অবস্থায় চৌহান ঘুরিকে হুংকার দিলে ঘুরি চৌহানের চোখ অন্ধ করে দেয়। ১৫ দিন একনাগাড়ে সংযুক্তাকে ধর্ষণ করার পর ঘুরি চৌহানের শিরশ্ছেদ করে কাটা মাথাটা খাজা মইনুদ্দিন চিশতীকে উপহার দেয়। চৌহানের কাটা মাথা দেখে, খাজা মইনুদ্দিন চিশতী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “অনেক কষ্টের পর অবশেষে আমরা চূড়ান্ত বিজয় পেলাম।”

    ঐতিহাসিক পাপিয়া ঘোষ : রাজপুত (সংস্কৃত রাজা-পুত্র থেকে, “একজন রাজার পুত্র”) বর্ণ, গোত্র এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলির একটি বৃহত উপাদানে গড়া, যা ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত বংশদ্ভুত সামাজিক অবস্থান নিয়েছে। রাজপুত শব্দটি কোনও বর্ণকে চিহ্ণিত করে না। গোষ্ঠীটিতে আকাধিক বর্ণ আছে। বৌদ্ধিকতার সাথে ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন পিতৃতান্ত্রিক গোত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে: বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী রাজপুত মর্যাদার দাবি করে, যদিও সমস্ত দাবি সর্বজনস্বীকৃত নয়। আধুনিক পণ্ডিতদের মতে প্রায় সমস্ত রাজপুত বংশের উৎপত্তি কৃষক বা যাজক সম্প্রদায়ের থেকেই হয়েছিল এবং বহু গোষ্ঠির জন্ম গ্রিকদের বংশধর থেকে। সুতরাং চান্দেলাদেরও সেই দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে হবে।

    হজরত ইবলিশ : ম্লেচ্ছরা যদি খাজুরাহোর মন্দিরগুলো অক্ষত রাখতো তাহলে তারা এদেশের লোকেদের শ্রদ্ধা অর্জন করতো। তাদের জন্যই এখন সারা আল-হিন্দে ম্লেচ্ছদের সবাই ঘেন্না করে। আর খাজা মইনুদ্দিন একজন চিশতি হয়ে কেমন করে জঘন্য কাজকে উৎসাহ দিয়েছিল। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে।

    —————XXXXXXX——————

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৮:২২734723
  • লোহার ভারি কালো চপারটা রোগা লোকটার ঘাড়ের ওপর পেছন থেকে সজোরে পড়তেই, চার ইঞ্চির আঘাতের রেখা-বরাবর, ময়লা চামড়ার তলা থেকে উথলে ওঠে সাদা গোলাপি নরম মাংস, টুটসি সমর সেনার হাসির ঠোঁতের মতন দুফাঁক কাটা জায়গাটা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে গলগলে গরম তাজা রক্তের নিটোল ছররা। বাতাসের ছোঁয়ায় গলে গড়িয়ে পড়ে ছররাগুনো। আক্রান্ত রোগা প্রৌঢ়ের শ্বাসনালিকায় প্রশ্বাস মোচড় দিয়ে ওঠে, বাঁদিকে হেলে পড়ে মাথা, আর দুলদুলে ঘাড় নিয়ে জীবনে শেষ দ্রুততম দৌড়ের নিশিডাক ওকে পেয়ে বসে।

    শ্বাস-ফুরন্ত লোকটা দৌড়োয়, সামান্য ঝুঁকে ভীত রাজহাঁসের মতন পা ফেলে পা ফেলে, সাদা টেরিকটের শার্ট জবজবে লাল, দৌড়োয়, দৌড়োতে থাকে, ছোটে, ছুটতে থাকে, পালাতে থাকে। পারে না আর। মৃগি রুগির মতন পড়ে যায় ভোটবাগানে জয়বিবি রোডের ধুলোর ওপর, চিৎ, হাত-পা ছড়িয়ে, সসব্দে, মাঝপথের প্রাচীন ধুলো উড়িয়ে। মুখে ছিট কাপড়ের রুমালবাঁধা আরও দুজন আক্রমণকারী, অপেক্ষারত, বাজারের নাইলন-থলে থেকে বের করে আরও ভারি, কালো, হাড়কাটার চপার। লোকটার ধূসর ট্রাউজার-পরা ঠ্যাং-ছেতরানো দেহে খিঁচুনি উঠে স্হির হয়ে যেতে, রক্ত-চিটচিটে চপার থলের মধ্যে পুরে, তিন দিকে পালাল স্বাস্হ্যবান যুবক খুনিরা।

    কয়েক মুহূর্তের দর্শক, শ্লথ পথচারীরা, প্রথমটায় থ, বিমূঢ়, তারপর ঘটনাস্হল থেকে পালাতে শুরু করে আতঙ্কে। সবাই মুক্ত হতে চাইছিল ঘটনা থেকে খ ঘটনা থেকে বিচ্যূত হবার আরামপ্রদ স্মৃতিতে ফিরে যাবে গলির নাগরিক। এই খুনের চেয়েও তারা ভীত হত্যা-পরবর্তী রাষ্ট্রযন্ত্রের আস্ফালন-নকশায়। ঠেকগুলোর ঝাঁপ বন্ধ করার উদ্বিগ্ন তাড়াহুড়ো, দোকানগুলোর শাটার নাবাবার ঘড়ঘড়, পথের কিনারা থেকে ভিকিরিদের পয়সা তুলে দৌড়ুবার সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলায় ফাঁকা হয়ে যায় জয়বিবি রোড। শুনশান লাশ, একা, চিৎ, পড়ে আছে। হাওয়ায় ফুরফুর করছিল ওর কোঁকড়া কাঁচাপাকা চুল।

    অপঘাতে মরার সময়টাতে মানুষের একা অসহায় দেহ কেমন ন্যালবেলে, হেলে সাপের মতন হয়ে যায়, নিজের চোখে তা দেখল অরিন্দম, অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, দেখল হত্যা, আততায়ী, আক্রান্তকে, চাক্ষুষ, আর গা গুলিয়ে তলপেট থেকে শ্বাসহীনতার ঘূর্ণিবাতাস পেঁচিয়ে উঠে এল কন্ঠনালি ওব্দি, কিন্তু বমি হল না। হাতের চেটোয়, কপালে, ঘাম। অথচ ওই লোকগুলোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই ওর, অরিন্দমের। ঘটনাটার এ এক জবরদস্তি।

    বছর পঁয়তাল্লিশের সদ্যখুন দড়ি-পাকানো লোকটা, ওইখানে, জয়বিবি রোডে, রক্তেভেজা, ধুলোর ওপরে যে এখুন হাত-পা ছড়িয়ে স্হির পড়ে আছে, হাঁ-মুখ আর দুচোখ খোলা, অরিন্দমের সামনে দিয়েই একটু আগে টেলিফোন বুথটায় ঢুকতে যাচ্ছিল, দেয়ালে সাইকেল দাঁড় করিয়ে, ঠিক তখুনই, ওফ, লোকটার গলা আর ঘাড়ের মাঝে পেছন দিক থেকে সজোরে কোপ মেরেছিল সবুজ টিশার্ট পরা ষণ্ডা ছেলেটা। চপারের ওপরে ওঠা, বাতাস ভেদ করে নাবা, গদ আওয়াজ, নরম তাঁবাটে চামড়া কেটে মাংসে ঢুকে যাওয়া আর উথলে বেরিয়ে আসা রক্তের ভলক, থমথমে দৃশ্যের ভয়াবহতা, ঘিরে ধরে ওকে। অননুভেদ্য জোঁকেরা ছড়িয়ে পড়ে মর্মস্নায়ুর রক্তজালিকায়।

     

    সবুজ টিশার্টের বুকে সাদা হরফে লেখা স্লোগানটাও, আততায়ী যখুন চপার হাতে এদিকে ফিরেছিল, দেখে ফেলেছিল অরিন্দম : ‘ভ্রুপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে’।

     

    ওর কবজিতে টান পড়তে, চমকে উঠল অরিন্দম। হুঁশ ফিরে এলো যখুন আদিত্য বারিক ওর হাতে টান মেরে দৌড়ুতে-দৌড়ুতে দাঁতে দাঁত যত আস্তে সম্ভব চেঁচিয়ে জানায়, এখানে দাঁড়ানো ঠিক নয় অরিন্দমদা, চলুন চলুন, ওই ভদ্দরলোক বালি পুরসভার কমিশনার শামিম মহম্মদ খান। তখুনই আদিত্যের নির্দেশের গুরুত্ব টের পায় অরিন্দম। পর পর চারটে বোমা ফাটার শব্দ হল আর পেছন ফিরে দেখতে পেল অরিন্দম, গন্ধকের নীলাভ-ধূসর ধোঁয়ায় জয়বিবি রোড ধোঁয়াক্কার, আকাশ থেকে বারুদের গন্ধ মেখে নেবে এসেছে ভীতির মশারি। পাঁচ মিনিট আগের গ্যাঞ্জাম রাস্তাটা, অকালপ্রয়াত নদীর মতন উষর। বালি থানার অধীন দুপুরের রোদ্দুর ততক্ষুনে, ওইটুকু সময়ের মধ্যে, সরে গেছে উত্তরপাড়া থানার এলাকায়।

     

    ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়ায়, গলির তলপেটের ঘিঞ্জি গলির ছমছমে অজানায় হনহনিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে, বড়ো রাস্তায় পৌঁছোবার পথ খুঁজে পায় না ওরা, আদিত্য আর অরিন্দম, খুঁজে পায় না শহরের নির্লিপ্ত নাগরিকতায় মিশে যাবার দরোজাটাকে। টাকরা শুকিয়ে গেছে অনভ্যস্ত অরিন্দমের। পা চালানোর ফাঁকে ডান দিকে, এস কে চ্যাটার্জি লেন লেখা রাস্তাটায়, দেখতে পেল গোটা তিরিশেক লোকের মাথা-গিজগিজে ভিড়, চলেছে ঝাড়পিটের তুমুল। ভিড় চিরে বছর আঠারোর রক্তাক্ত সুঠাম তরুণ ছিটকে বেরোয়, ওদেরচ দুজনের পাশ কাটিয়ে কয়েকপা এগোয় গণপ্রহারে থ্যাঁতলানো দেহ বজায় রেখে, মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রাস্তার ওপর।

    থ্যাঁতলানো তরুণকে অনুসরণকারী নাগরিকরা, তরোয়াল, ভোজালি, লাঠি, রড, শেকল, বর্শা হাতে ওদের দিকে ছুটে আসতে দেখে, ওরা দুজনে শাটার-বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে উঠে পড়ে। সশস্ত্র নাগরিকরা ওদের সামনে দিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় মাটিতে কাতরাতে থাকা ছোকরার কাছে। ঝুঁকে দাঁড়ানো মানুষের কালো-কালো মাথার ওদিকে, লাঠি আর তরোয়াল উঠছে-নাবছে দেখতে পায় অরিন্দম। হিন্দি গালাগাল। অরিন্দমের হাতের তালু ঠাণ্ডা আর কপালে বিনবিনিয়ে ঘান ফিরে আসছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতন অনুভূতি হয়, কিন্তু গা গুলিয়ে ঢলে পড়া থেকে ওকে সামলায় আদিত্য। ছেলেটা মরে গেছে নিশ্চই। তবু ওকে পিটিয়ে যাচ্ছে। মৃতদেহকে পিটিয়ে তার জীবন্ত অতীতের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা খুঁজছে লোকগুনো। অরিন্দম পড়ে গেছে সেই ভাষার সন্ত্রাসের খপ্পরে।

    তরুণের ন্যালবেলে দেহটা ধরে টানতে-টানতে ওদের সামনে দিয়ে নিয়ে যায় লোকগুনো। পেট ধেকে নাড়িভুঁড়ি ঝুলে বেরিয়ে আছে। এখুনও বোধয় প্রাণ আছে খিঁচোতে থাকা নাড়িভুঁড়িতে। আদিত্য যখুন বলল, এর নাম শেখ হিরা, শামিম খানের বিরোধী দলটার গুণ্ডা, তখুনও অরিন্দম শরীরের অসুস্হতা কাটিয়ে ওঠেনি। ঠোঁটের ওপর থেকে নিজের ম্লান হাসিটুকু জিভ দিয়ে চেটে নিয়ে জানায়, ইউটোপিয়ার স্বপ্ন বিক্কিরির জন্যে দুর্বৃত্তের দরকার হয়।

    বড়ো রাস্তার বাসস্টপে পৌঁছে, বাসে চেপে, বসার জায়গা মিনিট পনেরো পরে পেয়ে, বি-বা-দী বাগে নাবার পরও, অরিন্দমের গলায় শ্লেষ্মার দুঃস্বপ্ন আটকে ছিল। অফিস পাড়ার রাষ্ট্রীয় অভয়দানকারী বহুতলগুলোর ছায়ানম্র চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে, বেশ কিছুক্ষুণ দাঁড়িয়ে, স্বাভাবিকতার আভাস অনুভূত হলে আদিত্যকে বলল অরিন্দম, তুমি পুলিশের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টার হয়ে পালালে ? তোমার কাজ তো আইন বজায় রাখা, প্রতিরোধ করা, নাগরিকদের আগলানো। ছ্যাঃ, অন্তত কাছাকাছি থানাটাকে খবর দেওয়া উচিত ছিল।

    অরিন্দমদা আপনি তো পুলিশে চাকরি করেন না, তাই উপদেশ ঝাড়াটা সোজা। বিজ্ঞের ধাতস্হ মন্তব্য আদিত্যর। চাকরির এই ক’বছরেই সরকারি অভিজ্ঞতা ওকে মনুষ্যজনোচিত যুক্তিবাদীতে পালটে ফেলেছে। এরকুম হলেও বোধয় একজন লোক মানুষ থেকে ঞানব হয়ে যায়। মানব সন্তান। কলকাতা শহরটা দেশভাগের পর মানব উৎপাদনের কারখানা হয়ে গেছে।

    অভিজ্ঞতা এক ভয়ঙ্কর চিজ, গলার স্বর বদল করে বলল আদিত্য, যত নষ্টের গোড়া।

    ছ-ফিট, দোহারা ময়লা, থ্যাবড়া, আদিত্য বারিকের সঙ্গে অরিন্দমের পরিচয় পাটনা থেকে কলকাতায় অরিন্দমের বদলি হয়ে আসার পর। সাম্প্রতিক জলবসন্তে ওর, আদিত্যর, চেহারা এখুনও খানাখন্দময়। মাদার ডেয়ারির দুধের সরের মতন একপোঁচ হাসি লেগে থাকে পুরুষ্টু ঠোঁটে। গুঁড়ো দুধের জলগোলা হাসি, কথা বলার সময়। ময়লা হলেও জানে আদিত্য, ওর দিদি আর ছোটোবোন ওর গায়ের রঙকে ঈর্ষা করে। অরিন্দমের অফিসে আগে কাজ করত আদিত্য, ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে, আরও শ’চারেক কর্মীর মতন কয়েক নোট এগজামিনার। শুনতেই যা রমরমে। আসলে মজুর আর কেরানি মেশানো দোআঁশলা চাকরি। কলারের বাঁদিকটা নীল, ডান দিকটা সাদা। সে চাকরিতে বেশি মাইনে কম কাজ সত্ত্বেও, আত্মসন্মানবোধের পরিসর, ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ, আর জীবনকে উদ্দেশ্যহীন করা কাঁচা টাকার তাড়ার গাঁট উপরি হিসাবে পাবার সুযোগ-সুলুক না থাকায়, সুযোগ পেতেই আদিত্য পালিয়েছে মনের মতন চাকরির আশ্রয়ে, পুলিশে। ওর আদর্শ রুণু গুহনিয়োগী নামে এক প্রাক্তন অফিসার, যদিও তাঁর সঙ্গে আদিত্যর পরিচয় নেই, কিংবদন্তি শুনেছে, কাগজে পড়েছে, আদালতে গিয়ে দেখেছে সহকর্মীদের সঙ্গে, জয়ধ্বনি করেছে, যখুন অযথা বিচার চলছিল নায়কোচিত লোকটার। কর্মজীবি মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ওব্দি রুণু স্যারের কদর করে পদোন্নতির ধাপ একের পর এক এগিয়ে দিয়েছিলেন ওনার সক্ষম পায়ের দিকে।

    কয়েন-নোট এগজামিনারের চাকরিতে ওর কাজ ছিল খুচরো ্জন করানো, চটের নানান মাপের বস্তার প্যাকেট তৈরি, থলের মুখ বেঁধে গরম গালার সিলমোহর। চটের রোঁয়া অস্বাস্হ্যকর, নোংরা আর দাম বেশি বলে মোটা পলিথিন চাদরের স্বচ্ছ থলে পরে-পরে চটের জায়গা নিয়েছিল। কেউ যদি পাঁচ-দশ হাজার টাকার এক টাকা বা পঞ্চাশ পয়সা চায়, দিন কাবার হয়ে যাবে গুনে দিতে-দিতে। তাই ওজন করে আগে থাকতে গাঁটরি বেঁধে রাখার ব্যবস্হা। দু-পয়সা পাঁচ-পয়সা উঠে গিয়ে নিশ্চিন্দি। হালকা পয়সাগুনোর জন্যে বড়ো-বড়ো থলেতে একশো টাকা করে খুচরো ভরে রাখতে হতো। অনেজক খদ্দের বাড়ি নিয়ে গিয়ে একটা-একটা করে গুনে ফিরে এসে চেঁচাত, চারটে কম, সাতটা কম, তিনটে কম, আর তাই নিয়ে ফয়সালাহীন নিত্যিদিনের খিস্তি খেউড়। যে রেটে টাকার দাম পড়ছে, দশ কুড়ি পঁচিশ পয়সা আর এক দুই পাঁচ টাকার কয়েন তুলে দিতে হবে বছরকতক পর। হলদে কুড়ি পয়সা তো পাবলিক গলিয়ে অন্য কাজে লাগিয়ে ফেললে। কুড়ি পয়সার কয়েনটাই এক টাকায় বিকোতো। সময় ব্যাপারটা যথেষ্ট হিসেবি।

    কাগজ আর ছাপার খরচ বেড়ে যাওয়ায়, এক দুই পাঁচ টাকার নোট বন্ধ করে ছাড়া হয়েছে কয়েন। কয়েন নেবার পাবলিকের ভিড় তাই এদান্তি বেড়ে গেছে কাউন্টারে। পাবলিকের চাকর হওয়া আর সরকারের চাকর হওয়া যে দুটো এক্কেবারে আলাদা ব্যাপার, তা জেনেছিল আগের খুচরো-গোনার চাকরিতে। তার ওপর প্রথম দিকে চটের রোঁয়ায় কফের, আর পরে পলিথিনের জন্যে চামড়ায়, রোগের অ্যালার্জি হয়ে গিয়েছিল দোহারা আদিত্যর। দিনের পর দিন পাঁচমিশালি-অ্যালুমিনিয়াম মুদ্রার পর্ণমোচী জঙ্গলে ধাতব গন্ধের মাঝে হাঁপিয়ে উঠেছিল ওই চাকরিতে। মাখা ভাতে ওব্দি দোআঁশ ধাতুর অম্লকষায় স্বাদ চারিয়ে যেত হাতের তালু থেকে। যখুন ওই চাকরিতে ঢুকেছিল, তখুন সত্যিসত্যি বিশাল ওজনপাল্লায় কিলি-দশকিলোর বাটখারা চাপিয়ে মাপা হতো কয়েনের থলে। পরে এসেছিল ওজনের ইলেকট্রনিক মেশিন। আদিত্যর মনে হতো, অর্থনীতিতে স্নাতক হবার এই-ই পরিণাম। অমন বিতিকিচ্ছিরি কায়িক শ্রম করাবার জন্যে ওই অফিসটা চেয়েছিল অর্থনীতি গণিত কমার্সে ভালো নম্বর-প্রাপক স্নাতক। অসাধারণ স্হাপত্যের বহুতলগুনোয়, সারা দেশজুড়ে, স্নাতকরা এমনতর মাশুল গুনে যাচ্ছে পড়াশুনোয় ভালো বা অন্ত্যজ হবার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। ইশকুল-কলেজের জ্ঞান বোধয় কারুরই বিশেষ কাজে লাগে না।

    কয়েন বিভাগে কাজ করার আগে নোট বিভাগেও কিছুকাল ছিল আদিত্য। সে আরও ভয়ঙ্কর। মাথা-খারাপ হবার যোগাড়। কাজ ছিল টাটকা নোট আর পচা নোট আলাদা করার, একশোটা ভালো আর একশোটা পচা নোটের প্যাকেট তৈরি, দশ প্যাকেটের বাণ্ডিল, ভালোর আলাদা পচার আলাদা, পচা নোটে গোল-গোল চাকতির মতন মেশিনে ফেলে কয়েকটা ছ্যাঁদা করানো, ভালো নোটগুনোকে জনগণের ব্যবহারের জন্যে আবার পাঠানো, আর ছ্যাঁদা করা নোট চটের বস্তায় সিলবন্দি করে চুল্লিতে পোড়াবার জন্যে তুলে রাখা। পরে অবশ্য নোট কুচোবার আর তা থেকে মণ্ড বানাবার যন্ত্র এসেছিল বিদেশ থেকে। এক-দুই-পাঁচ টাকার নোট উঠে গিয়ে রেহাই হয়েছে। ওফ, ওই ছোটো নোংরা হিলহিলে স্যাঁতসেতে ছাতাপড়া নোট গোনা, শেষই হতে চাইত না।

    একটা পচা নোট কাছে থাকলে সেটা লোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুক্তি পেতে চায়। যাহোক-তাহোক খরচ করে ফেলতে চায়। দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক নষ্ট করে। দেশের যে অঞ্চল যত গরিব, সে অঞ্চলে চলে তত পচা নোট, নানা কায়দায় জোড়া নোট। কেমন নোট চলছে দেখে একটা অঞ্চলের আর্থিক অবস্হা টের পাওয়া যায়। অর্থনীতির সিলেবাসে পড়ানো হয়নি এসব। অভিজ্ঞতার লাথি খেয়ে শিখেছে।

    সেরকম অজস্র নোটের মাঝে বসে যৌবন খরচের চাকরি। আকাশে তখুন হয়তো বসন্ত ঋতুর স্নেহভাজন বকদম্পতিরা বেরিয়ে পড়েছে বাৎসরিক আমোদের জোড়ে-জোড়ে ; লালদিঘিতে পরকীয়া জলে ভাসছে বংশ-গৌরবহীন মাছ-যুবক, বা মহাকরণের চূড়োয় রাগতস্বরে আরম্ভ হয়ে গেছে বৃষ্টি, ছাড়া পেয়েছে ক্রিকেটশেষ ইডেনের সবজান্তা গড্ডলিকা, কিংবা গাড়ি পার্ক করার এলাকায় চলছে ঝড়ে গাছেদের হাওয়ার সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তি, কিংবা কাঠকয়লার আঁচের পাশে ঞাঝে-মাঝে টুসকি বাজিয়ে ফেলছে তাম্রশ্মশ্রু ভুট্টা। প্রকৃতি সুযোগ পেলেই শহরকে গপঅমে পালটে ফেলতে চায়। চারশো যুবক-যুবতির দেখা হয় না কিছুই।

    ওই বিভাগে বয়স্ক কাউকে দেখেনিকো আদিত্য। সবাই তরতাজা যুবক-যুবতি। পচা, হিলহিলে, স্যাঁতসেতে, ছাতাপড়া, তেলচিটে, নোংরা নোট গুনে চলেছে আনকোরা ধোপদোরস্ত যুবক-যুবতি, সুদর্শন ও সুশ্রি যুবক-যুবতি, মাথা নিচু করে, প্রাব চুপচাপ, দিনের পর দিন, দুপুরের পর দুপুর। আর কোনো কাজ নেই তাদের। ঘাড় গুঁজে নোটের দিকে তাকিয়ে কাজ করে যাওয়া, ধান রোয়ার মতন। একটা বিরাট অট্টালিকার মধ্যে তারা হাসি মুখে টিফিনের ডিবে হাতে প্রায় নাচতে-নাচতে ঢুকছে, নোট গুনছে বাণ্ডিলের পর বাণ্ডিল, বেরিয়ে আসছে গোমড়া কীটদষ্ট চেহারায়, বাড়ি যাচ্ছে কালকে আবার একই ঘানিতে পাক খাবে বলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-ভালো সব স্নাতক। ইশকুলে অনেকে প্রথম-দ্বিতীয় হয়েছিল রাত জেগে, বাড়ি থেকে জ্যোতি ছড়িয়ে হয়তো আহ্লাদিত করেছিল সারাটা পাড়া।

    এখুন তারা কেবল গণছোঁয়ায় বিরক্ত নোট মুখ বুজে গুনে যায়। মাঝে-সাঝে নিশি পাওয়া অবস্হায় তারা বেরিয়ে পড়ে দলবেঁধে পথসভা গেটসভা ঘেরাও ধর্না হরতাল ধিরেচলো বয়কট কর্মবিরতি অবস্হান অবরোধের ডাকে। প্রশ্ন তোলার জাগরুকতা আর নেই। পরের দিন থেকে ফিরে গেছে তারা স্বয়ংক্রিয় কাজে। পুরো ব্যাপারটা আদিত্যর মনে হয়েছিল ভুতুড়ে। ভালো মাইনে দিয়ে ভুত বানাবার কারখানা।

    পচা ছ্যাতলা-পড়া নোটের বদগন্ধের কী রমরমা। যত কম টাকার নোট, তত তার বদগন্ধ। পৃথিবীতে এরকুম গন্ধ যে জন্মাতে পারে, মানুষের হাতে-হাতে ঘুরে-ঘুরে যোগাড়-করা দুর্গন্ধ, অমন চাকরি না করলে অজানা থেকে যেত। একটা পচা নোট আলাদা করে শুঁকলে ওই গন্ধটা পাওয়া যায় না। অথচ কয়েক হাজার পচা নোট একজোট হলেই প্রকাশিত হয়, দেশটার পীড়ার অভিব্যক্তি, হেমন্তের শুকনো পাতার সঙ্গে মেশানো গুয়ের গন্ধ। দেশটার সংস্কৃতি কতটা পচেছে তা বোধয় ওই গন্ধ থেকে টের পাওয়া যায়। মুমূর্ষ গন্ধটা থেকে ছাড়ান পাবার জন্যে আদিত্য তখুন বুশশার্টের বগলে বিদেশি পারফিউম লাগাত।

    আড়াই লক্ষ স্নাতকের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আদিত্যকে নিয়ে আরও উনিশজন ওই চাকরিটার পরীক্ষায় সফল হয়েছিল। অথচ সেই চাকরিতে তিতিবিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেছে ও। শালা বেনের আড়তে চাল ডাল গম আটা ওজন করার মতন ভারি-ভারি বাটখারা চাপিয়ে চকচকে মুদ্রা ওজন করানোর চাকরি। প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতিদিন রোজরোজ রোজরোজ রোজরোজ, ছ্যাঃ। এখুন না হয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ওজন হয়। কিন্তু তখুন তো ঝুল-চাকরিতে জান একেবারে শ্মশানকয়লা হয়ে গিয়েছিল।

    অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টারের চাকরি পেয়ে নিজেকে সুগন্ধিত করে তোলার অভ্যাসে কিছুটা রদবদল করেছে ও, আদিত্য। এখুন ও জনসনের বেবি পাউডার, বাচ্চাদের সাবান-শ্যাম্পু, শিশুদের ক্রিম আর অলিভ অয়েল ব্যবহার করে। আগেকার এক আই জি, এখুন অবসরপ্রাপ্ত, দুটো কারখানার মালিক, শিখিয়েছিলেন জীবনদর্শনটা। নিষ্পাপ থাকার নিজস্ব গন্ধ আছে, বুঝলে হে, পুলিশ অফিসারের উচিত সেই গন্ধটাকে সবচে আগে দখল করা। ফি-বছর পুজোয় অধস্তন অফিসারদের জন্যে শিশুদের ব্যবহার্য সাবান পাউডার ক্রিম শ্যাম্পুর সারা বছরের কোটা উপহার পাবার ব্যবস্হা করে দিতেন উনি। ওঁর বাবা তো এসেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে, কিন্তু কত উন্নতি করেছেন। রিজেন্ট পার্কে জবরদখল-করা জমিতে প্রোমোটারকে দিয়ে কী পেল্লাই এক-একখানা ফ্ল্যাট পেয়েছেন ওনারা তিন ভাই। প্রায় সব উদ্বাস্তু নেতারাই আজ কোটিপতি। উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, এই এলেম বেচেই লালে লাল হয়ে গেল কত লোক। তারা কেবল টাটকা করকরে নোট গুনছে। আসল উদ্বাস্তুগুনো ফুটপাতে হকারি করছে আজও।

    আদিত্যর এখনকার উপরি-দামি চাকরিটা মাঙনায় হয়নি। দেড় লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছিল। বাড়ি বয়ে একজন প্যাংলা ডাকমাস্টার জানিয়ে গিসলো কার সঙ্গে কখুন কোথায় দেখা করলে চাকরিটা হবে। ডাকমাস্টারহীন বাঙালিসমাজ ভাবা যায় না। এরা থানার জন্যে টাকা তোলার অঞ্চলভিত্তিক ঠিকেদারি নেয়। পুলিশে ঢোকার আগে জানতই না আদিত্য যে তথ্য আর সংস্কৃতির এরা বাঙালি জীবনের চাবিকাঠি।

    সাতচল্লিশ সালের পনেরই আগস্টের রাত্তির বারোটার পর থেকে খর্চাখরচ না করলে, এমন কী ক্ষমতাধারী স্বজনজ্ঞাতি থাকলেও, সরকারি চাকরি পাওয়া কঠিন। তারপর ফি-বছর বেড়েছে খর্চাখরচের হার। আর আদিত্য তো জন্মেছে তার পঁচিশ বছর পর, রজতজয়ন্তীর রাত্তিরে, বর্ধমান জেলার মামার বাড়িতে। কর্মসংস্হান কেন্দ্র থেকে নাম সুপারিশ করাতে লেগেছিল হাজার পাঁচেক, পার্টির তদবির সত্ত্বেও, নইলে বেশি লাগত আরও। ডেসপ্যাচের কেরানিকে কিছু না দিলে চিঠি ছাড়ে না, কিংবা পাঠিয়ে দেয় ভুল ঠিকানায়। কর্মসংস্হান কেন্দ্রের চিঠি দেখে পোস্ট অফিসে দেরি করে সরটিং করবে। আদিত্য প্রতিটি ধাপকে মসৃণ রেখেছিল, করকরে তাজা নতুন নোট দিয়ে, যার আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে প্রাপকের মুখ। অপার বৈভব গড়ে তুলতে চায় ও, আদিত্য। নইলে ওর মতনই, ওর ছেলেপুলে নাতিদের, বনেদি ঘরের ছেলে বলে স্বীকৃতি দেবে না কেউ।

    আদিত্যর ঠাকুদ্দার জন্ম উনিশশো পাঁচ সালের ষোলুই অক্টোবর। সেদিন কিছু একটা হয়েছিল বলে পরিবারের স্মৃতিতে ঢুকে আছে তারিখটা। সবরমতী আশ্রমের দরোজা-জানলা বানাবার জন্যে ঠাকুদ্দা গিসলো নিজের বাবার সঙ্গে। অনেক যত্নে বানিয়েছিল দরোজাগুনো। গান্ধি মহারাজ নিজে বলে দিয়েছিলেন যে দরোজাগুনো এমন হবে যে কেউ খুললেই ক্যাঁচোওওওর আওয়াজ হবে, যাতে কেউ ঢুকলেই টের পাওয়া যায়। গল্পটা আদিত্যদের পারিবারিক সম্পত্তি। গান্ধি ইয়েরভাদা জেলে গেলে, নিজের গ্রাম ধর্মশিবপুরে ফিরে এসেছিল ঠাকুদ্দা। উনিশশো উনত্রিশের জানিয়ারিতে বাবার জন্ম।

    আওয়াজঅলা দরোজা বানাবার দরুন বাবু জগজীবন রাম ঠাকুদ্দার জন্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীর মাসোহারার ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন। লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দিয়েছিল, এরকমটাই লেখা ছিল প্রমাণপত্রে। আদিত্যরা তো ছুতোর, তত নিচু জাত তো আর নয়, তাই জগজীবন রামের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে হয়েছিল। আজকাল অমন প্রণামে কোনও কাজ হয়না। প্রণামী চায় সবাই, আদিত্যও চায়।

    লেখাপড়া শেখেনি ঠাকুদ্দা। কংরেস সভাপতি ভূপেন বোস পাঠিয়েছিলেন সবরমতীতে ছুতোরের কাজে। ঠাকুদ্দা কিন্তু দূরদর্শী ছিল বলতে হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামীর মাসোহারার টাকায় নিজের আর একমাত্র নাতি আদিত্যর নামে যৌথ রেকারিং ডিপোজিট খুলেছিল। পুলিশে চাকরির শুভ কাজে লেগে গেল চক্রবৃদ্ধি। নয়তো অত থোক টাকা একলপ্তে কয়েক বিঘে জমি বেচলেও উঠত না। গান্ধির সঙ্গের লোকজনদের পায়ের কাছাকাছি থেকে, ঠাকুদ্দা বোধয় টের পেয়ে গিসলো অনেক আগেই, যে দেশটা ভাগ হবে, আর তার দরুন বাঙালিরা এক ধাঁচের বামপন্হী হবে। তাই জন্যেই হয়তো বাবাকে ইনডিয়ান প্রলেটারিয়ান রিভলিউশানারি পার্টির বিজয় মোদকের বাড়িতে ফাইফরমাস খাটার কাজে লাগিয়েছিল দশ বছর বয়সে। অত বড়ো-বড়ো মানুষের চোপরদিনের গুজগুজ-ফিসফিসের কাছাকাছি থাকার চাপে ওদের পরিবারটা ভদ্দরলোক হতে পেরেছে আর ছুতোর শ্রমিক বদনামটা ঘুচেছে।

    নোট গোনা আর কয়েন ওজন করার চাকরিতে, মনে হত আদিত্যর, রোজ কিছু-কিছু সরিয়ে গড়ে ফেলা যাক ধনী হবার তহবিল। কিন্তু ধরা পড়ার কেলেঙ্কারির গ্রাম্য ভয়ে, আর যারা অমন কাজ করে ধরা পড়েছে তাদের এনস্হা দেখে, বাতিল করেছে সে ভাবনা। তাছাড়া তাতে লেগে যেত অনেককাল। রোজ দুটো-চারটে একশো-পাঁচশো টাকার নোট সরালেও বহু বছর লেগে যেত ভৈভবশালী হতে। শুধু টাকা হলেই তো হয় না, সেটাকে খাটিয়ে-খাটিয়ে ফাঁপাতে হয়। এ এস আই এর চাকরিটা ধর্মঠাকুরের পাঠানো। টাকাও আপনা থেকে আসতে শুরু করেছে তাঁর কৃপায়। ধর্মরাজের কৃপায় একদিন-না একদিন রুণু গুহনিয়োগীর মতন প্রভাব-প্রতিপত্তি লোকবল ঐশ্বর্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর গণমাধ্যমের আদরযত্ন পাবে। বাসের সিটে বসে হাতজোড় করে আদিত্য। কপালে ঠেকায়।

    সত্যি, ইষ্টদেবতাকে স্মরণ ছাড়া আর গতি নেই, যেভাবে চালাচ্ছিল গাড়িটা, বলতে-বলতে বাস থেকে নাবলেন ফর্সা মোটা গলদঘর্ম গৃহবধু কেরানি। সওদাগরি অফিসে এত বেলায় হাজিরে দিলে চাকরি চলে যাবে। নির্ঘাৎ কোনও জনসেবা বিভাগের।

     

    বি-বাদী বাগে বাস থেকে নেবে একটু এগোতে, এক হাড়-ডিগডিগে শতচ্ছিন্ন্ ভিকিরে বউ, কাঁখে পেটফোলা রুগ্ন শিশু, বোধয় ব্রিগেডের কোনো গ্রাম-ফোসলানো সমাবেশে এসে থেকে গেছে কলকাতায়, ওদের দিকে অনুকম্পা চাইবার হাত বাড়াতে, আদিটভ পাঁচশো টাকার একটা নতুন সবুজ নোট বুক পকেট থেকে বের করে ভিকিরি যুবতীর হাতের ওপর রাখলে, বউটি বলে ওঠে, পাকস্হলী থেকে নিজের দরদ টেনে বের করে আনা কন্ঠস্বরে, লটারির টিকিট লিয়ে কী করব বাবু ? কিছু পয়সা দাওনা ক্যানে, মেয়্যাটা মুড়ি খায়। আদিত্য বইটির হাত থেকে নোটতা তুলে নিয়ে ফুলপ্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একমুঠো খুচরো ভিকিরিটিকে দিলে, যুবতীর হনু-ঠেলা মুখমণ্ডল কৃতজ্ঞতায় উদ্ভাসিত হল।

    আদিত্যর অট্টহাস্য আর অরিন্দমকে শুনিয়ে স্বগতোক্তি, ওফ, এই নিয়ে বোধয় একশোবার হল।

    অরিন্দম স্তম্ভিত, হতবাক, থ।

    কী, খুব হাসি হচ্ছে দেখছি। ধর্ষণ-টরশন আজকাল কোটা অনুযাবী ভালোই চলছে তাহলে ! অফিসপাড়ার ভিড়ে, পরিচিত কন্ঠস্বরের মন্তব্যে, দুজনে একসঙ্গে সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, যিশু বিশ্বাস, শেষ যৌবনে খুদে চোখে মিটিমিটি, ফর্সা গোলগাল, চুল অত্যন্ত পরিপাটি, ভ্যান হিউসেন, অ্যালান সলি, লুই ফিলিপে, বেনেটন, অ্যাভাই, রেভলন, রে ব্যান জগতের অধিবাসী। খ্রিস্টান, কিন্তু টের পেতে দেয় না। ব্রাহ্মরা যেমন হিন্দুর ভিড়ে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে আজকাল, যিশুও তাই। মিশুকে। ব্রাহ্মরা নিজেরা একসঙ্গে জুটলে হিন্দুদের নিয়ে এখুনও রেনেসঁসি হাসাহাসি করে। যিশুর অমন জমায়েত নেই। পুলিশে চাকরি করে বলে আদিত্যকে ঠেস দিয়ে বলেছিল কথাগুনো। অরিন্দমের অফিসে বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিনিধি হিসেবে প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ছিল। এখন পার্কস্ট্রিটে নিজের ফ্ল্যাটে কনফারেনসিং যন্ত্র বসিয়ে আন্তর্জাতিক কনসালটেনসি খুলেছে। আহমেদাবাদের এম বি এ। বিদেশে যায় প্রায়ই। অকৃতদার বলতে যে নৈর্ব্যক্তিক স্ফূর্তি আর আত্মমগ্ন অস্হিরতা। পাতলা ল্যাপটপ কমপিউটার আঁটে এমন ব্রিফকেস।

    বড্ডো খোঁচা দেন যিশুদা। আদিত্যর তরফদারি করে অরিন্দম।

    আর আপনার আলুর দোষ তো বিখ্যাত। যিশুর মন্তব্যের প্রতিদানে আদিত্য।

    যিশু বিশ্বাস অনভিপ্রেত যৌন টিটকিরিতে অভ্যস্ত। হাসল কাঁধ নাচিয়ে। বললে, ঠিক ধরেছিস। মেদনিপুর বাঁকড়ো বর্ধমান গিসলুম হিমঘরের স্টাডি করতে। এখুন বারাসাত থেকে ফিরছি। আলু সম্পর্কে আমার সত্যিই দুর্বলতা আছে। মাছ মাংস ডিমের চেয়ে আমার আলু খেতে ভাল্লাগে। কলেজে পড়তুম যখুন, প্রফুল্ল সেন আলুর বদলে কাঁচকলা খেতে বলেছিল। তোরা তো সেসব জানিস না, লিকুইড ছিলিস। পয়লা জুলাই বিধান রায় ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়িয়ে বিদেশে হাওয়া হয়ে গিসলো, আর প্রথম ট্র্যামটায় ভবেশকাকা আগুন ধরিয়ে দিলে।

    ভবেশ কাকা ? এই কাকার কথা বলেননি তো আগে ? সমস্বর প্রশ্ন।

    হ্যাঁ, ভাবতে পারিস ? স্বাধীনতার পর কলকাতার ট্র্যামের প্রথম মুখাগ্নি। আমরা তখুন নাকতলার কাছে থাকতুম। অ্যাতো গরিব রিফিউজিতে ভরে গিসলো ওদিকটা তখুন যে কলকাতার লোকে ভয়ে ও-মুখো হতো না। বাবাও ভয়ে বেচেবুচে এদিকে চলে এল। পুরোনো বাড়ির পাড়ায় ইউনাইটেড রিহ্যাবিলিটেশান কাইউনসিলের আগুন-খেকো নেতা ছিল ভবেশ মণ্ডল, ইয়া মাসকুলার বডি। পাকানো পেশি বলে একটা কথা আছে না ? ঠিক তাই। বাড়িতে না বলে কত্তো মিটিঙ-মিছিলে গেছি ওনার সঙ্গে। কিন্তু বুঝলি, ভবেশকাও একদিন ছোটো বোনকে নিয়ে কোথায় চলে গিয়েছিল।

    যিশু থামে। চুপচাপ। বাকিটা শোনার জন্যে অপেক্ষা করে দুজনে। এবার হুগলি জেলায় গিয়ে খুঁজে পেলুম ওদের, আশ্চর্য, তিরিশ বছর পর। কথাগুলোর ফাঁকে-ফাঁকে ম্লান উদাসীনতা ছেয়ে যায় যিশুর ফর্সা মুখমণ্ডলে।

    গল্পের আশানুরূপ সমাপ্তি না পেয়ে আশা পুরণের অন্য এক গল্পের দিকে যিশুকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে আদিত্য। বলে, রাইটার্স থেকে কেটলিসুদ্দু একজন কালো সুন্দরী চা-উলিকে নাকি ফুসলিয়ে নিয়ে গিসলেন ? তাও কিশোরী !

    তাতে কী ? আরে ! মেয়েমানুষ মানেই ওসব নাকি ? সস-শালাহ ! তোকে ওই ট্র্যাফিক সার্জেন্টটা বলেছে, না ? নির্মল বেরা না কি যেন নাম ? আচ্ছা চলি।

    হত্যা আর মৃত্যু থেকে যৌনতার এলাকায় খেলাচ্ছলে পৌঁছে উপশম হল অরিন্দমের। থেকে-থেকে হত্যার দু-দুটো দৃশ্য পুনরাভিনীত হচ্ছিল ওর মগজের মধ্যে। যা ভালো, তার চেয়ে যা খারাপ, তা বেশি করে মনে পড়ে। আধুনিকতা মানুষকে প্রকৃতি থেকে ছিঁড়ে আলাদা করে সংস্কৃতিবান বানিয়ে ফেলার পর তাকে নির্মমতার ওপারে অন্য কোনও মমতাহীনতায় পৌঁছে দিয়েছে। স্পষ্টই টের পাওয়া যাচ্ছে যে আদিত্যও পৌঁছে গেছে সে জায়গায়। কত সহজে খুনের আতঙ্ক থেকে নিজেকে যৌনতার আমোদে নিয়ে এলো।

    পাটনা থেকে কলকাতায় এসে নিজের গাড়ি নিয়ে সরকারি ঝুটঝামেলায় পড়ার পর আদিত্যর সঙ্গে অরিন্দমের পরিচয়। রাস্তার প্রায় মাঝকানে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল এক ব্যাটা নিরক্ষর। যারা কলকাতার আদিনিবাসী নয় তারা এই শহরের ওপর তাদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে নানা ক্যারদানি অবলম্বন করে। বারদুয়েক হর্ন দেবার পর লোকটা সরে যাবে, ভেবেছিল অরিন্দম। সরেনি। ধাক্কাও লাগেনি লোকটার। রাস্তঅব পড়ে দুমড়ে-কুঁকড়ে আহত হবার অতিঅভিনয় করতে লাগল, হাতে খবরের কাগজ ধরা। নিখুঁত। আদিটভ পরে খোঁজ নিয়ে জানিয়েছিল যে লোকটা কোনো এক গ্রুপ থিয়েটারে কিশোর মালোর চরিত্রে অভিনয় করে, চাকরি নেই, দুই মেয়ে এক ছেলে আছে। আজকাল অমন পথনাটিকায় যাহোক রোজগারপাতি করে সংসার চালায়।

    লোকটা পথনাটিকা আরম্ভ করতেই গোটা আষ্টেক ষণ্ডা পৌঁছে গেল ওর সাহায্যের জন্যে। বাঙুর হাসপাতালে তো মেঝেতে শোবার ওব্দি জায়গা জোটে না রুগিদের ; দুর্ঘটনায় মাথা ফাটলে ব্রেন স্ক্যানিঙের তারিখ পাওয়া যায় সাত মাস পর। ও ব্যাটাকে অরিন্দমের গাড়িতে তুলে ষণ্ডাগুনো নিয়ে যেতেই বেড পেয়ে গেল। সঙ্গের স্যাঙাতদের কি খাতির। তারপর ওদের সঙ্গে থানায় যেতে গাড়ি বাজেয়াপ্ত করে নিলে ওসি। থানাতেও কি খাতির ওদের। পরের দিন থানার সামনে ফুটপাত ঘেঁষে নানা গাড়ির কঙ্কালের মাঝে রাখা গাড়িটা পরখ করতে গিয়ে দেখে ওয়াইপার, ব্যাটারি, এসি উধাও ; চারটে চাকাই পালটে টাকপড়া পুরোনো টায়ার লাগানো। আচমকা, ছাঁৎ করে, রক্তের চলকানির মাঝে মনৈ হয়েছিল অরিন্দমের, ওর পূর্বপুরুষদের এই পশ্চিমবঙ্গটা আর ওর নয়।

    অফিসে শলা-পরামর্শ-উপায় খুঁজতে গিয়ে, লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব ইন্সপেক্টর আদিত্য বারিকের হদিস পেয়ে, গাড়িটা ওই অবস্হায় ছাড়িয়ে এনেছিল রেকার দিয়ে টো করে। আর কদিন থাকলে মেশিনটাও পালটে যেত। কিশোর মালোর চরিত্রাভিনেতাকে আর থানায় খর্চাখরচ দিতে হয়েছিল মোটারকুম। আদিত্য বলেছিল, এসব মেনে নিতে, সব্বাই মানে, মেনে নিলে অসুবিধে হবে না। মেনে নিয়েছে অরিন্দম। মেনে নিয়েছে জনসেবার নতুন সংজ্ঞা। বহুকাল পাটনা শহরে থাকার ফলে অন্যায়, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, যথেচ্ছাচার, সন্ত্রাস মেনে নেওয়াটা রপ্ত করে ফেলেছে ও। কিন্তু পাটনায় সবই ছিল রাখঢাকহীন, খোলাখুলি। কলকাতায় সরকারি দফতরগুনোয় সবাই সততার মুখোশ পরে থাকে। মুখোশটার নাম হয়েছে সংস্কৃতি।

    আজকে আদিত্যকে নিয়ে ভোটবাগান গিসলো পাটনা থেকে ওর সঙ্গে আসা রসিক পাসওয়ান নামে পাটনা অফিসের এক চাপরাশির খোঁজে। গাড়িটা পাটনায় অসীম পোদ্দারের বাবার কাছ থেকে কিনেছিল অরিন্দম। চালিয়ে কলকাতায় এনেছিল ওরা দুজনে, ও আর রসিক পাসওয়ান। অরিন্দম এক রাত্তির কোন্নগরে বাপ-পিতেমোর ভিটেতে থেকে গিসলো আর রসিক চলে গেসলো হাওড়ায় ওর গ্রামতুতো জ্ঞাতির আস্তানায়। সে আজ দেড় বছরের বেশি হল। অরিন্দম তো এরই মধ্যে এক বছরের জন্যে ম্যানিলায় ট্রেনিঙে গিয়ে ফিরে এসেছে। অফিস পাঠিয়েছিল। এতদিন হয়ে গেল অথচ ফিরে গিয়ে অফিসে যোগ দেয়নি রসিকটা। আশ্চর্য। কদিন আগে পাটনা থেকে মোতিলাল কুশবাহা এসে একটা চিঠি দিয়ে গেছে, ভোটবাগান অঞ্চলে রসিকের খোঁজ করার জন্যে। হাতের লেখা দেখে মনে হয়েছিল অতনুচক্রবর্তীর। সম্বোধন করেছে কমরেড। কেউ কমরেড বলে ডাকলে যে মনে-মনে এরকুম অস্বস্তি হতে পারে, আগে ঠাহর করার সুযোগ হয়নি অরিন্দমের।

    সেই অতনু, সে মাওবাদি কমিউনিস্ট সেন্টার নাকি এম এল লিবারেশানের নেতা, আত্মগোপনের সমাজে থাকে এখুন। এককালে পাটনা অফিসে কয়েক-নোট এগজামিনার ছিল মুখচোরা অতনু। গাড়ি চালিয়ে আসার সময়ে নিয়ে গিসলো রসিক, হাজারিবাগের জঙ্গলে, নিখোরাকো খেতমজুরদের ছেলেমেয়েদের গণবিবাহে। মাও-এর লেখা রেডবুক থেকে পড়ে-পড়ে সে-কথাগুলোকেই মন্তর হিসেবে আওড়ে বিয়ে দিচ্ছিল। বেয়ের পরই ভিড়ের সুযোগে অন্ধকার জঙ্গলে উধাও। কথা হয়নি। এড়িয়ে গিয়েছিল অরিন্দমকে। বিহারি হতদরিদ্র অন্ত্যজদের বাঙালি ব্রাহ্মণ নেতার সঙ্গে মেলাতে বিভ্রান্ত বোধ করেছিল অরিন্দম।

    ভোটবাগান অঞ্চলটা সুবিধের নয় শুনে আদিত্যকে সঙ্গে নিয়ে গিসলো অরিন্দম। ওখানে এশিয়ার সবচে বড়ো লোহার ছাঁটের স্ক্র্যাপইয়ার্ড। সারসার খুপরি ঘর। অনুজ্বল শ্যামবর্ণ নর-মরদদের পাঁচমিশালি ভিড়। হলদে কমজোর টুনি। জেনারেটারের চাপাকান্না। অশীতিপর পাঁক। মাইকচোঙে পাঁচ-প্রহর লটারি। লোহার কালচে ছাঁট আর ভাঙা-ত্যাবড়ানো লোহার মরচে-পড়া ঠেক। এলাকাটা জুড়ে তেলকালির নড়বড়ে চোগা পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কারখানার সারিসারি ঢাঁচা। পুরো জায়গাটা মনে হয় নারী-বিবর্জিত। ছাঁট আর লোহাটুকরোর সাম্রাজ্যের দখল নিতে শেষ হয় না গান্ধী, গোলওয়লকর, মার্কসের কুলাঙ্গারদের কাজিয়া। ডোম বাগদি দুলে বর্ণাশ্রমের জেল ভেঙে স্বাধীন হবার পর, আধুনিকতার উন্নতি তত্ত্বের সাহায্যে বর্ণাশ্রম গড়ে ফেলেছে গামা রসগুল্লা মুন্না কওসর সীতারাম ড্যানি শেখ হিরার প্রজন্ম। ভেবে, রোঁয়ায় আতঙ্ক খেলে যায় অরিন্দমের। এ-ই তাহলে বঙ্গসংস্কৃতি।

    হাওড়া জেলার ভোটবাগানে যেমন লোহার ছাঁটের বাবরি, তেমনি নদীয়া জেলার কালীগঞ্জে কাঁসা-পেতলের ভাংরি। সুইস ডেভেলাপমেন্ট কোঅপারেশানের আর্থিক সাহায্যে কাঁসা-পেতল কারিগরদের স্টেনলেস স্টিলের শ্বদাঁত থেকে বাঁচানো যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে অরিন্দমকে পাঠিয়েছিল অফিস। যাদের পয়সাকড়ি আছে তারা আজকাল স্টেনলেস স্টিলে খায়। যাদের অঢেল পয়সা তারা খায় লা-ওপালা কাঁচে। গরিবরা এনামেল ছেড়ে ধরেছে অ্যালুমিনিয়াম। রুজি-রোজগার বন্ধ হবার পর কাঁসারিরা ভিটে ছেড়ে চলে গেছে, কাঁখে কোলে বাচ্চা-বোঁচকাসুদ্দু, কৃষ্ণনগর শান্তিপুর নকাশিপাড়া কালনা মেমারি পাণ্ডুয়া চুঁচড়ো। রাস্তার পাশে খুপরি-দোকানে, কোণে-কোণে দড়িবাঁধা প্লাসটিক চাদরের তলায় হাড়গিলে হাঁটুমুড়ে বসে থাকে তারা, উশকো-খুসকো উদাসীন ঘোলাটে চোখে, স্টোভ কুকার গ্যাসের উনুন সারাবার খদ্দেরের জন্যে। তার ওপর ফুটপাতে বসলেই পুলিশের ডাকবাবু আর পার্টির হাঁকবাবুকে ফি-হপ্তায় কিছু তো অন্তত দিতেই হবে।

    মাটিয়ারি গ্রামের সুভাষ খামরুই অরিন্দমকে শুনিয়েছিল সেনকিট হ্যাজাকের গল্প। ব্রিটিস আমলে কালীগঞ্জ থানার মাটিয়ারির হ্যাজাক কব্জা করে ফেলেছিল কলকাতা ঢাকা কটক লখনো চাটগাঁ। বরযাত্রীরা ফিরতে পারত না সেনকিট হ্যাজাকের জ্যোৎস্না ছাড়া। বিজলিবাতি এসে খেয়ে ফেলল হ্যাজাকসুদ্দু কাঁসারিদের খ মোরাদাবাদের কাঁসারিরা বাজার বুঝে মাল পালটে ফেলেছে। সেখানে তো কাঁসারি বাড়ির ছেলে ইন্দিরা গান্ধীর সুন্দরী নাতনিকে বিয়ে করেছে। এখানে দ্যাখেন খামরুইরা বাপ-পিতেমোর কাজ নুকোতে কোর্টে হলফনামা দিয়ে পদবি পালটে ফেলছে।

    মাটিয়ারি ধর্মদা মুড়াগাছা সাধনপাড়ার কারিগরদের আর বিদিশি ডলার যুগিয়েও বাঁচানো যাবে না। কাঁচামাল নেই, কাজের সময়ে বিজলি নেই, জেনারেটারের খরচ, রোলিং শিট মেশিনের এস এস আই রেজিস্টারি বন্ধ। ভাংরি দেখলেই উপরির খোঁজে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ বিয়েসেফ শুল্কবাবুরা। থানার ডাকমাস্টারের টোকেনে কারখানাগুলান লাটে। তার ওপর বিক্কিরির টেসকো। কেঁদে ফেলেছিল নরহরি বর্মন, ছাপ্পান্ন বছরের দশাসই। কান্না শোনার, চোখের জল মুছে দেবার, লোক নেই। কাঁসা ভাঙলেই, বললে নরহরি কাঁসারি, নুকোনো কান্না বেরোয় গো।

    পাটনা অফিসের সেই সুন্দরী দেখতে মানসী বর্মন, ফোলা-ফোলা আঙুলে টরটরিয়ে নোট গুনত ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে, হঠাৎ চলে গিয়েছিল চাকরি ছেড়ে, অরিন্দমের কলকাতা বদলি হবার ঠিক আগে। ও কি কাঁসারি ছিল ? ওর তো প্লেস অব ডোমিসাইল নদীয়া জেলার কালীগঞ্জে। অমন নয়নাভিরাম আঙুল। মনে হত যেন জ্বরের রুগির কপালে রাখা ছাড়া আর কোনও কাজের জন্যে নয় হাত দুটো। নোট গুনে-গুনে কী ক্ষমাহীন অপচয়।

    কী অরিন্দমদা, আপনিও কি কেটলিউলির চিন্তায় মশগুল ?

    আদিত্যর কথা শুনে, অরিন্দম নিজেকে বলতে শুনল, পাটনা থেকে এক মুহূর্তে কলকাতায় পৌঁছে, হ্যাঁ, চেনো ? পরিচয় করিয়ে দাও না।

    আরে কী বলছেন কি আবোল-তাবোল। পুলিশের চাকরি করি। যিশুদার না হয় লোকলজ্জা নেই। আমার দ্বারা হবে না। যিশুদাকেই বলবেন। ভোটবাগানে ফের কবে যেতে চান একটা টেলিফোন করে জানিয়ে দেবেন।

    আর যাব না, বলল অরিন্দম। ভোটবাগানের হত্যার মাঝে দাঁড়িয়ে তখুনই মগজে তৈরি হয়ে গিয়েছিল উত্তরটা। তারপর আদিত্যর প্রত্যাখ্যানের জবাবে বলল, পুলিশ তো পশ্চিমবঙ্গে সত্যের মালিক।

    হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।

     

    মোকররি আর চাকরান মিলিয়ে বাহান্ন বিঘে জমি আর একলাখ কুইন্টাল ক্ষমতাসম্পন্ন মোমতাজ হিমঘরের অংশীদার, পঁয়ষট্টি বছরের গেরুয়া-পোশাক, বাঁ হাতের সরু-সরু তামাটে আঙুল দিয়ে আঁচড়াতে-থাকা সাদা ধবধবে দাড়ি, কালো-ফ্রেম গ্রাম্য বাইফোকাল, বাবরিচুল ভবেশ মণ্ডলকে হুগলি জেলার এই প্রত্যন্ত গ্রামে দেখে যতটা স্তম্ভিত হয়েছিল, তার চেয়েও অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় নির্বাক আনন্দে ছারখার হয়েছিল যিশু, ভবেশকার বোন খুশিদিকে দেখে। খুশিরানি মণ্ডল।

    কাঁসার বগি থালায়, কম্বলের আসনে খেতে বসে, প্রথম গপঅস মুখে তুলে, তিতকুটে লাগায়, যিশু বলে ফেলেছিল, এ বড্ডো তেতো নিম-বেগুন, আপনাদের দেশে নিমপাতা একটু বেশি তেতো বউঠান। সরাসরি যিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে খুশিদি বলে উঠেছিল, নিমপাতা নয়, একে বলে বামমি শাগ, খেলে মাথা খোলে। আমি কি তোর বউঠান ?

    তিরিশ বছর পর শোনা পরিচিত কন্ঠস্বরে যিশু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। ওর সামনে, হাতে হাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে, ন্যাতানো আনারদানা জামদানিতে খুশিদি, ভবেশকার সৎ বোন। বিস্ময়ের নিষিদ্ধ স্বগতোক্তিতে বলে ফেলেছিল, আরে খুশি, খুশিদি, আর স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়েছিল গম্ভীর ভবেশকার দিকে। মুখাবয়বে দ্রুত বদল ঘটতে দেখল চাষি মেয়ে আর গ্রামীণ ক্ষমতাকেন্দ্রের মালিক দাদার। ভবেশকার চাউনিতে বিদ্যুৎগতি তিরস্কার। বোধয় ওঁর ছোটো বোনকে চিনতে না পারায়। আজকাল গ্রামগুনোয় সত্যের স্বামীত্ব ভবেশকাদের হাতে।

    এই বয়েসেও খুশিদিকে দেখতে কত ভালো। অচেনা শব্দ খুশিদির কন্ঠে, না-বলা কথা গিলে ফেলার আওয়াজ, অনেকটা হেঁচকির মতন। কন্ঠ বেয়ে কান্নার ঘূর্ণি চলে এসেছে চোখের ডাগরে, মুখ না তুলেই টের পায় যিশু।

    সূর্যনগরে আমি একটা অশথগাছ পুতেছিলুম। সেই গাছটা আচে ? প্রসঙ্গ খোঁজে খুশিদি। তুই কেমন আচিস রে যিশকা ?

    হ্যাঁ, সেটা তো এখুন গাছতলা নামে বিখ্যাত। অনেক বাস ছাড়ে গাছতলা থেকে। তুমি দেখলে আর চিনতে পারবে না। গাছটা বিরাট হয়ে গেছে। উঁচু-উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে গেছে। আদিগঙ্গার ওপারেও গিজগিজ করছে বাড়ি। তুমি কি ভাবছ এখুনও ধানখেত আছে সেখানে ? যিশু কাঁধ নাচিয়ে নিজের স্বাভাবিক হাসি উপভোগ করে। যিশু আবার তাকায় খুশিদির মুখের দিকে, আর আমূল আক্রান্ত হয় ভারাক্রান্ত স্মৃতিতে। অশথ্থ গাছটার গোড়ায় একটা ঠাকুর আছে কী যেন।

    নমঃশুদ্রদের খুন ধর্ষণ বাড়িঘর জ্বালিয়ে যখুন তাড়ানো হয়েছিল খুলনার মাইড়া গ্রাম থেকে, পঞ্চাশ সালে, যুবক ভবেশকা রাতারাতি পালিয়ে এসেছিল কচি ফুটফুটে সৎ বোনকে কোলে নিয়ে। ভবেশকার ঠাকুমা দাদু বাবা মা দাদা বউদি কেউ বাঁচেনি। ভবেশকার সৎ মা নিশ্চই ফর্সা আর সুন্দরী ছিল। অনেক জমিজমা ছিল ওদের, নয়তো অমন ভালো দেখতে দ্বিতীয় পক্ষের বউ কী করেই বা পেয়েছিল ভবেশকার বাবা। উদবাস্তু কলোনির চূড়ান্ত দুর্দশার মধ্যেও অনেকের ঈর্ষা উদ্রেক করত খুশিদির চাঞ্চল্য। ডান চোখে তিল। কাঁদলে থুতনিতে টোল পড়ত। নিটোল টোল।

    তিরিশ বছর আগে আরামবাগি প্যাচে কংরেসি আলুর দাম হঠাৎ বাড়লে, খাদ্য আন্দোলনের দিনগুলোয়, তুলকালাম করেছিল ভবেশকা। তাঁবাটে পেশিতে দোহারা, ঝাঁকড়া অবিন্যস্ত, একদিনের খোঁচা-খোঁচা, নোংরা ধুতি-শার্ট, থমথমে চোখে-মুখে চেঁচাত, দেশভাগ আমরা চাইনি। হাতে পেলে জহোর্লাল জিনহাকে চিবিয়ে পোস্তবাটা করে। আর আজ হিমঘরের অংশীদার ভবেশকা, সংরক্ষণের ক্ষমতার দ্বিগুণ আলু হিমঘরে ঢুকিয়ে দুলাখ কুইন্টাল আলু পচিয়ে, সেই একই হুগলি জেলার চাষিদের ভয়ংকর বিপদে ফেলেও নির্বিকার। পচেছে আরও অনেক হিমঘরে। চাষির মুখের দিকে তাকালে সর্বস্বান্তের সংজ্ঞা টের পাওয়া যায়।

    পশ্চিমবঙ্গে টোটো ঘুরে, ব্রিফকেসে ফ্লপি আর ল্যাপটপ, তিন রকুমের হিমঘর দেখেছে যিশু : একলাখ কুইন্টালের বেশি, পঞ্চাশ হাজারের বেশি, পঞ্চাশ হাজারের কম। কৃষি বিপণনের বাবুদের তোয়াজে তেলিয়ে লাইসেন বের করতে হয়, হেঃ হেঃ, বলেছিল মোমতাজ হিমঘরের ক্যাশিয়ার শাসমল। তাও দাঁড়িয়ে যাবার পর তদারকিবাবু দেকে গেলে, মাত্তর দুবছের জন্যে, বোঝলেন, আবার দেবা-থোবার পালা, হেঃ হেঃ হেঃ। যে দেবে তাকে তো তুলতেও হবে, হেঃ হেঃ।

    ষাট হাজার কুইন্টালের হিমঘরে পাঁচতলা চেম্বারটা একশোদশ ফিট লম্বা, একশো আট ফিট চওড়া, ছাপ্পান্ন ফিট উঁচু। প্রত্যেক তলায় বারোটা করে তাক। মদ্যিখান দিয়ে যাতায়াতের জন্যে আড়াই ফিটের গলি। চ্যাঁচারির চালি দিয়ে আলাদা ভাগ-ভাগ করা থাকে তাকগুনো, যাতে তালাবন্ধ হাওয়া মনের আনন্দে খেলতে পারে চেম্বারের মধ্যে। সবচে ওপরে ছটা কনডেসেট কয়েল। তার ওপর ঘোরে ছাদপাখা। দেয়ালে চল্লিশ মিলিমিটার আর ছাদে আশি মিলিমিটার থার্মোকোলের পলেস্তারা।

    আরও, আরও টাকা করার পাঁয়তাড়ায় ভবেশকারা চলাফেরার আর হাওয়া খেলার জায়গাতেও ঠুসে দিয়েছিল বাড়তি বস্তা। তার ওপর বিজলির গোলমালে তাপের গুমোট বেড়ে গিসলো। শীতে জমে যাবার বদলে আলু ভেপসে গলদঘর্ম। কার জন্যে টাকাকড়ি জমিজমা চাই ভবেশকার !

    হিমঘরের আয়ু তো কুল্লে ষাট বছর। মেশিনঘরে থাকে সিনকো, কির্লোসকার, অশোক লেল্যাণ্ড, ক্রম্পটনের কমপ্রেশার, তেল-ইঞ্জিন, ইনডাকশান মোটর, ডিজেল জেনারেটার, অ্যামোনিয়া ট্যাঙ্ক, অয়েল সেপারেটার পাম্প, রেফ্রিজারেশান পাইপ। খড়গপুর আই-আই-টির মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার যিশুকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে-দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল জাবেদালি ঘরামি। শিক্ষানবিশের মতো মাথা নেড়েছে যিশু, ও, আচ্ছা, হ্যাঁ, তাই বুঝু, কেন, ঠিক, বুঝেছি।

    বৌজলেন বিশ্বেস মোসাই, ছাব্বিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হপ্তা রেকে দেয়া যায় আলু, পঁয়ত্রিশ থেকে আটতিরিশ ডিগ্রি ফারেনহাইটে, বললে ম্যানেজার, নাক সামান্য ফুলিয়ে। দাম বাড়লে অসময়ে বিক্কিরির ঘামের দাম পায় চাষি।

    কিন্তু পচ ধরে তো জলের দরে বিকোচ্ছে ?

    আসছে বছর দ্যাখবেন। আলুখোরদের বাঁশ দেবে চাষিরা।

    খাতাপত্তরে ফি-বছর লোকসান দেখান কেন ? মাল তো লোডিং হয় অনেক বেশি ? আপনার নাম তো কৃপাসিন্ধু, না ?

    ও আপনেরা কলকেতার লোক, বুজবেন না। গ্রামে তো আর খবরের কাগজের রাজনীতি হয় না।

    চাষবাসের ব্যাপার, সত্যিই, এভাবে জানা ছিল না যিশুর। কারখানার রাজনীতি, স্কুলের রাজনীতি, অফিসের রাজনীতি, চাষের রাজনীতি, সবই আলাদা। আলুর চাষ শুরু হয়েছিল নভেম্বরে, শুরু হয়েছে রাজনীতির হালখাতা। এক হেক্টরে দুশো থেকে আড়াইশো কুইন্টাল ফলন হয় আলুর। প্রথম ফসল জানুয়ারিতে। বাজারের জন্যে। নতুন ধবধবে তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ আলু, দামটা ভালো পাওয়া যায়, ফড়ে মেড়ো কাঁচা-বাজারের দালাল ওপরপড়া পার্টিদার সত্ত্বেও।

    আজ্ঞে মুসুলমান রাজার আমলে যেমন ছিল তালুকদার দফাদার পত্তনিদার তশিলদার মজুমদার হাওলাদার, এই আমলের কালে স্যার হয়েচে পার্টিদার, আজগালগার জমিদার। বলেছিল পুড়শুড়ার নিতাই মাইতি, ডাকবাংলোর কেয়ারটেকারের বড়ো ছেলে। যিশু কোনো চাকরি করে না, বুদ্ধি বিক্রি করে, শুনে ঠাহর করতে পারেনি চাকুরিপ্রার্থী ছোকরা।

    হিমঘরে রাখার আলু ওঠে ফেবরারির শেষাশেষি, বলেছিল জাঙ্গিপাড়ার নারায়ণ পোড়েল, ওখানকার হিমঘরের সুপারভাইজার, টাকমাথা, থলথলে, ময়লা। চাষিরা গোরুর বাড়ি আর মিনিট্রাকে চটের বস্তা ভরে আনে। হুগলি বর্ধমানে ষাট কেজিতে এক বস্তা। মেদিনীপুরে পঞ্চাশ কেজি। বস্তাকে বাংলায় বলে প্যাকেট। একখেও গোরুর গাড়ি মানে পাঁচ থেকে দশ কুইন্টাল, বলদ অনুযায়ী। আজ্ঞে বাঙালি বলদেরা তো আর হরিয়ানার বলদের মতন তাগড়া নয়। মিনিট্রাকে পঁচিশ থেকে চল্লিশ কুইন্টাল। তায় আবার ফি-বছর ডিজেলের দাম ডবল-ডবল বাড়ছে। হিমঘরে লোডিঙের সময় দেড়শো আর আনলোডিঙের সময় আশিটা কেঁদো মজুর আসে মুর্শিদাবাদ থেকে, সারা পশ্চিমবঙ্গে। নারায়ণ পোড়েল সিগারেটের টুসকি ঝাড়ে। মজুরগুনোকে আনে ওদের সরদার। বহরমপুরের কাসিমুদ্দি কাঠামি। সে দুদিকেরই ভাগা আর কমিশন খায়।

    আপনি তো হিমঘরে কাজ করে টেম্পো কিনে ফেলেছেন পোড়েলবাবু, মাইনেপত্তর ভালোই পান বলুন। ধনেখালি হরিপাল লাইনে চলে টেম্পোটা।

    না-না, কে বললে, এ আবার মাইনে নাকি। সরদারদের কাছ থেকে, মাটিঅলার কাছ থেকে, বাছনদারের কাছ থেকে, চাষির কাছ থেকে টাকা খাই। বস্তা পিছু ঘুষ নিই, ইচ অ্যাকর্ডিং টু হিজ এবিলিটি। আরে বিশ্বাসবাবু, এদিকের মাল ওদিকে না করলে কেউই সুস্হ জীবন কাটাতে পারে না। টাকা ছাড়া শান্তি কই। আমার ওসব ঢাক-ঢাক গুড়গুড় নেই। যিশুকে হতচকিত করেছিল নারায়ণ পোড়েল। সত্যবাদীরা আজও আছে পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গসমাজে।

    ঠিকাছে, তারপর বলুন। ল্যালটপে টাইপ করতে থাকে যিশু, শুনে-শুনে। পেছন থেকে গ্রামীণ খোকাখুকুরা দেখতে থাকে পদিপিসির মার্কিন বাকসো।

    যে আলু রাখছে তাকে হিমঘর একটা রসিদ দ্যায়। তাতে তার নাম, সাকিন, আলুর হাল, ওজন, ভাড়া, বিমাখরচ দর্জ। এই রসিদটা বিক্কিরি করা যায়। কিনে কদজা নেয়া যায় আলুর। শ্যালদা বাজারের কাঁচা ফড়ে, বড়োবাজারের মেড়ো, হিমঘরের মালিক, পঞ্চায়েতের পাঁচুরা সময়মতন রসিদে কোপ মারে। সে এক জবর লড়াই। পার্টিবাবুরাও মারচে আজগাল।

    হ্যাঁ, বলে যান, বলে যান।

    প্যাকেটগুলো ঠিক জায়গায় রাখা, নম্বর লেখানো, মেলানো, এসব আমিই তদারকি করি। পনেরো দিন থেকে মাস খানেক লেগে যায় লোডিঙে। লোডিঙের দুদিন আগে থেকে মেশিন চলে। চেম্বারের তাপ দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে নাবিয়ে আনতা হয়। লোডিঙ যেমন-যেমন এগোয়, ভেতরের তাপ বেড়ে সাত ডিগ্রিতে ঠেকে। আলুর বুকের গরুমটা বুঝুন থালে। চা খাবেন নাকি ?

    না-না, আগে শেষ করুন।

    হ্যাঁ, কী বলছিলুম যেন ? ও, হ্যাঁ। তাপ বেড়ে গেলে তাকে নাবিয়ে আনতে হবে আবার দেড় ডিগ্রিতে, একটু-একটু করা, টানা একমাস। যদ্দিন আলু থাগবে, বজায় রাখতে হবে দেড় ডিগ্রি। আর্দ্রতা রাখতে হবে পঁচাত্তর শতাংশ। দুঘন্টা অন্তর কমপ্রেশার পাম্প, জেনারেটার চেম্বারের তাপ, বাইরের তাপ চেক করেন অপারেটারবাবু, সুকান্ত যুগি। ওই যিনি তখন মুটিয়াদের কাছ থেকে তামাকপাতা নিচ্ছিল, মোটামতন, জাতে তাঁতি, সিপিয়েম। আলুর দম খাবার সময়ে এই খাটনির হ্যাঙ্গাম কে-ই বা জানতে পারে। বুঝেছি। তারপর ?

    মে মাস থেকে আলুর বস্তা বের করা শুরু হয়। চলে সেই আপনার নভেম্বর ওব্দি। শুকোবার ছাউনিতে এনে রাখা থাকে। বীজ আলুকে কুন্তু শুকুলে চলবে না। শুকিয়ে ছোটো-বড়ো ছাঁটাই করে বাছনদাররা। আজগাল অবশ্যি সিঙুর থানার রতনপুরে বিরাট খোলাবাজারে কিংবা আপনার বদ্যিবাটি আর তারকেশ্বর রোডের আড়তে চাদ্দিক থেকে আনা মাল ফেলে বাছাই করাচ্ছে ব্যাপারি। সস্তা পড়ে। বাছনদারদের চাগরি নেই। বাছনদাররা তাই ইউনিয়ান করেচে। তাতে আর কার কী ! অমনেও মরবে এমনেও মরবে।

    জানি। বদ্যিবাটি তারকেশ্বরে গিসলুম। তা ফড়েরা চাষিদের রসিদ কিনে রাখে বলে নম্বর মিলিয়ে ওরা মুটিয়া দিয়ে নিজেরাই মাল বের করায়। চাষিরা মাল ছাড়াতে এলে ওৎ পেতে থাকে ব্যাপারির লোক। হিমঘরে মাল রাখা বাবদ তিন থেকে পাঁচ শতাংশ শুকোবার জন্যে বাদ যায়। ঔ তা নিয়েও নিত্যিদিন কিচাইন। নভেম্বরের পরেও হিমঘরে মাল পড়ে থাগলে বাড়তি ভাড়া দিতে হবে। ডিসেম্বরে মেরামত, চালিবদল, ওভারহলিং, কনডেনসার পাইপ পোস্কারের কাজ। নতুন রঙের পোঁচ পড়ে।

    কী, তুমি খাচ্ছ না ? ভবেশকার কথায় নিঃশব্দ গলাখাঁকারি ছিল। চেতনার ঝটকায় জাঙ্গিপাড়া থেকে সোজা শেষপুকুরে পৌঁছে যায় যিশু। সারাতির শেষপুকুর গ্রামে।

    হ্যাঁ, ন্যাকোরচোকর করচিস। বলল খুশিদি।

    কী বলবে ভাবতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হল যিশুর। বলল, তোমরা না চাইলেও ঠিক খুঁজে বের করেছি তোমাদের। বের করতুমই একদিন।

    ময়ূরভঞ্জের রানির কুঠির কাছে ছিল না তোদের বাড়ি। এখুনও চোকে ভাসচে। মনে হচ্চে এই তো সেদিন। সবকিচু পালটে গেচে, না রে যিশকা ?

    রানির বাড়ি এখুন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। আমাদের বাড়িটা একটা কারখানা কে বেচে দিয়ে আমরা তো বহুকাল পার্কস্ট্রিট চলে গেছি।

    তা ভালো করেছ। পার্কস্ট্রিট তো দামি জায়গা, সোনার খনি। ভবেশকার বৈষয়িক মন্তব্য।

    থালা থেকে মুখ না তুলে একের পর এক পদ গিলছিল যিশু। সারা বাড়ি চুপচাপ। ভবেশকার পুঁইডাঁটা চেবানো দাঁতহীন শব্দ। খেয়ে উঠে, কালো রঙের কাঠের চেয়ারের হাতলে তোয়ালে। যিশুর জন্যেই তোয়ালেটা বেরিয়ে এসেছে কাপড়ের গাদা থেকে। মুখ মুছতে গিয়ে আলতো ঘ্রাণ টানে যিশু। হ্যাঁ, জলজ্যান্ত খুশিদির অমোঘ সুগন্ধ রয়েছে এতে, সংস্কৃতির কৃত্রিমতামুক্ত প্রকৃতির গন্ধ।

    তুমি একটু শুয়ে জিরিয়ে নাও। আমি দেখিগে, জালি বণ্ডের খবর পেয়েচি। বলতে-বলতে বাড়ির বাইরে বেরোয় ভবেশকা, খালি পায়ে, গোড়ালি ওব্দি ঝুলে আছে টেরিকটের গেরুয়া আলখাল্লা। পঞ্চায়েতের মাদারির খেল খেলতে যাচ্ছে বোধয়।

    কোনও ডুবন্ত জোতদারের থেকে কেনা, সাবেকি মেহগনি পালঙ্কে শুয়ে, কলকাতা থেকে তিরিশ বছর আগে ভবেশকা আর খুশিদির আচমকা হারিয়ে-যাওয়া আর আজকে তেমনিই হঠাৎ খুঁজে পাওয়ায়, যিশুর ভাবনায় অনির্বাণ আহ্লাদ খেলছিল। ব্যাটমে তোলা নেটের মশারি। শিমুলের ধবধবে বালিশ। এমব্রয়ডারি নেই। ছোট্ট মোটা কোলবালিশ, পা রাখার জন্যে। বারান্দায় টালির চাল। শালি-শুনা জমি ইঁটভাটার জন্যে ব্যবহার বারণ বলে টালির খোলা তো উঠেই গেছে বলতে গেলে। দেয়ালে পুরোনো আমলের লম্বাটে আয়না। পেরেকে চাবির গোছা ঝোলানো। সঙ্গেকার তাকে কাঁকুই। দেয়ালে ঝাঁকড়া হাসছে সত্য সাঁইবাবা। ভবেশকা বোধয় এ-ঘরেই শোয়। খুলনার বাড়িতে হুবহু এরকুম ঘরই ছিল হয়তো। গ্রামে লোকেরাও আজকাল এভাবে থাকে না। শহর তার রঙিন উস্হিতি জানাবেই। শহর মানেই তো দাপটের কেন্দ্র। খুশিদির ঘরটা কেমন কে জানে। ঘর তো বেশ কয়েকখানা। দুজন মোটে লোক।

    দেয়ালে-বসানো আলকাৎরা রঙের লোহার সিন্দুক, দিশি। কিছুক্ষূণ দ্বিধাগ্রস্ত থাকার পর আলতো পায়ে বিছানা থেকে নেবে, চাবির গোছাটা নিয়ে বারকয়েক কৌতুহলী চেষ্টা করতে খুলে যায় সিন্দুক। আলুর বণ্ডের বই, পাকিস্তানের পুরোনো একশো টাকার নোটের একটা বাণ্ডিল, উনিশশো পঞ্চাশ সালের হলদে খড়খড়ে পাকিস্তান অবজার্ভার আর দৈনিক আজাদ, দুটো একই মাসের। একটা ছবিসুদ্দু বিঞ্জাপন লাল কালিতে ঘেরা। লাল শালুর পাক খুলে শতচ্ছিন্ন বইটা, গীতা নয়, লুপ্ত সোভিয়েত দেসে ছাপানো ‘দাস কভাপিটাল’, এত বছর পরও মোষের খুরের শিরীষ -আঠার ভকভকে স্তালিনি গন্ধ। সংগ্রাহকের জন্যে গর্বাচভের সৌজন্যে বইটার সোভিয়েত সংস্করণ এখন দুষ্প্রাপ্য। সিন্দুক বন্ধ করে পালঙ্কে ফেরে যিশু।

    পাড়সুতোর নকশিকাঁথা চাপা দিয়ে, ভাতঘুমের অলস তন্দ্রায়, অতীতে ভাসছিল ও, যিশু। ষোলো বছর বয়সে কুড়ি বছরের খুশিদিকে ছোঁয়া, বাহু ধরা, চুলে নারকোল তেলের গন্ধ। স্মৃতির আলতো জলপোকা।

    কোথাও দুপুর-কোকিলের চোরা-কুহু। পশ্চিমের জানলায় থোকা-থোকা ফিকে হলুদ নোড়ফল ঝোলানো গাছটার পেছনে মঞ্চস্হ হচ্ছিল সূর্যাস্তের দ্বিপ্রাহরিক মহড়া।

    কাজের সময় কোকিল ডাকে, ভাল্লাগে না বাপু। কপালে খুশিদির স্পর্শ আর কন্ঠস্বরে অস্বস্তিকর অস্হিরতা। যিশুর তন্দ্রায় ঝনৎকার ঘটে। যিশুর শিরা-উপশিরা যা টানটান বাঁধা, ছিঁড়ে গেল, আর শ্বাসনালিকায় মোচড় দিয়ে ওঠে অদম্য বিষাদ।

    তোমার বরের কী হল খুশিদি ?

    কেঁপে উঠেছে খুশিদির চোখের পাতা, মুখমণ্ডলে অবিশ্রান্ত ক্লান্তি, হৃৎপিণ্ডে অশ্রুপতনের টুপটাপ। বিয়ে আর হল কই ! চারটে মোটে শব্দ, অথচ, অথচ জ্যোৎস্নায় ডোবা ভুতুড়ে ঝিলের মতন নিষ্পন্দ। বর্ধমান জেলার ছুতোর গাঁ’র সহদেব মণ্ডলের বড়ো ছেলে এখানের উপসাসথো কেন্দ্রে কাজ করতো, আমাকে দেখতে পেয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিল একাত্তর সালে। দশঘরার পোড়ামাটির পরি বলেছিল আমাকে দেখে। পালটি ঘর ছিল, কাসসপ গোত্তর। খুন হয়ে গেল। ধড় পাওয়া গেসলো, মাথা পাওয়া যায়নি। সবাই বললে, নকশাল ছিল, তা-ই। দাদাও সে কথাই বলেছিল। দাদা কী করে জানবে বল ? নকশাল তো ছিল ছোটো ভাইটা। নকশাল করলে বিয়ে করতে চাইবে কেন, বল ? গোপের হাটের আড়তদার রামরতন মণ্ডলও বিয়ে করতে চেয়েছিল। পনেরো বছর আগের কতা। দোকানে আগুন লেগে জ্যান্ত পুড়ে মারা গেল সে। আমি খুব অপয়া। খুশিদির চোখের নাব্যতা হয়ে ওঠে অতল। তুই কেমন আচিস যিশকা। কতো বড়ো হয়ে গেচিস, লোক অ্যাগবারে।

    দশঘরা অঞ্চলের টেরাকোটা, মাটির তলায় পুঁতে, তার ওপর মাস ছয়েক জলছড়া দিয়ে, কয়েকশো বছরের প্রাচীন আর দুর্মূল্য করে তোলার খবর জানে যিশু। দেখেছে। সন্তর্পণে ও বলল, অজানা ইনোসেন্ট নারীজীবনে প্রবেশ করে নিজেকে পুনরুদ্ধারের অভিপ্রায়ে, আমার সঙ্গে যাবে খুশিদি ? আমার কাছে ? পঞ্চাশ বছরের একজন বালিকাকে কাছে পাবার ক্ষমতাকে দুর্জয় করে তুলতে, উঠে বসেছিল যিশু। ওর কথার ঈষদুষ্ণ ভাপে, সালোকসংশ্লেষে অক্ষম স্বর্ণলতার মতন খুশিদি যখুন যিশুর কাঁধে মাথা রেখে, হ্যাঁ জানায়, রেশমগুটির মধ্যে তুঁতপোকার মতন ভাবাবেগের আরাধ্য পরিমণ্ডল গড়ে তুলেছে ও, যিশু।

    আমার শরীর কেমন-কেমন করচে। বুক ধড়ফড় করচে। কিছু আবার হবে না তো। বলেছিল সন্ত্রস্ত খুশিদি, আর যিশু উত্তর দিয়েছে, হোক, হওয়া দরকার, এরপর আর সময় নেই।

    হ্যাঁ, ঠিকই বলেচিস। ঠিক সময়ে পাকা ফসল তুলে না নিলে শুকনো সরষেও তো খেতে ঝরে যায়, বল ? তোর কিচু হবে না তো ? কাঁধ থেকে মাথা তুলে, চুলে নারকোল তেলের পরিচিত গন্ধ, যিশুর মুখের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে জানতে চেয়েছে খুশিদি, আর তারপর বলেছে, আমার কাচে তুষলাব্রতর সরষে আর মুলোফুল আচে। তোর বাকসোয় রেকে নিস।

    তুমি ব্রত করো ? কী-কী ব্রত করো ? যিশু কাঁধ নাচিয়ে হেসেছিল, শব্দহীন, যাতে রাহু কেতু অশ্লেষা মঘা বসতে না পারে ওর গায়ে। ইউরোপ আমেরিকা এশিয়া আফরিকার বহু নারীর হার্দ্র সঙ্গ কাটিয়েছে ও, যিশু। কিন্তু এই প্রথম একজনকে মনে হল আধুনিকতার স্পর্শদোষ থেকে মুক্ত ; সমূল নিসর্গপ্রকৃতির অন্তর্গত।

    হাসচিস কি ! ব্রতর অনেক গুণ। এই তো শাবনমাসে মনসার ব্রত করেছিলুম। পান্তাভাত আর সজনে শাগের পেসাদ খেতে হয় তখুন। তারপর ভাদ্দরে চরাচরি ব্রত করি। চরাচরি পুজোয় সব রকুমের পিঠে ভাজা হয়। আশিন সংক্রান্তিতে পিঠে-পুলি খেয়ে খেতে নল দিতে হয়। ভাদ্দরে জল, আশিনে নল, ধান ফলে গলগল, শুনিসনি ? পোস মাসে পোসতলা ব্রত করি। শাঁক বাজিয়ে চাল দুধ ফল ফুল গোড়ায় দিয়ে পাঁচ গাচা ধান তুলতে হয় পোসতলায়। যখুন নতুন-নতুন এসছিলুম শেষপুকুরে, গাছতলায় বিলরান্না করতুম। আজগাল আর হয় না খ বডডো ঝগড়াঝাঁটি হয় গাঁয়ে। ঘেঁটুব্রতর গান জানতুম আগে। সবায়ের বে-থা ছেলেপুলে হয়ে গেল। কথা বলার সময়ে খুশিদির হাত নাড়া দেখে মনে হচ্ছিল বাতাসের তোশক সেলাই করছে।

    চাষবাস, গ্রামজীবন থেকে বঙ্গসংস্কৃতি এখুন গিয়ে পৌঁছেচে কলকাতা শহরের শেকড়হীন নাচাকোদা, বাজনা-থিয়েটারে। পশ্চিমবাংলার ভূজমিন থেকে আর সংস্কৃতির সত্য অঙ্কুরিত হয় না। তা নকল কায়দায় পয়দা হয় অকাদেমি, অ্যাকাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, পার্টি অফিসে। খুশিদিই হয়তো শেষ বাঙালিনি।

    একবার ভবেশকার সঙ্গে মিছিলে হাঁটার সময়ে গলা ঢেলে গান গেয়েছিলুম তোমায় শুনিয়ে, মনে আছে ?

    মনে নেই আবার ? বাঙালদের মিছিলে গিসলি বলে পিটুনি খেয়েছিলি। খুশিদির চোখের কোলের অনিশ্চয়তার কালি কিছুটা কমে। চোখের কোলের কালির জন্যেও নারীকে ভালো দেখায়, আশ্চর্য। নৈকট্যার ঝাপটায় গড়ে ওঠে অজ্ঞাতসার। যিশু দুহাতে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে শেষতম বাঙালিনিকে। অ্যাই, কী হচ্ছে কী, পাগল নাকি, ভালোবাসা এমনি করেই জানাতে হয় বুঝি ? ছাড়াবার চেষ্টা না করে, গলা নাবিয়ে বলল খুশিদি। প্রশ্রয়প্রাপ্ত যিশু গনগনে ঠোঁট বুলোয়, রুদ্ধশ্বাস, ত্রস্ত। সিনেমা দেখে, টিভি দেখে, উপন্যাস পড়ে, মানুষ-মানুষীর যৌনতার বোধ কলুষিত হয়ে গেছে, সর্বজনীন হয়ে গেছে। খুশিদির জৈব প্রতিদান, বোঝা যাচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতায় নিষিক্ত নয়। থুতনির টোল কাঁপিয়ে, ফুঁপিয়ে ওঠে খুশিদি ; বলল, আয়, ভেতরের ঘরে চল যিশকা।

    যিশকা নামে ডাকার আর কেউ বেঁচে নেই। ডাক-নামের মৃত্যু মানুষের জীবনে জলবিভাজক। তার অস্তিত্বে যে যিশকা নামের কেউ একজন কখনও ছিল তা টের পেল যিশু, এতদিন পর। বহুকাল, বহুকাল, বহুকাল পর।

    খুশিদির কোমরলগ্ন যিশু, খুশিদির ঘরে, সেগুনকাঠের নিচু খাটের ওপর, খুশিদিকে আবরণমুক্তির সময়ে, খুশিদি বলল, পঞ্চাশ বছর বয়স হতে চলল, কেউ কখনও আদর করেনি আমায়, আদর করার মতন কিচু আচে কিনা তা-ও জানি না, কেউ ভালোবাসে না আমায়, কেএএএউ নয়। আমি খুবই অপয়া।

    উদোম স্বাস্হ্যবতী চাষি-প্রৌঢ়ার প্রগাঢ় চাউনির দিকে তাকিয়ে, ফুঁ দেবার মতন আলতো কন্ঠস্বরে যিশু বলেছে, ওসব বোলো না। জানি, পনেরই আগস্ট তোমার জন্মদিন করত ভবেশকা। তোমাদের কলোনিতে তা দেখে গালমন্দ করত অনেকে, আর ভবেশকা তাতে কান দিত না। এসো, আমি চোখ না বুজে তোমায় তিরিশ বছর পেরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। শরীর জুড়ে ঠোঁট বোলায় যিশু আর প্রতিবার বলে তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা। যিশু অস্ফুট বলতে থাকে, তোমার মুখের ভেতর থেকে রক্তচন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে, তোমার ঠোঁটে মধুপর্কের স্বাদগন্ধ, আম্রপল্লবের গন্ধ তোমার চোখের পাতায়, কানের লতিতে রক্তপদ্মের পাপড়ি, তোমার চুলে দুর্বাঘাসের সুবাস, তোমার এই হাতে কাঁচা ধানের সুগন্ধ। বেলপাতার সবুজ গন্ধ তোমার পায়ে, তোমার বুক থেকে ডাবের জলের গন্ধ পাচ্ছি। আআআআআআআঃ। কী মাখো তুমি ? অ্যাঁ ? কী মাখো ? কী মাখো ? কী মাখো ? আলো ? জল ? বাতাস ? সময় ? কী মাখো ?

    চুপ করিসনি, তুই বলতে থাক রে, তুই বল। কিচ্ছু বুঝিনে তুই কী কইছিস, তবু তুই বল, বলতে থাক। আমু মুকখু। নাকতলায় তো তখুনই ইশকুল হয়। লেকাপড়া শেখায়নিকো। মুকখু, জানি আমি মুকখু। ঠোঁট দিয়ে খুশিদির চোখের কোল থেকে, অশ্রু পুঁছেছে যিশু। খুশিদির নাভি ঘিরে জেগে ওঠে নরম পরাগ-রোঁয়ার দল।

    বাইরের আমবাগানে চলচ্ছক্তি হারিয়ে ফেলেছে বাতাস। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে রোদ্দুরের। চাপা উত্তেজনায় জ্ঞান হারিয়ে টুপ শব্দে মাটিতে পড়ল একাকী শিমুল। মাঝবয়েসি রোদের শেষ ফালিটুকু এসে পড়ে আছে বিছানার একপাশে। জানলার জংধরা শিকের বাইরে, নারকোল গাছের পাতায় বয়োবৃদ্ধ চিলকে ঘিরে গুটিকয় যুবা পাতিকাকের হাওয়া-সাঁতার হুড়দং। দক্ষিণের জানলায় পুরুষালী চেহারার ঝাঁকড়ামাথা খেজুরগাছ। তারপর থেকে, খুশিদির কাঁধের ওপর দিয়ে যতটা দেখা যায়, আলু খেতের সবুজ, খুপরি হাতে ময়লাটে রঙিন শাড়িতে আবছা কামিনেরা। ফড়িঙের ইচ্ছানুকূল স্পন্দন ছেয়ে ফেলছে চরাচর।

    মুখচোরা স্পর্শের আতিশয্যে খুশিদি এখুন প্রাণবন্ত পাথরে রূপান্তরিত, অন্তঃপুর নির্বাক, চোখের জলে গড়া মানবী। যিশু ওর দাঁত ঠোঁট মুখ দিয়ে খুশিদির চরণবন্দনা করে, জানুবন্দনা করে, স্তনবন্দনা করে, বাহুমূলবন্দনা করে, চোখবন্দনা করে। খুশিদি ফিরে যেতে থাকে তিরিশ বছর অতীতে প্রতিবেশী তরুণের শ্রেণি-নিষিদ্ধ সম্পর্কে, অপ্রত্যাবর্তনীয় সময়ে। অস্তিত্বের শীতাতপ আনাচকানাচ ভেসে যায় অবিরাম স্নিগ্ধতায়। জানা ছিল না এতকাল যে ওর নিজের শরীর এরকুম, যাকে এখুন দেহের আর মুখের ভাষায় যিশু করে তুলেছে পূজনীয়, অর্চনীয়, বন্দনীয়, আরাধনীয়, সাধনীয়, অহর্নীয়, উপাসনীয়, টের পায় যিশু। নিজের অর্চক, উপাসক, যাজক, জাপক, পূজক, সেবাইত, সাধক, আরাধককে সারা জীবনে প্রথমবার, পঞ্চাশ বছরে এই প্রথম, সাহায্য করে খুশিদি নিজেকে অবাধ করে তুলতে। অস্ফূট উঃ, খুশিদির চোখবোজা, ক্রমাগত বলে চলেছে, কেউ ভালোবাসে না আমায়, কেউ চায় না আমায়, আমি মুকখু, আমি অপয়া। অবারিত যিশু, গড়ে তোলে স্বপ্নের দ্রুতশ্বাস সম্পখফ। তিরিশ বছর আগের না-মেটা আশ পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে। সুখানুভূতির অঢেল বখরায় মরা গাঙ প্লাবিত হয়।

    বাঁশের বেড়া খোলার ক্যাঁচোর শুনে উৎকর্ণ শঙ্কিত খুশিদি উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত, পাক খেয়ে আনারদানা জামদানি জড়ায়, চোখের জল মোছে, হাত-খোঁপা বাঁধে, আর চাপা গলায়, দ্যাখ, দ্যাখ, দ্যাখ, দ্যাখ, বাইরে যা, বাইরে যা, এখুন তো দাদার আসার সময় হয়নি। ব্লাউজের হাতায় বাহু ঢোকায়। টেপা-বোতামের পট-পট শব্দ।

    ভীতির গভীরতায় অবাক যিশু বাইরে দাওয়ায় বেরিয়ে খুশিদি আর আগন্তুকের উদ্দেশে গলা চড়ায়, জাবেদালি এসেছে গো খুশিদি। বিশ্বাসবাবুর জন্যে খাসি কাটালে ভবঠাকুর, তাই পাটিয়ে দিয়েচে, আর এই হরিপালের দই, জানায় জাবেদালি ঘরামি, হিমঘরে নজরদার, থলথলে কালচে চাহারা, গোঁফ নেই, দাড়ি আছে, কুচকুচে। হিমঘরের নাটবল্টু পেরেক আলপিন ওর মুখস্হ। অনেক বন্ড কিনেছে নিজের নামে, নাবালক ছেলের নামে। পদবির বিশ্বাস শব্দটাকে কারা বিকৃত করবে তা মুখের দিকে তাকিয়ে টের পাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে যিশু।

    যিশকা এখেনে কদিন থেকে যাক না দাদা, কদ্দিন বাদে দেকা, ওর তো মা-বাপ কেউ নেই এসংসারে, আমরা ওকে পুষ্যি নিতে পারিনে ? ভবেশকা ফিরলে অবাস্তব প্রস্তাব করেছিল খুশিদি।

    কিইইইই যে আবোল-তাবোল বলিস ; বিলেত-ঘোরা লোক ও, আপিসের কাজে এয়েচে। তা থাকতে চায় থাকুক না কদিন, কিন্তু ব্যাবসা আর গাঁয়ের গপ্পো করিসনি ওর সঙ্গে।

    রাত্তিরে, মাংস খাওয়ার সময়ে, এই অভিজ্ঞতা অনেকবার হয়েছে যিশুর, আবার মনে হল, অন্ত্যজ বাঙালি পরিবার মোগলাই রান্না রাঁধতে পারে না, অথচ সবর্ণদের তুলনায় নবাব-সুলতানদের কত কাছে ছিল। যে হিন্দুর বাড়িতে এককালে ছাগলের মাংস আর মুরগি নিষিদ্ধ ছিল, তারা কিন্তু আজকাল নানা মোগলাই পদ দিব্বি রাঁধতে পারে। অরিন্দমের ছোটো ভাইয়ের বউ কত ভালো মাংস-পরোটা খাইয়েছিল অরিন্দমের জন্মদিনে। অরিন্দমের ছোটো ভাইটা তো সব রকমের মাংসই খায়।

    কে কোন তপশীলিকে সরকারি ব্রাহ্মণ বলেছিল বলে অরিন্দমের অফিসে ইউনিয়ান নেতাদের বিরুদ্ধে কত চেঁচামেচি করেছিল গৌরাঙ্গ নাগুরি, রমাপদ বাইন, জগৎ মান্না, সদানন্দ সাঁই, আর ঝাড়পিট ঘিরে নাট্যমোদীর কেরানিমঙ্গল। চাকরি-বাকরির চেয়ে নিজের বুদ্ধি বিক্রির ব্যবসা বরং ভালো, এর রাজনীতিতে তেমন হ্যাঙ্গাম নেই। খুশিদির সেগুনকাঠের পেল্লাই খাটে, রং-ওঠা নীল নেটের মশারির মধ্যে শুয়ে ভাবছিল যিশু।

    খুশিদির ঘরটা প্রায় ফাঁকা। একটা ড্রেসিং টেবিল অন্তত কিনে দিতে পারত ভবেশকা, একটা ট্রানজিস্টর বা টু ইন ওয়ান। নিদেনপক্ষে ছবি দেখার জন্যে সিনেমার ম্যাগাজিন। গ্রামপঞ্চায়ের এখানে কেবল টিভি নিষিদ্ধ করলেও, একটা টিভি তো রাখতে পারত সরকারি চ্যানেল দেখার জন্যে। খুশিদিকে ঠিক কোন শতকে আগলে রেখেছে ভবেশকা কে জানে। তালা-দেওয়া ঘরগুনোয় কী আছে জানতে অহেতুক আগ্রহ হয় ওর, যিশুর।

    ভেতরবাড়ির ভাঁড়ার ঘরে খাটে কটনের মশারি টাঙিয়ে খুশিদি বাতি নেভাবার পর, যিশু আলতো পায়ে ওর পাশে গিয়ে শুলে, কন্ঠস্বর উদারায় তুলে খুশিদি বলল, সকাল-সকাল ঘুমিয়ে পড়, কাল তো আবার আপিসের খাটনি আচে। আর গলা নাবিয়ে বলল, দুপুরে যা সব বলছিলি, সেগুনো আবার বল। পারবি ? ওমা তোর বুকে তো চুল নেই রে।

    যিশু প্রণয়ের প্রণয়ন করে।

    তোমাকে অনেক বলার আছে খুশিদি ; একই কথা বারবার কেন বলব ?

    না, না, দুপুরেরটাই বল, তখুন যেমন-যেমন করেছিলি। নিজের অস্তিত্বে উত্তেজনার ভণিতা চেয়েছে খুশিদি।

    তোমাদের খুলনার ভাষা তোমরা দুজনেই ভুলে গেছ ?

    তিরিশ বছরের ওপর রইচি এই গাঁয়ে। এই গাঁয়েরই হয়ে গেচি। আমি তো ছোটো ছিলুম, কিছুই মনে নেই। দাদা গপ্পো করে কখুনো-কখুনো।

    আমি তোমায় দেখে ভেবেছিলুম, বিধবা হয়ে ফিরে এসেছ। ভবেশকা যে কেন বিয়ে না দিয়ে আইবুড়ো করে রেখে দিয়েছে। অনেক ভালো পাত্র পেত তোমার জন্যে। নিজেও করেনি।

    দাদার তো চোপরদিন হিমঘর আর পারটি আর চাষবাস আর সভা। তুই করিসনি কেন ?

    আমি ? পড়াশোনো আর পড়াশুনো। তারপর রোজগার আর রোজগার। উন্নতি আর উন্নতি। ব্যাস, বিয়ের বাজার হাতছাড়া হয়ে গেল। আর তারপর বাবা-মা মারা গেল।

    তুই তো বেমমো, না রে ?

    যিশুর বেশ ভাল্লাগে খুশিদির অকৃত্রিম মর্মসত্তা। বলল, না, আমরা খ্রিস্টান, ফ্রানসিসকান খ্রিস্টান। আমাদের জাতের বাঙালি খ্রিস্টান কলকাতায় আর নেই। কলকাতায় জেসুইট,কারমেলাইট, ডোমিনিকান, অগাস্টানিয়ান জাতের বাঙালি খ্রিস্টানও আর নেই। কলকাতা এখুন নানা ধর্মের ট্যাঁসদের শহর, বুঝলে। হিন্দু ট্যাঁস, মুসুলমান ট্যাঁস, খ্রিস্টান ট্যাঁস। কিন্তু ছোটোবেলায় কতদিন বড়োদিনের কেক খাইয়েছিলুম, ভুলে গেলে ? অবশ্য তিরিশ বছর আগের মতন কেক আর হয় না। কেকের ময়দা তো এখুন দুপা দিয়ে মাড়িয়ে-মাড়িয়ে মাখে কলকাতায়।

    অতশত বুঝিনে, মোচরমান না হলেই হল। খিশিদির অজ্ঞানতার আহ্লাদ, আরো গভীরে, জানায়, তা বেমমোও যা খ্রিস্টানও তাই। আমিও তাই, বল ? কিন্তু দুপুরবেলা তুই আমার জন্যে হিন্দুর মন্তর পড়লি যে বড়ো। শুয়ে শুয়েই, যিশু কাঁধ নাচিয়ে আহ্লাদিত।

    জানলায় ফিকে শীতের শ্রবণসুভগ শুক্লপক্ষের স্তব্ধতা। ভুলো মনের বাতাসে আওয়াজ নেই। যিশু ফিসফিসিয়ে, তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব আমি। আমার কাছে ক্যামেরা আছে, কাল ফোটো তুলব তোমার।

    খুশিদির বিষণ্ণ উক্তি, আমার কোনো ছবি নেই, কেউ তোলেনি আজ ওব্দি। ভোটের ছবি তুলেচে যেন শাঁকচুন্নি। তারপর বহুক্ষুণ নিরুত্তর থেকে, কিন্তু কী করে যাব, দাদা এক পা-ও যেতে দেবে না। চাদ্দিকে দাদার পঞ্চায়েত, কিসক সভা, হ্যানোত্যানো কমিটি, হিমঘর, সমবায়ের লোকে গিজগিজ করচে। কী করে এড়াব ? সবাই চেনে আমাকে।

    বৈশাখী পূর্ণিমার মেলা আসছে তো। গাঁয়ের মুখে তো বিরাট মেলা বসে শুনেছি। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় কেউ খেয়াল করবে না। আমি কলকাতা থেকে টানা গাড়ি আনব।

    শরীর কেঁপে ওঠে খুশিদির। যিশুর মাথাকে চেপে ধরে উন্মুক্ত বুকে। যা ভালো বুঝিস, কর। কিচ্ছু ভাল্লাগে না আর। রাত্তিরেও চুল আঁচড়ে শুস ? এক লহমায় যিশু ফিরে গেছে মায়ের কোলে। চাঁদের আলোর ক্ষীণ স্বাদ ওর জিভে। রোমকূপের গোড়ায়-গোড়ায় পড়ে গেছে সাজো-সাজো রব। একত্রে অনোন্যোপায় হয়ে ওঠে দুজনে, অভিভূত, দিশেহারা, বিভোর, আচ্ছন্ন। অন্ধকারে তিরতির করে কাঁপতে থাকে অন্ধকার। চোরাবালির কেন্দ্র থেকে প্রসারিত হাতের অনুনয়ের মতন খুশিদির নিঃশ্বাস। একে আরেকের ব্রাহ্মমুহূর্ত গড়ে তোলে আর প্রশমিত করে পারস্পরিক স্পন্দন।

    প্রাকভোরে, শুক্লপক্ষ তখুনও কৃষ্ণপক্ষে ঢলে পড়ার জন্যে তৈরি হয়নি, ঘুম ভেঙে গেলে খুশিদি যিশুকে ঝাঁকায়। এখুনো ঘুমোসনি, নিজের বিছানায় যা, বিপদ হবে শেষকালে। যিশু যখুন মশারি তুলে বেরোতে যাচ্ছে, ওর বাঁ হাত ধরে, না যাসনে, আমার কাছে থাক। যৌবন ফুরোতে থাকা নারী-পুরুষ চুপচাপ পাশাপাশি শুয়ে নৈশব্দ্যের খাঁই মেটায়। চরাচরের অপার্থিব উম কনশিকাঁথার রূপ নিয়ে ঢেকে রেখেছে ওদের দুজনকে। বহুদূরে, কোনো পথকুকুরের খেদোক্তি শোনা যায়। এই এভাবে পরস্পর, একেই বোধয় শুশ্রুষা বলে, প্রাণ জুড়োনো বলে, মনে হচ্ছিল যিশুর।

    অ্যাতো জমিজিরেত প্রতিপত্তি কী করে করলে গো তোমরা ?

    বিনময় করে। জানিস তো, বিনময় ? ওখেনে আমাদের খেতখামার ঘরদোরের বদলে এখেনে কে একজন ফরোজন্দো মোমেনিন ছিল, তার সঙ্গে অদল-বদল। তক্কে-তক্কে ছিল দাদা।

    ওঃ বিনিময় ! কখুনো তো টের পাইনি ?

    তুই আবার কী টের পাবি ? তখুন কতই বা বয়েস তোর।

    গায়ে কাঁথা চাপা দিয়ে পেছনের ওসারায় এসে দাঁড়ায় যিশু। সকাল হয়ে এল। স্পষ্টবাক বিবাহযোগ্য কোকিল ডাকছে। সঙ্গে ফস্টিনষ্টি আরম্ভ করেছে ফাল্গুনের প্রেমানুভূতিময় কচি-কচি বাতাস। বেশ ভালো বাগান করেছে ভবেশকা। ঘষাকাঁচ কুয়াশা দেখা যাচ্ছে দূরের ঠান্ডা দোচালাগুলোকে ঘিরে। সজনেফুল আঁকড়ে সদ্যোজাত লিকলিকে সজনে ডাঁটারা বেরিয়ে এসেছে রোদ্দুরের উড়ন্ত উনকির সঙ্গে খেলবে বলে। কাঁটাকাঁটা সবুজ ছুনিফলের মুকুটে তালঢ্যাঙা রেড়িগাছ। পুকুরের পাড়ে মুখ তুলে পাতাহীন গাছে আমড়ার ফিকে সবুজ বউল। ছোটো-ছোটো প্রায়ান্ধকারে দোফলা গাছে পুরুষ্টু সফেদা। পাকা আর ডাঁসা অজস্র টোপাকুল, আলতো নাড়ালেই ঝরে পড়বে গোঁসা করে। গা ভরতি নানা মাপের সবুজ আঁচিল নিয়ে কাঁঠাল গাছ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে মুখে পাউডার মেখে নার্সারি স্কুলের খোকাখুকুর মতন জামরুল ফুলের দলবদ্ধ কুঁড়ি। লালচে-সবুজ ছাই মেখে কচি খসখসে ফলসা পাতা। নরম তুলতুলে গুটিপোকাকে আলগোছে খেয়ে ফেলল ময়নাপাখি। কত রকুমের পাখির ডাক। বেলা হলে আর শোনা যায় না তো ! গলায় কোরালের মালা ঝুলিয়ে মোচা ফেলছে সুপুরিগাছের সারি। জীবনমুখী গায়কের দ্রুতলয় গিটারের মতন বাঁশের শুকনো ফ্যাকাশে গাঁটে কাঠঠোকরা।

    খালি গায়ে, বাগানের ঘাসপথ বেয়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়ায় যিশু। আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে বাতাস। বাতাসে ডাঁটো স্ট্যাচু যেন। সব স্হির। দানদিকের বিশাল গাছে তেঁতুলপাতাও কাঁপছে না। বাঁধানো ঘাটে বয়ঃসন্ধির বালিকার মতন একধাপ ওপরে তো একধাপ নিচে খেলা করার পর ক্লান্ত হয়ে গেছে টলটলে পুকুর। আঁশটে গন্ধের ঐতিহ্যলালিত কুচোপোনার ঝাঁক ভেসে আছে আলতো রোদে ভেজা প্ল্যাঙ্কটন-পোকা খাবে বলে। ঘাটের জলে কাঁসার এঁটো বাসন। স্হানীয় চোরেরা ভবেশকাকে বেশ ভয় পায় বোধয়।

    কত জল পুকুরটায়। কত্তো। কলকাতায় হরদম ফেরুল নোংরা, জলের পাইপ পাম্প করার ঝঞ্ঝাট, স্টপকক চুরি, ফি-দিন মেরামত। জলের জন্যে টেনশানের চূড়ান্ত। অথচ এই অজ পাড়াগাঁয় অগুনতি পুকুর। ভবেশকার পুকুর তিনটের মধ্যে এটা সবচে ছোটো। পুকুরের উত্তরে গোয়ালঘর। সঙ্কর গাই রয়েছে দুটো, জার্সি।

    কত কি করে ফেলেছে ভবেশকা। দেশভাগের দরুন তাহলে জোতদার বিনিময়ও হয়েছিল। এগাঁয়ের লিগি মুসুলমান গিয়ে ইস্তাহারি রাজনীতিতে দড় হিন্দু জোতদার এল। মূল্যবোধ যে কে সেই। খুঁটিগুনোর তেমন তফাত হয়নি। তিরিশ বছর আগের ভবেশকার স্লোগান লাঙল যার জমি তার আজ ফলে গেছে। হালবলদ, জোয়াল-লাঙল ভবেশকার, জমিও ভবেশকার। সমন্বিত গ্রামীণ বিকাশ, প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প, ডোকরা, সাক্ষরতা অভিযান, রক্তদান শিবির, মৎস্য উন্নয়ন, পঞ্চায়েতের বরাত, তাঁতিদের সুতো, ত্রাণ প্রকল্প, তপশিলি কল্যাণ, হ্যান-ত্যান কমিটি, সমবায় তাপবিদ্যুৎ, স্বাস্হ্যকেন্দ্র, লোন-দাদন, আলুর বন্ড, ক্লাব, পুজো, নাটকদল, মেলা, বায়োগ্যাস, ধোঁয়াহীন চুলো, প্রশিক্ষণ, মডেল শৌচাগার, সব ভবেশকার, ভবেশকাদের, সব, সব, সঅঅঅঅব।

    পাতালের আলু, মর্ত্যের গতিপ্রকৃতি আর স্বর্গের খুশিদি, সমস্তকিছু ভবেশকার কবজায়। শাসনে এত আলু যদি সংরক্ষণ করা না-ই যাবে, পড়ে-পড়ে নষ্ট হবে, হিমঘরে গিয়ে পচবে, যাহোক-তাহোক দামে বেচে দিতে হবে চাষিকে, তাহলে বিঘের পর বিঘে পরিশ্রম, টাকা আর সময়ের অপচয় কেন ? ব্লকের আর জেলার আধিকারিকরা করছিলটা কী ? কী করছিল ? অ্যাঁ ?

    কোনো একটা অচেনা পাখির ডাকে চমকে উঠেছে যিশু। স্পষ্ট শুনেছিল পাখিটার গান। পরপর তিনবার পাখিটা বলল, ‘বাল ছিঁড়ছিল’।

    তিন সত্যিই করেছিল পাখিটা। পরের বছর নিশ্চয় প্রচণ্ড দাম বাড়বে। তখুনও কৃষি আধিকারিকরা একই কাজ করবে। ওঃ। চার বছর আগে আলু হয়েছিল একান্ন লক্ষ টন, যখুন কিনা সারা পশ্চিমবঙ্গের হিমঘরে রাখার জায়গা ছিল বাইশ লাখ টন। এবছর হয়েছে সত্তর লাখ টন। রাখার জায়গা আটাশ লাখ।

    যিশু ভেবেছিল বুঝি কাঁচা ফাল্গুনের ঘাসে শিশির মাখতে বেরিয়েছে একজোড়া বেঁজি, তার আওয়াজ। পেছন ফিরে দেখল ভবেশকা, নিমডাল পাড়ছে নাবালক গাছ থেকে। বলল, এ নাও যিশু, নিমের দাঁতন করো। খ্রিশ্চানরা কি দাঁতন করে ? টুথব্রাস বেরোবার আগে কী করত সিরিল র‌্যাডক্লিফ ? আর কঘর বাঙালি খ্রিশ্চান রইল হে এদেশে ? চার্চ-টার্চ যাও ? নাকি সেসবও বাইরের লোকেরা হাতিয়ে নিয়েছে ? নাকতলায় ডালগিশ সায়েবের বাড়িটা আছে ? ডালগিশ তো তোমাদের জ্ঞাতি, না ? তারপর ডালগিশের বাটলার, আরদালি, বাবুর্চি, খাদিম অনেকঘর খ্রিশ্চান তো ছিল নাকতলা-বাঁশদ্রোণিতে ?

    প্রশ্নাবলীর দাঁতন-বুলেটে যিশুর একাগ্রতা ছত্রভঙ্গ। অপ্রস্তুত, ও বলল, হ্যাঁ, ডালগিশ পরিবারে বাবার মাসির বিয়ে হয়েছিল। বাঙালি খ্রিস্টান বলতে গেলে আর নেই কলকাতায়। বাবা তো ওদিকের বাড়ি বেচে সেই আপনারা কলোনি ছাড়ার বছর দুয়েক পরেই পার্ক স্ট্রিটে ফ্ল্যাট কিনেছিল। সারা পশ্চিম বাংলায় আমিই শেষ বিশুদ্ধ বাঙালি খ্রিস্টান।

    হ্যাঁ, বলছিলে বটে। অত বড় বাগানবাড়ি ছেড়ে শেষে সেই ফ্ল্যাটে ! তা বেশ, বেশ। নাটকের চরিত্রের চিৎপুরি সংলাপের মহড়ার ঢঙে ভবেশকা। হিমঘরের লাইসেন্সটা আমরা শিগগিরই রিনিউ করিয়ে নেব। কোথায় আটকে আছে জানোই তো, অ্যাতো হিমঘর দেখেছো ঘুরে-ঘুরে। ড্রাই অ্যান্ড ওয়েট বাল্ব-থার্মোমিটারের অর্ডার দিয়ে রেখেছি ঠিকমতন তাপ মাপার জন্যে। পরিচালন সমিতির কার্যবিবরণীও এবার থেকে রেজিস্টারে লিখে রাখার ব্যবস্হা থাকবে, পরিচালকরা সই করবে তাতে। ডিফিউজানের বদলে বাঙ্কার পদ্ধতিতে পালটালে খর্চাখরচ কেমন পড়বে তার একটা তলবি-সভা হবে দিন-সাতেকের মধ্যে। বিজলির চেয়ে ডিজেলের খরচটা হয়তো কম, তাই আরকী। তারপর বিদ্যুৎ তো আজ আছে কাল নেই। দাঁতনের সঙ্গে চিবিয়ে-চিবিয়ে সেই প্রশ্নগুলোর একনাগাড় উত্তর দিয়ে গেল ভবেশকা যেগুলো মোমতাজ হিমঘরের কর্মীদের করেছিল যিশু, অথচ তারা সঠিক জবাব দিতে পারেনি বা চায়নি।

    ওহ-হো, ভবেশকা আমি এখানে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে আসিনি, বলেছি তো তোমায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা নাবার্ড কিংবা অমন কোনো ক্ষেত্রসমীক্ষক সংস্হার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। আমি নিজের কনসালটেনসি খুলেছি তো। একসঙ্গে অনেক কাজ নিয়ে ফেলি, কুলোতে পারি না একলা। এই কাজটা মিৎসুবিশির জন্যে করছি। ওরা আলুর নানারকুম ব্যবসায় ঢোকার আগে জেনে নিতে চায়। আমি তো চাষবাসের ব্যাপার বিশেষ জানি না। তাই বাড়তি কথা জিগেস করে ফেলি।

    হ্যাঁল য়যোতাজপুরের মামুদ মাফুজ বলছিল, তুমি নাকি ওর বাপের কাছে জানতে চেয়েছিলে মাদার সিডের ব্রডকাস্টিং কখুন হয়। আমরা বলি বীজ আলু পাতা। আরেকটা কথা। তোমার রিপোর্টে লিখো যে আমি এই ব্লকে কাভুর জাতের লাভজনক ওল চাষে সফলতা পেয়েছি। কাভুর ওলে মুখি বিশেষ হয় না, গলা কুটকুট করে না, ছোটো-ছোটো টুকরো কেটে আলুর মতন বসানো যায়। তোমায় খাওয়াবো অখন, তা হলে টের পাবে। আগে এখেনে সবাই সাঁতরাগাছি ওল চাষ করত। সিঙুর, বলরামবাটি, বাসুবাটি, মির্জাপুর, ঝাঁকিপুর, বারুইপানা সবখানে এখন কাভুর বসাচ্ছে চাষিরা। পা#চশো গ্রাম বীজে দশ কেজি মতন ওল পাচ্ছি, বুঝলে। অনেকে তো ওলের সঙ্গে বাড়তি ফসল হিসেবে লাল শাগ কি নটে বুনছে। বকবকম ফুরোলে, নিম দাঁতনের সঙ্গে ওলের জ্ঞান-চেবানো কথাবার্তা একদলা থুতুতে পালটে থুক করে রজনীগন্ধার ঝাড়ে ফেলল ভবেশকা। শিউরে উঠল ফুলগুলো।

    ধবধবে ফুলগুলো শিউরে উঠছে, স্পষ্ট দেখতে পায় যিশু। এই সাতসকালে ওলের জ্ঞানে বিব্রত লাগে ওর। কেনই বা প্রসঙ্গটা, আর কী-ই বা উদ্দেশ্য, ঠা্র করতে পারে না ও। চন্দ্রমুখী ধেকে ওকে কাভুরে নাবাচ্ছে ভবেশকা। পরের বছর আলুর দাম তিনচারগুণ বেড়ে গেলে শ্রমিক-মজুরদের খোরাকিটা ওল দিয়ে সামলাবার জন্যে সম্ভবত নিজেকে আগাম তৈরি করছে পশ্চিমবাংলার বঙ্গসমাজ।

    ভবেশকা নিমজ্ঞান চেবানো বজায় রাখে। চোত-বোশেখে ওল লাগালে ভাদ্দর-আশ্বিনে ফি-একরে পঞ্চাশ কুইন্টাল মতন পাচ্চি, বুঝলে। আলু যাদের মার খেলো, ক্ষতি নেই, পুষিয়ে নেবে। বোরো থেকে পোষাবার উপায়নেই। চাষের জল নেই। আরেক-দলা থুতুর ছিবড়ে পড়ে রজনীগন্ধার জামাকাপড়ে। আচমকা প্রসঙ্গ পালটে যেতে শোনে যিশু। আমাদের পঞ্চায়েত বিদ্যুতের বিল বাকি রাখে না কখুনো, বুঝলে, একটা রেকর্ড সারা পশ্চিমবঙ্গে। আরেকবার থুতুর পর বকনা বাছুরটাকে আঙোই পেড়ে ডাকে ভবেশকা।

    জল তাহলে এক ভয়ংকর সমস্যা। এই তো মনে হচ্ছিল গাঁয়ে কত জল। মাটির তলাকার জল যাতে রাজ্যসরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাই ব্লকগুনোকে কালো, ধূসর, সাদা, তিনরকুম ভাবে ভাগ করতে বলেছিল বিশ্বব্যাঙ্ক। কিন্তু কে কার কথা শোনে। চাষিকে বারণ করলেই অন্য পার্টিতে গিয়ে ঢুকবে। যার যেখানে ইচ্ছে শ্যালো বসাচ্ছে। সাদা ব্লক ধূসর হয়ে গেল। জল ফুরিয়ে ধূসর ব্লক হয়ে গেছে কালো। তারপর আর জল নেই। জল নেই তো জেলাশাসককে ঘিরে চেঁচাও। যেন কালেক্টর সায়েব মুতে-মুতে মাটির তলাটা আবার ভরিয়ে দেবে জলে। এরপর খাবার জলও জুটবে না। চাষের কীটনাশক চুয়ে-চুয়ে পাতালের জলও দূষিত হয়ে গেছে।

    কত নদীর বুকে, আজকাল, না, সাঁতার নয়, সাইকেল রেস হয়। নিজের চোখে দেখেছে যিশু। আর শুধু বোরো কেন ! ওই তো, বাঁকুড়ার মড়ার, বেলসুলিয়া, বাঁকদহতে রবি মরশুমে শ্যালো বসাতো না কেউ। উপচে পড়ত কংসাবতীর খালের জল। আচেরুদ্দি মল্লিক, আরেফ মণ্ডল জোড়া পাঞ্জাবি বলদ বিক্কিরি করে শ্যালো বসিয়েছিল খালের ধারেই। জল ওঠেনি। অক্টোবরে পাতা র‌্যাশন আলুর চারা বাঁচাতে গোরুর গাড়িতে ড্রামে করে ডিপ টিউকলের জল এনে ঢেলেছিল। বাঁচেনি। দিলশাদ বায়েন, আফিফ দালালদের চোপসানো চোখমুখ দেখে আগামী সংসারের দিনকাল আঁচ করেছিল যিশু।

    ওদিকে মেদিনীপুর, কাঁথি, এগরা, রামনগর, বাদলপুর, সাতমাইলের চাষিরা ভোগরাইতে গিয়ে উড়িষ্যা কোস্ট ক্যানালের লকগেট অপারেটারদের মোটা টাকা খাওয়ালে তবেই সেচের মিষ্টি জল জোটে। বাদলপুর পঞ্চায়েতের সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক দেবেন জানা নিজেই বলেছিল, নিজে। মাঝি-মালোরাও শংকরপুর মেছোঘাটায় ভুটভুটি নিয়ে যাবার জন্যে গাঁটের মালে হাসি ফোটায় অপারেটারবাবুদের মুখে। ফেরার পথে কিলো দশেক মাছ গচ্চা যায়। স্বাধীনতার আগে লোকে ওই খালে নৌকো বেয়ে কলকাতায় যেত, জানেন স্যার। বোরো তো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমসি হয়ে গেল। এবারে আর ধর্ম নিয়ে দাঙ্গা হবে না, দেখে নেবেন, হবে জল নিয়ে।

    বহিরাগত, বহিরাগত, বহিরাগতর মতন এই হুগলি জেলার খানাকুল, মারোখানা, ডোঙ্গল, রামমোহন, চিংড়া, ধনেখালি, পাণ্ডুয়ায় দেখেছে যিশু, অশান্তির তোয়াক্কা করছে না চাষি। মুণ্ডেশ্বরী, শংকরী, দ্বারকেশ্বর নদী আছে। জল নেই। ডি ভি সি আছে। জল নেই। বড়োসায়েব জিপগাড়ি আছে। জল নেই। ভজহরি ভুঁইয়া সঙ্গে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিল। ছোপছপে শংকরীর এখানে-সেখানে হাঁটু জলে বেআইনি বোরো বুনছে চাষি। মজা-যাওয়া কানা দামোদর আবার বর্ষায় হুড়মুড়িয়ে ঢুকে যায় হুগলি-হাওড়ায়। ত্রাণবাবুদের ঢল নাবে।

    গড়চুমুকে আটান্ন কপাটের স্লুইসগেট কোন কাজেই বা এলো, বলুন দিকি ? যিশুকে সরকারি আধিকারিক ঠাউরে অভিযোগ করেছিল ক্ষুদিরাম ঢাং। বছর কুড়ির আগের বাণে দ্বারকেশ্বর রাস্তা পালটে সেঁদিয়ে গিসলো গোয়ালসারা, খিলগাঁ, চোটডাঙল, শ্যামবল্লভপুর, কৃষ্ণবল্লভপুর, কলাগাছিয়ায়। নদী তো শুধরে ফিরে গেল আগের খাতে। চাষের জমিতে ফেলে গেল এক মানুষ গভীর ধু-ধু দিগন্তের বালি। হাজার তিনেক জাতচাষি এখুন দিনমজুর। দিনমজুর হলেই তো আর কাজ জোটে না !

    সেচ দপ্তর কী করে ? গ্রামোন্নয়ণ দপ্তর কী করে ?

    অচেনা পাখির ডাকে, পর পর তিনবার, সোচ্চার জবাবে চমকে ওঠে যিশু। ভাবনা গুলিয়ে যায়।

    শেষবার থুতু ফ্যালে ভবেশকা। কী, এখুনও ছোটোবেলার মতন চমকাও নাকি ? ন্যাচুরোপ্যাথি করো না কেন ? আমার তো আলসার সেরে গেছে।

    কটা দাঁত আর আছে ভবেশকার যে নিমের ডাঁটাটা সজনে খাড়ার মতন চিবিয়ে ফেলেছে ? নকল দাঁত হলে দাঁতন কেন ?

    নিমডালের কুচো-থুকথুক সেষে বলল, কালকে যখুন তোমার মা-বাবার দুর্ঘটনায় মারা যাবার খবরটা শুনলুম, মনটা বড্ডো খারাপ হয়ে গিসলো। ওঁয়ারা না থাকলে তো খুশিটা মানুষ হতো না। কত দুঃখের দিন গেছে। ঘাটে বসে পুকুর-কুলকুচো করে ভবেশকা।

    বাবা-মায়ের দুর্ঘটনার সূত্রেই আদিত্যর সঙ্গে যিশুর পরিচয়। বাগবাজারে গিসলো বাবা-মা, নয়ন সাহা লেনে ফাদার নরম্যানকে সেকেলে ধর্মান্তরিত বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারের এখনকার হালহকিকতের তথ্য দিতে, অবহেলিত সাংস্কৃতিক ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। বিরল প্রজাতির এই ধর্মসম্প্রদায়ের নিশ্চিহ্ণ হবার কারণ গবেষণা করছেন ফোর্ড ফাউন্ডেশানের আওতায়। বাবা ছিলেন শেষ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে চাদর, পায়ে পাম্পশু খ্রিস্টান। ক্রিসমাসের দিন মা পরতেন গরদের শাড়ি। খাঁটি বাঙালি খ্রিস্টান মেয়ের সন্ধান করতে-করতে যিশুর বিয়ে দেওয়া হল না।

    শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে, ল্যাজ-ওড়ানো ঘোড়ায় বসা নেতাজির মতন দেখতে ব্রোঞ্জের মনীষীর চোখের সামনে, হাত উঁচিয়ে ট্যাক্সি ধরতে গেলে, তিন নম্বর রুটের প্যাঙপেঙে জবেদকা বাসের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে রক্তাক্ত, মায়ের ডান হাত তখুনও বাবার বাঁ হাতের মুঠোয়। রাস্তার লোকেরা প্রথমে বাসটাকে জ্বালিয়ে আর চালককে পিটিয়ে মেরে ফেলে, তারপর একটা পথচলতি প্রাইভেট গাড়িতে বাবা-মাকে চাপিয়ে নিয়ে গিসলো আর জি কর হাসপাতালে। পথেই মৃত্যু।

    মৃতদেহ অশনাক্ত অবস্হায় আর জি কর থেকে মাছি ভনভনে লাশগাড়িতে মেঝের ওপর দোল খেতে-খেতে চলে যায় নীলরতন সরকার হাসপাতালের মর্গে। সারারাত, পরের দিনও যিশু হন্যে হয়ে খুঁজেছে থানায়, চার্চগুলোয়, বাবার বন্ধু আর প্রাক্তন সহকর্মীদের বাসায়, হাসপাতালে। তৃতীয় দিন এন আর এস মর্গে পৌঁছে স্তম্ভিত। চাপা কান্না আর অসহায় ক্রোধে কন্ঠরুদ্ধ, ও আবিষ্কার করেছিল উদোম উলঙ্গ বাবা-মাকে। দুজনেরই বাঁ হাত আর কাঁধ থেঁতলে গেছে। ঘড়ি, চশমা, পার্স, আংটি, হার, চুড়ি তো নেই-ই, রক্তে ভেজা পোশাক আর অন্তর্বাস হাপিস। মা-বাবাই কেবল নয়। মর্গের টিমটিমে শীতের ইঁদুরমরা গন্ধে গাদাগাদি পড়ে আছে অনেক লাশ। উলঙ্গ। কাঠ। স্টার্ক নেকেড, ঠাণ্ডা শক্ত হয়ে পড়ে আছে প্রত্যেকে। উদ্ভিন্ন কিশোরী, পীনোন্নত গৃহবধু, ঢাউস প্রৌঢ়া, হাড়গিলে বৃদ্ধার হাঁ-মুখ-খোলা চেয়ে-ধাকা মৃতদেহও রেয়াত পায়নি।

    মৃতদেহ খালাস করতে গেলে, কালু ডোমের স্পর্ধিত হাসির খিক-খিক সিগারেট টুসকি ভোলা যাবে না। এসট্যাবলিশমেন্টের নির্মম হাসিখানি। মহানগর কলকাতা আজ এইসব কালুয়া মুদ্দোফরাসের বজ্র-আঁটন মুঠোয়। ধর্মমঙ্গলের কালু ডোম এখুন পশ্চিমবাংলার নিখিল মর্গের যক্ষ। থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে সেখানে মুদ্দোফরাসের খিকখিকের বদলে পেটমোটা সরকারি হাসির খাকিরঙা গিগগিগ। পশ্চিমবঙ্গে হাসির সরকারিকরণ হয়ে গেছে। সোশাল অ্যাকশান ফোরামের শিশির ভট্টাচার্য, মানবাধিকার কমিশনের চিত্তোষ মুখোপাধ্যায়ও প্রতিষ্ঠানের উত্তরঔপনিবেশিক ডোমদের কাছে অসহায়। শেষে, একেবারে শেষে, ভেঙে পড়েছে যখুন, যখুন ওপরতলায় ধরাধরি ব্যর্থ, অরিন্দমের মাধ্যমে আদিত্য বারিকের কাছে পৌঁছেছিল যিশু। আদিত্যর দৌড়ঝাঁপে রেস্ত রফার পর খালাস করতে পেরেছিল মৃতদেহ।

    আদিত্য কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, এগুলো একটু-আধটু মেনে নিতে হয় যিশুদা। মন খারাপ করে লাভ কী ? স্বাধীনতার পর কত লোকের স্বজন যে অজান্তে পচেছে, কানের লতি নাকের পাটা চোখের পাতা খেয়ে ফেলেছে ইঁদুরে, মনে হয়েছিল যিশুর, ওফ, বীভৎস, বীভৎস।

    কী হল, কাঁদছ নাকি যিশু ? ভবেশকা বাঁ হাত রাখে ওর, যিশুর, কাঁথাঢাকা কাঁধে। লাল সুতো দিয়ে নকশা-করা একজোড়া উড়ন্ত প্রজাপতির ওপর রেখেছিল হাতটা। যিশু জানায়, না, আজকাল ভোরবেলা আমার চোখ দিয়ে জল পড়ে। ডাক্তার বলেছে কান্নার থলিটা চোখের তলা থেকে কেটে বাদ দিতে হবে।

    যিশি কিন্তু জানাল না যে ক্যরটেজে কফিনদুটো নিয়ে গিয়ে সমাধিস্হ করার দিন বিকেলেই, ও যখুন কমপিউটার টেবিলের সামনে অনাহারে ক্লান্ত ধানশীষের মতন মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিল, দেয়ালে ভাসাই-এর সেকোয়েরার গড়া কাঠের বেদনাময় খ্রিস্ট, পার্ক স্ট্রিটের বাতিস্তম্ভে হ্যালোজেনের বিষাদে রবিবারের রাস্তা একদম একাকী, হৃদরোগের অতর্কিত আক্রমণে চেয়ার থেকে লুটিয়ে পড়েছিল সাদাকালো চৌখুপি মোজেকে। রক্তচাপ ছ্যাঁৎ করে পড়ে গিয়ে ওপরে সত্তর নিচে চল্লিশ, নাড়ি স্পন্দন কুড়ি। হুঁশাহুঁশহীন স্হানান্তরিত হয়েছিল, এত জায়গা থাকতে, কত জায়গায় খ্রিস্টানদের সুবিধে থাকতে, বাইপাসে একটা হাসপাতালে, যেখানে গেট থেকে ঢুকেই হিন্দু দেবতার মন্দির ডাক্তারদের দায়মুক্ত করার জন্য সদাজাগ্রত।

    যিশুর চব্বিশঘন্টা কাজের ছেলেটা, উত্তর দিনাজপুর ভাঙাপাড়া গ্রামে বাড়ি, পতিতপাবন কীর্টনীয়া, পুতু, যাকে কমপিউটার, ফ্যাক্স, ই-মেল, অডিও কনফারেনসিং, ইনটারনেট চালাতে শিখিয়ে দিয়েছে যিশু, সামনের ফ্ল্যাট থেকে অজয় ব্যানার্জিকে ডেকে আনতে, ওই অজয়ই ভরতি করিয়েছিল হাসপাতালটায়, চেনাজানা আছে বলে।

    নিজেই প্রচণ্ড টেনশনে ছিল অজয়, তবু অনেক করেছিল। ও তো নিজেও একলা থাকে। ওর দিদির হেনস্হার খবর সেদিনই বেরিয়েছিল খবরের কাগজে। যিশুকে ভরতি করে, পতিতপাবনকে ইনটেনসিভ কেয়ারের সামনে বারান্দায় বসিয়ে, বাগবাজারে নরম্যান সায়েবকে খবর দিয়ে, রাত্তিরের দূরপাল্লার ট্রেনে গিয়েছিল দিদির কাছে।

    কী হয়েছিল হে ? পুতু বলছিল নাকি অনেক নোংরামি ? বিছানায় শুয়ে, অজয় অসহায় ফিরে এলে, জানতে চেয়েছিল যিশু।

    কথা বলার আগেই ফুঁপিয়ে উঠেছিল অজয়। তারপর সরি বলে, ধাতস্হ হবার পর, যা বলল, তা শুনে, ওষুধগন্ধের পারদর্শী মশারির শীতাতপে শুয়ে, যিশুর মনে হয়েছিল, এসব স্বাধীনতা-উত্তর সমাজ আর দেশভাগোত্তর হিন্দুত্বের দোষ। খ্রিস্টান সমাজে এরকম ঘটনা অসম্ভব। কালু মুদ্দোফরাসের ইবলিস ঔরসে জন্মতে আরম্ভ করেছে বাঙালিরা।

    দিদি বেঙ্গলি কোলফিল্ড উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের হেডমিস্ট্রেস। শুক্কুরবার ইশকুল খোলার সময় গেটের মুখে নানা বয়সের ছাত্রী আর তাদের বাবা-মা চাকর-চাকরানির সামনে একদল লোক কান ধরে ওঠবোস করিয়েছে, শাড়ি-ব্লাউজ ছিঁড়ে দিয়েছে, তাদে মধ্যে মহিলাই ছিল বেশি। আসলে, একদল স্হানীয় নেতা ইশকুলের মধ্যেই জোর-জবরদস্তি দুটো ঘর জবরদখল করে আরেকটা ইশকুল চালাচ্ছিল বলে দিদি ওদের সেই কবে থেকে বলছিল সময়টা আরেকটু এগিয়ে নিতে, যাতে মাধ্যমিকের ক্লাস আরম্ভ হলে বাচ্চাদের চেঁচামেচি এড়ানো যায়। কথায় কান দেয়নি ওরা। দিদি তাই রেগে-মেগে জবরদখল করা দুটো ঘরে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। তাইতে এই অবস্হা। ভেবে দেখুন একবারটি।

    সে আবার কী রে বাবা ! ইশকুলের মধ্যেই জবরদখল ইশকুল ? শুনিনি তো আগে। বলেছিল হতবাক যিশু। একদল ছত্রাক-প্রতিম বাঙালির কাছে জবরদখল একটা ভালো আর বৈধ মূল্যবোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে বটে। ঘরবাড়ি জমিজমার জবরদখল ছোটোবেলা থেকেই দেখেছে ও। ওদের নিজেদের ধানি জমি দখল হয়ে কলোনি হয়েছিল। তখনকার ওই অঞ্চলের মুসুলমান চাষিগুলোর জমি বসত দখল হয়ে পরের প্রজন্মে তো বলতে গেলে চাষবাস থেকে একেবারে উৎপাটিত। কিন্তু ইশকুল দখল করে ইশকুল ! নাঃ, ভাবা যায় না।

    হাসপাতালের সেবিকা মেনকা পাইক পাশে দাঁড়িয়ে গল্প গিলছিল। বলল, যাকগে, আর এসব শুনতে হবে না, মনিটর দেখুন হার্টবিট পঁচাশিতে চড়ে দপদপ করছে।

    হাসপাতালের কর্তারা এমন লোভী যে ভরতি হবার সঙ্গে-সঙ্গে ঢুকিয়ে দিসলো ইনটেনসিভ কেয়ারে। তারপর টানা পনেরো দিন রেখে দিলে আই সি সি ইউতে, যিশু একজন মালদার রুগি টের পেয়ে। দরকার ছিল না, তবু দুবেলা ইসিজি, ইকো, রক্তের নানা পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, অ্যানজিওগ্রাফি। তারপর বেলুন অ্যানজিওপ্লাসটি করে, কুঁচকির ওপর স্যান্ডব্যাগ চাপিয়ে, খাটের হাতলে পা বেঁধে রাখলে। মান্ধাতা আমলের সব চিকিৎসা পদ্ধতি। অনেক রুগি এদের খপ্পরে পড়েছে ঢাকা-চাটগাঁ থেকে এসে। যন্ত্রপাতি স্টেরিলাইজ করা ছিল না বলে যিশুর ডান দিকের উরু হাঁটু পর্যন্ত জোঁক লাগার মতন ছিট-ছিটে কালো ফোসকায় ভরে গিয়েছিল। ওফ, দুঃস্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন। সরে উঠে ফেরার পর পুতু পুজো দিয়ে এসেছিল নবদ্বীপের মায়াপুরে, হিন্দুদের চার্চে।

    ইনটেনসিভ কেয়ারটা ছিল বিশৃঙ্খলা, অযত্ন, দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা আর অকর্মণ্যতার স্বর্গরাজ্য। ছোকরা ডাক্তার-ডাক্তারনিগুনো শোবার পোশাক পরে রাত্তিরে ঘুমুতে চলে যায় রুগিদের প্রতি খেয়াল রাখার বদলে। সেবিকা, নার্স আর ঝি-চাকরগুনো ঢুলতো পালা করে, নাকও ডাকত। মাঝেমধ্যে বকরবকর ফস্টিনষ্টি। হাঁসফাস রুগির উদ্দেশে ইয়ার্কি থামিয়ে ডাক্তারকে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে আনতে-আনতে, দেখেছিল যিশু, শরীরে বারতিনেক খিঁচ ধরে সে টেঁসে গেল। রুগির মরে যাবার পর, বাইরে রাত-জাগা অভূক্ত দিশেহারা স্বজনকে ডেকে এনে, মৃতের দেহে লাগানো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির চক্রাবক্রা সবুজ আলো দেখিয়ে, মুখে অভিনয়ের কাঁচু আর মাচু এনে বলেছে, পেশেন্টের অবস্হা খুব খারাপ, আমরা চেষ্টা করছি, ভগবানে ভরসা রাখুন। আত্মীয়রা বাইরে বেরিয়ে যেতেই ঊর্ধ্বতনরা অধস্তনদের নির্দেশ দিয়েছে, ডেডবডি এখন রিলিজ করিসনি, বিল সেকশান থেকে আগে পুরো পেমেন্টের কনফার্মেশান আসুক।

    শুনে-শুনে আর দেখে-দেখে, প্রতিদিন অন্তত একবার, মনে হয়েছিল যিশুর, ভগবান লোকটা হিন্দুদের অসাধারণ আবিষ্কার। তা না ঈশ্বর, না দেবতা।

    আত্মীয়স্বজনকে, মৃত অথচ জীবন্তের-অভিনয়রত রুগি দেখানো হয়ে যাবার পর, যন্ত্রপাতি অতিতৎপরতায় খুলে, খরচাপাতির কাগজ বানিয়ে, কমপিউটারে যোগফল মিলিয়ে, লাশকে সাদা চাদরে ঢেকে, স্ট্রেচারে চাপিয়ে, অপেক্ষারত ভগ্নহৃদয় আত্মীয়কে বলা হত, অনেক চেষ্টা করেছিলাম আমরা, বাঁচানো গেল না। হোটেলের মতন, হাসপাতালটায় লাশেরও চেকআউট টাইম আছে। লাশ তো আর বলবে না যে সে অনেক আগেই চেকআউট করেছে, বিলটায় একদিনের বাড়তি খরচ দেখানো হয়েছে।

    দেখা করতে এসে সদ্য-পরিচিত আদিত্য বারিক বলেছিল, এসব মেনে নিতে হয় স্যার, সমাজ ব্যাপারটা তো চিরকাল এরকুমই।

    একজন পয়সাঅলা মারোয়াড়ি বুড়িকে অপারেশানের পর মেডিকাল চেয়ারে বসিয়ে, মুখের ওপর ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে, যাতে না ঘুমিয়ে পড়ে, লেডি অর্থোপেডিক সার্জেন হাতমুখ ধুয়ে পোশাক পালটে এসে দেখে, ইনটেনসিভের ইনচার্জ ডাক্তারটা, বুড়িটা যন্ত্রনায় চিৎকার করে প্রলাপ বকছিল বলে, কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশান দিয়ে অজ্ঞান করে নেতিয়ে রেখেছে। বুকের ওপর মাথা-ঝোলানো ধনী পরিবারের গৃহকর্ত্রীর সামনে, ইনটেনসিভের কাঁচঘরে আধমরা মানুষদের মাঝে দাঁড়িয়ে, দুই ডাক্তারের সে কী বাংলা-ইংরেজি খিস্তিখাস্তা। যিশুর মনে হচ্ছিল নিউইয়র্কের হার্লেমের ফুটপাতে শুয়ে গালাগাল শুনছে।

    কোনো রুগি প্রলাপ বকলে, ঝি-চাকরগুনো মাঝরাতেও তাকে নকল করে ভ্যাঙাত, যেন রাস্তার নির্মম চ্যাংড়ারা লেগেছে পাগলের পেছনে : মাঁ কোঁতায় গ্যাঁলে, জঁল খাঁবো জঁল খাঁবোঁ ডুঁডু খাঁবোঁ, ওঁরে আঁলোঁটা জ্বেঁলেদেঁ, যঁতীন কিঁ এঁলো, ওঁ মাঁ মঁরে গেঁলাঁম, ওঁহ আঁর কঁষ্ট সহ্য হঁয় নাঁ ঠাঁকুর, বাঁবাঁগোঁ আঁর পাঁরছি নাঁ, বাঁড়ি নিয়েঁ চঁল রেঁ, বাঁড়ি যাঁবোঁ, হেঃ হেঃ হেঃ, দাদু, সকালে পোঁদে ডুশ দেবো, আর চেঁচিও না। ভাষার নতুন কলোনাইজারদের বচননাট্য।

    শেষদিন তো কর্মীদের অতর্কিত স্ট্রাইকের ধাক্কায় বিজলিবাতিহীন ইনটেনসিভে একসঙ্গে তিনজন মরে গেল। আন্দোলনের কোল্যাটরাল ড্যামেজ।

    ভেলোর যাওয়া উচিত ছিল, বলেছিল ফাদার নরম্যান, বা কোনো খ্রিস্টান হাসপাতালে।

    হাসপাতালটায় কমবয়সী অগুন্তি নগণ্য মাস-মাইনের প্রশিক্ষার্থী নার্স। সবাই বলে সেবিকা। কলকাতায় শব্দের খেলায় বেশ্যারা যেমন যৌনকর্মী, মুটেরা যেমন শ্রমিক, ঝি-চাকররা যেমন কাজের লোক, তেমন ফালতু কাজের জন্য সেবিকা। শাসক তার শোষণপ্রক্রিয়াকে বৈধতা দেবার জন্য শব্দের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে রূপের প্রতিরূপ।

    শিশ্তথুতনি মেনকা পাইক মাছের কাঁটা বেছে, ভাত মেখে, যিশুর মুখে একগাল পুরে বলেছিল, কাকুদা, তোমায় তো শুয়ে-শুয়ে খেতে হবে এই কয়দিন। মুখের মধ্যে মেনকা পাইকের তর্জনী মধ্যমা অনামিকা যখন যিশুর অস্তিত্বকে স্পর্শ করেছে, মায়ের জন্যে অদম্য মন-কেমনের হাহাকারে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠেছে ও, গোপনে। শোকের রক্তাভ শিহরণ কন্ঠকে রুদ্ধ করে ছড়িয়ে পড়েছিল ফুসফুসে।

    মেনকা নিজের নাম বলেছিল ম্যানকা। লেখা না বলে বলত ল্যাখা। জোড়াভুরু ছিপছিপে স্বাস্হ্যবতী, কালোর মধ্যে চটক, অতিসোনালি কানের দুল, প্যাতপেতে লালফুল ছাপাশাড়ি, মুখমণ্ডলে ঘামের ফসফরাস দ্যুতি, দুচোখে দুষ্টুবুদ্ধি বন্যের অদৃশ্য চোরাস্রোত, চকচকে কোঁকড়া চুল টানটান বাঁধা। আরেকজন, কিশোরী-থেকে-তরুণী মেবেকে সঙ্গে এনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল একদিন ভিজিটিং আওয়ারে, আমার বুইন কাকুদা, মহাকরণে কাইজ করে।

    কোন বিভাগে ?

    কুন ডিপাট রে তর ?

    তিন তলায়।

    কৃষি আধিকারিক ডক্টর ত্রিবেদীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে, মেয়েটিকে খুঁজে পেয়েছিল যিশু, বাঁ হাতের আঙুলে ঝোলানো অনেকগুলো কাপ, ডান হাতে চায়ের কেটলি।

    ইশ রে, কাকুদা ! কেমন আছে তোমার শরীর ? একেবারে সেরে গেছে তো ? সম্ভাষণের আহ্লাদ উপভোগ করেছিল যিশু। চালু-চায়ের অনুকাপে চুমুক দিয়ে, বি-বা-দী বাগের আকাশে দেখেছিল, ছাইমাখা মেঘেদের সফরসূচি চূড়ান্ত করতে বেরিয়ে পড়েছে কালবৈশাখী।

    চলি রে কেটলি, একদিন তোদের দুজকে তাজ বেঙ্গলে লাঞ্চ খাওয়াব, মেনকাকে কথা দেয়া আছে। বলে, নিচে নেবে বেরোবার মুখে, দ্রুতগামী ট্রেনের নিশুতি শব্দের মতন বৃষ্টি। ওফুটে কারপার্কের মাকাল গাছে, ঠোঁটে খ্যাংরা নিয়ে ভিজছে স্হপতি কাকপুরুষ। আকাশচুম্বী হাওয়ায় প্রতিভাদীপ্ত বিদ্যুতের স্নায়ুপ্রদাহে, কাতরে ককিয়ে ওঠে কয়েকটা অল্পবয়সী মেঘ।

    ওঃ, মরে গেলুম হুজুর, আহ, আরেব্বাপ, অঁক, ছেড়ে দিন স্যার, আমি কিচ্ছু জানি না স্যার, উঃ বাপরে, আঃ, বাবাগো, আআআআঃ।

    আদিত্যর জন্যে বহুক্ষুণ অপেক্ষারত অরিন্দম অসুস্হ বোধ করছিল ক্রমশ, লকাপ থেকে ছিটকে-আসা আর্তচিৎকারে। বমি-বমি আসছিল। অরিন্দমের কাহিল প্রতিক্রিয়া উপভোগ করছিল টেবিলের ওদিকে মিটিমিটি তাগড়া ভুঁড়িদাস পুলিশ অফিসারটা, বোধয় ইন্সপেক্টার। অনেকবার এসেছে বলে মুখ-চেনা, বলল, আপনি বরং নিচে গিয়ে গেটের কাচে টাটকা হাওয়া নিন। আসলেই পাঠিয়ে দোবো।

    অরিন্দম উঠে পড়ল ব্রিফকেস নিয়ে। দশ কুড়ি পঞ্চাশ একশো টাকার প্যাকেট এনে দিতে বলেছিল অরিন্দমকে ওর অফিস থেকে। আদিত্যর বোনের বিয়ের যৌতুক। থোক টাকা থাকলে উঁচু জাতের ভালো চাকরে পাত্র পাওয়া সহজ, পাত্রী যে জাতেরই হোক না কেন। এই একগাদা টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে চায় না অরিন্দম। মা, ছোটো ভাই বা তার বউ জেনে ফেললে কেলেঙ্কারি। পাটনায় থাকতে হঠাৎই একবার ও মাসকতকের জন্যে পাগল হয়ে গিসলো বলে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব।

    গেটের কাছে দাঁড়িয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেল। পা ব্যথা করছিল। এই শহরের চতুর্দিকব্যাপী নিনাদে হারিয়ে যায় আর্তনাদ আর কাতরানির ছোট্টো-ছোট্টো শব্দকণা। আক্রমণ আর আত্মরক্ষার উপস্হিতি সারাটা শহরের চরাচর জুড়ে। পুরুষকর্মীদের চাউনি রুমার দিয়ে মুখের ওপর থেকে পুঁছতে-পুঁছতে বাড়ি ফিরছে আলগা চটকের গৃহবধু কেরানি। সঙ্গিনীর সাথে আলোচনার বিষয়বস্তু গণেশঠাকুরের শুঁড় ডানদিকে শুভ না বাঁদিকে। ক্ষীণস্বাস্হ্য সরকারি বাস চলে গেল, নাগরিক বোঝাই, ফোঁটার মতন মানুষ ফেলতে-ফেলতে, জিরোবে গিয়ে ঘণ্টাখানেকের জ্যামে। বাসে উঠলেই লোকে বসতে চায় এ শহরে, যুবকরাও, যাতে কাঁধে কাঁধ না মেলাতে হয়। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অভ্যাসমতন পথচারিণীদের ওপর চোখ বোলাচ্ছিল অপ্রস্তুত অরিন্দম। খিনখিনে ট্যাক্সির কাতার। ডিজেলের নাকজ্বালানো ধোঁয়া। ধোঁয়া-ধুলোয় মুখ ভার করে আছে আকাশ।

    অফিসে আবার এলেন কেন অরিন্দমদা ? পেছন ফিরে আদিত্যর থমথমে চেহারা দেখতে পেল অরিন্দম। মানুষকে নিজে হাতে পেটানোর আহ্লাদ থেকে, মুখের আনন্দময় প্রতিভা থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছে, আর কোনও দিন মুক্তি পাবে না আদিত্য। প্রতিনিয়ত ওর দরকার পড়বে প্রহারযোগ্য দেহ, সারাজীবন। রিটায়ার করলে কী করবে ও ?

    তোমায় তো বাড়িতে পাওয়া যায় না।

    তা নয়। এসব টাকাফাকা অফিসে রাখতে চাই না। দেখলেই তো হিংসে।

    কোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে রেখে দাও। ছুটি তো ? এখুন ?

    কী যে বলেন না, এখুনও কবুলতি লেখানো হয়নি। চলুন ওফুটে চায়ের দোকানটায় একটা ছেলে আছে আমাদের গ্রামের। ওর হাতে পাঢিয়ে দেব। আদিত্য বিব্রত বোধ করে অরিন্দমের সারল্যে। নোটগুনো কোথা থেকে এলো, বড়ো মাপের নোট কেন, কিছুইকি সন্দেহ করে না অরিন্দমদা ? টিকে আছে কী ভাবে অমন অনর্থক বোকামি নিয়ে !

    বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকের ধর্মশিবপুর গাঁয়ে, অজয় নদের তীরে, আদিত্য বারিকের বাস্তুভিটে। ঝিলুট থেকে কাঁচা রাস্তা আছে গ্রামে যাবার, তৃণমূল-কংরেস-সিপিয়েম মকদ্দমাবাজিতে আধখ্যাঁচড়া। সপ্তম পাঁচসালায় রাস্তাটা হবার আগে গাঁয়ে ফুলপ্যান্ট পরে ঢোকা যেত না বর্ষাকালে। কাঁধে বেলবটম, বাঁহাতে জুতোজোড়া, আন্ডারওয়্যার পরে ঢুকতো কলকাতা-বর্ধমানের কুটুমরা। ওদের গ্রামটা বাদে আশপাশের গ্রামগুনো মুসুলমান চাষিদের। জোতদার বর্গাদার কামলা সবাই মুসুলমান। ধর্মশিবপুরে আজ যাদের বাস, সেসব শীল, কাঁসারি, বারিক, কর্মকার, সাহা, শূর, পাল, কুণ্ডু, দাঁ, সাঁপুই, বায়েন, গায়েন, সরদার, পোড়েল পরিবার এসেছিল গঙ্গারাজা তৃতীয় অনঙ্গভীমের মন্ত্রী বিষ্ণু সিংহের রাঢ়দেশ অভিজানে সঙ্গী হয়ে। সেসব গৌড়ীয়দের প্লেস অব ডোমিসাইল এখন রাঢ়।

    র‌্যাদক্লিফ সায়েবের ভয়ে নেয়ামত মণ্ডল পালিয়েছিল পাকিস্তানে। পরে হাওয়া বুঝতে এলে নরহরি মণ্ডল নেয়ামতের একশো ছেচল্লিশ বিঘে জমি কিনে নিয়েছিল পচা আলুর দরে, মগফেজের দলিলে তারিখের গোলমাল করে। পাকা দলিল হয়নি, তাই রেজেস্ট্রি হয়নি। এর মধ্যে একশো বিঘে ছিল খোদখামার আর ওয়াকফ চিরাগি জমি, যা নরহরির ছেলে সত্যসাধনকে দিয়ে খাস লিখিয়েছিল ভূমিসংস্কার দপ্তর, আর যা রাঢ়ের লোক পায়নি। চাষবাস না করেও তার অনেকটা পেয়ে গেসলো সন্তোষ দাসের মামাতো ভাই। সন্তোষ দাস এ-তল্লাটে পার্টি করার জন্যে এসেছিল সত্তর সনে। বে-থা করে থেকে গেল। নিজেদের এখুন দাশ লেখে, বলে কায়েত।

    প্রথমে মুসুলমান গাঁয়ে-গাঁয়ে বকবক বকবক করে গান্ধির কোল থেকে মার্কসের কোলে চাষিগুনোকে তুলে নিয়ে গিসলো সন্তোষ জেঠু। মুসুলমানগুনো তো চালাক কম নয়, আগাম টের পায়। ওরা সদাসর্বদা শাসকের সঙ্গে আছে। কী লাটসায়েব, কী ফজলুল হক, কী নাজিমুদ্দিন, কী সুরাবর্দি, কী বিধান রায়, কী জ্যোতি বসু। হলে হবে কী ! কোথ্থেকে একদল কিশতিটুপি-পরা লিগি এসে ফিসফিস-গুজগুজ চালালে যে মুসুলমানগুনো আর সাউ সরদার নাইয়া ঘরামি পদবি রাখতে চায় না। মেটে মসজিদগুনোকে ওব্দি সবুজ তেলরঙে ছুপিয়ে ফেলেচে।

    প্রতিভা ছিল বটে সন্তোষ জেঠুর, বুঝলেন অরিন্দমদা, নইলে সহদেব মন্ডলের ছেলেটা নকশাল হয়ে ওর মুন্ডু কেটে লটকে দিত না, নিজের গ্রামর অরিন্দমকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে বলেছিল আদিত্য। শৈশবে দেখা সেই দৃশ্য আজও, সময় বুঝে, আদিত্যকে কাবু করে। বুঝলেন অরিন্দমদা, আমার মামার বাড়ি ছুতোর-গাঁ গ্রামের পরামাণিক শ্মশানসাধুরা মানুষের মুণ্ডু ঝুলিয়ে চোত সংক্রান্তির ভোরে যে নাচ দেখাত, তার চে ভয়ের দৃশ্য ছিল বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো সন্তোষ জেঠুর কাটামুণ্ডু। সারারাত শিশিরে-ভেজা জলজ্যান্ত মুণ্ডুটা চোখ রাঙাচ্ছিল, যে দেখতে গেছে তাকেই।

    সেই কবে, ছোটোবেলাকার কথা, পরের বছর শ্মশানসাধুদের হাতে ঝোলানো মুণ্ডুগুনোর মধ্যে দুটো ছিল সহদেব মণ্ডলের দুই ছেলের। ছোটোটা পূর্বস্হলী, ওই যে, গেছেন তো আপনি, ওখানে গুলি খেয়ে মরেছিল। বড়োটার ধড় পাওয়া গিসলো হুগলির শেষপুকুর গ্রামে। বুঝলেন অরিন্দমদা, সাধুরা অনেক দিন ধরে মাথাগুনো মাটিতে পুঁতে রেখেছিল তেল-সিঁদুর মাখিয়ে, গাজনাতলায় নাচবে বলে। এখুন তো কাটামুণ্ডু বেআইনি হয়ে গেছে বলে সাধুরা কুলি দিয়ে কাজ চালায়, দুধের বদলে ঘোল, আর কি। তার ওপর নাপতেরা আর কেউ সাধু হতে চায়না। তার চেয়ে গেরুয়া পরে হিন্দু পলিটিক্স করলে তবু কিছু পয়সাকড়ি হয়। চলুন না মামার বাড়ি, ব্রামভোন অতিথি পেয়ে মামামামিদের আনন্দই হবে।

    আমার তো গায়ে পৈতে-ফৈতে নেই।

    আরে ও তো পুরুতমশাইকে সকালে অর্ডার দিলে বিকেলে সাপ্লাই দিয়ে দেবে। পুরুতটা আবার বিজেপি, আগে সিপিয়েম করত। সিপিয়েমের পুরুত আসে কালনা থেকে। লোকটা স্টেট ব্যাংকে সিকিউরিটি গার্ড। চলুন না, জিপের ব্যবস্হা করি থালে।

    চলো যাওয়া যাক, ওয়েস্ট বেঙ্গলের অত ইনটিরিয়রে যাইনি কখুনও।

    খড়্গেশ্বরী নদীর ধারে ছুতোর-গাঁ গ্রামে আদিত্যর মামার বাড়ি। ঈশানেশ্বরের খেসসা গান, ফোকলা দাঁতে, আদিত্যর দিদিমার উদ্ভাসিত কন্ঠে, পুলকিত করেছিল অরিন্দমকে। দুই মামা মিলে বর্ধমানে ফার্নিচারের দোকান খুলে, বেতাহাশা কাঁচা পয়সা করেছে, জমিজিরেত, ট্রলিট্র্যাক্টর, চারাকাটার যন্তর, বিলিতি গাই, দুটো শ্যালো, আড়াই বিঘের পুকুর। আদিত্য যখুন বাবার কাঁধে চেপে মামার বাড়ি যেত, মামারা এত সচ্ছল ছিল না। কোচবিহার থেকে কাঠের টানামালের ব্যাবসা করে দিন ফিরিয়ে নিয়েছে। দহরম আর মহরম উঁচু মহলে। এফিডেভিট করে রায় পদবি নিয়েছে। মেয়েদের জন্যে ফরসা উদারচেতা বর পেয়েছে, মোটা টাকা যৌতুক দিয়ে।

    বুঝলেন অরিন্দমদা, ছোটোমামা দৌড়ঝাঁপ না করলে, এ এস আয়ের ইনটারভিউটা গুবলেট হয়ে যেত। দুরাত্তির ওর মামারবাড়িতে থেকে, অরিন্দমের মনে হয়েছিল, আদিত্যর মামারবাড়ির সবায়ের গা থেকে র‌্যাঁদামারা কাঁচা কাঠের গন্ধ বেরোয়। সত্যি। বড়োমামার শালকাঠ, বড়োমামির সেগুনকাঠ, ছোটোমামার নিমকাঠ, ছোটোমামির শিশুকাঠ। মাতুলালয় যেন ছালছাড়ানো গাছের জঙ্গল।

    কোচবিহারে তুফানগঞ্জে, মানসাই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান তো মামাদের, মানে আমার মায়ের, মামাতো ভাই। একবারটি ওখানেও নিয়ে যাব আপনাকে। লুকিয়ে-লুকিয়ে আসাম থেকে কাঠ আসে। অবশ্য কাকেই বা লুকোনো। বনকর্মীরা ব্যবস্হা করে, মাস মাইনে পায়।

    তোমাদের শিডুল হপ্তা আর ওদের শিডুল মাস ?

    বিক্কিরি বাবদ তোলা দিতে হয় আলফা আর বোড়োদের, সোনার বাংলা থেকে চিনের আর পাকিস্তানের বোমাবন্দুক আনার জন্যে। একটু ইদিক-উদিক হলেই ডুয়ার্সে এলেমজি চলে। কুমারগ্রাম, বকশির হাটে ছানবিন হয়। হাঃ হাঃ, পুলিশকেও তো দিতে হবে। ছোটোমামা নিজেকে টিম্বার মাফিয়া হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসে, কিন্তু কাঠের ব্যাপারিরা সে স্বীকৃতি দিতেই চায় না।

    কলকাতায় না থাকলে কোনো কিছুতেই স্বীকৃতি মেলে না।

    ছুতোর-গাঁ’র মুসুলমানগুনো ধর্মশিবপুরের মুসুলমানগুনোর চে ফরসা। করিম মুনশি আর ফরিদ মোল্লার বাড়ির সবাই ফরসা আর ঢ্যাঙা। দাদু বলে ওরা সব খাঁটি আর আমাদের গাঁয়ের কেলটেগুনো পাতি। ফরসা না হলে আমেদ মামুদ করিম জালাল নামগুলো ঠিক মানায় না। বুঝলেন অরিন্দমদা, ছুতোর-গাঁ’র নাম পালটে রায়গ্রাম রাখার দৌড়ঝাঁপ চলছে। বড়োমামা বলছিল, ছুতোর-গাঁ’র কুসুমেটে তেঁতুলে, দুলে, বাগদি, হাড়িয়া সব এফিডেভিট করে রায় হয়ে গেছে। মামাদের চে উঁচু পরিবার বলতে উগ্রক্ষত্রিয় মন্ডলরা আর ব্রামভোনরা।

    জমিদাররা যখুন ছিল, তখুন স্হাপত্য বলে একটা ব্যাপার ঢুকেছিল গ্রামগুনিয়। এখুন তো গ্রামে-গ্রামে তোমার মাম,আদের মতন পয়সাওলা লোক কম নয়। অথচ কোনো নতুন স্হাপত্য দেখা দিল না উত্তরঔপনিবেশিক পশ্চিমবঙ্গের পল্লিসমাজে। গরিব সাজাটাই এখুন গ্রামবাংলার স্হাপত্য।

    ভাগ্যিস অর্ডার দেওয়া পৈতেটা পরেছিল অরিন্দম। আদিত্যর দিদিমা-মাইমা-ছোটো বউদির কাছে ওটার জন্যে অনাস্বাদিত খাতির চলছে। অরিন্দমের চেয়ে বয়সে ঢের বড়ো ওর দিদিমা আর মামিরা চান সেরে এসে হঠাৎ পায়ের কাছে মেঝেয় ঢিপ-ঢিপ। এই জন্যেই গ্রামে যেতে অস্বস্তি হয়। জাতিপ্রথা বেশ জেঁকে টিকে আছে ভেতরে-ভেতরে, নানা জাতের মানুষ এখুনও এক সারিতে খেতে বসতে চায় না, বামপন্হী রাজনীতির শেকড়ের ফ্যাঁকড়া ছড়ালেও । অবশ্য ছোটো ভায়ের বিয়ের সময়েও পরতে হয়েছিল রেডিমেড পৈতে।

    তোমার বড়ো মামার ছেলে-বউকে দেখলুম না ?

    বড়দা-বউদি ফিবছর পুজোয় চাইবাসায় শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। ওখানে দশজন জামাই মিলে খুব হইহল্লা হয়। সত্যি, আরে স্ট্রাইক করেনি আগে। পনেরো বছর বিয়ে হয়েছে বড়দার, কিন্তু কোনও বার পুজোয় নিজের মা-বাপের কাছে থাকেনি।

    তুমি বিয়ে করে কী করো দেখা যাক।

    পুলিশে কাজ করে বিয়ে করার ঝামেলা আছে। আপনি করে ফেলুন না বিয়েটা। ব্রামভোন বাড়িতে কুচ্ছিত মেয়েরও রূপ থাকে। ছুতোর-গাঁয়ে ব্রামভোনরা সব ঈশানেশ্বরের পুজুরি, বুঝলেন তো। স্বাধীনতার পর সব মন্দিরের দখল নিয়ে নিয়েছে ব্রামভোনরা। দুলেদের ধর্মরাজের মন্দিরটা নিয়েছে। দেয়াসি তাঁতিরা বুড়ো-গাছতলায় কালাচাঁদ মন্দিরের সেবায়েত ছিল ; তাদের হটিয়ে সেটাও হাতিয়েছে। ব্রামভোনগুনোই দেশটাকে ডোবাল। জহোর্লাল তো ব্রামভোন ছিল, তাই না ?

    একটা মন্দিরের মধ্যেই অতগুলো পুতুল ডাঁই করে রাখা দেখলুম। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ চলছে নাকি ? শ্রীহীন দেবতাদে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার অবশিষ্টাংশ !

    আপনাদের আজগালকার ব্রামভোনদের ঠাকুর-দেবতা সম্পর্কে বড্ডো অচ্ছেদ্দা। ওগুনো ধর্মঠাকুরের মূর্তি। মামারবাড়ির এদিকটায় অনেক-অনেক মন্দির ছিল আগে। এখন আর কে দেখাশোনা করবে বলুন ? সেসব ঠাকুরের থান থেকে এনে রেখেছে ওই মন্দিরে। কত মূর্তি তো চুরি হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেল । অবশ্য বিদেশে গিয়ে যত্ন-আত্তি পায় মূর্তিগুনো, সেও তো একরকুম পুজোই, বলতে গেলে। সেবায়েতরা আজগাল দুর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমানে রিকশা চালায়, হকারি করে। বর্ধমানে দেখলেন তো, ঠেলায় চাউমেন বেচছে, আমায় যে দাকলে, ও ছেলেটা তাঁতি বাড়ির।

    আমাদের ধর্মশিবপুর গাঁয়ের অনেকে পাততাড়ি গুটিয়ে রানিগঞ্জ, আসানসোল, নিরসা, গোবিন্দপুর, ধানবাদ গিয়ে দুপুরুষ কয়লাখনিতে কুলিগিরি করছে। এমন সাতবাষ্টে হাড়গিলে চেহারা করে ফেলেছে, যে দেখলে টের পাবেন না বাঙালি না বিহারি, হিন্দু না মুসুলমান। আমরা তো ঠাকুদ্দার জন্যে পার পেয়ে গেলুম, নইলে কী দশা যে হতো। তল্লাটের মুসুলমানগুনো তো সোশালিস্ট ছেড়ে মুসলিম লিগে ঢুকে পড়েছিল, বুঝলেন, তার মধ্যেই ঠাকুদ্দার দৌলতে আমাদের ফ্যামিলির নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ভেদিয়া বেরাণ্ডা ছাড়িয়ে নিগন কৈচর উজানি কোগ্রাম ওব্দি। ঠাকুদ্দা তো বাবাকে ওয়ার্ধা আশ্রমে নিয়ে গিসলো। জহোর্লালের কোলে-বসা বাবার ফোটো আছে। তখনও টাক পড়েনি জহোর্লালের। সেসব এখন বাক্সবন্দি। আর বোধয় বেরুবে না।

    তোমার পুলিশে চাকরি এবার অন্যরকুম ইজ্জত এনে দিয়েছে, কী বলো ?

    ধুৎ, ইজ্জত-টিজ্জত নয়। ভয় পায় লোকে। বেশ ভাল্লাগে লোকেদের ভয় পাওয়াটা। শ্রদ্ধার ভালোলাগার থেকে ভয়ের ভালোলাগাটা সুপিরিয়র। হাঃ হাঃ।

    তুমি ছুতোর-গাঁ, ধর্মশিবপুর, মঙ্গলকোটের অ্যাতো গল্প জানলে কোথ্থেকে ? ঠাকুদ্দার কাছে ?

    না-না। ইশকুলে আসলাম স্যারের কাছে। ভুগোল পড়াতে-পড়াতে লোকাল ইতিহাস পড়িয়ে দিত। নিজেকে বলত রাঢ়ীশ্রেণি পাঠান। পূর্বপুরুষ কে একজন মোহম্মদ শামিম খান নাকি আলিবর্দি খাঁর সেনাদের সঙ্গে আরবি ঘোড়ায় চেপে বর্গিদের তাড়াতে-তাড়াতে এসে পৌঁছেছিল কাটোয়ায়। গঙ্গারাম নামে একজন কবি ছিল আগেকার কালে, তার লেখা মহারাষ্ট্রপুরাণে আছে নাকি গল্পটা। আসলাম স্যার তো কুচকুচে কালো। আর ঘোড়াটার টাট্টু বংশধররা এখন মন্তেশ্বর কিংবা দাঁইহাটে এক্কা টানে। হাঃ হাঃ, এক্কাও উঠে গিয়ে চাদ্দিকে ভ্যান রিকশা অটো ম্যাক্সি-ট্যাক্সি চলছে। আসলাম স্যার আজও ভূগোলের ক্লাসে ইতিহাস পড়ায়। ইতিহাস তো গপপো, বানিয়ে নিলেই হল। ভূগোল তো তা নয়।

    এখুনও পড়াচ্ছেন ? স্কুলমাস্টাররা তো শুনি রিটায়ার করে পাঁচসাত বছর ওব্দি পেনসন পাচ্ছে না।

    টাকের ওপর টুপি পরে আঙুল দিয়ে সাদা ধবধবে দাড়ি আঁচড়ায় আর দুপুরে ছেঁড়া আসন পেতে দেয়ালমুখো নামাজ পড়ে টিচার্স রুমে। এখুন তো টিচার্স রুম বলতে পশ্চিমের নোনা ইঁটের স্যাঁতসেঁতে ঘরটা, প্রায়ই ঠান্ডা খড়ামারা মেঝের ওপর দিয়ে গোখরো সাপ এদিক থেকে ওদিক নিশ্চিন্তি মনে চলে যায়। ছাত দিয়ে জল পড়ে। এখুন তো একটাও ক্লাসঘরে দরোজা-জানলার আড়কপাট নেই।

    আদিত্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল অরিন্দম। নিজেকে ঘিরে গ্রেটনেসের বুদবুদ তৈরি করতে চাইছে ও, আদিত্য। সবাই, ওর চেয়ে ছোটো, দরিদ্র, নিকৃষ্ট, দুস্হ, শ্রীহীন, অবহেলিত। অনেক মানুষ প্রেমহীনতাকে ভালোবাসে। অরিন্দম বলল, তুমি তো নিজেই স্কুলে মাস্টারির চেষ্টা করেছিলে, বলেছিলে একবার।

    ওঃ, সে এক কেলো হয়েছিল বটে। মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া হাইস্কুলে গিসলুম ইন্টারভিউ দিতে। এগারোজন প্রার্থী ছিল, বুঝলেন। চৈতন্য খামরুই বলে এক প্রার্থীর তো পাঞ্জাবির তলায় ছেঁড়া গেঞ্জি ওব্দি দেখা যাচ্ছিল। কুন্তু গুজগুজ ফিসফিস হাসাহাসি থেকে দশ মিনিটেই আমরা টের পেয়ে গিসলুম যে স্কুল কমিটি ওই পদের জন্যে আগে থাকতেই লোক ঠিক করে ফেলেছে। ইন্টারভিউটা লোকদেখানে।

    আমরা তো ইন্টারভিউ না দিয়ে বাস ধরার জন্যে ফিরে গিয়ে গ্যাঁজাচ্ছিলুম রাস্তার ধারে। হঠাৎ না, হইহই করতে-করতে তিরিশ চল্লিশজন লোক এসে ঘিরে ধরে কিল চড় লাথি থাপ্পড় কঞ্চিপেটা আরম্ভ করে দিলে। আমি ভাবলুম আমাদের ডাকাত ভেবে গণপ্রহার আরম্ভ হল বুঝি। আজগাল গ্রামে শত্রুপেটানোর এটা সবচে সহজ আর সস্তা কায়দা বেরিয়েছে। ভাবলুম আর বোধয় বাঁচার উপায় নেই। সব তো পাঁচ ফিটের গাঁইয়া বাঁটকুল। তিনটেকে দিলুম একটা করে পাঞ্চ, বুঝলেন। কেঁউয়ে কুকুর হয়ে কাৎ।

    তখুন ওদের নেতামতন লোকটা হুকুম ঝাড়লে যে ইন্টারভিউ না দিয়ে ফেরত যেতে পারবে না কেউ। ঘাড় ধরে হিড় হিড় করে, জামা খামচে, পেছন থেকে ঠেলে, স্কুল ওব্দি ধাক্কা দিয়ে-দিয়ে নিয়ে গিসলো আমাদের, পেছন-পেছন গ্রামের প্রায় একশো হাফল্যাংটো কচিকাঁচার দল, নেড়ি কুকুরের ঘেউ ঘেউ, একদল পাতি হাঁস গোঁতা খেয়ে নেবে গেল পুকুরে, তাইতে তিন-চারটে রুই-কাতলা লাফিয়ে উঠল, উড়িসশালা, সে অভিজ্ঞতা ভোলা যাবে না। কয়েকজন চাষি বউ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছিল। ইন্টারভিউ-ফিন্টারভিউ কিসসু নয়। হেডমাস্টারের ঘরে একটা রেজিস্টারে সবাইকে দিয়ে সই করিয়ে নিলে। ইন্টারভিউ না দিয়ে সবাই বাড়ি ফিরে গেলে তো শিক্ষক বাছাই বাতিল হয়ে যেত। তাই অমন হেনস্হা। কয়েকটা লোকের মুখ মনে রেখেছি। কখনও যদি পেয়ে যাই কলকাতায় কোথাও তো পোঁদের চামড়া তুলে নেব।

    এক্ষুনি লকাপে সেই কাজটা করছিলে বুঝি ? কী করে পারো ? আমার তো গলা শুকিয়ে বুক ধড়ফড় করতে লাগল বলে বেরিয়ে এলুম। তোমার সঙ্গে এবার বোধয় আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে। বলার পর, অরিন্দমের খেয়াল হল যে এই কমবয়সি আদিত্য ছাড়া ওর আর বন্ধু নেই কোনও ; এমন কেউ নেই যার কাছে গিয়ে বসর গল্প করা যায়। নানারকুমের গোলমালে আক্রান্ত হয়ে উঠেছে অপরিহার্য।

    আরে, এই ক্রিমিনালগুলোকে আপনি জানেন না। মহাফেজখানা থেকে কিছু গুণ্ডা ফাইল বের করিয়ে দেবো আপনাকে পড়তে, তাহলে টের পাবেন। আদিত্যর মুখময় ঘুরঘুর করছিল বিমূর্ত অভিভাবকত্বের গর্ব। তাস যেভাবে তার তুরুপ লুকিয়ে রাখে, সেভাবে হাসির মৃদুতা ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে রেখেছিল আদিত্য।

    অরিন্দম যেন হেমন্তের স্মৃতিভারাক্রান্ত কাঠফড়িং। বলল, জবাবদিহির সুরেই বলল, করেছে কী লোকটা ? শুনি।

    তিলজলার গোলাম জিলানি খান রোডের নাম শুনেছেন ? গেছেন ওদিকে কখনও ? র‌্যাফ নেবেছে। দুটি পাইপগান, রামদা, আর একগাদা বোমা পাওয়া গেছে। পুলিশের ওপর বোমা চালিয়েছে, অ্যাতো বুকের পাটা। কন্সটেবল গোপাল দাসকে তো চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে। শঙ্কর ঘোষ, কুমার দত্ত, এরশাদ খান, শঙ্করনারায়ণ পাণ্ডে, ওদেরও অল্পবিস্তর চোট লেগেছে। আসল দুটো খুনে হাওয়া হয়ে গেছে বোমার ধোঁয়ায়। চারটে হারামজাদাকে ধরেছি আমরা।

    তিলজলা ? অরিন্দমের মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত।

    কেন ? তিলজলায় আবার কী আছে ?

    তিলজলায় একজন থাকে। আমি তাকে কখুনও দেখিনি। তার বিষয়ে জানিও না কিছু। এমনকী নামও জানি না। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। মনের ভেতর প্রেমের ফাঁকা জায়গাটায় বসিয়ে রেখেছি তাকে।

    আদিত্য স্তম্ভিত। রেশ কাটলে বলল, আপনাদের এইসব ন্যাকান্যাকা পারভারটেড কথাবাত্রা শুনলে আমার পিত্তি জ্বলে যায়।

    নিঃস্ব, সন্ত্রস্ত, অভুক্ত ভবেশকাকা কাঁধে খুশিদিকে চাপিয়ে বর্ডার স্লপি হাতে বনগাঁ হয়ে শ্যালদা প্ল্যাটফর্মে উঠেছিল। জহোর্লাল ওদের মাটি থেকে ওদের উপড়ে ওদের দুরবস্হা দেখতে গিসলো নিজের চোখে। শ্যালদা থেকে চটকলের গুদামে। সেখান থেকে বালিগঞ্জের যশোদাভবন ক্যাম্প। তারপর কলকাতার দক্ষিণে ধানখেত আর জলাজমিতে যে যেমন ঠাঁই নিতে পারে। যিশুর দাদুর অনেক ধানিজমি ছিল ওদিকে। মুসুলমান ভাগচাষিদের বাস ছিল। এখুন তো সেসব জলাজমির নাম হয়েছে সূর্যনগর, আজাদগড়, নেতাজিনগর, শ্রীকলোনি, গান্ধি কলোনি, বাঁশদ্রোণি, বিজয়গড়, রামগড়, বাঘাযতীন, কত কী। যিশুর দাদুর ইংরেজ বন্ধুরা ডিঙি চেপে পাখি শিকারে যেত সেসব জলাজমিতে।

    আচমকা মানুষের ঢলে ভরে যেতে লাগল দিগন্ধ ওব্দি ধানখেত আর জলাজমি। ঠ্যাঙাড়েরা রাতবিরেতে তুলে দেবার চেষ্টা করত লোকগুনোকে। যিশুর দাদুও ভাড়াটে লেঠেল আর তাগড়া সব বৌবাজারি গুণ্ডা লাগিয়েছিল, গল্প করেছিল ভবেশকা। ভবেশকারা যে জায়গাটায় থাকত, লেঙেল-গুণ্ডাদের অনেকদিন ঠেকিয়ে জিতেছিল বলে জায়গাটার নাম দিয়েছিল বিজয়গড়। বারোভূতের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিল জিতে। নিজেরা ভারি-ভারি রোলার টটেনে রাস্তা বানিয়েছিল ভবেশকারা। রাত্তিরে পাহারা দিত দল বেঁধে। সেসব রাস্তায় সাইকেলে ঘুরেছে যিশু, দিনের বেলায়। বাঘাযতীন, বিদ্যাসাগর, শান্তিপল্লি, চিত্তরঞ্জন, রিজেন্টপল্লি, বিবেকনগর, দাশনগর, আদর্শপল্লি, রামকৃষ্ণ উপনিবেশ, বাপুজিনগর, বঙ্গশ্রী, নেলিনগর, শহিদনগর, মিত্রবাস, পোদ্দারনগর, মনেও নেই সব। এখুন গিজগিজ করছে মানুষ, উঁচুউঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি, ধনীদের আবাসন, চেনাই যায় না।

    ভবেশকা ছিল অসাধারণ নেতা। চলে আসার সময়ে রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে ছিল ফার্স্ট ইয়ারে। পোড়-খাওয়া তাঁবাটে পেশি, ড্যাংডেঙে হাত-পা, চওড়া ছাতি, কোঁকড়াচুল ভবেশকা রোজই বেরিয়ে যেত আন্দোলন করতে। খুশিদিকে যিশুর মায়ের কাছে রেখে যেত। এরকুম নেতাকে হাতে রাখা ভালো, এই ভেবে বাবা বলেছিল, যিশুর সঙ্গে খুশিও যাক না স্কুলে, টিউটর রেখে নিচ্ছি না হয়। প্রস্তাবে ভবেশকার কীইই রাগ। বললে, তাহলে আর আপনাদের বাড়ি আসব না। মিতালিদের বাড়ি রেখে যাব।

    ট্র্র্যামের ভাড়া যখুন এক পয়সা বাড়ল, প্রথম ট্র্যামটায় ভবেশকাই আগুন ধরিয়েছিল, পুলিশ রেকর্ডে আছে। পাকিস্তানি ওপার বাংলা থেকে তখুন সত্তর হাজার লোক এসে কলকাতায় ফ্যা-ফ্যা করছে, অথচ রোজগারপাতির কাজ নেই। তখুনও কলোনিগুনো পশ্চিমবঙ্গে ছিল, কলকাতা হয়নি। নিত্যিদিন কলকাতায় গিয়ে পিকেটিঙ, ট্র্যাম জ্বালানো, বাস পোড়ানো, ব্যারিকেড, বোমা, অ্যাসিড বালব, মিছিল, র‌্যালি। বোমা বানাতে গিয়ে ভবেশকার কড়ে আঙুল উড়ে গিসলো। খুশিদির কান্নাই থামে না। কাঁদলেই টোল পড়ত থুতনিতে।

    তেসরা জুলাই জ্যোতি বসু, গণেশ ঘোষ, জ্যোতিষ জোয়ারদার, সুবোধ ব্যানার্জি গ্রেপ্তার হতে, কালিঘাট ট্র্যাম ডিপো, শোভাবাজার-চিৎপুর ক্রসিং, একডালিয়া বাজার, শ্যামবাজারে তুলকালাম হয়েছিল। রাত্তিরে বাড়ি ফেরেনি ভবেশকা। টিয়ারগ্যাসের শেল কুড়িয়ে এনে দিত ভবেশকা। খুশিদির মোটে ছাব্বিশটা জমেছিল। যিশুর আটচল্লিশটা। দুটো আজও আছে ডাইনিং টেবিলে নুন-গোলমরিচ রাখার কাজে। ভবেশকা ইউসিআরসি আর ট্র্যামভাড়া বৃদ্ধি কমিটি, দুটোতেই ছিল। অক্টারলোনি মনুমেন্টের গোড়ায় দাঁড়িয়ে রোজ বক্তৃতা দিতে যেত আর তারপর ভিড়ভাঙা মিছিলে শ্লোগান। বক্তৃতা দিতে-দিতে অল্প সময়েই কলকাতার কথা বলার টান রপ্ত করে ফেলেছিল।

    পনেরো জুলাই হয়েছিল সাধারণ ধর্মঘট। সেই প্রথম বাংলা বন্ধ। উৎসব। পশ্চিমবাংলার বাঙালির জীবনের মূল্যবোধ পালটে গেল। কর্মসংস্কৃতি পালটে গেল।

    একদিন বিকেলে বাবার হাত ধরে গড়ের মাঠের মিটিং দেখতে গিসলো যিশু। দ্রোহের জ্যোতিতে মথিত ভবেশকার মুখ মনে পড়ে। ষোলোই জুলাই কলকাতার রাস্তায় সেনা নেবে গেল। তখুনকার দিনে র‌্যাফ ছিল না। শোভাবাজারে ভিড়ের ওপর গুলি চলেছিল আঠেরো তারিখে। প্রফুল্ল সেন ভয়ে এমন কেলিয়ে গিসলো যে বিদেশে আরাম আদ্দেক বাকি রেখে তিরিশ জুলাই তড়িঘড়ি ফিরতে হয়েছিল বিধান রায়কে। জহোর্লালের তো তখুন কানে-তুলো চোখে-ঠুলির রোগ, ভবেশকা বলেছিল। আইন ভাঙা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু সবাই মিলোএ ভাঙা আইন আর জোড়া লাগে না। যত আইনই তৈরি হোক পশ্চিমবঙ্গে, সেই থেকে, ভেঙে-ভেঙে ঝনঝন করে পড়ে যায়। আদালতের জজকে চটি ছুঁড়ে মারে। টেলিফোনে হুমকি দেয়। উপায় নেই। উপায় যে ঠিক কী, কেউই জানে না। চায় না জানতে।

    চিনের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, ভারতরক্ষা আইনের প্যাঁচে যখুন টালিগঞ্জ থানার সেপাইরা অশোকনগরে পঁয়তাল্লিশটা আস্তানা ভাঙতে এলো, তখুন ছুটি হয়ে গেসলো নাকতলা স্কুলে, যাতে ছাত্র আর টিচাররা প্রতিরোধে শামিল হয়। সন্তোষ দত্তর চেলা ছিল ভবেশকা। যুগান্তর বলতে যেটুকু টিকে ছিল, তা-ই করত দুজনে। পুনর্বাসন মন্ত্রী আভা মাইতিকে ওনার অফিসে গিয়ে ধমকে ছিল ভবেশকা। কী রোয়াব, ওহ, দ্যাখে কে !

    বিধান রায়ের আমলে যে খাদ্য রায়ট হয়েছিল, তা আবছা মনে আছে যিশুর। তখুন তো বর্গা আইনও হয়নি, পিএল চারশো আশির ল্যাং খেয়ে সবুজ বিপ্লবও হয়নি। ধানচালের কেনাবেচা সরকারি আওতায় নিয়ে গিয়ে গুবলেট করে ফেললে বিধান রায়। বাজার ধেকে উবে গেল চাল-গম। খাবার খুঁটতে কলকাতার ফুটপাথ ভরিয়ে ফেলেছিল গাঁয়ের লোকে, যে লোকগুনো কানিতে মাটির রং নিয়ে জন্মায়। ভবেশকা বিধান রায়কে মুখের ওপর বললে, সংগ্রহ বিতরণ তদারকির জন্যে গণসমিতি গড়া হোক পাড়ায়-পাড়ায়। বিধান রায় ভাবল, অ, বিরোধী দল পেছনের দরজা দিয়ে সেঁদোতে চাইছে। খাদ্যমন্ত্রী তখুন প্রফুল্ল সেন। তিরিশ হাজার পুলিশকে ধানচাল যোগাড়ের তদারকির কাজে লাগিয়ে দিলে। দাম বাঁধার হুকুম আর লেভি অর্ডার তুলে নেওয়া সত্ত্বেও, চাল গম ডাল তেল মশলার দাম বাড়তে লাগল। হু হু। হু হু। বিধান রায়ের বুকের ব্যারাম ধরিয়ে দিলে প্রফুল্ল সেন আর অতুল্য ঘোষ। খাদি-খদ্দর জামাকাপড় তো উঠেই গেল পশ্চিমবঙ্গে।

    গোলমাল আঁচ করে শুরু হল ভবেশকাদের ধরপাকড়। সেই নিয়ে তেইশবার জেল। গোলমাল কী আর সহজে থামে। ছাপোষার পেটে দানা নেই। আগস্টের শেষ দিনে, ডালহাউসি স্কোয়ারে, হাজার লোকের মিছিলের মাথায় ভবেশকা। ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট আর এসপ্লানেড ইস্ট ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। একশো চুয়াল্লিশ চলছে। কী ভিড়, কী ভিড়। লাউডস্পিকারের দরকারই হতো না তখুনকার দিনে। মিছিল ভাড়াও করতে হতো না। রাস্তার ওপরেই বসে গিয়েছিল বউ-ঝি, পোলাপান, মরদরা। হাতাহাতি আর ঢিল ছোঁড়াছুড়ি ছড়িয়ে পড়ল ধর্মতলা, চৌরঙ্গি, সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ, কলেজ স্ট্রিট। ট্র্যামের লাইন নিজের হাতে উপড়ে ফেললে ভবেশকা। ড্রাইভারের ফেলে-পালানো বাসটায় আগুন ধরিয়ে দিলে। পুলিশের সোঁটা ভবেশ মন্ডল, অমর বসু, রাম চ্যাটার্জি, চিত্ত বসু, মাখন পাল, মোহিত মৈত্র কাউকে রেয়াত করলে না।

    পরের দিন ভোর পাঁচটায় খুশিদিকে মায়ের জিম্মায় দিয়ে বিধান রায়ের বাড়ির সামনে ছাত্রদের জড়ো করে ফেলেছিল ভবেশকা। মাথা-গরম টাটকা সভা-ভাঙা মিছিলটা যখুন এগুচ্ছে, প্রিন্সেপ স্ট্রিট থেকে রইরই করে এসে হামলে পড়েছে পুলিশ। খণ্ডযুদ্ধ। সুযোগ বুঝে গুণ্ডা-মস্তানরাও ফাঁকতালে নেবে পড়েছিল। তোড়ে বৃষ্টি এসে কিছুক্ষণের বিরতি দিলে কী হবে, ভবেশকা আশুতোষ বিল্ডিঙে ছাত্রদের জড়ো করে, ঠেলাগাড়ি আর বিদ্যুৎ বিভাগের মই এনে রাস্তা জ্যাম করে দিলে। পুলিশের হাত থেকে বেটন ছিনিয়ে নিয়েছিল ভবেশকা। সন্ধে নাবতে, রাস্তায়-রাস্তায় আলো ভেঙে ফেলার নেতৃত্ব দিলে। অন্ধকারে জ্বলেছে গাড়ির টায়ার, ট্র্যাম-বাস। ঠেলাগাড়ি দমকল অ্যামবুলেন্স। মরে ছাই হয়ে গেল সনাতন কলকাতিয়াদের তিলোত্তমা কলকাতা। গোবিন্দ বল্লভ পন্হের মাথা-কাঁপানো অনুমতি নিয়ে গুলি চালালে পুলিশ। ভবেশকার বাহুর মাংস খাবলে শিস দিয়ে চলে গিয়েছিল গনগনে বুলেট।

    ভবেশকা তোমার সেই গুলি লাগার দাগটা আছে ?

    না হে, অ্যাতো দিন থাকে নাকি ! কবেই মিলিয়ে গেছে। পুকুরের জলে মুখ ধুয়ে গোরুর গোয়ালের দিকে চলে গেল ভবেশকা। এই সাত সকালেই গেরুয়া আলখাল্লা পরে আছে। ওটা পরেই শোয় বোধয়।

    ভবেশকা বলত, কংরেসের জন্য, শিশুর জন্য, কাশ্মীরের জন্য, হিন্দির জন্য, এডউইনার জন্য, কৃষ্ণমেননের জন্য, আনন্দভবনের জন্য, জহোর্লালের প্রাণ কাঁদে। আমাদের দুর্গতির জন্য কাঁদে না। এখন ভবেশকাও জন্যকে বলে জন্যে।

    কিন্তু দোসরা সেপ্টেম্বর জহোর্লাল আর ওনার খাদ্যমন্ত্রী এস কে পাতিলের টনক পঙ পঙ করে নড়ে উঠতে, পশ্চিমবঙ্গে ট্রেন-ভরতি চাল-গম পাঠিয়েছিল কেন্দ্রিয় সরকার। তেসরা সেপ্টেম্বর সাধারণ ধর্মঘতের ডাক দিয়ে রেখেছিল মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি। ভবেশকা এই কমিটিতেও ছিল। হাওড়ার খুরুট থেকে বামনগাছি ওব্দি ধোঁয়াক্কার হয়ে গিসলো দড়িবোমায়। দাশনগরে চটকলের গুদোমে আর মজদুরদের ঝুপড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল ভবেশকা। দাউ দাউ দাউ দাউ দাউ দাউ। জগাছা, বামনগাছি, মালিপাঁচঘরায় গিয়ে আম-জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল ভবেশকা। ধর্মঘটকে সফল করে তুলেছিল সুভাষ মুকুজ্জের পদ্য গেয়ে-গেয়ে। কমরেড তুমি নবযুগ আনবে নাআআআআআ ? খবরের কাগজের প্রথম পাতায় তখুন প্রায় রোজই নাক-ফোলানো ভবেশকা।

    সকাল হতে না হতে শোভাবাজার আর বিডন স্ট্রিটে শুরু হয়ে গেল হ্যাঙ্গাম। মায়ের কাছে খুশিদিকে সোপর্দ করে সেখানেও পৌঁছে গেছে চটি আর ধুতি-শার্ট পরা উশকোখুশকো ভবেশকা। রাত্তিরে মানিকতলা থানা আক্রান্ত। নেতৃত্বে ভবেশকা। ঢাকুরিয়ায় পুলিশ আউটপোস্টে বোমা। ভবেশকার কাঁধে বোমাভরা ব্যাগ। খিদিরপুর, টালিগঞ্জ, কালীঘাট, ভবানীপুর, বেলঘরিয়ায় ভবেশকার খ্যাপানো জনতার ওপর গুলি চালালে পুলিশ। বাহালার বাসের গুমটি আর ট্র্যাম ডিপোয় আগুন ধরিয়ে দিলে রাগি জনতা। নেতৃত্বে ভবেশকা। ভবেশকার মাথা থেকে প্রতিদিন নতুন-নতুন প্রতিবাদের শব্দ, শব্দবন্ধ, ভাষা বেরোচ্ছে। বনধ, হরতাল, অবরোধ, ঘেরাও, ধরনা, র‌্যালি, মিছিল, সমাবেশ, পথসভা, গেটসভা, পিকেটিং, মোড়মিটিং। ভুল বানানে ছেয়ে গেছে শহরের দেয়াল।

    চৌঠা সেপ্টেম্বর তো যারই মুখে রাগি-রাগি ভাব দেখেছে, তাকেই গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। কতজন যে মরেছিল কে জানে। মর্গে লাশ ল্যাংটো করার সেই শুরু। লাশ লোপাটের গণিতের ম্যাজিক তো আগেই শিখিয়ে গিয়েছিল ইংরেজরা। পুলিশকেও নিজের হাতে গড়ে-পিটে পুলিশ বানিয়েছিল ব্রিটিশরা। দুশো বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে।

    কলকাতা আর শহরতলির অবস্হা একটু-একটু করে থিতোল।

    সেবার তবু সামলেছিল। ষাটের মাঝামাঝি আর পারল না প্রফুল্ল সেন। একে বিধান রায় নেই, তার ওপর ভারতজোড়া ঘাটতি। আলু তো বাজার থেকে একদম লোপাট। প্রফুল্ল সেন বললে, তাতে কী, কাঁচকলা খাও, আপেল খাও। ধানের লেভি হুকুম জারি করলে সরকার। মানে, চালকলগুলোর পুরো মাল চলে গেল সরকারের একচেটিয়ায়। ভবেশকা বলেছিল, বুড়ার মাথা খারাপ হইয়া গিয়াসে।

    ব্যাবসাদাররা রেগে কাঁই। কলকাতার বড়োবাজারকে চটিয়ে দিলে কোনো সরকার টেকে না। তাদের বিকিকিনি তো লাটে। সরকারি দর আর বাজারদরের মধ্যেকার গভীর খাদে পড়ে গেল বেচারা কংরেস। থান পাকাত আগেই তুলে নিয়ে বিহার আসাম পাকিস্তানে চালান করে দিতে লাগল জোতদাররা। রেশনের দোকান ফাঁকা। মাছিরাও ডানা গুঁজড়ে গুমুচ্ছে। লোকে বলে সেটা ছিল তিতকুটে ফসলের শীত। খবরের কাগজের ক্রোড়পত্রে ভবেশকা।

    চাষিবাড়ির খেতমজুর-বউ ঝিরা চালপাচারের মজায় সেই যে ফেঁসে গেল, সংসার করার কায়দাই পালটে ফেললে। সংসারের ঝক্কি নেই, কাঁচা ট্যাকা, ট্রেনের গুলতানি, একদিনের টিকিটে প্রতিদিন যাতায়াত, রাত্তিরটা হাজতে কখনওবা, হোমগার্ড আর পুলিশের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি। মোড়লদের বানানো এতকালের বেড়াগুনো ছেদরে গেছে সেই থেকে।

    আগেরবার বিধান রায় তড়িঘড়ি দার্জিলিং থেকে ফিরে তুলে নিয়েছিল লেভি অর্ডার। এবার বুড়োহাবড়া কংরেসের তলানিরা টেরই পায়নি যে পথে-পথে নেবে পড়েছে কচি ছোকরার রাগি দল। ভবেশকা বললে, পচা গাছডারে শিকড়সুদ্ধ উপড়াইয়া ফেলার এই-ই সুযোগ। এবিটিয়ে, ওয়েবকুটা, বারো জুলাই, এসেফাই, পিয়েসিউ, এয়াইয়েসেফ, ডিয়েসো, সিটু, কোঅর্ডিনেশান, কিসান সভা, এসপ্লানেড ইস্টে মিলে-মিশে একাক্কার। ওপাড়ার সরকারি আর সওদাগরি অফিসের চাকরেরা আওয়াজে-এওয়াজে কালা হয়ে যেতে লাগলো বলে ওখানে লাউডস্পিকার বাজানো বন্ধ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। তা সত্ত্বেও চাষাভুষোরা মহাকরণে কাজে এলে কেরানিরা তাদের অনুরোধ-উপরোধ আর শুনতে পায় না। স্ফিকসের মতন বোসথাকে।

    তখুন ভবেশকার গড়নপেটনের আদলে দিকে-দিকে শ্রমিক-কৃষকের ছবি এঁকেছিল বড়ো দেবুদা। সেই থেকে লালশালু হলে দেয়াল-পেন্টাররা ওরকুমই শ্রমিক আঁকে। এমনিতেও, যদিও বাঙালি শ্রমিকগুনো প্যাংলা, বেঁটে আর রুগণ। আবার এরকুম ছবিও আঁকা হয়েছিল, মঞ্চে মাইকের ডান্ডা বাঁ হাতে আর আকাশের দিকে ডানহাত, বক্তৃতা দিচ্ছে ভবেশকা। অবস্হান, অনশন, ফেস্টুন, শ্লোগান, ওঃ, সরকারের ধনুষ্টঙ্কার হয়ে গেল।

    ভবেশকার গরিমা তখুন দ্যাখে কে। বসিরহাটে মহকুমায় হামলা। নেতৃত্বে ভবেশকা। কৃষ্ণনগরে স্টেশনে আগুন। নেতৃত্বে ভবেশকা। মদনপুর, পায়রাডাঙা, বিরাটির এলআইসি, স্কুল পর্ষদ, উদবাস্তু পুনর্বাসন দপ্তর তছনছ। নেতৃত্বে ভবেশকা। রামরাজাতলায় বম্বে মেল থামিয়ে আগুন। নেতৃত্বে ভবেশকা। কৃষ্ণনগরে পুলিশের গুলিতে মরা আনন্দ হাইতের শব মর্গ ভেঙে বের করে মিছিলের আগে-আগে ভবেশকা। ভবেশকার নির্দেশে, যে যেখানে মরেছিল, রাস্তায় গলিতে পার্কে মাঠে, লাল সিমেন্টের দেড় বাই আড়াই ফুটের শহিদ বেদি বানানো হচ্ছিল সেদিনকেই। অনেক জায়গায় শহিদ বেদির বদলে রাস্তায় হাম্প তৈরি হয়েছিল।

    তারপর ব্যাস, ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলনের একদিন সকালে পাড়ার সবাই টের পেল, ভবেশকা রাত্তিরে ফেরেনি। কিন্তু খুশিদিও বাড়িতে নেই। আগের দিন সন্ধে থেকেই দেখা পাওয়া যায়নি ওদের। কলোনির লোকেরা কত জায়গায় খুঁজল ওদের। কোথাও ওদের লাশ পাওয়া গেল না ; হাসপাতালে, থানায়, মর্গে। কত জায়গায় সাইকেলে চেপে খোঁজ করেছিল যিশু, দিনের পর দিন। ভোরে তিলকনগর, সকালে পোদ্দারনগর, দুপুরে নেলিনগর, বিকেলে বাপুজিনগর। না, কেউ ওদের খবর জানে না। কেউ দেখেনি ওদের। অমন চটক আর গা-গতর, কেউ তুলে নিয়ে যায়নি তো খুশিদিকে, মা বলেছিল বাবাকে। খুঁজতে-খুঁজতে, নিজের প্রগাঢ় অনুভূতির ক্ষত আবিষ্কার করে কেঁদে ফেলেছিল যিশু, একা-একা দাশনগরের কাঁচা রাস্তায় দাঁড়িয়ে।

    আর ভবেশকা-খুশিদি কিনা এখানে, কলকাতার এত কাছে, মুণ্ডেশ্বরী নদীর ধারে এই শেষপুকুর গ্রামে, সেই থেকে। কলকাতা থেকে টানা গাড়িতে সারাতি, তারপর ভ্যান রিকশায় গোপের হাট। চাঁপাডাঙা ওব্দি ট্রেনে এসে ম্যাক্সিট্যাক্সিতে সারাতি আসা যায়। ভবেশকা কিনা এখানে। কলকাতায় যায় নিশ্চই। প্রথঞ পোড়ানো ট্র্যামের ছাই মেখে বাঙালির যে নতুন সৎসমাজ, ভবেশকা আজ তার অগুন্তি সন্তানদের একজন।

    কীইইইইরে, রোদ উঠে গেল, ক্যাঁদরা গায়ে দাঁড়িয়ে আছিস ঠায়, যা দাঁত মেজে নে।

    কন্ঠস্বরের জলতরঙ্গে ধ্বক করে উঠেছিল যিশুর হৃৎপিণ্ড। চ্যাটা খোঁপায় যিশুদি। হ্যাঁ, সকাল বেলাকার, রোদ্দুরে তার প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেলেছে। পুকুরে ভাসছে মাদুরকাঠির মতন চিকচিকে রোদ। পাঠরত স্কুলবালকের মতন দোল খাচ্ছে সুপুরু গাছের ঝাঁকড়া মাথা। যিশু বলল, তোমার গলার আওয়াজ অবিকল সেরকুমই আছে খুশিদি ; তুমি একটুও বদলাওনি। চলো না, আজকেই চলে যাই।

    না না না না না না না না। খুশিদি স্পষ্টত আতঙ্কিত।

    অ্যাতো কীসের ভয় খুশিদি। এই বয়সেও ভয় পাও !

    ভয় তোর জন্যে। আমি বড্ডো অপয়া। তোর যদি বিপদ হয়। বৈশাখী পূর্ণিমার মেলার ভিড় যেদিন থাকবে, অনেক লোকের ভিড় হয়, তখুন যাওয়াই ভালো। টের পাবে না কেউ। কলকাতা থেকে টানা গাড়ি আনিস। ঘোমটা দিয়ে নেব।

    এখুন তোমার গা থেকে তোমার মতন গন্ধ বেরুচ্ছে না। ভয় পেয়েছ বলে।

    আমার মতন গন্ধ ? আছে বুঝি ? পঞ্চায়েত প্রধান আচে না ? অসীম তালোধি ওর মেয়ের ভুতের ব্যারাম আচে। দাদা ওষুদপথ্যি করে। রোগবালাই ঝাড়ার জন্যে রাসপা ত্রিফলা হিং রসুন শুঁঠ নিসিন্দে কুঁচিলা বেড়ালা হোত্তুকি চিতেমূল সব বাটছিলুম একসঙ্গে। বোধয় তারই গন্ধ পাচ্ছিলি। বাটতে-বাটতে কালকের মন্তরগুনো, যেগুনো আমার জন্যে বলছিলিস, মনে পড়ে গেল। তাই দেকতে এলুম অ্যাতোক্ষুণ ধরে ঘাটে কী কচ্চিস।

    ভবেশকা ঝাড়ফুঁক করে বুঝি ? অদ্ভুত। কোথায়, ভবেশকা ?

    দাদা তো বেরিয়েচে। কাজ ছিল কি ? দুপুরের আগে ফিরবে না।

    তাহলে এসো। খুশিদির হাত শক্ত করে ধরে যিশু। এসো আলুর গল্প করি। অভিভূত হাতের পর্যটনপ্রিয়তার কাছে সমর্পিত, স্পর্শে অবহিত হয়ে ওঠে দেহ। মুগ্ধ যিশু গলা নাবিয়ে বলল, যদি জানতুম তুমি এই গ্রামে আছ, তাহলে বাঁকুড়া বীরভূম বর্ধমান মেদিনীপুরে অযথা সময় নষ্ট করতুম না। এসো।

    শেষপুকুরের হিমঘর কখনও মুসুলমান মালিকের ছিল। শাজাহানের তাজমহলের মতন হিমঘরটাকে দ্বিতীয় বেগমের স্মৃতিমন্দির করেছিল। হিমঘরের পেছনের মাঠে স্বামী-স্ত্রীর কবর, ইঁটের দাঁত-বেরোনো, ছাগলছানারা ওটায় চড়ে লাফ খেতে শেখে। লোকটার ছেলে দেশত্যাগের কাটাকাটির সময়ে গায়ে হাতে পায়ে ছোরাছুরির চোট নিয়ে পাকিস্তানে ভৈরব নদীর ধারে পালিয়েছিল। ভবেশকার সঙ্গে ওর যোগাযোগটা ভবেশকার নাছোড় অধ্যাবসায়ের ফসল।

    বর্ধমান থেকে আরামবাগ হয়ে সারাতি পৌঁছেছিল যিশু। আসার দিনই দেখেছিল, তারকেশ্বর-আরামবাগ রোডে চারটে করে আলুর বস্তা সাইকেলে চাপিয়ে সার বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে প্যাংলা গলদঘর্ম ছেঁড়ালুঙ্গি খালি-গা চাষিরা। চাষির কাছ থেকে ফ্যালনা দামেও আলু কেনার লোক নেই। চাষি ধারে বেচবে ছোটো আড়তদারকে, ছোটো আড়তদার বড়ো আড়তদারকে, বড়ো আড়তদার শ্যালদার কাঁচাবাজার কিংবা বড়োবাজারের পাকাবাজারকে। চাষিরা আর ছোটো আড়তদাররা কবে যে টাকা পাবে ঠিক নেই। আলুর চেয়ে খড়ের আশি আঁটির দাম বরং ভালো। আলু বিকোচ্ছে না। এদিকে খড়ের দাম চড়ছে। আলু বিকোয়নি বলে চাষিরা বীজ আলুর ঋণ শোধ করতে পারেনি। ছোটো আড়তদাররা বীজ আলুর টাকা আদায় করতে না পেয়ে অসহায়। ধরট নিতে চাইলেও এগিয়ে আসছে না কেউ।

    প্রশ্ন তুলে উত্তরটা লিখে নিতে দেখলে, কুন্ঠিত-সঙ্কুচিত হয় গাঁয়ের লোক। লেখালিখিকে সন্দেহ করে সবাই। বুকপকেটে একটা ছোটো টেপ রেখেছে যিশু যাতে কেউ টের না পায়। যারা অভিযোগ জানাতে চায়, তাদের জিগেস করতে হয়। কোন চাষির দুঃখের বোতাম কোথায়, আঁচ করে টিপলেই, গল-গল করে বেরোতে থাকে ক্রোধ কষ্ট দুর্দশা হতাশা গ্লানি অভিশাপ। চাষির অভিশাপ একদিন ফলবেই, চাষিরাই বলে সেকথা।

    বড়োতাজপুরের মামুদ মাফুজ। আগে তো লোডিঙের সময় থেকেই আলুর দর চড়ত। বণ্ডের ব্যামো ধরিয়ে দর কমিয়ে দিলে। আমরা কিচু বুঝিনে ? ঘোড়ার ঘাস খাই ? ওই তো, আলু চাষের জন্যে ঋণ নেয়নি শ্বেতলেশ্বর গাঁয়ের সমবায় সমিতি। তাদের সদস্যরা বণ্ড পেলে কী করে ? হাঃ। আমাদের কাচ থেকে সংরক্ষণ বাবদ বাড়তি ট্যাকা আদায় হচ্ছে। অথচ মহাজন আর ফড়িয়া দালালরা চাষি সেজে বণ্ড পেয়ে গেল। ভক্তিপদ কুণ্ডুর চার হাজার প্যাকেট ঢোকানো হয়েচে, ইদিকে এক ডেসিমাল জমিও নেই। হাতে-পায়ে কুঠ হয়ে মরবে যত বেজন্মার দল, এই আমি বলে রাকচি।

    খিলগাঁয়ের ক্ষুদিরাম ঢাং। এবছর শীত পড়েছিল টানা, না কী গো ? বিষ্টিবাদলা ঝড়ঝাপটা হয়নে। হাওয়াটাও শুগনো ছিল এবার। তা বোরো চাস তো হবে নে। আর গেল বছর আলুর দাম উটেছিল ভালো। ভেবেছিলুম, আলু তুলে সব ধার-দেনা মিটিয়ে দিতে পারব এবার, ওই যে দেকুন না, ওই চালটাও সারিয়ে নিতুম, মেজো মেয়্যাটার বিয়ের জন্যিও জমাতে পারব কিছু ট্যাকা। কিচ্ছু হল নে। আমাদের দেকার কেউ নেই। আমাদের কতা শোনার কেউ নেই। কীটনাশক খেয়ে মরতেও ভয় করে গো বাবু।

    বেলসলিয়ার আচেরুদ্দি মল্লিক। দেখেন না কেন, বাড়িতে সকাল থেগে উটে কাজ হয়েচে পচা আলু আর ভালো আলু আলাদা করার। নিত্যি দিন। আলুর তো পাহাড় জমে গেচে। পচা বাছতে বেলা হয়ে যায়, তাপপর দাগ ধরলিই কেটে-কেটে গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্চি। গরুগুনোও আর আলু খেতে চায় না। আগে তো টানের সময়ে দাগি আলুও কাঁচাবাজারের মহাজন নিয়ে যেত। রাত্তিরে আলুর পাহারাও হয়েচে ঝকমারি। ছেলে দুটোর রাত জেগে-জেগে শরীর বরগতিক হয়ে গেল। ওর মায়ের হাত দুটো দেকুন। দেকাও হাত দুটো, দেকাও, দেকাও না, লজ্জাশরমের কী, উনি তো হালিম-কালিমের চেয়েও ছোটো। দেকুন, পচা বেছে-বেছে হাতময় দানা বেরিয়ে গেচে।

    হালিম মল্লিক। আমাদের গাঁয়ে পচা আলুর নাম হয়েচে কলিমালু, নেতার নামে। আলুর গোলমালের জন্যে মুখ্যমন্ত্রী ওনাকে ওননো বিভাগে পাটাচ্চেন শুনলুম।

    বাদলাপুরের দেবেন জানা। চল্লিশ বছর আগে দার্জিলিঙের বিজনবাড়িতে আলুর ধসা রোগ হয়েছিল, বুঝলেন বিশ্বাসদা। কেন্দ্র সরকার তখুন পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্য রাজ্যে আলু পাঠানো বন্ধ করে দেছলো। তা সে অর্ডার তোলবার কারুর খেয়াল হল না অ্যাদ্দিনেও। তেনারা পোঁদে তেল দে ঘুমুচ্চেন। ইদিকে অন্ধ্র উড়িষ্যা থেকে তো ফি বছর আলো এসছে এখানের বাজারে। এখান থেকে নুকিয়ে-নুকিয়ে গেছে সিকিম ভুটান আসাম। লাগ-লাগ টন আলু পচার পর এখুন অর্ডার তোলার কাগজ বেরুচ্চে বলে শুনিচি। কেন্দ্র সরকারে জহোর্লালের টাইম থেকে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের লোক নেই। জহোর্লাল দিনকতকের জন্যে চারু বিশ্বাসকে মন্ত্রী করেছিল, তাও ফ্যালনা। নেতাগুনোর বাপের দুটো করে বিয়ে। তাই বিমাতা-বিমাতা করে নাকে কাঁদে।

    খাগড়াপাড়ার সত্যনারায়ণ সামান্ত। আমি স্যার দিসি উপায় করিচি। এই বটগাছতলায়, ওই যে, ওখেনটায়, আড়াই ফুট গত্তো খুঁড়ে প্রথমে বালি, তার ওপর কীটনাশক ছড়িয়ে আট কুইন্টালটাক আলু রেকিচি। তার ওপর আড়াআড়ি-লম্বালম্বি খড় বিছিয়ে আবার ওষুদ ছড়িয়ে দিইচি। ওই ইঁটের পাঁজা চাপিয়ে ঢেকে দিইচি। তিনচার মাস তো অন্তত থাগবে। তারপর কপাল। ঠাকুরের যা ইচ্ছে তাই হবে। কত দৌড়োদৌড়ি কল্লুম। এক প্যাকেট মতনও জায়গা পেলুম না। পঞ্চায়েতের কোটাও পেলুম না, সরকারি কোটাও পেলুম না। আর কত দাম ধরে মালিকের কোটা নিতে গেলে আমাদের মতন চাষির পুষোবে না। জেলাসদরে বল্লে, মন্ত্রীর ঠেঙে চিটি আনো, থালে সরকারি কোটা পাবে। কাকে ধরি ? বলেন। তাই এই উপায় করিচি। ইদিকে সেলসিয়াস আবার চল্লিশে চড়তে চলেচে।

    গুপ্তিপুরের বুড়ি। আলু-পচা আন্ত্রিকে নাতি মারা গেচে। নিববংসো হবে, অ্যাই বলে রাগলুম। যমে নেবে, যমে নেবে।

    খড়ি নদীতে জোড়া-নৌকোর মাচানে দাঁড়িয়ে কুতিরডাঙার অক্ষয় ঘোষাল। আলু পুরটসুন্দরদ্যুতি কদম্ব সন্দীপিতঃ সদ্য পকেটকন্দরে স্ফূরতুবঃ হিমঘরনন্দনঃ।

    বড়োপলাশনের শ্যামদাস প্রামাণিক। দশ প্যাকেট আলুর জন্যে মাসে এক প্যাকেট সুদ। অতিষ্টো করে মাল্লে। পাপের ভোগান ভুগতিই হবে।

    ষাটপলনের কেষ্ট দেবনাথ। দাদা সিপিয়েম করে, আমি ফরোড ব্লক করি। আমি না পেলে দাদা। দাদা না পেলে আমি। কেউ তো বন্ড পাবো। তাছাড়া কৃষি বিপণন আর সমবায় তো আম,আদের দলের হাতে। আমাদের অসুবিধা তেমন হয় না।

    জমিরাগাছির অনন্ত কুণ্ডু। আপনি একবার ভেবে দেখুন স্যার। ধান আর গমের বেলায় সংগ্রহমূল্য বছর-বছর বাড়িয়ে দিলে বলোরাম জাখড়। আলু কি জাখড়ের অ্যাঁড়, অ্যাঁ ? তা কেন সংগ্রহ করবে না সরকার ? তার কেন সংগ্রহমূল্য হবে না ? বলুন আপনি। আলুও তো ক্যাশ ক্রপ। আসলে পঞ্জাব আর হরিয়ানার বেলায় দরোজা হাটকরে খোলা। আমাদের বেলায় পোঙায় লাতি।

    এর আগে অনেক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে যিশু। কত কারখানা আর ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিতে সাহায্য করেছে মোদি গোয়েঙ্কা মল্ল ভারুচা খান্না খৈতান লালওয়ানি কেশওয়ানি মাহিন্দ্রা শিল্পপতিদের। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। স্রেফ মগজ খাটিয়ে। এরকুম অভিজ্ঞতা হয়নি আগে। পেরু না বোলিভিয়া কোথ্থেকে এসে বাঙালি জীবনে ঢুকে পড়েছে নির্বিকল্প আলু।

    আলুহীন পৃথিবী ভাবাই যায় না। বেলে কিংবা পলি দোআঁশ অল্প-টোকো জমিতে মখমল মাটির লেপ চাপা দিয়ে কেমন ডিম্বাশয় গোলগাল, তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে গভীর আয়ত চোখে ভূমিষ্ঠ হয় চন্দ্রমুখী আলু। ভূমিষ্ঠ হয় জ্যোতি অলঙ্কার কুন্দন সিঁদুরি নবীন সফেদ কুমার বংশের খোকাখুকু যুবকযুবতি। এদের অনেকে চন্দ্রমুখীর সদবংশের নামে পৌঁছোয় বাজারে। ভিজে হাওয়া আর কুয়াশা সহ্য হয় না ওদের। নাবি, ধসা, ভুষা, সাঙ্কোষপোরা রোগে ধরে। বড্ডো সুখী ওরা, তাই উই পোকা, পিঁপড়ে, কাটুই পোকা, লাল বিটল, জাব পোকা, থিপস, সাদা গ্রাব, সুতলি পোকার দলবল সুযোগ পেলেই ওদের শীতের রাত্তিরে জাপটে ধরে। ওদের আঃ উঃ লক্ষ্মীটি পায়ে পড়ি, প্রাণে মেরো না, বাঁচাও-বাঁচাও নিঃশব্দ চিৎকার মাঝরাতে মাটিতে কান পেতে শুনতে পায় আলমপুর গ্রামের কাশীনাথ মাইতি। টাকার মতন আলুও বহুবল্লভা।

    সে আলু, পচলে যে আটদশ কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাসের দখল নিয়ে নেবে, নানা রকুমার মাছি আর উনকিকে দূরদূর দেশ থেকে ডেকে আনবে সোহাগ পেতে, সে অসহ্য দুর্গন্ধের সঙ্গে গতবছর বৈশাখে পরিচিত হল যিশু, পরপর কয়েকটা হিমঘরের তথ্য যোগাড় করতে গিয়ে। ওফ, নরক, নরক।

    শীতযন্ত্র বিকল হয়ে গিয়েছিল পোলবা দাদপুরের বালিকুখাড়ি সমবায় হিমঘরে। পচে জল হয়ে গেল আলু। পাঁচ হাজার চাষি পরিবার সর্বস্বান্ত, রিপিট, সর্বস্বান্ত, লিখে রেখেছে যিশু। চাষিরা হিমঘরের সামনে গিয়ে ধরনা দিচ্ছিল বলে একশো চুয়াল্লিশ জারি হল। একদিকে হিমঘরের লোকেরা আরেক দিকে চাষিরা। সে কী হাতাহাতি মারামারি লাথালাথি। চুঁচড়ো থেকে বিরাট পুলিশপার্টি গিয়ে লাঠিপেটা করে বাগে এনেছিল। দিনদুপুরে মশারির মধ্যে বসে ল্যাপটপ খুলেছিল, অ্যাতো মাছির ঝাঁক। না খেয়ে ছিল বারোঘন্টা, নিরম্বু। তারপর পালিয়েছে। কত জনের যে হাঁপানি ধরে গেল কে জানে। চারটে চাষির বাড়িতে সাতটা বাচ্চা মরেছিল আন্ত্রিকে। অনেকের গা-ময় দাগড়া দাগ বেরিয়েছে। দুর্গন্ধ সৃষ্টি করায় মানুষের জুড়ি নেই। যত উন্নতি, তত আবর্জনা, তত নোংরামি, তত দুর্গন্ধ।

    গোস্বামীমালপাড়ার হিমঘরে সাতষট্টি হাজার প্যাকেট নষ্ট হয়েছিল। গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য হালিম মাজেদ ছিল জেলাশাসকের আপিসে, কোনো কাজে। বললে, বিমার টাকা উশুল করেও হিমঘর সমিতি বিমা করায়নি। চোত মাসে বিমা কোম্পানির লোক এসেছিল, কিন্তু কম ভোল্টেজে যন্তর বিকল হয়ে আলু পচার ভয়ে বিমায় রাজি হয়নি। বেলমুড়ি থেকে বিজলি আসে টিমটিম করে। দুটো জেনারেটর, তা দুটোই পড়ে আচে ভেঙে। হিমঘরের সহসভাপতি মহম্মদ জাকারিয়া বলেছিল, কিচু আলু বাঁচানো যাবে। তা বাঁচানো যায়নে কিচুই। নির্বাচন এসে পড়েছিল বলে মজুর-কামলা-মুটিয়া পাওয়া যায়নে। এলেকশান এলে কিচু পয়সার মুখ দেখতে পায় ওরা।

    পচে হালুয়া হয়ে গিসলো আলু। অমন সুন্দরী চন্দ্রমুখী কন্দ নিজেরা পচেছে, থলেগুলোকেও পচিয়েছে। আলুর পাহাড় থেকে আগ্নেয়গিরির পচা লাভাস্রোত। আশপাশের ভাদিলপুর, দেপুর, কেয়োলপার গাঁয়ের লোকেদের পাতলা পায়খানা আর ভেদবমি থামতেই চায় না। প্রাণ একেবারে অস্হির, আইঢাই, কাহিল। সরকারি স্বাস্হ্যকেন্দ্র এই আলুপচা রোগ সারাতে বিফল। হিমঘরের বাইরে পচা আলুর কাই কেঁখে ব্লিচিং পাউডার ছড়ানো হয়েছিল। দুর্গন্ধ আর একরোখা মাছি যায়নি তবু। পচা আলুর গ্যাস বের করতে ছেঁদা করা হয়েছে দেয়াল। তবু হিমঘরে গুমরে মরছে পচা আলুর শবের বদগন্ধ। কলকাতায় তখুন বিদেশি সিনেমার উৎসব চলছে।

    আর যেটুক বেরোতে পেরেচে, বলেছিল বালিকুখাড়ির লুৎফর রহমান, এমনভাবে চাষিবাড়ির ছেল্যামেয়্যার পেচনে লেগেচে বাবু, যে ওঝা ডেকেও ছাড়চেনে। বিষ্টি পড়লে আর দেকতে হবেনে। আলুর গুয়ের বান ডাকবে। নিমাই ঢোলের মিষ্টির দোকান একমাস বনদো।

    কালনার বংশীধর হিমঘরে বীজ আলু পচে গেছে। হিমঘরের ভাড়া জমা দিয়ে গেটপাস পাবার পরও বীজ আলু দিলে না। অ্যাতোটা পথ এসে চোপোররাত হয়রানি। একদিন তো চারঘন্টা রাস্তা অবরোধ হল। হয় বীজ দাও নইলে দাম দাও। হিমঘরের চাকরে বাবুরা গণপিটুনির ভয়ে টেবিলে খোলা কলম ফেলে হাওয়া। শয়ে-শয়ে চাষি জড়ো হচ্ছে আর গলার শিরা ফোলাচ্চে। ভবভূতি কপালি জমি তৈরি করে, ছেলেকে বীজ আনতে পাঠিয়েছিল। শক্তি সরকার পাওয়ার টিলার ভাড়া নিয়ে, জমিকে দিন দশবারো পতিত রেখে, জল কমপোস্ট রেড়ির খোল নিমের খোল দিয়ে, জো বুঝে মাটি ভেঙে আলু বোনার নালা কেটে ফেলেছিল। অলদ্রিন আর ব্রাসিকল এনে রেখেছে। তারপরই বজ্রপাতের মতন সর্বনাশা খবর। আলুর মড়কে বীজ নষ্ট। দিন দশের মধ্যে না পাতলে ফলন হবে না।

    দুজনেরই করোনারি থ্রমবোসিস, আলুপচা রোগে, বললে সদর হাসপাতালের ডাক্তার।

    মুটিয়া মজুর সর্দারদের ভাগ্য আর কমিশন থেকে কাটমানির নিষ্পত্তি না হওয়ায় বীজের আলু বাইরেই পড়েছিল টানা পনেরো দিন। বীজ আলু হল চাঁপা ফুলের পাপড়ি। অযত্ন ওদের সহ্য হয় না। তিন নম্বর চেম্বারে তিরিশ হাজার প্যাকেট বীজ আলু নষ্ট হল। এক চাষির বীজ অন্যকে দিয়ে যদ্দিন চলে চালিয়েছে। দিতে-দিতে ফুরিয়ে গিসলো। আলুর অদেষ্ট, চাষির অদেষ্ট।

    কিন্তু আলুর গপ্পো নিয়ে তুই কী করবি রে ? বলল খুশিরানি মণ্ডল।

    ভবেশকা অ্যাতো সম্পত্তি আর টাকা নিয়ে কী করবে, বলো তুমি, অ্যাঁ ? সেই ভবেশকার এমন ভুঁড়িটুড়ি, ঠাকুরদেবতা, ঝাড়ফুঁক, দলাদলি, ওফ, আমি তো ভাবতেই পারি না। ট্র্যামের ভাড়া এক পয়সা বেড়েছিল বলে, আর আলু পাওয়া যাচ্ছিল না বলে, কী-ই না করেছিল ভবেশকা। ভবেশকাকে দেখছি আর মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। গেরুয়া, বাবরিচুল, সত্য সাঁইবাবা, মাদুলি, গোমেদের আঁটি। আধুনিক লোকটার তো দফারফা। কেন, অ্যাঁ, কেন ?

    যিশু জানে খুশিদি অবোধ, নিষ্পাপ, অজ্ঞান, তাই নির্বাক।

    তোমার জন্মের সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভবেশকা তোমায় একটা ভারি কালো লোহার শেকলে আষ্টেপৃষ্টে আগলে রেখেছে, রুমালে চোখ বেঁধে। কত চাষির আলু নিশ্চিন্তে পচিয়ে ফেললে ভবেশকা। পঞ্চায়েতের যে পঁচাত্তর শতাংশ বন্ড তা-ও গোলমাল হয়েছে, কালোবাজার হয়েছে, আর মালিকদের কুড়ি শতাংশ তো সোজা বেচে দিয়েছে পাকাবাজারে। এমনকী চাষির বন্ডেও ভবেশকার সই না থাকলে হিমঘরে তোলা যাবে না। সেই ভবেশকা, ভাবতে পারো তুমি ! বুকের মধ্যে চব্বিশঘন্টা বারোভুতের মেলা চলছে ভবেশকার।

    জানি। খুশিদির চোখের পাতা কাঁপে।

    খুশিদি কেঁদে ফেলবে। যিশুর হৃৎপিণ্ডের কপাটক ফরফর শব্দ করে নিঃশব্দে। ভবেশকার প্রসঙ্গ পালটায়। বুঝলে, বীরভূমে ষাটপলসা হিমঘর চালানো নিয়ে সে কী খেওখেয়ি। হিমঘর সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ দাশ আর বাদবাকি সদস্য রেবতী ভট্টাচার্য, অম্বিকা দত্ত, জনার শেখ এরা হল ফরোয়ার্ড ব্লকের, কিন্তু আরেক সদস্য মিনতি ঘোষ, যিনি পঞ্চায়েত প্রধান, তিনি সিপিয়েমের। সমবায়ের পাঁচ লাখ টাকার হিসেব মিলছে না অভিযোগ তুলে বিশ্বনাথ দাশ বরখাস্ত করলে সহকারি ম্যানেজার শিশির ঘোষ আর ক্যাশিয়ার বৈদ্যনাথ মণ্ডলকে। ব্যাস, আর দ্যাখে কে ; বেঁধে গেল দু-দলের কাজিয়া। ময়ূরেশ্বরের সিপিয়েম সভাপতি ত্রিপুরেশ্বর মণ্ডল দখল নিলে চেয়ারম্যানের কুরসি। আদালতের হুকুমে বিশ্বনাথ দাশ ফিরে পেয়েছে চেয়ার। এই আলুমন্হনের বিষের ভাগটা চাষিদের।

    জানি, এখানেও সিপিয়েম, তৃণমূল, কংরেস আর বিজেপি হয়েচে। সবাই মিলে একটা নাম নিলেই তো হয়। চাপা কান্নায় খুশিদির অন্যমনস্ক কন্থস্বরে ভাঙন।

    গল্পের রেশ থামলে খুশিদির আপ্রাণ ধরে রাখা অশ্রুবিন্দু টপ করে ঝরে পড়বে আর যিশু চেতনায় ঘটে যাবে বিস্ফোরণ। কথা বলা বজায় রাখে ও, যিশু। পুরশুড়ার হরপার্বতী হিমঘরে কী হয়েছে জানো না ? দেড় কোটি টাকার আলু পচিয়ে, বিদ্যুৎ পর্ষদের কয়েক লক্ষ টাকার বিল না মিটিয়ে, পুরোনো মালিকরা নতুন এক ব্যাবসাদারকে চুপচাপ হিমঘর বেচে দিয়ে পালিয়েছে। চাষিদের ক্ষতিপূরণ যে কে দেবে বা আদৌ দেবে কিনা, কেউ জানে না। নতুন মালিক পচা আলু বাইরে বের করে পোড়াচ্ছিল। সেই তেল-চিটচিটে ধোঁয়ায় গোলাপজাম আর জামরুল ওব্দি পাকা জামের মতন কালো হয়ে গেছে। পুরশুড়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পতিতপাবন জানা শেষে গিয়ে আলু পোড়ানো বন্ধ করলে।

    খুশিদির ম্লান মুখাবয়বে তবু পরিবর্তন নেই।

    যিশু বলল, এবছর মোহনবাটির হিমঘরে অ্যামোনিয়ার ট্যাঙ্ক ফুটো হয়ে সোমথ্থ পাটগাছগুলো অজ্ঞান হয়ে গিসলো। খুশিদির ভাব পাল্টাচ্ছে না দেখে যিশু দুবাহু ধরে চোখে চোখ মেলে জানায়, মিছেই এসব গল্প করছি। তুমি কি কিছু বলবে ? খুশিদি ? বলবে কিছু ?

    সন্ধ্যা। চাঁপাডাঙা লোকাল থেকে হাওড়ায় নেবেই সুটকেস হাতে দৌড় লাগাতে চাইছিল যিশু। পারছিল না। রাস্তা আটকে ধিরে-ধিরে হাঁটছে ফণাতোলা সাপের মতন সতত উদ্যত নিতম্ব, একগাদা, নানা আদল আর আদরায়। সামান্য ফাঁক পেতেই পাশ কাটিয়ে আবার দৌড়োয়। একজন ষণ্ডা পুলিশ অফিসার আচমকা ওর বাহু আঁকড়ে থামাতে, রক্ত চলকে ওঠে হৃৎপিণ্ডে। পায়ের পাতা, আঙুলসুদ্দু, শিরশির করে ওঠে মোজার ভেতরে, ভয়ে, গলায় শ্লেশ্মা উথলোয় হঠাৎ। কোনো অপরাধ না করেও অপরাধের বোধ মগজে ঘুরঘুর করে ওর, মুহূর্তে মনে হল।

    সম্বিতস্হ হয়ে যিশু থ আর ক্রুদ্ধ। আদিত্য। সঙ্গে অরিন্দম, বিটকেল জুটি।

    আদিত্যর ভিড়-জমানো অট্টহাস্য, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ওফ ভয় পান পুলিশকে ! কী কেলেঙ্কারি করে ফিরছেন দাদা ? অ্যাগবারে চোখকান বুজে দৌড়োচ্ছিলেন। তা কই, কোনো কেটলিবাই বা খুন্তিসুন্দরীকে তো দেখছি না। ওপাস ডিয়ে সটকিয়ে দিয়েছেন ?

    হাত ঝাঁকিয়ে ছাড়ায় যিশু। শ্যাঃ, এরকম ইয়ার্কি ভাল্লাগে না। অরিন্দম, তুমি আবার অপর্ণা সেনের মতন মার্কেটেবল হাসি দিচ্ছ কেন ?

    আদিত্য পাছায় দুহাত, পেছনে ঝুঁকে, জিভের ডগা মুড়ে কথা বলার কায়দা, পুলিশে চাকরি পেয়ে শিখেছে, বজায় রাখে। ওঃ হোঃ হোঃ হোঃ, নির্ঘাৎ কিছু গোলমাল করে ফিরছেন আটপুর জাঙিপাড়া থেকে, বলে দিন দাদা, বলে দিন, আমরাই বাঁচাব, আমরাই হলুম গে রোকখোক আর ভোকখোক।

    আরে ট্যাক্সি ধরতে ছুটছিলুম, কেঁচিয়ে দিলে। চলো, একটা ট্যাক্সি পাইয়ে দাও। সুটকেস প্ল্যাটফর্মে রেখে, সিগারেট বের করে ধরায় যিশু, তারপর খেয়াল হওয়ায়, এগিয়ে দ্যায় আদিত্যর দিকে।

    অ্যাতো টাকা রোজগার করেন, একটা গাড়ি কেনেন না কেন ?

    গাড়ি ? বাবা-মায়ের বিয়ের দিনেই গাড়ি কিনে দিয়েছিল দাদু, সেটা চুয়াল্লিশ সন। সে গাড়িতে চেপে শ্রীরঙ্গমে শম্ভু মিত্তির বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন দেখতে গিসলো দুজনে, প্রথম দিনের শো। পরে তো শ্রীরঙ্গমের নাম হয়েছিল বিশ্বরূপা, এখুন কাছাকাছি পার্ক করা যায় না। তা হল থেকে বেরিয়ে দেখলে গাড়ি হাপিস। আর পাওয়া যায়নি গাড়ি। বাবা আর গাড়ি ছোঁয়নি। আমিও বাবাকে ফলো করছি। গাড়ি রাখা আর চালানো কলকাতায় ঝকমারি, এমন তোদের গিরগিটি এসট্যাবলিশমেন্ট।

    মানে ? অন্য দিকে তাকিয়ে অন্য কিছু খোঁজায় মনস্ক, ধোঁয়ার টুসকি ঝেড়ে জানতে চায় আদিত্য।

    গিরগিটির মাথা কখুনও লাল, কখুনও সবুজ, কখুনও কমলা রঙের হলেও, গিরগিটিটা গিরগিটিই থাকে। তুই এসব বুঝবি না। অরিন্দম এখানে কেন ? কেউ আছে-টাসছে নাকি ?

    হ্যাঁ, অরিন্দমদা অফিস থেকে দুদিন ছুটি নিয়ে বিহার থেকে আসা সব গাড়ি অ্যাটেন্ড করছে। অরিন্দমদার এক পুরোনো বন্ধুর কলকাতায় আসার কথা আছে। লোকাল ট্রেনটা এখুনও বিয়োচ্ছে, তাই চেঁচিয়ে কথাগুলো বলে আদিত্য।

    অরিন্দমের বন্ধু তো তোর তাতে কি ?

    এককালে অরিন্দমদার সহকর্মী ছিল লোকটা। চাকরি ছেড়ে এখুন গয়া পালামউ জাহানাবাদ হাজারিবাগে খেতমজুর খেপিয়ে বিপ্লব করছে। সে ব্যাটা ব্রামভোন।

    তা করুক না ; তোর চাকরিতে তো বাধ সাধছে না।

    আরে কলকাতায় আসছে অ্যাসল্ট রাইফেল বোমাফোমা কিনতে। শালা আর জায়গা পেলে না। লোকালের টুপটাপ বিয়োনো শেষ। নিত্যযাত্রীদের পচা কর্মসংস্কৃতির ঘেমো গন্ধ। মমমম।

    ওওওও। তাই ফুল ড্রেসে চোর ধরতে বেরিয়েছিস আর অরিন্দ এসচে খোচরগিরি করতে। যিশু কাঁধ নাচিয়ে হাসে।

    আদিত্যর জিভের ডগা এখুনও মোড়া। আরে এই সাবভারসিভ এলিমেন্টগুলো দেশের কাঠামোটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দিচ্ছে না। আগে তবু রঞ্জিত গুপ্ত, দেবী রায়, রুণি গুহনিয়োগীর মতন দায়বদ্ধ অফিসাররা ছিল। সেরকম ডেডিকেটেড অফিসার আর আজগাল কোথায়।

    অরিন্দম গম্ভীর, নিরুত্তর। এরকুম অনেকবার হয়েছে ওর। ওর উপস্হিতিতে ওর উদ্দেশে করা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে আরেকজন। লোকালটা বিইয়ে শেডে ফেরার ভোঁ।

    বাড়ি ফেরার তাড়া, তার ওপর ক্লান্ত, দৌড়ে ট্যাক্সি ধরার ধান্দায় কুলি নেয়া হয়নি ; যিশু স্টেশানের ভিড়ে বিরক্ত। বলল, বেশি-বেশি পোঁদপাকামি করিসনি, বুঝলি। মরবি শেষকালে। ভদ্রেশ্বর থানার ওসি ভোলানাথ ভাদুড়ি, ডোমকলের কন্সটেবল তপন দাস, জয়নগরের এস আই অশোক ব্যানার্জি, ওদের মতন বেঘোরে মরবি। আর ডেডিকেশান সাবভারসান এসব কপচাসনি ফালতু। এই তো জুন মাসে, রায়গঞ্জ থেকে খড়-বিচুলি নিণে একটা ট্রাক শিলিগুড়ি যাচ্ছিল, তার ড্রাইভার অরুণ দাস তো ইসলামপুর থানার বেরাদরদের তোলা দিতে পারেনি বলে ওকে আর খালাসিটাকে আড়ংধোলাই দিয়ে ওদের রক্ত জবজবে মুখে মুতলেন তেনারা। ইটস আ ফ্যাক্ট, আই অ্যাম নট জোকিং। আমি তখুন ইসলামপুরে ছিলুম। অন্য লরি ড্রাইভাররা জানতে পেরে যখুন একত্রিশ নম্বর হাইওয়ে অবরোধ করল, তখুন কেস গুবলেট করার জন্যে তোর ব্রাদাররা খালাসিটাকে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিলে পাশের চোপড়া থানায়। আমার কাচে খাপ খুলিসনি, বুঝলি। দুশো পাতার প্রজেক্ট রিপোর্ট প্যারা বাই প্যারা মুখস্হ বলতে পারি। ভুলে যেও না ইন্দিরা গান্ধি যে অভিশাপ কোড়োল তাতে নিজে তো গেলই, ছেলে দুটোও অপঘাতে মারা গেল। আর তোদের তো হেমেন মণ্ডল, শ্রীধর দাস, রাম অবতার, জয়চাঁদ শৈঠিয়া, রশিদ খান, বালা ভাগানি, রমেশ সিংদের মতন দায়বদ্ধ ক্যারেক্টার না হলে চলে না। যিশু, সংলাপের অস্বাভাবিক দ্রুততায় হতবাক করে ওদের দুজকে।

    ওদের ঘিরে বেগতিক শুরু হওয়ায়, অপ্রস্তুত আদিত্য বলল, আপোষের স্তুতিময় কন্ঠে, আরে চটছেন কেন, চলুন-চলুন, ট্যাক্সি পাইয়ে দিচ্ছি। দেশভাগের পর আর ফলে, ভিড়ের ঠ্যাঙাড়ে, খামখেয়াল, প্রতিদ্বন্দ্বীর যে কোনও একটা পক্ষকে গণশত্রুর ছাপ দিয়ে দিতে চায়। কাউকে শত্রূ ঘোষণা করার মধ্যে ঘোষকের আত্মপ্রসাদের হহুকুমনামা থাকে। বাঙালিজীবনে এখুন শত্রু না থাকাটা অবক্ষয়। প্রেম, তার মানে, শুধু ঈশ্বরের জন্যে, প্রকৃতির জন্যে। অরিন্দম বিব্রত। গণশত্রু শব্দটা খাঁটি বাঙালির নয়।

    পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে আদিত্যর যিশুকে প্রস্তাব, অরিন্দমদা আপনার আবিষ্কার-করা কেটলিউলির সঙ্গে পরিচয় করতে চাইছিল।

    কেন ? ওর কি নিজের মুখ নেই কথাটা পাড়ার ? যিশুর পক্ষে রাগ করাটা ওর স্বাস্হ্যের পক্ষে জরুরি। কারুর দিকে না তাকিয়ে বলল, আগের নিজের বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করুক, মুচলেকা দিক, ধরিয়ে দিক, ভারতরত্নটত্ন পাক।

    যিশুদা আপনি আমায় জানেন, তবু এমন কথা বলছেন কেন ? আসার আগে আদিত্য আমায় কিছুই বলেনি। অরিন্দম স্বার্থপর আম-জনতা আর ফিচেল হাবড়ুস নিত্যযাত্রীর ধাক্কা, এড়াবার চেষ্টা সত্ত্বেও, খেতে-খেতে, যিশুর সুটকেস আদিত্যর হাতে, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড পর্যন্ত তিনজন চুপচাপ হাঁটে। আদিত্যকে দেখে একজন সাদাপোশাক ভিকির বেঁকানো শিরদাঁড়া সোজা করে সেলাম ঠুকল। পোশাকের রাষ্ট্র-ক্ষমতার দাপটে আদিত্যকে জায়গা ছেড়ে দেয় লোকে। হাঁটেও সেভাবে আদিত্য। উত্তরআদর্শবাদী নবযুগের কমিসার। কিউ-এর চ২ছামেচিকে দাবড়ে, আদিত্যর দরজা খুলে দেয়া প্রথম ট্যাক্সিটায় বসে, অরিন্দমের দিকে স্মিত তাকিয়ে, প্রশমিত যিশু জানায়, কেটলিউলি ঘৌড়দৌড় দেখতে চায় অরিন্দম, পরিচয় করিয়ে দেব, নিয়ে যাবেনখন রেসকোর্সে। নিজে গেছেন তো কখুনও ? না গিয়ে থাকলে রাসেল স্ট্রিটে খোঁজ নিয়ে শিখে নিন।

    যিশু হাত নেড়ে চলে গেলে, আদিত্য অসংকোচে বলল, আচ্ছা অরিন্দমদা, আপনি তো ক্যানসারে বুককাটা প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, সে এপিসোড শেষ, নাকি ? না, মানে এমনিই জিগেস করছিলুম।

    অফিস এক বছরের জন্যে ম্যানিলায় আমাকে ট্রেনিঙে পাঠিয়েছিল, জানো তো ? এক বছরের ছাড়াছাড়িতে ব্যাপারটা কেমন যেন আপনা থেকেই চুকে-বুকে গেছে। আমি যখুন ছিলুম না তখুন অফিসে এ নিয়ে এমন ফিসফিস-গুজগুজ হয়েছিল যে ওর পক্ষে পিছোনো ছাড়া উপায় ছিল না। বেশিদিনবাঁচবে না, লিখেছিল আমাকে। সত্যিই বোধয় বাঁচবে না। রুগণ চেহারা হয়ে গেছে। আর তো কথাবাত্রাও হয় না। ও-ও এড়িয়ে যায়, আমিও এড়িয়ে যাই। একই অফিস বলে খুবই এমব্যারাসিং। ট্রান্সফার নিয়ে লখনো চলে যাব ভাবচি। এখানে একদম ভাল্লাগে না। অরিন্দমের কন্ঠে পরাজয়বোধ। অসহায়তার ঘূর্ণিপাকে বুঁদ হয়ে সদাসর্বদা প্রেমে পড়ে থাকতে চায় ও। একজন নারীকে ছেড়ে আরেকজন নারীর কাছে পৌঁছোনো ওব্দি ও ছটফট করে, আতঙ্কের ঘোরে থাকে। থিতু হতে পারে না কোনও নারীতে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে। ছোটো ভাই বিয়ে করে নিয়েছে। মা চিন্তিত। ম্যানিলায় গিয়েও মালয়েশিয়ার যুবতী প্রশিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কে পাতিয়ে ফেলেছিল।

    অরিন্দমের কথা শুনে আদিত্য বলে ওঠে, আরে না-না, এখুন যাবেন না। আগে লোকটাকে শনাক্ত করে দিন। কেরিয়ারের ব্যাপার। সিগারেটের বোঁটা মাটিতে ফেলে সরকারি জুতো দিয়ে মাড়ায় আদিত্য। ভিড়ে মধ্যে দিয়ে আবার প্ল্যাটফর্মে তাড়াতাড়ি ফিরতে অসুবিধা হচ্ছিল ওদের। পাজামা-পাঞ্জাবি-লুঙ্গিতে একদল ক্লান্ত পুরুষের জটলা লক্ষ করে আদিত্যর মন্তব্য, এই মালগুনিকে দেখচেন, সব বর্ডার পেরোনো ঢাকাইয়া পাতি-নেড়ে, রাতারাতি ঢুকে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের গাঁয়ে-গাঁয়ে, সবকটা লিগি, অ্যান্টি ইনডিয়ান এলিমেন্ট। ধমমো-শিবপুরেও জুটেচে। এগুনো আর ওই বাঙালগুনো, আমাদের পুরো পশ্চিমবঙ্গটাকে নষ্ট করে দিলে। আর ভারতবর্ষকে ডোবালো ব্রামভোনগুনো।

    আদিত্য যে কতরকুমের অ্যান্টিবডি খুঁজে বেড়াচ্ছে, কে জানে, মনে হল অরিন্দমের। মুসুলমানরাও নিজেদের মধ্যে আলোচনায় কেউ-কেউ এভাবে নিজের চরিত্রকে ব্যাখ্যা করে হয়তো। ও বলল, কিন্তু ওরা এখানে চিত্তরঞ্জন দাসে বেঙ্গল প্যাক্টও করতে আসেনি, আর তোমার কর্মসংস্হান কেন্দ্রে নাম নথি করে কাঁদতেও আসেনি। ওরা জানে পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ-লক্ষ লোকের কাজ ফাঁকা পড়ে আছে। সেই কাজগুনো করতেই আসচে ওরা। খাটবে-খাবেদাবে, বাচ্চা বিয়োবে, সাধ-আহ্লাদ করবে, মরে যাবে। কেন, বিহার-উড়িষ্যা থেকেও তো বছর-বছর লোক আসছে, কাজ পাচ্ছে, কাজ করছে, থেকে যাচ্ছে। শুধু এখানকার বাঙালিদেরই দেয়াল-জোড়া ন্যাকা-শ্লোগান প্যানপ্যানানি আর বুকনি।

    আদিত্যর পচন্দ নয় এরকুম যুক্তি। ঘরে-ঘরে কত বেকার ছেলেমেয়ে, দেশ রসাতলে যাচ্ছে, কেন্দ্র সরকার বঞ্চনা করছে, আইনশৃঙ্খলার সমস্যা, সমাজের অবক্ষয় নিয়ে বক্তব্যের রেকর্ড বাজায়। অরিন্দমকে বহুক্ষণ চুপচাপ থাকতে দেখে বলল, রসিক পাসওয়ান লোকটা বড়ো হলে কী হবে। সহজে মুখ খোলেনি বুঝলেন। চারদিন সময় নিয়েছে ভাঙতে। বাকিগুনোকেও আমরা ধরবই।

    অরিন্দম ভিন্ন খেয়ালে। ও যখুন পাটনা অফিসে এইচ আর ডিতে কাজ করত, অতনু চক্রবর্তী আর সুশান্ত ঘোষ দুই জিগরি বন্ধু ছিল ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে। টাকাকড়ি পরীক্ষক, কয়েন-নোট এগজামিনার। চাকরি ফেলে রেখে, কাউকে কিছু না বলে, দুজনেই পর-পর দুম করে উধাও। বাড়ির আরাম আর স্বজনজ্ঞাতির সংস্রব ছেড়ে এভাবে কেন চলে যায় মানুষ ! তারা কি কারুর বা কোনও কিছুর সোহাগ-বঞ্চিত ? ওভাবে উধাও হবার সাহসকে আসলে ও ঈর্ষা করে। নয়তো আদিত্যর সঙ্গে কাল আর আজ দুটো ছুটি নষ্ট করছে কেন ! পচা টাকার উপত্যকায় দিনের পর দিন কাজে হাঁপিয়ে উঠেছিল বোধয় ওরা দুজনে। এখানে যেমন রোজকার দশ কিলো-কুড়ি কিলো কয়েন ওজন করার চাকরিতে বিরক্ত হয়ে পুলিশে আদ্দেক মাইনেতে ঢুকে গেছে আদিত্য।

    প্রথমে সুশান্তটা উধাও হয়ে গিসলো। দুশো একর জমি আর সাত একর ফলবাগান আর রোববারি হাট ছিল ওর দাদুর, মুঙ্গেরের পিপারিয়া গ্রামে। ফাঁসির হুকুমপ্রাপ্ত জোতদার ব্যাজনাথ সিংকে উচ্চ আদালতে বাঁচিয়ে দেবার পুরস্কার হিসেবে তোপেয়েছিল ওর উকিল-ঠাকুদ্দা। যতদিন যাদব ক্রিমিনালদের দৌরাত্ম্য ছিল পিপারিয়ায়, সুশান্তরা গোপ বলে, ফসলের বখরা আর হাটের খাজনা পেতে ওদের অসুবিধা হয়নি। বস্তা-বস্তা চাল ডাল গম সরষে রাখা থাকত পাটনায় ওদের গর্দানিবাগের বাড়িতে। কজ্জল ধানুকের দৌরাত্ম্যে সুশান্তর বাপ জ্যাঠা কাকা পরে আর পিপারিয়া-মুখো হতে পারেনি। ধানুক, বিন্দ, ভূমিহাররা তখন একদিকে আর যাদবরা আরেক দিকে। যাদবদের নিত্যিদিন খুন করত ধানুকরা।

    তারিণী মণ্ডল নামে আরেকজন নির্মম ক্রিমিনালের সাহায্যে, ওই সব জমিজমা আবার দখল করার উদ্দেশ্যে, কাউকে কিছু না বলে, কিছু টাকা জমিয়ে সুশান্ত গিসলো নওয়াগাছির কাজি-কোরাইয়ায়। ওই মণ্ডলরা এককালে হুগলি জেলার চাষি ছিল, থেকে গেছে দিয়ারায় গিয়ে। আরেকজন মানুষের যা কিছু ভালো, সে সদগুণ আমার নেই, সেই দুর্বলতার খাতিরে আমি, আমরা, তাকে আক্রমণ করি, ভাবছিল অরিন্দম। প্রথমে সুশান্তকে আটকে রেখে মণ্ডলরা ওর বাবা-জ্যাঠার কাছে দশ লাখ টাকা ফিরৌতি বা ক্ষতিপুরণ চেয়েছিল। অত টাকা কোথ্থেকেই বা দেবে। সুশান্তকে পছন্দ হওয়ায় তারিণী মন্ডল নিজের চোদ্দো বছরের মেয়ের সঙ্গে সুশান্তর বিয়ে দিয়ে দিলে। আর ফিরতে পারেনি সুশান্ত। অপরাধীদের সঙ্গে দিনভর আর তাদের মেয়ের সঙ্গে রাতভর কাটাতে-কাটাতে অপরাধকেও ভালোবাসতে অভ্যস্ত এখুন ও, সুশান্ত। বাপ জ্যাঠা কাকার বিশাল একান্নবর্তী ছিল সুশান্তদের। ওর জন্যে সব পাঁকমাটি।

    লালু যাদব মুখ্যমন্ত্রী হবার পর যাদব ক্রিমিনালরা তাদের হৃতরাজ্য ফিরে পেয়েছে, লড়ে দখল করে নিয়েছে। অপরাধের জাতীয়করণ হয়ছে অনেক গাঁয়ে-গঞ্জে, এমনকী শহরেও। জেলাশাসককেই পিটিয়ে মেরে ফেলেছে হাজিপুরে। পিপারিয়ার দুশো একর জমি আর সাত একর ফলবাগান ফিরে পেয়েছে সুশান্ত। পাটনায়ও গিয়েছিল তারপর, নিজের বাড়িতে, গর্দানিবাগে। অন্তরালকে ভাঙা, হয়ে গেছে অসম্ভব। বাংলা কথাবাত্রাও আর গড়গড় করে বলতে পারে না, গাঁইয়া হিন্দি মিশিয়ে বাংলা বলে। দূরত্ব বেড়ে গেছে সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায়। ফিরে গেছে শ্বশুরের দেশে। দিয়ারা-দুপুরের উড়ন্ত রুপোলি বালিয়াড়িতে।

    সুশান্তর পর উধাও হয়ে গেল অতনু। একদম বেপাত্তা। কতরকুমের যে গুজব রটেছিল ওর নামে। একজন লোক যতদিন বাঁচে, তার নামে কতরকুমের গল্প হয়। মরে গেলে গল্পগুনোও মরে যায়। কেউ যে বেঁচে আছে তাকে নিয়ে রটনাগুনোই তার প্রমাণ। একা থাকত অতনু। নিজেদের বাড়ি। সব ছিল। স২সার পাতলেই মিটে যেত। সাজানো বাড়ি ছেড়ে আচমকা নিরুদ্দেশ। হাওয়া। পালঙ্ক, বিছানা, হাফ-তোলা মশারি, ডাইনিং টেবিলে চায়ের কাপ, মিউজিক সিসটেম, বিছানায় টেপে এনরিকো কারুসোর ক্যাসেট, টিভি, ডিম-মাখন, সবজি, কোল্ড ড্রিংকস ভরা থকথকে বরফ-ঝোলা ফ্রিজ, মিক্সার-গ্রাইণ্ডার, থালা-বাসন, জামাকাপড়, বাংলা-ইংরিজি হাজারখানেক বইপত্তর, পড়ে রইল যেমনকার তেমন, যেন ফিরবে এইমাত্তর, বাজারে গেছে। ওর প্রতিবেশি পদমদেও সিনহার বিধবা স্ত্রী দরোজায় তালা দিয়ে খবর দিসলো উদবিগ্ন বন্ধু-বান্ধদের।

    কতরকুম জনশ্রুতি পাক খেয়েছে অতনুকে নিয়ে। পাগল হয়ে গেছে। আত্মহত্যা করেছে। সাধু হয়ে চলে গেছে নেপালে। ড্রাগ অ্যাডিক্ট হয়ে বেঘোরে মরেছে। শেফালি বাউরি নামে এক হাফ-গেরস্তর সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে সংসার পেতেছে। শেষে কিনা, আশ্চর্য, অরিন্দম ওকে দেখতে পেল হাজারিবাগের ঘন জঙ্গলে। মাওবাদি কমিউনিস্ট সেন্টারের নিখোরাকি খেতমজুরের ছেলেমেয়েদের অনাড়ম্বর গণবিবাহে। রেড বুক থেকে ইংরিজিতে মন্তর পড়ে বিয়ে দিচ্ছিল। রেড বুককে বিয়ে দেবার বই করে ফেলেছে ! দেড়-দুশো হতদরিদ্র, ময়লা, স্নানহীন, হাফল্যাংটো গ্যাঞ্জামে বিয়ে শেষে অতনুর দিকে ভিড় ঠেলে এগোবার আগেই লোপাট হয়ে গিসলো। দেখতে কি আর পায়নি অরিন্দমকে ? এড়িয়ে গেল। স্রেফ উপেক্ষা করল। অদ্ভুত। অতনুর জীবনে অরিন্দমের জন্যে আর এক চিলতেও পরিসর নেই।

    পাটনা অফিসের চাপরাশি রসিক পাসওয়ানই নিয়ে গিসলো ওই জঙ্গলে। পাটনা থেকে অসীম পোদ্দারের ডিজেল অ্যামবাসাডর গাড়িটা কিনে কলকাতায় চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল অরিন্দম। অনেককে বলেছিল সঙ্গে যেতে। রসিক রাজি হল। দুজনে পালা করে চালিয়ে কোন্নোগর আসার পর রসিক পাসওয়ান বাসে করে চলে গেল হাওড়ায় ওর জেলার লোকের কাছে। আশ্চর্য, এই দেড় বছর চাকরি থেকে বেমালুমনিরুদ্দেশ ছিল রসিক। ভোটবাগানেই ধরেছে ওকে পুলিশ। ধরেছে গুণ্ডাদের দেওয়া তথ্যে। লোহার বাবরির সরকারি মান্যতাপ্রাপ্ত ক্রিমিনালদের সাহায্যে বন্দুক-টন্দুক জোগাড় করছিল। ও যে ভোটবাগানে লুকিয়ে রয়েছে, সেই চিঠিটা অরিন্দমকে আদপে সত্যিই কে যে লিখেছিল, সে সন্দেহ আরও গভীর হয়ে যাচ্ছে। আদিত্যর কি হাত আছে তাতে ?

    সমাজ কাউকে নিরুদ্দিষ্ট থাকতে দেবে না। খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে খুঁজে বের করবেই। এবার টেনে বের করতে চায় অতনুকে। লোকচক্ষু নামের একটামাত্র চোখের এই সমাজ। জিভ তার অনেক। আদিত্য সেদিন বলছিল, লেকচার ঝাড়ছিল, যে, সমাজ যাদের সহজে খুঁজে পায় না, তারাই যতরকুমের গোলমাল বাধায়। লুকোছাপা, গোপনীয়তা, প্রায়ভেসি দেখলেই তাকে উপড়ে ফেলতে হবে, হিঁচড়ে বের করতে হবে সবার সামনে। রঞ্জিত গুপ্ত, দেবী রায়, রুণু গুহনিয়োগীর দায়বদ্ধতার সেটাই ছিল চাবিকাঠি। আদিত্য সেই আদিম বুনো চাবিটা প্রায় করায়ত্ত করে ফেলেছে।

    অধ্যাপকের দামি উন্নাসিকতার আদলে বলেছিল আদিত্য, এই এখুন যদি রুণু স্যার গোয়েন্দা বিভাগে থাকত তাহলে অ্যাতো মার্ডার হত না। জানেন, গত বছর, এক হাজার আটশো আটত্রিশটা মার্ডার হয়েছিল, আর তার আগের বছর এক হাজার সাতশো পাঁচটা, যখুন কিনা মেয়েদের ওপর অত্যাচার গত বছর হয়েছিল সাত হাজার তিনশো উনআশি আর তার আগের বছর সাত হাজার তিনশো একাত্তরটা। ওই যে বললুম, ডেডিকেটেড অফিসার নেই। আগে ডিসি বিভূতি চক্রবর্তীর মতন লোক ছিল। অফিসারদের আর কত নাম করব ? রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, রাজকুমার চ্যাটার্জি, নীহার চৌধুরী, রবি কর, উমাশংকর লাহিড়ি, অরুণ ব্যানার্জি, আদিত্য কর্মকার, দীপক কর, আশিস মুখার্জি, তারপর আপনার পাঁচুগোপাল মুখার্জি, বুঝলেন, এসব নাম বাঙালির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পিওর গোল্ডে। এরা না থাকলে নকশাল মিনেস ইর‌্যাডিকেট হত না পশ্চিমবঙ্গে।

    তা থাকবে। অন্যমনস্ক বলে, অরিন্দমের খেয়াল হল যে, সোনার বাংলা অক্ষর সত্যিই দ্যাখেনো ও আজ ওব্দি। এবারে ছোটোভাইয়ের বউয়ের জন্মদিনে একটা ভারি সোনার গিনি গড়িয়ে দেবে। বাংলা হরফ থাকবে তাতে, ‘সোনার বাংলা’। চাঁদ সদাগরের মুখ ? বল্লাল সেনের মুখ ? না, মুখ্যমন্ত্রীর মুখ। কিন্তু কোন মুখ্যমন্ত্রী ?

    আজগাল তো পদ্য লিকিয়েরাও পুলিশ কমিশনার হয়ে যাচ্চে। জিভের ডগা মুড়ে জানায় আদিত্য। রুণু স্যার ঠিকই বলেছিল, পদ্য লিকে-লিকে কলকাতা পুলিশের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল তুষার তালুকদারটা।

    তুমিও লেখো না। তুমি পারবে। ধর্ষণকে বলতে হবে নিগ্রহ বা নির্যাতন।

    অরিন্দমের খোঁচাটা সূক্ষ্ম হয়ে গেল বোধয়, মর্মার্থ বুঝতে পারল না আদিত্য। বলল, পাগল নাকি। পদ্য লেকে বলে দীপক রুদ্র আর পার্টসারথী চৌধুরী সুপারসিড হয়ে মুখ্য সচিব হতে পারল না, দেখচেন না। প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষ তো পদ্য লেকে বলে প্রোমোটি আই এ এস হতে পারেনি। তারাপদ রায় অবশ্য হয়েছিল মজার-মজার পদ্য লিকতো বলে। চাকরিটা খাবেন দেকচি। পদ্য নাটক-ফাটক লিকে মন্ত্রী-টন্ত্রী হওয়া যায় বটে। কিন্তু সিরিয়াস সরকারি কাজে ওসব চলে না। আদিত্য নিজে নিজের জন্যে স্তোকবাক্যের বুজকুড়ি কেটে মাথামুণ্ডু বকে যায়।

    নিজের ভাবনায় মডগুল হবার দরুন, হাওড়া স্টেশানের অখিল ভারতীয় কচকচানি অরিন্দমের চারিপাশে শ্রুতির অবুঝ পার্টিশান তোলে। যিশুকে ওভাবে ধরে একটা ড্রাই রান দিলে আদিত্য। বর্ধমানের কোন-এক ধর্মশিবপুর গ্রামের, যেখানকার মানুষ এই একুশ শতকেও মাঠে হাগতে যায়, সেখানের এই স্বাস্হ্যবান যুবক একদিন মহিলাদের সামনে-পেছনে রুল ঢুকিয়ে রাষ্ট্রের আইন সামলাবে। যাকে ইচ্ছে ধরে তার পায়ের আর হাতের নখ উপড়ে নেবে, এক-এক করে। মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, কিল চড় ঘুষি লাঠি লাথি, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, যতক্ষণ না পেশি থেঁতলে লোকটা হেদিয়ে পড়ে। লোকটার ধড় সাপের লেজের মতন ছটফট না করা পর্যন্ত মুণ্ডু জবরদস্তি চুবিয়ে রাখবে জলে। ফেটে রক্তাক্ত অজ্ঞান না-হওয়া ওব্দি পায়ের পাতায় অবিরাম লাঠির বাড়ি মারবে ; কড়িকাঠ থেকে উল্টো ঝুলিয়ে। যতক্ষণ না শব্দ ওঠা বন্ধ হয়, হাতের গাঁটে পায়ের গাঁটে রুল পেটাবে। চুলের মুঠি ধরে, একবার এদেয়ালে একবার ওদেয়ালে মাথা ঠুকে দেবে। শিশ্নে মারতে থাকবে ফুটরুল দিয়ে। হাত-পা বেঁধে শুইয়ে বুটজুতো পায়ে উরু মাড়াবে। সিগারেটের টুকরোর ছ্যাঁকা দেবে, মেয়েদের নরম জায়গায়। ফাঁকে-ফাঁকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করবে মা-বাপ তুলে। পালাতে বলে, জলজ্যান্ত গুলি করবে পেছন থেকে ; মরে গেলে চ্যাংদোলা এক-দুই-তিন দুলিয়ে ফেলে দেবে হাসপাতালের আঁস্তাকুড়ে। এসবই ব্রিটিশের কাছ থেকে কংরেসিরা পেয়ে, দিয়ে গেছে বামপন্হীদের ; তারা আবার পরের কর্তাদের দিয়ে যাবে, অম্লানমগজে। সমাজ বোধয় কোনোকালেই বদলায় না। অধঃপতনের যাত্রাপথকেই বোধয় প্রগতি বলে। কিন্তু যতই যাই হোক, যিশু বিশ্বাসের কথাটাই ঠিক। ‘প্রান্তিক চিরকার ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংঘর্ষ চালিয়ে যায়।’

    অরিন্দম দেখল, জি আর পির চারজন কন্সটেবল তিনটে দেহাতিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আদিত্যকে সেলাম ঠুকলো কন্সটেবলগুনো। আদিতছ, কী রে জবাই করতে যাচ্ছিস, বলায়, একজন অম্লপিত্তকফে ভোগা কন্সটেবল চোখ টেপে, গাঁইয়াগুলা মহিলা কামরায় চাপতাসিলঅঅ।

    অরিন্দমের প্রশ্নবাচক ভুরুর উদ্দেশে আদিত্য রসিক হয়ে ওঠে। ওরা ওই দেহাতিগুনোকে জি আর পি থানায় ঢুকিয়ে একটাকে বলবে জামিনদার খুঁজে আনতে। এই বিদেশ-বিভূঁয়ে এসে টপ করে তো আর পাবে না জামিনদার। থানার দরোজার সামনে, দেখগে যাও, উবু হয়ে বসে আছে হুদো-হুদো হবু জামিনদার। ছাড়ান পাবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠবে দেহাতিগুনো। কত রকুমার কেস যে সারাদিন ধরছে তার ইয়ত্তা নেই। জি আর পির সঙ্গে বেশ ভালো বোঝাপড়া আছে জামিনদারদের। রেস্ত খসালেই ছাড়া পেয়ে যাবে লোকগুনো। জামিন, জামিনদার, জামিনের কাগজ সব ভুয়ো। রেস্ত পাওয়া হয়ে গেলেই ছিঁড়ে ফেলে দেবে ওসব কাগুজে প্রমাণ-টমান। অনেক দেহাতি-পার্টি তো হাতে হেভি মালকড়ি নিয়ে কলকাতায় আসে। আমাদের ওদিকের কালনার শৈলেন ঘটক জামিনদারি করে এক বছরেই সাত বিঘে দোফসলা জমি কিনে ফেলেছে। অবশ্যি উবু হয়ে বসার ওই জায়গাটুকু অনেক দাম ধরে পেতে হয়েছিল শৈলেন ঘটককে।

    প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি-অভিমুখী যাত্রী-ঠাসা লোকাল ট্রেনের চকিত-করা ভোঁ বেজে ওঠে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঘটকালি মন্দ নয়, বলল ও, অরিন্দম। ট্রেনটা ঘট করে শব্দ করে ছাড়তেই, আদিত্যকে ভ্যাবাচাকায় ফেলে, তাতে উঠে পড়ল অরিন্দ। টা-টা।

    ১০

    বাড়ি ফিরলেও অশান্তি। ছোটো ভাইটার বউ মধ্যশিক্ষা পর্ষদে কেরানি। অ্যামবাসাডরে পাশে বসিয়ে, সুপর্ণাকে ওর অফিসে নাবিয়ে, অরিন্দম চলে যায় বি-বা-দী বাগে নিজের দপ্তরে। তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাতে ভয় করে। ভাইয়ের অনুযোগ যে, ইচ্ছে করে গাড়ি আস্তে চালায় অরিন্দম। জ্যামহীন হরিশ মুখার্জি দিয়ে যাবার বদলে সিগনালের অজস্র ব্যারিকেড-বাধা গাড়িকন্টকিত আশুতোষ-শ্যামাপ্রসাদ দিয়ে যায়। বাসে প্রায় ঘেঁষাঘেঁষি। চলন্ত গাড়িতে হাসাহাসি করে ভাসুর ভাদ্দরবউ। অনেকে নিজের চোখে দেখেছে। পাড়ার বেকার ফুটপাতবাজরা পর্যন্ত আকৃষ্ট হয়েছে ওদের হাসির আদান-প্রদানে, ছি ছি। পাড়া কমিটির উদবাস্তু নেত্রী অঞ্জনা হাজরার একমাত্র মেয়ে বলে খাপ খোলে না কেউ। কই, বাড়ি ফিরে তো হাসাহাসি হয় না।

    কী ঘোর বিপদ অরিন্দমের। হঠাৎ কী করেই বা বলবে, এই সুপর্ণা, কাল থেকে তুই বাসে যাস। ঘড়ির ব্যাপারে পাগলামি আছে সুপর্ণার। টেবিলে-টেবিলে, প্রতিটি ঘরের দেয়ালে-দেয়ালে, বিভিন্ন বাজনার গোল লম্বাটে চারকোণা ছকোণা ঘড়ি ঝুলিয়েছে। বৈঠকখানার দেয়ালে টাঙিয়েছে ্রিণ-শিং বিদেশি ঘড়ি, আধঘন্টা অন্তর পাখি বেরিয়ে ডাকে। একঘন্টা অন্তর সমস্ত ঘড়িগুনো বাজতে থাকলে নিভৃত আ্‌লাদ হয় অরিন্দমের। অবশ্য সব ঘযিগুলোই দিনের বেলায় বাজে ; অন্ধকার হলেই তারা বোবা। সাতদিনের জন্যে অরিন্দম ওকে সাতরঙা ঘড়ি কিনে দিয়েছে বলেও উষ্মা।

    ভাদ্রবধুর অফিসে প্রশ্নফাঁস, জাল মার্কশিট, ফেলকে পাশ করানো, নম্বর বাড়ানো কেলেংকারির দরুন সেদিন অরিন্দমের টেবিলের সামনে বসে হিঁয়াঃ হিঁয়াঃ হিঃ হিঃ হিঃ খিক খিক হিঁয়াঃ ইঁয়াঃ করে হাত-পা-মাথা নাড়িয়ে-নাচিয়ে হাসি উপহার দিয়ে গেল পাটনা অফিসের মহাত্যাঁদোড় নোটপরীক্ষক মোহন রাজবংশী, যেন ওসব নোংরামির জন্যে অরিন্দমই দায়ি। ব্যাটা তো কোনও কাজ করে না অফিসে। নোটের প্যাকেট গোনার বদলে বাঁ পাশ থেকে ডানপাশে নিয়ে সই মেরে দিত। তারপর সারাদিন কোনো অফিসারের চেলেমেয়েকে কোথায় ভরতি করাবে, ডোনেশানের দরদস্তুর, পরীক্ষায় ভালো নকল চেলেকে বসানো, ইনভিজিলেটারের সঙ্গে রফা, এইসব সমাজসেবা করে বেড়ায়, আর তার জন্যে কমিশন খায়। পাটনায় থাকতে একবার প্রচ্ছন্ন টিটকিরি মেরেছিল অরিন্দম। তার প্রতিশোধ নিয়ে গেল।

    অরিন্দম ভাবছিল যে ওর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সবায়ের সমস্যা। সেই ছাত্রজীবন থেকে একের-পর-এক প্রেমাস্পদার সঙ্গে ও সম্পর্ক গড়েছে আর তা ভেঙে গেছে। গড়া-ভাঙার মাঝখানটা ঘিরে একটা করে দূষিত গল্প ছড়ায়। বিশ্বাসযোগ্যতায় দূষণ ঘটে। শেষ গল্পটা তুলি জোয়ারদারকে নিয়ে। যারা কখুনও প্রেম করেনি, তারা মনে করে প্রেমের জন্যে বুঝি মেয়েমানুষটাই সবকিছু। তা তো নয়। নেসায় যেমন নেশাটাই মুখ্য, ড্রাগটা তো গৌণ। ম্যানিলায় একবছর ট্রেনিঙে ছিল বলে, নারীসঙ্গ বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কথা ও কাহিনি ছড়িয়েছে অফিসে। ডলার বাঁচিয়ে হংকং আর ব্যাংককের লাল-আলো এলাকার সুমসৃণ মোঙ্গল-ত্বক আদর করার উত্তেজক জিভ-ভেজা গল্প। ছোটোভাইটাও অরিন্দমের নানা গল্পগাছায় ছোটোবেলা থেকে প্রতিপালিত। তার কাছে বিশ্বাস্য হয়ে ওঠা অসম্ভব।

    শ্যাওড়াফুলি লোকালে উদ্দেশ্যহীন উঠে পড়েছিল অরিন্দম। কোন্নোগরে নাবল না, ছোটোকাকার শ্রাদ্ধে যাওয়া হয়নি। হিন্দমোটরে নাবল না, অ্যাতো রাতে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে পড়বে মেজোকাকা। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে এমন সমস্ত কেউটে গোখরো লাউডগা অজগর শঙ্খচূড় কিরাইত চিতি চন্দ্রবোড়া কানড় ময়াল বের করে-করে কামড় খেতে থাকবে যে রাতভর ঘুমুতে দেবে না। প্রতিটি কামড়ের আগে বলবে, গল্পটা হল এই ; অথচ তা গল্প নয়, তাঁর জীবনের দুঃখকষ্টের চিলতে।

    লাটের পর লাট ঘামে পচা নিত্যযাত্রী উঠছে-নাবছে, কোথাও না কোথাও যাবে। তীর্থযাত্রীর মতন একটা ইদ্দেশ্যময় নির্ধারিত গন্তব্য তো আছে। বাড়ি, পরিবার, দিনানুদিনের যৌনতা, রুটিনবদ্ধ কর্মসূচি। এটাই তো সুখপ্রদ আধুনিক জীবন।

    ট্রেনটার শেষ স্টেশান শ্যাওড়াফুলিতে, নেবে পড়ল অরিন্দম। মাকে টেলিফোন করে দিল, পিসিমার বাড়ি যাচ্ছে, পরশু অফিস হয়ে ফিরবে। অন্ধকারের অন্ধিসন্ধিতে পঁকপঁক তুলে এগোয় রিকশা। খোঁদল-কানা টিমটিমে রাস্তায় বৃষ্টির আবেগ-মাখা কাদা। দুপাশের হামলে-পড়া দোকানদারিতে নোনাডাঙা রোডটা অনোন্যপায়। বৃষস্কন্ধ ট্রাক চোখ বুজে র‌্যাশান পাচার করাচ্ছে। পাঁঠার শিড়িঙে মরদেহের অবশিষ্টাংশ ঝুলে আছে একাকী উদাসীন কসায়ের চ্যাঁচারি-চিলমনের আবডালে। শহুরে বর্ষার অকাল-ছপছপে গলিতে রিকশা থামল। ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে যতটা চোখ মেলা যায়, থিতু হয়ে জিরোচ্ছে কৃষ্ণপক্ষের সজল মেঘ।

    পিসিমা যে পাঁচ বছর আগে মারা গেছে তা পৌঁছে টের পেল অরিন্দম। পিসতুতো ছয় ভাই, ইঁটের অর্থেক তৈরি দাঁত-বেরোনো বাড়িতে ঢুকে দেখল ও, আলাদা-আলাদা মিনি সংসার বানিয়ে ফেলেছে যে-যার ছাদ-পেটানো নানান মাপের খুপরি-ঘর ফ্ল্যাটে। আজকে বড়ো বউদির জন্মের সুবর্ণজয়ন্তীতে, ওদের একত্রে মদ খেতে বসার দরুন, স্কচ হুইস্কির ভরাযৌবন বোতলদুটো পিসিমা-পিসেমশায়ের উপস্হিতির কাজ করল। নয়তো অরিন্দম ঠিক কোন ভায়ের অতিথি, সে সমসয়া এক অপ্রস্তুত ঝামেলায় ফেলে দিত এই বাদলা রাত্তিরে। দুই বোন আর তাদের স্বামীসন্ততিও হাজির। গ্রামীণ প্রকৃতি-পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন প্রতিটি পরিবার নিজের বাড়ির মধ্যেই মেলা বসাচ্ছে এ-যুগে। পাঁঠাবলির বিকল্প ব্রয়লার। নাগরদোলা আর ফকির-বাউলের বদলে ভিসিপি-ভিসিআর এনে বা কমপিউটারে হিন্দি সিনেমার জগঝম্প। একান্নবর্তী এ-যুগে একবোতলবর্তী।

    সত্যিকারের বাউল-ফকিররা বোথয় আর টিকবে না বেশিদিন। লালন থাকবে ইশকুল-কলেজের পুঁথিপত্তরে। টিভি আর নাটক-মাচানে থাকবে পূর্ণদাস বাউল। অফিসের কাজে একবার মুর্শিদাবাদ গিয়েছিল অরিন্দম। তাঁতিদের কীভাবে সাহায্য করা যায় যাতে মুর্শিদাবাদি সিল্কের শাড়ি কর্ণাটক আর তামিলনাডুর শাড়ির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিততে পারে তা খতিয়ে দেখতে ধরমপুর, কুমিরদহ, ছয়ঘড়ি, নতুন হাসানপুর, দুর্লভপুর, গুধিয়া, হাসানপুর, হরিহরপাড়া, বাগড়ি, আলিনগর অঞ্চলে ঘোরাঘুরির সময় ফকির-বাউলের হেনস্তার অভিযোগ পেয়েছিল অরিন্দম।

    বোঝলেন বাবু, আমরা নাকি কাফের, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদা করি না বলে আমরা নাকি আল্লার বান্দা নয়, আমাদের গানবাজনা নাকি হারাম, রোজা রাখি না বলে ইন্তেকালের পর জান্নাতে আমাদের জায়গা নেই। বলেছিল সিরাজ ফকির। আড়াই হাজার ট্যাকা দিতে হয়েচে গান করি বলে। কংরেস সিপিয়েম ফরোড ব্লক তৃণমূল কেউ বাঁচাতে আসলেনে।

    স্বাধীন বাংলাদেশ হলে কী হবে, পাকিসতানি জামাত আছে সেখানে লুক্যে। কুষ্টিয়া রাজশাহি পাবনা থিক্যা আসসা বুল্যে যায় ফকির যেন কাফেরের মতন দোল না খ্যাল্যে, যেন নুন না খায় কাফেরের ভোজে। পরামাণিক ঘরামি কলু মোহন্ত মাঝি পদবি বাদ না দিল্যা তার ঘর‌্যে সাদি-নিকা বন্ধ করা হব্যে। বিয়া আকিকা ইদ বকরিদে লালনের গান গাইবা না। কাজেম মোহন্তর মেয়্যের সোহরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি আর তার আবার বিয়া কাফেরদের মতন দিল্যা, তাই লবণচল বন্ধ। রইসুদ্দি ফকির, একবাল হোসেন, কাজেমালি দোতারা নিয়্যা নেচেছিল। তেনাদের হুমকি দিয়্যা গেছে ওপারের তবলিগ। পাসপোট-ভিসা লাগ্যে নাই তবলিগঅলাদের। আমরা আল্লার বান্দা না পাকিস্তানের বান্দা বল্যেন আপনে। জানতে চেয়েছিল ফজলু ফকির।

    এমন অবস্হায় বালুচরি শাড়িকে ঢাকার বাজারে আর প্রবাসী ধনী বাংলাদেশিদের কাছে জনপ্রিয় করা শক্ত। বাঁকুড়া জেলায় বিষ্ণুপুর মহকুমার মাধবগঞ্জে মহাজন আর তাঁতিরা গোঁ ধরে আছে যে হিন্দু মোটিফ পালটাবে না। মুর্শিদাবাদি তাঁতিকে বালুচরি বোনা শিখতে হলে প্রথমে মাধবগঞ্জের মোটিফ শিখতে হবে। চাঁদ তারা উট তাঁবু খেজুরগাছ মিনার এসবের নকশা জ্যাকার্ডে তুলে যে সরকারি কম্পিউটারবিদ বিষ্ণুপুরে প্রচার করতে গিসলো তাকে তাঁতিরা আর মহাজনরা প্রচণ্ড মার দিয়েছিল। অরিন্দমের মনে হয়েছে এ তো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অতীত এক দুর্বোধ্য সমাজ, এর জট পাকাতে-পাকাতে দড়ির মুখ খোঁজাকে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছে। অথচ মুর্শিদাবাদের বালুচর গ্রামেই জন্মেছিল বালুচরি।

    হতভম্ব অরিন্দম বলেছিল, কিন্তু জেলা সদরে যে শুনলুম বাউল ফকির সংঘের সভাপতি শক্তিনাথ ঝা, তারপর কলকাতার সব গণ্যমান্য লোকেরা, মহাশ্বেতা দেবী, আবুল বাশার, প্রকাশ কর্মকার, মনোজ মিত্র, আজিজুল হক, কবির সুমন, সুজাত ভদ্র, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ওনারা মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে দরবার করেছেন।

    সিরাজ ফকির : ওই কলকাতায় গান-গপপো-থেটার করেন, তেনারা ?

    অরিন্দম : হ্যাঁ হ্যাঁ।

    সিরাজ ফকির : তা তেনারা থাকে কলকাতায় আর নাসিরুদ্দি ছায়েব ভোটে জেতে হেথায়।

    অরিন্দম : ওহ।

    সিরাজ ফকির : খেতে জল দিচ্ছিল জব্বার ফকির। ওর পাম্প তুলে নে গিয়ে রেখে দিলে পঞ্চায়েতের ছইফুদ্দি সরকারের বাড়ি। যে-ই জব্বারের জন্যে তদবির করেছে সে-ই জরিমানা দিয়েছে। তুঁত খেত আর পলু চাষ লাটে উতেচে গো। আর আপনে এসেচে মুরসিদাবাদি সাড়ি বাঁচাতে।

    অরিন্দম দেখেছে, বাহকরাও বলেছে, মহাকরণে মন্ত্রী আর সচিবরাও জানে, চিন আর কোরিয়ার উন্নতমানের রেশমসোতো চোরাপথে আসচে মালদা মুর্শিদাবাদ নদিয়া বাঁকুড়ায়। আহা, করে খাচ্চে গরিব মুটেরা। বড্ডো দুঃখুগো কুষ্টিয়া কোটচাঁদপুর কুমিল্লায়। বিদেশি সাম্যবাদী দেশের সরকার তাই স্মাগলিঙে নিয়োজিত। বাঁকুড়ায় দেখেছিল অরিন্দম, তাঁতি আর মহাজনের আড়ংধোলাই-খাওয়া কম্পিউটারবিদ দেখিয়েছিল, বালুচরি শাড়ির মফসসলি দিকটা এদেশি রেশম, আর শাড়িটার সদর পিঠে কোরিয়ার সিল্ক।

    এখানের রেশমচাষিরা পড়ে-পড়ে মার খাচ্চে। দিনকতক পর দড়িদঙ্কা হয়ে মরবে। আমাদের কিছু করার নেই স্যার ল আমরা স্মঅঅঅঅল ফ্রাই। হ্যান্ডলুম অফিসার, নস্যি-নাকি হুতাশ জানিয়েছিল অনুকুলচন্দ্র বসাক। আর তুঁত-চাষি হাজি ইসরাইল বলেছিল, পাশের মালদা জেলায় অবস্হা আরও খারাপ। আমরা লাভজনক দাম পাই না। ভালো জাতের ডিমও পাই না আজ্ঞে। কাজের সময়ে বিদ্যুৎ থাকে না। সেচের জল বাড়ন্ত। সারের দাম বেড়েই চলেছে। আমাদের কতা কেউ ভাবে না। আমাদের দেখার কেউ নেই। এই আপনারা কলকাতা থেকে আসেন, লিখে নিয়ে চলে যান। বিহিত হয় না। এই অ্যাতোক্ষুণ আপনার সঙ্গে কতা বলে কত সময় নষ্ট করলুম। আজকে হাটবার ছিল। আগে আমরা বছরে চারবার পলুপোকা পুষতুম। এখুন একবার পোষা দায়।

    আছেরুদ্দি মহাজন, দাড়িপাকা, গোঁফকামানো, বললে, বাঁ পা চেয়ারের হাতলে তুলে পায়জামা নাবিয়ে হাঁটু চুলকোতে-চুলকোতে, সরকার তো পাওয়ারলুম বসাতে দিতে চায় না যাও বা রেশমসুতো হয়, তার বেশিটা নিয়ে চলে যাচ্ছে ভাগলপুর বেনারস মোবারকপুরের ফড়ে। অঙ্গুলিহেলন জানেন তো ? আপনাদের কলকাতার বড়োবাজার সুতোর দাম বেঁধে দিচ্ছে ষড় করে। অঙ্গুলিহেলন-কমরেডদের সঙ্গে ষড় করে। সঅঅঅঅব সমস্যা কলকাতার তৈরি। মুর্শিদাবাদি রেশমশাড়ির দিনকার ফুরুল।

    ১১

    কী হল অরিন্দমদা, স্যাওড়াফুলি ইসটিশান থেকে হেঁটে এলে নাকি গো, অমন হাঁপ ছাড়চ ? জিভে জড়ানো উত্তর আগে জানিয়ে তার প্রশ্নটা পরে বলে সবচে ছোটো পিসতুতো ভাই পল্টু, থলথলে তাঁবাটে খালি গায়ে নেয়াপাতি ভুঁড়ির ওপর পৈতে, ডানবাহুতে রুপোর চেনে তাঁবার ডুগডুগি-মাদুলি, মুখের মধ্যে ভেটকি বৃদ্ধের লাশের ঝালঝাল টুকরো। সামনে কাঁচের গেলাসে মদের আদরে বিগলিত-চিত্ত বরফ-টুকরো। বলল, সময় লাগল বলতে, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ক্লাস টু ফাইভ এইট, ওঃ, কত যে ধকল গেল, নাঃ, বুঝবে না তুমি ; আগে বিয়ে করো, ছেলেপুলে হোক। মাদুলির চেন বাজিয়ে এক চুমুকে শেষ করে। দাঁতে বরফ ভাঙার কড়মড়।

    পল্টুর বউটাই কেবল হাঁটুমুড়ে টিভিতে নাক ঠেকিয়ে হিন্দি মারপিটে উৎকর্ণ। ছাপাশাড়ি, এলোখোঁপা, ছোট্ট কপালে মেরুন টিপ, পায়ের কাছে ফাঁকা গেলাস। বাদবাকি ননদ ভাজ ভাসুর ননদাই মদের পলু থেকে কথার মাকড়সার ঘরকুনো জাল বুনছে। গোল হয়ে সবাই। সামনে একাধিক কাঁসার থালায় আস্ত পারসে ভাজা, আরামবাগি মুরগি-ঠ্যাঙের সুস্বাদু পাহাড়, হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালার ভুষিমাল, দুফাঁক ডিমসেদ্ধ, মাছের ডিমের বড়া, শশা পেয়াজ গাজর। ভাইরা, জামাইরা, সবাই খালিগা, কারুর চেহারাই ব্যায়াম করা পেশল নয়। পায়জামার ওপর একটা করে বিশার তাঁবাটে কুমড়ো। বউরা, বোনরা মোটার ধাতে এগুচ্ছে। বোধয় মাঝে-মাঝেই হুইস্কির ক্যালরিতে তনু ভেজে।

    শতরঞ্চিতে বসে মাছের ডিমের একটা বড়া মুখে পুরে অরিন্দম যখুন চিবিয়ে অবাক ওর মধ্যেকার কাজু কিসমিস রসুনকোয়া সাদা-তিলের উপস্হিতিতে, বড়ো বউদি, যার আজকে জন্মদিন, ছেঁচিয়ে হুকুম জারি করে, এই অরিকেও একটা গেলাস দাও, দাও,দাও,দাও, কতদিন পরে আমাদের বাড়ি এল, তাও আবার রাত্তিবেলা।

    অরিন্দম স্পষ্টত বিচলিত। বলল, আরে না-না, আমি এসব খাই না, ককখুনো খাইনি ; সিগারেট ওব্দি খাই না।

    স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বড়ো বউদি, এমেবিয়েড, হাতে টলমলে গেলাস, ফরসা ভারিক্কি গতরকে একত্রিত করে পাছ-ঘেঁষটে উঠে বসে, আর বাঁহাতে অরিন্দমের গলা আঁকড়ে নিজের কানা-ভরা গেলাস দাঁতেদাঁত অরিন্দমের ঠোঁটের ওপর উল্টে দিলে। খাবিনে মানে ? তোর গুষ্টি খাবে, জানিস আজ আমার জন্মের সুবর্ণজয়ন্তী। বিশাল বুকের মাঝে অরিন্দমের মাথা ঠাসা।

    তোমার বুকে চেতল মাছের গন্ধ, বলতে, বড়ো বউদি চাপা গলায়, মাছটা কুরে রেখেছিলুম রে, হয়ে উঠল না। অরিন্দমের ফাঁস আলগা হয় না। জামা ভিজে গেছে। ফাঁসের দরুন কষ্ট হচ্ছে। আবার ভালোও লাগছে। নারীর বুকটুকুর এক পৃথক মাতৃত্ব আ্ছে মনে হয়।

    অ্যাই, দামি স্কচ বলে ভাবচ ওতে চান করলে নেশা হবে ? দুপাটি দাঁত ভিজছে গেলাসের হুইস্কিতে, ওয়ালরাসের হিলহিলে ঠোঁট নেড়ে বলল বড়ো জামাই। অরিন্দম, তার চে তুই বরং কিছু ভালগার জোক শোনা। গ্রামীণ বিকাশের অনুদান লোটা মাংসল জামাইয়ের কন্ঠস্বর।

    জাপটানো অবস্হাতেই বড়ো বউদির হুকুম, হ্যাঃ, তাই শোনাহ। বুজলি অরি, আমরা হলুমগে শান্ডিল্য গোত্রের মাতাল ; গোত্রের ভেতরেই শুঁড়িখানা। বিয়ের আগে তোর মতন ভারজিন কাশ্যপ গোত্র ছিলুম। নেশার কুয়াশায় ক্রমশ ঝিমোনো বউদির কন্ঠস্বর। জাপট আলগা হলেও অরিন্দম মাথা সরায় না। পাফ দিয়ে গুঁড়ো দুধ মাখানো বুক হলে ভালো হতো।

    আমি একটা বলছি। টিভি থেকে নিজেকে ছিঁড়ে আলাদা করেছে ছোটো বউ। স্বতঃপ্রণোদিত মাতাল। একবার না, অ্যাঁ, হি-হি, একজন না, অ্যাঁ, রাস্তার ধারে নর্দমায় হিসি করছিল, হি-হি। অশ্লীল নয়, অশ্লীল নয়, অ্যাঁ, নালির ধারে তোমরা যেমন করো। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের বোতাম লাগায়, অ্যাঁ, তখন জিপ ছিল না, বোতাম ছিল, বোতাম লাগিয়ে, অ্যাঁ, টের পেল ওর ঘাড় বেঁকে গেছে, হি-হি, একদম সোজা হচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে গেলো, ওষুদ খেলো, মালিশ লাগাল, ইনজেকশান নিলে, অ্যাঁ, হি-হি, কিন্ত কিছুতেই কিছু হল না, ঘাড় সোজা হল না। মহাবিপদ। কী করে বেচারা। বেঁকা ঘাড় নিয়েই কাঁচুমাচু মুখে বাড়ি গেল, বউকে বলল। বউ বললে, তা এই কতা, দাঁড়াও এক সেকেণ্ডে ঘাড় সোজা করে দিচ্চি। বলে, হি-হি, প্যান্টের বোতাম খুলে দিতেই ঘাড় সোজা হয়ে গেল। উউউউফ। লোকটা কোটের বোতাম প্যান্টের বোতামঘরে লাগিয়ে নিয়েছিল।

    সবাই, মাতাল ভাজ ননদ ননদাই ভাসুর হাসবে বলে উদগ্রীব করে তুলেছিল নিজেদের, কিন্তু নিরুৎসাহিত হল। অরিন্দমের হাসি পেয়েছিল, ছোটোবউ তার স্বামীকে তির্যক আক্রমণটি করল অনুমান করে। কিন্তু হাসার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে গিয়ে টের পেল, বড়ো বউদি আবার জাপটকে আঁট করে ফেলেছে ; হয়তো নিজের চেয়ে বেশ ছোটো একজন যুবকের গ্রন্হিসুগন্ধের মাদকতা মদের সঙ্গে মিশে জরুরি আহ্লাদ এনে দিচ্ছে।

    নোংরা চুটকি না হলে কেউ হাসবে না রে, সেজো বউদির বিজ্ঞ মন্তব্য। নোংরা মানে সেক্স !

    ছোটো জামাই তলানিটা চুমুক মারে। আঁচ্ছা আমারটা শোনো। তেমন নোংরা নয় যদিও। ওই সেক্স-টেক্স নিয়ে নয়। আমাদের রাজনীতিকদের নিয়ে। সো-সো। একজন মাঝারি নেতা, ভাষণ শেষ করে যখুন চেঁচিয়ে স্লোগান দিচ্ছিল, ওনি কোঁৎ করে নকল দাঁতের পাটি গিলে ফেলেছে। এক্সরে হল, সোনোগ্রাফি হল, গু পরীক্ষা হল, নিউক্লিয়ার মেডিসিন টেস্ট হল, দাঁতের পাটি-জোড়ার কোনো হদিস পাওয়া গেল না। একদোম যেন উবে গেচে। কলকাতায় কিছু হল না বলে ভেলোর, অ্যাপোলো, রামমনোহর লোহিয়া, হিন্দুজা, যশলোক, এ আই এম এস কত জায়গায় দেখালে, ব্রেন স্ক্যান হল, রাজনীতিক তো, হয়তো ব্রেনে চলে গিয়ে থাকবে দাঁত-জোড়া, এই ভেবে। দাঁত পাওয়া গেল না। শেষে বিদেশে নেতাদের একটা দল যাচ্ছিল মৌমাছির চাষ কী ভাবে করে দেখার জন্যে, তা একে-তাকে, মন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিকে ধরে প্রতিনিধি হয়ে ঢুকে গেল তাতে। উদ্দেশ্য হুসটনে গিয়ে রাষ্ট্রের খরচে ডাক্তার দেখাবে। দলটা আমেরিকায় পৌঁছোল। নানান পরীক্ষার পর যখুন ল্যাংটো উপুড় করে বডি চেক করছে, ডাক্তার অবাক। বললে, ইন্ডিয়ার রোপট্রিক শুনেছি বটে, কিন্তু এরকুম হাসিমুখ গুহ্যদ্বার এর আগে দেখিনি। ইন্ডিয়ার সব পলিটিশিয়ানদেরই কি এরকুম হাসি ? কয়েক মুহূর্ত ধেমে ছোটো জামাই বললে, হয়েছে কী, দুপাটি দাঁত ওইখানে গিয়ে আটকে গিয়েছিল।

    সমবেত হোঃ হোঃ হয় বটে তবে অভিপ্রেত অট্টহাস্য হয় না। অরিন্দম হাসতে পারে না। বড়ো বউদির ঢাউস বুকের মাঝে মাথা আটক। আসতে গেলে যদি আটক আলগা হয়ে যায়, তাই। সেজো বউদির মন্তব্য, নিজেকে ছাড়াচ্চিস না যে বড়ো ? অরিন্দম নিশ্চুপ, নিরাবেগ, নিরুত্তেজ।

    আঁচ্ছা, আমি একটা আসল অশ্লীল নোংরা অবসিন জোক বলছি। বড়ো জামায়ের প্রস্তাব সমর্থিত হবার মুহূর্তে অরিন্দম আঁৎকায়, জোকের জন্যে নয়, মহিলাদের সামনে অমন জোক শোনার অভিজ্ঞতা ওর নেই। না না না না, আমি তাহলে উঠে পড়ব, ধ্যাৎ।

    অরিন্দমের গলা আঁকড়ে রেখেই বড়ো বউদি, কেনওওওরে ? এখনও বে-থা করিসনি বলে ? কবে আর করবি ? আমার কাচে অনেক ছাত্রী-পাত্রী আচে। ফিগার-চটকে ভালো চাস ? না পড়াশুনোয় ? বলিস তো দেকি।

    মেজো বউদি : তোর সেই মাইকাটা শুদদুর প্রেমিকাটার কী হল রে ? আমাদের এদিকেও সব খবরাখবর আসে। খুব ঝুলোঝুলি করেছিলি নাকি বে করার জন্যে। তা কেঁচে গেল কেন ?

    বড়ো জামাই : অশ্লীল অঙ্গ দুটো নেই বলে।

    সমবেত মহিলা আর পুরুষের অট্টহাস্যের দমবন্ধ দমকা বোমাটা এবার ফাটে। হেসেই সামলে নেয় সবাই, ভাই বোন ভাজ ভাসুর ভাদ্দরবউ দেওর জামাই ননদ শালা ননদাই। চোখাচুখিতে ঝটিতি ইশারা বদল হয়। সবাই জানে, পাটনায় থাকতে অরিন্দম ওর চেয়ে বিশি বয়সের বিবাহিতা প্রতিবেশিনীর কিছুটা-খোলা হৃদয়ের গবাক্ষের নরম মাংসে করাঘাতের সাঁঝবিহান সম্পর্ক গড়ে তুলতে-তুলতে পাগল হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। পাড়াতুতো দিদিটার বর টাকা জমাবার ধান্দায় নিত্যিদিন ট্যুরে।

    কলকাতায় এসে ক্যানসারে এক-স্তন তুলি জোয়ারদারকে বিয়ে করার প্রস্তাবে, অরিন্দমের মায়ের, কিন্তু-কিন্তু বলতে যা বোঝায়, সে দুশ্চিন্তা ছিল। ছেলেটার আবার মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে আধখ্যাঁচড়া মেয়ের পাল্লায়। তবু, অন্য কাউকে না করলে ওকেই করুক, কাউকে করুক, স্হির হোক জীবন। তুলি এগিয়ে এসে পিছিয়ে গিয়েছে, কেননা মৃত্যুর আহ্বান বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, উচিত সময়ে লজ্জাবশত চিকিৎসা না করাবার দরুণ। ছোটো ছেলে বিয়ে করে নিয়েছে বলে বড়ো ভায়ের মা এখুন যাহোক একটা বউ চায়। এজাত বেজাত কালো ধলা কানা খোঁড়া মুখু বিধবা বর-পালানো বাচ্চাসুদ্দু যাকেই চাস আমি বাড়ির বউ করে আনব, গত দশ বছরে মা ওকে একা পেলেই বলেছে। কয়েকজন ঘটককেও বলে রেখেছে মা, যোটক-ফোটক কিচ্ছু চাই না, এককাপড়ে হলেও চলবে। ঘটকরা প্রতিদিন একজন-দুজন বিবাহযোগ্যাকে এনে ছুতোনাতায় বসিয়ে দিয়েছে ওর চেয়ারের সামনে, অফিসে এনে। ওফ, কী কেলেংকারি। চলকে ওঠার মতন নয়কো তারা কেউ। মেয়েগুলোরও অমন ডেসপারেট অবস্হা ? অপমান সহ্য করেও একজন স্বামী চাই। মেজোবউদি এক্ষুনি প্রতিশোধ নিল এগারো বছর আগে ওনার ছোটো বোনকে প্রশ্রয় দেয়নি বলে।

    আবার মেজবউদির খচানে উক্তি : মেয়েটা কিন জাতের রে ? কুলিকামিন ? নাকি ?

    বড়দা সর্বাধিক চুর। বুড়ো আঙুলে সুতো-ছেঁড়া পৈতে জড়িয়ে তরলীকরণের সরলীকরণ করে। এতঃ ন শুদ্রং ব্রাহ্মণাদি জাতি বিশেষং ভবতি সিদ্ধং, সর্বে লোকা একজাতি নিবদ্ধাশ্চ সহজ মেবিতি ভবঃ।

    মোনতোর-টোনতোর নিয়েচেন নাকি বড়দা ? আমাকে জানাতেন যদি তো আমিও নিতুম। বড্ডো অশান্ত থাকে মনটা। কার মোনতোর ? অনুকুল ঠাকুর না রামঠাকুর ? অ্যাঁ ? নাকি বাবা লোকনাথ ? বালক ব্রহ্মচারীর জপ শুনিচি বেশ কাজে দ্যায়। বড়ো জামায়ের কন্ঠে অকৃত্রিম আপশোশ।

    সেজো বউদি : আরে বামুনরা আবার মোনতোর নেয় নাকি ? ওসব কায়েত সুদদুরদের ব্যাপার। বামুনদের তো গায়িৎরি মনতোর আচেই। তাই-ই জপ করুন না দুবেলা মন দিয়ে।

    বড়ো জামাই : অঅঅঅঅ। অরিন্দম ভাবছিল, জোয়ারদার কোনো জাত হয় ? কেটলিউলি কোন জাত ? জাতিপ্রথার জন্মের সময়ে তো চা খাবার ব্যাপার ছিল না। দেখতে কেমন ? নাম কী ? কোথায় থাকে ? একদিন গেলে হয় মহাকরণে। কিন্তু সেখানে তো অনেক কেটলিউলি আছে। চিনতে পারবে নিশ্চই ও। চলকে ওঠা থেকে ঠিক টের পেয়ে যাবে।

    প্রধানশিক্ষিকা নিজের পুরো সুরাসক্ত ওজন ঢেলে রেখেছিল অরিন্দমের ওপর। বড়দি, তোমার ব্লাউজের বোতাম খুলে অরির ঘাড়টা এবার সোজা হতে দাও। মেজোবউদির কথায় অরিন্দম ছাড়া পায়।

    আগে লোকে সমাজের চাপে বাড়ির বাইরে মদ খেত। এখুন সমাজের ভয়ে বাড়ির মধ্যে বাড়িসুদ্দু সবাই খায়। তার কারণ আগে সমাজ বলতে যা বোঝাত তা আর নেই। সবাই সবাইকে ভয় পায় আজকাল। অন্যে কী করছে-করবে সবাই আঁচ করে টের পায়। কেউ বিশ্বাস করে না অথচ গালভরা কথা বলে। আমরা সবাই মিথ্যাগ্রস্ত মাতাল। বাঙালি মধ্যবিত্তের এ এক অদ্ভুত যাযাবর হামাগুড়ি। কোনো বিশেষ তীর্থ নেই। কত গোঁড়া ছিল এই বাড়িটা, পিসিমা-পিসেমশায় বেঁচে থাকতে। মুরগির মাংস তো নিষিদ্ধ ছিলই, মুরগির ডিমেরও বাড়িতে প্রবেশাধিকার ছিল না। খেতে বসে গণ্ডুষ না করা অপরাধ ছিল।

    পিসেমশায়ের বাস্তুভিটে ছিল হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের ফুলতলা গ্রামে। সেসব ছেড়েছুড়ে বেচেবুচে এখন শ্যাওড়াফুলিতে। এই বাড়িটায় অরিন্দম যখুন শেষ এসেছিল, টালির চালের দুটো মাত্র ঘর ছিল, সামনে-পেছনে ফুলের উচ্ছৃঙ্খল জঙ্গল। বলাগড়ের কাঁচাগোল্লা খেয়েছিল, মনে আছে। পিসেমশায় টাকমাথা, মোটা কাঁচের ভারিক্কি চশমা।

    ফুলতলার বসতবাড়ি, ভাগচাষ দেওয়া জমিজিরেত, সব ভেঙে-ভেঙে বিস্কুটের টুকরোর মতন তারিয়ে খেয়ে ফেলেছে গঙ্গা। কলকারখানার ফেনানো পাঁক আর পূণ্যার্থীর গু-মুত, গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে, বাঁকবদল ঘটেছিল নদীর। মাঝরাতে, চাঁদনি আলোর অগোচরে, কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রামবাসীদের চোখের সামনে, ডাঙাজমিন, ভরাখেত, কুরেকুরে শেষ করেছে নদীটা। অরিন্দম গিয়েছিল স্কুলে পড়ার সময়। গঙ্গা বয়ে গেছে জিরাট, শ্রীপুর-বলাগড়, চরকৃষ্ণবাটি, গুপ্তিপাড়া, সোমড়া, খামারগাছি আর ডুমুরদহ-নিত্যানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ওপর দিয়ে।

    সুলতাপুর, গুপ্তিপাড়া, রিফিউজিবাজার, ভরপাড়া, বেনালি, চররামপুর, গোঁসাইডাঙা, রসুলপুর, সুন্দরপুর, চাঁদরা, ভবানীপুর, চরখয়রামারি, রুবেশপুর, রামনগর গ্রামগুলোর অনেক ঘরদালান, রাস্তাঘাট, দেউড়িদেউল, দোকানবাজার, ইশকুল, শিবের থান, মেটে মসজিদ, ফকিরের কবর, রঙেশ্বরীর একচুড়ো গর্ভগৃহ, তিনফসলি জমি, সব সঅঅঅঅব, গিলেছে গঙ্গা। ইঁট আর শালবল্লা পুঁতে থামানো যায়নি নদীটার বেয়াড়াপনা। সেসব ইঁট-কাঠ নিজেদের বসতকে অহেতুক ঠেকনো দিতে যে যার তুলে নিয়ে গেছে। কারুর চেষ্টাই টেকেনি বেশিদিন। বাঁধাগাছি আর পালপাড়ার বামুনরা শ্যাওড়াফুলিতে চলে যাচ্ছে খবর পেয়ে পিসেমশায়ও কিনেছিল চারকাঠা জমি। ছেলেরা নিজেদের অবস্হামতন খুপরি তুলেছে।

    এই ঘরটা সর্বজনীন।

    ফুলতলায় থাকতে আলতাপাতার ব্যবসা ছিল পিসেমশায়ের। ওনার বাবার আরম্ভ করা ব্যবসা। অনেক ঘর রংবেনে মণিবণিক ছিল তল্লাটে। লাক্ষা গালা আলতার কাজ করত। রাসায়নিক আলতা বেরোবার পর দুবেলা দুমুঠোর ওপর চোট সামলাতে রংবণিকরা স্যাকরার কাজ ধরে একে-একে চলে গেল সুরাট, মুম্বাই, বাঙ্গালোর, কিংবা ঘড়িকোম্পানির জহুরি হয়ে গেল। পিসেমশায় রংবেনেদের কুলদেবতা রঙেশ্বরীদেবীর পার্টটাইম সেবাইত হয়ে চালিয়েছিল কিছুদিন। আজকে দেয়ালের খুঁতখুঁতে টিউবলাইটের তলায় ফ্যাকাসে রঙেশ্বরীদেবীর উদাসীন দৃষ্টিবলয়ে বসে নোংরা-নোংরা মোদো চুটকি চলছে।

    তোমরা কেউ আলতা পরো না ? বলে ফেলেছিল অরিন্দম।

    অ্যাই ছুটকি, তোর কাছে আলতা আছে তো ? নিয়ায়। ফ্লোর লিডার মেজবউদির গম্ভীর অনুচ্চস্বর আদেশে দ্রুত উঠে দাঁড়ায় ছোটো বউ, এক রাশ চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। অত চুল দেখে হঠাৎ ভয় করে ওঠে অরিন্দমের। অবাক হয় নিজেই। আজগে অরি আমাদের সবাইকে আলতা পরাবে। মেজবউদির দ্বিতীয় আদেশে ধাতস্হ হয়।

    ছুটকি দেয়াল, দরোজার কপাট, জানলার গ্রিল, বাকসোর থাক ধরে-ধরে নিজেকে সামলে ঘর থেকে বেরোয় আর ফিরে আসে বাঁ হাতে আলতার শিশি, তুলোকাঠি আর ছোট্ট কাঁসার বাটি নিয়ে। যেভাবে গিয়েছিল সেভাবেই মাতাল দেহবল্লরীকে সামাল দিয়ে। অরিন্দমের পাশে বসে। শাড়ি সামান্য তুলে পা বাড়িয়ে নিভৃত আবদার, আগে আমাকে পরাও। আলতাটা আমার বিয়ের ক’বছর যাবত পড়ে আছে। সময়ই হয় না। প্রফেসারির ঝকমারি, একটা তো মোটে রোব্বার, শাড়ি কেচে ইসতিরি করতেই সময় চলে যায়।

    ছুটকির বাঁ পা কোলের ওপর তুলে নিয়েছে অরিন্দম। প্রায় নিঃশব্দে বউটি বলে, তাড়াহুড়ো কোরো না, রয়ে-সয়ে সময় নিয়ে ভালো করে পরাও। অরিন্দম গলা নাবিয়ে বলল, তাহলে নেলকাটার আনো, নখ অনেক বেড়ে গেছে। নখ পালিশ লাগাও না বুঝি ? ছুটকি ঝটিতি উঠে দাঁড়াতে, মদ টলমল করে ওঠে ওর দেহ জুড়ে, বাতাসের ওপর দিয়ে হেঁটে নেলকাটার আর নখপালিশ আনে। কোলের ওপর পা তুলে নিয়ে অরিন্দম টের পায়, পা ধুয়ে মুছে এসেছে, আগের চে ঠাণ্ডা।

    মেয়েদের পা অপরিমেয় শ্রদ্ধার। তোমার পায়ে ছন্দ লেগে আছে। নখকাটার কুটকাট শব্দের চে আস্তে বলল অরিন্দম।

    ছন্দ ? কী ছন্দ ?

    অরিন্দম বিপাকে পড়ে। উচ্চমাধ্যমিকে বাংলা ভাষাটা মন দিয়ে পড়েনি। দ্রুত মনে করার চেষ্টা করে বলল, মুক্তক।

    যাঃ। ও তো বাংলা।

    হলেই বা। এই তো গোড়ালিতে তিল হয়ে লেগে রয়েছে অনুষ্টুপ।

    আবার সেই। না না। আমার পায়ে আছে আয়ামবাস, এই দ্যাখো, ট্রোকি।

    ওওওওও। ইংরেজি। ইংরেজি পড়াও।

    হ্যাঁ। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলুম। ব্লেকের ম্যারেজ অব হেভেন অ্যান্ড হেল মুখস্ত। বুঝেছি। অমন বিয়েই করেছ। এখুন তো আর কিছু করার নেই।

    কে বললে ? সাহস থাকলে ভাসুরের কোলে পা তুলে সবায়ের সামনে বসা যায়। সাহস থাকলে, মরনিং আফটার ওষুধের জোরে, অনেক কিছু করা যায়। কটা বউ পারে ?

    এখন তুমি মাতাল। মাতাল গৃহবধু। কী বলছ, না বলছ, তার হুঁশ নেই।

    মাতাল ? ঠিকাছে, আমি না হয় মাতাল। তোমার তো হুঁশ আছে। মুক্তক আর অনুষ্টুপ ছন্দে ঠোঁট রাখতে পারো? ছন্দ তো শুধু চরণেই থাকে না। থাকে সবখানে। ভালো করে চোখ মেলে দ্যাখো।

    বড়োবউদি শয়ে পড়েছিল। ওদের দিকে পাশ ফিরে। তোদের গুজগুজ ফিসফিস সঅঅঅব শুনতে পাচ্ছি আমি। অরিকে চেনো না। চুপচাপ জাল বিছিয়ে দেবে, টেরটি পাবে না। ভয়ংকর চিজ। অ্যাগবারে কাপালিক। ছু-মন্তর এড়াতে পারবি না। মাতন লেগে যাবে।

    ছুটকি বড়োবউদিকে, তুমি তো ওর জালে ছিলে এতক্ষুণ। এবার আমি না হয় থাকি। কাল থেকে তো আবার জাঁতা পেষা। তারপর অরিন্দমকে, কই দেখালে না কী রকম তোমার হুঁশ। আমি একজন স্বঘোষিত আদেখলে।

    শব্দবধির হওয়া সত্ত্বেও, সাপ যেভাবে তার চোয়ালের মাধ্যমে জমির সূক্ষ্ম স্পন্দন অনুভব করতে পারে, অনুভব করে শিকারের উষ্ণতার সংবাদ পায়, সেই গোপন অনুভুতি নিয়ে, বেশ যত্নে, নখপালিশ লাগায় আর আলতা পরায় অরিন্দম। এত কাছ থেকে, এভাবে কোনো যুবতীর কেবল পাটুকু এর আগে খুঁটিয়ে দেখেনি অরিন্দম। মুখ নিচু, ঠোঁটে ধূর্ত হাসি, ছুটকির চোরাস্রোত-চাউনি অরিন্দমের উদ্দেশে। ফিসফিস কন্ঠে অরিন্দম বলল, বেশ কয়েক বছর মদ খাচ্ছ তাহলে, অধ্যাপিকা ? মাথা নাড়ে ছুটকি, হ্যাঁ, এট্টুখানি, নমাসে-ছমাসে, ভাললাগে, এটারচে কোকাকোলার সঙ্গে রাম ভাল্লাগে, কিন্তু বড়ো আর সেজোর যে শুগার। স্নায়ুসুখে আপ্যায়িত দেহকে পাশ ফিরিয়ে, বাঁ পা নাবিয়ে, ডান পা অরিন্দমের কোলে তুলে দিলে ছুটকি।

    তোমার জামায় মদ, প্যান্টে আলতা, বাড়ি যাবে কী করে ?

    এমনি করেই। আমার তো পায়ে কবকব নেই, ছন্দ নেই, লোকলজ্জার ভয় নেই।

    শুদুই বকবক। পথিক তুমি পথ হারাইতে ভুলিয়া গেছ। যাও, গিয়া দেয়ালে পোস্টার সাঁটো, ইনক্লাব-জিন্দাবাদ করো, কিন্তু প্রেমাপ্রেমি কোরো না।

    হুঁ।

    রেখেছ বাঙালি করে, পুরুষ করোনি।

    হুঁ।

    আচমকা ওপরতলা থেকে বিলিতি বাজনার তারস্বর আসে। ওপরেও ঘর আছে বুঝি ? জানতে চায় অরিন্দম, স্বাভাবিক কন্ঠস্বরে। আগেরবার যখুন এসেছিল তখুন ছিল না ওপরতলায় কোনো ঘর। ফাঁকা ছাদ ছিল। আলসেতে গোলাপফুলের টব।

    এইটে যেমন আমাদের কমনরুম, ওপরেরটা বাচ্চাদের। ছাতের ওপর ওই একটাই ঘর। একটু থেমে, ছুটকি বলে, অরিভাসুর, প্রেম না থাকলে প্রাণটা বড্ডো খাঁ-খাঁ করে, না গো ? তোমার প্রেমের গল্প অনেক শুনেছি। প্রেম ছাড়া তুমি অসুস্হ হয়ে পড়ো, শুনেছি। তোমাকে আমার হিংসে হয়। জানাই হল না প্রেমে পাগল হওয়া কাকে বলে।

    ছুটকির পর গরমমশলার গন্ধের মতন স্বাস্হ্যবতী, ভূমিসংস্কার দপ্তরের করণিক সেজো বউদি এগিয়ে আসে পাছা ঘষে। হাঁটুর ওপর ওব্দি সাড়ি উঠিয়ে মেদনরম পা জোড়া তুলে দিলে অরিন্দমের কোলে। নে, সেবাযত্ন কর। শাড়ির পাড়ে আঁকা ফুলের গোছা ধরে পা ওব্দি নাবিয়ে এনে অরিন্দম বলল, অমন কোরো না, এখুনও অটুট আছ তুমি ; উলটে মাঝখান থেকে আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। শুনে, আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে কেঁপে-কেঁপে হাসে সেজো বউদি। বলল, আমার পায়ের ওপর রাজহাঁস এঁকে দে, ছোটোবেলায় ঠাকমা একবার এঁকে দিসলো, আমি তখুন পানিশ্যাওলার ইসকুলে পড়তুম। তারপর তো বাবা বদ্যিবাটিতে চলে এলো।

    প্রতিদিন সবাই মিলে কলকাতা ঠ্যাঙাও, ওদিকেই ফ্ল্যাট-ট্যাট কিনে নাও না কেন ?

    কীইইই যে বলিস। এখেনে একসঙ্গে আছি সবাই, বিপদে-আপদে দেখি। এরম তো বসা হবে না আজগের মতন। কলকাতায় সবাইকে আলাদা-আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতে হবে, পুকুর-বাগান থাকবে না, দম বন্ধ হয়ে যাবে।

    অ্যাই, অরিকে আমাদের বাংড়ির জন্মদিনের ক্যালেন্ডারটা দিয়ে দিস। থালে ফি-মাসে আসতে পারবে। ছুটকির ঠেঙে নিয়ে নিস অরি। মনে পড়ে গেল, অরি, কালকে আমার আয়কর রিটার্নটা ভরে দিস। মদঘুমের জগতে প্রবেশ করার প্রাক্কালে বড়োবউদির আদেশ। শতরঞ্চিতে মেদবহুল গতর এলিয়ে কৃতবিদ্য প্রধানশিক্ষিকা। অজস্র ছাত্রীর প্রণাম সংগ্রহকারী পদযুগল। শোয়া অবস্হাতেই মাতাল চরণে আলতা পরায় অরিন্দম। গোড়ালি ফাটা। নখ বড়ো হয়ে গেছে। বাড়িটার জীবননাট্যে বোধয় পারস্পরিক যত্নের সময় নেই। সবাই মগ্ন জীবিকায়। আর ফাঁক পেলেই এক চিলতে যৌথ সীমালঙ্ঘনের মৌতাত।

    তর্জনীতে গণ্ডারের শিঙের আংটি, ছোটো জামাই বলল, যেন মদের বুদবুদ ফেটে স্মৃতি ফিরে পেয়েছে, বলল, সেনসেক্স চারশো পয়েন্ট উঠেছে, বড়দা, তেমন-তেমন স্ক্রিপস থাকলে এই বেলা ঝেড়ে দাও।

    একে-একে বউদের, তারপর দুই ধুমড়ি বোনের নখ কাটে অরিন্দম, নখপালিশ লাগায়, আর আলতা পরিয়ে দেয়। ওদের পরানো শেষ হতে বড়দা আচমকা এগিয়ে দিয়েছে নিত্যযাত্রীর ট্রেনে ওঠায় রপ্ত হাড়প্যাংলা ঠ্যাং, শিরাপাকানো, যেভাবে পুরোনো শ্যাওলাধরা মন্দিরকে দুমড়ে জড়িয়ে থাকে অশ্বথ্থ গাছের শেকড়। অরি, আমাকেও লাগিয়ে দে দিকিনি, ভাবিসনে যে মাতাল হয়ে গেচি, আপিসে তো বুট জুতো পরে যাই। অরিন্দম তাকায় বাদামি কুয়াশামোড়া নতোদর প্রৌঢ়ের মুখের পানে। পুরসভার স্বাধিকারপ্রমত্ত অ্যাসেসমেন্ট ইন্সপেক্টর। বাঙালির, পশ্চিমবাংলার বাঙালির, স্বাধীনতা-উত্তর খাঁটি প্রতিনিধি। ছেলে মণিপুরে মোইরাঙে পোস্টেড। মোটা টাকা দিয়ে মণিপুর রেভলিউশানারি পিপলস ফ্রন্টের কাছ থেকে ইমিগ্র্যান্ট পারমিট নিতে হয়েছিল থাকার জন্যে। কালকে বিপ্লবীরা ওকে বাহাত্তর ঘন্টা সময় দিয়েছে মোইরাঙ ছাড়ার জন্যে, উদ্বিগ্ন মুখে বললেন বড়দা। অ্যানথ্রোপলজিকাল সার্ভের ভালো সরকারি চাকরি ছেড়ে ফিরে চলে আসছে। শত্রুতা না বাড়ালে বিপ্লব সফল হয় না। বিপ্লব ছাড়া বিদেশি অস্ত্র কারখানা লাভে চলবে না।

    বড়দার একপায়ে কাস্তে-হাতুড়ি, আরেক পায়ে পদ্মফুল আঁকে অরিন্দম।

    ছাদের ঘর থেকে আরেকবার ষাঁড়াষাঁড়ি ডেসিবল আচমকা এঘরের মদ সিগারেট মাংস মাছ চানাচুর ডিমসেদ্ধর মাথাভার বাতাসে কুচি-কুচি আছড়ে পড়তে, ছাদে যাবার সিঁড়িতে ওঠে অরিন্দম। এঘরে আর কেউ কথা কইবার অবস্হায় নেই। প্রশস্ত ছাদ। টবের গাছে ছোটো-ছোটো ফুলকপি ক্যাপসিকাম লংকা। আকাশ ছেয়ে গেছে মেঘে। অরিন্দমের মনে হল, অজানা কোনও কিছুর জন্যে ওর মর্মমূল ধ্বনিত হচ্ছে। ছন্দের বোধয় নিজস্ব ধর্ম হয়। চৈতন্যের পায়ে ছিল একরকুম, রামকৃষ্ণের আরেকরকুম। বুদ্ধের ছিল। যিশুখ্রিস্টের ছিল। কেটলিউলির আছে কি ?

    ১২

    ছাদের ঘরের দিকে ছাইরঙের দরোজা ঠেলে অরিন্দম দেখল, কুচোকাঁচা থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাশেষ ছেলেমেয়ের দল, যে যার মতন নেচে যাচ্ছে, হাত তুলে কোমর বেঁকিয়ে। একজন ফ্রক উড়িয়ে শাস্ত্রীয় নাচের অঙ্গভঙ্গী করছে ইউরোপীয় বাজনার তালেতালে, বোধয় শাস্ত্রীয় ভারতীয় নাচ শেখে, কুচিপুড়ি ভারতনাট্যম কোনো-একটা হবে। ঘরে ঢুকতেই অরিন্দমকে ঘিরে ধরে সবাই। বড়দা-মেজদার মেয়ে দুটো অরিন্দমের হাত ধরে অরিকাকু অরিকাকু বলে হাঁক পাড়ে। এদের দুজনকে ছাড়া আর কাউকে চেনে না অরিন্দম। কেউ গিয়ে বাজনা বন্ধ করে। জামায় তীব্র হুইস্কির গন্ধ আর প্যান্টময় খাপচা লাল রং যে এরা কেউই অনুমোদন করছে না, ভুরু কোঁচকানো অনুসন্ধিৎসা দেখে আঁচ করে অরিন্দম। বলল, খাইনি আমি, বমি পায়, ওদের গেলাস থেকে চলকে পড়েছে। এই কচিকাঁচাদের কাছে নিজের দুর্বলতা মেলে ধরে কিছুটা ভারমুক্ত বোধ করল অরিন্দম। বয়সের সাহায্যে নিচের তলায় আর ওপর তলায় আনন্দের মুহূর্ত গড়ে নিয়েছে এই বাড়ির সদস্যেরা। ওই বা কেন যে বঞ্চিত হয় আনন্দের পরিসর থেকে ! কেন যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনা !

    বালক-বালিকাদের মাঝে ভালো লাগে ওর, অরিন্দমের। আশ্বস্ত বোধ করে। পাটনায়, অফিসের লাঞ্চটাইমে পাশের নার্সারি স্কুলের ছুটি হত। ছোটো-ছোটো খোকা-খুকুর ছুটির হইচইয়ের মধ্যে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত অরিন্দম, দাঁড়িয়ে থাকত বেশ কিছুক্ষণ। চারিদিকে অজস্র কচি ছেলেমেয়ের ছোটাছুটি আর কোলাহলের মাঝখানে চুলচাপ দাঁড়িয়ে থাকত ও। পুজো আর গ্রষ্মে যখুন ইশকুলটা বন্ধ থাকত তখুন মন খারাপ লাগত অরিন্দমের। এখানে, কলকাতায় বি-বা-দী বাগে ওর অফিসের কাছে ইশকুল নেই। এই অফিস পাড়াটায় বালক-বালিকাদের প্রবেশাধিকার নেই। আজ পর্যন্ত কোনও ইশকুলের ছাত্রছাত্রীদের এই এলাকায় দেখতে পায়নি ও, অরিন্দম।

    ওর সামনে হিচইরত ছেলেমেয়েদের মুখ দেখে বুঝতে পারছিল অরিন্দম, ওকে বিশ্বাস করছে না এরা। শিশু কিশোর তরুণদের চেখে এখুন আগের প্রজন্ম সন্দেহজনক। জনকেরা সন্দেহজনক। মেজদার বড়ো মেয়ে এই ফাঁকে বাবার জামা-প্যান্ট এনে দিয়েছে। যাও, নিচে বাথরুমে চান করে পাউডার মেখে পালটে এসো, গিজার আছে।

    চান করে, জামা-প্যান্ট পালটে এসে বসলে, কাছে এসে মুখ থেকে গন্ধ শুঁকে আশ্বস্ত করে নিজেদের, শাড়ি-পরা উচ্চ-মাধ্যমিক, চুড়িদার মাধ্যমিক। এদের মধ্যে সবচে ছোটোটা, তুলতুলে বছর তিনেকের, পায়ে রুপোর মল, বিস্ফারিত তাকায়। কোলে চাপতে চাইছে। তুলে নিলে, কাঁধে মাথা রাখে। ঘুমের গন্ধ আসছে শিশুটির মুখ থেকে। কত ভালো লাগে এই গন্ধ।

    তোদের খাওয়া হয়েছে তো ?

    সমস্বরে, হ্যা আ্য আ্য আ্য আ্য আ্য, সন্ধেতেই। আজ তো ভুরিভোজ ছিল।

    জানলা দিয়ে দেখা যায়, বাতিস্তম্ভের আলোয়, বাড়ির পেছনের থমথমে পানাপুকুর। একগাল হাসিমুখে ঠায় দাঁড়িয়ে ঝাঁকড়া স্হলপদ্ম। পুকুরের দক্ষিণে বৈদগ্ধ্যে ভারাক্রান্ত আমগাছ, স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে থাকবে, ফলহীন। পুকুরের এদিকে জানলার তলায়, গোলাপ ঝাড় দুহাত তুলে খরচ করছে মোলায়েম সুগন্ধ। গাছগুনোর পাতাকে ফুঁ দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে অন্ধকার। লাস্যময়ী বাদলাপোকারা ঘরে ঢুকেই, ডানার ওড়না ফেলে দিচ্ছে পার্ক হোটেলের ক্যাটওয়াকে মডেলখুকিদের ঢঙে। অন্ধকারে তিরতির কাঁপা কৃষ্ণপক্ষের কনকনে আকাশে ভিজেভিজে বিদ্যুতের শব্দহীন আলো। কোনও প্রতিবেশির বাড়িতে উদাত্তকন্ঠ অ্যালসেশিয়ানের রোমশ ডাকের তরঙ্গ।

    পাঁচ-সাত বছরের গালে-টোল ফরসা দুঝুঁটি এগিয়ে আসে। তুমি কে গো ও ও ও ?

    আমি ? আমি হ্যামেলিনের কেটলিওলা। অরিন্দম কথাটা বলেই থ। এখনও তো কেটলিউলি অদেখা। তবে ?

    তুমি বাঁশি বাজাতে জানো ?

    বাঁশি ? উঁহু, জানি না।

    তবে কেটলড্রাম বাজাও ?

    না, তাও জানি না।

    লিটলুটা ঘুমিয়ে পড়েছে কেটলিকাকুর কোলে ; টুম্পা ওকে শুইয়ে দিয়ায়। আলো জ্বেলে মশারি টাঙিয়ে দিস। পিগটেল ফ্রকপরার হুকুম মান্য করে ববছাঁট ফ্রকপরা।

    কেটলিকাকু, তুমি গান জানো ? জানতে চায় ক্লস নাইনের পরীক্ষামুক্ত কিশোর।

    গান। মমমমমমম, ভেবে দেখি। গানের কিছুই জানে না অরিন্দম। কী করে লোকে যে রবীন্দ্রসঙ্গীত অতুলপ্রসাদ দ্বিজেন্দ্র নজরুলের গানের সুরের তফাত বোঝে, ঠাহর করতে পারে না ও, পারেনি। গানের আলোচনায় কুন্ঠিত বোধ করে। ওর সামনের ফ্ল্যাটে লরেটোতে পাঠরতা কিশোরী তিনচারটে গান কতকাল যাবৎ সেধে যাচ্ছে, সকালের আলো ফুটলেই, অবিরাম। শুনে-শুনে সুর আবছা মুখস্হ হয়ে গেছে অরিন্দমের। খোকাখুকু শ্রোতার মাঝে চেষ্টা করা যেতে পারে। শ্রোতাদের সামনে নিজেকে গান শোনানোর ভালই সুযোগ। শ্রোতারা যখুন অত্যুৎসাহী।

    কই গাও। গাইছি।

    মা রঙেশ্বরীকে হাত জোড় কল্লে না যে। ঠাকুর পাপ দেবে। গাইবার আগে, নাচবার আগে, পড়তে বসে, মা রঙেশ্বরীকে হাত জোড় কত্তে হয়। বিদেশী বাজনার তালে স্বদেশী নাচছিল যে কিশোরী, তার উপদেশ।

    অরিন্দম চোখ বুজে হাতজোড় করেছে। মগজের মধ্যে একাগ্র ভগবদভক্তি কী করে জোটায় কেউ-কেউ ? ব্যাপারটা ঠিক কী ? কোন উপায়ে অমন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ঘটে ! আমি কেন ওই বোধ থেকে বঞ্চিত ?

    জীবনে প্রথমবার ও, অরিন্দম, সিরিয়াসলি গান ধরে :

    II { স..সপা…T পা…পধা…ধপহ্ম-T হ্ম…হ্মা…গসাঃ… I সগঃ…সপা…TI

    সাঁ….ঝে০….রপা….খি….রা০০…০…ফি…রি…ল০….০কু…লা০…য়

    I গহ্ম…ক্ষণা…নর্সা…ধনা…পাঃ I পহ্মগঃ…হ্মপা-T – T গমাগমা…গরসা }I

    তু০…মি০…ফি০…রি০…লে০…না ০০০ ঘরে ০ ০ ০০০০ ০০০

    I প…পনা—TI না….সর্ণা….র্সর্সনধা I ধনা…পধর্নারা…র্সনধা I ধনা…ধপা–TI

    আঁ….ধা০….র…ভ…ব০….০০০ন…জ্ব০…লে০০০…নি০০…প্র০…দী০…প

    I সা….রা….রা….I রা…গহ্মপধা….গহ্ম I – T হ্মপা- TI গমা…গগা…রসা I

    ম…ন…যে…কে…ম০০০…০ন….০করে…০….০০…০০…০০

    ভুল ভুল ভুল ভুল, জানোওওওওনা, হলোওওওনা। হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে শাড়িপরা উচ্চমাধ্যমিক।

    অরিন্দম স্তম্ভিত। ঠাহর করতে পারে না গানের হওয়া না হওয়া। অথচ গাইতে-গাইতে বিভোর আত্ম্রীতিতে আক্রান্ত হয়েছিল। কোকিল যেভাবে কাককে ফুসলিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়, ও-ও নিজেকে ফুসলিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল অচেনা আনন্দের পরিসরে।

    হ্যাঁ, তুই বড়ো কুমার শানুর মা এসচিস। মাধ্যমিক অরিন্দমের পক্ষে।

    তুমি তো মিশ্র ইমনে গাইছিলে। গানটা তো নজরুলের, মিশ্র মল্লারে হবে। তুই গেয়ে শোনা দেখি। মাধ্যমিক চ্যালেঞ্জ জানায়।

    উচ্চমাধ্যমিক বসে পড়ে মেঝেতে। চোখ বোজে। কোলে হাত। প্রথমে গুনগুন। তারপর গান ধরে।

    II { সা মরা মা I পা ধা ণা I ণা ধপা মপধাঃ I পঃ মজ্ঞা রসা I

    সাঁ ঝে০ রা পা খি রা ফি রি০ ল০০০ কু লা০ ০য়

    I স সরজ্ঞা রা I সা ণা ধ পা I পনা না সা I সা সা র্সা }

    তু মি০০ ফি রি লে না ঘ ০ ০ রে ০ ০

    I মা মরা মা I মপা পাধ মপাঃ I মঃ পা সর্ণা I ধা পা পা I

    আঁ ধা০ র ভ ব ন জ্ব লে নি প্র দী প

    I পধা পধা পমা I গা মগা রসাণ I না সা গা I রগা মা মা I

    মা০ ০ন যে কে ম০ ০ন ক রে০ ০০ ০ ০

    কেটলিকাকু, আমিও গান জানি। নাদুস কিশোরের প্রস্তাব।

    গাও তাহলে, শুনি।

    আমমি চিন্নিগো চিন্নি তোমাআআড়ে ওগ্গো বিদেশিন্নি, তুমি থাআআআকো শিনধু পাআআআড়ে….

    অরিন্দমের হাসি পেয়ে যেয়। দূরদর্শনের সংবাদপাঠিকাদের কী সর্বব্যাপী প্রভাব। অত্যন্ত জোরে হেসে ফ্যালে ও কিশোরটিকে জড়িয়ে ধরে। অট্টহাস্য। দিলখোলা হাসি। হাসতেই থাকে। এভাবে খোলামেলা হাসেনি বহুকাল। হাসতে-হাসতে ভালো লাগে ওর। ওর দেখাদেখি সবাই হাসতে থাকে। সব্বাই।

    অতর্কিতে, বাইরে থেকে, বাঁদিকের বন্ধ জানলার ফুলকারি ঘষাকাচের শার্শির ওপর ভারি একটা ঢিল পড়তে, থমকে থেমে যায় হাসি। সবায়ের মুখমণ্ডলে আতঙ্কিত অনুসন্ধিৎসা। শার্শির ঠিক মাঝখানে, যেখানে ইঁটটা পড়ল, সেখানে ঘাপটি-মারা ছোট্টো মাকড়সাটা সেই মুহূর্তে, তক্ষুনি, কাচের বুক জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজের আলোকিত তন্তুজাল, শার্শির ফ্রেমের কোণে-কোণে।

    কেভ রে হারামজাদার বাচ্চা। গালাগালটা অরিন্দমের নিজেরই ভয় কাটাবার উপায় হিসাবে আরেকটু হলেই, এতগুলো কচিকাঁচা কিশোর-কিশোরীর সামনে বেরিয়ে যেত। ঠিক তখুনই, খোলা জানলাটা দিয়ে, ওরা দেখতে পেল, হ্যালোজেনের আলোয়, মাছরাঙার ঢঙে ছোঁ মেরে, ছোটো-ছোটো অগুনতি সাদা বরফের ছররা, ঝেঁপে নাবছে পানা-পুকুরের দাম সরিয়ে, মটকা-মেরে ঘুমোবার ভানরত কালবোস-কাতলার ওপর। জলতলের ওপরে লাফিয়ে উঠল কয়েকটা সোমথ্থ রুই।

    সাদা বরফ টুকরোর টিমটিমে প্রভায় উদ্ভাসিত হয় খোকাখুকুদের কচি-তুলতুলে মুখগুলো। পৃথিবীর মাটিতে নাবার আহ্লাদ-মাখানো শিলাবৃষ্টির খই খাবার নেমন্তন্নে, ছাদের দরোজা দিয়ে ঘরের মধ্যে আগত টুকরো মুখে পোরে মিনি টিঙ্কু টুম্পা তাতাই বুবুন খোকন বাবাই টুঙ্কা হাবলু গাবলু।

    অরিন্দম জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ফুঁ-এর মতন মুখময় বিচরণকারী আরামপ্রদ হাওয়ার আদর। গাছের পাতাদের গা শিরশির করছে ঠাণ্ডায়। বরফ-পাথরের টুকরো মেরে-মেরে ভ্যাপসা গরমকে তাড়িয়েছে বৃষ্টি। শিলাদের নাচের তাল ক্রমশ বিলম্বিত হয়ে থেমে যায়। বিদ্যুচ্চমকে, পুকুরের জলকে সর্পিল করল হেলে সাপ।

    দুকানে দুহাত চাপা দিয়ে তাতাই বলে ওঠে, যাআআআআআ।

    কেন ? কী হল ?

    এবার আর হিমসাগর খাওয়া হবে না। সঅঅঅঅঅব ঝরে গেল।

    ১৩

    পেঁকো জলজমা তপসিয়া সেকেন্ড লেন, নানান মাপের আধোডোবা ইঁটের ওপর দিয়ে যিশুর পেছন-পেছন বস্তির একটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারল অপ্রস্তুত অরিন্দম, এ জায়গায় অন্য জুতো পরে আসা উচিত ছিল। ফুলপ্যান্টের গোড়া ভিজেছে নর্দমা-ওপচানো এঁদো গলির বিষাক্ত জলে। ম্যানহোলের ঢাকনা তুলে খালি-গা লেংটি-লুঙ্গি পরা কয়েকজন প্যাংলা মানুষ জমা জল খোঁচালেও, ঘূর্ণি খেয়ে নালির গু-গোলা জল উগরে উঠে গলির ভেতর সেঁদোচ্ছে।

    সামলে-সামলে যেতে হবে, গোলাম জিলানি রোডে মসজিদে জল ঢোকা নিয়ে হ্যাঙ্গাম হয়েছে। আসার সময়ে হুঁশিয়ার করেছিল যিশু। খেয়াল করেনি তখুন। হতদরিদ্র মুসুলমান পাড়া। গলির বেহালে, অপুষ্টিতে লালিত লোকগুনোকে, মহরমের পতাকা দেখে, ভয় করছিল অরিন্দমের। নাকে রুমাল চাপা দিলে হাসবে এরা। টিটকিরি মারবে। পেটের ভেতর ওব্দি ঢুকে পড়ছে দুর্গন্ধ। এমনকী রি-রি করছে, নোংরা জলের ওপর চলকে-পড়া রোদের গা। নর্দমাটা ডাকাবুকো।

    বাসার সামনে টাঙানো বাঁশে ছাপা-শাড়ি, কালো শায়া, লাল ব্লাউজ, হাতা অলা গেঞ্জি, সিড়িঙে ফুলপ্যান্ট শুকোচ্ছে। ডিজেল ড্রামের ঢাকনার ওপর রবারের পাকানো ক্লান্ত পাইপ। আলকাতরা-রাঙানো করুগেটেড টিনের দরোজার ফাঁক দিয়ে নজরে পড়ে ঝুলমাখা টিউবলাইট। শালের কালো খুঁটিতে পেরেকে ঝোলানো আংটায় গাঁথা কাগজপত্র ; শিকেতে চালকুমড়ো। দেয়াল দেখা যাচ্ছে যেটুকু, কালচে কাঠের তাকে শিশি-বোতল-কৌটো-ডিবে। মেঝের ওপর অ্যালুমিনিয়ামের বিশাল গামলা আর কয়েকটা তেল-চটচটে কালচে ট্রে।

    খাইয়াঁ-খাইয়াঁ পেট ভরাবার মতলব রহেছেঁ, আঁ। গলা জড়াই ধরি মুহে চুম খালেক। তাঁয় উড়াই ফেল্লেক তামাম। মজাদারি পাহিছেঁক। আঁচতা ধাকালি দিবঁ একটা। মেয়েলি কন্ঠে বকুনি ঘরের মধ্যে। সাদা কেঁদো বেড়াল বেরিয়ে, আধডোবা ইঁটের ওপর লাফিয়ে-লাফিয়ে ওদের পায়ের কাছ দিয়ে দৌড়োতে, অরিন্দমের ডান পা জলের মধ্যে পড়ে, নোংরা জল ঢুকে যায় জুতোয়।

    এই কেটলি। হাঁক পাড়ার পর, অরিন্দমের দিকে ফিরে যিশুর আবেগহীন কন্ঠ, গতবছর জলের মধ্যে খোলা ম্যানহোলে একটা আড়াই বছরের মেয়ে পড়ে গিসলো। দমকলের লোক এসে, শেষকালে হুক নাবিয়ে, বডি তুললে। ময়না তদন্ত হয়েছিল। তা এরা গরিব লোক, বুঝতেই পারছ, রিপোর্ট-ফিপোর্ট নিয়ে কীই বা করবে। হুক দিয়ে না তুলে কেউ নিচে নেবে চেষ্টা করলে বেঁচে যেত বোধয়। কিন্তু পৃথিবীর মাটিতে এতো বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে মানুষ যে সুযোগ পেলেই খপ করে ধরে নেবে পৃথিবী। অরিন্দম ভয় পাচ্ছে দেখে যিশু কথাগুলো বলে গেল চিউইংগাম খাবার ঢঙে। তারপর কাঁধ নাচিয়ে হাসে।

    আড়হল্যা লাগ্যে নেঁও ; জলটো অধন হল্যে মেরায়েঁ দে। কথ্যভাষার মধ্যেকার জলতরঙ্গে অরিন্দম মুগ্ধ। বাঙালির জিভ থেকে এই সমস্ত স্হানিক বুলি ক্রমশ মুছে যাবে। হারিয়ে যাবে বাংলার মাটি থেকে। শহর গিলে খেয়ে নেবে বাংলা বুলিগুলোকেও।

    আসছি কাকুদা, মোড়ে গিয়ে দাঁড়াও। খুকুস্বর তরুণী-কন্ঠের ভেতর থেকে আসা আশ্বাসে ভারমুক্ত হয়েছে অরিন্দম। কাকা আর দাদা মিলিয়ে নতুনতম এক সম্পর্ক পাতিয়েছে বটে মেয়েটা। কাকুদা ! বাশ লাগল শুনতে। কলকাতায় বেগুনউলিকে লোকে বলে মাসি, অথচ নিজের মাসিকে পাত্তা দেয় না। বাসযাত্রী বা পথচারীকে যুবকেরা বলে দাদু, কিন্তু নিজের দাদুকে দুমুঠো খেতে দেয় না। কলকাতায় শব্দের মধ্যে সম্পর্কগুলো আর নেই।

    অতর্কিতে এক ঝলক ভ্যানিলা গন্ধের ঝাপটা। এই নোংরা পেঁকো দুর্গন্ধের সমুদ্রে কোথ্থেকে এই সুগন্ধ ! যিশু বলল, কেটলির বাপ দিশি বিস্কুট আর কাপ-কেক বানায়, তারই গন্ধ। কেটলির পা-দুখানার দিকে তাকিয়ে দেখো তুমি, সদ্য ধানচারা রোয়া হাতের চেটোর মতন পরিষ্কার। ওই অ্যালুমিনিয়াম গামলাটা দেখলে তো ? ওর মধ্যে পা দিয়ে কেক-বিস্কুট বানাবার ময়দা-টয়দা মাখে। পুজো করার যুগ্যি। ভারজিন মেরির মতন। সত্যি, কলকাতার রাস্তায় হাঁটাচলার পরও যে অমন পা থাকতে পারে কারুর, ধারণা ছিল না আগে। রাইটার্সে ভালোই বিক্রি হয় ওর কেক-বিস্কুট।

    বাপরে ! কলকাতায় এরম গা-সওয়া জায়গা আছে জানতুম না। কী করে থাকে লোকে ? প্রশ্ন তোলে অরিন্দম, উত্তর নেই জেনেও। ফেরার পথে টের পায় জমা জল বাড়ছে। প্রায় পুরো ডুবে গেছে ইঁটগুলো। অন্য জুতোটাও চপচপে জলে ঢুকে মোজা ভেজাচ্ছে। গলি থেকে জলটা বেরোচ্ছে না-ই বা কেন ? আবার প্রশ্ন তোলে অরিন্দম।

    এখুন তো অবস্হা তবু ভালো। বর্ষাকালে এলে দেখবে যতরকুম প্রজাতি আর ভাষার মানুষ কলকাতায় আছে, এই গলিটা তাদের সব্বায়ের গুয়ের মিলনমেলা। এখানে আন্ত্রিকের টিশু কালচার হয়। কড়াইডাঙার চামড়া টাউনশিপের জন্যে এগারোশো একর নিচু জমি ভরাটের কাজ চলছে ডি ডাবলু খালের বুকে বাঁধ বেঁধে মাটি কাটার জন্যে। তুমি ওদিকটায় যাওনি বোধয়। এখুন বেশ কিছুদিন বেরোবার উপায় নেই। জল বেরুচ্ছে না বলে বানতলার ভেড়িগুনো চোতমাসের গরমে ভেপসে উঠে মাছ মরছে। ভেড়িগুনো এখানকার নোংরা জল খাল থেকে টানে। এখুন তো চারাপোনা ছাড়ার মরশুম।

    ওফ, যিশু বিশ্বাস তো মগজের মধ্যে খবরের ব্যাংক বানিয়ে ফেলেছে। এর জন্যেও কনসালটেনসি পাবার তালে আছেন নাকি ? প্রশংসা জানায় অরিন্দম।

    নিজের সংগৃহীত তথ্য ঝালাবার কাজ চালিয়ে যায় যিশু। বালিগঞ্জে, পামার বাজার, চৌবাগায় পাম্পং স্টেশানগুনো কলকাতার মাটির তলাকার নর্দমার জল ওই খালটায় পাঠায়। তিলজলার ট্যানারির চামড়াধোয়া জলও মেশে। অতএব বুঝতেই পাচ্ছ, এই গলির কলকাতা বহুকাল এই গলিতেই থাকবে। গুয়ের ভেনিস। সিগারেটের প্যাকেট সামান্য খুলে অরিন্দমের দিকে বাঁহাত বাড়িয়ে, ও তুমি তো খাও না।

    তোমরাদের বললুম না মোড়ে গিয়া দাঁড়াও। একটু আগেই শ্রুত কন্ঠস্বর শুনে পেছন ফেরে অরিন্দম। কালচে টেরাকোটা রঙের মেদুর-ত্বক স্বাস্হ্যবতী। কৈশোর আর যৌবনের সেই নিদারুণ সংযোগ-মুহূর্তে, যখন আজেবাজে চেহারাও হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। ভ্যানিলা-সুগন্ধের জেল্লা। নিজেকে হতবাক করার জন্য আরেকবার ফিরে চাইতে হয়। অরিন্দমের এভাবে তাকাবার বাধ্যবাধকতাকে উপভোগ করছিল যিশু। এখানে আসার আগেই সতর্ক করেছিল যিশু, এ তোমার বিশুদ্ধ বাঙালি পাড়ার কলকেতিয়া লাফড়াউলি নয় যে দশবছর বয়েসেই দুলুর-দুলুর বুক নাচিয়ে ঘুরবে।

    নর্দমার নোংরা জল-জমা গলিটার ঢোকার মুখেই, বিতৃষ্ণা, কুন্ঠা ও সার্বিক ভয় যখুন ওকে পেড়ে ফেলতে চাইছিল, মনে-মনে মনে হয়েছিল অরিন্দমের, এই পেঁকো ছমছমে ঘুঁজির বাসায় ভালো কি সত্যিই থাকা সম্ভব, সৎ থাকা ? অত্যন্ত ধনী আর ভীষণ গরিবের পক্ষে সৎ থাকা বেশ কঠিন। সেরকম সৎ-টাকাকড়ি রোজগার করে বাঁচা যায় কি এখানে, এই এঁদো এলাকায় ? পরিচ্ছন্ন কোনো পাড়ায় চলে গেলেই তো হয়। মহাকরণে চা আর সস্তা বাটি-কেক বেচে দু-তিনজন লোকের কুলিয়ে যায় হয়তো।

    এরকুম একটা পাড়ায় থেকেও কেটলিউলির স্বাস্হ্য নিখুঁত, সূর্যকরোজ্জ্বল। হাত দুটো শ্রম-সুডোল। চকচকে ত্বকের স্নেহপরবশ মসৃণতায় পিছলে যায় অরিন্দমের মুগ্ধ দৃষ্টি। দ্রুত বেঁধে ফেলেছে ঘনকালো কমনীয়-উজ্জ্বল কোঁকড়াচুল হাতখোঁপা। প্রিন্টেড শাড়িটাকে বেগনে-নীল-হলুদ কল্পরাজ্যের ফুলগুনো শাড়িটাকে সহজে নোংরা হতে দিতে চায় না বলে বেশ কিছুদিন সযত্নে না-কেচে চলে যায়। মেয়েটা লম্বায় কত ? পাঁচ ফিট ? তাই হবে। যিশুর চেয়ে কয়েক ইঞ্চি বেঁটে। প্লাসটিকের স্ট্র্যাপবাঁধা বর্ষাকালের কালো জুতো, নোংরা জলে উঠছে-নাবছে। জুতোর গোড়ালিটা নরম নিশ্চই, নইলে মহাকরণে হরেক প্রকার হাওয়ায় চেপে-থাকা রাজনীতিবিদ, আমলা, কেরানি, আর কৃপাপ্রার্থী নাগরিকদের সামনে দিয়ে কাঁচের গেলাস আর কেটলি হাতে গটগটিয়ে হাঁটলে তো বারান্দা থেকে ঠেলে বিনয়-বাদল-দীনেশের কাছে পাঠিয়ে দেবে আদিত্য বারিকের ভুঁড়ি-ভোম্বোল সহকর্মীরা, যারা বারান্দায় বসে সারাদিন হাই তোলে আর মুখের কাছে টুসকি বাজায়।

    পা দুখানা সত্যই প্রতিভাদীপ্ত। সকাল-দুপুর সংগৃহীত প্রতিদিনের সূক্ষ্ম নোংরা সন্ধ্যাকালে চালান হয়ে যায় কেকগুলোয়। অরিন্দমের মগজে নির্বাক হইচই। প্রাকগ্রীষ্মেও মেয়েটা ঠান্ডা হাওয়ায় মোড়া। মেদহীন নারীত্ব বোধয় হয় না। মোড়ে পোঁছে কলের মুখহীন সতত বহমান জলে, জুতোসুদ্দু পা এগিয়ে প্রথমে ডান তারপর বাঁ হাঁটু ওব্দি শাড়ি তুলে ধুয়ে নিল মেয়েটি নির্দ্বিধায়। বোঝা যায়, রোজকার, যেদিন মহাকরণ খোলা থাকে, অভ্যাস।

    যিশু চাপা গলঅব, কীইইইইরে, তোর এই একটাই শাড়ি, বলতে ততোধিক নাবানো গলায় মেয়েটি জানায়, অন্য দুটা কাচার সময় হয়নি, পরে কেচে নিবো। ওর গিঁটপড়া ভুরুর তলায় ঝলমলে চাউনিতে সন্দিগ্ধ প্রশ্ন ছিল, এই লোকটা আবার কে, কাকুদার সঙ্গে জুটেছে সাতসকালে।

    ওর নাম অরি, অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। খুব ভালো লোক। তোকে রেস খেলা দেখতে নিয়ে যাবে। প্রস্তাব আর আদেশ একসঙ্গে মিশিয়ে, মাথা পেছনে হেলিয়ে, থুতনি দিয়ে অরিন্দমের দিকে নির্দেশ করে যিশু। কেটলিউলি ঝটিতি জরিপ করে ওকে, যেন এই কচি বয়সেও, মানুষের দিকে স্রেফ একটি বার তাকিয়ে, তার চরিত্রের ভালোমন্দ বুঝে ফেলবে।

    ভুরুর গিঁট বজায় থাকে। মাঝখান থেকে এই লোকটা আবার কেন ? কাকুদা তো নিজেই নিয়ে যাবে বলেছিল ঘুড়ার দৌড়ানো দেখতে। তা নয়, একজন অচেনা উটকো লোকের ঘাড়ে চাপাচ্ছে। এ কি ঘুড়ার পিঠে বসে ?

    যিশু নিজের সাফাইকে সাফসুতরো করে। আমি যেতুম, কিন্তু আমার দুদুটো রিপোর্ট ফাইনাল করা হয়নি এখুনো। একটা তো আজকে স্পাইরাল বাইন্ডিং করতে পাঠাব, যাতে রাত্তিরে কুরিয়ার করতে পারি। তার ওপর আবার কমপিউটারের প্রিন্টারটা আবার খারাপ হয়ে পড়ে আছে। ফ্লপিতে তুলে দেখতে হবে কাছেপিঠে কোথাও যদি প্রিন্টআউট নেয়া যায়। লাইটও থাকছে না সন্ধের দিকে। হাতের কাজ দু-এক দিনের মধ্যে শেষ করতেই হবে, নইলে কথার খেলাপ হয়ে যাবে। অরিন্দম অনেক ভালো লোক। বাড়িয়ে বলছি না। সত্যি। আলাপ করলেই টের পাবি। তোর অফিসের পাশেই ওর অফিস। ওই ডানদিকে যে তেরোতলা বাড়িটা। অফিসে এসকালেটার আছে, মেট্রোরেলের মতন। তোর অফিসে তো শ্রমিকদের সরকার তোকে চাপতেই দেয় না লিফ্টে, দিনে পঁচিশবার একতলা, তিনতলা করিস। ওর অফিসে ও অনেক বড়ো অফিসার। ওর গাড়িও আছে নিজের, তোকে চাপাবে। ওই তো, ওই যে, ওই ঘিয়ে রঙের গাড়িটা দেখতে পাচ্ছিস, ওইটে।

    কেটলিউলিকে কমপিউটারের বিশদ কেন ? ও কি কমপিউটার শিখছে ? কিন্তু অরিন্দম সম্পর্কে কথা বলার বদলে ওর অফিস, অফিসারি, তেরোতলা, এসকালেটর, গাড়ি এসমস্ত ওর সচ্চরিত্র হবার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে মেয়েটির এজলাসে পেশ হল। কেটলিউলির চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, যিশুর প্রয়াস দিব্বি সফল। মসৃণ তেলালো ত্বকে আভা দেখা যায়। ভুরুর গিঁট খোলে।

    তুইতোকারি করা বা তুমি বলা উচিত হবে কিনা নিশ্চিত হতে না পারায়, বিব্রত অরিন্দম বলল, আমাকে কাকুদা-অরিদা গোছের কিছু বলবেন না। স্রেফ অরি কিংবা অরিন্দম বলে ডাকবেন।

    যিশু কাঁধ নাচায়। ওহ হাসালে বটে। তুমিই বোথয় প্রথম আপনি-আজ্ঞে করছ ওর জীবনে। মহাকরণে সবাই তুইতোকারি করে। অত তোল্লাই না দিয়ে ওকে তুমি বলেই ডেকো। ঠিক, না রে কেটলি ?

    কেটলি বেশ বিখ্যাত পরিবারের মেয়ে, মাসখানেক আগে একবার বলে ফেলেছিল যিশু। ওর দাদু, মানে ওর মায়ের বাবা, নামকরা লোক ছিল, খাঁটি ডাকসাইটে। কুচকুচ করছে চুল। থমথম করছে মুখ। কুতকুত করছে চোখ। টনটন করছে জ্ঞান। খসখস করছে কন্ঠস্বর। তিরতির করছে চাউনি। গটগট করছে চলন। কনকন করছে আঙুল। দশাসই। পিস্তল রাখত। ভালো জামা-কাপড় পরার শখ ছিল। দু-দুটি বডিগার্ড থাকত সব সময়। স্বাধীনতার আগের বছর তো জান লড়িয়ে দিয়েছিল। আদিত্যকে জিগেস কোরো। যিশু আদিত্যর কথা পাড়ায় নিজের ক্ষুন্নতায় আশ্চর্য হয়েছিল অরিন্দম। আদিত্য তো বোধয় ওরচে অন্তত দশ বছরের ছোটো। যিশু আদিত্যর চেয়ে কুড়ি বছরের বড়ো।

    আদিত্যর দেওয়া তথ্যে বিস্মিত আর আকৃষ্ট হয়েছিল অরিনদম। সত্যি। অফিসের মহাফেজখানা থেকে ধুলোপড়া পুরোনো খড়খড়ে ফাইল এনে দিয়েছিল আদিত্য। ফাইল খুঁটিয়ে পড়ে, অবিচল অস্হিরতায় আক্রান্ত, ভেবেছিল অরিন্দম, বিকেলের বর্ষীয়ান আলোয় নিজের বিছানায় শুয়ে, টেবিলে রাখা চায়ে কখুন সর পড়ে গেছে খেয়াল নেই, ভেবেছিল ও, কলকাতার বিখ্যাত পরিবার বলতে ঠাকুর পরিবার মল্লিক পরিবারের মতন কয়েকটা উচ্চবিত্ত পরিবার বোঝায় কেন ! কত বাঙালি আছে, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ পঞ্চম ষষ্ঠ পুরুষ ওব্দি বংশলতিকা জানে বলে গৌরব বোধ করে। তারপর একদিন তারা মরে হাওয়া হয়ে যায়। সেই গৌরববোধটা কি তখুন হাওয়ায় ঈথারে ভেসে বেড়ায় ?

    আরও গোটাকতক ফাইল লুকিয়ে এনে দিয়েছিল আদিত্য। বর্ণময় সব চরিত্র।

    কেটলিউলির দাদুর নাম কেষ্টবাহাদুর জহোর্বাদি। দার্জিলিঙের বাঙালি। মা-বাপ অজানা। একজন চিনে মুটিয়া লালন-পালন করেছিল। তাকেই বাপ বলে জানত। দার্জিলিঙ থেকে কলকাতায় পৌঁছে, বছর ফুরোবার আগেই, পটল তুলল চিনে বাপ। কারা যে ওর মা-বাপ, চিনে বাপ সাঙ্গ হতে, জানা হল না আর। সব বাবারাই তখুন ওর চিনে বাপ। ফেকলু ছেলেটাকে শুয়োর মাংসের এক কসাই পুষ্যি নিলে। পযঅর বজ্জাতগুনোর সাকরেদিতে শিখে ফেলল চুরি-বাটপাড়ি, চাকুবাজি, হার ছিনতাই, ব্লেডমারা, পার্স তুলে চিতাবাঘ দৌড়। চোদ্দ বছর বয়সে রেফরমেটরি-জেলখানায়। কলকাতার আর আশেপাশের জেলখানায় যা হয়, গাঁজা চরস, হেরোইন, আফিম, কোকেন, সমকাম, ঝাড়পিট, অসুখ, অখাদ্য, অপুষ্টি। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো পোড়-খাওয়া ঘ্যাঁচড়া। তারপর অবিরাম ভেতরে-বাইরে, ভেতরে-বাইরে, ভেতরে-বাইরে, ভেতরে-বাইরে…।

    ছেচল্লিশের প্রাকস্বাধীনতা আর মানুষ-জবাই উৎসবে, মুসুলমানদের পাড়া টেরিটিবাজার ছেড়ে পালাল মলঙ্গা লেন, আর সেখানে গিয়ে গোপাল মুকুজ্জের হিন্দু বাঁচাও দলের ঠ্যাঙাড়ে ও সদস্যে পদোন্নতি পাওয়া কেষ্টকে তখুন দ্যাখে কে ! যত খুন করে ততো প্রতিষ্ঠা বাড়ে। শার্টের কলার, গোপাল মুকুজ্জের দেওয়া হলেও, গাধার কানের মতন উঁচু। ও দার্জিলিঙের লোক ছিল বলে ওর অ্ত্রটার নাম সেই থেকে হয়ে গেছে ন্যাপলা। অন্তত শ’খানেক মুসুলমানকে নুলো খোঁড়া কানা করেছিল, পাঞ্জাবি পুলিশের নজর এড়িয়ে। কচুকাটা কন্দকাটা হেঁটেকাটাও করেছিল দাদু। ওই ফাঁকেই, দেশ স্বাধীন হব-হব, একজন তাগড়া হেলে কৈবর্তের মেয়ের সঙ্গে থাকতে লাগল। ফাইলের মার্জিনে লেখা বিয়ে হয়নি। বাচ্চা হতেই জিনহা আর জহোরলাল যে যার আঁতুড়ে যখুন স্বাধীনতার বিগুল বাজাচ্ছে, বউটা কাঁখে বাচ্চা নিয়ে এক গাঁট্টাগোঁট্টা তেঁতুলে বাগদির সঙ্গে পালাল পুরুলিয়ার আরসা ব্লকের হেঁসলা গ্রামে।

    দেশ স্বাধীন হতে, হাত-পা ছড়াবার অনেকটা জায়গা দিয়ে অনেক মুসুলমান তো ডানদিকের আর বাঁদিকের পাকিস্তানে পালাল। গোপাল মুকুজ্জেরা আর তাই কেষ্টটেষ্টদের পুষতে চাইল না। তখুন সংবিধান লেখালিখি হবে, দিশি বুড়ো-হাবড়ারা চেয়ার-কুর্সি পাইক-পেয়াদা পাবে, ফলে কেষ্ট গিয়ে সমাজের বাইরে মুখ থুবড়ে পড়ে চিৎপটা২। তারপর কখুনও পটুয়াটোলার সত্যেন বিশ্বাস, ভূবন সরকার লেনের ব্রজেন সরকারের কাজে, কিংবা ফ্রিল্যান্স ঠ্যাঙাড়ে। সাতচল্লিশে টালিগঞ্জ থানার বন্দুক-কার্তুজ লুট, আটচল্লিশের নভেম্বরে মহরমে মারপিট। পঞ্চাশের ফেবরারি-মার্চের দাঙ্গায় গোপালবাবু-সুধাংশুবাবুদের স্যাঙাত হয়ে আবার দেশপ্রেমিকে উন্নীত। কেষ্টোবাহাদুর জহোর্বাদি বাঙালি-সমাজের প্রথম মস্তান। তারপর থেকে মস্তান ছাড়া সরকারি দল অচল। পশ্চিমবাংলার রাজনীতি অচল।

    কেষ্ট তারপর আরম্ভ করে দিল ডাকাতি। খুল্লমখুল্লা ঘুরে বেড়াত স্টেনগান নিয়ে। গড়িয়াহাটের গিনি ম্যানসনের ডাকাতিটা ওই করেছিল। তখুনকার দিনে মুখোশ পরে মুখ লুকিয়ে ডাকাতির চল হয়নি। তবুও প্রমাণ করা যায়নি। কে আর সাক্ষী হয়। মানুষের ভয়ডরের শরীর। তার ওপর দেশ স্বাধীন হতেই পুলিশকেও একই রকুম ভয় পেতে আরম্ভ করেছে লোকে। ছাড়া পেয়ে কেষ্ট দিনকতকের জন্যে পালাল মুম্বাই। ফিরে আসতে, একদিন রাস্তায় হঠাৎ, ছেচল্লিশের প্রতিরোধ সমিতির পাণ্ডা শিবপ্রসাদ সাহার সঙ্গে কেষ্টবাহাদুরের দেখা। বউবাজারে সাহার চালডালের দোকান। চলছিল না। একদিন বউবাজারের বড়ো ব্যাপারি শ্যামলাল গুপ্তর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ব্যবসার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল শ্যামলাল। কেষ্ট তো ওকে গুলি মেরে খুন করে বোমার ধোঁয়া উড়িয়ে ব্যাগ হাতিয়ে পালাল। কিন্তু পাবলিকের তাড়া খেয়ে সেঁদিয়েছে গিয়ে রূপম সিনেমাহলে। ধরা পড়তে রাগি জনগণের হাতে দেম্মার, পেড়ে ফেলে আড়ং ধোলাই। স্বাধীনতার পর সেই প্রথম বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ আর রাজনীতি-নিরপেক্ষ গণপ্রহার, কেননা মাত্র ক’বছরেই পুলিশের ওপর থেকে ভরসা উবে গিয়েছে নাগরিকদের। বলেছিল যিশু।

    মাউনব্যাটোন যাবার সময়ে জহোরর্লালকে বলে গিসলো, এই স্বজন-ঠ্যাঙাড়েদের ভার তোমার হাতে সঁপে যাচ্ছি, এরা অনেক কাজে দেবে, তোমার মেয়ে যখুন বড়ো হবে তখুন, এমনকী তোমার নাতি আর তাদের ছেলেমেয়েদেরও কাজে দেবে। তুমি আবার বাহাদুরি মেরে মানবতাবাদ ফলাতে গিয়ে খোলনলচে পালটে ফেলো না যেন। জিনহাকেও একই কথা বলিচি। তা কথাটা অমান্য করেনি দুজনে। বলেছিল যিশু।

    অনেকদিন চলেছিল কেষ্টর মকদ্দমা। জেল হাজতে তো ওর দাড়ির চুল সাদা হয়ে গেল। স্বাধীনতার পর বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখার সেই শুরু, ফউজদারি হোক বা দেওয়ানি। সাতান্ন সনের কলমের নিব ভেঙে ফাঁসির হুকুম হয়েছিল কেষ্টর। সে নিব পালটে নতুন নিব লাগালে, রাষ্ট্রপতির দয়ায় যাবজ্জীবনের পর কেষ্ট বেরিয়ে এল একেবারে লোলচাম বুডঢা, ভুরু আর কানের চুল পেকে দঙ্কাদড়ি। মেয়ের কাছে তপসিয়ায় বেঁচেছিল, অথর্ব। নাতনির টেরাকোটা হামাগুড়ি শেষ হবার আগেই, বাটিকেকের সদ্য নাবানো গরম ডালার মধ্যে পড়ে ঝলসে মরে গিয়েছিল। চিতায় ক্রিমিনালের লাশ থেকে ভ্যানিলার ভুরভুরে সুগন্ধ নিমতলার ঘাটকে শোকমুক্ত করে দিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্যে। বলেছিল যিশু।

    কেটলি ওর মায়ের কাছ থেকেই শিখেছে পা দিয়ে ময়দা চটকানো। ডালহাউসিতে ওর বাপ ফিরি করত সেসব কেক। উদবাস্তুরা তখুন সবে বড়োদিন, নিউ ইয়ার, হ্যাপি বার্থডে করতে শিখছে। নিয়মিত বিক্রিবাটা তো কেটলি মহাকরণে ঢোকার পর আরম্ভ হয়েছে। ঢোকার জন্যেও পুরুলিয়ায় গিয়ে ঝাড়খন্ড দলের বিরুদ্ধে বাড়ি-বাড়ি ঘুরতে হয়েছিল ওর বাপকে, নির্বাচনের সময়। বলেছিল যিশু।

    তাহলে মেনকা, আই মিন ম্যানকা পাইক, ওর বুইন নয় ? জিগেস করেছিল অরিন্দম।

    না-না। ও-ও তিলজলা বা বাইপাসের দিকে জবরদখল জমিতে থাকে কোথায় যেন। মস্তান ট্যাক্স আর পার্টি ট্যাক্স দিতে হয়।

    ওর নাম কী ? কেটলির ?

    নাম ? নাম দিয়ে কী করবে ?

    নিজের কাছে রাখব।

    ফাইলটার মার্জিনে একগাদা বানান ভুল সম্পর্কে মন্তব্য ছিল, পেনসিলে। মন্তব্যগুলোতেও বানান ভুল ছিল। উদবাস্তুরা এসে কমিউনিস্ট পার্টিটাকে দখল করে নিয়ে প্রাইমারি স্তরে ইংরিজি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল, যাতে বাঙালিদের একঘরে করে রাখা যায়। ফল ভুগছে।

    মন্দ বলোনি।

    আরেকটা ফাইল থেকে তো জেরক্স তুলে নিয়েছে অরিন্দম, আদিত্যকে খ্যাপাবে বলে। খেপছেও আদিত্য। প্রসঙ্গ তুললেই, এমনকী ওর ভুঁড়িদাস খাকি সহবেতনভূকরাও। একজন কন্সটেবল, ব্যাটা কেবলমাত্র কন্সটেবল, মেদিনীপুরের পাণ্ডে, অ্যাঁ, সে তো রেগে কাঁই। আসলে, মেছুয়াপট্টির ফলবাজারে ব্যাটার একটা ম্যাটাডর ভ্যান খাটতো ; পুরসভা সেটা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সতেরোটা হাতে-টানা রিকশা খাটে ওর। সবকটা রিকশা একটা লাইসেন্সেই চলে।

    কলকাতা থেকে হাতেটানা রিকশা কেন তুলে দেয়া হচ্ছে না জানো তো ? সব রিকশাই হয় পুলিশের নয়তো পলিটিকাল মাফিয়ার।

    ওই ফাইলটা, যেটার জেরক্স রেখেছে অরিন্দম, গৌরীবাড়ি লেনের হেমন্তকুমার মণ্ডল ওরফে হেমেন মণ্ডল ওরফে হেমা এজেন্টের। লুম্পেন কলকাতার জনকরাজা। ফাইলে, নামের আগায় ‘শ্রী’ জুড়ে দিয়েছিল কেউ সবুজ কালিতে। মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় পড়েছিল অরিন্দম, মনে আছে, হেমেন মণ্ডলটা ছিল রুণু গুহনিয়োগীর স্যাঙাত ঠ্যাঙাড়ে। বোঝো তাহলে। শেষে এই রুণু কিনা আদিত্যর রোল মডেল !

    স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস নাইন ওব্দি পড়েছিল হেমেন মণ্ডল। ক্লাস টেনে যাবার মুখে চলে গেল অন্যলোকের মালকড়ি-টানার ইশকুলে। গড়ে ফেলল হাড়-বজ্জাতদের হাড়হাভাতে হাড়গিলে দল। ভাড়াটে তুলতে হেমেন। চটকলে ভর্তি করাতে হেমেন। বানতলার ইঁট-বালি-লোহা কিনতে হেমেন। অবরোধকারীদের প্যাঁদাতে হেমেন। পুজোর চাঁদা তুলতে হেমেন। হেমেন রক্তদান ক্যাম্প করলে রোগাপটকা বুড়ো বাচ্চা সব্বাইকে দিতে হত ওর পাতা ফোলডিং খাটে কাঠ হয়ে শুয়ে। নইলে নয়ছয় লণ্ডভণ্ড খিস্তিখেউড় আড়ংধোলাই। লাশ লোপাট। নকশাল খুনের রেকর্ড করেছিল ও।

    রাষ্ট্র তখুন মহাকরণে কাগজ-কলম নিয়ে নাজেহাল। গৌরীবাড়িকে ভারতীয় সংবিধানের বাইরে নিয়ে যেতে সফল হয়েছিল হেমেন মণ্ডল। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবাংলার প্রথম মুক্তাঞ্চল। পঞ্চান্ন হাজার লোকের ঘাড়ের ওপর সন্ত্রাসের ছত্রপতি হেমেনজি। ফি হপ্তায় কে কত তোলা দেবে তা বেঁধে দিয়েছিল হেমেন। খেরোর খাতায় হিসেব রাখত। চাইলেই গাড়ি টিভি ফ্রিজ চেয়ার টেবিল বাসন-কোসন বিছানা-মশারি তক্ষুনি দিয়ে দিতে হবে হেমেনজিকে। তক্ষুনি। বাড়ি বা ফ্ল্যাট চাইলে, তাও। তক্ষুনি।

    অনিতা দত্তর ভায়ের ফ্ল্যাট দখল করে থাকতে লাগল হেমেন আর ওর ল্যাংবোট সেনা। অনিতার কাজ ওদের জন্যে রান্না করা, বাসন মাজা, জলতোলা, কাপড় কাচা, ঘরমোছা, জামাপ্যান্ট ইস্তিরি। অন্ধকার ভাঁড়ার ঘরটা অনিতার ভায়ের জন্য বরাদ্দ। পাড়ার লোকেরা তো ভয়ে লেংটু গুটিয়ে কেঁচো। রাষ্ট্র তখুন মহাকরণে বৈপ্লবিক ফাইলবাজি শিখছে।

    হেমেন কি আর ধরা পড়ে না ? পড়ে বইকি। ধরে রাখা যেত না। উকিলরা ছাড়িয়ে এনে আবার ছেড়ে দিত সমাজে। হেমেন সমাজের ভেতর। পুলিশ সমাজের বাইরে হাই তুলছে। হেমেন যতবার ছাড়া পায় ততবার ওর ইজ্জত বাড়ে। এরম হতে-হতে আলটপকা একদিন খেলাচ্ছলে শ্যামপুকুর থানার পরশুরাম রায়কে খুন করে ফেলেছিল। যাবজ্জীবন হল। কিন্তু হেমেন মণ্ডল বলে কথা। দিব্বি ছাড়া পেয়ে গিসলো হাইকোর্টে। বুকের পাটা ফুলে হিমালয়। বড়োতলার গুণ্ডা হারু আদককে গিয়ে খুন করে দিলে, তারই পাড়ায়, হিন্দি সিনেমার সংলাপ বলতে-বলতে। ইন্দি ফিলমে তখুন সবে ক্রিমিনালরা নায়কের পিঁড়িতে বসছে। বাড়ির ছেলে-ছোকরা আর বউঝিরা বাংলা ফিল্ম ছেড়ে হিন্দির দিকে ভিড়ছে তখুন। পাড়ার কচি কিশোররা হিন্দি সিনেমার ঢঙে কথা বলে আহ্লাদে আটখানা হতে শিখছে।

    কংরেসের সিদ্ধার্থ রায় বিদেয় নিলে কী হবে, জনদরদী বামপন্হী সরকার সেশন আদালত থেকে হারু আদকের খুনের মামলা চুপিচুপি তুলে নিলে। এদিকে হেয়ার স্ট্রিটে, মানিকতলায়, উল্টোডাঙায়, শ্যামপুকুরে, পার্ক স্ট্রিট, বড়োতলা আর চব্বিশ পরগণার থানায়-থানায় হেমেনের নামে শ’খানেক কেস ঝোলানো। ঝোলানো মকদ্দমার দড়ি আপনা থেকেই পচে যায়। হেমেনের খাতিরে বিশেষ আদালত হল। হতেই, নাকচ করে দিলে হাইকোর্ট। জনদরদী সরকার জানতো যে হাইকোর্ট নাকচ করে দেবে। আইন বলে কথা। তা-ও আবার ইংরেজদের বানানো।

    শুধুমাত্র তিনটে কেসের তল্লাশিতেই হেমেনের বৈভবে পাওয়া গিসলো লাখের বেশি কাঁচা টাকা, বিলিতি মটোরগাড়ি, অনেকগুলো ব্যাংকের মোটা ফিক্স ডিপোজিত, লকার, গয়নাগাটি, ট্রাক, এমনকী ওর পাঁচ-পাঁচটা লাইফ ইন্সিয়োরেন্স। বিদেশি ইনসিয়োরেন্স কোম্পানিরা এসে যাতে না ব্যবসায় ভাগ বসায় তাই অনেক কাল আগে থাকতেই খুনি-ডাকাত-মস্তানদের জীবনবীমা আরম্ভ হয়ে গিসলো। পরে তো খুনি ধর্ষক আর ডাকাতরা বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে যেতে লাগলো, খাদি-খদ্দরে ধবধবে।

    হেমেনকে শেষে শায়েস্তা করলে গৌরীবাড়ি পাড়ার মেয়েরা। পাড়ায় বিনে পয়সায় কোচিং চালাত লাবু স্যার, একটু খোঁড়া। সবাইকে নানা রকুমার কাজে সাহায্য করত লাবুবাবু। সবচে শ্রদ্ধেয় লোক ছিল পাড়ায়। লোকে লাবুকে এতো ভালোবাসছে শ্রদ্ধা করছে দেখে হেমেন আর ওর কেল্টে-খ্যাংরাটে সাঙ্গো-পাঙ্গোরা একদিন লাবুবাবুর ছেঁড়া কলার ধরে হুমকি দিলে, কোচিং-ফোচিং বন্দ করো, যথেষ্ট ল্যাখাপড়া শিখিয়েচো পাবলিককে। লাবুবাবু তাতে কান দিলে না। না শোনার ফলে একদিন ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকদের সামনেই ফাইট-মাস্টার হেমেন মণ্ডলের হাতে কোচিং ভাঙচুর আর লাবুস্যারকে লাথি গুষি চেন সোঁটা মেরে-মেরে বেধড়খ হল। থ্যাঁতা লাবুবাবুকে দেখতে গলায় স্টেথোঝোলানো ডাক্তার এলে তারও হল রামপ্যাঁদানি আড়ংধোলাই। শেষে থাকতে না পেরে একজন গেরস্ত বউ জোর করে ডেকে নিয়ে এল আরেক ডাক্তারকে। হেমেনরা আবার ট্যাঁ-ফোঁ করতেই পাড়ার সমস্ত বউ মেয়ে বুড়িরা হাতের কাছে যা পেল তাই নিয়ে গাছকোমরে নাবল রাস্তায়। জনদরদী সরকারের বরকন্দাজরা হেমেনকে বাঁচাতে গেলে তাদেরও জুটল চটিপেটা আর গুঁড়োলংকা। হেমেন-রাজ ফুরোলো।

    পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের বোধ আর সংবেদনকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়ে গেছে রুণু গুহনিয়োগী-হেমেন মণ্ডলের দলবল। মর্গের আর ভাগাড়ের বেওয়ারিশ লাশের কংকাল বিদেশে চলে যাচ্ছে বিক্কিরির জন্যে। গঙ্গায় নৌকো ভাসিয়ে দিয়ারায় নিয়ে গেলেই হল। ওই তো, নিজের চোখেই দেখেছে অরিন্দম মুর্শিদাবাদের ট্যুরে গিয়ে। হরিহরপাড়ার স্বরূপপুরে জমির খেয়োখেয়ির ছোরাছুরিতে কাঙালি শেখের বারো বছরের ছেলে হাবল শেখের হাত কেটে দিলে কংরেসিরা। সেই কাটা হাতটা বাজারের থলেতে পুরে জেলা আর মহকুমা আধিকারিকদের দেখিয়ে বেড়াচ্ছিল এসিউসির ছেলেরা। ওই কাটা হাতটা দিয়েই একজন অনুসন্ধিৎসুর গালে চল কষিয়ে দিলে।

    ১৪

    অভিনয়ের অ আ ক খ শিখছে এমন এক নিরক্ষর নোংরা আজীবন চান করেনি নাকে পোঁটা খয়েরি-চুল বালিকা ওদের দিকে নখপালিশ-ওঠা হাত বাড়িয়ে আনুনাসিক প্রার্থনা জানাতে আরম্ভ করলে, অরিন্দমের হুঁশ হয়, আবোল-তাবোল ভাবছিল ও, ছি-ছি !

    আমরা কি তাহলে মাঝপথে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্ব পাতানোর অনুষ্ঠান করব ? যিশুর কথায় অরিন্দম বিব্রত। কেটলিউলি নিজের থুতনি একবার বাঁ-কাঁধে আরেকবার ডান-কাঁধে ঠেকায়।

    পাশ দিয়ে চটাং-চটাং কথা বলতে-বলতে একজোড়া হাওয়াই চপ্পল চলে যায়। সামনের দোকানটায় ন্যাতানো জিলিপির ওপর হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ভিমরুল পরিবারের বালক-বালিকা। শালপাতার ওপর মাছি-সমাজের ভনভন গ্রাম পঞ্চায়েতের বখরা নিয়ে ঝগড়া। একটা সাদা-বাদামি কুকুর আস্তাকুঁড়ে চর্বিত চর্বনে একাগ্র। সাদা লংক্লথে জড়ানো শিশু আর গোটানো শীতলপাটিসহ গোটা তিরিশেক উদাসীন টুপি-লুঙ্গি দল ওদের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে অরিন্দমের কোমরে ডান বেড় আর কেটলির হাত বাঁ-হাতে নিয়ে পার্ক-করা গাড়ির দিকে এগোয় যিশু।

    মুসুলমানদের নীরব শবযাত্রার শোক বড্ড ছোঁয়াচে। আর শবযাত্রায় নেতৃত্ব সব সময়ে এক মৃতদেহের। মৃত্যুর কি যাত্রা সম্ভব ? আমাদের এই কালখণ্ডটা শবযাত্রার। দাদু-ঠাকুমার কাল ছিল তীর্থযাত্রার। আমরা মডার্ন হবার যোগ্য নই। ওদের দুজনকে নিয়ে যেতে-যেতে ভাবছিল যিশু।

    ধুৎ, ভাললাগেনা। কেটলিউলির কথাগুলো কাঁপে থরথর। ঝটকায় হাত ছাড়ায়।

    পায়ের কাছ থেকে জিলিপি-ভেজা ঠোঙা তুলে নিয়ে যায় কাগজ-কুড়ানিয়া বাতাস। মেয়েটির উক্তিতে অরিন্দম একশা, হকচকায়। বাচনভঙ্গীর সঙ্গে মানানসই পুরু তাঁবাটে ঠোঁট। ওপরের ঠোঁটের ওপর, নাকের তলায়, কয়েক ফোঁটা ঘাম। হয়তো কেকের ময়দা ঠাসার পরিশ্রম।

    ভ্যানিলার ভারাতুর গন্ধের আদর কাটিয়ে, গাড়ির ডিকি তুলে জুতো-মোজা খুলে ঢোকায় অরিন্দম আর কোলহাপুরি বের করে পরে। রাস্তার কলে ও হাত-পা ধুতে গেলে, কেটলিকে যিশুর ফিসফিস। কী ভাবছে, বলতো, অরিন্দমটা। নির্ঘাত চটবে আমার ওপর। তোর কথা শুনেই এসেছে ও। বলছি তো, ওর মতন লোক আজকাল দেখা যায় না। তুই-ও অনেক লক্ষ্মী মেয়ে, বলেছি ওকে।

    ভালো লোক বললে চরিত্রের ওপর অসহ্য চাপ পড়া। অরিন্দম নীল বর্ডার দেয়া ধবধবে রুমালে হাত মুছতে-মুছতে এসে, ওদের কাছ-ঘেঁসে দাঁড়াতে, কেটলিউলি অরিন্দমের মুখে কনকনে চাউনি ফেলে জানতে চায়, কেনই বা যাব তোমার সঙ্গে ?

    কথাগুলো একযোগে অরিন্দমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিরে ফেলতে চায় ওর সযত্নলালিত সততাকে। দৃষ্টি স্হির রাখে অরিন্দম। সরাসরি তাকায়। একবারও পড়তে দেয় না চোখের পাতা। ওদের দুজনকে তো বটেই, নিজেকেও স্তম্ভিত করে ওর অনুচ্চস্বর ঘোষণা: তোমায় আমি বিয়ে করতে চাই।

    কেটলিউলি ভাবার সময় নেয় না। যেন প্রস্তাবের উত্তর আগে থাকতে নির্ণীত। কিংবা চিন্তার দ্বারা কলুষিত হবার আগেই প্রশ্ন তোলে। কুতো দিনের জন্য ?

    অরিন্দমের কানে কালো, মসৃণ-ডানা, ঝিঁঝির অদৃশ্য কলতান আটকে যায়। ওকে চাপা না দিয়ে একটা বেসরকারি বাস চলে গেল পাশ কাটিয়ে। টের পায় মগজের মঞ্চে অস্হিরতার ঝিঁকা নাচ। ফুসফুসের মধ্যে কোথাও নিজের ডাকের পুনরুক্তি দিয়ে আবহকে উত্তেজিত করছে কোকিল। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল ও, অরিন্দম, বাতাসের অদৃশ্য মৃগশিশুরা দুধ খেতে নাবছে কেটলিউলির সদ্যোদ্ভিন্ন হৃদ্যতায়। ওর মনে হল, কেটলিউলির মেরুতে বার্তা পৌঁছে দেবার ভাষা ওর আয়ত্বে নেই। হিন্দি আর বাংলা সিনেমা-ও কেটলিউলির কাছে প্রেম-ভালোবাসাকে হাস্যকর আর ফালতু করে দিয়ে থাকবে। প্রেমের সমস্ত অভিব্যক্তিকে ফোঁপরা করে দিয়ে গেছে আধুনিকতা।

    ওই অশথ্থ গাছটা যতদিন বাঁচবে, বলল ও, অরিন্দম, মেরুন-সবুজ স্বচ্ছ নৃত্যপটিয়সী অশথ্থপাতায় খেলতে-থাকা নিরুচ্চার রোদ্দুরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল ও, আমি আজকে, এক্ষুনি বিয়ে করতে চাই, বলল ও, বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে যেতে চাই, বলল ও, আমি যে-কোনো প্রথায় বিয়ে করতে রাজি, বলল ও, আমি ঠান্ডা মাথায় ভেবে-চিন্তেই এসব কথা বলছি, বলল ও, আমি সব রকম ঝড়ঝাপটা পোয়াতে তৈরি, বলল ও, আমাদের বাড়িতে কেউই আপত্তি করবে না, বলল ও, মায়ের বরং আনন্দই হবে, বলল ও, তুমি তোমার মহাকরণের কাজ ইচ্ছে করলে বজায় রাখতে পারো, বলল অরিন্দম।

    যিশু থ, বোধয় মুগ্ধ। যৌন সম্পর্কের শ্রেণিবিভাজন কি সত্যিই মুছে ফেলা যায় ? আবেগকে এতকাল বারংবার অবজ্ঞা করার দরুন ওর নিজের গুরুত্বপূর্ণ নির্ণয়গুলো মুলতুবি থেকে গেছে, তামাদি হয়ে গেছে। অরিন্দমের এক্ষুনি বিয়ে করতে চাই আর কেটলিউলির কুতো দিনের জন্য, আত্মসমর্পনের এই আঘাত-প্রত্যাঘাত ওকে তীব্র চোট দিয়েছে। কপালে বরফের থান ইঁটের মতন। প্রতিভা তো সকলেরই থাকে, কিন্তু যে নির্বোধ অজানার আহ্লাদে টেনে নিয়ে গিয়ে মানুষের টুঁটি চেপে ধরতে চায় তার প্রতিভা, সেখানে একা ঢোকার সাহস, সবায়ের হয় না।

    গটগটিয়ে গাড়িতে বসতে গিয়ে দরোজা বন্ধ পায় কেটলিউলি। বিড়ম্বিত মুখশ্রী দেখে অরিন্দম দ্রুত তালা খুলে সামনের সিটে বসতে আ্‌বান জানায় দুজনকে। কেটলিউলি বসেছে চালক অরিন্দমের পাশে। যিশু বলল, আমি পেছনে বসছি। অরিন্দম গাড়ি ঘোরায়।

    বাবুরা দিনদুপুরে চললেন পিগনিগ কত্তে, শালা মটোরগাড়ির রোয়াব দেকাচ্চে। মন্তব্য ঝাড়ে রোগাটে কালচে ধুতি-পাঞ্জাবি, কটমট। যিশু বলল, ইনিও গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো ইশকুলের সদস্য। অরিন্দম পালটা মন্তব্য করে কলকাতায় গাড়ি থাকাটা গণশত্রুতা।

    যিশু: আমরা কি তাহলে এখুন বিয়ে কত্তে যাবো ?

    কেটলি : হ্যাঁঅ্যাঅ্যঅ্যা। কুথায় যাবো ?

    যিশু : খ্রিস্টান হলে আমি আজই চার্চে ব্যবস্হা করে ফেলতুম। ব্যাপটাইজ করতেও সময় দরকার। রেজেস্ট্রি করতে চাইলেও তো নোটিশ দিতে হবে। যাবার পথে না হয় নোটিশটা দিয়ে যাওয়া যাক, কী বলো ? তোমার হিন্দু মতে তো পাঁজি-পুরুতের ঝক্কি। মহারাষ্ট্র মণ্ডল কিংবা তামিল সমাজমকে খর্চা-খরচ দিলে ওরা ইন্সট্যান্ট ব্যবস্হা করে শুনেছি। তোমার মুসুলমান বা বৌদ্ধ বন্ধুবান্ধবদের নক করে দেখা যেতে পারে। তার চেয়ে আমিই না হয় পুরুত হয়ে যাই, এক সঙ্গে বাঁচা নিয়ে তো কথা। ও, না, আজকে অনেক কাজ আছে আমার পরশু আমার কার্ডামম রিপোর্টের প্রেজেন্টেশান। গিয়ে ইকুইপমেন্টগুলো চেক করে রাখতে হবে।

    যিশুর ফ্ল্যাটে ছোটো ঘরটায় টেবিলে আর দেয়ালে বসানো আছে নানা যন্ত্রপাতি, দেখেছে অরিন্দম। বাঙালি কর্মীদের চেয়ে যন্ত্রপাতিকে বেশি বিশ্বাস করে ও। ঘরটায় একা বসে নিজের রিপোর্টের বিশ্লেষণ করে শোনায় জাপান বা আমেরিকার কোনো কোম্পানির বোর্ড সদস্যদের, যারা কাজটার ঠিকে দিয়েছে। তারা প্রশ্ন তোলে। যিশু উত্তর দেয়। প্রকল্প বা প্রস্তাব তক্ষুনি অনুমোদিত বা প্রত্যাখ্যাত হয়, কিংবা আবার বাড়তি তথ্য যোগাড়ে বেরোতে হয়, নতুনভাবে অনুমোদনের জন্যে। হলে ওর মোটা লাভ। না হলে মন খারাপ। প্রচণ্ড খাটে। নিয়ন্ত্রণ না করলে কাজ সবসময় দক্ষের দিকে, মানুষের দক্ষযজ্ঞের সক্ষমতার দিকে আকৃষ্ট হয়ে মানুষকে ঘিরে রাখে। যারা নিকৃষ্ট আর ফাঁকিবাজ তারা তাদের অক্ষমতার কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলে আর ক্রমশ রূপান্তরিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠে।

    অ।। আমি তো ধর্মহীন আস্তিক।

    যি।। কেটলি তুই কী বলিস ?

    কে।। ঘুড়ার দৌড় দেখতে যাবো।

    যি।। তুই দৌড় দেখতে চাস, না রেস খেলতে চাস ? মাঠে না গিয়েই রেস খেলা যায় রাসেল স্ট্রিটে টার্ফ ক্লাবের কাউন্টারে।

    কে।। ঘুড়াও দেখে নিবো, রেসও খেলে নিবো।

    যি।। আমাকে তাহলে পার্কস্ট্রিটে নাবিয়ে দাও অরিন্দম। পার্ক সার্কাস বা ক্যামাক স্ট্রিট দিয়ে ঢোকার সময় আছে এখনও। টাইমে পৌঁছোতে পারলে কাজ হয়। নইলে সেই আবার ঘুরপথে চৌরঙ্গি দিয়ে ঢুকতে হবে।

    কে।। চলো না কাকুদা, আমরাদের সঙ্গে। খেলা জিতে নিবো আর চলে যাবো শশুরবাড়ি। হি-হি।

    যি।। আগে তো জিতগে যা। আজকে আমার সত্যই অনেক কাজ আছে। তার ওপর আমার ম্যান ফ্রাইডেটা বাড়ি যাচ্ছে। ওদের গ্রামে টেনশান শুরু হয়েছে আবার। বেচারা কীর্তনিয়া।

    অ।। সেই বাঙাল ছেলেটা ? কী হল ওর ? এইজন্যেই আপনার পুরোদস্তুর অফিস খোলা উচিত ছিল। ক্লার্ক, অ্যাকাউন্টেন্ট, ডাটা এনট্রি অপারেটর এসব রেখে। অঢেল টাকা তো রোজগার করেন।

    কিছুক্ষণ থম মেরে যায় যিশু। তারপর আরম্ভ করে পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতাউত্তর পল্লিসমাজের অকথ্য রূপকথা। শোনার জন্যে গাড়ির গতি কমায় অরিন্দম।

    উত্তর দিনাজপুরের অন্ত্যজ উদবাস্তু গ্রাম ভাঙাপাড়ায় ওর বাড়ি। উত্তরবঙ্গের গ্রামগুনোর নামও স্ট্রেঞ্জ। ভাঙাপাড়া, মাথাভাঙা, ফাটাপুকুর, রাজাভাতখাওয়া। ওদের গ্রাম থেকে আমিই এনেছিলুম ছেলেটাকে। একদম রঅঅঅ। এখুন তো ও আর থাকতে পারে না গ্রামে গিয়ে। গ্রামটা একেবারে অজ পাড়াগাঁ, অলমোস্ট এইটিন্হ সেঞ্চুরিতে। পার্টির দলাদলি ছাড়া অন্য কোনও রকম আধুনিকতা নেই।

    গত বছর ওদের গ্রামের চালকলটায় আর সেখানকার শদেড়েক কুঁড়েঘরে আগুন ধরিয়ে আটজনকে পিটিয়ে গলাকেটে খুন করেছিল পাশের টুনিভিটা গ্রামের মাহাতোরা। পাঁচশো মাহাতো, হাতে মশাল নিয়ে দৌড়ে আসছে, কী ভয়াবহ। তোমাদের বিহারের খুনোখুনি তো এর কাছে নস্যি। পাঁআআআচ শোওওও লোক হাতে মশাল নিয়ে চ্যাঁচ্যাতে-চ্যাঁচাতে এগোচ্ছে একটা গ্রামের দিকে, ভাবতে পারো ? শরৎ চাটুজ্জে তো এই সিনারিও নিয়ে এপিক লিখে ফেলতেন, একশট আফিম মেরে। বিগ বাজেট হিন্দি ফিল্মও হতে পারে; পাঁচশো গব্বর সিং দাঁত বের করে ছুটে আসছে।

    বুঝলে ? একটা কোলের বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল আগুনে। পড়পড় করে পুড়ে ঝামসে কালো হয়ে গেল জলজ্যান্ত তুলতুলে বাচ্চাটা। বুঝলে ? টুনিভিটার মহাজন সুরেন মাহাতোর লাশ আগের দিন পাওয়া গিসলো ভাঙাপাড়া গ্রামে। গ্রামে-গ্রামে ব্যাংক খুলে মহাজনদের খুব সুবিধে হয়েছে। কী বলছিলুম ? হ্যাঁ। অজিত বালা নামে একজন চালকল মালিকের কাছে মোটা টাকা পাওনা ছিল সুরেনের।

    আমার কাজের ছেলেটার বাবা-মা আর বোন এসে ছিল আমার ফ্ল্যাটে। বিহারের বলরামপুর থেকে লাঠিয়াল এনেছিল মাহাতোরা। তাদের হাতে লাঠি, বল্লম, সড়কি, টাঙি, বাঁশ, শাবল, জেরিক্যানে পেটরল। ওই সমস্ত অস্ত্র নিয়ে পাঁচশো লোক, ছুটে আসছে, হই-হই করতে-করতে, বুঝলে ? জাস্ট ভিজুয়ালাইজ। ভাঙাপাড়ার জোতদার বুধন মাহাতোর হাজার খানেক বিঘে জমির বেশিটাই খাস হয়ে গিসলো। ভাঙাপাড়ার রিফিউজিরা কেউ-কেউ পাট্টা পেয়েছিল। গোলমালের পাণ্ডা ওই বুধনটাই। ওর ছেলে ব্রহ্মদেবকে ধরেছিল পুলিশ। আরে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ তো সব আদিত্যর কার্বন কপি।

    ভাঙাপাড়ার পরিবারগুনো ধান থেকে চাল বানিয়ে বিক্কিরি করে। ধান কোটে বলে ওদের বলে কুটনি। মহাজনদের কাছ থেকে দাদন ছাড়া ওদের চলে না। কবে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, পঞ্চাশ বছর আগে। অনেক কুটনির অবস্হা সামান্য ফিরেছে। অনেকে আবার রয়ে গেছে উদবাস্তু, অলমোস্ট কাঙালি। এদিকে জমির দামও বেড়েছে তরতর করে। মাহাতোরা তো ব্রিটিশ আমলের জোতদার। ধার দিয়ে, লোভে ফেলে, ভয় দেখিয়ে, আবার হাতাবার তালে ছিল জমিজমা। মাহাতোদের দলে ভিড়েছিল পলিয়া জাতের লোকেরা, ওরাও ল্যান্ডেড ক্লাস। এরা ঝাড়খণ্ডিদের মতন উপজাতি নয়। ভাঙাপাড়ার উদবাস্তুদের চেয়ে উঁচু জাতের লোক এই চাষাগুনো।

    জমিদারি আমলের মতন ধার-দাদনের কাগজে টিপছাপ আজও চলছে। পঞ্চায়েতেও তো জোতদার, মহাজন, মাহাতোদের দখলে। খুনোখুনির পর ব্রহ্মদেবটা তো হাওয়া হয়ে গেসলো। আর ধরাটরা পড়েনি বোধয়। ওদিকে সমবায়-টমবায় বলে কিছু নেই। মেদিনীপুর, বর্ধমান, বাঁকুড়ার মতন সমবায় ব্যাপারটা মাটি পায়নি উত্তরবঙ্গে। এনজিও নেই বলেই মনে হয়, জেলা সদরে যা জেনেছি। এনজিও গঠন করতে গেলেই খুন হবে, আসামে মাজুলি দ্বীপে সঞ্জয় ঘোষের মতন। বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাবুদের কথা তোমায় আর কী বলব। তোমরা তো ওদের মালিক। লাইসেন্স দাও, ইন্সপেক্ট করো।

    দেশভাগের পর বামুন, কায়েত, বদ্যি যারা এসছিল, কেউ আর পড়ে নেই। সব্বাই দিব্বি গুছিয়ে নিয়েছে। উদবাস্তুদের নেতা হয়েছে। রাজনীতিরও দখল নিয়েছে। কিন্তু মার খেয়ে গেল অন্ত্যজরা। উত্তরপ্রদেশের তরাই অঞ্চলে তো ওদের জমিজমা সব শিখ সরদাররা হাতিয়ে নিয়েছে ; আন্দামানে গিয়েও উপনিবেশ গড়তে দেয়া হয়নি।

    আচমকা ওদের সঙ্গিনী জিগ্যেস করে ফ্যালে, কুন দেশ গো ?

    এই নিষ্পাপ অজ্ঞানতা বজায় থাকুক। আধুনিকতার কলুষমুক্ত থাকুক, ভেবে, অরিন্দম বলল, কোন দেশ আবার, তোমার দেশ।

    না-না, আমরাদের দেশ নয়। আমরা ঝগড়া করি না। মেয়েটির দুচোখে ড্যাবড্যাবে গরিমা।

    তাই জন্যে তোর বিয়ে দিচ্ছি অরিন্দমের সঙ্গে, ও-ও মহাক্যাবলা, ঝগড়া-ফগড়া করতে পারে না, বলল যিশু, প্যাকেটে সিগারেট ঠুকতে-ঠুকতে।

    তুমি সিগ্রেট খাও না ? অরিন্দমের কাছে জানতে চায় বাগদত্তা।

    না, আমি পান সিগারেট মদ গাঁজা কিচ্ছু খাই না।

    ঠিক, তুমি বোকা। অরিন্দম সম্পর্কে বাগদত্তার মূল্যায়ন।

    যিশু ওর পল্লিকথার পরবর্তী পর্ব শুরু করে।

    গ্রামটায় থেকেছি আমি। প্রাইমারি ডাটাবেসের লোভ আমি সামলাতে পারি না, জানোই। কুটনিদের পুরো তথ্য আছে আমার কাছে। আনবিলিভেবলি গরিব এই লোকগুনো। একচালা, হোগলা, চ্যাঁচারি, ডিগডিগে, ক্যাঁতরা-কানি, লালচাল, জলেতে তেলের গন্ধ, পানাপুকুরে চন, নোংরা ছোটোছোটো মাছ আর শাকশেকড়। আমার তো পেট খারাপ হয়ে গিসলো। বুঝলে ! তাও আবার পায়খানা নেই। মাঠে হাগতে যাও।

    হি-হি।

    এই, হাসিসনি।

    লোকাল রাজনীতিকরা মাথা গলায়নি ? জানতে চেয়েছিল অরিন্দম।

    আরে তা আর বলতে। প্রান্তিকের সংঘর্ষ মানেই রাজনীতি, আই মিন পার্টি-পলিটিক্স। সিটুর কুটনি ইউনিয়ানের বিবেকানন্দ কীর্তনিয়া বলেছিল, গণহত্যার পুরো ছকটা সিপিয়েম নেতা হরেরাম মাহাতোর। সিপিয়ের সাংসদ সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেছিল, হরেরাম নির্দোষ, আসলে জোতদাররা জমি কাড়তে চাইছে। জেলা বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বীরেশ্বর লাহিড়ি বলেছিল, জোতদার-মহাজনদের কথায় ওঠবোস করি না আমরা। বিজেপির শ্রীধর মল্লিক বলেছিল, পেটরল এসেছে মাহাতোদের চালকল থেকে। কলকাতায় কংরেসের মানস ভুঁইয়া বলেছিল, যারা খুন হয়েছে তারা সবাই কংরেসের। আরেসপির জেলা সম্পাদক জ্যোতিষ সরকার বলেছিল, আরেসপির প্রভাবশালী নেতা ছিল টুনিভিটা গ্রামের সুরেন মাহাতো। কারামন্ত্রী বিশ্বনাথ চৌধুরি ভাঙাপাড়ায় গণশ্রাদ্ধের দিন বলেছিল, পুনর্বাসনের ব্যবস্হা করা হচ্ছে। ব্লক আধিকারিক অশোক সাহা বলেছিল, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুনোর জন্যে তেরপল আর কাপড় কেনা হচ্ছে। দিনাজপুর-মালদা রেঞ্জের ডি আই জি অশোক সেন বলেছিল, হত্যাকারীদের খোঁজ চলছে। জেলার পুলিশ সুপার দেবেন্দ্র সুকুল বলেছিল, অবস্হা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। জেলাশাসক পবন আগরওয়াল বলেছিল, গ্রামবাসীদের মাথাপিছু ষাট টাকা নগদ, শুকনো খাবার আর জামাকাপড় দেয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী শ্রীকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছিল, শোকমিছিল বার করলে অশান্তি হবে। আরেসপির স্হানীয় নেতা রমণীচন্দ্র ঘোষ বলেছিল, বুধনের ছেলে ব্রহ্মদেব তো কংরেসের লোক….

    তুমি কী বলেছিলে ? সঙ্গিনীর রাগি প্রশ্নে দুজনেই স্তম্ভিত।

    যাক বাবা, আমার বাড়ি এসে গেল। জবাব এড়াবার সুযোগ পেয়ে সত্যিই প্রীত হয় যিশু। দোর খুলে, বাঁ পা বাড়িয়ে, চুলের টেরি বাঁচিয়ে নাবে। নেবে, সামনের জানালায় ঝুঁকে, মেয়েটি ওর কথাগুলো পুরোপুরি বুঝতে পারবে না জেনেও বলে, বুঝলি, আমরা সাধারণ লোকেরা মহলায় প্রক্সি দিই, কিন্তু আসল নাটকটা করে অন্য লোকেরা। আমাদের এই পাড়ায়, পার্ক স্ট্রিটে, বুঝলি, সক্কালবেলা একজন লোক কাক আর কুকুরদের আও আও আও আও, কানি আও, লেংড়ি আও, ডাক পেড়ে-পেড়ে রুটির গোছা খাওয়ায়।

    হি-হি।

    একদঙ্গল মেট্রোপলিটান কিশোরী রাস্তা দিয়ে ঢলঢলে বুক ফুলিয়ে যেতে-যেতে, হাই আংকল, চেঁচিয়ে হাত নাড়ায় যিশুকে। নজর ওদের কেটলিউলির দিকে।

    অরিন্দম : আমিও কাল থেকে আপনাকে কাকুদা বলে ডাকব।

    যিশু : কালকে কেন ? এখন থেকেই বলো।

    অরিন্দম : আগে বিয়েটা করি।

    যিশু : সত্যি ? না খাঁটি সত্যি ? কোনটা ? আচ্ছা চলি।

    গাড়ি থেকে নেবে, শনিবারে প্রাক-দুপুরে, সওদাগরি পাড়ায়, হঠাৎই দরাজ হয় যিশুর গলা। মোন মোর উড়াং বইরং করে রেএএএএ….। উত্তর দিনাজপুরে শোনা।

    ইশ রে, আবার গান !

    ১৫

    তপসিয়া সাউথ রোড, বাইপাস, তিলজলা রোড, দিলখুশা স্ট্রিট, পার্কসার্কাসের মোড়ে পাক খেয়ে পার্ক স্ট্রিটে যিশুকে নাবাবার পর আউটরাম রোডে বাঁক নিয়ে ক্যাসুরিনা অ্যাভেনিউতে পড়ে গাড়ি। সদ্য-পরিচিতির আগল ভাঙার আগের নিশ্চুপ মুহূর্ত। কে কী কথা বলবে। আবার অভিব্যক্তির সমস্যা হয় অরিন্দমের।

    দু’পাশ জুড়ে পান্নাসবুজ। পিঠের ওপর থেকে রোদ্দুরকে ঘাসে ফেলে দিয়ে ছায়ায় দাঁড়ায় অরিন্দমের অ্যামবাসাডর গাড়ি। টুলবক্স খুলে একটা ছোট্ট হলুদ বই কেটলিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে আবার স্টার্ট দেয় গাড়িতে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে গাড়ি বেগবান।

    পাতা উলটিয়ে ঘুড়ার ছবিগুনো দ্যাখে মেয়েটি। দেখে, রেসের বইটা রেখে দ্যায় টুলবক্সে। শরীর কাঁপিয়ে হাসতে থাকে নিঃশব্দে। উপভোগ করে নিজের হাসি।

    অরিন্দমের মনে হল, শরীর থিরকিয়ে এই যে হাসি, এভাবে দেহময় প্রতিভাদীপ্ত হয়ে ওঠা হাসি, দেহকে দেহাতীত করে দিচ্ছে, ভরসন্ধ্যার মতো আহামরি জোনাকিরা অন্ধকারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঝরে-ঝরে পড়ছে। ও, অরিন্দম, বলল, কী হল ? ঘোড়া পছন্দ করো।

    পড়তে জানি না।

    কেন ? ইশকুলে ইংরেজি শেখায়নি ?

    বাংলাও পড়তে পারি না। কুনো ইশকুলে পড়ি নাই গো। আমি লিখাপড়া জানি না।

    অরিন্দম টের পায় ও সজোরে গাড়িতে ব্রেক মেরেছে। কিঁইইইচ। হসপিটাল রোডে ঘাসের কিনারে থামে গাড়ি। ভীত শঙ্কিত চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, অ আ হসসোই দিরঘোই কিচ্ছু জানো না ?

    মায়েটি আলতো মাথা নাড়ায়।

    দিকে-দিকে সাক্ষরতার এতো গল্প, গ্রাম-শহরের দেয়ালে-দেয়ালে সাক্ষরতা সফল হবার ছড়া, অথচ কলকাতা শহরে একজন তরতাজা তরুণীর সঙ্গে বাংলা অক্ষরের পরিচয় হয়নি। শিলেট-পেনসিল নিয়ে কেউ সঙ্গে বসেনি কোনওদিন। হাতেখড়ি হয়নি। হাজার -হাজার বাংলা শব্দের মানেই জানে না। অবিশ্বাস্য। টেরাকোটা রঙের ওই পুরু ঠোঁট উচ্চারণ করেনি আজ ওব্দি কোনো লিখিত অক্ষর। অবহেলা অনাদর অভাবে স্ফূরিত অজ্ঞান নিরক্ষর ঠোঁট।

    কী দেখছ গো ?

    তোমার কানের লতি পাটিসাপটার মতন তুলতুলে।

    লিখাপড়া শিখে নিবো।

    আমার মাও লেখাপড়া জানত না। পরে শিখেছে।

    আজকা একটা সিনেমা দেকবো, কেমন ? বালকুনিতে ?

    আমাদের বাড়িতে টিভি-ভিসিআর আছে। বাড়িতে বসে যত ইচ্ছে সিনেমা দেখতে পারবে।

    অরন্দম দেখল, ওর সামনের দুটো চোখের জলাশয়ের ওপর জোনাকি উড়ছে। গাড়ির কাচে সানফিল্ম লাগানো ; পিছনের দরোজাদুটোর কাচ তোলা ছিল। ড্রাইভারের দিকের কাচ দ্রুত তুলে দিয়ে অনুসন্ধিৎসু মেয়েটির দিকে নিষ্পলক তাকায় অরিন্দম। সামনের দিক থেকে যে গাড়িটা আসছে, সেটা এখুনও অনেক দূরে। ছোট্ট পুরু ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট একবার আলতো ছুঁইয়ে নিয়েছে অরিন্দম। কিন্তু মেয়েটি চোখ বুজে জড়িয়ে ধরেছে ওকে, আর বলে উঠেছে, আমার আচকা লজ্জা হয়।

    অরিন্দমের কনুই লেগে হর্ন বেজে ওঠে। বাতাসের পরতে লুকিয়ে-থাকা অদৃশ্য প্রতিধ্বনিরা হর্নের শব্দে কেঁপে ওঠে আচমকা। মেয়েটির হাঁ-মুখ থেকে বিকিরিত খুদের জাউয়ের পান্তার সোঁদা গন্ধে অরিন্দম মুগ্ধ, সন্মোহিত। শি্রণ চাউর হয় রোঁয়ায়-রোঁয়ায়।

    স্টার্ট দেয় গাড়ি। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে দৃশ্যমান আকাশে সপারিষদ উড়ছে চিলপুরুষ।

    রেসকোর্সে পৌঁছে, গাড়ি থেকে নাবার আগে, রেসের গাইডবইটা আবার বের করে টুকিটাকি পরিচয় করায় অরিন্দম। ফিলি, জকি, ঘোড়ার মালিক, দূরত্ব, চাম্পয়ান কাপ, ট্রেবল, টানালা, জ্যাকপট, আউটার সাউন্ড। মাদি ঘোড়াগুনোকে ট্রেনিং দিয়েছে কারা। ঘোড়ার জাত। ঘোড়ার বংশতালিকা। কেটলিউলি হতবাক।

    দিল্লি আর ব্যাঙ্গালোরে বারোশো মিটার জিতেছে, এই ঘোড়াটার নাম জ্বলন্ত চুমু।

    হি-হি।

    এর নাম তোপের গোলা, ঘোড়সওয়ার রুবেন, ওজন ষাট কেজি, কলকাতায় চোদ্দোশো মিটার জিতেছে। সব নামই রেজিস্ট্রি-করা, অন্য কেউ দৌড়ের ঘোড়াকে এই নাম দিতে পারবে না। অনেক ঘোড়া আছে, নাম শোনো। ক্লাসিক অ্যাফেয়ার, অ্যাপোলোনিও, হার্ডিলা, ডানসিং কুইন, ইয়েনা, ফ্ল্যাশ গর্ডন, সান শ্যাক, অলস্টার, জেরিজ ফ্লেম, ওকহিল, সানফ্ল্যাগ, কিং র‌্যাট, টলারেন্স, কোপাকাবানা, কার্নিশ প্রিন্স। কোন ঘোড়াটার টিকিট কিনব ?

    আমি কী জানি ! বাংলা ঘুড়া নাই ?

    ওদের পাশে একটা ঠাসাঠাসি ট্যাক্সি এসে থামে। তর্করত পাঁচজন জুয়াড়ির কথা শোনা যায়। মফসসল থেকে বোধয়। শ্যালদায় নেবেই ট্যাক্সি ধরেছে। হয়তো ফিহপ্তা ট্রিপ মারে। মোটা লোকটার হাতে রেসের বই। রেসুড়েদের চেহারাটা তেলচোয়াড়ে হয় কেন কে জানে ! নিজেকে এদের সমগোত্রীয় ভেবে বিসদৃশ লাগল অরিন্দমের।

    প্রথম জুয়াড়ি: অ্যাপোলোনিয়ারের মা ব্রিটিশ। ডার্বি জিতেছিল, জানেন তো গোরাদা।

    দ্বিতীয় জুয়াড়ি: তোদের বাঞ্চোৎ মা-বাপের সদবংশে না হলে চলে না, না রে শশী ? জুয়া হল একটা জীবনদর্শন, বুজলি। জেতার ঘোড়ার শ্রেণিই আলাদা। এ তোর পার্টিবাজির শ্রেণি নয়, বুজলি। আমি শালা হেরো হতে চাই না। জিদবো, তবে ছাড়বো।

    তৃতীয় জুয়াড়ি : আসার সময়ে প্রতাপবাবু এই অ্যাপোলোনিয়ারের টিপস দিয়েছে সুখেনকে। গৌরাঙ্গ, অমরনাথ, কুমুদবাবু, বিরেন সিংহি সবাই একটা কতা বারবার করে বলে দিয়েচে। ঘোড়াটার আঁত্তা একেবারে ঝড় দিয়ে গড়া। সালা যেন জেলাধিপতি। মাথা বাঁয়ে কিন্তু দেকচে সামনেদিকে।

    চতুর্থ জুয়াড়ি : অমর প্রেম জকির সিক্স টু ওয়ান যাচ্চে, জানিস তো ব্রহ্মানন্দ।

    পঞ্চম জুয়াড়ি : সবাই আলাদা-আলাদা ঘোড়ায় লাগাই, সেইটেই ভালো, যারটা লাগে লাগবে। কে যে জিদবে বলা যায় না।

    লোকগুনো চলে গেলে, গাইডবই খুলে অরিন্দম বলল, হ্যাঁ, জকি অমর প্রেমের ঘোড়াটার নাম অ্যাপোলোনিয়ো। আরও সব জকি আছে। ব্রিজশা, কুমার, আলি, কামিল, প্রসাদ, রাবানি, যাদব, সুনীল সিং, খান, শ্রফ, প্যাটেল, রাজ্জাক, আলফ্রেড। তোমার কোন ঘোড়সওয়ার পছন্দ ?

    কে জেতে গো ? ঘুড়া, না ঘুড়ার পিঠে যে বসে ?

    জিতি আমরা, যারা খেলতে এসেছি।

    আমরাদের কুন ঘুড়া?

    তুমি তো বললে না। তুমি গাড়িতে বোসথাকো, আমি বুকির ঠেঙে টিকিট আনছি।

    না না না না। একলা-একলা থাকবো না।

    কাচ তুলে বাইরে থেকে বন্ধ করে দিচ্ছি, ভয়ের কী !

    রেসুড়েদের নমুনা দেখে কেটলিউলির এখানে আসা সম্পর্কে যে দ্বিধা জেগেছে তা উপভোগ করতে-করতে অরিন্দম প্রথম রেসের সবকটা ঘোড়ার টিকিট কাটে। ঘোড়েল বুকিক্লার্ক ওর দিকে অভিসন্ধির হাসি হাসে। প্রেমিকার সঙ্গে প্রথমবার ? নাকি হনিমুন লাক-ট্রাই ?

    ফিরে এসে, গাড়ি খুলে, বন্ধ করে, কেটলিউলির ঘর্মাক্ত হাত ধরে ও, অরিন্দম। বন্ধ গাড়িতে ঘেমেছে। দিনভর কেটলি বয়ে-বয়ে কড়া পড়ে গেছে হাতে। বলে, আমার হাত ছেড়ো না, ঠেলাঠেলিতে হারিয়ে যাবে। অরিন্দমের মনে হল, হাত ধরে না থাকলে কোনও মহাকরণবাসী বিরক্ত করতে পারে। ভাববে আস্পদ্দা তো কম নয়। স্রেফ হাত ধরে থেকেও তো শ্রেণিবদল ঘটানো যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময়ে চাপা স্বরে বলল ও, অরিন্দম, আমিও খেলিনি কখুনো, আজ প্রথমবার, প্রথম জুয়ায় সবাই জেতে।

    জুয়া ?

    জুয়াই তো।

    ভিড়ের মধয়ে ওর অফিসের প্রোটোকল আধিকারিক রাঘব সান্যালকে দেখতে পেল অরিন্দম। শুনল, ওর বউ রমাকে বলছে, অরিটা ঝি-চাকরানিদেরও ছাড়চে না আজগাল, শালা বিয়ে কল্লে না কেন আজ ওব্দি কে জানে। রমার কষ্টার্জিত মুখাবয়বে প্রত্যুত্তর ফোটে না। পাটনায় থাকতে, রাঘব যখন অফিসে কেয়ারটেকার আর অরিন্দম মামুলি কেরানি, টেলিফোন অপারেটর রমার জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেকটা এগিয়েছিল অভিসন্ধির অনুপযুক্ত অরিন্দম। জিতে-জিততে দান ছেড়ে দিয়েছিল, কেননা পাশের ফ্ল্যাটের অতসি বউঠানের মধ্যদুপুর বুকের সুরভিত স্নিগ্ধতা তখুন অফিস পালাতে উৎসাহিত করছে অনভিজ্ঞ অরিন্দমকে। সমাজের আজ্ঞায় অসফল প্রেমিকের গতিবিধি বেশ সন্দেহজনক।

    প্রথম খেলার ঘোষণা হয়। ভ্যানিলার গন্ধ হারিয়ে গেছে এখানকার নারীদের দামি আর বিদেশি সুগন্ধে। কেটলিউলি দৃশ্যত কুন্ঠিত। ঘোষিত হয় ঘোড়াগুনোর পরিচয়, জকিদের পরিচয়, ঘোড়া-মালিকের পরিচয়। জেতবার চাপা উত্তেজনা সবায়ের চোখে-মুখে।

    আমরাদের কুন ঘুড়া ?

    যে ঘোড়া ওড়ে কিন্তু ডানা নেই।

    পুলরুম থেকে এসে দাঁড়িয়েছে ঘোড়ারা। হালকানীল জিনস-পরা নাশপাতি-নিতম্ব একজন মহিলা ওদের সামনে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। কিলবিলে আনন্দে স্পন্দমান তার গেঞ্জিঢাকা বুক। পাকাচুল সঙ্গীর মুখে অনুমোদনের হাসি। রেসুড়ে ধনীদুহিতারা তাদের যৌবন ধরে রাখে বহুকাল। কেটলিউলির পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ভ্যানিলা। এতকালের সংস্পর্শে শরীরের গ্রন্হি থেকেই হয়তো নির্গত হয় ভ্যানিলা, ইচ্ছামতন।

    ভ্যানিলা কী করে হয় জানো। মাথা নাবিয়ে উড়ন্ত চূর্ণকুন্তলকে জিগেস করে অরিন্দম।

    কী করে ? অপলক জানতে চায় মেয়েটি।

    আলকাতরা থেকে।

    ইশ রে। তোমায় বলেছে।

    হ্যাঁ সত্যি। আলকাতরা থেকে পাওয়া যায় এথিল ভ্যানিলিন নামে একটা রস। স্টোক মেশিনে পরিষ্কার করে ভ্যানিলা হয়। সে ভ্যানিলা আমরা খাই।

    কেটলিউলির চোখে অবিশ্বাস আর শ্রদ্ধা।

    অরিন্দম শুনতে পায় চরাচর জুড়ে ধামসা, মাদল, ঝাঁঝ, শিঙা, চ্যাড়াপেটি, মদনভেরি, বাঁশি বাজছে। কলরোল তুলেছে হেঁতাল, গবান, গর্জন, গেঁওয়া, গোলপাতা, রাইন, পশুল, খলসি গাছের দল। ছাড়া পেয়েই ছুটতে আরম্ভ করেছে ঘোড়াগুনো, ছোটাচ্ছে ঘোড়সওয়ার, রঠিন টুপি, চকরা-বকরা পোশাক। দাঁড়িয়ে পড়েছে দর্শকরা, কয়েকজনের চোখে দূরবিন, নিজের ঘোড়াকে ইংরেজি ভাষায় উৎসাহিত করতে থাকে। বাতাসের ছোটো-ছোটো বাদামি টুকরোর ওপর লাগাম হাতে অর্ধেক উবু হয়ে বসে আছে ঘোড়সওয়ার। দর্শকরা নিজের গ্রীবাকে দীর্ঘ, দীর্ঘতর করছে, চ্যাঁচাচ্ছে। সবুজ ঘাসের ওপর ছুটছে ঘোড়াগুনো। হাওয়ার দুর্গপ্রাকার ডিঙোবে বলে ছুটছে। খুরের ডুগডুগি বাজিয়ে ছিৎরে দিচ্ছে আধভেজা ঘাস। ছুটছে গা ঘেঁষাঘেঁষি। রোদ্দুরের চিলতেকে এক মুহূর্তের জন্যেও বসতে দিচ্ছে না চামড়ায়। স্বমহিমায় উজ্জ্বল একের পর এক বাদামি ঢেউ উঠছে আর নাবছে। ঢেউগুনোর ওপর রঙিন পলকা ঘোড়সওয়ার। সাংগীতিক মূর্ছনায় খুরধ্বনির শব্দ দ্রুত থেকে দ্রুততর। ছুটছে ঘোড়াগুনো। ছুটছে ঘোড়াগুনো। ঝুরো ঝুরো হয়ে ভেঙে পড়ছে অদৃশ্য বাতাসের গমগমে প্রতিরোধ।

    ছুটছে ঘোড়াগুনো। অজস্র মানুষের দ্রুতশ্বাস চিৎকারের অনধিগম্য প্রতিধ্বনি চিরে কালোবরণ বিদ্যুৎ। পৃথিবীতে যেন অর্গল বলে কিছু নেই। ওরা ছুটছে। ভাসমান বেতারকণার সঙ্গে সংঘর্ষে দেদীপ্যমান সূর্যলোক চলকে পড়ছে ওদের ঝকমকে বেগবান পেশি থেকে। চারটে পায়ের কোনোটা মাটিতে পড়ার আগেই বাতাস ওদের টেনে নিচ্ছে সামনে। গ্রীবা প্রসারিত। ছুটছে রূপসীরা। রঙিন পালকে গড়া ওজনহীন ঘোড়সওয়ার, লাল-নীল, চৌখুপি জামা, হলুদ ডেনিম-টুপি, বাঁধভাঙা ঝরনার ধাক্কায় ছিটকে এগোচ্ছে, কালচে-বাদামি নদীতে রূপান্তরিত ঘোড়াগুনো বাঁক নিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে না ওদের দ্রুত ধাবমান পা। ছুটচে ঘোড়াগুনো। কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব……

    সবকটা ঘোড়া একাকার হয়ে বিশাল একটিমাত্র ঘোড়া হয়ে গেছে। উড়ে যেতে চাইছে আকাশে। বাদামি কুয়াশায় পালটে গেছে বিশাল ঘোড়াটার আদল। এদিকে আসার জন্য বাঁক নিচ্ছে উড়ন্ত নদীটা। স্পষ্ট কুচি-কুচি খুরধ্বনি। অমোঘ উদবেগের দিকে ধেয়ে আসছে। অজস্র পায়ের বিশাল ঘোড়াটা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে অনেক ঘোড়া হয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক স্পর্শের পেশল বিদ্যুৎ বাঁচিয়ে ছিটকে চলে আসছে ঘোড়াগুনো। সামনে ঝুঁকে রয়েছে দোমড়ানো-পিঠ লাল নীল সবুজ ঘোড়সওয়ার। ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ার একটিমাত্র ঝড়ের টুকরো। এগিয়ে আসছে। এগিয়ে আসছে।

    পুরুষ আর মহিলা জুয়াড়িদের উন্মত্ত বাহবায় দৌড়ে এগিয়ে আসছে একের পর আরেক ঘোড়া। যত জোরে চ্যাঁচাতে পারে উত্তেজিত অগুন্তি মানুষ-মানিষি, উৎসাহিত করছে বাজিধরা ঘোড়াকে। শেষতম ঘোড়া আর তার ঘোড়সওয়ারের নাম করেও লোকে চিৎকার করছে, বাকাপ, বাকাপ,বাকাআআআপ। অরবিটিনো, বাকাপ, শলিশ গোল্ড, বাকাপ, বাকাআআপ, লরেনজো, চাং ফা, অ্যাকোয়া মেরিন, কানসাই, স্যান্ড ডান্সার, বাকাপ, বাকাপ, মডেস্টি ব্লেজ, শিনজুকু, টিকোরিয়া, গোল্ড লাইট, বাকাপ, বাকাপ, বাকাপ, বাকাআআপ, অ্যাপোলোনিয়ো, জোরে, আরও জোরে, অ্যাপোলোনিও, অ্যাপোলোনিও…ও…ওওওও….

    চিৎকারের ঢেউ স্তিমিত হয়ে ফোঁপানি আর অট্টহাসিতে পালটে যেতে থাকে। হাততালি ক্ষীণবল। বিজয়ী ঘোড়ার নাম ঘোষিত হচ্ছে। অরিন্দম অ্যাপোলোনোয়োর টিকিটটা গোছা থেকে আলাদা করেছে। দ্বিতীয় সলিড গোল্ড। সেটাও আলাদা করে। জ্যাকপট ঘোষিত হয় আর প্রথমটিকিটটার নম্বর মিলিয়ে অরিন্দম স্তম্ভিত, তলপেট থেকে জলোচ্ছ্বাস উঠে কন্ঠরুদ্ধ করে।

    কুন ঘুড়া ? অরিন্দমের কবজি-খেমচানো তরুণী-আঙুল আলগা হয়।

    যেটা জিতল।

    সত্যি ?

    সত্যি।

    সত্যি বলছ ?

    সত্যি।

    বলো না, সত্যি কিনা। কেটলিউলির কন্ঠস্বরে কিশোরী।

    সত্যি। ড্যাবড্যাবে অবিশ্বাস আর উতলা বিশ্বাসে আক্রান্ত দ্বিধাগ্রস্ত মেয়েটির তাকলাগা ঘোরের দিকে তাকিয়ে অরিন্দমের আশ্বাস। কবজি ধরে থাকা আলগা আঙুলগুনো সজোড়ে আঁকড়ে ধরে আবার। মেয়েটির কোমরে হাতের বেড় দেবার আবেগ সামলাল অরিন্দম। এই মেয়েটা ওর থেকে বয়সে অনেক ছোটো। যত তাড়াতাড়ি হোক বিয়ে করে নিতে হবে। আজ হলে আজই। এর আগে অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে অথচ ব্যাখ্যাহীন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

    ছোটোভাই আর ওর বউটা বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে রেখেছে, কনে আর কনের বাবার নাম ফাঁকা রেখে। অরিন্দম জুয়াড়িদের ওই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মেয়েটির উদ্দেশে বলল, আজই আমরা বিয়ে করব।

    বাড়ি গিয়া বাবাকে খবর দিব আর জামাকাপড় গুছিয়ে নিবো।

    না-না। আর বাড়ি যাবার দরকার নেই। সোজা আমার বাড়ি যাব।

    সিনেমার মতন ?

    খুব সিনেমা দ্যাখো ? ম্যানকার সঙ্গে ?

    হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা।

    চলো, টাকাটা নিয়ে নিই। ভিড় হবে কাউন্টারে।

    দামি বেদেশি সুগন্ধ একেবারে মিইয়ে গেছে উত্তেজিত সুন্দরীদের দেহগ্রন্হির বিলোড়িত গন্ধে। পার্স থেকে ছোটো স্প্রে বের করে সুগন্ধের নবীকরণ করে নিচ্ছে কেউ-কেউ পরবর্তী ঘোড়দৌড়ের আগে। কাউন্টার থেকে টাকাগুনো সংগ্রহে সময় লাগে। নতুন নোটের প্যাকেটগুনোর রোদে প্রতিফলিত আলোয় উদ্ভাসিত ওদের মুখমন্ডল। এটাই ব্যাধি, এটাই ওষুধ। বিব্রত হলে হাসে মানুষ। আগাম আশঙ্কায় হাসে।

    নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেসকর্মী বকশিশ প্রার্থনা করলে, কয়েকটা নোট দিয়ে দিলে অরিন্দম, নিজের উপশমের জন্যে। অ্যাতো টাকা দিয়ে দিলে ? কথা না বলে বলল মেয়েটি। ক্ষতের কষ্টের মতন গোপন আনন্দ পায় আরিন্দম।

    গাড়ি স্টার্ট করে অরিন্দম বলল, এবার জুতো খুলে পা তুলে বোসো। কেটলিউলি তা-ই করে। আয়নিত বিকিরণ-মাখানো পায়ের তলা থেকে আভাসিত হচ্ছে ধানচারা রোয়ার হিমেল গরিমা। নিঃশঙ্কচিত্ত তকতকে গোড়ালি। প্রতিদিন, কেকের ময়দামাখার সময়ে, ভ্যানিলা-সুগন্ধের অভিনন্দন পায় এই পা জোড়া। আমলা, কেরানি, পিয়োনরা, হয়তো মন্ত্রীও, সেই অভিনন্দনের স্বাদ পায়। দিনের বেলাতেও নৈশভোজের আলো লেগে আছে আঙুলগুলোয়। শাড়ির ফলের সেলাই খুলে গেছে। ধুলো-ময়লার কালচে কিনার শুকোয়নি এখুনও।

    ল্যাজধরা মরা ইঁদুরের মতন দু আঙুলে প্লাস্টিকের কালো জুতো জোড়া তুলে গাড়ির বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল অরিন্দম। ওই পায়ের জন্যে এই জুতো নয়, অন্য জুতো কিনব চৌরঙ্গি থেকে। তরুণী অবাক হয় না। অধিকারে শিকড় অস্তিত্বের অতল ওব্দি চারিয়ে দিচ্ছে অরিন্দম। শিরশির করে ওঠে আর্জি। মুখের ওপর এসে পড়েছে সোমথ্থ দুপুরের হিমসিম রোদ।

    অ।। কেটলি।

    কে।। অ্যাঁ।

    অ।। এই নামে সাড়া দিতে তোমার ভাল্লাগে, তাই না ?

    কে।। আমার কাজই তো তাই। এই দ্যাখো, কড়া পড়ে গেছে হাতে।

    অ।। জানি। এখন আমরা পিয়ারলেস ইন-এ যাব।

    কে।। তুমিও পিয়ারলেস করো ?

    অ।। না-না। ওটা একটা হোটেল। সেখানে গিয়ে আমরা আমাদের বিয়ের আইবুড়ো-ভাত খাব। কলাপাতায়।

    কে।। আইবুড়া কেমুন ভাত গো ? সিদ্ধ না আতপ ?

    অ।। আইবুড়ো চালের নাম নয়। বিয়ের আগে আমার আর তোমার নাম।

    কে।। হি-হি…আমি আই আর তুমি বুড়া।

    অ।। আমরা খাব আতপচালের ভাত, শুক্তো, পটলের ঝালসাজ, হিঞ্চেশাকের বড়া, ভাজামুগের ডাল, রুই মাছের কালিয়া, দইতে রাঁধা মুরগি, পাঁপড়া, শশা-আঙুরের চাটনি, মিষ্টি দই, ছানার পায়েস, কালাকাঁদ। হাতপাখার বাতাস। চাবিবাঁধা আঁচল কাঁধে ফেলে পানের খিলি এগিয়ে দেবে হোটেলের ওয়েটার বউদি। কেমন ?

    কে।। অত খাবার ? সব একই দিনে খেয়ে নিবো কেন ? আমরাদের জন্য রেখে দিবো। আজ ডাল খাবো, কাল শোক্তো খাবো, পরশু মাছ খাবো, তাপপরদিন মাংস খাবো। ছানার পায়েস কেমুন হয়গো ? বড়ো খিদা পেয়েছে আমার। নিমবেগুন হয় না ? নিমবেগুন খাওয়া ভালো। আমি সঅঅঅঅব শাগ ভাজতে জানি। কলমি, কুলাখাড়া, সেপুন্না, নিসিন্দা, পুঁই, নটে, কুমড়া, বাথুয়া, লাউ সব সব সব সব পারি।

    অ।। মাংস ?

    কে।। জানি। কলকাতায় পাখির মাংস নাই। ময়ূরের মাংস নাই। বয়লার আর বয়লার। তারচে বাবা ডালভাত ভালো।

    মেয়েটার শরীর জুড়ে প্রাচীন নিষাদকুলের নাচ লুকিয়ে আছে যেন, মনে হচ্ছিল অরিন্দমের। এর চাউনি রৌদ্রোজ্জ্বল। চিরপ্রদোষ-মাখা শ্যামলিনী। অত্যন্ত সাদামাঠা। কালো মেয়েদের সুশ্রী বলতে যা বোঝায়, এর তেমন কিছুই নেই। এর প্রাণশক্তির জোরের বখরাটুকু আজীবন চায়, আজীবন চায় অরিন্দম। হঠা্ৎ-ই, এই ভেবে যে মেয়েটা নাবালিকা নয়তো, ধ্বক করে ওঠে হৃৎপিন্ড। সব চুরমার হয়ে যেতে পারে তাহলে।

    তুমি এবার ভোট দিয়েছিলে ? কেটলিউলির অন্তস্হালের দখল নিতে জিগেস করে অরিন্দম।

    হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা। এবার আবার একটা সাদা আর একটা গোলাপি দুটা-দুটা ভোট ছিল। ঞ্যানকা বলছিল লোকগুলার মাথা খারাপ। অন্যবার তো একটাই কাগজ হয়। আমি বলেছি, এবার আমি ভোট দিলুম কিনা, তাই আমার জন্য দুটা-দুটা। হি-হি।

    কেন্দ্র সরকারের নির্বাচন, রাজ্যসরকারের নির্বাচন, এসমস্ত আলোচনা অবান্তর। সাদা আর গোলাপি কাগজ থেকে পাওয়া রাজনীতিহীন আহ্লাদটুকুই যথেষ্ট। মেয়েটির দুচোখে ধানখেতের সবুজ অতিশয়োক্তি অরিন্দমকে আশ্বস্ত করে। হৃৎপিণ্ডে, বর্ষারাতের ঝিলমিলে মেরুণ অন্ধকার, কানে আসে আনন্দের অঙ্কুরোদ্গমের রিনরিন।

    আরেকটা জিনিস রাঁধতে জানি। বলব ? কাসুন্দির সুন্দি ছাড়া, পাঁঠার পা, লবঙ্গর বঙ্গ ছাড়া, কিনে আনগে তা। বলো তো কী ?

    মহোল্লাস ছেঁকে ধরে অরিন্দমকে কাঁটা দ্যায় গায়ে। বলবার ছিল কাঁঠাল, বলল এঁচোড়।

    হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা। হ্যাঁ শব্দের রণন হতে থাকে অরিন্দমের মস্তিষ্কে। বলবার মতন ধাঁধা বা ছড়া মনে করার চেষ্টা করে। মাথায় আসে না। বোধহয় জানেই না আদপে কোনও।

    হসপিটাল রোড থেকে ক্যাসুরিনা অ্যাভেনিউতে গাড়ি বাঁক নিলে কেটলিউলি সজোরে বলে ওঠে, আবার ওই রাস্তায়, ইদিকে কাকুদা বলছিল তুমি ভালোলোক। আর মটোর থামাবে না কিন্তু। মেয়েটির মুখাবয়াবে শঙ্কা।

    পথের দুধারে গাচের ফাঁকে-ফাঁকে রোদ্দুরের সবুজ ঠাঠা। ব্রিটিশ আমল থেকে নিজের গায়ে রোদ বসতে দিচ্ছে না ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কিন্তু স্বাধীনতারপর সরকারি বাসের ভেজাল-দেয়া পোড়া ডিজেলের ভাসমান গুঁড়োর দাঁত জোরজবরদস্তি বসে যাচ্ছে ওর মার্বেলে। কলকাতার এই ডিজেলগুঁড়োর আতঙ্ক ছাদে আলসেতে বারান্দায় বড়ি শুকোবার রেওয়াজ উঠে গেছে। তুলি জোয়ারদার শনিবার অফিস ছুটির মধ্যাহ্ণে অরিন্দমের সঙ্গে এখানে এসে এখানের ঘাসে বসে থাকতে ভালোবাসত। এই মেয়েটি,কেটলিউলি সম্পর্কে আরও জানতে ইচ্ছে করে অরিন্দমের।

    প্রশ্ন।। অত দূর থেকে রোজ কেমন করে যাও ?

    উত্তর।। কুথায় ? আমার আপিসে ?

    প্রশ্ন।। হ্যাঁ, কী ভাবে মহাকরণে পৌঁছোও ?

    উত্তর।। বাইপাস গিয়া এসপালানেড যাই। তাপপর ওইটুকু হাঁটা দেই। আর ডালাউসির বাস পেলে তাতে যাই। বড়ো আঁইশটানি গন্ধ ওই ঠিন, আমরাদের পাড়ায়।

    প্রশ্ন।। সারাদিন বড়ো বেশি কাজ, না ? দুতলা-তিনতলা ?

    উত্তর।। লোকগুলা বড়ো আগলটাপড়া।

    মেয়েটার কথাগুনো চিনচিন করে।

    অন্যান্য বছর চৈত্রাকাশে রাগ পুষে রাখে সূর্য। এবছর রোদ্দুরের হাবভাব নিরুত্তাপ। জহোর্লাল নেহেরু রোডে লাল রঙের শতছিন্ন বাস ধুঁকছে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে। হয়তো জহোর্লালের প্রথম কি দ্বিতীয় পাঁচসালা ফেবিয়ানি আমলে হাসিমুখে চশমা পরে কিনেছিলেন বিধান রায়। দুপুরের রাজপথে বাতাসের বুকে থেকে-থেকে হাঁপানির টান। ফুটপাতের কিনারে কয়েকটা দেশোয়ালি দাঁড়কাক, দেশোয়ালি পথ-হোটেলের ফেলে-দায়া হলদেটে ভাত খুটছে তিড়িক-তিড়িক। এ-অঞ্চলে, চৌরঙ্গিতে, জীবনের অবলম্বন বলতে বোঝায় জীবিকা। কেজো চোয়ালের হন্তদন্ত যুবকেরা বেতনভূক ভিড়ের স্বাধীনতা-উত্তর আলস্যকে বাঁ-হাতে একপাশে ঠেলে-ঠেলে এগোচ্ছে।

    পার্কিঙের জায়গা খুঁজছিল অরিন্দম। শাড়ি আর একজোড়া জুতো কিনতে হবে। বাটা, উডল্যান্ডস, মেসকো রয়েছে ওফুটে। দামি জুতো কেনা দরকার। জুতো দেখে লোকে চরিত্র নির্ণয় করে। গোড়তোলা ডার্কট্যান ব্যালেরিনা ? স্ট্র্যাপ-দেয়া গ্রিক স্যানডাল ? শাড়ি কোনটা ? তাঁতের। হালকা নীল বা ফিকে বেগুনি জমি। বেগমবাহার বা কটকি হলে কেমন মানাবে। সিল্ক বোধয় এই গরুমে অচল। নয়তো কাতান বা তাঞ্চোই। নাঃ, সুতির ফিকে সবুজ ভয়েল কেমন ? দোকানের কাউন্টারে যে মেয়েগুলো থাকে, তারাই বলতে পারবে, কেননা ম্যাচিং ব্লাউজ, শায়া চাই ; ওরাই সাহায্য করবে নিশ্চই।

    পাপহীনতার আঁচে-মোড়া মেয়েটির বাঁ পায়ের তলায় একটা তিল জনরে পড়ে। অরিন্দমের আছে ডানপায়ে। বার্ধক্যে বেড়াতে যাবে অনেক জায়গায়। চতুর্দিক জুড়ে নিঃশব্দ রাগসঙ্গীত লাউডগার সবুজ ঘুঙুরালি শুঁড়ের মতন গজিয়ে উঠতে থাকে অরিন্দমের চারিপাশে। সিন্ধু ভৈরবী, আহিরললিত, গান্ধারি-টোড়ি, শুক্লবিলাওল, মধুমাধবী সারং, বারোয়াঁ, পলাশকাফি, তিলকশ্যাম, পটকঞ্জরি, চাঁদনিকেদার, শিবরঞ্জনী, হংসকিংকিনি, জয়ন্তীমল্লার, দুর্গাবাহার, মধুমাধবী। ভালোলাগার এই মনস্হিতির বর্ণনা নেই।

    ওই দ্যাখো। তেলেঙ্গি, না ?

    মোটাসোটা বউ আর ব্লাউজ-শায়া পরা মেয়ের সঙ্গে, বোধয় কেরালার, সাদা লুঙ্গি শার্ট-পরা লোকটা হকারের সাথে দরদস্তুরে ব্যস্ত। তেলেগু নয়, বলল অরিন্দম। এখন তো অন্ধ্রের উগাদি উৎসব হয়। হতেও পারে। চৈত্রমাসেই তো হয় উগাদি। অন্ধ্রের একজন মুসুলমান অফিসার কাজ করত পাটনায় আমার সঙ্গে। ওর মা আর দিদি ঘাগরা আর ফতুয়া-ব্লাউজ পরত বলে, লজ্জা পেত ওর বাড়ি গেলে। সজনেপাতা দিয়ে মাংস রাঁধত।

    আমিও সজিনাপাতা রাঁধতে পারি। তোমার ডিপাটে তেলেঙ্গি আছে ? কুন আপিস ?

    ওই যে, তোমার অফিসের পাশে, এসকালেটার আছে।

    কাটা ট্যাকার ব্যবসা ?

    হ্যাঁ, নোটের আর পয়সার ব্যবসা আমাদের। নোট ছাপি, করকরে নোট বাজারে ছাড়ি, নোংরা পচা নোট গুঁড়ো করে কাগজ বানাই। পাঁচ কিলো দশ কিলো ওজন করে ব্যাগভর্তি পয়সা বেচি।

    ইশরে। অনেকঅনেক পাওনা পাও। আমার আপিসে লরির কাগজ বের করতে পাওনা লাগে, বাইরের লোকজন অগুন্তি আসে সারাদিন, কাগজ বের করার জন্য বোসথাকে, দাঁড়িয়ে থাকে একঠায়, গেলাস গেলাস চা খায়।

    জানে অরিন্দম। পায়ে-মাখা ময়দার কেক খায়। বহুদূর শহর-গঞ্জ থেকে এসে খেয়ে যায় চরণামৃত। কিছুদিন আগে বেশ হইচই হয়েছিল দশ কোটি টাকার ব্যাংক ড্রাফ্ট আর এক কোটি টাকার পোস্টাল অর্ডার ওই বিভাগের আলমারিতে গুঁজড়ে রাখা ছিল বলে। সরকারি তহবিলে জমা করার জন্যে পাঙানো হয়নি। বচরের পর বছর পড়ে-পড়ে খড়খড়ে, রং-ওঠা, দোমড়ানো, ওগুনোর কথা মনে ছিল না কারুর, আশ্চর্য। কাজই করতে চায় না কেউ। অলস শুক্রকীটের ফসল বলে কিছু হয় কি ? ওই নির্মম হৃদয়হীন পরিবেশে মেয়েটা কাপ আর কেটলি ঝুলিয়ে কতবার এঘর-ওঘর পাক খায় কে জানে !

    অরিন্দম দেখতে পেল, ওফুটের কিনারে, বাটার দোকানের সামনে কেরালার নাম্বারপ্লেট লাগানো হলুদ মারুতি জেন গাড়িকে টো করে থানায় নিয়ে যাবার জন্যে পুলিশের লালরঙা রেকারট্রাক থেকে কয়েকজন নাবল। গাড়িটার তলায় ঢুকল একজন। গিয়ারকে নিউট্রাল করে ক্রেনে ঝোলাবে।

    ওরেব্বাপ। এখানে পার্ক করলে ওই গাড়িটার দশা হবে। আগেই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে অরিন্দমের। সেটুকুই যথেষ্ট। প্রথম পনেরো মিনিটে বভাটারি আর ওয়াইপার লোপাট। তারপর এক-এক করে স্টেপনি, কার্বুরেটার, রেডিয়েটার, ফিউজ বক্স, স্টিয়ারিং বক্স, প্রপেলার শ্যাফ্ট আর তার কদিন পরে তো মেশিনটাই হাপিস। ব্যাস। শ্যাশিটাকে ঠ্যালায় চাপিয়ে বাড়ি ফেরত নিয়ে যাও। আদিত্য তো বলেই দিয়েছে, এসব ব্যাপারে ও নাচার।

    রেকার-লরির পেছনে নিজের প্রিয় গাড়ির উর্ধ্বমুখী দুরবস্হা দেখে কেরালীয় লোকটা, ওর থপথপে বউ আর শায়া-ব্লাউজ পরা ঢ্যাঙা মেয়ে, তিনজনই দুহাত ওপরে তুলে চ্যাঁচাতে-চ্যাঁচাতে দৌড় লাগায় ধাবমান রেকারের দিকে।

    কেটলিউলির কি হাসি কি হাসি। মেয়েটির দিকে নয়, অরিন্দম তাকিয়ে থাকে ওর হাসির দিকে। অপার্থিব, অপার্থিব,অপার্থিব। দ্রুতগামী যানের মাঝে পড়ে রাস্তা পেরোতে পারছে না মালায়ালি পরিবারটা, আর তা দেখে হাসছে তো হাসছেই মেয়েটা। বিদ্যুৎবাহী হাসির অদৃশ্য প্রজাপতিরা উড়ছে গাড়ির মধ্যে। অরিন্দমের মাথা থেকে পায়ের আঙুল ওব্দি বইতে থাকে মহাজাগতিক রশ্মিতরঙ্গ।

    রাস্তা পেরোতে থাকা পরিবারটিকে বাঁচিয়ে, পাশ কাটিয়ে বেরোতে গিয়ে, দ্রুতবেগে ছুটে-আসা আলুর বস্তা বোঝাই হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালার মিনি ট্রাক সজোরে ধাক্কা মারল অরিন্দমের গাড়ির পেছনে। প্রচণ্ড অট্টহাস্য করে ওঠে ধাতব সংঘর্ষ। আলুর চটের বস্তা ছিঁড়ে রাস্তাময় গড়ায় এলা-মাটি মাখা আলু। আরম্ভ হয় জনগণের আলু কুড়োবার উৎসব। হকার-ভিকিরি-কেরানি-দোকানি-গৃহবধু-দারোয়ান-পকেটমার-ট্যাক্সিচালক সবাই মেতে ওঠে আধ-পচা আলু সংগ্রহে।

    তীব্র ধাক্কা খেয়ে অরিন্দমের গাড়ি ওদের দুজনকে সুদ্দু কিছুটা ছুটে গিয়ে রাস্তায় পড়ে-থাকা পাথরে তুলে দিয়েছে বাঁ দিকের চাকা, আর তারপরেই কাৎ হয়ে উলটে গেল। আকাশের দিকে চারটে ঘুরন্ত চাকা। গুবরে পোকার মতন দুবার পাক খেয়ে আগুন ধরে গেল গাড়িটায়। সশব্দে বিদীর্ণ হয় ডিজেল ট্যাঙ্ক আর গাড়িটা আগাপাশতলা ঢাকা পড়ে যায় তরল দগদগে আগুনে। আগুনের টোপর পরে ওলটানো গাড়ির ওপর নাচতে থাকে শিখা।

    ১৬

    ব্রিটিশ কাউনসিল থেকে হেঁটেই ফিরছিল যিশু। সেকসপিয়ার সরণি থেকে ক্যামাক স্ট্রিট ধরে মনে পড়ল তাকা তুলতে হবে। পরশু বৈশাখী পূর্ণিমা, জেনে রেখেছে। কাল সকালে বেরিয়ে পড়বে। ক্যাশ টাকা দরকার। পার্স খুলে ইন্দুসিন্ধ ব্যাক আর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এটিএম কার্ড দেখে আশ্বস্ত হল।

    ক্যামাক স্ট্রিট ভিড়াক্কার। রাস্তার দুপাশে পুলিশের জিপ। লরি, খাকি, লাঠি, রেব্যান, খইনি, এলাহি। আদিত্যকে দেখতে পেল। আদিত্য যিশুকে আসতে দেখে, যিশুর সেরকমই মনে হল, রে ব্যান চশমা পরে নিল। হাতে বেটন। বুকে নামের তকমা। গটগটীয়ে রোয়াব। প্রোমোশান পেয়ে গেল নাকি, ওপরঅলাদের মোটা টাকা খাইয়ে। ওঃ, তুই তো একদম উত্তমকুমারের পাইরেটেদ ভার্সান হয়ে গেলি রে।

    আদিত্যর মনে হল, আরেকটু হলেই ওর মুখাবয়াবে ধরা পড়ে যেত অরিন্দমদার বীভৎস মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর। সামলে নিয়েছে। যিশুদার কথা বলার ঢঙ থেকে পরিষ্কার যে অরিন্দমদার দুর্ঘটনার খবর জানে না। ভালোই। গাড়িতে সম্পূর্ণ দগ্ধ নারীর লাশ পাওয়া গেছে ল পোড়া নোটের তাড়া। অরিন্দমদার বাড়িতে কেউ বলতে পারেনি, কার লাশ, মেয়েটি কে ! শনাক্ত করা অসম্ভব, এমন পুড়েছে। কত লাশ যে এভাবে পুলিশের জিম্মায় এসে নামহীন পড়ে থাকে ; তারপর একদিন নামহীন ধোঁয়া হয়ে উবে যায়। যিসুদার কাছে চেপে যাওয়াই ভালো। নইলে কী মনে করবে অরিন্দমদা সম্পর্কে। কমবয়সী যুবতী, হয়তো, গুচ্ছের টাকা, গল্পের খেই আপাতত নেই। আর খেই না থাকলেই গল্প খুঁজতে থাকবে অন্ধকার চোরা রাস্তাগুলো। কত দেখলো তো পুলিশে ঢুকে। তুলি জোয়ারদার নয়, অন্য কেউ ছিল।

    যিশু বলল, কীরে, এখানেও তোলা তুলছিস ? এটা তো সম্ভ্রান্ত অফিসপাড়া। তোদের সত্যি, বলিহারি। তোদের সেই লিয়াকত আলি না কি নাম যেন, তিনটে গাড়ি খাটায় বেনামে, কর্ম বিনিয়োগ কেন্দ্রের কার্ড জাল করে হাওড়া আর ডায়মন্ড হারবারে চেলেছোকরাদের চাকরির লোভ দেখিয়ে লাখ-লাখ কামিয়েছিল, সে ধরা পড়েছে ? না কি লুকিয়ে রেখেছিস তোদের পুলিশ কলোনির কোয়ার্টারে ? সে তো আবার ওসি। তোর চে উঁচুতে।

    আদিত্য বলল, আঙুল করা স্বভাব আপনার গেল না।

    যিশু বলল, তা এখানে কী ?

    আদিত্য বলল, আর-রে আর বলবেন না। বাঙালিগুনো তলে-তলে কলকাতাকে দিয়ে দিচ্ছে। এক-একখানা ভাম বসে আছে অ্যাসেসমেন্ট বিভাগে।

    যিশু বলল, যা বলেছিস। ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের ওপর পুরোবাবুদের খুব রাগ। ওরা কলকাতা ঐতিহ্যকে টিকতেই দেবে না। দেখছিস না, টাউনহলের বাগানে বেঢপ বাড়ি তুলেছে।

    আদিত্য বলল, এসব হল বাঙালদের কুকিত্তি।

    যিশু বলল, বাঙাল, মুসুলমান আর ব্রাহ্মণদের ওপর তোর দেখি যখন-তখন গোঁসা। তা পুরসভার বাবুরা ক্যামাক স্ট্রিটটাই বেচে দিয়েছে নাকি ? বলা যায় না ; ভাঙা টেবিল-চেয়ার জুড়ে যা সব মাল বসে আছে ওদের অফিসটায়। আদিত্য বলল, ওই মার্কেটটা সিল করে দেয়া হচ্ছে, ওই যে, ওইটা। বেআইনিভাবে একটা আংশ বাড়িয়েছিল, শালা ধসে পড়েছে। ভাগ্যি যে কেউ ট্যাঁসেনি। ভেতরে-ভেতরে একটা মেজানাইন ফ্লোর খাড়া করে ফেলেছিল, বুঝলেন। এ যেন পারমাণবিক অস্ত্র। কেউ টেরটি পায়নি। নকশা অনুমোদন হয়েছিল বসতবাড়ির, আর ওনাদের বিল্ডিং বিভাগের গ্যাঁড়াকলে রূপ পালটে হয়ে গেল মার্কেট। পার্কিঙের জায়গাতেও দোকানঘর। হ্যাহ হ্যাহ।

    যিশু বলল, একেবারে সুপার কেলো দেখছি। তা ওটা দেখছি ভাঙা হচ্ছে আলপিন দিয়ে, আর বাঙালি হকার তোলার বেলায় পেলোডার বুলডোজার। তা বেশ, তা বেশ।

    আদিত্য বলল, কেলো বলে কেলো ! আলিপুর রোডে একটা বহুতল বাড়ির একতলা দোতলা আর বেসমেন্ট নেই।

    যিশু বলল, বলিস কী রে। দাঁড়িয়ে আছে কী করে ? কেতাবি তত্ত্বের ওপর ?

    আদিত্য বলল, ম্যাজিক, ম্যাজিক, কমরেডদের ম্যাজিক। অ্যাসেসর কালেক্টর আর ইন্সপেক্টর ষড় করে নথি থেকে তিনটে ফ্লোর বেমালুম গায়েব করে দিয়েছে। পার্টির লোক, কারোর মুরোদ নেই মুখ খোলে। আপনি আর কী লুইফিলিপে আর পিয়ের কার্ডিন পরেন। অ্যাসেসমেন্ট ইন্সপেক্টারটাকে দেখলে ভিরমি খাবেন। সুট, সাফারি, সেলুলার, আই পড, বেনসন হেজেস। হিংসে হয়। রিঅ্যালি। কাসপারভের ডবল আই কিউ লোকটার। ভ্যালুয়েশানের আগেই মিউটেশান ফি জমা নিয়ে নিয়েছিল। ওফ শালা কী চিজ একখানা, যেন স্তালিনের বিচি থেকে একেবারে যুবক হয়ে বেরিয়েছে। ইন্সপেকশান বুক লেখা হবার আগেই হিয়ারিং নোটিসখানা পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেগুনো আর ফ্ল্যাট মালিকদের না পাঠিয়ে, পাঠিয়ে দিয়েছে বিল্ডারকে। বিল্ডিংটা দেখেছেন ? কী নেই ! পার্কিং লট, মার্কেট, এসকালেটর, হেল্থ ক্লাব, বিলিয়ার্ড রুম, রকেট লিফ্ট, পেল্লাই কম্যুনিটি হল, ছাতে খেলার মাঠ, আরেক ছাতে বাগান, কত কী ! সোনার লিকুইড দুইছে পার্টির পাকাচুল-দাদারা। ইন্সপেক্টরটা বদ্দি বামুন, বরিশালের ফেকলু, শালা তিলে খচ্চর। খাল কেটে মারোয়াড়ি কুমির ঢোকাচ্ছে। দেবে একদিন দাদাদের পোঁদে কামড়, তখন টেরটি পাবে মজা।

    যিশু বলল, আস্তে বল, আস্তে বল, শুনতে পেলে অবরোধ করিয়ে দেবে। তুই অবশ্য কম যাস না। লাইন তো ধরেই ফেলেছিস। শাসকবর্গের বশংবদ রোগপোকা।

    আদিত্য বলল, কীইইই যে বলেন।

    যিশু বলল, মেড়োগুনো এককাপড়ে এসে কোটিপতি হয়ে গেল। সেন্ট্রাল ক্যালকাটা, আলিপুর, সল্টলেক সব দখল করে নিয়েচে। আর শ্যালদায় একপাল লোক নাকে কাঁদচে, দেঁশ ভাঁগ চাঁইনি বলে। লাথি খেয়েও বাংলাদেশে ভিটে দেখতে যায়।

    আদিত্য বলল, ম্যানহোলের লোহার ঢাকনি চুরির ব্যাবসা করছে।

    যিশু বলল, তোরই তো মাসতুতো ভাই সব। দামি-দামি ট্যাংরা পারসে ইলিশ খাওয়া সর্বহারা।

    আদিত্য বলল, আমরা তো নস্যি। খুচরোর জন্যে পুলিশের লোকে প্যান্টের পকেটে চামড়ার লাইনিং লাগায়। সত্যি। জোক করছি না।

    যিশু বলল, যার যেমন মূল্যবোধ। কারুর খুচরো, কারুর করকরে। আমার ফ্ল্যাটটা মিউটেশানের সময়ে, এখুনও পরিষ্কার মনে আছে আমার, অ্যাসেসমেন্ট ইন্সপেক্টারটা বাবার কাছে অশৌচের শোকপোশাকে এসে হাজির। একটু আগেই বোধয় বাপকে পুড়িয়ে এসছে শ্মশানে। ভুঁসকো ভুঁড়িতে মোটা পৈতে ঝুলিয়ে, বুঝলি, পায়ে রবারের জুতো, হাতে ন্যাকড়াসন, এসেছে ঘুষ খেতে। আবার দাঁত বের করে হাসছিল, খ্যাক-খ্যাক খ্যাক-খ্যাক।

    আদিত্য বলল, আজগাল লোকে নিজের বাপকেও খুন করে দিচ্ছে বাপের চাগরিটা পাবার জন্যে, দেখছেন।

    যিশু বলল, সেটা বাঙালির চাকরি ওরিয়েন্টেশানের জন্যে। বাঙালির শালা জীবিকা মানেই চাকরি। কাজ দাও, মানেই চাকরি দাও। চাকরি ছাড়া আর ভাবতেই পারে না কিছু। বাপকে খুনের রিস্ক নেবে, কিন্তু নিজে কিছু করার রিস্ক নেবে না। বাঙালিরা এতো আড্ডা দ্যায় কেন বল তো ? আড্ডাটা হল মায়ের কোল। চাকরিটাও মায়ের কোল। মায়ের কোলের আরাম চাই বাঁধা টাকার মাই খেয়ে। অন্য সব কাজকম্ম তো চলে যাচ্ছে অবাঙালিদের কবজা্য়। ওই তো, দ্যাখ, ট্যাক্সি ড্রাইভারগুনো সবকতঅ বিহারি, নয় ইউ পি সাইডার। ট্যাক্সি আর বাসের মালিকগুনো পাঞ্জাবি। ধোপা, ছুতোর, নাপতে, মুচি, কামার, বাড়ি বানাবার মিসতিরি, পুরোসভার ডোম, বড়োবাজারের মুটে, তুই দেখগি যা, হয় বিহারি, নয় ইউ পি সাইডার। হাওড়া-শ্যালদা স্টেশানের, ব্যাংকশাল আর শ্যালদা কোর্টের, রোড ট্রান্সপোর্ট অফিসের, সব দালালগুনো, সবকটা ক্রিমিনাল, তুই তো ভালো জানবি, সব ওদিকের। কলের জলের কাজ করছে উড়েরা। বাঙালিদের ব্যাবসার কথা তো ছেড়েই দে। কেউ দাঁড়াতে চেষ্টা করলেই দাদারা লাল ডাণ্ডা ঢোকাবে। বড়োবাজার থেকে ডাণ্ডার ফাইনানসিং হয়।

    আদিত্য বলল, এতেও গবেষণা করছেন নাকি ? কিচ্ছু ছাড়বেন না দেখচি।

    যিশু বলল, আরও বলছি, শোন তাহলে। আমাদের বিলডিঙের লিফ্টটা রিনিউ হচ্ছে না দুবছর ধরে। ওদের অফিসে গিয়ে পাওয়াই যায় না কাউকে। একই বাড়ির জন্যে পুরসভাকে ট্যাক্স দাও, অট্টালিকা কর দাও, আবার বহুতল কর দাও। অথচ কোনও অফিসে পাবি না বাবুদের কাউকে। কোনও না কোনও রকম মায়ের কোলে ঢুকে বসে আছে। পঞ্চাশ বছরে স্বাধীনতা আমাদের খাঁটি জোচ্চোর করে দিয়েছে। পশ্চিমবাংলার বাঙালির বাকতালা আসলে মাইখাবার আরেকরকম ফর্ম।

    আদিত্য বলল, তা এখন কোথায় চললেন ? বাড়ি ?

    যিশু বলল, যাচ্ছি কাঁচা আম কিনতে। বিয়ারে দুচার টুকরো ফেলে খাবো। আমার অ্যাসিট্যান্টটা গ্রামে গেছে, এখনও ফেরেনি। চিন্তায় ফেললে। তুই জানিস তো ? ভাঙাপাড়া ?

    আদিত্য বলল, আপনি বিদেশে কোন একটা কাজে যাবেন বলছিলেন, তার কী হল ?

    যিশু বলল, হ্যাঁ, সিয়েরা লিয়োন। নিত্যিদিন শালা সরকার পালটায়। পয়সা-কড়ি পাওনা আছে অনেক।

    আদিত্য বলল, ওব-বাবা, আফরিকা ! আর জায়গা পেলেন না ? আফরিকায় যা কনডোমের সাইজ ! ইনডিয়ানরা গিয়ে পায়ে মোজা করে পরে শুনেছি। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।

    যিশু বলল, তোর তো ওই একটাই চিন্তা। না, একটা বলি কী করে। দুটো, রূপ আর রুপিয়া।

    আদিত্য বলল, আরে আপনার তুলনায় আমি তো এখনও কচি। তা আপনি সেটল হচ্ছেন না কেন। ইন্সট্রুমেন্টটা লিগালাইজ করুন এবার।

    যিশু বলল, একবার কোনও রববার সেইন্ট পলস ক্যাথিড্রালে গেলে টের পাবি। যত দিন যাচ্ছে তত অবাঙালি আর কুচ্ছিত হয়ে যাচ্ছে বাঙালি খ্রিস্টানরা। কবর দেবার জায়গার অভাব তো মা-বাবার ফিউনারালের সময়ে দেখেছিলি। আমি হলুম গে বাঙালির রেনেসঁসের রেলিকস। বিশুদ্ধ বাঙালি খ্রিস্টান আর নেই। আমিই শেষ প্রতিভূ। মাইকেল মধুসূদনের নাতি-নাতনিরা শুনেছি অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। অন্তত কুচ্ছিত হওয়া থেকে তো বেঁচেছে।

    আদিত্য বলল, আপনার সেই কেটলিউলির কী হল ? তিলজলার কেটলি কুইন ? সে তো আছে।

    যিশু বলল, ধুৎ কীইইই যে বলিস বোকার মতন। অরিন্দমকে নিয়ে গিসলুম তো কেটলির বাসায়। গাড়িটারি নিয়ে অ্যাগবারে তৈরি হয়েই গিসলো ; মেয়েটাকে সেদিনকেই বিয়ে করবে বলে। প্রেম ছাড়া তো ও সাফোকেটেড ফিল করে। করে ফেলেছে বোধয়, বিয়ে, দেখগি যা।

    আদিত্য স্তম্ভিত। দ্রুত ছুটে গিয়ে মোটর সাইকেলে বসে। কিকস্টার্ট করে। নীলাভ ধোঁয়া তুলে মিডলটন স্ট্রিটে ঢুকে যায় মোটর সাইকেল।

    আদিত্যর ব্যাখ্যাহীন আচরণে যিশু অবাক। কাজ ফেলে ছুটল নাকি অরিন্দমের বউ দেখতে ! কিংবা কেটলির পরিবারের ফ্যাঁকড়া খুঁজতে পুলিশি ফলাতে ছুটল ?

    হাসপাতালে পরিচয়ের পর কেটলি আর ওর বন্ধু মেনকার বাড়ি তিলজলা-তপসিয়ায় বারকয়েক গেছে যিশু। প্রশংসনীয় ওদের স্বনির্ভর হবার উদ্যম। কেটলির সৎ ভাইটা মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টারে ঢুকেছিল। ওদিকে কোথায় বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার জঙ্গলে মরেছে পুলিশের গুলিতে। ওর বাপ বারকয়েক বিয়ে করেছে ছেড়েছে। গ্রাম ছেড়ে এসে ওরা সরকারি গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের রান্নাঘরে ঠিকেমজুর ছিল। তারপর ট্যাংরায় পাঁউরুটি কারখানায়। এখন দিনে একশোটা কেক বানাচ্ছে নিজেই। বিক্রিবাটাও মন্দ নয়।

    ছেলেটা মাওবাদী হবার আগেই, বহু আগে, কলকাতায় চলে এসেছিল। গত নির্বাচনে মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার কিছু এলাকায় ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছিল। পাতলা গোবর দিয়ে সাঁটা, হাতে লেখা পোস্টার পড়েছিল গাছের গুঁড়িতে, চালাবাড়ির মেটে দেয়ালে, হোগলায়। আমলাশোল, শিয়াড়বিনধা, চাকাডোবা, বাঁশপাহাড়ি, কেঁউদিশোল গ্রামে হ্যান্ডবিল বিলি হয়েছিল। পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ব্লকের ধাদকা আর কুমড়া পঞ্চায়েতে, বাঁকুড়া জেলার রাইপুর ব্লকের ছেঁদাপাথর এলাকায় ওদের প্রভাব যে সিপিয়েম আর ঝাড়খন্ডদলের তুলনায় যথেষ্ট তা যিশু টের পেয়েছিল খাদিবোর্ডের প্রকল্পের অ্যাসাইনমেন্টে। ঘনশ্যাম সিং সর্দার, যে পরে বন্দুক-কার্তুজসুদ্দু ধরা পড়েছিল, সেই মাওবাদী নেতার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যিশুর।

    ওই এলাকার সংগঠক, মাওবাদীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ লোক, অতনু চক্রবর্তীর সঙ্গেও যিশুর আলাপ হয়েছিল গালুডিতে। তেড়ে সাঁওতালি, ভোজপুরি, হিন্দুস্হানি বলতে পারে। পাইকা-স্মল পাইকা গুলে খেয়েছে। চাকরি-বাকরি ছেড়ে-ছুড়ে ঢুকেছে এইসবে। সবাই আছে ওর খোঁজে ; বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ প্রশাসন, জোতদার, জঙ্গলের ইজারাদার, সবাই। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার গ্রামবাসীরা খবরাখবর দিয়ে যেমন ডাকাতদের বাঁচায়, ওইসব অঞ্চলের গ্রামবাসীরা বাঁচায় মাওবাদীদের। শত্রুপক্ষ-মিত্রপক্ষের তত্ত্বে ফারাক নেই। আছে কাজে।

    কুড়ি কিলোমিটার জুড়ে দুর্গম জংলি সবুজ। সাঁোতাল, মুন্ডা, ভুমিজ, খেড়ে, শবর, কৈবর্ত, তেঁতুলে বাগদির বাস। উঁচু জাতের বাঙালির ধাক্কায় শহরের প্রান্ত থেকে ঠেলে-ঠেলে পৌঁছে গেছে জঙ্গলে কিনারে, জঙ্গলে। এখন জঙ্গলের দেয়ালে পিঠ। কেন্দুপাতা, সাবাইঘাস, মহুয়াফুল, মহুয়াবীজ, শালবীজ, শালপাতা, কুসুম, নিম, বেল, কালমেঘ, কুড়চি, আমলকি, জ্বালানিকাঠ কুড়িয়ে আর বেচে যতটুকু চলে। ময়ূর মেরে টাউনে মাংস নিয়ে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায়। যা কিছু দেখতে ভালো, মেয়েমানুষ হলে তো কথাই নেই, তাকেই সাবড়ে ভুষ্টিনাশ করতে চায় শহরের মানুষ। জিনিসটার বা প্রাণীটার নয়, মানুষ আহ্লাদিত হয় ভুষ্টিনাশের স্বাদে। প্রতিটি সৌন্দর্যবস্তুর চর্বণপদ্ধতি আলাদা। চেবাবার, খাবার, গেলার, চাটার আওয়াজ আলাদা-আলাদা।

    বাঁশপাহাড়ি এলাকার নিতাই মুড়া আর ভরত মুড়ার নামডাক আজ পঁচিশ বছর। বলছিল, তৃণমূল কংরেস বল্যেন, সিপিয়েম বল্যেন, ঝাড়খন্ড বল্যেন, সঅঅব গর্মাগরম বইকবকম। ওই খাদি বোর্ডের প্রকল্পের কাজের সময়ে তো ঝিলিমিলির কাছে বারোঘাটির জঙ্গলে বন্দুক-পিস্তল ভাঁজার শিবির দেখেছিল যিশু। বোড়ো, উলফা, আল উমমা, আনন্দমার্গীদের চিন নানা অস্ত্রশস্ত্র দিলেও, মাওবাদি কমিউনিস্ট সেন্টারকে দেয় না, ব্যাপারটা বুঝে ওঠা মুশকিল ! অবাক লেগেছিল যিশুর যে অল্প সময়ের মধ্যে ওরা ওর সম্পর্কে অনেক-কিছু জানে। কেন্দুপাতার ব্যাবসা বন্ধ করতে ওরা ট্রাক লুঠ করেছিল। প্রশাসন তো ব্যবসাদারদের। ওদের মালকড়ি ছাড়া ভোটাভুটি অচল।

    যাঃ, কী আবোল-তাবোল ভাবছিল হাঁটতে-হাঁটতে। ইন্দু সিন্ধ ব্যাংকটা পেরিয়ে, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড় ছাড়িয়ে, রাসেল স্ট্রিটের কাছাকাছি এসে গিয়েছিল যিশু। ভাবল, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড থেকেই তুলে নেওয়া যাক টাকাটা।

    কাজের ছেলেটা ফ্ল্যাটে ফিরল কিনা জানার জন্যে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে বাড়ির নাম্বার প্রেস করে কানে ধরেছিল। ধুতি-পাঞ্জাবি চশমাচোখে হাফটেকো মধ্যবয়স্ক জিগ্যেস করল, দাদা, সোচিন কত করেচে ?

    ১৭

    পুকুরের জলে টলটলে রোদের গুঁড়ো মাখতে-মাখতে জলের মধ্যে মাথা গুঁজে পাক খৈয়ে কুচোপোনা তুলে আনছে পানকৌড়ি। মাথা ডুবিয়ে পাক খায় আর রুপোলি মাছ তোলে। উড়ে গিয়ে ঘনসবুজ চিকচিকে নারকোল পাতার ওপর বসে সূর্যের দিকে পিঠ করে। স্নানশেষে যুবতীদের মাথা ঝাঁকিয়ে এলোচুল ঝাড়ার মতন গা কাঁপায়। কালো-কালো পালকের নিখুঁত ছুরি শুকোবার জন্যে জাপানি হাতপাখার মতন ডানা খোলে।

    পুকুরের এদিকটায় অপলক শালুকের আবরুর মধ্যে মাথা গুঁজে মিষ্টিমদ গিলছে তিরতিরে কাঠফড়িং। বাঁদিকের নারকোল গাছটার পাতার ওপর ভজনালয় খুলেছে দাঁড়কাকের দল। সমগ্র পুকুরটা উঠে এসেছে রাত্তিরের অবগাহন থেকে। তোলা উনুনের ধোঁয়াপাকানো তঞ্জেবকাশিদা মসলিনের মতন কুয়াশায় ঢাকা কলাগাছের ডানার পিছনে খোড়ো একচালা। গোলাপি পায়ে পুকুরের জলতলকে চিরে ধবধবে পাতিহাঁস কুলবধুরা গ্রীবা উঁচু করে বেরিয়েছে পাড়া বেড়াতে। ওই বড়ো গাছটায়, কী গাছ কে জানে, পনেরো-কুড়িটা ওড়নশেয়াল জাতের বাদুড় ঝুলছে।

    কলকাতা থেকে টানা ভাড়াগাড়িতে, চাঁপাডাঙা-বলরামপুর রোডে, মুণ্ডেশ্বরী নদীর পোলটার মুখে, রাস্তার ওপর পুকুরের ধারের ছাপ্পর-ছাওয়া ভেটেরাখানায় দাঁড়িয়ে ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল যিশু আর ড্রাইভার। ট্র্যাভেল এজেন্সির শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় যিশু ঘুরেছে ওদের গাড়িতে। চেনা। শেষপুকুর যাবার জন্যে যেখান থেকে কাঁচা রাস্তায় বাঁক নিতে হয়, সেই গোপের হাট জায়গাটা দেখিয়ে দেবে ড্রাইভারকে। গাড়ি তো আর নজর বাঁচিয়ে দেড় দিন পার্ক করে রাখা যাবে না। অলসের অনুসন্ধিৎসা সর্বাধিক। কাল সন্ধ্যায় আবার আনবে গাড়িটা। মোচ্ছবতলা আর তালটিকুরির মদ্যিখান দিয়ে গ্রামে ঢোকার ঠিক মুখে বাবলাডাঙার ঢিপির গোড়ায় থাকবে গাড়িটা। আলের ওপর দিয়ে এলে তাড়াতাড়ি পৌঁছোনো যায় বাবলাডাঙায়। ওই গাড়িতেই ফিরবে যিশু। যিশু আর খুশিদি। বৈশাখী পূর্ণিমার মেলার জন্যে প্রচণ্ড ভিড় থাকবে সেদিন, চেঁচামেচি, নাগরদোলা, যাত্রাদল, হট্টগোল, চোঙার বাজনা, গুড়-বেসনের মেঠাই। হুকিং-করা জগমগে ঝিকিমিকি আলোর রোশনাই। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছেলের মতন হারিয়ে যাবে দুজনে কোথাও। এত বিশাল পৃথিবী।

    ধুলোয় পড়া ভাঙা ভাঁড়ে সকালবেলাকার ভোমরালি মাছি। পচা আলুতে প্রতিপালিত স্বাস্হ্যবান মাছির রাজত্ব এই শুরু হল। বেলে মাছি, নীল মাছি, দিশি মাছি আর ডোরোসেফিলা মেলানোগ্যাসটার, যে মাছিগুনো আলুর পচাই খেয়ে মাতলামো করে।

    চায়ের দোকানের ওগলা-বেড়ার পিচনে তেতো-নাজনের পাতাহীন গাছে শুকিয়ে আমসি তিন-গতরি ডাঁটা। কয়েকটা নাজে-খাড়া তিনফলা নোঙরের মতন তিন পাশ ধেকে ওপরমুখো ঝুলছে। ধূসর ডালে তিড়িকনাচন খেলছে নালবুলবুলি আর ছাতারে পাখি। পিচপথ থেকে নেবে যাওয়া দুপাশের ঢালে কালবৈশাখীর বৃষ্টির প্রশ্রয়ে উৎফুল্ল মুজঘাস, চোরকাঁটকি, কাঁটাকারির হাঁটু-ঝোপ। তারপর কালচে-সবুজ হোগলাবন, একটা ঘোড়া নিমের গাছ। কোঁড়া-বেরোনো বাঁশঝাড়ের তলায় বাঁথা সৌম্যকান্তি রামছাগলটার বোটকা গন্ধ এতটা দূরে এসেও ভলক মারছে। তালকি তাড়ির হাঁড়ি আর মাটির ভাঁড় নিয়ে রাস্তার ধারে ধুলোয় উবু বসে খদ্দের সামলাচ্ছে, এই সক্কালবেলায়, শুঁড়িবাড়ির বুড়ি। আর কহপ্তা পরেই তো তালশাঁস। ঢাল থেকে নেবেই খেতের সবুজ প্রগলভতা। তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন। শ্যালো ঘিরে বোরো। ঠিকুলকাঠির টঙে চোখমুখ আঁকা রাজনীতিক-ঋঢ়িতুল্য কালো হাঁড়ি।

    টাট্টুটানা একটা ছক্করগাড়ি চলে গেল আলুর বস্তা নিয়ে। শিল পড়ে রয়ে-রয়ে মার খায়েচে গো, ইমঘরে জায়গা নেই, মহাজনও নেবেনে। যিশু জানতে না চাইলেও ওকে উদ্দেশ্য করে বলল বস্তার ওপর বসে-থাকা চাষি। তারপর লোকটার নিশপিশে স্বগতোক্তি, দেকি, চাঁপাডাঙায়, নইলে ফেলদোবো, উপায় নেই উপায় নেই, পচতে নেগেচে।

    শিলাবৃষ্টি ? আরে ! ছাঁৎ করে ওঠে। লক্ষ করেনি এতক্ষুণ। খেতের ফসল কি মাথা নত করে আছে ? তার মানে পেঁয়াজ আর রসুনের গোড়ায় তো জল জমে গেছে। কী ভয়াবহ। একে আলু পচছে, তার ওপর এই। বিঘে প্রতি দেড় কুইন্টাল সুস্বাদু সুখসাগর পেঁয়াজ হয় এই জেলায়। আগেরবারেই তো হামজানপুর, বড়াল, জ্যামোর, ব্যাপসাগড়, চণ্ডীগাছা, দুয়ারপাড়া মৌজায় গিয়েছিল যিশু। পেঁয়াজ সংরক্ষণের সরকারি চাড়ও তথৈবচ। সিজকামালপুরে পেঁয়াজ সংরক্ষণাগারে কথা চলছে তো আজ কয়েক বছর হয়ে গেল স্যার, পেঁয়াজের আড়তদার তীর্থ পৈতাণ্ডি বলেছিল।

    শিলাবৃষ্টি হয়েছে পর পর গত তিন দিন। তাইজন্যেই আসার সময়ে কাঁচা বাড়িগুনোর গোলটালির ছাউনি আর মেটেগরের দেয়াল অমন মনমরা লাগছিল। গোলপাতার আর শনের ঝুপড়ি ফর্দাফাঁই। সকালের নবোঢ়া বাতাসের শীতল আদরে খেয়াল করেনি কিছুই। ভালোলাগায় অতর্কিতে বিষণ্ণতার ছোঁয়াচ ধরে।

    শেষপুকুরেও চাষিরা অসহায় স্নায়ুচাপে আর দুঃখে আক্রান্ত হয়েছে নিশ্চই, ভবেশকার রাজনৈতিক ওল উৎপাদন সত্ত্বেও। দিন-খাওয়া চাষিবাড়ির ভেতরে পরিবেশটা কেমন ? আগের বছর হিমঘরের আলু পচেছিল সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। চাষিরা ক্ষতিপূরণ পায়নি। পাবেও না। এবছর আলু রাখার জায়গা নেই হিমঘরে, গুদামে, আড়তে। বৈশাখী পূর্ণিমার মেলাও তাহলে হবে নির্জীব। চোদ্দ কাঠার বাশি খাস বিলি হয় না। বর্গাদার খাবে কী? কর্জ চোকাবে কোথ্থেকে ? আর গাঁয়ে গাঁয়ে তেভাগা ফসল হয়ে এখন ফসলের এক ভাগ জমির মালিকের, দ্বিতীয়ভাগ নথিকরা বর্গাদারের, তৃতীয়ভাগ যে কামলাটা আসলে চাষ করে, তার। পাঁচ সাক্ষ্যে মানুষ বর্গাদার হয়। কালীদাস গরাই বলেছিল, কেউ মরে বিল সেঁচে, কেউ খায় কই।

    পুকুর-পাড়ের কলাগাছের আড়াল থেকে একটা ভিকিরিকে আসতে দেখে গাড়িতে গিয়ে বসল যিশু। কাছে এলে সানফিল্ম লাগানো কাচ তুলে দেবে। নিশ্চিন্দি। ভিকিরিরা হাত বাড়ালে বেশ বিব্রত বোধ করে ও। পার্স খুলে হয়তো দেখবে খুচরো নেই। নোট দেওয়া যায়, কিন্তু অন্য লোকেদের তাতে গোঁসা হয়। অ, বড়োলোকমি। ড্রাইভারের দ্বিতীয় ভাঁড় শেষ হয়নি। নয়তো ভিকিরিটা এসে পৌঁছোবার আগেই কেটে পড়া যেত।

    লোকটা কাছে এলে, দেখল যিশু, বাউল আর ভিকিরি মেশানো এক তৃতীয় সম্প্রদায়। আধুনিকতা এদের এখুনও নামকরণ করেনি। শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা এদের চায় না। পৌষ মেলার জন্য পেডিগ্রি দরকার হয় কী ? কে জানে ! পশ্চিমবাংলায় এরা বোধয় উত্তরাধুনিক প্রাণী। গৃহবধু পকেটমারিনীদের মতন। বাউলের পদাবনতি হলে জাতভিকিরি হয়। ভিকিরিরা নিজের পদোন্নতি ঘটিয়ে নিজেদের আধা বাউল কিংবা নববাউল করে ফেলেছে। ক্লাবঘরের ফেকলুরা যেমন আঁতেল।

    কাছে এসে ঝুঁকে, জানালার কাচে মুণ্ডু এনে, না, ভিক্কে চায় না লোকটা, বলে, একটা চা খাওয়াও না কত্তা ; আর যিশুর দোনামনা শেষ হবার আগেই, দোকানদারকে বলে, নে রে মদনা, একটা চা আর লেড়ো দে দিকিনি, বড়ো সায়েব দিচ্চে, বড়ো সায়েবের সংসার ভরে উটুক নাতি-নাতজামায়ে।

    যিশু খুঁটিয়ে দেখছিল বছর পঁয়তাল্লিশের কালোবরণ দাড়িপাকানো গড়নের লোকটাকে। গায়ের খসখসে চামড়ায় ছিৎরে পড়েছে বয়েস। দুরঙের হাওয়াই চপ্পল দুপায়ে। সবুজটা শনের ধাগায় বাঁধা। তাঁবাটে পায়ের দরানি-পড়া গোছে লাউডগা-সাপ শিরা। কাছা মেরে পরা ধুলোট হাফলুঙ্গি। বোতামহীন কমবয়েসি বুশশার্টের ফাঁকে চ্যাটালো পেটের ওপর পাঁজর দেখা যাচ্ছে। নানা রঙের তাপ্পি-মারা তেলচিটে ঝোলা কাঁধে। ওষুধ বা মনিহারি জিনিসের টিনের একতারা। তাঁবার টান-টান ইলেকট্রিক তার। দাড়িতে বিশেষ চুল নেই লোকটার। কিন্তু মাথার কনকজটা নেবেছে কাঁধ পর্যন্ত। জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা-নেঙড়ানো একদা-আদল আন্দাজ করতে পারে যিশু।

    বড়ো সায়েবকে তোমার গান শোনাও না ক্যানে। ক্ষমা করে দেবার অপত্য কায়দায় হুকুম করে খালি-গা চা-দোকানি, ডেকচিতে চাপানো আলুর তরকারিতে খুন্তি নাড়তে-নাড়তে। তারপর মৃদু হেসে যিশুকে, ও অনেক গান জানে স্যার, হাফু গান। শুনেচেন নিকি, হাফু ? বাপ-চোদ্দোপুরুষের গান আমাদের এই হুগলি জেলার, তা হাফু তো উটেই গেল।

    হাফু ? শুনিনি তো !

    লোকে গাইতে-গাইতে হাঁপিয়ে যায় তো, তাই হাফু। এগবার ধল্লে আবনি না বললে আর থামবেনে। ওতোরপাড়ার মুকুজ্জে রাজারা ভালোবাসত।

    না, শুনিনি কখুনও।

    সোনেন্নিকো ? বাউল-ভিকিরির কন্ঠস্বরে ভর্ৎসনা। গলা কাঁপিয়ে, একতারায়, নাকি তোতারায়, ড়িং ড়াং বুগ বুগ। মাছ ভাজার তেল ছেটাবার শব্দ ওঠে গুপিযন্ত্রে। সোনেন কত্তা, মন দিয়া সোনেন,

    ওগো কলিমালুর জোড়া

    তোমার পচা বেগুনপোড়া

    ল্যাং খেয়ে তোর চাগরি গেল

    বুজলিরে মুকপোড়া…

    ড্রাইভারটা সশব্দে হেসে ওঠে আচমকা। ভাঁড়ের চা ফুলপ্যান্টে পড়লে হাসি চুপসে যায়।

    কিন্তু সে লোক তো কবেই পালটে গেছে। এখুন তো ওন্নোলোক। তোমার হাফু পালটায়নি কেন ? ঠোঁটে মুচকি এনে যিশির প্রশ্রয়। গায়কের হাঁপানি রোগে ওর কন্ঠে সব গানই হাফু।

    পরবর্তী ড়িং ড়াং বুগ বুগ ধরে লোকটা,

    সুবাস বোসের নাম ডুবোলি অণ্ডকোষের জামাই

    ঠেককেদারি তুরাই পেলি লেইকো চুরির কামাই

    তুদের সমাজবদল হ্যাঁ লা, ন্যাড় জোলাবার খ্যালা

    থালে কেনরে এতো জুলুস-মিছিল

    কেনরে ধানাই পানাই

    হায় রে তুদের গোডিম ভাঙে নাই,

    তুদের গোডিম ভাঙে নাই…

    গান বোধয় শেষ হয়নি, হাফু গান যখন। বাউল-ভিকিরি থেমে গেল চা-দোকানির কথায়। আগে ও পার্টি করত স্যার। মাধ্যমিক ওব্দি পড়েছেল। সোনাওনে সেই গানটে, সেই যে…

    বাউল ভিকিরির সুরহীন ড়িং ড়াং আরম্ভ হয় আবার। বলল, ম্যাট্রিক আর দেয়া হল কই। আলুর আর চালের আকাল করে দিলে পোফুল্লবাবু ; চলে গেলুম চাঁপাডাঙা ইসটিশান পোড়াতে। সে আগুন আর নিববেনে কত্তা। রাবণের মুকে আগুন বলে কতা।

    গোটা পনেরো দশ-বারো বছরের খালি-গা বালক জড়ি হয়ে গেছে এরই মধ্যে। সারা পশ্চিমবঙ্গ ভরে গেছে এরকম লৈকাপড়াহীন-কাজহীন কিশোর-কিসোরীতে। মাঠ আর পথ বেয়ে অমন আরও বালক-বালিকা আসছে। গ্রামে কিছু একটা হলেই এরা জড়ো হয়ে যায়।

    সেই ইংরিজি গানটে সোনাও না বড়ো সায়েবকে।

    ইংরিজি গান ? তুমি বেঁধেছ ? শোনাও দেখি।

    সোনেন সোনেন:

    দিনে মিটিং রাতে মেটিং

    এই তো হোলো বাংলাদেস

    আসে যায় মাইনে পায়

    রাঁড়ের পো-রা রয়েচে বেস

    কলঙ্কে গড়া রাজনীতিকদের গল্প আরও অশ্লীল হয়ে উঠতে পারে আঁচ করে, গাড়ি থেকে নেবে দোকানির পাওনা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে বাউল-ভিকিরিটাকে দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট দিলে, লোকটা এক পায়ে দাঁড়িয়ে ড়িং ড়াং পাক খায়। বলে, শেষপুকুরের মেলায় যাবার ভাড়াটা দেলেন বড়ো সায়েব, তেনার নাতিপুতিরা সুখে থাকুক। তারপর গেয়ে ওঠে প্রকৃত হাফু গান,

    মাছ ধরা হল না গো সই

    দোটো পায়লা লেগেছে জালে

    সই যে পাতালে

    সব দেখে যা লে…

    কী সবটা লে

    যম না চিতিলে

    যাকে খেলে লে…

    ময়না ধানের খয় না

    ছেলে কেন আমার হয় না

    মক্কাশ্বর যাবি

    তবে খোকা পাবি

    তেঁতুল খেলে গা জ্বলে

    আমড়া কেলে ব্যাং হলে

    মাছ ধরা হল না গো সই…..

    গানের মাঝেই ছেড়ে দিল গাড়ি। গাড়িতে জুত করে বসে, ঘন্টায় আশি কিলোমিটার বেগের আরামে, দুটো কাঠি নষ্ট করার পর, তৃতীয়টায় ধরাতে সফল হয় যিশু। হাফু গানের দুর্গতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওর মনে হচ্ছিল, কাউকে অপমান করলে, এমনকী গানের মাধ্যমেও, তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা বোধয় দুটো ভালো-কথা বলা সম্পর্কের চেয়ে গাঢ়। গাঁয়ে-গাঁয়ে, পাড়ায়-পাড়ায়, এত যে আড়াআড়ি আর খাড়াখাড়ি বিভাজনের খেয়োখেয়ি আর দলাদলি, যার কোনো মাথা নেই মুন্ডু নেই, হয়তো সেকারণে।

    গা-ছাড়া রাস্তার দুধারে, শনাক্তকরণ প্যারেডের মতন ভাটাম, চটকা, ইউক্যালিপটাস, বাবলা, শিরিষ। সবুজের ফাঁকে-ফাঁকে সকালের বলদর্পী আলোর ব্যাটন। উবড়ো-খাবড়া পথ, গতিকে গোরুর গাড়ির বেগে এনে ফেলেছে। পথের হাল স্হানীয় বিধায়কের ক্ষমতা বা জোচ্চুরি ফাঁস করে।

    বেশ ভোর রাত্তিরে উঠতে হয়েছিল বলে তন্দ্রার আমেজ কাটাতে পারছিল না যিশু। চা-সিগারেট-হাফুর পরও। ওর খেয়াল হল গাড়ি থেমে রয়েছে আর চিৎকার চেঁচামেচির রেশ আসছে। কী ব্যাপার ? ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল ও।

    অবরোধ করতাসে পাবলিক !

    অবরোধ ? সে কী ? আচমকা উদ্বেগের রক্ত ছড়িয়ে পড়ল যিশুর মুখমণ্ডলে। হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়। পৌঁছোতে আমাকে হবেই। তুমি হর্ন না বাজিয়ে আস্তে আস্তে গাড়ি চালাও।

    গাইড়িরে ড্যামেজ কইরা দিবে স্যার !

    না-না, তা করবার হলে লোকগুনো ছুটে আসত এতক্ষুণে। ওদের তো আমাদের সম্পর্কে আগ্রহ দেখচি না। ওই তো, ওদিক থেকে গাড়ি আর বাস আসছে তো ভিড় কাটিয়ে।

    জমায়েতের কাছাকাছি পৌঁছে যিশু দেখল রাস্তার পাশে রাখা কাঁচাবাঁশের মাচানবাঁধা দুটো মধ্যবয়স মৃতদেহ। পুরুষ আর চাষি বউয়ের। তুমুল চিৎকার করে কাঁদছে, বুক চাপড়াচ্ছে কয়েকজন। এভাবে শোকপ্রকাশ কলকাতায় আর দেখা যায় না। ওফ, দ্যাখা যায় না এসব দৃশ্য। গলার কাছে শ্লেষ্মা এসে গেছে। একসঙ্গে দুজনের মৃত্যু। গ্রামবাসীদের মধ্যে মৃত্যুজনিত প্রাণচাঞ্চল্য। সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে ও, যিশু। অচলাবস্হা গড়ে উঠতে পারে এদের আবেগের চাপে। তার আগেই দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া দরকার। কী হয়েছে গো ? একজনকে জিগ্যেস করল যিশু।

    মাল তুলেছে আজ দুবচ্ছর অথচ তাঁতি সমবায়ের ট্যাকা দ্যায়নে পান্না মাঝি। তাঁতিরা তাই চাষের ওষুদ খেয়ে মরচে। মহাজন দিয়েছেল সুতো। তা কী আর করবে। আগে পেটটা ভরাতে হবে তো। সুতো বেচে খেয়ে ফেলেচে।

    ওওওও। এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল যিশু। ড্রাইভারকে বলল, চলো চলো। উদ্বেগে রক্তচাপ বেড়েছে নির্ঘাত। তন্তুজ আর কী করবে ! তাঁতিদের শীর্ষ সংস্হা। নিজেই তো এর কাছে ধার করে ওকে শোধ দ্যায়। তাঁত সমবায়ের পাওনা মেটাবে কোথ্থেকে। টঙে-টঙে পার্টির লোক। দুবছর কেন, অনেক তাঁত সমবায়ের পাঁচ বছরের পাওনা মেটাতে পারেনি। যেখানেই বাঙালি আমলা সেখানেই রক্তচোষার দিগ্বিজয়। পার্টির প্রতি প্রভূভক্ত আমলা। মুসুলমান তাঁতি বউরা আজকাল বিড়ি বাঁধছে। মরদরা যাচ্ছে মাছ ধরতে। হিন্দু পরিবারের সদস্যরা হেস্তনেস্ত করে উঠতে পারছে না এখুনও। শীর্ষ সমবায় যেসব গামছা লুঙ্গি ধুতি শাড়ি তুলেছে, তাঁত সমবায়গুনোর কাছ থেকে সেগুনো আদপে বিক্কিরি হবে কি না ঠিক নেই। ওদের দোকানগুলো সময়মতন খোলে না, আর বন্ধ হয়ে যায় সন্ধের আগেই। সরকারি কর্মী ওরা; ওদের দোষ দেয়া যায় না, দশটা-পাঁচটার চাকরি। তাঁতজিনিসটাই বোধয় দশ বছরে নিপাত্তা হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গে।

    দু-দুজন আত্মহতভঅ করেছে। পুলিশ পৌঁছোবে সৎকারের পর। সবাই তো আদিত্যর জাতভাই। কাঁচ তুলে এসি চালিয়ে দিতে বলল যিশু। ঘুম পাচ্ছে।

    ১৮.

    বাবলাডাঙায় বাবলাগাছ আর নেই। রয়েছে অর্জুনগাছ, বয়োবৃদ্ধ। মোচ্ছবতলায় আর কোনও মহোৎসব হয় না। গোপের হাটে হাট আর বসে না, গোপরাও থাকে না। তালটিকুরিতে তালগাছ আর নেই। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর, নামের মধ্যে জিনিসটা বা ব্যাপারটা আর থাকে না, নেই। মানে একেবারে নিশ্চিহ্ণ। যেমন স্বাধীনতা, যেমন গণতন্ত্র, যেমন নাগরিকতা, যেমন ন্যায়, যেমন দায়দায়িত্ব, যেমন সত্য, যেমন কর্তব্য। ভাবছিল যিশু। বাবলাডাঙায় গাড়ি থেকে নেবে ড্রাইভারকে অর্জুনগাছটা দেখিয়ে দিল যিশু, যার তলায় কাল, বৈশাখী পূর্ণিমার সন্ধ্যায়, চাঁদের আলো মেখে অপেক্ষা করবে এই গাড়িটা বা ট্র্যাভেল এজেন্সির নাম আঁকা অন্য যে-কোনও গাড়ি।

    পাঁচটা নাগাদ পোঁছে যেও কিন্তু।

    হঅঅঅ। আমাদের দ্যাখসেন নাকি ডিউটি ফেল করসি ?

    মোচ্ছবতলায় কদমগাছের নিচে দাঁত বেরোনো ইঁটের চবুতরার ওপরে বসে গ্যাঁজাচ্ছে হাফবুড়োরা। কয়েকজনকে চিনতে পারল ও, যিশু। হিরু পাকড়ে। মন্দিরে ওকে রামচাকি বাজাতে দেখেছে। সুনীল মালিক, বাদল কোঁড়া, মানিক সাঁতরা, বদরুদ্দি খোনকার, সবাই বর্গাদার ; গত বছর এদের সমস্ত আলু পচেছিল হিমঘরে। আর ওই লোকটা তো জগৎ বাইন। আলুতে সারের ব্যবহার সম্পর্কে জিগ্যেস করতে গেয়ে উঠেছিল, বেনফেডের সার দিলি কনফেডের জামা, ধুতির নামে গামছা দিলি, ত্রাণের নামে মামা। রসিক লোকেরা, সত্যি, অদম্য ; নিজের দুঃখকষ্টকেও অলঙ্কারে মুড়ে তোলে।

    ওর, যিশুর, পদবি, বিশ্বাস, সেটাও কেউ ঠিকমতন উচ্চারণ করতে চায় না। কেউ বলে, বিসসেস, কেউ বিসাস, কেউ বিহহাহ, কেউ বিষশ্বাস ; যার যা ইচ্ছে। চব্বিশ পরগণার বিরাট ঝিয়ের দল প্রতিদিন কলকাতায় কাজ করতে আসে। সবাই মুসুলমান। অনেকে বাংলাদেশি। আসল নামে কাজ পাওয়া অনেক সময়ে মুশকিল বলে বউগুনো সরস্বতী, আরতি, সন্ধ্যা, কামিনী, অর্চনা নাম দিয়ে রাখে। যারা কাজ দেয় তারাও জানে। ইন্দু হলে নাম হতো খেন্তি, পেঁচি, পুঁটি ধরণের। আত্মপরিচয় ব্যাপারটা বায়বীয় বোধয়। বাবলাডাঙায় বাবলাগাছ আর নেই। বাবলাগাছেদের নামও আর নেই। বনবিভাগ গাছে-গাছে সংখ্যাচিহ্ণ এঁকে রাখে। যিশু অন্য দিকে তাকাল।

    বারবার ব্যাখ্যা করা সত্ত্বেও ওকে এই লোকগুনো সরকারি প্রতিনিধি মনে করে। অভোযোগের কান্না আরম্ভ করবে এক্ষুনি। যিশু বলে, আরে বাবা, আমি সে-লোক নই ; ওরা ভুরু কোঁচকাবে, থালে থাতবাকসো কেন, লাল কালি সবুজ কালির কলম কেন, ফাইল-কাগজ কেন, ইংরিজি লেকালিকি কেন !

    মোচ্ছবতলার এই চবুতরায় কখুনো নাকি শ্যামানন্দ শ্রীজীব গোস্বামী বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের জন্যে এসে বসেছিলেন। পাশবালিশের মতন গোল ভগ্নাবশেষটা হয়তো চাঁদনির ইমারতি থাম। অথচ কোনও বৈষ্ণবের দেখা পায়নি যিশু এ-তল্লাটে। অষ্টসাত্ত্বিকভাব বলতে নতুন চন্দ্রমুখী আলুর রাঙাপানা ত্বক।

    তালটিকুরি আর মেলাতলা পেরোয় যিশু। দরমা, হোগলা, চ্যাঁচারি, চট, তেরপলের দোকানপাট। নাগরদোলা, ম্যাজিক, যাত্রা-অভিনয়ের মঞ্চ, সব জোগাড়যন্তর পুরো। হুকিংও। হুকিং করে বিদ্যুৎ না নিলে আর মেলা জমে না। রোশনাই-এর খরচ তো আর মেলা-দর্শকরা জোগাবে না। শনি, শেতলা, মনসা, শিব, ধর্মঠাকুর, সমস্ত মন্দিরের অধিষ্ঠাতারা হুকিং করে নিজেদের আলোকিত করে রাখে পশ্চিমবঙ্গে। ইষ্টদেবতা বলে কিছু আর নেই। সব সার্বজনীন।

    মন্দিরে লোকজন নেই। যিশু দেখেছিল ঢুকে আগেরবার এসে। কে আর টের পাচ্ছে যে ও খ্রিস্টান। কলকাতার কালীঘাটেও ঢুকেছে। পাকা তাল আর জবাফুল হাতে শাঁখারুলি বধুদের প্যাচপেচে কিউ। ঢুকেছে দক্ষিণেশ্বরেও। মুলো হাতে দর্শনার্থীদের ময়ালসাপ লাইন। বিহারের লোকেরা কবজা করে ফেলেছে মন্দিরগুনো। ইশকুলে পড়ার সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঢুঁ মেরেছিল। তাল আর মুলোর চল তখন ছিল না। এরকুম সাংস্কৃতিক রদবদল বোধয় দেশভাগের দরুন। চার্চগুনোও তো কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়কার প্রতিভা হারিয়ে ফেলেছে।

    মন্দিরের দক্ষিণে বিশাল বটগাছটা। বটগাছে যে এরকুম গাদা-গাদা বুনো মৌমাছির চাক ঝুলে থাকে, শেষপুকুরে আসার আগে দেখেনি যিশু। কিসের মধু এরা জোগাড় করে কে জানে। আলুফুলের মধু হয় ? মন্দিরের পেছনে তো বিরাট দামপুকুর, যার নামে এই গ্রাম। পুকুর খোঁড়ার সময়ে সেষনাগের প্রতিমা পেয়েছিল গোপেরা। বটতলার অজস্র ঝুরির সোঁদা অন্ধকারে আধা-অবহেলিত সেই পাথরটার নাম আজ বুড়ো শিব। পূঞ্জীভূত সময়ের বিরামহীনতাকে ধরে রেখেছে দিনেমারের সময়কার এই বট গাছটার সুকোমল অন্ধকার। মৌমাছিদের ডানাগুঞ্জনের ঝিরিঝিরি সুগন্ধ।

    ভবেশকার বাড়ি যাবার কোনও নির্দিষ্ট পথ নেই। রাজনৈতিক দলাদলির মামলা আর পালটা মামলায় কাঁচা রাস্তাটা বছর দশেক থেকে আধখ্যাঁচড়া। আদালতের স্হগিতাদেশ উঠতে-উঠতে কোনোদিন এটুকুও ভেসে যাবে ঠিকেদারদের প্রার্থনায় প্রীত মুন্ডেশ্বরীর বদরাগি জলে। বাঁশঝাড়ের অধোবদন সবুজ বাতাসে জিরোবার জন্যে ঝরাপাতার ওপর ব্রিফকেস রেখে সিগারেট ধরাল যিশু। চারিদিকে নিস্পন্দ আলোড়নের ছায়াছন্ন তরিবাতময়তা।

    এখুন আগে বরং হিমঘরে গিয়ে এখানে আসার ন্যায্যতা প্রমাণ করা যাক, ভাবল ও, যিশু। হিমঘর আর বিদ্যুৎ সাবস্টেশানটা তো দেখাই যাচ্ছে। বিদ্যুতের হুকিঙের লোড হিমঘরটা নিতে পারবে কিনা আঁচ করা কঠিন। আলুগুনো আবার হয়তো দমবন্ধ হয়ে মরবে। আলের ওপর দিয়ে হেঁটে, পরিত্যক্ত উপস্বাস্হ্যকেন্দ্রের পেছনের আমবাগানের পাশ দিয়ে, পিচ রাস্তার ওপর পোঁছল যিশু। এই উপস্বাস্হ্যকেন্দ্রটা যখুন স্বাস্হ্যবান ছিল, তখুন এখানে কাজ করত খুশিদির যুবক পাণিপ্রার্থী। দরোজা, জানলা, মায় ইঁটও উপড়ে নিয়ে গেছে স্বাবলম্বী মানুষ।

    ইমঘরের ক্যাশিয়ার জয়দেব শাসমল আসছিল ক্যাঁচোর-ক্যাঁচোর সাইকেলে। যিশুকে দেখে নেবে পড়ে। কেঁদো থপথপে হাঁটুনি। এগিয়ে আসে মুচকি মুখে। প্রথমদিন এই লোকটা ভেবেছিল যিশু বুঝি সরকারি আধিকারিক, চুরিচামারি ধরতে এয়েচে। তাই সুনিয়ে-সুনিয়ে জিভ-গোটানো মন্তব্য করেছিল, লিকতে দে, লিকতে দে, বাবারও বাবা আচে। গ্রামে গেলে, লোকে নিজের ভয় অনুযায়ী যিশুকে কিছু-একটা ভেবে নেয়। বিদ্যুৎ পষহদের লোক, হুকিং ধরবে। ব্যাঙ্কের লোক, ঋণখেলাপি উশুল করতে এয়েচে, পালাও। স্বাস্হ্য দপতরের লোক, টিকে দিতে, ওষুদ গেলাতে, এয়েচে। গ্রামীণ বিকাশের, মেলা বক্তিমে ঝাড়বে।

    দেকেচেন নাকি ? কাগোচে ? ধুতির খুঁট পকেট থেকে টেনে মুখ পুঁছে জানতে চায় শাসমল। নিজেই খোলসা করে। বারাসাত হিমঘরের ইউনিট ম্যানেজার শান্তি চাটুজ্যে নাকি গা ঢাকা দিয়েচে, হেঁ হেঁ, বন্ডের বই ভুলে গিয়ে বাড়ি নে গেসলো। বলেচে জেলাশাসকের নির্দেশ মানিনে, হেঁ হেঁ।

    ক্লান্ত যিশু চাইছিল কোথাও গিয়ে একটু বসে, এক গ্লাস জল খায়। আপাতত শাসমলের কথায় দেখনসই সায় দেয়া প্রয়োজন মনে করে হাঁসল কাঁধ নাচিয়ে। শাসমল প্রশ্রয় পায়, আরেকবার মুখ পোঁছে চল্লিশোর্ধ ভুঁড়িদাস। বলে, আমডাঙা, বারাসাত, দেগঙ্গা ব্লকের চাষিদের আলু তো এই বোসেখ মাসেও হিমঘরের মাটে পড়ে আচে, হেঁ হেঁ।

    মানুষ অন্যের অবমাননায় বা তাকে হেয় করার জন্যে যখুন হাসে, মনে হল যিশুর, তখুন হাসিতে ক্যারদানি ফলায়। এক-একজন এক-একরকুম। ঠিঁউউউ। হ্যাঁহ হ্যাঁহ হ্যাঁহ। হা হা হা হা। ফিঃ ফিঃ ফিঃ ফিঃ। ইয়াহ ইয়াহ ইয়াহ। খ্যাক খ্যাক খ্যাক খ্যাক। খিক খিক খিক। হুমফ হুমফ হুমফ। ওঃ হোঃ হোঃ।

    শাসমলের কাঁধে হাত রেখে আরেকটু প্রশ্রয় দিলে যিশু। এই লোকটা বুঝতে পারে না কনসালট্যান্ট কাকে বলে। ভাবে উপদেষ্টার আবার কী দরকার। উপদেষ্টার উপদেশের দরদাম শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে এর। আলু, ক্যাশিয়ারকে জমিদারি দিয়েছে, নায়েবি ফলাবার জন্যে। চলুন না, আপনার হিমঘরেই যাই, একটু বসা যাক, আরও একাধটা ব্যাপার জানবার ছিল, আপনার মতো অভিজ্ঞ লোক তো বড়ো একটা দেখলুম না এলাইনে, বলল যিশু। তারপর শাসমলের ইতস্তত দেখে স্তো দেয়, আমি তো সরকারি লোক নই, জানেনই তো আপনি, জাপানি কোম্পানিতে কাজ করি, জাপানি মেশিন কত ভালো হয়, জানেন তো।

    বারাসাতের আলু ঘোটালার কথা ভালোই জানে যিশু। এ আর নতুন কী। প্রথম ট্রাম-পোড়া ছাইমাখা সাধুসন্ত আজ সর্বত্র। সত্তর হাজার বস্তা রাখার জায়গায় রাখা হয়েছিল এক লাখ কুড়ি হাজার। প#ত্রিশ হাজার বস্তার তবু জায়গা হয়নি, বাইরে পড়ে-পড়ে নষ্ট হয়েছিল। সিলাবৃষ্টির মার খেয়ে এলিয়ে পড়েছিল বস্তাগুলো। কালোবাজারে পাঁচগুণ দামে বন্ড কেটেছে ইউনিট ম্যানেজারের চোখের সামনে। পিয়োনটা গ্রুপ থিয়েটার করে। ওদের দলটার নাম প্রতিবাদী সভা। আকাদেমিতে নীলদর্পণ-এ ভালো অভিনয় করেছিল, ক্লাস।

    ওই অঞ্চলে, বারাসাতের ওদিকটায়, হিমঘরের ভরসাতেই অত আলু চাষ হয়েছিল, অথচ ঠাঁই পেল মহাজনের আলু। সব বামপন্হী আর রামপন্হী দলে চেয়ার আছে মহাজনদের। তারা তো আর আজকের লোক নয়। মেহনতি চাষি যে সত্যি-সত্যি এমনতর মেহনত করে ফেলতে পারে, মাটির উমে ঘাপটি মেরে আলুগুনো নিজেরাই টের পায়নি, আমলা-গামলা তো কোন ছার। বর্গা আইন পাস করলেই যেন সব হয়ে গেল, ব্যাস, ভূমিসংস্কার শেষ ! খেতে-মাঠে যা ফলছে তার কী হবে ? তার তো হিল্লে করতে হবে। মেয়ের বিয়ে দিতে তো ট্যাকা চাই। চাষির বুক চাপড়াবার শব্দ পৌঁছোয়নি কোথাও।

    মন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশান দিয়েছিল চাষিরা। ম্যানেজিং ডিরেক্টার বেংকটরমণ এক-খেপ পরিদর্শন করেছিল। জেলাশাসক অরুণ মিশ্র বিভাগীয় ব্যবস্হা নেবার জন্যে প্রতিবেদন দিয়েছিল সরকারকে। পঞ্চায়েত সমিতির পৃথ্বীশ দে আর ব্লক আধিকারিক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় যথেষ্ট দৌড়ঝাঁপ করেছিল। অচলায়তন ভেঙে মুক্তধারা বেরোয়নি। জমিদারি উঠে গেছে, জমিদার ওঠেনি। হয়ত কোনও দিন উঠবে না।

    বুজলেন বিসসেসবাবু, হিমঘরের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে বলল শাসমল, আমাদের এখেনে ট্রান্সফরমারের পোরসিলিন চুরি হয়ে দুদিন লাইট আসেনে, হেঁ হেঁ।

    রাজনৈতিক ঋণমেলার ঠেলায় গ্রামীণ ঋণ বন্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বব্যাঙ্ক। মেলার মজা লুটল পাঞ্জাব, হরিয়ানা, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র। নয়তো ঠিক সময়ে আরও কটা হিমঘর দাঁড়িয়ে যেত পশ্চিমবঙ্গে। এখটা হিমঘর বসাতে তিন কোটির মতন টাকা দরকার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে।

    হিমঘরে পৌঁছে যিশু দেখল, শেডে এখনও শ’দেড়েক বস্তা পড়ে আছে। গোটা দশেক হাফল্যাংটো মুটিয়া ঘুমোচ্ছে। ওদের ঠোঁট থেকে শেষ তাড়িটুকু শুষে নিচ্ছে বেলে মাছির দঙ্গল। এলা মাটির ডাঁই। বাতিল আলু ছড়ানো-ছিটোনো চাদ্দিকময়। তার ওপর দিয়েই হেঁটে অফিসঘরে যেতে হল যিশুকে। একটা থনঝোলা সাদাকালো ছাগল শুকে বেড়াচ্ছে বাতিল আলু, খাচ্ছে না।

    লোক লাগিয়ে নিজেরাই হয়ত ট্রান্সফরমার খারাপ করিয়ে রাখে। আলু পচলে বিদ্যুৎ পর্ষদের ঘাড়ে দোষ চাপাবার সুযোগ থাকবে। একশো বত্রিশের তেত্রিশ কেভির ক্ষমতাসম্পন্ন। সোজা কথা নয়।

    আপনাদের তো জেনারেটর আছে ? অনেক হিমঘরে দেখেচি বিদ্যুতের চে ডিজেল সস্তা বলে অষ্টপ্রহর জেনারেটর চলছে, বলল যিশু।

    স্টোরকিপার কৃপাসিন্ধু আশ এসে দাঁড়িয়েছিল। বলল, আঁগগে ডিজেল ছেল না। রসুলপুর থেকে নিয়েলুম। আআআর বলেন কেন। তা ওইটুকুন শীত ইমঘরে ধরা থাকে। খেতি হয় না।

    শাসমল পৈতেতে বাঁধা চাবি দিয়ে ক্যাশিয়ারের ঘরের তালা খোলে। শাসমলরা কি বামুন যে পৈতে পরে আছে ? কে জানে, হবেও-বা। আদিত্য ভালো বলতে পারত। পলিশহীন আমকাঠের চেয়ার-টেবিল এলা মাটির ধুলোয় গেরুয়া। দেয়ালে সত্য সাইবাবার হাসিমুখ ঝাঁকড়াচুল ছবি। কোণে, মেঝেতে, স্টোভ। চা ফোটানোর অ্যালুমিনিয়াম ডেকচি। তলানিপড়া তিনটে খুদে মাপের কাচের গেলাস। মাছি অধ্যুষিত। প্লাসটিক বয়ামে চিনি, চা, গুঁড়ো দুধ।

    চা খাবেন নাকি ?

    নাঃ। মুন্ডেশ্বরী পোলের আগে খেয়েছিলুম আসার সময়ে। এখুন বরং এক গেলাস জল খাওয়ান।

    কুঁজোর ওপর ঢাকা দেওয়া স্টিলের গেলাসে জল গড়িয়ে শাসমল বলল, অঅঅঅঅ। হরেন পাইকের ছেলের দোকানে। ভালো চা করে। ময়দার পরোটা আর আলুর দমটাও ভালো করে। হরেন পাইকের হাফু গান শুনলেন নাকি ? হেঁ হেঁ।

    যিশু স্তম্ভিত। হরেন পাইক ? বাউল ভিকিরিটা চা-দোকানির বাবা। বাবা-ছেলের সম্পর্ক এমন স্তরেও পৌঁছোয়। মাই গড। বলল, হ্যাঁ, হাফু কিনা জানি না, নিজেই গান বেঁধেছে মনে হয়। একতারাটাও হাফুছাপ।

    ওওওই যখন যা খবর হয় আর কী। শেষপুকুরে মেলা বসলেই আসে ফিবছর। থাকচেন তো, কাল, মেলায় ? মেলাটা এবার জমবে না বোধয়।

    কেন ?

    মহাজনের সঙ্গে দেকাদেকির ভয়ে চাষিরা আবার আসে কিনা দেকুন। ব্যাঙ্কের বাবুরাও তো একটা ঘর নিয়েচে।

    শেষপুকুরে আসবার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্যে, শাসমলের আর কৃপাসিন্ধুর কাছে যিশু যখুন আবোল-তাবোল আগডুম-বাগডুম ফাঁদছে,পিয়োন মুরার প্রামাণিক, শালপ্রাংশু ষাঁড়ের মতন নজরকাড়া ছাতি, বলল, আবনার সেই আলোজ্বলা ল্যাপটু টাইপযন্তরটা আনেননি এবার ?

    ল্যাপটপ ? ওটা তো কমপিউটার। না, আনিনি। বলল যিশু। ল্যাপটপে খুশিদির ফোটো লোড করেছে ; এদের সামনে খোলা যাবে না আপাতত।

    লেকালিকি সব হয়ে গেচে ? বই হয়ে বেরোবে তো, না ?

    এই সামান্য কিছু বাকি। তাই তো এলুম আপনাদের কাছে। তারপর প্রশ্নমালার লাটাই থেকে সুতো ঢিলে করতে থাকে যিশু। উত্তরদাতাদের ঋতুবন্ধ খুলে যাবার আহ্লাদ।

    এবার সবাই রাধাপদ্ম চাষের কথা ভাবচে।

    রাধাপদ্ম ? জানা নেই বলে ক্ষুণ্ণ হয় যিশু।

    ও ওই সুযযোমুখি ফুল, বলল কৃপাসিন্ধু। তারপর দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে প্রায় স্বগতোক্তি, আলুর বুক এমন টাটিয়ে উডলো গেলোবছর। আবনি হলেন গে রায়রাঁয়া লোক, দেকুন যদি চাষিদের কিচু উবগার হয়। কৃপাসিন্ধুর মুখে গরম বালিতে চাল ভাজার গন্ধ। শাসমল পান্তা ব্রেকফাস্টের হাঁইইইই হাঁইইইই হাঁ-মুখ খুলে সুরেলা হাই তুলে যাচ্ছে কিছুক্ষুন অন্তর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা আলুর মধ্যে মুটিয়াগুনো সম্পর্কে উদাসীন একটা ডেঁপো ইঁদুর চষে বেড়াচ্ছে। আমোদে উ৮ড়ছে দুচারটে শুকনো আমপাতা।

    গোগ্রাসে ছুটন্ত একটা রাতকানা ট্রাক চলে গেল। হাম্প ডিঙিয়ে, ডিগুম ডিগুম তুলে।

    সবশেষে, আদপে যেটা জানতে চায় যিশু, সেই প্রশ্ন করে। আচ্ছা ভবেশকা কি বাড়িতে আছেন ?

    অ্যাই দ্যাকো অ্যাগবারটি। আগে বাড়ি যাননি ? ভবঠাকুর তো আরামবাগ গ্যাচে খড়ের ছাতু কিনতে। ওই যে মাশরুম চাষের বীজ, তাই আনতে। তারোপোর পার্টির কাজ তো আচেই। ফিরতে সেই সোনধে। মুরারি প্রামাণিকের মিছিল-চনমনে উত্তর।

    জবাবের আঘাতে টলে যায় যিশু। ওফ। গাড়িটা না ছাড়লেই হত। আজই ফিরে যেতে পারত। অনুশোচনার সর্পাঘাতে আক্ষেপের বিষ ছড়িয়ে পড়ে অস্তিত্বে। হিমঘর অফিসের দোরগোড়ায় কূট প্রশ্নের মতন শেয়ালকাঁটা। গেটের বাইরে রাস্তার ওপারে দুলছে অর্কমন্দারের জংলি ডালপালা। বকুলপাখিদের উচ্চবাচ্যে মুখরিত।

    এরকম একটা জায়গায় রাস্তার ওপর স্পিডব্রেকারের হাম্প ! না আছে কাছে ইশকুল, না আছে জনবসতি। তোলা আদায়ের নতুন ধাঁচের জমিদারি খাজনা আদায়। হয়তো ভবেশকাই প্রথম তোলা আবিষ্কার করেছিল। তোলা আদায়ের খরচ মেটাতে পরিবার পিছু এক পয়সা। তাঁবার পয়সা চালু ছিল তখন। আর এখুন গতিকে স্তিমিত করা আর রুদ্ধ করার নাম প্রগতি।

    আত্মপ্রসাদে ভেজা কন্ঠস্বরে শাসমল বলল, চলুন না পৌঁছে দিই ; সাইকেলের পেচনের সিটে বসতে পারেন তো ? বাকসোটাকে কোলে ধরে নেবেন, যা অগনিশর্মা চড়চড়ে রোদ।

    সন্ধিক্ষণ। এ-ই তো সন্ধিক্ষণ। ভবেশকা নেই। সময়ের সম্রাজ্ঞী এখন খুশিদি। ওর পক্ষে অত্যন্ত হাস্যকর, সিটে বসে যেতে তক্ষুনি রাজি হয়ে যায় যিশু। কন্ঠের গোড়ায় লুকিয়ে থাকা আওয়াজহীন ঢক্কানিনাদ ঢিপ-ঢিপ করে ধাপে-ধাপে নেবে যাচ্ছে বুকের মধ্যে। জ্ঞান তো ক্ষমতার বনেদ। যে আবাদ করবে, সে-ই জানবে কেবল।

    প্রকাস করা যায় না এমন ত্রব্র আবেগের ধাক্কায় সারাটা পথ প্যাঙপেঙে সাইকেলের পিছনের সিটে চুপচাপ বসে থাকে ও, যিশু। আগে এরকুম কখুনও হয়নি। যৌনতা নয়। যৌনতা তো তৃপ্তির বাজারে অঢেল। ওর মাথার কাছে সঙ্গী এক হলুদ বোলতার বুঁবুঁবুঁ বুঁবুঁবুঁ সত্ত্বেও বসে থাকে কথাহীন উদ্বেগে। বুজলেন যিশুবাবু, আমার মতন টাকমাতা লোকের আপনার অমন একরাশ চুল দেকে হিংসে হচ্ছিল, সেইটেই জানান দিচ্চে বোলতাটা। যিশু বলল, বোলতাটা চুলের গোপন তথ্য জানতে পেরেছে বোধয় !

    দুপুরের রোদ এপাশ-ওপাশ আরম্ভ করেছে। হাসাহাসি করতে-করতে ইশকুল যাচ্ছে একদল ছেলেমেয়ে, খাতাপত্তর হাতে, ইশকুলই হবে, প্রাইমারি। জলতেষ্টায় দীর্ঘশ্বাস গেলে যিশু।

    পাতাঅলা ফণীমনসার ঝাড়ের কাছে, মাটিতে বাঁ আর প্যাডেলে ডান পা, রোদের উষ্মা বাঁচাতে মাথায় ধুতির খুঁট, শাসমল বলল, ওই কলাবাগানে, ওই যে, গোলাপি-গোলাপি করমচা হয়ে রয়েচে, ওর পাশ দিয়ে মিনিট দশেক হাঁটলেই ভবঠাকুরের নাচদুয়োর।

    পথার ধারে কচুরিপানা গিজগিজে জলায়, সংসার চিন্তায় এক পায়ে ঠায়মগ্ন মেচোবক। গঙ্গাফড়িঙের ঝিমুনির খাতিরে হাতের পাতা মেলে আছে জলকলমি।

    ঠিকাছে, কাল সকালে একবার আসব। ভুরুর ওপর বাঁহাতের ছায়া ফেলে,ক্যাসিয়ারের কাছ থেকে মুক্ত হল যিশু। শর্টকাটের বদলে ঘুরপথের মুখে ছেড়ে দিয়ে গেল লোকটা। এর চে তো একা গেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেত আলের ওপর দিয়ে।

    হাঁটছিল যিশু। কলাবাগান। রকমারি কলা। তেউড়ের ব্যবসা নিশ্চই। বেহুলা, মন্দিরা, বাতিসা, জাঁতিকোল, মালভোগ, কানাইবাঁশি, চিনিচাঁপা, জাহাজি, মনুয়া, ডয়বাকলা। একজন আইধোইরা তেউড় চাপাচ্ছিল ভ্যান রিকশায়, জানতে চাইল, কটা বেজেছে এখুন। যিশু বাঁহাত নাড়িয়ে দেখায় ঘড়ি নেই। কাজ আরম্ভ করার মুহূর্ত থেকেই অনেকে চায় তা তক্ষুনি শেষ হোক। করমচা গাছের পর বড়ো-বড়ো পাটিগাছ। কুচবিহারের মাথাভাঙায় এর শেতলপাটি হয়।

    পাটিগাছের লাগোয়া দরমার বেড়ার ওপর সার বেঁধে ছড়ানিটিকার সংলাপ বলছিল ফালতা পায়রাদের ভ্রাম্যমাণ দল। ফটফটিয়ে উড়াল দিলে অচেনা লোক যিশুকে দেখে। দরমার বেড়ার ভয়াবহ স্মৃতি থেকে মুক্ত হতে পারেননি ভবেশকা। কী ভয়ংকর এলাকা ছিল দরমার অভিশপ্ত কলোনিগুলো। খাস কলকাতার লোকে যেতে চাইত না ভয়ে। সন্ধে হলেই ময়ূরভঞ্জের রানির বাড়ি থেকে গোড়ে ওব্দি ওৎপাতা আতঙ্ক। মুসুলমান ফুলচাষিগুনো গোড়ে গ্রাম থেকে পালাবার সময়ে গ্রামের নামটা নিয়ে পালিয়েছিল, গোড়ের মালার সঙ্গে-সঙ্গে। সেই গোড়ে এখন নোংরা ঘিঞ্জি গড়িয়া। ভাবা যায় না।

    পরপর তিনটে ধানের মরাই পেরোয় যিশু। অব্যবহৃত পোর্টেবল শৌচাগার। ছায়ায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মাটির খয়াটে প্রতিমার ভিড়, কয়েক বছরের খড় বেরোনো, আঁচ করে যিশু, বোধয় শনি, শেতলা, বিশ্বকর্মার, রক্তাল্পতায় জ্ঞান হারিয়ে নিমতলায় অপেক্ষা করছে প্রকৃতির দাপটের জন্য। তাদের ঘিরে কংরেস ঘাস। বকফুলের গাছ। কত্তো ফিকে সবুজ বকফুল। আশশ্যাওড়া, হিমচাঁপা, কোকিলাক্ষ করবী, বেগনে রঙের কলকে। পায়ের কাছে ফুরফুরে সুসনি। পুকুরে চান করতে নেবেছে খুশিরানি মন্ডল।

    ১৯

    কে রে ওদিকে ? তিরস্কার-মাখানো কন্ঠস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে অপ্রস্তুত খুশিদি। তাড়াতাড়ি জলে নেবে কেবল মাথাটুকু জলের ওপর। চুল ভাসছে।

    আমি যিশু। যিশকা।

    যিশু ! তবে ? কালকেই তো বৈশাখী পূর্ণিমা। আমি ভাবলুম….

    কী করে ভাবতে পারলে খুশিদি ?

    আমি ভাবলুম আমার বয়েস ফুরিয়ে গেছে বলে..। খুশিদির মুখমন্ডলে ফোঁপানির পূর্বাভাস। প্রতিবিম্ব দোল খায়।

    তা ভুল। অমন ভেবো না। তুমি অপূর্বময়ী।

    তুই ঘরে গিয়ে জিরো। আমি একটা ডুব দিয়েই আসচি।

    না, তুমি চান করো। আমি দেখব। ঘাটের সিঁড়িতে ব্রিফকেস রেখে বসে যিশু। জুতো-মোজা খোলে। পায়ের পাতা জলে ডুবিয়ে বসেছে।

    অনেক অনেক অনেক অনেক বছর পর সাঁতার কাটছে খুশিদি।

    বুকের গামছা ভাসিয়ে দিয়েছে খুশিদি। শায়াও নাবিয়ে দিয়েছে ফাঁস খুলে। জলের চাদর গায়ে জড়িয়ে জলেতে খেলতে থাকে ছিপছিপে ঢ্যাঙা পেশল-গড়ন, এর একরাশ চুল। অনির্বচনীয় স্পন্দন ওঠে জলতলে। পুকুরটাকে জুড়ে সমগ্র ভূমণ্ডল চাষি-মেয়ের আনন্দিত নিরাভরণে অভিভূত। নারীর তরল রূপ পায় জলখন্ডের অমেয় কায়াকান্তি। আসক্ত করে তোলে দশাসই চিতল আর কাতলদের। মৎস্যকুমারী খুশিদি একজায়গায় কিছুক্ষণ তলিয়ে গিয়ে দেদীপ্যমান করে তুলছে আরেক দিকের জল। তলিয়ে ভেসে না-ওঠা ওব্দি যিশু রুদ্ধশ্বাস।

    হিরের টুকরোয় রুপান্তরিত জলের প্রাঞজল ফোঁটারা লাফিয়ে উঠছে বিশাল প্রজাপতির দানার ঝাপটায়, তারপর ছত্রখান হয়ে যাচ্ছে জলের ওপর পড়ে। বাতাস আচমকা নিরুচ্চার। রোমহর্ষে আক্রান্ত হয়েছে ঘাটের পাশে আমলকি পাতারা, নিঃশব্দ জলতরঙ্গের রিনরিন পাতায় পাতায়। এপার থেকে ওপারে, ওপার থেকে এপারে, ওইদিকে, এইদিকে, চারিদিকে, যিশু যেদিকে তাকায়, পুকুরের জলকে উদ্ভাসিত করে তুলছে ত্বকের আলো। রোখ চেপে গেছে প্রথম আনর্গল উৎসর্জনের, নিজেকে উজাড় করার কমনীয়তা। নমনীয়তায় ভর করেছে আজীবন জমানো ব্যথা বেদনা পুলক অভিমানের ভাঁড়ার।

    স্বতঃপ্রবৃত্ত পুকুর সাঁতরাচ্ছে খুশিদিকে ঘিরে, সারা গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছে আপ্যায়ন। নারীর জ্যোতির্ময়ি আদলে রূপান্তরিত হয়েছে জলে আটক তরল দুপুর। আর জলেতে ছড়িয়ে দিচ্ছে গাছের ফাঁকে-ফাঁকে এসে-পড়া সূযফরশ্মির গুঁড়ো। মুক্তি পেয়ে গেছে শাড়ি শায়া ব্লাউজ ভিতরের জামায় এতকাল অন্তরীণ দেহলাবণ্য। মুক্তি পাচ্ছে খুশিদের মাথার মধ্যে জমা উদ্দেশ্যহীণতা, অবসাদ, দিনানুদৈনিক।

    দুই হাঁটুর ওপর দু’কনুই রেখে, দু’হাতের পাতায় দুই গালের ভার ছেড়ে দিয়ে, পায়ের পাতা জলেতে, ট্রাউজারের কানাত ভিজছে, যিশু সুনতে পায় নিজের হৃৎপিণ্ডের ক্বণ, নিক্বন, শিঞ্জন, শিঞ্জিনী। মসিদখানি, রেজাখানি শুনতে পায়। ঝাঁজ, ঝাঁজর, দগড়, চিকারি, খমক শুনতে পায়। দেখতে থাকে খুশিদির বিভোর ভাসমান বুক, জানু, মুখশ্রী, এলোচুল, অনাবিল ব্যাকস্ট্রোক, প্লবমান চিৎসাঁতার, উড্ডীন বাটারফ্লাই, অনুসন্ধানী ডুবসাঁতার। এক ঘন্টা, হয়তো দু’ঘণ্টা হয়ে গেল, হুঁশ নেই। জলের সঙ্গে খেলছে চাষিমেয়ে। বাড়িয়ে তুলছে জলের তাপমাত্রা।

    যিশু আমূল সন্মোহিত। পৃথিবীতে ভ্রুক্ষেপ বলে কিছু নেই। লবনাম্বু উদ্ভিদের জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গমের মতন ও, যিশু, টের পায়, অনুরণনের দপদপে লয়ে নিজের উদগ্রীব, থমথমে, উপদ্রুত আহ্বান। খুশিদির বয়েস একটা স্হিতিতে স্হির হয়ে আছে। তারপর আর বাড়েনি। খুশিদির চেয়ে ইতিমধ্যে বয়েস বেড়ে গেছে যিশুর।

    শুশুকের মতন জলের পোশাকসুদ্দু আচমকা উঠে, বাঁহাতে গামছা আর শায়া, জলের তৈরি সলমা-সিতারায় ঠিকরোচ্ছে রোদ্দুর, জলের তৈরি স্বচ্ছ পুঁতি বেজে উঠছে প্রতিটি চুলের প্রান্তে, যিশুর কাঁধে ডান হাতের ভর দিয়ে, খুশিদি একছুটে গিয়ে দাঁড়াল ভাঁড়ারঘরের ছেঁচতলায়। ডাকে হাতছানি দিয়ে। দরোজার আগড় ঠেলে চলে যায় ভিতরে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে স্পর্শ করলে গড়ে ওঠে এক ব্যাখ্যাহীন দায়দায়িত্ব।

    এক হাতে জুতো জোড়া, আরেক হাতে ব্রিফকেস নিয়ে ঘরে ঢুকে যিশু দেখল উদোম খুশিদি চুল ঝাপটাবার আগে গামছা নেঙড়াচ্ছে। ভিজে চুলের প্রান্ত থেকে শানের ওপর টুং টাং টিং টুং ঝরে পোড়ে মিহিন বাজনা-তরঙ্গ তুলছে পোখরাজের খুদে-খুদে পুঁতি। প্রতিটি জলফোঁটার পতনে, আশ্চর্য হয় যিশু, বালক-বয়সে শোনা মায়ের কন্ঠ আবছা ভেসে আসছে :

    টুং : যিশকা, দুপুর রোদে টো-টো করতে বেরিয়ো না, জ্বর হবে।

    টাং : ওদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা কোরো না যিশকা, ওরা হিদেন।

    টিং : আজকাল যিশকা তোমার কথাবাত্রায় রিফিউজিদের মতন টান এসে যাচ্ছে।

    টাং : তুমি নাকি দক্ষিণেশ্বরে হিন্দু টেম্পলে গিসলে যিশকা।

    টুং : খুশির সঙ্গে অমন হাসাহাসি কোরো না যিশকা। ওরা ইল ম্যানার্ড, চাষাভুষো।

    টিং : চাদর নোংরা হলে কাচতে বের করে দাও না কেন যিশকা।

    টিং : যিশকা, অত বাংলা স্টোরি বুকস পড়ে সময় নষ্ট কোরো না।

    টাং : তোমার চুল সবসময়ে অত আনটাইডি থাকে কেন যিশকা।

    টুং : অত-অত ভাত ছোটোলোকরা খায়।

    টিং : স্কুলের খাতায় ওসব হিজিবিজি লিখেছ কেন।

    খুসিদিএ স্মিতস্নিগ্ধ আভায় ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে টলটলে শীতলতা। ঝিকমিক করছে কেশকূপ। অবিনশ্বরতার সমারোহ মনে হয়। চোখের তারায় আত্মগোপনরত রূপাতীত বিষাদের শিশিরবিন্দু ঝরে পড়ছে মেঝেয়। চোখ দুটো আরোগ্যকামনার মতন আয়ত। জুতো আর বাকসো মাটিতে রেখে লুই ফিলিপে আর পিয়ের কার্ডিন থেকে দ্রুত মুক্ত হয় যিশু। দু’বাহুতে নিয়েই, আঃ, কী শীতল। একেই হয়তো প্রাণ জুড়িয়ে-যাওয়া বলে। সামুকের মাংসের মতন ঠাণ্ডা কোমলস্বভাব বুক। অস্ফুটস্বরে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। নিশি-পাওয়া প্রাণীর মতন স্পর্শেন্দ্রিয়। হৃৎস্পন্দনে থিরথির কাঁপছে ত্বক, চ্যাটালো নিম্ননাভি।

    প্রায়ান্ধকার বিশাল ঘরটা, এ বাড়ির সবচেয়ে বড়ো ঘর, যেন নিঃসঙ্গ শোকসন্তপ্ত অচলায়তন। খেতমজুরের, চাষির আর শ্রমিকের হাতিয়ার আর যন্ত্রপাতি আর কাজের জিনিসে ঠাসা ঘরখানা।

    আষ্ঠেপৃষ্ঠে, চাউনির ওপর চাউনি মেলে, শুকনো স্পর্শের ওপর ভিজে স্পর্শ সামান্য তুলে খুশিদি বলল, হ্যারে যিশকা, সকাল থেকে কিচু খাসনি বুজি ? মুখ থেকে খিদের গন্ধ বেরুচ্চে ? সিগ্রেটের গন্ধও বেরুচ্চে। তোর গা কী গরুম !

    হ্যাঅ্যা গো, খাইনি কিছু। সত্যি, তুমি আমার মা আমার দিদি আমার বউ আমার বন্ধু আমার গডেস, সবকিছু। ডেঁড়েমুশে আদর করছিল যিশু। গতরের মোহময় নিভৃতি জুড়ে চারিয়ে দিচ্ছিল এক্তিয়ার, যথেচ্ছ প্রবণতা। দু’গাল ভাত বসিয়ে দিই। আরেকবার নেয়েনে।

    সৌজন্য জানাবার ভঙ্গীতে, ঘরের মেঝেতে ডাঁই-করা মাছ ধরবার জালের ওপর এলিয়ে পড়ে খুশিদি। দেয়ালে খুঁটিতে, কোণে, মেঝের ওপর, বেড়াজাল, বিনজাল, পাঁতিজাল, খেপলা জাল, কুঁড়ো জাল, ভাসা জাল, চুনো জাল, টানা জাল, শ্যাংলা জাল, উঁখা জাল, ধর্ম জাল, খেটে জাল, বেঁওতি জাল, ঘুরণ জাল, ওঃ, কতরকুমের আঁশটে গন্ধের জাল !

    অ্যাতো জাল কী হয় গো ?

    ভাড়া খাটে।

    ভাড়া ?

    হ্যাঁ, মাঝি জেলে মালোরা নিয়ে গিয়ে মাছ ধরে। খালে বিলে পুকুরে দামোদরে যায় গঙ্গায় যায় সমুদ্দুরে যায়।

    যিশু চুপসে যায়। সেই ভবেশকা। শ্রমিকদের আর শিষিতের নেতা ভবেশকা। আজকে তাদের হাতিয়ারকে ভাড়া খাটাচ্ছে। এই ঘরের সবই ভাড়ার, অবিশ্বাস্য। লাঙল, জোয়াল, ডিজেল-পাম্পসেট সব, সব, সব ভাড়া দেবার জন্যে।

    ওই পেতলের ঘড়াগুনো ? ওগুনোও ভাড়া দেবার ?

    না, ওগুনো বন্দকিন। চাষি বউরা, মুনিশ বউরা বন্দক রেকেচে।

    বন্ধক ?

    বন্দক জানিস না ? বনদোওওওক বনদোওক। ঘড়া-বাসন বাঁধা দিয়ে ট্যাকা ধার নিয়েচে।

    সুদে টাকা নেবার জন্যে ?

    হ্যাঁরে। একশো ট্যাকায় মাসে দশ ট্যাকা।

    মাসে ?

    হ্যাঁ, মাসেই তো। কেন ?

    ঘড়াগুনোর ওপর, যেগুনো খুশিদির মাথার কাছে রাখা, দেখতে পাচ্ছিল যিশু, তাতে ছোটো-ছোটো কাগজ সাঁটা। কাগজের ওপর নাম আর তারিখ দেওয়া। লক্ষ্মী লোহার। পদ্ম মান্না। বিবিজান। রাধা পোড়েল। চম্পা সাঁপুই। কনকবালা দাস। আশা ঘরামি। আরও অনেক অনেক অনেক অনেক। পিতলের বাসন চিরকাল থেকে যাবে। মন খারাপ হয়ে যায় যিশুর।

    তোমার পিঠে ফুটছে না তো ? উষালগ্নের মতন বাহুমূলে ছুঁয়া বুলিয়ে জানতে চায় যিশু। দৃশ্যমান জগৎ থেকে এই ঘরের বস্তুপৃথিবীকে অস্বীকার করার জন্য ও চোখ বোজে।

    খুশিদির চাউনি হিমায়িত, শ্বাস গনগনে, খিদের গন্ধের খোঁজে পুরুষের হাঁ-মুখে নারীর অনাস্বাদিতপূর্ব জিভ। গলা-কাটা মোরগের মতন কেঁপে ওঠে শরীর। সাপ যেভাবে জিভ দিয়ে গন্ধবস্তুর কণা বাতাস থেকে তুলে নিয়ে নিজের ঘ্রাণিকা ইন্দ্রিয়ের গ্রন্হিতে মাখিয়ে নেয়, ওরা দুজনে একে আরেকের ভারাতুর অনুভূতি মেখে নিচ্ছিল অসংলগ্ন কথাবার্তা দিয়ে। প্রমোদ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে ওদের হাত, ভক্তিনম্র স্পর্শ।

    কাল, বৈশাখী পূর্ণিমার সন্ধ্যায়, শেষপুকুর ছেড়ে যাবার বিস্তারিত পরিকল্পনা শুনে খুশিদি বলল, আমার তো কেমন যেন ভয় করচে, আজগে এক্ষুনি চলে গেলে ভালো হতো। শুনে আবার অনুশোচনা হল যিশুর। গাড়িটা রেখে দিলেই হতো বরং। খুশিদির ভয়ের যে কী আছে এই বয়েসে।

    তোমাকে তো জোর করেই নিয়ে যেতে পারি।

    না না না না না না।

    অদ্ভুত, সত্যি। ভাবল যিশু। পশ্চিমবাংলার গ্রাম মানেই ভয়ের চক্রব্যূহ।

    এ-ঘরেই শুস তুই যিশকা। থালে দাদার সন্দেহ হবে না। মশারি টাঙিয়ে দেবোখন রাত্তিরে। তুই যদি পালটি ঘর হতিস কত ভালো হতো থালে।

    পালটি তো। তুমি মেয়ে, আমি ছেলে।

    খুশিদি ওঠে ওভাবেই, নিরাবরণ, খাটের ওপর রাখা জালগুলো নাবায়। খাটের তলায় রাখা মরচে-পড়া হাতুড়ি দুরমুশ কাস্তে করাত কাটারি উকো নিড়ুনি হেঁসো টাঙি বল্লম খন্তা গাঁইতি দাউলি কোদাল ঠিক করে সাজায়। ঘরের মাঝে রাখা ডালা কুলো ডাবড়ি চারি সিউনি তসলা ধামি এক-এক করে এক পাশে সরিয়ে গুছিয়ে রাখে। কাজের দ্রুততায় যিশু অবাক, মুগ্ধ। গেমে গেছে। ছাদ-পাখার সুইচ টিপে বলল, ঠিকাছে, চলছে, রোজই তো অ্যাগবার দুবার ঢোকে দাদা।

    জিরিয়ে নাও একটু, ক্লান্ত হয়ে গেছো।

    যাঃ দাঁড়া, চাদর তোশক বালিশ আনছি। তুই ততোক্ষুণে পুকুরে একডুব দিয়ায়।

    চান তো করেই বেরিয়েছি সকালে। আরেকবার তোমাতে ডুব দিই। দখলের অপ্রতিরোধ্য চাহিদায় যিশু বাহুবদ্ধ করে খুশিদিকে। বিচ্ছুরিত ঘামসুগন্ধের আ-আলজিভ ঘ্রাণ নিলে। ওর হাতের ঔৎসুক্য ফুরোয় না।

    যাঃ, শরীর খারাপ হবে। খালি পেটে রইচিস না।

    হলেই বা। নিষেধ থাকলেই ভাঙতে হয়।

    আচ্ছা, সেবার যেসব মন্তর আমার জন্যে পড়েছিলি, সেগুনো আরেকবার বলবি ? যিশকা ?

    যিশু কাঁধ কাঁপিয়ে হাসে। নতজানু, জড়িয়ে ধরে উতলা আগ্রহে। বলে, তুমি শান্ত, তুমি দাস্য, তুমি সখ্য, তুমি বাৎসল্য, তুমি মধুর। যিশু উঠে দাঁড়ায়।

    দেহের হালকানো ভার যিশুর ওপর ছেড়ে দিয়েছে খুশিদি। আর খুশিদি, নিঃশব্দ কান্নায় কেঁপে-কেঁপে আপ্লুত করছে ওকে। খুশিদির চোখের জল নিজের গালে অনুভব করে যিশু। জিভ দিয়ে কান্নায় নুনের স্বাদ পায়। খুশিদির থুতনিতে টোল। কাঁপছে।

    চুপ করলি কেন ? আরও বল, যিশকা।

    তুমি অনিমা, তুমি লঘিমা, তুমি গরিমা, তুমি প্রাপ্তি, তুমি প্রকাম্য, তুমি ঈশিত্ব, তুমি ঈশিত্ব। এসব মন্তর যিশুখ্রিস্টের মায়ের জন্যে।

    সে কে ?

    আমার মা-বাবার ভগবান। যিশু কৈশোরের স্মৃতিতে যেতে চেষ্টা করে।

    চুপ করে গেলি কেন ? চুপ করিসনি। বল। বলতে থাক। যিশকা।

    তোমার ডান কাঁধে পোকা কামড়াল বোধয়। লাল হয়ে গেছে।

    ওটা জড়ুল। জন্মে ওব্দি আচে। তুই থামলি কেন ? খুশিদির কন্ঠস্বরে ভাঙন।

    তুমি মঙ্গলা, তুমি বিজয়া, তুমি ভদ্রা, তুমি জয়ন্তী, তুমি নন্দিনী, তুমি নারসিংহী, তুমি কৌমারী। কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর শেষতম নিদানের মতন যিশুর ফিসফিস, আর কত কষ্ট পেতে চাও খুশিদি ? কেনই বা চাও ?

    খুশিদি সটান দাঁড়িয়ে আছে চোখ বুজে, ওপর দিকে মুখ, চাষি-মেয়ের শ্রমসোহাগী পেশল বাহু ঝুলে আছে দু’পাশে, কাঁধে এলিয়ে নাবা ভিজেচুলে বুক ঢাকা, নাভির ঘাম শুকোয়নি এখুনও, পায়ের গোছ আর পাতা জুড়ে অনুপম কৌলিন্য।

    মুগ্ধতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যে সত্তা, তার দুর্নিবার ঔজ্জ্বল্যের সঙ্গে পরিচিত হয় যিশু।

    ২০

    বুকড়ি চালের ভাত আর আগাছা ট্যাংরার ঝোল খেয়ে, অবেলা ওব্দি ক্লানত গুম ধেকে উঠে, দাওয়ায় বেরিয়ে যিশু দেখল, হাতল-আলা চেয়ারের পিছনের দু-পায়ায় ভর দিয়ে দোল খাচ্ছে ভবেশকা। কালো ভারিক্কি চশমা। বাঁ পায়ে ভয়ানক ঢেউ-খেলানো গোদ।

    ভবেশকার পায়ে গোদ ! ভাবা যায় ? লাফিয়ে উঠে যেত পুলিশের ভ্যানে। মিছিলের নেতৃত্বে হেঁটে চলে যেত এসপ্ল্যানেড ইস্ট পর্যন্ত। একবার তো কলেজ স্ট্রিটে বাসের ছাদ থেকে রাস্তায় নেবেছিল লাফিয়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজের ছেলেরা দেখেছিল, অ্যালবার্ট হল কফিহাউসে বসে গল্প করেছিল বহুকাল ওব্দি। গোদের জন্যই বোধয় গেরুয়া আলখাল্লা। আলখাল্লার জন্যে সত্য সাইবাবা।

    জলেতে ভুরু ভাসিয়ে-রাখা কুমিরের মতন চশমার ফ্রেমের ওপর দিয়ে চোখ তুলে নাকচ-করা দৃষ্টি মেলে, সর্দিগর্মিতে নাকবন্ধ গলায় ভবেশকা বলল, কী এখুনো আলুর রিপোর্ট ফাইনাল কত্তে পাল্লে না ? কী-ই বা আচে এতে ? আমি তো অ্যাক দিনে লিকে দিতে পাত্তুম।

    এরম অনেক মানুষ আছে। জানতে না চাইলেও নিজের বিষয়ে বলবে। গতবার তারকেশ্বর লোকালে, ঠাসাঠাসি-গাদাগাদি ভিড়ে ওর, যিশুর, গায়ের ওপর দাঁড়িয়ে এনতার কথা বকছিল দুজন বউড়ি যুবতী। ছোট্টখাট্ট গোলগাল, অত্যধিক সিঁদুর। যিশু বসেছিল, আর ওর দিকে মুখ করে ওরা দুজন দাঁড়িয়ে, ওর কাঁধের ওপর দিয়ে জাল আঁকড়ে। ওদের নির্ভেজাল অতিমাংসল বুকে যিশুর নিশ্বাস পড়ছিল নিশ্চয়ই। চানাচুর চিবোবার শব্দের মতন ওদের একজন বলে উঠেছিল, আমো তো অ্যাকদোম সেন্টটেন্ট মাকি না। যিশুর বিদেশি পারফিউমের প্রতি কটাক্ষ। দার্শনিক গাম্ভীর্যের আড়ালে যিশু বুঝতে পারছিল, এদের মাংসের ঘর্মাক্ত অকৃত্রিম গন্ধ যদিও ওর খারাপ লাগছে, তবু তা এক ঝটকায় বিপথগামী করে দিতে পারে। ওদের লাল ব্লাউজের আহ্বায়ক বাহুমূলের টানটান সাদা সুতোর সেলাই, যিশুকে চোখ বুজতে বাধ্য করেছিল।

    বউ দুটির তক্কাতক্কি, কার জামাইবাবু শালির পেটে বাচ্চা এনে ফেলেছিল, দোষ তিনজনের মধ্যে কার, এখুন কী করণীয়, তাই নিয়ে। কইকালার ঘরজামাই নিতাই সাহা। শালি, একমাত্র, কণা। বউটার নাম আলোচনায় আসেনি। ওদের গল্পের থুতুর ছিটে লাগছিল নিরুপায় যিশুর মুখে-হাতে-গলায়। হাওড়ায় নাবার সময়েও নিষ্পত্তি হয়নি কার আত্মহত্যা করা উচিত, তিন জনের মধ্যে কার। প্ল্যাটফর্মে পা দিয়ে, ওদের পাশ দিয়ে যেতে-যেতে যিশু আলতো শুধিয়েছিল, দুজনকে দুপাশে নিয়ে শুক না নিতাই, ঘটেই যখন গেছে ব্যাপারটা।

    এখন, এই মুহূর্তে, ভবেশকার কথার কী উত্তর দেবে ? ভবেশকা বোধয় দুর্ব্যাবহারের সম্ভাবনা গড়া তোলার লোভে পড়েছে। কারণ, মনে হয়, আলু। একদা হুগলি জেলার কংরেসিরা বাজার থেকে আলু লোপাট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে আস্তিন গুটিয়ে বাসে-ট্রামে আগুন ধরিয়ে গুলিতে মরার জন্য রাজপথে নেবেছিল পরোয়াহীন যুবক ভবেশকা। আজ পায়ে গোদ, গেরুয়া, বাবরি চুল, আলখাল্লা, বুড়ো, মহাজন, ভূস্বামী, আঙুলে গ্রহরত্নের রুপোর আংটি, ধর্মগুরু, দলাদলি, ভবেশকার কিচ্ছু যায়-আসে না। হাজার-হাজার কুইন্টাল আলু পচলে, আলু-চাষি সর্বস্বান্ত হলে, আলুর দাম পাকা বাজারি-কাঁচাবাজারি দাঁওপ্যাঁচে নিম্নবিত্তের পক্ষে অসহনীয় হয়ে গেলেও কিচ্ছু যায়-আসে না। পচা আলু আসা আরম্ভ হয়ে গেছে শহরগঞ্জের বাজারে। চাষিরা গোর দিচ্ছে।

    নির্লিপ্ত নির্বিকার নৈর্ব্যক্তিক মহারাজ ভবেশকা বসে আছে প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকত্বের জাদু-সিংহাসনে, নাক ফুলিয়ে, হাসি নেই। জিভের ভাষায় আড় পর্যন্ত পালটে, করে ফেলেছে স্হানীয়। পায়ের গোদে হাত দিয়ে হিন্দুয়ানি প্রণাম করে যিশু বলল, প্রান্তিক চাষিদের সার আর সেচের চাহিদা-জোগানের ব্যাপারটা দেখিনি তখুন, আজকে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে নেব। তুমি ভালো আছ তো ? কথাগুলো বলতে-বলতে যিশু দেখল বারান্দায় ঘটি আর জলভরা বালতি রাখা রয়েছে। গোদ-ছোঁয়া হাতটা ধুয়ে নিতে হবে।

    আমি ? হঁ। আরে আমরাও তো সব কল্লুম, নইলে কোতায় থাগতে তোমরা আজগে ? তা ভেবে দেকেচো ? এই যে ধরনা, ঘেরাও, বয়কট, অবরোধ, ধীরে চলো, কর্মবিরতি, র‌্যালি, সমাবেশ, হরতাল, পথসভা, গেটসভা, এইসব ? এই সব গণতান্ত্রিক হাতিয়ার। এসব চাড্ডিখানি কতা নয় হে। নদী যেভাবে নিজের ঘোলাস্রোতে গা এলিয়ে দেয় বর্ষার বাজে কথায়, ভবেশকা, দরবেশ-পোশাক ভবেশকা, বলে যায় নিজের অভ্যস্ত গল্প। নিমের দাঁতনের মতন আতীতকে চিবিয়ে-চিবিয়ে ছিবড়ে বার করে ভবেশকা। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, থামে হেলান দিয়ে শুনতে-শুনতে, খেই হারিয়ে ফেলে যিশু। ওর চারপাশে ওড়ে খোশমেজাজ বুদবুদ।

    আচমকা একটা কোকিল ডাকতে আরম্ভ করে। উত্তেজনার পর্যায়ে উঠে যায় পাখিটার ডাক। ভবেশকাকে বাধ্য করে রোমন্হন পালটাতে। তোমার জন্যে কামারপুকুরের বোঁদে আর সিঙুরের দই আনিয়ে দিয়েচে কৃপাসিন্ধু, জলখাবারে খেয়ে দেকো। আর খানাকুল থেকে কালাকাঁদ আনতে বলেচি বিষ্ণু সাঁবুইকে।

    যিশু ফিরে আসে সম্বিতে। মিষ্টিগুনোর নামের মধ্যে মিষ্টিগুনো আর নেই। শব্দের মানে ব্যাপারটা পশ্চিমবঙ্গে আজ মৃত্যুশয্যায়। ও, যিশু, দেখল, আর্কাজাতের করলার জন্যে টাঙানো তারের মাচার তলায় ঢুকে, বেলে-দোআঁশ মাটিতে বসানো হলুদ চারার কেয়ারি বাঁচিয়ে করলা লতার শুকনো পাতা ছাঁটাই করছে খুশিদি, কুঁজো বুড়িদের মতন ঝুঁকে। খুশিরানি মন্ডল। পনেরো থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বয়সের স্হিতিস্হাপকতাকে ইচ্ছেমতন নিয়ন্ত্রণ করে খুশিদি। বিশুদ্ধ আকর্ষণ ছাড়া বিশুদ্ধ যৌনতা হয় না। কীভাবে, কোথায়, মুলতুবি ছিল এই আকর্ষণ ? মস্তিষ্কে ? হবেওবা।

    আচ্ছা ভবেশকা, তুমি নিজেও বিয়ে করলে না, খুশিদিকেও আগলে-আগলে রাখলে, বিয়ে দিলে না। কেন বলো তো ? যিশুর অযাচিত প্রশ্নে আপ্রস্তুত ভবেশকার ্তচকিত চমক। যেন এই প্রশ্নের উত্তর আজীবন লুকোতে-লুকোতে নেশা ধরে গেছে কোনও গোলকধাঁধার আমোদে। হরিণের উৎকর্ণ মাথা নাড়িয়ে খুশিদি রান্নাবাড়ির দিকে চলে যায়।

    ভবেশকা দু-হাত সামান্য তুলে ঘোরায়। বলল, লোকে করলা, লাউ, কুমড়ো, চিচিঙে, ঝিঙে গাছে আজগাল ডিডিটি আর বিএচসি দিচ্চে, ভাবদে পারিস, অ্যাঁ ? দেকগিজা, দেকগিজা, আমার মাটিতে লেদা, চুঙি, পাতামোড়া, কুরনি, গণ্ডারে, কাঁটুই কোনও পোকা পাবি না তুই। হাতের তালুতে আগুনে-বাত হয়ে চামড়া উঠছে ভবেশকার, বলল, পানের চাষও করেছিলুম, বুজলি, আংরা দাগ ধরে বড্ডো, নইলে…

    জবাজবদিহি চেপে রাখত চাইল না যিশু। আত্মতৃপ্ত প্রশান্তি থেকে নাড়া দিয়ে ভবেশকাকে টেনে বের করার চেষ্টায় নাছোড়, অস্বাভাবিক প্রত্যয়ের সঙ্গে জানতে চায়, কই বললে না তো, সংসার পাতলে না কেন ? সামান্য থেকে, সতর্কতা মিশিয়ে সন্তর্পণে যিশু বলল, খুশিদিরও বিয়ে দিলে না কেন ?

    যিশুর দিকে না তাকিয়েই হাসল ভবেশ মণ্ডল। পরস্পরকে বিব্রত করার মতন কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। থামে হেলান দিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় যিশু। হাসনিহানার নিরিবিলি গন্ধের বিচ্ছুরণে দুজনেই টের পায়, সন্ধে নেবেছে বহুক্ষুণ। জুনিপোকার উড়ন্ত আলোয় ধুকপুক করছে অন্ধকার। নিষেকের পর করলা-ফুলের ডিম্বাশয় চুপচাপ রূপান্তরিত হচ্ছে ফলে।

    চেয়ার থেকে তার ক্যাঁঅ্যঅ্যঅ্যচ শব্দটা নিজের পাছার সঙ্গে তুলে নিয়ে ভবেশকা বলল, ভবিতব্য হে ভবিতব্য। যেন ভবি আর তব্য আলাদা-আলাদা।

    মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যিশু দেখতে পায় মশারির বাইরে খুশিদি। উঠে এসেছে নিজের ঘর থেকে। অনুচ্চস্বরে বলল, যিশকা, সরে শো, একটু জায়গা দে।

    এত অস্ত্রশস্ত্রের ঘরে কেন শুতে দিলে খুশিদি ? জিগ্যেস করেছিল যিশু, যখন যিশুকে করলা-ফুলের পরাগ মাখিয়ে আর নিজে কাকভোরের বাতাস মেখে চলে যাচ্ছে খুশিদি। আর খুশিদি বলেছিল, শিয়োরে লোহা নিয়ে শুলে ভুতপেত দূরে থাকে। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল যিশু। ঘুম ভাঙলে শেনতে পায় খুশিদির একটানা কন্ঠস্বর:-

    কোতায় আচো গো মাতা লক্ষ্মী দয়াবতী

    কাতরে তোমার পায়ে করিগো মিনতি অ্যাকেতো অবলা মোরা তাতে ভক্তিহীন বিদ্যেবুদ্ধি শক্তিহীন সদা অতি দীন

    না জানি করিতেস তুতি না জানি পুজোন কেমনে তোমারে মোরা করি আবাহন কেবলি ভরোসা মনে ইহা শূন্য আচে যে তোমাকে ডাকে তুমি যাও তার কাচে নিজ গুণে কিপা করি বসিয়ে আসনে কিপা দিষ্টি করো মাগো যতো ব্রতীজনে এই মাত্র বর তুমি দেও গো সবায় সতত ভকোতি যেন থাকে তব পায়

    লক্ষ্মীর রেফারেন্স রয়েছে যখন, তার মানে এটা বোধয় পাঁচালি, শুনে-শুনে মুখস্হ করে ফেলে থাকবে খুশিদি। এভাবে দিনের পর দিন মুখস্হ বলার কথাগুলোর কোনও মানে কি আর আছে খুশিদির কাছে ? যিশুর মনে হল এ যেন খুশিদিরই বন্দনা। আজানা কোনও কিছুর প্রতি খুশিদির এই প্রগাঢ় আত্মসমর্পণ আর বিশ্বাসের ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তার জন্যে হিংসে হয় যিশুর। কত লোক, হাজার-হাজার লোক, ইদের দিন নামাজ পড়ে। রবিবারের দিন চার্চে হাঁটু গেড়ে হাতজোড় করে বহুক্ষুণ নিঃশব্দ প্রার্থনা জানায়। মন্দিরের সিঁড়িতে বহুক্ষুণ যাবত মাথা ঠেকিয়ে থাকে। বিভোর হবার মতন ওই বীজ, খুসিদির সংস্পর্শে এসে, খুশিদির জন্যে, নিজের সত্তায় আবিষ্কার করে, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল যিশুর।

    বিছানা ছেড়ে জামাকাপড় পরে যিশু বেরিয়ে পড়ে গাঁয়ের আঁদুল-কাঁদুল ঘুরতে। ফেলে-ছড়িয়ে রোদ উঠেছে। রোদ্দুরের ভয়ে বটগাছটার ছায়াসঙ্গিনী তখুনও ওর তলা থেকে বেরোয়নি। বুড়ো শিব ঢাকা পড়ে আছে শুকনো বটপাতায়। কিংবা এখুন পার্বনহীন অনাদরে শেষনাগ হয়ে আছে। পাতাগুনো ওপর থেকে কয়েকটা সরিয়ে দিল যিশু। পিঁপড়ের কাতার। সাতসকালে কেউ এসে চিনিগোলা দুধ ঢেলে থাকবে। গাছটার ডালে ডালে বুনো মউমাছির চাকগুনো থেকে একাধ কুইন্টাল মোম বেরোয়। কত লিটার মধু আছে কে জানে। বটগাছটা মধু চায় না।

    মন্দিরে পুজুরিটা একা। দেবতার সাজগোজ চলছে। মেলার দোকানপাট অগাধ ঘুমে। তালটিকুরির দিকটায় দার্শনিক উদাসীনতায় হাগতে বসেছে বুড়ো আর জোয়ান। যাত্রাদল আসছে মেলায়। মুনমুন সেন আর তাপস পালের গালফোলা পোস্টার। যাক, ভালোই, বিকেল থাকতেই পুরো তল্লাট ছেয়ে যাবে অচেনা গাদাগাদি ভিড়ে। লাঙল আর জোয়ালের কাঠ কিনতে আসে মেলাটায় দূরদূর থেকে চাষিরা। বেগমপুর আর গুপ্তিপাড়া থেকে সং আসে। ঘন্টাকয়েক পর থেকেই লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়ে যাবে মেলায়।

    ভোরের আলোর কুচিকুচি ঢেউ যিশুর চোখেমুখে ঠাণ্ডা হাওয়া মাখাচ্ছিল।

    চারিদিকে মূষিক প্রসবকারী গর্ত। সারোতা, গোপের হাট, খেমাপাড়া, তেঘাট যাবার ছক্করগাড়ি আর ভ্যান-রিকশা এই ভোর থেকেই। রাস্তা পার হচ্ছিল একজন বুড়ো চাষি। হাতে ধরা দড়িতে রোগাটে দিশি গাই, পেট ঢোকা, পাঁজর জিরজিরে। যিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, গোরুটার আওয়া হয়েচে, গুয়াবুড়ি শাগ খাওয়াতে নে যাচ্চি। রোগ আর তার ওষুধ, দুটোর কিছুই জানে না যিশু। কী বলবে ? রাস্তার পাশে হিলুয়ার ভূঁয়ে নেবে-পড়ে ফিতে-কিরমিতে ভোগা গতরের বৃদ্ধ আর তার গাই।

    রাস্তার দু’ধারে আলুর বস্তা, একের ওপর আরেক, গোটা বিশেক করে, পড়ে আছে হিল্লে হবার অপেক্ষায়। কবে কে জানে। পাহারা নেই। রাস্তার কিনার-বরাবর একের পিছনে আরেক চাষি বা খেতমজুর, লুঙ্গি-গেঞ্জিতে, সাইকেলে তিনটে বস্তা চাপিয়ে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে, ভারসাম্য বজায় রেখে। কে জানে কোথায় যাচ্ছে। মুখ খুলে কথা বললেই কাহিল হয়ে পড়বে লোকগুনো।

    মোড়ের ঝুপড়িতে বসে চা আর ভাণ্ডারহাটির রসগোল্লা খায় যিশু। মহানাদের খাজাও ছিল। তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে চমচম খেতে ভালোবাসত খুশিদি। ছবি বিশ্বাসের বাড়ির পাশেই ছিল ময়রার দোকানটা। খ্রিস্টান চরিত্রে অভিনয়ের খুঁটিনাটি জানার জন্যে বাবার কাছে এসেছিল কয়েকবার। এখানে ভবেশকার বাড়িতে চায়ের ব্যবস্হা নেই। এককালে চায়ের পর চা না হলে ভবেশকার গলায় বক্তৃতা আটকে যেত। ভবেশকাদের যুগের আগে এমন ছিল যে ফরসারা কালোদের, ঢ্যাঙারা বেঁটেদের, শহুরেরা গেঁয়োদের, সবর্ণরা অন্ত্যজদের, পয়সাঅলারা গরিবদের, ধোপদুরস্তরা নোংরাদের, টেরিকাটারা উস্কোখুস্কোদের, রাজনৈতিক বক্তৃতা দিত। এখনও আছে অনেকটা। অ্যাবং, অ্যাবং, অ্যাবঙের শিকলি জুড়ে-জুড়ে কজনই বা অবিরাম বকে যেতে পারে। বাংলাভাষাটা তো আর সব বাঙালির নয়। বেশিরভাগ লোক তো স্যাঙাত হয়ে ল্যাঙাত খায়।

    চা খেয়ে, গোপের হাটের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে, একটা পেঁপে বাগান দেখতে পেয়ে, গাছে-গাছে কুর্গ-হানিডিউ জাতের সোমথ্থ পেঁপে, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে যখুন মনে-মনে প্রশংসা করছিল যিশু, বাগানের ভেতর থেকে দোহারা যুবক, জিনস প্যান্টে গোঁজা হাতকাটা গেঞ্জি, শহুরে স্মার্ট চেহারা, ডাকে ওকে, আপনি তো স্যার ভবঠাকুরের আত্মীয়, শুনেছি, হিমঘর নিয়ে গবেষণা করছেন।

    যিশুর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে ভয়। মাত্র ক’দিনে লোকে ওর গতিবিধির সঙ্গে পরিচিত। ভাগ্যিস মেলা আর যাত্রার ভিড় থাকবে, নইলে বিপদ অনিবার্য। গ্রামে আর ঘোরাঘুরি চলবে না। বহিরাগত সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা আর ঔৎসুক্য থাকবেই। যিশু বলল, দু-আড়াই কেজির ফল হয়, না ?

    যুবক তার গাছের অস্মিতা ধার করে। আজ্ঞে স্যার তিন কেজি ওব্দি হয়। যিশু এর পর মাটি আংলানো, বীজে সেরেসার ড্রাই মাখানো, মাটি চৌরস, নুভাক্রন স্প্রে, হাওয়া-পরাগি ফুল, কত মাদিগাছের জন্যে কটা নরগাছ, তরুক্ষীরের পেপেন, লালমাকড়, কুটে রোগ ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের সিরিজ সহযোগে যুবকের মনে শ্রদ্ধা তৈরি করলে, যুবক ওকে তাদের বাড়ি যেতে বলে। ওই তো, দেখা যাচ্ছে, স্যার আসুন না।

    আরেকদিন কখুনো, জানিয়ে, ফেরার রাস্তা ধরে যিশু। জানা রইল বাড়িটা, দরকারে কাজে লাগবে। কিন্তু ও খ্রিস্টান জানলে পুরোটা শ্রদ্ধা কি বজায় থাকত ? ভবেশকাই হয়তো সিংহাসনচ্যুত হয়ে যাবে, জানাজানি হলে। ভবেশকাও বলবে না কাউকে।

    ফিরে, যিশু দেখল, জাবেদালি এঁড়ে বাছুরটার লাফঝাঁপ সামলে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ভাগচাষিদের গ্রামীণ রাজনীতির বখরা দিয়ে বর্গা এড়াবার কায়দা করে ফেলেছে লোকে। ভবেশকার পরিবার বলতে কেবল ভাই-বোন। জাবেদালি ক্ষমতার বখরাটুকুতেই তৃপ্ত। অনেক জায়গায় তো ভাগচাষ এড়াতে লোকে এড়িয়ে যাচ্ছে চাষবাস, ইউকালিপটাস পুঁতে ফেলছে অথচ এখানেই পোলবা থানার হালসুই গ্রামে প্রথম বর্গা ক্যাম্প বসেছিল। হিমঘরের আলু পচিয়ে সেই পোলবা আজ জগদবিখ্যাত, সত্যিই জগদবিখ্যাত। পচা আলু থেকে চামড়ায় রোগ ধরেছে চাষিবউদের ; সারছে না।

    জাবেদালি জানালে, ভবঠাকুর হিমঘরে গেছে, যিশধ যেতে পারে যাবার থাগলে। হৃৎপিণ্ডে সমুদ্র চলকে ওঠে, শব্দ শোনা যায়। দাওয়ায় উঠে জুতো খুলে রেখে, তার পর নেবে হেঁসেলে ঢুকে যিশু দেখল, চাকা-চাকা আলু কাটছে খুশিদি। অত্যধিক ধেনো-টানা পথে পড়ে-থাকা মাতালের মতন একটা শোলমাছ বিলকিয়ে উঠছে থেকে-থেকে ঘরের কোণে। ধোঁয়াহীন চুলাটায় বোধয় প্রথম দিনের পর আর রান্না হয়নি। বাসনকোসন সবই কাঁসা আর পিতলের। এ-গ্রামে এখুনও স্টেনলেস স্টিল ঢোকেনি বোধয়। চালায়-ছাদে বুস্টার লাগানো অ্যান্টেনা দুতিনটে নেতাবাড়িতে নজরে পড়েছে গ্রামে। ভবেশকার নেই। কেবল-ও, পার্টির অনুমতি আর ট্যাক্স ছাড়া টানা যায় না।

    মেঝেয় বসে যিশু বলল, আমি তো বেজাত, মদ মাংস গোরু শুয়োর সব খাই।

    জানি তুই মেলেচ্ছো, ওই পিঁড়েটা নিয়ে বোস।

    তোমাকেও ম্লেচ্ছ করে তুলব।

    আমার কিন্তু বড্ডো ভয় করচে। আমি এমন অপয়া। অশথ্থগাছ তুলে পুঁতেছিলুম, তাই। অশথ্থগাছ ওপড়াতে নেই। নম্রতায় ঢাকা খুশিদির সত্যিকার আশঙ্কা।

    কুটনো কোটা হয়ে গেলে, তোলা উনুনের পাশে যখুন বঁটিটা মুড়ে রাখছে খুশিদি, যিশু বলল, ভবেশকাকে যদি বলি, আমি তোমায় নিয়ে যাচ্ছি, বিয়ে করতে চাই, তাহলেও রাজি হবে না ভবেশকা ; কেন, আমি জানি।

    না না না না না না। প্রায় আঁৎকে ওঠে খুশিদি। অ্যাকদোম পাড়িসনি ওসব কতা। খুশিদির আতঙ্কিত মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে কয়েক দশক যাবৎ জমানো অন্তরঙ্গ উচ্ছ্বাসের রক্তিমাভ আকুতি। পারবি তো ? যিশকা ?

    তোমাকে এভাবেই আগলে রেখে দেবে ওনার হিমসংসারে। কেন, আমি জানি। তার পর পচা আলুর মতন……

    তুই আজ বাইরে-বাইরেই থাক। আকাশের মুকও আজ যা দেকচি, বিকেলে হয়তো কালবোশেখি আসবে, ভালোই হবে একদিক থেকে। ভাঙা গলায় বলল খুশিদি। যেন নিজেই নিজেকে পাহারা দিচ্ছে। পোড়াবাড়ির ডাকবাক্সে বহুদিন পড়ে-থাকা চিঠির মতন কেমন এক প্রাপকহীনতা ভর করে আছে। উঠে পড়ে যিশু। হিমঘর রওনা হয় মোজা-জুতো পরে।

    সকালের উদার শীতবাতাসকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে অন্তরীক্ষ। রোদের কণায় ঘষটানি খেয়ে দিনের আলো ক্রমশ ্য়ে উঠছে অনচ্ছ। অশোভন বৈশাখী গরম। কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করার আগে পাতাহীন মগডালে বসে আছে তরুণ শকুনেরা। নিজেরই অনন্যোপায়, আকাঙ্খার আক্ষেপ, খুশিদির জন্যে পুনর্জীবিত বয়ঃসন্ধি, হিমঘরের দিকে যেতে-যেতে, নিজেকে বোঝার চেষ্টা করছিল যিশু। আর কখুনও তো এরম হয়নি, কারুর জন্যে। লাফিয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে নিজের ভেতর থেকে। ঢোলবাদকদের বাহুর দুপাশে বাঙ্ময় ডানা মেলে ছুটতে ইচ্ছে করছে আলের ওপর দিয়ে।

    হিমঘরে ভবেশকার দরবার বসেছে। চিন্তান্বিত ভবেশকা প্রৌঢ় আই-এ-এস আমলার ঢঙে কালো ফ্রেমের চশমা খুলতে গিয়ে হাত নেড়ে বলতে চাইছিল কিছু। চা ভরতি গেলাস টেবিলের ওপর থেকে পড়ে চুরমার। অস্বাচ্ছন্দ্যের তাৎক্ষণিক ঘোর থেকে চকিতে নির্মিত প্রসন্নতায় যেতে দেরি হয় না। এসো, এসো, পুলিন তুই টুলটায় বোস, যিশুকে বসতে দে।

    এক ডজন লোক হবে এখানে। একজন বিশাল-পাছা মহিলা, পঞ্চায়েত কি পার্টির উঠতি-নাবতি কেউ। যিশু কেবল কৃপাসিন্ধু আর শাসমলকে চেনে। পুরুষগুনোকে দেখে মনে ্চ্ছে এরা কেউ চান করে না, চুল আ#চড়ায় না, নিয়মিত দাড়ি কামায় না। একত্রত হলে গুজগুজ-ফিসফিস করে। বাঙালির রেনেসঁসের উত্তেজনায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী পূর্বপুরুষদের মাত্র চতুর্থ উত্তরপুরুষ ওব্দি পৌঁছে বাঙালি গ্রামসমাজে যিশু নিজেকে বেমানান পেল। এদের দেখে কথাটা স্পষ্ট যে ধুতি পরার রেওয়াজ গ্রামেও শেষ হয়ে এল।

    শাসমল ঘড়াঞ্চি সিঁড়িতে বসে। কিছু বলার জন্যে হাঁ করেছিল। মুখ বন্ধ করে অক্ষরগুনোকে ফুসফুসে ফেরত পাঠিয়ে দিলে। ওর পাশে হাতলভাঙা চেয়ারে ময়লামতন বেঁটে, গালে দুদিনের নুন-গোলমরিচ দাড়ি, গেরুয়া পাঞ্জাবি, অভিব্যক্তিহীন অলস চাউনি মেলে বলল, সকালে পেঁপে দেখতে যেওয়া হয়েছিল ? লোক ভালো নয় স্বপন সামন্ত। জেলাসদরে মিধ্যে চিটি লিকেচে আমাদের হিমঘর নিয়ে। যেন আমরা সবাই চোর আর উনি হরিসচন্দোর। ওর বাপটা তো অতুল্লো ঘোসের চাকর ছিল। ল্যাঙোট কাচত। আর গেঁটে বজ্জাত দাদুটা পোফুল্ল সেনের দয়ায় আলুর ট্যাকায় জমিজমা করে নিলে।

    টেবিলের ওপর তবলাবাদকের আঙুল নকল করে একজন বৃহদায়তন নিতম্ব বলল, জহোর্লালের দ্যাকাদেকি যখুন সুবাস বোসকে হেয় করছিল ওই পোফুল্ল ঘোস, কিরনসংকর রায়, নলিন সর্কার, নিমল চন্দর, তখুন ওদের ল্যাংবোট ছিল ওর দাদু।

    লোকটাকে দেখতে-দেখতে যিশুর মনে পড়ে গেল সেই অডিটারদের চেহারা, যাদের কিছুদিন আগে পুরুলিয়া জেলা সমবায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছিল। এই লোকগুনো বোধয় অন্যের জীবনকাহিনীতে তালাবন্ধ। বিপুলবপু লোকটা গ্রামের কিংবা ব্লকের কিংবা আরও বড়ো ভূখন্ডের সমসাময়িক রাজনীতিতে ভবেশকার চে উঁচুতে। চিৎকার করে মুণ্ডেশ্বরী নদীতে ঢেউ তোলে। নিজের কথাবার্তাকে বাকচাতুরীর আড়ালে কী উদ্দেশ্য দিতে চাইছে আঁচ করতে না পেরে, যিশির মনে হল, এরা সবাই পার্টিমণ্ডুক, ছদ্মবেশী বেকার, আর ও এদের একটা ওয়াক-ইন ইনটারভিউ দিচ্ছে।

    ও, যিশু বিবৃতির ঢঙে বলল, পেঁপেগুনো কিন্তু বিরাট-বিরাট।

    তা হবে না কেন ? ব্যাংকের লোন নিয়ে মহাজনি করা হয়। মহিলার মন্তব্য।

    তাই বুঝি ? যিশুর মনে হল, জগৎটা মিটমাটপন্হীদের। প্রত্যয়ও চাই আবার মিটমাটও চাই।

    আমাদের চাসিদের আতান্তরে ফ্যালেনি ? এই এনাদের জিগ্যেস করে দেকুন। রোগা, কালো, ময়লা-জামাকাপড় বৃদ্ধের উক্তি।

    আলু রপ্তানির নিষেদনামা তো উটে গ্যাচে। আফরিকায় দেসে-দেসে লোকে আলু খায় ভাতরুটির বদলে।

    টুলে-বসা পুলিন জ্ঞান দিলে ভবেশকা অবস্হা সামাল দ্যায়, আরে ওকে কী বোঝাচ্ছিস, ও নানা দেশ ঘুরেচে।

    এবার আমরা ওননো রাজ্যেও পাটাতে পারবো, বলল পাশের লোকটা, যার গা থেকে তিতকুটে গন্ধ বেরুচ্ছিল।

    পশ্চিমবঙ্গে শিষ্টভাষার নামে কলকাতায় যা আজ বাজারচালু, সেই লোকগুনোর কথা শুনে যিশুর মনে হচ্ছিল, দেশভাগ না হলে তা এক্কেবারে আলাদা হতো।

    আমাদের দোসে আলু পচেনি, আর বাড়তি আলু রাকিও না আমরা। গেরুয়া পাঞ্জাবি বক্তব্য পেশ করে। স্বপন সামন্ত যেসব চুগলি করেচে, সব মিথ্যে।

    ওফ, এরা এখুনও ভাবচে ও একজন আলুগোয়েন্দা। কেলেংকারি জড়ো করে-করে প্রতিবেদন লিখে কোনও অজানা ওপরঅলাকে পাঠিয়ে এদের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, ক্ষমতা সব নষ্ট করে দেবে। পশ্চিমবঙ্গে কেউ কি কোথাও সত্যিই আছে, যাকে ধরলে দুর্ভোগের প্রতিকার হয় ? কাঙধ কাঙপিয়ে স্বাভাবিক হাসি হেসে ফ্যালে যিশু। বাইরে মুটিয়াগুনো এখনও পড়ে-পড়ে ঘুমোচ্ছে, আর শেডের তলায় রাখা আলুর বস্তার সংখ্যা যথেষ্ট বেড়েছে। যিশু বেফাঁস বলে ফেলল, ওগুনো কী হবে ?

    ওসব আড়তদার, ফড়ে, মহাজনদের মাল, নিয়ে যাবে। ভবেশকার খোলসা।

    স্বপন সামন্তের অভিযোগের কপি দেয়া হয়েচে নাকি আবনাকে ?

    দেয়া হয়েচে, করা হয়েচে, শুনে আদিত্যর কথা মনে পড়ে গেল যিশুর। ওর জেরা করার কায়দা। ইংরেজ পুলিশ অফিসারদের কাছ থেকে অনুবাদ করে পেয়েছিল বাঙালি ঊর্ধ্বতনরা। দিয়ে গেছে অধস্তনদের, আদিত্যকে। সেদিন মোটরবাইকে উধাও হয়ে গেল আচমকা, অদ্ভুত। উপস্হিত লোকগুনোর মুখের ওপর চাউনি ঘোরাল যিশু, আর দেখতে-দেখতে মনে হল, মানহানি ব্যাপারটা সম্ভবত আর্থিক। আত্মিক নয়।

    না, তা ইমঘর নিয়ে ওনার সঙ্গে কোনও কথা হয়নি আমার। উনি যে চিঠি-ফিটি লিখে কমপ্লেন করেছেন, তা-ই জানতুম না। কপিটা পেলে মন্দ হতো না। অবশ্য ওসব কমপ্লেন-ফমপ্লেনে কারুর কিছু হয় না আজকাল। গাজোয়ারি ছাড়া কিচ্ছু আর কাজে দ্যায় না।

    হুঁ।

    সকালে বেড়াতে-বেড়াতে দেখলুম অত বড়ো-বড়ো পেঁপে, তাই দাঁড়িয়ে পড়েছিলুম। মুখগুনোর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল হতভম্ব যিশু, কেউ বিশ্বাস করছে না ওকে। কী বিপজ্জনক। বাড়িতে থাকলে সন্দেহ হতে পারে, আবার গ্রামে বেড়ানোটাও উদ্রেক করছে সন্দেহ। গত দশ-বিশ বছরে গ্রামে-গ্রামে, এমনকী কলকাতার সনাতন পাড়ায়-পাড়ায়, নতুন এক সন্দেহভিত্তিক বর্ণাশ্রম উদ্ভব হয়ে্ছে। নতুন তত্ত্বটার নাম শত্রুশিবির। তা থেকেই নতুন বর্ণ-বিভাজন। বাইরের লোক আর কোনও গ্রামে গিয়ে জমিজমা কিনে টিকতে পারবে না।

    চৌকাঠের কোণের গর্ত থেকে একটা গোবরিয়া বিছে বেরিয়ে বিবাদী বাগের রাস্তা পেরোবার মতন শুঁড় দিয়ে এদিক-ওদিক দেখে ঢুকে গেল বাইরে ছড়ানো-ছেটানো বাতিল আলুর ভেতর। রাস্তার ওপারে, আকন্দ গাছটার কাছে, খুলে কথা বলঅব মগ্ন শালিকদল। পশু-পাখি ছাড়া আর কেউ খুলে কথা বলে না পশ্চিমবাংলায়। পুঁটলি থেকে রামরোট রুটি, কাঁচা পেঁয়াজ, আলুমশলা নিয়ে, গামছা পেতে বসেছে চারজন মুটিয়া। বোধয় ব্রেকফাস্ট।

    টেবিলের ওদিকে কন্দর্প-ক্যাবলা ফরসা একজন কাগজ পড়ছিল, কালকের, হাঁইইইইহ আওয়াজ সহযোগে হাই তুলল। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পূর্বতন মালিকের ইঁটজিরজিরে নোনা কবরের ওপর কাকেদের ভরা সংসার। গোড়ায় আপনা থেকে গজিয়েছে বুনো কনকনটে। কন্দর্প-ক্যাবলা জানায়, ডাবল সার্কিট লাইনের তার চুরি হয়ে কোলাঘাটের একটা ইউনিট বন্ধ, পুলিনদা।

    অ।

    সবাই চুপচাপ। ইন্টারভিউ নেবার প্রশ্ন বোধয় ফুরিয়ে গেছে।

    হঠাৎ জাবেদালি অফিসঘরে প্রবেশ করে। লুঙ্গি আর খালি গায়ে। ঘর্মাক্ত। দৌড়ে এসেছে। চোখমুখ থমথমে। হাঁপাচ্ছিল। উদবিগ্ন ঘোষণা করে, হালিক ধাড়া গলায় দড়ি দিয়েচে, পুলিশ এয়েচে লাশ নাবাতে।

    অন্ধকারের বিস্ফোরণ হয়, আর গুঁড়ো-গুঁড়ো কালো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে দরবারিদের চেহারায়। সবাই এমন কনকনে তাকায় যেন যিশুই খুনি। ওকে একা ফেলে রেখে সবাই ছিটকে বেরোয় অফিসঘর থেকে, আর মাঠ ভেঙে গ্রামের দিকে দৌড়োয় । মহিলা সবার শেষে, পাছায় চেয়ারের হাতল আটকে গিয়েছিল বলে।

    তালা দিয়ে দি থালে। জাবেদালির ইশারায় উঠে পড়ে যিশু। ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন তোলে।

    ধারদেনা করে সাড়ে তিন বিঘে বুনেছিল। অবোসথা তো নিজের চোকেই দেকেচেন। বোরা বোনা আবার বারণ।

    পশ্চিমবঙ্গের বাইরে রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া সত্ত্বেও, পঞ্চাশ লক্ষ টন আলুর হিল্লে হবে না। হিমঘরেও জায়গা নেই। বিহার, উত্তরপ্রদেশে, অন্ধ্র, উড়িষ্যায় অনেক আলু হয়েছে। লুকিয়ে পাচার হবে নেপাল বাংলাদেশ বর্মায়। তার কিছু টাকা যাবে সুইস ব্যাংকে। গুজরাতের জমিতে তো জো নেই, তবু হয়েছে আলু। দুধ সমবায়ের জোরে সেখানে গোরু-মোষকে আলু খাওয়ানো যায়। যিশু জিগ্যেস করল, হালিক ধাড়া বন্ড পায়নি ?

    জাবেদালি উত্তর না দিয়ে বলল, আপনি এগোন।

    যিশু একটা সিগারেট ধরায়।

    জনশ্রুতির মতন বাতাস বইছে। মন্দিরের পাঁচিলের ওপর কয়েকটা চটুল কাক। মসজিদ বলতে এ-গ্রামে সবুজ-সবুজ চুড়ো-দেয়া মাঠের মাঝে একটা দেয়াল, ধবধবে সাদা। সুলতানি চারচালা বাঙালি মসজিদ আর হবে না। আরবদেশের মসজিদের নকল হবে কেবল। মন্দিরের বাইরে পুজোর উপাচার বিক্রির খাট পাতা। আকন্দফুলের মালা ঝোলানো খদ্দেরহীন দোকানটায় বুড়িটা ঢুলছে। একটা আলাপি কুকুর ল্যাজ নাড়ে। মদগর্বিত ষাঁড়। মদিরেক্ষণা মৌমাছি। ভিজে চিলের মতন ডানা ঝুলিয়ে রয়েছে ঝিম্ত কলাগাছগুনোর ছেঁড়া পাতা। কঞ্জুস হাওয়ার তাপে বাবলাগাছগুনোর গায়ে কাঁটা দিয়েছে। পথিপার্শ্বে উইপোকাদের বিজয়স্তম্ভ। মার্জিত চেহারার খেজুরগাছ, গলায় খেজুরছড়ার মালা।

    দুপুর টাটিয়ে উঠেছে ক্রমশ, অথচ মেঘেদের ধূসর আনাগোনাও চলছে। বৃষ্টির ওপর আধিপত্য, দুঋতু আগে খর্ব হবার ফলে, নেতিয়ে পড়েছে ভেষজ সবুজ। মোরামপথ ধুলোয় জেরবার। প্রমেথিউসের নাট্যাভিনয়ে গুবরেপোকা। সকৌতুকে ফুটে আছে শেয়ালকাঁটার নরম ফুরফুরে হলুদ। কাঁঠালগাছে অজস্র এঁচোড়ের সঙ্গে ঝুলে আছে সুরাসক্ত মৌমাছিদের মোমভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্প। নীরবতা পালন করছে শোকমগ্ন শ্মশান। মেলার তোড়জোড় জানান দিচ্ছে বাচাল-প্রকৃতির লাউডস্পিকার। গাছের ছায়া থেকে কিশোর হিমসাগর বেরিয়ে লাফ দিয়েছে আলোয়।

    সারাটা দুপুর ফ্যা-ফ্যা কাটিয়ে, চুল না-ভিজিয়ে পুকুরে ক্লান্ত চান সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল যিশু। ঘুম ভাঙে ভবেশকার চ্যাঁচামেচিতে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, খুশিদিকে বকছে। এই বয়সেও বকুনি ! কাছে গিয়ে ভবেশকাকে, কী হয়েছে গো, জিগ্যেস করায়, উলটে বকুনি খায় যিশু, তুমি মাঝখানে কতা বলতে এসো না।

    ক্ষুব্ধ যিশু বলল, আরে, এই বয়সে এমন বকা-ঝকা করছ কেন ? শুধু নিজের স্বার্থটাই দেখবে ? বিষয়ী হওয়ার এতই দরকার নাকি তোমার ? আমি…। কথা সম্পূর্ণ করা উচিত হবে না মনে করে যিশু চুপ করে যায়।

    ভবেশকা বাঁপাশে হেলে, থপথপিয়ে দাওয়া থেকে নেবে বেড়ার আগল খুলে ক্রুদ্ধ বেরিয়ে গেলে খুশিদি স্কুলবালিকার মতন চোখ মুছে বলল, তুই খেয়ে নে। বাকসো গুচিয়ে রেকেচিস তো ? আমি এককাপড়ে চলে যাব। একদোম ভাল্লাগে না আর।

    হ্যাঁ। সন্ধে হলেই তুমি চলে যেও। মেলার ভিড় তো থাকবেই। কদম গাছতলায় অপেক্ষা কোরো, নইলে সোজা বাবলাডাঙায় গাড়িটার কাছে চলে যেও। ড্রাইভারটাকে বলা আছে। ভবেশকা একেবারে আউটডোর জীব হয়ে গেছে। কী হয়েছিল কী ? যে এত বকছিল তোমায় ?

    মোদকের বউকে জলপড়া দেবে। জলপড়ার কাঁসার জামবাটিটা পাওয়া যাচ্চে না। বাবা তারকেশ্বরের ছোঁয়ানো বাটি। কোতায় রেকেচে নিজেই। গুষ্টির তো জিনিস। ভাল্লাগে না।

    জলপড়া ? ভবেশকা জলপড়া দেবে ? যিশুর মাথার ভেতরে শম্ভূ মিত্রের কন্ঠস্বরের অনুকরণে ডলবি ডিজিটাল বজ্রপাত হয়। জলপড়া !

    হ্যাঁ। সেরে যায় তো। কানচোন মোদকের বউ বাচ্চা বিয়োবার আনজা রাকতে পারচে না।

    ভবেশকা সেই যে রেগেমেগে বেরিয়েছে, ফেরেনি। সন্ধে হয়ে গেল। লাইট চলে গেছে, সম্ভবত মেলার হুকিঙের অকথ্য শোষণে। যাত্রাদলের জেনারেটারের ক্ষীণ নিরবয়ব একটানা শব্দ। শুরু হয়ে গেছে ঝিঁঝিদের দেয়ালা-পারঙ্গম কানাঘুষা। কাতর আবেদনের মতন অন্ধকার। মাঝে-মাঝে স্পন্দিত হয়ে উঠছে শব্দহীন বিদ্যুচ্চমকের উদ্বেগ।

    আমি থালে এগুচ্চি, অন্ধকারে অনুচ্চ গলায় বলল খুশিদি, চাপা উত্তেজনায় কন্ঠস্বর রুদ্ধ। মুখে-মাখা স্নোক্রমের গ্রামীণ সুগন্ধকে ছাপিয়ে যাচ্ছে হাঁ-মুখের শঙ্কিত উৎকন্ঠার ভাপের গন্ধ। একপলক বিদ্যুচ্চমকে দেখা গেল থুতনির নিটোল টোল। পাটভাঙা, কাসুন্দি রঙের, ফুলফুল শাড়ি। হাত কাঁপছে। হাঁটার ধরনে স্পষ্ট যে ভয় আর উৎকন্ঠা নিয়ন্ত্রণ করছে খুশিদির শরীরকে, খনিগর্ভে আটকে-পড়া শ্রমিকের মতন।

    অ্যাতো ভয় কিসের খুশিদি। বুকে জড়িয়ে ধরে ভয় স্তিমিত করার চেষ্টা করে যিশু।

    জানি না কেন জিশকা, আমার খুব ভয় করচে। দাওয়া থেকে নেবে দ্রুত অন্ধকার বাগান পেরিয়ে চলে গেল খুশিদি।

    পেনটর্চ জ্বেলে যিশু নিজের বাকসো আরেকবার দেখে নিলে। খুশিদিকে ভরসা দিচ্ছিল অথচ ছোঁয়াচে উদ্বেগে চাবি লাগাতে ভুলে যায় ব্রিফকেসে। নৈঃশব্দে বসে থাকে কিছুক্ষণ। পা টিপে বেরোয়। আলতো খোলে বাঁশের বেড়া। চাঁদ ঢাকা পড়ে গেছে কালবৈশাখীর ছেতরানো মেঘে, কিন্তু পূর্ণিমার আগাম আভায় নির্জন বধির অন্ধকারকে মনে হচ্ছে হাস্যোজ্জ্বল। নেশাগ্রস্তের মতন মাথা ঝুঁকিয়ে আছে গাছগুনো। বুনো সুগন্ধ ছড়াচ্ছে সিসলকাঁটার গুঁড়িসুড়ি ঝোপ।

    ভবেশকার বাড়িটা যেন গাছে-ঘেরা দুর্গ। এখান থেকে মোচ্ছবতলার কদমগাছ অনেকটা পথ। ট্রান্সফরমার লোড নিতে পারেনি হয়তো, কখুন আলো আসবে অনিশ্চিত। এই ভেষজ অন্ধকারে সেঁদোতে আলোরও গা ছমছম করবে। বুড়ো শিবতলার বয়োবৃদ্ধ বটগাছটার একগাদা স্তম্ভমূল ঝুরিতে অন্ধকারকে এখানে ছোঁয়া যায়। টর্চটা ব্যবহার করা উচিত হবে না। সাপ বা শেয়াল একটা গেল বোধয়। যিশু দ্রুত হাঁটে শুকনো পাতার ওপর। শ্মশানের বিয়োগান্ত গন্ধ আসছে ওদিক থেকে। হালিক ধাড়ার নশ্বরতার প্রতি শেষ সম্ভাষণ হয়তো। মেঘ না থাকলে সন্ধ্যাতারার ঘনবসতিপূর্ণ আকাশভূমি দেখা যেত। আলো ফোটাতে তলবিসভা ডাকছে ঝিঁঝিপোকারা। শুকনো পাতার ওপর বোধয় সাপ বা তক্ষকের বুকে হাঁটার আওয়াজ।

    উদ্বেগ কাটাতে সিগারেট ধরাবার জন্যে দাঁড়িয়ে পড়েছিল যিশু। হঠাৎ শুনতে পায় অনেকগুনো লোকের কন্ঠে ডাকাত ডাকাত ডাকাত চিৎকার। পেছন দিক থেকেই তো ছুটে আসছে। এরা ডাকাত ? টাকাকড়ি তো বিশেষ নেই ওর কাছে। কাদের বাড়ি ডাকাতি করেই বা পালাচ্ছে ? ছোটাছুটির পদধ্বনি কাছাকাছি কোথাও। গাছের ডাল থেকে লাফাবার ধুপধাপ। ওর দিকেই আসছে মনে হয় ডাকাতের দলটা। যিশু দৌড়োয়।

    যিশুর মাথার ওপরে সজোরে বাড়ি পড়তে, হাতছাড়া ব্রিফকেস ছিটকে গিয়ে লাগে বটগাছের ঝুরিস্তম্ভে আর ডালা খুলে শুকনো পাতার ওপর ছড়িয়ে পড়ে শার্ট-প্যান্ট, কাগজপত্তর, টর্চ, টাকাকড়ি, ডটপেন, ক্যালকুলেটর, মোবাইল ফোন, ক্রেডিট কার্ড, চেকবই, পাসপোর্ট, টাই, ঘড়ি, ডাকটিকিট, তুষলাব্রতর সরষে আর শুকনো মুলোফুল। টাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করলে, পিঠের ওপর লাঠির শব্দ ওঠে। তারপর পায়ে আর কাঁধে। তবু দাঁড়াবার চেষ্টা করে যিশু। মাথার ওপর আবার আঘাত। যিশুর পরিপাটি আঁচড়ানো দামি পরচুলা মাথা ধেকে খুলে বেরিয়ে গেলে, আবার আঘাত। সেই মুহূর্তে, যিশু দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে তখুনও, অন্তরীক্ষ থেকে পতনরত চকচকে রুপোলি কিলবিলে সাপটার ল্যাজ ধরে হ্যাঁচকা টান দ্যায় বুড়োশিব। প্রচণ্ড আওয়াজ তুলে কাছেই বজ্রপাত হল কোথাও। বজ্রপাতের কাঁপুনিতে, মৌমাছির চাক থেকে কয়েক ফোঁটা মধু ঝরে পড়ে যিশুর রক্তাক্ত মাথায়।

    শ্বাস দ্রুত আর হৃৎস্পন্দন খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে যিশুর। ফুসফুসে ভাসমান রক্তের হেমোগ্লোবিনে অক্সিজেনের স্হান সংকুলানে ব্যাঘাত ঘটছে বলে মস্তিষ্কে পৌঁছোতে অসুবিধা হচ্ছে। কপালে, হাতের চেটোয়, ঘাম জমছে আর জুতোর মধ্যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে আঙুলগুনো। আলজিভের চারিপাশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ক্রমক্ষীয়মান অশরীরী হলুদ ও বেগুনি অন্ধকার-কণার অজস্র খুদে-খুদে ফুল ভাসছে অস্পষ্ট চরাচর জুড়ে।

    ব্রিফকেস থেকে পড়ে বহুকালের পোরোনো হলদে খড়খড়ে কাগজের পাতা উড়তে থাকে ইতিউতি। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ। প্রথম পৃষ্ঠায় তলার দিকে ডানকোণে ফুটফুটে আড়াই বছরের নাতনির ফোটোর তলায় তার হারিয়ে যাবার বিজ্ঞাপন দিয়েছে দাদু মিনহাজুদ্দিন খান। মেয়েটির ডান কাঁধে জড়ুল। ডান চোখে তিল আছে। কাঁদলে থুতনিতে টোল পড়ে। মেয়েটির নাম খুশবু। ডাক নাম খুশি।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৮:৫৪734724
  • উৎসর্গ : বাবা শ্রীরঞ্জিত রায়চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধায়

     

    মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস "ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস"

    এক

    লাশগুলোকে নামানো হচ্ছিল হোসপাইপ কেটে থামানো পাটনামুখো দরোজা-জানলাহীন, টয়লেটের পাল্লাহীন গয়া প্যাসেঞ্জারের অন্ধকার লাগেজ ভ্যান থেকে, একের পর এক আদুল-গা তামাটে পুরুষের পেশিদার শরীর, মহিলাদের ঘোমটামোড়া দেহ, ঠাণ্ডা কাঠ, পূণ্যলাভের জন্য পুড়তে যাবে গঙ্গায়, আর এই লেভেল ক্রসিং থেকে একটু দূরত্বে, রাস্তার ধারে ফোলডিং চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে, ল্যাম্পপোস্টের তলায় বসে স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রমাণপত্র দিয়ে চলেছে পাটনা মিউনিসিপাল কর্পোরেশানের পাকাচুল কদমছাঁট চশমাচোখ ডাক্তার সুনীলরঞ্জন নাহাবিশ্বাস ওরফে বিসওয়াসজি, শ্মশানঘাট কাছেই বলে, প্রতিদিন সন্ধ্যার টিমটিমে বিজলি আর কেরোসিন লন্ঠনের আলোয় ফুলকো মেলার জমজমাট ভিড়, আগেভাগে তৈরি তাদের বাঁশের মাচান, ফুল, শাদা আর গোলাপি থানকাপড়, ঠ্যালা, রিকশা, ট্যাকসি, ধুপ, সিঁদুর, খুচরো টাকা পয়সা, খই-বাতাসা, কাতাদড়ি, নাইলন দড়ি, মাটির কলসি। ফিক্সড প্রাইস। কাউকে দরদস্তুর করতে হয় না। বিহারি সংস্কৃতির মড়া পোড়ার যাকিছু।

    পাটনা-গয়া লাইনে দাঙ্গা বা জাতপাত-মারকাট হলে, যখন লাশের সংখ্যা বেড়ে যায়, লেভেল ক্রসিং পেরোতে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়। ট্রেনটার কোনো বরাদ্দ সময় নেই থামার। যতক্ষণ লাশ ততক্ষণ আশ। লেভেল ক্রসিং ছেড়ে প্রচুর সময় লেগে যায় ট্রেনটার, স্টিম এনজিনের ভোপ্পোর ভোঁ কয়লাচুরো উড়িয়ে, কিংবা ডিজেল এনজিনের গরম হলকার ধোঁয়া ভাসিয়ে। বর্ষাকালে জলে ডোবা রাস্তা, গ্রীষ্মে জ্যাম, শীতে শবযাত্রীর শিকারে সস্তার রাঁঢ়।

    মোটর সাইকেলে বসে যখন বিরক্তি উথলে উঠছিল, ট্রেনটার যাবার অপেক্ষায়, পাশেই এক যুবক হাতি, পেছনের বাঁ পা জিরেন দিচ্ছিল শ্রীকৃষ্ণের কায়দায়, নীহারিকার বর্ণালী থেকে তখন সবে হেমন্ত নামছে স্হানীয় পৃথিবীতে, অদৃশ্য কানামাছি-ওড়ানো শুঁড়ের ধাক্কায়, যেন বিদ্যুৎ দিয়ে গড়ে নরম মাংস, ঘুরে যায় মুণ্ডু, চকিতে হাজার সর্ষেফুল ফুটে উঠে মিলিয়ে যায়, তারপর গলায় চোঙবাঁধা অবস্হায় নিজেকে খুঁজে পায় সুশান্ত, হাসপাতালে, সরকারি রাজেন্দ্র ব্লকের শতচ্ছিন্ন গয়ের রক্ত পুঁজ মাখা বিছানায়, মাছির দল তার ঠোঁটে বসে ঘুমজাগানিয়া চালিশা শোনাচ্ছিল। হাসপাতাল, তায় সরকারি, পটল অবধারিত জেনে, একহাতে নলসুদ্দু স্যালাইনের বোতল ঝুলিয়ে বাড়ি কেটে পড়েছিল ও, সুশান্ত, রিকশায় চেপে। বাড়িতে ধুদ্ধুমার। অনেককাল লেগে গিয়েছিল সারতে। থানায় গিয়ে মোটর সাইকেলটা নিয়ে এসেছিলেন সুশান্তর বড়োজ্যাঠা, হাতে-টানা ঠ্যালায় চাপিয়ে।

    বিছানায় শুয়ে, গলায় চোঙবাঁধা, কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে, কাকার কাছ থেকে জানতে পেরেছিল সুশান্ত, ওই পালোয়ান হাতিটায় চেপে ইন্দিরা গান্ধি গিয়েছিলেন আক্রান্ত গ্রামের মানুষদের সান্ত্বনা দিতে। এগারোজন তফশিলি মানুষের সাফায়া করে দিয়েছিল পিছড়াবর্গের কুরমি জাতের মহাবীর আর পরশুরাম মাহাতো, যাদের পরে ফাঁসি হয়েছিল। সীতারাম মাহাতো, সিরি মাহাতো, রামকিশুন মাহাতো, রাজেন্দর মোচি, নেপালি, সিমন, বলদেও আর কেশব মাহাতোর কুড়ি বছরের জেল। কিন্তু কালীচরণ, দাসো পাসোয়ান, রামচন্দর মোচি, মহাবীর মাঝি, শ্রবণ পাসওয়ান, রাজো পাসওয়ানদের প্রতি একজন মৃত প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাসভঙ্গের আক্রোশ হাতিটা চাপিয়ে দিলে ওর, সুশান্তর, ঘাড়ে !

    মুচি মাল্লা শুঁড়িদের হাতে যে-সব দেড়-দু একর জমির কাগজ ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তার মালিক ওই কুরমিরা জেল থেকে তেল, কাপড়, চিনি, টাকা ফি মাসে পাঠাচ্ছে নিজের নিজের বাড়ি ; জমি কেনাকাটা চলছে, অথচ মুসহর দুসাধ চামার আর তেলিরা সুযোগ পেলেই গ্রাম ছেড়ে পাটনা, জ্ঞাতি খুঁজেপেতে কলকাতা। গ্রামে একটা পুলিশ ফাঁড়ি বসিয়ে কর্তাবাবারা নিশ্চিন্ত।

     

    বেলছির পর যখন পারসবিঘায় গোলমাল হল, লাগেজ ভ্যান থেকে লাশ নামাতে সময় লেগেছিল বেশ, মনে আছে সুশান্তর। রামাশিষ, হরিভগত, শ্যামনারায়ণ প্রসাদ, রামস্বরূপ, সিয়ারাম, কিসমিসিয়া দেবী, হরমণিকুয়ারি, গুলাবিয়া দেবী, পতিয়া দেবী, আর শ্যামপেয়ারিদের জলজ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিল নিরঞ্জন শর্মার ছোটো ভাই মদন শর্মা। তারপর থেকে ভূমিহার আর নিচুজাতের খুনোখুনি। খুনোখুনিতে ঝামরে নষ্ট হয়ে গেছে সবুজ গ্রামের পর সবুজ গ্রাম। এই সব গ্রামে রোদ্দুরেরও শীত করে। কনসারা, দরমিয়া, নোনহি-নগওঁয়া, মলবরিয়া, দনওয়র-বিহটা, মিনবরসিমা, বারা– উড়ন্ত ধুলোয় মানুষহীন প্রান্তর, সাপের পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে সন্দেহময় শুকনো পাতায় পদক্ষেপ। লেঠেল-ঘেরা পাকা ধানের খেত। পাড়ভাঙা যেমন নদীর মুদ্রাদোষ, তেমন সুশান্তর এই লাশ-নামানো-মেলা দেখা, মাঝে-মধ্যে সান্ধ্যকালীন নেশা।

    সুশান্তর চেহারা অবাঙালি। পাঁচফুটের ফর্সা গালফোলা ঘাড়েগর্দান কোঁকড়াচুল চনমনে। গলায় চোঙ বেঁধে হালকা কাজের বিভাগে কিছুকাল কাটাবার পর পৌঁছেছিল অতনুদের ত্যাঁদড়া-কর্মী বিভাগে। ঘোষ বলে অফিসে জাতপাতের বিভাজনে ও দুধিয়া ঘোষ, মানে গয়লা, যাদব, বিহারি যাদব কর্মীরা নিজেরাই ওকে কৃষ্ণায়ত যাদব বানিয়ে দিয়েছে, কংসায়ত যাদবে ফ্যালেনি। অথচ মুঙ্গেরের পিপারিয়ে গ্রামে, যেখানে ওদের প্রচুর জমিজমা, ঘোষ হবার দরুণ সেখানে যাওয়া, ফসল তোলানো, এতোয়ারি হাটের খাজনা তোলা সব বন্ধ। বাবার ঠাকুর্দা, মানে ঠাকুর্দার বাবা, হাইকোর্টে, তখন কলকাতা হাইকোর্টে মামলা লড়তে যেতে হতো, ভূমিহার রাজনাথ সিংকে ফৌজদারি মামলায় জিতিয়ে দেয়ায়, মুঙ্গেরের রোমহর্ষক দিয়ারায় দুশো একর জমি, আর সাত একর আনাজ-বাগান, আর এতোয়ারি হাট ওর ঠাকুর্দার নামে করে দিয়েছিল। সুশান্ত যায়নি কখনও পিপারিয়ে। ছোটোবেলায় চাল মুসুর অড়র ভুট্টা সর্ষে পটল কচি তরমুজ আম আর হাটের টাকা আসত। তারপর ওখানে কৈলু যাদব, কজ্জল ধানুকদের অপহরণের দল এমন জ্বালাতন আরম্ভ করলে যে সেসব জমিজমা এখন কাদের হাতে তা শুধু কানাঘুষায়, কোনো যাদব ছিটকে পাটনায় এলে, তার মুখে ভাসাভাসা জানা যায়। বাংগালি-তাংগালি বলে, সুশান্তরা আর সেখানে পাত্তা পায় না। লোকমুখে প্রচারও করে দেয়া হয়েছে যে কোনো বাংগালি ঘোষবাবু এলে তার মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দেয়া হবে।

    দিয়ারা, দ্বীপের মতন গঙ্গার চর, জেগে ওঠে, থাকে বছরের পর বছর, বেগুসরায় মুঙ্গের থেকে নদীর কিনারে-কিনারে ভাগলপুর কাটিহার ওব্দি। এক জায়গায় ডুবে আরেক জায়গায় কুমিরের পিঠের মতন ভেসে ওঠে অনেক সময়ে, খেলা করা অজস্র মানুষের সুখশান্তি নিয়ে, তাদের দুর্ধর্ষ ক্রুর মমতাহীন আতঙ্কিত করে রাখে আজীবন, ভালা বরছি গঁড়াসা ভোজালি পাইপগান কট্টা তমঞ্চা দিয়ে। ঢেউরা দিনেরাতে হাসি বিলোয়।

    মেদিনি পুলিশফাঁড়ির সুরজগড়হার কাছে হুসেনা গ্রামের পালোয়ান, কোমরে ঘুনসি, গলায় তাবিজ, থলথলে বুক আর উরধ, কদমছাঁট অধিক যাদব, দুধ বিক্রির ফাঁকে, কিষান-কামিলের নূনতম মজুরির মজুরি আন্দোলন পিষে ফেলার লেঠেল হিসেবে জোতদারেরদের স্যাঙাত থাকতে-থাকতে নিজেরাই আরম্ভ করে দিলে জোরজবরদস্তি জমিজমার দখল নেয়া, কানপুর থেকে চটের থলেতে আসত পিস্তল কারতুজ হাতবোমা দোনল্লা একনল্লা, খড়ের গাদায় লুকোনো, পালতোলা নৌকোয়। সামহো-সোনবরসা কুরহা দিয়ারায় গোটাকতক চাষি ট্যাঁফোঁ করলে, তাদের ডান হাত কেটে গঙ্গায়। নিজেদের হুসেনা গ্রামে পুলিশের ওপর কয়েক ঝাঁক গুলি চালিয়ে ভাগাল। তারা আর ওমুখো হয়নি। মেদিনি ফাঁড়ির পুলিশ ইন্সপেক্টর যতীন্দ্রনাথ সিং ছ’জন কন্সটেবলের শং্গে যখন ওদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে, অধিক যাদব গঁড়াসা দিয়ে চারজনের ভুঁড়ি ফাঁসায়। লাশ নদীতে আর বন্দুকগুলো নিজেদের কব্জায়। পেট চিরে মারাকে শিল্পের পর্যায়ে তুলেছিল। পেট চিরে পূণ্যসলিলা গঙ্গায় ফেলেছিল আরও অনেককে, টুকরো-টুকরো, যেমন পাঁঠার দোকানের মাংস, বেশিরভাগ সীমান্ত চাষি, যেমন অঙ্গদ যাদব, এতোয়ারি মাহাতো, ডুকো মাহাতো, দেবেন মাহাতো, সুধীর মাহাতো। অধিক যাদব মরলে, ওর রাজ্যপাট যায় কৈলু যাদবের হাতে, সে পিপারিয়ে গ্রামের অমৃত যাদবের ছেলে। সুশান্তদের গরদানিবাগের বাড়িতে অমৃত যাদব একবার এসেছিল, চার বছরের খালি-গা ধুলোমাখা কৈলুকে নিয়ে।

    লখন তাঁতিকে, পুলিশের মুখবির, মানে চর সন্দেহে, কেন তাড়িয়ে-তাড়িয়ে গ্রামবাসীদের চোখের সামনে থেঁতো করে মেরেছিল কৈলু, অফিসের একজন পিওনের কাছে, যে অবসর পাবের পর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের কিছু টাকায় কিনে, কোনও এক কমবয়সী তরুণীকে বিয়ে করেছিল, তার কাছ থেকে জানতে পেরেছিল সুশান্ত। পরে, মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যস্হতায়, কৈলু যাদব আর ওর প্রতিবেশী দুলারচন্দ্র যাদবের সন্ধি হলে, অপহরণের ব্যবসা আরমভ করে কৈলু। দিয়ারা থেকে দূরে-দূরে ছড়িয়ে পড়ে ব্যবসার আওতা, পাটনা রাঁচি মজফফরপুর লখনউ কানপুর এমনকি দিল্লির রাস্তা থেকেও তুলে আনতে পেরেছিল রওনক আগরওয়ালকে। কৈলুকে সাফায়া করার জন্যে সরকার ‘অপারেশান কোবরা’ চালু করলে, সেই যে ও গা ঢাকা দিয়েছে, খুঁজে পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত।

    কৈলুর জায়গা দখল করেছে কজ্জল ধানুক, আর ধানুকদের নরকে যাওয়া উচিত হবে না ভেবে সুশান্তর বাবা কাকা জ্যাঠারা আর নিজেদের জমিজমা খেতখামার চাষবাস হাটের আয় ইত্যাদির কথা ভুলে গিয়ে ও-মুখো হননি। পিপারিয়াতে ওরা বাংগালি যাদব। বারোটা যাদব বাচ্চাকে একদিন দুপুরে বরছি-ভালা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করেছে কজ্জল ধানুক, শুনেছেন ওনারা লোকমুখে। ধানুক বিন্দ আর ভূমিহার এখন একদিকে, যাদবরা অন্যদিকে। লছমিপুর-তৌফির দিয়ারায়, বদলা নেবার জন্যে, গঙ্গার ওপর থেকে ভেসে গিয়ে শীতের কুয়াশা যখন ঘিরে ধরেছে কুঁড়েঘরগুলোকে, যাদবরা দল বেঁধে হামলা করে বিন্দ বাচ্চা বউ বুড়োদের আস্ত রাখা অনুচিত ভেবেছিল ; বিন্দ জোয়ানরা বেঁচে গিয়েছিল কেউ কেউ, অন্ধকারে পিটটান দিয়ে।

    ঘন সবুজ কচি আমের থুতনিতে হাত দিয়ে আদর করছিল একটা প্রৌঢ় আমপাতা। গাছের প্রায়ান্ধকার গোড়ায়, আধভিজে উইপোকার মেটেরঙা দেউড়ি। মিহিন আবেগপ্রবণ বিকেল-বাতাস বেড়াতে বেরিয়েছে গোধুলী-বাতাসের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে। আকাশে দীঘল ফোলাফোলা মেঘ। অনেক দূরে, ওই দিকে, একাধটা ঠুনকো বিদ্যুতের অদৃশ্য আওয়াজ। এখন রূপসী মর্জির বিকেল। অল্পবয়সী খেটে-খাওয়া কয়েকটা কাক চলে গেল দক্ষিণ থেকে উত্তরে। একটু আগে সামনের ছাতিম গাছে যে-চড়াই পাখিগুলো স্হূল রঙ্গরসিকতায় মশগুল রেখেছিল নিজেদের, তারাও এখন ডানা গুটিয়া ঠোঁট গুঁজে চুপচাপ। রাস্তার ওপারে ধনী আর উদার কাঁঠালগাছ। রোদ্দুর বোধহয় গাছের ছায়া মাড়ায় না এ অঞ্চলে। চারিদিকের এমন অতীন্দ্রিয় জগতের আভাস পেয়ে ছোটোখাটো গোলগাল নুড়ির দল উদাসীন শুয়ে আছে কালভার্টের তলাকার ছিপছিপে নালার কিনার বরাবর।

    কালভার্টের ওপর বসে, ধূসরিত কাহিল পা ঝুলিয়ে, আনমনে এইসব দেখছিল অতনু। যে লজঝড়ে বাসটা পাটনা থেকে ভোর পাঁচটায় ছেড়েছিল, তা থেকে এই অজ দিগন্তে নেমে পড়েছে ও। সৌন্দর্য সৃষ্টির আকুতিতে মগ্ন আসন্ন বিকেল-গোধূলির স্নেহময় আকাশ, বাসের জানালায় থতমত বাতাস, বাধ্য করেছিল ওকে এইখানে নেমে পড়তে। সেই তখনই জড়সড়ভাব এসে গিয়েছিল স্হানীয় রোদ্দুরের। একটু পরেই কেয়ারি-করা অন্ধকার গজিয়ে উঠবে ওর চারপাশে, তখন পথ, চলার পথ, দেখা যাবে না বলে হাঁটতে আরম্ভ করবে ও, অতনু। জঙ্গলের কালচে সবুজ মহাফেজখানা পেরিয়ে, গ্রামটা ওইদিকেই।

    ময়লা বলতে যা বোঝায়, অতনুর গায়ের রঙ তার থেকে এক পোঁচ ফর্সা। দু-চোখ প্রায় সব সময় বরফের বুদবুদ, ভেতরে ভেতরে উসখুসে নদীর মুখচোরা স্রোত। গত অঘ্রাণে তেইশে পড়েছে। নোংরা জামা-কাপড়। টো-টো বেড়ানো চটজলদি পিচপথের ধূসর গন্ধমাখা কোলহাপুরি। হাতঘড়ি পরার অভ্যাস, চুড়ি-চুড়ি মনে হয় বলে, আর সময়ের বাদবিচার না-থাকায়, নেই ওর। এই বয়সেই চুলের কিছুটা চিলতে, ডান ঘেঁষে, পেকে গেছে, দুশ্চিন্তায় নয়, চিন্তাহীনতায়। কখনও যেচে আলাপ করে না, কারোর সঙ্গে অতনু। কম কথা বলে। অনেকক্ষণ টানা কথা বলতে পারে না। খেই হারিয়ে যায়। কথা বলতে-বলতে ওর মনে হয়, এঁর সঙ্গে এসব আলোচনা করার মানে হয় না। তরুণীদের এড়িয়ে চলে। কেউ ওর সঙ্গে কথা বললে, ওর তার সংক্ষিপ্ততম জবাব দ্যায়, হ্যাঁ, না, ও, আচ্ছা, তাই বুঝি, ঠিক আছে, চলি।

    অতনুর হাতে মানসী বর্মণের গচ্ছিত রাখা বাদামি নরম ফোম রেকসিনের ব্যাগ। কয়েক লক্ষ টাকার নোংরা-হাফনোংরা নোট, আর অসীম পোদ্দারের ডায়েরি আছে তাতে। টাকাগুলো তেকচিটে আধমরা অসুখী। ডায়েরিতে স্বীকৃতি আছে যৌন যথেচ্ছাচার থেকে কুড়োনো রোগের। ব্যাগে টাকার ডাঁই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে, রাত্তিরেই, খাটের তলা থেকে টেনে স্তম্ভিত, এই বেরিয়ে পড়ার নির্ণয় নিয়ে ফেলেছিল।

    দূরের ক্ষণজন্মা বিদ্যুৎগুলো এবার ফুরিয়ে গেছে। মেঘের হাত ধরে ছোটো-ছোটো তারারা গুটিগুটি পায়ে আসছে ওই সংসারে। আলুথালু পোশাক সামলে ঘরে ফিরছে বকযুবতী। একটা লরি চলে গেল হেডলাইটের শানবাঁধানো আলো জ্বেলে। গলা শুকিয়ে ধু-ধু করছিল বলে, এবার উঠে দাঁড়াল অতনু। আনমনা হয়ে উঠেছে চারপাশের বর্তমান। বহুক্ষণ বসে থাকার দরুণ ঠ্যাং দুটি ভঙ্গিসর্বস্ব। আড়মোড়া ভেঙে কিছু-ভারি ব্যাগটা তুলে কাঁধে ঝুলিয়ে নিলো। উদ্দেশ্যহীন জীবন হয়তো এবার প্রহেলিকাময় হবে। জীবনের মোড় পালটাবার জন্যে তার সামনে বেশ কয়েকটা বিকল্প থেকে যে-কোনো একটা বেছে নিতে হবে ওকে। ক্ষুধা আর স্বার্থের বাইরে জীবনযাপন আছে কি, যেখানে বেঁচে থাকার জন্যে কোনো চাবিকেন্দ্র চাই না !

    যদিও ওরা দেশভাগের উদ্বাস্তু নয়, অতনু কো০নো রাজ্যের ভূমিপুত্র হতে পারেনি, তার জন্য দরকার কোনো জায়গায় ন্যুনতম থাকার প্রমাণপত্র ্র বাবার ছিল না স্হির সাকিন আর ঠাকুর্দার ছিল না স্হাবর ধানপাটের তৌজি-মৌজা। কেউই কোথাও থাকেননি বেশিদিন। শেকড় গজিয়ে ফেলতে ভালো লাগত না ওনাদের। সত্যি, একই বাড়িতে, একই পাড়ায়, একই শহরে, একই লোকজনের মাঝে, মাসের পর মাস, ঋতুর পর ঋতু, বছরের পর বছর, কাটিয়ে দিতে পারে কেউ-কেউ, গর্ব করে অমন মরচেপড়া জীবনযাপন নিয়ে। ভস্মপূঞ্জ জমে যায় না কি তাদের চোখের পাতায় আর ভুরুর চুলে, ভেবেছে অতনু।

    আচমকা খেয়াল করল অতনু, অন্ধকারে, যুঁই ফুল তার সুগন্ধ দিয়ে ছড়াচ্ছে আন্তরিকতা। এক হাজার বছর পরেও এই সুগন্ধ থেকে যাবে। কোনো রেশ থাকবে না অতনুর। বাবাও তো থিতু হবার আগেই ইঁদুর মারা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করা নিজের ছেলেকে চাকরিটা পাইয়ে দিয়ে গেলেন। জানতেন ছেলেটা নিজে কিছুই করে উঠতে পারবে না। প্রাতিষ্ঠানিক সমবেদনা। গোড্ডা বিহটা লাহেরিয়াসরায় জপলা বা বকসরের কোনো ছাদহীন মাটির দেয়ালের স্যাঁতসেতে স্কুলে, এই চাকরিটা নে পেলে, অর্ধেক মাইনেতে, চরবাহাদের পড়াতে হতো হিন্দির মাধ্যমে ইংরেজি, ওই ভাষায় স্নতকোত্তর হবার মাশুল। মাইনের আর্ধেক দিয়ে দিতে হতো শিক্ষা বিভাগের সরকারি পেয়াদাদের।

    বাবা কেন আত্মহত্যা করেছিলেন ? মাও বলতে পারেননি। অতনু তাই দায়টা নিজের চাকরির ওপর চাপিয়ে নিয়েছে।

    চাকরিটা আসলে কেরানি আর মজুরের দোআঁশলা, শুনতে জমজমাট, ব্যাংকনোট এগজামিনার, টাকাকড়ি পরীক্ষক, অথচ যারা চা কিংবা মদ পরীক্ষা করে, তাদের কতো র‌্যালা। অতনুর কাজ টাটকা নোট আর পচা নোট আলাদা করা, একশোটা নোটের প্যাকেট তৈরি, দশটা প্যাকেটের বাণ্ডিল, দিনের পর দিন, দিনের পর দিন, দিনের পর দিন, দিনের পর দিন, দিনের পর দিন, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, মাসের পর মাস, মাসের পর মাস, মাসের পর মাস, মাসের পর মাস, মাসের পর মাস, ঋতুর পর ঋতু, ঋতুর পর ঋতু, ঋতুর পর ঋতু, ঋতুর পর ঋতু, ঋতুর পর ঋতু, ঋতুর পর ঋতু, গ্রীষ্মের পর বর্ষা, বর্ষার পর শরৎ, শরতের পর হেমন্ত, হেমন্তের পর শীত, শীতের পর বসন্ত, বছরের পর বছর, বছরের পর বছর, বছরের পর বছর, বছরের পর বছর, বছরের পর বছর, বছরের পর বছর, বাছাই ছাঁটাই, গোনার পর ভালো নোটগুলো চলে যায় ব্যাংকে আর ট্রেজারিতে। পচা নোটগুলোয় গোল-গোল চাকতির মতন গোটাকতক ছ্যাঁদা, ঝপাং ঝপাং ডাইস দিয়ে করার পর, নোটগুলো মরে গিয়ে অচল হয়ে গেছে ভেবে, যাতে আবার না বেঁচে উঠে ব্যবহৃত হয়, ছ্যাঁদা-ছ্যাঁদা নোটের প্যাকেট আর ঝরে পড়া গোল চাকতি, বস্তাবন্দি সিলমারা চটের থলেতে চলে যায় অন্য বিভাগে পুড়ে ছাই হবার জন্যে।

    প্রথম দিকে অতনু, তেএঁটে ফাঁকিবাজ হবার আগে, এদেশের ভার্জিন কর্মচারীদের যেমন হয়, মন আর সততা খরচ করে, টাটকা আর পচা নোট আলাদা করত, গুনত, পচা নোটগুলোই কেবল নষ্ট করাত গোল-চাকতি ছ্যাঁদা করিয়ে। সহকর্মীরা ধমকাতে আরম্ভ করেছিল ; আর হুমকি দিয়েছিল ভাজপা, জদ, ইনকা, সপা ইউনিয়ানের কত্তারা। কে আর সৎ হয়ে প্যাঁদানি খায় ! ভালো নোট হোক খারাপ নোট ওক, পচা হোক বা আনকোরা, প্যাকেটের সবকটা টাকাকে, প্রতিটি, অতনু পচা ছাপ মেরে নষ্ট করিয়েছে। কমিয়ে ফেলেছিল কাজের চাপ। সৎ হবার ফালতু বোঝা, নোয়ম মেনে চলার লাফড়া, প্যাকেট খোলার আর ঝঞ্ঝাট নেই। দরকার নেই গোনার। এহাতে প্যাকেট নাও, ছ্যাঁদা করাও, নিজের কোড চিহ্ণ দাও শেষ নোটে, এবার তুলে দাও সহকারি খাজাঞ্চির হাতে, যে নিজের টেবিলে বসে জনর রাখে কেউ গ্যাঁড়াবার তাল করছে কিনা, যদিও দরোজায় চেকিং হয় বেরোবার সময়। অতনুর তাড়াতাড়ি কাজ শেষ, ছুটি, বাড়ি যাও, বা বাইরে বেরিয়ে যা ইচ্ছে করে বেড়াও, সহকারি খাজাঞ্চি খুশি, খাজাঞ্চি খুশি, খুশি সব্বাই, স্মুথ সেইলিং। দশটা-পাঁচটার টুঁটি টেপা চাকরি হয়ে গেল এগারোটা-একটা। না-গোনার মধ্যে ঝুঁকির তড়াস। সে ঝুঁকি সবাই নিচ্ছে। অতনু কেন মাঝখান থেকে সৎ হতে যাবে ! চাকরির জন্যে তো আর কারোর প্রতি দায়বদ্ধতা গজায় না। তাই চাকরিকে চাকরি বলে মনে হচ্ছিল না অতনুর। ভেতো জীবন হয়ে উঠেছিল নিরলস কুঁড়েমিতে মুখর। সেকশানের লোহার জাল দেয়া জানলার বাইরে শিমুল গাছটায়, আহ্লাদে ফেটে পড়া লাল ফুলগুলোয় লুকিয়ে বউ কথা কও পাখি নির্দেশ দিয়েছে অতনুকে, নোট গুনে নাও, নোট গুনে নাও, নোট গুনে নাও, নোট গুনে নাও।

    অতনুর সহকর্মীরা বসন্তঋতুকে বলে ফগুয়া। গাঁও চলে যায় অনেকে, বউয়ের কাছে। বসন্তঋতু তো বউদেরও ডাক দেয়। কোথায়-কোথায় সেসব গ্রাম। বাসে-ট্রেনে-নৌকোয়-পায়ে হেঁটে কোশের পর কোশ। রোহতাসের কারমু পাহাড় এলাকায়, ভাগলপুরের কহলগাঁও সুলতানগঞ্জ বহিপুরে, সীতামড়হির মানেচওকে, অওরংগাবাদের মদনপুরায়, দলেলচৌক বধৌরায়, চাতরার প্রতাপপুর হাণ্টারগঞ্জ ইটখোরিতে যেখানে খয়েরের চোলাই হয়, জাহানাবাদের আরওয়ালে, বিষ্ণুগঞ্জে, মখদুমপুরে, পোরমগাঁও আর হিঁডিয়ার নকসল্লি মাওওয়াদি জামাতে, নওয়াদা জেলার হিঁসুয়ায়, মুঙ্গেরের শেখপুরায়, কুঁওর সেনা সানলাইট সেনা ব্রহ্মর্ষিসেনা আজাদ সেনা শ্রীকৃষ্ণ সেনাদের বাভন বনিয়া রাজপুত কোইরি কাহার কুরমি আহির গাঁওয়ে, সোনাপাস রুগড়ি সুপাইসায়, কোতওয়ালসায়, তেলাইডি বড়াউরমা সিংগাড়ি লোসোদিকি পিতকলাঁ মাদেউবটা গ্রামে, যেখানে ধুলোবালি ছাড়া আর কিছুই নিজের মনে ঘোরাঘুরি করে না। কোথাও যায়নি অতনু। সহকর্মীরা বলেছে, আবে চল, তনিক হিলাকে-ডোলাকে মৌজমস্তি কর ফগুয়ামেঁ। সেসব গ্রাম দেখতে ইচ্ছে করেছে কিন্তু যেতে ইচ্ছে করেনি অতনুর। পাটনার কাছে-পিঠের বাইরে যায়নি কোথাও।

    সময় কাটাবার জন্যে একজোড়া কাকাতুয়া কিনেছিল ; আর কিনেছিল শাদাঝুঁটিটার জন্য বাংলা ছড়ার সিডি, আমি হব সকালবেলার পাখি, সবার আগে কুসুমবাগে উঠব আমি ডাকি। হলুদঝুঁটির জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীতের, আমি হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়। ছড়ার বা রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্যে কেনেনি, কিনেছিল কাকাতুয়া দুটোর জন্য। এত মিঠে গলা পাখিদুটোর, সত্যি। অডিওগুলো না বাজালে, সকাল থেকে গলিতে গালমন্দের যে তারস্বর আদানপ্রদান হয়, তা শিখে ফেলত পাখি দুটো।

    চাপচাপ অসন্তোষ মাখানো, নোংরা তেলচিটে আধমরা পচা টাকার দু-চোখ জুড়োনো রূপে, চাকরির বছর দেড়েকের মাথায়, নিষ্পৃহ হয়েছিল অতনু। অতিশয়োক্তির মতন কোটি-কোটি কেগজের স্যাঁতসেতে ছাতাপড়া নীলসবজে টাকার টিলা। একশো টাকার, পাঁচশো টাকার, হাজার টাকার, পঞ্চাশ কুড়ি দশ পাঁচ টাকা থেকে সারাবছর শুকনোপচা পাতার বুনো জঙ্গুলে গন্ধ। সেসব আদুলগা টাকার সঙ্গে কথা বলা এদানতি বন্ধ করে দিয়েছিল অতনু। মূল্যহীন অঢেল।

    গলায় চোঙবাঁধা সুশান্ত অতনুর বিভাগে এলে আলাপ। সুশান্তই প্রথম দিন বলেছিল, ‘তোর নাম তো অতনু চক্রবর্তী ? আমি সুশান্ত ঘোষ। দেখেছি তোকে, অমন একা ম্যাদামারা হয়ে পড়ে থাকিস কেন ? চলিস আমাদের বাড়ি, তোর ভাল্লাগবে। ’

    একটার পর, শেষশীতের দুপুরে, কাজ শেষ হলেই, অফিস ছুটি, সুশান্তর মোটর সাইকেলে। চালাতে শিখে গেল অতনু, ধুতি পরেই, চটি পায়ে। নাটুকে নষ্টকুমার-কুমারীদের মতন, শীতের বসন্তঋতু মেজাজি পাগলাটে ছায়া-চেহারাগুলোর নিঝুম দাপাদাপি, দৃষ্টিতে রক্তমাখা ছুরি নিয়ে তাপটগবগে হলকার পিচগলা গ্রষ্ম, দিলখোলা বর্ষার প্যাচপেছে হাঁটু-কাদা রাস্তা, ছুটেছে দিশেহারা মোটর সাইকেল। কখনও পেছনে সুশান্ত, কখনওবা পেছনে অতনু। পাটনা সাহেব থেকে দানাপুর-খগোল, এরাস্তা-সেগলি-রাজপথ। কিন্তু ধুতি-পাঞ্জাবি থেকে শার্ট-প্যান্টে যেতে পারেনি অতনু। শীতে আলোয়ান। এদিকে সুশান্ত, বিহারি জোতদার পরিবারের যুবকদের মতন, রাজপুত ভূমিহার কুরমি যারা, কিংবা ব্রাহ্মণ কায়স্হ বিহারি আমলার শহুরে ছেলেদের ধাঁচে, অফিসে প্রতি ঋতুতে হালফ্যাশান এনেছে। জ্যাকেট জিনস টিশার্ট উইন্ডচিটার, ব্রাণ্ডেড। দপতরের গৃহবধু কর্মীদের নজরে সুশান্ত অবিনশ্বর জাদুখোকন, লিচুকুসুম, মাগ-ভাতারের অচলায়তনের ফাটল দিয়ে দেখা মুক্ত দুনিয়ার লালটুশ। গেঁজিয়ে যেতে পারে, চোখে চোখ রেখে, ননস্টপ, যান বাজে বকার মধ্যেই পালটে যাচ্ছে হিজড়েতে, সবায়ের অজান্তে।

    কী হয় অমন কথা-বলাবলিতে, এক্সচেঞ্জ হলে সুশান্তর পাশে চুপচাপ, বাচাল গৃহবধুদের মাঝে ঠায় অপ্রস্তুত, আধ থেকে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, ঠোঁট বন্ধ রেখে হাইতোলা চেপেছে অতনু। মহিলাকর্মীদের বিভাগ আলাদা। তিনটে-চারটে বেজে যাবার ভয়ে, যখন কিনা কাজ সেরে একটায় বাড়ি কেটে পড়া নৈতিক। মহিলাকর্মীরা নাকি সৎভাবে কাজ করে, ইউনিয়ানগুলো ওনাদের টলাতে পারেনি। লম্বা টিকোলো আঙুলে টরটরিয়ে দরকচা নোট গোনে, পচা নোট বাতিল করে, সেগুলোতে ছ্যাঁদা করায়, প্যাকেটের পেছনে যে যার নিজের কোডের ছাপ মারে, কেবল হাফকাটা নোট বাছাই করে ফেরত পাঠায়। মহিলাদের সততার চাবিকেন্দ্র, শরীরের তুলতুলে জায়গাগুলোয় লুকোনো থাকে বলে, এও মনে হয়েছে অতনুর, সৎপুরুষ আর সতীনারীর কী অবাঞ্ছনীয় তফাত। ওনাদের সুখপাঠ্য মুখশ্রী, অম্লমধুর স্তন, দুষ্প্রাপ্য নিতম্বের আদেখলাপনায়, শ্রাবণের বিকৃত-মস্তিষ্ক বুড়িগণ্ডক বা পুনপুন নদীগুলোর মতন, নিজেকে মশগুল আর অনিশ্চিত রেখেছে ভারজিন অতনু।

    গায়কের ইশারায় যেভাবে ধ্বনিপরম্পরা টের পায় তবলাবাদক, তেমনই, নৈশভোজে বেরোনো টিকটিকি যুবকের মতন, মহিলা সহকর্মীদের অবান্তর কথাবার্তা, ভোজপুরি হোক হিন্দি-বাংলায়, বলার জন্যেই বলা, একপলক দূরত্বে দাঁড়িয়ে গিলেছে সুশান্ত। কোনো যুবতী মুখে রুমাল চেপে থাকলে অতনুর সন্দেহ হয়েছে যে এবার নির্ঘাৎ ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরবে সুশান্তকে, এত কাছে কী করে দাঁড়ায়, শ্বাস-প্রশ্বাসের দূরত্বে !

    –অররে সুশান্তজি, একদম টইয়র লগ রহেঁ হ্যাঁয় আজ !

    –বাঃ, বেশ মানিয়েছে তো লাল সোয়েটারটা হলদে স্কার্ফের সঙ্গে। শিমলা থেকে বুঝি ?

    কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক সুশান্ত, আরও স্বচ্ছলতার আপ্রাণে, ট্রাকে করে শীতে দাক্ষিণাত্য থেকে আম, কোংকন থেকে এঁচোড়-কাঁঠাল, গ্রীষ্মে শিমলা থেকে টোম্যাটো কড়াইশুঁটি ফুলকপি, পুণা হায়দ্রাবাদ থেকে ব্রয়লার, রায়গড় থেকে সফেদা, ভুসাওয়াল থেকে কলা এনে ছেড়েছে পাটনা শহরের বাজারে, ওর কাকার সঙ্গে ব্যবসায়। পিপারিয়ার জমিদারি হাতছাড়া হলেও বর্ধমানের মেমারিতে আছে এখনও বসতবাড়ি আর কিছু তৌজি-মৌজা খামার-খতিয়ান। ওদের পারিবারিক কিংবদন্তি অনুযায়ী, ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা ছিলেন নামকরা ঠগি। বাড়ির সবাই এখনও রঙিন রুমাল রাখে। ঠগিদের বংশধর হবার গোপন গর্ব আছে সুশান্তর।

    কৃষিবিজ্ঞান পড়ে নোটপরীক্ষক। এনজিনিয়ার, জীববিজ্ঞানে ডক্টরেট, উচ্চ গণিতে স্নাতকোত্তর, জেনেটিকসে বিশারদ, সংস্কৃতে সান্মানিক স্নাতক, হরেক রকম শিক্ষিতের ছড়াছড়ি এই চাকরিতে, মজুর আর কেরানির এই দোআঁশলা কাজে ; একবার এই এগারোটা-একটার আরামে ঢুকে গেলে বড় একটা বেরিয়ে যায় না কেউ। দশ-বারো বছরের মাথায় কেরানিগিরির সাধারণ বিভাগে পদোন্নতি হলে কাজের ধারা পালটায়, কাজের সময়ও দশটা-পাঁচটায় আটকে পড়ে।

    অতনুকে ছাড়ে না পচা নোটের জীর্ণ গন্ধ, যে গন্ধে ওর চারিপাশে ঘনিয়েছে দুর্বহ স্বচ্ছ অন্ধকার। পোড়াবার সময়, চুল্লি থেকে ভেসে আসে মড়া পোড়াবার হুবহু, অথচ ছাইয়ের রং সোনালি ! চুল্লিতে নোট ফেলার সময় ননীদা হরিবোল দ্যান, রাণা রামদেও সিং আওয়াজ দিয়ে ওঠে রামনাম সৎ হ্যায়। চাকরির দোটানায় বেশির ভাগ স্বপ্নই স্বল্পপরিসর।

    উচ্চাকাঙ্খী মহিলাদের তিনজন, যারা পদোন্নতি পেয়ে ইউডি কাউন্টার আলোকিত করে, যদিও জোচ্চুরির ওই ঘেমো অঞ্চলে পুরুষদের একচ্ছত্র, কেননা জনগণের বেহুদা কিচাইন, টু-পাইস অফুরন্ত, খুল্লম খুল্লা। একটাকা দুটাকা পাঁচটাকার তরতাজা করকরে নোটের আনকোরা প্যাকেট, দশ-কুড়ি টাকা বেশিতে ঝাড়া যায়, বিয়ের মরশুমে প্রায় দ্বিগুণ, হাতজোড় কন্যাদায়গ্রস্তের কাতার। জোড়াতালি, তাপ্পি, ছেঁড়া, উইচাটা, ঝুরঝুরে, তেলচিটে, ছাতাপড়া, কাহিল, ভ্যাপসা নোট, যেগুলো কেউ নিতে চায় না, ছুঁতে চায় না, কুষ্ঠরোগাক্রান্ত, সেগুলো নিয়ে হাজিরা দ্যায় মুচকিমুখ দালালরা, আবডাল হলেই যারা মনে-মনে আর ফিসফিসিয়ে মাদারচোদ গধে-কা-লণ্ড রণ্ডি-কে-অওলাদ ভোঁসড়ি-কে-জনা কুত্তে-কা-চুত আওড়ায়, অতনুর সুশান্তর মানসী বর্মণের অসীম পোদ্দারের দপতরের উদ্দেশে, কাউন্টারের টেলরদের উদ্দেশে। দালালরা বাঁধা কমিশন হাতপাচার করে। দালালগুলো, কাউন্টারে কিউ দেবার জন্যে অফিসের সিকিউরিটির পালোয়ানদের টাকা খাওয়ায়, কেননা কিউতে প্রতিদিনের বরাদ্দ কেবল চল্লিশজন। ভিজিল্যান্স ধরেছিল সিকিউরিটে অফিসারকে, শর্ট সারভিস কমিশনের সেনাক্যাপ্টেন, সে ব্যাটা এখন ট্রান্সফার হয়ে ত্রিভান্দ্রম না নাগপুরে।

    কতরকমের নোট যোগাড় করে আনে দালাল নোট-বদলকারীরা। এত সূক্ষ্ম জোড়াতালি, শাদা চোখে টের পাওয়া যায় না কিচ্ছু। অফিসাররা পরখ করার জন্যে টেবিলের ওপর এনামেলের গামলায় ছাড়লে, কিছুক্ষণে আলাদা হয়ে ছিতরে যায় তাপ্পি দেয়া জোড়াতালি নোট। হয়তো দুকোণের সংখ্যাগুলো আলাদা, আদ্দেক আসলের সঙ্গে জোড়া আদ্দেক নকল, কিংবা কুড়ি টাকায় দুটাকার তাপ্পি, পাঁচশো টাকায় পাঁচ টাকা, সাতটা একশো টাকার নানা টুকরো জুড়ে একটা আস্ত। চিনে ছাপিয়ে এনে পাকিস্তানিরা নকল নোট ভারতের বাজারে ছাড়ার পর কিচাইন বেড়েছে। দালালগুলো আলট্রাভায়োলেট আলোর যন্ত্র কিনে যাচাই করে নেয় নোটগুলো নকল পাকিস্তানি না আসল ভারতীয়। পাকিস্তানি নোট হলে পুলিশের প্যাঁদানি, জেলহাজত, হুজ্জোতের শেষ নেই।

    আসল নোট যত বেশি পচা, যত বেশি নষ্ট, আবদার তত বেশি, পরিবর্তে অনুমোদিত টাটকা নোট পাবার নিয়ম তত খুঁতখুঁতে, পাশ করার অফিসারের পাদানি তত উঁচু। জুড়ে-জুড়ে কাঠ হয়ে গেছে যেসব নোটের প্যাকেট-বাণ্ডিল, গায়ে গা সেঁটে আলাদা হতে চায় না, উইচাটা থিকথিকে, গ্রামীণ আটচালায় ছিল সোঁদা দেয়ালবন্দি, খামার বাড়ির মাটির অযাচিত গভীরে কলসিবদ্ধ, গাছতলায় পোঁতা গোমোট কাঠের বাক্সে, আত্মহত্যাকারিনীর সঙ্গে জ্বলে আধখাক বা আধসেঁকা ঝুরঝুরে, চেহারা পালটে কাগজ না নোট বোঝার উপায় নেই, এসেছে হয়তো জেলা মুজফফরপুরের মিঠুনপুরা মোহোল্লার রমইরাম বিধায়কের রক্ষিতার বাড়ি থেকে ঘুষের ফাউ, ধানবাদের এ এস পি রেজি ডুংডুঙের ধরা ব্যংক ডাকাতের বস্তা থেকে, সন্ত কানেশ্বরের অমরপুরী আশ্রমের তহখানায় বহুকাল লুকোনো, সে-সব বহুরূপী নোট পাস করেন আরও বড়ো সায়েব। দালালদের বরাদ্দ খাতিরে হাফসায়েব ছোটোসায়েব বড়োসায়েবরা দিনকানা। কোন অফিসের কোন বড়ো সায়েবের দুর্বলতা ঠিক কী আর কতটা নামতে পারেন, দালালরা, ভারত দেশে ছড়ানো অদৃশ্য নাইলনজালের বুনোটে, জানে, না-জানলে চলে না, আর বদলি হলে কাঁড়ির তাড়া বেঁধে ধাওয়া মারে সে-শহরে। দেখতে ভিকিরি সে-সব দাঁত-ফাঁক দালালরা, দাঁতের ফাঁক থেকে টুথপিক দিয়ে মোরগের ডানা বের করতে-করতে, হাওয়াই জাহাজে পাড়ি দ্যায় এক রাজধানি থেকে আরেকে, তোবড়ানো তোরঙ্গে নোটের পচা লাশ নিয়ে। কারোর বা অজানা শহরে বেনামা ব্যাংক খাতায় আড়মোড়া ভাঙে বখশিশ। দেওয়ালি দশেরায় পেস্তা কাজু খোবানি মুনাক্কা আনজির কাগজিবাদামের রঙিন ডিবে। স্টেনলেস স্টিলের, লা ওপালা চিনামাটির ডিনার সেট। শিভাস রিগ্যাল, ব্ল্যাক ডগ, কিং অফ কিংস, আবসোল্যুট।

    গত বছর গরমকালে সুশান্ত, এক শনিবার মহঙ্গুর দোকানে বিকেল ছটায় অপেক্ষা করতে বলেছিল, বগেড়ির মাংস খেয়ে জীবনের অ্যাকশান রিপ্লে দেখাতে নিয়ে যাবে। অতনুর বাসা মহেন্দ্রুতে। সব রকম মাংস পাওয়া যায় মহঙ্গুর দোকানে। ওর নোলানির্ভর রান্না আরম্ভ হয়নি তখনও। কড়াই ডেকচি ঘুমোচ্ছে পোঁদ উল্টে, কোনে ঠেশান দিয়ে জিরোচ্ছে খুন্তি হাতা সানচা। বুকের বসনখোলা তনদুরি চিকেনগুলো গায়েহলুদের মশলা মেখে দোল খাচ্ছে দড়িতে, শিকে গেঁথা খরগোশ, পাঁঠার ঠ্যাঙের ডাঁই অ্যালুমিনিয়াম পাতে ঢাকা টেবিলে, পায়রার গোলাপি মাংস, বারকোশে পোস্ত আর সাদাতিল মাখা কিমার কাঁচাগোল্লা, ভগ্নস্বাস্হ্য ছাগলের হাড় থেকে চলছে কাবাবের মাংসের চাঁছাই।

    মোটর সাইকেলের পিলিয়নে হেলমেট পরে বসতেই, সুশান্ত বললে, চল, অকুস্হল কাছেই। বুঝলি তো, বিগ বস খান্না সায়েব রিটায়ার করার আগে সিক লিভ খরচের জন্যে একমাসের ছুটিতে। তাঁর কাজ সামলাতে হেড অফিস থেকে এসেছেন ডেলিওয়েজ কড়ারে মুখার্জিসায়েব। চল্লিশোর্ধ টাকমাথা, কড়া লোক হিসেবে কর্মীমহলে পছারিত, দু-বার ঘেরাও আর সাতবার ধর্নার খেতাব আছে।

    ফ্রেজার রোডে, সম্রাট হোটেলের পার্কিং লটে, দোচাকে দাঁড় করাতে, অতনু বললে, ‘, এসব তেলফেল দেয়া আমার দ্বারা হবে না। ’

    ‘ধারণা করতে পারবি না, এমন ব্যাপার,’ বাঁ চোখের বাঁ কোণ সামান্য কুঁচকে জানিয়েছিল সুশান্ত।

    রিশেপশানে খোঁজ করে সাততলার সাতশো বত্রিশ নম্বর ঘরে কোকিল-ডাক কলিং বেলে টোকা দিতে, দরোজা সামান্য ফাঁক, ভুরু কোঁচকানো চাউনি চারিয়ে এক ঝটকায় মেপে নিলেন দুই কুতূহলী খোট্টাকে। সিঁথে উল্টে চুল বাড়িয়ে টাক-ঢাকা মাঝবয়সী দোহারা। ফরসা। পাজামা ধবধবে। মেরুন সিল্কের ড্রেসিং গাউন। উড়ছে আড়িপাতা বিলিতি পারফিউম আবছা অন্ধকার শীতাতপে। বিছানায় গোলাপি মখমলের চাদর দেখা গেল ফাঁ দিয়ে। মুখার্জি মশায় একটু পেছোতেই, ঘরের ভেতর ফুলদানি রাখা টেবিল-থামের পাশে দাঁড়িয়ে সুশান্ত ভদ্রতার অভিনয় করল, ‘আমার নাম সুশান্ত ঘোষ, আপনার আনডারে কাজ করি, ডি সেকশানে। ’

    ‘ও, আমি এক্ষুনি বেরোবো, আপনারা যদি রবিবার সকালের দিকে আসেন। ’ ভেসে এলো হুইস্কি-প্লাবিত চেতনা।

    ‘ঠিক আছে স্যার, রবিবার সকালেই আসব, এর নাম অতনু চক্রবর্তী, একই সেকশানে। ’

    ‘ওওওও, বারিন্দির বামুন। ’ হাসলে কপালের শিরা ফোলে। ‘সাতটা শকুন মরলে একটা বদ্যি, আর সাতটা বদ্যি মরলে একটা বারিন্দির। ’ কাঁধের ওপর ঘাড়-বেঁকানো, মুচকি দিয়ে দরোজা ভেজিয়ে দিলেন।

    ‘জিরিয়ে নেয়া যাক। ’ জাজিমে ঢাকা সিএফএল প্রায়ান্ধকার করিডরের শেষ প্রান্তে রাখা উনিশ শতকী ঢাউস অ্যান্টিক সোফার কালো ফোমনরম কোলে বসে, কাচের টেবিল থেকে চকচকে বিদেশি পত্রিকা হাতে নিয়ে জানালো সুশান্ত, বলল, ‘তুইও একটা পত্রিকা তুলে মুখ ঢেকে ওই দিকে উঁকি দে। ’ সবুজ কার্পেট পাতা নিঝুম ছমছমে, পেতলের ঝকমকে গামলায় ঘরকুনো গাছালির ফিকে সবুজ পাতায় ঘন সবুজের ফোঁটা। বাস্তবকে রহস্যখুশি দিয়ে যতটা অবাস্তব করা যায়। কারই বা বাস্তব ভাল্লাগে।

    চিকন রঙিন পত্রিকার বিদেশিনী মাই খোলার এক ফাঁকে, দেয়াল ঘড়িতে সাতটা বাজার কুহু শেষ হয়নি, লিফ্ট থেকে একজন চৌখশ নীল-পাগড়ি আধবুড়ো শিখ দালাকে দেখা গেল খুঁড়িয়ে বের হতে, পেছন-পেছন হলুদ শালোয়ার লাল কামিজ হলুদ ওড়না মাথায়, প্রায় ফর্সা স্বাস্হ্যবতী, যাকে মুখার্জির শীতল ঘরে টোকা দিয়ে ঢুকিয়ে, লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে ফেরত গেল লিফটে। করিডর আবার ফাঁকা নিস্তব্ধ।

    ‘দেখলি তো ? তার মানে রোজ সন্ধে সাতটায়। ’

    ‘রোজই হয় বুঝি ? কে খবর দিলে তোকে ?’

    ‘এ ব্যাতার রোজ নতুন মডেল চাই। এর বড়ো ছেলে কানপুরে না খড়গপুরে আইআইটিতে পড়ে। শালা বাঙালির নাম ডোবালো। ’

    ‘লিঙ্গের কোনো জাত ধর্ম ভাষা দেশ হয় না। ’

    কথাটা বলে ফেলে অতনু টের পেল, অজান্তে অদ্ভুত সত্যি কথা বেফাঁস উগরে ফেলেছে। লিঙ্গ এক উপহাসাস্পদ আবরদক। বেশিটা জীবন কেটে যায় এর ওপর ভর দিয়ে অথচ জিনিশটা কত অনুর্ভরযোগ্য। কত তাড়াতাড়ি একে জ্বালাতন করা যায়, ধোঁকা দেয়া যায়, হাল ছেড়ে দেয়া যায় এর। কিন্তু এমন ভান করে যেন অজাতশত্রু, মালিককে জাদুক্ষমতা দিয়ে দিতে পারে এমন অস্ত্র যেন, পেশীহীন আঙুল-পোকাটাকে তাই সদম্ভে চেষ্টা করে যেতে হয় সর্বনাশের বিরুদ্ধে লড়তে। কিছুই করার নেই মুখার্জির।

    ‘তাই তোকে বলেছিলুম, গেলবার হরিহর ছত্তরের মেলার সময় নাংগা ক্যাবারে দেখে আসি শোনপুরে ; গেলি না। দেখলে তো আর চরিত্র তোর নষ্ট হবে না।’

    সুশান্ত নিজে গিয়েছিল যদিও, মোটর সাইকেলে। তখন গঙ্গার ওপর পাটনা সিটির কাছে এপার-ওপার পোলটা হয়নি, এপারে মহেন্দ্রুঘাট থেকে ওপারে পহলেজা ঘাট বাচ্চাবাবুর স্টিমার যেত দিনে চার খেপ, ঢাউস ঢেউ তোলে, নামে স্টিমার হলেও মাপে বিরাট। সে-বছর বৈশালীর বিধায়ক বীর মহোবিয়া মেলা থেকে একটা পাগলা হাতি কিনে নিয়ে গিয়েছিল, একশো লেঠেলের পাহারায়। মহোবিয়ার কাছ থেকে হাতিটা কিনেছিল পালামৌ জেলার বিশ্রামপুর বিধানসভা এলাকার বিধায়ক বিনোদ সিং, সি সেকশানের কয়েননোট এগজামিনার দেবেন্দর পরসাদ সিংএর ফুফেরা কাকা, যে কিনা দিনদুপুরে পুলিশ খুন করে যশশ্বী হয়েছিল, খ্যাতি পেয়েছিল নিজের বিরাদরিতে। মালহানের ফজল মিয়াঁ, কমরুদ্দিন, সহজ গঞ্জুকে পিটিয়ে করেছিল আধমরা, চিত্তবিনোদনের জন্যে। চিত্ত সেরকম হলে শির উচ্চ হয়। পাগলা হাতি কিনে জোতদাররা শির উচ্চ করার উপায় খুঁজে পেয়েছিল। হাতিটাকে মাঝরাতে শেকল খুলে এমন খেপিয়ে দিত বিনোদ সিং যে জেগে থাকতে বাধ্য হতো গ্রামবাসী। ব্যাটাকে অবশ্য খুন করতে বাধ্য হয় সহানুভূতিশীল লোকেরা, যারা রাতে একটু ঘুমিয়ে নিতে চায়। উচ্চ শিরকে মাঝরাতেই নামিয়ে দিয়েছিল কেউ ; নামিয়ে পাগলা হাতির পায়ের তলায়।

    ‘বিম্বিসার অশোক জরাসন্ধ অজাতশত্রু এদের থেকে খুব একটা তফাত নেই, না ?’

    ‘আচ্ছা, কার কাছ থেকে জানলি মুখার্জির ফাইভস্টার অভিসারের কথা ?’

    ‘মোটা টাকার পচা বাণ্ডিল পাশ করার এই একটাই আবদার লোকটার। মাগি খায়। ভিজিল্যান্স বোধহয় আদিরসের স্টক নিয়ে ঘাঁটায় না কাউকে। আমরা প্রোমোশান পেয়ে ওই পোস্টে উঠতে-উঠতে বুড়িয়ে যাব। ’ সত্যিকার আফশোয সুশান্তর গলায়।

    কুড়ি মিনিট পড় মাথায় হলুদ ওড়না দাঁত চেপে ঢালু কাঁধ ত্রস্ত মেয়েটা লেফটের বদলে পাকানো সিঁড়ি বেয়ে অদৃশ্য হতেই, সুশান্ত সোফা থেকে তড়াক, অতনুর হাত ধরে হালকা পায়ে, তারপর সাতশো বত্রিশে কলিং ঘণ্টি বাজায় আর দরোজা খুলতেই, ‘স্যার, আমার গগলসটা ফেলে গেছি। ’ সায়েবের কোমরে গোলাপি তোয়ালে, সাজানো টাকের চুল উস্কোখুস্কো, ধামসানো বিছানার চাদর চেয়ারে দলা। দরোজার পাশে উঁচু পাতলা স্ট্যাণ্ডে রাখা গ্ল্যাডিওলির গামলার পাশ থেকে চশমাটা তুলে, ‘সরি স্যার, ডিস্টার্ব করলুম। ’

    মুখময় কুয়াশামাখা মুখার্জির সামনে, স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার, দু-চোখ জুড়ে অগাধ দূরত্ব। লোকটা আবিষ্কার করছিল ওরা দুজন তার দিকে প্রখর চাউনি মেলে তাকিয়ে।

    লিফটের দরোজা বন্ধ হতেই, ‘হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ, পেট ফেটে গেল। ’

    সুশান্ত : না, বালিশের পাশে কনডোমের প্যাকেট ছিল।

    সুশান্ত : রেকর্ডারে মোৎসার্টের বাইশ নম্বর কনচের্টো লাগিয়ে রেখেছেন ভদ্দরলোক ; পিয়ানো আর অর্কেস্ট্রা।

    সুশান্ত : টাক থেকে ভুরুর কাজল মোছার সময় হয়নি !

    সুশান্ত : ভাবতেই পারেনি, ঢুঁ মারব।

    সুশান্ত : দেখে নিস, নির্ঘাৎ হোটেল পালটাবে কাল।

    সুশান্ত : একেলে ? সেকেলে ? আধুনিক ? উত্তরাধুনিক ? কী বলা হবে লোকটাকে ?

    পরের দিন, বুধবার সন্ধেবেলা, বধিরদের মধ্যে কেচ্ছা যেভাবে একান-সেকান হয়, একই শিখ নোট এক্সচেঞ্জার দালালের সঙ্গে ময়লাপানা ডাগরচোখ শাদা টিপ শাদা অরগ্যাণ্ডি শাড়ি, পীনোন্নত ব্লাউজে, গলায় নকল মুক্তোর মালা, ঢ্যাঙা ছিপছিপে। পাটলিপুত্রা হোটেলে, কেননা গোপন রাখতে ঠাঁই পালটেছেন সম্রাট থেকে এই হোটেলে। দরোজায় কান রেখে সুশান্ত বলেছিল, ‘হিউগো মনটেনেগরোর ফিস্টফুল অফ ডলার্স। ’

    পঁয়তাল্লিশ দিন জুড়ে হরেকরকম নারীর আনাগোনার মাঝে ওরা শুনল, হোয়াম-এর দ্য এজ অফ হেভেন, মাইকেল জ্যাকসনের ‘আই অ্যাম ব্যাড’, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু উউ উউ উউ উউ’, ফিল কলিনসের ‘অনাদার ডে ইন প্যারাডাইস,’ বনি এম-এর ‘ব্রাউন গার্ল ইন দ্য রিং,’ মোৎসার্টের সোনাটা পনেরো, সোনাটা ষোলো, এলভিস প্রেসলির ‘বোসসা নোভা বেবি, বড়ে গুলাম আলি খাঁ-এর ‘কা করুঁ সজনী আয়ে না বালম,’ দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের ‘আজি এই গন্ধবিধুর সমীরণে,’ বাখ-এর চার নম্বর কনচের্টো, লোপামুদ্রার ‘ছাতা ধরো হে দেওরা এইসান সুন্দর খোঁপা হামার ভিঁজ গেলাই না। ’ শুনলো নজরুল, অতুলপ্রসাদ, আব্বাসউদ্দীন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পূর্ণদাস বাউল, কিশোর কুমার, মোহম্মদ রফি, কুমার শানু, শ্রেয়া ঘোষাল, লতা মঙ্গেরশকর, আশা ভোঁসলে। জানে না বলে কারা গেয়েছে, কী গান, হদিশ করতে পারল না সুশান্ত, তা কিশোরী আমনকর-এর বসন্তবাহার, পণ্ডিত যশরাজের রাগ ভবানীবাহার, ভীমসেন যোশীর হিন্দোল বাহার, মল্লিকার্জুন মনসুরের বসন্তি কেদার।

    –লোকটা তো হরফনমওলা। এমন বাঁধাধরা সময় করে ফেলেছে। ও তো পাভলভের কুকুর। গড়িতে সাতটার ঢং ঢং হলেই, দুপায়ের মাঝখানে চিতচোর কেলেঙ্কারি। একেবারে ঠাপ্পু ওস্তাদ !

    –সেই জন্যে রোজ আলাদা-আলাদা গান বাজায়। বউয়ের সঙ্গে শোবার সময়েও নিশ্চই বাজায়। বাড়িতে প্রচুর গানের স্টক করে ফেলে থাকবে। ঘোড়ার ডাক্তারি, বি ভি এস পড়ে আমাদের পরের ব্যাচে চাকরিতে ঢুকেছে জীবন দে সরকার আর অখিলেশ শ্রীবাস্তব, ওদের জিগ্যেস করেছিলুম।

    –আমার মধ্যে দুটো সুড়সুড়ি চালু হয়েছে। গানবাজনা বুঝতে আরম্ভ করেছি।

    –অন্যটা ? ভুরু কোঁচকায় সুশান্ত। আঁচ করে ফেলেছে। হোসটেলে পুসায় পড়ার সময়ে, অনেক কাল আগে ওর মধ্যেও খেলেছিল। দুটো ব্লক ছিল ছাত্রাবাসের, হোমো ব্লক আর হেটেরো ব্লক। জবাবদিহি চাইবার মতন গলার আওয়াজ টাকরায় ঠেকিয়ে, তাই :’বল ? অন্যটা ?’

    –কিছু কিছু ব্যাপার আগে কুকাজ ভাবতুম, এখন আর সেসব তেমন খারাপ মনে হচ্ছে না। কেমন যেন লিবারেটেড ফিল করছি। বোধহয় গানের প্রভাব।

    বুদ্ধ মার্গের পাশের রাস্তায়, ধোঁয়া-ডিজেলের ছিন্নাংশে মোড়া ব্যস্ত শহর পাড়ার ভিড়ের মাঝে, লাল মোটর সাইকেলের থ্রটলের গলাখাঁকারি তুলে, জড়োয়া ঝিকমিকে বাজারের সামনে, ছুটন্ত মোটরগাড়িগুলোর শ্যেনদৃষ্টি আলোয়, ফ্যাস করে এক মুহূর্তের জন্যে ফোঁপানির ঝলক তুলে নিজেকে সামলায় সুশান্ত।

    অতনু : আজ ওব্দি তুই বললি না, কার কাছ থেকে জেনেছিলি !

    সুশান্ত : রমা বউদির কাছ থেকে।

    অফিসের কেয়ারটেকারের বউ রমা, টেলিফোন অপারেটার। সকলের কথাবার্তা আড়ি পেতে শুনে মশলাদার গল্প চেপে রাখেন আর হাসেন নিজের মনে গিগ গিগ। ওনার বিয়ের আগে কেয়ারটেকার রাঘব সান্যালকে লেখা রমা ব্যানার্জির আট পাতার চিঠি, কাগজের এদিক-ওদিক খুদে-খুদে হাতের লেখায়, পড়েছিল অতনু-সুশান্ত। আত্মহত্যার চিরকুটে প্রেমপত্রের মিশেল। রাঘবের জাঁতাকাল অনুনয়, ‘একটা খসড়া লিখে দাও না অতনু। ওর সবকিছু এতো ছোটোছোটো কচিকচি, রুখতে পারলুম না। ‘অতনু উপদেশ দিয়েছিল, চোখমুখ থেকে অভিনয় এক্কেবারে বাদ দিয়ে, ‘বিয়ে করে ফেলুন না, ওসব ফালতু লেখালিখে দিয়ে কী করবেন !’

    অফিস বিলডিঙেই সাজানো-গোছানো কোয়ার্টার পেয়েছিল রাঘব। বোতামখোলা একাকীত্বে অকালমৃত স্তনেরা জীবন ফিরে পায়। প্লাসটিকের তৈরি বাঁশপাতার সবুজ খড়খড়ি তুলে ঢুকে পড়ে হাসিমুখ রোদ্দুরের আবালবৃদ্ধবনিতারা। সৈন্য বাহিনীর শর্ট সারভিস কমিশন থেকে ফিরে আসা রাঘব কী একখানা ছিল। অফিস এলাকাকে যুদ্ধক্ষেত্র আর যগ্যিবাড়ির চনমনে চেহারা দিয়েছিল, এ সে-ই। জিপের ট্রেলারে, তাঁবুর তলায়, তুষারের মেঝেতে, গান ক্যারেজে, ট্যাংকের মধ্যে বসে, উটের ছায়ায় মরুভূমির বালিতে, হোমো করার ফিরিস্তি। মেয়েমানুষের অনুপস্হতি দিয়ে ঘেরা দুর্ভেদ্য যৌনতার নড়বড়ে আর নাছোড় স্ট্যাগ কিংবদন্তি। সৈন্য জওয়ানদের জন্যে মুখস্হ হিন্দি হুকুমগুলো চারিয়ে যায় কামিন কামিলা মজুর দারোয়ান ঝি চাকর আরদালি পিওন চাপরাসি খানসামা ঝাড়ুদারদের দুনিয়ায়। আর্মি ক্যানটিনের ঘোড়াছাপ রাম। আফরিকানিবাসীদের মতন ঠাশবুনোট চুল ওর, আঁচড়াতে হয় না, তেল দিতে হয় না। রনা বউদির দেওয়া কোনও খবর গোপন রাখতে পারে না রাঘব।

    রাঘবের দেয়া মুখার্জি মশায়ের বিদেয় পার্টির শেষে, পটলের দোরমা চিংড়ির মালাইকারি গোবিন্দভোগের পায়েস হয়েছিল। অতনু সুশান্ত আনন্দ বোস অরুণ মুখার্জি মণিমোহন মুখার্জি মলয় রায়চৌধুরী প্রদীপ দাশগুপ্ত বাইরে পোর্টিকোয় বেরিয়ে দ্যাখে গেটের কাছে হকিস্টিক সাইকেল চেন লাঠি নিয়ে মারপিট চলছে দু-দল কর্মীর। চন্দ্রকেতু সিং-এর রাজপুত-ভূমিহার গ্যাঙের সঙ্গে তফসিলি গ্যাঙের। ইউনিয়ান নেতা ছিল চন্দ্রকেতু সিং, বছর চারেক, কলকাতা থেকে বদলি নিয়ে আসার পর, কলকেতিয়া স্লোগানবাজি দলাদলি ল্যাং-মারামারি চুকলি শিখে কুরমি কায়স্হ আর গোয়ালারা ওকে ঠেলে ওরই চেলা বেচয়েন লালকে ইউনিয়ান নেতা বানিয়ে ফেলেছিল। মারপিটটা এইজন্যে যে একজন দুসাধ কেরানি নিজেকে রাজপুত হিসেবে পরিচয় দিয়ে চন্দ্রকেতুর গোপন মিটিঙে যোগ দিত, তা ফাঁস হয়ে গেছে। রামচিজ সিং, দুসাধকে, ধোলাই দেয়া আরম্ভ হতে, লাঠিসোঁটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে সবাই, দু-দলের পালোয়ানরা।

    –ওঃ, কী করে এমন একটা অসভ্য দেশে থাকেন। মুখার্জি সায়েব কোঁৎ পাড়েন। চলন্ত মারপিটের মাঝ দিয়েই ওনার গাড়ি বিমানবন্দর যাবে।

    –গেটের বাইরে ওসব, চিন্তার কিছু নেই স্যার।

    –অনেক বাঙালি পরিবার নাকি বিহার ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

    –হ্যাঁ, দিল্লি লখনউ মুম্বাই আর তা না হলে পশ্চিমবঙ্গ।

    কথাটা সত্যি, অতনুর মনে হল। গঙ্গাভিলার ছেলেরা চলে গেছে। লঙ্গরটুলির রায়রা। নাগ ডাক্তার। রেডিও টিউটোরিয়ালের বাঁড়ুজ্জে। সমরেণ চক্রবর্তী আর ওর ভাইরা। জীবনময় দত্ত আর ওর বউ, কলকাতায় সাহিত্য করবে বলে। গরদানিবাগ, চাঁইটোলা, লোদিপুর, কংকরবাগ থেকে, পরিবারের পর পরিবার। বাঙালির প্রিয় মাছগুলোই আর আসছেনা পাটনার বাজারে। এখানের জাতপাতের লড়াইতে বাঙালিরা কোন দিকে, নাকি যে যেমন জাতের সেই দিকে যাবে কিনা নির্ণয় নিতে পারছে না বলে পালাচ্ছে। ইসকুলগুলোয় আর বাংলা পড়ানো হয় না। সরকার বাংলা টেকস্টবুক ছাপায় না। বাংলা শিক্ষক নিয়োগ করে না। হিন্দিতেই বাড়িতে কথা বলা আরম্ভ করে দিয়েছে বহু বাঙালি পরিবার। বাংলা অ্যাকাডেমির সভা হলে বাইরে পানের দোকানে দাঁড়িয়ে হিন্দিতে কথা বলেন কোনো-কোনো সদস্য। বিহার ছেড়ে পালাচ্ছে বাঙালিরা। যাদের জো নেই তারা ভাগলপুরের বাঙালিদের মতন স্হানীয় সংস্কৃতিতে মিশে যেতে বাধ্য। সাংস্কৃতিক চাপ থেকে চাগিয়ে ওঠা দুঃখের খতিয়ান রাখে না কোনো ভূভাগের ইতিহাস। মিলিয়ে যায় হরপ্পাবাসী বা মিশরীয়দের মতন।

    মারামারির মধ্যে দিয়েই এগোলো অফিসের গাড়ি, মুখার্জি আর রাঘবকে নিয়ে। একাধজনের মাথা ফেটে গেছে, জামায় রক্ত, তেড়ে হিন্দি গালাগাল চলছে। গাড়ির কাঁচ তুলে না দিলে পটল চিংড়ি গোবিন্দভোগ উগরে দিতেন মুখার্জি।

    ‘জায়গাটা বড্ড ড্রাই’, সুটকেসে কেবিন ব্যাগেজের টভাগ বাঁধতে-বাঁধতে বিমানবন্দরে বললেন মুখার্জি। বখশি৯শের নিয়মমাফিক লোভে ড্রাইভার রমাকান্ত দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ, পেল না। মুখার্জি সিকিউরিটি চেকে সেঁদিয়ে গেলে, রাঘব বেরিয়ে আসছে, রমাকান্ত’র উষ্মা, ‘স্যার, লোকটা লুচ্চা, পর-পর তিনটে রবিবার নৌকোয় মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করেছে গঙ্গায়। ’

    ‘তুই কী করে জানলি ?

    ‘আমার ট্যাকসি করে ঘাটে গিসলো। ’

    গাড়লের মতন কাশতে পারে এমন একটা সাত গ্যারেজের তেল খাওয়া ট্যাকসি কিনেছিল রমাকান্ত। অফিসের নতুন গাড়ি থেকে কলকব্জা মায় টায়ার চালান হয়ে গেছে তাতে। ঘাঁটালে, রমাকান্ত মুরমু ওর ঝাড়খণ্ডি বেরাদর দিয়ে চটিয়ে দেবে মজদুর ইউনিয়ানকে, আর অফিসের মারাঠি ম্যানেজার রাঘবকে বলবে তুমি ট্যাক্ট জানো না। ট্যাকসিটা রমাকান্ত’র ছেলে ছিরিকান্ত চালায়, এটা-সেটায় লাগে। রাঘব সত্যিই অবাক পেল নিজেকে, ওর ছেঁদো খুচরোর লোভ দেখে, বলে ফেলল, ‘কেন, ভদ্দরলোকদের নুনু হয় না বুঝি ? যতো নুনু বাঞ্চোৎ ফুটপাতিয়াদের। জিভের আড় থেকে সৈন্যজওয়ানদের বিটিং দি রিট্রিট হয়নি আজও। সুবেশ মধ্যবিত্ত বাঙালি চোস্ত হিন্দি গালাগাল আরম্ভ করলে থম মেরে যায় বাতাস।

    বিমানবন্দর থেকে ফেরার সময়ে অফিসবাড়ির পেছনের গলিতে ঢোকার মুখে চায়ের দোকানে স্যাঙাতদের সঙ্গে চন্দ্রকেতু সিং, মাথায় ব্যাণ্ডেজ। ‘সব মিটমাট হয়ে গেছে তো ?’ গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বের করে রাঘব জিগ্যেস করায়, চন্দ্রকেতু জবাব দ্যায়, ‘আরে গান্ধিজি বেঁচে থাকলে এসব আম্বেদকরাইটদের রাস্তা মাপিয়ে দিতুম। ’

    ভেতর, চটের পর্দার আড়ালে, তিন পাত্তির জুয়া খেলছে কয়েকজন কেরানি নোট-পরীক্ষক আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ; জুয়া খেলায় শ্রেণি বিভাজনের পাঁচিল হয় না। বোর্ড মানি নেবে বলে, বাঁশের বেঞ্চের ওপরে ঠ্যাঙে ঠ্যাং তুলে বসে আছে চন্দ্রকেতু ; বালিয়া জেলায় ওর বাপের দোশো একর ধানজমি আর পঞ্চাশ একর গ্যয়েরমজরুয়া জমি রেখেছে দখলে। পাটনায় রাজেন্দ্রনগরের একতলা ফ্ল্যাটের চারপাশে বেড়া তুলে সরকারি জমিতে মোষ পুষেছে। দুধ আর ঘুঁটে বেচে। অফিসে কাজটাজ ছোঁয় না। বললে, ‘হেঃ হেঃ, ইউনিয়ান কা কাম, জানতে হি হ্যাঁয়। ’

    ফ্ল্যাটে ফিরে রাঘব জানতে পারল, ঝিয়ের চোদ্দ বছরের মেয়েটা, যাকে ওর বাপ পরশু শশুরবাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল, আজ সকালে তার লাশ পাওয়া গেছে, কোইলওয়র নদীর বালিতে পোঁতা। পুলিশ তার শশুর আর খুড়শশুরকে গ্রেপ্তার করেছে, বলাৎকার, খুন আর লাশ লোপাটের চেষ্টার দায়ে। মেয়েটার বাপ-মায়ের আছাড়ি-পিছাড়ি কান্নাকাটি চলছে রাঘবের কোয়ার্টারের দোরগোড়ায়।

    রাঘব : ছোটোবেলায় কতবার গেছি কোইলওয়র চড়ায় পিকনিক করতে।

    রমা : কই, আমায় নিয়ে যাওনি তো কখনও !

     
     

     

    দুই

    ঢ্যাঙা ময়লা দোহারা গোলমুখো রাঘব। বেহেড রাম টেনে পেশী গলছে, রক্তে চিনি অবশ্যম্ভাবী, হিসিতে পিঁপড়ে লাগতে শুরু। টুকলি-স্নাতক বলে ওর ছুটির দরখাস্ত, ফিনাইল সাবান ঝ্যাটা ডাসটার সোয়াইপার ন্যাপথালিন, মানে অফিসকে ঝকঝকে রাখার জন্য যাকিছু দরকার, তার আর্জি, যা আগে অতনু লিখে দিত, এখন রমা লেখে। পদাতিক জওয়ানের ওপর যুদ্ধ লড়ার ভার দিয়ে তাঁবুতে আয়েশ করেন ব্রিগেডিয়ার।

    অতনু : টাকা গোনার কেরানিগিরির চেয়ে ঢের ভালো কাজ এই মেথর-ঝাড়ুদার খ্যাদানো।

    ন্যাতানো হিলহিলে সাতবাস্টে পোকালাগা ঝিমিয়ে-পড়া তেলচিটে নোংরা নোটের পাহাড়-ঘেরা উত্যকায় বসে একনাগাড়ে বিচলিত হবার চেয়ে, ও-কাজ অনেক আরামের। নোটের মাঝখানে বসলেই টেনশান। রক্তে গিরগিটি সাঁতরায়। তলপেটে পাঁকাল মাছ কিলবিল করে। প্রথম দিকে তো ঘুমই হতো না।

    রাঘব : শুধু ঝাড়ুদার খ্যাদাই কে বললে আপনাকে ? বেসমেন্টে ফুটবল মাঠের মাপে যে ভল্টটা আছে, দেখেছেন ? চারপাশে আয়না-লাগানো এনটার দ্য ড্র্যাগন করিডরে রাইফেলধারী প্যারামিলিটারি চব্বিশ ঘণ্টা ? আমাকেই খেয়াল রাখতে হয়। সিকিউরিটির অ্যালার্ম বেলের পাগলা ঘণ্টির মহড়ার সময় দেখেছেন ? সবচেয়ে বেশি ছোটাছুটি করতে হয় এই রাঘব বোয়ালকে।

    আগ্রহ নেই বলে দেখেনি অতনু। কী আর এমন আছে দেখার ! কর্মচারীরা ইচ্ছে করলে নিজেদের জরুরি কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজ গয়নাগাটির বাকসো সিল মেরে রাখতে পারে ওখানে, বিনে খরচে। অন্য কোথাও লকার নিতে হবে না। ইনকাম ট্যাক্স সেলস ট্যাক্স সিবিআইরা অতর্কিত হানায়, যা আজকাল আখছার বলে অ্যাকাউন্টস অফিসার বিরক্ত, যে সোনাদানা হিরেমুক্ত পাউণ্ড ডলার ইউরো থাক-থাক নোট পায়, পেল্লাই কালো-কালো তোবড়ানো ট্রাঙ্কে ভরে, ফেলে রেখে যায়, হাভাতে প্যাংলা জনাচারেক দিনমজুরের কাঁধে চাপিয়ে। সহজে ফয়সালা হয় না সেসব কেসের, পড়ে থাকে বছরের পর বছর। কালো প্যাঁটরার ওপর জমতে থাকে কালো প্যাঁটরার পাহাড়। অ্যাকাউন্টস অফিসার চেঁচায়, ‘বাঞ্চোতগুনো সুইস ব্যাঙ্কে রাখলেই পারতো, নিজের বাড়িতে কেন যে লুকিয়ে রাখে। ’

    ব্যাপারটা দেখার অনুসন্ধিৎসায় সুশান্ত একটা ফাঁকা চুরুট বাকসো, ওর জ্যাঠার, চটে মুড়ে সিল করে রেখে এসেছে। ননীগোপাল বসু সেদিন ভল্টের বিঘত লম্বা চাবির গোছা ঝুলিয়ে, নাকে রুমাল বেঁধে, পচা টাকার গোটা পঞ্চাশ বস্তা পোড়াতে নিয়ে যাবার জন্যে বের করছিলেন, সুশান্তকে বললেন, ‘বাঃ, এই বয়সেই গুছিয়ে নিয়েছ বেশ। ’

    পাটনা শহরে যেবার বন্যার কোমর-উঁচু জল ঢুকেছিল, বেসমেন্টের নতুন-পুরোনো সব নোট গলে হালুয়া হয়ে গিয়েছিল তিন দিনে। চরম ক্ষতি হয় রাম ইকবাল সিং হিন্দি অনুবাদকের। নেপাল থেকে দু’কিলো ভালো জাতের আফগানি চরস এনে রেখেছিল, ঠাকুরের গয়না বলে।

    ননীগোপালবাবুর কাজটা উচ্চপদ্সহ মুদ্দোফরাসের। দিনের পর দিন নাকে রুমাল, টাকে তোয়ালে, অলস দুপুরের টাক-ঝলসানো রোদে, চুল্লির জানলাফোকর দিয়ে, গুণে-গুণে অগুনতি বিষাক্ত বাণ্ডিল ফেলা, কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরানো, দাউ-দাউ ওব্দি শিমুল গাছের ছায়ায়, উনুনবাড়ির চুল্লির খিড়কিতে তালা দেয়া, তালা টেনে দেখা, পরের দিন সকালে এসে ছাই খুঁচিয়ে পরখ কোনো নোট বেঁচে আছে কিনা। সে-সময়ে ময়লা নোটের শ্বাসকষ্টে ঠাস করে ফেটেছে, ননীবাবুকে অবাক করে, শিমুলের উদাসীন বিগতযৌবন তুলোকৌটো ; মুহূর্তখানেকের জন্যে ননীগোপাল-যন্ত্রকে খোকাপুরুষে পালটেছে বসন্তঋতুর ইয়ার্কি।

    হেডঅফিস থেকে উড়ো খবর এসেছে যে নোট পোড়ানো বন্ধ করে এবার নোটের পাল্প তৈরি হবে আর তা থেকে কাগজ তৈরি হবে। পাল্প তৈরির মেশিন বসবে কয়েকটা সরকারি কেন্দ্রে। সেখানে চালান যাবে বস্তাভরা পচা নোট।

    চুল্লিটার দেয়ালে এক অবিবেচল অশ্বথ্থগাছ, পাত্তা না পেলে এসব গাছগাছালির যেমন হয়, হু-হু বেড়ে চলেছে, কেউ ওপড়াতে চায়নি। এখন কাটতে কারোর সাহসে কুলোয় না, কাটলে বংশরক্ষা হবে না। রাঘব খুঁজে-খুঁজে কাহার কুর্মি দুসাধ মুসহর চামার হাজাম পাশি ডেকে এনেছে। তারপর শিয়া সুন্নি কুরেশি বোহরা আহমেদিয়া শিখ খ্রিস্টান কাঠুরে ছুতোর বা কসাই। ‘হায় বাপ, পিপল,’ বলে পালিয়েছে সবাই।

    ‘রাঘববাবু, ইউ ক্যান নট কাট ডাউন দি পিপল,’ বাঁ হাত দিয়ে ডান কান থেকে রুমালের খুঁট তুলে বলেছেন ননীগোপাল, অনেকের মতে কমরেড ননীগোপাল।

    ননীবাবুর এই অনুমান যে যতদিনে জোয়ান গাছটা চুল্লিটাকে খাবে, ততদিনে অবসর প্রাপ্তি ঘটে যাবে ওনার, কপালের ওপর আব বেড়ে আলুর মতন হয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। ধারণাটা ঘা খায়, চুল্লিটার ওপর প্রচণ্ড বৃষ্টির রাতে লকলকিয়ে বাজ পড়লে। অশথ্থ গাছটা জাগ্রত প্রমাণ হওয়ায়, কর্মচারী অফিসার ফিরিঅলা দালাল সবাই সেলাম ঠোকে গোড়ায়। বেচয়েন লাল সেখানে পয়সা ফেলার বাকসো রেখেছে কোঅপারেটিভ ক্রেডিট সোসায়টি আর কোঅপারেটিভ স্টোরের সিংকিং ফাণ্ডের জন্য। রাণা রামদেও সিং কোঅপারেটি স্টোরের সচিব থাকাকালে, তালের টিন গুঁড়োদুধের টিন জ্যাম জেলি স্কোয়াশের বোতল ইঁদুর আরশোলা আর মাকড়সায় খেয়ে ফেলেছিল। অডিটাররা বিশ্বস করেছে রানা রামদেও সিং-এর বক্তব্য।

    মুখার্জি এসেই বেচয়েন লালের বাকসো সরাতে চেয়েছিলেন। হেডঅফিসে ফ্লপিতে লিখে নোট পাঠিয়েছিলেন, কুরিয়ারে, তখন ইনটারনেট বসেনি পাটনা অফিসে। যাবার দিন গাছটার গোড়ায় সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে একটা পাঁচশো টাকার নোট ঢুকিয়ে গেছেন বাকসোটায়। উনি যেসব অখদ্দে নোট পাস করেছেন, সেগুলো পুড়ে নষ্ট হবার পরই ধ্বসেছে চুল্লিটা। আসছে মাসের ছাব্বিশ লাল পেনসিল হাতে তারিখে অডিট পার্টি এসে পড়বে।

    রাঘব : ননীদা তো স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে নিলেন গো। সোনালি করমর্দন। গ্র্যাচুইটির টাকায় বাংলাদেশি মেয়ে কিনছেন কোন নোট এক্সচেঞ্জারের কাছ থেকে। হিন্দি মতে বিয়ে করবেন।

    রমা : উনি নাকি ভারজিন ?

    রাঘব : হ্যাঁ, বিহারে থেকেও ভারজিন রয়ে গেলেন। আমাকে বিয়ের যোগাড়যন্তর করতে হবে আর সম্প্রদান।

    রমা : যাক, একজন সুপারঅ্যানুয়েটেড জামাই বোনাস।

    রাঘব : গোলমাল হবে না তো ? মেয়েটা বগুড়ার মুসলমান। ঝি-গিরি করে থাকা-খাওয়া কুলোচ্ছিল না, তারপর শরীর বেচত। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাফাঙ্গা না বেধে যায়।

    রমা : তুমি অত ভিতু কেন ? বাংলাদেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধ করতে গিসলে, আর এটুকু সামলাতে পারবে না ? তা ননীদার খর্চাখরচ কেমন পড়ল ?

    রাঘব : পনেরো হাজার। দেখতে-শুনতে নাকি দারুণ। ইচ্ছে করে নোংরা সেজে থাকে মেয়েটা, যা শহরের অবস্হাগতিক।

    রমা : ননীদার তো কোনও টেলিফোন আসে না। নোটের ছাই ঘাঁটতে-ঘাঁটতে মড়ার সোনার আঙটি !

    বিয়ের রাতে, ক্লার্ক অওয়ধ হোটেলের ব্যাংকিয়েট হলে, লোহার হোমকুণ্ড থেকে হিলহিলে ধোঁয়াক্কারে, লিট্টি, বথুয়াশাক, মেথিফোড়ন-দেয়া খোসাসুদ্দু আলুরসুন, বেগুনের ভরতা, লাউয়ের পায়েস, আটার কাচাউড়ি খেতে-খেতে সুশান্ত আর অতনু থ, স্তম্ভিত, হতবাক, এঁটোহাতে কর্তব্যবিমূঢ়।

    সম্রাট হোটেলে মুখার্জির ঘরে যে মেয়েটি ঢুকেছিল প্রথম দিন, আর অতনুর দেহ ওর জীবনে অর্গলবর্জিত হতে প্রশ্রয় দিয়েছিল, সেই রহস্যময়ীর নাবাল সুগন্ধ, দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে, আলপনা আঁকা পিঁড়ের ওপর, সে এক বিপর্যয়। ওরা দুজনেই মনে-মনে চেঁচাচ্ছিল, যা কেবল ওরা দুজনেই, সুশান্ত আর অতনু শুনতে পাচ্ছিল, “ননীদার কাছে যেও না ; আমরা আওরংজেবের অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে দেব। ”

    ‘আর করলার খোসা শুকিয়ে খাবেন না ননীদা, ঠোঁট দুটো মিষ্টি রাখবেন, বহুমূত্র, সরি, অ্যাঁ, ডায়াবেটিস সামলাবার বদ্যি তো পেয়ে গেলেন’, প্রশাসন বিভাগের অরিন্দমের মন্তব্যে নিজেদের সামলে ওঠার সময় আর সুযোগ পেল সুশান্ত আর অতনু ; আর সেই ফাঁকে পকেটে বাঁ হাত ঢুকিয়ে তটস্হ ভাব দূর করতে চাইল সুশান্ত, অতনু ধুতির কোঁচায়। ঘাড়ের কাছটা, লাল ব্লাউজের ওপর যেটুকু খোলা, সুশান্ত মনে-মনে সেখানে ঠোঁট চেপে রইল।

    মালাবদল করতে-করতেই, ননীগোপাল ধমকে উঠলেন অরিন্দমকে, ‘অতনু-সুশান্তদের ক্যাশ সাইড থেকে ক্লারিকাল সাইডে বদলির কেসটা চেপে রেখেছিস কেন ?’

    চন্দ্রকেতু সিং জানালো, সবাই বাংলায় কথা বলছে বলে, কিছুই টের পাওয়া যাচ্ছে না। ওর রাজপুত ভূমিহার স্যাঙাতরা ওর সমর্থনে হইহই করে ওঠায়, বেচয়েন লাল বাঙালিদের তরফ নিয়ে নিলে তড়িঘড়ি, কেননা এদান্তি ও কমিউনিস্ট নেতা জগন্নাথ সরকারের সঙ্গে ওঠবোস চালু করেছে, ইউনিয়ানের নির্বাচনে বাঙালিদের ভোট টানতে হবে।

    চশমা, বাইফোকাল, পরে যাতে শুভদৃষ্টি করতে না হয়, তাই নরম কনট্যাক্ট লেন্স, বশ অ্যান্ড ল্যাম্বে ধোয়া, করিয়েছিলেন ননীদা। আর তেমন বুড়িয়ে যাওয়া ঘোলাটে ঘোলাটে দেখাচ্ছিল না ; গোঁফে কলপ, ঠোঁটে হালকা লিপ্সটিক, দামি পারফিউম, শ্যাম্পু-করা বুকে আধপাকা চুল, দুবাই থেকে ঝকঝকে জুতো, নেপাল থেকে চিনা-সিল্কের পাঞ্জাবি, ঢাকা থেকে ধুতি, যতোটা দেখন-জোয়ান করে তোলা যায়।

    মামুদ জোহের ওর পুরো নারী-নারকো গ্যাঙ নিয়ে, অসীম পোদ্দার, দেবেন্দর প্রসাদ, মলয় রায়চৌধুরী, শিবু পালিত, সজল, অশোকতরু, কমলেশ, প্রতুল, নরেশ, রবীন দত্ত, পুলক, সুশীল প্রায় সবাই হাজির। সারারাত সে কি নাচ ! দমাদম মস্ত কলন্দর, কোই মুঝে পগলা কহে, দম মারো দম, ডিজের ফাটা রেকর্ড ঝমাজঝম। সবাই টঙ। টাল্লি। টাইপিস্ট বাহাদুর চউবে, কর্মচারীদের দশ টাকায় দশ পয়সা প্রতিদিন হিসেবে ধার দেয়। একপাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের দলে মানসী বর্মণ, শ্যামলী কর্মকার, উমা ভর্মা, নয়নিকা জায়সওয়াল আরও অনেকে। দপতরি গুলাব শর্মা, ছোটো জাতে বিয়ে করে আর ফেরত যেতে পারেনি গ্রামে। ভাজপা, ইনকা, ভাকপা, জপা, জদ গোষ্ঠীর অনেকে। দালালরা নতুন পোশাকে। এলাহি।

    দিনভর জোয়ান হয়ে ওঠার অফুরন্ত নাড়িস্পন্দনের দাবদহে ননীগোপাল নিজের সঙ্গে তর্কে ব্যস্ত, চাউনি দিয়ে ঘেরাও। জানলায়, হলদে নরম কলকে ফুলের দুর্বল ডালে, ভোরবেলায়, দোয়েল পাখির বন্দিশ আশ্রিত গান। পৃথিবীতে এর আগে কলকে ফুল দোয়েল পাখি ছিল না। হুড়মুড় কোথ্থেকে এসে পড়েছে বর্ষাকাল। অন্ধকারের অন্দরমহলে নক্ষত্রদের অবাধ গতিবিধি। বার্ধক্যের কাছাকাছি যখন, বিয়ে করে, শৈশবে হারানো বগুড়া ময়মনসিংহ খুঁজে পেলেন তার অপাপবিদ্ধতার গভীরে, সেখানে, সে অতল-গভীরে, রুই মাছের পিচ্ছিল ঝাঁক পাশাপাশি রুপোলি বাসা বাঁধে।

    ননীগোপালের বিয়ের রাতেই কিছুটা অপ্রকৃতিস্হ দেখাচ্ছিল অরিন্দমকে, মদ তো খায়নি ও। তবু কথায়-কথায় ‘না।’ কেউ কিছু না বলতেই, বাসর জাগার মাঝে, ‘না।’ ‘না।’

    –এই অরিন্দম।

    –না।

    –কী হয়েছে ?

    –না।

    –আরে, কী হয়েছে ?

    –না।

    –যাঃ।

    –না।

    –ইয়ারকি রাখুন তো।

    –না।

    –বোকা নাকি !

    –না।

    –নাটক বন্ধ কর দিকিনি।

    –না।

    এক্কেবারে মাথা খারাপ হয়ে গেল শুমুলতলা থেকে ফেরার পরই। ওর মামা চালান করে দিলেন কলকাতার লুম্বিনি পার্ক। ‘কেমন যেন অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিল এদান্তি, তোমরা কিছু জানো ?’ পাশের ফ্ল্যাটের তিরিশোর্ধ গৃহবধুর সঙ্গে অফিস পালিয়ে দুমদাম দুপুর কাটাচ্ছে, জানত ওরা। বলল, সুশান্তই বলল গোবেচারা মুখে দুশ্চিন্তার অভিনয় টাঙিয়ে, ‘না, আমাদের তো কিছু বলেনি ও।’ অরিন্দমের থেকে সাত বছর বড়ি পীনোন্নত মহিলা আসল কাজটা করতে দিচ্ছেন না, অথচ চলছে দুবছর, মুখ আর আঙুল দিয়ে পারস্পরিক যেটুকু হয়। শেষ হাসিখুশি ছিল অরিন্দম শিমুলতলার ক’দিন। তারপর আবিষ্কৃত হয় লুঙ্গি গেঞ্জিতে মোগলসরাই স্টেশানে। নতুন টাকার ষোলোটা প্যাকিং বাকসো বেনারসে স্টেট ব্যাঙ্কে পৌঁছে ফেরার সময় শিবু পালিত ওর কাঁধে হাত রাখতেই, ‘না’। ব্যাপার কী জানতে চাওয়ায় একদলা থুতু বাঁ হাতের তেলোতে নিয়ে কপালে ছপ। সেই কবে বাবা মারা গেছেন অরিন্দমের। বোনের বিয়ে হয়েছে আকাশবাণীর এক গায়কের সঙ্গে। মা আর ছোটো ভাই।

    অরিন্দমের মামার বাড়ির বাইরে বেরিয়ে, গেটের কাছে, ‘পাশের ফ্ল্যাটেই চলছে দু’বছর অথচ ওর মা কেন টের পাননি ?’ প্রশ্নের মধ্যে প্রমেথিয়াসের মতন মুকখু হয়ে উঠতে চাইছিল অতনু।

    শিমুলতলায় ইউনিয়ানের হলিডে হোমে হুড়দংগ। অতনু সুশান্ত মৌলিনাথ অরিন্দম। রাত্তিরে পাথুরে পথে জোনাকি-ওড়ানো অন্ধকার বুনো বাতাসে চারজন উদোম উলঙ্গের লাট্টুপাহাড় জয়। দুপুর পাহাড়ি নদীর জলের তলায় ডুবে জলেতে কেবল উচ্ছৃত শিশ্নটুকু ভাসাতে, মৌলিনাথের ওয়াটার অর্কিড দর্শণ আর চিৎকার। জলে কিছুতেই নামতে চাইছিল না গৌর-গা মৌলিনাথ। অরিন্দম কালো, শৈশব থেকে সর্ষের তেল মালিশ-খাওয়া চিকনত্বক কালো, নার্ভাস হলে নাক খোঁটে।

    ‘চেহারা তো কয়লার খাদান, কী করেই বা মেয়েমানুষটা হ্যাণ্ডল করছে আপনাকে,’ অরিন্দমের ভাসমান শিশ্নকে উদ্দেশ্য কে ক্রুদ্ধ মৌলিনাথ, মোটা কাচের চশমায় খুদে-খুদে চোখ। অফিসে বসে দুপুরের লাঞ্চ-খাওয়া হাই তুলতে গিয়ে রেটিনা ফ্র্যাকচার। ভর্তির পরীক্ষায় কেরানিদের তালিকায় শীর্ষে ছিল মৌলিনাথ। রমা ব্যানার্জির জন্যে রাঘবের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় নেমেছিল রোগা পাতলা কালো অরিন্দম। অরিন্দম জিততে-জিততে ছেড়ে দিলে। পাশের ফ্ল্যাটে ততদিনে বগলকাটা ব্লাউজের খাঁজ নামতে নামতে করাঘাতের আওতায় ; সন্দেহের অতীত তখন হয়ে চলেছে জীবনের সার্থকতা।

    –ননীদার বউয়ের নাম জানেন নাকি ? মৌলিনাথ প্রসঙ্গ পালটাতেই জলের তলা থেকে শেকড়ের ঝুরিসুদ্ধ উঠে এসেছিল তিনটে তিন রঙের অর্কিড ফুল।

    –সুলতানা, সুলতা বলে ডাকেন ননীদা।

    –তুই কী করে জানলি ?

    –রাঘব নেমন্তন্ন করেছিল ওনাদের।

    –ননীদার বউ কি শাড়ি পরে না শালোয়ার ?

    –শাড়ি, শাড়ি। তোর প্রেমিকাদিদির মতন ল্যাংটো থাকবে নাকি, ঠিক দুকুরে !

    –না, মানে…

    –ননীদার কিন্তু উচিত ছিল আমাদের ফিইস্ট দেয়া।

    –তারপর আপনি ঢুকে পড়ুন ওনার হেঁসেলে।

    –ঢুকতে দিলে ঢুকব।

    –ছুঁচ যখন ফাল হয় তখন ছুঁচের কষ্ট কেই বোঝে না।

    –শাল্লাহ।

    চানটান করে ফেরার পর গায়ে, মানে চুলহীন বুকে, আর ভাতখোরের সদ্যনতুন নেয়াপাতিতে পাউডার মেখে, হলিডে হোমের গাড়িবারান্দার সিঁড়িতে বসেছিল, পরিপাটি চুল, কাঁধে পৈতে, স্মৃতির ধোঁয়াটে এলাকায় ঘুরছিল এক মনে অরিন্দম। মৌলিনাথ বেশ কিছুক্ষণ যাবত অরিন্দমের খোলা পিঠের বাঁ দিকে আলতো ঘুষি সহযোগে, ‘প্রেম করা হচ্ছে ! পরকীয়াবাজি ! অ্যাঁ ?’ বড়বড় করে যাচ্ছিল অবিরাম। আচমকা খেঁকিয়ে অরিন্দমের ককিয়ে ওঠা, ‘কী হচ্ছে কী, লাগে না নাকি !’ শিশুরও লা্বে না এমন আদর-ঘুষি, ওরা তিনজন স্তম্ভিত, বিব্রত। চুপচাপ।

    গলা খাঁকারি দিয়ে অতনু, ‘যাই, দাড়িতা কামিয়ে আসি’, আর সঙ্গে-সঙ্গে সুশান্ত, ‘চল, আমায় একটা শ্যাম্পুর স্যাশে কিনতে হবে।’ রাস্তায় রাস্তায় ফ্যা-ফ্যা শেষে সন্ধে নাগাদ ফিরে এসে ওরা দুজন দেখল, কাঠের বাসন্তী আঁচে সুস্বাদু খরগোশ ঝলসাচ্ছে মৌলিনাথ আর অরিন্দম, লোহার শিকেতে ন্যাকড়ামোড়া দুটো দিক বাঁ-হাত ডান-হাত করছে। মুখময়, দু-জনেরই, উপশমহীনতার আভা। চোখে-মুখে নগর জিয়ন উপভোগের করুণ ও দয়নীয় আনন্দপ্রবাহ। খেতে-খেতে, খাবার পর, শুতে যাবার সময়, কেউ কোনও কথা বলেনি। সকালে মিটকি মেরে পড়ে থেকে চারজনেই দেরিতে একে-একে উঠেও কথাবার্তা না-হওয়ায়, সুশান্ত চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘শিমুলতলা তো দেখা হয়ে গেল। আর কী ? ফেরা যাক তাহলে। ’ ও, সুশান্ত, নিজের ব্যাগ গোছানো আরম্ভ করলে, অরিন্দম মৌলিনাথ অতনুও দেখাদেখি।

    মনের মধ্যে বিতর্কিত মতান্তর চলছিল চারজনের। যে যার নিজের।

    মৌলিনাথ : কোথ্থেকে এই পাতিপুরুষ নোটগুনিয়েদের পাল্লায় পড়লুম। না আসলেই ভালো ছিল। চারদিনের ছুটি নষ্ট। ঘোরাঘুরি আর খাওয়া। বই নেই কাগজ নেই টিভি নেই। পড়াশুনা করে না, গবেটের দল। ছ্যাবলামি আর নোংরামো। ভদ্রতা নেই, আদর্শ নেই, চিন্তা নেই। অফিসে চারদিনে অনেক কাজ জমে যাবে। অ্যাকাউন্টেন্ট মিত্র সায়েব হাসি-ঠাট্টা করবেন। জ্যোতিন্দর প্রসাদকে বলে আসা হয়নি। তাড়াহুড়োয় ছুটির দরখাস্তটা কমরেড এ কে সিনহাকে দিয়ে এসেছিলুম।

    সুশান্ত : জায়গাটায় কোনো ব্যবসার জিনিস কালেক্ট করার সুযোগ নেই। এটা এক্কেবারে ট্যুরিস্টদের স্বাস্হ্য ফেরাবার আড্ডা। প্রেমিক-প্রেমিকা টাইপের ছেলে-মেয়েও রয়েছে, কনডোম তো গেস্টহাউসেই গোটাদশেক পড়ে থাকতে দেখেছি, নানা রঙের। প্রেমের আবার রঙও হয়। দুধের মিষ্টি এখানে প্রচুর হয় বটে, কিন্তু তা পাটনায় নিয়ে গিয়ে বিক্কিরি লোকসান। ফলটল বাইরে থেকে আসে। লর্ড কর্নওয়ালিসের পেয়ারের জমিদারদের স্বাস্হ্য ফেরাবার কিংবা মোসাহেব সঙ্গে নিয়ে মাগিবাজি করবার বাগানবাড়িগুলো ভেঙে পড়ছে, প্রোমোটারদের নজরে এসেছে মনে হচ্ছে। কয়েকটা পালটে গেছে হলিডে হোমে, যদ্দিন টেকে, ধ্বসে না পড়ে। হোমগুলোর জন্যে মদের দোকান চলছে। আরেকটু খোঁজখবর করা যেত। ভেস্তে দিলে অরিন্দম আর মৌলিনাথ। পরে কাকার সঙ্গে আসব একবার। মা-বাবারও ভাল্লাগবে জায়গাটা। আসাম থেকে এক ট্রাক আনারস আনার জল্পনা করছিল কাকা। কদ্দুর এগোলো কে জানে।

    অরিন্দম : আমার অবস্হা তো কেউ আর বুঝবে না। মিথ্যে নিয়েও কী গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অসহ্য। এই দুর্গতি থেকে আরোগ্যের উপায় নেই। অথচ জীবনে বিরুদ্ধে আমি কিছুই করিনি। পালাতে হবে। দুঃখের নিজস্ব আনন্দ থেকে পালাতে হবে। কোথায় যাব ? নিঃশ্বাস ধরে রাখার ক্ষমতা আর আজ আমার নেই। পালানো কি নৈতিক বিজয় নয় ! ধাতানি খেয়ে গড়াতে-গড়াতে মানুষ নিজের ঠাঁই টের পায়। জানাজানি হলে আত্মহত্যা ছাড়া উপায় নেই। কী ভাববেন মা ? না। না। ছেড়েছুড়ে চলে যাব অন্য কোথাও। কাশি গঙ্গোত্রী হরিদ্বার দ্বারকা রামেশ্বরম। কলকাতায় বদলির দরখাস্তটা মঞ্জুর হয়ে গেলে বেঁচে যেতুম। ওখানেও যদি জেনে যায় সবাই ? ফালতু ছেঁদো লোকেরাও ঘেন্না করার টিটকিরি মারার বিচার করার ক্ষমতা পেয়ে যায়। কেন যে এমন একটা বিপদে আটকে গেলুম ! নেকড়েরা কবর খুঁড়ে লাশ খাবে। পাড়াপড়শি সহকর্মী মৌলিনাথ সবাই জুরি। অবুঝ। ওদের নিয়ম-নীতির বাইরে গেলেই প্রতিশোধ নেবে। ওফ।

    অতনু : জায়গাটা সত্যি, পৃথিবীর বোধহয় সব জায়গাই, কেমন যেন ভালো লেগে যাবার ব্যবস্হা করে রাখে। এরা সব নিজের হ্যান নিজের ত্যান নিজের অমুক নিজের তুসুক নিয়ে কাটিয়ে দিলে। আমিও তো, অন্যের কোনও কাজে এলুম না। নিজেরই বা কী কাজে এলুম ? আমার বেঁচে থাকার মানে কি কেবল আমার ? অরিন্দমের প্রশ্বাসেও রয়েছে স্বীকারোক্তি : প্রেম চাই, নারীর দায়-দায়িত্ব চাই না। অবশ্য, একজন মানুষের গোপনীয়তা তার নিজের। কেন কিছু ব্যাপার গোপনীয় ! এটা আসলে একরকমের চুরি। তালা তো আগে তৈরি হয়, চাবি পরে। জীবনে অনেক ঘটনা এমন যে অপরাধ আর বিচারের তফাত থাকে না। পিঠে লাঠি খেয়ে অনুভবের নতুনত্ব আসে। তা নতুন তো বটে !

    ‘–চল, ইস্টিশানে গিয়ে ট্রেনের টাইম দেখে নেব। কোনও না কোনও ট্রেন তো থাকবে। আমি রেজিস্টারে সই করে চৌকিদারের হিসেব মিটিয়ে দিয়েছি। ’ সুশান্ত জানালো।

    স্টেশানে পৌঁছে প্রচণ্ড ভিড়। শ’দুয়েক লোক প্ল্যাটফর্মে। ট্যুরিস্ট নয়। কালো আটপৌরে সাধারণ মানুষ, নোংরা, গরিব, স্নানহীনতার দুর্গন্ধ। অনেকের হাতে ঝাণ্ডা, কে জানে কোন দলের। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল পাটনাগামী ট্রেন আসছে। চুম্বকে আলপিনের মতো ঝুলছে মানুষ, ট্রেনের ছাদে, এনজিনের সামনে। খাটোধুতি, প্ল্যাটফর্মে বসে-থাকা এক বৃদ্ধের কাছে সুশান্ত, তার হাত থেকে ঝাণ্ডাটা চেয়ে নিয়ে, জানতে পারল, গত আট আগস্ট জামশেদপুরে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার তরুণ তুর্কি নেতা নির্মল মাহাতো খুন হয়েছেন, তার মানে যেদিন ওরা এখানে এসেছিল, সেই দিনই। এরা সবাই পাটনা যাচ্ছে গুসসা অভিযানে।

    ট্রেনের ঢোকা কেবল দুষ্কর নয় অসম্ভব আঁচ করে, হাতের ঝাণ্ডা উঁচু, ট্রেন এসে পড়েছে প্ল্যাটফর্মে, সুশান্ত ঝাণ্ডা উঁচু করে, যত জোরে পারে চেঁচিয়ে উঠল, ‘নির্মল ঞাহাতো জিন্দাবাদ। ’

    : জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।

    : মাহাতোজি অমর রহে।

    : অমর রহে, অমর রহে।

    : নির্মল মাহাতো।

    : জিন্দাবাদ।

    : জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।

    : নির্মল মাহাতো জিন্দাবাদ।

    : ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা।

    : জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।

    তাকে ঘিরে-ওঠা ভিড়কে সঙ্গে নিয়ে একটা কামরায়, শোষক আর শোষিতের আবহমান সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে, ট্রেনের কামরায় ঢুকে গেল সুশান্ত। ওরা তিনজন পারল না উঠতে। ছেড়ে দিল ট্রেন। ট্রেন অদৃশ্য হলে স্টল থেকে একটা খবরের কাগজ কিনলে মৌলিনাথ।

    দক্ষিণ বিহার জুড়ে হরতাল। গমহরিয়ার কংগ্রেসি অমরেন্দ্র সিনহা, ডুমারিয়ার বনরক্ষক প্রয়াস পাসওয়ান, আদিত্যপুরের সতীশ শর্মাকে কুপিয়ে মেরেছে রাগি জনতা। রাঁচি চাইবাসা জামশেদপুর দুমকায় ভয়ে কেউ বেরোচ্ছে না রাস্তায়।

    টিসকোর চামারিয়া গেস্টহাউসের পোর্টিকোয় পৌড়ায়াটের ঝাড়খণ্ডি বিধায়ক সুরজ মণ্ডল আর নির্মল মাহাতো কথা বলছিলেন স্হানীয় দুই সংবাদদাতা এন কে সিং আর সুনীল ব্যানার্জির সঙ্গে। অওতার সিং তারির মায়ের শ্রাদ্ধ ছিল, তাই রাঁচি থেকে আসার সময়ে মোর্চার কর্মকর্তা বাবুলাল সোয় আর শিবাজি রায়ও মাহাতোজির সঙ্গে ছিলেন। সকাল সাড়ঢ নটা নাগাদ দেখা করতে এসেছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট টি এন শর্মা। তারপর কালীপদ মাহাতো যে গাড়িটা কিনেছিল, যেটাকে ঝাড়খণ্ড ক্রান্তিরথে পালটে বিহার বাংলা ওড়িশা ঘোরার পরিকল্পনা, সেটার অনুমোদন শেষে পোর্টিকোয় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন দুজনে। আচমকা ঘঢ়টানি খেয়ে একটা গাড়ি এসে থামতে, পাখির ডানার মতন গাড়ির চারটে দরোজা একসঙ্গে খুলে, দুমদাম তিনজন বন্দুকধারীর সঙ্গে নামে জামশেদপুরের রংবাজ বাহুবলী বীরেন্দর সিং আর তার দুই ভাই পণ্ডিত-পপপু। চিৎকার করে হুকুম দেয় বীরেন্দর, ‘দুটোকে আজকে এখানেই উড়িয়ে দে। ’ দুজন ঠিকেদার সুনীল সিং আর শংকর সিংও দাঁড়িয়ে ছিল পোর্টিকোয়। ভ্যাবাচাকা কাটিয়ে ওঠার আগেই চলতে থাকে গুলি। নির্মল মাটিতে, রক্তে। সুরজ মণ্ডলের ডান হাত এফোঁড়।

    আগের বছর সোনারিতে, নভেম্বরে, বীরেন্দরের ওপর কয়েকজন লোক চড়াও হয়ে খুন করতে চেয়েছিল ওকে। নির্মলসুদ্দু মোর্চার ছ-সাত জনের নামে পুলিশে এফ আই আর করেছিল ও, বীরেন্দর। এও জানিয়েছিল যে সুবর্ণরেখা পরিকল্পনায় নির্মল বাইরের ঠিকেদারদের আনত, প্রায় নিয়মিত। ঠিকেদারির মালকড়ির বাঁটোয়ারায় নাকি গণ্ডোগোল। এদিকে সুরজ মণ্ডল বলছে যে পুরো ষড়যন্ত্রটা সেচ আর সংসদীয় মন্ত্রী রামাসুর পরসাদ সিং-এর, আট বচ্ছর যাবত বিশ সূত্রীর পুরো টাকা, সিংভূমে খরচ করার বদলে নিজে হড়পে নিয়েছে। বীরেন্দর ওর স্যাঙাত।

    তাত আগের বছর, মানে আগের বছরের আগের বছর, গরমকালে, সাহেবগঞ্জের ঝাঁঝিতে, গলায় ঝোলানো নতুন ডুগডুগি বাজাতে-বাজাতে একজন সাঁওতাল যুবকের পেছন-পেছন তীর-ধনুকধারী সাঁওতাল পুরুষ আর খোঁপায় ফুলগোঁজা নারীদের বিশাল মিছিলের ওপর পুলিশ যাণ পড়পড়িয়ে গুলি চালায়, যেন দোলের পিচকিরি নিয়ে রঙ খেলছে, পনেরোটা লাশ পড়ে গেলেও পালায়নি কেউ, কাননা মন্তর পড়ে নাচতে-নাচতে প্রায়-উদোম জানগুরু ঝাড়ফুঁক দিয়ে হাপিস করার চেষ্টা করছিল পুলিশ আর গুলিগোলার। ঝাঁঝি থেকে দিকুগুলোকে বিঠলাহা করার জন্য গ্রামে-গ্রামে সবুজ পাতা পাঠিয়ে বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছিল আগেই। কারি-পাহাড়পুর রকসি সবৈয়া কান্দর বড়াকেঁদুয়া জরদাহা পোখরিয়া এসব দুর্গম গ্রামে পুলিশের সঙ্গে ষড় করে দিকুরা মেরে ফেলেছে অনেক সাঁওতালকে। এই তালে, আইনশৃঙ্খলার গোঁজামিলে, উপজাতি এলাকার পাদরি, ফাদার অ্যান্টনিকে গুলি করে মেরে ফেললে পুলিশের দল, সাঁওতালদের ওসকানোর গুরু ঠাউরে।

    গণ্ডোগোলটা আরম্ভ হয়েছিল, জঙ্গল ইজারার ঠিকেদার, কঠের চোরাচালানি দিকু মোতি ভগত আর বনরক্ষক এরিক হাঁসদার হিসসা ভাগ নিয়ে। পুরো যতটা হিসসা হওয়া উচিত, তা পাচ্ছে না, এই উষ্মায় এরিক হাঁসদা বোরিয়া থানায় মোতি ভগতের বিরুদ্ধে এজাহার ঠুকে দিতে, মোতি ভগত থানার সবাইকে তোড়ে করকরে মিষ্টিমুখ করাবার ফলে, ভগত পেল কংগ্রেসের লোকজন, আর হাঁসদা পেল ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা। একদিকে দিকু আর রাষ্ট্র, অন্যদিকে অরণ্য আর উপজাতি।

    মৌলিনাথ চশমার পুরু কাঁচ পুঁছতে-পুঁছতে, ‘কবে সেই বিভূতিভূষণের আরণ্যক পড়ে ছিলুম ; আমরা তাহলে আজ কোথায় দাঁড়িয়ে ?’

    ‘–ভেবে লাভ নেই, ঘুরেফিরে সব বাঙালি পরিবার ওই কথাই ভাবছে।’ অতনু ফুট কাটল।

    অরিন্দম কোনও কথা বলা দরকার মনে করেনি। শিকারের আগে গোখরো যেমন মাথা তুলে ব্যাঙকে অভিবাদন জানায়, কিংবা পুলিশের কবর খুঁড়ে গুমখুন লাশ তুললে মৃতদেহ যেমন নিজের মনে হাসে, ও-ও, অরিন্দম, ‘সকলেই অস্হিরতা্য় ভুগছে’, ভাবল।

    ‘আর তো সন্ধে ওব্দি ফেরার গাড়ি নেই, চলুন না, দেওঘর বৈদ্যনাথধাম যাই ট্যাকসিতে,’ মৌলিনাথ প্রস্তাব দিতেই, আশ্চর্য, অরিন্দম সায় দিলে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।

    অতনু জানালো, পুকুরের ঠাণ্ডা জলে নামছে এমন সন্তর্পণে, ‘থ্যুৎ, আমি তো ধর্মের কিচ্ছু বুঝি না। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, টিশ্যু কালচার, পিনাল কোড, জয়েসের ইউলিসিসও যা, ধর্মও তাই। ’

    অরিন্দম বিড়বিড় করছে দেখে, ফেলে পালানো সুশান্তর উদ্দেশে চাপা ক্রোধে মৌলিনাথকে জানালো, ‘পৈতে আকটা পরি, বিনা মন্তরের, অফিসের শাদা টোয়াইনের, নইলে মা অশান্তি করেন। রামাশ্রে পাসওয়ানকে বললেই নতুন টোয়াইন দিয়ে তৈরি করে দ্যায়, অফিসের ড্রয়ারে স্টক করা আছে। এখন ওব্বেশে দাঁড়িয়েছে। আমি দিগভ্রান্ত থাকতে চাই।’

    খোকাবয়ব মৌলিনাথ দেখল ড্যাবড্যাবে, ফিসফিস করে বলা কথায় যে পুইরোনো তাচ্ছিল্য থাকে, বলল, ‘আরে, চলুন, চলুন। ’ মৌলিনাথ অরিন্দমের মধ্যে তুইতোকারি। অতনুর বেলায় বিশেষ মেশে না বলে, আপনি। নিজে থেকে এই প্রথম বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিল অতনু। বাবা মারা যাবার পর। অরিন্দম আর ওর বাড়ির খবরাখবর জানলেও, কিছুই জানে না মৌলিনাথের পরিবারের বিষয়ে। বরানগরে ওর আত্মীয়রা থাকেন, হয়তো, বাবা-মাও, কিন্তু দ্যাখেনি কাউকে কখনও ; আলোচনা করে না বাড়ির ব্যাপারে। পাটনায় এসে মেসবাড়িতে, তারপর একটা ঘরভাড়া, এখন অফিসের কোয়ার্টারে। একা থাকে, একা রাঁধে, একা খায়।

    সামনের সিটে অরিন্দম, পেছনে মৌলিনাথ ঢুলছে অতনুর পাশে। ছুটন্ত পিচপথের দুপাশে যত রকমের সবুজ হয়, সোনাঝুরি আকাশমণি মহুয়া সিরিষ আম দেওদার শিশু অর্জুন তমাল আমলকি বট অশথ্থ তাল খেজুর পিয়াল বকুল মাতামাতি করছে, বাতাসের আদর খেয়ে। প্রতিধ্বনি থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়তলি। অতনু ভাবছিল, অরিন্দমকে বলবে, পশ্চাত্তাপ মানুষকে খাটো করে, কিন্তু বলতে পারল না।

    মৌলিনাথ আর অরিন্দম গেল শিবের পুজো দিতে, বাংলা জানা এক পাণ্ডার হেপাজতে। পাণ্ডার দেয়া ধুতি পরে। ওদের জামা জুতো হাতঘড়ি মানিব্যাগ পাহারা দিতে-দিতে সুশান্তর প্রশংসা করছিল অতনু। সুশান্ত কতো অনায়াস ; বেঁচে থাকার এজেণ্ডা সর্বদা তৈরি, মুহূর্ত অনুযায়ী এজেণ্ডা।

    জলপ্যাচপেচে দালানে খালি-পা, গ্যাঁদাফুলের মালা গলায়, চন্দনের তেলক কপালে, আঁজলায় কচি শালপাতার ঠোঙায় প্রসাদ নিয়ে ফিরলে, অতনু জানতে চাইল, ‘কতো গচ্চা গেল ?’ তাইতে অরিন্দম, ‘ঠাকুরদেবতা নিয়ে ঠাট্টা করবেন না ; পৈতেটা দেবতাকে উৎসর্গ করে দিলুম, আর পরব না। ’

    মৌলিনাথ বলল, ‘তাড়াতাড়ি ছাড়ান পাবার জন্যে মানত করেছিস তো ? কাটিয়ে দে, কাটিয়ে দে। ’ অরিন্দম প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে গেল।

    জামাকাপড় পরে ওরা অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমের দিকে, এক্কাগাড়িতে। মৌলিনাথ গলা ছেড়ে দিয়ে, ‘বেএএদনায় ভোওওরে গিয়েছে পেয়ালাআআআ, নি্য়ো হে নিয়ো, হৃদয় বিদারি হয়ে গেল ঢালা, পিয়ো হে পিয়ো…’। এক্কাচালক মৌলিনাথকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আশ্রম মেঁ পিনা মনা হ্যায়। ’

    গেটের কাছে নামতেই, এক আশ্রমিক যুবক অরিন্দম কে বলল, ‘স্যার, আপনার কানে-কানে একটা মন্তর ফস করে বলে দেব, জীবন জুড়িয়ে যাবে। ’ একটু দূরে নিয়ে গিয়ে, বকুল গাছের ছায়ায়, ছেলেটি অরিন্দমকে বলল, ‘স্যার দশটা টাকা দেবেন, দরকার আছে। ’ দিয়ে দিলে। দিতে গিয়ে মানিব্যাগে রাখা মহিলাটির ফোটোটা বের করে উড়িয়ে দিল কুটিকুটি।

    আশ্রমে ঘুরতে-ঘুরতে, এক বিশাল বাদামি কুঁজউঁচু সাহিওয়াল ষাঁড় পাঁচিল ঘেরা চৌহদ্দিতে দাঁড়িয়ে ছুঁচলো গোলাপি শিশ্ন বের করে পা পটকাচ্ছে দেখে, অরিন্দম হনহনিয়ে আশ্রমের অফিসঘরে পৌঁছে, সামনের প্যাংলা চেহারা চশমাচোখ মাঝবয়সীকে, ‘দাদা, দিয়ে দিন না একটা গোরু, কতো কষ্ট পাচ্ছে প্রাণীটা, ওই তো অত্তো গোরু রয়েছে ওখানে, ওর মধ্যে থেকে দিয়ে দিন না একটা। ’ ওনারা, বৈরাগী কেরানিরা, অরিন্দমের মুখের দিকে বলদ-চাউনি মেলে, নিজেদের সেরেস্তাদারি বাক্যালাপে ফেরত যায়।

    আবার এক্কাগাড়িতে, গানহীন, স্টেশানের কাছে হোটেলে খেয়ে, ট্রেন ধরল ওরা, তখন রাত অনেক। গাড়ির হ্যাঁচকায়, আচমকা রুকে গেল বলে, বাংক থেকে ঝুঁকে মৌলিনাথ জানতে চাইল, ‘কোন স্টেশান রে অরিন্দম ?’ তারপর সাড়া না পেয়ে আবার, কিন্তু জবাব না পাওয়ায় ঝুঁকে বুঝতে পারল সিটে নেই অরিন্দম। সামনের বাংকটায় অতনু বেঘোর। ঝিমুনির মাঝে সহযাত্রীদের কথাবার্তা থেকে কে একজন কাটা পড়েছে শুনের বাংক থেকে নিচে লাফিয়ে ডাকল অতনুকে, ‘অরিন্দম সিটে নেই, কে একজন কাটা পড়েছে, গাড়ি থেমে আছে বেশ কিছুক্ষণ। ’

    ‘কী বলছেন কী,’ অতনু হতচকিত, ও-ও নামে লাফিয়ে, চটিতে পা গলিয়ে কামরা থেকে পাথরের ওপর, দৌড়োয় যেদিকে একদল লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে, আর পৌঁছে জোর দিয়ে ঠেলে ভিড়ে সেঁদিয়ে যায়। বীভৎস। থেঁতো হয়ে গেছে একেবারে। হাত আর মাথা ধড় থেকে আলাদা।

    –সামনেকি গাঁও কি অওরত হ্যায় কোই। খুদকুশি করলি বেচারি।

    রক্তে জবজবে শাড়ি, কাটা হাতে সবুজ কাঁচের চুড়ি, ভাঙেনি, আতঙ্ক আর উদ্বেগ স্তিমিত হলে, লক্ষ্য করে ওরা দু’জন। কামরায় নিজেদের জায়গায় যখন ফিরল, তখনও আসেনি অরিন্দম। গাড়ি ছেড়ে দিল। ওরা নিজেদের মধ্যে অরিন্দমকে নিয়ে বলাবলি করছিল, কিছুটা চাপা উত্তেজনায়, আঁচ করে সামনের বুড়োটে লোকটা, বোধহয় কৃষক, বেশ চওড়া হাতের তালু, পাকানো রোদে পোড়া গড়ন। জানালো যে আপনাদের সাথী বাড় কিংবা বক্তিয়ারপুরে নেমে গেছে। শুনে, বিরক্তি আর রাগ হল দুজনেরই। ট্রেনটা আস্তে-আস্তে ফতুহা স্টেশান পার হচ্ছিল।

    ফতুহা !

    এখানে, এই ফতুহায়, দেশ স্বাধীন হবার পাঁচ মাস আগে, তখন বিহারে কংগ্রেস দলের অন্তরিম সরকার, একটা ছুটন্ত মোটরগাড়িকে হাত দেখিয়ে, থামতে বলেছিল একদল পুলিশ। সবাই হিন্দু। ডাকাত ধরতে বেরিয়েছে। গাড়ির পেছনের সিটে কংগ্রেস দলের অধ্যক্ষ আবদুল বারি। দেশ স্বাধীন হলে উনিই হবেন রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। মোহনদাস করমচন্দ গান্ধি পাটনা আসছেন বলে বারি সাহেবের তাড়া। পুলিশ দল জানালো তারা বারি-ফারি কিছু জানে না, আর টেনে হিঁচড়ে গাড়ি থেকে রাস্তার ওপর ফেলেই একাধিক থ্রি নট থ্রি দিয়ে ঝাঁঝরা, ছলনি। মুখ থুবড়ে পড়লেন আর মারা গেলেন আবদুল বারি, শাহবাদ জেলার কোইলওঅর গ্রাম থেকে সবকিছু ছেড়েছুড়ে নুন বানাতে গিয়েছিলেন গান্ধির সঙ্গে। বলেছিলেন, পাকিস্তান-ফাকিস্তান মানি না। লড়াইটা হিন্দু মুসলমানের গোপন ষড়যন্ত্রের কাজিয়া, না রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, তা কেউ জানতে পারেনি। অ্যাডিশানাল জজ রায়সাহেব পি কে নাগ নামে এক বাঙালির এজলাসে পুলিশগুলোর বিরুদ্ধে মাসকতক মামলা চলার পর, ব্যাস, ভুলে যায় সবাই, সাংবাদিকরাও। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর তখতে বসলেন বিহার কেশরী নামে খ্যাত শ্রীকৃষ্ণ সিংহ, আর শুরু হয়ে গেল জাতপাতের খেয়োখেয়ি। বারি সাহেবের দুই ছেলে সালাউদ্দিন আর শাহাবুদ্দিনকে বারোকাঠা পুসতইনি জমি থেকে খেদিয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার প্রথম প্রজন্মের গুণ্ডারা। ভারতবর্ষের ভিড়ে হাপিশ হয়ে গেছে ওরা, আর ওদের ছেলেমেয়ে।

    অতনুদের বাড়ির কাছ থেকে পুর্বদিকে মাখানিয়া কুঁয়া চাঁইটোলা নয়াটোলা মছুয়াটুলি লঙ্গরটুলি দরিয়াপুর হাথুয়া মার্কেট বাকরগঞ্জ হবে যে রাস্তাটা গান্ধি ময়দানে গিয়ে পড়েছে, সেটার নাম এখন বারি পথ, মুসলমান ভোটদাতাদের জন্য কনসোলেশান প্রাইজ। গান্ধি ময়দানের দক্ষিণে, অতনুদের অফিসবাড়ির বিশাল অট্টালিকা। বারিপথের দু’পাশে সমস্ত ফাঁকা জায়গায় বাঁশের খুঁটি পুঁতে, চট টাঙিয়ে, অ্যালুমিনিয়াম হাঁড়িকুঁড়ির ষষ্টিপূজক ছট মাইয়ার সংসার, ভাত ডাল রুটি আলুসেদ্ধর দোকান, চুলকাটার, তাড়ির, গাঁজার, জুয়ার, তেলেভাজার, খাজা আর বেসনলাড্ডুর, রিকশ আর ঠ্যালা রাখার, বাঁশ আর শালখুঁটির, টিপ-সিঁদুর-চুড়ির পশরা দোকান, নানা দেবীদেবতার মিনিমন্দির।

    বারি পথের সমান্তরাল, গঙ্গার পাশ দিয়ে, পশ্চিমে পাটনাসাহেব থেকে পুবে খগোল ওব্দি এগিয়ে গেছে, দু’পাশে ঝকমকে দোকানপশরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল টাউনহল গোলঘর সাজিয়ে অশোক রাজপথ। সারা পাটনা শহর দেখা যায় গোলঘরের টং থেকে। দুর্ভিক্ষের শষ্যভাঁড়ার হিসেবে তৈরি হয়েছিল মন্বন্তরে, এখনও তাই, গর্ভগৃহে চ্যাঁচালে তেইশবার প্রতিধ্বনি হয়। পায়ে-পায়ে ক্ষয়ে গর্ত হয়ে গেছে গোলঘরের একশো পঁয়তাল্লিশটা দাঁত বের-করা সিঁড়ি। মেরামতের টাকা, ইংরেজরা চলে যাবার পর, ফিবছর ভাগাভাগি হয়। রাস্তা সারাবার বরাদ্দও তাই। নালি-নর্দমা পড়ে আছে কন্ঠরুদ্ধ হয়ে পচা পাঁকে ; বর্ষায় রাস্তাগুলো নিজেরাই নিজেদের দুর্বিসহ পায়। গান্ধি ময়দানের পূর্ব-দক্ষিণ দিকটা, ফ্রেজার রোড বেইলি রোড ডাকবাংলো রোড বোরিং রোড নষ্ট আর অসহ্য নয় ততোটা। মন্ত্রী আমলা জজ উকিল ঠিকেদাররা থাকে ওদিকে। টিমটিমে হলেও, সন্ধের পর আলো জ্বলে ওদিকের পথে-গলিতে-মোড়ে। বারিপথ তখন প্রায়ান্ধকার, ছমছমে, ক্রমশ ফাঁকা। মাঝে-মাঝে যাত্রী-ঠাশা মিনিবাস, ধাক্কা খেয়ে আর মেরে দোমড়ানো, অটো থেকে ঝুলন্ত বাড়তি যাত্রী, অবিরাম হর্ন বাজিয়ে আওয়াজ দিয়ে আলোর কাজ চালায়।

    বারিপথে কেবল ছটপুজোয় সারারাত আলো জ্বলে, রাস্তার দুপাশে বেআইনি খুঁটি পুঁতে, হুজিং করে ঝোলানো হাজার চিনা টুনির রিমঝিম আলো। ওই একদিনই ঝাঁট পড়ে রাস্তায়। ভোর রাতে সধবার দল উদোম স্নান করবে। কেউ-কেউ পথের ওপর সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করতে-করতে ঘাটে যাবে। ছোকরা মাস্তানরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, ভেঙে পড়ে ঘাটে-ঘাটে বাইনোকুলার হাতে, পারিবারিক বাইনোকুলার, যা দিয়ে বাপ-জ্যাঠাও একই কাজ করেছিল, অজস্র উলঙ্গ নারীর জোয়ান সুঠাম দেখার লোভে। গঙ্গার পাড় বরাবর তাই ঘাটে-ঘাটে তেরপলের পর্দা টাঙানো থাকে মহিলা পুলিশ পাহারায়। ছটের সময় ঠেকুয়া তৈরি হয় ঘরে-ঘরে। চারপাঁচজন পড়শি দিয়ে যায় অতনুদেরও, শক্ত মুচমুচে নরম ঘি জবজবে নানা রকমের মিষ্টি ঠেকুয়া। অনেকদিন ওব্দি থাকে।

    বেলা হয়ে আসছে, কখন পাটনায় পৌঁছোবে কে জানে, নিজের ব্যাগ থেকে একটা ঠেকুয়া মৌলিনাথকে দিয়ে অতনু বলল, ‘অরিন্দমের ব্যাপারটা সুশান্তকে জানিয়ে দেবেন, বাড়ি না ফিরলে কেলেংকারি, সুশান্ত ওর মা আর ভাইকে ম্যানেজ করে নেবে। ’

    বাড়ি ফেরেনি অরিন্দম। শিবু পালিত ওকে আবিষ্কার করেছিল মোগলসরাই স্টেশনে, খালি-পা, কদিনের দাড়ি, লাল চোখ, চুল উস্কোখুস্কো, উদভ্রান্ত, কিছু খায়নি দিনকতক। ডানায় ঠোঁট গুঁজে ঘুমন্ত পাতিহাঁসের মতন একা। চেহারা দেখে, মনে হয়েছিল শিবু পালিতের, বেঁচে থাকার ইচ্ছের বাইরে চলে গেছে। শিবু ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে গেল পাটনায়। কলকাতায় নিয়ে গেলেন ওর ডাক্তার মামা ; মানসিক রোগের হাসপাতালে ঠাঁই পেল।

    ‘পাগল হবার আগে অরিন্দম তোদের ক্লারিকালে ট্রান্সফারের কেসটা হিল্লে করে গেছে তো ? সারা জীবন নোট গুনবি নাকি ?’ একদিন অফিসে এসে বলে গেলেন ননীগোপাল। আর বললেন, ‘রাঘব তো সিকিউরিটি অফিসার হয়ে চলে যাচ্ছে কলকাতা। হেডাপিস থেকে যে আসছে, তাকেই মুরগি আর ছানার পায়েস খাওয়াচ্ছে রমা। নতুন সব বিভাগ খোলা হবে, তোরা ঝপাঝপ প্রোমোশান পেয়ে যাবি। ’

    অতনু নিজেকে নিঃশব্দে বলল, ‘প্রোমোশান নিয়ে কী করব !’

    অফিসের নতুন বাড়িটা ননীগোপালের সামনেই তৈরি। তখন গান্ধি ময়দানের রেলিং ছিল না, গেট ছিল না। শুলভ শৌচালয়ের গ্যাস-আলো জ্বলত না, ময়দানের মধ্যে রেলিঙের কিনারঘেঁষা হাঁটা পথে, যার ওপর এখন জগিং করতে বেরোয় হাফপ্যান্ট যুবকেরা। ময়দানের উত্তরে ডুমো-ডুমো শ্রীকৃষ্ণ হলটা হয়নি। আবদুল বারি মারা যাওয়ায়, শ্রীকৃষ্ণ সিং মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল, ভূমিহার। এখন ভূমিহারদের দিনকাল গেছে। উঁচু জাতের রাজনীতিকদের দিনকাল কোনঠাশা হয়ে গেছে। তফসিলিরাই নিজেদের মধ্যে দলিত-মহাদলিত ভাগাভাগি চালাচ্ছে।

    অফিসে নতুন বাড়িতে তৈরির সময়ে, সিমেন্টে গঙ্গামাটি মেশানো হাতেনাতে ধরেছিল ভিজিল্যান্স। ফলে, এগজিলিউটিভ ইনজিনিয়ারে পদোন্নতি পেয়ে মুম্বাই বদলি হয়ে গেছে মারাঠি ক্লার্ক-অফ-ওয়র্কস। স্হপতি, নামকরা, শতকরা একভাগের আধ ভাগ। বেশি নিয়েছিল সিপিডাবল্যুডির রেটের চেয়ে। ব্ল্যাকলিস্টেড ঠিকেদার, নতুন নামে কোম্পানি খুলে পেয়েছিল ঠিকেটা। পুরোনো দপতরবাড়ি থেকে আসবাবপত্র আসার পথে, নতুন বাড়িটায় আসতে-আসতে, দুটো গোদরেজ আলমারি আর একটা গোদরেজ টেবিল, কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়ে প্রাণ পাবার দরুন, মাঝরাস্তা থেকে লোপাট। ননীদার কাছে অনেক পুরোনো গল্পের ডাঁই। চাকরি ছেড়েও অনেক খবর রাখছেন, যা সবাই জানে না। তার মানে ননীদার ওয়ানরুম ফ্ল্যাটে বেশ মুখরোচক আড্ডা জমছে আজকাল। যাবে একদিন, ভেবেও অতনু কুন্ঠিত।

    রাঘব-রমা ট্রান্সফার হয়ে, ছলছলে হাসি বিলিয়ে, কলকাতা যাবার পর, শীতাতপ যন্ত্রের হরিয়ানাবাসী ইলেকট্রিশিয়ান, যার এসি পার্টসের দোকান ফ্রেজার রোডে, আর যে ভ্যায়েনচো ভ্যায়েনচো ভ্যায়েনচো ছাড়া কথা বলে না, পদোন্নতি পেয়ে রাঘবের পোস্টে কেয়ারটেকার হয়ে গেল। অফিসটা কেন্দ্রীয় এসি। ড্রয়ারে শাল-সোয়েটার রাখে কেউ-কেউ। বাচ্চার খেলনার মতন থারমোমিটার ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে হিউমিডিটি মাপার এক ফাঁকে মুচকি হাসি বিলিয়ে যায় টাকমাথা সুপারভাইজার, ‘ঝপ করে এগারো ডিগরিতে নেমে গেল।’ বাইরে তখন রাস্তার পিচ গলাচ্ছে গ্রীষ্ম, আর দুপুর বেলার গোঁয়ার রোদ্দুরকে আস্কারা দিয়ে মাথায় তুলেছে সূর্য। শীতাতপ না হলে অতনু-সুশান্তদের ফ্যানের হাওয়ায় নোট গোনা আর বাছাই অসম্ভব। মৌলিনাথ আর অরিন্দমের সে-সুযোগ নেই, ওরা কেরানি।

    রোজ জতো পুরোনো নোট জমা পড়ে, তার মধ্যে থেকে প্রত্যেক নোট-পরীক্ষক কর্মচারীর মাথাপিছু দিনকার বরাদ্দ অনুযায়ী, পচে নোট আর ভালো নোট বাছাই করার কাজ, যাতে পচা নোটগুলো জ্বালানো আর ভালোনোটগুলো বাজারে ছাড়া যায় আবার। অতনু প্রায় ছেড়ে দিয়েছে বাছাবাছি-গোনাগুনির কাজ। সুশান্ত তো একদমই। নারী-নারকো গ্যাঙের সবাই। মহিলারা কেবল গোনে, বাছাই করে, এক মনে, ধৈর্য ধরে। অতনুর মনের মধ্যে এর জন্য একটা খচখচ থাকলেও, প্রায় সবাই যখব সেই কাজ করছে, তখন সৎ হওয়ার অনেক হ্যাঙ্গাম, বেশ বিপজ্জনক। পাঞ্জাবি এক বড়োসাহেব এসে, ক্লোজ সার্কিট টিভি বসিয়ে নজর রাখতে চাইছিল। বেচয়েন বলেছিল, ‘শালা বিজলি থাকে না বলে এসি চলে না অনেক সময়ে, লিফট চলে না, ঘুরঘুট্টি বেসমেন্ট, উনি চলেছেন টিভি লাগাতে। ’

    সত্যি, শীতকালে, অফিস ছুটির সময়ে, আলো চলে গেলে, গায়ে-পড়া পুরুষের ইচ্ছাকৃত ধাক্কা বাঁচাবার জন্য মহিলাতরা অনেকেই, দ্রুত টর্চ বের করে নিজেদের কাঁধব্যাগ হাতব্যাগ থেকে, আত্মরক্ষার জন্য। কেউ-কেউ সিগারেট লাইটার হাতে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। যেমন মানসী বর্মণ, এককালে ওদের বিরাট বইয়ের দোকান ছিল, ননীগোপাল ওর বাবাকে দেখেছেন, রাশিয়ার নেতাদের মতন বপু-হোৎকা আর মোদো-গোলাপি চেহারা।

    শিমুলতলা দেওঘর থেকে ফেরার পরের দিনই, অতনুর সেকশানে ঝপাং শব্দে ডাইস মেশিনে একাধিক গর্ত করে নোট নষ্ট করছিল রসিক পাসওয়ান, চাপরাসি। ব্যস্ততার মাঝে, কর্মরত অতনুর কপালে এসে ছিতকে লাগল রসিকের তর্জনীর কাটা ডগাটা, লেগে, ওর কপালে রক্তের টিপ পরিয়ে, ওরই টেবিলে পড়ল। বুঝে ওঠা মাত্র ও স্তম্ভিত। পেট মোচড় দিয়ে বমি উঠে আসছিল আরেকটু হলে। পকেট থেকে রুমাল বের করে প্রায়-নির্বিকার রসিক জড়িয়ে নিলে কাটা রক্তঝরা আঙুলে, আর আঙুলের টুকরোটা দেখাতে গেল প্রধান খাজাঞ্চিকে। সুশান্তকে বলতে ও জানিয়েছিল, ওদের আঙুল-টাঙুল বীমা করিয়ে রেখেছে অফিস। দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে বীমা করানো থাকে। আঙুল কাটার অঢেল ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। তর্জনীর জন্যে তো মোটা টাকা পাবে। ওর বোধহয় টাকার খাঁকতি, তাই নিজের আঙুল কেটে ফেলেছে নিজেই।

    গরমকালেও রসিকের সর্ষের তেল, শীতকালে শাদা উর্দির কলার তেলচিটে, বর্ষাকালে রবার জুতোর ক্যাঁকোঁ, পানিবসন্তের শ্রীছাঁদ। রসিকের ঘটনার পর অতনু লক্ষ করেছে, সুখচৈতি রাম, হরবিলাস, ট্যাঙোয়া মাহাতো, রামপুজন সিং, খলিল আহমদ সকলেরই একটা করে বা দুটো আঙুল কাটা।

    বিশ্বসভঙ্গের বিরুদ্ধেও বীমা করানো আছে। মানুষের অভাব-অনটনের দুঃখে গড়া মতিগতি। আগেকার দিনে, ইংরেজদের সময়ে, প্রধান খাজাঞ্চি আসত সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে, নোট গোনানো বাছাই আর পোড়াবার জন্যে। সে ভর্তি করত নিজের চেনাজানা নির্ভরযোগ্য লোকজন। এখন টাকাকড়ি পরীক্ষকরা এলডি থেকে ইউডি, উপখাজাঞ্চি হয়। কেউ যদি নোটফোট গেঁড়িয়ে লোকসান করায়, তাই বিশ্বাসভঙ্গের বিরুদ্ধে বীমা। দিনের পর দিন চারধাতরে এত টাকা, পচা গন্ধমাখা টাকার ঢিবি, থাক-থাক টাকা, যে অতনুর ভয়-ভয় করে। ভয়ের বিরুদ্ধে বীমা নেই। মানুষের সম্পর্ক ভেঙে যায় বিশ্বাসভঙ্গের দরুন, তার জন্য তো বীমা হয় না ! হলে, আর দু’পক্ষ মেনে নিলে, অনেক কষ্টের সুরাহা হতে পারত।

    হাতে-হাতে টাকা এত নোংরা কী ভাবেই বা হয়, ভেবেছে অতনু। তুলতুলে হয়ে ওঠে। মানুষের হাতে তো অমন ময়লা থাকেনা, যতো জমে যায় নোটে ! ময়লা, হাতে থাকলেও, থাকে গরিব মজুর কুলি কামিন চাষির চেটোয়। আর টাকা ঘুরে বেড়ায় ধনীর, সচ্ছল মানুষের, হাত ফেরতা। কতো করকরে থাকে যখন নতুন। অন্ধকারের আগল ঠেলে কী দশা হয় শেষে, পুড়ে মরার আগে। একেবারে মানুষের মতন, সারা জীবন নিজের অস্তিত্বে জড়ো করা ময়লা নিয়ে পুড়তে যায়। এতো গাদাগাদা নতুন-পুরোনো টাকা যে ফুটবল মাঠের মাপের স্ট্রং রুমেও বস্তাবন্দী কুলোবে না। বেশ কয়েক মাস আগে থাকতে ক্লায়েন্ট ব্যাংককে জানিয়ে রাখতে হয় যে তারা কতো বস্তা বা বাকসো পচা নোট জমা দেবে অতনুদের ভাঁড়ারে। কবে যে কাউন্টিং মেশিন আর শ্রেডার আসবে, কেবল গুজবই শোনা যায়। তেলচিটে হিলহিলে নোটগুলো তো কাউন্টিং মেশিনে দিলেই ছিঁড়ে পাকিয়ে দলা হয়ে যাবে।

    আইন পালটে, সরকারি খরচ মেটাবার জন্যে, রাজনীতিকদের পোয়াকে বারো করার জন্যে, যতো ইচ্ছে নোট ছাপা যায়, বাজারে ছাড়া যায়। ননীগোপাল যখন চাকরিতে ঢুকেছিলেন তখন বাজারে পাঁচশো কোটি টাকার নোট ঘুরে বেড়াতো। চাকরিতে ইস্তফাদেবার সময়ে তা এক লক্ষ ষাট হাজার কোটিও। বেড়েই চলেছে প্রতিবছর। সব গেছে হিল্লি-দিল্লির নেতা ঠিকেদার আমলা চোরাকারবারী সঞ্চয়চোরদের গবভে। ডাকাত আর বিধায়ক গোপাল সিং। সতবীর সিং, সুরেন্দ্র সিং রাঠি, মোহম্মদ ইলিয়াস, শাহাবুদ্দিন, শ্রীপাল, ধর্মপাল যাদব, হরিশংকর তেওয়ারি, বীরেন্দ্র শাহি, রঞ্জিত, শারদা প্রসাদ রাওয়ত, বিলায়তি রাম কত্যাল, রাজু ভটনাগর, রাজেশ কুমার সিং, মিত্রসেন যাদব, বিনয় কাটিয়ার, নাজির আলি, লটুরি সিং, রমাকান্ত যাদব, রিজওয়ান জহির, দুধনাথ যাদব, পপ্পু যাদব, ওম প্রকাশ গুপ্তা, শমিউল্লা খাঁ, কৃষ্ণকিংকর সিং, রামপাল শর্মা, বাবুলাল তিওয়ারি, মঙ্গলপতি ত্রিপাঠি, সঞ্জয় সিং, বালেন্দু শুকলা, কুঁয়র অশোক বীরবিক্রম সিং, গণপতরাও ধুরবে, জগমাল সিং, রাজকুমার জয়পাল, বীরভদ্র সিং, আবদুল লতিফ, সি এম ইব্রাহিম, পাপ্পু কালানি, হিতেন্দ্র ঠাকুর, মির্জা হাজি মস্তান, ইউসুফ প্যাটেল, করিম লালা, বরদারাজন মুদালিয়ার, দাউদ ইব্রাহিম, টাইগার মেমমন, সুকুর নারায়ণ বখ।ইয়া, সূর্যদেও সিং, আলমজেব, মহেশ ঢোলকিয়া, রমাকান্ত নায়েক, আমিরজাদা সমদ খান, সতীঋ খোপকর, বিনায়ক ওয়াগলে, বিটঠল চভান, থিম বাহাদুর থাপা, চার্চিল আলেমাও — এদের হাতে-হাতে ফিরেছে মোটা টাকার আর পাতলা টাকার নোট।

    অতনুর মনে হয়, ওর নিজের মাইনের টাকা, আর এই সমস্ত গিজগিজে টাকা এক জিনিস নয়। মাইনে পেলে ও অঙ্ক গোনে টাকায়। এসব পচা নোটগুলোর অঙ্ক যাই হোক, তাদের সংখ্যা গোনে। পঞ্চাশ টাকার একশোটা নোটও যা পাঁচশো টাকার একশোটা নোটও তাই।

    বরাদ্দ ছুটির শেষে রসিক পাসওয়ান কাজে যোগ দিলে, সুশান্ত জানতে চেয়েছিল, কী গো, আঙুলের ঘা শুকিয়ে গেছে তো ? কাটলে কেন আঙুলটা জেনেশুনে।’

    –‘নাতনিটার বিয়ে দিলুম। ছুটিও পেলুম, টাকাও। ’ রসিক পাসওয়ান অমায়িক।

    ‘–মাইনে তো যথেষ্ট পাও।’ সুসান্তর খোঁচা।

    ‘–ছেলেটাকে তো কোথাও ঢোকাতে পারলুম না। প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে টাকা তুলে একটা মুদির দোকান করে দিয়েছিলুম। চালাতে পারলে না। ’

    ‘–তাই বলে আঙুল কেটে নিলে ?’ সুশান্তর বিস্ময়।

    ‘–ওই একটাই নাতনি। ভালো দেখে বিয়ে দিয়ে দিলুম। ’

    ভালো শব্দটার কী ভাবে খোলোশা হয়, অপেক্ষা করছিল অতনু। হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সুশান্ত।

    ‘–কী করব বলুন। ছেলেটা গধহা বেরোলো। এখন ছ’টা নাতিকে মানুষ করতে হবে। লেখাপড়া শিখছে। মাইনের টাকা তো ওদের জন্যেই খরচে ফেলি পুরোটা। ছেলের বউটা শেষ বাচ্চা বিয়োবার সময় বাঁচেনি। ’

    ‘–ওদের ঠাকুমা আছে তো ?’

    ‘–হ্যাঁ, আছে বলেই রক্ষে।

    ‘মানুষ করা’ আর ‘গধহা’ শব্দ দুটোয় আরেকবার আটকালো অতনু। রসিকের বাড়ি অওরঙ্গাবাদের দরমিয়া গ্রামে, শুনেছে। অনেকে বলে ও থাকে ওয়ারিসআলি গঞ্জে, নওয়াদা জেলায়। দরমিয়া আর ওয়ারিসআলিগঞ্জ দুটোই নকসল্লি মাওওয়াদিদের গঢ়, ক্রান্তিকারী কিষাণ সমিতি জনআদালত বসায়। গত বছর আশ্বিন মাসে ওর ছেলের নামে হুলিয়া বেরিয়েছিল, আর রসিকের খোঁজখবর করতে শাদাপোশাক পুলিশ এসেছিল অফিসে, সুশান্তর কাছে জেনেছে অতনু।

    আশ্বিন মাসের সেই সন্ধেবেলা তিরিশ-চল্লিশজনের জামাত পৌঁছেছিল অম্বিকা সিং-এর বাড়ি, ভালা ভোজালি বরছা গঁড়াসা নিয়ে। বাড়ির দালান থেকে ইন্দ্রদেব-এর ছোটো ভাই ভীমকে কব্জা করে ওকে দিয়েই দরোজায় টোকা দেওয়াতে, অম্বিকার দাদা জগন্নাথ সিং-এর সদরের দরোজা খুলতে বাধ্য করায়। রামলেশ, প্রমোদ, মুরারী আর বারো বছর বয়সী গয়া সিংএর হাত যারা পিছমোড়া করে বেঁধেছিল, রসিক পাসওয়ান তাদের একজন। ভিড়ে একজন, ‘তোদের বাপগুলো কোথায়,’ বলে উঠতেই, শুনতে পেয়ে, অম্বিকা সিং স্ত্রী গাজরদেবীকে একটু উঁকি মেরে দেখতে বলে কী ব্যাপার। গাজরদেবীর হুঁশিয়ারি শোনামাত্র, চালার গোলটালি সরিয়ে পালায়, লুকোয় গিয়ে অড়হর খেতের মধ্যে। অম্বিকা আর জগন্নাথ সিংকে না পেয়ে রসিকের দল রামলেশ, প্রমোদ, মুরারী, গয়া, গাজরদেবী, অম্বিকার মেয়ে গীতা আর জগন্নাথের মেয়ে পুষ্পার মাথা ওখানে দাঁড়িয়ে আলাদা করে দিয়েছিল ধড় থেকে। তারপর ওরা, ঝিঁঝিডাকা জোনাকি-জ্বলা ওই রাতেই, মরদনবিঘায় গিয়ে, বৈদ্যনাথ সিং, অলখদেও সিং আর ওর ছেলের বউ উষা আর বৈদ্যনাথের মেয়ে শকুন্তলাকে ছিন্নভিন্ন করার পর, আওয়াজ দিয়েছিল, ‘রক্তের বদলে রক্ত চাই লাশের বদলে লাশ। ’ আসলে ঠিক সতেরোদিন আগেই, দরমিয়ার ছ-সাত কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, পরসডিহায়, উঁচু জাতের লোকেরা, অম্বিকা-জগন্নাথের লেলিয়ে দেবার দরুণ, বন্দুকের গুলি মেরে ষাট বছরের জগন্নাথ সাহু, নব্বই বছরের চামার সাহু আর তার ছেলে রাজেশ্বর সাহু, রাজারাম সাহু আর দুই নাতি সঞ্জয় আর বিনয়ের লাশ নামিয়ে দিয়েছিল।

    আরেকজন চাপরাশি ঝুনুরাম কিসকুর কাঁধে হাত রেখে মসকরা করতে-করতে রসিক পাসওয়ান সিঁড়ি দিয়ে মেজানাইন ফ্লোরের দিকে এগোলে, অতনু সুশান্তকে বলতে বাধ্য বোধ করল, ‘সবায়ের ব্যক্তিগত ব্যাপারে এত নাক গলাস কেন ?’

    সুশান্ত বলল, ‘সকলেরই নকল গল্প আর আসল গল্প দুটোই জানি, সবকটা আঙুল কাটা চাপরাসির। মুঙ্গের থেকে বন্দুক কি৯নবে রসিক। রামখেলাওন ওর রক্ষিতার হার গড়িয়ে দিয়েছিল সবজিবাগের কণকমন্দির জুয়েলার্স থেকে। শেখ আলি পাঁচ হর্স পাওয়ারের ডিজেল পাম্প কিনেছে। ’ তারপর কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক থেকে, ‘দিনকতকের জন্যে সিক লিভ নেবো। কাকার সঙ্গে আসাম যাচ্ছি দু ট্রাক আনারস আনতে। ’

    অতনু জানতে পারল, শনিবার বিকেলে, অ্যানেকসি বিলডিঙে ক্যানটিন কমিটির নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে, চন্দ্রকেতু সিং দিলে খবরটা, বাঁ-চোখের পাতা সামান্য কাঁপিয়ে, ননীদা সস্ত্রীক হনিমুনে গেছে সুশান্ত আর ওর কাকার সঙ্গে, কামাক্ষ্যা আর গণ্ডারের অভয়ারণ্যে, বয়সের স্বামী-স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য মেটাতে। সুশান্ত তার মানে চেপে যাচ্ছে কিছু-কিছু। চন্দ্রকেতু চশমা পুঁচছিল। চশমা খুলে ফেললে মনে হয় ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে।

    সুশান্ত-অতনুর সম্পর্কে যেটুকু লুকোছাপা না হলে নয়। অতনু কুঁড়ে, আরামপ্রিয়, যে-কোনো ছাপা কাগজ পড়তে ভালোবাসে, বসার চেয়ে ওর ভালো লাগে গড়িয়ে পড়তে, মেঝেতে বসলে দেয়ালে ঠেসান দিয়ে, বাসে-ট্রেনে উঠেই হাতল খোঁজে, অতিথি বা বয়স্করা বসার আগেই বসে পড়ে। বিছানায় বসলে এলিয়ে পড়ে বালিশ টেনে। সুশান্ত খবরের কাগজ বই ম্যাগাজিন পড়ে না, শেয়ার দরে ওঠানামার দরটুকু ছাড়া। খেলার খবর, রাজনীতিতে আগ্রহ নেই, অথচ একনাগাড়ে বকবক করতে পারে। সকলের বাড়ি-বাড়ি চষে বেড়ায় মোটরসাইকেলে। ছোঁয়াচে উৎফুল্লতায় ভোগে। অতনু মেয়েমহলে অস্বস্তি পায়। সুশান্ত সহজ। অফিসারদের অ্যাসোশিয়েশান, কর্মচারী ইউনিয়ান, ক্যানটিন, সমবায়, স্পোর্টস ক্লাব কিছুতেই অংশ নেয় না ও, সুশান্ত, কিন্তু খবর রাখে পুরো। গান-বাজনার ও কুইজ মাস্টাত, বিদেশি হোক বলিউডি হোক ইন্ডি পপ হোক। অডিও ডিভাইস কানে লাগিয়ে মোটর সাইকেল চালায়। বললেই টুইস্ট রক অ্যান রোল র‌্যাপ ট্যাংগো হিপহপ রুম্বা ফ্রি ফর অল নেচে দেবে সুশান্ত। অতনু তো নতুন পরিচিতের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়ালে আড়ষ্ট হয়, দ্রুত কেটে পড়ার ছুতো খোঁজে।

    সুশান্তদের একান্নবর্তী পরিবারে প্রতি সপ্তাহে গ্যাস সিলিণ্ডার লাগে। ঢিলেঢালা অগোছালো খোকাখুকুরা চোর-পুলিশ খেলতে-খেলতে পাক খেয়ে যায় বনেদি ড্রইংরুমে। জ্যাঠাকাকাদের অট্টহাসির ছররা ছিটকোয় তিনতলা থেকে একতলা। প্রতিটি ঘরের দেয়াল জুড়ে দোল খেলার রং। এক তলায় সিঁড়ির নিচে ডাঁই করা চটি আর জুতো, যার যেটা ইচ্ছে পায়ে গলিয়ে বেরিয়ে যায়। সুশান্ত আর ওর বড়জ্যাঠামশায় ছাড়া, যিনি এখনও সাইকেল চালিয়ে আন্টাঘাট কিংবা চিড়াইয়াটাঁড়ে বাজার করতে যান, আর কারোর স্নান করার আর খাবার বাঁধাধরা সময় নেই। সুশান্তদের বাড়িতে ঢুকলে অতনুর ইচ্ছে করে পরিবারের সদস্য হয়ে যেতে। ও এত চাপা যে নিজে থেকে কোনো হুল্লোড় আরম্ভ করতে পারে না। অন্যের বানানো হুল্লোড়ে ঢুকতেও ইতস্তত।

    নিজের মাইনের টাকা ওব্দি অন্যের সামনে গুনতে লজ্জা করে অতনুর। চাকরির প্রথম মাইনের একটা পাঁচ টাকার প্যাকেট, লুকিয়ে গুনতে গিয়ে অফিসের পায়খানায় পড়ে গিয়েছিল। পড়ে যেতেই ফ্লাশ। অফিসকে তাই জানিয়ে দিয়েছে, মাইনেটা ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা দিতে ; ব্যাঙ্ক থেকে তো আর থোক অতো টাকা তুলতে হবে না। সুশান্তই পরে অতনুকে খোসা ছাড়িয়ে বের করে আনতে পেরেছে। স্কুল-কলেজে অতনুর নিকটবন্ধু ছিল না। অতনুর কাছ থেকে কলম বা বই নিয়ে কেউ ফেরত না দিলে ওর মন খুঁতখুঁত করে ; নোটসের খাতাও স্নাতকোত্তর পড়ার সময়ে সহপাঠিনীদের কাছ থেকে ফেরত চাইতে পারেনি। সুশান্তর মোটর সাইকেলও যে যখন ইচ্ছে চেয়ে নিয়ে যায়।

    অখিলেশ ঝা আই এ এস দিয়ে সফল হবার পর গ্রামের রাজপুত দারোগা যখন পুলিশ এনকোয়ারি নিয়ে খেলাচ্ছিল তখন সুশান্তর মোটর সাইকেলে অখিলেশকে বসিয়ে তদবিরের জন্যে চন্দ্রকেতু সিং নিয়ে গিয়েছিল ওরই, মানে চন্দ্রকেতুর গ্রাম, উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলার সোনিয়া-রানিগঞ্জ গ্রামের মাফিয়া সরদার সুরজদেও সিং-এর ভাই রামাধীরের কাছে। দারোগাটা রামাধীরের শালা। রামাধীরের বিরুদ্ধে তখন অবশ্য ফৌজদারি চলছিল ৩০২, ৩০৭, ৩২৪ আর ৪৫২ ধারায়। রামাধীরের একটা টেলিফোনে কাজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ফেরার সময় বিহটার কাছে গ্রামের আধন্যাংটো ছেলেরা গোটাকতক মোষের ল্যাজ মুচড়ে, ওদের দিকে হাঁকিয়ে দেওয়ায়, রাস্তা থেকে নেমে মোটর সাইকেলটা কাঁঠাল গাছে ধাক্কা খায় আর সঙ্গে-সঙ্গে দুজনেই অজ্ঞান, গায়ের ওপর খসে-পড়া এঁচোড়। ঘণ্টা দুয়েক ওরা ওখানেই পড়েছিল। গ্রামবাসীরা কলম ঘড়ি আঁটি টাকাকড়ি যা কিছু ওদের পকেটে আর ছিল, মায় কাঁধব্যাগও, হাতিয়ে কেটে পড়েছে সেই সুযোগে। বিডিও দেখতে পেয়ে জিপে তুলে নিয়ে যায়। ওদের আর দোমড়ানো মোটর সাইকেলকে। মামুদ জোহেরের ম্যাটাডর নিয়ে বিহটা থেকে মোটর সাইকেল আর হাতে-মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা দুই সহকর্মীকে ওদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল সুশান্ত।

    কোন আগ্রহ গিঁথে রেখেছে সুশান্তদের বিরাট পরিবারটাকে, যখন কিনা পাটনায় কোনো একান্নবর্তী পরিবার আর টিকে নেই, যে পরিবারের মধ্যে চুপচাপ সেঁদিয়ে যেতে চেয়েছে অতনু, তা অনেক ভেবেও বুঝে উঠতে পারেনি অতনু। বর্ধমানের বর্ধিষ্ণু চাষি পরিবারের কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক, অথচ ঢুকেছে আজেবাজে পচা নোট বাছাইয়ের চাকরিতে। গ্লানিবোধ বা দুঃখ, নজরে পড়ে না। মেমারিতে জমিজিরেত চাষবাস তদারক করেন সুশান্তর ন-কাকা নতুনকাকা, তাঁরা আসেন কখনও কখনও পশ্চিমে বেড়াতে আসার নাম করে। নতুনকাকার বড় ছেলে নকশাল হয়েছিল, বাড়ি ফেরেনি আজও। পাটশাক, জামরুল, আঁশফল, নোনা, কামরাঙা, গোলাপজাম ওদের বাড়িতেই প্রথম দেখেছে অতনু, মেমারি থেকে আনা।

    অতনুর বাড়িতে বিধবা মা। তিরিক্ষি দুর্গন্ধের নালির গায়ে সটান শাদা বাড়ি ওদের। একতলা। দোতলা অর্ধেক হয়ে আধখেঁচড়া ইঁট-বেরোনো। মায়ের শাদা থান আর অতনুর শাদা ধুতি-পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কোনো রং নেই পোশাকের। কাকাতুয়া দুটো শাদা। বাড়ি ফিরলেই ওর মন খারাপ, তার কোনো কারণ নেই, উৎস নেই। মায়ের সঙ্গে বড়ো একটা কথাবার্তা হয় না। অতনু মাছমাংস কেনে না। ডাল ভাত আলুভাতে তরকারি। ডাল তরকারি আলুভাতে ভাত। শাদাকালো টিভিটা পালটে রঙিন টিভির প্রস্তাবে রাজি করানো যায়নি মাকে। বহুকাল অন্ধ আর বোবা হয়ে পড়ে আছে।

    সুশান্তর বাড়িতে পুঁটলি তোরঙ্গ বাকসো প্যাঁটরা এলে বাড়িসুদ্দু সবাই হুমড়ি খেয়ে কী আনলে গো, ওটা কী গো, একটু দেখতে দাও না গো, পছন্দের বলিহারি, সুশান্তর ছোটো ভাই অপাংশু সবচেয়ে বেশি উৎসুক। অতনুর কোনো আত্মীয় নেই। আছে কি না তা জানেও না অতনু। কেউ আসে না। কেউ যায় না। কেউ চিঠি লেখে না, বিয়ে পৈতে অন্নপ্রাশন শ্রাদ্ধের কার্ড পাঠায় না।

    অতনুর জন্মের সময়ে ওর মায়ের প্রসবক্রিয়া নষ্ট করতে বাধ্য হয়েছিল ডাক্তার। ভাইবোন নেই। পড়াশোনায় চিরকেলে ছাপোষা, দ্বিত্বীয় শ্রেনিতে, অথচ মুখে বই গুঁজে থাকতে ভালোবাসে সারাক্ষণ। খেলাধুলাহীন। আগ্রহ নেই। কেউ কখনও জানতে চায়নি বড়ো হয়ে ও কী হতে চায়। জিগ্যেস করলে জবাব দেবার মতন ভাবনা ছিল না ওর আকাঙ্খায়। বাবা কেন যে ইংরেজি পড়ালেন ! কখনও ভালো লাগেনি ভাষাটা। রসকসহীন সাহিত্য। যদিও প্রতি ক্লাসে প্রতিবছর ইংরেজি পেপারে সবচেয়ে বেশি মার্কস অতনুই পেয়ে এসেছে। ইংরেজিতে পড়লে ওর মুখস্হ হয়ে যায় ; বাংলা আর হিন্দিতে হয় না। উচ্চাশা না থাকলেও, ভবিষ্যতের ধারণা না থাকলেও, কেউই বোধহয় নোট আর পয়সাকড়ির পরীক্ষক হতে চায় না। ভালো নোট, খারাপ নোট, আসল নোট, নকল নোট,সচল নোট, অচল নোট, আস্ত নোট, কাটা নোট, বাছাই নোট, ছাঁটা নোট, তাজা নোট, পচা নোট, কারোর উচ্চাকাঙ্খায় জাগে কি ! বালকের কিশোরের তরুণের যুবকের ? তার বাবার ঢুকেছিলেন এই চাকরিতে। বছর দু’তিন চাপরাশি থাকার পর নোটপরীক্ষক হয়েছিলেন। নাগপুরে। তারপর মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, মাদ্রাজ, বাঙ্গালুরু, পাটনা। পাটনায় মারা গেলেন বলে বাবার দৌলতে অতনু পেল চাকরিটা। মাইনে যথেষ্ট, দুপুরেই ছুটি, এরকম আয়েশের চাকরি তো আর পাওয়া যাবে না। সেঁটে গেল অতনু।

     

    তিন

    সুস্হ অরিন্দম ফিরে এসে কাজে যোগ দিলে, সবাই ওকে ঘিরে ধরেছে যখন—

    : পাশের খাটালটায় গয়লাগুলো দুধে জল মেশাতো রোজ। আমরা পাগলরা একদিন হইচই করে সেটা বন্ধ করালুম।

    : মানে ? পাগল হোসনি তুই ?

    : বাহ ! পাগল আবার হতে যাব কেন ?

    : আর এই যে এত কাণ্ড-কারখানা করলেন ?

    : কী করব ! ছাড়াতেই পারছিলুম না নিজেকে। ভালোলাগাটাই খারাপ লাগতে আরম্ভ করেছিল।

    : আর মানিব্যাগে ফোটি নিয়ে ঘুরলি ! সবাইকে দেখিয়ে-দেখিয়ে বেড়ালি যে ?

    : জানি। প্রেম সম্পর্কে ধারণাটা লটকে গেছে। ওটার দরকার ছিল। : সকলেরই জীবনে ভুল ভাঙার সুযোগ আসে।

    : মজা তো যথেষ্ট লুটলেন !

    : অমন জাঁতিকলে পড়লে বুঝতেন। জীবনটা নষ্ট করে ফেললুম।

    : বিয়ে করে ফ্যাল এবার, বিয়ে করে ফ্যাল।

    : পাগলামির বদনামটা আগে কাটিয়ে নিই।

    : আরে কন্যাপক্ষ শুধু চাকরি আর নুনুর রঙ দেখবে। আর তাছাড়া কাট মারলেই পারতেন। পাগল সাজার দরকার তো ছিল না।

    : ও আপনারা বুঝবেন না। যাকগে, যখন পাগল ছিলুম, তখন দশ টাকার রুপোর কয়েন বেরিয়েছিল। আমার জন্যে রেখেছে কি না ?

    : পঞ্চানন সিনহার কাছে খোঁজ নিন। রেখেছে নিশ্চই। আপনাকে বাদ দিতে সাহস পাবে না। পাগল হয়েছেন খবর পেয়েও ম্যানেজমেন্ট কাউকে পোস্ট করেনি আপনার জায়গায়। তবে মেড়ো পার্টিদের একেকটা কয়েন পনেরো-কুড়ি টাকায় বেচেছিল পঞ্চানন। কাউন্টারে ও-ই তো ছিল তখন। বাজারে এখন পঁচিশ টাকা রেট যাচ্ছে। কালীপুজো-দেওয়ালিতে পঞ্চাশে উঠবে।

    পঞ্চানন সিনহা ভাগলপুরের। বলে, আরে ভাই, ম্যায় বঙ্গালি হুঁ। কায়স্হ। ঘোষ বোস মিত্রা সে শাদি হোতা হ্যায় হম লোগোঁ কা। বংলা কা চর্চা নহিঁ হ্যায়, ভুল গয়ে। নদিয়া পুরেইলিয়া জলপাইগুররি মেঁ কাফি সগে-সমবন্ধি রহতে হ্যাঁয়।

    কী ভয়াবহ। এভাবে নিশ্চিহ্ণ হওয়া। অতনুর মনে হয়েছে। সুশান্ত বলেছে, তাতে কি ! ভাষা আবার কোনও ব্যাপার নাকি ? কিছু একটা বলতে আর বলে বোঝাতে পারলেই হল।

    অরিন্দম সত্যই পাগল হয়ে গিয়েছিল কি না, কথার মারপ্যাঁচে সে ব্যাপারে সহকর্মীদের মাঝে অবুঝ সন্দেহ চাউর করে দিতে পেরেছে বেশ সহজে। অরিন্দম যখন চিকিৎসার স্মৃতিহীন ঘেরাটোপে, অফিসের কোয়ার্টার রাজেন্দ্রনগরে রেলফাটকের কাছে, বিলির জন্যে তৈরি হয়ে যাওয়ায়, ওর নামে, অনুপস্হিতিতে বরাদ্দ হয়ে গিয়েছিল একটা ফ্ল্যাট। মা আর ছোটো ভাই নতুন কোয়ার্টারে। পুরোনো ভাড়া বাড়ির পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশিনীর মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা আর নেই, কিংবা তার থলথলে খলবলে স্বামীর, যে বাড়তি রোজগারের ধান্দায় অহরহ ট্যুরে।

    পাগল হয়ে অরিন্দম মোটা হয়ে গিয়ে খানিক। ভুঁড়ি এখন বপু। ঘিরে থাকা মুখমণ্ডলের ওপর দৃষ্টিকে আনাগোনা করিয়ে, পিয়ানোর রিডের ওপর যেমন আঙুল, ডো রে মি ফা, ভাঙা গলায় বলে উঠল অরিন্দম, ‘আচ্ছা, অতনু-সুশান্ত জুটিকে দেখছি না, ওরা আমার জয়েন করার খবর পায়নি বুঝি ?’

    শিবু পালিত, মানে আশিয়ানা বিলডিঙের শৈবাল, যে নাটক করে, মানে গ্রুপ থিয়েটার, বিপ্লবী উৎপল দত্তের সঙ্গে রঙ্গিলা উত্তমকুমারের মিশেল দিয়ে জানালো, ‘সুশান্ত গেছে দু-ট্রাক কড়াইশুঁটি আনতে, আর অতনু গেছে রেমিটান্স নিয়ে।

    ‘অতনু আর রেমিট্যান্স ?’

    রেমিট্যান্স মানে বন্দুকধারী প্যারা মিলিটারি পুলিশ পাহারায় অনেকগুলো কাঠের বাক্সে থাক-থাক টাটকা নোট ট্রেনের ওয়াগনে করে পাততাড়ি। সেগুলো তুলে দেয়া নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের জিম্মায় ; যে নিয়ে যাচ্ছে যে বুঝে নেবে প্যাকেট আর বাণ্ডিল। যারা নেবে তারা গুণে যাচাই করে নেবে। গোনাগুনি করতে তাদের যতদিন সময় লাগে ততদিন সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকতে হবে। নিয়ে যাবার হরেক হ্যাঙ্গাম। ওয়াগন ব্রেকারের ভয়। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকার সঙ্গে সফরের ভয়। ট্রেন থামলেই গাড়ি থেকে নেমে দেখে নাও সব ঠিকঠাক। তালা টেনে যাচাই করে নাও। ঘুমের দফারফা। বারবার হিসি পাবে। গোনাগুনতিতে দিনের পর দিন কাটাতে হয় অচেনা জায়গায়। থাকার হোটেল নেই অনেক শহরে। মুখে দেয়া যায় না এমন খাবার। মশা। রোগের বালাই। নোংরা জল। লোডশেডিং। ধুলো। লু। বৃষ্টি। একা।

    পুরোনো হিলহিলে নোটের স্যাঁতসেঁতে গুঁড়ো০গুঁড়ো ধুলোয় অতনুর অ্যালার্জি হয়েছিল। চাকরিতে ঢুকেই। চোখের জলে নাকের জলে রুমাল ভিজে, ধুতির খুঁট ভিজে, সহ্যশক্তি না গজানো ওব্দি অ্যালাজেসিক আর অ্যালার্জির বড়ি খেয়ে অর্ধনিমিলিত, ক্যানটিনের বেঞ্চে বা ডিসপেনসারির স্ট্রেচারগাড়িতে চিৎ। বড়ো খাজাঞ্চি, যাঁর টেবিলের বিশাল কাঁচের তলায় ভারতের প্রতিটি তীর্থের দেবী-দেবতার রঙিন-শাদাকালো ছবি, বলেছিলেন, ‘এ চাকরির অনেক হ্যাপা আছে, কিন্তু সয়ে যাবে, এরপর যদি আঁস্তাকুড়ে শোও তাহলেও অসুখে পড়বে না। ’

    নামকরা কেরানি বলে দশটা-পাঁচটায় নির্ভুল আটক অরিন্দম। পাগলোত্তর জীবনে একদিন চারটে নাগাদ, যখন ও মনে-মনে একটা খসড়া বাংলা থেকে ইংরেজিতে তর্জমা করছে, ধাড়ি নোট-পরীক্ষক গৃহবধুদের মুখরা দল নানা সুগন্ধের বেড়ায় ঘিরে ধরল ওকে। উমা ভর্মা, মানসী বর্মণ, শ্যামলী কর্মকার, হেমা শ্রীবাস্তব, সরিতা যাদব, আরও কয়েকজন। একজন বলল, ‘আমরা নালিশ জানাতে এসেছি, সাকসেনা সাহেব সবাইকে দেখিয়ে-দেখিয়ে আমাদের কনফিডেনশিয়াল অ্যাপ্রেজাল রিপোর্ট লিখেছেন আর হাসিঠাট্টা করেছেন। ’

    ‘জানি,’ অরিন্দম মুখ না তুলেই বলল, ‘মানসী বর্মণের পোটেনশিয়ালিটির কলামে লিখেছিলেন “আনপ্রুভড”, কারেক্ট করিয়ে নেয়া হয়েছে। ’

    মানসী বর্মণ কাছে ঘেঁসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বৃন্দাবন পার্কে ছিলেন শুনলুম। ’ মানসী দৃষ্টিকটুভাবে সুশ্রী, আকর্ষণিয়ভাবে উন্নাসিক, ফুলোফুলো ত্বরান্বিত আঙুলে নোট গোনার অকল্পনীয় ব্যুৎপত্তি।

    ‘না, লুম্বিনী পার্কে,’ গা বাঁচায় অরিন্দম, মুখ না তুলেই।

    উমা ভর্মা হিন্দিতে বলল, ‘ওঃ, ভাগ্যিস মথুরায় নয়। ’

    অরিন্দম চোখাচোখি এড়াতে চাইছিল। কে জানে মৌলিনাথ উসকেছে কি না এদের। এরা ওকে দলবেঁধে হেনস্হা করতে এসেছে। প্রতিবেশিনীর কানাঘুষো দূতী। তার পাগলামির খবরের সঙ্গে মুখরোচক আরও গুজব রটে থাকবে, সত্যিকে ফেনানো অতিকথা। গ্লানিকে পাগলামি দিয়ে সারাবার প্রক্রিয়াকে তাহলে রুদ্ধ করতে চাইছে এরা। একজন মানুষের ভাবনাচিন্তাকে আঘাত করার ঠিক কতটা অধিকার, সামাজিক প্রাণী হিসেবে, আরেকজনের থাকতে পারে ? মানসীর তো বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির গুজব। লক্ষ কি সত্যিই অরিন্দম !

    ‘মথুরার রাজায় গিজগিজ করছে অফিসটা। ’ শ্যামলী কর্মকার, ময়লা, কোঁকড়া চুল, দেখতে দশ-পনেরো দিনের পোয়াতি, মন্তব্য করল। গায়ের রঙ ময়লা নয়, তবু বাবা-মা শ্যামলী নাম রেখেছে বলে হয়তো কৃষ্ণ আর তার লীলার ওপর ওর রাগটা আমার ওপর ঝাড়ল, নিজেকে নিঃশব্দে বলল অরিন্দম।

    চলে গেলেন গৃবধুরা, মোজেকজমিনে ময়ূরপঙ্খী নৌকো বেয়ে। শিশির ফোঁটারা বেরিয়েছেন নৈশভ্রমণে। শ্যামলী কর্মকারের দু’কাঁধে আর পিঠে মাংসের আদরনীয় তিরিশোর্ধ পরত জমতে শুরু করেছে, না তাকিয়েও দেখতে পাচ্ছিল অরিন্দম, ফর্সা পিঠে শিরদাঁড়ার দুপাশে জড়ুল আঁকা ডানাছড়ানো নরম মাংসের প্রজাপতি।

    অরিন্দম জানে ও পাগল হয়ে গিয়েছিল। কেন তাও মনে আছে ওর। অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার থেকে জানতে পেরেছে কবে থেকে ছুটিতে ছিল ও। কিন্তু কোন মুহূর্তে পাগল হয়ে গিয়েছিল, মনে নেই, কবে কখন, কোথায়। উন্মাদ হয়ে ওঠার মুহূর্তটা জানতে চায় অরিন্দম, নিজেকে নিজের বাইরে থেকে জানতে চায়, দেখতে চায়, আহ্লাদের অনিকেত মুহূর্তটা, সেই উজ্বল বিস্ফোরণ, বিগ ব্যাং, নীহারিকাপূঞ্জ, অন্য জগতে স্হানান্তরন। হাসপাতালের কাগজে ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপির অঙ্কময় লেখাজোখা। বোবাদের বিনির্মাণ করলে কতরকম গোলমেলে অরিন্দম বেরিয়ে আসবে, যে অরিন্দমদের ও চেনে না। বুড়ো কাউনসেলার সেরে যাবার পর বলেছিলেন, আপনার আত্মবিশ্বাস আপনাকে সারিয়ে তুলেছে। সেটা কোন অরিন্দমের আত্মবিশ্বাস ?

    নিকট বন্ধুদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেনি। জানা ছিল, এই সম্পর্কের উত্তরণ নেই। কিন্তু নরম মাংসের নেশায় একরোখা অন্ধত্ব জাপটে ধরল ওকে। নিজের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ দিয়ে শুরু।

    অফিসের কাচের বাইরে তাকাল অরিন্দম ; এক গূড়দর্শী শঙ্খচিল সাঁতরাচ্ছে আকাশের রোদ্দুর-মাখানো ঢেউয়ে।

    ওদের সংস্হায় প্রত্যেক বছর একজন পাগল হয়। গেল-বার দুবেজি হয়েছিল, তার আগের বছর এম কে ঝা পাগল হয়ে আর ফেরেনি। আসছে বছর কার পালা কে জানে। এর চেয়ে, অসীম পোদ্দার মামুদ জোহের মিলে যে সান্ধ্যদল গড়ে তুলেছে, যাকে সবাই নারী-নারকো গ্যাঙ বা না-না লেচার বলে, তাতে ঢুকলে পাগল হওয়া থেকে রেহাই পেত হয়তো।

    বি সেকশানের নোট পরীক্ষকদের কেউ বড় একটা ঘাঁটায় না। সংস্হা যাদের ঘ্যাঁচড়া বজ্জাত আড়বুঝো বদরাগি ঝগড়ুটে কর্মচারী মনে করে, তাদের পাঠায় ওই সেকশানে। মামুদ জোহরের কাছে জানলায় সানফিল্ম লাগানো ফিকে নীল রঙের ম্যাটাডর ভ্যান, সানফিল্ম লাগানো বেআইনি হওয়া সত্বেও লাগিয়েছে, ড্রাইভারের পেছনে সানমাইকার দেয়াল। পেছনে কি চলছে দেখা যায় না। ড্রাইভার পেছনের ট্র্যাফিক দ্যাখে রিয়ারভিউ আয়নায়, তাই ভাড়া করা ড্রাইভার রাখে না, গ্যাঙের সদস্যরা নিজেরাই চালায়। সানমাইকার দেয়ালের পেছনে, দুদিকের সিট টানলে সোফা-কাম-বেড, মখমালের চাদর দেয়া বিছানা গড়ে ওঠে। মাইক্রোবায়োলজিতে গবেষণা মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে মামুদ জোহের ঢুকেছিল চাকরিতে। নিজের শহর, নিজের প্রাসাদোপম বাড়ি, এখানেই চাকরি, ব্যাস।

    অসীম পোদ্দারের জানলায় পর্দা ঢাকা শাদা ডিজেল অ্যামব্যাসাডর। অ্যামবাসাডর উঠে যাচ্ছে বলে মনখারাপ থাকে। জেনেটিকসে পিএইচডি অসীম পোদ্দার। কেন্দ্র সরকারের বায়োটেকনোলজি বিভাগে অধস্তন বৈজ্ঞানিকের চাকরি পেয়েছিল, কিন্তু নোটপরীক্ষকের চেয়ে মাইনে কম বলে যায়নি ; অফিসে, এমনকি চায়েরদোকানে, পেছনের গলিতে তাড়ির আর জুয়ার ঠেক-এ ওর নাম ডকটর।

    অফিসের কাজ শেষ হলে, একটা-দুটোর মধ্যেই হয়ে যায়, পেছনের গলিতে, যেখানে পোড়া নোটের ছাই দিয়ে একটা পোর্টেবল গন্ধমাদন ঢিপি, ওরা গিয়ে দল বেঁধে তাড়ি খায় চায়ের কাপে, সিপ মেরে, তাড়ির ঋতুতে। ভাঙের ঋতু হয়, দিশি মদের, আফিমের, গাঁজার, চরসের, স্ম্যাকের। গাঁজাগুঁড়ো তামাক-চরসে মিশিয়ে আইভরি পাইপে। মেডিকাল কলেজের নাইজেরিয় ছাত্ররা হেরয়িন এল এস ডির ব্যবস্হা করে। ম্যাটাডরে ফার্স্ট এইড বাক্সে অ্যালুমিনিয়াম পাত, চামচ, ডিস্টিলড জল, সুঁই নেবার পিচকিরি, কাঁচি, লাইটার, ছিলিম, টয়লেট পেপার, তুলো। আর আছে বিদেশি-স্বদেশি নিরোধ বা কনডোম, রঙবেরঙ, নানা সুগন্ধের। আছে অকুস্হলকে তুলতুলে করে তোলার মলম। শনিবার-শনিবার হল্লাবোল। সেদিন যে একটারও আগে ছুটি। সেদিন ওদের দলে বেশ কয়েকজন অফিসারও শহরের অন্য কোনো নির্দিষ্ট মোড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ে ওদের দলে। দাশগুপ্ত, বোস, আগরওয়াল, রায়চৌধুরী, মুদলিয়ার, খান্না, মুখার্জি ওরা সব। লটারি অনুযায়ী ফি-হপ্তায় দুজন, ট্রেজারার আর ম্যানেজার হয়, যারা গাড়ি চালায়, ছোঁয় না কিছু। সন্ধে নাগাদ কোনও হাফগেরস্হ যুবতীকে এই কড়ারে তোলা হয়, দশ বারোজন তার সঙ্গে রতিভ্রমণ করবে ম্যাটাডরের সোহাগ বিছানায়, আর তারপর তার আসতানায় ছেড়ে দেয়া হবে কাজ শেষে। দুদিন বা তিনদিন একসঙ্গে ছুটি থাকলে ওরা অমন যুবতীকে নিয়ে বাইরে কোথাও চিটফান্ডের লটারি খেলতে যায়। মেয়েটির সঙ্গে লুকোচুরির খেলা। যে জেতে সে মেয়েটিকে আর চিটফাণ্ডের নির্দিষ্ট অংশ পায়।

    এই দলটার সঙ্গে মেশার অসুবিধে, তাদের অনৈতিকতা আর উচ্চশিক্ষার গর্ববোধ ছাড়া, নিজেদের মধ্যে কনভেন্টে পড়া ইংরেজিতে কথা বলে। মৌতাত ছাড়া, কারোর কোনো উচ্চাকাঙ্খা নেই, বা নেই কেরিয়ার সম্পর্কে চিন্তা। যতটুকু আয় তাকে মনে করে যথেষ্ট। ওদের কথা বলার ঝাঁঝ থেকে জানিয়ে দেয় যে কেউ কিছু হয়ে ওঠে না, বুদ্ধিজীবির কাজ আদর্শবাদকে এড়ানো, বেঁচে থাকাটা জ্বরভারে আনন্দ, স্মৃতি জিনিসটা বানানো, বাস্তব বলে আদপে কিছু হয় না বলে কোনো দুশ্চিন্তায় ভোগার দরকার নেই। অসম ধ্যানধারণার কারণে, অনেকে হেঁ-হেঁ হাসতে-হাসতে দ্রুত পাশ কাটায়। বংশরোপণ সিং যাদব ওই ভাবে পাশ কাটাতে গিয়ে থলে ভর্তি অফিস থেকে চুরি করা গোটা দশেক রঙিন পেপারওয়েট নিয়ে ওদের হাতে ধরা পড়েছিল। চাপরাশি থেকে উঠতে-উঠতে অবসরপ্রাপ্তির বছরে অফিসার হয়ে হেনস্হা।

    মামুদ জোহের সব সময় গম্ভীর, চিন্তিত। অন্য মুসলমান কর্মচারী বা অফিরাররাও ওর ধারে কাছে যায় না। কিছুটা কুঁজো আর গাঁট্টাগোঁট্টা, বেশ ফর্সা, কুঁজো হলেও ঢ্যাঙা, নিজের নাক দেখিয়ে বলে এটাই আরবদেশের, বাদবাকি ইনডিয়ান। অসীম পোদ্দারের বাঁ হাতে, এমনকি নাচগান-হুল্লোড় আর যৌন-অভিসারের সময়েও, একটা ডায়েরি, টুকটাক লিখে নিচ্ছে কিছু। দলে আছে বাইশ থেকে চল্লিশ বয়সি। রেগুলার দেবেন্দর, অভিজিৎ, শৈবাল, হরিশ, রবীন, অশোক, নরেন, প্রতুল, অনিমেষ, সুশীল, সুধীর, কমলেশ — বাঙালি বিহারি পাঞ্জাবি ওড়িশি।

    সুশান্ত, সব ব্যাপারে নাক গলানোর সুবাদে, অসীম পোদ্দারকে একবার অনুরোধ করেছিল, গরদানিবাগ হাই স্কুলে পড়া স্হানীয় ইংরেজি এড়িয়ে বাংলাতেই, অ্যামব্যাসাডরটা চালিয়ে দেখবে। চালু কিরতে গিয়ে বোঝে গাড়িটায় ক্লাচ নেই। কমলেশ, অটোমোবিল এনজেনিয়ারিং পড়ে যে ছোকরাটা নোট-পরীক্ষকের চাকরিতে ঢুকেছিল, ক্লচ বাদ দিয়ে দিয়েছে। কত গাড়ি বারিপথ বুদ্ধমার্গ অশোক রাজপথ থেকে দিনদুপুরে হাপিস হয়ে যায় রোজ, ওদেরটা হয়নি। চাকা ব্যাটারি ওয়াইপার ওব্দি চুরি যায়নি। অথচ চুরি হতে পারে না এমন অস্হাবর এমন কিছু পাটনা শহরে নেই, জীবজন্তু এমনকি মানুষও, মাঝপথ থেকে আচমকা উধাও।

    নিসপিসে বাঁ পা দুচারবার নাড়ানাড়ি করে বিস্ময়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে সুশান্ত, ‘হিন্দমোটরে পাঠিয়ে দিন না প্রোজেক্টটা। ’

    ‘না, অনেকের চাকরি চলে যাবে ; তাছাড়া এর ড্রিং তো অনেককাল আগে এসে গেছে ইনডিয়ায়, অটোমোবিল ইনডাসট্রিতে সম্পূর্ণ রদবদল ঘটে যাবে কয়েকবছরে। তখন আমাদের ইনডিয়ান গাড়ি কমপিট করতে পারবে না, ‘ বলেছিল অসীম পোদ্দার। অসীম এখনও বাংলায় কথা বলে, অথচ ওর জাঠতুতো ভাই তরুণ পোদ্দার, যার বাবা ক্ষেত্রমোহন পোদ্দার ব্রাহ্মস্কুল রামমোহন রায় সেমিনারির প্রধান শিক্ষক ছিলেন, আর পায়জামার ওপর ধুতি পরতেন, ও, তরুণ পোদ্দার বাংলা জানলেও বলে না, বাঙালিদের সঙ্গেও হিন্দিতে কথা বলে। তরুণের বড়দা, কল্যাণ পোদ্দার এখন প্রধান শিক্ষক, নিজেকে বাঙালি পরিচয় দিতে কুন্ঠিত হয়। ব্রাহ্ম শিক্ষক পাওয়া যায় না বলে উনিই প্রধান শিক্ষক, বংশপরম্পরায় চলবে স্কুল। বাংলা পড়ানো হয় না, কেননা সরকার আর বাংলা টেক্সটবুক ছাপে না ; স্কুলও বাঙালি শিক্ষক পায় না।

    সুশান্তকে কিন্তু মামুদ জোহের সমীহ করে, ট্রাকে করে ভিন্ন রাজ্য থেকে অসময়ের ফল-আনাজ আমদানির খাটুনি-প্রতিভার জন্যে। কেননা প্রায় সবাই মনে করে খাটুনির প্রতিভা একেবারে নেই বাঙালি যুবকদের, ঝুঁকি নেবার, অথচ অনেকেই মাওওয়াদি হবার ঝুঁকি নিয়ে বনপার্টিতে চলে যায়। মামুদ জোহেরের গ্যাঙের অনেকে যেতে চেয়েছে সুশান্ত’র পেছন-পেছন, কিন্তু ওর কাকা বলেছেন ব্যবসাপাতির ঘাঁতঘোঁত সবাইকে জানানো উচিত নয়।

    ননীদার বিয়েতে পৌঁছেছিল মামুদ জোহের অসীম পোদ্দাররা, রাত একটা নাগাদ আকাশের তারা মাথায় করে, টং, ঝিমন্ত বাসরের টনক নড়িয়ে, বেদম বাজনা ম্যাটাডরের মিউজিক সিসটেমে, পরিত্রাহি আশা ভোঁসলে আর ডি বর্মণের সুরে। ওদের গুরুমাতাল শৈবাল পালিত শুধু লিট্টি খেয়ে বলেছিল, ‘চিংড়ি কাটলেট চিকেন টিক্কা চিজ পকোড়া করতে পারতেন, নইলে আর প্রভিডেন্ট ফাণ্ড কেন ?’ কিন্তু ওদের সঙ্গে নকল কোঁকড়াচুল টকটকেঠোঁট চোখেকাজল গালেরুজ হাতেমেহেন্দি তরুণীটি বথুয়া শাক দিয়ে গোগ্রাসে গিলেছিল পুরি, মানে বড়ো মাপের মোটা-মোটা লুচি, নিজের সঙ্গে একটা হোমসার্ভিস প্যাকেটও তৈরি করিয়ে নিয়েছিল।

    ননীদা বললেন, ‘যাক, বিয়েতে এই পূণ্যিটা অন্তত করে নিলুম, কী বল হে মামুদ, জীবনে যে কখনও এমন নেমন্তন্ন খায়নি, তার আশীর্বাদ পেলুম।’ রাজেন্দ্রনগরের কমিউনিটি সেন্টারের সামনের বাড়িটায়, রাস্তার ওপারে, সারা রাতের ভগবতী জাগরণের জগঝম্প চলছিল পুরোদমে। নরক, ব্যাস, রাত দেড়টা-দুটোয় লোডশেডিং গুলজার।

    মামুদের দলের অফিসাররা, জানাজানি এড়াতে যাদের নির্ধারিত জায়গা থেকে তুলে নেয়া হয়, ননীদার বিয়েতে আলাদা এসেছিল একে-একে। ওদের লাম্পট্যের উল্লেখ করে প্রচুর উড়ো অভিযোগ এসেছে বেনামে। অফিস নির্ণয় নিয়েছে, সেরকমই কেস তৈরি করেছিল অরিন্দম, অফিসের বাইরে যে যা করে তা তার নিজস্ব ব্যাপার, সংস্হার কোনও দায়দায়িত্ব নেই। ‘ভাগ্যিস আপনি অবৈধ সম্পর্ক পাতিয়েছিলেন, বাঁচাবার পথ কেটে বের করতে পারলেন,’ ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলেছিল মুদালিয়ার।

    রমাবৌদি সবচেয়ে আগে ধরে ফেলেছিলেন এই নানা গ্যাঙের কাজকারবার, উপস্হিতি। ‘কাউকে শিগগির পাঠিয়ে দ্যাখো তো ও-ফুটে গেটের সামনে লাল শাড়ি-পরা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কি না’, টেলিফোনে বলেছিলেন রাঘবকে। রাঘব তখন দুপুরের ভোজন সেরে টুথপিক দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে ছাগল বের করছিল, দৌড় দিলে দোতলার ওর কোয়ার্টার সংলগ্ন বারান্দায়। ‘হ্যাঁ, রয়েছে একজন কারোর অপেক্ষায়, চোখে কালো চশমা। কাঁচ তোলা সাদা অ্যামবাসাডর তুলে নিয়েছিল সুবেশা তন্বীকে, পেছনে ফলো করছে একটা ম্যাটাডর ভ্যান। ’

    ‘দাশগুপ্ত সায়েবের কাছে কলগার্লের ডায়রেকটরি আছে গো,’ জানিয়েছিল রমা। শুনে রাঘবের মদে চিকনগাল বিখ্যাত ঘিঘিক-ঘিঘিক হাসি, হেঁচকিকে হাসিতে রূপান্তরিত করে ফেলেছে অভ্যাসবশত।

    দাশগুপ্ত যখন লাঞ্চ করতে লাউঞ্জে, ব্রিফকেসে পাওয়া গেল সুদৃশ্য ছোট্ট ডাইরেকটরি, সিঙ্গাপুরে গ্লসি কাগজে ছাপানো। টালিফোন নাম্বার, চেহারা, উচ্চতা, বয়স, কতোগুলো ভাষা জানে, সাংকেতিক না, কয়েকজনের খোলাবুক ফোটো। প্রত্যেকের দরদাম ডলার আর দিনার-দিরহামে। এদেশের সেরা খরিদনারীদের তালিকা। কিছু টেলিফোন নম্বর নিজেই লিখে রেখেছে দাশগুপ্ত। টিক দেয়া কয়েকটায়। প্রথম পৃষ্ঠায়, ‘উইথ গ্রেট অ্যাডমিরেশান ফ্রম এস পি মুখার্জি,’ মুক্তোর মতন।

    অরিন্দমের সেসময়ের মণিব দাশগুপ্ত, প্রশাসনের অধিকর্তা। ব্রিফকেসে নিখিল ভারত কলগার্ল ডাইরেকটরি আবিষ্কার শান্তি দিয়েছিল অরিন্দমকে, বিপথগমনের সাহস যুগিয়েছিল, কেননা ও তখন বিবাহিতা অভিজ্ঞ প্রতিবেশিনীর দুই থলথলে শ্যামল উরুর খিলে আটক। অন্যের অনুপস্হতিকে পুষিয়ে দিচ্ছে নিজের নির্ভেজাল কৌমার্য দিয়ে।

    তার দিনকতক পরেই নিজের ঘোরানো চেয়ারে পাক খেয়ে হৃদরোগে কার্পেটে ঠিকরে পড়ে যখন দাশগুপ্ত মৃত্যুমুখী, অরিন্দমের দুহাতের চেটোয় হিম জমে উঠছিল ফোঁটায়-ফোঁটায়, ঘামের সন্দিহান বিন্দু বিনবিনিয়ে উঠেছে কপালে। মামুদ জোহের কাঁদতে-কাঁদতে না-না গ্যাঙের সহমর্মীদের নিয়ে অকালবৃদ্ধের লাশ গাড়িতে তুলে ছুটেছিল কুরজি মিশনারি হাসপাতালে।

    শ্যামলী কর্মকার যাখন শ্মশান অভিমুখী ফুলে ঢাকা দাশগুপ্তর শবের কপালে হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘যৌনতা বাদ দিলে লম্পটদের চরিত্র আদারওয়াইজ ভালো হয়,’ তখন অরিন্দম আচমকা, ‘কী বলছেন কী আপনি ? দাশগুপ্ত সায়েব আর লম্পট ! দাম না দিয়ে কোনও সেবা কারোর থেকে নিতেন না। ’

    অফিসের গৃহবধু কর্মীরা থ, যেন অরিন্দমেরও যোনি ছিল কখনও, কোনও বয়সে।

    দাশগুপ্তের মৃত্যুর পর, অফিস যখন অফিসের মতন নির্লিপ্ত নৈর্বক্তিকে ফিরেছে, উকিল ভৈরোঁনারায়ণ শুক্লা স্টাফ সেকশানে ঢুকে জানিয়ে গেল, দাশগুপ্ত নিজের সম্পত্তি দিয়ে গেছে সান্ধ্যদলের পাঁচজনকে, স্হাবর সম্পত্তিও বেচে তাদের মধ্যে টাকা ভাগ করে দেয়া হবে।

    তেরো দিনের মাথায় রাজেন্দ্রনগরের কমিউনিটি হলে শ্রাদ্ধ-উৎসব। উৎসবের কাণ্ডারী না-না গ্যাঙের সদস্যরা। অরিন্দম শ্রাদ্ধে গিয়ে দ্যাখে ও-ই একলা শুধু ধুতি পাঞ্জাবি পরে বাঙালি সেজে পৌঁছেছে। এতদিন কাছাকাছি থেকেও নিজের নিকট ওপরঅলাকে বুঝতে পারেনি, মিশতে পারেনি দাশগুপ্তর কমবয়সী সঙ্গীদের সাথে। চরিত্র জুড়ে তক্কে-তক্কে থাকার সতর্কতা অরিন্দমকে সব ব্যাপারেই উটকো করে ফেলেছিল।

    সবাইকে অবাক করে কিন্তু ভিড়ে গেল, এতদিনকার চর্চিত দূরত্ব মুছে, অতনু।

    ঘরকুনো মনমরা নিঃসঙ্গবিলাসী গররাজি অতনু বাধ্য হয়েছিল টাকা ঠাসা কাঠের বাক্সগুলো নিয়ে অনেকদূরে যেতে, কারণ এবার আর তার বদলে কেউ রাজি হয়নি। এর আগে এড়িয়ে যেতে পেরেছে প্রত্যেকবার। ট্যুরের টিএ-ডিএর লোভে চলে গেছে ওর বদলে আরেকজন। প্রথমে ভেবেছিল লম্বা ছুটি মেরে ডুব দেবে দায়িত্ব থেকে। অবাক হয়ে গেল নিজের মধ্যেই ইচ্ছেটা আবিষ্কার করে। অনিচ্ছার মধ্যে বোধহয় পরাজয়বোধের ঘুণপোকা পাক খাচ্ছিল এতকাল। তাছাড়া শরীরের কষ্টবোধকে মনে হতো সবচেয়ে বড়ো শত্রু। রোপনি আর কাটাই ঋতুতে বেশির ভাগ বিহারি কর্মচারী গ্রামে যায় ; তাই অতনুর বদলে এবার যাবে না কেউ।

    যাদের জমিজমা নেই, ব্রাহ্মণ কায়স্হ দলিত-মুসলমান বা অবিহারি, তারা বললে, এবার নিজের পায়ে দাঁড়াও ; তোমার হয়ে আমরা আর কতো সেইব ! গুলিগোলা খেতে আমরা যাচ্ছি না।

    : ওখানের লোকেরা কুকুর-বেরালের মাংস খায়।

    : সবরকম পাখি খায়, কাকও, তারিয়ে।

    : সাপখোপ খায়।

    : প্রকৃতি কিন্তু অপূর্ব।

    : মেয়েরা অপূর্ব সুন্দরী। টকটকে রঙ। দেখে মনে হবে আনটাচড।

    : পুরুষগুলো কিন্তু অফিসেও মাল টেনে ভোম হবে থাকে।

    : নোট গুণে দেখে-শুনে নাবার জন্যে রোজ হাতজোড় করতে হবে তোকে। বিরক্ত হয়ে যাবি। এক ঘণ্টায় যা গোনা যায় তা গুনতে দিন কাবার হয়ে যাবে।

    : ঘোরাঘুরিরও তেমন স্কোপ নেই।

    : কদ্দিন যে গিয়ে পড়ে থাকতে হবে কে জানে !

    : একদম টাইমপাস হয় না ; তার ওপর সন্ধে হয় তাড়াতাড়ি, দুটো বাজতেই বিকেল।

    : মালটানা পাতাফোঁকার ওব্বেস থাকলে তেমন অসুবিধে হতো না।

    : সাবধানে মেলামেশা করবেন। ওদিকে খুব এডস-ফেডস হয়, সেদিন দেখাচ্ছিল দূরদর্শনে। ধুতিটা পালটে এবার ফেডেড জিনস ধরুন। কাপড়-ফাপড় কাচাকাচির অনেক ঝুঠঝামেলা।

    : গরম কাপড় নিয়ো সঙ্গে। শুধু আলোয়ানে কুলোবে না।

    : থাকার জায়গাও পাওয়া যায় না সহজে। যাও বা দুচারটে হোটেল আছে বা গেস্ট হাউস, সরকারি অফিসারদের কব্জায়।

    : আরে অফিসারগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতন শহরে ফেরত যায়, দু-তিনটে বছর কোনও রকমে কাটিয়ে। বাড়তি মাইনে, বাড়তি এল টি সি, তবু কি নাকে কান্না।

    : খোঁজাখুঁজি করলে দু’তিনঘর বাঙালি পেয়ে যাবেন। বাঙালি কোথায় নেই !

    বেচারা। অতনুর সবই জানা। অফিসের সকলেই জানে এসব। উৎসাহ দেবার বদলে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। কারণ হ্যাঙ্গাম পোয়াতে পারে না বলে, কাছাকাছি শহরেও ক্যাশ রেমিট্যান্স নিয়ে যাবার কাজ এড়িয়ে গেছে এর আগে। সবাই তা জানে। এখন তিরিশ-চল্লিশ বাকসো পাঁচশ একশ পঞ্চাশ কুড়ি আর দশ টাকার নোট পুলিশ পাহারায় ট্রেনে, তারপর ভ্যানে, ইনার লাইন পারমিটের ভ্যানতারা, স্হানীয় পুলিশকে জানানো, ওফ কি ঝকমারির চাকরি। কিছু অঘটন হলে, যদি বেঁচে থাকে, অতনুকে নিয়ে টানাটানি। গুলি খেয়ে পটল তুললে তো কথাই নেই। অফিস বীমা করিয়েই খালাস।

    মা-কে একলাই চালাতে হবে। সুশান্তকে বলে যাবে বাজার-টাজার করে দিতে। ও বাইরে গেলে মুশকিল।

    সকালেই ভাগলপুর থেকে ফিরেছে সুশান্ত। ওর বড়দা, বড়জ্যাঠামশায়ের ছেলে, যা ডাক্তারের ক্লিনিকে কাজ করে, অনেককাল কমপাউণ্ডার, সেই সত্যেন বোসরায়ের সতেরো বছরের মেয়ে পাপড়িকে বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গেছে গুণ্ডারা।

    হিন্দিতে লেখা স্টেটমেন্ট, এফ আই আর-এর জেরক্স অতনুকে দিয়েছিল সুশান্ত।

    “আমি ডক্টর সত্যেন্দ্রমোহন বোসরায়ের স্ত্রী অর্চনা বোসরায় সাকিন বড় পোস্টাপিসের কাছে, কপতোয়ালি থানা, জেলা ভাগলপুর। আজ সতেরো ডিসেম্বর দুপুর একটায় ভাগলপু মেডিকাল কলেজ হাসপাতালস্হিত পুলিশ শিবিরের জমাদারের উপস্হিতিতে মেডিকাল কলেজের এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে বয়ান দিচ্ছি যে দুপুর বারোটা নাগাদ যখন আমি পুজোর ঘরে ছিলুম, হঠাৎ আমার মেয়ে পাপড়ির মা-মা চিৎকার শুনতে পাই। চিৎকার শুনে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি চার-পাঁচজন জোয়ান ছেলে আমার মেয়েকে টেনে বাইরে নিয়ে যেতে চাইছে। তাদের মধ্যে জিন্দো এলাকার সাবোর থানা-নিবাসী রামদাস মণ্ডলের ছেলে প্রবীণ সিংহকে চিনতে পারি। অন্য আরেকটা ছেলেকেও চিনি যে ডাক্তার আর এন ঝার স্ত্রীর সঙ্গে দিনকুড়ি আগে এসে প্রবীণের সঙ্গে পাপড়ির বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। ওই প্রস্তাব আমি সঙ্গে-সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলুম। আমার মেয়েকে ধরে টানাটানি রুখতে যেই আমি ওদের মধ্যে গিয়ে পড়ি, তক্ষুনি নীল রঙের জ্যাকেট পারা বেঁটে মতন এক ছোকরা আমার দিকে পিস্তল তাক করে। ভয়ে আমি যেই পুজোর ঘরে ঢুকেছি, মেয়ের বাঁচাও-বাঁচাও চিৎকার শুনে তক্ষুনি বাইরে এসে দেখি, প্রবীণ এক হাতে আমার মেয়ের চুলের মুঠে আর অন্য হাতে পিস্তল নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাকে দেখে পাপড়ি আমার দিকে এগিয়ে আসতেই, প্রবীণ চে!চিয়ে উঠল, ‘প্রদীপ ঝা, এর মুখ বন্ধন করে দাও। ’ রোগা ফর্সা ছেলেটা আমার মুখে লিউকোপ্লাস্ট এঁতে দিল। তারপর প্রবীণ বলল, ‘এই সুরেশ বুধিয়া, দেখছিস কি, তাড়াতাড়ি উঠিয়ে নিয়ে চল। ’ যে ছেলেটা পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে এই ফাঁকে পিস্তলটা দিয়ে বেশ জোরে আমার মাথায় মারে, আর হিঁচড়ে নিয়ে যায় আমার মেয়েকে। আমি আবার বাধা দেবার চেষ্টা করলে প্রবীণ গুলি চালায়। রাস্তার সিঁড়িতেও আটকাতে গেলুম তো সেখানে দুটো লোক দাঁড়িয়ে ছিল, দেখলে চিনতে পারব, কোনও ভারি জিনিস দিয়ে আমার মাথা ফাটিয়ে দিলে। এর মধ্যে আমার দেওর আর ওর স্ত্রী এসে পড়ে ওদের আটকাতে গেলে প্রবীণ আবার গুলি চালায়। আমরা চেঁচাতে-চেঁচাতে ওদের পেছন-পেছন গেট পর্যন্ত পৌঁছলে, ওরা একটা শাদা মারুতি গাড়িতে আমার মেয়েকে তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়। গাড়ির নম্বর ডি আই ডি ২৮৯৬, আর গাড়িটার কাছে ২২২৩ নম্বরের আরেকটা গাড়ি ছিল। ভেতরে তিন-চারজন, সেটাও মারুতির সঙ্গে পালায়। গাড়ি দুটো বিহার হোটেলের দিকে চলে গেল। আমি আমার ছ’বছরের মেয়ে অর্পিতার সঙ্গে রিকশয় চেপে প্যাটেলবাবু রোডে আমার স্বামীর ক্লিনিকে যাই, আর ঘটনা জানাই। তারপর আমার স্বামী কমপাউণ্ডার শচীন ঘোষকে নিয়ে ভাগলপুর মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্যে আসি। আমি নিশ্চিত যে প্রবীণ সিংহ, প্রদীপ ঝা, সুরেশ বুধিয়া আর অন্য ছ;সাতজন ষড় করে আর পিস্তল চালিয়ে আমার মেয়ে পাপড়িকে অপহরণ করেছে। ”

    পড়ার পর, অতনু জোরে বলে ফেলেছিল, ‘এবার কী হবে তাহলে ?’ সুশান্তর জ্যাঠামশায় নামছিলেন দোতলা থেকে, বললেন, ‘হবে আবার কী ! মারুতি গাড়িটা মুখ্যমন্ত্রীর শালা বাচ্চা ঝা’র। তারপর একটু থেমে, ‘এদেশ থেকে পাততাড়ি গোটাতে হবে। ’

    সুশান্তকে এই প্রথম, এত বছরের পরিচয়ের পর, গম্ভীর আর চিন্তিত দেখে, অতনু বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল।

    সুশান্তর বাড়ি থেকে একটা ব্লোপ্লাস্ট সুটকেস, কানে ঠুলি দেবার অডিও ডিভাইস, ওর নিজে ট্যুরে যাবার পাতলা বিছানা, ফোলানো বালিশ নিয়েছে, আর সুশান্তর মেজদার একটা ফুলপ্যান্ট জ্যাকেট, যদি দরকারে পড়ে, তাই। যেখানে যাচ্ছে সেখানে জিনসের জামা-কাপড় কর্ডুরয় জুতো বিদেশি অনেক জিনিস পাওয়া যায়, সুশান্ত জানিয়েছে। সস্তায়। সুশান্তর মাধ্যমে, মানসী বর্মণ দিয়েছে ফ্রানসের ইউ ডি কোলোন আর মাস্ক পারফিউম আনতে। আলু ছেঁচকি রুটি আর স্কুলের সময়ের রঙিন ওয়াটার বটল দিয়েছেন মা। উনি ততো চিন্তিত নন কেননা বাবা প্রায়ই যেতেন অমন বাইরে ট্যুরে, অফিসের কাজে। মায়ের সঙ্গে কেমন যেন দূরত্ব গড়ে উঠেছে ক্রমশ, খুব কম কথা হয়। অতনু নিজে ছাড়া কেউই ওর প্রথম ট্যুর নিয়র চিন্তিত নয়। চিন্তায় পাকিয়ে উঠেছে ওর দুশ্চিন্তা।

    কিসের দুশ্চিন্তা, নিজেই ঠাহর করে উঠতে পারছিল না। পেটের মধ্যে পাক খাচ্ছে পিচ্ছিল পাঁকালের দল।

    অতনুর ঊর্ধতন অফিসার, যার এসব কাজের দায়, এসেছিলেন স্টেশানে, লোডিং ঠিকমতো হল কিনা যাচাই করতে, ওয়াগন বন্ধ হবার পর তালাগুলো নাড়িয়ে দেখলেন অনেকবার, সিল করে দিলেন সবকটা তালা অফিসের সিলমোহর মেরে। সুশান্তও এসেছিল, বলল, ‘পাপড়িকে জোর করে বিয়ে করেছে প্রবীণ, কেস দায়ের হয়েছে, কিন্তু পাপড়িকে ওর বাবা-মা ফেরত নিতে চাননি, বেশ গণ্ডোগোল আরম্ভ হয়েছে। ’ আরও থমথমে হয়ে উঠল অতনু, বিমর্ষ, আক্রান্ত, নিঃসঙ্গ।

    ট্রেন ছাড়তে, হাত নাড়িয়ে বিদায় সম্ভাষণ জানাবার মাঝে, অতনুর মনে পড়ে গেল, আচমকা, চিরুনি টুথব্রাশ পেস্ট সাবান দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম নিতে ভুলে গেছে ও।

    ট্রেন থামলেই, প্ল্যাটফর্মে নেমে, ওয়াগানটার দিকে খেয়াল রাখছিল অতনু। বারবার ওর ওই প্রকাশ্য উদ্বেগে বিরক্ত প্যারা মিলিটারির সঙ্গী হেড কন্সটেবল জানালো, অত চিন্তার কিছু নেই, অমন ঢের ক্যাশ বাকসো সঙ্গে নিয়ে গেছে ওরা, ডাকাতরা এ-মাল ছুঁতে ভয় পায়, আর এই রুটে মাওওয়াদি পড়ে না ; মাওওয়াদিরাও এই ওঘান ভাঙতে চায় না, নতুন নোটের নম্বরের ট্রেল অনুসরণ করে প্রশাসন ওদের ধরে ফেলতে পারে।

    ঠিক আছে, যা হবার হবে, দেখা যাবে, ভেবে, রুটি আলু ছেঁচকি খেয়ে, বিছানা পেতে শুয়ে পড়ল অতনু। স্বপ্ন দেখল, বাবা পায়ে হেঁটে ট্রেকিং করে, মিউলের পিঠে দু’পাশে টাকার বাকসো ঝুলিয়ে, সঙ্গে লাল মুরেঠা-মাথা বন্দুকধারী পুলিশ, ছ’টা বাদামি কালো মিউলের পাশে-পাশে মালবাহকদের পিঠে সুটকেস বেডিং, যাচ্ছেন হিমালয়ের কোনো ব্যস্ত গঞ্জের কারেন্সি চেষ্টে। হনুমান টুপি, মাফলার, দস্তানা, বালাপোষের কালো কোট। দূরের অস্বচ্ছ হিমবাহের উড়ন্ত শ্বাস খেলে বেড়াচ্ছে সিঁড়ি-ভাঙা সবুজ ধানখেতের ওপর। পায়ের কাছে হলুদ প্রজাপতির চনমনে দল, এই শীতেও, বসন্ত ঋতুকে ডানায় করে নিয়ে চলেছে বাবার জন্য। চড়াই থেকে নেমে ভাঙছেন উৎরাই। সাদা-বেগুনি ঘাসফুলের ছিটে। গলায় ঘণ্টি-বাঁধা উদাসীন গাইগোরু মুখ তুলে আগন্তুকদের এক পলক দেখে, জাবর কাটায় মন দ্যায়।

    ঘুম ভাঙল সেপাই নুরুদ্দিন মণ্ডলের দাড়ি-ঝোলানো ডাকাডাকিতে। ঘুম ভাঙতেই আশঙ্কিত, ভাবল বুঝি গোলমাল, ছিটকে উঠে বসল। না, সকাল। টুথব্রাশ পেস্ট আনেনি শুনে নিমদাঁতন দিয়ে গেল আর দাঁতন হয়ে গেলে গরম চপ আর চা। সুশান্তর উপদেশ অনুযায়ী সেপাইগুলোকে গুড হিউমারে রাখার জন্য এসব ভদ্রতা অতনুরই করার কথা। কিনউ অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে উঠতে পারছিল না। চা-চপ খেয়ে নিল গোবেচারা নৈঃশব্দে, আলগা চটি বুড়ো আঙুলে ঝুলিয়ে। গন্তব্যে না-পৌঁছানো ওব্দি, ওখানে সরঞ্জাম কেনার পরই দাড়ি কামাবে।

    নুরুদ্দিন আবার খোঁজ করতে এলে, ‘আমি ঠিক আছে, অত ভাবছেন কেন—,’ অতনু বলল।

    ‘না, মানে সাহাব বলেছেন আপনি কখনও যাননি রেমিট্যান্স নিয়ে, তাই। ’

    ‘আরে ঠিক আছে, কেন কষ্ট করছেন মিছিমিছি’— কে এদের এসব বলেছে কে জানে ! অযথা অপদস্হ করা। সবাইকে সব কথা কি না বললেই নয়। স্টেশানে এসেছিলেন শ্রীনিবাসন, ওঁরই কীর্তি, নির্ঘাৎ। ছি ছি।

    পরের স্টাশানে নুরুদ্দিন হিন্দি খবরের কাগজ দিয়ে গেল।

    ‘আপনি কি পুলিশে ? একজন মোটামতন বয়স্ক সহযাত্রী, উসখুস বাদ দিয়ে জানতে চায় সরাসরি।

    ‘না’। নোট পরীক্ষক বললে বুঝতে পারবে না আঁচ করে উত্তর দিল অতনু।

    ‘ও। সি আই ডি ? সি বি আই ?’

    চুপ মেরে থাকাটা বরং ভালো। আর জবাব দিল না অতনু। আবার জেরা আরম্ভ হতে পারে আঁচ করে ওপরে নিজের বার্থে উঠে গেল। সহযাত্রীদের মধ্যে ইন্দিরের খুন, অপারেশান ব্লু স্টার, বোফোর্স, নাগমণির স্ত্রী হত্যা, নির্মল মাহাতো হত্যা, বৈশালীতে মহোবিয়া খুন, জগন্নাথ মিশ্রর বলুয়া গ্রামের কাছে কমরেড রাজকিশোর ঝার হত্যা, বেগুসরায়ে ভাজপা, মাকপা, ইনকা নেতাদের বেরহম পিটুনি, জয়প্রকাশের চ্যালা লালু যাদব নীতিশকুমারদের জাতপাত রাজনীতি, বিধান পরিষদের উপসভাপতি রাজেশ্বরী দাশের দত্তকপুত্রী শ্বতনিশা ওরফে ববিকে নিয়ে মন্ত্রী বিধায়ক আর তাদের জোয়ান ছেলেদের বেলেল্লাপনা, দলেলচৌক বধৌরায় মুখ্যমন্ত্রী বিন্দেশ্বরী দুবের হাত, জয়প্রকাশ নারায়ণের সচিব আব্রহাম কী ভাবে শোভা চক্রবর্তীকে ঠকিয়েছে, ধানবাদের মাফিয়া মকদ্দমায় সূর্যদেব সিং সত্যদেব সিং শংকরদয়াল সিং সকলদেও সিং রঘুনাথ সিং কেমন হেসেখেলে ছাড়া পেয়ে গেছে, আর সমস্ত অপদার্থতার কারণ পুলিশ সি বি আই সি আইডির অফিসাররা, এসব গল্প চলে অতনুকে উদ্দেশ্য করে।

    অতনু খবরের কাগজ দিয়ে মুখ ঢেকে নিল নিজের বার্থে শুয়ে। কাগজে লিখেছে, প্রবীণ সিংকে ১০৭, ১৪৮, ১৪৯, ৪৫২, ৩৬৭, ৩৪১, ৩৪২ দণ্ড সংহিতার ধারায় আর অস্ত্র আইনের ২৭ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রশাসন প্রবীণের আস্তানার খবর পেলেও পুলিশ সে রাতে তাকে বারাহাটে গ্রেপ্তার করতে যায়নি। বারাহাটে ওরা বাহুবলী নেতা ওংকার রামের বাড়িতে উঠেছিল। সেখানেই প্রথমে ধর্ষণ, তারপর বিয়ে।

    অতনুর আবার মনে হল, ‘এবার কী হবে ?’ প্রত্যেকে, সবাই, গোটা রাজ্য উচ্ছন্নে যাবার আর কোনও নজির নেই বোধহয়।

    হাতিদহের পোলটা দেখা হল না। খাগাড়িয়া কাটিহার নিউ জলপাইগুড়ি পেরিয়ে গেছে। বিহার থেকে পশ্চিমবাংলায় ঢোকার নিসর্গ পরিবর্তনের মধ্যে শিহরণ বোধ করছিল অতনু ; পরিচিত স্বপ্নের চলচ্ছবির মধ্যে ছুটছিল ট্রেন, বাতাসের গন্ধেও পরিবর্তন ঘটে গেছে যেন।

    গৌহাটিতে ওয়াগন থেকে প্যারা মিলিটারি পাহারায় মাল গুনে-গুনে নামিয়ে তোলা হল অন্য ওয়াগনে। সারারাত স্টেশানে, মশা, কাঁধ ব্যথা, ঘুম নেই,। সকাল দশটায় ইনার লাইন পারমিট সংগ্রহ। শিলচর। বন্ধ কালো ভ্যান। সামনে জিপ পেছনে জিপ। উবড়ো খাবড়া চড়াই। অপ্রতিদ্বন্দ্বী নিসর্গের নয়নাভিরাম নষ্ট হয়ে যায় শরীরের সহ্যশক্তির অসহায় পরাজয়ে। দুর্গম প্রকৃতি আর অনভিপ্রেত ভয়ে বিরক্ত হয় অতনু, ঘুমিয়ে পড়ে।

     

    চার

    মাল নিয়ে অতনু যখন গন্তব্যে পৌঁছোল, শাখা ম্যানেজার ওর খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, উস্কোখুস্কো চুল, নোংরা ধুতি পাঞ্জাবি, চোখের কোণে কাহিল অন্ধকার দেখে, মুখে অমায়িক, করমর্দনের শেষে বললেন, হ আর দন্ত্য স মেশানো কেমন যেন অচেনা ইংরেজিতে, চূড়ান্ত ক্লান্তি সত্ত্বেও বিসদৃশ লাগছিল, কাগজগুলো দিন, রিসিভ করে নিচ্ছি। গোনাগুনি কাল থেকে শুরু করলেই হবে। আজকে বরং জিরিয়ে নিন, খুবই ধকল গেছে দেখছি। কাছেপিঠে হোটেল আছে কিনা জিগ্যেস করতে, উনি জানালেন, থাকার ব্যবস্হা করা হয়েছে, বেয়ারা পৌঁছে দেবে।

    বাকসোগুলো তালিকায় টিক দিয়ে ভল্টে রাখা হলে, ক্যাশিয়ারের নিঃশ্বাসে ভক করে মদের গন্ধ ওড়ায় বিচলিত হয় অতনু। পেচ্ছাপ করতে যাওয়ার নাম করে চাবিটা বেঁধে নিল পৈতেতে।

    বাইরে বেরিয়ে, পিওনের পেছন-পেছন তিন ফার্লংটাক হাঁটার পর যে বাড়িটায় ওরা ঢুকল, তার দেয়ালে ‘ইনডিয়ান ডগস গো ব্যাক’ কালো মোটা বুরুশে, লেখা দেখে হঠাৎ নিজেকে একা বোধ হল অতনুর। আসার সময় রাস্তায় দেখেছে বেশিরভাগই স্হানীয় মহিলা, পুরুষ কম। বাইরে থেকে আসা, কেন্দ্রিয় ভূখণ্ডের একজনকেও দেখতে পায়নি। মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। ওরা ওরা, আমরা আমরা –ওদের আর আমাদের এই বোধের ঝগড়াঝাঁটি থেকে মানুষ বোধহয় কখনও বেরিয়ে আসতে পারবে না। ভিন্ন গ্রহ থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী এলে পৃথিবীর মানুষ পারস্পরিক হিংসে থেকে বেরোতে পারে, মনে তো হয়।

    ‘এ বাড়ির লোকজন আপনার দেখাশোনা করবেন। ’ কাউকে কিছু বলা নেই কওয়ানেই, খোলা সদর দিয়ে ঢুকে দোতলার একমাত্র ঘরটায় ওকে পৌঁছে দিয়ে, সেলাম ঠুকে চলে গেল বেয়ারা বা পিওন। টিপস দেয়া ঠিক হবে কিনা, এই কুন্ঠা থেকে মুক্ত হবার আগেই, চলে গেল লোকটা, পিওনও বেশ ইংরেজি জানে, হ আর দন্ত্য স মেশানো হলেই বা।

    বাড়ির কেউ খোঁজ নিতে আসবে মনে করে অপেক্ষা করছিল অতনু।

    ঘরটা সাজানো। পোরোনো অ্যান্টিক খাটে শাদা বিছানা-বালিশ, পায়ের কাছে পাট করা কম্বল, ছোট্ট পড়ার টেবিল, সঙ্গে কুশন-দেয়া চেয়ার, ডান দিকে আলোর তলায় বেতের আরামকেদারা, পাশের দেয়ালে গোল, সামান্য পারা-ওঠা আগেকার কালের সোনালি-ফ্রেম আয়না, টেবিলের ওপর দুটো ওলটানো কাচের গেলাস, জলভরা ঢাকা-দেয়া জাগ খাটের শিয়রে শাদা পর্দা টানা জানলা। রোমান সংখ্যার পুরোনো দেয়ালঘড়ি। মেঝেতে নস্যিরঙা ড্রাগেট ক্ষয়ে গেছে কয়েক জায়গায়। উনিশ শতকী ছমছমে সব মিলিয়ে। এই প্রথম অতনুর হাতে ঘামা ভয়-ভয় ভাব এলো।

    এখন সাড়ে তিনটে বেজেছে। এর মধ্যেই বিকেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাইরে বেরিয়ে বাড়ির অবস্হান, ইনডিয়ান ডগস গো ব্যাক লেখা দেয়াল, রাস্তার ওপাশের বাড়ি দুটোর টালির ছাদ আর বাঁশের বারান্দা মগজের স্মৃতিঘরে তুলে রাখল অতনু, যাতে ফেরার পথে হারিয়ে না যায়। মহিলাদের, যারা ওর দিকে অনুসন্ধিৎসু তাকিয়ে পথ দিয়ে যাচ্ছিল, সত্যিই দেখতে ভালো। সমস্ত মোঙ্গোলয়েড নারীর থাকে অপার্থিব চটক, যেন কেউ ছোঁয়নি কখনও, পরাগমাখানো ত্বক। খোকাখুকুগুলোও কেমন গোলাপি। গাল টিপে দিলে কি আক্রান্ত হবে ? কেমন জীবন্ত চনমনে।

    সবাই তাকেই দেখছে। ইনডিয়ান ডগরা বোধহয় বেরোয় না এ-সময়। গায়ে ধূসর আলোয়ান, ধুতি-পরা ডগ দ্যাখেনি। বুড়ো-জোয়ান সব পথচারীই প্যান্ট পরে বেরিয়েছে। মেয়েরা পরেছে স্কার্ট বা শায়ার মতন কিছু।

    ভেতরে কিছু পরে ? অন্তর্বাস পাওয়া যায় এখানে ? এমনিতে দেখে তো মনে হচ্ছে দেহের যা কাঠামো, অন্তর্বাসের প্রয়োজন নেই। অফিসে গৃহবধু আর অবিবাহিতা কর্মীদের আঁটো শাড়ি ছাপিয়ে, অনেকেরই জাঙিয়া ফুটে ওঠে।

    একটা দোকান দেখে থামল অতনু। একটা রাস্তা চলে গেছে পাক খেয়ে দোকানটার ওপরতলার দিকে। সাবান তেল ওষুধ চাল ডাল শুঁটকি মাছ সবই। ক্ষুদে ডিপার্টমেন্টাল দশকর্মা। কোন ভাষায় কথা বলবে অস্বস্তির মাঝেই, দোকানের মহিলা প্রথমে ভাঙা হিন্দি আর তারপর পরিষ্কার ইংরেজিতে জানালেন, যা চাই সবকিছু পাওয়া যাবে, কনডোম থেকে বিশুদ্ধ স্কচ। টুথব্রাশ পেস্ট সাবান চিরুনি সেফটি রেজার ল্যাদার দু-রকম বিদেশি পারফিউম কিনল অতনু।

    করকরে নোটগুলো হাতে নিয়ে দোকানি বললেন, ‘ও, তুমি এসেছ এবার ? রোসাংলিয়ানাদের বাসায় উঠেছ ? তোমার এগে মোহন রাজবংশী নামে একজন এসেছিল, একশো চব্বিশ টাকা না দিয়ে চলে গেছে। ’

    ‘আমার থেকে নিয়ে নিন’, অতনু কুন্ঠিত। ‘আমি এসেছি মুম্বাইয়ের হেড অফিস থেকে’, অসৎ লোকের থেকে নিজের পার্থক্য দাঁড় করাতে বেমালুম মিথ্যে বলে ফেলে বিমর্ষ বোধ করল ও। কোথায় যে উঠেছে নিজেই জানে না এখনও। হোটেলের নাম কি ইনডিয়ান ডগস হতে পারে ? দোকানি জানালেন, টাকাটা উনি ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজারের কাছ থেকে আদায় করেছেন।

    ঘোরাঘুরি করতে-করতে অতনু টের পাচ্ছিল যে এখানে কায়িক শ্রম করে মেয়েরা। পুরুষরা কী করে কে জানে ! রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে আসছে। তার মানে সন্ধে নামলেই জায়গাটা একদম খাঁ-খাঁ।

    রাজবংশীটা শালা এখানেও এসেছিল, রেমিট্যান্স নিয়ে। পাটনায় অফিসারদের ছেলেমেয়েদের জন্যে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষক আর ট্যাবুলেটারদের টাকা খাইয়ে বেশি নম্বর পাইয়ে দেবার কাজ করে। এনজেনিয়ারিং ডাক্তারির পরীক্ষায় টুকলির ব্যবসা।

    –কবিতা পিসি, আমরা এই রাস্তায় এসেছিলুম গো। ’

    আরে, বাংলা, বাঙালি, এখানে ! অতনু ঘুরে দেখল, হাফপ্যান্ট-পরা কিশোর আর শাদা থানে অশীতিপর বৃদ্ধা, কিশোরের হাত ধরে। কথা বলতে চেয়েও, বলল না, কুন্ঠিত লাগছিল। এই থুথ্থুরে বুড়ির নাম কবিতা। পঁচাত্তর বছর আগে লাগসি ছিল। এখন শুধু পিসি বললেই হয়, রাঙাপিসি ফুলপিসি নতুনপিসি যা হোক। কবিতা নামে যে যুবক ডাকতো সে তো কবিতাকে মর্ত্যে ফেলে রেখে গদ্যের আকাশে। কদমছাঁট ছেলেটির হাত ধরে নেমে গেলেন বৃদ্ধা।

    ঘরে ফিরে অতনু দেখল টেবিলে রাখা রয়েছে টোস্ট আর একটা ফ্লাস্ক, বোধহয় চা বা কফি। টয়লেটে ঢুকে তোয়ালে সাবান আর লাল প্লাস্টিকের বালতি দেখল, গরম জল, চটি, শ্যাম্পু। দাড়ি কামিয়ে স্নান সেরে নিলো ; হোটেলটায় ব্যবস্হা বেশ ভালো।

    কফিটা গরম তখনও, খেয়ে ফেলল টোস্ট দিয়ে। গড়াগ্গড় কম্বল টেনে বিছানায়, পার্স আর সুটকেসের চাবি বালিশের খোলে শিয়রের তলায়।

    ঘুম না আসা ওব্দি ও, অতনু, ভেবে কুলোতে পারছিল না ইনডিয়ান ডগস কি বাইরের সবাই, ওই কবিতা পিসিও, ডগই বা কেন, বাঁদর গাধা কাক নয় কেন, আমরা বাঙালিরা কাদের ঘেন্না করি, আগে যারা বাঙালিদের ঘেন্না করত তখন তাচ্ছিল্য করে, ধুতি পরে বেরোনো ঠিক হবে না, সুশান্তর দেয়া প্যান্টটা মাপে বড়ো, প্যান্ট দেখে কি ভাববে মা, পৌঁছোনোটা লেখা হল না মাকে, মানসী বর্মণ গায়ে কোথায় লাগাবে পারফিউম, শ্যামলীর বগল শীতকালেও ভিজে থাকে, পচা নোটের গন্ধ ভালো লাগে না, এখানে কদ্দিনে নোট গোনা শেষ হবে, এখানে জমা পচা নোটগুলো ফেরত নিয়ে যেতে হবে পুড়িয়ে নয্ট করাবার জন্য…..

    তার পদবি ধরে ডাকা হচ্ছে শুনে ঘুম ভাঙতে অতনু দেখতে পেল, ঘরের টিমটিমে বিজলি আলোয়, তার মাথার কাছে ঝুঁকে সামান্য মোটা অথচ প্রায় বোজা-চোখ কাঁধ ওব্দি চুল, লাল কার্ডিগানে এক যুবতী, আর তার পাশে বেশ ঢ্যাঙা আরেকজন, গায়ে পশমের স্কার্ফ চোখে শ্লেষ মেশানো কৌতূহল যুবতী, চোখ ততো বোজা নয়। উঠে বসল বিছানায়।

    খাটো মেয়েটা কিছুটা নার্ভাস, বললে, ‘স্যার আজকে নিরামিষই রেঁধেছি, আপনি কি আমিষ খান ?’

    ‘হ্যাঁ,’ অতনু বুঝল পরিষ্কার আওয়াজ বেরোয়নি গলা থেকে, তাই আবার জানাল, হ্যাঁ, শুধু ডিম আর মুরগি খাই। ’

    ‘মাছ খান না ?’ জানতে চাইল ঢ্যাঙা যুবতী, জিনসের ঘাগরা। ‘তুমি তো বাঙালি ?’

    আবোল তাবোল মাংস আর শুঁটকির বোটকা ভয় অতনুর। বরং নিরামিষ খেয়ে চালিয়ে দেবে। যুবতীর কন্ঠস্বর কিছুটা ভাঙা ভাঙা, শোনেনি এর আগে। এত কাছাকাছি একজন যুবতীর সঙ্গে, একজন নয় দুজন, সে কথা বলতে পারছে। ছি ছি, মিথ্যে কথা বলা উচিত হয়নি।

    ‘তুমি ফ্যামিলি আনতে পারতে। ’ বেঁটে মতন যুবতীর খোঁজখবর।

    ‘বিয়ে করিনি এখনও। ’ বিছানা থেকে নেমে, টেবিলে রাখা ফ্রাইড রাইসে এক নজর লোভী চাউনি, বলল অতনু। এদের ইংরেজি সত্যি কত ভালো, হ আর দন্ত্য স নেই। নিজেরটায় বাঙালি টান, ভজকট।

    ‘ভালো কথা’, এক সঙ্গে বলে উঠল দুজনে। একজন আরেকজনের মাথায় আলতো চাঁটি মেরে, ‘গুড লাক।’

    ওরা চলে গেলে, কাঁটা-চামচ থাকা সত্ত্বেও, হাত দিয়ে খাওয়া আরম্ভ করেছে যখন, টেবিলে বিদেশি স্কচের বোতলটা দেখতে পেল অতনু, কিছুটা খালি, পাশে একটা ফুলকাটা কাচের গেলাস। একটু খাবে কি খাবে না নির্ণয় নিতে অস্বস্তি হচ্ছিল। খেয়ে গলমাল করে ফ্যালে যদি, যুবতীদের সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করে ফ্যালে যদি নেশার ঘোরে, পিঠের ছাল ছাড়িয়ে নেবে এই বেঙ্গলি ডগের। খায়নি তো আগে। সুশান্তর মতে মদ খাওয়া খারাপ। দেখাই যাক সামান্য। গেলাসে একটুখানি ঢেলে, যদি মাথা ঘোরে, ঘুম না আসে, আবার বোতলে ফেরত ঢেলে দিল অতনু, এঁটো হাতে।

    ‘কী হল ? মিশেল দেয়া নয়। আমরা অতিথিদের সঙ্গে জোচ্চুরি করি না। ’ দরোজার কাছ থেকে খাটো মেয়েটার কন্ঠস্বরে অতনু স্তম্ভিত। তার ওপর নজর রাখা চলছে। হোটেল নয় বোধহয় এটা। ধরা পড়ে যাওয়ায় বিব্রত লাগছিল।

    ‘না, আমি কখনও মদ খাইনি। ’

    ‘খাওনো ? তোমার বয়স তো যথেষ্ট !’

    ‘আমাকে কেউ কখনও খেতে অনুরোধ করেনি। কে জানে কেন খাইনি। ঠিক জানি না। ’

    কাছে এসে অতনুর কাঁধে হাত রাখে মেয়েটি। ‘আমি বলছি, খাও। তুমি বোধহয় কোনো নেশাই করো না, তাই না ? ইনোসেন্স রয়েছে তোমার চোখে মুখে আচরণে। ’

    মেয়েটির স্পর্শে মানসিক শারীরিক বিচলিত অতনু বলল, সত্যি। আমি কিছুই চেষ্টা করে দেখিনি। তোমাদের এই হোটেলটার নাম কি রোসাংলিয়ানা ?’

    ‘না।’ চটে যায় যুবতী। ‘আমরা ইংচুঙার। আর এটা হোটেল নয়, গেস্ট হাউস। ’

    অতনু কাঁচুমাচু, মেয়েটির পারফিউম কিছুটা ধাতস্হ করে ওকে। একগাল খাবার তোলে।

    ‘বান্ধবী নেই ?’ এবার অতনুর কাঁধে আঙুলের চাপ দিয়ে মেয়েটি সহজ করে তোলার চেষ্টা করে আবহকে।

    ‘না’। আমূল নড়ে ওঠে অতনুর টনক।

    ‘কিন্তু তোমার তো বয়েস হয়েছে বেশ। ’ কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে মাথার চুলে বিলি কাটে মেয়েটি।

    অতনুর গলায় শ্লেষ্মা জমে ওঠে, শরীরে সাড়া বোধ করে। ‘অনুভব করিনি কখনও ; কেউ আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়নি, তাই ততটা অনুভব করিনি। ’

    ‘তুমি তো ভারজিন?’

    অতনু বিস্মিত বিচলিত হতবাক। একই সঙ্গে শীত করে, গরম লাগে। এত কাছ থেকে নারীর শরীরের সুগন্ধ পায়নি এর আগে। দেহের কোন গোপন গ্রন্হি থেকে আসে এই ঘ্রাণের সংকেত। মা-ও এভাবে হাত বুলিয়ে দেয়নি কতকাল। ওকি তাকাবে মেয়েটির দিকে ? তাকালে যদি চোখাচুখি হয় ? মেয়েটি যদি ওর চোখে উদ্দেশ্য খুঁজে পায় ! নাঃ, এখন থাক, পরে সময় মতন খুঁটিয়ে দেখে নেবে দুজনকেই।

    গেলাসে সামান্য হুইসকি ঢেলে, জল না-মিশিয়েই, গিলে ফেলল, আর গা গুলিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। বাকি ফ্রাইড রাইস খাওয়া যাবে না আর। কী অভাবনীয়! সামান্য এক চিলতে স্পর্শে তার চরিত্রের গিঁটগুলো খুলে যাচ্ছে। অস্তিত্বের অচেনা জটিল দুঃখ জমাট বেঁধে গেছে গলায়। কই, জীবন নিয়ে তো ও অসন্তুষ্ট ছিল না এতকাল। কোথায় আর কেনই বা লুকিয়ে ছিল গোপন ফোঁপানি !

    থালা গেলাস তুলে নিয়ে যেতে-যেতে মেয়েটি জানিয়েছিল, ওরা দু’জনে এই গেস্টহাউসের হাউসকিপার রাঁধুনি ঝি ধোপা সবকিছু। প্রতিদিনের খর্চাখরচ জানিয়ে দিয়েছে তো ম্যানেজার ? অতনু যেন সবাইকে বলে না বেড়ায়।

    নেশাটা বেশ ভালো লাগছে টের পেয়ে বেশ শিহরিত হচ্ছিল অতনু। বিবেক কাকে বলে ! বিবেকের ভালো লাগছে। পাটনায়, বিহারের পথে শহরে গ্রামে গঞ্জে যা ঘটছে, তা ? দরোজায় ছিটকিনি তুলে, মশারি টাঙিয়ে, আলো নিভিয়ে, শুয়ে পড়ল ও। বাইরে শুরু হয়ে গেছে বৃষ্টির টাপুর। সজ্ঞানে বাড়াবাড়ি করছিল বাতাস। অতনু ভাবছিল লোকে কি করে মিজো নাগা কুকি মণিপুরি নেপালি নেওয়ারি ভুটানি খাসি লেপচা চিনা জাপানি ভিয়েতনামির তফাত করে ? ফর্সা হলে, অনেকটা চ্যাপ্টা চেহারার বাঙালিও গুলিয়ে যাবে।

    দরোজার কড়া নাড়ানাড়ির শব্দর ঘুম ভাঙতে, কম্বল মুড়ি দিয়ে ছিটকিনি খুলতেই ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার। জিনস, চামড়ার জারকিন, কুতকুতে হাসি, বলল, ‘স্যার দরোজা জানলা বন্ধ করে ঘুমোচ্ছেন ! এখানে চুরি-ডাকাতির ভয় নেই। বাইরে চেয়ে দেখুন তো কি টাটকা বাতাস, বুক ভরে টেনে নিয়ে যান নিজের দেশে, সারা জীবন কাজে দেবে। দেখছেন তো কত শিগগির সকাল হয়। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতন হয়েছে তো রাত্তিরে ? এরা দুই বোন খুবই ভালো। অসুবিধা হবে না আপনার। ছোটো দেখতে, ও-ই অবশ্য বড়, জুলিয়েট। লম্বা দেখছেন যাকে, ছোটো, জুডিথ।

    ভোরবেলা উঠেই টাকার কথা পাড়া বিসদৃশ, কে জানে এখানে রোজকার খরচ কত, এমন ঢালাও ব্যবস্হা। লোকটাকে বসতে বলে টয়লেটে ঢুকল অতনু। হেগে, দাঁত মেজে, ঠাণ্ডা জলে মুখ ধুয়ে টয়লেট থেকে বেরিয়ে বলেই ফেলল অতনু, ‘কিন্তু এখানে থাকতে বেশ খরচ পড়বে মনে হয়। ’

    ‘না না, কে বললে ? আপনারা রোজকার যা হলটিং পান, তার চেয়ে অনেক কম। যাবার সময় কেনাকাটার পয়সা থাকবে। একদিন আমাদের অফিসের গাড়িতে ঘুরিয়ে আনব আপনাকে। রবিবার চলুন না। এরপর তো আর এসব জায়গা দেখা হবে না। ’

    যাক, লোকটা বকবক করতে পারে। অতনু আশ্বস্ত। ওকে বেশি কথা বলতে হবে না।

    ‘যে-জন্যে সাত সকালে এলুম, সন্ধে তাড়াতাড়ি হয়তো, তাই ওভারটাইমটা সকালে হয়। আর ছোটো ডিনোমিনেশানের নোটগুলো গুনটে একটু সময় লাগে। আপনি রেডি-টেডি হয়ে সময়মত আসুন। ’

    ট্রেতে দু’কাপ কফি আর নোনতা বিস্কুট নিয়ে এসে টেবিলে রাখল কালকের খাটো মেয়েটি। কাঁধ ওব্দি কালো চুল আঁচড়ে নিয়েছে এই ভোরেই। নীল কার্ডিগান, পশমবোনা হলুদলাল স্কার্ট। ফিকে হলুদ আর গোলাপির মাঝামাঝি গায়ের রঙ। নখ খায়, কফি এগিয়ে দেবার সময় আঙুল দেখে মনে হল।

    ‘ঠিকমতো দেখাশুনা করছ তো এনার ? এনারাই বাজারে টাকা ছাড়েন যখন যত ইচ্ছে। পুড়িয়ে নষ্ট করেন যখন যত ইচ্ছে। কী বলেন স্যার ?’

    ‘উনি বেশ ভিতু, দরোজা বন্ধ করে ঘুমোন। ’ রাশভারি যুবতীর কন্ঠস্বর।

    ‘মুখ ধোবার গরম জল ছিল না’, অতনু বলে ফেলল।

    ‘এনেছিলাম, দরোজা বন্ধ ছিল। ’ পর্দা সরিয়ে নেমে যায় তরতর।

    অত গরম কফি সপাসপ চুমুক মেরে উঠে দাঁড়াল ম্যানেজার। ‘আমি তাহলে উঠে, আপনি তাহলে তৈরি হয়ে চলে আসুন ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে। ’

    নিচে থেকে খিলখিল হাসাহাসি শোনা গেল। খাটের শিয়রের দিকের জানলার পাল্লা খুলে অতনু বিমূঢ়। রাতের বৃষ্টি কোনও প্রমাণ রেখে যায়নি। কোঁকড়া কেশদামের মতন ঘন সবুজ পাহাড়ের পাদদেশে আলুলায়িত বাঁশঝাড়। জানলা থেকে ধাপে ধাপে নেমেছে টালির ছাদের চালাঘর। ঝকঝকে আকাশে বেরিয়ে পড়েছে হুড়ো মেঘের দল। প্রায় প্রতিটি পাহাড়েই আধখোলা বিনুনির মতন দোল খাচ্ছে দু-একটা ঝরণা। অনেক নীচে এক চিলতে উপত্যকায় দশ-বারোটা শাদা-কালো ছাগল; গোরুও হতে পারে। ট্রেনে-ভ্যানে সফর করার সময়ে ঘটেনি তো এরকম ভালোলাগা।

    পৃথিবী এখানে দিন গুজরান করে। চরাচর জুড়ে, এক গৃহবিমুখ নিভৃতি। ভাব বিনিময়ে মশগুল মোহিনী বাতাস। হালকা হাওয়ায় অদৃশ্য বস্তুকণাদের নিঃশব্দ বেতার গুঞ্জন চলছে।

    –স্যার, আপনার ব্রেকফাস্ট। গরম জল দিয়েছি বাথরুমে। চান করবেন না বেশি, শরীর খারাপ হবে।

    ঢ্যাঙা যুবতী। মেরুন ডেনিমের ফ্রক। বাদামি কর্ডুরয়ের ডাঙ্গারি। ববচুল। কাঁধের ওপর ঝটপট মাথা ঘোরায়। নখে নখপালিশ। টানা ছোটো-ছোটো চোখ। অত ফর্সা নয়, তবুও যথেষ্ট ফর্সা। বেশ আলাদা দেখতে দুজকে।

    –তোমাদের দু’জনের মধ্যে কে বড় ?

    বলে ফেলে, আনন্দ হয় অতনুর। কথাবার্তা নিজের তরফ থেকে, আরম্ভ করতে পেরেছে। এরকমটা তার কাছে নতুন।

    –জানি না।

    অতনু বুঝতে পারল না, এটা উদাসীনতা, বিরক্তি, না সম্পর্ক সহজ করার তারল্য।

    স্নান সেরে সুশান্তর দেয়া শার্ট-প্যাণ্টে পালটাল নিজেকে। ব্রেকফাস্ট মানে টোস্ট আর ডিম। কানে গানের ঢুলি লাগিয়ে বেরোবার সময়, সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে, ভেতরে উঁকি দিয়ে কাউকেই দেখতে পেল না।

    রাস্তায় আর তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল না পথচারীদের। আশ্বস্ত লাগল। কারোর ব্যস্ততা নেই। অতনুও নিজের তাড়াহুড়োয় ঢিলে দিলো, দিয়ে আরাম বোধ হল কানে; সুশান্তর প্রিয় গজল, পঙ্কজ উদাসের। ম্যানেজার, কে জানে কী নাম লোকটার, পরিচয় দেয়নি নিজের, জানালো, কর্মচারীরা কেউ আসেনি এখনও, তবে চিন্তার কিছু নেই, যতদিন গুনে বুঝে নিতে সময় লাগে, আরাম করুক অতনু। ইচ্ছে করলে কাছেপিঠে ট্রিপল এক্স ভিডিও পার্লারে যেতে পারে, আফরিকান,আমেরিকান, থাই্যাণ্ডের ফিল্ম। যদি চায় তো অন্য শহরে যেতে পারে। বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারে দিন দশেক। যারা রেমিট্যান্স নিয়ে আসে সবাই করে এসব। রাজবংশী তো বর্মায় গিয়ে অনেক কেনাকাটা করেছিল ; টাকাই সীমান্তের পাসপোর্ট-ভিসা।

    –আমি এক জোড়া জুতো কিনতে চাই।

    –আনিয়ে দেবখন দোকান-টোকান খুলুক। আপনার চটি জোড়া দিয়ে দেবেন, ওই মাপের নিয়ে আসবে।

    –আমি বরং একটু ঘোরাঘুরি করে আসি।

    –তা কেন, আমি লোক দিয়ে দেব আপনার সঙ্গে। সকলে তো আর ইংরেজি জানে না। যদিও কেউ ঠকাবে না আপনাকে। বেলা আরেকটু বাড়ুক, তারপর বেরোনো যাবে।

    কাঁচুমাচু অতনু বসে থাকে চুপচাপ, কানের গানে এবার আশা ভোঁসলে। বাইফোকালে স্হানীয় খবরের কাগজ পড়ে আপাতগম্ভীর ম্যানেজার। কর্মচারীরা একজন-দুজন করে আসতে থাকে, অলস হাত তুলে সুপ্রভাত জানায়, একই ভঙ্গীতে অতনু।

    জীবন এখানে অতিবাহিত হয়। নির্লিপ্ত নিসর্গ মানুষের সাতে-পাঁচে নেই। এখানে বোধহয় আদিকাল থেকে কেউ কখনও চিৎকার করেনি।

    –আচ্ছা, একটা মোটর সাইকেল পাওয়া যাবে ? ভাড়ায় ?

    –মোটর সাইকেলে যাবেন কো০থায় ? শেষে ছেলে-ছোকরাদের হাতে বিপদে পড়বেন।

    –তাহলে সাইকেল, জায়গাটা দেখি।

    –না না, সাইকেলে কী ? দুদিনে সবাই জেনে যাবে। আপনি আমার অতিথি। সাইকেল মানায় না।

    –এখানেও আছে ওসব ?

    –বড়ো-ছোটো সব জায়গাতেই আছে স্যার। তাড়া কিসের ? জিপে করে সব দেখিয়ে দেবো। এই তো এসেছেন। : দুচারদিন শরীর এলিয়ে দিন। আরাম করুন। বলেন তো বিয়ার আনাই।

    –আনান। বলে ফেলতে পারল অতনু। বলে ভালো লাগল ওর, ভারমুক্ত মনে হল। অফিসে বসে বিয়ার জিনিসটা মন্দ নয়। বিয়ার জিনিসটা সম্পর্কে ধারনা হবে। খটকা লাগছিল অতনুর। কাছে-পিঠে চেনা-জানা কেউ নেই বলে কি খোলামেলা অনুভব করছে, নাকি বাঁক দিতে চাইছে নিজের ঘটনাহীণ উদ্দেশ্যহীন জীবনকে, নাকি ও আর অতনু থাকতে চায় না, বিরক্তি ধরে গেছে একঘেয়ে অতনুতে !

    কাচের জাগ উঁচু করে চিয়ার্স হল। বেশ কিছুক্ষণ বসে-বসে কয়েক জাগ। সামনের চেয়ার টেনে তার ওপর ঠ্যাং তুলে চোখ বুজল। ঘুম-ঘুম আমেজে পড়ে রইল ডান কাঁধে নিজের মাথা ফেলে। ঘুমিয়ে পড়েছিল।

    ‘আপনার চাবিটা দিন, কাজ আরম্ভ করাই’, ম্যানেজারের কন্ঠস্বর শুনে আচমকা উঠে দাঁড়ায় অতনু, সোয়েটার শার্ট খোলে, চাবিসুদ্দু পৈতে কাঁধ থেকে নামায়, পৈতেটা ম্যানেজারের হাতে দিয়ে সোয়েটার পরে। ঘাড় গুঁজে ঠ্যাং তুলে বসে থাকে, আগের মতো। অপরিচিত ঘূর্ণীঝড়ের ঝিমঝিমে কুয়াশাময় রাজধানি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল মগজে।

    –ঠাণ্ডা না লাগে ; আপনি আরাম করুন। চিন্তা নেই। ক্যাশিয়াররা সামলে নেবে।

    যাঃ, হঠাৎ মনে পড়ল অতনুর। পার্স আর সুটকেসের চাবি রয়ে গেছে বালিশের খোলে। ফিরে যাবে কি ? কোনও ছুতো ? ছিঃ, এরকম ভাবনাচিন্তা অনুচিত। জেটজাহাজের ঘনঘোর আওয়াজ বিরক্তি ঘটায়। বহুক্ষণ চুপচাপ।

    –আমি বাই এয়ার গৌহাটি হয়ে পাটনা ফিরব। একটা ওপন টিকিট কাটিয়ে দেবেন।

    –আজই কেটে রাখছি। যেদিন যেতে চাইবেন। ভিআইপি কোটায় পেয়ে যাবেন। কোনও চিন্তা নেই।

    –আচ্ছা, এখানে লাইব্রেরি নেই ?

    –লাইব্রেরি ? চার্চের আছে।

    –চার্চ ? থাকগে, চাবির সঙ্গে আমার পৈতেটাও দিয়েছি, দেখুন তো, পৈতে মানে ব্রাহমিন’স স্যাকরেড থ্রেড।

    –এই যে, খামে ভরে রেখে দিয়েছে ক্যাশিয়ার।

    পৈতের খামটা পকেটে পোরে অতনু। বাবা কালীঘাটে নিয়ে গিয়ে দিয়েছিলেন। মন দিয়ে ভেবে দ্যাখেনি এতদিন, রুটিনের মধ্যে আটক থেকেছে, বোকার মতন পৈতে পরে থেকেছে, মানে হয় না কোনও। অরিন্দম তো পাগল হবার আগেই ফেলে দিয়েছে। সুশান্ত নিচু জাতের কচি মেয়ের সঙ্গে নিশ্চই মানিয়ে নিয়ে সংসার করছে। আমিই যতোসব ফালতু আচার-বিচারে আটকে থেকেছি।

    –আপনাকে বর্মা মানে মাইনামার আর বাংলাদেশ থেকেও ঘুরিয়ে আনতে পারি। যাবেন নাকি ?

    –আমার তো পাসপোর্ট নেই।

    –ওসব দরকার হয় না, লোকে দুবেলা যাচ্ছে আসছে।

    গোঁজ হয়ে বসে থাকে অতনু, হাঁ-মুখ সামান্য খোলা, নেশার অনভ্যাস, ভাবছিল। সুযোগ হাতছাড়া করা বোকামি। জীবনে অনেক সুযোগ হারিয়ে যায়, আর আসে না, বুড়িয়ে মরে যায় মানুষ। মুখার্জি ছিল যতদিন, হাতছাড়া করেনি,সুযোগ, জল ঝড় জ্বর ক্লান্তি শরীর খারাপ হাঁচি-কাশি যা-ই হোক,। অরিন্দম নিয়েছে ছোটো-ছোটো সুযোগের সকাল দুপুর সন্ধে, হয়তো না ভেবেই, মেরুর টান এড়াতে পারেনি। অসময়ের ফল আর আনাজ এনে ব্যবসা করত সুশান্ত। সুযোগ, সুযোগ, সুযোগ।

    –হ্যাঁ, যাবো, যাবার আগে জুতো কিনতে হবে।

    –চলুন আমার কেবিনে গিয়ে বসবেন। ঠিকমতো আয়েস করতে পারবেন।

    কার্পেট পাতা বিরাট কেবিন। অনেক বড়ো টেবিল। বেশ উঁচু গ্রেডের ম্যানেজার তার মানে। কথাবার্তায় আচরণে টের পাওয়া যাচ্ছিল না। সোফায় আধশোয়া, তন্দ্রার কুয়াশায় ভেসে বেড়াচ্ছিল অতনু। কাচের পার্টিশানের ওধারে, দেখল, আধভেজা চাউনি ভাসিয়ে, পাথরঘষা প্যান্ট আর স্পোর্টস জুতো পরা বাবরিচুল কর্মচারীরা ঢুলু চোখে, জলভেজা স্পঞ্জে আঙুল ছুঁইয়ে, ও নিজে যেমন গুনত চাকরিতে নতুন ঢুকে, অলসচাকা মেশিনের ঢঙে গুনে চলেছে একের পর এক প্যাকেট। কাউন্টারে মহিলা কর্মী সোয়েটার বুনছে সবুজ উলে, সবুজ গোলাটা উল ছেড়ে-ছেড়ে পাক খাচ্ছে মেয়েটার কোলে। ম্যানেজার মগ্ন চারভাঁজ সংবাদে। জীবন সব জায়গায় বোধহয় একইরকম। এই প্রবাহকে বিরক্ত করে এগিয়ে চলে, রেশ কাটাতে-কাটাতে, মানুষের সমাজ। সত্যি, অতনুর মনে হচ্ছিল, বাস্তব ব্যাপাটাই আজগুবি।

    লাঞ্চ করতে গেস্ট হাউসে ফিরে ভাত আর মুরগির মাংস ভালো লাগল অতনুর। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওব্দি খাওয়া হয়নি ঝরঝরে গরম ভাত। রুটি পাঁউরুটি চপ সিঙাড়া ওমলেট কাটলেট ফুলুরি লুচি চিনেবাদাম পেঁয়াজ-মুড়ি খেয়েছে, পেলে চার বেলা, না পেলে অভুক্ত। পেটের ভুটভাট ভাতের ধবধবে শরীর দেখে থেমে গেছে। খেতে-খেতে নজরে পড়ল, টেবিলের ওপর পার্স আর চাবি, বিছানা গোছগাছ। হাত ধুতে গিয়ে টয়লেটে দেখল গেঞ্জি আন্ডারওয়্যার কেচে অ্যালুমিনিয়াম আলনায় মেলে দেয়া। ট্রেনের ধুতি পাঞ্জাবি নেই। ভালো লেগে উঠল এক ঝলক।

    আর ব্র্যাঞ্চে ফিরে না গিয়ে, কুঁকড়ে চাদর চাপা দিয়ে, গান শোনার ঠুলি আর যন্ত্র বালিশের পাশে, জামা-ট্রাউজার পরেই শুয়ে পড়ল অতনু। দেয়ালে মুখ গোঁজ করা ঘড়িতে দুপুর একটা, পাটনার দুপুর, এখানে বিকেল হয়ে এসেছে। ঘুমিয়ে পড়েছিল।

    আবছা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে, মুখ বের করে দেখল, গোধুলীর আলোরাঙা প্রায়ান্ধকার, জুলি একটা ট্রানজিসটার হাতে, শিয়রে রেখে বলল, ‘ঢাকা, বাংলাদেশ, তোমার গান।’ মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে…

    মেয়েটির কথায় কাঁজি ভাতের স্নিগ্ধ সুরভি। অতনু বলল, প্রায় স্বগতোক্তি, কিন্তু আত্মসমর্পণের স্বরে, ‘তোমার দাঁত কত সুন্দর।’ ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যায় মেয়েটি। কেমন রেশমের মতন মসৃণ চুল। যমের তেজ দিয়ে এই চুলই তৈরি হয়েছিল নিশ্চই। বুক ? চাঁদের আলো দিয়ে হয়তো গড়া। বরুণের বরাভয় দিয়ে পায়ের গোছ আর উরু। এ বাড়ির একজন যুবতী সম্পর্কে এরকম চিন্তাধারা অনুচিত। কিন্তু কী করবে, ভেবে ফেলছে যে ! ইনডিয়ান ডগ হয়ে গেছে ভেতরে ভেতরে।

    জুলির ডাকে ঘুম ভাঙল অতনুর। কপালে হাত রেখে মুখ নামিয়ে আলতো বলেছিল, ‘স্যার।’ এত নিকট থেকে এর আগে কখনও দেখেনি কোনো যুবতীকে, কোনো মহিলাকে, মাকে ছাড়া। কেমন বিসদৃশ অচেনা গন্ধ এর উপস্হিতিতে, বুনো আর তেতোতেতো অথচ আকর্ষক। বিব্রত ও, অতনু। উঠে বসে ধড়মড়।

    ‘চলো আমাদের সঙ্গে চা খাবে ; একা-একা তোমার সময় কাটবে না, মুখ ধুয়ে নাও। ’ বলল জুলি, সামান্য হাসি, লিপ্সটিকহীন গোলাপি ঠোঁটে।

    মুখ ধুয়ে জুলির সঙ্গে নিচে নামল অতনু। নিচের তলাটা দেখার ইচ্ছে ছিলই। কতজন থাকে। কে কী করে। আর ক-জন আছে গেস্ট হাউসে। ঘরগুলো কেমন সাজানো। বাড়ির লোকেরা কোন ভাষায় কথা বলে, কেমন লাগে শুনতে। তাছাড়া, কোনো যুবতীকে সম্পূর্ণ জানতে গেলে তার বাড়িটাও দেখতে ইচ্ছে করে, মনে হল ওর।

    হলঘর। একপাশে রান্নাঘর। অন্যপাশে বোধহয় দুটো শোবার ঘর। হলঘরে জানলা নেই। হলঘরেই, রান্নাঘরে ঢোকার মুখে, গোল ডাইনিং টেবিল ঘিরে ছটা গথিক ঢঙ চেয়ার, শোবার ঘরের দিকটায় বাদামি ফোমলেদারের ঢাউস সোফার দুপাশে টিপয়ের ফুলদানিতে বেগুনি রঙের অচেনা ফুলের তোড়া, সুগন্ধ বিলোচ্ছে ফুলগুলো, বা হয়তো জুডি। রান্নাঘর থেকে জুডি বেরিয়ে এসে, ‘হভালো’। অতনুও ‘হ্যালো’ প্রত্যুত্তর দিয়ে সোফার দিকে বসার জন্য এগোতে, জুলি বলে উঠল, ‘স্যার, কিচেনে এসো, আমাদের সাহায্য করবে। ’ রান্নাঘরে ঢুকে, জানলা দিয়ে দেখল অতনু, সন্ধ্যাকাশে গুটিগুটি বেরিয়ে পড়েছেইসকাপন রুইতন চিড়িতন হরতনের দুরি তিরি নওলার দল।

    অতনু : আমি তো কিছু করতে জানি না, কী সাহায্য করব ?

    ‘কেন ? বাড়িতে কোনও কাজ করো না ?’

    ‘বাড়িতে তোমার কে-কে আছেন ?’

    অতনু : মা আছেন।

    ‘মাকে সাহায্য করো না ? উনি একলাই সব করেন ?’

    ‘বাবা নেই ? ভাই-বোন ?’

    অতনু : না, কেউ নেই। বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন। উনি মারা যাওয়ায় এই চাকরিটা পেয়েছিলুম।

    ‘তোমার বাড়ির বেশ দুঃখের গল্প আছে, না ? বোলো আমাদে, পরে। এখন আমাদের সাহায্য করো। বাড়ি ফিরে গেলে মাকে সাহায্য করতে পারবে। এক মাসে আমরা তোমায় অনেক কাজ শিখিয়ে দেবো। তোমার মাকে বলতে পারবে, অনেক সাংসারিক কাজ শিখে এসেছ। মায়ের শরীর খারাপ হলে একাই সামলে নিতে পারবে। ’

    ‘আচ্ছা, দেয়ালে মিলিটারি পোশাকে ওই ফোটোটা কার ?’ প্রসঙ্গে পালটাতে চায় অতনু। জুলি-জুডির কথা শুনে প্রথমবার ওর মনে হল যে সত্যিই তো, মাকে সাহায্য করা উচিত ছিল ওর; কখনও তো ভেবে দেখেনি যে মাকে সব কাজ একা করতে হচ্ছে ; বাবা তো মাকে কত রকমভাবে সাংসারিক কাজে সাহায্য করতেন।

    বহুকাল পর, ফিরে যাবার কয়েকদিন আগে, ছুটির দিনের সকালে, ফোটোটা কাছ থেকে দেখে, বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল ও, অতনু। বিপর্যস্ত আর হতচকিত।

    ‘ফোটোটা আমার বাবার। ’ জুলি জানিয়েছিল, যে কথার মধ্যে, বলবার ঢঙে, বেশ বোঝা গিয়েছিল, কেমন যেন এক ধাঁচের জাতি-স্বাতন্ত্র্যের অহংকার। জুডি বলেছিল, ইনডিয়ান আর্মির হাতে মারা যান। ’

    এখন, ফোটোর কাছ থেকে সরে এসে, প্রসঙ্গ বদলাতে নিজেকে বাধ্য করল অতনু। চোট্টো ট্রানজিসটারটা দেখিয়ে, ‘এই হিন্দি গানটা সিমন গারফাংকেলের এল কোনডোর পাসার নকল। আর বলে ফেলেই, ফিরে এলো প্রসঙ্গটায়, ‘তোমার বাবার মানে ? জুডি তো তোমার বোন !’

    ‘আমাদের মা এক কিন্তু বাবা আলাদা। ’

    ‘মা-ও মারা গেছেন বুঝি ?’

    ‘না, ঠিক জানি না, মাও আবার বিয়ে করেছিলেন। তুমি কি গানের বিষয়ে পড়াশোনা করেছ ?’

    ‘এস পি মুখার্জি, আমাদের অনেক বড়ো অফিসার, ওনার কাছে হাতেখড়ি। ’ প্রতি রাতে সন্ধে সাতটায় মৃদুমন্দ আলুলায়িত গান, আর নিশি পাওয়া পারফিউম, আর শীতাতপ বিছানা, আর মনমাতানো নারীদের গল্প, দু’জন অবিশ্বাসী কাহিনিখোরের চাউনিকে পুলকিত করে, বিস্ফারিত শোনালো ও, অতনু। দাশগুপ্তের গল্প। অরিন্দমের গল্প।

    ‘ভালোবাসা চিরকাল ক্ষণস্হায়ী। ’

    ‘আর ক্ষতিকর। ’

    প্রখর মন্তব্যে অতনু থ। হালকান। বোঝার চেষ্টা করে দু’জন যুবতীর অগাধ দৃষ্টির থমথমে চপলতায় অভিজ্ঞতা নাকি শিক্ষা নাকি প্রতিদিনের গতানুগতিক যাপন, কোন ঝড়ের কেন্দ্র জুগিয়েছে এমন আপোশহীন মন্তব্যের আশ্রয় ! নিজেকে কেমন যেন অনুগ্রহভাজন মনে হল। কেমন যেন অবাক শিহরণ। কেমন যেন অকথিত রোমাঞ্চ। কেমন যেন মুক্তির আবেশ। কেমন যেন সমুদ্র-তলদেশের তোলপাড়। কেমন যেন উৎকন্ঠা, উদ্বেগ, শঙ্কা।

    ‘পেঁয়াজের পাতাগুলো ছোটোছোটো করে কাটব ?’

    কাঠের ক্ষয়ে যাওয়া চৌকো তক্তার ওপর ছুরি দিয়ে পেঁয়াজ কাটে অতনু। বরবটির মতন দেখতে অথচ ছোটোছোটোসবুজ সবজি কাটে। টোমাটো। ডিম ফাটাতে শেখে। চামচে দিয়ে ফেটাতে। আলু আর গাজর ছাড়াতে। শুয়োরের মাংস ধুতে, চাল আর ডাল বাছতে। শুয়োরের মাংসে খিছুড়ি, রেঁথে গর্ব হয় অতনুর। দুজনের দেহের সঙ্গে ছোঁয়ায় অতনু পুলকিত হতে থাকলেও, কাজে উৎসাহিত হতে থাকলেও, ওরা তা নিয়ে একেবারেই চিন্তিত নয়, অস্বাভাবিক মনে করছে না। অতনুকে সহজ করে তুলতে চাইছে ওরা, বাড়ির একজন সদস্য করে তুলতে চাইছে, মনে হল ওর।

    কুকারে শুয়োরের মাংস সেদ্ধ হবার নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষায় যখন ওরা তিনজন খাবার টেবিল ঘিরে, আলো জ্বালানো হয়নি হলঘরে, নিজের বাড়ির গল্প করে ফেলেছে অতনু, রাঘব আর রমা বৌদির, সুলতানা আর ননীদার, মানসী বর্মণের রূপের, শ্যামলী কর্মকারের ঠেকার আর পিঠে প্রজাপতি-জড়ুলের, পিওন রসিক পাসওয়ানের আঙুলকাটার, ইন্দিরা গান্ধির হাতির শুঁড়ের ধাক্কায় সুশান্তর গরদান ঘুরে যাওয়া, শিমুলতলা, পাপড়ি বোস, নির্মল মাহাতো, তখন হঠাৎ ট্রানজিসটারে একটা হিন্দি গান আরম্ভ হলে অতনু বলল, ‘এই গানটা বিটলসদের অ্যাণ্ড আই লাভ হার সুরের নকল। ’

    অতনুর এই প্রথম খেয়াল হল যে, গান ওর ভালো লাগত না, গান সম্পর্কে জ্ঞানও, তা ভেবে দ্যাখেনি, আশ্চর্য। এই যুবতী দুজনের ক্ষণিক সঙ্গও ওকে গানের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে ; এদের ছোঁয়ায় রয়েছে সঙ্গীতের উৎস। এতকাল ও একাকীত্ব এনজয় করত, নিঃসঙ্গ থাকতে ভালো লাগত, সকলের সঙ্গে কথা বলতে চাইত না। নিজস্ব একাকীত্বের পরিসর তৈরির জন্য কানে গানের ঠুলি দিয়ে রাখত যাতে কেউ যেচে কথা বলতে বিব্রত বোধ করে।

    রান্নাবান্না হয়ে গেলে অতনু শিখল, যেন ও প্রথম নাচতে শিখছে, কেমনভাবে থালা বাটি গেলাস চামচ ছুরি কাঁটা সাজানো হয় টেবিলে। রান্নাঘর পরিচ্ছন্ন। গোছগাছ। খাবার টেবিলের আসেপাশে মেঝেতে পড়ে থাকা নোংরা পরিষ্কার। ওরা দুজনে হাতমুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হতে গেলে, এত সহজে এত কথা বলতে পারছে বলে আত্মতৃপ্তির স্মার্টনেস অনুভব করছিল অতনু।

    দুজনে প্রায় একই সময়ে বেরিয়ে এলো নিজেদের ঘর থেকে, চুল আঁচড়ে, পোশাক পালটে, পারফিউম লাগিয়ে, লিপ্সটিক বুলিয়ে। দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত আনমনা অতনুর দুপাশ থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে, তার দুগালে ঠোঁট চেপে ধরে দু’জনে, দুদিক থেকে একই সঙ্গে, আর তক্ষুণি, হৃৎপিণ্ডের শীতল রক্তউচ্ছ্বাসে, ঝলকের মতন, ও, অতনু, টের পায়, এটা হোটেল নয়, গেস্ট হাউস নয় ; এটা আসলে ভূতল দেহগ্রাহকের গোপন পান্হশালা। ওর মনে হয়, ও গভীর বিপদে পড়তে চলেছে, ও এই বিদেশ-বিভূঁয়ে একবারে একা, আর ফিরে যেতে পারবে না, ওর পায়ের আঙুলগুলো ঠাণ্ডা, বাঁ দিকে গলার কাছ থেকে ফুসফুস হয়ে তলপেটের দিকে নেমে যাচ্ছে হাজার হাজার বরফের পিঁপড়ে।

    তাহলে তাই হোক, নিজেকে নিঃশব্দে বোঝাল অতনু, দুদিকে দুজনের কাঁধে বাহু রেখে নিজের ভার ওদের ওপর ছেড়ে দ্যায় ও, অতনু। ওরা ওকে এনে যখন সোফায় বসাচ্ছে, ওদের মুখের ভেতর থেকে, একেবারে হাঁ-মুখের আলজিভ থেকে, প্রথম বৃষ্টির সোঁদা মোহক গন্ধে দীপায়িত নিজের শারীরিক সমর্পণ স্বীকার করে অতনু। এই দুটি তরুণীর মাধ্যমে নিজেকে ব্যঞ্জিত করতে পারছে।

    : তুমি কি নার্ভাস ?

    : না, আমার যেন কেমন ভয় করছে, যেন এক্ষুণি একদল লোক দরোজা ভেঙে ঢুকে পড়বে আমার খোঁজে, জবাবদিহি চাইবে, বলবে আমি সীমালঙ্ঘন করছি।

    : যাঃ। অনেক রাত হয়েছে, এখন আর কেউ জেগে নেই।

    : জানি।

    : অল্প ড্রিংক করো। ওয়াইন খাবে ? শেরি ?

    : আমি বরং একটু হুইসকি খাবো। কালকেরটাই।

    অতনু অল্প আর ওরা দুজনে তার দ্বিগুন হুইসকি খায়, রয়ে-সয়ে। তারপর গরম গরম খিচুড়ি। আড়ষ্টকন্ঠে বলে ওঠে, ‘ভালো হয়েছে।’

    : তবে ? তুমি বলছিলে শুধু ডিম আর মুরগি খাও।

    : চুপ করে গেলে কেন ? তোমার গল্প বলো।

    অতনু : মিথ্যে কথা আমি বলি না। বলে ফেলে খারাপ লাগছিল। আর মা মাছ-মাংস খান না, তাই বাড়িতে হয় না কিছু।

    : ওসব হোটেলে-রেস্তরাঁয় খাও ?

    মছুয়াটুলির মহংগুর দোকানের গল্প বলে অতনু। পিন্টু হোটেলের গল্প। চাঁইটোলার দাদুর দোকানের আড্ডা। ডাকবাংলো মোড়ে কফিহাউস। আধখ্যাঁচড়া কালীদাস রঙ্গালয়। রবিন্দ্রভবনে নাটক। সালিমপুর হাহারার এই এম এ হল-এ অফিসকর্মীদের নাচগান। লঙ্গরটুলির দুর্গাপুজো। সবজিবাগে চর্বিদার পাঁঠার মাংস। সেই চর্বির পরোটার দোকান। গঙ্গা, গোলঘর, সোমবারী মেলা। এদের মনের পৃথিবীকে অন্য জগতে নিয়ে যেতে চায় অতনু।

    : তুমি কি সাপের মাংস খেয়েছ ? রাঁধব একদিন।

    অতনু : ব্যাঙ হরিণ খরগোস কচ্ছপ হাঙর খেয়েছি। গোরু শুয়োর মোষ সাপ বেড়াল কুকুর এসব খাইনি।

    : আমরা খাওয়াব তোমায়, যদি পাওয়া যায়।

    : খাবার সময়ে টের পাবে না কিসের মাংস।

    মুখ ধুতে গিয়ে অতনু বুঝতে পারে, এই যুবতীদের সামনে কুলকুচি করতে ওর লজ্জা করছে। তাই অস্বাভাবিক কায়দায়, যাতে বিশেষ আওয়াজ না হয়, আলতো কুলকুচি করে। পায়ের ধাপ সামান্য ভিন্ন পড়তে, ওর মনে হল টলছি না তো, এরা ভাবছে না তো যে এই সামান্য মদ খেয়ে নিজেকে সামলাতে পারেনা, কেমনতরো মরদ !

    দুজনে দুদিক থেকে টলায়মান অতনুর বাহু আঁকড়ে, ওকে ওপরের ঘরে নিয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে, ওর দুই হাত দুই যুবতীর বহরে, ওদের পোশাক ঝাপটাচ্ছে অতনুর গায়ে, একজনের শরীরগ্রন্হির বুনো আর তেতো সুগন্ধ বেসামাল করে ফেলছে, বুকের মধ্যে আবার আরম্ভ হয়ে গেছে অদৃশ্য শুশুকদের জলঘাই। ওর ঘরে হিটার চালিয়ে রেখে ঘর গরম করে রাখা হয়েছে। উষ্ণতার তাপে অতনু আশ্বস্ত হয়। কে জুলি আর কে জুডি খেয়াল থাকে না। দুজনের মুখের দিকে তাকালে, তাদের ইশারাময় হাসির সঙ্গে পরিচিত হয় ও, অতনু।

    শিয়রের বন্ধ জানলার শার্শি তখন দুহাত দিয়ে কচিশীতল কুয়াশা মাখছিল মুখে। অতনুর বুকের বাঁ দিকে নৃত্য পরিবেশন করছিল উদীয়মান ঘুর্ণি।

    ওরা দুজুনেই সোয়েটার খুলে কাঁধের ওপর থেকে নিজেদের বসন, যেন কোনও আলতো ফাঁসে ধরা ছিল এতক্ষণ, ফেলে দেয় মেঝেতে। বিস্ফারিত শিহরণে স্তম্ভিত অতনু। আজ ওব্দি ও যুবতী শরীরের এতখানি দ্যাখেনি। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। দু-বাহু দিয়ে দু-জোড়া করুণাময়ূ উরুর প্রীতিকর তাপ নিজের গাল কপাল ঠোঁটের ওপর চেপে ধরে বারবার, আর চেপে রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও, ডুকরে ওঠে নিঃশব্দে।

    ‘এ কী,কী হল ?’

    তার চোখের জল ওদের সুঠাম সাবলীল উরু থেকে নিজের কপাল দিয়ে মুছে দিল অতনু। ওকে তুলে দাঁড় করায় ওরা। ওর পোশাক খুলতে সাহায্য করে দুজনে, আর বিব্রত উদোম অতনুকে জিগ্যেস করে জুলি, ‘অমন দিশেহারা হয়ে উঠেছিলে কেন ?’ যার উত্তরে অতনু বলতে পেরেছিল, ‘জানি না’। ব্যাকুল উষ্ণ করে-তোলা শীতের অনুসন্ধিৎসু প্রায়ান্ধকারে, দুজন মানুষীর সারীরিক গর্বের আলোকছটায়, নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়েছিল অতনুর দুর্বল নগ্নতা।

    ‘তুমি ব্যায়াম করো না ?’

    ‘না’, বলল অতনু, বিচারবুদ্ধি নষ্ট আর ন্যায়-অন্যায় বোধ লোপ পাবার মুহূর্তটায় ঘাপটি মেরে থাকা তীব্র আনন্দের মাঝামাঝি সম্ভাব্য বিপদের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে।

    অতনু ওদের পারস্পরিক আর ওকে বলা কথা শুনতে পাচ্ছিল না। বিস্ময়ে, ঢেউ-খেলানো দু-রকমের নয়নাভিরাম বুক, গোলাপি আভায় চোবানো দু-জোড়া ছোটো-বড়ো বৃন্ত, চুনিপাথরের প্রাণপ্রাপ্ত পুঁতি। ঘোরলাগা অসহায় স্পর্শ চালিয়ে, পরখ করে সুডোল নাভি, কোমরের অনর্গল পাক, বুকের পাশ থেকে লতিয়ে ওঠা প্রবাহিত বাহুমূল, মসৃণ থুতনি, তুলতুলে গাল, পিঠ থেকে দৌড়ে নেমে সহসা উঁচু হয়ে ওঠা নরম মাংস, দু-উরুর মাঝখানে সংবেদনশীল সযত্নলালিত রহস্য, আঙুলের ফাঁকে গলে-যাওয়া পশম। ব্রহ্মাণ্ডকে মালিকহীন মনে হয় অতনুর। মায়ের আঁচল ভিজিয়ে মুখ পুঁছে দেবার স্মৃতি, এতকাল পর, একেবারে আচমকা, ফিরে আসে।

    অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, আলাদা-আলাদাভাবে, নারীশরীরের সমগ্রতা থেকে পৃথক, এত আকর্ষণীয়, এত প্রিয় এরকম স্নিগ্ধ হতে পারে, জানা ছিল না। সত্যি জানত না ও, একজন মেয়েমানুষের রহস্যের সঙ্গে, এমনকি সে যদি বোবা কালা অন্ধ নুলো খোঁড়া হয়, তাহলেও আরেকজনের সঙ্গে মিল হয় না ; প্রত্যেকে সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন রহস্যজগত।

    : কত তফাত তোমাদের দুজনের মধ্যে।

    : তোমার পছন্দ ?

    : এই অনুভূতিকে বোধহয় পছন্দ বলে না।

    : এসো, শুয়ে পড়ি।

    : তিনজনে কুলোবো ?

    : শীতকাল তো ; শীত বাড়তে থাকবে রাতে; শীত তো মানুষের ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তোলার ঋতু।

    রুমহিটার নিভিয়ে শুয়ে পড়ল তিনজনে। দুজনকে দুপাশে, ফ্যারাওয়ের দুই বাহুতে মাথা রেখে দুই মিশরীয় রাজমহিষী, কম্বলের তলায় শুয়ে পড়ার পর, দুদিক থেকে দুজন হাঁটু তুলে দিল অতনুর উরুর ওপর।

    : তোমার কিছু হচ্ছে না ? ইচ্ছে করছে না ?

    : করছে। কিন্তু তোমরা যে দুজন।

    : তুমি কাকে চাও।

    : দুজনকেই।

    : আগে কাকে চাও।

    : একসঙ্গে দুজনকে।

    : কী করতে হবে জানো ?

    : পেরে যাব মনে হয়।

    : আগে জুডিথের পালা, ও ছোটো তো, ও তোমাকে দেখিয়ে দেবে। তোমার সামন্য ছড়ে যেতে পারে। জ্বালাও করতে পারে। ভয়ের কিছু নেই। প্রথমবার সকলেরই হয়। তোমাকে গোলাপি রঙের ভ্যানিলা-গন্ধের কনডোম পরিয়ে দেবে। কাক থেকে তুমি নিজের ইচ্ছেমতন কনডোম বেছে নিয়ে পোরো, কেমন?

    : বুঝে গেলে তো জুলি যা বলল ? আমি তোমার ওপর বসব। তোমার কষ্ট হবে না তো, আমার ভারে, অতনু ? যখন তুমি আর আমি উত্তেজিত হতে থাকব, তখন তুমি ওঃ জুডি, আহ জুডিথ, আমি তোমায় ভালোবাসি, কোনওদিন ছেড়ে যাব না, তোমায় ছাড়া বাঁচব না, উঃ ওফ, এই সব আবোল তাবোল বকতে থেকো। আমিও তোমার নামে অমন করেই বলতে থাকব। এটা শিষ্টাচার।

    জুডি দুই পাশে দুই পা ছড়িয়ে বসলে, ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া আরম্ভ করে, প্রতিদানে জুডিও, অতনু ঘামতে থাকে, বলতে থাকে শিষ্টাচারের কথাগুলো, মনে হয় নিজের কথাই বলে চলেছে যা কাউকে কখনও বলা হয়ে ওঠেনি, জমে থেকে গিয়েছে মগজে, এলিয়া পড়ে জীবনের প্রথম নারীকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে। মনে হয় স্ফূর্তির অতীত এই পাথেয়। জুডি নিজের জায়গায় ঢলে পড়ে। অতনু জুডিকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। জুলি ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে থাকে।

    কিছু পরে ঘুম ভেঙে যায় সেই তীব্র সন্মোহক সুগন্ধে, বুনো আর তেতোতেতো। পাশ ফিরে শুয়ে আছে জুডি। অগোর। ঘুমন্ত ঠোঁটে চুমু খেয়ে জুলির দিকে পাশ ফিরে ও, অতনু, দ্যাখে, জুলি মিটিমিটি জেগে। হাত ধরে অতনুকে নিঃশব্দে বিছানা থেকে নামায়, আর চিৎ হয়ে হাঁটু উঁচু করে শুয়ে পড়ে মেঝেতে আগে থাকতে পাতা ধূসর তোয়ালের ওপর। শাঁখনীলাভ উপশিরার কারুকাজ করা চাপা অথচ বর্তুল বুকে মাঝে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর সোনালি লকেট নজরে পড়ে অতনুর। টের পায় জুডি কেন শ্রমটা নিজের দেহে নিয়েছিল ; যাতে জুলির জন্য অতনুর দেহে যথেষ্ট ক্ষমতা বজায় থাকে। এলিয়ে পড়ে কিছুক্ষণ পর, টের পায় অতনু, গন্ধটা আর নেই। পরস্পরকে জড়িয়ে থাকার সময়ে জুলি অতনুর কানে ফিসফিস করে জানা্য়, কালকে আমরা তোমাকে ফোএপ্লে শিখিয়ে দেবো, মেয়েদের অরগ্যাজম একটু সময় নিয়ে হয়, তাই আমাদের জন্য ফোরপ্লে করতে হয়, তারপর তোমার উৎসার, । পালঙ্কে উঠে চাপা দিয়ে তিনজনে ঘুমিয়ে পড়ে পাশাপাশি।

    তারপর, প্রথমে কুন্ঠা বোধ করলেও, অতনু মুখমেহন করতে আর করাতে শেখে ; এ এক নিভৃতির রসিক বালখিল্য। ওরা গিলে ফেলছে দেখে ও, অতনুও গিলেছে ; দুজনের স্বাদ এক্ষেত্রেও আলাদা, যেমন বৃন্তকে ঘিরে গোলাপি বৃত্তের মাপ আর রঙ দুজনের আলাদা।

    নিজের সামনে নোট গোনাবার আগ্রহ, কর্মচারীদের গাফিলতির আশঙ্কা, তাড়াতাড়ি কাজ মিটিয়ে ফিরে যাওয়া, এসব উবে গেছে অতনুর ভাবনা থেকে। এসে মাকে পৌঁছানো সংবাদ দিয়েছিল একটা, তারপর আর জানা্য়নি। ম্যানেজারের নাম রোসাংলিয়ানা, ওর একটা হোটেল আছে নেপালি পাড়ায়, তবুও সেখানে থাকতে বলেনি। ওপন এয়ার টিকিট কিনে দিয়েছিল, পাওনা মিটিয়ে দিয়েছে অতনু। বাকি পুরো টাকা, করকরে নোট, দিয়েছে জুলি-জুডিকে। ছুটি বাড়িয়েছে আর মাইনে চেয়ে নিয়েছে স্টেট ব্যাঙ্কের মাধ্যমে, সেই করকরে নোটগুলো দিয়েছে জুলি-জুডিকে। যেদিন ওরা তাড়িয়ে দেবে ফিরে যাবে অতনু। তার আগে ও কিছুতেই ফিরবে না। ছুটি নেবে। দুজনকে একসঙ্গে ভালোবাসবার ছুটি। এই অভিজ্ঞতা ফিরবে না।

    কাজ শেষ হয়ে যাবার পর, কাগজপত্র বুঝে নেয়া হয়ে গেছে, অসুস্হতার অজুহাতের একমাসের ছুটি ফুরিয়ে যাবার পর, আরও এক মাস ছুটি নিয়েছে অতনু। মাকে জানিয়েছে, জায়গাটা ভালো লেগেছে, মন আর শরীর দুইই ভালো।

    এখানে এসে অতনু কেবল দাড়ি কামিয়েছে ; চুল কাটায়নি। ওর দীর্ঘ শ্যাম্পু-করা চুল আঁচড়ে পেছন দিকে রাবার-ব্যান্ড বেঁধে দ্যায় জুলি বা জুডি।

    যৌনতার অপ্রতিরোধ্য অলিগলি দিয়ে, প্রতি রাতের নতুন আঙ্গিক, ফোরপ্লে, কখনও-সখনও ওর আবদার মেটাতে দিন দুপুরে, সম্পূর্ণ আলাদা এক সংস্কৃতির একেবারে মদ্দিখানে, একটু-একটু করে সেঁদিয়ে যায় ও, অতনু — পান-ভোজন, চার্চ, সংস্কা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, কুসংস্কার, নিয়ম-রীতি, সামাজিক আচার, পোশাক-পরিচ্ছদ, ভয়-ঘেন্না — এ এল আলাদা জগতের সংসার। ওরা বিহারকে ভালো চোখে দ্যাখে না। রোজ খুন ধর্ষণ বজ্জাতি। বলেছে, ‘কী করে থাকো ? ভয় করে না ?’ অথচ আসার সময়ে এই উত্তরপূর্বের অরাজকতার ভয় দেখিয়েছিল অফিসের অনেকে। কোথাও আসলে ভয়ের কিছু নেই। যে ভিতু সে মায়ের গর্ভেও ভয়ে-ভয়ে থাকে, এই বুঝি বাপের জাদুদণ্ড এসে আহত করবে তাকে। স্মৃতিকে বঞ্চনা করে ভয় পায় মানুষ, ভয় তাকে অপরিণতমনা করে তোলে, ভালোবাসতে বাধা দ্যায়। জুডি-জুলির সঙ্গ না পেলে কেবল এই অঞ্চলই নয়, মানবজীবনের বহুকিছু অজানা থেকে যেত।

    অতনুর মনে হয়েছে, সৌন্দর্য ব্যাপারটা আপেক্ষিক। আকর্ষণও আপেক্ষিক। বিহারি বা বাঙালি যুবতীদের বুক কত তাড়াতাড়ি আদর করার ব্যাপার থেকে দুধ খাবার জিনিস, বিয়ের আগে উনিশ কুড়িতে যেতে যেতেই। এখানের মেয়েমানুষদের আদর করার বুকের সঙ্গে দুথ খাবার বুকের তেমন তফাত নেই। বৃন্তকে ঘিরে বর্তুল চক্রের রঙও তো সকলের এক নয়। মানসী বর্মণের বুক কি ঢাউস। লঙ্গরটুলিতে, রাজেন্দ্রপথের আশ্রমে, গরদানিবাগে, কদমকুঁয়ায়, পুজোর সময়ে ঢাউস বুকের বাঙালি যুবতীরা দুর্গাকে পুষ্পাঞ্জলি দ্যায়, দুর্গার চেয়ে, লক্ষ্মী-সরস্বতীর চেয়ে, তাদের অবিবাহিত পীনোন্নত বুক উঁচিয়ে। গঙ্গাভিলায়, দুর্গা সরস্বতী লক্ষ্মীর বুক কিছুটা বড়ো করা হতো পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী, কিন্তু ফ্ল্যাট বাড়ি করে পয়সা করার ধান্দায় সে পুজো উঠে গেছে। কলকাতায় পালিয়েছে গঙ্গাভিলার ছেলেরা। হয়তো সেখানে গিয়ে পারিবারিক পরম্পরা দান করেছে কোনো পাড়ার পুজোর প্রতিমাদের। ছটের সময়ে বিহারি বুকেরও একই হাল।

    গঙ্গা ভিলার নতুন ফ্ল্যাটবাড়িতে অতনুর বাংলা ভাষা-সাহিত্যের অধ্যাপক-অধ্যাপিকা জিতেনবাবু আর বেলাদি থাকতেন, তাঁদের অবিবাহিত লিভ-ইন সংসারে শ্রীঅরবিন্দ আর শ্রীমার নৈতিক সমর্থন জুগিয়ে। পাটনা শহরের প্রথম যৌনপ্রগতিবাদী। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সব বাংলা ভাষার অধ্যাপকদের থেকে আলাদা ; এনারা দুজনে ছিলেন বেঁচে থাকার জ্ঞানী। তারপর থেকে এসেছে একের পর এক চাকুরে অধ্যাপক। জীবনে ভালোবাসা না পেলে বোধহয় মাতৃভাষাকে ভালোবাসা যায় না।

    অতনু মূর্খের জীবন চায়নি। চেয়েছে রক্তমাংসের গূঢ় তাৎপর্য ; বর্তমানকে ভালোবাসতে চেয়েছে। অতীতের প্রতি ওর উদাসীনতা নেই, নেই চিন্তার প্রতি অবিশ্বাস। জুলি-জুডিকে সাহায্য করে সংসারের কাজে। কুটনো কোটে, রান্না করে, মশলার আন্দাজ, ভাত রাঁধা, বাসন মাজা, ঝাঁট দেয়া, ঝুল ঝাড়া, কাপড় কাচা, ইসতিরি করা, এমনকি জুলি-জুডির পোশাক আর অন্তর্বাসও, মেঝেতে পাতা রাতের তোয়ালে, সারা দিনমান ব্যস্ত। বাজারে গেলে কানাঘুষোর উৎপাত সম্ভব, তাই ওরে যেতে দেয়নি ওকে। অতনু চেয়েছিল ওদের সঙ্গে নিয়ে বেরোয়। ব্যায়াম করে সকালে। আঁটো পোশাক পরে ওরা দুজনেই করে ; যখন একজন করে না অতনু আঁচ করে তার মেন্সটুরেশান চলছে, কপালে হাত রেখে দ্যাখে।

    কিনেছে নতুন ট্রাউজার শার্ট রঙিন-টিশার্ট সোয়েটার জুতো। কয়েকটা রবিবার সারাদিন ঘুরেছে পাহাড়তলিতে ভিনশহরে ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজারের জিপে। বর্মা আর বাংলাদেশে লুকিয়ে-চুরিয়ে যেতে চায়নি অতনু। বাংলাদেশে যাওয়াটা, ওই ভাবে, অত্যন্ত অসৎ কাজ হবে, মাতৃভাষার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। সারাদিন ঘুরে এসেও প্রেম করা বাদ দিতে চায়নি। কত করকমের বাঁশের জঙ্গল হয় দেখেছে, নদী আর ঝিল, এখানকার ফুল, পাখির ঝাঁক। সবুজের পর সবুজ, নানা রঙের সবুজ। আর পাহাড়ি বৃষ্টি, যখন-তখন।

    জুলি-জুডির রাঁধা এমন সম্স্ত খাবার ও, অতনু, খেয়েছে, যা আগে ভাবলেও ওর গা গুলিয়ে উঠত। এখন সবকিছু, যা মানুষ খায়, তা ও খেতে পারে। একদিন এগুলো নিশ্চই কাজে দেবে জীবনে। নারীর শরীর আর অদ্ভুত ভালোবাসা ওকে গভীর বোধে তুলে নিয়ে গেছে।

    তরল ইন্দ্রপতনে কেঁপে উঠেছে প্রতিরাতের মুর্হূমুহু প্রায়ান্ধকার, দুর্নিবার সন্মোহন ঘোরের টান ছাপিয়ে ; দুই স্নিগ্ধতার মাঝে গড়ে তোলা মরুঅঞ্চল হয়ে উঠেছে সবুজ। কখনওবা দুপুরের আলোয় অতনু আবদার করেছে ও আলোকিত অবস্হায় দেখতে চায়, স্পর্শ করতে চায়, গন্ধ পেতে চায়, কন্ঠস্বর শুনতে চায়, জিভের স্বাদ পেতে চায়, মুখমেহনের স্বাদ পেতে চায়। আর কিছু দিন থেকে যায় অতনু।

    ফিরে যাবার কয়েকদিন আগে, রান্নাঘরে টাঙানো মিলিটারি-পোশাক ফোটোটা দেখে ও স্তম্ভিত। অবিকল, হুবহু অতনুর বাবার মতন দেখতে। তাহলে কি ইঁদুরের বিষ খেয়ে উনি মারা যাননি, কাপুরুষের মতন ! গুলি খেয়ে বীর দর্পে শহীদ হয়েছেন। মৃত্যুর রকমফেরে যে উদার গরিমা, অতনু তাতে আপ্লুত হয়ে যায়। মৃত্যু মানে তো স্রেফ স্মৃতির বিনাশ ; মানুষ তাই মরতে ভয় পায়, তার স্মৃতি নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাক সে চায় না।

    এয়ারপোর্টে বসে অতনুর মনে হয়, একদিন এদের দুজনকেও ভুলে যাবে। যাবে কি ? এখন কত মনকেমন করছে। এরা দুজন ওকে নিয়ে সাময়িক সংসার পেতেছিল। আবার নতুন কেউ আসবে ; তার সঙ্গে সংসার পাতবে। তারা কি অতনুর মতন ভালোবাসবে ওদের ? ফোঁপানি সামলায় ও, অতনু। জুলি-জুডি তো একদিন বুড়ি হয়ে যাবে। বিয়ে কেন করেনি, জানতে চায়নি। বুড়ো বয়সে, অবসর নেয়া হয়ে গেলে, অতনু আসবে আরেকবার। তখন এখানে মোনোরেল হয়ে যাবে, বহু হাইরাইজ উঠে যাবে, এয়ারপোর্ট উন্নত হয়ে যাবে।

    কলকাতায় প্লেন বদলে, দমদম বিমানবন্দরে সারা সকাল বসে থেকে পাটনা ফিরেছিল। কলকাতা শহরে ওর কেউই নেই, কোথায়ই বা যাবে ! জ্যামে আটকা পড়ে ফ্লাইট ছেড়ে যেতে পারে। যা মিছিল আর অবরোধ চলছে।

    পাটনা বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে বুঝতে পারল আজকে দোলপূর্ণিমা, একটা দল এসে এক বালতি নর্দমার জল ঢেলে দিল অতনুর মাথায়, এর চুলে মুখে মাখাল চটচটে অ্যালুমিনিয়াম পেন্ট। চূড়ান্ত অশ্লীল লোকগীতি, ঢোলক বাজিয়ে, গাইতে-গাইতে চলেছে একদল ধেনোমাতাল যুবক, আর কলি শেষ হতেই ধুয়ো উঠছে, আরে ভাই র‌্যা র‌্যা র‌্যা র‌্যা। গোবরমাখা চেহারা দেখে ওরা অতনুকে রেহাই দিলে, নয়তো এতক্ষণে খাবলে ছিঁড়ে ফেলত ওর জামাকাপড়।

    অনেক ধরাধরির পর একজন রিকশচালক রাজি হল।

     

     

    পাঁচ

     

    দোলের ছুটির পরদিন অফিসের গেটে পৌঁছে অতনু দেখল অফিস বন্ধ, লাল শালুতে লেখা তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ধর্মঘট। গেটের পাশে তাঁবুতে কম্বল-সতরঞ্চি পেতে লুঙ্গি গেঞ্জি খোঁচা-খোঁচা দাড়িতে অনশন করছে ন্যাতানি সহকর্মীরা। তাস লুডো থান-ইঁট উপন্যাস রজনীশ রামচরিতমানস চলছে। তাঁবুর গায়ে লাল শালুর ওড়নায় লেখা “মানসী বর্মণ সংগ্রাম কমিটি”। ছাপানো হ্যাণ্ডবিলে ধর্মঘটের ইতিহাসের প্রশ্নোত্তর হিন্দিতে বিলোনো।

    ননীদা-সুলতানার বাচ্চা হচ্ছিল না বলে গায়নাকের কারসাজিতে একজনের ধাতুতে আরেকজনের ডিম ফেটিয়ে নলখোকার জন্যে গর্ভের সসপ্যান দরকার পড়ে, কেননা সুলতানার বাচ্চাদানিটা অকেজো, তাঁবুর টুকরো-টাকরা গল্প জুড়ে-জুড়ে বুঝলো অতনু। ননীদা নাকি অনেক দৌড়ঝাঁপ খোঁজাখুঁজি নানা গৃহবধু কর্মীর হাতেপায়ে ধরে শেষে মানসী বর্মণকে রাজি করিয়ে ওর পেটে বাড়তে দিয়েছে বাচ্চাটা। স্হানীয় অফিস বলেছে তার জন্য মানসী বর্মণ ডাক্তার খরচ আর মেটারনিটির ছুটি পাবে না। অরিন্দম এমনভাবে কেস ঘুরিয়ে নোট আর চিঠির খসড়া লিখেছে যে হেড অফিসও বলেছে যে, পাবে না। মা হলেই হবে না ; বৈধ মা হতে হবে।

    ইউনিয়ান এখন দু’ভাগ। বেচয়েন লাল দিনে কুড়িবার কমরেডি কাটিং চা খেয়ে-খেয়ে লিভার ক্যানসার নিয়ে হাসপাতালে, বাঁচবে না। ডাক্তাররা মার্কস লেনিন স্তালিন মাও সব বন্ধ করে দিয়েছে। বলেছে, চুপচাপ শুয়ে আরাম করুন। চন্দ্রকেতু সিং এই তালে ইউনিয়ান দখল নিতে না পেরে, গলায় রজনীশ লকেট ঝুলিয়ে ঘুরছে। মহাদলিত, দলিত, পিছড়াবর্গ আর মুসলমানদের জোট ননীদা আর মানসী পিছড়া জাত আর সুলতানা মুসলমান বলে সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি। উঁচু জাত থেকে নিচু জাতের আওতায় চলে গেছে ইউনিয়ান।

    বিহারের বাঙালিদের টিকে যাবার এটাও একটা প্রক্রিয়া হতে পারে, মনে হয় অতনুর।

    প্রত্যেক চব্বিশ ঘন্টা পালা করে অনশন, রোজ দশজন, সিনিয়রিটি অনুযায়ী। অতনুকে দেখে শিবু পালিত রঙিন শর্টস সামলে রোমশ দাবনায় চাপড় মেরে উঠে বসে, ‘আপনাকে তো চেনাই দায়, ভেতো চেহারা পালটে শার্ট-প্যাণ্ট, গোঁফ কামিয়ে ফেলেছেন, আগেকার তেল-চুকচুকে চুলে শ্যাম্পু, চুল বাড়িয়ে পিগটেলে রাবার-বভাণ্ড, সেন্ট-পারফিউম কিছু একটা মেখেছেন। হলটিং থেকে বেশ সেভিং করেছেন মনে হচ্ছে। শিবু পালিতের সিগারেটের ফিকে নীল ধোঁয়ায়, এই বসন্তকালে, ছড়িয়ে পড়ছিল হেমন্তের শুকনো-হলুদ পাতা পোড়ানো আধভেজা গন্ধের আমেজ। যারা তাস খেলছিল, নটা-দশটার অফিসমুখো সময়ের দ্রুতিকে জোর করে কুঁড়েমিতে ধরে রেখে, বোধহয় কম পয়সার জুয়া, অতনুর পরিবর্তনকে অনুমোদন জানালো ঠহাকার মাধ্যমে। অসাধারণ বিহারি অট্টহাসি এই ঠহাকা, শৈশব থেকে অমন করে হাসতে না শিখলে রপ্ত করা যায় না, অনেকটা ঠিঁউউউউ বা ফিঁউউউউউ আওয়াজ বেরোয়, যেন অবশ্যম্ভাবী ছিল অতনুর বদলে যাওয়া। শিবু পালিত কিন্তু বলল, যেন কিছু হয়নি, ‘সুশান্ত অবাক হয়ে যাবে। ’

    ‘সুশান্ত কোথায় ? আসে আপনাদের খোঁজ নিতে ?’

    পিপারিয়া বলে একটা জায়গায় ওদের অনেকটা জমিজমা আছে। সেই জমি হাতাবার জন্য ভাগলপুর গেছে।

    ভাগলপুর ? পিপারিয়ে তো মুঙ্গেরে !

    ভাগলপুরের বাহুবলী গিরোহটার সাহায্য নিতে গেছে।

    বাপরে ! কী বলছেন কি ? ওকে বাড়ি থেকে যেতে দিয়েছে কেমন করে ?

    বাড়িতে বলেনি কাউকে। মৌলিনাথকে বলেছিল।

    ভাগলপুরের নাথনগর আর বিহপুর থানার কসমাবাদ, দুধলা, বৈকুণ্ঠপুর, তেতিস, অমরি, নকরটিয়া, অজমেরিপুর, ভগবতীপুর, দিলদারপুর, রত্তিপুর, ওদেদিয়া, কাহেওয়ারা, গিরিপুর, চোওহদ্দি, রাঘোপুর, গঙ্গাপুর, রসতপুর আর শাহপুর গ্রামগুলোতে রাজত্ব করে একদল খুংখার খুনি— তারিণী মণ্ডল, মলহোরিয়া মণ্ডল, ডুব্বা মণ্ডল আর সন্তান মণ্ডল। আধুনিক মানবসমাজের বাইরে ওই অঞ্চল। ইংরেজদের সময় থেকে কোনও তারতম্য হয়নি আজ ওব্দি এই গ্রামগুলোর মানুষদের জীবনধারায়, সংঘর্ষে, দারিদ্র্যে, শোষণে। যার যত পেশিশক্তি, তার ততো জমিন। ১৯৫৯ থেকে ভাগলপুরে গঙ্গানদীর তীরে একশো আটত্রিশটা গ্রামে ভূমি সংস্কারের চেষ্টা বারবার ভেস্তে গেছে। কাগজে-কলমে জমির মালিক যে-ই হোক না কেন, খুংখার গিরোহদের সমর্থনে দখল রাখতে হয় ছুঁচের ডগার সমান ভূখণ্ডও।

    পিশাচদের অভয়ারণ্যে কত টাকা নিয়ে গেছে সুশান্ত ? এত দিনের ব্যবসা তাহলে এই টাকা তোলার জন্যে ? মলহোরিয়া মণ্ডলকে দিয়ে কাকে ঠ্যাঙাতে চায় ও ?

    শিবু পালিতকে অতনু বলল, ‘আপনার ভ্যানগার্ডদের দেখছি না ?’

    মামুদ জোহের তো প্রথম দিনেই দশজন মিলে ঢুকে গিসলো অনশনে। পিকনিকে বেরিয়ে গেছে। রাজগির। হরতালের ছুটিটা নষ্ট করে কী লাভ ? আমাকে কেউ খবরটা আগেভাগে দ্যায়নি। কিছুটা হেরো শোনালো শিবু পালিতের কন্ঠস্বর।

    মানসী বর্মণেরবাড়ি জানেন ?

    কংকরবাগ কলোনি। কৃষিবিভাগের সিনিয়ার আগরওয়াল থাকে যে বিলডিংটায়। যাবেন নাকি ? যান, দেখা করে আসুন। একটা প্ল্যান আছে, ফিরে আসুন, তারপর বলছি।

    রিকশয় চিড়াইয়াটাঁড় উড়ালপোল। এগজিবিশান রোড, রাজেন্দ্রপথের মোড়ে, ডাক্তার ভট্টাচার্যের কলইনিকের বাইরে রাস্তা ওব্দি উপচে পড়েছে শতছিন্ন শ’খানেক গরিব রোগির রোগাটে খ্যাংরাটে প্রায় খালিগা ভিড়ের ঠেসাঠেসি। মোড়ের লাইট সিগনালগুলো মাঝরাতের মোদোমাতাল লরির ধাক্কায় দুমড়ে হেলে পড়ে দাঁড়িয়ে আবার কোনো কানা ট্রাকের ধাক্কা খাবার অপেক্ষায় আছে। বিজলি থাকে না বলে এমনিতেও দরকার নেই ওগুলোর। রিকশ থেকে নেমে পোলটা হেঁটে পার হয় অতনু। নামতে, চারিদিকে কাঁচা গু। লাফিয়ে লাফিয়ে পার হবার অভ্যাসে বাচ্চারা পোঁছে গেছে যৌবনে। ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে অনেকটা এগিয়ে আবার রিকশ নিল অতনু। রাস্তার দু’পাশে গোরু বাঁধা, নানা জাতের গোবরের ডাঁই। দেয়ালে ঘুঁটে ঠোকা একতলা বাড়ির মাথায় ডিশ অ্যানটেনা। তার পাশে-পাশে উঠেছে বহুতল, একের পর এক, বৈভবশালীরা দিল্লি থেকে টাকাকড়ি লুটে নিবেশ করছে ফ্ল্যাটে মালটিপ্লেক্সে মল নির্মাণে। রাস্তার ওপর প্লাসটিকের ঝাঁপ ফেলে, তিসির তেলে পাম তেল মিশিয়ে কচরি-পকৌড়া ভাজছে খালিগা গামছাপরা ময়রামরদ। ধুলো ওড়ার ঋতু আরম্ভ হল।

    কলিং বেল টেপার কয়েক সেকেন্ডে সামান্য ফাঁক হয় চেনবাঁধা পাল্লা। টাঙাইল শাড়িতে মানসী বর্মণ, উদাসীন বহিরাবয়ব, সর্বতোমুখী পরিব্রাজক চাউনি, নিঃশব্দ উলুধ্বনির বলয়ে ঘেরা উচ্চারণ-উন্মুখ শরীর। দরোজা খুলে, ‘আরে, আপনি। চিনতে পারিনি প্রথমটা। চুল বাড়িয়ে রাবার বভাণ্ড বেঁধে পপস্টারদের মতন করে ফেলেছেন। অনেক দিন দেখিনি তো। কোথায় যেন গিয়েছিলেন। আসুননা, ভেতরে আসুন। বারমহল আর খাসমহল, আমার এই দুঘরের ফ্ল্যাট। ওপরের ফ্ল্যাটেই আগরওয়াল সায়েব থাকে। বড্ড ছ্যাঁচড়া। তাই চেন দিয়ে রাখি। ’

    অতনু আঁচ করেছিল অনেক লোকজন থাকবে মানসী বর্মণের বাসায়, থাকবে ধর্মঘটের রেশ, একাধজন নেতা সাঙ্গপাঙ্গ সুদ্দু। পুরো ঘরটা আসবাব কার্পেট কিউরিওতে ঠাসা, সামলে চলাফেরার পরিসর। কোনও অজানা প্রতিপক্ষের কিংবা পরিচিত গোপন সঙ্গীর অনুপস্হিতির দুঃখ ছেয়ে আছে যেন। এই ঘরে একটা বাচ্চা খেলবে ভেবেই ভুল ভাঙে অতনুর। খেলতো।

    দরোজা বন্ধ হবার আওয়াজ হতেই, ওপর থেকে নেমে এসেছে লুঙ্গিপরা সন্দেহ-বাতিকগ্রস্ত ছোঁকছোঁকে আগরওয়াল। ধর্মঘটের ছুটি লুটছে বাড়িতে বসে। মানসীর দরোজায় চাবির ফুটোয় চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করে ভেতরে কী চলছে। কী করেই বা গর্ভবতী হল, সেই সন্দেহর নিরসন চায় আগরওয়াল। ঘরের দেয়ালঘড়িতে বাজনা বেজে ওঠে, যেন একাঙ্কের আরম্ভ। চাবির ফুটো থেকে অতনুর পাছা সরে গেলে পর্দা ওঠে।

    মানসী : ( সোফায় বসতে বসতে ) আসুন না, ওখানটায় বসুন, জানলা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসে। ধ্যাৎ, আপনি-আপনি করতে পারছি না। তোমাকে তুমিই বলছি। তুমি তো বেশ ছোটো আমার চে, তাই না ? ( ঘাম না থাকা সত্ত্বেও আঁচল দিয়ে কপাল মুছে ) তুমি তো কোথাও যাও না, কারোর সঙ্গে মেশো না বলে বদনাম। উন্নাসিক, না ? ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতকোত্তরের উন্নাসিকতা, না ? কৌতূহল হলো বুঝি ? ইউনিয়ান এমন পাকিয়ে ফেলেছে ব্যাপারটা…

    অতনু : ( মানসীর পাশে ধপ করে বসে। পকেট থেকে পারফিউম বের করে এগিয়ে দ্যায়। মানসী হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দ্যাখে ) পুরো ঘটনাটা কেমন যেন অবিশ্বাস্য। ননীদার বিয়ে তো রুপকথার গল্প। তারপর আপনার এই দুঃসাহসী কাজ। ইউনিয়ানও চাইছিল ম্যানেজমেন্টকে আক্রমণ করার ইশ্যু, পেয়ে গেল আপনাকে।

    মানসী : ( মৃদু হাসি। মাথা নাড়িয়ে আলগা খোঁপার ঢল পড়ে যেতে দ্যায় কাঁধে পিঠে। ) ও বাবা, বেশ গুছিয়ে কথা বলতে জানো। ( পারফিউমের ঢাকনি খুলে বাতাসে স্প্রে করে। ) আর কী হবে এসবে ? আমার গা থেকেই এখন মৃগনাভির গন্ধ বেরোয়। ( ডান হাতের তর্জনী রাখে হৃদয়ের জায়গায়। ) তোমার উচিত পারফিউম মাখা ; তোমার গা থেকে যৌবনগ্রন্হির গন্ধ বেরোচ্ছে। অবশ্য তোমার যদি প্রেমিকা থাকে সে অমন গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যাবে।

    অতনু : আপনাকে দেখতে খুব ভালো, এত কাছ থেকেভ দেখিনি তো আগে, বলবে ভেবেও বলল না অতনু। ( তার বদলে ঝুঁকে পড়ে, মানসীর বুকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে শোঁকে। ) হ্যাঁ, সত্যি, তালশাঁসের মতন গন্ধ।

    মানসী : ( অতনুর চুলে আঙুল বুলিয়ে। ) দুর বোকা, তালশাঁসে কি মৃগনাভির গন্ধ হয় ? মাস্ক পারফিউমের নাম শোনোনি ?

    অতনু : ( আচমকা উদাসীন। ) কে জানে, গন্ধটা পেলে টের পাবো। কিন্তু আপনি এতো বড়ো ঝুঁকি নিলেন যে ! কিছু হয় যদি ? যদি কমপ্লিকেশান হয় ? ( সেই বুনো আর তেতো গন্ধের জন্যে আচমকা তীব্র হাহাকার হয় অতনুর। মনকেমন করে ওঠে। )

    মানসী : ( খরস্রোতা ভঙ্গীতে। ) কীইইই আবার হবে ! বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি না হলে আমার ছেলেমেয়ে ফোর-ফাইভে পড়ত এখন। ( চিন্তিত ভ্রুযুগল। )

    অতনু : ( মুখ ফসকে অথচ সরাসরি মানসীর দৃষ্টির গভীরে তাকিয়ে। ) ছাড়লেন কেন ? সবাই বলে আপনি তালাক দিয়েছেন।

    মানসী : হ্যাঁ, আমিই ছেড়েছিলুম। ( ক্ষুব্ধ ) হিজড়ে ছিল লোকটা।

    অতনু : ( বিস্ময়ে ) হিজড়ে ? হিজড়েরা বিয়ে করে নাকি ! ( কথাগুলো বলে, মানসীর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, হয়তো মানসীর কথায় সত্যতার অভাব রয়েছে। )

    মানসী : ( পরাজিত হাসি ) সে হিজড়ে হতে যাবে কেন ! ছোটোবেলায় অসুখ-বিসুখ হয়েছিল কিছু, তাইতে অ্যালিগো স্পারমিয়া হয়ে গিয়েছে। ডাক্তার দেখায়নি সময়মতো। পরে অ্যাজোস্পারমিয়া হয়ে গিয়েছে। ( উষ্মা ফুটে ওঠে। ) অমন বর থাকাও যা, না থাকাও তা। পোকাই নেই তো ডিম ফোটাবে কি দিয়ে ?

    অতনু : ( মানসীর মুখ আরও খুঁটিয়ে দেখতে-দেখতে। ) তাতে কী হয়েছে ! এখন যেমন করলেন, তখনও চুপিচুপি কারোর স্পার্ম নিয়ে নিতেন।

    মানসী : ( অবাক। ) কী বলছ কি তুমি ! এখন ব্যাপারটা আলাদা। বর থাকতে ওসব করে কখনও কোনো বউ ? ঢি-ঢি পড়ে যেত। কেলেংকারির একশেষ। বরও মেনে নেবে কেন ? এখন যা করেছি তাতে কতো গর্ব বলো ইউনিয়ানের। টাইমস অফ ইনডিয়াতে বাংলা অ্যাকাডেমির জীবনময় দত্ত আমাকে নিয়ে ফিচার লিখেছেন, তা জানো ?

    অতনু : ছাড়াছাড়ির পর আবার বিয়ে করতে পারতেন।

    মানসী : কুমারী মেয়েরাই বসে আছে, বিয়ে হচ্ছে না কতো মেয়ের, ডিভোর্সিকে কে বিয়ে করবে ?

    অতনু : কেন ? আমি।

    মানসী : ( অতনুর চোখে চোখ মেলে, কিছুক্ষণ হতবাক ) তুমি ? পাগল নাকি ? ভেবেচিন্তে বলছ ? আগে বলোনি তো কখনও। ভালো করে কথাই বলতে না। বেশি-বেশি পড়াশুনো করো বলে একটা ভয়-ভয় ভাবও ছিল তোমার প্রতি। তোমার মা মেনে নেবেন কেন ?

    অতনু : ভেবেচিন্তে বলছি না। আবেগেও বলছি না। মাও মেনে নেবেন না, জানি। কিছুকাল আগে হলে আমিও এমন কথা বলতে পারতুম না। কীই বা এসে যায় তাতেও। কিছুই মানামানির দরকার হয় না মানুষের মতন থাকতে গেলে। জানেন, প্রেম মায়া মমতা ভালোবাসা শ্রদ্ধা লোভ সবকিছুই ক্ষণস্হায়ী। মুহূর্তটাকে ধরুন, ফুরিয়ে গেলে ছেড়ে দিন। বরকে যেমন ছেড়েছেন, পছন্দ না হলে আমাকেও ছেড়ে দিতেন। সিরিয়াসলি বলছি।

    মানসী : ( বিস্ময় আর শ্রদ্ধা। ) কতো কথা বলতে পারো, সত্যি। তোমার চরিত্রের এই দিকটার সঙ্গে পরিচিত ছিলুম না।

    অতনু : ( উঠে দাঁড়ায়। দরোজার দিকে এগোয়। ) কথায় আর কাজে মিল ঘটে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না।

    মানসী : ( উঠে দাঁড়ায়। অতনুর হাত নিজের দুহাতে নিয়ে। ) আবার এসো, অ্যাঁ, আসবে তো ? চা-কফি কিচ্ছু খাওয়াতে পারলুম না।

    অতনু : ( ম্লান হাসি। মাস ছয়েক আগে হলে মানসীর ঘর্মাক্ত স্পর্শে বজ্রপাত ঘটে যেতো স্নায়ুকেন্দ্রে। ) হ্যাঁ, আসবো।

    দেয়াল ঘড়িতে পনেরো মিনিটের বাজনা বেজে ওঠে। অতনু দরোজার দিকে এগোলে, চাবির ফুটোয় একাঙ্কের যবনিকা। আগরওয়াল লুঙ্গি সামলে পা টিপে-টিপে ওপরে পালায়, আর মিসের আগরওয়ালকে হাঁপাতে-হাঁপাতে, ‘মওগিটা এবার একটা বাচ্চা ছোকরাকে ফাঁসিয়েছে।’

    বাইরে বেরিয়ে, ফ্ল্যাট-কলোনির গেটের কাছে, যেখানে বিষন্ন মুখটি নিচু করে বসে আছে করমচা-ঝোপ, রোদ্দুরকে আন্দাজমতন ধরে রেখেছে নরম সবুজ পাতা, সেখানে রিকশর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে অতনু ভাবছিল, মানসীর ছবিটা ছাড়তে চাইছিল না ওকে। মজুর আর কেরানির দোআঁশলা চাকরিতে গড়া এক চিন্ময়ী শরীরে কত অনায়াসে, সামান্য জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়, মাতৃত্বের সর্বব্যাপী প্রহেলিকা ঘিরে ধরেছে।

    হাঁটল কিছুক্ষণ। যেতে চাইছে না কোনও রিকশ। হুড তুলে উর্দ্ধমুখী ঠ্যাঙে আরম্ভ হয়ে গেছে ভাতঘুম। পাতলা ডাল কাঁচা লঙ্কা সহযোগে প্রচুর সেদ্ধভাতের নেশাময় হামেজের ঘুম।

    ওর নাম ধরে কাউ ডাকছে শুনে চায়ের ঝুপড়িটায় দু-জন অফিসারকে দেখতে পায় অতনু। অরুণ মুখোপাধ্যায় আর তার ভায়রাভাইয়ের ছোটোভাই মলয় রায়চৌধুরী। চায়ের এইসব ঠেকগুলোয় পোস্তফলের খোসা আর এলাচ দিয়ে চায়ের পাতা দুধে ফুটিয়ে চা হয়, কড়ক চা। চেনা খদ্দেররা গাঁজা ভাঙ চরস আফিম তাড়ি খায় ; ঝকঝকে রোদে এই সমস্ত নেশার আলাদা আমেজ হয়।

    –মিস বর্মণের বাড়ি গিসলে ?

    –হ্যাঁ।

    –রূপের খোলতাই কেমন দেখলে ?

    –আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিও সব মিটমাট হয়ে গেলে।

    অনুনাসিক দোষে দুষ্ট এক মিনিবাস এসে দাঁড়াতে, এদের দুজনকে এড়াবার জন্যে, বাসটার গন্তব্য না জেনেই উঠে পড়ল অতনু। নামল গিয়ে পাটনা স্টেশানের স্টপেজে। দুপুর রোদ্দুরেও হনুমান মন্দিরে পূণ্যার্থীর কাতার, শালপাতায় প্যাঁড়া আর গাঁদাফুল। গাঁদাফুল বোধহয় সব ঋতুতেই হয় আজকাল।

    রিকশ পেতে অসুবিধা হল না। ফ্রেজার রোড ধরে আকাশবাণী ক্লার্ক অবধ হোটেল হাথুয়াকোঠি সুলভ শৌচালয় পার হয়ে পৌঁছোয় ধর্মঘটিদের তাঁবুতে। ঘুমোবার ভান করছে বা ঘুমিয়ে পড়েছে অভুক্ত হরতালিরা। রাস্তার উড়ন্ত ধুলো এসে সাঁতরাচ্ছে প্লাসটিক বালতির অলস জলে। একঘেয়েমি থেকে চাগিয়ে ওঠা ক্লান্তিতে ভরপুর তাঁবুর বসন্তকালীন বাতাস। নিস্তেজ সংঘর্ষের গতানুগতিক উদ্দেশ্যহীনতায় গন্তব্য খোঁজার জন্য পড়ে আছে এই একপাল মরদ। তাঁবু জুড়ে ঘামনিঃসৃত যৌবগ্রন্হীর গন্ধ।

    শিবু পালিতের সতরঞ্চিতে বসল পা ছড়িয়ে অতনু। জুতো-মোজা খুলে রাখে একপাশে। তাঁবুর একটা ছ্যাঁদা দিয়ে রোদ্দুরের আনাগোনা এমন চলছিল যে সেটাকে এড়িয়ে অসুবিধে হচ্ছিল যুত করে বসতে। বিষুব রেখার এপারে আসছে বোধহয় বসন্তকালের সূর্য। সেই ঝোঁকে অতনুকে বিরক্ত করছে খানিক। ঢুলতে আরম্ভ করেছিল অতনু, শিবু পালিত ভেঙে দিল তন্দ্রা, ‘আরে চক্রবর্তী, ফিরলেন কখন ? আঃ, প্যান্টের ক্রিজ খারাপ হয়ে গেল তো। এদের উচিত ছিল চেয়ার-ফেয়ারের ব্যবস্হা রাখা,’ দু কনুইতে ভর দিয়ে, বুক আর মুণ্দু উঁচিয়ে শিবু পালিতের উক্তি।

    –কখন থেকে না-খেয়ে আছেন ?

    –কাল সন্ধে থেকে। ছটা থেকে ছটার ডিউটি।

    –খিদে পায়নি ?

    –রাত্তিরে আর সকালের দিকে তেড়ে পেয়েছিল ; দু’ফুঁক মেরে সামলে নিয়েছি।

    –সিগারেট খেলে খিদে মরে যায় ? আমিও সকাল থেকে খাইনি কিছু। দিন তো একটা, দেখি টেনে।

    –সিগ্রেট কে বললে ! চরস, হ্যাশিশ। বেশ মিষ্টি। মিষ্টিখোর বাঙালির জন্যে এরচে প্রিয় আইটেম নেই। শালা এখানকার লোক গাঁজা ভাঙ তাড়ির বাইরে বেরোতে পারল না।

    –কই দেখি।

    –নিন, আলতো টানবেন, নইলে কাশি পাবে।

    নয়ানাভিরাম ধোঁয়া খায় অতনু, রসিয়ে। ক্রমশ চোখের ওপর থেকে কপালের দুপাশ ফাঁকা। জিভ আর মাড়ি সুকোয়। স্মৃতির টুকরো ভাসমান। একাধিক ইঁদুর বিষ খেয়ে মরে পড়ে আছে তবু তাদের ওপর গুলি চলছে। অবিস্মরণীয় স্মৃতিভ্রংশ। রাস্তার ওপারে টেলিফোনের তারের ওপর কাক-পরিবারের কুশীলবদের সমবেত অভিনয়। অতনুর কানে তুলো গুঁজে দিয়েছে কেউ, ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম। পেতলের খোকা কৃষ্ণের হামাগুড়ি, মানসী বর্মণের কাচের আলমারিতে। দু’কানের পাশে নাছোড় বাতাসের পীড়াপীড়ি। মাছি মূমাছি বোলতা ভ্রমর ভিমরুল গঙ্গাফড়িঙের ধাতব গুঞগজন। বিজ্ঞাপনের মডেল তারকা সাবান মাখতে মাখতে হাসছেন হোর্ডিং জুড়ে। বাহ্যজ্ঞানশূন্য আদুলগা। মানসী বর্মণ আদুল গা ! মাথা নাড়িয়ে ছবিটা মুছতে চেষ্টা করে অতনু। ঘাড় নিচু করে বসে থাকে কিছুক্ষণ

    –খিদে তো যায় না। শুধু নেশা হয়। স্মৃতিতে অদ্ভুত সব অবিশ্বাস্য ছবি ভেসে উঠছিল, বাকি অংশটা শিবু পালিতের হাতে দিয়ে বলল অতনু।

    –ব্যাস। কাৎ হয়ে পড়ে থাকুন ; মাথা ঘুরতে দেবেন না, মাথা ঘুরতে দেবেন না, ঘুমিয়ে পড়ুন চোখ বুজে, মৌতাত নিতে থাকুন, এনজয় করুন। মৌতাত কেটে গেলে বাড়ি যাবেন। আপনার অনশানের পালা কবে ?

    –কে জানে ! খোঁজ নিইনি। আমার মাথা কিন্তু কোনো কারণেই ঘোরে না।

    শৈবাল পালিত কন্ঠস্বর নামায়, প্রায় ফিসফিস, ‘চলুন না কালকে রাজগির, আমাকে নিতে ওরা ভ্যান পাঠাবে সকালে। আমার বাড়িন জানেন তো ? আশিয়ানা বিলডিং। এসে যান ভোর ছটা নাগাদ। ’

    –আচ্ছা, আপনারা ঠিক কী করেন ? ঠিক কী ধরণের ফুর্তিফার্তা ? নাচ-হইহল্লা, না কী ?

    –চলুন না। মানব জন্ম তো একবার। কিন্তু আমি তো আপনাদের মতন গড়গড় করে ইংরেজি বলতে পারি না।

    –ওও, ডিয়ার, ইংরেজিতে কথাগুলো ভালগার মনে হয় না। হিন্দি-বাংলায় কেমন যেন ডার্টি আর অবসিন মনে হয়। বাংলায় ফাক কান্ট শিট বুলশিট আসহোল মাদারফাকার ফাকইউ বলা যায় ? ছি ছি। ইংরেজিতে মা আর দিদির সামনেও বলা যায়। আর আপনি তো শেক্সপিয়ার টিএস এলিয়ট আওড়াতে এক্সপার্ট। ঝেড়ে দেবেন দুচার লাইন কেউ ট্যাঁ-ফোঁ করলে।

    –ঠিক আছে। পৌঁছে যাব।

    মৌতাত কেটে গেলে অতনু বাড়ি গিয়ে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে উঠে চা তৈরি করে। অবাক মা।

    –বিদেশ থেকে শিখে এলি বুঝি ? তোর বাবা তো সব পারত। বড়ি দিতে পারত, জানিস ?

    –তোমায় আর কিছু করতে হবে না। কালকে অবশ্য যাব এক জায়গায়, ফিরতে দিন দুয়েক লাগবে।

    –হ্যাঁ, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে একটু মেলামেশা কর। আর কত দিন মুখে বই গুঁজে ঘরকুনো থাকবি !

    ম্যাটাডর ভ্যানটা পার্ক করা ছিল শিবু পালিতের ফ্ল্যাটবাড়ির রাস্তায়। গাড়িতে ঢুকে অতনু দ্যাখে শিবু আগে থাকতে ড্রাইভারের সিটে, ছিটের রঙচঙে বুশশার্ট আর জিনস-ছিঁড়ে হাফপ্যান্ট। ফর্সা উরুতে ঘন কোঁকযা চুল। কিছুক্ষণ পর গাড়ি গিয়ে ঢোকে গোলঘরের পেছনে এক ঘিঞ্জি গলিতে। ঘিঞ্জি বলতে কালচে কাঠ, ফ্যাকাশে প্লাস্টিক, ত্যাবড়ানো টিনের দেয়াল, বাঁশের নানা মাপের বেড়ের খুঁটি, আধপচা নারকেল দড়ি, হলুদ নাইলন দড়িতে বাঁধা, খরখরে চুনবালি, চটের পর্দা, উদাসীন বুড়ো, টিনের ডিবে হাতে গঙ্গার পাড়ে হাগতে যাচ্ছে গামছাপরা মাস্তান ছোকরা, দাঁতনরত ল্যাঙটপরা ষণ্ডা।

    স্তুপের আকারে ১৭৮৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন জন গার্সটিনের পরিকল্পনায় তৈরি গোলঘরে এখনও চোদ্দ লক্ষ টন চাল বা গম মজুত রাখার ব্যবস্হা আছে ; ১৭৭৭ সালের বাংলা-বিহার দুর্ভিক্ষের পর তৈরি হয়েছিল ১৪৫টা পাকানো সিঁড়ির গোলঘর। তারই পেছন দিকে দারিদ্র্যের চূড়ান্ত।

    ‘একজনকে পিক আপ করতে হবে,’ শিবু পালিত নেমে যায় আর মিনিট পনেরোর মধ্যে ফিরে আসে কালো কুচকুচে ছিপছিপে এক যুবতীকে সঙ্গে নিয়ে, দু’হাতে প্লাসটিকের আসমানি চুড়ি, নাকে ফিরোজা পাথরের নাকছাবি। কালো শিফনের শাড়ি, আসমানি ব্লাউজ, চুলে চাঁপাবেলির গোড়ে, চোখে আইলাইনার। এরকম একটা অখদ্যে জায়গায় থেকেও মেয়েটা কত টাটকা উচ্ছল প্রাণবন্ত সপ্রতিভ চনমনে। দারিদ্র্যের মধ্যে কোথায় অস্তিত্বের স্পন্দন তাও ঠিকমতন খুঁজে নিজেদের আনন্দকে প্রবাহিত রাখছে মানুষ।

    ওদের দুজনের মাঝে ঝপাং বসে পড়ে মেয়েটি, তার ছোঁয়াচে প্রাণপ্রাচুর্য নিয়ে অতনুর দিকে অনুসন্ধিৎসু চাউনি। ‘আপনাকে দেখিনি তো আগে কখনও,’ কোলের ওপর রাখে ওড়িশার পিপলি গ্রামের কাঁধ ব্যাগ, কথায় খাঁটি বিহারি টান।

    –না, ও এই প্রথমবার আমাদের সঙ্গে। ওর নাম অতনু।

    –আর আমার নাম শেফালি। সবাই আমাকে টু বলে ডাকে। আরে, তোমার হাত কত নরম, তোমার হাত কি ঘামে ?

    ‘তোমার কথায় অত হিন্দি টান কেন ?’ অতনু জানতে চাওয়ায় মেয়েটি জানায় তার বাবা বিহারি মা বাঙালি। কলকাতার কাছে চটকলে ওর বাবা মজুর ছিল। বাবার সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল মা। মা কিন্তু বামুন বাড়ির মেয়ে, হুঁ। বাবারা দেওঘরের বাউরি।

    –দেওঘরের বাউরি ? ওরা তো বাঙালি। বলল অতনু।

    শুবু পালিত বলল, ‘না হে, এ বাউরি সে বাউরি নয়। দেওঘরের বাউরিরা পাণ্ডাদের বাসন মাজত আর এঁটোকাঁটা খেত আগেকার দিনে।

    –আর এখনকার দিনে তোমরা আমাদের খাও না ? শেফালি বলল সামনের আয়নায় দুজনের দিকে তাকিয়ে।

    –পেলে খাই। শিবু পালিত বলল শেফালিকে।

    –হুররররররেএএএএ। চেঁচিয়ে ওঠে মেয়েটি আর দুহাত দুজনের কাঁধে রেখে নিজের দিকে টানে যার দরুণ গাড়িটা হঠাৎ মাঝরাস্তা থেকে বাঁদিকে প্রায় ঘাসের ওপর চলে যায়।

    –এই টু, অ্যাকসিডেন্ট হবে রে !

    অতনু হিমশিম। কী ধরণের চরিত্রে তাকে অভিনয় করতে হবে জানে না। মুখে ধুলোমাখা রোদ-কণিকার দল হুড়মুড়িয়ে উঁকি মারে গাড়ির জানলায়। কিছুক্ষণেই নোংরা হয়ে যায় শার্শি।

    ‘তোমার ভুরু, চোখের পাতা আর চুলে ধুলো জমছে,’ অতনুর বলা শেষ হবার আগেই মেয়েটি তার মুখ আর মাথা মুছে ফ্যালে অতনুর বুকে। শার্ট নোংরা হওয়া সত্ত্বেও অতনু স্পর্শমুগ্ধ। ফুলের গন্ধ ছাপিয়ে পুরুষকে মুহূর্তে আড়ষ্ট করার নারী সুগন্ধ –এই নারী-সুগন্ধের সঙ্গে পরিচিত ছিল না অতনু, কাঁচা তারুণ্যের সন্মোহক গন্ধ।

    ‘এবার তোমরা কতজন গো ?’ শিবুকে জিগ্যেস করে টু।

    ‘ষোলোজন। অতনুকে নিয়ে সতেরো। কাহিল হয়ে যাবে না তো ?’

    ‘আমি ? তোমরাই ভিরমি খাবে একে-একে। সবাইকে জানি কার কত মুরোদ। একটুতেই জিব বেরিয়ে যায়। কত টাকা করে দিচ্ছে সবাই?’

    ‘পনেরোশো করে, সবসুদ্ধ চব্বিশ হাজার, অতনুকে ছেড়ে।’

    ‘আমার কাছে হাজার দুয়েক টাকা আছে।’ বলল অতনু, মেয়েটির দিকে আয়নায় তাকিয়ে।

    ‘ও বাবা, নতুন হলে কি হবে ! এতো ডুবে-ডুবে জল খেতে চাইছে গো। আটঘাঁট বেঁধে বেরিয়েছে।’ অতনুকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে শেফালি, তারপর শিবুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করে, ‘কোথায় হবে ব্যাপারটা ?’ ছাড়ে না অতনুকে।

    ‘নালান্দায়, ধ্বংসাবশেষে তোমাকে গড়ে তোলা হবে, বুঝলে ভিক্ষুণী।’

    অতনুকে ছেড়ে দিয়ে, ‘ঘরভাড়া নেয়া হয়ে গেছে ? খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্হা ? এবার কে তোমাদের নেতা গো ?’

    ‘এবার কো-অর্ডিনেটার রবীন দত্ত। ’

    ‘চশমা পরা, ঢ্যাঙা, সে ?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘ওঃ, খুব জমবে। ’

    হকচকিয়ে অভিভূত অতনু। রাইখয়রার মতন এমন ফুরফুরে এক ছিপছিপে অপলকা শ্যামাঙ্গী, এক ঝটকায় এক হাতে তুলে নেবার মতন সুঠাম কোমর, ঝোটন বুলবুলির কোঁকড়াকুচি চুল, গলায় আসমানি পুঁতির মালা, কানে নকল মাকড়ি, পাতলা ঈষদুষ্ণ ঠোঁট, ফটিকজল চাউনি, এই অতি সাধারণ প্রাণচঞ্চল মেয়েটা মরে যাবে না তো, এতগুলো ভুখা জোয়ান মরদের ঝাপটায়।

    ‘কি দেখছ গো অমন করে?’ মেয়েটি জিগ্যেস করে অতনুকে।

    ‘তোমাকে।

    ‘আমাকে ? এই নাও দ্যাখো, আমি আমার মায়ের কোল অন্ধকার করে জম্মেছিলুম তো, তাই সবাই আমাকে দেখতে চায়। ’ আচমকা অতনুর নাকে নাক ঠেকিয়ে চোখে চোখ রাখে শেফালি। দৃষ্টি আর হাঁ-মুখের সোঁদা শ্বাসে, পলকে, বনসৃজন ঘটে যায় অতনুর অনুভূতিতে। পৃথিবীর অপূরণীয় ক্ষতি ঘটে যাবে এই নারীর যৌবন ফুরিয়ে গেলে। জীবন তো কেবল একবার, কালকেই বলেছিল শিবু, যা যায় তা আর ফেরে না।

    ‘তুমি প্রেম-টেম করোনি এখনও ?’ জানতে চায় শেফালি। নাক থেকে নাক তোলে না, চাউনিও বিঁধছে অতনুকে। নিজের হাঁ-মুখে মেয়েটির নিঃশ্বাসকে সেঁদিয়ে যেতে দেয় ও ; শেফালি আবার অতনুর কোমর জড়িয়ে ধরে, বলে, ‘তোমার মতন ঝুঁটি-বাঁধা কারুর সঙ্গে এখনও প্রেম করিনি ; চুলের ওই ঝুঁটি খুলে দু’হাতে টেনে যা প্রেম হবে না, টেরটি পাবে কারে প্রেম কয়। ’

    ‘প্রেম করিনি, ট্রেম করেছিলুম। দুটো জাপানি পরির সঙ্গে। তারা উড়ে চলে গেছে আমায় ফেলে। ’ অতনু চুমু খাবার ইচ্ছেকে দমিয়ে রেখে নাক থেকে নাক সরিয়ে নিয়ে বলল।

    ‘দু’জন ! হুঃঁ। একটাকেই সামলাতে পারবে না ওই নাদুস চেহারায়, তো দু’জন। দেখব অখন একদিন ; চোলো একদিন দেখব কে আগে দৌড়ে গোলঘরের ছাদে পৌঁছোয়। ’

    ‘তুমিই জিতবে, তোমাকে আমি জেতাবোই, গোলঘরের টঙে উঠতে হোক বা ট্রেমে।’

    ‘হারজিত ছাড়া আর ভাবতে পারো না তোমরা ? দুজনে হাত ধরে উঠব, দুজনেই জিতব ; ট্রেমেও হারজিত হয় না মোশাই, বুঝলে ? যেদিন আমার সঙ্গে ট্রেম করবে সেইদিন জানতে পারবে ; একসঙ্গে দুজনের আনন্দকে একই সময়ে মিশিয়ে ফেলতে হয়, তবে তো প্রেমের জয়। ’

    ধুলোবালি মেখে আত্মনিমগ্ন বিকেলে, বক্তিয়ারপুরে, ঢাবায় রুটি-তড়কা খাবার পর, রাজগিরে এক বাগান বাড়িতে পৌঁছোলে স্বাগতম জানায় দলের বর্তমান অভিভাবক রবীন দত্ত আর বাড়ির মালিকের ছেলে নোট পৃইক্ষক দু-নম্বর দেবেন্দর প্রসাদ। অতনুকে পেয়ে সকলের হই হই, নতুন মোরগ মুবারক। গেট দিয়ে ঢুকেই ভঠ্গীসর্বস্ব পাম গাছের সারি এগিয়েছে দু-দিক থেকে। পোর্টিকো ওব্দি। ইংরেজের তেলমারার খরচে তৈরি গথিকধাম জমিদারি একতলা।

    দেবেন্দর যখন ফার্স্ট ইয়ারে, ওর নাকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে কন্যাপক্ষ ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়েছিল। সে বউকে আনেনি বাড়িতে। পাঁচশো বিঘে ধানক্ষেতের লোভে বিয়ে করেছে আবার। পালামৌ-এর বালুমঠ ব্লকে ওদের পুসতয়নি বাড়ি। বিনোবা ভাবেকে অনেক জমি বিলিয়ে ছিল দেবেন্দরের বাবা জ্যাঠা কাকা। লেঠেল লাগিয়ে কেড়ে নিয়েছে সে সব পাথুরে কাঁকুরে জমি বিরহোড় আদিবাসীদের থেকে। চাষিদের নিজের জমিও মেরে দিয়েছে এই তালে। ওদের গ্রামে রিলিফের টাকাটাই প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় ফসল। ওদের এককালের জমিদারির প্রজা যারা এখনও প্রজাত্ব ছাড়িয়ে বেরোতে পারেনি, সেই বিরহোড় উপজাতিরা থাকে কুমভা নামের ঝুপড়িতে। বঁধুয়া মজুর সব।

    এখন বনপার্টির জোয়ানরা উপজাতিদের জলপাই পোশাক আর বন্দুক হাতে দিয়ে ঘন জঙ্গলে প্রশিক্ষিত করে তুলছে ; এতকালের জমিদারির বদলা নিতে চাইছে তারা। দেবেন্দর জানে মারামারি-কাটাকাটি অনিবার্য। তার আগে বেঁচে থাকার যাবতীয় মজা লুটে নাও।

    রাজগিরের এই বাড়িটার এখানে-সেখানে এখনও ল্যাংটো পাথরের এলিয়ে-পড়া বিদেশিনীরা। আম্রপালীর উরু আর নিতম্বে গড়া ভেনাস। উর্বশীর খোলা স্তন মেলে হেলে রয়েছেন হেলেন অফ ট্রয়। শকুন্তলার কটাক্ষ বিলোচ্ছেন মার্বেল পাথরের শীতল ক্লিওপ্যাট্রা। দেশ ছেড়ে যেতে পারেনি এ-সমস্ত জারজ মেমের দল।

    বাঘপায়া মেহগনি পালঙ্কের লাল হলুদ সবুজ কাঁচ জানলার বিশাল টিমটিমে ঘরে অতনুকে পৌঁছিয়ে রবীন দত্ত বলল, ‘রাত্তির সাড়ে আটটায় ডাইনিং হল। ’

    তৈরি হয়ে পৌঁছোয় অতনু। বিরাট লম্বাটে ডাইনিং টেবিল সাজানো কাচের প্লেট গেলাস স্টেনলেস স্টিলের ছুরি কাঁটা চামচ আর শাদা ভাঁজকরা রুমালে। দেবেন্দর প্রসাদ দুটো কাঁধ-উঁচু চেয়ার দেখিয়ে অতনুকে অবিশ্বাস যোগায়, ‘এইখানে বসেই এডউইনা মাউন্টব্যাটনকে প্রথম চুমু খান জোহারলাল নেহেরু।’

    ঠহাকা হাসির মাঝে কেউ বলে উঠল, ‘আর এডউইনা ওনাকে বলেন, মত ঘাবরাও, তুমহারা কাম হো জায়গা। ’

    রবীন দত্ত তদারক করতে করতে জানায়, ‘ওকে বিশ্বাস করবেন না। গতবার আমাদের বেলেছিল এই ঘরে বসে হিন্দু কংগ্রেসিরা আবদুল বারিকে খুন করার প্ল্যান করেছিল। ’ রবীন দত্ত সবাইকে অনুরোধ করছিল, কেউ যেন মদ না খায়, নেশাভাঙ না করে, আজেবাজে জিনিস না খায়, এমনকি এখানকার জলও নয়। খনিজ জলের বোতল রাখা আছে ঘরে ঘরে। খেয়েদেয়ে সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ুন। শরীর খারাপ করলে চলবে না। কালকের জন্যে চাঙ্গা থাকতে হবে সবাইকে।

    অতনু দেখল দূরে বসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসছে শেফালি। বাতাসে ঝাঁক বেঁধে উড়ছে ওর খোঁপার ফুলের সুগন্ধ। একেই বোধহয় মথিত হওয়া বলে।

    কম মশলা দেয়া মাংস, সেদ্ধ সবুজ সব্জি, লেটুস বিট গাজরের স্যালাড, আটা আর বেসনের রুটি, ভাত আর পুডিং। পাশে-বসা অসীম পোদ্দারকে অতনু, ‘ওই তো একরত্তি মেয়ে’, বলে প্রশ্নবাচক হতে চাইলে, অসীম বলে উঠল, একরত্তিদের হ্যাণ্ডল করে বেশ তৃপ্তি। ’ তারপর অতনুকে দেখে বিস্মিত, আর গলা নামিয়ে, ‘কেমন আছে জুডি-জুলি ? সুখে আছে তো ওরা ?’

    পরিষ্কার হয়ে যায় এবার, কার নির্দেশে তাকে ইংচুগার খরিদনারীদের আড্ডায় তোলা হয়েছিল। অতনুর বুকের কাছে মাথা এনে আপ্রাণ ঘ্রাণের পর অসীম পোদ্দার, ‘এখনও স্বর্গের গন্ধ যায়নি আপনার গা থেকে। কোনোদিন যাবে না দেখবেন। ওটাই তো আনন্দ, কী বলেন !’

    অতনু থ। অভিজ্ঞতার অংশীদার আড়াল থেকে এভাবে বেরিয়ে এলে নিজের অভিমানবোধ ওকে খেলো করে। নানা উপাদেয় রান্নার স্মৃতির দরুণ সেদ্ধ খাবার মনে হচ্ছিল জোলো।

    কাল সকাল আটটায় ব্রেকফাস্ট আর ন’টায় সবাইকে গাড়িবারান্দায় পৌঁছতে হবে। জানিয়ে চলে গেল রবীন দত্ত। আঁচাবার সময় অশোক চোপড়াকে জিগ্যেস করেছিল অতনু, ‘আজকে কার ঘরে শোবে শেফালি ?’

    ‘আজকে ? কেন ? আজকে ও একলাই শোবে !’ অশোক চোপড়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সুশীল, সে জানিয়ে দিল ওপর-পড়া হয়ে।

    বরাদ্দ ঘরটায় পৌঁছে অতনু নিজের অভিজ্ঞতার অভাবের সঙ্গে পরিচিত হয় আবার। একটা পায়জামা ধুতি বা লুঙ্গি আনা উচিত ছিল। আনেনি। জামা কাপড় খুলে উলঙ্গ শুয়ে পড়ল অগত্যা চাদর ঢাকা দিয়ে। শুয়ে-শুয়ে ভাবছিল, এতো ফুর্তিফার্তা নেশাভাঙ হই-হুল্লোড়ের ঘন-ঘন খরচ কোথা থেকে জোগায় সবাই ! মাইনে কি বাড়িতে দিতে হয় না একটুও ?

    তন্দ্রার মধ্যে অতনু টের পাচ্ছিল, বাইরে, দ্রুতলয়ে ঝিঁঝির ডাক অন্ধকারকে ফেনিয়ে তুলছে।

    সকালে স্নান করে ডাইনিং হলে হ্যালো-হাই, ব্রেকফাস্ট করছে, নিজের সঙ্গে নিজে নিঃশব্দ মন্ত্রণা করতে-করতে চলে যাচ্ছে। টেবিলে তখন পুলক, মামুদ জোহের, কমলেশ আর দেবেন্দর। পোচ টোস্ট কলা কফি। টু বোধহয় খেয়ে চলে গেছে কিংবা আসেনি এখনও। ভিড়ে কথা বলাবলি কম। দু’একজন হলে কথা বলার সুবিধে। এতকাল ধরে বজায় রাখা দূরত্বে কী কথাই বা কার সঙ্গে বলবে ! কোন বিষয়ে ? খেলা ? বিহারের রাজনীতি ? বিজ্ঞান ? মেয়েমানুষ ? অফিস ? ইউনিয়ান ? মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ?

    খেয়ে নিল চুপচাপ, মুখ নিচু করে।

    বাইরে, পোর্টিকো থেকে এগিয়ে, গেটের কাছে হলুদ কল্কে ফুলের ভেতরে সেঁদিয়ে কারিগর মৌমাছিরা তখন কারচুপির গুঞ্জন চালাচ্ছে। অতনু দেখল অ্যামবাসাডর গাড়িগুলো ভরে গেছে। ভ্যানে ড্রাইভারের সিটে আত্মমগ্ন মামুদ জোহের। অনেকে ম্যাটাডরের পেছনে ; অতনুও বসল তাতে। বাড়ির ভেতর থেকে রবীন দত্ত আর টু বেরিয়ে আসতে সবকটা গাড়ি থেকে শেফালিকে আবদার জানানো হল তাদের গাড়িতে বসার জন্য। শেফালি মামুদ জোহেরের পাশে গিয়ে বসতে, রবীন দত্তও উঠল তাতে। স্টার্ট দ্যায় গাড়িগুলো।

    রাস্তার দু’পাশে কচিসবুজ কচিমেরুন পাতার ঠাণ্ডা বাতাস। একটু পরেই রোদের তাত আরম্ভ করবে ধুলো ওড়ানো। কচু খেতে জল দিচ্ছে কৃষক। ফসল কেটে তুলে নিয়ে যাবার পর সোনালি গোড়া। সেচের অভাবে মাঠের পার মাঠ তেপান্তর। বাবলা গাছের কাঁটাঢ্যাঙা ঝাঁকড়া। দূরে, পোড়ামাটির ছাপ্পর-ছাওয়া গ্রাম। সবকিছু কত উদাসীন, যেন গৌতম বুদ্ধের পরের সময়কার উদাসীনতা থেকে মুক্তি পায়নি উন্মুক্ত প্রান্তর। যৌথ সন্ত্রাস, জাত-ঘৃণা আর পার্থিব মালিকানার নিষ্ঠুর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কত চুপচাপ লুকিয়ে রেখেছে নিসর্গ। ঠাণ্ডা মাটির দেয়ালে অন্ধকারাচ্ছন্ন হেলান দিয়ে আছে বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়ের মতন প্রায় সব বাড়িতেই দাঁড়িয়ে আছে তরতাজা ভালা বরছি গঁড়াসা কুঠার গাদাবন্দুক পেতলসোঁটা।

    পৌঁছে গেল ওরা নালান্দার ধ্বংসাবশেষে। বোধের অতীত মনে হল অতনুর। যিশুখ্রিস্টের পাঁচশো বছর আগে জায়গাটা ছিল বৌদ্ধ মহাবিহার, চিন তিব্বত ইরাক সিরিয়া মধ্য এশিয়া থেকে দশ হাজার ছাত্র এসে পড়ত এখানে ; আর দু’হাজার শিক্ষক ছিল, বিশাল গ্রন্হাগার ছিল। জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর, গৌতম বুদ্ধ, নাগার্জুন, কতো জ্ঞানীগুণী এসেছেন এখানে। জায়গাটাকে দুর্গ মনে করে বখতিয়ার খিলজি ধ্বংস করে দিয়েছিল, গ্রন্হাগার পুড়িয়ে দিয়েছিল। বইয়ের ওপর শাসকদের এতো রাগ কেন কে জানে। বৌদ্ধধর্মের অবসানের সঙ্গে নালান্দার অবসান। আর আমরা তাদেরই উত্তরপুরুষ, শেফালিকে নিয়ে ফুর্তিফার্তা করব। অবিশ্বাস্য। কিন্তু কিছু করার নেই। দেখা যাক সবাই কী করে, ভাবল অতনু।

    গাড়িগুলো থেকে সবাই নেমে গাছের ছায়ায় দাঁড়ালো। কালো চশমায় শেফালি। কচি কলাপাতা অরগ্যাণ্ডি। কাঁধে লাল-সবুজ ঝোলা। পিঠে ছড়ানো আধভিজে এলোচুল।

    ‘আচ্ছা, যারা কালো, তারা বিদঘুটে পোশাক পরে কেন ?’ কন্ঠস্বর নামায় পুলক। আরও ফিসফিস কন্ঠে অশোক চোপড়া, ‘আমি আজ ওব্দি এত কালো মেয়েমানুষকে নেকেড দেখিনি। ওর মাইটা কেমন হবে, বোঁটা, তার চারিধারের গোল ? সেক্সের জন্যে নয়, জাস্ট দেখার জন্যে। ’

    সত্যি, জুলি-জুডির থেকে একেবারে আলাদা এই অজানা পৃথিবী। প্রেম আর পারভারশানে বোধহয় তফাত নেই। শেফালির ট্রেম।

    সকলে রবীন দত্তকে ঘিরে ধরলে আরম্ভ করে ইউনিয়ান নেতার বাঁধাগৎ-বক্তৃতা। ‘ফ্রেণ্ডস রোমানস কান্ট্রিমেন, লেণ্ড মি ইয়োর ইয়ার্স। ও ! জাজমেন্ট, দাও আর্ট ফ্লেড টু ব্রুটিশনেস, অ্যান্ড মেন হ্যাভ লস্ট দেয়ার রিজনস…শেফালি পাবে পাঁচ হাজার…যেজিতবে সে পাবে শেফালিকে আর দশ হাজার…বাদবাকি রাহা-খাওয়া…দেবেন্দর ওর চাকর চাকরানিকে হুকুম দিয়ে এসেছে একতা ঘরে ফুলশয্যা তৈরি করে রাখতে…যে জিতবে তার জন্যে…খরচের অ্যাকাউন্ট অডিট করে প্রমাণপত্র দেবে অশোক চোপড়া…শেফালি ধ্বংসাবশেষের মধ্যে চলে যাবার আধঘণ্টা পর যাবে বাকি সবাই…যে সবচেয়ে আগে শেফালিকে পাবে সে জিতবে…খুঁজে পেলে ওকে ধরে রাখতে হবে…এনে গাড়িতে অপেক্ষা করবে সবাই না ফেরা ওব্দি…ইচ্ছে করলে শেফালি যতবার ইচ্ছে হাত ছাড়িয়ে পালাতে পারে…যে একবার বাইরে বেরিয়ে আসবে সে ডিসকোয়ালিফায়েড…গুড লাক।’

    কেউ কাউ কছ থেকে সত্যিই খুঁটিয়ে দেখল শেফালিকে। টু-ও ঠোঁটের কোণে হাসি। যৌনতার চিটফাণ্ড তাকে গৌরবোজ্জ্বল করেছে। এক বৃদ্ধ ট্যুরিস্ট, গবেষকও হতে পারেন, দাঁড়িয়ে রবীন দত্তর বক্তৃতা শুনছিলেন, গজগজ করতে করতে চলে গেলেন সস্ত্রীক।

    কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে শেফালিও চলে গেল বৌদ্ধ মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষে, প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

    ভেতরে গিয়ে খিদে তেষ্টা পায় যদি, অনেকে কেনাকাটা করে নিচ্ছে। অতনু কিনল না কিছু। এতগুলো ছোকরা, কতক্ষণই বা লাগবে, ভিড়ও নেই বিশেষ। তার মানে শুধু একজনই পাচ্ছে মেয়েটাকে, বাদবাকি সকলের লোকসান। জিতলে অবশ্য যে জিতবে, তার অনেক। শেফালি বলেছিল হারজিত ছাড়া ভাবতে পারো না কিছু। হারজিত রয়েছে বলেই তো ভালো, মনে হল অতনুর, নয়তো এতগুলো ছেলে যদি একজন মেয়ের সঙ্গে সেক্স করে তাহলে তো মেয়েটা মারা পড়বে।

    ঘড়ি দেখে আধঘণ্টা পরা অতনুও ঢুকল সবায়ের সঙ্গে। ঢুকেই নরেন একদিকে আর প্রতুল আরেকদিকে দৌড়োলো বোঁ বোঁ, হয়তো ষড় করে ষাঁড়াশি অভিযান, টাকাটা ভাগ করে নেবে, বা একজন টাকা, একজন শেফালি। মামুদ জোহের শিবু পালিত দেবেন্দর প্রসাদ উঁচু জায়গাটায় বসল ঘাসের ওপর। বোধহয় ওদিক থেকে তাড়া খেয়ে এলে ধরবে এদিকে। কিংবা শেফালির সঙ্গে ট্রেম করা হয়ে গেছে বলে তেমন আগ্রহ নেই। বাকি সবাই গটগট, গুটিঘুটি, লম্বা পা ফেলে, এক-পা টগবগিয়ে, দুমদাম, হন্তদন্ত, হেলতে দুলতে, যে যেমন আঁক কষেছে গায়েব হয়ে গেল।

    অতনু দোটানায়, এর আগে দেখা হয়নি নালান্দার ধ্বংসাবশেষ, মগজের ভেতরে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা চোরপুলিশ খেলছে শেফালির সঙ্গে। খেলতে খেলতে দেখতে হবে, দেখতে দেখতে খুঁজতে হবে। পাথরের বালিশে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ানো একটা কিশোরী-গাছের ছায়ায় অতনু দেখছিল প্রাচীন ইঁটের গাঁথুনি, ছাত্রদের যাতায়াতের পধ, ইসকুলের পরিসর, ভিক্ষুদের ঘর, ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সিঁড়ি — সবই কেমন যেন উদ্দেশ্যহীন। ধ্বংসাবশেষের ঠিক কী উদ্দেশ্য হয় ? তারা কি জীবন পেয়ে যায় পর্যটকদের চাউনির মাধ্যমে, তাদের ছোঁয়ায় ! এখানকার বাতাসে, কই, তখনকার মহাজ্ঞানী শিক্ষকদের উপস্হিতি টের পাওয়া যাচ্ছে না তো ! নালান্দা সম্পর্কে একটা ট্যুরিস্ট বুকলেট কিনে নিলে কাজের কাজ হতো। গাড়িতে বসে শেফালি বুকে মুখ আর মাথা ঘষে ভাবনা গণ্ডোগোল করে দিয়েছে।

    কাছেপিঠে, দূরে, কোথাও কচি সবুজ শাড়িতে, দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না কাউকে, না শেফালি, না বকুল রজনীগন্ধা বেলি চামেলি টগর যুঁই। পর্যটক দলের তরুণীদের মুখের দিকে এভাবে তাকানো বেশ বিপজ্জনক।

    শিক্ষিকার সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের দল চলে গেল, বিদেশিনীদের বোঝাতে ব্যস্ত গাইড, জাপানি চেহারার ভিক্ষু গোষ্ঠী। ঘণ্টাখানেক কেটেছে। ওই তো, এ সেকশানের অনিমেষ। খোঁজা এখনও চলছে তার মানে। ওপরে উঠে বিহঙ্গম দৃশ্য নেয়া যাক ভেবে অতনু সিঁড়ি ভেঙে উঠে দেখল সুবীর জিরোচ্ছে। ‘আমার হাঁটু ব্যথা হয়ে গেছে, জল তেষ্টা পাচ্ছে, সারেনডার করে বসে আছি’, ভুরুর ওপরে বাঁ হাতের ছায়া ফেলে জানাল সুবীর।

    এক পাক ঘোরা হয়ে গেছে অতনুর। অনেকের সঙ্গে দু-বার তিন বার সাক্ষাৎ, যেন কেউ চেনেই না কাউকে। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সজল, চোখে বায়নাকুলার। কেয়ারি করা বেড়ার পাশে ঘাসে শুয়ে পুলক আর সুবীর। পাশ কাটিয়ে চলে গেল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য কমলেশ। কেবল টু নামের কালো মেয়েটির দেখা নেই। দেখাই পাওয়া যাচ্ছে না, ধরার, ধরে রাখার, ধরে সঙ্গে নিয়ে যাবার কথা তো পরে। এই রোখটাই তাহলে নেশা, একজন যুবতীকে অন্য পুরুষের কাছে হারাবার ভয়। বাঘ সিংহ হরিণ জেব্রা জিরাফ বনমহিষ হলে পুরুষরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করত, লড়ে মরে যেত, তবু জিততে হবে, জিততে হবে, জিততে হবে। ঘুমন্ত মাছের চোখে তীর মারার খেলা।

    এই নিয়ে অতনুর তিনবার পাক। রোদ্দুর তেজ দেখাচ্ছে। ক’টা বেজেছে কে জানে। বেশ খিদে। অবসন্ন অতনু খোঁজা ছেড়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়া যায়। অনেকে বেরিয়ে এসেছে ওর মতন, ঢুলছে গাড়িতে বা ভ্যানে বসে, কানে গানের ঠুলি। চারটে ডানা মেলে দেয়া অ্যামবাসাডর থেকে বেরিয়ে এলো রবীন দত্ত, ‘পেলে না তো ? ব্যাড লাক, বেটার নেক্সট টাইম। ও একেবারে খরগোশ, মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে পড়ে, তাই ওকে আমাদের এত পছন্দ। ডিকিতে লাঞ্চ প্যাকেট আর বিয়ার আছে।’ বেশ অপ্রস্তুত লাগছিল অতনুর। খেয়ে, ঘাসের ওপর চিৎ শুয়ে ঢুলতে মনোযোগ দ্যায়।

    সাড়ে চারটে নাগাদ শেফালির হাত শক্ত করে ধরে বেরিয়ে আসে অভিজিৎ, চেঁচাচ্ছে, ‘পেয়ে গেছি আমার হেলেন অফ টার, পেয়ে গেছি আমার হেলেন অফ টার, কোথায় একিলিস ইউলিসিস আগামেমনন !’ হতচকিত সবাই।

    অতনু দেখল, শেফালির পরণে কমলা-হলুদ সিল্ক, খোঁপা বাঁধা মাথায় ঘোমটা, মোটা কালো ফ্রেমের বাইফোকাল, পাউডারে ফর্সা মুখ, হাতে প্লাসটিকের ব্যাগ। ওঃ, একে তো অতনু দেখেছিল, খটকা লাগেনি শাড়ি চশমা ব্যাগে ভোল পালটাবে। নিশ্চিত ছিল। পেল না। শেফালি কি টার শব্দটার মানে জানে !

    ‘আরে, আমি ধরেছিলুম একবার ওকে, কিন্তু বোকা বানিয়ে ছাড়িয়ে পালিয়ে গেল। আমার কাছে জলের বোতল চেয়ে জল খাচ্ছিল, আমি ভাবলুম, আহা, তেষ্টা পেয়েছে মেয়েটার, ব্যাস পালালো’, বলতে বলতে গলা বুজে যাচ্ছিল কমলেশের।

    শেফালির চোখে রাশছাড়া অবিমৃষ্যকারিণীর আনমনা কৌতুক। ’

    –কী করে পেলি তুই ?

    –মেয়েদের পেচ্ছাপখানায় নজর রেখেছিলুম। তা সত্ত্বেও ফেল করেছিলুম একবার। লাল শাড়িতে ছিল। লাল গিয়ে যখন কমলা-হলুদ শাড়ির বুড়ি বেরোল, অমনি পেছু নিয়েছি। কিছুটা ফলো করে বুঝলুম সঙ্গে ন্যাওটা নেই। ও তো দৌড় দিলে। ধরে ফেললুম। এক ব্যাটা শিখ সরদার আরেকটু হলেই প্যাঁদাত। টু বাঁচাল।

    বেশ জোরে জোরে সংক্রামক অন্তরঙ্গ হাসি খেলাচ্ছিল নিজের আগাপাশতলা জুড়ে সতেজ মেয়েটা ; সকলেই ক্লান্ত, অথচ শেফালি ক্লান্ত নয়। ওর এই প্রাণপ্রাচুর্যের বখরা পাবার জন্যেই ওর ডাক পড়ে, তাহলে। অতনুর কাছে এসে, ‘কেমন হাঁদা গো তুমি, দু-বার তোমার সামনে দিয়ে এলুম গেলুম,’ বলতে-বলতে মুখমণ্ডলকে ম্লান করে ফ্যালে ও, অতনুর নতুনত্ব তাহলে কাম্য ছিল। হাতছাড়া হয়ে গেল অকপট স্ফূর্তির জীবন্ত গ্র্যানিট-প্রতিমা।

    ফেরার পর, রাত্তিরে, জমজমাট হল বুফে ভোজ। পোলাও নান সসেজ মেটে চিংড়ি দইবড়া হুইস্কি রাম জিন। রইরই। তেড়ে বিলিতি বাজনার ছটফটে হুল্লোড়। যেমন ইচ্ছে নাচের বেহিসেবি আপ্রাণ। দেবেন্দরের গ্রাম থেকে আনা সাত-আটজন বরগার খাটছে। কমিঅওটি প্রথায় এরা বংশপরম্পরায় বঁধুয়া মজুর। নইলে এতজন যুবকের সাধ-আহ্লাদের খেয়াল কেই বা রাখবে ! দাড়িঅলা ছেঁড়া-লুঙ্গি লোকটাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল কমিঅওটির হিন্দু-মুসলমান হয় না।

    অভিজিতের বগলদাবায় মেয়েটা। ঝাড়লন্ঠনে আন্তরিক নেশার ঝিকমিক। প্রত্যেকের খেয়াল নিজের হুঁশ নষ্ট করার দিকে, যেন কারোর আর কাউকে দরকার নেই। নাচবে কিনা সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় হাতে গেলাস নিয়ে আরেকটা চেয়ারে ঠ্যাং তুলে অতনু। টেবিলে ফেলে-রাখা কারোর একটা ডায়েরি, অন্যমনস্ক কয়েকপাতা উল্টে চুপসে গেল। অসীম পোদ্দারের। সাংকেতিক রোজনামচার ফাঁকে-ফাঁকে, প্রতি পৃষ্ঠায় লাল কালিএ ঠাসা ‘ওঁ হ্রীং রামকৃষ্ণায় নমঃ,’ অগণন নিভৃত মুহূর্তের জমাট অন্তরাল।

    অভিজিৎ-শেফালি এসে বসল অতনুর পাশে।

    অতনু : একদিন লুট করে নিয়ে যাব তোমায়, তোমার বাবা যেমন করেছিল।

    শেফালি : না বাবা, আমি অমন দারিদ্দির হতে চাই না। যদি অঢেল টাকা আনো তাহলে যাব।

    অভিজিৎ : আরে, আমার বদলে তুমিই নিয়ে যাওনা হে। আমি টাকাটা পেয়েই খুশ।

    শেফালি : এই অভিজিৎ লোকটা একদম ভেড়া। ওর কিসের ভয় জানো ? ও কোনও মেয়েমানুষের সঙ্গে এখনও ওইটা করেনি।

    অতনু : টু, খেয়েদেয়ে একটু মোটা হও। তবে তো আমার সংসার চালাতে পারবে।

    শেফালি : খাবার পয়সা কোথায় ! আনিসাবাদে এক কাঠা জমি কিনেছি। দুটো ঘর তুলতে হবে।

    অভিজিৎ : বাড়ি-ফাড়ি অতনু বানিয়ে দেবে তোমায়। ওর বাবার পুরো টাকাটা তো রয়েছে।

    শেফালি : সত্যি ?

    অতনু : তিন সত্যি।

    মদের ভাসমান ঘোরে, হাতে গেলাস, কখন খালি হয়ে গেছে তার হুঁশ নেই, বিহ্বল সংবেদনে চুর অতনু, প্রচণ্ড ডি. জে. বাজনার উদ্দামের মাঝে ঝিম মেরে বসে থাকে, আনন্দ নিচ্ছিল টুকরো-টাকরা আদানপ্রদানের।

    শেফালি : তোমার বাড়িটা কোন পাড়ায় গো ?

    অভিজিৎ : চালাকি নাকি। বলে দিই, তারপর তুমি এসে বাপ-মার হাটে হাঁড়ি ভেঙে ব্ল্যাকমেল করো। সেটি হচ্ছে না।

    দেবেন্দর : একে তো শালা ধানে উপজ ভালো হয়নি, তার ওপর মাওওয়াদি নকসল্লিগুলো দিককরা আরম্ভ করেছে। নিচু জাতের লোকেদের ভুনে মাটিয়ামেট না করলে পুরো দেশ ডুবে যাবে। কাংরেস কিচ্ছু করবে না।

    কমলেশ : আমি তো জানতুম শুধু অওরঙ্গাবাদ জেহানাবাদ নওয়াদা গয়াতেই দঙ্গাফসাদ। পলামুতেও পূঁছে গেছে ?

    অশোক : চন্দ্রকেতু সিং দশ হাজার টাকা খরচ করে আমেরিকান মাগিদের ঠুকে আসছে রজনীশ আশ্রমে ফি বছর একবার। বলছিল যে পেন্টাগন সিআইএ এমএনসিদের ঠুকছে মনে করে চাপে ফর্সা মাগিগুলোর ওপর। চলুন না, আসছে শীতে এক ট্রিপ মারি।

    সুশীল : তার চেয়ে ব্যাংকক চলুন না এল টি সি নিয়ে। থাইল্যাণ্ডের মতন ল্যাংটো কচি-কচি নধর মেয়েছেলের বাজার আর কোথাও নেই।

    নরেশ : তোর জন্যেই মিস করলুম। স্ট্র্যাটেজিটা ভুল ছকে ফেললি।

    প্রতুল : বা রে, আমি কী করব ! এমন বহুরূপী সাজবে তুই জানতিস ?

    সুবীর : জনি ওয়াকারের সঙ্গে চিড়াইয়াটারের ধেনো মিশিয়ে ককটেল করেছে দেবেন্দর। মজা কিরকিরা হয়ে গেল।

    শিবু : মজফফরপুর থেকে লিচুর মদ আনিয়েছি। গন্ধেতেই আমেজ এসে যায়। আসুন না একদিন বিকেলে, আমার ফ্ল্যাট আশিয়ানায়, চেনেন তো ?

    নাচ-গান-হুল্লোড় তুমুল। বাঁ দিকের কোনের পেল্লাই দরোজার কাছে, পাঁচ-সাতজনের তক্কাতক্কি, প্রায় হাতাহাতি, হাত ঝাঁকানো, মুণ্ডু ঘাড় থেকে এগিয়ে জিরাফি বক্তব্য, মাথা ঝাঁকানো। জটলায় কোমর দুলিয়ে ফুট কাটতে কাটতে অটোমোবিল ইনজিনিয়ার আর জিওলজি স্নাতকের রাগি চাপান-উতোর। হঠাৎ তার মাঝ থেকে মামুদ জোহের দ্রুত এসে ফাঁকা চেয়ারে বাঁ পা রেখে ডাইনিং টেবিলে উঠে পড়ে, চেঁচামেচির বেড়া ডিঙিয়ে আচমকা, প্যান্টের চেনবোতাম বাঁ হাতে দিয়ে টেনে খুলেই ঝপ করে জাঙিয়ে হীন চিৎকার, এই বে, কারা কারা জানতে চাইছিস মৌলবাদ কাকে বলে। ’

    নেশার গহীন মৌতাতে অতনু টের পায় বাজনা থেমে গেছে। নাচানাচি। স্তব্ধ। কথা কাটাকাটি কাহিল। পিনপতন স্তব্ধতায়, আরেকবার চেঁচিয়ে ওঠে কবেকার কোন পাঠানের বিহারি বংশধর, গয়া অওরঙ্গাবাদের মাঝামাঝি চালহো পাহাড়ার উপত্যকার ক্রুদ্ধ নগমাগড়ের মামুদ জোহের।

    –উড়িশসাঁটা, এ তো জৌনপুরের লালমূলা। শেফালির আন্তরিক উদ্গীরণে কেটে যায় অস্বস্তিকর স্তব্ধতা, ফিরে আসে বাজনার স্বাভাবিকতা, কথা বলাবলি, পানীয়ে চুমুক।

    মামুদ নামে টেবিল থেকে। একজন দু’জন করে নাচ আরম্ভ হয় আবার। যোগ দেয় অভিজিৎ শেফালি অতনু। চুর অতনি অবাক হয়, মেয়েটা বিদেশি নাচ জানে, নেচে দেখায় অতনু অভিজিৎকে। ডান হাত ধরে ঘুরে এসে ঝাপটে পড়ে অভিজিতের বুকে, আবার পাক খুলে ঘুরে দাঁড়ায়। অভিজিৎ ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে শেফালির সঙ্গে।

    আবোল-তাবোল নাচতে নাচতে একা-একাই, অতনুর দৈহিক আড়ষ্টতা খসে পড়তে থাকে, শেফালির উদ্দেশে ওথেলোর সংলাপ আরম্ভ করে, “ও, বিওয়্যার, মধ লর্ড, ওফ জিলাসি ; ইট ইজ দি গ্রিন আইড মনস্টার, হুইচ ডথ মক দি মিট ইট ফিডস ওন…” আর অভিভূত শেফালি অতনুকে জড়িয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলে, রবীন দত্ত্ এসে ছাড়ায় ওদের দুজনকে, ‘স্টপ ওথেলোইং উইথ দিস গার্ল।’

    ভিরু অভিজিতের কাঁধে ভর দিয়ে বিড় বিড় করতে করতে খাবার ঘর থেকে শেফালি বেরিয়ে গেলে, রবীন দত্ত আলতো স্বরে বলে অতনুকে, ‘তোমার কি মেয়েমানুষ চাই ? দেবেন্দর ব্যবস্হা করেছে।

    ‘মেয়েমানুষ ?’ কতবার কতজনের মুখে শোনা শব্দটা এই প্রথম সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হল অতনুর।

    ‘হ্যাঁ, দশ-বারোজন কমিঅওটি মেয়েছেলে এনে রেখেছে ওর গ্রাম থেকে, আমাদের জন্যে। ’

    রবীন দত্তর পেছন-পেছন গিয়ে অনুসন্ধিৎসু অতনু দেখল, একটা ঘরের মেঝেতে বসে চারজন গ্রাম্য বিহারি যুবতী এঁটো থালাগুলো থেকে উচ্ছিষ্ট নিয়ে কাগজে রেখে বেশ তৃপ্তি করে খাচ্ছে। ঘরের এক কোনে ঢাকা দেয়া কপমিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার। প্রিন্টআউট-নেয়া বাতিল কাগজে খাচ্ছে ওরা। এমন উদ্ভট জায়গায় কমপিউটার !

    –ওই মেয়েটাকে নিতে পারো, গা-গতর আর মুখচোখ ভালোই।

    জীবনে হয়তো কয়েকবার চান করেছে, নোংরা জামাকাপড়, চুল আঁচযায়নি কোনোদিন, কটারঙের উস্কোখুস্কো চুল। এর হাতে এখনও হয়তো ধানকাটার বিচুলির গন্ধ। পায়ের গোছে ধান মাড়াইয়ের কুঁড়ো লেপ্টে আছে এখনও, চুলের ফাঁকে শালপাতার টুকরো। একে ধর্ষণ করে থাকবে দেবেন্দরের পরিবারের সবকটা পুরুষ। এর মাকে কি দেবেন্দরের বাবা ধর্ষণ করেছিল ? কে জানে, হয়ত এই যুবতীই দেবেন্দরের বাবার ঔরসপ্রসূত।

    মেয়েটি অতনুর মুখের দিকে ম্লান চাহিদা নিয়ে তাকায়। পেট ভরে সুস্বাদু খাবার খেয়ে নিয়ে যাবার অনুনয়। যেতে অনিচ্ছুক নয়, হয়তো নরম গদির বিছানায় শুতে পাবে রাতভর।

    –এরকম নোংরা মেয়েমানুষ চলবে না। অতনু সত্যি কথা বলে। টলতে-টলতে নিজের বরাদ্দ ঘরে। মেয়েমানুষের সামনে তাহলে পুরুষের উদারতন্ত্র এভাবেই খসে পড়ে। মাতালেরও থাকে শ্রেণিচেতনা, অ্যাঁ ? এসব পালটাবে না কখনও। পালামৌয়ের লাতেহারে নকসল্লি মাও্ওয়াদিরা বনপার্টি বানিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এসব বোধহয় চলতে থাকবে, তাপ্পি-মারা আবহমান, সোভিয়েত দেশের মতন। নিজের সঙ্গে জোচ্চুরিও চলতে থাকবে প্রত্যেকের।

    পরের বারের খেলাটা হয়েছিল শোনপুর মেলার কার্তিক পূর্ণিমার দিন। পুরস্কার এক লাখ। যুবতীর প্রাপ্য পঞ্চাশ হাজার। রাজপুত বাড়ির বিবাহিতা তরুণী, ফর্সা, ভরাট বুক, ভারি পাছা– যৌনতা উদ্রেকের জন্যে নানা আঙ্গিকের রঙিন ফোটোর অ্যালবাম হাতে হাতে গোপনে ঘুরছিল অফিসের এ-বিভাগ সে-বিভাগ। রাজপুত বাড়ির বউ শুনে ভেঙে পড়েছিল তফসিলি যুবকের ভিড় এইবারের খেলায়। কে একজন গ্রিক সেনাপতি মগধ রাজ্যকে এক হাজার গ্রিক যুবতী উপহার দিয়েছিল, নসল বদলের জন্য। খেলার যুবতীর গায়ে হয়তো সেই গ্রিক যুবতীদের কারোর রক্ত বইছে। জিতলে গ্রিসের প্রতিটি মহাকাব্যের নায়িকাদের পাওয়া যাবে।

    মেলার হাজার হাজার মানুষের মধ্যে অফিসের বেশ কিছু উচ্চ-পদাধিকারীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেছে অতনুর। হাফ-কেরানি, কেরানি, ছোটো সায়েব, মেজো সায়েবের দল দাঁও লাগিয়েছিল, অথচ সকলেই সকলকে, হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে, বলেছে মেলা দেখতে এসেছিল, হাতি উট ঘোড়া মোষ বিক্রি, চটের পর্দা টাঙানো ল্যাঙটো ক্যাবারে, লোহার গোল অতিকায় নাগরদোলা, ছোটো কাঠের নাগরদোলা, সঙ, ম্যাজিক, নকল বিনুনি, চুড়ি, হিজড়ে, লউণ্ডা, ভুতঘর।

    অতনু জিততে পারেনি। শেফালি হলে চেষ্টা করত।

    জিতেছিল ডক্টর অসীম পোদ্দার।

    ওদের ফুলশয্যার ব্যবস্হা ছিল খড়বোঝাই পালতোলা নৌকোয়। রাজপুত যুবতীর পাশ থেকে উঠে কখন যে জলেতে শব্দহীন নেমে গিয়েছিল মাঝরাতের গঙ্গার শীতল অতলে, মাঝিরাও টের পায়নি। সাঁতার না-জানার আমোদ ওর পেট ফোলা লাশের ঠোঁটে আবিষ্কার করে পুলিশ। নৌকোয়, মেয়েটির শিয়রে যে ডঅয়রিটা রেখে গিয়েছিল অসীম পোদ্দার, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে রেখেছে, নামসই আর তারিখসুদ্দু, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ি নয়।’

    চন্দ্রকেতু সিং-এর দ্বিতীয় পক্ষের বউ ওই যুবতী পুরো দেড় লক্ষ টাকা নিয়ে গিয়ে দিয়েছিল হাসিমুখ চন্দ্রকেতুকে। দিয়ে ফিরে গেছে বালিয়ায় নিজের ধুলোসুনিবিড় গ্রামে।

     

    ছয়

    নালান্দা থেকে ফিরে জানা গিয়েছিল হরতাল তুলে নিয়েছে ইউনিয়ান, কেননা সমস্যাটা সার্বজনীন নয়। আর, বাঙালি একটা ডিভোর্সির জন্যে ধর্মঘটে প্রতিদিন এভাবে মাইনে কাটানোর মানে হয় না। রাজপুত কায়স্হ ব্রাহ্মণ কুরমি কোয়রি কাহার পাসি হাজাম দুসাধ ভূঁইয়া চামার সকলে একমত।

    প্রধানমন্ত্রির লাথি খেয়ে মুখ্যমন্ত্রীও পালটে গেছে। ধানবাদের কয়লা মাফিয়ার সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না মুখ্যমন্ত্রীর। নতুন মুখ্যমন্ত্রী রাজপুত। আগেরটা ছিল ব্রাহ্মণ। কয়লা মাফিয়ারা রাজপুত। দিল্লিতে ওদের ঘুঁটি এককালের যুবাতুর্কি ভিকিরি এখনকার কোটিপতি সাংসদ চন্দ্রশেখর। নতুন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছে এদের মাফিয়া বলা অনুচিত।

    কত মুখ্যমন্ত্রী এলো-গেলো, সবকিছুই যেমনকার তেমন। পাকাচুল হাফটেকো সুনীলরঞ্জন নাহাবিশ্বাস, কর্পোরেশানের ডাক্তার। ছাদের ওপর মাটি ফেলে বাগান করেছে। রঙিন ছাতার তলায় বেতের ধবধবে চেয়ার। শ্মশানগামী লাশের সংখ্যা, গয়া অওরঙগাবাদ জাহানাবাদ নওয়াদায় এমসিসি আর লিবারেশানের মাওবাদি বনপার্টির জলপাইরঙা বিপ্লবে, বেড়ে চলেছে প্রতিদিন। এই মাটির জীবনে খাপ খেয়ে গেছে নাহাবিশ্বাস, বাঙালি অট্টহাসির বদলে বিহারি ঠহাকা দিতে পারে, দ্যায়ও আহ্লাদে টইটুম্বুর হলে, লাশের সংখ্যা বাড়ছে দেখে।

    বাড়ির সব কাজ মায়ের থেকে নিজের হাতে নিয়ে নিতে পেরেছিল অতনু। মেছুয়াটুলির মাছের বাজার আর মুসল্লাপুর সবজিহাট থেকে, কুটনো কোটা, রান্না, বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট, কাপড় কাচা। মা বলেছিলেন, মাছ-মাংস এনে রাঁধতে পারিস, আমারটা না হয় অন্য বাসনে রেঁধে দিবি। অতনু তা করেনি। বাবার সময়ের পেতলের ধালাবাটি বেচে কিনেছে স্টেনলেস স্টিলের আর কাচের। গোদরেজ বুককেস আর আলমারি। রঙিন টিভি। সিডি-ডিভিডি প্লেয়ার কিনে দিয়েছে মাকে, বাংলা ফিল্মের ডিভিডি আর রবীন্দ্রসঙ্গীত-আধুনিক গানের সিডি। নিজের জন্য মোটর সাইকেল কিনেছে, বাজাজ পালসার।

    কিন্তু মানসী বর্মণের বাচ্চাটা, অল্পবিস্তর গণউৎসাহ সত্বেও বাঁচেনি। ঠিকই জন্মেছিল, যেমন বাচ্চারা পৃথিবীর দিকে মাথা করে বেরিয়ে আসে। পাটনা মেডিকাল কলেজের ডাক্তার লক্ষ্মী চ্যাটার্জি বাচ্চাটাকে উলটো টাঙিয়ে, ছাত্রছাত্রীদের বোঝাবার সময়, কাঁদাতে গেলে, হাত পিছলে মেটিতে। মানসী বর্মণের জ্ঞান ছিল না।

    কাছের লোকের সহানুভূতি দুঃখকে গভীর করে।

    অতনুর মা মারা গেলেন। রক্তচাপের ওষুধ খাওয়া গোপনে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নিঃসঙ্গতার আহ্বান করা হার্ট অ্যাটাক। বছর খানেকের বেশি হরেক রঙের ওষুধ পাওয়া গেল ওনার তোরঙ্গে। বোধহয় বাবার আত্নহত্যার প্রতিশোধ। বা, অতনুর স্বনির্ভর হওয়ায় নিজের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছিল। কিংবা বার্ধক্যের উদ্দেশ্যহীন ক্লান্তি। কেউ মাকে এসে খবর দিয়েছিল কি, তার আজকালকার চালচলন !

    বিহারে সব্বাই যেভাবে বাঁচতে চাইছে, তাইতে মিশতে চেয়েছে অতনু। বাঙালিরা যাকিছু খারাপ মনে করে, অথচ বিহারিরা করে না, তা কেন খারাপ মনে হবে অতনুর, বিহারে থেকে ? এখানেই তো মরা আর বাঁচা। পশ্চিমবাংলায় ওর কেউ নেই, কিছুই নেই, তাই নিজেকে প্রবাসী বাঙালি বলে চালাবার মানে হয় না। ঢাকা আর কলকাতা থেকে বহির্বাংলার দূরত্ব সমান।

    রোজ সাড়ে দশটায় অফিসে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে ভেকাভেজা হতদরিদ্র নিকষ বিষণ্ণ নোটের আমন্ত্রণ অতনুকে ছেয়ে ফ্যালে, ধূসর বিষাদমুখো নোটের ঢিবি আড়াল তোলে জানলার মুখরিত আলোয়, স্খলিত-বিগতযৌবনা নোটের ভেষজ অন্ধকূপে ও চাকরি করে চলে ভারাক্রান্ত, দিনের পর দিন, ম-ম করে ন্যাতানো শ্বাসরুদ্ধকর ছাতাপড়া সোঁদা-সোঁদা নোট। যেন ওৎ পেতে থাকে হাড়হাভাতে নোটেরা।

    অনেকদিন, অনেক অনেকদিন, আকাশে যখন ত্যাবড়ানো অ্যালুমিনিয়াম থালার চাঁদ, অতনু চেয়েছে এই নিরাভরণ কদাকার বিবর্ণ নোটের জাপট থেকে মুক্তি পেতে।

    আজকাল, বলতে গেলে, নিজের নতুন মোটরবাইকেই জীবনযাপন করে অতনু। বাড়ি ফিরে একা-একা রান্না, একা-একা খাওয়া, একা-একা টিভি, সিডিতে, পেনড্রাইভে হিন্দি আর ইংরেজি ফিল্ম, বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট, মশারিটাঙানো, বিদেশি গান কানের মিনিঠুলিতে। একা-একা খেতে বসাটা ভয়াবহ। সকালে অন্তত কাকাতুয়া দুটো সঙ্গে দেয়। ওরাও ছড়া আর গান গুলিয়ে ফ্যালে। অ্যানিমাল প্ল্যানেটে কিংবা ন্যাশানাল জিওগ্রাফিকে বাঘ সিংহ কুমির চিতা হায়েনার মাংস ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খাওয়াটা ভাত-ডাল-তরকারি খাবার সময়ে ভাল্লাগে না।

    ঘুমের মধ্যেই কখন, অজান্তে, মারা গিয়েছিলেন মা। চা বানিয়ে দিতে গিয়ে টের পেয়েছিল অতনু। কাকে বলবে, কাকে খবর দেবে, কী করবে এখন, চাপা গলায় অজস্র অনুত্তর ছেয়ে ফেলেছিল কিছিক্ষণ। মানসীকে খবর পাঠাবে ? শেফালির মতন চটপটে কেউ থাকত যদি। সুশান্ত থাকলে কথাই ছিল না। রসিক পাসওয়ানকে খবর দেবে ? শেষে মামুদ জোহেরকে টেলিফোনে জানালে ও অনেককে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ঘণ্টাখানেকে, দলের প্রকল্প অভিভাবক যেন, কে আনবে কাঁচা বাঁশের মাচান, পুরুত ডেকে আনবে, শ্রাদ্ধের ফর্দ নিয়ে কেনাকাটা, একজন আগেই চলে যাক গুলফিঘাট শ্মশানে। শ্মশানে যাবার মালপত্তর তুলে নিয়েছিল মামুদ, কিন্তু মুসলমান বলে যদি পরে কথা হয়, রেখে দিয়েছিল মাটিতে।

    বাঙালি পুরুত পাওয়া গেল না। সতীশ ঘোষাল বললেন, বুড়ো হয়ে গেছি, আর পারি না। শ্মশানের যেতে চায়নি অন্য বাঙালি পুরুতরা, যারা শ্মশানের কাজটা করে দিতে পারত ; বড্ডো হ্যাঙ্গাম, তেমন আয় দ্যাখে না পুজোআচ্চার মতন। তায় বিধবা, গায়ে তো গয়নাগাটিও থাকবে না। পাওয়া গিয়েছিল মৈথিলি পুরুত। অরিন্দম অবাক, বাঙালিদের তো এসব আচার নেই, মন্তরগুলোও অচেনা।

    বয়সের গাছপাথর নেই এমন পুরোনো শ্মশান। আলমগঞ্জ থেকে মাখানিয়া কুঁয়া অব্দি বিস্তৃত এলাকার কতো বাঙালি পরিবার ছাই হয়েছে এখানে, সেই কোম্পানির আমল থেকে, যারা সায়েবদের পেছন-পেছন এসেছিল, ম্যাকলে সায়েরবের শেখানো ইংরেজি লিখতে শিখে। মরে গেলে মানুষ এত ঠাণ্ডা হয়ে যায়, এমন বিসদৃশভাবে শক্ত, বাবা মারা গেলে ময়না তদন্তে সেলাই-করা ওনার শরীর ছুঁয়ে টের পায়নি অতনু। মায়ের মারা যাওয়াটা কেন যেন ব্যক্তিগত ক্ষতির মতন হাঁ-করা অভাব গড়ে দিয়েছে। শূন্যতা নয়, ভরাট বেদনা। একেই বোধ হয় শোক বলে। গভীরভাবে উদগ্রীব টিমটিমে গোপন পীড়া।

    সুশান্তর বাড়িতে খবর নেবার জন্য গিয়েছিল অতনু। রেলফাটকে, সঙ্গে মোটরবাইক থাকায়, একঘণ্টা কাবার। প্যাসেঞ্জারের লাগেজভ্যান থেকে চলছে লাশ নামানো, কাঁচা বাঁশের মাচানে কাতাদড়ি দিয়ে বাঁধাবাঁধি। লাশেরদের মুখ আগে থেকেই ব্যথায় কাতর। কাতাদড়িতে বাঁধার কষ্ট তবুও ফুটে উঠছে। কান্নাকাটি নেই শববাহকদের ; যা কাঁদবার কেঁদে নিয়ে থাকবে যে-যার নিজের গ্রামে। পুলিশের বিরক্তমুখ লোভী-হাত কেঠো-ব্যাটন তদারকি চলছে। সাসারামে দাঙ্গা হয়েছিল।

    সাসারামের নুরনগঞ্জ পাড়ার কাদা-প্যাচপেচে রাস্তায় স্কুটার স্কিড করে সাইকেল আরোহীকে ধাক্কা মারলে, দাঙ্গার আরম্ভ মদরসলামি পির মজারের দেখাশোনা করত বুড়ো ইউনুস শাহ আর জোয়ান জুমরাতি শাহ, তক্ষুনি খুন হয়েছিল। মাজারের বাইরে ফুল বেচত সলমা, সেও। মুহম্মদ হাফিজ, আবদুল সত্তার আর মুহম্মদ নাজিরের লাশ লোপাট। শহরের সবচেয়ে বড়ো দোকান মুহম্মদ ফিজুদ্দিনের লিবাসঘর পুড়ে ছাই। বদলা হিসেবে এই ট্রেনযাত্রী লাশ।

    সুশান্তর জ্যাঙামশায় বললেন, ‘আমাদের কিছু না বলে উনি গিসলেন জমির দখল নিতে, লেঠেল লাগাতে। নওগাছিয়ার কাজিকোইরা গ্রাম থেকে এক ব্যাটা মণ্ডল এসে জানিয়েছিল, সুসান্তকে ওরা কিডন্যাপ করেছে, আর দশ লাখ টাকা ফিরৌতি দিলে ছাড়া হবে। ’

    ফিরৌতি ? মানে, র‌্যানসাম ?

    হ্যাঁ, হ্যাঁ। অতো টাকা কোথায় পাবো আমরা ? জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা করেছিলুম। শুধু আশ্বাস। কেউ কিচ্ছু করলে না।

    সুশান্ত ভালো আছে তো ?

    ভালো আছে মানে ? তারিণী মণ্ডল নাকি নিজের চোদ্দ বছরের মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এই ক্রিমিনাল মণ্ডলগুলো আদিতে বাঙালি ছিল ; লেঠেল হয়ে এসেছিল কোম্পানির আমলে। সুশান্ত বাঙালি জানতে পেরে বন্দুক পাহারায় জোর করে বিয়ে দিয়ে জামাই করে নিয়েছে, বিহারে যেমন হয় আকছার, জামাই দখল।

    চোদ্দ বছরের মেয়ে ?

    ওদের বন্দুকধারি লোক জিপগাড়িতে এসে জানিয়ে গেছে, গোপালপুর, ফলকিয়া, পরবত্তা, ডিমহা, কেলওয়ারি, তিনহেংগা, আর কহলগাঁও-এর অনাদিপুর, আভাপুর, আর অঠগম্মা দিয়ারায় এখন সুশান্তর রাজত্ব।

    রাজত্ব ! মানে ?

    মানে আবার কী ! ভিড়ে গেছে ক্রিমিনালগুলোর দলে। আর কি ফিরতে পারবে কখনও ? দিয়ারার বাইরে বেরোলে পুলিশ ওর পোঁদের চামড়া তুলে নেবে।

    অতনু টের পাচ্ছিল, হাসিখুশি একান্নবর্তী পরিবারটা পালটে ফেলেছে বাড়ির আবহাওয়া, কেননা তাদের বাড়ির ছেলে তোয়াক্কা করেনি পারিবারিক যৌথ সাধআহ্লাদ, দাবি-দাওয়া, স্বপ্ন-কল্পনা। একান্নবর্তী পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলে কি দশ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারত না ! চেষ্টা করতে কী ছিল ; সুশান্তর অফিস থেকে চাঁদা তুলে কিছু জোগাড় হতো। বাকিটা ওনারা দিতেন।

    তারিণী মণ্ডলরা এককালে বাঙালি ছিল ! সুশান্ত যদি ওভাবে মিসে যেতে পারে তাহলে ওর ঝুঁকি নিশ্চই শ্রদ্ধেয়। চোদ্দ বছরের গ্রাম্য অশিক্ষিত, বাংলা জানে না এমন একটি মেয়ের সঙ্গে ও কী করে কে জানে ! তরুণী হয়ে উঠতেও তো বছর দুয়েক। খালি গায়ে গলায় তাবিজ খাটো ধুতি ধরেছে কি ? ফ্যান নেই, লাইট নেই, টিভি নেই, ওর প্রিয় বিদেশি গান শোনার সুযোগ নেই। কীভাবে থাকে, সময় কাটায়, কী খায় ? জলের ওয়াটার ফিলটার নেই। কিসের জন্যে সবকিছু ছেড়েছুড়ে ঢুকে গেল অমন অচেনা সমাজে ? বাড়িতে বলেনি, অথচ মৌলিনাথকে বলেছিল।

    অফিসে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে, দেখা হলে, মৌলিনাথ বলে উঠল, ‘কী অতনু, রেণ্ডিবাজি করে ইনটেলেকচুয়াল হবার তালে আছেন নাকি ?’

    ‘আপনি তো দাস ক্যাপিতালের মলাট লাগিয়ে ফ্যানি হিল পড়তেন অফিসে বসে, উরুর ওপর উরু রেখে। ’ অতনুর আকস্মিক ঠারে চুপসে যায় মৌলিনাথ।

    মানসী বর্মণ ডেকে পাঠিয়েছিল আপনাকে। যাবেন বলে আর দেখা করতে যাননি। বাচ্চাটা মরে গেল। সহানুভূতির জন্যে অন্তত যাওয়া উচিত ছিল। নেশাফেশা বেশি করবেন না অতনু, রোগে ধরলে কে দেখবে।

    ঠিকাছে, যাব। অনেকক্ষণ ধরে হিসি চেপে আছি।

    কে দেখবে, জানতে চাইল মৌলিনাথ ! দেখাদেখির দরকার হয় কি ? একা মরে পড়ে থাকলেও দুর্গন্ধের দায়ে পড়াপড়শিরা ছুটে আসবে গতি করার জন্য ; পুলিশে নিয়ে গিয়ে পোড়াবে। কাউকেই কেউ দেখে না, সবই আপনা থেকে ঘটে যায়। মায়ের মারা যাবার সময় যেমন মামুদ জোহের ঘটে গেল।

    অফিসের চতুর্থ-তৃতীয় শ্রেণির কর্মিদের টয়লেটের বালব-টিউব মেরে দিয়েছে ঝাড়ুদাররা। পেতলের কল, সিংকের ধাতব পাইপ চুরি হবার পর এখন লেগেছে পিভিসি প্লাসটিক। জল বেয়ে মেঝেতে শ্যাওলা। দরোজার হাতল বার-বার চুরি হয় বলে পাটের দড়ি দিয়ে বাঁধা। ডোর-ক্লোজার কাজ করে না বহুকাল। দেয়ালজুড়ে পরস্পরবিরোধী ইউনিয়নের হরেকরঙা পোস্টার। টয়লেটে যৌনসংকেত লিখনের দিন বোধহয় শেষ ; সমাজ উন্নত হয়ে চলেছে, তার লক্ষণ। কোনে-কোনে খাপচা-খাপচা পানের আর তামাকের পিক গয়ের থুতু শিকনি। রাঘব বদলি হয়ে যাবার পর দুস্হ হয়ে গেছে এই বিশাল অট্টালিকা। জানলার নোংরা কাচের বাইরে, চোদ্দ বছরের ছাগলচরানি বালিকার মতন রোঁয়া ওড়াচ্ছিল শিমুল।

    সন্ধ্যাবেলা মানসী বর্মণের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজিয়ে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পর ফিরে যাবে কিনা ভাবছে যখন অতনু, দরোজা খুলতেই ধুপকাঠির গন্ধ আর মানসী, রোগাটে, চুলে ববকাট, ফ্রিল দেয়া হলুদ ব্লাউজ, তাঁতের ফিকে হলুদ শাড়ি। কই, দুঃখ কষ্টের ছাপ, মৌলিনাথ বলেছিল, পেলো না অতনু, মানসীর চেহারায় আচরণে, ঘরের আসবাবে।

    আরে, অতনু !

    ফিকে হাসল অতনু। আমি ভাবলুম এখনও ওপরতলার আগরওয়ালের নেকনজর এড়াতে খুলতে চাইছেন না।

    ও ব্যাটা বিদেয় হয়েছে এই বিল্ডিং থেকে। পুজো করছিলুম, তাই দেরি হল।

    পুজো ? আপনি পুজো করেন বুঝি ? জানতুম না।

    কেন ? ঠাকুর-দেবতা মানো না। বোসো না, দাঁড়িয়ে রইলে কেন !

    ভাগ্য ভালো যে আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি কিনা জানতে চাননি। মা মারা যাবার পর ঠাকুর-দেবতাদের তোরঙ্গে বন্দি করে রেখেছি। একদিন গিয়ে গঙ্গা ব্রিজ থেকে বিসর্জন দেবো।

    ছিঃ, অমন বলে না। কতো বিপজ্জনক চাকরি, কখন কী হয় তার ঠিক আছে ? ভগবানে বিশ্বাস রাখতে হয়।

    এসব কী এখানে ?

    সেন্টার টেবিলে রাখা ছিল তুলো, সাইকেল রিকশার ভেঁপুর মতন কাঁচে লাগানো রবারের হর্ন, স্টেনলেস স্টিলের বাটিতে কয়েক চামচ দুধ, মসৃণ প্লাস্টিকের গোলাপি হাতলে ডিম্বাকার আয়না। মানসী বর্মণের দপ করে রং পালটানো মুখশ্রী দেখে অতনু টের পায় যে প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। শাড়ির আঁচল সরায় মানসী। ব্লাউজে ছড়িয়ে-পড়ে দুই বৃন্তকে ঘিরে দুধের ভিজে ছোপ দেখে অতনু নির্বাক।

    কী করি ? ডাক্তার বলেছে পাম্প করে বের করে দিতে, নইলে ক্যানসার হতে পারে, বলল মানসী।

    স্তনবৃন্ত দেখে উতরোল অতনু জিগ্যেস করল, রোজ পাম্প করতে হয় ?

    দু’বেলা। দাঁড়াও, চা বসাই। আগের বার নে খায়েই চলে গিসলে। টোস্ট খাবে ? চানাচুর ?

    মানসী রান্নাঘরে ঢুকতেই, ঘোর-লাগা অতনু টুক করে খেয়ে ফ্যালে বাটির দুধ। সোঁদা আচ্ছন্ন করা গন্ধ, সারা শরীর জুড়ে শিহরণ খেলে যায়, শিশুর আহ্লাদ বয়ে যায় দেহের আগাপাশতলা।

    অনভিপ্রেত আকস্মিকতায় থ, ও, মানসী, ‘পাগল না মাথাখারাপ, ওঃ, সত্যি, ওফ, কোন জগতের জীব তুমি ?’ অন্য ঘরে চলে যায় আর ফেরে বেশ কিছুক্ষণ অতনুকে বসিয়ে রেখে, লালপেড়ে গরদ, কপালে বিশাল লাল টিপ, হাতে রেকসিনের ঢাউস ব্যাগ, রাখে, অতনুর পায়ের কাছে, ‘তালশাঁসের গন্ধ পাচ্ছ না’, জানতে চায়।

    না, চারিদিকে কেমন মিষ্টি দুধ-দুধ গন্ধ। বাচ্চাটা নষ্ট হল আপনার মন খারাপ হয়নি ?

    এখন আমি জানি আমার পেটে বাচ্চা হতে পারে, বলার সময়ে ময়ূরের গলার মতন হয়ে উঠল মানসীর গর্ব, অদৃশ্য পেখম লাল গরদের শাড়িতে। বলল, তোমার কথা বল। অনেক কানাঘুষা শুনি।

    যা শোনেন সবই সত্যি। নিজের লাম্পট্যের সংবাদকে অতিরঞ্জন দেবার চেষ্টা করল অতনু।

    সত্যি ?

    অতনু বুঝতে পারল সত্যি কথা আশা করেনি মানসী, তাই অন্য প্রসঙ্গে চলে যায় সুশ্রী যুবতী, ‘আমার এই ব্যাগটা তোমার কাছে রেখে দিও, অ্যাঁ, কিছু দরকারি কাগজপত্র আছে, আমি কিছু দিনের জন্যে ওরসলিগঞ্জ যাচ্ছি।

    ওয়ারিস আলি গঞ্জ ? ও তো মারাত্মক জায়গা, মুসহররা থাকে, সতযুগ মানঝি, ঝাড়ুদার, রাঘবের পেছন-পেছন চাবির থলেগুলো নিয়ে ঝনঝনিয়ে ঘুরতো, ও তো ওখানকার। ইঁদুর পুড়িয়ে খায়।

    ইঁদুর রোস্ট করে বা রেঁধে তো অনেক দেশেই খায়। ওতে আবার খারাপ কিসের, আরশুলা, উচ্চিংড়ে, কুকুর, বেরাল, সাপ, ফড়িং, গুটিপোকা সবই খায় মানুষ। আমরা খাই না, তাতে কি ! আসলে ওরা একঘরে হয়ে থেকে গেছে উঁচু জাতের লোকগুলোর চাপে। কুচ্ছিত অবস্হা। কবে যে অবস্হা বদলাবে, কে জানে !

    ওরা তো বিয়ে করে আর ছাড়ে। করেই না অনেক সময়। সতযুগ মানঝির কতগুলো ছেলেমেয়ে ও নিজেই জানে না। কিন্তু আপনি অমন একটা জায়গায় যাচ্ছেনই বা কেন ? প্রশ্ন করে অতনুর মনে হল ওইটুকু দুধ খাবার দরুণই এরকম একটা ব্যক্তিগত কথা জিগ্যেস করার অধিকার পেয়ে গেছে ও। দুধের সম্পর্ক গড়ে ফেলেছে।

    আমার এক নিকটাত্মীয় ওখানকার গান্ধী আশ্রমে মুসহরদের উন্নতির জন্য কাজ করেন।

    তাই বুঝি ? দুধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সুতোয় টান পড়ল অতনুর।

    হ্যাঁ। দ্বারভাঙ্গা কালীবাড়ি যাচ্ছি, তুমি যাবে ?

    চলুন। ব্যাগটা উঠিয়ে নিল অতনু। ভাগ্যিস মোটরসাইকেল আনেনি।

    রিকশয়, ঠেসাঠেসি, দুধের মোহক গন্ধ পায় অতনু। রাস্তায় এতো গর্ত যে শক্ত করে হ্যাণ্ডল ধরে না থাকলে, ছিটকে পড়তে হবে মুখ থুবড়ে। রাজেন্দ্রনগর, মেছুয়াটুলি, মাখানিয়া কুঁয়া, হয়ে অশোক রাজপথে পড়ে। তারপর বাঁ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা বিলডিঙের গলি। চত্বরের ভেতরে গঙ্গার তীরে মন্দির। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে মন্দিরের সিড়ির লাগোয়া ছিল গঙ্গা, এখন সরে গেছে অনেকটা। দ্বারভাঙ্গা বিলডিঙে ঢোকার মুখে গলিপথের দুপাশে মেডিকাল কলেজের যৌনরোগ চর্মরোগের বিভাগ। খুঁটিতে বাঁধা গোরু, হয়তো কোনো ডাক্তারের।

    ছাত্র ইউনিয়ানের নির্বাচনের সময়ে যে পাম গাছটায় বেঁধে অরবিন্দ অবস্হির মাথায় লোমনাশক লাগানো হয়েছিল, গাছটা এখনও তেমনি ঠায়। ইউনিয়ানের নির্বাচনে এখন আর অমন নিরীহ আক্রমণ হয় না, ছুরি-ছোরা তমঞ্চা-কাট্টা নিয়ে হয়।

    অন্ধকারে প্রাচীন মন্দির, কালচে ধরেছে দেয়ালে, পায়রা চামচিকে অবাধ, ফুল-পচা বেলপাতা শুকনো, রেড়ির তেলের গুমো গন্ধ। শাদা ধবধবে চুনকাম করা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মন্দির হলে বোধহয় শ্রদ্ধাভক্তি কমে যায়। মন্দিরে ঢোকার মুখে অতিগরিব ভিকিরি আর গরিব জুতোরক্ষক। জল-স্যাঁতসেতে পাথরের ঠাণ্ডা মেঝে। সিঁদুরমাখা হাড়িকাঠ, কখনও ছাগবলি হতো। পাকাদাড়ি প্রায়ান্ধকার বুড়োদের আদুলগা জটলা। ঝাঁপতোলা ঘোমটায় বিহারি বউ।

    ‘খুব জাগ্রত দেবতা, এই মন্দিরের ঘণ্টা আপনা থেকে বাজে, রাত আটটায়’, জানায় মানসী।

    অতনু উত্তর দ্যায় না ; বহুদিন ও আর সহপাঠীরা রাত নটা-দশটা পর্যন্ত গঙ্গার ঘাটে বসে আড্ডা মেরেছে। মন্দিরের দরোজা বন্ধ হবার পর কে যে ঘণ্টা বাজায়, জানে ও। চেয়ে-চেয়ে ও দেখছিল নিরন্তন পরিপূর্ণতায় উপচে-পড়া নর্দমা, কুলুঙ্গির মধ্যে শ্যাওলাপোশাক ঈশ্বরদের দুর্বল ভঙ্গি, নিরীহমুখ দেবতা, দালানে শুয়ে নিজের কুঁই-কুঁই উপলব্ধিকে প্রকাশে মশগুল কুকুর। একশো বছর আগে শেয়ালরা আসত, তাদের কাজ চালাচ্ছে শহুরে কুকুরেরা।

    ‘খুব জাগ্রত, মাথায় জবাফুল রাখার পর যদি পড়ে না-যায়, তাহলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়,’ মানসী বোঝাল।

    আপনার ফুল পড়ে, না থাকে ? মেঝেয় রেক্সিনের ব্যাগটা রাখতে-রাখতে জানতে চাইল অতনু।

    পড়ে যাবে কেন ? থাকে। একবারও পড়েনি আজ ওব্দি।

    বাচ্চাটার স্বাস্হ্যের জন্যে কি মানত করেছিল মানসী বর্মণ ? কে জানে, জিগ্যেস করা উচিত হবে না, তার প্রাপ্যের দুতিন ঝিনুক দুধ তো ও নিজেই খেয়ে নিয়েছে।

    অন্ধকারে রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে কয়েকশো বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছেন এককালের দ্বারভাঙ্গা মহারাজের পারিবারিক কালীপ্রতিমা। বোধ হয় দুধে-চিনিতে চান করানো হয় তাই মাথার ওপর ফুল রাখলে তা আটকে যায়। দর্শনার্থীরা একের পর এক ফুল চাপিয়ে, পুরুতকে টাকা দিয়ে, মনস্কামনা পুরো করার আগাম মিটিয়ে চলে যাচ্ছে। মানসী ব্লাউজ থেকে ভাঁজ করা টাকা বের করে পুরুতকে দিল, হাত জোড় করে দেখে নিল প্রতিমার মাথার ওপর ফুল। অতনু দেখল নোটটা বুকের দুধে ভেজা।

    তুমি চাও না কিছু। দ্যাখো না। হয়তো ঝট করে অফিসার হয়ে যাবে।

    একটা করকরে নতুন নোট দিল অতনু, প্যাকেট থেকে তাসের মতন টেনে বের করে। পুরুত অভ্যস্ত হাসিমুখে ফুল চাপাল প্রতিমার মাথার ওপর। তক্ষুনি পড়ে গেল ফুলটা। মানসী গম্ভীর। গম্ভীর কাঁচুমাচু পুরুত। অতনু আবার প্যাকেট থেকে টেনে নতুন নোট দিল। পুরুত খোঁজাখুঁজি শেষে বাছে এমন ফুল যাতে পড়ে না যায়, বেশ কিছুক্ষণ প্রতিমার মাথায় ঠিক মতন গুছিয়ে রেখা হাত সরিয়ে নিল। পড়ে গেল ফুলটা। দর্শকদের গুঞ্জন আরম্ভ হয়ে গেছে অতনুকে ঘিরে। তিনবার ফুল চড়ানো যায় জানালো এক প্রৌঢ় গৃহস্হ। অতনু আবার দিল করকরে নতুন টাকা। পুরুতের থাত থরথর। ফুল পড়ে যায়। ভিড় জমতে থাকে অতনুকে ঘিরে। মানসীর ঠাণ্ডা অথচ ঘেমো হাত ধরে বাইরে আসে অতনু, হাঁটে গলিপথ ধরে দুজনে, চুপচাপ।

    এই কাঁপুনির সঙ্গে পরিচয় আছে অতনুর। জুলি-জুডির সঙ্গে বসবাস করে জেনে ফেলেছে যুবতী দেহে অরগ্যাজমের ঢেউয়ের কথা। মানসী বর্মণের অরগ্যাজম ঘটে গেল তিনবার ফুল পড়ে যাবার ঘটনায়। নারীর মানসিক দেহের রহস্য এখনও অতনুর কাছে অধরা, নিজেকে নিঃশব্দে বলল অতনু।

    প্রাঞ্জল রাজপথে পৌঁছে, যে-যার বাড়ি যাওয়াই, কোনো কথা না বলে, উচিত মনে করে। নভেলটি বুক ডিপোর বহুতল বাড়িটার কাছ থেকে রিকশয় তুলে দিল মানসীকে। রিকশয় চাপার আগে ওব্দি, ওর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল মানসী, নিয়ন্ত্রণহীন। এমনকি হ্যালোজেন আলোয়, আবছা বেজে উঠছিল পায়ের মল। ওর কাঁপুনিতে কেমন যেন লুকিয়ে রেখেছে গোপন তথ্য, যেন অতনুর দুধ খেয়ে নেওয়া আর ফুল পড়ে যাবার মধ্যে দিয়ে সেই গর্হিত গোপনে পৌঁছে দিয়েছে কালীপ্রতিমার বোবা বার্তা।

    অতনু বোধ করছিল এক গোপন আনন্দ। বিজয়প্রাপ্তির গরিমা ছেয়ে ফেলছিল ওকে। অতনুকে দেখে ছুটন্ত ট্রাকগুলোর চক্ষুস্হির। খাজাঞ্চি রোডের মোড় থেকে পাটনা-সাহেবগামী অশোক রাজপথের অবস্হা ভালো নয়। পাটনা কলেজের সামনে রাজপথের মাঝখানে বিশাল গাছ, অশথ্থ গাছ কোথাও গজিয়ে গেলে কাটে না কেউ, কেন তা জানে না অতনু। রাজপথ খোঁদলে ছয়লাপ, প্রতি বৃষ্টিতে খোঁদলের ভাইবোনের সংখ্যা বেড়ে যায়। ওরা মিউনিসিপাল কর্পোরেশানের অবৈধ সন্তান। এগলি-ওগলি কোনো আগাম না জানিয়ে ঢুকে পড়েছে রাজপথে, এমন সদালাপী অন্ধকার। উষ্মাপ্রকাশে সদাব্যস্ত ডিজেল ধোঁয়া।

    অমনভাবে না কাঁপলে, কী এক অচেনা নির্বাক থরথরে আটক রহস্য, বাড়ি ওব্দি পৌঁছে দেবার প্রস্তাব দিত অতনু, দুধের গন্ধে মেশানো মানসীর পারফিউমের সুগন্ধের আয়ত্বাধীন রিকশয় পাশাপাশি বসে যেতে মানসীর ফ্ল্যাটে। আধুনিকতা নামের বিহারি কালখণ্দে সেঁদিয়ে, মানসী বর্মণের ঠিক কোথায় চিড় ধরেছে, আর কেনই বা, ঠাহর করতে পারছিল না অতনু।

    মায়ের ওষুধবড়ি আর ক্যাপসুলগুলো দিয়েছিল সামনের বাড়ির পদমদেও সিনহার ছোটো ছেলেটাকে, চেয়েছিল স্কুলের প্রোজেক্ট বানাতে চায় জানিয়ে, ও সেগুলো দিয়ে গণেশঠাকুরের মূর্তি তৈরি করেছিল কালো কাগজে ফেভিকল দিয়ে সেঁটে-সেঁটে। সেইন্ট জেভিয়ার স্কুল তার জন্য ওকে বেস্ট প্রজেক্টের পুরস্কার দিয়েছে, দেখিয়েছিল এনে। পুরস্কারের তুলনায় প্রজেক্টটাই মনে ধরেছিল অতনুর।

    নানা অগোছালো ভাবনা মগজে জেঁকে আসে, ঝরে পড়তে থাকে ছবির মতন। টি কে ঘোষ স্কুলের মোড় থেকে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে, কীই বা করবে বাড়ি গিয়ে, হাঁটাই যাক। মহেন্দ্রু মোহোল্লা, ওর বাড়ি, বেশি দূরে নয়। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, বিজ্ঞান কলেজ পেরিয়ে এগোয়। ব্যাগটায় কী আছে কে জানে ! দলিল-টলিল বোধহয়। মেঘলা রাতের গোলাপি আকাশ। সোঁদা গন্ধ উড়ছে বাতাসে। গান্ধি ময়দানে আরম্ভ হয়ে গিয়ে থাকবে বৃষ্টির অঝোর, শান্তি ফিরে আসছে বাতাসের আলোয়।

    কড়কড়াৎ শব্দ, চিড় ধরে গেল আকাশে। একাধ ফোঁটা টুপটাপের পরেই, অতর্কিত ঝমঝমাঝম। ভেজা যাক খানিক। কাঁধ কুঁচকে, প্যান্টের দু’পকেটে হাত ঢুকিয়ে, কনুইতে ঝুলছে রেক্সিনের ব্যাগটা, যদিও ওজন বোধহয় তিন কিলোটাক হবে, বাড়ি পৌঁছে, তালা খুলতেই, কাকাতুয়া দুটোর স্বাগতম শোনা যায়। বৃষ্টির তুমুলতায় বিদ্যুৎ সম্পর্কে একটা চাপা অহংকার ভাব। ব্যাগটা বেডরুমের খাটের তলায় ঠেলে দিয়ে, জানলা খুলে, জামা কাপড় ছাড়তে-ছাড়তে অতনু দেখল, পদমদেওবাবুর বাড়িতে ঢোল বাজিয়ে কীর্তন চলছে। শৈশব থেকে এই সমস্ত ধার্মিক জগঝম্প সয়ে গেছে ওর। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, দেয়ালে টাঙানো ওষুধবড়ির ফ্রেমে বাঁধানো গণেশঠাকুরের পায়ের কাছে ধুপ গোঁজা। রাজা রবি বর্মার আঁকা হলে হয়তো গণেশঠাকুরের হাঁচি পেতো ধোঁয়ায়, এ তো ওষুধবড়ির দেবতা, হাঁচি-কাশির ওষুধবড়িও আছে হয়তো ওগুলোর মধ্যে।

    রান্না চাপাতে ইচ্ছে করছিল না। একটা ছোটো চরসের নরম সিগারেট তামাক মিশিয়ে টানতে-টানতে এসে যায় ঘুমনেশার আচ্ছন্নতা। তন্দ্রার শিথিল আহ্লাদে, মন কেমন করে ওঠে সুশান্তর জন্য। ভিনভাষী পঞ্চদশীর বুককে আদরযোগ্য করে তুলছে হয়তো বৃষ্টির নিরপেক্ষ হৃদয়হীনতায়, উপভোগ আর দুর্ভোগে ভাগাভাগি-করা দিয়ারা তীরের গ্রামীণ অন্ধকারে।

    আচ্ছন্নতায় ভেসে ওঠে মানসী বর্মণের বৃষ্টি ভেজা চুলের ঝাপট। জানলার কপাট বন্ধ করে বৃষ্টির ঝাপট সামলায় অতনু।

    অফিস যাবার সময়ে পদমদেওবাবুর ছেলেকে কাকাতুয়া দুটো নিয়ে গিয়ে দিল অতনু, কাকাতুয়া দুটো ছেলেটার সঙ্গে পরিচিত। কাল রাতে ওরা রামশীলা পুজনের কীর্তন গাইছিল। রামশিলা মানে একটা নতুন থানইঁট, লাল রঙের গামছার ওপরে রাখা। পদমদেওবাবুর বও মাথায় করে নিয়ে যাবে ইস্টিশান ওব্দি, তারপর সেখান থেকে রামভগতরা নিয়ে যাবে অযোধ্যা।

    কাকাতুয়াদুটো পেয়ে যাওয়ায় ওদের রামশিলা প্রোগ্রামে ভাটা পড়ল বোধহয়, কেননা ওদের দেখাশোনার জন্য বাড়িতে কাউকে থাকতে হবে সব সময়।

    ধান ইঁট পুজো নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়ে গেছে অনেক শহরে, কসবায়। নাথনগরের তনৌনি, সিমরিয়া, বিন্দু, বেলদরটোল গ্রামে চারশোজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। চান্দেরির কুয়ো আর পুকুরগুলো ভেপসে উঠচে ফ্যাকাশে চোখখোলা লাশে, জলে এলোচুল ভাসিয়েছে মৃত যুবতী আর প্রৌঢ়ারা। কহলগাঁও গ্রামের ধনৌরা গ্রামে বিশাল উচ্ছৃঙ্খল ভিড়কে ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালিয়েছে সি আর পি। অন্ধকারে গচ্ছিত-রাখা বোমা-বারুদ নেমে পড়েছে চৌখণ্ডি, মণ্ডই, ভারতীগঞ্জ, কিল, বভনটোলার পথে-পথে। পাটনাতে থমথমে ভাবটা টের পাওয়া যাচ্ছিল না।

    অসীম পোদ্দার মারা যাবার পর দলের মধ্যে, সবাই এককাট্টা হলেই, টিমটিমে শোক ছেয়ে ধরে। অফিস বিলডিঙের পেছনের গলিতে তাড়ির দোকানটায় বসে ভাঁড় হাতে কেঁদে ফ্যালে কেউ-কেউ। অতনুর মনে হয় তাকে বাদ দিয়ে সমস্তকিছুই অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিকতা বাদ দিয়ে চলতে পারেনা বিহার, অজাতশত্রু-অশোকের এই রাজ্য, বিহার, পাটলিপুত্রের হিংসা-দ্বেষ রয়ে গেছে উড়ন্ত হৈমন্তী বাতাসে। কংগ্রেসের রাজত্ব শেষ। যাদব-কুর্মি-দলিত-মহাদলিতের জটপাকানো রাজত্ব আরম্ভ হয়ে গেছে। অফিসের ইউনিয়ান আগেই চলে গেছে যাদব কব্জায়, চলছে ছিনাঝপটি। যাদব, মুসলমান, তফসিলী কর্মীরা একদিকে। ছেঁড়া-পচা নোটবদলের যে কাউন্টারটায় দালালদের কাছ থেকে উপরি সবচেয়ে মোটা, তাতে ম্যানেজমেন্ট পালা করে বসায় যাদব মুসলমান তপসিলি। ট্যুরে যায় যে ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা, সেই বিভাগের পোস্টিং-এর জাতনির্ভর কোটা মেনে নিয়েছে অফিস-প্রসাসন। প্রায়ই অফিস গেটের বাইরে, সুলভ শৌচালয়-নিঃসৃত গ্যাসবাতিতে রক্তারক্তি ঘটছে।

    অফিসের মধ্যেই কারোর-কারোর পিঠে পিস্তল ঠেকানো হয়, দিশি তামাঞ্চা বা কাট্টা। বাইরে বেরোলে একচোট দেখে নেবার প্রস্তাব।

    বাঁকহীন চলে যাচ্ছে অতনুর জীবনপ্রবাহ। ব্রিটেনে আমেরিকায় একটা নোটের আয়ু সাত মাস ; নোটের ত্বক শ্বেতাঙ্গ থেকে কৃষ্ণাঙ্গ হলেই তার জীবন ফুরিয়ে যায়। এখানে তা তিন-চার বছর ; ফর্সা থেকে ধূসর থেকে কালো থেকে কুচকুচে হওয়া পযর্ন্ত ধুঁকিয়ে-ধুঁকিয়ে বেঁচে থাকে। অতনু সেই আয়ুকে কমাতে সাহায্য করে। নতুন চুল্লি বলে নোট পোড়াবার ধুম লেগেছে। শোনা যাচ্ছে চুল্লিব্যবস্হা বিদেয় করে শ্রেডার আনা হবে, কাগজের মণ্ড তৈরি করে তা থেকে আবার কাগজ তৈরি হবে।

    মোটর সাইকেলের পিলিয়নে বসে অরিন্দম একদিন অতনুর ফাঁকা বাড়িতে অফিসফেরতা এসেছিল, দু-ফুঁক চরস খাবার গোপন সদিচ্ছা নিয়ে। পাকানো সিগারেটে তামাক মিশেল দিয়ে বেশ কয়েকফুঁক টেনে ঘণ্টা দুয়েক এমন নিয়ন্ত্রণহীন হেসেছিল অরিন্দম যে, মনে হচ্ছিল আবার বুঝি ঘটল মগজের বেগড়বাঁই।

    ‘জানেন তো মানসী বর্মণ রিজাইন করে চলে গেছেন ওরসলিগঞ্জের গান্ধি আশ্রমে কাজ করার জন্যে,’ নেশাচ্ছন্ন অরিন্দম, বিছানায়, পাশবালিশ টেনে, বলেছিল।

    –চলে গেছে ? কবে ? জানি না তো !

    –আপনি এমন বলছেন যেন আপনার অনুমতি নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।

    –হ্যাঁ। খবরটা শুনে ভেতরে-ভেতরে খারাপ লাগল। কবে গেছে ?

    –গত মাসের পনেরো তারিখে। উনি বলেছিলেন জানাজানি না করতে।

    –ওয়ারিস আলি গঞ্জ তো নওয়াদার মারাত্মক জায়গা। মুসহররা থাকে। বিনোদ মিশ্রর নকশালদের মাওওয়াদি বনপার্টির গঢ়। একজন সুন্দরী আধুনিকা থাকবে কী করে সেখানে গিয়ে ! ওরকম জায়গায় গান্ধি আশ্রম করেটাই বা কী ?

    –আশ্রম পরিচালক ওনার স্বামী।

    –স্বামী ? মানসী তো ডিভোর্সি !

    –সব বানানো গল্প। লোক দেখানো। ওনার স্বামী এমবিবিএস ডাক্তার, বোধহয় বিলেত থেকে পাশ করা সার্জেন। ডাক্তারি করেন আর দলিত-মহাদলিতদের লোকেদের মধ্যে বিপ্লবের প্রচার। ওষুধ কেনার জন্য ভদ্রলোক পাটনায় আসতেন মাঝেমধ্যে, হয়তো ওনাদের গোপন মিটিঙের জন্যেও। বাচ্চাটা ওনারই। ননীদারাও গেছেন মানসী বর্মণের সঙ্গে, ওখানেই থাকবেন, বুড়ো বয়সে মুসলমান মেয়ে বিয়ে করে পাটনায় থাকলে গণ্ডগোল পোয়াতে হতে পারে, তাই ননীদা চলে গেলেন। ওখানে কেউ অত খোঁজখবর করবে না পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে। আর, গান্ধি আশ্রম বলে কিছুই নেই ওখানে। আছে ডাক্তারখানা। মাওওয়াদি কমিউনিস্ট সেন্টারের ক্রান্তিকারী কিষাণ সমিতির অফিস ওটা। গান্ধি আশ্রমের একটা সাইনবোর্ড অবশ্য আছে বলে শুনেছি।

    –আপনি কী করে এত সব জানলেন ?

    –উনি চলে যাবার পর জানতে পারলুম রসিক পাসওয়ানের কাছ থেকে।

    অতনুর মনখারাপ হয়ে যায়। পৃথিবীর কাজকারবার থেকে তাকে সত্যিই বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর অরিন্দম যা বলে তাতে ওর মনে হয় ক্রমশ একলা হয়ে যাওয়াই ভবিতব্য।

    –আমি তো মিউচু৮য়াল করে কলকাতা চলে যাচ্ছি।

    অতনু তখন ভাবতে আরম্ভ করেছে, বছর সাতেক আগে পাটনার রাস্তায় এক শোকযাত্রা, বিপ্লবী ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা বালমুকুন্দ রাহি আর চন্দ্রদেও যাদবের গলাকাটা মৃতদেহ নিয়ে মিছিল। ক্রান্তিকারী কিষাণ সমিতি তখন জমিদারি উচ্ছেদ শুরু করেছে, অপরাধী জোতদারদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে জনআদালত, ভূমিহীনদের পাইয়ে দিচ্ছে জমিজমা। তখন, কানাই চ্যাটার্জি, অমূল্য সেনের মৃত্যুর পর, বিহারিত্বে পালটে গেছে বিপ্লব। ভাষার ক্ষমতাও যে এভাবে হস্তান্তরিত হতে পারে তা তখন আর এখনও ভাবেনি বাঙালিরা, যারা হয়তো বেশিদিন আর থাকতে চাইবে না বিহারের মাটি কামড়ে।

    –বুঝলেন অতনু, কলকাতায় চলে যাচ্ছি।

    –কিন্তু কেন ?

    –এখানে থাকা যায় না। ওখানে গিয়ে ফ্ল্যাট-ট্যাট কিনব, দরকার হলে বিয়ে-ফিয়ে করব। এখানে থাকতে হলে হতে হবে সুশান্তর মতন ট্যাঁশ রাজা বাহদুর, নয়তো মানসী বর্মণের মতন বিপ্লবী, নয়তো আপনার মতন ইয়ে…

    –রেণ্ডিবাজ ? ছাপোষা জীবন বেশ কঠিন এখানে তাই না ?

    –কলকাতার লাইফই আলাদা ; টাটকাতাজা ফিলিং পাওয়া যায়।

    অরিন্দম চলে গেল বদলি হয়ে। রাঘব-রমা তো আগে থাকতেই রয়েছে কলকাতায়। যারা কলকাতায় চলে যায় তাদের সম্পর্কে আর কোনো খবর পাওয়া যায় না ; পাওয়া যায় যখন তারা খাপ খাওয়াতে না পেরে পাটকায় ফিরে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদের গালমন্দ করে। অথচ বিহারের অনধিগম্য গ্রাম থেকেও নানা খবর আসে লোকমুখে। সুশান্ত নাকি নতুন বীজ আর খেতি আর্মভ করে উপজ বাড়িয়ে ফেলেছে, দিয়ারার জমি আর পড়ে থাকে না ; সরকারকে লেখালিখি করে পাকা রাস্তা, খাবার জল আর বিজলি আনিয়েছে নিজের এলাকা পর্যন্ত। আংরেজিতে লেখালিখি করলে সরকার নড়েচড়ে বসে।

    দলিত-মহাদলিত ছেলেমেয়েদের অক্ষরজ্ঞান দিতে দেখা গেছে মানসী বর্মণকে, গয়া জাহানাবাদ অওরঙ্গাবাদ নওয়াদার গ্রামে, বনপার্টির বন্দুকধারী যুবক-যুবতী থাকে ওনার পাহারায়। ননীদা সাইকেলে এ-গ্রাম সে-গ্রাম করে টাকমাথায় ভিজে গামছা বেঁধে।

    মাসকতক পরে অফিসে একদিন কি হ্যাঙ্গাম, বিপদসংকেতের পাগলা ঘণ্টি। বিপদ আপদ সন্ত্রাস ডাকাতি সামলাবার জন্যে অফিসে নানা জায়গায় অ্যালার্ম ঘণ্টির বোতাম লুকোনো আছে। কাঁচের ঢাকনি ভেঙে বোতাম টিপলে সারা অট্টালিকা জুড়ে অবিরাম বাজতে থাকে মাথা-ধরানো পাগলা ঘনহতি। ন-মাসে ছ-মাসে একবার করে মহড়া হয়। বহুক্ষণ বাজছিল বলে আশঙ্কা করা গেল যে আজকেরটা রিহার্সাল নয়, আসল। বাইরে বেরোবার আর ঢোকবার শাটার গেট দরোজা বন্ধ হয়ে গেল দ্রুত, তাক করে বসে গেল বন্ধুকধারী সরকারি সেপাইরা, স্যুট-টাই পরা কর্তাদের হন-হন গট-গট, চেয়ার থেকে মুণ্ডু বের করে হাফ-কেরানি আর কেরানিদের কচাল। ঘণ্টাখানেক পর অলক্লিয়ার ঘণ্টি বাজলে জানা যায় ব্যাপারটা। একজন অফিসার, যিনি জোড়াতালি দেয়া নোট একটা-একটা করে পাস করেন, তিনি বাজিয়েছিলেন।

    ছেঁড়া-জোড়াতালি নোটবদলের কেরানির খাঁচার পেছনে ওই অফিসারের টেবিল। পাবলিক-দালালরা নোটের লট দ্যায় কেরানিকে। কেরানি নিজের খাতায় নথি করে দ্যায় অফিসারকে। তক্ষুণি বদলযোগ্য হলে অফিসার নোটের ওপর সই-তারিখ দিয়ে পাঠান হাফ-কেরানির কাউণ্টারে। সেখানে টোকেন দেখিবে নতুন নোট পেয়ে যায় পাবলিক। এই দুটো কাউণ্টারে বসার জন্য তুমুল হয় কর্মীমহলে।

    অফিসার আপন মনে জোড়াতালি নোট পাস করছিলেন প্রতিদিনের ঘানির বলদের ঢঙে। আচমকা একটা নোট হাতে নিয়ে তিনি স্তম্ভিত। নোটটা তিনি নিজেই বছরখানেক আগে ছাপ সই-তারিখ দিয়ে পাস করেছিলেন। এটা তো পুড়ে নষ্ট হয়ে যাবার কথা। বাজারে গেল কী ভাবে ! তার মানে পোড়াবার চুল্লিতে পৌঁছোবার আগেই মাঝপথে মেরে দিয়েছে কেউ। কোনও কর্মী নিশ্চয়ই করেছে কাজটা। একটা যখন সরিয়েছে তখন আরও অনেক সরিয়েছে নির্ঘাৎ। তার মানে অন্তত এক বছর যাবত চলছে চুরিচামারি। তার মানে একজন মাত্র নয়, অনেকে জড়িয়ে আছে, কেননা নোটটা তো নানা ধাপ হয়ে পুড়তে যায়, সেই ধাপগুলোয় যারা আছে তাদেরও হাত আছে। মগজের ভেতরে দ্রুত ছবি গড়ে উঠছিল ওনার ; তাঁর পাস করা নোট বলে আরও বেশি আতঙ্কিত বোধ করছিলেন অফিসার। যে লোকটা নোটটা দিয়েছিল, ধরতে হবে তাকেই, তাকে ধরলে পুরো সুতোর গোলাটা বের হয়ে আসবে। ভয়া গলা শুকিয়ে যায় ওনার। কপালে বিনবিনে ঘাম। পেপারওয়েট দিয়ে কাঁচের ঢাকা ভেঙে বাজিয়ে দিলেন পাগলা ঘণ্টি। খদ্দেরটা ছিল ঘোড়েল। নজর রেখেছিল। পাগলা ঘণ্টির প্রথম রেশটা উঠতেই হাওয়া।

    পুলিশে খবর দেয়া হল।

    ওই নোটটা যেদিন পুড়ে যাবার কথা, সেদিন কাদের ডিউটি ছিল চুল্লিতে, তাদের নাম রেজিস্টার থেকে বের করে, প্রথমে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মীর বাড়ি হানা দিয়ে পুলিশ আরও কিছু অমন নোট পেল। তাকে উত্তম-মধ্যম আদরের পর পুলিশ জানতে পারল চুল্লির জানালা দিয়ে মুণ্ডু ঢুকিয়ে, চুল্লির আগুনে ফেলবার বদলে, নিজের গেঞ্জির ভেতরে ঢুকিয়ে নিত প্যাকেট। ছ্যাঁদা-করা নোটের প্যাকেট হলে বদলে নিত নোট পরীক্ষক অসীম পোদ্দারের কাছ থেকে। নিজের সেকশানে আস্ত প্যাকেটের সঙ্গে ছ্যাঁদা-করা নোটের প্যাকেট পালটে নিত অসীম। কারোর সন্দেহ হতো না, কারণ আস্ত নোট ছ্যাঁদা করানোর কাজটা অসীমেরই ছিল।

    অসীমের বন্ধুবান্ধবদের একে-একে জেরা করা আরম্ভ হল। মৃত অসীম সম্পর্কে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল ওর দলের সবাই। দাশগুপ্ত মারা গিয়ে যা দিয়ে গেছেন, সেটাই তো যথেষ্ট ছিল, তবে ? অতনুরও জেরা হল।

    –আপনার নাম অতনু চক্রবর্তী ?

    –হ্যাঁ।

    –মহেন্দ্রু মোহোল্লায় থাকেন ?

    –হ্যাঁ।

    –নিজেদের বাড়ি ?

    –হ্যাঁ।

    –বাবা-মা কেউ নেই ?

    –হ্যাঁ।

    –বাবা মারা যাওয়ায় চাকরি পান ?

    –হ্যাঁ।

    –বাবার প্রভিডেন্ট ফাণ্ড গ্র্যাচুইটির টাকা স্টেট ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটে জমা আছে ?

    –হ্যাঁ।

    –একটু-আধটু নেশা করেন ?

    –হ্যাঁ।

    –অসীম পোদ্দারের সঙ্গে নালান্দা আর শোনপুর মেলায় গিয়েছিলেন ?

    –হ্যাঁ।

    –একটু-আধটু মাগিবাজি করেন ?

    –হ্যাঁ।

    –জুয়া খেলেননি তো কখনও ? তাস, ঘোড়দৌড় ?

    –হ্যাঁ।

    –বিয়ে করেননি কেন ?

    –প্রস্তাব আসেনি।

    –রান্নাবান্না নিজেই করেন ?

    –হ্যাঁ।

    –নোট না গুণেই পোড়াতে পাঠান ?

    –হ্যাঁ।

    –ঠিক আছে, যেতে পারেন।

    বাড়ি পৌঁছে, খাটের তলা থেকে মানসী বর্মণের দেয়া রেকসিনের ব্যাগটা টেনে ধুলো ঝেড়ে, জিপ খুলতেই অতনু স্তম্ভিত। ঠাইক যা অনুমান করেছিল। অগোছালো নোটে ঠাসা। আস্ত নোটের ভেতরে গোঁজা অসীম পোদ্দারের ডায়েরি। পাতার পর পাতা মানসী বর্মণকে লেখা প্রেমপত্র। যৌনরোগ বা যৌনস্বেচ্ছাচার থেকে পাওয়া রোগ আর সারবে না, তাই শেষ প্রেমপত্র লিখেছে, জানিয়েছে শেষ চিঠিটায়।

    অতনুর অজান্তে তাকে বিসদৃশ ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে দিয়েছে সবাই, খেলা করেছে ওর ইনোসেন্স নিয়ে। ওর কাঁধের ওপর একটা ব্যথা উঠে কোমর বেয়ে পায়ের গোছে নেমে যায়। বুকের তীব্র ঢিপঢিপে অসুবিধে হয় শ্বাস নিতে।

    কীভাবে গতি করবে এই রহস্যেঘেরা দায়িত্বের ? কীই বা উদ্দেশ্য ? মায়ের ছোটো-ছোটো ঠাকুরদেবতা এর মধ্যে পুরে গঙ্গা ব্রিজ থেকে ফেলে দেয়া যায় নদীতে। সুশান্তর কাছে চলে যাওয়া যায় ফিরৌতির টাকা দিতে। আনিসাবাদে বাড়ি উঠে যেতে পারে শেফালির। প্রয়োজনীয় অস্ত্র যোগাড় হয়ে যাবে রসিক পাসওয়ানের। ছোটোখাটো গ্রামীণ হাসপাতাল হতে পারে ওয়ারিস আলি গঞ্জে। আজীবন সুখে থাকা যায় জুলি-জুডির সঙ্গে। এতগুলো বিকল্প থেকে যে-কোনো একটা বেছে নেয়া শক্ত।

    দুশ্চিন্তা, তাও অহেতুক, অন্যের চাপানো, কাহিল করে রাখে অতনুকে রাতভর।

    ভোরবেলা, প্রথম বাস ধরার জন্যে, ধুতি-পাঞ্জাবি-চটিতে রূপান্তরিত অতনু, ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে, রিকশ চাপে, বাঁকিপুরে দূরপাল্লাগামী বাস ডিপোর উদ্দেশে।

    কোনও একটা, যে-কোনও একটা, বিকল্পগুলোর মধ্যে থেকে বেছে নিতে হবে।

    ———————————————————————————————————————————————

    ( পরের পর্ব আছে ‘জলাঞ্জলি’ উপন্যাসে )

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৯:০০734725
  • মলয় রায়চৌধুরীর গল্প : উংলি

    --ব্যাস ! দুমিনিটেই রোগি পরীক্ষা হয়ে গেল ?

    --হ্যাঁ, উনি তো তবু নুনু আর পোঁদ ভালো করে দেখলেন, আগের ডাক্তার নিতিন ধাবালিয়া তো কিছুই এগজামিন করেনি ; ঘসঘস করে প্রেসক্রিপশান লিখে বলে দিল পেচ্ছাপের ফ্লো-চার্ট আনতে, রক্তের পিএসএ রিপোর্ট আনতে, আর ক্যানসারাস গ্রোথ হয়েছে কিনা জানার জন্য ডক্টর সুমন্ত ব্যানার্জির ক্লিনিকে গিয়ে একটা টেস্ট করিয়ে আনতে। ডক্টর ব্যানার্জি বললেন, নিডলটা আপনার অ্যানাসের ভেতর থেকে এলিমেন্ট আনার সময়ে ব্লিডিং হতে পারে, মেডিকাল ইনশিওরেন্স করিয়ে তারপর আসুন। তুমি তো জানোই, তোমার সামনেই তো ডক্টর ব্যানার্জি উপদেশ দিয়ে সাতশো টাকা ফিস নিয়ে নিলেন। ডোনেশান দিয়ে ডাক্তারি পড়েছে যত চুতিয়ার দল, এখন টাকাগুলো রিকভার করে চলেছে।

    --আস্তে বলো, শুনতে পাবে অন্য পেশেন্টরা।

    --শুনতে পেলে ওদের ভালোই লাগবে, মনে-মনে ওরাও এইসব কথাই আউড়ে চলেছে। মধ্যবিত্ত কুন্ঠায় মুখে আনতে পারে না, এই যা।

    --সেসব তো ঠিক আছে। ইনি কী করলেন ? দুঘণ্টা অপেক্ষা করে, তারপর নম্বর এলো, ব্যাস দুমিনিটে পরীক্ষা হয়ে গেল ! মহিলা ইউরোলজিস্ট তো এর আগে দেখিনি বাবা। মহিলাকে দেখাবার জন্যে বুড়োদের লাইন লেগে গেছে। বসার জায়গাও নেই।

    --নন্দিনী দেবরায়ের ভালো পশার ; ঠকান না, তাই রোগিদের লাইন।

    --ভালো হলেই ভালো। কী করে চেক করলেন, পর্দা টেনে দিলেন বলে দেখতে পেলুম না।

    --উনি সার্জিকাল গ্লোভস পরে তর্জনীতে কী একটা মলম লাগিয়ে পোঁদের মধ্যে ঢুকিয়ে ফিল নেবার জন্য আঙুলটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখলেন, এমন ঘোরাচ্ছিলেন যে আরেকটু হলেই পেচ্ছাপ করে ফেলতুম। তারপর চিৎ হতে বলে নুনু বিচি উল্টেপাল্টে দেখলেন, তলপেট টেপাটিপি করলেন ; বললেন, ওকে, উঠে বসুন। আন্ডারউইয়ার দেখে বললেন, এটা তো রাজনৈতিক দলের পতাকা বলে মনে হচ্ছে।

    --শশশ, শুনতে পাবে লোকে। রাজনৈতিক দলের পতাকা আবার কোথায়, তোমার জামাই-ই তো এনে দিয়েছিল দুবাই বেড়াতে গিয়ে, রাজনৈতিক দলের পতাকার সঙ্গে রঙের মিল আছে, সে যাহোক।

    --আরে, শুনবে তো কী হয়েছে ? সবকটা বুড়োর পোঁদেই আঙুল করবেন আর তাদের নুনু-বিচি উল্টেপাল্টে দেখবেন। অনেকে তো বোধহয় সেকেন্ড টাইম এসেছে, দেখছ না প্লাসটিকের প্যাকেটে রিপোর্ট-টিপোর্ট নিয়ে বসে-বসে গোমড়ামুখে হাই তুলছে।

    --তোমাদের বুড়োদের অমন ছুঁড়ি ডাক্তার না হলে রোগ সারে না। তাও যেচে হাগার জায়গায় আঙুল করতে দেয়া। কী যে রোগ ধরিয়েছ। ডাক্তারগুলোও ভাবছে বুড়োগুলোর কাছে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা গচ্ছিত রয়েছে, তা থেকে দুয়ে নিই।

    --ছুঁড়ি আবার কোথায়। পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ বয়স হবে। চেহারা মেইনটেইন করছেন, বাড়িতে হয়তো জিম-টিম আছে ওনাদের।

    --কত ফিস নিল জানো ?

    --কত ?

    --এক হাজার টাকা।

    --এক হাজার ? বাপরে, আমাকে তো মিস্টার ঘোষ বলেছিলেন পাঁচশো টাকা ফিস।

    --পাঁচশো টাকা রিপিট ভিজিটের জন্য। রিসেপশানিস্ট বলল, রিপোর্ট দেখাবার সময়ে ফিস দিতে হবে না।

    --যেচে পোঁদে আঙুল করাবার জন্য একহাজার টাকা !

    --যেমন রোগ বাধিয়েছ। আচ্ছা, তোমাদের অঙ্গটা তো সামনে, তা পোঁদে আঙুল ঢোকাবার কী দরকার?

    --পোঁদে আঙুল দিয়ে গ্ল্যাণ্ডটা টের পাওয়া যায়। গ্ল্যাণ্ডটা পেছনে।

    --আপাতত ওষুধ দিলে ভালো হতো। মিসেস বটব্যালের হাজবেন্ডকে প্রথমবার দেখেই ওষুধ চালু করে দিয়েছিলেন।

    --মিস্টার বটব্যালের গ্ল্যাণ্ড বড় হয়ে গেছে, নেগলেক্ট করেছেন, ডাক্তার পোঁদে আঙুল করবে এই দুশ্চিন্তায় লজ্জাও পেতেন। যাক, ইনি অন্তত পেচ্ছাপের ফ্লোচার্ট আনতে বলেননি, ক্যানসারের ভয়ও দেখাননি। বললেন যে আঙুল দিয়ে যা ফিল করতে পারলেন মনে হচ্ছে এখনও দশ আউন্সের মতন আছে, চল্লিশ আউন্সের মতন হলে তারপরে ওসব ফ্লোচার্ট এটসেটরার কথা ভাবা যাবে।

    --রিসেপশানিস্টকে জিগ্যেস করেছিলুম ফ্লোচার্টের ব্যাপারটা। এখানেও হয়, ওই দিকে, যেদিকে আইভিএফ সেন্টার। চারপাঁচ লিটার জল খেয়ে যখন পেচ্ছাপ পাবে তখন একটা ফানেলের ভেতরে পেচ্ছাপ করলে তা ইমিডিয়েটলি কমপিউটারাইজ হয়ে ঢেউয়ের একটা প্রিন্টআউট তৈরি করে দ্যায় ; যারা সুস্হ তাদের ঢেউটা পাহাড়ের মতন হয়, চূড়ায় উঠে গিয়ে নেমে যায়। যারা অসুস্হ তাদের একগাদা ছোটোছোটো ঢিবি গড়ে ওঠে কিংবা সমতলভূমি আর একটাআধটা ঢিবি আঁকা হয়ে যায়।

    --আমার ওসব প্রবলেম নেই; যথেষ্ট ফ্লো আছে। কেবল এয়ার ট্র্যাভেল করলে ফ্লোটা ডিস্টার্ব হয়ে যায়। বলেছি ডাক্তারকে। উনি বললেন, এয়ারট্র্যাভেল করার সময়ে কমোডে বসে করবেন, বাড়িতেও দাঁড়িয়ে করা অ্যাভয়েড করুন।

    --তো ওষুধ দিলেন না যে।

    --বললেন, একটা সোনোগ্রাফি করিয়ে কুড়ি দিন পর আসুন।

    --পুরুষদেরও সোনোগ্রাফি হয় নাকি ?

    --বললেন তো হয়, লিখে দিয়েছেন, ওনাদের এই ক্লিনিকেই হবে। পাশের ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ডেট আর টাইম নিয়ে নিতে বলেছেন।

    --মেয়েরা পোয়াতি হলে তখন সোনোগ্রাফি করে। পুরুষদের আবার কী দেখবার আছে ?

    --ব্লাডার, ব্লাডার। তিন লিটার জল খেয়ে সোনোগ্রাফি, ঠিক তারপরেই পেচ্ছাপ করে সোনোগ্রাফি, যাতে বোঝা যায় যে ব্লাডারে কতটা পেচ্ছাপ থেকে যাচ্ছে।

    --নন্দিনী দেবরায় ইউরোলজিস্ট, ওনার স্বামী অশেষ দেবরায় আইভিএফ বিশেষজ্ঞ, ছেলে আর ছেলের বউ গায়নাক, কতটাকা যে প্রতিদিন রোজগার করে।

    --পুরো পরিবারটা মানুষের যৌনাঙ্গসেনট্রিক।

    --এত বড়ো হাসপাতাল খুলে ফেলেছে।

    --প্রসংশা করতে হয় ওনাদের বাবা-মার। বাঙালিদের যৌনাঙ্গ যে সমাজে ক্রমশ রুগ্ন অথচ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা ছেলেমেয়েদের ডাক্তারি পড়াবার সময়েই আঁচ করে ফেলেছিলেন; ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বলতে হবে। অত প্রেমের কোবতে লিখলে আর প্রেমের গান ভাঁজলে অঙ্গটা রুগ্ন হবেই, তা প্রেমিকের হোক বা প্রেমিকার হোক।

    --ওইদিকটায় গিয়েছিলুম, যেদিকে আইভিএফ বিভাগ। রিসেপশানিস্ট মেয়েটাকে চিনতে পারলুম, আমরা যখন বাগবাজারে থাকতুম তখন আমাদের ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতেন দত্তগুপ্ত পরিবার, তাদেরই ছোটো মেয়ে অনিন্দিতা, ডাকনাম অনু। প্রতিবার আইভিএফ করতে কত টাকা লাগে জানো ? চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।

    --কত ?

    --আড়াই লাখ টাকা মিনিমাম। তাও প্রথমবারেই যে সফল হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

    --এসব আমাদের সময়ে থাকলে তুমি প্রতিবার ওভাম বেচে পঞ্চাশ হাজার রোজগার করতে পারতে।

    --ছিঃ, অন্য কার স্পার্মের সঙ্গে মেশাতো। ভাবলেও ঘেন্না করে।

    --তাতে কি ! আমিও স্পার্ম বেচতুম। কারোর ওভামের সঙ্গে মেশাতো।

    --আমার ওভামের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর তোমার দুর্বল স্পার্ম আর নেবে না ওরা।

    --হ্যাঁ, ডাক্তার নন্দিনী দেবরায় জানতে চাইছিলেন যে এখনও সেক্স লাইফে অ্যাকটিভ আছি কিনা।

    --তুমি কি বললে ?

    --বললুম যে না, আর মগজ কাজ করে না। সবই তো মগজের ব্যাপার। তা উনি বললেন, ভালো, ওষুধ চালু করে দেবার পর স্পার্ম তো যেমন তৈরি হয় তেমন তৈরি হতে থাকবে, কিন্তু তার জেট-ফাংশানের জন্য যে ফ্লুইড দরকার তা ব্লক হয়ে যাবে, কেননা গ্ল্যাণ্ডটার কাজ রেসট্রিক্ট করে দেবে ওষুধটা।

    --সেরে গেলেই ভালো, অন্তত আর যাতে গ্রোথ না হয়। সবাই এমন ক্যানসারের ভয় দেখাল।

    --অনেকে লজ্জায় দেখায় না আর শেষে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। কী আর এমন, না হয় পোঁদে আঙুল করবে। সারা জীবন তো প্রতীকিভাবে কতজন যে কত কাজে বাগড়া দিয়ে আঙুল করেছে তার ইয়ত্তা নেই, এখনও করে চলেছে।

    ২.

    সোমেন দত্ত সমস্যাটা টের পেয়েছিলেন ফ্রাংকফার্ট থেকে ফেরার পথে, ফ্লাইটে, পেচ্ছাপ পাওয়া সত্ত্বেও, কয়েকবার টয়লেটে গিয়েও পেচ্ছাপ হল না। ক্রিউরা সন্দেহের চোখে দেখছিল ওনার টয়লেট যাওয়া-আসা ; হয়তো দাড়ি আছে বলে সন্ত্রাসবাদী ভেবে বসে আছে।

    অমন বারবার টয়লেটে যাচ্ছেন দেখে জনৈকা এয়ারহোস্টেস জানতে চাইলেন যে কোনো কিছু কি ভুলে গেছেন। সোমেন দত্ত সরাসরিই বললেন যে না, হারায়নি কিছু, কিন্তু এর আগে এয়ার ট্র্যাভেল করার সময়ে তাঁর এই সমস্যা হয়নি যা এখন হচ্ছে।

    --কী সমস্যা ?

    --পেচ্ছাপ হচ্ছে না ; বেশ জোরেই পেয়েছে, অথচ হচ্ছে না। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলুম তবু হল না।

    --আপনি এক কাজ করুন। আরও কয়েক গ্লাস ঠান্ডা জল খেয়ে নিন। টয়লেটের কাছে এই সিটটা খালি আছে, এটায় বসুন। নিশ্চয়ই পাবে। টেনশান নেবেন না।

    ঠান্ডা জল খেয়ে কিছুক্ষণেই সোমেন দত্তর মনে হল যে এই বুঝি টপ-টপ করে আরম্ভ হয়ে গেল। আবার ঢুকলেন টয়লেটে। কিছুক্ষণ প্রয়াসের পর বেরিয়ে আসতে অন্য একজন এয়ার হোস্টেস বলল, কী স্যার, ইউরিনেট করতে পারলেন ?

    --না, হল না।

    ওনার সমস্যা নিয়ে এয়ার হোস্টেসগুলো নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেছে নাকি ! এই মেয়েটা কোথা থেকে জানতে পারল যে ওনার পেচ্ছাপ আটকে গেছে।

    মেয়েটি বলল, স্যার, আমার বাবারও একই সমস্যা, আপনি কমোডে বসুন, আমি এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল দিচ্ছি, আপনি ঢালুন আর কিছুক্ষণ ওয়েট করুন, দেখুন হবে, জোর দেবেন না, রিল্যাক্সড হয়ে ইউরিন পাস করার চেষ্টা করুন।

    --জল কোথায় ঢালব ?

    --কেন, যেখান দিয়ে ইউরিনেট করবেন, কুল ডাউন হলে দেখবেন আপনা থেকেই নেমে আসছে। আপনি টয়লেট ডোর লক করবেন না।

    লিঙ্গের ডগায় ঠাণ্ডা জল ঢেলে মিনিট পাঁচেক চোখ বুজে বসে রইলেন সোমেন দত্ত। হল। অনেকক্ষণ ধরে হল। আহ, কী আরাম। বাইরে বেরোতেই তিনজন এয়ার হোস্টেস তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসির মাধ্যমে জানতে চাইলে সোমেন দত্ত তাদের ধন্যবাদ দিলেন সুপরামর্শের জন্য।

    --আপনি গিয়েই একজন ভালো ইউরোলজিস্টকে কনসাল্ট করবেন স্যার, বলল প্রথম এয়ার হোস্টেস।

    দ্বিতীয় এয়ারহোস্টেস বলল, আপনি ফ্লাইটে কয়েক পেগ হুইস্কি খেয়েছেন বলে সমস্যাটা দেখা দিয়ে থাকবে, ফ্লাইটে রক্তে অক্সিজেন কমে গিয়ে প্রবলেমটা হয়েছে। একজন ভালো ইউরোলজিস্টকে দেখাবেন, কোনো চিন্তার নেই।

    বিদেশিনী এয়ারহোস্টেসরা বেশ হেল্পফুল। ফ্রি অ্যান্ড ফ্র্যাংক। অবশ্য ইংরেজিতে কথাগুলো বলার সুবিধা আছে। বাংলায় হলে বলতে হতো ওইখানে জল ঢালুন, ওইখানে মানে কোনখানে, যেখান দিয়ে হিসি করেন ! হিসি বা পেচ্ছাপ কি বলতে পারতো বাংলায়, একজন যুবতী, ইতস্তত করত। নিজেকে মনে মনে বললেন সোমেন দত্ত।

    পাড়ার অকিঞ্চন সান্যাল, যাঁর সঙ্গে প্রতি শনিবার হুইস্কি নিয়ে বসেন, তাঁকে জিগ্যেস করতে, তিনি বলেছিলেন, তাঁর তো এখনও সমস্যাটা দেখা দেয়নি। রাসবেহারিতে একজন ইউরোলজিস্টের বোর্ড দেখেছেন বটে, তার নাম ডক্টর নিতিন ধাবালিয়া। সোমেন দত্ত ধাবালিয়ার ফোন নম্বর ইনটারনেট ঘেঁটে যোগাড় করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলেন। ধাবালিয়ার বিরাট ক্লিনিক, সিসিটিভি লাগানো, চেম্বারে বসে দেখতে পান কতজন রোগি অপেক্ষা করছে। রোগি বেশি হলে প্রত্যেককে তাড়াতাড়ি দেখে ছেড়ে দেন। সোমেন দত্ত যেদিন দেখাতে গিয়েছিলেন সেদিন অমনই ভিড় ছিল। ডক্টর ধাবালিয়া নাম জিগ্যেস করলেন, সমস্যা জিগ্যেস করলেন, তারপর বললেন পেচ্ছাপের ফ্লোচার্ট, রক্তের পিএসএ রিপোর্ট আর ক্যানসারাস গ্রোথ হয়েছে কিনা তার জন্য ডক্টর ব্যানার্জির কাছে রেফার করে দিয়েছিলেন।

    সোমেন দত্তর স্ত্রী ধাবালিয়ার চেম্বার থেকে বেরিয়েই বললেন, নিকুচি করেছে এই ডাক্তারের, আগেই ভয় পাইয়ে দিচ্ছে ক্যানসারের। সবকটা কমিশনখোর মিলে নেটওয়র্কিং করে রেখেছে ; আমিই বরং ভালো ইউরোলজিস্টের খোঁজ নিচ্ছি। মিসেস ঘোষ, যাঁর স্বামী এমবিবিএস ডাক্তার, সকাল-সন্ধে গরিব রোগিদের দেখেন, তাঁর কাছে খোঁজ নিয়ে সোমেন দত্তর স্ত্রী আইভিএফ সেন্টারের ঠিকানা আর ফোন নম্বর পেয়েছিলেন।

    --আরে, আইভিএফ করার ডাক্তারকে দেখিয়ে কী করব ? তুমিও আর ডাক্তার পেলে না। স্ত্রীকে বলেছিলেন সোমেন দত্ত।

    --এটা শুধু আইভিএফ সেন্টার নয়। এটা একটা হাসপাতাল। স্বামী আইভিএফ করেন, স্ত্রী ইউরোলজিস্ট আর ওনাদের ছেলে-বউ গাইনাকলোজিস্ট।

    --মহিলা ইউরোলজিস্ট !

    --হ্যাঁ, বেশ নামকরা, ডক্টর নন্দিনী দেবরায়। আমি ডেট নিয়ে রেখেছি। একমাস পরে ডেট দিয়েছেন।

    --দিনের বেলা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছ তো ? রাত্তিরে পথঘাট ঠিকিমতন দেখতে পাই না, গাড়ি চালাতে অসুবিধা হয়।

    --হ্যাঁ হ্যাঁ, পরের মাসে সাত তারিখে, সকাল দশটায়। এনার কাছে ধাবালিয়ার প্রসঙ্গ তোলার দরকার নেই, কী বল ?

    --তা ঠিক।

    ৩.

    ডক্টর নন্দিনী দেবরায়ের হাসপাতালে দেখিয়ে পাশের আইভিএফ সেন্টারে সোনোগ্রাফির অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ঢুকে অপেক্ষারতাদের সোফায় বসে-থাকা একজন পোয়াতি যুবতীর মুখটা মনে হল পরিচিত। এই বয়সে স্মৃতি কাজ করে না। স্ত্রীকে জিগ্যেস করলেন। স্ত্রীও মনে করতে পারলেন না।

    বাড়ি ফিরে মনে পড়ল সোমেন দত্তর। ঠিক, মেয়েটার নাম মধুবন্তি বণিক, ওনার ছাত্রী ছিল, ইংরেজিতে সান্মানিক স্নাতক পড়ত, কোর্স পুরো না করেই উধাও হয়ে গিয়েছিল, প্রেমে পড়ে। যে যুবকের সঙ্গে উধাও হয়ে গিয়েছিল সে, অরিজিৎ কর, ছাত্রদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিল, বিপ্লবের কথা বলত, সমাজবদলের কথা বলত, কলেজের সামনে দিয়ে যে মিছিল যেত তাতেও যুবকটিকে দেখেছেন কয়েকবার, মুঠি উঠিয়ে স্লোগান দিতে-দিতে যাচ্ছে, সঙ্গে মধুবন্তি। ছেলেটি নিশ্চয়ই নেতৃস্হানীয়, সামনে-সামনে যাচ্ছে যখন, মনে হয়েছিল সোমেন দত্তর।

    তা তো সাত-আট বছর আগের কথা। মধুবন্তি বণিক আইভিএফ সেন্টারে কেন ? অনিরুদ্ধ করই বা কোথায় গেল। বিপ্লবের ঘুটি ওলোটপালোট হয়ে যাবার দরুণ কি ওদের দুজনের জীবনেও ওলোটপালোট ঘটে গেছে ! মধুবন্তি কি বিয়ে করেছিল অনিরুদ্ধ করকে ? বিয়ে করে ছেড়ে দিয়েছে ? নতুন বরের স্পার্ম থেকে বাচ্চা হবার সম্ভাবনা নেই ?

    মধুবন্তি বণিকের বাবা ধনী ছিলেন, ব্যবসা আছে, কয়েকটা মল-এ দোকানও আছে ওনাদের কারখানার জিনিসের। আড়াই লাখ টাকা করতেই পারেন খরচ। একবার কেন কয়েকবার খরচ করতে পারেন। অনিরুদ্ধ কর গরিব পরিবারের ছেলে ছিল। সে কি আর বিপ্লব করে অত টাকা করতে পেরেছে ? অনেক বিপ্লবী অবশ্য নানা ফন্দিফিকির চালিয়ে অঢেল টাকা করে ফেলেছে -- গাছ, মাছ, ঠিকেদারির পথে। অনিরুদ্ধও কি সেই পথে গেল শেষ পর্যন্ত ! মিছিলে-মিছিলে পুঁজিবাদ, আমেরিকা, সাম্রাজ্যবাদ, ওয়ালস্ট্রিট, কালো হাত, কায়েমি স্বার্থ, কত রকমের স্লোগান শোনা যেত ওর শিরা-ফোলানো গলায়।

    সোনোগ্রাফি করাতে গিয়েও বসে থাকতে হল বেশ কিছুক্ষণ, এক ঘণ্টার বেশি। প্রচুর জল খেয়ে সোমেন দত্তর হিসি পেয়ে গিয়েছিল বলে টয়লিটের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন, রিসেপশানিস্ট মেয়েটি, অনিন্দিতা দত্তগুপ্ত বলল, আংকল যাবেন না যাবেন না, ব্লাডার ফাঁকা হয়ে গেলে চলবে না।

    --চেপা রাখা কঠিন হয়ে গেছে গো, বললেন সোমেন দত্ত।

    --আরেকটুক্ষণ আমাকে টাইম অ্যালাউ করুন, এর পরেই আপনাকে পাঠাবো, বলেছিল অনিন্দিতা।

    সোমেন দত্তর স্ত্রী সোনোগ্রাফি চেম্বারের দিকে নজর রেখেছিলেন। একজন পোয়াতি বউ বেরিয়ে আসতেই সোমেন দত্তকে ঠেলা দিয়ে বললেন, যাও যাও, বেরিয়েছে, নয়তো অন্য কাউকে পাঠিয়ে দেবে।

    সোমেন দত্ত সোনোগ্রাফির চেম্বারে ঢুকে দেখলেন, সেখানের ডাক্তারও মহিলা। এবার আর আন্ডারউইয়ার পরে আসেননি, জানতেন খুলতে বলবে, অহেতুক পরে এসো, আবার খোলো, এসব হ্যাঙ্গাম এড়াতে পরেননি। নিজেই ট্রাউজার খুলে শুয়ে পড়লেন। ডাক্তার তলপেটে আর পাশ ফিরিয়ে যন্ত্র চালিয়ে চলমান ফোটোতে দেখতে লাগলেন। হয়ে গেলে বললেন, যান ইউরিনেট করে আসুন, দাঁড়িয়ে নয়, কমোডে বসে, যতটা পারবেন ইউরিনেট করে নেবেন। টয়লেটে ঢুকে সোমেন দত্ত, ক্লিনিকের হাওয়াই চপ্পল পরে থাকা সত্ত্বেও, টের পেলেন যে পোয়াতিরা অনেকে কমোডেও বসতে পারেনি বলে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই সেরে ফেলেছে। পুরো ফ্লোর পেচ্ছাপে ভাসছে।

    আরেকবার সোনোগ্রাফি চেম্বারে ঢুকলে সোমেন দত্তর স্ত্রীও ঢুকেছিলেন। ডাক্তারকে জিগ্যেস করলেন, সব ঠিক আছে তো ? চিন্তার কিছু নেই তো ? ডাক্তার বললেন, এবিষয়ে ডক্টর নন্দিনী দেবরায় পরামর্শ দেবেন।

    সোমেন দত্ত আর ওনার স্ত্রী কাউন্টারে টাকা জমা করার সময়ে মধুবন্তি বণিককে দেখতে পেলেন, আইভিএফ সেন্টার থেকে বেরোচ্ছে, কোলে গোলগাল বাচ্চা, ফর্সা, ভালো দেখতে।

    --তুমি মধুবন্তি না ? জিগ্যেস করলেন সোমেন দত্ত।

    --হ্যাঁ, স্যার ; আপনি ভালো আছেন ?

    --ভালো আর কই। ইউরোলজিস্ট নন্দিনী দেবরায়কে দেখাচ্ছি। তোমার বাচ্চাটা দেখতে-শুনতে বেশ ভালো হয়েছে। কি নাম রেখেছ ?

    --ছেলে না মেয়ে। জানতে চাইলেন সোমেন দত্তর স্ত্রী।

    --থ্যাংকস স্যার। ছেলে মাসিমা। নাম রেখেছি অপূর্ব।

    --তা তুমি একা ? অরিজিৎকে দেখছি না। সে কোথায়।

    সোমেন দত্ত আর ওনার স্ত্রীকে স্তম্ভিত করে মধুবন্তি বলল, নরকে।

    দুজনেই ভুরু কুঁচকে রইলেন, ভ্যাবাচাকায় আক্রান্ত, এরপর প্রসঙ্গটা শেষ করবেন না অন্য প্রসঙ্গে যাবেন এমন দোটানা থেকে মধুবন্তিই ওনাদের মুক্তি দিল। বলল, বাচ্চাটা যদিও আমার, কিন্তু অনিরুদ্ধ এর বায়ালজিকাল বাবা নয়, এর বায়ালজিকাল বাবা যে কে তা আমিও জানি না, কেননা অপূর্ব আইভিএফ করে হয়েছে। অনিরুদ্ধ এর লিগাল বাবা।

    প্রসঙ্গটা গোলমেলে পথে চলে যাচ্ছে আঁচ করে সোমেন দত্ত বললেন, আচ্ছা চলি, অপূর্বকে ভালো করে মানুষ কোরো।

    হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে বসে সোমেন দত্তর স্ত্রী বললেন, স্পার্মের জৌলুশ না থাকা একদিক থেকে ভালো। বুড়ো বয়সে অনিরুদ্ধর পোঁদে কোনো ডাক্তার তো আর আঙুল করবে না।




     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৯:১৪734726
  • রাহুকেতু : মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস

    কলকাতার উত্তর-শহরতলিতে, রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারী অসীম গাঙ্গুলি মশায়ের ওঝাপুর বাড়ির নড়বড়ে কাঠের গেটের ভেতরে ঢুকে, সে-ই শেষবার, রাহুলের, তখন কত বয়স হবে, মমমমমমমমম, থাকগে, যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, মনে পড়ে গেল, কানপুরের অশোক নগর থানায় হাজতবাসের কথা। উত্তরবঙ্গের কোনো জোতদারের বাগানমহল ভেঙে তৈরি হয়েছিল অসীমবাবুর ওঝাপুরের সেই ভাড়া-করা ছয়-ফ্ল্যাটের কোঠাবাড়ি।

    হাজতের অন্ধকারে, রাতের মশাগুঞ্জনের বহুভাষি ঝাঁকের খেয়ালি ঘুর্ণির ভেতর দিয়ে মেঝেয় ছিটকে পড়ল, রাহুলের হাঁটুতে ধাক্কা খেয়ে, একজন মানুষ, যে, গন্ধ থেকে যেটুকু আঁচ করা গেল, কানপুরি-ঠররার নেশায় বস্তাপ্রতিম কেউ হাড়গিলে । ঘরের মধ্যে আগে থাকতে কতজন যে রয়েছে তা জানতে পারছে না রাহুল ; কেবল বুঝতে পারছে যে বেশ কয়েকজন মানুষ, যারা পুলিশ আইনপ্রণেতা আর যে বা যারা তাদের আইনের প্যাঁচে পাকিয়ে হাজতে ঢুকিয়ে দিয়েছে, তাদের সবাইকে হিন্দির বহুপ্রচলিত খিস্তিগুলো বিড়বিড়িয়ে চলেছে, একনাগাড়ে, সেই যখন থেকে রাহুলকে পোরা হয়েছে এই অচেনা দুর্গন্ধের ছোট্টো স্যাঁতসেতে লক-আপে।

    রাহুলকে, ওর বয়স তখন কত হবে, মমমমমমম, থাকগে, যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, অমনভাবে ছুঁড়ে ফেলা হয়নি ; পিঠে ঠেলা মেরে ঢোকানো হয়েছিল অন্ধকারে, আহ্লাদী মশাদের ঘুর্নিগুঞ্জনে, হাত থেকে হাতকড়া আর কোমরের দড়ি খুলে । কানপুর শহরের জুহি পরমপুরওয়া বস্তি, যেখানের নিচুজাতের কালচে-তাগড়াই হিন্দু কাঙালি আর হতদরিদ্র ডিগডিগে শিয়া মুসলমানদের অবাঙালি পাড়ায় ওর শৈশব কেটেছে, সেখানকার প্রতিদিনের কথোপকথনে ব্যবহৃত এই সমস্ত খিস্তির সঙ্গে রাহুল অতিপরিচিত, তাই ওর মধ্যবিত্ত সংবেদন, এখন অশোক নগরে চলে গেলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর হলেও, নাড়া খেল না।

    পাশের জনানা হাজত থেকে নারীকন্ঠে শোনা গেল, “দারোগাজি, অব তো বত্তি জলাইয়ে, অন্ধেরে মেঁ মরদ ইয়া মেহরারু কওন ঘুসে যা রহা হ্যায় পতা নহিঁ। ”

    কিছুক্ষণ পর, দুর্গন্ধকে আরও অসহ্য করে, আলো জ্বলল।

    টিমটিমে পঁচিশ ওয়াটের হলুদ-টুনির বিজলিবাতিতে চোখ সয়ে গেলে , ইংরেজ আমলের হলদেটে ঘরের, খুপরি-জানলার মরচেপড়া শিক ধরে, রাহুল দাঁড়িয়ে ছিল, দশ বাই দশ হবে চুনকামহীন ছ্যাদলাপড়া ঘরটা, ঔপনিবেশিক লোহার জংধরা বরগা, দেখল, হেটো-ধুতি আর ময়লা গেঞ্জি-পরা দুজন তামাটে মজবুত প্রৌঢ় উবু হয়ে বসে দেয়ালে ঠেসান-দেয়া একজন পাজামা-কুর্তায় চওড়াকাঁধ তাগড়া যুবকের পা টিপছে, দু’জন খালিগা চাক-কাটা লুঙ্গিতে রোগাটে প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে ফিসফিসোচ্ছে, কোনের দিকে একটা কোঁচাকাছা-ধুতি-হাফশার্ট যুবক বসে আছে বেঢপ ঢঙে, কেননা তার হাত থেকে হাতকড়া খুলে দেয়া হয়নি, রোগা শিড়িঙ্গে মাতালটা মেঝেয় আর ও, সব মিলিয়ে আটজন।

    এক কোনে, যেখানে ঝাঁঝালো চটচটে-হলদে পেচ্ছাপ জমে আছে, সেখানে, যেহেতু লক-আপে পেচ্ছাপ করার কোনো ব্যবস্হা নেই, যার পা টেপা হচ্ছিল, তার নির্দেশে, মাতালটাকে টেনে বাঁধের কাজে লাগানো হল, যাতে পেচ্ছাপের স্রোত ঘরের ভেতর এসে অন্যান্যদের না ভেজায়।

    “ই বেওড়াকো ঠিক সময় পর ভেজিস ভগওয়ান”, বলল দাঁড়িয়ে থাকা ঢ্যাঙা কালো লোকটা।

    লোকগুলোর কথাবার্তা থেকে, পরের দিন ফৌজদারি আদালত-চত্তরের কাঁকরে বসে জিরোবার সময়, রাহুল জানতে পারবে, কাকে কোন আরোপে পোরা হয়েছে গারদে। যে পা টেপাচ্ছিল সে আর তার দুজন স্যাঙাত কাল বিকেল থেকে রয়েছে, ডাকাতি করতে গিয়ে পাবলিকের হাতে ধরা পড়ে পিটুনি খেয়েচে ; পুলিশ ওদের নেতার ঠ্যাঙে বাড়ি মেরে-মেরেও, ডাকাতির মালপত্তর কোথায় লুকিয়ে রাখে, তা তখনও পর্যন্ত জানতে পারেনি বলে, কোর্টে তোলেনি ; ওরা মুখ খোলেনি, যাতে সময় থাকতে বাদবাকি স্যাঙাতেরা সেগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলতে পারে। দাঁড়িয়ে যারা ফিসফিস করছিল, যে দু’জন, তাদের একজন বলল তাকে চুরি করার আরোপে বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়েছে, যদিও সে বহুদিন চুরি করতে বেরোয়নি, অন্য ছোঁড়াটা আরেকজন চোর, যেদিন চুরি করে তার পরের দিন উনোনে আগুন জ্বলে, চুরি না করে উপায় নেই ; জামিন পায় ভালো, আবার চুরি করতে যাবে, না পেলে ওর বউ গঙ্গার ধারে অন্ধকারে খদ্দের ফাঁসিয়ে, একটাকা-দুটাকা যা পায়, দু’চার খেপ সাঁঝনি করে আসবে। যার হাতকড়া রাতের বেলাও খোলা হয়নি, সে, হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া বালিশ-পেট সেপাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, তার কাকাকে খুন করার পর পরিবারের

    লোকেদের জাপট ছাড়াতে পারেনি। অন্যজন পকেটমার, সাপ্তাহিক কোটায় তাকে তুলে আনা হয়েছে। চশমা-চোখ রাহুলের পোশাক আর গাম্ভীর্যের কারণে ওরা কেউ ওর কাছে ঘেঁষেনি। খৈনি ঠুকে সঙ্গের সেপাই অন্যদের জানিয়েছে যে সে, রাহুল, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো খতরনাক কেতাব লিখেছে।

    টিমটিমে ঝিমন্ত আলো আরেকবার নিভে গেলে, বা নিভিয়ে দেয়া হলে, খিস্তির ঝাড় পুলিশের তরফ থেকে এলো, হুমকিসহ, কথা বলা বন্ধ না করলে পিটিয়ে বেহোশ করে দেয়া হতে পারে। তবু, তাগড়া ডাকাতটা মা-বোনের গালমন্দে ফিসফিসিয়ে জানালো যে পাশের জনানা লকআপে বেশ্যাদের রাতের বেলায় ধরে এনে সিপাহিগুলো ধর্ষণ করছে, পারাপারি করে, কতবার আলো নিভলো তা গুনে বলা যায় যে কটা সিপাহি কবার কিরিয়াকরম করে বেরোল যা থেকে আন্দাজ করা যায় যে থানায় কতজন সেপাই আছে।

    রাহুল, ক্লান্ত, চুপচাপ, পানের পিক শুকনো গয়ের বমি-মাখা দেয়ালে ঠেসান দিয়ে, জানলার তলায়, এককোনে বসে পড়েছিল, অন্ধকারে মশাদের সঙ্গে ছারপোকারাও নতুন কুটুম পেয়ে তাদের উপস্হিতির মুফত-চুলকানি জানাতে শুরু করেছে, টের পেল। মাতালকে টেনে বাঁধের কাজে লাগালেও পেচ্ছাপের কিলবিলে স্রোত উঁকি মারতে-মারতে ওর দিকেও পৌঁছে গেছে। লকআপে ঢুকলে মানুষের বেশি পেচ্ছাপ পায়।

    দুপুরে, অফিস-প্রধানের তিন তলার সিনথেটিক কার্পেটপাতা ঘরে ডেকে-পাঠিয়ে রাহুলকে বলা হয়েছিল, এই দুজন কলকাতা থেকে এসেছেন, আপনার সঙ্গে কোনো ব্যাপারে কথা বলতে চান ; নিচে যান, যা আলোচনা করার অফিসের বাইরে গিয়ে করুন। অফিস-প্রধানের নির্দেশে অবাক রাহুল দুই আগন্তুকের সঙ্গে পথে গিয়ে নামার পর তারা দুদিক থেকে ওর জামা খামচে ধরে বলে ওঠে, পালাবার চেষ্টা করবেন না, আমরা বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হবো, আপনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে, আমরা লালবাজার পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ থেকে এসেছি।

    রাহুল বিমূঢ় হতবাক থ। বলল, ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না, অপরাধটা কী ? অনুমান করল যে এরা অফিস-প্রধানকে বিস্তারিত জানিয়ে থাকবে, তাই, রাহুল যাতে অফিস কর্মীদের সামনে অপদস্হ না হয়, আর ওর গ্রেপ্তারিতে অফিস যাতে জড়িয়ে না পড়ে, সেকারণে উনি অফিসের বাইরে গিয়ে কথাবার্তা চালাতে বললেন।

    –আপনার বাড়ি নিয়ে চলুন, সেখানেই জানতে পারবেন।

    একটা রিকশ ডেকে ওকে মাঝখানে বসিয়ে দুজনে দুদিক থেকে রাহুলের বাহু আঁকড়ে ধরে রইল। রিকশঅলা বলল, হুজুর তিনজন বসলে পুলিশ ধরবে আমায়, এখনও তেমন রোজগার হয়নি যে ছাড়াবার হাতখরচ দেবো। মোটা গোছের লোকটা রিকশঅলার মাথায় কশে চাঁটি মেরে বলল, আমরাই পুলিশ, তোকে বলা হচ্ছে, তুই চল, অশোক নগর। তাই না, মিস্টার রাহুল সিংহ ?

    এরা ওর বাড়ির হদিশও জানে দেখছি, নিজেকে নিঃশব্দে বলল রাহুল।

    বাড়ির কাছে পৌঁছে দেখল একটা পুলিশ জিপ দাঁড়িয়ে, স্হানীয় পুলিশের লাঠি আর বন্দুকধারীরা আগে থাকতেই ঘিরে রেখেছে পুরো বাড়ি। হ্যাঁ, পুরো বাড়ি, চারিদিক থেকে। এক সঙ্গে এত পুলিশকর্মীকে এ-পাড়ায় আগে দেখা যায়নি বলে অনুসন্ধিৎসু জনতার গুজগুজানি ভিড়। স্হানীয় পুলিশের টাকমাথা ইন্সপেক্টর আর কলকাতার দুই পুলিশ অফিসার রাহুলকে নিয়ে ঢুকল বাড়ির ভেতরে।

    রাহুলের বাবা দরোজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, বললেন, তোর কিছু লেখালিখির জন্যে এরা কলকাতা থেকে তোকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে, আমি দিনুকে খবর পাঠিয়েছি, বসন্তবাবুকে জানাতে। তোর দুজন বন্ধু পরশু দিন অ্যারেস্ট হয়েছে, তাদের কাছ থেকে তোর অফিসের আর বাড়ির ঠিকানা যোগাড় করে এসেছে কলকাতার পুলিশ। দিনু বা দীননাথ রাহুলের জাঠতুতো দিদির স্বামী। বসন্তবাবু বা বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় দিনুর আত্মীয়, শহরের সবচেয়ে নামজাদা আর দামি অ্যাডভোকেট।

    ভাড়ার জন্য রিকশঅলাটা ঘ্যানর-ঘ্যানর করছিল দেখে রাহুলের বাবা ভাড়াটা মিটিয়ে দিলেন।

    রাহুলের বাবার কাচের আলমারিতে পেপারওয়েট মেরে কলকাতার রোগাটে পুলিশ অফিসার বলল, আমাদের কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে, খানাতল্লাসি করা হবে। আলমারিগুলো খুলে দিন।

    –আমার আলমারির কাচ ভাঙছেন কেন, আশ্চর্য ? ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ তো ওর পড়ার ঘরে গিয়ে তল্লাসি চালান। বললেন, রাহুলের বাবা, বেশ উত্তেজিত, কাঁপছিলেন। প্রত্যুত্তরে সে বলল, পুরো বাড়ি তল্লাসি করা হবে, ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আছে, একশো কুড়ি বি, জানেন তো, একশো কুড়ি বি আই পি সি ? রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ? ইতিহাস পড়া আছে নিশ্চয়ই ? রাজনারায়ণ বসু, অরবিন্দ ঘোষ, বলবন্ত ফাড়কে, দামোদর চাপেকর, ওনাদের ধরার

    জন্য এই আইন পাশ হয়েছিল। আপনার তো গর্ব হওয়া উচিত। আপনার ছেলেকেও ধরা হচ্ছে সেই অভিযোগে। আমি কলকাতা পুলিশের এস আই মুখার্জি আর উনি এস আই বারোড়ি ; লোকাল থানার এই অফিসারকে চিনে রাখুন,

    মাঝে-মাঝে রোঁদে বেরিয়ে আপনার বাড়িতে ঢুঁ মারতে পারেন, ইনি ইন্সপেক্টর আবদুল হালিম খান।

    ঘোড়েল সাবইন্সপেক্টর, পুলিশ ট্রেনিঙে শেখা বুলি আউড়ে গেল।

    সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে তিন অফিসার বিভিন্ন ঘরে চলে গেল। রাহুল শুনতে পেল ওর মায়ের প্রায়-কেঁদেফেলা কন্ঠস্বর, আপনারা যে কাজ করতে এসেছেন তা করুন, আমার বিয়ের তোরঙ্গ ভাঙছেন কেন ? বললে তো আমিই খুলে দিতুম। তোরঙ্গ হাঁটকাচ্ছেন কেন ? ওটা আমার বিয়ের বেনারসি, ছিঁড়ে যাবে, ছিঁড়ে যাবে, অনেক পুরোনো, ওভাবে হাতড়াবেন না, ওটা আমার শ্বশুরমশায়ের বিদেশে-পাওয়া ফোটোগ্রাফির পদক।

    তার মানে এদের উদ্দেশ্য কেবল ওকে গ্রেপ্তার আর ওর লেখা সংক্রান্ত নয়, স্পষ্ট হল রাহুলের কাছে। ওর বাবা-মাকে, অপমান করার মাধ্যমে, আঘাত দিয়ে, ওকে ঘিরে ফেলার, অবদমনের, দুমড়ে-ফেলার প্রয়াস। কোন লেখা, কোন বই, কিছুই ওকে বলা হল না, অথচ ব্রিটিশ আমলের লাল-পাগড়ির ঢঙে ভাঙচুর লণ্ডভণ্ড করতে নেমেছে। কী ধরণের ষড়যন্ত্র, কাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র, আঁচ করতে পারছিল না। মুখার্জি নামের সাব ইন্সপেক্টার ওর পড়ার ঘরে ঢুকে আলমারি থেকে বইপত্র ছুঁড়ে-ছুঁড়ে মেঝেয় ফেলতে থাকলে রাহল বলল, ‘’এগজ্যাক্টলি কি খুঁজছেন জানালে ভালো হয়, আপনি রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শেকসপিয়ার সবাইকেই হেনস্হা করছেন ওভাবে মাটিতে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে। ’’

    –হ্যা হ্যা, ওনাদের হাড়-পাঁজর ভেঙে গেল বোধহয়, হ্যা হ্যা। বলল সাব ইন্সপেক্টর।

    লোকটা বদল্যার, র‌্যাঁবো, টলস্টয়, কাফকা, ডস্টয়েভস্কিতে হাত দিল না, এমনকি ফ্যানি হিল, হ্যাভলক এলিস আর হেনরি মিলারেও, সম্ভবত সেগুলো পেপারব্যাক বলে, বা নাম শোনেনি বলে।

    –আপনার কাছ থেকে আমরা জ্ঞান নিতে আসিনি, কোন বই কার লেখা তা জানা আছে। আপনার লেখার খাতা, ডায়রি, বন্ধুদের চিঠিপত্র, কোথায় রেখেছেন, সব বের করুন। রাহুল ওর পড়ার টেবিলের পাশের আলমারি খুলে দিয়ে জানাল, এখানেই সবকিছু পাবেন।

    খান সাহেব, একঠো কনোসটেবোলকো ওপর মেঁ বোলাইয়ে, বলল মুখার্জি। জনৈক কন্সটেবল এলে তার হাতে তুলে দিতে থাকল, সম্ভবত যা যা চাই।

    রাহুলের বাবা-মা’র ঘর লণ্ডভণ্ড করার পর সাব ইন্সপেক্টর বারোড়ি রাহুলের পড়ার ঘরে ঢুকে বলে উঠল, এই টাইপরাইটারটা তো টানা মাল মনে হচ্ছে, এটাও নিয়ে নে, কন্সপিরেসির চিঠিচাপাটি এতেই লেখা হয় নিশ্চই। রাহুল বলল না যে টাইপরাইটারটা একজন বিদেশি পত্রিকা-সম্পাদকের পাঠানো।

    টাইপরাইটারসহ রাহুলের টেবিলে রাখা পাণ্ডুলিপি, দুটো ডায়েরি, ওর আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত লিফলেটগুলো, অসীম গাঙ্গুলি, প্রদীপন চাটুজ্জে, রক্তিম চাটুজ্জে, হরিচরণ খাঁড়া, সুকোমল রুদ্র আর অন্য বন্ধুদের লেখা চিঠিপত্রের দুটো ফাইল, একটা ভারতীয়দের চিঠি আর অন্যটায় বিদেশি লেখকদের, দাদা অনিকেতের সদ্য প্রকাশিত বইয়ের সব কয়টি কপি, বিদেশি সাহিত্য পত্রিকা আর যা যা ওদের মনে হল মামলা সাজাতে কাজে দেবে, বা রাহুলের লেখালিখির প্রবাহকে নষ্ট করতে পারবে, বা ওর মগজকে ফাঁকা করে তুলতে পারবে,সবই জড়ো করে তালিকা তৈরি করতে বসল মুখার্জি। চিঠিপত্রের ফাইলের ভেতরে একটা খামে জনৈকা ফরাসি মহিলার ফোটো আছে যা অসীম গাঙ্গুলি বিদেশ থাকার সময়ে চিঠির সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন। বিদেশিনীর ফোটো দেখে এরা নোংরা রঙ্গ-তামাশা করতে পারে ভেবে রাহুল চেপে গেল।

    বার্ধক্যে পৌঁছে রাহুলের আপশোষ হয় যে ফোটোগুলো নিতে বারণ করা উচিত ছিল। করেনি, কেননা এক সপ্তাহ আগে সিংহবাহিনী নামে কেউ একজন আমহার্স্ট স্ট্রিট পোস্ট অফিস থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল, ‘’বি কেয়ারফুল। রামায়ণ নট্ট কোম্পানি’জ অধিকারী হ্যাজ কাম ব্যাক। ’’ কে যে টেলিগ্রামটা পাঠিয়েছিল, তা বহুকাল জানতে পারেনি রাহুল ; জানতে পারল যখন তখন ওর বয়স, মমমমমমমমমম, থাকগে, যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, আর ওর প্রথম উপন্যাসের প্রুফ দেখতে বসে বলে উঠেছিলেন গেঞ্জি-লুঙ্গিতে মল্লিকমশায়, ‘’আপনাকে তো আমি সতর্কতার টেলিগ্রাম করেছিলাম, যা ষড়যন্ত্রের আবহাওয়া কলকাতায় সেসময়ে তৈরি হয়েছিল, নানা কথা কানে আসছিল।’’

    –ওঃ, আপনি করেছিলেন ? সিংহবাহিনী শব্দটার জন্য ঠাহর করতে পারিনি।

    –কেন ? কেতু তো কলেজে পড়ার সময় থেকে প্রতিবছর সিংহবাহিনীর পুজোয় আমার বাড়ি এসেছে।

    –আসলে জানা ছিল না ; তাছাড়া তখন তো আপনার সঙ্গে পরিচয় ছিল না।

    –ওহে, আমাকে এ-পাড়ায় এক ডাকে লোকে চেনে ; এক ডাকে মানে এক ডাকে, বুঝেছ।

    –কেয়ারফুল হয়েই বা কী করতুম বলুন। বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে তো আর যেতে পারতুম না। এক পুলিশ

    কনস্টেবল অবশ্য লকআপ থেকেই পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দিয়েছিল। পালাইনি বলে আমায় বলেছিল বেবকুফ।

    –ওতো বিখ্যাত হে। তিনটে শব্দকে আলাদা আলাদা করে যদি পড়তে তাহলে বুঝতে পারতে। রামায়ণ, নট্ট আর কোম্পানি।

    –ভালো আইডিয়া দিলেন। কখনও যদি এই-সমস্ত ঘটনা নিয়ে লিখি তাহলে আপনার এই ফ্রেজটা প্রয়োগ করব।

    মল্লিকমশায় মারা গেছেন। আজকে লিখতে বসে ওনার পাঠানো টেলিগ্রামটার কথা মনে পড়ল রাহুলের।

    আবদুল খান আর বারোড়ি তিনতলার ঘরে সংগ্রহযোগ্য এগজিবিট খুঁজতে যাবার নাম করে আরও কিছু জিনিসপত্র ভাঙচুর-লণ্ডভণ্ড করে এলো। ওই ঘরটায় বাবার সংগ্রহের উনিশ শতকের শেষে ঠাকুর্দার তোলা ফোটোর বহু নেগেটিভ প্লেট সযত্নে রাখার ব্যবস্হা। একটা তাকের সব প্লেটগুলো যে ভেঙে ফেলা হল, তা ভাঙা-কাঁচের ছেতরাবার আওয়াজ থেকে আঁচ করল রাহুল, যা, পরে, বাড়ি ফিরে সত্য বলে জানতে পেরেছিল। ওর লেখালিখির সঙ্গে যে এভাবে বহুমূল্য সংগ্রহ নষ্ট হয়ে যেতে পারে সে ধারণা ছিল না, আর, পরে, যখনই ও প্রাচীন ফোটোর কোনো প্রদর্শনীতে গেছে, বা সে-বিষয়ে কোনো বইয়ের পাতা উলটেছে, অপরাধবোধে ভুগেছে। বাবা মারা যাবার পর, তখন রাহুলের বয়স কত,মমমমমমমম,বাহান্ন, হতে পারে, যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, ওর থিতিয়ে-যাওয়া সেই অপরাধবোধ ফিরে এসে কাঁদিয়ে দিয়েছিল ওকে।

    বাবা মারা গিয়েছিলেন কানপুরে, আর রাহুল তখন ভূবনেশ্বরে ট্যুরে। দাদা অনিকেতের টেলিফোন পেয়েও তৎক্ষণাত ও কানপুর যায়নি ; কয়েকদিন পরে গিয়েছিল, স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে মুম্বাই থেকে তুলে নিয়ে ।

    রাত নটা নাগাদ বাজেয়াপ্ত বইপত্র জিপগাড়িতে তুলে চলে গেল পুলিশের অফিসাররা। রাস্তা থেকে দু’জন লোককে, তারা কর্পোরেশনের ঝাড়ুদার, ডেকে এনেছিল, বাজেয়াপ্ত জিনিসের তালিকায় সই করার জন্য।

    রাহুলকে হাতে হাতকড়া পরালো একজন কনস্টেবল, কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। পাড়ার সকলে ওকে ছোটোবেলা থেকে চেনে। সরকারকে উৎখাত করার কী এমন বই লিখেছে, বই লিখলে সরকার উৎখাত হয় কিনা, একাধজন কাছে এসে জানতে চাইলেও, জবাব দেবার মতন মনস্হিতি ছিল না রাহুলের। নটা বেজে যাবার দরুণ দোকানপাট বন্ধ হয়ে রাস্তাঘাট প্রায় অন্ধকার ; তার মাঝখান দিয়ে বকলস-পরা কুকুরের মতন চলল ও, রশির এক প্রান্ত জনৈক ক্লান্ত-বিরক্ত কনস্টেবলের হাতে।

    একটা সাদা-কালো নেড়িকুকুর, পুলিশ দেখে, কিংবা ওকে ওভাবে দেখে, চেঁচিয়ে অন্য কুকুরদেরও খবর পাঠালো। ওভাবে একজন দর্শনীয় অপরাধী-মানুষ হিসাবে, হাঁটতে-হাঁটতে, দড়ির টানে হাঁটতে-হাঁটতে, রাহুল ক্রমশ টের পাচ্ছিল, যে, সমাজের ভেতরে থেকেও, কী ভাবে সে আলাদা হয়ে চলেছে, হেঁটে-হেঁটে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলেছে, স্বয়ংসম্পূর্ণ একক হয়ে চলেছে, সবায়ের থেকে ক্রমশ পৃথক হয়ে চলেছে। ফুলশার্ট ট্রাউজার চশমা পরা একজন যুবককে, হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবার ঘটনা, এই রাস্তায়, আগে কখনও ঘটেনি মনে হয় ; রাস্তার দু’পাশের জনতা, যারা নিজেদের দোকানপাতি গোটাতে ব্যস্ত, ওর দিকে তাকিয়ে।

    আলাদা হবার অভিজ্ঞতায় যে লুকোনো হর্ষ, গোপন আহ্লাদ, চাপা গর্ববোধ, আর অতিক্রমণের নিরাময় থাকতে পারে, তা ওর ভাবনায় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়া পরা অবস্হায়। অথচ আলাদা তো হতে চায়নি ও, রাহুল।

    জীবনে এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই ঘটনার পর আর কোনো আক্রমণ, সমালোচনা, টিটকিরি, খোঁচা দিয়ে বলা কথা ওর অপ্রিয় লাগেনি, লাগে না, অপমানজনক মনে হয়নি, হয় না। অপ্রিয়, এই শব্দটাই অকর্মণ্য হয়ে গেছে রাহুলের ক্ষেত্রে, এক্কেবারে ফালতু।

    হাজত থেকে কানপুরের ফৌজদারি আদালতে যাবার দিন ভোরবেলা, থানায় এসেছিলেন সুমিতাদি, সুমিতা চক্রবর্তী, গায়ে কাশ্মিরি শাল চাপা দিয়ে, বেশ উদ্বিগ্ন, বলেছিলেন, আজকের ডেইলি পায়োনিয়ারের প্রথম পাতায় তোর গ্রেপ্তারির সংবাদ পড়ে নিজেকে সামলাতে পারলাম না, নাউ ইউ হ্যাভ ডান ইট, রাহুল, ইউ হ্যাভ ডান ইট,বৈঠকখানা থেকে পথে নামার ছাড়পত্র পেয়ে গেলি, কনগ্র্যাচুলেশান্স। অন্য কয়েদিদের অবাক করে, গরাদের ভেতর হাত বাড়িয়ে রাহুলের চুলে বিলি কেটে দিয়ে, বেবি অস্টিন চালিয়ে চলে গিয়েছিলেন।

    ওঝাপুরের পথে, রাহুলের বয়স তখন কত, বোধহয় সত্তর, মমমমমমমম, থাকগে, সে যা-ই হোক, কী-ই

    বা এসে যায়, ফ্ল্যাট অনুসন্ধানকালে, একজন বিদেশিনীকে দেখে, পুলিশের বাজেয়াপ্ত-করা ফোটোগুলোর স্মৃতি উসকে ওঠায়, কয়েক দশক আগের ওই ঘটনাগুলো আচমকা মনে পড়ে গেল।

    ‘আরে, আমি তো এ- জায়গায় এসেছি আগে, অনেক বছর আগে, বেশ কয়েকবার এসেছিলুম’, রাহুল সিংহ, যার গায়ের চামড়া হয়ে গেছে মরচেপড়া লোহা, বলল তিরিশোর্ধ ছেলে পার্থপ্রতিমকে। রাহুল আর ওর স্ত্রী সুমনা

    দুজনেই সত্তর পেরিয়েছে, তাই পার্থপ্রতিম, নিজের বাসার কাছাকাছি সাংসারিক আসবাব সমেত একটা ফ্ল্যাট দেখাতে নিয়ে এসেছিল। যে ফ্ল্যাটের ভাড়া সে-সময়ে ছিল একশ টাকা, তা এখন কুড়ি হাজার ; যে ফ্ল্যাটের দাম ছিল এক লাখ টাকা, তা এখন এক কোটি। যে পথে ছিল সবুজ গাছগাছালি, সে পথ নিজেই নিজেকে খুঁজতে বেরিয়ে

    চুন-বালি-ইঁট-সিমেন্টে-দেয়াল শ্লোগানে নিরুদ্দেশ। ধানখেত ছিল, ছিল ধানখেতের সবুজ বাতাস, ছিল চাষি ; ছিল পুকুর, পুকুরে হাঁস, হাঁসের ডাক, মাছের আচমকা ঘাই ; সেসব কোথ্থাও নেই।

    একই বাড়িতে একই পাড়ায় একই শহরে বেশিদিন থাকতে পারে না রাহুল, পারেনি, ফলে, এতদিন ছিল পশ্চিমবাংলার বাইরে একের পর এক প্রবাসে। ওর মনে হয়, একই মানুষের দ্বারা পরিবৃত থাকবার ফলে জীবন ও জীবনবীক্ষা মামুলি ও ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে। নতুন কিছু ঘটার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যায়। যদিও রাহুল রেকলুজ প্রকৃতির, একা থাকতে পছন্দ করে, কম কথা বলে, কিন্তু ওর চারিদিকের মানুষদের কথাবার্তা ও জীবনযাত্রায় আগ্রহের কারণে, একই বাড়ি-পাড়া-শহরের ঘানিতে পাক খেয়ে, একই মানুষের মুখ অবিরাম দেখে-দেখে ও তাদের কথাবার্তা শুনে, কিছুদিনের মধ্যেই দমবন্ধ, ক্লান্ত ও হতাশ বোধ করে। হ্যাঁ, ঠিকই, অন্যের জীবনের রুটিনবদ্ধ-ঘটনাহীনতা, ওর জীবনকেও ঘটনাহীন করে তুলতে পারে এমন আশঙ্কায় পীড়িত হয় । যে-শহরেই থেকেছে, একা-একা রাস্তায়-রাস্তায় হেঁটেছে, চাকরি করার সময়ে ছুটির দিনে, অবসর নিয়ে প্রতিদিন।

    প্রতিটি ঘরের নিজস্ব উদাসীনতার যন্ত্রণাক্লিষ্ট বা আনন্দঘন সুবাস হয়, প্রতিটি বাড়ির নিজস্ব নয়নসুখ আলোবিচ্ছুরণ আর ঘনান্ধকারের রহস্য, প্রতিটি পাড়ার নিজস্ব বুলির গুঞ্জনমালা বাতাসকে ভারাক্রান্ত বা হালকা স্পর্শে ভাসায়, প্রতিটি শহরের নিজস্ব কথাপ্রণালীর কাহিনিময় শব্দতরঙ্গ চতুর্দিক মথিত করে। সে-কারণে চিরকাল নতুন সুবাস, আলো, গুঞ্জন ও শব্দতরঙ্গের অনুসন্ধানে ক্ষণিক-তীর্থের উদ্দেশ্য-সন্ধানী যাযাবরের মতন একা চরে বেড়াবার প্রয়াস করে গেছে রাহুল। তা করতে গিয়ে, ওর দেহের এমনই ক্ষতি হয়েছে যে সত্তরে পৌঁছে, এক-একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের হাতে এক-একটা অঙ্গ আর প্রত্যঙ্গ সোপর্দ করে দিতে হয়েছে।

    জীবনের বাঁকবদলগুলো অন্যের হাতে ছেড়ে দেয়নি। ওকে নিয়ে, সময়ের রঙের সঙ্গে তাল দিয়ে, এক জিভ থেকে আরেক জিভে, তা থেকে আরও-আরও জিভে, বহু গল্পের লাফালাফি হয়েছে, হয়ে চলেছে আজও, জানে ও। গল্প যারা তৈরি করেছিল, তারা প্রায় কেউই আর নেই ; নানা রকম রোগ তাদের দখল করে শ্মশানে বা কবরে তুলে নিয়ে গেছে। ও-ভাবে উঠে যাওয়ায়, অনেকের ক্ষেত্রে, রাহুলের মনে হয়েছে, গুড রিডেন্স অব ব্যাড রাবিশ, যা ও বলেওছে কাউকে-কাউকে, যারা কখনও-সখনও রাবিশের স্তুপ থেকে মুণ্ডু বের করে ওর দিকে পিটপিটিয়ে তাকিয়ে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছে।

    গোরখপুরে ট্যুরে গিয়ে, সেখানের কৃষি আধিকারিক হরিশচন্দ্র শর্মা, ওকে নিয়ে গিয়েছিল গোরখনাথ মন্দিরে, রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমম, বোধহয় চুয়াল্লিশ, থাকগে, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, এক সাধু হঠাৎ দৌড়ে এসে জটাপড়া দাড়ি ওর মুখে ঘষে দুর্গন্ধিত হাঁ-মুখ খুলে নোংরা দাঁতের হাসি ছড়িয়ে বলেছিল, ‘’দীকছা অওর আশির্বাদ দে রহা হুঁ তুমহে, জয় ভোলেনাথ, কোই ভি আদমি, যো তুমহারে সাথ দুশমনি করেগা, ও্য়হ তুমসে পহলে মর যায়গা। ’’ তখন রাহুলের ফালতু, বিরক্তিকর, লেগেছিল নোংরা-গেরুয়াল্যাঙোট সাধুর ছাইমাখানো বুকনিটা, কেননা ওর পৈতের সময় পুরুতমশায় তেরো বছর বয়সেই ওকে দীক্ষা দিয়েছিলেন, কানে-কানে গায়ত্রীমন্ত্র, যা এখন মোবাইলের কলার টিউন বা অ্যালার্মে বাজে। অনেক সময়ে নামজানা কেউ মারা গেলেই রাহুলের ঘুমন্ত আতঙ্ক চাগিয়ে ওঠে, আর মনে হয়, আরে, কি ভয়াবহ, এ লোকটা তো সত্যিই শঠতা করেছিল, পেছনে লেগেছিল।

    কাচের বাসন ভাঙার আওয়াজে বাবার দুশ্চিন্তিত মুখ ভেসে ওঠে। কোনো ফ্যক্ট্রিতে লোহা বা টিন পেটার ঠুংঠাং ধ্বনি উঠলে মায়ের বিয়ের তোরঙ্গের কথা মনে পড়ে।

    একদিন দুপুরে, তরুণ নট তীর্থংকর গুহরায় রাহুলকে ফোনে জানালো যে সুপ্রসিদ্ধ মাতাল এবং স্বল্প-পরিচিত নট প্রভাস চোঙদার মারা গেছে, ঠিক সেই সময়ে, প্রভাসেরই অপেরার একটা রচনাংশ, রাহুলকে উদ্দেশ্য করে লেখা,

    পড়ছিল, এমনি-এমনি, ডাকে বহুদিন আগে পাঠিয়েছিল প্রভাসেরই বধিবিহার-নিবাসী জ্ঞাতি, “এই তো উনি

    সকালবেলায় দাড়ি মুখ পয়পরিষ্কার করলেন — বেরোনোর আগে –, বৌয়ের হাত থেকে মায় চুন অবধি — কিন্তু আর ফিরে এলেন না — হয় এরকম — তাছাড়া আমাদের বাবারা আমাদের জন্য কোনো উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেননি — রাখবার কথাও ছিল না অবশ্য–”। টেলিফোনটা রিসিভারে রেখে স্তম্ভিত রাহুল, নাকে এসে লাগল গোরখপুরের সাধুর জটার দুর্গন্ধ। কী করে প্রভাস নিজের মৃত্যুর কথা গোরখপুরের সাধুর কাছ থেকে আগাম জেনে ফেলেছিল ! প্রভাস যখন

    লিখেছিল, তখন রাহুলের বয়স, মমমমমমমম, বোধহয় পঁয়ত্রিশ, থাকগে, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, অথচ এতকাল পড়েনি। পড়তে বসল কিনা প্রভাস চোঙদারের মৃত্যুর দিন, যেদিন থেকে ও আর ফিরবে না !

    তিরিশ বছর পরে, কলকাতায় ফিরে, প্রভাস চোঙদারের মফসসলের বাড়িতে গিয়েছিল অনিকেত আর রাহুল, ওকে আগাম না জানিয়ে। লোকাল ট্রেন থেকে নেমে, রিকশ ধরবে বলে দাঁড়িয়েছিল, দেখল দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক দলের

    মিছিলে লাল ঝাণ্ডা নাড়িয়ে স্লোগান দিতে-দিতে চলেছে প্রৌঢ় প্রভাস। একদা-প্রতিষ্ঠানবিরোধী আজ কোন লোভে বা ভয়ে শাসকের দলে ভিড়ে গিয়ে তাদেরই ধ্বজা ওড়াচ্ছে ? ওরা অবাক। মিছিলে ঢুকে ওকে ডাক দিতেই, বোঝা গেল, রাহুলের চোখের আয়নায় নিজেকে দেখতে পেয়ে, আঁৎকে উঠল প্রভাস। আরেকজনের হাতে ঝাণ্ডা-পরানো ডান্ডা ধরিয়ে, ওর বাসায় নিয়ে গেল। বাসায় গিয়ে, প্রবেশ করেই, রাহুল দেখতে পেল, দেয়ালে ঝোলানো শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রীর ফোটো, এক কোনে ডাঁই করে রাখা লাঠি আর দলের ঝাণ্ডার গোছা, থাকের পর থাক দলীয় সংবাদপত্র। দেখে থ হয়ে গেল ওরা, রাহুল আর রাহুলের দাদা অনিকেত।

    প্রভাস জানাল, উপায় নেই, ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা ভুলে যাও, মফসসলে থাকলে বুঝতে।

    –তাহলে মাঝে-মধ্যে আন্দোলনের নাম করে পত্রিকা প্রকাশ করছ কেন ?

    –আন্দোলনকে এইভাবেই জিইয়ে রেখেছি।

    –শাসকের সঙ্গে যোগ দিয়ে ?

    –শাসক বলছ কেন ? দ্রোহের মাধ্যমে সমাজকাঠামোয় উলটপালট করছি আমরা, সমাজকে দিচ্ছি বৈপ্লবিক অভিমুখ, গ্রামে গিয়ে দেখে এসো, ঔপনিবেশিক সামন্তকাঠামো আর খুঁজে পাবে না।

    রাহুল বলল, আমি তো পশ্চিমবাংলার গ্রামে-গ্রামে ঘুরে বেড়াবার চাকরিটাই করছি ; তোমরা হেঁসেল থেকে শোবার ঘর, খেত-খামার থেকে দপতর, এমন নজরদারি-জাল বিছিয়ে দিয়েছ, আর মগজ-দখলের নৃত্য চালিয়েছ, যে লোকে কথা বলতে ভয় পায়। দাড়ি-গোঁফ আছে আর হিন্দি-উর্দু জানি বলে অবাঙালির ভেক ধরে তাদের সঙ্গে কথা বলি আর প্রকৃত তথ্য আদায় করি। নতুন সামন্তকাঠামো গড়ে তুলেছ তোমরা প্রতিটি গ্রামে।

    প্রভাসের শরীরের ভাষা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে ওর কাছে প্রতিষ্ঠান শব্দটার মানে পালটে গেছে। ওর ভেতরে যে লড়াই চলছে, তা, ও, প্রভাস, লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে গেল ; প্রতিষ্ঠানের কাছে হেরে যেতে বাধ্য হয়েছে, মফসসলি সন্ত্রাসের চাপে পড়ে। রাহুলকে বলল, তোমার পশ্চিমবঙ্গ-বিশ্লেষণ পড়েছি, সব লেখাই পড়ি, সব নট্ট কোম্পানিতেই তো আজকাল দেখছি তোমার পায়ের ছাপ।

    –তোমার অপেরার অভিনয়ও তো দেখি, আমার আর রাহুল সম্পর্কে তরুণ নটদের যে গালগল্প শুনিয়েছ, তাও জানি, তাদের কেউ-কেউ বলে ফেলেছে। এমনকি নিজের স্ত্রীকেও একজন আন্দোলনকারী ঘোষণা করেছ। কামেশ্বর চোঙদারও তা-ই করেছে। ভালোই, কাউকে বাদ দেবার প্রকল্প তো আমাদের ছিল না, তাই স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সকলকেই অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা যেতে পারে। অনিকেত বলল।

    রাহুল বলল, আমার ছেলে আর মেয়েকে নির্দেশ দেয়া আছে যে তারা যেন কখনও কারোর বিরুদ্ধে আমার লেখালিখি নিয়ে নাক না গলায়, কেননা আমার লেখালিখি উত্তরাধিকারহীন।

    অনিকেত বলল, যাক, তোমার সঙ্গে আবার দেখা হল, তোমার বীশ্ববীক্ষার তারল্যের সঙ্গে পরিচয় হল ; কিন্তু মুচলেকা দিয়েছিলে, সে কথাটা অস্বীকার করো কেন ? প্রদীপন, রক্তিম, চঞ্চল, ওরাও তো পুলিশের সাক্ষী হয়েছিল, কিন্তু কেউই তোমার আর কামেশ্বরের মতন লুকোছাপা করেনি, গল্প বানিয়ে পরের প্রজন্মকে ভুল বোঝায়নি। ওরা কেউই অস্বীকার করে না।

    –হেঁঃ হেঁঃ।

    –আন্দোলনের ইতিহাসকে বিকৃত করার কি সত্যিই দরকার ছিল ? বলল রাহুল।

    প্রভাস চোঙদার কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ গম্ভীর করে, আরোপটা স্বীকার করে নিল। বেশ কিছুক্ষণ পরে বলল, “অসীম গাঙ্গুলি প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে যেভাবে বাইরে থেকে ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন সেভাবে মহাভারত নট্ট কোম্পানির বঙ্কু বোস ভিতর থেকে ভেঙে দিতে চেয়েছেন, কামেশ্বরের কাঁধে বন্দুক রেখে।”

    রাহুল বলল, হ্যাঁ, জানি, কলকাতায় এসে তিন-চার বছর কাটিয়ে, অমন ধারণা আমারও হয়েছে ; রামায়ণ নট্ট কোম্পানি যেমন আন্দোলনকে বাইরে থেকে ভেঙে দিতে চাইছিল, তেমনই, মহাভারত নট্ট কোম্পানি ভেতর থেকে ভেঙে দেবার চেষ্টা করে গেছে, মূলত কামেশ্বর চোঙদারের মাধ্যমে। কিন্তু জেলি ফিশদের তো ভাঙা যায় না।

    শাসক-দলের সঙ্গে বেঁধে-বেঁধেই থাকো, বঙ্গকেজিবির ছত্রছায়ায়, বলে, ওর বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছিল অনিকেত।

    তারপর তীর্থঙ্কর গুহরায়ের টেলিফোনে প্রভাসের মৃত্যু সংবাদ ; মৃত্যু দিয়ে প্রভাস প্রমাণ করে গেল যে মফসসলি সন্ত্রাসের চাপ আর ও নিতে পারছিল না, পাড়াতুতো নেতাদের এড়াবার জন্য সবসময় মাতাল থাকতে হচ্ছিল। মারা গেল রক্তচাপজনিত হার্ট অ্যাটাকে।

    ওইভাবেই, হঠাৎই, কোনো ভুলে-যাওয়া ঘটনা মনে পড়ে যায় রাহুলের, হয়তো সংবাদপত্রের পাতায় দাঙ্গার খবর পড়ে। রাহুলের বয়স তখন, মমমমমমমমম, বোধহয় বত্রিশ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। ফয়জাবাদের এক সংস্হার পরিচালন পরিষদের সদস্য হিসাবে প্রায়ই যেতে হত ওই ঘুমন্ত গঞ্জ শহরে, গ্রামীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসাবে। একদিন সংস্হার অধ্যক্ষ বললেন, চলুন আপনাকে অযোধ্যা দেখিয়ে আনি, রাম কোথায় জন্মেছিলেন দেখে যান। অবাক হল রাহুল। বাল্মিকীর মস্তিষ্কপ্রসূত অযোধ্যানগরী আর রাম, ওই মহাকাব্যের বাইরে, প্রচ্ছদ ফুটো করে, বাস্তব জগতে কী করে এলেন ! সত্যই আছে নাকি অযোধ্যানগরী ? অ্যামব্যাসাডরে চেপে গোলাপিফুল পোস্তখেত আর সবুজ ধানখেতের হাওয়া মেখে পৌঁছোল নোংরা ঘিঞ্জি এক জায়গায়।

    অধ্যক্ষ এক ফুলঅলাকে জিগ্যেস করতে, সে বললে, ও রামকোট খুঁজছেন ? ওই বাঁদিকের খোঁড়া রাস্তাটা দিয়ে যান।

    এটা অযোধ্যা ? না এলেই তো ভালো হত। কল্পনার অযোধ্যার সঙ্গে তো কোনো মিল নেই, এতই নোংরা, এঁদো, পুজোর দোকানপাটে দমবন্ধ পথগুলোয় গাড়ি ঢোকা মুশকিল। অতএব নেমে হাঁটতে হল, বাঁদরের উৎপাত সামলে। শুকনো খাদের ধারে, আগাছায় ঘেরা, বৃষ্টি আর রোদে কালো, ফাঁকা চুনসুরকি-খসা ইঁটবেরোনো মসজিদকে দেখিয়ে অধ্যক্ষ বললেন, এই যে এইটিই রামের জন্মস্হান। প্রধান গম্বুজ আর তার দু’ধারে ছোটো গম্বুজ, দশরথের প্রাসাদ।

    সুর্যবংশের মহারাজা দশরথের প্রাসাদ !

    এটা ? জনশূন্য, লোকজন নেই, একেবারে ফাঁকা, কেবল একজন পাহারাদার দড়ির চারপাই পেতে ঘুমোচ্ছিল প্রবেশপথের সামনে। সে বলল, স্যার আপনারা জুতো খুলে যান। রাহুলের অবিশ্বাস আরও দৃঢ় হল ; দশরথ রাজার বাড়িতে জুতো খুলে যেতে হয়, এরকম কথা বাল্মিকী লিখেছেন বলে তো মনে পড়ল না। সে রাজত্বের সিংহাসনে নির্বাসিত-বনবাসী রাজপুত্রের জুতো রাখা হতো। তখনকার দিনে হয়ত ঘাসের দড়ি দিয়ে বোনা জুতো হতো ; যদিও বাঙালি কবি বলেছেন খড়ম। খড়ম পরে সারা রাজ্যে চলাফেরা অসম্ভব ছিল নিশ্চই।

    ভেতরে, হলঘরসদৃশ এলাকায় ঢুকে আরও অবাক। লম্বাটে ঘরে বেঞ্চ ধরণের একটা বেদির ওপর গোটাকতক মূর্তি রাখা। বাঁদিকের একটা থাম কেবল কালো গ্র্যানিট পাথরের, যার গায়ের ভাস্কর্য দশরথের প্রাসাদের নয় বলেই তো মনে হল। এটা আঁতুড় ঘর? দেয়ালের চুনসুরকি খসে-খসে পড়েছে, দশরথের দাসদাসীরা প্রতিদিন পরিষ্কার করে বলে মনে হল না।

    অধ্যক্ষকে বলল, আপনি আমার কল্পনার মহাকাব্যকে নষ্ট করে দিলেন। তখনও পর্যন্ত, টিভি-জগতের রঙিন রাজা-রাজড়ারাদের জন্ম হয়নি, যারা পরে রোম বা গ্রিসের সৈন্যদের পোশাক পরে দেখা দেবে বিভিন্ন সোপ-অপেরায়। মন-খারাপ করে ফিরে এসেছিল রাহুল।

    বহুকাল পর, রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমমম, বাহান্ন বোধহয়, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, মুম্বাইতে পোস্টেড, শীতকালের কয়েকদিন লাগাতার সংবাদ বেরোচ্ছিল দশরথের সেই প্রাসাদ ধ্বংসের তোড়জোড় চলছে, শেষে টিভিতে দেখল, অজস্র লোকের গেরু্য়া কিলবিল উঠে পড়েছে গম্বুজের ওপর, ভাঙতে আরম্ভ করেছে, ধুলো উড়ছে। মন আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আজ আর দশরথের রাজপ্রাসাদকে কল্পনায় আনতে পারে না রাহুল, চোখ বুজলেই দেখতে পায় একজন পাহারাদার, জনশূন্য মসজিদে কয়েকটা মূর্তি, আর অজস্র লোক তাকে ভাঙবার জন্য ওপরে উঠে নাচছে। কল্পনা জবরদখলের নৃত্য।

    তার কয়েকদিন পরে, নিজের ফিয়াট গাড়ি ড্রাইভ করে অফিস যাচ্ছিল রাহুল, দেখল, মাহিমের কাছে, রাজপথের

    ওপর, মারামারি চলছে, জনগণের এই ধরণের মারামারি এর আগে কখনও দেখেনি ও, রাহুল। কারোর কারোর হাতে লাঠি, তরোয়াল, ছোরা এমনকি. মনে হয়েছিল, জনাকয় লোকের হাতে বন্দুক। তরোয়ালের কোপে, ওর আতঙ্কিত চোখের সামনে, স্বামী বিবেকানন্দ রোডে পড়ে গিয়েছিল দুজন লোক। প্রাচীনকালে যে যুদ্ধ খোলা মাঠে হতো, সৈন্য-সামন্তরা করত, তা করছে খ্যাংরাটে গরিব মানুষের দল। করছে একদল অন্যদলের কল্পনাজগতকে দখল করার

    জন্য। মাহিম-ব্যান্ড্রার মোড়ে গাড়ি ঘুরিয়ে ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেস হাইওয়ে দিয়ে সান্টাক্রুজ কোয়ার্টারে ফিরে এসেছিল। পরের দিনের সংবাদপত্রের খবরে জানতে পারল যে অনেক গাড়ি পুড়েছে, কতজন মারা গেছে তা জানা যায়নি।

    টিভি দেখতে-দেখতে ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল অনেককাল আগে দমদমের পথে রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারী-মশায়ের ঢিল ছুঁড়ে-ছুঁড়ে বায়বীয় অপেরার যুদ্ধক্ষেত্রে লাশ ফেলার প্রয়াস। সেও ছিল কল্পনা দখলের খেলা। দাদা অনিকেত দেখা করতে গেলে আরও বড়ো একখানা পাথর ছুঁড়েছিলেন নর্দমায়, যার পাঁক চলকে নোংরা করে দিয়েছিল দাদার ট্রাউজার।

    রাহুল, কোন মহাগ্রাসে আক্রান্ত হয়ে, জঙ্গম-সক্রিয় প্রেমের স্বনির্মিত কলুষে, যে দিকে ইচ্ছা সূর্যোদয় ঘটাবার ইন্দ্রিয়মন্হন চালিয়েছিল, অক্ষরের যুদ্ধক্ষেত্রে একক লড়াইয়ের সেইসব দিনগুলোয়, মাঝে-মধ্যে ভেবে ফ্যালে,

    তাড়ণাতাপের বিচলনে চক্রব্যুহে প্রবেশ-ক্ষমতার দুঃসাহস তো সকলের থাকে না, ওর কেন হল, কী করেই বা হল, বর্ণোচ্ছল স্মৃতিতরঙ্গের ঈশ্বরহীন অভিনিবেশের জাদুময়তা, মরুভূমির চিরকালীন উজ্জ্বলতায় অভ্রান্তির নিমগ্ন অভিসার, উপাসনা-বর্জিত, একক উজ্জীবন !

    ছেলেকে বলছিল রাহুল, অসীম গাঙ্গুলি নামে একজন নট থাকতেন ওঝাপুরের এই পাড়ায় ; তাঁর দোতলার ফ্ল্যাটে যেত ও, নিয়মিত না হলেও বার পাঁচ-ছয় গিয়েছিল। তার আগে ওনার নিমপুকুর স্ট্রিটের বাড়িতেও গিয়েছিল। শেষবার কথা কাটাকাটির পর আর মাত্র এক বারই। সামনে আধমরা ঘাসের উবড়ো-খাবড়া মেঠো শহুরেপনা নিয়ে দোতলা বাড়ি, চূনকামের অবহেলায় আর বৃষ্টির দাপটৈ ছাইরঙা, যার ওপর তলায়, ছটা ফ্ল্যাটের একটিতে ভাড়া থাকতেন উনি। ছড়ানো-ছেটানো জায়গা নিয়ে বাগান ; ফুল-ফলের গাছ, তারপর গেট দিয়ে ঢুকে, ওপরে উঠে গোলবারান্দা। দক্ষিণ দিকে সবুজ, এখনকার নাগরিকের চোখে প্রান্তর বলা চলে, শাকসব্জির চাষে ব্যস্ত ক্ষেতমজুর। আর বিশাল জলাশয়। এখন সে জায়গায় বহুতল আবাসন, চেনা কঠিন, যেমন আর চেনা যেত না ওনাকে, সর্ষের তেল বা কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধের বিজ্ঞাপনে বা পেজ থ্রির খোকা-খুকুদের রঙিন গ্যানজামের চাককাটা বুশশার্টের লোলচর্ম ফোটোয় ।

    টিভিতে অসীম গাঙ্গুলির বিশাল শবযাত্রা দেখেছিল রাহুল সিংহ ; ছুটকো-ছাটকা নট্ট কোম্পানির অভিনেতাদের হইচইময় শোকযাত্রা। রাহুলের বয়স তখন কত হবে, মমমমমমম, বোধহয় বাহাত্তর, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। টিভিতে ওনাকে নিয়ে যে প্রোগ্রাম হয়েছিল, বিজ্ঞাপনের কাঁটাতার ডিঙিয়ে তা থেকে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, যে, যৌবনের গোলালু স্বাস্হ্য শুষে উপঢৌকন দিয়েছেন জনপ্রিয়তার নেশাকে। রবীন্দ্রনাথও অনেক বয়স পর্যন্ত, প্রস্টেটের শারীরিক কষ্ট নিয়ে বেঁচেছিলেন, কিন্তু অসীম গাঙ্গুলির মতো অমন শুকিয়ে আমসি হয়ে যাননি তো ! যশ আর জনপ্রিয়তা তাহলে ভিন্ন। কুড়ি-তিরিশের কোঠায় রবীন্দ্রনাথের যে গোঁফ ছিল তাতে উনি তা দিতেন, ফোটো দেখে অনুমান করা যায়, আদর-খাওয়া গোঁফের প্রান্ত। অসীম গাঙ্গুলি কখনও গোঁফ রাখেননি, যতদূর মনে পড়ে, সেই যখন উনি কলেজে পড়তেন, ধুতির ওপর বাড়িতে-কাচা হাফ-হাতা শার্ট, তখনও।

    স্কুল-কলেজের সিলেবাসে ঢোকার আনন্দে কী দেহের স্নেহপদার্থকে অসীম গাঙ্গুলি গলিয়ে ফেলেছিলেন ? কিংবা হাপিত্যেশ করে বসে-থাকা প্রকাশকদের অগ্রিমের কড়ার রাখতে। অথবা তরুণ স্তাবকদের টাঙানো প্রশংসার মশারিতে ঢাকা গদিতে শোবার নেশায়। হবেও বা। ডটপেনের রিফিলে ভরা নীল কল্পনাপ্রবণ স্নেহপদার্থ !

    শেষ বারের পর রাহুল ওনাকে, মানে অসীম গাঙ্গুলিকে, অ-দেখন বা নির্দেখা করে দিয়েছিল, কারণ উনি তখন বিখ্যাত, কোষ্ঠকাঠিন্য আর সর্ষের তেলের বিজ্ঞাপনের পোস্টারে, অপ্রতিরোধনীয়তার দুরমুশে বয়সের বানভাসি-খাওয়া ওনার ফুলকোফোলা মুখ ঝুলত লাইটপোস্টগুলোয়, টিভির পর্দায়, দুর্গা-প্রতিমাকে পুরস্কার দানকারী গ্লসি পত্রিকার পাতায়-পাতায়, ক্ষমতার মায়াময় চোখধাঁধানো নিখুঁত মানুষের অতিকথার হাসি, ঠোঁটের ইন্দ্রজালে মিশিয়ে হয়ে উঠেছেন মধ্যবিত্ত বাঙালির গন্ধমাদনের উদ্ভিদ, নটবণিক।

    রাহুলের দাদা অনিকেত সিংহের বাড়িতে, যখন যে শহরে পোস্টিং হয়েছে দাদা অনিকেতের, অসীম গাঙ্গুলি

    গেছেন সেখানে বেড়াতে, ওনার নট্ট কোম্পানির বন্ধুদের দলবল নিয়ে। বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে। শিশুপুত্রকে নিয়ে।

    প্রিয় বন্ধু ছেলেকে নিয়ে আসছেন শুনে দুধেল গোরু কিনেছিল অনিকেত ; কলকাতায় তো আর খাঁটি দুধ খাওয়া হয় না, যদিও পাড়ায়-পাড়ায় দলীয় বলদের খাটাল। বিখ্যাত হবার পর, কোষ্ঠকাঠিন্য, সর্ষের তেল, দোল-দুর্গোৎসব, সভা-সন্মেলন, বিদেশ ভ্রমণ থেকে ফুরসত পেতেন না বলে অধিকারীমশায় যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন ; সাহিত্যসভায় প্রধান অতিথির আসনে বসে, প্রথমে প্রৌঢ়, পরে বৃদ্ধ, অনিকেতকে চিনতে পারতেন না। অনিকেতও ওনাকে অচেনা

    করে দিয়েছিল। অসীম গাঙ্গুলি মারা যেতে, লিটল অপেরাদের নতুনগোঁফ অধিকারীদের বায়নার দরুন অচেনা থেকে চেনায় ফিরতে হয়েছে অনিকেতকে ; পুরোনো কাগজপত্র ঘেঁটে অসীমের কয়েক দিস্তা চিঠি, যেগুলোর কপিরাইট উইপোকারা দাবি করেনি, তাদের বিলিয়ে দিয়েছেন অনিকেত।

    অসীম গাঙ্গুলি মারা যাবার পর ওনার মানসীর ভাসিয়ে দেয়া নিঃশ্বাসগুলো মনে পড়ল রাহুলের—

    ‘’যেহেতু প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তাই অপেরা লিখতে তোমায় হবেই ?”

    “পুজোয় তোমার অপেরা নাহলে কি-ই বা হত বলো তো ?”

    “শরীর যদি বিদ্রোহ করে, তবুও কেন ! কেন তোমায় অপেরা লিখতে হবে ?”

    “অপেরা যদি খুব খারাপ হয় তারচেয়ে না লেখাই কি ভালো ছিল না ?”

    সে-সব বাতাস গায়ে এসে লাগায়, রাহুলের মনে হল, রবীন্দ্রনাথকে অমন করে বলার স্মৃতি-বিদেশিনী ওনার বোধজগতে ছিল না বলেই কি লেখালিখি বাদ দিয়ে ছবি আঁকতে আরম্ভ করলেন ? তোরা যে যা বলিস ভাই, লিখব না লিখব না।

    তা নয়। অসীম গাঙ্গুলীর জীবনে কোনো ব্যর্থতার বিষাদ ছিল না, লাৎ মেরে চলে যাবার সময়ে প্রেমিকার দেয়া পরাজয়ের ক্ষয়রোগ ছিল না, নিকটতমের উধাও হবার মানসিক অশান্তি ছিল না, অন্তরজগতে কখনও হাহাকার বাসা বাঁধেনি।

    আর ? আর হাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি-বাঁধা অবস্হায় ডাকাত-খুনি-চোর-পকেটমারদের সঙ্গে রাজপথ দিয়ে জনগণের চোখের সামনে হাঁটার অভিজ্ঞতা ছিল না।

    ওনার, মানে অধিকারীমশায়ের, বা আর কারোর, চিঠিফিটি রাখেনি রাহুল সিংহ। যেগুলো পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেনি, সেগুলো কুটিকুটি করে উড়িয়ে দিয়েছে। রাহুলের মা বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, সব্বাইকে ছিঁড়ে গুয়ের ডাবায় ফেলে দে, এখনও মেথরানিটার আসার সময় আছে। ’ রাহুলদের কানপুরের বাড়িতে, তখন খাটা পায়খানা ছিল। অবশ্য গুয়ের ডাবায় ফেলেনি ; তিন তলার ছাদে দাঁড়িয়ে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে উড়িয়ে দিয়েছিল সাওনকে মহিনার ভিজে হাওয়ার উদ্দেশে ; রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমমম, থাকগে, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়।

    গুয়ের ডাবা ছেঁড়া চিঠির টুকরো-টাকরায় কবিত্বময় হয়ে উঠতে পারে, হয়ত এই আশঙ্কায়, রাহুলের অনুমান, পরের বছর থেকে, সরকারি হুকুমনামায়, খাটা পায়খানা বন্ধ হয়ে গেল।

    –কেতুর ঘাড়ে বসে দুবচ্ছর খেয়েচে-দেয়েচে ওই রক্তিমটা, কেতুকে যে তোশক দিয়েছিলুম তাতে কতগুলো সিগারেটের ছ্যাঁদা করেচে দেখেচি, মদের গেলাস ফেলে দাগ ধরিয়েছে, লজ্জা নেই, কেতুর বন্ধুদের রেঁধে-বেড়ে খাইয়েচি, ওদের বাসন মেজেচি, আর তার বদলে কিনা এই ? অকিতোগ্গো, অকিতোগ্গো। বলেছিলেন মা।

    –কেতুর রোলেক্স হাতঘড়িটা, যেটা ওর জ্যাঠা দিয়েছিল, সেটাও তো ওদের কেউ হাতিয়েছিল, তারপর থেকে কেতুটা হাতঘড়ি পরাই ছেড়ে দিলে। বলেছিলেন বাবা।

    স্মৃতি যদিও তার পর অজস্র ছবি গড়েছে আর মুছেচে, দুটো হুল ফুটিয়ে-ফুটিয়ে সময়কে বিষাক্ত করে দিয়েছে নানারকমের ঘড়ি, তবু মনে পড়ে যাচ্ছিল রাহুলের, সেই সব গোলমেলে আচরণের ইতিহাসে ছয়লাপ মানুষদের মুখমন্ডল। মাতাল জোচ্চোরদের তাপদগ্ধ বালখিল্যে থমথমে কুতূহলী কফিহাউসের, আর চপল শুঁড়িখানার মর্মভেদী ঝিলমিলে একাকীত্বের জবজবে টয়লেট। বাসে-ট্রামে স্যাঁতসেতে ঘেমো ভিড়ের ভেপো যাত্রীদের গা-ঘেঁষাঘেষি অভিজ্ঞতা। জীবন্ত রক্তমাংসে পুনরুথ্থান ঘটছিল মৃতদের। বদল ঘটেছে কি ? আসলে পরিবর্তন হল কল্পনা, ম্যাজিক, ইন্দ্রজাল ; কেননা বদল তো শাশ্বত, চিরন্তন, চিরস্হায়ী।

    আর রাহু-কেতু ? যারা কল্পনামন্হনে উঠে এসেছিল ? তারা পৃথকভাবে একক অনুপম অদ্বিতীয় সর্বগ্রাসী সর্বভূক সর্বাশী সর্বত্র-বিদ্যমান স্হিতধী বন্ধনহীন সীমাহীন অতিবাস্তবতার ভূমন্ডলের যাযাবর, আর তাই, উত্তরাধিকারহীন।

    আগের আর পরের মাঝে স্হিতিস্হাপকতাই বোধহয় ঐতিহ্য। কিন্তু যদি আগের আর পরের স্হিতিতে যারা

    আছে তারা না মানে তাহলে আর কীই বা করা।

    তারপর, সেই যে, তারপর, অসীম গাঙ্গুলির ওঝাপুরের বাসায় ইলিশের বদলে আমেরিকান কই।

    –আমি, আমিই তোমাকে অপেরা-জগতে এনেছি ; তা তুমি ভুলে গেলে কী করে ? আমিই সর্বপ্রথম তোমার লেখা অপেরা নিয়মিত প্রকাশ করার ব্যবস্হা করে দিয়েছিলুম। তোমার দাদা করেনি। তোমার রক্তিমদাও কিছু করেননি।

    শাসাঘাতে ওপরনিচ ঘটিয়ে কথাগুলো বললেন অসীম, অসীম গাঙ্গুলি, রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারীমশায়। মরুভূমির হুহু হাওয়ায় বালিয়াড়ির ঢেউরা পালটিয়ে পালটিয়ে পালটিয়ে আদল বদল করে গেল অবিরাম। বালির ওপর দিয়ে হালকা পায়ে দৌড়ে উধাও হল হলদে অক্ষরের মাকড়সারা।

    ভাসিয়ে-দেয়া নিঃশ্বাস ভেঙে-ভেঙে তার ভেতরে পুরে দেওয়া এই বার্তাটা পেল রাহুল সিংহ, যার ডাক নাম রাহু : “অনুগত রেনিগেড কোথাকার ! ক’দিন আগের গুণমুগ্ধ আজ আততায়ীর রূপ ধরে উপস্হিত হয়েছে।”

    রাহুল সিংহ, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু, ওনার কথাগুলো শোনার চেয়ে ওনার মুখমন্ডল কেন গোলাকৃতি, আর গোলাকৃতি বলেই উনি অমন ব্যতিক্রম কিনা, তাই ভাবছিল। গালে দু’দিনের দাড়ির তলায় ভাতের নরম চর্বি।

    রাহুলের দাদা অনিকেত আর অসীম গাঙ্গুলির বন্ধু নৃপতি চাটুজ্যে ওরফে প্রদীপন বলেছিলেন, ‘লক্ষ্য করে

    দেখো, ওর মুখমন্ডল পুরুষের মতো নয়, বিরল, বিরঅঅঅঅঅঅল। ’ সিঁড়ির ধাপে এক পা আর আরেক পা মাটিতে রেখে, ঠোঁটের কোনে চারমিনার। ‘আর রক্তিমের মুখটা আয়তাকার, বুঝলে, দাড়ির আড়ালে চাপা দিয়ে গোলাকৃতি দেখানোর চেষ্টা করে, টলস্টয়ের পারভারটেড সংস্করণ ; সেক্সলেস হলে যা হয় আরকি। এসব আবার কোথাও লিখে দিও না ; তোমাকে কোনো কথা বলাও বেশ রিসকি। ’

    –না, ওনার সেফটি রেজার কেনার পয়সা নেই বলে দাড়ি রাখতে হয়েছে।

    –আর মাল খেতে বুঝি পয়সা লাগে না ?

    –সে তো এর-তার ঘাড়ে।

    –ঘ এর জায়গায় যে গ-এ চন্দ্রবিন্দু হবে, এটুকু জ্ঞান নেই ? বাংলা ভাষায় অপেরা করছ, এটুকু জানো না ?

    রাহুল যাতে কোথাও লেখে, তা-ই যে নৃপতি চাটুজ্যে ওরফে প্রদীপন চাইছেন, পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসির মাধ্যমে ওনার বক্তব্যের স্বীকৃতি দিল হরিচরণ খাঁড়া।

    লেখালিখির জন্য হরিচরণ খাঁড়া এফিডেভিট করে দুর্গা বর্মন নাম নিয়েছে। খাঁড়া পদবি তখনও, রাহুলের বয়স যখন, মমমমমমম, বোধহয় একুশ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, লেখালিখিতে অচল ছিল, আর এখনও তাই, রাহুলের বয়স যখন, মমমমমমম, বোধহয় তিয়াত্তর। সমাজের সেবক হতে হলে খাঁড়া পদবি সচল, অথচ লেখালিখির ময়দানে নামতে চাইলে খাঁড়া অচল।

    হরিচরণ খাঁড়াকে দুর্গা বর্মণ বলে না ডাকলে বুড়ো বয়সেও রাগ হয় হরিচরণের। খাঁড়া বিসর্জন দিতে গিয়ে, মায়ের দেয়া আদরের নাম, হরিচরণকেও বিসর্জন দিয়েছে। সারা জীবনে কেউই হরিচরণকে সিরিয়াসলি নেয়নি, তার কারণ নাম-বদল নয় ; তার কারণ হরিচরণ বুঝতে পারে না যে ওর দুলকি-কাঁধ খোকা-ঢেউ আচরণই ওকে খেলো করে তোলে।

    প্রদীপন চট্টো ওরফে নৃ্পতি চাটুজ্যে, হাসার সময়েও, যে মুখোশটা পরে থাকেন, সেটা দৌর্মনস্যের উইপোকারা কুরে-কুরে খেয়ে চলেছে। ওনার চোখ কুঁচকে তাকানোর নানারকম মানে হয়। যারা ডেসিফার করতে পারে তাদের অন্যতম রাহুল সিংহ।

    —ফিজিওনমি পড়ছেন নাকি প্রদীপনদা ?

    –লেখক হতে চাইছ, মুখের আকৃতি বিচার করবে না ? আমার মুখ তোমার মুখ আমরা পিকাসোর কিউবিস্ট ক্যানভাস থেকে নেমেছি। আর অসীইইইইম ? তো, ওর মুখ দেখো ভালো করে, হেলেনিক, আগামেমননের তাপ্পিমারা কেঠো ঘোড়া থেকে যেন সদ্য নেমেছে, হাতে বর্শা, পিঠে ঢাল, ঢুকতে চলল বিগহাউসের দুর্গে। পেছন-পেছন, বুকে চামড়ার বডিস বাঁধা, যুবতী সৈন্যের দল। গ্রিসে কি ইটালিয়ান মার্বেল যেতো, হোমারের সময়ে ? অসীমের পাশে দাঁড়িয়ে খেয়াল করেছ কি, মার্বেলের ঠাণ্ডা গন্ধ ঘিরে থাকে ওকে। মেয়েদের, জানো তো, ঠাণ্ডা মার্বেলের ওপর শুতে ভাল্লাগে ?

    –কীইইই যে বলেন, শীতকালের গ্রিসে মার্বেলের ঠাণ্ডা মেঝেয় হেলেন অব ট্রয়কে হোমার নিশ্চই শুতে বলতেন

    না, বলল রাহুল। ইউলিসিসের গল্পতেও নেই ঠান্ডা মার্বেলের মেঝেয় শোবার ঘটনা।

    –রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারীমশায় নিজেও জানেন সেকথা। বিরল, একসেপশানাল, প্রগলভ, প্রলিফিক।

    সেদিন, ওনার ওঝাপুরের বাড়িতে, অসীম গাঙ্গুলির মুখের দিকে নজর ঘুরিয়ে নৃপতি চাটুজ্যে ওরফে প্রদীপন চট্টোর বিশ্লেষণ যাচাই করছিল রাহুল।

    হরিচরণ খাঁড়া ওরফে দুর্গা বর্মণ, যে, মরা চিঠির ডাক বিভাগে কাজ করে, জীবিত লেখক আর জীবিত প্রাপকের মাঝে মরা চিঠি পড়ে-পড়ে, তাদের জ্যান্ত করে তোলে দপতরের অন্ধকারে, লোডশেডিঙে বসে মুচকি হাসির স্টক তৈরি করে রাখে, আজকে সকালে একটা ব্যানাল-হাসি স্টেটমেন্ট দিয়েছিল। কাঁধ নাচিয়ে, ও বলেছিল, ‘ ভবিষ্যত কাউকে কবি হবার অভিশাপ দেয়, আর কাউকে আবার কবি হবার আশীর্বাদ দেয়। প্রদীপন চাটুজ্জেকে অভিশাপ দিয়েছে আর অসীম গাঙ্গুলিকে দিয়েছে আশীর্বাদ; অপেরা না লিখে ছোটোগল্পই লিখুন প্রদীপন। ’

    নৃপতি চাটুজ্যে ওরফে প্রদীপন সাইকেলে শিবপুরের দিকে পাইডেল মারতেই ভবদেব মিত্র বলেছিল, ‘লক্ষ করেছ ? প্রদীপন চাটুজ্জে সক্রিয় হলে ঘাড়ের ওপর ওনার মাথাটা শকুনের মতন কেমন আগে-আগে যায়? জীবনের যাবতীয় নোংরামির ভেতরে মুকুটসুদ্দু মাথা ঢুকিয়ে পচাগলা মালগুলো তুলে আনেন কলমের ডগায় !’

    ‘তাই ওনার গদ্যের বিস্তার উড়ন্ত শকুনের বিশাল ডানার মতন ; অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছেন, কেউ আর সহজে ধরতে পারবে না ওনাকে ; বিনা অনুমতিতে ইনসমনিয়া রুগির স্বপ্নেও দিব্বি ঢুকে পড়েন’, বলেছিল সুকোমল রূদ্র।

    তাই অসীম গাঙ্গুলির হিংসে। প্রদীপনের গদ্যকে হিংসে, রক্তিমের পদ্যকে হিংসে। হিংসায় পাহাড়প্রমাণ অপেরা লেখার টেবিল।

    নৃপতি চাটুজ্জেকে, ওনার পৌরসভার ঝিমন্ত দপতরে, লোকে নৃপতি নামে চেনে ; প্রদীপন নামে খোঁজ করতে গেলে সহকর্মী, যদি নাদুসপেট কেউ উপস্হিত থাকে, যা কদাচিৎই, তিনি ভাতঘুম থেকে জেগে উঠে, বলেন, ‘ওঃ, নৃপতিকে খুঁজছেন ? ওই যে চেয়ারে ঝোলা ঝুলছে, ঘণ্টাতিনেক অপেক্ষা করুন, দুপুরের পর একবার পদার্পন করবেন, ঝোলা তুলতে। ’ লিখিয়ে বন্ধুরা কেউই নৃ্পতি নামে ডাকে না। তারাই আবার হরিচরণ খাঁড়াকে দুর্গা বর্মণ নামে ডাকতে চায় না, হরিচরণ খাঁড়া নামে ডেকে মর্ষকামী হর্ষ পায়। আসলে প্রদীপন নামে উল্লেখ না করলে উনি ওনার কোনো লেখায় জীবনভরের মতো ঐতিহাসিক বাঁশ দিয়ে রাখবেন, বা, হতে পারে, সম্পূর্ণ বাঁশঝাড়।

    অসীম-প্রদীপনের আরেক বন্ধু আছেন, যিনি ঝোলা টাঙিয়ে অফিস থেকে উধাও হয়ে যেতেন, হরিপদ রায় ; ওনাকে দেখলেই যে লোকের হাসি পায়, তা উনি জানতেন বলে, হাসির অপেরা দিয়ে শুরু করেছিলেন। পরে, একদিন, চেয়ারে বসে হাই তুলতে-তুলতে, চোয়াল আটকে যেতে, দেখতে পান আলমারির ওপর, লাল শালুতে, আর কয়েক দশকের ধুলোয় মোড়া, একটা বস্তা সেই কবে থেকে পড়ে আছে, যখন উনি লোয়ার ডিভিশান কেরানি হয়ে মহাকরণের অ্যানেক্সিতে টেবিলের তলায় ঠ্যাং দোলাতে ঢুকেছিলেন।

    ছুটির পর অফিস ফাঁকা হয়ে যেতে, বস্তাটা নামিয়ে দেখেন, আরেসসসসশালা, অতি-পুরানো ক্ষেত্রসমীক্ষার প্রতিবেদন। জমা দেবার পর, সরকার, যেমন হয় আরকি, ভুলে গেছে যে ক্ষেত্রসমীক্ষা করানো হয়েছিল, তার প্রতিবেদন জমা পড়েছে। হরিপদ রায় বাড়ি নিয়ে গিয়ে প্রতিবেদনের তথ্য আমকাঠের টেবিলের ওপর উপুড় করে, লুঙ্গি দিয়ে ধুলো ঝেড়ে, উপজাতিদের সম্পর্কে একখানা সিরিয়াস বই লিখে, হাসির অপেরা-লেখক পদবি থেকে হাঁফ ছেড়ে মুক্তি পেলেন, আর প্রকাশকের কাছ থেকে লাখখানেক টাকা। ওই গ্রন্হের জোরে উনি প্রথমে ডাবলু বি সি এস হলেন, ঠ্যাং দোলানো কিছুটা থামল, তারপর প্রোমোটি আই এ এস হয়ে ঠ্যাং দোলানো থেমে গেল এক লপ্তে। যখন হাসির অপেরা লিখতেন, তখন উনি ছিলেন প্রফুল্ল সেনের সেবক। প্রোমোটি আই এ এস হয়ে রূপ পালটে হয়ে গেলেন বামপন্হীদের দরবারি ; কেরানি-বিপ্লবে বড় একটা অংশ নিতেন না । হরিপদ রায়কে ওনার ঠ্যাংদুলুনি কেরানি অবতারে রাহুল দেখেছিল বটে, ওপরে ওঠার গল্পটা প্রদীপন চট্টোর কাছ থেকে পাওয়া।

    রাহুল অনেকবার চটিয়েছে প্রদীপনকে।

    প্রদীপনের দপতরে গিয়ে, ওনার সহকর্মীদের সামনেই রাহুল জানতে চেয়েছে, সহকর্মীরাও একই নরকের নিবাসী যখন, ‘ আজকাল ঘুষের রেট কীরকম যাচ্ছে ?’ পৌরসভায় ওনার বিভাগে ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত সবাই ঘুষখোর, পিওনরাও। উনি নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে অপেরা লেখেন কিন্তু চারিপাশে ঘুষের মোচ্ছব নিয়ে লিখতে চান না। দাদা অনিকেতকে প্রশ্ন করতে অনিকেত বলেছিল, ‘ ছদ্মনামে লিখলেও সরকারি দপতরের নিয়ম ভাঙার দায়ে বিপদে

    পড়বে। অবসর নিয়েও লিখবে না, দেখিস, পেনশন আটকে যাবার ভয়ে। ওনার প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা হল

    বেডরুমসেন্ট্রিক, বিছানাই এসট্যাবলিশমেন্ট, আর ভাষাকে স্যাবোটাঝ করার কাজটা ক্লাসি নয়, মিডলক্লাসি।’

    আরেকবার, তখনও গ্রামের শেয়ালরা রাজনৈতিক দলের কর্মীতে রূপান্তরিত হয়নি, হুক্কাহুয়াও পালটায়নি স্লোগানে, হ্যারিসন রোডের মোড়ে, এখন যার নাম মহাত্মা গান্ধি রোড, কয়েকজন হিজড়ে রাহুলদের ঘিরে হাততালি বাজিয়ে পয়সা চাইতে, ওই চিৎপুর ক্রসিংটায়, ওনার বিব্রত গ্রিক বায়ুদেবতা ঈওলাসের ঢঙে বিড়ম্বিত মুখের পানে

    তাকিয়ে রাহুল বলে ফেলেছিল, ‘আপনার হেটেরোসেক্সুয়াল ছলাকলার দাম চাইতে এসেছে। ’ উনি ট্রামে চাপতেই, রঙীন নাইলন শাড়ি মোড়া হিজড়েগুলোও ওনার পেছন-পেছন লাফিয়ে উঠে গিয়েছিল।

    ট্রামের হাতল ধরে দরোজা দিয়ে মাথা বের করে, ঘুষিকে সমান্তরাল করে, রাহুলের উদ্দেশে কয়েকবার নাড়িয়ে, অদৃশ্য কাপড়ে সাবান ঘষে বাতাসকে পরিচ্ছন্ন করার প্রয়াস করছিলেন প্রদীপন।

    রাহুলের পিঠে আলতো করে ছুরি চালিয়েছিলেন প্রদীপন, লালবাজারে বসে, ওনার বিখ্যাত গদ্যকলমে, একখানা অস্বীকৃতির ঘোষণা, আর পরে, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। তার আগে কখনও, মনে হয়নি রাহুলের যে প্রদীপন মনে-মনে এতটা ভিতু ; সবকিছুকেই ভয় পান। রাস্তায় টায়ার ফাটলেও অচেনা আশঙ্কায় ওনার মুখ পীড়িত হয়ে উঠত। এখন ওনার মুখটা মনে করলেই পীড়া শব্দটা বেজে ওঠে, কর্কটক্রান্তির পীড়া। অসীম গাঙ্গুলির ভয়ে, চিঠির ঠোকরানি খেয়ে-খেয়ে, উনি রাহুলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন কাঠগড়ায়। পরে যদিও লিখেছিলেন যে বউয়ের ভয়ে অমন অস্বীকৃতি দিতে হয়েছিল, যদিও বউ তখনও বউ হয়নি, হবো-হবো।

    হাওড়া ব্রিজের ওপর দিয়ে ধোঁয়া খেতে-খেতে ভবদেব মিত্র আর ওর বন্ধুনি রোশনিকে রাহুল বলেছিল,

    ‘একজনের স্মৃতি আরেকজনের মুখমন্ডলকে ততদিন দূষিত করে রাখে যতদিন না নতুন কোনো স্মৃতি এসে তোমার চেতনাকে বিষাক্ত করছে। ’ ব্রিজের তলা দিয়ে তখন বিকেলের ক্লান্ত ঢেউ। যে যার গোপন স্ক্যানডাল নিজের-নিজের সামুরাই ব্রহ্মচর্যে চাপা দিয়ে বাড়িমুখো বাসি-বিকেলের নিত্যযাত্রী।

    হরিচরণ খাঁড়া ওরফে দুর্গা বর্মণ রোজই একটা মরা চিঠি বাড়ি নিয়ে গিয়ে মাকে পড়ে শোনায়। মাকে চিঠি লেখার কেউ নেই অথচ বয়সকালে চিঠি পেতে ইচ্ছে করে তো। বাড়ি মানে বস্তির একটা চালাঘর, শ্যাওলা-সবুজ বারোয়ারি খাটা পায়খানা। রাহুল মাঝে-মাঝে রাত কাটায় ওর ওই ঘরে, কেননা কলকাতায় রাহুলের মাথা গোঁজার জায়গা নেই। চারিদিকে বইপত্র ছত্রখান, উনিশ শতকের গন্ধের, আলোর, ঝিমঝিমে হাওয়া। জানালায় কাঠের গরাদ, ক্ষয়াটে। বারোয়ারি পায়খানা, ওই একটাই, ভোর থেকেই রিজার্ভেসানের লাইন। ফলে, রাহুল ওর আস্তানায় রাত কাটাতে চায় না।

    অসীম গাঙ্গুলির বাড়িতে কথা-কাটাকাটির সেই সূত্রপাত।

    –ক্রিয়েটিভ লেখালিখি ? জানি না, আপনি যাকে অপেরা বলে মনে করেন, আমিও ঠিক তাই করতে চাইছি কিনা। না, রাহুল যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু, সেকথা বলা প্রয়োজন মনে করল না অসীম গাঙ্গুলিকে, ওনার ওঝাপুরের ফ্ল্যাটের ঘরে দাঁড়িয়ে। দুজনে যে ক্রমশ মেরুপৃথক ভাবনাজগতের বাসিন্দা হয়ে চলেছে, তা দুজনেই খেপে-খেপে জেনে ফেলেছে ; প্রথম পরিচয়ের সময় থেকেই। উনি চাইছেন ওনার নামের প্রতিধ্বনি ওনাকে ঘিরে থাকুক ক্ষমতাবান অশরীরির মতন, যাতে উনি কথার হইচই গায়ে মেখে নিজের ইচ্ছেমতন আত্ম-অভিকর্ষ নিয়ে খেলতে পারেন, তরুণ-তরুণীরা সেই অভিকর্ষের টানে পাক খেয়ে চলুক। বন্ধুদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এসো, দেখাও, কার অভিকর্ষে কত জোর আছে, কার পালে কত ঝড়, কার পেছনে কতগুলো হ্যামেলিনের নংটি আর ধেড়ে ইঁদুর, কার হেফাজতে কত তোষাখানা !

    প্রথম পরিচয়। রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু, তখন হাফপ্যান্ট পরত, বয়স, মমমমমমম, বোধহয় চোদ্দ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। অসীম গাঙ্গুলি পরতেন ধুতির ওপর শহুরে ধোপার আদর-খাওয়া হাফশার্ট।

    আজকে, ওঝাপুরের দোতলায়, উনি ময়লা পায়জামার ওপর জলকাচা ফিকে নীল বুশশার্ট পরে আছেন। ওই পোশাকেই বাজার থেকে ফিরেছেন।

    আসার সময়ে রাহুল, রাহুল সিংহ, ডাক নাম রাহু, মনের ভেতরে বিড়বিড় করে এসেছিল যে অসীম গাঙ্গুলির সঙ্গে কোনো তর্ক করবে না, কথার ওপর কথা বলবে না, তবু সম্পূর্ণ অপ্রসঙ্গিক একটা কথা বলে ফেলল, পিরামিডের তলায় লুকোনো শবের সোনার মোড়ক খুলে হিরেবসানো তরোয়াল বের করার মতন করে, ‘আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্হ

    তো আমার দাদা নিজের গ্যাঁটের কড়ি দিয়ে ছেপেছিলেন।’

    নীরবতার অন্ধকার গোলকধাঁধায় ফেলে আসা একটা বাক্য কুড়িয়ে নিজেকে অবাক করে তুলল রাহুল। শ্বাসাঘাত হল, এঃ, হেএএএ।

    –মূল প্রসঙ্গে এসো, বললেন অসীম গাঙ্গুলি, কোনো চিঠিতেও তো তুমি জানাওনি যে তুমি কী করতে চলেছ ? কৃতজ্ঞতাবোধ নেই তোমার। অথচ আমিই তোমাকে অপেরা-জগতে এনেছিলুম। তুমি নিজের কী ক্ষতি করেছ তা আজ

    বুঝতে পারবে না, তবে একদিন নিশ্চয় বুঝতে পারবে, তখন আমি অপেরাসম্রাট হয়ে রাজত্ব করব। তোমাকে আমি প্রায় দশ বছর চিনি-জানি। আমি তোমায় একজন রেকলুজ তরুণ বলেই তো জানতুম, ইউ ওয়্যার আ লোনার। নিজেকে ঘিরে সবাইকে জড়ো করলে কী ভাবে ! অমন অরগানাইজিং দক্ষতা আছে বলে তো জানতুম না।

    প্রবাসে, কানপুরে, যেদেশে রাহুল সিংহ, যার ডাক নাম রাহু, সে সময়ে থাকত, সেখানকার মণ্ডিরোডের চালগমের আড়তদারদের দেয়ালে সিঁদুর দিয়ে লেখা থাকত “শুভ লাভ।” হিসেবের লাল-মলাট হলুদ-কাগজের খেরোখাতায়, খাড়া লম্বা লাইনের একদিকে লাভের অঙ্ক, আরেকদিকে ক্ষতির। তার মানে, অসীম গাঙ্গুলির ওষধি-তর্কে, শুভ ক্ষতির দিকে পড়েছিল রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু।

    অশুভ লাভের চেয়ে শুভ ক্ষতি বরং শ্রেয়, নিজেকে নিঃশব্দে বলল রাহুল।

    ইংরেজরা কেন কলকাতা ছেড়ে দিল্লিতে পাট তুলে নিয়ে গিয়েছিল, আসার সময়ে সেকথা ভাবতে-ভাবতে রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু, টের পেয়েছিল যে ইতিহাসের ওই বাঁকবদলের কিছুই ওর মনে নেই। ইংরেজরা বোধ হয় বাঙালিদের বলতে চাইছিল, :”দাঁড়া, দেখাচ্চি মজা।” কিন্তু দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে রাজধানি তুলে

    নিয়ে যাওয়া, অমন কাজ প্রতিভাবান শাসকই করতে পারেন।

    চামড়ার টাকাও টাকা। শাসক চাইলে চামড়ার টাকাকেও স্বর্ণমুদ্রার সমান মূল্য দিতে বাধ্য হয় শাসিত জনগণ।

    নিমপুকুর ছেড়ে অসীম গাঙ্গুলি অভিকর্ষের নাড়ি তুলে নিয়ে এসেছেন কলকাতার বাইরে, ওঝাপুরে ! চলে গেছেন, র‍্যাদার। রাহুল যেমন এক শহর থেকে অন্য শহরে নিজের চাকরি তুলে-তুলে নিয়ে গেছে সারা জীবন, তারপর চাকরিকে তুলে নিয়ে গেছে গ্রামে-শহরে-গঞ্জে-নদীতে, এমনকী গভীর জঙ্গলেও। জঙ্গলে বসে উপজাতি পরিবারের বউয়ের দেয়া বেগুনপোড়া খেয়েছে শালপাতায়, পোড়ানো কাঁঠালবিচি বা কাঁচকলা-পোড়া খেয়েছে, চাল-গম তাদের অনধিগম্য বলে।

    তাই, মনে হয়েছে ওর, কোনো জীবনকাহিনীই ব্যক্তিগত নয়; একজনের জীবনের জিজ্ঞাসাচিহ্ণগুলো, সব চিহ্ণই, আরেকজনের জীবনে বেমালুম পাওয়া যায়। উত্তরগুলোর সদিচ্ছা চালিয়ে নিয়ে যায় ব্যক্তিগত থেকে কৌমের দিকে। সম্ভবত। তার কারণ কারোর-কারোর কাছে আলো মানেই অতীত, আর ভবিষ্যৎ মানেই আতঙ্ক।

    একটু আগে ফালিকাগজটা অসীম গাঙ্গুলির বাঁহাতে শিহরন তুলেছিল। শিহরণের রিনরিন বাজনা শুনতে পেয়েছিল রাহুল।

    থেকে-থেকে কাঁপুনিটা ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে, উড়ছে ঘরময়, জাগরণকে স্বপ্নের নামে চালাবার মতন করে। ঠোঁট নিঙড়ে একফোঁটা শ্লেষ। অসীম গাঙ্গুলির শ্লেষে, হাসিও বেফাঁস। বললেন, “বাংলা অপেরাকে ওমুখো হতে দেব না।”

    রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু, মহাশূন্য থেকে পৃথিবীতে নেমে আসা ভিনগ্রহী প্রানী, মগজের ভেতরে মা-বাবার তৈরি-করা রণক্ষেত্র বয়ে বেড়াবার, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রণক্ষেত্র, দায়-দায়িত্ব থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে এনেছে স্কুলের গন্ডী পেরোবার আগেই। বঙ্গজীবনের সময়কে একটা মাত্র লাইন বরাবর চলার ধারণায় বসবাস করার এলেম পায়নি, যদিও প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছিল।

    ওমুখো ? লিনিয়ার ! তিরিশ চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর যারা লেখালিখি করবে, তারা বাংলা অপেরাকে, দশ দিকে হাজার মুখে চালিয়ে দেবে, তা বোধহয় উনি অনুমান করতে পারছেন না। এক কালে নিজে কেঠো ট্রোজান ঘোড়া থেকে নেমেছিলেন, আর কতগুলো ট্রোজান ঘোড়া ওনার সিংদরোজার দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে তা উনি অনুমান করতে পারছেন না।

    অসীম গাঙ্গুলির কাছে রাহুলের প্রথম অপেরার পাণ্ডলিপি জমা আছে মাস তিনেক। ওনার ‘রামায়ণ নট্ট কোম্পানি’ থেকে প্রকাশ করবেন। অথচ বলছেন লিনিয়ার থাকতে হবে। রামায়ণের বদলে মহাভারতের কথা মাথায় রাখলে হয়ত খেয়াল রাখতেন যে মানবজীবনের ন্যারেটিভগুলো একই রেখায় চলে না।

    পঞ্চাশ বছর পর যারা লেখালিখি করবে, তারা বলবে, ‘আমার অপেরার রাজপাট আমার নিজের, আমি কী করি

    না করি তাতে কার বাপের কি ; তুমি পড়তে না চাও পোড়ো না, আরেকজন তো পড়বে। তোমার বেছানো লাইন ধরে চলুক তোমার পরাগিত সন্ততি, তোমার আই ভি এফ করা কচি-নটের দল। ’

    তা ঠিক ; প্রচুর পরাগিত সন্তান-সন্ততি হাওয়ায় উড়িয়ে গেছেন উনি।

    আর বাংলা অপেরা ? যারা বাঙালি থেকে পাকিস্তানি হয়ে আবার বাংলাদেশি হয়ে বাংলা ভাষায় রাজত্ব করতে

    আসবে, তারা খেপে খেপে নিজেদের উথালপাথাল দিয়ে কোন মুখে যে যাবে তা কে-ই বা জানত? বাংলা অপেরার ভাষাকেই কলকাতিয়া নাম দিয়ে ঘাড় থেকে নামিয়ে দিতে চাইবে, নিজেদের পৃথক প্রমাণ করতে চাইবে, তা-ই বা কে জানত !

    রাহুল সিংহ, যার ডাক নাম রাহু, তার দাদা অনিকেত সিংহের কলেজ-জীবনের বন্ধু ছিলেন অসীম গাঙ্গুলি। তখন রাহুলের বয়স, মমমমমমমম, বোধহয়, থাকগে, ওনার সঙ্গে পরিচয় হয়নি, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। কলেজের দেয়াল পত্রিকায় অসীমের অপেরা পড়ে মনে ধরেছিল বলে দাদা অনিকেত যেচে আলাপ করেছিলেন নিজের পত্রিকায় ওনার অপেরা চাইবার জন্য। দাদা তখন হুগলির অশোক মৈত্রর সঙ্গে ‘লেখা’ নামে একটা লিটল অপেরার যোগাড়যন্তর করতেন। থাকতেন শ্যাওড়াফুলিতে দেশের বাড়ির দু’আড়াইশ বছরের পুরোনো খণ্ডহরের চিলেকোঠার সোঁদা ঘরে। কাঠের ঘর, আলকাৎরা লেপা, যাতে উইপোকারা না সংসার পাতে। রাতে লন্ঠনের প্রভা। দেয়ালে সেকালের বিশাল খাঁড়া, চোখ আঁকা, কোনের দিকে দশ ফিট উঁচু বর্শার গোছা, লোহার ভারি-ভারি ঢাল, শাদা চুলের চামর, যেগুলোয় একশ বছরেও হয়ত হাত দেয়নি কেউ। শীতের দুপুরে আসেপাশের ছাদে যুবতীরা তাদের দীর্ঘ চুল

    পিঠের ওপর ফেলে জবাকুসুম তেলের সুগন্ধ পাঠায় অনিকেতের উদ্দেশে।

    অসীম গাঙ্গুলি নিমপুকুর ছেড়ে চলে গিয়েছেন বেশ উত্তরে, শহরতলিতে। দোতলা বাড়িটা খুঁজতে কিছুটা হয়রান তো হয়েছে রাহুল। এর আগেও এসেছে কিন্তু মনে রাখতে পারে না ও। রাস্তাটা নিজের সময়মতন যেদিকে যখন ইচ্ছে বাঁক খেয়ে কাদায় কাঁকরে বালিতে খানাখোঁদলে অবয়বহীনতার আগাম খবরের ধাঁচে পৌঁছে দিয়েছে রাহুলকে, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু। কলকাতার কেন্দ্র ছেড়ে এত দূরে কেন ? বাড়িভাড়া কম বলে, নাঃ, তা নয়, নিজের সঙ্গে অভিকর্ষ তুলে নিয়ে যাবার ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। পরাগিত সন্ততিদের টেনে আনার গৌরব।

    কলকাতা শহরের কেন্দ্র বলে কিছু আছে কি ? কেন্দ্র ! না, এই শহরের কোনো কেন্দ্রস্হল নেই। ডালহাউসি স্কোয়ারকে বলা যাবে না কেন্দ্র — ওই জায়গাটা তো সন্ধ্যা হলেই ফাঁকা। দিনের বেলায় একের পর এক দেশভাগোত্তর উৎখাতদের রাগি মিছিল আছড়ে পড়ে, অথচ বিকেল হতেই, সারা দিনের গ্রীষ্মকে হাওয়ায় জড়িয়ে ভোঁ-ভাঁ। স্লোগানের শুকনো জিভগুলো ভেসে বেড়ায় ফাঁকা এলাকাটায়। খুঁজে মরে বিধান রায়কে। ওনারও তো অভিকর্ষে তোবড়ানো মানব-শরীর। চলে গেছেন। মিছিল সামলাতে হিমসিম প্রফুল্ল চন্দ্র সেন।

    রাগি জিভের ভুত-ভুতনিরা গ্রীষ্মের লুবাতাস হয়ে টিকে যাবে সরকারি পাড়াটায়, আর, পরে, পরে-পরে, ভলকে-ভলকে মুঠো-ওড়ানো রাগি, গরিব, দুস্হ, উৎখাত, মুখশুকনো শিড়িঙে মানুষের আদলে দেখা দেবে, যেদিন যখন ইচ্ছে। উনিশ শতকের হাওয়া মুছে ফেলে দেশোদ্ধারের নামে তিরিশ বছরের ঐতিহাসিক বিপ্লব করবে হয়ত ভেতো কেরানিদের টেকো বা তেল-চুকচুকে আধঘুমন্ত দল।

    কিছুকাল আগে এই পাড়াতেই ধোপদোরস্ত মানুষদের ভিড় ‘ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়’ চেঁচাতে-চেঁচাতে যেত ; তারাই, পরে গিয়ে, —তখন তো প্রফুল্ল সেন প্রফুল্ল মনে সিংহাসন থেকে উধাও— বসল ডালহাউসির মসনদে, আর যতটা পারে প্রমাণ করার চেষ্টা করল যে স্বাধীনতার ফলটা পেড়ে খেতে হলে তাকে মিথ্যা বলে ঘোষণা দিতে হবে। ঝুঠা আজাদির নামে কত ট্রাম-বাস তারা পুড়িয়েছিল। পরে, বিধান রায়ের সময়েও কত ট্রাম বাস পুড়ল। তারপর থেকে পুড়েই চলেছে ট্রাম-বাস। সরকার ট্রাম তুলে দিতে পারছে না ; ট্রাম না থাকলে ছাইয়ের ভাইরা কীই বা পোড়াবে? বাসগুলো তো প্রায় সবই বেসরকারি। ক্রমশ সবই ঝুঠা হয়ে গেল, সবই, সবই, সবই, সবই।

    ধর্মোন্মাদদের তাড়ানো উৎখাত মানুষের পোড়ানো বাসের কঙ্কাল পথের একপাশে। রাহুল স্পষ্ট দেখল ধোঁয়ার আদল নিয়ে নানা আকার-প্রকারের ভুত আর ভুতনিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। এই ভুতগুলোই হয়ত তিরিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পর বাংলার উড়ন্ত জাজিমে বসে রাজত্ব করবে। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ভুত-ভুতনি নয়, রঙীন। তাদের কন্ঠস্বরও শুনতে পাচ্ছিল, রক্ত খাঁবো, পোড়া মাংস খাঁবো, হাড়গোড় চেঁবাবোঁ, জ্যান্ত পুঁতে দেবোঁ মাটির তলায়। আকাশ জুড়ে উড়ছে মেঘলা-স্লোগানে ভেজা কাক, চিল, শকুনের গোলাপি উল্লাস। গুন্ডা-বদমায়েশ অধ্যুষিত সবুজ গ্রামাঞ্চলেও

    উল্লসিত জিভগুলো পৌঁছে যাবে একদিন।

    সেন্ট্রাল ক্যালকাটা নামে জায়গাটাকেও বলা চলে না কেন্দ্র ; ওটা যেন ভাইভূক অক্টোপাসের মতন বাছবিচারহীন বিস্তারে আক্রান্ত, আত্মরক্ষার জন্য থুতুর রঙিন ধোঁয়ার আড়ালে ঢেকে রাখে নিজেকে। সামলে না হাঁটলে গায়ে একশ বছরের পুরোনো চুনবালির গয়ের খসে পড়ে। আসলে রাবণের মাথাগুলোর কথাই লোকে জানে ; শিরদাঁড়ার ওপর ওই ভারসাম্যহীন মাথাগুলোর চাপের কথা কাউকে বলতে শোনা যায় না। এক দিকে চারটে মাথা, মাঝখানে

    একটা, আরেকদিকে পাঁচটা ; ভারসাম্য বজায় রাখা চাড্ডিখানি কথা নয়। আর দশটা মাথার সবকটা মগজ কি একই ভাবনা ভাবে ? হাজারমাথা শহরের খামখেয়ালি দেহরাজ্যে মূল মগজ বোধহয় মরিচিকা সেজে বসে আছে, আর মরিচিকা তো হল প্রতিশোধ। সবাই সেখানে আগন্তুক, বহিরাগত, অসংশ্লিষ্ট, সেখানে অলিগলির ফ্যাকাশে বা তরতাজা বাড়িগুলো নিজের-নিজের গোপনীয়তা খরচ করে টিকে আছে। বউবাজারও।

    একসঙ্গে কুড়িটা চোখ মেলে সীতার দিকে তাকিয়ে রাবণ !

    চোখের প্রতিভা। প্রতিভা কি কেবল মাথার ? করতলের, বুকের, কাঁধের, উরুর, পায়ের পাতার, নাকের, কানের প্রতিভা কি নেই ?

    বউবাজার ! সত্যিই বউয়েরা বাজার বসায় ; রাহুলের অভিজ্ঞতা আছে। কলকাতায় নয়, অন্য শহরের অভিজ্ঞতা। যে-হাত প্রেমের উচ্ছন্নে টেনে তোলে।

    বন্ধুদের ডাকে রাহুল গিয়েছিল কাঠমাণ্ডুতে, যৌবনে। ওর বয়স তখন কত, মমমমমমম, হবে কিছু, কী-ই বা এসে যায়। স্পষ্ট মনে পড়ে যেতে লাগল ওর, রাহুলের।

    মাটিতে শাল বা শিশুকাঠের গুঁড়ি পুঁতে তাকে পাকিয়ে-পাকিয়ে চারতলা পর্যন্ত উঠে গেছে বাঁশের রেলিং আর

    কঞ্চির ধাপ-দেওয়া সরু সিঁড়ি, এতই সরু যে, একজন যদি নামতে থাকে তাহলে তাকে জায়গা দেবার জন্য রেলিং-এ হেলে দাঁড়াতে হবে। তা সত্ত্বেও ছোঁয়া বাঁচানো ছিল কঠিন। স্হান সংকুলানের জন্য দুই পাক ওঠার পর একতলা, তারপর দুই পাক উঠে দুতলা, এইভাবে পাক খেয়ে চারতলা পর্যন্ত টালির চালে তৈরি কাঠের প্রাসাদ ; ওই প্রাসাদে অমন সিঁড়ি ছিল কুড়িটা। প্রতিটা সিঁড়ি কেবল সরু নয়, তা বেশ প্যাঁচালো। প্রতিটি তলায় সিঁড়ির মুখে বাঁ দিকে একটা ঘর আর ডান দিকে খোলা বারান্দা। বারান্দা থেকে ভেতরের উঠোন দেখতে পাওয়া যেত। ঘরের মেঝেও কাঠের। ঘরগুলোর দুটি জানালাই পেল্লাই মাপের, দরোজার সমান বলা যায়, জানালার শিকগুলোও কাঠের। ঘরগুলো বারো বাই আট হবে।

    গ্রাউন্ড ফ্লোর বা একতলা ছাড়া ওপরের তলাগুলোয় আসবাব কম ; প্যাঁচানো সিঁড়ি দিয়ে আসবাব ওপরে ওঠানো কঠিন। ওঠাতে হলে ভেতরে উঠোনে নিয়ে গিয়ে দড়ি বেঁধে বারান্দায় তুলতে হবে। বিছানা বলতে, মাটিতে খড়ের আঁটি বিছিয়ে তার ওপর চাদর পাতা। ঘর ভাড়া মাথা-প্রতি মাসে এক টাকা, যা সংগ্রহ করতে সামন্তের পেয়াদা আসত মাসে একবার। পাড়াটার নাম ছিল ঠমেল, এখনও আছে, তবে তার রূপ রস গন্ধ বর্ণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে গত কয়েক দশকে — চিনের মার্কসবাদী উদারীকরণের সঙ্গে গরিবের মাওবাদের বিয়ে, ঘটকরা বেশিরভাগই ভারতীয় মারোয়াড়ি।

    অমন গুঁড়ি পুঁতে-পুঁতে, পঞ্চাশ মিটার বাই একশো মিটার জুড়ে আয়তাকার উঠোন ঘিরে কাঠের জনপ্রাসাদ ; টালির ছাউনি। সে-প্রাসাদের মূল দরোজা ছিল একটাই, আর তা চব্বিশ ঘন্টা খোলা ; এরকম দরোজাও হয়, সবসময় খোলা, আর এরকম দরোজাই সবচেয়ে জরুরি। দশ ফিট উঁচু, চার ফিট চওড়া কাঠের ফ্রেমে কাঠের ক্ষয়াটে জনপ্রাসাদের সিংদরোজা, তার পাল্লায় কে জানে কোন ধাতুর কারুকাজ করা তিব্বতি কলকা, ধুলো আর সময় জমে-জমে ধাতু নিজের ধাতুত্ব হারিয়ে ফেলেছে, মনে হত দেখে। কতজন থাকতেন ওই প্রাসাদের ফ্ল্যাটখাঁচাগুলোয় তা অনুমান করা যেত সকালবেলায়, যখন উঠোনে জড়ো হতেন অনেকে, প্রাতঃকৃত্য সারার জন্য, মাসান্তের বা পক্ষান্তের বা উৎসব-শুরুর স্নানের জন্য। ওই প্রাসাদের সবাই প্রতিদিন স্নান করতেন না বলে সুবিধা ছিল। প্রাতঃকৃত্য বলা হলেও, সবাই সকালে যেতেন না, অভ্যাসমতো বা আয়াসমতো বা আলস্যের ফাঁকে যেতেন। তাদের মতনই প্রতিদিন স্নান করার ব্যাপারটা রাহুল বাদ দিয়েছিল ; রাহুলের বন্ধুরাও তা-ই। দিনের পর দিন স্নানহীন, পোশাক পালটাবারও দরকার হতো না, তাই।

    সেই কুটিরপ্রাসাদে গরিব নেপালি আর নেওয়ারি পরিবার যেমন থাকতেন, তেমনই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন হিপি-হিপিনীর দল, নেপালি কবি-শিল্পী, আর আর ভারত থেকে আসা, রাহুলদের মতন, সীমাভাঙার উচ্চাকাঙ্খীরা। একতলায়, দুতিন ঘরের ফ্ল্যাটে থাকতেন মধ্যবিত্তরা। একজন নেপালি চিত্রাভিনেত্রীও

    থাকতেন ; তখন তো নকল স্তন বাজারে আসেনি তরুণীদের বুক দখলের প্রতিযোগীতায় ; চিত্রাভিনেত্রীর স্তন অমন

    মহাকাব্যিক ছিল কোন খোরাকের গুণে, জানতে চাইলে, সামন্তের ভাড়া নিতে আসা পেয়াদা মুচকি হাসি হাতে-ধরা নেপালি রুপিয়ায় মিশিয়ে বলত, মহাকবি কালিদাস নিজের মুখে নিয়ে ফুলিয়েছেন ।

    ষাটের দশকের কথা তো। সে-সময়ে ফান ফুড ফ্রিডাম ফ্রিক-আউট আর ফাকিং এর উদ্দেশে দলে-দলে তরুণ-তরুণী আমেরিকা-ইউরোপ, এমনকি জাপান থেকেও, নিজেদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন ; লন্ডন বা

    অ্যামস্টারডাম হয়ে বাসে, ট্রেনে আর হিচহাইক করে তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্হান, পাকিস্তান, ভারত হয়ে শেষ গন্তব্য নেপাল। লন্ডন আর অ্যামস্টারডম ছিল স্বাধঃপতিতদের জড়ো হবার ঘাঁটি। ভারত-পাকিস্তানের যে-গেট দিয়ে তাঁরা আসতেন তার নাম ছিল গন্দাসিংওয়ালা। তখনও ওয়াগার কুচকাওয়াজি আকাশঠ্যাং ডিগবাজির গেট তৈরি হয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে এখনকার মতন ধর্মবাজ বোমাবুমির সম্পর্কও হয়নি, চিনের যুদ্ধ সত্ত্বেও। সম্পর্ক এই রকমই, গালাগালি মারামারি খুনোখুনি, কত রকমের সম্পর্ক যে হয়। অথচ তা তো সম্পর্কই। এখন দাড়িয়াল পাকিস্তানিরা সুন্নতকরা খোকাদের শিখিয়ে-পড়িয়ে মরতে আর মারতে পাঠায় ; যাতে মরে গিয়ে সেসব খোকারা স্বর্গের হাইপাররিয়াল হুরি-পরিদের সঙ্গে ল্যাংটো শুতে পারে, আর দাড়িয়ালরা মর্তে শুতে পারে রিয়াল নারী-মাংসের বিছানায়।

    হিপিদের সেই যাত্রাপথের নাম ছিল শামুক-গতির হিপি-ট্রেইল, যে যাত্রাপথ ছিল অমায়িক যথেচ্ছাচার আর মহানন্দে অলস সময় কাটাবার উত্তরণের তীর্থ। সে-সময়ে ইউরোপ-আমেরিকার যুবক যুবতীরা চাইলেই চাকরি পেতেন– এখনকার মতন জব্দ-জাবেদার কোঁকড়া সময় নয়– অথচ দলে-দলে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন। এখন চাকরি পাওয়া কঠিন, তবু কেউ বেরিয়ে পড়েন না ; কারণ পৃথিবীটা হয়ে গেছে ঝগড়াটে, খেঁকুরে, লোভী, জোচ্চোর, মতলববাজ। শান্তির কোনো ট্রেইল আর নেই। পৃথিবীর অত্যন্ত ধনী এলাকাগুলোই কেবল লোকদেখানে শান্তিতে রয়েছে। সায়েবদের দেশের যুবক-যুবতীরা বিদেশে যায় বটে, যখন তাদের পোঁদে লাথি মেরে রাষ্ট্র পাঠায় যুদ্ধ লড়তে। বেচারা।

    ফিবছর এত বোমাবারুদ জমে যায় যে তাদের গতি করার জন্যে যুদ্ধ লড়তে হয়, না লড়ে উপায় নেই। রাষ্ট্র বলেছিল, হিপি হওয়া খারাপ, পাতা ফোঁকা খারাপ, জীবন উপভোগ করা খারাপ। মরো লড়ে, লড়ে মরো। বাবরি চুল রেখো না, ন্যাড়া হয়ে যুদ্ধ লড়তে যাও, ট্রিগারে আঙুল রেখে বলো ফাক ইউ।

    ফ্রিকিং আউট হবার জন্যই কাঠমাণ্ডুতে জড়ো হতেন হিপি-হিপিনীরা, নেপালে চরস গাঁজা ভাঙ আফিম পাওয়া যেত পথেঘাটে, অফুরন্ত, অফুরন্ত, অফুরন্ত, আর দামও নগণ্য, এমনকি অনেক সময়ে বিনে পয়সায়। তখন তা বেআইনি ছিল না। হিন্দু বা বৌদ্ধ যে কোনো মন্দিরচত্ত্বরে গেলে বুড়োদের জমঘটে বসে মাঙনায়ও ফুঁকে নেয়া যেত, হাতফেরতা দুচার টান, ভিজে ন্যাকড়ায় মোড়া ছিলিম।

    হিপিরা বেরিয়ে পড়ার পথে আফগানিস্হান থেকে আনতেন উঁচুমানের চরস বা হ্যাশিশ আর পাকিস্তান থেকে গাঁজাফুলের গুঁড়ো যাকে পাকিস্তানিরা বলতেন গর্দা। নেপালি গাঁজার সঙ্গে হ্যাশিশ আর গরদা কিংবা ভারতীয় আফিম মিশিয়ে তৈরি হতো একরকমের মাদক, হিপিরা বলত ডেডলি-লাভার। নিজেদের দেশ থেকে ওরা আনত লাইসারজিক অ্যাসিডে চোবানো ব্লটিং-পেপার, বা আনতো এল এস ডি ক্যাপস্যুল, চব্বিশ ঘন্টা, আটচল্লিশ ঘন্টা, বাহাত্তর ঘণ্টার ক্যাপস্যুল। দোয়াত-কলম ছিল বলে ব্লটিং পেপারও ছিল। ভেজা-কোকেন মাখা ব্লটিং-পেপার, কিংবা যে-লেটার প্যাডের কাগজ কালি টেনে নিতে পারে, এমন লেটার প্যাডে গুঁড়ো কোকেন মাখানো। রাহুল আর ওর দুই ছবি-আঁকিয়ে বন্ধু, অনীক খাস্তগির আর নির্মল মিত্র বাউলা, বেনারসে হিপি-হিপিনীদের পথপ্রদর্শক হবার দৌলতে, বিনে পয়সায় পেতো ব্লটিং পেপার।

    দাদা অনিকেত, অকিঞ্চন ব্যানার্জি, সুকোমল রুদ্র ফিরে যাবার পর, কাঠমাণ্ডুর কুটিরপপাসাদে রাহুল বেশ একা হয়ে গিয়েছিল। চিত্রকর দুই বন্ধু অনীক আর নির্মল বাউলা, সকালবেলা উঠেই কোথাও চলে যেত, এমনকি এক-একরাতে ফিরত না ওরা। অমনই এক রাতে, যখন ও নিঃসঙ্গ বোধ করছে, প্রথম এক এক্সট্রা লার্জ স্লিপিং ব্যাগে ঢোকার আহ্বান পেয়েছিল রাহুল, ভেবেছিল, কাগজটা মুখ পোঁছার জন্য।

    হাতের কন্ঠস্বর নির্দেশ দিল, ‘ইউ ফাকিং অথর, চিউ অ্যান্ড সোয়ালো, অ্যান্ড ফরগেট এবাউট দ্য ওয়র্লড ফর দিস ডে।’

    একটু চেটে, রাহুল আঁচ করল ব্লটিংটা মাদক মাখানো। মুখে ফেলে চিবিয়ে গিলে ফেলল। পুকুরে নামার মতন করে, প্রথমে বাঁ, তারপর ডান পা, আলতো নামিয়ে, নেমে গেল স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে।

    হিপি-হিপিনিরা ছিলই দরিয়াদিল, এমনকি দিলফেঁক, চাইলে নিজেদেরই বিলিয়ে দেবার জন্য তৈরি। স্বয়ম্ভূনাথ

    মন্দিরকে হিপিরা বলত মাংকি টেমপল, আর এই মন্দির ঘিরেই ছিল তাদের জমায়েত, নেশা করে নির্বাণপ্রাপ্তির প্রাঙ্গণ।

    এক্সট্রা লার্জ স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে, পায়ের দিকে মাথা করে, রাহুল পৌঁছে গিয়েছিল এক এক্সট্রা লার্জ মাংসল জগতে, কাঁচা সোনার বিপুলা অনিশ্চয়তায়, উচিত-অনুচিতের দোটানা-কাটানো ব্লটিং পেপারের জ্যোতির্ময়ী বিভ্রমে। ব্লটিং পেপারের মায়াজাল ওর রক্তে ছড়িয়ে পড়া ঢেউয়ের ওপর ডুবসাঁতার দিতে-দিতে রাহুল নিজের মাংসল অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত-সঙ্কুচিত করে সুযোগ-সন্ধানী সম্পর্কজাল বিছিয়ে ফেলেছিল, আর তা, মেয়েটি এক্সট্রা লার্জ বলেই, মেয়েটির

    স্বীকৃতি অনুযায়ী, ওকে জড়িয়ে ওপরে তোলা যায় না, কোমরের বেড় প্রায় বুকের সমান, দেহের শক্তিও এমন যে ও-ই পুরুষদের কাবু করে ফ্যালে, হিপি পুরুষরা তার সঙ্গ একদিনের বেশি দিতে চায় না।

    মেয়েটির নাম এমিলিয়া বনিয়া। ঢলে পড়ার আগে রাহুলকে প্রস্তাব দিয়েছিল, চলো আমার সঙ্গে, নিউ ইয়র্কে।

    রাহুল হ্যাঁ-না কোনো জবাব দিতে চায়নি। কাঁচা সোনার কাদায় গড়া এমিলিয়া বনিয়াকে বেনারস যাবার প্রস্তাব দিতে, এমিলিয়া তক্ষুনি রাজি। বেনারসে সবকিছুই আছে, খাওয়ার, ফোঁকার, লুকোবার, সুযোগ আছে।

    রাহুলের আগ্রহ ছিল অভিজ্ঞতায়, নিউ ইয়র্কে নয়, ব্লটিং পেপারের সাইকেডেলিক প্রতিক্রিয়ায়, কল্পনাকে খেলিয়ে তোলায়, যার সুযোগ বেনারসেও পাওয়া যাবে। মগজের ভেতরের উড়ন্ত বিশাল ফড়িংদের পিঠে চেপে চান্ডেলা বধুদের দেশে চলে যাওয়ায়, নিজেকে কখনও ডানাঅলা মাছ, মাছ থেকে লাল রঙের পেঁচা, পেঁচা থেকে দু-পেয়ে গিরগিটি, গিরগিটি থেকে বাঘে রূপান্তরণে। সবুজ বাঘ, তিনতলা উঁচু পেঁচা, জাহাজের মাপের মাছ, ডায়নোসরের মাপের নীল গিরগিটি। হোক এক্সট্রা লার্জ, আহ্বান যতদিন আছে ততদিন সাড়া দিয়ে যাবে। তারপর, মন আর কল্পনা ভরে উঠলে, কেটে পড়বে চুপচাপ। কারোর সঙ্গে কোথাও ও পালাবে না। পালাতে হলে একাই পালাবে, যেমন ছোটোবেলায় বাড়ি থেকে পালাতো।

    এক্সট্রা-লার্জ অভিজ্ঞতা ধরা পড়ে গিয়েছিল অনীক খাস্তগিরের কাছে। ওকে মোটা তরুণীর সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখে বলেছিল, “ও, অনিকেত-সুকোমলরা ফিরে যেতেই নেমে পড়েছ মাংসের পাঁকে। ওই ব্লটিং পেপারের বেশি এগিও না,

    ক্যাপসুল খেও না। খেলে হুঁশ থাকবে না, টের পাবে না তোমাকে নিয়ে কী করা হচ্ছে। ”

    –এল এস ডি ক্যাপসুল ?

    –হ্যাঁ, এস টি পি, বাহাত্তর ঘণ্টার ডোজ।

    –দিয়েছে ব্লটিংখানা, আমি কেন প্রেম দেব না !

    অনীক আর নির্মল বাউলাদের এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা ওর চেয়ে বেশি, জানে রাহুল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে বেনারস হিপি-হিপিনীতে ছয়লাপ। বৈভবশালী বাবা-মায়েরা ছেলে-মেয়েদের হিপি সাজিয়ে, ক্যালিফোর্নিয়া-নিউইয়র্কের হিপি-জগতে মিশে যেতে উৎসাহ দিয়ে, ওদের নামে প্রচুর ডলার ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে, পাতা-হ্যাশিশ টানার, চুল-দাড়ি বাড়িয়ে নোংরা থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন, যাতে সেনা বিভাগ ওদের প্রত্যাখ্যান করে, আর ওরা দেশের বাইরে কেটে পড়তে পারে, যতদিন না ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়। লয়োলা হিন্ডেনবার্গার নামে অমনই এক হিপিনী জুটেছিল অনীক খাস্তগিরের ছবি-আঁকার স্টুডিওয়, বেনারসে, যার সঙ্গে ও লিভ টুগেদার করত ; নাক-নকশা ভালো বলে হিপিরা অনীককে ডার্ক অ্যাডোনিস নাম দিয়েছে। ছবি এঁকে কতই বা আয় হয়। হিপিনীকে সঙ্গিনী হিসেবে পেলে যৌনতা, মাদক, আর অর্থাগমের দিক থেকে কত সুবিধা। লয়োলা চলে গেছে আরেকজনের সঙ্গে, অনীক তাই কাঠমাণ্ডুতে।

    নির্মল বাউলা অনীকের তুলনায় হিপিদের সম্পর্কে বেশি খোঁজখবর রাখে, ফাই-ফরমাস খাটে। থাকার জায়গা না পেলে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখে। ওর বউয়ের কোনো আপত্তি নেই, টাকাকড়ি আসলেই হল। কোনো ধনী হিপিনী আবদার করলে তার সঙ্গে গঙ্গার চড়ায় কুটির তৈরি করে আদম-ইভের ঢঙে উলঙ্গ জীবন যাপন করে, আর কাঠের আগুনে পাঁঠার ঠ্যাং পুড়িয়ে খায়।

    কাঠমাণ্ডুতে নির্মল বাউলা হিপিদলের সঙ্গে আস্তানা গাড়ার পর বাদবাকি সবাই ওর ডাকে এসে জড়ো হয়েছে। বেনারসের বাঙালি পাড়ার নির্মল বেলেল্লাপনার জন্য বেলেল্লা নামে খ্যাত ছিল ; সেই বেলেল্লা অবাঙালি-লোকমুখে হয়ে গেছে বাউলা। হাতে একতারার বদলে ছিলিম, কাঁধে সবসময়েই ঝোলা টাঙানো, মাথায় যখন-যেমন টুপি, নোংরা আলিগড়ি পাজামা, পাঞ্জাবির ওপর বন্ডি। অনীক সাধারণত কালো পাঞ্জাবিতে, ওর-ও কাঁধে তাপ্পিমারা ঝোলা, ঝোলায় ছবি আঁকার টুকিটাকি আর ছিলিম, পায়ে কোলহাপুরি।

    কাঠমাণ্ডুর নেপালি-নেওয়ারি তরুণ অপেরা-লেখকরা পছন্দ করতেন কানট্রি লিকার, বিশেষত রাকসি আর জাঁড়, যা রাহুলরা খেত মাংসের আচার দিয়ে। তার আগে জানত না যে হরিণের মাংসের, মোষের মাংসের, আচার হয়।

    অনেক সময়ে মোষের কাঁচা মাংস চটকে বানানো কাচিলা মন্ডের সঙ্গে চুকুস-চুকুস। রাহুলরা রাকসিকে বলত রাক্ষসী,

    মহুয়ার চেয়েও কড়া মেজাজের, জিভে কামড় দিয়ে পেটে নেমে যেত রাক্ষসী ; পেটের ভেতরে নেমে সে-রাক্ষসী তার লাল-নীল-হলুদ-বেগুনি-সবুজ চুল উড়িয়ে দিত শিরা-উপশিরায়। রাকসির গন্ধ বেশ ঝাঁঝালো ; অনেক দূর পর্যন্ত যেত তার নিশিডাক। রাকসি তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে সবাই আয়।

    নেপালের সংবাদপত্রে রাহুলদের উপস্হিতির সংবাদ সেখানকার তরুণ অপেরা-লেখকরা ফলাও করে ছড়িয়ে

    দিয়েছিল বলে অনেক ব্যাপার আর জিনিসপত্র হয়ে গিয়েছিল সহজলভ্য, এমনকি বিনে পয়সায়। প্রায়ই ডাক আসত এ-দালান সে-দালান থেকে সারারাত রাকসিপান আড্ডায় অপেরার জন্য।

    রাহুল আর অনিকেত দুজনেই গিয়েছিল, সঙ্গে সুকোমল রুদ্র আর অকিঞ্চন চক্রবর্তী। অনিকেত, সুকোমল, অকিঞ্চন দু-তিন সপ্তাহে ফিরে গেলেও রাহুল, চাকরি থেকে নিলম্বিত থাকায়, থেকে গিয়েছিল কয়েক মাস, ওই জনপ্রাসাদে, অনীক-নির্মল বাউলা, দুই চিত্রকর বন্ধুর সঙ্গে, যাদের সঙ্গে রাহুলের বন্ধুত্ব হয়েছিল বেনারসে। হিপিরা ভারতে এসে উঠত বেনারসে। সেই সুবাদে ওরা হয়ে উঠেছিল ওদের শহরপ্রদর্শক, বেনারসে ঘাঁতঘোঁতের গাইড, আর দরকার পড়লে বিছানায় শোবার-ঘুমোবার সঙ্গী।

    অচেনা তরুণীর সাথে শুয়ে পড়তে গেলে নিজেকে অতীত থেকে ভেঙে বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে হয়। কে জানে কার কোন রোগ, মনের, দেহের। রাহুল, যে চিরটাকাল একাকীত্বের বিষে ভুগেছে, বিপজ্জনক ভবিষ্যতের ফাঁদে পা দিতে ইতস্তত করেছে, আর উদ্বেগ-উৎকন্ঠার দোটানায় পড়েছে বারবার ; তবুও ওই আহ্লাদের খোঁজ থেকে বিরত হতে পারেনি। মাদকের আর যৌনতার বিভাময় হ্যালোতে আকৃষ্ট হয়েছে। যাপনকে করে তুলতে চেয়েছে অবাধ আর সীমালঙ্ঘনময়।

    রাহুলের, ওই জনপ্রাসাদে থাকার সময়ে, সবচেয়ে বেশি সমস্যা হতো মাদকের নেশা করে রাতের বেলায় সেই প্যাঁচালো সিঁড়ি বেয়ে নিজেদের ঘরে যাওয়া। নানা অপেরা-আড্ডায় সময় কাটিয়ে, ও, রাতে ফিরে, প্রায়ই গুলিয়ে

    ফেলত। ওরা ছিল দোতলায়। কটা পাকের পর দোতলায় পৌঁছোবে তা খেয়াল রাখতে পারত না। প্রত্যেক দিন বাঁদিকের কারোর ঘরের কাছে পৌঁছে টের পেত যে, এটা নয়, নিচে বা ওপরে গিয়ে ডানদিকে যেতে হবে। কারও কারও দরোজায় ঝোলানো থাকত পরদা, বেশ নোংরা, মনে হতো যে পরদাতেই হাত পোঁছে ভাড়াটেরা। সে ঘর কোনো হিপি-হিপিনির হলে তাদের ঘরের খড়ের বিছানায় গিয়ে চিৎপটাং গা এলিয়ে দেবার বাধা ছিল না, সকাল পর্যন্ত, বা যতক্ষণ না ধোঁয়ার খোঁয়ারি কাটছে ততক্ষণ হাত-পা ছড়িয়ে।

    এমিলিয়া বনিয়া এক হ্যাঁচকায় তার স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে টান দিলে, হ্যাশিশের ঝিলমিলে নেশায়, পায়ের দিকে মাথা করে ঘুম। মদ খেলে লোকে টলতে থাকে। ভেষজের নেশায় যা হয় তাকে বোধহয় বলা উচিত ভাসতে থাকা বা উড়তে থাকা, নিজের গড়ে-নেয়া আকাশে-বাতাসে। ছাদ থেকে ফেলে দেয়া টিশ্যু পেপারের মতন। কত রকমের রঙের বিস্ফোরণ ঘটে নিঃশব্দে, উড়তে থাকে কমলালেবুর কোয়ার ডানা মেলে প্রজাপতির ঝাঁক।

    একদিন রাতে ফিরে, আজও স্পষ্ট মনে আছে রাহুলের, সিঁড়ির পাক গুলিয়ে ওপরে গেল, হদিশ করতে না পেরে নিচের পাকে নেমে এলো, আরও কয়েকবার ওঠা-নামা করার পর উঠছে, একটা বাঁদিকের ঘর থেকে নোংরা পরদার ফাঁক থেকে স্বাস্হ্যবতী নারীর ডান হাত বেরিয়ে এলো, সবুজ কাঁচের চুড়ি, লাল রঙের ব্লাউজের হাতা ; এক হ্যাঁচকায় ভেতরে টেনে মহিলা নেপালি-টানের হিন্দিতে বললেন, ‘রোজই দেখি দরোজা অব্দি আসো, ফিরে যাও কেন ?’

    কাঠমাণ্ডুতে কয়েকমাস থেকে, বেনারস হয়ে, বেনারসে কুড়ি দিন আর একুশ রাত কাটিয়ে, রাহুল ফিরে গিয়েছিল শ্যাওড়াফুলির খণ্ডহরে। বেনারসে ঘর ভাড়া নিয়েছিল এমিলিয়া বনিয়া, তিন তলার ছাদে একলা একটা ঘর। জীবন হয়ে গিয়েছিল গুহামানবের, অনেক সময়ে চারপেয়ে পশুর। এমিলিয়া বনিয়াকে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার উদ্দেশে, পরে, তার যাবতীয় কাণ্ড-কারখানা নিয়ে একখানা উপন্যাস লিখে ফেলেছে রাহুল, এমন কায়দায় যাতে পাঠক মনে করে ওটা বানানো গল্প।

    কলকাতা থেকে সুকোমল রুদ্রর তাড়া আসতে, যেতে হল।

    আদালত ওকে একমাসের জেলের সাজা দিতে, ও রিভিশন পিটিশনের দরখাস্ত দিল। তারপর হাতে অফুরন্ত সময়।

    একদিন হঠাৎ নির্মল বাউলা এসে হাজির, দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে, কদমছাঁট চুলে, টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে। বলল, অনীক একজন হাফ-হিপিনীর সঙ্গে লিভ টুগেদার করছিল, তারপর ভয়ে চলে গেছে দিল্লি।

    –হাফ-হিপিনী ?

    –হ্যাঁ, আমেরিকান এমব্যাসির অফিসারের মেয়ে, সে অফিসার দিল্লিতে পোস্টেড।

    –ভয়ে ? কার ভয়ে ?

    –অকিঞ্চন ব্যানার্জি চারু মজুমদারের আন্দোলনে যোগ দিয়েছে বলে হাতে বেয়নেট নিয়ে পুলিশ ওদের সবায়ের পোঁদে লেগেছে।

    রাহুল বলল, পশ্চিমবঙ্গ তো আরো বিপজ্জনক, তুমি বরং কানপুর চলে যাও, জুহি পরমপুরওয়ার বস্তির লোকেদের সঙ্গে মিশে যাও। অনিকেতকে বলো কোনো একটা উপায় খুঁজে বের করতে। অনীক শেষে ফাঁদে পড়েনি তো ? কে যে কার ওপর নজর রাখার জন্য কাকে ব্যবহার করছে তা টের পাওয়া বেশ মুশকিল হয়ে গেছে হে।

    নির্মল বাউলা সপরিবারে কানপুর পৌঁছোলে, অনিকেতের উপদেশমত ও নাম পালটিয়ে ফেলল, নতুন নাম হল রামবহল প্রসাদ, কদমছাঁট চুল, চুল থেকে উঁকি মারছে টিকি। ধুতি আর শার্ট। অনিকেত ওকে রঙিন মাছের দোকান খুলে দিল। চারু মজুমদারের আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পর নির্মল বাউলা আবার নিজের নামে ফিরে গেল। কিন্তু বেনারসে ফিরল না। বসত গাড়ল দিল্লিতে।

    ওরা তিনজনেই, অকিঞ্চন, অনীক আর নির্মল, বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজবদলের গোপন স্বপ্নে মজে রইল যতদিন বেঁচে ছিল। ততদিনে স্বপ্নভূমি শহর ছেড়ে এগিয়ে চলেছে গভীর জঙ্গলে।

    সুমিতাদি, মানে সুমিতা চক্রবর্তী, ভবিষ্যত টের পেয়ে বিপ্লবের স্বপ্ন থেকে চুপচাপ উঠে আলতো পায়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছিলেন।

    মার্কিন বন্ধুনি অনীক খাস্তগিরকে নিয়ে, পাড়ি মারল আমেরিকা। নির্মল নিজের নামে ফিরলে, অনীক আর অকিঞ্চন দেশে ফিরল। অনীক ওর মার্কিন বউকে না জানিয়ে ফিরে এসেছিল, এসে, ডাকে ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছিল, কেননা ততদিনে ওর এক আইরিশ বন্ধুনি দখল করে নিয়েছে ওর জীবন আর সময়।

    অকিঞ্চন ব্যানার্জিও বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল, নয়তো খুন হয়ে যেত।

    রাহুল অতীতে ফেরে।

    ঠাকুমা, সবাকসুন্দরী, তাঁর করা প্রশ্ন মনে আছে : ঘুমের মেয়ে না শোবার মেয়ে !

    ঘুমের মেয়ে ? না, শোবার মেয়ে ?

    ঘুমোবার বা শোবার কেন্দ্রে মেয়েরাই বা কেন ?

    সারা জীবনে কোলবালিশ যে ভালোবাসা পায়, তা কি ভেবে দেখিছিস ? জিগ্যেস করেছিলেন সবাকসুন্দরী দেবী।

    বালিগঞ্জ কি কেন্দ্র ? শৌখিন বাঙালিয়ানা সেদিকেই এগোচ্ছে। বুদ্ধদেব বসুর অপেরাভবন ওই এলাকাতেই। ওমুখো হতে চায়নি জীবনানন্দ দাশের গোপন বিপদসঙ্কুল অপেরা ; সবই ট্রাঙ্কে চলে গেছে, থাকের পর থাক খাতা, সযত্নে। বোধহয় জানতেন যে প্রতিটি ভবনই অবসানের দিনক্ষণ সঙ্গে করে আনে।

    জোড়াসাঁকোকে রবীন্দ্রনাথ তুলে নিয়ে গেছেন বোলপুরে। তিনি বিদায় নেবার পর সেখানে একজুট হয়েছে বিভ্রান্তি, রক্তহীনতা, অবরোধ, আপেক্ষিকতা, কলুষ, অলীকমায়া আর প্রবঞ্চনার এমন অভিকর্ষ যা শিকড়কে মাটিতে টানতে চায় না ; পারে না। ক্ষুদ্রদের কী ভাবে দৈত্যের মতন দেখায়, পোকামাকড়রা তার অনুশীলন করে।

    রবীন্দ্রনাথ ! সুমিতাদির হাত ধরে ব্রাহ্ম কবি-লেখকদের জগতে। সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলার সেই শুরু।

    হাওড়া-শেয়ালদা-দমদমে পা দিয়েই যেখানকার মানুষ নিজের মধ্যে আত্মগোপন করতে চেষ্টা করে, সেখানে কী করেই বা গড়ে উঠবে কেন্দ্র ! ফলে দোষগুলোই হয়ে উঠেছে শহরটার বৈভব। গর্তনিবাসীরাও অকারণে ছদ্মবেশ ধরে। কেউই জানে না গর্তের মুখটা গোল না চৌকো না খাপছাড়া। মাঝে-মাঝে তাদের সুপ্ত সন্ত্রাসের আপতন, অমনোযোগী মজার ক্ষণস্হায়ী সম্ভাবনার ঝলকানি কখনও-সখনও চোখে পড়েছে রাহুলের, যার ডাক নাম রাহু।

    অসীম গাঙ্গুলি আঁচ করলেন, রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, কী ভাবছে। উনি বললেন, বেশ শ্লেষ মেশানো কন্ঠস্বরে, ‘রক্তিমকে বই ছাপতে দিয়েছিলে শুনেছি, সে বইয়ের কী দশা হয়েছে তাও শুনেছি।’ তারপর যোগ করেছিলেন, ‘স্কুল-কলেজে ভালো ফলাফল করলেই মানুষ চেনার ক্ষমতা হয় না। তোমার দাদা তো রক্তিমকে ভালো করেই চিনতো ; ওর পাহাড়টিলার বাসায় ছিল দুবছর। ওর তো উচিত ছিল তোমাকে সতর্ক করে দেয়া। অনিকেতের শ্বশুর কেন নিজের মেয়ের সঙ্গে রক্তিমের বিয়ে দিতে চাননি তা জানো তো ? আমাকে বিশ্বাস করা প্রয়োজন মনে করোনি তুমি !’

    রক্তিম চাটুজ্জের নামটা আন্দোলনের নেতা হিসাবে দেখানো হয়েছে বলে ঈর্ষা, নাকি রক্তিমের অননুকরণীয়

    অপেরার জনপ্রিয়তার জন্য ? নাকি পথেঘাটে রক্তিম মদ না খেয়েও মাতাল সাজার অভিনয় করতে পারে বলে ? চাপা

    ঈর্ষা মানুষকে কুঁদুলে করে।

    ঈর্ষা হওয়া উচিত সঘোষ।

    নীলকমল চৌধারী, চৌধুরী নয় চৌধুরী নয়, চৌধারী, চঔধাআআআরী, চঔধাআআআরী, হুম, কারেক্ট, যে মোটা-মোটা বাংলা পাল্প-অপেরা অনুবাদ করে দেশের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে গণবিয়েতে পাওয়া বউকে খোশখেয়ালে

    তরতাজা রাখে, কাল বিকেলে, ওর বড়বাজারি হিন্দি ট্যাবলয়েড দপতরে আড্ডা দেবার সময়ে বলেছিল, ‘আরে তুম ইন রংবদলু ফলানাদাদা ঢেকানাদাদা লোগোঁকো লেকর কেঁও চল রহে হো ! তুম তো হো রাহু ; সুরজকা আগ খা কর জিন্দা হো। চমকতে হুয়ে আঠ কালে ঘোড়ে পর সওয়ার হো। ছোড়ো উন বুডঢোঁকো। ’

    নীলকমল চৌধারীর বাবা নীলকমলের মা মারা যাবার পর যে মেয়েটিকে বিয়ে করেন, তার বয়স ছিল নীলকমলের চেয়ে কম। বাপ-ছেলে একই যুবতীর প্রতি আকৃষ্ট ; যুবতী বাপের চেয়ে ছেলেতে বেশি। বাড়িতে অবস্হা বেগতিক হয়ে উঠছে দেখে নীলকমলের বাবা সৌরঠ সভার গণবিবাহের মাঠে, যেখানে মৈথিলি ব্রাহ্মণরা বছরে একবার নিজেদের ছেলেমেয়ের পাত্রপাত্রীর খোঁজে ঢুঁ মারে, সেখানে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন নীলকমলের। চার বছরের মাথায় বউয়ের ভাইঝির প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করে নিলে নীলকমল ; বিছানায় ডান পাশে পুরোনো বউ, বাঁ পাশে নতুন বউ। টিকল না, নতুন বউয়ের বোনের সঙ্গে আবার প্রেমে পড়ায়।

    বিয়ে করলেই প্রেম ফুরিয়ে যায় মনে করে ও, নীলকমল, আর তাই, বারবার প্রেমে পড়তে চায়। নিজের তৈরি ফাঁদ কাটিয়ে বেরোবার জন্য নীলকমল পালিয়ে এলো কলকাতায়। ব্যাস, কলকাতায় ওকে জাপটে ধরল চিনাদের হালুমবাঘ পাড়া। কাগজের ড্রাগনদের আড়ালে কত কী যে করা চলে, তাও জেনে ফেলল। গাঁজা চরস আফিম চিনা যৌনসেবিকা আর ওই পাড়া থেকে কয়েক চাউমিন-মোমো দোকান দূরে ওর হিন্দি ট্যাবলয়েডের দপতর। রাহুলকে বললে, ‘চলো, তুমকো চিন দেশকে নরক মে লে জাতা হুঁ, ডিভাইন কাম-এ-দুনিয়া মেঁ পহুঁচ কর তুমহারা মর্দানগি খিল উঠেগা, তুমহারে অওর মেরে তরহ চুতিয়োঁকা স্বর্গ হ্যায়। ’

    –ডিভাইন কাম-এ-দুনিয়া ?

    –হাঁ, তুম চাহে ভার্জিল বনো য়া দান্তে, জো মর্জি। নরক কো স্বর্গ মে বদলনা কোই মামুলি স্বার্থ নহিঁ হ্যায়।

    আবার সেই কল্পনা দখলের খেলা ; কারোরই জানা নেই স্বর্গ কীরকম, কিংবা, সকলেই জানে স্বর্গ কীরকম। এনার স্বর্গে বসিয়ে দাও ওনার স্বর্গ ; ওনার স্বর্গে বসিয়ে দাও তাঁর স্বর্গ। এভাবেই কল্পনা দখল করো।

    নীলকমলের বাড়ি ছিল সাহারসা জেলার মাহিষি গ্রামে, ছিন্নমস্তার মন্দিরের জন্য প্রতিবছর বর্ষায় মেলা হয় ওদের গ্রামে। গিয়েছিল রাহুল, ওর বয়স তখন কত, মমমমমমমম, যা-ই হোক না, কী-ই বা এসে যায়। মন্দিরে পুজোর রাতে মোষ বলি হয় আর মোষের মাংসের প্রসাদ পায় ভক্তরা। দিশি সোমরস মদের সঙ্গে প্রসাদ, খেয়েছিল রাহুল, অন্য ভক্তদের মতন। রাহুল তো প্যাগান, তহমিনা আপার দেগে দেয়া জাহিল আর কাফের, কুফ্র, কুফ্র, কুফ্র কহিঁকা। রোদ-আলো-বাতাস-জল-প্রকৃতি ওর কাছে ডিভাইন, ঠাকুরদেবতাদের ঘরসাকিন-আদল নিয়ে নিশ্চিত নয়, খালি গায়ে আর মুখে মোষের রক্ত মেখে নেচেছিল। ওর মনে হয়েছিল, আর এর জন্য ধন্যবাদ দিতে হয় গ্রামবাসীদের যুক্তিহীনতাকে, ভাগ্যিস ছিন্নমস্তার মন্দিরটা ছিল, নয়ত সারা গায়ে মোষের রক্ত মেখে যে রাতদুপুরে দুশো মানুষ-মানুষী মিলে নাচা যায়, সাময়িক হলেও, বেপরোয়া উন্মাদ হওয়া যায়, তা অজানা থেকে যেত। নিজের একাকীত্বকে এনজয় করার আরামদায়ক পাগলামি। ইউরোপের জ্ঞানগম্যি থেকে ছাড়ান পাবার সহজ সুযোগ এনে দিয়েছিল নীলকমল। ভিড়ের ভেতরে সেঁদিয়ে একাকীত্বের মতন আরাম নেই।

    তখন পর্যন্ত, আর এখনও, সত্তর পেরিয়ে, ‘ঈশ্বর’ ধারণাটা কোনো হিন্দু ধর্মবইতে পায়নি রাহুল। পেয়েছে কেবল দেবী-দেবতাদের কাহিনী। কোনো বইতে ‘ঈশ্বর’ নেই, অথচ আত্মীয়-স্বজন-জ্ঞাতিগুষ্টির সবাই সেই অবর্তমান ঈশ্বরের কথা বলে ; দেবী-দেবতাদের মনে করে ‘ভগবান। রাহুলের মাও গণেশ দুর্গা সরস্বতীর মূর্তি সাজিয়ে রেখেছেন ঘরের কোনে, আর তাদের সবাইকে বলেন ভগবান। মা-বাবা কেউই ঈশ্বর শব্দটা কখনও ব্যবহার করেননি কেন, অবাক লাগে রাহুলের। নীলকমলও বলত, ‘আরে ঈশ্বর নামকা কোই অস্তিত্ব নহি হ্যায়, যো তুমহারে ঘরকা দেওতা হ্যায় ওহি ভগওয়ান হ্যাঁয় সমঝলো, বিসওয়াস করনে কা জরুরত নহিঁ, সমঝনে সে মতলব হ্যায়, কোই রহে ইয়া না রহে, কেয়া ফর্ক পড়তা হ্যায়। ’

    নেশা নীলকমলকে এমন নির্মোহ জাপটে ধরে ফেলেছিল, যে, প্রেমিকাদের ছাড়লেও, মগজের রাসায়নিক

    ইন্দ্রজালের মোহকে ছাড়তে পারেনি। রাহুলরা ওকে ফেরত নিয়ে গিয়ে প্রথম বউয়ের কাছে সোপর্দ করলে, ওকে ভর্তি

    করে দেয়া হল হাসপাতালে, লেখকদের কোটায়, একটা আলাদা ঘরে। ডাক্তার ওকে বলে দিয়েছিল যে ওর পেটের আর ফুসফুসের অবস্হা খুব খারাপ। শল্যচিকিৎসা করতে গেলে পুরো হাসপাতাল আফিম গাঁজা চরসের ধোঁয়ায় ভরে যাবে। মনের সুখে হাসিমুখে মরার অপেক্ষা করত।

    একদিন, ভিজিটিং আওয়ারে, রাহুলকে বললে, আমার জন্য কালকে একটা কনডোম এনে দিও।

    –কনডোম ?

    –হ্যাঁ, একজন নার্স রাজি হয়েছে।

    কিছুক্ষণ পর একজন ময়লা মালায়ালি নার্স ঘরে ঢুকতে, নীলকমল বললে, এই যে, এই মেয়েটিই রাজি হয়েছে ; তুমি কাল একটা কনডোম নিয়ে এসো।

    নার্স রাহুলের দিকে তাকিয়ে জিভের ডগা দিয়ে ঠোঁটে হাসি বুলিয়ে শুধিয়েছিল, হ্যাঁ, আপনি একটা কনডোমের প্যাকেট কাল এনে দেবেন, আজকে বরং উনি ভালো করে ঘুমিয়ে প্রেম করার জন্য চাঙ্গা হয়ে নিন।

    পরের দিন রাহুল গিয়ে দ্যাখে ঘর ফাঁকা, রুগির বিছানায় ধবধবে সাদা চাদর, নতুন রুগির অপেক্ষায়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, কাল রাতেই মারা গেছে নীলকমল। ওর প্রথম বউ রাত থাকতেই নিয়ে গেছে ওর শবদেহ। প্রাক্তন প্রেমিকারাও শবদেহের মালিকানার প্রশ্ন তুলতে পারে ! কেন ? রাহুলরা ওর শবদেহ নিয়ে যখন দাহ করার জন্য বেরোল, বাড়ির সামনে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সমস্বরে ওর বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানবিরোধী অপেরার লাইন আবৃত্তি করছিল। নীলকমলের অপেরায় একটা লাইনে যে ওর নাম রয়েছে, প্রথম শুনল রাহুল, শ্মশানের পথে। বইটা দিয়েছিল নীলকমল, কিন্তু আলস্যের দরুণ পড়া হয়ে ওঠেনি। আদরে পাওয়া কত বই যে অনাদরে চুপচাপ পড়ে থাকে, পড়ে থেকে-থেকে পড়েই থেকে যায়, পড়া হয়ে ওঠে না কোনো দিন। বইগুলো অপরাধবোধে ভুগে-ভুগে হলুদ-কালচে হয়ে যায়।

    সেই নীলকমল জানতে চেয়েছিল, ফলানাদাদা-ঢেকানাদাদাদের কেন সঙ্গে করে নিয়ে চলেছে।

    কেন চলে চলেছ ?

    আমি কেন নিয়ে চলব ? ওনারা দমবন্ধ হয়ে বাধ্য হয়ে চলে চলেছেন। অসীম গাঙ্গুলি ওনাদের দমবন্ধ করে

    দিয়েছেন।

    কী করে জানতে পারলেন অসীম গাঙ্গুলি যে রক্তিম চাটুজ্জেকে বই ছাপাবার টাকা দিয়েছিল রাহুল ! দাদা অনিকেত, যাঁর ডাক নাম কেতু, বলেননি নিশ্চই। হয়তো মদের ঘোরে তন্দ্রামাতাল রক্তিম চাটুজ্জে নিজেই ফাঁস করে দিয়ে থাকবেন। ঠিকই, দার্শনিক অপেরা নিয়ে লেখা বইয়ের পাণ্ডুলিপি আর টাকা রক্তিম চাটুজ্জেকে দিয়েছিল রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু ; উনি অত্যন্ত বাজে কাগজে পঞ্চাশ কপি বই ছাপিয়ে দিয়েছিলেন, প্রুফ দেখার প্রয়োজন মনে করেননি ; নিজেই একটা প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন। সে বই জড়ো করে রক্তিম চাটুজ্জের উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনেই, পেটরল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু। বাকপটুতার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে জোরাজুরি করেছিলেন রক্তিম, যাঁর অপেরার নিশিডাকে মুগ্ধ ছিল রাহুল ; আর সে মুগ্ধতা কাটিয়ে ও কখনও, এমনকি আজও, যখন ওর বয়স, মমমমমমমমমমমম, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, বেরোতে পারেনি, রক্তিম চাটুজ্জের সঙ্গে সম্পর্ক বিগড়ে যাবার পরও। বিগড়ে যাবার কারণ কেবল টাকা নয়ছয় নয়। কাউকে-কাউকে এক-এক সময়ে ভালো লাগে, আবার হঠাৎ ভালো লাগে না, অকারণে।

    রাহুলের বেশ আহ্লাদ হয় যখন রক্তিম চাটুজ্জের গবেষকরা, থিসিস লিখতে বসে, রাহুলকে খোঁচান, যেন রক্তিম চাটুজ্জেই ওই যন্ত্রজীবদের বকলস খুলে দিয়ে থাকবেন। কত সেলিব্রিটি আজকাল মদের বিজ্ঞাপনের মডেল হন। রক্তিম চাটুজ্জেও হতে পারতেন। কোষ্ঠকাঠিন্য আর সর্ষের তেলের চেয়ে শ্রেয় হতো যখন লুপুংগুটুর ঝর্ণার পৃষ্ঠভূমিতে ঘাসের ওপর শুয়ে বলতেন, ‘কওন কমবখ্ত হ্যায় জো বরদাস্ত করনে কে লিয়ে পিতা হ্যায় ; ম্যায় তো পিতা হুঁ কি বস সাঁস লে সকুঁ’, মহুয়া মদের খালি বোতল জলেতে ভাসিয়ে দিয়ে ! পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে ছাতিম গাছের তিনটে হলুদ পাতার ডগা।

    রাহুল যখন বিভাগীয় প্রধান পদে কলকাতার দপতরে বদলি হয়ে এলো, তখন কে বা কারা রটিয়ে দিয়েছিল যে ওর মৃত্যু হয়েছে। দুচারটে পত্রিকা ওর মৃত্যু নিয়ে আহ্লাদমাখা সম্পাদকীয় লিখেছিল। রাহুল তখনও কোয়ার্টার পায়নি বলে অনিকেতের বাড়িতে ছিল। ওর মৃত্যুর খবরে, অনিকেতের বাড়িতে, ছুটে এসেছিলেন কিন্তু রক্তিমই। সেখানে রাহুলকে দেখে বলে উঠলেন, ‘আরে ! তোমার মরে যাবার আনন্দে খালাসিটোলায় তোমার বন্ধুরা চিয়ার্স করছে, আর

    তুমি এখানে ইজিচেয়ারে বসে ঠ্যাং নাচাচ্ছ ! চলো, বেঁচে থাকার আনন্দে স্মিরনফ ভোদকা খাওয়াবে চলো। ’ রাহুল

    বলেছিল, একদিন যাবো আপনার বাড়ি স্মিরনফের বোতল নিয়ে। আপনি, আপনার স্ত্রী, দাদা, আমরা সবাই মিলে খাবো। রক্তিম বলেছিলেন, কবে আসবে ফোনে জানিও, মাংস-ভাত আর স্মিরনফ। গিয়েছিল রাহুল। সবাই নানা মাপের কাচের গ্লাসে, রক্তিমের স্ত্রী ওনার উঁচু শ্যামপেন গ্লাসে। কোথা থেকে অমলেন্দু আতর্থী জুটে গিয়েছিল সে-মৌতাতে।

    রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, প্রথম কথা-কাটাকাটির দিন, অসীম গাঙ্গুলির অগোছালো ধূসরফুল তোশক পাতা খাটে, যা মনে হচ্ছিল ঘুমের আলস্য ঝেড়ে স্বপ্নে মুখরিত মজাহীন রাত কাটিয়ে তখনও বেরোতে পারেনি, আগাম ম্যারাথন লেখালিখির আঁতুড় ঘর, আর ছোট্টো টেবিলে রাখা পত্র-পত্রিকার গন্ধের উদাসীনতার মাঝে বসে, চিৎকারে লুকোনো অচেনা ভাষার মতো বক্তব্যে, প্রায়-ফাঁকা রেলস্টেশানে কোনো মহিলার অট্টহাসির আকর্ষণে ক্ষণিক স্তম্ভিত জনাকয় পাবলিকের মতন, হতবাক, থ ; যেন বহু বহু বহু বহু দুরের ছায়াপথ থেকে পাঠানো শীতে, অসীম গাঙ্গুলি মুড়ে ফেলতে চাইছেন নিজেকে। ওনার রয়েছে নির্ধারিত ছককাটা উদ্দেশ্য, জীবনের মেপে-নেয়া গতিপথ, আকাঙ্খার রৈখিক নকশা। গলার শিরা ফুলিয়ে বলেছিলেন, কাফকা, বালজাক, মার্সেল প্রুস্তের মতন গদ্য লিখে তাক লাগিয়ে দেবেন, বাংলা গদ্যকে এমন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাবেন যা প্রদীপন চট্টো কল্পনাও করতে পারবে না।

    তাহলে সেই কল্পনাই !

    কল্পনা যদি তিন মাথার মোড়ে এসে দাঁড়ায় ?

    ইহুদিদের পরমপুরুষ মোজেসের পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়েছিল টেন কমাণ্ডমেন্টসের পাথরের টুকরোগুলো, সারা ঘরময়। জড়োকরা গল্পের খাজাঞ্চিখানা। টুকরো-টুকরো আয়না ছড়িয়ে মেঝেতে টুকরো-টুকরো মুখ।

    অসীম গাঙ্গুলিকে, দেখা করার দিনক্ষণ জানিয়েই গিয়েছিল রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু। অপেরাগ্রন্হ প্রকাশ করা নিয়ে কথা বলবে বলে এসেছিল, কিন্তু রাহুল ওদের আন্দোলনের একটা লিফলেট ওনার দিকে এগিয়ে দেয়া মাত্র সারা ঘর গমগম করতে শুরু করেছে বিদারের চচ্চড় আওয়াজে।

    নেতৃত্ব ! একটা ফালিকাগজে ইংরেজিতে লেখা একটা শব্দ। তার আঘাত এতো গুরুতর ! লিডার ?

    রাহুল যখন এসে পৌঁছেছিল, বাড়ি ছিলেন না উনি। মাসিমা, ওনার মা, বললেন, বোসো বাবা, তোমার প্রিয়

    ইলিশ মাছ কিনতেই গেছে ও ; ফিরবে এক্ষুনি।

    অসীম গাঙ্গুলির মা কী করে জানলেন রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু, ইলিশ মাছ খেতে ভালোবাসে ! ও তো বলেনি কখনও। এর আগে একবারই ভাত-ডাল-আলুভাজা খেয়েছিল অসীম গাঙ্গুলির নিমপুকুরের পুরোনো বাড়িতে। নিরামিষ।

    অসীম অবশ্য রাহুলদের কানপুরের বাড়িতে খেয়েছিলেন ইলিশ। মচ্ছিবাজার থেকে কিনে এনেছিল রাহুল, ঝিকমিকে রুপোলি ইলিশ।

    ঘন্টাখানেক পরে বাজার করে ফিরেছিলেন অসীম গাঙ্গুলি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে রাহুলকে, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার নাম কেতু, এক নজর দেখে, শরীরে গাম্ভীর্য খেলিয়ে, ভেতরে চলে গিয়েছিলেন।

    অসীম গাঙ্গুলির কন্ঠ শুনতে পেল রাহুল, ‘ইলিশ পাওয়া যায়নি ; আমেরিকান কই এনেছি। ’

    আমেরিকান কই ! আমেরিকাতে কইমাছ হয় নাকি ? স্ট্রেঞ্জ ! রাহুলের জানা নেই।

    ঘরে ঢুকে, রাহুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমেরিকান কই খাও তো ? নতুন এসেছে বাজারে। বিদেশে একে তেলাপিয়া বলে, খেতে ভালো, কাঁটা নেই। তোমাদের কানপুরে পাওয়া যায় ?’

    কে জানে, হয়তো ইচ্ছে করেই ইলিশ আনেননি অসীম ; মাছের মাধ্যমে বার্তা পাঠাতে চাইছেন । খাবার জন্য তো আসেনি রাহুল, যার ডাক নাম রাহু। এসেছিল রামায়ণ নট্ট কোম্পানি থেকে ওর প্রকাশিতব্য বই নিয়ে কথা বলতে, আর ওদের আন্দোলনের একটা বুলেটিন দেবার জন্য।

    অসীম গাঙ্গুলির দিকে আন্দোলনের সাপ্তাহিক বুলেটিনের ফালিকাগজটা এগিয়ে দিতে, ছিনিয়ে নিয়ে, বলে উঠেছিলেন, ‘দেখেছি দেখেছি ; তোমার বন্ধু হরিচরণ খাঁড়া দিয়ে গিয়েছিল। ’

    পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল রাহুল। ওনার মুখে, রাহুলের বড় জ্যাঠা যাকে বলতেন, রাগলে পরে সারা শরীরে পাথুরে জীবাশ্মর ঢেউ ছড়িয়ে ছড়িয়ে ঝির-ঝির ঝরে পড়তে থাকে, সেরকম আদল চোখে পড়ল রাহুলের।

    –লিডার ? লিডার আবার কী ? অপেরা মুভমেন্টের লিডার হয় নাকি ? হয়েছে কখনও ? কোন আন্দোলন

    লিডারের নাম ঘোষণা করে আরম্ভ হয়েছিল ? সুররিয়ালিজম, সিমবলিজম, ডাডাইজম, কোনো অপেরা-আন্দোলনের

    ম্যানিফেস্টোতে লিডারের নাম দেখেছ ? ম্যানিফেস্টোতে কি আঁদ্রে ব্রেতঁ লিখেছিলেন যে উনি পরাবাস্তববাদীদের নেতা ?’ মনে রাখা আর ভুলে যাওয়ার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে, একটানা প্রশ্ন করে গেলেন অসীম গাঙ্গুলি। তারপর বললেন, ‘ইংরেজিতে কেন ? আন্দোলন করতে চাইছ বাংলার অপেরাজগতে, ইংরেজিতে ম্যানিফেস্টো লিখে ? তোমার কানপুরের হিন্দি রসিকদের জানাতে চাও যে কলকাতায় আধুনিক অপেরার নেতৃত্ব এখন কার কন্ঠে ?’

    শুনতে-শুনতে, রাহুলের মনে হল, যেন কন্ঠরোধী রসায়নের তোড় আটকে গেছে ফুসফুসে, যা ওগরাবার সুযোগ পেয়ে গেলেন উনি, রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারীমশায়।

    ওহ হো ; এবার স্পষ্ট হল রূপক মজুমদার কেন রামায়ণ নট্ট কোম্পানি ছেড়ে চলে গেছেন। রূপকের কোনো ধরে রাখার লোভ নেই। ছেড়ে দেবার ক্ষমতা অনেকটা মহাশূন্যের মহাবিস্ফোরনের ক্ষমতার মতন ; একের পর এক গ্রহ আর উপগ্রহ নিজের দেহ থেকে জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে মহাকাশকে ভরে তুলেছে বিস্ময়ে। ধরে রাখাটা ক্ষমতা নয় ; ক্ষমতার অভাব। অন্যদের নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখার প্রয়োজন কেনই বা হবে একজনের !

    অনেককাল পরে, রাহুলের বয়স তখন কত, সে যা-ই হোক, কী-বা এসে যায়, ওই একই ফালিকাগজে ছাপা আরেকটা শব্দ আতঙ্কিত করেছিল কামেশ্বর চোঙদারকে, মহাভারত নট্ট কোম্পানির অধিকারীমশায়ের ওসকানিতে। সেই শব্দটা ছিল ক্রিয়েটার। কামেশ্বর চোঙদার সেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল প্রভাস চোঙদার, অমলেন্দু আতর্থী আর নবদেব সরখেলের রক্তে। বেচারা। রক্তদূষণে তারা ঢুকে গেল শাসকদলের ছত্রছায়ায়।

    সুমিতাদি : লিডার, ক্রিয়েটার এই সমস্ত ধারণাগুলো তো তুই বাইবেল থেকে পেয়েছিস ; লোকে তো বলবেই তোরা বিদেশি প্রভাবিত।

    রাহুল : খ্রিস্টধর্ম কি বিদেশি ?

    সুমিতাদি : ধর্ম তো জাস্ট আইডিয়া, যে-আইডিয়ায় একটা সম্প্রদায় বিশ্বাস করে।

    রাহুল : তবে ?

    সুমিতাদি : তুই নিজেই ভেবে দ্যাখ। গোঁফ-দাড়িতে ওই ভদ্রলোক, রক্তিম চট্টোপাধ্যায় না কি যেন নাম, তার মধ্যে তুই খুঁজে পেলি ওল্ড টেস্টামেন্টের মোজেসকে, আর মোজেস, সকলেই জানে, ছিলেন লিডার ; নিজের মধ্যে খুঁজে

    পেলি জিশাস খ্রাইস্টকে, যিনি, সকলেই জানে, খ্রিস্টধর্মের ক্রিয়েটার ; আর হরিচরণ খাঁড়া নামের ভদ্রলোকটি হলেন সেইন্ট পিটার, খ্রিস্টধর্মের প্রচারক। অনিকেত, তোর দাদা, দাঁড়িয়ে আছেন আব্রাহামের মতন বা সেইন্ট জোসেফের মতন।

    রাহুল : না, আমার মাথায় তো অমন চিন্তা ছিল না।

    সুমিতাদি : অবচেতনে ছিল। সেইন্ট পিটার যোগাড় করতে লাগল সদস্যদের, কনভার্ট করার জন্য। কেউ-কেউ হল, কেউ-কেউ হল না, বা হয়েও পালিয়ে গেল।

    রাহুল : এটা ঠিক যে একাধজন জুডাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, ফর থার্টি পিসেস অব সিলভার।

    সুমিতাদি : ধর্ম নিয়ে যে ঝগড়াঝাঁটি হয় তা ওই লিডার-ক্রিয়েটার থেকে জন্মেছে। তোর লিডার অমুক, তার লিডার তমুক। লিডার-ক্রিয়েটারের কী-ই বা দরকার ছিল ! তোদের কাজিয়াটাও সাম্প্রদায়িক কাজিয়ার মতন।

    রাহুল : তোমার লেনিনও তো লিডার ; তোমার মার্কস তো ক্রিয়েটার। নয়কি ?

    সুমিতাদি : আমি তো তোকে বলেছিলাম, যে যারা নিজেদের মার্কসবাদী বা লেনিনবাদী ঘোষণা করবে, সাম্যবাদী ঘোষণা করবে, তারা তোদের মতনই, বিশ্বাসের টুকরো-টাকরার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে কাজিয়ায় মাতবে। দ্যাখ না শেষ পর্যন্ত কী হল সোভিয়েট রাষ্ট্রের আর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে।

    রাহুল : আমার কোনো দাবি-দাওয়া নেই, ছিল না।

    সুমিতাদি : সর্বভূক বিষবৃক্ষটার জন্ম তো তুই-ই দিয়েছিস। কী করে বলছিস তোর দায় নেই ?

    রাহুল : নেই, জাস্ট নেই। যারা মালিকানার রোগে ভুগতে চায় তারা ভুগুক, তাদের ছেলে-মেয়েরা ভুগুক, চ্যালা-চামুণ্ডারা ভুগুক। আমার কিছু করার নেই।

    সুমিতাদি : সে তুই এখন যে যুক্তিই দিস না কেন, তোর ওই ক্যাথলিক স্কুলের প্রভাব তুই যে ছাড়াতে পারিসনি তা তোকে স্বীকার করতে হবে। আর তোর ওই কনট্রোভার্শিয়াল কবিতাতেও, মেয়েটি কে জানিস ? মেরি ম্যাগডালেন।

    রাহুল : অঞ্জলির কথা বলছ ?

    সুমিতাদি : স্মৃতির কথা বলছি। ক্যাথলিক স্কুলের স্মৃতির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছিস ব্যক্তিগত উত্তরণের স্মৃতি।

    উত্তরণ না বলে, আক্ষেপও বলতে পারিস। আক্ষেপের স্মৃতি।

    রাহুল : স্মৃতি থেকে তো আর আইরিশ নানদের মুছে ফেলতে পারি না। তোমাকে কি কোনো দিন স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারব ভেবেছ ? নেভার।

    বহুকাল পর, রাহুলের বয়স তখন কত, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, টিভির পর্দায় ঢাকার রাজপথে

    নাস্তিক-আস্তিক লড়াই দেখে রাহুল ভাবছিল, কেনই বা আস্তিকরা আফগান স্যুট পরে খুনোখুনি করছে, যখন কিনা তারা বাঙালি। তখন ওর মনে পড়েছিল সুমিতাদির কথাগুলো ; বিশ্বাস মানুষকে পোশাক পালটে ফেলতে ওসকায়। বিশ্বাসকে মুছে ফেলতে হলে পালটা-বিশ্বাস দরকার হয়ে পড়ে।

    রূপক মজুমদার টুসকি বাজিয়ে মুছে ফেলতে পারতেন, পেরেছেন আজীবন। যা পেছনে তা অদৃশ্য। পালটা-বিশ্বাসের প্রয়োজন ছিল না।

    শ্যাওড়াফুলির খণ্ডহরের চিলেকোঠায় রূপক মজুমদারকে দাদার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে দেখলেও ওনার সঙ্গে রাহুলের প্রকৃত পরিচয় হয়েছিল পরে, রাহুলের বয়স তখন কত, কোন সালে, মমমমমমমম, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, বাগবাজারের মোড়ে, যখন রাহুল আর অনিকেত একটা অত্যন্ত নোংরা পাইস হোটেলে ভিজে কলাপাতার ওপর ভাত নিম-বেগুন ইলিশের ঝোল খেয়ে, পাণিহাটির পথে, শেয়ালদা স্টেশান যাবে বলে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেসময়ে শেয়ালদা স্টেশানচত্তর সংসার-ভাঙা মানুষ-মানুষীতে গিজগিজে, যেতে হবে সেইসব ভাঙা সংসার ডিঙিয়ে-ডিঙিয়ে।

    –তুই অনিকেতের ভাই রাহুল ? কলকাতায় ভর্তি হতে এসেছিস ? অনিকেত পরিচয় করিয়ে দেবার আগেই সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন রূপক।

    –না, ও কানপুরেই পড়বে, অনিকেত জানিয়েছিল রূপককে।

    –ওর নাম রুপক মজুমদার, ও-ই রামায়ণ নট্ট কোম্পানিটা শুরু করেছে, এই কথা বলে, অখদ্দে প্রচ্ছদের অপেরা সুভেনিরের কপি দেখিয়েছিল অনিকেত। ওই নট্ট কোম্পানি সম্পর্কে রাহুলের আগ্রহ হয়নি, মিশনারি স্কুলে শিক্ষার কারণে ওর বিচরণের ক্ষেত্র ছিল ইংরেজি-ভাষার বইপত্র। কিন্তু এত কম বয়সের নট শুনে ওর ভীতিবিস্ময় হয়েছিল।

    দ্বিতীয়বার রূপকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল একটা নাটকের মহড়ায়, যাতে অনিকেতের কেবল একটা এক লাইনের সংলাপ ছিল। তৃতীয়বার ধানবাদে। অনিকেতের চাকুরিস্হলে প্রায়ই আসতেন রূপক। রাহুলের মনে হতো উনি কোনো না কোনো তাৎক্ষণিক ক্রাইসিস এড়াবার জন্য অনিকেতের পাহাড়ি আস্তানাগুলোয় পৌঁছে যান। অনাথ ছিলেন, আর হয়তো তাই, তাঁর মধ্যে অধিকারবোধ, স্বত্তাধিকার, মালিকানা, স্বামীত্ব ইত্যাদি অঙ্কুরিত হতে পারেনি, যে-গুণ বা দোষগুলো ছিল অসীম গাঙ্গুলির চরিত্রে কুঁদে-কুঁদে ঠাসা। যা নিজের মধ্যে সঞ্চিত করে আহ্লাদিত হওয়া যায়, মানে, যৌনতা আর প্রজ্ঞা, তা-ই রূপকের যাপন-অভিমুখের দিশা-নির্দেশ দিয়েছে। রামায়ণ নট্ট কোম্পানির সদস্যরা তাঁকে, ঈর্ষাবশত, র‌্যালা মজুমদার নামে ডাকত।

    রাহুলের মকদ্দমার সময়ে, ওকে সমর্থনের জন্য, একটা আবেদনের খসড়া লিখে রূপক সর্বত্র ছুটোছুটি করেছিলেন, অনেকের বাড়ি আর অফিসে গিয়েছিলেন, অনুনয়-বিনয় করেছিলেন, কিন্তু অর্নব বাগচী ছাড়া একজনেরও স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে পারেননি। তখনকার তরুণদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন অর্নব বাগচী, রামায়ণ নট্ট কোম্পানির আরেক প্রতিষ্ঠাতা। সে-সময়ে যাঁরা নিজেদের বাঙালি মূল্যবোধ ও ডিসকোর্সের অধিপতি ভেবে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ছড়ি ঘোরাতেন, দেহাতি কানপুরি রাহুল যে তাঁদের সেসব সংজ্ঞাবলী, বৈশিষ্ট্য ও মূল্যায়নের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নান্দনিক স্তরে তাঁদের বেদখল করে দিতে চাইছে, তা অনুধাবন করতে দখলিস্বত্ত্ব-বিরোধী ও আস্তিত্বিক অনাথ রূপকের বিলম্ব হয়নি।

    রূপক মজুমদারের সঙ্গে, শেষবার দেখা হয়েছিল অনেককাল পরে, সেই যখন রাহুলের বয়স, মমমমমম, বোধহয় সাতচল্লিশ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, কলকাতা বইমেলায়। ছোটো-ছোটো করে চুল ছাঁটা, হেটো ধুতিতে উনি।

    ইংরেজিতে ইশতাহার ছাপানো বলে অসীম গাঙ্গুলির ক্রোধের উৎসটা ঠিক কোথায়, অনুধাবনের চেষ্টা করল রাহুল। ইংরেজির অভিকর্ষটা ভিন্ন, নিঃসন্দেহে, অসীম গাঙ্গুলির আয়ত্বের বাইরে, আপাতত।

    কানপুর তো হিন্দিভাষী অঞ্চল, যেখানে থাকে রাহুল। ওর কলেজের অধ্যাপকরা, সহপাঠীরা, বন্ধুরা, বেশিরভাগই অবাঙালি। আন্দোলনের ইশতাহার নিয়ে তাদের কাছে কি যাবে না রাহুল ? ছোটোবেলার ক্যাথলিক

    স্কুলের নানদের কাছে ?

    আর রাণো নামের সেই নেপালি সহপাঠিনীর কাছে, প্রথমবার অপেরা-সংলাপ লিখে কাগজটা ভাঁজ করে যার হাতে দিয়ে প্রতিদানে চুমু পেয়েছিল ? সে রচনা তো, কয়েকদিন ঘষেমেজে, রাহুল ইংরেজিতেই লিখেছিল। মাথা ঠাণ্ডা না করে কোনো লেখাই লিখতে পারে না ও, লিখে ফেলে রাখে, উড়ন্ত শব্দ আর বাক্যদের কিছুকাল যাবত ধরে-ধরে খাতার ভাঁজে নিয়ে আসে, ঘষামাজা করে, পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পরও পরিবর্তন-পরিমার্জন করে, বইতে ঢোকার আগে

    পর্যন্ত রদবদল করে।

    রাণোকে লেখা অপেরা-সংলাপের শিরোনাম ছিল ‘এক্সচেঞ্জ এ কিস’। বোকামির চতুর কবিতাটাও আবছা মনে আছে রাহুলের :

    লেট ইওর পারফিউমড হ্যালো

    ফল ফর এ ফিউ সেকেন্ডস

    টু এনাবল মি ইন পিকিং আপ

    দি মেমরি অফ ইওর গ্ল্যান্সেস

    ইউ লেফ্ট ইন দি নোটস আই লেন্ট ইউ

    নট ফর নাথিং ! এট লিস্ট ইউ শুড

    এক্সচেঞ্জ এ কিস, ইভন ফ্লাইং উইল ডু।

    একজন তরুণীর, যে কিনা গোঁড়া সামস্ত পরিবারের, বৈভবশালিনী, তার চুমুতে যে মদের গন্ধ থাকতে পারে, তাও হুইস্কি নয়, সম্ভবত কানট্রি লিকার, অনুমান করতে পারেনি রাহুল। চুমুর অভিজ্ঞতার চেয়ে মদের গন্ধ-মাখা ঠোঁটের অভিজ্ঞতা রয়ে গেছে স্মৃতিতে।

    –কানট্রি লিকার ?

    –ইউ বুকিশ ফুল; ইট ইজ কলড কনিয়াক।

    –সত্যিই আমি শুনিনি আগে। হুইস্কি, রাম, ব্র্যানডি, ভোদকা, জিন, বিয়ার, এইগুলোই তো খেয়েছি। কানট্রি লিকার আর তাড়ি খেয়েছি ছোটোবেলা থেকে।

    –তাড়ি ? ইউ মিন টডি ? আই উড লাইক টু হ্যাভ ইট। কিন্তু তুমি যে বলেছিলে তুমি ক্যাথলিক কনভেন্টে

    প্রাইমারি স্তরে পড়েছিলে ?

    তাড়ির সঙ্গে কনভেন্ট স্কুলের বিরোধিতা কেন বুঝতে পারেনি রাহুল। বেথলেহেমে কি হুইস্কি, রাম, জিন, ব্র্যান্ডি, ভোদকা পাওয়া যেত ? কোন মদ খাওয়া হয়েছিল লাস্ট সাপারে ? ওয়াইন ? তখনকার দিনের ওয়াইন, বাড়িতে চোলাই করা। বেথলেহেমে কি আঙুর চাষ হতো ? কোথায় হয়েছিল লাস্ট সাপার ? বোকামি এড়াবার জন্য শিক্ষিত বোকামির আশ্রয় নিয়ে রাহুল বলল, আনব একদিন লুকিয়ে ক্লাসে, ওষুধের বোতলে ভরে, ফারমেন্ট হয়ে আরও কড়া হয়ে যেতে পারে, এলাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিও। কনিয়াকটা কী ?

    –তুমি জানো নিশ্চয়ই। তুমি তাকে কগন্যাক বলে জানো, আমার মনে হয়।

    কগন্যাক যে কনিয়াক তা ফাঁস হতে না দিয়ে রাহুল বললে, না, শুনিনি আগে। বন্ধুনিদের যেভাবে মিথ্যা কথা বলতে পারে, সেভাবে পুরুষ বন্ধুদের পারে না কেন, সমান্তরাল আত্মসমীক্ষায় ভেবে অবাক হল ও।

    –ফ্রান্সে ওই নামের জায়গায় এক বিশেষ ধরণের আঙুর থেকে হয়। তা থেকে তৈরি হয় ব্র্যান্ডি। ওই বিশেষত্বের জন্য সেই ব্র্যান্ডিকে বলা হয় কনিয়াক।

    –আমি খেজুর-রসের তাড়ি আনবো ; তুমি কনিয়াক খাইও।

    –বটলে একটু বেঁচে আছে। কালকে ক্লাসের পর দেবো। তোমার বই নিয়ে বেড়াবার সেই থলেটা এনো।

    বই কিনতে প্রচুর টাকার ব্যাপার। রাহুল সান্মানিক স্নাতক পড়ার সময় থেকেই পোস্টগ্র্যাজুয়েট লাইব্রেরি গিয়ে, বা অন্য সূত্রে বই এনে, পাঠ্য চ্যাপটারগুলো লিখে নিতো, একবার নয়, এক-একটা চ্যাপটার অনেকবার করে লিখে নিতো; তা করতে গিয়ে প্রায় মুখস্হ হয়ে যেত প্রতিটি বিষয়। বই নিয়ে বেড়াবার জন্য একটা পিঠ-ব্যাগ ছিল ওর।

    গঙ্গার পাড়ে রাণোদের গথিক স্হাপত্যের বিশাল হসটেলের পাশ দিয়ে বয়ে-যাওয়া গঙ্গার সুনসান ঘাটে বসে থাকা যায় বহুক্ষণ, একা, চুপচাপ, জলের দিকে তাকিয়ে, হয়তো বহু দূরে, বিঠুর দুর্গের ধ্বংসাবশেষের কাছে, টিমটিম করে ভেসে চলেছে পালতোলা নৌকো। বিঠুর দুর্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিজেদের সেনাকে জড়ো করেছিলেন নানা সাহেব,

    তাতিয়া তোপে, রানি লক্ষ্মীবাই ; তাই ইংরেজরা কামান দেগে উড়িয়ে দিয়েছিল দুর্গের প্রাসাদ আর বিঠুরের ঘাট।

    একাকীত্বের এই স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিবেশ নিজের কল্পনায় আরেকজনকে তুলে আনতে শেখায়, অন্যকে কল্পনা বিলোতে শেখায়, জলের মতন সবাইকে কল্পনায় ডুবিয়ে বা ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায় সমুদ্রের বিশাল একাকীত্বের দিকে, সুন্দরবনের মোহনায়, সুন্দরী গাছেদের আকাশমুখো শেকড়ের কিনার বরাবর বইতে-বইতে, বাঘেদের সাঁতারের আদর খেয়ে, হরিণ পরিবারের উড়ালের পাশ কাটিয়ে, জেলেদের নৌকোর ঘুম ভাঙিয়ে চলে যায় নিজের মনে।

    রাহুল গিয়েছিল, বাবার কিনে দেয়া সবুজ র‌্যালে সাইকেল চালিয়ে, মেয়েদের হসটেলে, ইশারামতন, সন্ধ্যায়, নির্দেশানুযায়ী সাইকেল ঘন্টির তিনটে ক্রিং ক্রিং ক্রিং।

    গঙ্গার ঘাটে, ডুবে যাওয়া সূর্যের অন্ধকারে রাণো বলেছিল, গায়ে হাত দেয়া চলবে না, কেবল ঠোঁটে ঠোঁট রেখেই তুলে নেবে ; কিপ অফ ইওর হ্যান্ডস, লিপস ওনলি। রাহুলের হাত দুটো আপনা থেকেই, ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে গিয়ে, ওর কোমর জড়িয়ে ধরেছিল। তারপর একটা চড় খেয়েছিল। চড়ের আঘাতের স্মৃতি গালেতে নেই, কেবল ঘটনাটা মনে আছে। চড় খেয়েও হাত সরায়নি। চড় মেরে চড়ের শব্দে ভয় পেয়ে গিয়েছিল রাণো, যদি কেউ শুনে ফ্যালে, জেনে ফ্যালে, তাহলে কেলেঙ্কারি— রা-স-টি-কে-শা-ন আর হি-উ-মি-লি-এ-শা-ন। রাহুলের আলিঙ্গন ওকে ভয় থেকে মুক্তি দিয়েছিল। ফিসফিস করে বলেছিল ‘ডোন্ট ক্লিং ডোন্ট ক্লিং ইউ ফিশ স্মেলিং ক্লিংগার’।

    ঠিকই, রাহুল তার পর থেকে কাউকে ক্লিং করে থাকেনি। যারা করেছে তারাই ওকে ক্লিং করেছে। গঙ্গা নদীও আর শহরটাকে ক্লিং করে নেই। শহরের বেড় ভেঙে বেরিয়ে চলে গেছে। চামড়ার কারখানাদের তেলচিটা নোংরায় ডুবে, সমুদ্রে স্নান করতে চলে গেছে গঙ্গা।

    সে-গঙ্গার পাড় আর নেই। বহু দূরে চলে গেছে গঙ্গা, শহরকে ঘেন্না করে, শহর থেকে দূরে। বালির চড়া পড়ে গেছে। পঞ্চাশ বছর পর গিয়েছিল রাহুল, ওর বয়স তখন কত, মমমমমমম, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায় । নিজের একাকীত্ব হারিয়ে ফেলেছে নদী। চড়ার ওপর প্লাস্টিক ব্যাগ, ঠাণ্ডা পানীয়ের বোতল, বিয়ারের টিন, পুজোর ফুল। জলও অত্যন্ত নোংরা। পা ডুবিয়ে বসার ইচ্ছা হবে না। পায়ের ছোঁয়া বয়ে নিয়ে যাবে না সুন্দরবনের সুন্দরী গাছেদের কাছে।

    শহরের ভেতর দিয়ে নদীটা যায়নি ; শহরই লোভে পড়ে নদীর পাড়ে এসে ঘাটি গেড়েছে, নদীটাকে খেতে আরম্ভ করেছে শহরগুলো, যেভাবে কেঁচোকে মাঝখান থেকে কুরে-কুরে খেয়ে ফ্যালে পিঁপড়েরা। মানুষের আদল নিয়ে লক্ষ লক্ষ

    পিঁপড়ের কাতার নোংরা করে চলেছে নদীকে, সে নদীর ঘোলা জল রাণোর প্রতিবিম্বখানা বুড়ি হবারও ঝিলমিল ধরে রাখার চরিত্র পায়নি। সে নদী আর নেই।

    রাণোর সঙ্গে প্রেমে পড়েনি রাহুল, রাণোও ওর সঙ্গে প্রেমে পড়েনি। চকিত-চুমু খাবার ইচ্ছেতে পড়েছিল,দুজনেই।

    –প্রথমবার ?

    –না, খেয়েছি আগে। আবার মিথ্যা কথা বলল রাহুল। চেপে গেল অঞ্জলি দাশের বাড়ির ঘটনাগুলো।

    –প্রেমিকা ?

    –না, বন্ধুর বোন, মাদুরের বেড়ার আড়ালে ফ্ল্যাশ কিস । তুমি ?

    –অনেকবার। আমার ভালো লাগে, এই চুমু খাওয়া। এক ধরণের ক্রেজি তৃপ্তি নিয়ে আসে যা পড়াশুনায় একাগ্র হবার জন্য জরুরি ; ও তুমি বুঝবে না। আমি তোমাদের থেকে আলাদা দেশ, সমাজ, শ্রেণি, পরিবার-পরিবেশের মানুষ।

    রাহুলের তো উল্টো, চুমুর ধান্দায় কদিন পড়াশোনায় মন বসেনি। আবার কবে আবার কবে আবার কবে সেই ফ্ল্যাশ কিসের সময় থেকেই ভুগেছে। রাণোর চুমু তাই জরুরি ছিল আগেরটা মুছে ফেলার জন্য। আবার কবে ভাবার দরকার নেই।

    অঞ্জলিকে তবু ঠোঁট থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

    স্কুলের সহপাঠী মোহন পালের বোনকে চুমু খেয়েছিল রাহুল, ওর বোন ঝুমা রাহুলের গালে একদিন দুপুরে টক করে ঠোঁট ঠেকিয়ে কলোনির বাইরে চলে গিয়েছিল। আচমকা। রাহুলের উচিত ছিল মোহনের বোনকে অনুসরণ করা। বোকা ছিল বলে বুঝতে পারেনি যে ওভাবেও সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করতে পারে কেউ। বই পড়ে-পড়ে চুমু বা ঠোঁটের আদরকে প্রেমের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার বোকামিতে ভুগত তখন রাহুল। তাই মোহনের বোনকে একা পেয়ে ওর ঠোঁটে চুমু খেয়েছিল, আর চাউনির রাগি ঝিলিক থেকে টের পেয়েছিল যে কাজটা ঠিক হয়নি।

    মোহনদের থাকার জায়গা ছিল ছোটো-ছোটো মাদুর-খুপরির ঘর। ওরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে রিফিউজি হয়ে এক

    কাপড়ে এসেছিল। ওদের মাকে যারা লুঠ করে মুখে কাপড় বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তখন তারা পাকিস্তানি বাঙালি

    ছিল, বাংলাদেশি বাঙালি হয়নি। মোহন পালের বাবা পাগল হয়ে গিয়েছিলেন ; আত্মহত্যা করে্ছিলেন। তারপর ওর বোন আত্মহত্যা করল, বাবা মারা যাবার দুঃখে। তারপর মোহন আত্মহত্যা করল, পৃথিবীতে ওর আর কেউ রইল না বলে। ও মরে যেতে রাহুল টের পেয়েছিল যে ও মোহনদের কেউ নয়। ওদের কল্পনাজগতে ওর ঠাঁই হয়নি কখনও। কী করে যে কারোর কল্পনার নিবাসীরূপে গ্রাহ্য হওয়া যায় তা ও আজও জানে না।

    ঝুমার শ্বাসের পান্তাভাতের বেদনাময় গন্ধ রয়ে গেছে স্মৃতিতে। কারোর আত্মহত্যার সংবাদ পড়লে বা শুনলে রাহুলের স্মৃতি পান্তাভাতের ঠাণ্ডা সুবাসে আক্রান্ত হয়। যেচে পাওয়া গোপন ক্ষত নিঃসঙ্গতায় হয়ে ওঠে দগদগে ; চুলে পাক ধরার সাথে-সাথে সেই অসহায়তার বোধ ক্রমশ ছুঁচোলো হয়ে বিঁধতে থাকে আজীবন।

    লিপিংমুহূর্ত শেষ হলে রাণো আচমকা বলে উঠেছিল, আর ইউ ট্রাইং টু বি এনাদার ট্যাগোর ?

    –ট্যাগোর ? না তো ; অমন মনে হচ্ছে কেন তোমার ? রাহুল নিজেকে শুনিয়ে নিঃশব্দে বলল, রবীন্দ্রনাথকে ওর কাছে নিয়ে এসেছিলেন সুমিতাদি, সুমিতা চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ও কারোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারে না, ইডিয়টিক মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ ওর স্মৃতিতে ব্যক্তিগত অঘটন। সুমিতাদি ব্রাহ্ম ছিলেন বলেই কি রাহুলের কাছে এনেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে, কেননা উনি যাঁদের বইপত্র পড়তে উৎসাহ দিতেন, পরে জানতে পেরেছে রাহুল, তাঁরা সকলেই ব্রাহ্ম। ব্রাহ্মদের দরকার ছিল একটি মাত্র ঈশ্বরের, যার দেখা চারটে বেদের কোনোটাতেই পাওয়া যায়নি, তাই যেতে হল উপনিষদে।

    পুজোর সময় কানপুরের কলকাতার দিল্লির জয়পুরের লখনউয়ের মুম্বাইয়ের প্যাণ্ডেলে ঘুরে-ঘুরে রাহুল খুঁজে ফিরেছে সুমিতাদির ঈশ্বরকে, যিনি লোপাট, উপনিষদের প্রভাবের সঙ্গেই লোপাট। তার জায়গায় ফিরে এসেছে বেদ আর পুরাণের নানা আকারের দেবী-দেবতা, যারা বছরের নির্ধারিত দিনে বা রাতে হইচইকারীদের কাঁধে চেপে দেখা দেন, যৎসামান্য অ্যাপিয়ারেন্স ফি নিয়ে। তারপর তাঁরা কেউ নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেন, আর কেউ আত্মহত্যা করে সেই গাছের তলায় পড়ে থাকেন।

    –ট্যাগোরের কম বয়সে তোমার মতন সরু গোঁফ ছিল।

    –যৌবনে ট্যাগোরের সরু গোঁফ ছিল নাকি ? জানি না তো। আমি তো যতগুলো ফোটো দেখেছি সবকটাই বুড়ো বয়সের। বিষাদে ঝুলে পড়া গোঁফ।

    –ছিল। সরু। তোমার মতনই পাকাতেন। তবে উনি কুস্তি লড়তেন বলে পাকাতেন, কুস্তি লড়ার আগে উরুতে চাপড় মারতেন কুস্তিগিরদের ঢঙে।

    –রবীন্দ্রনাথ গোঁফ পাকাতেন, শুনিনি কখনও, ফোটোও দেখিনি।

    –রবীন্দ্রনাথ গোঁফ পাকাতেন, হয়তো তখন উনি বিশের কোঠায়, তোমার মতন। নাঃ, তুমি তো এখনও টিন এজার, সীমা পেরোওনি। ছাত্রীদের বয়স ছাত্রদের চেয়ে বেশি হয়। বুকে চুল গজিয়েছে ?

    –না, গজাবে না হয়তো, বাবার নেই ; আমার বড়জ্যাঠার বড় মেয়ে, মানে, বড়দির অবশ্য পায়ের গোছেও লোম দেখা যায়, বোধহয় দাদুর ছিল।

    –তা না থাক, গোঁফ রেখো, আর পাকিও, বেশ ম্যানলি লাগে, আগেকার হলিউড নায়কদের মতন। যবে থেকে কিসিং সিনের বাড়বাড়ন্ত, তবে থেকে হলিউডের ফিলমে গোঁফ কামিয়ে ফেলছে নায়করা, ম্যানলিনেস দেখাবার জন্য গুলি চালাচ্ছে, ছুরিছোরা চালাচ্ছে, স্প্যাঘেটি ওয়েস্টার্নের ইডিয়সি।

    –সরু গোঁফ, রবীন্দ্রনাথ পাকাচ্ছেন, উরুতে চাপড় মারছেন, ছবিটা তো কল্পনা করাও বেশ আজগুবি। তুমি তো আমার চেয়ে বেশি জানো দেখছি। হলিউড ফিলম তো সপ্তাহে একবার আসে, দেখা হয় না। ওসব কিসিং-টিসিং রেগুলার দেখলে আমার পড়াশুনার বারোটা বেজে যাবে।

    –রবীন্দ্রনাথের ন্যাড়ামাথা ফোটো আছে আমাদের বাড়িতে।

    –রিয়্যালি ? ন্যাড়ামাথা রবীন্দ্রনাথ ? কেমন যেন অ্যাবসার্ড। ইমেজ বিগড়ে যায়। ন্যাড়ামাথা গায়ক দেখিনি যে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে।

    –উনি ছিলেন ব্রাহ্ম, কিন্তু ট্যাগোরের বাবা ওনার উপনয়ন করিয়েছিলেন, ব্রাহ্মণদের মতন। হাউ স্ট্রেঞ্জ। তারপরও ট্যাগোর নিজে ন্যাড়া হয়েছিলেন, ওনার বাবার শ্রাদ্ধের সময়ে, ব্রাহ্মণদের মতন। তখনও বোধহয় চতুর্বেদের আয়ত্বে ছিলেন, উপনিষদের জগতে প্রবেশ করেননি।

    –জানতুম না। তুমি বাড়ি গেলে আমাকে একটা ফোটোর কপি করিয়ে এনে দিও। নন-কনভেনশানাল

    রবীন্দ্রনাথকে টাঙিয়ে রাখব পড়ার ঘরে। রাহুল আত্মসংবরণ করল, নয়তো ব্রাহ্ম পরিবারের সুন্দরী সুমিতাদির কথা ফাঁস করে ফেলত ; কে জানে, সুমিতাদির প্রসঙ্গে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে রাণোর। পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য রাণোর নৈতিক সমর্থন জরুরি, মনে জোর পাওয়া যায়।

    –আমাদের বাড়ির ছেলে-মেয়েরা আগে সবাই কলকাতায় পড়তে যেত। কলকাতা থেকে আনা, বিদেশ থেকে

    আনা, বইয়ের লাইব্রেরি আছে নেপালের পোখরায়। ওনার মাথায় মেয়েদের মতন চুল আর গোঁফে তা দিচ্ছেন। অন্যটা বাবা মারা যাবার পর ন্যাড়া মাথায়।

    –গোঁফটা তাহলে কামিয়ে ফেলব।

    –এখন কামিও না। তাতে অযথা সময় নষ্ট হবে, প্রতিদিন বা একদিন অন্তর কামাতে হবে, আর তাতে সময় চলে যাবে ; পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার তো আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোও উচিত নয়। হংসকুমার যাদব আর শ্যামবিহারি শ্রীবাস্তব, দুজনেই তোমার চেয়ে ভালো ফলাফল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তাছাড়া ওদের জাতপাতের জোর আছে। তোমার তো কেউই নেই। তুমি তো বা-ঙ-গা-লি-কা-ন-ছা। গডফাদার নেই। আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা হয়ে কানপুর বিশ্ববিদ্যালয় হবার কথাবার্তা শুরু হয়েছে, তখন জাতপাতের খেলা আরও বেড়ে যাবে।

    –তুমি আছ, দি হিমালয়ান গডেস।

    –হা হা, গুড জোক। চুমুটা মনে রাখো, আর উঠে পড়ে লাগো। ওরা দিনে বারো থেকে সতেরো ঘন্টা পড়ছে বলে খবর। আমি তো হেসেখেলে বেরিয়েই যাবো, টোটাল নম্বর যতই হোক না কেন, বেরিয়ে গেলেই হল।

    অপেরা-সংলাপের চিরকুট ফেরত দিয়ে রাণো বলেছিল, নো নিড টু রাইট স্ক্রিবলার্স জাস্ট ফর এ কিস ; উই আর নট লাভার্স। রাহুল ভেবেছিল, আবার যদি নোটস চায়, তাহলে আরেকটা অপেরা-সংলাপ লিখবে, ‘লেট মি টাচ ইট’ নামে। তা আর লেখা হয়নি, নোটস চায়নি বলে। কিন্তু ওর উপদেশ কাজে দিয়েছিল। পড়াশুনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, অতি-একাগ্র। তা সত্ত্বেও প্রথম হতে পারেনি রাহুল ; দ্বিতীয় হয়েছিল। রেজাল্ট বেরোলে রাণো বলেছিল, ‘অ্যাজ ইউজুয়াল, একিলিস শুড নো হি হ্যাজ এ হিইইইল। ’

    রাণোকে, সাত-আট বছর বয়সের অভিজ্ঞতার কথা আরেকটু হলেই বলে ফেলেছিল রাহুল ; যে কিশোরী ওর

    যৌনতার উন্মেষ ঘটিয়েছিল, তহমিনা আপা, বা তহমিনা বানুর কথা। তহমিনা আলি শাহ। কখনও ওরা অবধের নবাব বংশের সদস্য ছিল। তবু, তহমিনা আপা বেশ কালো, আর দুই গালে টোল পড়ত, টোলের ভেতরে রোদের, প্রদীপের, লন্ঠনের, চাঁদের আলো ধরে রাখত, ঝিকমিক করত তেল না মেখেও তেল-চুকচুকে গাল।

    তহমিনা আপাদের বাড়িতে ডিম কিনতে পাঠাত মা, হাঁসের ডিম শুধু ওদের পোড়ো বাড়িতেই পাওয়া যেত, বাজারে পাওয়া যেত না । রাহুলদের বাড়িতে তখন মুরগির ডিম আর মুরগির মাংস ঢোকেনি। একদিন দুপুরে যখন আপাদের বাড়িতে কেউ ছিল না, উনি রাহুলের হাত ধরে একটা অন্ধকার ঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন, যে ঘরে ওদের হাঁস মুরগি ছাগল থাকত। খালি-গা রাহুলের হাফ প্যান্ট একটানে নামিয়ে দিয়ে নিজের চুড়িদারও নামিয়ে নিয়েছিলেন, আর তারপর জড়িয়ে ধরেছিলেন রাহুলকে। রাহুলের হাত নিয়ে নিজের কুঁচকির মাঝে চেপে ধরে নিজেই তাকে ব্যবহার করছিলেন ; তারপর রাহুলের যৌনাঙ্গ বাঁ হাতে নিয়ে খেলতে-খেলতে নিজের কুঁচকির ভেতরে ঘষা শুরু করেছিলেন। রাহুল জিগ্যেস করেছিল, এরকম করছেন কেন। আপা কোনো উত্তর না দিয়ে ঘামছিলেন, কেঁপে-কেঁপে উঠছিলেন। রাহুলের বেশ ভালো লেগেছিল খেলাটা। ডিম কেনার না থাকলেও, আরও কয়েকবার দুপুরে, যখন আপাদের বাড়ির সবাই কোনো কাজে বাইরে, গিয়েছিল রাহুল।

    দ্বিতীয়বার তহমিনা আপা কবজি ধরে জানোয়ার-ঘরের অন্ধকারে রাহুলের হাফপ্যান্ট টেনে নামাতেই রাহুল বলেছিল, আমাকে তাহলে মুরগির ডিম খাওয়াতে হবে, খাইনি কখনও ; স্কুলের বন্ধুরা বলে মুরগির মাংসও ভালো খেতে। তোমাদের রান্নাঘর থেকে মাঝে-মাঝে মাংস রাঁধার কত ভালো গন্ধ বেরোয়, মাংস খাওয়াতে হবে, নইলে আর আসব না।

    –তোর বাবা-মা যদি জানতে পারেন যে আমাদের বাড়িতে খেয়েছিস তাহলে তোকে আস্ত রাখবে না। গোবরজলে চান করাবে। ন্যাড়া করে টিকি রাখবে তোর।

    –তুমি আমার প্যান্টুল খুলে নাও জানতে পারলেও পিটুনি খাবো।

    –না না ককখনো বলিসনি কাউকে। আজকেই তোকে মাংস খাওয়াবো, অনেক ঝাল হয় কিন্তু।

    –আগে খাওয়াও।

    –তুই অপেক্ষা কর, এভাবেই দাঁড়িয়ে থাক, আমি এক্ষুনি আনছি।

    ছাগলদের খাবার দেবার সিমেন্টের ছোট্টো চৌবাচ্চার কিনারে বসে মাংস খাবার জন্য উৎসুক হয়ে বসেছিল রাহুল। ছাগলের বাচ্চাগুলো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বোধহয় জানতে চাইছিল কেন ও ওদেরই মতন পোশাকহীন।

    আপা অ্যালুমিনিয়ামের দোমড়ানো বাটি করে মাংস এনে রাহুলকে দিতে, রাহুল হাহ-হুহ করতে করতে খেয়ে নিয়েছিল ঝাল মাংস। আপা নিজের সবুজ চুন্নি দিয়ে পুঁছে দিয়েছিল রাহুলের হাত আর মুখ। বলেছিল, যাবার সময়ে রাস্তার মোড়ের কলে হাত আর মুখ ভালো করে ধুয়ে নিস ; মাংস খাবার গন্ধ মুখ থেকে বেরোলে আমিও বিপদে পড়ব। সেই প্রথম গোরুর মাংস খেয়েছিল রাহুল। আপার জড়িয়ে ধরার কাজ পুরো হয়ে গেলে নিজের জিভ দিয়েও পুঁছে দিয়েছিল রাহুলের ঠোঁট। রাহুল বলেছিল, তোমার গা কী গরম ; তুমি তো কুকুরদের মতন চেটে-চেটে পরিষ্কার করে দিলে। আপা বলেছিল, যখন বড়ো হবি তখন জানতে পারবি মানুষও নিজেদের এভাবেই পরিষ্কার করে।

    –বড়ো হবো না। বড়ো হলে তো তুমি আমার সঙ্গে আর খেলবে না, মাংস খাওয়াবে না।

    –তুই বড়ো হয়ে গেলেও খেলবো ; কিন্তু তুই তো আর খেলতে পারবি না। তোকে তখন আসতে দেবে না, আর আমার তো বিয়ে হয়ে যাবে। তুই হলি আমার নাজুক মজনু। তখন তো আর নাজুক থাকবি না ; নোংরা মরদ হয়ে যাবি, জাহিল হয়ে যাবি, কাফের, কুফ্র, কুফ্র, কুফ্র।

    শেষবার রাহুলের যৌনাঙ্গ নিয়ে আপা এত বেশি নিজেকে চেপে ধরছিলেন, বারবার, যে রাহুলের জ্বালা ধরে গিয়েছিল। ঠাকুমা সবাকসুন্দরী দেবীকে ছাড়া রাহুল কাউকে কখনও বলেনি জীবনের ওই ঘটনা, লজ্জা করেছে। রাণোকে বললেই বলত, তোমাকে রেপ করেছিল, মলেস্টেশান। বন্ধুদের বললেও নিশ্চয়ই ঠাট্টা করত যে ওকে রেপ করা হয়েছিল, ছি ছি।

    কানপুরের বাড়ি থেকে দেশের বাড়ি, শ্যাওড়াফুলিতে, ঠাকুমাকে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল রাহুলকে, ট্রেনে করে হাওড়া। ক্লাস নাইনের গণ্ডি সবে তখন পেরিয়েছে রাহুল। জীবনের ওই ঘটনা জানিয়ে নিজেকে হালকা করার এটাই সুযোগ ভেবে ঠাকুমাকে সব বলে ফেলেছিল। বলেনি ওর যৌনাঙ্গ ছড়ে যাওয়ার কথা, মাংস আর মুরগির ডিম খাওয়ার কথা। ঠাকুমা ট্রেনে বসে কেবল শুনেছিলেন, এমন মুখ করে যেন কিছুই হয়নি।

    রাহুলের কানপুর ফিরে যাবার দিন উনি বলেছিলেন, যা করেছিস তা আর কখনও কাউকে বলিসনে, আমাকে বলার বলেছিস ; অমন লুকোনো পিরিতের খেলা তো ব্যাটাছেলেরা করে। এখেনে তুই হয়ে গেলি মেয়ে, আর ছুঁড়িটা হয়ে গেল ছেলে। বুড়ো মিনসেরা আগেকার দিনে কচি মেয়েদের বিয়ে করে বেধবা করে সগগে চলে গেলে সেসব বেধবারা তাদের দেওর, ভাসুরের ছেলে-টেলেদের দিয়ে অমন পিরিতের খেলা খেলত, বুঝলি। কচি খোকাদের সঙ্গে অমন পিরিত করলে তো আর পোয়াতি হবে না, আশও মিটবে। তোকে দিয়ে মোচরমান ছুঁড়িটা আশ মিটিয়ে নিলে। জীবনে ওসব কথা আর মুখে আনবি না। সবাকসুন্দরী দিয়েছিলেন নির্বাক থাকার আদেশ। আজকে, লিখতে বসে, রাহুলের মনে হল, এই চাপটা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলি সবাইকে জানিয়ে দিয়ে।

    মুখে নয়, তহমিনা আপাকে, ঘুমের ভেতরে নিয়ে আসে রাহুল।

    চোখ বুজলে রাহুল তহমিনা আপার ডিমপল অব ভিনাসও স্পষ্ট দেখতে পায়। ডিমপল অব ভিনাস, যা পাছার ওপরের বাঁকে থাকে কারোর কারোর, গ্রিক দেবীর মতন। সে-সময়ে যে খেলা খেলবার মতন শরীর ওর ছিল না বলে খেলতে পারেনি তা যৌবনে কতবার স্বপ্নের ভেতরে খেলেছে রাহুল।

    পঞ্চাশ বছর পর, রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমমম, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, ওই পাড়ায় গিয়ে তহমিনা আপাদের পোড়ো বাড়ির জায়গায় দেখেছিল পাকা বাড়ি উঠেছে। ফ্ল্যাটবাড়ি। কয়েকজন মহিলা বাড়ির ভেতর থেকে বোরখা পরে বেরিয়ে কোথাও গেল। আপার ভাই নাজিমের নাম করে পাড়ায় খোঁজ নিয়ে জেনেছিল যে ওদের পরিবারের কেউ আর থাকে না শহরে। তহমিনা আপা বিয়ে হয়ে দুবাই চলে গেছে। আপার ভাইও চলে গেছে কোনো আরব দেশে।

    একসময় ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল যাতে আপার সংস্রব থেকে দূরে থাকা যায়, যাতে আর কেটে-ছড়ে না যায় কুঁচকির কাছে। পঞ্চাশ বছর পর আবার কেন দেখার ইচ্ছে হল। বুড়ি আপা প্রৌঢ় রাহুলকে দেখে কী বলতেন ? মনে করতেন কি ওনার সেই ঘেমো উত্তেজিত দুপুরগুলো ? “কাফের কহিঁকা, জাহিল কহিঁকা, বদজাত কহিঁকা, দিখা তেরা

    মজনুকা দুম। ”

    পাড়ায় এত চেঁচামেচি হতো যা পড়াশুনায় যাতে ব্যাঘাত না হয় তাই পড়ার সময় রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনত রাহুল ; সুমিতাদির দেয়া ছোঁয়াচে রোগ। স্কুলের পর থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত। এমনই বদভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে এই বার্ধক্যে পৌঁছে কিছুদিন আগে পর্যন্ত সংবাদপত্র পড়ার সময়ে কোনো মৃদু সঙ্গীতের অভাব বোধ করত ও, তাই কেবল-টিভির কোনো গানের চ্যানেল বা এফ এম রেডিও চালিয়ে বই-পত্রিকা পড়ে। সংবাদপত্র আর পড়ে না, ভালো লাগে না অন্যের

    ক্ষতগুলো নিজের চামড়ায় তুলে এনে ভুগতে। নিজেরই কত গোপন ক্ষত রয়ে গেছে যা কখনও সারবে বলে মনে হয় না।

    বাইরের জগত আর নিজের জগতের মাঝে রবীন্দ্রসঙ্গীত আড়ালের কাজ করত, পাঁচিলের। গানের প্রতি আগ্রহ ছিল না ; গানের আবহ দিয়ে বইয়ের জটিল তত্বগুলোকে আয়ত্ব করার উপায় বের করে ফেলেছিল। কী গান, কী কথা, কার গাওয়া, তা নিয়ে ও চিন্তা করেনি। লঙ প্লেইং রেকর্ড কলের গানে চাপিয়ে মন দিত পড়ায়। রাহুলের মা জানতেন ; গান থেমে গেলে রেকর্ডের উল্টোপিঠে বা ওই পিঠেই আবার বা অন্য রেকর্ডে পিন বসিয়ে দিতেন। রবীন্দ্রনাথকে এভাবেই ব্যবহার করেছে রাহুল, চিরকাল। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে ও, রাহুল। ওনার প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস পড়েছে বাইরের জগতের সঙ্গে আড়াল তোলার কাজে লাগাবার জন্য।

    রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বন্ধুদের আলোচনা শুরু হলে, ও চুপ করে থেকেছে, বা ওনার গোঁফ, নখ কাটা, কোন সাবান মাখতেন, কখন চুল আঁচড়াতেন, মাঝখানের সিঁথে কাটা কবে ব্যাকব্রাশ হল, কবে নাগাদ পৈতে ফেলে দিয়েছিলেন, পৈতে হবার পর ন্যাড়া মাথায় কি দাদারা চাঁটি মারতেন, বাবা মারা যাবার পর চুল-দাড়ি কামিয়ে ন্যাড়া হয়েছিলেন তার ফোটো কোথায় পাওয়া যাবে, কোন হুইস্কি খেতে পছন্দ করতেন, ইত্যাদি নিয়ে উৎসাহ দেখিয়েছে।

    স্নাতকোত্তরের পর রাণোর সঙ্গে আর দেখা হয়নি, ন্যাড়া-মাথা রবীন্দ্রনাথকে তাই পায়নি ও, রাহুল।

    বলেছিল রাণো কখনও একবার, ওর পূর্বপুরুষ হলেন জং বাহাদুর কুঁঅর। কিন্তু বলেনি যে সেই জং বাহাদুর লোকটির ষড়যন্ত্রের ফলে রাজ দরবারের ছত্রিশ জন লোক খুন হয়েছিল, আর প্রধান মন্ত্রীকে খুন করে সিংহাসন দখল করে রেখেছিল তার বংশধর, মানে, রাণোর পূর্বপুরুষ। রাণোর শিরায় সেই লোকটার রক্ত, ভাবা যায়, সেই রক্তের চুমু ওর ঠোঁটের স্মৃতিতে ! তার শেষ বংশধর পালিয়ে এসেছিল , ফিল্ড মার্শাল মোহন শমশের জং বাহাদুর রাণা নেপালের রাজাকে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছিল ভারতে। সে রাজার ছেলে রাজা হল, খুন হল, তার ভাই রাজা হল, উৎখাত হয়ে দেশ ছেড়ে পালালো।

    রাণো কি এখন বুড়ি ? আশি বছরের বুড়ি !

    রাহুল বলেছিল, জানি, তোমাদের নামের আগে তিনটে শ্রী বসানো হয় আর নতুন রাজার নামের আগে পাঁচটা। আমি আমার নামের ডগায় একটাও শ্রী জুড়তে দেবো না, কারণ আমি কাউকে তো খুন করিনি। এও জানি যে তোমাদের বংশে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি, সেই খুন হয়ে-যাওয়া প্রধান মন্ত্রীর স্ত্রীর অভিশাপে। কারেক্ট ?

    –হানড্রেড পার্সেন্ট। তবে, ভেবে দ্যাখো, রয়াল ব্লাডের চুমু পেলে। ওয়ান্স ইন এ লাইফটাইম অভিজ্ঞতা। রক্ত দূষিত হয়ে গিয়ে থাকবে তোমার, যতই হ্যারল্ড ল্যাসকি, বুকানিন, প্রুধঁ আর মার্কস পড়ো।

    –আর তুমি প্লেবিয়ান। তফাত এই যে তুমি এই অভিজ্ঞতা রিপিট করার অজস্র সুযোগ পাবে।

    –তা পাবো ; সেরকম সুযোগ পেলে নেবোও। নেপালে বা ইনডিয়ায় থাকতে চাই না ; বিদেশে চলে যেতে চাই।

    রাণোর বাঁ গালে টোলের জন্য আকৃষ্ট হয়েছিল রাহুল। যে তরুণীদের গালে টোল পড়ে তারা ওকে আকৃষ্ট করেছে, সুশ্রী না হলেও। বাংলা গল্প-উপন্যাস-কবিতা পড়তে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন যিনি, স্কুলের সেই উঁচু ক্লাসের ছাত্রী, ধনী ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়ে সুমিতাদিরও দুই গালে টোল পড়ত। সুমিতাদির গালে যদি টোল না থাকত তাহলে কি সিরিয়াস বই পড়ার, আর লেখালিখির প্রতি আগ্রহ হতো ওর? সুমিতাদি যে মন্দিরে গান গাইতে যেতেন, ব্রাহ্মমন্দির, তা এখন বিরাট একটা শপিং মল। নিজেকে বলতেন ব্রাহ্ম-বাঙাল-বামপন্হী-বামা।

    –তোমার কাছে এসে তাই সবাই ব্যা-ব্যা-ব্যা-ব্যা করে।

    –চুপ। কানমুলে ম্যা-ম্যা-ম্যা-ম্যা করাবো।

    রাহুলের স্ত্রী, বুড়ি হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও টোল পড়ে। অনেকে সাক্ষাৎকার নিতে এসে যখন প্রশ্ন করে, কোথা থেকে প্রেরণা পেলেন, তখন বলা উচিত যে তরুণীদের গালে টোল পড়া থেকে প্রেরণা পেয়েছি। সাইক্লোনের চোখের মতো ওই টোলগুলো, পাকিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যেতে চায়, তছনছ করে দিয়ে চলে যেতে চায়, আবার প্রথম থেকে জীবন শুরু করে পরের ঘুর্ণিঝড়ের অপেক্ষায়। গালের টোলের কোনো ধর্ম, সম্প্রদায়, ভাষা, দেশ, জাতি হয় কি ?

    কলেজে ঢোকার পর, সুমিতাদি রাহুলকে পথে দেখতে পেয়ে, বেবি অস্টিন গাড়ি থামিয়ে, ওনার বাড়িতে নিয়ে

    গিয়েছিলেন । রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমমম, বোধহয় মমমমম, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। তারপর ওনার গালের টোলের আলোয় শোনালেন ওনার প্রেমিকের বিপ্লবগাথা ; সে পুং-বিপ্লবী নাকি তখন কোথাও লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। ওনার প্রেমিক যে কে তা রাহুল তখন পর্যন্ত জানতে পারেনি, সুমিতাদির কাছে তার ফোটোও নেই।

    সুমিতাদির বাড়ি কয়েকদিন যাবার পর উনি ওনার বিপ্লবের স্বপ্নে টানতে চাইলেন রাহুলকে, সোভিয়েট রাষ্ট্রে

    প্রকাশিত অদ্ভুতগন্ধী বই পড়তে দিয়ে। ক্রমে, লোকমুখে জেনেছিল, বিপ্লবের স্বপ্নটা ওনারই, এবং উনিই তাতে টেনে এনেছিলেন ওনার বর নামের অদৃশ্য লোকটিকে, যাকে রাহুল কখনও দেখার সুযোগ পায়নি । রাহুলের বয়সী আরও ছেলে-মেয়ে আসত, যাদের এড়িয়ে যেত রাহুল, তারাও ওনার বিপ্লবী প্রেমিককে দ্যাখেনি কখনও ; সে যাকগে, ওর, রাহুলের, আগ্রহ তো সুমিতাদি। ওনার দেয়া বইগুলো রাহুল বাড়ি এনে পড়ত, বিভ্রান্ত হতো, কিন্তু গালের টোলের আলোর আকর্ষণে আবার গিয়ে আবার বই আনত, আরও বেশি করে বিভ্রান্ত হবার জন্য।

    বিপ্লব ? রাহুলের বড়-জ্যাঠামশায় একবার বলেছিলেন, যে-মেয়েরা বাপের অবাধ্য হয় তারা, আর যে-ছেলেরা মায়ের অবাধ্য হয় তারা, বড় হয়ে বিপ্লবী হয়।

    রাহুল আর অনিকেত দু’জনেই তো কখনও বাবার আর কখনও মায়ের অবাধ্য হয়েছে। ওরা তাহলে কী ?

    কয়েকটা মোটা বই দিয়ে সুমিতাদি একবার বললেন, স্কুলে তুমি একবার একটি মেয়ের জন্য মারামারি করেছিলে, মনে আছে ? আমি তো কল্পনাও করতে পারি না তুমি মারামারি করছ, অ্যান্ড ফর এ গার্ল। এরকম ডেলিকেট চেহারা তোমার, যে মারামারি খাপ খায় না, অন্তর্মুখি তরুণ, সে কিনা মারামারি করছে। আর মারামারি করেছ কোনও মেয়ের জন্য ? কোনও যুবতী এসেছে জীবনে ?

    মারামারি করেনি রাহুল, করে ফেলেছিল, অঞ্জলি দাশ নামে একজন সহপাঠিনীর ওসকানিতে। অঞ্জলি বলেছিল, কেমন মরদ রে তুই, তোর সামনেই আমাকে টিটকিরি মারছে আর তুই রেসপণ্ড করছিস না। ইন্সট্রুমেন্ট বক্স থেকে কমপাস বের করে এগিয়ে গিয়েছিল রাহুল। তার জন্য স্কুলের অফিসরুমে, কেরানিবাবুর নির্বিকার চাউনির সামনে, ওকে সারাদিন একঠায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল।

    অঞ্জলি অপেক্ষা করেছিল ওর শাস্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত। তারপর নিয়ে গিয়েছিল ওদের বাড়ি। বিশাল তিনতলা বাড়ি, প্রতি বছর হলুদ চুনকাম করানো হয়। থাকেন ওর মা আর ও, ব্যাস আর কেউ নেই। অত বড় বাড়ি রাখার কী দরকার জানতে চাইলে অঞ্জলি বলেছিল, বা রে, আমার দাদুর বাড়ি, বড় হলেই বা। রাহুলের মনে হয়েছিল

    যে অমন বৈভবশালী পরিবারের মেয়ে জানা থাকলে হয়ত মারামারি করত না ও। মারামারিটা তার মানে রাহুল নিজের জন্যই করেছিল, মারামারির জন্য মারামারি, উদ্দেশ্যহীন।

    সুমিতাদি কি তা বুঝবেন ? বুঝবেন নিশ্চয়ই। কেন কিছু তরুণ সব ছেড়ে-ছুড়ে বিপ্লবী দলে নাম লেখায়, ওনার অদৃশ্য প্রেমিকের মতন !

    –না, কোনো যুবতীর জন্য করিনি। পুলিশের সঙ্গে করেছিলুম, ছাত্র আন্দোলনের সময়ে, সেই যেবার নেহেরু এসে কানপুর-ময়দানে লেকচার দিয়ে গিয়েছিলেন, অথচ আমাদের কলেজে আসা দরকার মনে করলেন না। পুলিশের গুলিতে একজন সহপাঠী মারা গিয়েছিল।

    –জানি, কাগজে পড়েছিলাম, বলেছিলেন সুমিতাদি।

    অঞ্জলি কোনো জিনিস ছুঁতে দেয়নি ওদের বাড়িতে। সোফার পাশের টেবিলে এমিলি ডিকিনসনের একটা বই ছিল, রাহুল হাতে তুলে নেবার আগেই চেঁচিয়ে উঠেছিল অঞ্জলি, ছুঁসনি, ছুঁসনি, বাবা যে জিনিস যেখানে যেমন রেখে গেছে তা সেরকমই থাকবে।

    মানে ? কখন ফিরবেন তোর বাবা ?

    বাবা তো আমার যখন এক বছর বয়স তখনই মারা গিয়েছিলেন।

    অঞ্জলির মা বললেন, হ্যাঁ বাবা, আমি কাউকে কোনো জিনিসে হাত দিতে দিইনি। ঝি-চাকররা ঝাড়পোঁছ করে যেখানকার যা সেখানেই রেখে দ্যায়।

    রাহুল অঞ্জলিকে বলেছিল, তোর বাবা তোর গালে টোল দিয়ে যাননি কেন জানিস ? ছোঁয়া বারণ বলে।

    অঞ্জলি যা করল তা রাহুলের জীবনে প্রথম ক্লিংগিং, স্বতঃস্ফূর্ত, সংক্রামক। বলল, জিনিস, বুঝলি, ইডিয়ট, জিনিস, যাতে প্রাণ নেই, গাড়ল, আমি তো আর জিনিস নয়, আমি রক্তমাংস দিয়ে গড়া, শোঁক, আমার নিঃশ্বাস শোঁক।

    রাহুলও রক্তমাংস দিয়ে গড়া প্রমাণ করবার জন্য জড়িয়ে নিয়ে কার্পেটের ওপর শুয়ে পড়ল। মেয়েদের নিঃশ্বাস কী দিয়ে

    গড়া ? বরফের মরুভূমি দিয়ে হয়তো। জামাকাপড়, আকর্ষণের অংশটুকুতে নিজেদের মেলে ধরার খাতিরে যতটুকু, খুলে ফেলল, একজন আরেকজনের। দুজনেই একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হল আর, এতদিন পর রাহুলের মনে হয়, তা ছিল প্রথম প্রেম, উন্মাদ, মোহময়, নেশার মতন।

    স্কুলের পর,অঞ্জলির ঘরের ইরানি কার্পেটের ওপর শ্বাস-প্রশ্বাসের ঝড়, আর ওর মা বাড়িতে না থাকলে স্নানঘরে,

    শাওয়ার চালিয়ে। অঞ্জলির ঘরে গিয়ে বিছানায়। অন্ধকারে বা আলো জ্বেলে। হাফছুটির দুপুরে বা স্কুল শেষের সন্ধ্যায়। নারী শরীরের গোপন রহস্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে রাহুল, যা তহমিনা আপা স্পষ্ট করে মেলে ধরেননি, বা যা বুঝতে পারার মতন প্রতিক্রিয়া তখনও গড়ে ওঠার বয়স হয়নি সেসময়।

    পরস্পরের গোপন নাম হয়ে গিয়েছিল ক্লিংগার। আকর্ষণের নাম অঞ্জলি দিয়েছিল পাশাখেলা। পাশাখেলার সময়ে দ্রৌপদীর শাড়ি খুলে ফেলতে চেয়েছিল কৌরবরা আর দ্রৌপদীর তখন মাসিক, যোনিতে কানি বাঁধা।

    মনে রাখবি, শরীরের কিছু এলাকা ছোঁয়া চলবে না।

    নিষেধ ! এটাই বোধহয় আকর্ষণবোধের সূত্র ! ছোঁবো বললেই হয় না, রাহুলের তো সাহস চাই। ও তো ডরপোক।

    একদিন অঞ্জলি স্কুলে আসেনি বলে ফেরার পথে খোঁজ নিতে গিয়ে ওদের বাড়ির কেয়ারটেকারের কাছে রাহুল শুনল, অঞ্জলিকে নিয়ে ওর মা চলে গেছেন পণ্ডিচেরিতে। রাহুল তো জানতো ওরা বৈষ্ণব ; তারাও যায় নাকি অরবিন্দ আশ্রমে ? বৈষ্ণব !

    সুমিতাদি ব্রা্হ্ম। অঞ্জলিরা বৈষ্ণব। তহমিনা আপা শিয়া মুসলমান। আইরিশ নানরা ক্যাথলিক খ্রিস্টান। আকর্ষণের বনেদ তো একই। জাস্ট আকর্ষণ। তার কোনো কার্যকারণ ছিল না। নাকি অভিকর্ষ ? হয়তো বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ থাকতে পারে, যেভাবে নিউটনের আপেলকে টেনেছিল অভিকর্ষ। সে অভিকর্ষ কি নিউটনের নিজস্ব ছিল না ? কেননা আপেল তো তার আগে থেকেই পড়ত। পৃথিবীর অভিকর্ষ তো ছিল, কিন্তু নিউটন নিজের অভিকর্ষ আবিষ্কার করলেন।

    রাহুলও নিজের অভিকর্ষ আবিষ্কার করে, আর অবাক হয়। আপেলকে চায় পৃথিবী, পৃথিবীকে চায় সূর্য, সূর্যকে চায় আগুন, আগুনকে চায় মহাশূন্য। জাস্ট চায়। একজন আরেকজনকে চায়, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই।

    তোকে আবার কে চিঠি দিল, বলে একটা খাম রাহুলের হাতে দিয়েছিলেন রাহুলের মা, ‘দেখিস, আবার প্রেম-ট্রেম করিসনি যেন, করার হলে পরীক্ষার পর করিস’, কথা কটা বলে।

    ডাকে অঞ্জলির চিঠি, নীল রঙের কাগজে লেখা, আঁকাবাঁকা হাতের লেখায়, পেয়ে, রাহুল জানতে পারল যে ওদের কর্মকাণ্ড দেখে ফেলেছিলেন অঞ্জলির মা। অঞ্জলির সঙ্গে তর্কবিতর্ক ক্রমে ঝগড়ার চেহারা নিয়ে ফেলতে, উনি সেদিন সন্ধ্যাতেই ট্রেনের প্রথম শ্রেণির টিকিট কেটে রওনা দিলেন হাওড়া। অঞ্জলি লেখেওছে, প্রথম শ্রেণি, যে শ্রেণিতে রাহুল চাপেনি কখনও। ঠাকুমাকে নিয়ে বা মা-বাবার সঙ্গে দেশের বাড়িতে গেলেও রাহুলকে থার্ড ক্লাসে চেপে যেতে হয়েছে।

    নিজের কাঁধ, বাহু, শুঁকলেও অঞ্জলির গায়ের কোমল গন্ধ পায় রাহুল। ওদের বাড়ির রাস্তা দিয়ে গেলে গাছের পাতারা হাওয়াকে বলতে থাকে এখানে হাত দেয়া নিষেধ, ওখানে মুখ দেয়া নিষেধ।

    চিঠিটা রাখেনি ; চায়ের ঠেকে বসে, পড়ে, চায়ের দোকানের উনোনে ফেলে দিয়েছিল ছিঁড়ে, কুটিকুটি। চিঠি জুড়ে তেতাল্লিশবার লিখেছিল “ভালোবাসি তোকে”, বারো বার লিখেছিল “তোকে ছাড়া বাঁচব না”, আর কুড়ি বার লিখেছিল “তোর জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করব”।

    রাসবেহারির ফ্যাঁকড়া গলিতে, এক মহিলা কবি-অধ্যাপকের বাড়ি গিয়েছিল রাহুল, এমনিই, হাটতে-হাঁটতে, হঠাৎ দেখা করার ইচ্ছা হল, তাই ; কখনও সামনা-সামনি পরিচয় হয়নি। রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমম, বোধহয় তেইশ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। উনি নিচের তলায় বসিয়ে রাখলেন বেশ কিছুক্ষণ, তারপর খবর পাঠালেন, অসুস্হ, শুয়ে আছেন, রাহুল দেখা করতে পারে, তবে অবিরাম কথা বলা যাবে না।

    আমাকে সবাই এত ভয় পায় কেন, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে ভাবছিল রাহুল। সিঁড়ির দেয়ালে ওনার বিখ্যাত বাবা-মায়ের সেপিয়া ফোটো। গিয়ে দেখল, কবি-অধ্যাপক শুয়ে আছেন। ওঃ, ভয় নয়, একটু মেক-আপ করার সময় নিয়েছেন। অসুস্হ হলেও পাটভাঙা তাঁতের শাড়িতে, কপালে টিপ, যৎসামান্য পাউডার বোলানো গাল। টিপ দেখে

    ভালো লাগল। রোগিদের টিপ পরলে কত সুন্দর দেখায়, হাসপাতালগুলোয় অমন ব্যবস্হা থাকলে ভালো হতো।

    পরিবেশ পালটে যায়। পরে, একবার ও, মানব রায়, ভবদেব মিত্র আর ভবদেবের বন্ধুনি রোশনি, কয়েক প্যাকেট টিপ কিনে আর জি কর, এস এস কে এম, মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে নার্সদের অনুরোধ করে রোগিনীদের মেরুন টিপ বিলি করেছিল। প্রায় সব রোগিনী পরে নিয়েছিল টিপ, হাসি ফুটেছিল আত্মীয়দের মুখে। নিউজপ্রিন্টের কালোবাজারি এক ট্যাবলয়েডের সাংবাদিক ঘটনাটা জানতে পেরে টিপ বিলোনোকেও ওদের আন্দোলনের কর্মকাণ্ডের

    অন্তর্ভুক্ত করে রসগদ্য লিখেছিল।

    অগ্রজ মহিলা কবির কোনো অপেরা-সংলাপ মনে নেই রাহুলের, অপেরা বইয়ের নামও মনে নেই, কিন্তু ওনার চুমু-ডাক ফিকে-লাল ঠোঁট, আর টিপ-পরা সরু কপাল মনে আছে।

    মহিলা কবির বাড়ি থেকে বেরিয়ে, কতদিন পর, গড়িয়াহাটের মোড়ে, আচমকাই অঞ্জলির সঙ্গে দেখা, স্লিভলেস লাল ব্লাউজে, কাঁথা-স্টিচ শাড়িতে, সোনালি রিস্ট ওয়াচ, কানে হিরের ফুল ঝিকমিক।

    সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড এক পলকের জন্য থেমে গেল, আর রক্ত চলকে উঠে এলো রাহুলের শিরা-উপশিরা বেয়ে, দ্রুত, নিঃশব্দ আওয়াজ তুলে। রাহুলের মুখ থেকে আপনা থেকেই, এত বছরের সময়ের দূরত্বকে ঝটিতি মুছে ফেলে, এই গরমশ্বাস কথাগুলো বেরোল, যা শুনে নিজেই অপ্রস্তুত বোধ করল ও, ‘কি রে ? ক্লিংগার? এখানে ? কলকাতায় থাকিস?’

    অঞ্জলি বলল, এখন আমি ক্লিংগার নই, ক্লাইম্বার। চিনতে পেরেছিস দেখছি। আঁচ করেছিলাম, নির্ঘাত এড়িয়ে যাবি, চোখ থেকে চোখ সরাচ্ছিস না দেখে বুঝতে পারলাম এখনও বাসি রহস্যে বাঁধা আছিস। কিন্তু তুই কি করছিস কলকাতায় ? তুই তো কানপুরের জুহি পরমপুরওয়া পাড়া ছেড়ে অশোকনগরের বাড়িতেই আছিস বলে শুনেছি ; সব খবর রাখি।

    হ্যাঁ, বলল রাহুল, ফিসফিস করে, মাই গড, তোর গালে টোল পড়ছে। পারফিউম থেকেই তো বুঝতে পারছি, তুই কোথাও ক্লাইম্ব করে উঠে পড়েছিস, করকরে নোটের জগতে, আর আমি পচা-ছাতাপড়া নোটের আড়তে। অরবিন্দ আশ্রম থেকে এই মায়াবাজারে ? একটু থেমে, প্রাক-তারুণ্যের প্রাচীন ব্যর্থতাবোধ আর মনখারাপের ধুলোপড়া স্মৃতিকে সরিয়ে, হৃৎপিণ্ডকে গলা থেকে আবার বুকের ভেতরে নামিয়ে, রাহুল বলল, তোর হাত ধরব ? আমার কবজির শিরার আওয়াজ তোকে দেখেই যে লাফিয়ে উঠল তা ফিল করতে পারবি। সিঁদুর নোয়া-টোয়া বা হুকড-অফ চিহ্ণ তো দেখছি না। ধরব ? তোর ত্বক আরও মসৃণ হয়ে গেছে।

    অঞ্জলি রাহুলের কবজি আঁকড়ে চাপা গলায় বলল, চল, তোকে আমার টেমপোরারি আস্তানায় নিয়ে যাই, কাছেই, যাদবপুরে। আমার বর, ওই যার সঙ্গে ঘর করি আরকি, সে একজন স্মাগলার। রাহুলের উদ্বিগ্ন অবিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে যোগ করল, সত্যি রে। ও এখন বাইরে কাজে গেছে। কাছাড় শুনেছিস ? সিলেটি।

    স্মাগলার শব্দটা শোনামাত্র রাহুলের ভীতিময় আত্মদন্দ্ব ওকে গা-বাঁচিয়ে পরিস্হিতি যাচাই করতে নির্দেশ দিল।

    প্রসঙ্গের বাঁকবদল ঘটিয়ে রাহুল বলল, সিলেট ? শ্রীহট্ট ? ও তো পাকিস্তানে। সিলেটিদের তো বাঙালরাও স্বীকৃতি

    দ্যায় না, কালচারাল ডিফারেনসেসের জন্য। শুনেছি সিলেটিরাই একমাত্র পিওর ব্রিড বাঙালি। পেডিগ্রি বজায় আছে আজও, দেশভাগের এই কয়েক বছর পরও।

    কাছাড়ে ওদের বাঙাল বলে না ; সেখানকার মুসলমানদের হিন্দু সিলেটিরা বলে বাঙাল। সিলেটিরা সিলেটিই, পেডিগ্রি ছাড়তে চায় না। মাটিতে পুঁটি মাছ পুঁতে রেখে বহুকাল পর তারিয়ে-তারিয়ে খায়। বিয়ে-টিয়ের রীতি-রেওয়াজ একেবারে আলাদা, বেশ ইনটারেসটিং। পাকিস্তানে ওরা সিলেটিদের বলে আবুইদ্যা, কে জানে তার কী মানে।

    –চল, তার আগে কোথাও খেয়ে নিই। সকালে ট্রেনি হসটেলে কেবল ব্রেড-বাটার-কলা খেয়ে বেরিয়েছিলুম।

    –আমার বাসাতেই চল না, ভাত-টাত রাঁধাই আছে। যা আছে দুজনে খেয়ে নেব। তোর কথা শুনতে পাই এর-তার মুখে। কী সব আন্দোলন-টান্দোলন করছিস। চল, শুনবো। কলকাতায় কেন ? পোস্টেড ?

    –না, ট্রেনিঙে পাঠিয়েছে অফিস। এর-তার ? হু আর দে ?

    –তোদেরই জ্ঞাতি-গুষ্টি, যারা তোদের হিংসে করে। অপেরা লিখিস বলেও হিংসে করে। বোধহয় তোর অপেরার মাংসময় ডিভিনিটিকে হিংসে করে। কিসের ট্রেনিং রে ? তোর আবার ট্রেনিঙের দরকার আছে নাকি !

    –নোট পোড়াবার ট্রেনিঙ। আশ্চর্য লাগছে ? যে শোনে সে-ই অবাক হয়।

    –টাকা পোড়াবার ? তার ট্রেনিঙের কী দরকার ? এক জায়গায় জড়ো করে পেটরল ঢালো আর আগুন ধরিয়ে

    দাও।

    –প্রতিটি নোট পোড়াবার হিসেব রাখতে হয়। পচা-গলা-ছাতাপড়ে সবুজ হয়ে-যাওয়া নোটগুলো শেষ পর্যন্ত কী হয় ভেবে দেখেছিস কখনও ?

    –না ভাবিনি। ডেসট্রয় করা হয় জানতাম।

    –নোটের পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে চাকরি করি। প্রায় পনেরো ফিট উঁচু-উঁচু পচা নোটের পাহাড়। তা থেকে

    র‌্যানডাম স্যামপ্লিং করে, গুণে, তার পর বস্তায় ভরে, চুল্লিতে পোড়াতে নিয়ে যেতে হয়। বিটকেল গন্ধ, প্রথম দিকে জ্বর হতো, নাক দিয়ে জল পড়ত, গলা বন্ধ থাকতো মাঝে-মাঝে, এখন সব সয়ে গেছে।

    –হ্যাঁ, সব সয়ে যায়, সব সয়ে যায়।

    –জ্ঞাতিগুষ্টির কথা বলছিলিস, তারা কারা ?

    –কলকাতার, কানপুরের, গঙ্গার এপার-ওপারের। তোদের গুষ্টিটাই হিংসুটে।

    –এটা শুনতে আমার বেশ ভালো লাগে, এই যে কেউ-কেউ আমাকে হিংসে করে ; কেমন এক ধরণের স্ট্রেঞ্জ রাসায়নিক আরাম পাই। মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক ট্রাইবাল যুগে ফিরে গেছি।

    –তা না হলে আর মানব বলেছে কেন ! মানুষ তো বেসিকালি ক্যানিবাল।

    –আমি তো তোর ব্যাপারটা শুনতে চাই। তোর মা কোথায় ? স্মাগলার বলে অবজেকশান নেননি, সত্যিই যদি সে স্মাগলার হয় ? আমি তো বেটার অপশান ছিলুম। স্মাগলর শব্দটা ব্যবহার না করতে চাইলেও, তক্ষুনি প্রতিশব্দ না পাওয়ায়, প্রয়োগ করতে হল ওকে।

    তখন ছিলিস না ; তখন ছিলিস স্কুল কিড, নাইভ, ইররেসপনসিবল, কী করে কী করতে হয় তাই জানতিস না, ভুলে যাচ্ছিস কেন, থেমে-থেমে কথাগুলো বলে, একটা ট্যাক্সিকে হাত দেখিয়ে থামতে ইশারা করে, বলল অঞ্জলি। তারপর ট্যাক্সিতে বসে, রাহুল দূরত্ব রেখে বসতে যাচ্ছিল, কাছে ঘেঁষে থপ করে বসে, পারফিউমের সুগন্ধ রাহুলের দিকে উড়িয়ে, অঞ্জলি বলল, মা তো পণ্ডিচেরি যাবার কয়েক বছরের মাথায় মারা গিয়েছিলেন। আশ্রমই আমাকে স্কুলের শেষ ধাপ পর্যন্ত পড়িয়েছিল ; তারপর কলকাতা চলে এলাম রিসেপশানিস্টের চাকরি নিয়ে। আশ্রমে তো সায়েবে গিজগিজ, হোটেলে রিসেপশানিস্টের চাকরি পেতে অসুবিধা হয়নি, দেখতেই পাচ্ছিস আমার স্মার্টনেস। সেখানেই গেঁথে তুললাম আমার বরকে, এত টাকাকড়ির গোমর দেখাত যে না ফাঁসিয়ে থাকতে পারলাম না। পরে ক্রমেক্রমে জানলাম যে ও স্মাগলার। ভাল্লাগে না স্কাউন্ড্রেলটাকে, কিন্তু কি করি, উপায় নেই, পয়সাখরচের বদভ্যাস করে দিয়েছে ; আমার অ্যাম্বিশান ছিলই পয়সাঅলা বর। তাছাড়া, এত ব্যাপার জেনে ফেলেছি যে বেগতিক দেখলে হয়তো খুন করে ফেলে দেবে আসামের সবুজ চা-বাগানে নিয়ে গিয়ে। কিন্তু কী জানিস, ও জড়িয়ে ধরলেও আমি চোখ বুজে তখন তোর কথাই ভাবি, যেন তুই চুমু খাচ্ছিস, বুকে মুখ ঘসছিস, প্রবেশ করছিস।

    প্রবেশ ? সেই পাশাখেলার দিনে তো প্রবেশ নট অ্যালাউড বলেছিলিস ! ছোঁয়াও বারণ ছিল। স্মাগলারদের তো অঢেল টাকা। তাহলে যাদবপুরের রিফিউজি পাড়ায় থাকিস কেন ?

    যাদবপুরেরটা মাল রাখার জায়গা ; পুলিশ বড়ো একটা ওমুখো হয় না। তোকে সোজা আলিপুরের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে পারতাম। কন্ঠস্বরকে, ট্যাক্সিঅলা যাতে শুনতে না পায়, ফিসফিসানিতে নামিয়ে, বলল অঞ্জলি।

    কালো-হলুদ ট্যাক্সিটা এইটবি বাস স্ট্যাণ্ডের কাছে গতি কমাতে, অঞ্জলি ড্রাইভারকে হুকুম দিলে, এখানে থামতে হবে না, তুমি ঘুরে আলিপুরেই চলো। রাহুলের অনুসন্ধিৎসু ঘর্মাক্ত উদ্বিগ্ন মুখের পানে তাকিয়ে বলল, ‘আমি আজও তোর মুখ দেখে বলে দিতে পারি কী চলছে তোর মনের মধ্যে। তুই আমাকে দেখে একই সঙ্গে ভয় আর আনন্দের মাঝে, সত্যি আর মিথ্যের মাঝে, ভালো মেয়ে আর নষ্ট মেয়ের মাঝে, দোল খাচ্ছিস। তারপর জিগ্যেস করল, ভুরু কুঁচকে, তোর মুখ থেকে কথাগুলোর সঙ্গে কিসের যেন একটা স্ট্রেঞ্জ গন্ধ বেরোচ্ছে, কি খেয়ে বেরিয়েছিস ?

    –হ্যাশিশ। শব্দটা লিখে, স্মৃতিতে ফিরে, সত্তরোর্ধ রাহুল নিজের সম্পর্কে একটা ব্যাপার আবিষ্কার করল। কোনো মাদকই ওকে নেশার অভ্যাসে আটকাতে পারেনি। ছোটোবেলায়, ছ’সাত বছর বয়সে, পাড়ার স্হানীয় পার্বণে বা বিয়েশাদিতে তাড়ি খেয়েছে, ভালো লেগেছে, পরে বন্ধুদের সঙ্গে খেয়েছে, হিন্দি লেখকদের বাড়িতে খেয়েছে, তারপর কখন যেন আর খায়নি। ছোটোবেলায় এগারো-বারো বছর বয়সে দিশি মদ বা ঠররা বা সোমরস খেয়েছে, জিভে ভালো লাগেনি, মগজে ভালো লেগেছে, তারপরেও খেয়েছে, বন্ধুদের সঙ্গে খালাসিটোলায়, পিসতুতো দাদার সঙ্গে হাওড়া ব্রিজের তলায়, দাদা অনিকেতের সঙ্গে চাইবাসা, লাহেরিয়াসরায়, ডালটনগঞ্জ, ধানবাদ, দুমকায় মহুয়ার মদ আর ভাত পচানো

    হাড়িয়া খেয়েছে, দাদার বন্ধুদের সঙ্গে খেয়েছে, ভালো লেগেছে, তারপর আর খায়নি। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে গাঁজা ভাঙ

    চরস আফিম খেয়েছে, কবিবন্ধুদের সঙ্গে খেয়েছে, হিপি-হিপিনীদের সঙ্গে ফুঁকেছে, একা ফুঁকেছে, তারপর কখন যেন আর খায়নি। চিত্রকর বন্ধুদের সঙ্গে বেনারসে, হিপি-হিপিনীদের সঙ্গে নেপালে, লাইসারজিক অ্যাসিডে চোবানো ব্লটিং পেপার, কোকেনগুঁড়ো মাখানো ব্লটিং পেপার গিলে ফেলেছে, নেশায় ডুবে থেকেছে, ভালো লেগেছে, তারপর কখন যেন আর গেলেনি। প্রথমে চারমিনার খেতো, তারপর পানামা খেতো, তারপর পাকানো রাইস পেপারে ক্যাপস্ট্যান বা উইলস

    টোব্যাকো ভরে খেয়েছে, কখন যে ছেড়ে দিয়েছে, ওর মনে নেই। চুরুট ফুঁকেছে, ছেড়ে দিয়েছে। পাইপ টেনেছে, ছেড়ে দিয়েছে। পান-জর্দা খেয়েছে, ছেড়ে দিয়েছে। রাম, হুইস্কি, ভোদকা খেয়েছে, সহপাঠীদের সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে, স্ত্রীর সঙ্গে, ছেলে-মেয়ের সঙ্গে, অধস্তন অফিসারদের সঙ্গে মদ খেয়ে হুল্লোড় করেছে, তারপর ছেড়ে দিয়েছে। দেহ টলমল করেছে, কিন্তু চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পায়নি, মাতাল হয়নি, বাজে বকেনি, বা উল্টোপাল্টা আচরণ করেনি কখনও।

    ইচ্ছে করলেই ও, রাহুল, ছেড়ে দিতে পারে, দিয়েওছে, একের পর এক, পেছনে পড়ে থেকেছে স্বজনজ্ঞাতি, শ্যাওড়াফুলির খন্ডহর, কলকাতার ফ্ল্যাট, পরিচিত মানুষ-মানুষী, মাদক, বই, বন্ধু, বন্ধুনি, আসবাবপত্র, পোশাক, কোনো কিছুতে অভ্যস্ত হয়নি।

    যা ওকে ছাড়েনি তা হল হঠাৎ চাগিয়ে ওঠা মন-খারাপ, আচমকা উঁকি-দেয়া ব্যর্থতাবোধের গ্লানি, অকস্মাৎ মনে পড়ে-যাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা আর নিম্নরুচির ব্যবহার, গ্রামীণ উন্নয়নের পরিকল্পনা রূপায়নে নিষ্ফলতাজনিত দুঃখ— এমন কোনো পঞ্চায়েত বা গ্রাম পায়নি যেখানে পরস্পরবিরোধী দুদল মানুষ প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে ভণ্ডুল করার জন্য সব সময় মুখিয়ে নেই—, স্বজন আর স্বজন করে নিতে-চাওয়া মানুষের থেকে বিচ্ছেদের বেদনা, সুচিকিৎসা না পাওয়ায় মায়ের মৃত্যুর দায়।

    –নেশা ? নেশা করিস ? ছিঃ, ওটা তো ছোটোলোকদের নেশা। তোর ছোটোবেলাকার জুহি পরমপুরওয়ার হ্যাবিট ছাড়তে পারলি না। ড্রিংক করলেই তো পারিস। বলল অঞ্জলি।

    –নীলকমলের ট্যাবলয়েডের অফিসে গিয়েছিলুম, ও-ই ফুঁকতে দিল। তুই চিনবি না নীলকমলকে ; ও আমাদের ব্রাহ্ম স্কুলের প্রডাক্ট নয়। যদি না ফুঁকতুম তাহলে বোধহয় তোকে দেখে বিব্রত আর আড়ষ্ট বোধ করতুম। এড়িয়ে গিয়ে কেটে পড়তুম। ছোটোবেলায় কোন পাড়ায় থাকতুম জানিস তো ? ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে এখনও দেখা হয় মাঝে-সাঝে।

    –যত্তো সব চোর-ছ্যাঁচোড়ের পাড়া ছিল তোর সেই জুহি পরমপুরওয়া স্লাম, কানপুরের সবচেয়ে কুখ্যাত স্লাম।

    –তাহলে, ভেবে দ্যাখ, স্মাগলিং ব্যাপারটাকে খারাপ মনে হচ্ছে না তোর ; ছোটোলোকদের খারাপ মনে করছিস।

    রাহুলের মগজে বিভিন্ন রসায়ন কাজ করছিল, যেগুলোর ভেতর প্রধান হল সুপ্ত আতঙ্ক। ও এর আগে কখনও এমন কোনো মানুষের সান্নিধ্যে আসেনি যে স্মাগলিং করে, কিংবা যার পরিবারের লোকেরা স্মাগলার। স্মাগলিং শব্দটাই ভীতিকর, যারা করে তারা আরও খতরনাক, অন্ধকার অচেনা জগতের বাসিন্দা। একজন যুবতী, যাকে ও তখনও পর্যন্ত ভুলতে পারেনি, যে গোপন হাহাকারে ওকে ফেলে উধাও হয়ে গিয়েছিল, যাকে মুছে ফেলতে পারেনি ইন্দ্রিয়গুলো

    থেকে, তাকে ও আবিষ্কার করছে, হঠাৎই, সেই যুবতীরই স্বীকৃতি অনুযায়ী, সে কিনা অচেনা অন্ধকার জগতের নিবাসী। অযথা টানাহেঁচড়ায় পড়বে না তো ! পুলিশের লোকেরা নিশ্চয়ই নজর রাখে ওর বাসায়। কারা আসছে যাচ্ছে সেদিকে নজর রাখে। রাহুলের কেমন যেন শীত-শীত করতে লাগল, টের পাচ্ছিল যে ভেতর থেকে ও কাঁপছে।

    নিজেকে অভয় দেবার জন্য অঞ্জলিকে বলল, না, ভয় পাবো কেন ? পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে। সন্ধ্যার ফিকে আলোয় সবুজ রঙের তোশকে একজন কিশোরী। বাকিটা ফিসফিস করে, যাতে ট্যাক্সিচালক শুনতে না পায়, উদ্দীপনায় রিমঝিম, সবে উঁকি-দেয়া রোম, বুকের ওপর ঢেউ উঠতে শুরু করেছে। ভুলতে পারি না। কত দিন হয়ে গেল কিচ্ছু ভুলিনি। তোর সেই হেস্তনেস্তকারি বৈশাখী চিঠি। লজ্জা করে, বলে, তুই কমলারঙের নেটের মশারি ফেলে দিলি ; বললি বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি। শাওয়ারের ফোয়ারাকে বললি তোর তিন লক্ষ উড়ন্ত শিশু আমার কোল থেকে তোর বুকে উড়ে যাচ্ছে। তোর নাভি থেকে আলোছায়ার কাঁচা মায়াবি গন্ধ বেরুতো। আমার জিভে রয়ে গেছে তোর বুকের গমগমে স্মৃতি। এটাই প্যাশন। কাকে প্যাশন বলে জানিস না বোধহয়, যিশুখ্রিস্ট জেদ ধরেছিলেন কাঁধে করে বধ্যভূমি পর্যন্ত ক্রস বয়ে নিয়ে যাবেন, ওই জেদই প্যাশান।

    –জেদ ? নাঃ, জেদ নয় ; যিশু তো ছিল ছুতোর, অভ্যাস ছিল। তুই কত কিলো কাঠ কাঁধে বইতে পারিস ? জিগ্যেস করল অঞ্জলি।

    –তোকে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলুম, তোর পড়ার ঘর থেকে বাথরুম পর্যন্ত, কাঁধে চাপিয়ে, ভুলে গেছিস নাকি !

    রাহুলের জবাব।

    অঞ্জলি কথার মোড় ঘোরালো, জানিস, আমি আমার মায়ের লাভারের মেয়ে। বাবা মারা যাননি। আমার জন্মের পর কী করে জানতে পেরে সংসার ছেড়ে চলে গেছেন। আমার মনে হয় একদিন উনি হঠাৎই এসে দরোজায় উপস্হিত হবেন, স্বামী বিবেকানন্দের গেরুয়া পোশাকে।

    –স্বামী বিবেকানন্দ ! আর কাউকে পেলি না তুলনা করার জন্য ! বলে, রাহুলের সন্দেহ হল, অঞ্জলি বোধ হয় সব কথাই বানিয়ে বলছে। যে কারণেই হোক, গুল মারছে ; বলেছিল যাদবপুর, কিন্তু চলল আলিপুর।

    –বিবেকানন্দের ফিলোজফির জন্য বলছি না, জানিও না সেসব। প্রেম নিবেদন করার মতন পারফেক্ট পুরুষ বলে মনে হয়, যখনই ওনার ফোটো কোথাও দেখতে পাই। এসব আবার কোথাও লিখে দিসনি যেন। মঠের লোকেরা জানতে পারলে ব্রেন ওয়াশ করার ডাক দেবে।

    –লাভার ? তিনি কে জানতে পেরেছিস ? কী করেই বা জানলি ? রাহুলের মনে হল, নিজেকে নিয়ে কল্পনার ধোঁয়া তৈরি করছে অঞ্জলি।

    –মা নিজেই বলেছিল। তখনকার দিনের রোমান্টিক গল্পে যেমন হতো। লাভার ছিল পেইনটার, কলকাতায় থাকত, যক্ষ্মায় মারা গিয়েছিল। আমার ঘরের বাঁ-দিকের দেয়ালে যে ল্যাণ্ডস্কেপ পেইনটিং ছিল, সেটা নাকি ওই লাভারের, মানে আমার বায়ালজিকাল বাবার। কী আশ্চর্য দ্যাখ ! বায়ালজিকাল বাবা, অথচ তাকেই ঘেন্না করি।

    –তোর কতদিন হল বিয়ে হয়েছে ? বলে, রাহুলের কানে ফিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত টোকা দিতে লাগল। মনে করতে পারল না কোন গান।

    –চার বছর।

    –চার বছর হয়ে গেল, তোর তো একটা কিড হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।

    –না হলে আর কী করব। কতরকম ভাবে তো কতকিছু করা হল। আমার হাজবেন্ডের কিউ ক্রমোজোম থেকে বাইশ কিউ এগারো ডিলিশান আছে।

    রাহুল বুঝতে পারল যে ও ভুল প্রসঙ্গ তুলে ফেলেছে। অঞ্জলির হাতের ওপর হাত রেখে বলল, আই স্টিল মিস ইউ। ছেড়ে দে তোর বরকে। ডিভোর্স দিয়ে দে।

    অঞ্জলি সরাসরি রাহুলের মুখের দিকে তাকাল। চোখে চোখ। হ্যাঁ, আমিও তোকে মিস করি। লোকে বলে চোখের আড়াল হলেই ভুলে যায়, তা কিন্তু নয়। ওই বয়সের মাংসের বিস্ময় চিরকাল টিকে থাকে, তাকে কেন যে প্রেম বলা হয় তা জানি না।

    ট্যাক্সি থেকে নেমে রাহুল বলল, আমার কাছে শিভালরি দেখাবার মতো টাকাকড়ি নেই, তুই-ই ভাড়া মেটা। অঞ্জলি বলল, জানি, শুনেছি, ফালতু চাকরি করিস আর পুরো মাইনে উড়িয়ে দিস বন্ধুদের নিয়ে লেখালিখির পেছনে ; এখন বুঝতে পারছি তা নয়, আসলে গাঁজা-আফিম-চরসের পেছনে। কে জানে, হয়তো রেড লাইট এরিয়াতেও যাস, যা

    তোর সেক্সুয়াল অ্যাপেটাইট ওই বয়সেই ছিল, আর এখন তো ফুল ব্লাডেড স্টাড-বাইসন। অন্য চাকরি খুঁজছিস না কেন? ছাত্র তো ভালোই ছিলিস, রেজাল্টও ভালোই করেছিলি।

    –ঠিক জানি না, বোধহয় আমি বড়োই অলস ; কোনো অ্যাম্বিশান নেই। নিজের মগজের ভেতরে বাসা বানিয়ে বাবুই পাখির মতন কুনো। ওই যে ডাকনাম রাহু, বছরে একবার সূর্য খাই আর তাইতেই তিনশ চৌষট্টি দিন চলে যায়। কলেজে পড়াবার চাকরি পেয়েছিলুম, বাড়ির আরাম ছেড়ে যাবার মতন রেডি করতে পারলুম না নিজেকে। তুই যদি রাজি হোস তাহলে অমন কোনো চাকরি খুঁজবো।

    –হাঃ, এককালে তো দুজনে মিলে পালাবার প্রস্তাব দিয়েছিলিস।

    –তুইও তো তোর চিঠিতে কতকিছু লিখেছিলিস।

    –আমি ছিলাম কচি-হরমোন-খুকি আর তুই ছিলিস কচি-হরমোন-খোকা। দ্যাটস দ্যাট।

    আমি এরকমই, রাহুল গোপনে নিজেকে বলছিল, এর কোনো কারণ নেই। এই যে দুপাশ দিয়ে পথ চলে যাচ্ছে, তাদের কোনো আগ্রহ তো নেই রাহুল সম্পর্কে, রাস্তার বাঁকে ভিড়, সরকার-বিরোধী মিছিলের ক্লান্ত মানুষ-মানুষী, ততোধিক ক্লান্ত তাদের কাঁধের ওপর রাখা পতাকা। সকালে ও বিশেষ উদ্দেশে বেরিয়েছিল। এখন ট্যাক্সির ভেতরে বসে অঞ্জলির নির্দেশে যাচ্ছে কোথাও ; যাবার ছিল যাদবপুর, পরিবর্তে এখন চলেছে আলিপুর– একে কি পরিভ্রমণ বলবে ?

    আকাশ মেঘলা হতে পারত। মার্চ মাস মানে তো বসন্তকাল, তার রেশ গড়ে তুলছে অঞ্জলিকে ঘিরে, ওরই কারসাজিতে

    রোমাঞ্চ খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে, অথচ সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরোবার সময়ে যাবার কথা ছিল সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে এক বন্ধুর দপতরে, যে ওরই প্রবাসের কানপুর শহর থেকে এসেছে, সুকোমল রুদ্র, অপেরা-সংলাপের মুক্তাঙ্গনে নতুন ঘটনা ঘটাবার জন্য শলা-পরামর্শ করার উদ্দেশে। তার বদলে ঢুঁ মারল নীলকমলের ট্যাবলয়েডের দপতরে। অথচ স্মাগলার-বধুর সংসর্গের ভীতিময় আকর্ষণ কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

    সুকোমল রুদ্র সাইক্লোস্টাইল-করা বুলেটনগুলো বের করে, স্টেনসিল দিয়ে হাতে এঁকে বা লিখে। রাহুল একটা চার্ট তৈরি করে ওকে দিয়েছিল ; কবিয়ালদের বংশলতিকায় এখনকার নটদের নাম। রক্তিম চাটুজ্জের নামও ছিল বলে পুরো রামায়ণ নট্ট কোম্পানির লেঠেলরা সুকোমলকে ঘিরে ধরেছিল কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসের সামনে। চওড়াকাঁধ, কোঁকড়াচুল, কালোত্বক কাঠ-বাঙাল সুকোমল যে একাই কানপুরি রুদ্র-হুঙ্কার দিয়ে লড়তে আহ্বান জানাবে, তা ওর প্রতিপক্ষের কেউই আঁচ করেনি। সবাই কলেজ স্ট্রিট, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট ধরে দে পিট্টান। সুকোমলের সঙ্গে সেদিন কামেশ্বর চোঙদার, নবদেব সরখেল আর প্রভাস চোঙদারও ছিল ; ওরা তো সুকোমলকে ঘিরে ফেলা হচ্ছে দেখে আগেভাগেই পালিয়েছিল।

    ওল্ড কোর্ট হাউসের ট্রেনি হসটেল থেকে বেরিয়ে, ডালহাউসি স্কোয়ারে ট্রাম দেখতে পেয়ে উঠে পড়েছিল রাহুল, পরিভ্রমণ অভিযানে, চলমান ঘটমান সময়ের সঙ্গী হবার খাতিরে, একাকীত্ব উপভোগ করবে, শহুরে রোদের ফিকে অনুভব চারিয়ে দেবে অস্তিত্বে। নীলকমলের অন্ধকার দপতরের শীতশীতে চেয়ারে বসে হ্যাশিশ ফুঁকে, বাসে চাপল, আর সে বাস ওকে পৌঁছে দিল রাসবেহারি।

    অঞ্জলিকে দেখেই মন অশান্ত হতে চাইল, শিকড় থেকে ঝাঁকিয়ে তুলতে চাইল আলস্যের নিয়মানুবর্তীকে, অপ্রত্যাশার লোভনীয় বিস্ময়কে ফাঁদ পেতে ধরে ফেলতে চাইল। ওর সেই বৈশাখী চিঠির তীব্র আঘাতের বিদায়সঙ্গীত বাজতে লাগল দপদপে রগের শিরায়।

    ফ্ল্যাটের চাবি খুলে ভেতরে ঢুকে দরোজা বন্ধ করেই অঞ্জলি পেছন ফিরে রাহুলকে জড়িয়ে, ওর কাঁধে মাথা রেখে কেঁপে-কেঁপে ফোঁপাতে আরম্ভ করল। গালে গড়িয়ে আসা চোখের জল যদিও জিভ দিয়ে চেটে নিল রাহুল, কিন্তু ও টের পাচ্ছিল যে ভয়ে ওর হাতের চেটো ঠাণ্ডা হয়ে আসছে আর সামান্য কাঁপুনি ঘটছে শরীর জুড়ে। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই দাড়িয়েছিল দুজনে। কাঁপুনি থেমে আত্মস্হ হলে, রাহুল, মিথ্যা কথা বলার সাহস কন্ঠে এনে, যেসব কথা স্কুলের শেষ বছরে বলবে বলে নিজেকে তৈরি করেছিল, সেগুলো বলতে আরম্ভ করল, বলল, আই স্টিল মিস ইউ, ভুলতে পারি না তোকে, তোর শ্বাসের গন্ধ ভুলতে পারি না। বলে, রাহুল নিজেকে বোঝালো, জড়াজড়ি আর চুমু সত্তেও তো ওর দেহ সাড়া দিচ্ছে না, অচেনা ভয়ে ওর যৌনতা জাগল না। এরকম কেন হচ্ছে ? কতদিন পর একজন যুবতীর তপ্ত দেহ জড়িয়ে ধরে আছে, কিন্তু ওর মনে বা দেহে, তার প্রতিক্রিয়া ঘটছে না !

    অঞ্জলিকে চিনতে না পেরে কাটিয়ে দিলেই হতো।

    তুই আমাকে মিস করিস বা না করিস, তুই আমার লাভার হ, আমার মায়ের লাভারের মতন, কাঁধ থেকে মাথা তুলে বলল অঞ্জলি, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। চল, চল, প্রমাণ কর যে তুই আমার লাভার হবার যোগ্য। যাদবপুরে না গিয়ে তাই এখানে এলাম। পাশাখেলি চল, আগেকার দিনের মতন, শাওয়ারের জলে, তোর তিন লক্ষ শিশু উড়ে আমার বুকে এসে বসুক, চল।

    –স্কুলের সময়ে তুই তো লাভার হতে দিসনি, অবসাদগ্রস্ত গলায় বলল রাহুল, বলেছিলি, সবকিছু করা চলবে না, ওনলি ড্রাই লাভ।

    –হ্যাঁ বলেছিলাম। এখন হ। এখন সবকিছু কর। আজকে থেকে যা। সারারাত মাংসামাংসি করব। জীবনের

    সেই বোকা দিনগুলোয় যা পাওয়া হয়নি তা আশ মিটিয়ে পুরো করে নিতে চাই আজ।

    –তুই ওই স্মাগলারকে ছেড়ে দে, ডিভোর্স দিয়ে দে ; আমার সঙ্গে চল। প্রস্তাবটা যে অবাস্তব, তা জেনেই বলল রাহুল। পরপর মিথ্যা বলার দরুণ বেশ হালকা লাগছিল।

    –আর হয় না রে। একসঙ্গে শোয়া যায়, কিন্তু ঘর করা আর যায় না। স্মাগলারের সঙ্গে ঘর করা যায়, কবি-টাইপদের সঙ্গে, উচ্চাকাঙ্খাহীন পুরুষের সঙ্গে, যারা নিজের সম্পর্কেই সন্দেহে ভোগে, তাদের সঙ্গে ঘর করা যায় না, সে স্টাড-বাইসন হলেও। তাছাড়া মনের দিক থেকে আমরা অনেক দূরে চলে গেছি, নর্থ পোল সাউথ পোল। আমি তোকে সেরকমই ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড চাই, যেরকম ছোটোবেলায় চাইতাম; ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড, ফিলমি ভালগার প্ল্যাটনিক

    প্রেম নয়। তোর সঙ্গে এখন প্রতিদিন শুতে পারি, অবাধ যৌনতার খেলা খেলতে পারি সারা ফ্ল্যাটে

    দৌড়ে-লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে। কিন্তু ঘর করা সম্ভব নয়। ঘর করার ব্যাপারটা রুটিন। আর দুজন মানুষের রুটিন যদি খাপে-খাপে না মেলে তাহলে মনের ডিফারেনসেস মেটানো কঠিন।

    অঞ্জলির বরের ড্রেসিংগাউন পরে, পারফিউম মেখে, লাঞ্চ করল রাহুল। হুইস্কি খেল দুজনে। ব্ল্যাক ডগ, নিশ্চয়ই স্মাগলিং করা হুইস্কি। তারপর বেডরুমে গিয়ে সেই যে বিছানায় আশ্রয় নিল, আচমকা একে আরেকজনকে টেনে নিয়ে আদর করল স্কুলের দিনগুলোর ঢঙে। রাহুলের দেহ তবু সাড়া দিল না।

    –কী হয়েছে তোর ? রেসপন্ড করছিস না, একেবারে ফ্রিজিড।

    –জানি না। রাহুল ভাবছিল মোক্ষম কথাটা বলবে, যে, একজন মেয়ে ওর মনের মতন নয়, এই ধারণা মগজে একবার ঢুকে গেলে ও ফ্রিজিড হয়ে যায়, সেকারণে ও যৌনকর্মীদের বাড়ি যায় না।

    অঞ্জলি ওর স্মাগলার বরের গ্রামের বাড়ি আর সেখানে সঙ্গমের আলোচনা আরম্ভ করল, রাহুলকে ঈর্ষার মাধ্যমে যদি উত্তেজিত করা যায়। ওদের বাড়িটা বাঁশের তৈরি, জমি থেকে বেশ উঁচুতে, বাঁশ পুঁতে-পুঁতে তার ওপর দুতলা টালির চালার বাড়ি। বর্ষায় বাসার তলায় জল জমে থাকে, মাছ ধরা যায়, ডিঙি করে যেতে হয় রাস্তা পর্যন্ত। পাতা বাঁশের ওপর মাদুর পেতে সঙ্গম করার সময়ে পুরো বাড়িটা সঙ্গীতময় হয়ে ওঠে, বাঁশের ক্যাঁকোর-ক্যাঁকোর শব্দে। স্মাগল-করা জিনিস লুকোবার জন্য বাঁশের দেয়ালে খোপোর গড়া আছে, পুলিশ রেইড করলেও মাল খুঁজে পাবে না, যদিও ওই গ্রামে যেতে হলে ট্রেন তারপর বাস তারপর কাঁচাপথে মোটর সাইকেল তারপর কয়েক কিলোমিটার হাঁটা, কিংবা বর্ষায় ডিঙি-নৌকো।

    গল্প শুনতে-শুনতে রাহুল ঘুমিয়ে পড়েছিল।

    সকালে রাহুল যখন জামা-ট্রাউজার-জুতো পরে তৈরি, অঞ্জলি বলল, তুই বেসিকালি কাওয়ার্ড, তাই এড়িয়ে গেলি। তোর পকেটে যে কাগজটা ছিল তাতে যাদবপুরের ঠিকানা লিখে দিয়েছি ; আর এই বাড়িটা তো তুই চিনেই গেলি। ফোন নম্বরও লিখে দিয়েছি। আমি তুললে রেসপণ্ড করিস, নয়তো করিস না। যদি তোর কাওয়ার্ডনেসকে কাবু করতে পারিস তাহলে চলে আসিস।

    তুই চল না আমার সঙ্গে। পালিয়ে চল। আমার নাম-ধাম তো আর তোর বর জানে না। কার সঙ্গে ইলোপ করলি কি করেই বা জানবে। আমার আস্তানা থেকে ডিভোর্স নোটিস পাঠিয়ে দিস। আবার অবাস্তব প্রস্তাব দিল রাহুল। দিয়ে ভয়ও করল, কে জানে, যদি অঞ্জলি প্রস্তাবটা মেনে নিয়ে বলে ওঠে, ঠিক আছে, চল।

    যাক, তা বলল না অঞ্জলি। বলল, তুই মাংসের সম্পর্ককে ডিবেস করে ফেলছিস। আমি তো আছিই, তোর বাড়িতে না গিয়ে অন্যের বাড়িতে আছি, তাতে কী এলো-গেলো।

    দাঁড়া, বলে, অঞ্জলি ড্রইংরুমের একটা আলমারি থেকে রাহুলকে চামড়ার পার্স দিয়ে, যোগ করল, এই নে, তোর ট্রাউজারের পকেটে তো দেখলাম পার্সটার্স নেই, পকেটে টাকা গুঁজে রাখিস। হিসাব রাখিস কী করে ?

    –হিসাব ? আমি তো কোনোকালে কোনো কিছুর হিসেব রাখিনি। বন্ধুবান্ধবরা অভাবের কথা বললেই সাহায্য করি ; সময়কে লাগাতার খরচ করতে থাকি।

    –এত দিনে কিছু একটা হয়ে ওঠা উচিত ছিল তোর।

    ‘হয়ে ওঠা’ ! কতবার শুনেছে কথাটা রাহুল। এই হয়ে ওঠা ব্যাপারটা ঠিক কী, ভেবে কুলকিনারা পায়নি। মানুষ তো মানুষই, তার আবার হওয়াহয়ির কী আছে ! মানুষ কী ভাবে ধাপে ধাপে বিবর্তনের সিঁড়ি বেয়ে জেলি-প্রাণ থেকে মানুষ হল তা তো ডারউইন বলে গেছেন। তারপর আবার কী হয়ে উঠবে মানুষ ? বাইবেলের গল্প থেকে ইউরোপের লোকেরা বেরুতে পারছে না বলে আমরাও কেন আটকে পড়ব সেসব গল্পে ? বিজ্ঞান বাদ দিয়ে হয়ে ওঠার গল্প। কেউ কি অপেরা-গায়ক বা অপেরা-লেখক হয়ে ওঠে ? রবীন্দ্রনাথ কি হয়ে ওঠার কথা চিন্তা করেছিলেন ? হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কি চেয়েছিলেন শব্দকোষের ভাঁড়ার আবিষ্কারক হয়ে উঠবেন ? ইউরোপ গিলিয়েছে, আরও নানা রকমের গল্পের সঙ্গে এই হয়ে ওঠার গল্প। হাতে কলম এলেই আরম্ভ হয়ে যায় হয়ে ওঠার কৌম-নিরপেক্ষ আনুই বিষাদ দুঃখ অশান্তি।

    বিষাদ দুঃখ অশান্তি ! রাহুলের বয়স তখন কত হবে, মমমমমমমম, যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। লেক মার্কেটের সামনের হোটেল ভেঙ্কটেশ থেকে বেরিয়ে দাদা অনিকেতের বাড়ি যাবে বলে স্ত্রী সুমনার সঙ্গে টালিগঞ্জমুখো ট্রামে চাপতে যাচ্ছিল। কলকাতার ফ্ল্যাট বেচে দেবার পর, কলকাতায় গেলে,ওই হোটেলেই উঠত সেসময়ে। রাসবিহারি

    ক্রসিঙে একজন পেটমোটা মোদো-গাল প্রৌঢ় সামনে এসে বলল, ‘স্যার চিনতে পারছেন ?’ অনেককেই চিনতে পারে না

    রাহুল আজকাল, এমনকি মুখ দেখে চেনা মনে হলেও, নাম মনে পড়ে না। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চোখে চাউনি-প্রশ্ন তুলতে, সুমনাও মাথা নাড়ল, উঁহু।

    –স্যার, আমি অনির্বাণ মৌলিক।

    রাহুল, তবু মনে করতে পারল না।

    –আপনার আন্ডারে জুনিয়ার অফিসার ছিলাম, কলকাতাতেই, আপনি ইনচার্জ ছিলেন, আপনি আমার অ্যাপলিকেশান ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন, মনে পড়ছে ?

    –না না, আমি কখনও কারো কোনো দরখাস্ত ছিঁড়ে ফেলে দিইনি, প্রতিটি অ্যাপলিকেশান রেকমেণ্ড করেছি, তা সে যোগ্য হোক বা না হোক।

    –আমি অন্য অ্যাপলিকেশানের কথা বলছি স্যার। আমি গ্রেপ্তার হয়ে হাজতে একরাত ছিলাম, চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারত, আপনি বাঁচিয়েছিলেন।

    মনে পড়ল সেই যুবক অনির্বাণ মৌলিককে। বলল, কিন্তু এরকম কুৎসিত হয়ে গেলে কী করে ? তোমার তো ফিল্মস্টারের মতন চেহারা ছিল, তোমার স্মার্টনেস তোমার সহকর্মীদের ঈর্ষার কারণ ছিল। সেসব মিটে গেছে ? বললেও, ভেঙেপড়া আদল দেখে, রাহুল বুঝতে পারল যে সেই যুবকটি নিজেকে ধ্বংস করে, জন্ম দিয়েছে এই মোটা ভ্যাদকা লোকটাকে।

    অনির্বাণ মৌলিক বিয়ে করেছিল। ছেলে হয়েছিল একটা। তারপর ওর বদলি হয়ে গেল মিজোরাম। ওর স্ত্রী যেতে চাইল না। অনির্বাণ জোরাজুরি করেনি, মিজোরামে ছেলের স্কুলের সুবিধা নেই, স্ত্রীকেও আত্মীয়স্বজনহীন একা থাকতে হবে, কেননা ওকে তো সারা রাজ্যে ট্যুর করে বেড়াতে হবে। দেড় বছর মিজোরামে কাটিয়ে, টিএ-ডিএর যথেষ্ট টাকাকড়ি জমিয়ে ফিরে এলো। ফিরে, জানতে পারল, ওর স্ত্রী প্রেগন্যান্ট। অনির্বাণ তো ওর স্ত্রীর সঙ্গে দেড় বছরের একদিনও শোয়নি, তো বউ অন্তঃস্বত্তা হল কী করে ! স্ত্রীকে অনুরোধ করল, অ্যাবর্ট করিয়ে ফেলতে। স্ত্রী রাজি না হওয়ায়, শ্বশুর-শাশুড়িকে জানালো ঘটনাটা। শ্বশুর, শাশুড়ি আর স্ত্রী ওর বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ দায়ের করল থানায়। অনির্বাণ মৌলিক গ্রেপ্তার হয়ে চালান হয়ে গেল।

    ছাড়া পেয়ে পরের দিন একটা দরখাস্তে বিস্তারিত লিখে রাহুলের কাছে জমা দিয়েছিল। ওটা ফরোয়ার্ড করলেই যুবকটি চাকরি থেকে সাসপেন্ড হয়ে যাবে। রেস্তহীন মকদ্দমা যে কী ব্যাপার, তা ভালোই জানা ছিল রাহুলের। ফৌজদারি আদালতে দিনের পর দিন একা-একা দাগিদের মাঝে কপর্দকহীন সময় কাটানো ! অ্যাপলিকেশান ছিঁড়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিয়ে রাহুল ওকে বলল, চেপে যাও, কেস-ফেস লড়তে হয় চুপচাপ লড়ো, কাউকে কিচ্ছু বলার দরকার নেই ; আর যদি তোমার স্ত্রীকে তুমি ওভাবেই অ্যাকসেপ্ট করে নিতে পারো, তাহলেও কাউকে কিছু বলার দরকার নেই ; পুরো ব্যাপারটা তোমার ব্যক্তিগত নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করছে, তুমি ছাড়া আর কেউ তো কিছুই জানে না। আমিও তোমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিচ্ছু জানি না ; আমার কাছে ঘটনাটা ঘটেনি।

    –আপনি যেমন বলেছিলেন, ঘটনাটা ঘটেনি, আমিও সেভাবেই অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছিলাম। কিন্তু একসঙ্গে থাকতে পারিনি, সেই থেকে আলাদা। বোঝাপড়া করে নিয়েছি। মাইনে পাই, এক তৃতীয়াংশ রেখে সবটা দিয়ে দিই, তবু আজ পর্যন্ত ছেলেদের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে দেয় নি, সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। এই ভাবেই চলছে। মদ খাই, খালাসিটোলায় গিয়ে কাঁদি, বমি করি…

    –ডিভোর্স দিয়ে আবার বিয়ে করলে না কেন ?

    –তাহলে তো সবই জানাজানি হয়ে যেত স্যার। লোকে কী ভাবত ওর সম্পর্কে, ভেবে দেখুন, আমার কথা না হয় বাদ দিন, ছেলেগুলো বড়ো হয়ে সমাজের নোংরা লাথির মুখে পড়ত। প্রথম বাচ্চাটাও আমার নয় স্যার।

    –তুমি তো বলেছিলে..

    –বলেছিলাম। ডিএনএ টেস্ট করিয়ে জানতে পেরেছি। সুমনার দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ বলল, স্যার জানেন

    আমার ব্যাপারটা।

    –অযথা টেনশান এড়াতে, ও তো অন্য কারোর ব্যক্তিগত ব্যাপার সাধারণত বাড়িতে আনে না। বলল সুমনা।

    অনির্বাণ মৌলিক টালিগঞ্জমুখো অটোয় উঠে যাবার পর, ঘটনাটা সুমনাকে জানিয়ে রাহুল বলল, আমি এই লোকটার জীবন নষ্ট করে ফেলেছি; এর দরখাস্ত গ্রহণ করে সাসপেন্ড করে দিলে সবাই জেনে ফেলত, আর এ বাধ্য হতো

    নিজের সঙ্গে নিজে লড়তে ; ফালতু পড়ে গেল এমন বউ-বাচ্চার রুলেট খেলায় যে খেলাটা প্রকৃতপক্ষে ও খেলছেই না।

    বোকার মতন কেঁদে মরছে। এ নিজেকে মেলে ধরলে প্রেমে পড়ার মতো তরুণী পেয়ে যেতো, অফিসেই ছিল কয়েকটি মেয়ে যারা এর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করত। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা চাপিয়ে দিয়ে ধ্বংস করে ফেললুম আরেকজন মানুষের জীবন।

    –তুমি তো সুরিন্দরের বাবার চিঠিও ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে ; কতবার বলেছিলুম খোঁজ করো কার চিঠি, যাদের কথা উনি লিখেছেন তারা কারা, শুনলে না। চিঠি পড়েই ছিঁড়ে ফেলে দেবার এমন বদভ্যাস করে ফেলেছো যে ওর জীবনটাও নষ্ট হয়ে গেল। অনির্বাণ চলে যাবার পর বলল সুমনা।

    রাহুলের সহকর্মী সুরিন্দর ওবেরয়ের প্রসঙ্গে কথাটা তুলেছিল সুমনা। রাহুলের বয়স তখন কত হবে, মমমমমমম, বোধহয় পঁয়ত্রিশ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। অফিসে ডাকে যে চিঠিপত্র আসে তা থেকে বাছাই করে যার চিঠি তার কাছে পৌঁছে দ্যায় পিওন। পরপর তিনদিন যে চিঠি ওর টেবিলে পিওন রেখে গেল, তাতে কেবল পদবির মিল ছিল, নামের জায়গায় কেবল শ্রীমান লেখা। ওর পদবির অন্য কেউ অফিসে নেই বলে চিঠিগুলো ওকেই পৌঁছে দিয়েছিল পিওন।

    চিঠিতে একজন বাবা তাঁর ছেলের সংসারে কোনো গোলমাল চলছে কিনা তা জানতে চেয়েছিলেন। ওর সহকর্মীদের কয়েকজনকে চিঠিগুলো পড়তে দিয়েছিল রাহুল, কিন্তু কেউই চিহ্ণিত করতে পারল না যে প্রেরক লোকটি কে, কেননা তিনি প্রাপককে ‘বেটা’ সম্বোধন করেছিলেন আর নিজেকে ‘পিতাসমান’। চিঠিতে পিতাসমান লোকটি বেটার কাছে জানতে চেয়েছেন যে তাঁর ছেলের স্ত্রীর সঙ্গে অবনিবনার মিটমাট হয়েছে কিনা ; ছেলের বড় ছেলেকে শিখ করবে ভেবেছিল, তা করেছে কিনা ; রান্না করতে গিয়ে ওনার নাতনির হাত পুড়ে গিয়েছিল, সে কেমন আছে ;ছোটো ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করেছে কিনা, ইত্যাদি।

    ওর, রাহুলের, অফিসের ড্রয়ার মাস তিনেকে একবার পরিষ্কার করার জন্য জমে ওঠা চিঠিগুলো ছিঁড়ে বাজে কাগজের বিনে ফেলার পর ওর নজরে পড়ল রহস্যময় চিঠিগুলোর একটা খামে পোস্টঅফিসের ছাপটা আবছাভাবে যেন হিন্দিতে ‘রোপড়’ মনে হচ্ছে।

    রোপড় ? রোপড়ের একটা গ্রামে তো ও হনিমুন করার জন্য গিয়েছিল, সহকর্মী সুরিন্দর ওবেরয়দের আখ-সর্ষে-গমের খেত-খামার ঘেরা বাড়িতে, সাটলেজ বা শতদ্রু নদীর তীরে। অপরিচিত পাঞ্জাবি গ্রামে হনিমুনের প্রস্তাবে সুমনাও রাজি হয়েছিল। দেশভাগের আগে মুসলমানদের গ্রাম ছিল ; দখল করে নেয়া বাড়িগুলোর সদর দরোজাও জানলার মাপের, হেঁট হয়ে ঢুকতে হতো, এঘর-সেঘর করতে হলেও অমনই ছোটো-ছোটো দরোজা। জানলার বদলে ছাদের কাছে ভেনটিলেটর। গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে লোটা হাতে সুমনাও কাকভোরে গিয়েছিল আখ খেতে। পরে, বেলায়, রাহুলও গিয়েছিল, উলঙ্গ হওয়া নিয়ে রাহুলের কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না, আজও নেই, কলেজ থেকে এক্সকার্সানে গিয়ে দল বেঁধে হাগতে যেতো, হাগবার সময় গালগল্প হতো, পাদবার প্রতিযোগীতা হতো।

    সুরিন্দরদের বাড়িতে প্রতিদিন সকালে পেতলের এক ফুট উঁচু গেলাসে লস্সি, ঘিয়ে চোবানো বেসনের আর ভুট্টার আটার রুটি, পেতলের হাঁড়িতে কাঠের মুগুর দিয়ে পেষা ঘিয়ে ভাজা পালংশাক খেয়ে-খেয়ে কয়েক সপ্তাহেই চেহারার খোলতাই হয়ে গিয়েছিল।

    সুরিন্দরকে তো চিঠিগুলো দেখিয়েছিল, কিন্তু ও বেশ হাসিমুখে বলেছিল যে ওগুলোতে তোলা প্রসঙ্গে থেকে মনে হয় অন্য কারোর।

    রোপড়ের ছাপ রয়েছে যখন, সন্দেহ থেকে বেরোতে না পেরে, সুমনা আর রাহুল একদিন রাতে আটটা নাগাদ ঢুঁ মারল সুরিন্দরের বাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়েই শুনতে পেল প্রচণ্ড ঝগড়া চলছে ওর আর ওর স্ত্রীর। ফিরে যাবে কিনা, শোনা উচিত হবে কিনা, ইত্যাদি চিন্তার মাঝে দোটানায় ওরা শুনতে পেল এই কথাগুলো :

    –তোমার তো বাচ্চাদের জন্য সময় নেই ; সব সময় বাইরে থাকো, কোথায় যাও আমি জানি, ওই বয়ফ্রেন্ডের কাছে যাও দুপুরবেলা, যখন আমি অফিসে থাকি। মেয়ের ওপর রান্নার ভার দিয়ে তুমি সেজেগুজে বেরিয়ে যাও। রান্না করতে গিয়ে ওর হাত পুড়ে গেল, তবু তুমি ভ্রুক্ষেপ করলে না। দয়ামায়া খুইয়ে বসে আছো।

    –যাই তো যাই। কেমন করে ভালো বাসতে হয় তুমি তার কিছুই জানো না। অফিস থেকে ফিরলে, অফিসের কাজ নিয়ে বসে গেলে, ব্যাস খেলে-দেলে, তারপর রুটিন মতো নিজের কর্মটি করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লে। আমার দিকে ভালো করে তাকাবারও ফুরসত নেই তোমার ; আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কেয়ার তো কোনোদিনই করলে না।

    –বাচ্চাদের সামনে এসব আলোচনা কোরো না।

    –মিন্টুকে শিখ করার সময়ে আমার সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন মনে করোনি। তোমার সংসারে আমার কোনো দাম আছে নাকি ? আমি কেবল জড়িয়ে ঘুমোবার পুতুল।

    –মাইনের পুরো টাকাটা তোমার হাতে তুলে দিই।

    –তুমি যে মাইনের টাকা দাও তা থেকে অনেক বেশি হাতখরচ খান্না আমাকে দ্যায়। তোমার সঙ্গে কেনই বা থাকবো!

    –থেকো না, কে বলেছে থাকতে।

    –চলেই যাবো। দাঁড়াও না তোমায় দেখাচ্ছি মজা। আমি চলে গেলে তখন বুঝবে।

    ঝগড়ার মাঝে ঢুকে পড়তে রাহুল-সুমনার মধ্যবিত্ত চেতনা বাধা দিল। সুরিন্দরের ফ্ল্যাটে না ঢুকে ফিরে গেল ওরা। রাহুল পরের দিন অফিসে গিয়ে দেখল ওর ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট সুইপাররা খালি করে দিয়েছে, নয়তো, যে চিঠিগুলো ভালো করে পড়া হয়নি, ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, ছেঁড়া টুকরোগুলো সাজিয়ে, আবার পড়ে পরিস্হিতি বোঝার চেষ্টা করত, বোঝাপড়া সম্ভব কিনা তা খতিয়ে দেখত। সুরিন্দরের বাবাকে টেলিগ্রাম করতে পারত, বা রোপড়ের গ্রামে গিয়ে নিয়ে আসতে পারত ওনাকে। অন্যের সংসারে মাথা গলানো অনুচিত হবে মনে করে হাত গুটিয়ে বসে রইলো।

    দিনকতক পরে শুনলো যে সুরিন্দরের বউ ছোটো ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে একজন লোকের সঙ্গে পালিয়ে গেছে।

    পরে, রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমমমম, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। রাহুলের চণ্ডীগড়ের কোয়ার্টারে মদ খাবার সান্ধ্য আড্ডায় সুরিন্দর ওবেরয় বলে ফেলল, যে ওর বউ সত্যিই একজনের সঙ্গে চলে গেছে, কোথায় গেছে জানে না, জানতে চায় না, ছোটো ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে, কেননা ওই বাচ্চাটা নিশ্চয়ই খান্নার।

    তারপর, রাহুলের বয়স যখন, মমমমমমমম, বোধহয় পঁয়তাল্লিশ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, ও চলে এসেছে গ্রামীণ উন্নয়নের চাকরিতে, সুরিন্দর নোট পোড়াবার স্তর থেকে ওপরে উঠে-উঠে সেই অফিসেই জাঁদরেল অফিসার হয়েছে, মুম্বাইতে রাষ্ট্রীয়স্তরের এক মিটিঙে পরস্পরের সাক্ষাৎ। সৌজন্য বিনিময়ের পর সুরিন্দর ওর অফিস কোয়ার্টারে খেতে ডাকল সুমনা-রাহুলকে। ওরা গিয়ে দ্যাখে সুরিন্দরের বউও রয়েছে। ওর বউ ফিরে এসেছে দেখে সুমনা-রাহুল ঠিকমতো সন্ধ্যাটা কাটাতে পারল না, ভেবে পেল না কী নিয়ে কথা বলবে। সুরিন্দরই বলল, ওর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে নিউইয়র্কের এক যুবকের সঙ্গে। বড় ছেলের পড়াশোনা তেমন হয়নি, নানা কারণে, তাই ভালো চাকরি পায়নি, চণ্ডিগড়ে থাকে। ছোটো ছেলের প্রসঙ্গ তুলল না ; তাকে ওরা ওর ফ্ল্যাটে দেখতেও পেল না।

    অবসর নেবার পর একদিন হঠাৎ চণ্ডিগড় থেকে সুরিন্দরের বড় ছেলের ফোন পেয়ে জানতে পারল যে লিভারে ক্যানসার হয়েছিল সুরিন্দরের ; অপারেশন করাতে গিয়ে মারা গিয়েছে ; ও জানতে পেরেছে অন্ত্যেষ্টির পর। দিল্লিতে একা থাকত, চব্বিশ ঘণ্টার এক চাকর ছিল দেখাশোনার জন্য, গাড়ি চালাবার জন্য, সে-ই শেষকৃত্য করেছে। প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের পুরো টাকা চিকিৎসা করাতে খরচ হয়ে গেছে।

    –মা কোথায় ?

    –মায়ের সঙ্গে ফর্মাল ডিভোর্স তো হয়নি।

    –মুম্বাইতে তোমাদের কোয়ার্টারে ওনাকে যে দেখেছিলুম ?

    –বাবা মারা গেলে যাতে ফ্যামিলি পেনশন পান তা নিশ্চিত করতে এসেছিলেন।

    –তোমার ছোটো ভাই কোথায় ?

    –জানি না। মা-ও কোথায় থাকে জানি না।

    সুরিন্দর মারা যাবার পর ওর বাবার পাঠানো চিঠিগুলোর উদ্বেগের জের থেকে গেছে রাহুলের সঙ্গে, ফিকে বেদনাময় অপরাধবোধের মতন। ছিঁড়ে না ফেলে সুরিন্দরের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে ওর বাবাকে বিস্তারিত জানালে উনি আর দুই পরিবারের সদস্যরা হস্তক্ষেপ করে কিছু একটা বিহিত করতে পারতেন, সম্পর্কে ভেঙে পড়ার আগে এসে মধ্যস্হতা করতে পারতেন, ফরম্যাল ডিভোর্স করিয়ে পরিস্হিতিকে জটিলতা থেকে বাঁচাতে পারতেন। রাহুলকে অন্তত অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিতেন।

    সুরিন্দর কি জীবনে কিছু হয়ে উঠতে পেরেছিল ? হেরে যাওয়াটাও, বোধহয়, অনির্বাণ মৌলিকের মতনই, হয়ে

    ওঠা। সুরিন্দরের বউই বা কি হয়ে উঠেছিল ? খান্না সাহেবের সঙ্গিনী ! অনির্বাণ মৌলিকের বউ কী হয়ে উঠেছিল ? গোপন প্রেমিকের মানসী।

    হয়ে ওঠা’ ! রাহুলের হয়ে ওঠা !

    কী ? না, নোটের মুদ্দোফরাস ! মুদ্দোফরাস হিসাবে পার্সোনালিটি নির্মাণ। শ্মশানের ডোম লাশ পোড়ায়, আর রাহুল পোড়ায় টাকার লাশ, একটা-দুটো নয় শ্মশানের চেয়ে অনেক বেশি, লক্ষ-লক্ষ, দিনের পর দিন।

    সুযোগ পেতেই, মুদ্দোফরাসের চাকরি ছেড়ে পালিয়েছিল রাহুল। গ্রামীণ উন্নয়নের নতুন চাকরিতে, সারা ভারত চষে বেড়িয়েছে, সরকারি খরচে। তার আগে তো ও জানতোই না জোয়ার গাছ আর বাজরা গাছের তফাত, মুসুর ডাল লতা আর অড়রডাল ঝোপের তফাত, ওংগোল গরুর সঙ্গে থারাপারকর গরুর তফাত, কেন কিছু ছাগলের গলা লম্বা আবার কিছু ছাগলের গলা ব্যাপারটাই নেই, কত কি জানতো না।

    চাকরিটার জন্য, যারা ওর ইনটারভিউ নিয়েছিল, তারা বিশেষ কিছুই জিগ্যেস করেনি। কিন্তু ও যখন উঠে থ্যাংকস জানিয়ে পেছন ফিরেছে, ইনটারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান ওকে বললেন, মিস্টার সিংহ, ওই কোনে যে ফুলদানি রাখা রয়েছে তা থেকে ধানের শিষটা তুলে এনে আমায় দিন। শুনেই, যাতে ওর মুখ যে শুকিয়ে গেল, তা ওনারা টের না পান, রাহুল দ্রুত পেছন ফিরে, এলিমিনেশান মেথড প্রয়োগ করল। বাড়িতে সরস্বতী পুজোয় যবের শিষ দরকার হতো, সেটা ও চেনে, গমের শিষ যে যবের শিষের মতন তা ও জানে, বাদবাকি শিষের মধ্যে দুটো বটল ক্লিনারের মতন দেখতে, অতএব সেদুটো জোয়ার-বাজরা-নাচনি হবে, ঘাসের চোরকাঁটা চেনে, কাশফুল চেনে। বাঁচল যেটা, সেটাই তাহলে ধানের। শিষটা তুলে ওনাদের দেবার এক মাসের ভেতর ওর চাকরির আর পোস্টিঙের চিঠি পেয়ে গিয়েছিল।

    পোস্টিঙের পরই, তখন রাহুলের বয়স, মমমমমমম, বোধহয় মমমম, থাকগে, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, রাহুলকে বুন্দেলখন্ড অঞ্চল পর্যবেক্ষণ-ক্ষেত্রসমীক্ষা করে প্রতিবেদন লেখার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হল ইটাওয়া-জালাউন-ললিতপুর ইত্যাদি জেলাগুলো পরিদর্শনের জন্য। অফিসের রাজনীতির খেলায় নতুন, তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে, কৃষিজ্ঞান পরীক্ষা নেবার জন্য এবং সেই সঙ্গে অভিজ্ঞতা জড়ো করার জন্য পাঠানো হল ওকে, কেননা ওই অঞ্চলগুলোতে রাতে থাকার হোটেল, যানবাহন আর খাওয়া-দাওয়ার অভাব সহজেই কাবু করে ফ্যালে বাইরের লোকেদের।

    ওর সৌভাগ্য যে ইটাওয়ার জেলা কৃষি আধিকারিক শার্দুল মীনাকে রাহুলের কোনো শুভানুধ্যায়ী, হবু অধস্তন অফিসার, ওর সম্পর্কে বিস্তারিত খবর পাঠিয়ে দিয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারল কৃষি আধিকারিক রাহুলের স্নাতকোত্তর সহপাঠী অভিমন্যু মীনার বড় ভাই। কৃষি আধিকারিকের সরকারি বদান্যতায় জেলা সদরের আর ব্লকস্তরের অতিথিভবনগুলোয় রাতে থাকার, খাওয়ার, ব্যবস্হা হয়ে গেল। ঘোরাঘুরির সুবিধার জন্য উনি ওঁর বিভাগের বয়স্ক অভিজ্ঞ অফিসার সুগ্রিব নিমচকে সঙ্গে দিলেন। সরকারি জিপ ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে গেল রাহুল।

    তিনদিনের ক্ষেত্রসমীক্ষায় রাহুলের কর্ডুরয় প্যান্ট — পরে এই প্যান্ট ওর গুডলাক ট্রাউজার খেতাব পেয়েছিল –, ডোরাকাটা শার্ট, চোখের পাতা, মাথার আর ভুরুর চুল গেরুয়া ধুলোয়, এবং কাগজপত্র সংখ্যা ও তথ্যে ভরে উঠল। শুধু গেঞ্জি আর আণ্ডারওয়্যার বদলাতো, কেননা মাত্র চার দিনের ট্যুর বলে দুটো সেট শার্ট-প্যান্ট সঙ্গে নিয়েছিল।

    অঞ্চলটা, যেখানে ওর সহকর্মীরা আসতে চায় না, ওর মনে হল বর্ণনাতীত। পথের দুধারে গভীর ও সঙ্কীর্ণ গিরিখাতের শুকনো ও বিমূর্ত ভুলভুলাইয়ার প্রায় জনহীন বিস্তার ধুলো উড়িয়ে অধঃক্ষিপ্ত জলরাশির প্রত্যাশায় ভূতাত্বিক বৈচিত্র্যকে করে তুলেছে কূতূহলোদ্দীপক আর দূরভিসন্ধিপূর্ণ। দুপুরের আগেই দিগন্ত ঢেকে যায় গেরুয়া কুয়াশায়। এখানকার ফুল-ফল ও প্রাণীরা ছলনাময়। চারিদিকে থম মেরে মায়াময় অস্হিরতা। একটাই নদী বয়ে গেছে অঞ্চলে, যা উটের পিঠে বসে পারাপার করছে গ্রামবাসীরা।

    চতুর্থ দিন কিছুটা যাবার পর নিমচ একটা মন্দিরের কাছে জিপগাড়ি পার্ক করতে আদেশ দিয়ে ভেতরে ঢুকতে, রাহুলও নিমচের পিছু-পিছু ঢুকে কালী মন্দির দেখে অবাক হল। সাধারণত কয়েক ঘর বাঙালি যে জায়গায় থাকে সেখানে কালী মন্দির নজরে পড়ে। নিমচকে জিগ্যেস করতে সে জানালো যে মন্দিরটা সতেরো শতকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আতেরের মহারাজা বদন সিংহ, হয়তো আপনার পূর্বপুরুষ, আপনিও তো সিংহ ! রাহুল মাথা নেড়ে স্বীকার করে নিল বায়বীয় আত্মীয়তা।

    নিমচ বলল, তিনি শক্তির উপাসক ছিলেন। এখানকার শক্তি-উপাসকরা, তা সে যে জাতেরই হোক না কেন, জরুরি কাজে যাবার আগে কালীমাকে প্রণাম করে যায়, আর সফল হলে পাঁঠা বলি দেয়। হাড়িকাঠে শুকনো রক্তের দাগ দেখে বিশ্বাস হল রাহুলের। কে জানে এরা নীলকমলের গ্রামের ছিন্নমস্তার মন্দিরে মোষ বলির পর রক্তমাখা নাচ নাচে কিনা।

    খালি-গায়ে পৈতে ঝোলানো পুরুত নিমচকে বলল, বাবাসাহেব কাছের এক গ্রামে এসেছেন। উত্তরে নিমচ বলল,

    বহুদিন পর বাবাসাহেব নদীর এই পারে এলেন।

    রাহুল গলা নামিয়ে জানতে চাইল, বাবাসাহেব কি কোনো সাধুসন্ত ?

    –জি হাঁ, পহুঁচে হুয়ে আদমি হ্যাঁয়, বলল নিমচ।

    অভিব্যক্তিটা বেশ মনের মতন মনে হল রাহুলের, ‘পৌঁছে-যাওয়া মানুষ’। মানুষ তো মহাশূন্যে, চাঁদে, সমুদ্রের মেঝেয়, সর্বত্র পৌঁছে গেছে। সাধুরাও মেডিটেট করে পৌঁছে যায় হয়তো অভিষ্ট্য লক্ষ্যে। ওদের আন্দোলনের এক অপেরা-গায়ক, অবিনাশ ভট্টশালি, মামলা-মকদ্দমার সময়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল। পরে রাহুল জানতে পারে যে অবিনাশ কোনো ধর্মগুরুর দর্শনে প্রভাবিত হয়ে পৌঁছে গেছে আত্ম-উত্তরণের তৃপ্তিতে। সকলেই কোথাও না কোথাও পৌঁছে যায়, রাহুলের পৌঁছোনো হয় না। যাযাবার রয়ে গেল। চারিদিকে ঘুরে বেড়ায়, অথচ পৌঁছোয় না।

    কাঁচা রাস্তায় জিপগাড়ি ছুটল, রাহুলের পোশাক ও ত্বকের রোমে ধুলোর আস্তরন সংগ্রহ করতে-করতে। কিছুটা যাবার পর লাল কাঁকরের পথের মাঝখানেই কয়েকজন গ্রামবাসী বসেছিল বলে ড্রাইভার জিপ থামাতে, তাদের একজন চালককে বলল, এই রাস্তাটা আগে গিয়ে খারাপ হয়ে গেছে, আপনারা পাশের গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে যান।

    বাতাসকে আরও ধূসর করে সাত-আট কিলোমিটার যাবার পর রাহুল দেখল একটা বিশাল বটগাছের তলায় প্রায় কুড়ি-পঁচিশজন গ্রামবাসী একজন তামাটে পেটমোটা মোড়লের সামনে বসে, সম্ভবত তার বাণী শুনছে। ‘আরে, বাবাসাহেব’ বলে, চালক সেই দিকে গাড়ি নিয়ে গিয়ে থামাল। নিমচকে নামতে দেখে রাহুলও নামল। উস্কোখুস্কো বাবরিচুল মোড়লের উর্ধাঙ্গে জামা বা গেঞ্জি নেই, কোমরে চাক-কাটা লুঙ্গি, কোঁচড়ে রাখা মুড়ি খাচ্ছে। মোড়ল বসে আছে গোবরলেপা মাটির উঁচু বেদির ওপর।

    মোড়লের কাছে গিয়ে নিমচ হাতজোড় করতে সে ওর হাতে একমুঠো মুড়ি নিজের কোঁচড় থেকে তুলে দিল। নিমচ তা হাতে নিয়ে এক গ্রাসে খেয়ে ফেলল। রাহুলকে ইঙ্গিত করে মোড়ল নিমচকে জিগ্যেস করল, ‘সরকার বাহাদুর?’

    –জি হাঁ, নিমচের বিনয়ী প্রত্যুত্তর।

    মোড়ল রাহুলকে ডেকে বলল, সরকার বাহাদুর, তুম ভি লো, খাও। যেখানে-সেখানে যা পাওয়া যায় তা সাধারণত খায় না রাহুল, পেট খারাপ হবার ভয়ে। ও পকেট থেকে রুমাল বের করে মুড়িগুলো বেঁধে নিল, পরে সুযোগ বুঝে ফেলে দিতে পারবে। রাহুলের আচরণে প্রীত হয়ে মোড়ল ওকে আরও কাছে ডাকল। কাছে গেলে, মাথার ওপর হাত রেখে বলল, জিতে রহো।

    ওরা জিপগাড়িতে গিয়ে বসল। কিছুদূর যাবার পর নিমচ বলল, আপনি বুন্দেলখণ্ডের চম্বলঘাটিতে যেখানে ইচ্ছে যেতে পারেন, কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করবে না, বাবার আশীর্বাদ পেলেন।

    রাহুল জানতে চাইল, ইনি কি এখানকার ধর্মগুরু ? পোশাক দেখে তো মনে হল বয়স্ক চাষি।

    নিমচ বলল, স্যার, উনি ডাকাত সরদার বাবা মুস্তাকিম ; সরকার ওনার মাথার দাম রেখেছে এক লক্ষ টাকা। যারা ওনার সামনে বসেছিল তারা ওনার দলের ডাকাত।

    ভাগ্যিস গুডলাক প্যান্টটা পরে এসেছিলুম, রাহুল নিজেকে নিঃশব্দে বলে আস্বস্ত বোধ করল। কতরকমের মানুষের আশীর্বাদ যে পেয়েছে জীবনে, যাদের আশীর্বাদ পাওয়া সহজ নয়। কিছুকাল পরে কাগজে পড়েছিল, উত্তরপ্রদেশের পুলিশ বাবা মুস্তকিমকে মেরে, রটিয়ে দিয়েছে যে ওর দলের লোকেরাই মেরেছে ওকে ; ওরা খবর পেয়েছিল যে বাবার কোঁচড়ে সবসময় শুধু মুড়ি থাকে না, তার তলায় থাকে লুকোনো টাকা। মেরে, কোঁচড়ের কয়েক লাখ টাকা মেরে দিয়ে, সরকার থেকে মুস্তকিমের মরা মাথার দামও গুনে নিয়েছে।

    এই প্যান্টটা পরেই অতগুলো শিষ থেকে ধানের শিষ বেছে ইনটারভিউতে সফল হয়েছিল ; ওর প্রতিযোগী তো কয়েক হাজার যুবক ছিল, তাদের অনেকেরই যোগ্যতা আর পড়াশুনা ওর চেয়ে ভালো, অথচ ওকে বেছে নেয়া হল।

    এই প্যান্টটা পরেই অঞ্জলির আলিঙ্গনে ঢুকেও বেরিয়ে আসতে পেরেছিল, নয়তো স্মাগলারের বউকে ধর্ষণ করার গ্লানিতে ভুগত সারাজীবন। স্মাগলারের বোষ্টুমি !

    এই প্যান্টটা পরেই মুম্বাইয়ের সেনচুরি বাজারের কাছে দাউদ ইব্রাহিমের স্যাঙাতদের ফাটানো বোমা থেকে একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিল রাহুল আর ওর স্ত্রী সুমনা ; অফিস থেকে ছেলের স্কুলে যাবার জন্য তাড়াতাড়ি বেরিয়েছিল, সেনচুরি বাজার পেরোবার পরই শুনতে পেল পেছনে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের আওয়াজ, সেই সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি। সেই বিস্ফোরণে সুমনাদের ‘লেডিজ ট্র্যাঙ্গল’ নামের গোষ্ঠী, যাতে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান মহিলারা ছিল, তা ভেঙে গিয়েছিল।

    ওদের গোষ্ঠীর সদস্যারা মুম্বাইয়ের তিনটি ধর্মস্হানে যেত প্রতি মাসে একবার। মঙ্গলবার প্রভাদেবীর সিদ্ধি বিনায়ক

    মন্দিরে, বুধবারে মাহিম চার্চের নোভেনায় আর শুক্রবারে ভাটার সময়ে হাজি আলির মাজারে। বিস্ফোরণের পর, যে যার আবার জন্মসূত্রে-পাওয়া নিজের-নিজের সম্প্রদায়ের খোলশে ঢুকে পড়েছিল। সুমনার বন্ধুমহলও বদলে যেতে লাগল তার পর থেকে। তারা ওকে টেনে নিয়ে গেল রামকৃষ্ণ মঠে, দীক্ষা নেবার জন্য। দীক্ষা নিয়ে, দুবছর বেশ জপ-তপ করল, তারপর ছেড়ে দিল, উড়ু-উড়ু মন আর একঘেয়ে বসে থাকার ক্লান্তিতে। ধর্ম থেকে, ততদিনে রঙিন টিভির জগতে যে বিস্তার ঘটল, তাতে রওনা দিল। কল্পনার জগতে। ধর্মের কল্পনা জগতের চেয়ে টিভির কল্পনা জগত অনেক রঙিন।

    সুমনার দীক্ষা সমারোহ দেখার জন্য গিয়েছিল রাহুল। দেখল, যিনি ওকে দীক্ষা দিলেন, বেশ বুড়ো একজন গেরুয়াপোশাক, তিনি ওর মাথায় একজোড়া কাপড়ে-মোড়া বালা, যা নাকি সারদা দেবীর, তা ছোঁয়ালেন। রাহুলের মনে পড়ে গিয়েছিল ওর মকদ্দমার সময়ে পেশকারবাবুর টেবিলে রাখা লাল শালুতে আগাপাশতলা মোড়া একটা মোটা বই, যার ওপর হাত রেখে সাক্ষীরা সবাই সত্য কথা বলার শপথ নিত। সেই দুজন পুলিশ ইনফরমার, লিটল অপেরা সম্পাদক, যাদের ও সাক্ষ্যদানের আগে কোনো দিন দ্যাখেনি, তারাও বইটায় হাত রেখে শপথ নিয়েছিল। ওর বিরুদ্ধ-পক্ষের সাক্ষী প্রভাস চোঙদার, কামেশ্বর চোঙদার, প্রদীপন চাটুজ্জে, রক্তিম চাটুজ্জে, চঞ্চলকুমারও শপথ নিয়েছিল বইটায় হাত রেখে। যেদিন ওর মকদ্দমা শেষ হল, রাহুল জিগ্যেস করেছিল পেশকারবাবুকে যে লালশালুতে মোড়া ওটা কী বই ? পেশকারবাবু কেবল একখানা রহস্যময় হাসি একান থেকে ওকান ছড়িয়ে ওনার কয়েকটা সোনালি দাঁত দেখিয়েছিলেন।

    রাহুলের সেই কর্ডুরয় প্যান্টটা এখনও আছে, কখনও সেলাই বাড়িয়ে, কখনও সেলাই কমিয়ে, কোমরের চরিত্র যেমন-যেমন বদলেছে।

    এখন, সত্তরে পৌঁছে, স্মৃতি খুঁটে, যখন এমিলিয়া বনিয়ার মুখ, রাণোর মুখ, তহমিনা আপার মুখ, অঞ্জলির মুখ, সুরেখা রেড্ডির মুখ, মীরা ব্যানার্জির মুখ, ও, রাহুল, হুবহু মনে করতে পারেনা, এক-একটা ভাসা-ভাসা মুহূর্ত কেবল ভেসে ওঠে, এত কিছু পড়ে ফেলেছে, এত অভিজ্ঞতা জমিয়ে ফেলেছে, অতীতকে বানিয়ে ফেলা সহজ। বানিয়ে ফেলতে হয়, টুকরো টুকরো দিয়ে গড়ে, খাপচা-খাপচা। সুমিতাদি বলেছিলেন, তোর জীবনের সবকটা মেয়েকে এক নামে লীন করে ফ্যাল, আর সেই নামকে নিয়ে নতুন-নতুন অপেরা লেখ, আর হ্যাঁ, তাতে তোর সুমিতাদিকেও রাখিস কিন্তু, ভুলে যাসনি যেন। রাহুল নতুন নাম পেয়ে গেল, আচমকা, ভিলে পারলের মাছের বাজারে, যখন এক বাঙালি যুবতী ওকে বলে উঠল, স্যার, আপনিই তো রাহুল সিংহ, আমি আপনার লেখা পড়ি, বেশ ভালো লাগে আপনার প্রিডেটর ডটপেন।

    –প্রিডেটর ? হিমালয়ের তরাইয়ের সেই বাঘিনীকে মনে পড়ল রাহুলের ; তার পারফিউমে ঢাকা গন্ধ।

    –হ্যাঁ স্যার, বাংলায় তো প্রিডেটর অপেরা-লেখক আর কেউ নেই।

    –থ্যাংকস। তোমার নাম কি ?

    –অবন্তিকা।

    যুবতীটি চলে যাবার পর বাড়ি ফিরে অবন্তিকাকে নিয়ে অপেরা লেখা আরম্ভ করেছিল রাহুল। প্রথম যে অপেরা লিখেছিল, ‘ব্লাড লিরিক’ শিরোনামে, মনে আছে আজও :

    অবন্তিকা, তোর খোঁজে মাঝরাতে বাড়ি সার্চ হল

    এর মতো ওর মতো তার মতো কারো মতো নয়

    যেন এমন যেন অমন যেন তেমন নয়

    কী করেছি কবিতার জন্য আগ্নেয়গিরিতে নেমে ?

    একি একি ! কী বেরোচ্ছে বাড়ি সার্চ করে

    কবিতায় ? বাবার আলমারি ভেঙে ব্রোমাইড সেপিয়া খুকিরা

    কবিতায়। হাতুড়ির বাড়ি মেরে মায়ের তোরঙ্গে ছেঁড়া বিয়ের সুগন্ধী বেনারসি

    কবিতায়। সিজার লিস্টে শ্বাস নথি করা আছে

    কবিতায়। কী বেরোলো ? কী বেরোলো ? দেখান দেখান

    কবিতায়। ছি ছি ছি ছি, যুবতীর আধচাটা যুবা ! মরো তুমি মরো

    কবিতায়। সমুদ্রের নীলগোছা ঢেউ চিরে হাড়মাস চিবোচ্ছে হাঙর

    কবিতায়। পাকানো ক্ষুদ্রান্ত্র খুলে এবি নেগেটিভ সূর্য

    কবিতায়। অস্হিরতা ধরে রাখা পদচিহ্ণে দমবন্ধ গতি

    কবিতায়। লকআপে পেচ্ছাপে ভাসছে কচি বেশ্যা-দেখা আলো

    কবিতায়। বোলতার কাঁটাপায়ে সরিষা-ফুলের বীর্যরেণু

    কবিতায়। নুনে-সাদা ফাটা মাঠে মেটেল ল্যাঙোট ভুখা চাষি

    কবিতায়। লাশভূক শকুনের পচারক্ত কিংখাবি গলার পালকে

    কবিতায়। কুঁদুলে গুমোট ভিড়ে চটা-ওঠা ভ্যাপসা শতক

    কবিতায়। হাড়িকাঠে ধী-সত্তার কালো-কালো মড়া চিৎকার

    কবিতায়। মরো তুমি মরো তুমি মরলে না কেন

    কবিতায়। মুখে আগুন মুখে আগুন মুখে আগুন হোক

    কবিতায়। মরো তুমি মরো তুমি মরো তুমি মরো তুমি মরো

    কবিতায়। এর মতো ওর মতো তার মতো কারো মতো নয়

    কবিতায়। যেন এমন যেন অমন যেন তেমন নয়

    কবিতায়, অবন্তিকা তোর খোঁজে সার্চ হল, তোকে কই নিয়ে গেল না তো !!

    একজন মানুষকে, নিজেকে যে কিছু-একটা হয়ে উঠতে হয়, সে যে একজন সাবজেক্ট, সাবজেক্টের বিপরীতে যে অবজেক্ট জগৎসংসার, এ-সমস্ত ভাবনাচিন্তা, রাহুল যে পরিবারে, পাড়ায় আর পরিবেশে ছোটোবেলায় কাটিয়েছে, সেখানকার লোকেদের ছিল না। ছোটোবেলায়, আর তার পরেও অনেককাল পর্যন্ত ও জানত যে একজন মানুষের নানারকম প্রয়োজন মেটাবার দরকার হয়, আর সে-সব প্রয়োজন মেটাবার জন্য তাকে নানা উপায়-ফন্দিফিকির খুঁজতে হয়। এই কাজটা তার জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে, লোকটাকে নিজেকেই কিছু একটা হয়ে উঠতে হবে, সেরকম ধ্যানধারণা বা শিক্ষা, রাহুলের বাবা-জ্যাঠামশায়ের বা প্রতিবেশীদের কারোর কাছ থেকে পায়নি। কিছু জিনিসপত্র পেলে ভালো হয়, অমুক কাজটা বড়ো হয়ে করতে পারলে ভালো হয়, এমন ইচ্ছে পেয়ে বসত বটে পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে।

    চেতনা একটা নির্মিত ব্যাপার, একটা কন্সট্রাক্ট। কেউ যদি জীবনে কিছু একটা হবার আকাঙ্খা পোষণ করে তো ওটা নির্মিত, ওটা কন্সট্রাক্টেড ; অবজেকটিভ জগতটি দ্বারা নির্মিত। কিন্তু যে বাস্তবতাকে একজন লোক প্রত্যক্ষ করছে, রাহুল করছে, সেটিও কোনো না কোনো মাধ্যম আশ্রয় করেই পৌঁছোচ্ছে। ভাষার মাধ্যমে, অবধারণার মাধ্যমে, বস্তুনামের মাধ্যমে, চিহ্ণ বা ছবির মাধ্যমে। মাধ্যমের দ্বারা নির্মিত, কন্সট্রাক্টেড। রাহুলের হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা, তার মানে, মাধ্যম ছাড়া সম্ভব নয়। যেহেতু নির্মিত, তাই অবিরাম নির্মিত হতে থাকে। যা অবিরাম পরিবর্তিত হয়ে চলেছে, তার আবার হয়ে ওঠে কেমনতরো ! কেউ কি প্রিডেটর হয়ে ওঠে ?

    অঞ্জলির গল্পের মতন। অশান্তি সৃষ্টি করে উধাও হয়ে যাবার কাহিনি। রাহুল বলল, তোর বর কি স্মাগলার হয়ে উঠেছে ? তুই কি স্মাগলারের বোষ্টুমি হয়ে উঠেছিস ?

    পার্স দেবার জন্য আলমারি খোলার সময় রাহুলকে তিনটে সোনার বিস্কুট দেখিয়েছিল অঞ্জলি, বেশ ভারি ; বলেছিল সাত ভরির হয় এগুলো। সোনা ! সোনার বিস্কুট দেখে গলায় শ্লেষ্মা জমে গিয়েছিল রাহুলের। হাতে তুলে নিলেও, তাড়াতাড়ি ফেরত দিয়েছিল। হয়ত গিলে ফেলে, পরে গু থেকে বের করেছে এরা। ধুলেও, গু-এর মাইক্রোবস কি সহজে যায়, তাও স্মাগলারের গু। কিংবা অঞ্জলির গু-ও হতে পারে। গু থেকে বের করা সোনা দিয়ে হয়তো কারোর বিয়ের আংটি তৈরি হবে। প্রাক্তন প্রেমিকার গু থেকে পাওয়া সোনা গলিয়ে বিয়ের আংটি !

    –আঙুলের ছাপের ভয় পাচ্ছিস ? কানপুরের বাড়িতে, বাথরুমে, শাওয়ারের তলায় তো তিন লক্ষ শিশু আমার স্তনমণ্ডলির দিকে উড়িয়ে যাবি বলেছিলি, অথচ আজ ওড়াতে পারলি না, তাদের কয়েকটার স্বপ্ন কি আর আমার নাইটি

    ধরে ঝুলছে না ভাবছিস ! তুই সেরকমই থেকে গেলি, নাইভ, ইররেসপনসিবল, উচ্চাকাঙ্খাহীন, ম্যাদামারা, লক্ষ্মীটি-মার্কা, বেসিকালি কাওয়ার্ড। হয়ে উঠতে চাস না।

    — রাতটা থেকে যাব ? এখান থেকেই ট্রেনিং সেন্টারে চলে যাব সকালে ? তোর সঙ্গে জাস্ট একটু সময় কাটিয়ে

    নেয়া। নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য কয়েকটা মিথ্যা কথা বলে ফেলল রাহুল।

    জড়াজড়ি করতে চেয়েছিলিস, পেয়েছিস। আমি চেয়েছিলাম, পেলাম না। বারবার চাইবার কী আছে ? লোকে ঘরকুনো হয়, তুই মনকুনো। কুঁকড়ে ল্যাজ গুটিয়ে পিছিয়ে গিয়ে, আবার চাই চাই চাই চাই করাটা বাচ্চাদের মানায় ; তুই তো এখন একটা লোক। ইম্যাজিন ? লোক ! এ কাওয়ার্ড জেনটলম্যান, প্রোব্যাবলি উইথ ডিসফাংকশানাল সেক্স।

    –তুই কিন্তু আমায় একজন নতুন নারীকে পাইয়ে দিলি।

    –নতুন নারী ? নারী ? কীরকম শুনি। নারী শব্দটা কেমন যেন নোংরা মনে হয়। নারী শুনলেই চোখের সামনে একজন উলঙ্গ পেটমোটা ভারিবুক ভারিপাছা মাগির ছবি ভেসে ওঠে। এনিওয়ে, বল..

    –জীবনানন্দ দাশের নাম শুনেছিস তো ?

    –ওই বনলতা সেনের কবি ? পড়িনি, শুনেছি।

    –হ্যাঁ। বনলতা সেন কেবল জীবনানন্দেরই ছিল। সতীসাধ্বী, টাচ-মি-নট, ওয়ান-ম্যান-উওম্যান।

    –আমার লেখার নারী…..

    –জানি, শি ইজ আ বিচ ! ইয়েস, আই নো হু আই অ্যাম।

    –হ্যাঁ, আমার লেখার নারী সতীসাধ্বী নয়, ওয়ান-ম্যান-উওম্যান নয়, সে পাঠকের সঙ্গেও শুতে পারে, আলোচকের সঙ্গেও ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডে রাত কাটাতে পারে, সে স্মাগলারের বোষ্টুমি হতে পারে, নিজের শরীরকে নিয়ে যা ইচ্ছে করতে পারে, সে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

    –কারেক্ট, আমি এরকমই। প্রশ্ন হল যে তুই সেরকম নারী চাস কিনা।

    –কে বলল তুই আমার অপেরার নারী ? আমার কল্পনাকে জবরদখল করার চেষ্টা করছিস তুই। আমি আমার অক্ষরের নারীকে বলব না, ওইখানে যেওনাকো তুমি, বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে।

    –সেটাই তো হওয়া উচিত। জীবনানন্দের বনলতা সেন কি ওনার স্লেভগার্ল ছিলেন ? কবিরা নিজেদের কবিতায় এরকম স্লেভগার্ল পুষতে চায় কেন বলতো ? হিংসুটে ছিল লোকটা। প্রেমের কবিগুলো এরকম হিংসুটে হয় কেন ? প্যাট্রিয়ার্কাল? শেকসপিয়ার তাই ওনার বয়ফ্রেণ্ডকে নিয়ে সনেট লিখেছেন। পণ্ডিচেরিতে, আই মিন আশ্রমের গেস্টহাউসে, একটা কাপল ছিল, পুরুষ কাপল।

    –তোকে খুঁজে পেয়ে আমি রিডিফাইন করতে পারলুম আমার অক্ষরের নারীকে। আমার পাঠকদের, যে পাঠকই পড়বে,, তার বিছানায় আমার কল্পনার নারীকে ছেড়ে দেব।

    –নো প্রবলেম, এনি ডে। লেখিকাদেরও উচিত তাদের কল্পনার পুরুষদের অমন স্বাধীনতা দেয়া। অবশ্য পুরুষগুলোকে স্বাধীনতা দেবার দরকার হয় না, ওরা জন্মগতভাবে লেচার, তোর মতন।

    অঞ্জলির এই সান্নিধ্যের রেশ রাহুলের কলমে সঞ্চারিত হয়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে একটা লেখায়, আর সেই রচনাটার জন্যই ওকে নিয়ে টানাটানি হয়েছিল ; ওর কয়েকজন বন্ধুও বিপদে পড়েছিল, এমনকি দাদা অনিকেত, যিনি প্রকাশক ছিলেন, তিনিও। লেখাটা কিন্তু ছিল অত্যন্ত কুল ক্যালকুলেটেড একটা রচনা, সাপের ঠান্ডা রক্ত কলমে ভরে লেখা, আদ্যন্ত নিরীক্ষামূলক। প্রায় একমাস ধরে শব্দ খুঁজে, বাক্য গঠন করে, লিখেছিল। চেয়েছিল বাংলা ভাষায় ভিন্ন সংবেদের প্রসারণ, চেয়েছিল তৈরি-কথার ছবিতে স্পিড বা গতি আনতে, একটা লাইন থেকে আরেকটা লাইনকে, এই সমাজের মানুষগুলোর মতনই, আলাদা ব্যক্তিত্বের ছবি পরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিল।

    অঞ্জলির বাড়ি থেকে রাহুল ট্রেনি হোস্টেলে ফিরতে পারেনি, ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে পুলিশ ব্যারিকেডের জন্য। মিছিল থামাবার জন্য ব্যারিকেড। ডালহাউসি চার ধার থেকে বন্ধ। বাস পোড়ানো হয়েছে, শুনল। অমর বসু, রাম চ্যাটার্জি, চিত্ত বসু, মাখন পাল, মোহিত মৈত্রদের নাকি লাঠিপেটা করা হয়েছে। পেছনের স্ট্র্যান্ড রোড দিয়ে হাওড়ায় পৌঁছে শেওড়াফুলির লোকাল ট্রেন ধরল, ঠাকুমার আশ্রয়ে রাতটা কাটাবার জন্য। প্রচুর গল্প আছে সবাকসুন্দরীর স্টকে, সেকালের কলকাতার বাবু-বিবিদের কেচ্ছা।

    বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে ক্রিয়েটিভ লেখালিখি। ব্যাপারটা অদ্ভুত। লেখালিখি নিয়ে ব্যবসা করলে তা হয়ত হয় না, ব্যবসাদার-ব্যবসাদার ভাই-ভাই পরিবেশ থাকে, ব্যবসাদারি লাভের প্রতিযোগীতা থাকে।

    ক্রিয়েটিভ লেখালিখি, এমনকি অমন লেখালিখির পত্রিকা সম্পাদনা করলেও, বন্ধুদের শত্রু করে তুলতে পারে। ওর লেখালিখির জন্য যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপতারি পরোয়ানা বেরিয়েছিল, তারা সকলেই ওর শত্রুতে রূপান্তরিত,

    কেউ-কেউ তখনই, কেউ আবার পরে, কেউ অনেক পরে যখন চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে।

    লালবাজারে অনিল ব্যানার্জি নামের ইন্সপেক্টার, যে পরে নকশাল খতমকারী হিসাবে সরকারি যশ পেয়েছিল, তার জেরায়, রাহুলের সামনেই, কেঁদে ফেলেছিল প্রভাস চোঙদার বা জুনিয়ার চোঙদার আর কামেশ্বর চোঙদার বা সিনিয়র চোঙদার। দু’জনে চুপচাপ যে মুচলেকা লিখে দিয়েছে, আন্দোলনের বিরুদ্ধতা করেছে, আন্দোলনের মতের বিরোধী, তা লিখে জানিয়েছে, তা তো বহুকাল পরে, ওকে যখন চার্জশিট দেয়া হল, তখন জানতে পেরেছিল রাহুল। রাহুলের উষ্মার বিষে ওরা রূপান্তরিত হল যদুবংশের মিথ্যাবাদি চোঙদারে।

    রাহুলের যে আগাম সন্দেহ হয়নি তা নয় ; একদিন লালবাজার থেকে, ভবদেব মিত্র আর ওর বন্ধুনি রোশনির সঙ্গে হাওড়া স্টেশানে গিয়ে সিনিয়ার চোঙদারকে দেখতে পেয়ে হাত তুলে নামধরে চেঁচিয়েছিল ; ওকে দেখতে পেয়ে কামেশ্বর চোঙদার দৌড়ে গিয়ে, উঠে পড়ল, প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যাচ্ছে যে ট্রেনটা, তাতে। ভবদেব আর রোশনির আগ্রহে রাহুল সেদিন তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চের ওপর দাড়িয়ে সেই লেখাটাই পড়েছিল, যেটা নিয়ে মকদ্দমা চলছিল। কত লোক জড়ো হয়ে গিয়েছিল, কী ঘটছে দেখার জন্য, কেউ-কেউ হয়তো বক্তৃতা শোনার জন্য। তার আগে ভবদেব ঘড়ির তলায় দাঁড়িয়ে নিজের ‘হত্যাকাণ্ড’ নামের লেখাটা পড়েছিল। এখন, প্রায় পাঁচ দশক পর, হাওড়া স্টেশানে পা ফেলার জায়গা নেই, কারোর সময় নেই অন্যদিকে তাকাবার, সকলেই দৌড়োচ্ছে, যাচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে । কত ফাঁকা থাকত তখনকার দিনের হাওড়া স্টেশান।

    শেয়ালদা ফাঁকা থাকত না ; সেখানে তখন অসহায় রিফিউজিদের ক্রুদ্ধ সংসারের ধ্বংসাবশেষ।

    যদুবংশের চোঙদার শুনে হরিচরণ খাঁড়ার, না, সেসময়ে নয়, প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে, রাহুলের ওপর গোঁসা উথলে উঠেছিল। সেসময়ে তো ও চোঙদারদের ওপর খাপ্পা, ওদের অপেরায় ওকে কোনো ভূমিকা দেয়া হয়নি বলে।

    রাহুলদের আন্দোলনকে টিটকিরি মেরে, একটা ফিলমে, নামকরা পরিচালক, আন্দোলনের অপেরা-নটের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ; সেই ফিলমে কয়েকজন আন্দোলনকারীর নাম নায়ক উচ্চারণ করলেও, হরিচরণের নামটা করেনি, ফিলমের লেখক নির্ণয় নিতে পারেননি যে তিনি হরিচরণ খাঁড়ার নাম উল্লেখ করবেন না কি দুর্গা বর্মণের। হরিচরণের ধারণা দেড় হাজার মাইল দূর থেকে রাহুলের কলকাঠি নাড়ায় ওর নাম বাদ গেছে। রাহুল তো একে-তাকে বাদ দেবার যে প্রথা আগেকার নট্ট কোম্পানিরা পত্তন করেছিল সেই প্রথাকেই বর্জন করতে চেয়েছিল।

    যখন রাহুলের লেখাটা নিয়ে বিচার চলছিল, আর রাহুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় উঠেছিল জুনিয়ার চোঙদার, রাহুলের পেছনের গরাদের খাঁচার ভেতর থেকে একজন বিপজ্জনক আসামি ওকে বলেছিল, ‘তুমহারে ধন্দে কা আদমি তুমহারে খিলাফ গবাহি দে রহা হ্যায় ? ছোড়না মত। ভুন দেনা সালোঁকো। কাহাঁসে পকড়কে লায়ে থে ইন চুতিয়োঁকো তুমহারে ধন্দে মেঁ !’

    জামিনে ছাড়া ছিল বলে রাহুল দাঁড়াত লোহার গরাদের খাঁচায় পিঠ ঠেকিয়ে, আর পেছনের দরোজা দিয়ে ঢুকত বিপজ্জনক আসামিরা, যারা জামিন পায়নি, ডাকাতি খুন ইত্যাদির অপরাধে আটক। ওর মামলা নিয়ে প্রায়ই মন্তব্য শুনত খাঁচার ভেতর থেকে, কর্কশ কোনো উত্তেজিত কন্ঠের। রাহুলের উদাসীনতার ব্যাখ্যা বোধহয় খুঁজে পেতো না তারা।

    ধান্দা !

    লেখালিখি, শেষ পর্যন্ত, সত্যিই ধান্দা হয়ে গেল ! পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এরকম সন্দেহে আক্রান্ত হয়েছে রাহুল সিংহ। ক্রিয়েটিভিটি কি ধান্দাবাজি ? তাহলে দূরত্ব তৈরি করে তা বজায় রাখাটাই এখন প্রধান কাজ। ধান্দা থেকে দূরে। সম্বর্ধনা পুরস্কার ইত্যাদি যাবতীয় জমঘট থেকে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে, একক অস্তিত্ব নিয়ে, নিজের নির্জনতাকে আগলে।

    কানপুরের ফৌজদারি আদালত জামিন দিয়ে হুকুম দিয়েছিল কলকাতায় গিয়ে ম্যাজিসট্রেটের সামনে সারেনডার করতে। সারেনডার মানে যে ফৌজদারি আদালতের প্রথম ম্যাজিস্ট্রেটের ঘরে উকিল-মুহুরি-অপরাধীদের গিজগজে, পা রাখার জায়গা নেই এমন ঠাসাঠাসি ঘেমো ভিড়, সে ধারণা ছিল না রাহুলের ; উকিল দরকার।

    পিসেমশায় ওনার বড় ছেলে দুর্জয়, মানে, ঝন্টুর মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছেন যে ওনার একজন পরিচিত উকিল আছে। ফৌজদারি আদালত-বাড়িটা যে এরকম ভুলভুলাইয়া, বাড়িটার বিভিন্ন ঘরে ছড়ানো তেরো-চোদ্দোটা এজলাস, তা এক নম্বর এজলাসের প্রধান বিচারক রাহুল-অনিকেতকে জামিন দিয়ে, বিচার প্রার্থনার জন্য নয় নম্বর এজলাসের

    চশমাচোখ বিচারকের কাছে না পাঠালে, পোড়ো হাভেলির ভাঙা দরোজাগুলো মেলাতে পারত না রাহুল। পরে, বামপন্হীরা মসনদে বসার পর যখন ওনাদের এদিক-ওদিকে তাকাবার ফুরসত হল, বাড়িটার হাল ফিরিয়েছে।

    সে-সময়ে, যখন রাহুলের বিচার চলছিল, বাড়িটা ছিল নরকের কলকাতিয়া ভার্সান। বহু বামপন্হী নেতাকে আসতে

    হতো আদালতটায়, যখন তারা বিরোধী পক্ষে ছিল। মসনদে বসার পর সারিয়ে, ওপরতলাটা তাদের প্রিয় লালরঙে রাঙিয়ে, পুরো না হলেও, অনেকটা ভোল পালটিয়ে দিয়েছে।

    কলকাতায় মাথা গোঁজবার ঠাঁই বলতে পিসেমশায়ের বাড়ি। তিন মেয়ে আর ছয় ছেলে নিয়ে একটা ছোট্টো ঘরে থাকেন উনি, খাটের তলাতে শুতে হয় ওনার বাড়ি গেলে, সকাল থেকে হাগবার লাইন লাগে, গামছা পরে স্নান করতে হয় চৌবাচ্চার ধারে দুতিনজন মিলে। অবিরাম জল পড়ে-পড়ে চৌবাচ্চার চারপাশ এমনই পেছলা যে এক হাতে চৌবাচ্চার পাড় আঁকড়ে, আরেক হাতে ঘটি নিয়ে স্নান।

    পিসেমশায় অনিকেত-রাহুলের গ্রেপ্তার হবার খবর পেতেই জানিয়ে এসেছিলেন নিজের শাশুড়িকে, মানে, রাহু-কেতুর ঠাকুমা সবাকসুন্দরী দেবীকে। তাঁর প্রিয় নাতি কেতুর গ্রেপ্তারের সংবাদে ঠাকুমা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলেন। কলেজে পড়ার সময়ে কেতু তাঁর সঙ্গেই থাকত, শ্যাওড়াফুলির ভেঙে-পড়া জমিদারবাড়িতে, চিলেকোঠার ঘরে। হার্ট অ্যাটাকের তৃতীয় দিনে মারা গেলেন। উনি মারা যেতে কানপুর থেকে বাবা-জ্যাঠা-কাকারা সবাই জড়ো হলেন শেওড়াফুলির খণ্ডহরে।

    ভাগ্যিস ঠাকুমাকে আগেই লেখাটা পড়ে শুনিয়ে ছিল রাহুল। খালি গায়ে, কোমরে গামছা ঝুলিয়ে, মুখময় ফিকফিকে হাসি মাখিয়ে, শুনেছিলেন ঠাকুমা। শুনে জানতে চেয়েছিলেন, এটা তোর মোচরমান মেয়েটা তো নয়, এ আবার কারা-কারা, বলিসনিতো ; অমন শক্ত-শক্ত কথা লিখিছিস, তা লোকে পড়ে বুঝতে পারবে তো ?

    –লোকে বলেছে অশ্লীল।

    –তার মানে ?

    –নোংরা-নোংরা।

    –তা নোংরা ব্যাপারটা কি ব্যাটাছেলেদের একচেটিয়া ?

    অনিকেত আর ও গ্রেপ্তার হতে, বাবা-কাকা-জ্যাঠা আর মা-কাকিমা-জেঠিমা সবাইকে শোনাতে হয়েছে। সকলেই জানতে চেয়েছেন এরা কারা-কারা, কখন ভাব-ভালোবাসা করলি এতজনের সঙ্গে, ইশকুলের না কলেজের, না ওই সুমিতার দলের ? ঠিক জানি সুমিতাই লেলিয়ে দিয়েছে ওর দলের কয়েকটাকে, না রে ? একে নিজে সুন্দুরি, তায় আবার সুন্দুরি মেয়েদের মোচ্ছোব। সবকটা মেয়েই কি বেমমো ?

    বড়-জ্যাঠা বললেন, মা মারা গেল বলে তোরা নিজেদের দায়ি করিসনি। আমাদের পরিবারে সেই সুলতানি আমল থেকে প্রত্যেকটা প্রজন্মে কেউ না কেউ গ্রেপ্তার হয়, মামলা হয়, ভোগান্তি হয় ; আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলুম, আমার কাকা গ্রেপ্তার হয়েছিল, আমার দাদুর ভাই গ্রেপ্তার হয়েছিল। বড়-জ্যাঠার কথাগুলো, অনেককাল পর, যখন ওর ভাইপো, অনিকেতের বড় ছেলে গ্রেপ্তার হল, তখন মনে পড়ে গিয়েছিল। বংশের রক্তেই তো শাসক-বিরোধিতা।

    ন্যাড়া শুধু বড় জ্যাঠা হয়েছিলেন। অন্য ভাইদের বলেছিলেন, তোদের আর বুড়ো বয়সে খোট্টাদের মতন সবাই মিলে ন্যাড়া হবার দরকার নেই ; রাহু-কেতুর মামলায় কোর্টে কি ন্যাড়ার দল যাবে ?

    সবাকসুন্দরী দেবী আগাম না জানিয়ে মারা যাওয়ায়, রাহুলের বাবার মুখ গোমড়া। হেস্তনেস্ত করা হল না। খণ্ডহরের ট্যাক্স, দাদু মারা যাবার পর থেকে দিয়ে এসেছেন বাবা। ঠাকুমা মারা যেতে, ঘোষণা করে দিলেন, শোকসভাতেই, যে, আর উনি ট্যাক্স দেবেন না, এই পোড়ো-বাড়ি সম্পর্কে ওনার কোনো আগ্রহ নেই। ‘’যে জমিটা কোতরঙে মার নামে কিনেছিলুম, মা না জানিয়ে ওটা বিশেকে লিখে দিলে, ভেবেছিলুম বুড়ো বয়সে দেশে ফিরে থাকব, তা আর হল না। ’’ বিশে সবচেয়ে ছোটো ভাইয়ের নাম। নিঃসন্তান বিশে, পরে, সে জমি লিখে দিয়েছিল নিজের শালার মেয়ের নামে। শালার মেয়ে সে জমি বেচে দিয়ে, বিশে আর বিশের বউকে নিয়ে চলে গেছে কোন্নোগর।

    শোকসভায় বিশে আর বিশের বউ অনুপস্হিত। ছোটোকাকা বিশেখুড়ো, ছেলেপুলে হয়নি বলে, শালার মেয়েকে পুষ্যি নিয়েছিলেন। যৌবনে বেশ যৌনরোমান্টিক ছিলেন রাহু-কেতুর বিশেখুড়ো। সবাকসুন্দরী দেবীকে দিয়ে জমি লিখিয়ে নেবার পর, যখন কানপুর ছেড়ে হঠাৎ কোতরঙে চলে গেলেন, তখন ওনার বাক্স-প্যাঁটরা সবই পড়েছিল ওনার কানপুরের ঘরে, বহু বছর, হয়তো কখনও আসবেন, এই আশায় তাতে কেউ হাত দেয়নি। কলকাতার পুলিশ রাহুকেতুর মা-বাবার আলমারি-তোরঙ্গ ভাঙার সময় ভাগ্যিস বিশেখুড়োর বন্ধ ঘরে রাখা ওনার জিনিসপত্রে হাত দেয়নি। দিলে,

    ওনার তোরঙ্গের তালা ভাঙলে, যা বেরোতো তা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ত।

    কানপুরের বাড়ির পুরোনো জিনিসপত্র বিক্রি করার নির্নয় নেয়া হলে, বিশেখুড়োর জঙধরা তোরঙ্গ ভাঙার পর,

    পুরোনো জামা-কাপড়ের তলায় পাওয়া গিয়েছিল একটা পেটমোটা ফোটো-অ্যালবাম। অজস্র শাদা-কালো ফোটো, সবই

    বিশেখুড়োর বউয়ের, নানা আঙ্গিকে, সম্পূর্ণ নগ্ন। আদর্শ নগরের বাড়ি যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন, বিশেখুড়ো আর ওনার বউ ঝিমলিকাকিমা, থাকত নির্মীয়মান বাড়িতে, দুজনে মিলে রাজমিস্ত্রি-ছুতোরদের কাজ তদারক করার জন্য। রাতে, ফ্ল্যাশলাইটে, সেই বাড়িতে, পঁচিশ বছর বয়সী ঝিমলি-বউয়ের ফোটো তুলত বিশেখুড়ো। বিশেখুড়োর কল্পনার অপ্সরাদের নগ্ন প্রতিমা বিশেখুড়োর বউয়ের নানা আঙ্গিকে ধরে রাখা। গ্রিক দেবীদের মতন, বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা তেলরঙা নিউডের মতন অ্যান্টিক সোফায় আধ-শোয়া, গায়ে রবারের কালো সাপ জড়ানো ইভ বাঁহাতে আপেল ধরে আছে। কল্পনাকে যতটা অবাস্তব করে তোলা যায়।

    দুর্জয় ওরফে ঝন্টুদা ফোটোগুলো দেখতে পেয়ে, বলেছিল, চল বাইরে নিয়ে গিয়ে জ্বালিয়ে ফেলতে হবে। বাড়ির লোকেরা জানলে কেলেঙ্কারি ; বাইরের লোকেরা টুকরো-টাকরা দেখলেও টের পাবেনা ।

    —জ্বালাবে তো ছিঁড়ে জ্বালিয়ে ফেলো, একটা-একটা করে অতক্ষণ কী দেখছ ?

    –দেখছি, অমন সুন্দরী ছিল তো বাচ্চা হল না কেন। তুই রাজকাপুর-নার্গিসের ফিলিম দেখেছিস ?

    –বরসাত দেখেছি।

    –ঝিমলিমামি হুবহু নার্গিস।

    –দেখা তো হয়ে গেছে, এবার ছিঁড়ে জ্বালিয়ে ফেল।

    –শালা, আগে যদি এগুলো পেতুম তো বিশেমামাকে ব্ল্যাকমেল করে দিদিমার জমিটা আমার নামে লিখিয়ে নিতুম।

    –যাকগে, এবার নষ্ট করে ফেল।

    –করছি, করছি, একটা রেখে নিলুম, যদি কখনও ব্ল্যাকমেল করার চান্স পাই, বলা তো যায় না।

    ঝণ্টুদা একটা রেখে বাকিগুলো ছিঁড়ে জ্বালিয়ে নষ্ট করে ফেলেছিল।

    পিসেমশায় ওনার বড় ছেলে দুর্জয় ওরফে ঝন্টুকে নিয়ে অনিকেত-রাহুলদের সঙ্গে গেলেন ওনার পরিচিত ফৌজদারি উকিলের বাড়ি। উকিলের বাবাও উকিল ছিলেন, তাঁর বাবাও উকিল ছিলেন। বাড়িতেই ওনার বিশাল অফিসঘর, চারিদিকে কাচের আলমারিতে ঠাসা মোটা-মোটা আইনের বই, সোনালি আর রুপোলি অক্ষরের কোমরবন্ধ-পরা। উকিলবাবুর পশার নিশ্চয়ই ভালো। চেয়ারে, বেঞ্চে, নানা কিসিমের মানুষ-মানুষী। মেঝেতেও দেয়ালে ঠেসান-দিয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন ওথলাবুক-যুবতী আর ক্লান্ত পৌঢ়া, যাদের পোশাক দেখে গরিব বলে মনে হল রাহুলের।

    উকিলমশায়ের চশমাচোখ নির্দেশে ওরা বসল ওনার বিশাল টেবিলের ডানধারে। কনুইয়ের খোঁচা মেরে ঝন্টুদা রাহুলকে ইশারা করছিল জানালার বাইরে কারোর দিকে। রাহুল বিরক্ত হচ্ছিল তাতে। অনিকেত গম্ভীর।

    পিসেমশায়কে মুখ তুলে দেখতে পেলেন উকিলমশায়, বললেন, কী হল পাঁচকড়ি, আবার তোমার ছেলে কুকম্ম করতে গিয়ে ধরা পড়েছে ? আগেই বলেছিলাম যে বিয়ের বয়স হতে চলল, দিয়ে দাও, এই বয়সে শরীর ছোঁক-ছোঁক করবেই।

    পিসেমশায় কোনো চটপট জবাব দিচ্ছেন না দেখে উকিলমশায় বললেন, কী হল, তোমায় ধরেছে নাকি ? তোমাকে তো সব্বাই চেনে এ-পাড়ায় ; আমি তো বলেও দিয়েছি যাতে তোমাকে অযথা হেনস্হা না করে।

    ঝন্টু বলল, জেঠু, কেসটা আমার মামাতো ভাইদের। ওরা ওই অপেরা-টপেরা লেখালিখি করে তো, লালবাজারে আলিপুর-বালিগঞ্জের বড়োবড়ো-বাঙালিরা নালিশ ঠুকেছে ওদের লেখার বিরুদ্ধে। ওরা অ্যারেস্ট হয়েছিল, জামিনে ছাড়া পেয়ে কলকাতার ফৌজদারি আদালতে সারেনডার করতে এয়েচে।

    –আরে সরকারের বিরুদ্ধে আর লেখা কেন ? দেশ তো স্বাধীন হয়ে গেছে। প্রফুল্ল সেন এমনিতেই সেমসাইড গোল দিয়ে চলেছে ; ফাইল পড়ার সময় নেই, গপ্পের বই পড়বে কি পায়খানায় হাগতে বসে ?

    –না, ওদের একশো কুড়ি বি আর দুশো বিরানব্বুইতে ধরেছে। ওরা মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে গিয়ে খামে ভরে পিচবোর্ডের মুখোশ দিয়ে এসেছিল, রাক্ষসের মুখোশ, তাতে ছাপিয়েছিল ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন’। অনিকেতের পিসেমশায় বললেন।

    –পুলিশ কমিশনারকেও জোকারের মুখোশ পাঠিয়েছিল, বলে, ঝন্টু অনিকেতকে জিগ্যেস করল, আর কাকে-কাকে পাঠিয়েছিলিস রে ?

    –সবাইকে, বলল রাহুল, একশো মুখোশ কিনে তার পেছনে স্লোগানটা ছাপানো হয়েছিল। তারপর যোগ করল,

    সংবাদপত্র মালিক আর বুদ্ধিজীবীদেরও দেয়া হয়েছিল, কয়েকজন জেলা ম্যাজিসট্রেটকেও।

    –তাতে কী ! ও তো বেশ মজার খেলা বলতে গেলে। ইনটারেসটিং অ্যাক্টিভিটি। তাই বলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ? তার ওপর অশ্লীল ভাষায় রাষ্ট্রকে আক্রমণ ? দেখছ যে প্রফুল্ল সেন চালের যোগান দিতে, আলুর যোগান দিতে কুলিয়ে উঠছে না, রাজ্যপাট চালাতে পারছে না, কাঁচকলা খেতে বলছে। কারা কমপ্লেন করেছে কিছু জানা গেছে ? বড়োবড়ো-বাঙালি, বলেছ বেশ।

    –না, ওরা আজকেই এসেছে। আগে ওদের দিয়ে সারেনডারটা করিয়ে দিন। দুর্জয় ওরফে ঝন্টু বলল।

    –ওরা একটা আন্দোলন শুরু করেছে আর নানা বিষয়ে ইংরিজি-বাংলায় ইশতাহার ছেপেছে ; পলিটিশিয়ানদের বলেছে, বেশ্যার ডেড বডি আর গাধার ল্যাজের মিক্সচার। বলে, মুচকি হেসে, পাঁচকড়ি তাকালেন অনিকেতের দিকে।

    –পলিটিকাল ম্যানিফেস্টোতে আরও আটটা পয়েন্ট আছে, বলল অনিকেত।

    –রিলিজিয়ান নিয়েও একটা ইশ্তাহার বের করেছে, পাঁচকড়ি জানালেন উকিলকে।

    –এত কাণ্ড-কারখানা চলছে কলকাতায়, খবর পাইনি তো ! আমি কি বড়ো-বাঙালি নই নাকি ! অ্যাডভোকেট রুমেও কেউ তোলেনি ব্যাপারটা। মনে হচ্ছে গভীর পাঁকের জীবদের চটিয়েছ তোমরা। দলে তোমরা দুই ভাই না আরও সাঙ্গ-পাঙ্গ আছে ?

    –আমরা তিরিশ-চল্লিশজন হবো।

    –তিইইইরিশ-চল্লিশ জন ? দলটার নাম কি ?

    –সর্বভূক।

    –ভূক ? সর্ব ? ওব-বাবা। তাহলে প্রফুল্ল সেনের স্যাঙাতরা তো চটবেই। আঁতে ঘা দিয়েছ দেখছি। একে তো রিফিউজি পাবলিক রোজই ডালহাউসি অভিযান চালাচ্ছে, শহরে-শহরে মিছিল-মিটিং হচ্ছে, বাস-টাস পুড়ছে, তার ওপর তোমরা যদি ওনার গোদের ওপর কাঁইবিচি হয়ে উদয় হও, কেলেঙ্কারি কেস। গাধার ল্যাজ এবং বেশ্যার ডেড বডি, কারেক্টলি অ্যান্টিসিপেটেড ইম্যাজিনেশান বলতে হবে, তাদের কপুলেশান থেকে যদি পলিটিশিয়ানদের জন্ম দিতে হয়। আমার বাপ-ঠাকুদ্দাও এমন কেস লড়েনি।

    উকিলমশায় ওনার মুহুরিকে বললেন অনিকেত আর রাহুলের সই নিয়ে নিতে, ওকালতনামায়। অনিকেতকে বললেন, ওসব ইশ্তাহার-টিসতাহার, মুখোশ, লেখাপত্তর আর যা-যা করেছ, তার একখানা করে কপি আমার মুহুরির কাছে জমা দিও। কালকে সকাল নটায় ব্যাংকশাল কোর্টে পৌঁছৈ যেও। কোর্টটা কোথায় জানো তো ?

    ঝন্টু বলল, আজ্ঞে আমি নিয়ে যাবো। জামিনদার হবার জন্য বাবাকে কী-কী নিয়ে যেতে হবে ?

    –বাড়ির দলিল থাকে তো ভালো, তা নইলে ইনকাম সার্টিফিকেট এনো। দুজন আসামী তো, তাই আরেকজন জামিনদার যোগাড় করে এনো।

    ওকালতনামা সই করা হয়ে গেলে পিসেমশায় চলে গেলেন। ঝন্টু থেকে গেল অনিকেতদের সঙ্গে, ও অনিকেতের সমবয়সী আর ছোটোবেলাকার বন্ধু, এক সঙ্গে সাঁতরে গঙ্গা পারাপর করত। পিসেমশায় চলে যাবার পর, উকিলবাবুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে, পথে নেমে, ঝন্টু বলল, ওই যে দেখছিস সামনের গলিটা, তোকে ওদিকে তাকাতে বলছিলুম, ওটাই সোনাগাছি ; যে মেয়েগুলো উকিলবাবুর চেম্বারে মেঝেয় বসে আছে, তারা সোনাগাছির, ওদের সঙ্গের লোকগুলো ফড়েবা ভেড়ুয়া, ওই যাদের বলে পিম্প, কোনো না কোনো মামলায় পুলিশ এদের ঝুলিয়ে দিয়েছে, টাকা খসাতে পারেনি, কতই বা রোজগার ওদের, বল।

    অনিকেত ঝন্টুকে বলল, শালা তুইও সোনাগাছি ট্রিপ মারিস, ধরাও পড়েছিস পুলিশের হাতে। বলিসনিতো ?

    –বলব আবার কী ? বাবাও তো যায়, বাবা কি মামাদের কখনও বলেছে। মামারা জানে, আমার মাও জানে, তোদের ঠাকুমাও জানত। তোর রামায়ণ কোম্পানির বন্ধুদেরও চিনিয়ে দিয়েছি। আজ তো শনিবার, অপেক্ষা কর একটু, দেখতে পাবি কাউকে-কাউকে।

    কলকাতার আদালতের অভিজ্ঞতা ছিল না। কোথায় যে তা-ই জানত না রাহুল-অনিকেত। ফেকলু উকিলরা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ‘সাক্ষী চাই ? সাক্ষী চাই ? এফিডেভিট করাবেন ?’ বলে চেঁচায় মক্কেল ফাঁসাবার ধান্দায়। একতলার সারাটা আদালত চত্ত্বর জুড়ে, যেখানে যে চিলতে মতন জায়গা পেয়েছে, টুলের ওপর রংচটা টাইপরাইটার রেখে ফটর-ফটর ট্যারা-বেঁকা টাইপ করে চলেছে রোগাটে খ্যাংরা বা ভেতো-পেট টাইপিস্টের কাতার। তাদের ঘিরে

    চোপসানো-মুখ, আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন লিটিগ্যান্টের গ্যাঞ্জাম। নিচেতলার আদালত চত্তর জুড়ে তেলেভাজা, কাগজ-কলম,

    অমলেট, ভাত-রুটির খুপরি-ঠেক। কোর্ট পেপার কেনার দীর্ঘ কিউ। ইংরেজরা যেসব বিহারিদের চাপরাসি-ঝাড়ুদার-আরদালির কাজ দিয়েছিল, তারা নিচেতলার প্রতিটি খাঁজখোঁদোল আর ফাঁকা পরিসর জবরদখল করে ছেলেপুলে নিয়ে সংসার পেতে ফেলেছে। আদালত-বাড়ির পেছন দিকে শুকোয় তাদের শাড়ি শায়া ব্লাউজ বডিস জাঙিয়া ট্রাউজার স্কুলের ইউনিফর্ম শিশুর জামা। জেল থেকে জামিন না-পাওয়া খতরনাক দাগিরা পুলিশের বন্ধ গাড়িতে এলে, পানাপুকুরে ঢিল পড়ার মতন ক্ষণিকের জন্য ভিড়টা সরে গিয়ে নিজের জমঘটে ফিরে আসে।

    বড় জ্যাঠা, নিজের ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে, কেতু-রাহুলের পিসেমশায়কে বলেছিলেন, পাঁচু, তুমি আর ফৌজদারি উকিল পেলে না ? রাঁঢ়-বাড়ির উকিল ধরালে ?

    জবাবে কেতু-রাহুলের পিসেমশায় বলেছিলেন, ও উকিল আজ ওব্দি কোনো কেস হারেনি, ঠিক জিতিয়ে নিয়ে আসবে। চোখের সামনে খুন করল যে গুণ্ডা, তাকেই ছাড়িয়ে নিয়ে এলো, আর এ তো কোন ছার, দুচার-পাতা লেখা। আমার বিয়ের সময় তোমরা তুলতুলে কাগজে বিয়ের যেরকম পদ্য ছাপিয়েছিলে, এ সেরকমধারাই ব্যাপার।

    রাহুল-অনিকেতের জন্য বিচার্য নয় নম্বর এজলাসটা ওপরতলায়, সিঁড়ির প্রথম পাকের পর দ্বিতীয়। মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হবার আগে পর্যন্ত প্রভাস চোঙদার আর কামেশ্বর চোঙদারও নিজেদের উকিল নিয়ে এই এজলাসে হাজিরা দিয়েছে। সবাই যে-গাড্ডায় ও-ও সেই গাড্ডায় যুক্তিতে হরিচরণ খাঁড়া কোনো আলাদা উকিল করেনি। বাদবাকি যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপতারি পরোয়ানা ছিল, তারা আপাতত গা ঢাকা দিয়েছে, অশোকনগর, আগরতলা, বিষ্ণুপুরে। বিচারকের মাথার ওপরের হলুদ টুনিটা ছাড়া জানলাহীন এজলাসে আলো ঢুকতে ভয় পায়। দুই-ব্লেডের বিশাল ছাদপাখা, যার অবিরাম ঔপনিবেশিক কাতরানি অবসর নেবার অনুরোধ জানাতে থাকে উত্তরঔপনিবেশিক কর্ণধারদের।

    এজলাসের পেশকারকে সবাই গাংলিবাবু বলে ডাকে, যিনি চাকুরিতে যোগ দেবার সময় ছিলেন বলাই গঙ্গোপাধ্যায় নামের যুবক। রাহুলের বিচারের সন-তারিখে পৌঁছে উনি তেলচিটে কালো, মুষকো, সারাদিন বসে থাকার কুমড়োভুঁড়ি থলথলে আদল, চকচকে টাক, মোটা কালো ফ্রেমের বাইফোকাল, আর মেটে-ময়লাটে ধুতি-পাঞ্জাবিতে সেই যুবকটির ধ্বংসাবশেষে রূপান্তরিত। কখনও হাসেন না। সারা কলকাতার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ-শব্দ নয় নম্বর এজলাসে বছরের পর বছর জমে-জমে ওনাকে চুবিয়ে রেখেছে তার সংমিশ্রণের দিনগত-পাপক্ষয়ী আরকে।

    পুলিশ কেবল রাহুলকে চার্জশিট দিয়ে, বাদবাকি সবাইকে ছেড়ে দেবার পর, জানা গেল, চোঙদারভাইরা মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হয়েছে বলে ওদের বিরুদ্ধে কেস তুলে নিয়েছে সরকার। ছাড়া পাবার আগে চোঙদাররা সরকারকে বলত প্রতিষ্ঠান ; ছাড়া পাবার পর খবরের কাগজ কোম্পানির সরকার ফ্যামিলিকে বলে প্রতিষ্ঠান। শুধু রাহুলকেই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে দেখে ওর বলিয়ে-কইয়ে বন্ধুরা শিস দিতে-দিতে হাওয়া। রাহুল-অনিকেতকে অবাক করে চার্জশিটের সঙ্গে রাহুলের বিরুদ্ধে যে সরকারি সাক্ষীর তালিকে দেয়া হয়েছে, তাতে কেতুর কলেজ-বন্ধু প্রদীপন চাটুজ্জে, রক্তিম চাটুজ্জে আর চঞ্চলকুমারের নামও লেখা।

    অনিকেতকে রাহুল বলল, দেখলে তো, অসীম গাঙ্গুলি বিদেশ থেকে ফিরলেন, আমরা গ্রেপতার হলুম, আর এনারা ডিগবাজি খেলেন।

    –জানি, ব্যাপারটা কাকতালিয় নয়, বলল কেতু।

    চার্জশিট পাবার আগে পর্যন্ত রাহুল-অনিকেতকে জেরা করার নামে প্রায় প্রতি সপ্তাহে ডাকা হতো লালবাজারের প্রেস সেকশানের ইনটারোগেশান রুমে। ডেকে বসিয়ে রাখা হতো আর শোনানো হতো পাশের ঘরে যাদের প্যাঁদানি দেয়া হচ্ছে তাদের কান্নাকাটি-কাতরানি-চিল চিৎকার। তদন্তকারী ইন্সপেক্টর আদালতকে জানাতো যে তদন্ত চলছে, অনুসন্ধান পুরো হয়নি। রাহুল-অনিকেতের বন্ধুরা যে ওই প্যাঁদানির প্রতিধ্বনিতে ভুগে-ভুগে, কেঁদে-ককিয়ে মুচলেকা লিখে, দে-পিটটান দিয়েছে, তাতে রাহুল-অনিকেতের সন্দেহ নেই।

    তদন্তকারী ইন্সপেক্টর একদিন সন্ধ্যায় অনিকেতকে জানাল যে কালকে ঠিক সকাল দশটায় পুলিশ কমিশনার আপনাদের সঙ্গে দেখা করবেন, ওনার ঘরটা জানেন তো। স্বাভাবিক যে জানত না ওরা। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের বাইরে অন্য বিভাগে যাবার প্রয়োজন হয়নি। ঘুরে-ঘুরে লালবাজার দেখার একটা ইচ্ছে অবশ্য ছিল, ট্যুরিস্টদের মতন।

    পরের দিন পৌঁছে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর, কমিশনারের ঘরে নয়, ওনার পাশের ঘরে, কনফারেন্স রুমে যেতে বলা হল। ওরা ঘরে ঢুকে দ্যাখে একটা লম্বা টেবিলের চারিধারে বসে আছেন, বলা যায় প্রায় সকলেই পেটমোটা,

    গম্ভীরমুখো লোক। কমিশনার যে কে তা বোঝা গেল, ওনার নামও পি. সি. সেন, বসবার চেয়ারও উঁচু।

    অনিকেত-রাহুলের জন্য দুটি চেয়ার ফাঁকা ছিল, তাতে ওদের বসতে বলা হল। থ্যাংকস জানিয়ে বসল। তদন্তকারী ইন্সপেক্টরের মাধ্যমে ওদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হল উপস্হিত কেদারানশীনদের সঙ্গে, লিগ্যাল রিমেমব্র্যান্সার, হোম ডিপার্টমেন্টের সচিব, সেনা বিভাগের কর্নেল, ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার, চব্বিশ পরগণা আর হাওড়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, প্রমুখ। পুলিশ কমিশনারের সামনে দুটো ঢাউস ফাইল রাখা।

    অনিকেত-রাহুল এতদিনে টের পেল যে কলকাতার, দুর্জয়ের ভাষায় বড়-বাঙালি কেউকেটারা, ওদের দুজনের সম্পর্কে যে-ধরণের নালিশ ঠুকেছেন, তা এই কর্মকর্তারা সাধারণত পান না ; এখন ওঁদের মুশকিল হয়েছে এতজনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ দায়ের করে তা থেকে বেরোবার উপায় বের করা। পুলিশ কমিশনারই প্রথমে মুখ খুললেন, আপনারা দাঁতের মাজনের বিজ্ঞাপনের মতন হ্যাণ্ডবিলে আর্ট মুভমেন্ট করছেন ? এভাবে ক্রিয়েটিভ আর্ট হয় ?

    রাহুল বলল, এভাবে দ্রুত পাঠকের কাছে যাওয়া যায়, সে হাতে পেয়ে চোখ বোলাতে বাধ্য হয়, দাঁতের মাজনের বিজ্ঞাপনের মতন। পত্রিকা হলে তার সময় ও ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হতো, তাকে কিনতে হতো। হ্যাণ্ডবিলের মাধ্যমে তার সময়ে হস্তক্ষেপ করে, তার ইচ্ছা না থাকলেও, তাকে বাধ্য করা হচ্ছে একবার পড়ে নিতে। কেবলমাত্র আগ্রহীদেরই বিলোনো হয়। দাঁতের মাজনের মতো সাধারণ পাবলিককে বিলি করা হয় না, অত ছাপাবার মত টাকাকড়িও নেই আমাদের।

    –আপনাদের লজিস্টিক্স, আই মিন ফিলজফি, একটু বুঝিয়ে বলুন তো। সেনা বাহিনীর কর্নেল জানতে চাইলেন।

    অনিকেত-রাহুল এবার নিজেদের বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়ে গেল। মগজে জমে থাকা চিন্তাভাবনার খোলা হাওয়ায় উড়াল। অনিকেত জিওফ্রে চসার থেকে টেনে নিয়ে গেল সময়ের ক্ষুধায়, বর্তমান সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ে। রাহুল টেনে নিয়ে গেল অসওয়াল্ড স্পেংলারের ইতিহাস দর্শনে। কথা বলতে-বলতে ওদের কন্ঠস্বর ক্রমশ বিদ্যায়তনিক হয়ে উঠছিল। দুজনের লেকচার শুনতে বসে, বুঝতে পারছিল ওরা দুজন, একেবারে অজানা চিন্তার দিকে নিয়ে চলেছে অফিসারদের।

    –আপনারা এলিট নাগরিকদের আক্রমণ করছেন কেন ? হোম ডিপার্টমেন্টের সচিবের প্রশ্ন।

    অনিকেত বলল, আমরা তো কাউকে আক্রমণ করিনি, ওনারা আক্রান্ত বোধ করছেন, ইতিপূর্বে এই ধরণের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না।

    –শুধু টেবিলের তলায় পা দুলিয়েছেন তাঁরা। মানে, ওনাদের মনোদৃষ্টিবান মানুষ বলা যায় না।

    –মুখোশ বিলি করার আইডিয়াটা কার ? জানতে চাইলেন লিগাল রিমেমব্রান্সার।

    রাহুল বলল, আমার।

    –মুখ্যমন্ত্রীকেও পাঠিয়েছেন ? কতজনকে পাঠিয়েছেন ?

    –হ্যাঁ, বলল রাহুল। প্রায় একশোজনকে।

    –আমার অফিসে এসেছে, বললেন চব্বিশ পরগণার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।

    –লালবাজারে আমার দপতরেও এসেছে। ওনার সামনের একটা ফাইল ওলটাতে-ওলটাতে বললেন পুলিশ কমিশনার। অনিকেত দেখলো, ওদের বুলেটিন, পত্রিকা সবই রয়েছে ফাইলটায়।

    –টাকা-পয়সা কোথা থেকে আসে। জানতে চাইলেন হাওড়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ওনার লোকেরা সম্ভবত হরিচরণ খাঁড়ার বাড়িতে নজরদারি করে খরচের সমস্যা সমাধান করতে পারেননি।

    অনিকেত বলল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা দুই ভাই-ই করি, অন্যেরাও কখনও সখনও করে। হ্যান্ডবিলে বিশেষ খরচ হয় না।

    –টপলেস প্রদর্শনী করাবার কথা ছিল, ইনভিটেশান কার্ড পেয়েছিলেন অনেকে, তা হল না কেন ? প্রশ্ন করলেন হোম ডিপার্টমেন্টের সচিব।

    রাহুল ঠোঁটে সামান্য হাসি খেলিয়ে বলল, যারা ভেবেছিলেন যে টপলেস বলতে বুক-খোলা মেয়েমানুষ বোঝায়, তাদের ঘাড়ের ওপর মাথাটা, বা টপটা নেই। ওটাই টপলেস, নিজেরা যে প্রকৃতপক্ষে বোকা, মগজহীন, তা যাতে ওনারা বুঝতে পারেন আর আত্মধিক্কারে ভুগতে পারেন, তাই।

    –নামগুলো তো দুই ভাইয়ের খাসা ; সিংহকে রাহু আর কেতুর মুখোশ পরিয়ে রেখেছ নিজেরাই, চেয়ার ছেড়ে

    ওঠার সময় বললেন পুলিশ কমিশনার।

    ঘন্টা দুয়েক দুজনকে এভাবে জেরা করার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছিল।

    তার পরের সপ্তাহে সবাইকে রেহাই দিয়ে কেবল রাহুলের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হল। জেরার রকমফের দেখে রাহুল আঁচ করেছিল যে যারা নালিশ ঠুকেছে তাদের মূল লক্ষ্য ও-ই। চার্জশিটের দিন অনিকেত রাহুলকে বলেছিল, অসীমের মূল লক্ষ্য তুই, আর যারা নালিশ ঠুকেছে তাদের মূল লক্ষ্যও তুই, কিরকম মিলে যাচ্ছে ব্যাপারটা। বিশ্বাস করতে মন চাইছে না যে এটা কাকতালীয়, না কি সুতোর খেই খুঁজলে শেষটা ওঝাপুরের চৌকাঠেই পৌঁছোবে। ও তো ফিরেছে, একদিন যাবো ওর বাড়ি। পাকাবুদ্ধির চাল চেলেছে।

    রাহুল বলেছিল, প্রকৃত সূত্র প্রতিষ্ঠান, তা সে লোকটা অ-আ-ক-খ যেই হোক না কেন। অসীম গাঙ্গুলি রূপকারের কর্মী মাত্র।

    মামলা আরম্ভ হতে, কলকাতায় যাওয়া আর ফিরে আসার ঝামেলা এড়াতে রাহুল এক-একদিন এক-এক জায়গায় রাতের আশ্রয় নিতো। সুকোমল রুদ্রের জ্যাঠামশায়ের স্যাকরার দোকানে, হরিচরণ খাঁড়ার বাসায়, বড়োবাজারে হিন্দি পত্রিকার মারোয়াড়ি সম্পাদকের ব্যবসার গদিতে ; যেখানে পারে সেখানেই রাতটা কাটিয়ে দিত। চোঙদার-ভাইরা মুচলেকা দেয়ার পর থেকে ওকে এড়িয়ে যেত; শুরুতে ওদের টালার ভাড়াবাড়িতে, পরে ওদের মেসবাড়িতে, রাহুলের জন্য ‘প্রবেশ নিষেধ’ বোর্ড লটকিয়ে দিয়েছিল।

    চার্জশিটের সঙ্গে পুলিশের সাক্ষীদের নাম দেখে উকিল মশায় গম্ভীর। বললেন, ও হে, ফৌজদারি মামলা হয় অবজেকটিভ এভিডেন্স দিয়ে। তোমার বিরুদ্ধে তো দেখছি বেশ কয়েকজন নট সাক্ষী হয়েছে, তোমার দলের লোকেদেরও নাম রয়েছে। কেসটাকে ওরা সাবজেকটিভ করে দিয়েছে। তোমাকেও তো কয়েকজন নট-নটী যোগাড় করতে হবে।

    শুনে, রাহুলের পিসেমশায় বললেন, এই তোমার পশার ? এখন সাবজেকটিভ-অবজেকটিভ কাজিয়ার হ্যাঙ্গাম দেখাচ্ছ ! জানতুম আমি, আগেই জানতুম, লেখালিখির কেস খুনের কেসের চেয়ে কঠিন, তা তুমি শুনলে না। শালাদের কাছে আমার মাথা কাটা গেল। একে তো এই মামলার জন্যে শাশুড়ি গত হলেন।

    উকিলমশায় চোখ থেকে চশমা বাঁহাতে নামিয়ে বললেন, কেউ খুন হলে সাক্ষীরা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলে না যে খুন করতে কেমন লাগে, ভালো না খারাপ, বুঝেছ ? রেপ কেস হলে সাক্ষীকে কি জিগ্যেস করা হয় যে রেপ করতে কেমন লাগে ? এই কেস সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। জজসায়েব হয়তো নিজেই পড়তে বসবেন, তখন ? খুনের মামলায় কি জজসায়েব নিজে খুন করে দেখে নেন যে খুন করা কেমন ?

    রাহুলের কিছু করার নেই, কেননা কোর্ট-কাছারির মারপ্যাঁচ ওর জানা নেই, আদালতের প্রতিদিনের কচকচি বিরক্তিকর আর গা-বেঁধানো হয়ে উঠেছে।

    একটা ডেট থেকে আরেকটা ডেটের মাঝে সপ্তাহের বেশি সময় থাকলে রাহুল চলে যেত শ্যাওড়াফুলির ঠাকুমাহীন খণ্ডহরে। ভবদেব মিত্র, মানব রায়, আর বেনারস থেকে দুই চিত্রকর বন্ধু, নির্মল মিত্র বাউলা আর অনীক খাস্তগীর এসে, খণ্ডহর গুলজার করে তুলত। ওদের গাঁজা-টানা দমকা হাসিতে উড়তে আরম্ভ করত অবহেলিত পায়রার ঝাঁক। সবাকসুন্দরী দেবী মারা যাবার পর বারোঘরের বিশাল খন্ডহরে একা থাকতে ভালো লাগত না চাপা-বেদনাবোধে আক্রান্ত রাহুলের। পুরো খণ্ডহরটাই যেন বিষাদে ভুগে নোনা ইঁটের আর্তি ঝরিয়ে চলেছে, অবিরাম। ঠাকুমা যখন ছিলেন ওনার রাঁধা হবিষ্যান্ন খেয়ে চলে যেত। বন্ধুদের কাছে খণ্ডহর প্রিয় ছিল স্বাধীনভাবে আড্ডা, মাদক ফোঁকা, ইত্যাদির স্বাধীনতার জন্য। ঠাকুমা মারা যাবার পর বাড়ির সিংদরোজার পাল্লা দুটো আর পায়খানা দুটো, যেগুলো ছিল সিংদরোজার বাইরে, সেগুলোর কপাটও চুরি হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুদের বলে দিতে হতো যে পায়খানায় গেলে বাইরেই মগ রেখে দিতে, যাতে বোঝা যায় যে ভেতরে কেউ বসে ধ্যান করছে। রাহুল কানপুরমুখো হলে ওরাও কানপুর চলে আসত।

    একবার অনীক আর নির্মল বাউলা আন্দোলনের পোস্টার আঁকতে খণ্ডহরে এলো ; ভবদেব আর মানবও পৌঁছে গেল কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে। সকালে মুড়ি-লাঁচা লঙ্কা খেয়ে-খেয়ে চোঁয়া ঢেঁকুর মারায় ভুগতে থাকলে, ভবদেব প্রস্তাব দিল যে রূপদর্শীর বাড়ি যাওয়া যাক রবিবারের সকালে, উনি তো একদিন রাধাবল্লভি আর আলুর দম খাবার ব্রেকফাস্টের নেমন্তন্ন দিয়ে রেখেছেন।

    রূপদর্শীর মালিকানায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েড ‘আয়না’তে রাহুলদের টিটকিরি মেরে চুটকি আর কার্টুন

    প্রকাশিত হতো, যার মূল সুর ছিল সর্বভূকদের লেখা বিদেশি প্রভাবিত। ওরা গিয়েছিল সম্পাদকের খোঁজে। একজন

    ছেঁড়া গেঞ্জি পরা লোক হদিশ দিলে যে রূপদর্শী হলেন পত্রিকাটির মালিক। রাহুলরা ওনার ট্যাবলয়েড দপতরে গিয়ে হাঙ্গামা করেছে শুনে রূপদর্শী এক সাংবাদিকের মাধ্যমে খবর পাঠালেন যে ওরা যেদিন ইচ্ছে ওনার বরানগরের বাড়িতে রাধাবল্লভি-আলুর দম সহযোগে ব্রেকফাস্ট করতে পারে।

    সেই মত রাহুল ভবদেব অনীক নির্মল গিয়ে হাজির হল ওনার বাসায়। দরোজার বাইরে থেকেই হাঁক পাড়ছিল সবাই মিলে, “আমি দাসু রায়, আমি দাসু রায়, হামি দাসু রায়।”

    উনি দরোজা খুলেই, যদিও ওদের কাউকে দেখেননি কখনও, বললেন, দাসু রায় নাম শুনেই বুঝেছি, কাদের আগমন হল।

    তর্কাতর্কি শুরু করে উনি বললেন, ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাবের কথা। ভবদেব প্রসঙ্গ তুলল বাংলা ভাষায় সনেটের আঙ্গিক, জীবনানন্দে ইয়েটস, মানব প্রসঙ্গ তুলল তিরিশের লেখায় ঔপনিবেশিক প্রভাব যা প্রাকঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যে দেখা মেলে না। অনীক-নির্মল তুলল রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকায় ফরাসি প্রভাব।

    রাহুল কোনো আলোচনা না করে কেবল আলুর দমের গুণগান করছিল, কত নরম আলু, কী স্বাদ, এত বড়-বড় করে কেটে ভাজার পরেও ভেতরে মশলা ঢুকতে পেরেছে।

    রূপদর্শী বুঝতে পারলেন যে রাহুল সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে তর্কটা চালিয়ে নিয়ে চলেছে। উনি বললেন, ও, রূপদর্শীকে গুলগল্পের টেক্কা দিচ্ছ !

    রাহুল বলল, হ্যাঁ দাদা, আলু জিনিসটা আমাদের দেশের নয়, বেশি দিন হল আসেওনি। এই কন্দমূল পোর্তুগিজরা প্রথম জাহাঙ্গিরের দরবারে উপহার দিয়েছিল। ইনকাদের ধ্বংস করে লাতিন আমেরিকা থেকে স্পেন লাল আলু নিয়ে গিয়েছিল ইউরোপে। সেখান থেকে ইউরোপের উপনিবেশগুলোয় পৌঁছোয় আলু। পোর্তুগিজরা পেরু-বলিভিয়া থেকে শাদা আলু এনেছিল ভারতবর্ষে। আমাদের দেশে ওয়ারেন হেস্টিংস দেহরাদুনে আলু চাষের ব্যবস্হা করেন, তাই শাদা আলুকে অনেকে বলে নৈনিতাল আলু। চন্দ্রমুখি আলু, যাকে আপনি মনে করছেন বাংলার মাটি থেকে জন্মেছে তা ওই নইনিতাল আলু। ওই আলুর জন্যই প্রফুল্ল সেন হিমসিম খাচ্ছেন, কেননা বাঙালির পাতে আজ আর আলু না হলে চলে না।

    –দাসু রায় আর কাঁচকলা, রাধাবল্লভীতে কামড় দিয়ে বলল ভবদেব মিত্র।

    রূপদর্শী রাহুলের পিঠ চাপড়ে বললেন, মক্কেল দেখছি ব্রিফ তৈরি করেই কেস লড়তে এসেছে ; ঠিক আছে নিমন্ত্রণ রইল, পরের বার ফুল কোর্স লাঞ্চ খাওয়াবো। লাঞ্চ খাবার আর সুযোগ হয়নি, কেসের অবিরাম হয়রানির জন্য, আদালতের খরচের দরুণ, পকেটে ছ্যাঁদা হয়ে যাবার যোগাড় তখন।

    রাহুল যখন, মমমমমমম, কত বছরে পড়েছে, মমমমমমম, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, শরিকরা সবাই বাড়িটা বেচে দেবার তোড়জোড় করায়, অনিকেত আর ও শ্যাওড়াফুলির খণ্ডহর বিক্রিতে রাজি হয়ে গেল। মকদ্দমার পর রাহুল ওই বাড়িতে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিল ; ওর খুড়তুতো বোন, তার নকশাল আন্দোলনকারী প্রেমিক পুলিশের গুলিতে খুন হয়ে গেলে, বড়ঘরের বরগায় ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। ওই বাড়িতে গেলেই রাহুল ছোড়দা ডাকের প্রতিধ্বনির গুঞ্জন শুনতে পেত। সবাকসুন্দরী দেবীর হাসির প্রতিধ্বনি শুনতে পেত।

    আদালতে, যে এজলাসে ওর মকদ্দমা চলত, সেখানেই একজন বৃদ্ধের আত্মহত্যার মামলাও চলত। অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল লোকটা। বোধহয় মামলাটা লড়ে জেতার মধ্যে দিয়েই অবসাদ থেকে ছাড়ান পেয়েছিল। জানা হয়নি রাহুলের।

    এজলাসে, বিচারকের টেবিলের বাইরে, ডানদিকে দেয়াল-ঘেঁষে, জালঘেরা লোহার শিকের খাঁচা, জামিন-না-পাওয়া বা অন্য মামলায় দণ্ড-পাওয়া দাগি আসামিদের জন্য, যারা জেল থেকে পুলিশভ্যানে এসে ওই খাঁচার পেছনের দরোজা দিয়ে ঢোকে। খাঁচার জাল আর মেঝে নোংরা হয়ে আছে গয়ের থুতু কফ বমি খইনি পিকের ছোপে। রাহুল বা ওর মতন যারা জামিনে-ছাড়া তারা ওই জালের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ায়, পায়ে ব্যথা করলে খাঁচায় ঠেসান দিয়ে। খাঁচার দাগিরা নানা মন্তব্য করতে থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাহুলের সমর্থনে, কেননা লেখার বা শায়রি করার জন্য মামলার কথা তারা শোনেনি আগে।

    বিচারকের টানা টেবিল, ওনার বসার চেয়ারের বাঁদিকে, যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে আর্চ-দেয়া

    দরোজার খাদির নোংরা পর্দা সরিয়ে উনি এজলাসে আসেন আর যান। এলে, সবাই উঠে দাঁড়ায়, নিশ্চিন্ত হয়, কেননা

    কে কখন থেকে, কবে থেকে, তার স্বজনজ্ঞাতির ডেটের আর শুনানির জন্য অপেক্ষা করছে, তা, তাদের মুখ দেখে মনে

    হয়, একশো বছর, হাজার বছর, বা তারও বেশি। এত মকদ্দমা জমে আছে যে বেশিরভাগ শুনানি হয় দশ-পনেরো মিনিটের, বড়োজোর আধঘন্টা।

    এজলাসের মেট্রপলিটান ঘর্মাক্ত গ্যাঞ্জামে আর চেয়ার-বেঞ্চে স্বাস্হ্যবতী ছারপোকাদের প্রেমনিবেদনের মাঝে বেশিক্ষণ বসতে পারেনা রাহুল। এ-এজলাস সে-এজলাস ফ্যা-ফ্যা করে, মশলাদার সওয়াল-জবাব হলে দাঁড়িয়ে শোনে, কী ভাবে খুন-ধর্ষণ-ডাকাতি-ছিনতাই-চুরি-মারপিট-পকেটমারি-লুটপাট-দখল-বেদখল-চুল্লুবিক্রি-আত্মহত্যা-বউভাগানো ইত্যাদি গল্পের জট খুলছে আর পাকাচ্ছে। ওর কেস ওঠার সময় হলে মুহুরিবাবু রাহুলকে খুঁজে-পেতে ডেকে নিয়ে যান, খাঁচায় পিঠ দিয়ে দাঁড়াবার জন্য। অমন দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া ওর আর কোনো ভূমিকা নেই। প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত আদালতে রাহুলকে মুখ খুলতে হয়নি। মামলায় ‘আমি’ বলতে অপরাধীকে বোঝায় না, ‘আমি’ মানে অপরাধীর উকিল। উকিলই বলে, “আমি দোষী নই।”

    উকিলবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনের লাইটপোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে ছিল ওরা তিন জন ; ঝন্টু বিড়ি ফুঁকতে আর অনিকেত-রাহুল একটা সিগারেট ভাগাভাগি করে ফুঁকতে ব্যস্ত।

    সিগারেট ফুঁকে অনিকেত চলে যাবে, ওর হাতে আড্ডা দেবার সময় নেই। তিন বছর হল ওর বিয়ে হয়েছে, মেয়ের বয়স মোটে দু’বছর, তার ওপর এই হ্যাঙ্গাম। বলল, এ নিশ্চয়ই অসীমের কাজ ; বিদেশ থেকে ফিরেই পোঁদে লেগেছে, অতুল্য ঘোষের কাগজে কাজ করত, অনেক চেনা-জানা করে ফেলেছিল, তাদের ধরাধরি করে বাঁশ দিতে নেমেছে, প্রদীপন বলেছিল যে বিদেশ থেকে কড়া চিঠি লিখতো সবাইকে, যাতে আমাদের আন্দোলনকে ভেঙে দেয়া হয়, রাহুলকেও হুমকি দিয়ে লিখেছিল, ফিরুক, তারপর দেখে নেবে, ওর গায়ে পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে।

    –হ্যাঃ হ্যাঃ, আমি মাইরি কোনো নদীর পাড়ে হাগবার সুযোগ পাইনি আজও। হরিদ্বারে গঙ্গার পাড়ে হাগলে আর তার ঠাণ্ডা কনকনে জলে ছোঁচালে নাকি ছাঁৎ করে সোজা স্বর্গে যাওয়া যায়, বলল ঝন্টু।

    তিনজনে চুপচাপ বিড়ি-সিগারেট ফোঁকায় ব্যস্ত। ফোঁকা হয়ে গেলে, ফুটপাতে পা দিয়ে ঘষে নেভালো।

    ঝন্টু ফিসফিস করে বলে উঠল, ওই দ্যাখ, ওই দ্যাখ, পুরো রামায়ণ কোম্পানি চলেছে, ওরা গলিতে ঢুকুক তারপর তোদের দেখাবো কোন বাড়িতে ঢুকল।

    –বুদ্ধদেব বসুর বদল্যার পড়ার এই ফল। তবে বদল্যার তো দল বেঁধে যেত না। বলল অনিকেত।

    –বুঝলিনে, বেঁধে-বেঁধে থাকলে খরচ কম, হোলসেল রেট। বলল ঝন্টু।

    –তিরিশের সময় থেকে বিদেশি কবিরা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষ। নিজের দেশের কবিয়ালদের পাত্তা দেয়া হয় না। উইলিয়াম ব্লেক ছিল ছুতোর, ফ্লবেয়ার আর র‌্যাঁবো ছিল জাতচাষা, ওদের দেশের মণ্ডল বা ধাড়া বা বেরা, তাদের পুর্বপুরুষ ভাবতে বাঙালি কবিরা লজ্জা পায় না, যত লজ্জা নিজের বাপ-চোদ্দোপুরুষকে স্বীকৃতি দেয়ায়। গত বছর যে সাইক্লোস্টাইল করা বুলেটিন বেরিয়েছিল, তাও মোটে পঁচিশ কপি, যেটা বিলি করা হয়েছিল সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ কফিহাউসে, ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছিল কলকাতায়। অথচ একটা আপাত ইনোসেন্ট ছক ছিল তাতে, দেখলেই বুঝতে পারতে। ভোলা ময়রা, গোঁজলা গুঁই, লালু, নন্দলাল, রামজি, রঘু, কেষ্টা মুচি, নিতাই বৈরাগী, ভবানী বেনে, হরু ঠাকুর– এনাদের পূর্বপুরুষ হিসাবে দেখানো হয়েছিল, এখনকার ব্রাহ্মণ, কায়স্হ, বদ্যি কবিদের। ব্যাস, কলকাতা তেলে-বেগুনে। সুকোমল রুদ্রকে ঘিরে ধরেছিল কফিহাউসের সামনে।

    –অনেকে আবার নিজেদের দেবীদেবতার জায়গায় গ্রিস-রোমের অ্যাডোনিস, আফ্রদিতি, লেডা, ভেনাস, ইউলিসিস ইত্যাদিকে এনে গৌরব বোধ করে।

    –দাঁড়াকবি নাম দিয়ে কবিয়ালদের অপমান করেছে, এমনকি বাংলা ভাষার নামকরা অধ্যাপকরাও করেছে ; ওরা বুঝতেই পারেনি, শেষ লড়াইটার জন্য সেইসব ভূমিজ কবিরা নিজের দু’পায়ে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিল। চতুষ্পদ থেকে প্রাণীরা কেন আর কী-কী কারণে হাত দুটোকে ফ্রি করতে চাইল, করে জীবজগতে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল, তা খতিয়ে দেখেননি। আসলে ওনারা জীবনের সমস্তকিছু সাহিত্যের মালমশলা প্রয়োগ করে ব্যাখ্যা করতে চাইতেন।

    –এখন বদল্যারি ফাঁদে পড়েছে।

    –চ না, আমরাও ফাঁদে পড়ি, ঝন্টুর প্রস্তাব।

    –না না, আমরা কোনো বেশ্যার ঘরে যাবো না, বলে, চলন্ত বাসে উঠে পড়ল অনিকেত।

    –তুই চল, ঝন্টু বলল রাহুলকে, ওরা কোন বাড়িটায় ঢুকবে আমি জানি, আমিই তো রূপক মজুমদার আর প্রদীপন

    চাটুজ্জেকে বাড়িটা দেখিয়েছিলুম। ওই বাড়ির মাসিটা পয়সাঅলা, দেখতে-শুনতে ভালো মেয়েদের তোলে। ওই বাড়ির সামনে যে বাড়িটা তার বারান্দা থেকে সেসব খদ্দেরদের দেখা যায়। রামায়ণ কোম্পানির শেয়ার হোলডারদের দেখতে পাবি।

    ঝন্টুর সঙ্গে রামায়ণ নট্ট কোম্পানির সদস্যদের পেছু নিল রাহুল। গলিটা বোধহয় ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধকার। বিটকেল গন্ধ, বেলিফুল, বিড়ি-সিগারেট আর মদের সংমিশ্রণে উড়ছে। হয়তো হরমোনে বাড়বাড়ন্ত মাংসবাজারের গন্ধ এরকম তিতকুটে হয়। ঝন্টুর পেছন-পেছন সিমেন্ট-ঝরা, ফিকে হলুদ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলো রাহুল। বারান্দায় এক কোনে মোটামতন এক প্রৌঢ়া, পানের বাটা নিয়ে বসে। ঝন্টুকে দেখে বললে, আজকে তোর মাগির হপ্তাবাবুর রাত, তুই অন্য কাউকে চাস তো দ্যাখ। বারান্দার তিন দিকে ছোটো-ছোটো ঘর, কয়েকটার দরোজা বন্ধ। কয়েকটায় সাজগোজ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে যুবতীরা, বড্ডো বেশি সাজুগুজু, টকটকে লাল ঠোঁট, গালে লালচে পাউডার, ব্লাউজ থেকে উথলে সবই দেখা যাচ্ছে, বোঁটা ছাড়া। এদের জড়িয়ে ধরলেও সহজে লিঙ্গোথ্থান হবে বলে মনে হয় না।

    –শশশ, ওই দ্যাখ, ওই দ্যাখ।

    রাহুল দেখল সামনের বাড়িটার একটা ঘরের সামনে একজন যুবতীর সঙ্গে কথা বলছে প্রদীপন চাটুজ্জে, মস্করা করছে নিশ্চয়ই, যে-ভাবে হাসি খেলছে যুবতীর শরীর জুড়ে। কথা বলতে উনি ওস্তাদ। আন্দোলনের বুলেটিনে একবার লিখেছিলেন, বেশ্যার ঘরে আয়না থাকবেই, খাদ্যদ্রব্য কদাচিৎ দেখেছি, তবে বাসন থাকে, কাঁচের কলাইয়ের কাঁসা বা পিতলের বাসন ; বেশ্যা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কটি তথ্য এই হতে পারে যে এক সে উপহার পেতে ভালোবাসে দুই তার আত্মা আছে তিন তার লজ্জাহীনতা সত্যের মতো চার সে মৌলিক নির্বোধ পাঁচ সামনে কোনো সময় নেই এমন মানুষ যদি ভাবা যায় সে সেই রকম ; তার সম্পর্কে একটি কথাই গভীরতরভাবে ভেবে জানার, তার শরীর যখন একজন ভোগ করে, কী মানসিক অবস্হায় সে থাকে, লোক এলে সে সুখী হয়, বিরক্ত হয়, ঘৃণাও করে, লোককে হিংসে সে কখনও করে না, যখন লোক তাকে উলঙ্গ করে, সে বিরক্ত হয়, একবার উলঙ্গ হলে স্বস্তিবোধ করে, তার সহজ লাগে, কিন্তু বেশিরভাগ লোক একসঙ্গে উলঙ্গ হয় না, আলো নিভবার আগে অন্তত আণ্ডারওয়ার বা গেঞ্জি পরে থাকে, বেশ্যার নগ্নতা সে দ্যাখে, তাকে দেখতে দ্যায় না, তারপর কতকগুলি নিয়মকানুন তারা মানে, বেশ্যারা, সে-সময় শয়তান তাদের সাহায্য করে বা ঈশ্বর, যে-জন্য তারা কদাচিৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

    –তুমি প্রদীপন চাটুজ্জের লেখাটা পড়েছিলে, বেশ্যাদের নিয়ে লেখা ? ঝন্টুকে জিগ্যেস করল রাহুল।

    –পড়েছি, পড়েছি, তুই দিয়ে গিসলি। ও নিজের কথা লিখেছে, কী করে ও জানল অন্যরা কী-কী করে ? বেশ্যারা নিজেরাই জামাকাপড় তাড়াতাড়ি খুলে ফ্যালে, যাতে কাজ সেরে পরের খদ্দেরের জন্যে ধুয়েটুয়ে রেডি হতে পারে। তাছাড়া কোনো-কোনো কচি খদ্দেরের তর সয় না, তাড়াতাড়ি শাড়ি-ব্লাউজ খুলে সরিয়ে না রাখলে তড়িঘড়ি জড়িয়ে ধরে লিকুইড ফেলে নোংরা করে দেবে। তখন ? প্রদীপন চাটুজ্জে তো হাড়গিলে, পাঁজরা গোনা যায়, তাই ঘর অন্ধকার হলে গেঞ্জি-আণ্ডারওয়ার খোলে। তোকে একদিন দিনের বেলা নিয়ে আসব, তখন রেট অনেক কম থাকে, ওসব রঙচঙ মেখে কুচ্ছিত হয়ে সাজে না, দেখতে পাবি, একদম নর্মাল, যেন পাড়ার মেয়ে। দিনের আলোয় তোর সামনে শাড়ি-ব্লাউজ খুলে দাঁড়ালে সারা ঘর আলোয় আলো হয়ে যাবে, ভালো না বেসে পারবি না।

    –ভালোবাসা, বলেছো ভালো। আমার এক বন্ধু বলে মাংসামাংসি।

    –ওই দ্যাখ, রামায়ণের অন্য ক্যারেকটারদের, একটার কাছে সবাই যাবে নাকি রে ? হোলসেল রেট পাবে মনে হচ্ছে। রূপক মজুমদারকে দেখতে পাচ্ছিস। তোর মনে আছে ? কেতুর পড়ার ঘরে ডিং হেঁকেছিল যে বেপাড়ার মেয়েদের ওইতে হাত দেবে না, এখন তো রসে-রসে টইটুম্বুর, ওইতে ওই দিতে চলেছেন। ওই দ্যাখ বসন্ত বাঁড়ুজ্জে না মুকুজ্জে, আর ওটা সাবর্ণীচরণ, লেকালিকি করে না, রামায়ণের স্যাঙাত হয়ে ঘোরে। ওই ঘাড়ে-গর্দানেটা কে রে ?

    –উনি মিস্টার রায়। আর অন্যজন অর্ণব মুখোপাধ্যায়।

    –উঁচু মক্কেল। খড়মের পাহারাদার ! শরৎ চাটুজ্জের পর আবার চাটুজ্জে বাঁড়ুজ্জে মুকুজ্জে গাঙ্গুলিরা এসব পাড়াকে আলো বিলোতে এয়েচে।

    –আসল লোককে দেখছি না ? সীতাকে তো ইউরোপের নন্দনকাননে ফেলে চলে এসেছেন।

    –ওই তো, হ্যাঃ, ধুতি-পাঞ্জাবিতে, হাতে আবার গোড়ের মালা, শরৎ চাটুজ্জের গদির তালে আছে। আর ওটাও কে একজন চাটুজ্জে, ওই যে, কালো শার্ট কালো প্যান্ট, রামায়ণের আরেকটা ক্যারেকটার, ওদের সঙ্গেই আসে। আরে,

    রাজপুত্তুরই তো নন্দনপালঙ্কে প্রথমে ঢুকে গেল রে। চল, কেটে পড়ি, বারান্দায় গুলতানি করবে ওরা, সিগারেট-মিগারেট

    ফুঁকবে, তখন এদিকে চোখ পড়লেই তোকে দেখে ফেলবে। আমার তো বদনামের ভয়ডর নেই, তোরই মুশকিল। কফিহাউস থেকে ছড়াবে।

    –বদনাম ? কী বলছ কি, হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়েছিল গোটাকতক চোর-ডাকাত-খুনির সঙ্গে।

    –যা বলেছিস, আমার বাপটাই তো বদনাম, বদনামের বাপ।

    ঝন্টুর বাবা পাঁচকড়ি যৌবনে ছিলেন হেদোর কর্মকর্তা, অবিভক্ত বাংলার বিখ্যাত অ্যামেচার সাঁতারু। কলকাতার মাংসামাংসি জগতে ঢুকেছিলেন চাকরির উপরি খরচ করতে। ম্যানেজিং এজেন্সিতে তাঁর কাজ ছিল মাল কেনা-বিক্রি করার দরপত্র আহ্বান, খোলা, অর্ডার দেয়া বা নেয়া। লক্ষ-লক্ষ টাকার ব্যাপার, টন-টন মালপত্রের লেনদেন, জাহাজভরা সাপ্লাই। ঘুষের টাকা অঢেল। সোনাগাছির বাঁধা খদ্দের। ঘোড়দৌড়ের মাঠের জুয়াড়ি। সাঁতার কাটার সুবিধার জন্য এক-আধ ঢোঁক দিশি মদ গিলতেন, যাকে উনি বলতেন ধান্যেশ্বরী। খাঁটি স্কচ বা সিংগল মল্ট উপঢৌকন পেলেও নিতেন না। বলতেন, ধান্যেশ্বরী তো মাকালীর আরেক রূপ, নিজের মাকে ছেড়ে কেন বিদিশির পেচন-পেচন ঘুরব। মারোয়াড়ি ব্যাবসাদারদের অবদান হিসেবে পাঁচকড়িবাবুর পরিচয় হল থিয়েটারের ব্যাকস্টেজ এক্সট্রা যুবতীদের সঙ্গে। তাদের সূত্রে সোনাগাছি-বৌবাজারে উত্তরণ। ওনার যৌবনে সোনাগাছির এক-একটা বাড়ি এক-একজন যৌনকর্মীর নামে খ্যাত ছিল, রাধারানির বাড়ি, চারুমতির বাড়ি, সুখময়ীর বাড়ি, যে বাড়িগুলো ঝণ্টুর সময়ে পৌঁছে অমুক-মাসি তমুক-মাসির বাড়ি হয়ে গেছে।

    –ওটা কার বাড়ি ঝন্টুদা ? জিগ্যেস করল রাহুল। রাধারানি, চারুমতি…

    ঝন্টু বলল, ফিসফিসিয়ে, ওরা যেটায় গেছে সেটার নাম পাকিস্তানি মাসির বাড়ি।

    –পাকিস্তানি ? কী বলছ কি ? এখানে আবার পাকিস্তান এলো কোথ্থেকে। দেখছ তো যারা পাকিস্তান থেকে এসেছে তাদের বাঁচার লড়াইতে প্রফুল্ল সেন নাজেহাল।

    –ওই জন্যেই তো বলছি। পাকিস্তানিরা রেপ করে কচি-কচি হিন্দু মেয়েদের নষ্ট করার পর তারা এপারে পালিয়ে এসে আড়কআঠিদের খপ্পরে পড়ে। আড়কাঠিদের থেকে এই মাসি ভালো দেখতে ফর্সা মেয়েগুলোকে কিনে নিচ্ছে। জমানো পয়সা আছে কাঁড়ি-কাঁড়ি, দুবার তো খুন হতে-হতে বেঁচেছে, ভেড়ুয়াগুলোর জন্যে বেঁচে গেছে। তোকে একদিন দুপুরে নিয়ে যাব। আমার বাবা ওর বাবু ছিল এককালে। ওর ঘরে ফোটো দেখলে মনে হবে খুকি বয়সের সন্ধ্যারানি দেবী, অ্যাঃ।

    –তোমাকে দেখাতে হবে না। আমরা জর্জ ফ্রেজার নামে এক বিটনিককে নিয়ে ওদিকের একটা বাড়িতে গিয়েছিলুম। জর্জের শখ হয়েছিল বাঙালি মেয়ের সঙ্গে শোবার। এক-দু দিনের জন্যে ভারতে এসে তো আর প্রেম হয় না, তাই।

    –ও, তুইও তাহলে এদের বিছানায় শুয়েছিস ?

    –না, শুইনি। এখানের বিছানায় শুলে আমার লিঙ্গ দাঁড়াবে না। কোনো মেয়ের সম্পর্কে আমার ধারণা ভালো না হলে আমার লিঙ্গ দাঁড়ায় না।

    –তোর আবার লিঙ্গ হবার বয়স হয়েছে নাকি ; এখনও তুই খোকানুনুর বয়সে আছিস। একটু বয়স হোক, তারপর দেখিস ; ফেলবি কড়ি আর মাখাবি তেল, মাখবি নয়, মাখাবি।

    সত্তরোর্ধ রাহুলের মনে পড়ল, পাকিস্তান হবার সময়ে যেমন রেপের শিকার মেয়েরা প্রাণ বাঁচাবার জন্য এপারে পালিয়ে আসত, ঠিক তেমনই, যখন পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হবার লড়াই আরম্ভ হল, তখনও, রেপ-করা মেয়েরা পালিয়ে এসেছে প্রাণ বাঁচাবার জন্য। পাকিস্তান হবার সময়ে হিন্দু বাড়ির মেয়েরা এসেছিল। পাকিস্তান ভাঙার সময়ে হিন্দু-মুসলমান দু’ধর্মের মেয়েরা এসেছিল। তাহলে, পাকিস্তানি মাসির জায়গায় কি কোনো বাংলাদেশি মাসি বসতে আরম্ভ করেছিল ? কে জানে ! ঝন্টুদা তো চলে গেছেন লাহেরিয়াসরায়ের শ্মশানে ; পাকিস্তানি মাসিও চলে গিয়ে থাকবেন নিমতলায়।

    ঝন্টুদার কথা শুনে রাহুল বলল, না, আমার এই পাড়াগুলো পর্যটকদের মতন ঘুরে-ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করে, কারোর সঙ্গে শোবার ইচ্ছে হয় না। পরে, বিদেশে গিয়ে, বিশেষ করে অ্যামস্টারডমে, রাহুল গিয়েছিল অমন এক পাড়ায় পরিক্রমণ-পর্যটনে। ওর বয়স তখন কত, মমমমমমম, কত হবে, থাকগে,, যা-ই হোক না কেন, কী-ই বা এসে যায়। পাড়াটার নাম ‘দ্য ওয়ালেন’ বা খালপাড় : খালে সাঁতরে বেড়াচ্ছে রাঁজহাঁস। পর্যটনের জন্য একটা সংস্হা আছে ওই

    পাড়ায়। পর্যটকরা, মহিলা গাইডের, যিনি নিজে এককালে পাড়াটিতে যৌনকর্মী ছিলেন, তাঁর পেছন-পেছন, সেই খালের নৌকো থেকে নেমে,পাড়ার এগলি-সেগলি ঘুরতে-ঘুরতে ওপর দিকে তাকিয়ে, একতলায় চোখ বুলিয়ে, এটা-ওটা হাতে নিয়ে, দেখে বেড়ান চারিদিক।

    পথের দুপাশে, নীল-লাল-হলুদ ঝিলমিলে আলোয়, নিচে তলায়, সরকার অনুমোদিত গাঁজার দোকান, একা-একা যৌনকর্মের টুকিটাকি সাজ-সরঞ্জামের দোকান, অহরহ-চালু যৌনকর্ম দেখার দোকান, সবুজ বা ফিকে-সবুজ আবসাঁথ যা র‌্যাঁবো-বদল্যারের প্রিয় ছিল তা পান করার দোকান, যৌনকর্মের ফিল্ম-ডিভিডি-সিডির দোকান, কিনে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য ফোলানো যায় এরকম রবারের যুবতী বা রবারের যুবকের দোকান। ওপরতলায় বিশাল জানালায়, ফিকে লাল আলোয়, প্রৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ থেকে আনা, প্রায়-নগ্ন যুবতীরা, বসে আছে খদ্দের আকৃষ্ট করার জন্য। রেস্তরাঁর মেনুর মতন, যেমন যৌনকর্ম, তার তেমন দাম বাঁধা, সময়ও নির্দিষ্ট। ওরা যখন মহিলা গাইডের পেছন-পেছন যাচ্ছিল, আরেকটু হলেই এক যুবক গাইডের গায়ের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ত। গাইড সেই যুবকটির হাত ধরে গ্র্যানাইট-বেছানো পথে বসানো একটা ভাস্কর্য দেখালেন, যেটিতে যুবক হোঁচট খেয়েছিল।

    ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্য, মাই টিপতে উদ্যত পুরুষের হাত। হাজার হাজার আদেখলা পুরুষ তার ওপর দিয়ে হেঁটে, তাকে ঝকঝকে করে তুলেছে।

    আরেকবার পর্যটনে গিয়েছিল থাইল্যাণ্ডে। সেখানের হট জোন নামের এলাকায়, সারি-সারি কাচের শোকেসে দাঁড়িয়ে আছে, নগ্নবুক, সরু জাঙিয়া পরা তরুণী-কিশোরীর দল, আলু-পটল বাছাই করার মতন তাদের মধ্যে যাকে চাই বেছে নাও। অ্যামস্টারডমের মতন অমন দোকানপত্তর নেই, আছে রেস্তরাঁ আর বার। রেস্তরাঁয় পাওয়া যায় সব রকমের মাংস, কুমির, তিমি, অক্টোপাস, সাপ, হাঙর, কাঙ্গারু, আরও অজানা জীবজন্তুর।

    ঝণ্টুদা সেদিন বলেছিল, ওঃ, জানিস তাহলে, আমি ভেবেছিলুম এখনও ন্যালাক্যাবলা বোকা হাঁদা গঙ্গারাম থেকে গেছিস।

    অঞ্জলি রাহুলকে সেই স্কুলের দিন থেকে বোকা, ক্যাবলা, আনস্মার্ট বলে এসেছে বটে।

    ফোনে কোনো সাড়া না পেয়ে অঞ্জলির যাদবপুরের ঠিকানায় গিয়েছিল রাহুল। অমন কোনো বাড়িই পেল না খুঁজে, ওই নামের রাস্তা নেই, বাস ডিপোর আশে-পাশের গলিতে বর্ণনা দেয়া সত্ত্বেও, হদিশ দিতে পারল না কেউ, অঞ্জলির মতো কোনো যুবতীর। ”সরু কোমরের যুবতী এ-পাড়ায় নেই, আপনি যে বলছেন, কোমর সরু আর বুক-পাছার মাপ ভারি, অমন মেয়ে এদিকে পাবেন না”, বলে, স্মিত হাসি বিলিয়েছিল একজন টাকমাথা পথচারী।

    আলিপুরের সেই ফ্ল্যাটেও গিয়েছিল রাহুল। পেটের ওপর গেঞ্জি ঝুলিয়ে বেরিয়ে এলেন এক মারোয়াড়ি, আর কয়েকটা গোলগাল কিশোর-কিশোরী ; জানালেন যে যারা ভাড়া নিয়েছিল তারা উঠে গেছে, কোথায় গেছে তা জানেন না। রাহুল স্তম্ভিত। ঘটনাটা সত্যিই ঘটেছিল তো, নাকি হ্যাশিশের নেশা দিয়ে গড়ে তুলেছিল অঞ্জলিকে ! কী করেই বা সম্ভব। অঞ্জলির উপহার দেয়া চামড়ার পার্সটা তো ওর হিপ পকেটে রাখা।

    অঞ্জলির আরেকবার অন্তর্ধানের সংবাদে রাহুলের যা ঘটল, তা হয়ত চিত্তবিক্ষোভ।

    যেখানেই পোস্টেড থাকুক না কেন, বছরে এক দিন, ১৬ই মার্চ দুপুর দেড়টার সময় গড়িয়াহাটের মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে থেকেছে রাহুল সিংহ, বিয়ে করার আগে পর্যন্ত, যদি, যদি, যদি, যদি, যদি, যদি, অঞ্জলির দেখা মেলে।

    মেলেনি।

    গড়িয়াহাট মোড়ের চেহারা পালটে গেছে, ফ্লাইওভার হয়েছে, ফুটপাতে আর হাঁটা যায় না, রাসবেহারির দোকানগুলো চলে গেছে অবাঙালিদের কবজায়, অঞ্জলির দেখা মেলেনি।

    অথচ যে মেয়েটি রাহুলকে চেয়েছিল, দিল্লি অফিসে ওর অধস্তন অফিসার সুরেখা রেড্ডি, মমমমমমম, রাহুলের বয়স তখন কত, যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়, রাহুলের চেয়ে উনিশ বছরের ছোটো, রাহুলকে পাবার জন্য উন্মাদ, তাকে তো রাহুল প্রশ্রয় দেয়নি, তাহলে কেন ও নিজে চেয়েছে অঞ্জলি দাশ ওকে প্রশ্রয় দিক। সুরেখা রেড্ডি প্রতিদিন বাংলা তাঁতের শাড়ি পরে আসত অফিসে, একদিন শাঁখা-রুলি পরেও এসেছিল, সহকর্মীদের টিটকিরি সইত, তা যে রাহুলকে ইমপ্রেস করার জন্য, পরে জেনেছিল ও। ঢ্যাঙা, ময়লা, দীর্ঘ চুল, চুলে সুগন্ধী ফুল, ইংরেজি স্কুলের দ্রুত কথা বলার অভ্যাসে রপ্ত।

    একদিন, ট্যুরে আজমের যাবার জন্য আইটিবিপি বাস স্ট্যান্ডে টিকিট কাটবে বলে নির্দিষ্ট খিড়কির কাছে পৌঁছে দ্যাখে সুরেখা রেড্ডি দাঁড়িয়ে। ডেনিমের ট্রাউজারে, পিঠে রাকস্যাক, সিনথেটিক জ্যাকেট। রাহুলের কবজি ধরে,

    পরিষ্কার বাংলায় বলল, স্যার, আমি দুটো টিকিট কেটে রেখেছি, সামনের সিট, চলুন, ওই যে আমাদের বাস।

    রাহুল হতবাক। কোনো তরুণী ওর হাত ধরলে যে আচমকা ক্রোধে আক্রান্ত হতে পারে, তা নিজের মধ্যে আবিষ্কার করল। রাগে ওর কানের দু’পাশ দপদপ করতে লাগল।

    –তুমি বাংলা জানো ? বলল রাহুল। ভাবল, এরকম কেন হয়, এই অন্তরঙ্গ অর্জন যা চাই না, বিষাদের আত্মময়তা, অতীতের অপসৃয়মান শঙ্খধ্বনির আহ্বান, যা শুনতে চাই না, গন্তব্যহীনতার ছকে রাখা পথ, যে রাস্তায়

    হাঁটার মতন ফুরসত অবশিষ্ট নেই, হিসেবনিকেশহীনতা, যা অপরিচিত হয়ে গেছে, স্পন্দিত দ্যুতির সর্বস্বতা-বিস্তারী টান, যার চুম্বকত্ব ও ফেলে দিয়েছে, সময়কে অসময়ে রূপান্তরণ, যে ক্ষমতা কবেই বিসর্জিত।

    হঠাৎ, কোথা থেকে এই যুবতী, এবং কেনই বা ! উল্লসিত দেহ-জাগরণের এ কোন নিমন্ত্রণ ! ও তো চুলে কলপও লাগায় না, পোশাক সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ নেই, পারফিউম-পাউডার লাগায় না— অভীপ্সাহীন দিনানুদৈনিকের অনতিক্রম্য প্রকৃতিজগতে চলে গেছে বহুকাল, লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছে প্রায় দেড় দশক। সর্বোপরি, প্রায় প্রায় প্রায় ভুলে গেছে অঞ্জলিকে দাশ নামের মেয়েটিকে। এখন অঞ্জলি ওর সামনে এসে দাঁড়ালেও পরস্পরকে চিনতে পারবে না। অভিকর্ষহীন হয়ে গেছে, বুঝতে পারবে দুজনে দুজনকে দেখে।

    এই মেয়েটি, সুরেখা রেড্ডি, ওর, রাহুলের, কেবিনে এসে কোনে রাখা চেয়ারে বসে থাকত কখনও-কখনও। ইয়েস মিস, জিগ্যেস করলে বলত, নাথিং ইমপরট্যান্ট স্যার, আই শ্যাল কাম আফটারওয়র্ডস। রাহুল সেসময়ে বুঝতে পারেনি যে ওর কেবিনে অফিসারদের অবিরাম আসা-যাওয়ার সুযোগ নিয়ে মেয়েটি ওর দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। কেবিনের দরোজা খোলা রেখে তাহলে উচিত কাজই করত রাহুল। নয়ত বন্ধ কেবিনে হাত চেপে ধরে কী করে ফেলত কে জানে।

    রাহুল, বিপদ থেকে কী করে বেরোবে, তা সমান্তরাল চিন্তায় বিশ্লেষণ করে, নির্ণয় নেবার সময়টুকু হাতে পাবার জন্য, একই প্রসঙ্গ আবার তুলল, ইংরেজিতে জিগ্যেস করল, তুমি বাংলা শিখলে কোথায় ?

    আমার মা বাঙালি স্যার। চলুন না, যাবার পথে গল্প করব।

    রাহুল বেকায়দায়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, নিশ্চিত হবার জন্য, পরিচিত কেউ নেই তো। বলল, ইংরেজিতেই, আমি তো ট্যুরে যাচ্ছি, তুমি কী করবে সঙ্গে গিয়ে ? অফিস তো কোনো অ্যাসিসট্যান্ট দেয়নি, আমি সহায়ক নিয়ে কাজ করতে পারি না।

    মেয়েটি চাপা গলায়, রাহুল টের পেল যে কন্ঠস্বর আবেগে ক্রুদ্ধ, বলল, আই লাভ ইউ, ইয়েস, আমি আপনাকে ভালোবাসি। ইফ ইউ ফিল লাইক, ইউ মে কল ইট লাস্ট ; আমি আপনাকে চাই।

    হাত ছাড়ো, ট্যুরে যাচ্ছি না। ‘কেউ দেখে ফেলতে পারে’, কথাগুলো বলা উচিত হবে না মনে করে চেপে গেল। বলল, ইংরেজিতেই, বাংলায় কথা বলছ, এখানে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন, আজমের শরিফে তীর্থ করতে যাবার জন্য।

    নারীসঙ্গ থেকে যতটা সম্ভব নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে সফল হবার অলস গোমানুষ আনন্দে ছিল এতকাল। কোথা থেকে এই মেয়েটা উদয় হয়ে ওর শান্ত একাকীত্বকে নড়বড়ে করে দিতে চাইছে। ট্যুরে-ট্যুরে ভারতবর্ষের প্রেমে এমনই মশগুল যে অন্য কোনো কিছু আর ওকে আকৃষ্ট করে না। বাউলদের বোধহয় এরকমই হয়, পথে-পথে ঘোরাঘুরি করে, নানা ধরণের মানুষদের সঙ্গে মিশতে-মিশতে — একাকীত্বের পরিসরে আত্মলীন।

    ট্যুরে না যেতে চান যাবেন না, ছুটি নিন, আমি বললাম না আপনাকে, যে আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমি আপনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবো। আপনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমার সঙ্গে থাকবেন, যদি বলেন তাহলে এখনই আমরা কোথাও চলে যেতে পারি। উধাও হয়ে যাবো। আমি আপনাকে চাই।

    কী করবে বুঝে উঠতে পারল না রাহুল, এ কি পাগল, কোনো রোগ নেই তো এর, বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে, হয়তো কাউকে কিছু না বলে। প্রেমে পড়ার রসদ রাহুলের মনে হল, সবই ও খরচ করে ফেলেছে। এই যুবতীর, যার স্মাগলিং বা অঞ্জলি-জাতীয় কোনো গোপনতার সঙ্গে সংস্রব নেই বলে মনে হচ্ছে, তার প্রস্তাব আরও কুড়ি বছর আগে পেলে হয়তো ও পিছলে যেতে পারত। এখন তো মগজ একেবারে ফাঁকা — উত্তেজনার গ্রন্হিগুলো অকেজো। স্কুলের শিক্ষকরা ওকে বলতেন অ্যাম্বিশানহীন ; ও এখনও তা-ই রয়ে গেছে, উচ্চাকাঙ্খাহীন। নারীর কোনো জায়গা ওর জীবনে আর নেই। ইজিচেয়ারে ঠ্যাং তুলে, চোখ বুজে, ও এখন বাড়ির বাগানে একা বসে থাকতে ভালোবাসে, প্রজাপতিদের ডানাগুঞ্জন শুনতে পায়, ভেঙেপড়া সোভিয়েত দেশ থেকে ভরতপুরের দিকে উড়ন্ত সারসদের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে, ও চায় যে কেউ যেন ডিস্টার্ব না করে।

    সুরেখা বলল, আমি আজমের গেছি স্যার, আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না, অনেক ভালো-ভালো লজ আছে,

    আমরা আজমের শরিফে গিয়ে চাদরও চড়াতে পারব। চলুন, চলুন, কন্ডাক্টার যাত্রীদের ডাক দিচ্ছে, ওই যে, হর্ন বাজাচ্ছে।

    রাহুলের কানে পৃথিবীর কোনো শব্দ প্রবেশ করছিল না। রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমম, বোধহয় কত হবে, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। কি করে এই পাগল অফিসারকে কাটাবে দ্রুত ভাবার চেষ্টা করছিল। ব্রিফকেস বাঁ হাতের ওপর রেখে ডালা খুলে বলল, ইংরেজিতেই, আরে, আমি তো রিপোর্টের ফরম্যাট আনতে ভুলে গেছি।

    তুমি যাবে বলে মনস্হ করেছিলে তো একটা ডুপলিকেট ফরম্যাট রেখে নিতে পারতে। যাকগে, আজকে ট্যুরটা ড্রপ করে দিই, আবার অ্যাপ্রুভাল নিয়ে পরে যাবো। রিপোর্টের কোনো ফরম্যাট হয় না, সুরেখা ধরতে পারল না, ওর স্তরে এই সমস্ত গুরুগম্ভীর ব্যাপার পৌঁছোয় না।

    –টিকিট তো কাটাই আছে স্যার, চলুন না জাস্ট বেড়িয়ে আসি, দুজনে এক সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাবো।

    –একে তো ট্যুরে যাচ্ছি না, তার ওপর যদি ছুটি নিয়ে বেড়াতে যাই, জানতে পারলে ডায়রেকটার পারফাংকটারি ডিউটির অভিযোগে চার্জশিট করে দেবেন ; তুমি তো বেঁচে যাবে, আমি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায়ে পড়ব। আর, সুস্পষ্ট বলল রাহুল, স্ক্যান্ডাল ক্রিয়েট হবে, হাত ছেড়ে দাও, কী করছ কি। জানো না কি আমার ছেলে আর মেয়ে স্কুলে পড়ে ?

    –জানি, আমি আপনার স্ত্রীকেও একদিন বলেছি যে আমি আপনাকে পছন্দ করি।

    কী বিপদ। এই মেয়েটা ওর জীবনপ্রবাহে বাঁধ তোলার চেষ্টা করেছে তলে-তলে, আর ও কিচ্ছু টের পায়নি। প্রত্যেকদিন নজর রেখেছে হয়তো, চেয়ে-চেয়ে দেখেছে ও কী করছে, কবে কোথায় ট্যুরে যাচ্ছে, একা যাচ্ছে না কারোকে সঙ্গে নিয়ে।

    –তুমি বাড়ি যাও। আমি জোর করে হাত ছাড়িয়ে সিন ক্রিয়েট করতে চাই না। আমার স্ত্রীকে বিপন্ন করার চেষ্টা করে ভালো করোনি।

    –তাতে কি স্যার ? আমি পুরো রেসপনসিবিলিটি নেবো। আমার বাবার জমিজমা আছে প্রচুর, আমিও চাকরি করছি। কোনো প্রবলেম হবে না।

    ‘হাত ছাড়ো’, কন্ঠস্বরে অধস্তনকে বকুনি-মেশানো চাউনি মেলে বলল রাহুল।

    সুরেখা হাত ছেড়ে দিয়েছিল। ওর হাত থেকে টিকিট দুটো নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিল রাহুল, আর সোজা গিয়ে একটা অটোয় বসে বাড়ি চলে গিয়েছিল।

    সুরেখা পরের দিন অফিসে আসেনি; দুপুর নাগাদ ওর বাড়ি থেকে সংবাদ এলো যে টয়লেটের অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেছে সুরেখা রেড্ডি।

    কোনো সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে কি, জানতে চেয়েছিল আতঙ্কিত রাহুল।

    না, পাওয়া যায়নি। ওর মা-বাবাও জানেন না কেন অমন কাজ করতে গেল।

    ভাগ্যিস সুরেখার হাত থেকে বাসের টিকিট দুটো নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। পুলিশ নির্ঘাত সুরেখার আজমেরের সঙ্গে রাহুলের আজমেরের মিল খুঁজে পেত।

    বেশ কয়েকদিন পরে সুরেখার লেখা দীর্ঘ প্রেমপত্র, যা ও সম্ভবত কয়েকমাস ধরে লিখেছে, ডাকে পেয়েছিল রাহুল। বাংলা অক্ষর, কিন্তু তেলুগু টানে পাকানো হাতের লেখা। চিঠি আর রাখে না রাহুল, সমস্ত চিঠিই পড়ার পর ছিঁড়ে ফেলে দ্যায় ও। সুরেখার চিঠি সংস্কৃত অভিধানের ভেতরে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল, বহুকাল, ভুগেছে দুশ্চিন্তায়, আমিই কি দায়ি, আমিই কি দায়ি, আমিই কি সুরেখার মৃত্যুর জন্য দায়ি ? এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তির উপায় কি হতে পারে ভেবেছে, ভেবেছে, তারপর একটা ডিটেকটিভ উপন্যাস লিখেছে সুরেখাকে কল্পনা করে, সেই উপন্যাসে নিজেকে পিঁপড়ে আর কুকুর দিয়ে খাইয়েছে রাহুল, আর, আর হ্যাঁ, অদ্ভুত, ওর মনের ভেতরে যে পিঁপড়ে আর কুকুররা ওকে খেয়ে ফেলছিল এতকাল, তা থেকে মুক্তি পেয়েছে। অনেকদিন ধরে ও পিঁপড়ে আর পিট বুল কুকুরের সামনে নিজেকে মনে-মনে ছেড়ে দিয়েছিল ; শেষ পর্যন্ত লিখে ফেলল, কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে।

    ডিটেকটিভ উপন্যাসটা প্রকাশিত হবার পর সুরেখার চিঠি, শেষবার পড়ে, যা রাহুলের প্রায় মুখস্হ হয়ে গিয়েছিল, ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল জুহুর সমুদ্রে। কত তফাত সুরেখার প্রাণবন্ত চিঠির সঙ্গে অঞ্জলির মেকি চিঠির।

    সুরেখার আত্মহত্যার পরই রাহুলের মাও মারা গেলেন। ভেঙে-পড়া কাকে বলে তার আগে ও জানত না। অঞ্জলি স্মাগলারকে বিয়ে করেছে জেনেও ভেঙে পড়েনি। রাস্তা দিয়ে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে যখন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখনও ও ভেঙে পড়েনি। মামলায় বন্ধুরা বিশ্বাসঘাতকতা করলেও ভেঙে পড়েনি। মায়ের মৃত্যুতে ভেঙে

    পড়ল। কেঁদে নেবার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার একপাশে।

    মায়ের মৃত্যু আর সুরেখার আত্মহত্যার পর থেকেই আবার লেখেলিখি ফিরে এলো রাহুলের কলমে, ভাঙা-ভাঙা ছন্দে, কোনো নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেবার রচনা, নিজেকে স্বাধীনতা দেবার রচনা, ট্যুরে পাওয়া দুর্বিষহ ঘটনা থেকে চাগিয়ে ওঠা রচনা। বাংলা ভাষায় কেমনতর অপেরা লেখালিখি সেসময়ে হচ্ছে তার কোনো হদিশ ওর ছিল না, কেননা পত্রপত্রিকা পড়া ছেড়ে দিয়েছিল বহুকাল।

    ঢাকার এক সম্পাদক, মাহমুদ রহমান, কোথা থেকে ওর ঠিকানা যোগাড় করে অবিরাম অনুরোধ করছিলেন লেখা পাঠাবার জন্য। কয়েকমাসে কয়েকটা অপেরাপ্রতিম লেখা লিখে রাহুল পাঠিয়ে দিয়েছিল, আর ভুলে গিয়েছিল। অনুমান করতে পারেনি যে সেগুলো ঢাকায় প্রকাশিত হবার পর সেখানকার অন্যান্য লিটল ম্যগাজিন সম্পাদকরা ওকে অবিরাম চিঠি লিখতে থাকবেন লেখা পাঠাবার অনুরোধ জানিয়ে ; স্মৃতিকথা লেখার অনুরোধ জানাবেন এক বৃদ্ধ সম্পাদক।

    উৎসাহিত রাহুল নেমে পড়ল নিজের একাকীত্বের কুয়োর ভেতরে, টের পেল যে ওর লেখার ধারা পালটে গেছে, তাতে আন্দোলনের তাপস্নিগ্ধ আত্মস্বীকৃতির রেশ আর নেই। তার বদলে উঠে এসেছে ট্যুরে পাওয়া, অন্যের জীবনের বা শহর-গ্রামের কারোর অঘটন-দুর্ঘটনার বিপর্যয়।

    আবার লিখতে আরম্ভ করে, রাহুল তখন জয়পুরে, ওর অজান্তে, হিন্দি ভাষার পত্রপত্রিকায় ওর ফোটো আর আন্দোলনের সংবাদ পুনঃপ্রকাশিত হতে থাকায়, ও তখন বিভাগীয় প্রধান, আকর্ষণ গড়ে ফেলেছিল অপরূপা হিন্দি-ভাষী এক তরুণী কর্মীর দৃষ্টিতে। ওর লেখালিখি বারবার গোলমাল সৃষ্টি করেছে, ওর জীবনে তো বটেই, অন্যের জীবনেও। সেই তরুণীর নাম সঙ্গীতা মনসুখানি।

    অফিস টাইম শেষ হবার পরও ঘণ্টা দেড়েক বসেছিল রাহুল ; বেসমেন্ট থেকে গাড়ি বের করতে ওর অধস্তন কর্মচারী, যার গাড়িতে ও বাসায় ফেরে, হায়দার হুসেইনের সময় লাগবে, অবসর নেবার বয়সে পৌঁছে গেছে লোকটা। স্লোপে রিভার্স করে সহজে গাড়ি তুলতে পারে না ওপরে। কেবিনে বসে গাড়িটার বেগড়বাঁই শুনতে পায়। হায়দার হুসেইনের হর্ণ না বাজা পর্যন্ত আরও কয়েকটা ফাইল ক্লিয়ার করে নিতে পারে, অনায়াসে। হঠাৎ ফুঁপিয়ে কান্নার মেয়েলি আওয়াজ। উইনডো এসিটা শব্দ করে বলে, বন্ধ করে উৎকর্ণ হল রাহুল। হ্যাঁ, ঠিক তাই, চাপা কান্না।

    কেবিন থেকে হলঘরে বেরিয়ে রাহুল দেখল সব আলো জ্বলছে, ফ্যানগুলো চলছে, সানমাইকার অত্যুজ্বল কিউবিকলগুলো ফাঁকা। বিভাগীয় প্রধান হবার দরুন প্রতিদিন ও মাথা ঘুরিয়ে একবার চারিদিকে না তাকিয়ে পারে না, অভ্যাসমতো চাউনি যেতেই, দেখল সঙ্গীতা মনসুখানি, বিষন্ন সুন্দরী, ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চোখ তুলে রাহুলের দিকে তাকাতেই ছাঁৎ-করার বোধে আক্রান্ত হল ও। বিভাগের প্রধান হিসাবে দূরত্ব বজায় রাখতে হয় বলে কখনও কথা বলেনি। সুমিতাদির পর, এত সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ওর হয়নি আজও। কান্নাটা বেশ সিরিয়াস। কী করবে ও। মোবাইলে হায়দার হুসেইনকে দ্রুত ওপরে আসতে বলল ; মেয়েটির ডেস্কের উল্টো দিকে দাঁড়াল গিয়ে, আর কাঁপা কন্ঠস্বরে জিগ্যেস করল, ‘কী হল মিস মনসুখানি, কাঁদছেন কেন ? বাড়ি যাননি কেন ? কী হয়েছে কী ? কমপ্লেন করলেই তো পারতেন। সামথিং পার্সোনাল ? অসুবিধা না থাকলে আমায় বলুন। দেখি কী করতে পারি।

    মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে, সুমিতাদির পর আরেকবার, অপরূপ শব্দটার মানে স্পষ্ট হয়েছিল রাহুলের। কী ফর্সা। টকটকে লিপ্সটিক। গভীর চোখ। ছোট্টো কপাল। কোঁকড়া চুলে মেক্সিকান বিনুনি। ম্যানিকিওর করা নখে টকটকে নেলপালিশ। কানে পান্নার দুল। গলায় সোনার হারে বড়ো মাপের পান্নার লকেট। ছোট্টো হাতঘড়ি। বাঁ হাতের সব আঙুলেই আজকালকার আংটি, বুড়ো আঙুলেও। ঝিরিঝিরি বিদেশি পারফিউম। তার মানে মাইনের অনেকটা সাজগোজে যায়। গলা-খোলা সবুজ ডিজাইনার পোশাকটারই যথেষ্ট দাম হবে।

    হায়দার হুসেইন হন্তদন্ত এসে হাঁপাতে-হাঁপাতে মেয়েটিকে জিগ্যেস করল, ‘আয়া কোথায় ? আয়া আসেনি এখনও?’

    হায়দারকে দেখে আত্মস্হ মেয়েটি বলল, আয়া তিনটের সময় এক্ষুনি আসছি বলে এখনও আসেনি, মাকে ফোন করেছিলাম, বাড়িতেও যায়নি। কথা শেষে আলতো ফুঁপিয়ে ওঠে তরুণী।

    কেঁদো না, কেঁদো না, আমি তোমার হুইলচেয়ার আনছি। বলে, রাহুলের হাত ধরে লিফটের দরোজার কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে হায়দার হুসেইন বলেছিল, সঙ্গীতা মনসুখানি কোমরের তলা থেকে বিকলাঙ্গ, পা দুটো নেই বললেই চলে, চাকরি পেয়েছে প্রতিবন্ধি কোটায়, প্রাইভেটে পড়ে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর, একাডেমিক রেকর্ড ভালো, চব্বিশ ঘণ্টার আয়া আছে, সে-ই ওকে অফিসে আনে আর নিয়ে যায়, অফিসে বাড়িতে বাথরুম করায়, বাবা নেই, মা স্কুল টিচার

    ছিলেন, ওর হুইলচেয়ার বা প্রতিবন্ধি পুশকার্টটা বেসমেন্টে রেখে যায় আয়া, হয়তো কোথাও গিয়ে আটকে পড়েছে, এরকম ব্যাপার তো ঘটেনি কখনও আগে, এমনিতে তো ও সকলের আগে সাড়ে চারটের সময়েই চলে যায়, আমি ওর পুশকার্টটা আনছি।

    বোকা-বোকা, অসহায়, কর্তত্বের অনুপযুক্ত মনে হয়েছিল নিজেকে, রাহুল সিংহের, হায়দার হুসেইনকে নিয়ে লিফট নিচে নেমে যাবার পর। অধস্তন স্টাফদের ব্যক্তিগত সমস্যাকে আমল দেয়নি। দৃশ্যমান অর্ধেকটুকু দেখে, মেয়েটি সম্পর্কে রঙিন ছবি এঁকে ফেলেছিল মগজে, অথচ জীবনের নিষ্পত্তি হচ্ছে বাকি অর্ধেকটা দিয়ে, যা টেবিলের আড়ালে

    থেকে গেছে।

    অর্ধেক সুমিতাদি ! বাকি অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে বিপ্লবের স্বপ্ন !

    বিকলাঙ্গের ঠেলাগাড়ি, বিশেষভাবে তৈরি, পেরাম্বুলেটারের আকারে, নিয়ে ঘর্মাক্ত হায়দার পৌঁছোলে, দুজনে মুখ চাওয়া-চায়ি করে যে অনুচ্চারিত কথাগুলো বলল, মেয়েটিকে তুলে ওর গাড়িতে বসাতে হবে, তা তো ভাবিনি, কে তুলবে, কী ভাবে ?

    হায়দার বলেছিল, স্যার, আমি গতবছর বাইপাস করিয়েছি, তাছাড়া এখনও হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক গোলমালের রেশ মেটেনি, কী থেকে যে কী ঘটে যায় আজকাল তার ঠিক নেই, তখন মেয়েটি বলেছিল, স্যার, আমি আরেকটু অপেক্ষা করছি, আয়া এসে যাবে নিশ্চয়ই।

    রাহুল ভাবল কী ভাবে তুলবে, যেভাবেই তুলুক না কেন, জড়িয়ে তুলে ধরা ছাড়া উপায় নেই। এত সুন্দরী তরুণীকে জীবনে কখনও জড়িয়ে ধরার অভিজ্ঞতা ওর হয়নি, সুযোগ হয়নি কখনও। যাকে ও চেয়েছিল, যে ওকে না-পেয়ে আত্মহত্যা করেছে, তহমিনা আপা, কাউকেই সুন্দরী বলা যায় না, গালে টোল পড়লেও, সুমিতাদি ছাড়া। সুমিতাদি স্কুলে রাহুলের চেয়ে তিন ক্লাস উঁচুতে পড়তেন, কতদিন ওনার বৈঠকখানা ঘরে গিয়ে কোমর জড়িয়ে ওপরে তোলার ইচ্ছে হয়েছে, তুলে, চেঁচাতে ইচ্ছে করেছে, কমরেড সুমিতা জিন্দাবাদ।

    সুমিতাদিকে কল্পনা করে, সঙ্গীতাকে জড়িয়ে ধরার তীব্র ইচ্ছা হল, আর রাহুল একটু ঝুঁকতেই, দু’হাত ওপরে তুলল যুবতী, যেভাবে কোলে ওঠার জন্য শিশুরা তোলে, হয়ত ছোটোবেলা থেকে যান্ত্রিক অভ্যাস।

    বুকে জড়িয়ে রাহুল তুলে নিয়েছিল সঙ্গীতা মনসুখানিকে, আর যা ও ভাবতেও পারেনি ঘটতে পারে, মেয়েটি ওর গলা জাপটে দুদিক থেকে আঁকড়ে কাঁধে মাথা রেখে প্রায় গালের কাছে নিজের ঠোঁট চেপে রাখল, ভিজে-ভিজে শ্বাসের গরম ভাপ, মনে হল রাহুলের। স্পর্শের নেকট্যে সম্পূর্ণ সঙ্গীতাকে অনুভব করতে পারছিল রাহুল, সে বিকলাঙ্গ হলেও, কোমরের তলায় শীর্ণ উরু আর বিকৃত পা হলেও। একজন সুন্দরী, সুসজ্জিতা, সুগন্ধমাখা যুবতীর তাজাগরম দেহ, নিম্নাঙ্গ তার সম্পূর্ণ না থাকলেও, জড়িয়ে ধরার রসায়ন শুরু হয়ে গিয়েছিল রাহুলের আগাপাশতলা। ওর পুশকার্টে নামিয়ে সিট বেল্ট বেঁধে দেবার সময় বুকে হাত ঠেকল। বুকে হাত ঠেকতেই মনে পড়ল, অঞ্জলি বলেছিল, পুরুষগুলো লেচার হয়।

    সুমিতাদির কোমর জড়িয়ে ওপরে তুললে কী বলতেন উনি ?

    কত আর ব্যা-ব্যা-ব্যা-ব্যা করবি !

    রাহুল বলত, কী করি, রামছাগলরা এরকমই হয়, ব্যা-ব্যা-ব্যা-ব্যা…

    বেসমেন্টে গিয়ে হায়দার হুসাইনের গাড়িতে তোলার সময়ে আরেকবার জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেল রাহুল, কিন্তু এবার সঙ্গীতা মনসুখানি নিজেই ওর কোমর আঁকড়ে ধরল, যাতে ও তুলে নিয়ে গাড়ির ব্যাক সিটে বসিয়ে দিতে পারে। আলিঙ্গনের মধ্যেই খুলে দিল মেয়েটির সিট বেল্ট, বুকে কয়েকবার হাত লাগা ছাড়া উপায় ছিল না ; হৃৎস্পন্দনের পারস্পরিক আলতো দামামার আদান-প্রদানের মাধ্যমে দুদিক থেকে পাছার তলায় হাত দিয়ে এক লপ্তে তুলে নিয়েছিল মেয়েটিকে, আর টের পেয়েছিল খাপে-খাপে বসে গেল নিজেদের চনমনে প্রত্যঙ্গ। রাহুলের মনে হয়েছিল, মিস মনসুখানি যেন বিকল অংশটা ঠেসে ধরেছে ওর সচল অংশে। সম্ভবত ও-ই এই মেয়েটির প্রথম পুরুষ, পুরো অবয়ব কেঁপে-কেঁপে উঠেছিল মেয়েটির। সঙ্গীতার বাড়িতে পৌঁছেও একই কাজ আরেকবার ধাপে-ধাপে করতে হল রাহুলকে। মেয়েটি ওর হাত ধরে বার-বার থ্যাংকস জানিয়েছিল। পরে, রাহুলের মনে হয়েছে, আয়ার না আসা কী ইচ্ছাকৃত, কেননা থ্যাংকস জানাবার পরও সঙ্গীতা ওর হাত ছাড়তে চায়নি কেন।

    রাহুলের রগ দপদপ করে বলছিল, লেচার লেচার লেচার লেচার….

    কেন, সুমিতাদি ?

    ঘটনাটা স্মৃতিতে যখনই ভেসে উঠেছে, রাহুলের ভেতরের কুকুর ওকে ঘেউ-ঘেউ করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে ওই একটি ঘণ্টায় সে একজনকে আকর্ষণের তীব্র মাতলামিতে টেনে নিয়েছিল, যে ধরণের আকর্ষণ তহমিনা আপা, অঞ্জলি, এমিলিয়া বনিয়া, মীরা, সুরেখার কাছ থেকে পায়নি। একজন মেয়ের ভালোবাসা আরেকজনের থেকে একেবারে পৃথক হয়, তার কারণ ব্যক্তি হিসাবে একটি মেয়ে আরেকটি মেয়ের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

    মীরা ব্যানার্জি। সুরেখার মতনই আরেক নারী যে প্রথম পরিচয়ের দিনই রাহুলকে স্তম্ভিত করে, জানিয়েছিল, ওর ইউটেরাস নেই। রাহুলের বয়স তখন কত হবে, মমমমমমম, বোধহয় কত, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায় । প্রথম পরিচয়ের দিনই একজন যুবতী কেন এরকম একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার তাকে জানাল, তা ওর দুশ্চিন্তা হয়ে

    উঠেছিল। তার পর মীরা একদিন বলল, সুরেখার ঢঙেই, আপনার স্ত্রীকে আমি বলেছি, আপনাকে আমি পছন্দ করি। যে ইঁটগুলো দিয়ে রাহুল নামের বাড়িটা গড়া, সেটাকে ভাঙার প্রয়াস কেন করেছে সুরেখা আর মীরা, তার কুলকিনারা সেদিন পায়নি রাহুল। ওকে দেখতে তো স্মার্ট নয়, শরীর থেকে যৌনগ্রন্হির গন্ধও ওড়ায় না, সাদামাটা আটপৌরে চেহারা, মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে কুন্ঠিত বোধ করে, রেকলুজ, কম কথা বলে, তবু কেন ও কাউকে-কাউকে আকর্ষণ করে ফ্যালে।

    একদিন, অফিসে নিজের কেবিনে কাজে মশগুল ছিল, তবু প্রচণ্ড একটা আওয়াজ শুনতে পেয়ে, রাহুল অনুমান করল, অ্যানি বেসান্ত রোডে গাড়িতে-গাড়িতে ধাক্কা লাগল ;বৈভবশালীদের শহর, অঢেল টাকা, ডজনখানেক গাড়ি, ধাক্কা লাগলেও গায়ে মাখে না। একটা গাড়ি আচমকা থামলে, তার পেছনের সব গাড়িগুলো একটার পর একটার পেছনে ধাক্কা মারতে থাকে। আরেকবার অমন আওয়াজ হতেই, রাহুল দেখল যে মীরা ব্যানার্জি ওর হাত ধরে টান দিয়ে বলছে, চলুন, চলুন, বেরোন, শিগগির বেরোন, ভূমিকম্প হচ্ছে।

    মীরা ওকে টেনে কেবিনের বাইরে নিয়ে যেতে, রাহুল দেখল, সত্যিই, অফিসার আর কর্মীরা সবাই দৌড়োচ্ছে হলের বাইরে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে ওপরতলার কর্মিরা। মীরা ওর হাত ধরে টানতে-টানতে বাইরে ভিড়ের মধ্যে এনে দাঁড় করিয়ে দেবার পর, সমবেত সবাই দেখল, ভূমিকম্প নয়, ওদের অফিস বিল্ডিংটাই, ওপরতলা থেকে একেরপর এক ফ্লোর নিয়ে শব্দ করে, সিমেন্টের ধুলো উড়িয়ে, পড়ছে। রাহুলের চোখের সামনে, কয়েক মিনিটের ভেতর, পড়ে গেল বিশাল দশতলা বাড়িটা।

    মীরাকে ধন্যবাদ জানাতে, ও বললে, বলেছিলাম তো আপনাকে যে আমার ইউটেরাস জন্ম থেকে নেই। যাকে পছন্দ হয়, তাকে ইন্সটিংক্টিভলি পছন্দ হয় ; ওই পছন্দের পরিবর্তে তাকে কিছু উপহার দিই। আমি এভাবেই, আজ পর্যন্ত, আপনাকে নিয়ে, সাতজনকে বাঁচিয়েছি। আজকে আপনাকে আরও বেশি করে বাঁচবার জন্য সময় উপহার দিলাম। মনে রাখবেন।

    ব্যাস, স্মৃতিতে তুলে রেখেছে রাহুল। অজস্র স্মৃতি-ছবির একটা। ওর বিভাগের কেবল একজন মারা গিয়েছিল, বিল্ডিংটা চাপা পড়ে। যে মারা গিয়েছিল, তার অভ্যাস ছিল জুতো খুলে খালি পায়ে বসে কাজ করা। হল ছেড়ে পালাবার চেঁচামেচি শুনে জুতো পরবার জন্য টেবিলের তলায় মাথা ঝুঁকিয়েছিল, তাতে যেটুকু দেরি হয়েছে, বাইরে বেরোবার সময় পায়নি। রাহুলকে অমন সময়টুকু পাইয়ে দিয়েছিল মীরা।

    ওপরতলা থেকে চোদ্দজন সময়মতো নামতে পারেনি। তাদের থ্যাঁতলানো দেহ সিমেন্টের চাঁই সরিয়ে কয়েকদিন পর পাওয়া গিয়েছিল।

    যে মেয়েটিকে রাহুল বিয়ে করল, সুমনা সেন, তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এক তামিলভাষী তরুণী। রাহুলের বয়স তখন কত, বোধহয় আঠাশ, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়। সেবারও ট্রেনিং নিতে গিয়েছিল চেন্নাইয়ে।

    এত রকমের ট্রেনিং ওকে দিয়েছে ওর গ্রামীন উন্নয়ন অফিস যে চাকুরির এক চতুর্থাংশ সময় ওর কেটে গেছে ট্রেনিং নিতেই। কী ট্রেনিং যে নেয়নি ! বিদ্যুৎ প্রসারণ, তাঁতের কাজ, চাষের কাজ, খাল তৈরি, জমিতে নিয়ে যাবার পিভিসি পাইপ, ঘাসের রকমফের, হরটিকালচার, প্ল্যান্টেশান, ছোটোএলাচ, ঋণখেলাপির কার্যকারণ, সহযোগীতা, আরটেজিয়ান কুপ, শ্যালো বনাম ডিপ, মৎস্যচাষ, দুধ-কোঅপারেটিভ, গোপালন, মাংসের প্রক্রিয়াকরণ, নদীর বাঁধ, কোল্ড স্টোরেজ, আলু চাষ, চাষের যন্ত্রের ব্যবহার, ক্ষুদ্র সেচ, গ্রামের বউদের জন্য কমপিউটার, একই ট্রেনিঙের রিফ্রেশার কোর্স ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকমই একটা ট্রেনিং নিতে গিয়ে সুমনার সঙ্গে ওর আলাপ। বাংলা তাঁতের শাড়ির সঙ্গে হাই হিলে পেখমতোলা সুমনাকে, পরিচয়ের পরমুহূর্তেই সরাসরি বলেছিল, ‘আপনাকে বিয়ে করতে হলে

    আপনাদের বাড়িতে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে ?’

    –বড় মামার সঙ্গে, আমার বাবা-মা ছোটোবেলায় মারা যান, আমি মামার বাড়িতে মানুষ।

    চেন্নাইয়ের মাউন্ট রোডে ওদের বাংলোবাড়িতে গিয়ে রাহুল দ্যাখে, ড্রইংরুমে সাজানো নানা মাপের কাপ আর শিল্ড, দুটো কুকুর, বারান্দায় বেতের চেয়ার, টুপি টাঙাবার আর ওভারকোট ঝোলাবার আয়নালাগানো র‌্যাক ; একটা আলমারিতে গোটা দশেক রাইফেল আর বন্দুক। লাল ড্রাগেট বেছানো ঘরে অজস্র ইংরেজি পেপারব্যাক, এত পুরানো যে পাতা ওলাটানো গেল না সহজে, দেয়াল-ঘেঁষা তাকগুলোয়, বোঝা যায় যে কুড়ি-পঁচিশ বছরের ওপর কেউ হাত দেয়নি ওগুলোয়, পৃষ্ঠাগুলো কালচে। রাহুলের প্রথম প্রতিক্রিয়া, যাকে বলা যায় স্টান্ড। কোথায় চেন্নাইয়ের এই অভিজাত পরিবার আর কোথায় ওর নিম্নবিত্ত দিন-আনি-দিন-খাই পরিবার।

    সুমনার বড়মামা চন্দ্রনাথ গুপ্ত, রাহুল জেনে নিয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধাপে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত, বাড়ি ছিলেন না। মেজমামা, সূর্যনাথ গুপ্ত, স্যুটপরা, ঢুকলেন ড্রইংরুমে, নিজেই আগাগোড়া কথা বলে গেলেন, ওনাদের বিখ্যাত হিন্দি-ইংরেজি-তামিলে চোবানো বাংলায়। ওনার ঠাকুর্দা রহড়ার, যেখানে উনি, যাননি কখনও, রাহুলও যায়নি। বাবা ছিলেন ইন্সিওরেন্স কোম্পানির মালিক। ইন্সিওরেন্স ন্যাশানালাইজেশান হবার পর ওনাদের আর্থিক অবস্হা পড়ন্ত।

    পড়ন্ত শুনে আস্বস্ত হয়েছিল রাহুল। সে-কারণেই সুমনাকে চাকুরি করতে পাঠানো হয়েছে। এ-কথা শুনে আবার দমে গিয়েছিল রাহুল। সুমনার নিজের বোন সুচরিতা আর মামাতো বোন বসুধা ক্যাথলিক স্কুলে পড়ায়, বাড়িতে টিউশানির কোচিং ক্লাস নেয় ওরা।

    কাচের আলমারি থেকে দু’তিনটে বন্দুক আর রাইফেল বের করে তাদের ক্যারদানি দেখালেন মেজমামা। সুমনা ওর মামাতো বোনেদের বলে থাকবে যে রাহুল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে : পরিচয়মাত্রই প্রস্তাব, এরকম পাত্র ওরা দেখেনি আগে, রাহুলও দেখেনি। এক-একজন করে এসে দেখে যাচ্ছিল ওকে। রাহুলের মনে হল, প্রত্যেকেই, বিয়ে করার উপযুক্ত। সবাইকে একসঙ্গে বিয়ে করে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না, এক-এক ঋতুতে এক-একজন।

    রাহুলকে কথা বলার, প্রস্তাবটা পাড়ার সুযোগ না দিয়ে, মেজমামা এমন অবিরাম কথা বলতে থাকলেন যে রাহুলের সন্দেহ হল, সম্ভবত ইনি চাকুরে ভাগ্নিকে হাতছাড়া করতে রাজি নন। মেজমামা বললেন, ওনারা তিন ভাই দু’বোন। ছোটো বোন পনেরো বছর বয়সে মারা গেছে। সুমনার মা মারা গিয়েছিলেন সুচরিতা যখন এক মাসের। ওনাদের দুটো গাড়ি ছিল, শেভ্রলে, দুটোই জেড-ব্ল্যাক। এখন আছে ফাঁকা গ্যারাজ, যেটা সার্ভেন্ট কোয়ার্টার হিসেবে কাজে লাগে। ছোটোভাই থাকে ভুসাওয়ালে। ওনার বাবার আরও দু’জন ভাই, দু’জনেই বিয়ে করেননি, একজন জীবিত। বাবা গ্রীষ্মকালে লণ্ডনে গিয়ে থাকতেন। আলমারিতে লণ্ডনের কাটলারি, নীল ফিনফিনে।

    বিলেতফেরত হবার ছাপ ওদের টয়লেটে দেখেছিল রাহুল, টয়লেটে পায়খানার জন্য চেয়ার রাখা, যে চেয়ারের বসার জায়গায় গোল করে কেটে এনামেলের ডেকচি বসানো, ওই ডেকচিতে হাগতে-মুততে হবে, কাজ হয়ে গেলে কবজা-লাগানো কাঠের পিঠটা ফেলে ঢাকা দিতে হবে, পরিষ্কার করার জন্য দুপুরে আর রাতে মেথর আসে। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে হাগতে বসে টুং-টাং শব্দ উঠবে থাতব ডেকচি থেকে।

    বিয়ের প্রস্তাব দিতে গিয়ে, দু’বার শরবত খেয়ে, রাহুলের পক্ষে পেচ্ছাপ চেপে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না বলে বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছিল, নয়তো অন্যের বাড়ি গিয়ে টয়লেটে, যাকে সবাই এখন ওয়াশরুম বলে, যাওয়া এড়িয়ে যায় রাহুল। এখন, ওর বয়স সত্তর, তাই কারোর বাড়ি একেবারেই যেতে চায় না, প্রস্টেটের দরুন টয়লেটে বার কয়েক ঢোকবার আশঙ্কায় ; গেলেও, সেদিন জল আর তরল খাওয়া নিয়ন্ত্রণে রাখে।

    মেজমামার বক্তৃতার জন্য সেদিন রাহুলের প্রস্তাব জানাবার সুযোগ হয়নি। পরের দিন যেতেই বহু প্লেট এসে গেল রাহুলের সামনের সেন্টার টেবিলে, নানা রকম খাবার সাজানো, যাকে বলে থরে-থরে। পেটুক রাহুলের কাছে আটপৌরে বাঙালি রান্নার বাইরে অন্যধরণের রান্না বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ও জানতে চাইলে, ওকে যখন জানানো হল যে যাবতীয় রান্না সুমনা করেছে, বিশেষভাবে রাহুলের জন্য, তখন ওর পেটের আনন্দ মুখময় ছড়িয়ে পড়েছিল।

    সুমনার বড়-মাইমা ড্রইংরুমে ঢুকে রাহুলের ইন্টারভিউ নিতে বসলেন। রাহুলের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইনটারভিউ, যেগুলো ছাপা হয়নি, অথচ যেগুলো প্রকাশিত হওয়া সবচেয়ে জরুরি ছিল, এই ইনটারভিউ তার অন্যতম। রক্তিম চাটুজ্জে ওনার প্রেমিকার বাবার নেয়া এই ধরণের ইনটারভিউতে ফেল করে রাহুল-বিরোধী, অনিকেত-বিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। ইনটারভিউতে রাহুল সফল হলেও, ও শুনতে পেল ভেতরে গিয়ে বড়মাইমা সুমনাকে বলছেন, তোর চেয়ে বয়সে ছোটো মনে হচ্ছে, যা, রাহুলের মনে হল, সম্ভবত পারিবারিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ।

    একটু পরে সুমনার বড়মামা ফিরলে, গ্রুপ ডিসকাশান হল, যার আলোচ্য বিষয় ছিল রাহুলের জন্মসন, অনিকেতের জন্মসন, রাহুলের বাবার জন্মসন, বাবা-মা স্কুলের মুখ দ্যাখেননি বলে ওর আর অনিকেতের জন্মসন স্কুলে ভর্তির দিন পাঁজি দেখে শুভ দিন খুঁজে রাখা হয়েছিল শুনে অবাক হলেন না, কেবল ঘাড় নাড়লেন, যার মানে হয়তো ‘কোথ্থেকে এই ছোটোলোকটাকে ধরে আনল সুমনা’, কিংবা ‘ও আচ্ছা, চলবে, এরকম পরিবার ইউপি সাইডে আছে বটে।’

    চাকুরির বয়স, কত মাইনে ইত্যাদি জানতে চেয়ে উপরি নেই শুনে উপস্হিত সবাইকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল, কিন্তু ট্যুরের টিএ-ডিএ থেকে টাকা বাঁচে শুনে আস্বস্ত হলেন, যে টাকা রাহুল এতকাল উড়িয়ে আনন্দ পেতো। প্রাথমিকভাবে রাহুল সেলেকটেড হল, কিন্তু, হ্যাঁ, ওনাদের একটা কিন্তু আছে, আর তা হল, আগামি মাসের চার তারিখে মেজমামার বড় মেয়ের বিয়ে, পাত্র কাস্টমসে কাজ করে, অনেক উপরি, ক্যাশ এবং কাইন্ড দুইই।

    রাহুল বিয়ে করছে জানিয়ে কানপুরে বাবাকে, আর অনিকেতকে ওর অফিসের ঠিকানায় সিংভূমে টেলিগ্রাম করে দিয়েছিল, সুমনার মামাদের অনুমতি পাবার আগেই। তার কারণ রাহুলের প্রচারিত চরিত্রদূষণের কারণে রাহুলের মা, যাকে বলে প্রকাশ্যে, ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, যে, রাহুল যে-কোনো যুবতীকে সিঁদুর পরিয়ে বাড়িতে আনলে তাকে

    তৎক্ষণাত বাড়ির ছোটো বউএর স্বীকৃতি দেয়া হবে, জাত-ধর্মের ক্রাইটেরিয়া প্রযোজ্য হবে না, যেহেতু ওগুলো রাহুল আগেই খুইয়ে বসে আছে।

    মামা-মামিদের ইতস্তত উসখুসভাব দেখে রাহুল আবার দুটো টেলিগ্রাম করে দিয়েছিল, বাবাকে আর অনিকেতকে, ‘ম্যারেজ ক্যানসেল্ড’। রাহুল আঁচ করল যে সংসারে সুমনার আর্থিক অবদান এতই জরুরি যে ওকে এখনই ছাড়া যাবে না। সুমনার দাদামশায় যা রোজগার করতেন তার পুরোটাই ইংরেজিয়ানায় খরচ করে দিতেন, ফলে সঞ্চয় নামের কোনো পুঁজি নেই। সেই লোকদেখানো আভিজাত্য টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তথৈবচ হালচাল। অফুরন্ত রোজগার করতেন বলে বেঁচে থাকতে ছেলেদের চাকরি করতে দেননি, ভাড়া নেয়া বাংলোয় বসবাস করে নিজের বাড়ি কেনার কথা চিন্তা করেননি। তিনি মারা যাবার পর, ছোটো ছেলে, যার তখনও চাকরিতে ঢোকার বয়স ছিল, সুমনাদের চেন্নাই এসট্যাবলিশমেন্ট থেকে কেটে পড়ে, রেলের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, রেলের জনৈক কেউকেটা কর্তার চিঠির জোরে, যিনি, সেই কেউকেটা কর্তার শর্ত ছিল যে তাঁর একাধিক মেয়ের একটিকে, যাকে পছন্দ, বিয়ে করতে হবে।

    গল্প-উপন্যাসের মামা-মামির সংসারে যেমন হয়, ততটা না হলেও, সুমনা আর ওর বোনকে মামাতো বোনেদের চেয়ে বেশি শ্রম দিতে হতো, বিশেষ করে প্রতিদিন সবায়ের জন্য রুটি বেলা আর সাঁকায়।

    –কতগুলো রুটি ? জানতে চেয়েছিল রাহুল।

    –ছেচল্লিশটা !

    –আমাদের কানপুরের বাড়িতে কাজের মাসি আছে, যে রুটি বেলে-সেঁকে দিয়ে যায়।

    –গিয়ে ছাড়িয়ে দেব।

    –এখনও তো মামারা ফাইনাল করে উঠতে পারছেন না।

    –করবেন।

    ক্যানসেল টেলিগ্রামের পরের দিন সুমনা রাহুলের ট্রেনিং সেন্টারে এসে হাজির, বড় মাইমা ডেকে পাঠিয়েছেন। গেল রাহুল। ওনারা রাতভর শলা-পরামর্শ করে নির্ণয় নিয়েছিলেন যে চাকুরি করে না এমন এক মামাতো বোন, যাকে রাহুলের পছন্দ, বিয়ের প্রস্তাব দেবেন। কিন্তু সুমনার ছোটোবোন সুচরিতার প্রস্তাবে ওনারা বিপদে পড়লেন। সুচরিতা জানালো যে রাহুলকে দেখে ওর ভালো লেগেছে, তাই ও-ই রাহুলকে বিয়ে করবে, কারোর কোনো চিন্তার প্রয়োজন নেই। শুনে, বেশ লেগেছিল রাহুলের, ও-ই যেন স্বয়ম্বর সভায় বসে আছে, আর রাজকুমারীরা প্রতিযোগীতায় নেমেছেন।

    পরিবারে একাধিক বিয়ের বয়সী মেয়ে থাকায় দুই মামার মতবিরোধের মাঝে পড়ে গিয়ে সুমনাকে ওনারা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন, নয়তো পরে ওর জন্য পাত্র তো ওনাদেরই খুঁজতে হবে, টাকাকড়ি খরচ করতে হবে, আর তখন যদি না পাওয়া যায় ! মেজমামা রাহুলকে হুকুম করলেন, ওনাদের টেলিফোন থেকে কানপুরে বাবাকে টেলিফোন করতে, ওনারা কথা বলতে চান। রাহুলদের কানপুরের বাড়িতে টেলিফোন ছিল না। বাবাকে আর অনিকেতকে ওনাদের টেলিফোন থেকে ফোনোগ্রাম করে দিল।

    ফোনোগ্রাম করার পর, কার্ড ছাপাবার জন্য, মেজমামা তথ্য নিলেন ইংরেজিতে, কেননা বাংলা ভাষায় ওনার

    অনুপ্রবেশ ঘটেনি। মেজমামাকে তথ্য দিচ্ছিল রাহুল, দেখল সুমনা আর ওর ছোটো বোন ইংরেজিতে তর্কাতর্কি চেঁচামেচি করতে-করতে বাংলোর ঘেট খুলে দৌড়োলো, বাইরে মাউন্ট রোডে, তখন সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকার। রাহুলের দিকে তাকিয়ে সুমনা বলল, ‘ও-ই আপনাকে বিয়ে করতে চাইছে, অ্যাডামান্ট’। ওদের পিছনে ছুটে দুজনকে দুহাতে ধরে, ঝাঁকিয়ে রাহুল বললে, ‘কি করছেন কী, আমি যে-কোনো কাউকে বিয়ে করার জন্য কানপুর থেকে চেন্নাই আসিনি, চলুন, ফেরত চলুন’। দুজনের কবজি ধরে, প্রায় ফিলমি ঢঙে শিভালরি দেখিয়ে, ফেরত আনতে মেজমামা ওদের বাড়ির ভেতরে যাবার নির্দেশ দিয়ে কার্ডের খসড়া রচনায় মন দিলেন।

    কার্ডের খসড়ায়, সুমনার বাবা সুরঞ্জন সেনের নামের আগায় এমন কোনো ইঙ্গিত পেল না রাহুল যা থেকে টের পাওয়া যায় যে উনি জীবিত না মৃত। ফলে প্রশ্নটা তুলতে, সুমনার বড় মামা বললেন, ‘ইট ইজ এ লঅঅঅঅং স্টোরি’। কিন্তু স্টোরিটা যে কী তা বলতে চাইলেন না। পরে, রাহুল তখন কানপুরে, পাঁচ-ছয় বছর বয়সের স্মৃতি রিকালেক্ট করে সুমনা বলেছিল, বাবা এসেছিল আমাদের নিতে, সঙ্গে ঘোমটায় মুখ-ঢাকা কমবয়সী সৎ-মা, কোলে বছরখানেকের বাচ্চা। দেখলেই বেশ বোঝা যায় বাবার আর্থিক অবস্হা খুবই খারাপ। বড়দাদু বকুনি দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

    তারপর ওর বাবা ওর অফিসে কয়েকবার গিয়ে দেখা করার চেষ্টা করেছিলেন, সম্পর্ক নবীকরণের উদ্দেশ্যে।

    মামারা আর দাদুরা বাবা সম্পর্কে এমন আতঙ্ক ওর মনে গেঁথে দিয়েছিলেন শৈশব থেকে যে ও দ্রুত এড়িয়ে গিয়ে বাবার সামনে থেকে পালিয়েছিল।

    বড়দাদু নামক বৃক্ষটিকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য ছোটোদাদু আর মেজদাদুর সংসার পাতা হয়নি। পারিবারিক গল্পগাছা অনুযায়ী, বার্ধক্যে মারা যাবার সময় দুজনেই ভার্জিন ছিলেন। যৌবনের কী অপচয়, মনে হয়েছে রাহুলের। সুরঞ্জন সেন ছিলেন অনুশীলন বা যুগান্তর সমিতির সদস্য, জেনেছিল রাহুল, সুমনার দিদির কাছ থেকে। কলকাতায় বিএ পড়ার সময় পুলিশ সুরঞ্জনদের ডেরায় হানা দিলে তিনি বেনারস পালান। সেখানে শচীন্দ্রনাথ সান্যালের শিষ্যদের আস্তানায় লুকিয়ে থাকার পর পালিয়ে যান লাহোর। আমিরচাঁদ, বালমুকুন্দ, অবোধবিহারী প্রমুখের গড়া বৈপ্লবিক পরিকাঠামোয় ঢুকে পড়েন। ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন বলে ইংরেজদের মন্টেগোমারি ক্লাবে নাম ভাঁড়িয়ে স্যুট-টাই পরে ম্যানেজারের চাকরিতে যোগ দেন। মন্টেগোমারি ক্লাবের জনৈক সদস্য, ইন্সিওরেন্স কোম্পানির মালিক, চেন্নাইয়ের এক বিলাতপ্রেমী বাঙালির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যিনি তাঁর বড়ো মেয়ের সঙ্গে সুরঞ্জনের বিয়ের প্রস্তাব দ্যান।

    সমাজে ঢুকে এভাবে লুকিয়ে থাকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি সুরঞ্জন সেন। বিয়ের পর তাঁর প্রকৃত কাজকারবার ফাঁস হয়ে যায় তাঁর শ্বশুরের কাছে, এবং ব্রিটিশ-শাসকের স্নেহধন্য শ্বশুরমশায় দুই নাতনি আর মেয়েকে নিয়ে ফিরে যান চেন্নাই। সুমনার সন্দেহ যে বড়দাদু পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন বাবাকে। সুমনার অন্তসত্ত্বা মা হয়ত স্বামী আর বাবার মূল্যবোধের সংঘর্ষের উদ্বেগজনিত সংক্রামে মারা গিয়েছিলেন তৃতীয় মেয়ের জন্মের সময়ে। একদিকে বিলেত ফেরত নব্যপ্রবাসীর অতিসাহেবিয়ানা, আরেকদিকে বিপ্লবীর স্বপ্নালু বাঙালিয়ানার ঘাত-প্রতিঘাত। সুরঞ্জন সেনের দ্বিতীয় স্ত্রী আর ছেলের কী হল, জানার ইচ্ছা হয় সুমনার। কানাঘুষা শুনেছে যে সুরঞ্জন সেন ভবঘুরে হয়ে গেছেন।

    সুমনার ছোটোমামার ছেলের বিয়েতে বরযাত্রী হয়ে ভুসাওয়াল থেকে ট্রেনে মুম্বাই যাচ্ছিল ওরা সবাই, একটা তৃতীয় শ্রেনির সাধারণ কামরা সম্পূর্ণ দখল করে। দাদারে সকাল সাতটায় ট্রেন পৌঁছাবে, কন্যাপক্ষের লোকেরা– সবাই মারাঠি, কেননা ছেলেটি বিয়ে করছে প্রদেশের রাজস্ব সচিবের মেয়েকে– নিতে আসবে, মহিলারা তাই সাজগোজ করে নিচ্ছিলেন। হঠাৎ টয়লেটের কাছ থেকে সুমনার ‘বাবা-বাবা’ চিৎকারে রাহুল আর ছোটোমামা দৌড়ল কী হয়েছে দেখতে। দেখল, প্রায় ভিকিরির জামাকাপড়ে, এক দীর্ঘদেহী বৃদ্ধ, কদমছাঁট চুল। সুমনা বলল, আমার ডাকে চাদরে মুখ লুকিয়ে নিয়েছে। ছোটোমামা মুখ থেকে চাদর সরাবার চেষ্টা করে ‘জামাইবাবু-জামাইবাবু’ বলে বারকয়েক ডাকলেন, আর সাড়া না পেয়ে নিশ্চিত হবার জন্য নিজের দাদা-বৌদিকে ডাকতে গেলেন। ওনার পেছন-পেছন রাহুল আর সুমনাও গেল বড়মামা মেজমামা আর মাইমাদের ডেকে আনতে কামরার কিউবিকলগুলো থেকে।

    রাহুল হতভম্ব, বাকরহিত।

    সবাই দল বেঁধে ফিরল টয়লেটের কাছে। কুড়িজনের ঠেলাঠেলি। রাহুলরা ফিরে দ্যাখে সুরঞ্জন সেন নেই। দাদার স্টেশান এসে পড়ায়, উত্তেজনায় খেয়াল করেনি কেউই, ট্রেনের গতি স্তিমিত হয়ে এসেছিল, আর সেই সুযোগে নেমে পড়েছেন রাহুলের শ্বশুরমশায়। প্ল্যাটফর্মে ছুটোছুটি করে, স্টেশানের বাইরে খোঁজাখুঁজি করেও, তাঁর দেখা মিলল না। আর কখনও তিনি এলেন না রাহুলের সামনে। নিজের শ্বশুরের সঙ্গে পরিচয় হল না রাহুলের। শাশুড়ির ব্যবহারিক

    স্নেহ থেকেও বঞ্চিত থেকে গেল। রাহুলের বয়স তখন কত হবে, মমমমমমম, বোধহয়, মমমমমম, কতইবা, সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায়।

    পরে, কলকাতায় থাকার সময়ে, জামাইষষ্ঠীর বাজার করতে-আসা প্রতিটি প্রৌঢ়াকেই রাহুলের মনে হত ওর শাশুড়ি।

    –এত ভারি দু-দুটো থলে বইবেন কী করে ? আমাকে দিন আপনাকে রিকশয় তুলে দিচ্ছি।

    –হ্যাঁ বাবা, বয়স হয়ে আসছে তো, আর বইতে পারিনে, মেয়ে-জামাই-নাতি কাল সকাল-সকাল আসবে বলেছে; তাই বাজারটা আজকেই করে রাখলাম, মাছের অর্ডার দিয়ে দিয়েছি, কালকে ভোরবেলা এসে কাটিয়ে নিয়ে যাবো।

    –আমার গাড়ি আছে, বলেন তো আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবো ; গাড়িতে আমার স্ত্রী বসে আছে। আসলে আমার তো শাশুড়ি ছিলেন না।

    –তাহলে তুমি আর তোমার বউও চলে এসো কালকে, ভালোই হবে।

    –না মাসিমা, আরও কয়েকজন শাশুড়ির নেমন্তন্ন গত কয়েকবছর যাবত তোলা আছে। আপনারটাও তোলা থাক। সেনচুরির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। জীবনে কত-কিছু যে তুলে-তুলে রাখছে !

    –আজকাল আর তোমাদের মতন মানুষ বড় একটা হয় না। রিকশয় উঠে বললেন রাহুলের, হয়তো, নব্বুইতম শাশুড়ি।

    রাহুল নিজেকে বলল, আমি তো ভাবছিলুম আমি মানবেতর মানুষ, কত যে অমন ‘তুলে রাখা’ তুলে রেখেছি।

    সুরঞ্জন সেনের অন্তরজগতে যি বিপ্লবী বাসা বেঁধেছিল, তা রাহুলের মতনই, রাহুলের মনে হয়েছে, মানবেতর কোনো প্রাণী।

    ওর, রাহুলের ভেতরে, মানুষ আছে না জানোয়ার, তা নিয়ে নিজেকে ঝালাতে গিয়ে ওর সন্দেহ কাটেনি। একবার ট্যুরে গিয়ে, রাহুলের চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে, অবিরাম ট্যুরের চাকরিতে, মরা বাঘিনীকে যখন চিৎ করে শোয়ানো হয়েছিল, তার রক্তাক্ত যোনির দিকে তাকিয়ে নিজেকে বাঘ মনে হয়েছিল ওর, এমনই ছিল তার অপ্রতিরোধ্য ইরটিক আকর্ষণ। উত্তর প্রদেশের, তখনও উত্তরাখণ্ড রাজ্য হয়নি, নেপালের ঘন-সবুজ সীমান্তে দু’সপ্তাহ যাবত জঙ্গলঘেঁষা গ্রামগুলোয় ক্ষেত্রসমীক্ষা করে বেড়াচ্ছিল রাহুল আর ওর সহায়ক ভেটেরিনারি ডাক্তার উমাপ্রসাদ রাও। পিলিভিত জেলার উত্তরাঞ্চলের টনকপুর পর্যন্ত নেপাল সীমান্ত কভার করে, নানপারাতে বেস ক্যাম্প বানিয়ে নেপালগঞ্জ রোড, ভনঘা, ধর্মনপুর, কুমভের, হাটারিয়ান ঘাট, সিঙ্গাহি, নিঘাসন অঞ্চলের পাহাড়তলির গ্রামগুলো ঘুরে তারপর মৈলানিকে কেন্দ্র করে সোনারিপু, ধনগড়হি, কৈলাটি, চন্দনচৌকি পর্যন্ত গ্রামগুলোয় সেরে ফেলেছিল ক্ষেত্রসমীক্ষা।

    রাহুলের ক্ষেত্রসমীক্ষার বিষয় ছিল বিশুদ্ধ ভারতীয় গরু নামে আর কোনো প্রাণী এদেশে টিকে আছে, নাকি স্বদেশি-বিদেশী সংমিশ্রণে এদেশি গরু আর একটিও নেই। ক্যালেণ্ডারে শ্রীকৃষ্ণের সাথে যে গরুগুলোর দেখা মেলে, সেগুলো নিউ জার্সি বা হলস্টিন ফ্রিজিয়ান। রবি বর্মা শ্রীকৃষ্ণের পেছনে যদি কয়েকটা গোরু এঁকে যেতেন তাহলে সমস্যা হয়ত কম হতো।

    বাজারের বিশ্বায়নের বহু আগে থাকতে, গৃহপালিত জন্তুজানোয়ার আর হাঁস-মুর্গির সংকরায়ন হয়ে চলেছে। হিমালয়ের সমতলের জঙ্গলে রাহুল খুঁজে পেয়েছিল স্বদেশি গোরু, গাধার মাপের ছোটো-ছোটো গোরু, সামনে ছুঁচালো শিং, জঙ্গলে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য। দুধ তেমন দেয় না বলে কেউ পোষে না, এত ছোটো যে চাষের কাজেও লাগে না। কখনও কখনও অবশ্য মারোয়াড়িদের ছেড়ে-দেয়া অন্য জাতের বা বিদেশি-সংকর ষাঁড় হেলতে-দুলতে পৌঁছে যায় জংলি গোরুর পালে, আর তাদের ধর্ষণের পর, বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে মারা পড়ে কিছু-কিছু গোরু।

    গোরু খাবার লোভে একটা বাঘিনি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নেমে এসেছিল কোথাও, তারপর জলভরা খালে পড়ে উঠতে পারেনি, খালের দু-ধার সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। পিছলে-পিছলে বার-বার পড়ে গেছে জলে। সুন্দরবনের বাঘেদের মতন জলে অনেকক্ষণ সাঁতরাতে পারেনি। জল খেয়ে-খেয়ে, মরে ভেসে উঠেছিল। গ্রামবাসীরা বাঘিনীর লাশ জল থেকে তুলে বিডিওকে খবর দিতে, বিডিও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানায়। বিডিওর মাধ্যমে তিনি রাহুলকে অনুরোধ করেন যাতে রাহুলের সহায়ক ভেটেরিনারি ডাক্তার পোস্ট মর্টেম করে একটা রিপোর্ট লিখে জেলাসদরে পাঠায়, কেননা জেলা সদর থেকে জানোয়ারের, তাও বাঘের, পোস্টমর্টেম করায় দক্ষ ভেটেরিনারি সার্জেনকে পাঠাতে কয়েকদিন লেগে যাবে।

    পোস্টমর্টেমের জন্য গ্রামবাসীরা বাঘিনীটাকে চিৎ করে শুইয়ে রাখতে, বাঘিনীর রক্তাক্ত যোনির দিকে নজর

    পড়েছিল রাহুলের। বাঘিনীর লাশ তখনও শক্ত হয়নি। তার মানে বেশিক্ষণ হল মারা যায়নি। নিজের ভেতরের

    বাঘটাকে, যে বাঘিনীর যোনিতে আকৃষ্ট হয়ে ওর দেহকে একটু-একটু করে জাগিয়ে তুলছিল, আবিষ্কার করে রাহুল অবাক হল না। বুঝতে পারল ও, রাহুল, যে, ডারউইনের সব কয়টা জীব-ধাপের প্রাণী রয়ে গেছে ওর ভেতরে, যারা, অঞ্জলির বিশ্লেষণে, লেচার।

    শার্ট-প্যান্ট খুলে, উদোম উলঙ্গ হয়ে, বাঘিনীর ফর্সা গোলাপি বুকের ওপর শুয়ে বোঁটাগুলোয় মুখ ঘষার ইচ্ছে করছিল। ভেটেরিনারি অফিসারকে প্রস্তাবটা দিতে সে বলল, কোনো প্রবলেম নেই স্যার, এরা চিৎ করে ধরে থাকুক, আপনা থেকেই বডি শক্ত হয়ে যাবে ; ভেটেরিনারি সায়েন্সে পড়ানো হয় যে মানুষদের মধ্যে এরকম কারনাল ডিজায়ার জেগে ওঠা স্বাভাবিক; তবে সেসব পশুরা তো গৃহপালিত, বাঘিনীর প্রতি আকর্ষণের কথা পড়িনি। তবে, ম্যাকলের লেখা ইনডিয়ান পিনাল কোড অনুযায়ী, নন-হিউমানদের সাথে ইনটারকোর্স করা ক্রিমিনাল অ্যাক্ট। আপনি তো শুধু শুতে চাইছেন, ক্রিমিনাল অ্যাক্ট আর সম্ভব হবে না স্যার, কেননা বডি শক্ত হয়ে গেছে।

    –হ্যাঁ, বাঘিনীর বুকে শুয়ে ওর ভালোবাসা চাই।

    পোস্টমর্টেম হবার পর সরকার কেবল চামড়াটা নেবে, মাংস-হাড়টাড় ফেলে দেবে জানতে পেরে পাহাড়ি গ্রামগুলো থেকে বহু পুরুষ-মহিলা-বাচ্চা বাঘিনীকে ঘিরে জড়ো হয়েছিল, তাদের হাতে নানা মাপের, আকারের, পাত্র ; আকাশেও জড়ো হয়েছিল উড়ন্ত শকুন আর চিল।

    গ্রামের পাহাড়ি লোকেরা বাঘের মাংস খায়, হাড় শুকিয়ে গুঁড়িয়ে রেখে দ্যায়, ওষুধ হিসাবে। পাহাড় ডিঙিয়ে

    চিনেতেও পাচার হয়ে যায়। রাহুলের নির্দেশে, বাঘিনীর পিছনের দুটি পায়ে আর সামনের দুটি পায়ে সমান্তরাল করে বাঁশ বাঁধা হল, যাতে বাঘিনী ওভাবেই চিৎ শুয়ে থাকে, আর কোথাও রাতভরের জন্য বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। বাঘিনীকে, গ্রামবাসীদের কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে গিয়ে, রাখা হল জনৈক পাঞ্জাবি সরদারের ফাঁকা গ্যারাজে। দেশভাগের পর প্রচুর জাঠ পাঞ্জাবির বসত গড়ে উঠেছে হিমালয়ের সমতলভূমিতে। সবাইকে জানিয়ে দেয়া হল যে কাল সকালে পোস্টমর্টেম হবে।

    সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে, ভেটেরিনারি অফিসার পারফিউম ছিটিয়ে বাঘিনীর দেহের গন্ধকে কিছুটা দমন করে রাহুলকে বললে, স্যার আপনি যান, আমি বাইরে পাহারা দিচ্ছি। ও, রাহুল, অনেকটা রাম টেনে নিজেকে মাতাল করে নিয়েছিল।

    রাহুল জামাকাপড় খুলে শুয়ে পড়ল বাঘিনীর ঠান্ডা বুকের ওপরে। অন্ধকারে বাঘিনীর স্তনের বোঁটায় মুখ ঘষতে-ঘষতে, ওর, আশ্চর্য, কান্না পেতে লাগল, সুরেখা রেড্ডির জন্য। মদের নেশায়, সুরেখা রেড্ডির বুকে মুখ রেখে, প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। সহায়ক অফিসার টর্চ জ্বেলে গ্যারাজে ঢুকে টেনে তুলল ওকে, আর, হাত ধরে টানবার সময়ে রাহুলের মনে হল ও এমিলিয়া বনিয়ার স্লিপিং ব্যাগ থেকে অনীক খাস্তগীরের টানে উঠে পড়েছে।

    ডাক্তার রাও রাহুলকে র‌্যাপার মুড়ি দিয়ে বলল, স্যার, পোস্টমর্টেমের সময় আপনি থাকবেন না, বুকের মাঝখান থেকে চেরা সহ্য হবে না আপনার, তাছাড়া গ্রামবাসীরা মাংসের জন্য কাড়াকাড়ি করবে।

    ওফ, আত্মহত্যা করেছিল বলে সুরেখারও বুক চিরে পোস্টমর্টেম হয়েছিল নিশ্চয়ই।

    একজন যুবতীর বুকের মাঝখান থেকে চিরে সেলাই করে দেয়া ! বাঘিনীকে অন্তত সেলাই করা হবে না।

    রাতেই ও, রাহুল, জিপে চেপে ফিরে গেল ক্যাম্প-স্টেশানে। মাংস খাবার জন্য কাড়াকাড়ি হবে শুনে অসুস্হ বোধ করছিল।

    সুরেখাও প্রত্যাখ্যাত হয়ে অসুস্হ বোধ করেছিল কি ? গুমরে কেঁদেছিল হয়তো। কে জানে।

    সুরেখার চিঠির ভাঁজে আরেকটা চিঠি ছিল, বহুদিন, বাসি-পোস্টকার্ড, সময় তাকে হলুদ করে দিয়েছিল। প্রদীপন চাটুজ্জের চিঠি। রাহুলের কেস হাইকোর্টে শেষ হবার পর লিখেছিলেন : “প্রিয় রাহুল, হাইকোর্টের রায় পড়ে তোমাকে মনে মনে তৎক্ষণাৎ কনগ্র্যাচুলেট করেছি। একটা মামলা হওয়া দরকার ছিল, কাউকে না কাউকে এরকম মামলার আসামী হতেই হত। সীমাবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এর ফলাফল আধুনিক সত্য-সাহিত্যের পক্ষে যথেষ্ট ভালো হবে, মনে হয়। কৃতিত্ব সবটাই তোমার একার, তবু, লেখক নামের যোগ্য সকলেই একে পুরস্কার বলে মনে করবে ও ভাগ করে নিতে চাইবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি পুরস্কৃত হওয়ার আনন্দ পেয়েছি। প্রীতিসহ, প্রদীপন চট্টোপাধ্যায়। ” ওই একই দিনে এই চিঠিটাও ছিঁড়ে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল রাহুল।

    বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজ থেকে ওই একটি চিঠিই ও, রাহুল, পেয়েছিল, মামলা জিতে যাবার পর ; তার কারণ

    প্রদীপন ছাড়া বাকি ৯৯৯ জন চাননি যে ও মামলা জিতে যাক। অসীম, যিনি রাহুলের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাঁর কাছ থেকেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি, যদিও দাদা অনিকেতের সঙ্গে উনি তখনও চিঠির মাধ্যমে পত্রঅপেরা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রদীপন রাহুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ; তার কারণ অসীম বিদেশ থেকে ওনাকে তাতাচ্ছিলেন, রাহুলের বিরুদ্ধে ; ওনাকে, রক্তিমকে, চঞ্চলকুমার বসুকে, যাঁরা ওনার বঁড়শির কেঁচো খেতে গিয়ে, এমন আটকে পড়েছিলেন, যে, রাহুলের বিরুদ্ধে যাওয়াটাই আখেরের পক্ষে সুবিধাজনক মনে করেছিলেন ওনারা। অসীম তা-ই চাইছিলেন। ওনারা রাহুলের বিরুদ্ধে পুলিশের সাক্ষী হয়ে যেতেই অসীম তুরুপের তাসটি খেললেন রাহুলের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে, আর অপেরার ইতিহাসে চিরকালের জন্য বিশ্বাসঘাতক হিসাবে বদনাম করে দিলেন নিজের বন্ধুদেরই।

    কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে, সেদিন সন্ধ্যায়, যখন প্রদীপন, রক্তিম, চঞ্চলকুমার বসু ঘিরে ধরেন অসীমকে, তখন অসীম একখানা ডিগবাজিপত্র লেখেন অনিকেতকে, অদ্ভুত ডিগবাজি, যা সচরাচর সিরিয়াস লেখকেরা খেতে চাইবে না।

    প্রদীপন আর রক্তিমের আস্হা ফিরে পাবার জন্য ততটা নয়, যতটা ছিল, যে সংবাদপত্রে অসীম গাঙ্গুলি যোগ দিয়েছিলেন, তার মালিকদের প্রীত করার জন্য, নিজের রামায়ণ নট্ট কোম্পানির সুভেনিরে সম্পাদকীয় লিখলেন রাহু-কেতুদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে। তখনও রাহুলের মকদ্দমা শেষ হয়নি, সাব জুডিস ছিল, আদালতের দৃষ্টি আকর্ষন করে কনটেম্পট অব কোর্টের মামলা ঠুকে দিতে পারত। প্রদীপন পরামর্শ দিয়েছিলেন, দাও না ঠুকে, দেখোই না খেলাটা কেমন জমে যায়। দেয়নি রাহুল, কেননা অসীম তার আগে ওর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

    রাহুল আবার লেখালিখিতে ফিরে আসার আনন্দে, অনিকেত বললে, তোর বিরুদ্ধে লেখা অসীমের পত্র-অপেরার চিঠিটা এবার প্রকাশ করার সময় হয়েছে, ও বেঁচে থাকতেই বেরিয়ে যাওয়া উচিত, যদিও ওর তাতে একটা মুথাঘাসও ছিঁড়বে না, তবু, লিটল অপেরাদের জগতে এটা গিয়ে পড়ুক।

    ঘাস আর আছে কি ? মহীরুহের তলায় তো ঘাস গজায় না। বলেছিল রাহুল।

    সাক্ষ্য দেবার চার দিনের মাথায় অসীম অনিকেতকে লিখেছিলেন, আরও অনেক কথার পর, “সাক্ষীর কাঠগড়ায় রাহুলের রচনা আমাকে পুরো পড়তে দেয়া হয়। পড়ে আমার গা রি রি করে। এমন বাজে লেখা যে আমাকে পড়তে বাধ্য করা হল, সে জন্য আমি ক্ষুব্ধ বোধ করি— আমার সময় কম, ছাপা-লেখালিখি কম পড়ি, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না — এমন লেখা পড়ে আমি মাথাকে বিরক্ত করতে চাই না। রাহুলের তিনপাতা রচনায় একটা লাইনেও অপেরার চিহ্ণ নেই। রাহুল যদি আমার ছোটো ভাই হতো, আমি ওকে অপেরা লিখতে বারণ করতাম অথবা গোড়ার অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করতে বলতাম। যাই হোক, তবু আমি বেশ স্পষ্ট গলাতেই দুবার বলেছি ওর ঐ অপেরা আমার ভালো লেগেছে। এর কারণ, আমার কোনো মহত্ব নয়– আমার সাধারণ, স্বাভাবিক, সীমাবদ্ধ জীবন। যে-কারণে আমি আনন্দবাজারে সমালোচনায় কোনো বাজে বইকে ভালো লিখি— সেই কারণেই রাহুলের লেখাকে ভালো বলেছি। ”

    অসীম গাঙ্গুলির চিঠিটা পড়ে, রাহুল বলল, তাহলে একটা জুতোর বাক্স দিয়ে আসি রিভিউ করার জন্য, বাচ্চাদের চটির বাক্স তো মোটা বইয়ের মতন দেখায়।

    কলকাতায় ফেরার পর একদিন, সুকৃতি রেস্তরাঁয় মুর্গির কাটলেট খেতে-খেতে প্রদীপন চাটুজ্জে বললে, রাহুল যে তৈরি হয়েই যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছিল তা বোধহয় অসীম অনুমান করতে পারেনি। তুমি যে আবার ফিরে আসবে, ফিরে এসে এত রকমের কথা বলবে, প্রশ্ন তুলবে, দার্শনিকদের দাড়ি চটকাবে, কেউই আঁচ করতে পারেনি। অনিকেত ওটা সময়মতন ছেড়েছে। হাঃ হাঃ, বাজে বইকে ভালো বলে-বলেই তো কত রাঘব বোয়ালকে জালে তুলল ; বাজে বই কেন, ওর চারপাশে যে মালগুলো পাক খাচ্ছে তা কে-ই বা না জানে। ভোঁদাদের সন্ধ্যায় একবার ঘুরে এসো। এক-একখানা ওই তোমরা যাকে বলো ইয়ে, মানে, বাল, বাঙালি লেখকের অ্যাবরিভিয়েশান।

    প্যারানয়েড ছিলেন রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারীমশায়। বিদেশে গিয়েও অপপ্রচার করতে ছাড়েন নি, বলেছিল রাহুল। ওনার পর ওই একই অপেরা-শিক্ষার স্কুলের খরচে হরিপদ রায় গিয়েছিল, সে লোক তো নিউ ইয়র্কে সেইন্ট মার্কস চার্চে নিজের লেখার অনুবাদ পড়তে গিয়ে ঘোষণা করেছিল যে সেও সর্বভূক আন্দোলনের সদস্য ; এদিকে কলকাতায় রাহু-কেতুদের বাঁশ দেবার জন্য লাগাতার দৌড়ঝাঁপ চালিয়েছে।

    প্রদীপনের উক্তি : যাক, জীবনে একটা প্যারানয়া তো আছে ; সেটার কনট্রিবিউটার হিসাবে তোমার প্রাউড হওয়া উচিত। কজন মানুষই বা পারে আরেকজনের জীবনে একখানা পার্মানেন্ট ঘা তৈরি করে দিতে, সিক্রেট উন্ড ! সে-ক্ষত চাপা দেবার জন্য পাতার পর পাতা, হাজার-হাজার পাতা, সারা জীবন লিখে যেতে হয়েছে, যাতে ধারে না কাটুক, ভারে তো কাটবে। অসীমের সমস্যা কী জানো ? এম এতে ফলাফল খুব বাজে হয়েছিল ; বাংলায় এম এ, সে

    কিনা একেবারে তালিকার শেষে !

    প্রাউড ? প্রাইড ? ব্যাপারটা আদপে কী ? জিগ্যেস করার পর, রাহুলের মনে পড়ল, থানার লক আপে সকালে ওর হাগা পেয়ে গিয়েছিল। একটা কনস্টেবল ওর কোমরে দড়ি বেঁধে বলল যাও, ওদিকে গোসল করে এসো ; দড়িটা আনেক লম্বা, আমি এখানে বসেই পাহারা দিচ্ছি দড়ি ধরে, তুমি সেরে এসো।

    কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্হায় হাগতে গিয়েছিল রাহুল। অত্যন্ত নোংরা পায়খানা, দরোজার বালাই নেই, কবেকার বড়ি-বড়ি বড়া-বড়া গু শুকিয়ে আছে, অনেক কয়েদি পায়খানায় না হেগে তার আসেপাশে বাইরেই ঘাসের ওপর হেগে রেখেছে। রাহুলও ফাঁকা দেখে, কাঁধের ওপর ট্রাউজার ফেলে, ঘাসের ওপর সেরে নিয়েছিল, ছোঁচাবার মগ-টগ ছিল না, যে কল থেকে অবিরাম জল পড়ে চলেছে সেখানে পেছন ফিরে ছুঁচিয়ে নিয়েছিল।

    যখন ফিরল, কনস্টেবলটা বলল, আরে বেবকুফ, ভাগনা চাহিয়ে থা ; তুমকো হমনে ইসিলিয়ে অকেলে ভেজা কি উধর সে ভাগ যাও। তুমহারা কেস সমঝা হ্যায় হমনে। ভাগ যাতে তো ইয়ে কলকত্তাওয়ালে পুলিস ফির আতে কেয়া তুমহারা ঝাঁট উখাড়নেকে লিয়ে ? বেবকুফ কহিঁকা। ফালতু কেস ঠোক দিহিস হ্যায়। লিখালিখি করকে সরকারকা দুশমন কোই নহিঁ বনতা হ্যায়। সরকার কওন হ্যায় ? হম। তব ? হমারে খিলাফ যেতনা চাহিয়ে লিখতে রহো, কেয়া ফরক পড়তা হ্যায় ! সরকারকা ঝাঁট উখাড়নেকে লিয়ে চাহিয়ে বব্বর শের মারনেওয়ালে পহলওয়ানোঁ কা বন্দুকধারি ঝুণ্ড।

    একজন খইনিখোর সেপাইয়ের অব্যর্থ ভবিষ্যবার্তা। পাঁচ-ছয় বছর পরেই দেখা দিল শহর-দাপানো নকশাল কিশোর আর যুবকেরা। তারপর, অবিরাম, নানা প্রদেশের জঙ্গলে দেখা দিতে লাগল বন্দুকধারী বিপ্লবীর দল।

    পালাবার জন্য তো আর লেখালিখির যুদ্ধক্ষেত্রে নামেনি রাহুল।

    সকাল দশটা নাগাদ সবাইকে হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে, একসঙ্গে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হল কানপুরের

    ফৌজদারি আদালতে। কি ভিড়, কি ভিড়, নানা থানা থেকে আসা কোমরে দড়ি আসামিতে আদালত চত্ত্বর গিজগিজ। রাহুলের বাবা আর দিনুদা ওকে দেখতে পেয়ে বলে গেলেন, চিন্তার কিছু নেই, বসন্তবাবুকে কোর্টে দেখলে হাইকোর্টের জজরাও ভয় পায়, আর এ তো মামুলি ম্যাজিস্ট্রেট, জামিন হয়ে যাবে, তারপর তোকে কলকাতায় উকিল ঠিক করে ব্যাংকশাল কোর্টে সারেণ্ডার করতে হবে। কলকাতার পুলিশগুলো তোকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যাবার তালে আছে, যাতে কলকাতা যাবার পথে ট্রেনের কামরায় তোকে দুচারঘা দিতে পারে, সেরকম হুকুমই ওদের দেয়া হয়েছে, ইন্সপেক্টর খান বলছিল।

    একটার সময় রাহুলের নম্বর এলো। পায়ে ব্যথা ধরে গিয়েছিল বলে অন্য আসামিদের সঙ্গে ও-ও মাটিতে বসে পড়েছিল। রাতে থানায় বাড়ি থেকে টিফিনকৌটোয় রুটি তরকারি দিয়ে গিয়েছিল বাবার কর্মচারী রাম খেলাওন। তারপর সকাল থেকে খাওয়া হয়নি, খিদে পেয়ে গিয়েছিল, ক্লান্তও বোধ করছিল, ঘুম হয়নি, লকআপে একটু গড়িয়েছিল বটে কিন্তু গড়িয়ে-আসা পেচ্ছাপ গায়ে লাগতে উঠে পড়েছিল। গা থেকে ঘাম আর পেচ্ছাপের গন্ধ বেরোচ্ছে। এজলাসে ওকে যেতে হল না। আসামীদের কোনো ভূমিকা থাকে না ফৌজদারি মামলায়, হেনস্হা আর জেল-জরিমানা ছাড়া। বাকি কাজগুলো করে উকিল মোক্তার পেশকার সাক্ষী ম্যাজিস্ট্রেটরা। আসামি কেবল নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবার শোপিস।

    অসীম গাঙ্গুলির বাড়ি থেকে অঞ্জলির সঙ্গে দেখা করতে যাবে রাহুল। ওর আন্দোলনের ফালি-কাগজটার পেছনে অঞ্জলির যাদবপুরের ঠিকানা লেখা। যে যুবকের সঙ্গে অঞ্জলি থাকে সে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে ভারতে আর ভারত থেকে পূর্ব-পাকিস্তানে নানা জিনিসের স্মাগলিং করে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সোনা আনে সিলেটে, সে সোনা চলে আসে কলকাতায়, শিলচর বা আগরতলা হয়ে।

    সুমিতাদিকে কি সাম্যবাদের স্মাগলার বলবে রাহুল ?

    পরে যখন দেখা হয়েছে, সুমিতাদির মুখের দিকে তাকালেই মনে হয়েছে, ডাক্তার বোধহয় ওনাকে বলে দিয়েছে যে ওনার কখনও বাচ্চা হবে না। ডাক্তারের ওই অমোঘ ঘোষণা কী ভাবে গ্রহণ করে একজন নারী ? কোনো পুরুষের পক্ষে সে অভিজ্ঞতার গভীরে প্রবেশ করা অসম্ভব। একজন নারীর মনে সারা জীবন বাজতে থাকে ওই ঘোষণা। হবে না, হবে না, হবে না। হবে না, হবে না, হবে না। সকালে উঠে, রান্নাঘরে, কাজে যাবার সময় পথে, অফিসে বা স্কুলে পড়াতে গিয়ে কাজের সময়, ফেরার পথে, বিকালে, সন্ধ্যায়, ব্রাহ্মমন্দিরে প্রার্থনার সময়ে, রাতে শোবার সময়, ঘুমের ভেতর স্বপ্নে।

    অঞ্জলি তাই রাহুলকে ধরেছিল, বীজ স্মাগলিং করে গর্ভে লুকিয়ে নেবার জন্য। কাউকে না কাউকে ও পাকড়াও করবেই।

    সুমিতাদির সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল, সান্মানিক স্নাতক হবার পর, রাহুলের কাকিমা যে স্কুলে পড়াতেন সেখানেই শিক্ষকতা করতেন সুমিতাদি, গালের টোল অটুট। নিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ি, বেবি অস্টিনে পাশে বসিয়ে। তারপর সযত্নে রাখা ভাঁজকরা একটা চিরকুট বের করে রাহুলকে বলেছিলেন, তোর লেখা, যখন স্কুলে পড়তিস, লাইব্রেরিতে আমার টেবিলের পেপারওয়েটের তলায় গুঁজে, হঠাৎ এসে হঠাৎ চলে গিয়েছিলি, রেখে দিয়েছি, কেন বলতো। তুই আমার নির্ভেজাল রসিক নাগর। তখন তো তোর প্রেমপত্র লেখার বয়স হয়নি ; শরীরে টেসটোসটেরন না জন্মালে যতই চিঠি লেখো না কেন, তাকে প্রেমপত্র বলা যায় না। সুমিতাদির কথা শুনে, ওনার প্রৌঢ় গালের টোলে ঠোঁট ঠেকাবার ইচ্ছে সংবরণ করেছিল রাহুল। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘ভালোবাসি আপনাকে।’ সুমিতাদি চিরকুটটা মুড়ে বইয়ের ভেতরে ঢুকিয়ে আলমারিতে রাখতে-রাখতে জানতে চেয়েছিলেন, ‘কাদের অপেরা পড়ছিস আজকাল ? কেতু নাকি কলকাতা থেকে দু-আলমারি বই দিয়ে গেছে তোকে।

    –আপনি পড়বেন ? আমার পড়া হয়ে গেছে ; আমি বোধহয় ওই ধরণের রচনার জগতে বিচরণ করতে চাই না। বইগুলো এবার বিলি করে দিতে হবে। দেখি আর অস্বস্তি হয়। আপনি বললেন না একটু আগে, টেসটোসটেরন। ওই জিনিসটা বিশেষ নেই।

    –না রে, অপেরা পড়ার মতো সময় আর নেই, স্কুলের পর তো টিউশানিতে কেটে যায় সেই রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত। তুইও নাকি লেখালিখি করছিস লুকিয়ে-লুকিয়ে। তা ইংরেজিতে লিখিসনি বাবা, তোর ওই ক্যাথলিক স্কুলের পিছুটান এবার ছাড়। রবীন্দ্রসঙ্গীত থাকতে তোর কেন যে জন নিউটন নামের সেই নোংরা ক্রীতদাসটার গান পছন্দ তা জানি না।

    আয়ারল্যান্ডের নানদের চোখ ভেসে ওঠে রাহুলের স্মৃতিতে ; গির্জার প্রায়ান্ধকারে রাহুল আর ওর সহপাঠীরা, ওর বয়স তখন কত, মমমমমমমম, তিন কি চার, হাতজোড় করে গাইবার চেষ্টা করছে ইংরেজি ভাষায় গান, যে ভাষা তখনও পর্যন্ত ও বিশেষ জানে না, আর যে গান ওর মগজে থেকে যাবে মস্তিষ্করোগের মতন :

    অ্যামেজিং গ্রেস ! হাউ সুইট দি সাউন্ড

    দ্যাট সেভড এ রেচ লাইক মি

    আই ওয়ান্স ওয়াজ লস্ট, বাট নাউ অ্যাম ফাউন্ড

    ওয়াজ ব্লাইন্ড বাট নাউ আই সি

    শাউট, শাউট, ফর গ্লোরি

    শাউট, শাউট অ্যালাউড ফর গ্লোরি ;

    ব্রাদার, সিসটার, অ্যান্ড মোরনার

    অল শাউট গ্লোরি হ্যালেলুয়া..

    রাহুল কেবল হ্যালেলুয়া শব্দটা সবায়ের সঙ্গে চেঁচাত। তারপর সিসটারদের সঙ্গে গাইতে-গাইতে মুখস্হ হল যখন, তখন সেই স্কুল ছেড়ে ব্রাহ্ম স্কুলে চলে যেতে হল, বাড়ির অভিভাবকদের মতে ওর, রাহুলের, স্বভাবচরিত্র কেরেস্তানদের মতন হয়ে যাচ্ছিল বলে।

    পরে, রাহুল জেনেছে যে গানটা জন নিউটন নামে একজন খালাসির লেখা, যে কৈশোরে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, প্রেমিকা পলির সঙ্গে বিচ্ছেদের কারণে ; তারপর জাহাজের ক্যাপ্টেন সম্পর্কে নোংরা-নোংরা গান লিখে গাইবার অপরাধে ক্রিতদাসরূপে চালান হয়ে গিয়েছিল সিয়েরা লিওনের খেত-খামারে চাষবাসের কাজে। সেখানে তাকে দিন-রাত খাটতে হতো। বেশ কয়েক বছর পর, যৌবন শেষ হতে চলেছে, তার বাবা খবর পেয়ে, তাকে কিনে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন। অ্যামেজিং গ্রেস গানটা বাড়ি ফিরে লেখা, ক্রমশ মুখে-মুখে লোকগীতি হয়ে ওঠে, আর উপনিবেশের নেটিভদের জন্য সেখানকার গির্জায়, খ্রিস্টানদের স্কুলে, প্রার্থনাসঙ্গীতের মতন হয়ে ওঠে।

    –হ্যালেলুয়াআআআআ..

    –আঃ অমন বিটকেলভাবে চেঁচাসনি, কী যা হালুয়া-হালুয়া মাথামুন্ডু মানে, তাই জানি না। ওসব ছাড় দিকিনি।

    –কি করে ছাড়ি ! টেসটোসটেরন তো আইরিশ নানরা দিয়ে গেছেন।

    –ছিঃ, কী যে বলিস, ওনারা তোর প্রথম শিক্ষক ছিলেন। শ্রদ্ধা করবি তো।

    –শ্রদ্ধায় কি টেসটোসটেরন থাকতে নেই ! আপনি তো আমার উন্মাদ ক্রাশ, যখন টেসটোসটেরন তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে। আইরিশ নানরা ছিলেন প্রথম ক্রাশ। আপনাকে স্কুলে দেখার আগে কুলসুম আপা নামে এক কিশোরীর হাতে পড়েছিলুম, জানেন।

    –না না, ওসব আমায় বলিসনি, আঁৎকে উঠেছিলেন সুমিতাদি, অনুমান করে ফেলেছিলেন বোধহয় কী ঘটে থাকবে।

    –আপনি যে বইগুলো দিয়েছিলেন, আর দাদা মামার বাড়ি থেকে যে দাড়িওয়ালা বইগুলো এনেছিল, সেগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে যে রাজনীতির তত্ত্ব যতই আকর্ষক হোক না কেন, সবকিছু নির্ভর করে লোকগুলোর ওপর, বুঝলেন, যে লোকগুলো ওই তত্ত্বকে ভালো বাসতে-বাসতে কোনো এক ফাঁকে নিজেকে ভালো বাসতে আরম্ভ করে। ব্যাস, তত্ত্ব একেবারে গুবলেট। ভালোবাসা, অন্যকে বাসলেও, আসলে নিজেকেই ভালোবাসবার মাধ্যম, নয়তো মানুষ কেনই বা বারবার প্রেমে পড়বে ? একজন প্রেমিক বা প্রেমিকাকে ছেড়ে আরেকজনের দিকে এগিয়ে যাবে ?

    –ঠিক ধরেছিস। বই লিখে ফ্যাল না।

    –লিখতে আরম্ভ করেছি। খসড়াটা দাদা দিয়েছে বিমানবিহারী মজুমদারের ছেলেকে, প্রতিক্রিয়া জানাবার জন্য।

    –যা লিখছিস, যা ভাবছিস তাই লেখ। অন্য কারোর মতামতের ওপর নির্ভর করিসনি।

    খসড়াটা দাদা আর বুজলুদা অনুমোদন করে দিলে, রাহুল ওটা দিয়েছিল রক্তিমকে, কলকাতায় কোনো ছাপাখানায় ছাপিয়ে প্রুফ পাঠাতে।

    রক্তিমকে টাকা দিয়েছিল ছাপাবার জন্য।

    তুমি আর লোক পেলে না ? ঘটনাটা শুনে বলেছিলেন প্রদীপন চাটুজ্জে, ও টাকা চলে গেছে শুঁড়ির বাড়ি।

    সুমিতাদি চা তৈরি করার জন্য রান্নাঘরে গেলে, রাহুল চিরকুটটা বই থেকে বের করে ‘ভালোবাসি আপনাকে’ লেখার তলায় লিখে দিয়েছিল, ‘ইতি ভ্লাদিমির ইলিচ’। তারপর বইটা যেখানে ছিল, গুঁজে দিয়েছিল সেখানে।

    দেয়ালে টাঙানো, ফ্রেম-বাঁধানো, ওনার ক্রচেটের কাজে ধুলো জমে ছিল। কালো আর লাল সুতোয় একটা কাজ আজও মনে আছে রাহুলের। ‘’এনিওয়ান হু নোজ এনিথিং অফ হিসট্রি নোজ দ্যাট গ্রেট সোশাল চেনজেস আর ইমপসিবল উইদাউট ফিমেল আপহিভল। সোশাল প্রগ্রেস ক্যান বি মেজার্ড এগজ্যাক্টলি বাই দি সোশাল পোজিশান অফ দি ফেয়ার সেক্স, দি আগলি ওয়ানস ইনক্লুডেড।’’ দি আগলি ওয়ানস ইনক্লুডেড, এইটুকু ছিল লাল রঙে, বাকিটা কালো সুতোয়।

    –ওইটুকু লাল সুতোয় কেন ?

    –ওটা আমার জন্য। আমি তো আগলি, নয়তো আমার প্রেমিক ছেড়ে চলে যাবে কেন, বল। বিপ্লবী মাত্রেই আগলি, সে নারী হোক বা পুরুষ।

    প্রেমিক ? আমি জানতুম সে সুমিতাদির বর ! সে তো ছাড়েনি ; সুমিতাদিই তাকে বের করে দিয়েছেন বাড়ি আর জীবন থেকে, কানপুরের ব্রাহ্মমহলে সেরকমই গুজব।

    সুমিতাদির ডিভোর্সের গুজবও শুনেছিল রাহুল, কিন্তু বর যে কে, তার নাম কী, কেমন দেখতে, কিছুই জানতে পারেনি কখনও। কথা বাড়ালে অন্যের জটিলতায় অযথা জড়িয়ে পড়তে পারে আশঙ্কায়, আচ্ছা চলি বলে কেটে পড়েছিল রাহুল।

    রাহুলের এখন মনে হয়, সুমিতাদি বোধহয় অনুমান করে ফেলেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত কী হবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ; দলের হয়ে মসকো ইউক্রেন লেনিনগ্রাড কোথায়-কোথায় বেড়িয়ে এসেছিলেন। সম্ভবত নিজের বৈবাহিক জীবন আর দলীয় সোভিয়েত বৈবাহিক জীবনের রমরমার দিনে। আর কোনোদিন বাচ্চা হবে না, হয়ত এই ভাবনার সঙ্গে গর্বাচভ-ইয়েল্তসিনের কাজ-কারবারকে মিশিয়ে এক ভিন্ন জগতে চলে গিয়েছিলেন সুমিতাদি। নিজেই যে-বিপ্লবীকে যেচে বিয়ে করেছিলেন বলে গুজব, তাকে যে জীবন থেকে লাথিয়ে বের করে দিয়েছিলেন, তাও গুজব, যেন সেই অপদার্থ সোভিয়েত নেতাদের লাথাচ্ছেন, যাদের গুমখুন আর অত্যাচারের জন্য বিপ্লবের স্বপ্ন ঘুচে গিয়েছিল ওনার।

    সুমিতাদি কিন্তু পশ্চিমবাংলার বামপন্হীদের ব্যাপারেও ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, “এরা আরও নৃশংস, দেখে নিস তুই, কালে-কালে নরক গুলজার করে ফেলবে, নেমে যাবে আত্মধ্বংসের গলিঘুঁজিতে। ’’

    ওনার গালের টোলের লালচে রঙ যে কমে যাচ্ছে তা উনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টের পেতেন। গালের টোলে দেখতে পেতেন মানব সমাজের ভবিষ্যৎ। পচে যাচ্ছে, পচে যাচ্ছে, পচে যাচ্ছে।

    –দাদা যে সমস্ত পত্রিকা এনেছিলেন, তাতে একটা নাম পেয়েছি, বেশ আকর্ষক, হরিচরণ খাঁড়া।

    –স্কুলে তো একটা মেয়ে ছিল, জানিস না, সারদা খাঁড়া, তোর চেয়ে দু’বছর জুনিয়ার ? ম্যাথসে হানড্রেড পার্সেন্ট মার্কস পেতো। খাঁড়া পদবি হয়, হবে না কেন !

    –না, ওনার ঠিকানাও দেয়া আছে পত্রিকাটায়। আপনি কখনও বুদ্ধদেব বসুর পত্রিকায় এই ধরণের পদবি দেখেছেন ? হরিচরণবাবুকে বলেছি আমাদের বাড়িতে আসতে, উনি সালকিয়াতে থাকেন। ওই সময়ে দাদা রক্তিমকেও সঙ্গে আনবেন। আমরা যে আন্দোলন আরম্ভ করতে চলেছি তার জন্য প্ল্যানিং করতে চাই।

    –তোর কাকিমা বলছিলেন বটে; রক্তিম ছেলেটাকে ওনার ভাল্লাগেনি, বদগন্ধে নাকি ভুরভুর করে।

    –হরিচরণবাবু আর রক্তিম চাটুজ্জে এলে নিয়ে আসব আপনার বাড়ি।

    –না না। আমার বাড়িতে আর বিপ্লবীদের পায়ের ধুলো চাই না। তুই ওড়াগে যা বিপ্লবের ধুলোর ঝড়। গালের টোলে আলোর সমুদ্রের ঢেউ তুলে বলেছিলেন সুমিতাদি।

    সুমিতাদির কোমর জড়িয়ে ওপরে তুলে, কমরেড সুমিতাদি জিন্দাবাদ, স্লোগান দেবার, পুরো ইচ্ছেটা, আবার চেপে গেল রাহুল।

    আশ্চর্য যে মোহন পালের বোনের গালেও, দুই গালে, টোল পড়ত। নিজেই নিজের সাইক্লোনের ঘুর্ণিপাকে জড়িয়ে চলে গেছে আত্মহত্যার পথ ধরে।

    অসীম গাঙ্গুলিও চুপচাপ সাইক্লোনের পাক বাঁধছিলেন সেদিন, তা এখন, এই এতকাল পরে জানতে পারছে রাহুল সিংহ।

    কানপুরের ছাপাখানার বাংলা হরফ কেবল বিয়ে-পৈতে-শ্রাদ্ধর ম্যাটারে সীমিত, সে খবর রাখে না অনেকেই। অসীম গাঙ্গুলির কথা শুনে একটা আইডিয়া এলো রাহুলের। ঠিক, বিয়ের কার্ড। বিয়ের কার্ডকেও কাজে লাগাতে হবে।

    প্রাপক কার্ড পেয়ে ভাববে বিয়ের নেমন্তন্ন। খুলে দেখবে ক্ষমতার তীব্র আকস্মিকতার মেজাজে ভেতর থেকে

    বেরোল শ্বদাঁতের ঝিলিক নিয়ে সাহিত্যের দানবের ঔজ্জ্বল্যের ভ্রুকুটি। যারা বসন্ত ঋতুকে পছন্দ করে না, তাদের একাধটা কালো-গ্রীষ্মের ঘেয়ো স্মৃতি থাকা উচিত। যাদের মাথা ঘাড়ের ওপর নেই তারা জানে না যে তারা টপলেস।

    হরিচরণ খাঁড়া ওরফে দুর্গা বর্মণকে আইডিয়াটা দিতে ও বলেছিল, ‘সব শালারা মুখোশ পরে বসে আছে। একএক জন ভাম, বুঝলে, বর্ষার বাচাল বাঞ্চোত। ’

    হরিচরণ খাঁড়া ওরফে দুর্গা বর্মণের কথা শুনে রাহুলের আরেকটা আইডিয়া এল। ঠিক। মুখোশ। জানোয়ার দানব রাক্ষস জোকার ইত্যাদির কাগজের মুখোশ, যার ওপর ছাপানো থাকবে, ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন। ’ পেয়ে কী ভাববেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন ?

    ইইইইইনটেএএএলেকচুলরা ! চুলগুলোই দেশটাকে ডোবালো, বলবেন মন্ত্রীসভার সদস্যদের।

    প্রদীপন চাটুজ্যে একদিন সাহিত্যিক অমল ধরের বাড়ি গিয়েছিল, জানোতো ? ওই যে হে অমল ধর, বিগব্যানার সাপ্তাহিকের জন্য ছোটোগল্প ছাঁটেন। ওনার বাড়িতে সামনের ঘর থেকে আরম্ভ করে মায় সিঁড়িতেও চারিদিকে নিজের ফোটো টাঙিয়ে রেখেছেন, কয়েকটা বেশ পেল্লাই মাপের।

    প্রদীপনকে বলেছেন, আপনাদের আন্দোলন আত্মপ্রচারমুখী হয়ে উঠেছে। কথাটা বলে, হাওয়া থেকে একটা অদৃশ্য চুল উপড়ে ফুঁ দিয়ে নাকি উড়িয়েছিলেন।

    বিষের নিঃশব্দ বিকীরণ। লোকে বুঝুক যে তথ্যের মধ্যে বসবাস করে অম্বলের চোঁয়াঢেঁকুর মাখানো সংলাপে ভেজা সময়কে ইতিহাস বলে চালানো যায় না।

    বাগড়ি মার্কেটে চলো, ওখানে হোলসেল দরে মুখোশ পাওয়া যায়। জব প্রেসও আছে কাছাকাছি।

    আরে, ও তো এখন অসীম গাঙ্গুলির ঘরে, খেয়াল হল রাহুলের।

    ওনার পরের কথায় অবস্হান স্পষ্ট হল রাহুলের, ‘নেতার নাম যদি একান্তই দেবার ছিল, নিজের নাম দিলে না কেন ! তুমিই যখন সব করছ তখন নেতা হিসেবে নিজের নাম দিলে না কেন ? আর হরিচরণ খাঁড়া ওরফে দুর্গা বর্মণ নামের সম্পাদকের ভূমিকাই বা তাহলে কী ?‘

    যাক, বাঁধাধরা ধারণায় জবর চোট দেয়া গেছে তাহলে। রাহুল চুপ করে রইল ; শোনা যাক ওনার মনের

    ভেতরের লুকোনো ইউরেকা চিৎকারগুলো, যা গমগম করতে চাইছে ক্ষোভ আর ক্রোধের ভুলভুলাইয়ায়।

    –এখন বোধহয় এসেছ তোমাদের সঙ্গে যোগদানের প্রস্তাব নিয়ে ! একটা কথা তুমি ভুলে গিয়েছিলে রাহুল ; আমিই তরুণ কবিদের নেতা। তুমি কেন আমার সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন মনে করোনি ? কারা বাধা দিয়েছিল তোমায় ? তুমি কি বুঝতে পারোনি যে আমাকে বাদ দিয়ে আমার বিরুদ্ধে একটা কিছু করার চেষ্টা হচ্ছে? রামায়ণ নট্ট কোম্পানিকে এলেবেলে করে দেবার চেষ্টা হচ্ছে ? অথচ আমিই তোমাকে সাহিত্যে এনেছিলুম।

    আমিই তোমাকে সাহিত্যে এনেছিলুম।

    আমিই তোমাকে এনেছিলুম।

    আমিই তোমাকে….

    আমিই….

    আমি….

    আমি, আই অ্যাম দি এমপেরর।

    তার পরের কথায় রাহুলের মাথার ওপর বোমা ফাটিয়ে দিলেন অসীম গাঙ্গুলি, ‘আমি কি রক্তিমের থুতু চাটব ?’

    অসীম গাঙ্গুলি এভাবে ক্ষেপে গেলেন কেন, তাও আচমকা, এতক্ষণে ঠাহর করতে পারল রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, আর যার দাদার ডাক নাম কেতু। ওর, রাহুলের বা রাহুর, মনে হল, নেতিপ্রধান আলো আর ইতিপ্রধান অন্ধকারের পাঁচিল তুলে দূরত্বের ইঙ্গিত দিতে চাইছেন উনি, মানে অসীম ঘাঙ্গুলি, রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারীমশায়। ও যতটা পরিচিত ততটাই আগন্তুক হয়ে উঠছিল ওনার দোতলার ঘরে বসে। হয়ত, হয়ত কেন, বোধহয়, বা বোধহয়ও নয়, ওনার হৈতুকবাদী উষ্মা কাটিয়ে ভেসে আসছিল নিয়মনিষ্ঠ রক্ষণশিলতার সীসকবর্ণ অদৃশ্য গোমরের মেঘ।

    এই বাড়িটায় ঢোকার মুখে গেট থেকে অনেকটা জায়গা ফাঁকা। পাঁচিলের ধারে-ধারে রক্তকরবী। দীর্ঘ পলাশ গাছ, রক্তকরবীদের জেঠামশায়, ছেয়ে আছে লালচে গোলাপিতে। কিন্তু সে যাই হোক, তার ডালে বসে কয়েকটা কাক, কে জানে কোন ভাষায়, ঝগড়া করছিল, হয়ত দুর্গন্ধের নান্দনিকতা নিয়ে।

    অসীম গাঙ্গুলির কথাটা, যা শুনে রাহুলের মনে হচ্ছিল, স্মৃতির আগের শৈশবে পাওয়া কোনো তথ্য মেলে ধরতে চাইছেন উনি, তা মিথ্যা নয়। রাহুলের দাদা অনিকেতের সহপাঠী ছিলেন অসীম। সেই সূত্রে রাহুলদের শ্যাওড়াফুলি বাড়ির খণ্ডহরের আলকাৎরা মাখা কেঠো চিলেকোঠায় নিকোটিনের কুণ্ডলী-পাকানো নিঃশব্দ বিকিরণের আওতায় আড্ডাধারী দাদার বন্ধুদের মাঝে বসে, ছায়া গড়তে পারে না এমন দুর্বল রোদের মতন কন্ঠে ওনার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছিল রাহুল :-

    অনেক দিনের আমার যে গান আমার কাছে ফিরে আসে

    তারে আমি শুধাই, তুমি ঘুরে বেড়াও কোন বাতাসে। ।

    যেফুল গেছে সকল ফেলে গন্ধ তাহার কোথায় পেলে,

    যার আসা আজ শূন্য হল কী সুর জাগাও তাহার আশে। ।

    সকল গৃহ হারাল যার তোমার তানে তারি বাসা,

    যার বিরহের নাই অবসান তার মিলনের আনে ভাষা।

    শুকালো যেই নয়নবারি তোমার সুরে কাঁদন তারি,

    ভোলা দিনের বাহন তুমি স্বপন ভাসাও দূর আকাশে। ।

    এই গানের দরুন আবহাওয়া কিছুটা বুড়োটে হয়ে উঠেছিল বলে অশোক মিত্র গমগমে গলায় গেয়ে উঠেছিলেন:-

    নাই ভয় নাই ভয় নাই রে।

    থাক পড়ে থাক ভয় বাইরে। ।

    জাগো মৃত্যুঞ্জয় চিত্তে, থৈ থৈ নর্তননৃত্যে।

    ওরে মন বন্ধনছিন্ন

    দাও তালি তাই তাই তাইরে। ।

    রূপক মজুমদার ওই গানটাই আরও উঁচু গলায় গাইতে, দাদা অনিকেত রূপকদাকে বলেছিলেন, ‘চুপ চুপ, ঠাকুমার কানে গেলে চেঁচাবেন, জানিস না রবীন্দ্রনাথ আমাদের বাড়িতে নিষিদ্ধ, বেম্মো বলে ; অন্য গান ধর’।

    রূপকদা, যিনি হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের মাপজোকের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, গেয়ে উঠেছিলেন :-

    হম দর্দকে মারোঁ কা, ইতনাহি ফসানা হ্যায়

    পিনেকো শরাবে ঘম, দিল ঘম কা নিশানা হ্যায়

    তকদির কে হাথোঁ মেঁ মরনে কি তমন্না হ্যায়

    হম দর্দকে মারোঁ কা ইতনাহি ফসানা হ্যায়…

    কোনো মানুষকে দেখলেই বা তার সঙ্গে পরিচিত হলেই তার জীবনের গল্প জানার আগ্রহের অভ্যাস না থাকায়, চিলেকোঠায় বেশিক্ষণ বসেনি রাহুল, গানও পুরোটা শোনেনি। তাছাড়া দাদা অনিকেত আর দাদার বন্ধু রূপক মজুমদারও ইশারার মাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে এটা বড়োদের জমায়েত, তুই এখন যা। রূপকদাকে একবার ওর পিসতুতো দাদার সঙ্গে হিন্দি ফিলমের নায়িকা রেহানা, সুরাইয়াকে নিয়ে তর্ক করতে শুনেছিল রাহুল। বিষয় ছিল যৌনতা।

    পিসতুতো দাদা ঝণ্টু, ভালো নাম দুর্জয় চক্রবর্তী, কান নাড়তে পারেন ইচ্ছামতো, হাসির নিঃশ্বাস নাক দিয়ে বের করার অভ্যাস, কলকাতার আদি বনেদি পরিবারের কিনা, তাই কথা বলার সময়ে বহু অক্ষর উহ্য থেকে যায়, ওনার দাবি ছিল যে সুরাইয়ার যৌনতা রেহানার চেয়ে বেশি।

    রূপক মজুমদার দাবি করছিলেন রেহানার বেশি ; সানডে কে সানডে আনা মেরি জান শুনেছেন ?

    পরনোগ্রাফিক ফিনকির লালচে চোখ কুঁচকিয়ে ঝণ্টুদা, দিশি মদ খেয়ে-খেয়ে যাঁর দাঁতে কালচে ছোপ পড়ে গেছে, চটে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ রেহানা তো বিশ্বাসঘাতক, পাবলিকের ভালোবাসা পেয়েও পাকিস্তানে পালিয়েছে।’

    –পাকিস্তানে চলে গেলেই কি তার যৌনতা নষ্ট হয়ে যায় ?

    –আপনি রেহানার ওখানে হাত দিয়ে দেখেছেন নাকি ?

    –হাত দিয়ে যদি দেখেন তাহলে একজন রূপসীর থেকে আরেকজনের পার্থক্য অনুভব করতে পারবেন না।

    –অনুভব আবার কী ?

    –রক্তমাংসকে অনুভব করতে হয়। আপনি যখন চুমু খান তখন তার অনুভূতিকে স্পর্শ করেন, তার স্বাদ গ্রহণ করেন।

    –আরে মশায় আমাকে শেখাবেন না। আমি স্কুলের সময় থেকে সোনাগাছি যাচ্ছি।

    –তাহলে তো একেবারেই বুঝতে পারবেন না। প্রেম করেছেন কখনও ?

    –প্রেম তো অযথা সময় নষ্ট। মজনু যদি লায়লাকে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করত, তাহলে তার পরে আরও তিনটে মেয়েকে বিয়ে করত, বুঝলেন, প্রেমের শুধু গপ্পো হয়। মার্ক করেছেন কি যে যারা প্রেম করে তারা লম্পট ? আপনার লেখক বন্ধুদেরই দেখুন না ; উইকেন্ডে সোনাগাছি-হাড়কাটা-খিদিরপুর করে বেড়ায়। আমিই সেসব ঘোঁতঘাতের হদিশ দিয়েছি। ওরা কেউই জানত না কোথায় ইমাম বক্স লেন আর কোথায় অবিনাশ কবিরাজ লেন।

    –আপনার সঙ্গে বিতর্কে গিয়ে আমারও সময় নষ্ট, আপনি বরং হাত দিয়েই অন্যের আকর্ষণের মনোহারিত্বে বসবাস করুন। তবে আপনার আঙুলে স্পর্শের আকুলতা নেই বলেই মনে হয়। লজ্জাবোধের রক্ত আপনার দু’গালে হৃদয় থেকে উঠে আসে না। আপনার মতো লোকদের চাউনির চাহিদা মেটাতে গিয়েই অধিকাংশ যুবতীকে ক্লান্ত দেখায়।

    রাহুলের মনে হল, প্রেমিকও হতে হবে, অপ্রেমিকও হতে হবে, নয়তো নিজের মধ্যে ঝড়ের হ্যাঙ্গামের মজা কোনো দিনই টের পাবে না। দুটোর একটা অধরা থেকে যাবে ; ঝড় চলে যাবে পাশ কাটিয়ে।

    রূপকদা সারাটা জীবন ওই ঝড়ের চোখের ভেতরে পাক খেয়ে কাটিয়েছেন।

    রূপকদার কতরকমের যে রূপ ! দাদা অনিকেত যখন ধানবাদে চাকরি করত, রাহুল একবার গিয়ে দেখেছিল যে রুপকদা বাসন মাজছেন। সেই রূপকদা পরে বাউলদের সঙ্গে নিয়ে এদেশ-সেদেশ করে বেড়ালেন, কত রেহানার সঙ্গ পেলেন, ওখানে-সেখানে হাত দিলেন, তারপর ফিরে এলেন রূপসী বাংলার হাতছানিতে ; ওখানে হাত দিয়ে দেখতে।

    দেশের বাড়ির খণ্ডহরে গেলে, রাহুলের প্রধান আকর্ষণ ছিল ঠাকুমা সবাকসুন্দরী দেবীর সঙ্গে সময় কাটানো, ওনার মুখে ওনার ছোটোবেলার গল্প শোনা, ওনার বিয়ের পর জড়ো করা পারিবারিক কেচ্ছা। রাহুলের মনে হতো ঠাকুমা সবাকসুন্দরী দেবী কন্ঠ দিয়ে চিন্তা করেন। সারাদিন খালি গায়ে থাকেন, বুকের ওপর শুকিয়ে যাওয়া মাই ঝুলিয়ে, কোমরে গামছা বেঁধে, আর নিজের সঙ্গে অনর্গল নিজে কথা বলেন, অনর্গল। রাহুল ওনাকে খন্ডহরে চিরকাল এই পোশাকেই দেখেছে, শীতেও। কোন বয়সে পৌঁছে নারী অমন যৌনতার বোধ হারিয়ে ফেলে, ভেবেছে রাহুল। মেয়েরা তো নিজেদের দেহ নিয়ে কত সচেতন। ঠাকুমার অনেককিছু সহ্য হয় না।

    গরম আমি সহ্য করতে পারি না।

    গান-বাজনা আমি সহ্য করতে পারি না।

    খবরের কাগজ আমি সহ্য করতে পারি না ।

    বউ-ঝিদের হাসাহাসি আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না।

    বিউলির ডালের গন্ধ আমি সহ্য করতে পারি না।

    বাজি ফাটানো আমি সহ্য করতে পারি না।

    দোল-খেলা আমি সহ্য করতে পারি না।

    রাহুলের জন্মের আগেই ঠাকুরদা মারা গিয়েছিলেন ; দাদা অনিকেতের স্মৃতিও আবছা। দাদুর যাকিছু ভালো লাগত তা আর ঠাকুমার সহ্য হয় না। অনিকেতের সংগ্রহের সাহিত্যের বইগুলোকে উনি মনে করতেন সময় নষ্ট। অনিকেত স্নাতকের পরীক্ষা দিয়ে সবকটা বই কয়েকটা বস্তায় বেঁধে দেশের বাড়ি থেকে কানপুরের বাড়িতে এনে রাহুলের সোপর্দ করে দিয়েছিল। বেশির ভাব নটের নামই অচেনা। কোথায় বিক্রি হয় এসব বই !

    রাহুল সিংহের সমবয়সী সাহিত্যিকরা কেউ গান গায় না ; গানে তেমন আগ্রহ নেই কারোর। নবদেব দাশগুপ্ত বাংলা-হিন্দি সিনেমার এঁটুলি, প্রথম পরিচয়ের দিনই হিন্দি ফিল্ম এর গান গেয়ে শুনিয়েছিল অথচ বামপন্হীরা গদিতে বসতেই, গান গাইতে হলে কমিউনিস্ট ইনটারন্যাশানাল, ব্যাস। সিনেমার গান গাইতে লজ্জা করে অথচ অ্যান্টিএসট্যাবলিশমেন্ট।

    রাহুলের স্কুল-কলেজের বন্ধুরা, যে তিনজন জিগরি-দোস্ত ছিল, তারা তো অবশ্যই, গলা ছেড়ে রাস্তাঘাটেও গান গাইত। নবীন গুপ্ত তো শচীনদেব বর্মনের ভক্ত। ক্লাস টেনে পড়ার সময়ে বিঠুর দুর্গের ধারে গঙ্গা নদীর পাড়ে তালগাছের তলায় বসে সদ্য-নামানো দুপুরের গ্যাঁজানো তাড়ি টেনে চেঁচিয়ে অতুলপ্রসাদ গাইত। তাড়ির মাটির হাঁড়িতে পৈতের আংটি-পরা আঙুলে তবলা বাজাত অর্ণব উপাধ্যায়। তাড়ি টেনে বাঙালিয়ানার ইনফিডেল ভান্ডাফোড় :-

    জল বলে চল, মোর সাথে চল

    তোর আঁখিজল, হবে না বিফল, কখনো হবে না বিফল।

    চেয়ে দেখ মোর নীল জলে শত চাঁদ করে টলমল

    জল বলে চল মোর সাথে চল।

    বধূরে আন ত্বরা করি, বধূরে আন ত্বরা করি,

    কূলে এসে মধু হেসে ভরবে গাগরি

    ভরবে প্রেমের হৃদকলসি, করবে ছলছল।

    জল বলে চল, মোর সাথে চল।

    মোরা বাহিরে চঞ্চল, মোরা অন্তরে অতল,

    সে অতলে সদা জ্বলে রতন উজ্বল।

    এই বুকে, ফোটে সুখে,হাসিমুখে শতদল

    নহে তীরে, এই নীরে, গভীরে শীতল।

    জল বলে চল, মোর সাথে চল।

    –তাড়ি টানলে অতুলপ্রসাদ গাইতে ইচ্ছে করে কেন রে ?

    –মগজে ঢুকে কেউ কাঁদতে থাকে, ‘শূন্য এ-বুকে পাখি মোর…’

    –গীতবিতান হাত থেকে পড়ে গেলে তাড়ির হাঁড়ি ভাঙার আওয়াজ হয়, মার্ক করেছিস ?

    কলেজে ঢুকে, ফার্স্ট ইয়ারে, গঙ্গার ঘাটে, বিঠুর দুর্গের ভাঙা পাথরের পাঁজার ওপর বসে, গাঁজা টেনে, রাহুল, নবীন, অর্ণব আর বরুণ ধর চারজনে মিলে জসিমউদ্দিন-শচীনদেব বর্মণ :-

    নিশিতে যাইও ফুলবনে

    –রে ভোমরা

    নিশিতে যাইও ফুলবনে। ।

    জ্বালায়ে চান্দের বাতি

    আমি জেগে রব সারা রাতি গোওওওওওও ;

    আমি কব কথা শিশিরের সনে

    –রে ভোমরা।

    নিশিতে যাইও ফুলবনে। ।

    তুমি নীরব চরণে যাইও

    –রে ভোমরা।

    নিশিতে যাইও ফুলবনেএএএএএএ…

    ওদের আচরণে একজন অধ্যাপক আরেকজনকে বললেন, স্পষ্ট শুনতে পেল রাহুল, ‘ফার্স্ট ইয়ার মেঁ হি নশে মেঁ ধুত হ্যায় পাগল সব। ‘

    আশ্চর্য, নিজে নিজের মালিক হবে, তাতেও ব্যাগড়া।

    গাঁজা টেনে বাড়ি ফিরে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল বরুণ। ওর মা ওকে রাহুলদের সঙ্গে মিশতে বারণ করতেন। যত্তোসব দলিদ্দর বাড়ির ছেলে। চোপোর দিন গাঁজা ভাঙ খেয়ে স্বাস্হ্যের দফারফা। তাড়ি খেতে নিষেধ করতেন না।

    তাড়ি খেলে মোটা হয় মনে করে ওনারা ভাবতেন বরুণের চেহারার খোলতাই হচ্ছে। কয়েকদিন জ্বরে ভোগার পর সারছিল না বলে কলকাতায় নিয়ে গেলেন ওর বাবা। তখন ধরা পড়ে গেল ওর লিউকেমিয়া রোগ।

    কানপুর শহরে সে-সময়ে, কেমোথেরাপির, বোন ম্যারো ট্র্যান্সপ্ল্যান্টৈর, কোনো চিকিৎসা ব্যবস্হা ছিল না। চিকিৎসার জন্য বারবার কলকাতা যেতে হতো। একবার কলকাতা থেকে ফিরে, টাকমাথা তখন বরুণের, বললে, কেমোথেরাপিও এক টাইপের অপেরা রে, তুই কলমে লিখিস, নবীন গায়, অর্ণব আবৃত্তি করে, এই যা। জাস্ট সহ্য করার ক্ষমতা চাই, কলকাতায় না গেলে তোদের রোগ সারা কঠিন।

    বরুণের সঙ্গে কতবার বাড়ি থেকে পালিয়েছে রাহুল, বাড়িতে বাবা-মাকে না বলে, এক কাপড়ে, একটা গামছা নিয়ে বরুণের সঙ্গে উধাও হয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পর বাবা-মা কখনও কোনো জবাবদিহি চাননি, বা কোথায় গিয়েছিল তা জানতে চাননি। বরুণের আত্মীয়ের ট্রাকে চেপে নানা শহরে চলে যেত। পথের ধারে ঢাবায় ড্রাইভারদের সঙ্গে চারপাইয়ে বসে তড়কা-রুটি আর ঠররা বা আধপোড়া মুর্গীর সঙ্গে রাম। ধানকাটা খোড়ো-খেতে, সন্ধ্যাবেলায়, সেই যে-মাঠে অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধ লড়েছিল, তেরপল পেতে গন্ধকগন্ধা শাড়িখোলা যুবতী, যার বয়স, অন্ধকারের আদরা দেখে আঁচ করল, ওদের চেয়ে বেশি ; তার মুখ থেকেও দিশি মদের ভুরভুর। কেননা, ড্রাইভার জ্ঞান দিয়েছিল, মদ না খেলে যুবতীদের মুখের দুর্গন্ধে খদ্দের পালিয়ে যায়। রোজই তো আর গাবভেরেন্ডার দাঁতন করা হয়ে ওঠে না।

    ড্রাইভার বলেছিল, যাও, মালিক, সঙ্গত করে এসো, ওই খড়ের আঁটির ঢিপির ওদিকে। রাহুল আর বরুণ গিয়ে দেখে, পাতা তেরপলের ওপর একজন বউ। ওদের দেখতে পেয়ে বউটা শাড়ি খুলে ফেলল। ওরা দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল, ব্যাস ব্যাস। বউটা তখন, সময়ের রঙে রাঙানো ওই অন্ধকারে, যেন ছায়ার মাংস দিয়ে গড়া ডানা নাচিয়ে, আকাশ থেকে নেমে আসা নক্ষত্রগুলোকে, যেগুলো জোনাকির আদলে ওকে ঘিরে উড়ছিল, তাদের শুনিয়ে গাইতে লাগল, ‘জাদুগরো সাঁইয়া ছোড়ু মোরু বাঁইয়া হো গোয়ি আধিরাতো, আবো ঘরো জানো দো। ’ ওইটুকুই বেশ বারকয়েক গাইবার পর, বরুণ মেয়েটাকে বললে, ‘হো হো আবো ঘরো যাও, আর পাকা ধানের গন্ধের স্ট্রিপটিজ দেখাতে হবে না। ’ রাহুলকে বলেছিল, ড্রাইভারগুলো অন্ধকারে কেন জানিস ফাকাফাকি করে ? নিজেই তার উত্তর দিয়েছিল, ‘তাহলে মন দিয়ে রাতভর গাড়ি চালাতে পারে। ’

    বরুণ টর্চ জ্বালাতেই চেঁচিয়ে বসে পড়েছিল বউটা।

    সম্রাট অশোক এই মাঠে যুদ্ধ করেছিল ; সৈন্যরা কি তখনকার দিনে ফাকাফাকি করত ! পরের দিন আবার লড়তে হবে বলে রাতভর ঝাঁপিয়ে পড়ে এর-তার সঙ্গে ? রাহুলরা সেইসব সৈন্যদের রক্ত-সম্পর্কের যোদ্ধাভুত হয়ে সেই মাঠে নেমেছে। সিংহ খেতাব তো গৌড়ের রাজার দেয়া ; কোনো যুদ্ধ লড়ে জেতার ঘুষ, সেটাই বয়ে বেড়াচ্ছে রাহুল।

    বরুণের মামা ট্রাক ড্রাইভারদের যে বাড়তি টাকা দেন তাতে, বরুণ বললে, ফাক করার খরচও অন্তর্ভুক্ত। বরুণ অন্ধকারে পার্স বের করে দুটো টাকা বউটাকে দিতে চাইলে ; নিল না।

    ফিরে দড়ির খাটে গিয়ে বসতে, ড্রাইভারকে সেকথা জানাতে, পাগড়ি খুলে কাঁধে চুল-নামানো পাঞ্জাবি ট্রাকচালক বললে, আরে মালিক, আমি টাকা ওর মরদকে দিয়ে দিয়েছি, ওই যে, ওর মরদ, বাসনগুলো তুলে নিয়ে মাজতে বসেছে। সকলে ওর মরদকেই টাকা দিয়ে দ্যায়। মরদকে দেখে রাহুলের মনে হয়েছিল তেমন গরিব তো নয়, যে এভাবে বাড়তি আয় করতে হবে। বাড়তি আয় ব্যাপারটা বোধহয় একরকমের সুযোগ ; লোকটা তার, যাকে বলে সদ্ব্যবহার, তা-ই করে নিচ্ছে। ও ওর বউকে ভালোবাসে নিশ্চয়ই, তার ব্যাখ্যা যেমনই হোক না কেন। তার মানে ভালোবাসা হল অবস্হানবিশেষ, নর-নারীর নির্দিষ্ট হাল !

    –তাহলে তেরপলটা তুলে আনো, যা কাজ করার তা তো হয়ে গেছে ?

    –তেরপলটাও ওদেরই মালিক।

    চিকিৎসার জন্য বরুণ এতবার কলকাতা যেত যে কবে ফিরল কবে গেল তার খবর পেত না ওরা। মন খারাপের ভয়ে আর ওদের পাল্লায় পড়ে বরুণ রোগটা ধরিয়েছে শুনে-শুনে ওর বাড়ি মুখো হয়নি। ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল বলা যায়।

    মারা যাবার বেশ কিছুকাল পরে রাহুল ওর মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিল। সংবাদটা যেদিন পেল, সেদিন বাড়ি ফিরে অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসেছিল। অন্য দিন অফিস থেকে ফিরে ওর চার বছরের মেয়ের সঙ্গে খেলা করত। লক্ষ্য করল ওর মেয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে, পেছনে দুটি হাত। রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, তুমি দাদু-ঠাকুমাকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালাতে।

    চারজনের মধ্যে বরুণই প্রথম খসে গিয়েছিল। নবীন ছেড়ে দিলে গান গাওয়া ; অর্ণব ছেড়ে দিলে আবৃত্তি। রাহুলের ক্ষেত্রে ফল হল বিপরীত। লেখালিখি আর একাকীত্ব ওকে পেয়ে বসল। ক্রমশ, যাকে বলে রেকলুজ, তাই হয়ে গেল রাহুল। আলফা সিংহের মতন রেকলুজ। তিনজনেই বরুণের মৃত্যুর দায়টা স্বীকার করে নিয়েছিল, রাহুল বেশি করে, আর সেই অকারণ অপরাধবোধ ওকে ছেড়ে যায়নি আজও, সত্তর পেরিয়ে যাবার পরও।

    কানপুরে বরুণের স্মৃতি থেকে বেরোনো অসম্ভব হয়ে উঠছিল বলে নোট পোড়াবার চাকরি ছেড়ে গ্রামীণ উন্নয়নের চাকরি পেয়ে রাহুল অন্য শহরে চলে গেল, কলকাতায় গেলে সেখানেও বরুণের অনুপস্হিত উপস্হিতি এড়ানো যাবে না, তাই কলকাতায় গেল না। বরুণের স্মৃতি থেকে বেরোবার জন্য একের পর এক শহর বদলেছে, একই শহরে বারবার বাড়ি পালটিয়েছে। বরুণ যায়নি স্মৃতি থেকে।

    কলকাতায় বারকয়েক গিয়ে, পিসেমশায়ের বাসায় থাকার সময়ে, দাদার প্রায় সব বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল রাহুলের। রূপক মজুমদার আর দাদার সঙ্গে গিয়েছিল নাটকের মহড়ায়।

    তার বেশ কিছুকাল পর দাদার সঙ্গে রাহুলদের কানপুরের আধখ্যাঁচড়া চূনকামহীন বাড়িতে, তখনও পুরো তৈরি হয়নি, শীতকালে এসেছিলেন অসীম গাঙ্গুলি। দাদা আর অসীম গাঙ্গুলি দুজনেই তখন ধুতি আর হাফশার্ট পরতেন। গন্ধ থেকে টের পেয়েছিল রাহুল, স্হানীয় দিশি মদ ঠররা খেয়েছিলেন নিশ্চয়ই, দোতলার আলসের নর্দমার কাছে বসে অসীম গাঙ্গুলি বমি করতে লাগলেন রাত এগারোটা নাগাদ, ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক অপেরা। রাহু-কেতু, বা রাহুল-অনিকেতের মা তখন রান্নাঘর পরিষ্কার করছিলেন। ওনার উষ্মা মনে আছে রাহুলের, ‘এই রাহু-কেতুর বন্ধুরা মদ খেয়ে সামলাতে পারে না যখন তখন যতটা পারে ততটা খেলেই তো হয় ‘। তারপর উনি রাহুলকে ডেকে দুটো লেবু নেঙড়ানো জল পাঠিয়েছিলেন, অসীমদার জন্য।

    গামছা এগিয়ে দিলে, মুখ পুঁছে লেবুজল চোঁচোঁ খেয়ে, অসীম গাঙ্গুলি বলেছিলেন, অনেকটা স্বগতসংলাপের ভঙ্গীতে, যেন হাতির দাঁতের তৈরি ব্যাবেল-মিনারের চূড়া থেকে, ‘ও তুমিই রাহুল, রাহু ? তুমি তো সূর্যকে কালো রঙে রাঙিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখো। কাল সকালে কথা হবে’। স্বগতসংলাপের অতিরেকে ছিল স্বর্গোদ্যানের আপেলে কামড় দেবার অভিজ্ঞতা।

    সকালবেলা, দাদা আর ওনার বন্ধুকে চা বিস্কুট দিতে গেলে, অসীম গাঙ্গুলি বলেছিলেন, ‘বাড়ি থেকে হাত খরচ পাও?’‘

    –না, পাই না, তার জন্য দুজন ছাত্রীকে পড়াই।

    –বাংলায় গল্প কবিতা প্রবন্ধ লেখো না কেন ?

    রাহুলের দাদা অনিকেত বলেছিলেন, ও গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লিখছে আজকাল, ফাইলটা দিয়েছি বিমানবিহারী মজুমদারের ছেলেকে, আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত ; ক্রিয়েটিভ লেখাও কয়েকটা লিখেছে ওর ডায়েরিতে।

    — ভালো তো। যা লিখছ সবই আমায় পাঠাতে পারো ; আমি প্রকাশের ব্যবস্হা করে দেব। তার জন্য হাত খরচের টাকা পেয়ে যাবে। টিউশানি করে অযথা সময় নষ্ট করতে হবে না। নিজের নামে যদি লিখতে অস্বস্তি হয় তাহলে ছদ্মনামে লিখতে পারো। ছাত্রীদের কেউ প্রেমিকা নয় তো ?

    –টাকা !

    — যে কোনো বিষয়ে লিখতে পারো। পাণ্ডুলিপি কী ভাবে তৈরি করতে হয় জানোতো ? পরীক্ষার খাতার মতো।

    অনুপ্রবেশ্য আভার একাকীত্বের জেলগারদে তখন নিজেকে ঘিরে রাখত রাহুল ; অহংকারের তরল আলকাৎরার বিছানায় শুয়ে আমুদে গড়াগড়ি খেত। টাকায় কি অপেরা থাকে ? স্বর্ণমুদ্রার স্বকীয়মূল্য হিসাবে ভাবা যায় কি ক্রিয়েটিভ লেখাকে ? তা তো অবৈধ গুপ্তপ্রণয়ের মতন, বা নিজের সঙ্গে নিজে গুপ্তচক্রান্তের মতন, ইনট্র্যানসিজেন্ট। পশু-পাখিদের অপেরা নেই কেননা তারা চমকে উঠতে পারে, কিন্তু তাদের বিস্মিত হবার চেতনা নেই, চমৎকারে মোহিত হয় না। অপেরাকাররা তাই অবজ্ঞাপূর্ণ অনিশ্চয়তার পীড়ায় ভুগতে পছন্দ করে, প্রশংসনীয় দুঃসাহসের সপ্রতিভ প্রদর্শনী জাহির করে বেড়ায়।

    স্নাতকোত্তরের ফল বেরোতেই অধ্যাপকের চাকরি পেয়েছিল, দুদুটো, একটা ত্রিপুরায় আর একটা আসামে। গেলনা। নিজে রান্না করে, বা হোটেলে খেতে হবে, ঠররা খাবার ভুরভুরে অসুবিধা, পাতা ফোঁকার পথে নকল গাম্ভীর্যের অসুবিধে, এইসব ভেবে, গেল না। কানপুর শহরেই চাকরি পেয়ে গেল। বাবা বললেন আমাকে টাকা দিতে হবে না, নিজের জামা-জুতো বইপত্তর এবার নিজের খরচে চালাও। মা বললেন, মুরগির মাংস কিনে আনিস, আমি রেঁধে দেব, তোর তো খেতে ইচ্ছে করে জানি। তবে সিগারেট বেশি খাসনি। জানি, সুমিতার আড্ডায় গিয়ে বিড়ি-সিগারেট খাস।

    রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমমম, বোধহয় কত, থাকগে,সে যা-ই হোক, কী-ই বা এসে যায় !

    রাহুল লেখালিখির টেবল কিনল, বইপত্রের আলমারি তৈরি করাল, ট্রানজিসটার কিনল, রাজপথের ওপরে বইয়ের বড়ো দোকানটায় অর্ডার দিয়ে রাখত বইয়ের, ইংরেজি বইয়ের। বাংলা বই অনিকেত নিয়ে আসত কলকাতা থেকে।

    বইয়ের পোকা রাহুল একা ছিল না। আলমারিতে অনাকাঙ্খিত কীটরাও বই ফুটো করার শ্রমদান করত। কোনো-কোনো উদগ্রীব পোকা একটা বইতে ঢুকে একের পর এক বইয়ের ভেতর দিয়ে টানেল তৈরি করে জ্ঞান-কোষাগারের খোঁজে বেরিয়ে, মনে করিয়ে দিত যে বইগুলো রাহুল কেনই বা কিনেছিল, স্রেফ সাজিয়ে রাখার জন্য ? হ্যাঁ, কতো বই স্রেফ সাজাবার জন্যই হয়, বাড়ির লোকেরা পড়ে না, যে কিনেছে সেও পড়া হয়ে যাবার পরও কেন যে বইটাকে আলমারিতে গুছিয়ে বা গুঁজে রাখে, তার উত্তর সে নিজেই হয়ত বলতে পারবে না।

    দাদা অনিকেত যে বইগুলো কলকাতা থেকে পাত্তাড়ি গুটিয়ে চলে আসার সময়ে এনেছিল, সেগুলো, ওই যখন এনেছিল, তখনই পড়ে ফেলেছিল রাহুল; তবু পড়ে আছে বইগুলো, পড়ে-পড়ে বলদের মতো তাকিয়ে থাকে, কখন তাদের ল্যাজে মোচড় দিয়ে কাজে লাগানো হবে। কোনো খেতমজুর-পাঠক পেলে রাহুল তার মুখে হাসি ফোটাতে দিয়ে দিত। সেই ফাঁকে উই আর সিলভার মথরা বইগুলোর ভেতরে হরপ্পা-মহেঞ্জোদরো বানাতে থাকে। অবশ্য কিছু বই পোকাদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল, সেই যখন রাহুল কলকাতায় মামলা লড়তে ব্যস্ত, তখন বেশ কয়েকজন বইচোর, কী মাসিমা, কেমন আছেন, রাহুলের মামলা এখনও চলছে নাকি, হ্যাঁ কাগজে দেখেছি, বুলির ঘুমের ওষুধ ছড়িয়ে, ভারতে দুষ্প্রাপ্য বই ঝোলায় পুরে, মাসিমার পায়ে গদগদ প্রণাম জানিয়ে, কেটে পড়ত।

    অসীম গাঙ্গুলিকে বাদ দেবার কথা, আন্দোলন শুরু করার সময়ে, কই, ভাবেনি তো রাহুল । আন্দোলনে নেয়া বা বাদ দেয়া ইত্যাদি গালভারী প্যাঁচপয়জারগুলো আসেনি মগজে। আর বাদই বা দেয়া হবে কেন ! বাদ দেবার ক্ষমতা মানুষ কোথা থেকে পায় ? একে বাদ দাও, তাকে বাদ দাও, অসহিষ্ণুতার চূড়ান্ত ! মনুস্মৃতি পড়ে তো আর রাহুলরা জাত্যাভিমানের পিরামিড গড়েনি ; ইংরেজদের দেখাদেখি কালা আদমিদের বাদ দেবার আধুনিকতাবাদী থিম সংও

    বাঁধেনি । বাদ দেয়া হচ্ছে না, হবে না, ঘোষণা করার জন্যই তো হরিচরণ খাঁড়াকে দায় নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। দাদার বন্ধু, রক্তিম চাটুজ্জে তখন বলেছিলেন, অসীমকেও আমি আনব, রোসো ; আওয়াজটা আগে তুলে দেওয়া যাক।

    ডাক নাম যেহেতু রাহু, সেকারণে দেবতাদের মোহিনী ষড়যন্ত্রের আঁচ পায়নি। বুঝতে পারেনি যে অসীমকে না জানিয়ে আওয়াজ তুলতে চাইছেন রক্তিম। পরে প্রদীপন চাটুজ্জে, যাঁর আসল নাম নৃপতি, তিনিও, মানে প্রদীপনও, পরামর্শ দিয়েছিলেন যে সবাইকে অমন জানিয়ে কী করবে ! দেখোই না কী ঘটে। তুমি তো আর ফুটবল টিম তৈরি করছ না যে ক্যাপ্টেন দরকার। সময় তোমাকে দিয়ে যা করিয়ে নিচ্ছে তা সময়ের ব্যাপার, বুঝলে, তোমার এতে কোনো অবদান নেই ; তুমি জাস্ট ওয়ার ক্রাই বজায় রাখো। গিভ এ ড্যাম টু ওয়ান অ্যান্ড অল।

    ফলে, রাহুলের কন্ঠ থেকে : হ্যালেলুয়াআআআআ….

    ফুটবল টিম ! প্রকারান্তরে উনিও, মানে প্রদীপন চাটুজ্জেও, বলেছিলেন, ফুটবল টিমের মতো কাউকে ক্যাপ্টেন রাখার প্রয়োজন নেই। রক্তিমের নামে নেতা যোগ করায় উনিও অখুশি। উনিও বাদ দিতে চাইলেন অসীম গাঙ্গুলিকে।

    এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন অসীম গাঙ্গুলি। খাটে বসলেন।

    –তুমি উপলক্ষ্য মাত্র। তোমার কি মনে হয় না যে তুমি দায়িত্ববোধহীন কাজ করছ ?

    –পুরো ব্যাপারটা আমার পরিকল্পিত, বলল রাহুল, যার ডাক নাম রাহু। বিছানা থেকে লিফলেটটা, যার পিঠে জরুরি ঠিকানা লিখে রেখেছিল, তুলে, ভাঁজ করে, পকেটে রেখে যোগ করল, এটা আমারই লেখা, আর আপনি বলছেন যে আমি উপলক্ষ্য, আসল লক্ষ্য আপনি ! রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, মগজের রসায়ন চেপে রাখার চেষ্টা করেও পারল না। বলল, আসলে দায়িত্ববোধহীনতাই তো গতি, নিজস্ব দায়িত্বহীনতার আক্রমণাত্মক বোধ, আমার কাছে ক্রিয়েটিভিটি অন্তত তা-ই, আমি আমিই। ’

    রাহুলের বর্ণময় কন্ঠস্বর ঘেউ-ঘেউ স্তরে চলে গিয়ে থাকবে। মাসিমা, মানে অসীম গাঙ্গুলির মা, ঘরে ঢুকে বললেন, এত চেঁচামেচি শুনছি তখন থেকে ; ছেলেটা কখন থেকে এসে বসে আছে তোর সঙ্গে দেখা করার জন্য, ওর তো খিদে পেয়ে গিয়েছে।

    রাহুল, যার ডাক নাম রাহু, উঠে প্রণাম করল অসীম গাঙ্গুলির মাকে। যখন এসেছিল, তখনও করেছিল। অসীম বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

    ওনার দিকে তাকিয়ে, অসীম গাঙ্গুলিকে রাহুল বলল, ‘’তোলা থাক।’’ বলার পর, রাহুলের মনে হল যে অসীম গাঙ্গুলির বাড়ি আসা জরুরি ছিল। লেখালিখি ব্যাপারটাই তো অ্যান্টিএসট্যাবলিশমেন্ট কাজ, একধরণের দ্রোহ, সীমালঙ্ঘন– বাস্তবতার, ভাষার, অভিধার, বাক্যের, ব্যকরণের, শব্দার্থের, ব্যানালিটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

    মাসিমা বললেন, কী হয়েছে বাবা, প্রণামও তুলে রাখছ ? অসীমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যা স্নান করে আয়।

    আজ আর স্নান করব না ; এঘরেই দিয়ে দাও, বললেন অসীম।

    রাহুল সিংহ, যার ডাক নাম রাহু, টের পেল যে তাকে তাড়াতাড়ি বিদেয় করে দিতে চাইছেন অসীম গাঙ্গুলি।

    প্রণাম মুলতুবি রাখার জন্য ততটা নয়, যতটা ওর বুকপকেটে রাখা হ্যণ্ডবিলটার জন্য। নিয়মিত জায়গার বদলে ওনার শোবার বা লেখালিখির ঘরেই পাত পাড়তে বললেন।

    –হ্যণ্ডবিল ? একটা এক ফালি কাগজ ছাপিয়ে সৃজনশীলতা ? ভালো প্রেসও পাওনি দেখছি, হরফগুলো সবই ভাঙা-ভাঙা। সৃজনশীলতা হবে রবীন্দ্রনাথের মতন পুরুষ্টু বই লিখে, বা যেমন বঙ্কিমের উপন্যাস। আঁদ্রে ব্রেতঁ, ত্রিস্তান জারা, এজরা পাউন্ড কেউ কি হ্যাণ্ডবিল ছাপিয়ে আন্দোলন করেছেন ? পরাবাস্তববাদী ম্যানিফেস্টোতে কি আঁদ্রেঁ ব্রেতঁ লিখেছিলেন যে তিনি লিডার, নেতা ? তিনি ক্রিয়েটর যখন তিনিই তো নেতা ! তিনি ক্রিয়েটর হয়েও তা তোমাদের মতো প্রচার করে বেড়াননি।

    –সব ঝড়ই মাঠে নামার আগে একটা পাতাকে ছুঁয়ে আগমন-বার্তা পাঠায়, বলল রাহুল।

    অসীমদার বোন ঘরে ঢুকলেন। স্পষ্ট যে রাহুল নামের জীবটিকে ভালো করে দেখে নিতে চান। ‘দাদা, আমি একটু বেরোচ্ছি’ বলে বেরিয়ে গেলেন।

    ফিরতে বেলা করিসনি, বললেন অসীম গাঙ্গুলি। বোনের মুখের দিকে তাকায়নি রাহুল। হাতের দিকে তাকিয়ে হালকা রোম দেখতে পেল। রাহুলের বড়দির হাতে-পায়ে অমন রোম।

    বোন আবার ঢুকলেন, হাতে দুটো আসন নিয়ে। মেঝেতে পাশাপাশি আসন দুটো পেতে, কাঁসার গেলাসে জল রেখে চলে গেলেন। আবার ঢুকে ভাতের থালা রেখে চলে গেলেন।

    পাশাপাশি খেতে বসেছিল ওরা। রাহুল,ইচ্ছাকৃতভাবে, গণ্ডুষের আচরণ করল। ওর পদবি যে আসলে জাস্ট খেতাব, তা জানেন অসীম। দেখে উনি বললেন, বামুনগিরি চালিয়ে যাচ্ছ দেখছি। হেসে উঠলেন, যাকে বলা যায়, মনের সুখে। শ্লেষ প্রয়োগ করলেন, গণ্ডুষের মন্ত্র জানো তো, না হাত ঘোরানোই সার ?

    রাহুল বলল, জানি, মুখস্হ, তারপর গম্ভির ভাবে মন্ত্রোচ্চারণের ঢঙে বলল, ‘জিংগল বেল জিংগল বেল জিংগল অল দ্য ওয়ে…। ’

    পাশের ঘর থেকে চাপা খিলখিলের রেশ ভেসে এল।

    অসীম কি বুঝতে পারলেন যে রাহুল তাঁকে শ্রদ্ধার আসন থেকে নামিয়ে দিতে পারে। উনি জানেন যে যাদের ঈশ্বর নেই উনি তাদের পয়গম্বর।

    –সুররিয়্যালিস্ট শব্দের জনক হলেন গিয়ম অ্যাপলিনার। উনি আন্দোলনে ছিলেন না। ওনাকে ক্রিয়েটর হিসাবে বা লিডার হিসাবে প্রচার করা হয়নি পরাবাস্তব ম্যানিফেস্টোতে। তোমার সঙ্গে যারা গেছে তারা লোভি । কেউ তো তোমার সমবয়সী নয়, ভেবে দ্যাখো। তুমি কি ভাবছ তোমার দাদার জন্য রক্তিম আর প্রদীপন তোমার সঙ্গে যোগ দিল ? আমাকে না জানিয়ে ? ভাতের ওপর মুগের ডালের বাটি উপুড় করে মাখতে-মাখতে বললেন অসীম গাঙ্গুলি।

    রাহুল তেলাপিয়ার পিঠ থেকে পুরো মাংস খুবলে নিয়ে বলল, গিলতে গিলতে, আপনি আমাকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না, ফেকলু মনে করছেন। যেটুকু তোলপাড় ঘটিয়েছি, তা থেকেই তো আমার ভূমিকা স্পষ্ট। আমি আপনাকে জানাবার জন্যই এসেছিলুম। আপনার বন্ধুরা যাঁরা আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের আহ্বান করে আনিনি আমি। রক্তিম চট্টোপাধ্যায়ের মনে ধরেছিল আমার বক্তব্য। তাঁরা কেউই এই সমস্ত প্রশ্ন তোলেননি। রক্তিম আমায় বলেননি যে উনি নেতা হতে চান। প্রদীপন, মৃণ্ময় মজুমদার, চঞ্চলকুমার বসু, যাঁরা আপনার বন্ধু, তাঁরা নিজেরাই যোগ দিয়েছেন।

    –হুঃ, মৃণ্ময়, ওকে যে রক্তিম নিয়ে গেছে, তুমি উদ্যোক্তা হয়ে নিজেই জানো না। লেখালিখির বাইরে, লেখকদের কার্যকলাপ নিয়ে মৃণ্ময়ের কোনো উৎসাহ নেই, ও হয়ত বুঝতেও পারেনি যে রক্তিম ওকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে’, বললেন উনি।

    চুপ করেই ছিল রাহুল। কে কাকে এনেছেন আর আনছেন এগুলোর কোনো গুরুত্ব নেই আর, আন্দোলন নিজস্ব গতি ধরে নেবার পর। হরিচরণ খাঁড়া ওরফে দুর্গা বর্মণকে বেশ কয়েকজন অচেনা তরুণ অনুরোধ করেছে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। এমনকী শান্তিনিকেতনের পাঠভবন থেকে অমলেন্দু আতর্থী নামে একজন ছাত্র ওর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। হরিচরণ খাঁড়া ওরফে দুর্গা বর্মণের মতে, ক্রিয়েটিভ লেখকরা কমবেশি হিংসুটে হয়, আর বাজে ব্যাপার হল, প্রক্রিয়াটা আত্মবর্ণনার রূপক।

    –আমার রামায়ণ নট্ট কোম্পানি তো ছিলই। তুমি আলাদা করে আন্দোলন আরম্ভ করে ভালো করোনি। ভালো যে করোনি তা তুমি কিছুদিনেই জানতে পারবে। যারা লোভি তারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তোমার ওই সোকলড

    আন্দোলনে গেছে। আলুভাজা খেতে-খেতে বললেন অসীম গাঙ্গুলি।

    ইলিশ পাওয়া যায়নি নাকি অসীম গাঙ্গুলির এখন টানাটানি চলছে, তেলাপিয়া শেষ করে খেয়াল হল রাহুলের, যার ডাক নাম রাহু। অতুল্য ঘোষের সংবাদপত্রের চাকরি অতুল্য ঘোষের সঙ্গেই উধাও। আসানসোলে গিয়ে ভোটের মাঠে বীজ ছড়াচ্ছেন অতুল্য ঘোষ ; কম বয়সে উনি স্বামী বিবেকানন্দের ভাইয়ের প্রভাবে সাম্যবাদী ছিলেন । অসীম গাঙ্গুলি এখন কংগ্রেসি ; বয়স বাড়লে হয়ত সাম্যবাদী হবেন। সাম্যবাদীদের ঘোর সমালোচনা করেন। বয়স হলে হয়ত গুণগান করবেন। তারা মসনদে বসার সুযোগ পেলে হয়ত নিজেকে, আর সেই সঙ্গে রামায়ণ নট্ট কোম্পানিকে আমূল বদলে ফেলবেন। হয়ত রামায়ণ-মহাভারত ভাই-ভাই হবে।

    খাওয়া শেষ হলে অসীম গাঙ্গুলি বললেন, ভোজনান্তেও তো বোধহয় গণ্ডুষের প্রক্রিয়া কমপ্লিট করতে হয়। রাহুল ওনার মুখের পানে তাকিয়ে, উঠে পড়ে বলল, ‘’তোলা থাক। ’’

    চাকরি-বাকরি যদি না-ই থাকে, তাহলে বন্ধুদের সঙ্গে হইহই করে খালাসিটোলা, অলিমপিয়া, এটসেটরা যান কার টাকায় ? টিমটিমে নিয়ন পাড়ার আলোয় রইরই করেন কার খরচে ? বোধহয় শিল্প সমালোচক সাবর্ণীচরণ মুকুজ্জের টাকায় বা হিসাবরক্ষক বন্ধু বসন্ত বাঁড়ুজ্জের টাকায়। যদিও বাংলা চকচকে ফিল্ম পত্রিকাগুলোতেও লিখে চলেছেন, শচীন ভৌমিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ওই করে শচীন ভৌমিক বম্বে পাড়ি দিয়েছেন। অসীম গাঙ্গুলিও হয়তো কোথাও পাড়ি মারবার তালে আছেন। একটা বড় খবরের কাগজে চাকরির জন্য ওনার নাম সুপারিশ করে মালিককে

    চিঠি দিয়েছেন আগের কাগজের মালিক। অসীম গাঙ্গুলির এই এলেমের সঙ্গে কেউ টেক্কা দিতে পারবে না। তাঁর পাবলিক রিলেশানের কাজ খুব উন্নত। নেটওয়রকিং, নেটওয়র্কিং, নেটওয়র্কিং। যোগাযোগ যোগাযোগ যোগাযোগ যোগাযোগ, আর সংলাপ রোমন্হনের ক্ষমতা। কলকাতার কেউকেটাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন রূপক মজুমদার ; রূপকদার সঙ্গে সবায়ের বাসায় গিয়ে পরিচয় করে নিয়েছেন অসীম।

    রূপক সবাইকে খেই ধরিয়ে দিয়ে নিজে উধাও ।

    উধাও হবার আগে, বড়োবাজারে মারোয়াড়ির গদিতে, মামলার সময়ে, যেখানে কোনো-কোনো দিন রাতে রাহুল আশ্রয় নিতো, আর সান্ধ্য জমায়েতে দেয়ালে ঠেসান দিয়ে মাদকে বুঁদ থাকত, সেখানে হঠাৎ উপস্হিত হয়ে, কোনো কথা না বলে, পকেট থেকে বের করলেন একজোড়া মধ্যপ্রদেশী পাঁচমারি ঘুঙুর, নিজের পায়ে বাঁধলেন, আর নাচতে-নাচতে গাইতে লাগলেন :

    চোখ মেরো না বেদানা চুল বেঁধো না

    তোমার ঐ হলুদ জানালায়

    তুমি ঝুলিয়ে রেখো না বেদানা

    ঝুলিয়ে রেখো না

    নীল কাঁচুলি ঝুলিয়ে রেখো না

    আমো যখন আসব ঘরে

    তুমি নাইতে যেও না বেদানা নাইতে যেও না…

    উপস্হিত সবাইকে এমন মাতিয়ে দিলেন যে সকলেই উঠে নাচতে লাগলেন, যেন নাচিয়েদের ঘুর্ণাবর্ত শুরু হল, পাকের পর পাক পাকের পর পাক কোমর থেকে কাঁটাতারের ঘের নামিয়ে দিতে লাগল রাহুল।

    বহুকাল আর বহুবিবাহের পর রূপকদার সঙ্গে বইমেলায় দেখা হয়েছিল রাহুলের। রাহুলের বয়স তখন কত, মমমমমমম, যা-ই হোক না, কী-ই বা এসে যায় !

    রাহুলকেও ইতিহাসের দর্শন পড়ার খেই ধরিয়েছিলেন দীপক ; সেই তখন, যখন দাদা অনিকেত ধানবাদে পোস্টেড। বাসন মাজার সঙ্গে ইতিহাসের দর্শনকে দিব্বি মিলিয়ে দিয়েছিলেন রূপকদা।

    রাহুলের দাদা অনিকেতের বিয়ের সময়ে দাদার বন্ধুরা সবাই বরযাত্রী ছিলেন। সিংভূমের পাহাড়ি জেলাসদরে। কেবল রক্তিম চাটুজ্জে আসেননি, কেননা ওই বাড়িতে রক্তিম চাটুজ্জের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটি যুবতীর প্রেমে প্রায় উন্মাদ রক্তিম কী করে সম্পর্ক নাকচ করে চলে গেলেন ! জাস্ট হাওয়া। যুবতীর বাবা অনুমোদন করেনি বলে মেয়েটকে স্মৃতির কারাগারে ফেলে রেখে পালালেন। যে তরুণীর জন্য টানা দুবছর পড়ে রইলেন, শরৎ চাটুজ্জের দেবদাসের মতন অষ্টপ্রহর মহুয়ায় মাতাল, তার কী হবে চিন্তা করলেন না। তাকে নিয়ে লেখা রচনাগুলোকে তার চেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। প্রেমিকরা তাঁদের প্রেমের কবিতায় যে ভালোবাসার কথা বলেন, তা কোন ভালোবাসা !

    দাদা অনিকেতের বিয়েতে রূপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় ছাড়া সবাই এসেছিলেন সিল্কের ধুতি পাঞ্জাবি পরে। অসীম গাঙ্গুলি তো বটেই, এমনকি রূপকও। অনুপস্হিতির মাধ্যমে উপস্হিত ছিলেন রক্তিম, গালের ভাঁজে গোপন ট্র্যাজেডির ব্যক্তিগত ইতিহাস দাড়ির তলায় লুকিয়ে, কোথাও, কোনো মাতাল-জমায়েতে। পরে একজনকে ছুঁয়ে আরেকজনকে স্পর্শের স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখবেন হয়ত।

    এসব ব্যাপারে রাহুলের যা হয় তাকে বলা চলে প্রতিক্ষিপ্ত হওয়া। এনসিসিতে থ্রি-নট-থ্রির গুলি চালানো শেখার সময়ে বন্দুকের বাঁটের ধাক্কায় যেমনটা হতো। নড়ে উঠত বহু দূরের টার্গেট।

    অসীম গাঙ্গুলির ঘরে, আঁচিয়ে এসে, রাহুল ভাবল বলবে, কিন্তু বলল না, যে, আপনার বন্ধুরা খোঁয়াড়বদ্ধ হবার দরুণ বেড়া ভেঙে ভিনমুখো হয়েছেন। কয়েক বছর পরে প্রদীপন একটা পোস্টকার্ডে লিখেছিলেন রাহুলকে,’অসীম আমার ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দিয়েছে হে, তুমি তাড়াতাড়ি এর বিহিত করো। ’

    ফালিকাগজ তো রয়েছেই, এক ফর্মার করে দেয়া যেতে পারে। হ্যালেলুয়াআআআ….

    রাহুল বলল, তেলাপিয়া মাছটা ভালো খেতে ; বাজার দখল করে নেবে মনে হয়। ইলিশ ক্রমশ লোপাট হয়ে যাবে। এই মাছের কথা জানি ; পুকুরে ছাড়লে অন্য মাছের চারা খেয়ে সাবাড় করে দ্যায়, আর নিজেদের বংশ বাড়াতে থাকে। তারপর তেলাপিয়াদের একচ্ছত্র।

    –তোমার মতলব জানি। তোমাকে কেই বা কলকাতায় চেনে ! একটা বই বেরোবার পরও অনিকেতকেই লোকে

    তেমন চেনে না। ওদের ব্যবহার করে তুমি নিজের ফিল্ড গড়ে নিয়েছ।

    রাহুল অপেক্ষা করছিল অসীম গাঙ্গুলির পরের সংলাপের জন্য।

    –এখন আর ওদের প্রয়োজন নেই তোমার। তুমি জানো যে তরুণ কবিদের নেতা আমি, অসীম গঙ্গোপাধ্যায়, রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারী। তাই আমাকেও ব্যাবহার করে নিতে চাও। তার আর প্রয়োজন নেই। এবার নিজে করে দেখাও। আমিও দেখব, হ্যাণ্ডবিলে কেমন করে নট্ট কোম্পানি চালাও ।

    –দেখাদেখির কিছু নেই। আমার কাজ কেবল বাক্য-খরচে আর শব্দ সাজানোয় সীমিত থাকবে না। বাঙালি সমাজকে নাড়িয়ে দেবার, ডিরোজিওর মতন পরিকল্পনা আছে আমার। ডিরোজিওর সামনে এসট্যাবলিশমেন্ট ছিল প্রাগাধুনিক বঙ্গসমাজ। আমার সামনে এসট্যাবলিশমেন্ট এই সময়, উত্তরঔপনিবেশিক সমাজ। ডিরোজিও ছিলেন সোফিসটিকেটেড। আর আমার মিলিউ বা হরিচরণ খাঁড়ার মিলিউ তো আপনি জানেনই, ছোটোলোকেদের। আমি আপনাকে আন্দোলনে যোগ দেবার আহ্বান নিয়ে আসিনি। যদি তা করবার থাকত তাহলে আপনার বন্ধু অনিকেতই করতেন। আমি ভেবেছিলুম আপনি আনন্দিত হবেন।

    –তোমার ওই হিলহিলে হ্যাণ্ডবিল বিলি করে ! দেখব। হ্যাণ্ডবিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ! প্রতিষ্ঠানকে ভাঙতে হলে তার ভেতরে ঢুকে ভাঙতে হয়। বুলেটিন ছাপিয়ে হয় না।

    রাহুলের মনে হল দাদা অনিকেত অসীম গাঙ্গুলি সম্পর্কে যা বলতেন তা সঠিক। অসীম গাঙ্গুলি প্রতিষ্ঠান বলতে বোঝেন কোনো ইন্সটিটিউশান, বিশেষ সংবাদপত্র দপতর, কিংবা ঝন্টুদা যাকে বলেন কলকাতার বড়-বাঙালিরা। প্রতিষ্ঠান যে ক্ষমতা আস্ফালনের বিমূর্ত অবয়ব, তা কি উনি টের পান না ? সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেই হয়ত কাগজঅলাদের মনে করেছেন প্রতিষ্ঠান। বাঙালি সংস্কৃতির সামগ্রিক ছবি হয় ওনার সামনে ভেসে উঠছেনা বা উনি নিজের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছেন। পাঁচের দশক থেকে কলকাতার রাজপথে উদ্বাস্তুদের লড়াই ওনার চোখে পড়ছে না। তারা কার বিরুদ্ধে লড়ছে ? অনেকের বিরুদ্ধে। ক্ষমতা-প্রতাপের ছড়ানো-ছেটানো আস্ফালনঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে। ইংরেজরা চলে যাবার সময়ে যে খোস-পাঁচড়া চামড়ার ওপর, আর ক্ষয়রোগ শরীরের ভেতর, দিয়ে গেছে, তা থেকে কত রকমের কায়েমিস্বার্থের প্রতাপী আস্ফালন জন্মেছে, তা উনি দেখতে পাচ্ছেন না, বা দেখতে চাইছেন না।

    –শুধু বুলেটিন লিখে নয়। আরও অনেক পরিকল্পনা আছে। মর্ত্যে বিশৃঙ্খলাও তো দরকার। আধুনিকতার প্রকল্প আর ঘাঁটিগুলো আক্রান্ত হবে, একের পর এক, লক্ষ রাখবেন। আপনার পছন্দ হবে না। বাঙালি মধ্যবিত্তের আত্মাভিমানের দানবটাকে আমরা খুঁচিয়ে বের করে আনব। তারপর যা হবার তা হবে।

    কথাগুলো বলার সময়ে রাহুল নিজেকে শুধিয়ে নিঃশব্দে বলতে শুনল, যে সমস্ত লেখকরা ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়’ বা এই স্বাধীনতা মিথ্যা আওয়াজ তুলে একসময় ট্রামে বোমা মেরে বাসে পেটরল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, অজস্র বাঙালিকে আহত-নিহত করেছিল, তারা এখন অসীম গাঙ্গুলির শ্রদ্ধার আরামকুর্সিতে বসে দোল খাচ্ছেন ; তাদের ওই অপরাধ উনি বেমালুম ভুলে গেছেন ; আমি তো তাদের মতন তথাকথিত বিপ্লব করতে যাচ্ছি না।

    –ও, তুমি বিশৃঙ্খলার দেবদূত। অ্যানজেল অব কেয়স ! দেখব দেখব। চালিয়ে যাও যতদিন পারো। জুতোর ফোস্কাও বেশ কিছুদিন একাগ্র আর একগুঁয়ে থাকে। তবে যিশুখ্রিস্ট হবার চেষ্টা কোরো না।

    –আসার সময় আপনার গলির মোড়ে দেখলুম একটা ঘোড়ার খুরে লোহার নাল বসানো হচ্ছে। ঘোড়াটার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল হাসছে।

    অসীম গাঙ্গুলি বললেন, হুঁ। তারপর, জল খাওয়া শেষ করে বললেন, চ্যালেঞ্জ কোরো না। জানো তো আমি লাঠিচালানো শিখেছিলুম। জলে ডোবার সম্ভাবনা তোমার ; তুমি তো আমার মতো সাঁতার জানো না, এপার-ওপার করতে পারবে না, পাড়েই ডুবে মরবে।

    –জানি। প্রদীপন চাটুজ্জেকে আর রক্তিম চাটুজ্জেকে আপনি বলেছেন, আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে।

    প্রদীপন কেন যোগ দিয়েছেন জানেন ? উনি আমায় বলেছেন যে ‘এটা মিস করেছিলুম হে, এই রিলেন্টলেস বমবারডিং অব দি হেডকোয়ার্টার, প্রতি সপ্তাহে একটা করে গ্রেনেড’। উনি একে বলেছেন, ‘গৌরবের এথিকাল ঝিলমিল।’ বলেছেন, যত পারো আনন্দের হেঁচকি তুলে নাও এই সুযোগে।

    প্রদীপন আরেকটা কথা বলেছিলেন, যা রাহুল বলল না অসীম গাঙ্গুলিকে, ‘’এর পর লক্ষ্মণের ট্যালকাম-পাউডার লাইনটা কারা টানছে সেদিকে খেয়াল রেখো।’’ অসীমদার কথা মাথায় রেখেই বলেছেন, সন্দেহ নেই।

    –দ্যাখো কে কতদিন টেকে। এসট্যাবলিশমেন্টের সঙ্গে লড়ে জেতা যায় না। এসট্যাবলিশমেন্টে প্রবেশ করে

    অন্তর্ঘাত ঘটাতে হয়। ‘মোজেকের ওপর পা আর হাওয়ায় চোলাই-করা মেঘেতে মাথা গলিয়ে বললেন অসীম গাঙ্গুলি, যেন পিঠে করে নদী বয়ে বেড়াচ্ছেন।

    –স্ট্রেঞ্জ। রাহুলের ব্যারিটোন গলার স্বরে ধ্বনিত হয়েছিল ওর হতভম্ব হওয়া। আর মগজের ভেতর ফিসফিস হয়েছিল, মার্ক অ্যান্টনির সংলাপ। তার মানে, হুশিয়ারি দিয়ে রাখলেন অসীম গাঙ্গুলি।

    পরজন্ম দেখতে-পাবার ক্ষমতাসম্পন্ন কন্ঠে অসীম বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক শুনেছ। ’ উনি যেন নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেন।

    –আপনি হাওয়াইজাহাজের পাইলট হয়েই থাকুন ; আমি প্যারাশুট পিঠে প্যারাট্রুপারের ভূমিকায় থাকতে চাই। আপনার চোখে প্যারাট্রুপারের দেখা ব্রহ্মাণ্ডটা বিমূর্ত। বোধহয় সেকারণেই আপনি বিষ্ণু দেকে নাকচ করেছেন।

    –না, আমি বিষ্ণু দেকে বিমূর্ত বলে নাকচ করিনি ; উনি আমার কবিতা থেকে অংশবিশেষ বাদ দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন।

    –তার মানে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে একজন কবি আরেকজনকে নাকচ করতে পারেন ! একে-তাকে বাদ দেয়া, এর-তার লেখা থেকে অংশ ছাঁটাই, এগুলো তো ইংরেজদের শিখিয়ে যাওয়া ঔপনিবেশিক রোগ।

    –পারবে না কেন ? আমার যাকে পছন্দ নয় তাকে আমি নাকচ করে দিই। কথাটা মনে রেখো।

    জিতে যাওয়া হেরে যাওয়া, সৃজনশীলতা তাহলে রণক্ষেত্র ; ক্ষমতার মাদকতন্দ্রা দেয়। দেয় নিশ্চয়ই। একে সাব-এডিটারের চাকরি থেকে বের করে দাও। ওকে এই পুরস্কার, তাকে সেই পুরস্কার দিয়ে পোড়া বাসের ভুত-ভুতনিতে পালটে দাও। দরবার বসাও। যত ক্ষমতা তত সন্দেহ তত স্তাবক তত পীড়া।

    গেট খুলে বেরিয়ে বাঁদিকে এগোবার পর রাহুল দেখল আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে কারোর উদযাপিত জন্মদিনের গোলাপতোড়া। ও এখন যাবে যাদবপুর, বান্ধবীর বাসায়।

    খুরে নতুন নাল-বসানো কালো চকচকে ঘোড়াটা উঠে দাঁড়িয়েছে।

    তা ছিল প্রথমবারের কথা কাটাকাটি।

    শেষবার, অসীম গাঙ্গুলির ওঝাপুরের বাড়ির গেটের ভেতরে ঢুকে, রাহুলের মনে পড়ে গেল প্রথমবারের কথাকাটাকাটি।

    ওকে ঢুকতে দেখে, অসীম গাঙ্গুলি, যে ভাবে দৌড়ে নিচে চলে এলেন, বোঝা গেল, রাহুলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বিদেশ থেকে ফিরে ধুতি বাতিল করে দিয়েছেন। চেককাটা শার্ট আর ট্রাউজার, চুলে শ্যাম্পু। শ্লেষাত্মক চাউনি মেলে, বললেন, তাহলে, যাকে নেতার আসনে বসিয়েছিলে, সে-ই পিঠে ছুরি মারল তোমার ? মনে করে দ্যাখো, আমি সতর্ক করেছিলুম তোমায়, আন্দোলনের নেতৃত্ব সকলের দ্বারা হয় না, নেতা সাজিয়ে কাউকে বসিয়ে দিলেই সে নেতা হয়ে যাবে, অমন চিন্তাকরাটাই তো ভুল, বলেছিলুম তোমায় সেবার।

    রাহুল নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনল, এশিয়া সোসাইটির বনি ক্রাউন তো আন্দোলনের নেতা হিসাবে রক্তিম চাটুজ্জের জন্যে স্কলারশিপের সুপারিশ করেছিলেন, তা ওলোট-পালট কী ভাবেই বা হয়ে গিয়েছিল !

    –আমার কেসের ব্যাপারে সব খবর রেখেছেন। থ্যাংকস। হ্যাঁ, লিডার-ক্রিয়েটার চিহ্ণিত করে প্রথম ইশতাহারেই নামের দরকার ছিল না, ওটা আমারই ব্লান্ডার। আর, রাহুল একটু থেমে, বলবে কি না ভেবে নিয়ে বলে ফেলল, রক্তিম চট্টোপাধ্যায় মনে করেন যে তাঁর প্রেমিকাকে বিয়ে করার পথে আমি এবং দাদা অনিকেত বাগড়া দিয়েছি। আসল ব্যাপার আপনিও জানেন। রক্তিম চাটুজ্জে এত মদ খেয়ে প্রতিদিন ওনাদের বাড়ি যেতেন যে ওদের বৈঠকখানা থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত চলে যেত মহুয়ার গন্ধ ; উনি পুরো দু’আড়াই বছর দাদার বাসায় কাটালেন, বেকার, কী করে একজন বাবা তার মেয়ের বিয়ে দেবার কথা ভাববে অমন পাত্রের সঙ্গে ?

    –ওর প্রেমিকা তোমাদের কানপুরের বাড়িতে রয়েছে, শুনেছি।

    –রয়েছে নয়, উনি স্নাতকোত্তর পড়তে গেছেন ; আমি আর অনিকেত দুজনেই বাইরে, আমাদের বাড়িতে ওনার পড়াশুনার সুবিধা হবে বলে আছেন। কলকাতায় এই ধরণের গুজব ছড়ানোর দরুণই রক্তিম চাটুজ্জে আরো অফেনডেড হয়েছেন।

    –তোমাকে তাহলে মারতে গিয়েছিল কেন, কফিহাউসের সামনে, দলবল নিয়ে ?

    –আমাকে নয়, সুকোমল রুদ্রকে ; আপনার পরিচিত এক সংবাদপত্র মালিককে জানাবার জন্য, যে উনি তাদের জন্য কতটা নামতে পারেন। চাকরি তো অলরেডি পেয়ে গেছেন বলে শুনেছি। মারকুটে সেই লেখকদলের সদস্য কারা

    ছিল সে-খবরও হয়ত আপনি পেয়ে গিয়ে থাকবেন।

    –তোমার আন্দোলনের লোকেরা শেষ পর্যন্ত তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে, রাজসাক্ষী হয়েছে, তোমার তো অপমানিত বোধ করা উচিত। মনে হচ্ছে না, তুমি ডিফিটেড ?

    — না, তা হবে কেন, আমি তো কোনো রাজ্য জয় করতে বেরোইনি। তবে, আমি এক্সপেক্ট করিনি যে প্রদীপন, রক্তিম আর চঞ্চলকুমার বসু আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন, সরকার পক্ষের সাক্ষী।

    –চোঙদার ভাইরা তো তোমার বিরুদ্ধে, তোমার আন্দোলনের বিরুদ্ধে, মুচলেকা সই করে দিয়েছে ; আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করেছে, লিখেছে নাকি যে ওরা তোমার আন্দোলনের মটোতে বিশ্বাস করে না। তোমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছে।

    –বারবার তোমার তোমার বলছেন কেন ? এই আন্দোলন তো কারোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা প্রায়ভেট প্রপার্টি নয়। আমরা কি ওই গাছের তলায় গিয়ে আলোচনা করতে পারি ? অনেকটা হেঁটে এসেছি। হাঁটতে-হাঁটতে রাহুল বলল, চোঙদার ভাইদের সমস্যা হল আত্মবিশ্বাসের অভাব, মূলত চাকরি চলে যাবার ভয়।

    অসীম গাঙ্গুলি এগোলেন গেটের বাইরে অর্জুন গাছের ছায়ার তলায়, উত্তেজনা বা ক্রোধ চাপা দিতে রাস্তা থেকে কয়েকটা পাথরটুকরো তুলে দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে ছুঁড়তে থাকলেন। রাহুলকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন না। ভালোই হল, ভাবল রাহুল, অসীম গাঙ্গুলির মা শুনতে পেতেন ওদের তর্কাতর্কি। রাহুল যে গ্রেপতার হয়েছে, মামলা চলছে ওর বিরুদ্ধে, বন্ধুরা ওর বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়েছে, হয়ত ওনার কানে গিয়ে থাকবে, এবং উনি অসীম-বিরোধী অবস্হান নিয়ে ফেলতে পারেন অনুমান করে অসীম গঙ্গোপাধ্যায় রাহুলকে নিয়ে গেছেন বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে।

    –আপনি বিদেশ থেকে ফিরতেই আমাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হল, আন্দোলন তো চলছে সেই একষট্টি থেকে, অনেকেরই কিছু কর্মকাণ্ড পছন্দ হয়নি। তখন কিন্তু পুলিশ অ্যাকশানের গুজব রটেনি। আপনি ফিরতেই এ-সব হল। এ-ও শোনা যাচ্ছে যে লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেণ্টের ডেপুটি কমিশনার আপনার রামায়ণ নট্ট কোম্পানির একজন নটের নিকটাত্মীয়।

    –কী বলতে চাইছ কি, স্পষ্ট করে বলো। তুমি বলতে চাইছ আমি ফোন তুলে প্রফুল্ল সেনকে এবং পুলিশ কমিশনার পি. সি. সেনকে বললুম যে এদের এগেইনস্টে কড়া অ্যাকশান নাও, আর তারা আমার কথা শুনে হুকুম দিলে যে যাও, রাহুলকে দড়ি বেঁধে রাস্তায়-রাস্তায় ঘোরাও ; শিশুসুলভ ভাবনা। এখনও একটা ভালো চাকরি জোটাতে পারলুম না, আর তুমি এসেছো দোষারোপ করতে।

    –দোষারোপ করতে আসিনি। আপনার জোর গলায় বলা সত্ত্বেও আমার সন্দেহ থেকে যাচ্ছে যে আমার আর দাদার বিরুদ্ধে মামলায় আপনার হাত আছে।

    –কী করে এসব কথা বলতে পারছ ? রামায়ণ নট্ট কোম্পানি থেকে তোমার অপেরার বই প্রকাশ করেছি।

    –আপনি করেছেন ?

    –আমার অনুমোদন আর নির্দেশেই প্রকাশিত হয়েছে।

    –খরচ তো আমাকে করতে হয়েছে। আপনার নট্ট কোম্পানির ছোকরারা এখানের প্রেসগুলোতে গিয়ে হুমকি দিয়ে বইটা ছাপতে দেয়নি। বসন্তবাবুও সাহায্য করেননি ছাপার ব্যাপারে। আমি বইটা বহরমপুর থেকে ছাপিয়ে এনেছি।

    –তোমার বই, তোমাকেই তো আগ্রহ দেখাতে হবে। কে-ই বা চেনে তোমাকে যে এগিয়ে এসে তোমার বই নিজের

    আগ্রহে প্রকাশ করবে ?

    –সে যাক, আমি এসেছি জানতে যে আপনি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে রাজি কিনা। মায়াময় দত্ত আপনাকে অনুরোধ করে থাকবেন, উনি আর বরুণ সান্যাল স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যুধাজিৎ দত্তও দিচ্ছেন।

    –কে যুধাজিৎ ?

    –তিরিশের একজন কবির ছেলে, লুম্বিনি পার্কে সাইকোলজিস্ট। মনোবৈজ্ঞানিক হিসাবে বিশেষজ্ঞের মতামত দেবেন।

    –আমি দেবো না বলিনি তো। আমাকে ভেবে দেখতে হবে। তোমার সম্পর্কে আমার যতই স্নেহ থাক, তুমি আমাকে না জানিয়ে হঠাৎ করে আন্দোলন আরম্ভ করতে গেলে কেন, তার কোনো কুলকিনারা পাইনি এখনও। রামায়ণ নট্ট কোম্পানি তো ছিলই। তোমার অপেরাগ্রন্হও আমার কোম্পানি থেকে বেরোচ্ছিল, আমার সুভেনিরে তোমার বইয়ের বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলুম। আমার চিন্তা করার সময় দরকার।

    –জানি। প্রদীপন চাটুজ্জে আপনার চিঠিটা, যেটা আমার বিরুদ্ধে লিখেছিলেন বিদেশ থেকে, সেটার একটা অংশ পড়ে শুনিয়েছিলেন। আপনি বিদেশে যাবার আগেই প্রদীপন আমায় বলেছিলেন যে আপনি ওনার ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দিয়েছেন। চঞ্চল বসুরও ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দিয়ে থাকবেন, যে-জন্য উনি ইংল্যন্ডে বসবাস করতে চলে যাচ্ছেন। চঞ্চল বসু আর রক্তিমকেও অমন চিঠি লিখেছিলেন। বসন্তবাবু আর হরিপদ রায়কেও লিখে থাকবেন ; কখনও হয়তো জানা যাবে, ওনাদের কাগজপত্র প্রকাশিত হলে। মূল সুর ছিল যে আপনি আমাদের আন্দোলন ভেঙে দেবেন।

    –বাজে বকছ। আমি ভেঙে দেব বলিনি। বলেছিলুম, ভেঙে দেবার ক্ষমতা রাখি।

    –আপনি প্রদীপন চাটুজ্জেকে লিখেছিলেন, মনে করে দেখুন, যে আমরা আন্দোলন করছি রামায়ণ নট্ট কোম্পানি অর্থাৎ অসীমের প্রতিপক্ষ হিসেবে। লিখেছিলেন যে আপনি প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ্যে আমাদের আন্দোলনের বিরোধিতা করেননি ; এর অর্থ কী ? গোপনে আপনি অনেক কিছু করতে পারেন, আপনার চেনাজানা প্রচুর, অতুল্য ঘোষের মাধ্যমে আপনি প্রফুল্ল সেনের কাছে আপনার ভাবনা সহজেই পৌঁছে দিতে পারেন। আমি বা অনিকেত পরি না। আমাদের মামলা চলছে, আর কলকাতায় আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, আমরা চাকরি থেকে সাসপেণ্ডেড। দেখছেন তো, আপনি কতোবার আমাদের বাড়িতে, দাদার বাড়িতে গিয়ে থেকেছেন, কিন্তু দাদা আপনার কাছে এখনও একবারও আসেননি।

    –তোমাদের আন্দোলন আমি একেবারে পছন্দ করি না। বিদেশ থেকে ফিরে এসে শুনলুম তোমার আন্দোলনের কে একজন অমলেন্দু আতর্থী, শান্তিনিকেতনের পাঠভবনের ছাত্র, রাসটিকেট হয়েছে। সে একটি ছাত্রী সম্পর্কে তার পত্রিকায় অকথা-কুকথা লিখেছিল।

    –হরিচরণ খাঁড়াকে অমলেন্দু আতর্থী জানিয়েছে যে আমাদের আন্দোলনে যোগ দেবার অপরাধে তাকে পাঠভবন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

    –তবে ? ভেবে দ্যাখো ! পাঠভবনের মতন শিক্ষণসংস্হাও তোমাদের অপাংক্তেয় মনে করছে। সুতরাং আমার পক্ষে অপছন্দ করার যথেষ্ট কারণ আছে। আমার সোজা কথা, তোমাদের আন্দোলনকে পছন্দ করি না।

    –করেন না তার কারণ আপনি একে মনে করেছেন এই আন্দোলন রামায়ণ নট্ট কোম্পানি-বিরোধী বা অসীম-বিরোধী। আপনি সবাইকে যে চিঠিগুলো লিখেছেন, সেগুলো তো আমার বিরুদ্ধে। আমি তো আপনার বিরুদ্ধে এক লাইনও কোথাও লিখিনি, কাউকে লিখিনি, মানে, এখনও লিখিনি।

    –বিষ্ণু দে সম্পর্কে আমার বক্তব্য ছাপিয়েছ। ওটা আমার ব্যক্তিগত মতামত।

    প্রতিটি কথার পর একটা করে ঢিল ছুঁড়ছিলেন অসীম গাঙ্গুলি। হাত ব্যথা হয়ে গিয়ে থাকবে বলে থামলেন, আসে-পাশে যত ঢিল ছিল, রাহুল এক পলক চেয়ে দেখল, খরচ করে ফেলেছেন উনি। প্রচুর কৃষ্ণচূড়া ফুল ঝরাতে পেরেছেন ; অদৃশ্য শত্রুদের রক্তাক্ত করতে পেরেছেন।

    –তাতে কী এসে যায় ? বিষ্ণু দেকে বলেছেন অশিক্ষিত ; খোলাখুলি বললেই তো পারতেন। আপনি প্রদীপনকে লিখেছিলেন, “রাহুলকে এত পছন্দ করছেন কেন ; ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে আপনি নিশ্চই মনে-মনে বিশ্বাস করেন না”, এটসেটরা। আপনি তাহলে আমার অপেরাগ্রন্হ রামায়ণ নট্ট কোম্পানি থেকে বের করতে রাজি হলেন কেন, আমাকে লিখতে উৎসাহিত করতেন কেন, প্রথমবার যখন আপনি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন তখন কেন বলেছিলেন আপনাকে লেখা পাঠাতে ; আপনি ছাপাবার আর টাকা রোজগারের ব্যবস্হা করে দেবেন ? আসলে আমি আপনার দরবারে যোগ দিতে চাইনি, সেকারণেই আপনার রাগ। যাকগে, তাহলে ধরে নিচ্ছি যে আপনি সাক্ষ্য দেবেন না। যদি সাক্ষ্য দেন তাহলে এ-কথা মনে রাখতে হবে যে আদালতের কাঠগড়াটা সমালোচনার জায়গা নয়,

    আমার লেখাটার বিরুদ্ধে যদি কোর্টে মতামত দেন, তাহলে সাক্ষ্য দেবার প্রয়োজন নেই।

    –দেবো না, বলিনি তো। তুমি আমাকে আক্রমণ করছ, সেই সঙ্গে সাক্ষ্যও দিতে বলছ।

    –তার কারণ আপনার সম্পর্কে আমার সেই আগেকার দৃষ্টিভঙ্গী বেশ ঘা খেয়েছে। পছন্দ করেন না বলছেন যখন, তার মানে তো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করবেন হয়ত। আপনি ফিরে এসে চারিদিক থেকে আমার সঙ্গে শত্রুতা করছেন, অন্য সবাইকে আমার বিরুদ্ধতা করতে বলছেন, আমার এরকম একটা সন্দেহ দানা বাঁধতে আরম্ভ করেছে। আপনি প্যারানয়ায় ভুগছেন।

    –তোমাদের আন্দোলনকে যেমন পছন্দ করি না, তেমন বিষ্ণু দের কবিতা পছন্দ করি না। অনেকের লেখাই আমি পছন্দ করি না, আমার ভালো লাগে না। জেমস জয়েস, এজরা পাউন্ড পড়ে আমার ভালো লাগেনি, আমার রুচির সঙ্গে

    মেলে না। যাদের ভালো লাগে তাদের আমি তাদের পছন্দ করি। তুমি যদি একে সাবজেকটিভ বলে উড়িয়ে দিতে চাও, সেটা তোমার সমস্যা। যাদের পছন্দ করি তাদের বাজে বইকেও ভালো বলি, আনন্দবাজারে-দেশে দেখে থাকবে।

    –আমাদের আন্দোলনকে অপছন্দের কারণটা কী ?

    –কারণটা তুমি জানো। অনিকেতকেও বলেছি। প্রদীপনকে, রক্তিমকে, চঞ্চলকে, বসন্তবাবুকে আমি সেসব কথা বিদেশ থেকে লিখেছিলুম, ওরা তোমায় বলেছে হয়ত। আমার বক্তব্য সোজামাটা, যে-যে বন্ধু হতে চাও, কাছে এসো, সঙ্গে থাকো, আমিও সঙ্গে থাকব, সাহায্য করব ; যে-যে বন্ধু হতে চাও না, কাছে আসতে চাও না, আলাদা হয়ে যেতে চাও,দূর হয়ে যাও চোখের সামনে থেকে।

    –তার মানে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না

    –দেবো না বলিনি তো। অনিকেতকে বোলো দেখা করতে।

    –আপনি বিদেশে গিয়ে ভারত-ফেরত একজন বিটনিক কবিকে বলে এসেছেন যে আমি নাকি রক্তিমকে দিয়ে ওনার কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে প্ররোচনা দিয়ে রক্তিমের বহুমূল্য সময় নষ্ট করে চলেছি। ইংরেজিতে রক্তিম চট্টোপাধ্যায়ের যতগুলো অনুবাদ এখন পর্যন্ত বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছে, সবই আমি করেছিলুম।

    –ও, জানতুম না। কই, রক্তিম বলেনি তো।

    রাহুল সিংহ আর অসীম গাঙ্গুলি দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ সংলাপহীন।

    –চলো, খেয়ে যেও। রাহুলের দিকে মুখ করে বললেন অসীম।

    রাহুল বলল, তোলা থাক। একটা ফাঁকা বাস যাচ্ছিল, যেখানেই যাক, আস্তানা তো নেই কোথাও, হাত দেখিয়ে উঠে পড়ল।

    একেবারে ফাঁকা প্রাইভেট বাস ; কেবলমাত্র একজন মহিলা বসেছিলেন লেডিজ সিটে, যাঁকে দেখে, রাহুল প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, আরে, সুমিতাদি, তুমি, এখানে, কলকাতায় !

    মহিলা বললেন, তোর খোঁজেই তো সেই সকাল থেকে বেরিয়েছি ; শুনলাম রাহুকেতু নামে কি একটা বই ছাপিয়েছিস, আর তাতে পাঠকদের কাছে আসল কথাটাই চেপে গেছিস।

    –কী কথা ?

    –যে তুই-ই ছিলিস আমার একমাত্র তুই…

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৯:১৮734727
  • মলয় রায়চৌধুরীর গল্প : এই রোগের নাম চাই

    ---তুমি পুলিশে চাকরি পেলে কী করে ? তোমার নামে তো অনেককিছু শোনা যেতো, মানে তোমার অসামাজিক কাজকারবারের ব্যাপারে।

    ---না স্যার, আমি প্রথম থেকে এরকুম ছিলুম না ; রোজগারপাতির জন্যে, বাবা-মা আর সংসারের ব্যাগার ঠেলতে আমাকে নানা কাজ করতে হয়েচে, এখুন অবশ্য নানুদি আমার টাকায় সংসার চালাতে দিতে চান না, বলেন ও হোলো রোগের ট্যাকা। আপনি তো জানেন আমার বাবা-মা দুজনেই অন্ধ। অন্ধ ছিলেন না, সুদু ক্যাটারাট ছিল ওনাদের ; বিনে পয়সায় অপারেশান করাতে গিয়ে চোখ খুইয়েচেন, ক্যাম্প বসিয়েছিল ক্লাবের গেঁড়ে-কাত্তিকরা, চোখের ডাক্তারদের এনে, ক্লাবেই চল্লিশ জনের অপারেশান হয়েছিল, সকলেই অন্ধ হয়ে গেচে। হেমুদা মারা যাবার পর ওনার অন্ধ বাবা-মা ভিককে করে খাচ্চেন, খাচ্চেন আর কি বলব, ওই কোনো রকুমে টিকে আচেন। ক্লাবের কত্তাদের ধরেছিলুম আমরা, তা ওয়াঁরা বললে সরকারের কাচে আবেদন করা হয়েচে। সরকার আর কী করবে বলুন, তাদের কি হেগে-পেদে কাজ নেই যে অন্ধদের পেচনে দৌড়ুবে, অন্ধ বলে তো ভোটও দিতে যেতে পারেনি ওয়াঁরা, শেষে আমরাই ব্যবস্হা করে ওয়াঁদের ভোটগুনো দিলুম, তার বদলে নেতাটা যতো টাকা দেবে বলেছিল, তা দিলে না, ঘাগুর মেসো।

    ---কিন্তু পুলিশে চাকরি পেলে কেমন করে, তোমার তো লেখাপড়াও ঢুঢু।

    ---বলচি স্যার। ইসকুলে টেন পর্যন্ত পড়েছিলুম, টেনে-টুনে, ক্লাস টিচারদের ভয় দেখিয়ে ; ক্লাস টিচাররা কেউই চাইতো না যে আমি ওয়াঁদের ক্লাসে পরের বচরও থাকি। আর না পড়েও তো বারো ক্লাসের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, জানেন তো। ক্লাবের কত্তা অন্তত এটুকু খয়রাত তো করেছিলেন। বাবা-মায়ের চোখ ফিরিয়ে দিচ্চি, বলেছিলেন উনি সার্টিফিকেটের কাগচটা দেবার সময়ে। ইংরিজি বলতে পারি না, নয়তো উকিল হবার ডিগ্রিও যোগাড় করে ফেলতুম। শালা ইসকুলের মাস্টাররাই ইংরিজি জানে না, পড়াবে কি ! ঝণাদা উকিল হবার ডিগ্রি পেয়েচে বাবা-মায়ের চোখের বদলে, তবে ঝণাদা বাবা-মাকে দেখার বদলে বিয়ে করে অন্য শহরে ওকালতি করতে চলে গেচে, ওয়াঁর মা-বাপ ভিককে করে চালাচ্চেন।

    ---ইনটারভিউ তো ইংরেজিতে হয় ?

    ---না, স্যার, কন্সটেবলদের ইনটারভিউ ইংরিজিতে হয় না। তাই রক্ষে।

    ---কিন্তু তুমি তো ইন্সপেক্টার।

    ---হ্যাঁ, স্যার, ধাপে-ধাপে হয়েছি।

    ---ধাপে-ধাপে ? না লাশে-লাশে ?

    ---আমার কোনো দোষ নেই স্যার। আমি হুকুম পেয়েছি, হুকুম তামিল করেছি।

    ---তোমার দাদা তো রাজনীতি করতেন ?

    ---দাদা নয় স্যার, উনি আমার কাকা। সংসারটা উনিই টানতেন। রাজনীতি করতেন না উনি, লেকালিকি নিয়ে থাকতেন। তখন খতমের যুগ চলছিল, ওয়াঁদের কোটা পুরো করার জন্যে কাকাকে বদনাম দিয়ে তুলে নিয়ে গেল, তারপর কয়েকদিন পাওয়া যায়নি ; পাওয়া গেল একটা নৌকো ডুবে যাবার পর।

    ---বদনাম ?

    ---বদনামইতো। সব সরকারেরই একদিকে থাকে যারা বদনাম, আরেক দিকে নাম। এ এক গোলকধাঁধা আমি আজও বুঝে উটতে পারিনি। কে যে কখুন নাম থেকে বদনামের দলে চলে যাবে আর কে যে কখুন রঙ পালটে বদনাম থেকে রাতারাতি নামের দলে চলে যাবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

    ---তুমি তো বদনামেও নেই নামেও নেই।

    ---হ্যাঁ, স্যার, আমি ওই যারা দোল খায় তাদের দলে। আমি চিরকাল সিংহাসনের পক্ষে, যে বসবে তার থুতু চাটবো, এই আমার জীবনের লটারি।

    ---এখন হঠাৎ মুখ খুলতে চাইছ কেন ?

    ---কালা করতুত করেচে যারা তারা এবার ফেঁসে যাবে। তারা আমাকে ফাঁসাতে চাইচে। আমাকে সরিয়ে দিতে লোক লাগিয়েচে, কাকার মতন আমাকেও লোপাট করার তালে আচে।

    ---তুমিও তো ওই যাকে বলছ কালা করতুত, সেই সব কাণ্ড নিজেও করেছ।

    ---নিজের ইচ্ছেয় তো করিনি স্যার। হুকুম পেইচি, হুকুম তামিল করিচি।

    ---কিন্তু করেছ তো তুমি ?

    ---আমি কি আর একা করিচি ? ওয়াঁরাও করেচেন। ওয়াঁরাই বেশি করেচেন। আপনি শুনে দংগ রয়ে যাবেন ওয়াঁদের কালা করতুত শুনে। কন্সটেবলের চাকরি তো এমনি-এমনি পাইনি, ওয়াঁদের কালা করতুত ঢাকার জন্যে মনহুস একজন লোকের দরকার ছিল যে কখুনও না বলবে না, মুখ বুজে অর্ডার শুনবে।

    ---তোমার ভয় করে না ? একদিকে তোমার ওপরওয়ালারা আরেক দিকে যাদের খতম করেছ তাদের লোকেরা এবার তোমাকে সরিয়ে দিতে চাইবে, মুখ খোলার জন্য।

    ---আমি ওয়াঁদের সব কালা করতুত একটা ভিডিওতে রেকর্ড করে রেকিচি।

    ---মানে ? সবকটা মার্ডারের ভিডিও তুলে রেখেছ ?

    ---না, কারা কাকে আর কাদের মার্ডার করার হুকুম দিয়েছিল, তা বলিচি আর সেই সঙ্গে কিছু ফোটুও আচে।

    ---তোমার ওপরওয়ালারা তো নিজেদের ইচ্ছেয় করেননি। তাঁরাও নেতাদের হুকুমে করেছেন।

    ---সে সব নেতাদের নামও রেকর্ড করিচি ভিডিওতে ; সহজে কেউ আমার গায়ে হাত দিতে পারচে না তাই। জানে যে আমার গায়ে হাত দিলেই ভিডিওর কপি পৌঁছে যাবে নিউজ চ্যানেল আর খবরের কাগচের দপতরে, সেরকম ব্যবস্হা করে রেকিচি। আপনি আগে আমাদের পাড়ায় থাকতেন, ছোটোবেলা থেকে চেনেন আমায়, তাই আপনাকেই সব খুলে বলচি, আমাকে লোপাট করে দিলে আপনি সব জানিয়ে দিতে পারবেন। আপনাদের চ্যানেল দেখি তো, বেশ চেঁচামেচি করে খবর পড়েন সবাই, দিল খুশ হয়ে যায়।

    ---আমি তো নিউজ চ্যানেলে আগে কাজ করতাম, এখন করি না, এখন আমি তোমাকে নিয়ে একটা বই লিখতে চাইছি। বইটা লিখে রেডি রাখব, তোমাকে সরিয়ে দিলেই প্রকাশ করব। তুমি একটা কনট্র্যাক্ট সই করে দেবেন।

    ---হ্যাঁ, স্যার, তখুন বিক্কিরি বেশি হবে। আমি বেঁচে থাকতে বইটা তেমন বিক্কিরি হবে না। বইতে ফোটুগুনোও দেবেন স্যার। আর এই ডায়েরিটা রাখুন, এটা আমার কাকার, উনি লেকালিকি করতেন।

    ---কই দেখি। বাঃ, প্রচুর কোটেশান দেখছি, ওনার নিজের ?

    ---হ্যাঁ, স্যার।

    ---যাক ভালো হলো। বইটায় কিছু জ্ঞানগর্ভ ব্যাপার রাখতে পারব, নয়তো সমালোচকরা ভাববে পাল্প ফিকশান। আগের বইটাকে কেউ ননফিকশান বলে মানতে চায়নি।

    ---রাখবেন স্যার, কাকা সারা রাত পড়তেন আর লিখতেন, পায়ে পোলিও ছিল তো, ক্রাচ নিয়ে অফিসে যেতেন। বাড়িতে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতেন, এঘর-ওঘর করার জন্যে, লেখালিখির জন্য।

    ---দাঁড়াও, একটু পড়ি কোটেশানগুলো।

    *শত্রুতাও সম্পর্কে, যা কেউ চায় না।

    *জলাতঙ্ক রোগটা মানুষেরা কুকুরের কাছ থেকে পেয়েছে।

    *জীবনে অন্তত একবার কেউ না কেউ না কেউ পিঠে ছুরি মারবেই, আর সে আঘাত কখনও সারবে

    না।

    *সঙ্গমের চেয়ে যোনির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার আনন্দ বেশি।

    *তুমি যদি কাউকে ঘৃণা করো, সে যদি তা জানতে না পারে, তাহলে ঘৃণা করাটা উদ্দেশ্যহীন।

    *যদি না চোখে-চোখে রাখা হয়, তাহলে পুলিশ স্টেট হয়ে ওঠার জন্য গণতন্ত্রের মাটি সবচেয়ে নরম।

    *আমার কখনও ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ হয়নি ; প্রতিবার ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট টাচ’ হয়েছে।

    *সৃজনশীল মানুষের অধঃপতনের অভিজ্ঞতা হওয়া জরুরি, কেননা তা জ্যোতিষ্কদের হয়, পশুদের

    হয় না।

    *অতীতকে কারাগার মনে করলে সমস্ত স্মৃতি নোংরা হয়ে যায়।

    *যে মেয়েকে দেখতে এসে পাত্র পক্ষ পছন্দ করল না, সে জীবনকেই রিজেকশান বলে মনে করবে।

    *কবিতার জন্য নিয়তিকে বশে আনতে হয়।

    *মানুষ পৃথিবীর প্রতি অপার বিরক্তি নিয়ে জন্মায় ; তাই সে জন্মেই কাঁদতে আরম্ভ করে।

    *অপবাদ আকর্ষণ করার ক্ষমতা না থাকলে জীবদ্দশায় একজন কবির খ্যাতি মেকি হবার সম্ভাবনা।

    *মানব সম্প্রদায়ের মুক্তির তাত্বিকরা শেষ পর্যন্ত গণহত্যাকারীতে রূপান্তরিত হয়।

    *এককালে যারা অবক্ষয়-বিরোধী ছিল, তারাই বঙ্গসমাজে অবক্ষয় নিয়ে এলো।

    *ভদ্রলোক কাদের বলে ? যারা ক্লিটোরিস উচ্চারণ করতে লজ্জা পায়।

    *বিশ্বাসঘাতকেরা মরার আগে আত্মসন্মানহীন শিষ্যদল তৈরি করে যায়, যারা মৃতের গোলামি করে

    বেঁচে থাকে।

    *রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গুণ্ডামি হল বিশুদ্ধ ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীতার পরিসর।

    *”পবিত্র বই” আর “অপবিত্র বই”-এর পার্থক্য হল যে “অপবিত্র বই” কেবল মানুষরাই লিখতে পারে।

    *এক-একজন মানুষকে একবার দেখেই টের পাওয়া যায় তার মগজে সাভানার কোন জন্তুদের

    উৎপাত চলছে।

    *যে লোকটা কখনও কোনো মাদক জীবনে নেয়নি, সে গাঁজা ফোঁকার বিরোধিতা করবেই।

    *আশাবাদ : একটা নক্ষত্র কয়েক লক্ষ বছর আগে মরে গেছে ; তার আলো এখন পৃথিবীতে এসে

    পৌঁছেচে।

    *বিছানাকে অন্ধকারে আরণ্যক করে তোলাই ফুলশয্যা।

    *কবিতার উৎস কোনো না কোনো রহস্য যার উন্মোচন অন্য উপায়ে সম্ভব নয়।

    *কোথায় জায়গাটা ঠিক কোথায় ?

    *পশুরা জানতে পারল না যে মানুষ হল সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী।

    *ঈশ্বর কেবলমাত্র একজন এবং তাঁর নাম যৌনতা।

    *প্রতিশোধের ষড়যন্ত্র করা জরুরি কেননা তা জখমকে শুকোতে দ্যায় না।

    *জীবন সম্পর্কে কথা বলা প্রায় অসম্ভব কেননা তার জন্য যথার্থ অভিব্যক্তি কোনো ভাষায় নেই।

    *ব্যর্থ বিপ্লবী মার্কসের কবর দেখতে যান ; ব্যর্থ কবি দেখতে যান বদল্যারের কবর।

    *প্রেম তখনই সফল যখন তা প্রেমিক ও প্রেমিকা দুজনকেই ধ্বংস করে দ্যায়।

    *বর্ণবিভাজিত সমাজব্যবস্হায় শ্রেণিহীন সমাজের কল্পনা অবাস্তব ; মনুস্মৃতির পাহাড় মাথায়

    চাপিয়ে বিপ্লবের কথা ভাবা বাতুলতা। নির্বাচন প্রক্রিয়া বর্ণবিভাজনের শেকড় সমাজের আরও

    গভীরে পৌঁছে দিয়েছে।

    *স্মৃতির জ্বলন্ত শবকে শ্মশানের ডোমেদের মতন খুঁচিয়ে আগুনের ফিনকি উড়িয়ে চলেছি।

    ---তোমার কাকা বোধহয় প্রেম করতেন ? কবিতার বইও লিখে থাকবেন।

    ---হ্যাঁ, করতো তো, কবিতার বইতে লেখা আছে, যাকে ভালোবাসতো তার নাম, সংস্কৃততে কি সব লেখা তাকে নিয়ে।

    ---কই দেখি।

    ---এক-আধ কপি আছে হয়তো। বিক্রি হয়নি তো, আমিই বইয়ের দোকানে দিয়েছিলুম, এক কপিও বিক্রি হয়নি। বইগুলো একে-তাকে ডাকে পাটাত, একআধজন চিটি লিকে জানাতো কেমন লেগেচে। ব্যাস। আমিই তো পোস্টাপিসে গিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে আসতুম। এই নিন, রেখে-রেখে উইয়ে কেটে দিয়েচে।

    ---বাঃ, ওনার প্রেমিকার নাম তো বেশ, নয়নসুন্দরী । কোথায় থাকেন উনি ? বেঁচে আছেন এখনও?

    ---ও তো আমাদের নানুদির ভালো নাম। একটু আগে দেখলেন না, আমাদের বাড়িতেই থাকে এখুন, আগে কম বয়েসে আমাদের কাজের বউ ছিল। উনিই নানুদি, এখন বয়স হয়ে গেচে একটু, তবু চোখ দুটো দেখলেন তো কেমন বড়ো-বড়ো। নানুদির বরকেও পুলিশ মেরে ফেলেছিল, ফালতু ছিঁচকে কাজ করতো, পাউচে মাল ভরে বিক্রি, ড্রাগ নিয়ে এখান-সেখান, ঠ্যাঙানির চোটে মরেই গেল বেচারা। নানুদি আর কাকা তার আগে থেকেই ঘরের দরোজা বন্ধ করে নিজেদের ভালোবাসতো। একবার দরোজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলুম, নানুদি শাড়ি-ব্লাউজ খুলে দাঁড়িয়ে আচে আর কাকা একেবারে কাচ থেকে হুইলচেয়ারে বসে নানুদির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আচে, দুপায়ের ফাঁকের দিকে, বুঝচেন তো কী বলচি। তারপর নানুদি হাঁটুগেড়ে কাকার কোলে মুখ রাখলে, জানেন তো, মুখ দিয়ে যা করবার করলে। কাকাও মুখ দিয়েই যা করার করতো। নানুদি কাকাকে চান করিয়ে দিতো, সাবান মাখিয়ে দিতো, গা পুঁচে দিতো। কাকা মরে যাবার পর নানুদি বিধবার সাদা সাড়ি ধরেচে। বর মরার পর সাদা সাড়ি ধরেনি।

    ---উনি তোমাদের বাড়িতে এসে রয়ে গেলেন তোমার মা-বাবা অবজেকশান নেননি ?

    ---মা-বাবা দেখতেই পায় না ; নানুদি হাল না ধরলে ওয়াঁরা অক্কা পেয়ে যেতো অ্যাদ্দিনে, ওয়াঁদের কে দেখতো।

    ---তুমিই খরচ যোগাও ? প্রচুর টাকা করেছ শুনেছি, জমিজমাও কিনেছ।

    ---নাহ, নানুদি আমার টাকা নেন না। উনি বলেন এই রোগের টাকা নেবেন না। রোগের কী আচে বলুন আপনি? নানুদি নিজের বর থাকতেই কাকাকে ভালোবাসতো, ঘর বন্ধ করে কতো কি করতো, অথচ আমার কাজকে বলে রোগ।

    ---তুমি খুনি বলে, কতো খুন করেছ তার হিসেব রেখেছ ? খুন করা আর ভালোবাসার মধ্যে মেরে ফেলা আর বাঁচিয়ে রাখার তফাত। তোমার কাকাকে উনি ভালোবেসে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তোমাদের সংসারে রয়ে গেলেন তোমার কাকাকে ভালোবাসতেন বলে।

    ---না, স্যার, কোনো হিসেব রাখিনি, রাখলে মাথা গোলমাল হয়ে যেতো।

    ---তোমার কাকাকে কী ভাবে খুন করা হয়েছিল তা জেনেছ নিশ্চয়ই ওই চাকরিতে যোগ দিয়ে ?

    ---কাকাকে ওনার হুইল চেয়ারের সঙ্গে নাইলন দড়ি দিয়ে বেঁধে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়েছিল। গুলি মেরে বা গলা কেটে ফেলে দিলেও কথা ছিল ; তা নয়, একেবারে জ্যান্ত মানুষটাকে তার হুইল চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে জলে ফেলে দিলে।

    ---তুমি সেই থেকে তোমার কাকার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে চলেছ নানা মানুষকে মেরে।

    ---তা জানি না, ভেবে দেখিনি। কাকাকে ছেদ্দাভক্তি করতুম, কিন্তু ওয়াঁর জন্যে জান লড়িয়ে দেবার কতা ভাবিনি কখুনও। মানুষ মারি মারার জন্যে। একজন মানুষকে দনাদ্দন গুলি চালিয়ে উড়িয়ে দেয়াটা যেন নিজেই পাখনা মেলে ওড়ার মতন। মানুষকে মেরে ফেলার আনন্দ বাঘ-সিংহ মারার চেয়ে ঢের ঢের বেশি। আপনাকে বোঝাতে পারব না।

    ---প্রথমবার যখন একজনকে মেরেছিলে তখন হাত কাঁপেনি ?

    ---না স্যার, হাত কাঁপবে কেন ? আমি তো চুরি করছি না বা পকেট মারছি না যে প্রথমবার হাত কাঁপবে।

    ---চালাঘরসুদ্ধ পুড়িয়ে কয়েকজনকে মেরেছিলে বলে শুনেছি।

    ---একা করিনি তো ! আমাদের সিনিয়র সঙ্গে ছিল। বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েমানুষ-পুরুষমানুষের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনতেন যদি আপনি। কী যে মজা পাচ্ছিলুম আমরা সবাই বুঝিয়ে বলতে পারব না। সিনিয়ররা আমাদের দামি মদ খাইয়ে নিয়ে গিসল, ভেবেছিল যে আমরা ঘাবড়ে যাবো, ভয় পাবো। আমরা যে ওয়াঁদের মাতায় হাগি তা দুচার মাসেই বুঝে গিসলেন ওয়াঁরা।

    ---কেউ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেননি ?

    ---চেষ্টা আবার কী করবে। আগুন লাগাবার পর গুলি চালিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ করে দিয়েছিলুম।

    ---ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ হয়েছে, তুমি তার সদস্য তো ?

    ---না স্যার, আমি কোনোরকুম রাজনীতিতে নেই ; ওসব রাজনীতির ব্যাপার-স্যাপার, বুঝিও না ভালো।

    ---সেক্সে তোমার আগ্রহ নেই।

    ---আজকাল উঁচু দরের কল গার্ল পাওয়া যায়, টাকা ঢাললে ; রাজনীতির নোংরামিতে কেন যাব মিছিমিছি।

    ---উঁচু দরের মানে। অনেক টাকা খরচ করতে হয় ? মধুচক্র ?

    ---ঠিক তা নয়। নেটওয়ার্ক আছে, তাদের বললে হোটেলে রুম বুক করে সাপলাই দ্যায়। বেশ্যাদের চেয়ে আমার কলগার্লদের পছন্দ। রেট যে বেশি তা ঠিক। উজবেকিস্তানের মেয়েদের ভালো নেটওয়য়র্ক ছিল, মাঝখান থেকে দুজন খুন হয়ে কলগার্লের বাজারটাকে সামনে এনে গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছে। ওদের সঙ্গে বিকিনি পরা সেলফি তোলাতেও এক হাজার টাকা চায়। শোবার জন্যে পনেরো হাজার থেকে এক লাখ, মালের বডি অনুযায়ী। তাজাকিস্তানের এক আধবুড়ি ওদের নেটওয়ার্কের আন্টি, তাকে আগাম জানাতে হয়, টাটকা মাল চাইলে আনিয়ে দ্যায়। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আসে, কুড়ি-পঁচিশ লাখ কামিয়ে এক হপ্তায় নিজের দেশে ফিরে যায়।। হিন্দি ফিলিমে নাচের দলে ঢোকার জন্যে যারা আসে, তাদের রেট আরও বেশি, দেখেছেন তো, সকলেই বলতে গেলে সুন্দুরী আর কী ফসসা, গোলাপি মাখন অ্যাগবারে। আপনার দরকার হলে বলবেন, অ্যারেঞ্জ করে দেব।

    ---বলব।

    ---ওদের আসা-যাবার গাড়ির ব্যবস্হা করতে হয়।

    ---তোমার কাকা কবিতার বইটার নাম রেখেছেন “নয়নতারা”, হ্যাঁ, সংস্কৃতেই উৎসর্গ করেছেন নয়নতারাকে।

    ---নানুদি কাকার হুইল চেয়ার ধরে নিজের চারিধারে হাসতে-হাসতে ঘোরাতো আর কাকা ওই সংস্কৃত কবিতাটা পড়ে-পড়ে নানুদিকে শোনাতো। নানুদি তো বাংলা পড়তেই জানে না, সংস্কৃত আর কি বুঝবে, কাকা তবু শোনাত আর নানুদি ওনার চেয়ার নিজের চারিধারে ঘোরাতো।

    ---আরে না হে, এটা সংস্কৃত কবিতা নয়। তুমি ভালো করে শোনো, তাহলে বুঝতে পারবে নানুদি কেন নিজের চারিধারে তোমার কাকাকে ঘোরাতেন আর কাকা এটা ওনাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে পড়তেন :

    ওম ইষ একপদী ভব,

    সা মামনুব্রতা ভব,

    বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

    বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ

    ওম ইষ একপদী ভব ইতি প্রথমন। ।

    ওম ঊর্জে দ্বিপদী ভব,

    সা মামনুব্রতা বভ,

    বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

    বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ।

    ওম ঊর্জে জরদষ্টয়ঃ। ।

    ওম বায়স্পোষায় ত্রিপদী ভব,

    সা মামনুব্রতা ভব,

    বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

    বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ।

    ওম রায়স সন্তু জরদষ্টয়ঃ। ।

    ওম মায়োভব্যাস চতুষ্পদী ভব,

    বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

    বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ।

    ওম মায়োভব্যাস জরদষ্টয়ঃ। ।

    ওম প্রজাভ্যঃ পঞ্চপদী ভব,

    সা মামনুব্রতা ভব,

    বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

    বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ।

    ওম প্রজাভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ। ।

    ওম ঋতুভ্যঃ ষষ্টপদী ভব,

    বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ

    বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ।

    ওম ঋতুভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ। ।

    ওম সখে সপ্তপদী ভব,

    সা মামনুব্রতা ভব,

    বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

    বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ।

    ওম সখে জরদষ্টয়ঃ গা। ।

    ---বুঝলুম না স্যার। সংস্কৃত বইয়ের স-ও দেখিনি কখুনো।

    ---এটা বিয়ের মন্ত্র, যা আগুনের চারিধারে বর-বউ ঘোরার সময়ে বর উচ্চারণ করে। বউয়ের দায়িত্ব নেবার মন্ত্র। সপ্তপদী শুনেছ তো, তার মন্ত্র। আমি নিজের বিয়েতে পুরুতের কথামতো এই মন্তর আউড়ে ছিলাম, আজকে ভালোভাবে পড়ে বুঝতে পারলাম। তোমার নানুদিকে উনি নিশ্চয় জানিয়েছিলেন যে এটা বিয়ের মন্ত্র।

    ---আচ্ছা, তাই কাকা মারা যাবার পরে নানুদি এক কপি নিজের টিনের সুটকেসে যত্ন করে রেখেচে। আর কাকার ঘরে টোপোর-মুকুটও আচে একটা তাকের ওপরে। নানুদি কাকাকে টোপর পরিয়ে, নিজে মুকুট পরে, হুইল চেয়ার ঘোরাতো, তখুন অতো খেয়াল করিনি যে কাকার ছুটির দিনে চান করাবার আগে দুজনে মিলে বিয়ে করত টোপোর-মুকুট পরে।

    ---নানুদি তোমার টাকা নেন না তো সংসার চলে কেমন করে ?

    ---কাকা ওনার বীমা, পেনসনের আর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের নমিনি করে গিসল নানুদিকে, ভাগ্যিস কাকার বডি পাওয়া গিসল, তাই তো ক্লেম করতে পারলো নানুদি।

    ---বডি ? কী করে ? তুমি বলছ রাতে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। স্টিলের চেয়ারে বাঁধা বডি, ভেসে ওঠার তো কথা নয়।

    ---সেও এক ভগবানের ম্যাজিক স্যার।

    ---ভগবানের ম্যাজিক ?

    ---পরের দিন সকালে একটা ভুটভুটির মেশিন ফেটে গিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছিল। কাটা তেল মিলিয়ে চালায়, কখুন যে ফাটে কেউ বলতে পারে ?

    ---তারপর ?

    ---যারা সাঁতার জানতো তারা সাঁতরে পারে উটে যেতে পেরেছিল কিন্তু বেশ কয়েকজন বউ আর বাচ্চা তলিয়ে গিসল। তাদের খোঁজে ডুবুরি নাবল। ডুবুরিরা সবচেয়ে আগে কাকার বডিটাই তুলে আনল। পুলিশের নথিতে লেখা আছে যে কাকাও ওই ভুটভুটি করে যাচ্ছিল। ভালোই হল, কি বলুন ? কেন যে দড়ি বাঁধা তা আর কেউ জিগ্যেস করলে না ; করলে নিজেরাই বিপদে পড়ত। আত্মহত্যা বলেও চালাতে পারেনি বীমা কোম্পানি ; বীমার টাকাটা ব্যাংকে রেখেচে নানুদি, তারও সুদ পায়।

    ---নানুদি রোজগার করে তোমাকে খাওয়াচ্ছেন তাহলে।

    ---না, স্যার, আমি এখানে থাকি না, আমার নিজের ডেরা আচে, এখেনে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য ডেকেছিলুম। নিরিবিলি পাড়া, বাড়িতেও কোনো কিচাইন নেই।

    ---থ্যাংক ইউ, তুমি এই কনট্র্যাক্টটায় সই করে দাও, তোমার জীবনী লেখার গল্পের সত্ত্ব আমাকে দিচ্ছ, আর কেউ লিখতে পারবে না।

    ---একটু হিরোগিরি দেখাবেন স্যার ; আমার কয়েকটা ফোটো আছে, দিচ্ছি আপনাকে। কিছু কেচ্ছা জুড়ে দেবেন, কাটবে তাহলে, বিকোবেও ভালো।

    ---হ্যাঁ, দেখাবো, রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই গাঁজাখুরি উপন্যাস লিখে বাজার মাৎ করছে লিখিয়েরা। তোমার রোগের তো একটা নাম দিতে হবে, দেবো খুঁজেপেতে একখানা।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৯:২০734728
  • মলয় রায়চৌধুরীর আভাঁগার্দ নভেলা : ইলিশের কাটলেট

    অন্যায়ের বিচার কোথায় গিয়ে চাইতে হয়?কালিবাউশের ডিম, কাডলের বিচি,চিঙ্গইড় মাছ দিয়া কচুর লতি।চালকুমড়া ইলিশঃ ফুল নয় প্রাণ ভরে নিই বাতাসের গন্ধ চোখ থেকে যারা ঘুম মুছে আমাদের খিদে সাজিয়ে রাখে হাটে বাজারে কিংবা পথের ধারে হাসতে হাসতে...কচি চালকুমড়া চাকচাক কইরা খেজুর কাঁটা দিয়া কেইচা নেওয়া লাগে। এরপর হলুদমরিচ মাখায়া ভাজেন। তারপর নরমাল তরকারির মতই। সোয়াদ ই সোয়াদ!কবিতায় ব্যবহৃত কোনো শব্দ কখনোই কারো মালিকানার নয়। কোনোই রোদ্দুর আর ব্যক্তিগত থাকছে না কোন এক গর্ভিণী কাছিম ধীরে,অতি ধীরে মেঘ দর্শনকালে, ফসিল হয়েছে দ্রুত,লাভাস্রোতকে ভ্রমে নদী কল্পনায়। ছাদের উপর, আমশি শুকোনোর আমন্ত্রণ থাকছে না তার অ্যারাইভাল ডিপারচারের নিঃশব্দ দরজা, কিসের সেন্সর নিয়ে খুলছে ডুবছে উড়ছে পর্দা, আর পিঠে হাত, পিঠে নেই হাত বন্দর বন্দর ক্যাব ক্যাব কার্ড কার্ড আকাশের অনেক উপরে বমি বমি করলেই খোঁপা বাঁধা ট্রেতে পিল, মুখে হাসি, ভিতরে গুলিয়ে ওঠা সহজাত টকজল হাওয়ার কম্প্রেশনে, কমোডের মধ্যে দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে চলে গেল যেন, অর্থহীন রাগে কুঁকড়ে ওঠা প্রিয়মুখ কোন ব্রাণ্ড কণ্ডোম স্বাদহীন স্মৃতিহীন মনে আছে, তার মধ্যে কেমন শীৎকার মনে পড়ছে না আর। হঠাৎ ভীষণ শব্দ কী হল কী হল? "জোব্বাখানা পড়ে গেছে" "এত শব্দ তাতে?"

    শব্দ রাবীন্দ্রিক বা জীবনানন্দ দাশীয় হয় না। রবীন্দ্রগিরি, জীবনানন্দগিরি থাকে কবিদের লেখায় শব্দ ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে। আমাদের আত্মবিশ্বাস,দৃঢ়তা,আত্মশক্তি রূপে থেকে যান অন্তরে। বাহ্যিক এই নিরঞ্জন শুধু একথা মনে করিয়ে দেয় জীবন অনিত্য,স্থায়ী নয় কোনো মায়ার বন্ধনই।আমি নিজেকে পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল বলছি এই কারণে নয় যে, আমি সবার থেকে শিক্ষিত, বা আমার সংগ্রহে প্রচুর বই আছে। এ কারণে নয় যে আমি ফুকো, নীটসে, বেগম রোকেয়া, অবনীন্দ্রনাথ, সেরভেন্তিসকে নিয়ে অনর্গল কথা বলতে পারি। এসব অনেকেই পারেন। আমার চেয়েও কেউ কেউ ভাল পারেন। পেরে অশ্বডিম্ব প্রসব করেন, দামি প্রকাশনা থেকে। আমি এ কারণে নিজেকে একমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল বলছি যে, আমি এই রাজ্যে সবচেয়ে কম রেফারেন্সে সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারি, ও বলতে পারি। বন্ধুরা আমাকে ভালোবাসেন সন্দেহ নেই, ফলে আমি তাঁদের কাছ থেকে নানা উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা পেয়ে কৃতার্থ হই। কিন্তু বলি যে, আমি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তাতে কোনও ধর্মীয় দিনক্ষণের বা উপাস্যদের কোনও বিশেষ মাহাত্ম্য আমার কাছে নেই।তাত্ত্বিক দিক আপনার কথা একশো ভাগ সত্য, সেটা মেনে নিতে বাধ্য।

    কিন্তু নির্বিকার ব্রহ্ম স্থির এবং অপরিবর্তনীয় থেকেও জগতের সব পরিবর্তন এবং সৃষ্টির মূলে থাকে এটাও তো সত্য। সমগ্র সৃষ্টিই তো ব্রহ্ম, শব্দ সমগ্র ব্রহ্মরই অংশ। এক অর্থে তাই সমগ্র ব্রহ্মর অংশ শব্দ গতিশীল। তা যদি না হতো শব্দের পর শব্দ বসিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হয় কেন? যেহেতু শব্দ ব্রহ্মর অংশ সেই হেতু শব্দও নির্বিকার, কিন্তু জড় নয়, তার চালিকা শক্তি আছে। ফলে আপনারা দয়া করে কোনও তিথিভিত্তিক শুভেচ্ছা আমাকে পাঠাবেন না, দেবদেবীর ছবিও পাঠাবেন না। শুধু শুভেচ্ছা পাঠাবেন, তাইই কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করব।এই সময় ছাড়াও, আজ থেকে সহস্র বছর আগেকার, ও শত বছর পরবর্তী সময় ও স্থান নিয়ে একটা স্থির ভাবনা আমার আছে। সংস্কারবদ্ধতা ও সংস্কারবিমুখতার বাইরে থেকে, মধ্যপন্থায় আমি কথা বলতে পারি। মোকামতলায় আমার দাদাবাড়িতে একটা বিয়া হইতেছিলো, আমার যতদূর মনে পড়ে। শ্যাওলা ধরা একটা কুয়ারে ঘিইরা একদল মহিলা গীত গাইতেছে, নতুন বউ-জামাই দুইজনই কুয়ায় ঝুইকা আছে। গীতের বেশীরভাগ শব্দই অস্পষ্ট, একটা লাইন বার বার ঘুরে আসতেছে-- 'পান দিয়া গুয়া দিয়া লো...' আমার খুবই হাসি পাইতেছিলো, এই গুয়া জিনিসটা আসলে কী হইতে পারে সেইটা অনুমান করতে করতে।

    সবাই উলু দেওয়া শুরু করলো,আশ্চর্য! এইটা হিন্দু বিয়া না, অথচ সবার সিঁথিতে সিন্দূর অল্প কইরা। আমি কুয়ার পানিতে তাকায়ে আছি, পানি থিক্ থিক্ করতেছে। ছাই দিয়া বাসন মাজার পর ঘাটলার পানি যেমন ছাইরঙা হয়, ঠিক তেমন সুরমারঙ্গা কুয়ার পানি।তবু পানিতে স্পষ্ট দেখলাম নতুন বউ-জামাই নিজেদের মুখ জোড়-পান দিয়া ঢাকছে। আম্মু আমারে টাইট করে জড়ায়ে রাখছে, যাতে কুয়ায় না পড়ি। আমি আম্মুর তখনকার চেহারা মনে করার চেষ্টা করি, মনে পড়ে না। নতুন জামাই-বউরের চেহারাও মনে নাই। সন্ধ্যার আগ দিয়া এই শুভদৃষ্টি হইতেছিলো। এই হইহল্লার মধ্যে কে যানি চিৎকার দিলো --বরখা কই! বরখা কই! কয়েকজন ডাকতেছে, বরখা... বরখা! বরখা কোথাও নাই। একটা কানা বুড়ি(সম্ভবত বরখার দাদী ছিলো সে ) বলতেছিলো, গোরস্থানের দিকে দেখ, বরকীর খুডাটা জঙ্গলে জড়ায়া যায়। ব্যা ব্যা শুইনা কইছিলাম ঐডারে ছুটায়া আনতে। সেই রাত্রে বিয়াবাড়ির আনন্দ পণ্ড হইছিলো।বরখারে আর বাঁচানো যায় নাই। অনেক রাত্রে আম্মু আব্বুরে ধইরা বলতেছিলো, কোনো কবরে একটা ফাটল আছে, সেইটার ভিতরে বরখা পইড়া কাৎরাইতেছিলো। ওরে তুইলা আনার পর দেখা গেল সারা শরীর সাদা।

    রক্ত পড়তে পড়তে সাদা হয়ে গেছে ও। সবাই নাকি বলতেছিলো পিশাচ রক্ত চুইষা নিছে। আম্মা বার বার বলতেছিলো, পিশাচ রক্ত চুষলে ওই জায়গা দিয়া রক্ত পড়বে কেন? আমি ঘুমের মধ্যেই এই কথাগুলি শুনতে পাইতেছিলাম। বরখার জন্য খুব খারাপ লাগতেছিলো আমার। ইশারা আর গোঁ গোঁ করতো, কথা বলতে পারতো না মেয়েটা।কানেও কম শুনতো। আমার এখনও মনে আছে একটা ছাগলের বাচ্চা কোলে নিয়া সারা উঠান ঘুরতো মেয়েটা, বয়স তেরো-চোদ্দ। সেই বিয়াটার দিন সে কালোর মধ্যে ছোট ছোট সাদা ফুলের একটা কামিজ পরা ছিলো। একটু বড় হওয়ার পর আম্মুরে আমি প্রায়ই প্রশ্ন করতাম, আম্মু, বরখায় কোন জায়গা দিয়ে রক্ত বের হইছে? আম্মু নিশ্বাস ফেইলা অন্য কোনো কথা বলতে চাইতো, বেশী জ্বালাইলে বলতো-- কে তোমারে এইসব বলছে? কই থিকা এই গল্প শুনছো তুমি?

    একদিন আম্মু খুবই বিরক্ত হইলো, বললো এই অত্যাচার আর সহ্য হয়না। ওকে, শোনো তাইলে-- মুতু কর যে দিক দিয়া, সেই দিক দিয়া। এইবার শান্তি হইছে? কিন্তু এখন তুমি আমারে বলো, এই গল্প তোমারে কে শোনাইছে? তোমার আব্বু? আমি বললাম, না! আমি তো দাদাবাড়ির সেই বিয়াতে ছিলাম, তুমিও ছিলা। একটা কুয়ার সামনে মুখের উপর দুইটা পান একটু কোনা করে ধরে রাখছে নতুন বউ আর জামাই। মহিলারা গীত করতেছে। কুয়ার পানিতে ওরা ঝুইকা আছে। শুভদৃষ্টির পর ওই পান আর সুপারি কুয়ার পানিতে ফেলা হইলো। তখন সবাই বলতেছিলো-- বরখা কই, বরখারে পায় না। আম্মা আমারে থামায়ে বললো, এইসব কী বলস তুই? এইসব ঘটনা কে বলছে তোরে! তোর বাপেও তো তখন ঐখানে ছিলোনা। আর সবচাইতে বড় কথা তুইও ত ছিলিনা তখন! আমিই তাইলে বলছি মনেহয় এইসব, না? আম্মুরে কোনোভাবেই বুঝাইতে পারিনাই(এখনো পারি না) যে,এই গল্প আমার কারো কাছে শোনা না। আমি তারে বললাম, তুমি বরখারে অনেক আদর করতা, সে ছাগল নিয়া তোমার পিছে পিছে ঘুরতো।

    তোমার গলায় আর কানে একটা গোলাপ গোলাপ রূপার সেট ছিলো, তুমি ওরে সেইটা ওই বিয়ার দিন পরায়ে দিছিলা। মনে আছে? ও তোমার চুলে বিলি দিয়া দিতো, কথা বলতে পারতো না এইজন্য উকুন পাওয়ার পর মুরগীর মত খুট খুট শব্দ কইরা তোমার হাতের তালুতে উকুন ছাড়তো।মনে নাই? আম্মা এইসব শুইনা চিৎকার দিয়া আমারে জড়ায়ে ধরলো। বাবারে! আর কইস না। এগুলা তুই কোনোদিনও দেখস নাই। বাবারে, তুই তখন হসই নাই। তুই তখন আমার পেটে, বাবা! আম্মুর এই কথায় আমি যারপরনাই বিরক্ত হইছি। মাঝেমইধ্যে বরখার কথা খুব মনে পড়ে আমার, আজকে যেমন মনে পড়তেছে। বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার শেষমাথায় চলে গেছিলাম। বৃষ্টির তোড়ে একটা কবর দেখলাম ফাইটা গেছে, মনে হইলো উঁকি দিলেই বরখারে দেখতে পাবো। সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম ছাত্র নামধারী এই দলের ছাত্রগুলা আসলে কি। এরা কোন যুক্তিতর্ক বুঝে না। মতাদর্শের ভিন্নতা কি জিনিস তাও বুঝে না।

    রাজনীতি তো অনেক দুরের ব্যাপার। শুধুই বুঝে ক্ষমতা। দখল নেয়ার জন্যে এরা করতে পারে না এমন কিছু নাই। কামরুল স্পটে মারা যায় নি। তবে কয়েক মাস নাকি হাসপাতালে ছিলো। তারপর তার কি হয়েছিলো জানি না। কামরুলরা এভাবেই আস্তে আস্তে কত কত আবরার হয়, আমরা কয়জনেই বা তার খবর রাখি। ফেইজবুকে মাঝে মাঝে ঘাইঘুই তারপর একদম নিশ্চল। কিন্তু হায়েনা’রা বসে থাকে না। তাদের রক্ত খাইখাই ভাব বাড়তেই থাকে। বাড়তেই থাকে......আমি পলিটিকাল পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থেকেও মানবতাবাদী হতে শিখেছি। দেহ আর আত্মার ভেদ নিয়ে ভাবিত নই। শ্লীল অশ্লীল নিয়ে চিন্তিত নই। অধ্যাপক ও রিক্সাচালকের পাশে আমি সমান মানানসই। আমি এতটাই স্বনির্ভর হতে পেরেছি যে কেউ চটে যাবে এই ভয়ে কোনো কথা বলা থেকে বিরত হতে হয় না। সর্বোপরি, সবচেয়ে কম প্রভাবিত হয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলার সামর্থ্য রাখি। প্রগতির ধার ধারি না। উন্নতিতে বিশ্বাস করি না।

    সম্প্রসারণ ও বিকাশের প্রতি আমি আস্থাবান, ও প্রচারক। মেয়েদের শরীর, সাহিত্য পুরস্কার, মঞ্চের আলো এগুলো আমাকে আর পথভ্রষ্ট করতে পারে না। এই জায়গায়, এই চরম জায়গায় আমি নিজেকে ছাড়া জীবিত কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।। আমি আমার কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ও জীবনান্দ দাশ ও আরো অনেকরেই নিয়া আসার চেষ্টা করি। তাদের কবিতার রূপ, রঙ্গ ও নানান ভবিষ্যৎসহ। যারে প্রভাবিত হইতে না-চাওয়ারা বলবেন—"ব্যবহার করলুম!"তো আমি আমার কবিতায় কবিদের ব্যবহার করি। সব কালের সব কবিদের।সুতরাং কোনো কবির পরিচিতি দখল করা শব্দও খুব সামান্য ঘটনা।তাই আপনি এখন যখন ও আরো পরেও যখন 'তবু' দিবেন কবিতায় তা জীবনানন্দের 'তবু' হবে না যদি না তা জীবনানন্দের 'তবু' হয়।বর্তমানে উভ-নয়ন দৃষ্টি সম্পন্ন বাঙালি ক্রমশ বিরল হতে দেখা যাচ্ছে। তবে এক চোখ বিশিষ্ট এবং এক কান বা দু কান কালা হতভাগ্য প্রজাতির সংখ্যা আকাশ ছোঁয়া হয়েছে। তাঁরা যখন দ্যাখে খুনি এবং শয়তান ঘরের কেউ, তখন তাঁরা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়, কবিতা লেখে, চিঠি লেখে, সেলফি তোলে, উৎসবে মাতে, মলে যায়, পাহাড় সমুদ্র দর্শনে বেরোয়।

    কিন্তু যখন দ্যাখে খুনি বা শয়তান বাইরের দূরের কেউ, বা এমন কেউ যে তাঁর হিপোক্রেসির মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারে, তখন তাঁরা মাঠে ঘাটে রাস্তায় নির্বাচিত প্রতিবাদের কলম তাক করে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে।ডিটেনশন ক‍্যাম্পে ইতিমধ্যে আটজন মহিলার গর্ভপাত হয়েছে।প্রায় ষাটজনের কাছাকাছি মহিলা ধর্ষিত!লড়াই যেখানে হোক,যেভাবে হোক জারি রাখুন বন্ধুরা।ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা! যেখানে প্রতি মুহূর্তে সম্পর্ক ভাঙে,সেখানে একটা মানুষকে গোটা জীবন আগলে রাখা মানেই তো প্রতিদিন দুগ্গাপুজো,প্রতিদিন ঈদ,প্রতিদিন উৎসব।নবমী নিশি আগতপ্রায়। সম্বচ্ছরের দুরন্ত মেগা রাত। ক্লান্ত মাইক গত পাঁচ দিন বেদম চিল্লিয়ে শিশির মেখে জিরোবেন তখন। মাইকবিহীন মন্ডপে থোকা থোকা আনন্দ-ভীড়। ছোট্টো ছোট্ট চৌকো-গোল-তেকোণা জটলা আবার চলমান জনস্রোতে মিশে যাবে--- যাচ্ছে, তৈরী হচ্ছে, ভাঙছে---- ঢেউয়ের মতো। বলা বাহুল্য ওনার পরিহিত জামাটি আসলে আমার।বাবাটিও আমার।আমার সব কিছু হস্তগত করতে হবে ওনাকে। আমি কখনো যশো দেহিং,পুত্রং দেহি বলিনি সাদা বাংলায় কথা বলেছি।আমার রাজেন্দ্রানী তাই সারা বাড়ি র আদরের ধন।আরে দর্পণে মুখটা ঠিক করে দেখতে দে রে অনামুখোরা-এখনই তাড়াচ্ছিস কেনো?"বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত মূল্যবান গবেষণার বিষয় হল বাঙ্গালির পুরুষার্থ কোথায় থাকে-- অণ্ডকোষে? না কি সেখানেও থাকে না...?

    অ্যান্ড, আমাদের বাংলা কবিতারে আমাদের মধ্য দিয়াই আগাইয়া নিয়া যাইতে হবে। অবশ্যই আগানো মানে যা ছিল না, আগে যা সম্ভব ছিল না ভাষায় কবিতায় তাকে ধরতে ধরতে যাব।কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিত্ব লইয়া তিনিরোধকের প্রতিভায় সামনে খাড়াইবেন। তার থিকাও যা নিবার আমরা নিব। আমরা মানে শত রূপ বাংলা কবিতারা।অর্থাৎ যদি বাংলা তার নিজের কালের যাত্রায় অগ্রসরমান থাকে তবে সব বিশিষ্ট কবিও ভঙ্গি, ভাব, অবশিষ্ট, টীকা আর বিবিধ না-পারাসহ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যাবেন।বড় কবিদের কাজ তাই—ভাষার ভিতরে মিশে যাওয়া।ছোট কবিরা ছন্দ-অছন্দ, মাপজোক, যাপন-টাপন, সুখ-দুঃখের বেদনা-মেশিন!যখন আবার আসবো না আর এই ধরাতেহয়তো শতেক বছর পরেইতখন যারা ধানের খেতে...বুদ্ধিজীবীর কী কাজ ~‍লাঞ্ছিত-বঞ্চিতের পক্ষে লড়া মানে অভিজাতের পক্ষে লড়া। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা বহুদিন যাবৎ এই লড়া লড়তেছেন। যদিও নিষ্ফল। 'সমাজতন্ত্রই অভিজাততন্ত্র'--বোধগম্য হইলো না! সমাজতন্ত্রের ধারণার সাথে অাপনার এই অভিজাততন্ত্রের ধারণা মিলাইতে পারতেছি না।


    তাদের কাজ অর্থের বা টাকার বা সম্মানের মূল্য বা মিনিং বদলাইয়া দেওয়া।কথাটা ভালো লেগেছে।অয়ি তাবাসসুম ~আপেক্ষিক দরিদ্র বন্ধু তাবাসসুম আমার নতুন বন্ধু 'অগো লগে মিশবা না' ~ ফেসবুকে যেইটা বুঝলাম কে কার লগে মিশলে কে কার লগে আর মিশবে না, বুদ্ধিজীবী বা অ্যাকটিভিস্টদের মধ্যে এই জিনিসেরই চর্চা চলে, ধুমাইয়া।এই 'চৌহদ্দি তৈরি ও তার মধ্যেই ঘাস খাইতে হবে' দিয়া চলতেছে বুদ্ধিরা। কারণ কী এর? খুব মজা। আমি রান্দি, তয় খেজুরের কাঁটা দিয়ে মোরব্বাক্যাচা করি না। আবার রনলে কইরা দেহুম।আমের আঁচার, পেপে দিয়া পাতলা ডাইল, কলমি শাক, নলামাছ ভাজি, আর মুরহাটিপস্ঃ শাক বটি দিয়া কুচি করবেন না, সবসময় হাত দিয়া ছিঁড়বেন।

    পেপে ভর্তা, চালকুমড়া পাতা ভর্তা আর কলা ভর্তা।কেন কলকাতার বাংলা হইতে ঢাকার বাংলা আগাইন্না ~সব ভাষা বা ভাষার সব ধরনই এক—এ রকম চিন্তা ছাগলদের।ইংরাজি ভাষা অন্য সব ভাষার চাইতে উপরে। কেন উপরে?যেহেতু সব ভাষা এক না।ভাষা অস্ত্র, ভাষা কৌশল। অর্থাৎ ভাষা ও ভাষার ধরন মাত্রই একই মর্যাদা বা মাপে অবস্থান করে না। একই ভাষা একেক কালে একেক দশা প্রাপ্ত হয়।যেমন কলকাতার আর ঢাকার বাংলা এক বাংলা না।আমরা যারা নিজেদের থেকে অনেকটা বয়সে বড় কারোর প্রেমে পড়ি, তারা কিন্তু আদতে একটা আশ্রয় খোঁজার জন্য প্রেমে পড়ি। কাইন্ড অফ তাদের মধ্যে আমরা একটা ফাদার ফিগার বা মাদার ফিগার খুঁজি, কথায় কথায় আমরাই বলি তো সবসময়, যে আমাদের প্রেমিক প্রেমিকারা আমাদের মায়ের বা বাবার মতো আগলে রাখে।

    ব্যাপারটা হলো ঠিক সেখানেই, আমরা যত বেড়ে উঠি ততই মা বাবার থেকে একটা দূরত্ব তৈরি হতে থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা এমন কাউকে খুঁজি যে বাবা মার মতো হবে অনেকটা, পুরোটা না হলেও।যে কিনা আমাদের আগলে রাখবে, একটু বকাঝকা দেবে ভুলভাল কাজ করলে, খুব একটা বেশি পজেসিভ হবেনা, আমরা মুক্ত ভাবে স্বাধীন হয়ে ঘুরতে পারবো, কোনো রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসের ঝুট ঝামেলা থাকবে না।হুটহাট আমাদের ফোন করবে, খোঁজ খবর নেবে, শরীর কেমন আছে, জিজ্ঞেস করবে! সময়মতো না স্নান খাওয়া দাওয়া করলে একটু টোন কেটে কথা বলবে "তোমার তো অনেক মানুষ আছে, তাদের সময় দিতে দিতেই তোমার দিন পেরিয়ে যায়"....স্বদেশে পূজ্যতে গরু ;বিদ্বান্ সর্বত্র পূজ্যতে। একটা খোঁড়া ছেলে.....কথাটা ধক করে বুকে লাগে। কেন রমিতা একটু শান্তি দেয় না।ছোট্ট শিশুরা খেলে বেড়ায় বাবলা টা ফ্যালফ্যাল করে দেখে। রুদ্র সহ্য করতে পারে না। মদ খেতেই থাকে। কাজ করে না। কী হবে আর।মা পেনশন পায়। তার দায় নেই।রমিতা ভালো মাইনের চাকরি করে নিজের বাড়ি ঘর। তার কী আছে।কিছু না।কিছুই না। সব শেষ। আরো পাথর হয়ে যাচ্ছে সে দিনকে দিন। কেউ কখনো বোঝেনি তাকে। বুঝবে না। ভালোবাসা বলে কিছু হয় না। অর্থহীন শব্দ।শুনলাম এক ঐতিহ্যবাহী কলেজের এক পিএইচডিখচিত অধ্যাপিকা এতটাই গুরুর প্রেমে মশগুল যে, তিনি ছাত্রদের ধরে ধরে সাপ্তাহিক সফরে এই গুরুর একটি নিকটবর্তী আশ্রমে নিয়ে যান দীক্ষা নেওয়াতে। নম্বরপ্রত্যাশী ছাত্রদল আর কী করে! অগত্যা! এইসব ঘটনায় এই 'শ্রী শ্রী' (প্রয়োজনমতো আরও শ্রী লাগানো যেতে পারে) ঠাকুরের প্রতি আগ্রহ আমার দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে।

    কত রাত কেটে যায় একা একা।আবার গৃহহীন আবার বিতারিত। ওই যে মধ্যরাতে শুনশান রাস্তাটা আর সে জেগে আছে,ওই যে রাস্তার কুকুরের মতো জীবনটা তার।কে বোঝে। দিঘার সমুদ্রতটে শরীর ঘেঁষে বসে আছে রমিতা আর সে। একশ অশ্বারোহী র মতো ছুটে আসছে ঢেউ,তারা ভরা আকাশ। কী অপূর্ব নির্জন। ক্রমাগত মা ফোন করছে মোবাইলে।বিরক্তিকর নিম্নচাপের মত ঘ্যানঘেনে অভিযোগ, কান্না। শরীর থেকে উঠে আসছে অব্যক্ত ক্রোধ। সব কিছু বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে। রমিতা জড়িয়ে ধরে,আদর করতে চাইছে।এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় হাত। নিষ্ফল আক্রোশে ফুঁসতে থাকে তার ভেতরের জন্তু টা। রমিতা দুঃখ পেয়েছে।মোবাইল টা বন্ধ করে দিলে যে আরো বড়ো আর বিশ্রী ব্যাপার ঘটাবে মা তা কেন বোঝে না রুম।পৃথিবী আসলে এক সারি সারি বিষণ্ণ মুখের শপ। দোকানি গিয়েছে খেতে। অরক্ষিত ক্যাশ।কে নেবে বিষণ্ণতা?বাজারে মন্দা বড়।বিক্রিবাটা কম। সারি সারি বসে আছে বিষণ্ণ সেলসবয়। ক্ষয়াটে চোখগুলি কাস্টমার খোঁজে। কেউ নেই। শুধু র‍্যাকে র‍্যাকে র‍্যাপ করা মুখেদের স্যাক।

    আর কিছু ভালো লাগছে না। ছোটো থেকেই তার রাগ চণ্ডাল। হিতাহিতবোধশূন্য হয়ে যায় রাগ হলে।আমরাও লজ্জা পেয়ে হেসে উঠবো, একটু ন্যাকামি করবো, কোনো একটা বৃষ্টির বিকেলে দেখা করবো, মেঘ জমে থাকবে ঘন কালো মেঘ। একটা কফিশপে বসবো, দু কাপ কফি নিয়ে দু ঘন্টা কাটিয়ে দেবো। ফিরে আসার সময় একবার ঘুরে তাকাবো, চোখে চোখ পড়বে, ব্যস এটুকুই।বাড়ি ফিরে এসে একটা টেক্সট করবো "আজকের দিনটা আমি মনে রাখবো গোটা জীবন, আপনি বাড়ি ফিরলেন তো, আবার কবে দেখা হবে আমাদের?"....আমরা কিন্তু আমাদের থেকে অনেক বড় বয়সের মানুষের প্রেমে যতটা না সেক্সুয়াল ডিমান্ড বা ওই দেখেই উফফ ক্রাশ খেয়ে গেলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি থেকে পড়ি তার চেয়ে অনেক বেশি একটা শান্তির ঘর একটা আলোছায়া মাখা বারান্দার খোঁজে পড়ি। আজও সেই দ্বিতীয় বিয়ে, একাধিক পুরুষ সঙ্গী, একাধিক নারী সঙ্গী, বিবাহের পূর্বে সন্তান এসব নিয়ে কেচ্ছা করি। আবার মন্দিরের গায়ে খোদাই করা সাধারণ ও অসাধারণ যৌনজীবন ও তখনকার মানুষের যৌন অভ্যাস নিয়ে ফোটোগ্রাফি, শিল্পচর্চা ইত্যাদি ইত্যাদি করে থাকি। মাঝে মাঝে ভাবি আমরা কী লেভেলের প্রগতিশীল! তাই না?কার ঘরের কোণে কতোটা ঝুল, গত পরশু পর্যন্ত জানতে ক'জন?

    ঢাকারটা আগানো।চিন্তা বা বুদ্ধি এর কারণ না। তবে যে ভাষা আগানো তার চিন্তা অগ্রসর হইয়া থাকে ভাষার কারণে। ভাষা অগ্রে, চিন্তা না। লোকে চিন্তা দিয়া ভাষা করে না, ভাষা দিয়া চিন্তা করে। ঢাকার ভাষা আগায় থাকার একটা কারণ, ঢাকার লোকেরা পূর্ণ বাক্যে কথা বলে কম। যেইটা কলকাতার কেরানি বাংলার শিক্ষিত বৈশিষ্ট্য।পূর্ণ বাক্য মানে ইঙ্গিত বা সংকেতের বিলোপ।ইঙ্গিত বা সংকেত হ্রাস পাইলে ভাষাও ক্রমে অর্থ হারাইতে থাকে।রান্দনের সময় ঘুটনি দিয়া বাইরায়া রান্দবেন, নরম হইয়া মিশ্যা যাইবো মুখে।এইটা হইলো আমার পছন্দের শাক কলমি, সাথে ইঁচাগুড়া।এইটারে তো পরোটা না লুচি মনে হইতাছে..নাইল্যা শাক / পাট শাক, বেশী কইরা রসুন কুচি দিয়া।এইটা তেল না, ফ্রেশ পাতাগুলি গ্লেস মারতেছে। পাটশাকে আমি তেল দিই না। সামান্য ঘি দিয়া রান্দি। রান্দা শেষে উপরে লেবুর রস চিপ্পা ..খিচুরী, লোচা(কইতরের ছাও) ভুনা, ইলিশ ভাজা, আমের আচার... আহ্ দুই রকমের শাক। একটা পালং আরেকটা খুদুইরা(আঞ্চলিক নাম)। বেগুন ভাজা তো আমার সবচে প্রিয়। রুই মাছটা না রানলেও চলতো। হিহিহি শুকনা মরিচ ভাজা দিয়া। দুদক চেয়ারম্যান বলছেন, ঘুষ খাওয়া আর ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে পার্থক্য নাই। কথাটা সম্পূর্ণ ভুল।

    ঘুষ খাওয়ার বিনিময়ে লোকে কাজ কইরা দেয়। ভিক্ষা নেওয়ার বিনিময়ে ভিক্ষুকরা কী কাজ করে? কিছু না।কাজেই ভিক্ষাবৃত্তি ঘুষ খাওয়ার চাইতে মহৎ পেশা। পেশা যত মহৎ কাজ ততই কম। আমরা ভাত খাইতে ভাত পাই না পণ্ডিতে খায় নারিকেল চল যাই মেশিনে ভাঙ্গাই শুক্রবারে সইষ্যা তেল পণ্ডিতের মা'য় করাতে ধার দিল ওরে পণ্ডিতের মা'য় ঝং ধরা করাতে… আমরা খালের পানিত বেইন্না বেলায় মাছ নি মারি আর আমরা হাত পাইত্তা বইয়া থাহি পণ্ডিতেরই ধার দেয় না নারিকেল হেয় দেয় না টেহাপয়সা বিদ্যাবুদ্ধি কিছু আমরা পুটকি মারমু পণ্ডিতেরে খালের ধারত নিয়া… হের মা'য় বুঝতে পাইরা পাহারা দেয় করাতে ধার দিয়া হেয় খায় নারিকেল, নারিকেল আর চারা ছিটায় চাইরো ধারদা দিয়া...আমরা চারা টোহাই ভাত খাই না পণ্ডিতে খায় নারিকেল চল যাই মেশিনে ভাঙ্গাই শুক্রবারে সইষ্যা তেল ওরে পণ্ডিতের মা'য় কবরে পাও দিল… সত্য ও আমি ~সত্য, তথ্য ও প্রমাণ—এসব প্রাইভেসি বিরোধী জিনিস। এসব নিয়েই উত্তেজিত আধুনিক অ্যাক্টিভিস্ট সমাজ। যদি প্রাইভেসি চাইবেন তবে কেন সত্যের দরকার?

    লুটেরা ও পাহারাদার ছোটলোকগুলির মাধ্যমে নিজেদের লুটপাটের নিরাপত্তা ধইরা রাখার দরকার এক সময় ছিল রাজনৈতিক দলসমূহ ও তার বড়লোক বড়লোক অভিভাবকদের। কিন্তু এখন পুলিশ সে দায়িত্ব পুরাই নিয়া নিছে। আবার ছোটলোক পাহারাদাররা এখন যেহেতু বড়লোকদের চাইতেও বড়লোক হইছে কাজেই এরা পুরানা বড়লোক ও তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা গ্রহণের পথে একটা একটা সন্দেহ হিসাবে খাড়া থাকতেছে। আমার তো মনে হয় "আসিতেছে ভবিষ্যত"-কে নিষ্কটক করার লক্ষ্যে নবীন লুটেরাদের সাইজ করা উদ্দ্যেশ্য নয়, উদ্দ্যেশ্য রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। দন্দ্বটা নবীন-প্রবিণের নয়---ক্ষমতাকে মাঝে মাঝে নৈতিকতার মোড়কে হাজির করা--জনগণকে এমন বার্তা দেয়া যে, দেখ দেখ আমরা নীতির ক্ষেত্রে কত আপোষহীন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে আমিই কি জিগাইছিলাম নাকি উনি নিজেই বলতেছিলেন মনে নাই। কোনো সভায় না আলাপে তাও মনে নাই। আমি তখন বাংলাবাজার পত্রিকায়। স্যারের উত্তরার বাসায় ডিকটেশন নিতে যাইতাম। উনি ধীরে ধীরে বলতেন, আমি শুইনা শুইনা কাগজে তুলতাম। সে অনেক দিন আগের কথা। কত, বিশ চব্বিশ বছর হবে বা। যে এই যে লুটপাট করে সরকারের লোকেরা, বিজনেসম্যানরা এগুলি কি বন্ধ হবে না? সত্যি বলতে আমার ব্যক্তিগত জীবনে আমি ভীষণ পজেসিভ একজন মানুষ, কাউকে একবার কাছের মনে করলে তা সে মেয়ে হোক বা ছেলে, আমি তাকে অন্য কারোর সাথে শেয়ার করতে পারিনা।

    তখন সায়ীদ স্যার বলতেছিলেন যে, লুটপাট যারা করতেছে তাদের যখন নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে তখন অপেক্ষাকৃত চুনোপুটিদের লু...ক্যাসিনোর কেন মালিক হইতে হবে ~পুরানা ক্ষমতাশালী ও অর্থবানরা নতুন ক্ষমতাশালীদের ততক্ষণই গ্রহণ করে যতক্ষণ নতুনদের 'তুলনায় বেশি ক্ষমতা কিন্তু কম অর্থ' নামের দারোয়ানগিরি বজায় থাকে।ক্যাসিনোর মালিক হওয়া মানে নতুন ক্ষমতাবানরা নতুন অর্থেরও মালিক হইতে শুরু করছেন!পুরানাদের জন্যে এই রকম ক্ষমতা ও অর্থেরা যথার্থ হুমকি হইয়া দাঁড়াইতে পারে, সেই ভয় আছে, পুরানাদের।কাজেই ক্যাসিনোরা যতই নিজের লোক হউক না কেন, নিজের উত্তরাধিকাররা যেই দিনই ক্ষমতার গোল টেবিলে বসা শুরু করছেন সেই দিন থিকাই নতুন অর্থ ও ক্ষমতার মালিকদের সাইজ করার আন্তঃদলীয় রাজনীতি জরুরি হইয়া দাঁড়াইছে। এই হিসাবটা বোঝা দরকার।ক্ষমতার পাহারাদাররা যেন চিরকাল পাহারাদারই থাকে, ওদের কেন মালিক হইতে হবে! ভিড়ের মধ্যে বসে আছি একা ডাবুহাতা করে তুলে দেওয়া হচ্ছে স্বপ্ন, একটা নোংরা হাত, লঙ্গরখানা সবাই পাত পেড়ে খাচ্ছে আমি ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি অন্ধকারে, হাতঘড়িটা হারিয়ে ফেললাম এইমাত্র, ঘরে ফেরার দায় নেই, দারুণ ব্যস্ততা, অন শপ থেকে ছিটকে আসছে বমির শব্দ, অপরিচিত মেয়েটার গায়ে বেড়ালের গন্ধ, ভোর না হওয়া পর্যন্ত শুয়ে থাকবো এখানেই, রাত্রির লঙ্গরখানা কিম্বা পানশালা এখন, ধর্মের হাট-বাজার

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৯:২৭734729
  • ভ্যান গগের কান :

    মলয় রায়চৌধুরীর রহস্যোপন্যাস

    পিচ্চির রোজনামচার খাতায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন, খুঁটিয়ে পড়ছেন, নোট নিয়ে রাখছেন, যুবকটা কেমন করে কবে কোথায় হারিয়ে গেল, নাকি খুন হল, তা তাঁর আন্ডারে গোবরঘাট থানা ইনভেস্টিগেট করছে, এখনও নির্ভরযোগ্য ক্লু পায়নি অনুসন্ধানকারী অফিসার ভোম্বোল সোম, যাকে উনি ভোমসো বলে ডাকেন।

    রিমা খানের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে, চুল তেমনই বয়কাট, তবে নুনমরিচের ছোঁয়া, কোনো গয়না পরেন না, কেবল ডান হাতে একটা স্টেনলেস স্টিলের অমৃতসরি নোয়া, অপরাধীদের থেকে কবুলতি আদায়ের জন্য। সিগারেট ফোঁকা ছাড়তে পারেননি, দিনে কুড়িটা। সিভিল ড্রেসে থাকলে জিনস আর টপ, শীতকালে রাতের বেলায় হুডি। পুরোনো বুলেট মোটর সাইকেলটা, যেটায় চেপে নোংরা পরি নামে পপুলার কুখ্যাতি পেয়েছিলেন, দান করে দিয়েছেন রজত মণ্ডলকে, যে তাঁর সাকরেদ কন্সটেবল ছিল, যখন তিনি এক অপরাধীকে পেঁদিয়ে মেরে ফালার দায়ে সাসপেণ্ডেড ছিলেন। এখন চোখে রে ব্যানের গগলস পরে অফিসের জিপ ব্যবহার করেন। ওনার পা দুটো কোমরের ওপরের অংশের চেয়ে দীর্ঘ, তাই দুই পা ছড়িয়ে বসেন, ডিসিপি, সিপির সঙ্গে মিটিঙেও অমন করে বসেন বলে অধস্তন অফিসাররা ওনার যৌনতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে, তা উনি জানেন। এক পায়ের ওপরে আরেক পা রেখে উনি বসতে পারেন না। যখন দাঁড়ান, বুকের ওপরে দুই হাত ক্রস করে থাকেন।

    এক দুই তিন নম্বর দেয়া খাতাগুলো তেমনভাবেই পড়া আরম্ভ করলেন, ক্রম অনুযায়ী। হাতের লেখা দেখে টের পাওয়া যায় যে ছেলেটা বাংলা মিডিয়ামে পড়েনি, তাছাড়া ন্যারেটিভ হয়ে দাঁড়িয়েছে ম্যাশআপ, কার কথা, কে বলছে, কাকে বলছে, উদ্ধৃতি নাকি নিজের বক্তব্য, কোথায় শুরু, কোনটা কল্পনা, কোনটা সত্য ঘটনা, কিছু ঠিক করে বোঝার উপায় রাখেনি, অনুমান করে এগোচ্ছেন রিমা খান।

    “মিছিল, র‌্যালি, সমাবেশ, মহাসমাবেশ, গেটসভা, মোড়সভা, মোহোল্লাসভা, লোকসভা, ভোজসভা, শোকসভা থেকে মানুষজন ফেরার পর, নানা রকমের বক্তৃতা শোনার পর, দর্শনে আপ্লুত হবার পর, তাদের মাথা, মানে কাঁধের ওপরে তাদের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার ক্ষমতা আয়ত্ব করে ফেলেছে ; তারা যাদের ছুঁয়েছে, যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, যাদের নিয়ে ভেবেছে, স্বপ্নে যাদের দেখেছে, সবায়ের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার ক্ষমতা পেয়ে গেছে, তা সে মানুষ-মানুষীরা গণ্ডমূর্খ হোক বা মহাজ্ঞানী, মার্কসবাদি-গাঁটকাটা, লেনিনবাদি-ডাকাত, হিন্দুত্ববাদী-দাঙ্গাবাজ, সন্ত্রাসবাদী-সালাফিস্ট, মাওবাদি-পকেটমার, গান্ধিবাদি-স্মাগলার, জাতীয়তাবাদী-লেঠেল, বর্ণবাদী-দেওবন্দি, যুক্তিবাদী-কুচুটে, মানবতাবাদী-জোচ্চোর, উপযোগবাদী-কিপটে, বিজ্ঞানবাদী-মাদুলিঅলা, ব্যক্তিবাদী-দলবাজ, দৃষ্টবাদী-বহূরূপী, ডারউইনবাদী-ধর্মগুরু, সমাজবাদী-জোতদার, তিনি যেই হোন না কেন । ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন, অ্যসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার, যাঁকে পাবলিক আর মিডিয়া এককালে নাম দিয়েছিল ‘নোংরা পরি’, তখন তিনি পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন, দাগি অপরাধীরাও ভয় পেতো। সেই সময়ে তিনি জেমস বণ্ডের মতন নিজের পরিচয় দিতেন, “রিমা, রিমা খান”। তাঁর অধীনে এক থানায় মিসিং ডায়রি করেছিলেন পিচ্চির বাবার অ্যাডভোকেট, তাকেই এফ আই আর হিসেবে দায়ের করেছে থানার ওসি, পিচ্চি নামের এই যুবকের লোপাট হবার এক সপ্তাহ পরে।

    অনুসন্ধান চালাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট থানার ইন্সপেক্টর ভোম্বোল সোম, সংক্ষেপে ভোমসো। খাতাটা উল্টেপাল্টে, ভোমসোকে, যে রিমা খানের টেবিলের উল্টোদিকে বসেছিল, বললেন, দেখি বাকি খাতাগুলো পড়ে। আমার তো মনে হচ্ছে এই ছোঁড়াটা ইনসেন। সেই জন্যেই বোধহয় ওদের অ্যাডভোকেট ওর লোপাট হবার দিনই মিসিং ডায়রি করেছেন, আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে পারতেন। আঠেরো বছরের তরুণ, এসে যাবে দিনকতক পর। এর মা-বাবাও একে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ; হয়তো তাঁদের খোঁজে ভারতভ্রমণে বেরিয়েছে ছেলেটা। তুমি এর আর এর মা-বাপের ফোটো সব থানায় পাঠিয়ে দিয়েছ তো ? দেখি সব কয়টা খাতা এক এক করে পড়ে । ভোমসো উঠে চলে গেলে, চেয়ারে ছারপোকা থাকায় পোঁদ চুলকোতে-চুলকোতে, হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে রিমা খান পড়ায় মনোযোগ দিলেন।

    “যারা ভাষণ দিয়েছে সেইসব গ্যাঞ্জামে, ঘাম পুঁছতে-পুঁছতে, তারাও অনেকসময়ে পিঠের দিকটা পাবলিকের সামনে রেখেছে, যাতে জনগণকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিজেদের জালে ফাঁসিয়ে তোলা যায়। ফলে, তাদের সামনে দিক আর পেছন দিক বলে কোনো ব্যাপার নেই। তার আগে তারা পিঠের দিকে মুখ করে হাঁটতে পারতো না, বাঁ-দিক বা ডান-দিকে মুখ করে হাঁটতে পারতো না। তাদের দেহের বাদবাকি অঙ্গ তেমনই আছে, কেবল মুণ্ডুটা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার ক্ষমতা তারা পেয়ে গেছে। তারা পিঠের দিকে মুখ করে ছলছলে চোখে প্রগতির উদ্দেশে এগিয়ে যেতে পারে, চোখের পাতা নামিয়ে চুমু খেতে পারে, জুলজুলে চোখে শুভদৃষ্টি করতে পারে, মুসলমান হলে বিয়ের সময়ে ঝিকিমিকে চোখে ‘কবুল’ বলতে পারে বা বি্যে ভাঙার জন্যে চকচকে চোখে ‘তালাক’ বলতে পারে, দলবেঁধে গোলগোল চোখে ‘ইনক্লাব জিন্দাবাদ’ বলতে পারে, শবদেহের অনুগামী হয়ে জলসজল চোখে গান গাইতে পারে, শ্মশানে মোদোমাতাল হয়ে ঘোলাটে চোখে নাচতে পারে, পিটপিটে চোখে ক্রিকেট আর ফুটবল মিটমিটে চোখে লাট্টু আর ড্যাঙ্গুলি টেরাচোখে আর টেনিস ব্যাডমিন্টন আড়চোখে চুকিতকিত অস্হির চোখে লুডো আর দাবা খেলতে পারে। মোবাইল, ল্যাপটপ, আর নানা গ্যাজেট নিয়ে চোখ কুঁচকে কাজ করতে পারে, ড্যাবড্যাবে চোখে গাড়ি আর বিমান চালাতে পারে, এক চোখ বুজে বন্দুক আর দুই চোখ খুলে কামান চালাতে পারে, দীপ্ত চোখে ধানের আঁটি পুঁততে পারে, উদ্ভাসিত চোখে নারকেল বা তালগাছে উঠতে পারে, বঙ্কিম কটাক্ষে ভিনযৌনতার দেহের দিকে তাকাতে পারে। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন :

    “বাচ্চারা জন্মাবার সময়ে তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘুরিয়ে চারিদিক দেখে নিয়ে জন্মায়। আমাদের বাংলাভাষী দেশে আরম্ভ হয়ে এই মেরুক্ষমতা সারা পৃথিবীতে মহামারীর মতন ছড়িয়ে পড়েছে। সেই কে একজন বলেছিলেন, বাঙালি আজ যা করে অন্যেরা তা পরে করে, ব্যাপারটা তাইই ঘটেছে। বাঙালি গাড্ডায় পড়লে সারা দেশ গাড্ডায় ; বাঙালি নেতা গাড়ল হলে সারাদেশে সারা জগতে গাড়লদের নেতৃত্ব। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি যা পেয়েছেন আর পড়ে অবাক হয়েছেন :

    “শুধু পিচ্চির তা হয়নি, আমি নিজের চোখে দেখেছি । ও যেমনভাবে জন্মেছিল, তেমনই আছে। ওর মা-বাবা ওকে তেমনটা না বোঝালেও, তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরাবার মেরুক্ষমতা ও পায়নি। ওর মা-বাবা কিন্তু সেই মেরুক্ষমতা পেয়েছিল। পিচ্চিদের বাড়ি ; সে যে কি পেল্লাই একখানা বাড়ি বর্ণনা করতে পারব না, যখন আমি কিনা একজন লেখক, বর্ণনা বিক্রি করে-করে ফুটানি মারি। তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরাতে পারার মেরুক্ষমতার কারণে পিচ্চির মা আর ধনী মহিলারা গলায় দু সেট হার পরেন, একটা পিঠের দিকে আরেকটা বুকের দিকে, এও আমার নিজের চোখে দেখা, সোনার দোকান থেকে পিঠের দিকে মাথা করে বুক-পিঠ আলোয় আলো করে নামছেন, দেখেছি। বিজ্ঞাপন দেখেছি সোনার দোকানের সাইনবোর্ডে, “দুপুরবেলা পিঠের কিনুন, সামনে সন্ধ্যাবেলা, বোকা বরকে গেঁথে তুলুন, বলুন এটা র‌্যালা”।বিজ্ঞাপন তো আসলে কথার ব্যবসা, অথচ যারা বিজ্ঞাপনের ব্যবসায় আছে, সেই লোকগুলো বিশেষ পড়াশোনা করেনি, বলতে গেলে মুকখু। তারা বিজ্ঞাপন লিখতে পারে না, তারা অন্ধ, বোবা, কালা, তা সে মেয়ে হোক বা ছেলে। বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের ব্যক্তিসত্তা গড়ার চেষ্টা হয়, যা চাই না, তা যোগাবার শোষণকাঠি পোঁদে গোঁজার কারিগরি। যে জিনিসের বিজ্ঞাপন সেই জিনিশের গুণের কথা বলা হয় না, শুধু ব্যক্তিসত্তা গড়ার স্বপ্ন তৈরির চেষ্টা, যেন সেই জিনিশটা পেলেই কেউকেটা হওয়া যাবে, সফল, দেখতে-সুন্দর, ঈর্ষা জাগাতে সক্ষম -- গাণ্ডুকে পাণ্ডুরঙ করে তোলার তিকড়ম। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন, যেন অন্য কেউ লিখেছে, অথচ পিচ্চিরই লেখা, বাংলা মিডিয়ামে পড়েনি এমন কারোর হাতের লেখা এক নজরে টের পাওয়া যায়, তবে বাংলা গালমন্দ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছে ।

    “পিচ্চির দুর্ভোগ, যা বয়সের সঙ্গে কিছুটা সহ্য হয়ে গেছে, থ্যাঁতলানো এক দুর্ঘটনার স্মৃতি, যখন-তখন দুর্ঘটনায় চটকানো মানুষের মাংস দেখতে পেলেই মনে হয়, ওই দুজন ওর মা-বাবা হলে ভালো হতো, বৈশাখের সকালবৃষ্টির দরুন জমে থাকা শহরের নোংরায় দাঁড়িয়ে, পেঁকো জলের গন্ধের খোঁয়ারির মাঝে, দেয়ালপোস্টারের অভিনেত্রীর হাসিমুখ মাইয়ের ওপরে ফেলা পানের পিকের তলায়, দেখছিল ও, ঘিরে থাকা ভিজে ভিড়ে, সেদিন ছিল ওর জন্ম-তারিখ, আর জন্মদিন মানেই কারোর লাশ বা কয়েকজনের লাশ। ভাই-বোন নাকি বর-বউ নাকি বন্ধু-বন্ধুনি নাকি মাগি-মরদ কে জানে কাদের মাংসের ঘ্যাঁট ; মা-বাবা হলে ওনাদের সম্পর্কে পিচ্চির আর কিছু মনে থাকতো না। বৃষ্টিতে রক্তের ধারা পিচ্চির স্পোর্টস শু ভেজানো আরম্ভ করলে, ও টের পেলো, প্রতিবার রক্ত দেখলে যা হয়, তাই হতে চলেছে ; কেন যে প্রতিটি জন্মদিনে আঘাতের রক্তের মুখোমুখি হতে হয়। জন্মাবার সময়ের রক্ত ওর সঙ্গ ছাড়েনি। অজ্ঞান অবস্হার মগজের কুয়াশায় ও টের পায়, এই সময়টা ঝুরঝুরে সংবেদনের, মিলমিশ মনকেমনের, আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া নকলকারির আর বাছবিচারহীন ফালতু যৌনসম্ভোগের, যে সময়ে বাঙালির ঐতিহ্যের মূল্যবোধের গভীরতার বৈশিষ্ট্য, আসঞ্জন, মর্মার্থ, মৌলিকতা আর প্রামাণিকতা উবে গেছে কিংবা ফাঁকা ইশারার ঘুর্ণিতে পাক খেয়ে ডুবে গেছে, জনগণের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার মেরুক্ষমতার কারণে। ”

    “পিচ্চি আবছা শুনতে পেলো, ভিড়ের একজন বলছে, ‘এ ছোঁড়াকে মিরগি রোগে পেয়েচে, অজ্ঞান হয়েও বিড়বিড় করছে, মাথাটা ঘোরান দিকি, মুখ দেখা যাচ্ছে না। ’ কোটি-কোটি লোক প্রত্যেক বছর মরে যায়, প্রতি ঘণ্টায় দশ হাজার মরে, প্রতি মিনিটে একশোজন। কার কিই বা আসে যায় তাতে ? কিন্তু যখন কোনো এক জায়গায় একসঙ্গে অনেক লোক মরে যায়, ঝড়ে, ভূমিকম্পে, সুনামিতে, যুদ্ধে, আত্মঘাতী বোমায়, তখন সবাই অবাক হয়, রেগে যায়, সামনের বাতাসের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে। ”

    পিচ্চির রোজনামচার খাতায় আবার প্রথমপুরুষে লেখা পড়লেন এসিপি রিমা খান :

    “ পিচ্চির মাথা নিজেদের দিকে ঘোরাবার চেষ্টা করে আরেকজন সুপুরুষ, যার দাড়িতে মৌমাছির চাকের মতন মোমমধুর রঙ, বললে, ‘নাঃ, এ তো দেখছি এই যুগের মানুষ নয়, প্রাগৈতিহাসিক, মাথা পাক খায় না ; যাকগে শালা, মরুকগে, নিশ্চয়ই অতিমানব, সুপারখোকা। ’ যখন জ্ঞান ফিরলো, শহরের নাগরিকরা ওকে ফুটপাতে শুইয়ে যে যার কাজে-অকাজে চলে গেছে, হাতঘড়ি, মোবাইল, পার্স পকেট থেকে হাতিয়ে ; এইভাবে, অনেকবার দুর্ঘটনা দেখে, রাস্তায় অজ্ঞান হবার আর ঘড়ি, মোবাইল, পার্স এমনকি ল্যাপটপ হারাবার অভ্যাস হয়ে গেছে ওর। পিচ্চি অনেকবার পাঁয়তাড়া ভেঁজেছে, এইরকম একটা লোককে ধরে পেটে ছুরি বসিয়ে দেয়, ঘ্যাচাঙ, কাউকে না কাউকে তো একদিন খুন করতেই হবে, নয় তো বেঁচে থেকে কীই বা লাভ ? উঠে বসে পিচ্চির মনে পড়ল, বাবা একবার বলেছিলেন, ‘সত্তর-আশির দশকে আমাদের সংস্কৃতি যা হারিয়েছে তা বজায় ছিল উনিশ শতকের আভাঁগার্দ মনীষীদের সময়ে-- নবজাগরণের লোকজনের মধ্যে রামমোহন রায়, ভি ডিরোজিও ও তাঁর বিপ্লবী শিষ্যবৃন্দ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর অনুসারীরা, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ-- এক-একজন আভাঁগার্দ সংস্কৃতির মশাল। মানুষের চুলের মুঠি ধরে ঘুম থেকে টেনে তুলেছিলেন। কী ছিল না ওনাদের ? আদর্শ, আত্মবিশ্বাস, কর্মোন্মাদনা, সমাজকে নতুন মোড়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার ঝোঁক, আর যা সবচেয়ে বড়ো তা হলো যে শিল্পের ধারণা, অনাগ্রহী অভিজাত দৃষ্টিতে, জরুরি রূপক ব্যবহার করে সংস্কৃতিকে এমনভাবে পালটে দিচ্ছিলেন যাতে স্বদেশী পাবলিক বুঝতে পারে। ওনাদের কারোর মাথাই তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরতো না, যেমন পিচ্চির ঘোরে না। তারপর এইযুগ এলো, তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরার যুগ। গাঁড়ল, আঁড়ল, বাঁড়ল, চাঁড়ল, ষাঁড়ল নেতাদের যুগ। ”

    “এই যুগের ট্র্যাজেডি হলো যে কেউই সুখি নয়, তা সে লোকটা সময়ে আটকে থাকুক, দুঃখে বা আনন্দে, কেননা সকলেই এই জগতে একা ; আগেকার দিনগুলোকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কেউ আটকে গেলে সে একাই আটকে থেকে যাবে। মানুষকে চেষ্টা করতে হয় এই ট্র্যাজেডি থেকে বেরিয়ে কেটে পড়ার সুযোগের সদ্ব্যাবহার করার। শহরের লোকগুলো যদি তোমাকে না চায়, তোমার কাছের লোকেরা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, বেশির ভাগ মানুষ যদি অকর্মণ্য হয়, সেই শহরে থাকার কোনো মানে হয় না। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই জমায়েতকে পেছনে ফেলে কেটে পড়া দরকার। কেবল চুতিয়া আর গাণ্ডুরা বলে বেড়ায় যে আমি অমুক শহরকে ভালোবাসি, তারপর দেয়ালে মোতে, বমি করে, পানের পিক ফ্যালে, ভুল বানানে স্লোগান লেখে। যারা পিচ্চিকে ঘিরে ধরেছিল তারা ওই সার্বজনীন তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরানো পাবলিকেরই অ্যাণ্ডা-বাচ্চা, পিচ্চির সন্দেহ নেই, নিশ্চয়ই দোআঁসলা গাঁড়লদের বংশধর। ”

    “হেঁটে চার কিলোমিটার দূরে ওর বাবার বন্ধু অ্যাডভোকেটের অফিসে পৌঁছোলে, যে অ্যাডভোকেট পিঠের দিকে মুখ করে একজন মক্কেল তরুণীকে সলিসিট করছিলেন, ঠোঁটের কোনায় থুতুর ফেনা, তলাকার ঠোঁট চেবাতে-চেবাতে, ওনার কাছ থেকে বাড়ি যাবার ট্যাক্সিভাড়া নিয়ে ফিরেছিল পিচ্চি, আধ-ফাঁকা বাড়িতে, যার মালিক ও, পিচ্চি, ইকোল মণ্ডিয়ালের ছাত্র ছিল। সেই স্কুলেও একমাত্র ওর মাথা ঘুরতো না। মা-বাবা বাড়ি ছাড়ার আগে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে গেছেন অ্যাডভোকেট মশায়কে, ফলে পিচ্চির মজা, টাকা খরচ করার, উচ্ছন্নে যাবার, সীমা ভাঙার আর অন্য কারোর চাপানো বাধানিষেধ নেই, পিচ্চির নিজের অ্যাকাউন্টেও অঢেল। ”

    “আমি নিজের চোখে দেখেছি। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় সেই একই ঢঙে লেখা, ভ্রু কুঁচকে পড়তে লাগলেন এসিপি রিমা খান, টেবিলের তলায় দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে।

    “ পিচ্চির বাবা আর মা একদিন রাতে কোথায় উধাও হয়ে গেছেন ; পিচ্চিকে লেখা চিঠিতে জানিয়ে গেছেন, পিচ্চি যেন খোঁজ না করে, কাউকে না জানায়, ওর জন্যে দুজনেই অঢেল টাকাকড়ি রেখে যাচ্ছেন, পিচ্চি ইচ্ছেমতন খরচ করতে পারে। তখন পিচ্চির বয়স এগারো। তারপর তো ও নাইটফলের বয়সে পৌঁছোলো। ওর স্বপ্নে যুবতীরা এসে নাইটফল ঘটায় না, পুরুষরা আসে, নানান বয়সের, যাদের মুখ পিচ্চি দেখতে পায় না, কেবল পোঁদটুকু দেখতে পায় ; পোঁদের মসৃণতা বা চুল দেখে ও টের পায় এটা কোন রাজনৈতিক প্রতিভা যাকে ও টিভিতে দেখেছিল, যে কোনো কুতর্কে চেঁচাচ্ছিল। ও নির্ণয় নিয়েছে যে ডে-ফল ঘটাতে হলে কোনো যুবতীর অনুমতি নিয়ে তার গর্ভের দরোজায় ফেলবে, গরমকাল হলে এসি চালিয়ে, শীতকাল হলে লেপ চাপা দিয়ে। ”

    “বিছানায় তোয়ালে পেতে রাখতে হয়েছে। কেননা যে হাউসক্লিনিং কোম্পানিকে ওদের বাড়ি পরিষ্কার করার আর গুছোনোর চুক্তি দেয়া আছে, তাদের এক বুড়ো সদস্য বলেছিল, ‘আপনার যা বয়স, বিছানায় তোয়ালে বা রাবারক্লথ পেতে শোয়া অভ্যাস করুন, এই দাগ তোলবার কেমিকাল এখনও এখানকার বাজারে আসেনি, আমরা অর্ডার দিয়েছি, থাইল্যাণ্ড থেকে শিগ্গির এসে যাবে”।

    পিচ্চির রোজনামচায় দুর্ঘটনার বয়ান পড়ছিলেন এসিপি রিমা খান, অথচ পুলিশের রেকর্ডে এই দুর্ঘটনার নথি করা হয়নি কেন ? পড়ে ভাবছিলেন রিমা খান।

    “রাস্তার ধারে মাংসের জড়াজড়ি ঘ্যাঁট দেখে কালটে চেহারার এক ঢ্যাঙাকাত্তিক লোক কাঁদো-গলায় বলে ফেলেছিল, ‘দেখুন, কতো ভালোবাসতেন একজন আরেকজনকে, চেনার উপায় নেই কে কোন জন’, মনে আছে লোকটার চামগাদড় চেহারার জন্যে। বলাবলি মনে আছে পিচ্চির, লোকগুলোর ছিদাম মনে নেই।

    ----প্রকৃতির কী লীলা দ্যাখেন, বরের বুকের ওপরে বউয়ের বুকদুটো চলে এয়েচে।

    ----বউয়ের হাতের জায়গায় বরের ঠ্যাঙ।

    ----মানুষের মাংস বড্ডো অসহায়।

    “মর্গ থেকে মাংসের ঘ্যাঁট শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ইনসিনারেটরে, দুজনের আধার কার্ড আত্মীয়ের হাতে, ডিজিটাল-নথি থেকে হাপিশ করে দেবার খাতিরে। পিচ্চি গিয়েছিল শ্মশানে, যদি ওই দুজন ওর মা-বাবা হয়, কোনও ঠিক নেই আজকালকার দিনে, সাংবাদিকরা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারে কে কার বাবা কে কার দলের কে কোন কোম্পানির।”

    রোজনামচায় পাগলদের নিয়ে পিচ্চির বক্তব্য পড়ে এসিপি রিমা খান অবাক হলেন, এই ছোঁড়াটার পরিবারে ইনস্যানিটির দোষ ছিল সম্ভবত। কেমনতর তা বলা কঠিন ; হয়তো উদ্বেগজনিত ব্যাধি, মুডের বিশৃঙ্খলা, স্কিৎসোফ্রেনিয়া কিংবা সাইকোটিক সমস্যা, ডিমেনশিয়া, দায়িত্ব নেবার ভয়।

    “এখানে কে পাগল নয় বলা মুশকিল। কেউ দ্রোহী, কেউ খাপ খায় না, কেউ গণ্ডোগোল পাকায়, আসল গর্ত না জেনেই জবরদস্তি করে, কেউ কেউ বিষয়গুলোকে অন্যভাবে দেখতে চায়। তারা নিয়মনীতি জানে না। সমঝোতা কাকে বলে জানে না। স্হিতাবস্হাকে শ্রদ্ধা করে না। তারা মুখিয়ে থাকে পাল্টাপাল্টি করে ফেলার জন্যে। তারা মানবজাতটাকে ঠেলেঠুলে চালিয়ে নিয়ে যায়। বাবা হয়তো এই কারণেই গাড়ি কেনেননি, চিরকাল ট্যাক্সি। কিন্তু বলেছিলেন, ‘তুমি যতোই যাই করো, সময়টা হয়ে গেছে শয়তানদের ঘুর্ণিপাঁক, তোমার ঘাড় না ঘুরলেও, ঘুরিয়ে মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হবে কোনো বিদেশি উদ্গীরণ, বা আরও খারাপ, তুমি যাই বলো না কেন, প্রাসঙ্গিকতা সত্বেও, লোকে বলবে সেটা এই সময়ের জন্যে জরুরি। সময় বেশ বিপজ্জনক, সময় থেকেই পালাতে হবে, অথচ জানি যে পালানো কঠিন, পালাবার চেষ্টাকে ঠাট্টা করবে।’”

    এই প্যারাটা রোজনাচায় পড়ে এসিপি রিমা খানের মনে হল, পিচ্চি নিজেই আত্মহত্যার কিংবা মার্ডারের ক্লু রেখে গেছে।

    “ছোটোবেলা থেকে, কারোর গা থেকে রক্ত বেরোতে দেখলে তাকে নিজের আত্মীয় মনে হয় পিচ্চির, কান্না পেয়ে যায়, বেশি রক্ত দেখলে ও অজ্ঞান হয়ে যায়, ডেঙ্গু হয়েছে কিনা জানার জন্য প্যাথলজিস্টের সামনে বসে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে, নয়তো নিজের রক্ত দেখে নিজেই অজ্ঞান হয়ে যাবে। বেশিরভাগ দেবী-দেবতাকেই মনে হয় রক্তখোর, মানুষকে আগাম না জানিয়ে বিপদে ঠেলে দেয়। এরাই সব দেশের নেতা-নেতি। তারা রক্ত না পেলে পাবলিককে টাইট করে দেবে। তারা রক্ত খাচ্ছে না দেখে পাবলিক তাদের শ্রদ্ধা করবে না। পাবলিক যতো বেশি যন্ত্রণায় ভুগবে ততো বেশি আনন্দ পাবে মাংসের দেবী-দেবতারা। মানুষকে ভয় পাইয়ে রাখা তাদের ধর্ম। বাবা বলতেন চাকরের সঙ্গে গিয়ে মাছ মুরগি কিনে আনাটা শিখে নিতে, পিচ্চি কখনও যায়নি। বলেছে, চাকরের কাজ চাকর করবে, আমি কেন তার শ্রম কেড়ে নেবো, তাছাড়া চাকরদের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরে, আমার ঘোরে না। তখন পিচ্চির বয়স দশ। বাবা যে চিঠিটা লিখে গিয়েছিলেন তা পিচ্চি গত কয়েক বছরে বহুবার পড়েছে ; বারবার পড়লে ছিঁড়ে যেতে পারে অনুমান করে স্ক্যান করে স্মার্টফোনে তুলে রেখেছে :

    ডিয়ার পিচ্চি,

    আমার খোঁজ কোনোদিন কোরো না, আই লাভ ইউ, কিন্তু ইদানিং আমি একটা পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছি, ছয়জনের, সবাই আমার মতন লেনিনবাদী নয়, তিনজন যুবক মার্কসবাদী আর তিনজন যুবতী মাওবাদী, যুবকদের মধ্যে আমিই একমাত্র, তুমি নিশ্চয়ই মানবে যে আমি একজন যুবক, বয়স মাত্র চৌঁত্রিশ, প্রেম করে বিয়ে করেছিলুম বলে তুমি আমার আর তোমার মায়ের কম বয়সেই জন্মেছিলে। এবারে প্রেম-ভালোবাসা থেকে মুক্তি। অভিধানে পলিঅ্যামোরাসের মানে দেয়া আছে কিনা জানি না, তুমি তো টেক স্যাভি, গুগল সার্চ করে মানে জেনে নিও। আমি এই গেঁয়ো শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, আর কখনও ফেরার ইচ্ছে নেই, তা এইজন্যে নয় যে আমি নিজের বাড়ি আর তোমাদের ভালোবাসিনি, বরং এইজন্যে যে মনের ভেতরে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াটা অনেককাল যাবৎ পোষা ছিল। ছেড়ে যাওয়া আমার জীবনের উদ্দেশ্য, জানতুম শৈশব থেকে, এটা একটা আইডিয়া, একজন মানুষ হিসেবে লালন করা আইডিয়া, যতো বড়ো শহর তাতে ততো বেশি নিজেকে হারিয়ে ফেলবার সুযোগ, যতো কংক্রিটের আকাশ ছোঁয়া বাড়ি, ততো তার গলিঘুঁজির উল্টোপাল্টা লোকজন, জঞ্জালের বিশাল পাহাড়। চিন্তা কোরো না, অ্যাডভোকেট মশায়কে বললেই উনি গাইড করবেন, মিসগাইডও করতে পারেন, তবে মনে রাখা দরকার যে মিসগাইড করার উপদেশগুলো বেশি কার্যকরী, তা আমি আমার বাবার মিসগাইডেন্স থেকে শিখেছি। লাভ ইউ। বাবা।”

    যাক পিচ্চি নিজের জন্মদিন লিখে রেখেছে রোজনামচায়। আশ্বস্ত হলেন এসিপি রিমা খান। আর তো কোনও কাগজপত্র বাড়িতে পাওয়া যায়নি। মা-বাবার খোঁজে বেরোবার সময়ে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে থাকবে।

    “বামিয়ানের বুদ্ধকে আফগানিস্তানের দাড়িয়ালরা বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার দিন পিচ্চি জন্মেছিল, মার্চ মাসে, ২০০১ সালে তাই বাবা নাম রেখেছিলেন পিচ্চি, ওনার মতে তালিবানরা জন্মায় পিচ্চি হয়ে মরে পিচ্চি হয়ে আর সারাজীবন পিচ্চির মতন বেপরোয়া জীবন কাটায়। কিন্তু বুদ্ধকে আবার নবায়িত করা হয়েছে। তালিবানরা আবার আসবে, আবার বুদ্ধর মূর্তি বোমা মেরে ওড়াবে, নিজের-নিজের বোরখাপরা বেগমদের শেকলে বেঁধে নিয়ে যাবে, হুকুম না শুনলে গুলি করে মারবে যাতে আরেকটা টাটকা বউ পাওয়া যায়, কচি কুচুরমুচুর বউ। ”

    পিচ্চির রোজনামচার পাতায় নিজের সম্পর্কে লিখেছে, পড়ে আনমনা হলেন এসিপি রিমা খান :

    “মায়ের লেখা চিঠিটাও স্মার্টফোনে স্ক্যান করে তুলে রেখেছে পিচ্চি। মা-বাবা দুজনের মূল চিঠি ব্যাংকের লকারে রাখা আছে, আর তো কিছু নেই লকারে রাখার, তাই, বছরে একবার গিয়ে চিঠি দুটোর গন্ধ শুঁকে রেখে দ্যায়, ভাঁজ খুলে পড়ে না। দুজনেই বৈশাখ মাসে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, দুজনের চিঠিতেই কোনো তারিখ দেয়া নেই। মায়ের চিঠিতে যা লেখা :

    স্নেহের পিচ্চি

    আমার খোঁজ কোনোদিন করিবে না, আমি তোমায় খুবই ভালোবাসি, প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি, তুমি জানো, তুমি আমার একমাত্র সন্তান, তোমার যাহাতে কোনও অসুবিধা না হয়, আমার অ্যাকাউন্টে তোমাকে সঙ্গে লইয়া গিয়া তোমার নাম যোগ করিয়া দিয়াছিলাম, যাবতীয় গহনা বিক্রয় করিয়া দিয়াছি ও সেই অর্থ সঙ্গে লইয়া যাইতেছি। তোমার অ্যাকাউন্টের টাকা, তুমি যথেচ্ছ নয়ছয় করিতে পারিবে, কুন্ঠিত বোধ করিও না, জীবনের আনন্দ লইও, তবে কখনও দুঃখশোকের কবিতা পড়িও না। প্রেমের কবিতা পড়িবে ও তদনুসার প্রেম করিবে, একাধিক করিবে। এই কবিতাখানি পড়িয়া বুঝিতে পারিবে আমি কি ইশারা করিতেছি।

    ঘুরিয়ে গলার বাঁক ওঠো বুনো হংসিনী আমার

    পালক উদাম করে দাও উষ্ণ অঙ্গের আরাম,

    নিসর্গ নমিত করে যায় দিন, পুলকের দ্বার

    মুক্ত করে দেবে এই সব্দবিদ কোবিদের নাম।

    কক্কার শব্দের শর আরণ্যক আত্মার আদেশ

    আঠারোটি ডাক দেয় কান পেতে শোনো অষ্টাদশী,

    আঙুলে লুলিত করো বন্ধবেণী, সাপিনী বিশেষ

    সুনীল চাদরে এসো দুই তৃষ্ণা নগ্ন হয়ে বসি।

    ক্ষুধার্ত নদীর মতো তীব্র দুটি জলের আওয়াজ--

    তুলে মিশে যাই চলো অকর্ষিত উপত্যকায়

    চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ

    উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়,

    ঠোঁটের এ-লাক্ষারসে সিক্ত করো নর্ম কারুকাজ

    দ্রুত ডুবে যাই এসো ঘুর্ণমান রক্তের ধাঁধায়।

    পড়াশুনায় তুমি ভালো, প্রতি বছর প্রথম হও, তোমার শিক্ষার ব্যাপারে সেহেতু আমার চিন্তা নাই। তোমার দাদুর ব্যক্তিগত পাঠাগারে প্রচুর গ্রন্হ আছে, পড়িয়া সময় কাটাইতে অসুবিধা হইবে না। কখনও পরামর্শের প্রয়োজন হইলে তুমি অ্যাডভোকেট মহাশয়ের সহিত আলোচনা করিতে পারো। গৃহত্যাগের চেয়ে উচ্চতর কিছুই নাই, সবচেয়ে দয়নীয় হইল গৃহত্যাগ মনের ভিতর পোষণ করিয়া বাঁচিয়া থাকা। আমি কাহাকেও আঘাত দিতে চাহি নাই, সেই হেতু তোমাকে পূর্বাহ্ণে বলি নাই যে গৃহত্যাগ করিতেছি। অতঃপর জীবনে যাহা ঘটিবে তাহা ঘটিতে দিব, কোনও দুশ্চিন্তা নাই। জীবন নিজের স্বকীয় ইচ্ছানুযায়ী অতিবাহিত করিবে। আমার সস্নেহ আশীর্বাদসহ -- মা। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় পরের পাতায় গেলেন এসিপি রিমা খান, হাতের লেখা ডান দিকে বেঁকেছে, কিন্তু কেন, ভাবলেন উনি :

    “বাবা আর মা চলে যাবার পর ঠাকুর্দার লাইব্রেরির বই ঘেঁটে পিচ্চির মনে হয়েছিল, উনি বহুপন্হী ছিলেন এবং সেকারণে প্রচুর টাকাকড়ি রোজগার করতে পেরেছিলেন, দেশ-বিদেশ ঘুরতে পেরেছিলেন ; ওনার মিসগাইডেন্সের সবচেয়ে আলোচিত টপিক, যা বাবা প্রায়ই বলতেন, তা হলো জীবন কাটাতে হলে রবীন্দ্রনাথের দাদুর মতন কাটাও -- খাও, পিও, জমিজিরেত কেনো, বিদেশে যাও, বিদেশিনীদের সঙ্গে মৌজমস্তি করো। তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ, দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ–সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।”

    “পিচ্চি যখন স্বপ্ন দ্যাখে তখন স্বপ্নের মধ্যে ও বামপন্হী হিসেবে নিজেকে চিনতে পারে। ঘুম ভেঙে গেলে আর বামপন্হী থাকতে পারে না। বহুপন্হী হয়ে যায়, আর সবায়ের মতন, জনগণের মতন।”

    “দিনের বেলা ওর মনে হয়, এখনকার বহুপন্হী ভাবুকরা যুক্তি, বিজ্ঞান, অবজেকটিভ বাস্তবকে ফুঃ বলে উড়িয়ে দেয় আর দাবি করে যে সবকিছুই সাংস্কৃতিক স্তরে আপেক্ষিক। বহুপন্হীরা বিজ্ঞান আর যুক্তিবাদকে ঘেন্না করে কেননা ওরা কোনো-কোনো বিশ্বাসকে সত্য বলে দেগে দ্যায়, মানে সেগুলো সফল আর উঁচুস্তরের আবার কোনো-কোনো বিশ্বাসকে মিথ্যা মনে করে, তারা নিকৃষ্ট, পরাজিত। হীনতা সম্পর্কে বহুপন্হীদের ধারণা এতো গভীর যে ওরা বহু ব্যাপারকে অন্যের চেয়ে সফল আর উচ্চতর মনে করতে পারে না। মানসিক বিকারকে ওরা ফালতু মনে করে। ওরা মানুষের ক্ষমতার জিনগত ব্যাখ্যা বরদাস্ত করতে পারে না। অমন ব্যাখ্যা মেনে নিলে ওদের মেনে নিতে হবে যে সবাই সমান নয়। একজন মানুষের গুণ বা দোষত্রুটির দায় ওরা চাপিয়ে দ্যায় সমাজের ওপরে। মানে, নিকৃষ্ট হওয়াটা তার দোষ নয়, সমাজের দোষ, সমাজ নাকি তাকে উচ্চতর হবার সুযোগ দেয়নি। ”

    “স্বপ্নের মধ্যে পিচ্চি নিজেকে কোনো রাতে স্তালিন হিসাবে দেখতে পায়, কোনো রাতে লেনিন, কোনো রাতে মাও, কোনো রাতে ফিদেল কাস্ত্রো, কোনো রাতে চে গ্বেভারা, কোনো রাতে ট্রটস্কি, কোনো রাতে হুগো চাভেজ, কোনো রাতে হো চি মিন, কোনো রাতে পল পট। অসুবিধা একটাই, বিছানায় ও ল্যাংটো হয়ে শোয়, নয়তো ঘুম আসে না, কিন্তু কোনো বই পড়ে জানতে পারেনি যে এনারা কেউ ল্যাংটো হয়ে শুতেন কিনা। ”

    “স্বপ্নের মধ্যে পিচ্চি মা আর বাবার প্রিয় গানগুলো শুনতে পায়। ”

    “বাবা নিজের দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরে বেতের ইজিচেয়ারে বসে, বরফে চোবানো ব্লু লেবেলের গ্লাস হাতে, যে ঘরের দেয়াল নীলাভ, শুনতে পেতেন না মা একতলায় নিজের অ্যান্টিক পালঙ্কে সবুজ মখমলের চাদরে চোখ বুজে বসে, শিমুল তুলোর কোলবালিশ জড়িয়ে, কোন গান শুনছেন। মা শুনতে পেতেন না বাবা কোন গান বাজাচ্ছেন। ”

    “ গ্যারেজের ওপরে ওর খেলবার মেজানাইন ঘরে বসে পিচ্চি দুজনের বাজানো গানই শুনতে পেতো, ওর তো গানের সুরও প্রায় একই রকম মনে হতো। ”

    “এই শহরে যে বাড়িতে পিচ্চি জন্মেছিল সেখানে এখন মাল্টিপ্লেক্স, মাইয়ের খাঁজ দেখানো ফিল্মিমাইয়ার পোস্টার ; প্রথম প্রি-প্রাইমারি স্কুলটা ভেঙে উঠে গেছে তিরিশতলা, ভেতরটা দেখা যায় না এমন আয়না-কাচে মোড়া, ক্রিকেট খেলার মাঠটায় ফ্লাইওভারের থাম ; এই শহরে ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার আগেই উবে যায়, মগজে পুষে রাখা বিটকেল চিন্তা দিয়ে নাগরিকরা বানিয়ে চলেছে স্হাপত্য ভাস্কর্য পেইনটিং নগ্নিকার আঁস্তাকুড়। পিচ্চিকে তাই একোল মণ্ডিয়ালে গিয়ে পড়তে হয়েছিল, তারপর আর ভাল্লাগেনি, মনে হয়েছে সবই তো ওর জানা। ”

    রোজনামচার একটা খাতা শেষ করে পরের খাতাটা তুলে নিলেন রিমা খান ; নানা রকমের ডুডল, খাতার প্রথম দিকের কয়েকটা পাতায়, মনে হয় চোখ আঁকার চেষ্টা করেছে, কার চোখ কে জানে, যেন কোনো রাক্ষসের।

    দুই

    “ পিচ্চির নিজের ভালো লাগে মেটাল গান, হেভি মেটাল, তাতে ওর ঝাঁকড়া চুলে হেড ব্যাং করতে সুবিধে হয়। দরোজা জানালা বন্ধ করে এসি চালিয়ে পিচ্চি উলঙ্গ দাঁড়িয়ে গান শোনে আর হেড ব্যাং করে। ”

    রিমা খান নোট নিয়ে রাখলেন। এই অ্যাডভোকেটই মিসিং ডায়রি করেছে, ভোমসোকে জিগ্যেস করতে হবে ওনার এলাবোরেট স্টেটমেন্ট নিয়েছে কিনা।

    “পিচ্চির অছি, অ্যাডভোকেট মশায় বলেছিলেন, তলাকার ঠোঁট দাঁত দিয়ে চিবোতে-চিবোতে, বাঁ হাত দিয়ে গান্ধিমার্কা চশমা টেবিলের ধুলোট কাগজের ডাঁইয়ের ওপর রেখে, আর বাঁ হাতে ধরা সিগারেটের ছাইকে টুসকি মেরে, বুঝেছ পিচ্চি, তোমাদের সংসারে আসল গোলমাল তৈরি হয়েছে ওই বিশাল বাড়ির জন্যে, তিনজন মোটে মানুষ, তোমাকে যদি হাফ ধরি তাহলে আড়াইজনের জন্য অতোবড়ো বাড়ির দরকার ছিল না। দশ হাজার স্কোয়ার ফিট, বাগান নিয়ে কুড়ি হাজার স্কোয়ার ফিট। রবি ঠাকুরের বাবা জানতেন তাঁদের বিরাট বাড়ির জন্যে অনেক ছেলেপুলে দরকার, কেউ যদি তার বউদির সঙ্গে প্রেম করে তাহলে অন্যেরা জানতে পারবে না। তোমার যদি কয়েকটা দাদা থাকতো তাহলে কোনো একজন বউদির সঙ্গে প্রেম করতে পারতে। অতো বড়ো বাড়ির জন্যেই তোমার আর ভাইবোন হলো না, তোমার ঠাকুর্দারও হয়নি, এই যদি বস্তির কুঁড়ে ঘরে থাকতে, কিংবা অজ পাড়াগাঁয়ে, তাহলে লালু যাদবের ছেলেপিলের মতন তোমারও গাদাগুচ্ছের জেঠা-কাকা ভাই-বোন হতো, বাড়িটা গমগম করতো, মা-বাবাও বাড়ি থেকে পালাতেন না। আমাদের ছোটোবেলায় ছেলেছোকরারা বকুনি খাবার ভয়ে কিংবা বাঁধন ছেঁড়ার জন্য বাড়ি থেকে পালাতো। তোমার মা-বাবা বাড়ি থেকে পালালেন, আজব যুক্তি দিয়ে, এরকম ঘটনা আমি আমার কোনো মক্কেলের জীবনে ঘটেছে বলে শুনিনি, আজ দশ বছর হতে চলল প্র্যাকটিস করছি। কতোবার তোমার বাবাকে বলেছি একতলাটা ভাড়া দিয়ে দাও, লোকজনের আসা যাওয়া থাকবে, দিনে গোরস্তান রাতে চোরবাগান মনে হবে না, তা তোমার বাবার সেই এক কথা, যা তোমার ঠাকুর্দাও বলতেন, আর টাকাকড়ি চাই না, যা আছে তাইই যথেষ্ট, তার ওপর যাদের ভাড়া দেবো তারা কেমন ধরনের মানুষ তা তো আগে থেকে জানা যাবে না, হয়তো রোজই ঝগড়াঝাঁটি করবে নিজেদের মধ্যে, আর আমাদের শান্তি নষ্ট করবে, তামাক খেয়ে থুতু ফেলবে, মাল টেনে বউকে পেটাবে, জোরে টিভি চালাবে, বাগানে পেচ্ছাপ করবে। ”

    “অ্যাডভোকেট মশায়ের মুখের দিকে তাকালে মন খারাপ হয়ে যায় পিচ্চির ; ওনার মেয়ে হয়নি, পাঁচটাই ছেলে, ছয় নম্বর পয়দা করতে-করতে ওনার বউ মারা গেলেন, ছয় নম্বরও কয়েকদিন মোটে টিকেছিল। পাঁচটা ছেলেই অপগণ্ড, কেউ ক্লাস এইট, কেউ ক্লাস সেভেন, আর এগোতে পারেনি, গণিত আর ইংরেজিতে বারবার গাড্ডুস খেয়েছে, একটা ছেলে তো স্কিৎসোফ্রেনিয়ার রোগি। অ্যাডভোকেট নিজে কতো পড়াশোনা করেছেন, গরিব মা-বাপের মুখে রোশনাই ফুটিয়েছেন, বস্তি ছেড়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকেন, অথচ ওনার ছেলেগুলো ওনার মুখময় অন্ধকার মাখিয়ে দিয়েছে। কোনো মানে হয় না। কোনো ছেলে ওনার দপতরে ঢুকলে মুখ এমন বিকৃত করেন যেন হুপ শব্দ করে গাছ থেকে ল্যাজ তুলে লাফাবেন। ”

    “পিচ্চির অছি, অ্যাডভোকেট মশায় বললেন, তলাকার ঠৌঁট চেবাতে-চেবাতে, তোমার জন্যে আমি দুজন প্রেমিকা খুঁজে রেখেছি, কনে আর কইন্যা, যদিও বয়েস তোমার চেয়ে দুজনেরই বেশি, তোমায় প্রেমিকের করণীয় বিষয়ে ভালো গাইড করতে পারবে। তুমি হয়তো তাদের জন্য প্রথম নও, শেষও নও, একমাত্র নও ; তারা আগে প্রেম করে থাকতে পারে, পরেও আবার করবে। কিন্তু এখন তো তোমাকে ভালোবাসবে, সেটাই যথেষ্ট, নয়কি ? মেয়ে দুটি সুন্দরীতমা নয়, নিখুঁত নয়, পাছা পর্যন্ত চুল নেই, ঢাউস বুক নেই -- তা তোমার শরীরেও তো কতো খুঁত আছে, মাসকুলার নও, একটু মোটা, চুল ঝাঁকড়া, রোজ স্নান করো না, পোশাক পালটাও না ; যাকে বাছবে, দুজনে মিলেও নিখুঁত হবে না বটে, তাতে কি ? তোমাকে হাসিখুশি রাখে যদি, যদি মেনে নেয় যে জীবনে ভুলভাল কাজ করে ফেলেছে, তোমাকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখাবে, তোমাকে তার একটা অংশ দিতে গররাজি হবে না, যদিও তুমি হয়তো বিশ্বাস ভেঙে ফেলতে পারো, সেও তোমার সেই জিনিশটা ভেঙে ফেলতে পারে, আই মিন ইয়োর হার্ট। তুমি তাকে আঘাত দেবে না, সেও তোমাকে আঘাত দেবে না, তুমি তাকে পালটাতে চেষ্টা কোরো না, সেও তোমাকে পালটাতে চেষ্টা করবে না। তোমাকে আনন্দ দিলে হাসবে আর তাকেও আনন্দ দেবে। বুঝলে?”

    “প্রেমিকা ? পিচ্চি নিজেকে চুপচাপ বলল, ‘আমি তো প্রেম করতে চাই না, খুন করতে চাই, এমনভাবে খুন করতে চাই যে কেউই টের পাবে না। অ্যাডভোকেটকে শুনিয়ে বলল, আমি দুজনের সঙ্গেই, কনে আর কইন্যার, একসঙ্গে প্রেম করতে চাই, রাঁধুনিকে বলে দেব ওদের যার যা পছন্দ তেমন ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার রাঁধতে।”

    “সেই দিন থেকে জীবন হয়ে উঠল ঘনঘোর কালো, কুচকুচে কালো, আকাশ কালো, বাতাস কালো, গাছপালা কালো, বৃষ্টি কালো, ফুলগুলো কালো, ঘরের আলোও কালো, জানালার বাইরে কেবল কালোয় কালো অথচ তা অন্ধকার নয়। প্রেমের অর্থ অন্ধকার নয়, প্রেমের মানে কালো সুরঙ্গে সেঁদোনো, হাতড়ানো। কালো যে কতো আকর্ষক তা দুজন তরুণী, কনে আর কইন্যা, শিখিয়ে দিল পিচ্চিকে, তার আগে পিচ্চি কোনো তরুণীর সামনে উলঙ্গ হয়নি।”

    “দুই কানে উড়ন্ত চুল আছে, তাই যেকোনো ছুতোয় গোরিলাদের প্রসঙ্গ এসে যায় পিচ্চির অছি অ্যাডভোকেট মশায়ের মগজে। বললেন, তোমার তো মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরে না, বুকের চুল লেজার দিয়ে কামিয়ে নিও। মেয়ে দুটি, কনে আর কইন্যা, তেমন প্রেমিকই চেয়েছে। তোমাদের বাড়িটা ওদের দুজনকে ভাড়া দিয়েছি, তুমি অনুমোদন করে দিও, ওই দুজনের মধ্যে একটি মেয়েকে তোমার প্রেমিকা হিসাবে চুজ কোরো, কনেকে বা কইন্যাকে। কে তোমার প্রেমিকা তা তোমাকে বুঝে নিতে হবে। দুই মেয়েরই মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার মেরুক্ষমতাসম্পন্ন। ”

    “পিচ্চি বলল, জানি, আমি বলি কি, ব্যাপারটা বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্যে ঘটেছে ; মা-বাবাও বাড়ি ছেড়েছেন উষ্ণায়নের প্রভাবে, আমি উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়ব কনে আর কইন্যা দুই প্রেমিকাকে দুই পাশে রেখে, ওদের কাঁধে হাত রেখে উড়ব, ওদের শিখিয়ে দেবো কেমন করে ড্র্যাগনদের ট্রেনিং দিতে হয়। ”

    “পিচ্চির অছি, অ্যাডভোকেটের পরামর্শে, নিচের তলাটা পার্টিশান করে কনে আর কইন্যাকে ভাড়া দিয়েছে পিচ্চি, সাজানো ঘরগুলো, সব আসবাবই আছে। কেননা ও যখন বাড়ির বাইরে থাকে তখন কাউকে তো থাকতে হবে, নয়তো যা চোর-ছ্যাঁচোড়ের আর পার্টিবাজির যুগ, বাবা-মায়ের স্মৃতিই চুরি করে নিয়ে চলে যাবে, রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারের মেডেলই চুরি হয়ে গেল, আর পাওয়া গেল না, চোরেদের পাওয়া গেল না, মেডেলও পাওয়া গেল না। ”

    “অছি অ্যাডভোকেটের দেখাদেখি পিচ্চিও দুটি মেয়েকে ফর্সা আধুনিকা কইন্যা আর কালো অধুনান্তিক কনেতে বর্গীকরণ করে ফেলেছে, তাদের গায়ের রঙ অনুযায়ী, যদিও কালো কনেই গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে নিজের মোটর গাড়ি রাখে ; একজন যুবতী চারজন বসবার জায়গায় করেটা কী। দুই তরুণীকে পিচ্চির বর্গীকরণ : কনে দক্ষিণ আমেরিকা আর কইন্যা উত্তর আমেরিকা। এই দুই তরুণী ওর প্রেমিকা হবে, সলিসিটর মশায়ের ঠোঁট-চেবানো প্রস্তাব। ফর্সা কইন্যা বলেছে ও এম এ পড়ছে, কালো কনে এম এস সি, ওদের দাবি তাইই, অ্যাডভোকেট মশায়ের তথ্য অনুযায়ী। দুজনেই সঙ্গে এনেছে দুটো করে ঢাউস সুটকেস, আর কিটব্যাগ। ”

    “পিচ্চি ভেবেছিল, যখন সত্যিকার কোনো সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে আলাপ হবে, তাকে বলব, যে, যদি সে রাতটা আমার সঙ্গে কাটায়, তাহলে তাকে নিয়ে উপন্যাস লিখব। সলিসিটার বলেছিলেন যে এই ট্রিকটা কাজে দেয়, বিশেষ করে তার নামে যদি উপন্যাসের নামকরণ হয় ; তারপর মিষ্টি রাতটা কাটানো হয়ে গেলে, মেয়েটি টা-টা করে চলে গেলে, মনের মধ্যে একটা কষ্ট বাসা বাঁধবে, লিখতে বসে সেই কষ্টের কথা এসে যাবে, মেয়েটির কথা আসবে না। তাই তোমার এমন প্রেমিকা চাই যে টা-টা করবে না, বা করলেও তোমার সঞ্চয়ে একজন বিকল্প প্রেমিকা থাকবে। তা সত্বেও কষ্ট কমাবার জন্য তোমায় একটা-কিছু লিখে ফেলতে হবে, নয়তো তার স্মৃতি মগজ থেকে নামাতে পারবে না। কিন্তু সে তোমার স্মৃতিতে থেকে যাবে। তাকে মগজ থেকে মুছে ফেলার জন্যে হয়তো তাকেই খুন করতে হবে। পিচ্চি সে কথা মনে রেখে এই খাতায় নিজের স্মৃতি অন্য লোকের ডটপেন দিয়ে লিখে রাখছে। ”

    অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার রিমা খান আরেকটা সিগারেট ধরালেন, ধোঁয়া টেনে ওপরের দিকে ছাড়লেন, আর নোট নিলেন, মেয়েগুলোকে জেরা করে ভোমসো কোনো তথ্য পেয়েছে কিনা জানতে হবে ; হঠাৎই দুটি মেয়ে একা-একা একটা বাড়িতে থাকতে চলে এলো প্রেমিক পাবার স্বার্থে, নাকি ছোঁড়াটাকে বিয়ে করে সম্পত্তির মালকিন হবার গোপন ইচ্ছেতে। ছোঁড়াটা আগে সেক্স করেছে কিনা তার আভাস দেয়নি। যাক পড়তে থাকা যাক, ভাবলেন রিমা খান।

    “ফর্সা কইন্যা কালো কনের আগে এসে সংসার গুছিয়ে ফেলেছে ; কিনতে হয়নি কিছুই কেননা সবই তো মজুত, গুছিয়ে নেয়া মানে ওয়ার্ডরোবে স্কার্ট-টপ-লনজারি-শাড়ি-ব্লাউজ-বডিস-পুলওভার-সোয়েটারের রঙিন কাতার। খাবার জন্যে নিজেদের রাঁধতে হবে না, রাঁধুনিকে বললেই হল। ফর্সা কইন্যার একটা গোলাপি স্কুটি আছে, বাইরেই রাখে, গাছের তলায়। বেরোবার সময়ে সিটের ওপর থেকে পাখির গু সেই দিনের সংবাদপত্রের রাশিফলের পাতা দিয়ে পুঁছে নেয়। চুড়িদার বা শাড়ি নয়, চেরা স্কার্ট পরে, মিনি-মিডি-ম্যাক্সি, উরু দেখে ভাল্লাগে, ভাল্লাগাটাই বোধহয় প্রেম করার প্রথম ধাপ। যে তরুণীরা উরু-দেখানো পোশাক পরে তারা বিজ্ঞাপন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে উরুতে তেল সাবান বেবিফুড শ্যাম্পু এইসবের প্রচার করতে পারে। ”

    “পিচ্চি ওর অছি অ্যাডভোকেটকে বলেছিল, থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর মিসগাইডেন্স স্যার, আপনার কথা মতো লাইন মারামারি শুরু হয়েছে, কিন্তু আমি মারছি না কনে-কইন্যারা মারছে তা খোলশা হয়নি এখনও, তবে দুজনেই বেশ টানছে। ”

    “কালো কনে যেদিন নতুন গাড়ি এনে গ্যারেজে ঢোকালো, কালীঘাটে পুজো দিয়ে, ওয়াইপারে গ্যাঁদাফুলের মালা পরিয়ে, সেদিনকেও পিচ্চি অজ্ঞান হয়েছিল, যথারীতি ওর জন্মদিনে, বারান্দায় ওঠার মুখে মার্বেলপাথরের সিঁড়ির কাছে একটা স্যানিটারি ন্যাপকিন দেখে, তখনও টাটকা রক্ত লেগে। ”

    রিমা খান নোট নিলেন, স্কুটি আর মোটরগাড়ির রেজিস্ট্রেশান পার্টকুলার্স সংগ্রহ করতে বলবেন ভোমসোকে। হ্যাঁ, সত্যিই গাড়ি কেনার মতন টাকাকড়ি থাকতে, একা বসবাস করতে এলো কেন কনেটা ?

    “ফর্সা কইন্যা ওকে অজ্ঞান হতে দেখে হাতে-ধরা মিনারাল ওয়াটারের ছিটে দিয়ে জ্ঞান ফেরাতে, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে পিচ্চি বলে উঠেছিল, এটা কী জিনিস, এতো রক্ত, কে ফেলে গেছে, কারোর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে নাকি?”

    “পিচ্চির কথা শুনে, ওকে হাত ধরে টেনে তুলে ফর্সা কইন্যা বলল, ‘স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে গেছে মস্তিষ্কে চুন-সুরকি ভরা খণ্ডহর, বহুকাল থেকে, হিউম্যানিটিজের ছাত্ররা, যারা স্বাধীন চিন্তা করতে পারে, পড়াশুনোয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, অনেকে ছেড়ে চলে গেছে, বলা যায় তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

    টিকে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাথায় হাওয়া-ভরা বোকা দার্শনিকদের সামনে মাথা হেঁট করে তাদের কথা আওড়ানো, নামও সব বিটকেল, দেরিদা, লাকাঁ, ফুকো, আর্নেস্তো লাক্লাউ, জিলে দেল্যুজ, স্লাভো জিজেক, লুই আলথুজার, হ্যানো-ত্যানো। আসলে, ব্যাপারটা হলো দর্শনশাস্ত্রের পীড়ন বা অত্যাচার। আমাদের দেশের অধ্যাপকগুলো ওদের গোবরগণেশ দর্শনের রথে চেপে কেরিয়ার গুছিয়ে নিচ্ছে। তোমারও সেই দশা, মেয়েদের যৌবনে পোঁছোনো সম্পর্কে না জেনে প্রেমিক হবার জন্য তৈরি হয়ে গেলে।”

    “পিচ্চি থ্যাঙ্কস দেবার হ্যাণ্ডশেকের জন্য ডান হাত বাড়িয়েছিল, কইন্যা, যার সারা শরীর যেন কাঁচা ঘুমে ডুবে কুয়াশায় ভরা, বলল, আজকাল কেউ ব্রিটিশদের মতন হ্যাণ্ডশেক করে না, এখন হাগিঙ করতে হয়, আমেরিকানদের মতন, বলে ওলেঙ্কা পিচ্চিকে জড়িয়ে হাগ করতে, পিচ্চি জিগ্যেস করলে, এই প্রথা কি প্রতিবার দেখা হলে করতে হয় ? তোমার গায়ের গন্ধ কিন্তু বেশ ফুলেল !”

    রিমা খান নিজেকে বললেন, ওঃ, মেয়েটা দেখছি এই সমস্ত নাম আউড়ে ছোঁড়াটাকে ইমপ্রেস করতে চাইছে ; এখন ইমপ্রেস করার এটাই চল, শরীরের ভঙ্গি আর জ্ঞানের লেঙ্গি।

    “কেউই এসব কথা বলে না, উচ্চারণ করে না, এটা পাগলাগারদের সভাঘর। কারোর হয়তো মাথার ঠিক নেই আবার কেউ এটাকে রোমান্টিক বলে মনে করে, রোমান্টিকরাও এক ধরণের পাগল, যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই আর যা চায় তাই করতে পারে। ”

    “পিচ্চি ফর্সা কইন্যার সামনে অবাক চাউনি মেলে বুঝিয়ে দিলে যে ও মেয়েটির কথা কিছুই বোঝেনি।”

    “তুমি ওই একোল মণ্ডিয়াল স্কুলে পড়েছিলে তো, নানা ব্যাপারে জ্ঞান হয়নি। একে বলে স্যানিটারি প্যাড বা ন্যাপকিন, মেয়েরা মাসে একবার ভ্যাজাইনায় বাঁধে, তাদের ওভুলেশান হয়, ডিম বাসি হয়ে গেলে তা রক্তের সঙ্গে বেরিয়ে যায়, ওই ডিম থেকেই তো ছেলেপুলে হয়, জানো না, এতো বয়স হতে চলল, ওই ডিমের সঙ্গে স্পার্মের প্রেম হলে গর্ভে ভ্রুণ তৈরি হয়, ফিটাস, ফিটাস। তোমার মরা স্পার্মও তো নাইটফলে বেরিয়ে যায়, যদি ম্যাস্টারবেট না করো। মেয়েদের ম্যাস্টারবেশনের সঙ্গে অবশ্য ডিম মরার সম্পর্ক নেই। বললে কইন্যা উত্তর আমেরিকা, দুই পা ফাঁক করে কোমরে হাত রেখে ; আমার ভ্যাজাইনা ওই কয়দিন বেশ রেগে থাকে, আদারওয়াইজ আমার ভ্যজাইনা বেশ খুশমেজাজী। ”

    “এতো রক্ত ? তাহলে তো প্রত্যেক মাসে হাসপাতালে গিয়ে ব্লাড নিতে হয় তাদের ? তোমাকেও নিতে হয় নিশ্চয়ই। তুমি তো আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়ো, স্কার্ট পরে থাকো, এখনই রক্ত বেরোনো আরম্ভ হয়ে গেছে? ফর্সা কইন্যার কথাগুলো শুনে পিচ্চির মগজে ঝড়ে গাছ পড়ার, বিতর্কে টেবিল চাপড়াবার, গাড়ির ব্রেক মারার তীক্ষ্ণ আওয়াজ, বরফের ওপর হাঁটার শিহরণ সব একসঙ্গে ঘটে গেল।

    “হ্যাঁ, বারো বছর বয়স থেকে হয়েছে। তোমার চেয়ে আমি বয়সে বেশ বড়ো, স্নাতকোত্তরে দর্শন পড়ি, আর অধ্যাপকদের অ্যাবিউজ করি। তুমি নাকি আমার প্রেমিক হবে বলে ধার্য করা হয়েছে, বেবি বয়? ওই দিকের কালো কৃষ্ণকলিও নাকি তোমার প্রেমিকা হবার জন্য ধার্য। ওই কালো মেয়ের বয়স কিন্তু আমার চেয়ে বেশি। ”

    “ বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য বোধহয়, তাড়াতাড়ি আরম্ভ হয়ে গেছে। তো মাঝরাস্তায় ফেলেছো কেন ?”

    “আরে বাড়ির মালিক খোকা, ওটা আমার ফেলা নয়, আমার পিরিয়ডের দেরি আছে । পিরিয়ডের রক্ত বেরিয়ে যায় বলে রক্ত নিতে হয় না, আপনা থেকেই রক্ত তৈরি হয়ে যায়, অনেককে অবশ্য আয়রন ট্যাবলেট খেতে হয়। তিন-চার দিন রক্ত বেরোয়, টানা। ওইটাই সেফ পিরিয়ড সেক্স করার। তুমি এখনও সেক্স করোনি, বুঝতে পারছি ?”

    “না, করিনি, পিচ্চি বলল, ভ্যাজাইনাই দেখিনি এখনও, ওই কালো কনের ভ্যাজাইনা বোধহয় খুশমাজেজী নয়, তাই রক্তমাখা প্যাডটা এখানে ফেলে গেছে।”

    “ ইনডিয়ান স্কুলে না পড়লে ছেলেরা যে মুকখু হয়, তা তোমাকে দেখে বুঝতে পারছি ; তোমরা শুধু শিট ফাক আসহোল মাদারফাকার বিগ-ও কান্ট ডিক পুসি সাকার লিকার প্রিক স্টিক-টু-আস এইসব বলতে শেখো, কোমরে হাত রাখাই আছে কইন্যার।”

    “মাসে এক লিটার রক্ত দেখতে হলে আমার আর সেক্স করা হবে না। রক্ত দেখলে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। পিচ্চি নিজেকে নিঃশব্দে বলল, অনেকটা কাশফুলের দোল খাবার মতন করে, কাউকে হত্যা না করলে রক্তের ভয় থেকে আমার মুক্তি নেই, নিজেকে রক্তের পুকুরে চুবিয়ে তবে হয়তো নিষ্কৃতি পাবো।”

    “সবচেয়ে ফালতুগুলোই এখানে, এই জগতে, এসে জুটেছে। ইচ্ছে করলেই তারা যে কাউকে মেরে ফেলতে পারে, মেরে ফেলার নির্দেশ দিতে পারে, তার জন্যে তাদের পাপবোধ হয় না, অপরাধবোধ নেই। নিজের কথা ছাড়া তারা আর কিছু ভাবে না, তাই অন্যের দুঃখকষ্টের কথা তাদের মাথায় ঢোকে না, পৃথিবীর রাস্তায় গলিতে রাজপথে মাঠে কাতরাবার জন্যে আধমরা করে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। মানুষ না খেতে পেয়ে মরলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। মাথামোটা এইসব গাঁড়ল আঁড়ল চাঁড়ল ষাঁড়ল, বাঁড়লগুলোর জন্যে এই জগত ছাড়া আর অন্য জগত নেই, এটাকেই তারা শান্তি মনে করে, তারা ভাবে পাবলিক তাদের এইজন্যে পছন্দ করে, এমনকি ভালোবাসে। ”

    “জিভে ঠোঁট বুলিয়ে ফর্সা কইন্যা বলল, আমাকে পেতে হলে, আমি তোমাকে সম্পূর্ণ নেবো, ইন্সটলমেন্টে নয়, টপ টু বটম ইন ওয়ান পিস, আমি তোমাকে আমার ভেতরে অনুভব করতে চাই, আমার গভীরতার উষ্ণায়নে, তুমি বলো কবে কখন যাবো তোমার ঘরে, তোমার শ্বাসের সঙ্গে আমার শ্বাস মেশাবো, আমার নাম করে তুমি নদীর ঢেউ হয়ে উঠবে আর নামবে। রক্তের জন্যে ভয় পেও না। প্রত্যেকদিন রক্ত বেরোয় না, ওই কয়েকদিন বেরোয়, বেশ কষ্টকর সেই কয়েক দিন, মনে হয় যাকে পাই তার মাথায় মুগুর বসিয়ে দিই। তুমি অবশ্য বাড়ির মালিক, চুমু বসাবো, ঠোঁটের ওপরে দাঁত চেপে বলল কইন্যা। ”

    “তুমি এতোকিছু জানো, তুমি কি কোনো পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীর মেম্বার ? আমার বাবা অমন একটা গোষ্ঠীতে যোগ দেবার জন্যে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছেন। এই দ্যাখো ওনার চিঠি “।

    “ইনটারেসটিং চিঠি, বলল ফর্সারানি, তারপর যোগ করল, যে জগতসংসার নিখুঁত, সেখানে বসবাস করে তুমি কাউকে নিজের হৃদয় না দিয়েও, ফাক করতে পারো। প্রত্যেকটা আঠালো চুমু আর মাংসে প্রতিবার ফোটানো নখের কাচের টুকরো, তোমাকে তোমার হৃদয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, বেবি বয়, তাইই হল প্রেম, ভালোবাসা পিরীতি হোয়াটএভার। গোয়ায় রাশিয়ানদের আর হিমাচল প্রদেশে ইজরাইলিদের পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীরা থাকে বলে শুনেছি, গোপন ডেরায় কান্ট-কক ফেসটিভাল করে। ”

    “পিচ্চি বলল, তাহলে, আমি বলি কি, যে রাতে ইচ্ছে চলে এসো, আমি ওই ওপরের মেজানাইন ফ্লোরের ঘরটায় থাকি, কালো কনেকেও বলব আসতে, তিনজনে মিলে পোশাক খুলে বাথটাবের জলে শুয়ে থাকব।”

    “ফর্সা কইন্যা ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বললে, জানি, দেখেছি, ল্যাংটো হয়ে ঘোরাঘুরি করছ ; বডিটা ভালোই, লোভনীয়। কিন্তু তিনজন একসঙ্গে হলে গোলমাল হবে তো, কাড়াকাড়ি, টানাটানি, ধস্তাধস্তি। বোধহয় তুমি একটু গোলমেলে। তোমার মাও তো তোমাকে ছেড়ে পালিয়েছেন শুনেছি। এমন তো নয় যে তোমার জন্যই ওনারা চলে গেলেন, ছেলেপুলে হলে হাজারটা ঝামেলা, যাতে পোয়াতে না হয়, তাই পালিয়েছেন। ”

    “হতে পারে। একে রক্ত তায় আবার সেই রক্তের সঙ্গে আপোষ করে সেক্স। আমার দ্বারা কিছুই হবে না দেখছি। তারপর নিজেকে শুনিয়ে নিঃশব্দে বলল, উপায় ওই একটাই, কাউকে খুন করে তার রক্তে সাঁতার কাটা। ফর্সা কইন্যার অজন্তামার্কা চোখে চোখ রেখে পিচ্চি বলল, কিন্তু তোমার আর ওই কালো কনের ফিগার বেশ অ্যাট্র্যাক্টিভ, কোমর কতো সরু, কেমন করে বজায় রেখেছো, টিভির পর্দায় তো বাঙালি মেয়েদের দেখি বুক পেট পাছা সব একই মাপের। ”

    “ওরা দুবেলা ভাত-মাছ না খেয়ে থাকতে পারে না, ফাস্টফুড খায় স্টুডিওতে, পিৎজা, পাস্তা, ম্যাগি, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ক্রাঞ্চি ট্র্যাফো, হুপার, ফ্রস্টি, কোলা এটসেটরা। তুমি তো হোমো হয়ে যেতে পারতে। পুরুষে-পুরুষে সেক্স। ”

    “অ্যাঃ, খালি গায়ে পুরুষদের সারা দেহে চুল দেখলে আমার বমি পায়, স্বপ্নে অবশ্য ওনাদের ব্যাকসাইড বেশ লোভনীয় মনে হয়, আঁড়ল গাঁড়ল চাঁড়ল ষাঁড়ল বাঁড়লদের ব্যাকসাইড সারা পৃথিবীতে একই রকম, লোভনীয়। কিন্তু ঘুম ভাঙলেই তারা শিম্পাঞ্জি, গোরিলা বা বেবুন। তুমি যাও না কোনো গোরিলার সঙ্গে সেক্স করতে। ”

    “ওফ, দারুণ হবে, নেয়ানডারথালের সঙ্গে সেক্স করে কতো গুহামানবী ওই কালো কনের মতন ফ্যামিলি পয়দা করেছে। ”

    “তুমি ওদের হিংসে করো ?”

    “ইউ মিন ঈর্ষা ? অনেককে অনেক কারণে ঈর্ষা করি, তা কি আর ছাই মনে থাকে ! তোমাকেই তো ঈর্ষা করি এই এতো বিশাল বাড়ির মালিক হবার কারণে। একদিন দেখেছিলুম কালো কনেকে তুমি লাইন মারছিলে ; মেয়েটা এমনভাবে হাঁটছিল যেন সারা শরীর থেকে লিবার্টি ইকুয়ালিটি ফ্র্যাটারনিটির সোনার গুঁড়ো ঝরে পড়ছে, যেন এক্ষুনি বেরিয়ে এসেছে ফরাসি বিপ্লব আর নভেম্বর বিপ্লবের খুনোখুনি সেরে।”

    “পিচ্চি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ওঃ, যদি থাকতে পারতুম ওই বিপ্লবগুলোতে ! শবের ওপর দিয়ে ঝাণ্ডা নিয়ে দৌড়োতুম, বিপ্লবের জয়গান গাইতে গাইতে, সবার জন্য স্বাধীনতা, স্বাধীনতা সাম্য শান্তি, স্বাধীনতা সাম্য ভ্রাতৃত্ব, সাম্য শৃঙ্খলা শান্তি । ”

    “ওকে শুনিয়ে ফর্সা কইন্যা বলছে, শুনতে পেল পিচ্চি, ওর দিকে পিঠ আর মুখ করে, যাতে পিচ্চি মেয়েটার পাছার ভাঁজ দেখে নির্ণয় নিতে পারে, কালোকে টানবে নাকি এই ধলাকে ? ফর্সা কইন্যা বলছিল, আমরা সবাই একা, সেক্স করার সময়েও একা, জন্মাই একা, মারা যাই একা, বুড়ো বয়সে দেখবে যে নানা মানুষের সঙ্গে মেলামেশা সত্ত্বেও, আমরা সারাদিন একা, তাই তো মানুষ নিজেকে শ্রদ্ধা করে, অন্যের হৃদয়ে ঢুকে একাকীত্ব শেষ করা যায় না, সেখানে আনন্দ খুঁজতে যাওয়া বোকামি।”

    “আমি বলি কি, কালো কনে সোনার গুঁড়ো ঝরায়নি, কলেজের নির্বাচনে ভোট দিয়ে ফিরছিল, পায়ে তাই নাচ লেগেছিল। ”

    “ফর্সা কইন্যা, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বলল, কলেজের নির্বাচন, ও তো আগে থাকতেই সদস্যরা নির্বাচিত, নির্বাচনের আগেই। এ তো একোল মণ্ডিয়াল নয়, দেশি কলেজে নতুন সদস্যদের অনেক হ্যাপা, মেয়ে সদস্য হলে যা হয় তা মেয়েরাই বলতে পারে, বেবি বয়। ”

    রিমা খান নোট নিলেন, এই ছোঁড়ার পরিবারে কেউ লেখক-টেখক ছিল কিনা তার খোঁজ নিতে বলতে হবে ভোমসোকে ; খাতায় রোজনামচার বদলে উপন্যাস লিখছে যেন। কিংবা রেকর্ড রাখছে কোনও কারণে। কিন্তু কারোর মার্ডারের এফ আই আর তো হয়নি ; হয়েছে তিনজনের উধাও হবার, পিচ্চি আর ওর মা-বাপের।

    “ভোট ? তোমার তো এখনও ভোট দেয়া হয়নি ? যাকগে, তোমার ঘরে চলো, তোমাকে আমার নেকেডনেস দেখাবো, তুমি দেখবে, তোমাকে আমি দেখাব যে সব সময়ে রক্ত বেরোয় না। তুমি যে গানগুলো বাজাও আমি তা গাইতে পারি। চলো, শোনাবো তোমাকে। দুজনে মিলে নাচাও যেতে পারে গানের তালে তালে। ”

    “পিচ্চির মনে পড়ল, অ্যাডভোকেট মশায় সাবধান করে দিয়েছেন, যেন ভাড়াটে কনে আর কইন্যা ওকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে না দেয় ; প্রেম আর প্রেমের জাল দুটো আলাদা ব্যাপার -- প্রেমের জাল মানে সেক্স করে প্রেগনেন্ট হয়ে সম্পত্তির দাবিদার হবার চেষ্টা। বাড়ির লোভে ফাঁসাতে পারে ; কালো কনেও একই প্রোপোজাল দিয়েছে। ফাঁসাকগে, নিজেকে নিঃশব্দে বলল পিচ্চি, দুজন একই সঙ্গে প্রেগন্যান্ট হলে সুবিধে।”

    “তুমি কি আমাকে তোমার প্রেমের জালে ফাঁসাতে চাইছ, জিগ্যেস করল পিচ্চি, কইন্যার চোখের দিকে কাছ থেকে তাকিয়ে। ফর্সা তখন মাথা ঘুরিয়ে পিচ্চির দিকে বুক এনেছে, কাছাকাছি। ”

    রিমা খান নোট নিলেন, এই তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরাবার গল্পটা কেন ঢোকাচ্ছে বারবার, কোনো ইশারা দিতে চাইছে কি ছোঁড়াটা ?

    “হ্যাঁ, ধরে নাও চাইছি, স্কার্ট-ইজের পরা বউ আর তার ট্রাউজার-স্কুলশার্ট ইউনিফর্ম পরা স্বামী, বেশ মানাবে কিন্তু, তোমার টাকায় উদয়পুরের হোটেলে গিয়ে বিয়ের পার্টি দেয়া যাবে। ”

    “তোমার নাম কি, পিচ্চি জিগ্যেস করলো কইন্যাটিকে। ”

    “আমার নাম ওলেঙ্কা, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বলল কইন্যা, কোমরে দুই হাত রেখে, পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে। ”

    “কালো কনের নাম বিন্নি, বলে, পিচ্চি জিগ্যেস করল, আচ্ছা উলঙ্গ হবার কি কোনো রঙ হয় ? কালো বলে তার নগ্নতার রঙ কালো হবে এমন তো কোনো তর্ক হতে পারে না ! তোমার নেকেডনেসের রঙের সঙ্গে ওই কালো কনের নেকেডনেসের পার্থক্য হয়তো নেই। ”

    “তা ঠিক, বলল ওলেঙ্কা, নগ্নতার রঙ হয় না। যারা কখনও কোনো নগ্নদেহকে নিজের দেহ দিয়ে ঢাকেনি বা অন্যের দেহ দিয়ে নিজের নগ্নতাকে ঢাকেনি, তাদের কাছে নগ্নতার রঙ থাকতে পারে। ”

    “ওলেঙ্কা ? আরে, আমার বেডরুমের ভেতর দিয়ে ইকোল মণ্ডিয়ালে পৌঁছোবার যে রাস্তা আছে, তার শেষে যে বিশাল নদী, নদীতে নৌকো বাঁধা আছে, তাতে যে দুটো মেয়ে আমাকে ডাক দেয়, দেখতে উবহু তোমার আর বিন্নির মতন, তাদের নামও ওলেঙ্কা আর বিন্নি, কিন্তু তাদের দেশে মেয়েরা বুক খোলা রাখে। ”

    “পিচ্চি সত্যি কথাই বলেছে। আমি ওর পেছন-পেছন গিয়ে নিজের চোখে দেখেছি। আমি তো লেখক, লেখকের কাজ উন্মচিত করা কিংবা দেখা, তাই দেখতেই হয়েছে। লিখতে হলে সৎ হতে হয়, এমনকিছু লিখে ফেলতে হয় যা কেউ কখনও পড়বে না, নিজের জীবন সম্পর্কে যা ভাবছো তা কাউকে জানতে দেবে না, অন্যদের জীবনকে পড়তে হবে, তাদের ছাপা-জীবন নয়, সামনে থেকে দেখা জীবন, লিখে যেতে হবে যাহোক আবোল তাবোল, রোজ একটু, এক চিলতে যা কেউ কখনও জানবে না। আমি তাই সবায়ের দিকে নজর রাখি। নিজের চোখে দেখি আর লিখি। ”

    রিমা খান নোট নিয়ে রাখলেন, ভোমসোকে সঙ্গে নিয়ে পিচ্চির ঘরটা ইনভেসটিগেট করতে হবে আর পিচ্চি কেন একজন লেখকের কথা উল্লেখ করছে সেটাও রহস্য।

    “ জিভে ঠোট বুলিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, চলো তাহলে, যাওয়া যাক সেই দেশে, আমি বুক খুলে রাখব। স্নানের ঘরে আয়নার সামনে রোজ খুলি, আজ তোমার চোখের সামনে খুলে রাখব, দেখবো তোমার চোখের তারায় রিফলেকশান পড়ে কিনা। দেহের স্বাধীনতাবোধ হলো ভার্জিন যুবকের সামনে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ানো, বা যুবকের পক্ষে ভার্জিন যুবতীর সামনে ল্যাঙটো হয়ে দাঁড়ানো, কোনোরকম প্রতিদানের আশা ছাড়াই, কোনো লাভের আনন্দ বা ক্ষতির আতঙ্ক ছাড়াই। তখনই স্বাধীনতা ভরে উঠবে কানায় কানায়, যাতে উপুড় করে ভরে দেয়া যায়, ভরে নেয়া যায়। ”

    “আমি তোমাকে, যখন তুমি বুক খুলে রাখবে, মা বলে ডাকব, বিন্নি এলে তাকেও মা বলে ডাকবো। তোমাদের তো দুধ নেই, তবু যা পাই তাইই খাবো, হাওয়া খাবো, পারফিউম খাবো, ঘামের নুন খাবো। ”

    “সেটাই তো হওয়া উচিত। তুমি যখন পোশাক পরে নেবে তখন তোমাকে বাবা বলে ডাকব, কেমন ? ওনাদের অ্যাবসেন্স এইভাবেই মিটুক। ”

    “ইয়েস, লেট দি সিনার্স টেক ওভার দি ওয়র্লড। ”

    “তাই হবে। জন্মে অবধি আমার ইচ্ছে করেছে পুরুষ হবার। তোমার বাবা ডাকে সেই আশ মিটিয়ে নেবো। ইনসেশচুয়াস সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলবো ; এটাই একমাত্র সাম্যবাদী সম্পর্ক, অ্যাডাম আর ইভের সম্পর্ক। ”

    “ জিভে ঠোঁট বুলিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, এই দ্যাখো, আমার কব্জিতে এই কাটার দাগ, আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম একবার, লাইফ বড়ো বোরিঙ হয়ে গিয়েছিল। আমার ধারণা ছিল না যে বাবার ক্ষুর কব্জির ওপরে চালিয়ে জীবনের ধারাটাই বদলে যাবে, বাড়ির লোকেরা সবাই আমাকে ভালোবাসবে, প্রতিবেশিরা দেখা হলে মুচকি হেসে জানতে চাইবে কেমন আছি। তারপরেও তো দিব্বি বেঁচে আছি, বেঁচে থাকতে মজা লাগছে, ভাগ্যিস কব্জিটা কেটেছিলাম। এইভাবে তুমি নিজের ভেতরের চাপ বের করে দিতে পারো, তুমি নিজেকে পালটে ফেলতে পারবে, এই যেমন এখন আমি ভালো দেখতে যুবকের সঙ্গে এক রাতের জন্য শুতে ইতস্তত করি না, নিজের মুড তো নিজেই গড়ছি, হেলাফেলায় যৌবনটা কাটিয়ে ফেলতে হবে, বুঝলে, বেবি বয় !”

    “আমি বলি কি, বেবি বয়, কেন ?”

    “তোমার কানে তো ছ্যাঁদা রয়েছে, দাঁড়াও, আমার টপ দুটো তোমার কানে পরিয়ে দিই, তাহলে ম্যাচো মনে হবে”। ওলেঙ্কা নিজের কান থেকে খুলে স্ফটিকের টপ দুটো পরিয়ে দিল পিচ্চিকে। কাছাকাছি আসার দরুন, ওলেঙ্কার শ্বাসের গন্ধে পিচ্চির লিঙ্গ দাঁড়িয়ে পড়েছিল আর বিঁধছিল ওলেঙ্কার উরুতে। ওলেঙ্কা উরু সরিয়ে বলল, “দাড়াও, সবুর করো, সবুরে মেওয়া ফলে। ”

    “পিচ্চির কানে টপ দুটো পরিয়ে দিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা পিচ্চিকে ঘিরে নাচতে আরম্ভ করল, আর গাইতে লাগল। পিচ্চিও কইন্যা ওলেঙ্কার হাত ধরে ওর গানের তালে হেড ব্যাং করে নাচতে লাগল। মেয়েটা বেশ চটচটে, ঝুরঝুরে, ফুলকো, তুলোট, শিরশিরে, ভুরভুরে, চুলবুলে।

    অনেক ভাগ্যের ফলে চাঁদ কেউ দেখিতে পায়।

    অমাবস্যা নেই সে চাঁদে দ্বিদলে তার বারাম উদয়।।

    যেথা রে সে চন্দ্র-ভুবন

    দিবারাত্রি নাই আলাপন

    কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ

    বিজলি চঞ্চলা সদায়।।

    বিন্দুনালে সিন্ধু-বারি

    মাঝখানে তার স্বর্ণগিরি

    অধর চাঁদের স্বর্গপুরী

    সেহি তো তিনি প্রমাণ জায়গায়।।

    দরশনে দুঃখ হরে

    পরশনে সোনা করে

    এমনি মহিমা সে চাঁদের

    লালন ডুবে ডোবে না তায়।।

    রিমা খান নোট নিয়ে রাখলেন, এই ওলেঙ্কা আর বিন্নি কইন্যা-কনে দুটোকে জেরা করে ওদের চরিত্র বুঝতে হবে, সমাজ পারমিসিভ হয়ে গেছে বটে, হরমোনের ট্যাবলেট আর প্রেগনেন্সি কিট বাজারে আসার দরুণ মেয়েরা নিজের বডি সম্পর্কে নির্ণয় নিচ্ছে, কিন্তু এই মেয়েটা তো বড়োই সাহসী, নাকি পিচ্চি নামে ছোঁড়াটার গাঁজাখুরি কল্পনা ! পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীর খোঁজে পিচ্চি গোয়া কিংবা হিমাচল প্রদেশে বাপের সন্ধানে চলে গিয়ে থাকতে পারে, ভোমসোকে বলতে হবে ওই দুই রাজ্যে পিচ্চির ফোটো পাঠিয়ে খোঁজ নিতে বলতে হবে পুলিশ বিভাগকে। রিমা খান এবার তিন নম্বর খাতা পড়া আরম্ভ করলেন।

    “বাবার অঢেল টাকার মালিক আজ পিচ্চি। গার্জেন আছেন, অছি, বাবা ওনার টেঁটিয়া বন্ধু অ্যাডভোকেটকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে পিচ্চির টঙে বসিয়েছেন। গার্জেন রবিঠাকুরের গানের ভক্ত, দাড়ি গোঁফ আলখাল্লা রবিঠাকুরের, গলার আওয়াজও, শুধু চশমাটা গান্ধির। পিচ্চি জানে উনি বিয়ে করে অপগণ্ড অশিক্ষিত ছেলে পয়দা করেছেন, তারা কোনো কাজের নয় ; বউ মরে যাবার পর বিয়েও করেননি, করলেই পারতেন, আদালতের কচি এক মেয়ে-উকিল তো ওনার অ্যাসিস্ট্যাণ্ট। বেচারা অ্যাডভোকেট মন খারাপ হলে রেড লাইট এরিয়ায় গিয়ে মৌজমস্তি করেন ; অনেক সময়ে বড়ো ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে যান, তার যাতে খুঁতখুঁতুনি রোগ না হয়, মেজ না সেজ একটা ছেলের তো স্কিৎসোফ্রেনিয়া ; ওই অপগণ্ডদের জন্য বিয়ের কনে পাওয়াও কঠিন, একবার একজন কাজের মেয়েকে বড়ো ছেলের বউ হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সে কাজ ছেড়ে যাবার সময়ে গাছকোমর বেঁধে থুতনি তুলে বলে গিয়েছিল, ‘বিছানার লগে পাত্রী খুজতেসেন তো, আগে পোলারে চাকরি করানোর লগে পাঠান, পরে বিছানায় তুইল্যা কাজের মেয়ের শশুর হয়েন।”

    “পিচ্চি অ্যাডভোকেটের কথা দুবার কিংবা তিনবার শোনার আগে চোখ কুঁচকে বলে ওঠে, আজ্ঞে, আমি বলি কি, কী বললেন, আরেকবার শুনতে পেলে ভালো হয়। ”

    “পিচ্চিকে অন্য শহরে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ডুপলিকেট রবীন্দ্রনাথ, মানে পিচ্চির অছিবাবু। সম্ভবত যাতে ওনার সামনেই পিচ্চির ভাঙা গলা গমগমে না হয়ে ওঠে, বুকে-গোঁফে চুল দেখার আগেই, দেরাদুন, মুসৌরি, দার্জিলিঙ, আজমের, পিলানি, কোথাও বোর্ডিঙ কলেজে । বাড়ুক সেখানে। ”

    “পিচ্চির ঘরের ভেতর দিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে নদীর পারের স্কুলের কথা জানেন না অ্যাডভোকেট মশায় ; পিচ্চি জানায়নি ওনাকে ; জানালে উনি নির্ঘাত সঙ্গে যেতে চাইবেন। ”

    “ পিচ্চির মাথায় কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল, সেলুনের নাপিতদের কাটতে বেশ অসুবিধা হয়, তাই ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের চুল ছাঁটে। ”

    “রবিঠাকুরের একটা গান শোন, বলে, রবিঠাকুরীয় গলায় রামধুনের সুরে গেয়ে ওঠেন অ্যাডভোকেট। পিচ্চি শোনে খোনাকন্ঠী গান।”

    “টেবিলের উল্টোদিকে এক মক্কেল মুণ্ডু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বসে-বসে হাই তুলছিল, হাই মাঝখানে থামিয়ে বলে উঠল, ‘রবিঠাকুরের গানে তাড়ি আনলেন কোথ্থেকে ?’ এগান রবিবাবুর নয়, বোধ হয় কোনো আধুনিক কবির, কিংবা আপনার ছেলেদের কারোর, ওরা শুনলুম তাড়ি ধরেছে। ”

    “তুমি যদি জানতে পারো যে কী ঘটতে চলেছে, যদি জেনে যাও নিকট ভবিষ্যতে পরপর কী ঘটবে, তোমার কৃতকর্মের ফল যদি জেনে যাও, তাহলেই ভরাডুবি। তুমি হয়ে যাবে শিবের মতন চিৎ, খড় বেরিয়ে আসবে ভাসানের পর, কালীঠাকুরের পা তখন ভেসে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। তোমার খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ হয়ে যাবে, হাসাহাসি মুখ থেকে মিলিয়ে যাবে, কাউকে কখনও নিজের করে নিতে পারবে না, তা সে ওলেঙ্কা হোক বা বিন্নি বা কইন্যা-কনে দুজনেই। ”

    “অ্যাডভোকেটের কেরানি বললে, ‘স্যার আমার মনে হয়, আধুনিক সরকারি কোনো কবির, গান লিখতেন কিনা জানি না, নামটা আজকাল প্রায়ই ছেলে-ছোকরাদের মুখে শুনি কিনা; ওই যে ছোকরাগুলো দাড়ি-গোঁফ রাখে, চোখে পিচুটি, কাঁধে ঝোলা, দাঁত মাজে না, ল্যাটিন কোয়ার্টারে গিয়ে দিশি মদ খায়। ”

    “মক্কেল আদালতে মামলা লড়ছে, হারতে রাজি নয়, বললে, ‘তাহলে সেই কবি, যিনি গাছপালা নদীটদি নিয়ে লিখে গেছেন, হয়তো ছন্দের খাতিরে তাড়ি এসে গেছে।”

    “অ্যাডভোকেটের ফাইনাল নির্ণয়, ‘রবিঠাকুরের গানের সুরে গাওয়া যেকোনো গানই রবীন্দ্রসঙ্গীত। কোনো দাড়ি-গোঁফ ছেলে-ছোকরার লেখা হলেও ক্ষতি নেই ; আমার মেজ ছেলের দাড়ি আছে।’”

    “পিচ্চি বিরক্ত, হেড ব্যাং করছিল, বললে, ‘আমি বলি কি, নিজে একটা গ্র্যাজুয়েট হবার সংস্হায় ভর্তি হয়ে যাবো। ”

    “পিচ্চি জানে, রবীন্দ্রনাথ আঁকা পশ্চিমবঙ্গের উইখাওয়া মানচিত্র আঁকার চেয়ে সহজ, চুলের গোছা পেলেই হল। গান শুনে পিচ্চিও মাথা নাড়ায়, তবে রবিঠাকুরের নয়, মগজে বাজতে-থাকা মেটালগান, হেভিমেটাল, ডেথমেটাল, হোয়াইট মেটাল, জোম্বি, গোজিরা। সেই মাথা নাড়ানোকে বলে হেড ব্যাং, মাথার ভেতরে যে ব্যাঙগুলো থাকে তারা বর্ষাকাল এসে গেছে মনে করে নাচে। ”

    “টয়লেটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ল্যাংটো পোঁদে হেড ব্যাং করে পিচ্চি, যখনই ঢোকে “।

    “অ্যাডভোকেট গান্ধিছাপ চশমা টেবিলের ওপর থেকে তুলে অপ্রস্তুত কাশি কেশে নিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, ঠোঁট চেবাতে-চেবাতে, তোমাকে একোল মণ্ডিয়াল স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিল। দিশি স্কুলে তোমার বখে যাবার চান্স ছিল। এখন বলো, কোন মেয়েটাকে তোমার ভালো লাগছে, কইন্যাকে না কনেকে ? দুজনকেই নিশ্চয়ই ? তা তুমি দুজনের সঙ্গেই সম্পর্ক চালিয়ে যাও, দুজনকেই খেপে-খেপে ভালোবাসতে থাকো, ওয়ান অ্যাট এ টাইম অর বোথ টুগেদার অ্যাট দি সেম টাইম, বাসতে-বাসতে জানতে পারবে কাকে ভালোবাসা বলে, আমি তাই আইডিয়াল বডির ভাড়াটে সেলেক্ট করেছি তোমার জন্যে, নইলে তো দুটো ছোঁড়াকেও ভাড়া দেয়া যেতে পারতো। ”

    “শুনতে বিদকুটে মনে হলেও, বিপ্লবী হতে হলে প্রেমিকের রসে বুক আর অণ্ডকোষ ভরা থাকা উচিত, এই দুটো বৈশিষ্ট্য ছাড়া আসল বিপ্লবী হতে পারবে না। প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে ধ্রুবসত্য লুকিয়ে থাকে, তা বাজে হোক বা ভালো। পরিস্হিতি যতোই জটিল হোক না কেন, বাইরে থেকে লোকে তোমাকে যেভাবে ইচ্ছে যাচাই করুক না কেন, সত্যের গভীরতা এক ইঞ্চি হোক বা ডিপ টিউবওয়েলের মতন অনেক তলায়, একবার যদি হৃদয়ের ভাঙা টুকরোগুলো সেলাই করে নাও, দেখবে যে প্রথম সঙ্গমের ধাতুরসের ফোয়ারার মতন সত্যের ঝর্ণায় তুমি স্নান করছ। জীবনে সবচেয়ে আনন্দদায়ক ভাবনা হলো যে, কেউ তোমাকে ভালোবাসছে। নিজেকে ভালোবাসো, বুঝতে পারবে কাকে বলে ভালোবাসা। ”

    “ পিচ্চি বলল, চেষ্টা করছি, আধুনিক যুগের বাঙালিসমাজে বিশ্বরেকর্ড করার জন্য, ফ্রক-ইজের পরা ব্রাইড আর হাফপ্যান্ট-স্কুলড্রেস পরা গ্রুম। উদয়পুরের হোটেলে গ্র্যাণ্ড পার্টি। নয়তো লেহেঙ্গা-শাড়িতে কালো বিন্নি আর আমি লালধুতি-সবুজ পাঞ্জাবিতে, কোনো হোমস্টেতে, পাহাড়ি গ্রামে। কিন্তু কোনো মন্তর বা পুরুতের ব্যাপার থাকবে না, জাস্ট ফুলশয্যা, মানে জাস্ট শয্যা, শয্যাটাই আসল।”

    “আরে বিয়ে করতে হবে না, দুজনের সঙ্গে লিভ টুগেদার করো, বললেন অ্যাডভোকেট।”

    “জানি, আপনাকে বলতে হবে না।”

    “বই পড়ে-পড়ে, আর বাবা মা দুজনেরই চোখ খারাপ ছিল বলে পিচ্চিরও চার বছর বয়স থেকে চশমা পরতে হচ্ছে, যদিও চোখের ডাক্তার বলেছেন যে কয়েক বছরে ওর চোখের দৃষ্টি ঠিক হয়ে যাবে, তবে ও যেন নাকের ডগায় বই ঠেকিয়ে পড়ার অভ্যাস ছাড়ে, ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক, হিসট্রি চ্যানেল ও অ্যানিমাল প্ল্যানেট যেন রাত জেগে ঘর অন্ধকার করে না দ্যাখে ; পিচ্চি দিনের বেলায় অন্যের সামনে চশমা পরে না। ’

    “জ্ঞানই ক্ষমতার উৎস, খারাপ কাজ করার ক্ষমতা ; পিচ্চি জানে, ম্যাস্টারবেশন করে জেনেছে, ওর গা থেকে সেই সময়ে এক রকমের গন্ধ বেরোয়, ক্ষমতার গন্ধ, মানুষের দেহের গন্ধ নয়, অতিমানবের গন্ধ, রাক্ষসের বা দানবের বা দেবতাদের শরীরের সুগন্ধ, তা এমনই শুভ আর জৈব যে, তার কাছাকাছি হলে যে কোনো তরুণী সেই গন্ধে মোহিত হয়ে ওকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে। ’

    “অ্যাডভোকেট বললেন, মেয়ে দুটোকে পাশে বসিয়ে ট্রিপল এক্স অ্যাডাল্ট ফিল্মও দেখতে পারো তোমার কমপিউটারে, তবে তোমার মতন বয়সে বোধহয় শরীরে সাড়া জাগে না আমাদের দিনকালের মতন, তখন কম বয়সে বিয়ে হতো, সাড়া জাগতো। অ্যাডাল্ট হও, তখন নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারবে, অ্যাডাল্ট লাইফ লিড করতে পারবে। এখন যদি কিছু করি অবশ্যই প্রিকশান নেবে। কনে আর কইন্যাকেও বলে দিয়েছি প্রিকশান নিতে, ওরা অবশ্য তা জানে, কলেজ ইউনিয়ানের সদস্য হতে হলে প্রিকশান নেয়া শিখতে হয়। ”

    “স্যার আমি বলি কি, বেশ কিছুকাল ম্যাস্টারবেট করি, তার আগে নাইটফল হতো, স্বপ্নে পলিটিশিয়ানদের পোঁদ দেখতুম আর কিছু করার আগেই নাইটফল হতো, হয় এখনও, পিচ্চি বলল অ্যাডভোকেটকে। শুনে উনি অবাক হলেন না, কেননা এই উত্তরটাই চাইছিলেন। পিচ্চি বলল, এখন আমার বয়স আঠারো, রাইপ ফর অ্যাডভেঞ্চার্স, আপনি তো রেড লাইট এরিয়ায় যান নাইট শিফ্ট করতে, বড়ো ছেলেকে নিয়ে, আমাকেও নিয়ে চলুন একদিন, আই মিন একরাতে। ”

    “অ্যাডভোকেটকে পিচ্চি মিস্টার মউসিয়ান বলে ডাকতো, ওনার গান গাইবার দোষ আর ইরানি উঁচু নাকের কারণে তো বটেই, আর ছেলের সঙ্গে রেড লাইট এরিয়া ভিজিটের কারণে ; কিন্তু বাবা উধাও হবার পর ওই নামটা আর ব্যবহার করে না। তবে পিচ্চি ভাবে যে ওনার নাক ইরানি অথচ ওনার ছেলেদের নাক মোঙ্গোলিয়ান কেন । ”

    “নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো, ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট চিবিয়ে বললেন অ্যাডভোকেট, তার আগে কনে আর কইন্যার কাছে ট্রেনিঙ নিয়ে নাও।”

    “যখন কোনো লোক তোমার সঙ্গে কথা বলার সময়ে চোখের দিকে সরাসরি তাকায়, তার মানে তোমার কথাবার্তায় তার আগ্রহ আছে। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকলে তা ভয় দেখানোর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু চোখ সরিয়ে নিলে, অনবরত অন্য দিকে তাকাতে থাকলে বুঝতে হবে লোকটার তোমার প্রতি আগ্রহ নেই কিংবা বিব্রত বোধ করছে কিংবা নিজের আসল অনুভূতি লুকোতে চাইছে। ”

    “লাল রঙের টিশার্ট পরতে পিচ্চির ভালো লাগে, বুকে চে গ্বেভারার মুখ, আর গাঢ় নীল রঙের প্যান্ট, ও জানে, এই রঙে ভিড়ের ভেতরেও বাবা ওকে খুঁজে বের করতে পারতেন। ”

    “বুঝতে পারছেন তো ! আমরা সব্বাই পলাতক, কোথা থেকে পালাচ্ছি তা নিজেরা জানি না, কিংবা জানি যে নানা কারণে পালাচ্ছি, একে আরেকের সঙ্গে ধাক্কা লাগছে, তাকে ঠেলে এগিয়ে চলেছি, কোথায় তা জানি না, যে আরাম নিজের বাইরের জগত থেকে পাই, যে ক্ষমতা যোগাড় করি, নিজের জন্যেই করি, সব ক্ষমতাই নিজের জন্যে, কিন্তু অমন ক্ষমতাবোধও ফালতু, কেননা অমন ক্ষমতা থেকে লোকে নিজেকে খারাপ করে তুলেও তা জানতে পারে না। সব্বাই এই ক্ষমতাটাই চায়। খারাপ হবার আর অন্যের ক্ষতি করার ক্ষমতা। ”

    “পিচ্চির শাদা প্রাসাদবাড়িতে ওর নিজের আলাদা কয়েকটা ঘর আছে, তাতে গ্যাজেট আর বই বেশি। বাবা বিদেশে গেলেই বই আর সিডি কিনে আনতেন। পিচ্চির দাদুও জার্মানি থেকে অনেক বই আর সিডি পাঠাতেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের। এখন পুরো দোতলা পিচ্চির, ওর ভাল্লাগে না, গ্যারাজের ওপরের ঘরই ভালো । কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নি সঙ্গে থাকলে তিনজনে মিলে হেড ব্যাং করে পুরো দোতলা একশো ডেসিবালে ফাটিয়ে দিতে পারবে।”

    “পিচ্চির বাবা মিউজিয়ামের কিউরেটর ছিলেন, মানে জাদুঘরের তত্বাবধায়ক, জাদুঘরে উনি সকলের ওপরে, জাদুঘরের দেখাশোনার ভার ওনাকে দিয়েছিল সরকার। বেশি পড়াশুনা করে ফেলে তাকে কাজে লাগাবার চাকরি, টাইম পাস, দাদু বারণ করেছিলেন, তবুও। তাহলে কি মিউজিয়ামই ওনাকে প্রাগৈতিহাসিক জীবনে ফিরে যাবার ডাক দিয়েছে ? হয়তো আফ্রিকায় বা লাতিন আমেরিকায় গিয়ে গুহামানবের পলিঅ্যামোরাস জীবন কাটাচ্ছেন।”

    “অ্যাডভোকেট মশায় বলেছিলেন একদিন, গান্ধিছাপ চশমা টেবিলের ওপরে রেখে, ঠোঁট চেবাতে-চেবাতে, মানুষমাত্রেই ফিরে যেতে চায় গুহার জীবনে, স্বাধীনতায়, স্বেচ্ছাচারিতায়, তাই তো অ্যাটম বোমা নামের আগুন আবিষ্কার, নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড নামের চাকা আবিষ্কার, ডিজিটাল টেকনোলজি নামের অক্ষর আবিষ্কার, পলিঅ্যামোরাস নামের গুহাসেক্স এসেছে, আমিও ফিরে যেতে চাইছি আফ্রিকার প্রাগৈতিহাসিক জীবনে, কিন্তু ছেলেগুলোই লায়াবিলিটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, লোকে বলে ভাগ্যবানের বউ মরে, কিন্তু আমার বউ মারা যাওয়া সত্বেও ভাগ্যবান হতে পারলুম না।”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নিকে হাসাতে ভালো লাগে পিচ্চির ; ওরা যখন হাসে পিচ্চি ওদের বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে, দুজনের কারোর বুকই নাচে না। যখন পিচ্চির ঘরে গিয়ে ডেথমেটালের তালে নাচে, তখন ওদের বুকও নাচে, তার কারণ ওরা দুজনে পোশাক খুলে পিচ্চির সঙ্গে নাচে। ওরা যে আগে থাকতেই নাচ জানে, ডিসকো-ফিসকোয় গিয়ে নাচানাচি করেছে তা বুঝে ফেলেছে পিচ্চি। তিনজনে মিলে শাওয়ারের তলায় নাচে।”

    “বিন্নি বলছিল, ঠোঁটের ওপর বাঁহাত চাপা দিয়ে, ওফ তোমার নাচ দেখে এতো হাসি পায় যে গিগলিঙ ছাড়া আর কিছু করতে পারি না, কেননা তোমার ফ্যামিলি জিউয়েলও গিগল করতে থাকে নাচের সঙ্গে, যেন আমাদের দুজনকে সেলাম করছে, আমি তো হাসতে হাসতে আইসক্রিমের মতন গলে গলে ভিজে যেতে থাকি। বিন্নি মেয়েটা বেশ স্বাদু, ভেষজ, আঙটাখোলা, নাগালকাতর, মিঠুমিঠু, দোলমেজাজী, শরবতীয়া, ঝিনুকখোলা, হৃষ্টবদন। ”

    “আমিও ভিজে যাই, বুকের ওপরে দুই হাত ক্রস করে, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বলেছিল ওলেঙ্কা। “

    ভোমসোকে ওর থানায় ফোন করে এসিপি রিমা খান বললেন, ভোমসো, তুমি এই মেয়ে দুটোর পেছনে শ্যাডো লাগিয়ে খোঁজখবর নাও, এরা ছাত্রী নয় বলে মনে হয়, পিচ্চির খাতা পড়ে এটা আমাকেও স্ট্রাইক করল যে দুজনের বডি মডেলদের মতন বালিঘড়ি টাইপ কেন, আটপৌরে বাঙালি মেয়েদের মতন ঢেপসি নয় তো।

    ভোমসো বলল, খোঁজ নিয়েছি ম্যাডাম, সরি, স্যার, ওদের গাড়ি আর স্কুটি নিজেদের নামেই। তবু, আমার মনে হয় ওদের নাম ওলেঙ্কা আর বিন্নি নয়। ওরা কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না। সম্ভবত ওরা মিস ইণ্ডিয়া প্রতিযোগীতায় যোগ দিয়ে মডেল হবার জন্য শহরে এসেছিল, তারপর যা হয়, বিজ্ঞাপন বা অ্যাসাইনমেন্ট না পেয়ে ডেটিং র‌্যাকেটে ঢুকুছে, যদিও হানড্রেড পারসেন্ট শিয়োর নই।

    রিমা খান নির্দেশ দিলেন, তুমি মোটর গাড়িটার ভেতরে কোনো ক্লু পাও কিনা দেখো, হয়তো গাড়িটা সেক্সুয়াল ফুর্তিফার্তার কাজে লাগানো হয়। কিন্তু কেনই বা দুটো মডেলকে ভাড়াটে হিসাবে আনবে অ্যাডভোকেট লোকটা। ওই লোকটার পেছনেও শ্যাডো লাগিও।

    ভোমসো বলল, স্যার, মোটরগাড়িতে আমাদের ডগ স্কোয়াডের মিলি কোনো ক্লু পায়নি, মানে পিচ্চি তাতে কখনও বেড়াতে বেরোয়নি বলেই মনে হয়, ড্রাগের ট্রেসও পায়নি। পিচ্চি লোপাট হবার পর মেয়ে দুটোকে দেখে মনে হয় বেশ ভেঙে পড়েছে। ওরা গাইনাকের কাছেও গিয়েছিল, জানি না রোগ-টোগ আছে কিনা, আমি গাইনাকের ফোন নম্বর দেবো, আপনি একটু খোঁজ নেবেন, আপনার নাম শুনে তথ্য দিতে ইতস্তত করবেন না বলেই মনে হয়।

    রিমা খান বললেন ওদের মোবাইলের সিডিআর যোগাড় করে দেখতে হবে কাদের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে।

    হ্যাঁ, স্যার, তাই করব, বলল ভোমসো। কিন্তু ওরা মোবাইল ব্যবহার করে কিনা ঠিক জানি না, মালি আর দারোয়ান ওদের মোবাইল ব্যবহার করতে দেখেনি, পিচ্চি থাকতে ল্যাণ্ড-লাইন ব্যবহার করত। আর স্যার, পিচ্চির ব্যাঙ্কের লকার ভাঙতে হয়েছিল ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ নিয়ে, তাতে ওর বাবা-মায়ের চিঠি তো পাওয়া যায়নি, যেদুটো চিঠি পাওয়া গেছে আপনাকে ইমেল করে পাঠিয়েছি, ল্যাপটপে পড়ে দেখে যদি নির্দেশ দেন তো সেই পথে এগোই, আমি তো কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না।

    এসিপি রিমা খান ল্যাপটপ খুলে চিঠি পড়া আরম্ভ করলেন, কেমন যেন আগেকার দিনকালের ভাষা-মাখানো চিঠিটা:

    স্নেহের সুহৃদপপতিম,

    গত রবিবারে তুমি লাতিন কোয়ার্টারে শুনিলাম আসিয়াছিলে। আশ্চর্য সেই দিনটিতেই বহু কাল পরে আমার কামাই হইল। ইহাতে আমি খুবই কষ্ট পাইয়াছি। তুমি অনেককাল পর অথচ আসিলে ইহাকেই বলে কপাল ! কবে আবার তুমি আসিতে পারিবে জানাইও

    ইদানিং কালে কাহারও সহিত বড় একটা দেখা হয় না, তাহার মধ্যে একজনকে মিস করা বড় কষ্টের। ইতিমধ্যে একদিন লর্ড চ্যাটার্লির সহিত সাক্ষাৎ হয়, সে তাহার নব-প্রকাশিত পঞ্জিকা আমাকে দিল -- এইটি তোমার বই। আমি তাহাকে বলিলাম সুহৃদপ্রতিম এইসব কি লেখে, জেনো, পাঠক হিসাবে আমরা বলিতে পারি। তখন সে আমায়-আমাদের ( কেননা সেখানে মসিয়ঁ লাহিড়ি ও অন্যান্য ) তোমার প্রগতি পরায়ণতা বিষয়ক অনেক কথা বলিল একথা আমি কহিলাম ( আমাদের ঝাড়া ৩ -৪৫ হইতে ৭ -৩০ অবধি কোন কথা কহিতে দেয় নাই ) -- দেখ, দারিদ্র্য দুঃখ উচ্চবর্ণেরা মনে রাখে -- আর নিম্নরা ভোগে -- আর কবিতা পদ্য লেখাই একটা বিদ্রোহ -- আবার তাহার বিষয় রূপে এইসব হইবে এ আমার মোটা বুদ্ধিতে মনে হয় না ! সে তখন বহু বিষয়ে আমাদের তত্ত্ব ( তথ্য না ) বলিতে লাগিল আমরা খুবই আকর্ষিত হই ( আকৃষ্ট নহে ) মাঝে-মাঝে ( অবশ্য এখন ) মনে হইতেছিল -- হয়ত তাহার চমৎকার কন্ঠস্বরই আমাদের ভাল লাগিতেছিল। ইহাও ধ্রুব তাহার দৃষ্টিভঙ্গী যারপরনাই তীক্ষ্ণ ! তবে সে দেখিলাম আর কথা সূত্রে বড় বেশী পারসিকিউশনে ভুগিতেছে -- জানি না, ইহা তাহার লেখার বিষয়ও হইতে পারে।

    যাহা হউক এখন তোমার দিনক্ষয় -- কেমনে হইয়া থাকে। আমি ত লোকের সহিত ঝগড়া করিতে করিতে গেলাম, লুই ফিলিপে যিনি অগতির গতি ( তাই ভাবি লুই ফিলিপে, তুমি তোমরা না থাকিলে কবে শালা নিশ্চিহ্ণ হইয়া যাইতাম ) তিনি আলপস পর্বতে গিয়াছিলেন। গত পরশ্ব তাহার সহিত সাক্ষাৎ হয়। । সে বড় ধরিয়াছিল -- যদি তাহার সহিত লাতিন কোয়ার্টার যাই ! লাতিন কোয়ার্টারে ইদানিং রাত্রে যাওয়া বড় ভাবনার -- মারপিঠ রোজ করা যায় না। ও ভারী মজার কথা বলি -- তুমি মসিয়ঁ লাগুলুকে চেন কি ? ইনিও বুর্জোয়া-যম। নিজে লা ফিগারো কাগজের প্রতিপত্তিশালী কর্মী, একজন অভিমানী ! চেহারায় উচ্চবর্ণ : ফ্রেঞ্চ রিভলিউশানেতে যেমন পরচুলা ফেলিয়া দিলেই যে কোন ভদ্র, ছোটলোকদের সহিত প্রাণভয়ে কোনরূপ মিশিয়া যাইত -- ইঁহার সে উপায় নাই ( গাত্রত্বক হস্তিদন্ত মার্জিত ) ইনি কেমনভাবে -- ধরণী রক্তাক্ত হইবে -- তাহার ছবি মন্ত্রবলে জাগাইলেন। ( রাজনীতি কম্যুনিজম আছে বলিয়া আর কাহাকেও পারভার্স অ্যাবনর্মাল বলিতে হয় না ) -- অবশেষে কহিলেন আত্মস্তূতিতে -- যে আগে আমি পাঁঠা ছিলাম তাই ( মৎলিখিত ) পুস্তকই আপনাকে ঐ অবস্হা হইতে ইদানীংকার অবস্হায় আনিয়াছে। ঐ অভিমানী ব্যক্তি স্বীকার করিলেন। বিশেষে তর্ক হইত। কিন্তু আমাকে উঠিতে হয় -- আমি ভাবিয়া দেখিয়াছি -- ঠাকুর আমাকে বড় ঘরে জন্ম দিয়াছেন ফলে এই সব বাজে ব্যাপারে আমার ভাববার দরকার নাই সমষ্টিভাবে বাঁচিবার মত আমার - শালা গোয়ার্ত্তুমি নাম - পূর্ব্বজন্মকৃত পাপও নাই।

    ঠাকুর করুন তুমি ভাল থাক !

    ইতি দাদু

    চিঠিটা পড়ার পর এসিপি রিমা খান নোট নিলেন যে এটা অন্য কোনো দাদু অন্য কোনো নাতিকে লিখেছিল, হয়তো তা নিলামে কেনা হয়ে থাকবে। তাই ব্যাঙ্কের লকারে যত্ন করে রাখা হয়েছে। পরের চিঠিটা পড়ায় মন দিলেন রিমা খান।

    সুহৃদপ্রতিমেষু,

    আমি রাতে দাঁত মাজি। দাঁত মাজতে মাজতে ভাবছিলাম তোমাকে কী লিখব। চমৎকার বাড়ি পেয়েছি লণ্ডনে, ইলেকট্রিসিটি আছে, আজকাল এখানে খুব ঠাণ্ডা পড়েছে এ-সবই লেখা উচিত, কিন্তু কী দরকার। একটু আগে লেনটিল-রাইস খেলাম -- টম্যাটো কড়াইশুঁটি ডিম ইত্যাদির --- ওয়ান অব দি মাইটিয়েস্ট ডিশেস আই এভার হ্যাড -- দরকার আছে ? না। বেশ, আমি সুখী নই -- অসুখী। জীবনে কখনো সুখী বোধ করিনি। আমার অসুখী থাকার একটা অধিকারবোধও এতদিনে জন্মে গেছে -- আমি জানি -- আই হ্যাভ এভরি রাইট টু বি আনহ্যাপি, একথা বলারও দরকার নেই। কেবল আনাড়িকেই বলা যেতে পারে যে ঐ ডেলিকেট ডিশ সত্ত্বেও, সুন্দরী স্ত্রী সত্ত্বেও, নরম বিছানা, অতি উষ্ণ লেপ ও তার ধবধবে শাদা ওয়াড় সত্ত্বেও -- আরো কী কী সব সুন্দর চমৎকার যার-পর-নেই আশাতীত সত্ত্বেও -- ইত্যাদি -- যে আমি অসুখী। আমি ভালো নেই -- এ নিশ্চয়ই প্রিন্স হ্যামলেটের পোশাকেও আমাকে বোঝা যাবে।

    তোমাকে হাসতে হাসতে বলেছিলাম আমাদের মধ্যে কে আগে সুইসাইড করবে আমি জানি না। টিনাকে দেখিয়ে বলেছিলাম। বাস্তবিক আমি জানি। শুধু টিনা ও আমার মধ্যে নয় -- আই শ্যাল বি দ্য লাস্ট পার্সন টু কমিট সুইসাইড ; নট দ্যাট আই শ্যাল নট। আই শ্যাল বি দ্য লাস্ট পার্সন আই সে। কারণ আমি কাওয়ার্ড এবং এ কাওয়ার্ড ডাজ নট গিভ ইন ভেরি ইজিলি। বলাবাহুল্য সুহৃদপ্রতিম, আমি পুলিশকে ভয় করি না। আমিও অনিশ্চয়তাকে ভয় করি। যে দিকে দেখি, দেখি কিছুই ঠিক নেই। আগে ভাবতুম মানুষ ভুল জীবন কাটাচ্ছে। তা সংশোধন করে দেওয়া দরকার -- নিজের ত্রুটি ও শিক্ষার কথা লিখে। সে বালখিল্যতা কেটে গেল যথাসময়ে। এখন দেখি প্রত্যেকটি লোক নির্ভুল ও ঠিক জীবন কাটাচ্ছে। যে জন্য বিলডুংসরোমান ( যাকে বলা হয় আত্মজীবনীমূলক ) লেখার আর প্রয়োজন দেখি না। এ-কথা ঠিক যে কেউ কারো কথা শোনে না, কেউ কারো চিঠি পড়ে না। সকলেই, প্রত্যেকটি নরনারী, অ্যাডাল্ট ও অভিজ্ঞ, শিক্ষায় সম্পূর্ণ, কেউ নিউজ ছাড়া আর কিছু পড়ে না। তোমাকে যদি লিখতে পারতুম, স্নান করে এসে দেখলুম টিনা ঘরে নেই, তারপর অপেক্ষা করতে লাগলুম, বিকেলেও বসে রইলুম, বুঝতেই পারলুম প্যারিসে চলে যায়নি রাতে, প্রেতিনীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য কিনা দরজা জানলা অমন নিখুঁতভাবে বন্ধ করলুম ! রাত্রেও খেলুম না, এপাশ-ওপাশ করলুম, ভয় তো পাবোই, প্রকৃত ভয়, আমূল ভয় -- নিজের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় এমন প্রকৃত ভয় তো পাবেই, কারণ এ তো আর হিউগোর চাকরি হারাবার কি ভেরলেনের পুলিশের ভয় নয়। হায়, এ অন্য ভয়। শেষ রাত্রের দিকে একটু ঘুমিয়েও পড়লুম। পরদিন লণ্ডনময় গুঞ্জন -- পিঁপড়ের মতন সার দিয়ে লোক আসছে -- লোকে লোকারণ্য -- আমি নিজে গিয়ে সত্তর ফিট নিচে কুয়োর মধ্যে ভেসে ওঠা টিনার সবুজ স্কার্ট-পরা লাশ দেখে এলুম।

    কথার কথা বলছি। এ হতো খবর। হাজার হাজার লোক ইনটারেসটেড হতো। বন্ধুবান্ধব টিনার আত্মীয়স্বজন দাঁতে দাঁত চেপে বলত -- হারামজাদা ! আমার আত্মীয়স্বজন কিন্তু তা বলতে পারত না। তারা আমাকে জানে। জানে, আমি যা করছি তা স্বাভাবিক। আমার জন্য একটি মেয়ের জীবন নষ্ট হওয়া এমন নিষ্ঠুরতা -- এ স্বাভাবিক কারণে তারা জানে আমি অসুখী এবং একজন অসুখী লোকের যে-ভাবে বাঁচা উচিত আমি তেমনি স্বাভাবিক, ঠিক বা নির্ভুলভাবে আমি বেঁচে যাচ্ছি। বাড়ির কাছে আমার এতো কৃতজ্ঞতা সুহৃদপ্রতিম ! কত ক্ষমাহীন অন্যায় করেছি কত ব্যভিচার করেছি মা-দাদা-দিদি-বড়দা -- বিশেষত এমন কী বাবার ওপর -- বাবা ছাড়া আমাদের বাড়ির সকলেই আমাকে কখনো দোষ দেয়নি, সহ্য করেছে ও আবার তা করার সুযোগ দিয়েছেও -- এখন বিয়ের পর সবচেয়ে বেশি সুযোগ করে দেয়।

    যাক। শোনো। কেমন আছো ? হিউগো বড় বেশি নিন্দে করছে তো আমার ! সুহৃদপ্রতিম, আমার হিউগোর নিন্দে করার সুযোগ নেই। বলতে পারি না হিউগো আপনার সম্পর্কে অমুক বলেছিল বা তমুক বলেছিল। আমার ডিগনিটি নষ্ট করতে পারছি না। ভেরলেনের সম্পর্কে আপনি আমেরিকা থেকে আসার পর ও-রকম বলার জন্য আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। তার কোনো দরকার ছিল না। আমি কাপুরুষ -- জীবন আমার কাছে আর দুর্বোধ্য নয়, এজন্য আমি ভীত। আমার পুলিশের ভয় নেই। চাকরি হারালে আমি কিছুই হারাব না । আমি সম্পূর্ণ পরাজিত ও ব্যর্থ। কমপ্লিটলি ফ্রাসট্রেটেড অ্যাণ্ড অ্যাবসলিউটলি ডিস্লিউশন্ড বউ দিন আগে থেকেই। কোনো কাজ শুরু করার আগে আমি কখনো কোনো উৎসাহ বোধ করিনি। ব্যর্থ হব জানতাম বলেই এমনভাবে ব্যর্থ হলাম -- নইলে সব হিশেবেই আমি সব দিক থেকে সার্থক হয়েছি। আমার জিবনে এত আশা পূর্ণ হয়েছে -- যা সচরাচর কারো হয় না। বস্তুত আমার জীবনের ‘প্রত্যেকটি’ আশা পূর্ণ হয়েছে।

    শেষ পর্যন্ত কিনা হিউগোও আমার ওপর চটে গেল সুহৃদপ্রতিম, যার প্রতি জীবনে অজ্ঞানতও আমি নিশ্চিত কোনো অন্যায় করিনি। হিউগো সম্পর্কে আমি যে একেবারে নিশ্চিত ! প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তাকে বেছে নিতে হল দলের মধ্যে কাওয়ার্ডটিকে, বেশ, কিন্তু সে কি মনে করে আমার মুখে চোখে যে ভয়, তা পুলিশের, তা মারধোর খাবার ! হিউগো নিশ্চয় তা ভাবে।

    ইতি আপনার হিংসুটে প্রতিপক্ষ

    লর্ড চ্যাটার্লি

    রিমা খান একটা সিগারেট ধরিয়ে মনে করার চেষ্টা করলেন এই দ্বিতীয় চিঠির চরিত্রগুলোকে তিনিই ধরেছিলেন কিনা, নামগুলো, ক্রিমিনালরা যেমন গোপন করে, তেমন কিনা, আসল নাম হয়তো অন্য। তবে এই ক্রিমিনাল গ্যাঙটা বেশ বড়ো ছিল মনে হচ্ছে। তিনিই বোধহয় এদের ববিটাইজ করার ভয় দেখিয়েছিলেন, কয়েকজন ববিটাইজ হবার ভয়ে মুচলেকা দিয়েছিল। চিঠিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ফোন তুলে ভোমসোকে জিগ্যেস করলেন, তুমি এই সুহৃদপ্রতিম লোকটার খোঁজ নিয়েছ ?

    ভোমসো বলল, আজ্ঞে স্যার, অ্যাডভোকেটের নামই তো সুহৃদপ্রতিম, দারুন নাম একখানা, তিনি সুহৃদ নন, সুহৃদের মতন। চিঠি দুটো পিচ্চির লকারে পাওয়া গেছে তার কারণ সুহৃদপ্রতিমই তো ওনাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হোলডার। রিমা খান জিগ্যেস করলেন, তোমার শ্যাডোরা কোনো খবর যোগাড় করতে পেরেছে ? ভোমসো জানালো, আজ্ঞে হ্যাঁ, মেয়ে দুটোকে অ্যাডভোকেট পেয়েছেন ডেটিঙ অ্যাপ থেকে। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে রিমা খান বললেন, তুমি অ্যাডভোকেটের পেছনে যে শ্যাডো লাগিয়েছো, তা চব্বিশ ঘণ্টার করে দাও, দুজন বা তিনজনকে লাগাও লোকটার পেছনে। পিচ্চির বাবা আর মায়ের হ্যাণ্ড রাইটিঙ যোগাড় করেছ ? চিঠিগুলো ওনাদের লেখা নয় বলেই তো এখন মনে হচ্ছে। ভোমসো জবাবে জানালো, না স্যার, ওনাদের হাতের লেখার স্যাম্পল ওনাদের বাড়িতে পাইনি। আমার মনে হয় অ্যাডভোকেটের দপতরে সার্চ করলে হাতের লেখার নমুনা পাওয়া যাবে, তর জন্যে সার্চ ওয়ারেন্ট চাই। রিমা খান বললেন, তাড়াহুড়ো কোরো না, আগে কোর্টে প্রমাণযোগ্য তথ্য কালেক্ট করো। পিচ্চিদের বাড়ির সামনে আর অ্যাডভোকেটের বাড়ির সামনে সরকারি বা বেসরকারি সিসিটিভি নেই, খোঁজ নিয়েছি।

    রিমা খান ভাবছিলেন, তাঁর বিয়ে করা হয়ে উঠল না তার কারণ তিনি চাকরির শুরু থেকেই মার্ডারারদের ভালোবেসে ফেলেছেন, ভালোবেসে ফেলার দরুন উঠেপড়ে লেগেছেন তাদের ফাঁসিকাঠে ঝোলাবার প্রচেষ্টায় মেতে থাকতে, লোকটা যে হত্যাকারী তা প্রমাণ না করা পর্যন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ না করা পর্যন্ত তিনি শান্তি পাননি। খুনিকে ফাঁসির অর্ডার যখন আদালত দ্যায়, রিমা খান লক্ষ করেছেন, তখনই তাঁর অরগ্যাজম হয়, আর তা প্রতিবার হয়েছে। হত্যাকারীকে ফাঁসির হুকুম পাওয়ালে তবেই তাঁর মন ও শরীর শীতল হয়। হত্যাকারীদের এক ধরণের কারিশমা থাকে, আত্মবিশ্বাসী ক্যারিশমা, তাকে ছিঁড়ে হত্যাকারীর মুখের চামড়া তুলে ফেলতে চান উনি। যখন সাব ইন্সপেক্টর ছিলেন, তখন সব অপরাধীকে হাজতে পুরে ববিটাইজ করার হুমকি দিতেন। এক ব্যাটাকে এমন পিটিয়েছিলেন যে সে ব্যাটা মরে গেল আর উনি চাকরি থেকে সাসপেণ্ড হয়ে রইলেন বেশ কয়েক বছর। মার্ডার হওয়া একজন পুরুষের কঙ্কালের হত্যাকারীকে খুঁজে তবে চাকরি ফেরত পেয়েছিলেন। কোনো পুরুষ যদি তাঁকে আকৃষ্ট করে তাঁর মনে হয় এ লোকটা নিশ্চয়ই খুনি কিংবা ভবিষ্যতে কাউকে খুন করবে।

    রমা খান চটে গেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না, লাথিয়ে জুতিয়ে ব্যাটন ঢুকিয়ে শায়েস্তা করার অভ্যাস তাঁর যায়নি। তাতে সমস্যা আরও বেড়ে যায় জানেন তিনি, তাঁর ওপরের অফিসাররা তাঁকে সামলাতে হিমশিম খান অথচ তাঁর এই ক্ষমতাকে ব্যবহারও করতে চান, নিজেরা তা পারেন না বলে, পুরুষ হয়েও পারেন না, তাঁদের নেকনজর কেবল ঘুষের দিকে, কালো টাকা রোজগারের দিকে। নিজের হিংস্রতাকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন রিমা খান, তাঁর মা-ও বলতেন যে মেয়েমানুষের অতো রাগ-দাপট ভালো নয়, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাটাই নেই রিমা খানের। কতো মার্ডারারকে তিনি যাবজ্জীবন দিইয়েছেন, ফাঁসিকাঠের মাচান পর্যন্ত পাঠিয়েছেন, কিন্তু কেন তিনি ক্রোধোদ্দীপন সম্পর্কে চরমপন্হী, তার হদিশ পেলেন না। মনোবিদের কাছে কখনও নিজেকে সোপর্দ করতে চাননি, কেননা তা জানাজানি হলে আবার হয়তো চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে।



     

    চার নম্বর খাতায় মন দিলেন রিমা খান। মাত্র দুপাতা।

    “কেউ যদি জানতে চায়, ‘বাবা কী করতেন’, পিচ্চি তক্ষুনি মিউজিয়ামের কিউরেটার কথাটা তো বলেই, তাছাড়া, ও মনে করে যে বেশির ভাগ লোক তো বোকার হদ্দ, জাদুঘর বলতে কী বোঝায় তা জানে না, তাই গড়গড় করে বলতে আরম্ভ করে, মাঝে-মাঝে দুহাত ওপরে তুলে ইনভার্টেড কমার ইঙ্গিত করে। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নিকেও তেমন করে বোঝাতে লাগল পিচ্চি, নিজের ঘরে বিশাল পালঙ্কে বসে। ওরা দুজনে সোফায়, দুজনের হাতে বিয়ারের টিন, নিজেরা কিনে এনেছে, পিচ্চিকেও খাইয়েছে।”

    “জাদুঘর বা সংগ্রহালয় বলতে বোঝায় এমন একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে। জাদুঘরে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুসমূহ সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করা হয় এবং সেগুলি প্রদর্শ আধার বা ডিসপ্লে কেসের মধ্যে রেখে স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে জনসাধারণের সমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ বড়ো জাদুঘরই প্রধান শহরগুলিতে রয়েছে। অবশ্য ছোটো শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলেও স্থানীয় জাদুঘর গড়ে উঠতে দেখা যায়।

    অতীতকালে জাদুঘরগুলো গড়ে উঠত ধনী লোকদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগে কিংবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে। এই সব জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকত শিল্পকর্ম, দুষ্প্রাপ্য ও আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক বস্তু বা পুরাবস্তু। সারা বিশ্বেই জাদুঘর দেখা যায়। প্রাচীনকালে গড়ে ওঠা আলেকজান্দ্রিয়ার জাদুঘর ছিল আধুনিককালের স্নাতক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতন। বিশিষ্ট অভিধানকার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাশের মতে, বাংলায় "জাদুঘর" কথাটি আরবি আজায়ব্ ঘর বা আজায়ব্ খানা শব্দটি থেকে এসেছে। বাংলায় "জাদুঘর" কথাটির অর্থ হল, "যে গৃহে অদ্ভুত অদ্ভুত পদার্থসমূহের সংগ্রহ আছে এবং যা দেখিয়া মন্ত্রমুগ্ধবৎ হ’তে হয়। অভিধান মতে, "জাদুঘর" শব্দের অর্থ, "যে-ঘরে নানা অত্যাশ্চর্য জিনিস বা প্রাচীন জিনিস সংরক্ষিত থাকে।" ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে। শব্দটির মূল উৎস গ্রিক শব্দ মউজিয়ন ; যার মানে গ্রিক পুরাণের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক মিউজদের মন্দির। প্রাচীন গ্রিসে এই জাতীয় মন্দিরগুলোকে কেন্দ্র করে লাইব্রেরি এবং শিল্প পুরাকীর্তির সংগ্রহশালাও গড়ে উঠতে দেখা যেত। ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই জাতীয় একটি জাদুঘর। অ্যাথেন্সে প্লেটো প্রথম একটি মিউজিয়াম গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন। যদিও পসেনিয়াসের রচনায় অন্য একটি স্থানকে মিউজিয়াম বলে অভিহিত করা হয়েছে। এটি হল ধ্রুপদি অ্যাথেন্সে অ্যাক্রোপোলিসের উল্টো দিকে একটা ছোটো পাহাড়, আমি দেখে এসেছি। লিজেণ্ড হল যে, মউসিয়াস নামে একজন লোক এই পাহাড়ে বসে গান গাইতেন। বুড়ো বয়সে তিনি সেখানেই মারা যান আর সেই পাহাড়েই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর নামানুসারে পাহাড়টির নামকরণ হয়েছিল মউসিয়ন। ”

    “মুখস্ত বুলি ফুরোলে পিচ্চি ছুটে গিয়ে নিজের ল্যাপটপ এনে দেখালো কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নিকে, গ্রিসে, মিশরে, কোথায় কোথায় ও গিয়েছিল মা-বাবার সঙ্গে। ”

    “পিচ্চির মা বিয়ের আগে কলেজে ইংরেজি পড়াতেন ; পিচ্চি হবার পর চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। বলতেন, ইংলিশ হলো টয়লেট পেপার কালচারের ভাষা। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নি দুজনেই চেঁচিয়ে উঠল, নো নো, আই ডোন্ট অ্যাগ্রি।”

    “আমার মা টয়লেট পেপার ইউজ করতেন ; তোমরাও পোঁদ পোঁছো কাগজে, আমি কিন্তু জল দিয়ে ছুঁচোই, আমার বাবাও জল দিয়ে ছোঁচাতেন। মা ছিলেন খ্রিস্টান আর বাবা ছিলেন হিন্দু। ছিলেন বলছি কেননা ওনারা কোনো ধর্ম মানতেন না। আমারও কোনো ধর্ম নেই, তবে জন্মের পর আমাকে সুন্নত করে দেয়া হয়েছিল, বাবার নির্দেশে, যাতে প্রেম করতে সুবিধে হয়। আচ্ছা, তোমরা তখন দেখিয়েছিলে, আমি ভেবেছিলুম জিগ্যেস করব, কিন্তু ভুলে গেছি, তোমরা দুজনেই ওখানকার চুল কামিয়ে ফেলেছো কেন ?”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, কামিয়ে ফেলিনি, লোমনাশক মাখিয়ে নিকেশ করি, তাতে তোমাদের মতন প্রেমিকদের আনন্দ হবে, জায়গাটাও হ্যাপি থাকবে, আর আমরাও স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধার সময়ে পরিষ্কার থাকবো, নয়তো চুলে-রক্তে একাকার জবজবে হয়ে গেলে বসতে অসুবিধা হবে।”

    “তাহলে রিজিয়া সুলতানা, নুরজাহান, মুমতাজ মহল, ওনারা সিংহাসনে বসতেন কেমন করে?”

    “তা ঠিক, এই বিষয়ে হিস্টরিয়ানরা কিছু লিখে যাননি, ভবিষ্যতে কেউ লিখবেন হয়তো, এখন পিএইচডি না করলে প্রফেসারি পাওয়া কঠিন, আর বিষয়বস্তুও কমে আসছে। বলল পিচ্চি।”

    “পিচ্চির কী মজার ছোটোবেলা ছিল, ওর মায়ের শেষ বাবা একজন জার্মান সাহেব। মায়ের বাঙালি বাবা মারা যাবার পর পিচ্চির দিদিমা একজন জার্মান ডাক্তারকে বিয়ে করে জার্মানির বার্লিন শহরে থাকেন।”

    “পিচ্চির জার্মান দাদু বেড়াতে এলে ওর জন্যে অনেক গিফ্ট আনতেন ; একবার উনি একটা ঢিল উপহার দিয়েছিলেন, বার্লিনে যে উঁচু দেয়াল ছিল দুই জার্মানিকে দুভাগ করে, সেটা ভাঙা হলে অনেকে ইতিহাস হিসাবে পাঁচিলের টুকরো নিজেদের বাড়িতে রেখেছে। ”

    “পিচ্চি ভেবে রেখেছে যে দুই বাংলা যখন এক হয়ে যাবে তখন সীমান্তের কাঁটাতারের টুকরো ও সংগ্রহ করে রাখবে, সুযোগ পেলেই নেতাদের পোঁদে ফোটাবে ; ওর অবাক লাগে যে মানুষের পেট আর পোঁদ নেতা হলেই কেন ফুলে ফেঁপে পচা মোষের মতন হয়ে যায়। ”

    “কনে বিন্নি হাসতে হাসতে, মুখে বাঁহাত চাপা দিয়ে, ডান হাতে নিজের পেছন দিকে হাত বুলিয়ে বলল, নেতা হলে পুরুষদের পোঁদ পোয়াতি বউদের মতন ফুলে ওঠে, টাকাও ফি-বছর ফুলে ফেঁপে দেশের গোদ হয়ে যায়, প্রতিবারের নির্বাচনে নেতাদের টাকাকড়ি চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়, অথচ ইনকাম ট্যাক্স ওদের পোঁদে বাঁশ করার ঝাড় খুঁজে পায় না।”

    “পিচ্চির মা অবশ্য বলেছিলেন যে আর জোড়া লাগবে না দুই বাংলা, ছিঁড়ে-ছিঁড়ে আরও দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। সুন্দরবন ভাগাভাগি হয়ে গেছে, এক দেশের বাঘ আরেক দেশের বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম করে না, বাঘেদের গুরু ফতোয়া জারি করেছে, পুর্ব সুন্দরবনে বাঘ-বাঘিনীর আরবি নাম রাখতে হবে। বাঁদরের দলও সীমানা অনুযায়ী গোষ্ঠী তৈরি করে ফেলেছে, সীমা টপকে অন্য দল থেকে ফুসলিয়ে মাদি বাঁদর আনতে চায় না, আনলেই দলবেঁধে খামচা-খামচি খেয়োখেয়ি রক্তারক্তি বাঁদুরে দাঙ্গা শুরু হয়ে যাবে। নিজেদের দেশেই হিন্দু মুসলমান বিয়ে হলে দাঙ্গা বাধে কিংবা এক পক্ষের লোকের হাতে আরেক পক্ষ খুন হয়, সেই অবস্হায় তুই ভাবছিস দুটো দেশের বিয়ে হবে, জার্মানির হয়েছে কেননা ওদের দেশে জাঠতুতো-খুড়তুতোতে বিয়ে হয়। ”

    “জার্মান হলেও পিচ্চির সঙ্গে ভাঙা-ভাঙা বাংলায় কথা বলতেন জার্মান দাদু, আর পিচ্চি ভুল ধরিয়ে দিতো। দাদু বলতেন মানুষের ভাষা সবচেয়ে নোংরা আর ক্ষতিকর জিনিশ, মানুষের উচিত হাতিদের কাছে ভাষা শিখে নেয়া। পিচ্চি তা জানে, নইলে মানুষের মুখে থুতু থাকবে কেন ! মানুষ যদি জন্তু-জানোয়ারের মতন হতো, নিজেদের কোনো ভাষা না থাকতো, তাহলে পৃথিবীতে এতো লড়াই দাঙ্গা যুদ্ধ মারকাট খুনোখুনি হতো না। ”

    “বাবা বলেছিলেন, ভাষা যদি না থাকতো তাহলে কোনো ধর্মের বই লেখা হতো না, বুঝলি। যত্তো নষ্টের মূল হলো বই আর লেখালিখি। ককখনো বই লিখতে যাসনি, ওসব গুরুঠাকুরদেরই ভালো মানায়, কিংবা আকাশ থেকে পড়া কোনো শকুন ডিমের। আমি জানি, আমাদের যদি লড়াই করতে হয়, তাহলে সবকয়টা ধর্মের ছাদে বসে থাকা হাওয়াটার সঙ্গে লড়তে হবে। যদি ইতিহাসে খুঁজিস তাহলে দেখবি, ওই হাওয়ায় গড়া জীব পুরো মানবজাতটাকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছে, এক দলের সঙ্গে আরেক দলের মারামারি বাধায়, স্বাভাবিক প্রেরণাকে নষ্ট করে দ্যায়। টঙের হাওয়ায় গড়া জীবটা তাইই করে, আর সবকয়টা ছাদের হাওয়া তাইই করে, নিয়ন্ত্রণ, ধ্বংস, মুছে ফ্যালা আর শুভবোধকে খতম করা। ব্যাপারটা যুথের, মানব-ভেড়ার, আর এই মানব-ভেড়াগুলো কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ছাদ থেকে ওই বদ হাওয়ায় গড়া জীবটাকে নিকেশ করো, দেখবে যে মানব-ভেড়ারা অন্য বদ হাওয়ায় গড়া জীব ছাদে এনে ফেলেছে। ”

    “বাবার জাদুঘরের সিনিয়র কেরানি বলেছিল, ‘অবোকখয়, অবোকখয়, ভাষা হল অবকখয়ের সাপের বাসা। ওনার কাছ থেকেই পিচ্চি শিখেছে আঁড়ল গাঁড়ল বাঁড়ল ষাঁড়ল চাঁড়ল শব্দগুলো।’

    “পিচ্চি মায়ের ন্যাওটা ছিল বলে মা যেভাবে কথা বলতেন, পিচ্চিও সেইভাবে বলে। কারোর সঙ্গে কথা বলার আগে বা কারোর প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে পিচ্চি ওর মায়ের মতনই বলে, “আমি বলি কি”, বলে, তারপর নিজের কথাটা বলে। ”

    রিমা খানের সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছিল, আরেকটা ধরিয়ে নোট নিলেন, পিচ্চিদের বাড়ির রাস্তায় আর সলিসিটারের বাড়ির সামনে যদি সিসিটিভি থাকতো তাহলে পিচ্চি লোপাট হবার দিনের রেকর্ড দেখতে পাওয়া যেতো। যাক, পিচ্চির ল্যাপটপে ওর বাবা-মায়ের বিভিন্ন সময়ে বিদেশ ভ্রমণের ফোটো আছে। ভোমসোকে বলতে হবে পিচ্চির জার্মান দাদু আর দিদিমার ঠিকানা যোগাড় করতে।

    নিজের সম্পর্কে রিমা খানের মনে হয়, তিনি মরুভূমিতে একটা ক্যাকটাস গাছ, সেই গাছের ফুলও তো কুসুমিত হয়। তাঁর পুলিশ জীবনের প্রতিটি সফলতা হলো ক্যাকটাসের কুসুমিত হওয়া।



     

    “কনে বিন্নি, কইন্যা ওলেঙ্কা আর পিচ্চি ঘরের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে জঙ্গল এসে গেল। গাছে-গাছে বারান্দা।”

    “বাগানে, পাকাচুল কুঁজো মালির কাছ থেকে গাছে জল দেবার সবুজ পাইপ নিয়ে তিনজনে ভেজাভিজি খেলা আরম্ভ করল, হ্যা-হ্যা-হি-হি-হুহু, শাড়ি ভেজে, স্কার্ট-টপ ভেজে, ট্রাউজার ভেজে। উদয়পদ্ম, কলকে ফুল, কাঁঠালি চাঁপা, কেলি কদম, ছাগল কুঁড়ি, জংলি ঝুমকো, জবা, দাঁতরাঙা, দোপাটি, পাহাড়ি কাশ, বনচণ্ডাল, বেলি ফুল, বৈঁচি, মহুয়া, মাধবীলতা। ”

    “কাজ ভালো করতেন বলে শহরের ছোটো মিউজিয়াম থেকে বড়ো মিউজিয়ামে বদলি হয়ে গিয়েছিলেন পিচ্চির বাবা, একেবারে দুহাজার কিলোমিটার দূরের সমুদ্রের ধারের ওনার নিজের শহরে। শহরে এতো গাড়ি যে রাতের বেলায় লাল রঙের যাওয়া আর হলদে রঙের আসা দেখতে পায় পিচ্চি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বিন্নি-ওলেঙ্কাকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়ালো একটা বারান্দায়। বিন্নি বলল, তোমার সঙ্গে থাকতে-থাকতে আমি জানোয়ারের মতন তোমার পোষা হয়ে যাচ্ছি, মনে হচ্ছে আমি ফাঁদে ধরা পড়ে গেছি আর তুমি আমার মগজে বসন্তঋতু ভরে দিচ্ছ, আমাকে ভিজিয়ে ফেলছো আমারই শরীরের রসে, উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছি কখন তুমি প্রথম কামড়টা বসাবে। ”

    “পিচ্চি বলল, সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে গো, কাকে আগে কামড় দেবো, আই অ্যাম স্পয়েলড বাই চয়েসেস।”

    “ওলেঙ্কা পিচ্চিকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বলল, তুমি ডার্টি টক পারো না ? ডার্টি টক শুনলে আমি ভিজে যাই, প্রেমিকের নোংরা কথাবার্তা না শুনলে বড়ো ম্যাজমেজে লাগে। শব্দের ভেতরে যে নোংরামি থাকে তা আসলে নোংরা নয়। শরীর যদি সাড়া না দেয় তাহলে তা নোংরা। ”

    “নোংরা মানে আই লাভ ইয়োর পুসি, আই শ্যাল মেক ইউ খুশি, হোয়েন ইউ আর জুইসি, এইসব তো? অনেক জানি। হ্যাঁ, মানছি, ডার্টি টকের কাজ হলো শরীরকে তাতিয়ে তোলা। আমি বলি কি, আমাদের গরমের দেশে শরীর তো আগে থাকতেই তেতে থাকে।”

    “ গরমের ছুটিতে বাবার সঙ্গে মাঝে-মাঝে মিউজিয়ামে গিয়ে ঘরে-ঘরে একা বেড়াতে-বেড়াতে জাদুঘরের নানা জিনিস দেখতো পিচ্চি, কী লেখা আছে পড়তো, একটা মমি আর একটা ডায়নোসরের বিশাল কঙ্কালকে পিচ্চির ভালো লাগতো। আশেপাশে কোনো দর্শক না থাকলে, মুখের ব্যাণ্ডেজ খুলে মমিটা তিন হাজার বছরের ভাষায় ওর সঙ্গে কথা বলতো, কোনো রানির মমি বোধহয়, কেননা একদিন চোখ মেরে ইশারা করেছিল, মমিও লজ্জা পেতো, কোনোদিন বুকের ব্যাণ্ডেজ খুলে দেখায়নি।”

    “ওর বাবা জাদুঘরের তত্ববধায়ক ছিলেন, তাই জাদুঘরে ঢুকতে পিচ্চির কোনো টিকিট লাগতো না, হাফটিকিটও নয়। ”

    “ পিচ্চি জানে, আর সেই কথাই ও বিন্নি-ওলেঙ্কাকে বোঝাতে আরম্ভ করল, “মানুষ বললে যেমন সব রকমের মানুষ বোঝায়, চীনা, আফ্রিকানিবাসী, আরবদেশের, ইউরোপ-আমেরিকার, ব্রাজিলের রেডইনডিয়ান, ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ, তেমনই ডায়নোসর বললে পাহাড়ের মাপের সব ধরণের গিরগিটিকে বোঝায়, যেমন চারপেয়ে ব্রন্টোসরাস, ডিপলোডকাস আর ব্রাকিওসরাস, যারা গাছের পাতা আর ফলমূল খেতো, সরু গলার অনেক উঁচু ছিল তারা, যাতে তখনকার আকাশ-ছোঁয়া গাছের মগডালের পাতা আর ফল খেতে পারতো। চারপেয়ে ছোটোমাপের, ঘাসপাতা খেয়ে থাকতো যেগুলো তারা হলো স্টেগোসরাস আর অ্যাঙ্কিলোসরাস, তাদের শিরদাঁড়ার ওপরে কিংবা গায়ে গণ্ডারের বা কুমিরের চামড়ার মতন শক্ত আঁশ থাকতো। কেউই জানে না তাদের কোনো ভাষা ছিল কিনা। আমার মনে হয়, নিশ্চই ওদেরও ভাষা ছিল, তাই ওরা হাপিশ হয়ে গিয়েছে। ”

    “মানুষও একদিন পৃথিবী থেকে লোপাট হয়ে যাবে, কোনো সন্দেহ নেই পিচ্চির, ভাষা মানুষকে লোপাট করে দেবে, ভাষার মতন ক্ষতিকর বিষ আর নেই। ”

    “পিচ্চি যখন কনে বিন্নির কাঁধে ডান হাত আর কইন্যা ওলেঙ্কার কাঁধে বাঁ হাত রাখল, বিন্নি-ওলেঙ্কা প্রতিবাদ করেনি, দুজনেই পিচ্চির কোমর জড়িয়ে ওর কথা শুনতে লাগল। যেগুলো মাংসখোর ছিল তারা অতো উঁচু হোতো না, তাদের তো গাছের মগডালের পাতা খাবার দরকার ছিল না, কাছেপিঠে কোনো প্রাণী দেখলে তার ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মাংস খেয়ে নিতো, মাংস খাবার জন্য ওদের দাঁতও ছিল বেশ বড়ো-বড়ো আর ধারালো, তারা ছিল দুপেয়ে, কিন্তু ছোটো-ছোটো হাত ছিল তাদের, শরীরের হেলদোল বজায় রাখার জন্য, তাদের মধ্যে নামকরাগুলো ছিল চকোলেট রঙের টিরানোসরাস রেক্স যাদের বামপেলাত জুরাসিক পার্ক ফিল্মে দেখেছিল মাংস খাবার জন্য মানুষের পেছনে দৌড়োচ্ছে ; জুরাসিক পার্ক তো একটা বানানো গল্প, তখনকার কালে তো আর মানুষ ছিল না, বামপেলাতকে বোকা বানাবার আর জায়গা পায়নি ফিল্মঅলারা, পিচ্চির কথা ফুরোবার আগেই দুজনে জিগ্যেস করল, একসঙ্গে, তা ওদের সেক্স অর্গান সম্পর্কে কিছু জানো না?”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বললে, হ্যাঁ, ফিল্মঅলারা ভেবেছিল ডায়নোসরগুলো কোনো ভাষা জানে না, আর যতো ভাষা তা শুধু মানুষরাই জানে। টাকাকড়ি রোজগারের জন্যেও তো ভাষারই দরকার, টাকাকড়িও যতো গণ্ডোগোলের কারণ, টাকার ওপর কতো টাকা লেখা না থাকলে মানুষের উপকার হতো।”

    “ না ফিল্মে তো কোনো অর্গান দেখায়নি, কোনটা মেল কোনটা ফিমেল বোঝার উপায় ছিল না। অন্য মাংসখোরগুলো ছিল ফিকে সবুজ রঙের ভেলোসিরাপটার, স্লেট রঙের অ্যালোসরাস, স্পাইনোসরাস, ডেইনোনিকাস, আর সবুজ কারনোটরাস। পিচ্চি ভেবে পায় না এমন শক্ত-শক্ত নাম রাখার কী দরকার ছিল ! বিজ্ঞানীরাও অদ্ভুত মানুষ। সব সময়ে শক্ত শক্ত নাম রাখবে যাতে পড়া মুখস্হ করতে কষ্ট হয়। ”

    “মজার ব্যাপার হলো, পিচ্চির বাবা বলেছিলেন ওকে, ডায়নোসরদের গা সাপ আর কুমিরদের মতন ছিল ঠাণ্ডা। কুমির যেমন গা গরম করার জন্য রোদ পোয়ায়, ডায়নোসররাও গা গরম করার জন্য রোদ পোয়াতো। তখনকার সূর্যর রোদ আরও গরম ছিল। ”

    “ডায়নোসরদের সবকটা জাত লোপাট হবার দরুন পিচ্চির মন খারাপ হয়ে যায়। কেন লোপাট হল তার গল্প বাবার কাছে শুনেছে পিচ্চি, কিন্তু বিশ্বাস হয়নি। বাবা বলেছিলেন যে, একটা ধুমকেতু এসে মেকসিকোর সমুদ্রে এমন ধাক্কা মেরেছিল যে সারা পৃথিবী তার ধুলোয় ছেয়ে গিয়েছিল, সূর্য ঢাকা পড়ে পৃথিবী অনেককাল অন্ধকারে ঢাকা ছিল, অন্ধকার ছিল বলে গাছপালা রোদের আলো পায়নি, ডায়নোসররাও ঠিকমতন শ্বাস নিতে পারেনি, গাছপালা মরে যেতে থাকলে খাবার জিনিস না পেয়ে রোগা ডায়নোসররা মারা যেতে লাগলো, যে ডায়নোসররা অন্য ডায়নোসরের মাংস খেয়ে থাকতো তারা আর মাংস পেলো না, শেষে একটা-একটা করে সব ডায়নোসর পৃথিবী থেকে গায়েব হয়ে গেল, পড়ে রইলো তাদের পাথর হয়ে যাওয়া জীবাশ্ম, যাকে ভালো বাংলায় বলে ফসিল। ”

    “পিচ্চির বিশ্বাস ওরা লোপাট হয়ে গিয়েছিল ভাষা আবিষ্কারের দরুন, হয়তো এক-এক জাতের ডায়নোসরের এক-এক রকম ভাষা ছিল, যেমন আছে মানুষের বেলায়। ওরা নিশ্চই জ্ঞানী-গুণী ছিল, নয়তো নির্ঘাৎ ধর্মের বই লিখে ফেলতো। ”

    “মিউজিয়ামের মমিটা মিশর থেকে আনা, মিশরের পিরামিডে ছিল, ইংরেজরা এনেছিল, তখন নতুন জাদুঘর সাজাবার জন্য ইংরেজরা নানা দেশ থেকে নানা জিনিস লুটপাট করে এনে সাজিয়েছিল জাদুঘরকে। পিচ্চি পিরামিড দেখেছে, কিন্তু তখন ওর বয়স মোটে সাড়ে চার বছর ছিল বলে সবকিছু ততো ভালো করে মনে নেই। মমির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে পিচ্চির মনে হতো ও হয়তো হাজার-হাজার বছর আগে পিচ্চিদেরর আত্মীয় ছিল, কেননা ও শুনেছে আর পড়েছে যে সব মানুষই আফ্রিকা থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ”

    “মিশর তো আফ্রিকাতেই, তাই না ? আফ্রিকার মানুষদের মতন পিচ্চির স্বাস্হ নয় বলে ওর হিংসে হয় ওদের দেখলে। ”

    “কনে বিন্নি, বাঁ হাত দিয়ে হাসি চেপে, বলল, না না, তুমি এইরকমই বেশ, আমার কালো বেডফেলো চাই না । ”

    “শুধু মমিই নয়, পিচ্চির মনে হয় পৃথিবীতে যতো রকমের প্রাণী আছে, যতো রকমের গাছপালা আছে, সকলেই ওর আত্মীয়। আগের শহরে ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময়ে স্কুলের টিচার ডারউইন নামে একজন সাহেবের আবিষ্কারের গল্প শুনিয়েছিলেন, বোর্ডে ছবি এঁকে দেখিয়েছিলেন, গল্পটার নাম বিবর্তন। ডারউইন সাহেবের আগে বিলেতের লোকে নাকি বিশ্বাস করতো যে ভগবান সাতদিনে পৃথিবী তৈরি করেছিলেন। ডারউইন সাহেব এমন বই লিখলেন যে যারা অমন বিশ্বাস করতো তারা বেজায় চটে গিয়েছিল। কিন্তু ডারউইন সাহেব প্রমাণ করে দিলেন যে যতো রকমের প্রাণী পৃথিবীতে আছে সবাই জন্মেছে ধাপে-ধাপে, কোটি-কোটি বছর ধরে, একটা প্রাণের জন্ম থেকে বাদবাকি সব প্রাণের জন্ম হয়েছে। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা জিভে ঠোট বুলিয়ে বললে, বাইবেলের গল্পটা আমি জানি, অ্যাডাম আর ইভের বাচ্চাদের থেকে মানুষ জন্মেছে, অ্যাডাম আপেল খেয়ে পাপ করেছিল বলে, কেমনধারা গল্প বল, অ্যাঁ ? অ্যাডাম আর ইভের ছেলে-মেয়েরা তো আপন ভাইবোন, তারা সেক্স করে জগতজুড়ে এতো মানুষের জন্ম দিলে ? আর এখন ভাইবোনরা ভাইফোঁটার দিন সেক্স করলে পুলিশে ধরবে, কোনো মানে হয়, অ্যাঁ !”

    “বিন্নি বলল, শোনো শোনো হে জগৎবাসী, একদিন গড মাটি থেকে ধুলোবালি তুলে নিয়ে একজন মানুষ তৈরী করলেন আর তার নাকে ফুঁ দিয়ে প্রাণবাযু প্রবেশ করালেন যার ফলে মানুষটা জীবন্ত হয়ে উঠল, এরপর গড পূবদিকে একখানা বাগান বানালেন আর বাগানটার নাম দিলেন ইডেন আর গড তাঁর সৃষ্টি করা মানুষটাকে সেই বাগানে রাখলেন, আর সেই বাগানে গড সবরকমের সুন্দর গাছ আর ফলমূলের গাছ পুঁতলেন, বাগানের মাঝখানে গড একটা জীবনগাছ পুঁতলেন যা ভাল আর মন্দ বিষয়ে জ্ঞান দেয়, গড মানুষটিাকে বললেন বাগানের য়ে কোনও গাছের ফল তুমি খেতে পারো কিন্তু য়ে গাছ ভালো আর মন্দ বিষযে জ্ঞান দেয সেই গাছের ফল কখনও খেও না, তারপরে গড বললেন, মানুষের নিঃসঙ্গ থাকা ভালো নয়, আমি তোমাকে সঙ্গদান করার জন্যে তোমার মতন আর একজন মানুষ তৈরী করব, গড পৃথিবীর ওপরে সমস্ত পশু আর আকাশের সমস্ত পাখি তৈরি করবার জন্য ধুলোবালি ব্যবহার করলেন, গড ওই সমস্ত পশুপাখিকে লোকটার কাছে নিয়ে এলেন আর লোকটা তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম দিল, লোকটা অসংখ্য পশু পাখি দেখল কিন্তু সে তার সঙ্গদানকারী কাউকে দেখতে পেল না, তখন গড সেই মানুষটাকে গাঢ় ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন, লোকটা যখন ঘুমোচ্ছিল তখন গড তার পাঁজরের একটা হাড় বের করে নিলেন, গড সেই লোকটার পাঁজরের হাড় দিয়ে তৈরি করলেন একজন মেয়েমানুষ, আর তাকে লোকটার সামনে নিয়ে এলেন। ব্যাস শুরু হয়ে গেল আমাদের পাপ করার স্বাধীনতা।” arrowup arrowright

    “আরে, ওটা তো ধর্মের বই, ইহুদিদের ভাষা দিয়ে লেখা, ওই গল্পটাই পরে অন্য ভাষায় লেখা হয়েছে, এখন এক ভাষার মানুষ আরেকভাষার লোকের পোঁদে বোমা মারে, অথচ গল্প ওই একটা বই থেকে নেয়া, সেই অ্যাডাম আর সেই ইভের ছেলেপুলে, উত্তরে পিচ্চি বলল, গড নিজে অথচ হাওয়া। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে, দু হাতে পিচ্চিকে জড়িয়ে বলতে লাগল, খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে, দাও সাড়া দাও, এই দিকে চাও, এসো দুই বাহু বাড়ায়ে।”

    ‘কনে বিন্নি বলল, ওলেঙ্কা, দ্বার তো তোর, তুই তো খুলবি, পিচ্চি সেই ঘরে যাবে।”

    “প্রথম যেদিন ডারউইন সাহেবের গল্পটা পিচ্চি শুনেছিল, ওর মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পিচ্চির মনে হয়েছিল যে ও কেন আগেই জন্মায়নি, ডারউইন সাহেবের আগে, তাহলে ওর নামই লোকে জানতে পারতো, পিচ্চিও তো একই কথা ভাবে, প্রমাণ যোগাড়ের জন্য ডারউইন সাহেবের মতন ও-ও বাঁদুরে টুপি পরে কম্বল মুড়ি দিয়ে, দক্ষিণ আমেরিকার সমুদ্রতীরে, পাহাড়ে, সেখানকার আদিবাসিদের সঙ্গে মেলামেশা করতো। যাকগে, ডারউইন সাহেব না বললেও ও জানে সব প্রাণী আর গাছপালা একই দানা থেকে জন্মেছে, কিন্তু সেই দানার জায়গাটা দুই পায়ের মাঝখানে কেমন করে হল, তা বুঝতে পারে না পিচ্চি, ও তো রোজই আপেল খায়।”

    “ডায়নোসরদের নিয়ে ইংরেজি জুরাসিক পার্ক ফিল্মগুলো দেখেছে পিচ্চি। ডায়নোসরদের খারাপ, মাংসখেকো দেখতে ওর ভালো লাগেনি। ডায়নোসররা খারাপ হতে যাবে কেন। মানুষ তো ডায়নোসর দেখেনি, শুধু তাদের দেহ, ঠ্যাঙ, মুখের জীবাশ্ম যোগাড় করে, দাঁতের জীবাশ্ম যোগাড় করে, ডিমের জীবাশ্ম যোগাড় করে, অনুমান করে নিয়েছে দাঁতালো ডায়নোসররা খারাপ আর মাংসাশী। মানুষরা নিজেদের মধ্যে ফালতু মারামারি করে বলে ডায়নোসরদেরও মনে করেছে নিজেদের মধ্যে মারামারি করতো। পিচ্চি যদি গাছের মতন উঁচু একটা ডায়নোসর পেতো তাহলে তাকে পুষতো, তার পিঠে বসে, ঘোড়ায় বসার মতন করে, নানা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো। দেখতো গাছের মগডালগুলো কেমন হয়, মগডালে জুরাসিক আমলের পাখিগুলোর বাসায় ডিমগুলো কতো বড়ো। ”

    “পিচ্চি ঘোড়ায় চেপেছে ; ওর বাবা ওকে জার্মান দাদুর বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে ঘোড়ায় চাপিয়েছিলেন, সেই ধরণের ঘোড়াকে বলে ট্রাকেহনের, চকচকে বাদামি পিঠ, আর কেমন ঘাড় নাড়ে। তার আগে পিচ্চি জানতো না যে ঘোড়াও অনেকরকম হয়। পিচ্চি ভেবেছিল যে ঘোড়া তো ঘোড়াই, তার আবার চেহারা আর চরিত্র আলাদা হবে কেন। জার্মান দাদু একটা বই উপহার দিয়েছেন ওকে, তাতে কতো রকমের ঘোড়ার ছবি আর নাম দেয়া আছে ; দাদু কানে-কানে বলে দিয়েছিলেন যে পিঠে গদি না রেখে ঘোড়ায় চাপলে নাইটফলের মতনই ডেটাইম ফলে প্যাণ্ট ভিজে যাবে, ঘষটানি লেগে।”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা জিগ্যেস করলে, কোমরে দুই হাত রেখে,ঘোড়া কতোরকমের হয় গো ? আমরা বিয়ে করে জংলি ঘোড়ার দেশে যাবো, কী বলো, মোঙ্গোলিয়ায় আছে বোধহয়, চেঙ্গিজ খান ওই ঘোড়ায় বসে পৃথিবী জয় করেছিল, মানে বর্বরের দল মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতো নিজেদের দেশে। ”

    “কনে বিন্নি পিচ্চির কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললে, বাবর তো আরবি ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছিল আর তাতে চেপে যুদ্ধ করেছিল বলে লড়াই জিতে গিয়েছিল। তুমি আমার ওপর আরবি ঘোড়া ছোটানোর মতন চাপো। কনে বিন্নি ফোলা বুক আরও ফুলিয়ে, পিচ্চিকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে আরম্ভ করল:

    জন সমুদ্রে নেমেছে জোয়ার,

    হৃদয় আমার চড়া

    চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি—

    কোথায় ঘোড়সওয়ার?

    দীপ্ত বিশ্ববিজয়ী! বর্শা তোলো

    কোন ভয়? কেন বীরের ভরসা ভোলো?

    নয়নে ঘনায় বারে বারে ওঠাপড়া?

    চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি?হৃদয় আমার চড়া?

    অঙ্গে রাখিনা কারোই অঙ্গিকার?

    চাঁদের আলোয় চাঁচর বালির চড়া

    এখানে কখনো বাসর হয় না গড়া?

    মৃগতৃষ্ণিকা দূর দিগন্তে ডাকি?

    আত্মাহুতি কি চিরকাল থাকে বাকি?

    জনসমুদ্রে উন্মথি’ কোলাহল

    ললাটে তিলক টানো

    সাগরের শিরে উদ্বেল নোনা জল,

    হৃদয়ে আধির চড়া

    চোরাবালি ডাকি দূর দিগন্তে,

    কোথায় পুরুষকার?

    হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর!

    আযোজন কাঁপে কামনার ঘোর

    অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকার?

    হালকা হাওয়ায় বল্লম উঁচু ধরো

    সাত সমুদ্র চৌদ্দ নদীর পার—

    হালকা হাওয়ায় হৃদয় দু-হাতে ভরো,

    হঠকারিতায় ভেঙে দাও ভীরু দ্বার

    পাহাড় এখানে হালকা হওয়ায় বোনে

    হিম শিলাপাত ঝঞ্ঝার আশা মনে

    আমার কামনা ছায়ামূর্তির বেশে

    পায়-পায় চলে তোমার শরীর ঘেঁষে

    কাঁপে তনু বায়ু কামনায় থরথর

    কামনার টানে সংহত গ্লেসিয়ার

    হালকা হাওয়ায় হৃদয় আমার ধরো,

    হে দূর দেশের বিশ্ববিজয়ী দীপ্ত ঘোরসাওয়ার!

    সূর্য তোমার ললাটে তিলক হানে

    বিশ্বাস কেন বহিতেও ভয় মানে!

    তরঙ্গ তব বৈতরণী পার

    পায়-পায় চলে তোমার শরীর ঘেঁষে

    আমার কামনা প্রেতচ্ছায়ার বেশে

    চেয়ে দেখ ঐ পিতৃলোকের দ্বার!

    জনসমুদ্রে নেমেছে জোয়ার—

    মেরুচূড়া জনহীন—

    হালকা হওয়ায় কেটে গেছে কবে

    লোক নিন্দার দিন

    হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর,

    আযোজন কাঁপে কামনার ঘোর

    কোথায় পুরুষকার?

    অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গিকার?”

     

    “ পিচ্চি বলল, দেবো, দেবো, এখন তো ছাড়ো, দাও বললেই দেয়া যায় নাকি ?”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, কোমরে দুই হাত রেখে বলল, আমি সেকেন্ড ফিডল হতে রাজি নই। ”

     

         
       
          
           
           
           
          

    “হেঁই মারো মারো টান”

    “হেঁইও”

    “টগবগটগবগ”

    “হেঁইও”

    “ পিচ্চি, রেলস্টেশনের ঘোষকের কন্ঠে জানালো, অ্যাডভোকেট তোমাদের বলেছেন, আমাকে তোমরা ট্রেনিঙ দেবে, সে কথা ভুলে যাচ্ছ কেন ? তোমার সঙ্গে প্রেম করছি, স্টক ফুরিয়ে যাবে না তো ? ওলেঙ্কার জন্য কিছু স্টক বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ও অবশ্য বলেছে, ওর অঙ্গটা সব সময় খুশমেজাজী।

    “কইন্যা ওলেঙ্কা পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, বুকের ওপরে দুই হাত ক্রস করে, থুতনি ওপরে তুলে বলল, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে, আই অ্যাম দি ফার্স্ট টেন্যান্ট, বেবি বয়, আমার চান্স মিস হলো, ঠিক আছে জিরিয়ে নাও। ”

    “কনে বিন্নিও বলল, মুখে বাঁ হাত চাপা দিয়ে, আমিও, আই অ্যাম দ্য ফার্স্ট, তাই প্রেমটা সেরে ফেললুম। বিন্নি তখনও ভাইব্রেশান মোডে, শ্বাসের উল্লম্ফন চলছে, টলনমলন জারি। ”

    “পিচ্চি, পালঙ্ক থেকে উঠে, একবার বিন্নি আরেকবার ওলেঙ্কার দিকে মুখ করে জানতে চাইল, আচ্ছা, ঘোড়াদের পেনিস কত্তো লম্বা হয়, গাধা জেব্রা হাতিদেরও কতো বড়ো হয় ? সিনেমায় ডায়নোসরের ডিককে ছোটো দেখিয়েছে কেন ? ডিক তো হাড়ের তৈরি নয়, তাই জীবাশ্ম পায়নি বলে মানুষেরা ভেবেছে ডায়নোসরদের ডিকও দুচার ইঞ্চির। ব্যাটারা বোকার হদ্দ। আমার এখন নাইটফলের বয়স, তবু আমার ডিক ডায়নোসরদের চেয়ে বড়ো।

    “কই দেখাও, বলে উঠলো কইন্যা ওলেঙ্কা। ”

    “দেখে, হাতে নিয়ে, কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, অ্যাডাল্ট হলে অ্যাডাল্ট ফিল্মের লোকগুলোর মতন হবে তোমার ডিক, তখন একে আর ডিক বলা যাবে না, সুন্নত করার ফলে এটাকে অন্য নামে ডাকতে হবে। ”

    “তোমরা ট্রিপল এক্স ফিল্ম দেখো, অ্যাডভোকেট বলেছে তোমাদের সঙ্গে বসে একসঙ্গে দেখতে।”

    “তাতে কী হয়েছে, সেক্স করার আগে দেখে আনন্দ নিই, দেখতে দেখতে যে বুক ধড়ফড় করে, সেইটেই ভাল্লাগে, বলল কনে কনে বিন্নি । ”

    “যেখানে ভাল্লাগে তাকে কী বলে জানো ?”

    “মারবো মুখে একলাথি, বলল কইন্যা ওলেঙ্কা।”

    “তুমি যেই লাথি মারার জন্যে পা তুলবে, আমি চট করে বসে তোমার তাঁবুতে মাথা ঢুকিয়ে আফরিকার ম্যাপ দেখবো। ”

    “সত্যি লাথাবো কিন্তু, বাড়ির মালিক বলে ভেবো না ছাড় পেয়ে যাবে। কইন্যা ওলেঙ্কার কথা শুনে কনে বিন্নি বলল, তুই তাহলে চাইছিস যে পিচ্চি তোর তাঁবুতে ঢুকে ম্যাপ দেখুক। ”

    “পিচ্চি বিন্নি-ওলেঙ্কাকে বোঝাতে আরম্ভ করল, মানুষের বেলায় লিঙ্গ-যোনিও ভাষার জনক। তাই বিপজ্জনক। ধর্ম জানবার জন্যে যুদ্ধের সময় জার্মানরা আর দেশভাগের সময়ে দুদেশের লোকেরা লিঙ্গ দেখে যাচাই করেছিল কে কেন দলে। এখনও দাঙ্গা-ফ্যাসাদের সময়ে নুনুর ভাষা যাচাই করে মারমুখি পাবলিক। নুনুর জন্যেই তো দেশভাগ হয়েছিল। ”

    “চোখে বিস্ময় জড়ো করে কইন্যা ওলেঙ্কা বললে, তুমি কত্তো জানো বেবি বয়। আচ্ছা, অ্যানিমাল প্ল্যানেটে দেখেছি, সেক্স করার সময়ে মাদি হাতি, মাদি ঘোড়া, মাদি গাধা, ওরা তো কই আহ উহ, ওঃ করে না, কেন?”

    “পিচ্চি বলল, ওদের ভাষায় অব্যয় নেই, তাই। সেক্সে অব্যয় এনেছে আমেরিকানরা। চণ্ডীদাস, জয়দেব, ভারতচন্দ্র, আল মাহমুদে, কই অব্যয় নেই তো। ”

    “কনে বিন্নি বলল, সে যাই হোক, আমি কিন্তু রসে থইথই অব্যয় ইউজ করতে ভালোবাসি, এখন যেমন করলুম ; সেক্স মোটেই প্রায়ভেট কাজ নয়, নয়, নয়, নয়,নয়, কাজটা সামাজিক। মরদ আর মাদি যখন একজন আরেকজনের জাপটে নিজেদের ধরা দেয়, তখন মরদটা হয়ে ওঠে শিকারজীবী আর মাদিটা নিজের আনন্দের জন্য সবরকম ফন্দি খাটায়, সে তখন পরোয়া করে না কিচ্ছু। তারা দুজনে একজন হয়ে ওঠে, বিছানার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায় আত্মনিয়ন্ত্রণ, তখন শুধু ভালোবাসা, ভালোবাসা, ভালোবাসা, ভালোবাসা, আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একবারে নয়, অনেক বারের অভিজ্ঞতা। ”

    “ওফ, তুমি একখানা চিজ বটে, বলল কইন্যা ওলেঙ্কা।”

    “ইংরেজরা যখন এদেশে ছিল, সেই সময়ে ইংরেজরাই হতো কিউরেটর বা তত্ববধায়ক। পিচ্চির বাবা প্রাচীন ইতিহাস আর প্রত্নতত্ব নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছিলেন বলে উনি এই চাকরিটা পেয়েছিলেন। ”

    “জঙ্গলের অনেক ভেতরে ওরা চলে গিয়েছিল, জড়াজড়ি খেলতে-খেলতে। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা, ঘাসে শুয়ে, পিচ্চির হাত ধরে টান মেরে বলল, এসো, ঘাসের ওপরেই আমার ভাল্লাগে, সেই গুহামনবীর অভিজ্ঞতা পাবো। পিচ্চি টান সমালাতে না পেরে পড়ল কইন্যার বুকের ওপরে, তারপর যা হয়, তাই হলো, ওর স্টক নবীকরণ হয়ে গিয়েছিল। ”

    “এই জঙ্গলে ঢোকার সুবিধের জন্যেই তোমাদের ফোরফাদার এই বাড়িটা তৈরি করিয়েছিলেন, দক্ষিণখোলা, কী হাওয়া একেবারে, বলল বিন্নি। ”

    “পিচ্চির স্কুলে কেউ বলতে পারেনি কেন দক্ষিণখোলা বাড়িই চাই, কেননা সব বাড়ি তো আর অমনভাবে তৈরি হয় না, একটা ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হয়, তাতে যে ফ্ল্যাটগুলো থাকে সেগুলোর তো চারটে দিক থাকবেই, সবাই তো দক্ষিণমুখো বাড়ি পেতে পারে না। পিচ্চি নিজেই বুঝতে পেরেছিল যে আসলে দক্ষিণ দিকে থেকে এয়ারকাণ্ডিশানের মতন হাওয়া আসে, তাই সকলেই দক্ষিণখোলা ফ্ল্যাট কিংবা বাসা চায়।

    “দক্ষিণ দিকে কী আছে যে এতো হাওয়া আসে ওই দিক থেকে ! বাবার অফিসের লোকেদের প্রশ্ন করার পর পিচ্চি জানতে পেরেছিল যে দক্ষিণ দিকে সমুদ্র আছে ; সমুদ্রের খোলা হাওয়া এসে শহরটাকে ঠাণ্ডা করে তোলে। ওই দিক থেকে বৈশাখ মাসে আকাশ কালো করে যে বৃষ্টিঝড় ওঠে তাকে বলে কালবৈশাখি। ”

    “আরও দক্ষিণে হাঁটছি আমরা, কিছুক্ষণেই লাতিন আমেরিকায় পৌঁছোবো, বলল পিচ্চি। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা চেঁচিয়ে উঠল, পাগল না কি তুমি, কোথায় তোমাদের বাড়ি আর কোথায় ব্রাজিল পেরু ভেনেজুয়েলা আরজেনটিনা !”

    “আরে দ্যাখোই না তোমরা। আমি তো স্কুলে ভর্তি হবার সময়ে এই রাস্তা দিয়েই গিয়েছি। তোমরা তোমাদের নিজেদের গল্প বল তো, তখন থেকে আমার গল্প শুনছ। কোথায় আগে তোমরা ছিলে ? তোমাদের বাবা নিশ্চয়ই ভালো রোজগার করেন, এতো টাকা দিয়ে ভাড়া নিলেন। আমি তো সলিসিটারমশায়কে একটা মিনিমাম ভাড়ার কথা বলেছিলুম যাতে কেউ না আসে। সে জায়গায় দু-দুটো ডাগর যুবতী চলে এলো, তাও আবার গাঁজা পাতার নেশুড়ে। ”

    “কনে বিন্নি বলল, পিচ্চির গলা জড়িয়ে, যখন তুমি নেশা করবে, তখন একজন কালো সুন্দরী পরী তার কালো জ্যোতিতে তোমাকে মুড়ে ফেলবে, তোমার ভেতরে অনুভব করবে সেই কালো কুচকুচে শক্তিটা, কালী ঠাকুরের মতন, তুমি তার পায়ের তলায় শুয়ে পড়লেও সে জিভ বের করে থামবে না, তোমাকে যতো পেড়ে ফেলতে থাকবে তুমি ততো তার জাপটানিতে ধরা দেবে, যেমন কবিরা কবিতার নেশায় ধরা দেয়, নেশাড়ুরা নেশায়, জুয়াড়িরা জুয়ায়, তোমার আত্মা কালো হয়ে উঠবে, জীবনযাপন কালো হয়ে উঠবে, তুমি কালোর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। তুমি আর তুমি থাকবে না। তোমার চেহারা, তোমার কন্ঠস্বর, তোমার আদবকায়দা এতো কালো হয়ে যাবে যে তুমি চিনতেই পারবে না তুমি পিচ্চি না কালো আগুনের সূর্য।”

    “কনে বিন্নির কোমর জড়িয়ে পিচ্চি বলল, তাহলে তাই হোক। শিগগিরই হোক। যোগাড়-যন্তর করো আমার ভেতরটা কালো কুচকুচে করবার, এখন যেটুকু করেছ, তাতে তো কালো হয়নি, রোজ কালো হওয়া অভ্যাস করতে হবে।”

    রিমা খান খাতাটা বন্ধ করে নিজেকে বললেন, নাঃ, কিছুই নেই এই খাতায়, কেবল গাঁজাখুরি কাহিনি, হয়তো মেয়ে দুটো পিচ্চিকে ড্রাগ অ্যাডিক্ট করে তুলে থাকবে, নয়তো এই সব বিদকুটে জ্ঞানের সালতামামি লিখবে কেন। মা-বাপ সম্পর্কে কোনো উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না, ওনারা কোথায় গেলেন, কেন গেলেন। ভোমসাকে আরেকটা ফোন করতে হবে বা ওর থানায় একটা সাডন ট্রিপ দিতে হবে। আর অ্যান্টি নারকোটিক্সে জিগ্যেস করতে হবে মেয়ে দুটো সম্পর্কে ওদের কাছে কী ধরণের তথ্য আছে। পিচ্চির বাড়িতে অ্যান্টি নার্কটিক্সের লোক পাঠিয়ে দেখতে হবে ওরা ড্রাগ নিতো কিনা, নিলেও কোন ড্রাগ নিতো।

    ছয় নম্বর খাতায় মন দিলেন রিমা খান।

    “পিচ্চি কইন্যা ওলেঙ্কাকে জড়িয়ে বলল, তোমার গল্প বলো এবার ওলেঙ্কা। ”

    “ওলেঙ্কা নিজের গল্প শোনানো শুরু করল, ওর গল্পতে কালো কুচকুচে হয়ে ওঠার মতন মশলা নেই।”

    “নতুন যে শহরে ওলেঙ্কার বাবা বদলি হয়ে গিয়েছিলেন, যেখান থেকে এখন ওনারা এসেছেন পিচ্চির শহরে, সেখানে বাড়ি ভাড়া নেবার জন্য অনেক টাকা লাগতো, মায়ের মুখে শুনেছিল ওলেঙ্কা, সহজে ফ্ল্যাট পাওয়া যায় না, বাবার অফিস থেকে অনেক দূরে-দূরে বাড়ি ভাড়া পাওয়া যেতো। ”

    “পঞ্চাশ তলা, সত্তর তলা, উঁচু-উঁচু বিলডিঙে ছোটো-ছোটো ফ্ল্যাট আর তার ভাড়াও অনেক, একতলায় ফাঁকা জায়গায় গাড়ি রাখবার জন্যও ভাড়া গুণতে হতো, যদিও ওলেঙ্কার বাবার গাড়িটা ছোটো ছিল, আসার আগে বেচে দিয়েছেন। বাবা ছোটো গাড়িই কিনেছিলেন, ওরা তো মোটে তিনজন, বড়ো গাড়ি কিনে কীই বা হবে, বলেছিলেন মা। ”

    “এখানে হোস্টেলে থাকার সুবিধার জন্যে, ওলেঙ্কার জন্য স্কুটি কিনে দিয়েছেন, হোস্টেল ছেড়ে পিচ্চিদের বাড়িতে থাকতে এসেছে এতো সস্তায় বেশ কয়েকটা ঘর পাবার দরুন, আর স্বাধীনভাবে থাকার সুবিধের জন্যে, তার সঙ্গে ফাউ ভালোবাসার তরতাজা মানুষ।”

    “নতুন শহরে পৌঁছে, শুধু নিজের অফিসের কথা নয়, ওলেঙ্কাকে একটা ভালো কলেজে ভর্তির কথাও ভাবতে হয়েছিল বাবাকে। সেই কলেজের কাছাকাছি যাতে ফ্ল্যাট পাওয়া যায়। কাছাকাছি না হলেও, অন্তত বাসে করে যাতে যেতে পারে, নিজস্ব গাড়ি বা স্কুটার থাকা আজকাল খুবই দরকার, জানতো ওলেঙ্কা, কেননা চারিদিকে মেয়েদের ধর্ষণের সংস্কৃতি আরম্ভ হয়েছে। ওলেঙ্কা চায় নিজের ইচ্ছেমতন ইনটারকোর্স করতে, যাকে পছন্দ হবে তার সঙ্গে, কলেজে মেয়েরা তো তাইই করছে। গাঁজাপাতা ফোঁকাও কলেজে শিখেছে, রেভ পার্টিতে যাওয়া শিখেছে কলেজের বন্ধুদের থেকে। সাড্ডল্য হয়ে উঠেছে শহরের সংস্কৃতি অনুযায়ী।”

    “বাবার সঙ্গে ফ্ল্যাটের খোঁজে গিয়ে ওলেঙ্কা দেখেছিল ওই শহরে লোকে যদি দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাট কিনেছে কিংবা ভাড়া নিয়েছে, তাহলে দরোজার ওপরে ঝাড়ফুঁকের ফকির কিংবা ফাঙ সুইয়ের ওঝাকে দিয়ে নানা জিনিস বা ছবি লাগাতো, যাতে বাড়ির লোকে প্রতিবেশি ডাইনিদের কুনজরে না পড়ে, বাড়ির লোকেরা অসুখে-বিসুখে না পড়ে, বাড়ির লোকেদের টাকা-পয়সা নিয়ে টানাটানি না হয়, বাড়ির লোকেদের ঘাড়ে মামদো-ভুতে এসে না চাপে। ”

    “একটা ফ্ল্যাট দেখতে গিয়ে ওলেঙ্কা আর ওর বাবার চোখে পড়েছিল একজন আলখাল্লা-পরা লোক হাতের মালসায় ধুনো জ্বালিয়ে নেচে-নেচে ময়ূরের পালকের ঝাড়ু দিয়ে দক্ষিণমুখো দরোজা থেকে ভুতপ্রেতজিন তাড়াচ্ছেন। দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাটের দরোজায় তারা প্রত্যেক দিন সকালে গ্যাঁদাফুলের মালা ঝোলায়, পাতিলেবুর সঙ্গে পাঁচটা কাঁচা লঙ্কা বেঁধে ঝোলায়, সেই মালা আর লেবু-লঙ্কা পরের দিন কর্পোরেশানের আঁস্তাকুড়ে গিয়ে ফেলে দ্যায়। ওলেঙ্কা জানতে পেরেছিল, সেই শহরের লোকে বড়ো বেশি শাস্ত্রে বিশ্বাস করে ; বাড়ি বানাবার আর বাড়িতে থাকার শাস্ত্রকে বলে বাস্তুশাস্ত্র, যেমন সেক্সের শাস্ত্রকে বলে কোকশাস্ত্র। ওলেঙ্কা ওর বড়োমামুর মুখে বাস্তুঘুঘুর কথা শুনেছিল, ওই শহরে বাস্তুশাস্ত্রের কথা জানতে পারলো। ওলেঙ্কা বাস্তুঘুঘু কথাটা শুনে মনে করেছিল এমন ঘুঘুপাখি, যেগুলো গাছের ডালে বাসা বাঁধে না, মানুষের বাড়িতে এসে এখানে-সেখানে ডিম পাড়ে, পায়রাদের মতন ; ঘুঘুপাখি ওলেঙ্কা দেখেছে, পায়রার মতন দেখতে, কিন্তু গায়ের রঙটা ক্যাডবারির মিল্ক চকোলেটের মতন। কেউ-কেউ পায়রার মাংস খায় অথচ ঘুঘুপাখির মাংস খায় না, বোধহয় ঘুঘুপাখির মাংস বিটার চকোলেটের চেয়েও বিটার, করলার মতন তেতো। বড়োমামু বুঝিয়েছিলেন যে বাস্তুঘুঘু পাখিদের বলে না, মানুষদের বলে। যে আত্মীয়রা কারোর বাড়িতে গিয়ে সহজে যেতে চায় না, তাদের বলে বাস্তুঘুঘু। ওলেঙ্কার মনে হয়, সেই লোকগুলোকে খারাপ মনে করা উচিত নয়। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কাদের বাড়িতে যদি একজন বাস্তুঘুঘু থাকতো তাহলে তার সঙ্গে ও গল্প-সল্প করতে পারতো। বাড়িতে তো মা আর বাবা ছাড়া কেউ নেই। যে বউটা বাসন মাজতে আর ঘর পুঁছতে আসে, তার সঙ্গে বেশি কথা বললে সে বলতো অতোশতো জানিনে বাপু, এখুন আমার এক্কেবারে সময় নেই, আরও পাঁচটা বাড়িতে কাজ সারতে হবে। অন্য যে বউটা সকালে আর সন্ধ্যায় রান্না করতে আসতো, তার সঙ্গে ওলেঙ্কা যদি রান্না ঘরে গিয়ে কথা বলতে চাইতো, সে বলে উঠতো, এই দেখলে তো, তোমার জন্য লঙ্কা বেশি পড়ে গেল, এখন তুমিই বলবে এতো ঝাল খেতে পারিনে, কিংবা বলবে, ওহ তোমার কথায় কান দিতে গিয়ে নুন দিতে ভুলে গেছি। যারা ওই শহরে দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাট কিনতে বাধ্য হয়, তারা বাস্তুশাস্ত্রের ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে দরোজা ভেঙে আরেকটু পশ্চিম-দক্ষিণ কিংবা উত্তর-পশ্চিমের দিকে সরিয়ে নেয়। সেই ইঞ্জিনিয়ারের উপদেশ মেনে ফ্ল্যাটের ভেতরেও নানা রকমের অদলবদল করে। পায়খানার দরোজা যদি রান্নাঘরের দিকে মুখ করে হয় তাহলে পায়খানার দরোজায় বিরাট আয়না লাগিয়ে নেয়, যাতে মনে হবে রান্নাঘরের সামনে বুঝি আরেকটা রান্না ঘর রয়েছে। ওলেঙ্কার ইচ্ছা ছিল বাবা অমনই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিন যার রান্নাঘরের সামনে পায়খানার দরোজায় বিরাট আয়না বসানো আছে ; ও তাহলে নিজেকে পুরোটা আয়নায় দেখতে পেতো, রোজ আয়নার ওলেঙ্কার সঙ্গে গল্প করতো, কলেজে যাবার সময়ে তাকে টাটা করে যেতে পারতো। ”

    “অনেক ঘোরাঘুরির পর ওলেঙ্কার বাবা একটা চল্লিশতলা বিলডিঙের একত্রিশ তলায় ফ্ল্যাট পেলেন। সেই ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওলেঙ্কা নিজেকে বলেছিল, কী বোকা এখানকার লোকগুলো ; এতো উঁচুতে যদি ফ্ল্যাট হয়, তাহলে তার মুখ যেদিকেই হোক খোলা হাওয়া পাবেই, এমনকি দক্ষিণখোলা ফ্ল্যাটও ঝড় উঠলে সামলাতে পারবে না, বন্ধ কর বন্ধ কর বলে-বলে জানলা বন্ধ করতে থাকবে। এতো উঁচুতে ফ্ল্যাট, মশাও আসে না, মশাদের ডানায় ব্যথা করে এতো উঁচুতে উড়ে আসতে। চল্লিশতলা বিল্ডিং বলে সব ফ্ল্যাটেই বিশাল-বিশাল জানালা আর তাতে কাচ বসানো, কাচের রঙ কালচে, যাতে রোদের আলো এসে গায়ে জ্বালা না ধরায়, ল্যাঙটো হয়ে থাকলে কেউ দেখতে না পায়। যারা চাইবে তারা জানলা খুলে রোদ পোয়াতে পারবে। সকালের রোদের আলোয় নাকি ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, বাবা ওকে বুঝিয়েছিলেন একবার, যখন ওরা আগের শহরে থাকতো, আর সেখানে রবিবারের দুপুরে শীতের সময় বাবা গায়ে সর্ষের তেল মাখতেন। নতুন শহরে ফ্ল্যাটগুলো এতো উঁচুতে যে আগের শহরের মতন জানালায় গ্রিল বসানো নেই, চোরে অতো ওপরে উঠতেই পারবে না, ওঠেও যদি, নামতে পারবে না, নামেও যদি, গেটের ওয়াচম্যানের সিসিটিভিতে ধরা পড়ে যাবে। সেখানের পুলিশ ঘুষ নিয়ে ছাড়ার আগে বেদম পিটুনি দেয়, জানতে চায় কোন নেতার আণ্ডারে কাজ করে। ”

    “সেই শহরে শীতঋতু বলে কিছু আসেনা। লোকেরা বলে সেই শহরে চার মাস বর্ষাকাল আর আটমাস বসন্তকাল। ওলেঙ্কার বাবার আর সর্ষের তেল মাখা হতো না, লুকিয়ে মায়ের ময়েশ্চারাইজার মেখে নিতেন, জানে ও, বাবার গা থেকে সুগন্ধ বেরোয় স্নান করে বেরোলে। বাবা অবশ্য বিদেশি ডেওডোরেন্ট মাখতে ভালোবাসেন, বলেন না মাখলে, ভিড়ের দুর্গন্ধ গায়ে চেপে বসবে। সর্ষের তেল মাখার অভ্যাস ছাড়তে হয়েছে বাবাকে, তাতে মায়ের আনন্দ, মায়ের একেবারে পছন্দ ছিল না শীতকালে গায়ে সর্ষের তেল মাখা। ওলেঙ্কার বাবা বাস্তুর ইঞ্জিনিয়ারদের কথাবার্তা বিশ্বাস করেন না, আবার অবিশ্বাস করতেও ভয় পান। উনি বলতেন যে হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারো তো বাস্তুর ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শে তৈরি হয়েছিল, সেগুলো ধ্বংস হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল কেন, লোকে এখনও পর্যন্ত সেই সময়ের মানুষদের ভাষা আজও বুঝে উঠতে পারলো না। যিশুখ্রিস্টের জন্মের তিনচার হাজার আগের ব্যাপার-স্যাপার। ”

    “পিচ্চির দিকে তাকিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে, ভাষা হলো যতো নষ্টের গোড়া, তখন নিশ্চয়ই বুড়োরা বসে বসে চারটে বেদ লিখেছিল, মনু লিখেছিল মনুস্মৃতি। ভেবে দ্যাখ, মনুস্মৃতি না লিখলে ইণ্ডিয়ায় এতো হ্যাঙ্গাম হতো না জাতপাত নিয়ে, রোহিত ভেমুলা আত্মহত্যা করতো না, গোবিন্দ পানসারে, গৌরী লঙ্কেশ আর নরেন্দ্র ধাবোলকর খুন হতো না, গোরুর চামড়া ছাড়াবার জন্যে দলিতদের প্যাঁদানি খেয়ে মরতে হতো না, এখন যারা নিজেদের বলে বামুন, তারাই গোরুর চামড়া ছাড়াতো, জুতো তৈরি করতো, বিফ স্টিক খেতো, অশ্বমেধের পর ঘোড়ার মাংসের কাবাব খেতো। খুঁজে বের করেছিল কিন্তু সাহেবরা, বলেছিলেন ওলেঙ্কার বাবা, জেমস ফারগুসন নামে নীলকুঠির মালিক আর অযোধ্যার রাজার সেনাবাহিনির প্রধান আলেকজাণ্ডার কানিংহাম। অনেক সোনাদানা লুটপাটের পর ওদের হাতে আর কিছু করার ছিল না, তাই ভাঙাচোরা প্রাসাদ আর ধ্বংসাবশেষের বিষয়ে বই লিখতে গিয়ে যা যা মনে হয়েছিল ওদের, লিখে গেছে। এখনকার বাস্তুর ইঞ্জিনিয়াররা ওদের দেয়া জ্ঞান বিক্রি করে দিব্বি বড়োলোক হয়ে যাচ্ছে, কানে হিরে আর কাঁধে গেরুয়া চাদর রেখে বুকনি বিক্রি করে ব্যাটারা। ওলেঙ্কার অবশ্য ইচ্ছে ছিল যে বড়ো হয়ে ওও বাস্তুর টিচার হবে, কার বাড়ির ভেতরটা কেমন হওয়া উচিত, কোথায় কী রাখা উচিত, কোন দিকে মাথা করে শোয়া উচিত, এই সব জ্ঞান দিয়ে মোটাটাকা রোজগার করবে, পড়তে-লিখতে জানলেই হলো। কিন্তু ওলেঙ্কারর বাবা চেয়েছিলেন যে ও বড়ো হয়ে ডাক্তার হোক কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হোক ; ওলেঙ্কার তাই একেবারেই ইচ্ছা করে না বড়ো হতে, বারো বছর বয়সেই আটকে থাকতে চায়, স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধতে হতো না, তিন-চারদিন ব্যথায় কাতরাতে হতো না, অথচ পুরোনো শহর থেকে নতুন শহরে আসতে-আসতেই ও এগারো থেকে বারো বছরের হয়ে গেল, হঠাৎই পিরিয়ড আরম্ভ হয়ে গেল । ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কার বাবা ওকে বুঝিয়েছিলেন কলেজে গিয়ে ভর্তি হবার জন্য কি-কি করতে হবে, কেননা সেই বছর থেকে সরকারি নিয়ম হয়েছিল যে ছাত্র-ছাত্রী নিজেই যাবে ভর্তি হবার জন্য, বাবা-মা বা অন্য কোনো অভিভাবকের সঙ্গে আসার দরকার নেই। ”

    রিমা খান নিশ্চিত হলেন যে পুরো গল্পটা বানিয়ে বলেছে ওলেঙ্কা, ওর নাম ওলেঙ্কা নিশ্চয়ই নয়। পিচ্চি যা লিখে রেখেছে, তা থেকে মনে হয় যে সেও তেমন বিশ্বাস করতে পারেনি। মেয়ে দুটোকে এবার কাস্টডিতে নিতে হবে। ভোমসোকে বলতে হবে আদালতে তোলার জন্যে প্রমাণ যোগাড় করে রাখতে তার আগে, নয়তো জামিন পেয়ে গেলে উকিল ওদের গড়েপিটে মিথ্যের ঝুড়ি করে দেবে।

    “নিজের জীবনকে কাহিনি হিসাবে পর্যালোচনা করা আর সেই কাহিনি অন্যদের জানানোটাই মানুষকে করে তোলে মানুষ। জীবনের মানে খোঁজার জন্যেই লোকে কাহিনি ব্যবহার করে, বোঝার জন্যে, যে আমরা কে, সেই কাহিনি দিয়ে বাস্তবকে গড়ে নেয়া হয়। এই হয়েছিল, তাই ঘটেছিল, তারপর সেই ঘটনা, আমি সেখানে ছিলুম, আমি লোকটা অমুক। কাহিনি দিয়ে স্বপ্ন তৈরি করে ফেলা হয়, বর্ণনা করা হয় রোজকার সালতামামি, স্মৃতিকে বিলিয়ে দেয়া হয়, সকলের স্মৃতিই কমবেশি প্রায় একই ধরনের। তা সত্বেও নিজের জীবনের ঘটনা বর্ণনা করা সহজ নয় ; নিজের অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাসকে মিথ্যের মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে হয়, কাহিনির চরিত্ররা বর্ণনার শিকার, কাহিনিকারের লুকিয়ে রাখা জগতকে মিথ্যে দিয়ে মুড়ে রাখার চেষ্টা। যে বলছে বা লিখছে সে তা সচেতনভাবেই করে, নিজেকে ভুলতে পারে না, কাহিনি বর্ণনা করার সময়ে। ব্যাপারটা কঠিন কঠিন কঠিন কঠিন। ”

    পরের দিন সকালে এসে প্রথমে পিচ্চির সাত নম্বর খাতা পড়তে লাগলেন রিমা খান, যথারীতি সিগারেট ধরিয়ে, টেবিলের তলায় দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে। ওনার মনে হল যে পিচ্চি নিজেও বোধহয় অবিশ্বাস থেকে মেয়ে দুটো সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

    “পিচ্চি কনে বিন্নিকে বলল, তোমার জীবনের গল্প বলো, নিশ্চয়ই গামবেটে হবে, যা একখানা বোম্বেটে মেয়ে তুমি, আমাকেই রক্তাক্ত করে দিয়েছ।”

    “কনে বিন্নিদের বিলডিঙের কাছাকাছি ‘গার্লস ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কলেজ’ সবচেয়ে নামকরা ; কলেজে দরখাস্ত দিয়েছিলেন বাবা, নিজের অফিসের বেসরকারি প্যাডে। কলেজ থেকে চিঠি এসেছিল যে বিন্নি যেন আগামি মাসের তেরো তারিখে দশটা বেজে একুশ মিনিটে কলেজের মেইন গেটে এসে হাজির হয়ে যায়, গেট থেকে বিশেষ গাইড ওকে কলেজের দপতরে পৌঁছে দেবে। এই কিছুকাল আগে পর্যন্ত বাবা-মাকে গিয়ে ধরাধরি করতে হতো, ফর্ম তুলতে হতো। এখন কলেজ ইউনিয়ানের সচিবের কাছে ছাত্রীকে নিজেই ইনটারভিউ দিতে হয়, ফর্ম তোলার জন্যে ক্যাশ পেমেন্ট করতে হতো। দেখা গেলো যে অনেক ছেলে-মেয়ের বাবা-মা নিজেরা কখনও কলেজে পড়েননি, তাই বাবা-মায়ের ইনটারভিউ প্রথা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার-অনুমোদিত ছাত্র ইউনিয়ান। বিন্নির মনে হয়েছিল, বাবা-মায়ের ইনটারভিউ হলে ভালো হতো, ওর বাবা-মা তো লেখাপড়া শেখা, স্কুলে আর কলেজে পড়াশুনায় মেডেল পেয়েছিলেন দুজনেই, ভালো ইংরেজি বলতে পারেন। ছাত্র ইউনিয়ানের সচিব বিন্নির কানে কানে বলেছিল যে ওর সঙ্গে এক রাত শুলে অ্যাডমিশানের কোনো সমস্যা হবে না। বিন্নি তক্ষুনি রাজি হয়ে গিয়েছিল, শোবার অভ্যাস ওর আছে, অচেনা কারোর সঙ্গে শোবার আনন্দই আলাদা, তবে বিছানা নরম হওয়া দরকার। ঘাসে, সিমেন্টের ওপর, গাড়ির সিটে, কাঠের খাটে চলবে না, মোটেই চলবে না। তার আগে বিন্নি একা কেমন করে ইনটারভিউ দেবে ও বুঝে উঠতে পারছিল না। ওকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে মানুষের মাথার চুল প্রতিমাসে কয় সেন্টিমিটার বাড়ে, ও উত্তর দিতে পারবে না। ”

    “অথচ নতুন নিয়ম হয়েছে যে কোনো অভিভাবককে, যদি কলেজের গেটের কাছেও দেখা যায়, তাহলে ছাত্রীটিকে তক্ষুনি বিদায় করে দেয়া হবে, আর তার নাম ছাত্র ইউনিয়ানের কালো তালিকায় লিখে রাখা হবে, যাতে ভবিষ্যতে সে কলেজে ভর্তি হতে না পারে, কেবল এই কলেজে নয়, শহরের কোনো কলেজেই তার দাখিলা নেয়া হবে না। শহরের সব কয়টা কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজেদের পাহারাদারদের পাকা সড়ক পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রেখেছেন যাতে তারা নজর রাখতে পারে যে, ভর্তির সময়ে কেউ ছাত্রীর সঙ্গে আসছে কিনা, দূর থেকে পথ দেখিয়ে চলে যাচ্ছে কিনা। অমন কয়েকটা কেস ধরা পড়ার পরে সেই সমস্ত হবু ছাত্রীদের নাম কালো তালিকায় লিখে রাখা হয়েছে, তারা বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে বহু দূরের কোনো শহরে চলে গেছে যেখানে এই শহরের ছাত্র ইউনিয়ানের কালো তালিকাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। ”

    “কোনো কোনো বাবা-মা মাঝরাতে লুকিয়ে নিজেদের ছেলে মেয়েকে কলেজের পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন যাতে তারা রাস্তা হারিয়ে না ফেলে। বিন্নিকে ওর বাবা রাত দুটোর সময় কলেজের গরমের ছুটিতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিয়ে এসেছেন গেটটা, বেশ দূর থেকে, যাতে কলেজে ইউনিয়ানের পাহারাদাররা ওনাকে আর বিন্নিকে দেখতে না পায়। বাবা জিগ্যেস করেছিলেন, কী, নিজে চলে আসতে পারবি তো ? বিন্নি ঘাড় নেড়ে জানিয়েছিল যে পারবে। তবু ওর ভয় ছিল, রাস্তায় যদি ধর্ষকরা ওৎ পেতে থাকে, যদি কুড়িজন মিলে ওকে গণধর্ষন করে, সরকার তো বলবে এরকম কোনো ঘটনা আদপে ঘটেনি, কিংবা বলবে অমন ঘটনা তো কতোই হয়, কিন্তু ও কী করবে, তারপর বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য পালটে যাবে, যা এখন হয়েছে। ”

    “বাড়িতে বাবা বিন্নির পরীক্ষা নিয়েছেন যাতে ও কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে নিজেই ফর্ম ভরতে পারে, বাবার নাম, মায়ের নাম, ঠিকানা, ল্যাণ্ড লাইন নম্বর, মোবাইল নম্বর, ইমেল আইডি, উচ্চতা, বুকের ঘের, কোমরের ঘের, পাছার ঘের, পায়ের জুতোর মাপ, বডিসের সাইজ, স্যানিটারি ন্যাপকিনের মাপ, চশমার পাওয়ার, ফর্মের খোপে-খোপে ঠিকমতন ভরতে পারে। ফর্মটা কেমন তা ওর বাবা নিজে দেখেননি, তবু আন্দাজে ওকে বুঝিয়েছেন। বাবা ঘড়িতে দেখে নিয়েছেন ও প্রায় এক ঘণ্টায় ফর্ম ভরে নিতে পারে। প্রথম দিকে বিন্নির ভুল হতো, বারবার প্র্যাকটিস করে নির্ভুল ভরতে শিখে গিয়েছিল। ”

    “ফর্ম ভর্তি ছাড়াও যদি অঙ্কের ইংরেজির সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা নেয়, তাই বিন্নির বাবা বাড়িতে মোবেইল ফোনে অ্যালার্ম লাগিয়ে পরীক্ষা নিয়েছেন। প্রায় মাস খানেক লেগেছে শিখতে। তারপর সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা নিয়েছেন বাবা, যেমন পৃথিবী যে গোল তাহা কী করিয়া প্রমাণ করিবে, সূর্যের চারিধারে পৃথিবী ঘোরে নাকি পৃথিবীর চারিধারে সূর্য ঘোরে, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা কেন হয়, গ্রহণ কেন হয়, শীতকাল ও গ্রীষ্মকাল কেন হয়, পৃথিবী কোন দিকে ঘোরে, জোয়ার-ভাটা কেন হয়, এইসব। ”

    “কলেজে যাবার আগের দিন বাবা-মা বললেন, ভালো করে ঘুমিয়ে নে, বেশি চিন্তাভাবনা করিসনি, যাবার রাস্তা তোকে দেখিয়ে দিয়েছি, মোড়ে গিয়ে ছেড়ে দেবো, সোজা কলেজে চলে যাবি। বিন্নির ঘরে এয়ারকাণ্ডিশান চালিয়ে, ওর গায়ে কম্বল চাপা দিয়ে, ঘুমোতে বললেন মা। মোবাইলে অ্যালার্ম লাগিয়ে মাথার শিয়রে রেখে দিলেন। দুপাশে ওর প্রিয় সফ্ট টয়, তিন ফিটের কাঙারু আর দুই ফিটের ইগুয়ানা নিয়ে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ও ঘুমিয়ে পড়লো। ”

    “দশটা বেজে একুশ মিনিটে স্কুলের গেটে পৌঁছে গেল বিন্নি, ওর হাতে ঘড়ি ছিল, কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে ও পৌঁছে গিয়েছিল কলেজের গেটে। কলেজে পৌঁছে ও দেখলো, গেটটা সোনালি রঙের, ও হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল যে সেটা লোহার ওপরে সোনালি রঙ করা নাকি সত্যিই সোনার। গেটে কোনো দারোয়ান ছিল না বা ওয়াচম্যান, যেমন ওর আগের কলেজে ছিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো সিসিটিভি আছে কিনা যা দেখে ইউনিয়ানের নেতারা বুঝতে পারে গেটে কারা এসে দাঁড়িয়েছে, দেখলো কিছুই নেই, কেবল উঁচু গাছের সবুজ অন্ধকার জঙ্গল, গাছগুলোও অনেক-অনেক ঘেঁষাঘেঁযি, লতারা নির্লজ্জের মতন তাদের জড়িয়ে টঙে পৌঁছে গেছে। ”

    “ব্রাজিলের জঙ্গলের ক্যাসেটে ও দেখেছে এই রকমের গাছ, ওর জ্ঞান-বিজ্ঞানের বইতে এই ধরণের গাছের উল্লেখ আছে, ছবিও আছে। ওই তো তালগাছের মতন দেখতে ব্যারিগোনা, নারকেলগাছের মতন দেখতে হুয়াসাই, রবার গাছ, ব্রাজিল বাদাম -- বাদাম হয়ে আছে ডালে ডালে, উইমবাগাছ -- কি বিশাল আর কতো ওপরে উঠে গেছে, এই গাছগুলোই অন্ধকার করে দিয়েছে কলেজে ঢোকার রাস্তাটা, রেডইন্ডিয়ানরা ভাগ্যিস নেই এই শহরে, ওরা তো মনে করে এই গাছে ভুতপ্রেত থাকে, ফিকাসগাছ -- শেকড়গুলো যেন মাদুরের মতন এলানো। আর, ওহ, কতোরকমের ফুল, কতোরকমের অর্কিড, কতোরকমের প্যাশান ফ্লাওয়ার, লাল টকটকেগুলো নজরে পড়ছে বেশি। বিন্নি একটা ফুল তুলে নিজের খোঁপায় চুলে গুঁজে নিলে, বিন্নি এমন নাচতে আরম্ভ করল যেন ওর গা থেকে লিবার্টি ইকুয়্যালিটি ফ্র্যাটারনিটির সোনার গুঁড়ো ঝরে ঝরে পড়ছে, যেন ও এক্ষুনি ফরাসি বিপ্লব আর নভেম্বর বিপ্লবের পতাকা উড়িয়ে ফিরছে। ”

    “গেটে হাত দিয়ে বিন্নি বোঝার চেষ্টা করছিল সোনার কিনা, কোনো অজ্ঞাত কন্ঠস্বর লাউডস্পিকারে বলল, হ্যাঁ, মিস বিন্নি, অ্যাজ ইউ প্লিজ ওয়ান্টেড টু বি কল্ড, তুমি যথার্থ অনুমান করেছ, স্কুলের গেট সোনায় তৈরি। বিন্নি মনে-মনে নিজেকে বলল, সোনার ? কিন্তু ডাকাতরা এখনও তুলে নিয়ে যায়নি ? এদেশে কি চোর-ডাকাত-বাটপাড় নেই ! বিন্নি শুনতে পেলো কেউ বলছে, লাউডস্পিকারের মতন কন্ঠে, আপনি যথার্থ অনুমান করেছেন মিস বিন্নি, কোনো চোর-ডাকাত-বাটপাড়ের সাহস হয়নি গেট খুলে নিয়ে যাবার, তারা জানে সোনার গেট খুলে নিয়ে গেলে তাদের কেমনতর দশা হবে। ”

    বিন্নি ভাবছিল, আর কোনো ছাত্র-ছাত্রী আসেনি কেন ভর্তি হবার জন্য ! ও শুনতে পেলো কেউ ওকে নির্দেশ করে বললো, মিস বিন্নি, আপনি গেটের মধ্যে যে ছোটো গেট রয়েছে, তার ভেতর দিয়ে সোজা চলে আসুন, আপনার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ অপেক্ষা করছেন। আজকে কেবল আপনাকে ডাকা হয়েছে, প্রতিদিন একজনকে ভর্তি করার জন্য ডাকা হয়। গেটের ছোটো ফোকোর দিয়ে ঢুকে ও দেখলো, বিশাল জঙ্গল, সুন্দরবনের চেয়েও ঘন জঙ্গল, বিশাল বিশাল উঁচু গাছ, যেগুলোকে ও চিনতে পারলো না, কিন্তু শুনতে পেলো কোথাও করাত দিয়ে গাছ কাটা হচ্ছে আর গাছগুলো সশব্দে পড়ে যাচ্ছে।

    ওর বুক ঢিপ-ঢিপ করতে লাগলো, যদি কলেজ ইউনিয়ানের সচিব বা সহসচিব এই গাছগুলোর নাম জানতে চায়, ও তো সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। শালপাতার চেয়েও বড়ো-বড়ো পাতা, উঠে গেছে অনেক ওপরে, যেন ও ব্রাজিলের অ্যামাজন জঙ্গলে চলে এসেছে। গাছের ডালে-ডালে নানা রঙের ম্যাকাও পাখি দেখে বিন্নির অবাক লাগলো যে এই পাখিরা ও শহরে কোথা থেকে এলো, ওরাও কি পালকের রঙ অনুযায়ী এক-একটা ইউনিয়ান খুলেছে ! ওকে দেখে ম্যাকাও পাখিগুলোর কী আনন্দ, যেন কতোকাল থেকে চেনে। কতো রকমের রঙবেরঙের ম্যাকাও টিয়াপাখি, সবকয়টা একসাথে গাইছিল, ওয়েলকাম বিন্নি। নীল আর সোনালি রঙের ম্যাকাওপাখি, প্রায় তিন ফিট লম্বা, বড্ডো চেঁচায়। সবুজডানা লাল রঙের ম্যাকাও, ওদের ট্রেনিঙ দিলে মানুষের বন্ধু হয়ে ওঠে, কলেজ থেকে ফেরার সময় একটা এরকম ম্যাকাও বাড়িতে নিয়ে যাবে, কথা বলার মতন অন্তত কাউকে তো পাবে, যে মানুষ হয়ে জন্মায়নি। ছোট্টো হাহনের ম্যাকাও, সবুজ রঙের, ট্রেনিঙ দিলে তাড়াতাড়ি সবকিছু শিখে নিতে পারে, টিয়া পাখির মতন, কথা বলতে পারে। কালো রঙের হায়াসিন্হ ম্যাকাও, এদের পোষ মানানো বেশ কঠিন, সব সময় চায় যে ওদের খেয়াল রাখা হোক।

    পাখিগুলো বিন্নিকে পর্তুগিজ বা স্প্যানিশ ভাষায় স্বাগতম না জানিয়ে পরিষ্কার বাংলায় ওর নাম করে চেঁচাচ্ছিল, স্বাগতম মিস বিন্নি। দুটো পাখি এসে ওর কাঁধের ওপর বসে বললো, চলুন মিস বিন্নি, আপনাকে কলেজের অফিসঘরে নিয়ে যাই, আপনি তো পথ চিনে যেতে পারবেন না এই গভীর জঙ্গলে। চিন্তা করবেন না, বললো একটা ম্যাকাও পাখি, এই জঙ্গলে বিচুটিঝোপ নেই, সাপ-গিরগিটি আছে বটে, তা সেগুলো আমাদের দলের কেউ কেউ খেতে ভালোবাসে, নজর রাখে। বিন্নি জিগ্যেস করল, তা আপনাদের দেখতে এতো সুন্দর কিন্তু এরকম কর্কশকন্ঠ কেন ? লালসবুজ ম্যাকাও সবায়ের হয়ে উত্তর দিলো, আসলে কি জানেন, যাদের যতো সুন্দর দেখতে তাদের কন্ঠস্বর ততো কর্কশ হয়। বিন্নি বলল, ভুল ভুল ভুল, আমাকে দেখতে কতো সুন্দর, আমার কন্ঠস্বরও মাদার মেরির মতন, সুচিত্রা সেনের মতন, মধুবালার মতন, মাধুরী দীক্ষিতের মতন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতন।

    বিন্নি জিগ্যেস করল, অফিসঘরটা কোথায়, দেখতে পাচ্ছি না, ইউনিয়ানের সচিব বলেছিলেন তাঁর সঙ্গে শুতে, তা তিনি কোথায় ? নীল-সোনালী ম্যাকাও পাখি সবায়ের হয়ে উত্তর দিলো, ভেতরের ভেতরের ভেতরের ভেতরের ভেতরে। বিন্নি বলল, অতো ভেতরে, আচ্ছা ! এই ঘন জঙ্গলের ভেতরে কলেজের অফিস জেনে ভালো লাগলো বিন্নির। বিন্নিরর আগের শহরের কলেজে ইঁট আর সিমেন্টের অফিসঘরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে লাইন দিয়ে কেরানিবাবুকে প্রশ্ন করে সবকিছু জানতে হতো, সিলিঙ ফ্যানের ক্যাঁচোর ক্যাঁচোর আওয়াজের তলায় দাঁড়িয়ে। এই কলেজটা কী সুন্দর, কতো হাওয়া, মনে হয় যেন কাছে কোনো নদী বইছে, অ্যামাজন নদীর কোনো ধারা গঙ্গার সঙ্গে মিশে এতোদূর পর্যন্ত চলে এসেছে, অবাক হয় বিন্নি। পাখিরা একজন আরেকজনের হাতে হাই ফাইভ করে বলে গুড লাক।

    অ্যামাজন নদী তো বিশাল, তার জন্যেই পঞ্চান্ন লক্ষ কিলোমিটার জুড়ে আর্দ্র জলবায়ুর অরণ্য, ষোলো হাজার রকমের গাছ আছে, ব্রাজিল ছাড়াও পেরু, কলোমবিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, বোলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম আর ফরাসি গায়ানায় ছড়িয়ে। পৃথিবীর শতকরা কুড়ি ভাগ অক্সিজেন আসে অ্যামাজনের জঙ্গল থেকে, তিনশোর বেশি রেডইন্ডিয়ান উপজাতি এখনও থাকে জঙ্গলের ভেতরে --- আরও উপজাতি ছিল, স্পেন আর পর্তুগালের সাহেবরা এসে তাদের মেরে ফেলেছিল, এখন গাছ কেটে-কেটে সাহেবরা জঙ্গলটাকে ছোটো করে ফেলছে। আর গঙ্গার ধারে হেগে হেগে ভারতীয়রা শিবের মাথার ঝর্ণায় গুয়ের গন্ধ পৌঁছে দিয়েছে।

    অ্যামাজন জঙ্গল না থাকলে কোথায় যাবে পঁয়তাল্লিশ লক্ষ প্রজাতির পোকামাকড়, চারশো আঠাশ প্রজাতির উভচর, তিনশো আটাত্তর ধরণের সাপখোপ-গিরগিটি, চারশো সাতাশ ধরণের স্তন্যপায়ী প্রাণী, নদীর তিন হাজার রকমের মাছ আর জলজ প্রাণী ! বিন্নির কাছে জানতে চাইলে ও কিছুই বলতে পারবে না ; হয়তো ছাত্র ইউনিয়ানের সচিব বলতে পারবে। আগে যে শহরে বিন্নি পড়তো সেই কলেজে তো একটাও গাছ ছিল না, খেলবার মাঠে ঘাসও ছিল না, ছাত্ররা ধুলোয় ক্রিকেট আর ফুটবল খেলতো। বিন্নির শাড়ি রোজই ময়লা হয়ে যেতো। আর এই কলেজে কেবল গাছ নয়, কতো রকমের রঙিন পাখি, কতো রকমের ফুল আর ফল।

    একটা ম্যাকাওপাখি বলল, সাবধানে পা ফেলবেন, বুনো পিঁপড়ের ঝাঁক, ট্যারানটুলা মাকড়সার বাসা, বিষাক্ত ব্যাঙ, সোয়াঁপোকা থাকতে পারে। কলেজে প্রবেশের মুখে ছাত্রীদের বুদ্ধি আর প্রত্যুৎপন্নতা পরীক্ষার জন্য এই ব্যবস্হা রাখা হয়েছে, কিন্তু আপনি আমাদের প্রিয় বলে আগেই সাবধান করে দিচ্ছি।

    শুনে ভয় করতে লাগলো বিন্নির। এ কেমন কলেজ, আর তাদের এ কেমন পরীক্ষা। প্রশ্ন করে পরীক্ষা নেবার বদলে ভয় দেখিয়ে পরীক্ষা নিচ্ছে। কিন্তু ফিরে যাওয়া যাবে না। বাবা বলবেন তুই কতো ভিতু রে ; সামান্য পিঁপড়ে, মাকড়সা, ব্যাঙ, সোয়াঁপোকার কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলি !

    ম্যাকাও দুটোকে কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিন্নি পৌঁছোলো একটা ঘোলাটে নদীর পাড়ে, সেখানে কয়েকটা ডিঙিনৌকা বাঁধা রয়েছে, তাতে রেডইন্ডিয়ান উপজাতি মাঝিরা বসে। সব কয়টা মাঝিই চেঁচাতে লাগলো, স্পষ্ট বাংলায়, শ্রীমতি বিন্নি আমার নৌকায় আসুন, কলেজে যাবেন তো, আসুন আমি সন্ধ্যা হবার আগেই পৌঁছে দেবো, কিছুক্ষণেই বৃষ্টি আসবে, আমার নৌকায় ছাউনি আছে, ভিজবেন না। এরা বোধহয় ব্রাজিল বা পেরুর উপজাতি, এরাও বাংলায় কথা বলছে, বেশ আনন্দ হলো বিন্নির। তোমরা বাংলায় কথা বলতে পারো ? অবাক বিন্নি জিগ্যেস করলো মাঝিদের।

    একজন মাঝি, যার গলায় রঙবেরঙের পুঁতির হার, বেঁটে আর মোটা, কাঁধ পর্যন্ত চুল, চোখ দুটো তুলনামূলক ভাবে ছোটো, বলল, কেন পারব না, এখন তো বাংলা ভাষা পৃথিবীর ভাষা হয়ে গেছে, এরকম মিষ্টি ভাষায় সকলেই কথা বলতে চায়, দেখলেন তো পাখিগুলোও বাংলায় কথা বলছিল। ম্যাকাওপাখিরা উড়ে ফেরত চলে গিয়েছিল। বিন্নি মাঝিদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, কলেজটা কোথায়, নৌকো করে কোথায় যাবো ? আমি তো ভেবেছিলুম গেট দিয়ে ঢুকলেই কলেজের দপতর, সেখানে ইউনিয়ানের দেয়া ফর্ম ভরে ভর্তি হয়ে যাবো। বিন্নিকে নিজের নৌকোয় নেবার জন্য একজন জিনস-আর টিশার্ট পরা মাঝি আরেকজন মাঝির দিকে হাত দেখিয়ে বলল, মিস বিন্নি, ওর নৌকোয় উঠবেন না, ওর গায়ে গনজালো পিজারোর রক্ত আছে। ব্যাস দুজন মাঝির মধ্যে হাতাহাতি আরম্ভ হয়ে গেল।

    সেই ফাঁকে যে মাঝির গলায় পুঁতির মালা আর ডিঙিতে ছাউনি ছিল, সে বিন্নিকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের ডিঙিতে বসিয়ে বলল, আপনার কোনো চিন্তা নেই বিন্নি, এখানে কোনো অঘটন ঘটে না, আপনি নিশ্চিন্তে কলেজে পৌঁছে যাবেন, রাতের ভেতরেই ভর্তিও হয়ে যেতে পারবেন। বিন্নি দেখলো ডিঙিতে ওর বয়সী বা ওর থেকে কয়েক বছর বড়ো একটা মেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ফিক-ফিক করে হাসছিল, মেয়েটার গায়ে একগাদা প্রজাপতি এসে বসছিল আর উড়ে যাচ্ছিল। ডিঙিতে ওঠার আগে খালি-গা মাঝির গায়েও অমন প্রজাপতির দল এসে কিছুক্ষণ বসছিল আর উড়ে যাচ্ছিল।

    বিন্নি মেয়েটার পাশে গিয়ে বসল, ছাউনিতে বসার জায়গা ওই পাটাতনেই। বিন্নির শহরে তো এই বয়সী মেয়েরা খালি গায়ে থাকে না। বিন্নি মেয়েটাকে জিগ্যেস করলো তোমার আর তোমার বাবার গায়ে এরকম প্রজাপতিরা এসে বসছে কেন? মেয়েটা জবাবে বলল, উনি আমার বাবা নন, আমার দাদু, বাবার বাবা। বলে, টুক করে বিন্নির ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকিয়ে চুমু খেলো। বিন্নির বেশ ভালো লাগলো, ভালো লাগার দরুন ওর সন্দেহ হল, ও নিজে বোধহয় লেসবিয়ান, এরকম ভালো তো আগে লাগেনি, স্কুলে পড়ার সময়ে কতো ছেলেকে চুমু খেয়েছিল।

    মেয়েটা আবার বিন্নির গালে ঠোঁট ঠেকালো, তারপর বলল, তুমি বেশ বোকা, কী করে ভর্তি হবে কলেজে। এই প্রজাপতিরা আমাদের ঘাম থেকে নুন খাবার জন্য আসে। তুমি পোশাক খুলে বোসো, তুমি তো বেশ ঘেমে গেছো, দ্যাখো প্রজাপতিরা তোমার গায়ে এসে বসে নুন খাবে। বিন্নি মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বোকা নাকি, জানো না গায়ে প্রজাপতি বসলে বিয়ে হয়। মেয়েটা এবার জোরে হেসে বলল, প্রজাপতি না বসলেও বিয়ে হয়। আমাদের দেশে সকলেরই বিয়ে হয়। তারপর জানতে চাইলো, তোমার নাম কী ?

    বিন্নি বলল, আমার নাম বিন্নি। মেয়েটা বলল, আমার দাদুর নাম আলভারেজ, এক ডাকে সবাই দাদুকে চেনে আমাদের গ্রামে। বিন্নি জানতে চাইলো, তোমাদের গ্রাম কোথায়, অনেক দূরে ?

    এই ছোটো নদীটা গিয়ে মিশেছে উরুবাম্বা নদীতে, সেই উরুবাম্বা নদীর তীরে আমাদের গ্রাম, একটু ভেতরে যেতে হয়, নয়তো বর্ষায় উরুবাম্বার জল ভাসিয়ে দেবে গ্রামকে। বিন্নি মাঝির দিকে তাকিয়ে বলল, কলেজ কি রাতেও খোলা থাকে? আমার আগের কলেজে মর্নিং শিফ্ট তো দুপুর বেলাতেই ছুটি হয়ে যেতো। তার পরের শিফ্ট ছয়টায় ছুটি হয়ে যেতো। সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি, দুপুরে কোথায় কী খাবো, সন্ধ্যা হলে কী খাবো, আমার তো যখন-তখন খিদে পেয়ে যায়।

    মাঝি জলে নেমে নৌকো ভাসিয়ে দিয়ে বলল, বাহ, খোলা থাকবে না কেন, কলেজ মানে তো শিক্ষা, আর শিক্ষা তো চব্বিশ ঘণ্টার ব্যাপার। যতো শিখবেন ততো শিক্ষিত হয়ে উঠবেন। আর খাবার চিন্তা করবেন না, ওই তো দেখুন ওই পারে কতো আনারস হয়ে রয়েছে, ব্রাজিল নাট হয়ে রয়েছে। আমার ডিঙিতেও পাকা কলা আছে, পেঁপে আছে। আপনি যদি মাছ খেতে ভালোবাসেন তাহলে আমি নদী থেকে মাছধরে খাওয়াবো আপনাকে, আমার নাতনি মাছ ধরতে পারে। বিন্নি বলল, মাছ ? মাছ কেমন করে ধরবে, তোমার ডিঙিতে তো জালও নেই, ছিপও নেই, আর রাঁধবেই বা কোথায়।

    দাঁড়ান দেখাচ্ছি, বলে মাঝি উঠে দাঁড়িয়ে, নৌকোয় রাখা একটা সড়কি তুলে জলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে, নাতনিকে বলল, এই নে, দেখিয়ে দে মিস বিন্নিকে। মেয়েটা ডান হাতে শড়কি নিয়ে জলের দিকে ঝুঁকে ছুঁড়ে মারলো, একটা মাছকে গিঁথে তুলে আনলো। শড়কি থেকে মাছটাকে বের করে নখ দিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে ফেললো। বিন্নি বুঝতে পারলো যে মেয়েটা কিছুক্ষণ আগেই মাছ খেয়ে থাকবে, তাই গালে চুমো খাবার সময়ে আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছিল।

    মাঝি বললো, এবার এটাকে পাতায় মুড়ে পোড়াবো আর ফ্রেশ মাছ খাওয়াবো আপনাকে। মেয়েটা মাছটাকে একটা টিনের ওপরে রেখে কাঠের আগুনে পুড়িয়ে বিন্নিকে খেতে দিলে, বিন্নি এক টুকরো খেয়ে বলে উঠলো, আরে এ তো স্মোকড বিফের মতন, আগে এই মাছ খাইনি কখনও। মাঝি বলল, এর পর আপনাকে পিরানহা মাছ খাওয়াবো। বিন্নি আতঙ্কিত, বলল, পিরানহা খায় নাকি ? পিরানহারাই তো মানুষ খায়।

    মাঝি বলল, পিরানহা অনেক স্বাদু মাছ, একবার খেলে বার-বার খেতে চাইবেন। এই দেখুন, আমার গলায় যে মালা পরে আছি, তাতে এই লকেটটা পিরানহা মাছের দাঁত। আমাকে একটা অমন মালা দিও তো, বাড়ি ফেরার সময়ে নিয়ে যাবো, বলল বিন্নি। মাঝি নিজের গলা থেকে মালাটা খুলে বিন্নির গলায় পরিয়ে বলল, আপনি এটাই নিয়ে যান না, আমার বাড়িতে অমন অনেক মালা আমার বউ তৈরি করে রেখেছে।

    কিছুটা যাবার পর নদীতে বড়ো-বড়ো ঢেউ উঠছে দেখে আলভারেজ বলল, নৌকোটা কিছুক্ষণের জন্যে কিনারায় লাগিয়ে নিই, ডায়নোসরের পাল বোধহয় নদী পার হচ্ছে, ওই পারের জঙ্গল অনেক ঘন তো, মগডালের কচি পাতা আর ফুল খেতে ওরা ভালোবাসে। বিন্নি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, বলল, ডায়নোসররা আর আছে নাকি, কোটি-কোটি বছর আগে সব রকমের ডায়নোসর মরে গেছে, এখন কেবল তাদের জীবাশ্ম, মানে ফসিল, পাওয়া যায়। বিন্নির কথায় মেয়েটা ওর গায়ে ঢলে পড়ে হাসতে লাগলো। বললো, তুমি তো দেখছি কিছুই জানো না, জুরাসিক পার্ক ফিল্ম দ্যাখোনি, এখানেই তো তার শুটিং হয়েছিল, এখানকার সবরকমের ডায়নোসররা তাতে অভিনয় করেছিল।

    শুনে ভয় করতে লাগলো বিন্নির, বলল, টির‌্যানোসরাস রেক্সরা এখনও বেঁচে আছে, তাহলে তো আমাদের সবাইকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। মেয়েটা বিন্নির গায়ে নিজের খোলা বুক চেপে বলল,, তুমি তো আচ্ছা পাগল দেখছি। এদেশের ইতিহাস পড়োনি। স্পেন আর পর্তুগালের লোকেরা যখন প্রথম এসেছিল তখন ওরা টির‌্যানোসরাস রেক্সের মাংসই তো খেতো। ওরা টির‌্যানোসরাস রেক্সদের খেয়ে-খেয়ে নিশ্চিহ্ণ করে দিয়েছে, যে কয়টা বেঁচে আছে তাদের পোষ মানিয়ে নেয়া হয়েছে, তারাই ফিল্মে অভিনয় করেছিল। অন্য মাংসাশী ডায়নোসরদেরও পোষ মানিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন যে ডায়নোসররা জঙ্গলে বেঁচে আছে, তারা শাকাহারি, আমরা মাঝে-মাঝে তাদের ডিম যোগাড় করে খাই, খুবই পুষ্টিকর, একটা ডিমের অমলেটে বাড়ির সবাইকার পেটপুরে খাওয়া হয়ে যায়।

    নৌকোটা জোরে-জোরে দোলা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। আলভারেজ বলল, নাতনি, ছইয়ের ভেতরে ব্রন্টোসরাস ডায়নোসরের একটা ডিম রাখা আছে, দেখা, বিন্নিকে দেখা। ছইয়ের পাটাতনে রাখা একটা ফুটবলের মাপের ডিমের দিকে আঙুল দেখিয়ে মেয়েটা বলল, ওই যে। নৌকো বেশ দুলছিল বলে নিজের জায়গা ছেড়ে ডিমটা হাত দিয়ে দেখার সাহস হলো না বিন্নির। পরে দেখবে। এখন ও উৎসুক সত্যিকারের ডায়নোসরের দল দেখবার জন্য। নাতনি হাততালি দিয়ে উঠতে বিন্নি চেয়ে দেখলো সত্যিই একদল চারপেয়ে উঁচুগলা ফিকে সবুজ রঙের ডায়নোসরের দল, অন্তত কুড়িটা হবে, বড়ো ছোটো মিলিয়ে, এতো গভীর নদী হেঁটে পার হচ্ছে, যে ডায়নোসরটা সবচেয়ে ছোটো তারও পুরো পা নদীর জলে ডুবছে না। মাঝির নাতনির হাততালি শুনে সবচেয়ে বড়ো ডায়নোসরটা ওদের নৌকোর কাছে মাথা নামিয়ে যেন চেনার চেষ্টা করল।

    ভয়ে বিন্নির বুক ওঠা-নামা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, কি বিরাট মাথা, নাতনি ডায়নোসরের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছে দেখে বিন্নিরও হাত বোলাবার সাহস হলো। হ্যাঁ, ঠাণ্ডা, একটু খসখসে। ভোঁষ-ভোঁষ করে মোষের মতন শ্বাস ফেলছে। বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। মোবাইল ফোনটা সঙ্গে রাখলে ডায়নোসরের সঙ্গে, নাতনির সঙ্গে, অ্যালভারেজের সঙ্গে অনেকগুলো সেলফি তুলে নিতে পারতো। আনতে পারেনি, কলেজে নিষিদ্ধ বলে। ডায়নোসরগুলো ওই পারে চলে গেলে অ্যালভারেজ আবার নৌকো চালানো আরম্ভ করল।

    নাতনি কলার কাঁদি বিন্নির সামনে এনে রাখলে কয়েকটা খেয়ে মনে হলো পেট ভরে গেছে। নাতনি তবু একটা আনারস ছাড়িয়ে কিছুটা বিন্নিকে খাবার জন্য দিলো। কী মিষ্টি। বিন্নিকে ঠেলে ওলেঙ্কা চেঁচিয়ে উঠলো, ওই দ্যাখো, ওই দ্যাখো, এর আগে দেখেছো এই সাপ? বিন্নি দেখেছিল, ভেবেছিল জঙ্গলের বাঁশ জলে পড়ে কালো হয়ে গেছে আর ভাসতে ভাসতে চলেছে। মাঝির নাতনি বলল, ওটা অ্যানাকোণ্ডা সাপ। এই সাপ নিয়েও গাঁজাখুরি ফিল্ম হয়েছে। সাপগুলো অমন নয়। যেসব সাপ জড়িয়ে ধরে শিকারকে মেরে খায়, এই সাপও তেমনি। তবে এই সাপেরা ফিল্মে অভিনয় করেনি। ফিল্মে রবারের সাপ বানিয়ে দেখানো হয়েছে। আমাদের গ্রামে এসেই তো শুটিঙ হয়েছিল। জবাবে বিন্নি বলল, আমি ফিল্ম দেখিনি, অ্যানিমাল প্ল্যানেট আর ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে টিভিতে দেখেছি। আমার মা বলেন ফিল্ম দেখে কোনো জ্ঞান হয় না, সব বানানো গল্প, তার চেয়ে যা সত্যি সেগুলোই দেখা আর পড়া ভালো। বিন্নি জিগ্যেস করল, মাঝির নাতনি, তুমি সারাদিন দাদুর সঙ্গে নৌকোয় ভেসে বেড়াও? বাড়িতে চিন্তা করেন না মা-বাবা ?

    মাঝি অ্যালভারেজ দাঁড় বাইতে-বাইতে বলল, আমিই ওকে সঙ্গে নিয়ে আসি, আটজন নাতির পরে আমার এই এক নাতনি, আমার তিনটে ছেলের সকলেরই ছেলে। ছোটো ছেলেটার এই এক মেয়ে। ওকে বাড়িতে রেখে আসলে সবাই মিলে নানা কাজ করায়, তাই আমি সকালে বেরোবার সময়ে সঙ্গে আনি। আমার নিজের তো মেয়ে ছিল না। বংশে এই এক মেয়ে। সব সময় নজরে-নজরে রাখি। বিন্নি বলল, ওকে জামা পরিয়ে আনো না কেন ? আমাদের শহরে এই বয়সে মেয়েরা সবাই সব সময় জামা পরে থাকে। নাতনি বলল, আমার বড্ডো গরম লাগে, জামা পরে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। তাছাড়া জামা পরে না থাকলে কতো প্রজাপতি এসে বসে আমার গায়ে, আদর করে, ডানার বাতাস দেয়।

    বিন্নি বলল, ধ্যুৎ, ওটা কোনো যুক্তি হলো না। এখন মাঝনদীতে তো আর প্রজাপতিরা এসে বসছে না তোমার গায়ে নুন বা চিনি খাবার জন্য। নাতনি বলল, চিনি নয় মশায়, নুন, নুন, তুমি দেখো না জিভ দিয়ে নোনতা কিনা।

    ইউনিয়ানের সচিব বলল, বিন্নি, হয়ে গেছে, এবার চোখ খোলো, তুমি ভর্তি হয়ে গেছ কলেজে, আর কোনো চিন্তা নেই, প্রতিদিন ক্লাস না করলেও চলবে, পারসেন্টেজের ভাবনা ভাবতে হবে না, সব ম্যানেজ হয়ে যাবে, তুমি আজ থেকে আমাদের ইউনিয়ানের মেম্বার, এই নাও আই-পিল, এটা খেলে গর্ভগোলমাল হবে না।

    ব্যাস, সব ম্যানেজ করতে শিখে গেছি তারপর থেকে, পিচ্চিকে বলল বিন্নি। আমার গল্প এইটুকুই।

    কোনো প্রতিরোধ আমাকে অনুৎসাহ করতে পারেনা, যে মেয়ে বেঁচে থাকার শিল্পকে করায়াত্ত করেছে, কোনো অসুবিধা তাকে হতাশ করতে পারে না, প্রতিবন্ধকতা হল দ্বন্দ্বের সন্মুখীন হওয়ার চাবিকাঠি, বাধাবিপত্তি, তোমার কাজ করার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ, তা তোমাকে সাহস আর তেজ দেবে, প্রতিটি প্রতিবন্ধকতার পরে তুমি নিজেকে আরও বেশি সফল প্রমাণ করতে পারবে।

    প্রেস সেকশান প্রতিদিন তাঁর কাছে সেই দিনকার সংবাদপত্রের জরুরি কাটিংগুলো ফাইল করে, সঙ্গের কাগজে কোন থানার এলাকা আর সম্ভাব্য পন্হা সম্পর্কে নোট লিখে রিমা খানের কাছে পাঠায় ; রিমা খান নিজের মতামত দিয়ে ডিসিপিকে পাঠান। আজকে প্রথম কাটিং পড়েই রিমা খানের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। যে পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে তার বাজার ভালো। রিমা খান প্রেস সেকশনের ইনচার্জকে ডেকে পাঠালেন। সে এলে, বললেন, এটা কী ? এই সংবাদপত্রে সাহিত্যিকদের জারজগুলো চাকরি করে জানি, কিন্তু এটা কেমন খবর, আর কোন থানার ওসি এই খবরটা চাউর হতে দিয়েছে ?

    সংবাদের শিরোনাম, “ভিনসেন্ট ভ্যানগগের কান পাওয়া গেছে এই শহরের ম্যানহোলে”। সঙ্গে যে দুটো ফোটো তার একটা স্হানীয় একজন দলিত সাফাই কর্মচারীর হাতের তালুতে একটা কান, কানে হীরে বা নকল হীরের টপ, দ্বিতীয় ছবিটা কানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা ভ্যান গগের পেইনটিঙ। আসল সংবাদের আগে ভ্যানগগের কান কাটার কাহিনি। সাংবাদিকটা কখনও নেদারল্যাণ্ডস যায়নি নিশ্চয়ই, ভ্যান গগ মিউজিয়ামও দ্যাখেনি। খবরটা এইভাবে ফেনানো হয়েছে :

    চিঠি হাতে পোস্টম্যান বা ডাকপিয়ন জোসেফ রঁলা।। তুলির সুচারু টানে আর জ্ঞানে ও এখন অমর। বেদনায় ফুটে ওঠে অন্য রূপ। বললেন ভিনসেন্ট- কী ব্যাপার? আমার চিঠি? হাসিমুখে চিঠি দেন জোসেফ রঁলা।। চিঠি খোলেন ভিনসেন্ট। পল গঁগা চিঠি লিখেছেন। বলেছেন- তোমার সঙ্গে আমি কিছু সময় কাটাতে চাই। খুব তাড়াতাড়ি আসছি। ভিনসেন্ট তখনই বসে যান পল গঁগাকে চিঠি লিখতে :

    আর্লস ১৭ অক্টোবর ১৮৮৮

    প্রিয় গঁগা,

    তোমার চিঠির জন্য ধন্যবাদ। তুমি লিখেছো, 'শপথ করে বলছি আমি তোমার কাছে আসবই। এই মাসের কুড়ি তারিখের পরে যে কোনো একদিন।' মনে রেখো পল, ট্রেন জার্নিটা হয়তো একটু কষ্টদায়ক কিন্তু যখন আসতে আসতে পথের দু'পাশের দৃশ্য দেখবে, কষ্টের কথা তোমার মনে থাকবে না। অপূর্ব সব দৃশ্য। আমি যখন এসেছিলাম সেই সব দৃশ্য আমাকে পাগল করে তুলেছিল। একটু ঈর্ষা হচ্ছে তুমি সে দৃশ্য দেখবে। আমার মনে হয়েছিল জাপানের নিসর্গের কথা। শীত পড়বে কিছুদিন পরেই। যখন এখানে মিসত্রাল বয় তখন সময়টা কঠিন, এ ছাড়া অন্য সময় বেশ ভালো। তুমি আর আমি ছবি আঁকবো মিসত্রালের ফাঁকে ফাঁকে। আমার বাড়িটা তেমন সাজানো-গোছানো নয় বন্ধু। একজন গরিব শিল্পীর বাড়ি যেমন হয়। একটু একটু করে ভালো হবে, তা নিয়ে ভেবো না। দু'জনের সঙ্গে দু'জনের দেখা হবে, সেটাই হলো আসল খবর।

    তোমার চিরকালের বন্ধু ভিনসেন্ট

    অক্টোবরে এক ঝড়ের দুপুরে ঝড়ের কাকের মতো এসে উপস্থিত হলেন পল গঁগা। ফ্রান্সের এক নির্জন, নিঃসঙ্গ জায়গা। ছোটো জনবসতি। ভাবতেই পারিনি পল, তুমি আসবে। বা, বলেছিলাম না; আসব।পথে কোনো কষ্ট হয়নি তো তোমার? তোমার কথাই ঠিক। পথের কষ্ট কষ্টই নয়, যেসব ছবির মতো দৃশ্যের ভেতর দিয়ে ট্রেন এসেছে।চল, বাড়িটা দেখ। পাশের ঘরটা তোমার। নতুন বিছানা, নতুন সবকিছু। টাকা পেলে কোথায়?সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। থিও আছে না?

    বোঝা গেল পল গঁগা এমন বাড়ি দেখে মোটামুটি খুশি। এক সময় বলে গঁগা বললে, তা বন্ধু, এখানে কোনো ল্যাটিন কোয়ার্টার নেই ? একেবারে নিরামিষ? ভিনসেন্ট বললেন, প্যারিসের পিগালে এখানে নেই, কিন্তু যা আছে সেটাও বা মন্দ কী? নানা বয়সে নারী। আজ তো টায়ার্ড। কালকে যাওয়া যাবে।পল গঁগা প্রশ্ন করেন, প্যারিসের পিগালেতে গ্যাবি নামে একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তোমার, তাই না? ওকে দেখতেই তো যেতে। তারপর কী হলো? সতেরো বছরের একটা মেয়ে নতুন নেমেছে বাজারে। ও এখন কোথায়? শুনেছি, ও নাকি আর্লস এসে ব্যবসা শুরু করেছে। তুমিও তো এখানে। দেখা হয় না? ভ্যান গগ বললেন, গাব্রিয়েলা এখানেই।

    মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছেন ভিনসেন্ট ! সারাজীবন কাউকে গভীর করে ভালোবাসার জন্য হৃদয় ছিল উন্মুখ। এক ধরনের বন্যতা ছিল মেয়েটার চরিত্রে। প্রথম যাকে ভ্যান গগ ভালোবেসেছিলেন সেই 'কে' নামের মেয়েটা প্রত্যাখ্যান করে চলে গেছে। এর পর চলে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডসের নিউনুনে। ভিকার বা যাজক হয়ে। সেখানেই শুরু হয়েছিল তার 'পোটাটো ইটার' বা 'আলুখেকো গরিব' মানুষের ছবি আঁকার সিরিজ। শুরু হয়েছিল প্রতিভার বিস্ময়কর বিকাশ। গ্যাবির সঙ্গে দেখা পরে। গ্যাবি যখন আর্লসে চলে গেল, ভিসসেন্টও চলে এলেন আর্লস। প্রেম পড়ে গেলেন সূর্যমুখী ফুলের আর গ্যাব্রিয়েলার।

    বিকেলের পরে আঁকতে বসেছেন। তার আগে ভিনসেন্টের ছবিগুলো দেখা আর ভালো-মন্দ বলা। বিশেষ করে বুলফাইট নিয়ে আঁকা ছবিটা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন পল গঁগা। ষাঁড় যখন হেরে গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়- ওর কানটা কেটে নিয়ে ম্যাটাডর সমবেত দর্শকদের দেখায়, ষাঁড়ের কান। রক্ত ঝরতে ঝরতে পরাজিত ষাঁড় যখন মরতে বসে, তখন তলোয়ারের এক কোপে ওর মাথাটা কেটে ফেলা হয়।

    এত কিছু যদি জানো তাহলে বুলফাইটের ছবি আঁকা কেন? কেন নয়? তুমি বল ছবিটা কেমন হয়েছে?

    ছবি ঠিক আছে। আমি কখনও এ বিষয়ে ছবি আঁকবো না। কী নিয়ে আঁকবে? কোনো এক দূর দ্বীপে চলে যাব আপন মনে ছবি আঁকতে। কী যে হবে তখন কে বলতে পারে!

    ভিনসেন্ট বুঝতে পারেন, দু'জন শিল্পী হলেও দু'জনের দেখার চোখ এক নয়। তাই আলো চলে যাওয়া মুহূর্তে যখন ছবি আঁকতে বসেছেন পল গঁগা, ভিনসেন্ট বলেন, এই অল্প আলোতে এমন ম্যাটমেটে ছবি কেন আঁকছো? শুরু হলো তর্কবিতর্ক। পল অনেক দিন থাকতে এসেছিলেন। দ্বিতীয় দিনেই বুঝতে পারেন- বেশি দিন থাকা যাবে না। ভিনসেন্ট ঝগড়া করতে করতে বলেন, তুমি আবার ফট করে চলে যাবে না তো ?

    একা থাকার দুঃসহ ভার থেকে মুক্তি চান তিনি। গগাঁ কোনো উত্তর দেন না। ভিনসেন্ট বলেন, এই তো আবার থিওর টাকা এলো বলে। তখন প্রাণভরে যত ইচ্ছা আবসাঁথ টানা যাবে।

    সন্ধ্যার পর দুই বন্ধু চলে গেলেন রেডলাইট এরিয়ায়। ভিনসেন্ট সোজা গ্যাবির ঘরে। বলেন, দেখ এদের মধ্যে কোন মেয়ে তোমার পছন্দ। পল বলেন, তোমার গ্যাবির সঙ্গে অন্তত একবার শুতে পারবো না? অমন চিন্তা কখনও করবে না। ও কি ভার্জিন ? ফালতু বোকো না। হাতাহাতি আরম্ভ হবার যোগাড়। কোনোমতে ওদের সামলায় অন্য মেয়েরা। পল গঁগা ওদের একজনকে পছন্দ করেন। কিংবা বলা যায় ওদের একজন এই ভবঘুরে আঁকিয়েকে পছন্দ করে। নারীসঙ্গম ছাড়া শিল্পীরা মনের মতন কাজ করতে পারেন না। দু'জন শিল্পী নেশায় চুর হয়ে বাড়ি ফেরেন। পরের দিন সকালে আবার হাতাহাতি হবার যোগাড়।

    একদিন ভিনসেন্টের তেড়ে জ্বর এলো। পল ভাবলেন এবার কেটে পড়া ভালো, কেননা আবহ আর ছবি আঁকার মতন নেই। ভিনসেন্টকে বললেন, তুমি শুয়ে বিশ্রাম কর; আমি একটু বেড়িয়ে আসি।ভিনসেন্ট বললেন, আচ্ছা। কিন্তু এক সময় তাঁর আশঙ্কা হলো, গগাঁ এখনও আসছে না কেন? ও নির্ঘাত সুযোগ পেয়ে গ্যাবির কাছে গেছে। ভাবতে ভাবতে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। অনুপস্হিত গগাঁর উদ্দেশে বললেন, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।

    রেড লাইট এরিয়ায় গিয়ে দ্যাখেন, গ্যাবির ঘর থেকে বের হচ্ছেন পল গঁগা। তরোয়াল বের করে পলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন ভিনসেন্ট। পল গঁগাও তলোয়ার হাতে তার নিজের জিনিসপত্রের জন্য কোনো মায়া না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সোজা তাহিতি দ্বীপে।

    একাকিত্ব, বিষাদ, অসহায়তা ভ্যান গগকে পাগল করে দেয়। ভিনসেন্টে নিজের কানের পেছন ক্ষুরের টানে কানকে মাথা থেকে কেটে আলাদা করেন। কাগজে মুড়ে কানটা গ্যাব্রিয়েলার হাতে দিয়ে বলেন একটা মূল্যবান জিনিস, তুমি বলেছিলে তোমার খুব পছন্দ এটা। ভালো করে রেখে দিও।

    গ্যাব্রিয়েলা ভ্যান গগের কান নিয়ে কী করেছিল কে জানে! ডাক্তারের কথামতো প্রথমে ভ্যান গগ যান সাধারণ হাসপাতালে। কানে বড় ব্যান্ডেজ বাঁধা ভিনসেন্ট সেখানে আট দিন ছিলেন। সাধারণ হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কিছুদিন একা ছিলেন। পরে গ্রামবাসীরা পিটিশন করে জানায়, এই পাগলটাকে আমাদের এলাকা থেকে তাড়াও। ও একজন বেশ বিপজ্জনক লোক। এর পর ভ্যান গগের ভাই তাঁকে ভর্তি করে দেন সেইন্ট পল ডি মুসো নামের অ্যাসাইলামে। কান কাটার ঘটনা ঘটেছিল ২৩ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালে। নতুন বছরের কোনো একদিনে চুপ করে গ্যাব্রিয়েলা দেখা করতে এসেছিল তার সঙ্গে। গ্যাব্রিয়েলা জিগ্যেস করেছিল কেন এমন করলে? উত্তর দেননি ভ্যান গগ। কেবল গ্যাবিকে প্রশ্ন করেছিলেন, এটা আমার বিজয়, না পরাজয়ের ট্রফি? তুমি বল, আমি জিতে গেছি, না হেরে গেছি? গ্যাব্রিয়েলা বলেছিল, তুমি একজন মহান শিল্পী, কেউ তোমাকে হারাতে পারবে না। কখনও ছবি আঁকা ছাড়বে না। তোমার গ্যাবি তোমাকে চিরকাল ভালোবাসবে।

    এই শহরের ম্যানহোলে যে কান পাওয়া গেছে তা নিশ্চয়ই কোনো স্হানীয় শিল্পীর, নিজের গ্যাব্রিবেলাকে উপহার দিয়েছিলেন, সেই তরুণী প্রেমিকা তা বাড়ির নর্দমায় বা টয়লেটে ফেলে দিয়ে থাকবেন, বাড়ির অভিভাবকদের ভয়ে। থানার ওসি জানিয়েছেন তাঁরা এই শহরের ভ্যান গগ ও তাঁর গ্যাব্রিয়েলা দুজনকেই খুঁজছেন। হাসপাতালগুলো থেকে তাঁরা কানহীন কোনো রোগীর সংবাদ পাননি, কিন্তু আশা করছেন শীগ্রই শিল্পী ও তাঁর গ্যাব্রিয়েলার খোঁজ পাবেন এবং জেরা করে প্রকৃত তথ্য জানতে পারবেন।

    প্রেস সেকশনের ইনচার্জকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে রিমা খান জানতে চাইলেন, এটা কোন থানার আনডারের ঘটনা, আর থানার ওসি কে ? ওসিকে বলো আমার সঙ্গে এক্ষুনি দেখা করতে আর কানটা যদি বরফে না রেখে থাকে তাহলে বরফে রেখে নিয়ে আসতে।

    প্রেস সেকশনের ইনচার্জ বলল, সেই ওসি তো আপনার সঙ্গে কাজ করেছে, যখন আপনি কঙ্কাল প্রেমিক মার্ডার কেস ইনভেসিগেট করছিলেন।

    কে ? সুমন মিশ্র ? নাকি রমেন বসু ? ওরা তো রিটায়ার করে গেছে। তাহলে কে ? ওহ ওই ইডিয়টটা, রজত মণ্ডল, আসছে বছর রিটায়ার করবে, এখন টাকা কামাবার ধান্দায় সব খবর চাউর করে মালদার আসামী পাকড়াও করার সুযোগ খোঁজে। ডেকে পাঠাও, ডেকে পাঠাও, রাইট নাও, লাঞ্চ করে আসছি টাইপের কথাবার্তা বললে বোলো যে এক্ষুনি না এলে আজকেই সাসপেণ্ড হয়ে যেতে পারে। নেতাদের বিচি ধরে ঝুলছে বলে মনে করে কেউ ওর পোঁদে বাঁশ করতে পারবে না। বলো যে ওর প্রিয় নেতার বিচি কেটে ওর মুখে পুরে দেবার ঘাঁতঘোঁত জানা আছে আমার, সেই সঙ্গে ওর বিচি কেটেও মালখানায় রাখার ব্যবস্হা করে দিয়ে যাবো। এতো করে গড়েপিটে তৈরি করার চেষ্টা করলুম রজতটাকে, তবু ওর টাকা কামাবার ছোঁকছোঁক গেল না, মিডিয়ার কাছ থেকেও টাকা খায়। ডেকে পাঠাও, ডেকে পাঠাও।

    রিমা খানের চেঁচামেচি শুনে মণ্ডলের শুভানুধ্যায়ী কোনো কন্সটেবল ফোন করে দিয়ে থাকবে রজতকে, মিনিট পনেরোয় মুখের ভয় আর ঘাম রুমালে পুঁছতে পুঁছতে ঢুকল এসিপির চেম্বারে। রিমা খান বললেন, বোসো, এই যে কানটা তুমি বাজেয়াপ্ত করেছ, এতে যে টপ দেখা যাচ্ছে, তা সেই গয়নাটা কোথায় হাপিশ করলে, স্যাকরার কাছে বেচতে গিয়ে জানতে পেরেছো ওটা কোনো মণিরত্ন নয়, নেহাতই ঝুটো, তা কানটা এনেছো ? ব্যাপারটা ইনভেসটিগেট করার আগেই সংবাদপত্রে নিজের নাম দেখার লোভ তোমার গেল না, কতো টাকা দিয়েছে ওই মিডিয়া এমপায়ার ? কান টানলে মাথা আসে কথাটা জানো তো ? এই মাথাটাই ভোমসো খুঁজে বেড়াচ্ছে বেশ কিছু দিন ধরে, এখনও কোনো হদিশ পায়নি। অমন তানজানিয়ার শিমপাঞ্জিদের মতন দাঁত বের করে হেসো না। ম্যানহোলটা কারা পরিষ্কার করাচ্ছিল, করপোরেশান না কোনো প্রা্য়ভেট পার্টি ?

    রজত মন্ডলের দেঁতো হাসি বন্ধ হল, বলল, স্যার, তা তো জানি না, কানটা পাবার পর দুজন সাফাইকর্মী পাড়ার ক্লাবের সচিবের কাছে কানটা দিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়েছে, কেউ বলতে পারছে না, কারা পরিষ্কার করাচ্ছিল, করপোরেশনের স্হানীয় কর্মীরা জানিয়েছে, ওরা কোনো আদেশ-নির্দেশ দেয়নি, ওদের কাছে কোনো কমপ্লেন আসেনি।

    ----কানটা বরফে কখন রাখলে ? দেখে মনে হচ্ছে, আজকে রেখেছো, কালকে সারা রাত তোমার থানায় পচেছে, তার আগে নর্দমার পাঁকে পচেছে। ফ্লাস্কে করে এনেছো, ভালোই করেছ, যাও এটা ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে জমা দেবার ব্যবস্হা করো, আমি ওদের বলে দিচ্ছি কি করতে হবে। কানে যে টপটা পরানো সেটাও ওদের কাছে জমা দিয়ে নথি করিও।

    ---হ্যাঁ, স্যার, তাই করছি, বলে, দ্রুত কেটে পড়তে যাচ্ছিল রজত মণ্ডল।

    ---আমাকে বিকেলের মধ্যে রিপোর্ট দাও, কারা নর্দমা পরিষ্কার করানোর জন্যে সাফাইকর্মী দুটোকে কাজে লাগিয়েছিল, আর সাফাইকর্মী দুটোকে খুঁজে বের করে ওদের আশ্বস্ত করো যে ওদের কিছু করা হবে না।

    ---ওদের কাস্টডিতে নেবো না ?

    ---না। ওরা আমাদের সাহায্য করবে, এই গিঁট খোলবার। আর কোনো মিডিয়াকে ইনটারভিউ দিও না। রিটায়ার করার পর যা করার কোরো, তখন নাচের দল তৈরি করে নন্দনে গিয়ে পোঁদ তুলে নেচো।

    রজত মণ্ডল চলে গেলে ভোমসোকে ডেকে পাঠালেন রিমা খান।

    ভোমসো ঘরে ঢুকে বলল, আপনি খবরের কাগজের ওই ভ্যান গগের কান নিয়ে ভাবছেন তো? যদিও থানাটা আমার আণ্ডারে নয়, আমি বেশ কিছু তথ্য যোগাড় করে ফেলেছি। কানের ছবিটা কাগজে পড়ে ওলেঙ্কা নামের মেয়েটা আমার কাছে এসেছিল, ভয়ে মুখ চুপসে গেছে, কাঁদছিল, ও জানালো যে কানের টপদুটো ও পিচ্চিকে পরিয়ে দিয়েছিল, নিজের কান থেকে খুলে। অন্য মেয়েটা, বিন্নি, সেও কাঁদছিল, বলল যে পিচ্চি ওদের দুজনকে ওর ওপর এতো নির্ভরশীল করে তুলেছিল যে ওরা জীবনের সব সমস্যা ভুলে গিয়ে বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল। বিন্নিও মনে করে, কানটা পিচ্চির। আমি আমার এক শ্যাডোকে বলেছি ম্যানহোলটার দিকে নজর রাখতে। পরিষ্কার করাচ্ছিল কে জানেন ? শুনলে অবাক হবেন। আমি সাফাইকর্মী দুজনকে লোকেট করেছি, ওদের সঙ্গে এনেছি, বাইরে বসে আছে, বলেছি ওদের সাক্ষ্য দিতে হবে, তার জন্যে সরকারের কাছ থেকে টাকা বরাদ্দ আছে।

    রিমা খান, সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বললেন, জানি। তুমি এখনই ওয়ারেন্ট ইশ্যু করিয়ে বাপ আর বড়োছেলেকে গ্রেপ্তার করার ব্যবস্হা করো। আর সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে লোকটার বাড়ি সিল করে দাও। আমি নিশ্চিত, লোকটার সেপটিক ট্যাঙ্কে তুমি তিনটে পুরোনো কঙ্কাল বা হয়তো লাশ আর একটা টাটকা কঙ্কাল পাবে। টাটকা কঙ্কাল এই জন্যে অনুমান করছি যে দেহকে টুকরো-টুকরো করা হয়েছে, পায়খানার পথে মাংসখণ্ডগুলো ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, যার ফলে জ্যাম হয়ে গেছে নর্দমা, সম্ভবত পুরো পাড়ার নর্দমা। আর পিচ্চির ঘর থেকে কয়েকটা নিজস্ব জিনিশ যোগাড় কোরো, ওর ট্রুথব্রাশ, চিরুনিতে যদি চুল লেগে থাকে বা অন্য কোনো বস্তু যা থেকে ডিএনএ নিয়ে কানটার সঙ্গে আর লাশ বা কঙ্কাল পেলে তার সঙ্গে ম্যাচ করা যায়। হয়তো ওর বিছানার চাদরে আর তোয়ালেতে তুমি নাইটফলের বা মেয়ে দুজনের সঙ্গে সেক্স করার সিমেনের ট্রেসও পেতে পারো।

    ভোম্বোল সোম অ্যাডভোকেট আর তার বড়ো ছেলের নামে ম্যাজিস্ট্রেটের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা লিখিয়ে লোকটার বাড়ি-কাম-দপতরে গিয়ে সার্চ করা আরম্ভ করল। রিমা খান যেমন বলেছিলেন, ফ্লাশ পায়খানার সেপটিক ট্যাঙ্কের ওপর থেকে সিমেন্টের স্ল্যাব সরিয়ে তার মধ্যে পাওয়া গেল তিনটে কঙ্কাল, দুটো ক্ষয়ে এসেছে আর একটা টাটকা। টাটকার গায়ে তখনও মাংস লেগে। বাড়ির ভেতরে একতলার টয়লেটে ভোম্বোল সোম পেলেন মার্বল স্ল্যাব কাটার দশটা ডিস্কব্লেড, একশো সাতাশ এমএমের বশ কোম্পানির ইলেকট্রিক হ্যাণ্ডসেট, তার ওয়ারেন্টি অ্যাডভোকেটের নামে।

    অ্যাডভোকেট আর তার বড়ো ছেলেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ কাস্টডিতে রাখার আদেশ যোগাড় করে ফেলেছে ভোম্বল সোম। রিমা খানের ঘরে মুখ নিচু করে বসেছিলেন অ্যাডভোকেট আর তাঁর বড়োছেলে। রিমা খান জিগ্যেস করলেন আপনি এটা করলেন কেন ? আপনি করেননি, অন্যেরা করেছে, তাও বলতে পারবেন না, যাবতীয় এভিডেন্স আপনার বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে। আপনি এতোই নিষ্ঠুর আর নির্দয় যে মার্বল কাটারের ডিস্কব্লেড দিয়ে শরীর থেকে মাংস কুরে কুরে ফ্লাশ করে দিতেন। যে পরিবার আপনাকে এতো বিশ্বাস করতো তাদের সদস্যদের আপনি কেবল খুন করেননি, তাদের মাংসও গুয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। তার কারণ আমি জানি। আপনার সব কয়টা ছেলে অশিক্ষিত অপগণ্ড, তাদের জন্যে আপনি অন্যের সম্পত্তি দখল করে ভোগ করতে চাইছিলেন। ভেবেছিলেন গান্ধিমার্কা অ্যালুমিনিয়ামের চশমা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে, মহাত্মার চেহারা আয়ত্ব করে ফেলবেন। আপনার বড়ো ছেলেকে থার্ড ডিগ্রির সামান্য ডোজ দিতেই কাঁদতে-কাঁদতে সবকিছু ফাঁস করে দিয়েছে।

    পিচ্চিকে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলার দরকার ছিল না তো ? আপনি ভেবেছিলেন যে মেয়ে দুটোকে হত্যার দায়ে ফাঁসিয়ে নিজে ক্লিন বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু দেখুন, ওলেঙ্কা, এখনও জানি না ওর নাম ওলেঙ্কা কিনা, পিচ্চিকে ভালোবেসে নিজের কান থেকে খুলে টপ দুটো পরিয়ে দিয়েছিল, সেই টপের কারণেই আপনাকে সন্দেহ করা আরম্ভ করলেন ইনভেস্টিগেটিঙ অফিসার। পুলিশে আমার একটা বদনাম আছে। কোনো আসামীকে ফাঁসির মাচানে পৌঁছে দিয়ে আমি শারিরীক আর মানসিক আনন্দ পাই। তিনটে হত্যাই যে রেয়ারেস্ট অব রেয়ার, তা আপনার ব্যবহার করা মার্বল কাটিং মেশিন আর ডিস্ক-ব্লেডের সেট প্রমাণ করবে। আপনি এতোই নিশ্চিন্ত ছিলেন যে কাটার ডিস্কগুলো থেকে রক্ত ধোবারও প্রয়োজন মনে করেননি, মেশিন থেকে আপনার আর আপনার বড়ো ছেলের আঙুলের ছাপ মোছার চেষ্টা করেননি। ওগুলো দিব্বি আপনার টয়লেটে রেখে আয়েস করছিলেন। আপনি জানতেন ওই তিনজনকে কিডন্যাপ করার অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে কেউ করবে না, ওনারা নিজেরাই আপনার বাড়ি-কাম-অফিসে যাতায়াত করতেন, আপনি আর আপনার বড়ো ছেলে তাঁদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে গিয়ে ভালো খাবার-দাবার খাইয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করলেন। আপনি বোধহয় জানেন না যে পিচ্চি এক ধরণের রোজনামচা লিখতো, তা থেকে আভাসে-ইঙ্গিতে যথেষ্ট পথনির্দেশ পাওয়া গিয়েছে। ব্যাঙ্কের লকারে পিচ্চির বাবা-মায়ের চিঠি রাখা আছে, এটা কেন পিচ্চিকে বলেছিলেন বলুন তো ? তার বদলে দুটো অন্য চিঠি রেখে পিচ্চিকে বিপথে চালাবার চেষ্টা করেছিলেন। আর চিঠিগুলো আপনার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেটাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন, তার ঘরে চিঠিগুলোর খসড়া পাওয়া গেছে, উপন্যাস কবিতা নাটকের বই পড়িয়ে তাকে বাগে আনতে পারেননি, সে নিজেই জানিয়েছে যে চিঠিগুলো তার লেখা।

    রুল দিয়ে অ্যাডভোকেটের থুতনি ওপরে তুলে রিমা খান বললেন, আরেকটা কথা, শুনে আপনার ক্রিমিনাল মাথা আরও খারাপ হয়ে যাবে, কানটা যে পিচ্চির তা প্রমাণ হয়ে গেলে, বিন্নি আর ওলেঙ্কার পেটে যে বাচ্চাগুলো এখন কয়েক মাসের ভ্রুণ, তারা যে পিচ্চির সন্তান, তা প্রমাণ হয়ে যাবে। যে দুটো মেয়েকে ফাঁসাবার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের কোলে ওই বিরাট সম্পত্তির উত্তরাধিকারী দিয়ে যাবার ব্যবস্হা করে গেছে পিচ্চি। মেয়ে দুজনও নিশ্চয়ই চেয়েছে যে তারা পিচ্চির বাচ্চার মা হতে পারলে জীবনে আর কিছু করার দরকার নেই, সম্পত্তির অর্ধেক তো পাবে, তাইই যথেষ্ট।

    কিছুক্ষণ থেমে রিমা খান বললেন, পিচ্চির জার্মান দাদু আর দিদিমাকে খবর পাঠানো হয়েছে, ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে ; তাঁরা এই দুই তরুণীর আর পিচ্চির বাচ্চাদের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন। ওনাদের দেশে এইভাবে অবিবাহিত তরুণীদের বাচ্চা হওয়াটাকে সমাজ আর খারাপ মনে করে না।

    রিমা খানের কথাগুলো শুনতে-শুনতে অ্যাডভোকেট বোধহয় ফাঁসির মঞ্চটা প্রত্যক্ষ করছিলেন। সেই মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রিমা খান বললেন, আপনার এখন কী হচ্ছে বলুন তো ? আপশোষ বলব না। আপনার হচ্ছে ক্রোধ। বোঝা যাচ্ছে আপনার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে, ব্লাড প্রেশার শুট আপ করেছে, অ্যাড্রেনালিন অ্যাবনর্মাল হয়ে যাচ্ছে, মাথা কাজ করছে না, শরীরের কোথাও কোথাও ব্যথা অনুভব করছেন, ভ্রু নেমে এসেছে, ঠোঁট চেপে আছেন, চোখ কিছুটা ঠেলে বেরোচ্ছে। তার সঙ্গে আপনার ভয়ও করছে, ভয় করলে মানুষ সেখান থেকে পালাতে চায়, এড়াতে চায়, আপনি চেয়ারের হাতল দুহাতে আঁকড়ে আছেন, সেটা আপনার ভয়ের লক্ষণ। ধরা পড়ে গেছেন বলে অবাক হচ্ছেন, কেননা আপনি নিশ্চিত ছিলেন যে ফাঁসলে মেয়ে দুটো ফাঁসবে, আপনার অন্য অপগণ্ড সন্তানরাও জানে না তাদের বাবা তাদের জন্য কেমন ঝুঁকি নিয়েছিল, তাদের চোখে আপনি খুনি প্রমাণিত হলেন, সেই ভাবনা আপনাকে কুরে খাচ্ছে। চোয়াল ঝুলে এসেছে তাই। ধরা পড়ে গিয়ে বিষণ্ণ হয়ে পড়েছেন, হেরে যাবার বোধ কাজ করছে আপনার মধ্যে, অসহায়তা, প্রতিবাদ করতে পারছেন না আমার কোনো কথার, চুপ মেরে গেছেন, মিজারেবল অবস্হা, জীবনে আনন্দের মুড আর ফিরবে না আপনার, দেখুন না ঠোঁটের দুই কোন ঝুলে পড়েছে। যান, আপনি তো এতোকাল উকিলগিরি করলেন, এবার হাজতে বসে নিজের আর বড়োছেলের বাঁচার উপায় বের করতে পারেন কিনা দেখুন। আমরা কিন্তু আপনাকে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে যাবোই।

    মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট-এর একটা লাইন আপনাকে দেখে মনে পড়ছে, “অ্যাওয়েক, অ্যারাইজ অর বি ফর এভার ফলন। ”

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৭ জুলাই ২০২১ ১৯:৩৪734730
  • মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস

    লাবিয়ার মাকড়ি

    চিনেবাদামের খোসার রঙের দশতলা আদালত-বাড়িটা ঘন পাইন জঙ্গলের ভেতরে, যেখানে আসতে হলে সোঁদা গন্ধের সুড়ঙ্গ বেয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়, হাজার হাজার লোক দুশো ছেচল্লিশ বছর যাবত এই পথে চলে চলে বর্ষার পরেও চোরকাঁটা গজাতে দেয় না, জঙ্গলের ভেতরে বলে পেশকার-মুহুরি আর উকিল-মক্কেলরা ক্লান্ত হয়ে গেলে, শুকনো পাতার ওপর বসে কিংবা শুয়ে জিরিয়ে নেয়, ঝোপঝাড়ের সবুজ আড়ালে পুরুষরা দাঁড়িয়ে আর মহিলারা উবু হয়ে হিসি করে, হাগে, তার কারণ আদালতবাড়ির প্ল্যান অনুমোদন করার সময়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, পায়খানা রাখাকে আইনের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করে বাদ দিয়েছিলেন।

    জঙ্গলের ভেতরে অনেকে দল বেঁধে এলে টিফিন বাক্স খুলে মান্দ্রাজি চাদর পেতে বাজরার রুটি আর বাকরখানি খিচুড়ির পিকনিকও করে নেয়। যে আসামীরা জেল হাজত থেকে আসে, তারা একের পেছনে আরেকজন হাঁটতে হাঁটতে যায়, পালাবার উপায় নেই, কেননা সবার কোমর দড়ি দিয়ে বাঁধা, হাতে হাতকড়া, সামনে একজন পুলিশের হাতে দড়ির এক দিক, পেছনের পুলিশের হাতে আরেক, পাহারা দেবার বন্দুকধারীরা পাশে-পাশে লেফ্ট-রাইট।

    এই আদালত বলতে যে বিচারালয় বোঝায় না তা জজ সাহেব নিজেই এজলাসে বসার সময় প্রতিদিন ব্যাখ্যা করে দিতেন। তিনি এও বুঝিয়ে দিতেন যে জেল বলতে কারাগার বোঝায় না। উনি বলেছিলেন, এগুলো সিস্টেমের অংশ, সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা প্রকাশের আধার, ব্যাস, মেনে নিতে হয়, মেনে নিতে হবে, জয়ো হে।

    আদালতে যাবার পথে কোমরে-কোমরে দড়ি-বাঁধা, হাতে হাতকড়া, তরুণ তরুণী যুবক যুবতী প্রৌঢ় প্রৌঢ়া বুড়ো বুড়ি সব রকমের মদ্দামাগি আসামীরা সার দিয়ে ট্যাগোর-রক সুরে বাঁধা এই গানটা গাইতে গাইতে যায়, গানটা অনেকটা অ্যাসিড রকের মতন :

    “হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে--

    যেমন বন্ধ খাঁচার পাখি মনের আনন্দে রে।

    ঘন পাঁকের ধারা যেমন বাঁধন-হারা,

    ডিজেল বাতাস যেমন আকাশ লুটে ফেরে।

    হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে দে রে --

    দলদাসের নাচন যেমন সকল রাস্তা ঘেরে,

    বংশ যেমন বেগে ঢোকে পিছন ফেড়ে,

    অট্টহাস্যে সকল পাড়ার শান্তির বুক চেরে।

    হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে…..”।

    যখন আমি জামিনে ছাড়া পাইনি তখন আমিও অমনভাবে সকলের সঙ্গে সারি দিয়ে গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে যেতুম। পাহারাদাররা সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পোঁদে লাথি মারতে-মারতে যেতো, ডানদিকের পাহারাদার বাঁ পা দিয়ে আর বাঁ দিকের পাহারাদার ডান পা দিয়ে।

    লাথি খেতে-খেতে আমাদের গাইতে আরও ভালো লাগত, উৎসাহ পেতুম, তার কারণ এই অনুন্দ্যসুন্দর দেশে লাৎখোররাই সবচেয়ে বেশি আনন্দে থাকে, তাদের ভবিষ্যত স্হিতিস্হাপক হয়ে ওঠে।

    আমার মতন যারা জামিনে ছাড়া পেয়ে কেস লড়ছে, তারা বাসা থেকে বা হোটেল থেকে বা জ্ঞাতির বাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে পোঁছোয়, উকিল মুহুরি মোক্তার জজ কেরানিদের সঙ্গে পাশাপাশি।

    কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদাররা আদালত চত্বরেই বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে, তাদের ভুঁড়ি-ফোলা বাচ্চারা কেমন করে স্কুলে বা কলেজে পড়তে যায় জানি না। কে জানে, হয়তো বড়ো হয়ে তারাও কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদারি বা মুহুরিগিরি করবে বলে স্কুলে যাওয়া দরকার মনে করে না।

    জংলি ঝোপঝাড়ের বদান্যতা, আর ফেলে ছড়ানো ঢ্যাঙা গাছে, সব্জেটে অন্ধকারে জঙ্গলটা ঠাণ্ডা হলেও, গথিক ঢঙের আদালতবাড়িটা বেশ গরম, শীতকালেও বিশেষ হেরফের হয় না। প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ভেবেছিল শহর থেকে দূরে জঙ্গলের ভেতরে হলে শহরের ভোঁচকানি তিকড়মবাজি আদালতে এসে পৌঁছোবে না। কিন্তু সে ভাবনার পোঁদে হুড়কো দিয়ে শহর ঠিক পৌঁছে গেছে তার নচ্ছারমো নিয়ে। মাকড়সাদের না মেরে শুধু তাদের জাল আর ঝুল ঝাড়ার ঠিকে দেয়া হয় এক নম্বর পিন্ডিকেটকে ; আরশোলাদের না মেরে কেবল মশা তাড়াবার ঠিকে দেয়া হয় দুই নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পানের পিক বাঁচিয়ে চুনকাম করার ঠিকে দেয়া হয় তিন নম্বর পিন্ডিকেটকে ; ছারপোকাদের বাঁচিয়ে আসবাব পালিশের ঠিকে দেয়া হয় চার নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ কতোগুলো যে পিণ্ডিকেট আছে তার ঠিকঠিকানা নেই।

    প্রতিষ্ঠান আদমসুমারি করে দেখেছে যে যারা আদালতবাড়িতে আসে তাদের শতকরা নিরানব্বুই জন দুঃস্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে ; আর, কে না জানে, পিণ্ডিকেটের সাহায্য না পেলে দুঃস্বপ্ন গড়া সম্ভব নয়।

    প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কড়া মাদক আর নেই ; অভ্যাস, লোভ আর নেশায় আকাশের দিকে পোঁদ করে সাষ্টাঙ্গ হয়ে যায় অমন নেশাখোররা। ডারউইন নামে একজন সাহেব নাকি ওনার ‘অরিজিন অফ টার্নকোটস’ গ্রন্হে লিখে গেছেন যে অমন নেশায় বাঁদরদের লাল পোঁদও রাতারাতি হলুদ নীল সবুজ কমলা বেগুনী হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

    আদালতের নয়তলায় নয় নম্বর এজলাসের গুমোট গরম, বেঞ্চে ছারপোকার চামড়া-চাটা হুল, দেয়ালে বারোয়ারি পিকের থুতুর সাতবাস্টে দরানি, বদবুদার ঘামের চটচটে হলকায়, যখন আমার মামলা চলছিল, সপ্তাহে পনেরো মিনেটে মুখে-তাম্বাকু উকিল দাঁড়িয়ে কিছু বললে, আবার পরের সপ্তাহে দশ মিনিট কুঁজোকেল্টে কেউ গলাখাঁকারি-সাক্ষ্য দিলে, ঢিকিয়ে-ঢিকিয়ে এই ভাবে চলছিল, ক্ষয়াটে সিঁড়ি পাকিয়ে একবার ওপরে, আবার হুড়হুড়ে ভিড়ের ঠেলায়, পাক খুলে নিচের তলায়, তখন আরও অনেক বিচারাধীনের মামলার মারপ্যাঁচ শুনতুম আর ভাব করার চেষ্টা করতুম, বিশেষ করে যারা খুন করে জামিনে রয়েছে, তাদের সঙ্গে ; কেউ পাত্তা দিত না, কেননা আমার মোটর সাইকেল চুরির মামলাটা ওদের ওজনদাঁড়িতে ছিল খবরের কাগজ কিনিয়েদের ওজনমারার মতন ছিঁচকান্তি।

    তবু বিশেষ একজনের মামলার ডেট পড়লে, পেছন থেকে যার অন্যমনস্ক হাঁটা দেখলে ঘুষঘুষে জ্বর এসে যায়, আমি তার শুনানিতে পৌঁছে কান পাততুম পক্ষে-বিপক্ষে কিরকম বেলাগাম তক্কাতক্কি চলছে, এতই প্যাঁচানো ছিল তার কেস, আর সেই তক্কে খুনের দায়ে মামলাটা যে লড়ছে তার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল, প্রথমদিকে ভয়ে-ভয়ে, কেননা খুনি যখন খুনি, একটু শ্রদ্ধা তো তাকে করতেই হবে, আমি যা কোনোকালে পারব না তা সে করে ময়ুরকন্ঠী গলা উঁচিয়ে, বুক ফুলিয়ে, খোঁপার বাঁধন নামিয়ে, আদালত চত্বরে ঢেউ তুলেছে।

    সমাজের ভেতরে-বাইরে খুনিরা সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার পাত্র বা পাত্রী, অন্য আসামীরা তার তলায়। আমি ছিলুম সবচেয়ে তলার পাদানিতে, ফেকলু মোটর সাইকেল লিফটার। উকিলকে বলেছিলুম, যে বারবার মোটর সাইকেল না বলে বাইক বলুন না, তা উনি বললেন বাইক বললে লোকে ভাববে সাইকেল।

    সরকারি উকিল, চাকরিতে ঢোকার সময়ে যে কালোকোট ছিল তাইতেই চালিয়ে যাচ্ছে, আমার কেস উঠলেই, আমার দিকে হাড়গিলে আঙুল তুলে বলত, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটর সাইকেল রেপিস্ট, তার কারণ নতুন মোটর সাইকেল দেখলে নিজেকে আজও সামলাতে পারি না, মনে হয় লিফ্ট করে নিয়ে পালাই, আর উড়িয়ে রেপ করি, কোনোটা লাল, কোনোটা হলুদ, কোনোটা ঝকঝকে কালো, দেখলেই মাঝরাতের কুয়াশায় তুলে নিয়ে ছুটিয়ে বেড়াই দূর দূর হাইওয়ের ওপর। কিন্তু একসময়ে, রাতকয়েকে মন ভরে গেলে, কিংবা আরও চিকনতনু মোটর সাইকেল দেখতে পেলে, যেখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলুম, তার কাছাকাছি রেখে দিয়ে কেটে পড়ি।

    জজ সাহেব আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে আসল রহস্যটা কী।

    আমি সহজ উত্তর দিয়েছিলুম, যে, জগতসংসারের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার দমক আর যুক্তিপূর্ণ জীবনের চাহিদার টানাপোড়েনের বিকৃত ভারসাম্যের টাল সামলাবার জন্যে আমাকে নতুন-নতুন মোটর সাইকেল চুরি করে চার-পাঁচ শো কিলোমিটার চালাতেই হয়, এছাড়া এই নির্মম পৃথিবীর প্রতি অনুশোচনাহীন রোষ, আর মানুষে-মানুষে সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশের উপায় জানি না ; নান্দনিক বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য ভার্জিন মোটর সাইকেল চাপতেই হয় আমাকে, নইলে নিজের ছেৎরানো আত্মপরিচয়কে সামলাতে পারা অসম্ভব হয়ে উঠবে।

    জজ জানতে চেয়েছিলেন, কোন ব্র্যাণ্ডের জাঙিয়া পরে চালান ?

    আমি যা সত্যি তাই বলেছিলুম, মি লর্ড, আমি সারা জীবনে কখনও জাঙিয়া পরিনি, এখন এই যে আদালতে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো আণ্ডারওয়্যার নেই ; মনে-রাখা-অভিজ্ঞতাকে নষ্ট করে দ্যায় আণ্ডারওয়্যার।

    জজ বলেছিলেন, এ হল নৈরাত্মসিদ্ধিরর প্রকোপ, মেশিন আপনার মগজকে মিউটিলেট করে দিয়েছে ; সে কারণেই আপনি ভার্জিন মোটর সাইকেলে চেপে গর্ববোধ করেন, মগজ অসুস্হ হলে মানুষের শরীর চাঙ্গা হয়ে ওঠে, যতো কলঙ্ক ততো বিহ্বলতার অসুস্হতা আপনার মগজকে পেয়ে বসে ; প্রেম, মানুষ পশু বা যন্ত্র, যার সঙ্গেই হোক, তা এক আতঙ্কদায়ী অনুভব।

    আমি বলেছিলুম, আপনি যথার্থ বলেছেন হুজুর, যে সব লোকেরা নিজেদের সঠিক জন্মদিন জানে তাদের সম্পর্কে আমার ঘেন্না হয়, মোটর সাইকেল তো কবে জন্মায় কেউই জানতে পারে না, অথচ দেখুন হুজুর, তার জন্মদিনের নথি তৈরি হয় বিক্রির দিন।

    জজ বলেছিলেন, হুম। সমাজকে বাধ্য হয়ে আপনার মতন নিহিলিস্ট, অ্যানার্কিস্ট আর দিবাস্বপ্নদ্রষ্টাদের প্রশ্রয় দিতে হবে, নয়তো এই সমাজের অবসান থামানো যাবে না । তারপর জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন, নারীদের অপছন্দ করেন কেন?

    যা সত্যি তাই বলেছিলুম আমি, পোশাক খুললেই ম্যানেক্যুইন বেরিয়ে পড়ার ভয়ে, মি লর্ড ; আর তাছাড়া, স্ত্রীলোকদের গোপনাঙ্গকে বড়ো গ্রটেস্ক স্থাপত্যের ব্যাপার মনে হয়। শোবার ঘরের চারটে দেয়ালে যদি আয়না লাগানো থাকে তাহলে প্রেমকর্মকে কি হাস্যকর মনে হবে না ? বলুন আপনি !

    বুড়ো জজ, কাঁচাপাকা না-আঁচড়ানো চুল, নাকে ঝোলানো চশমা, আমাকে, যেহেতু একশো বছর পর কুড়ি টাকার নোট লুপ্ত হয়ে যাবে, কুড়ি টাকা জরিমানা করেছিলেন, আর সাবধান করে দিয়েছিলেন যাতে ভবিষ্যতে এরকম কাজ প্রমাণসাপেক্ষে না করি, উপদেশ দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর হলেও, আমি যদি ইংরেজিতেও স্নাতকোত্তরটা করে নিই, তাহলে বুকার প্রাইজের যোগ্য ‘বাইসাইকেল রেপিস্টস সিকরেট লাইফ’ নামে একখানা বেস্ট সেলার লিখতে পারব ; জজসাহেবও জানেন যে বাংলার বেস্ট সেলার লিস্টটা চারশো বিশ, সে কথা উনি ওনার রায়ে লিখেছেনও।

    পুলিশের যে দুজন সাক্ষ্য দিয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে, তারা কখন যে শোরুমের পাশের দেয়ালে যখন দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করছিলুম, সে সময়ে, আড়চোখে মোটর সাইকেল দেখতে থাকা আমার ফোটো তুলে নিয়েছিল, ক্লিক শব্দ শুনেও, জানতেও পারিনি। সাক্ষ্য দেবার সময়ে তারা বলেছিল, আমি নাকি জেলহাজতে কুন্দনলাল সাইগল গাইতুম।

    রায় দেবার পরে জজসাহেব জানতে চেয়েছিলেন, ভোট দিই কিনা।

    আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম, যে স্যার, ভোট ব্যাপারটা তো বুমেরাং, তাই ভয়ে দিই না, মানবতার মতন চালাকি আর নেই।

    নাকের একটা চুল উপড়ে জজ সাহেব বলেছিলেন, ভালো নির্ণয়, আমিও তাই মনে করি। আদর্শের ভেতরে যতো তাড়াতাড়ি ম্যাগট জন্মায় ততো তাড়াতাড়ি ডাস্টবিনের পচা কুকুরের শবেও জন্মায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষ তত্ব ফাঁদে কোনো-না-কোনো পরাজয় বা অসফলতাকে ব্যাখ্যা করার জন্যে।

    আমি বলেছিলুম, জি হুজুর, কম বয়সে যা লাল সেলাম ছিল তা বুড়ো বয়সে ফোকলা দাঁতে ঘোলাটে চোখে অ্যাঁড় খেলাম হয়ে গেছে।

    জজ জিগ্যেস করেছিলেন, বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।

    বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, কিন্তু মোটর সাইকেলে নয়, হাওয়াই জাহাজে করে।

    বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে ? কানে কড়ে আঙুল ঢুকিয়ে আরামের পরশ দিতে-দিতে জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন।

    যা সত্যি আমি তা-ই বলেছিলুম, দিশি পায়খানায় বসে জলে ছোঁচাবার অভ্যাস থাকায়, বিদেশে গিয়ে টয়লেট পেপার ব্যবহারের দরুণ, টাইমস স্কোয়ারে রঙ-করা মাই-খোলা মেমদের সঙ্গে ফোটো তোলাবার সময়েও হাসি মুখ করতে পারতুম না, সব সময় মনে হতো পোঁদে গু লেগে আছে।

    জজ সাহেব বলেছিলেন যে উনি ব্যারিস্টারের পরিবারের বলে ছোটোবেলা থেকে কমোডে বসে টয়লেট পেপার প্রয়োগ করে হেগে চলেছেন, এমনকি প্রতিদিন রায় দেবার সময়েও উনি নিজের পশ্চাদ্দেশ সম্পর্কে চিন্তা করেন না ; তবে এর পর টাইমস স্কোয়ারে গেলে রঙ-করা উন্মুক্ত-স্তন মেমদের সঙ্গে অবশ্যই ফোটো তোলাবেন।

    আসলে যে টিভিতে জাপানি তেল, বুলেট তেল আর হনুমানের মালা বিক্রি করে তারাই মোটর সাইকেল ধর্ষক লিখে লিখে আমার কেসটাকে গুবলেট করে দিয়েছিল, ওদের কাগজেই রসিয়ে রসিয়ে লিখত, পাবলিক পড়ে নিজেদের টাকে হাত বুলিয়ে ভাবত, এ শালা মোটর সাইকেলকে কেমন করে রেপ করে, নাকি ছুটন্ত মোটর সাইকেলের ওপর কোনো মেয়েমানুষকে চিৎ করে শুইয়ে রেপ করতে করতে গাড়ি ওড়ায়। ওদের সাংবাদিক আমায় জিগ্যেস করেছিল যে মেয়েদের দিকে তাকালে আমার যৌনতার উদ্রেক হয়, নাকি মোটর সাইকেলের দিকে তাকালে।

    আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম ওনাদের যে, ধোয়া সত্য, লালচে তুলসী পাতায়, নতুন ঝকঝকে মোটর সাইকেল দেখলে আমার লিঙ্গোথ্থান হয়, কিন্তু কোনো যুবতী আমাকে জড়িয়ে চুমুখেলেও আমার দেহে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না ; মনে হয় পাঁঠার মাংসের কার্টিলেজ চুষছি, আমি মেয়েদের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সিটি বাজাইনি কখনও, শোরুমের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন মোটর সাইকেলের দিকে ঠায় তাকিয়ে হুইসল দিয়ে গান করি।

    জজসাহেব, কানের ঝুলঝুলে লতিতে পাকাচুল, ভুরুতে পাকাচুল, ঝাবড়া গোঁফের চুলও পেকে ঝুলে পড়েছে, আমার মামলার যে আদেশপত্র লিখেছেন, লিখতেও মাস দুয়েক সময় নিয়েছিলেন, তার সঙ্গে আমার মামলার যে কী সম্পর্ক বুঝতে পারিনি বলে আমার রাশভারি উকিল চটে গিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন, মহাশয়, আপনি যদি কাউকে বুঝতে না পারেন তাহলে সেটা আপনার চরিত্রদোষ।

    জজ সাহেব লিখেছেন, “মোটর সাইকেল বহু ভাষায় স্ত্রীলিঙ্গ, আসামী মোটর সাইকেল চুরি করেননি, তার কারণ ধারা তেইশের বারো বি অনুযায়ী, কোনো মহিলাকে চুরি করা যায় না, কিডন্যাপ করা যায়, আসামী কাউকে কিডন্যাপ করেননি, কোনো ক্ষতি করেননি, যেমন চুরি করেছেন তেমনই বিনা আঁচড়ে ফেরত দিয়েছেন, যদিও চুরি করা মহাপাপ নয়, কিঞ্চিদধিক পূণ্য-মিশ্রিত পাপ, তাই মোটর সাইকেলে চাপা পাপ নয়, আদি মানব সমাজে পাপ নামে কিছুই ছিল না, থাকার কারণ নেই, তখন মোটর সাইকেল ছিল না, আদি মানবীদের আমরা মহিলা বলি না, মহিলা বা তরুণী বললে, কিডন্যাপের প্রশ্ন উঠবে, তখনকার দিনে মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্হা ছিল, পুরুষদের সিডিউস করার প্রথা ছিল, মোটর সাইকেলকে সিডিউস করা সম্ভব নয়, যদিও বহু মোটর সাইকেলের বিজ্ঞাপনে প্রায় ল্যাংটো মেয়েমানুষের শরীর ব্যবহার করা হয়ে থাকে ; ধারা একচল্লিশের উপধারা তিন অনুযায়ী বিজ্ঞাপনে নগ্ন নারীর ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু আসামীকে নগ্ন নারী বিজ্ঞাপনে ব্যবহারের জন্য দায়ি করা চলে না, আসামী জাঙিয়া পরে মোটর সাইকেলে চাপেন না, সমাজের উন্নতির জন্য প্রত্যেক নারী-পুরুষের উচিত জাঙিয়া না পরা। একথা ঠিক যে মোটর সাইকেলেও ছিদ্র থাকে যার ভিতরে পেটরল নামের ধাতুরস ফেললে তা উত্তেজিত হয়, এবং কেবল সেকারণেই তাকে নারীছিদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। নারীছিদ্রে পৌরুষের পেট্রল ফেললেই যে তা উত্তেজিত হয়ে উঠবে, তার প্রমাণ নেই। পুরুষ হলেই যে তার পৌরুষ থাকবে তা অকাট্য নয়। যাহা হউক, আসামী যেহেতু আসামী, এবং টাকার দাম বিশ্ববাজারে পড়ে যাচ্ছে, আসামীকে কেবল পড়ে যাওয়া টাকায় দণ্ডাজ্ঞা দেয়া হল। আমাদের মনে রাখতে হবে যে টাকার কোনো লিঙ্গ হয় না, তা হেটেরোসেকসুয়ালও নয় এবং হোমোসেকসুয়ালও নয়। ”[১]

    যাক, সিঁড়ির পাকে ঠ্যাঙ পাকিয়ে আর খুলে, আমার মামলাটা চুকেছে, কিন্তু আদালতে আমি চান করে চুল আঁচড়ে একগাল ভাত খেয়ে, নতুন ধুতি-শার্ট পরে, নিয়ম করে আসি, খুনি ময়ূরকন্ঠীর মামলার চাপানওতোর শুনতে।

    খুনিকে বউ বলব না তরুণী না যুবতী না মহিলা বুঝতে পারতুম না, কেননা বুক দেখে না পাছা দেখে না কোমর দেখে না মাথার চুল দেখে কেমন করে যে ঠাহর করতে হয় তা তখন জানতাম না,কিন্তু তার সঙ্গে, পারস্পরিক ক্লান্তির কারণে ভাব হয়ে গিয়েছিল, উকিল মক্কেল ফরিয়াদি বাদি আসামীদের তেলচিটে জমঘটে যৎসামান্য পোঁদ রাখার মতন তো আর জায়গা থাকত না, আমরা গিয়ে আদালতের গুটকা ছেটানো জংধরা আধঝোলা লোহার গেটের সামনে ইঁটের দাঁত বেরোনো আদালতভোগান্তি পাবলিকের ছিরিচরণ ঠ্যাঙানো ফুটপাতে বসে গ্যাঁজাতুম, প্রথম-প্রথম ছোঁয়া বাঁচিয়ে, ওই যে, ভাটাম গাছটার তলায়, পানের দোকানের ডান দিকে, গাছের ঝগড়ুটে কাকেদের গু ফেলার এলাকার বাইরে। মেয়েটা বেশ ঢ্যাঙা, চোখ দুটো এতই বড়ো যে সরাসরি তাকালে, খুনির চোখ যখন, তখন বিঁধবেই, বুকের ভেতরে সেঁদিয়ে চোখ দুটো আমার সারা শরীর ছানবিন করে বেরিয়ে আসতো গলার কাছে, টের পেতুম।

    ময়ূরকন্ঠীর কোনো মুখোশ নেই, আনন্দেরও নেই, দুঃখেরও নেই, নয়তো আদালতে যারা একতলা থেকে নয় তলা, উকিলদের ঘরে গোমড়া মুখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে, পেশকারদের আড্ডায় হাই তোলে, কোর্টপেপারের লাইনে আড়মোড়া ভাঙে, তাদের চুপসে মুখের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, এককালে আনন্দের অসুখে ভুগেছিল, এখন দুঃখের পোঁচড়ে খানিক ঝুলে আছে, লুকিয়ে রেখেছে যে যার নুনের ছিটে।

    ময়ূরকন্ঠীর কথা শুনে-শুনে আমি ওর মনের অশান্তির ঝড়ঝাপটা টের পাচ্ছিলুম, যা চলে গেছে আর যা চলছে, বাস্তব কিংবা ফেনানো, কোনটা আগে কোনটা পরে তা যদিও বুঝতে পারছিলুম না, তরতরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল আমার সামনে ছবি এঁকে-এঁকে, কন্ঠস্বর যেন জানে সে কি ঘটিয়ে ফেলেছে, যাতে সারল্য সম্পর্কে সন্দেহ গড়ে ওঠে।

    একদিন হঠাৎই ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, প্রেম জিনিসটা স্হূল, অশিষ্ট, রূঢ়, বর্বর, অমার্জিত ; মানুষকে ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য করে তোলে, বিচারবুদ্ধিহীন ফানুসে পালটে দ্যায় ; কাউকে যতো বেশি ভালোবাসবে তার প্রতি ততো রূঢ়, বর্বর, অশিষ্ট, অমার্জিত, হতে হবে তোমায় ; তুমি যখন কারোকে ফাকিং করবে তখন তোমায় নিজের যন্ত্রণাবোধকে, যার সঙ্গে সঙ্গম করছ তার যন্ত্রণাবোধের সঙ্গে মিশিয়ে অনুভব করতে হবে। একজনের সঙ্গে যদি প্রতিদিন সঙ্গম করো তাহলে প্রেম লোপাট হয়ে যাবে ; মগজ তো হিসাব রাখে, ক্যালেণ্ডারে টিক দ্যায়। একথাও মনে রাখতে হবে যে প্রেমে লাৎ না খেলে প্রেম সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি হয় না, কেননা প্রেমের নিষ্ঠুর নোংরা বুনো ধ্বংসাত্মক নিহিলিজমের আরাম উপভোগ করার পরেই প্রেম সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে ওঠে।

    জবাবে আমি বলেছিলুম, আমি তো নতুন মোটর সাইকেল ছাড়া আর কারোর সঙ্গে কখনও প্রেম করিনি, তাই হয়তো ঝাড়পোঁছ করে ফেরত রেখে এসেছি ; একে আরেকজনকে পণ্ড করিনি, প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতন।

    আমার মামলার ডেট না থাকলেও ওর যদি ডেট থাকতো, পৌঁছে যেতুম ওর এজলাসে, হাত তুলে অপেক্ষা করার ইশারা করলেও, আর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওর মামলার প্যাঁচগুলো শুনতে থাকলেও, বুঝতে পারতুম না যে কেন ও খুন করেছে, নাকি করিয়েছে, বেশ কয়েকজনকে, আর কোনো সাক্ষী নেই যে বলবে খুনের জন্যে ময়ূরকন্ঠীই দায়ি। পুলিশ যে দুটো লোককে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলেছিল তারা ঘাবড়ে গিয়ে বেমালুম বলে দিয়েছে যে মেয়েটাকে তারা চেনে না, দেখেনি কখনও। ভালো দেখতে এরকম একজন যুবতী কী করে আর কেন যে খুনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল হদিশ পেতুম না। সত্যিই খুন করেছে, নাকি নিজের সম্পর্কে গল্প বানিয়ে আসামীত্বের আনন্দ নিচ্ছে, তা্‌ও সন্দেহ হতো আমার।

    আমি ওকে ওর নাম জিগ্যেস করেছিলুম, বলতে চায়নি, আদালতে পেশকার কেস নম্বরের লোক হাজির কিনা চেঁচায়, যেমন আমার মামলায়, আমার নাম উঠতোই না কখনও, পেশকার কেস নম্বর হাঁকতো। যখন আমরা ফুটপাথে বসা আরম্ভ করলুম, ছোঁয়াছুঁয়ির দূরত্ব কমে এলো, মেয়েটি বললে, ঠিক আছে, আমি তোমাকে ৬১৪ বলে ডাকবো আর তুমি আমাকে ৩৯০ বলে ডেকো, যেমনটা আমাদের কেস নম্বর। প্রস্তাবে সঙ্গে-সঙ্গে ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়েছিলুম মনে আছে, আমার দরকচা বয়সে নম্বরদার খুনি বন্ধুনী পাওয়া চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য, তাও এরকম চুলবুলে তরতাজা স্তন ফোলানো, খোঁপা নামানো, পিঠে বাংলা আঁচল-ফেলা মেয়ে, কোনো কোনো দিন ডেনিম জিনসে, পায়ে রঙিন কেডস, হাতে প্লাসটিকের বালা। খুনি মেয়ের স্টাইল স্টেটমেন্ট বেশ ভালো লাগত, দিল খুশ করে দিত।

    একদিন আমি বলেই ফেললুম, যেদিন ও লাল ফুলের চুড়িদার পরে এসেছিল, তোমার মামলার কিছুই তো বুঝতে পারলুম না, তোমার বিরুদ্ধে শুনছি প্রমাণ নেই, তবু তোমায় গ্রেপ্তার করা হল, পুলিশ হাজতে ছিলে, তারপর জেল হাজতে ছিলে কতো দিন, আর এখন দু বছর যাবত মামলা চলছে। হেসে বলেছিল, যেন স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে অশ্লীল জোকস শেয়ার করছে, সব জানতে পারবে একদিন, আমি এটা নিয়ে একটা লেখা জড়ো করেছি, কয়েকজনের লেখা, সেই কাগজগুলো তোমায় দিয়ে যাবো, তুমি সাজিয়ে নিও।

    যেদিন ওর দশ বছরের জেল হয়ে গেল, সেদিন আমাকে একটা প্লাসটিকের ব্যাগ আর সোনার গয়নার ডিবে দিয়ে বললে, এতে আছে কাগজগুলো, আর সোনার ডিবেতে আছে মুক্তোর মাকড়ি। ডিবে খুলে দেখলুম তিনটে মাকড়ি। আমার কোঁচকানো ভুরুর দিকে তাকিয়ে ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, তিনটে মাকড়ি কেন জানতে চাইছ তো, লেখা আছে, তিনটেই করিয়ে ছিলাম অর্ডার দিয়ে।

    জজ সাহেব ময়ূরকন্ঠীর রায়ে যা লিখেছেন, তাও যে বড়ো একটা বুঝতে পেরেছি, তার দাবি করব না।

    দণ্ডাদেশ দেবার সময়ে অপারেটিভ প্যারায় উনি লিখেছেন, “যাকে বা যাদের খুন আপনি করেছেন, সে বা তারা তখনই আপনার ভেতরে ঢুকে পড়েছে, আর সারাজীবন থাকবে, সাজা শেষ হবার পরও থাকবে, আপনি তাকে বা তাদের নিজের ভেতরে বইতে-বইতে অনাথ হয়ে যাবেন। এটা ঠিক যে বাজে লোকেদের সঙ্গে মিশলে জ্ঞান বাড়ে, আপনাকে সেই সমস্ত মানুষই ঘিরে থেকেছে শৈশব থেকে। ইস্কুল মাস্টার টাইপের ভালোমানুষরা বড্ডো পানসে, অভিজ্ঞতাহীন, তা আপনি জানেন। শুধু টাকা রোজগার করে কেউ সারভাইভ করে না, তাই খুন চুরি ডাকাতি রাহাজানি লুটপাট গুণ্ডামি মারপিট ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের মিথ্যা জোচ্চুরি ছলনা প্রতারণা অসাধুতা ভণ্ডামিকে প্রতিরোধের পথ হিসাবে এই সমস্ত কাজ জরুরি হয়ে ওঠে, নইলে তো সারা জীবন বমি করতে করতে কেটে যাবে ; আপনার তো বটেই, সকল অপরাধীরই, বোধ ব্যাপারটা আংশিক, গানের সুরের মতন তা কোনো একটি লাইন ধরে এগোয় না। হত্যা করা মোটেই হিংস্রতার প্রকাশ নয়। আপনি জানতেন যে যা করবেন মন দিয়ে করবেন, ফলাফলের জন্য ভাবতে গেলে সব গুবলেট হয়ে যাবে, কেঁচে যাবে। একথা সত্য যে, সব সুড়ঙ্গের শেষে আলো থাকলেও সে আলো সকলের ভাগ্যে জোটে না ; লক্ষ শুক্রাণুর মধ্যে একটিই কেবল ডিম্বাণুর আলো পায়। একথাও সত্য যে এক-এক সময়ে বেঁচে থাকা অসহ্য হয়ে ওঠে, আর কিছুকাল পর তা ভালো লাগতে আরম্ভ করে, অসহ্যের নেশা হয়ে যায়। আপনার বিরুদ্ধে খুনের প্রমাণ অকাট্য নয়, আনুষঙ্গিক, এবং আপনি একজন আসামী। আসামী মাত্রেই সাজার পাত্র। অপরাধী-সমাজে খুন যেহেতু সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় বলে পরিগণিত, তাই ধারা একশো সাঁইত্রিশের উপধারা সাত অনুযায়ী আমি আপনাকে শ্রমবর্জিত কারাদণ্ড দিচ্ছি। দণ্ডভোগের জন্য আপনি বেনারসি কটকি মুর্শিদাবাদি বালুচরি যেমন শাড়ি ইচ্ছা পরতে পারেন, আরামকেদারায় বসে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখতে পারেন। ”[২]

    পাঁচজন আসামীকে জজ সাহেব ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন, মনে আছে, তারা সবাই দলীয় পতাকাকে লুঙ্গির মতন করে পরে একজন পোয়াতি বউকে ধর্ষণ করে খুন করেছিল। জজ সাহেব রায়ে লিখেছিলেন, “মানুষ একদিন মরে যাবে বলেই বেঁচে থাকে, এবং মরে যাবার পর চিতায় ওঠাই ভালো, কেননা তাহলে কাউকে আপনাদের পঁচাশি কুইন্টালের স্মৃতি বইতে হবে না। ফাঁসির মঞ্চে আপনাদের মুখে লিউকোপআস্ট লাগিয়ে দুপুর বারোটায় আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হবে, তার কারণ হল আপনারা ধর্ষণ ও হত্যাকে জীবনের উদ্দেশ্য করে তুলেছেন, অন্তত উদ্দেশ্য তো ছিল আপনাদের। ফাঁসির হুকুম দিয়ে কলমের নিব ভাঙা নিয়ম, কিন্তু আমি বল-পেন ব্যবহার করি।”[৩]

    সেন্ট্রাল জেলের জেলার সরসিজ বসু, বেশ ঢ্যাঙা ভদ্দরলোক, হাসির গমকে কয়েদিরা কুঁকড়ে যায়, কড়িকাঠ থেকে আরশোলা-টিকটিকি খসে পড়ে, আমি যখন জেল হাজতে চোদ্দদিন পচছি, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটরসাইকেল রেপিস্টের পুলিশি প্রতিবেদন পড়ে, আর টিভিতে গরমাগরম কানার-বচন শুনে, বলেছিলেন, বোঝা-যায়-না এরকম একখানা গম্ভীর স্বকপোলসত্য কাহিনি জেলের সুভেনিরের জন্যে তৈরি করে দিতে, যা লোকে পড়ে বুঝতে পারবে না, ভাববে বাংলায় বিদেশি ভাষা পড়ছি, অথচ ঘাড় কাৎ করে বাহবা দেবে। ঠিকই, বাংলায় লিখে অমনটা করতে পারব, ইংরেজিতে লিখলে যতোই প্যাঁচালো হোক, যারা পড়ে তারা উজবুক হলেও বুঝে ফ্যালে।

    আমি ওনাকে বলেছিলুম, স্যার আমি লিখনদার কিংবা বেচনদার কিছুই হতে চাই না, চাইনি, হবো আবার কি, যা আছি, তা-ই আছি, এই প্যান্ট-জামায়, ব্যাস, লিখে হবেই বা কি ! আপনি হয়তো বলবেন, লেখালিখি অনেক ভালো কাজ, কিন্তু স্যার ভালো কাজ মানেই তো পারভারশান, প্রেম করার মতন আঠালো, ঠাণ্ডা মাথায় আরেকজনের আত্মপরিচয়কে মুছে নস্যাৎ করে তার কল্পনাকে জবরদখল করা ছাড়া প্রেম আর কি হতে পারে বলুন ? লেখালিখিও তাই নয় কি !

    জেলার সরসিজ বসু বললেন, আপনি না চাইলেই বা, হেরে যাবে জেনেও মানুষ একে আরেকজনকে ভুল বুঝিয়ে ঝগড়ার মাধ্যমে কি সম্পর্ক তৈরি করে না ? তবে ! আপনার কতো লোকের সঙ্গে বুনো মাকড়সার জালের মতন অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে উঠবে, দেখবেন। মনে রাখবেন যে যুদ্ধ হল চরম আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ; লেখালিখিও যুদ্ধ। আর প্রকৃত প্রেম বলে কিছুই হয় না, সবই মানবদেহের রসায়ন। আমরা তো কতো লোককে ঘৃণা করি, আবার তাদেরই যারা ঘৃণা করে, এমন লোকের সঙ্গে দেখা হলে গর্বে হাসাহাসি করে ফুলে উঠি, নয়কি ! আসলে ঘৃণা করাটা হল এক ধরণের সহিষ্ণুতা। যাক, আপনি লিখুন, এখনও তরতাজা যুবক, নয়তো যতো বয়স বাড়বে, ততো বেশি অবাঞ্ছিত লোকেদের পাবেন আপনার চারিপাশে, আসল শত্রুদের চেয়ে কাল্পনিক শত্রুদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। এখন আমার কাজ আছে, কয়েদিরা স্বমেহন করে-করে জেলের নর্দমা জ্যাম করে দিয়েছে, ইলিশের ডিম উপচে পড়ছে নর্দমাগুলো থেকে।

    কিন্তু স্যার, আমি তো কখনও লেখালিখি করিনি, বলেছিলুম জেলার সাহেবকে।

    উনি বললেন উনি যখন চাকরিতে সবে ঢুকেছিলেন, পায়ে পালিশ-করা বুটজুতো, টানটান উর্দি, তখন জানতেনই না আসামীদের টর্চার করার কাজটা কীভাবে আরম্ভ করতে হয়, প্রথমবার একজন আসামীকে টর্চার করে মুখ খোলাতে গিয়ে কেমন গলদঘর্ম হয়েছিলেন, আসামীটা নিজেই হাসাহাসি টিটকিরি ইয়ার্কি করছিল ; তারপর ধাপে ধাপে সব শিখে নিয়েছেন, সব রকমের টর্চার। টর্চার করে করে মন ভরে গেছে বলে প্রতিষ্ঠানে কাঠখড় পুড়িয়ে জেলার হয়েছেন। টর্চার ব্যাপারটা অনেকটা সঙ্গম করার মতন, মিশনারি আঙ্গিক থেকে এগোতে এগোতে চুরাশি আঙ্গিকের চেয়েও বেশি আঙ্গিক দখলে চলে আসে, নতুন নতুন আবিষ্কার, এই আরকি। টর্চার করা যেমন কেউ শিখিয়ে দেয় না, তেমনই সঙ্গম করা। ইউ জাস্ট ডু ইট অ্যাণ্ড এনজয় দি ফার্স্ট ব্লাড।

    জেলার সাহেবের আদেশ মেনে নিয়েছি। তবে আমি ওনাকে বলেছি যে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গম্ভীর-গদ্য থেকে মশলা টানবো না স্যার, তাতে লোকে আমাকে মুকখু মনে করবে, আমি তাই বিটকেল নামের বিদেশীদের গিঁট দেয়া ড্যাংগুলিই খেলবো, তাহলে লোকে আমাকে অন্তত বিদ্বান তো মনে করবে।

    Double space

    আজকে দুপুরবেলা আকাশ কালো করে যখন বৃষ্টি হবো-হবো করেও হল না, অনেক খুঁজে ময়ূরকন্ঠীর দেয়া কাগজগুলো বের করে সাজিয়েছি, দেখি খুনের কারণ জানতে পারি কিনা, ঢুকে যেতে পারি কিনা ওর ভেন্ট্রিল্যাকুইস্ট বিবেকে, জানতে পারি কিনা ওর অসুখ আর কর্তৃত্বের ইতিহাস, যা ময়ূরকন্ঠীকে আত্মধ্বংসের মোহনায় ভাসিয়ে দিয়েছে, নিজের ভেতর যে তাঁবু ফেলেছে তার রহস্য কি। হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে ওর তাঁবুর লন্ঠনালোকে আনন্দালোকে।

    ময়ূরকন্ঠী যখন জেল থেকে সেজেগুজে বেরোবে তখন তো আমি কোথায় কোন মোটর সাইকেল উড়িয়ে নিয়ে চলেছি তার ঠিকঠিকানা নেই, তাই জেলার সরসিজ বসুকে বলেছি, ২০২৪ সালের ২৮শে অক্টোবর বারোটা তিরিশ মিনিটে ময়ূরকন্ঠী যখন ছাড়া পাবে, ওর হাতে ছাপা সুভেনিরের একখানা কপি তুলে দিতে। উনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেখবেন লেখাটা যাতে খুনির প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ হয়।

    আদালতবাড়ি পাইন বনের জঙ্গলে বলে প্রতিষ্ঠানের ঠিকেদাররা জেল তৈরি করিয়েছে সেগুন বনের জঙ্গলে। সে অনেকটা হাঁটা পথ।

    লিখতে বসে যে চিন্তাটা প্রথমে এলো তা এই যে প্রেমের সফলতার জন্যে রঙিন কনডোম কেন, সুগন্ধি কনডোম কেন ? তাহলে কি প্রকাশ্য দিবালোকে প্রেম করা উচিত ! প্রেমের প্রকৃত গন্ধ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রেমযন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা ! বাস্তব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে না কি প্রেমিক-প্রেমিকারা !

    আমি কি বাস্তবকে কল্পনায় পালটাতে পারব, এত বিশৃঙ্খলার ভেতর জীবন কাটিয়েছি, একজন মানুষকেও দেখলুম না যে অসৎ নয়, যে লোকগুলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছে, সবচেয়ে অসৎ হবার সম্ভাবনা তাদের মধ্যেই পাই।

    Double space

    ওম নাস্তি, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি লিখে, ঘুমোতে যাবার আগে কাগজগুলো সাজানো শুরু করলুম। জানি ব্যর্থ হবো, তবু আরম্ভ করতে দোষ কোথায় !

    সবায়ের জন্যে তো লিখছি না, যারা সাজা পেয়ে ভুগছে আর ভবিষ্যতে এসে ভুগবে, শুধু তাদের জন্যে লিখছি। যারা বিনা কারণেই সাজা পেয়েছে আর ভবিষ্যতে অকারণে সাজা পাবে, তাদের পড়ে আনন্দ হবে।

    জেলার বলেছিলেন, রাতে ঘুমোবার সময় যখন স্বপ্ন দেখবেন, তখন স্বপ্নের ঘোরে লিখবেন, মনে রাখবেন যে জন্মাবার সময়ে আপনার সারা শরীর রক্তে ভাসছিল, তার স্মৃতি নষ্ট হতে দেবেন না।

    আমি বলেছিলুম, যা সত্যি তাই বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, খুনখারাপি ছাড়া প্রতিষ্ঠানের বদল হয় না, প্রথমে সাফাই করতে হয় ওপরতলার লুম্পেনদের, তারপরে এক এক সিঁড়ি লুম-লুম-পেন-পেন করে নামতে হয়, তবে গিয়ে মহাকাব্য ।

    Three line space

    জগার্স পার্কে ছয়টা দৌড়-পাকের পর সিমেন্টের ফিকে লাল বেঞ্চে, পাখিদের যৌথ গু এড়িয়ে, অর্ধেক ফাঁকা জায়গায় শাদা শর্টস আর লাল টিশার্ট স্পোর্টশ শু, যুবক বসল, ইউ ডি কোলোনিত একহাতি গামছা পকেট থেকে বের করে মুখ মুছে, তাকালো আগে থাকতে বসে থাকা যুবতীর দিকে, যুবতীর পাছার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইছিল যুবক, তার আগেই যুবকের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে যুবতী কথা বলা আরম্ভ করল, এমন ঢঙে যেন মৃত্যুর উনি মালকিন। [৪]

    এই বোকাচোদার মরণ, জানিস না যে মেয়েদের দিকে একনাগাড়ে তাকানো অশ্লীল, তাকে দখল করে যৌনতায় কয়েদ করার ইচ্ছে...তখন থেকে দেখছি...কুমিরের কুতকুতে চোখ মেলে স্টকিং করছিস...আর মেয়েমানুষ পাসনি...যা না...ওই তো অতো কচি কচি মেয়েরা মাই দুলিয়ে পোঁদ নাচিয়ে জগিং করছে...ওদের পেছন পেছন গিয়ে দৌড়োতে পারিস না বানচোদের মরণ...আমার পাশে এসে বসার কি দরকার...আমার চোখ দুটো বড়ো আমার ঠোঁট বেশ পাতলা... আমার স্কিন বেশ ঝকমকে...আমার মাই দুটো হইচই মার্কা...এইসব এক ফাঁকে বলবি বলেই তো পেছু নিয়েছিস...নাকি...আর ইউ ডেফ...ইউ মরণের মাদারফাকার...হোয়াই ডোন্ট ইউ স্টপ স্টকিং...এছাড়া... আর কোনো কারণ আছে তো বল...শুতে চাস এক্ষুনি...নাকি...রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ি আর তুই চাপ আমার ওপর...আমি শাড়ি তুলে ধরি আর তুই তোর কম্মো করে কেটে পড়...এই চাইছিস তো...কি রে... মুখে কথা সরছে না যে...রাসকেলের মরণ...হাঁ করে তাকিয়ে আছিস...মাই টিপবি...চল তাহলে পার্কের ঘাসে গিয়ে বসি...ছাতা-টাতা এনেছিস...আড়াল করার জন্য...যত্তো বোকাচোদাগুলো আমার পেছনেই লাগে…ক্ষমতার কেন্দ্রে জরায়ু থাকবেই…

    যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, একজন মেয়ের সঙ্গে প্রথমবার শোবার কথা ভাবলেই বুক ধড়ফড় করে ; সাজগোজ করে সময় নষ্ট করার মানে হয় না, সেই তো চটচটে ঘাম, যতো সব আঠালো ক্লান্তি, জখমের খোসা, প্রথমবার পাতপাড়ার মতন বসে হলে সবদিক থেকে ভালো। কিন্তু মানতে হবে, এই মেয়েটা শ্রোতার সন্মানহানির কায়দা আলজিভে রপ্ত করে ফেলেছে। [৫]

    যুবতী : যা যা... কেটে পড়...বাড়ি যা...তোর মা ব্রেকফাস্ট নিয়ে অপেক্ষা করছে...তবু ফলো করিস...চটি খুলে পেটাবো নাকি...না হাঁক পেড়ে লোক জড়ো করব...আপনি কি ভাবছেন...আপনি স্মার্ট আর হ্যাণ্ডসাম বলে পার পেয়ে যাবেন...উরুর চুল পায়ের গোছের চুল দেখিয়ে হিম্যান প্রমান করতে চাইছেন..আপনার গৌরবর্ণ দোহারা ঢ্যাঙা চেহারা...একমাথা কোঁকড়া চুল দেখে ফেঁসে যাব আমি...অতই সস্তা পেয়েছেন নাকি আমাকে...যান নিজের পথে যান...বিরক্ত করবেন না...ভালো করে কথা বলছি...এর পর চটি পেটা করব সত্যি-সত্যি...কোথা থেকে যে জুটলো এই গবেটটা...নেড়ি কুকুরের মতন লেগেই আছে পেছনে...এই ঢ্যামনা রোমিওর মরণ...নিজের পথ দ্যাখো...আমার পঁচিশ বছর বয়স হয়ে গেছে বলে ভেবো না যে শোবো বলে মুখিয়ে আছি…বারো বছর বয়স থেকে এই বোকাচোদাগুলোকে ফেস করতে হচ্ছে...বাসে চাপো তো পোঁদে বডি ঠেকিয়ে মরণের ল্যাওড়া ফোলাবে...উৎসবে যাও তো ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মাই চটকে বেরিয়ে যাবে...বেশ্যালয়ে যাবার মুরোদ নেই মরণের বানচোদগুলোর...রাস্তায় বিনিপয়সার মাগ পেলেই লেগে যাবে পেছনে…আমাকে স্টকিং করার হলে হিটলার করবে...জোসেফ স্ট্যালিন করবে...জুলিয়াস সিজার করবে...

    যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, রোমান্টিক শব্দটা ইংরেজি, এর বাংলা প্রতিশব্দ নেই, মেয়েটা যে কথার ঝাড়ের মাঝে শ্বাসের সময় নিচ্ছে, তা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে, কথাগুলোর চেয়ে মাঝের নিঃশব্দ ফাঁকটাই আতঙ্কের।

    যুবতী : তা সে তুমি যতই নায়কের মতন হাবভাব করো...চলো...চলো...যাও...যাও...কী ভাবছ...আমি ভার্জিন কিনা...হ্যাঁ...আমি ভার্জিন...কারোর সঙ্গে শুইনি...আগে ম্যাস্টারবেট করতুম… এখন অটোমেটিক অরগ্যাজমের টেকনিক রপ্ত করে ফেলেছি...লাবিয়ায় মুক্তো লাগানো একটা মাকড়ি লাগিয়ে নিয়েছি...এই যে দুই কানে যেমন দেখছিস, তেমনই...সেই মাকড়িটা....পার্কে এক পাক হাঁটলেই...বুঝেছিস তো...কিছুক্ষণের ঘষটানিতে আপনা থেকেই অরগ্যাজম হতে থাকে...সেটাই এনজয় করি পার্কের বেঞ্চে বসে...কোনো মরণের কুত্তাপুরুষের দরকার হয় না...হাঃ হাঃ...কি বুঝলি...মাকড়ি তো...দুই কুঁচকিতে উল্কিও করিয়েছি...প্রজাপতি উড়ছে...উল্কি জানিস তো...ট্যাটু...অরগ্যাজমে উড়তে থাকে প্রজাপতি দুটো...বুঝলি...কি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন যে...বিশ্বাস হচ্ছে না...ভাবছিস কে কে আছে আমার যে এই সব মজা নিই লাইফের...আছে রে দু দুটো বাপ...একজন অন্ধ...পিটুনির চোটে অন্ধ হয়ে গেছে...আরেকজন অ্যালঝিমার রুগি...ভাবছিস মাটা কমনে আছে...সে বেটি পালিয়েছিল আরেকজন কচি কচকচের সঙ্গে...ছোঁড়াগুলোর টেস্টও বলিহারি...টিভিতে মাকে দেখে প্রেম করে বসল এক ছোঁড়া...মা তার সঙ্গে লিভ-টুগেদার বেঁধেছে...টিভির গল্পটাকেই নিজের জীবনে অ্যাডপ্ট করে নিয়েছে...তুই এখনও তাকিয়ে আছিস যে...কুঁচকির প্রজাপতি দেখতে চাইছিস নাকি...তাহলে তোকে বলি যে আমার বুকের খাঁজে কাঁকড়ার উল্কি আছে…তোরা তো হাজার হাজার বছর আগে গুহায় যেমন থাকতিস এখনও তেমনই আছিস…তুই কি ভাবছিস আমি কারোর সঙ্গে শুতে চাই না...চাই...চাই...চাই...স্ট্যালিনের সঙ্গে শুতে চাই...মাওয়ের সঙ্গে শুতে চাই...হিটলারের সঙ্গে শুতে চাই...সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে শুতে চাই...লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে শুতে চাই...আর এন ট্যাগোরের সঙ্গে শুতে চাই...রামকিঙ্কর বেইজের সাথে শুতে চাই...এক এক রাতে এক এক স্বপ্নে শুতে চাই...ফর মি লাভ ইজ ইনসারেকশান...স্টকিং হল প্রতিবিপ্লব…[৬]

    যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এরা এক এক সময়ে এক একটা মানুষকে পছন্দ করে, তারপর সারাজীবন একজনকে নিয়ে কেমন করে কাটায় ! আসলে অন্ধকার জমাট বাঁধতে থাকে, সম্পর্ক গলতে থাকে। সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শিল্প হল কনফিউজন ক্রিয়েট করা। সেটাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যেন কোনো আক্রমণ থেকে প্রাণপণে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে।

    যুবতী : তোর এখনও শুনে আশ মেটেনি...যা দিকিন এখান থেকে...কার কাছে ট্যাটু করিয়েছি তাই ভাবছিস তো...কোনো মহিলা-টহিলার পারলরে নয়, পুরুষেরই ট্যাটু পারলরে, প্রজাপতি দুটোর গায়ে তিন রকমের রঙ আছে...কাঁকড়াটা লাল করিয়েছি...কোনো মরণের বানচোদ ধর্ষকের পাল্লায় যদি পড়ি কখনও তো তাকে লাল কাঁকড়া ফেস করতে হবে...যদিও জানি যে লাবিয়ার মাকড়িতে তার নুনু আটকে ফর্দাফাঁই হয়ে যাবে...বুঝলি...কী...শুনে ভয় পেয়ে গেলি...এতক্ষণে ধারণা করে নিয়েছিস নির্ঘাত যে আমি বেহেড পাগল...তা ঠিক...আমি কম কথার মেয়ে...বেশি বক বক করতে পারি না...আমি কি করে দুটো বাপকে চালাই ভাবছিস...অন্ধ বাপের পেনশন জোটেনি...কেস চলছে...শালা কবে যে ফয়সালা হবে...তাও আমাকেই সামলাতে হয়...বাপের দপতরে গেলে মরণের কেরানিগুলো আমার খাপেখাপ দেখতে থাকে...অরগ্যাজমের উত্তেজনা-আনন্দ উপভোগ করব...তা নয় মাকড়ি খুলে দৌড়োও আদালতে...জানতে চাইছিস বোধহয় যে দুটো বাপ কেমন করে হতে পারে...হতে পারে..হতে পারে...এই ধরো আমি তোমাকে বিয়ে করে নিলুম...তারপর তোমায় ডিভোর্স না দিয়ে চুপচাপ আরেকজনকে বিয়ে করে নিলুম...একজনের সঙ্গে শুয়ে কি আশ মেটে..বলো তুমি...মেটে না...মেটে না...সব মিথ্যে...ইউ লিভ ফর ওয়ান্স ওনলি...জানতে পেরে আমি দুজনকে এক ছাদের তলায় এনেছি...ভাবছ বাপেদের ককটেল চরিত্র পেয়েছি আমি...তা ঠিক ধরেছ...দুজনের চরিত্র আমার ওপর একসঙ্গে বর্তেছে...কোন বাপের মেয়ে আমি জানি না...বিজ্ঞানের সাহায্য নেয়া যেতে পারত...নিইনি...শেষে হয়তো দেখব এদের দুজনের কেউই আমার বাপ নয়...পুরো টাকা গচ্চা...তাছাড়া জেনেই বা কী হবে কোনটা আমার বাপ...বলো…

    যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই মেয়েটা, সব মেয়ের মতনই, বিভ্রমের বাস্তবতায় বাস করে, যেন ঘুম ভেঙে দেখছে এতোকাল খরগোশের গর্তে ঘুমোচ্ছিল আর হঠাৎ উঁকি দিয়েছে শেয়ালের হাসিহাসি হাঁ-মুখ।[৭]

    যুবতী : তুই ভাবছিস আমি কি করি...হ্যাঁ...রান্নাবান্না করি...আমি আসলে ওই হাসপাতালটায় রিসেপশানিস্ট ছিলাম...বুঝলি...তোর জন্যেই তো চাকরিটা গেল...আমি কিই বা করেছি...আমার কোনো দোষ ছিল না...পুরো বিজ্ঞানের দোষ...বিজ্ঞান মানেই ফাঁদ...ফেলে দিল আমাকে ফাঁদে...তুই তো জানিস...দেখেছিলেন তো কী হয়েছিল সেদিন…নার্সটাকে বলেছিলাম এম আর আই রুমে ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে আসতে...তাকে বলা হল কিছু সে শুনলো আরো কিছু...সে বেটি কি করলে...সে করিডরে রাখা অক্সিজেন সিলিণ্ডারটা নিয়ে রাখতে চলে গেল এম আর আই রুমে...তারপর যা হবার তাই হলো...এম আর আই মেশিনের রাক্ষসি ম্যাগনেটিক ফিল্ডকে অ্যাক্টিভেট করে দিলে মেটাল সিলিণ্ডারটা...সেকেন্ডের মধ্যে নার্সটাকে আর যে টেকনিশিয়ান সেখানে দাঁড়িয়েছিল দুজনকেই খেলনার মতন টেনে নিলে মেশিনটা...সে কি আওয়াজ...আর চিৎকার… চার ঘণ্টা ধরে আটকে ছিল ওরা...তাতে আমার কি দোষ…ওই দুর্ঘটনার জন্যে নাকি আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে…দিনকাল খারাপ যাচ্ছে মনে করলে তাকে আরও খারাপ করে তুলে পার পাওয়া যায়...

    যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই যুবতী ভবিষ্যতের কলোনিতে ডেরা ডেলে আছে, সময়কে নষ্ট করে-করে অতীতে পৌঁছোতে চাইছে মনে হয়। এর মগজ সময়কে ভুলে গিয়ে থাকবে, কিন্তু মগজ দাগ রেখে গেছে এর সময়ে। তাই সময়কে নষ্ট করে চলেছে, আর কতো পাক খুলবে কে জানে, নষ্ট হওয়া ছাড়া সময়ের তো অন্য কোনো গতি নেই। হঠাৎ কথা বন্ধ করে আবার আরম্ভ করে, বোধহয় এই নৈঃশব্দের সময়টায় ওর অরগ্যাজমের তুলতুলে বিস্ফোরণ হয়।

    যুবতী : জেনেরাল ইলেকট্রিক থেকে একজন ইনজিনিয়ার এসে মেশিনটা ডিঅ্যাক্টিভেট করার পর ম্যাগনেটিক ফিল্ডটা গেল...মরণের নার্সের তো কনুই ফ্র্যাকচার...টেকনিশিয়ান বেচারা একদিকে নার্স আর সিলিণ্ডারের মাঝে...দুই হাত নার্সের দুই বুকে অথচ টিপতে পারার মতন জ্ঞান নেই...অন্যদিকে মেশিনের হাঁ-মুখে...বেচারার ইউরিনারি ব্লাডার ফুটো হয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড...ওদের দুজনকে সারিয়ে তুলতে নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জন, অরথোপেডিক সার্জন, নেফরোলজিস্ট, প্লাসটিক সার্জন, ইনটেনসিভিস্ট কতো ডাক্তারের যে সময় গেল...নার্সটা কখনও কাজ করেনি এম আর আই রুমে...জানতো না যে এম আর আই রুমে মেটাল নিষিদ্ধ...তোকে এসব কেনই বা বলছি...তুই জেনে কিই বা করবি...মেশিন সুইচ অফ করলেই ওর ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিঅ্যাক্টিভেট হয় না...আমি তো দৌড়ে গিয়ে সুইচ অফ করে দিয়াছিলাম...তারপরেও ওদের দুজনকে টেনে বের করা যাচ্ছিল না… ম্যাগনেটকে মেশিন থেকে আলাদা করতে সময় লেগে গিয়েছিল...চার ঘণ্টা ওইভাবে আটকে...নার্সের দুই মাইয়ে দুই হাত...টিপবে তেমন জ্ঞান নেই...কত দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল...ইনটারনাল এনকোয়ারিতে আমাকেই বলির-ছাগলি করা হল...চাকরি খোয়ালাম…নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে...হসপিটালিটি কোর্সটা না করে কমার্স পড়লে বরং ভালো ছিল…

    যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, যাক এর বকবকানির কারণ জানা গেল। অ্যাদ্দিনে প্রগতির সহজাত তোতলামির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, হয়তো সেই থেকে যারা ওকে পছন্দ করে তাদের ও অপছন্দ করে। এ যখন জানতে পারবে যে আমি একটা বুনো জানোয়ার, তখন কি হবে !

    যুবতী : প্রথম বাপটা আমার জন্যেই অন্ধ হয়ে গেল...পিটুনি খাবার পর যে হাসপাতালেই নিয়ে গেছি...আমার মুখ আর নাম দেখেই নার্সগুলো দুর্দুর করে তাড়িয়েছে...ট্রিটমেন্ট হল না ঠিকমতন...প্রথম বাপটা অন্ধ হয়ে গেল...সেই থেকে পৃথিবীটাকে জুতোতে ইচ্ছে করে...হাসপাতালগুলোকে রাতের অন্ধকারে একদিন পেটরল ঢেলে আগুন লাগাব...তুই তো পেছনে লেগেছিস...হেল্প করবি...নাকি...শুনেই মরণের গাঁড় চুপসে গেল...আমি এক বাক্যির মেয়ে...কাউকে রেয়াত করি না...বদলা নেবোই...বলির পাঁঠা বানালো কিনা আমাকে...আমার কি দোষ...নার্সটাকে বলেছিলাম ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে গিয়ে দিতে...উনি অক্সিজেন সিলিণ্ডার নিয়ে ঢুকে পড়লেন...মানুষকে আর বিশ্বাস করি না...কথা বলাকেও বিশ্বাস করি না...বলা হয় কিছু...আরেকজন শোনে কিছু...শেষে কাণ্ড ঘটে অন্যকিছু...দুর্বাঁড়া তোকে কেনই বা বলছি এসব...

    যুবকের দিকে পাশ ফিরে বলতে থাকল যুবতী, বড়ো টানা স্মাজফ্রি কাজলচোখ কুঁচকে।

    যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলছিল, সাতসকালে জগিং পার্কে কাজলটানা চোখ ! হলুদ ব্লাউজের সঙ্গে ম্যাচিং ফিকে হলুদ প্রজাপতি ওড়ানো সিনথেটিক শাড়ি। চুলে হলুদ ক্লিপ। পায়ে হলুদ ফুল ফ্লিপ-ফ্লপ, জগিং শু নয়। প্রতিদিন আসে না, সপ্তাহে দিন তিনেক। কোনো দিন টপ আর স্ল্যাক্স, কোনোদিন ডেনিম জিনস, কোনোদিন চুড়িদার, ওকে দেখতে পেলে টানের দরুণ কোনো না কোনো যুবক বসে ওর পাশে গিয়ে।

    আজকের যুবকের দেখে মনে হল মেয়েটা হাঁ করে কুয়াশা খায় আর সেগুলো কথার মোড়কে পুরে ওড়ায়, সেটাই বোধহয় ওর নিজের নিয়ন্ত্রণ খোলার তরকিব, জানে যে ওর কথাগুলো ভাইরাসে আক্রান্ত, ওর ভেতরের পরগাছাগুলোকে কথা শুনিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

    Double space

    হাঁটতে বেরিয়ে এই পার্কে কেবল বুড়িদেরই শাড়িতে দেখেছে যুবক, বা চুড়িদার পরে আসতে। যুবতীরা টপ আর ডেনিম জিন্স, কানে গান, অনেকে ব্রেজিয়ারহীন, মাই থলথলে, কুছ পরোয়া নেই গর্ব। এই যুবতীকে জগিং করতে দেখেনি যুবক, হাত দুলিয়ে হাঁটে, স্রেফ এক পাক, মানে আধ কিলোমিটার, তারপর গিয়ে ওই নির্দিষ্ট সিমেন্টের সিটে।

    যুবক শুনে থতমত, কোনো তরুণীর মুখে এরকম কিলবিলে কথার তোড় শোনেনি এর আগে, মানে সাজুগুজু শিক্ষিতা টাইপের মুখে, তুইতোকারির সঙ্গে আপনি-তুমি মিশিয়ে কী বলতে চাইছে বুঝতে পারছিল না যুবক, সন্দেহও হচ্ছিল যে ইচ্ছে করেই বলছে, আধপাগলি সাজছে।

    সকালে জগিং করার সময়ে তৃতীয় পাক দেবার পর আজ তৃতীয়বার দেখল মেয়েটাকে, সিমেন্টের বেঞ্চে ঠেসান দিয়ে কাঁপছে। জগিং করে না, কেবল হাঁটে মেয়েটা, এক পাক দিয়েই বসে পড়ে বেঞ্চে আর কাঁপে, তিনচার বার কেঁপে বসে থাকে মিনিট দশেক, তারপর উঠে পড়ে। যে যুবকরা টান খেয়ে বসে তাদের কেউ কেউ ওর পেছন-পেছন যায়, কে জানে কোথায় যায়। সত্যিই তাহলে যুবকেরা একে স্টকিং করে।

    কথার তোড়ের পর, শুয়ে থাকা বাছুরের ভয় পাওয়ার ঢঙে, আচমকা উঠে দাঁড়াল যুবতী, বলল, ফলো করবি না, তোদের সবকটাকে চিনি। [৮]

    মেয়েটি উঠে পড়ার পর ওকে সতর্ক করার জন্যে, স্টকিঙের উদ্দেশ্যে নয়, এই মেয়েকে দেখে দেখে আশ মিটে গেছে, এখন ছুঁয়ে দেখতে দিলে প্রস্তাবটা লুফে নেবে। আজকে যুবতীর সমস্যার কথা বলবে বলে, পিছু নিয়েছিল যুবক, লোকজন বিশেষ নেই এরকম ফাঁকা দেখে বলবে, কিন্তু চারিদিকে ব্যস্ত পথচারীদের আনাগোনার দরুণ, যদিও কেউ পথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেও এদের কারোর কিছু এসে যাবে না, বলতে না পেরে, পেছন-পেছন যাচ্ছিল। জগিং পার্ক থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে লাল থোকায় ঝিলমিলে গুলমোহর গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে, খসে পড়া পাপড়ি মাড়াতে-মাড়াতে, যুবতী যুবকের দিকে পেছন ফিরে বলল, মাদারচোদ।

    গালাগালটা শুনে, আশ্চর্য, যুবকের বেশ ভালো লাগল, জাস্ট হিল্লোল। একজন যুবতীর মুখে এই গালাগাল যে মধুমাখানো রহস্যময় হেঁয়ালি হতে পারে, তা এর আগে জানত না, হৃৎপিণ্ড জিনিসটা রক্তের স্রোতকে ইশারা করে মগজে পৌঁছে দিয়ে প্রশ্ন করতে থাকল, ইহার পর কী ইহার পর কী ইহার পর কী। বলতে চাইল, শোবেন নাকি আমার মায়ের ভুতাত্মার সঙ্গে, উনি তো স্বর্গে। তার বদলে চুপ করে রইল, আরও হেঁয়ালির গোলকধাঁধার আশায়। [৯]

    Double space

    যুবতী জানতো গালাগাল শুনেও এই যুবক ফলো করায় বিরতি দেবে না। আগেও এরকমই হয়েছে। স্মাজফ্রি কাজলটানা আড়চোখে দেখে নিয়ে, মেয়েটি এবার সরাসরি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল, যুবকের মুখোমুখি হবার জন্য, আর বলল, কি রে মরণের বানচোদ, বললাম না, তা সত্ত্বেও পিছু ছাড়ছিস না দেখছি, লোক জড়ো করব নাকি, অ্যাঁ, মারের চোটে বাপের নাম ভুলে যাবি, যদি না অলরেডি ভুলে গিয়ে থাকিস।

    মেয়েটি যে সিমেন্টের বেঞ্চে বসেছিল, সেখানে আজ রক্তের দাগ দেখেছিল যুবক। দাঁড়িয়ে উঠতে, ফলো করে বুঝতে পারছিল, যুবতীর শাড়ির আঁচল আর পাছায় রক্ত লেগে। প্রতিদিন কাঁপে, নিশ্চয়ই কোনো অসুখ অনুমান করে, যুবক ভাবছিল, ফাঁকা পেয়ে বলবে যে, আপনার আঁচলে আর শাড়িতে রক্ত লেগে। বলতেই যাচ্ছিল, আপনি বোধহয় আজকে ফিসফিস বেঁধে আসেননি।

    দাঁড়িয়ে আছিস, বোকাচোদার মরণ, ফাক অফ, স্টকিং করবেন না, আমি ডিসগাস্টেড ফিল করি, স্কুলের সময় থেকেই আপনাদের মতন রোমিওদের আচরণে বিরক্ত হয়ে-হয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি। কাইন্ডলি ফলো করবেন না। কেন ফলো করছেন জানি, আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি, সিরিয়াল স্টকার।

    যুবক বলল, আপনাকে যে কথাটা বলতে চাইছি, সেটাই সরাসরি বলি, তাহলে বুঝতে পারবেন কেন স্টকিং করছি। আপনার মাকড়ি ছিঁড়ে গিয়ে থাকবে, ব্লিডিং হচ্ছে বুঝতে পারেননি, তাকেই বোধহয় অরগ্যাজমের আঠা মনে করছেন। আঁচলে আর পেছনে হাত দিয়ে দেখুন।

    যুবতী তক্ষুনি পেছন হাত দিল না, চোখে এক চিলতে নকল ভয় খেলিয়ে, আঁচল সামনে এনে রক্ত দেখতে পেয়ে পেছনে হাত দিয়ে টের পেল চুপচুপে। বলল, সরি, বুঝতে পারিনি, আজকে তো ডিউ ডেট নয়, ডিউ ডেটের আগেই হয়ে গেছে, ডিউ ডেটের একদিন আগেই মাকড়ি খুলে ন্যাপকিন বেঁধে রাখি।

    এই ভাবেই পথ দিয়ে হেঁটে যাবেন ? আমার মোটর সাইকেল আছে, চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। চিন্তা করবেন না, দরোজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ি চলে যাবো। ভাগিয়ে ধর্ষণ করতে নিয়ে যাব না কোথাও, তাছাড়া আপনার লাবিয়ায় মাকড়ির প্রটেকশান তো আছেই।

    চল চল চল চল চল, ভালো আইডিয়া দিয়েছিস, এই ভাবে তো পথে হাঁটা যাবে না, মাছিতে পেছন ঝালাপালা করে দেবে।

    Double space

    মোটর সাইকেলের পেছনের সিটে বসে যুবককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল যুবতী, বলল, যাগগে, এবার তুই তোর গল্প বল।

    স্টার্ট দিয়ে যুবক বলল, এতোক্ষণ আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে, গালমন্দ করছিলেন, এখন আমার পিঠে বুক চেপে আছেন কেন, অস্বস্তি হচ্ছে, পিঠে আপনার ডাবল ব্যারেল মাংসের পিস্তল ঠেকাবেন না, আনইজি ফিল করছি। আর আমার গল্প বলতে আমার জীবনের কোনো গল্প নেই, তাতে অন্য কেউ-না-কেউ আছেই।[১০]

    যুবকের ঘাড়ে গরম ভাপের শ্বাস ফেলে যুবতী বলল, অস্বস্তি হচ্ছে কেন শুনি ? যখন স্টকিং করছিলিস তখন তো অস্বস্তি হয়নি, দেখি দেখি, হ্যাঁ, তোর তো ফুলে উঠছে রে ! একটুকু ছোঁয়াতেই এই অবস্হা ! এক পরশেই শহিদ মিনার তুলে ফেলতে পারিস, আগের জন্মে গাধা ছিলিস নাকি রে ! অক্টারলুনির তো অনেককাল লেগেছিল।

    মোটেই ফোলেনি, হাত সরান, হাত সরান, কী করছেন কী ? লোকজন যাতায়াত করছে ; দেখতে পেলে তারাই এবার চটি পেটা করবে আমাদের দুজনকে। কোন মাংসের মেয়ে আপনি !

    দুজনে একসঙ্গে মার খেলে কী হবে জানিস তো ? আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে জুড়ে যাবো, সাপের মতন, লোকেদের চোখে, নিজেদের চোখেও। আমি তোর পরগাছা, তুই আমার পরগাছা, ওই দম্পতি বলতে যা বোঝায়, দুজনে দুজনকে চুষতে থাকো ছিবড়ে না হওয়া পর্যন্ত, চকাস-চকাস।

    আবার হাত দিচ্ছেন, আমি অকওয়ার্ড ফিল করি এসব ব্যাপারে। প্লিজ। গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে। তার চেয়ে আপনার গালাগালের বক্তৃতা শুরু করুন বরং, আমার শুনতে ভালো লাগছিল, সেক্সুয়াল থ্রিল পাচ্ছিলাম।

    তোর নাম কি হার্দিক ? এতো হৃদয়বান ড্যাংগুলি। আই মিন হার্ড ডিক ! তোর ডিক তো একটু ছোঁয়াতেই হার্ড হয়ে গেল রে। ম্যাস্টারবেট করিস তো ? তবে এতো সেনসিটিভ কেন, লজ্জাবান লন্ঠন ?

    মোটেই হার্ড হয়নি, ওটা আপনার কল্পনা ; আমি যদি হার্ডিক হই তাহলে আপনি তো লাবিয়া কুইন। আগে কখনও শুনিনি যে অরগ্যাজমের জন্যে কেউ লাবিয়ায় মাকড়ি পরে। বাজারে কি কলা-বেগুন-মুলোর অভাব ?

    তুই যে আকাট তা তো তোকে ঝাড় দিয়েই বুঝতে পেরেছি। স্বয়ংক্রিয় ব্যাপারটা বুঝিস না। পিস্তলের কথা বলছিলিস একটু আগে, তা বিছানায় হোক বা প্রতিষ্ঠানের সিংহাসনে, না ঠেকালে নড়ে না রে, ঠেকাও আর গুড়ুম। দুঃখের কথা কি জানিস, সিংহাসনটা কখনও খালি থাকে না, ল্যাংড়া গিয়ে নুলো আসে।

    বাঁ হাত দিয়ে যুবতীর হাত নিজের বুকের কাছে এনে যুবক বলল, তুই তুই করবেন না। আমিও যদি আপনাকে তুই তুই করি তাহলে কাজের বউ হয়ে উঠবেন। আমার এক ক্লায়েন্ট অবশ্য কাজের বউয়ের সঙ্গেই সংসার করে।

    এবার ডান দিক, হ্যাঁ, সোজা গিয়ে প্রথম রাইট টার্ন।

    এতো দূর থেকে পার্কে হাঁটতে যান, নিজের বাড়ির কাছে বাগান টাগান নেই ? তাছাড়া মাকড়ির আনন্দ তো রাস্তায় হাঁটলেও পেতে পারেন।

    তিন গলির মোড়ের মুখে দুজন যুবক, প্রায় ষণ্ডাগোছের, ডোরাকাটা ফুলশার্ট, শার্টের কলারে লাল টাই, কালো ট্রাউজার, রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে হাত তুলে থামতে বলল ওদের।

    এরা যদি মেয়েটার পেছনে লাগে, তাহলে, যুবক পরিকল্পনা ছকে নিল, মেয়েটাকে এদের কব্জায় ফেলে বাঁ দিকের গলিতে ঢুকে শর্টকাট মারবে নিজের আস্তানার দিকে।

    মোটর সাইকেল থামতে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, শহিদ মিনারকে পড়ে যেতে দেবেন না যেন, দু সেকেণ্ডেই ফুসকি হয়ে গেলে ফিরে আরো ভয়ংকর গালাগাল দেবো, বলে, মেয়েটা নিজেই নেমে এগিয়ে গেল স্মার্ট যুবক দুজনের দিকে।

    এরা মেয়েটার বডিগার্ড বা বাউন্সার নাকি ! যা গালাগাল ছাড়ছিল, আর যাদের সঙ্গে এর মেলামেশা, কোন লাইনের মেয়ে রে বাবা ! হুকার ইন ডিসগাইজ নয়তো ! যুবক কয়েকটা শব্দ ভাসা ভাসা শুনতে পেল, সুপারি, টাকা, কাট ডাউন, ক্যারি, মিডনাইট। ওদের একজন মেয়েটাকে একটা কাঁধে ঝোলাবার চামড়ার স্লিং ব্যাগ দিল। অন্যজন একটা পুরিয়া দিল, মোড়ক খুলে শুঁকে, হাতে রেখে নিল যুবতী।

    অ্যাক্সিলাটারে স্পিড নেবে ভাবছে যখন, ফিরে এসে সিটে বসল যুবতী। ওকেই মেরে ফেলার প্ল্যান করছে নিশ্চই ; রোজ একটা ছেলেকে ফাঁসায় আর খুনের হুমকি দিয়ে র‌্যানসাম আদায় করে বোধহয়। স্পিড নিয়ে এঁকে বেঁকে মেয়েটাকে ফেলে দেবার কথা মনে এসেছিল যুবকের, তখনই যুবতী আবার দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল যুবককে, নিজের বুক যুবকের পিঠে চেপে ধরে। ডান হাত এগিয়ে যুবকের কুঁচকিতে রেখে মেয়েটি বলল, কেমন যুবক আপনি, হার্ড ডিক এক সেকেন্ডেই সফ্ট চিক হয়ে যায়, বাঁ হাতে পুরিয়া খুলে নিজের ঠোঁটে মাখিয়ে যুবতী বলল, এদিক ফের, এদিক ফের, তোকে একটা চুমু খাই।

    গাড়ি থামিয়ে পেছন ফিরল যুবক, এমন সুযোগ ছাড়ার মানে হয় না। লোকজনের যাতায়াতকে ডোন্টকেয়ার করে যুবককে চুমু খেল যুবতী, ঠোঁটের গুঁড়ো যুবকের মুখের ভেতরে জিভ দিয়ে পাঠিয়ে।

    এটা কি জিনিস, জানতে চাইল যুবক, বলল, এ তো চিনি নয়, বেকিং সোডার স্বাদও নেই, হেরোইন -কোকেন খাইয়ে দিলেন নাকি, গাড়ি চালাতে গিয়ে দুজনেই ডিগবাজি খেয়ে পড়ব। আর কতো দূরে আপনার বাসা ?

    যা চাটলি তাকে বলে মেয়াও-মেয়াও-কিস, সায়েন্স পড়েছিস না আর্টস ? চাটার অভিজ্ঞতা আছে, নাকি নউশিখিয়া আনাড়ি ! চাটতে না পারলে কোনো প্রেম টেকে না, তা সে নেশা হোক বা সেক্স। [১১]

    আবার তুই তুই করছেন, সসেজ-পোড়া গন্ধের চুমু খেলেন যখন, অন্তত তুমি তুমি তো করতে পারতেন। না, আমি দর্শনে সান্মানিক স্নাতক পড়তে পড়তে ছেড়ে দিয়েছিলাম।

    মুকখু ? ওঃ, তাই গালাগাল খেয়েও মুখ বন্ধ করে ছিলিস, বলবি তো যে তুই আকাট, দর্শন আবার বিষয় নাকি, অন্য সাবজেক্টে সিট না পেয়ে শেষে দর্শন, তারপর দার্শনিক হয়ে ঘোলা জলে সাঁতার, বোমক্যাওড়া সাতল্যাওড়া বক্তিমে, যা কখনও কারোর কাজে লাগে না ! চোখ কান নাক মুখ হাত থাকতেও লোকে কেন দার্শনিক হয় জানিস ? দুনিয়ার বাদবাকি মানুষকে তারা মনে করে বোকাচোদার মরণ, তাদের চোখ কান নাক মুখ হাত নেই। তোরও সেই অবস্হা।

    আকাট নই, ভালো রেজাল্টই করতাম, দাদা ক্যানসারে মারা যাবার পর দোকানটা আমাকেই চালাতে হচ্ছে। বাবা মারা যেতে মা চালাতেন, মা মারা যাবার পর দাদা চালাতো, দাদাও মারা গেল, এখন আমি চালাই। যে মেয়েটার সঙ্গে দাদার বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাদের বাড়ির লোক তো আমার সঙ্গে তার বিয়ে দেবার জন্যে ঝুলোঝুলি করছিল। আমার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো মেয়ে তাকে বিয়ে করা যায় নাকি ! ভেতরে ঢুকে কি সাঁতার শিখব ? তাছাড়া মেয়েদের চেয়ে আমার নতুন মোটর সাইকেল বেশি পছন্দ।

    দোকান ? কিসের দোকান ?

    দশকর্মভাণ্ডার। জন্ম থেকে নিয়ে চিতায় চড়া পর্যন্ত সব রকমের ফর্দ মেনে সাপলাই দিই।

    ওঃ, যতো অশিক্ষিত সুপারস্টিশাস লোকেদের সঙ্গে তোমার কারবার, ঘোমটাদেয়া সিঁথিতে সিঁদুর শাঁখাপলা বউ, খাটো ধুতি পৈতে ঝোলা পেটমোটা বামুন, খ্যাংরাকাঠি কায়েত, দশ আঙুলে দশ রত্নের আঙটি বদ্যি বামুন, তাদের গঙ্গাজলের নামে কলের জল বিক্রি করো, থার্মোকোলের শালপাতা, কাগজের মাটির ভাঁড়, হলদে রঙের কাঠের গুঁড়োকে হলুদ, কৃষ্ণচূড়ার ডালকে বেলকাঠ, জানি জানি। ওসব ছাড়তে হবে তোমায়। আমি শিখিয়ে দেবো যে মেয়াও-মেয়াও-কিস থেকে কতো বেশি রোজগার করা যায়।

    আপনার কেউ মরে গেলে বলবেন। আমি নিজে ঈশ্বর ঠাকুর্দেবতায় বিশ্বাস করি না, এই সব দশকর্মতেও বিশ্বাস করি না, অন্যেরা বিশ্বাস করছে বলে তাদের জ্ঞান দিতেও যাই না। লোকে যেমন আলু-পটল মাছ-মাংস বিক্রি করে, আমি ঐতিহ্য বিক্রি করি।

    ঐতিহ্য ? গুড ওয়র্ড। ভালো করিস। কেউ মরে গেলে আমি ভালোবাসায় সোপর্দ করি। তারপর যুবতী যোগ করল, এখানে এক মিনিট দাঁড়া, ওই পেটমোটাকে এই ব্যাগটার মাল দিয়ে আসি, বলে, নেমে, রাস্তার পাশে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল যুবতী।

    Double Space

    আম কাঠের পালিশ-ওঠা আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে কোলে বন্দুক রেখে বসে থাকা লোকটার হাতে স্লিং ব্যাগ থেকে দুটো হাফ কিলো ময়দার প্যাকেট দিতে, সে পেতলের হাতবাক্স থেকে নোটের তাড়া বের করে যুবতীকে দিল। কোনো কথাবার্তা হল না। এই দেয়ানেয়াও এক ধরণের কথা। সেক্স করার মতন, কথা বলার দরকার হয় না, নাক মুখ দিয়ে নানা রকমের শ্বাস আর আওয়াজ বের করে আনন্দ দেয়ানেয়া করে, ছেলে-মেয়ে, মেয়ে-মেয়ে, ছেলে-ছেলে।

    যুবতী তাড়াতাড়ি হেঁটে ফিরে এলে, যুবক কন্ঠস্বর নামিয়ে, যুবতীর খোলা নাভির দিকে তাকিয়ে বলল, বুঝেছি, এই নেশার গুঁড়োর ব্যবসা করেন। নিজেকে কানে কানে জিগ্যেস করল, নাভিতে কি সাবান লাগায় ? নাকি সব সাবান মুখে? নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমে গেছে।

    তা খারাপ কি ? তুই দশকর্মের গাঁজা বেচিস, আমি মেয়াও মেয়াও বেচি, বলল যুবতী, যুবকের চোখ অনুসরণ করে নিজের নাভি শাড়িতে আড়াল করল।

    আপনার নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমেছে, ওখানেও সাবান লাগাতে হয়।

    আমি ওয়াশিং মেশিন নই যে লিন্ট জমবে ; আর যদি জমেও থাকে, তা থেকে কি উল বানিয়ে তোর জন্যে সোয়েটার বুনে দেবো ?

    ফ্রি রাইড দেবার বিনিময়ে একটা ফ্রি প্রশ্ন করছি, দশাশই পেটমোটাটা কে ? অমন আরও পেটমোটা আছে নিশ্চয়ই তোমার ক্লায়েন্ট লিস্টে ? কথাগুলো বলে, নিজের কানে কানে যুবক বলল, এ ব্যাটা এতো মোটা, ছোঁচায় কেমন করে ! ছোঁচাবার লোক রাখতে হয়েছে নিশ্চয়ই। যতো বজ্জাত তাদের পোশাক ততো ধবধবে সাদা হয় আজকাল।

    তোরও তো পেটমোটা-ঢাউসবুক বউরা আছে ক্লায়েন্ট লিস্টে।

    তা আছে, তাদের কাকিমা মাসিমা জেঠিমা বলে ডাকতে হয়। তোমার এই পেটমোটাটা কি কাকু জেঠু দাদু মেসো পিসে।

    পেটমোটাটা নেতা, নেতার বয়স আর বডির ওজন যতই হোক, তাদের দাদা বলে ডাকতে হয়। মিছিলের লোকেদের মেয়াও মেয়াও খাইয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটাতে পারে, র‌্যালি-র‌্যালায় মাঝরাত পর্যন্ত না-খাইয়ে বসিয়ে রাখতে পারে। অন্য টাইমে রঙচঙে ঝিলমিলে টুনি জ্বালিয়ে হিজড়েনাচের অনুষ্ঠান করে ওর বাংলা-মাতাল চেলাদের জন্যে, ভাই-বেরাদরদের জন্যে বার-ডান্সার আনিয়ে ঝিনচাক একশো ডেসিবেল অনুষ্ঠান করে। নেতাগিরির জন্য যা যা করা দরকার সবই করে। দেখছিস না, নিজের কোলে রাইফেল, পাশে বডিগার্ডদের পকেটে-কোমরে পিস্তল। গুণ্ডা-মাস্তানের দল ছাড়াও, ওর স্টকে অনেক ভিখিরি আছে, প্রায় শ’দুয়েক হবে, সবাই ভালো অভিনেতা, দরকার পড়লে টিভি-সিনেমার পরিচালকরা ওর কাছ থেকে ভাড়া করে নিয়ে যায়, বেশ্যার ব্যবসাও আছে ওর, তিন চারটে পাড়ায় বেশ্যা বসিয়েছে, তা প্রায় শ’তিনেক হবে। ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ আছে, তাদের মেয়াও-মেয়াও চাটিয়ে পাঠিয়ে দ্যায়, পার্টির র‌্যাশান কার্ডের ঠিকানা জানিয়ে ; তুই জয়েন করতে পারিস, তোর তো মোটর সাইকেল রয়েছে।

    নিশ্চয়ই ডোনেশান দ্যায় সৎ কাজের জন্যে ? জানতে চায় যুবক, কন্ঠস্বরে শ্লেষ।

    শ্লেষকে পাত্তা দেয় না যুবতী, শর্টস-পরা যুবকের চুলে-ভরা উরুতে হাত রেখে বলে, হ্যাঁ, কতো ছেলেমেয়ের পড়াশুনার খরচ মেটায়, বিধবাশ্রমকে দান করে, স্কুল-কলেজে ভর্তি করায়, ওর নিজেরই আছে ইনজিনিয়ারিং আর মেডিকাল কলেজ।

    শুকোতে থাকা ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে যুবক পেছন ফিরে বলল, হাত সরান, গুঁড়োয় কিন্তু আমার নেশা আরম্ভ হয়েছে, অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে ; এ-রাস্তাও কতোকাল সারানো হয়নি, জানি না, তার ওপর পিঠে আপনার দোনলার গুঁতো দিয়ে চলেছেন, এরকম ছুঁচালো নকল বডিস পরেন কেন।

    যুবতী বলল, কন্ঠস্বরে আত্মাভিমানের ঝিলিক, নকল নয়, আসল, ছুঁচালো বলে নকল মনে করার কারণ নেই। বডিসও পরে নেই আমি, এখনও ঝুলে যাবার বয়স হয়নি, কেবল ব্লাউজের ওপর শাড়ি।

    গর্বের ব্যাপার বলুন ? আর কতো দূর আপনার গর্বের খোঁচা খেতে খেতে যেতে হবে ?

    ওই যে, শ্মশানকলোনির সামনে, পুরোনো আমলের একতলা বাড়ি দেখছো, ওটাই আমার ঠেক।

    তুমি এতো ঘোরালে কেন তাহলে ? এটা তো জগার্স পার্কের পেছনের শ্মশানকলোনি, এই শ্মশানের ধারে বাড়ি, কাদের বাড়ি এটা, ভাড়া না নিজেদের, এরকম ফাঁকা জায়গায় বাড়ি, রাতের বেলায় মড়া এলে কান্নাকাটিতে ঘুমের দফারফা। এই শ্মশানকলোনি আমি তো চিনি, বাবা, মা দাদাকে এখানের চিতাতেই তুলেছি। একটামাত্র বাড়ি তবু লোকে একে শ্মশানকলোনি কেন বলে জানি না।

    ফর ইওর ইনফরমেশান, আজকাল শবযাত্রীরা আর কান্নাকাটি করে না, গান গাইতে গাইতে আসে, গান গাইতে গাইতে যায়। কান্নাকাটি আগের প্রতিষ্ঠানের সময়ে ছিল, এখন তামাদি হয়ে গেছে। আর কি জানিস, তোর উরু-পায়ের গোছে চুল দেখে তোকে এতো ভালো লেগে গেল, ওই যাকে খারাপ লোকেরা বলে চিত্তচাঞ্চল্য, ভাবলাম আজকে এই ছেলেটাকেই ধরি। তোকে দেখেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল। আর এই বাড়িটা আমার নিজেরও নয় ভাড়ারও নয়, জবরদখল করা, কখনও কোনো জমিদারের বাইজি-নাচাবার জন্যে তৈরি হয়েছিল।

    জবরদখল ? মানে ?

    অন্যের আচার-বিচার, আদর্শ, মতামত, দর্শন, পাঁচালি যদি দখল করে নিজের বলে চালাতে পারিস, বিক্রি করতে পারিস, তাহলে বাসা জবরদখলের দোষ কোথায়, বল তুই আমায় ! ব্রিটিশরা তো এই দেশটাকে জবরদখল করে কলোনি বানিয়েছিল ; আমরা এটাকে শ্মশানকলোনি বানিয়েছি। [১২]

    গান গাইতে-গাইতে ?

    হ্যাঁ, সেই যে একজন সামাজিক সুপারম্যান মারা গেল, শহরচত্ত্বরে যার ডেডবডি রাখা হয়েছিল পাবলিকের দুখদর্শনের জন্যে, নাকে ভ্যানিলাগন্ধের তুলো গুঁজে, তার শবযাত্রী চেলারা গান গাইতে গাইতে এসেছিল, গাইতে গাইতে ফিরে গিয়েছিল, তখন থেকেই ক্রেজটা ধরে নিয়েছে পাবলিক।

    ক্রেজ ?

    হ্যাঁ, ভদ্রমহোদয়, দেখিসনি, সঙ্গে বাজনা-টাজনাও থাকে অনেক শবযাত্রার, একবার একজন বাজিয়ের শব এসেছিল, তার শবযাত্রীরা হেভি মেটাল বাজাতে বাজাতে এসেছিল। বছর দশক হয়ে গেল, নিরীক্ষামূলক শবযাত্রার চল হয়েছে। তোর মা-বাপ-দাদা পটল তুলেছেন অলরেডি, নয়তো তুইও কোনো রক ব্যাণ্ড ভাড়া করে আনতে পারতিস, শ্মশানের অফিসঘরে কানট্রি রক, ফোক রক, পাওয়ার মেটাল, থ্র্যাশ, গ্রাঞ্জ, পাঙ্ক রক, গ্ল্যাম মেটাল, হেভি মেটাল, সকলের ফোন নম্বর আর রেটচার্ট আছে। তবে আজকাল ট্যাগোর রকের চল বেশি।

    Double space

    আচ্ছা, আপনি যান, আমি চলি। আপনার গা থেকে আমার দোকানের দশকর্মের জিনিসপত্রের গন্ধ বেরোচ্ছে, আশ্চর্য। নিজের অনিশ্চয়তাকে বোঝার চেষ্টায় বলে ফেলল যুবক, যদিও টের পেল যে বলে ফেলাটা বোকামি হয়েছে, কেননা এই যুবতীর গা থেকে যে গন্ধ বেরোচ্ছে তা আঁশটে, যেন লইট্যা মাছ লুকিয়ে রেখেছে কোঁচড়ে।

    ভেতরে চল, দেখতে পাবি, আমার অ্যাঁড়গোবিন্দ ড্যাডি, অন্ধ হয়ে গেছে আড়ং ধোলাইয়ের চোটে, স্রেফ গোটাকতক টাকিয়াল গোঁপুড়ে দাড়িয়ালের দর্শনকে নিজের বলে চালাতে গিয়ে। শেষে ওর শিষ্যরা খুনোখুনি, ব্যাংকলুঠ, ঠিকেদারি, হুমকিটাকা, দালালি, লাশলোপাট, বোমাবাজি, মেয়ে পাচার, এই সব কাজে ঢুকে পড়ল আর বাপের দর্শন-আদর্শের দফারফা করে ছাড়লে।

    বাড়িটার দাবিদার আসেনি, কোনো টেকো বা দাড়িয়াল, সিনডিকেটের লাঠিয়াল, কিংবা মাগি-ধুমসিদের মাফিয়া ? জানতে চায় যুবক, এমন কন্ঠস্বরে যেন আগে জানলে সে-ই দখল করে নিতো।

    কতোকাল হয়ে গেল কোনো দাবিদার আসেনি। সেসময়ে কান্নাকাটি শুনতে আমার ভালো লাগত। মড়া এলেই জানলা খুলে দিয়ে কান্নার রোল শুনতুম। মড়াপোড়ার অমায়িক সুগন্ধ ভালো লাগে। মানুষের হাসি প্রায় সবায়ের একই রকম হয়, কিন্তু কান্না সবায়ের আলাদা-আলাদা, যাকে দেখতে যেমন তার কান্না ঠিক তার উল্টো, যতো ভালো দেখতে, ততো কুচ্ছিত তার কান্না। আজকাল অবশ্য কাঁদবার প্রথা তামাদি হয়ে গেছে।

    যুবতী মোটর সাইকেল থেকে নামতে, যুবক পকেটের রুমাল-ধরণের ছোটো গামছা বের করে সিটের রক্ত পুঁছে শুঁকলো, আর রুমালটা পকেটে রেখে নিল।

    কি, স্বর্গীয় সুগন্ধ না ? থুতনি উঁচিয়ে, জিগ্যেস করল যুবতী, থুতনির কালো তিলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর পাতলা ঠোঁটে শ্লেষ খেলিয়ে যোগ করল, রুমালের বদলে গামছা ?

    যুবক বলল, পৌঁছে দিলাম তো, তার মাশুল হিসেবে রক্তগন্ধা রেখে নিলাম। এই মাপের গামছা দশ রকমের সংস্কারের সব কয়টায় ইউজ হয়, আমি তাতে তোমার রক্ত পুঁছে এগারো নম্বর যোগ করলাম।

    ব্যাস এইটুকু ? চলো চলো বাড়ির ভেতরে চলো, এখনও তো মেয়াও-মেয়াও-কিস সম্পর্কে জ্ঞান দিইনি।

    যুবক চোখ মেরে বলল, জ্ঞান নেবো, একটা শর্তে।

    বোকাচোদার মরণ, মুকখুর আবার শর্তও আছে, প্রথম আলাপেই চোখ মারে ! কী, শুনি ? চোখ মারার মাশুল হিসাবে কথায় স্ল্যাং মিশিয়ে বলল যুবতী।

    লাবিয়ার মাকড়িটা আমি নিজে হাতে খুলে দেবো, তোমাকে খুলতে তো হবেই, স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধার জন্য। সেই সুযোগে প্রজাপতি দুটোকেও দেখে নেবো, আমি অমন প্রজাপতি জীবনে দেখিনি, লাবিয়ার মাকড়িও জীবনে দেখেনি, পুরুষ্টু লাবিয়ার ঠোঁটই দেখিনি তো তার মাকড়ি আর কোথ্থেকে দেখবো। ব্যাস, মাকড়ি খুলব, আর কোনো আগ্রহ নেই, বলেছি তো আপনাকে, মেয়েদের চেয়ে নতুন মোটর সাইকেলের বডি আমাকে বেশি টানে, কতো মসৃণ হয় মোটর সাইকেলের ত্বক।

    চলুন, ভেতরে চলুন, একদম আওয়াজ করবেন না দাঁড়ান, তালা খুলি, বাপেদের তালা দিয়ে যেতে হয়। একবার তালা দিয়ে যাইনি, আলঝিমার বাপ গিয়ে আধসাজানো চিতার ওপর শুয়ে পড়েছিল, যারা লাশ নিয়ে এসেছিল তারা চ্যাংদোলা করে গান গেয়ে গালাগাল দিতে-দিতে ফেরত দিয়ে গিয়েছিল।

    তালা খোলার পর অন্ধকার বাড়ির ভেতরে ঢুকে দুর্গন্ধে হেঁচে ফেলল যুবক, ওয়াক সামলে নিল।

    আওয়াজ শুনে চেঁচাতে শুরু করল কোনো বুড়ো হাঁফ-ধরা কন্ঠস্বর।

    মার শালাকে মার শালাকে….

    মার মার মার মার মাথা ফাটিয়ে দে, ছাড়িসনি, চুলের মুঠি ধরে উপড়ে নে...

    লাগা ক্যাঁৎকা... লাগা, বানচোদ নিজেকে ভেবেছে জ্ঞানের পাতকো...

    মার শালাকে মার মার মার মার মার মার বোকাচোদাটাকে….

    আমাদের দলের সঙ্গে পাঙ্গা, বুঝিয়ে দিচ্ছি কাদের চটিয়েছে বানচোদ…

    টেবিলের কাঁচটা ভেঙে দে, লাঠি দিয়ে হবে না, লোহার রড দিয়ে ভাঙ ভাঙ ভাঙ…

    আবার কমপিউটার রাকা হয়েছে, কতো লোকের চাগরি খেয়ে নিলে কমপিউটারগুনো…

    মার মার মার মার বানচোদকে…

    দেয়ালে ওগুনো কাদের ছবি টানিয়েছে গাণ্ডুটা, আমাদের কোনো নেতার নয়…

    মার ডাণ্ডা...ভাঙ ভাঙ...কি পারছিস না...আমাকে দে…

    মাথা ফাটিয়ে দে ল্যাওড়ার বাচ্চার…

    চোখে মার, নাক ফাটিয়ে দে..

    মার মার মার মার মার, টেলিফোনের তার ছিঁড়েছিস...ছেঁড় ছেঁড়…

    টাবিলের কাঁচ তুলে ফেলে দে…

    শালা পুলিশের ভয় দেখাচ্ছিল আমাদের…

    জানে না আমরা কার পোষা…

    মার মার জামা ছিঁড়ে দে...পারছিস না...কেটে বের করে নে…

    খালি পিঠে বাড়ি না মারলে বোকাচোদার মনে থাকবে না..

    দে রদ্দা দে রদ্দা…

    মার পেটা পেটা কামিনাটাকে...ল্যাখাপড়ার হিরোগিরি বের করছি বানচোদের…

    ইনজিরি ঝাড়ছিল চুতিয়ার বাচ্চা…

    বাল উপড়ে নে...

    ড্যাডি, কী হচ্ছে কি, আমি আমি, এসেছি, চেঁচিও না, বলে বারণ করল যুবতী।

    অন্ধকারে যে লোকটা চেঁচাচ্ছিল, আবছা বোঝা গেল সেই ড্যাডি নামের বাবা, আরেকটা লোকও বসে আছে, গুম হয়ে, তাকে কী বলে ডাকে তার জন্য অপেক্ষা করছিল যুবক। দুজনের চোখেই কালো চশমা, কাঁধ পর্যন্ত চুল, লম্বা দাড়ি, ঝাবড়া গোঁফ, মনে হয় চুল কেটে দেবার, দাড়ি কামাবার, গোঁফ ছাঁটার সুযোগ থেকে এরা বঞ্চিত।

    বিরাট হলঘরে, যেখানে কখনও মোসাহেবদের নিয়ে পাশবালিশ জড়িয়ে বিলিতি মদ খেতো জমিদার, চারটে বেতের চেয়ারের দুটোয় সামনা সামনি বসে, দুজনেই উলঙ্গ, দুজনেই নিজের লিঙ্গ বই দিয়ে চাপা দিয়ে রেখেছে ; বইগুলো বোধহয় ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ভুগোলের শক্ত মলাটের অ্যাটলাস। দুজনের মাঝে কোনো টেবিল নেই। ড্যাডি লোকটা একটা পাইপ ফুঁকছে, কিংবা ফোঁকার ভান করছে।

    যুবতী, বাঁ দিকে তাকিয়ে, স্লিং ব্যাগ থেকে, ইলেট্রনিক টর্চ বের করে ড্যাডি নামের বাবার ওপর ফোকাস করে জিগ্যেস করল, ব্রেকফাস্ট করেছ। বাঁদিকে ফেরার সময়ে বুক দুটো যুবকের দিকে তাক করা ছিল, নিঃঃশব্দে গুড়ুম শুনতে পেল যুবক, অদৃশ্য ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল।

    ড্যাডি ঘাড় নাড়ালো, আলোয় চিকচিক করে উঠলো মলম লাগানো খোসপাঁচড়া, তারপর বলল, ভালোবাসা খায়নি মনে হয়, তুই ওদের খেতে দিয়ে যাসনি বোধহয়, গান তো গায়নি ওরা, ভালোবাসা জানে, মাংসই সর্বজনীন।

    অন্য বুড়োটার দিকে মাথা নিচু করে, যুবতী জিগ্যেস করল, তোমার কফি খাওয়া হয়েছে ?

    বুড়ো, যাকে যুবতী জিগ্যেস করেছিল, চকচকে মোদো মুখ তুলে যুবতীর দিকে চুমু ওড়ানোর ঢঙে বলল, তোর ড্যাডির যখন চোখ ছিল, জ্ঞানচক্ষু নয়, চামড়ার চোখ, জ্ঞানচক্ষু তো ওর নেইই, তখনও নিজের অন্ধত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারিনি।

    ড্যাডি, গুমরে উঠে, বলল, একদিন পৃথিবীর বদল ঘটবেই, আর তা ঘটাবে অন্ধ, কালা আর বোবারা, দেখে নিস নর্দমার পোকা ; চোখ আছে বলে গোমরে ফেটে পড়ছিস স্কাউন্ড্রেল। শোন বানচোদ, পুরোনো সমাজের একেবারে নিচু স্তর থেকে ছিটকে পড়া যেসব লোক বেকার হয়ে পচছে, সেই লুম্পেনদের সুপারলুম্পেনরা বিপ্লবের খাতিরে এখানে-ওখানে আন্দোলনের মধ্যে ঝেঁটিয়ে নিয়ে আসবে একদিন, কিন্তু এদের জীবনযাত্রার ধরণটা এমনই যে, তা প্রতিক্রিয়াশিল ষড়যন্ত্রের ভাড়াটে হাতিয়ারের ভূমিকার জন্য তাদের অনেক বেশি করে তৈরি করে তুলবে। আর তা করছিস তোরাই। একদিন সব বদলে যাবে, দেখিস, নতুন দিগন্ত দেখা দেবে।

    বাপি নামের বুড়ো বলল, বকওয়াস শালা, কি যে মাথামুণ্ডু বাংলিশ বকছে, নিজেই লুম্পেনদের পুষেছিল, তারাই তোর পোঁদে বাশ করে অন্ধ করে দিলে। লুম্পেনদের নিয়ে তত্ববাজি হয় না, এই লুম্পেনরা ইউরোপের লুম্পেন নয়, খাঁটি দেশি লুম্পেন, পিওর দেশি ব্রিড। যখন চোখ ছিল তখন দেখেছিলিস তো এদেশের রাস্তার কুকুর আর ওদের দেশের রাস্তার কুকুররা কতো আলাদা।

    তারপর যুবতীর দিকে তাকিয়ে বাপি জিগ্যেস করল,ভালোবাসার জন্যে আর খোরাক পাওয়া যাচ্ছে না বুঝি রে ?

    ড্যাডি দিল কথাটার উত্তর, খুনখারাপি না করলে উত্তরণ ঘটবে না ; মনে করো পোল্যাণ্ডের জঙ্গলের মাটির তলাকার হাড়, খুনখারাপি হল মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রধান বার্তামাধ্যম, রক্ত রক্তের সঙ্গে কথা বলে।

    বাপি পোঁদ উঁচু করে জোরে পাদল, ড্যাডির কথার উত্তর হিসাবে, বোধহয় আটকে রেখেছিল, সঠিক সময়ে ছাড়বে বলে।

    বাপির কানে ফিসফিসিয়ে যুবতী বলল, যুবক শুনতে পায় এমন কন্ঠে, একটাকে ফাঁসিয়ে এনেছি, মেয়াও মেয়াও গিলিয়েছি, আরও কয়েকবার মুখে ঠুশে দেবার পর গতি করতে হবে।

    বাপি সে কথায় ততো গুরুত্ব না দিয়ে সামনের বুড়োকে বলল, গামবাট অন্ধ ল্যাঁড়টা আবার জ্ঞান দিতে লেগেছে, শালার চোখ গেলে দিয়েছে পিঁজরেপোলের বাছুর ছেলেছোকরারা, তবু পুঁথির গুদলেট চোরাপাঁক থেকে বেরোতে পারল না। জীবন থেকে আর কিছু পায় না, পায়নি, বিদেশিদের লেখা অনুবাদ করা বদগন্ধের বই পড়ে-পড়ে বস্তাপচা বুকনি ঝাড়ে। ম্যাকলে যদি ইংরেজি চালু না করত, তাহলে বুকনি ঝাড়ার, বই পড়ার, এলেমও থাকত না গেঁড়েগুলোর।

    এই চোপ।

    তুই চুপ কর অন্ধ ; তোর তো কোথাও যাবার যো নেই।

    তুই পড়ে আছিস কেন, এখানে, পোঁদ মারাতে ?

    আমি আসতে চাইনি। আমি এই খুনশ্মশানের অংশ হতে চাইনি, মেয়েটাই জোর করে নিয়ে এলো, ওর মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবার জন্যে, নয়তো ওর মায়ের চাকর হয়ে ভালোই ছিলাম, ওর মায়ের কচি কচকচে বরকেও মেনে নিয়েছিলাম।

    যুবতী বলল, মাকেও যে কবে ভালোবাসায় সোপর্দ করব তার অপেক্ষায় আছি।

    অন্ধ সামনের বুড়োর উদ্দেশে বলল, শালা, মাগের নাঙ কোথাকার। এই ভেড়ুয়াটাকে দেখলেই বঙ্কিমের সেই কথাগুলো মগজে বাজতে থাকে, সেই যে সাম্যতে উনি লিখেছিলেন, রাম সেলাম করিয়া, গালি খাইয়া, কদাচিৎ পদাঘাত সহ্য করিয়া, অথবা ততোধিক কোনো মহৎ কার্য করিয়া, কোনো রাজপুরুষের নিকট প্রসাদপ্রাপ্ত হইয়াছে। রাম চাপরাশ গলায় বাঁথিয়াছে -- চাপরাশের বলে বড়োলোক হইয়াছে। আমরা কেবল বাঙ্গালির কথা বলিতেছি না -- পৃথিবীর সকল দেশেই চাপরাশবাহকের একই চরিত্র -- প্রভূর নিকট কীটানুকীট, কিন্তু অন্যের কাছে ? ধর্মাবতার !! তুমি যে হও, দুই হাতে সেলাম করো, ইনি ধর্মাবতার। ইঁহার ধর্মাধর্ম জ্ঞান নাই, অধর্মেই আসক্তি -- তাহাতে ক্ষতি কি ? রাজকটাক্ষে ইনি ধর্মাবতার। ইনি গণ্ডমূর্খ, তুমি সর্বশাস্ত্রবিৎ -- সে কথা এখন মনে করিব না, ইনি বড় লোক ইঁহাকে প্রণাম করো। বলে, পেট নাচিয়ে হাসতে লাগল লোকটা।

    দেড়ফুটিয়াটা বঙ্কিম চুরি করে আমায় জ্ঞান দিচ্ছে, আর এতক্ষণ বলছিল আমিই নাকি অন্যের মতাদর্শ নিজের বলে চালাই। ম্যাকলের ধোলাই খেয়ে বঙ্কিম বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে, এর শিষ্যগুলোর তো বঙ্কিম পড়তে হলে ভয়ে বিচি শুকিয়ে যায়। সংস্কৃতকে তুলে দিয়েছিল, এখন বোঝো।

    চালাস তো। লেখালিখি আর ছাপানোর ব্যাপার না থাকলে তোরা কি আর পৃথিবীটাকে এরকম বদনাম করতে পারতিস ?

    আমি যে আলো দেখতে পাই তুই তা পাস না, তুই এক রকমেরই আলো দেখিস, যার নাম অন্ধকার।

    যুবতী চেঁচিয়ে উঠল, আঃ, একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দাও না তোমরা দুজনে। আমি তো তোমাদের সমস্যার সমাধান করছিই, ধৈর্য্য ধরতে পারো না !

    Double space

    যুবকের মাথা ঝিমঝিম করছিল, ঘুমও পাচ্ছিল, জিগ্যেস করল, ভালোবাসা ? মেয়ে না ছেলে ?

    হ্যাঁ, ভা, লো, বা আর সা, আমার পোষা চারটে শকুন, আপনি যে বদগন্ধে হাঁচতে লাগলেন, আরেকটু হলেই বমি করে ফেলতেন, তা ওদের জন্যে, ওদের জন্যে লাশের বন্দোবস্ত করতে হয়, কিংবা শ্মশান থেকে আধপোড়া মাংস যোগাড় করে আনি, বাঁচে না কিছুই, কিন্তু সবটা এক লপ্তে খায় না, আরও পচিয়ে খায়, যার যেমন রুচি।

    শকুন ? পেলেন কোথায় ? ভা-লো-বা-সা ? সা-বা-লো-ভা। সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা ! বেশ সঙ্গীতময় নাম তো ! যুবক গঙ্গাজল ছেটাবার মতন করে হাত নাড়িয়ে বলল, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি। নিজেকে শুনিয়ে নিঃশব্দে বলল, এই লোকগুলো যা বলছে তা সত্যিই ভেবে বলছে কিনা কে জানে, এরা আদপে ভাবেই না হয়তো, কথা বলাটা এদের জীবনযাপনের টাইমপাস ; কিংবা হতে পারে এদের মগজটা বিকৃত বা ফাঁকা।

    এই শ্মশান থেকেই টোপ দিয়ে ধরে এনেছি, ভালো গান গাইতে পারে ওরা, অনেকে মড়া আধপোড়া হয়ে গেলেই কেটে পড়ে, মুদ্দোফরাস আর ডোমগুলোও লোকজন নেই দেখে, নদীর জলে ফেলে, চিতা নিভিয়ে, আধপোড়া লাশ ভাসিয়ে দিয়ে বাড়ি কেটে পড়ে। ওদের প্রিয় গান গাইতে-গাইতে অমনই এক লাশ খাচ্ছিল কয়েকটা শকুন, তারা রোজ আসত খাবারের লোভে, বাজার থেকে মাংস কিনে এনে পচিয়ে ফাঁদ পেতে ধরে ফেললাম এক এক করে চারটেকে। আধপোড়া লাশ পেলে বেশ কিছুকাল চলে যায়, নয়তো বন্দোবস্ত করতে হয়। ওই ঘরটা শকুনদের নাচমহল, জমিদার ব্যাটা ঝাড়লন্ঠনের মিহি আলোয় বাইজিদের ঠুমরি শুনতো, কয়েকটা বাইজির ফোটো আছে দেয়ালে।

    লোকে সুন্দর দেখতে পাখি পোষে, আর তুমি শকুন পুষেছ ? যুবক সত্যিই অবাক।

    শকুনদের আমার ভালো লাগে, আই লাভ দেম, কি বিউটিফুল ওদের দেখতে। তাই তো নাম দিয়েছি ভালোবাসা। ভেবে দেখুন, ভালাবাসা কি শকুনের মতন ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় না প্রেমিক প্রেমিকাদের ? জমিদার মশায়ের ভালোবাসাবাসির বিশাল ঘরেই ওদের ঠাঁই দিয়েছি। ওদের সেক্স করা দেখেছেন ? প্রাণ জুড়িয়ে যাবে দেখলে, পায়ের আর ডানার কী অসাধারণ ভারসাম্য।

    শকুনদের নাম ভালোবাসা রাখাটা কি হিংস্রতা নয় ? বলল যুবক।

    যুবতী বলল, ভায়োলেন্স হবে কেন ! মানুষের মতন ওরাও লেগ পিস চায়, বোনলেস চায়, থাই পিস চায়, ডাবল-ব্রেস্ট চায়, সসেজ-পেনিস চায়। বরং শকুনঘরে ঢুকলে সেই সময়টুকুর জন্যে পৃথিবীর টান চলে যায়, দেখবেন একবার ঢুকে। দুঃখ বিষাদ প্রেমের গ্লানি কষ্ট যন্ত্রণার মানসিক দুর্দশা থেকে মুক্তি দেয়। ক্ষণিকের জন্যে হলেও কম প্রাপ্তি তো নয়।

    বিদেশি সিনেমায় দেখেছি বটে, যেগুলোর তলার দিকে ইংরেজিতে সংলাপ দৌড়োয়, সত্যি কিনা জানি না, ফর্সা মেয়ের লেগ পিস, থাই পিস, ডাবল ব্রেস্ট নিয়ে খেলছে ফর্সা ছেলে, ফর্সা মেয়েটা ছেলেটার সসেজ-পেনিস নিয়ে খেলছে। ওসব সিনেমা বেশি দেখার সুযোগ পাই না, এতো বড়ো লাইন পড়ে টিকিটের জন্যে, ল্যাংটো বডি দেখতে কার না ভাল্লাগে, বলুন ?

    আর তো দেখতে পাইনে, কাঁদো কাঁদো গলায় হেঁচকির মতন বলে উঠল ড্যাডি আমের বাবা।

    যুবক নিজের কথা চালিয়ে গেল, পাড়ায় তো দেখেছি একজন মেয়ে অনেকের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করছে। পাড়ার পেছনদিকে একটা জঙ্গলমতন আছে, সেখানের ঝোপগুলো দুললে বুঝতে পারি ভালোবাসাবাসি চলছে। আজকাল তো বাহাত্তুরে বড়ি বেরিয়েছে, একটা বড়ি খেয়ে নাকি বাহাত্তরজন ছোঁড়ার সঙ্গে তিন দিন ধরে একের পর এক শোয়া যায়। চোদ্দ বছর বয়স হলেই, ওই যে তুমি যাকে বলছ হার্ড ডিক, শহিদ মিনার, তা হয়ে যায়। আমি ওই লাইন পছন্দ করি না। যাকে জানি না, চিনি না, অমন মেয়ের সঙ্গে শুতে আমার ভীষণ ভয়। কারোর সঙ্গে শুতেই চাই না তাই। শুলেই আমার ভেতরের ফাইটারটা সেদিনকেই মরে যাবে। আমি দিনের বেলায় দশকর্মভাণ্ডার চালাই আর রাতে নতুন মোটর সাইকেল লিফ্ট করি, বেচি না, জাস্ট চুরি করে চালাই আর কাছাকাছি রাস্তায় রেখে দিই।

    যুবতী এবার খুঁটিয়ে দেখল যুবককে, বাইসেপ আছে, চোখে প্রশ্নের খোঁচা, বলল, ওঃ, তুমি তো আমাদের লাইনেরই দেখছি, ভালোই হল, তোমায় আর মেয়াও মেয়াও দেবো না, নিজের কাজে লাগাব। তোমাকে শুতে হবে না, বসে-বসেও জীবনের আনন্দ নেয়া যায়।

    কাজ ? কী কাজ ?

    প্রথম কাজ হল আমার মায়ের লিভটুগেদার ছোঁড়াটাকে ভালোবাসায় সোপর্দ করা।

    যত্তো সব ক্রিমিনাল চিন্তা।

    আমার আশঙ্কা ছিল যে কেমন করে তোমাকে আমাদের নোংরায় টেনে আনি।

    মোটর সাইকেল চুরি করে চালানো মোটেই নোংরা কাজ নয় ; এটা আমার হবি।

    যুবতী অন্য বুড়োটাকে জিগ্যেস করল, বাপি, তোমার ব্রেকফাস্ট হয়েছে ? সে কোনো উত্তর দিল না। যুবতী তার মুখের ওপর ইলেকট্রনিক টর্চের আলো ফেলে উঁচু গলায় জানতে চাইল ব্রেকফাস্ট হয়েছে কি না, কোনো উত্তর পেলো না। তার বদলে নাটুকে ঢঙে বুড়ো বলতে লাগল

    নাম তো সুনা হোগা, রাহুল

    আকাশের দেবতা সেইখানে তাহাকে দেখিয়া কটাক্ষ করিলেন

    নাম তো সুনা হোগা, রাজ

    কাঁটা ফুটিবার ভয়ও কি নাই কুসুমের মনে

    নাম তো সুনা হোগা, দেবদাস

    সইতে পারি না ছোটবাবু

    নাম তো সুনা হোগা, বাজিগর

    শরীর ! শরীর ! তোমার যোনি নাই কুসুম

    নাম তো সুনা হোগা, চার্লি

    আমি এক মাতাল, ভাঙা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল

    নাম তো সুনা হোগা, ভিকি

    প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ; শিল্প ফাজলামি নয়

    নাম তো সুনা হোগা, অর্জুন

    বাংলা ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি -- আজও পারি না

    নাম তো সুনা হোগা, ম্যাক্স

    ইউ আর অলওয়েজ এ পার্টিজান, ফর অর এগেইনস্ট ইট

    নাম তো সুনা হোগা, ওম কাপুর

    সব মাতাল ; আমাদের জেনারেশনের কোনো ভবিষ্যত নেই

    নাম তো সুনা হোগা, কবির খান

    আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব, ইট ইজ নট অ্যান ইম্যাজিনারি স্টোরি

    নাম তো সুনা হোগা, জি ওয়ান

    এদেশে শ্রমিক আন্দোলন করতে গেলে খৈনিই ধরতে হবে

    লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও...লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও...লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও...লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও...লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও...লাৎ খাও...ধর্ম ফিরছে...ধর্ম ফিরছে...ঈশ্বর ফিরছে না...ধর্ম ফিরছে...কেউ বাঁচবে না...সব...কচুকাটা...খুন...ধর্ষণ...পালাও...পালাও...চাপাতি রাখো….ত্রিশূল রাখো...ধর্ম ফিরছে...ঈশ্বর ফিরছে না...বোমাবারুদ তাজা করো...ধর্ম ফিরছে...ট্যাঙ্ক...ফাইটার জেট...কার্পেট বোমা...সভ্যতার সঙ্কট কেটে গেছে...গরিব-ধনীর ফারাক মিটে যাচ্ছে...ধর্ম ফিরছে...হাহা...হাহা...হাহা…ঈশ্বর ভাগলবা...বিনা ঈশ্বরের জবরদস্ত ধর্ম ফিরছে...

    ঢেঁকুর তোলার মতন করে মুখ উঁচিয়ে, ঠোঁটের কোন দিয়ে, যেন বিড়ি খেয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে, অন্ধ বলল, ধর্ম হল আফিম আর ঈশ্বর হল কালো গর্ত।

    অন্য বুড়ো প্রত্যুত্তর দ্যায়, মুখের ভেতর জিভ খেলিয়ে, আর তোদের বৌড়াহাগুলো যে ভোদকা খেয়ে, হুইস্কি টেনে পোঁদ উল্টে রাস্তার পাশের ডাস্টবিনে পড়ে থাকে, ওগুলো ধর্ম নয় বুঝি ? উপনিবেশের লোকেরা আফিম চাটে বলে ধর্ম হল আফিম, আর শাদা চামড়ারা হুইস্কি রাম ভোদকার নেশা ছাড়তে পারে না, তবু তা নেশা নয়, অ্যাঁ, শাদা চামড়ার ক্যারদানি শোনো, যতোই জ্ঞান থাকুক, মগজের ভেতরে কালো চামড়াদের ঘেন্না করবেই। শালারা ভোদকা পেঁদিয়ে দেশের কাঠামোটাই ভেঙে ফেললে, ঠিক মতন দাঁড়াতে পারে না, ভোদকার নেশায় হেলে পড়ে, বলে কিনা আফিম হলো খারাপ নেশা।

    অন্ধ বলল, ব্ল্যাক হোল, দি সুপ্রিম হোল, পবিত্র জ্বালাময়ী ছ্যাঁদা, পালসেটিং, থ্রবিং।

    মাংসের গর্তে ঢোকবার ধান্দায় চোখ খোয়ালো আর এখন গর্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে আকাশে, বলল অন্য বুড়ো।

    অন্ধ বলল, যখন চোখ ছিল তখন অনেককিছু দেখেছি, বুঝলি গাড়ল, কাফকা কতো মনস্তাপ ঝেড়ে গেলেন, প্রাগে গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছি ইহুদি গোরস্তানে ওনার কবর, কেন, সবই যদি মুছে ফেলার ছিল তবে নিজের শবকে চিতায় তুলতে বলা উচিত ছিল ; এ হল জীবনের সামঞ্জস্যহীনতা, আমার মতন, চোখ নেই, তবু যা আগে দেখেছি তা দেখতে পাই।

    অন্য বুড়ো, তুলোট জিভ নাচিয়ে বলল, আরে আমিও ডস্টয়ভস্কির কবর দেখে এসেছিলাম সেন্ট পিটার্সবার্গের টিখিন গোরস্তানে, আলেকজান্ড্রা নেভেসকি মঠে।

    যুবকের মনে হল, এরা দুজনে দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে নিজেদের বেঁচে থাকাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলেছে।

    অন্য বুড়ো বলল, কী বলছি আর তেলচাট্টা ব্যাটা কী বুঝছে ! আই কিউ ঠেকেছে গাড্ডুসে।

    যুবতী ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ভুরু কোঁচকায়, বলে, তখন থেকে এক নাগাড়ে বকর বকর করে চলেছ, তোমার এই বাজে অভ্যাসটা গেল না বাপি, কোন শাঁখচুন্নি-পেত্নি তোমার কানে কী সংলাপ যে ঝাড়তে থাকে, তারা কারা যাদের কন্ঠস্বর শুনতে পাও আর ওগরাও, মগজের ময়লা জমেছে তোমার কানে ; একই সঙ্গে স্কিৎসোফ্রেনিয়া আর অ্যালঝিমার রোগের খিচুড়ি বাধিয়েছ। ড্যাডির ব্যাপারটায় যুক্তি আছে, পিটুনি খেয়ে মাথা আর চোখ দুটোই গেছে, তুমি এরকম ডায়ালগবাজি কেন ধরলে জানি না, ব্রেকফাস্ট খাওনি কেন জানি না, নাও হাঁ করো, মেয়াও মেয়াও খাও আর ঝিমোও।

    বাপি নামের বুড়োর মুখে সেই একই পুরিয়া থেকে এক চিমটি পুরে দিল যুবতী। বাপি নামের বাবা চুপ করার আগে যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, এক চুটকি সিন্দুর কি কিমত তুম কেয়া জানো রমেশবাবু, দি লাভার ইজ এ টারমিনাল ইডিয়ট, রমেশবাবু।

    যুবক বাপি নামের বুড়োর দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, আরব ভাষায় প্রেম শব্দটা নেই, তাই ওনারা চারটে করে বউ আর দশ-বিশটা বাঁদি রাখেন, বোরখায় ঢাকা দিয়ে তাদের আড়ালে নিয়ে গিয়ে খোলেন।

    যুবতী চলে গেল রান্নাঘরে, ফিরে এলো, সুপ-স্পুন দেয়া দুটো সুপ বাউল নিয়ে, বাবা দুজনের কোলে রাখা অ্যাটলাসের ওপরে রাখতে, দুজনে একই সঙ্গে জিগ্যেস করল এটা কিসের সুপ রে ? স্বাদ আছে তো ?

    যুবতী বলল, এটা তোমাদের প্রিয় নোজবুফোঁ ইন ম্যারো ব্রাইন উইথ নিপলচেরি।

    এ আবার কী সুপ, শুনিনি তো কখনও, বলল যুবক।

    ড্যাডি নামের বাবা জিগ্যেস করল, যে হেঁচেছিল সে তো তোর বাপি নয়, এই লোকটাই কি ? কাকে সঙ্গে নিয়ে এলি? তোর দলের কেউ? নাকি ভালোবাসার জন্যে ?

    যুবতী বলল, হ্যাঁ, একজনকে এনেছি, দেখি কি হয়, ওর নাম হার্ড ডিক, শহিদ মিনার। সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে যোগ করল।

    ড্যাডি বলল, আমরা শ্মশানের মুদ্দোফরাসকে বলে রেখেছি, নামকরা লোকের শব এলে তার আধপোড়া নাকটা কেটে আমাদের জন্যে রাখতে, যতো নামকরা মানুষ, তার নাক ততো উঁচু, তাই তার পোড়া নাক ততো সুস্বাদু হয়, খেয়ে দেখতে পারো। আধপোড়া নাক দিয়ে নোজবুফোঁর স্বাদ অসাধারণ। এর মধ্যে আধপোড়া নিপল দিয়ে ড্রেসিং করলে, আহা, এর তুলনায় আর ডিশ হয় না। মড়াদের আমরা পছন্দ করি, কেননা মড়ারা মনে করিয়ে দ্যায় যে, হ্যাঁ, দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রতিষ্ঠান কোথাও না কোথাও লুকিয়ে লুকিয়ে প্রতিটি নাক আর নিপলের দিকে নজর রেখেছে। [১৩ ]

    নিপলও কি শ্মশানের চিতা থেকে ? জানতে চায় যুবক। তারপর যোগ করে, আপনাদের কোলের অ্যাটলাস টেবিলের আইডিয়াটা প্রশংসাযোগ্য।

    যুবতী জবাব দ্যায়, অফ কোর্স, কুড়ি থেকে পঁয়তাল্লিশের রেঞ্জে।

    বাপিবাবাটা বলল, নিপল হল আফ্রিকার, আহা, মুখে নিলে পুরো মুখ ভরে ওঠে, ঠিক যেন চুরাশিভোগ দোকানের কালোজামের মিষ্টি।

    ড্যাডিবাবাটার পছন্দ হল না, কিংবা হলেও, বিরোধীতা করতে হবে বলে বলল, দুর্বাঁড়া, নিপল হল আইসল্যাণ্ডের, কী গোলাপি, যেন গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি, মুখে নিলেই ফিরে যাবে শৈশবে, ওঁয়াউ-ওঁয়াউ করে হাত-পা নাড়াতে ইচ্ছে করবে।

    আপনারা তো নিপলের চরিত্র বদল করে দিচ্ছেন, চোষবার বস্তুকে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলছেন ! কতো আদরের মাংসল বোতাম, যা দুটি হৃদয়কে জোড়ে, মুখে গিয়ে কথাহীন বার্তারস গড়ে তোলে ! হতাশ্বাসে আড়ষ্ট গলা থেকে হাওয়া দিয়ে বাক্য বের করে বলে ওঠে যুবক।

    প্রতিষ্ঠান নির্দেশ দিয়েছে বদলানোর, তাই চোষবার বস্তুকে খাবার বস্তু করা হয়েছে, মানুষের মতন বাঁচতে হলে আত্মসন্মান খুইয়ে টিকে থাকতে হবে, বুঝলে, এটা বদলের প্রধান রহস্য। মাঝেসাঝে দুঃখের খেপ এসে ল্যাঙ মারে, সো হোয়াট ! তখন বোলো যে বিষাদে ভুগছি, ব্যাস।

    বাপি নিজের মনে বলল, একদিন জয় মা জবাই, তোমাকে আমি পাবই করব সবকটাকে, সবচেয়ে আগে এই চকরলস বুঢ়ুয়াটাকে।

    চামচ দিয়ে খাবার বদলে চুমুক দিয়ে সুপ খেল বুড়ো দুজন, সুড়ুপ সুড়ুপ আওয়াজ করে, আওয়াজে ছিল অবসরপ্রাপ্ত যৌনজিভের ইশারা,খাওয়া হয়ে গেলে পরস্পরের দিকে ছুড়ে মারল সুপের বাউল। দুজনেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হল।

    আলোয় বাড়ির ভেতরটা আর দুটো বুড়োকে আরও বীভৎস, নোংরা আর দুর্গন্ধময় মনে হল যুবকের, কিছুক্ষণ সময় লাগল আবহের সঙ্গে সমঝোতা করতে।

    আচ্ছা, এখনও হার্ড ডিকের মানুষ পাওয়া যায় ? আমি তো ভেবেছিলুম সেসব আমাদের কালের সঙ্গে ফুরিয়েছে। চোখ থেকে কালো চশমা খুলে বলল ড্যাডি নামের বাবা।

    যুবক দেখল লোকটার দুচোখ গলে সাদা হয়ে বাইরে প্রায় বেরিয়ে এসেছে ; বীভৎস।

    না ফুরোয়নি, তোমার ওই হার্ড ডিকের নিসপিসুনির জন্যেই মার খেয়েছিলে। বলল যুবতী।

    যুবক শ্লেষ্মা জড়ানো গলায় বলল, কি যে খাওয়ালেন, এখন বাড়ি যেতে পারব কি না জানি না ; বাইরে মোটর সাইকেলটা আছে কেউ না নিয়ে পালায়।

    কেউ নেবে না, কিছু চুরি যায় না শ্মশানকলোনিতে, মড়ার হাফ-বেকড নাক আর মড়ানীর সিজলিং নিপল ছাড়া। তোমাকে যে মেয়াও মেয়াও কিস দিয়েছি, তার নাম হল মেফিড্রোন, এটা এক ধরণের কেমিকাল, এর নাম মেথিলমেথাক্যাথিনোন, তোমাকে এই জন্য বলছি যে তুমি আকাট মুকখু, আর এখন নেশায় তোমার মাথা কাজ করছে না ; কিছুদিন আগে পর্যন্ত বাজারে কেমিকালের দোকানে সহজেই পাওয়া যেত, এখন সরকার ব্যান করে দিয়েছে, ছাত্রদের মধ্যে পপুলার নেশা, এতে গাঁজা চরসের মতন ফোঁকাফুঁকির বালাই নেই, বদগন্ধও নেই, অতটা নেশাও হয় না, অথচ ফুরফুরে নেশা হয়, লোয়ার ক্লাস নেশা মনে হয় না, আমি একটা ফ্যাকট্রি থেকে সরাসরি কিনি।

    আমাকে এসব বলছেন, তারপর যদি প্রতিষ্ঠানে ফাঁস করে দিই।

    তুমি করবে না জানি। তুমি তো নিজেই স্বীকার করলে দিনে সাধু রাতে চোর।

    কী করে জানলে ? কিন্তু চোর ঠিক নই, আমি মোটর সাইকেল ফেরত দিয়ে আসি চালাবার পর।

    যে একবার আমার লাবিয়ার মাকড়ি খুলেছে সে আমার কেনা গোলাম হয়ে গেছে।

    দুজন বুড়োই এক সঙ্গে বলে উঠল, একে তোর লাবিয়ার মাকড়ি খোলানোর জন্যে এনেছিস ?

    যুবতী বলল, হ্যাঁ, মত বদলাতে হল, খোলাবো সময় হলে।

    বুড়ো দুজন একই সঙ্গে বলে উঠল, তোর মা আমাদের দিয়ে নিজের লাবিয়ার মাকড়ি খোলাবে বলে লোভ দেখিয়ে বিয়ে করেছিল, তারপর ল্যাঙ মেরে দিলে, তাই আজকে আমাদের এই দশা। এর ভাগ্যে যে কী লেখা আছে তা জানি না ; শেষে তোর মা এসে একে তোর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে না যায়। বুঝলে মিস্টার হার্ড ডিক, মাকড়িটা হল সূর্য আর তাকে ঘিরে পাক খায় যে মুক্ত সেটা হল পৃথিবী। মাকড়িটা যেখানে ঝোলানো, তা হল আকাশগঙ্গা, ছায়াপথ, ওই পথে যদি একটু ভুল করেছ, পিছলে পড়েছ, আমার মতন অন্ধ বা বাপিবুড়োর মতন অ্যালঝিমার রুগি হয়ে মরবে।

    ছিনিয়ে নিলেই হল ! ভালোবাসা আছে কী জন্য ? মাকে থেঁতো করে ভালোবাসার ঘরে ছেড়ে দেবো, ওদের প্রিয় গানের মাঝে।

    যুবক বলল, আমি শুধু খুলে দিতে চাই, জাস্ট অনুসন্ধিৎসা, আপনাদের মতন আকাশগঙ্গায় সেঁদিয়ে সাঁতরাতে চাই না।

    প্রেম আর মৃত্যুর মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই হে, মিস্টার হার্ড ডিক, বলল ড্যাডি নামের বাবা, পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে, দুটোই এক ধাক্কায় কাজ সাঙ্গ করে ফ্যালে ; আদিরস আর অন্তরস।

    Double Space

    যুবক বলল, এমন নেশা করে দিয়েছ যে এখন আমি কিছুই করতে পারব না। আমি ভালো করে দেখতে চাই।

    তুমি ভাবছিলে আমার মেনসের ব্লিডিং হচ্ছে, এখন সে কথা জানতে চাইছ না ?

    হ্যাঁ, তাইতো, তুমি অমন অবস্হাতেই রয়েছ দেখছি, যাও চেঞ্জ করে এসো।

    ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশান, আমিই আপনাকে এত দিন ধরে স্টকিং করেছি, আপনি আমাকে স্টকিং করেননি। আমি জানি আপনি রেড বেল্ট কারাটে, ফ্রি স্টাইল বক্সিংও জিতেছেন বেশ কয়েকটা।

    মানে ?

    মানে ওটা নকল রক্ত, আমার রক্ত নয়।

    ড্যাডি চিৎকার করে উঠল, রক্ত ? কোথায় রক্ত ? মার শালাকে মার মার মার মার বানচোদকে, দে প্যাঁদানি, মার মার মার মার...বাল উপড়ে নে...

    আঃ, কী হচ্ছে ড্যাডি, কোথ্থাও রক্ত নেই, বলল যুবতী।

    ড্যাডি কাঁদতে আরম্ভ করল, আর জড়ানো গলায় বলতে লাগল, আমার কেউ নেই, ওগো আমার কেউ নেই, কেন আমাকে পেটানো হয়েছিল কেউ জানতে চায়নি, আমি নিজেও জানি না কেন আমার নাক থেঁতো করে চোখ গেলে দেয়া হয়েছিল, প্রতিষ্ঠান আসেনি, প্রতিবেশি আসেনি, সংস্হার লোক আসেনি, কোনো এনজিও আসেনি, আমি অন্যগ্রহের প্রাণী হয়ে গেলাম...হায়…

    চুপ করো, চুপ করো, চুপ চুপ চুপ, হাঁ করো, ড্যাডি নামে বাবাকে বলল যুবতী।

    ড্যাডি নামের বাবা হাঁ করলে, মুখের মধ্যে এক টিপ মেয়াও মেয়াও গুঁড়ো ঢুকিয়ে দিতে চুপ করল বুড়ো।

    মেয়াও মেয়াও ওনাদেরও ? জিগ্যেস করল যুবক।

    যুবতী বলল, হেসে নয়, গম্ভীর হয়ে গিয়ে, হঠাৎই, দিনের বেলা ঝগড়া করছে তো দুজনে, সন্ধ্যে হলেই একজন আরেকজনের ওপর চাপা আরম্ভ করবে, হোমোসেক্সুয়াল ওল্ড লাভার্স, মায়ের লাথি খাবার পর এখন বিছানাই ওদের স্বর্গ আর নরক, তারপর মুখে হাসি ফিরিয়ে এনে বলল, ঘুরিয়ে বলতে হলে, সত্য বলে কিছু হয় না, যা হয় তা হল অসামঞ্জস্য, অ্যাবসার্ডিটি।

    প্রসঙ্গ পালটে, যুবতীকে যুবক বলল, আমাকে স্টকিং করছিলেন কেন, আমি রেড বেল্ট, ফ্রি হ্যাণ্ড কিক বক্সিং লড়ি, তাতে আপনার কী লাভ।

    ভুরু কুঁচকে যুবতী বলল, তোমার সাহায্য আমার চাই, তুমি রেড বেল্ট, কিক বক্সিং এক্সপার্ট।

    যুবক বলল, আমার নেশা গাঢ় হয়ে চলেছে...জীবনের মানে বা উদ্দেশ্য খুঁজতে যেও না কখনও...আমি এর আগে কী বলেছি মনে করতে পারছি না...আহা কি আনন্দের...নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যর্থতা ডেকে এনেছি জীবনে...আনবিক বোমা ফাটার পর যে ফুল আকাশে গিয়ে খোলে তার চেয়ে সুন্দর কোনো ফুল আর নেই...সৌন্দর্য চিরকাল ধ্বংস ছাড়া আর কিছু করতে পারে না...মানুষ জাতটাই তো ব্যর্থ...তাহলে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ভাববো কেন...আমি কখনও অপমানিত হই না সে তুমি আমাকে গালমন্দ করো বা জুতোপেটা করো...আমি রাস্তায় পড়ে থাকা ঝিকমিকে থুথু...কতো লোক তো পোঁদে মৌমাছির চাক নিয়ে সারাজীবন মধু বেচার চেষ্টা করে যায়...কোনো আগাম পরিকল্পনা করি না...জানি ব্যর্থ হবো...সবাই পৃথিবীটাকে বদলাবার তালে আছে...তার প্রমাণ তো দেখতেই পাচ্ছি...কোনো বাঞ্চোৎ উদ্দেশ্যসাধনে সক্ষম হয়নি...আমার নেশা হয়ে গেছে...কোথায় গেলে গো লাবিয়া রানি...মাকড়ি কই...আছে...নাকি বানানো গল্প...আমার মায়ের তো কোনো মাকড়িই ছিল না... কানেও নয়...লাবিয়াতেও নয়...আমিই তো মায়ের শবের শাড়ি খুলে নতুন শাড়ি পরিয়েছিলাম চিতায় তোলার আগে...গায়ে গাওয়া ঘি মাখিয়েছিলাম...মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে চাই...মা বলেছিল আমি গিরগিটির মতন রং বদলাতে পারি বলে জীবনে কখনও বিপদে পড়ব না...তবে নেশা হচ্ছে কেন...মা মারা যাবার পর কোনো রান্নাই ভাল্লাগে না…

    যুবতী : বুড়ো দুটোর মুখ বন্ধ করালাম তো ইনি শুরু হয়ে গেলেন, মেয়াও মেয়াও কিসের উল্টো প্রতিক্রিয়া এই প্রথম দেখছি।

    যুবক : শুরু হলেই শেষ হবে এমন কোনো কথা বিজ্ঞান বলে নি...বিগ ব্যাঙ...বিগ ব্যাঙ...বোবা অন্ধকার...বাবা তো আমার জন্যে গর্ব বোধ করত...আমিও বাবার জন্য গর্ব বোধ করি...দুজনে দুজনের সব গোপন কথা জানতাম...মাস্টারপিস বাবা...বাবা ছিলেন যাদুকর...নেগেটিভকে পজিটিভ করা ছিল ওনার নেশা আর পেশা...আমার ভেতরে অনেক রকমের জন্তুজানোয়ার সাপ-বিছে আছে...তাদের বেরোতে দিই না...কেউ কেউ কেন এতো সুন্দর হয়...ধাঁ করে এসে লাগে...কিন্তু খুঁত থাকবেই…আমি একাই ভালো আছি...কোনো সম্প্রদায়ে থাকতে চাই না...সম্প্রদায়ে গেলেই সবাই মিলে ঘেন্না করার আনন্দে ভুগতে হবে...সম্প্রদায়ও তো নেশা...তার চেয়ে মেয়াও মেয়াও কিসের নেশা বেশ ভালো...কারোর ক্ষতি তো করছি না...যে কথাগুলো পেছনের সিটে বসে বলছিল...হাটতে হাঁটতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছিল...তার মাধ্যমে কিছুই বলছিল না...সব মিথ্যে...বানানো...এখন আমার যাবতীয় দ্বিধা উবে গেছে...এই বুড়ো দুটো যেচে কেনা গোলাম হয়েছে...কার ক্রীতদাস জানি না...দাসত্ব উপভোগ করছে...যৌনরোগের মতন...আমি তো মেয়েটার দুঃখময় রাগি দৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করে বিশেষ কিছু পেলাম না...এদের এই জবরদখল শ্মশানকলোনির বাড়ির মতন বাড়ি দেখিনি জীবনে...অচেনা...আতঙ্কজনক...দুর্দশার আড্ডাখানা...যন্ত্রণা চিরকাল নবীন...প্রত্যেক মেয়ের জ্যামিতি আলাদা অথচ আমি গণিতজ্ঞ নই...অসৎ মেয়েরা কুচ্ছিত হলেও সুন্দরী হয়...তাদের ভেতরের অন্ধকার তাদের সুন্দরী করে তোলে...

    এ মাল তো দেখছি যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে কয়েককাঠি সরেস ; যুবকের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে ডাকে যুবতী, এই হার্ড ডিক, ঠোঁটে এক চুমুতেই নেশা হয়ে গেল ? তাহলে ক্রিটিকাল জায়গায় চুমু খেলে তোকে তো পাগলাগারদে ভর্তি করতে হবে।

    যুবক : বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে চলেছি...মিথ্যে কথা বলার একটা আনন্দ আছে...দশকর্মের জিনিসপত্তর বেচতে গিয়ে এইটাই সবচেয়ে জরুরি অভিজ্ঞতা....প্রেমের কথা আউড়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়...মরার জন্যে আর সেক্স করার জন্যে ভালো নরম বিছানা খুবই দরকার...সেক্স বাইরে বেরোয়...প্রেম ভেতরে ঢোকে...দুটো উলঙ্গ দেহের মিশ খাওয়া জরুরি...দীর্ঘ জীবনের জন্যে...এর আগে সব বানিয়ে বলেছি...বাপি আঙ্কল...ড্যাডি আঙ্কল...দীর্ঘক্ষণ ধরে চুমুখাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর...প্রেমেও মাঝে মাঝে গ্যাপ দিতে হয়...সেক্স হল দুটো উলঙ্গ শরীরের সবচেয়ে উচ্চাঙ্গের নাচ...কোনো মিউজিকের দরকার নেই...শরীরই সঙ্গীত…বাবা বলে দিয়েছিলেন...দশকর্মের মাল বেচছো বলে ঠাকুর্দেবতায় বিশ্বাস কোরোনি যেন...মন্দির-টন্দিরেও যেওনি...ওনারা বশ্যতা দাবি করেন...একবার কারোর অনুগত হলেই জীবন তালগোল পাকিয়ে যাবে...হতবুদ্ধি...বিভ্রান্ত...কিংকর্তব্যবিমূঢ়...রাজনীতিকদেরও ঘেন্না করবে...ওরাও বশ্যতা দাবি করে...সুন্দরীদের সঙ্গে সেক্স করে কখনও মন ভরবে না...তুমি দোটানায় পড়ে যাবে যে বাদবাকি অঙ্গগুলো নিয়ে তখন কী করব...জুলিয়াস সিজার হিটলার স্ট্যালিনের মতন পাছার জোর নিয়ে আর কোনো রোল মডেল পৃথিবীতে জন্মাবে না...মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিল করে রাস্তায় হাঁটলে বিপ্লব পালিয়ে যাবে...বাবা বলেছিলেন ঠাকুর্দেবতা হল অর্শের মতন...শান্তিতে বসে থাকতে দেবে না...

    যুবতী বলল, এ তো দেখছি প্রথমবারেই কুপোকাৎ। এরকম হলে তো এর শহিদ মিনার এক মিনিটেই ধ্বসে পড়বে ! বাবা আর কী-কী বলেছিলেন শুনি ?

    যুবক : বাবা বলেছিলেন...গরম মাংসের শরীরের সঙ্গে সেক্স করার চেয়ে স্বপ্নদোষে আনন্দ বেশি...কতো হীরে মুক্তো পান্না পোখরাজ তরল আকারে বেরিয়ে ঘুমকে নদীতে পালটে দ্যায়…প্রেম আনন্দও নয় বিষাদও নয়...প্রেম হল মুহূর্তদের চিরকালীন বানাবার অসফল ম্যাজিক...আমরা সবাই নিজেকে শাস্তি দিতে বাধ্য...যুদ্ধ দাঙ্গা খুনোখুনি লুটপাট চলতে থাকবে নয়তো প্রতিষ্ঠানগুলো টিকবে না...মানবসভ্যতা রসাতলে চলে যাবে...

    এ মরণের পাবলিক কোন জগতের চুতিয়া রে, বলে ওঠে যুবতী।

    যুবক আধখোলা চোখে চেয়ে বলে, আরেকটা মেয়াও মেয়াও চুমু হবে ?

    না, হবে না, বলল যুবতী, শেষে ওভারডোজের বাওয়ালে মরবে। যুবকের মাথা দুহাতে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলে ওঠে, ক্লিন সেক্সুয়াল ভিজে চুমু নাও।

    আরে ! তোমার সেক্সুয়াল চুমু নিয়ে কী করব ? তুমি তো স্তালিন, হিটলার, জুলিয়াস সিজার, প্রতাপাদিত্য, ট্যাগোরের সঙ্গে শুতে চাও। নেশার ঘোরেও যুবক দেখল যে যুবতী কখন শাড়ি পালটে, চান করে, চুলে শ্যাম্পু করে, কালো স্ল্যাক্স আর মিলিটারি টপ পরে এসেছে। আঁশটে বদগন্ধের বদলে যুঁই ফুলের সুগন্ধ।

    এতক্ষণ ধরে নেশার ঘোরে আছি ? তোমার স্ল্যাক্সের তলায় লনজারি নেই তো ? থাকলে অসুবিধা হবে কি ? জিগ্যেস করল যুবতীকে। তারপর যোগ করল, আচ্ছা, সারাদিন জানলায় বসে শাহ জাহান কী করতেন, শুধু একটা দেহই কি ভেসে উঠত ওনার চোখে ? আরও যাদের সঙ্গে শুতেন, তাদের মাংসের স্মৃতি কি কিছুই ছিল না ? তাদের বুকের মাপ, মাইয়ের বোঁটা, উরুর তাপ, চুলের মুঠি, বগলের গন্ধ, ফোরপ্লের অরগ্যাজম, মনে পড়ত না ? তাদের দুই পা কি জাহাঁপনার কাঁধে উঠে গহ্বহের নিশিডাক দিত না ?

    জবাব দিল বাপি নামের বাবা, বলে উঠল, নেশার ঘোরে ছিলে বলে বেঁচে গেছ, নয়তো আমাদের সম্পর্কে যে বাজে বকছিলে তুমি, তোমার লিঙ্গ কেটে ফেলতুম আমরা। অনেকের লিঙ্গ কেটে ফরম্যালিনে চুবিয়ে রেখেছি, ওই দিকে, বইয়ের তাকের ওপরে, দ্যাখো। আর তোমার প্রশ্নের উত্তরে বলি, প্রেম-ফেম তো এনেছিল কেরেস্তানগুলো, তার আগে ছিল বিশুদ্ধ যৌনতা, আগুনের মতন টাটকা, খাজুরাহো আর কোণারক দেখেছ কি ; আহা, আমাদের ছিল বাৎসায়ন, আম্রপালী, বহুবিবাহ, বহুগমন, সমকাম, বহুস্বামীর সুখের শান্তির স্বস্তির দেশ, প্রেম করতে শিখিয়ে সব নষ্ট করে দিলে কেরেস্তানগুলো। [১৪] হ্যাঁ, তুমি জিগ্যেস করতে পারো যে তাহলে প্রেমিক কেন প্রেমিকার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে !

    ড্যাডি নামের বাবা বলল, আমি মারতে পারতুম, মারিনি, এতো সুন্দর মুখ, আহা চোখ জুড়িয়ে যায়, মগজের ভেতরের বিবেক সব পরিকল্পনা ফুরফুরিয়ে ভণ্ডুল করে দিলে ! মারলে কিন্তু ওর সুন্দর মুখ আমার কব্জায় চলে আসতো, আমিই শেষবারের মতন ওর সুন্দর মুখ দেখতাম, তারপর যারা দেখত তারা কুচ্ছিত দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিতো, যেমন আমায় দেখে ঘেন্না করে সবাই। তারপর নিজেকে শুনিয়ে বলল, মানুষ জন্ম থেকেই দয়াহীন নিষ্ঠুর, মৃত্যুকে সৃষ্টি করে।

    ও, তাই কেনা গোলাম হয়ে গেলেন ? জানতে চায় যুবক।

    ড্যাডি নামের বাবা বলল, আমরা কিনা ক্রীতদাস, কেনা গোলাম।

    বাপি নামের বাবা ড্যাডি নামের বাবাকে বলল, ওই গানটা ধর, আমরা সবাই খোজা গানটা, দুজনে মিলে গাই, আমাদের রানিকে উৎসর্গ-করা গান। বলে উরু পেটা আরম্ভ করল, তবলার ঢঙে।

    বুড়ো দুজন আরম্ভ করল গান : [১৫]

    আমরা সবাই খোজা, আমাদের এই রানির রাজত্বে

    নইলে মোদের রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

    আমরা হুকুম তামিল করি, তাঁর আঙুল নাড়ায় চরি,

    আমরা মজায় আছি দাসের রানির ত্রাসের রাজত্বে--

    নইলে মোদের রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

    রানি সবারে দেন মার, সে মার আদর করে দেন,

    মোদের খাটো করে রাখলেই বা হাজার অসত্যে--

    নইলে মোরা রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

    আমরা চলব তাঁরি মতে, শেষে মিলব তাঁরি পথে,

    মোরা মরলেই বা বিফলতার বিষম আবর্তে--

    নইলে মোরা রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

    গানটা আরও ছিল কি না যুবক জানে না, বুড়ো দুটো চুপ করে যেতে শুনতে পেল দরোজায় বাইরে থেকে তালা খোলার শব্দ, এদেরই কেউ হবে, নয়তো চাবি পাবে কোথ্থেকে।

    Double Space

    যুবক দেখল সেই দুজন বডিবিলডার ধরণের স্মার্ট লোক, যাদের সঙ্গে যুবতী, ফিসফিস করেছিল, সুপারি, খুন, বডি এই সব নিয়ে, তারা একটা লোককে কাঁধে নিয়ে ঢুকল।

    যুবতী জিগ্যেস করল, কেউ দ্যাখেনি তো ? বেঁচে আছে না কাজ শেষ করে এনেছিস।

    একজন ষণ্ডা, যে খয়েরি স্ট্রাইপের ফুলশার্ট পরেছিল, গলায় টাই, সে বলল, মনে হয় কাম তামাম হয়ে গেছে। তারপর অন্যজনকে আদেশ দিল, ভালোবাসার ঘরে রেখে দে। দুর্মুশ দিয়ে মাথাটা নরম করে দিস নয়তো ভালোবাসার ভালোবাসতে সময় লেগে যেতে পারে।

    কোথায় পেলি ? জিগ্যেস করল যুবতী।

    খয়েরি ফুলশার্ট বলল, ওই যে, সাতটা গাছ মেরে ফেলেছে, মিলি বাগ, জিপসি মথ, লঙহর্ন বিটলস, বোরার, আর টেন্ট ক্যাটার পিলার ছড়িয়ে, সেগুলোকে মারার কনট্র্যাক্টের টাকা তুলতে গিয়েছিল বিজ্ঞাপন কোম্পানির দপতরে, ওই যে, গাছগুলোর জন্যে যাদের হোর্ডিং ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। চালু চিজ বানচোদ, কতো তাড়াতাড়ি গাছগুলোকে মারলে। বিজ্ঞাপনের দপতর থেকে যেই বেরিয়েছে ক্লোরোফর্ম করে কাৎ করে ফেললাম। চ্যাংদোলা করে আনতে হলো ; কয়েকজন শবযাত্রী মড়া পুড়িয়ে হাঁড়ি ফাটিয়ে ন্যাড়া মাথায় চান সেরে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরছিল, সমবেত গান থামিয়ে জানতে চাইছিল যে, কী হল, বাঁশের মাচা পাওয়া গেল না, প্যাকিং বাক্সের মাচা তো সস্তায় পাওয়া যায় ফুটপাথে, ফুলের বাজারের কাছে ?

    ওদের বললাম যে পকেট ফাঁকা, কী আর করা যাবে, অগত্যা চ্যাংদোলা করে পোড়াতে নিয়ে যাচ্ছি। ন্যাড়ামাথা শ্মশানফের্তারা শুনে বাহবা দিলে, একজন বলেছে প্রতিষ্ঠানের বারোয়ারি সভায় প্রস্তাবটা লিখিত আকারে তুলবে।

    এই চ্যাংদোলা করে শ্মশানে নিয়ে আসা অনুমোদন করা উচিত প্রতিষ্ঠানের, অনেক খরচ বাঁচবে, খাট-তোষক নষ্ট হবে না, কাঠ নষ্ট হবে না, ফুল নষ্ট হবে না, ফুলবাগানে মৌমাছিরা ডানা-মিউজিকে ফুলেদের ফোসলাতে পারবে, বরেরা মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে বউয়ের খোঁপায় ফুল গুঁজতে পারবে, শ্মশানে মন দিয়ে গান গাইতে গাইতে লোকে আসতে পারবে, ফিরতে পারবে। তারপর ঝিমধরা অথচ অবাক যুবকের দিকে তাকিয়ে যুবতী বলল,মায়ের কাছ থেকেই গাছ মারার সিক্রেটটা শিখেছিল কচি-কচকচে স্কাউন্ড্রেলটা।

    অন্ধ বুড়ো বলল, হ্যাঁ, কখন থেকে ভালোবাসা অপেক্ষায় রয়েছে, প্রায় দুতিন দিন ওদের খাওয়া জোটেনি। কার লাশ আনলি ?

    যুবতী বলল, আমার মায়ের কচকচে-কচি প্রেমিকের।

    অন্ধ বুড়ো বলল, মেমেন্টো হিসাবে ওর নুনু কেটে রেখে নে, তাকে ফরম্যালিন আছে, তাতে চুবিয়ে রাখ, অনেককাল থাকবে, কিন্তু বিচি দুটোর সুপ রাঁধিস, রান্না হলে ওগুলো খেতে বেশ ভাল্লাগে, সুইট অ্যান্ড সাওয়ার টেসটিকলস। তারপর নিজেকে শুনিয়ে বলল, মৃত্যু হল ভাগ্যের ব্যবসাদার।

    অন্ধকে উদ্দেশ্য করে যুবতী বলল, তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না, আমাদের কাজ মৃত্যুর পরের, সারা দিন ধরে বসে বসে মানুষের মাংস পোড়ার উজ্জ্বল চিড়চিড়ে-ফটর ফটর স্বরলিপিতে লেখা গান শোনো, তার বেলায় !

    অন্য বুড়ো বলল, দারুন খবর, দারুন, দারুন, এতদিনে একটা কাজের কাজ হল ; ভালোবাসার খাবার সময় ওদের প্রিয় গানটা জোর গলায় গাইবার শিস দিয়ে দিস। তারপর যোগ করল, হ্যাঁ, একটা বিচি আমায় খেতে দিস আর আরেকটা ওই বুড়োকে, কতোকাল যে মানুষের বিচির সুপ খাইনি। শ্মশানে যতো মাল আসে, আত্মীয়রা আনতে এতো দেরি করে, চন্দন মাখানো আর ধুপ জ্বালানো আর গোলাপজল ছেটানোয় যে, সব বিচি ততক্ষণে পচে যায়।

    যারা চ্যাংদোলা করে এনেছিল তারা দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল, তাছাড়া আজকাল বিচি ট্রান্সপ্লান্ট করা হচ্ছে তো, কোল-কমপিউটারের জন্যে শুক্রাণু কমতে লেগেছে, তাই বেশ কিছু লাশ বিচি খুইয়ে আসছে।

    অন্ধ বুড়ো বলল, হ্যাঁ, মনে আছে, একবার এক সুপারম্যান মড়া-নেতার বিচি সুস্বাদু হবে বলে ডোমের কাছ থেকে চেয়ে আনিয়েছিলাম, এঃ, বানচোদের বিচিতে কি পচা গন্ধ, বমি করতে করতে কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম, শালার যতো রাজনীতি, বিচি দুটোতেই জমিয়ে রেখেছিল, মানুষ কতো নীচে নামতে পারে, ভাবো, কতো খারাপ দিনকাল এসে গেল।

    তোমার ভয় পাবার দরকার নেই, নেশায় প্রায় আচ্ছন্ন যুবকের দিকে মুখ নিচু করে বলল যুবতী।

    যুবক শুনতে পেল গান শুরু হয়েছে, ওঃ, এটাই ভালোবাসার খাবার সময়ের গান, শুনেছে কোথাও, পুজোটুজোয় তো নয়, পাঁচালিও নেই কোনো এই গানের ; ফিরে এই গানের একটা পাঁচালি ছাপিয়ে নিতে হবে, বাজার আছে নিশ্চয়ই। শুনতে লাগল গানটা, নেশাঝিমোনো পায়ের তাল দিয়ে। ওকে দেখে অন্যেরাও গানের সঙ্গে পায়ের তাল দিতে লাগল।

    “আমরা করব ভয়,

    আমরা করব ভয়,

    আমরা করব ভয়, প্রতিদিন...

    আহা, বুকের গভীরে আছে বেশ ভয়,

    আমরা করব ভয়, প্রতিদিন...

    প্রতিদিন সূর্যগ্রহণ,

    প্রতিদিন স্বপ্নভাঙন,

    কোনোদিন সত্যের ভোর, আসবে না...

    এই মনে নেই বিশ্বাস,

    আমরা করি অবিশ্বাস,

    সত্যের ভোর আসবে না, কোনোদিন...

    পৃথিবীর মাটি হবে খটখটে,

    বাতাস হবে তিতকুটে, প্রতিদিন...

    এই মনে নেই বিশ্বাস,

    আমরা করি অবিশ্বাস,

    আকাশ হবে গনগনে, প্রতিদিন...

    আরো হোক ধ্বংসের গান,

    পাবলিককে ধরে পেটান,

    ধ্বংসের সুরে হবে গান, প্রতিদিন...

    আমরা মানি সব বাধাবন্ধন,

    হাতে বাঁধা শেকলের ঝনঝন,

    সামনে মিথ্যার জয়, প্রতিদিন...

    এই মনে নেই বিশ্বাস,

    আমরা করি অবিশ্বাস,

    সামনে মিথ্যার জয়, প্রতিদিন...

    আমরা করব ভয়,

    আমরা করব ভয়, প্রতিদিন...

    আহা, বুকের গভীরে আছে বেশ ভয়,

    আমরা করব ভয়, প্রতিদিন...

    আমরা করব ভয়, প্রতিদিন...”

    গানটা শেষ হলে আবার শুরু থেকে রিওয়াইণ্ড হয়ে বাজতে লাগল। যুবক জানতে চাইল, এটা কোন বাংলা ব্যাণ্ডের গান ?

    অন্ধ ড্যাডি বলল, এটা ভালোবাসার গান, ওরা নিজেরাই গাইছে, এ গানের শেষ নেই, যতক্ষণ লাশ ততক্ষণ আশ।

    বাপি, যার কপালের ডানদিকের আব চকচক করছিল, যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিকেদারদের জয়ের যুগ চলছে হে, বুঝলে ? ফর ঠিকেদার, অফ ঠিকেদার, বাই ঠিকেদার, নো চেঞ্জ, নো বদল। তাই ভালোবাসার এই গান এখন বেশ জনপ্রিয় ; শ্মশানে যারা আসে তাদের অনেকেই আর হরিবোল দেয় না, এই গান গাইতে গাইতে আসে, গাইতে গাইতে ফিরে যায়, তাদের কাছে শুনে-শুনে শিখে নিয়েছিল শকুনগুলো।

    ড্যাডি, নখ-ওঠা বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে খোদরানো সিমেন্টের মেঝেতে অদৃশ্য কোনো শব্দ লিখতে লিখতে বলল, প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায়, আমার সব বইগুলো হেলায় পড়ে আছে, পড়বার কেউ নেই, বইগুলো অভাগা, পড়ুয়া না পেয়ে ওরাও মরে যাবে একদিন, অনেকগুলো বই তো অলরেডি মরে গেছে, মরা বইদের যে শ্রাদ্ধশান্তি করব, তারও উপায় নেই, দেখতেই পাই না। তারপর সত্যিকারের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, শুনেছি ফুটপাথের বইঅলারাও বিনে পয়সায় দিলে নিতে চায় না, বলে এইসব মরা বইয়ের চেয়ে ছুকরি-ছোকরাদের বেচা কাঁকড়াটে কবিতার বই বরং বেশি বিক্রি হয়।

    যুবক জানতে চাইল, কেন, আমার দোকান থেকে তো নানা দেবী-দেবতার পাঁচালিও বিক্রি হয় রেগুলারলি ; বিয়েতে আজকাল ভোজ খেতে গিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালিই গিফ্ট দ্যায় নিমন্ত্রিতরা, কেননা ছিঁড়ে গেলেও যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া যায় না, নদীতে বিসর্জন দিতে হয়।

    ফুটপাথের বই-বেচিয়েরা কেনে তোমার পুরোনো পাঁচালি ? জানতে চাইল অন্ধ।

    না, পাঁচালি সেকেণ্ড হ্যাণ্ড কেনা অশুভ। বিয়েতে সেকেণ্ড হ্যাণ্ড পাঁচালি দেয়া যায় না ; বিয়েতে পাঁচালি দিলে সে বিয়েতে নাকি প্রেমের বদলে সেক্স গুরুত্ব পায় আর গণ্ডায় গণ্ডায় পিল-পিল করে বাচ্চা হয় বছর-বছর।

    অন্ধ বলল, আগে জানলে একখানা সেকেন্ড হ্যাণ্ড পাঁচালি কিনতাম এই সব জ্ঞানের বই না কিনে।

    বাপি নামের বুড়োর দিকে তাকিয়ে, কেন, আপনি তো দেখতে পান, পড়লেই পারেন, দেয়ালের তাকে, ধুলো পড়ে আবছা, ফ্যাকাশে রঙের মলাট, সারি দিয়ে রাখা বইয়ের তাকের দিকে ইশারা করে বলল যুবক।

    চক্ষুষ্মান বুড়ো নিজের কালো চশমা খুলে, বলল, আরে ওসব মরা বিপ্লবের বই পড়ে কিছু হয় নাকি! তাছাড়া বইগুলো ধার নিয়ে আর ফেরত দ্যায়নি, বলে বেড়াতো যে সারাজীবন ঋণী থাকতে চায়, জ্ঞানের প্রতি ঋণী, আসলে গেঁড়িয়েছে বলে ঋণী, সে কথা তো আর সকলে জানছে না। আর জ্ঞান ? ওই তো ও জ্ঞান ফলাতে গিয়ে আগতখোকা-বিগতখোকা-বহিরাগতখোকাদের ঠ্যাঙানি খেয়ে মাশুল দিল ; জ্ঞান ফলাবার জন্যে শেষে অন্ধ হতে হলো। দিকে দিকে অন্ধদের পাকাচুল পঙ্গপাল, ফি-দিন ‘আমরা করব ভয়’ গাইতে গাইতে শ্মশানে আসছে আর আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে। একটু-আধটু যা বাঁচে ভালোবাসায় খায়।

    আবের ওপর হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল, আত্মআবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে হলে, নিজেকে যে অপরিহার্য তথ্য ঠেশে-ঠেশে খাওয়ানো হয়েছে আর যা থেকে ওই আবিষ্কার বেরাস্তায় চলে গেছে, তার ওপর জবরদস্ত দখল থাকতে হবে। আর বেশি দিন নেই ; ইউরোপে লক্ষ লক্ষ মানুষ আফ্রিকা আরবদেশ আফগানিস্তান থেকে ঢুকে ফাটিয়ে চৌচির করে দেবে, যতো বেগড়বাঁই তত্ব ওরা পৃথিবীর ওপর এতোকাল ফলিয়েছে সেগুলোকে, জাস্ট ওয়েট অ্যাণ্ড ওয়াচ। একসঙ্গে দুটো স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা রাখি, বুঝলি ?

    পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে, অন্ধ বলল, তুমি চুপ করো দিকিনি ; নিজে তো বিগত সংস্কৃতি আর উদারতার অতিশয়োক্তির বানাউটি আর সর্বনাশী সম্পর্কে ফেঁসে আছো জীবনভর। দেশভক্তি, সামাজিক সাজগোজ, গোমর, মুখখানা দেখেছো নিজের ? ঠিক যেন যোগেন চৌধুরীর আঁকা, ওপর থেকে নিচে ওব্দি নেতিয়ে গলে গলে চুইয়ে পড়ছে।

    চক্ষুষ্মান বুড়ো, খেপে গেছে বোঝা যাচ্ছিল, উত্তেজনায় কাপতে-কাঁপতে বলল, তোমার মুখ দেখেছ, কালো চশমা খুললেই প্রকাশ কর্মকারের আঁকা মুখের মতন দেখায়। চারিদিকে অন্ধকার দেখতে পাও, যা নিজেরাই বানিয়েছ, সুখে থাকার ভান করো, চারিদিকে জোচ্চুরির আর অন্যায়ের দানা পুঁতেছ, এখন প্যারানয়ায় ভোগা ছাড়া তোমার উপায় আছে নাকি, শালা অন্ধ কোথাকার, অন্যের মতাদর্শ ভাঙিয়ে খেয়েছে এতোকাল। ব্যাটা বোঝেই না যে মানুষের সমাজে মানুষের জীবন কাটাতে হলে লাথালাথি হবেই। ইতিহাস-খ্যাদানো ভূগোল-তাড়ানো গাণ্ডু, যার কথা ধেবড়ে গিয়ে মানে বেরোয় না, ভেতরে ঢু ঢু, অন্যের বুকনি কপচায়, সারাজীবন ফাকতা উড়িয়ে লেকচারবাজি করে তোমার জীবনের অ্যাচিভমেন্ট কী ? লাবিয়ার মাকড়ি খোলার শর্তে সারাজীবন হ্যাঁ আর না, হ্যাঁ আর না, হ্যাঁ আর না, তামিল করে গেল। কথাগুলো দ্রুত বলে পেট নাচিয়ে হাসতে লাগল চক্ষুষ্মান বুড়ো। আবের বদলে আদরের হাত নাভিতে।

    হাসির দমকে কোলের অ্যাটলাস মেঝেয় পড়ে গেলে, যুবক দেখল, বাপির কুঁচকির সব চুল পেকে গেছে। ওর মনে হল, এরা কথা বলে একে আরেকজনের সম্পর্কে যা ঠিকমতন বোঝাতে পারছে না, তা দুজনের আঁকা দিয়ে সঠিক বোঝাতে পেরেছে। কথাদের পেট থেকে মানে উধাও হয়ে গেছে এদের দুজনের, কথাদের বোধহয় পেটখারাপ বা আমাশা হয়েছে, ভ্যাজর-ভ্যাজর দিয়ে পরস্পরের যন্ত্রণাভোগের কারণ বুঝতে চেষ্টা করে চলেছে। নিজেকে নিঃশব্দে বলল, মানুষের কথারও জোলাপ হওয়া উচিত ছিল, সব বেরিয়ে যেতো হড়হড়িয়ে। [১৬]

    Double Space

    অন্ধ বুড়ো চক্ষুষ্মানের কথা লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।

    যুবতী, যুবক, দুজন স্মার্ট ষণ্ডা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চক্ষুষ্মান বুড়ো পাছার তলা থেকে মাংসকাটার ভারি চপার বের করে অন্ধের গলা বুক পেট মুখ লক্ষ্য করে চালাতে থাকল একের পর এক, চিৎকার করতে থাকল, করব এদের জবাই, তোমাকে তো পাবই, করব এদের জবাই, তোমাকে তো পাবই।

    অন্ধ বুড়ো পড়ে গেল মেঝেয়, রক্তারক্তি, মুন্ড ধড় থেকে আলাদা। টিকটিকির ল্যাজের মতন নাচতে থাকে মুণ্ডহীন ধড়।

    চক্ষুষ্মানের হাত থেকে চাপাতি কেড়ে নেবার চেষ্টায় স্মার্ট ষণ্ডা দুজন এগোতে, তাদের লক্ষ্য করে এলোপাথারি চপার চালানো আরম্ভ করল বুড়ো ; দুজনেরই গলা থেকে মুণ্ড আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর।

    চক্ষুষ্মান উলঙ্গ বুড়ো মাটিতে পড়ে গিয়েছিল ; সেই অবস্হাতেই নিজের গলায় কোপ দিয়ে মুন্ডু ধড় থেকে আলাদা করে ছটফট করতে লাগল। মরে গিয়েও দুজনের ধড়ের পারস্পরিক লাথালাথি থামেনি, মুণ্ড দুটো একে আরেকের দিকে তাকিয়ে মরণোত্তর গালমন্দ করে চলেছে।

    যুবকের মনে হল, কাটা মুণ্ডগুলো ওর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে অট্টহাসি হাসছে, বোধহয় বলছে, কোথায় গেল হে তোমার রেড বেল্ট আর কিক বক্সিং !

    মুণ্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে যুবকের মনে হল, কোন পাগলদের পাল্লায় পড়েছিলাম, নিজেরা কাটাকাটি না করলে এই শ্মশানকলোনি থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়ত ; দুটো বুড়ো আর দুটো পালোয়ান মিলে আমায় সোপর্দ করে দিত ভালোবাসায়।

    চক্ষুষ্মানের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে নাড়ি দেখে, তারপর অন্ধের, বুকে কান রেখে, রগের পাশে আঙুল রেখে দেখল যুবক, বলল, এনারা গেছেন, মুণ্ডু আর জোড়া লাগানো যাবে না ; ভালোবাসার ওভার ফিডিং হয়ে যাবে। মেঝে থেকে চপার তুলে সকলের লিঙ্গ এক এক করে কেটে, সেগুলো তাকের ফরম্যালিনের কাচের জারে ফেলে দিল, দেখল জার ভরে গেছে নানা মাপের লিঙ্গে। বইগুলোর সঙ্গে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার প্রতিযোগীতা করছে অজানা লিঙ্গগুলো, সন্দেহ নেই !

    যুবতী জিগ্যেস করল, সত্যিই মরে গেল বাপিবাবাটা আর ড্যাডিবাবাটা ? ওদের জন্যেই আমি নিজের জীবন নষ্ট করে এতকিছু করে চলেছি কতোকাল যাবত, সব পণ্ড করে দিল। এরা না থাকলে তো লাবিয়ার মাকড়ি পরতাম না, বিয়ে করে নিতাম তোমার মতন কোনো হাট্টাকাট্টা গাবরু জোয়ানকে।

    এখন কী করবে, জানতে চাইল যুবক।

    চলো হেল্প করো, এদের চ্যাংদোলা করে ভালোবাসার ঘরে রেখে আসি।

    দুজনে চ্যাংদোলা কর ধড়গুলো রাখলো নিয়ে গিয়ে ভালোবাসার ঘরে।

    দুজন বাবার কাটামুণ্ডগুলো চুল ধরে ঝুলিয়ে, বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল যুবতী, মুণ্ডুগুলো মেঝেয় রেখে, ছুটে গিয়ে তাকে রাখা কথ্থক নাচের ঘুঙুর নিয়ে দুই পায়ে স্ল্যাক্সের ওপরে বেঁধে নিল, ফিরে এসে দু হাতে দুই বাবাদের দুই মুণ্ডের চুল ধরে ঝুলিয়ে, দুর্বার উন্মাদনায়, অদৃশ্য আগুনশিখার বিশুদ্ধ হল্কা উড়িয়ে, নাচতে লাগল।

    যুবকের নেশা কেটে গিয়েছিল, দেখল যুবতীর হাতে ঝোলানো মুণ্ড দুটো নাচের তালে তালে চোখ মেলে রশ্মি বিকীর্ণ-করে ওকে ইশারা করছে।

    যুবতীর বেপরোয়া নাচে যুবক ভ্যাবাচাকা, কোনো আড়ষ্টতা নেই গনগনে মুখ যুবতীর, বের করে এনেছে ভেতরের তেজ, সঞ্জীবনী, তাদের পালটে ফেলেছে নাচে।

    নাচের তালে যুবতী গান গাইতে আরম্ভ করল, কন্ঠস্বর বেশ মশলাদার, পাশা-খেলায় জেতা দুর্যোধনের মামার কাজের বউয়ের মতন, ওদের কাটা গলা থেকে মেঝেয় রক্ত পড়ার সরোদ বাজনা বাজছে, গলা থেকে যে নলিগুলো ঝুলে আছে, লাল লাউডগা সাপের মতন মাথা উঁচিয়ে নিজেদের মধ্যে খেলছে :[১৭]

    মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যা নাচে

    তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

    আমি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে

    তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

    হাসি কান্না হীরাপান্না দোলে ভালে

    কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে

    নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে

    তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

    কী আনন্দ কী আনন্দ কী আনন্দ

    দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ

    সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে

    তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

    যুবতী নাচ থামাতেই বাবাদুটোর মুণ্ড চেঁচিয়ে ওঠে, আরে, নাচ থামালি কেন রে, বেশ তো নাচের তালে তাল দিচ্ছিলাম।

    নিকুচি করেছে, আমি নাচছিলাম নিজের আনন্দে, তোমাদের গান শোনাবার জন্যে নয়, তোমাদের ভালোবাসার ঘরে রেখে দিচ্ছি, ওখানে যতো ইচ্ছে গান শুনতে থেকো, বলে, যুবতী মুণ্ড দুটো ঝুলিয়ে ভালোবাসার ঘরে দৌড়ে ঢুকল, পেছনে পেছনে যুবক।

    বাকি মুণ্ডগুলো নিয়ে গিয়ে যুবক দেখল ভালোবাসা দুর্মুশ করা শবের ভেতরে মাথা পুরো ঢুকিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছে, ছিঁড়ে বের করছে, আর গপ গপ করে গিলছে।

    যুবক ভাবল, আচ্ছা, আমরা কেন খাবারের ভেতরে গলা পর্যন্ত মাথা ঢুকিয়ে খেতে পারি না !

    যুবতী বলল, এই মুণ্ডগুলোকেও দুর্মুশ করে দিন, নয়তো খেতে সময় লাগবে ওদের।

    ---নিজের বাবাদের পিটিয়ে দুর্মুশ করবে ?

    ---মরে যাবার পর বাবারা কি আর বাবা থাকে ? স্মৃতি হয়ে যায়। স্মৃতির স্টক তো আর অসীম নয়, তাই বাবারাও নতুন স্মৃতিকে জায়গা করে দিয়ে লোপাট হয়ে যাবে। বাবা শব্দটা ফোঁপরা হয়ে যাবে দুচার বছরে।

    ---তা ঠিক, আজকাল তো মা-বাপদের ফুটপাতে ফেলে ছেলেমেয়েরা আধুনিক জীবনে উধাও হয়ে যায়।

    দুর্মুশ করার সময়ে রক্তের ছিটে লাগল যুবকের পায়ের উরুর চুলে, শর্টসে, জামায়, মুখে-চোখে। মাথার ঘিলু ছড়িয়ে পড়তেই শকুনগুলো মুণ্ডু উঁচিয়ে গান গাইতে গাইতে দৌড়ে এলো তরতাজা জ্ঞান খাবার জন্যে।

    ---এখন কী করবে ?

    ---বাবাদের লায়াবিলিটি তো চুকলো, কিন্তু বাড়লো পালিয়ে বেড়াবার লায়াবিলিটি। ভালোবাসা তো ততো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে ফেলতে পারবে না, পচা গন্ধে শববাহকদের টানবে। পচা গন্ধ কার না ভালোলাগে, বলো ? পচা গন্ধ হলে লোকে টেনে টেনে শোঁকে, তারপরে ইঁহি ইঁহি করে নাকে রুমাল চাপা দ্যায়, তা সে শিকনির রুমাল হলেও। পচা গন্ধের টানে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পাবলিক এদিকে আসবেই। নিজেরা তালা ভাঙবে কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ডেকে তালা খোলাবে।

    ভালোবাসার জানলাগুলো খুলে দিই, এতকাল বন্ধ করে রেখেছিলাম যাতে পালিয়ে না যায়, এখন তো আর দরকার নেই, পালাবার হলে পালাক উড়ে।

    ---এখানে তোমার কোনো প্রমাণ রয়ে গেল ?

    ---প্রমাণ বলতে বাবাদের আধখাওয়া শব। আর মেয়াও মেয়াও ভরা বস্তাগুলো।

    ---তাহলে কী করবে ?

    ---পালাতে হবে।

    ---চলো আমার বাসায়। আমি তো একা থাকি।

    ---দুজনেই ধরা পড়ব। তোমাকে যে কাজে লাগাব বলে এনেছিলুম, তার তো আর দরকার হল না। তুমি চুপচাপ বেরিয়ে পড়ো।

    ---কিন্তু লাবিয়ার মাকড়ি খুলিনি যে এখনও ? তোমাকে ফেলে পালাতে পারব না।

    যুবতী তাড়াতাড়ি নিজের পোশাক খুলে মেঝেয় ফেলে দিল।

    যুবক বেশ কাছ থেকে তারিয়ে দেখে নিয়ে মাকড়িটা খুলল, খুলেই, মাকড়িতে চুমু খেল, মাকড়ির জায়গাতেও জিভ বুলিয়ে বলল, স্বর্গ যদি থাকে তা এইখানে, নরক যদি থাকে তা এইখানে।

    যুবতী বলল, যথেষ্ট কাব্যি হয়েছে, পরে ওসব নাটুকেপনার অনেক সময় পাবে, এখন যা করা জরুরি, তা-ই করো।

    যুবক দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, লাবিয়ার মাকড়িই ছিল তোমার তিন বাপের বীশ্ববীক্ষা, বাস্তবের ব্যাখ্যা। এখন এই নাও, রেখে নাও মাকড়ি, পরে দরকার হতে পারে।

    যুবতী বলল, মনে থাকবে, থ্যাংকস। ওই ঘরে পেটরলের জেরিক্যান আছে গোটা দশেক, চলো, ছড়িয়ে দিই পুরো বাড়িটায়।

    দুজনে মিলে সারা বাড়িতে পেটরল ছড়াতে লাগল। স্ল্যাক্স পরে নিল যুবতী। দেশলাই কাঠি জ্বেলে ফেলে দিতে, আগুন ছড়িয়ে পড়ল।

    দুজনে হাত ধরাধরি করে পালালো বাড়ির বাইরে।

    চলো, পালাও, বিস্ফোরণ হবে, যুবকের হাত ধরে টান মেরে বাইরে বেরোয় যুবতী, বলে তাড়াতাড়ি করো, কুইক কুইক, জিপ খুলে মোটর সাইকেলে বসো, আমি স্ল্যাকস নামিয়ে বসছি তোমার কোলে, চালাও মোটর সাইকেল, স্টার্ট দাও, উঁচু-নিচু রাস্তা আপনা থেকেই আমাদের পৌঁছে দেবে মহা-আহ্বাদের গন্তব্যে, রসের তীর্থ। ডেথ টু মোনোগ্যামি। বুঝলি, প্রেম হল সবচেয়ে অন্তর্ঘাতী ব্যাপার।

    মোটর সাইকেল স্টার্ট দ্যায়, যুবকের কোলে যুবতী, লাবিয়ার মাকড়ি খুলে এই প্রথম আরেকজনের সাহায্যে। তারপর হাইওয়ে, উড়ে চলে মোটর সাইকেল। দুপাশের গাছের ডালপালারা ওদের কোলপ্রেম দেখে হাততালি দিয়ে পেছন দিকে দৌড়োচ্ছে।

    যুবতী দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করে ওঠে, ইয়াআআআআহাহাহাহা, ধন্যবাদ গ্যালিলিও গ্যালিলি, নড়ে চলেছে, নাড়া দিয়ে চলেছে, নিজেও ওঠানামা করে হাইওয়ের হাওয়ায়।

    দুজনের কেউই পেছন ফিরে দ্যাখে না যে বাড়িটা বিস্ফোরণে উড়ে গেল।

    ফরম্যালিনে চোবানো লিঙ্গগুলো জার ফেটে ছিটকে বেরিয়ে দেবশিশুর ফিনফিনে গঙ্গাফড়িং-ডানা মেলে মেঘ-টুসটুসে হাওয়ায় ছুটে চলল, যাতে খরায় মার খাওয়া দেশটায় বৃষ্টি শিগগির আসে। [১৮]

    তাকে রাখা বইগুলোও মলাটকে ডানা বানিয়ে উড়ে চলল লিঙ্গগুলোর পেছন পেছন।

    ভালোবাসা ততক্ষণে অনেক উঁচু ধোঁয়াটে নীল আকাশে গান গাইতে গাইতে পাক খেয়ে উড়ছে।

    সুনসান হাইওয়েতে, একটা জঞ্জালস্তুপের উদ্দেশ্যে যুবতী আরেকবার চিৎকার করে, মা, এই নাও, টু হেল উইথ তোমার লাবিয়ার মাকড়ি, আমার মেয়ে হলে তাকে লাবিয়ায় মাকড়ি পরতে শেখাব না, এই জঞ্জালেই তুমি আমাকে এক দিনের মাথায় ফেলে দিয়েছিলে, আজ তোমাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি।

    -------------------------------------------------------------------------------------------------------------

  • সোনালী মিত্র | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৮:৪৪734838
  • সোনালী মিত্র নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

     

    সোনালী মিত্র : '' প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার '' এর পরে মলয় রায়চৌধুরীর সেই কবিতা আর এলো কই যে আগামী প্রজন্ম মনে রাখবে ? নাকি বিতর্ক হয়েছিল বলে কবিতাটা বিখ্যাত হয়েছিল ? নাকি মলয় রায়চৌধুরীর সব প্রতিভা ঢাকা পরে গেলো ''প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার '' এর সৌজন্যে ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : ওটা ছিল মূলত দ্রুতির কবিতা ; আক্ষেপানুরাগের কবিতা। ওই কবিতার দরুন পঁয়ত্রিশ মাস ধরে আদালত-উকিল-চাকুরি থেকে সাসপেনশানের কারণে অর্থাভাব ইত্যাদির ফলে দ্রুতির রেশ আক্রান্ত হয়েছিল। কলকাতায় তো আমার মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না, কেননা আমরা তখন পাটনায় থাকতুম। সুবিমল বসাক ছাড়া অন্যান্য বন্ধুরাও কলকাতায় তাদের আস্তানায় রাতে থাকতে দিত না। উত্তরপাড়ার আদিবাড়ির খণ্ডহরে রাতে থাকলে সকালে কলকাতা আদালতে যাবার জন্যে প্যাসেঞ্জার ট্রেন, যার সময়ের ঠিক ছিল না। ইলেকট্রিক ট্রেন তখন সেরকমভাবে আরম্ভ হয়নি। সে কি দুরবস্হা। টয়লেট করতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার ট্রেনে ; রাত কাটাতুম সুবিমলের জ্যাঠার স্যাকরার এক-ঘরের দোকানে, বৈঠকখানা পাড়ায়। একই শার্ট-প্যাণ্ট পরে দিনের পর দিন কাটাতে হতো ; স্নান রাস্তার কলে, সেগুলোও আবার এতো নিচু যে হামাগুড়ি দিয়ে বসতে হতো। কবিতা লেখার মতো মানসিক একাকীত্বের সময় পেতুম না মাসের পর মাস।

    .

    ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা তখন বিখ্যাত হয়নি ; হয়েছে এই বছর পনেরো-কুড়ি হল। তখন তো ভয়ে লোকে হাংরি শব্দটাই ব্যবহার করত না, কবিতাটা নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা। আমার মনে হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ওদেশে কবিতাটা প্রকাশের ব্যাপারে বা হাংরি আন্দোলন নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে ভীতি ছিল না। ঢাকায় মীজানুর রহমান ওনার পত্রিকায় ধারাবাহিক আমার ‘হাংরি কিংবদন্তি’ প্রকাশ করেছিলেন। আশির দশকে আমার বেশির ভাগ লেখা প্রকাশিত হয়েছে ঢাকার পত্র-পত্রিকায়। বাংলাদেশের কবিদের দেখাদেখি পশ্চিমবঙ্গে বছর দশেক পরে কবিতাটা প্রকাশের সাহস যোগাতে সক্ষম হন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা। এখন তো কলকাতার সংবাদপত্রের পুস্তিকাতাও প্রকাশিত হতে দেখি। ‘ক্ষুধার্ত’, ‘ক্ষুধার্ত খবর’ ইত্যাদি যে পত্রিকাগুলো সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রকাশ করত, তাতেও ওরা আমার কবিতা প্রকাশ করতে বা আমার নামোল্লেখ করতে ভয় পেতো ; এমনকি হাংরি শব্দটা এড়াবার জন্য ক্ষুধার্ত শব্দটা প্রয়োগ করা আরম্ভ করেছিল। আসলে শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ আদালতে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গিয়ে আত্মঅবমাননার গাড্ডায় পড়েছিল।

    .

    আমার মনে হয় তোদের নাগালে আমার বইপত্র পৌঁছোয় না বলে কেবল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ দ্বারা প্রভাবিত রয়েছিস। আমার উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ আর ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ তো বেশ বৌদ্ধিক রেসপন্স পেয়েছে, বিশেষ করে কম বয়সী অ্যাকাডেমিশিয়ানদের থেকে। নয়তো কেনই বা বিষ্ণুচন্দ্র দে আমার কবিতা নিয়ে পিএচডি করবেন, উনি ওনার গবেষণাপত্র গ্রন্হাকারে প্রকাশ করেছেন। স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায় এম ফিল করবেন ? মারিনা রেজা ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণার জন্য আসবেন ? আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী গবেষণা করছেন। অধ্যাপক দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা বিনির্মাণ করে অ্যাকাডেমিশিয়ানদের সাইটে আপলোড করেছেন। পড়ে দেখতে পারিস। তুই দিল্লিতে থাকিস বলে আমার বইপত্র পাস না। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইটালি থেকে গবেষণার জন্য আসছেন ড্যানিয়েলা লিমোনেলা।

    ..

    সোনালী মিত্র : হাংরি আন্দোলন নতুনধারার কবিতার জগতে বিপ্লব এনেছিল। কিছুদিন ফুল ফুটবার পরেই রোদের তাপে মিইয়ে গেলো ! মতপার্থক্য জনিত কারণেই কি আন্দোলন শেষ হয়ে গেলো ? পৃথিবীতে সমস্ত আন্দোলনই প্রথমে আগুন লাগিয়ে দেয় মানুষের বুকে, আবার আগুন নিভিয়েও দেয় আন্দোলনের হোতারা, হাংরি ও এর ব্যতিক্রম হোল না কেন?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী: হ্যাঁ, পৃথিবীর সব আন্দোলনই একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে ; তার কাজ হয়ে গেলে মিলিয়ে যায় ; আন্দোলন মাত্রেই সমুদ্রের আপওয়েইলিং। হাংরি আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় একের পর এক কতোগুলো আন্দোলন হয়ে গেছে বাংলা সাহিত্যে। তারা মিডিয়া প্রচার পায়নি বলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলুম, যে কারণে এই মাস তিনেক আগেও বিবিসির প্রতিনিধি এসে একটা প্রোগ্রাম তৈরি করে নিয়ে গেলেন আর প্রসারণ করলেন। গত বছর আমেরিকা থেকে অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে একটা ফিল্ম তৈরি করে নিয়ে গেলেন ; হাংরি আন্দোলন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বক্তৃতা দেবার সময়ে ওনার কাজে লাগে ফিল্মটা। হাংরির পর তো কবিতার আর গদ্যের ক্রিয়েটিভ ধারাই পালটে গেছে।

    .

    সোনালী মিত্র : আপনারা কবিতা আন্দোলন করে কি করতে চেয়েছিলেন ? এতদিন পরে পেছনের দিকে তাকালে কি মনে হয় অল্পবয়সে হুজুকে চেপেছিল আপনাদের সাহিত্য সাধনা ? আপনারা যা চেয়েছিলেন তার কতখানি সফলতা অর্জন করেছিলেন ? যদি সফলতা অর্জন করে থাকেন তাহলে ধরে রাখতেই বা পারলেন না কেন ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : না, আমাদের আন্দোলন কেবল কবিতার আন্দোলন ছিল না। গদ্য-নির্মাণ আর ছবি-আঁকারও আন্দোলন ছিল। ছবি আঁকায় ১৯৭২ সালে অনিল করঞ্জাই ললিত কলা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ গল্পের বইটা সেই ষাটের দশকেই প্রশংসিত হয়েছিল ; এখন তো ওর রচনাসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে, আর পাঠকদের দ্বারা সমাদৃত হচ্ছে। হাংরি আন্দোলনের কারণে পাঠবস্তু মুক্ত হয়ে গেছে যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে; কবিতা আর গল্প লেখা হচ্ছে মুক্ত-সূচনা, মুক্ত-সমাপ্তি এবং মুক্ত আঙ্গিক নিয়ে ; মানের নিশ্চয়তা এড়াতে পারছে ; অফুরন্ত মানে গড়তে পারছে; সংকরায়ণ ঘটাতে পারছে; ‘আমি’কে বহুমাত্রিক আর বহুস্বরিক করে তুলতে পারছে ; শিরোনামের পরিবর্তে রুবরিক প্রয়োগ করতে পারছে ; ভঙ্গুরতা আনতে পারছে ; মাইক্রোন্যারেটিভকে গুরুত্ব দিতে পারছে; ফ্লাক্স তৈরি করতে পারছে। এ থেকেই তো বোঝা যায় যে পরের পর প্রজন্মে সফলতা ক্রমশ চারিয়ে যেতে পেরেছে।

    .

    সোনালী মিত্র : হাংরি ভূত কি গায়ে চেপে বসে আছে এখনও আপনার পরিচয়ের সঙ্গে ? এখন ও যা লেখেন মানুষ তুলনা টানে হাংরি কবিতার সঙ্গে, এটাকে উপভোগ করেন না খারাপ লাগে ? জীবনের এইপ্রান্তে এসে কি মনে হয় হাংরি আন্দোলন অন্যকোন ভাবে পরিচালনা করা যেত যাতে এই সময়েও সমান প্রাসঙ্গিকতা থাকত ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী: হাংরি আন্দোলনের তো কেউ পরিচালক ছিলেন না। আমাদের আন্দোলনের কোনো সম্পাদকীয় দপতর, হেড কোয়ার্টার, হাই কমাণ্ড, পলিট ব্যুরো জাতীয় ব্যাপার ছিল না। যাঁর যেখান থেকে ইচ্ছে বুলেটিন বা পুস্তিকা প্রকাশ করার স্বাধীনতা ছিল। বাঙালির সাহিত্য চেতনায় এই ব্যাপারটা ছিল অভাবনীয়। প্রথম দিকে হ্যাণ্ডবিলের আকারে বেরোতো আর ফ্রি বিলি করা হতো ; যিনি বের করতেন তিনিই বিলি করতেন। কবিতার পোস্টারের প্রচলনও আমরাই সর্বপ্রথম করি, তখনকার দিনে উর্দু লিথোপ্রেসে অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা পোস্টার ছাপিয়ে। দেয়ালে সাঁটার কাজটা করতেন ত্রিদিব মিত্র আর ওনার প্রেমিকা আলো মিত্র। এখন যেটা হয়েছে তা হাংরি নাম ঘাড়ে চেপে যাওয়ার নয়। যা মাঝে-মাঝে নজরে পড়ে তা হল, মলয় রায়চৌধুরী নামটা আমার লেখার আগেই পাঠকের কাছে পৌঁছে একটা ইমেজ গড়ে ফেলার। এর জন্য আমার কিছু করার নেই। জনৈকা পাঠিকা লিখে জানিয়েছিলেন যে আমার কবিতাগুলোকে তিনি প্রিডেটর মনে করেন, এবং আমাকে নয়, আমার কবিতার সঙ্গে তাঁর সুপ্ত যৌনসম্পর্ক গড়ে ওঠে তা তিনি টের পান। অর্থাৎ এ-ক্ষেত্রে আমার নামকে অতিক্রম করে তিনি আমার কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে নিয়েছেন। এই তরুণীর চরিত্রটিকে আমি ‘ভালোবাসার উৎসব’ কাব্যনাট্যে ব্যবহার করেছি। হাংরির ভুতপ্রেত আমার চেয়ে পাঠক-পাঠিকার ওপর চেপে বসেছে বেশি করে। আর হাংরি আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা না থাকলে তুই পাঁচ দশক পর বিষয়টা নিয়ে উৎসাহী কেন ?

    .

    সোনালী মিত্র : স্পষ্টত তখন হাংরি আন্দোলন নিয়ে বাংলার কবিদল দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, যারা সঙ্গে থাকব বলেও পরে সরে গিয়েছিলেন, যারা কিছুদিন থাকবার পরে সরে গিয়েছিলেন, যারা প্রথম থেকেই বিরুদ্ধে ছিলেন, তাদের প্রতি আপনার কখনও কি মনে হয়েছে যে শিল্প-সাধনার স্বাধীনতার পরিপন্থী ছিলেন তারা ? কিংবা তাদের সেই সাহস ছিল না ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : দু’ভাগ নয়, অনেক ভাগ। লেখালেখির জগতে এই ধরণের ঘটনা আকছার ঘটে। এটা ব্যক্তিচরিত্রের ব্যাপার, শিল্প-সাধনার নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকা থেকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে ওসকাচ্ছিলেন হাংরি আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়া যাবার জন্য। তাঁরা বেরিয়ে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে পুলিশের সাক্ষী হয়ে যেতেই উনি ফিরে এসে আমার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেলেন আর নিজের বন্ধুদের ছবিটা বাঙালির ইতিহাসে নোংরা করে দিলেন। মীজানুর রহমান ‘হাংরি কিংবদন্তি’ ধারাবাহিক প্রকাশ করার পর গ্রন্হাকারে বের করতে চাইছিলেন, কিন্তু সেখানেও শামসুর রাহমানের মাধ্যমে তাঁকে বিরত করা হয় ; করেছিলেন ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর কবিরা। স্ট্যালিন যখন পরাবাস্তববাদীদের জেলে পুরছিলেন তখন কয়েকজন কমিউনিস্ট হয়ে-যাওয়া পরাবাস্তববাদী স্ট্যালিনকে সমর্থন করেন। হুমায়ুন আজাদ আর অভিজিৎ রায় হত্যা নিয়ে আল মাহমুদ আর নির্মলেন্দু গুণ মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে বসে রইলেন। আল মাহমুদ একজন মৌলবাদী, তাঁর আচরণ বোঝা যায়। নির্মলেন্দু গুণ মুখ খুললেন না ভয়ে, এসট্যাবলিশমেন্ট তাঁকে সাহিত্যের ইতিহাস থেকেই লোপাট করে দিতে পারে এই আশঙ্কায়। পশ্চিমবঙ্গেও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে, কিন্তু ‘পরিবর্তনওয়ালা’ কবি-সাহিত্যিকরা মুখে লিউকোপ্লাস্ট চিপকে লুকিয়ে পড়েন। শিল্প-সাধনার স্বাধীনতা তখন কোথায় যায় ?

    .

    সোনালী মিত্র : মলয় রায়চৌধুরী একটা ব্র্যান্ড। মলয় রায়চৌধুরী তকমা ছেপে গেলে অনেক কিছু করে ফেলা যায় যা একটা সাধারণ শিল্পীর দ্বারা সম্ভব নয় ! আপনার কি মনে হয়নি এতদিন যা লিখেছেন, যা লিখছেন এসব যেন কিছুই নয়, চরম কিছু বাকি রয়ে গেলো যা এখনও লেখা হোল না ! শেষ সময়ে এসে কি পেছনে তাকিয়ে হাঁটেন না সামনের পথ তৈরি করার খেলাতে মেতে আছেন ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : হ্যাঁ, আসল লেখা এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি ; মগজের মধ্যে ঘটে চলে অনেকরকমের ভাবনাচিন্তা। ব্র্যাণ্ড কিনা তা জানি না। আমার কতো প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস, কাব্যনাট্য গ্রন্হাকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। ব্র্যাণ্ড হলে তো কোনো না কোনো প্রকাশক রাজি হতেন প্রকাশ করতে। কেউই রাজি হন না। অনেকে ছাপার জন্য টাকা চেয়ে বসেন। টাকাই যদি দিতে হয় তো নিজেই ছাপিয়ে ফ্রি বিলি করা ভালো, যেমন রবীন্দ্রনাথ করতেন। কেননা প্রকাশকরা টাকা নিয়ে নাকি যথেষ্ট কপি ছাপেন না, শুনেছি কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিকের কাছে। পেছনে ফিরে তাকাই না। আমি বইপত্র সংগ্রহ করি না, নিজের বইও আমার কাছে নেই, তাই আগের লেখাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কটা অবিরাম ছিন্ন হয়ে চলেছে। আমার বইয়ের কোনো লাইব্রেরি নেই। বই-পত্রিকা পড়ি, আগ্রহী পাঠকদের বিলিয়ে দিই।

    .

    সোনালী মিত্র : যৌবনে শুভা শেষ জীবনে অবন্তিকা'র মধ্যে দিয়ে প্রেমের ভিন্নতা খুঁজতে চাওয়া কি কোন ভুল সংশোধন ? নারীকে যখন ভোগ্য, পুরুষকে ও যখন ভোগ্য ভেবে সমস্ত নৈরাশ্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন কি মনে হয়নি শ্মশানের পাশেই হাসনুহানা গাছে কত ফুল ফুটে আছে, সেই ফুলের শোভা ও নৈরাশ্যর মতই ভীষণ সত্য, ফুলকে উপেক্ষিত করা যায় ?

    ,

    মলয় রায়চৌধুরী : শুভা যৌবনের নয় ; বয়ঃসন্ধিকালের। আমার “রাহুকেতু” উপন্যাস পড়লে তুই আমার জীবনের কয়েকজন নারীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারবি। “ভালোবাসার উৎসব” কাব্যনাট্যেও আছেন তাঁরা। আমার ‘অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস’ বইতে একটি নারী চরিত্র আছে যে একজন আধচেনা পুরুষের হাত ধরে বলে ওঠে, ‘চলুন পালাই’। এটা আমার জীবনে একজন নারীর প্রবেশের প্রয়াস ছিল। অবন্তিকা একটি নির্মিত প্রতিস্ব। এর আগে রামী, বনলতা সেন, নীরা, নয়ন, সুপর্ণা ইত্যাদি ছিল কবিদের নিজস্ব নারী। অবন্তিকা সেরকম নারী নয়, সে স্বাধীন, পাঠকের কাছে, আলোচকের কাছে, নির্দ্বিধায় যায়। অবন্তিকা আমার স্লেভগার্ল নয়।

    .

    সোনালী মিত্র : এই সময়ের কবিতার ভবিষ্যৎ কি ? এই সময়ের কবিতা কোনপথে এগিয়ে গেলে হাংরি যেখানে শেষ করেছিল সেখান থেকে শুরু করা যাবে ? নাকি এখনকার কবিরা গোলকধাঁধায় পড়েছে, কি করবে না করবে কিছুই যেন লক্ষ্য নেই তাদের সামনে ? নাকি এখনকার কবিতা সমাজ রাষ্ট্র সময় থেকে সরে যাওয়া কোন জাফর শা ? কোন উত্তাপ লেগে নেই তাদের হৃদয়ে ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : এখন তো অনেকের কবিতা পড়ে আমার হিংসে হয়; অসাধারণ কবিতা লিখছেন এখনকার কবিরা। মনে হয় শব্দ বাক্য ছন্দ সবই তো রয়েছে, আমি কেন এদের মতন লিখতে পারছি না। যেমন রাকা দাশগুপ্ত, সাঁঝবাতি, মুজিবর আনসারী, বিভাস রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, বিদিশা সরকার, বহতা অংশুমালী, মিচি উল্কা প্রমুখ। সব নাম এক্ষুনি মনে আসছে না।

    .

    সোনালী মিত্র : কবির চেতনায় কোন না কোন পূর্বজ কবির একটি আদর্শগত ধারাপাত থেকে যায়, এটা প্রাচীন কাল থেকেই লক্ষণীয়, কবি অগ্রজ কোন কবির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ? আসলেই কে কাউকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যায় সাধনায় ? যদি যায় কতদূর গিয়েই বা ফিরে আসা উচিত নিজের চেতনায় ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : শৈশবে আমাদের পরিবারে শিউনন্দন কাহার আর বাবার ফোটোগ্রাফি দোকানে রামখেলাওয়ন সিং ডাবর, দুজন কাজের লোক ছিল। শিউনন্দন নিরক্ষর হলেও পুরো রামচরিতমানস মুখস্হ ছিল। রামখেলাওয়ন রহিম, দাদু আর কবির থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারত। তারা কাজের লোক ছিল বলে সরাসরি বকুনি দিতে পারত না, কিন্তু রামচরিতমানস বা রহিম-কবির-দাদু থেকে কোট করে জানিয়ে দিত আমরা কী ভুল করছি। আমার বাল্যস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা”র ‘এই অধম ওই অধম’ অংশে আমি তাঁদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিষেধ করার কিছু উদাহরণ দিয়েছি। অগ্রজ কবিদের বদলে এই দুই জনের প্রভাব আমার ওপর গভীরভাবে পড়েছিল। তাছাড়া, আমাদের বাড়িতে প্রথম স্কুলে পড়তে ঢুকেছিলেন আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরী। আমাদের পরিবার সেই অর্থে শিক্ষিত-সংস্কৃতিমান পরিবার ছিল না। বাবা-মা আর জেঠা-কাকারা কেউই স্কুলে পড়েননি। বাবা-জেঠারা সুযোগ পাননি কেননা ঠাকুর্দা ছিলেন ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফার-আর্টিস্ট, বেশির ভাগ সময় কাটাতেন প্রিন্সলি স্টেটের সদস্যদের পেইনটিং আঁকায় ; উনি সপরিবারে মুভ করতেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। আমার বাবা তো জন্মেছিলেন লাহোরে। গোঁড়া বামুন পরিবার ছিল বলে ঠাকুমা আর বড়োজেঠা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মনে করতেন বেমমো ; বহুকাল রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ছিল আমাদের বাড়িতে।

    .

    সোনালী মিত্র : প্রতিটি সফল পুরুষের পিছনে নাকি একজন নারী শক্তি বিরাজ করেন। আপনার কলমের প্রাণোচ্ছল পরিনতির জন্য কোন নারীশক্তিকে কি আধার মানতে চান ?কবি কলম দূর্ধষ রোম্যান্টিক, এই রোম্যান্টিসিজম এখনো কি প্রেমে পড়তে বাধ্য করে ?আপনার কলমে যে নারীদের পাই তারা কি শুধুই কল্পনারী নাকি বাস্তবেও তাদের ছোঁয়া আছে ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : না, আমার পেছনে কোনো নারী নেই, মানে প্রেমিকা-নারী নেই। তবে সাপোর্ট সিস্টেম হিসাবে মা ছিলেন। যে নারীদের আমার লেখায় পাস, তারা কল্পনারী নয়, বাস্তবের নারী, একমাত্র অবন্তিকা হল বিভিন্ন নারীর উপাদান নিয়ে নির্মিত একটি প্রতিস্ব। ‘চলুন পালাই’ পর্ব থেকে আমি আর প্রেমে পড়তে চাই না। রোম্যান্টিক হওয়াটাই আমাকে বিপদে ফেলেছে বারবার। বড্ড ডিসট্র্যাকশান হয় প্রেমে। বুড়ো হয়ে গেছি বলে বলছি না, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

    .

    সোনালী মিত্র : একদম সর্বশেষ প্রশ্নটা করেই ফেলি, আগামীদিনে আপনার পরিকল্পনা কি ? নতুন কি কোন পরিকল্পনা আছে লেখালেখি নিয়ে ? পাঠকরা কি নতুন স্বাদের কিছু পেতে চলেছে আপনার কলম থেকে ?

    .

    মলয় রায়চৌধুরী : তোরা তো আমার লেখাপত্র যোগাড় করে পড়িস না। কমার্শিয়াল পত্রিকায় আমার লেখা বেরোয় না যে হাতে পাবি। ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে লেভেল-জামপিং আর ফ্রো-টু আঙ্গিক দেবার কাজ করেছি। ‘ঔরস’ উপন্যাসে ফর্ম ভেঙে মানুষের পাশাপাশি মাছিদেরও টিভি সাংবাদিকের চরিত্র দিয়েছি। ‘গল্পসংগ্রহ’তে বিভিন্ন জীবজন্তু পাখিপাখালিকে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মানুষের ভূমিকা দিয়েছি। চটকল আর পাটচাষের দুর্দশা নিয়ে ‘নখদন্ত’ উপন্যাসটায় ডায়েরি, নোটস, সত্য ঘটনা আর কাহিনির মিশেল দিয়েছি। ‘জঙ্গলরোমিও’ নামে একটা উপন্যাস পুজোর সময় প্রকাশিত হবার কথা, যার গল্প একদল ক্রিমিনালদের নিয়ে, সেখানে কারোর নাম উল্লেখ করা হয়নি, তাদের সংলাপের ঢঙই তাদের পরিচয়। এলেকট্রা কমপ্লেক্স নিয়ে একটা নভেলাও প্রকাশিত হবে পুজোর সময় বা পরে, তাতেও ফর্মের নিরীক্ষা করেছি।


     

    ( মায়াজম ব্লগজিনে প্রকাশিত )



     

  • সুমিতাভ ঘোষাল | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৮:৫০734839
  • হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

    নিয়েছেন সুমিতাভ ঘোষাল

     

    ( ‘গদ্য-পদ্য সংবাদ’ পত্রিকায় ১৯৮৬ অক্টোবরে প্রকাশিত )

    সুমিতাভ : ষাটের দশকের হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ কতোটা ?

     

    সুনীল : হাংরি আন্দোলনে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। আমি তখন কৃত্তিবাস নামে একটা পত্রিকার সম্পাদনা করতুম। কৃত্তিবাসের থেকে কয়েকজন এই আন্দোলন শুরু করে। এদের মধ্যে প্রধান ভূমিকা প্রথমে নিয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী, সে ছিল আমার বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর ছোটো ভাই। সমীর রায়চৌধুরী কৃত্তিবাসের একজন লেখক এবং ওই গোষ্ঠীরই একজন। মলয়েরও কিছু কিছু লেখা কৃত্তিবাসে বেরিয়েছিল।


     

    সুমিতাভ : আচ্ছা শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো... ( কথায় বাধা দিয়ে )

    সুনীল : হ্যাঁ, তারপরে মলয় প্রথমে শুরু করার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাতে যোগ দেয় এবং পরে উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও পরিচিতদের মধ্যে অনেকে আসেন । এইভাবে হাংরি আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু এই আন্দোলনের কোনো ইস্তাহার বা কোনো ব্যাপারে আমার কোনো নাম ছিল না বা আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না।


     

    সুমিতাভ : হাংরি আন্দোলনকে কি আপনি একটা আদৌ সাহিত্য আন্দোলন বলে মনে করেন ?


     

    সুনীল : হাংরি আন্দোলন তো সাহিত্যের আন্দোলন হিসেবেই শুরু হয়েছিল। কতোটা সাহিত্য তারা সৃষ্টি করতে পেরেছিল, সে বিষয়ে আমি কোনো মতামত দেব না। সেটা এখনকার যারা পাঠক তারাই বিচার করবে। তবে নতুন কোনো একটা সাহিত্য তারা সৃষ্টি করতে পেরেছিল এটা ঠিক।


     

    সুমিতাভ : তখনকার সাহিত্যে এই আন্দোলনের কোনো প্রতিচ্ছবি পড়েছিল কি?


     

    সুনীল : দুটো ব্যাপার হয়েছিল। একটা হয়েছিল কী হাংরি আন্দোলনের যারা প্রধান তারা কিছু কিছু পত্র পত্রিকায় লিফলেট ইত্যাদি ছাপাতে শুরু করে। এই সাহিত্যকে বদলাতে হবে ; অন্যরকম সাহিত্য সৃষ্টি করে পুরোনো মূল্যবোধকে নষ্ট করে দিতে হবে ইত্যাদি।


     

    সুমিতাভ : না, সাহিত্যে এর কোনো প্রতিচ্ছাপ পড়েছে কি ?

    সুনীল : না। আমি বলব সাহিত্যে এর কোনো ছাপ পড়েছে বলে আমি মনে করি না। তবে এটা একটা গোষ্ঠী, অন্যরকম সাহিত্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। তবে অ্যাবরাপ্টলি এই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়। তবে এতোদিন বাদে আবার সেসব নিয়ে আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। মাঝখানে দশ বছর হাংরিদের সম্পর্কে কথাবার্তা শুনিনি। ( এই দশ বছর মলয় রায়চৌধুরী কলকাতার সাহিত্য জগতের বাইরে ছিলেন, বুলেটিন প্রকাশ করার জন্য টাকা তিনিই দিতেন )।


     

    সুমিতাভ : ট্রাডিশানাল বাংলা সাহিত্যকে কোনোভাবেই এরা একটুও বদলাতে পেরেছিল কি ?


     

    সুনীল : সেটা তো আমি বলতে ওপারব না। হাংরিদের যারা প্রথান, যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, এরা হাংরি আন্দোলনের মাঝামাঝি অবস্হায় এর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। যখন এই নিয়ে কোর্টে কেস হয়, তখন এরা বিবৃতি দেয় যে, আমাদের সঙ্গে হাংরির কোনো সম্পর্ক নেই। ওদের লেখা আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যের মূল ধারার সঙ্গেই যুক্ত। আলাদাভাবে হাংরি আন্দোলনের কোনো প্রভাব আছে বলে আমি মনে করি না।


     

    সুমিতাভ : ক্ষমতাবান বেশ কছু লেখক থাকা সত্ত্বেও, হাংরি আন্দোলনের জীবৎকাল খুব অল্প। এর কারণ কি ?


     

    সুনীল : ক্ষমতাবান লেখকরা প্রথমে তাড়াতাড়ি সরে গেলেন। দ্বিতীয় কথা, এরা সিরিয়াসলি সাহিত্য রচনা করার বদলে এমন কিছু কাজ করতে লাগলেন, যেগুলো অনেকেরই বিরক্তি উদ্রেক করলো। যেমন ধরো এরা কাউকে জুতোর মালা পাঠিয়ে দিল। কাউকে একটা মুখোশ পাঠিয়ে দিল। বা কাউকে টেলিফোন করে বলল, আপনার ছেলে মারা গেছে, বাড়ি চলে যান। এইভাবে কিছু কিছু অল্প বয়সের চ্যাংড়ামি --- এটা অনেকেই করে, অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু এটাই যেন প্রধান হয়ে দাঁড়াল। লেখার মধ্যে তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করার করার জন্য অযথা এবং অকারণ অশ্লীলতা আনার চেষ্টা করল। আমি অবশ্য কোনো শব্দকেই অশ্লীল বলে মনে করি না। তথাকথিত অশ্লীলতা, তথাকথিত অশ্লীল শব্দ। বা আরেকটা ছিল, অন্যকে গালাগালি দেওয়া। এই সমস্ত দিকেই যেন তাদের মন বেশি গেল। অবশ্য অন্য লোকের অন্য মত থাকতে পারে।


     

    সুমিতাভ : হাংরি লেখাগুলোতে আত্মকামিতা জিনিসটার কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে করেন?


     

    সুনীল : তা, আত্মকামীতা মানে ধরো, আমরা কৃত্তিবাসে যেটা বলতাম, যে নতুন আধুনিক সাহিত্য বলতে আমরা কী বুঝতাম ?তখন আমরা বলতাম যে কৃত্তিবাসের মূল সুর হচ্ছে কনফেশন। স্বীকারোক্তিমূলক লেখা। আমরা যেভাবে জীবন যাপন করছি সাহিত্যে সেটাকে ঠিক সেভাবেই স্বীকার করে নেওয়া দরকার। হাংরিরা হয়তো তার থেকেও আরো এক্সট্রিম-এ চলে গিয়েছিল। তারা, যাকে বলে আত্মকণ্ডূয়ন, সেটার দিকে চলে গিয়েছিল। তবে আমার মনে হয় হাংরি আন্দোলনের মূল সুর কৃত্তিবাস ধারারই একটা অঙ্গ।


     

    সুমিতাভ : নকশাল আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্ব, আর হাংরি আন্দোলন, মোটামুটি সমসাময়িক। এর কোনো বিশেষ তাৎপর্য আছে বলে আপনি মনে করেন ?


     

    সুনীল : হাংরি আন্দোলনের মধ্যে রাজনীতি কিছু ছিল না। তবে ক্ষুধার ব্যাপারটা ছিল। তবে সেটা খাদ্য অভাবের যে ক্ষুধা, তা নয় বোধহয়। এটা বোধহয় অন্য কোনো ক্ষুধার কথা ওরা বলতে চেয়েছিল। নকশাল আন্দোলন অনেক ব্যাপক, অনেক মহৎ আত্মত্যাগ আছে। হাংরি আন্দোলন সেরকম কিছু একটা নয়।


     

    সুমিতাভ : হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার কম-বেশি পঁচিশ বছর পর, আবার একটা ক্ষুৎকাতর আবহাওয়া, বিশেষত ছোটো পত্র-পত্রিকাগুলোয় চোখে পড়ছে। এরকমটা কেন হচ্ছে বলতে পারেন ?


     

    সুনীল : সেরকম কোনো আবহাওয়া আমার চোখে পড়ছে না। যা চোখে পড়ছে তা হলো হাংরিদের নিয়ে আবার লেখালিখি শুরু হয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকায় এদের কেস টেস ছাপা হচ্ছে, হিস্ট্রিটাও ছাপা হয়েছে। মলয় রায়চৌধুরীকে বহুদিন নীরবতার পর আবার লেখালিখি করতে দেখছি।


     

    সুমিতাভ : সেটা এতদিন পরে হঠাৎ কি কারণে ?


     

    সুনীল : আলাদা কোনো কারণ নেই। এটা নেহাতই কলকাতার ব্যাপার।


     

    সুমিতাভ : ধন্যবাদ। আমরা তাহলে উঠি…


     

    সুনীল : তবে এটা বলছি, আমার সঙ্গে হাংরিদের সম্পর্ক এই যে আমি তাদের কোনো পত্র-পত্রিকায় লিখিনি। তাদের সঙ্গে আমার কোনো মানসিক মিলও ছিল না। আন্দোলনেও অংশ নিইনি। তবে যখন মামলা হয়, তখন আমার কাছে মলয় রায়চৌধুরী এসেছিল, যেন আমি তার হয়ে সাক্ষ্য দিই। আমি তার পক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছি। আদালতে দাঁড়িয়ে আমি বলেছিলুম, মলয় রায়চৌধুরীর কোনো কবিতায় আমি কোনো অশ্লীলতা খুঁজে পাইনি। আদালতে এটাই আমার সাক্ষ্য ছিল।


     

    সুমিতাভ : সেটা আপনি স্নেহের বশে করেছিলেন, না নিজের বিশ্বাসে ?


     

    সুনীল : আমি পরে মলয়কে বাড়িতে বলেছিলাম, দেখ তোমার কোনো কবিতাকে যদিও আমি সার্থক কবিতা বলে মনে করি না, কিন্তু কেউ একটা কবিতার মধ্যে কিছু অশ্লীল শব্দ লিখেছে বলে তাকে আদালতে ডেকে নিয়ে গিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে, সেটাও আমি সমর্থনযোগ্য মনে করি না। সাহিত্যের জন্য শাস্তিদানের কোনো ঘটনা যদি ঘটে, তবে আমি সবসময় অভিযুক্তের পক্ষেই থাকব।

    ( সুমিতাভ ঘোষাল সম্পাদিত 'গদ্য-পদ্য সংবাদ' পত্রিকার অক্টোবর ১৯৮৬ সংখ্যায় প্রকাশিত )

  • মলয় রায়চৌধুরী | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৮:৫৪734840
  • লা ফাঁফারলো : শার্ল বদল্যার-এর উপন্যাস

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    স্যামুয়েল ক্র্যামার, যিনি প্রথম দিকে ম্যানুয়েলা দে মঁতেভেরদে বেনামে কয়েকটা রোমান্টিক বোকামি সই করেছিলেন -- রোমান্টিসিজমের সোনালি দিনগুলোয় -- তিনি ফ্যাকাশে এক জার্মান বাবা এবং ময়লা এক চিলে মায়ের পরস্পরবিরোধী ফসল। এই দ্বৈত শুরুর সঙ্গে যোগ করুন ফরাসি শিক্ষা আর সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট, আর আপনি অবাক হবেন -- কিংবা, হয়তো, পরিতুষ্ট ও মানসিকভাবে তৃপ্ত -- তাঁর চরিত্রের অদ্ভুত জটিলতার কথা শুনে। স্যামুয়েলের আছে বিশুদ্ধ, ভ্রূকোঁচকানো, কালোকফির ফোঁটার মতন চকচকে দুই চোখ, উদ্ধত ও অবজ্ঞাছাপ নাক, বেহায়া কামুক ঠোঁট, চৌকো স্বৈরাচারী থুতনি, আর রাফায়েলকে নকল-করা মাথাভর্তি চুল। --- লোকটা একইসঙ্গে ভীষণ অলস, করুণা-জাগানো উচ্চাকাঙ্খী, এবং খ্যাতি-পাওয়া অভাগা ; কেননা সারাজীবনে উনি আধখ্যাঁচড়া ধ্যানধারণা ছাড়া আর কিছুই বড়ো একটা ভাবতে পারেননি। কুঁড়েমির যে সূর্য ওনার চারিপাশে চোপোরদিন রোদ ছড়ায় তা ওনাকে ক্ষইয়ে দিয়েছিল, আর খেয়ে ফেলেছিল ওনাকে দেয়া স্বর্গের যৎসামান্য প্রতিভার খোরাক। প্যারিসের এই ভয়ঙ্কর জীবনে আমি যে সমস্ত আদ্দেক-বিশাল মানুষদের দেখেছি, স্যামুয়েল সেইসব জমঘটিয়া চালু চিজের চেয়ে বেশি-কিছু ছিলেন -- দুনিয়ার বাইরে একজন, খেয়ালি জীব, যাঁর কবিতা ওনার রচনার চেয়ে চেহারায় বেশি খোলতাই হতো, এমনই একজন যিনি, দুপুর একটা নাগাদ, তাপ পোয়াবার কয়লার আগুনের ঝলক আর ঘড়ির টিকটকের মাঝে, সব সময় মনে হতো যেন নপুংসকতার একজন দেবতা -- একজন আধুনিক, উভলৈঙ্গিক দেবতা --- নপুংসকতায় এমন বিশাল, এমন নিদারুণ যে তাঁকে মনে হতো মহাকাব্যিক !

    আমি কেমন করেই বা আপনাকে বোঝাই, এই ছায়া-লোকটাকে স্পষ্ট দেখতে সাহায্য করি, দমকা আলোয় আচমকা ডোরাকাটা -- একই সঙ্গে ঢিমেতালে আর উদ্যমী -- কঠিন পরিকল্পনায় ফলপ্রসূ আর পরিত্যক্তগুলোয় উপহাসাস্পদ ; একজন লোক যাঁর আপাত-আত্মবিরোধীতা প্রায়ই তাঁর সাদাসিধেভাবকে দখল করে নিতো, আর যাঁর কল্পনা তাঁর একাকীত্ব ও চরম কুঁড়েমির সমান ছিল বিশাল ? স্যামুয়েলের স্বাভাবিক ব্যারামের একটা ছিল তাঁদের সমান মনে করা যাঁদের তিনি শ্রদ্ধা করতেন ; কোনো ভালো বই বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়ার পর, ওনার অনৈচ্ছিক সিদ্ধান্ত হতো, “হ্যাঁ, এটা এতো ভালো যে আমিই লিখে ফেলতে পারতুম !” আর সেখান থেকে নির্ণয়ে পৌঁছোতেন, “সুতরাং এটা আমারই লেখা !” --কেবল একটা হাইফেনের দূরত্ব, এই যা।

    আধুনিক পৃথিবীতে, লোকে যা আঁচ করে তার চেয়ে এই ধরণের চরিত্রের সংখ্যা বেশি ; পথে, জনগণের পার্কে, পায়চারির রাস্তায়, আবাসনগুলোতে, আর কুঁড়েদের স্বর্গে এইরকম জীব গিজগিজ করছে। আর তারা এই ছাঁচের সঙ্গে এমন খাপ খেয়ে গেছে যে বিশ্বাস করে যে তারাই এটা আবিষ্কার করেছে।

    আজকে তাদের সবায়ের দিকে তাকিয়ে দেখুন, খেটেখুটে প্লোটিনাস বা পোরফিরির ( দুজনেই ছিলেন নিও-প্ল্যাটনিক দার্শনিক ) রহস্যময় কাগজে মানে খোঁজার চেষ্টা করছে ; কালকে ওরা নিজেদের জোলো আর ফরাসি চরিত্র সম্পর্কে অবাক হবে, যে বিষয়ে ছোটো ক্রেবিলঁ ( ইনি ছিলেন ঔপন্যাসিক যাঁর গোলমেলে চরিত্র প্লেটিনাস ও পেরিফিরির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল ) বেশ ভালোভাবে বর্ণনা করে গেছেন। কালকে ওরা জেরোম কারদানোর ( ইনি ছিলেন ইতালীয় বহুবিদ্যাবিশারদ যিনি গণিত, জ্যোতিষ, ওষধি সম্পর্কে বই লিখেছিলেন কিন্তু যিশু খ্রিস্টের জন্মছক লিখে বিপদে পড়েন ) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বার্তালাপে ব্যস্ত ছিল। আর এখন স্টার্ন-এর সঙ্গে তারা হাসাহাসি করছে, কিংবা র‌্যাবেলের সঙ্গে খানাপিনা আর বাগাড়ম্বরে হইচই করছে। আর এসবের মাঝে নিজেদের ভোলবদলে তারা এতো সন্তুষ্ট যে ভবিষ্যতে ওই সমস্ত প্রতিভাধরদের ছাপিয়ে গিয়ে কোন দৃষ্টিতে তাদের মাপা হবে তা নিয়ে চিন্তিত নয়। -- এক বোকা আর সন্মানজনক ধৃষ্টতা ! আর বেচারা স্যামুয়েল ছিলেন ঠিক তাই। জন্মসূত্রে বিশিষ্ট ভদ্রলোক, সময় কাটাবার ক্ষেত্রে এক ধরণের বজ্জাত -- মেজাজে অভিনেতা -- গোপনে নিজের খাতিরে তুলনাহীন ট্র্যাজেডি কিংবা, বলা যায়, ট্র্যাজিকমেডির খেলা খেলতেন। যদি আমোদ-প্রমোদ ওনার পাশ কাটিয়ে যেতো আর ওনাকে কাতুকুতু দিতো, তা উনি অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন, আর আমাদের ভদ্রলোক দিলখোলা হাসিও জোর করে হাসতেন। যদি কোনো স্মৃতি ওনার চোখে জলের ফোঁটা আনতো, উনি আয়নার সামনে গিয়ে নিজের কান্না দেখতেন। যদি কোনো তরুণী নিষ্ঠুর আর কমবয়সী ঈর্ষায় ওনাকে ছুঁচ বা ছুরি দিয়ে খোঁচাতো, স্যামুয়েল নিজের ছুরি বের করে জখমটাকে গর্বের জৌলুশ ঢুকিয়ে গভীর করে নিতেন, কিংবা যখন মনে পড়তো কারোর কাছে ওনার কুড়ি হাজার ফ্রাঁ দেনা রয়েছে, উনি আনন্দে চেঁচিয়ে উঠতেন, “কি যে এক দুঃখি, শোচনীয় ভাগ্য যে একজন প্রতিভাধরকে লক্ষ-লক্ষ ফ্রাঁ দেনার দায়ে বিরক্ত করা হচ্ছে !”

    কিন্তু তা সত্বেও, মনে করবেন না যে উনি সত্যকার অনুভব বোধ করার অযোগ্য ছিলেন, আর আবেগ শুধু ওনার চামড়ার ওপর হালকাভাবে ডানা ঝাপটাতো। উনি নির্দ্বিধায় অচেনা মানুষকে নিজের জামা খুলে দিয়ে দিতে পারতেন, যে মানুষটাকে উনি মুখ দেখে, আর হ্যাণ্ডশেক করার পর, কালকেই নির্ণয় নিয়েছেন যে লোকটা ওনার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের অন্যতম। মন আর আত্মার ক্ষেত্রে উনি জার্মানদের অলস প্রকৃতির চিন্তাশীলতা প্রদর্শন করতেন ; আবেগের ক্ষেত্রে, ওনার মায়ের তড়বড়ে আর টলমলে আকুলতা দেখা যেতো ; আর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ওনার ছিল ফরাসি লোকদেখানেপনার সব কয়টা অভ্যাস।

    দুশো বছর আগে মৃত কোনো লেখক বা শিল্পীকে নিয়ে বিতর্কে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিজেকে জখম করে নিতেন। আর এককালে উনি যেমন গভীর ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন, পরের দিকে হয়ে গেলেন গোঁড়া আস্তিক।

    যতোজন শিল্পীর কাজে উনি মনোনিবেশ করেছিলেন আর যতো বই পড়েছিলেন তাঁদের সবাই ওনার মধ্যে জড়ো করা আছে, আর তবু, এই মহান কর্মশক্তি সত্বেও, উনি ছিল চিরকেলে মৌলিক। উনি সদাসর্বদা ছিলেন অমায়িক, খেয়ালি, অলস, ভয়ঙ্কর, সন্ন্যাসী, অশিক্ষিত, অপরিচ্ছন্ন, ছিনাল স্যামুয়েল ক্র্যামার, রোমান্টিক ম্যানুয়েলা দে মঁতেভেরদে। একজন বন্ধুর প্রতি উনি যতোটা মোহাচ্ছন্ন হতেন, যতোটা একজন তরুণীর প্রতি, আর কোনো নারীকে ভালোবাসতে হলে কমরেড মনে করে ভালোবাসতেন। যাবতীয় সূক্ষ্ম অনুভূতির যুক্তি যেমন ওনার আয়ত্বে ছিল তেমনই নীচ প্রতারণার বিজ্ঞানও, অথচ তা সত্বেও কোনোটায় উনি সফল হতেন না কারণ যা সম্ভব নয় তাতে উনি বড়ো বেশি বিশ্বাস করতেন। ব্যাপারটা কি অবাক হবার মতো ? --- কেননা উনি যা অসম্ভব তার প্রক্রিয়ার কল্পনায় চব্বিশ ঘণ্টা সময় কাটাতেন।

    স্যামুয়েলের, এক সন্ধ্যায়, বাড়ির বাইরে বেরোবার খেয়াল হলো ; বাতাস বেশ মনের মতন ছিল আর সুগন্ধিত। মাত্রাধিক্যের প্রতি ওনার প্রকৃতিগত রুচির সঙ্গে তাল রেখে, স্বাতন্ত্র্য ও অপচয়ের রুটিন ছিল সমানভাবে জোরালো আর দীর্ঘ, আর বহুকাল হতে চলল বর্তমানে উনি নিজের ভাড়াকরা-বাসার প্রতি অনুগত থেকেছেন। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আলস্য, দোআঁশলা কুঁড়েমি ওনার শিরার ভেতর দিয়ে চলাচল করার দরুণ ঘরের ওলোটপালোট, ওনার পোশাক-আশাক আর ওনার বড্ডো নোংরা জটপড়া চুল ওনাকে বিরক্ত করে না। নিজেই জামাকাপড় কাচেন, চুল আঁচড়ান, দেখিয়ে দিতে পারেন কেমন করে কিছুক্ষণের মধ্যেই উনি পোশাকের ভেতরে আবার বসবাস করছেন আর সেই সব মানুষের আত্মবিশ্বাস যাদের জন্য সৌষ্ঠব হল প্রতিদিনকার ব্যাপার তা ওনার রয়েছে ; তারপর উনি জানালা খুললেন। ধুলোপড়া ঘরটাতে ফেটে পড়ল এক গরম, সোনালি দিন। বসন্তকাল হঠাৎ আগাম হদিশ ছাড়াই কয়েক দিনে এসে পড়ায় স্যামুয়েল অবাক হলেন। উষ্ণ মৃদু বাতাস, মিষ্টি সুবাসে গর্ভবতী, উনি শ্বাসে ভরে নিলেন -- আর একটা ঝটকা ওর মাথায় উঠে গেলো, পরমানন্দ আর কামনার উদ্রেক জাগিয়ে, আরেক অংশ বেমালুম চুয়ে পড়ল ওনার হৃদয়ে, পাকস্হলীতে, আর যকৃতে। নির্ণয় নিয়ে, দুটো মোমবাতিকে নেভালেন, যার একটার শিখা সুইডেনবোর্গ-এর ( সুইজারল্যাণ্ডের দার্শনিক ) বই ঘিরে কিছুক্ষণ কাঁপলো, আরেকটা শিখা সেই সব বইয়ের ওপরে কাঁপতে লাগলো যেগুলো পড়া কখনই কাজের নয়, যদি না কারোর সত্যকে জানবার সীমাতিরিক্ত রুচি থাকে।

    ওনার একাকীত্বের ঢিবি থেকে, ফালতু কাগজপত্রে ভারাক্রান্ত, পুরোনো বইয়ের ডাঁই আর ওনার দ্বিবাস্বপ্নে ছয়লাপ, স্যামুয়েল লক্ষ্য করেছেন কোনো এক বিশেষ আদরা আর চেহারা লুক্সেমবুর্গ বাগানের পথে পায়চারি করে, এমন একজনের মতন দেখতে যাঁকে উনি গ্রামে থাকার সময় ভালোবেসেছিলেন -- সেই বয়সে যখন একজন ভালোবাসাকে ভালোবাসে।

    যুবতীটির গঠন, বহুদিনের ব্যবহারে যৎসামান্য পূর্ণতাপ্রাপ্ত আর মোটা হয়ে গিয়ে থাকলেও, তখনও একজন শ্রদ্ধেয় নারীর পুরোদস্তুর শোভন মাধুর্য বজায় ছিল ; মহিলাটির চোখের গভীরে এখনও পাওয়া যাচ্ছিল সেই তরুণীর চোখের জলের উচ্ছ্বাস। মহিলাটি আসেন আর ফিরে যান, সব সময়ে এক উপযুক্ত মার্জিত চাকরানির সঙ্গে, যার চাউনি আর ধরনধারন দেখে যদিও মনে হয় সে চাকরানি নয়, সে একজন সঙ্গী। মহিলাটি ফাঁকা জায়গা খোঁজেন, আর বিধবার দুঃখি আদলে বসে থাকেন, অনেক সময়ে বিক্ষিপ্তচিত্ত হাতে একটা বই নিয়ে, যা উনি কখনও পড়তেন না।

    স্যামুয়েল ওনাকে লিয়ঁর ( বদল্যার বয়ঃসন্ধির সময়ে এই পাড়ায় থাকতেন ) পাড়ায় চিনতেন, তরুণী, সতর্ক, ক্রীড়াময়ী, আর রোগা। মহিলাটিকে খুঁটিয়ে দেখে, আর বলতে গেলে, যাতে চিনতে পারেন, উনি একের পর এক স্মৃতির ছাল ছাড়িয়ে মেয়েটির সম্পর্কে কল্পনায় যা বেঁচে আছে তাকে পুনরুদ্ধার করতে চাইলেন ; নিজের কাছে বর্ণনা করলেন, সবিস্তারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, যৌবনের সম্পূর্ণ উপন্যাস, যা এতোকাল জীবনের অন্যান্য কাজকারবারে আর আবেগের অলিগলিতে হারিয়ে গিয়েছিল।

    সেইদিন সন্ধ্যায়, উনি মহিলাটির সামনে নত হয়ে শুভেচ্ছা জানালেন, কিন্তু যথেষ্ট সতর্ক আর নির্বস্তুক ভঙ্গীতে। যেতে-যেতে, পেছন থেকে সংলাপের এই টুকরোগুলো শুনতে পেলেন :

    “মারিয়েত, ওই লোকটা সম্পর্কে তুমি কী ভাবো ?” কিন্তু এই কথাগুলো এমন আনমনা কন্ঠস্বরে বলা হয়েছিল যে সবচেয়ে বিদ্বেষপরায়ণ শ্রোতাও এতে এমন কিছু পাবে না যে মহিলাটিকে ভর্ৎসনা করা যায়।

    “লোকটাকে আমার খুবই ভালো লাগে, ম্যাডাম। ম্যাডাম কি জানেন ওনার নাম স্যামুয়েল ক্র্যামার ?”

    এবং বেশ বকুনি দেয়া কন্ঠস্বরে : “কেমন করে তুমি জানলে, মারিয়েত ?”

    এই কারণেই, পরের দিন, একটা বেঞ্চে পাওয়া মহিলাটির বই আর রুমাল বেশ যত্ন করে সামলে রাখলেন স্যামুয়েল, যা মহিলাটি হারাননি, কেননা তিনি রুটির টুকরো নিয়ে চড়ুইপাখিদের ঝগড়া কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, কিংবা হয়তো গুল্মঝোপের ভেতরে যে লতাপাতা তার সম্পর্কে ভাবছিলেন। অনেকসময়ে এরকম হয় যে দুটি আত্মার মাঝে কথাবার্তা শুরু হতে পারে, ভাগ্য যাদের একই স্তরে তুলে এনেছে, যদিও মহিলাটির শোনার ও জবাব দেবার ইচ্ছেতে স্যামুয়েল আদ্ভুত আনন্দে আলোড়িত হলেন।

    “আমার কি সেই সৌভাগ্য আছে, ম্যাডাম, যে আপনার স্মৃতির এক কোনায় আমি এখনও আছি ? কিংবা আমি এতোই বদলে গেছি যে আপনি আমার মধ্যে শৈশবের সেই বন্ধুকে চিনতে পারছেন না যার সঙ্গে আপনি চোর-পুলিশ আর স্কুল-পালানোর খেলা খেলতেন ?”

    “একজন মহিলা,” মহিলাটি অর্ধেক হাসি মাখিয়ে বললেন, “লোকজনকে চেনার অধিকারকে অতো তাড়াতাড়ি উপভোগ করে না ; তাই আপনাকে ধন্যবাদ, মসিয়ঁ, সেই আনন্দময় আর সুন্দর স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তোলার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য। তাছাড়া...প্রতি বছরের জীবনযাপনে কতো ঘটনা ঘটে, কতো ভাবনাচিন্তা উদয় হয়....আর আমার তো মনে হয় অনেক বছর কেটে গেছে তারপর ?”

    “অনেক বছর,” স্যামুয়েল বললেন, “যা আমার ক্ষেত্রে কখনও ধীরগতিতে, আবার কখনও তাযাতাড়ি বিদায় নিয়েছে, কিন্তু নিজের মতো করে তারা ছিল নিষ্ঠুর!”

    “কিন্তু তাদের কবিতা?” চোখের হাসি বজায় রেখে মহিলা বললেন।

    “চিরকাল, ম্যাডাম !” স্যামুয়েল জবাবে বললেন, হাসতে হাসতে। “কিন্তু আপনি কি পড়ছেন?”

    “ওয়ালটার স্কটের ( বদল্যারের আগের প্রজন্মে ওয়ালটার স্কটের ঐতিহাসিক উপন্যাস ফ্রান্সে জনপ্রিয় ছিল ) একটা উপন্যাস। ”

    “এবার আমি মাঝে-মাঝে আপনার ধারাবাহিকতা ভাঙার কারণ বুঝতে পারছি ! ওহ, বড়োই একঘেয়ে লেখক ! কবর খুঁড়ে ধুলো বের করার ধারাবিবরণীকার ! প্রাচীন ব্যাপারের টুকিটাকি বর্ণনার খুঁতখুঁতে মাল, যতো রকমের পুরোনো আর বাতিল জিনিশ হতে পারে তার ডাঁই --- অস্ত্রশস্ত্র, টেবিলের ওপরের বাসনকোসন, আসবাবপত্র, গথিক সরাইখানা, আর রোমাঞ্চকর দুর্গ, যেখানে প্রাণহীন ম্যানেকিনরা আঁটোসাঁটো পোশাক আর জমকালো কোট পরে ঘুরে বেড়ায়--- একঘেয়েমিতে ক্লান্ত আঠারো বছরের কুম্ভীলকও দশ বছর পরে আবার ছুঁয়ে দেখার কথা স্বপ্নেও ভাববে না ; ঢালহাতে বীরদের অসম্ভব মধ্যযুগীয় সহচর, আর বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রেমিক-প্রেমিকারা--- হৃদয়ের সত্য নেই, অনুভবের দর্শন নেই ! আমাদের উচ্চমানের ফরাসি ঔপন্যাসিকদের থেকে কতো আলাদা, যাঁদের রচনায় প্রাকৃতিক বস্তুর বর্ণনাতেও তাঁরা আবেগ আর নৈতিকতা দেখান ! কেই বা পরোয়া করে প্রাসাদের চাকরানি গলাবন্ধ পরে আছে নাকি উদিনোর নকশাকরা পেটিকোট, যতোক্ষণ তার কান্না আর রাষ্ট্রদ্রোহ বিশ্বাসযোগ্য ? কোমরে ছোরা গোঁজা প্রেমিক বেশি আগ্রহ জাগায় নাকি যে ভিজিটিঙ কার্ড রেখে গেছে, আর একজন স্বৈরাচারি লোক কালো কোট পরে কম কাব্যিক ভয় দেখায় নাকি যে চামড়া আর লোহার পোশাক পরে আছে সে ?”

    স্যামুয়েল, বুঝতেই পারছেন, সেই শ্রেনির মানুষ যাঁদের বলা হয় “গম্ভীর” -- আবেগহীন আর অসহ্য, এমন মানুষ যাদের কাজকর্ম তাদের কথাবার্তাকে নষ্ট করে দেয় ; এমন মানুষ যাদের কাছে প্রতিটি সুযোগ, প্রতিটি পরিচিতি, এমন কি পথের ধারে গাছের তলায় আরম্ভ হওয়া গল্পগুজব, একজন ছেঁড়াজামা লোকের সঙ্গেও, নিজেদের মতামত প্রকাশ করার সুবর্ণ সুযোগ পায়।

    ফেরিঅলা, পর্যটক শিল্পোদ্যগী, ফাটকা বাজারের সবজান্তা, আর “গম্ভীর” কবিদের পার্থক্য হল বিজ্ঞাপন আর উপদেশের ; শেষের লোকগুলোর দোষ একেবারে ফালতু।

    মহিলাটি সরলভাবে বললেন, “মসিয়ঁ স্যামুয়েল, আমি কেবল একজন সাধারণ পাঠিকা, মানে একজন হাবাগোবা। তাই আমি সহজেই সবকিছুতে আনন্দ পাই। বরং আপনার কথা আলোচনা করা যাক : আমাকে যদি আপনার কোনো বইয়ের যোগ্য পাঠিকা বলে মনে করেন তাহলে খুবই খুশি হবো। ”

    “কিন্তু, ম্যাডাম, কেমন করেই বা তা হবে…?” বড়ো বেশি আত্মম্ভরী কবি অবাক হয়ে উত্তর দিলেন।

    “যে লোকটা আমাকে পড়ার বই দেয় সে বলছিল যে সে আপনার নাম কখনও শোনেনি।” মহিলাটি মিষ্টি করে হাসলেন, মন্তব্যের খোঁচাকে নরম করার উদ্দেশে।

    “ম্যাডাম,” স্যামুয়েল নীতিগর্ভ জবাবে বললেন, “উনিশ শতকের সত্যকার জনগণ মহিলাদের দ্বারা সংগঠিত ; কুড়িজন অধ্যাপক আমাকে যে মহত্ব দিতে পারবেন না, আপনার অনুমোদনে আমি তা পাবো। ”

    “তাহলে মসিয়ঁ, আমি আপনার দেয়া কথার ওপর নির্ভর করছি। -- মারিয়েত, আমার ছাতা আর স্কার্ফ আনো ; ওঁরা বাড়িতে অপেক্ষা করছেন। আপনি হয়তো জানেন আমার স্বামী তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরেন। ”

    মহিলাটি সংক্ষিপ্ত মাধুর্যে প্রণত হলেন, তাতে কোনোরকম আপস-প্রবণতা দেখা গেল না, যদিও সে আচরণ ছিল যথোচিত সন্মানপূর্ণ।

    স্যামুয়েল অবাক হলেন না যে পুরোনো প্রেমিকা এখন দাম্পত্য বাঁধনের নিয়মে আটক। ভাবপ্রবণতার বিশ্বজনীন ইতিহাসে, এই ধরনের ব্যাপার জরুরি। মহিলাটির নাম এখন ম্যাডাম দে কোসমেলি, এবং ফাবোর্গ সঁ-জারমেইনের উঁচুদরের অভিজাত পাড়ায় তিনি থাকেন।

    পরের দিন, স্যামুয়েল মহিলাটিকে দেখতে পেলেন, ফুলগাছের চারাগুলোকে মধুর ভঙ্গীতে এবং প্রায় দুঃখি চেহারায় ঝুঁকে পরখ করছেন, আর নিজের ‘ওসপ্রেজ’ কাব্যগ্রন্হটি তাঁর দিকে এগিয়ে দিলেন, তা এমনই এক সনেট সংকলন যা আমরা সবাই লিখেছি আর পড়েছি, যে বয়সে আমাদের ধ্যানধারণা ছিল ছোট্ট আর মাথার চুল লম্বা।

    স্যামুয়েল জানতে আগ্রহী ছিলেন যে ওই ‘ওসপ্রেজগুলো’ দুঃখি সুন্দরীর আত্মাকে নাড়া দিয়েছে কিনা, আর এই সমস্ত বজ্জাত পাখিদের চেঁচামেচি তাঁর পক্ষে ওকালতি করেছিল কিনা ; কিন্তু কয়েক দিন পরে মহিলাটি তাঁকে রূঢ় সারল্য এবং সততায় বললেন : “মসিয়ঁ, আমি একজন নারীমাত্র, এবং তার দরুন আমার মতামতের গুরুত্ব যৎসামান্য ; কিন্তু মনে হয় লেখকদের দুঃখদুর্দশা আর প্রেমের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুঃখদুর্দশা আর প্রেমের মিল নেই। নিঃসন্দেহে, আপনি বেশ সুরুচিপূর্ণ প্রণয় নিয়ে লেখেন, যা নারীদের মনে হবে নিখুঁত চমৎকারিত্বপূর্ণ, এমনই চমৎকারীত্বপূর্ণ যে তাকে হয়তো ভয় পাওয়া উচিত। মায়েদের সৌন্দর্যের গান আপনি যে শৈলীতে গেয়েছেন তার ফলে আপনি তাদের মেয়েদের অনুমোদন থেকে বঞ্চিত হবেন। আপনি বলেছেন যে ম্যাডাম অমুকের সঙ্গে আপনি প্রেমে পাগল, যিনি কিনা, তাঁর সন্মান বজায় রাখার জন্যই বলছি, নিজের ছেলেমেয়ের মোজা আর দস্তানা রিপু করার তুলনায় আপনার বই পড়ায় কম সময় দেন। কিন্তু, এর ঠিক উলটো, এবং কোনো রহস্যময় কারণে, আমি বুঝে উঠতে পারছি না, আপনি আপনার আধ্যাত্মিক ধুপধুনো বজায় রাখেন অদ্ভুত প্রাণীদের জন্য, যারা সেই মহিলাদের চেয়েও কম পড়েন, আর আপনি প্ল্যাটনিক আহ্লাদে সেইসব অন্ধকার জগতের সুলতানাদের জন্য, যাদের উচিত ছিল, আমার মনে হয়, একজন কবির সংবেদী দৃষ্টির সামনে পড়ে গেলে, জঙ্গলে আগুনলাগার পর গরুরা যেমন জেগে উঠে চোখ মেলে দ্যাখে, তার চেয়ে বড়ো বড়ো চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকানো। আর তারপর আমি বুঝতে পারছি না কেন আপনি শবযাত্রার বিষয় এবং অঙ্গের গঠনতন্ত্রসংক্রান্ত বর্ণনায় দুর্বলতা দেখান। যখন কারোর বয়স কম আর তার রয়েছে, যেমন আপনার আছে, প্রকৃত কর্মগুণ এবং খুশি থাকার জন্য যাবতীয় প্রয়োজনীয় আয়োজন, আমার মনে হয় খুবই স্বাভাবিক হতো যদি আপনি আপনার মেধাকে অভিশাপে প্রয়োগ না করে আর ‘ওসপ্রেজ’-এর সঙ্গে কথা না বলে, স্বাস্হ্যের উৎসবপালন করতেন, আর মার্জিত ভদ্রলোকের আনন্দে থাকার কথা বলতেন। ”

    আর কেমন করেই বা স্যামুয়েল ক্র্যামার তার প্রতিক্রিয়া জানালেন ? “ম্যাডাম, অনুগ্রহ করুন, বা আমাদের অনুগ্রহ করুন, কেননা আমার মতো অনেক বেরাদর আছেন ; সবকিছুর প্রতি এবং নিজের সম্পর্কে ঘৃণা আমাদের এই পর্যায়ে এনেছে। তার কারণ আমরা সহজাত প্রক্রিয়ায় সম্ভ্রান্ত এবং সুন্দর হয়ে ওঠার জন্য যে হতাশায় ভুগি, আমাদের মুখে অদ্ভুত প্রলেপ মাখিয়ে রাখতে হয়। আমরা হৃদয়চর্চার জন্য নিজেদের প্রতি যে অধ্যাবসায় খরচ করেছি, তাদের কুৎসিত বাড়বৃদ্ধি ও আঁচিলকে অনুবীক্ষণের তলায় ফেলে যাচাই করতে হয়, যেগুলোকে আমরা নিজেরাই বাড়তে আর গজাতে দিয়েছি, ফলে অন্য মানুষের মতন কথা বলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা কেবল বাঁচার জন্যই বেঁচে থাকে, আর আমরা, হায়, আমরা বেঁচে থাকি জানবার জন্য। এখানেই আসল রহস্য। বয়স কেবল কন্ঠস্বরকে বদলায়, আর চুল ও দাঁতকে ধ্বংস করে ; আমরা পালটে দিয়েছি স্বাভাবিক বাচনভঙ্গী, আমরা এক এক করে উপড়ে ফেলেছি, শ্রদ্ধেয় মানুষের অন্তরে যে ছলাকলাহীন স্বল্পভাষিতার শূকরলোমের চাদর থাকে, তাকে। আমরা সেই উন্মাদ মানুষদের মতন মনের ভেতরে ঢুকে গেছি, যারা তাকে বোঝবার চেষ্টায় পাগলামিকে বাড়িয়ে তোলে। বছরগুলো কেবল রক্তমাংসের দেহকে দুর্বল করে, কিন্তু আমরা অনুভবের আকার বদলে দিয়েছি। অভিশাপগ্রস্ত, রুগ্ন বাবারা যাঁরা আমাদের প্যাংলা ডিগডিগে পেঁচোয়-পাওয়া করে তুলেছেন, আমরা এমনই নিয়তির মার খেয়েছি যে মরাবাচ্চা ছাড়া কিছুই প্রসব করি না!”

    “আবার সেই ‘ওসপ্রেজ!” বললেন মহিলা। এদিকে আসুন তো, আপনার বাহুটা আমায় ধরতে দিন, আর বসন্তঋতু বেচারা এই ফুলগুলোকে কেমন হাসিখুশি রেখেছে, তাদের সমাদর করা যাক!”

    ফুলগুলোক প্রশংসা করার বদলে, স্যামুয়েল ক্র্যামার, যাঁর মনের মধ্যে প্রবাদ আর বাক্য উপচে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, কয়েকটা বাজে পংক্তি, যা সুষ্ঠুভাবে লিখেছিলেন, তাদের গদ্যের মতন গুছিয়ে, অস্বীকার করা আরম্ভ করলেন। মহিলাটি স্যামুয়েলকে অবিরাম বকবক করতে দিলেন।

    “কতোই না পরিবর্তন -- আর স্মৃতি ছাড়া একই মানুষের কতোটুকুই বা অবশিষ্ট থাকে! কিন্তু কেবলমাত্র স্মৃতি নতুন ব্যথা নিয়ে আসে। সেইসব সুন্দর দিনগুলো, যখন এক সকাল নিজের সঙ্গে আমাদের হাঁটুর ব্যথা আনতো না, স্বপ্নের ভারে মন্হর কিংবা অনমনীয়, যখন প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আমাদের স্পষ্ট চোখে হাসি ফুটতো, যখন আমরা যুক্তি দিতুম না বরং স্রেফ বেঁচে থাকতুম আর হুল্লোড় করতুম ; যখন আমাদের দীর্ঘশ্বাস মৃদু, নিঃশব্দে আর গর্বহীনভাবে ছড়িয়ে পড়তো, তাদের কথা মনে করুন ! কতোবার যে আমি দেখেছি, আমার কল্পনায়, হেমন্তের সেই সব সুন্দর সন্ধ্যায়, যখন তরুণ হৃদয়গুলো নতুন গাছের মতন একইভাবে আচমকা বেড়ে ওঠে, প্রেমের বিদ্যুতে আক্রান্ত হয়ে ওপর দিকে গজিয়ে উঠতে থাকে। তখন আমি দেখি, আমি অনুভব করি, আমি শুনি ; বড়ো প্রজাপতিগুলোকে চাঁদ জাগিয়ে দেয় ; উষ্ণ বাতাস রাতের ফুলগুলোর পাপড়ি খুলে দেয় ; ঝর্ণায় জলেরা ঘুমিয়ে থাকে। আপোনার হৃদয়ে শুনতে পাবেন, দ্রুত, আচমকা রহস্যময় পিয়ানোর নৃত্যসঙ্গীত। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে ঝড়ের আনা সুগন্ধ ; ভিজে বাতাসে ভীত না হয়ে, এই সময়ে বাগান সেজে ওঠে লাল এবং শাদা পোশাকে। স্কার্টের ঝুলে অনুগত ঝোপগুলো কাঁটা আটকে দেয় ; এক ধরণের ঘুর্ণিবাতাসে বাদামি চুল স্বর্ণাভ চূর্ণকুন্তল মেলামেশা করে ! --- আপনার কি এখনও মনে আছে ম্যাডাম, বিশাল খড়ের গাদা, কতো সহজে পিছলে যেতো, বুড়ি নার্সের ধিমেতাল কাজ, আর আপনার কাকিমার নেকনজরে যে ঘড়ি বিরাট খাবার ঘরে সবাইকে তড়িঘড়ি ডেকে আনতো ?”

    ম্যাডাম দে কোসমেলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্যামুয়েলকে নিরস্ত করলেন, এবং মুখ খোলার জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন, বলাবাহুল্য লোকটাকে থামার অনুরোধ করার জন্য, কিন্তু উনি আবার বকবক আরম্ভ করে দিয়েছিলেন।

    “সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হল,” স্যামুয়েল বললেন, প্রতিটি প্রেমের অসুখি অবসান ঘটে, আর যতো দৈবভাবে ডানার উড়াল আরম্ভ হয় তার তুলনায় আরও অসুখি অবসান ঘটে। যতোই আদর্শমূলক হোক না কেন, কোনো স্বপ্ন নেই, যা স্তন আঁকড়ে থাকা লোভী বাচ্চায় শেষ হয় না ; লুকোবার জায়গা থাকে না, অমন স্বাদু আর অস্পষ্টতার জন্য কোনো আশ্রয় থাকে না, যেখান থেকে টেনে এনে কুঠার আক্রমণ করবে না। এটা তো কেবল বস্তুগত ধ্বংস ; আরেকরকম আছে, আরও মমতাহীন আর গোপন, যা অদৃশ্য ব্যাপারগুলোকে আক্রমণ করে। ভেবে দেখুন, যাকে আপনি বেছে নিয়েছেন তার ওপর ঘেঁষে হেলান দেবার মুহূর্তে, আর যখন আপনি তাঁকে বলেন, ‘চলো দুজনে উড়ে চলে যাই, আর আকাশের গভীরতার সন্ধান করি’--- এক অপ্রশম্য, গম্ভীর কন্ঠস্বর আপনার কানের কাছে ঝুঁকে বলে দেবে যে আমাদের আবেগ মিথ্যুকের, সুন্দর মুখশ্রী আমাদের দৃষ্টিক্ষীণতার সৃষ্টি, আর সুন্দর আত্মাগুলো আমাদের অজ্ঞানতার উৎপাদন, আর এমন একদিন নিশ্চয়ই আসবে যখন সেই প্রতিমা, যাকে এখন সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তা আদপে কেবল ঘৃণারই নয়, বরং অবজ্ঞা ও অভিঘাতের বিষয়বস্তু মনে হবে !”

    “আর বলবেন না, মসিয়ঁ,” বললেন ম্যাডাম দে কোসমেলি।

    মহিলাটি নিঃসন্দেহে প্রভাবিত হয়েছিলেন ; স্যামুয়েল টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর ছুরি পুরোনো আঘাতকে খুঁচিয়েছে, আর উনি বকবক চালিয়ে গেলেন, নির্দয়ভাবে।

    “ম্যাডাম,” উনি বললেন, স্মৃতির আঁটোসাঁটো দুর্দশায় মাধুর্য থাকে, আর দুঃখের মাদকতায় কেউ কেউ আরাম খুঁজে পান। --- এই বিষণ্ণ হুঁশিয়ারিতে, অনুগত আত্মাগুলো চিৎকার করে উঠবে : ‘হে ভগবান, আমার স্বপ্ন অক্ষত ও বিশুদ্ধ থাকতে আমাকে এই জায়গা থেকে তুলে নিন ; আমি আমার আবেগকে তার পুরো সরলতা-মাখিয়ে জগতসংসারকে দিয়ে যেতে চাই, আর আমার মাথার মুকুটের ফুলগুলোকে তাজা রাখতে চাই।’ কিন্তু মোহমুক্তির ফলাফল ভয়ঙ্কর। মৃত প্রেম থেকে জন্ম নেয় লাম্পট্য এবং কুৎসিত নপুংসকতা : আত্মার লাম্পট্য ও হৃদয়ের নপুংসকতা, যার একটি কৌতূহলে নির্ভর করে বাঁচে, এবং অন্যটি অবসাদে। আমরা সবাই কম-বেশি পর্যটকদের মতন যারা বহু দেশ ঘুরে বেড়িয়েছে ; তারা সূর্যকে দ্যাখে, যা একসময় তাদের চলার রাস্তায় সুন্দরভাবে সৌষ্ঠবের সোনালি রোদ বিছিয়ে দিয়েছিল, এখন সমতল দিগন্তে ডুবে গেছে। তারা অজানা জঞ্জালে ভরা নোংরা পাহাড়ের ওপর বসে, হাল ছেড়ে দিয়ে, আর বনগোলাপের ঝাড় থেকে ওঠা সুগন্ধকে বলে যে ফাঁকা আকাশে তারা অযথা উড়ে যাচ্ছে; কয়েকটা দুর্দশাগ্রস্ত বীজকে বলে, তারা এই শুকনো জমিতে ব্যর্থ অঙ্কুরিত হচ্ছে ; পাখিদের বলে, যে পাখিরা মনে করে তাদের বিবাহ কারোর আশীর্বাদপূত, তারা শীত ও ভয়ানক বাতাসে চাবকানো দেশে নীড় তৈরি করে ভুল করছে। তারা মরুভূমির পথে আবার চলা আরম্ভ করে, যা তারা জানে যে এইমাত্র যে পথ পেরিয়েছে ঠিক তার মতোই, যুক্তি নামের ফ্যাকাশে মায়াপুরুষ রক্ষীর সঙ্গে, যে তার উষর চলার পথে নিভু লন্ঠনের আলো দেখায়, আর যে, থেকে-থেকে যখন আবেগের তৃষ্ণা ফিরে আসে, মানসিক ক্লান্তি দিয়ে তেষ্টা মেটায়।”

    হঠাৎ স্যামুয়েল শুনতে পেলেন গভীর দীর্ঘশ্বাস আর ফোঁপানির শব্দ, যা লুকোনো সম্ভব হয়নি, আর উনি ম্যাডাম দে কোসমেলির দিকে ফিরে চাইলেন ; মহিলাটি শব্দ করে ফোঁপাচ্ছিলেন, আর চোখের জল লুকোবার মতন প্রতিরোধশক্তি ওনার ছিল না।

    স্যামুয়েল নিঃশব্দে কিছুক্ষণ ওনার দিকে তাকিয়ে রইলেন, আচরণে নম্রতা, তোষামোদ দেখিয়ে ; নির্দয়, ভণ্ড অভিনেতা মহিলার সুন্দর চোখের জল সম্পর্কে গর্ববোধ করছিলেন, দেখছলেন যেন তা ওনারই সৃষ্টি করা, ওনার সাহিত্যিক সম্পত্তি। এই দুঃখের প্রকৃত মর্মার্থ বুঝতে উনি ভুল করলেন, ঠিক যেমন ম্যাডাম দে কোসমেলি তাঁর প্রতি ওনার চাউনিকে ভুল বুঝলেন। এক মুহূর্তের জন্য ভুল-উপলব্ধির একক খেলা চলল, তারপর স্যামুয়েল ক্র্যামার ওনার হাত নিজের দুই হাতে ধরে রইলেন, যা মহিলাটি বিশ্বাস করে স্যামুয়েলের হাতে ছেড়ে দিলেন।

    “ম্যাডাম,” কিছুক্ষণ নিরবতার পর স্যামিয়েল আরম্ভ করলেন -- সেই ধ্রুপদী নিরবতা যা গভীর আবেগের নির্দেশক --- “সত্যকার জ্ঞানে আশার তুলনায় অভিশাপ কম থাকে। আশার দৈব উপহার ছাড়া, কেমন করেই বা আমরা মানসিক অবসাদের কুৎসিত মরুভূমি পার হবো যার কথা আমি একটু আগেই বললুম ? যে মায়াপুরুষ আমাদের সঙ্গে থাকে সে যুক্তিবোধের মায়াপুরুষ ; আশার পবিত্র জল ছিটিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেয়া যায়, তা হলো ধর্মশাস্ত্রের প্রথম অন্তর্নিহিত শক্তি।

    এমন এক মনোরম দার্শনিকতা আছে যা সবচেয়ে বাজে জিনিশ থেকেও আরাম আনতে পারে।

    অন্তর্নিহিত শক্তি যেমন পাপশূন্যতার চেয়ে বেশি মূল্যবান, এবং যেমন সুস্হ বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করার চেয়ে মরুভূমিতে বীজ বপন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনই সম্পর্কের মাধ্যমে উন্নত আত্মার নিজেকে আর প্রতিবেশীকে বিশুদ্ধ করে তোলা ভালো। আর যেমন ক্ষমার অযোগ্য বিশ্বাসঘাতকতা হয় না, তেমনই এমন কোনো ভুল নেই যা মাফ করা যায় না, এমন কোনো স্মৃতিভ্রংশ নেই যাকে অতিক্রম করা যায় না ; এ হল প্রতিবেশীকে ভালোবাসা আর তার ভালোবাসা পাওয়ার বিজ্ঞান, আর ভালোভাবে বেঁচে থাকার শিল্প। আত্মা যতো সূক্ষ্ম, ততো তা মৌলিক সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করতে পারে ; আত্মা যতো দরদী, এবং দৈবিক আশার সামনে নিজে খুলে ধরে, ততো সে অন্যের মাঝে খুঁজে পায় প্রেমের উদ্দেশ্য, তা যতোই ময়লা হোক না কেন ; এ হলো পরার্থবাদীতার কাজ, এবং একজনের তুলনায় আরেকজন পর্যটক অনেক বেশি দেখে থাকবে, উষর মরুভূমিতে যন্ত্রণাক্লান্ত আর পথভ্রান্তির ভ্রমে, আবার ফিরে পাবে তার বিশ্বাস আর ভালোবাসা যা সে হারিয়ে ফেলেছিল, এবার আরও তেজোময়তায় কেননা সে নিজের আর প্রেমিকের আবেগ পরিচালন-প্রণালীর শিক্ষক। ”

    ম্যাডাম দে কোসমেলির মুখ একটু পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল ; তাঁর দুঃখ এখন জলে ভেজা সূর্যের মতন আশায় ঝকমকে, আর স্যামুয়েল তখনও ওনার বক্তৃতা শেষ করেননি, ম্যাডাম শিশুর উৎসাহী ও সরল ব্যগ্রতায় বললেন।

    “তা কি প্রকৃতই সত্য, মসিয়ঁ, তা কি সম্ভব, যে প্রকৃতই শাখা-প্রশাখা আছে যা সহজে একজন হতাশ বেপরোয়া মহিলা আঁকড়ে ধরতে পারেন ?”

    “নিশ্চয়ই, ম্যাডাম।”

    “ওহ, আপনি আমাকে সবচেয়ে সুখি নারী করে তুলবেন যদি আমাকে উপযুক্ত মনে করে আপনার রেসিপি দেন !”

    “তা মোটেই সহজ নয়,” নির্দয়ভাবে স্যামুয়েলের জবাব ।

    ভাবপ্রবণতার এই বাড়বাড়ন্তের সূত্রে, প্রত্যাশার উদ্ভব হয়েছিল, আর তার ফলে দুজনের হাতকে মিলিয়েছিল, তা এমনই যে যৎকিঞ্চিত ইতস্তত করার আর শালীনতার ভান করার পর স্যামুয়েলের যখন মনে হলো ভালোভাবে তর্ক উপস্হাপন করতে পেরেছেন, ম্যাডাম দে কোসমেলি নিজের পক্ষের জ্ঞাপন এই ভাবে আরম্ভ করলেন :

    “আমি যতোটা জানি, মসিয়ঁ, ওই নিঃসঙ্গতায় এক কাব্যিক আত্মাকে যে যন্ত্রণাভোগ করতে হয়,

    এবং আপনার মতো উচ্চাকাঙ্খী হৃদয় কেমন করে নিজেকে একাকীত্বে খেয়ে ফেলছে বুঝতে পারি ; কিন্তু আপনার দুঃখযন্ত্রণা, যা কেবল আপনারই, তার উৎস, আপনার ভাষার জাঁকজমকের তলায়। আমি যেটুকু বুঝতে পেরেছি, তা অদ্ভুত, অতৃপ্ত, এবং প্রায় এমন প্রয়োজনের যা পাওয়া একেবারে দুষ্কর। আপনি যন্ত্রণাভোগ করেন, সত্য ; সম্ভবত আপনার যন্ত্রণাবোধ আপনার মহনীয়তার সৃষ্টি করে, আর তা আপনার কাছে তেমনভাবেই দরকার যেমন অন্য লোকেদের কাছে আনন্দ। --- এখন, একটু প্রসন্ন হয়ে শুনুন, আর যে মুশকিলগুলো সহজে বোঝা যায় তাদের সম্পর্কে সহমর্মীতা প্রকাশ করুন -- গেঁয়ো দুঃখদুর্দশা ? আমি আপনার কাছে পরামর্শ চাইছি, মসিয়ঁ ক্র্যামার, আপনার কাছে, একজন পণ্ডিত ব্যক্তি, বৌদ্ধিক জগতের মানুষ -- পরামর্শ এবং সম্ভবত এক বন্ধুর কাছে সাহায্য। আপনি জানেন সেইসব দিনগুলোয় যখন আপনি আমাকে চিনতেন তখন আমি ভালো মেয়ে ছিলুম, আপনার মতোই একটু স্বপ্নালু, কিন্তু ভীতু আর সম্পূর্ণ বাধ্য ; আপনার তুলনায় আমি আয়নায় নিজেকে কম দেখতুম, এবং আমার জন্য প্রতিবেশির বাগান থেকে বুক ফুলিয়ে চুরি করা আপনার দেয়া পিচ আর আঙুর পকেটে রাখতে বা খেতে ইতস্তত করতুম। আমি কখনও কোনো অভিলাষকে প্রকৃত স্বীকারযোগ্য ও সম্পূর্ণ মনে করতুম না যতোক্ষণ না তার অনুমতি আমাকে দেয়া হয়েছে, আর আপনার মতো একজন মার্জিত যুবককে আমি বাইরে বাগানের চেয়ে আমার বুড়ি কাকিমার সামনে জড়িয়ে ধরতে বেশি পছন্দ করতুম। বিবাহযোগ্য প্রতিটি যুবতীর জন্য যা জরুরি, মানে প্রণয়ের ভান এবং চোখের সামনে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা, আমার কাছে বেশ দেরি করে এসেছিল। যখন আমি পিয়ানোর সঙ্গে একটু গান গাইতে শিখলুম, আমাকে যথেষ্ট যত্ন নিয়ে পোশাক পরানো হতো, আর পিঠ সোজা রাখতে শেখানো হতো ; আমাকে জিমনাস্টিক্স শেখানো হতো, আর নিষেধ করা হতো যে ফুলগাছ পুঁতে বা পাখি পুষে আমি যেন হাত নোংরা না করি। আমাকে বাচ্চাদের গল্পলেখক বেরকঁ ছাড়া আর কাউকে পড়তে বারন করা হতো আর আমাকে ভালোভাবে সাজগোজ করিয়ে খারাপ অপেরা দেখতে নিয়ে যাওয়া হতো। যখন মসিয়ঁ দে কোসমেলি পল্লীভবনে এলেন, ওনার সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য আমার মনে তখনই গভীর অনুভূতির তীব্র সঞ্চার হয়েছিল ; ওনার কর্মশক্তিসম্পন্ন যৌবনের সঙ্গে আমার বুড়ি খিটখিটে কাকিমার তুলনা করে, তাঁর মধ্যে আমি পেলুম মর্যাদাসম্পন্ন সুন্দর বৈশিষ্ট্য, আর উনি আমাকে বেশ সন্মানজনক বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। তাছাড়া লোকেরা আরও আকর্ষক গুণাবলীর কথা বলল: এক ভীরু বন্ধুর বোনকে বাঁচাবার জন্য দ্বন্দ্বযুদ্ধে একটা হাত ভেঙে ফেলেছিলেন ; পুরোনো গরিব বন্ধুদের প্রচুর টাকাকড়ি ধার দিয়েছেন, আরও কে জানে কতো কি। নিজের চারিধারে উনি আদেশের আবহাওয়া গড়ে তুলতেন যা ছিল একই সঙ্গে অমায়িক আর অপ্রতিরোধ্য, সেই আবহ আমাকে দখল করে নিয়েছিল। পল্লীভবনে আসার আগে উনি কেমন জীবন যাপন করতেন ? আমার সঙ্গে শিকারে যাবার আগে বা আমার পিয়ানো বাজানোর সাথে নিজের তৈরি গান গাওয়ার আগে উনি কি অন্যান্য আনন্দের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন ; ওনার কি রক্ষিতা ছিল ? আমি সেসব কিছুই জানতুম না, এবং তা জানার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি ওনাকে ভালোবাসার জন্য মনস্হির করে নিয়েছিলুম, একটি মেয়ের তাবৎ বিশ্বাস নিয়ে, যার কখনও তুলনা করার সুযোগ হয়নি, আমি ওনাকে বিয়ে করলুম --- যা আমার কাকিমাকে সবচেয়ে বেশি পুলকিত করেছিল। যখন আমি ধর্মত ও আইনত ওনার স্ত্রী হলুম, আমি ওনাকে আরও বেশি ভালোবাসতে লাগলুম --- আমি ওনাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতুম, তা নিশ্চিত। আমি কি ভুল করেছিলুম, আমি কি সঠিক ছিলুম ? কেই বা বলতে পারে ? এই প্রেমে আমি বিভোর ছিলুম, আর ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে তার হদিশ না থাকার দরুন আমি ভুল ছিলুম। -- ওনাকে বিয়ে করার আগে কি ভালো করে জানতুম ? না, একেবারেই না ; কিন্তু আমার মনে হয় একটি সরল মেয়ে যে ধ্বংস-হওয়া নারীর অযোগ্য প্রেমিক বেছে নেবার বদলে, অবিচক্ষণ নির্ণয়ে বিয়ে করে ফ্যালে, তাকে দোষারোপ করা যায় না। একজন ও আরেকজন -- যে দুর্দশায় আমরা আক্রান্ত !--- আমরা দুজনেই অনুপদিষ্ট। এই অভাগী বলির প্রাণী, যাদের আমরা বলি বিবাহযোগ্যা মেয়ে, লজ্জা সম্পর্কে শিক্ষিত নয়, অর্থাৎ, পুরুষের অসচ্চরিত্রতা সম্পর্কে জ্ঞান তাদের নেই। আমার মনে হয় এই বেচারী মেয়েদের উচিত, বিয়ের বাঁধনে আটক পড়ার আগে, দুজন পুরুষের নিজেদের মধ্যে জীবন বিষয়ে কথাবার্তা লুকিয়ে শোনা, বিশেষ করে মেয়েদের নিয়ে। অমন ভয়াবহ পরীক্ষার পরে, তারা কম বিপজ্জনকভাবে নিজেদের বিয়ের সর্বনেশে ঝুঁকিতে সঁপে দিতে পারে, তাদের ভবিষ্যত স্বৈরাচারীর শক্তি ও দুর্বলতা তখন তারা জেনে ফেলেছে। ”

    স্যামুয়েল বুঝতে পারছিলেন না ঠিক কোন দিকে এই সুন্দরী বলির প্রাণী এগোচ্ছেন ; কিন্তু উনি আঁচ করতে পারছিলেন যে ম্যাডাম নিজের স্বামীর সম্পর্কে অনেক বেশি কথা ফাঁস করা আরম্ভ করেছেন, নিজেকে সত্যকার বিভ্রান্ত নারী প্রমাণ করার জন্য।

    কয়েক মিনিট চুপচাপ থাকার পর, মহিলা যেন সবচেয়ে অন্ধকারময় ঘটনাটি বলতে ভয় পাচ্ছেন, উনি আবার বলা আরম্ভ করলেন : “একদিন, মসিয়ঁ দে কোসমেলি প্যারিসে ফিরে যেতে চাইলেন ; আমার নাকি দীপ্তিমতি হবার অধিকার ছিল, আর আমি যে সৌষ্ঠবের পাত্রী, তার চৌহদ্দিতে লোকে আমাকে দেখুক। একজন সুন্দরী শিক্ষিতা মহিলা, আমার স্বামী বললেন, প্যারিসের সম্পত্তি। সমাজে নিজেকে কীভাবে তুলে ধরতে হয় তা জানা উচিত, আর তার প্রভার ছিটেছটা পড়া উচিত তার স্বামীর ওপরে। --- অভিজাত আত্মা ও সুস্বভাবের একজন মহিলার জীবনে একমাত্র গৌরব হল তার সঙ্গে বসবাসের সঙ্গীর অংশ হওয়া, স্বামীর কর্মদক্ষতার সহায়তা করা, এবং সর্বোপরি, তাকে সবাই ততোটাই সম্ভ্রম করুক যতোটা সে তার স্বামীকে সম্ভ্রমযোগ্য করে তোলে।

    ---নিঃসন্দেহে, আমার কাছে, তাঁর আদেশ মেনে, এটাই ওনাকে মহানন্দ দেবার সবচেয়ে সরল ও অমোঘ উপায় ছিল ; জানতে পারা যে আমার প্রয়াস ও আমার আনুগত্য ওনার দৃষ্টিতে আমাকে উচ্চতা দিচ্ছে, এই ভয়ঙ্কর প্যারিসের সঙ্গে এঁটে ওঠার জন্য আমার আর কোনোকিছু নির্ণয়ের দরকার ছিল না --- যে শহর সম্পর্কে আমি প্রবৃত্তিগতভাবে আশঙ্কিত ছিলুম--- যেন সেখানে আমার স্বপ্নের দিগন্তে ছিল অন্ধকারময়, ঝকমকে মায়াপুরুষ যা আমার বেচারা ছোটো প্রেমিকার হৃদয়কে কুঁকড়ে দিচ্ছিল।--- আর সেখানে, স্পষ্টত, সেটাই আমাদের যাত্রার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল। একজন স্বামীর আত্মম্ভরিতা তার প্রেমে-পড়া নারীর মধ্যে সততা সৃষ্টি করে। হয়তো উনি নিজেকে মিথ্যা স্তোক দিয়েছিলেন, সম্ভবত এক ধরনের সরল বিশ্বাসে, আর না বুঝেই নিজের বিবেককে ঠকিয়েছিলেন। --- প্যারিসে, নিকট বন্ধুদের জন্য কয়েকটা দিন নির্ধারিত ছিল, যাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে মসিয়ঁ দে কোসমেলি শেষে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, যেমন ক্লান্ত হয়ে পড়লেন নিজের স্ত্রীকে নিয়ে। বোধহয় উনি নিজের স্ত্রী সম্পর্কে বিরাগে আক্রান্ত হলেন, কেননা মেয়েটি তাঁকে অত্যধিক ভালোবাসতো ; যে কেউ তা দেখলেই টের পেতো। বন্ধুদের উনি অপছন্দ করা আরম্ভ করলেন সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে ; একঘেয়ে কথাবার্তার আনন্দ, যাতে আবেগের জায়গা ছিল না, তা ছাড়া তাদের কাছে দেবার মতো আর কিছুই ছিল না। শিগগিরই, তাঁর কাজকারবারের মুখ অন্যদিকে মোড় নিলো। বন্ধুদের পরে এলো ঘোড়া আর জুয়াখেলা। সমাজের দহরম-মহরম আর আলাপ-আলোচনা, যারা বাঁধন এড়িয়ে যেতে পেরেছে তাদের দেখে, আর যারা তাদের বুনো ব্যস্ত যৌবনের অগুন্তি গল্পগাছা ওনাকে শোনাতে লাগলো, ওনাকে তাপ পোয়াবার আগুন আর খবরের ফিরিস্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলো। উনি, সেই লোকটি, যাঁর হৃদয় ছাড়া আর কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক ঘটেনি, হয়ে উঠলেন ব্যাবসাপাতির মানুষ। বৈভবশালী এবং পেশাহীন, উনি এখন নিজের পুরো সময় সদাব্যস্ত ভিড়ের অসারতায় ভরে তুললেন। সেইসব পতিপত্নীসংক্রান্ত প্রশ্ন -- “কোথায় যাচ্ছো ?”--- “কখন ফিরবে ?”-- “তাড়াতাড়ি ফিরে এসো”-- সবই আমায় গিলে ফেলে গলায় আটকে নিতে হতো, কেননা এখন ইংরেজ জীবন -- হৃদয়ের মৃত্যু -- ক্লাব ও সঙ্গীমহল ওনাকে সম্পূর্ণ শুষে নিয়েছিল। সাজগোজ করার ও ফুলবাবুগিরি ফলাবার জন্য যে কষ্টকর প্রয়াস উনি করতেন তা প্রথমদিকে আমার মন খারাপ করেছিল ; স্বাভাবিক যে আমায় তুষ্ট করা লক্ষ্য ছিল না। আমিও তাই চেষ্টা করলুম আরও বেশি সুন্দরী হবার, একজন ছিনাল হবার, ওনার ছিনাল, যেমন উনি সবায়ের জন্য ছিলেন ; অতীতে, আমি তাঁকে সবকিছু দিতে চেয়েছিলুম, দিয়েছিলুম, আর এখন আমি চাইছিলুম তার জন্য উনি আমার কাছে অনুরোধ-উপরোধ করুন। আমি আমার মৃত আনন্দের ছাইকে জাগিয়ে তুলতে চাইছিলুম, তাদের জীবনে ফেরত আনার চেষ্টা করছিলুম ; কিন্তু আমি প্রকৃতপক্ষে ছলাকলায় দক্ষ নই এবং অসততায় একেবারে অনিপুণ, কেননা উনি আমার প্রয়াসকে লক্ষ্য করছেন বলে মনে হতো না।--- আমার কাকিমা, ঈর্ষান্বিত বুড়িদের মতন নির্দয় দর্শকের ভূমিকায় নেমে গিয়েছিলেন, যখন কিনা একসময় তাঁরা ছিলেন অভিনেত্রী, আর যে আনন্দ তাঁরা উপভোগ করতে পান না, তা জোর করে কল্পনা করে নেন, আমাকে জানাবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন, এক খুড়তুতো ভাইয়ের মাধ্যমে, যে আমার স্বামী নাটকের একজন ঠশকি অভিনেত্রীর জালে আটকা পড়েছেন। আমি প্রতিটি নাটক দেখা আরম্ভ করলুম, এবং মঞ্চে কোনও সামান্য সুন্দরী এলেও, তার মধ্যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখে কেঁপে উঠতুম। শেষ পর্যন্ত, সেই একই খুড়তুতো ভাইয়ের মাধ্যমে, আমি জানতে পারলুম, তার নাম সুন্দরী ফাঁফারলো, একজন নর্তকী, যাকে যতো সুন্দরী দেখতে, ততো সে গবেট। --- লেখক হিসাবে, আপনার নিশ্চয়ই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে থাকবে। -- আমি নিজের মুখশ্রী আর দেহ নিয়ে বেশি ভান করি না আর গর্ববোধও করি না ; কিন্তু আমি আপনাকে দিব্বি দিয়ে বলতে পারি, মসিয়ঁ ক্র্যামার, বহু রাত্রিতে তিনটে বা চারটের সময়ে সকালে, স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে অবক্ষয়িত, আমার চোখ না-ঘুমিয়ে আর কান্নায় লাল, আমার স্বামীর বিশ্বস্ততা ও কর্তব্যে ফিরে আসার জন্য প্রার্থনার পর, আমি ঈশ্বরকে জিগ্যেস করেছি, আর আমার বিবেক, আর আয়নায়, আমি কি এই বজ্জাত ফাঁফারলোর মতো সুন্দরী নই? আমার আয়না আর আমার বিবেক জবাবে বলেছে, “হ্যাঁ তুমি সুন্দরী”। নিজেকে গৌরবান্বিত করতে ঈশ্বর আমাকে নিষেধ করেছেন, কিন্তু একটা সঙ্গত বিজয়ের জন্য করেননি। কেন, তাহলে, দুই সমান সুন্দরীর মধ্যে, পুরুষরা সেই ফুলকে পছন্দ করে যাকে সবাই শুঁকেছে, অন্যজনকে বাদ দিয়ে, যে বিশ্বস্তভাবে বিয়ের বাগানের ব্যক্তিগত পথে অত্যন্ত গোপনে লুকিয়ে থেকেছে ? আর কেনই বা এই মহিলারা, যারা নিজের দেহকে সৌষ্ঠব করে তুলেছে--- যে দেহ-ঐশ্বর্যের চাবি কেবল একজন সুলতানের আয়ত্বে থাকা উচিত -- আমাদের চেয়ে বেশি ভক্তদের আকর্ষণ করে, আমরা যারা একটিমাত্র ভালোবাসার অসুখি শিকার ? কোন সে ঐন্দ্রজালিক চমৎকারিত্ব যার দ্বারা এই প্রাণীদের চারিপাশে অসচ্চরিত্রতা মহিমাচ্ছটা গড়ে তোলে? আর সততা, বিশেষ কয়েকজনকে কেন বিসদৃশ বিকর্ষণের পাত্রী করে তোলে ? আমাকে ব্যাখ্যা করে বোঝান, আপনি তো পেশার কারণে জীবনের যাবতীয় ঝোঁক আর তার বিভিন্ন কারণের কথা জানেন !”

    স্যামুয়েল জবাব দেবার সময় পেলেন না, কেননা মহিলা তাঁর বক্তব্যের আকুলতা বজায় রাখলেন:

    “মসিয়ঁ দে কোসমেলির বিবেকে কিছু গাম্ভীর্যপূর্ণ তর্ক আছে, যেমন ঈশ্বর যদি কোনো কমবয়সী ও বিশুদ্ধ মানুষের অধঃপতনের ব্যবস্হা করে থাকেন, তাহলে তা অন্য কাউকে আনন্দ দেবার জন্য। যদি মসিয়ঁ দে কোসমেলি আজ রাতেই মারা যান, তাহলে তাঁকে বহুবার ঈশ্বরের কাছে দয়াপ্রার্থনা করতে হবে ; তার কারণ তিনি, তাঁর নিজের দোষে, তাঁর স্ত্রীকে কুৎসিত অনুভূতি শিখিয়েছেন -- ঘৃণা, প্রণয়ীকে অবিশ্বাস, এবং প্রতিশোধের স্পৃহা। -- আহ, মসিয়ঁ ! আমি দুঃখে অনিদ্রায় অস্হির রাত কাটাই ; আমি প্রার্থনা করি, অভিশাপ দিই, ঈশ্বরনিন্দা করি। যাজক বলেন যে আমাদের উচিত আত্মসমর্পিত হয়ে ক্রস বহন করা ; কিন্তু প্রেম যখন উন্মাদনায় পর্যবসিত হয়েছে, তখন আত্মসমর্পণের প্রশ্ন ওঠে না, আর বিশ্বাস ভেঙে গেছে। গির্জায় আমার স্বীকৃতি শোনার যাজক নারী নন, এবং আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি, আমি ওনাকে ভালোবাসি, মসিয়ঁ, পায়ের তলায় পিষে দেয়া রক্ষিতার সমস্ত আবেগ আর সমস্ত দুর্দশা নিয়ে ভালোবাসি। এমন কিছু নেই যা আমি চেষ্টা করিনি। যে সাধারণ ভদ্র পোশাক পরলে উনি পছন্দ করতেন, তা ছেড়ে দিয়ে আমি নাটকের মেয়েদের মতন বিদকুটে আর ব্যয়বহুল সাজসজ্জা করেছি। এবং আমি, যে সাধ্বী স্ত্রীর সন্ধানে তাঁকে ভাঙাচোরা পল্লীভবনে যেতে হয়েছিল, সেই আমি বেশ্যার জামাকাপড়ে ওনার সামনে নিজেকে জাহির করেছি ; তখন আমি হৃদয়ে মৃত্যুকে অনুভব করেছি, তখন আমি নিজেকে করে তুলেছি চতুর আর প্রাণবন্ত। আমি আমার হতাশাকে সাজিয়ে তুলেছি ঝলমলে হাসিতে। কিন্তু হায়, উনি কখনও চেয়ে দেখেননি। মসিয়ঁ, আমি এমনকি ঠোঁট আর গালে রুজ মেখেছি ! -- আহ, বুঝতেই পারছেন, এটা এক গতানুগতিক কাহিনি, সব দুর্দশাগ্রস্তের মতন একই গল্প -- এক আঞ্চলিক উপন্যাস !”

    মহিলা যখন ফোঁপাচ্ছিলেন, স্যামুয়েলের তখনকার হাল, লুকোবার জায়গার খোঁজে তার্তুফের (মলিয়ের-এর নাটকে ধর্মীয় ভণ্ড ) মতন, যেন এই মহিলার সাধ্বী কান্না, যা তাঁর হৃদয় ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছিল, আর হতবুদ্ধিকর ভণ্ড কবির কলার ধরে টান মারতে চাইছিল। ম্যাডাম দে কোসমেলির বেপরোয়া ভাব, তাঁর স্বাধীনতা এবং তাঁর আস্হা স্যামুয়েলকে সাহস যোগালেও অবাক করেনি। স্যামুয়েল ক্র্যামার, যিনি প্রায়ই অন্য লোকেদের চমকে-দেয়া কথা বলেছেন, নিজে কখনও তেমন চমকে আক্রান্ত হননি। উনি দিদেরোর বাণীকে ব্যবহার করে তার সত্যতা প্রমাণ করতে চাইলেন : “বিশ্বাসহীনতা অনেক সময়ে মূর্খের কদভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়, এবং অল্পেই বিশ্বাসীরা বৌদ্ধিক জগতের মানুষ প্রতিপন্ন হয়। বুদ্ধিমান মানুষেরা সম্ভাব্যতার অপরিমেয়তাকে গভীরভাবে যাচাই করে। মূর্খেরা ভাবেই না যে ঠিক তার সামনে যা রয়েছে তা সম্ভব কিনা। বোধহয় এর দরুন তা একজনকে ভিতু করে তোলে আর অন্যজনকে গোঁয়ারগোবিন্দ। ”


     

    এতেই সবকিছুর ব্যাখ্যা মেলে। কয়েকজন খুঁতখুঁতে পাঠক, যাঁরা সত্যের প্রতি ভালোবাসাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন, নিঃসন্দেহে সমালোচনার জন্য এই কাহিনিতে অনেককিছু পাবেন, যখন কিনা আমার একমাত্র পরিশ্রম ছিল নামগুলো পালটে দেয়া আর বিশদকে আলোকিত করা ; কেমন করেই বা, তাঁরা বলবেন যে, স্যামুয়েল, একজন নিম্নশৈলীর কবি আর নীচ নৈতিকতার মানুষ, ম্যাডাম দে কোসমেলির পর্যায়ের এক নারীর সঙ্গে সুদক্ষ ব্যক্তির মতন কথাবার্তা বলতে পারে? ওয়ালটার স্কটের উপন্যাসের প্রসঙ্গ তুলে মহিলাটিকে রোমান্টিক ও ফালতু কবিতার তোড়ে ভাসিয়ে দিতে পারে ? এবং ম্যাডাম দে কোসমেলি, শোভন ও সাধ্বী স্ত্রী, কেমন করেই বা তিনি প্রতিদানে স্যামুয়েলকে, পরিমিতিবোধ এবং সন্দেহ ছাড়াই, নিজের গোপনতা আর দুর্দশার কথা অবিরাম শুনিয়ে যেতে পারেন ? এর জবাবে আমি বলব যে ম্যাডাম দে কোসমেলির সুন্দর সত্তাটি সারল্যের, এবং স্যামুয়েল হলো সাহসী প্রজাপতি, গ্রীষ্মকালের ছারপোকা আর কবিদের মতন; সে প্রতিটি আগুনে ঝাঁপায়, আর সব জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে। দিদেরোর বাণী থেকেই টের পাওয়া যায় কেন একজন ছিলেন অতো খোলামেলা, অন্যজন ততো রূঢ় ও ততো উদ্ধত। এ থেকে স্যামুয়েল জীবনে যে সাঙ্ঘাতিক ভুলগুলো করেছেন তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, একজন মূর্খ অমন অবিবেচকের মতন ভুল করতো না। জনগণের সেই অংশ, যদের সত্তা ভয় দিয়ে গড়া, তারা স্যামুয়েলের মতন চরিত্রকে বুঝতে পারবে না, যে লোকটা অপরিহার্যভাবে অল্পেই বিশ্বাসী আর কল্পনাবিলাসী ছিলেন, যতো দূর সম্ভব তিনি বিশ্বাস করতেন -- একজন কবি হয়ে, তার জনগণের মধ্যে -- আর মানুষরূপে, তার আবেগের সাহায্য নিয়ে বিশ্বাস করতেন।

    কিছুদিনের মধ্যেই স্যামুয়েল ভাবতে আরম্ব করেছিলেন যে এই মহিলাটি একজন শক্তিমতী, তাঁকে দেখতে যেমন তার চেয়ে বেশি গভীর, এবং এই মনখোলা কর্তব্যনিষ্ঠাকে সরাসরি আক্রমণ করা সঠিক কাজ হবে না। স্যামুয়েল নতুন করে নিজের রোমান্টিক বুকনি মহিলাটির সামনে ঝাড়া আরম্ভ করলেন। নিজের মূর্খতার জন্য লজ্জিত, এবার স্যামুয়েল ডেকাডেন্ট হবার নির্ণয় নিলেন; কিছুক্ষণ যাবত শিক্ষালয়ের যাজকের প্রাদেশিক ভাষায় নিজের গুপ্ত আঘাতের কথা বললেন, কিংবা আরও আঘাত সৃষ্টি করে, আরও বড়ো ঘা, ব্যথাহীনভাবে তাদের গরম লোহার সেঁক দিলেন। ভালমোঁ ( পিয়ের শোদেরলো দ্য লাকলোস-এর বইয়ের নারী-ফোসলানো চরিত্র ) কিংবা লাভলেস-এর ( স্যামুয়েল রিচার্ডসনের বইয়ের নারী ফোসলানে চরিত্র ) মতন পাকা ক্ষমতা যাঁদের নেই, যিনি সৎ নারীকে ফোসলাতে চান, যে নারী কোনোরকম সন্দেহ করছেন না, সেই লোকগুলোর হাস্যকর ও বেঢপ আচরণের সঙ্গে পরিচিত, যারা নিজেদের হৃদয় উপহার দেবার জন্য বলে, “দয়া করে এই অসম্ভব ব্যাপার গ্রহণ করুন।” স্যামুয়েল যে কতো মূর্খ ছিলেন তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন থেকে আমাকে এই ঘটনাটাই রেহাই দেবে। ম্যাডাম দে কোসমেলি, ভালোবাসার পাত্রী সেই এলমিরার ( তার্তুফের স্ত্রী )মতন সততার পরিচ্ছন্ন ও বিচক্ষণ দৃষ্টিতে, তখনই প্যাঁচ কষে নিলেন যে এই আনাড়ি নীচমনাটাকে নিজের আর স্বামীর সন্মান বাঁচাবার জন্য কেমন করে ব্যবহার করবেন। তিনি স্যামুয়েলের অস্ত্র দিয়ে তাকেই আঘাত করলেন; স্যামুয়েলকে তাঁর হাত ধরে চাপ দিতে দিলেন ; দুজনে মিলে বন্ধুত্বের আর প্ল্যাটনিক কথাবার্তা বললেন। তিনি “প্রতিশোধ” শব্দটি বিড়বিড় করে আওড়ালেন ; তিনি বললেন যে, মহিলাদের জীবনে যে দুর্দশাগ্রস্ত সংকট উৎপন্ন হয়, অনেকেই স্বেচ্ছায় তাদের হৃদয়ের অবশিষ্টাংশ প্রতিহিংসা-গ্রহণকারীকে দিয়ে দেবেন, হৃদয়ের সেই অংশ যা খলনায়ক ফেলে গেছে তা দিয়ে দেবেন -- সেইসঙ্গে অন্যান্য অসম্ভব কথাবার্তা এবং নাটুকে সংলাপ চালিয়ে গেলেন। সংক্ষেপে, তিনি নৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণয়ের ভান করলেন, আর আমাদের সৃজনীশক্তিচ্যুত যুবক, যিনি জ্ঞানীর তুলনায় হাবাগবা ছিলেন, ফাঁফারলোকে মসিয়ঁ দে কোসমেলির কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে তাঁকে ওই বারাঙ্গনা থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিলেন --- এই আশায় যে কাজটির দাবি অনুযায়ী পরিবর্তে সৎ মহিলাটির বাহুডোর পাবেন। --- কেবল কবিরাই এই ধরণের দানবিকতা আবিষ্কারের জন্য সরল হয়।

    এই হাস্যকর গল্পের বিশদ ব্যাপার হলো, যা চারটি চরিত্রের মাঝে অভিনীত নাটকের মাঝে ঢোকানো কৌতুককর ব্যাপারের মতন, তা হল স্যামুয়েলের সদ্যরচিত সনেট সংক্রান্ত ; কেননা, সনেটের ক্ষেত্রে, স্যামুয়েল ছিলেন সংশোধনাতীত : একটা ছিল ম্যাডাম দে কোসমেলির জন্য লেখা, যাতে স্যামুয়েল অতিন্দ্রিয়বাদী শৈলীতে তাঁর বিয়াত্রিচের মতন সৌন্দর্যের, তাঁর কন্ঠস্বরের, তাঁর চোখের স্বর্গীয় শুদ্ধতার, তাঁর আচরণের নম্রতার, ইত্যাদি গুণগান করে লিখেছিলেন, আরেকটা ছিল ফাঁফারলোর জন্য লেখা, যাঁকে স্যামুয়েল টুকরো-টুকরো মাংসে রাঁধা মশলাদার ছলনাময়ী হিসাবে ভেবেচিন্তে তুলে ধরলেন, যাতে বেতো রুগির টাকরাতেও রক্ত চলকে ওঠে, এমন এক কাব্যিক জনার যাতে উনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ, এবং যাতে উনি প্রথম থেকেই সম্ভাব্য আন্দালুসীয় উদ্ভটতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন। এবার, নর্তকীর ডেরায় পৌঁছোল প্রথম টুকরো-টাকরা, যিনি এই বাকতাল্লার সংগ্রহ চুরুটের ডিবেতে ফেলে দিলেন; দ্বিতীয়টা পৌঁছোলো বেচারি পরিত্যাক্তার কাছে, যিনি প্রথমে বড়ো-বড়ো চোখে পড়লেন, তারপর বুঝতে পারলেন আসলে ঠিক কী ঘটেছে, এবং তাঁর যাবতীয় দুঃখদুর্দশা সত্বেও দিলখোলা হাসি হাসতে বাধ্য হলেন, যেমন ভালো দিনগুলোয় হাসতেন।

    স্যামুয়েল নাট্যগৃহে গেলেন ফাঁফারলোকে মঞ্চে দেখার জন্য। নারীটিকে হালকা-চলন, চমৎকার, প্রাণশক্তিসম্পন্ন, সাজসজ্জায় অত্যন্ত রুচিশীল দেখে, তারিফ করলেন যে মসিয়ঁ দে কোসমেলি বেশ ভাগ্যবান, যিনি এইরকম একটি নমুনায় নিজেকে ধ্বংস করার সুযোগ পেয়েছেন।

    স্যামুয়েল নর্তকীর বাড়ি দু-বার গেলেন --- বাসার সিঁড়ির ধাপে মখমল বসানো, পর্দা ও জাজিমে সাজানো, শহরের নতুন গাছপালায় ছাওয়া এলাকা ; কিন্তু নিজের পরিচয় দেবার মতন কোনো উদ্দেশ্য খুঁজে পেলেন না। ভালোবাসার ঘোষণা ব্যর্থ হতে পারে, এমনকি বিপজ্জনক। যদি বিফল হয়, আরেকবার আসতে পারবেন না। আর তাছাড়া, স্যামুয়েল জানতে পারলেন মেয়েটি দর্শনার্থীদের আমল দেন না। কয়েকজন নিকটবন্ধু মাঝে-মাঝে তাঁর কাছে আসেন। এতো চমৎকারভাবে আশ্রিত ও রাখা, একজন নর্তকীর বাসায় গিয়ে স্যামুয়েল কীই বা বলবেন কিংবা করবেন, আর প্রেমিকের দ্বারা যিনি এমন উপাস্য ? কীই বা আনবেন ওনার জন্য, স্যামুয়েল দরজি নন, পোশাক নির্মাতা নন, ব্যালে-শিক্ষক নন, কোটিপতিও নন ? -- স্যামুয়েল তাই একটা সহজ ও অপরিণত পাঁয়তাড়া আঁটলেন : ফাঁফারলোকে ওনার কাছে আসতে হবে। সেই যুগে, আজকের তুলনায় তখনকার দিনে গুণগান বা নিন্দা করা সমালোচনামূলক প্রবন্ধের বেশ গুরুত্ব ছিল। সংবাদপত্রের “ক্ষমতা”, একজন নামকরা উকিল যেমন সম্প্রতি এক দুঃখজনক কুখ্যাত মামলার ( রক্ষিতা লোলা মন্তেজকে কেন্দ্র করে বুভালোঁঁ ও দুজারিয়ের দ্বন্দ্বযুদ্ধ যাতে দুজারিয়ে মারা যায় ) সময়ে বলেছেন, তখনকার দিনে এখনকার তুলনায় অনেক বেশি ছিল ; কয়েকজন বুদ্ধিমান মানুষ এককালে সাংবাদিকদের কাছে হার মেনেছিলেন, তাদের দুর্বিনীত মাথা-ঘোরানো কাজকারবারের কোনো সীমা ছিল না। স্যামুয়েল অতএব নেমে পড়লেন -- যিনি সঙ্গীতের একটা শব্দও জানতেন না -- গীতিময় নাটকের বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় নামলেন।

    তখন থেকে, এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রে ফাঁফারলোকে প্রতি সপ্তাহান্তে টুকরো-টুকরো করা হতে লাগলো। অবশ্য, আপনি বলতে পারেন না, কিংবা ইঙ্গিত করতে পারেন না, যে, ওনার পা, কনুই, বা হাঁটুর আকৃতি খারাপ ; মোজার ভেতরের পেশিগুলো পাকানো, তা লিখলে নাকের ডগায় চশমা ঝোলানো লোকেরা চেঁচিয়ে বলতো, এটা ঈশ্বরীনিন্দা ! তার বদলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলো যে তিনি অশিষ্ট, মামুলি, রুচিহীন, ব্যালে নাচে জার্মান আর স্পেনীয় কায়দা আমদানির চেষ্টা করেন ; স্পেনীয় করতাল, নালবসানো জুতো, জুতোয় উঁচু গোড়ালি -- এবং তিনি পদাতিক সেনার মতন মদ খান, তিনি ছোটো কুকুরদের আর চাকরের মেয়েকে খুব ভালোবাসেন -- এবং তাঁর ব্যক্তিজীবনের অন্যান্য নোংরা ঘটনা, যে ব্যাপারগুলো নিয়ে কয়েকটা ছোটো সংবাদপত্র প্রতিদিন চরে খায় আর পুষ্ট হয়। সাংবাদিকের পেশায় যা আজব কৌশল, যারা অসদৃশ ব্যাপারের তুলনা করতে ভালোবাসে, তাঁর সঙ্গে এক বায়বীয় নর্তকীর বৈষম্য দেখানো হলো যে সদাসর্বদা শাদা পোশাক পরে, এবং যার মার্জিত ভঙ্গীমা দর্শকদের বিবেককে কখনও তাড়িত করে না। অনেকসময়ে, যখন ফাঁফারলো বিশেষ করে কোনো কঠিন লাফ দিতে সফল হয়েছেন, তিনি চেঁচিয়ে উঠে সামনের সারির দর্শকদের দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে ওঠেন ; হাঁটার সময়েও নাচার সাহস প্রদর্শন করেন। তিনি কখনও তেমন রুচিহীন সুতির পোশাক পরেন না যার ফলে কোনো কিছু না দেখালেও আপনি সবকিছু দেখতে পাবেন।

    তিনি এমন বস্তু পছন্দ করেন যা কোনোরকম আওয়াজ সৃষ্টি করে, লম্বা স্কার্ট, মচমচে, ঝিলমিলে, টিনের গয়নায় সাজানো, যাকে স্বাস্হ্যবতী হাঁটুর সাহায্যে ওপরে তোলা যায়, আর ঘটিহাতা বক্ষবন্ধনী। তিনি নাচতেন, কানবালা পরে নয়, বরং বড়ো ঝুলন্ত দুল পরে যাকে আমি বলব প্রায় ঝাড়লন্ঠন। তিনি স্কার্টের সঙ্গে জেনেশুনে ঝুলিয়ে রাখতেন গোছাগোছা পুতুল, বুড়ি জিপসিদের মতন, যারা ভয়দেখানো কায়দায় আপনার ভবিষ্যত বলে দেবে, যাদের আপনি দুপুরবেলায় রোমান ধ্বংসাবশেষে পাবেন ; এই সমস্ত মজার ছোঁয়া, সংক্ষেপে, যা রোমান্টিক স্যামুয়েল, ফ্রান্সে অলক্ষিতে ঘুরে বেড়ানো শেষ রোমান্টিকদের একজন, আবেগ দিয়ে ভালোবাসতো। এতোই যে, ফাঁফারলোকে তিন মাস যাবত অবিরাম অপমান করে, উনি সারানোর অসাধ্য ব্যারামে, তাঁর প্রেমে পড়ে গেলেন, আর মেয়েটি তাঁর দিক থেকে জানতে চাইলেন এই দানবটা কোন লোক, যার হৃদয় পেতলের, এই বাচাল, এই বুভুক্ষু সত্তা যে তাঁকে তাঁর রাজকীয় প্রতিভার দাবি থেকে বঞ্চিত করার গোঁ ধরে আছে।

    আমাদের উচিত সুন্দরী ফাঁফারলোর সুবিচার করা, তাঁর দিক থেকে ব্যাপারটা ছিল কেবল কৌতূহলের, তার বেশি কিছু নয়। অমন একজন মানুষের মুখের মাঝখানে কি নাক আছে, আর বাদবাকি প্রাণীদের সঙ্গে কি তার কোনোরকম মিল আছে। তিনি যখন স্যামুয়েল ক্র্যামার সম্পর্কে যৎসামান্য তথ্য যোগাড় করতে পারলেন, যখন জানতে পারলেন যে লোকটা আর সবায়ের মতন মামুলি, সামান্য বোধ আর সামান্য গুণাবলীও আছে, তাঁর অস্পষ্টভাবে মনে হলো, এ ব্যাপারে তেমন রহস্যময় কিছু নেই, আর প্রতি সোমবারের এই ভয়ঙ্কর প্রবন্ধগুলো হয়তো সাপ্তাহিক ফুলের তোড়া, কিংবা কোনো নাছোড় আগ্রহীর ভিজিটিং কার্ড। এক রাতে স্যামুয়েল ওনার সঙ্গে সাজঘরে দেখা করলেন। দুটো পেল্লাই মোমবাতি আর তাপ পোয়াবার আগুন কাঁপা-কাঁপা আলো ফেলছিল খাসকামরায় চারিধারে ঝোলানো রঙচঙে পোশাকে।

    এই এলাকার রানি, মঞ্চ ছেড়ে যেতেই, সাধারণ নশ্বরের সাধারণ পোশাক পরে নিয়েছিলেন, পা মুড়ে বসেছিলেন চেয়ারে, তাঁর আদরযোগ্য পায়ে-পরা জুতোর ফিতে নির্লজ্জভাবে বাঁধছিলেন। ওনার দুই হাত, পুরু কিন্তু বলিষ্ঠ, জুতোর ফুটো দিয়ে মাকুর কর্মতৎপরতায় ফিতে পরাচ্ছিল, স্কার্টটা যে নামানো উচিত সে দিকে খেয়াল ছিল না। ওই পা, ইতিমধ্যে, স্যামুয়েলের জন্য, হয়ে উঠেছিল অনন্তকালীন আকাঙ্খার জিনিস। দীর্ঘ, রোগাটে, বলিষ্ঠ, শিরা-পাকানো, একসঙ্গে সবই, তাতে ছিল নিখুঁত সৌন্দর্য এবং লাম্পট্য আকর্ষণের সমৃদ্ধি। চওড়া জায়গাটায় লম্বালম্বি কাটলে, পা দিয়ে এক ধরণের ত্রিকোণ তৈরি হতে পারত, যার শীর্ষবিন্দু ছিল জঙ্ঘাস্হি, আর যার নরম গোলাকার পায়ের ডিম গড়ে তুলছিল উত্তল বনিয়াদ। একজন আসল পুরুষের পা বেশ শক্ত, এবং দেভেরিয়ার আঁকা নারীদের পা বড়োই কোমল। এই মনোরম ভঙ্গীতে, ফাঁফারলোর মাথা, পায়ের দিকে নামানো, প্রাচীন রোমের রাজ্যপালের মতন খোলা ঘাড়, দম্ভপূর্ণ ও শক্তিময়, যা ওনার কাঁধের হাড়ের খাঁজকে কল্পনা করতে দিচ্ছিল, শ্যামল অতিরিক্ত মাংসে ঢাকা। ওনার ভারি পর্যাপ্ত চুল, দুই দিক থেকে সামনে ঝুলে পড়ে বুকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল আর দৃষ্টিকে ঢেকে দিচ্ছিল, যার দরুন উনি বারবার তাদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছিলেন। মহিলাটি এবং তাঁর পোশাক মোড়া ছিল উদ্ধত ও মোহময় অধীরতায়, সেই বিরক্ত শিশুর মতন যার মনে হয় সবকিছু তাড়াতাড়ি হচ্ছে না, এক অধীরতা যা অবিরাম নতুন নতুন দৃষ্টিপথ তৈরি করছিল, রেখা ও রঙের নতুনতর প্রভাব আনছিল।

    স্যামুয়ে। শ্রদ্ধা জানিয়ে অপেক্ষা করলেন -- কিংবা শ্রদ্ধার ভান করে থামলেন, কেননা, এরকম এক শয়তান মানুষের, সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো কখন অভিনেতাটা তাকে দখল করে নেবে।

    “আহ, আপনি এসেছেন, মসিয়ঁ,”, উনি যা করছিলেন তা না থামিয়ে বললেন, যদিও কয়েক মিনিট আগে স্যামুয়েলের আসার কথা তাঁকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। “আমার মনে হয়, আপনি আমাকে কিছু জিগ্যেস করবেন ?”

    তাঁর বাক্যের শ্রদ্ধা-জাগানো ঔদ্ধত্য বেচারা স্যামুয়েলের হৃদয়ে সরাসরি প্রবেশ করল ; ম্যাডাম দে কোসমেলির সঙ্গে থাকলে স্যামুয়েল এক সপ্তাহ ধরে রোমান্টিক ম্যাগপাইয়ের মতন কিচিরমিচির করতে পারতেন : এখানে, নম্রকন্ঠে উত্তর দিলেন :

    “হ্যাঁ, ম্যাডাম।” আর স্যামুয়েলের চোখে জল এসে গেল।

    এটা দারুন সফলতা ; সুন্দরী ফাঁফারলো হাসলেন।

    “আপনাকে কোন পোকায় কামড়েছে, মসিয়ঁ, যে আপনি আমাকে অমন করে ছিঁড়ে ফেলছেন ? কী এক জঘন্য পেশা…..”

    “জঘন্যই তো, ম্যাডাম। তার কারণ আমি আপনাকে ভক্তি করি।”

    “সেটাই আমার মনে হয়েছিল,” ফাঁফারলো জবাব দিলেন। “কিন্তু আপনি একজন দানব, এগুলো ঘৃণ্য কৌশল। --- আমরা বেচারি মেয়েরা। ” যোগ করলেন উনি, হাসতে হাসতে। “ফ্লোরা, আমার ব্রেসলেট নিয়ে যাও। আপনার হাতটা দিন, আর আমার ঘোড়ার গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে চলুন, আর বলুন, আপনি কি মনে করেন আমি আজকে রাতে ভালো নেচেছিলুম ?”

    বাহুতে বাহু গলিয়ে দুজনে বাইরে বেরোলেন, দুই পুরোনো বন্ধুর মতন। স্যামুয়েল প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন, বা অন্তত ওনার মনে হলো ওনার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। -- উনি হয়তো বড়োই অদ্ভুত, কিন্তু এখন উনি নিঃসন্দেহে হাসির খোরাক নন। আনন্দে ডগমগ, ম্যাডাম দে কমেলিকে নিজের সফলতার কথা বলতে উনি ভুলে গেলেন, ভুলে গেলেন একা বসে থাকা ওনার ছোট্ট ঘরে একটু আশার কথা পাঠাতে।

    কয়েকদিন পরে, ফাঁফারলো তাঁর জন্য উৎসাহীদের ব্যবস্হা করা এক প্রশস্ত মঞ্চে কলোম্বাইনের ভূমিকায় ( কমেদিয়া দেল আর্তের নায়িকা ) নাচলেন। বহু মনোরম রূপে তিনি আবির্ভূত হলেন, কলোম্বাইন থেকে মার্গারিতে ( ফাউস্ত ) থেকে এলভিরা ( মোৎসার্ট ) থেকে জেফিরাইন ( লোকসঙ্গীত ) অনায়াসে কয়েক প্রজন্মের চরিত্র বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সাহিত্য থেকে তুলে নিয়ে নিজস্বতা দিলেন। একজন খ্যাতিমান সঙ্গীতকার অসাধারণ সুর দিতে রাজি হয়েছিলেন যাতে বিষয়বস্তুর নতুনত্বের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায়। ফাঁফারলো বদলে-বদলে কখনও শ্রদ্ধেয়া, কখনও ভুতশিশু, কখনও বা খেলায় মগ্ন নারী। ওনার শিল্পে উনি ছিলেন মার্জিত, অভিনয় করছিলেন পা ব্যবহার করে আর নাচছিলেন চোখ দিয়ে।

    প্রসঙ্গক্রমে, আমরা উল্লেখ করতে পারি যে আজকাল নৃত্যশিল্পকে বড়োই অবজ্ঞা করা হয়। মহান সংস্কৃতিগুলো, প্রাচীনকাল থেকে আরম্ভ করে এবং ভারতবর্ষ ও আরবদেশকে অন্তর্ভূক্ত করে, একে কবিতার সমান চর্চা করেছে। কোনো-কোনো পৌত্তলিক গোষ্ঠীর কাছে সঙ্গীতের চেয়ে নৃত্য ততোটাই উন্নত যতোটা দৃশ্যমান ও তৈরি-করা জগত, অদৃশ্য ও না-বানানো জগতের তুলনায় উন্নত।--- এটা কেবল তাদের কাছেই স্পষ্ট হয় যারা বুঝতে পারে যে ছবি আঁকায় ভাবকল্পনা যোগায় সঙ্গীত। --- সঙ্গীতের যাবতীয় রহস্যকে মেলে ধরতে পারে নৃত্য, এবং অতিরিক্ত গুণ হলো যে এটা মানবিক ও স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান। নৃত্য হলো বাহু ও পা-যুক্ত কবিতা; -- তা উপাদান --- শুভ, অপরিসীম, প্রাণচঞ্চল --- চলিষ্ণুতার দ্বারা অলঙ্কৃত। -- দক্ষিণ ফ্রান্সের ধ্রুপদি নৃত্যসঙ্গীতের মানসপ্রতিমা হলেন তেরপিসকোর ; আমার অনুমান, তিনি ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গী, এবং তাঁর পা দুটি গমের সোনালি ক্ষেতে প্রায়ই নৃত্য করত ; তাঁর দেহভঙ্গীমা, নিখুঁত মূর্ছনার প্রতিরূপ, ভাস্কর্যের দৈবী উপাদানের যোগান দিতো। কিন্তু ক্যাথলিক ফাঁফারলো, যিনি তেরপিসকোরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে সন্তুষ্ট নন, শিল্পের আধুনিক দৈবতার সাহায্য নিলেন। পরীদের দেহকাঠামোর সঙ্গে কুয়াশার মিশেল ঘটল এবং জলপরীরা কম বাষ্পীয় ও কম উদাসীন হয়ে উঠলো। তিনি একইসঙ্গে ছিলেন শেক্সপিয়ারিয় খামখেয়াল ও ইতালীয় বিদূষকের তৈরি নারী।

    কবি আনন্দবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন ; ওনার মনে হচ্ছিল নিজের সামনে প্রথম যৌবনের স্বপ্নগুলো দেখতে পাচ্ছেন। স্যামুয়েল হয়তো ওনার সাজঘরের চারিপাশে বোকার মতন তিড়িংনাচ লাফাতে পারতেন, এমনকি যে উন্মাদ মাদকতা ওনার ওপর চেপে বসেছিল, আত্মহারা হয়ে কোনো জিনিসে মাথা ঠুকে ফাটিয়ে ফেলতে পারতেন।

    একটা ছোটো আর ভালোভাবে বন্ধ ঘোড়ার গাড়ি কবি আর নর্তকীকে দ্রুত সেই ছোটো বাসায় নিয়ে গেল যার বর্ণনা আমি আগে দিয়েছি।

    আমাদের ভদ্রলোক নর্তকীর পায়ে আর হাতে জ্বরগ্রস্ত নিঃশব্দ চুমু খেয়ে তার প্রশংসা করলেন।--- আর ফাঁফারলোও মুগ্ধ হয়েছিলেন বৈকি, কেবল ওনার আকর্ষণের ক্ষমতার জন্য নয়, বরং এর আগে উনি কখনও এমন অদ্ভুত পুরুষকে দেখেননি, পরিচিত হননি এমন বৈদ্যুতিক কামের আবেগের সঙ্গে।

    রাত ছিল গোরস্তানের মতন কালো, আর মেঘের দলকে বাতাস এমন দোলাচ্ছিল, তাদের থেকে ঝেড়ে ফেলতে লাগলো শিলা আর বৃষ্টির স্রোত । ঝোড়ো হাওয়া চিলেকোঠাকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল আর চূড়া থেকে ভেসে আসছিল গোঙানি। নর্দমা, যা কিনা গতকালের প্রেমপত্র আর হুল্লোড়ময় শবের বিছানা, নিজের সঙ্গে হাজার গোপনতা ভাসিয়ে নিয়ে গেল পয়ঃপ্রণালীর দিকে ; হাসপাতালগুলোয় পরমানন্দে পড়তে লাগলো মরণশীলতা, এবং সেইন্ট জাক রাস্তায় চ্যাটারটন ও স্যাভেজরা ( আঠারো দশকের দুজন দুস্হ ফরাসি কবি ) লেখার টেবিলের ওপরে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া তাদের আঙুল শক্ত মুঠোয় ধরে থাকলেন--- যখন আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে কৃত্রিম, সবচেয়ে অহংকারী, সবচেয়ে কামুক, সবচেয়ে অর্থগৃধ্নূ আর চালাক লোকটা বিরাট খাবার টেবিলে রাতের ভোজের জন্য হাজির হলেন, সঙ্গে অতীব সুন্দরী নারী যাঁকে প্রকৃতি চোখের আনন্দের জন্যে কখনও গড়েছিল। স্যামুয়েল জানলা খুলে অভিশপ্ত শহরের দিকে ওনার বিজয়ী চোখ বোলাতে চাইছিলেন ; তখনই, চাউনি নামিয়ে ওনার সামনের বিভিন্ন উপভোগ্যের দিকে দৃষ্টি পড়তে, দ্রুত এগিয়ে গেলেন ভোজ্যবস্তুর দিকে।

    এই ধরণের জিনিসপত্রের মাঝে, স্বাভাবিকভাবে ওনার বাকপটু হয়ে ওঠার কথা ; এবং ফাঁফারলোর তাঁকে মনে হলো প্রায় সৌম্যকান্তি, মাথার ওপরে চুলের জংলি জট আর মূল্যনির্ধারকের নাক সত্বেও।

    খাবার সম্পর্কে স্যামুয়েল আর ফাঁফারলোর মতামত মিলে গেল এবং এলিট প্রাণীদের জন্য জরুরি পুষ্টিকর প্রণালী সম্পর্কেও মতের মিল হলো। মোহিনীর খাদ্য তালিকা থেকে বর্জিত ছিল সাদাসিধে মাংস আর স্বাদহীন মাছ। শ্যাম্পেন সাধারণত তাঁর টেবিলকে অপমান করতো না। সুন্দর ফুলের তোড়ার পাশে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ বোরদৌ সেলাম করতো বার্গ্যাণ্ডির নামিদামি সারিকে, ওভের্ন, আঁজু এবং দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে ওয়াইন, আর জার্মানি, গ্রিস, স্পেন থেকে বিদেশি ওয়াইন। স্যামুয়েলের বলার অভ্যাস ছিল যে এক গেলাস খাঁটি ওয়াইনকে একগোছা কালো আঙুরের মতন দেখতে হওয়া উচিত, আর তা যেমন খাওয়া দরকার তেমনই পান করা দরকার। --- ফাঁফারলো চাইতেন মাংস রাঁধা হোক রক্তমাখা আর ওয়াইন হবে কার্যকর। কিন্তু তা সত্বেও, উনি কখনও মাতাল হতেন না। ---দুজনেই কন্দক ছাতাফলের ( ট্রাফল ) আন্তরিক ও নিগূঢ় প্রশংসার ভান করলেন। কন্দক ছাতাফল, যা পৃথিবীর দেবী সিবেল-এর গুপ্ত ও রহস্যময় উদ্ভিদ, সেই স্বাদু অসুখ, যা দেবী তাঁর নাড়িতে সবচেয়ে দামি ধাতুর চেয়ে বেশি দিন লুকিয়ে রাখেন, সেই সূক্ষ্মবস্তু যা কৃষিবিদদের জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে, ঠিক যেমন সোনা করেছিল অপরাসায়নিক প্যারাসেলসাসকে, কন্দক ছাতাফল প্রাচীন ও আধুনিক জগতের মাঝে তফাত তৈরি করেছে, যা এক গেলাস চিওস পান করার পর, একটি সংখ্যার পর অজস্র শূন্যের মতন প্রভাব গড়ে তোলে।

    সস, রান্নার মশলা, এবং গন্ধমাখানো খাবার সম্পর্কে যদি বলতে হয়, তা হবে এক গুরুগম্ভীর প্রশ্ন যার জন্য বিজ্ঞানের পত্রিকার মতন একটা পুরো অধ্যায় দরকার পড়বে, তবে আপনাদের আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে সেগুলো ছিল সামঞ্জস্যে যথাযথ, আর সর্বোপরি প্রকৃতির ঔষধালয়কে রান্নার কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তায় ব্যবহৃত। আদা-পেঁয়াজ-রসুন, ইংল্যাণ্ডের গুঁড়োমশলা, জাফরান, উপনিবেশের রান্নার জিনিস, খাবারের ওপরে ছড়ানো অদ্ভুত গুঁড়ো, সবকিছুই ওনাদের মনের মতন মনে হলো, তার সঙ্গে উল্লেখ করতে হয় কস্তুরি আর ধুপের সুগন্ধ। ক্লিওপেট্রা যদি বেঁচে ফিরে আসতেন, আমি নিশ্চিত যে তিনি তাঁর গোমাংস আর মৃগমাংসের ফিলেকে আরবের সুগন্ধে ভিজিয়ে নিতেন। নিঃসন্দেহে, বিষয়টা নিন্দার যে আজকালকার সবচেয়ে ভালো রাঁধুনিরাও বিশেষ ও ইন্দ্রিয়সুখের জন্য তৈরি আইনে তেমন রাঁধতে বাধ্য নন, যাতে তাঁরা তাঁদের রান্নার জিনিসের রাসায়নিক গুণাগুণ বুঝতে পারেন, আর জানেন না কেমন করে আবিষ্কার করতে হয়, প্রেমিককে খাওয়াবার উৎসবের মতন গুরুত্বপূর্ণ অবস্হায়, সেই সব রান্না-সম্পর্কিত উপাদান যা দেহকে উদ্দীপ্ত করে এবং তাড়াতাড়ি জৈব-প্রণালীতে পৌঁছে যায়, বিষের মতন, ইথারের মতন বায়বীয়। একটা কৌতূহলের ব্যাপার, কেমন করে ভালোভাবে থাকা যায় সে-বিষয়ে তাঁদের মতের মিল, দুজনের একই রকমের পছন্দ পরস্পরকে কাছে নিয়ে এলো ; ইন্দ্রিয়চেতনার গভীর বোধ, স্যামুয়েলের প্রতিটি চাউনি ও প্রতিটি শব্দে আলোকিত হচ্ছিল, তীব্র প্রভাব ফেললো ফাঁফারলোর ওপর। স্যামুয়েলের কথাগুলো, অনেকসময়ে রূঢ় ও পরিসাংখ্যিক, কখনও বা ফুলের বা শ্যাশের মতন সুগন্ধিত ও কমনীয়, কথাবার্তার এই অদ্ভুত প্রবাহ, যার গোপনীয়তা কেবল স্যামুয়েলই জানতেন, এই চমৎকার নারীর শুভ অনুগ্রহে শেষ হলো। সেই সঙ্গে, তীব্র ও গভীর সন্তুষ্টির বোধ বাদ দিয়ে নয়, যা স্যামুয়েল ঠাহর করতে পারলেন, মহিলাটির শোবার ঘর খুঁটিয়ে দেখার পর, ঘরের সাজসজ্জা আর পর্দায় পাওয়া গেল পছন্দ ও সংবেদনের নিখুঁত মিলন।

    স্যামুয়েল একেবারে পছন্দ করতেন না --- আর আমার মতে তিনি এই ব্যাপারে সঙ্গত, বাসার অন্দরমহলের স্হাপত্যে আমদানি-করা ছুঁচোলো সমকৌণিক নকশা। পুরোনো দুর্গের বিশাল ঘরগুলো আমার ভীতিসঞ্চার করে, আর আমি সেখানকার নিবাসীদের জন্যে দুঃখ পাই, গোরস্তানের মতন শোবার ঘরে প্রেম করতে বাধ্য হয় তারা, ওই প্রকাণ্ড শববহনের কফিনের ওপরে যাকে ওরা বলে বিছানা, কিংবা পেল্লাই মনুমেন্টের ওপরে, যার ছদ্মনাম চেয়ার। পম্পেইয়ের ব্যক্তিগত ঘরগুলো ছিল একহাত মাপের ; মালাবার সমুদ্রতীরের ভারতীয় ধ্বংসাবশেষও তেমন ব্যবস্হার কথা বলে। সেই ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং জ্ঞানী লোকেরা ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন। একটা অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গাতেই আন্তরিক অনুভূতিগুলো গভীরতা পায়।

    ফাঁফারলোর শোবার ঘরও বেশ ছোটো ছিল, নিচু ছাদ, নরম জিনিসপত্রে ঠাশা, যা ছিল সুগন্ধিত এবং ছোঁয়া বিপজ্জনক ; ঘরের আবহতে খেলছিল সেই অদ্ভুত সুবাস যা যে-কাউকে একটু-একটু করে মরতে ইচ্ছুক করে তুলবে, যেন সে কাচের চাষঘরে রয়েছে। বেগুনি অথচ একাধিক রঙে রঙিন লেসবসানো আর কাপড়ের তালের ওপরে খেলা করছিল আলোর বাতি। দেয়ালে, এখানে-সেখানে, পেইনটিঙে আলো ফেলে তা সৃষ্টি করছিল স্পেনীয় রোমাঞ্চকর নাটক : বড়ো বেশি কালো পটভূমিতে বড়ো বেশি শাদা মাংস। আর তাই এই আনন্দবিহ্বল বাসার গভীরতা থেকে, যা যুগপৎ অসৎ জায়গা ও পবিত্র আশ্রয়, স্যামুয়েল দেখলেন যে হৃদয়ের নতুন ঈশ্বরী এগিয়ে আসছেন ওনার দিকে, নারীর নগ্নতার সমগ্র ঔজ্বল্য ও পবিত্র উৎকর্ষ নিয়ে।

    কোথায় এমন পুরুষ আছে যে তার পার্থিব দিনগুলোর অর্ধেক দামে, নিজের স্বপ্নে, প্রকৃত স্বপ্নে, দেখতে চাইবে না, তার সামনে অবগুন্ঠনহীন দাঁড়িয়ে, তার কল্পনায় লালিত খেয়ালে, সাধারণের নোংরা দৃষ্টি থেকে সুরক্ষিত রাখার পোশাকের স্তরগুলো, একের পর এক পড়ে যাচ্ছে ?

    আর তবু, দেখুন, এখানে স্যামুয়েল হঠাৎই আক্রান্ত হলেন এক উদ্ভট খামখেয়ালে, নিজেকে দেখলেন রাগি বাচ্চার মতন চেঁচিয়ে উঠতে : “আমি কলোম্বাইনকে চাই, আমাকে কলোম্বাইন এনে দাও ; আমাকে অবিকল তার মতন এনে দাও যে সেই রাতে তার অসাধারণ পোশাকে আর তার রজ্জুনর্তকীর বক্ষবন্ধনী পরে আমাকে পাগল করে দিয়েছিল !”

    সুন্দরী ফাঁফারলো, প্রথমে অবাক, যে পুরুষকে বেছে নিয়েছেন তাঁর অস্বাভাবিকতায় নিজে সঁপে দিতে বিহ্বল, ঘণ্টি বাজিয়ে ফ্লোরাকে ডাকলেন ; ফ্লোরা মিথ্যেই বোঝাবার চেষ্টা করল যে সকাল তিনটে বাজে, সবকিছুই নাট্যগৃহে তালাবন্ধ আছে, দারোয়ান গভীর ঘুমে, আবহাওয়া আতঙ্কজনক -- ঝড় গর্জন চালিয়ে যাচ্ছিল -- কিন্তু যে মালকিন নিজেই অন্যের নির্দেশ মানছেন তাঁর নির্দেশ তো মানতে হবে, আর চাকরানি বেরিয়ে পড়ল ; সেই সময়ে ক্র্যামার, এক নতুন ভাবনার বশবর্তী, ঘণ্টি বাজিয়ে জোর গলায় বলে উঠলেন : “আর রুজ আনতে ভুলো না !”

    এই চারিত্রিক বিশেষত্ব, ফাঁফারলো এক সন্ধ্যায় তাঁর বন্ধুদের কাছে বর্ণনা করছিলেন, যাঁরা স্যামুয়েলের সঙ্গে তাঁর প্রণয়ঘটিত ব্যাপার সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন, আমাকে একেবারেই অবাক করেনি ; ওসপ্রের লেখককে আমি এই ঘটনায় যথাযথ চিনতে পারলুম। স্যামুয়েল সবসময় রুজ ভালোবাসতেন, আর নীলকান্তমণি আর শাদা রঙ, সব রকমের চুমকিবসানো পোশাক। উনি মহানন্দে গাছেদের আর আকাশকে নতুন করে রঙ করে দিতে পারতেন, এবং ঈশ্বর যদি গোপনে প্রকৃতির পরিকল্পনা ওনাকে জানাতেন, উনি হয়তো তার সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলতেন।

    স্যামুয়েলের ভাবকল্পনা ছিল কলুষিত, আর হয়তো বিশেষ করে সেই কারণেই প্রেম তাঁর কাছে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা কম ও যুক্তিযুক্ততা বেশি ছিল। তা ছিল, সবার ওপরে, সৌন্দর্যকে সমাদর, এবং তার জন্য বাসনা মেটাবার আকাঙ্খা ; উনি মনে করতেন প্রজনন হলো প্রেমের কলুষ, গর্ভাবস্হা হলো মাকড়সার ফাঁদ। উনি কোথাও লিখেছিলেন “দেবদূতরা উভলিঙ্গ এবং বন্ধ্যা। ”--- মানবদেহকে উনি এমনভাবে ভালোবাসতেন যেন তা বস্তুর সামঞ্জস্য, চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এমন স্হাপত্যের উদাহরণ ; এবং এই চরম বস্তুবাদ, বিশুদ্ধ ভাবকল্পনা থেকে বেশি দূরত্বে ছিল না। কিন্তু, সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে, যা ভালোবাসার কারণ, তাতে ছিল, উনি বিশ্বাস করতেন, দুটি উপাদান : অঙ্গরেখা এবং প্রলোভন -- এবং অঙ্গরেখা যতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ওনার কাছে প্রলোভন এই রাতে ছিল রুজ।

    সুন্দরী ফাঁফারলো অতএব ওনার কাছে অঙ্গরেখা ও প্রলোভন দুয়েরই প্রতিনিধি ছিলেন ; আর যখন, বেপরোয়া ও বিজয়িনী শান্ত প্রণয়িণী নিজের বিছানার ধারে বসে, স্যামুয়েলের গায়ে আলতো করে হাত রাখলেন, স্যামুয়েল ওনার দিকে চেয়ে দেখলেন, স্যামুয়েল যেন সৌন্দর্যময়ীর স্পষ্ট চোখের ভেতরে অনন্তকালকে দেখতে পাচ্ছিলেন, আর ওনার নিজের দুই চোখ মনে হয় ভেসে যাচ্ছিল বিশাল দিগন্তে।

    আর, অনেকসময়ে অসাধারণ পুরুষদের ক্ষেত্রে, তাঁরা স্বর্গোদ্যানে একাই থাকেন, তাঁদের সঙ্গে সেখানে কেউই বসবাসের যোগ্য হয় না ; এবং ঘটনাক্রমে যদি লোকটা জোর করে কাউকে ভেতরে টানার চেষ্টা করে, মহিলাটি সদাসর্বদা তাঁর একটু পেছনেই থাকবেন ; এবং যে স্বর্গে তিনি একা রাজত্ব করেছিলেন, তাঁর ভালোবাসা দুঃখে পরিণত হওয়া আরম্ভ করল, আর সে নীল আকাশের বিষাদপূর্ণ চিন্তারোগে ভুতে পেলো, একজন নিঃসঙ্গ রাজার মতন।

    কিন্তু স্যামুয়েল কখনও নারীটিকে নিয়ে ক্লান্ত হননি, এবং একেবারেই নয়, যখন উনি প্রণয়িনীর গোপন বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, ভোরের ঠাণ্ডায় ফুটপাথে জোরে জোরে পা ফেলে, তখন ঠোঁটে চুরুট আর পকেটে হাত ঢুকিয়ে অহঙ্কারের আনন্দ উপলব্ধি করেছিলেন -- যার বর্ণনা আমাদের বিখ্যাত আধুনিক ঔপন্যাসিক ( বালজাক ) কোথাও করে গেছেন।

    হৃদয়ের বদলে, স্যামুয়েলের ছিল এক অভিজাত বুদ্ধি, এবং অকৃতজ্ঞতার বদলে, ওনার আনন্দ উপভোগ ওনার মধ্যে জন্ম দিয়েছিল এক উপাদেয় আরাম, এক ধরণের কামনার ভাবাবেশ, যা সম্ভবত ভালোবাসার চেয়ে সূক্ষ্ম ব্যাপার, সাধারণ মানুষ যেমন ভালোবাসাকে মনে করে। তাঁর দিক থেকে, ফাঁফারলো সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন, বিশেষজ্ঞের আদর খরচ করেছিলেন স্যামুয়েলের জন্যে, কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই পুরুষটা অমন সেবা পাবার যোগ্য। স্যামুয়েলের ভাষার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিলেন ফাঁফারলো, রহস্যমূলক অথচ অশুদ্ধ ও কাঁচা নোংরামি মাখানো কথাবার্তায়। ফাঁফারলোর জন্য অন্তত এগুলোতে ছিল নতুনত্বের আকর্ষণ।

    নর্তকীর প্রেমে পড়ার ফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। কয়েকটা অনুষ্ঠান রদ করতে হয়েছিল, কিছু মহড়ায় আবহেলা করছিলেন নর্তকী ; বহু পুরুষ ঈর্ষা করতে আরম্ভ করেছিল স্যামুয়েলকে।

    এক রাতে, হয়তো ঘটনাচক্রে, মসিয়ঁ দে কোসমেলির অবসাদ, কিংবা তাঁর স্ত্রীর প্যাঁচালো ছলনা, দুজনকে একসঙ্গে তাপ পোয়াবার আগুনের পাশে এনেছিল---দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ থাকার পর, যা সংসারে ঘটে থাকে, যখন কারোর পরস্পরকে কোনো কথা বলার থাকে না, আর অনেককিছু লুকোবার থাকে ---পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো চা মামুলি ফাটা টিপটে মসিয়ঁকে দেবার পর, যে টিপট হয়তো মহিলার কাকিমার বাড়ির সময়কার -- দশ বছর আগে প্রচলিত গান পিয়ানোর টুকরো-টাকরা বাজনায় মসিয়ঁকে শোনাবার পর -- মহিলা মসিয়ঁকে বললেন, নৈতিক উৎকর্ষে মিষ্টি আর বিচক্ষণ কন্ঠস্বরে, যাতে তা সৌজন্যপূর্ণ মনে হয়, সেইসঙ্গে এই ভয়ে যে অনুরাগের উদ্দেশ্যকে চটিয়ে না ফ্যালেন---বললেন মসিয়ঁর জন্য তিনি অত্যন্ত দুঃখিত, তিনি অনেক কেঁদেছেন, নিজের জন্য ততোটা নয় যতোটা মসিয়ঁর জন্য ; তিনি, তাঁর বশ্যতায় পুরোপুরি অনুরক্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন, আশা করেছিলেন যে অন্তত অন্য কোথাও মসিয়ঁ ভালোবাসা খুঁজে পাবেন, যা তিনি তাঁর স্ত্রীর কাছে আর চাইছেন না; নিজেকে পরিত্যক্ত পাওয়ার চেয়েও মসিয়ঁর প্রতি তাঁর প্রেমিকার বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি আরও বেশি যন্ত্রণা পেয়েছেন ; এটা নানান কারণে স্ত্রীর নিজের ভুল, যে তিনি প্রণয়ী স্ত্রীর দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে নিজের স্বামীকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেননি ; এখন, তিনি রক্তাক্ত ঘা সারিয়ে তোলার জন্য তৈরি, এবং দুজনে যে ধৃষ্টতা করেছেন তার সম্পূর্ণ দোষ নিজের ওপর নিতে চান, ইত্যাদি---- এবং মধুমাখানো এই শব্দগুলোর পেছনে ছিল প্রেমের দ্বারা ওসকানো এক ষড়যন্ত্র। মহিলা ফোঁপালেন, আর তা বেশ ভালোভাবেই ; আগুন তাঁর চোখের জল আর মুখাবয়বকে আলোকিত করে তুলেছিল, সুন্দর করে তুলেছিল দুঃখের কারণে।

    মসিয়ঁ দে কসমেলি কোনো কথা না বলে উঠে চলে গেলেন। পুরুষরা নিজেদের ভুলের ফাঁদে পড়ে নিজেদের মনস্তাপকে ক্ষমাপ্রার্থনায় বড়ো একটা পালটে ফেলতে চায় না। যদি মসিয়ঁ ফাঁফারলোর বাসায় যেতেন, নিঃসন্দেহে আবিষ্কার করতেন বিশৃঙ্খলার অবশেষ, চুরুটের শেষ টুকরো, আর খবরের কাগজ।

    একদিন সকালে, ফাঁফারলোর অপমানকর কন্ঠস্বরে স্যামুয়েলের ঘুম ভাঙলো ; যে বালিশে ফাঁফারলো মাথা রেখেছিলেন সেই বালিশ থেকে পরিশ্রান্ত মাথা তুললেন স্যামুয়েল, ফাঁফারলো ওনাকে যে চিঠিটা দিলেন তা পড়ার জন্য : “ধন্যবাদ, মসিয়ঁ, হাজারবার ধন্যবাদ, আমার আনন্দ ও আমার কৃতজ্ঞতা এক সুন্দরতম জগতে আপনার খাতায় জমা পড়বে। আমি তা গ্রহণ করছি। আমি আমার স্বামীকে ফেরত নিয়ে যাচ্ছি, আপনার হাত থেকে, আজ রাতে আমি ওনাকে আমার সঙ্গে কোসমেলির জমিদারিতে নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে আমি আমার স্বাস্হ্য আর আমার জীবন ফিরে পাবো, যার জন্য আমি আপনার কাছে ঋণী। গ্রহণ করুন, মসিয়ঁ, অনন্তকালীন বন্ধুত্বের জন্য আমার প্রতিশ্রুতি। আপনার সম্পর্কে আমি সদাসর্বদা এতো উচ্চধারণা পোষণ করি যে আমি জানি অন্য কোনো রকমের পরিশোধের পরিবর্তে আপনি এই বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেবেন।”

    স্যামুয়েল, লেসবসানো চাদরের ওপরে হাতপা ছড়িয়ে, কল্পনাযোগ্য শীতলতম ও সুন্দরতম কাঁধে হেলান দিয়ে, অস্পষ্টভাবে মনে করলেন, আর কিছুটা কষ্ট করে স্মৃতিতে জড়ো করতে চাইলেন, ষড়যন্ত্রের উপাদানগুলো, যা উনি পরিণতির দিকে নিয়ে এসেছেন ; কিন্তু স্যামুয়েল শান্ত গলায় বিড়বিড় করে বললেন, “আমাদের প্রণয় কি সত্যিই আন্তরিক ? কেই বা নিশ্চিত করে বলতে পারে যে সে ঠিক কী চায়, আর নিজের হৃদয়ের ব্যারোমিটারকে যথাযথ পড়তে পারে ?”

    “তুমি কি বলছ ? তোমার কাছে ওতে কি লেখা আছে ? আমাকে দেখতে দাও,” ফাঁফারলো বললেন।

    “ও কিছু নয়,” স্যামুয়েল জবাব দিলেন। “এক শ্রদ্ধেয় মহিলার কাছ থেকে একটা চিঠি, এমন একজন যাঁকে আমি কথা দিয়েছিলুম যে তোমাকে আমার প্রণয়ের পাত্রী করে ফেলবো।”

    “তোমাকে তার দাম দিতে হবে,” জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন ফাঁফারলো।

    একথা বোধহয় সত্য যে ফাঁফারলো ভালোবাসতেন স্যামুয়েলকে, কিন্তু তা অন্যের হৃদয়ের কাছে অজানা ভালোবাসা, এমন ভালোবাসা যার গভীরতম এলাকায় ছিল তিক্ততা। স্যামুয়েলের কথা বলতে গেলে, ওনার শাস্তি খাপ খেয়ে গিয়েছিল ওনার অপরাধের সঙ্গে। স্যামুয়েল অনেক সময়ে কামপ্রণয়ের অভিনয় করতেন ; ওনাকে তা করতে বাধ্য করা হয়েছিল ; কিন্তু তা শ্রদ্ধেয় তরুণীদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ স্বচ্ছ, শান্ত, তীব্র প্রেম ছিল না, বরং এক ভয়ঙ্কর প্রেম, নিরানন্দ ও লজ্জাজনক, রাজনর্তকীদের অসুস্হ প্রেম। ঈর্ষার যাবতীয় অত্যাচারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন স্যামুয়েল, আর সেই অপকৃষ্ট দুঃখদুর্দশা যার মধ্যে আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দেয় চিকিৎসার অসাধ্য এক অপরিহার্য অসুখ -- সংক্ষেপে, যে পঙ্কিল বিয়েকে আমরা বলি উপপত্নীগ্রহণ তার সমস্ত আতঙ্ক ভোগ করছিলেন স্যামুয়েল। ---আর ফাঁফারলোর কথা বলতে হলে, তিনি প্রতিদিন সতেজ আর মোটা হতে লাগলেন ; তিনি হয়ে উঠলেন বলিষ্ঠ সুন্দরী, চকচকে ত্বক এবং ছলনাময়ী, অনেকটা সান্ত্বনাদায়িকা পথচারিনীর মতন। কিছুদিন পরেই উনি ইসটারের আগের চল্লিশদিনের উপোস করবেন, আর নিজের গির্জার এলাকায় দান বিলোবেন। আর তারপর, হয়তো, স্যামুয়েল, প্রায় মৃত, একটা বাক্সে তাঁকে পেরেক পুঁতে রাখা হবে, নিজের ভালোদিনগুলোয় উনি যেমন বলতেন, আর ফাঁফারলো, খ্রিস্টের সেবিকার মতন আদল-আদরায়, কোনো যুবক মালিকের মাথা ঘোরাবেন।--- ইতিমধ্যে, ফাঁফারলো জেনে গেছেন কেমন করে বাচ্চা পয়দা করতে হয় ; উনি মহানন্দে দুটি যমজ বাচ্চার জন্ম দিলেন। --- স্যামুয়েল চারটি বিজ্ঞানের বইয়ের বাবা হলেন : তার একটি চারজন খ্রিস্টের সুসমাচার লেখকদের একজনকে নিয়ে-- আরেকটি রঙের প্রতীকত্ব নিয়ে -- অন্য আরেকটি বিজ্ঞাপনের নব্যপ্রণালী নিয়ে -- আর চতুর্থের নাম আমি মনেও আনতে চাই না। শেষ বইটি সম্পর্কে ভয়ের ব্যাপার হলো যে তাতে ছিল প্রচুর কর্মপ্রেরণা ও তেজ, এবং ঠাশা কৌতূহল। স্যামুয়েলের এমন দুঃসাহস, যে বইটার মলাটে উৎকীর্ণ ছিল, “সোনার অভিশপ্ত লোভী”!

    ---ফাঁফারলো চাইছিলেন যে তাঁর প্রেমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত হোন, আর পাঁয়তাড়া কষে বিভাগীয় মন্ত্রীকে রাজি করাতে চাইছিলেন যাতে স্যামুয়েলকে সন্মানের ক্রুশ পুরস্কার দেয়া হয়।

    বেচারা ওসপ্রেসের কবি ! বেচারা ম্যানুয়েলা দে মঁতেভেরদে ! -- অনেক নীচে নেমে গেছেন।-- আমি সম্প্রতি শুনেছি উনি একটা সমাজবাদী পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছেন আর রাজনীতিতে ঢুকতে চান। --- এক ইতর মনের মানুষ ! দার্শনিক মসিয়ঁ নিসার্ড যেমন বলেছেন !


     

    [ সমালোচক এনিড স্টার্কির মতে এই উপন্যাসটি বদল্যারের সঙ্গে তাঁর কৃষ্ণাঙ্গী প্রেমিকা জাঁ দুভালের সম্পর্ক নিয়ে লেখা। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত ]

  • মলয় রায়চৌধুরী | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:০২734841
  • দার্শনিক-সাহিত্যিক, কবি সমীর রায়চৌধুরী

    মলয় রায়চৌধুরী


     

    প্রাচীন ও নবীনের প্রান্তসীমা ধ’রে

    গভীরে প্রবেশ তাঁর ; মধ্যমণি যাঁকে

    বিহঙ্গদৃষ্টিতে মেনে, রন্ধন স্বপাকে

    প্রস্তুতির বেশি কিছু ব্যর্থতার জ্বরে

    বিপন্ন যে কতবার ! কিন্তু এতে সুখ

    গোপন করিনি, জানে শ্বেত পারাবত ;

    উদ্ডীন, তথাপি খুঁজে অগ্রদানী ক্ষত

    নিরস্ত হয়েছে। তুমি প্রতিমার মুখ

    সম্যক আয়ত্ত করে এই নষ্টপ্রায়

    সময়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাবণসম্মতি

    অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত করেছো বান্ধব--

    ঋষির পাণ্ডিত্যে তাই শিশুর সভায়

    মানায় তোমাকে, তুমি স্পর্শগন্ধশ্রুতি

    স্বয়ং স্বতঃসিদ্ধ -- ক্ষান্ত হলে জনরব।

    ( শঙ্করনাথ চক্রবর্তী, ‘সমীর রায়চৌধুরী’ )


     

    সমীর রায়চৌধুরী একজন দার্শনিক-সাহিত্যিক ; কেবল ভাবুক বা কবি বা গল্পকার বা প্রাবন্ধিক বললে ওনাকে বোঝানো যায় না। ইউরোপে যেমন ছিলেন স্তেফান মালার্মে, উমবের্তো একো, এজরা পাউণ্ড, জাঁ পল সার্ত্রে, আতোয়াঁ আর্তো, আলবেয়ার কামু, মিলান কুন্দেরা, টি এস এলিয়ট, অলডাস হাক্সলি, জাঁ জাক রুশো, ফিয়োডোর ডস্টয়েভস্কি প্রমুখ, যাঁদের লেখায় আমরা তাঁদের বিশ্ববীক্ষা পাই। বাংলা সাহিত্যে উনিশ শতকের পর থেকে আমরা কেবল প্রাবন্ধিক বা গল্পকার বা কবি বা ঔপন্যাসিক পেয়েছি বলে সমীর রায়চৌধুরীর কাজকে বুঝে ওঠা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়নি -- তাঁরা সমাজকে বুঝতে চেয়েছেন কেবল বাংলা ভাষাসাহিত্যের জ্ঞানের মাধ্যমে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার যে বিশেষ সংখ্যা ওনার কাজ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তাতেও দেখা গেছে কেউ-কেউ, অন্ধের হাতি দেখার মতন, কেবল একটি ডাইমেনশানকেই তুলে ধরেছেন, হয় তাঁর গল্প বা কবিতা বা শব্দভাবনা ; হাংরি আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে লিখতে দেখলুম না কাউকে, সম্ভবত হাংরি আন্দোলন ব্যাপারটাই এমন। দাদা, তাঁর গভীর পড়াশুনা আর ব্যাপক অভিজ্ঞতার দরুণ, ছিলেন মাল্টিডিসিপ্লিনেরিয়ান।

    অলোক গোস্বামী দাদার ছোটোগল্পের বই “খুল যা সিমসিম” আলোচনায় ( বোধ, মার্চ, ২০০৯ ) একটি ঘটনার কথা বলেছেন, “কফিহাউস থেকে বেরুনোর পথে এক প্রথিতযশা সাহিত্যিক বলেছিলেন, সমীর রায়চৌধুরী পড়েছি। তবে কী যে লেখেন, গল্পের আকারে প্রবন্ধ না প্রবন্ধের আকারে গল্প, বুঝতে পারিনি।” উমবের্তো একোর “দি নেম অফ দি রোজ” সম্পর্কে কয়েকজন আলোচক, বুঝতে না পেরে, এরকম কথাই বলেছিলেন ; এজরা পাউণ্ডের কবিতা সম্পর্কে এখনও এমনতর মন্তব্য ইনটারনেটে পাওয়া যায়। দাদা তাঁর ছোটোগল্পে অন্ধকারকে, জ্যামিতিকে, ভারসাম্যকে, সন্ত্রাসকে, ভয়কে কেন্দ্রচরিত্র দিয়েছেন, যখন কিনা বঙ্কিমচন্দ্রের পর থেকে গল্প লেখা হয়ে আসছে ব্যক্তিএকককে নিয়ে। দাদা তাঁর অন্তর্ঘাতী, ক্যাননভঙ্গকারী, সৃজনশীল রচনাগুলোয় যা ধরার প্রয়াস করেছিলেন তা হল “মানবেতিহসের প্রেক্ষিতে এই মুহূর্তের সংঘর্ষময় নবাঞ্চল”। তাঁর ইতিহাসবোধ কেবল সময়কেন্দ্রিক ছিল না। তাঁর পাঠবস্তুর শরীরেই জ্ঞানের বিকাশে অভিজ্ঞতার ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন, রৈখিক সময়ের একটিমাত্র ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, বস্তুত ‘সময়বোধ’-এ বিপ্লব আনতে চেয়েছেন, এবং চল্লিশ বছরের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংঘর্ষময় জায়গাটাকে ভরে তুলতে চেয়েছেন নবাঞ্চলের ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা দিয়ে, অভেদের সন্ধান দিয়ে ।

    ১৯৬৩ সালে, হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার একটা গল্প প্রকাশিত হয়েছিল ‘জলছবি’ নামে, তা শেষ হয়েছে স্বমেহনের অবিকল বাৎসায়নি বর্ণনা দিয়ে, যা বহু পাঠক ধরতে পারেননি, সম্ভবত অতো আগে তেমন পাঠক গড়ে ওঠেনি :

    “উরুসন্ধিতে সাবান বোলাতেই বুক ফুঁড়ে অসংখ্য বুলবুলি উঠে যায়।

    দু’পা ফাঁক করে দাঁড়ায়। ক্ষিপ্ত মুঠোয় নির্মমভাবে সাপ ধরে ফেলে।

    শিরাউপশিরা ধমনিতে উষ্ণরক্ত টগবগ করে ওঠে। অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া

    ছোটে সীমান্তের দিকে। একত্রিত অনিমেষ দ্রুত নিক্ষেপে শরীর ফুঁড়ে

    ছিটকে বাইরে বেরোয়। একটা স্তব্ধ মুহূর্ত। বার্তা পৌঁছোয়। ”

    যে ধরণের প্রশ্নাবলী সাধারণত বিতর্কমূলক দর্শনে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়, তা দাদা তাঁর কবিতা ও ছোটোগল্পে বুনে দিয়েছেন। দাদার কবিতা ও ছোটোগল্প কেউ-কেউ বুঝে উঠতে পারেননি তার কারণ বঙ্গসমাজের বর্তমান কালখণ্ডে অজ্ঞানতা ও শিক্ষাহীনতা হয়ে উঠেছে গর্ববোধের ব্যাপার। বাঙালির সমাজে পাড়ায় পাড়ায় কোমসোমোলদের চূড়ায় একজন করে ইলিয়া এরেনবুর্গ দিব্বি তাদের সাংস্কৃতিক মধ্যস্হতার পণ্ডিতিয়ানা চালিয়ে রাজত্ব করছিল, যখন দাদা হাংরি আন্দোলনের পরে, নব্বুই দশকের গোড়ায়, পাকাপাকিভাবে কলকাতায় ফিরলেন। দাদা বুঝতে পারলেন যে এই কলকাতা, এই পশ্চিমবাংলা, তাঁর সিটি কলেজে পড়ার সময়কার, পাণিহাটিতে থাকার সময়কার, উত্তরপাড়ার বসতবাড়ির খণ্ডহরে থাকার সময়কার বাস্তবতার শহর ও রাজ্য নয়, এই বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে সমস্ত পত্রিকা সে সময়ে প্রকাশিত হচ্ছিল, সেগুলো তাঁর মনের মতো ছিল না, বেশিরভাগ পত্রিকা ছিল, আছে এখনও, বিশেষ-বিশেষ বৌদ্ধিক কমপার্টমেন্টে কিংবা গোষ্ঠীতে বিভাজিত।

    কলকাতায় ফিরে দাদা “হাওয়া৪৯” নামে একটি সাহিত্যিক-দার্শনিক পত্রিকা প্রকাশের তোড়জোড় করলেন, বন্ধুদের বাড়ি-বাড়ি গেলেন, কিন্তু কেউই আগ্রহ দেখালেন না। কোন বন্ধু ? যে বন্ধুর প্রথম কাব্যগ্রন্হ তিনি নিজের টাকায় ছাপিয়ে দিয়েছিলেন, মানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ; যে বন্ধু তাঁর চাইবাসার নিমডি টিলার বাসায় টানা আড়াই বছর ছিলেন, মানে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ; যে বন্ধু মদ খাবার পরের দিন সকালে খাঁটি দুধ খেতে চান বলে দাদা তার জন্য বাড়ির সামনে দুধ দোয়াতেন, মানে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ; যে বন্ধু তাঁর বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে বিনা ভাড়ায় বছর খানেক থেকে উপন্যাস লিখে অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন, মানে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। দাদার প্রস্তাব শুনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, “হাঃ হাঃ, সমীর চিরকাল নতুন-নতুন পরিকল্পনা তৈরি করে, ও কলেজের সময় থেকেই অমন।” বার্ধক্যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শরীর যখন ভেঙে পড়েছে, তখন ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছিলেন, “সবাই আমার কাছে আসে, শুধু সমীরটাই আসে না, ও কি পুরস্কার চায় না !”

    বয়স্ক বন্ধুদের বাড়ি না গেলেও চলতো। দাদা লক্ষ করেননি যে তাঁর অবর্তমানে কলকাতায় ও পশ্চিমবঙ্গের জেলা সদরগুলোয় নতুন প্রজন্মের কবি ও লেখকরা দেখা দিয়েছেন, যাঁদের ভাবনাচিন্তা প্রায় দাদার সমান্তরাল, যাঁরা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক প্রথানুগত চলতি-আড্ডার গুমোট নয়, ভাষাসাহিত্যের ক্যানন অস্বীকার করতে চাইছেন, যাঁদের পাঠবস্তু ট্র্যান্সগ্রেসিভ এবং অন্তর্ঘাতী। ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে দাদা প্রকাশ করলেন “হাওয়া৪৯” পত্রিকার প্রথম সংখ্যা।

    ১৯৪৯ সালে, যে-বছর দাদা ম্যাট্রিক পাশ করলেন, আমার বয়স ছিল দশ, আমাকে একটা ফিল্ম দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন, দাদা পাটনার এলফিনস্টোন সিনেমা হলের মর্নিং শোতে ফিল্মটা আগেও কয়েকবার দেখেছিলেন, আর ভালো লেগেছিল বলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, ফিল্মটার নাম ‘দি উইজার্ড অফ অজ’, নায়িকা জুডি গার্ল্যাণ্ড, পরবর্তীকালে এই ফিল্মটার ডিভিডি কিনে আমি আমার স্কুলপড়ুয়া ছেলে আর মেয়েকে প্রায়ই দেখাতুম। ১৯৯০ সালে, অবসর নিয়ে যখন দাদা কলকাতায় ফিরলেন, তখন বলেছিলেন, গল্প রচনার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, আর ‘দি উইজার্ড অফ অজ’ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, সমাজের ভেতরের সংঘর্ষে ব্যক্তিজীবনের ব্যাখ্যার অতীত দুর্ঘটনাগুলো ওই ফিল্মের জাদুবাস্তব চরিত্রদের মতন হয়ে চলেছে। বস্তুত, তরুণ আর অতিতরুণদের কাছে, কলকাতায় এসে, দাদা দেখা দিলেন সাহিত্যের নবাঞ্চলের উইজার্ড হিসাবে। ২২শে জুন ২০১৬ তাঁর মৃত্যুর পরে ২৪ জুন তেইশটি পত্রিকা একত্রিত হয়ে কলকাতার অবনীন্দ্র সভাঘরে যে স্মরণসভার আয়োজন করেছিলেন, তা থেকেই তাঁর উইজার্ডরির জাদুবাস্তব খেলার সঙ্গে পরিচিত হই।

    ১৯৬১ সালে হাংরি আন্দোলনেও দাদা ছিলেন উইজার্ডের ভূমিকায়, কেবল শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখের আন্দোলনের প্রতি প্রত্যয় উৎপাদনের জন্যই নয়, অনেক সময়ে বুলেটিন ছাপার খরচ দেবার জন্যও নয়, কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যে মননভূমি আগে থেকেই গড়ে তোলা দরকার সে-বিষয়ে পরামর্শের জন্যও। এখন সকলেই জানেন যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আইওয়া থেকে চিঠি লিখে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখকে হাংরি আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়ে যাবার জন্য প্ররোচিত করছিলেন, কিন্তু দাদাকে তিনি তেমন কোনো চিঠি লিখছিলেন না। ওনারা শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু দাদা হাংরি আন্দোলনে ম্যাটাডরের মতন লাল চাদর নিয়ে ষেঁড়ো লেখকদের থামাচ্ছিলেন। অবশ্য বিবিসি থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে ডোমিনিক বার্নের একটি রেডিও প্রোগ্রামের জন্য অসুস্হ শরীরে উৎপলকুমার বসু সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তিনি একজন হাংরি আন্দোলনকারী, তার মাস কয়েক পরেই উৎপলকুমার বসু মারা যান।

    ওনারা তিনজনেই যখন আমার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষে সাক্ষী হলেন তখন দাদা বলেছিলেন, “অবাক হবার কিছুই নেই”। শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ যখন ছাড়া পাবার জন্য হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করার মুচলেকা লিখে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, তখনও দাদা বলেছিলেন, “ওরা সারাজীবন এই পরাজয়বোধ বয়ে বেড়াবে আর লেখালিখি করবে সেই ক্ষয়রোগের সমর্থনে।” একেবারে অব্যর্থ বলেছিলেন দাদা। দাদার বিরুদ্ধে একটা বাড়তি পেনাল কোডের সেকশান চাপানো হয়েছিল, তরুণদের বিপথগামী করার। চাইবাসার মতন ছোটো জায়গায় দাদার গ্রেপতারি বেশ অপমানজনক ছিল নিশ্চয়ই, দাদার শশুর একজন মোক্তার ছিলেন বলে, আর জেলা শাসক দাদার লেখালিখির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলে, তাঁকে লকআপে ঢোকানো হয়নি।

    এখানে একটা ঘটনা বলে নিই, নয়তো লিখতে বসে ভুলে যেতে পারি। বড়োজ্যাঠা-মেজজ্যাঠার পরপর মেয়ে হবার দরুণ ঠাকুমা, বংশধরের জন্য বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। দাদাকে ঠাকুমা তাই খুব ভালোবাসতেন। হাংরি আন্দোলনে দাদা গ্রেপ্তার হয়েছেন শুনে ঠাকুমার সেইদিনই হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল আর মারা যান। ঠাকুমার মৃত্যুর কারণে হাংরি আন্দোলনের সময়ে বাবা আর জেঠা-কাকারা জেঠিমা-কাকিমারা সবাই উত্তরপাড়ায় একত্রিত হয়েছিলেন। বড়োজ্যাঠা ন্যাড়ামাথায় গিয়েছিলেন আমাদের মকদ্দমার প্রথম দিনে, আর কোনো ভাই ন্যাড়া হননি।

    ঠাকুমা, যাঁর নাম ছিল অপূর্বময়ী, আর ঠাকুর্দা যাঁর নাম ছিল লক্ষ্মীনারায়ণ, ওনাদের ছয় ছেলে প্রমোদ, সুশীল, রঞ্জিত, অনিল, সুনীল, বিশ্বনাথ আর এক মেয়ে কমলা। বাবা ছিলেন তৃতীয়, রঞ্জিত, লাহোরে জন্মেছিলেন বলে মহারাজা রঞ্জিত সিংহের নামে ওনার নামকরণ। একান্নবর্তী পরিবারটিকে মোটামুটি একা বইতেন বাবা। নিম্নবিত্ত বলতে যা বোঝায়, তাই। থাকতুমও আমরা পাটনার অতিদরিদ্র পাড়ায়। দাদার শেষ কাব্যগ্রন্হের নাম “অপূর্বময়ী স্মৃতি বিদ্যালয়”। উত্তরপাড়ার বসতবাড়ি খণ্ডহর হবার আগে, নকাকা-নকাকিমার সবে বিয়ে হয়েছে, তখন ওনারা সাবর্ণ ভিলার দুটো বিশাল ঘরে “অপূর্বময়ী বিদ্যালয়” নামে বাচ্চাদের একটা স্কুল খুলেছিলেন ; স্কুলটা উঠে যায় ওনাদের দুজনের মধ্যে অবনিবনার কারণে, তখনকার দিনে তো কথায়-কথায় ডিভোর্স ব্যাপারটা ছিল না।

    দাদার প্রধান অবদান দুটি শতকের সাহিত্যিক-নান্দনিক বৈভিন্নকে দুই হাত দিয়ে টেনে নিজের বুকের কাছে এনে একটা সেতু গড়ে ফেলা, এবং সেকারণেই দাদা আগ্রহী করতে পেরেছিলেন আগের শতকের প্রভাত চৌধুরী, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের পাশাপাশি পরের শতকের অনুপম মুখোপাধ্যায়, তুষ্টি ভট্টাচার্য প্রমুখকে, অথচ দাদা কোনো সংবাদপত্র বা পাবলিশারের পেটোয়া লেখক ছিলেন না ; ওপরে শঙ্করনাথ চক্রবর্তীর কবিতাটা পড়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়ে থাকবে। দাদার এই ধরণের বক্তব্য যে, “শব্দের ভেতরে শব্দেরা পাশ ফিরে থাকে”, “একটি বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একাধিক বাক্য”, “গল্পেরা আমার মাধ্যমে জন্মায়, কলম থেকে নয়”, “তুমি নিজের পারিবারিক ইতিহাসের ভেতরে যেমন জন্মাও, তেমনই স্বদেশের ইতিহাসের ভেতরে” ইত্যাদি কথাগুলো তাঁর অভিজ্ঞতাসঞ্জাত।

    অভিজ্ঞতা জমেছে শৈশবে পাটনা শহরে অন্ত্যজপাড়া ইমলিতলায় থাকার সময় থেকেই। তাঁর সময়ের আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিক কি এমনতর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন, তাঁদের শৈশবে ! ছোটোবেলায় দাদার একটা চোখ ট্যারা ছিল, ট্যারা চোখ সোজা করার জন্য ডাক্তার দেখাবার মতন টাকাকড়ি বাবার ছিল না কেননা ওনাকে কুড়িজনের একান্নবর্তী পরিবার চালানো ছাড়াও উত্তরপাড়ায় ঠাকুমার খরচ আর বসতবাড়ির ট্যাক্স পাঠাতে হতো ; বাবার দোকানে আড্ডা মারতে আসতেন এক বৃদ্ধ, যিনি ছিলেন বিখ্যাত চোখের ডাক্তার দুকখন রামের ( জগজীবন রামের বাবা ) কমপাউণ্ডার, তিনি আরেকজন বালকের ট্যারা চোখ সোজা করার প্রেসক্রিপশানের নকল এনে দিলে বাবা দাদার চশমা করিয়ে দিয়েছিলেন, গান্ধিছাপ গোল চশমা, ডাঁটিটা স্প্রিঙের ; দাদার ট্যারা চোখ বছর দুয়েকে সোজা হয়ে গেল কিন্তু বাঁ-চোখটা সারাজীবনের মতন খারাপ হয়ে গেল।

    ইমলিতলা ছিল অন্ত্যজ বিহারি আর অত্যন্ত গরিব শিয়া মুসলমানদের পাড়া ; এই পাড়ায় চোর-পুলিস খেলার সময়ে যেকোনো বাড়ির ভেতরে ঢোকা যেতো, কেউই বারণ করতো না, মসজিদের ভেতরে মাদুরের আড়ালে লুকোনো যেতো, যদিও বড়োজ্যাঠামশায় তা পছন্দ করতেন না। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যে কানা গলি ছিল তার শেষে একটা বস্তি ছিল, বস্তিতে গাঁজা গাছের ঝোপ, ওই গাছের ফুল শুকিয়ে বউ-মরদরা ফুঁকতো, দাদার গাঁজা ফোঁকার হাতেখড়ি সেখানেই হয়ে গিয়েছিল, আমার আর মেজদারও। দাদার কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর বন্ধুরা গাঁজা ফুঁকতেন বলে মনে হয় না। দাদা আমাদের সঙ্গে নেপালে গেলে, হাংরি আন্দোলনের সময়ে, হিপিদের জমায়েতে, গাঁজা হ্যাশিশ আর এল এস ডি নিয়েছিলেন, মোষের কাঁচা মাংসের পদ চাল-গমের মদ রাকসির সঙ্গে খেয়েছিলেন। নেপালের সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় দাদার ছবি ছাপা হয়েছিল। পরে দাদা নেপালি কবিলেখক আর হাংরি আন্দোলনকারীদের একটা যৌথ সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন, যার প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন অনিল করঞ্জাই।

    কানা গলির শেষের বস্তিতে শুয়োর মেরে খাওয়া হতো, তাড়ি সহযোগে। সন্ধ্যাবেলায় গনগনে লোহা ঢুকিয়ে গর্তে ফেলা শুয়োর মারার আর্তনাদ পেলে দাদা পরের দিন বলতেন, চল শুয়োরের মাংস খাব তাড়ি দিয়ে, রান্নাঘর থেকে এলাচ নিয়ে নে, ফিরে এসে ফিটকিরি দিয়ে দাঁত মেজে নিস। সেই সব গরিব পরিবারের পুরুষ সদস্যরা চুরি-ডাকাতি-পকেটমারি করে সংসার চালাতো, তাদের কাউকে গ্রেপতার করার জন্যে পাড়ায় পুলিশ ঢুকলে দাদা বলতেন চল চল ছাদে চল ; ছাদে গিয়ে দেখতুম সন্দেহজনকরা গোলটালির ওপর দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে পেছনের আমবাগানে। পাড়ায় দাদার সমবয়সী বন্ধুদের মধ্যে একজনের বাবা পকেটমার ছিল, সেই বন্ধুও বাপের কাছে পকেট মারা শিখছিল, দাদা তাকে বদ্রি পাটিকমার বলে ডাকতেন। দাদা বাড়িতে এসে বলেছিলেন, বদ্রির কুঁড়েঘরে ইশকুলের মতন ব্যাপার, এ-পাড়ার আর অন্য পাড়ার অনেক ছোঁড়া শিখছে, দুআঙুলে পার্স তোলা, আধখানা ব্লেডে কাটা, এইসব।

    আমাদের বাড়িতে খাঁচাকলে ইঁদুর পড়লে বস্তির দুসাধদের দেয়া হতো, পুড়িয়ে খাবার জন্য। দাদা, মেজদা আমি শৈশবে ইঁদুরপোড়া চেখেছি। যদি জাঁতিকলে ইঁদুর পড়তো তাহলে দাদা ছাদে গিয়ে কিংবা মাঠে গিয়ে, ইঁদুরের ল্যাজ ধরে “চিল কা বাচ্চা চিলোড়িয়া” বলে ঘোরাতেন আর আকাশে চিলেরা পাক খেতে আরম্ভ করলে ছুঁড়ে দিতেন, একটা চিল ঠিকই ইঁদুরটাকে ধরে নিয়ে পালাতো। পরে আমি আর মেজদাও এই খেলা খেলেছি।

    ইমলিতলায় গুলি, টেনিসবলের ফুটবল, ড্যাঙগুলি, লাট্টুখেলায় দাদা ছিলেন ওস্তাদ, সাইকেলের টায়ারকে কাঠি মেরে মেরে গোলা রোডের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবার প্রতিযোগীতায় দাদা জিততেন প্রতিবার। কিন্তু কাঁইবিচি মানে পাকা তেঁতুলের বিচি আর কলকে ফুলের বিচি যাকে পাড়ায় বলা হতো কানায়েল, সেগুলো গর্তে ফেলার আর টিপ করে মারার খেলায় মেজদা জিততো। টেনিসবল নর্দমায় পড়ে গেলে গুয়ের ভেতর থেকে কাঠি দিয়ে বের করে আনতে হতো, আর বাড়ির কেউ দেখে ফেললে, সন্ধ্যায়, শীতকাল হলেও, চান করে গায়ে গঙ্গাজল ছেটাতে হতো। কম বয়সে পৈতে হয়ে গিয়েছিল বলে বকুনিটা বেশি করে খেতে হতো দাদাকে। বড়দি-ছোড়দির বিয়ে হয়ে যাবার পর সন্ধ্যার সময়ে গামছা পরে চৌকাঠগুলোয় গঙ্গাজল ছেটাবার আর শাঁখ বাজাবার কাজ ছিল দাদার।

    বাবা তাই দাদাকে একটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলেন। দাদা পাড়ায় ফুটবল টিম গড়ে অন্য পাড়ার টিমের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতার আয়োজন করতেন। শিল্ডটা দাদা নিজে তৈরি করতেন, পিচবোর্ডকে শিল্ডের মতন কেটে তার ওপর ব্রুকবণ্ডের রাঙতা মুড়ে আর লাল রঙের রিবন সেঁটে। মাঠে খেলতে গেলে, এখন তার নাম গান্ধি ময়দান, একদিকের গোলপোস্ট হতো দাদার দুপাটি জুতো দিয়ে, অন্য দিকেরটা বিরজু নামে দাদার এক পাড়াতুতো খোঁড়া বন্ধুর, তার মা ছাতু বিক্রি করতেন। দাদা ফেরার সময় জুতো পরে আসতে ভুলে যেতেন আর পুজো পর্যন্ত বিনা জুতোয় থাকতেন, স্কুলও যেতে হতো খালি পায়ে, কেননা বাবা সকলের জুতো বছরে ওই একবারই কিনে দিতেন, মহালয়ার আগে। খালি পায়ে স্কুলে যাওয়া এড়াতে দাদা একজন জজের জুড়িগাড়িতে, পেছন দিকে যেখানে আর্দালি দাঁড়ায়, সেখানে বসে চলে যেতেন, জজ সায়েবকে পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময়ে আর্দালির দাঁড়াবার জায়গা তো ফাঁকা থাকতো।

    ইমলিতলায় শাসনের ভার ছিল বড়োজ্যাঠার ওপর। ওনার খাটের তলায় শরকাঠির গোছা ছিল তা থেকে একটা টেনে বের করে হাতের চেটোয় মারতেন, শরকাঠি অবশ্য দুতিনবারেই ভেঙে যেতো। বড়োজ্যাঠা দাদার নাম ধরে হাঁক পাড়লেই দাদা আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে লাফ মেরে হুলাসবাবুদের বাড়ির ছাদে গিয়ে ওনাদের চারটে সিঁড়ির কোনো একটা দিয়ে নেমে পালাতেন, ফিরতেন বড়োজ্যাঠা অফিস চলে গেলে কিংবা ভুলে গেলে। দুটো বাড়ির মাঝের গলি ছিল অন্তত চার ফিট। হুলাসবাবু তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ নিয়ে একটা খেলা খেলতেন যা দাদার পছন্দ ছিল ; কুরুশকাঠির মতন একটা লোহার কাঠি যাকে ‘শ্রীরামশলাকা’ বলা হতো, সেটা কোনো একটা খোপে চোখ বুজে রাখা ; যেখানে-যেখানে রাখা হতো সেই অক্ষরগুলোর সাহায্যে কোনো দোহা চিহ্ণিত করে ব্যাখ্যা করে হুলাসবাবু ভবিষ্যত বলতেন। এই খেলা নিয়ে “টিনিদির হাত” নামে দাদার একটা গল্প আছে ‘খুল যা সিমসিম’ গল্পগ্রন্হে।

    স্কুলের শেষ ধাপ পর্যন্ত, অর্থাৎ ম্যাট্রিকুলেশান অব্দি, দাদার পড়ার টেবিল বলতে ছিল একটা বড়ো মাপের প্যাকিংবাক্স, বাবার ফোটোগ্রাফির দোকান থেকে আনা, তার ওপর মায়ের পুরোনো শাড়ি পাতা। দাদাকে মেঝেয় বসে পড়তে হতো, রাতে লন্ঠনের আলোয়। লন্ঠনের কাচের ভুষো দাদাকে পরিষ্কার করতে হতো। কাচ ভেঙে গেলে দাদা বাতি জ্বেলে রসুন দিয়ে জুড়ে নিতেন যতো দিন চলে। মা ছিলেন রান্নাঘরের ইনচার্জ, সুতরাং মায়ের আদেশে দাদাকে কয়লা ভাঙতে হতো, বাতিল প্যাকিংবাক্সের কাঠ টুকরো করতে হতো উনোনের জন্য, অনেকসময়ে সকালে পোড়া কয়লা বের করে উনোন সাজিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে হতো। পোড়া কয়লার সাদা অংশ আলাদা করে রেখে দিতে হতো যাতে তার সঙ্গে ফটকিরির গুঁড়ো মিশিয়ে বাবা বাড়ির সকলের জন্য দাঁতের মাজন তৈরি করে দিতে পারেন।

    মেজজ্যাঠা জামের ভিনিগারের ব্যাবসা আরম্ভ করার তোড়জোড় করে ছিলেন, যদিও চলেনি। আড়াই-তিন ফিটের এনামেলের গামলা জামে ভরে দাদাকে তার ওপর লেফ্ট-রাইট করতে বলতেন, পরে আমিও করেছি। লেফ্ট-রাইট করার সময়ে দাদা একটা গান গাইতেন, “তুফান মেল, ইসকে পইয়ে জোর সে চলতে, অওর অপনা রাস্তা তয় করতে, সবহি ইসসে কাম নিকালে, বচ্চে সমঝে খেল, তুফান মেল”, কাননবালার গান সম্ভবত, স্মৃতি থেকে লিখছি।

    সন্ধ্যাবেলা পড়াশুনার শেষে বড়োজেঠিমা আমাদের গল্প বলতেন, ঠাকুমার ঝুলি, পঞ্চতন্ত্র, ইশপের ফেবল, আরব্য রজনীর খিচুড়ি বানিয়ে ওনার নিজস্ব গল্প। আমরা জাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনরা লন্ঠন ঘিরে ওনার গল্প শুনতুম। শুনতে-শুনতে দাদা লন্ঠন নিভিয়ে দিতেন, বলতেন, “আলো জ্বললে গল্পটা দেখতে পাবো না”। দাদার গল্পে যে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তব তার উৎস বড়োজেঠিমার অবিশ্বাস্য গল্পগুলো। দাদার গল্পগুলোয় জাদুবাস্তবতার আরেকটা কারণ হলো, যেকারণে দাদা তাঁর পত্রিকার নাম রেখেছিলেন “হাওয়া-৪৯” বা ঊনপঞ্চাশ বায়ু, তা হল এই যে পাটনা কলেজিয়েট স্কুল, যে স্কুলে দাদা পড়তেন, তা এক সময়ে ছিল পাগলাগারদ, সেই বিলডিং ভেঙে স্কুলের বিলডিঙ তৈরি হয়, পরে পাগলাগারদ রাঁচিতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। স্কুলের ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে পাগলদের সম্পর্কে নানা আজগুবি কুহকের গল্প ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে আদান-প্রদান করতো, চোর-পুলিশ লুকোচুরির বদলে পাগল আর সুস্হমগজের খেলা খেলতো। অবসরের পর বাঁশদ্রোণীতে পাকাপাকি থাকার সময়ে দাদা এক মুসলমান চাবিঅলা, ঠেলাগাড়ির সবজিঅলা আর নাপিতের সঙ্গে বাড়ির বারান্দায় খোশগল্প করতেন আর তাদের কাছ থেকে যে জাদুবাস্তব জগতের আভাস পেতেন তা তাঁর গল্পে কাজে লাগতো। “তোমাদের বাড়ির রোদ”, এই অভিব্যক্তি দাদা পেয়েছিলেন তাঁর বাংলাদেশি কাজের-বউয়ের কাছ থেকে, যে রোদ, দাদার মনে হয়েছিল, একযোগে স্হাবর ও অস্হাবর সম্পত্তি। তেমনই বাড়ির নিজস্ব অন্ধকার, যা পাওয়া যাবে দাদার ‘মেথিশাকের গন্ধ’ গল্পে।

    দাদার আরেকটি স্মৃতি ছিল পাণিহাটির রাঙাদিদুকে কেন্দ্র করে, যিনি কম বয়সে বিধবা হয়ে যাবার দরুন সংসারছাড়া হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকে সবাই নেড়ি পাগলি বলতো, তিনি দাদাকে ভালোবাসতেন আর কোলে বসিয়ে নানারকম আজগুবি গল্প শোনাতেন। মামার বাড়ির ব্যানার্জি পাড়া রোডে যখন যার বাড়িতে ইচ্ছে খেতেন রাঙাদিদু, দাওয়ায় শুতেন, মাথা গোলমাল হলেও সমাদৃত ছিলেন, পাড়ায় পাড়ায় সারাদিন টোটো করে বেড়াতেন। উনি ছিলেন দাদামশায়ের কোনো ভাইয়ের স্ত্রী। নাপিত দেখলেই বেলতেন, ‘এই হারু, আমার মাথাটা ন্যাড়া করে দে দিকিনি’।

    দাদার কাছে একটা খেলা শিখেছিলুম যা আমি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” স্মৃতিকথায় লিখেছি। একটা নীল মাছিকে মেরে, সুতোর একদিকে বেঁধে দাদা ছুঁড়ে দিতো গোপাল হালুইকরের জিলিপির পাহাড়ের ওপরে, সেই পাহাড়ে ভিমরুলের ঝাঁক। একটা ভিমরুল মাছিটাকে কামড়ে ধরে মিষ্টির বদলে ননভেজ খাওয়াই পছন্দ করতো, মুখ থেকে ছাড়তে চাইতো না, পেট না ভরা পর্যন্ত। দাদা অন্য প্রান্তটা ধরে ঘুড়ির মতন ওড়াতে-ওড়াতে ইমলিতলার এগলি-সেগলি দৌড় মারতেন, পেছনে পাড়ার ছেলেরা।

    গোলা রোড দিয়ে শব গেলে শববাহকরা ‘রাম নাম সৎ হ্যায়’ বলতে বলতে যেতো, যা শোনা যেতো ইমলিতলার বাড়ি থেকে। মৃতের আত্মীয় শবের সামনে হাঁটতে-হাঁটতে খইয়ের সঙ্গে তামার পয়সা ছেটাতো। শববাহকদের কন্ঠস্বর শুনতে পেলে দাদা বলতেন, “চল চল পয়সা লুটবো”। আমি আর মেজদা দাদার পেছন -পেছন দৌড়োতুম, আর পয়সা কুড়োতে-কুড়োতে ‘রাম নাম সৎ হ্যায়’ ধ্বনি তুলতুম। দাদা পয়সা জমিয়ে আলুকাবলি খেতেন বা সিনেমা দেখতেন, একেবারে সামনের শ্রেণির, যাকে তখন বলা হতো ছওআনিয়া, বা তখনকার চব্বিশ পয়সা। সিনেমা দেখা আমাদের বাড়িতে নিষিদ্ধ ছিল, বড়োজ্যাঠা আর ঠাকুমা পছন্দ করতেন না, সিনেমাকে বলতেন লোচ্চাদের তামাসবিনি। বয়স্করা লক্ষ্য রাখতেন যে তিনটে থেকে ছ’টা টানা তিন ঘণ্টা ছোটোরা কেউ বাড়িতে অনুপস্হিত থাকছে কিনা। দাদা একটা উপায় বের করেছিলেন ; একদিন প্রথমার্ধ উনি দেখে গেটপাসটা আমায় দিতেন দ্বিতীয়ার্ধ দেখার জন্য, পরের দিন আমি প্রধমার্ধ দেখতুম আর দাদা দ্বিতীয়ার্ধ। মরনিং শো দেখতে গেলে বাড়িতে কেউ টের পেতেন না। অমন একটা মরনিং শোতে দাদা আমাকে ‘উইজার্ড অফ অজ’ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

    দাদার জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগণার পাণিহাটিতে, মায়ের মামার বাড়িতে, ব্যানার্জি পাড়া রোডে, এখন রাস্তাটার অন্য কোনো নাম হয়েছে ; দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় কম বয়সে মারা যাওয়ায় দিদিমা ছেলে মেয়েদের নিয়ে বড়ো ভাই অনাদিনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে আশ্রয় পান। মায়ের বাপের বাড়ি, যার নাম “নিলামবাটি”, তা ছিল অনাদিনাথের বাড়ির উল্টোদিকে। পাণিহাটিতে দাদার নাম রাখা হয়েছিল বাসুদেব, সেখানে সকলে বাসু নামেই চেনে দাদাকে, মা-ও দাদাকে বাসু নামে ডাকতেন। পাটনায় আসার পর, জাঠতুতো দিদিরা দাদাকে মিনু বলে আদর করা আরম্ভ করেন, দাদা মীনরাশির জাতক বলে। সমীর নাম রাখা হয়েছিল জন্মছকে ‘স’ উঠেছিল বলে। জাঠতুতো দিদিদের বিয়ে হয়ে গেলে ওনাদের বাড়িতে ভাইফোঁটা করতে যেতুম দুজনে, মেজদা যেতো না। ইমলিতলার বাড়িতে ভাইফোঁটা হতো তার আগের দিন, প্রতিপদে, সাবর্ণ চৌধুরীদের পারিবারিক সংস্কার রক্ষার খাতিরে।

    ইমলিতলায় দাদার জিভে বাংলা আর পাটনাইয়া হিন্দির খিচুড়ি তৈরি হচ্ছিল বলে দাদাকে ভর্তি করা হয় বাঙালি পরিবার পরিচালিত মহাকালী পাঠশালায়। দাদার জন্ম যদিও ১৭ আগস্ট, কিন্তু ভর্তির সময়ে পুরুত মশায় সতীশ ঘোষালের উপদেশে দাদার জন্ম তারিখ পাল্টে করে দেয়া হয়েছিল ১লা নভেম্বর, ১৯৩৩। ইমলিতলার বাড়িতে জন্মদিন পালনের কোনো ব্যাপার ছিল না ; দাদার জন্মদিন পালনের কোনো ঘটনা দরিয়াপুরে চলে যাবার পরও ঘটেনি। জন্মদিন যে উৎসব হিসেবে পালন করা হয় সেই সাস্কৃতিক স্তরে ছিল না আমাদের একান্নবর্তী পরিবার।

    মহাকালী পাঠশালায় পড়া শেষ করলে দাদাকে ভর্তি করা হয় পাটনা কলেজিয়েট স্কুলে। এই স্কুলে দাদা পাটনার খ্যাতনামা বাঙালি পরিবারের ছেলেদের পান, যেমন বিমানবিহারী মজুমদার, গোপাল হালদারের ভাই রঙিন হালদার, প্রভাতী পত্রিকার সম্পাদক মানিক ভট্টাচার্য, জহর রায়ের বাবা সতু রায়, নিরঞ্জন সেনগুপ্ত প্রমুখ। দাদার আগ্রহে একটা নাটকের দল গড়ে ওঠে, আর বন্ধুরা মিলে বড়দির শশুরের বিশাল জমিদারবাড়ির দালানে নাটক অনুষ্ঠান করতেন। দাদার পাটনার বন্ধুরা কিন্তু আমাদের ইমলিতলার বাড়িতে আসতেন না, ছোটোলোকদের পাড়া বলে।

    ম্যাট্রিকুলেশানের পর দাদাকে কলকাতায় পড়তে পাঠাবার নির্ণয় নেন বাবা-মা, তার কারণ আমার মেজদা ( যাকে বড়োজেঠা এক বেশ্যার কাছ থেকে দেড়শো টাকায় কিনেছিলেন ) নিজের জন্মের কথা কোনো সূত্রে জানার পর, যাকে বলে “খারাপ হয়ে যাওয়া” তাই হয়ে যাচ্ছিল, বাংলায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় মায়ের মামার বাড়িতে। মামারা দাদাকে সিটি কলেজে আই এস সি পড়ার জন্য ভর্তি করে দেন। মামার বাড়িতে ছোটোমামা ছিলেন মার্কসবাদে আকৃষ্ট, প্রচুর বই ছিল ওনার সংগ্রহে, নিজের সংগ্রহের শতাধিক বই দাদাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া ওই বাড়িতে বৈঠকখানায় ইংরেজি ও বাংলা বইয়ের একটি গ্রন্হাগার ছিল, পুরোনো আমলের পত্রিকা ছিল, দেয়ালে টাঙানো ছিল উনিশ শতকের মনীষীদের ছবি, সেই ঘরে সন্ধ্যাবেলায় পাণিহাটির বয়স্করা একত্রিত হতেন দার্শনিক তর্কাতর্কির জন্য ।

    মামার বাড়ির শিক্ষা আর পারিবারিক সংস্কৃতি দাদার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পেরেছিল। দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের কারণ আবিষ্কারকারী স্যার রোনাল্ড রসের সহগবেষক, গ্রেট ব্রিটেনের সপ্তম এডোয়ার্ডের স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। পাণিহাটির কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন দাদামশায়। তাঁর নামে পাণিহাটিতে একটি রাস্তা আছে। ব্যাঙ্কে তাঁর ফোটো ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত টাঙানো ছিল, পাণিহাটির মিলিউ পালটে যাবার পর ছবিটি ফেলে দেয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরীর পরিচয় ছিল, এবং সেই সূত্রেই মা-বাবার বিয়ে। মায়ের নাম অমিতা। দাদা আর আমি দুই ভাই, নিজেদের কোনো বোন নেই।

    মায়ের মামার বাড়ির শৃঙ্খলা দাদার ইমলিতলা চরিত্রের সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না। তাছাড়া সেসময়ে ইলেকট্রিক ট্রেন আরম্ভ হয়নি, প্যাসেঞ্জার ট্রেনে শেয়ালদায় আসা-যাওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় ছিল না। শেয়ালদা স্টেশানও হাওড়া স্টেশানের তুলনায় পুর্বপাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুতে ছিল ছয়লাপ, প্রতিদিন যাদের দুরবস্হা দেখতে-দেখতে দাদার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। তাছাড়া ঠাকুমার পছন্দ ছিল না যে দাদা পাণিহাটিতে মায়ের মামার বাড়িতে থাকুন। দাদা চলে এলেন উত্তরপাড়ায় ঠাকুমার বারো ঘর চার সিঁড়ির খণ্ডহর সাবর্ণ ভিলায়, বেছে নিলেন চিলেকোঠার ঘর, ঠাকুমাকে এড়িয়ে এই ঘরে সিগারেট ফোঁকা যেত। পাণিহাটিতে রাতে বাড়ি ফিরতেই হতো, তার কারণ মামারা কলকাতায় চাকরি করতে যেতেন আর ফিরতেন, তা যতো রাতই হোক, ট্রেন পাইনি বলে ওজর দেবার সুযোগ ছিল না। ঠাকুমা একা থাকতেন, তাই রাতে কলকাতায় থেকে গেলে তাঁকে যা হোক কোনো গল্প শুনিয়ে দিতে পারতেন দাদা। উত্তরপাড়ার বাড়িতে আদ্যিকালের একটা পেল্লাই বিছানা দাদাকে বরাদ্দ করেছিলেন ঠাকুমা, যার পায়াগুলো ছিল বাঘের পায়ের মতন।

    উত্তরপাড়ার বাড়ি থেকে প্রতিবেশী অমিত মৈত্র নামে একজনের সঙ্গে দাদা “লেখা’ নামে একটা পত্রিকা আরম্ভ করেন। সিটি কলেজের দেয়াল পত্রিকায় একজনের কবিতা প্রশংসনীয় মনে হওয়ায় দাদা আর্টস বিভাগে গিয়ে সেই ছাত্রটির সঙ্গে পরিচয় করেন। ছাত্রটির নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। দাদার সঙ্গে এই সময়ে পরিচয় হলো আনন্দ বাগচি, দীপক মজুমদার, শংকর চট্টোপাধ্যায়, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, শিবশম্ভু পাল, ফণীভূষণ আচার্য প্রমুখের, যাঁরা প্রায়ই ছুটির দিনে দাদার চিলেকোঠায় আড্ডা মারতে আসতেন। এনারা কেউ না কেউ দাদার জন্যে খাবার আনতেন ছুটির দিনে। কলেজের দিনে দাদা কলকাতার পাইস হোটেলে খেতেন, সাধারণত কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের পাইস হোটেলে বা শ্যামবাজারের পাইস হোটেলে। “কৃত্তিবাস” পত্রিকা আমি প্রথম দেখি দীপক মজুমদারের হাতে, শ্যামবাজারের পাইস হোটেল থেকে খেয়ে দাদা আর আমি বেরিয়েছি, ওনার সঙ্গে দেখা। দাদা ওনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দ্যান প্রখ্যাত কবি আর সম্পাদক হিসেবে।

    ইমলিতলার পরিবেশ থেকে মুক্ত করার জন্য দাদাকে সিটি কলেজে পড়তে পাঠানো হলেও পিসতুতো ভাই সেন্টু ওরফে অজয় হালদার দাদাকে কলকাতার সেই পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করাতে কার্পণ্য করলেন না। পিসেমশায় থাকতেন আহিরিটোলার শরিকি বাড়িতে, নিয়মিত সোনাগাছি যেতেন আর ধেনো মদ খেতেন। সেন্টুদার সঙ্গে পরিচয় ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের, সম্ভবত কোনো মদের জমঘটে তাঁদের প্রথম আলাপ। দাদার সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় হলো। দাদার চিলেকোঠার ঘরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন আর দীপক মজুমদার গাইতেন হিন্দি ফিলমের গান। সেন্টুদা আর দীপক মজুমদারের তর্কাতর্কি হতো হিন্দি ফিলমের রেহানা, কুলদীপ নায়ার, সুরাইয়া, মধুবালার যৌনতা নিয়ে। একবার তর্কে হেরে যেতে যেতে সেন্টুদা হঠাৎ দীপক মজুমদারকে বলে ওঠেন “তুমি রেহানার ওখানে হাত দিয়ে দেখেছো নাকি !”

    ও, হ্যাঁ, দাদার সম্পর্কে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল, ভুলে যাবার আগে লিখে ফেলি। বেনারসে কাঞ্চনকুমার মুখোপাধ্যায় নকশাল আন্দোলনে যোগ দিলে ওর বন্ধু হাংরি আন্দোলনের ছবি-আঁকিয়ে অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় নকশাল আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়েছিল। এই ঘটনাটা নেপাল থেকে আমরা ফেরার পর। নেপাল থেকে অনিল আর করুণা একটা করে ‘রেড বুক’ কিনেছিল, আমিও কিনেছিলুম। সস্তায় পাওয়া যাচ্ছিল বলে ওরা দুজনে চিনে তৈরি লাল টকটকে মাও সে তুঙ কোট কিনেছিল। আমি আর দাদা কিনিনি, আমার রঙচঙে পোশাকের অ্যালার্জি আছে, আর বিহারের জাতপাতে আক্রান্ত মার্কসবাদ দেখে দাদা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। বেনারসে অনিলের বাঙালিটোলার স্টুডিওতে কিংবা কাঞ্চনের বাড়ির গ্যারাজের ওপরের ঘরে বেনারসের নকশালদের জমায়েত হতো। বেনারসের বাঙালিটোলার পেইনটারদের সঙ্গে অ্যালেন গিন্সবার্গ আর পিটার অরলভস্কির পরিচয় হয়েছিল।

    একদিন একজন সাংবাদিকের কাছে ওরা জানতে পারলো যে অনিলের স্টুডিওয় পুলিসের রেইড হতে পারে আর হয়তো ওদের গ্রেপ্তার করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। কলকাতায় নিয়ে যাওয়া মানেই মাঝপথে কোতল। অনিল দিল্লি পাড়ি মারলো আর আমেরিকান বন্ধুনির সঙ্গে পালালো আমেরিকা, কাঞ্চনও আমেরিকা চলে গেল। করুণার বউ-ছেলে ছিল, ও এসে আমাদের পাটনার বাড়িতে লুকোলো। দাদার পরামর্শে করুণা চুল-দাড়ি কামিয়ে প্রায় ন্যাড়া হয়ে ধুতি-গেঞ্জিতে বিহারি সীতেশবাবু হয়ে গেল, আর দাদা করুণার জন্য একটা রঙিন মাছের দোকান খুলে দিলেন। মাসখানেক বাদে বউ-ছেলেকে পাটনায় ডেকে পাঠালো করুণা। বছর দুয়েক পরে অনিল দিল্লি ফিরলে করুণাও চলে গেল দিল্লি ; কাঞ্চন ফিরল কলকাতায়। নকশাল আন্দোলনের দরুণ বেনারসের বিশাল বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয় কাঞ্চনকে। অনিল আশির দশকে আইরিশ শিল্পসমালোচক জুলিয়েট রেনোল্ডসকে বিয়ে করেছিল। জুলিয়েট পরে অনিলের স্টুডিওতে গিয়েছিলেন, ওর লেখাপত্র আর পেইনটিঙ রেইডের সময় নষ্ট করে দিয়েছিল পুলিস, কিছুই উদ্ধার করা যায়নি।

    ওফ হো, আরেকটা ঘটনা মনে পড়ল, এই সুযোগে বলে নিই। ১৯৬৮ সালে আমি অফিসের কাজে গিয়েছিলুম নাগপুর, সেখানে নভেম্বরের শেষে পরিচয় হল সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কয়েকদিন পরে ওকে বললুম, আপনাকে বিয়ে করার জন্য আপনাদের বাড়িতে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে। সলিলা বলেছিল, বড়ো মামার সঙ্গে। ওদের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারলুম সলিলা রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় ছিল, ড্রইংরুমে শিল্ড আর নানা মাপের কাপ। বিয়েতে ওর মত আছে দেখে দাদাকে টেলিগ্রাম করে দিয়েছিলুম আর বউদিকে একটা চিঠি লিখে দিয়েছিলুম। পাটনায় বাবাকেও টেলিগ্রাম করে দিয়েছিলুম। দাদা প্রথম ট্রেনেই চলে এলেন নাগপুর, সেসময়ে নাগপুরের প্লেন চালু হয়নি, হলেও দাদাকে চাইবাসা থেকে জামশেদপুর হয়ে কলকাতা গিয়ে নাগপুর পৌঁছোতে হতো। দাদা চক্রধরপুর থেকে সোজা পৌঁছে গিয়েছিলেন নাগপুর। সলিলার বড়োমামার সঙ্গে কথা বলে ফিরে গিয়েছিলেন। বিয়েও ঠিক হয়ে গেল ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৬৮। দাদা তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন আর বউদি, মেয়ে হনি আর দাদার শাশুড়িকে নিয়ে চলে এলেন। বাবা-মা এলেন না কেন, তখন টের পাইনি। ভেবেছিলুম প্রেমিক হিসাবে আমার কীর্তিকলাপ সম্পর্কে ওনারা রুষ্ট বলে হয়তো আসেননি। বউদিও তড়িঘড়ি চলে এসেছিলেন একই কারণে, আমার প্রেমিকত্বর সিরিজ শেষ করার জন্য। বিয়ের পর পাটনায় যাবার বদলে দাদা টিকিট কাটলো চক্রধরপুরের। চক্রধরপুর থেকে গাড়িতে চাইবাসা। চাইবাসায় গ্যাঁদাফুলে গ্যাঁদাশয্যা, খাটও এমন যে ক্যাঁচোর-ম্যাচোর আওয়াজ হয়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম করার অভিজ্ঞতা ছিল খাটখানার। কয়েক দিন পরে পাটনা গেলুম। গিয়ে জানতে পারলুম যে মেজ জ্যাঠামশায় মারা গেছেন আর ওনার অশৌচ চলছে। অশৌচের মধ্যেই বিয়ে করে ফিরলুম আর যেদিন লোক খাওয়ানো সেইদিনই বউভাত হলো। দাদা সব চেপে গিয়েছিলেন যাতে বিয়েটা বানচাল হয়ে না যায়। মা সেন্টুদার হাতে একটা চিরকুট পাঠিয়ে দাদাকে লিখেছিলেন, “সিঁদুর পরিয়ে আনলেই হবে।” মানে, মাও চাইছিলেন যাতে বিয়েটা ফসকে না যায়।

    উত্তরপাড়ায় ফিরি। দাদা বি এস সি পাশ করে জার্নালিজমে ভর্তি হয়েছিলেন। বাবা ডেকে পাঠালেন পাটনায়। বাবার দোকানে আড্ডা মারতে আসতেন বিহার সরকারের মৎস্য দপতরের বিভাগীয় প্রধান মিস্টার ভর্মা। তিনি বাবাকে বলেছিলেন দাদাকে যদি ফিশারিজ ইন্সপেক্টরের চাকরিতে ভর্তি করতে চান তাহলে ডেকে পাঠাতে। দাদা পাটনায় ফিরলে চাকরিটা পেয়ে গেলেন। তাঁর নিয়োগে একটাই অসুবিধে ছিল যে তিনি বাঁচোখে দেখতে পেতেন না। মিস্টার ভর্মার সহৃদতায় ডাক্তারি পরীক্ষার সময়ে ডাক্তারই বলে দিয়েছিল কেমন করে চোখের চেকআপটা করাতে হবে। চাকরি পাবার পর দাদার পোস্টিং হল বিভিন্ন জেলা সদরে মিষ্টিজলের মাছ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের জন্য। তারপর বিহার সরকার পাঠিয়ে দিল কোচিতে, সামুদ্রিক মাছ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের জন্য ; এই সময়ে দাদা মাছ ধরার জাহাজে বেশ কিছুকাল আরব সাগরে কাটিয়েছিলেন।

    ফেরার পর দাদার পোস্টিঙ হল চাইবাসায়। দাদার বন্ধু বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ভাগলপুরে দাদার সঙ্গে একই মেসে থাকতেন, তাঁর বিয়ে হল চাইবাসায় মধুটোলা নিবাসী সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেজ মেয়ে ডলির সঙ্গে। দাদা চাইবাসাতেই চাকরি করেন জেনে মধুটোলা বাড়ির সদস্যরা বললেন, সময় কাটাবার জন্য মাঝে-মাঝে আসতে। দাদা কবিতা আর গল্প লেখেন, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জেনে ওই বাড়ির বড়ো মেয়ে মন্টি, যাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, তিনি দাদার প্রতি আকর্ষিত হন। দাদা আর মন্টি নির্ণয় নেন যে দুজনে যেমন আছেন তেমনই থাকবেন, পরিবার ভেঙে বেরোবার প্রয়োজন নেই। এই ঘটনাটি শক্তি চট্টোপাধ্যায় “কিন্নর কিন্নরী” উপন্যাসে বিস্তারিত লিখেছেন, সেখানে দাদার নাম শম্ভু আর শক্তির নাম পার্থ।

    উত্তরপাড়ার চিলেকোঠায় দাদার যে বন্ধুরা আড্ডা মারতে যেতেন, তাঁরা এবার চাইবাসায় দাদার নিমডির কুঁড়েঘরে আড্ডা মারতে যাওয়া আরম্ভ করলেন, প্রধানত হাটে সবুজ শালপাতায় করে হাড়িয়া খাওয়া, মহুয়ার মদ খাওয়া, যা তাঁরা সকলেই প্রথমবার চাইবাসায় খেলেন, আর আসেপাশের জঙ্গলে-ঝর্ণায় ঘুরে বেড়ানো। দাদার বাড়িতে কবি-লেখকরা প্রায়ই আসেন জানতে পেরে মধুটোলার বাড়িতেও তাঁরা খাবার আমন্ত্রণ পেতেন। দাদা নিমডি টিলার ওপরে একটা চালাঘরে একা থাকতেন বলে একাকীত্ব কাটাবার জন্য কলকাতা থেকে বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে থাকার জন্য ডেকে আনলেন। শক্তি তখন “কুয়োতলা” উপন্যাস লিখছিলেন। দাদা অফিসের কাজে বাইরে গেলে শক্তিকে মধুটোলার বাড়িতে অতিথি হিসাবে রেখে যেতেন। শক্তিকে মাসের পর মাস কলকাতায় অনুপস্হিত পেয়ে একবার সুনীল আর সন্দীপন চাইবাসায় গিয়ে দ্যাখেন নিমডির চালায় দাদা নেই, ট্যুরে গেছেন, ওনারা দুজনে মধুটোলায় গিয়ে শক্তিকে দেখে অবাক, দুজনের কেউ একজন বলে ওঠেন, ‘কী রে, তুই এখানে ইস্টিশন পুঁতে ফেলেছিস !’

    কৃত্তিবাস পত্রিকার ২৫ তম সংকলনে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ‘চাইবাসা চাইবাসা’ নামে একটা ছোটো গদ্য লিখেছিলেন, বেশ ইনটারেসটিং, তুলে দিচ্ছি এখানে। “বিশ্বস্তসূত্রে এই উড়োখবর আমরা পাই যে শক্তি চাইবাসার সেন্ট্রাল জেলে রয়েছে, তছরুপের কথাই আমি শুনি। এটা শুনে, তখন আমরা ছেলেমানুষ ছিলুম বলে, আমার ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের খুব মনোকষ্ট হয়। আমি ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তির দুই বন্ধু, আমরা সেদিন রাত্রেই, সম্বলপুর প্যাসেঞ্জার ধরি। এটা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। আমি নিই হাওড়ার চেনা দোকান থেকে তিনটে খালি সোডার বোতল, চাইবাসায় এক্সচেঞ্জ করার কথা ভেবে, এটা সুনীলও যুক্তিযুক্ত মনে করেছিল। সুনীল একটা ক্যাপস্টানের টিন নিয়েছিল, যা গরাদের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে ডোরাকাটা শক্তির হাতে ওর দেবার ইচ্ছে ছিল। টিনটা আমরা ট্রেনে খুলিনি। মাইরি। ”

    “চাইবাসায় গিয়ে এবারও সমীরকে পেলুম না, ট্যুরে। কিন্তু শক্তি ? পরদিন জেলে গিয়ে খবর নিলেই হবে এরকম ভেবে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে টিনটা ও ওপরে তিনটে সোডার বোতল রেখে, ডাকবাংলো ছেড়ে আমরা বেরিয়ে পড়লুম নদীর দিকে, চাইবাসার শ্মশানের দিকে শীতের রাত্তিরে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলুম গান গাইতে গাইতে। মধুটোলার কাছে ফটাস করে একটা বাড়ির দরোজা খুলে গেল, ‘এতো রাত্তিরে চাইবাসায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় কে রে’, বলতে বলতে শক্তি বেরিয়ে এলো। এখানে হঠাৎই মনে পড়ল, এই মধুটোলার রাস্তাতেই, ‘সাইকেল কি সাঁতার কেউ কখনো ভোলে ভাই’, বলে তড়াক করে সাইকেলে লাফিয়ে উঠে ঐ বাড়ির পাঁচ বোন ও তিন বন্ধুর সামনে সুনীল উলটে দড়াম করে রাস্তায় পড়ে যায়। যাই হোক সেদিন রাতে, নভেলে-পড়া যায় এমন মধ্যবিত্ত প্রবাসী বাঙালির লাল টালির বাড়ির মধ্যে বসে আমরা দুজনে আধ ঘণ্টার মধ্যে বুঝতে পারি যে শক্তি জেলে নেই। ক্যাপ্সটেনের টিন খুলতে আমরা ডাকবাংলোয় ফিরে যাই। ঐ বাড়ির দুটি মেয়ে সমীরের ও শক্তির বান্ধবী ( একজন পরে সমীরের স্ত্রী ) এটা বুঝতে আমাদের দু’দিন সময় লেগে যায়। এটা বুঝে, মধুটোলায় ওরা সান্ধ্য চা-পান করতে গেলে আমি ও সুনীল তখন সোডার বোতলগুলি ( তখন ভর্তি ) একের পর এক জ্বলন্ত হ্যারিকেন লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারি। সমীরের লেপ তোশক ও মশারিতে আগুন লেগে যায়। আমরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে রো-রো নদীর ওপারে গিয়ে আমাদের জীবনের প্রথম আদিবাসী রমণীর কাছে জীবনের প্রথম মহুয়া খাই। তার শারীরিক সৌন্দর্য ছিল। ”

    “চাইবাসা থেকে ফিরেই আমি মায়ের কাছে কাশীতে চলে গেলুম। সম্ভবত ঐ একই ট্রেনে, ডুন এক্সপ্রেসে, সুনীলের চিঠিটাও আমার সঙ্গে যায়, কারণ হিসেবমতো ১৪/১/৬০ তারিখে আমি সেবার কাশী পৌঁছেছিলুম। যাই হোক, ঐ চাইবাসা পরে আমাদের তিনজনের লেখাতেই বেশ একটা ভূমিকা নিয়েছিল বলতে হবে। আমি সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী নামে গল্প লিখি, সুনীল যুবক যুবতীরা ও অন্যান্য। শক্তির লেখার এক অংশে চাইবাসা হাহাকারের মতো ছড়িয়ে রয়েছে।”

    “চাইবাসা থেকে অদূরে পাহাড়ের ওপর হেসাডির ডাকবাংলোয় বড়ো প্যাঁচে পড়েই কবি তথা লেখক হিসেবে আমাদের ডি এফ ও শ্রীকমলাকান্ত উপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। প্রমাণস্বরূপ শক্তি ওঁর সামনে একটা ছোটো কবিতা রচনা করে, যার মধ্যে ‘ছুটে কে তুলিলে শালবন বাহুবন্ধন চারিধারে’ এরকম একটা লাইন ছিল। বস্তুত ছোটো ও বড়ো দলে চাইবাসায় আমাদের একাধিকবার যেতে হয়েছিল। শক্তি বারংবার গেছে। চাইবাসায় যাওয়ার জের আমাদের পরবর্তী জীবনেও বেশ কয়েক বছর ধরে চলে। ওখানে না গেলে আমরা হয়তো এরকম হতুম না। কী হতুম ? রাজা হতুম, আবার কী। রাজা হতুম কথার কথা। এতটা প্যাঁচে পড়তুম না। ”

    শক্তি মধুটোলার বাড়ির মেয়ে শীলার প্রেমে পড়েন এবং তাকে শোনাবার জন্য অজস্র কবিতা লেখা আরম্ভ করেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই বাড়ির কিশোর সন্তুর চরিত্রটিকে নিজের কাহিনিতে ভূমিকা দিলেন, যে কাহিনিগুলোয় তিনি নিজেই কাকাবাবু। সুনীল চাইবাসাকে কেন্দ্র করে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে লিখলেন “অরণ্যের দিনরাত্রি”, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখলেন “জঙ্গলের দিনরাত্রি”, শক্তিও শীলার সঙ্গে প্রেম এবং চাইবাসা-হেসাডি-বেতলায় কাটানো অভিজ্ঞতা এনেছেন ‘‘কিন্নর কিন্নরী” উপন্যাসে।

    চাইবাসার স্মৃতি নিয়ে দাদাকে একটা চিঠি ১৯৬৮ সালে লিখেছিলেন সন্দীপন, নসট্যালজিক, বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার অনুশোচনারও যেন আভাস একচিলতে।


     

    ১৬/৯ বরানগর

    ৭১ কাশীনাথ দত্ত রোড, দোতলা

    কলকাতা - ৩৬

    প্রিয় সমীর,

    অনেকদিন আগেই ঠিকানা লিখে ফেলেছিলুম, আমার মেয়ে জুলেখা টিকিটটা ছিঁড়ে নিয়েছিল। অর্থাৎ আমার মেয়ে বেঁচে আছে। ক’দিন আগে গিয়েছিলুম সুনীলের কাছে -- মদ্যপানজাত মারামারির ফলে প্রহৃত ও গুরুতর আহত হয়ে বাড়িতে পড়ে আছে জেনে যাই, সন্ধের দিকে রিক্সা করে একটি ও.টি. পাঁইট এনে দুজনে খেলুম, তোমাকে নিয়ে কথা বলছি দেখলুম। সুনীল তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছে বলল ও তোমার ঠিকানা আমি চেয়ে নিলুম। স্বাতী দিল্লিতে।

    তোমাদের একটি ছেলে হয়েছে শুনলুম। তুমি অনেকদিন কলকাতা আসোনি। চাইবাসার কথা মনে পড়লে তোমার কথা মনে পড়ে। তুমি সৎ-ব্যবহার করেছিলে যা মনে পড়ে। রো-রো নদীর ধারে বসে শ্মশানে গল্প মনে পড়ে। নিমডির বাড়ির উঠোনে তেল মেখে হাঁড়িয়া-খাওয়া মনে পড়ে। বেলাদের বাড়ি মনে পড়ে। মধুটোলা, বাজারের দোকানে চা ও সিঙাড়া -- কানপুরে অস্ট্রেলিয়া হেরে গেছে তোমাদের খবর দিলুম -- হেসাডিতে এসে তুমি এক রাত্তির কাটিয়ে গিয়ে আমাদের ঋণমুক্ত করে গেলে -- এসব ও অন্যান্য মনে পড়ে।

    চাইবাসা আমার মনে ইমপ্রেশান রেখে গেছে যা মোছার নয় -- তখন সরল ও ছেলেমানুষ ছিলুম। আজো তাই আছি। চাইবাসা ও তোমাকে একসঙ্গে মনে পড়ে।

    ভেবে দ্যাখো, এ-রকম হওয়া সম্ভব, এ-রকম মনে পড়া। বয়স ৩৫ হল, আজো ৩০-দিকে গড়াচ্ছি -- ২৫এর দিকে। আমার হাংরি জেনারেশান-ফেশান মনে পড়ে না। তোমাকে ও চাইবাসাকে আজও মনে পড়ে।

    তুমি অ্যাকসেপ্ট করো বা না করো আমার বাস্তবিক কিছু এসে যায় না। কাফে খালি হয়ে গেলেই আমার মাথাও খালি হয়ে যায় না।

    শুভেচ্ছাসহ

    সন্দীপন

    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের এই চিঠির পাশাপাশি দেবী রায়কে হাংরি বুলেটিনে ছাপার জন্য পাণ্ডুলিপি পাঠাবার সময়ে ৯ জানুয়ারি ১৯৬৩ তারিখে যে চিঠি উনি লিখেছিলেন তা পড়লে পাঠক বেশি আনন্দ পাবেন বলে মনে হয় :-

    প্রিয় হারাধনবাবু,

    হাংগরি জেনারেশনের জন্য লেখা পাঠালাম। প্লট, কনটেন্ট, ক্র্যাফ্ট -- এসব বিষয়ে ডেফিনিশন চেয়েছেন, আপাতত অন্য কতকগুলো ডেফিনিশন পাঠালাম, ওগুলো পরে লিখব। প্রকাশযোগ্য কিনা দেখুন।

    ছাপলে সবকটি এক সঙ্গে ছাপতে হবে --- নইলে খাপছাড়া লাগবে। ছাপার ভুল যেন বেশি না থাকে। দরকার করলে অনুগ্রহপূর্বক একটা ফ্রেশ কপি করে প্রেসে দেবেন।

    অমৃত-তে আমার বইয়ের যে-বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছে, দেখেছেন ! নইলে পাবলিশার-এর কাছে গিয়ে তার একটা কাটিং পাঠাবার ব্যবস্হা করেন তো খুশী হই। ওই বিজ্ঞাপনটা দেশে বেরোবার কথা আছে -- যদি বেরোয়, তার প্রুফটা কাইণ্ডলি দেখে নেবেন। আনন্দবাজারে কোনো লেখকদের বিবৃতি বেরিয়েছিল নাকি ? তাহলে তারও একটা কাটিং পাঠাবেন।

    সামনের মাসে বাড়ি পাল্টাব। আরো এক মাস থাকবো না ততদিন। সহজে যাব না। শরীর ভালো। ‘ছোটোগল্পে’ আবার লেখা দিতে পারলাম না, সম্ভব হলে, ক্ষমা করবেন।

    পুনশ্চ : লেখাটা প্রকাশ করার আগে আপনি ছাড়া কেউ যেন না দেখে। অনেক বাদ দিয়ে খুব নরম করে সবদিক বাঁচিয়ে লিখেছি, ভয় নেই।

    *) হাংগরি জেনারেশনের একটা সিম্বল করতে বলেছিলুম, কী হল ! পাঁচ নয়া পয়সা দাম করতে পারেন।

    **) কমাগুলো ভেবে চিন্তে দিয়েছি, ওইগুলো আসল জিনিস, যেন থাকে।

    ***) শেষের তারিখটা যেখানে আছে, সেখানে প্রকাশের তারিখ দেবেন।

    ****) ‘অভিযান’ পূরবীতে হয়েছিল তো ?

    ****) আগামী সপ্তাহে নতুন ঠিকানা পাঠাব। তার আগে চিঠি দিলে, কুমুদ বাঙলো, রুম নং ৫, টিকোর, চুনার, মির্জাপুর --- এই ঠিকানায় দেবেন। ‘আক্রমন’ বানানে কী ‘ন’ না ‘ণ’?

    ভালোবাসা নিন। সুনীলবাবুকে ( হাজরা ) প্রীতি জানাচ্ছি।

    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

    ১৯৬২ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ ও পিটার অরলভস্কিও গিয়েছিলেন চাইবাসায় দাদার নিমডির কুঁড়েঘরে, ছিলেন দিনকয়েক। ওনারা গিয়েছিলেন চাইবাসায় উপজাতিদের তৈরি হাড়িয়া আর মহুয়া মদের কথা শুনে। দাদা ওনাদের তালশাঁস আর জাম খাইয়েছিলেন। ওনারা ওগুলোকেই ভেবেছিলেন মাদক। জাম খেয়ে জিভ বেগুনি হয়ে গিয়েছিল বলে আশঙ্কিত ছিলেন। পরে সন্ধ্যায় ওনাদের নিয়ে হাটে গিয়ে হাড়িয়া খাওয়ান দাদা আর দাদার ড্রাইভার গুলাব সিংকে দিয়ে সদ্য চোলাইকরা গরম-গরম মহুয়ার মদ আনিয়ে খাওয়ান। গিন্সবার্গ পাটনায় আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এপ্রিল ১৯৬৩ সালে।

    ইংরেজি ভাষার ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষের স্ত্রী ডেবোরা বেকার অ্যালেন গিন্সবার্গের ভারতে থাকা নিয়ে একটা বই লিখেছেন “দি ব্লু হ্যাণ্ড” নামে ; সেই বইতে তিনি হাংরি আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছেন অথচ তিনি কোনো হাংরি আন্দোলনকারীর সঙ্গে দেখা করেননি, তাঁর বইতে তিনি ব্লার্বে লিখেছেন যে বাংলা জানেন অথচ ইনডেক্স দেখলেই টের পাওয়া যায় যে বাংলার একটিও বই-পত্রিকা-বুলেটিন তিনি পড়েননি, তিনি কলকাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গুলগল্প লিখেছেন। বলাবাহুল্য যে হাংরি আন্দোলনকে বিদেশি পাঠকের কাছে ফালতু প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। গিন্সবার্গের সঙ্গে যে হাংরি আন্দোলনকারীদের পরিচয় হয়েছিল, তাদের সঙ্গে দেখা করেননি বা তাদের উল্লেখ করেননি। সন্দীপ দত্তের লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে হাংরি আন্দোলনের পৃথক সংগ্রহ দেখারও আগ্রহ হয়নি ডেবোরা বেকারের। দাদা সেসময়ে কলকাতাতেই ছিলেন, দেখা করেননি কেন তা এক রহস্য। অথচ ইতালির গবেষক ড্যানিয়েলা লিমোনেলা কলকাতায় এসে দাদার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সন্দীপ দত্তের লাইব্রেরি থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। বিবিসির ডোমিনিক বার্নও দাদার সাক্ষাৎকার নিয়ে গিয়ে প্রচার করেছেন। ডোমিনিককে দাদা বলেছিলেন “আমি এক হাজার বছর বাঁচবো”।

    দাদা মধুটোলার বাড়ির সেজ মেয়ে বেলাকে বিয়ে করেন। বরযাত্রী হিসাবে কলকাতা থেকে এসেছিলেন উত্তরপাড়ার চিলেকোঠার কবি-বন্ধুরা। বিয়ের পর দাদা নিমডি টিলার চালাঘর ছেড়ে রোরো নদীর ধারে একটা বাড়ি ভাড়া করেছিলেন। সেই বাড়িতে সন্তোষকুমার ঘোষ এবং আরও অনেকে গিয়েছিলেন। কলকাতার কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এক্সকারশানে যাবার আগে দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন আর দাদা তাদের থাকার ব্যবস্হা করতেন। হাড়িয়া আর মহুয়ার মদের কথা শুনে অচেনা তরুণ কবি-লেখকরাও পৌঁছে যেতেন।

    একদিন পাটনায় আমি অফিস যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিলুম, বাবা ডেকে পাঠিয়ে বললেন, মিনু একটা মেয়েকে বিয়ে করবে বলছে, তুই দেখেছিস ? আমি মধুটোলার বাড়িতে বারকয়েক গেলেও কাউকে তেমন লক্ষ্য করিনি ; মা মধুটোলার বাড়ি গিয়েছিলেন, বললেন যে উনি মেয়েটিকে দেখেছেন, ভালো সেলাই-ফোঁড়াই, রান্নাবান্নার কাজ জানে। দাদা দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা-মা’র সামনে, আমাকে বললেন, চারপাঁচ দিনের ছুটি নিয়ে নে। বরযাত্রীদের জন্য সেনটোলায় একটা বাড়িতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্হা হয়েছিল। বিয়ের পর দাদার বন্ধুদের আমরা জিপে করে জামশেদপুর স্টেশান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলুম, তখনও ওনারা সিল্কের পাঞ্জাবি আর জমকালো ধুতিতে ।

    হাংরি আন্দোলনে সবাইকে জেরা করেছিল ইন্সপেক্টার অনিল ব্যানার্জি, নকশাল আন্দোলনের সময়ে যাঁর বেশ নামডাক হয়েছিল, কিন্তু দাদাকে আর আমাকে জেরা করে একটা ইনভেসটিগেটিং বোর্ড। পুলিশ কমিশনার পি সি সেনের ঘরে কমিশনার ছাড়াও উপস্হিত ছিলেন ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার দেবী রায়, যাঁর ধারণা ছিল হারাধন ধাড়া তাঁকে অপমান করার জন্যই দেবী রায় ছদ্মনাম নিয়েছেন, আর ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লিগাল রিমেমব্রানসার, চব্বিশ পরগণার ডিসট্রিক্ট ম্যাজিসট্রেট, স্বরাষ্ট্র দপতরের আধিকারিক, ফোর্ট উইলিয়ামের মিলিটারি অফিসার। বোঝা যাচ্ছিল যে আমাদের দুজনের বিরুদ্ধে বিশেষ করে অভিযোগ এনেছেন কলকাতার তদানীন্তন এলিটরা, যাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য আবু সয়ীদ আইয়ুব, সন্তোষকুমার ঘোষ এবং সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র মালিক। স্বরাষ্ট্র দপতরের আধিকারিক বোধহয় জানতেন না যে হাংরি বুলেটিন বেরোয় ফালি কাগজে, তাই জিগ্যেস করেছিলেন, “আন্দোলন চালাবার জন্য কোথা থেকে টাকা পান?” ফালি কাগজ কিনতে আর ছাপাতে পঞ্চাশ টাকা লাগে শুনে পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন “আপনারা সাহিত্য করছেন না দাঁতের মাজন বিক্রি করছেন। ”

    হাংরি আন্দোলনে বন্ধুদের গোলমেলে ভূমিকার পর দাদা তাঁদের সঙ্গে সাহিত্যিক যোগাযোগ প্রায় ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। তাঁর লেখালিখির প্রথম পর্ব বলতে গেলে মামলার পর শেষ হয়ে যায়। পড়াশুনায় একাগ্র হন, পাটনা থেকে ইংরেজি বইপত্র নিয়ে যেতেন। বন্ধুরা কিন্তু কলকাতা থেকে পালাবার জন্য দাদার পোস্টিঙের জায়গাগুলোয় যেতেন, মজফফরপুর, দ্বারভাঙ্গা, ধানবাদ, দুমকা, ডালটনগঞ্জ ইত্যাদি জায়গায়। আমি ডেভিড গারসিয়া নামে একজন হিপি ও সুবো আচার্য আর সুবিমল বসাককে দুমকায় নিয়ে গিয়েছিলুম। দুমকার বিশাল বিহারি টাইপ বাড়িতে পায়খানা ছিল বেশ দূরে, আর পোশাক খুলে টাঁঙাতে হতো সামনের একটা কাঁঠাল গাছের ঝুলন্ত এঁচোড়ে, পায়খানায় দরোজা ছিল না, গাছটা আড়ালের কাজ করতো। তরুণরা যাতে তাঁর বাসায় দলবেঁধে যায়, দাদা একবার বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন। তাঁর লেখালিখির দ্বিতীয় পর্ব আরম্ভ হয় অবসরের পর কলকাতায় নিজের বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে পাকাপাকি থাকতে এসে, যখন ‘হাওয়া-৪৯’ পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করলেন।

    “কালিমাটি “ পত্রিকার ( ৯৩ নং ) জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে দাদাকে প্রশ্ন করেছিলুম, “তোমার কলেজজীবনের সময় থেকে দীপক মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শংকর চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, বিমল রায়চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষকুমার ঘোষ, দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমুখ পাটনা, উত্তরপাড়া, চাইবাসা, ধানবাদ, ভাগলপুর, দ্বারভাঙ্গা, মজফফরপুর, দুমকা ডালটনগঞ্জ ইত্যাদি বাসায় নিয়মিত যেতেন। তাঁদের স্মৃতিচারণামূলক লেখায় তোমার উপস্হিতির অভাব দেখা যায়। তা কি তুমি দীর্ঘ দিন বাইরে ছিলে বলে ? নাকি হাংরি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলে বলে ? অথবা তোমার ট্রাইবাল ইন্সটিংক্ট নেই বলে ?”

    উত্তরে দাদা বলেছিলেন, “স্মৃতিচারণায় না থাকা স্বাভাবিক, কেননা অনেক তথ্য ও সত্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে, নানা ধরণের পার্থিব ভীতি তাঁদের মনে কাজ করে, হিসেব করে লেখেন, বাদ দেওয়াকেই সহজ উপায় বলে মনে করেন। আবার হয়তো দীর্ঘ দিন বাইরে থেকেছি, কলকাতার কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারিনি। হাংরি আন্দোলন বা অধুনান্তিক চিন্তাভাবনা বা কোনো নতুন ধারণা আধুনিকতামনস্ক বন্ধুদের কাছে একটি বিশাল অন্তরায়। তাছাড়া, তাঁরা অনুগামী গড়ে তুলতে অধিক মনোযোগী। তাঁদের বেশিরভাগকে আবিষ্কারকের ভূমিকায় দেখি না, সংযোজনমনস্ক নয়। ”

    লেখক-কবির কাজ সম্পর্কে দাদা বলেছিলেন, “চিন্তার মাধ্যমে ভাব ও ভাষার সামঞ্জস্য গড়া, প্রকাশময়তার সম্প্রসারণ ও ব্যাপ্তি ঘটানো, যার ফলে পূর্ব অবস্হান থেকে ভাষা আরও সমৃদ্ধ হয়ে নবাঞ্চলের সংযোজন করে নতুন প্রজন্মের ভাষা হয়ে উঠবে, সম্প্রসারণ মানেই তো অতিক্রম, আর কবি ও লেখকের প্রধান দায়বদ্ধতা ভাষার প্রতি, কেননা ভাষাকে উত্তরোত্তর সমাজের আরও যোগ্য করে তোলা। ভাষা বদলে গেলে সামাজিক প্রক্রিয়া স্বতঃপ্রভাবিত হয়। উনিশ শতকে যেভাবে প্রভাবিত হতো আজ আর সেভাবে সম্ভব নয়। বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখেরা নিজেদের লেখালিখির মাধ্যমে আইনকানুনকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন, আজ যেমন অরুন্ধতী রায়কে দেখা যায় মেধা পাটকরের সঙ্গে আন্দোলন করছেন, নর্মদা বাঁধের উচ্চতা হ্রাস এবং সংলগ্ন জনবসতিগুলোর পুনর্বাসন সম্পর্কে, তাঁদের আন্দোলনের ফলে সমাজ রাষ্ট্র প্রভাবিত হয়েছে, আন্দোলন অনেকটা সফলতা পেয়েছে। মুশকিল এই যে, আজ রাষ্ট্র স্বয়ং প্রতিবাদীর ভূমিকা নেয়। যার ফলে কবি-লেখকের প্রতিবাদী ভূমিকাকে হজম করে নেয় বা বানচাল রাখে। ইনটারনেট আর ব্লগ ব্যবহার আজ অন্যতম উপায়, এবং কবি-লেখকরা আজ ঠিক তাই করছেন। আরেকটা কথা, বাংলা ভাষা ক্রিয়াভিত্তিক ভাষা, প্রত্যেক শব্দের একাধিক অর্থ। কেননা, ব্যক্তি, দাম্পত্য, সমূহ সবই সেই অর্থময়তার পরিসরে অন্তর্ভুক্ত, যেকারণে শব্দগুলির অর্থময়তার বীজমন্ত্রে যথেচ্ছ সম্প্রসারণের খোলা-সম্ভাবনা। মনুষ্যসমাজ বা মানবপ্রজাতি টিকে আছে তার চিন্তাচেতনার ও ভাষার উত্তরোত্তর সম্প্রসারণের মাধ্যমে। ”

    দাদার লেখায় পরিসরের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছিলেন অরবিন্দ প্রধান তাঁর “পরিসরের ভিন্ন মন্তাজ : সমীর রায়চৌধুরীর ছোটোগল্প” ( কালিমাটি, নং ৯৩ ) প্রবন্ধে। পরিসরের গুরুত্বের কারণেই হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরোধীতা দেখা দিয়েছিল। দাদা দেখিয়ে ছিলেন যে এটি একটি দার্শনিক প্রতর্ক। কৃত্তিবাস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কতৃক ইতিহাসকে একরৈখিক অনুমান করার জন্য গলদটা গড়ে উঠেছিল। ভুলটা ঘটেছিল স্পেস বা ভাবনা পরিসরকে গুরুত্বহীন মনে করে, টাইম বা ঘটনার অনুক্রমকে অতিগুরুত্বপূর্ণ মনে করার ফলে। সময়কে একটিমাত্র রেখা বরাবর এগিয়ে যাবার ভাবকল্পনাটি, যিনি ভাবছেন তাঁর ইচ্ছানুযায়ী, বহু ঘটনাকে, যা অন্যান্য দিকে চলে গেছে, বাদ দেবার অনুমিত নকশা গড়ে ফ্যালে। ফলে জসীমউদ্দিন বাদ যান, নজরুল বাদ যান। মাইলফলক কেবল একটা রাস্তাতেই থাকে না। সব রাস্তাতেই থাকে। তাবৎ মাইলফলক বরাবর একটা রেখা টানা যায় না। শ্রীরামপুরের প্রটেস্ট্যান্ট ইংরেজরা একটিমাত্র রেখা বরাবর লাইনগুলোকে কল্পনা করতে শিখিয়েছিল, যার ফলে বহু মাইলফলক বাদ যেতো। দাদা এটা প্রমাণ করার জন্য প্রথমে ইংরেজিতে সম্পাদনা ও প্রকাশ করলেন “পোস্টমডার্ন বাংলা পোয়েট্রি” ও “পোস্টমডার্ন বাংলা শর্ট স্টোরিজ” এবং হিন্দিতে সম্পাদনা ও প্রকাশ করলেন “অধুনান্তিক বাংলা কবিতা”, যে সংকলনগুলোয় সেই মাইলফলকগুলোকে তিনি পুঁতলেন যেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক একরৈখিক পথের বাইরের।

    দাদার কাছ থেকে আমরা জানলুম যে ‘কৃত্তিবাস’ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ডিসকোর্সটি ঔপনিবেশিক নন্দনবাস্তবতা বা কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়ালিটি দ্বারা তাড়িত বলে তা টাইম কেন্দ্রিক। কিন্তু হাংরি আন্দোলনের ডিসকোর্সটি স্পেস বা স্হান বা পরিসরলব্ধ, কেননা তা উত্তরঔপনিবেশিক টানাপোড়েন উপজাত। ‘কৃত্তিবাস’ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কাউন্টার ডিসকোর্সরূপে উদ্ভূত হয়েছিল উত্তরঔপনিবেশিক পরিসরের হাংরি আন্দোলন, যে আন্দোলনটি আরম্ভ করার প্রধান উদ্যোক্তাদের অন্যতম ছিলেন দাদা। ইউরোপীয় ভাবনার ধারকবাহক হিসাবে যে নতুন ধরণের দার্শনিকতা জন্মেছিল, তাঁরা নিজেরা ছিলেন স্হানিক বা ভূমিক পরিসর থেকে উৎপাটিত ; এই যে পরিসরহীনতা, এটা একরৈখিক দর্শনে জরুরি ছিল। দাদা বললেন, হাংরি আন্দোলনের আনা পরিবর্তন-প্রয়াস হল চিন্তাতন্ত্রের, সময়তাড়িত চিন্তাতন্ত্র থেকে পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্রে ফিরে যাবার। ইংরেজরা আসার আগে প্রাকঔপনিবেশিক ভাবনা-পরিসরটি ছিল বিশেষ-বিশেষ মনন-প্রবৃত্তির এলাকা। দাদার বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিচলিত হয়েছিলেন, এবং তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় লেখা ১৯৬৬ সালের তাঁর এই সম্পাদকীয়তে, তখনও হাংরি মকদ্দমা আদালতে চলছে এবং কেস সাবজুডিস :

    “অনেকেই প্রশ্ন করছেন বলে আমরা লিখিতভাবে জানাতে বাধ্য হলুম যে হাংরি জেনারেশান নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা আন্দোলনের সঙ্গে কৃত্তিবাস সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্কিত। ঐ প্রকার কোনো আন্দোলনে আমরা বিশ্বাস করি না। কৃত্তিবাসের নামও যুক্ত করতে চাইনি কখনো। ‘হাংরি’ নামে অভিহিত কোনো-কোনো কবি কৃত্তিবাসে লেখেন, বা ভবিষ্যতে অনেকে লিখবেন, কিন্তু অন্যান্য কবিদের মতোই ব্যক্তিগতভাবে, কোনো দলের মুখপাত্র হিসেবে নয়। সংঘবদ্ধ সাহিত্যে আমরা আস্হাশীল নই। পরন্তু বাংলাদেশের যেকোনো কবির প্রতিই কৃত্তিবাসের আহ্বান। হাংরি জেনারেশানের আন্দোলন ভালো কি খারাপ আমরা জানি না। ঐ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ বা পরিনাম সম্পর্কে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। এ-পর্যন্ত ওদের প্রচারিত লিফলেটগুলিতে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি চোখে পড়েনি। নতুনত্ব প্রয়াসী সাধারণ রচনা। কিছু-কিছু হাস্যকর বালক ব্যবহারও দেখা গেছে। এছাড়া সাহিত্য-সম্পর্কহীন কয়েকটি ক্রিয়াকলাপ বিরক্তি উৎপাদন করে। পিজিন ইংরেজিতে সাহিত্য করার লোভ উনিশশো ষাট সালের পরও বাংলাদেশের একদল যুবক দেখাবেন --- আমাদের কাছে তা কল্পনাতীত ছিল। তবে ঐ আন্দোলন যদি কোনোদিন কোনো নতুন সাহিত্যরূপ দেখাতে পারে -- আমরা অবশ্যই খুশো হবো। ”

    মনে রাখা দরকার যে হাংরি আন্দোলনে দাদাও চাইবাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, আর এই মামলা চলাকালীন সম্পাদকীয়টি লিখছেন দাদার সেই বন্ধু যাঁর “একা এবং কয়েকজন” কাব্যগ্রন্হটি দাদা নিজের টাকায় “সাহিত্য প্রকাশক” নামে একটা সংস্হা খুলে ছাপিয়েছিলেন। সুনীল কেন এই সম্পাদকীয়টি লিখেছিলেন, দাদা গ্রেপ্তার হওয়া সত্বেও তা এখন কিছুটা আঁচ করা যায়। দৈনিক পত্রিকায় চাকুরি ও লেখা প্রকাশ ছাড়াও, মনে হয়, পুলিশের চাপ ছিল। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় “নতুন কৃত্তিবাস” পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় লিখেছেন যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে দিয়েছিলেন। আমার চার্জশিটের সঙ্গে সেই মুচলেকাগুলোর কপি পুলিশ দেয়নি বলে ঠিক জানি না, পুলিশ আমায় কেবল শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষের মুচলেকার কপি দিয়েছিল, সম্ভবত তারা মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিল বলে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অ্যালেন গিন্সবার্গকে লিখেছিলেন যে মোট ছাব্বিশজনকে পুলিশ জেরা করেছিল, অর্থাৎ হাংরি বুলেটিনে যাদের নাম ছিল তাদের তো জেরা করা হয়েই ছিল, দাদার সঙ্গে যাদের বন্ধুত্ব ছিল তাদেরও জেরা করা হয়েছিল, এমনকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও। উৎপলকুমার বসুকে লেকচারারের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলে অ্যালেন গিন্সবার্গের সৌজন্যে তিনি লণ্ডনে একটি স্কুলে পড়াবার চাকরি পান।

    ২ অক্টোবর ২০১৫ ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত, আবু সয়ীদ আইয়ুবকে লেখা অ্যালেন গিন্সবার্গের চিঠি দুটি থেকে ব্যাপারটা কিছুটা স্পষ্ট হবে :

    প্রথম চিঠি:-

    ৭০৪ ইস্ট ফিফথ স্ট্রিট, অ্যাপট ৫এ, নিউ ইয়র্ক

    অক্টোবর ৬, ১৯৬৪

    প্রিয় আবু সয়ীদ,

    আপনার কাছে পাঠানো আমার চিঠিটি নিতান্তই বোকার মতো উদ্ধত এবং বুদ্ধিহীন হয়ে গিয়েছে এবং আমি দুঃখিত যে, সেটি আপনাকে রীতিমতো ক্ষুব্ধ করেছে। আমার লেখায় যে বিরক্তিকর অসম্মান প্রদর্শন এবং ধৃষ্টতা ফুটে উঠেছে তার জন্য আমার চুপ করে থাকাই শোভন, যেমন আপনার কী করা উচিত নয়, এসব ব্যাপারে অযথা নাক গলিয়েছিলাম, হয়তো লেখার গুণগত মান না বুঝেই। এবং এক অগ্রজকে বকাঝকা করা। আমি ক্ষমাপ্রার্থী, সেই সঙ্গে অজুহাত হিসাবে এটাও জুড়ে দিই যে, আমি অত্যন্ত দ্রুত লিখছিলাম -- একই বিষয়ে, একই দুপুরে অনেকগুলো চিঠি --- এবং অবস্হাটি আমি যেমনটা বুঝতে পারছি, আপনি যেমন ভাবছেন, অল্পববসী লেখকদের কাছে সেটি আর-একটু বেশি আশঙ্কাজনক। সম্ভবত আমার লেখার পর, এতদিনে অবস্হাটি অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু আমি মলয়, এমনকি সুনীল গাঙ্গুলি এবং উৎপল বসুর ( শেষোক্ত দুই ব্যক্তির মনে হয় বিচক্ষণতা বেশি ) চিঠি থেকে যা বুঝতে পারছি, মলয় মানুষ হিসাবে আমার পছন্দের এবং ওর ইংরেজিদুরস্ত ম্যানিফেস্টোর প্রাণোচ্ছলতা আমার সত্যিই ভালো লাগে --- আমার মতে যেকোনো ভারতীয় ইংরেজি গদ্যের চেয়ে বেশি বুদ্ধিদীপ্ত। যদিও আমি এটা বুঝেছি যে ছেলেটি অনভিজ্ঞ, আবেগপ্রবণ এবং ওঁর ম্যানিফেস্টোগুলির ছেলেমানুষি, কিংবা বলা ভাল, সারল্যের মধ্যেই তার আবেদন

    ( আসলে ব্যাপারটি নিছকই পছন্দ, রুচি বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল, এবং নিশ্চিতভাবেই এমনতর সাহিত্যসংক্রান্ত ঘটনা নয় যার মীমাংসা করতে পুলিশের সাহায্য নিতে হবে ); পুলিশের কাণ্ডকারখানা এমনই যে কেবল মলয়ই নন, তাঁর ভাই সমীর ( তরুণ দার্শনিক ) দেবী রায় এবং আরও দুই যুবক, যাঁদের সঙ্গে আমার কখনও আলাপ হয়নি, শৈলেশ্বর এবং সুভাষ ঘোষ, এঁরা প্রত্যেকেই গ্রেপতার হয়েছিলেন। তারপর জামিনে ছাড়া পান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিসের তদন্ত, উৎপলের বয়ান অনুযায়ী, “যাঁদের গ্রেপতার করা হয়েছিল তাঁদের এর মধ্যেই চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং দোষ প্রমাণিত হলে সেটি তাঁরা খোয়াতেও পারেন। ” আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে এই “অশ্লীল সাহিত্যের ষড়যন্ত্র” ব্যাপারটায় ইন্ধন যুগিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, জনতা ও অন্যান্য বাংলা সংবাদপত্রগুলি। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের আদালতের নির্দেশমতে ‘লেডি চ্যাটার্লি’ অশ্লীল আখ্যা পাওয়ায়, আমার সংগ্রহে রাখা টাইমস অফ ইনডিয়ার একটি খবরে জানানো হয়েছে, ‘অনেক বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিকের রচনার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনতে বহু মানুষ এগিয়ে এসেছে।’ বসু লিখেছেন, ‘একটি চাকরি খোয়ালে আর-একটি জোটানো অসম্ভব।’ গ্রেপতার হওয়া পাঁচজনকে আটক রাখা হয়েছিল প্রায় দু’দিন। উৎপল বসুকে আটক করে পাঁচ ঘণ্টা জেরা করে পুলিশ। আমি বুঝতে পারছি, সুনীলকেও পুলিশ জেরা করেছে। যতদূর জানি, পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে কিনা, সেটি এখনও স্হির করা হয়নি এবং সেই সিদ্ধান্ত অনেকখানি নির্ভর করবে এই তরুণ লেখকরা অগ্রজ এবং প্রতিষ্ঠিত লেখক, কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম) এর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে সমর্থন পাবেন কিনা, তার ওপর। আমি অবশ্য প্রত্যেকের কাছেই শুনেছি, কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) এ-ব্যাপারে একেবারেই মুখ খোলেনি। এই লেখকদের রচনার গুণগত মান কেউ স্বীকার করুন বা না করুন, আপনার চিঠি থেকে যা প্রকাশিত হয়, তার চেয়ে আদত পরিস্হিতিটি কিন্তু আরও অনেক ভয়াবহ। ভারতে পুলিশি তদন্তের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার -- তার অন্তহীনতা ও কাফকিয়ান নির্মমতা -- যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, তাতে ব্যাপারটিকে আপনার মতো হালকা চালে আমি কিছুতেই দেখতে পারছি না। আপনার হয়তো মনে আছে, বেনারসে মাসের পর মাস আমায় লোক অনুসরণ করেছে, পুলিশ এসেছে, মার্কসবাদীরা হুমকি দিয়েছে, দশ দিনের মধ্যে ভারত ছাড়ো নোটিস এসেছে, অশ্লীল সাহিত্য বিলি করা ও তরুণদের নষ্ট করার ভিত্তিহীন অভিযোগে। দিল্লির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বন্ধুদের মধ্যস্হতায় এবং ভারতীয় কনস্যুলেট থেকে নিউ ইয়র্কে পাঠানো চিঠির সাহায্যে সব সামাল দেয়া গিয়েছিল। সাহিত্যক্ষেত্রেও একবার এহেন সাংঘাতিক আইনি ব্যবস্হা চালু হয়ে যাওয়ার পরও তা দ্রুত খারিজ হয়ে যাবে, এমন আত্মবিশ্বাস আমার নেই, বিশেষ করে যেখানে তরুণ অরাজনৈতিক অনভিজ্ঞ উৎসাহীরা জড়িয়ে। ‘Fuck the Bastards of Gangshalik School of Poetry’ -র মতো একটি বাক্য নিয়ে অশ্লীলতা সম্পর্কে আপনার যা বিশ্লেষণ, তার সঙ্গে আমি একেবারে সহমত নই। এটা যে কোন ‘স্কুল’ তা আমি জানিও না। কিন্তু প্যারিস কিংবা কলকাতার কাফেতে, ত্রিস্তঁ জারার পুরোনো ম্যানিফেস্টোতে এটাই চলতি সাহিত্যভাষা -- মুখের ভাষা এবং প্রকাশিত লেখাতেও। সাহিত্যে এই কায়দা, এই আবেগ, বুদ্ধিদীপ্ত হালকা বদমায়েসি, বিশ শতকের ‘গ্রন্হাগার পুড়িয়ে দাও’ চিৎকারের মতোই। আমি সত্যিই তেমন শকড হইনি, যখন ওনারা বলেছিলেন, জনসমক্ষে একজন মহিলা তাঁর স্তন অনাবৃত করে দিক। আপনার সত্যিই ব্যাপারটি আপত্তিকর মনে হয় ? বড়োজোর এটা আইনবিরুদ্ধ, এই পর্যন্ত। অনেকের কাছেই শুনেছি, গতবছর এডিনবরা ফেস্টিভালের উজ্জ্বলতম মুহূর্তটি ছিল ব্যালকনিতে এক সম্পূর্ণ নগ্ন মহিলার উপস্হিতি -- আমি অবশ্যই ব্যাপারটা সমর্থন করি। তবে আমি নিজে বিশ্বের অপরপ্রান্ত থেকে এটি ‘প্রোমোট’ করতে আসিনি। আর আমার এটাও মনে হয় না যে, এই ধরণের ডাডামার্কা কাজকর্মের নেপথ্যের গভীরতম প্রেরণাটি কেবলমাত্র সস্তা আত্মপ্রচার। সেকারণেই আমার মনে হয়, এঁদের প্রতি আপনি সত্যিই অবিচার করছেন, এঁদের সাহিত্যকৃতিকে আপনি যতোই নিচু নজরে দেখুন না কেন। কারণ সাহিত্যগত মান নিয়ে নানাবিধ মতামত থাকবেই। মলয়, সুনীল বা বসুকে ফারলিংঘেট্টি চেনেনও না, কিন্তু ‘সিটি লাইটস জার্নাল’-এ ওনাদের অনুবাদ প্রকাশ করছেন। এশিয়া সোসায়টির শ্রীমতী বনি ক্রাউন টেক্সট যোগাড় করে দিয়েছেন। যতো অনুবাদ তিনি সংগ্রহ করেছেন, এই লেখাগুলিও তাঁর কাছে ততটাই কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়েছে। এখানে KULCHUR পত্রিকাটিও -- আভাঁগার্দ কাগজ হিসেবে যার বেশ নামডাক -- তাতে আলোচ্য তিনটি ম্যানিফেস্টো ( গদ্য, পদ্য এবং রাজনীতি বিষয়ক ) চলতি বছরের গোড়ায় পুনর্মুদ্রণ করেছিল। এব্যাপারে আমার সঙ্গে যোগাযোগের কোনও প্রয়োজন হয়নি।

    “অনুবাদ পড়ে আমি এটুকু অন্তত বুঝেছি, মলয় এবং অন্যান্য কবিদের, যাঁদের গ্রেপতার কিংবা জেরা করা হয়েছে, তাঁদের কবিতা এবং ম্যানিফেস্টো যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক। সুতরাং অন্য গোলার্ধের বাসিন্দা হয়েও এবং সাহিত্যের সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গতা স্বীকার করেও, আমি কবি এবং সমালোচক হিসেবে ( যেহেতু আমি এখানে কেরুয়াক, বারোজ, আর্তো, এবং মার্কিন কবিদের বিভিন্ন ধারার অপ্রকাশিত লেখার সম্পাদক এবং এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছি ) আমার মতামত প্রকাশ করবই, আমার নিজের বিশ্বাসে স্হির থাকার জন্য, এবং আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এঁদের কাজে আধুনিক জীবনের নানা চিহ্ণ সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। এঁরা জিনিয়াস বা অসাধারণ, এমন দাবি না করেও বলা যায়, সমাজব্যবস্হার প্রতি তাঁদের যে মনস্তত্বগত অনাস্হা, সেটি তাঁরা ফুটিয়ে তুলেছেন স্পষ্ট ও মৌলিক ভাষায়। অন্যদিকে, এঁদের সমসাময়িক এবং অগ্রজরা এখনই ধ্রুপদী ভক্তিভাব বা সামাজিক ‘উন্নত’ ভাবনা, মার্কসবাদ, মানবতাবাদ ইত্যাদি সম্পর্কেই অধিক আগ্রহী। আমার মনে হয় না এই লেখকদের ‘বিটনিক’ আখ্যা দেওয়া উচিত, বিট-অনুকারকও নয়, কারণ শব্দটাই অত্যন্ত কাগুজে বাঁধাধরা বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি মার্কিন ধারণা অনুযায়ী ‘বিটনিক’দের সঙ্গেও এটি খাপ খায় না।

    “আর কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) সম্পর্কে আমার কিছু ভীতি আছে, যেমন ১) সংস্হাটি সম্ভবত মার্কিন সরকারের সঙ্গে যুক্ত ফাউণ্ডেশান ফাণ্ডগুলির সাহায্য পায় ; ২) আয়রন কার্টেন অন্তর্গত শাসনব্যবস্হার চেয়ে পশ্চিমী দুনিয়ার দমননীতির বিপজ্জনক দিকগুলি সম্পর্কে এরা কম সতর্ক। আমেরিকায় সারা বছর ধরে নাট্যশিল্প, বই, চলচ্চিত্র, কবিতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে আইনি যুদ্ধ চলে, যার ফলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আভাঁগার্দ চিন্তাভাবনা প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছে। মার্কিন কমিটির মাথা মিস্টার এ. রাইখম্যান-এর সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকায় কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) এর কোনো অস্তিত্বই নেই, নিতান্তই কঙ্কালটুকু পড়ে আছে। আর এই বছর আমায় নিউ ইয়র্ক থেকে জন হান্টের যোগাযোগ করতে হয় প্যারিসের অলিম্পয়া প্রেসকে বাঁচানোর জন্য। গাফিলতি কিন্তু আছেই। আপনি যতখানি মঞ্জুর করবেন, তার চেয়ে আমার সমালোচনা খানিক বেশিই হয়ে গেল। বেশ -- নিষ্পাপ বিবেক --- অ্যালেন।

    “পুনশ্চ: আপনি সত্যিই একথা জোর দিয়ে বলছেন যে ম্যানিফেস্টোকে সাহিত্য বলা যাবে না এবং সেকারণেই ঘটনাটি সাহিত্যে দমননীতির উদাহরণ নয় ? সত্যি ???????????????

    “আমি প্যারিসে অফিস এবং মিস্টার কারনিক দুজায়গাতেই চিঠি লিখব। আপনার নিশ্চয়ই স্মরণে আছে, রাশিয়ানরা ব্রডস্কি, ইয়েভতুশেঙ্কো, ভজনেসেন্সকিদের তৃতীয় শ্রেণির শিল্পী হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিল, যাদের কোনো সরকারি গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন নেই। এবং মার্কিন পুলিস এজেন্সিগুলির কাছ থেকে এই একই কথা আমাদের সম্পর্কেও শুনেছি। ”


     

    দ্বিতীয় চিঠি:-

    ৭০৪ ইস্ট ফিফথ স্ট্রিট, এন ওয়াই সি-৯, অ্যাপ্ট-৫এ

    ১৩ অক্টোবর ১৯৬৪

    প্রিয় আবু সয়ীদ,

    “জঘন্য ! আপনার বাগাড়ম্বর আমায় বিভ্রান্ত করে তুলেছে, মাথা গরম করে দিচ্ছে আমার। আপনি প্রতিষ্ঠিত লেখক নন, ‘আমার কোনও পদমর্যাদা নেই’, এসব কথার মানে কী? ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের উদ্যোগে চলা চতুর্মাসিক পত্রিকার সম্পাদক আপনি। আপনার নিজস্ব লেটারহেড রয়েছে। কমিটির ভারতীয় এক্সিকিউটিভদের তালিকা আপনার হাতের কাছেই আছে, ভারতে কমিটির ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কেও আপনি ওয়াকিবহাল। চিনের ভারত আক্রমণের সময় আমি কলকাতায় একটি বড়সড় সমাবেশে উপস্হিত ছিলাম, সেখানে আপনার সহসম্পাদক মিস্টার ( অম্লান ) দত্ত সাংস্কৃতিক বর্বরতা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছিলেন। যা হোক, মিস্টার বি. ভি. কার্নিককে আমি চিঠি লিখেছিলাম, যদিও আমার মনে হচ্ছিল যে, কলকাতা কমিটির কোনও সদস্য বা কমিটির সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিরই কাজটি করা দরকার ছিল। আর বাগাড়ম্বর বলতে আমি বোঝাতে চাইছি ‘আপত্তিকর উপাদান’-এর কথা। মহাশয়, আপনি ও পুলিশই সেগুলিকে আপত্তিকর বলছেন। সেগুলি নিছক আপত্তিকর তকমা পাওয়া উপাদান মাত্র, প্রকৃত আপত্তিকর নয়। পরের দিকে যে বলেছেন ‘প্রশ্নাতীত আপত্তিকর’, তাও নয়। আমি আপনাদের আপত্তি তোলা নিয়েই প্রশ্ন করছি, তাই তা এতোটুকুও ‘প্রশ্নাতীত’ নয়। আসলে পুরোটাই হলো রুচি, মতামত ইত্যাদির ব্যাপার। পুলিশ তাদের নিজেদের ও অন্যদের রক্ষণশীল সাহিত্যরুচি চাপিয়ে দিচ্ছে জোর করে। আমার মতে এটি কালচারাল ফ্রিডাম বা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতারই বিষয়। আশা করছি, এ-বিষয়ে ইন্ডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম, বিশেষ করে সেটির কলকাতা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা-ও একমত হবেন। আমার আরও অদ্ভুত লাগে জেনে যে, এক্ষেত্রে কারওকে সাহায্য করা মানে নবীন লেখকদের বলা, তাদের মতাদর্শ থেকে পিছু হটতে, নিজেদের অবস্হান পালটাতে, ইত্যাদি। ব্রডস্কি, ইয়েভতুশেঙ্কো প্রমুখের ক্ষেত্রে যেরকম করা হয়েছিল, সেরকমই একেবারে। এমনকী, তারা যে ‘ফালতু’ লেখক, সেটাও। আমি আপনাকে ফের রাগাতে চাই না। আপনি ক্ষুব্ধ হন এমনকিছু বলছি না। কিন্তু একটি কথা বলতেই হবে যে, বর্তমান ইশ্যু নিয়ে আমার-আপনার চিঠি আদান-প্রদান আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছে ওই নবীন রুশ কবিরা কেন আপত্তিকর বা ‘ফালতু’, তা নিয়ে আমার সঙ্গে রুশ আমলাদের কথোপকথন। ‘দায়িত্বহীন, ‘নিম্ন মানের লেখা’, ‘নিম্ন রুচি’। ব্রডস্কির মামলার সময়ে, আপনার মনে থাকতে পারে, বিচারক প্রায় সারাক্ষণ ব্রডস্কিকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক কবে আপনার মর্ম স্বীকার করেছে।’ বেচারা মলয় --- যদি ও একজন নিম্ন মানের লেখকও হয় --- তা হলেও ওর জায়গায় আমি থাকলে আপনার সম্মুখীন হতে আমি ঘৃণা বোধ করতাম।

    “ওরা সকলেই সম্পূর্ণ বুদ্ধিহীন, জ্যোতি ( দত্ত ) যদি একথায় আপনার সহমত হয়, তাহলে ও আপনার আত্মগরিমা তুষ্ট করার জন্য সাধুতার ভান করেছে। দলের সবাই, ছাব্বিশজন যাদের জেরা করা হয়, সুনীল উৎপল বসু, সন্দীপন, তারাপদ তো আছেই, এরা ছাড়া অন্য যারা গ্রেপতার হয় সেই সব মধ্যমানের লেখকরা -- যদিও মলয়ের নির্যাতনের প্রতি প্রতিষ্ঠানের সপসপে মনোভাব দেখে মলয়ের অনভিজ্ঞতার প্রতি আমার মমত্ব জাগছে -- এরা সবাই ফালতু এরকম দাবি করা আপনার পক্ষে বা জ্যোতির পক্ষে অসম্ভব। কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ও হাংরি আন্দোলনের সদস্যদের -- এই মামলায় যারা সকলেই পুলিশের দ্বারা হেনস্হা হয়েছে --- সমর্থন করেন, এমন কোনও বাঙালি লেখক বা সমালোচককে যদি আপনি না চেনেন, তাহলে আপনার মতামত সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। নিজেকে একদম আলাদা রেখেও বুদ্ধদেব বসু তাদের গুণের স্বীকৃতি দিয়েছেন, যেমন দিয়েছেন বিষ্ণু দে ও সমর সেন। আমি শুধু মলয় নয়, সমস্ত সদস্যদের কথা বলছি।

    “এর পাশাপাশি আপনার আর একটি বিরক্তিকর বক্তব্যে আমি স্তম্ভিত, যে পশ্চিমের দমননীতির বিরুদ্ধেও কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম)কে একইরকম ভূমিকা নিতে হবে। আপনি বলেছেন, ‘আমি পর্তুগাল, স্পেন ও পাকিস্তানের কথা ভাবছিলাম’। এখনও পর্যন্ত আমার শোনা আপনার বক্তব্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিরক্তিকর এটি। লরেন্স, ফ্যানিহিল, জেনে, বারোজ, মিলার, আপনাদের কামসূত্র, কোনারকের আলোকচিত্র -- এসব ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে, বহুল-প্রচারিত আইনি মামলা চলছে, শায়েস্তা করার চেষ্টা চলছে। এছাড়া ফ্রান্সে একাধিক সংবাদপত্র ও আলজেরিয় যুদ্ধবিষয়ক বই দমননীতির কোপে পড়েছে, পড়ছে। রাজনৈতিক কারণেই এই দমন। এমনকী কংগ্রেসও ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) এর কয়েকটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যদিও তা নিতান্ত অনিচ্ছুকভাবেই। কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) সম্ভবত আয়রন কার্টেন দমননীতির বিরুদ্ধেই সরব হতে পছন্দ করে, পাশ্চাত্য দমননীতির বিরুদ্ধে নয় --- আমার এ ধারণা আরও বেশি করে দৃঢ় হচ্ছে, বিশেষ করে আপনার প্রতিক্রিয়ার ধরণ-ধারণ দেখে। এই বিগত এক বছরেই নিউ ইয়র্ক শহরে চলচ্চিত্র, বই সম্পর্কে পুলিশি ধরপাকড় তো হয়েইছে, এমনকী কমেডিয়ানরাও ( লেনি ব্রুস-এর ঘটনা ) বাদ যাননি। আমার মনে হয়, আপনার এ-সম্পর্কে যতোটা জানা দরকার ততটা আপনি জানেন না। ভদ্রভাষায় বললে তাই দাঁড়ায় আরকী। যেমন, আপনি কি জানেন যে, ইংরেজি ভাষায় যে প্রকাশক ডুরেল, মিলার, বারোজ, নবোকভ, টেরি সাদার্ন, দ্য সাদে ও প্রাচ্য প্রণয়গাথা প্রকাশ করেছিল, সেই অলিম্পিয়া প্রেস ফরাসি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ? এ ব্যাপারে ফরাসি কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) কিছু করতে তেমন উৎসাহী ছিল, তা নয়। অলিম্পিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া এক আন্তর্জাতিক কেচ্ছায় পরিণত হওয়ায় একটু নড়েচড়ে বসে তারা একটি পিটিশন চালু করেছে। নিশ্চয়ই এটা জানেন যে, ভারতে লেডি চ্যাটার্লিজ নিষিদ্ধ ? ভারতীয় কমিটি কি এ বিষয়ে মাথা ঘামিয়েছে ? হাংরিরা তো হালের।

    “যা হোক, এসবই তত্ত্বকথা, আমার ক্ষোভ উগরে দেওয়া -- মতের বিনিময় -- ঈশ্বরের দোহাই, মাথা গরম করবেন না --- মলয় ও তার বন্ধুদের বিরুদ্ধে আনা পুলিশের অভিযোগ মনে হয় এখনও রুজুই আছে --- মলয় লিখেছে যে ২৮ ডিসেম্বর বিচার শুরু হবে --- এই অদ্ভুত পরিস্হিতি থেকে মুক্ত হওয়ার মতো প্রবীণ লেখকদের কাছ থেকে কোনও সহায়তাই পাওয়া যায়নি এখনও অবধি --- ও বলেছে, বোধহয় ওর কথাগুলো সত্যিই, যে, ‘আমাদের গ্রেপতার হওয়ার ফলে কবি ও লেখকরা এতোটাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে যে, তারা প্রায় সকলেই তাদের লেখার ধরনটাই পালটে ফেলেছে। ’ অবশ্য ও যে লেখক দলকে চেনে, তাদের কথাই বলছে, ‘প্রতিষ্ঠিত’ বয়স্কদের কথা নয়। ও জানিয়েছে কংগ্রেসকে ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পায়নি ও। আপনিও এড়িয়ে গেছেন। আর ‘আমাদের গ্রেপতার হওয়ার পর আমাদের কোনো ম্যাগাজিন বা বুলেটিন আমরা ছাপাতেই পারছি না। ’ পুলিশের ভীতি। উৎপল বসু আজ একটা চিঠিতে লিখেছে, ‘ভীষণ বাজে খবর। আজ আমার কলেজ কর্তৃপক্ষ ( যেখানে আমি জিওলজি পড়াই ) আমায় পদত্যাগ করতে বলল। আমার কোনো যুক্তিই ওরা শুনতে নারাজ। আমার তো একরকম সর্বনাশ হয়ে গেল। ওরা টাইম পত্রিকা খুলে দেখিয়ে বললে, এই তো আপনার ছবি ও বক্তব্য। আপনার মতো কোনো লোক আমাদের এখানে থাকুন, এ আমরা চাই না...আমার চিঠিপত্র পুলিস ইনটারসেপ্ট করছে। আপনি আমার শেষ চিঠিটা পেয়েছেন ?...ইত্যাদি।’ এ একেবারে অসুস্হকর এক পরিস্হিতি। এরকমভাবেই সব চলতে থাকবে, এই ভেবে চিন্তিত হয়ে আমি আসলে প্রাথমিকভাবে তড়িঘড়ি, অতি দ্রুত চিঠি লিখেছিলাম। কারণ পুলিশি শাসনতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমার ভারতে থাকতেই হয়েছে। এখন কিন্তু পরিস্হিতি যথেষ্ট সংকটপূর্ণ। প্রবীণ, দায়িত্ববান কোনও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হস্তক্ষেপ না করলে এর থেকে নিষ্কৃতি সম্ভব নয়। বোধহয় ক্যালকাটা কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডমের প্রতি চিঠি আপনাকে উদ্দেশ করে লেখা আমার উচিত হচ্ছে না। যদি তাই হয়, তাহলে কলকাতায় কংগ্রেসের ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) দপতরে এ-বিষয়ে ভারপ্রাপ্তের হাতে দয়া করে চিঠিটি পৌঁছে দেবেন। আপনাকে রুষ্ট করে থাকলে মার্জনা করবেন। তবে চিঠিতে অন্তত আপনাকে কথাগুলি সোজাসুজি বলছি। এই মুহূর্তে আপনার-আমার মতানৈক্যের থেকেও পুলিশ পরিস্হিতিই প্রকৃত চিন্তার বিষয়।--- অনুগত, অ্যালেন গিন্সবার্গ।

    “পুনশ্চ : আমার বিলম্বিত উত্তরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। পিটার ( অরলভস্কি ) ও আমি গত এক মাস হারভার্ডে বক্ততৃতাদানে ব্যস্ত ছিলাম। আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই কেমব্রিজ থেকে ফিরেছি।

    দাদাকে সম্ভবত জ্যোতির্ময় দত্ত বলেছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে দেখা করতে। আমরা দুজনে দেখা করেছিলুম। কিন্তু আইয়ুব সাহেব এ-ব্যাপারে মুখ খোলেননি, এমন ভাব করেছিলেন যেন দুটো ভিখারি ওনার ড্রইংরুমে ঢুকে পড়েছে। দাদাও জানতো না, আমিও জানতুম না যে গিন্সবার্গ আর আইয়ুব সাহেবের মধ্যে আমাদের কেস নিয়ে কথাবার্তা চলছে। ব্যাপারটা আমরা জানতে পারি পরে যখন দাদাকে আর আমাকে কলকাতায় র‌্যাডিকাল হিউম্যানিস্টের দপতরে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামের ভারতীয় সচিব এ. বি. শাহ দেখা করতে বলেন। এ. বি. শাহ পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে জেনেছিলেন যে কলকাতার এলিটবর্গের কারা আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ ঠুকেছেন। এ. বি. শাহ বললেন, তিনি কিছু করতে পারবেন না। এলিটবর্গের কলকাঠি ছাড়া তো জানার কথা নয় যে উৎপলকুমার বসু কোথায় অধ্যাপনা করেন, এবং তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত।

    অ্যালেন গিন্সবার্গের চিঠির জবাবে আবু সয়ীদ আইয়ুব ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪ এই চিঠিটি লেখেন। চিঠিটির কপি পরে গিন্সবার্গই আমাদের পাঠিয়েছিলেন, জানাবার জন্য যে আইয়ুব সাহেব কতোটা ক্রুদ্ধ :-

    Pearl Road

    Calcutta

    31 October, 1964

    Dear Mr Ginsberg,

    I am amazed to get your pointlessly discourteous letter of 13th. That you agree with communist characterization of the Congress for Cultural Freedom as a fraud and a bullshit intellectual liberal anti-communist syndicate, did not, however surprise me ; for I never thought the Congress had any charge of escaping your contempt for everything ‘bourgeoisie’ or ‘respectable’.

    If any known litteratur or intellectual had come under police repression for their literary or intellectual work, I am sure the Indian Committee for Cultural Freedom would move in the matter without any ungraceful promptings from you. I am glad to tell you that no repressions of that kind has taken place here currently. Malay Roychoudhury and his young friends of the Hungry Generation have not produced any worthwhile work to my knowledge, though they have produced and distributed a lot of self-advertising leaflets and printed letters abusing distinguished persons in filthy language ( I hope you agree that the word ‘fuck’ is obscene and ‘bastard’ filthy at least in the sentence ‘Fuck the Bastards of the Gangshalik School of Poetry’; they have used worse language in regard to poets whom they have not hesitated to refer to by name ). Recently they hired a woman to exhibit her bosom in public and invited a lot of people including myself to witness this wonderful avantgarde exhibition ! You may think your duty to promote in the name of cultural freedom such adolescent pranks in Calcutta from halfway round the world. You would permit me to differ from you in regard to what is my duty.

    It was of course foolish of the police to play into the hands of these young men and hold a few of them in custody for a few days ( they have all been released now) thus giving the publicity and some public sympathy --- publicity is precisely what they want to gain through their pranks.

    I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee for Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of American Beatnik poetry. I respect your knowledge of European literature but can not permit myself to be guided by your estimation of writers in my language --- a language of which you chose to remain totally ignorant.

    With all good wishes in spite of your grave disagreements and in admiration of some of your wonderful poems.

    Yours sincerely

    Abu Sayeed Ayyub


     

    আইয়ুব সাহেব যখন এই চিঠিটা লিখছেন তখন পর্যন্ত চার্জ শিট দেয়া বাকি আছে, প্রদীপ চৌধুরীকে ত্রিপুরা থেকে গ্রেপতার করে কলকাতায় আনা বাকি আছে। আইয়ুব সাহেব দাদার “ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি” কাব্যগ্রন্হ তখনও পড়েননি, উৎপলের কবিতাও পড়েননি, তা তিনি স্বীকার করেছিলেন আমাদের কাছে। তিনি জানতেনই না যে উৎপলের চাকরি চলে গেছে, জানতেন না যে দাদাকে চাইবাসায় গ্রেপতার করা হয়েছিল, আর তখনও পর্যন্ত সাসপেন্ড রয়েছেন। কারা তাঁকে খবর যোগাচ্ছিল জানি না। যারা যোগাচ্ছিল তারাই আমাদের বুলেটিন, পত্রিকা ইত্যাদি কলকাতায় ছাপাতে দিচ্ছিল না। দাদার এক বন্ধু, অদ্রীশ বর্ধনের দাদা, নতুন প্রেস খুলেছিলেন বহরমপুরে, সিগনাস প্রিন্টিং নামে, দাদা সেখানে ছাপার ব্যবস্হা করে দেন তাঁকে বলে।

    অ্যালেন গিন্সবার্গ এবং আবু সয়ীদ আইয়ুবের চিঠিগুলো পড়লেন তো ? এবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দুটি চিঠি পড়ুন, একটি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা, হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে, তাতে দাদার কোনো উল্লেখ নেই, অন্য চিঠিটা এক বছর পরে দাদাকে লেখা, যাতে লিখছেন যে মলয় কবিতা লিখতে জানে না, বোঝাই যায় যে পরের দশকগুলোর কবিতায় আসন্ন বাঁকবদলের হদিশ পাননি, এমনকী তরুণীরাও যে বাঁকবদলের অন্যতম কারণ হবেন, তা আশা করেননি, নকশাল আন্দোলনের আগাম আঁচ করতে পারেননি । পরের প্রজন্মের কবিদের সম্পর্কে তাঁর হিংসে তিনি লুকোননি, বোধহয় ভেবে দেখেননি যে চিঠিগুলো কখনও প্রকাশিত হলে ছবিটার ফ্রেমে ঘুণ ধরে যেতে পারে, কিংবা হয়তো ভেবেছিলেন যে বহুল প্রচারিত পত্রিকার গদিতে বসে সময়কে রৈখিকতার বাইরে যাবার তত্বকে হাপিশ করে দিতে পারবেন।

    15 June 1964

    313 South Capital

    Iowa City

    USA

    সন্দীপন,

    নদীর পাড়ে গাছের ছায়ায় বসেছি, প্রচণ্ড হাওয়া, সঙ্গে ৫ ডজন বিয়ার ক্যান, পাশে সাঁতারের পোশাক পরা একটা ধলা মেয়ে, মাঝে মাঝে তার পাছায় টোকা মারছি পায়ের আঙুল দিয়ে, এ দৃশ্য কেমন ? অবিকল এই দৃশ্যের মাঝে আমি শুয়ে আছি। চিঠি লিখছি। কিন্তু আমি এ দৃশ্যের মধ্যে নেই। হাতের তালু গোল করে খুব ছোটো করে, চোখের কাছে আনছি --- সবকিছু দূরে চলে যাচ্ছে। মেয়ের মুখও। খিদে নেই। তেষ্টা নেই। তবু বিয়ার খাচ্ছি। কারণ, এখানে বসে খাওয়া বেআইনি বলে, ঘরের মধ্যে খুব গরম। থাকতে পারিনি। ঘাসের ওপর গড়িয়ে গেলাম। একটা দূরন্ত খরগোশকে ধরার জন্য পাঁচবার ছুটে গিয়েছিলাম।

    কী ভালো লেগেছিল আপনার চিঠি পেয়ে। বিশেষত লাল পেনসিলের অক্ষর। যেন দুটো চিঠি পেলুম। গল্পটা আপনার ভালো লাগবে না জানতুম। গদ্য লিখে আপনাকে খুশি করতে পারব এমন দুরাশা আমার নেই। সত্যি নেই। কারণ, আপনি গ্রেট গদ্য লিখেছেন একসময়, এখন আর তেমন না। কিন্তু যা লিখেছেন, তার ধারে কাছে আর কেউ পৌঁছোতে পারেনি। আমি ওরকম গদ্য লিখতে পারি না। লিখবো না। কিন্তু ওই গদ্যই আমার প্রিয় পাঠ্য। আপনি পড়বেন, এই ভয়ে আমি সহজে গদ্য লিখতে চাই না। তবু, কখনও লিখি, হয়তো টাকার জন্য, টাকার জন্য ছাড়া কখনও গদ্য লিখেছি বলে মনে পড়ে না, লিখেছিলুম একটা উপন্যাস, সেটা ছাপার সম্ভাবনা নেই। আমার কবিতার জন্য আপনাকে ভয় করি না, কবিতার লেখার ক্ষমতার ওপর আমার বেশি আস্হা নেই, আপনি যেরকম কবিতা ভালোবাসেন, অথবা যাই হোক --- আমি সেরকম কখনও লিখব না। আমি কবিতা লিখি গদ্যের মতো, ওরকমই লিখে যাবো। ও সম্বন্ধে আমার কোনো দ্বিধা নেই। শক্তি অসাধারণ সুন্দর বহু লাইন লিখেছে। আমার চেয়ে অনেক বড়ো, আমি ওকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু শক্তির কবিতা মুণ্ডহীন, আমি ওরকম লিখতে পারবো না, চাই না, কারণ আমি ওরকমভাবে বেঁচে নেই। বরং উৎপলের কবিতা আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এখানে এই শুয়ে থাকা, গাছের ছায়া মুখে পড়ছে --- তখন মনে হয় কোথাও কিছু নেই, না কবিতা, না হৃদয়।

    প্রিয় সন্দীপন, দু’দিন পর আজ সকালে আবার আপনার চিঠি পেলুম। কি সব লিখেছেন কিছুই বুঝতে পারলুম না। কেউ আমাকে কিছু লেখেনি। শরৎ ও তারাপদ কফিহাউসে কি সব গণ্ডোগোলের কথা ভাসা ভাসা লিখেছে। সবাই ভেবেছে অন্য কেউ বুঝি আমাকে বিস্তৃত করে লিখেছে। কিন্তু আপনার চিঠি অত্যন্ত অস্বস্তিজনক। তিনবার পড়লুম, অস্বস্তি লাগছে। বিছানা থেকে উঠে কলের কাছে গেলুম, ফিরে এলুম টেবিলে, আবার রান্নাঘরে, ভালো লাগছে না, কেন আমাকে এরকম চিঠি লিখলেন ? আমি তো শুয়েছিলুম। আমি তো বিছানায় রোদ ও আলস্য নিয়ে খেলা করছিলুম। কেন আমাকে এমনভাবে তুললেন ?

    সন্দীপন, আপনি অনেকদিন কিছু লেখেননি, প্রায় বছর তিনেক। তার বদলে আপনি কুচোকাচা গদ্য ছাপিয়ে চলেছেন এখানে সেখানে। সেই স্বভাবই আপনাকে টেনে নিয়ে যায় হাংরির হাঙ্গামায়। আমি বারণ করেছিলুম। আপনি কখনও আমাকে বিশ্বাস করেননি। ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন। আমি শক্তিকে কখনও বারণ করিনি, কারণ আর যতো গুণই থাক, শক্তি লোভী। শেষ পর্যন্ত উৎপলও ওই কারণে যায়। কিন্তু আমি জানতুম আপনি লোভী নন। আপনার সঙ্গে বহুদিন এক বিছানায় শুয়েছি, পাশাপাশি রোদ্দুরে হাঁটার সময় একই ছায়ায় দাঁড়িয়েছি। সেই জন্য আমি জানতুম। সেইজন্যই বুঝেছিলুম আপনার লোভ আমার চেয়ে বেশি নয়। আমার ওতে কখনও লোভ হয়নি, হয়েছিল অস্বস্তি থেকে ঘৃণা। ইংরেজিতে রচনা ছাপিয়ে ইওরোপ আমেরিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করা আমার বিষম বদরুচি মনে হয়েছিল আগেই, এখানে এসে আরও বদ্ধমূল হয়েছি। হাংরির গ্যাঁড়াকলের প্রতি আরও ক্রুদ্ধ হয়েছি। অপরের কৌতূহল এবং করুণার পাত্র হতে আপনার ইচ্ছে করে ? হাংরি এখানে যে দুএকজন পেয়েছে, তাদের কাছে তাই। আমি এতোদিন দেশে রইলুম --- অনেক সুযোগ এবং আহ্বান পেয়েছিলুম, কোথাও তবু একটি লাইনও ইংরেজি পদ্য ছাপাইনি। ছাপালে কিছু টাকা পেতুম, তবু না। কারণ সবাইকে বলেছি, আমি বাংলা ভাষার কবি, আমি শুধু বাংলাতেই লিখি, যে ভাষায় কথা বলে সাত কোটি লোক -- ফরাসি ও ইতালির চেয়ে বেশি। এবং ফরাসি ও ইতালির চেয়ে কম উন্নত ভাষা নয়। আমার কাজ কবিতা লেখা, নিজের কবিতা অনুবাদ করা নয়, ও কাজ অন্যের। তোমার দরকার হলে বাংলা শিখে অনুবাদ করে নাও। এই ধরণের সূক্ষ্ম পিঠচাপড়ানির ভাব লক্ষ্য করেই আমি বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্হের কাজ, যে জন্য আমি এখানে এসেছিলুম, এক লাইনও করিনি।

    হাংরির এই ইংরেজির মতলব ছাড়া, বাংলা দিকটা আরও খারাপ। ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই। শর্টকাটে খ্যাতি বা অখ্যাতি পাবার চেষ্টা --- অপরকে গালাগাল বা খোঁচা দিয়ে। আপনি মলয়কে এতো পছন্দ করছেন --- কিন্তু ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে, আপনি নিশ্চয়ই মনে মনে বিশ্বাস করেন না। আমি চলে আসার পরও আপনি হাংরির পৃষ্ঠপোষকতা করছেন --- হিন্দি কাগজের জন্য আপনি কি একটা লিখেছিলেন --- তাতেও হাংরির জয়গান। ভাবতে খুব অবাক লাগে --- আপনার মতো অ্যাবস্ট্র্যাক্ট লেখক কি করে ইলাসট্রেটেড উইকলিতে ছবি ছাপাটাও উল্লেখের ব্যাপার মনে করেন। এগুলোই হাংরির গোঁজামিল। এই জন্যই এর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক থাকাতে বারবার দুঃখ পেয়েছি, দুঃখ থেকে রাগ, রাগ থেকে বিতৃষ্ণা। একটা জিনিস নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আমি হাংরির কখনও প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করিনি, ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করিনি। পারতুম। করিনি, তার কারণ, ওটা আপনাদের শখের ব্যাপার, এই ভেবে, এবং আপনারা ওটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছিলেন কৃত্তিবাস বা সুনীলের প্রতিপক্ষ হিসেবে। সে হিসেবে ওটাকে ভেঙে দেওয়া আমার পক্ষে নীচতা হতো। খুবই। বিশ্বাস করুন, আমার কোনো ক্ষতির কথা ভেবে নয়, আপনার অপকারের কথা ভেবেই আমি আপনার ওতে থাকার বিরোধী ছিলুম। এটা হয়তো খুব সেন্টিমেন্টাল শোনালো, যেন কোনো ট্রিক, কিন্তু ও-ই ছিল আমার সত্যিকারের অভিপ্রায়।

    এবারে নতুন করে কি ঘটলো বুঝতে পারলুম না। যে-ছাপা জিনিসটার কথা লিখেছেন সেটা দেখলে হয়তো বুঝতে পারতুম। এবং এটা খুবই গোলমেলে --- যে চিঠি আপনি চারজন বন্ধুকে একসঙ্গে লিখেছেন, যেটা চারজনকে এক সঙ্গে পাঠানো যায় না, সেটা হারাধন ধাড়াকে পাঠালেন কি জন্য, বুঝতে পারলুম না। কিংবা আমার বোঝারই বা কি দরকার ? আচ্ছা মুশকিল তো, আমাকে ওসব বোঝার জন্য কে মাথার দিব্বি দিয়েছে এই আষাঢ় মাসের সন্ধ্যাবেলা ? আমি কলকাতায় ফিরে শান্ত ভাবে ঘুমোবো, আলতো পায়ে ঘুরবো --- আমার কোনো সাহিত্য আন্দোলনের দরকার নেই। মলয় আমার চিঠি কেন ছাপিয়েছে ? আমার গোপন কিছু নেই --- বিষ্ণু দেকে আমি অশিক্ষিত বলেছি আগেও, কৃত্তিবাসের পাতায় ব্যক্তিগত রাগে, কারণ উনি ওঁর সংকলনে আমার কবিতা আদ্দেক কেটে বাদ দিয়েছেন বলে। কিন্তু মলয়ের সেটা ছাপানোর কি মতলব ? যে প্রসঙ্গে লিখেছিলুম সেটা ছাপিয়েছে তো ? আমি ওকে লিখেছি সম্প্রতি. ‘সামনে পেছনে বাদ দিয়ে, ডট ডট মেরে চালাকির জন্য আমার চিঠি যদি ছাপাও, তাহলে এবার ফিরে গিয়ে কান ধরে দুই থাপ্পড় মারব’। আপনার চিঠি সম্বন্ধেও তাই। আপনার চিঠি ওরা ছাপিয়েছে সেটাই খারাপ(*) --- যা লিখেছেন, তা নয়। বেশ করেছেন লিখেছেন --- আমি না পড়েই বলছি। ওটা আপনার, শক্তির বা আমার ঘরোয়া ব্যাপার --- আর কার কি তাতে? আপনার যা খুশি বলার অধিকার আছে।

    কিন্তু ওসব থাক সন্দীপন। আপনাকে কেউ মারবে না। কার অমন স্পর্ধা আছে ? যদি আপনি জায়গা দেন, আমি সব সময় আপনার পাশে আছি। অনেকে আছে। আপনার সঙ্গে কতো ঝগড়াঝাটি হয়েছে --- কিন্তু এই দীর্ঘদিন নিরালায় ভেবে দেখলুম, আপনাকে বাদ দিয়ে আমাদের চলে না। এক হিসেবে আপনি আমার অপরাংশ, আপনার চরিত্রের অসংলগ্নতা, ভুল এবং জোচ্চুরি --- সব কিছু আমার প্রিয়। যেন আমার না-পাওয়া জীবন। লেখক হিসেবে, ‘প্রতিভাবান’ এই শব্দটি যদি ব্যবহার করতে হয় --- তবে আমাদের পুরো জেনারেশনে তন্ময় দত্ত ছাড়া --- শুধু আপনার সম্পর্কেই আমি একথা ভাবি। আপনার ঐ সুখের সূক্ষ্ম শরীর কেউ ছোঁবে না --- কলকাতা শহরে এমন কেউ নেই। না নেই। আপনি নরম ভাবে শুয়ে থাকুন রীনার পাশে, আপনি ওঁকে মঙ্গল গ্রহের গল্প বলুন।

    আমি কলকাতায় পৌঁছোবো ১৮ই আগস্ট। নানা কারণে এখানে এক মাস দেরি হয়ে গেল। দেরি হয়ে গেল আমারই বোকামিতে খানিকটা। জুনের মাঝামাঝি বা আগস্টের প্রথমে প্যারিসে একটা থাকার জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কয়েক দিনের জন্য। আমি জুন মাসটা নষ্ট করেছি --- সুতরাং আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। এই ঠিকানায় আছি জুলাইয়ের বারো তারিখ পর্যন্ত অন্তত, তারপর নিউ ইয়র্ক ও ইংল্যাণ্ড। এখানে থেকে এম এ পড়তে পারি আমি --- আপনার মনে এরকম ধারণা এলো কি করে ? আমি কি সম্পূর্ণ কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়েছি ? কৃত্তিবাসে আপনার লেখা নিয়ে প্রচুর গণ্ডোগোল করেছি --- তবু, এবার কৃত্তিবাসে আপনার লেখা না দেখে মন খারাপ লাগলো। এখান থেকে কোনো জিনিস নিয়ে যাবার হুকুম আছে আপনার কাছ থেকে ?

    ভালোবাসা

    সুনীল

    (*) এটি চিঠি নয়। দেবী রায়কে লেখা -- হারাধন ধাড়াকে নয় --- নানা রঙিন পেনসিলে লেখা হাংরি বুলেটিনের জন্য গদ্য। বুলেটিনে এই গদ্যটি প্রকাশিত হয়েছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবিরাম উপন্যাস লেখা আরম্ভ করলে আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাস প্রকাশ অসম্ভব করে দিয়েছিলেন। সেকারণে সন্দীপন আজকাল পত্রিকায় যোগ দেন। দাদাও কৃত্তিবাস পত্রিকায় লেখা পাঠানো বন্ধ করে দেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য দাদার কাছ থেকে কবিতা দাদার পোস্টিঙের জায়গায় গিয়ে নিয়ে আসতেন, তখন দাদার কবিতার ধারা কৃত্তিবাসের ধারা থেকে পালটে গেছে। এবার দাদাকে লেখা চিঠিটা পড়ুন :-

    ৩২/২, যুগীপাড়া রোড, দমদম

    কলকাতা - ২৮

    ৯ নভেম্বর ১৯৬৫

    সমীর,

    মলয়ের ৫ তারিখের মামলার বিস্তৃত বিবরণ নিশ্চয়ই ওদের চিঠিতে জানতে পারবি, বা জেনে গেছিস। সে সম্পর্কে আর লিখলুম না।

    দুটি ব্যাপার দেখে কিছুটা অবাক ও আহত হয়েছি। তুই এবং মলয় ইত্যাদি ধরেই নিয়েছিলি আমি মলয়ের স্বপক্ষে সাক্ষী দেবো না --- বরং অন্যান্যদের বারণ করব, কোনোরকম সাহায্য করবো না। তোর অনুরোধ ছিল ‘শেষ অনুরোধ’ --- যেন আমি প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ অনুরোধ আগে প্রত্যাক্ষ্যান করেছি। মলয়ও কয়েকদিন আগে সকালে আমার বাড়িতে এসে বললো, ওর ধারণা আমি চারিদিক থেকে ওর সঙ্গে শত্রুতা করছি এবং অপরকে ওর সঙ্গে সহযোগীতা করতে বারণ করছি !

    অপর পক্ষে, মামলার রিপোর্ট কাগজে বেরুবার পর --- কফি হাউসের কিছু অচেনা যুবা, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাকে অভিনন্দন জানাতে আসে। আমি নাকি খুবই মহৎ ব্যক্তি --- হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে কখনও যুক্ত না থেকেও এবং কখনও পছব্দ না করেও যে ওদের স্বপক্ষে সাক্ষী দিয়েছি --- সেটা নাকি আমার পক্ষে পরম উদারতার পরিচয়।

    ওদের ওই নকল উদারতার বোঝা, এবং তোদের অন্যান্য অবিশ্বাস --- দুটোই আমার পক্ষে হাস্যকর মনে হল। মানুষ কি স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে ভুলে গেছে ? আমার ব্যবহার আগাগোড়া যা স্বাভাবিক তাই। আমার স্ট্যাণ্ড আমি আগেই পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছি। আমি হাংরি জেনারেশন পছন্দ করি না ( সাহিত্য আন্দোলন হিসেবে )। আমি ওদের কিছু-কিছু পাজি ব্যবহারে বিরক্ত হয়েছি। মলয়ের দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না --- আমার রুচি অনুযায়ী এই ধারণা। অপরপক্ষে লেখার জন্য কোনো লেখককেই পুলিশের ধরার এক্তিয়ার নেই --- একথা আমি বহুবার মুখে এবং কৃত্তিবাসে লিখে জানিয়েছি। পুলিশের বিরুদ্ধে এবং যেকোনো লেখকের স্বপক্ষে ( সে লেখকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক যা-ই হোক না ) দাঁড়ানো আমি অত্যন্ত স্বাভাবিক কাজ বলেই মনে করি। কারুর লেখা আমি অপছন্দ করি বলেই তার শত্রুতা করবো, কিংবা অন্য কারুকে নিবৃত্ত করবো তাকে সাহায্য করতে -- এরকম নীচতা কি আমার ব্যবহারে বা লেখায় কখনো প্রকাশ পেয়েছে ? এসব ছেলেমানুষী চিন্তা দেখলে -- মাঝে মাঝে রাগের বদলে হাসিও পায়।

    যাই হোক, আদালতের সাক্ষ্যতে আমি দুটি কথা বলেছি। মলয়ের লেখার মধ্যে অশ্লীলতা কিছুই নেই --- এবং ওর লেখাটা আমার ভালোই লেগেছে। ধর্ম সাক্ষী করে আমি দ্বিতীয় কথাটা মিথ্যে বলেছি। কারণ, কয়েকদিন আগে মলয় যখন আসে --- তখন আমি বলেছিলুম যে ওর লেখা আমি পছন্দ করি না। কিন্তু শ্লীল-অশ্লীলের প্রশ্নটি জেনারাল, এবং সেই জেনারাল প্রশ্নে আমি অশ্লীলতা বলে কিছুই মানি না। সুতরাং সেই হিসেবে মলয়ের লেখাও যে বিন্দুমাত্র অশ্লীল নয়, তা আমি সাক্ষীর পক্ষে উঠে স্পষ্ট ভাবে বলতে রাজি আছি। তখন মলয় আমাকে অনুরোধ করে, আমি যদি ওকে সাহায্য করতে চাই, তবে জজসাহেবের সামনে ওর কবিতা খারাপ লাগে এটাও যেন না বলি। আদালত তো আর সমালোচনার জায়গা নয়। বরং ওর কবিতা ভালো লাগে বললেই নাকি মলয়ের পক্ষে সুবিধে হবে।

    সাক্ষীর কাঠগড়ায় মলয়ের কবিতা আমাকে পুরো পড়তে দেওয়া হয়।(*) পড়ে আমার গা রি-রি করে। এমন বাজে কবিতা যে আমাকে পড়তে বাধ্য করা হল, সে জন্য আমি ক্ষুব্ধ বোধ করি --- আমার সময় কম, কবিতা কম পড়ি, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না--- এসব কবিতা পড়ে আমি মাথাকে বিরক্ত করতে চাই না। মলয়ের তিনপাতা রচনায় একটা লাইনেও কবিতার চিহ্ণ নেই। মলয় যদি আমার ছোটো ভাই হতো, আমি ওকে কবিতা লিখতে বারণ করতাম অথবা গোড়ার অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করতে বলতাম। যাই হোক, তবু আমি বেশ স্পষ্ট গলাতেই দুবার বলেছি ওর ঐ কবিতা আমার ভালো লেগেছে। এর কারণ আমার কোনো মহত্ব নয় --- আমার সাধারণ, স্বাভাবিক সীমাবদ্ধ জীবন। যে কারণে আমি আনন্দবাজারে সমালোচনায় কোনো বাজে বইকে ভালো লিখি --- সেই কারণেই মলয়ের লেখাকে ভালো বলেছি। যাই হোক, সেদিন আদালতে দাঁড়িয়ে মনে হল, হাকিম এবং পুলিশপক্ষ এ মামলা ডিসমিস করে দিতে পারলে বাঁচে। কিন্তু মলয়ের প্রগলভ উকিল মামলা বহুদিন ধরে টেনে নাম কিনতে চায়।

    ডিসেম্বর ৮-৯ তারিখে পাটনায় আমেরিকান সাহিত্যের ওপর একটা সিমপোজিয়াম হবে। আমি তাতে যোগদান করার জন্য নিমন্ত্রিত হয়েছি। ঐ সময়ে পাটনা যাবো। আশা করি ভালো আছিস।

    সুনীল।

    (*) কবিতাটির নাম ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কবিতাটি প্রথমবার পড়েন। তার আগে তিনি কবিতাটি পড়েননি।

    ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘কৃত্তিবাস’ দ্বিতীয় সংকলনের সম্পাদকীয় লেখার সময়েও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনের প্রতি ঈর্ষাজনিত ক্ষতের কথা ভুলতে পারেননি। তিনি লিখেছিলেন, “অ্যালেন গিনসবার্গের প্রভাবেই কিনা জানি না, এই সময় কৃত্তিবাস লেখক গোষ্ঠীরই একটি অংশ হাংরি জেনারেশন নামে একটি আন্দোলন শুরু করে। প্রায় একই লেখক গোষ্ঠী হলেও, কৃত্তিবাস পত্রিকা ঘোষিতভাবে হাংরিদের সঙ্গে সম্পর্ক-বিযুক্ত থাকে, আমি নিজেও কখনো হাংরিদের দলে যোগ দিইনি। দু’এক বছরের জন্য হাংরি জেনারেশনের আন্দোলনের সোরগোল কৃত্তিবাসের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল হয়েছিল এবং তা একদিকে টাইম ম্যাগাজিন অন্যদিকে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আমি হাংরিদের থেকে সব সময়ে দূরে দূরে রইলেও অশ্লীলতার অভিযোগে যখন শ্রীযুক্ত মলয় রায়চৌধুরীর বিচার হয়, তখন আমি তার পক্ষ সমর্থন করে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। ”

    হাংরি আন্দোলনের দেবী রায়, ত্রিদিব মিত্র, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সুবো আচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় কারোর সঙ্গে গিন্সবার্গের দেখা হয়নি। দাদার সঙ্গে হয়েছিল ১৯৬২ সালে আর আমার সঙ্গে ১৯৬৩ সালে। হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬১ সালে। বস্তুত কৃত্তিবাস গোষ্ঠীই গিন্সবার্গের দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এবং তাঁদের অনেকেরই কবিতায় সেকারণে এই সময় বাঁকবদল ঘটেছিল, যখন কিনা তাঁরা কবিতা লিখছিলেন পঞ্চাশ দশক থেকে। গিন্সবার্গের তোলা ফোটোও তাঁরা কৃত্তিবাস পত্রিকার কভারে ছেপেছেন। কোনো হাংরি বুলেটিনে গিন্সবার্গের অস্তিত্ব নেই।

    ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার হাংরি সংখ্যার জন্য নাসের হোসেন দাদাকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন, “হাংরি আন্দোলন চলাকালীন নানাধরণের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি পরস্পরের সঙ্গে বিচ্ছেদও ঘটেছে। এই ঘটনার প্রভাবে মেইনস্ট্রিমের কিছু-কিছু ভূমিকা সম্পর্কে কিছু কি বলবেন ?”

    দাদা তার এই উত্তর দিয়েছিলেন, “দেখ, আমার প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে সুনীল বাইরে থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ভাঙন ধরাতে সচেষ্ট ছিলেন। শক্তিকে নেতা করা হয়েছিল বলে সুনীল অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ছিলেন। আর প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশয় ভেতর থেকে ভাঙন ধরাতে চেষ্টা করেছিলেন এবং অনেকটা সফল হয়েছিলেন। এগুলি যে কেউ গবেষণা করলেই টের পাবেন। ”

    দাদার জন্য তাই জরুরি ছিল কলকাতায় এসে “হাওয়া-৪৯” পত্রিকার মাধ্যমে নিজের দর্শনকে প্রতিরোধ হিসাবে এসট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতরূপে তুলে ধরা। এক সাক্ষাৎকারে ( চন্দ্রগ্রহণ, হাংরি সংখ্যা ) নাসের হোসেন দাদাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “হাংরি জেনারেশন থেকে আপনি অধুনান্তিক অবস্হানপন্নতায় গেলেন কীভাবে ? আমার ধারণা এ-দুটোর দূরত্ব বিস্তর।”

    উত্তরে দাদা বলেছিলেন, “আধুনিকতা বা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা থেকে উত্তরঔপনিবেশিক অধুনান্তিকতায় যাত্রাপথ চিহ্ণিত করা তোমার পক্ষেও সহজ। দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও, স্বাধীনোত্তর চেতনা তারিখের কাঁটায় সায় দিয়ে বদলে যায় না। হাংরি আন্দোলন স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে ঘটেছিল ষাটের দশকে। এবং ক্রমশ ভেদের সনাক্তকরণ থেকে অভেদের সন্ধানে যাত্রার মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে প্যারাডিম শিফট বা বাঁকবদলের অনিবার্যতা। ঔপনিবেশিক আধুনিকতা থেকে বেরিয়ে আসার পরিস্হিতি। হাংরি আন্দোলন সবার আগে এই পরিস্হিতি অনুধাবন করতে পেরেছিল ; এবং আন্দোলনের অপরিহার্যতাকে উপলব্ধি করেছিল। কেননা এই ধরণের পরিবর্তন আন্দোলনের মাধ্যমেই সম্ভব। যার ফলে পরবর্তীকালে পর পর একাধিক আন্দোলন ঘটতে থেকেছে। স্বাধীনোত্তর পর্বে ঘটলেও, সেই আন্দোলনগুলির কাঠামো ছিল ঔপনিবেশিক আধুনিকতায় আক্রান্ত। আমরা এ-কথা বুঝতে পেরেছিলাম যে আগের কাঠামো থেকে যেভাবেই হোক বেরিয়ে পড়তে হবে। এবং সাহিত্যের প্রথম শর্ত আগের ভাষাকাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ভাষার পরিমণ্ডল গড়ে তোলা। আমরা প্রত্যেকেই কবিতা-গল্প ইত্যাদিতে ভাষার পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট থেকেছি। যেমন মলয় তাঁর কবিতার নাম দিলেন ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’, শৈলেশ্বর ঘোষ দিলেন ‘ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা’, প্রদীপ চৌধুরী নাম রাখলেন ‘চর্মরোগ’, বাসুদেব দাশগুপ্ত তাঁর গল্পগ্রন্হের নাম রাখলেন ‘রন্ধনশালা’, সুবিমল বসাক তাঁর উপন্যাসের নাম রাখলেন ‘ছাতামাথা’, আমি আমার গল্পের নাম দিলাম ‘স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা অমলেট অবধি’, ‘জলছবি’, ‘অতিক্রম’, কাব্যগ্রন্হের নাম রাখলাম ‘জানোয়ার’। প্রত্যেকের ভাষা, উপস্হাপনা, প্রয়োগ সম্পূর্ণ পৃথক। এগুলো ঠিক রাতারাতি ঘটেনি। বিষয়গুলোকে নিয়ে আমি ও মলয় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করেছি, আলোচনা হয়েছে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের ( হারাধন ধাড়া ) সঙ্গে। দেবী রায়ের কবিতা প্রথম থেকেই গঠন ও মেজাজ-মর্জিতে অভিনব। আমাদের পূর্বে যাঁরা লেখালিখি করেছিলেন তাঁদের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফালগুনী রায় তাঁর বইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসন’। হাংরি আন্দোলনের মধ্যেই এবং ষাট দশকের অধিকাংশ আন্দোলনের মধ্যেই অধুনান্তিকতার বীজ অন্তর্নিহিত ছিল। কেননা যে পরিবর্তন ঘটছিল তা সময়কেন্দ্রিক প্রশ্নময়তা থেকে পরিসরভিত্তিক অবস্হানপন্নতার দিকে তার চেতনার অভিমুখ ক্রমশ রচনা করছিল। এই প্রসেসটা এমন ছিল যে সেখানে প্রাধান্য ছিল গড়ে তোলার চেয়ে উঠে আসার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার স্বতশ্চল তাগিদ। হাংরি আন্দোলনের কোনো হেড অফিস/হাই কমাণ্ড/পলিটব্যুরো বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ছিল না। ঠিক যেমন অধুনান্তিকতার কোনো কেন্দ্র থাকে না, অধুনান্তিক লেখালিখির চরিত্র একটি বিকেন্দ্রিক উপস্হাপনা। ফলে ষাট দশকের অন্যান্য সাহিত্য আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল না, অধুনান্তিক বীজ সেখানে নিহিত ছিল। হাংরি আন্দোলন থেকে অধুনান্তিকতায় পৌঁছে যাওয়া যেজন্য খুব স্বাভাবিক। হাংরি আন্দোলন ছিল সর্বাত্মক আন্দোলন। সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি জীবনচর্যার সবদিকেই এই আন্দোলন মনোযোগ দিয়েছিল। “হাওয়া ৪৯” পত্রিকার সংখ্যাগুলিতে বিষয়গুলির ক্রমান্বয়কে যদি লক্ষ্য করো, তাহলে দেখতে পাবে, সমস্ত দিকেই ছিল হাংরি আন্দোলনকারীদের গভীর অভিনিবেশ। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কাগজে-কলমে মুক্তি পাওয়ার পর হাতেনাতে সেই মুক্তি প্রতিষ্ঠার দায় প্রবলভাবে অস্হির রাখে সমাজচিত্তকে। সঙ্গে থেকে যায় ঔপনিবেশিকতার চাপিয়ে দেওয়া খেসারতগুলো। মাথাচাড়া দেয় আত্মবিচ্ছেদগ্রস্ত সত্তার নিজস্ব ভৌমতার অনিবার্যতা। অধুনান্তিকতা সেই সময়ে আমাদের পরিকল্পনায় ছিল না, যদিও তার বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছিল আমাদের ডিসকোর্সে। পরিবর্তনই ছিল আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অধুনান্তিকতা উঠে এসেছে বোধের সমস্তরকম স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে। কোনো পরিকল্পনা থেকে উঠে আসেনি। আধুনিকতা বা মডার্নিজমের থেকে বেরিয়ে এসে তুমি যে জায়গাটায় পৌঁছোলে বা পৌঁছোচ্ছ, তার একটা নামকরণ দরকার এবং সেই ভিন্ন পরিসরটির নামকরণ করেছেন আলোচকরা। অধুনান্তিকতা একটি পরিসর ; অনেকে তাকে আন্দোলন ভেবে ভুল করেন। ”

    ‘হাওয়া-৪৯’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সাজানো বাগানের পরের স্টপ’ প্রবন্ধে ‘অধুনান্তিক’ শব্দটি প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন বহুভাষাবিদ প্রবাল দাশগুপ্ত।

    তাঁর “উত্তরাধুনিক প্রবন্ধ সংগ্রহ” গ্রন্হে দাদা একটা তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন, স্পষ্ট করার জন্য যে আধুনিকতার সঙ্গে অধুনান্তিকতার পার্থক্য কোথায়, তুলে দিচ্ছি এখানে :

    আধুনিক অধুনান্তিক

    যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, যুক্তিবিপন্ন, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে

    সিঁড়ি-ভাঙা অঙ্কের মতো যুক্তি মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা,

    ধাপে-ধাপে এগোয়, কবিতার আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু

    আদি-মধ্য-অন্ত এই ভাবগুলো হওয়া আর শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না

    বজায় থাকে, একরৈখিক দেওয়া, ছেতরানো, ক্রমান্বয়হীন, আবেগ

    ক্রমঅগ্রসর, কেন্দ্রাভিগ, যুক্তির যুক্তির দ্বৈরাজ্য কেন্দ্রাভিগ, যুক্তি ও

    দিকে কবিতার অভিমুখ, আঁটো আবেগের দ্বৈরাজ্যের দিকে কবিতার অভিমুখ,

    সাঁটো, স্বয়ংসম্পূর্ণ। এলোমেলো দেখায়।

    বদ্ধ সূচনা, বদ্ধ আঙ্গিক, বদ্ধ মুক্ত সূচনা, মুক্ত আঙ্গিক, মুক্ত সমাপ্তি।

    সমাপ্তি।


     

    ডিসটোপিয়া। হেটারোটোপিয়া।


     

    সুনিশ্চিত মানে, পরিমেয়তা ও মানের নিশ্চয়তা এড়িয়ে যাওয়া, অফুরন্ত

    মিতকথনের প্রতি গুরুত্ব, কবির মানে, যা ইচ্ছে তা মনে করে নিতে পারেন

    ঠিক করে দেয়া মানে, স্হাবর। পাঠক, মানের ধারণার প্রসার, প্রচলিত মত

    অস্বীকার।

    তলে-তলে মানে, বাইরে মুখোশ। যা আছে তা-ই, লুকোনোর কিছু নেই,

    স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা ভিতর-বাহির

    আলাদা নয়।


     

    ‘আমি’ পাঠবস্তুর কেন্দ্রে, ‘আমি’র একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব,

    নির্মাণ, একক আমি, পূর্ব ক্যানন থেকে বেরিয়ে যাওয়া, ক্যানন

    নির্ধারিত মানদণ্ড, ক্যানন দাঁড় ভেঙে দেওয়া, সীমা আবছা, সীমায় ভাঙন,

    করানো, সীমা স্পষ্ট, আত্মপ্রসঙ্গই মিশ্রতা, লিমিন্যালিটি, সংকরায়ন,

    মূল প্রসঙ্গ, শুদ্ধতা, ‘আমি’র সংকরত্ব।

    পেডিগ্রি ( কুলুজি )।


     

    একক মালিকানা, স্পষ্ট মালিকানা, মালিকানার রুবরিক, মালিকানার বহুত্ব,

    শেকড় -- গোপন গভীরে, কবিই মালিকানা বিপন্ন, মালিকানা বিসর্জন,

    টাইটেল হোলডার। পাঠকই টাইটেল হোলডার, শেকড়

    ছড়িয়ে পড়ে, রাইজোম্যাটিক।


     

    একরৈখিক, লিনিয়ার, লিনিয়রিটি, প্লুরালিজম, বিদিশাগ্রস্ত বহুস্বরের আশ্রয়,

    দিশাগ্রস্ত, একক গলার জোর, কবি দিগ্বিদিকে গতিময়, ভাবুক, জগৎ

    ধ্বনি মিল দেন, প্রগতি। আয়োজনের মেলবন্ধন উসকে দেন,

    অ্যাক্টিভিস্ট।


     

    কবি একজন বিশেষজ্ঞ। কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত

    বৈশিষ্ট্য।


     

    শ্রেষ্ঠত্ব, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠ কবি, বিবেচন-প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা

    একজনকে তুলে ধরা, হিরো, গুরু সরিয়ে দেয়া, কবির বদলে সংকলনের

    কবির গুণগান, একসময়ে একজন গুরুত্ব, কবিতার প্রধান পাঠকৃতি বিচার্য,

    বড়ো কবি, ব্র্যাণ্ডনেম তৈরি, বিশেষজ্ঞ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলা, শ্রেষ্ঠত্ববোধক

    সেন্সেলাইজেশান, আইকন। ফাঁস করে দেয়া, সার্বিক চিন্তা-চেতনা,

    জেনেরালাইজেশান।


     

    কথা খেলাপ, প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, শব্দার্থকে কথা চালিয়ে যাওয়া, কথার শেষ নেই,

    সীমাবদ্ধ রাখা, কবিতার জন্য কবির শ্বব্দার্থের ঝুঁকি, কবিতাকে আত্মমনস্কতা

    আত্মধ্বংস, কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন। থেকে মুক্তি।


     

    বাদ দেবার প্রবণতা, এলিমিনেশন, জোটবাঁধা, যোগসূত্র খোঁজা, শব্দজোট,

    ঝকঝকে, ছাড়া-ছাড়া স্পষ্ট শব্দ। অর্থ-জোট, বাক্যজোট, উগ্র মতকেও

    পরিসর দেয়া।


     

    একটিমাত্র মতাদর্শ, ইজম, তন্ত্র বহুমতাদর্শের পরিসর, ভেঙে-ভেঙে

    অনুযায়ী চলবে, হাইকমাণ্ড, টুকরো ইজমের সমাজ অনুযায়ী

    পলিটব্যুরো-নির্দেশিত। প্রতিনিয়ত রদবদল, ক্রমাগত

    পরিবর্তন, ভঙ্গুরতা, জীবন থেকে

    উঠে-আসা ধারণা।


     

    নিটোল কবিতা, শক্তিমত্তার পরিচয়, এলোমেলো কবিতা, বহুরঙা, শক্তি

    গুরুগম্ভীর, কবিতার নির্দিষ্ট মডেল জাহির করা মুশকিল, হালকা মেজাজ,

    যেমন সনেট, ওড, ব্যালাড ইত্যাদি, নির্দিষ্টতার বাইরে, অপরিমেয় নাগাল।

    অনুভবের গভীরতার খোঁজ।


     

    কবিকে প্রকৃতির বাইরে সাংস্কৃতিক জীব সব মানুষই প্রকৃতির অংশ,

    মনে করা, নিসর্গবন্দনা। ইকোফ্রেণ্ডলি কবি।


     

    প্রতীকের প্রাধান্য, প্রতীকের প্রতীক এড়িয়ে যাওয়া, ভেঙে দেয়া,

    চমৎকারিত্ব, প্রতীকের আহামরি, যা বলার সরাসরি বলা।

    ঘুরিয়ে বলা।


     

    স্হিতাবস্হার কদর, পরিবর্তন শ্লথ। পরিবর্তনের তল্লাশি, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপ

    স্বীকৃত।


     

    নাক-উঁচু সংস্কৃতি, প্রান্তিককে অশোভন সাংস্কৃতিক বিভাজন বিলোপ, অভেদের

    মনে করা, শ্লীল ও অশ্লীল ভেদাভেদ, সন্ধান, একলেকটিক, বাস্তব-অতিবাস্তব-

    ব্যবধান তৈরি করা, ভেদের শনাক্তকরণ। অধিবাস্তবের ব্যবধান বিলোপ।


     

    ‘বড়ো কবি’ বলে দেবে কাকে কবিতা যেমন ইচ্ছে হয়ে ওঠা কবিতা, বহুপ্রকার

    বলে, ভালো কবিতা ও খারাপ কবিতা, প্রবণতা গ্রাহ্য, কবি বেপরোয়া।

    বাইনারি বৈপরীত্য, উতরে যাওয়া

    কবিতা, কবিতা হবে সমরূপী।


     

    খণ্ডবাদী, রিডাকশানিজম, কমপ্লেকসিটি, জটিলতা, অনবচ্ছিন্নতার

    অবিচ্ছিন্নবোধ। দিকে।


     

    কেন্দ্রিকতায় উদ্ভূত, গ্র্যাণ্ডন্যারেটিভ। প্রান্তিকতায় উদ্ভূত, মাইক্রোন্যারেটিভ।


     

    পরমসত্য, অকাট্যসত্য, ধ্রুবসত্য। সাময়িক প্রত্যয়, তত্বের বহুবিধ

    অনুশীলন।


     

    কবিতা বিষয়কেন্দ্রিক, কবিতা কবিতা ফ্লাক্স থেকে জাত, কেন্দ্রিয়

    দর্শন নির্ভর। বিষয়ের অনুপস্হিতি।


     

    কবিতার শিরোনামের গুরুত্ব, কবিতার শিরোনাম গুরুত্বহীন,

    শিরোনামের সঙ্গে কবিতার দার্শনিক না থাকলেও চলে, প্রান্তিক শব্দ, পথচলতি

    বা ভাবগত সম্পর্ক, হিরো, গুরু, অভিব্যক্তি।

    প্রতিভা, মাস্টারপিস, ক্ষমতার মসনদ

    তৈরি, শব্দে মহিমাযোগ, মৌলিকতার

    হামবড়াই।


     

    একটিমাত্র বার্তার বাহক। একসঙ্গে বহুকন্ঠস্বর ও বহুবার্তা,

    এমনকী বার্তাবর্জন।


     

    কবিতার লক্ষ্য অব্যর্থ, কবির কবিতার লক্ষ্য বহুত্ববাদী।

    ব্যক্তিসত্তার বিবেচন।


     

    আধিপত্যের প্রতিষ্ঠা। আধিপত্যের বিরোধিতা।


     

    ‘আমি’ যা বলব সেটাই কবিতা, ‘তুমি’ যা বলবে সেটাও কবিতা,

    এককেন্দ্রিকতা, বৃক্ষশাখার মতন বহুকেন্দ্রিক বা কেন্দ্রহীন পাঠবস্তুর

    ইন্টারলিংকড। অজস্র উপাদান, সংজ্ঞার সীমা

    ছাপিয়ে যায়, ঘাসের মতন ইন্টারলকড,

    রাইজোম্যাটিক।


     

    ওপরের তালিকাটা থেকে স্পষ্ট হয় যে দাদার গল্প লেখার দ্বিতীয় পর্বে অধুনান্তিক জাদুবাস্তবতা এসেছে তাঁর বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি ও পাঠ থেকে সংগ্রহ করা চিন্তাভাবনার হাত ধরে। বন্ধুদের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে দাদা লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রায় দেড় দশক। প্রথম পর্বের গল্পগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের গল্পগুলোর ভাষায় ও কাঠামোয় পার্থক্য আছে। একইভাবে তাঁর প্রথম পর্বের কবিতা ( ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি, জানোয়ার, আমার ভিয়েৎনাম ) থেকে তাঁর দ্বিতীয় পর্বের কবিতা ( মাংসের কস্তুরীকল্প, পোস্টমডার্ন কবিতাগুচ্ছ, বিদুরের খড়ম, নির্বাচিত কবিতা, আপূর্বময়ী স্মৃতি বিদ্যালয় ) সম্পূর্ণ পালটে গিয়েছে। ছোটোগল্পের যে সংজ্ঞা ইউরোপ থেকে এসেছিল, অর্থাৎ একটি হুইপক্র্যাক এনডিং থাকতে হবে এবং ব্যক্তিএককের কাহিনি হবে, তা দাদার গল্প লেখার প্রথম পর্বেও ছিল না।

    রবীন্দ্র গুহ তাঁর ‘সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের ভূবন : গাণিতিক বহুকৌণিকতা ও উপভোগের প্রতিক্রিয়া’ প্রবন্ধে ( কবিতা ক্যাম্পাস, নং ৭১, জানুয়ারি-জুন ২০১১ ) বলেছেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ছোটো গল্পের প্রধান ধারক ভাষা ও আঙ্গিক। পৃথিবী জুড়ে যা কিছু লেখালিখি হচ্ছে তার মূল শক্তি বিষয় নয়, দায়বদ্ধতা নয়, আসল হচ্ছে কাঠামোটি। শাখা-প্রশাখা বিনোদনের উপকরণ সমৃদ্ধ হলেই গল্পটি উপভোগ্য হবে এমন নয়। ভাষার গুণে এবং সুঠাম কাঠামোর জন্য অনেক তুচ্ছ বিষয়ও ভাবনার স্তরে বিস্তর অতিরিক্ত ভাবনা ফুটিয়ে তোলে। যেমন আছে ‘মেথিশাকের গন্ধ’তে, ‘শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বাচন’-এ এবং ‘আলজাজিরা’তে। ‘মেথিশাকের গন্ধ’তে ডিটেইলিং নেই, আছে অতি সহজবোধ্য সংকেতময়তা। অন্ধকার তুলকালাম আড্ডা জমায়। ছায়ার পিছনে বিনম্র ছায়া। আড়ালে গোছানো কথাবার্তা। নির্জনতার মোড়ক উন্মোচিত হয় এইভাবে :-


     

    ‘অন্ধকারে জুজুবুড়ি, রাক্ষস, খোক্কোস, শাঁকচুন্নি, একানড়েরা থাকে -- মা’র কথা না শুনলে খপ করে খেয়ে নেয়-- তারপর মা যখন মামার বাড়ি পাণিহাটিতে নিয়ে যেতেন-- রাঙাদিদু কাছে টেনে সবাইকে রাক্ষস খোক্কোস জয় করার রূপকথা শোনাতেন --- আমরা নিজেরাই কেউ রাজপুত্র সেজে জয়ের খেলা খেলতাম-- খেলতে খেলতে ভয় কেটে গেল --- রাঙাদিদু স্বামীর ঘর করার আগেই বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যে বিধবা হয়ে গিয়েছিলেন -- ছোটোছোটো কদমছাঁট চুল -- ফর্সা রঙ -- রোগা হাত-পা --- পরনে থানকাপড় -- সবাই বলত নেড়ি পাগলি--- আমাদের রাগ দুঃখ বাড়ত --- সেই রাঙাদিদু হঠাৎ মারা গেলেন --- পরের বার পাণিহাটিতে গিয়ে আর দেখা হল না --- মা বললেন --- অন্ধকারের দেশে চলে গেছেন --- সেই প্রথম অন্ধকারের মধ্যে প্রিয়জনের বাস তৈরি হল --- তারপর এক-এক করে মা বাবা ছোড়দি মেজোজেঠা নকাকা বন্ধুবান্ধব কতো প্রিয়জন সেই অন্ধকারে চলে গেল----’ ( মেথিশাকের গন্ধ )


     

    ‘মেথিশাকের গল্প’তে অন্ধকারই প্রধান চরিত্র। অলোক গোস্বামী ‘খুল যা সিম সিম’ প্রবন্ধে ( বোধ, মার্চ ২০০৯ ) বলেছেন, “গল্পটিতে সমীর এই অন্ধকারকে, তার বহুমাত্রিকতা এবং ব্যক্তিত্ব সমেত তুলে ধরেছেন। পড়তে পড়তে বুঝি অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ জড়িয়ে আছে অস্তিত্ব-চেতনার সঙ্গে। যে অভিজ্ঞানগুলো মারফৎ কোনো ব্যক্তি নিজেকে সনাক্ত করে অন্ধকার নিমিষে সেসব অভিজ্ঞান হাপিস করে দিতে পারে। মুছে দিতে পারে পরিচিত ভূগোল। কেড়ে নিতে পারে সভাসামগ্রী। অর্থহীন করে দিতে পারে কোড অফ কম্যুনিকেশন, তছনছ করে দিতে পারে পারস্পরিক সম্পর্কক্ষেত্র।

    “অন্ধকারের স্বরূপসন্ধান যেহেতু সভ্যতার কাম্য নয়, তাই শেফালির মারফত সমাজ বহুবচনে বিধিসম্মত সতর্কবার্তা পাঠায়, ‘যে যেখানে আছ সেখানেই থাকো -- মোমবাতি জ্বেলে নিয়ে আসছি…’।

    “কিন্তু অন্ধকারই তো পারে মনকে প্রশ্রয় দিতে, কল্পনাকে বিস্তৃত করতে। সেজন্যই সৃষ্টির আধার অন্ধকার। ভুলি কেমনে বাল্মীকির আশ্রমের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির নাম তমসা, যা সমীরের ভাষ্যে, ‘কবিতার জন্ম হয়েছিল এই নদীতীরে, আরও সহজ করে বলা যায়, মানুষ নামের প্রাণীর কবিত্বের জন্ম কবিতার জন্ম এই তমসাতীরে। যে কবিত্ব এই প্রজাতির চালিকাশক্তি।

    “হতেই পারে অন্ধকার মৃত্যুর নিজস্ব এলাকা। তার জন্য সেই স্হান ভয়ঙ্কর হবে কেন ? মৃতের তালিকায় প্রিয়জনও তো থাকেন।


     

    ‘এখন আমার নিজেরই অন্ধকারের দেশে চলে যেতে তত দ্বিধা নেই...সেখানে বাঁধন আছে...শক্তি আছে...রাঙাদিদু মা বাবা ছোড়দি সবাই তো সেখানেই...অন্ধকার এখন প্রিয়জনের সংসার…’


     

    “আলোকে অন্ধকারের সাপেক্ষে রেখে সমীর বলেন,


     

    ‘শীতের সকালের দিকে যেমন ব্রেকফাস্টের সময় ডাইনিং টেবিলের ডানকোনে একচিলতে চেনাজানা এ-বাড়ির নিজস্ব রোদ আসে। একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যাচ্ছে এই অন্ধকারও সমান চেনাজানা। চলতে ফিরতে, সঙ্গ নিতে কোনো অসুবিধে নেই। এই অন্ধকার নিজস্ব বিষয়-সম্পদের বাইরে নয়। ”


     

    আরেকটি গল্পে অন্ধকারকে কেন্দ্রচরিত্র দিয়েছেন দাদা, ‘কালো রঙের কাজ : আঁধারের অবিনির্মাণ’। অন্ধকার সম্পর্কে দাদার গল্প দুটি আলোচনা কালে বিজ্ঞানের অধ্যাপক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘সমীর রায়চৌধুরীর ছোটগল্প : কয়েকটি বিজ্ঞানময় অবলোকন’ প্রবন্ধে ( কালিমাটি, নং ৯৩ ) বলেছেন, “বিজ্ঞানে, অন্ধকার স্হানিক বা অস্হানিক দুইই হতে পারে ( আলো কেবল স্হানিক ) যে অন্ধকারের বিন্দুগুলি পরস্পরের সংযুক্ত নয়, সেই অন্ধকার স্হানিক। অস্হানিকে অন্ধকারের এক বিন্দু নড়ে-চড়ে উঠলে, অন্য এক বিন্দুতেও টান ধরে। কথক ও তাঁর স্ত্রী শেফালির মধ্যে সেই অস্হানিক অন্ধকার সেখানে যোগাযোগসূত্রটি হল রান্নাঘরে নির্মীয়মান মেথিশাকের গন্ধ।”

    নীলাঞ্জন লিখেছেন, ‘মেথিশাকের গন্ধ’ গল্পে লেখক শুরুতেই অন্ধকারের পরিসরে নিজের জড়ো করা সত্ত্বার ( Acccumulating self ) বর্ণনা দিয়েছেন :-


     

    ‘অনেকদিন পর আবার হঠাৎ লোডশেডিং। যাকিছু আমার বলার মতো বিষয় সম্পদ জড়ো করেছি, সব আড়াল হয়ে গেল। টেবিল চেয়ার বেডরুম টিভি ফ্রিজ ওয়াশিং মেশিন শেফালি ঘরদোর বুকসেল্ফ সিলিংফ্যান কবিতার খাতা পাশবই, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এ-বাড়ির যাকিছু দৃষ্টোগোচর, এই মুহূর্তে নিজের নিজের অবস্হান থেকে সেই উপস্হিতি এই অন্ধকারে নিভে গেছে। যে অবস্হানগুলো নিজেদের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে এই মহাবিশ্বে আমার জলজ্যান্ত থেকে যাওয়া।

    নীলাঞ্জন তারপর লিখেছেন, এর পরেই দেখি অন্ধকারের সঙ্গে আত্মীয়তা গঠনের চেষ্টা। অবশ্য তা হতেই পারে। ‘আমি আছি; এই বোধ যদি আলো হয়, তবে ‘আমি নেই’ এই বোধ অন্ধকার। দুই বোধই পাশাপাশি থাকে। কবির কাছে অন্ধকার এক গাঢ় তন্ময়তা ডেকে আনে। হয়তো বা তখনই উদ্ভাসিত হয় তৃতীয় নেত্র। দুই চর্মচক্ষুর কাজ ফুরোলেই, তৃতীয় নেত্র নড়েচড়ে ওঠে। লেখক মনে করিয়ে দিচ্ছেন তমসা নদীর কথা। তমসা সামান্য পাল্টালে তামস, যার মানে অন্ধকার। আবার তামস উল্টে দিলেই ‘সমতা’। অন্ধকারে সবাই সমান। সেই মনের ওপর ভর করেই লেখক এগোন। চেয়ার ছেড়ে উঠে, হাতের স্পর্শে অন্ধকারকে চিনে চিনে, অন্ধকারের ভিতর কতো অলিগলি, লেন বাইলেন টেবিলের দুইপাশ দিয়ে বেরিয়েছে। অন্ধকারে ভিতর ফাটলের সন্ধান পাচ্ছেন লেখক। আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরকার অন্ধকার। দুই স্নায়ুকোষের মধ্যবর্তী ফাটল, সেও এক অন্ধকার, বিজ্ঞানীরা যাকে বলেছেন Synaptic Cleft.

    অভিজ্ঞতা ছেনে দাদা পেয়েছেন স্বপ্ন-কল্পনা-বাস্তবের অন্তরালে কুহকী বাস্তবতার ইন্দ্রজাল, যেখানে ব্যক্তিক সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তব তার সত্যগুলোকে চিনে নিতে পারে, কয়েকটি গল্প সেই সময়ে লেখা যখন পশ্চিমবঙ্গে চলছে রক্তচোষার দিগ্বিজয়, যার দরুণ রাজনৈতিক সামাজিক সমালোচনা মুড়ে ফেলতে হয়েছে জাদুবাস্তবে, দ্বৈততার সংমিশ্রিত আদরায়। বাস্তব সমাজকেই দাদা গুরুত্ব দিয়েছেন, আর দ্বিতীয় পর্বে লেখা তাঁর গল্পগুলোয় বাস্তবের ভাঁজে খুলে দিয়েছেন প্যাণ্ডোরার বাক্স । প্রচলিত কৃৎকৌশল বাদ দিয়ে দাদা তাঁর গল্পগুলোয় এমন এক আবহ সৃষ্টি করেন যা আপাত-অস্বাভাবিক, পার্থিব ও অপার্থিব এবং সময় ও পরিসরকে মিশিয়ে গড়ে তোলেন এক তৃতীয় স্হিতি, দুঃখ-কষ্ট-ভয়ের পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন আনন্দময় পরিবেশের আকস্মিকতা। ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ গল্পে আরবি ভাষায় ছিল ‘ইফতাহ ইয়া সিমসিম’, দাদা তাই গল্পগ্রন্হের নাম রাখলেন ‘খুল যা সিমসিম’, ‘চিচিং ফাঁক’ নয়, কেননা ‘চিচিং ফাঁক’ শব্দবন্ধটির মধ্যে বিশাল পাথরের দরোজা খোলার ধ্বনিসাম্য নেই, গুহা সামান্য ফাঁক করে আলিবাবা আর চল্লিশটা চোর তাতে ঢুকতো না। নৃসিংহমুরারি দে তাঁর প্রবন্ধ ‘মূল সূত্রটাই যে অণোরণীয়ান’ ( কালিমাটি, নং ৯৩ ) প্রশ্ন তুলেছিলেন হিন্দি নামকরণ কেন। বস্তুত সিমসিম শব্দটি হিন্দি নয়, আরবি। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ বাংলায় গল্পটি লেখার সময়ে ইংরেজি ‘ওপন সিসেম’কে ‘চিচিং ফাঁক’ করে দিয়েছিলেন।

    দাদার লেখায় জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ সম্পর্কে সর্বপ্রথম লিখেছিলেন রবীন্দ্র গুহ ( কবিতা ক্যাম্পাস, নং ৭১, জানুয়ারি জুন ২০১১ ) তাঁর প্রবন্ধ “সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের ভূবন : গাণিতিক বহুকৌণিকতা ও উপভোগের প্রতিক্রিয়া” প্রবন্ধে। রবীন্দ্র গুহর প্রবন্ধটি থেকে প্রাসঙ্গিক আংশটি তুলে দিই আপনাদের কাছে:-

    “সহজ কথাটা সরাসরি বলাই ভালো, সৎ-সাহিত্যের দরোজাটা বাংলা সাহিত্যে খুলে দিয়েছে সমীর রায়চৌধুরীর পয়লা নম্বর গল্পবিশ্ব ‘খুল যা সিমসিম’। যাকে নিঃসঙ্কোচে বলা যায় রুবিক পৃথিবীর একটা মাল্টিক্রোম হাতছানি, অথবা আলো এখন বক্ররেখায় যায়। সমীরের ডায়াসপোরিক অভিজ্ঞতা থেকে আমরা পাই সোজাসাপটা সরলতা, অনুভূতির অসনাক্ত বিন্দুসকল ও কালের পরিবর্তনশীলতা। আরও পাই অজস্র কিংবদন্তি, রূপনির্মিতি, ক্ষেত্রজ জাদুবাস্তবতা।

    “আমরা যারা গদ্যের হিয়ায়, বাকশস্যে অফুরন্ত ইঙ্গিতময়তা প্রত্যাশা করি, শব্দের সম্পর্কায়ন ও দেহপুষ্টিতে যুগপৎ গুরুত্ব দিই, তাদের কাছে সমীর রায়চৌধুরী নামটির একটি একসেপশানাল গ্রামার আছে। সে শুধু সীমা ডিঙোয় না, ক্রিয়েটিভ প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত মোচড়ায় না, তার আনতাবড়ি অন্ধকারেরও একটা শৈলীগত অর্থ আছে। যা আপাত-অচ্ছুত মনে হলেও আদৌ অচ্ছুত নয়। সে এক আশ্চর্য জাদুসৌন্দর্যের ইশারা, যেখানে অন্ধকার ততোটা অন্ধকার নয়, শূন্যতা ততো গভীর শূন্য নয়। সমীরের কাছে অন্ধকারও একটা সম্পদ, শূন্যতাও মধুময়, শব্দ ও ধ্বনিময়। ‘বহুজাতিক ভুতের গল্পের খসড়া’ একটি খসড়ামাত্র নয়, বিশ্বায়নের হাজার বাস্তব মজার মধ্যে একটি অতিবাস্তব মজা। সমীরের লেখায় এই ঐতিহাসিক ধরতাইটা সত্য, অ্যাবসলিউট সত্য। জীবনে কতো দ্বন্দ্ব সংঘাত দুর্যোগ, কতো জ্যোৎস্না মেঘ কুয়াশা। অন্ধকারের ফাটল দিয়ে সব দেখতে পায় সমীর ---উত্তরঔপনিবেশিক অন্ধকারের অংশীদার সমীর বনাম কার্তিক। কার্তিককে ভুতের গল্প লিখতে হবে। এর আগে ছোটোদের ভুতের গল্প লিখেছে অনেকগুলো। সে লক্ষ্য করেছে পাঠক আগের থেকে অনেক বেশি ভুতপ্রুফ, সহজে ভয় পায় না। তাই সে এনেছিল উপাদান-বিভোর রেডিমিক্স। কিন্তু তাতে যে শর্টহ্যাণ্ডের সংক্ষিপ্ত ছোঁয়া, সেখান থেকে ভুতের গল্প বানানো বেশ দুষ্কর, সেসব বাকমালা পড়তে পড়তে প্রায়শই অন্যকিছু দেখতে পায়। যেমন সে দেখতে পেল :-


     

    ‘অনির্বাণের কথাই হয়তো ঠিক। লাইফ সেভিং ড্রাগ এদেশে ওই গন্ধমাদন। আস্ত পর্বত। পর্বে পর্বে গল্পের ভাঁজ। বহুজাতিকে হনুমানের ঝামেলা নেই, সবাই সমান হন্যমান। যেখানে ভাঙা কার্নিশ কথা বলে কবির সঙ্গে। চৈত্রের দুপুরে কুয়োর গভীরে শুয়ে থাকে নির্জনতা। ’

    বোধোদয়ের দোকান থেকে কার্তিক সেল্ফমেডের প্যাকেট নিয়ে আসে। এটা আশ্চর্য একটা প্যাকেট, প্যাকেটের মধ্যেই প্যাকেট, তার মধ্যে প্যাকেট, তার মধ্যে, তার মধ্যে। আরও ছোটো। আরও। কেবলই অনুমেয়র দিকে আরও ভুতভাবনের বহুব্রী।


     

    ‘বড়ো প্যাকেট খুলতে না খুলতেই বেড়ে যাচ্ছে হতে-হবের ঝোঁক। আশশ্যাওড়ার মৌলিক গন্ধ। ছায়ারা খেলছে আনি বানি জানি না। সব কিছুই চাইছে হতে পারলে হয়। গড়ে উঠছে কুহককুহেলি। খসে পড়ছে নোনা ইঁট। এপ্রান্ত থেকে সেপ্রান্ত অবধি পোড়াবাড়ির ইতিহাসের আত্মবিলয়ের আতর। ভেসে উঠছে ভৌগলিক।’


     

    ‘রেডিমিক্সের প্যাকেট খুলতেই ছড়িয়ে পড়ছে আবছা, ক্রমশ আঁধারের তিথিমাপ বাড়ছে। কার্তিক খুঁজে দেখে মলিন না আবডাল। নক্ষত্র নিভিয়ে আসছে জোনাকি, দমকা হাওয়ায় ছাতা হারানোর বর্ষাকালীন দুঃখু। জেগে উঠছে পোড়ো বাড়ির একদা। অনুসন্ধানী প্যাঁচা সন্ত্রস্ত চামচিকে আর ইঁদুরের বাসাবদলের চিরনির্মাণ ভেসে উঠছে ইহভৌতিক ছাপিয়ে। সন্দিগ্ধ খোঁড়া হয়ে হাঁটছে। ’

    ‘সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে আমতা-আমতা দোটানা। সিলিঙে ঠেকছে হতভম্ব, মাটিতে গড়াচ্ছে খটকা, বুজকুড়ি কাটছে তাজ্জব, অস্হির হয়ে উঠছে খামোকা, উঁকি মারছে তালগোল। জানলার কাছে ঝুলতে শুরু করেছে কাঁচুমাচু’


     

    গল্পটি শেষ হয়েছে একটি অবিশ্বাস্য জাদুবাস্তব-অধুনান্তিক আবহে--


     

    চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে হাড়গিলে নিশুতির হামা। বাড়ছে ভুতুড়ে পুঁজির রমরমা। পরস্পরের জায়গা বদল করছে খুঁটিনাটি আর খুঁতখুঁত। কার্তিক ভেবে দেখছে এবার কি সে ভীতির মধ্যে যাবে না ভয়ের অন্তরায় হয়ে উঠবে। প্যাকেট থেকে বেরোনো ক্রমউপদ্রবী আবছায়ায় সে একা। এই মুহূর্তে ছায়া-প্রচ্ছায়া দিশেহারা। জানলায় ঝুলছে কাঁচুমাচু। হতভম্ব ঠেকছে সিলিঙে। ছড়িয়ে পড়ছে অনুপস্হিতির অনুপ্রবেশ। এলোমেলো হয়ে পড়ছে চিন্তাজনিত। মাটিতে গড়াচ্ছে খটকা। বুজকুড়ি কাটছে তাজ্জব। ’


     

    “স্বাধীনতার পরও ভারত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হাতে অবাধ মৃগয়া ক্ষেত। তাবড় তাবড় ভারতীয় বণিকরা ভিন্নদেশীয় বন্ধুদের মদতে চমকদার সাবান, তেল, কেশকালা, দাঁতের মাজন তৈরি করছে। এইসব সামগ্রীর গুণ বিচারের জন্য কোনও কোনও বাণিজ্য সংস্হা দশ মিলিয়ন টাকা খরচ করছে বিজ্ঞাপন বাবদ। এদের সমবেত আক্রমণের ফলে আমজনতা পিতৃনাম ভুলতে বসেছে। ক্রেতারা বিগবাজারে বলিপ্রদত্ত। আজও কেউ বুঝলেন না ভোগবাদ একটি রোগ।

    “সে কলকাতাই হোক বা মুম্বাই বা শহর দিল্লি, মোড়ে মোড়ে বিশাল হোর্ডিং। বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপন। কোলগেট, পণ্ডস, পেপসোডেন্ট -বিড়লা-টাটা-রিলায়েন্স-বাজাজ-হিন্দুজা-মহিন্দ্রা। কাগজে টিভিতে কতোরকম নখরা। গাজোয়ারি নয়, সব বুদ্ধির খেলা। এই বিজ্ঞাপনের খরচ তুলতে, কতো রকমের প্যাঁচ -- কতোরকম ‘শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বাচন’ ---’ওঁ হ্রী হ্রী শ্রী ওঁ লক্ষ্মীবাসুদেবায় নমঃ।” ক্রেতাকে বিব্রত না করে বাজার দখল করতে হবে। সে গল্প শোনায় পিনাকী। গল্পের নায়ক সুব্রত। কোম্পানির মাল্টিন্যাশানাল, কোম্পানিতে অনেক কবি-লেখক-ডকু ফিল্মমেকার একাধিক। সবাইকে টপকে অ্যাসাইনমেন্টটা পায় সুব্রত। অফিস থেকে ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে পুরীতে এসে হোটেলে ওঠে। সে খায় দায় আর লক্ষ্য করে কে কেমনভাবে টুথপেস্ট ব্যবহার করে। মুখশ্রীতে কেমন মহিমা খেলা করে। ব্রাশের ডিজাইন দ্যাখে, টিউবের প্যাকিং। ফেনা, গল্প, স্বাদ, মেজাজ। ব্রাশের আকার ছন্দ দ্যাখে। গাদা ব্রাশ-টুথপেস্ট নিয়ে নাড়াচাড়া করে। এভাবেই সে পেয়ে যায় সূত্র। কেল্লা ফতে ---


     

    ‘স্রেফ টুথপেস্টের টিউবের মুখটা এক মিলিমিটার বাড়িয়ে দিতে হবে। গোপন থাকবে এই কৌশল। দাম মাত্র দুটাকা কমিয়ে একটা ঝুটো মিতব্যয়িতার গিমিক ধরে রাখা হবে বাজারে। অধবা গোড়ার দিকে সঙ্গে একটা গিফট বা কুড়ি পার্সেন্ট এক্সট্রা পেস্টের ভড়ং। মনোযোগের কেন্দ্র সরিয়ে দিতে। তাহলেই ফর্টি পার্সেন্ট অতিরিক্ত টুথপেস্ট ড্রেনআউট হয়ে যাবে। কেননা টিউবের মুখের ডায়ামিটার আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। স্রেফ এক মিলিমিটার। ’ ( শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বচন )


     

    “কালখণ্ডের চমৎকার কৌতুক হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের বাজারায়ন তথা বিশ্বপুঁজিবাদ। একথা বোধহয় বাংলা সাহিত্যে আধিপত্যবাদীরা বুঝে ওঠার আগেই বুঝে ফেলেছিলেন কতিপয় গোত্রচিহ্ণহারা দ্রোহপুরুষ, যাদের মধ্যে অন্যতম সমীর রায়চৌধুরী। শৈলী বা প্রকরণ মেনে সমীর কখনও গল্প লেখেননি। তাঁর পাঠকাঠামোয় কারো প্রভাব নেই। একেবারেই ভিন্ন এবং তাৎপর্যপূর্ণ। স্তন্যপায়িনীর পৃথিবীতে চলতে চলতে আবার সেই জাদুবাস্তবতা --- আছে আর নেই।

    “ভূখণ্ডের ক্ষয়, নিসর্গের ক্ষয়, এর মধ্যে জাদুবাস্তবতা খুব বাড়তি মনে হলেও ময়লা নয়। বিষয়টি আমাদের সাহিত্যে নতুন মনে হলেও বিশ্বসাহিত্যে নতুন নয় --

    The term magic realism, originally applied in 1920 to a school of painters, is used to describe the prose fiction of Jorge Luis Borges in Argentina, as well as the work of writers such as Gabriel Garcia Marquez in Colombia, Isabel Allende in Chile, Gunter Grass in Germany, and Joh Fowels in England. These writers interweave, in ever shifting pattern, a sharply etched realism in representing ordinary events and descriptive details together with fantastic and dreamlike elements, as well as with materials derived from myth and fairy tales ( A Glossary of Literary Terms, M.H.Abrams)

    “আমাদের জীবনে বাস্তবতা একাধিক। যেমন নিত্যবাস্তবতা, অদ্ভুত বাস্তবতা, রূঢ় বাস্তবতা, দিব্য বাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা। দুঃখ এবং সৌন্দর্যে ভরা এইরকম লাগামছাড়া বাস্তবতার জীব আমরা নাটকের কুশীলব, চিকিৎসক, সমাজসেবিকা, মিথ্যাবাদী, কবি, ভিখিরি, যোদ্ধা। সবার জীবনযাপনে পদ্ধতির পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যের ব্যাপারে যিনি যতোটা সচেতন তিনি ততোটাই সার্থক বস্তুবাদী। সমীরের চোখ সরাসরি নিত্যসুন্দরের দিকে থাকলেও, মার্কেস এবং গুন্টার গ্রাসের মতো জাদু-ভেল্কি-মন্ত্র-তন্ত্র বাদ যায়নি। বিশ্বায়নের মজা বাদ যায়নি। যেভাবে কল্লোল যুগের লেখকরা নতুন ঘরানার সাহিত্য গড়ে তুলেছিলেন, নির্মাণ করেছিলেন নতুন ভাষার, তেমনি সমীর আনলেন কল্লোল পরবর্তী অধুনান্তিক টাইমস স্টাইল, প্রকৌশল। গদ্যভাবনার গুণমাহাত্ম্য ভিন্নমাত্রা পেল। বিজ্ঞজনেরা ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে তার পাঠবস্তুর মাপজোক করল, পরিসর পরিস্হিতি এবং মুক্ত সূচনা, মুক্ত সমাপ্তির লক্ষণ খুঁজল, বিবাদ সৃষ্টি করতে পারল না।

    “সময়ের ক্ষয়, আতঙ্ক, সন্ত্রাস, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বাতাবরণ মানেই উত্তরআধুনিক, একথা সমর্থন করেন না সমীর। তার চেনা-অচেনা শব্দসকল, সাবঅলটার্ন কথাবিশ্ব অধুনান্তিক বিশ্বায়নের সারবস্তু। সমীরের পাঠবস্তু ন্যারেটিভ নয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফর্মবর্জিত। তার রচনায় অদ্ভুত ভাষাবুলি ঝুড়িঝুড়ি, যেমন---


     

    দিলফাড়, ঠাওর-ঠিকানা, মিল্লত, উড়ানমনস্ক, বুজরুকি, আলিশান, কাঁটোকা হার, দিল-জ্বালানি, হিট-রহস্য, দীর্ঘ জুম ফোকাস, ফিলিম, তুক মেলানো, বেপর্দা, কাঁইয়া, স্তনের ডৌল, জৈবতাপ, মনমর্জি, লালফুটকি, চিৎপুতুল, ঢালাউপুর ( ‘খুল যা সিম সিম’ গল্পগ্রন্হ থেকে )


     

    গোলগল্প থেকে গালগল্প : একটি অর্বাচীন ডায়ালগ’ প্রবন্ধে ‘শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বাচন’ বিশ্লেষণকালে শাশ্বত সিকদার বলেছেন :-

    “সমীরের লেখায় আমরা স্পষ্টত যা পাচ্ছি তা হল স্মৃতি আর কল্পনার দোলাচল। কোথাও বোঝার সঙ্জ উপায় নেই, কোনটা রিয়েল লাইফ ফিকশনের অংশ, কোনটা বাজিয়ে তোলা। সদ্য নোবেলপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক কোয়েটজির ‘এলিজাবেথ কোস্টেল্লো’ উপন্যাসেও আশ্চর্যভাবে বাস্তব ও মনগড়া চরিত্ররা মিলেমিশে থাকে। এর পরে, সমীর পাঠবস্তুর বাইরে থেকে সবজান্তা চালে বানোয়াট গল্প ফাঁদছেন না। পা ফেলছেন না নিজস্ব অভিজ্ঞতার বাইরে। তিনি নিজে অংশগ্রহণ করছেন রচনার অন্তবর্তী ব্যবসাবিষয়ক প্রতিবেদনে। অনেকের স্বরের সাথে চালাচ্ছেন ইনটারাপ্টেড ডিসকোর্স। নিজের বৈচিত্র্যময় ডায়াস্পোরিক অভিজ্ঞতার লক্ষ্মীর ঝাঁপি খুলে তিনি বার করে চলেছেন একটার পর একটা রসদ।

    “আমাদের মনে হয়েছে, সমীরের সব গল্পই আসলে, একভাবে, তাঁর অলিখিত আত্মজীবনীর টুকরো অংশ। পাণিহাটীর শৈশব আর কর্মসূত্রে বিহার-ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের দ্বৈত ডায়াস্পোরিক অভিঘাত সমীরের জীবনকে অনবদ্য সব অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ করেছে। সমীরের ভূগোল হয়েছে আশয়, তাই তাঁর ইতিহাসও হয়েছে সীমাহীন। আর তাই তাঁর গল্পে হাঁটাহাঁটি পা ঢুকে পড়েছে বিভিন্ন পরিসরের ভূগোল, ইতিহাস, প্রান্তিক মানুষজনের ঘামের টাটকা গন্ধ। অবলোকন প্রতিভার জাদুতে বর্ণিত এইসব ঘটনাগুলোর চারপাশের অদ্যাবধি আলো-না-ফেলা অঞ্চলগুলো এসেছে প্রকাশ্যে। সমীর তাকে হিরের মতন শব্দের আলো ফেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা তরতরিকায় দেখেছেন। ”

    দাদার গল্পের পাশাপাশি যে বিদেশি লেখকদের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে তাঁরা হলেন টমাস বার্নহার্ড, পিটার হাণ্ডকে, জন ফাউলস, অ্যাঞ্জেলা কার্টার, জন বানভিল, মিশেল টোরনিয়ার, গিয়ানা ব্রাশচি, ইউলেম ব্রাকমান, লুইস ফেরন প্রমুখ --- যাঁদের গদ্য একযোগে জাদুবাস্তব ও উত্তরাধুনিক। পরাবাস্তবের প্রভাবের কথা বলব না, কেননা দাদা পাণ্ডুলিপিতে যথেষ্ট কাটাকুটি করতেন এবং স্বগতলিখন লিখতেন না, লেখার আগে কাহিনিটি নিয়ে প্রচুর চিন্তা করতেন, বিভিন্ন রেফারেন্স বই ঘাঁটতেন। “হাওয়া ৪৯”-এর যে বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রকাশিত হয়েছে, প্রতিটির বনেদে একটি গল্প বা কবিতাগুচ্ছ প্রসঙ্গক্রমে এসেছে দাদার চিন্তায়, যেমন জটিলতা, সংকরায়ন, অপর, অধুনান্তিকতা, উত্তরঔপনিবেশিকা, ইকোফেমিনিজম, সীমা, ভারতত্ব, ডায়াসপোরা ইত্যাদি। বস্তুত ম্যাজিক রিয়্যালিজম অভিধা এতো বেশি প্রয়োগ হয়েছে, বিদেশে তো বটেই, এদেশেও, যে এসকেপিস্ট ফিকশানকেও অনেকে জাদুবাস্তবের পর্যায়ে ফেলছেন, ফলে বিনোদনের জন্য বা বাজারকে সন্তুষ্ট করার জন্য যে অবজেকটিভ মেইনস্ট্রিম ফিকশান লেখা হচ্ছে. তাদেরও জাদুবাস্তব বলে চালানো হচ্ছে।

    জাদুবাস্তব এসকেপিস্ট ফিকশান নয়, বিনোদনের জন্য নয়, বাজার ধরার জন্য নয়। এই ফিকশান আমাদের জগতকে চিহ্ণিত করে এবং তাতে আমাদের অবস্হানকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় ; সত্যগুলোর বার্তা পাঠায় অথবা তাদের অন্বেষণ করে। জাদুবাস্তব অত্যন্ত সিরিয়াস ফিকশান এবং তাতে গদ্যবিন্যাসের কাজ জরুরি। লেখক চেষ্টা করেন একটি বাক্যের মধ্যেই অতীত-বর্তমান ভবিষ্যতকে উপস্হাপন করতে। প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক বাস্তব থেকে এই বাস্তব পৃথক। জাদুবাস্তব ফিকশান চিন্তার পরীক্ষানিরীক্ষা নয়, দূরকল্পনামূলক নয়, তার বিশ্ববীক্ষা অবজেকটিভ মেইনস্ট্রিমের বাইরে।

    ‘সিগারেটের তিরোভাব’ গল্পটি নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (কালিমাটি নং ৯৩), আমি প্রসঙ্গিক অংশগুলো তুলে দিচ্ছি :-

    “এই গল্পে রয়েছে কথক ও তাঁর দৌইত্রী পিংকির মধ্যে স্নেহমধুর ভাবের আদানপ্রদান ও পিংকির দাদানের ( ঠাকুরদা ) মৃত্যু নিয়ে জেগে ওঠা সামাজিক পারলৌকিক সংস্কারবাহিত কিছি চিত্র। এই গল্পে সিগারেট দেহের বিকল্প হিসাবে দেখা দিয়েছে। দাদান অবিনাশবাবু ছিলেন চেন-স্মোকার। তাঁর মৃত্যু যেন সিগারেটের তিরোভাব। তাঁর সহসা মৃত্যুতে বাড়িতে শোরগোল পড়ে গেল, শোকের ছায়া নেমে এল। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের কাজ এগোতে লাগল। পিংকির মনে নানান প্রশ্ন। দাদুকে তার উত্তর যোগাতে হয়। পরদিন সন্ধ্যাবেলায় পুরোহিত এলেন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ব্যবস্হার জন্য। কাগজপত্র উল্টেপাল্টে দেখে বিধান দিলেন ---’ত্রিদোষ ঘটেছে। দানদক্ষিণা বেশি লাগবে। ষোড়শদান। আত্মাদেবতার তুষ্টি। বিশদভাবে অনুষ্ঠান প্রয়োজন।’

    “এক দৃষ্টিতে দেখলে ( আধুনিকতাবাদী ) এসব হল পুরোহিত অং-বং-চং। অবসলিট শাস্ত্রে এসব পাওয়া যায়। পরলোক অস্তিত্বহীন। কিন্তু তৃতীয় তরঙ্গের পোস্টমডার্ন বিজ্ঞান জানাচ্ছে, এগুলো ওরকম হুশ করে কালো কাকের মতো উড়িয়ে দিলে চলবে না, বরং এর ভিতরেও ফেলতে হবে সন্ধানী সার্চলাইট। মৃত্যু নিয়ে ভাবনার শিখা উসকে দিয়েছেন কাহিনিকার সমীর রায়চৌধুরী। লিখছেন:-


     

    ‘কিছুকাল আগে মরে যাওয়া ভাবলে কষ্ট পেতাম। যত দিন যাচ্ছে মৃত্যু নিয়ে ভাবনা পাল্টাচ্ছে। বাবা মা ন-কাকিমা ছোড়দি কিছু প্রিয় বন্ধুবান্ধব আর এই দাদান মারা যাওয়ার পর, মৃত্যুর এলাকাকে ফাঁকা লাগে না। একা বলে মনে হয় না। মনে হয় মৃত্যুও বসবাসের যোগ্য। ’

    “এককালে মৃত্যুর এলাকাকে ‘অমুত্র’ বলা হতো। আমি শব্দটির মধ্যে রস পাচ্ছি তাই একে ফিরিয়ে আনতে চাইছি :


     

    পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে... ন এব ‘ইহ, ন ‘অমুত্র’ ( হে পাত্র, বৈদিক কর্মত্যাগ করা সত্বেও যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি ইহলোকেও পতিত হয় না, পরলোকেও নিকৃষ্ট শরীর প্রাপ্ত হয় না ) [ গীতা, ধ্যানযোগ ৬.৪০ ]


     

    “পদার্থবিদ রিচার্ড ফেইনম্যান বলতেন, পদার্থবিদ্যার সমস্ত সমীকরণকে একটি মহাসমীকরণের মধ্যে পুরে ফেলা যায়। সেই মহাসমীকরণ হল Unworldliness = 0, সংক্ষেপে U = 0 এখন এই Unworldliness এর বাংলা করছি ‘অমুত্র’। এই সমীকরণের অর্থ পদার্থবিদ্যার সবকিছুই ইহসর্বস্ব ( Worldly) ; ইহলোকের বাইরে কিছুই নেই ; কিন্তু এই দৃষ্টিতে অধিবিদ্যার ( Metaphysics ) সম্ভাবনাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। তৃতীয় তরঙ্গের পোস্টমডার্ন বিজ্ঞান কিন্তু তা চাইবে না। সে বলবে -- ‘অমুত্র’ আছে। আছে তার নির্দিষ্ট গঠন। মৃত্যুর পর সেখানে যাওয়া যেতেই পারে। একে বলি প্রেতলোকের অসমীকরণ। গল্পকার সমীর রায়চৌধুরী আন্দাজ করেছেন এই অসমীকরণের অন্ধকারে দৃষ্টি চালিয়ে--


     

    ‘যারা মারা যায় তারা বোধহয় স্বজনের মৃত্যুর দ্বিধা সংগোপনে চুরি করে নিয়ে যায়। প্রেতলোকে আর খারাপ লাগে না।

    এদিকে পুরুতঠাকুর বলেছেন, বৈতরণী, চতুর্ধাশান্তি, ষোড়সদান, ভোজ্যউৎসর্গ --- শ্রাদ্ধানুকল্প -- মনোময় কোশ --- সে অনেক ব্যাপার। ’


     

    “মনোময় কোশের পর হল বিজ্ঞানময় কোশ, যেখানে তৃপ্ত আত্মার বাস, যেখানে ‘ইহ’ (This) এবং ‘অমুত্র ( That ) -- দুই পৃথক নয়, দুই জুড়ে সন্ধি হয়ে রচিত হয়েছে ‘ইহমুত্র’ যা স্বামী বিবেকানন্দের প্রিয় শব্দ ছিল। এই ইহমুত্রই গোটা জগৎ। মনোময় কোশে এদের দুই খণ্ডকে আলাদাভাবে দেখা হয়। আলাদাভাবে দেখা হলেও এদের মধ্যে যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যায় না, কোয়ান্টাম দর্শন এখানে কাজে লাগে। পিণ্ডদান কিংবা ভোজ্য উৎসর্গের পদ যেন এক একটি Wave-packet। সেই পদগুলি, এক্ষেত্রে, গল্পকার জানাচ্ছেন, স্হির হল…


     

    ‘হিঙের কচুরি, বেগুনি, মোচার ঘণ্ট, কইমাছের ঝালদে, দই ইলিশ, গলদা চিংড়ির মালাইকারি, এবং চা-সিগারেট’


     

    “সিগারেট তাহলে পুরুপুরি তিরোহিত হচ্ছে না, চলছে মৃতকের সহানুকল্পে --- অমুত্রের দিকে। তবু শ্রাদ্ধদিবসের দিনে অবিনাশবাবুর প্রিয় ব্র্যাণ্ডের সিগারেট প্যাকেট খুঁজে পাওয়া গেল না, কিনেও আনা হল না, ভোজ্য উৎসর্গের থালায় একটি পদ রিক্ত থেকে গেল

    “এই না পাওয়া নিয়ে সমীর রায়চৌধুরীর গল্পে দ্বিতীয় এপিসোড। স্কুলে পিংকির জামার মধ্যে শুঁয়োপোকার প্রবেশ, শুঁয়ো ফোটানো ও পিংকির জ্বর, শুঁয়োপোকা বন্ধন ও প্রজাপতি মুক্তির প্রাণময় উপস্হিতি। সেই বন্ধন ও মুক্তি ক্রমশ ‘ইহ’ ও ‘অমুত্রে’ও।

    “ স্কুলে গিয়েছিল পিংকি, তার গায়ে শুঁয়োপোকা উঠেছে, গায়ে ফুটিয়ে দিয়েছে শুঁয়ো। পিংকির বেশ জ্বর। ডাক্তারবাবু এসেছেন। সন্না দিয়ে শুঁয়ো তোলা হয়েছে, মলম লাগানো হল। দাদুকে দেখে পিংকির তোড়ে কান্না-- ‘শুঁয়োপোকা কেন স্কুলে গিয়েছিল ?’ জন্মদিনে পিংকিকে দাদু উপহার দিয়েছিলেন লতাপাতা আঁকা সবুজ জামা। সেইটি পরেই কি স্কুলে গিয়েছিল পিংকি ? উত্তর এখানে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যাই হোক না কেন --- অন্তরালে দেখি সম-অভিযোজনের দোলা, পিংকি ও শুঁয়োপোকা একই বিন্দুতে পৌঁছোচ্ছে।

    “কথক, পিংকির দাদু, পিংকির কান্না থামানোর জন্য তার ডলপুতুল ন্যান্সির খোঁজ করেন। সেই পুতুল পাওয়া যায়, জুতোর বাক্সের ভিতরে উল্টোনো অবস্হায়, এবং কী আশ্চর্য, সেই পুতুলের বুকের নিচে -- সেই আত্মার তৃপ্তিকর রিক্ত পদ --- সিগারেটের প্যাকেট। লোভনীয় সিগারেট, তবু কথক, পিংকির দাদু সেই প্যাকেট খোলেন না শেষ পর্যন্ত -- যেখানকার বস্তু সেখানেই ফিরে যাক। ওঁ নমো। ”

    দ্বিতীয় পর্বের ফিকশনে দাদার ন্যারেটিভ কেতা হয়ে উঠেছিল সহজাতভাবে অন্তর্ঘাতী, পরাভবী এবং তাতে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার প্রতি খোঁচাগুলো মজার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, যেমন, ওষুধের জন্য আমাদের দেশ সেই গন্ধমাদন পর্বেই রয়ে গেছে আর বিদেশ থেকে আনছে নানা ধরণের ক্যারদানি। একই ন্যারেটিভ কন্ঠস্বর প্রয়োগ করে তিনি বাস্তব এবং জাদুর মাঝে পর্যয়ানুবৃত্তি ঘটিয়েছেন, কিন্তু দুটির মাঝের পালাবদলকে এমনভাবে ন্যারেটিভে বুনে দিয়েছেন যে বোঝার উপায় নেই কোনটা বাস্তব আর কোনটা অবাস্তব। ফলে বাস্তব আর ইন্দ্রজালের বাইরে একটা তৃতীয় জঁর তৈরি করতে পেরেছেন, যেকারণে পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট তত্ত্বের মাধ্যমে বলা চলে যে তাঁর ন্যারেটিভের একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে। পর্যায়ানুবৃত্তির কারণে একটিমাত্র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কন্ঠস্বরকে প্রতিরোধ করে পাঠবস্তুগুলো। তাঁর ন্যারেটিভের কেতাটি সীমাগুলোকে অনুসন্ধানের পর লঙ্ঘন করে, সে সীমা রাজনৈতিক হোক বা ভৌগলিক হোক বা তাত্ত্বিক হোক বা বস্তুবর্গীয় হোক। সীমাগুলোকে ভেঙে তিনি উত্তরঔপনিবেশিক ভারতের সমাজ, গণতন্ত্র, ধর্মদ্বেষ, সন্ত্রাস, জাতিপ্রথা, দারিদ্র, দলীয় রাজনীতি, ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ইত্যাদির সত্যগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। পাঠকের মনে সন্দেহ চাগিয়ে তোলেন যে বাস্তবের বৈশিষ্ট্য যদি চূড়ান্ত না হয় তাহলে সত্য সম্পর্কে যাবতীয় অনুমানই ঝুঁকিআক্রান্ত। ক্ষমতা থেকে যাদের বঞ্চিত করা হয়েছে সেই ‘অপরদের’ বাকজগতকে প্রয়োগ করতে হয়েছে তাঁকে। ঔপনিবেশিক ও উত্তরঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রকরা, এদেশে হোক বা বিদেশে, ‘অপর’ সংস্কৃতিকে দাবিয়ে রেখে যে অবাস্তবতা সৃষ্টি করেছে, জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে তিনি তা উপস্হাপন করেছেন তাঁর ফিকশানগুলোয়।

    ১৯৯৯ সালে লেখা “খননকার্য” গল্পে কথকের মাসিমার শাবল হারিয়ে দিয়েছেন কোনো কবিবন্ধু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে। শাবল দিয়ে একজন কবি কেঁচো খুড়ছেন, কেন, তাঁর কেঁচো কেন দরকার, কথক সেকথা পরে জানিয়েছেন যে খোঁড়াখুঁড়ি কবিদের কাজ, অর্থাৎ এক ধরণের কবি কেঁচোর সন্ধান করে পুরস্কৃত হন। কথক কবিবন্ধু সম্পর্কে তাঁর খোঁচাটি লুকোননি, স্ত্রীকে বলছেন :


     

    ‘তা বড়ো বড়ো নামকরা কবিবন্ধু থাকলে ওসব একটুআধটু হবে, দাড়িওয়ালা ভক্তিপ্রসাদকে তো বহুবার দেখেছ, একটু বেশি মদ খেতে ভালোবাসে, একবার বাড়ি এলে সহজে যেতে চায় না, সাহিত্য অকাদেমি আনন্দ পুরস্কার, অনেক সব প্রাইজ পেয়েছে, তুমি তো আগে দেখেছ, আর ওই ঝাঁকড়াচুল জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন পদ্যলেখার সবচেয়ে বড়ো প্রাইজ, খুব অসাধারণ সব লোক, একটু আধটু হুঁশ কম থাকে, কবি হলে ওসব হয়, অতশত তুমি বুঝবে না, পদ্য লিখলে বুঝতে, ব্যাপারই আলাদা। ওরা সব একধরনের অমর মানুষ। ’


     

    মাসিমার লোহার শাবলের বদলে ভালো স্টেনলেস স্টিলের শাবল কিনে এনে দেবার পর মাসিমা জানান যে পুরোনো শাবলটা ওঁর শশুরমশায়ের, ওঁর স্মৃতির, বাড়ি তৈরির সময়ের অনেক গল্প আছে পুরোনো শাবলে, নতুন শাবল তা যত ভালোই হোক মাসিমার চাই না, পুরোনো শাবলের সঙ্গে তাঁর জীবনের গল্পও হারিয়ে গেল। অর্থাৎ অন্যের পারিবারিক ঐতিহ্য সম্পর্কে কবিরা আগ্রহী নন, তাঁরা কেবল পদ্য লিখে প্রাইজ পেতে চান এবং ‘একধরনের অমর মানুষ’ হতে চান।

    ১৯৯৩ সালে লেখা “টিনিদির হাত” গল্পে দাদা শৈশবের হুলাসচাচার ‘রামচরিতমানস’-এর প্রশ্নাবলীর খেলাকে এনেছেন এবং ন্যারেটিভে সংযোজন করেছেন বিভিন্ন মাত্রা, প্রেমের, হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব, ছোটোলোক-ভদ্রলোক বিভাজন এবং ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাসের গুরুত্ব, যা ঔপনিবেশিক চাপ সত্ত্বেও নিম্নবর্গের মানুষের জীবনে টিকেছিল। হুলাসচাচার ‘রমাচরিতমানস’ খেলায় একটি শলাকা দিয়ে বইতে নির্দেশ করলে হুলাসচাচা নির্দিষ্ট চৌপাই ব্যাখা করে ভবিষ্যত বলে দেন। বালক কথকের প্রতিটি ইচ্ছে পূরণ হয়েছে শুনে তার বন্ধ সুলেমানও খেলতে আসে, মনস্কামনা পূর্ণ হয় কিন্তু তার গাছে চাকা-চাকা ঘা দেখা দেয়। কথকের হিন্দু পরিবার মনে করে গোরুর মাংস খাবার কারণে হয়েছে ; সুলেমান মনে করা হিন্দুর গ্রন্হের খেলা খেলার জন্য হয়েছে। কথকের বাবা ঘায়ের ওষুধ দেন যা কথক ভুলিয়ে খাওয়ায় সুলেমানকে, খুদাবক্স ডাক্তারও ওষুধ দেন, আনোয়ারের দোকানে গিয়ে গোরুর মাংস খায় সুলেমান, টিনিদি আদর করে হাত বুলিয়ে দেন সুলেমানের মাথায়। সুলেমানের অসুখ সেরে যায়। বালক কথকের মনে সন্দেহ জেগে ওঠে যে এইগুলোর মধ্যে ঠিক কোন কারণে সেরে গেল সুলেমানের অসুখ।

    “টিনিদির হাত” গল্পটিতে জাদুবাস্তবতা হল ‘রামচরিতমানস’ এর রামশলাকা খেলা আর হুলাসচাচার ভবিষ্যৎবাণী প্রত্যেকের ক্ষেত্রে অব্যর্থ হওয়া। গল্পটির মাধ্যমে দাদা দৈব ঘটনাকে বাস্তবের রূপ দিয়েছেন, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে উদ্ভাবনাকে গুলিয়ে দিয়েছেন, যার দরুন চাপ সৃষ্টি করেছেন বাস্তব সম্পর্কিত ধারনায়। ইউরোপের আনা বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর ‘আলোকপ্রাপ্তির’ আঠারো শতকী প্রভূত্ববাদী সংস্কৃতির চাপকে আক্রমণ করেছেন সনাতন ভারতীয় সাংস্কৃতিক আচরণের মাধ্যমে। আলোকপ্রাপ্তির ঔপনিবেশিক চাপ অনুগত করতে চেয়েছিল কেবলমাত্র বিজ্ঞান ও যুক্তির দ্বারা, যখন কিনা সাধারণ ভারতীয়রা যেযার সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের নিজস্ব সত্যকে বাতিল করতে চায়নি। ‘অপর’-এর দৃষ্টিতে দেখলে, যেটা দাদা তুলে ধরতে চেয়েছেন এই গল্পে, যুক্তিহীনতাও জীবনের বহু ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারে, এবং বাখতিনের বক্তব্য ধার নিয়ে বলা যায় এক্ষেত্রে দেখা দেয় হেটেরোগ্লসিয়া বা বহু পরস্পরবিরোধী কন্ঠস্বর, ভারতের চিন্তাভাবনার সাস্কৃতিক বহুত্ব, নানাধর্মিতা, পারস্পরিক বৈভিন্ন্যকে ফিকশনটি আলোকিত করে।

    হাংরি আন্দোলনের আগে এবং হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার যে তিনটি কাব্যগ্রন্হ বেরিয়েছিল, সেগুলো নিয়ে দাদাকে একটা বই বের করতে বলেছিলুম, কিন্তু বইগুলো উনি নিজের কাছে রাখেননি, কারোর কাছ থেকে সংগ্রহ করতেও পারেননি। বইগুলো হল “ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি”, “জানোয়ার” এবং “আমার ভিয়েৎনাম”। আমি কৃত্তিবাস সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড থেকে দাদার কয়েকটা কবিতা তুলে দিচ্ছি যা থেকে স্পষ্ট হবে যে কৃত্তিবাসের লিরিকাল ধারা থেকে কীভাবে উনি ধাপে-ধাপে বেরিয়ে গেলেন।

    “ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি” পর্বের কবিতা ( দাদার মেয়ের নাম হণি, সেই সময়ের কবিতা ) কৃত্তিবাস পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল :


     

    হণির ভিতর দিয়ে দেখা যায়

    জাহান্নমে যাক গ্রহনক্ষত্রসমূহ ভেঙে পৃথিবীও যাক জাহান্নমে

    লাথি মেরে সব ভেঙে চুরমার করে দিলে, কাল আমি সহাস্যবদনে

    হাততালি দিয়ে মঞ্চে কোনোরূপ গ্লানিহীন নুরেমবার্গের আদালতে

    তুড়ি মেরে কাঠগড়া মুঠোয় গুঁড়িয়ে তোমাদেরও পারতাম ভেলকি সুবিস্তারে।

    সৌরমণ্ডলের পথে তছনছ পৃথিবীর অন্ধকার ফেরি আবর্তন

    কোনোরূপ রেখাপাত সম্ভব ছিল না গ্রন্হে হৃদয়ে মেধায়,

    আমার শরীর ঘিরে ইহুদির হিন্দু শিখ মুসলিমের আততায়ী আদর্শের

    ঘৃণ্য রক্তপাত--

    আমাকেও জয়োল্লাস দিয়েছিল মূত্রপাতে পোষা রাজনীতি।

    তোমাদের আস্ফালনে বিনয়ী মুখোশ ঘিরে আমার হণির জন্মদিন

    আমারই মুখোশ ধরে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে আর্ত চিৎকারে--

    ধান উৎপন্ন হওয়ার গন্ধ এখন পেয়েছি শুঁকে কৃষকের উর্বর শরীরে

    কুমারী মহিলাদের উজ্জ্বল মসৃণ দেহে বহুবার হাত রেখে উত্তরনিশীথে

    পরাগ চমকে ওঠে, স্পর্শ করে নারীর সমগ্র দেহ জুড়ে

    আশ্রয় ছড়ানো আছে প্রীত এক ধরণের মিহি রুখু বালি।

    ক্রমে এই সমস্তই নাভির ভিতরে আনে রুদ্ধ আলোড়ন,

    জেগে ওঠে মৃগনাভি, চেয়ারে টেবিলে গ্রন্হে অম্লান মাঠের ভিতরে

    ধু-ধু রিক্ত প্রান্তরের দিকে শাবক প্রসব করে রঙিন প্রপাত,

    চারিদিকে ফলপ্রসূ হয়ে গেছে রাশিরাশি প্রতিহারি ধান---

    #

    মনে হয় বহুক্ষণ মাঠে মাঠে গড়াগড়ি দিয়ে বিছানায় উঠে আসে নারী

    ক্ষুধার্ত শিকড়গুলি ঢুকে যায় নীড় আস্বাদনে,

    তখনই উৎপন্ন হওয়ার গন্ধ জাগে, কৃষকের উর্বর শরীরে

    প্লুত আবছা আঁধারে তাই বারবার মনে হয় পৃথিবীর সহজ সুদিন

    ফিরে এলো সুধাশান্তি

    আমার হণির জন্য তোমাদের কাছে আমি ঋনী চিরদিন।


     

    এই কবিতাগুলো কৃত্তিবাস পত্রিকার কুড়ি নং সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল :-

    ব্যক্তিগত ন্যাপথালিন

    বাক্স খুললেই ভবঘুরে সুখ

    ন্যাপথলিন তীব্র ন্যাপথলিন

    ন্যাপথলিনের গন্ধে সংসার উন্মুখ


     

    নিজস্ব ডেটল

    ছুটে আসে হাসপাতাল অতিউগ্র তরল শেফালি

    বুকে রাখা কোতোয়াল ভেদ করে তীব্র অশ্রুপাত

    স্পর্শ করে লুকানো ডুমুর।

    হনির মুখশ্রীছবি আমাদের আবহাওয়া রিপোর্ট

    আমাদের বুঁদ জলবায়ু

    জারি রাখি উচ্ছন্ন মেয়াদ মৃত্যু বেহুঁশ টম্যাটো।

    ক্রমশ হারিয়ে যায় আমার একান্তপ্রিয়

    টম্যাটোর লাল

    ছুটে আসে হাসপাতাল, অতিউগ্র তরল শেফালি

    ছুটে আসে তিন লক্ষ উন্মাদ কুকুর

    নধর পালংশাক রেগে ওঠে হঠাৎ খুরপি লাগে বুকে--

    মনে হয় বেশ আছি ছেলেপুলে নিয়ে সুখে।


     

    মৃতমন্ত্রীবিষয়ক নিধি

    আমিও শকুন হয়ে দেখতে চাই না আর নানাবিধ মড়া

    টক মিষ্টি ঝাল

    ওরা সব ছিল কাল

    আজ উঠে গেছে ঝাঁজ

    হঠাৎ পথের মোড়ে পুলিশের পক্ষে ওই মৃত বৃদ্ধ রেখে

    কিসের সুরাহা হবে ট্যাক্সিঅলা জানে

    এই অবসরে আমি চলে যেতে চাই কোনো আবছা আকাশে

    ঠুকরে দেখতে চাই টাটকা বিনোবা কতখানি ভেপসে উঠেছে ভেতরে


     

    ঝ্যান্ত মানুষ ঠুকরে

    দ্যাখা যায় গোপনীয় লাশ

    দ্যাখা যায় বাগানের লুকানো পলাশ

    এসোনা ঠুকরে দেখি তোমার প্রতিভা।

    হাংরি আন্দোলনের সময়ে প্রকাশিত হয় দাদার কাব্যগ্রন্হ “জানোয়ার”, টের পাওয়া যায় কেন তিনি কৃত্তিবাসের কোটর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, কৃত্তিবাসের লিরিকাল জগত থেকে উত্তরঔপনিবেশিক বাস্তবতায় আক্রান্ত হয়েছিল তার সংবেদ, তা “রবীন্দ্রনাথ” শীর্ষক এই কবিতাটিতে স্পষ্ট :-

    ১.

    ঈশ্বরকে চিনে নেওয়ার জন্য আর আমার বেলপাতার দরকার নেই

    কবিতাকে চিনে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন নেই ‘মতো’ আর ‘যেন’র

    জন্মভূমি স্বদেশ মাতৃভূমি চিনে নেওয়ার জন্য

    দেশবাসীর এখন মানচিত্রের প্রয়োজন

    সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য চিনে নেওয়ার জন্য

    সমাজের দরকার পোশাক-পরিচ্ছদ

    নির্ধারিত উর্দি ভাগাভাগি করে গা্য়ে চড়িয়ে মানুষ

    অভিনেতা পুলিশ শুশ্রুষাকারী উকিল বিচারক আর নেতা হয়ে উঠছে

    আমি কলতলায় ন্যাংটো স্নান করে দেখে নিচ্ছি আমার গোপন পবিত্রতা

    শান্তি আর শৃঙ্খলার জন্য মানুষকে হত্যা করা প্রয়োজন

    স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের জন্য কাঁদুনে গ্যাসের দরকার

    আদর্শ আর ক্ষমতার জন্য প্রয়োজন যুদ্ধ আর শান্তির শর্তাবলী

    যে-কোনো ধারণার চেয়ে মানুষ আজ খাটো হয়ে পড়ছে

    ২.

    শিল্প ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    দেশ ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    ধর্ম ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    ভাষা ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    সৌন্দর্য ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    সংস্কৃতি ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    ঐতিহ্য ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    বিশ্বপৃথিবী ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

    সেই রবীন্দ্রনাথের জন্মমৃত্যুর পরেও তার সোনার বাংলা ভাগ হয়ে গেছে

    সেই রবীন্দ্রনাথের জন্মমৃত্যুর পরেও তারই গান গেয়ে

    একদল মানুষ আরেকদল মানুষকে খুন করছে

    ৩.

    কংগ্রেস আর মুস্লিম লিগের ক্ষমতার চেয়ে

    ধর্মান্ধ রাজনীতির বিশাল দাপটের চেয়ে

    রবীন্দ্রনাথের ক্ষমতা অনেক অনেক কম

    নজরুলকে মাসোহারা দিয়ে বিধানসভা চক্ষুলজ্জা ঢাকছে

    দশ হাজার শান্তিনিকেতন খুলে রেখে পৃথিবীকে শান্ত রাখা সম্ভব নয়

    দশ কোটি শান্তিনিকেতন খুলে রাখলেও

    রাজনীতির হিংস্র বর্বরতা থামানো অসম্ভব

    পঁচিশে বৈশাখ থেকে বাইশে শ্রাবণ অব্দি ছুটে গিয়ে দেখেছি

    পৃথিবীর কিছুই সুরাহা হয়নি

    মানুষকে ভালো করে তোলা আমার সাধ্যাতীত

    বহুদূর পথ হেঁটে গিয়ে আমি পুনরায় ফিরে যাচ্ছি

    আমারই অশ্লীল নিভৃত কোটরে।


     

    “জানোয়ার” এর পর প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কাব্যগ্রন্হ “আমার ভিয়েৎনাম”। এখানে যে কবিতাটি তুলে দিচ্ছি, “পালামৌ -- ১৯৬৬”, তা “আমার ভিয়েৎনাম” পর্বের। কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য দাদা লেখা পাঠাচ্ছেন না দেখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দাদার কর্মস্হল ডালটনগঞ্জে গিয়েছিলেন কবিতা আনার জন্য। দাদা কবিতা লিখে দিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে জিপে করে দেহরি অন শোন স্টেশানে ছেড়ে দিয়ে আসেন। দাদা ইচ্ছাকৃতভাবে হাংরি আন্দোলনকারীরা সেসময়ে যে ধরণের কবিতা লিখছিলেন, যা ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, আমার আর সুবিমল বসাকের কবিতা পড়লে স্পষ্ট হবে, সেই ফর্মেই সামাজিক-রাজনৈতিক কবিতাটি দিয়েছিলেন।


     

    পালামৌ -- ১৯৬৬

    পাঁচ হাজার কেঁচোর সঙ্গে মাটি খুঁড়ে ভেবেছিলাম

    ঘুম ভেঙে উঠে দেখব সবুজ বিশাল ভারতবর্ষ

    হঠাৎ সঞ্জীবচন্দ্র ডেকে উঠবেন সমীর পালামৌ সমীর

    অথচ ভোটবাক্স নিয়ে আমি খুঁজে বেড়ালাম ভারতবর্ষের ভালোবাসা

    আমার গোপন তকমার লোভে কৃষকের লাঙল থেকে

    খুঁটে তুললাম প্রভূত ন্যাপথলিন

    কেননা পৃথিবীর সবচেয়ে নগ্ন আর মজবুত স্ত্রীলোকের নাম ভিয়েৎনাম

    এখন স্রেফ পাঁচ বস্তা চাল কিনে রেখে

    আমি দুর্ভিক্ষের দায়দায়িত্ব সেরে নিচ্ছি

    কয়েকটা ব্যাপারে কেবল মহিলার আধিপত্য সহ্য হচ্ছে না

    আত্তিলার রক্তেও ছিল না একশো ভাগ নিরেট পৌরুষ

    বুঝতে পারছি না কেন আমার গর্ভধারণের ইচ্ছে হয়

    কেন আমার মসৃণ বুকে হাত রেখে মাঝরাতে হঠাৎ ককিয়ে উঠেছি

    আমারই যৌনতার মধ্যে খুঁজে দেখেছি নিজস্ব গোলাবাড়ি একান্ত বীজধান

    আমারই বীর্য থেকে স্রেফ আমারই শরীরে প্রসব চেয়েছি আমি

    অথচ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অভাবে মহিলাকে দিয়ে এলাম প্রেম আর কোকাকোলা

    ঠিক এই কারণেই কোথায় কতখানি সমীর পরখ করতে

    এক মহিলা থেকে ঘুরে বেড়ালাম অন্য শরীরের আনাচে কানাচে

    আমার বাঁ-চোখ থেকে খুঁটে তুললাম তিনশো জোনাকির হঠাৎ জ্বলে ওঠা

    গোলাপের চতুর্দিকে নিয়ন্ত্রিত কীটের উদ্বেগ অভিযান লক্ষ্য করে

    আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার বিবেকের তলপেট

    নিজের তৈরি বাস্তবিকতার সঙ্গে

    পৃথিবীর বাস্তবিকতা মিলিয়ে দেখতে গিয়ে

    আমি টের পেলাম আমার ব্যক্তিগত ছাপাখানা

    কেননা প্রত্যেকবার একটা চৌরাস্তার কাছ-বরাবর এসে

    আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাচ্ছি

    বাম আর দক্ষিণ কমিউনিস্টদের খেল কসরৎ ঈর্ষা দেখতে

    মার্কসের জরায়ু থেকে বের করে আনছি তিন লক্ষ সমীর

    ভোরে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে কামরাজ পাতিল যেমন চোখে পড়া মাত্র

    আমার মুখ তেতো হয়ে উঠছে

    স্বপ্নের প্রথম শর্ত

    মনে করো জেগে আছো তুমি

    শব্দ আর শব্দ বিনিময়ে কবিতার ধর্ম হয়ে ওঠে

    শপথের চেয়ে ঘৃণ্য কোনো পাপ নেই

    প্রতিটি গলির মোড়ে অন্য এক প্রতিজ্ঞায় রুখে

    এখন সাপের খেলা

    ভ্রূ-আঁকা পেন্সিলে আমি মহিলার চোখের পাতায় লিখছি অশ্লীলতা, নার্সারি রাইম।


     

    কলকাতার বাঁশদ্রোণীতে পাকাপাকি আসার পর প্রায় দেড় দশক পর দাদা যখন লেখালিখি এবং ‘হাওয়া ৪৯’ পত্রিকার সম্পাদনা আরম্ভ করলেন তখন তাঁর কবিতাভাবনায় এবং কবিতা রচনায় বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেছে। তার প্রধান কারণ সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের সমাজের রাজনীতির সংস্কৃতির যে নতুন রূপের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, তার সঙ্গে তাঁর কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতার দুস্তর ফারাক অনুধাবন করতে পারলেন, প্রত্যক্ষ্য করতে পারলেন নবোদ্ভূত কেয়সকে, দেখলেন তার কেন্দ্রটি নিশ্চিহ্ণ। ফলত তাঁর কবিতায় কোনো ডমিন্যান্ট শৈলীর প্রভাব পড়ল না, কেননা কবিতার ক্র্যাফ্টকেই তুলে আনলেন কবিতার শরীরে ; তিনি ছবির সঙ্গে ন্যারেটিভকে এবং দার্শনিক বিবেচনা, প্রতিবর্তী ক্রিয়া, মুক্ত-সমাপ্ত পরস্পরবিরোধিতা, বুদ্ধিগত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, একই সঙ্গে একাধিক ঘটনা, দৃষ্টিভঙ্গীর পর্যায়ান্বন, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তর, অসঙ্গতি, অপ্রত্যাশিত বাঁক, অর্থান্তর সৃষ্টিকারী ও আপাতবিচ্ছিন্ন চিন্তাপ্রবাহ মিশিয়ে দিতে লাগলেন। অনেক কবিতায় শৈলীটিকে ভঙ্গুর করে ফেলে তাকে ডায়েরির রূপ দিলেন। তাঁর কবিতাভাবনা পশ্চিমবঙ্গের তরুণদের মাঝে জলবিভাজকের কাজ করল ; একদিকে পরম্পরাবাদীরা এবং অন্যদিকে তাঁরা, যাঁরা কবিতার ক্র্যাফ্টকে কবিতারচনার প্রধান আগ্রহ করে তুললেন। কবিতায় “বিষয়”-এর মৃত্যু ঘোষণা করলেন, বললেন যে শিরোনাম হল কবিতার ‘রুবরিক’, তা কবিতাবিশেষের টাইটেল হোলডার নয়। প্রাগাধুনিক-প্রাকঔপনিবেশিক কবিতার মতন পরিসর তাঁর কবিতায় হয়ে উঠল শব্দমূল ও ধাতুকাঠামো সংক্রান্ত আগ্রহ। পাশাপাশি, যেমন তাঁর ছোটোগল্পে, তেমনই কবিতায় উঠে এলো বহুজাতিকতা ও ক্রনি পুঁজিবাদের দরুণ প্রভাবিত মানুষের অবদমন. মনোভঙ্গ, বিষণ্ণতা ; ব্যক্তিএককের বেদখল হয়ে যাওয়া চেতনা, পরিবেশ ও সংসার।

    “জীবনানন্দ : সূর্য ও তপতী” প্রবন্ধে দাদা লিখেছিলেন, “কবিতার লক্ষ্য অনুভূতিদেশ। অনুভূতির গভীরে আছে আদি স্বাগতম। আছে সর্বভূতেষু জাগরণস্পৃহা। অহং ব্রহ্মাস্মি চেতনার অপেক্ষমাণ বুদবুদ। কবি সে আসঙ্গ-যুক্ততার কাতরতাকে উসকে দেন। শব্দ যোজনার সেই কালিক চেতনাকে অতিক্রমণ কবির লক্ষ্য। ঈষৎ অনন্যসাধারণ উত্তরসমাজকে ত্বরান্বিত ত্বরান্বিত ও আরো বেগবান করে তোলার তিনি চেতনার অভিমুখের মশালবাহক। সমাজ যত বেশি একলষেঁড়ে হয়ে পড়ে, একলপ্ততার প্রয়োজন তত বাড়ে। বহুরৈখিকতা, ময়ূরপঙ্খী বর্ণময়তা সেখান থেকে মুক্তি দেয়। ”


     

    তাঁর শেষ পর্বের কয়েকটি কবিতা এখানে তুলে দিই।

    এই কবিতা দাঁড়াতে চায় না

    কিছু কিছু শব্দের সকাল হয়ে আসছে

    কিছু কিছু শব্দের রিপেয়ারিং চাই দরকার জোড়া লাগানো

    কার সঙ্গে কিসের জোড়া সে-কথা পেয়ারিং শব্দের মধ্যেই আছে

    প্রয়োজন প্যার মহব্বত পিরিত পেয়ার

    পুরুষ প্রকৃতির তত্ত্বকথা না শোনালেও চলবে


     

    ছন্দ

    প্রত্যেক শব্দের মধ্যে কিছু শব্দ পাশ ফিরে থাকে

    প্রত্যেক শব্দের মধ্যে কিছু অক্ষর থেকে যায় স্বল্প উচ্চারণে

    কিছু উপসর্গ প্রত্যেক ধাতুর সম্পর্কে থেকে যায় অর্থবিহীন

    বুঝ আর অবুঝের মধ্যে বোঝাপড়া রাখে কার্যসাধিকা

    নীলুদের সংসারে ছোটমাসি মুখ বুজে কাজ করে যায়---

    জটিলতার কাছে সোপর্দ রয়েছে

    গতির অরৈখিক নকশা

    অংশ-প্রীতি, ঘুম

    যেভাবে বিশৃঙ্খলা ছন্দের মুখোশ।


     

    নিজস্ব রোদের জন্য

    নতুন বাড়িটিতে যেদিন প্রথম বিকেলের রোদ এসে

    জীবনের খোঁজ নিয়েছিল সেদিন থেকেই এবাড়ির নিজস্ব রোদ

    নিজস্ব হাওয়া বাতাস নিজস্ব মেঘলার জন্ম

    সবকিছু যা একান্তই এবাড়ির

    যেভাবে কিছু রোদ কিছু বৃষ্টি নিয়ে বেঁচে থাকা সংসার পাতে


     

    যেভাবে স্হানিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায় মহাভাষ্য থেকে

    যেভাবে ব্যক্তিগত রোদের কাতরতা নিয়ে একসময়

    পশ্চিমের বারান্দায় অতসীলতাকে বাঁক নিতে দেখেছিলাম

    দেখেছিলাম রোদের জন্য ঠাকুমার হাপিত্যেশ

    এখনও মনে পড়ে যায় দ্বারভাঙ্গায় আমাদের ডাইনিং টেবিলে

    চা পানের সঙ্গী এক চিলতে রোদ্দুর

    স্কুলের ছুটির ঘণ্টার সঙ্গে চলে যাওয়া রোদের অন্য এক সম্পর্ক ছিল

    যেমন কিছি কিছু ছায়ার সঙ্গে আমাদের নিভৃতের যোগাযোগ


     

    যেভাবে কিছু রোদ কিছু ছায়া ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে জমা পড়ে

    যেভাবে স্হানিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায় মহাভাষ্য থেকে।


     

    আয়নাঘর

    ঘুম ভেঙে আয়নায় দেখি বাবার তিনকাল পেরোনো মুখ

    রাতে খুলে রাখা দাঁতের ডিবে খুঁজছে...

    ইসেবগোল খেয়ে ঘুমিয়ে ওঠা লোকটার শুকনো গলায় তেষ্টা…

    কোঁচকানো গালে ছ-দিনের দাড়ি, ভুরুর বাড়ন্ত চুল চোখ ঢাকছে…

    ফিটকিরির গুঁড়ো দিয়ে ঢিমেতাল মাড়ি শেষ যত্নে ধুয়ে নিচ্ছে…

    সাদা পাথায় তিনটে কালো চুল দেখে নির্বিকার ফোগলা শূন্য হাসছে…

    খুলে রাখা নাক কান চোখ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাঁর দলিলে নেই


     

    বর্ণমালার ক্ষয়িষ্ণু অমৃতকণা ড্যাখে পরস্পর বর্ণগুলি মৌলকণা

    করোগেটেড কপালের বলিরেখায় কেওসের চিহ্ণ…

    ক’দিন বাদেই আসবে ডেটল না-রাখা টিনের কাঁচি চিরুনি…

    ইমলিতলার ভ্যানওয়ালা লটারি পাওয়ার গল্প শুনিয়ে যাবে…

    এমনই অনেক অনুভব ভব হয়ে উঠছে আয়নায় দেখা মুখের ভাঁজে…


     

    পেছন ফিরে দেখি চিরযৌবন আর কবিতার খাতা নিয়ে সমীর--

    শেফালির সঙ্গে বকখালিতে আজ ডেটিং

    পরস্পরের ভূপ্রকৃতি বাস্তুতন্ত্র গিরিখাত আগ্নেয়মুখ চিনে নিতে এখনও বাকি…

    কবিতার খাতা শেষ পাতায় লিখে রাখা ইজা


     

    আয়নাঘরে পেছনের আয়নায় বাবা পিতামহের মুখ দেখছে…

    প্রপিতামহ দেখছে প্রপৌত্রের মুখ

    পাঁচ রাউণ্ডের শেষে শেষ ডিফেন্সে আমি গোলপোস্টে একা

    নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে বিপক্ষের কর্ণার কিকের মুখোমুখি

    গোলার সামনে দুই জার্সি জটলায় পজিশন নিচ্ছে

    হেড-বেহেডে মাথার ওপর বল ঘুরছে ফিরছে

    পক্ষ বিপক্ষ বুঝে উঠতে হিমসিম খাচ্ছি


     

    ভয় এবার যদি পেনাক্টিকিকের হুইসল বাজে

    আয়নাঘরের মাঠে…


     

    [ রচনাকাল : জুলাই ২০১৬ ]


     


     


     


     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     


     

     

     


     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:০৭734842
  • মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস : নরমাংসখোরদের হালনাগাদ

    একটিমাত্র বাক্যে লেখা উত্তরঐতিহাসিক কোলাজ-নভেলা


     

    পাঠক বা পাঠিকা আপনি কখনও পুংযৌনাঙ্গের কাঠিকাবাব খেয়েছেন

    লাবিয়াফ্রাই ইন অলিভ অয়েল

    সে-ভূখণ্ডে পুরুষের অণ্ডকোষকে বলা হয় অলিভ

    খাননি তো

    উত্তরঐতিহাসিক এক ভূগোলের দুই পক্ষের লোকেরা মনে করে এই সমস্ত খেয়েই তারা মজায় আছে

    সে-দু’এলাকা পৌরাণিকাধুনিক যুগের পর থেকে জলহীন হবার ফলে জাতিপ্রথা তাঁবাদি হয়ে গেছে কেননা সকলেরই পোঁদে টাটকা গু লেগে থাকে আর কেউই জানে না চিন্তাভাবনা কাকে বলে কয়েকশো প্রজন্ম থেকে চান করা কাকে বলে কেউ জানে না কোনো মানুষের গায়ের রঙ টের পেতে হলে থুতু দিয়ে ঘষলে টের পাওয়া যায় চান করার ব্যাপার নেই বলে গায়ের তাড়িকুলকুল দুর্গন্ধই পারস্পরিক আকর্ষণের সেতু হয়ে উঠেছে চুলের রঙ হয়ে গেছে সোনালি বাদামি লাল নীল বেগুনি কালচে সেই পারের পুরুষ্টু আর আধখ্যাংরা জনগণ ওই পারের মানুষের জ্যান্ত বাসি শুকোনো শুঁটকি নোনা মাংস ছাড়া আর কিছু খায় না তাদের রক্ত খায় হাড়ের বোতলে ভরে হিসি খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে ভৌগলিক-ভাষায় গালমন্দ করে ওই পারের পুরুষ্টু আর আধখ্যাংরা জনগণ সেই পারের মানুষের জ্যান্ত বাসি শুকোনো শুঁটকি নোনা মাংস ছাড়া আর কিছু খায় না তাদের রক্ত খায় হাড়ের বোতলে ভরে হিসি খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে ঝাউবনের ভাষায় গালমন্দ করে সেই পারের জনগণ অফুরন্ত বিকৃতিতে উচ্ছৃঙ্খলতায় স্বেচ্ছাচারিতায় দুর্বৃত্তিতে ভ্রষ্টতায় মর্ষকামে মন্দগ্রাহীতায় নিকৃষ্টতায় লুঠতরাজে নষ্টামিতে ধৃষ্টতায় অনৈতিকতায় অনিশ্চয়তায় অবৈধতায় আদিমতায় নিমিত্তবাদে ফিরে যেতে চায় যখন চাঁদের ওই দিক পৃথিবীর পানে পিঠ করে পূর্ণিমার রাতে গোল হয়ে ওঠে ওই পারের জনগণ বিকৃতিতে উচ্ছৃঙ্খলতায় স্বেচ্ছাচারিতায় দুর্বৃত্তিতে ভ্রষ্টতায় মর্ষকামে মন্দগ্রাহীতায় নিকৃষ্টতায় লুঠতরাজে নষ্টামিতে অনৈতিকতায় ধৃষ্টতায় অনিশ্চয়তায় অবৈধতায় আদিমতায় নিমিত্তবাদে ফিরে যেতে চায় যখন শুক্রগ্রহের আঙটি কি দিয়ে গড়া জানা ছিল না পাঠক বা পাঠিকা আপনি দেখছেন তো তার ডিজেলরাঙা ভুষোকেলটে হাওয়ার ঘষাকাচ সেপার আর কসমোনটের চোখে দেখা দুনিয়ায় নেই দুনিয়ায় কেন টেলিসকোপে পাওয়া কোনো গ্রহেই নেই শুধু গ্রহেই কেন পুরো ব্রহ্মাণ্ডে কোথ্থাও নেই একই ব্যবস্হা ওপারের হাওয়ার যদিও ওপার-সেপার মিলিয়ে একই হাওয়া দুটো পক্ষকে হাওয়ার বদগন্ধ দিয়ে আলাদা করে রেখেছে তা আজ বহুকাল বহু বছর হল বৈকি তাছাড়া আর কোনো সীমানা নেই কাঁটাতার বলুন নদী বলুন সেপাইসান্ত্রি বলুন সিমেন্টের পিল্পে বলুন কোনো কিছুই নেই ব্যাস এই জমাট বদগন্ধ হাওয়া যা কখনও পূতপবিত্র নদী ছিল যার পিঠে চেপে ঝড় আসে বৃষ্টিহীন-মেঘ আসে পচা পাতারা আসে গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত বসন্ত আসে আর ফিরে যায় নাক উঁচু করে শুঁকতে হবে না জাস্ট নাককে ছেড়ে দিন নিজের কাজ করবার জন্য কি গন্ধ পাচ্ছেন বলুন তো খটখটে নর্দমার শুকনো নালির মরা নালার পাথুরে পাঁকের টাটকা গুয়ের বাসি গুয়ের আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া মরা ভ্রুণের রজঃশরাবের শুকনো রক্তের কানি মাংসখোর নেমন্তন্নের হাড়ের থালায় হিসি-পানের হাড়ের ফাটা গেলাস পিটিয়ে মারা মেটেল মানুষ ফুটবল দলের চাককাটা ফিকে জার্সি জন্মদিনের নষ্ট আমিষ-কেক আইসক্রিমের পৌরাণিকাধুনিক কাঠি বোঁটা-টফির চিমচিম কয়েকরাতের কনডোম তাড়ির চুল্লু-টানা চামড়ার পাউচ ফসিল আলু পটল বাঁধাকপি ফুলকপি ফরাসবিন-জীবাশ্ম উবে-যাওয়া নদীতে ফেলেছিল সেই সময়ের মানুষজন নদী নিজের বিষাক্ত স্মৃতি থেকে মাঝেমধ্যে উগরে দিলে পাওয়া যায় পৌরাণিকাধুনিক যুগের খেলার নিদর্শন গোল্লাছুট হাডুডু কানামাছি জলকুমির ডাংগুলি বউছি দাড়িয়াবান্ধা বলিখেলা বাঘবন্দি জলকুমির চুকিতকিত কিন্তু এক কণা মাংস পাবেন না কেননা সেপারের লোকেরা ওপারের মানুষদের চামড়ার টবে বসিয়ে কিংবা দাঁড় করিয়ে বাঁশের বা হাড়ের ছুরি দিয়ে বেশ সাবধানে চামড়া ছাড়িয়ে কিংবা তালপাতার ডাঁইয়ে আগুন ধরিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে স্মোকড মাংস খেতে ভালোবাসে চান করা কাকে বলে কেউ তা জানে না বলে চামড়ার ওপরের ময়লা মোম হয়ে জমে থাকে ঠিক তেমনিই ওপারের লোকেরা সেপারের লোকেদের দেখলেই বস্তাবন্দি করে বাঁশের মাচানে হুমহুনা ভাই হুমহুনা বেঁধে নিয়ে যায় বস্তাসুদ্দু চামড়ার টবে রেখে দুরমুশ করে কাঁচা খায় কিংবা পুড়িয়ে খায় সেপার বা ওপারের কোনো উৎসব হতে পারে না পাঠক বা পাঠিকা আপনারা তো আমার চেয়ে ভালো জানেন যে হিংস্রতা বাদ দিয়ে কোনো উৎসব সম্ভব নয় এমনকি প্রথম রাতের ইল্লিতে গিল্লি করার ব্যাপারও মানুষের মাংস খাওয়া ছাড়া বাছবাছাই করার কোনো দরকার যে হয় না তা নয় যতো মোটা মানুষ ততো স্বাদ তার চর্বিতে মানবতার গুণে সে নিজেই নিজেকে স্বাদু করে তোলে তার শিরার স্নেহপদার্থ বাড়িয়ে তবে সেপারের আর ওপারের পুরুষদের মধ্যে জোয়ানদের অনেকেই গুদাকৃষ্ট গুদোন্মাদ তেমনই ঝক্কিমন্ত যুবতীদের মধ্যে অনেকেই পুংলিংপাগলি লিঙ্গোদকপ্রাণ তারা শিকার বাছাই করে আড়াল থেকে পাঠক বা পাঠিকা আপনারাই বলুন সেপার-ওপার এরা কি দুটো ভুঁই না দুটো রাষ্ট্র না দুটো সম্প্রদায় না দুটো জাতি না দুটো দল না এক পক্ষ উদারপন্হী আরেক পক্ষ মৌলবাদী এক পক্ষ বিশ্বাসী আরেক পক্ষ অবিশ্বাসী এক পক্ষ গুণ্ডারাজ আরেক পক্ষ জঙ্গলরাজ এক পক্ষ শ্রমিকদরদী আরেক পক্ষ বেকারদরদী আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না পৌরাণিকাধুনিক যুগে সেপার আর ওপারের মানুষের মধ্যে ভাইরেভাইরেভাই রকাড্ডায়যাই ছিল বটে এখনকার উত্তরঐতিহাসিক যুগের মতন মানুষখোর ছিল না যবে থেকে জলহীন এই এলাকায় জলের আকালের ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে একদিন একজন আলটপকা এসে-পড়া কোথাকার-কোন-মেয়েকে সেপার ওপার কোনপার নেবে নির্ণয় করতে না পেরে তাকে পুড়িয়ে মেরে স্মোকড মেম খাওয়া হয়েছিল তারপর থেকে সেপার ওপার আলাদা দুটো পক্ষ হয়ে গেল সেই কোথাকার-কোন-মেয়েকে ধরে সেপার-ওপার উৎসব করে খেয়েছিল তারপর থেকে সেপার আর ওপার জমাট হাওয়ার দেয়ালের সেদিকে-ওদিকে আলাদা হয়ে গেল কোথাকার-কোন-মেয়েকে খাবার সময়েও আইন অনুযায়ী বখরা হয়েছিল একটা মাই টোঁটিসুদ্দু ওপার পেল একটা মাই টোঁটিসুদ্দু সেপার পেল একটা ঠ্যাঙ ওপার পেল একটা ঠ্যাঙ সেপার পেল একটা কান ওপার পেল একটা কান সেপার পেল ভাগ করতে অসুবিধে হয়নি কোথাকার-কোন-মেয়েকে উল্টো টাঙিয়ে এলোচুল ঝোলা মাঝখান থেকে হাড়ের চাপাতির কোপ মেরে-মেরে দুটুকরো করা হয়েছিল ফলে সোনালি কোঁকড়ারেশম চুলসুদ্দু হাফ-লাবিয়া অলিভতেলে ভেজে সেপারের লোকে খেলো হাফ-লাবিয়া অলিভতেলে ভেজে খেলো ওপারের লোকে প্রথম-প্রথম টোপ ফেলার জন্যে ওপার যেমন ল্যাংটো থলথলে অবিস্মরণীয় মেয়েদের তালগাছের তাড়ি নামাবার নাম করে কোমরে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা গয়না পরিয়ে ঝমঝমাঝম ঝমঝমাঝম কোঁচরঘণ্টা বাজিয়ে পাঠাতো এখনও পাঠায় বপুবেঢপ তেলচেকনাই পেছনতোলা পুরুষ পাঠাতো এখনও পাঠায় তেমন সেপারও থলথলে চর্বিদার গাবদাউরুৎ ঢেউদার মেয়েদের আর হোঁৎকা লোকেদের টোপ ফেলতো ওপারের ঢাকঢোল বাজিপোড়ানো নাচগান থেকে টের পাওয়া যায় সেপারের কাউকে ধরতে পেরেছে তাকে তারিয়ে খাওয়া চলছে অলিভতেলে রাঁধা হয়েছে মানুষের মাংসের হাড়িকাবাব রেজালা ধানশাক কাঠিকাবাব ডালচা কোরমা বিরিয়ানি কড়াইগোশ্ত ভুনা কাচ্চিবিরিয়ানি ভুনাখিচুড়ি রোগনজোশ ফ্রায়েডহিউম্যান রেশমিকাবাব এসব পদ রান্নার রাঁধুনির দুই পক্ষের একই নিয়ম তা হল যে মেয়েদের রজঃশরাব চলছে শুধু তারাই রাঁধতে পারবে কেননা তারাই একমাত্র পবিত্র সুবিধার জন্যে এখন বলা হয় সেপারপক্ষ আর ওপারপক্ষ নামের দুটো ব্যাণ্ড পার্টি ব্যাণ্ডে ওপারীয় সঙ্গীত হলে সেপার বুঝে যায় তেমনিই ব্যাণ্ডে সেপারীয় সঙ্গীত হলে ওপার বুঝে যায় ভিয়েন বসেছে যবে থেকে উত্তরঐতিহাসিক যুগ এলো দুপক্ষই মানুষমাংসখোর হয়েছে তবে থেকে সেপারের মানুষদের পপ-কালচার হল মরা আত্মীয়দের দুঃখে পূর্ণিমার রাতে সবাই মিলে হাড়ের বাঁশি বাঁশ-চামড়ার হারমোনিয়াম তালখোলের তবলা বাঁশ-হাড়ের তানপুরা পাখোয়াজ হাড়ের গিটার সেতার চামড়ার ড্রাম সরোদ মাইয়ের চামড়ার একতারা বাঁশের সানাই চামড়ার খোল দিলরুবা এস্রাজ তালগুঁড়ির মৃদঙ্গ ঢাক ঢোলক নাগড়া খরতাল মঞ্জীরা বাজিয়ে সুর করে কাঁদা যাকে বলে কেঁদে শোকমাতন হওয়া আর জ্বর হলে কপালে জলপটি দেবার জন্য দুখু-কান্নার সেই নোনতা জল হাড়ের বোতলে ভরে রাখা ওপারের মানুষদের পপ-কালচার হল অমাবস্যার রাতে মরা আত্মীয়দের দুঃখে সবাই মিলে বঁশি হারমোনিয়াম তবলা তানপুরা পাখোয়াজ গিটার সেতার ড্রাম সরোদ একতারা সানাই খোল দিলরুবা এস্রাজ মৃদঙ্গ ঢাক ঢোলক নাগাড়া খরতাল মঞ্জীরা বাজিয়ে সুর করে কাঁদা যাকে বলে কেঁদে শোকমাতন হওয়া আর জ্বর হলে কপালে জলপটি দেবার জন্য দুখু-কান্নার সেই নোনতা জল হাড়ের বোতলে ভরে রাখা এক পক্ষের পপ কালচার নাচনকোদনে আরেক পক্ষ বিরক্ত হয় ভ্যাঙায় অপসংস্কৃতির বদনাম দিয়ে খেপায় সেপার আর ওপার দুই পারেরই নিজেদের চরচামচা আছে কামড়সমিতি আছে ঝাড়ঝাঁকুনি আছে জোকারচিত্ততা আছে মিথ্যেখোর সমবায় আছে তোলাবাজ সহমর্মীতা আছে তারা উঁকির অঙ্ক কষে ওই পারের ফি-বাড়ির ঘাঁতঘোতের খবর কালোকেলটে কুচকুচে চামড়ার সেরেস্তা খাতায় বাঁশপেনসিলে নথি করে রাখে সেই নথি অনুযায়ী কথাকাটাকাটি হয় সভাসন্মেলন হয় আলোচনা হয় সালিশি জমায়েতে ফয়সালা করা হয় কোন বাড়িতে শাঁষদার মাল আছে মাল মানে ইল্লিতে গিল্লি করার যুবতী নয় মাল মানে যে পুং বা স্ত্রীং-এর শরীরে মাংসের পরিমাণ বেশি তবে মধ্যবয়সী মহিলাদের মাই ঢাউস হয় মাইয়ের টোঁটি শক্ত আর মাপে বড়ো হয় বলে তাদের চাহিদা দুই পারেই বেশি ওগুলো কেটে নিয়ে নতুন নতুন রেসিপি বানানো হয় কারোর মাইতে যদি ধরা পড়ার পর দুধ পাওয়া যায় তো পক্ষের মাই-বিশেষজ্ঞ ফিট্টমফিট পাহারাদারেরা সেই দুধ টিপে বের করা রেখে দেয় সেপারের একনায়ক মোড়লচিফ বা ওপারের একনায়ক মোড়লচিফ ঝিনুকে করে খাবেন বলে যার মাইতে দুধ পাওয়া যায় তার কোলে শুয়েই ঝিনুকে করে দুধ খাবার রেওয়াজ ব্যাপারটা পৌরাণিকাধুনিক যুগ থেকে চলে আসছে তো সেই যখন সমুদ্র থেকে পাওয়া ঝিনুকে বাচ্চারা এখন-অবলুপ্ত বাঘের সিংহের বাইসনের শেয়ালের ভাল্লুকের চিতার জাগুয়ারের দুধ খেতো যবে থেকে দেশটা জলহীন হয়ে গেল সব জানোয়ার পাখিপাখালি উবে গেল শুধু মানুষের চরিত্রের সঙ্গে মেলে এরকম দুটো জীব মশা আর মাছি অফুরন্ত উড়ালে টিকে আছে তেমনই টিকে আছে মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নিয়ে দুটো গাছ বাঁশ আর তাল এখন উত্তরঐতিহাসিক যুগে ধরে-আনা মানুষকে মানবতাবাদী পিঁজরেপোলে বন্ধ করে রাখে তারপর খাবার সময়ে একজনকে বের করে জিইয়ে রেখে টুকরো-টুকরো কেটে কেটে খেতে চায় তখন তাকে সটানঢ্যাঙা তালগাছে বেঁধে রাখা হয় সবাই নিজের ইচ্ছেমতন ধরাপড়া শরীরের পোঁদের মাইয়ের গালের থুতনির উরুর পায়ের-গোছের গোড়ালির নাকের কানের আঙুলের চোখের অংশ কেটে কাঠের আগুনে পুড়িয়ে খায় অলিভতেলে ভেজে খায় বা বিশেষ পদ রেঁধে খায় কাটার সময়ে রক্ত বেরোলে তা চামড়ার টবে জমিয়ে রেখে পাকাতালের মালায় করে খায় নয়তো হাওয়ায় উড়ে-আসা নদী খুঁড়ে পাওয়া কাঁচকড়ার বোতলে ভরে রেখে দ্যায় পরে শুকনো মাংসের সঙ্গে খাবে বলে যন্ত্রণা উপভোগ করতে না পারলে কারোর ভালো ঘুম হয় না আর পাঠক বা পাঠিকা আপনারা তো ভালো করে জানেন যে ব্যক্তিগত বা নিজস্ব বলে কিছু টিকে নেই মাংস শুকোবার উৎসব হয় সেপার ওপার দুই পারেই রোদে তালপাতা পেতে তার ওপর মাংসের টুকরো রেখে শুকোনো হয় কিংবা বাঁশগাছের ডালে ঝুলিয়ে পাথুরে-নুন মাখিয়ে যাতে আকালে কাজে লাগে আকাল মানে যখন মানবতাবাদী পিঁজরেপোল ফাঁকা একে অন্য পক্ষের কোনো মানুষকে হপ্তাখানেক ধরতে পারেনি আকালের দরুণ সেপার ওপার দুই পারের মানুষ বড়ো একটা বেরোয় না তখন শুকনো মাংস পুড়িয়ে রক্তের আচার টাকনা দিয়ে জমানো হিসির মদ দিয়ে খাওয়া হয় পৌরাণিকাধুনিক যুগে জন্তু-জানোয়ার খাবার চল ছিল গোরু ছাগল মোষ ভেড়া কুমির হাতি উট বাঁদর হনুমান চার পায়ের সবই খাওয়া হতো কিন্তু দুই পারের একনায়ক মোড়লচিফ একই সঙ্গে একই রাতে স্বপ্নাদেশ পেলো যে চারপেয়েদের খাওয়া অনুচিত তাতে নৈতিকতার ব্যামোয় ভুগে মানুষ কেরমে-কেরমে হাপিস হয়ে যাবার সম্ভাবনা আর তাছাড়া মানুষ যখন-তখন উঠলো বাই তো চাপতে চাই কায়দায় চুরাশি-আসন করতে পারে বিইয়ে-বিইয়ে নিজেদের বাকতাড়ুয়ার সংখ্যা বাড়াতে পারে জন্তুজানোয়ার তা পারে না কেননা তারা বাৎসায়ন পড়েনি রকে বসে সিটি বাজায়নি ভিড়ে পোঁদে গিল্লি ঠেকিয়ে দাঁড়ায়নি হাত গলিয়ে মাই টেপেনি তারা তাপে আসলে বছরে দিনকয়েকের জন্যে ইল্লিতে গিল্লি করে ফলে সংখ্যায় বাড়তে পারে না তা সত্ত্বেও জলের অভাবে তারা নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেল এদিকে গাঁড়হাভাতে মানুষ তো পিলপিলিয়ে সড়সড়িয়ে বেড়ে চলেছে তাই মানুষের মাংস খাওয়া উন্নত সভ্যতার লক্ষণ কিন্তু নিজের পক্ষের কেউ মারা গেলে তার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ বলে নিজের পক্ষের মানুষদের পোড়ানো হয় না পৌরাণিকাধুনিক যুগে অন্ত্যেষ্টিকালে পোড়ানো হতো বটে কিন্তু পোড়া-মাংসের গন্ধ পেয়ে কেউ-কেউ নিজেকে সামলাতে পারতো না পুড়তে থাকা বাবা বা মা বা বোন বা ভাইয়ের মাংস লোভে পড়ে চিতা থেকে তুলে কচর-মচর হাপুস-হুপুস খেয়ে নিতো মারা গেলে মাটিতে পোঁতাও হয় না কেননা পৌরাণিকাধুনিক যুগে যখন পোঁতা হতো তখন দেখা যেতো যে সমব্যথী মানুষজন নিজের বাবা বা মা বা বোন বা ভাইয়ের গলে যাওয়া মাংস মাটি খুঁড়ে গোধূলিবেলার রঙিন আকাশের তলায় বসে বসে আয়েসে চাকুসচুকুসিয়ে খাচ্ছে গিল্লিআইসক্রিম চুষছে নিজের পক্ষের কেউ মারা গেলে এখন তার শরীর ক্রুশবাঁশে হাড়ের গজাল দিয়ে গেঁথে হাওয়ার দেয়াল থেকে বেশ দূরে যে বাঁশবনের ক্যাম্পাস আছে তার মাঝখানের ফাঁকা চত্ত্বরে নিয়ে গিয়ে পুঁতে দেয়া হয় চারিদিকে বাঁশবন বলে ঝোড়ো হাওয়ায় ক্রুশবাঁশ উপড়িত হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে দুই পক্ষেই গাছ বলতে শুধু মুলি আর তল্লা জাতের বাঁশঝাড় আর তালগাছ কেননা নদী তো সেই কবেই পালিয়েছে মাটির তলার জল কোথায় যে লুকিয়ে পড়েছে কেউ জানে না একশো-দুশো প্রজন্ম থেকে দুই পক্ষের লোকেরা জানে না জল কাকে বলে তাই হিসি দেখিয়ে বাচ্চাদের পাঠশালায় বোঝানো হয় জল কেমন দেখতে ছিল নদী নেই বলে গতি করার জন্যে দুটো বাঁশকে ক্রস চিহ্ণের মতন বেঁধে তাতে হাতে পায়ে হাড়ের গজাল ঠুকে শবকে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে টঙে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় সে মড়াকান্তি মানুষ আপনা থেকেই রোদে শিশিরে অন্ধকারে শুকিয়ে দেখতে দেখতে মিচকিহাসি-করোটি আর হাতপাবাঁধা কংকাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তারপর তার মাথার বগলের কুঁচকির চুল খসে গিয়ে ওড়ে করোটি আর হাড়গুলো একএক করে ঝরে পড়ে তারা মিচকিহাসি বজায় রাখে যাতে প্রমাণ হয় যে জীবন কতো আনন্দময় ছিল মানবজন্ম সার্থক যে পক্ষের মড়া বা মড়ানি সেই পক্ষের বাচ্চারা ছুটির সময়ে মড়াকান্তিদের এই সংগ্রহশালা দেখতে যায় বড়োরা তাদের বুঝিয়ে দেয় কোন ক্রুশবাঁসে কোন একনায়ক মোড়লচিফ আধঝোলা কার আত্মীয় লটকানো বা কোন কঙ্কাল কার বাড়ির বা ঝড়ে ঘাসে ঝরে পড়া করোটি কোন মোড়লচিফের কোন ঝক্কিমন্ত রাত-ফোসলানো আধ-বউয়ের যখন ক্রুশবাঁশ থেকে হাড় পড়ে-পড়ে ঢিবি হয়ে যায় তখন সেই হাড়গুলো আর ধরে-আনা পুরুষদের হাড়গুলো পিষে-গলিয়ে খাঁটি নরোয়া ঘি তৈরি করা হয় ধরে-আনা মহিলাদের হাড় পিষে-গলিয়ে তৈরি হয় নারীয়া ঘি সেই খাঁটি নরোয়া-নারীয়া ঘিয়ে ভাজা মাংসের ফ্রাই খেতে সবাই ভালোবাসে ধরে-আনাদের পেটের টাটকা-তাজা নাড়িভুঁড়ির ছোটোঅন্ত্র দিয়ে টাটকাটাটকি চাউমিন হয় বড়ো অন্ত্র দিয়ে হয় পাস্তা বুড়োবুড়িরা গল্প করে পৌরাণিকাধুনিক যুগে শীতকালে যখন ফরফরিয়ে তুষার পড়ত তখন সেপার ওপার দুই পারেই মানুষকে ভবিষ্যতের জন্যে বরফের অনেক নিচে চাপা দিয়ে রাখা হতো যাতে ফাঁদ পেতে টোপ ফেলে ধরা না গেলে বরফে সংরক্ষণ করা মানুষ খাওয়া যায় বরফেতে জ্যান্তই পোঁতা হতো যাতে স্বাদ নষ্ট না হয় অনেক নিচে এই জন্যে পোঁতা হতো যে পোঁতার পরও দেখা যেতো মাটির তলা থেকে মানুষ পালিয়েছে তবে বেশি নিচে পোঁতা যেতো না কেননা মানুষের এমন আদরের শরীর যে মাটির তলায় গলে গিয়ে শুধু তার হাড়টুকুই পাওয়া যেতো অমন দুর্ঘটনা হয়েছে দু’পক্ষেই তখন হয় হাড় পুড়িয়ে জলে গুলে বাচ্চাদের স্বাস্হ্য ভালো করার জন্য খাওয়ানো হতো নয়তো হাড়ে লেগে থাকা সামান্য মাংস হিমক্রিমের মতন চেটে খেতো দুঃখের যে পৌরাণিকাধুনিক যুগের চব্বিশ ক্যারাটের সোনার দেশ হয়ে গেছে প্লাস্টিক-সোনার গাড্ডা এখন জ্যান্ত যুবক আর জ্যান্ত যুবতী ধরে আনার আরেক ফ্যাসাদ হলো যুবকেরা যুবতীকে খাবার আগে অনেকবার ইল্লিতে গিল্লি করে নিতে চায় যুবতীরাও ধরে-আনা যুবককে তালগাছের খরখরে গুঁড়িতে উলঙ্গ বেঁধে তাকে জড়িয়ে থাকে আর সে মরার আগেও মানবোচিত অভ্যাসবশত অত্যাচারের সন্মোহনে নব্বুই ডিগ্রি উত্তেজিত হয়ে উঠলে তার সঙ্গে এক বা দুই বা তিন সাধ আর সাধ্যমতো যুবতীরা ইল্লিতে গিল্লি করে দুই অঞ্চলের বহু তালগাছ তাদের ধাক্কুমধুক্কিতে হেলে পড়েছে এতে একটা সুবিধে হল যে বারবার ইল্লিতে গিল্লি করার ফলে যুবতী আপনা থেকেই টেঁসে যায় তার রক্ত অপচয় হয় না পুরুষরা সবাই মরে না তবে যুবতীরা তাকে কামড়ে আঁচড়ে চাবুকে পিটিয়ে অনেক সময়ে মেরে ফ্যালে চাবুক পেটাবার সময়ে লক্ষ্য রাখতে হয় যে চামড়া যাতে ব্যবহারযোগ্য থাকে যুবতীরা কখনওবা নিজেদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যুবকের লিঙ্গ কেটে নিজের কাছে রেখে নেয় আর রোদে শুকিয়ে তার ভাঁড়ারের লইট্যা-শুঁটকিলিঙ্গের সংখ্যা অন্যদের থেকে বেশি হবার গর্বে ভোগে যুবকরাও তেমনিই ইল্লিতে গিল্লির পর যুবতী মারা গেলে তার মাইয়ের টোঁটি কেটে নিয়ে নিজের বাড়িতে মাইয়ের টোঁটির স্টক বাড়ায় রোদে শুকিয়ে শুঁটকিমাইয়ের টোঁটি দেয়ালে মটরমালার মতন টাঙিয়ে রাখে আর তার তলায় নামস্বাক্ষর করে রাখে যাতে পরিবারের লোকেরা বুঝতে পারে কোন প্রজন্মের পুরুষ এই বীরত্বের কাজ করেছিল একনায়ক মোড়লচিফ যদি শুঁটকি মাই খেতে চায় বা সেই মোড়লচিফের ফোসলান্তি আধ-বউ যদি লইট্যা-শুঁটকিলিঙ্গ খেতে চায় তাহলে পোড়ানো লিঙ্গ বা মাইকে কচি তালের ভেতরে পুরে মোড়ক উন্মোচন উৎসব হয় তাতে এলাকার সবাই হাততালি দেবার জন্য জড়ো হয় আর একনায়ক মোড়লচিফ গলায় তালপাতার মাদুরের চাদর নিয়ে তালগাছের গুঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন উত্তরঐতিহাসিক যুগের মানবসভ্যতায় নিজস্ব পক্ষের অবদানের জন্য উপস্হিত সবাইকে ধন্যবাদ দেন ভবিষ্যতে আরও অমন উৎসবের ডাক পাড়েন মানবতাবাদী পিঁজরেপোলের সংখ্যা বাড়াবার আশ্বাস দেন উপস্হিত গুদাকৃষ্ট ও ল্যাওড়াপ্রিয় পুং আর স্ত্রীং লোকেরা মানুষ জিন্দাবাদ মানুষ জিন্দাবাদ মানুষ যুগ যুগ খাও মানুষ যুগ যুগ চাটো স্লোগান মারতে থাকে র‌্যালি র‌্যালা করে কচি তল্লাবাঁশের বা মানুষের শিরদাঁড়ার বেত দিয়ে বোনা গামলায় বসিয়ে নিয়ে যায় মোড়লচিফকে কোনো একনায়কবাজ মোড়লচিফ মারা গেলে তাকে দেখন-শ্রদ্ধার সঙ্গে নাকে তাড়ি ঢেলে সারা গায়ে গ্যাঁজানো তাড়ির অমরত্বের মলম মাখিয়ে একটা অন্ধকার ঘরে রেখে দেয়া হয় সেখানে সার বেঁধে বিখ্যাত একনায়ক মোড়লচিফরা চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে আর চিন্তায়-চিন্তায় শুকিয়ে যেতে থাকে তারপর একশো বছর কি দেড়শো বছরে ছোয়ারার মাপের হয়ে গেলে সেটা নতুন একনায়ক মোড়লচিফ সেই ছোয়ারা চিবিয়ে চিবিয়ে বা চুষে চুষে যার যেমন অভিরুচি খেয়ে নেয় একনায়ক হবার জন্যে যে মোড়লচিফের চিফত্বকালে সবচেয়ে বেশি মানুষ ধরে মানবতাবাদী পিঁজরেপোলে রাখা হয়েছে আর তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া হয়েছে তাকেই অমন শিরোপা দেয়া হয় নতুন মোড়লচিফ হবার জন্যে ধরা-মানুষের চামড়া ছাড়ানোর প্রতিযোগীতা হয় যে সবচেয়ে ভালোভাবে চামড়া ছাড়াতে পারে সে-ই নতুন মোড়লচিফ হয় প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দীকে মানবতাবাদী পিঁজরেপোল থেকে হিঁচড়ে বের করে আনা একজন মানুষ বা মানুষীর একটা অঙ্গর চামড়া ছাড়াতে বলা হয় হাত বা পা বা উরু বা গাল বা বুক বা পিঠ এমন ভাবে ছাড়াতে হবে যে চামড়ায় এক রত্তি মাংস বা চর্বি লেগে থাকবে না যুবতীদের বুকের চামড়া এমনভাবে ছাড়াতে হবে যাতে শুকিয়ে বুকবাঁধুনি তৈরি করা যায় মোড়লচিফের অভিষেকে সেই পারের লোকেরা সেই পারে আর ওই পারের লোকেরা ওই পারে জমায়েত হয়ে জাগাঘুমে যুগ যুগ মাংস খাও খাওয়াও ধ্বনি দ্যায় চামড়া শুধু পোশাকের জন্যই নয় আরও বহু শিল্পের কাজে লাগে গ্রীষ্মকালে বাড়ির ছাদে রোদ্দুরের বর্শাফলক যাতে ঘরে না বেঁধে তাই ছাদের ওপরে মানুষের চর্বি দিয়ে সাঁটা হয় ধরে-আনা মানুষের গলার বেল্ট তৈরি করতে তাকে হামাগুড়ি দিতে বলার সময়ে তার হাঁটুর আর হাতের চামড়া যাতে নষ্ট না হয় তাই তার হাতের দস্তানা আর হাঁটুর নিক্যাপ তৈরি করতে হয় ছোটো মাপের থেকে এক্সট্রা লার্জ মাপের ভুলে নিজেরাই নিজেদের দলের কাউকে যাতে না খেয়ে ফ্যালে তাই দু’পক্ষই কপালে রঙ মেখে থাকে সেই পক্ষের কপালে তালপাতা পোড়ানো কালো আর ওই পাড়ের কপালে শুকিয়ে যাওয়া নদীর মাটি রক্ত দিয়ে মেখে রাঙানো রঙে এর ফলে একদিক থেকে যেমন ভুলবোঝাবুঝির ফলে নিজেদের পক্ষের লোকজন থেকে বাঁচা যায় তেমনই কপালের রঙ দেখে অপর পক্ষের লোকেরা সহজে চিহ্ণিত করে ফেলতে পারে অথচ দুই পক্ষই মনে করে যে এছাড়া অন্য উপায় নেই বাৎসায়নের উপদেশ ছাড়াই এতো গিজগিজে মানবসম্প্রদায় হয়ে গেছে যে কে কেমন করে বুঝবে কে কোন পক্ষের তবে অপর পক্ষের মানুষকে ধরতে যাবার সময়ে নিজেদের কপাল থেকে রঙ মুছে ফ্যালে যাতে অপর পক্ষের লোকেরা বুঝতে না পারে এমনকি ফাঁদে ফেলার জন্য অপর পক্ষের রঙ কপালে মাখিয়ে টোপ ফ্যালে তারা ভাবে বুঝি তাদের পক্ষের কিন্তু ফাঁদে পড়ে যখন বুঝতে পারে যে ব্রেকফাস্ট-লাঞ্চ-ডিনার হতে চলল তখন আর কোনো উপায় নেই সেই পক্ষ ওই পক্ষ দুই পক্ষে কেউ-কেউ জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পী হতে চায় তারা ধরে-আনা লোকেদের হিসি বোতলে সংগ্রহ করে রাখে আর ভাবনাচিন্তা করার সময়ে টেবিলঘরে বসে হাড়ের বা বাঁশের কাপে করে চুমুক দিয়ে খায় যাতে পর্যাপ্ত হিসি পাওয়া যায় মূর্খতাকে তারিয়ে চাগানোর জন্য লিঙ্গ শুকিয়ে চুরুট বানিয়ে টেবিলঘরে চিন্তাধোঁয়া ফোঁকে ধরে-আনা মানুষদের প্রচুর তাড়ি খাওয়ানো হয় গাছে বাঁধা জ্যান্ত পুরুষের লিঙ্গতে হাড়ের বা বাঁশের বা চামড়ার বোতল টাঙিয়ে রাখা হয় সেটা ভরে গেলে মোড়লচিফের আধ-বউ বা পৌনে-বউ নিয়ে যায় কেননা আইন অনুযায়ী পুরুষদের হিসির ওপর কেবল মহিলাদের অধিকার একইভাবে কিশোরী-তরুণী-যুবতী-প্রৌঢ়া ধরে আনলে তাকে গাছে বেঁধে বাঁশের সরু পাইপ গুঁজে রাখা হয় আর পাইপের তলায় চামড়ার বড়ো বয়াম রেখে দেয়া হয় প্রথম বয়াম একনায়ক মোড়লচিফের প্রাপ্য আইন অনুযায়ী পাইপ গোঁজার সময়ে নাড়ানাড়ি করা নিষিদ্ধ কেননা নাড়ানাড়ি করলে অরগ্যাজম হয়ে যেতে পারে আর আঠালো অরগ্যাজমের হিসির স্বাদ মোড়লচিফদের পান করা অবৈধ অনৈতিক সংস্কৃতিবিরোধী দলবিরোধী তা একনায়ক হবার পথে কাঁটা অনেকসময়ে দেখা গেছে যে অরগ্যাজমের অন্ত্যমিল ছন্দের দরুণ বাঁশের সরু পাইপ বাঁশির মতন পৌরাণিকাধুনিক যুগের জনপ্রিয় গান আমি তোমারিই আমি তোমারই আমি তোমারই সুরে বেজে ওঠে পুরুষদের ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো-কোনো ঝক্কিমন্ত যুবতী দুধ দুইবার মতন করে সজাগ লিঙ্গের ধাতুরস চ্যামচ্যামিয়ে দুয়ে চামড়ার বাটি করে পৌরাণিকাধুনিক যুগের নেশা হাড়িয়ার মতন চেটে-পুটে খায় যাতে যৌবন ধরে রাখা যায় আর ত্বক চকচক করে একনায়ক মোড়লচিফ ইচ্ছে করলে ধরে-আনা যুবককে খেয়ে ফেলার আগে তর-সইছেনা-এমন কোনো লিঙ্গাকাঙ্খিনী যুবতীকে সোপর্দ করতে পারে কোনো মানে ওয়েটিং লিস্ট অনুযায়ী একনায়ক মোড়লচিফ উপহার দেন যে যুবতী উপহার পায় সে যুবককে গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার ফেট্টিতে বেঁধে হাত দুটো চামড়ার রশি বেঁধে দু পায়ে চামড়ার শেকল বেঁধে সঙ্গে নিয়ে ঘোরে ইচ্ছে হলে কোনো গাছে তাকে বেঁধে চুমুকখানেক তাড়ি চাটিয়ে চামড়ার চাবুক দিয়ে চাবকায় যাতে পিঠে বুকে দাগ না পড়ে তার বন্ধুরা নিজেদের ঠোঁটে পাথুরেনুন মেখে হিহি হিহি হোহো হাহা খিকখিক খ্যাকখ্যাক হাসতে হাসতে চাবুকের সদ্যরক্তিমের ওপর ঠোঁট বোলায় সঙ্গে অবশ্য ফিট্টমফিট পাহারাদার থাকে যাতে না যুবক পালিয়ে যায় কিংবা যুবতী না তার ধাক্কুমধুক্কির প্রেমে পড়ে হাতবাঁধা অবস্হায় হাতে দস্তানা হাঁটুতে নিক্যাপ পরিয়ে যুবককে পৌরাণিকাধুনিক যুগের জানোয়ারের মতন চার হাতেপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে যুবতীর পেছন-পেছন যেতে হয় লিঙ্গে ঝোলানো হিসির বোতল নিয়ে ধরে-আনা যুবকের পোঁদে সুড়সুড়ি দেবার জন্য যুবতী বাঁশপাতা দিয়ে মাঝেমাঝে তার পেছনে বোলায় কোনো যুবক যদি কোনো ধরে আনা যুবতীকে খাবার আগে পছন্দ করে তাহলে একনায়ক মোড়লচিফের ওয়েটিং লিস্ট অনুযায়ী নব্বুই ডিগ্রি গুদোন্মাদ যুবককে সোপর্দ করে পাঠক বা পাঠিকা আপনারা তো জানেনই যে দুর্ভাগা যুবতীরা অপরূপ সুন্দরী হয় আর শরীরে যন্ত্রণা এক লপ্তেই দিতে নেই একটু-একটু করে বেশ কয়েকদিন ধরে তারিয়ে তারিয়ে দিতে হয় পৌরাণিকাধুনিক যুগে অমন যন্ত্রণা দেবার জন্য ইঁদুরদের খেতে না দিয়ে যুবকদের পোঁদে বা যুবতীদের যোনিতে পুরে দেয়া হতো উত্তরঐতিহাসিক যুগে সে যুবতীর গলায় হাতে পায়ে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার বেল্ট বেঁধে হাতে দস্তানা হাঁটুতে নিক্যাপ পরিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ইচ্ছে করলে বাঁধা অবস্হাতেই যতোবার চায় ইল্লিতে গিল্লি করে সে যুবক যদি গুদোন্মাদ না হয়ে পোঙোন্মাদ হয় তাহলে সে ভিন্নছিদ্রান্বেষণে গিল্লির খেলা খেলতে থাকে তার কারণ উত্তরঐতিহাসিক যুগে যুবকেরা সৌন্দর্যকে চায় যাতে তাকে কলুষিত করা যায় যাতে তার অস্তিত্বের সীমা লঙ্ঘন করা যায় যাতে তার দেহাভিমানকে অবজ্ঞা করা যায় যুবকেরাও জানে তাদের সীমা আছে সেই সীমায় তারা বাঁধা যদি তাদের মনে হয় যে সেই সীমা ভেঙে পড়তে চলেছে তাহলে তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে কোনো কোনো যুবক অমন সন্ত্রাসের নেশায় ভয় কাটিয়ে সীমা ভেঙে যুবতীর দেহে চাবুকের দাগ রাখতে চাইলে একনায়ক মোড়লচিফের নিষেধে তা করতে পারে না চামড়া নষ্ট হয়ে যাবার আশঙ্কায় মোড়লচিফের দর্শন অনুযায়ী যুবতীদের হৃদয়ে প্রবেশের পথ হল তাদের যোনি যুবকদের হৃদয়ে প্রবেশের পথ হল তাদের পোঙাপথ মোড়লচিফের মুখ ফসকে বলা কথাই আইন তাই মোড়লচিফ কোনো দুর্ধর্ষ জাঁদরেল মহিলা হলে তাকে সব সময় মাংসের নানা পদ খাওয়ানো হয় যেমন মাইয়ের চিংড়ি-কাটলেট উরুর ফিশ ফ্রাই পাছার মালাইকারি যাতে মুখ ফসকে কোনো আইন না বেরিয়ে পড়ে কেননা বচন হচ্ছে বাস্তব সত্তার চিত্র বা ছবি আর দার্শনিক সমস্যা ভাষাগত সমস্যার নামান্তর যদি ধরে-আনা যুবতীর মাই ঝোলা অবস্হায় দোল খেতে থাকে তাহলে লাকিবয় যুবক তাতে চামড়ার বুকবাঁধুনি বেঁধে রাখে যাতে দোল খেয়ে-খেয়ে তাকে দুধ খেতে উৎসাহিত না করে ফিট্টমফিট পাহারাদাররা হিসির বোতল সঙ্গে রাখে হিসি হতে দেখলেই বোতলে ভরে নেয় যুবকের তেষ্টা পেলে তাড়ির অভাবে হিসি খেয়ে নেশা করে বেশি শীত পড়লে ধরে-আনা যুবতীকে হামাগুড়ি দেওয়ানোয় পাবলিক আনন্দ পায় যুবতী হিহি কাঁপতে থাকে মাইয়ের জমাটবাঁধা টোঁটি থিরথির করে আর সবাই তার কাঁপুনি বাড়াবার জন্যে তার গায়ে কোনো যুবকের জমা করে রাখা ঠাণ্ডা হিসি ঢেলে দ্যায় ধরে-আনা যুবতীর বা কিশোরীর বা তরুণীর বা প্রৌঢ়ার নাম যাই হোক তাকে সবাই উত্তরঐতিহাসিক পোস্টস্ট্রাকচারাল নান্দনিকতার খাতিরে সুন্দরী বলে ডাকে যদিও তার নামের কোনো দরকার নেই তবুও তাকে সেই পার ওই পার যে পারেই ধরা পড়ুক পৌরাণিকাধুনিক যুগে তার স্বনাম ধরে ডাকা হোতো বটে কিন্তু উত্তরঐতিহাসিক যুগ থেকে তাদের সুন্দরী বলে ডাকাই রেওয়াজ যাতে মাংসের আত্মপরিচয় সুন্দর হয় একই ভাবে কিশোর তরুণ যুবক প্রৌঢ় ধরে আনলে তাকে ফরম্যালিস্ট ভাবাদর্শের খাতিরে সুন্দর বলে ডাকা হয় যদিও তার নামের কোনো দরকার নেই তবুও নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় হয়তো বলতে হলে সুন্দরকে কখন পুড়িয়ে খাবো আমার যে খিদে পেয়ে গেছে কখন থেকে না খেয়ে আছি শুঁটকি মানুষ রোজ-রোজ খেতে ভাল্লাগেনা এবার সুন্দরের চামড়া ছাড়িয়ে তাড়াতাড়ি পোড়াবার ব্যবস্হা করো দিকিনি কথার গয়না পরিয়ে তাদের সুন্দর-সুন্দরীত্ব বজায় রাখা হয় যুবতীদের সঙ্গে শীতে যেমন আপ্যায়ন করা হয় তেমনই খুব শীতে যুবকরা যখন হামাগুড়ি দেয় তখন তাদের ঠাণ্ডা বাড়িয়ে দেবার জন্য সকালের তাড়ি বা বাঁশে জমে থাকা শিশির তার গায়ে ঢালে মেয়েদের হিসি ঢালে না কেননা তা দুর্লভ আর খেলে পরে নেশার খোঁয়ারি তিনচার দিন বজায় থাকে যা পৌরাণিকাধুনিক যুগের বাংলামদ খেলে হতো বসন্তকালে ধরাপড়া যুবতীর চুল বেঁধে খোঁপায় তালফুল বা বাঁশফুলের মালা পরিয়ে কোমরে পুংহাড়ের মালা পরিয়ে হামাগুড়ি দেওয়ানো হয় কোনো কোনো গুদাসক্ত যুবক এসব না করে যুবতীকে তাড়ির টবে ভিজিয়ে রাখে আর পুড়িয়ে খাবার আগে ইল্লিতে গিল্লি করে পোড়ালে মাংস থেকে তাড়ির মাদক-সুন্দর গন্ধ বেরোয় যা হাওয়ার দেয়ালে ধাক্কা মেরে তল্লাবাঁশের ভুলভুলাইয়া পেরিয়ে অন্য পারের মানুষদের জানিয়ে দ্যায় যে কয়েকদিন তাড়িতে চুবিয়ে রেখে পোড়ানো হয়েছে সমস্যা হয় মুণ্ডু খাবার সময়ে যদি নতুন পথজামাইরা রক্তে কব্জি ডুবিয়ে মুড়ো খেতে না চায় তাহলে তাদের বলা হয় মুণ্ডু নিয়ে ফুটবল খেলতে যে যতো বেশি গোল দিতে পারে সে মুণ্ডুটা নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়ির বিপ্লবী ঝাণ্ডার ওপরে লাগানো হাড়ের বর্শায় গিঁথে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে রাখে যাতে অপর পক্ষের নিবাসীরা দূর থেকে দেখতে পায় তাদের একজনের কেমনতর হাল হয়েছে দুই পক্ষেরই উদ্দেশ্য হল মানুষের পৌরাণিকাধুনিক যুগে ফিরে যাওয়া কিন্তু নানা বাধা বিপত্তির কারণে উত্তরঐতিহাসিক যুগ থেকে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে গেছে তার মধ্যে প্রধান হল সময়কে কেমন করে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় নিজেরা না হয় পিছিয়ে গেল কিন্তু সময়কে নিজেদের সঙ্গে পিছিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না তার কারণ দুই পক্ষের মাঝের হাওয়া যার কাঁধে চেপে সময় হাতছাড়া হয়ে চলেছে বদগন্ধ বেড়ে চলেছে হাওয়াকে থামিয়ে রাখার জন্যে দুপক্ষের সবায়ের বাড়িতে ঝাণ্ডা ওড়ানো হয়েছে কিন্তু দেখা গেছে যে হাওয়াকে থামাবার বদলে ঝাণ্ডাগুলো তাকে আরও তোল্লাই দিচ্ছে নয়তো কুয়াশাতেও ঝাণ্ডাগুলো অমন করে হাওয়ার সঙ্গে তাল দিয়ে ফরফর করছে কেন পৌরাণিকাধুনিক যুগে হাওয়ার দেয়ালের জায়গায় একটা নদী ছিল কিন্তু মানুষেরা জন্তুজানোয়ারের চামড়ার কারখানা রাসায়নিক কারখানা মানব-সম্প্রদায়ের অঢেল গু আর নানা কারখানার হাইড্রোক্লোরিক সোডিয়াম হাইড্রকসাইড সালফিউরিক নাইট্রিক অগজ্যালিক ফসফরিক ফ্লুয়োরাস সেলেরিক সিলিসিক কারবোনিক অ্যাসেটিক ব্রোমিক টাংস্টিক ফেরিসায়ানিক গ্লুটামিক ল্যাকটিক ফলিক বারবিটুরিক তুঁতেরঙা গাদ নদীতে ফেলে-ফেলে নদীর সারা গায়ে এমন ঘা করে দিয়েছিল যে নদী বেচারী প্রাণ বাঁচাতে এক কালবৈশাখির রাতে পাত্তাড়ি গুটিয়ে সমুদ্রে পালিয়েছে অথচ প্রকৃতির তাতে কোনো হেলডোল দেখা যায়নি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকেছে সকালে যারা নদীর পাড়ে হাগতে গিয়েছিল তারা নদীটাকে দেখতে না পেয়ে ছোঁচাবার উদ্দেশে আশেপাশের শহর গ্রাম গঞ্জ সব জায়গায় খুঁজেছে কিন্তু কোথ্থাও পায়নি তাই দুই পক্ষের টাকলা বা পাকাচুল জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পীরা মানুষের চর্বির লন্ঠনের বা কুপির আলোয় টেবিলঘরে শনিবার সন্ধ্যায় বা বেস্পতিবার দুপুরে বসে-বসে অনেক হেগে-পেদেও কুলকিনারা পায়নি তারা সকলে সুরাহার জন্যে নিজেদের মধ্যে পাদের প্রতিযোগীতা করেছিল কিন্তু জ্ঞানী হলে যা হয় পাদতে গিয়ে হেগে ফেলেছে কিংবা বিজ্ঞানী হলে যা হয় পাদতে গিয়ে হিসি করে ফেলেছে কিংবা দার্শনিক হলে যা হয় পাদতে গিয়ে ঢেঁকুর তুলেছে কিংবা শিল্পী হলে যা হয় পাদতে গিয়ে কোঁৎ পেড়েও হাওয়া বা আওয়াজ কোনোটাই বের করতে পারেনি তারা বলেছে হাওয়ার দেয়াল আসলে পৌরাণিকাধুনিক যুগের পেছলা কালো মরা বেড়ালের সুখচিন্তা দিয়ে গড়া যাদের দেখা যায় না শুনে অনেকে চটে গেছে কেননা তারা কালো বেড়ালদের ভয় পাবার কাহিনি তাদের ঠাকুমা-দিদিমার কাছে শুনেছে কিন্তু প্রতিটি শিশুর ঠাকুমা-দিদিমা পরিবর্তনশীল যেহেতু উত্তরঐতিহাসিক যুগে বেজন্মা বলে কিছু হয় না কে কার বাচ্চা জানার উপায় নেই তাই রাতে হিসি পেলে একা কেমন করে অন্ধকারে মুততে যাবে এই ভয়ে আদ্দামড়া ছেলেরাও অনুমিত-বাবার ঘুম ভাঙিয়ে সঙ্গে নিয়ে যায় অনুমিত-বাবা বেচারা কি আর করবে সেও মুতে নেয় মুততে মুততে লিঙ্গ খসে ওখানেই পড়ে গেছে ভেবে ঘুমের ঘোরে আবার খুঁজতে যায় কিন্তু চৈত্রের ওসকানিতে লিঙ্গ চড়াং হলে টের পায় যে কোনো ক্ষতি হয়নি মুততে বসে মাথার ভেতরে কোনো একজন অনুমিত-বাবা শুনতে পেয়েছিল যে চাঁদের আলোয় হাওয়াকে বদগন্ধ মুক্ত করা যেতে পারে কিন্তু তাতে হাওয়া নিজেই হাওয়া হয়ে যেতে পারে তার মানে বুঝতে না পেরে মুততে বসা অনুমিত-বাবা কাউকে আর সেকথা বলেনি যদিও মুততে যাওয়া অনুমিত-বাবা সব যুবক যুবতীকে ফিসফিসিয়ে বলে দিয়েছে যে আনন্দ পেতে হলে যে-কোনো রকমে পেতেই হবে কারোর নিষেধ মানার দরকার নেই কেননা শরীরের চেয়ে বড়ো কিছু হয় না আর আনন্দ মানেই শরীরের আনন্দ শরীর যা চাইছে তা সে নিজের মগজকে বলতে থাকে মগজ ফিরতি শরীরকে বলে যে যাও যা চাইছ তাই করো কিন্তু এসব কথা মোড়লচিফকে না বলে জুইসঁ জুইসঁ জুইসঁ জুইসঁ বলতে বলতে দৌড়েছিল বলে দিনকতক তাকে টাটকা চামড়া ছাড়ানো যুবতীর মজ্জার হালুয়া খাওয়ানো হয়েছিল যাতে তার মাথা খারাপ না হয়ে যায় পাঠক বা পাঠিকা আপনি যদি জুইসঁ বলতে ঠিক কী বোঝায় এবং আনন্দ বলতে আপনি কী বোঝেন তা জানেন তাহলে দুই পক্ষের মোড়লচিফদের প্লিজ জানিয়ে আসবেন যাই হোক তারপর থেকে সে রাতে মুততে বেরোলে তার তাৎক্ষণিক-বউ মানুষের চর্বির লন্ঠন নিয়ে তার পেছন পেছন যায় তাই উপায় হিসেবে মোড়লচিফের বেতে-বোনা গামলার পুরোনো প্রৌঢ়ার চামড়ার চাদর পাল্টানো হয়েছে নতুন যুবকের পোঁদের চামড়ার টাটকা চাদর দিয়ে একনায়ক মোড়লচিফের বাবরি চুল বাড়ানো হয়েছে কেননা সে পোঁদ ছিল চুলে ভরা একনায়ক মোড়লচিফকে চামড়ার গামলায় বসিয়ে শুকিয়ে-যাওয়া কুয়োর চারিপাশে ঘোরানো হয়েছে তবুও সেপক্ষের লোকেরা সমস্যার সুরাহা করতে পারেনি ওপক্ষের লোকেরা মোড়লচিফকে ধরে-আনা চটকদার মেয়েদের চুলের কোঁকড়া পোশাক পরিয়েছে সেই চুলের বিছানায় আসল ঝক্কিমন্ত আধবউ আর নকল তাৎক্ষণিক-বউ দুজনের সঙ্গে শুইয়েছে হিসির পোখরাজি শরবত খাইয়েছে রক্তের টোকো আচার খাইয়েছে একনায়ক মোড়লচিফকে চামড়ার গামলায় বসিয়ে শুকনো কুয়োয় নামিয়েছে তবু কোনো উপায় খুঁজে বের করা যায়নি তবুও শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকাণ্ডিশনে সেই পারের মোড়লচিফ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল যে হাওয়াতেই খুঁত আছে কারণ পৃথিবীতেই খুঁত আছে আর একথা বকবক করে বোঝানো যাবে না কেননা কথারা সবকিছু বলার জন্য যথেষ্ট নয় কথারা দিনকেদিন পচে যাচ্ছে কথা বলাবলিতেই খামতি রয়ে গেছে কথা ব্যাপারটা হলো টুলোপণ্ডিতের লাস্ট বেঞ্চার উপড়ে ফেলতে হবে সবরকমের জ্ঞানের ভাঁড়ার এতো জোরে জোরে চেঁচিয়েছিল সেই পারের মোড়লচিফ যে ওই পারের মোড়লচিফ তা শুনতে পেয়েছিল আর পেয়ে সেও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল চুতিয়া শিশুর নঙ্কু কোথাকার বুঝতে পারা যায় না এমন হম্বিতম্বি করে হাওয়ার সুরাহা খুঁজছে শিশুর পাতলা পায়খানারও অধম বাঞ্চোৎ মোড়লচিফ হয়ে ব্যাটা ভাবছে হাওয়া কিনে নিয়েছে ওর দাদু তো মেয়ে মানুষের চামড়া ছাড়াবার পর হৃৎপিণ্ডের মেটেল-গোলাপি ধুকপুকুনি দেখে ঘামে কাহিল হয়ে যেতো কতো স্বাদু হয় ছাড়ানো মেয়েমানুষের জলজ্যান্ত হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি কানের কাছে নিয়ে শুনলে সেই ধুকপুকুনির প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে আর ওর বাপ তো বাঁহাতে লিংমেহন করতো আর তার ফলে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি বেঁকে গিয়েছিল বলে নিজেকে বেঁকাপন্হী বলে দাবি করতো জানি না নাকি আমি ওদের পক্ষের সবাই বাঁহাতে ম্যাস্টারবেট করে এমনকি মেয়েরাও ক্লিটোরিসের টুনটুনি বাঁহাতেই বাজায় নিজেদের বেঁকাপন্হী তকমা বজায় রাখার জন্যে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও সে টুনটুনির নিশিডাক শোনা যায় ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং আমাদের সোজান্হীদের পক্ষে বাঁহাত ডানহাতের কোনো নির্দেশ নেই যে যেহাতে ইচ্ছে নিজেকে আনন্দের ওপারে টপকিয়ে নিয়ে যেতে পারে পাঠক বা পাঠিকা আপনারা যে হাতে করেন সেই হাতেই করবেন সরকার কোনো নির্দেশিকা এ-বিষয়ে এখনও জারি করেননি তবে শোনা গেছে যে আইনের খসড়া যাচাই করে দেখছেন লেজুড়পন্হী বুড়োহাবড়াগোষ্ঠী এই যে আমরা মানুষের মাংস খাই তা এই জন্যে তো যে আমরা আনন্দ টপকিয়ে পরমানন্দের আওতায় চলে যেতে পারি যাতে আত্মার উত্তরণ হয় যাতে নির্বাণপ্রাপ্তি হয় যাতে ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে একাত্ম হতে পারি যাতে যার মাংস খাচ্ছি সে আমার ভেতরে বেঁচে থাকে যাতে তাকে আমার ভেতরে বাঁচিয়ে আমি তাকে সারাজীবন ভালোবাসতে পারি যতোজনের মাংস তুমি সারাজীবনে খাবে তুমি ততোজনকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে পারবে মেয়েমানুষ পুরুষমানুষ দুরকমের মাংস খেয়ে তোমার মধ্যে তাদের অস্তিত্ব বজায় থাকবে কেননা মেয়েমানুষের মাংস হল রেড মিট তাতে আয়রন ক্রিয়েটিন দস্তা ফসফরাস ভিটামিন বি আর লিপোয়িক অ্যাসিড থাকে যা সবচেয়ে ভালো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পুরুষের মাংস হল হোয়াইট মিট তার ক্যালরি ফ্যাট কোলেস্টেরল কম হলেও আছে অ্যামিনো অ্যাসিড থিয়ামিন রিবোফ্ল্যাভিন যা স্বাস্হ্যের পক্ষে খুবই উপকারী হলেও তুমি যদি শুধু পুরুষের মাংস খাও তাহলে তোমার ভেতরে দোষ দেখা দেবে তোমার ভেতর থেকে ভালোবাসা উবে যাবে তুমি কোনো মেয়েমানুষের গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার বেল্ট বেঁধে হাতে চামড়ার দস্তানা পরিয়ে হাঁটুতে চামড়ার নিক্যাপ পরিয়ে হামাগুড়ি দেওয়াতে পারবে না তাকে পেছন থেকে ইল্লিতে গিল্লি করতে পারবে না তুমি উচ্ছন্নে চলে যাবে তোমার অধঃপতন হবে তুমি যা চাইছ তা আয়ত্ব করতে পারবে না যাকে খাচ্ছ তাকে এই জন্যেই তো খাচ্ছ যে সে চাইছে তাকে খাওয়া হোক নয়তো সে ধরা পড়বে কেন তার অবচেতনে ধরা দেওয়ার ইচ্ছে কাজ করেছে বলেই তো সে ধরা দিয়েছে ইচ্ছে ব্যাপারটা যে খাচ্ছে তার নয় যাকে খাওয়া হচ্ছে তার যাকে খাওয়া হচ্ছে সে তার ধরা পড়ার মাধ্যমে নিজের ইচ্ছেকে নরমাংসখোরের দায়িত্বে সোপর্দ করে দিচ্ছে মহিলার চামড়া ছাড়াবার আগে যদি যুবকেরা তাকে ইল্লিতে গিল্লি করে তাহলে বুঝতে হবে ওই মহিলার দেহে ইল্লিত হবার ইচ্ছে কাজ করছিল যা সে যুবকদের গিল্লিবিকৃতিতে সোপর্দ করে দিয়েছিল পাঠক বা পাঠিকা আপনি কি মোড়লচিফের এই জীবনদর্শনকে মান্যতা দেন যদি না দেন তাহলে প্লিজ উত্তরঐতিহাসিক যুগের মিডিয়ার মাধ্যমে জানিয়ে দেবেন একনায়ক মোড়লচিফ বলা বজায় রাখে যাকে খাওয়া হচ্ছে তার ভাষাকে খাওয়া হয় তার অহংকারকে খাওয়া হয় তার চেতনাকে খাওয়া হয় তার মুখ ফসকে বলা কথা খাওয়া হয় তার অপূর্ণ আকাঙ্খা খেয়ে নিজেদের মাধ্যমে তা পূরণ করা হয় যে মরে যাচ্ছে তার শেষ ট্রমাকে খাওয়া হয় তার স্বপ্নকে খাওয়া হয় তার সুখদুঃখকে খাওয়া হয় আর এটাই হল বাস্তব জগতের নান্দনিকতা তাকে যতো তাড়াতাড়ি স্বীকার করে নেয়া যায় ততোই আমাদের পক্ষের মঙ্গল কেননা বাস্তব ব্যাপারটা অশ্লীল এসব হুমকি দেয়া বক্তৃতা শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকাণ্ডিশনে বসে শুনছিল সেই পারের একনায়ক মোড়লচিফ তাই উত্তর দেবার জন্যে নিজের লোকেদের বলল শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকাণ্ডিশন থেকে টেনে তুলতে যাতে গাঁকগাঁকিয়ে জবর উত্তর দিতে পারে কিন্তু মোড়লচিফের সঙ্গে চামড়া ছাড়াবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে পালোয়ান যুবক দ্বিতীয় হয়েছিল সে বললে তোমাকে উত্তর দিতে হবে না কত্তা আমিই ওই ল্যাওড়াকান্তি গবেটের হুমকিবক্তিমের উত্তর দিচ্ছি হ্যাঁহ্যাঁপন্হী পাবলিক বললে হুম হুম তাই হোক তাই হোক মোড়লচিফ ও-ই দিক তোমার তো চুলেদাড়িতে পাক ধরেছে কোমরের ঠাপচাপ অবসর নিয়েছে ষাট ডিগ্রির চেয়ে বেশি বেঁকে গেছে সেই তুলনায় ও এখনও ভার্জিন ষাঁড়ের গোলাপি লিং ঝুলিয়ে ঘোরে আর গলাটাও ষাঁড়ের মতন হ্যাঁহ্যাঁপন্হীদের এরকম রায় শুনে মোড়লচিফ মুষড়ে পড়লেও রাজি হয়ে গেল কেননা শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকণ্ডিশনে অনেকক্ষণ ঝুলে থাকায় গলা বসে গেছে ফলে ষাঁড়যুবক আরম্ভ করলে হাঁকহাঁকিয়ে লিংনাচিয়ে যাতে ওই পারের একনায়ক মোড়লচিফ আর তার হিসিপোষ্য জনগণ শুনতে পায় ওরে গাণ্ডুগোবর্ধন অহং ব্যাপারটা তো কাল্পনিক জানিস না কি যে সচেতন জীবনে আমরা নিজের সম্পর্কে একটা হেতুপূর্ণ সমন্বয়ী সুসঙ্গত ব্যক্তিএককের ধারণা গড়ে তুলি আর তা না করলে কর্মকাণ্ড অসম্ভব হয়ে যাবে কিন্তু এসবকিছুই অহংয়ের কল্পনার স্তরে যে ব্যাপারটা একজন মানুষের অস্তিত্বের সমুদ্রে ভাসতে থাকা পৌরাণিকাধুনিক যুগের বরফস্তুপের যেটুকু দেখা যেতো তার চেয়ে বেশি কিছু নয় বুঝলি অহং হল ব্যক্তিএককের সেই ক্রিয়াকলাপ বা কাজের ফলাফল যা সবসময় ছেৎরানো বুঝলি কখনও নিজের মতন নয় বুঝলি যে ডিসকোর্স দিয়ে তার শেকল তৈরি তাতে গাঁথা বুঝলি রে ইডিয়ট অস্তিত্বের এই দুটো স্তরে মূলগত বিভাজন আছে -- একটা ফাঁক যা তুই নিজেকে আমি আমি আমি আমি বলার সময়ে কথায় নকল করছিলিস বলা কথার মধ্যে লোকটা মানে তুই লোকটা কখনই নিজের প্রতিনিধিত্ব করিস না কেননা তা সম্ভব নয় বুঝলি রে নিজের পুরো অস্তিত্বকে তুলে ধরার জন্যে মানুষের কাছে কোনো কলঙ্ক-দাগ থাকে না বা নেই বুঝলি ইডিয়ট তুই নিজেকে তোর কথার মধ্যে একটা সুবিধাজনক সর্বনাম বেছে আখ্যা দিতে পারিস আমি বলতে বোঝায় যে লোকটাকে আয়ত্ব করা যায় না যে ভাষার ফাঁক গলে পিছলে বেরিয়ে যাবেই তুই একই সঙ্গে তুই হতে পারবি না আর বলতে পারবি না যে তুই লোকটা তুই নিজে বুঝলি রে অবচেতনা বলতে তোর ভেতরের কোনো ফেনিয়ে তোলা বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিগত এলাকা বোঝায় না বুঝলি যা বোঝায় তা হল একজনের সঙ্গে আরেকজনের সম্পর্কের প্রভাব অবচেতন মোটেই তোর ভেতরের ব্যাপার নয় তা তোর বাইরের ব্যাপার হ্যাঃ হ্যাঃ বাঞ্চোৎ মুকখুর অ্যাঁড় কোথাকার পালোয়ান-যুবকের ঝাড়বক্তিমে থামতেই তার হাতে ধরা গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার বেল্ট বাঁধা হাতে চামড়ার দস্তানা হাঁটুতে চামড়ার নিক্যাপ বুকে চামড়ার বুকবাঁধুনী ধরে-আনা উলঙ্গ কোঁকড়াচুল-যুবতী বলে উঠল আপনিই তো মস্ত ইডিয়ট যা বলছেন আর যা করছেন তার সঙ্গে কোনো মিল নেই আপনি কি ভাবছেন আপনার অবচেতনে আমার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি যদি না গড়ে উঠে থাকবে তাহলে এরকমভাবে বেঁধে রেখেছেন কেন তা তো এই জন্যে যে আপনি যখন তখন আমার সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লি করছেন তার মানে গিল্লিকারীর সর্বনাম বেছে নিয়েছেন আর প্রতিনিধিত্ব করছেন আপনাদের পক্ষের আমার হিসি খাবার জন্য লালায়িত হয়ে রয়েছেন তার মাধ্যমে কি সম্পর্ক গড়ে উঠছে না যখন আপনারা আমার রক্তের আচার খাবেন আমার মাংস টাটকা শুকোনো লইট্যা-শুঁটকি নোনা করে খাবেন অলিভতেলে লাবিয়াফ্রাই খাবেন মজ্জার হালুয়া খাবেন তখন আপনাদের প্রত্যেক আমির সঙ্গে কি আমার সম্পর্ক গড়ে উঠবে না যখন বিগত সময়ের জন্তুদের মতন আপনি চার হাতেপায়ে আমার সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লি করছেন তখন কি সেই জন্তুদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক গড়ে উঠছে না যখন আপনারা আমার মাথার ওপরে তালপাতার চাটাইয়ের বস্তা ফেলে ধরে নিয়ে এলেন তখন কি পৌরাণিকাধুনিক যুগের চটকল শ্রমিকদের সঙ্গে আর সে-যুগের চাষিদের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক গড়ে উঠল না যারা না খেতে পেয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে জবাব দিন জবাব দিন চুপ করে থাকলে তো চলবে না জেনে রাখুন যে আমি ইচ্ছে করে ধরা দিয়েছি আপনাদের ফাঁদে পা রেখেছি আপনারা আমায় ধরে আনেননি জানি আপনারা আমার চামড়া ছাড়িয়ে আমার মাংস খাবেন ইল্লিতে গিল্লি করবেন যা আপনি তিনমাস যাবত করে চলেছেন আমার সঙ্গে আপনার পোষা জানোয়ার হয়ে আছি এখন আপনার মানবশাবক এসে গেছে আমার পেটে আমাকে খাবার সময়ে আপনি আপনার শাবককেও খুন করে খাবেন কি মুখ শুকিয়ে গেল কেন শুনে নিজের ছ্যানাকে খেতে ভয় অথচ অন্যের ছ্যানাদের দিব্বি খেয়ে চলেছেন কতোকাল হয়ে গেল আমি জানি আপনারা আমাকে খাবেন তাই আমার কোনো উৎকন্ঠা নেই উদ্বেগ নেই কোনো কাজ তো আমায় করতে হচ্ছে না শুধু আপনার অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে যাকে খাবেন সে তার বন্দিদশায় থাকে তাই মরার আগে এই বাঁধন হল কারাগার যখন খেয়ে ফেলবেন তখন আমি এই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যাবো ফলে আপনাদের প্রতিশোধ নেয়া হবে না যে নেই তার সঙ্গে কিসের প্রতিশোধ প্রতিবার আমাদের পক্ষের কাউকে খান তাতে কোথায় পৌঁছোন আপনারা একইভাবে আপনাদের পক্ষের কাউকে আমরা খাই তাতে কোথায় পৌঁছোই আমরা বলুন বলুন কোথাও পৌঁছোই না আমরা দু’পক্ষই একই অবস্হায় থাকি কোঁকড়াচুল-যুবতীর কথা শুনতে-শুনতে হতভম্ব একনায়ক চিফমোড়ল বলল নাও এবার বোঝো যখন ধরা পড়েছিল তখনই বলেছিলুম একে খেয়ে ফেলা যাক তা তুইই চিফমোড়লকে টেক্কা দেবার ধান্দায় একে বাঁচিয়ে রাখলি মনের মতন ইল্লিতে গিল্লি করার জন্য বলেছিলি মন ভরে গেলে সবাই মিলে খাবি এখন তিনমাস ওকে দুপুর নেই রাত নেই চোপরসময় ইল্লিতে গিল্লি করে-করে ওর পেটে তোর শাবক এনে ফেলেছিস এখন তো ওকে খাওয়া যাবে না যতোদিন না তোর শাবকটার জন্ম হচ্ছে ইল্লিতে গিল্লিই যদি করার ছিল তাহলে তুই তো দুতিনটে দুর্গন্ধসুন্দরী আধবউ একাধটা হড়হড়েত্বক ফুলবউ জুটিয়ে নিতে পারতিস তোর ভার্জিন গোলাপি নব্বুই ডিগ্রির ইশারার অপেক্ষায় কতো মেয়ে কোঁচড়ে ইল্লি পেতে বসে আছে তাদের ডেকে পাঠিয়ে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে ঢ্যাঙাতালের ছায়ায় তাদের সঙ্গেই ইল্লিতে গিল্লি করতে পারতিস তারা তোকে চাইছিল তোর নব্বুই ডিগ্রির আকর্ষণে এখন তো তারা পার্টটাইম বরেদের সঙ্গে রয়েছে কী আর করবে তাদেরও তো ঘামবার-হাঁপাবার-ঠাপকাঁপুনির ইচ্ছা-অনিচ্ছা আছে তাও তুই বললি ওদের সঙ্গে তেমন জমবে না তোর মন ওরা টানতে পারেনি মন দিয়ে যে কোন কাজটা হবে তা তো বুঝলুম না শরীরের কাজকে মনের নামে চালানোটা ভিতুদের ফাঁকিবাজি ফলে সেই জোয়ান মেয়েরা যে যার নিজের টাটকা জোয়ান আধবর খুঁজে নিয়েছে তাই ওই পক্ষের এই নতুন মেয়েটাকে চোপরদিন নিয়ে ইল্লিতে গিল্লি করে ঘুরলি এখন যখন পেটে শাবক এসে গেছে তখন তো আর হামাগুড়ি দেওয়ানো যাবে না গলায় বেল্ট বেঁধে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে নজরে নজরে রাখ কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল নজরে নজরে রাখার কোনোই দরকার নেই কেননা পেটে আপনাদের পক্ষের শাবক এসে যাবার ফলে ওই পক্ষের মোড়লচিফ আমাকে একঘরে করে দেবে শাবক জন্মালে তাকে সেইদিনই খেয়ে ফেলবে যতোদিন না আমার শাবক হচ্ছে ততোদিন আমি এখানেই থাকবো আপনাদের ইচ্ছে হলে গলায় বেল্ট বেঁধে রাখতে পারেন বা খুলে দিতে পারেন যা ভালো বোঝেন আমি পালাবো না আপনারা শাবক হয়ে যাবার পর আমাকে খাবেন একনায়ক মোড়লচিফ বললে এ তো মহা মুশকিল হলো শাবক হবার পর এর বুকে দুধ এসে যাবে সে দুধ তো শাবককেই খেতে দিতে হবে অন্য পক্ষের হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পক্ষের কেউ ওর দুধ খেতে পারবে না দুধ এলে তুই আবার লুকিয়ে চুসকি মেরে খেয়ে নিস না যেন যতোদূর বুঝছি এর হিসি খেয়ে নেশা হবে না কেননা এর পেটে আমাদের পক্ষের শাবক রয়েছে মোড়লচিফের ঠিকে-বউ বললে আমি তখনই তোমাকে বলেছিলুম যে এর রজঃশরাব বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে তুমি কান দিলে না আরেক বউ যে আগে মোড়লচিফের আধবউ ছিল কিন্তু মন ভরে গেছে বলে আরেকজনকে আধবিয়ে করে নিয়েছে সে বললে মোড়লচিফ তো জানেই না কোনটা রাজপথ আর কোনটা গলিপথ হাত ধরে দেখালে টের পায় কোনটা রাজপথ মোড়লচিফ বললে আমি তো ওর ইল্লিতে মাছি উড়তে দেখেছিলুম তাই ভেবেছিলুম যে মাছিগুলো রজঃশরাবের রক্ত চাটতে এয়েছে এখন বুঝতে পারছি যে মাছিগুলো রাজপথের আকর্ষণে পেছনে লাগেনি গরম পড়েছে বলে গলিপথের নেশার জলে তেষ্টা মেটাতে মেতেছিল একনায়ক মোড়লচিফের কচি আধবউ বললে এ মাগি তো নিজের শরীরকেই কারাগার বানিয়ে তাতে আমাদের শাবককে সাজা দিচ্ছে এর মনও জেলখানা জানি না সেখানে কি ষড়যন্ত্র চলছে এর স্মৃতিও একটা জেলখানা তাতে ওই পক্ষের ঘটনার স্মৃতি পুরে রেখেছে আর সেগুলো পেটের শাবক সাঁতরে সাঁতরে ঠিকই জানতে পারছে কোঁকড়াচুল-যুবতী কিছু বলতে যাচ্ছিল একনায়ক মোড়লচিফ ওর গলা থেকে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ফেট্টি খুলে দাঁড় করাবার চেষ্টা করতে কোঁকড়াচুল-মেয়েটা দাঁড়াতে পারছিল না এতদিন যাবত চার হাতে পায়ে চলাফেরার দরুন পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-মেয়েটিকে ধরে সামলালো আর মোড়লচিফ কোঁকড়াচুল-যুবতীর হাত থেকে দস্তানা আর হাঁটু থেকে নিক্যাপ খুলে পালোয়ান-যুবককে বললো নিয়ে যা নিজের ঘরে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেবার পর পালোয়ান-যুবকের দিকে তাকিয়ে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল আমি ছিলুম খালি পেটের ট্রোজান ঘোড়া আপনিই তাতে সৈন্য ভরে দিয়ে নিজেদের গেট দিয়ে তাকে নিয়ে আসতে বাধ্য হলেন আপনাদের দুর্গ এখন সুরক্ষাহীন আর মনে রাখবেন যতোদিন না আমার শাবক হচ্ছে ততোদিন আপনি আপনারা সবাই কল্পনার জগতে বসবাস করবেন আগামীর কল্পনা ভবিষ্যতের কল্পনা পাঠক বা পাঠিকা আপনার কি মনে হয় যে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-যুবতীর ফাঁদে পড়েছে এখানে বলে দিই যে পালোয়ান-যুবকের বয়স বাইশ বছর আর কোঁকড়াচুল-যুবতীর বয়স পঁয়ত্রিশ বছর তাছাড়া আপনার কি মনে হয় কোঁকড়াচুল-যুবতী সত্যিই গর্ভবতী আপনার কি মনে হয় যে কোঁকড়াচুল-যুবতী নিজে ধরা দিয়েছিল নাকি তাকে ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিল আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-যুবতীকে বলল আমি সব জানি কিন্তু আমি জানতে চাই না যে আমি জানি তাই হরেদরে আমি জানি না আমি জানি কিন্তু আমি তার ফলাফলের দায়িত্ব নিতে চাই না যাতে আমি প্রতিদিনকার মতন জীবন চালিয়ে যেতে পারি এই ভেবে যে আমি জানি না কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল হাহা হাহা তর্কাতীত তর্ক বটে যারা সবচেয়ে ভালো তাদের আত্মবিশ্বাস নেই আর যারা অত্যন্ত খারাপ তাদের রয়েছে আবেগি ঐকান্তিকতা এটা দুই পক্ষেরই উত্তরঐতিহাসিক অসুখ দুই পক্ষেই রয়েছে রক্তহীন উদারপন্হী আর আবেগ-আক্রান্ত মৌলবাদী ফলে যারা সবচেয়ে ভালো তারা আত্মনিয়োজিত হতে পারে না আর যারা অত্যন্ত বাজে তারা জাতিবাদী সাম্প্রদায়িক যৌন গোঁড়ামির নেশায় চুর আপনারা আমাদের বিশ্বাস করেন না আমরাও আপনাদের বিশ্বাস করি না কিন্তু কেন ভেবে দেখেছেন কি কখনও কোনোও কিছুতে কি আমাদের বা আপনাদের বিশ্বাস আছে আসলে আমাদের পারস্পরিক অবিশ্বাসই আমাদের বিশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়েছে আমি আমাদের একনায়ক মোড়লচিফকে কতোবার বোঝাবার চেষ্টা করেছি ওনার আর আমাদের পক্ষের সবারই ধারণা যে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে তাই পুরুষরা আমার কাছ-ঘেঁষতোনা আপনি হয়তো আমার কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন কিন্তু এটা মনে রাখবেন যে অন্যের প্রতি অবিশ্বাসের মধ্যেই বিরোধিরা সত্যকে খুঁজে পেয়েছে বলে মনে করে তারা সত্যের উৎপাদক তারা মনে করে অন্য পক্ষের জীবনযাত্রা গ্রহণযোগ্য নয় কেননা তাদের নিজেদের জীবনযাত্রা আলাদা আপনি আমাকে বলুন যে অবিশ্বাসীদের ভয় পাবার দরকারটাই বা কি কেবল এই কারণেই এক পক্ষ আরেক পক্ষকে হিংসে করে চলেছে আপনি আমাকে ঘৃণা করছেন কেননা আমি অপর পক্ষের অথচ ইল্লিতে গিল্লি করছেন আমার দেহকে ভালোবেসে হ্যাঁ একে ভালোবাসা বলা অনুচিত কিন্তু আপনি তো অন্য পার্টটাইম মেয়েমানুষ ইশারা করলেই পেতেন দেখেছি তো মেয়েরা আপনার নব্বুই ডিগ্রির প্রতি কেমন আকৃষ্ট তা সত্ত্বেও টানা তিন মাস আপনি আমার সঙ্গেই ইল্লিতে গিল্লি করে গেলেন আপনি কখনও ভাবলেন না যে হয়তো আপনার সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লির সময়ে আমারও ভালো লাগছে অথচ আপনি খেয়াল রাখলেন না যে আমারও ইল্লিখেলার চাহিদা আছে আমারও অরগ্যাজমের আঠা ওথলানোর দরকার আছে আপনি ভাবলেন আমি আপনার ইল্লি-গিল্লির কয়েদি বলে আপনার উচ্চতর পদমর্যাদা রয়েছে পালোয়ান-যুবক এতোক্ষণে মুখ খুলল বলল যে আমি ইল্লিতে গিল্লির সময়ে আঘাত না দিয়ে পারি না আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ি অশ্লীল কথাবার্তা বলতে থাকি তাতেই আমি আনন্দিত হই কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল আসলে আপনি ইল্লিতে গিল্লির সময়ে একা থাকলেও আপনার ভেতরে একটা ভিড় হইচই করতে থাকে যা আপনার আয়ত্বের বাইরে লক্ষ্য করবেন যে আমি আপনাকে হীনতর বা নিকৃষ্ট বলছি না অথচ আপনি এমনকি দুই পক্ষের মানুষেরা মৌলবাদীদের মতন ভেতরে ভেতরে জানে যে তারা নিকৃষ্ট মনে রাখবেন যে শত্রুপক্ষকের কথা না শুনলে আপনি নিজেকেও বুঝতে পারবেন না আপনি যখন প্রথমবার আমাকে চারহাতপা বেঁধে ইল্লিতে গিল্লি করেছিলেন তখন আমার ট্রমা ঘটেছিল কিন্তু প্রতিবারের ইল্লিতে গিল্লি আমার ট্রমা লাঘব করে আপনার কাছাকাছি নিয়ে গেছে ইল্লিতে গিল্লি ক্রমে হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্পর্ক তারপর যখন গর্ভবতী হয়ে গেলুম তখন বুঝতে পারলুম যে আমি আপনার শাবকের মা হতে চলেছি আপনি নিজেই নিজের ফাঁদে পড়ে গেছেন বললে বোধহয় ভুল হবে না যে আপনি আমার ইল্লির আসক্ত হয়ে পড়েছেন নয়তো তিন মাস বাঁচিয়ে রাখতেন না আমিও আপনার গিল্লিকে ভালোবেসে ফেলেছি হয়তো ক্রিতদাসীরা এমনি করেই তাদের প্রভূকে ভালোবাসতো কিন্তু ভালোবাসা এক ভয়ংকর দুর্দশা দুর্ভাগ্য অশুভ মগজের ভেতরের পৈশাচিক পরগাছা যতোক্ষণ থাকে ততোক্ষণ স্হায়ী সঙ্কট হয়ে যাবতীয় সুখ থেকে বঞ্চিত করে আমি আমার দুঃস্বপ্নের সঙ্গে আপনার দুঃস্বপ্নকে মিশিয়ে দিয়েছি যতোদিন আমি আছি ততোদিন এই দুঃস্বপ্ন থাকবে আপনার সঙ্গে কোঁকড়াচুল যুবতীর উষ্মায় উত্তেজিত বাইশ বছরের সুঠাপ পালোয়ান-যুবক হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার লুঙ্গি খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল চিৎশোয়া পঁয়ত্রিশ বছরের ইল্লিখোলা কোঁকড়াচুল-যুবতীর ওপর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলতে লাগল হ্যাঁ ঠিকই আমার উচিত ছিল তোমাকে চুমু খাওয়া বুকের ওপর ঠোঁট নিয়ে গিয়ে বলল আমার উচিত ছিল বুকদুটো আদর করা নাভিতে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে বলল আমার উচিত ছিল নাভিতে আদর করা কুঁচকিতে ঠোঁট রেখে বলল আমার উচিত ছিল জিভের প্রলেপ দেয়া আমিও চেয়েছিলুম পেটে বাচ্চা এসে যাক কেননা ভাষা দিয়ে কিচ্ছু প্রকাশ করা যায় না ভাষার ভেতরে সে ক্ষমতা নেই যা আমার শরীর বলতে পারে ঠোঁট বলতে পারে জিভ বলতে পারে ইচ্ছে ব্যাপারটা ভাষার নয় ইচ্ছে ব্যাপারটা শরীরের পঁয়ত্রিশ বছরের কোঁকড়াচুল-যুবতী দুহাতে পালোয়ান-যুবককে আঁকড়ে ধরে বলে ওঠে এই প্রথমবার আপনাকে আলিঙ্গন করছি আমি আমার বক্তব্য রয়েছে এই জড়িয়ে ধরায় এখন আপনি ঠোঁট দিয়ে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করছেন তা এতোদিন চার হাতেপায়ে জানোয়ারের মতন ইল্লিতে গিল্লির মাধ্যমে সম্ভব হয়নি অথচ সেই কুকর্মের মধ্যে দিয়েই আমরা দুজনে মা-বাবা হতে চলেছি ভালোবাসা শব্দটা কতোবার শুনেছি জীবনে পাঠশালায় বন্ধুদের মুখে বাড়িতে কিন্তু কখনও বুঝতে পারিনি তা ঠিক কি তা ছিল অন্যের অভিজ্ঞতা এখন টের পাচ্ছি যে ভালোবাসা আসলে এক অসহ্য অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎকার তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ব্যথার আনন্দের জন্য আর সেই আনন্দ আমাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে আপনি আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা সত্ত্বেও একে অভিব্যক্তি দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না আপনি আমার আকাঙ্খাকে এতোদিন অপমান করেছেন পালোয়ান-যুবক কুঁচকি থেকে জিভ তুলে বলল আমি কেবল বাসনাকে চরিতার্থ করায় থামতে চাইনি আমি উপভোগের আহ্লাদকে অতিক্রম করে যেতে চেয়েছিলুম যদিও তিন মাসে জেনে ফেলেছি যে মন কিছুতেই ভরে না সন্তুষ্ট হয় না কোঁকড়াচুল যুবতী বলল পৌরাণিকাধুনিক যুগের জঙ্গলে সিংহেরাও সিংহীর অনুমতি ছাড়া আর নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ইল্লিতে গিল্লি করত না কিন্তু আপনি অবিরাম করে গেছেন মন ভরাবার জন্য যা কখনও ভরে না আপনি আমার অনুভূতির কথা কখনও ভেবে দেখেননি আপনার চরিত্রে যা কাজ করছিল তা কৃতজ্ঞতার অভাব আমরা দুটো পক্ষই এতোকাল যা করে চলেছি তা হল পেছন দিকে এগোবার প্রগতি কোঁকড়াচুল-যুবতী এবার পালোয়ান-যুবককে কষে জড়িয়ে ধরে তার ওপর উঠে গেল বলল আপনি তো তিনমাস যাবত অনেক কিছু করেছেন এবার আমার পালা কোঁকড়াচুল-যুবতী পালোয়ান-যুবকের পায়ের দিকে পেছিয়ে গিয়ে মুখে পুরে নিল মুখ ফেনায় ভরে উঠলে গিলে খেয়ে ফেলল তারপর মুখ তুলে নিয়ে বলল আমার হাগবার সময়ে আর হিসি করার সময়েও আপনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন যদিও আপনি দয়া করে চামড়ার রুমাল দিয়ে পুঁছে দিতেন কিন্তু হাগা পেয়েছে সেটাও বলতে হতো আপনাকে যেন আপনার অনুমতি ছাড়া আমি হাগতেও যেতে পারবো না আমার রজঃশরাব বন্ধ হবার পরও আপনি যখন প্রশ্ন তুললেন না বুঝলুম যে আপনি একেবারে আনাড়ি সম্ভবত ভার্জিন এমনকি প্রথমবারও আপনাকে অনেক চেষ্টা করতে হয়েছিল পালোয়ান-যুবক বলল তুমি হিসি করছ কিংবা হাগছ দেখতে আমার ভালো লাগে পেছন দিক থেকে তোমাকে দেখতেও ভালে লাগে তোমার গু থেকেও আমি বেশ মিষ্টি গন্ধ পেয়েছি যা পোড়ানো শোকানো শুঁটকি নোনা মাংসের থেকেও আকর্ষক তুমিই তো বলছ কথা নিজেকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না কিন্তু আমি বুঝে গেছি তা হল নিঃশব্দ ঘোষণা কোঁকড়াচুল- যুবতী পালোয়ান-যুবকের ওপর সটান শুয়ে পড়ে ঠোঁটে ঠোঁট রাখল তারপর সামান্য তুলে বলল আপনি আপনার স্মৃতিতে আমাকে রাখবেন না বিপর্যস্ত হবেন কেননা আমার সঙ্গে কখন কি হবে আপনি জানেন না পালোয়ান-যুবক বলল কিছুই হতে দেবো না এই মোড়লচিফ মারা গেলে আমিই একনায়ক মোড়লচিফ হবো আমার মতন কেউই চামড়া ছাড়াতে পারে না উত্তরে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল হয়তো এমন অবস্হার সৃষ্টি হবে যে আপনাকে আমার চামড়াই ছাড়াতে হবে পালোয়ান-যুবক বলল তেমন অবস্হা হলে তখন দেখা যাবে এখন যতোদিন না শাবক পয়দা হচ্ছে ততোদিন আমরা বেঁচে নিই তাছাড়া কোনো কিছুতে বিশ্বাস করার দরকার নেই জাস্ট বেঁচে নেয়া প্রথমবারের ব্যথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেমন পৌরাণিকাধুনিক যুগের ফুলের জীবনে দুর্গা-টুনটুনির গভীর জিভ কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল হ্যাঁ সেই ব্যথা আমাকে আপনি উপভোগ করতে দেননি শরীরের এই ব্যথা তো কেবল শরীরের নয় তা জীবনের সংজ্ঞাকে দেহের রসায়নের সাহায্যে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে দেবার অবিস্মরণীয় ঘটনা কেননা মাংসহীন অস্তিত্ব সম্ভব নয় মাংসের প্রয়োজন এই জন্যে যে মাংসের সঙ্গে মাংসের সংঘর্ষে আর সেই সংঘর্ষজনিত রসায়নে নৈতিকতা সৃষ্টি হয় বিবিধতা গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যের রকমফের পাওয়া যায় মাংস হল একই সঙ্গে ব্যথার বাহক আর ব্যথার আড়ালে আনন্দের উৎস আমাদের দুই পক্ষই এই উভয়সঙ্কট বুঝেও বুঝতে চাইছে না পালোয়ান-যুবকের গিল্লি আবার ষাঁড়িত গোলাপি হয়ে উঠেছিল কোঁকড়াচুল-যুবতী নিজের ইল্লি তার ভেতরে নিয়ে নিলে পালোয়ান-যুবক বলল আমাদের যৌথব্যথা ছিল কিন্তু ক্ষুধা তার সমাধান আমরা দুপক্ষই করে ফেলতে পেরেছি পরস্পরের মাংস খাওয়ার প্রথা দিয়ে এখন আশাহীনতাই একমাত্র আরাম আর জলহীনতার চিরখরার ধ্বংস থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে পরস্পরের মাংস খাওয়া একটা বড়ো আবিষ্কার এর ফলে টেবিলঘরের জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পীদের মুখে সরাসরি কাঁচা-গু ছুঁড়ে মারা হয়েছে তাদের আর কোনো প্রয়োজন দুই পক্ষেই নেই কোঁকড়াচুল-যুবতী পালোয়ান-যুবকের দুই হাত নিজের দুই বুকের ওপরে এনে বলল আমরা কি করছি জানেন আমরা গোপনে আমাদের দুই পক্ষের সঙ্গে একটা খেলা খেলছি যা তারা জানে না এর ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হবে তা আমরা্ দুজনেও জানি না এই খেলা আমাদের দুজনকে দুই পক্ষ থেকে আলাদা করে তৃতীয় একটা বায়বীয় পক্ষ গড়ে তুলতে চাইছে কোঁকড়াচুল-যুবতীর দুই বুককে টেনে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে পালোয়ান-যুবক বলল শারীরিক রসায়নের দুর্গন্ধের তুলনায় সৌন্দর্য আর নেই কেননা এই দুর্গন্ধিত রসায়নেই রয়েছে আমার তোমার আমাদের দুই পক্ষের সকলের নিদারুণ পীড়ার নিঃশব্দ গোঙানি যাকে পরস্পরের অক্ষমতা দিয়ে চাপা দেবার চেষ্টা হয়ে চলেছে বহুকাল বহুযুগ ধরে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল নাড়াবেন না নাড়াবেন না স্হির থাকতে দিন সময়কে দ্রুত করার চেষ্টা করবেন না সময়কে আহত হতে দিন শামুকের মতন এগোতে দিন শামুকের রাসায়নিক লালা নিয়ে এই যে এখন আমরা বন্ধ ঘরে আঠাবদল করছি এই ইল্লিগিল্লির মর্মার্থ পালটে দিয়েছে আমাদের আগেকার সম্পর্ক যখন আপনি আমাকে সবায়ের সামনে জানোয়ারের মতন ইল্লিতে গিল্লি করতেন পালোয়ান-যুবক বলল সেটাই আমাদের পক্ষের নৈতিক মানদণ্ড যে সবায়ের সামনে করতে হবে যাতে কোনো মানসিক সম্পর্ক না গড়ে ওঠে যাতে মাংস খাবার সময়ে স্মৃতি ডুকরে না ওঠে কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে সেই সময়ের ইল্লিতে গিল্লি বা আশেপাশের গন্ধে ছেয়ে থাকা ইল্লিগিল্লির মধ্যে কোনো বার্তা ছিল না বরং তা আমাদের দুজনের মধ্যে দেয়ালের মতন কাজ করছিল বন্ধ ঘরে আমরা আমাদের দুই পক্ষের নৈতিক ঐতিহ্যে অন্তর্ঘাত ঘটাচ্ছি রীতি অনুযায়ী যা সবায়ের সামনে করার তা আমরা ঘরের ভেতরে করছি এমনকি লালাবদলের সময়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছি যা নিষিদ্ধই কেবল নয় যা শাস্তিযোগ্য আরও খারাপ এই জন্যে যে আমরা দুজনেই এতে সায় দিয়ে করছি নিজেদের ইচ্ছেমতন আঙ্গিক নিচ্ছি ফলে আমরা নারী-পুরুষ সঙ্গমকারী নয় আমরা দুজনে হয়ে উঠেছি সমাজবিরোধী কোঁকড়াচুল-যুবতী পালোয়ান-যুবকের মুখে ময়লার আস্তরণে ঢাকা ডান দিকের মাই প্রবেশ করিয়ে বলল বাইরে পৌরাণিকাধুনিক যুগের জানোয়ারের আঙ্গিকে ইল্লিতে গিল্লি করার সময়ে আমাদের দুজনের আত্মপরিচয় বজায় ছিল আমি ওই পক্ষের ধরে-আনা ক্রীতদাসী যাকে আপনারা বলেন সুন্দরী যদিও আমার নাম সুন্দরী নয় আর আপনার পরিচয় আপনি এই পক্ষের উচ্চাকাঙ্খী যুবক বন্ধ ঘরে সেই আত্মপরিচয় আমরা খুইয়েছি আমাদের শাবক মূর্ত হয়ে জন্মাবে বটে কিন্তু নিজের সঙ্গে নিয়ে আসবে বিশৃঙ্খলা আর জানেনই বিশৃঙ্খলামাত্রেই জারজ কোঁকড়াচুল-যুবতী ডান দিকের মাই পালোয়ান-যুবকের মুখ থেকে বের করে ময়লার আস্তরণে ঢাকা বাঁদিকের মাই ঢুকিয়ে দিয়ে বলল আর যে নৈতিকতার কথা আপনি বলছেন তা মিথ্যার বনেদে দাঁড়িয়ে থাকা বীক্ষা বাইরে পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারের মতন আঙ্গিকে মনের কোনো স্পর্ধা ছিল না এখন আমরা যা করছি তা পুরোপুরি মনের ভেতরের প্রক্রিয়া পাঠক বা পাঠিকা আপনি কি মনে করেন যে কোঁকড়াচুল যুবতী যা বলছে তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং কোঁকড়াচুল যুবতী কেনই বা পালোয়ান-যুবকের মুখ কায়দা করে বন্ধ করে দিচ্ছে যাতে পালোয়ান-যুবক প্রত্যুত্তর দিতে পারছে না আপনি কি মনে করেন যে পালোয়ান-যুবক কোনো উত্তর দিতে চাইলে মুখ থেকে মাই বের করে প্রত্যুত্তর দিতো আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না পালোয়ান-যুবক উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল মুখ থেকে মাই বের করে নিয়ে বলল আমার কাছে একজনের ইল্লির লাবিয়া মেজোরা আর মাইয়ের দুটো টোঁটি শুকিয়ে রাখা আছে আমি তখন কিশোর ছিলুম খাইনি আমার ভাগে ওইটুকুই পড়েছিল মাঝে মাঝে কুলের আচারের মতন চুষতুম আর খেয়ে ফেলার ইচ্ছে সংবরণ করতুম ইল্লিলাবিয়া বিছানায় পেতে তার ওপর শুয়ে নিজেকে উত্তেজিত করতুম এতোদিন ভাবতুম যে আমি প্রতীকিভাবে সেই মেয়েটায় আসক্ত বলে খাচ্ছি না কিন্তু এখন তোমার ধুকপুকে জীবন্ত মাই আর দপদপে জীবন্ত ইল্লিতে মুখ দিয়ে বুঝতে পারছি যে তা ছিল বিভ্রম চোখ বুজেও তোমার মতন সুন্দরী করে তুলতে পারিনি কল্পিত মেয়েগুলোকে কোঁকড়াচুল-যুবতী ময়লার আস্তরণ থুতুতে মোছা নিজের ডান দিকের মাই পালোয়ান-যুবকের মুখে পুরে দিয়ে বলল না তা নয় তা বিভ্রম নয় তাও প্রেম এক বিশেষ ধরণের প্রেম যেখানে আপনি প্রতিদিন আপনার প্রেমিকাকে নতুন করে মগজে এঁকে নিচ্ছিলেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো রূপ ফুটে উঠছিল না স্বমেহনের জন্য ওইটুকি ছবিই ছিল যথেষ্ট আপনার সামনে মূর্ত রূপ ফুটে উঠলে হয়তো আপনি তাকে খেয়ে ফেলবার তোড়জোড় করতেন আর হ্যাঁ আপনি আমাকে সুন্দরী বলে ডাকবেন না শুনলেই মনে হয় আমি আপনার চারপেয়ে ক্রীতদাসী আপনি আমাকে মা বলে ডাকবেন কেননা আমাদের পক্ষে যে মেয়েদের বয়স তিরিশের বেশি হয়ে যায় তাদের চেয়ে ছোটোরা তাদের মা বলে ডাকে তার কারণ বিয়ে বলতে বোঝায় নারী-পুরুষের এক সপ্তাহ বা মাস তিনেক বা বছর খানেকের সম্পর্ক মেয়েরা আর ছেলেরা ইচ্ছেমতন বউ আর বর যখন-তখন বদল করতে পারে বলে কে যে কার ছেলে বা মেয়ে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না ফলে গাঁড়হাভাতে মানুষ মাত্রেই বেজন্মা যখন পুরুষ বা নারী আর কাজকম্মো আকর্ষণের যোগ্য থাকে না কেউই তাদের মিনিট পাঁচেকের জন্যেও বউ বা বর করতে চায় না তখন তাদের রাখা হয় বয়স্কখোঁয়াড়ে সেখানে তারা সুখেই থাকে গল্পগুজব পরচর্চা করে দাবা খেলে সমাজ তাদের খোরপোষ আর পা টেপাবার ব্যবস্হা করে মরে গেলে ঘটা করে ক্রুশবাঁশে টাঙানো হয় পালোয়ান-যুবক থুতুতে পরিষ্কার বুক থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল আমাদের এখানেও একই রেওয়াজ তবে আমাদের এখানে মা বলার বদলে বলা হয় আন্টি আর যারা পুরুষসঙ্গ করার জন্য টার্গেট খুঁজছে তাদের বলা হয় মিস বা দিদিমণি তার কারণ বউ আর বরের মাঝে রতিসম্পর্ক বদলাতে থাকে যার ফলে একসময়ে এমনও হয় যে তোমার জন্ম দিয়েছিল সে তোমাকে পছন্দ করে ফেলল আর তুমিও তাকে পছন্দ করে ফেললে তাই যাতে মা বলে ডাকতে না হয় সেকারণে আন্টি ডাকের প্রচলন বলতে বলতে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-যুবতীকে জড়িয়ে ধরে পাক খেয়ে নিজের ওপরে তুলে নিল আর কোঁকড়াচুল-যুবতীর মুখের কাছে মুখ নামিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল আমাদের এই সম্পর্ক রতির বুঝলে এটা নিছক ইল্লিগিল্লির সম্পর্ক নয় যে সম্পর্ক পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারদের মাঝে গড়ে ওঠত রতি ব্যাপারটা জ্ঞানের যে জ্ঞানের প্রতিফলন তুমি দেখতে পাবে কোণারক আর খাজুরাহোর মন্দিরগুলোয় তার মানে রতি কোনো ভুল নয় তা এই পক্ষের সঙ্গে ওই পক্ষের মাঝে ঘটলেও রতির রসায়ন তরল নান্দনিক তাতে রয়েছে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ছোঁয়া দেখা শোনা শোঁকা স্বাদ আসলে অনুভূতিই সব জ্ঞানের উৎস তাই রতিক্রিয়া জিনিসটা পবিত্র তা ইল্লিগিল্লির মতন নয় রতিক্রিয়া অবচেতন থেকে তথ্য তুলে আনে যা পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারদের স্মৃতিতে ছিল না সঙ্গমের পরেই সিংহীকে চিৎ হয়ে শুয়ে গড়াগড়ি দিতে হতো কেননা তা নিছক যৌনতা বাচ্চা পয়দা করার জন্য তুমি যে মুখে নিয়েছিলে তার সঙ্গে বাচ্চা পয়দা করার সম্পর্ক ছিল না আমার মুখে তুমি তোমার বুক এক এক করে দিয়েছিলে তার সঙ্গে বাচ্চা পয়দা করার সম্পর্ক নেই তুমি কম বয়সে স্বমেহন করেছ আমিও করেছি তা এই জন্য যে আমরা মানুষ তোমার সঙ্গে এর আগে তিন মাস পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারের মতন সঙ্গম করেছি তা বাচ্চা পয়দা করার জন্য নয় তা রতির আনন্দের জন্য যা-কিছু পবিত্র তা শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয় দুই পক্ষের পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ার ইল্লিতে-গিল্লি প্রথা পবিত্রতাকে নষ্ট করার উদ্দেশে মানুষের জ্ঞান রতির জন্য সে প্রয়োগ করে কিন্তু জানোয়ারদের জ্ঞানজগত নেই মানে যা বলতে চাইছি তা হল এই যে রতি আমার সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের অন্তরজগতের সঙ্গে তার বহির্জগতের সম্পর্ককে ঘষেমেজে মুছে দ্যায় তাদের মাঝে বিদার ঘটিয়ে পুরুষের সঙ্গে নারীর যোগসূত্র তৈরি করে আসলে আমরা রতিপ্রাণী আর তাই জন্যেই আমরা পরস্পরের মাংস খেতে ভালোবাসি প্রত্যুত্তরে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল তিনমাস যাবত আপনি আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন তাকে প্রায়ই মনে হয়েছে নোংরা কলঙ্ককর নিকৃষ্ট নীচ অসৎ স্বার্থপর শোষণ ঘৃণ্য জঘন্য অকরুণ নির্মম অথচ তাতে ছিল একই সঙ্গে অমিল আর দেহের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা পরমানন্দ সমর্পণ পরাজয়বোধ দেহস্বত্বত্যাগ কর্তব্য সমবেদনা অনুগ্রহ আতঙ্ক লজ্জা তবে আমাদের দুই পক্ষের ঈশ্বরহীনতা আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে অনেক দেশে শুনেছি ঈশ্বর নামের একটা নকল নৈতিক বাঁধন তৈরি করে গাঁড়হাভাতে মানুষদের পৌরাণিকাধুনিক জন্তুজানোয়ারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় নিজেরাই নিজেরা সেখানে পরস্পরের সঙ্গে খুনোখুনি করে মেরে ফ্যালে কিন্তু খায় না যদিও তারা জন্তুজানোয়ার খেতো পাঠক বা পাঠিকা আপনার কি মনে হয় যে কোঁকড়াচুল-যুবতীটি ষড়যন্ত্র করে চলেছে পালোয়ান-যুবকের বিরুদ্ধে তাকে বশ করে সুযোগ খুঁজছে খুন করে রাতের অন্ধকারে রতিক্যালানে পালোয়ান-যুবকের পাশ থেকে উঠে চুপচাপ পালিয়ে যাবে ভাবছে হঠাৎ তারস্বরে সমবেত কান্নার ভেউ ভেউ হাউ-হাউ ভ্যাঁ-ভ্যাঁ আরম্ভ হতে পালোয়ান-যুবক নিজের কাজ তাড়াতাড়ি সেরে যোনি থেকে লিঙ্গ বের করে নিয়ে ঠোঁটের ওপর থেকে ঠোঁট তুলে নিয়ে বুকের ওপর থেকে হাত তুলে নিয়ে বলল আরে আরে আজকে পূর্ণিমা নাকি আজকে কান্নার রাত গোল চাঁদ মেঘের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে থাকবে আমাকেও কান্নায় অংশ নিতে হবে বলতে-বলতে চামড়ার লুঙ্গি পরে বিছানা থেকে নেমে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল যুবতীর দিকে তাকিয়ে বলল তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও তাহলে পেছনের বাঁশবনের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে পালাও ওই বাঁশবনে এখন রাতের বেলায় কেউ যায় না কেননা হাড়ের গজাল-ঠোকা ক্রুশবাঁশে টাঙানো আত্মীয়-স্বজনদের দেহ আর কঙ্কাল বাঁশপাতার হাওয়ায় কাঁদে গান গায় কথা-বলাবলি করে নাক ঝাড়ে কাশে তুমি বাঁশবনের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে দৌড়ে চলে যেও বুঝলে বাঁশবনের ক্যাম্পাস পেরোলেই দুর্গন্ধ হাওয়ার দেয়াল তার ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে সোঁ করে নিজেদের পক্ষে চলে যেতে পারবে এখানে থাকলে শাবক পয়দা হবার পর তোমাকে মেরে ফেলা হবে তা আমি সইতে পারবো না যাবার আগে চর্বির প্রদীপটা জ্বেলে দিয়ে যেও বুঝলে বলতে বলতে পালোয়ান-যুবক সমবেত কান্নায় কাঁদার জন্য দরোজার চৌকাঠ থেকেই হাসির সঙ্গে কান্না মিশিয়ে এগোলো আসলে তার হাসি ছিল নিজের গিল্লির দৈর্ঘ্যের আনন্দে যা তাকে কোঁকড়াচুল- যুবতীর কতো ভেতরে নিয়ে যেতে পারে সেই সুখচিন্তা নিয়ে আর কান্না ছিল কোঁকড়াচুল-যুবতীকে ছেড়ে যাবার দুঃখে কোঁকড়াচুল-যুবতী থেকে গেলে তার নিশ্চিত মৃত্যুর দুঃখে কোঁকড়াচুল-যুবতী চলে গেলে মনের মতন রতি করতে না পারার দুঃখে এদিকে পালোয়ান-যুবক চলে যেতেই কোঁকড়াচুল-যুবতী ঘুমোবার কথা ভাবলো কতোদিন ঠিকমতো ঘুমোনো হয়নি হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার চাদর টেনে চাপা দিয়ে নিজেকে নিঃশব্দে বলল যাবো না এখান থেকে যতোদিন এই তাগড়া পালোয়ান-যুবককে সঙ্গমের জন্যে পাচ্ছি ততোদিন জীবন উপভোগ করে নিই একে দিয়ে নানা আঙ্গিকের সম্পর্ক সম্ভব এ এখনও আনাড়ি ভাগ্যিস একজন ঘোলাটে মগজের পালোয়ান-যুবককে পেলুম এর মাপও মনের মতন দীর্ঘ সুখদায়ী সরস ঝিলমিলে এর অনেকগুলো ঠোঁট আছে যেগুলো একই সঙ্গে আমার সারা শরীরে আদর নিয়ে নেমে আসে এর জিভের লালায় রয়েছে রামধনুর সাতরঙের সুগন্ধ এ আমার হৃদয়ের ধুকপুকুনির সঙ্গে ক্লিটোরিসের টুনটুনানির ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ছন্দ মেলাতে পারে এর ভাঁড়ারে দেবার মতন মৃদু ব্যথা প্রচুর রয়েছে এর ওজন কুস্তিগিরের মতন ডাকসাইটে এ গোপন পালক দিয়ে আমার শরীরে ঘুমিয়ে থাকা কাঁপুনি শিহরণ রোমাঞ্চ জাগিয়ে তুলতে পারে আমার মাংসের ধাঁধার সমাধান করতে পারে যা এর আগে আমার আধবর বা কাঁচাবর বা পার্টটাইম বররা কেউ দিতে পারেনি এ আমাকে মেরে খেয়ে ফেললেও আমার তা প্রাপ্তি এরা যদি আমাকে নিজের পক্ষের বলে মেনে নেয় তাহলে আমি ক্রুশবাঁশে বাঁধা অবস্হায় এর দিকে তাকিয়ে ক্রমশ কঙ্কাল হয়ে যেতে রাজি আছি ভাবতে ভাবতে কোঁকড়াচুল-যুবতী ঘুমিয়ে পড়ল আর নাক ডাকতে লাগলো কেননা ওই পারের একনায়কের অলিখিত বিধিবিধান অনুযায়ী নাক ডাকলে বদস্মৃতিরা উধাও হয়ে শুধু সুখস্মৃতি ধরে রাখে আর সদ্য-অতীতকে ভুলে যাওয়া যায় ওদিকে পালোয়ান-যুবক দৌড়োতে দৌড়োতে টের পেলো যে আজকে পূর্ণিমা নয় আর কেউই সমবেত কান্না কাঁদছেনা বাঁশবনের ক্যামপাসে ক্রুশবাঁশে বাঁধা মানুষের মাংস খুঁটে হাজার মাছির গ্যাঞ্জাম আর হাজার মশার দল ওপর দিকে মুখ তুলে খিদের কান্না কাঁদছে ভাগ্যিস ওদের কোনো শোবার বিছানা নেই নয়তো না খেয়ে শুতে যেতে হতো খিদে পেলে ওপরে মুখ তুলে কাঁদলেই চলবে না যেখান থেকে হোক খাবার যোগাড় করতে হবে সেই পক্ষের ক্রুশবাঁশে টাঙানো আত্মীয়স্বজনরা যাদের মাথা বা করোটি মশা-মাছিরা খায়নি বা পৃথিবীর টানে মাটিতে ঝরে পড়েনি অমাবস্যার রাতে তারা সমবেত গান গায় সবচেয়ে বয়স্ক শব বা কঙ্কাল কোনো একটা গান আরম্ভ করলে সবাই মিলে সেই গান গায় একইভাবে ক্রুশবাঁশে বাঁধা আত্মীয়স্বজনরা পূর্ণিমার রাতে গান গায় সেই পক্ষের যুবক ফেরার পথে দেখতে পেলো নিজের পক্ষের সোনালিচুল ডবকাছুকরি ফিট্টমফিট পাহারাদারদের নিয়ে বোধহয় ওই পক্ষের ছোকরার গলায় হাড়ুহাজ-করা চামড়ার ফেট্টি বেঁধে হাতে দস্তানা পায়ে নিক্যাপ পরিয়ে হামাগুড়ি দিইয়ে ঘাসের রাস্তায় টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে ওর কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি বন্ধুনীরা হ্যাহ্যা হিহি হোহো খিকখিক করতে করতে যাচ্ছে পালোয়ান-যুবক কাছে গিয়ে দেখল বাঁধা ছোকরার সারা গায়ে চুল এমনকি পেছন দিকেও চুল ডবকাছুকরি যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল ওর পোঁদের চুল দেখেছ আর স্বাস্হ্য দ্যাখো বুকে চুল পিঠে চুল যন্তরটা এতো লম্বা যে প্রায় মাটিতে ছুঁচ্ছে অলিভফল থেকে লিটার খানেক তেল বেরোবে এ আমার রিয়্যাল পৌরাণিকাধুনিক অ্যানিমাল সহজে পুড়িয়ে খাবো না এরা সবাই আমার সঙ্গ নিয়েছে একে কোনো তালগাছে বেঁধে কাজ সারার জন্য এরকম তাগড়া ছয়প্যাক শরীর এর কোনো অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না তবে চুলেলছোকরা বলছে ও সেই পক্ষ ওই পক্ষ কোনো পক্ষের নয় ও বাইরের দেশ থেকে এখানে এসেছিল দলবাজি প্রচার করার জন্য পালোয়ান-যুবকের দিকে তাকিয়ে ডবকাছুকরির নীলচুল বন্ধুনি জিগ্যেস করল দলবাজি কাকে বলে তা তুই জানিস কি পালোয়ান-যুবক বলল না জানি না ওকেই জিগ্যেস কর দলবাজি কোন জিনিসের নাম যদি খাবার জিনিস হয় তাহলে আমাদের দরকার নেই কেননা আমরা উত্তরঐতিহাসিক যুগে পৌঁছে মানুষের মাংস ছাড়া কিছুই খাই না ছুঁচোবাজি বা তুবড়িবাজি বা ফুলঝুরিবাজি হলেও দরকার নেই অযথা আলোয় মগজ চিড়বিড়ে হয়ে যায় গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ফেট্টি বাঁধা ছোকরা মুখ তুলে বলল আরে দলবাজি কোনো খাবার বস্তু নয় ব্যাপারটা আদর্শের মানুষ কেমন করে ভালোভাবে বেঁচে থাকবে তার আদর্শ কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরিরা চুলেলছোকরার কথায় হিহি হাহা হোহো হেসে বলল আর কতো ভালোভাবে বাঁচবো তোমার মাংস খাওয়ার চেয়ে কাঠিকাবাব খাওয়ার চেয়ে অলিভফল খাওয়ার চেয়ে ভালো আর একটা বাঁচা আছে বটে যা তোমায় তালগাছে বেঁধে এক্ষুনি দেখানো হবে তুমি নিজেও তাতে অংশ নেবে বুঝলে কষ্টের সঙ্গে আনন্দ মিশিয়ে কেমন করে বাঁচা যায় তা জানতে পারবে তারপর তোমার যন্তরের কাঠিকাবাব যা জমবে না আহা তা আদর্শ জিনিসটা কি বলো দিকিন বুঝিয়ে তাহলে তোমাকে ততো যন্ত্রণা দেয়া হবে না যতো ওই পক্ষের লোকগুলোকে আমরা দিই চুলেলছোকরা দাড়িগোঁপসুদ্দু মুখ উঁচু করে বলল আদর্শ হল মহাপুরুষদের মতামত ফিরি করে বেড়ানো ডবকাছুকরি বলল তোর চেয়ে বড়ো মহাপুরুষ হয় নাকি রে মুকখু নিজের জিনিস কাজে লাগাবি তা নয় অন্যের বুকনি ফিরি করে বেড়াচ্ছিস তুই তো নিজেই মহান মাপের পুরুষ চুলেলছোকরা বলল ঠিক আছে আপনারা আমাকে নিয়ে গিয়ে তালগাছে বাঁধুন এখানে তো তালগাছ আর মুলিজাতের বাঁশগাছ ছাড়া কোনো গাছই দেখলুম না আমি বুঝিয়ে বলছি আদর্শ কাকে বলে এরকম পৌরাণিকাধুনিক যুগের ক্লাবপালিত কুকুরের মতন চার হাতেপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয় এই যুগেও যে মানুষের মাংস খাওয়া হয় তার চামড়া জ্যান্ত অবস্হায় ছাড়ানো হয় তার চামড়ার পোশাক জুতো বেল্ট দস্তানা নিক্যাপ তৈরি করা হয় এটা তো অমানুষিক মানুষ তো কবেই সভ্য হয়ে গেছে আর আপনারা পড়ে আছেন প্রাগৈতিহাসিক যুগে ডবকাছুকরি বলল ঝাঁট জ্বলে যায় পৌরাণিকাধুনিক যুগের এইসব কথা শুনে ওরে গাড়লঘিলু চুলেলছোকরা সভ্যই যদি হবি তো মহাপুরুষের বুকনি ফিরি করতে হচ্ছে কেন আমাদের দ্যাখ উত্তরঐতিহাসিক যুগের মানুষ কিচ্ছু ফিরি করি না কতো সুখে আছি সবাই মিলে ওই পক্ষের মানুষদের ধরি আর খাই এছাড়া আর কোনো আদর্শ নেই আমাদের দেখতেই পাচ্ছিস কতো ভালো আছি আমরা এর চেয়ে ভালো আর থাকা যায় নাকি শুনতে-শুনতে পালোয়ান-যুবক তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে কোঁকড়াচুল-সুন্দরীমা আছে না চলে গেল দেখবে ভাবছিল চুলেলছোকরাকে দাঁড় করিয়ে একটা তালগাছের সঙ্গে ঠেসে ধরে চামড়ার দড়ি দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে ফিসফিস করে বলল আমি তোমাকে পালাবার সুযোগ করে দেবো মাঝরাতে আজ হলে আজই তুমি তোমার সঙ্গে একজন কোঁকড়াচুল-যুবতীকে নিয়ে যাবে সে আমার সুন্দরীমা চুলেলছোকরা কেঁদে ফেলল সোনালিচুল ডবকাছুকরি পালোয়ান-যুবককে উড়ন্তচুমুর ধন্যবাদ জানিয়ে বলল ওকে তালগাছের গুঁড়িতে বেঁধে ফেলা হয়েছে এবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যাক কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরিরা চুলেলছোকরাকে কাছ থেকে খতিয়ে দেখল চুলেলছোকরার বুকের নাভির চুল নেমে এসে লিঙ্গ ঢেকে ফেলেছে ফিট্টমফিট পাহারাদাররা ঘাসের ওপর বসে পড়ল দেখে পালোয়ান-যুবক দৌড়োলো কোঁকড়াচুল-সুন্দরীমা আছে না চলে গেছে দেখতে ডবকাছুকরি বলল তা চুলেলছোকরা এবার বলো দিকিন তোমার আদর্শ জিনিসটা কি সেটাও কি চুলের অন্ধকারে ঢাকা কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ বন্ধুনিরা হ্যাহ্যা হিহি হোহো হেসে বলল আদর্শ হল বিভ্রম যা চুলে ঢাকা থাকে হ্যাহ্যা হিহি হোহো সোনালিচুল ডবকাছুকরি বলল যা বুঝছি আদর্শ হল পাগল হবার উপায় যা দিয়ে তুই ব্যাটা বিভ্রমে সন্ত্রাস ঘটাস তুই আসলে বাস্তব জগতকে ভালোবাসতে পারিসনি চুলেলছোকরা বলল আপনারা বোঝবার চেষ্টা করছেন না আদর্শ হল মানুষের ভালো করার মহৎ দূরদৃষ্টি কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি শুনে বলল হ্যাহ্যা হিহি হোহো আর সেই দূরদৃষ্টি হল একখানা ঝুলন্ত রক্তিম মরীচিকা সোনালিচুল ডবকাছুকরি বলল তোর পরিবেশে অবস্হায় যা খাপ খেয়ে গেছে তাকেই সারা পৃথিবীতে আদর্শ বলে চালাবার চেষ্টা করছিস তোর সমস্যা কি জানিস তুই নিজে ওই ভুয়ো জিনিসটার জেলখানায় আটকে আছিস স্বপ্ন দেখছিস যে যেখানে ছিলিস সেখানকার ব্যবস্হা ভালো নয় বলে বিকল্প ব্যবস্হা ফিরি করে বেড়ালে স্বপ্নপূরণ হবে আর ওই স্বপ্ন দেখার ধান্দাতেই এখানে মরতে এসেছিস কিচ্ছু হবে না কিচ্ছু হবে না কিচ্ছু হবে না এই উত্তরঐতিহাসিক যুগে তারপর ফিট্টমফিট পাহারাদারদের দিকে চেয়ে বলল তোদের কাছে কাঁচি আছে তো এর যন্তরের আশেপাশের চুলগুলো ছেঁটে ফ্যাল নইলে কেমন করে কী করব আমরা সন্ধে হলে দেখতেই পাবো না এতোজন লাইন দিয়ে রয়েছে ডবকাছুকরির কথা শুনে একজন ফিট্টমফিট পাহারাদার হাড়ুহাজ-করা হাড়ের কাঁচি দিয়ে ছাঁটা আরম্ভ করল চুলেলছোকরার কুঁচকির জঙ্গল আর গোধূলীলগ্নে হাসিমুখে বেরিয়ে এলো যন্তরখানা কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরির মুখে হাসি ফোটালো একজন বলল এই তো একেই বলে আদর্শ সোনালিচুল ডবকাছুকরি পোশাক খুলে ঢলঢলে বুকে তপতপে গরম উরু চেপে চুলেলছোকরাকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকার পর তার মানবতাবাদী শরীরে থিরথির করে প্রাণ ফিরে এলো তার জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে করল অথচ দুহাত বাঁধা সোনালিচুল ডবকাছুকরি তাকে চুমু দিয়ে চেটে নিজেকে চেপে ধরল চুলেলছোকরার পেশি-দপদপে দেহে আর ইল্লি-গিল্লি করে কিছুক্ষণেই যুবকের উত্তেজনা ঝরিয়ে ফেলল নিজের ইল্লির গুহায় তার আঘাতে তালগাছটা পেছন দিকে সামান্য হেলে গেল হেলতে গিয়ে গাছের টঙে বাঁধা চামড়ার হাঁড়ি থেকে কিছুটা তাড়ি চলকে চুলেলছোকরার মাথায় পড়তে সে চেটে নিয়ে কিছুটা তেষ্টা মেটাল বাকিটা সোনালিচুল ডবকাছুকরি চেটে তেষ্টা মেটালো সোনালিচুল ডবকাছুকরির পর কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরিও পারাপারি করে একই কাজ শেষ করার পর তালগাছ আরও খানিকটা হেলে পড়ল তখন চুলেলছোকরার অবস্হা পচা ক্রুশবাঁশের মতন ঝুলে কাহিল তখন যেসব ঝক্কিমন্ত যুবতীরা লাইনে ছিল তারা মুখ দিয়ে বাকি কাজটা করল চুলেলছোকরা হেলে থাকা আশেপাশের তালগাছের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল তালগাছগুলোকে কতো অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে হেলা তালগাছে হেলে থেকে চুলেলছোকরা বলল আপনারা রোজই যদি আমার সঙ্গে এই কম্মোটি করেন তাহলে আমি এই কাজকেই আদর্শ বলে মেনে নেবো তবুও যেহেতু দলবাজির আদেশ তাই আদর্শ ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি আপনাদের সোনালিচুল ডবকাছুকরি আর কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি ক্লান্ত হয়ে ঘাসের ওপর বসলে তালগাছে বাঁধা চুলেলছোকরা আদর্শ বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলো অথচ হাত না নাড়িয়ে কেমন করে বোঝাবে কুলকিনারা পেলো না দলবাজির আদর্শ প্রচারের জন্যে নানাভাবে হাত নাড়ানো আঙুল তোলা জরুরি এদিকে তার টলমলে শরীর আর ঝিমঝিমে মগজ থেকে যে কী কথা বের হচ্ছিল তা সে নিজেই টের পাচ্ছিল না তবু ঘোরের মধ্যে বলে চলল সব দলবাজ ছোকরাই আদর্শ প্রচারের জন্যে বাড়ি থেকে বেরোয় কিন্তু চুল ছাঁটিয়ে এখন আমি যে পরমানন্দ ভোগ করলুম সেই আনন্দপ্রাপ্তির জন্য বিভোর হয়ে যায় আদর্শের নামে কুর্সি-হোলডাররা দলবাজির ছোকরাদের শোষণ করে তাদের মনে করে পুরুষবেশ্যা অথচ ন্যায্য দাম চোকায় না আদর্শ জিনিসটা যদিও দুঃসাহস দাবি করে আর তার প্রয়োগ হওয়া উচিত সৎ উপায়ে কিন্তু তা বুদ্ধির গোঁজামিলের খেলায় নিজের নিয়মপ্রণালী দিয়ে বেকুব বেনে যায় তার কারণ ভাবনার তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টির বদলে মগজের জটিল ছুঁচোবাজিতে আত্মহারা হয়ে যায় এটা মানুষকে আকৃষ্ট করে বটে অথচ সেই প্রক্রিয়ায় তাকে অংশ নিতে দেয় না আদর্শ হলো পরম দুর্ভাগ্য দানবিক পরগাছা স্হায়ী বিপদকাল যা সমস্ত ছোটোখাটো আনন্দকে সমূলে বিনাশ করে চুলেলছোকরা বজায় রাখে নিজের কাহিল-বকবক শুনতে শুনতে সোনালিচুল ডবকাছুকরি আর দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ল আর ফিট্টমফিট পাহারাদারদের একজনকে বলল এই তোর লুঙ্গিটা ওকে পরিয়ে দে নয়তো রাত্তিরে মশামাছির সমাবেশ এসে ওর যন্তর খেয়ে ফেললে অনেক লোকসান হয়ে যাবে একজন ফিট্টমফিট পাহারাদার নিজের লুঙ্গি খুলে পরিয়ে দিলে চুলেলছোকরাকে সেই পক্ষ ওই পক্ষ দুদিকেই যারা ন্যানো পুং নিয়ে জন্মায় তাদের ফিট্টমফিট পাহারাদারের কাজে লাগানো হয় ন্যানো পুং মানে যাদের গিল্লি দাঁড়ালে আধইঞ্চি বা বড়োজোর পৌনে-একইঞ্চি চুলেলছোকরাকে চামড়ার লুঙ্গি পরিয়ে দেবার পর সবাই বিদেয় হলেও চুলেলছোকরার মগজের মেশিন চলতেই থাকল বকবকিয়ে যেমন যেমন মানুষের বয়স বাড়ে সে তার আদর্শকে এমনভাবে অতিক্রম করে যে তা ধুলোয় মিশে চুরোচুরো হয়ে যায় আর যদি তার অন্য জীবন না থাকে তাহলে তাকে ওই ধুলোবালি থেকেই আবার নতুন করে গড়ে তুলতে হবে সেই ফাঁকে তার মনের মধ্যে অন্যকিছুর খোঁজ চলতে থাকবে সে বোকার মতন তার ভেঙে-পড়া স্বপ্নের ধুলোবালি ঘাঁটাঘাঁটি করবে এই ভেবে যে তা টুকরো-টাকরা আগুনের স্তুপ যেন সেখানে একটা অন্তত স্ফূলিঙ্গ পাওয়া যাবে তা সে কণামাত্র হোক না কেন চেষ্টা করবে আরেকবার দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠুক যাতে তার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া রক্ত গরম হয়ে ওঠে আর তার আদর্শকে জাগিয়ে তোলে যে আদর্শকে সে কচি বয়স থেকে ভালোবেসেছিল যা তাকে ছুঁয়ে যেতো যা তার শিরায় শিরায় রক্তের সঙ্গে বইতো আর যা শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে চুলেলছোকরাকে তালগাছে বাঁধা দেখে ওর সামনে গোল করে সার দিয়ে মশা আর মাছিরা বসেছিল কিন্তু চুলেলছোকরার বকবকানির ফলে টের পাচ্ছিল যে মরা মানুষ নয় কিন্তু এর আগে এভাবে তালগাছে বাঁধা মানুষ অনেক সময়ে মরে গিয়ে মড়ার গন্ধ ছেড়েছে বলে অ্যানোফিলিস কিউলেক্স ইডিস বোরাচিণ্ডা লুটজিয়া ম্যানসোনিয়া হেমাগগাস সোরোফোরা ফিকালবিয়া মশারা আর নীলমাছি গুয়েমাছি কানামাছি ভনভনেমাছি কুকুরমাছি ইঁদুরমাছি পেঁকোমাছি অপেক্ষা করছিল যে কখন চুলেলছোকরার বক্তৃতা শেষ হবে আর মরে গিয়ে মাথা ঝুলিয়ে চুপ মেরে যাবে কোমর থেকে খসে যাবে চামড়ার লুঙ্গি আর ওরা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে চুষে-চুষে লবলবালব খেতে পারবে কিন্তু চুলেলছোকরার মুখ বন্ধ হবার কোনো লক্ষণ নেই সে বলতেই থাকলো পৌরাণিকাধুনিক যুগের গাঁড়হাভাতে মানুষদের কী এমন ছিল যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি হ্যাঁ আমরা হারিয়ে ফেলেছি আত্মবিশ্বাস আদর্শ উত্তাপ স্বাতন্ত্র্যবোধ তুমি তোমার আদর্শকে কখনও প্রত্যাশায় পালটে ফেলো না যতো আদর্শবাদী ছিল সবাই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে তার কারণ তারা মানুষের গাদাগাদি ঠেলাঠেলি সামলাতে পারেনি তারা নিজেদের আদর্শবাদী ঠাওরালেও তাদের পোঁদে লড়বার দম ছিল না তাই লড়াইটাকেই ভেবে বসেছে মামুলি ইতর সাধারণ প্রচলিত অমার্জিত অসূক্ষ্ম তারা সবাই ছিল চপল আর দাম্ভিক আদর্শ ছেড়ে পালিয়ে যাবার পরমুহূর্তে মানুষ খিটখিটে হয়ে যায় ফোঁপরা হয়ে যায় লোভী হয়ে যায় সে নিজে তা বুঝুক বা না বুঝুক যেমন আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে মহিলারা যা করে গেলেন আমার আদর্শকে চুষে বের করে নিয়ে গেছেন আমার সেই মহিলাদের কাজ ভালো লেগে গেছে আমি আর আদর্শবাদী থাকতে পারবো না একদল চিরকাল মনে করে অন্য দলটা খারাপ একের আদর্শ অন্যের আদর্শের চেয়ে উন্নত আদর্শবাদ তো স্রেফ একটা ভাঁওতা যে ধারণার বনেদ হল কোনো এক অভিপ্রায় আর সেই অভিপ্রায়টি যে ঠিক কী তা কেউই জানতে পারে না শুধু এটুকু জানে যে তা অবাস্তব কল্পনা থেকে পয়দা হয়েছে পৃথিবীকে নিখুঁত করে তোলার স্বপ্ন থেকে জন্মেছে আসলে আদর্শবাদী মানুষ তার ধারণার সীমা ঠাহর করতে না পেরে যাদের তার সঙ্গে মতের মিল নেই তাদের কচুকাটা করতে থাকে এক জায়গা থেকে তুলে আরেক জায়গায় চালান করে দ্যায় ভাবে যে বাস্তব জগতটাকে তার ঘোলাটে কল্পনার দেশে নিয়ে গিয়ে পুঁতে দেবে আদর্শবাদীদের ছেলেপুলেরা শেষ পর্যন্ত অবহেলিত পাগল হয় আদর্শবাদীরা নিজেরা হয়ে যায় জল্লাদ যতো গোঁড়া আদর্শ ততো পচনের অবিশুদ্ধতার কলুষের দূষণের বিকৃতির ঘুষের রমরমা আদর্শ হল দখলপ্রক্রিয়া অন্যের মগজ দখল অন্যের জীবন দখল অন্যের স্বাধীনতা দখল অন্যের অস্তিত্ব দখল অন্যের বৈভব দখল চুলেলছোকরার গালে একটা হাড়গিলে হাতের জবর চড় পড়তে মুখ বন্ধ করে কাউকে দেখতে পেলো না শুধু একটা বিশাল হাত লতিয়ে এসেছে বাঁশবনের দিক থেকে চড় মারা হাতটার মালিককে দেখতে পাচ্ছিল না চুলেলছোকরা কিন্তু তার গমগমে কন্ঠস্বর শুনতে পেলো শালা কুত্তির বাচ্চা তখন থেকে বকবক করে যাচ্ছিস একটু শান্তিতে থাকতে দিবি তা নয় আমরা মরে গেছি বলে ক্রুশবাঁশে বাঁধা আছি বলে আমাদের কি জীবন নেই আমাদের কি ঠায় বাঁধা অবস্হায় গা ব্যথা করে না ভাবছিস কবে শুকোবো কবে হাড় বেরিয়ে পড়বে কবে করোটি ঘাসের ওপর দড়াম করে পড়ে আমাদের মুক্তি দেবে তা কি আদর্শের ব্যাপার নয় সেই থেকে তোর ভ্যাজর ভ্যাজর শুনছি আমরা চুলেলছোকরা একফালি চাঁদের আলোয় তাকিয়ে দেখলো বিশাল একটা হাত এগিয়ে এসেছে বাঁশবনের ক্যাম্পাস থেকে আর তার সামনে তর্জনী নেড়ে-নেড়ে বকুনি দিচ্ছে দেখতে পেলো আরও গোটা দশেক হাড়গিলে হাড়ে মাংস লাগা হাত তার দিকে এগিয়ে এলো আর যে তালগাছে সে বাঁধা ছিল হাতগুলো সেই তালগাছকে উপড়ে তাকে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়ে শেকড়সুদ্দু পুঁতে দিল চুলেলছোকরা দেখতে পেলো তার চারিধারে কাঁচা পাকা শুকনো ক্রুশবাঁশের টঙে গজাল দিয়ে ঠোকা পচা আধপচা কঙ্কাল মানুষ কারোর করোটি নেই কারোর কোমর থেকে হাড়ের ঠ্যাং খসে পড়েছে অথচ আকাশ থেকে নক্ষত্রগুলো ঝরে ঝরে তাদের শরীরে আটকে এমন করে তুলেছে যে বাঁশবনের অন্ধকারেও তাদের ঝিলমিলে আদল দেখা যাচ্ছে একটা কঙ্কালের হাত এগিয়ে এসে তার অন্য গালে কষে চড় মেরে বলল এতোক্ষণ যেমন আদর্শ নিয়ে কপচাচ্ছিলিস এবার মৃত্যু নিয়ে কপচা দিকিনি আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না আমরা মরে গেছি না বাঁচা-মরার মাঝে লটকে আছি চুলেলছোকরা মনে মনে ভাবল এই সেরেছে দলবাজির ট্রেনিঙের সময়ে আমাকে তো নিজেরা মরে যাবার ব্যাপার নিয়ে কিছুই বলা হয়নি তবে জানি যে তোলা আদায় করতে গিয়ে অনেকসময়ে ত্যাঁদোড় লোকেদের পিটিয়ে মেরে ফেলতে হয়েছে যারা আমাদের কথা মেনে নেয়নি তাদের সাবড়ে দেয়া হয়েছে তাদের খেতের ধান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ওয়ানশটার দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে এই মড়াকান্তি পচার দল কি সেসব আদৌ বুঝবে যাকগে দলবাজি করে অন্তত কপচানি রপ্ত করে ফেলেছি কপচাই না হয় মৃত্যু নিয়ে চুলেলছোকরা বলতেই যাচ্ছিল হঠাৎ গম্ভীর স্বরে ক্রুশবাঁশে লটকানো একজন জাঁদরেল আধপচা পুরুষ বলে উঠল আমার গিল্লির ভেতরে যে ছয় ইঞ্চির কোলাপসিবল হাড় ছিল সেটা কোথায় গেল তার কথা শুনে অন্য মড়াপুরুষরাও একই প্রশ্ন তুলল হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা যখন বেঁচে ছিলুম তখন উত্তেজিত হলে আমাদের গিল্লির ভেতরে পাঁচ-ছয়-সাত ইঞ্চির হাড় ফনফনিয়ে উঠতো সেটা কোথায় গেল আমাদের কারোর দেহেই তা দেখা যাচ্ছে না দিনের বেলা ঘাসের দিকে তাকিয়ে দিনের পর দিন খুঁজেও তেমন কোনো হাড় যে খসে পড়েছে তাও তো দেখতে পাইনি তাদের কথার সঙ্গে তাল দিয়ে ঝক্কিমন্ত মহিলা কন্ঠস্বরের মড়ানিরা জিগ্যেস করল ঠিকই তো তোমরা যখন বেঁচে ছিলে আর আমাদের ইল্লিকে আনন্দে আত্মহারা করতে তখন তো তোমাদের গিল্লির ভেতরে হাড় গজিয়ে উঠতো এখন তো দেখছি সেই জায়গাটা তোমাদের আর আমাদের প্রায় একই হায় রে হায় এ কি অলুক্ষুণে ব্যাপার মরে যাবার পর নারী-পুরুষের সাম্য দেখতে হচ্ছে গো এই ছোঁড়া তুই তো বেশ জ্ঞানী বলে মনে হচ্ছে বল দিকিনি মরার সঙ্গে সঙ্গে সেই হাড়টা কোথায় লোপাট হয়ে গেছে চুলেলছোকরা বলা আরম্ভ করল স্যার ওটা তো হাড় ছিল না ওটাকে পৌরাণিকাধুনিক যুগে বলা হতো প্রেমের বাঁশি সেই বাঁশিও মরে যায় যখন প্রেম মরে যায় মানুষ বুঝতে পারে না যে তার প্রেম মরে গেলে সে কেমন করে প্রেমের বাঁশির হাড় ফেরত পাবে ভুলবোঝাবুঝি বিশ্বাসঘাতকতা ক্লান্তি উদাসীনতা আর অন্ধপ্রেমের কারণেও ওটা অদৃশ্য হয়ে যায় ওটা হলো কঠিন জিনিস দিয়ে তৈরি এক ধরণের আলো সেই আলো যতো দিন জ্বালিয়ে রাখতে পারবেন ততোদিন হাড়টা যখন ইচ্ছে গড়ে নিতে পারবেন গুটিয়ে নিতে পারবেন ওই হাড় হলো ভালোবাসার আলো আপনারা যাকে বা যাদের ভালোবেসেছেন তাকে বা তাদের ওই আলো একটু একটু করে দিয়ে হাড়টা ক্ষইয়ে ফেলেছেন ওই হাড়ের ভেতরে আপনাদের হৃদয়ের ঢিপঢিপাঢিপ ঢিপঢিপাঢিপ ধুকপুকুনি ছিল আর সেই ধুকপুকুনির সঙ্গে আপনার প্রেমিকার টুনটুনুনি ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং মিশিয়ে আপনারা হাড়টাকে আবার হৃদয়ের খোপে পুরে নিতেন এই যে খোপে পুরে নেয়া আর বের করা এই প্রক্রিয়ায় হাড়েরও বয়স হয় হাড়ও ক্রমশ খোপ থেকে আর বেরোতে চায় না আপনাদের হাড় ঠিকই বজায় আছে আপনাদের হৃদয়ের খোপে শুনতে শুনতে ক্রুশবাঁশে লটকানো এক গাঁড়হাভাতে মড়াকঙ্কাল কাঁদতে আরম্ভ করল বলতে লাগল আমি ওই পক্ষের কারুর সঙ্গে প্রেম করতে পারিনি আমাদের সময়ের সাড়ে পাঁচফিটের একনায়ক মোড়লচিফ সব সময় নিজের বেজন্মা ছেলেদের ওয়েটিং লিস্টে ওপরের দিকে রাখতো কেননা রাতের বেলায় ছেলেদের বদলে সে নিজেই চার হাতপা বাঁধা ওই পক্ষের মেয়েদের সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লি করতো ওই তো ওই ব্যাটা যার করোটি খসে পড়ে গেছে কয়েক বছরের আগের ঝড়ে অথচ ওর গিল্লির হাড় তিন ইঞ্চিরও কম ছিল বেঁচে গেছে ব্যাটা ছেলেদের দৌলতে ছেলেগুলোর ছয় ইঞ্চি সাত ইঞ্চির হাড় ছিল ক্রুশবাঁশে লটকানো দুজন আধপচা মড়া একই সঙ্গে বলে উঠল হ্যাঁহ্যাঁ ঠিকই বলেছ আংকেল বাবার ন্যানোনুনু ছিল তাই আমরা সুযোগ পেতুম বাবা তো বুঝতেই পরতো না কোথায় গেল বা গেল কিনা আমরাই আবার নিজেদের কাছে এনে বাকি কাজটা পুরো করতুম তবে বাবা তাদের চামড়া ছাড়াতে ওস্তাদ ছিল যে-রাতে শুলো তার পরের সকালেই চামড়ার গামলায় দাঁড় করিয়ে লেগে যেত চামড়া ছাড়ানোর কাজে আর আমরা অপেক্ষায় থাকতুম কখন অলিভতেলে লাবিয়াফ্রাই খাবো সে খাওয়া প্রেম করার চেয়েও মন বেশি করে ভরিয়ে দিতো আহা বেঁচে থাকার সেই দিনগুলো মনে পড়লে বড়োই কষ্ট হয় চুলেলছোকরা বলল আপনারা ওখান থেকে আমায় উপড়ে নিয়ে এলেন মৃত্যু সম্পর্কে জানার জন্য আর এখন আলাদা প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন ফলে মনে যা আসছে তা আবার প্রেমের হাড়ের মতন গুটিয়ে যাচ্ছে ক্রুশবাঁশে লটকানো মড়ারা আর মড়ানিরা একযোগে বলে উঠল আচ্ছা বলবল বল বল আর বাধা দেবো না চুলেলছোকরা আরম্ভ করতেই যাচ্ছিল একজন গাঁড়হাভাতে কঙ্কালমড়া যার করোটি ঝুলে পড়েছে কয়েকদিনেই ঝরে পড়বে ঘাসে সে বলে উঠল আমি মরে গেছি কিন্তু আমার মনে হয় আমার ইল্লিতে গিল্লির কোটা বেঁচে থাকার সময়ে পুরো হয়নি মৃত্যু আমার সঙ্গে জোচ্চুরি করেছে চুলেলছোকরা বলল কী আর করবেন বলুন আপনারা তো আপনাদের সংস্কৃতিতে আবার জন্মাবার প্রথা রাখেননি কিংবা আত্মঘাতী হয়ে স্বর্গে গিয়ে বাহাত্তরজন কুমারীর সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লির নিয়ম তৈরি করেননি ক্রুশবাঁশে ঝোলাই ভবিতব্য জীবনে যা পেয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন আমাকেই দেখুন না এখানে এসেছিলুম দলবাজির উদ্দেশে মানুষের ভালো করার কাজে কিন্তু আমার শরীরের সঙ্গে এমন ব্যবহার করা হলো যে এখন মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার সেটাই একমাত্র আদর্শ নয়তো মরে গিয়ে আমাকেও আপনার মতন আপশোষ করতে হতো কে জানে কালকেই হয়তো আমার চামড়া ছাড়িয়ে তারাই খাবে যারা আমার সঙ্গে ইল্লিগিল্লি করল আমার গিল্লির কাঠিকাবাব খাবে বলে তারা লালায়িত ক্রুশবাঁশে লটকানো সদ্যমরা ঝক্কিমন্ত এক মহিলা বলল তাই বলে মরার জন্য এপিটাফ লিখোনা যেনো কেননা ভাষা নিজেই মরে যায় আর তুমি ভাষার তলায় চাপা পড়ে যাবে তার চেয়ে তোমার মাংস খেয়ে অনেকে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে সেটাই ভালো তাদের ভাষা বংশ পরম্পরায় নতুন হতে থাকবে আর তুমিও তাদের বেজন্মা ছেলেপুলে নাতিনাতনির ভাষার ভেতর দিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে আরেকজন কঙ্কালমড়া যার হাড়ের বেশিরভাগই পড়ে গেছে শুধু করোটি ঝুলে আছে সে কেঁদেকেঁদে বলল আমার তো ন্যানোনুনু ছিল বলে সারাজীবন ফিট্টমফিট পাহারাদার করে রাখলে চার হাতপা বাঁধা ওই পক্ষের একজনের সঙ্গে লুকিয়ে এক ফাঁকে সম্পর্ক গড়তে গিয়েছিলুম তা সে বলেছিল কি জিনিস নিয়ে জন্মেছো বাপু ঘুম ভাঙিয়ে যদি ইল্লিতে গিল্লি করতেই এলে তাহলে বরং আমার বাঁধন খুলে দাও পালাবার আগে তোমাকে দেখিয়ে যাই কি করে কি করতে হয় যেই তার বাঁধন খুলেছি সে এই বাঁশবনের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে নিজেদের এলাকায় দেদ্দৌড় এতোদিন কাউকে বলিনি মনের দুঃখে তোমাকেই বললুম ভার লাঘব হলো এতোদিন ধরে ভাবছিলুম কাকে বলি তা তুমি তো শুনছি ওই পক্ষের নও তাই তোমাকেই বললুম কী দুঃখের জীবন ছিল বলো সারাজীবনে একবারও সঙ্গম করার সুযোগ পেলুম না আর ওই ব্যাটা যেটার ক্রুশবাঁশও পচতে চলেছে কঙ্কালসুদ্দু আছড়ে পড়বে আগামী ঝড়ে ওই ব্যাটা মোড়লচিফ হয়ে কুড়ি হাজার বারের চেয়েও বেশি মেয়েদের সামনে থেকে আর আড়াই হাজারবার ছেলেদের পেছন থেকে করেছে ছি ছি ছি ছি চুলেলছোকরা বলল আপনি আত্মহত্যা করলেই পারতেন ফিট্টমফিট পাহারাদারের করোটি বলল তা করলে তো আমায় ক্রুশবাঁশে ঝোলানো থেকে বঞ্চিত করে মশা-মাছিদের খেতে দিয়ে দিতো চুলেলছোকরা বলল মৃত্যু হল শিল্প তাই শিল্পের মৃত্যুর মাধ্যমে আপনি মৃত্যুর উৎসবে নাচন-কোদন করে মৃত্যুকে তার পাওনা মিটিয়ে দিতে বাধ্য হন সকলেই স্মৃতি হবার আশায় মরে যেতে চায় তবে মনে রাখবেন অন্যের আদর্শের জন্যে মরাকে মৃত্যু বলা হয় না তেমনই এক সঙ্গে দলবেঁধে মরাকেও মৃত্যু বলা যায় না তা হল আদর্শতাড়িত সমবেত পক্ষাঘাত মৃত্যুবোধ মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে কেননা প্রতিটি জীবন্ত মাংস একদিন না একদিন মরবেই আপনি যদি ভাবেন যে অন্যের জন্যে প্রাণ দিচ্ছেন তাহলে আপনার মতন মূর্খ আর দ্বিতীয়টি নেই একজন মানুষের মরাটা ট্র্যাজেডি কিন্তু হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে মরার ব্যাপারটা নিছকই একটা সংখ্যা আপনি আপনাদের দেহের সঙ্গে যে সমস্ত গল্প বেঁচে থাকার সময়ে বয়ে বেড়ান তার মৃত্যু অবধারিত বেঁচে থাকার সময়ে আমরা কেউই গুনি না যে কতোবার কতোজনের সঙ্গে সঙ্গম করেছি আপনি আপনার সেই দেহের জন্যেই মারা যান কোনো উদ্দেশ্য আদর্শ দুঃখ ব্যর্থপ্রেম বা ঋণখেলাপির জন্য নয় যারা নরক আর স্বর্গে বিশ্বাস করে তারা মরে যাবার পর টের পায় তেমন কোনো এলাকা আদপে নেই মরে যাবার পর যদি মানুষটা জানতেই না পারলো যে তার শবের পেছন পেছন হাজার হাজার মানুষ কাঁদতে-কাঁদতে গাইতে-গাইতে গিয়েছিল তাহলে তার মরার সঙ্গে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে ক্রুশবাঁশে লটকে থাকার কোনো পার্থক্য নেই ঘাসের ওপরে পড়ে থাকা কয়েকটা করোটি লাফিয়ে লাফিয়ে একে আরেকের সঙ্গে করোটি ঠুকে ঠকাং ঠকাং হেসে হেসে বলল ঠিকই বলেছো হে ছোকরা আমরা ক্রুশবাঁশ থেকে ঝরে ঝরে পড়ার পরও কেউ ভুত প্রেত শাঁকচুন্নি পেতনি হইনা মাটিতে পড়ার আগে মাছি আর মশার পেটে যাই আর পড়ার পর মাটির সঙ্গে মিশে ঘাস হই এমনকি পৌরাণিকাধুনিক যুগে হাতি শিম্পাঞ্জি বাদুড় টিয়াপাখি বেবুন জংলি-শুয়োর সেই মাটি খেয়ে নিজেদের শরীর থেকে অধিবিষ বের করতো এই দ্যাখো চারিদিকে তারা কতো রকমের রঙে হেগে গিয়েছিল সব আজ ফসিল বছর কয়েকের মধ্যেই প্রত্নত্ত্ববিদরা এসে ফসিলগু দেখে জানাবেন যে তা কোন ডায়নোসরের ডিম ছিল এখন পাথর হয়ে গেছে চুলেলছোকরা প্রত্যুত্তরে বলল আজ্ঞে হ্যাঁ মানুষও এতো রকমের রঙে হাগতে পারে না তা সে মানুষ মহাপুরুষ হোক আদিপুরুষ হোক গদিপুরুষ হোক পেঁকোপুরুষ হোক চোরপুরুষ হোক নেতাপুরুষ হোক গুণ্ডাপুরুষ হোক প্রেমিকপুরুষ হোক হঠাৎ একজন নাকচ্যাপ্টা হলদেটে মড়াকান্তি মানুষ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল আমিই সবচে মহান মোড়লচিফ আমি সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে সাফাচট করেছিলুম বিপ্লব কোনো রাত্রিভোজ নয় বিপ্লব হলো দ্রোহের জাগরণ বিপ্লব কোনো রাত্রিভোজ নয় বিপ্লব হল দ্রোহের জাগরণ বিপ্লব কোনো রাত্রিভোজ নয় বিপ্লব হলো দ্রোহের জাগরণ জোরে জোরে চেঁচাবার ফলে তার হলদেটে নাক খসে পড়ে গেল আর নাকি সুরে একই কথা বলতে লাগল রাত্রিভোজ শোনাচ্ছিল রাঁড়ের ভোজ আরেকজন কোতলকান্ত টাকমাথা চুটকিদাড়ি চেঁচিয়ে বলতে লাগল কোন শালা আমার চেয়ে বড়ো মোড়লচিফ হয়েছে আমি চমকচাঁদু রাজারাজড়া বাবাপুরুত আর গিল্লিটেঁটিয়াদের লাথিয়ে হাপিশ করেছিলুম বলেছিলুম আমায় একটা যুবক প্রজন্ম দাও আমি সারা পৃথিবী পালটে দেবো আমাকে একটা যুবক প্রজন্ম দাও আমি সারা পৃথিবী পালটে দেবো ইতিহাসের পোঁদে লাথি না মারলে এগোয় না ইতিহাসের পোঁদে লাথি না মারলে এগোয় না এতো জোরে চেঁচাচ্ছিল যে কেউই শুনতে পাচ্ছিল না তবু একজন টিঙটিঙে পচনবান্ধব মড়াকান্তি বলে উঠল তা পৃথিবীটা বদলে হলটাই বা কি সে তো পৌরাণিকাধুনিক যুগের কুকুরের ল্যাজ আবার যে কে সেই পাকিয়ে পাইকপাড়া মাঝখান থেকে মড়ার পর মড়া মড়ার পর মড়ার নথির লটবহর আরেকজন যার গা থেকে চামড়ার পোশাক খোলা হয়নি চেঁচাতে লাগল কৃতজ্ঞতা হলো এমন অসুখ যে রোগে কুকুরেরা ভোগে চেঁচাতে চেঁচাতে তার গোঁফ খসে পড়ে গেল বেঁটেখাটো হলদেটে আধবোজা-চোখ একজন ঘ্যানঘ্যানানির মতন করে বলতে লাগল দারিদ্র্যকে সমাজবাদ বলে না বড়োলোক হওয়াটা যশোদায়ক দারিদ্র্যকে সমাজবাদ বলে না বড়োলোক হওয়াটা যশোদায়ক বাঁশবনের ক্যাম্পাসে ঘাসে পড়ে থাকা করোটিগুলো চুলেলছোকরার পায়ের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল তোমার জ্ঞান তো দেখছি অঢেল এবার একটু ইল্লিতে গিল্লি নিয়ে বলো দিকিন মানে ওই আরকি দুজনে চাদরের তলায় ঘাসে তালপাতার চাটাইয়ে শুয়ে যা করে কিংবা তালগাছের গুঁড়িতে বেঁধে যা করে কিংবা চার হাতপা বেঁধে যা করে সামনে দিক থেকে পেছন দিক থেকে যা করে একটা করোটি বলল আমার এককালে ঢলঢলে বুদ্ধিদীপ্ত বুক ছিল চুলের রঙ আগুনের রঙে রাঙিয়ে রাখতুম কতো ছোকরা যুবক মদ্দামরদ আদ্দামড়ামরদ পাকতাড়ুয়ামরদ আমার সঙ্গে শুয়ে পুড়ে মরেছে কিন্তু তেমন রহস্য তৈরি করতে পারেনি তুমি একটু উপদেশ দাও তো তাহলে যারা বাঁশবনের মিউজিয়ামে আসে তাদের জ্ঞান দিতে পারবো চুলেলছোকরা বলল কাম-বাসনা-লালসাকে আবেগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না রতিকর্মকে আকাঙ্খার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না যৌনতাকে খামখেয়াল ব্যক্তিগত-বাঁধন গভীর সম্পর্কের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না যৌনতায় থাকা দরকার বিস্ময়ের বুনন ক্ষণে-ক্ষণে তনুকৃত আঙ্গিকের রূপান্তর যা কামোদ্দীপনার উপাদান যৌনক্ষমতার উৎস হল কৌতূহল একঘেয়েমি যৌনতাকে শেষ করে ফ্যালে তাই প্রেমিক-প্রেমিকাকে খুঁজে নিতে হবে আবিষ্কার করতে হবে মেজাজ যৌনতার সঙ্গে মেশাতে হবে অশ্রু খিলখিলে হাসি কাতুকুতুর দেদোল মানেহীন কথা ঈর্ষা ভয় গালগল্প কল্পনার উড়াল প্রতিশ্রুতি মাদক সঙ্গীত নাচ মদ ঘাম গন্ধ মন ভরে গেলে এঁটুলির মতন আঁকড়ে থাকার দরকার নেই হারেম পালটে ফেলতে হবে বিশেষ করে মেয়েরা যতো তাড়াতাড়ি পারবেন সাধুপুরুষ পালটে ফেলবেন লুচ্চাপুরুষ খুঁজবেন যাতে অবিরাম গন্ধের চুলের ত্বকের ঘামের পেশিশক্তির আলিঙ্গন-ক্ষমতার ঠোঁটের লালার দেহতাপের রদবদল হতে থাকে নয়তো নির্ণয় নিতে গিয়ে যৌবন ফুরিয়ে যেতে পারে মনে রাখতে হবে ইল্লিগিল্লি হলো স্বেচ্ছাচারিতার শিল্প প্রত্যেক প্রেমিক বা প্রেমিকা তার নিজস্ব যৌনমগজের প্রতিনিধি জীবন গুটিয়ে যায় আবার ফেঁপে ফুলে ওঠে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ইল্লিগিল্লি মরে যায় যৌনতা হবে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠাহীন আপনার শরীর নিয়ে নিরীক্ষা করার অধিকার আপনার আছে মনে রাখবেন যৌনকর্মীরা চিরকাল ভার্জিন হয় তাই আপনি বারবার বিস্ময়কে খুঁজতে যান আর বিস্ময় আপনার হাতছাড়া হয়ে যায় যৌনতায় রয়েছে অনন্ত পরিসর অনন্ত মর্মার্থ অনন্ত ঘাতমাত্রা আপনার মধ্যে তরল আগুনের প্রয়োজন যা দিয়ে আপনি আপনার ইল্লিউলি বা গিল্লিঅলাকে পুড়িয়ে মারতে পারবেন আপনাকে আপনার কল্পনা আর মগজের দানবদের দিয়ে চালিত হতে হবে ইল্লি ও গিল্লি হলো একটি সঙ্গীতযন্ত্র আপনি যদি তা বাজানো বন্ধ করেন তবে দুর্ভোগে ভোগেন তার কারণ দুটি বিপরীত সত্য এক জায়গায় এসে পরস্পরকে আঘাত করে একই সময়ে অনেকের সঙ্গে ইল্লিগিল্লি করে যেতে হবে তাহলেই আপনি আগুনটা জিইয়ে রাখতে পারবেন দেহে আছে অজস্র জায়গা যাকে জাগিয়ে তুলতে জানতে হবে তাহলেই তার তেষ্টা মিটবে দেহ কখনও বিশ্বস্ত হতে পারে না আপনি চাইলেও সে আপনার সঙ্গে ছলনা করতে থাকবে আপনি তাকে বাগে আনতে গিয়ে উন্মাদনায় আক্রান্ত হবেন আপনি নায়ক বা নায়িকার মতন ক্যাবলা-কেবলি হলে ইল্লিগিল্লিরস উবে যাবে কেননা ইল্লিগিল্লি-খেলা চায় খলনায়ক বা খলনায়িকা আত্মার আত্মীয় নয় নিখুঁত ইল্লিগিল্লি বা নিখুঁত ইল্লিউলি-গিল্লিঅলা বলে কিছু হয় না সুন্দর বা সুন্দরী হবার প্রয়োজন হয় না ইল্লিগিল্লি হলো অভিজ্ঞতা প্রতিবার নতুন অভিজ্ঞতা সবচেয়ে সভ্য আনন্দ হলো কুড়ি-পঁচিশজন যুবক-যুবতী মিলে পানোন্মত্ত অবস্হায় হইচই করতে করতে যাকে পাওয়া যায় তার সঙ্গে তক্ষুনি ইল্লিগিল্লি করা যৌনতাকে উৎসবের স্তরে নিয়ে যেতে হবে অমন করলে আপনার মধ্যেকার আদি সৃজনীশক্তিকে উচ্ছৃঙ্খল রূপ দিতে পারবেন মনে রাখবেন যে যা নিষিদ্ধ তা আপনাকে বন্ধন থেকে ছাড়া পাবার উৎসাহ যোগায় তাই কোনো নিষেধ শুনবেন না অবজ্ঞা করবেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবেন কেননা আপনি ইল্লি ও গিল্লিকে বানমাছের মতন দিব্যধাম করে তোলেন ব্যূহকে সৌষ্ঠবে অলঙ্কৃত করে তোলেন দুটো শরীর বিপথে যাচ্ছে যাক তাতে কার বাপের কি এসে যায় ধ্বংস তো হতেই হবে একদিন না একদিন তার আগে জীবনকে পুরোপুরি বেঁচে নিতে হবে চুলেলছোকরার কথা থামিয়ে একজন মড়াকান্তি মাংসঝরা হাড় বেরোনো ঝক্কিমন্ত বউ বলল আমরা চেষ্টা করেছিলুম ধরে আনা পুরুষের গিল্লির কাঠিকাবাব না বানিয়ে তাকে কেটে নিয়ে জীবন্ত করে রাখা যায় কিনা যাতে বড়ো মাপের পেলে তাকে জীবন্ত করে রেখে যার যখন প্রয়োজন ব্যবহার করতে পারে জিনিসটা নিজেই ভেতরে গিয়ে থিথিরিয়ে কাঁপবে আর টুনটুনিয়ে ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং আনন্দ দেবে কিন্তু আমাদের টেবিলঘরের জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পীরা প্রচুর পাদাপাদি করেও জিনিসটা জীবন্ত করে রাখার রসায়ন বা প্রক্রিয়া বের করতে পারলেন না যদি বের করতে পারতেন তাহলে ধরে আনা পুরুষের টাটকা মাংসও খাওয়া হতো আর সেই সঙ্গে তার গিল্লি যন্তরটাকেও অমরত্ব দেয়া যেতো শুনেছি পৌরাণিকাধুনিক যুগের ইল্লিউলিরা অমনভাবে গিল্লিযন্তর জিইয়ে রাখার জলপড়া-বাটিচালানো আবিষ্কার করেছিলেন ওনাদের গিল্লিঅলা মরে গেলে ওনারা কান্নাকাটি না করে জলপড়া দিয়ে গিল্লিযন্তরটা কেটে রেখে নিতেন সময় তো এমন ব্যাপার যে নিজেই গলে-গলে চুইয়ে পড়ে অমন একটা গিল্লিযন্তর হাতে থাকলে খোলাখুলি সৎ থাকতে পারবে মেয়েদের আর পুরুষদের জোচ্চুরি সামলাতে হবে না স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের পার্থক্য ঘুচে যাবে পাগলামির সঙ্গে মিশে যাবে পার্থিব একঘেয়েমি মেয়েরা নিজেদের শরীরকে পুরো স্বাধীনতা দিতে পারবে যে পুরুষরা পুরুষদের ভালোবাসে তাদেরও ওটা কাজে লাগতো তুমি জানো নাকি কোনো টোটকা চুলেলছোকরা বলল আজ্ঞে আমি তো সংস্কৃত বা আরবি বা ফারসি বা লাতিন কোনো ভাষারই জলপড়া-বাটিচালানো জানি না নয়তো আমার গিল্লি যখন কেটে নেয়া হবে তখন ওটাকে অন্তত অনন্তকাল জিইয়ে রাখতে পারতুম আমি না থাকলেও আমার শৌর্যবীর্য তো অমর হয়ে থাকতো তবে আমাদের দেশে ব্যাটারিচালিত ভাইব্রেটর পাওয়া যায় যা অনেকটা আপনার চাহিদার সঙ্গে মেলে আগে যদি জানতুম এখানে ভাইব্রেটরের ভালো বাজার আছে তাহলে সঙ্গে আনতুম তাতে আমার আদর্শপ্রচারে সুবিধা হতো আপনারা এক কাজ করতে পারেন এতো মানুষ ভাগাড়স্হ করছেন তাদের চামড়া থেকে ডিলডো বানিয়ে নিতে পারতেন পুরুষসঙ্গীর অভাবে দুপুরবেলায় বা রাতে শুতে যাবার আগে ডিলডো নিয়ে ইল্লিতে দিলে ভালো ঘুম হতো চুলেলছোকরার কথা বন্ধ হয়ে গেল ওই পারের একনায়ক মোড়লচিফের চিৎকার করে বলা কথায় মোড়লচিফ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো কোথ্থেকে ওরা একটা চুলেলছোকরাকে পাকড়াও করেছে সে ব্যাটা আমাদের পক্ষের নয় অথচ জ্ঞান দিয়ে চলেছে বাঁশবনের মড়া আর মড়ানিদের ব্যাটা জানেই না যে অমন একটা পোর্টেবল যন্তর থাকলে দুই পক্ষেরই কতো ক্ষতি হতো মানুষ ধরার জন্যে যে অস্ত্র আমার পক্ষের মেয়েরা আর সমকামী ছেলেরা প্রয়োগ করে তার নাম প্রলুব্ধ করা মোহিনীশক্তির জাল বিছিয়ে মানুষ-মানুষী ধরা সন্মোহনের ডাক দিয়ে ফাঁদে ফেলে ধরে আনা এখনও তোদের পক্ষের গোটা পঁচিশেক যুবক-যুবতী ধরা আছে আমাদের পিঁজরেপোলের স্টকে কালকেই একটাকে খাওয়া হবে মেয়ে ফাঁসাবার ধান্দায় নিজেই ফেঁসে গেছে নব্বুই কিলোর মালটা মানুষ চরিত্র নিয়ে জন্মায় ভ্রষ্ট হবার জন্য বিপথে যাবার জন্যে মোহিনীশক্তি হলো পৃথিবীর আসল শিল্পকৌশল তা আকাঙ্খাকে মুক্তির এলাকায় নিয়ে গিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে দেয় প্রলুব্ধ করার মোহিনীশক্তি প্রকৃতির ব্যাপার নয় তা শিল্পকৌশলের ব্যাপার যা দিয়ে যাবতীয় শুভশৃঙ্খলাকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু মোহিনীশক্তির প্রলুব্ধ করার ক্ষমতার সঙ্গে নারীত্বকে বা সমকামীর পেলবত্বকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না প্রলুব্ধ করায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল বহিরঙ্গের স্পষ্ট প্রতীয়মানতা তা নারীর খাঁজভাঁজে সমকামীর পাছার চালে সীমাবদ্ধ নয় তাকে নান্দনিক ঘটনা মনে করা ভুল কেননা প্রলুব্ধ করার প্রক্রিয়ার উৎস হলো বাস্তবের বিনাশ যে ফাঁদে পড়ছে সে কি আর জানে না যে একটা খেলার হাতছানির পেছনে দৌড়োচ্ছে কোনো কিছুই তো লুকিয়ে করা হচ্ছে না সে যা দেখছে তা তো বাস্তব তা সত্ত্বেও সেই বাস্তবের বিনাশ ঘটিয়ে সে ফাঁদে পা দিচ্ছে তার আকাঙ্খার প্রেতাত্মা তাকে নিশি ডেকে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে তা যৌনতা নয় কেননা উত্তরঐতিহাসিক যুগে যৌনতা সব জায়গায় দেখতে পাওয়া যাবে যৌনতার ইল্লিগিল্লি ছাড়া বুঝতে হবে যে প্রলুব্ধ করায় রয়েছে প্রলুব্ধকারী বা প্রলুব্ধকারিনীর ক্ষমতার চাল যা একলপ্তে বাজিমাৎ করে দিতে পারে তা পুরো দেহের কিন্তু দেহব্যবচ্ছেদের নয় দেহকে অঙ্গে-অঙ্গে ভেঙে ভেঙে নয় যৌনবিপ্লব হল সমগ্র দেহের বিপ্লব ইল্লিগিল্লির কাল্পনিক ভাবনার বিপ্লব নয় আমরা দুই পক্ষেই চামড়া ছাড়িয়ে মেরে ফেলার আগে অবশ্যই ইল্লিগিল্লি করি বারবার ইল্লিগিল্লি করি মরার আগে যে প্রলুব্ধ হয় সেও ইল্লিগিল্লির সুযোগ পায় পুরুষ পুরুষের সঙ্গে ইল্লিগিল্লির সুযোগ পায় মেয়েরা মেয়েদের সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লি করার সুযোগ পায় কারোর ক্ষেত্রে কোনো বাধানিষেধ নেই উত্তরঐতিহাসিক যুগে যে পুরুষ কোনো নারীকে প্রলুব্ধ করতে চাইছে তাকে ধরে এনে ইল্লিগিল্লি করবে আর খাবে বলে সে নিজের আসল চেহারার বদলে নকল চেহারা দেখিয়ে বিভ্রম গড়ে তুলছে আর শেষে ফেঁসে যাচ্ছে আবেগের গোলকধাঁধায় অথচ লোকটা নিজেকে ভেবে নিয়েছিল এই খেলার ওস্তাদ আর শেষ পর্যন্ত শিকার হল সে নিজে আমরা দুই পক্ষের সবাই এগুলো জানি তবুও প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করি প্রলুব্ধ না হবার চেষ্টা করি আবার প্রলুব্ধ হয়ে অন্য পক্ষের ইল্লিগিল্লিসঙ্গী হয়ে সময় এলে ইল্লিগিল্লিসঙ্গী আর তার ভাই-বেরাদরের পেটে চলে যাই কিংবা তারা আমাদের পেটে চলে যায় সকালে তোদের পক্ষের ওই তালগাছটাকে দেখেছিলুম শুকনো নদীর পাড়ে সোজা দাঁড়িয়ে তারপর একটু-একটু করে হেলে পড়ল আমি কি জানি না নাকি তালগাছটার ওপর কেমনধারা অত্যাচার করা হয়েছে বিকেলে দেখলুম সেখান থেকে উপড়ে বাঁশবনে ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়ে পুঁতে আবার সোজা করে দেয়া হয়েছে ওই পারের একনায়ক মোড়লচিফের কথা আধঘুমে শুনতে পেয়ে সোনালিচুল ডবকাছুকরির হুঁশ হলো যে তালগাছে চুলেলছোকরাকে বেঁধে রেখে এসেছিল তাকে ওই পক্ষের লোকেরা ফাঁদ পেতে নিয়ে পালালো নাকি অমন পেশিচমকানো চুলেলছোকরা তো লাখে একজন পাওয়া যায় ডবকাছুকরি সোনালিচুল উড়িয়ে দৌড়োলো দেখতে যে সব ঠিকঠাক আছে কিনা যে জায়গায় তালগাছটা ছিল সেখানে দেখতে না পেয়ে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে গিয়ে চুলেলছোকরাকে দেখতে পেয়ে আশ্বস্ত হলো ততোক্ষণে কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশবিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরিও পৌঁছে গেছে ওই পক্ষের একনায়ক মোড়লচিফের উদ্দেশে ডবকাছুকরি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল মেয়েরা সাজগোজ করে বেশ করে সেটা তাদের অধিকার আর দায়িত্ব প্রলুব্ধ করার জন্য তাদের ঐন্দ্রজালিক আর অলৌকিক হতেই হবে তাদের কাজই নিজেকে মুছে ফেলে অন্য একজনকে সৃষ্টি করা যাতে তারা টার্গেটপুরুষ বা পুরুষদের তাক লাগিয়ে দিতে পারে বিস্ময়বিহ্বল করে দিতে পারে এমনকি ভয়বিহ্বল করতে পারে মুগ্ধ করতে পারে জাদুবশ করতে পারে কারোরই বা কোনোকিছুরই অস্তিত্ব স্বাভাবিক নয় তাদের চ্যালেঞ্জ করা হয় বলে তাদের তলব করা হয় বলে তারা তাতে সাড়া দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে পুরুষরা স্বাভাবিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয় না তাদের চাই কৃত্রিম আনুষ্ঠানিক সৌন্দর্য কেননা তা গূঢ় রহস্যমূলক আভ্যান্তরীন যে পুরুষকে প্রলুব্ধ করি সে পৌরাণিকাধুনিক যুগের জানোয়ার হয়ে যায় যেমন এই চুলেলছোকরা একে তো মাই দেখাইনি চামড়ার স্কার্ট তুলে ইল্লির ফাঁকফোকর দেখাই নি আমরা সবাই মিলে চুলে রঙ করিয়ে জানোয়ারের মুখোশ পরে একে ফাঁদে ফেলেছি আর ধরেছি যখন কিনা চুলেলছোকরা দুই পক্ষের কোনো পক্ষেরই নয় নারীর প্রলুব্ধ করার ক্ষমতা নান্দনিকভাবে উন্নত তা হলো সূক্ষ্ শিল্পকৌশল প্রলুব্ধ করার অর্থ হলো নারী আর পুরুষের বা সমকামী হলে পরস্পরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অপ্রতিরোধ্য ইশারা যার মাধ্যমে চুম্বকত্ব গড়ে ওঠে শিকারের মাথা ঝিমঝিম করে কি করছে না করছে ঠাহর করতে পারে না আর অংশগ্রহণকারীদের মাঝে অদৃশ্য চুক্তি লেখা হয়ে যায় আপনি বেশি ফ্যাচফ্যাচ করবেন না আপনাদের পক্ষের দশজনের বেশি ভারিভরকম নারীপুরুষ ধরা আছে আমাদের পিঁজরাপোলে যারা আমাদের সবরকমের চাহিদা মেটাবে বুঝতেই পারছেন উত্তরঐতিহাসিক যুগে পৌরাণিকাধুনিক যুগের শিল্প আর নেই কেউ আর কবিতা লেখার দরকার মনে করে না ছবি আঁকার দরকার মনে করে না মূর্তি গড়ার দরকার মনে করে না গানের নতুন সুর বাঁধার দরকার মনে করে না হ্যাঁ কম বয়সে ছেলেপুলেরা হাড়আঁটির ভেঁপু বাজায় হাড়ের বাঁশি বাজায় পোঁদের চামড়ায় তৈরি ঢাকে হাড়ের কাঠি ঠোকে সেগুলো শিল্প নয় নঙ্কুখোকাদের খেলা এখন মানুষের মাংস খাওয়াই সর্বোচ্চ শিল্প কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশবিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি বলল ঠিক তাই ঠিক তাই ঠিক তাই ঠিক তাই ঠিক তাই সোনালিচুল ডবকাছুকরি দৌড়ে গিয়ে চুলেলছোকরার চুলের মুঠি ধরে মুখ উঁচু করে মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল আমাদের এখানে বেশ্যাবৃত্তি বলে কোনো ব্যাপার নেই ইল্লিগিল্লি বেচাকেনা হয় না আমরা সমস্তবাদকে নস্যাৎ করে টাকাপয়সা দিয়ে লেনদেনের ব্যবস্হাও নিকেশ করেছি আমরা কোনোরকম যন্ত্রের দাসত্ব করি না তাই আমাদের ডিলডো বা ভাইব্রেটরের প্রয়োজন নেই কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশবিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি বলল ঠিক তাই ঠিক তাই ঠিক তাই ঠিক তাই ওই পক্ষের একনায়ক মোড়লচিফ চেঁচিয়ে উত্তর দিলো ওরে সোনালিচুল ডবকাছুকরি আর তোর স্যাঙাতিনি দশবিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি তোদের ধরার ফাঁদ পাতা হয়ে গেছে তখন টেরটি পাবি মজা চুল রঙ করে চুলেলছোকরার সঙ্গে যেভাবে তোরা জোর করে ইল্লিতে গিল্লি করলি তা আমার জানতে বাকি নেই চুলেলছোকরা যে তালগাছে বাঁধা সেই তালগাছ থেকে কোমরে চামড়া-তাড়ির হাঁড়ি নিয়ে সড়সড়িয়ে নেমে এলো একজন আর বলল তোমাদের জ্বালায় ঠিক মতো তাড়িও বের করতে পারি না গাছ চাঁছতে পারিনা তাল পেকে গেলে নামাতে পারি না যে বাচ্চারা হিসির বদলে তালশাঁসের রস খেতে চায় তাদের জন্য তালশাঁষও নামাতে পারি না কতো গাছ যে তোমরা হেলিয়ে দিয়েছ ভেবে দেখেছো কখনও আমার কতো অসুবিধা হয় ভাগ্যিস বাঁশবনের ক্যাম্পাসে এনে গাছটাকে সোজা করে পুঁতলেন আমার পিসেমশায়রা আর মেসোমশায়রা তাই নামতে সুবিধা হল তাও তো কতো তাড়ি চলকে নষ্ট হয়ে গেল তাড়ি ফুরিয়ে গেলে গরমে যখন তেষ্টায় মরবে তখন আমাকেই সবাই মিলে দুষবে যারা যৌবনের দোষে গাছ হেলিয়ে দিচ্ছে তাদের কেউ মুখ ফুটে কিছু বলবে না আমি কিন্তু ছাড়ার পাত্র নই এই সোনালিচুল ডবকাছুকরি আর কমলা লাল নীল বাদামি দশবিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি মিলে এই চুলেলছোকরাকে গাছে বেঁধে কি কাণ্ডটাই না ঘটালে ওপর থেকে দেখতে দেখতে উত্তেজনায় আমি তো হাড়ের ছুরি দিয়ে গাছ চাঁছার বদলে আমার নব্বুই ডিগ্রি গিল্লি দিয়েই চাঁছতে শুরু করেছিলুম তাড়ির সঙ্গে আমার ধাতুরসও ঝরে পড়ল দেখতে পেলুম যে চুলেলছোকরা আর সোনালিচুল ডবকাছুকরি তাতে নতুন স্বাদ পেয়ে পরমানন্দে চাটছে তবে তালগাছগুলো যখন হেলে পড়তে থাকে টঙে পাতা আঁকড়ে আমি বুঝে ফেলেছি যে একজন মানুষ বা মানুষী সবচেয়ে ঐকান্তিক ইল্লিগিল্লি করে যদি তাদের সম্পর্কটা আকস্মিক হয় আর কাজ সেরে তারা যে যার পথে চলে যায় যুবতীদের বেশিরভাগকেই দেখেছি তারা কোনো সঙ্গীর সঙ্গে আবেগে জড়িয়ে পড়তে চায় না কেননা তারা ভাবে যে অমন জড়িয়ে পড়লে তার সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে আর মজা নেয়া থেকে মন অন্য দিকে চলে যাবে ভবিষ্যত ব্যাপারটার তো কোনো দিক হয় না অনুভূতিকে এড়িয়ে যাবার জন্যে বেশিরভাগ যুবতীই পুরুষকে কেবল আনন্দ পাবার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় এই যেমন তালগাছের রস কতো আদরযত্ন করে তাদের তাড়িতে পরিণত করি তেমনিই সত্যিকারের অরগ্যাজম কেবল ইল্লিগিল্লির রসমুক্তি নয় তা সঙ্গীদের পরস্পরের বিশ্বাসের মাত্রার ওপরও নির্ভর করে তারা নিজেদের কতোটা খোলাখুলি মেলে ধরছে একজন আরেকজনের কাছে তালগাছের আবেগ থেকে যেমন তাড়ি তেমনই কোমরের আবেগ থেকে রসবদল ভেবো না যে আমি তাড়ি নামাই বলে মুকখু আমি যবে থেকে তালগাছে ওঠা শিখেছি তবে থেকে অনুমিত-বাবা আমায় শিখিয়ে দিয়েছেন তালগাছ হেলে যাচ্ছে কি না সেদিকে নজর রাখতে আর যদি হেলে যেতে থাকে তাহলে কারা সেই হেলানোর কাজে যুক্ত পৌরাণিকাধুনিক যুগে ঈশ্বর তালগাছে থাকতো ঈশ্বরের কথা বলতে হলেই লোকে ওপরে আঙুল দিয়ে দেখাতো এখন আমি ঈশ্বরের জায়গাটা নিয়েছি ওপর থেকে সকলের কাজকম্মো দেখতে পাই তোমরা আমাকে উত্তরঐতিহাসিক যুগের ঈশ্বর বলে মানতে না চাও সেটা তোমাদের মর্জি তবে মনে করিয়ে দিই ঈশ্বরের মতন আমিও বিশ্বাসঘাতক আমি প্রত্যেকের জিভ বিশ্বাসঘাতকতার তাড়ি দিয়ে ভিজিয়ে দিই জানি আমাকে তোমরা তাড়িখোর পাগল ভাবো কিন্তু যে-প্রশ্নগুলো আমি তোমাদের প্রায়ই করি ওই পক্ষের তাড়িখোরও ওই পক্ষের লোকেদের করে তা হল জীবনের অর্থ কি আমরা কে আমরা এখানে কি জন্যে জীবনের শুরু কেমন করে জীবনের প্রকৃতি কি বাস্তবতার প্রকৃতি কি জীবনের উদ্দেশ্য কি একজন মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কি জীবনের গুরুত্ব কি জীবনে কাকে বলব অর্থপূর্ণ আর মূল্যবান জীবনের দাম কি মানুষের বেঁচে থাকার কারণ কি আমরা সবাই কি জন্যেই বা বেঁচে আছি তাড়িঅলার কথার জবাবে সোনালিচুল ডবকাছুকরি বলল আবার তোমার আরম্ভ হয়ে গেল ভ্যাজর ভ্যাজর আমরা এখানে আছি এসেছি থাকি মানুষ ধরে তাদের মাংস খাবার জন্য আর খাবার আগে তাদের সঙ্গে মন ভরে ইল্লিগিল্লি খেলার জন্য যাকে আমরা বলি অহম ব্রহ্মাস্মি বা তৎ ত্বম অসি তুমি তো নেশায় বুঁদ থাকো এসব কথা বুঝবে না তোমার সবক’টা প্রশ্নের একটাই উত্তর হয় আগেই বলেছি তোমাকে উত্তরটা হল যে ব্যথায় আনন্দ আছে এখন এটা বোঝাবার জন্যে তো একটামাত্র শব্দ নেই তাই তুমি বুঝতে পারো না তুমি ব্যথা আর আনন্দকে আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করো চুলেলছোকরা সোনালিচুল ডবকাছুকরিকে থামিয়ে বলে উঠল আপনি ঠিকই বলেছেন যে ব্যথায় আনন্দ আছে আমার তো ব্যথা থামবার নাম নেই আপনি আর আপনার সখিরা মিলে এমন যাচ্ছেতাই করলেন আমার গিল্লির সঙ্গে অথচ কী যে আনন্দ পেয়েছি বুঝিয়ে বলতে পারবো না কবে আবার অমন ব্যথা দেবেন দিদিমনি যদি আজ রাতেই দেন আমার কোনো আপত্তি নেই সব ব্যথা সহ্য করে নেব আপনারা আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন তাহলে আমি রোজই অনেককে ব্যথার আনন্দ দিতে পারবো সোনালিচুল ডবকাছুকরি বকুনি দিয়ে বলল চুপ চুপ একেবারে চুপ আমরা গভীর অনুভূতি আলোচনা করছি যে অনুভূতি ব্যথার তোমার আমার ইল্লিগিল্লির কারবারের নয় চুলেলছোকরাকে বকুনি দিয়ে তাড়িঅলার দিকে তাকিয়ে গোল হয়ে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ঘাঘরা তুলে ঘুরে-ঘুরে নাচতে নাচতে সোনালিচুল ডবকাছুকরি বলল জীবন হল ব্যথার উৎস মানুষ এই বাস্তবতাকে ভয় পায় নিজেকে ভয় পায় অথচ এই বাস্তবতা তার নিজের প্রেম-অপ্রেম সব ফালতু কথা আসলে মানুষ নিজের অনুভূতিকে ভয় পায় অনুভূতি তাকে বিপর্যস্ত করে তাদের ছোটোবেলা থেকে শেখানো হয় যে ব্যথা জিনিসটা খারাপ আর বিপজ্জনক কেমন বোকার মতন কথা যদি তুমি আনন্দ সামলাতে পারো তাহলে তোমায় তো ব্যথা সামলাতেই হবে দুটোকে আলাদা করা যায় না লোকে ব্যথাকে ভয় পায় কেন বুঝতে পারি না ব্যথাকে তারা লুকিয়ে রাখে যখন কিনা ব্যথা তোমায় জাগিয়ে তোলে ব্যথাকে জরুরি মাংসের মতন শরীরে বয়ে বেড়াতে হয় তোমার জীবনীশক্তি রয়েছে ব্যথাকে অনুভব করার মধ্যে তুমি ব্যথা বইতে সক্ষম কিনা সেটাই দেখার অনুভব করার ক্ষমতা তোমার নিজের তা তোমার নিজস্ব বাস্তব যদি তুমি তাতে লজ্জা পাও আর সবায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখো তাহলে তুমি তোমার বাস্তবতাকে ছারখার করার জন্য সমাজকে সুযোগ করে দিচ্ছ তোমাকে বুক চিতিয়ে বলতে হবে যে ব্যথা ভোগ করার অধিকার আমার আছে সোনালিচুল ডবকাছুকরির দেখাদেখি কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশবিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুরিরাও গোল হয়ে ঘুরে-ঘুরে হাড়ুহাজ-করা ঘাঘরা তুলে নাচতে লাগল চুলেলছোকরা আবার চেঁচিয়ে উঠল আমি তো কখন থেকে বুক চিতিয়েই আছি আসুন না আরেকবার ব্যথার সঙ্গে আনন্দ দিয়ে যান আমার জীবনীশক্তিকে যাচাই করে দেখুন আমি কতো ব্যথা সইতে পারি আমি এসে পর্যন্ত না খেয়ে আছি মনে রাখবেন আপনারা তো কাল বা পরশু আমাকে খেয়েই ফেলবেন তার আগে কি আমার শেষ ইচ্ছা পুরো করা হবে না আসুন না আরেকবার হয়ে যাক আপনি না হলেও কমলাচুল লালচুল নীলচুল বাদামিচুল যে-কেউ হলেই চলবে কোমরের তলায় বড়ো ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে সোনালিচুল ডবকাছুকরি বলল এই চুপ তখন থেকে বলছি মুখ বন্ধ রাখতে চুপ করে থাক নয়তো এক্ষুনি কাঠিকাবাব বানিয়ে তোকেই খাওয়ানো হয়ে তুই বানচোদ এক বাস্তব জগতে অবাস্তব বহিরাগত চুলেলছোকরা বলল হ্যাঁ জানি সব বহিরাগতকেই অবাস্তবতার খেতাবে চোবানো হয় তারপর সে যখন বাস্তবের দখল নিয়ে নেয় তখন বাস্তব জগতের গাঁড়হাভাতে মানুষগুলো ঠ্যাং রাখার জায়গা পায় না আমার এইটুকু অনুরোধ রাখতে পারছেন না ডবকাছুকরি একজন ফিট্টমফিট পাহারাদারের পকেট থেকে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা বড়ো ছুরি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে চুলেলছোকরার নব্বুই ডিগ্রি শিশ্নকে ক্যাচাৎ কেটে চুলেলছোকরার মুখে পুরে দিয়ে বলল এবার এইটা খেয়ে পেট ভরা আর মুখ বন্ধ কর ব্যথা ভোগ কর একজন ফিট্টমফিট পাহারাদার দৌড়ে চুলেলছোকরার কাছে গিয়ে পড়তে থাকা রক্ত একটা চামড়ার পাত্রে জমা করা আরম্ভ করল ভরে গেলে সোনালিচুল ডবকাছুকরিকে পাত্রটা দিতে ও চোঁকচঁকিয়ে খেয়ে ফেলল কমলাচুল এগিয়ে গিয়ে চুলেলছোকরার কাটা জায়গাটা জিভ দিয়ে চেটে রক্ত খেতে খেতে বলল ওফ কখন থেকে তেষ্টা পেয়েছে চেটে খাই মজা পাই চেটে খাই মজা পাই চেটে খাই মজা পাই তারপর লালচুল নিলচুল বাদামিচুল চেটে চুলেলছোকরার রক্ত থামালো ততক্ষণে চুলেলছোকরা কাটা-শিশ্ন গিলে ফেলে জ্ঞান হারিয়েছে সোনালিচুল ডবকাছুকরি কাটা জায়গাটা দেখিয়ে তাড়িঅলাকে বলল এই যে এখানকার ব্যথা সেটাতে আনন্দ নেই সুতরাং এই আনন্দহীন ব্যথা তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর নয় তোমাকে বুঝতে হবে যে ব্রহ্মাণ্ডে ব্যথাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এমনকি বেঁচে থাকার চেয়ে ইল্লিগিল্লির ঘাম-হাঁপানো-বদগন্ধের সৌন্দর্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেননা ব্যথা বাদ দিয়ে আনন্দ সম্ভব নয় দুঃখ ছাড়া আনন্দ সম্ভব নয় দুর্দশা ছাড়া সৌন্দর্য সম্ভব নয় আর এই সমস্তকিছু বাদ দিলে জীবন হয়ে যাবে জোলো পানসে আশাহীন সর্বনাশ জঘন্য ব্যথার সুগন্ধ গাঁড়হাভাতে মানুষের ঘামের সঙ্গে তুলনীয় হলেও তা অনেকবেশি সব মানুষই ব্যথা সহ্য করতে পারে যদি তার সঙ্গে আনন্দ থাকে ব্যথা হল আনন্দের খোচর ওই চুলেলছোকরাকে দ্যাখো ওর ব্যথা থেকে আনন্দকে কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি এখন ও আর ব্যথাকে বৈভব ভাবতে পারবে না এদিকে পালোয়ান-যুবক ছুটতে-ছুটতে ফিরে দেখলো যে কোঁকড়াচুল-যুবতী পালায়নি চামড়ায় হাড়ের সলমা-সিতারা লাগানো চাদর চাপা দিয়ে পাশ ফিরে কুঁকড়ে ঘুমোচ্ছে পালোয়ান যুবক চাদরের তলায় ঢুকে কোঁকড়াচুল যুবতীর পেছনে পৌরাণিকাধুনিক যুগের চামচের মতন খাপে-খাপে শুয়ে পড়ল কোমরে হাত রেখে পালোয়ান যুবকের ছোঁয়ায় কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল আপনি ভাবছিলেন আমি পালিয়েছি ছুটতে-ছুটতে এসেছেন মনে হচ্ছে ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে বলে নিজের বাঁ পা ওপরে তুলে ধরতে পালোয়ান যুবক ইশারা বুঝতে পেরে বাঁপায়ের সঙ্গে আরো সেঁটে গেল আর পালোয়ান যুবক ইল্লিতে গিল্লি করার আগেই কোঁকড়াচুল-যুবতী পালোয়ান যুবকের পাছায় ডান হাতের চাপ দিয়ে নিজেই ইল্লিতে গিল্লি করে নিয়ে বলল আপনি দৌড়োতে-দৌড়োতে এসেছেন তাই জানি ক্লান্ত হয়ে গেছেন এখন ঘুমিয়ে পড়ুন পালাবার রাস্তাটা রাতের বেলায় দেখিয়ে দেবেন কিন্তু আমি ওই পক্ষে যাবো না আমি দুটো পক্ষকেই ছেড়ে চলে যেতে চাই নয়তো আপনার শাবককে বাঁচাতে পারবো না জানেন তো সত্যের মুখ কেবল একটাই আর তা হল হিংস্র পরস্পরবিরোধিতা আমার মনে বিদ্রোহের চেয়ে জরুরি আর প্রবল অন্য কিছু নেই ইল্লিগিল্লি যতো বেশি নোংরা ততো তার টান যুবক বলল সেটাই ভালো আমি তোমার চামড়া ছাড়াতে পারব না অন্য কেউ ছাড়াতে এগোলে তার সঙ্গে আমার খুনোখুনি হয়ে যাবে জানো পৌরাণিকাধুনিক যুগে এই দুই পক্ষের মাঝে একটা নদী ছিল যাতে জোয়ার-ভাটা নামে একটা খেলা খেলতো নদী নিজের জল নিয়ে মাটির তলায় কতো জল ছিল এখন বাঁশগাছ নিজের বাঁশত্ব প্রমাণ করে বেঁচে আছে আর তালগাছ তো বাঁশের প্রপিতামহ কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল আমরা চিরকাল দ্বিখণ্ডিত থাকবো নিজেদের মধ্যে প্রত্যেকের শরীরের মধ্যে আমাদের সংস্কৃতি হল হাড়ের চামড়ার রক্তের পেচ্ছাপের বাঁশের তাড়ির আর মৃত্যুর আমার কোনো প্রত্যাশা নেই এই দুই পক্ষের কাছে যা মন্দ তাকেই ভালো বলে চালানো হয়ে এসেছে গাঁড়হাভাতে সাধারণদেরই রমরমা অসাধারণদের আর দেখা পাওয়া যায় না মানুষ তার ভূমি আর উদ্দেশ্য দিয়ে বিভাজিত নতুন জগত কেবল নতুনদের দিয়েই গড়ে উঠতে পারে নতুন উদ্যম নতুন মূল্যবোধ উত্তরঐতিহাসিক যুগে আমরা নিজের চোখে দেখছি যে প্রতিটি একনায়ক মোড়লচিফই জোচ্চোর হাস্যকর তারা মানুষের কোনো কাজে লাগেনি তাই মানুষের মাংস খাবার প্রথা চালিয়ে যাচ্ছে একনায়ক মোড়লচিফরা সকলেই অসৎ তারা ভাবছে যে মানুষের নিকৃষ্ট ব্যাধি পঙ্কিলতা কলঙ্ক কদর্যতার মাধ্যমে তারা উন্নত পৃথিবীর দিকে আমাদের সবাইকে নিয়ে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করলে কোনো রদবদল হবে না সংস্কৃতি পুরো ধ্বংস হয়ে যাবে হয়তো আমরা পারস্পরের মাংস না খেয়ে বেশিদিন বাঁচবো না কিন্তু যে কয়জন বাঁচবে তারাই নতুন করে সবকিছু গড়ে তুলতে পারবে আমি আপনাকে এই জন্যেই ক্ষমা করে দিতে পেরেছি যে আপনি আমার গর্ভে নতুন প্রজন্ম আনতে সাহায্য করলেন দুজনে চামচের পাশে রাখা চামচের মতন ঘুমিয়ে পড়ল মাঝরাতে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-যুবতীকে জাগিয়ে বলল যে চলো তোমাকে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে বাঁধা চুলেলছোকরার কাছে নিয়ে যাই সে সেইপার ওইপার কোনো পারের নয় সে বাইরে থেকে এসেছে তুমি তার সঙ্গে বাইরে পালিয়ে যেতে পারবে কোঁকড়াচুল-যুবতী জেগেই ছিল বলল আমাকে একদুটো ধারালো ছোরা বা ছুরি দিয়ে দাও পালাবার সময়ে ধরা পড়লে হাতাহাতি লাথালাথি করতে পারবো পালোয়ান-যুবক দেয়ালে টাঙানো দুটো হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ছোরা দিয়ে বলল এগুলো দিয়েই আমি মাংস ছাড়াবার প্রতিদ্বন্দীতা করি এছাড়াও হাড়ের পেরেক বসানো বাঁশের এই গদাটা রেখে নাও এটা দিয়ে ওই পক্ষের অনেক মানুষকে ধরা হয়েছে মাথায় একটা বাড়ি মারলেই শিকার অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাবে কোঁকড়াচুল-যুবতী চামড়ার ঘাঘরা পরে বুকবাঁধুনি বেঁধে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ছোরাদুটো কোমরে গুঁজে নিলো আর গদাটা এক হাতে নিয়ে পালোয়ান-যুবকের পেছন পেছন পা টিপে টিপে এগোলো চারিদিকে অন্ধকার সকলেই ঘুমে লেদিয়ে স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত পালোয়ান-যুবকের সঙ্গে বাঁশবনের ক্যাম্পসে গিয়ে পোঁছে ওরা দেখলো চুলেলছোকরা তালগাছে বাঁধা যন্ত্রণায় অন্ধকারকে আরও কালো করে তুলেছে পালোয়ান-যুবক দূর থেকে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুলেলছোকরাকে ইশারা করল যাতে কথা না বলে তারপর তার বাঁধন খুলে দিয়ে নিজের কোমর থেকে চামড়ার লুঙ্গি খুলে চুলেলছোকরাকে পরিয়ে দিয়ে বলল তুমি এই কোঁকড়াচুল-যুবতীকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও এর পেটে আমার শাবক আছে সাবধানে এখান থেকে পালাও যে রাস্তা দিয়ে যেখান থেকে এসেছিলে সেখানেই পালাও যন্ত্রণায় অন্ধকারের চেয়েও অন্ধকার মুখে চুলেলছোকরা বলল আচ্ছা ওরা দুজনে দেখল পালোয়ান-যুবক হাত নেড়ে ওদের বিদায় জানাচ্ছে পালোয়ান-যুবক দূরের অন্ধকারে মিশে গেলে কোঁকড়াচুল-যুবতী বাঁশের গদাটা চুলেলছোকরাকে দিয়ে বলল এটা আত্মরক্ষার জন্যে রেখে নাও পথে কখন কী হয় তার ঠিক নেই চুলেলছোকরা বলল যাবার আগে আমার একটা কাজ আছে তাতে তুমি সাহায্য করবে তুমি তো তিনমাস রয়েছো এদের এলাকায় সেই সোনালিচুল ডবকাছুকরির বাসা নিশ্চয়ই জানো সেখানে নিয়ে চলো নিস্তব্ধে কোনো শব্দ কোরো না ওরা দুজনে পা টিপে টিপে এগোয় সোনালিচুল ডবকাছুকরির বাসার দিকে অন্ধকার ঘরে সোনালিচুল দেখেই বুঝে যায় কোথায় শুয়ে আছে ডবকাছুকরি ফিসফিসিয়ে চুলেলছোকরা কোঁকড়াচুল যুবতীকে বলল আমি গদা দিয়ে ওর মাথায় মারতেই ওর মুখ শ্বাস নেবার জন্য হাঁ করবে তখন তুমি হাড়ের ছোরাটা ওর মুখে ঢুকিয়ে দিও তারপর দুজনে মিলে ওকে থেঁতো করে কেটে পড়ব এখান থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী দুজনেই পিটিয়ে মেরে ফেললো সোনালীচুল ডবকাছুকরিকে মরতে মরতে সোনালিচুল ডবকাছুকরির ইল্লি থেকে শয়েশয়ে ধাতুকীট বেরিয়ে ঘর আলোয় আলো করে তুলল পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল তোমাকে তো দেশে গিয়ে লিঙ্গ বদলে নতুন একটা ফিট করে নিতে হবে এরকম কাটা শিশ্ন নিয়ে তো বাঁচতে পারবে না এসো আমার সঙ্গে একটা লিঙ্গ এখান থেকে জোগাড় করে নিয়ে যাই কোঁকড়াচুলের পেছন পেছন চুলেলছোকরা নিঃশব্দে গিয়ে ঢুকলো পালোয়ান-যুবকের ঘরে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার চাদর চাপা দিয়ে ঘুমোচ্ছিল পালোয়ান যুবক তার মাথায় সজোরে বাঁশের গদা দিয়ে মারতেই মাথা ফেটে ঘিলু ছিৎরে গেল মরতে-মরতেও মানবিক অভ্যাসবশত তা চেটে নিল পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল যুবতী সাবধানে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ধারালো ছোরা দিয়ে পালোয়ান যুবকের লিঙ্গ গোড়া থেকে কাটতে-কাটতে বলল বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে আমি এর ইল্লিতে গিল্লি করার প্রতিদান দিচ্ছি তারপর যোগ করল এবার আমরা এদের ক্ষমা করে দিতে পারি চুলেলছোকরা বলল হ্যাঁ প্রতিশোধের মতন এতো উচ্চমানের শিল্প আর নেই প্রতিশোধ হল অধিকার সমুচিত-শাস্তি আর দায়িত্বের যোগফল ক্রোধ বাদ দিয়ে সৃষ্টি সম্ভব নয় আমাদের স্মৃতিতে জিইয়ে রাখার জন্য এই অভিজ্ঞতা মানব সম্প্রদায়ের সম্পদ

  • মলয় রায়চৌধুরী | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:১১734843
  • জাঁ জেনের কবিতা : মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদি

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী


     

    কবিতাটি সম্পর্কে জাঁ জেনের বক্তব্য : “আমি এই কবিতাটি আমার বন্ধু মরিস পিলোর্গেকে উৎসর্গ করেছি, যার উজ্বল মুখ আর দেহ আমার ঘুমহীন রাতগুলোয় ঘাপটি মেরে ঢোকে। আত্মার আত্মীয় হিসাবে তার জীবনের শেষ চল্লিশ দিন তার সঙ্গেই আমি বেঁচেছি। সে ছিল পায়ে চেন বাঁধা অবস্হায় এবং অনেকসময়ে দুই হাতেও, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অন্ধকার কুঠুরিতে, সাঁ-ব্রিয়েক কারাগারে। সংবাদপত্রগুলো আসল ব্যাপারটাই ধরতে পারেনি। তারা নির্বোধ প্রবন্ধগুলোর সঙ্গে সায় দিয়েছে যেগুলো পিলোর্গের মৃত্যু নিয়ে আহ্লাদ করেছিল। ইউভ্রে সংবাদপত্র লিখেছিল, ‘এই বালক ছিল আরেক নিয়তির উপযুক্ত’। সংক্ষেপে, তারা পিলোর্গেকে হেয় করেছিল। আমি তাকে চিনতুম, সে ছিল দেহ ও আত্মায় সৌম্যদর্শন ও মহৎ। প্রতিদিন সকালে যখন আমি আমার কুঠুরি থেকে তার কুঠুরিতে যেতুম, ওর জন্য কয়েকটা সিগারেট নিয়ে -- জেলার সাহেবকে ধন্যবাদ, কেননা তিনি পিলোর্গের সৌন্দর্য, যৌবন ও অ্যাপোলোর মতন মাধুর্যে বিমোহিত ছিলেন -- পিলোর্গে গুনগুন করে গান গাইতো আর হেসে আমাকে বলতো, সেলাম সকালবেলার জনি। পিলোর্গের বাড়ি ছিল পুই দ্য দোমে, সেখানকার টান ছিল ওর কথাবার্তায়। পিলোর্গের ঐশ্বর্ষময় করুণার সৌষ্ঠবে ঈর্ষান্বিত জুরিরা, অদৃষ্টের ভূমিকা নিয়ে, ওকে কুড়ি বছরের জন্যে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল, কেননা ও সমুদ্রের ধারে কয়েকটা বাড়িতে ডাকাতি করেছিল আর পরের দিন নিজের প্রেমিক এসকুদেরোকে খুন করেছিল ; এসকুদেরো পিলোর্গের এক হাজার ফ্রাঁ চুরি করে নিয়েছিল। এই একই আদালত পরে আদেশ দিয়েছিল যে পিলোর্গের মাথা গিলোটিনে রেখে ধড় থেকে আলাদা করে দেয়া হোক। ১৭ মার্চ ১৯৩৯ সালে পিলোর্গেকে রাষ্ট্র ওইভাবে হত্যা করে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যায় মরিস পিলোর্গে। ”

    এই কবিতাটিতে কয়েদি ও সমকামীদের জগতে প্রচলিত বহু ইশারা প্রয়োগ করেছেন জাঁ জেনে। জেনে তাঁর কবিতায় পাঠকদের নৈতিক ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধে অন্তর্ঘাত ঘটাবার কাজ করেছেন। তিনি পাপ, পতন, ক্লেদ ইত্যাদিতে পেয়েছেন সৌন্দর্য এবং তার গুণকীর্তন করেছেন, গুরুত্ব আরোপ করেছেন নিজের অসাধারণত্বে, নিষ্ঠুর ও বেপরোয়া অপরাধীদের করে তুলেছেন নিরুপম আইকন, সমকামের বিশেষ আচার-আচরণ ও শব্দভাঁড়ারকে নির্দিধায় ব্যবহার করেছেন এবং হিংস্রতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বর্ণনাকে উপভোগ করেছেন।

    -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------

    জেলের উঠোনে বাতাস একটি হৃদয়কে গড়িয়ে নিয়ে চলেছে

    গাছ থেকে ঝুলছে ফোঁপাতে থাকা এক দেবদূত

    শ্বেতপাথরকে পাকিয়ে নভোনীল থাম

    গড়ে তুলছে জরুরি দরোজা

    তা আমার রাতের জন্য খোলা।

    এক বেচারা পতনরত পাখি আর ছাইয়ের স্বাদ

    দেয়ালে ঘুমন্ত চোখের স্মৃতি

    আর এই দুঃখে ঠাশা মুঠো যা নভোনীলকে হুমকি দিয়ে

    তোমার মুখ নামিয়ে আনে

    আমার হাতের

    গহ্বরে।


     

    এই কঠিন মুখ, মুখোশের চেয়েও হালকা

    দামি মণিরত্নের চেয়েও আমার হাতে ভারি ঠেকছে

    প্রতিরোধের আঙুলে ; ভিজে গেছে কান্নায়

    অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ভয়ঙ্কর

    এক সবুজ চাদর তাকে

    ঢেকে রেখেছে।

    তোমার মুখ কঠোর। একজন গ্রিক মেষপালকের মতন

    আমার বন্ধ দুই হাতের মধ্যে কাঁপছে

    তোমার মুখ এক মৃত নারীর মতন

    তোমার চোখ দুটো গোলাপ

    আর তোমার নাক হতে পারে

    এক শ্রেষ্ঠ দেবদূতের ঠোঁট।

    যদি তোমার মুখ গান গায়, তাহলে কোন নারকীয় পাপ

    তোমার দূষিত বিনয়ের ঝিলমিলে তুষারকে গলিয়ে দিয়েছে

    ইস্পাতের উজ্বল নক্ষত্র দিয়ে তোমার চুলের ধুলো ঝেড়েছে

    আর কাঁটার মুকুট পরিয়েছে তোমার মাথায় ?

    আমাকে বলো কোন উন্মাদ দুর্ভাগ্য আচমকা তোমার চোখকে মেলে ধরে

    এক বিষাদ যা এতো তীব্র যে বুনো দুঃখ

    তোমার শীতল চোখের জল সত্বেও

    তোমার গোল মুখকে আদর করতে আতঙ্কিত হয়

    শোকের মিষ্টি হাসি হেসে ?

    আজ রাতে, সোনালী বালক, “চাঁদের ফেনা” গানটা গেও না

    তার বদলে মিনারবাসিনী এক রাজকন্যা হও যে স্বপ্ন দেখছে

    আমাদের দুর্ভাগা প্রেমের -- কিংবা ফরসা কেবিন বালক

    যে উঁচু মাস্তুল থেকে নজর রাখছে।

    আর সন্ধ্যায় জাহাজ-পাটাতনে গান গাইবার জন্যে নেমে আসবে

    নাবিকদের মাঝে গইবে ‘সমুদ্রের নক্ষত্রদের জয়’

    ন্যাড়ামাথা আর হাঁটুগেড়ে, ধরে রেখেছে

    তাদের বজ্জাত হাতে

    লাফখোর লিঙ্গকে।

    তোমাকে ধর্ষণ করার জন্য, সুন্দর হঠকারী কেবিন বালক

    পালোয়ান নাবিকরা এতোক্ষণে তাদের ট্রাউজারের মধ্যে টনটন করে উঠছে

    আমার প্রেম, আমার প্রেম, তুমি কি আমার চাবি চুরি করবে

    আমার জন্য মেলে ধরবে

    শিহরিত মাস্তুলের আকাশ ?

    যেখানে তুমি রাজকীয় কায়দায় পোঁতো শাদা পাগলকরা তুষার

    আমার পৃষ্ঠতলে, আমার নিঃশব্দ কারাগারে :

    আতঙ্কিত, মৃতের মাঝে ফুটে ওঠা ল্যাভেণ্ডার

    মৃত্যু তার গৃহিণীদের নিয়ে আসবে

    আর আনবে মায়াপুরুষ প্রেমিকদের…

    নিজের মখমল পদক্ষেপে, একজন শিকারি পাহারাদার পাশ কাটায়

    আমার চোখের খোদলে তোমার স্মৃতি রয়ে গেছে

    আমরা ছাদের ওপর চড়ে হয়তো পালিয়ে যেতে পারি

    ওরা বলে গিয়ানা

    ভীষণ গরম জায়গা।

    ওহ দ্বীপান্তরের কলোনির মিষ্টতা

    অসম্ভব আর বহুদূর

    ওহ পালাবার আকাশ, সমুদ্র আর নারিকেলসারি

    স্বচ্ছ ভোরবেলা, মোহময় সন্ধ্যা

    শান্ত রাত, কামানো মাথা

    আর চিকনত্বক গাণ্ডু !

    ওহ প্রেম, চলো দুজনে মিলে এক বলিষ্ঠ প্রেমিকের স্বপ্ন দেখি

    ব্র্‌হ্মাণ্ডের মতন বিশাল

    যদিও তার দেহ ছায়ার ময়লামাখা

    সে আমাদের এই স্বর্গীয় কারা-আশ্রয়ে ল্যাংটো করে শেকলে বাঁধবে

    ওর সোনার দুই উরুর মাঝে

    ওর পেটের ওপরে

    সিগারেট ফুঁকতে-ফুঁকতে

    দেবদূতের দেহ থেকে কেটে গড়ে নেয়া এক ঝলমলে কোটনা

    ফুলের তোড়ার ওপরে শক্ত হয়ে ওঠে

    কারনেশন আর জুঁইফুলের তোড়া

    যেগুলো তোমার উজ্বল হাত কাঁপতে কাঁপতে নিয়ে যাবে

    ওর অভিজাত মর্যাদায়, বিকৃতমস্তিষ্ক

    তোমার চুমুর ছোঁয়ায়।

    আমার মুখগহ্বরে দুঃখ ! উথলে উঠছে তিক্ততা

    আমার অসুখি হৃদয়কে ফুলিয়ে তুলছে ! আমার সুগন্ধী ভালোবাসাগুলো

    দ্রুতই বিদায় নেবে, বিদায় ! বিদায়

    প্রিয়তম অণ্ডকোষ ! আমার অবরুদ্ধ কন্ঠস্বরকে

    থামিয়ে, বিদায়

    হে বেহায়া লিঙ্গ !

    গান গেও না, তুমি ফন্দিবাজ, বর্বরতা দেখাও !

    পবিত্র উজ্বল গলার কচি মেয়ে হয়ে ওঠো

    আর যদি তুমি ভয় না পাও, সঙ্গীতময় বালিকা

    আমার অন্তরজগতে বহুকাল আগে মৃত

    কুঠার দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন

    আমার মাথা।

    আদরের বালক, কতো সুন্দর, লিলাকফুলের মুকুট তোমার মাথায় !

    আমার বিছানায় নত হও, আমার জাগ্রত লিঙ্গকে

    তোমার সোনালি গালের পরশ নিতে দাও। শোনো

    সেই খুনি, যে তোমার প্রেমিক

    হাজার স্ফূলিঙ্গ জরিয়ে

    নিজের গল্প শোনায়।

    ও গান গেয়ে বলে যে তোমার দেহকে পেয়েছিল, তোমার মুখ

    আর তোমার হৃদয় -- যা এক দ্রুতগতি

    শক্তিশালী অশ্বারোহীও

    কখনও ফাঁক করতে পারবে না। ওহ বালক

    তোমার গোলাকার হাঁটু পাবার জন্য

    তোমার শীতল গলা, নরম হাত

    তোমার বয়সী হতে হবে !

    উড়তে হলে, তোমার রক্তাক্ত আকাশে উড়তে হলে

    আর মৃতদের নিয়ে অনন্যসাধারণ মূর্তি গড়তে হলে,

    এখানে আর সেখানে জড়ো করা, চারণভূমিতে, ঝোপে,

    ওর মৃত্যুর জন্যে তৈরি করা ঔজ্বল্যে

    আছে ওর বয়ঃসন্ধির আকাশ…।

    বিষণ্ণ সকালগুলো, মদ, সিগারেট…

    তামাকের ছায়া, নাবিকদের কলোনি

    আমার জেলকুঠুরিতে খুনির প্রেত আসে

    এক বিশাল লিঙ্গ দিয়ে আমাকে ঠেলে দ্যায়

    আমাকে আঁকড়ে ধরে।

    «

    এক কালো জগতকে যে গান অতিক্রম করে যায়

    তা হলো এক কোটনার কান্না যে তোমার সঙ্গীতে আনমনা

    তা ফাঁসিতে লটকানো একজন মানুষের

    যে কাঠের মতন শক্ত

    তা এক কামার্ত চোরের

    মায়াময় আহ্বান।

    ষোলো বছরের এক কয়েদি সাহায্য চায়

    কোনো নাবিক ওই আতঙ্কিত কয়েদিকে সাহায্য করতে এগোয় না

    আরেকজন কয়েদির পা মুচড়ে

    শেকলে বাঁধা।

    আমি নীল চোখের জন্য খুন করেছি

    এক উদাসীন সৌন্দর্যকে

    ও আমার শ্বাসরুদ্ধ ভালোবাসা কখনও বোঝেনি

    তার কালো শকটে, এক অচেনা প্রেমিক

    আমাকে পুজো করে মৃত

    জাহাজের মতন সুন্দর।

    যখন তুমি অপরাধ করার জন্য তৈরি

    নির্দয়তার মুখোশ পরে, সোনালি চুলে ঢাকা

    বেহালার মিহি পাগলকরা সুরে

    তোমার কেলেঙ্কারির সমর্থনে

    কচুকাটা করো এক মহিলাকে।

    এরকম সময় সত্বেও, লোহাব গড়া এক রাজকুমার

    হৃদয়হীন আর নিষ্ঠুর, পৃথিবীতে দেখা দেবে

    যেন কোনো বুড়ি কাঁদছে।

    সর্বিপরি, ভয় পেও না

    চোখ ধাঁধানো ঔজ্বল্যের সামনে।

    এই প্রেত ভিতু আকাশ থেকে নেমে আসে

    অপরাধের কামোন্মাদনায়। এক বিস্ময়কর বালক

    অনন্যসাধারণ সৌন্দর্য নিয়ে ওর দেহ থেকে জন্মাবে

    ওর বিস্ময়কর লিঙ্গের

    সুগন্ধিত ধাতুরস থেকে।

    পশমের জাজিমের ওপরে কালো গ্র্যানিট পাথর

    এক হাত পাছায়, শোনো ও কেমন করে কথা বলে

    সূর্যের দিকে ওর পাপহীন শরীর

    আর ফোয়ারার কিনার পর্যন্ত

    শান্তিময়তায় প্রসারিত।

    রক্তের প্রতিটি উৎসব এক টগবগে ছোকরাকে উৎসর্গ করে

    যাতে প্রথম পরীক্ষায় বালকটি সমর্থন যোগাড় করতে পারে

    তোমার মানসিক যন্ত্রণা আর ভয়কে তুষ্ট করো

    ওর শক্ত প্রত্যঙ্গকে শোষণ করো

    কাঠিবরফের মতন।

    তোমার গালে স্পন্দিত হতে-থাকা লিঙ্গকে আলতো চিবোও

    তার ফোলা মুখকে চুমু খাও, ঝাঁপ নিতে দাও

    আমার প্রত্যঙ্গকে

    তোমার গলার ভেতরে, এক শোষণেই গিলে নাও

    ভালোবাসার রুদ্ধকন্ঠ, ফেলে দাও থুতুর সঙ্গে

    মুখ খুলে !

    হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করো টোটেম-গাছের মতন

    আমার উল্কিদাগা ধড়, কান্না না পাওয়া পর্যন্ত তাকে পুজো করো

    আমার যৌনতা তোমাকে চুরমার করে দেবে

    প্রহার করবে অস্ত্রের চেয়ে বেশি

    যা তোমার ভেতরে প্রবেশ করবে।

    জিনিসটা তোমার চোখের সামনে লাফিয়ে ওঠে

    সামান্য মাথা নামিয়ে দ্যাখো কেমন লাফিয়ে ওঠে

    এতো সুন্দর দেখতে যে চুমু খেতে ইচ্ছে করে

    তুমি ঝুঁকে ফিসফিস করে তাকে বলো :

    “মাদাম” !

    মাদাম, আমার কথা শোনো ! মাদাম, আমরা এখানে মারা যাবো।

    খামারবাড়িটা ভুতুড়ে ! জেলখানা ভয়ে কাঁপছে !

    সাহায্য করো, আমরা যাচ্ছি ! আমাদের তুলে নিয়ে চলো

    আকাশে তোমার ঘরে

    হে দয়ার ম্যাডোনা !

    সূর্যকে হাঁক পেড়ে ডাকো যাতে সে এখানে এসে আমাকে সান্ত্বনা দেয়

    গলাটিপে মারে এই গেরস্ত মোরগগুলোকে !

    জল্লাদকে ঘুম পাড়াও !

    আমার জানালায় নষ্টামির হাসি হাসে দিন

    জেলখানা হলো মারা যাবার বিস্বাদ পাঠশালা।

    «

    তোমার হাসিমাখা নেকড়েদাঁতকে আমার ঘাড়ে বিশ্রাম নিতে দাও

    আমার ঘাড়ে আস্তরণ নেই আর ঘৃণাহীন

    বিধবার হাতের চেয়েও হালকা আর ঐকান্তিক আমার হাত

    আমার কলারের ভেতরে হাত বুলোও

    এমনকি তা তোমার হৃদয়কে স্পন্দিতও করে না

    ওহ এসো আমার সুন্দর সূর্য

    ওহ এসো আমার স্পেনের রাত

    আমার দৃষ্টির সামনে এসো যা কাল মারা যাবে

    আমাকে এখান থেকে অনেক দূরে নিয়ে চলো

    যাতে বিকারের উন্মত্ততায় ঘুরে বেড়াতে পারি।

    আকাশ জেগে উঠতে পারে, নক্ষত্রেরা ঝংকার তুলতে পারে

    ফুলেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারে, আর চারণভূমিগুলোতে

    কালো ঘাসগুলো আহ্বান করতে পারে শিশিরকে

    যেখানে সকাল তৃষ্ণা মেটাতে আসে

    হয়তো ঘণ্টাধ্বনি হবে : আমি একা

    মারা যাবো।

    ওহ এসো গো আমার গোলাপি আকাশ, ওহ এসো আমার সোনালি ঝুড়ি !

    রাতে শাস্তিপ্রাপ্ত তোমার জেলবন্দীকে দেখে যাও

    মাংস খুবলে নাও, মেরে ফ্যালো, ওপরে ওঠো, কামড়াও

    কিন্তু এসো। তোমার গাল রাখো

    আমার গোল মাথার ওপরে।

    আমরা এখনও ভালোবাসার কথা বলা শেষ করিনি

    আমরা এখনও শেষ করিনি আমাদের চুরুট ফোঁকা

    আমরা অবাক হই কেন আদালত দণ্ড দ্যায়

    একজন সৌম্যদর্শন খুনিকে

    যার তুলনায় দিনকেও ফ্যাকাশে মনে হয়।

    হে প্রেম, আমার মুখগহ্বরে এসো। হে প্রেম, দরোজা খুলে দাও !

    নেমে পড়ো, আলতো হাঁটো, দালানগুলো পেরিয়ে যাও

    মেষপালকের চেয়েও আলতো পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে উড়ে যাও

    মৃত পাতাদের ঝটিতি চলে যাবার বদলে

    বাতাস তুলে নিয়ে যাবে।

    ওহ দেয়ালের ভেতর দিয়ে যাও, আর যদি চলে যেতে হয়

    আলসের ওপর হাঁটো -- ছাদের ওপরে, সাগরের ওপরে

    আলোয় ঢেকে নাও নিজেকে, হুমকি প্রয়োগ করো, প্রার্থনা ব্যবহার করো

    কিন্তু এসো, আমার কুক্কুরি

    আমার মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে এসো।

    «

    আমার দোলখাবার কুঠুরিতে, ঝাউগাছের গানের সামনে উন্মুক্ত

    ( নাবিকদের গিঁটপাকানো দড়িতে ঝুলছে

    যাদের সকালের স্বচ্ছতা সোনালী করে তোলে ) দেয়ালের ওপরের খুনিরা

    নিজেদের ভোরবেলা দিয়ে মুড়ে রাখে।

    কে পলেস্তারার ওপরে বাতসের গোলাপ খোদাই করেছে ?

    কে আমার বাড়ির স্বপ্ন দ্যাখে

    হাঙ্গেরির তলদেশ থেকে ?

    কোন বালক আমার পচা খড়ের ওপরে শুয়েছে

    ঘুমভাঙার মুহূর্তে

    বন্ধুদের কথা মনে করে ?

    আমার উন্মাদনাকে অস্হিরতা দাও, জন্ম দাও আমার আনন্দ থেকে

    সৌম্যকান্তি সেনায় ঠাশা এক সান্তনাদায়ক নরক

    কোমর পর্যন্ত নগ্ন -- আর স্বকামী পুরুষের ট্রাউজার থেকে

    টেনে নামাও গন্ধের অদ্ভুত ফুল

    যা আমাকে বিদ্যুতের মতন আঘাত করবে।

    কে জানে কোথা থেকে উপড়ে তোলো উন্মাদ অঙ্গভঙ্গীগুলো--

    বালকদের পোশাক খোলো, অত্যাচার আবিষ্কার করো,

    তাদের মুখের সৌন্দর্যকে বিকৃত করো

    আর গিয়ানার জেলখানা দিয়ে দাও বালকদের

    যাতে তারা দেখাসাক্ষাৎ করতে পারে।

    হে আমার বুড়ি মারোনি নদী, হে মিষ্টি কেয়েনের জল !

    পনেরো থেকে কুড়িজন কয়েদির

    আমি অবনত দেহগুলো দেখতে পাই

    ফরসা বালকটিকে ঘিরে ধরেছে

    পাহারাদারদের ফেলে-দেয়া সিগারেট ফুঁকছে

    ফুলের মাঝে আর শ্যাওলায়।

    একটা ভিজে আধা-সিগারেট সবাইকে দুঃখিত করার জন্য যথেষ্ট

    ঋজু, একা, শক্ত ফার্নের ওপরে

    তাছাড়া মার্জিত এবং খাঁটি একটি ভ্রাম্যমান কামড়।

    সবচেয়ে যে কমবয়সী সে স্হির হয়ে বসে

    নিজের সুন্দর পোঁদ রেখে

    অপেক্ষা করে

    গৃহিনী হবার জন্য।

    আর পুরোনো খুনিরা রাতের বেলায় উবু হয়ে

    আচার অনুষ্ঠানের জন্য জড়ো হয়

    একটা শুকনো কাঠি থেকে টেনে বের করবে

    কোনো চটপটে কয়েদি

    চুরি করা এক টুকরো আগুন

    উথ্থিত লিঙ্গের চেয়েও যা

    পবিত্র ও মার্জিত।

    চকচকে পেশির পালোয়ান ডাকাতও

    এই কচি তরুণের সামনে নত হয়ে শ্রদ্ধা জানায়

    চাঁদকে তুলে নিয়ে যায় আকাশে

    হাতাহাতি প্রশমিত হয়

    যখন কালো পতাকার

    রহস্যময় ভাঁজগুলো

    ঢেউ খেলতে থাকে।

    তোমার অঙ্গভঙ্গী তোমাকে কতো ভালো করে মুড়ে নেয় !

    রক্তিম হাতের তালুতে রাখা একদিকের কাঁধ

    তুমি সিগারেট ফোঁকো। আর গলায় ধোঁয়া নেমে যায়

    তখন কয়েদিরা গম্ভীরমুখে নাচতে থাকে

    গুরুত্ব দিয়ে, নিঃশব্দে, পারাপারি করে

    তোমার মুখ থেকে ওরা এক সুগন্ধী ফোঁটা নেবে

    দুটো নয়, গোল হয়ে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার

    তোমার জিভ থেকে ওদের জিভে

    হে বিজয়ী ভাই।

    ভয়ানক দিব্যতা, অদৃশ্য আর বজ্জাত

    তুমি তখন ঝকঝকে ধাতুতে গড়া উদাসীন ও তীক্ষ্ণ

    একা নিজের কথা ভাবছ, মারাত্মক ব্যবসাদার

    তোমার হ্যামক থেকে দড়ি খুলে

    গান গায়।

    তোমার অপলকা আত্মা পর্বতমালার ওপরে ভেসে যায়

    সঙ্গে আবার যায় জাদুমথিত উড়াল

    জেলকলোনি থেকে পলাতক এমন কেউ

    উপত্যকার প্রান্তসীমায় মারা গেছে

    ফুসফুসে গুলি খেয়ে

    এমনকি তোমার কথা

    না ভেবেই।

    হে বালক, চাঁদের বাতাসে জেগে ওঠো

    আমার মুখের ভেতরে ঝরাও কয়েকফোটা ধাতুরস

    তোমার গলা থেকে তোমার দাঁত পর্যন্ত গড়িয়ে-আসা, হে প্রেম

    গর্ভবান করার জন্য, শেষ পর্যন্ত

    আমাদের মহাসমাদরে বিয়ে হচ্ছে।

    তোমার পরমানন্দিত দেহকে আমার দেহের সঙ্গে জুড়ে দাও

    তা জঘন্যতার কারণে মারা যাচ্ছে

    হে তুলতুলে মিষ্টি ইতর

    তোমার গোল সোনালী অণ্ডকোষদের বিস্ময়ে

    আমার কালো শ্বেতপাথরের লিঙ্গ

    তোমার হৃদয়কে বিদ্ধ করবে।

    ওর যে সূর্যাস্ত পুড়ছে তাতে নিশানা করো

    যেটা আমাকে খেতে চাইছে !

    আমার শিকারের আত্মারা, আমার হাতে বেশি সময় নেই

    এসো, সাহস থাকলে, তোমাদের পুকুর

    তোমাদের জলাজঙ্গল, কাদা ছেড়ে যাও

    যেখানে তুমি বুদবুদ ওড়াও ! আমাকে খুন করো ! পোড়াও !

    একজন ফুরিয়ে-যাওয়া মিকেলাঞ্জেলো, আমি জীবন থেকে গড়েছি

    কিন্তু প্রভু, আমি চিরকাল সৌন্দর্যের সেবা করেছি :

    আমার তলপেট, আমার হাঁটু, আমার রক্তিম হাত

    সবই বিপদাশঙ্কার।

    মুর্গিখামারের মোরগেরা, ফরাসিদেশের ক্রীড়াকৌতূক

    দুধঅলার বালতি, বাতাসে একটা ঘণ্টা

    পাথরকুচিতে এক পদক্ষেপ

    আমার শার্শি শাদা আর স্বচ্ছ

    এক আনন্দময় ঔ্রজ্বল্য আছে

    লিখনস্লেটের কারাগারে।

    মহাশয়গণ, আমি ভীত নই !

    যদি আমার মাথা গিলোটিনের চুবড়িতে গড়িয়ে পড়ে

    তোমার ফ্যাকাশে মাথা নিয়ে, আমার ভাগ্যের কারণে

    তোমার কৃশতনু পাছায়।

    কিংবা আরো ভালোভাবে বলতে হলে :

    তোমার গলার ওপরে

    হে প্রিয়...।

    চেয়ে দ্যাখো ! অর্ধেক খোলা মুখের বিয়োগান্তক রাজা

    তোমার উষর বাড়িয়াড়ির বাগানে আমার ঢোকার অধিকার আছে

    যেখানে তুমি শক্ত হও, ঋজু, একা

    দুই আঙুল তুলে

    নীল কাপড়ের পর্দা

    তোমার মাথা ঢেকে রেখেছে।

    আমার তন্দ্রার ভেতর দিয়ে আমি তোমার পবিত্র সদৃশকে দেখি !

    ভালোবাসা ! গান ! আমার রানি !

    তোমার ফ্যাকাশে চোখের মণিতে কি পুরুষের এক প্রেত

    খেলার সময়ে

    আমাকে যাচাই করছিল

    দেয়ালের পলেস্তরার ওপরে ?

    গোঁ ধরে থেকো না, প্রভাতসঙ্গীত গাইতে দাও

    তোমার ভবঘুরে হৃদয় থেকে, আমাকে একা একটা চুমু দাও...।

    হা ঈশ্বর, আমার গলা চিরে যাবে

    যদি আমি তোমাকে চটকিয়ে হৃদয়ে পুরতে না পাই

    আর ধর্ষণ করতে পারি !

    «

    ক্ষমা করুন ঈশ্বর কেননা আমি পাপ করেছি !

    আমার কন্ঠস্বরের অশ্রু, আমার জ্বর, আমার দুঃখদুর্দশা

    ফ্রান্সের মতন সুন্দর দেশকে ছেড়ে পালিয়ে যাবার পাপ

    তা কি যথেষ্ট নয়, প্রভু, আমার বিছানায় গিয়ে

    আশায় উপুড় হয়ে পড়ার ?

    আপনার সুগন্ধী বাহুতে, আপনার তুষারের দুর্গে !

    অন্ধকার জগতের প্রভু, আমি এখনও জানি কেমন করে প্রার্থনা করতে হয়

    হে পিতা, এটা আমিই, যে এক সময়ে কেঁদে বলেছিল :

    “সর্বোচ্চ স্বর্গের জয়,

    চৌর্য ও ব্যবসায়ের পৌরাণিক

    আলতো পায়ের গ্রিক দেবতা হারমেসের জয়

    যিনি আমাকে রক্ষা করেন !”

    মৃত্যু থেকে আমি শান্তি আর দীর্ঘ ঘুম চাইছি

    ঈশ্বরের সিংহাসন রক্ষদের গান

    তাদের সুগন্ধ, তাদের গলার মালা

    বড়ো তপ্ত পোশাকে ক্ষুদে দেবদূতদের লোমাবরণ

    আমি চাই চাঁদহীন সূর্যহীন রাত

    বিস্তীর্ণ প্রান্তরের আকাশে।

    আমার মাথা গিলোটিনে কাটার সময় এটা নয়

    আমি আরামে ঘুমোতে পারি।

    ওপরের ছাদে, আমার অলস প্রেম

    আমার সোনালি বালক, আমার মুক্তা জেগে উঠবে

    ভারি জুতো দিয়ে পিষে ফেলার জন্য

    ন্যাড়া করোটির ওপর।

    «

    যেন পাশের বাড়িতে কোনো মৃগিরোগি বাস করে

    জেলখানাটা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘুমোয়

    একজন মৃত মানুষের গানের অন্ধকারে।

    জলে ভাসমান নাবিকরা যদি বন্দর দেখতে পায়

    তাহলে আমার লোকলস্কর উড়াল নেবে

    আরেক

    আমেরিকার দিকে।


     

     

     

     

     


  • মলয় রায়চৌধুরী | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:১৫734844
  • জাঁ জেনে : চোরের জার্নাল :

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    যারা জেল খাটে তাদের পোশাক গোলাপি আর শাদা ডোরাকাটা। যদিও আমার হৃদয়ের ওসকানিতে আমি সেই জগৎ বেছে নিয়েছি যেখানে আহ্লাদিত হই, আমি অন্তত সেখানে সেই সমস্ত মর্মার্থের ইশারা খুঁজে পাবার ক্ষমতা রাখি, যা আমি জানতে চাই : ফুল আর দণ্ডিতদের মাঝে একটা কাছাকাছি সম্পর্ক আছে। প্রথমটার যেমন অপলকাভাব আর সূক্ষ্মতা, তেমনই প্রকৃতির, যেমন দ্বিতীয়টার নির্দয় সংবেদনহীনতা। যদি আমাকে একজন দণ্ডিতের -- কিংবা অপরাধীর বর্ণনা করতে হয় -- আমি তাকে ফুলে এমনভাবে সাজাবো যে সে তার তলায় চাপা পড়ে যাবে, সে নিজেই ফুল হয়ে উঠবে, বিশাল আর নতুন ফুল। যাকে আমি পাপ বলে জানি তার জন্য, আমি আরামে এক অভিযানে বেরোলুম যা আমাকে কারাগারে পৌঁছে দিলো। যদিও তারা সব সময়ে সুপুরুষ নয়, যে মানুষেরা পাপে পর্যবসিত, তাদের পৌরুষের প্রচুর সততা থাকে। তারা নিজে থেকেই, কিংবা কোনও অঘটনের কারণে, যা তাদের জন্য বাছাই করা হয়েছে, তারা বিনা নালিশে কলঙ্কের, ঘৃণ্য ঘটনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেমন প্রেমে, যদি তা গভীর হয়, মানুষকে তার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায়। যৌনতার খেলা এক নামহীন জগতকে ফাঁস করে, যা প্রেমিকদের রাতের ভাষায় প্রকাশিত হয়। সেই ভাষাকে লিখে রাখা যায় না। তা রাতের বেলায় কানে-কানে কর্কশস্বরে ফিসফিস করে বলা হয়। ভোর বেলায় তা লোকে ভুলে যায়। তোমাদের জগতের সদগুণকে প্রত্যাখ্যান করে, অপরাধীরা এক নিষিদ্ধ ব্রহ্মাণ্ডকে আশাহীনভাবে সঙ্গঠিত করার জন্য একমত হয়। তারা তার ভেতরে বসবাস করার জন্য আত্মসমর্পণ করে। সেখানকার হাওয়ায় বমি পায় : তারা তবু সেখানে শ্বাস নিতে পারে। কিন্তু -- অপরাধীরা তোমার ধরাছোঁয়ার বাইরে-- যেমন ভালোবাসায়, তারা পেছন ফেরে আর আমাকেও জগতসংসার আর তার আইনকানুন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য করে। তাদের ঘাম, বীর্য, আর রক্তের গন্ধ। সংক্ষেপে, আমার দেহকে আর আমার তৃষ্ণার্ত আত্মাকে তা একনিষ্ঠতা উপহার দ্যায়। তাদের জগতের এই যৌনতার দরুন আমি অশুভের প্রতি আকৃষ্ট হই। আমার দুঃসাহসিক অভিযান, কখনও দ্রোহ বা অবিচারের অনু্ভূতির দ্বারা প্ররোচিত হয়নি, তা যেন এক দীর্ঘ সময়ের সঙ্গম, দুঃসহ, অদ্ভুত, যৌন উৎসব ছিল ( কাল্পনিক উৎসব যা কারাগারে নিয়ে যায় আর যাকে আগাম অনুমান করা যায় )। যদিও তা অনুমোদিত, আমার দৃষ্টিতে তার ন্যায্যতা প্রতিপাদনও, জঘন্য অপরাধের, তা হবে অত্যন্ত অবক্ষয়ের নিদর্শন। সেই চরম বিন্দু যেখানে পুরুষদের জুগুপ্সাকে নিয়ে যায়, তাকে আমার মনে হতো বিশুদ্ধতার আদর্শ জায়গা, অর্থাৎ, সবচেয়ে ঘোলা প্রেমাত্মক সাদৃশ্য, যেখানে উদযাপিত হয় মেকি বিয়ে। তাকে সুরে বাঁধবার ইচ্ছায়, আমি ব্যবহার করি স্বাভাবিক সংবেদনের আঙ্গিকে আমাকে দেয়া উপহার, যা দণ্ডিতের চেহারায় আগে থেকেই উত্তেজিত করে তোলে। ব্যাপারটা জাগিয়ে তোলে, তার রঙে আর তার বন্ধুরতায়, এক ধরণের ফুল যার পাপড়িগুলো কিছুটা কোঁকড়া, যার বর্ণনা আমার পক্ষে যথেষ্ট, শক্তিমত্তার ধারণাকে লজ্জার জুড়িদার করা ; লজ্জা যা কিনা প্রাকৃতিক স্তরে অত্যন্ত অপলকা আর মহার্ঘ। এই অনুষঙ্গ, যা আমাকে আমার সম্পর্কে অনেক কথা বলে, তা নিজের সম্পর্কে অন্য কোনো মনের কথা প্রস্তাব করবে না, আমার মন তা এড়াতে পারে না। এইভাবে আমি আমার কোমলতা দণ্ডিতদের উপহার দিয়েছি ; আমি তাদের মনোরম নামে ডাকতে চেয়েছি, তাদের অপরাধকে অভিহিত করতে চেয়েছি, শালীনতার কারণে, সূক্ষ্ম রূপকে ( যার আড়ালে আমি জানতে পারতুম না খুনির বৈভবী পৌরুষ, তার লিঙ্গের হিংস্রতা )। এই ছবির মাধ্যমে আমি কি তাদের গিয়ানার পেনাল কলোনিতে কল্পনা করতে পারিনা : সবচেয়ে পালোয়ান, মাথায় শিঙ, সবচেয়ে কঠিন, মশারির ঢাকনার আড়ালে ? আর আমার ভেতরের প্রতিটি ফুল এমন এক বিষাদ ছড়ায় যে তার সবই দুঃখ আর মৃত্যুর নিদর্শন। এইভাবে আমি ভালোবাসা চাইলুম, যেন তা বন্দিশিবিরের ব্যাপার। আমার প্রতিটি কামেচ্ছা আমাকে তার আশায় আকৃষ্ট করলো, তার একটা আভাস আমায় দিলো, আমাকে অপরাধীদের উপহার দিলো, তাদের কাছে আমাকে উপহার দিলো কিংবা আমাকে অপরাধ করার জন্য অনুপ্রাণিত করলো। যখন আমি এই বইটা লিখছি, শেষ অপরাধীরা ফ্রান্সে ফিরছে। সংবাদপত্রে সেই খবর প্রকাশিত হচ্ছে। রাজার উত্তরাধিকারীরা এক শূন্যতায় ভোগে যদি তাকে অভিষেক থেকে প্রজাতন্ত্র বঞ্চিত করে। বন্দিশিবিরের সমাপ্তি আমাদের জীবন্ত মননকে পৌরাণিক অতল জগতে উত্তীর্ণ হওয়ায় বাধা দ্যায়। আমাদের সবচেয়ে নাটকীয় আন্দোলনকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। আমাদের অভিনিষ্ক্রমণ, নৈপূণ্য, সমুদ্রের পথে মিছিল, মাথা নত করে ক্রিয়ান্বিত হয়েছিল। ফিরে যাওয়া, সেই একই মিছিলের প্রত্যাবর্তন, তা অর্থহীন হয়ে গেছে। আমার অন্তরজগতে, বন্দিশিবিরের ধ্বংস হয়ে দাঁড়িয়েছে শাস্তির শাস্তি : আমাকে খোজা করা হয়েছে, আমি আমার কলঙ্ক থেকে কর্তিত। আমাদের স্বপ্নকে তাদের গৌরব থেকে মুণ্ডহীন করার ব্যাপারে উদাসীন, ওরা আমাদের আগেই ঘুম ভাঙিয়ে দ্যায়। পেনাল কলোনির তুলনায় দেশের কারাগারগুলোর নিজেদের ক্ষমতা থাকে : পেনাল কলোনির মতো তা নয়। তা ছোটোখাটো। তাতে সেরকম সৌষ্ঠব, কিছুটা বিনীত মহিমা নেই। আবহাওয়া সেখানে এমন গুমোটভরা যে তোমায় নিজেকে হিঁচড়ে বেড়াতে হবে। তুমি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াও। দেশের কারাগারগুলো বেশ উঁচু, আরও অন্ধকার আর কড়া মেজাজের ; পেনাল কলোনির ধীর, বিষণ্ণ যন্ত্রণাবোধ ছিল চরম দুর্দশার নিখুঁতভাবে কুসুমিত হবার জায়গা। তাই এখন দেশের জেলগুলো, বজ্জাত পুরুষে ফেঁপে ওঠা, পোশাক কালচে, অনেকটা রক্তের মতন, যা কার্বনিক গ্যাস দিয়ে ভেজানো। ( আমি “কালচে” লিখেছি। দণ্ডিতদের পোশাক -- যারা ধরা পড়েছে, বিচারাধীন, এমনকি জেলবন্দিরাও, আমাদের নামকরণের জন্য যে শব্দগুলো বেছে নিয়েছে তা বেশ অভিজাত -- আমার ওপরে শব্দটা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে : পোশাকগুলো সাদাসিধে বাদামি রঙের। ) আমার হ্যাংলামি তাদের জন্য। আমি জানি পেনাল কলোনি হোক বা দেশের কারাগার, তা প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণের মতন হয়। আওয়াজ-করা ভারি কাঠের জুতোয়, শাস্তি-পাওয়া লোকগুলো সব সময়েই যেন ভার সামলাতে পারে না। মাল নিয়ে যাবার ঠেলাগাড়ির সামনে হঠাৎ বোকার মতন ভেঙে পড়ে। কোনো পাহারাদারের উপস্হিতিতে ওরা মাথা নামায়, আর হাতে ধরে থাকে খড়ের তৈরি রোদ থেকে মাথা বাঁচাবার বড়ো টুপি -- যা কমবয়সীগুলো সাজিয়ে নেয় ( আমার তাই মনে হয়েছে ) পাহারাদারের অনুমতি-দেয়া চুরি করা গোলাপফুলে -- কিংবা বাদামি কাপড়ের বেরেটুপি। ওরা হতভাগা, বিনয়ের অভিনয় করে। যদি তাদের মারধর করা হয়, তাদের মগজে কোনো ব্যাপার নিশ্চয়ই কঠিন আকার নেবে : যারা ভিতু, তারা গুটিসুটি কেটে পড়ে, ভয় পাওয়া, কেটে পড়া, এগুলো হলো -- যখন সবচেয়ে কঠিন অবস্হায় রাখা হয়, বিশুদ্ধ ভয় আর কেটে পড়া-- তাদের শক্ত করে তোলা হয় “সুসিক্ত” করার মাধ্যমে, যেমন নরম লোহাকে শক্ত করা হয় সুসিক্ত করা হয়। এসব সত্বেও তারা চাটুকারিতা বজায় রাখে। যদিও আমি বিকলাঙ্গ আর দুর্ঘটনাগ্রস্তদের দুরছাই করি না, যারা সুপুরুষ অপরাধী, আমার নমনীয়তা তাদের আকর্ষণ করে।


     

    অপরাধ, আমি নিজেকে বললুম, পিলোরগে বা অ্যাঞ্জেল সান-এর মতন নিখুঁত সফলদের গড়ে তোলার আগে তাকে বহুকাল অপেক্ষা করতে হয়। তাদের সংহার করার আগে ( শব্দটা নিষ্ঠুর ) জরুরি হলো একযোগে কিছু ঘটনার সংশ্লেষ : তাদের মুখের সৌন্দর্য, তাদের দেহের শক্তি আর সৌষ্ঠব আর তার সঙ্গে যোগ করতে হবে অপরাধ সম্পর্কে তাদের প্রবৃত্তি, পরিস্হিতি যা অপরাধীকে গড়ে তোলে, অমন অদৃষ্ট বেছে নেবার নৈতিক প্রাণশক্তির ধারণক্ষমতা, আর সব শেষে, শাস্তি, তার নিষ্ঠুরতা, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য যা একজন অপরাধীকে তাতে গৌরবান্বিত বোধ করার অধিকার দ্যায়, আর, এই সমস্ত কিছু ছাপিয়ে, অন্ধকারের এলাকাগুলো। নায়ক যদি রাতের সঙ্গে লড়াই করে জিতে যায়, তাহলে তার কাছে থেকে যায় বিজয়ের টুকরো-টাকরা ! সেই একই সংশয়, খোশমেজাজ পরিস্হিতির একই কেলাসন, একজন খাঁটি গোয়েন্দার সফলতাকে দিশানির্দেশ দ্যায়। আমি উভয়কেই সন্মান করি। কিন্তু আমি তাদের অপরাধকে ভালোবাসি, তার জন্য যে শাস্তি বরাদ্দ, “সেই পেনালটি” ( আমার মনে হয় না তারা এর আগাম আঁচ করেনি। তাদের একজন, প্রাক্তন মুষ্ঠিযোদ্ধা লেডো, হাসিমুখে তদন্তকারীদের জবাব দিয়েছিল : “আমার অপরাধগুলো ? সেগুলো করার আগে হয়তো আমি তা নিয়ে অনুতাপ করতুম” ) যাতে আমি তাদের সঙ্গে যেতে চাই, যাইই হয়ে যাক না কেন, আমার ভালোবাসা উপচে পড়বে।


     

    এই জার্নালে আমি অন্য কারণগুলো লুকোতে চাই না, যা আমাকে চোর বানিয়েছে, সবচেয়ে সহজ কারণ হলো ক্ষুধা, যদিও দ্রোহ, তিক্ততা, ক্রোধ কিংবা তেমন ধরণের ভাবপ্রবণতা আমার বাদবিচারে ঢোকেনি। গোঁড়ামিভরা যত্নে, “ঈর্ষান্বিত যত্নে”, আমি আমার দুঃসাহসিক অভিজানের খাতিরে নিজেকে গড়ে তুললুম, যেমনভাবে কেউ তার বিছানা বা ঘরকে ভালোবাসাবাসির আগে সাজায় ; অপরাধ করার জন্য আমি ছিলুম গরম। আমার উত্তেজনা হলো এক থেকে আরেক জনের মাঝে দোল খাওয়া। তাকে বাতিল করে আমার যে কতো বড়ো ক্ষতি হয়েছে তা আমি গোপনে আবার কল্পনা করি, নিজের অন্তরে আর কেবল একা নিজের জন্য, গিয়ানার পেনাল কলোনির চেয়েও পঙ্কিল এক পেনাল কলোনি। আমি বলব যে দেশের কারাগারগুলোকে বলা চলে “ছায়াময়”। পেনাল কলোনিতে রয়েছে চড়া রোদে। সেখানে সবকিছু ঘটে নিষ্ঠুর আলোতে, যাকে আমি প্রাঞ্জলতার নিদর্শন হিসাবে বেছে নেয়া ছাড়া আর কিছু বলতে পারব না।


     

    আমি সেই সাহসকে হিংস্রতার নাম দেবো, যা অলস হয়ে অপেক্ষা করছে আর বিপদের অঙ্কশায়ী। তা দেখা যেতে পারে এক চাউনিতে, হাঁটাচলায়, এক হাসিতে, আর তোমার মধ্যেই যা আছে তা ফলত মুচড়ে ওঠে। তা তোমাকে কাবু করে ফ্যালে। হিংস্রতা হলো এক প্রশান্তি যা তোমাকে বিপর্যস্ত করে। বলাবলি করা হয় : “লোকটার আভিজাত্য আছে !” পিলোরগের অপলকা বৈশিষ্ট্য ছিল উদ্দাম হিংস্রতার। স্তিলিতানোর একটি মাত্র হাতের হিংস্রতার অভিসন্ধি, স্রেফ টেবিলের ওপরে রাখা, স্হির, নীরবতাকে বিঘ্নিত করেছে আর তা বেশ বিপজ্জনক। আমি চোরেদের আর কুটনিদের সঙ্গে কাজ করেছি, যাদের কর্তৃত্ব আমাকে তাদের ইচ্ছের কাছে ঝুঁকিয়েছে, কিন্তু কয়েকজনই সত্যিকারের সাহসী হিসাবে প্রমাণ করতে পেরেছে নিজেদের, তাদের মধ্যে যে জন সবচেয়ে বেশি সাহসী ছিল -- গি -- সে ছিল হিংস্রতাহীন। স্তিলিতানো, পিলোরগে আর মিশাই ছিল ভিতু। জাভাও তাই। এমনকি যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, স্হির আর হাসিমুখ, তাদের চোখে, নাকের ফুটোতে, হাঁ-মুখে, হাতের তালুতে আর হাতে ধরা পড়তো, ফুলে ওঠা ঝুড়ি, সোয়েটার কিংবা ডেনিমের তলায় পেশির নিষ্ঠুর ঢিবি, এক উজ্বল আর নিরানন্দ ক্রোধ, দেখে মনে হতো আবছায়া।

    কিন্তু, প্রায় সব সময়েই, ব্যাপারটাকে চিহ্ণিত করার মতো কিছু নেই, স্বাভাবিক ইঙ্গিতের অনুপস্হিতি ছাড়া। রেনের মুখ প্রথম দর্শনে মনোরম। ওর নিচু বেঁকা নাক দেখে মনে হতো যেন চতুর দুর্বৃত্ত, যদিও ওর মুখের সীসার মতন ফ্যাকাশে উদ্বেগ তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলবে। ওর চোখদুটো ক্ষর, ওর ঘোরাফেরা শান্ত আর অসন্দিগ্ধ। স্নানের ঘরে ও ঠাণ্ডা মাথায় সমকামীদের পিটুনি দ্যায় ; তাদের পোশাক তল্লাসি করে, যা পায় কেড়ে নেয়, অনেক সময়ে, শেষ বার্তা হিসেবে, গোড়ালি দিয়ে পোঁদে লাথি মারে। আমি ওকে পছন্দ করি না, কিন্তু ওর ঠাণ্ডা মেজাজ আমাকে ওস্তাদি শেখায়। ও গভীর রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে, পেচ্ছাপখানা, বাগান, ঝোপঝাড়, শঁজে লিজের গাছের তলায়, স্টেশনগুলোর কাছে, পোর মাইলোতে, বোয় দ্য বুলোনে ( সব সময়ে রাতের বেলায় ) এমন এক গাম্ভীর্য নিয়ে থাকে যা থেকে কল্পনাপ্রবণতা একেবারে বাদ। যখন ও ফেরে, ভোর দুটো বা তিনটের সময়ে, আমার মনে হয় আমি দুঃসাহসিক অভিযানে ফুলেফেঁপে উঠেছি। ওর দেহের প্রতিটি অঙ্গ, যা নিশাচরের, ওর কাজে অংশ নেয় : ওর হাত, ওর বাহু, ওর পা, ওর ঘাড়ের পেছন দিক। কিন্তু ও, এই সমস্ত বিস্ময় সম্পর্কে অনবহিত, আমাকে সেগুলো সম্পর্কে সোজাসুজি বলে। পকেট থেকে বের করে আঙটি, বিয়ের আঙটি, ঘড়ি, সন্ধ্যাবেলাকার লুটের মাল। একটা বড়ো কাচের পাত্রে রাখে যা তখনই ভরে উঠবে। রাস্তায় পায়ুকামীদের বা তাদের কাজ কারবার দেখে ও অবাক হয় না, তা বরং ওর কাজকে সাহায্য করে। ও যখন আমার বিছানায় বসে, আমি উৎকর্ন হয়ে উঠি, ওর অভিযানের টুকরো টাকরা শোনার জন্য : জাঙিয়া পরা একজন অফিসার যার মানিব্যাগ ও চুরি করেছিল সে তার আঙুল তুলে চিৎকার করেছিল : “বেরিয়ে যাও !” রেনে ব্যাটা বিজ্ঞের উত্তর : “তুই কি মনে করিস তুই সৈন্যবাহিনীর কেউ ?” বুড়ো লোকের খুলিতে একখানা কড়া ঘুষি। সে লোকটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল যখন রেনে, বেশ উত্তেজিত, দেরাজ খুলে একগাদা মরফিনের শিশি পেয়েছিল। অনেক গল্প, যেমন, যে সমকামীর পয়সাকড়ি ছিল না আর যাকে ও নিজের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিল। আমি এইসব ঘটনা শুনি বেশ একাগ্র হয়ে। আমার অ্যান্টওয়ের্পের জীবন মজার হয়ে ওঠে, ঋজু দেহের কাঠামোয়, আমার পুরুষালি ধরনধারন অনুযায়ী। আমি রেনেকে উৎসাহ দিই, আমি ওকে পরামর্শ দিই, ও আমার কথায় কান দ্যায়। আমি ওকে বলি যে নিজে প্রথমে কথা বলবে না। “লোকটাকে তোমার কাছে আসতে দাও, তাকে ঝুলিয়ে রাখো। অবাক হবার ভান করো, যখন সে বলবে, নাও করো। কার কাছে বোবা সাজতে হবে তা আঁচ করে নিও। ”

    প্রতি রাতে আমি তথ্যের অংশবিশেষ যোগাড় করি। আমার কল্পনা তাতে হারিয়ে যায় না। আমার উত্তেজনার কারন আমি নিজের মধ্যে শিকার আর অপরাধী উভয়ের ভূমিকা খুঁজে পাই। সত্যি বলতে কি, আমি নিঃসরণ করি, রাতের বেলায় আমি আমার থেকে পয়দা হওয়া শিকার আর অপরাধীকে উদ্ভাবন করি ; আমি তাদের দুজনকে একই জায়গায় আনি, আর সকালের দিকে আমি জানতে পেরে উৎফুল্ল হই যে শিকার মৃত্যুদণ্ডের আদেশের মুখে পড়েছিল আর অপরাধীকে পাঠানো হচ্ছিল পেনাল কলোনিতে বা আরেকটু হলে গিলোটিনে চাপানো হচ্ছিল। এই ভাবে আমার উত্তেজনা আমার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা গিয়ানার পেনাল কলোনি।

    ওরা না চাইলেও, এই লোকগুলোর ভাবভঙ্গী আর নিয়তি ঝঞ্ঝাময়। তাদের আত্মা এমন হিংস্রতা সহ্য করে যা তারা চায়নি আর যাকে তারা মানিয়ে নিয়েছে। যাদের স্বভাবগত পরিবেশ হিংস্রতার, অথচ তারা নিজেদের কাছে সহজ-সরল। এই দ্রুত আর ধ্বংসাত্মক জীবনকে যে গতিবিধিগুলো গড়ে তোলে তা সরল আর সরাসরি, একজন নামকরা নকশাকারের আঁকা রেখার মতন পরিষ্কার -- কিন্তু যখন রেখাগুলো চলন্ত অবস্হার মুখোমুখি হয়, তখনই ঝড় ওঠে, বিদ্যুতে তারা মারা পড়ে কিংবা আমি বিপদে পড়ি। তবু, তাদের হিংস্রতার সঙ্গে আমার হিংস্রতার কীই বা তুলনা, যার মানে তাদের হিংস্রতাকে মেনে নেয়া, তাকে আমার করে তোলা, তাকে আমার ইচ্ছে অনুযায়ী গড়ে নেয়া, তাকে থামিয়ে দেয়া, তাকে ব্যবহার করা, তাকে আমার ওপরে চাপিয়ে নেয়া, তাকে জানা, তাকে অনুমান করা, তার অনিষ্টপাতকে অনুধাবন আর উপলব্ধি করা ? কিন্তু যা আমার ছিল, আমার আত্মরক্ষার জন্য অভিলাষিত আর জরুরি, আমার বলিষ্ঠতা, আমার অনমনীয়তা, তাদের হিংস্রতার তুলনায়, যা তারা একটা অভিশাপের মতন পেয়েছে, যুগপৎ অন্তরজগতের আগুন আর বহির্জগতের আলো, যা তাদের পুড়িয়ে ছারখার করে আর আমাদের উদ্ভাসিত করে ? আমরা জানি যে তাদের অভিযানগুলো বালকসুলভ। তারা নিজেরা মূর্খ। তারা তাস খেলার হারজিত নিয়ে খুন করার জন্য বা খুন হবার জন্য তৈরি থাকে, যখন একজন প্রতিপক্ষ -- কিংবা তারা নিজেরা -- জোচ্চুরি করছিল। তা সত্বেও, অমন লোকেদের ধন্যবাদ, বিয়োগাত্মক ঘটনা সম্ভব হয়।

    এই ধরণের সংজ্ঞা -- বহু পরস্পরবিরোধী উদাহরণ দিয়ে -- হিংস্রতা সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করছি। আমি এমন শব্দ প্রয়োগ করব না কোনো ঘটনার নায়ককে তুলে ধরার খাতিরে, বরং তারা আমার সম্পর্কে কিছু বলুক। আমাকে বুঝে ওঠার জন্য, কুকর্মে পাঠকের অংশগ্রহণ জরুরি। তবু আমি তাকে সতর্ক করে দেবো যখনই আমার ভাবোচ্ছাস আমার পদক্ষেপকে টলমলে করে তোলে।

    স্তিলিতানো ছিল দীর্ঘদেহী আর পালোয়ান। ওর চলনভঙ্গী ছিল একযোগে নমনীয় আর গোদা, প্রাণবন্ত আর ঢিমেতালে, সর্পিল ; লোকটা ছিল চটুল। আমার ওপরে ওর ক্ষমতার বেশির ভাগ -- আর বারিও চিনোর বেশ্যাদের ওপর -- কারণ হলো এক গাল থেকে আরেক গালে চালান করা ওর মুখের লালা, যা ও অনেকসময়ে হাঁ-মুখের সামনে আনতো পরদা টানার মতন। “কিন্তু কোথা থেকে এতো থুতু যোগাড় করে,” আমি নিজেকে জিগ্যেস করতুম, “কোথা থেকেই বা আনে? আমার তো কখনও ওর মতন তেলালো আর রঙিন হবে না। তা হবে পাকানো কাচের মতন মামুলি, স্বচ্ছ আর অপলকা। ” আমার পক্ষে কল্পনা করা স্বাভাবিক ছিল যে ওর লিঙ্গটা কেমন হবে যদি আমার সুবিধার জন্য তাতে অমন সুন্দর একটা জিনিস মাখায়, ওই দামি মাকড়সার তন্তু, এমন এক পাতলা-জাল যা আমি গোপনে প্রাসাদের আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করেছি। ও একটা পুরোনো ধূসর টুপি পরতো যার সামনে দিকটা ভাঙা। যখন ও সেটা আমাদের ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলতো, তা হঠাৎ হয়ে উঠতো যেন বেচারা কোনো ডানা কাটা মরা পায়রার মতন, কিন্তু যখন ও ওটা পরে নিতো, কান পর্যন্ত টেনে নামিয়ে, টুপির অন্য কিনারাটা ওপর দিকে উঠে যেতো আর দেখা যেতো ওর গৌরবান্বিত সোনালি চুল। ওর উজ্বল চোখের কথা যদি বলতে হয়, নম্রভাবে নামানো -- তবু স্তিলিতানো সম্পর্কে বলতে হবে : “ওর হাবভাব অবিনয়ী” -- যার ওপরে চোখ বন্ধ হয়ে আসতো আর চোখের পাতা এতো সোনালি, এতো উজ্বল আর ঘন, যে তা সন্ধ্যার ছায়া আনতো না বরং নিয়ে আসতো শয়তানের ছায়া। মোটের ওপর, কী মানে হয় যখন একটা দৃষ্টি আমাকে বন্দরের কাছে টলমলিয়ে দ্যায়, আমি দেখি জাহাজের পাল, একটু একটু করে, থেকে-থেকে, ছড়িয়ে পড়ে আর মাস্তুলের ওপর পর্যন্ত কষ্ট করে উঠে যায়, প্রথমে ইতস্তত, তারপর সুসংকল্পিত, যদি এই বিচলনগুলো স্তিলিতানোর প্রতি আমার প্রেমের বিচলনের প্রতীক না হয় তাছাড়া আর কীই বা হবে ? ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বারসেলোনাতে। ও ভিখারি, চোর, পরী আর বেশ্যাদের জমঘটে বসবাস করছিল। ও ছোল সৌম্যকান্তি, কিন্তু এটা দেখার ছিল যে আমার অধঃপতনের সঙ্গে ওর সৌন্দর্যের কতোটা যোগাযোগ। আমার পোশাক ছিল নোংরা আর ছেঁড়া। আমি ছিলুম শীতে কাতর আর ক্ষুধার্ত। এই সময়টা ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে দৈন্যপীড়িত।

    ১৯৩২. স্পেন সে সময়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ইঁদুর-ছুঁচোয়, তার ভিখারিতে। তারা গ্রাম থেকে গ্রামে যেতো, আন্দালুসিয়াতে কেননা জায়গাটা উষ্ণ, ক্যাটালোনিয়াতে কেননা জায়গাটা ধনী অধ্যুষিত, কিন্তু পুরো দেশটা ছিল আমাদের জন্য অনুকূল। ফলে আমি ছিলুম একটা উকুন আর সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলুম। বারসেলোনাতে আমরা কালে মেদিওদিয়া আর কালে কারমেন-এ ঘুরে বেড়াতুম। অনেক সময়ে আমরা বিনা চাদরের বিছানায় ছয়জন শুতুম, আর সকালে উঠে বাজারে যেতুম ভিক্ষা করার জন্য। আমরা দল বেঁধে বারিও চিনো ছাড়তুম আর ছড়িয়ে পড়তুম প্যারালেলোতে, হাতে বাজারের সাজি নিয়ে, কেননা বাড়ির বউরা পয়সার বদলে একটা পেঁয়াজ বা শালগম দিতেন। দুপুরে আমরা ফিরতুম, আর কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাওয়া সবজি দিয়ে সুপ বানাতুম। ইঁদুর-ছুঁচোর জীবনের কথাই বলব। বারসেলোনাতে আমি পুরুষদের জুটি দেখতে পেতুম যার দুজনে মধ্যে একজনের ভালোবাসা বেশি সে অন্যজনকে বলত:

    “আজকে সকালের সাজিটা আমি নিয়ে যাবো।”

    সে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতো। একদিন সালভাদোর আমার হাত থেকে সাজিটা আলতো করে টেনে নিয়ে বলল, “আমি তোমার হয়ে ভিক্ষা চাইতে যাবো।”

    বাইরে তুষার পড়ছিল। ও বরফজমা ঠাণ্ডা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল, ছেঁড়া আর ফর্দাফাঁই জ্যাকেট পরে -- পকেটগুলো ছেঁড়া আর ঝুলন্ত -- আর তেলচিটে ময়লায় অনমনীয় শার্ট। ওর মুখটা ছিল গরিব আর দুঃখি, ছলনাভরা, ফ্যাকাশে আর নোংরা, কেননা ঠাণ্ডার দরুন আমরা কখনও ধুতুম না। দুপুরবেলায়, ও সবজি নিয়ে ফিরলো আর কিছুটা চর্বি। এখানে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করব এক ধরণের ক্ষতের দিকে -- ভয়াবহ, কেননা বিপদ সত্বেও আমি উত্তেজিত করে দিতে পারতুম -- যার মাধ্যমে আমার সামনে মেলে ধরা হতো সৌন্দর্য। আর তীব্র -- ভাতৃসুলভ -- ভালোবাসা আমার দেহকে তাতিয়ে তুললো আর টেনে নিয়ে গেলো সালভাদোরের কাছে। ওর পেছন পেছন হোটেল ছেড়ে, আমি ওকে দেখতুম একজন মহিলাকে মিনতি করছে। আমি ফরমুলাটা জানতুম, কেননা আমি নিজের জন্য আর অন্যের জন্য ভিক্ষা করেছি : এতে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে হিতৈষিতা মিশ খায় ; ঈশ্বরের সঙ্গে গরিব লোকটাকে মেলায় ; ব্যাপারটা হৃদয় থেকে বেরোনো এমন এক নিরহঙ্কার যে আমার মনে হয় তা থেকে সরাসরি সুগন্ধের প্রকাশ ঘটে, ভিখারির হালকা শ্বাস যে তা উচ্চারণ করে। সারা স্পেন জুড়ে সে-সময়ে ওরা বলতো:

    “ঈশ্বরের জন্য।”

    ওর কথা শুনতে না পেলেও, আমি বুঝতে পারতুম যে প্রতিটি দোকানে, প্রতিটি গৃহবধূর কাছে এই কথাটাই ওগরাচ্ছা সালভাদোর। কোটনারা যেমন নিজেদের বেশ্যার দিকে নজর রাখে আমি ওর ওপর নজর রাখতুম, কিন্তু হৃদয়ে ওর জন্য কোমলতা পুষে ! এইভাবে, স্পেন আর আমার ভিখারির জীবন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো অপমানের মহিমার সঙ্গে, কেননা তার জন্য দরকার ছিল গর্ববোধ ( অর্থাৎ, ভালোবাসার ) ওই সমস্ত নোংরা, ঘৃণ্য প্রাণীদের সুশোভিত করার জন্য। দরকার ছিল কর্মদক্ষতার, যা আমি একটু-একটু করে হাসিল করলুম। যদিও তোমাকে এর কায়দা আমি ঠিকমতন বলতে পারবো না, অন্তত এটুকু বলতে পারি যে আস্তে আস্তে আমি নিজেকে বাধ্য করলুম এই দুস্হ জীবনকে স্বেচ্ছাকৃত প্রয়োজনীয়তা হিসাবে মেনে নিতে। ব্যাপারটা যা আমি ঠিক তাই মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করিনি, আমি একে উঁচুতে তুলিনি, মুখোশ পরাইনি, বরং উল্টোটা, আমি এর অপরিচ্ছন্নতাকে হুবহু সত্যাপন করতে চেয়েছি, আর সবচেয়ে নোংরা নিদর্শনগুলো আমার কাছে হয়ে উঠলো জাঁকজমকের নিদর্শন।

    এক সন্ধ্যায়, আমি আতঙ্কিত বোধ করলুম, যখন পুলিশের হানার পর আমার খানাতল্লাস করা হচ্ছিল -- আমি সেই সময়ের কথা বলছি যা এই বইয়ের শুরুতে লেখা ঘটনাগুলোর আগের -- অবাক গোয়েন্দা আমার পকেট থেকে টেনে বের করলো, অন্যান্য টুকিটাকির মধ্যে, ভেসলিনের একটা টিউব। আমরা এটা নিয়ে ঠাট্টা করতুম কেননা ভেসলিনটা ছিল মেনথল দেয়া। পুরো নথি দপতর, সেই সঙ্গে আমিও, যদিও কষ্ট করে, এইভাবে হাসিতে মুচড়ে উঠলুম :

    “তুমি এটা নাকে শোঁকো ?”

    “দ্যাখো, তোমায় আবার না সর্দিকাশিতে ধরে। তুমি তোমার জুড়িকে হুপিং কাফ দিয়ে ফেলবে।”

    আমি ভাসা-ভাসা অনুবাদ করলুম, প্যারিসের একজন জোচ্চোরের ভাষায়, সুস্পষ্ট আর বিষাক্ত স্প্যানিশ প্রবাদের বিদ্বেষপরায়ন বিড়ম্বনাটুকু। ব্যাপারটা একটা ভেসলিন টিউবের যার পেছন দিকটা মোড়া ছিল। যার মানে দাঁড়ায় যে তা ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশ হানায় পুরুষদের পকেট থেকে যে সমস্ত চমৎকার টুকিটাকি বের করা হয়েছিল, এটা ছিল তার মধ্যে অপমানের নিখুঁত প্রতীক, যা বেশ সাবধানে লুকিয়ে রাখা হয়, তবু তা গোপন মহিমার চিহ্ণ, যা আমাকে পরে অবমাননা থেকে বাঁচিয়েছে। যখন আমাকে লকআপে পোরা হলো, আর আমি আমার তেজোময়তা ফিরে পেলুম যাতে গ্রেপ্তারির দুর্ভাগ্য কাটিয়ে উঠতে পারি, ভেসলিনের টিউবের ছবিটা আমাকে ছেড়ে যায়নি। পুলিশের লোকটা আমাকে ওটা বেশ ক্রুরভাবে দেখিয়েছিল, যাতে তারা তাদের প্রতিশোধস্পৃহায়, ঘৃণায়, অবমাননায় আহ্লাদে আটখানা হতে পারে। কিন্তু, দ্যাখো দ্যাখো ! সেই নোংরা, অপকৃষ্ট জিনিসটা যার উদ্দেশ্য দুনিয়ার কাছে মনে হয়েছিল -- পৃথিবীর ওই প্রতিনিধি জমঘটের কাছে যা কিনা পুলিশের দল আর, তাছাড়া, ওই বিশেষ পুলিশের স্প্যানিশ দলটা, মুখে রসুনের দুর্গন্ধ, গায়ে ঘাম আর তেলের, কিন্তু দেখতে শাঁসালো, পেশি বেশ পালোয়ানি আর নিজেদের নৈতিক চালচলনে অটল -- অত্যন্ত জঘণ্য, আমার কাছে হয়ে উঠলো বেশ মহার্ঘ। যেসব জিনিস আমার কোমলতাকে ফাঁস করে তাদের থেকে আলাদা, এই জিনিসটা মোটেই অলৌকিক মহিমাদীপ্ত ছিল না ; তা পড়ে রইলো টেবিলের ওপরে ভেসলিনের ধূসর টিউব হয়ে, ভাঙা আর বিবর্ণ, যার বিস্ময়কর বিচক্ষণতা, আর কারাগারের মহাফেজখানায় মামুলি জিনিসপত্রের সঙ্গে তার অত্যাবশ্যক সংগতি ( বেঞ্চ, কালির দোয়াত, নিয়মের বই, মাপার স্কেল, দুগন্ধ ), সাধারণ উদাসীনতার মাঝে, আমাকে মর্মপীড়িত করতে পারতো, যদি না টিউবের ভেতরের মাল আমাকে মনে করিয়ে দিতো একটা তেলের কুপির কথা ( হয়তো তার প্রাণবন্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য ), রাতের বেলায় একটা কফিনের পাশে রাখা।

    তা বর্ণনা করার জন্য, আমি আরেকবার একটা ছোটো লক্ষ্যবস্তু গড়ে তুলি, কিন্তু এই ছবিটা তাতে ঢুকে পড়ে : ল্যাম্পপোস্টের তলায়, যে শহরে বসে আমি লিখছি, একজন বুড়ির ম্লান মুখ, গোল, ছোটো, চাঁদের মতন, খুবই ফ্যাকাশে ; বলতে পারছি না আমি দুঃখ পেয়েছিলুম নাকি ভণ্ড সেজেছিলুম। বুড়ি এগিয়ে এলো আমার দিকে, বলল যে ও ভীষণ গরিব আর কিছু পয়সা চাইলো। ওই চাঁদামাছের মতন মুখের ভদ্রতা আমাকে তক্ষুনি বলল : বুড়িটা এখনই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে।

    “বুড়িটা চোর”, আমি নিজেকে বললুম। আমি যখন ওর কাছ থেকে চলে যাচ্ছি, এক ধরণের তীব্র ভাবাবেশ, আমার অন্তরের গভীরে ঘুমিয়ে, আর তা আমার মনের কিনারায় নয়, আমাকে ভাবতে প্ররোচিত করল যে হয়তো বুড়িটা আমার মা যার সঙ্গে আমার এখন দেখা হলো। আমি তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানি না যিনি আমাকে দোলনায় ফেলে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু আশা করলুম যে রাতের বেলায় যে ভিক্ষা চাইছিল সেই বুড়িই আমার মা।

    “যদি তিনিই হতেন তাহলে কী হতো?” আমি বুড়ির থেকে দূরে যেতে যেতে ভাবতে লাগলুম। ওহ! যদি তাই হতো, আমি ওনাকে ফুলে ঢেকে দিতুম, গ্ল্যাডিওলি আর গোলাপে, আর চুমু দিয়ে ! ওই চাঁদ-মাছ চোখের ওপরে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে ফোঁপাতুম, ওই গোল, বোকা মুখের ওপরে ! “কিন্তু কেন”, আমার ভাবনা এগিয়ে চললো, “ কেনই বা তা নিয়ে কাঁদবো?” আবেগপ্রবণতার এই গতানুগতিক ছাপ আমার মগজ থেকে সরে যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না, তার জায়গায় অন্য ব্যাপার এলো, সবচেয়ে নোংরা আর নিকৃষ্ট, যাকে আমি মর্মার্থের ক্ষমতা দিলুম চুমুর, কিংবা কান্নার কিংবা ফুলের।

    আমি ভাবলুম, “আমি ওনার কাঁধে মাথা রেখে আবোলতাবোল বলতে পারলে আনন্দিত হবো”, ভেসে যাবো ভালোবাসায় ( এক্ষুনি যে গ্ল্যাডিওলি ফুলের কথা বলেছি তা কি বাচ্চার লালার কথা মনে পড়ায় ? )। ওনার চুলেতে লালা ফেলবো কিংবা ওনার হাতে দুধ ওগরাবো। কিন্তি আমি সেই চোরকে আদর করতে চাইবো যা আমার মা।

    ভেসলিনের টিউব, যা আমার লিঙ্গকে তেলালো করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি কিংবা আমার প্রেমিকদের লিঙ্গ, তাঁর মুখ মনে পড়িয়ে দিল যিনি, এক স্বপ্নবিহ্বলতার সময়ে যা শহরের অন্ধকার গলিতে ঘোরাফেরা করতো, তিনি ছিলেন মায়েদের মধ্যে সবচেয়ে অভীষ্ট। তা আমাকে আমার গোপন আনন্দগুলোর জন্যে গড়েপিটে তৈরি করেছিল, এমন সমস্ত জায়গায় যা অসম্বদ্ধ তুচ্ছতার, যা হয়ে উঠেছিল আমার খেয়ালখুশির শর্ত, এই যেমন আমার বীর্যের ছিটেফোঁটা লাগা রুমাল প্রমাণ করে। টেবিলের ওপরে শুয়ে, তা ছিল পুলিশের বিরুদ্ধে আমার ওড়ানো অদৃশ্য বিজয়কেতন। কারাগারের এক কুঠুরিতে। আমি জানতুম যে আমার ভেসলিনের টিউবটা সারারাত ধরে অপমানের মুখে পড়বে -- চিরকালীন উপাসনার উলটো ব্যাপার -- একদল সশক্ত, সৌম্যকান্তি, খসখসে কন্ঠে পুলিশের। এমনই তারা পালোয়ান যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল লোকটা সবকয়টা আঙুল মোচড়ায়, তা থেকে ফেটে বেরোবে, প্রথমে একটা ঠুসকি পাদ, ক্ষণিক আর পচা, গঁদের একটা ফিতে বেরিয়ে আসতে থাকবে হাস্যকর নৈঃশব্দে। যাই হোক, আমি জানতুম যে এই ছোটো আর বিনয়ী বস্তুটা ওদের বিরুদ্ধে নিজেই লড়ে যাবে ; তার সামান্য উপস্হিতি দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত পুলিশকে বেশ চটিয়ে ফেলতে পারবে ; জিনিসটা নিজের দিকে টেনে আনবে অপমান, ঘৃণা, শাদা আর বোবা ক্রোধ। হয়তো জিনিসটা সামান্য বিদ্রুপ করবে-- বিয়োগান্ত নায়কের মতন যে দেবতাদের চটিয়ে মজা পায় -- তার মতনই অবিনাশী, আমার আনন্দে আত্মসমর্পিত, আর গর্বিত। আমি ফরাসি ভাষার নতুন শব্দে গান গাইতে চাইবো। কিন্তু আমি তার জন্য লড়তেও রাজি, তার সন্মানে সর্বসংহারের অনুষ্ঠান করতেও রাজি আর কোনো একটা গ্রামকে গোধুলীবেলায় লাল নিশান দিয়ে সাজিয়ে তুলতে চাইবো।

    কোনো নৈতিক কাজের সৌন্দর্য নির্ভর করে তার প্রকাশ করার মধ্যে। একথা বলা যে এই জিনিসটা সুন্দর তার মানে হলো যে তা সত্যিই সুন্দর। তাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে। এটা হলো ছবির করণীয় কাজ, অর্থাৎ, বাস্তব জগতের প্রভার সঙ্গে তার একাত্মতা। কাজটা সুন্দর হবে যদি তা প্ররোচিত করে, আর আমাদের কন্ঠে বিকশিত হয়, গান। অনেক সময়ে যে চেতনার সাহায্যে আমরা একটা বিখ্যাত কুকর্মের কথা ভেবেছি, প্রকাশ করার ক্ষমতার জন্য জরুরি তাকে জ্ঞাপন করা, আমাদের গান গাইতে বাধ্য করা। এর মানে হলো প্রতারণা ব্যাপারটা সুন্দর হবে যদি তা আমাদের দিয়ে গান গাওয়ায়। চোরদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তা যে আমাকে আবার নৈতিক জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তা নয়, আমি ভাবলুম, তার ফলে আমি আরেকবার নিজেকে সমকামীতার জগতে পাবো। আমার গায়ে যতো জোর বাড়ে, আমি আমার শুভ হয়ে উঠি। আমি হুকুম জারি করি। পুরুষদের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য বলতে আমি বুঝি একটা মুখের আর শরীরের সমন্বয়পূর্ণ বৈশিষ্ট্য আর তার সঙ্গে অনেক সময়ে যোগ করতে হয় পুরুষালি চারুতা। সৌন্দর্যের সঙ্গে তখন যোগ হয় দুর্দান্ত সৌষ্ঠব, প্রবলপ্রতাপ আকার-ইঙ্গিত। আমরা মনে করি তারা নির্ধারিত হয় বিশেষ নৈতিক আচরণের মাধ্যমে, আর নিজেদের ভেতর তেমন সদগুণ চর্চা করে যা আমাদের শুকনো মুখ আর অসুস্হ শরীরকে সেই ওজস্বিতা দেবে যা প্রেমিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে থাকে। হায়, এই সমস্ত সদগুণ, যা তাদের কখনও থাকে না, তা আমাদের দুর্বলতা।

    এই যে আমি লিখতে বসেছি, আমি আমার প্রেমিকদের নিয়ে ভাবি। আমি তাদের আমার ভেসলিন মাখিয়ে দিতে চাইবো, সেই মোলায়েম, মিহি মেনথলগন্ধ জিনিসটা ; আমি চাইবো তাদের পেশিগুলো স্নান করুক স্বচ্ছ হালকা জিনিসটায় যেটা ছাড়া সবচেয়ে সৌম্যকান্তির সাধনীটিও কম প্রণয়োদ্দীপক।

    যখন কোনো প্রত্যঙ্গ বাদ দেয়া হয়, বলা হয় যে অন্য অঙ্গটা তখন শক্তপোক্ত হয়ে বেড়ে ওঠে। আমি আশা করেছিলুম যে স্তিলিতানোকে যে হাতটা খোয়াতে হয়েছিল তার প্রাণক্ষমতা ওর লিঙ্গে একত্রিত হবে। অনেককাল যাবত আমি কল্পনা করেছি একজন সারবান সদস্যের, সোঁটার মতন, যা সবচেয়ে সাংঘাতিক অর্ন্তদৃষ্টির ক্ষমতা রাখে, অথচ যা আমাকে প্রথমে উৎসুক করলো তাহলো এই যে স্তিলিতানো আমাকে ব্যাপারটা জানতে দিলো : মামুলি ভাঁজের দাগ, যদিও আশ্চর্যজনকভাবে বাঁ পায়ে, ওর নীল ডেনিম ট্রাউজারে। এই ব্যাপারটা আমায় দুঃস্বপ্নে দেখা দিতো যদি না স্তিলিতানো উদ্ভট মুহূর্তগুলোয়, ওর হাত জায়গাটায় না রাখতো, আর যদি না ও, মহিলারা যেমন সৌজন্য দেখান, ভাঁজের দাগটা দেখিয়ে নখ দিয়ে কাপড়ের ওপর চিমটি কাটতো। আমার মনে হয় না ও কখনও আত্মাভিমান হারিয়েছে, কিন্তু আমার কাছে ও থাকতো বিশেষভাবে প্রশান্ত। নির্লজ্জের মতন হেসে, যদিও বেশ নিস্পৃহ, ওকে আমার আদর করার পানে চেয়ে থাকতো। আমি জানতুম ও আমাকে ভালোবাসবে।

    হাতে সাজি নিয়ে সালভাদোর, আমাদের হোটেলের চৌহদ্দি পেরোবার আগে, আমি এমন উত্তেজিত বোধ করছিলুম যে রাস্তাতেই ওকে চুমু খেলুম, কিন্তু ও আমাকে ঠেলে এক পাশে সরিয়ে দিলো :

    “তোমার মাথা খারাপ ! লোকেরা ভাববে আমরা গাণ্ডু !”

    ও ফরাসিভাষা ভালোই বলতে পারতো, পেরিপিয়াঁয় আঙুর ক্ষেতে কাজ করার সময়ে শিখেছিল। গভীর আঘাত পেয়ে আমি পেছন ফিরলুম। ওর মুখ বেগুনি হয়ে উঠলো। ওর গায়ের রঙ ছিল শীতের বাঁধাকপির মতন। সালভাদোর হাসলো না। ও মর্মাহত হয়েছে টের পেলুম। “আমি এরকম ব্যবহারই পাই”, ও নিশ্চয়ই ভেবেছিল, “সাতসকালে উঠে তুষারের মধ্যে ভিক্ষা করার বদলে। ও জানেই না কেমন আচরণ করতে হয়।” ওর চুল ভিজে গিয়েছিল আর জটপাকানো। জানালার ভেতর থেকে, মুখগুলো আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল, কেননা হোটেলের একতলায় একটা কাফে ছিল যা ফুটপাত পর্যন্ত প্রসারিত, যার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো ওপরের ঘরে যাবার জন্য। আস্তিনে মুখ পুঁছে সালভাদোর ভেতরে চলে গেলো। আমি ইতস্তত করছিলুম। তারপর ওর পেছন পেছন ঢুকলুম। আমার তখন কুড়ি বছর বয়স। যদি নাকের ডগায় একটা ফোঁটা চোখের জলের মতন অনাবিল হয় তাহলে কেনই বা তা একই আগ্রহে চেটে নেবো না ? আমি আগে থেকেই যথেষ্ট জড়িয়ে পড়েছিলুম নীচকুলোদ্ভবদের পুনর্বাসনে। যদি না বেয়াড়া সালভাদোরের ভয়ের ব্যাপার হতো, আমি কাফেতেই ওকে চুমু খেতে পারতুম। ও, যদিও, নাকের জল ফেলছিল, আমি বুঝতে পারলুম ও নিজের শ্লেষ্মা গিলছিল। হাতে সাজি নিয়ে, ভিখারি আর ভবঘুরে নিরাশ্রয়দের পাশ কাটিয়ে ও রান্নাঘরের দিকে এগোলো। আমার আগে-আগে।

    “তোমার সঙ্গে ব্যাপারটা কি বলোতো ?” আমি বললুম।

    “তুমি লোকেদের মনোযোগ আকর্ষণ করছ।”

    “তাতে দোষের কি?”

    “লোকে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওইভাবে চুমু খায় না। আজ রাতে, তুমি যদি চাও…”

    ও ঠোঁট ফাঁক করে এমনভাবে কথাগুলো বললো মনে হলো তা কমনীয়তাহীন আর সেই সঙ্গে একইরকম অবজ্ঞার সুরে। আমি শুধু আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে চেয়েছিলুম, আমার দারিদ্রের স্নেহে উষ্ণতা দিতে চেয়েছিলুম।

    “কিন্তু তুমি কি ভাবছিলে ?”

    কেউ একজন ওর সঙ্গে ধাক্কা খেলো আর দুঃখ প্রকাশ করলো না, ওকে আমার থেকে আলাদা করে দিলো। আমি ওকে রান্নাঘরের ভেতর পর্যন্ত অনুসরণ করিনি। আমি স্টোভের কাছে একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসলুম। যদিও আমি সতেজ সৌন্দর্যের প্রশংসা করি, আমি এখন আর মাথা ঘামালুম না যে এই গেরস্হ ধরণের লোকটাকে ভালোবাসার জন্যে নিজেকে কেমনভাবে উপস্হিত করব ; এমনই এক দারিদ্র্যপীড়িত ভিখারি যার ওপর কম সাহসীরাও তর্জন-গর্জন করতে পারে, কেমন করেই বা ওর তেকোনা পাছাকে আদর করতে পারবো...আর যদি, দুর্ভাগ্যবশত, ওর সাধনীটা প্রণয়োদ্দীপক হয় ?

    বারিও চিনো জায়গাটা, সে-সময়ে, ছিল একধরণের আস্তানা যেখানে স্পেনের লোকেরা কম আর বিদেশিরা বেশি ভিড় করতো, তাদের সব কয়টা ছাঁটাই মাল। আমরা অনেকসময়ে কাগজি-বাদাম সবুজ পোশাক পরতুম কিংবা নার্সিসাস-হলুদ রেশমের শার্ট আর ছেঁড়া ক্যাম্বিশ জুতো, আর আমাদের চুল এমন পেছন দিকে চেকনাই দেয়া থাকতো যে মনে হতো তাতে চিড় ধরবে। আমাদের কোনো নেতা ছিল না বরং পরিচালক ছিল। আমি বলতে পারছি না কেমন করে তারা অমন ক্ষমতা পেলো। বোধহয় আমাদের সামান্য মালপত্রের ভালো দাম যোগাড় করতে পারতো বলে। ওরা আমাদের সমস্যার খেয়াল রাখতো আর কাজকারবারের ব্যাপারে খবর দিতো, তার জন্য ওরা মোটামুটি একটা অংশ নিতো। আমরা ঢিলেঢালা দল গড়িনি, কিন্তু সেই বিরাট নোংরা বিশৃঙ্খলায়, যে পরিবেশে তেলকুটে দুর্গন্ধ, পেচ্ছাপ আর গুয়ের ছড়াছড়ি, কয়েকজন বাজে আর ইতর লোক নিজেদের চেয়ে চালাক-চতুরদের ওপর বেশি নির্ভর করতো। কলুষ আর কল্মষ আমাদের যুবকদের সঙ্গে ঝিলমিলিয়ে উঠতো আর হাতেগোণা কয়েকজনের রহস্যময় প্রতিভা, যারা সত্যিই স্ফূলিঙ্গ ছড়াতো, যুবকেরা যাদের দেহ, চাউনি আর ইশারা-ইঙ্গিত এমন এক চৌম্বকশক্তিতে আকর্ষণীয় ছিল যে আমাদের করে তুলতো তাদের শিকারী। এই ভাবেই আমি ওদের একজনের দ্বারা টলে গিয়েছিলুম। এক হাতের স্তিলিতানো সম্পর্কে লেখার জন্য আমি কয়েক পৃষ্ঠা অপেক্ষা করবো। শুরুতেই বলে ফেলা যাক ওর কোনো খ্রিস্টধর্মী মূল্যবোধ ছিল না। ওর পুরো ধীশক্তির, ওর পুরো ক্ষমতার, উৎস ছিল ওর দুই উরুর ফাঁকে। ওর লিঙ্গ, আর যা তাকে সম্পূর্ণ করে, সম্পূর্ণ যন্ত্রপাতি, এতোই সুন্দর ছিল যে আমি তাকে সৃজক অবয়ব বলতে পারি। যে কেউ মনে করতে পারতো যে ও মরে পড়ে আছে, কেননা ও কদাচিৎ, আর বেশ ধীরেসুস্তে, উত্তেজিত হতো : ও কেবল দেখতো। অন্ধকারে ভালোভাবে বোতামদেয়া অবস্হায় ও নিষ্পাদনের জন্য তৈরি হতো, যদিও কেবল এক হাতে বোতাম পরানো, যে আলোকময়তায় জিনিসটার বাহক উজ্বল হয়ে উঠবে।

    সালভাদোরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছয় মাস বজায় ছিল। এটা সবচেয়ে মোহক ভালোবাসা ছিল না, ছিল বহুপ্রসূ ভালোবাসাগুলোর অন্যতম। আমি ওই অসুস্হ দেহ, ধূসর মুখ, আর কয়েকটা চুলের হাস্যকর দাড়ির লোকটাকে ভালোবাসার জন্য নিজেকে বাগ মানিয়ে নিয়েছিলুম। সালভাদোর আমার যত্ন করতো, কিন্তু রাতের বেলায়, মোমবাতির আলোয়, আমি হুকুন বাছতুম, আমাদের পোষা প্রাণী, যেগুলো বাসা বাঁধতো আমাদের ট্রাউজারের খাঁজে-খাঁজে। উকুনগুলো আমাদের সঙ্গে বসবাস করতো। আমাদের জামাকাপড়কে প্রাণবন্ত করতো, এক উপস্হিতি, আর যখন ওরা বিদায় নিতো, আমাদের পোশাক হয়ে যেতো প্রাণহীন। আমরা জানতে চাইতুম -- আর অনুভব করতে -- যে এই আধা-স্বচ্ছ পোকাগুলো ঝাঁক বেঁধে রয়েছে, যদিও পোষা নয়, ওগুলো আমাদের জীবনের এমন অংশ হয়ে গিয়েছিল যে তৃতীয় কোনো লোকের উকুন আমাদের বিতৃষ্ণা জাগাতো। আমরা ওগুলোকে তাড়াতুম কিন্তু দিনের বেলায় ভাবতুম ডিমগুলো থেকে কচি উকুন বেরিয়েছে। ওগুলোকে নখে পিষে মারতুম, কোনোরকম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা ছাড়াই। লাশগুলোকে ফেলে দিতুম না -- বা অবশিষ্টাংশ -- জঞ্জালে ; ওগুলোকে পড়ে যেতে দিতুম, আমাদের রক্তে রক্তাক্ত, আমাদের অপরিচ্ছন্ন জাঙিয়ায়। আমাদের উন্নতির একমাত্র প্রমাণ ছিল উকুনগুলো, উন্নতির পাতালের নিদর্শন, কিন্তু ব্যাপারটা যুক্তিযুক্ত ছিল এই কারণে যে আমাদের অবস্হা একটা অপারেশান করতে পারলো যা ন্যায্যতা প্রমাণ করে, যে আমরা, একই শর্তে, আমাদের অবস্হার চিহ্ণগুলোকে ন্যায্যতা দিচ্ছি। উকুনগুলো ছিল দামি, কেননা আমাদের অবসানের জরুরি জ্ঞানের জন্য এই মণিরত্নগুলোকে, বলা যেতে পারে, আমাদের বিজয়। তারা চিল একযোগে আমাদের গৌরব ও লজ্জা। আমি বহুদিন একটা ঘরে থাকতুম যাতে জানালা ছিল না, কেবল দালানে একটা ঘুলঘুলি, যেখানে, সন্ধ্যাবেলায়, পাঁচটা চোটো মুখ, নিষ্ঠুর আর কোমল, হাসতো কিংবা গুমোট জায়গাটাকে আঁটার অযোগ্য করে তুলতো, টপটপে ঘাম ফেলে, ওই পোকাগুলো শিকার করতো যেগুলোর সুকৃতিতে আমরা অংশ নিয়েছি। ভালো ছিল যে অমন দুর্দশার গভীরে, আমি ছিলুম গৃহস্হের মধ্যে সবচেয়ে গরিবের প্রেমিক। আমি তাই পেয়েছিলুম এক বিরল সুবিধা। মুশকিল হতো বটে, কিন্তু আমার প্রতিটি বিজয় -- আমার নোংরা হাত, গর্বে মেলে ধরা, আমার দাড়ি আর দীর্ঘ চুলকে সদম্ভে প্রকাশ করতে পারতো -- আমাকে দিতো শক্তি -- কিংবা দুর্বলতা, আর এখানে দুটো ব্যাপারই এক-- কেননা বিজয় অনুসরণ করে, যা আমাদের ভাষায় বলা হতো অপমানপূর্ণ হতাশা। তবু, আমাদের জীবনে আলো আর প্রতিভা জরুরি হওয়ার কারণে, শার্শি আর জঞ্জালের ভেতর দিয়ে একটা সূর্যরশ্মি আসতো আর ঢুকে পড়তো নিষ্প্রভতায় ; এই উপাদানগুলোর জন্য আমাদের ছিল শিশির জমে তৈরি তুষার, মেঝের ওপরে বরফের পাতলা প্রলেপ, যদিও তারা দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে, আমাদের কাছে যথেষ্ট ছিল, আনন্দের উৎস, যার চিহ্ণ, আমাদের ঘরে অনন্বিত : ক্রীসমাস আর নববর্ষ উৎসব সম্পর্কে আমরা যেটুকু জানতুম তা হল তার সঙ্গে যাকিছু থাকে আর যা উল্লাসিত লোকদের কাছে প্রিয় : তুষার।

    নিজেদের ক্ষতকে চর্চা করাটাও ভিখারিদের কাছে বাড়তি পয়সা রোজগারের একটা উপায় --- যার ওপর নির্ভর করে জীবন চালানো যায় --- যদিও তারা হয়তো এই পথে চলে যায় তাদের দারিদ্র্যের হালতের আলস্যের দরুণ, গর্বে মাথা তুলে দাঁড়ানো, অবজ্ঞাকে পরোয়া না করে, সেই জিনিসটা হলো পুরুষালি সততা। নদীতে পাথরের মতন, গর্বও ভেঙে পড়ে আর অবহেলায় চূর্ণ হয়, ফেটে যায়। আরও অপমানে প্রবেশ করলে, গর্ববোধ উন্নত হবে ( যদি সেই ভিখারিটা আমি হই ) যখন আমি জানি -- শক্তি বা দুর্বলতা -- অমন অদৃষ্টের সুযোগ নেবার জন্য। এটা খুবই জরুরি, যেমন এই কুষ্ঠরোগ আমাকে কাবু করছে, আমাকেও তাকে কাবু করতে হবে আর, শেষে, আমাকে জিততে হবে। তাহলে কি আমি ক্রমশ করে জঘন্য হয়ে উঠবো, বেশির থেকে বেশি, বিতৃষ্ণার পাত্র, সেই অন্তিম বিন্দু পর্যন্ত যা এখনও অজানা কিন্তু যা এক নান্দনিকতা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে আর সেই সঙ্গে নৈতিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ? বলা হয় যে কুষ্ঠরোগ, যার সঙ্গে আমি আমাদের অবস্হার তুলনা করি, টিশ্যুগুলোতে চুলকানির সৃষ্টি করে ; রোগি নিজেকে চুলকাতে থাকে ; তার লিঙ্গোথ্থান হয়। স্বমেহন হয়ে দাঁড়ায় পৌনোঃপুনিক। তার নিঃসঙ্গ যৌনতায় কুষ্ঠরোগি নিজেকে সান্তনা দ্যায় আর নিজের রোগের স্তবগান গায়। দারিদ্র্য আমাদের ঋজু করেছে। সারা স্পেন জুড়ে আমরা এক গুপ্ত ব্যাপার বয়ে বেড়িয়েছি, ঔদ্ধত্বের সঙ্গে মিশেল না দেয়া অবগুন্ঠিত চমৎকারীত্ব। আমাদের অঙ্গভঙ্গী হয়ে উঠলো নম্র থেকে আরও নম্র, মিনমিনে থেকে আরও মিনমিনে, যেমন যেমন আমাদের নীচাবস্হার স্ফূলিঙ্গ আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও দীপ্ত হতে থাকলো। এইভাবে আমার ভিখারির চেহারাকে মহিমায় মুড়ে তোলার জন্য আমার মধ্যে বিকশিত হলো বিশেষ কর্মদক্ষতা। ( আমি এখনও সাহিত্যিক প্রতিভার কথা বলিনি। ) এটা একটা কাজে লাগাবার শৃঙ্খলা বলে আমার মনে হয়েছে আর এখনও তার দরুণ আমি মৃদু হাসি হাসতে পারি সবচেয়ে নম্র পেঁকোদের মাঝে, তা মানুষ হোক বা জিনিসপত্র, এমনকি বমিও, এমনকি যে লালা আমি আমার মায়ের মুখের ওপর উগরে আবোলতাবোল বকতে পারতুম, এমনকি তোমার গু-পেচ্ছাপ। ভিখারি হবার অবস্হানের ধারণা আমি আমার মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখবো।

    আমি হতে চেয়েছিলুম মহিলাদের মতন যাঁরা, বাড়িতে, লোকেদের দৃষ্টির আড়ালে, নিজের মেয়েকে সামলে রাখে, এক ধরণের বীভৎস কদাকার দানব, বোকা আর শ্বেতাঙ্গ, যে চার পায়ে ঘোঁৎঘোৎ করে বেড়ায়। মা যখন জন্ম দিয়েছিলেন, তখন ওনার বিষাদ সম্ভবত এমন ছিল যা তা তাঁর জীবনের একমাত্র সারসত্তা হয়ে উঠেছিল। উনি এই দানবকে ভালোবাসবার নির্ণয় নিলেন, তাঁর পেট থেকে যে কদর্যতা বেরিয়ে এসেছিল, শ্রমের দ্বারা সুসম্পন্ন, আর তাকে ভক্তিভরে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। তাঁর নিজের ভেতরে তিনি এক বেদিকে সাজিয়ে তুলেছিলেন যার ওপরে তিনি দানবের ধারণাকে সংরক্ষণ করেছিলেন। স্নেহে উৎসর্গ করে, আলতো হাতে, তাঁর প্রতিদিনের পরিশ্রমে তাতে কড়া পড়ে গিয়ে থাকলেও, আশাহীনের স্বেচ্ছাকৃত উদ্দীপনায়, তিনি নিজেকে পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন আর পৃথিবীর বিরুদ্ধে তিনি দাঁড় করিয়ে দিলেন দানবটাকে, যা জগতের আর তার ক্ষমতার সমানুপাত নিয়ে নিলো। দানবকে বনিয়াদ করে নতুন রীতিনীতি প্রতিপাদন করা হলো, যে রীতিনীতি কে অবিরাম লড়ে যেতে হয়েছে জগতের পরাক্রমের সঙ্গে যা তাঁকে বিদ্ধস্ত করতে এগিয়ে এসেছে কিন্তু থেমে গেছে তাঁর বাসার দেয়ালের কাছে পৌঁছে যেখানে তাঁর মেয়ে অবরুদ্ধ ছিল।

    কিন্তু, অনেকসময়ে চুরি করা দরকার ছিল, আমরা জানতুম সাহসের সুস্পষ্ট পার্থিব সৌন্দর্যের কথা। ঘুমোতে যাবার আগে, সরদার, মানে দলের কর্তা, আমাদের পরামর্শ দিতো। যেমন ধরা যাক, আমরা জাল কাগজ নিয়ে নানা কনসুলেটে যাবো যাতে আমাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশের দূত, আমাদের দুঃখকষ্ট আর দুর্দশায় প্রভাবিত হয়ে বা চটে গিয়ে, আমাদের টিকিট কেটে দেবেন সীমা পর্যন্ত। আমাদের নেতা সেগুলো বারসেলোনা স্টেশানে বিক্রি করে দেবে। সে আমাদের বলতো গির্জায় কেমন করে চুরি করতে হবে -- যা স্পেনের লোক করতে সাহস পায় না -- কিংবা বড়োলোকদের ভিলায় ; আর ও নিজে নিয়ে আসতো নেদারল্যাণ্ড আর ইংরেজ নাবিকদের যাদের কাছে আমরা খুচরো পয়সার জন্য গাণ্ডুগিরি করতুম।

    এইভাবে আমরা কখনও চুরি করতুম, আর প্রতিটি লুটতরাজ আমাদের কিছুদিনের জন্য খোলা জায়গায় স্বাস নিতে দিতো। রাতের তৎপরতার জন্য আমাদের আগে থেকে খবর রাখতে হতো অস্ত্রশস্ত্রের। ভয়ের চোটে তৈরি স্নায়বিক দুর্বলতা, আর অনেক সময়ে উদ্বেগ, ধার্মিকের মতন মেজাজ গড়ে তোলে। সেরকম সময়ে আমি সামান্য দুর্ঘটনাতেও অশুভের সংকেত পেতুম। সুযোগের ইশারা হয়ে ওঠে অনেক ব্যাপার। অজানা ক্ষমতাগুলোকে আমি জাদুমুগ্ধ করে দিতে চাই যার ওপর আমাদের অভিযানের সফলতা নির্ভর করে। আমি নৈতিক কাজ দিয়ে তাদের জাদুমুগ্ধ করতে চাই, মূলত দান-খয়রাতের মাধ্যমে। আমি ভিখারিদের বেশি করে আর হাত খুলে দিত চাই, আমি বুড়ো লোকেদের আমার আসন ছেড়ে দিই, আমি একপাশে সরে দাঁড়াই যাতে তারা যেতে পারে, আমি অন্ধদের রাস্তা পার হতে সাহায্য করি, আরও কতো কি। এইভাবে, মনে হয় আমি মেনে নিই যে চুরিচামারির কাজের ওপর একজন দেবতার শাসন কাজ করে যাঁর কাছে নৈতিক কাজ গ্রহণযোগ্য। এই প্রয়াসগুলো হলো সুযোগের ওপরে জাল ফেলার কাজ যাতে এই দেবতা, যার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, জালে ধরা পড়বে, আমাকে ক্লান্ত করবে, বিঘ্ন সৃষ্টি করবে আর ধার্মিক মনঃস্হিতি তৈরি করতে সাহায্য করবে। চুরি করার ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিক কাজের গাম্ভীর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে। তা সত্যিই অন্ধকারের হৃদয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তার সঙ্গে যোগ হব যে তা রাতে হলে ভালো, যখন লোকেরা ঘুমোয়, এমন জায়গা যা বন্ধ আর হয়তো কালোর মুখোশে ঢাকা। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটা, নৈঃশব্দ্য, দিনের বেলাতেও যে অদৃশ্যতা আমাদের দরকার হয়, হাতড়ানো হাতের অন্ধকারে ইশারা কোনো আসন্ন জটিলতা বা সতর্কতার। কেবল একটা দরোজার হাতল ঘোরানোতেও দরকার হয় অনেকগুলো প্রক্রিয়া, প্রতিটি পলকাটা মণিরত্নের মতন দীপ্তিমান। যখন আমি সোনা খুঁজে পাই, তখন মনে হয় আমি তা মাটির তলা থেকে বের করেছি ; আমি বহু উপমহাদেশকে, দক্ষিণ-সমুদ্রের দ্বীপগুলো লুট করেছি ; আমাকে নিগ্রোরা ঘিরে রেখেছে ; তারা আমার অসুরক্ষিত দেহকে বিষমাখানো বর্শা দিয়ে খোঁচা দেবার হুমকি দ্যায়, কিন্তু তখন সোনার সততা কাজ করা আরম্ভ করে, আর আমাকে দারুণ একটা বলিষ্ঠতা পিষে ফ্যালে কিংবা উল্লসিত করে। বর্শাগুলো নামানো হয়, নিগ্রোরা আমাকে চিনতে পারে আর আমি উপজাতির একজন সদস্য হয়ে যাই।

    নিখুঁত কাজ : ভুল করে আমার হাত সৌম্যকান্তি এক ঘুমন্ত নিগ্রোর পকেটে ঢুকে যায়, আমার আঙুলে তার শক্ত হতে থাকা লিঙ্গ অনুভব করি আর হাত বের করে তার পকেট থেকে চুরি করা সোনার মুদ্রা আবিষ্কার করি -- বিচক্ষণতা, ফিসফিসে কন্ঠস্বর, উৎকর্ণ কান, অদৃশ্য, কোনো দোসরের স্নায়বিক দুর্বল উপস্হিতি আর তার ইশারা বুঝতে পারা, সবকিছু আমাদের নিজেদের মধ্যে কেন্দ্রিত করে, আমাদের একজুট করে, আমাদের করে তোলে উপস্হিতির নাচের দল, যা গি-এর মন্তব্য ভালো ব্যাখ্যা করে :

    “তুমি অনুভব করো যে তুমি জীবন্ত।”

    কিন্তু আমার অন্তরজগতে, এই সামগ্রিক উপস্হিতি, যা আমার মনে হয় কাজের গাম্ভীর্যকে অসাধারণ ক্ষমতার বোমায় পালটে দিয়েছে, তা যেন এক অন্তিক ভালোথাকা--- লুটতরাজ, যখন চলছে, সব সময়ে মনে হয় এটাই শেষ, এমন নয় যে তুমি ভাবো যে এর পর আরেকটা করবে না -- বস্তুত তুমি ভাবোই না -- বরং অমন অহং-এর একত্রীকরণ হতে পারে না ( জীবনে তো নয়ই, কেননা একে আরও চাপ দিলে জীবন থেকে কেটে পড়তে হবে ) ; আর কাজের এই একতা যা বিকশিত হয় ( যেমন গোলাপফুল তার দলমণ্ডল মেলে ধরে ) তা সচেতন ইঙ্গিত-ইশারার, তাদের নৈপূণ্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী, তাদের দুর্বলতা সম্পর্কেও আর তবু কাজটায় যে হিংস্রতা আছে, এখানেও তাকে ধার্মিক আচার-আচরণের মূল্য দ্যায়। প্রায়ই আমি তা কাউকে উৎসর্গ করি। প্রথমবার ছিল স্তিলিতানো যার অমন সন্মান ছিল প্রাপ্য। আমার মনে হয় ওর দ্বারাই আমি অভিষিক্ত হয়েছিলুম, মানে, ওর দেহ সম্পর্কে আমার আবেশ আমাকে পিছিয়ে আসতে দ্যায়নি। ওর সৌন্দর্যের প্রতি, ওর খোলাখুলি দুর্বিনয়ের প্রতি, আমি প্রথম দিকের চুরিগুলো উৎসর্গ করেছিলুম। ওই অসাধারণ বিকলাঙ্গের এককত্বও, যার হাত, কবজির কাছ থেকে কাটা, কোথাও পচছে, কোনো চেস্টনাট গাছের তলায়, ও আমাকে তাইই বলেছিল, মধ্য ইউরোপের জঙ্গলে। চুরি করার সময়ে, আমার শরীর ফাঁস হয়ে যায়। আমি জানি তা আমার ইশারা-ইঙ্গিতে ঝলমল করে। পৃইবী আমার সমস্ত চলাফেরা সম্পর্কে একাগ্র, যদি তা আমায় ল্যাঙ মারতে চায়। সামান্য ভুলের জন্য আমাকে বড়ো খেসারত দিতে হবে, কিন্তু যদি ভুল হয়ও আর আমি তা সময়মতো টের পাই, তাহলে আমাদের বাপের আস্তানায় সবাই আহ্লাদে আটখানা হবে। কিংবা, যদি ফেঁসে যাই, তাহলে বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় আর তারপর কারাগার। কিন্তু বুনো অমার্জিতদের ক্ষেত্রে, যে দণ্ডপ্রাপ্ত পালাবার ব্যবস্হা করার ঝুঁকি নেয় সে তাদের সঙ্গে সেই উপায়ে দেখা করবে যা আমি সংক্ষেপে আমার অভ্যন্তরিক অভিযানে বর্ণনা করেছি। যদি অচেনা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে, সে প্রাচীন উপজাতিদের পাহারা-দেওয়া কোনো মাল পাচারকারীর মুখোমুখি হয়, তাহলে তারা তাকে মেরে ফেলবে কিংবা বাঁচাবে। আদিম জীবনে ফিরে যাবার জন্য আমি দীর্ঘ, বহু দীর্ঘ পথ বেছে নিয়েছিলুম। যা আমি সবচেয়ে আগে চাই তা হল আমাদের জাতির দ্বারা নিন্দা।

    সালভাদোর আমার কাছে গর্ববোধের উৎস ছিল না। ও যখন চুরি করতো, ও কেবল দোকানগুলোর সামনের জানলার তাক থেকে মামুলি জিনিস তুলে নিতো। রাতের বেলায়, যে কাফেতে আমরা সবাই জড়ো হতুম, ও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সৌম্যকান্তির পাশে দুঃখি মুখে সেঁদিয়ে যেতো। অমন জীবন ওকে হাঁপিয়ে তুলতো। যখন আমি ঢুকতুম, আমি ওকে কুঁজো হয়ে বসে থাকতে দেখে লজ্জা পেতুম, কোনো বেঞ্চে বসে, ওর কাঁধ সবুজ আর হলুদ সুতির কাঁথায় জড়োসড়ো, যেটা গায়ে জড়িয়ে ও শীতকালে ভিক্ষা করতে বেরোতো। ও একটা পুরোনো কালো শালও গায়ে জড়াতো, যেটা আমি নিতে চাইনি। সত্যিই, যদিও আমার মন সহ্য করতো, এমনকি চাইতো, নম্রতা প্রকাশ করি, কিন্তু আমার তেজি দেহ তা প্রত্যাখ্যান করতো। সালভাদোর দুঃখি, চাপা গলায় বলতো :

    “তুমি কি চাও আমরা ফ্রান্সে ফিরে যাই ? আমরা গ্রামের দিকে কাজ করবো।”

    আমি বললুম, না। ও আমার অপছন্দ বুঝতে পারেনি -- না, আমার ঘৃণা -- ফ্রান্সের প্রতি, এমন নয় যে আমার অভিযান, যদি বারসেলোনায় থেমে যায়, গভীরভাবে চলতেই থাকবে, বেশি বেশি করে গহনভাবে, আমার অন্তরজগতের প্রত্যন্ত এলাকায়।

    “কিন্তু আমি সব কাজ করে দেবো। তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। ”

    “না।”

    আমি ওকে ওর আনন্দহীন দারিদ্র্যে ওর বেঞ্চে ফেলে চলে যেতুম। আমি স্টোভের কাছে যেতুম কিংবা মদের জমায়েতে আর দিনের বেলায় কুড়িয়ে পাওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফুঁকতুম, একজন দাঁত-খেঁচানো আন্দালুসীয়ের সঙ্গে, যার নোংরা শাদা পশমের সোয়েটার ওর ধড় আর পেশিকে ফুলিয়ে তুলতো। নিজের দুহাত কচলে, যেমন বুড়োরা করে, সালভাদোর ওর বেঞ্চ ছেড়ে সার্বজনিক রান্নাঘরে ঢুকে সুপ তৈরি করতে আরম্ভ করতো কিংবা গ্রিলের ওপরে একটা মাছ বসিয়ে দিতো। একবার ও প্রস্তাব দিলো যে হেউলভাতে যাওয়া যাক কমলালেবু তোলার মজুরের কাজ করতে। তখন সন্ধ্যা আর ও অনেকের কাছে অপমানিত হয়েছিল, আমার হয়ে ভিক্ষা করার জন্যে অনেক ধমক খেয়েছিল, তবুও আমাকে ভর্ৎসনা করে ক্রিয়োলায় আমার যৎসামান্য সফলতার কথা বলতে পারলো।

    “সত্যিই, তুমি যখন কোনো খদ্দেরকে বেছে নাও, তোমার উচিত তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া।”

    আমরা হোটেলের মালিকের সামনেই ঝগড়া করছিলুম, যে আমাদের বাইরে বের করে দিতে চাইছিল। সালভাদোর আর আমি তাই ঠিক করলুম পরের দিন দুটো কম্বল চুরি করবো আর দক্ষিণে যাবার মালগাড়িতে লুকিয়ে রাখবো। কিন্তু আমি এমন চালাক-চতুর ছিলুম যে সেদিন সন্ধ্যাতেই একজন কাস্টমস অফিসারের হাফকোট গেঁড়িয়ে আনলুম। যখন ডক দিয়ে যাচ্ছিলুম, যেখানে ওদের পাহারাদাররা থাকে, একজন অফিসার আমাকে ডাকলো। সে যা চাইলো আমি তাইই করলুম, সান্ত্রি কুঠরির ভেতরে। বীর্যপাতের পর ( সম্ভবত, আমাকে সেকথা বলার সাহস ছিল না লোকটার, ও একটা ফোয়ারার কাছে ধুতে চলে গেলো ), এক মুহূর্তের জন্য ও আমাকে একা ছেড়ে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে আমো ওর পশমের বড়ো কালো উর্দি নিয়ে কেটে পড়লুম। আমি হোটেলে ফেরার আগে সেটা পরে নিলুম, আমি আমি জানতুম দ্ব্যর্থকতার মজা, তখনও পর্যন্ত বিশ্বাসভঙ্গের আনন্দ নয়, যদিও যে প্রতারণামূলক বিভ্রান্তি আমাকে বুনিয়াদি পরস্পরবিরোধিতাকে অস্বীকার করতে বাধ্য করবে তার বিরচন ইতিমধ্যে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। কাফের দরোজাটা খোলার সময়ে সামনেই দেখলুম সালভাদোর। ভিখারিদের মধ্যে ও ছিল সবচেয়ে বিষণ্ণ। ওর মুখের বৈশিষ্ট্য, এমনকি গঠনবিন্যাস ছিল অনেকটা কাঠের গুঁড়োর মতন যা দিয়ে কাফের মেঝে ঢাকা থাকতো। তক্ষুনি আমি স্তিলিতানোকে দেখতে পেলুম জুয়াড়িদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাদের চোখাচোখি হলো। ওর চাউনি আমার দিকে রইলো কিছুক্ষণ, একটু লজ্জিতও হলো। আমি কালো উর্দিটা খুলে ফেললুম, আর সবাই মিলে সেটা নেবার জন্য দরাদরি আরম্ভ করে দিলো। তাতে অংশ না নিয়ে স্তিলিতানো তাকিয়ে থাকলো তুচ্ছ দর-কষাকষির দিকে।

    “যদি চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি করো,” আমি বললুম। “তোমরা মনোস্হির করো, কাস্টমসের লোকটা নির্ঘাৎ আমার খোঁজে আসবে। ”

    তাস-খেলুড়েরা তৎপর হয়ে উঠলো। ওরা সবাই এরকম অজুহাতের ব্যাপার জানে। যখন তাসের শাফল আমাকে ওর দিকে নিয়ে এলো, স্তিলিতানো ফরাসি ভাষায় বলল :

    “তুমি প্যারিস থেকে ?”

    “হ্যাঁ। কেন ?”

    “না, এমনিই, কোনো কারণ নেই। ”

    যদিও ও-ই প্রথম এগিয়ে এসেছিল, আমি জানতুম, যখন উত্তর দিলুম, একজন অন্তমূখী মানুষের মরিয়া আচরণের ইঙ্গিত-ইশারা, যখন সে কোনো যুবককে চায়। আমার বিভ্রান্তিকে লুকোবার জন্য, আমি শ্বাসরুদ্ধ হবার ভান করলুম, আমার চারপাশে মুহূর্তটার হইচই ছিল। ও বলল, “নিজের জন্যে তুমি বেশ ভালোই কাজ করছ।”

    আমি বুঝতে পারলুম যে এই প্রশস্তি বেশ চালাকি করে দেয়া হলো, কিন্তু ভিখারিদের মাঝে কতো সৌম্যকান্তি যে স্তিলিতানো ছিল ( আমি তখনও ওর নাম জানতুম না ) ! ওর একটা হাতে বেশ বড়ো ব্যাণ্ডেজ বাঁধা আর বুকের কাছে ঝোলানো, কিন্তু আমি জানতুম ওই হাতটা ওর নেই। স্তিলিতানোকে কাফে বা রাস্তায় কোনোটাতেই ঘন ঘন দেখা যেতো না।

    “উর্দিটার জন্য কতো দাম দিতে হবে ?”

    “তুমি আমাকে এর দাম দিতে চাও ?

    “কেন দেবো না ?”

    “কিসের মাধ্যমে দেবে ?”

    “তুমি কি ভয় পাচ্ছো ?”

    “তুমি কোথা থেকে এসেছো ?”

    “সার্বিয়া। আমি ফরাসি সৈন্যবাহিনীর লোক। আমি বাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছি।”

    আমি স্বস্তি পেলুম। বিপর্যস্ত। যে আবেগ আমার মধ্যে গড়ে উঠলো তা এক শূন্যতার, যাতে ভরে গেল বিয়ের দৃশ্যের এক স্মৃতি। নাচের হলঘরে সৈন্যরা দলবেঁধে নাচছিল, আমি ওদের ওয়ালৎজ নাচ দেখছিলুম। সে সময়ে আমার মনে হচ্ছিল দুজন সৈনিকের অদর্শন সেখানে সামগ্রিক। ওরা আবেগে বয়ে যাচ্ছিল। যদিও প্রথম দিকে ‘রামোনা’ পর্বে তাদের নাচ ছিল অপাপবিদ্ধ, কিন্তু তাইই কি থাকবে আমাদের উপস্হিতিতে, ওরা হাসি বদল করে বিয়ে করে নিলো, যেমন প্রেমিক-প্রেমিকারা আঙটি বদল করে ? অদৃশ্য যাজকদের অনুজ্ঞা সত্বেও সৈন্যরা উত্তর দিল, “আমি দায়িত্ব গ্রহণ করছি।” প্রত্যেকে ছিল দম্পতি, উভয়ই মুখের ওপরে কালো জাল ঢেকে আর এক উর্দি ( শাদা চামড়া, কাঁধের লাল আর সবুজ দড়ি )। ওরা থেমে-থেমে পরস্পরের কোমলতা আর স্ত্রীসুলভ শিষ্টতা অদলবদল করছিল। আবেগকে উঁচু স্তরে বজায় রাখার জন্য, ওরা নিজেদের নাচকে ধিমেতালে করছিল, যখন কিনা তাদের লিঙ্গ, দীর্ঘ কুচকাওয়াজে ক্লান্ত, পরস্পরকে রুক্ষ ডেনিমের ব্যারিকেডের আড়াল থেকে বিপজ্জনকভাবে ভয় দেখাচ্ছিল আর চ্যালেঞ্জ করছিল। পালিশ-করা চামড়া তৈরি শিরস্ত্রাণের মুখাবরণে ঠোকাঠুকি লাগছিল। আমি বুঝতে পারছিলুম স্তিলিতানো আমাকে আয়ত্ত করতে চাইছিল। আমি সেয়ানার খেলা খেলছিলুম:

    “তা থেকে প্রমাণ হয় না যে তুমি দাম দিতে পারবে।”

    “আমাকে বিশ্বাস করো।”

    অমন কঠিন মুখ, অমন শক্তপোক্ত দেহের মানুষ, আমাকে বলছে বিশ্বাস করতে। সালভাদোর আমাদের দেখছিল। ও আমাদের বোঝাপড়া সম্পর্কে জানতো আর টের পেলো যে আমরা ওর ওর একাকীত্বের, সর্বনাশের নির্ণয় নিয়ে ফেলেছি। কোপনস্বভাব আর বিশুদ্ধ, আমি ছিলুম জীবনে ফিরিয়ে দেয়া পরীর দেশের নাটক। যখন ওয়ালৎজ নাচ থামলো, সৈন্য দুজন নিজেদের থেকে দূরে সরে গেলো। আর জাঁকজমকভরা ও বিহ্বল দুটি অর্ধাংশের প্রত্যেকে ইতস্তত করলো, আর, অদর্শন এড়ানোর আনন্দে, চলে গেলো, মাথা নামিয়ে, পরের ওয়ালৎজের জন্য কোনো যুবতীর দিকে।

    “দাম দেবার জন্য আমি তোমাকে দুদিন সময় দেবো,” আমি বললুম। “আমি মালকড়ি চাই। আমিও সৈন্যবাহিনীতে ছিলুম। পালিয়ে এসেছি। তোমার মতন।”

    “তুমি পেয়ে যাবে। ”

    আমি উর্দিটা দিয়ে দিলুম ওকে। ও নিজের একটা হাতে নিলো আর আমাকে ফেরত দিয়ে দিলো। ও মৃদু হাসলো, যদিও উদ্ধতভাবে, আর বলল, “ওটা গুটিয়ে ফ্যালো।” আর তার সঙ্গে রহস্যোচ্ছলে যোগ করলো, “ততক্ষণে আমি একটা গুটিয়ে নিই। ”

    অভিব্যক্তিটা সকলেই জানে : “স্কেটিংবোর্ড গুটিয়ে ফেলা। ” চোখের পাতা না ফেলে, ও যা বলল আমি তাই করলুম। উর্দিটা হোটেল মালিকের মালপত্র লুকোবার জায়গায় তক্ষুনি লোপাট হয়ে গেলো। হয়তো এই মামুলি চুরি আমার মুখকে উজ্বল করে থাকবে, কিংবা স্তিলিতানো ভালো সাজার অভিনয় করছিল ; ও যোগ করলো : “তুমি তাহলে বেল-অ্যাব-এর একজন প্রাক্তনীকে মদ খাওয়াচ্ছো ?”

    এক গেলাস মদের দাম দুই সউ। আমার পকেটে ছিল চারটে, কিন্তু আমি সেগুলো সালভাদোরকে ধার দিলুম যে আমাদের দেখছিল।

    “আমি কপর্দকশূন্য,” স্তিলিতানো গর্বভরে বলল।

    তাস খেলুড়েরা নতুন গোষ্ঠী তৈরি করছিল যার দরুণ কিছু এক মুহূর্তের জন্যে আমি সালভাদোর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলুম। আমি দাঁতের ফাঁকে বিড়বিড় করলুম, “ আমার কাছে চার সউ আছে আর আমি সেগুলো তোমাকে পাচার করে দিচ্ছি, কিন্তু দাম তোমাকেই দিতে হবে। ”

    স্তিলিতানো মৃদু হাসলো। আমি পরাজিত। আমরা একটা টেবিলে বসলুম। ও সৈন্যবাহিনীর কথা বলা আরম্ভ করেছিল, কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু অন্য কথা বলা শুরু করলো।

    “আমার কেমন মনে হচ্ছে আমি তোমাকে আগে কোথাও দেখেছি।”

    আমার কথা বলতে হলে, আমি স্মৃতিতে সবকিছু ধরে রেখেছিলুম।

    আমার অদৃশ্য দড়িদড়া আঁকড়ে ধরা জরুরি ছিল। আমি কূজন করতে পারতুম। শব্দাবলী, কিংবা আমার স্বরভঙ্গী, কেবল আমার আকুলতাকে প্রকাশ করতে পারতো না, আমি শুধু গান শোনাতে পারতুম না, আমার কন্ঠ থেকে বেরোতে পারতো বুনো প্রণয়খেলার ডাক। হয়তো আমার ঘাড়ে শাদা পালকগোছা গজিয়ে উঠেছিল। একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা সব সময়ে সম্ভব। আমাদের জন্য অপেক্ষা করে রূপান্তরিত আকৃতি। আতঙ্ক আমাকে রক্ষা করলো।

    আমি আকৃতির রূপান্তরের ভয়ে বসবাস করেছি। পাঠককে পুরো সচেতন করার জন্য, তারা দেখছে যে প্রেম আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে -- এটা কেবল বাগ্মীতার ব্যাপার নয় যার জন্য তুলনা দরকার -- বাজপাখির মতন -- সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভীতির জন্য আমি কাছিমঘুঘুর উদাহরণ ব্যবহার করি। জানি না সেই মুহূর্তে কেমন অনুভব করেছিলুম, কিন্তু আজকে আমি যা চাই তা হলো স্তিলিতানো সম্পর্কে আমার কল্পনাশক্তি, কেননা আমার দুর্দশার তুলনা করা যায় একটা নিষ্ঠুর পাখি আর তার শিকারের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে। ( আমি যদি আমার ঘাড় মৃদু কূজনে ফুলে ওঠা অনুভব না করতুম তাহলে আমি বরং লালবুক রবিনপাখির কথা বলতুম)।

    এক বিদকুটে প্রাণী দেখা দেবে যদি আমার প্রতিটি আবেগ একটা পশু হয়ে দেখা দ্যায় : আমার ঘাড়ে কেউটের ক্রোধ হিসহিস করে ; সেই একই কেউটে আমার লিঙ্গকে ফোলায় ; আমার বিনয়ের অভাব থেকে পয়দা হয়েছে আমার ঘোড়াগুলো আর নাগরদোলা….এক কাছিমঘুঘুর যার খসখসে স্বর আমি ধরে রেখেছি, যা স্তিলিতানো লক্ষ্য করেছিল। আমি কাশলুম।

    প্যারালেলোর পেছনে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল যেখানে মাস্তানরা তাস খেলতো। ( প্যারালেলো হলো বারসেলোনার একটা অ্যাভেনিউ যা বিখ্যাত রামব্লাসের সমান্তরাল। আই দুই প্রশস্ত রাস্তার মাঝে, আক অন্ধকার, নোংরা, সরু গলি গযে তুলেছে বারিও চিনো জায়গাটাকে। ) মেঝেতে বসে, ওরা তাস-টাস খেলতে থাকে ; ধুলোর ওপরে চারচৌকো কাপড় বিছিয়ে তাসগুলো সাজিয়ে রাখে। এক তরুণ জিপসি তার মধ্যে একটা খেলা চালাতো, আর আমি আমার পকেটের কয়েকটা সউয়ের ঝুঁকি নিলুম। আমি জুয়াড়ি নই। ধনীদের ক্যাসিনো আমাকে আকৃষ্ট করে না। বিজলিবাতির ঝাড়লন্ঠনে আমি সিঁটিয়ে যাই। মার্জিত জুয়াড়ির মেকি ঘনিষ্ঠতা দেখে আমার বমি পায়। আর বল, রুলেট আর ছোট্টো ঘোড়াগুলো নিয়ে খেলার অসম্ভাব্যতা আমাকে অনুৎসাহিত করে, কিন্তু আমার ভালো লাগতো মাস্তানদের ধুলো, নোংরা আর চালবাজি।

    আমি সামনে দিকে ঝুঁকে জিপসিটাকে পাশ থেকে দেখলুম, বালিশে চাপা, কোনও বেদনার কারণে। আমি ওর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দেখি ওর মুখবিকৃতি, কিন্তু ওর ব্যথার প্রভাও। আমি এটা প্রায়ই দেখেছি রাস্তায় বসে থাকা ছোঁড়াদের তেলচিটে মুখে। এখানকার পুরো জনসমপ্রদায় জেতা কিংবা হারার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি উরু ক্লান্তি কিংবা উদ্বেগে কাঁপছে। সেইদিনকার আবহাওয়া ছিল আশঙ্কাজনক। আমি তরুণ স্পেনিয়দের যৌব অধীরতায় আটক পড়ে গিয়েছিলুম। আমি খেললুম আর জিতলুম। আমি প্রত্যেকটা দান জিতলুম। খেলার সময়ে আমি একটাও কথা বলিনি। তাছাযা, জিপসিটা ছিল আমার অচেনা। নিয়ম অনুযায়ী জেতা টাকাকড়ি নিয়ে আমার কেটে পড়ার কথা। ছেলেটাকে দেখতে আতো সুন্দর যে ওইভাবে ওকে ছেড়ে কেটে পড়াটা হবে সৌন্দর্যের অবহেলা। ও হঠাৎ দুঃখি হয়ে উঠলো, গরম আর অবসাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ও মুখ নত করে নিয়েছিল। আমি দয়া করে ওকে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিলুম। আচমকা অবাক হয়ে, ও সেগুলো নিয়ে নিলো আর আমাকে ধন্যবাদ জানালো।

    “হ্যালো, পেপে,” একজন পাগলাটে কালচে চেহারার খোঁড়া লোক ডাক দিয়ে উঠলো আমার পাশ দিয়ে লেংচে যেতে যেতে।

    “পেপে,” আমি নিজেকে বললুম, “ওর নাম পেপে।” জায়গাটা ছাড়লুম, কেননা আমি ওর কৃশকায়, প্রায় নারীসুলভ কমনীয় ছোটো হাত দুটো দেখেছিলুম। কিন্তু সবে কয়েক পা এগিয়েছি চোর, বেশ্যা, ভিখারি আর পায়ুকামীদের ছেড়ে, কেউ একজন আমার কাঁধে হাত রাখলো। ও ছিল পেপে। ও খেলা ছেড়ে চলে এসেছে। ও আমাকে স্প্যানিশে বলল :

    “আমার নাম পেপে।”

    “আমি হুয়ান।”

    ‘চলো, মদ খাওয়া যাক।”

    ও আমার চেয়ে লম্বা ছিল না। ওর মুখ, যা আমি ওপর থেকে দেখেছিলুম যখন ও মাটিতে বসেছিল, কম পুষ্ট মনে হলো। দেহ কাঠামো সুশীল।

    “ছেলেটা একটা মেয়ে,” আমি ভাবলুম, ওর কোমল হাতের কথা মনে করে, আর আমি অনুভব করলুম ওর সঙ্গ আমাকে বিরক্ত করবে। ও এখনই ঠিক করে নিলো যে টাকাটা আমি জিতেছিলুম তা মদ খেয়ে ওড়াবে। আমরা শুঁড়িখানাগুলোয় চক্কর মারলুম, আর যতোক্ষণ একসঙ্গে ছিলুম ওকে বেশ কমনীয় লাগছিল। ওর পরনে ছিল, শার্টের বদলে, নিচু গলা নীল জার্সি। খোলা জায়গাটা থেকে দেখা যাচ্ছিল একটা মোটা ঘাড়, ওর মাথার মতনই চওড়া। যখন ও মাথা ঘোরালো, বুক না ঘুরিয়ে, একটা মোটা পেশিতন্তু জেগে উঠলো। আমি ওর দেহটা কল্পনা করার চেষ্টা করলুম, আর, কোমল প্রায় নরম হাত সত্বেও, মনে হলো তা বেশ পুরুষ্টু, কেননা ওর উরুগুলো ট্রাউজারের পাতলা কাপড়কে ভরে দিয়েছিল। আবহাওয়া ছিল উষ্ণ। ঝড় ওঠেনি। আসপাশের তাস খেলুড়েদের স্নায়ুচাপ হয়ে উঠেছিল তীব্র। বেশ্যাগুলোকে মনে হচ্ছিল গাগতরে। ধুলো আর রোদ ছিল কষ্টকর। আমরা তেমন মদ খাইনি, খেলুম লেমোনেড। আমরা হকারদের কাছে বসলুম আর মাঝেসাজে এক-আধটা কথা বললুম। ও হাসি বজায় রেখেছিল, একধরনের ক্লান্তিময়তায়। মনে হচ্ছিল ও আমাকে প্রশ্রয় দিতে চাইছে। ও কি সন্দেহ করছিল যে ওর সুন্দর মুখ আমার ভালো লেগেছে ? আমি জানতে পারলুম না, কিন্তু ও আর এগোলো না। তাছাড়া, আমারও ওর মতন একই ধূর্ত চাউনি ; ভালো পোশাক পরে যারা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল তাদের কাছে আমি বোধহয় অমঙ্গলের সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছি ; ছেলেটার যৌবন আর কলুষ আমার মতনই, আর আমি ছিলুম ফরাসি। সন্ধ্যার দিকে ও জুয়া খেলতে চাইলো, কিন্তু সব জায়গাগুলো দখল হয়ে গিয়েছিল বলে দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমরা খেলুড়েদের আসেপাশে ঘুরে বেড়ালুম। বেশ্যাগুলোর গা ঘেঁষে ও যখন যাচ্ছিল, পেপে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করলো ওদের সঙ্গে। কাউকে-কাউকে চিমটি কাটলো। গরম হয়ে উঠছিল অসহ্য। আকাশ আর মাটি হয়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠ। ভিযের স্নায়ুচাপ বিরক্তিকর লাগছিল। জিপসি ছোঁড়াটার ওপর ছেয়ে গিয়েছিল ধৈর্যচ্যুতি কেননা ও নির্ণয় নিতে পারছিল না কোন খেলাটায় যোগ দেবে। নিজের পকেটের টাকাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। হঠাৎ ও আমার বাহু আঁকড়ে ধরলো।

    “এসো !”

    প্যারালেলোতে কয়েক পা দূরে একটা বিশ্রামাগারে ও আমাকে নিয়ে এলো। সেটা চালাচ্ছিল বুড়িরা। হঠাৎ অমন নির্ণয়ে অবাক হয়ে আমি জিগ্যেস করলুম :

    ‘কী করতে চলেছ তুমি ?”

    “আমার জন্য অপেক্ষা করো। ”

    “কেন ?”

    ও স্প্যানিশ একটা শব্দ ব্যবহার করে উত্তর দিলো যা আমি বুঝতে পারলুম না। সে কথা ওকে বললুম, এক বুড়ির সামনে, যে তার দুটো সউয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল, শুনে হাসিতে ফেটে পয। ছোঁড়াটা আর স্বমেহনের ইঙ্গিত করলো। যখন ও বেরিয়ে এলো, ওর মুখে রঙ ধরে গিয়েছিল। ও তখনও হাসছিল।

    “এখন সব ঠিক আছে। আমি তৈরি। ”

    ঘটনাটা থেকে আমি শিখলুম যে, বড়ো দাঁও মারার আগে, খেলোয়াড়রা ওখানে ঢুকে স্বমেহন করে যাতে নিজেদের শান্ত করে খেলতে পারে। আমরা জুয়ার জমঘটে ফিরে গেলুম। পেপে একটা গোষ্ঠীকে বেছে নিলো। ও হেরে গেলো। ওর কাছে যতো টাকা ছিল সব হেরে গেলো। আমি ওকে থামাতে চেষ্টা করেছিলুম ; ততক্ষণে সব হেরে বসে আছে। খেলার যেমন নিয়ম, যে লোকটা টাকাকড়ি ধার দিচ্ছিল বা জমা রাখছিল তাকে বলল তহবিল থেকে ওকে পরের খেলার জন্য ধার দিতে। লোকটা প্রত্যাখ্যান করলো। আমার তখন মনে হলো যা বৈশিষ্ট্যে জিপসির ভদ্রতা গড়া তা টকে গেল, যেমন দুধ ছানা কেটে যায়, আর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো যেরকম ক্রোধ আমি আগে কারোর দেখিনি। জিপসি ছেলেটা মহাজনটার টাকাকড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তুলে নিলো। মহাজন ওর পেছনে ছুটে লাথি মারার চেষ্টা করলো। পেপে পাশ কাটিয়ে নিলো। ও টাকাগুলো আমার হাতে দিলো, কিন্তু যতোক্ষণে আমি সেগুলো পকেটে রাখতে যাবো ছোঁড়াটার ছুরি বেরিয়ে এসেছে। ছুরিটা ও বসিয়ে দিলো মহাজনের বুকে, একজন ঢ্যাঙা, তামাটে লোক, যে পড়ে গেলো মাসটিতে আর যে, তার ত্বকের তামাটে রঙ সত্বেও, ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, গুটিয়ে গেলো, ছটফট করে ধুলোর ওপরে মরে গেলো। জীবনে প্রথমবার আমি কাউকে পটল তুলতে দেখলুম। পেপে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যখন আমি লাশ থেকে দৃষ্টি ঘোরালুম, ওপর দিকে চাইলুম, সেখানে, মুখে মৃদু হাসি নিয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে স্তিলিতানো। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। মৃত লোকটা আর সৌম্যকান্তি মানুষেরা যেন একই সোনালি ধুলোতে মিশে গেছে, পৃথিবীর সব জায়গা থেকে এসে উপস্হিত নাবিক, সৈন্য, মাস্তান আর চোরেদের সঙ্গে। পৃথিবী আর ঘুরছিল না : স্তিলিতানোকে নিয়ে তা সূর্যের কাছে কাঁপছিল। একই সময়ে আমি পরিচিত হলুম মৃত্যু আর ভালোবাসার সঙ্গে। এই দর্শনশক্তি, যদিও ক্ষণিকের, তবু আমি সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না কেননা আমার ভয় ধরে গিয়েছিল যে আমাকে পেপের সঙ্গে দেখে মৃত লোকটার বন্ধুরা আমার পকেটে রাখা টাকাকড়ি কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু আমি যখন কেটে পড়ছি, আমার স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠলো আর পরবর্তী দৃশ্যের কথা মনে পড়িয়ে দিলো, যা আমার মনে হয়েছিল সমারোহপূর্ণ : “হত্যাটা, এক সৌম্যকান্ত বালকের দ্বারা, একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে যার রোদেপোড়া ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে, মৃত্যুর রঙ ধরে গেলো, আর তা আরাম করে দেখলো একজন দীর্ঘদেহী ফর্সা লোক যার সঙ্গে আমি সম্প্রতি গোপনে বাগদত্ত হয়েছি।” আমার চাউনি ওর দিকে দ্রুত হলেও, আমার হাতে সময় ছিল স্তিলিতানোর পালোয়ানি পৌরুষকে স্বীকার করা আর দেখা, দুই ঠোঁটের মাঝে, আধখোলা মুখে, একটা শাদা, থুতুর গোলা, শাদা পোকার মতন মোটা, যা ও ঘোরাচ্ছিল, ওপর থেকে নিচে যতক্ষণ না তা ওর হাঁ-মুখ ঢেকে ফেলছে। ও ধুলোর ওপরে খালি পায়ে দাঁড়িয়েছিল। ওর ঠ্যাঙ ঢাকা ছিল ছেঁড়া নোংরা ফ্যাকাশে ডেনিম ট্রাউজারে। ওর সবুজ শার্টের হাতা ছিল গোটানো, তার একটা ওর কাটা হাতেরর ওপর পর্যন্ত ; কবজিটা, যেখানে সেলাই করা চামড়ায় একটা ফ্যাকাশে গোলাপি ক্ষতচিহ্ণ দেখা যাচ্ছিল, তা ছিল সঙ্কুচিত।

    বিয়োগাত্মক আকাশের তলায়, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক ভূচিত্র পার হয়ে যাবার ছিল যখন রাতের বেলায় স্তিলিতানো আমার হাত ধরলো। কী ছিল সেই তরল জিনিসটার বৈশিষ্ট্য যা ওর কাছ থেকে আমার কাছে ধাক্কা দিয়ে চালান করা হতো ? আমি বিপজ্জনক নদীতীরে হেঁটেছি, উদয় হয়েছি বিষণ্ণ সমভূমিতে, শুনেছি সমুদ্রের আওয়াজ। যখন সিঁড়িবদল হলো, বলা চলে আমি ওকে ছুঁইনি : ও ছিল জগতের ওস্তাদ। সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলোর স্মৃতি নিয়ে, আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতে পারি, শ্বাসহীন উড়াল, অনুসৃতি, পৃথিবীর সেই সব দেশের যেখানে আমি কখনও যাবো না।


  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে প্রতিক্রিয়া দিন