

যাঁরা ব্রহ্মচারীর মতো জীবন যাপন করেন, তাঁদের উপাধি হয় ব্রহ্মচারী। একটি কম সমর্থিত মত হল, যে কেশবচন্দ্র ভারতী শ্রীচৈতন্যদেবকে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা দেন। তাঁর বড়দাদা গোপালচন্দ্র ভারতী দীক্ষার পরে নিজেদের মুখোপাধ্যায় উপাধি ত্যাগ করে ব্রহ্মচারী উপাধি গ্রহণ করেন। এদের নবম বা দশম বংশধর হচ্ছেন উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী। এক অনন্যসাধারণ মেধার অধিকারী এই মানুষটির গ্র্যাজুয়েশন ১৮৯৩ সালে হুগলি মহসিন কলেজ থেকে – অংক এবং কেমিস্ট্রি নিয়ে ডাবল অনার্স, Thysetes মেডেল পান। এরপরে ১৮৯৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কেমিস্ট্রিতে এমএ পাশ, সাথে গ্রিফিথ মেমোরিয়াল প্রাইজ। একই সময়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। এলএমএস ডিগ্রি পান ১৮৯৯ সালে। ১৯০০ সালে এমবি ডিগ্রি – মেডিসিন এবং সার্জারি দু’টিতেই প্রথম হয়ে গুডিভ এবং ম্যাকলিওডস মেডেল পান। ১৯০২ সালে এমডি পাশ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপরে ১৯০৪ সালে পিএইচডি অর্জন। বিষয় ছিল “Studies on Haemolysis”। তাঁর পিএইচডির থিসিসের সংক্ষিপ্ত এবং উন্নত চেহারার নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় বায়োকেমিক্যাল জার্নাল-এ ১৯০৯ সালে “Some Observations on the Haemolysis of Blood by Hyposmotic and Hyperosmotic Solutions of Sodium Chloride” শিরোনামে। এছাড়াও ক্যালকাটা স্কুল অফ ট্রপিকাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন থেকে Mente মেডেল এবং এশিয়াটিক সোসাইটির উইলিয়াম জোন্স মেডেল লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রায় সম্পূর্ণ জীবন কেটেছে গবেষণার নির্ভুল লক্ষ্যে। প্রায় ১৫০টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে নেচার, ল্যান্সেট, ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল, বায়োকেমিক্যাল জার্নাল, ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ বা ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেট-এর মতো জার্নালগুলোতে। ... ...

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বনগাঁয়, উদ্বাস্তু-শিবিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কলেরার প্রাদুর্ভাব। স্যালাইনের জোগান যথেষ্ট না হওয়ায় মুত্যু-মিছিল। একসময় দেখা গেল, মোট আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৩০%। বনগাঁ উদ্বাস্তু-শিবিরে এইসময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পাঠানো হল ডা. দিলীপ মহলানবিশকে.... কলেরার জীবাণু দূষিত জল আর খাবার দিয়ে শরীরে ঢোকে আর বংশবৃদ্ধি করে এক বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি করে, যার প্রভাবে রোগী উদরাময়ে আক্রান্ত হয়। কলেরার জীবাণুর আবিষ্কারক জার্মান বিজ্ঞানী ডা রবার্ট কখ (১৮৪৩-১৯১০) পর্যন্ত বিশ্বাস করতেন, এই পদার্থ আমাদের অন্ত্র থেকে শোষিত হয়ে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। ডা. শম্ভুনাথ দে অত্যন্ত সরল এক পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রমাণ করেন, কলেরার জীবাণু-নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ জীবাণু-কোষের বাইরে চলে আসে এবং রোগের যাবতীয় লক্ষণ সৃষ্টি করে আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রের মধ্যে থেকেই.... আমার ক্ষোভের সীমা ছিল না, যখন ব্যক্তিগত আগ্রহে তাঁর অবদান সম্বন্ধে বইপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, যে-শহরে আমার বাড়ি, সেই শহরেরই এক কোণে তিনি থাকতেন- দুই গেঁয়ো যোগীর গল্প .... ... ...

নারী অধিকার”, “গণতন্ত্র”, “জাতির গঠন” এগুলি আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোর লক্ষ্য ছিল, এসব কথা আফগানিস্তানে ঠাট্টারই নামান্তর! আমেরিকা আফগানিস্তানে এসেছিল এই অঞ্চলের স্থিতি বিঘ্নিত করে একে সন্ত্রাসবাদের মুক্ত-ভূমিতে পরিণত করার মাধ্যমে এর আশেপাশে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলির, বিশেষত চিন এবং রাশিয়াকে ঘিরে ধরার পাশাপাশি এই অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিকে ছিবড়ে করে শুষে নেবার লক্ষ্য নিয়ে। অবশ্যই এরকম ভাবার কোন কারণ নেই যে মার্কিন সরকার নিজেদের বাহিনীর এরকম লজ্জাজনক অপসারণ চেয়েছিল, যার ফলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আবার মার্কিন বাহিনীকে ফিরে আসতে হল বিমানবন্দরগুলি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যাতে তাদের আমলা এবং অন্যান্য কর্মীদের নিরাপদে বার করে নিয়ে যাওয়া যায়। আমরা বিশ্বাস করি, আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গেছে তাদের তৈরি পশুদের (তালিবান) কাছে পরাজিত হয়ে নয়, ফিরেছে তাদের নিজস্ব দুর্বলতার কারণে। এই অপসারণের দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে বলে আমরা মনে করি। ... ...

সিন্ধুলিপি যেমন প্রায় দেড়শো বছর ধরে নানান পণ্ডিত গবেষকের কাছে একটি খুব শক্ত চ্যালেঞ্জিং সমস্যা হিসেবে আদৃত হয়েছে, তেমনই অনেক অত্যুৎসাহী পাঠোদ্ধারকের নানান অদ্ভুত পাঠোদ্ধারের দাবিতে লাঞ্ছিতও হয়েছে খুব বেশী। এই ভুলভাল পাঠোদ্ধার সম্পর্কে খুব মজার একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন বিশ্ববিশ্রুত ভারততাত্বিক আসকো পারপোলা (Asko Parpola), তাঁর ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত "Deciphering the Indus script" নামের বিখ্যাত বইতে। পারপোলা দেখিয়েছেন যে, স্প্যানিশ মিশনারি পণ্ডিত ফাদার হেরাস (Enric Heras de Sicars ওরফে Henry Heras) তাঁর ১৯৫৩ সালে লেখা একটি বইতে সিন্ধুলিপির অদ্ভুত সব প্রোটো-দ্রাবিড়ীয় পাঠোদ্ধার ক'রে খুব বিখ্যাত হয়েছিলেন। এমনকি হেরাসের গবেষণার সম্মানার্থে ভারতীয় সিকিউরিটি প্রেস উনিশশো একাশি সালে হেরাসের ছবি আর মহেঞ্জোদারোয় পাওয়া একটি সিন্ধুলিপিযুক্ত সীলের ছবি পাশাপাশি রেখে প্রায় কুড়িলক্ষ ৩৫ পয়সার ডাকটিকিটও ছাপায়। এখন দেখা যাক ফাদার হেরাসের পাঠোদ্ধারের ধরণ ঠিক কিরকম ছিল! ... ...

আমরা খুঁজে পাই আমাদের চরিত্রদের, না তারা কোন অভিজাত শহরের উচ্চ মধ্যবিত্ত নয়, নয় কোন অলীক রূপকথার নায়ক নায়িকা কিংবা রহস্যময়ী কোন অতি-মানবী। আমরা দেখতে পাই তারা নেহাতই ছাপোষা জীবনের মালিক। ব্যক্তিগত কিছু কথাবার্তা চলে, দুটি চরিত্রের ভেতর আমরা দর্শক একটু একটু করে ঢুকি। ছবির এই অংশে ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং জয়া আহসান উভয়ের অভিনয় যথাযথ, চিত্রগ্রহণ ও মোটামুটি ভাবে সাবেকি, যেন অতি পরিচিত বিষয় আমরা দেখতে পাই অতি সহজে ভাবেই। ছবির আসন্ন ভবিষ্যতের জন্য, পরিচালকের লুকোনো তাসে ট্রাম্প করার প্রয়োজনে যে এ এক প্রস্তুতি চাল, তা দর্শক হিসাবে আমরা ধরতে পারিনা। এর কিছু মুহূর্ত পর আমরা যখন তাদের নতুন ভাবে আবিষ্কার করা শুরু করি, আমরা বুঝি যে সহজ সরল ভঙ্গির বহিঃ কাঠামোয় লেখক তথা পরিচালক আসলে হাঁটতে চান শহুরে মনস্তত্ত্বের জটিল সারণি ধরে। ... ...

আফগানরা স্বাধীনচেতা জাতি। ব্রিটিশরাও তাঁদের পুরোপুরি পদানত করতে পারেনি। তারা ব্রিটিশদের রক্ষাধীন ছিল, প্রটেক্টোরেট। গত চার দশকে মহাপরাক্রমশালী সোভিয়েত ইউনিয়ান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেউই তাঁদের কব্জা করতে পারেনি। দেশটা জ্ঞাতি ও উপজাতি রেষারেষি ও দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ। দেশের বিভিন্ন পকেটে, দুর্গম অঞ্চলে যুদ্ধবাজ সামন্তসর্দারদের সার্বিক আধিপত্য, যেখানে ধর্মের চেয়েও নিজের ক্ল্যান বা উপজাতির প্রতি আনুগত্যই ছিল প্রধান। আশির দশক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ানকে আটকানোর জন্য উগ্র ধর্মান্ধ সৌদি জঙ্গিদের মাধ্যমে আমেরিকানরা প্রথম এখানে ধর্মীয় মৌলবাদ রফতানি করে। আজকের তালিবানি উত্থান সেই নীতিরই বিষফল। এটা নিশ্চিত যে তালিবানিরা পালটাবে না। প্রতিদিন মধ্যযুগীয় বর্বরতার নতুন সব নমুনা প্রকাশ্যে আসছে। কিছু অসমসাহসী মহিলা এবং সামান্য কিছু জায়গায় সর্দারদের মিলিশিয়া প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে। এটা চলবে, কারণ আফগানিস্তান এমন একটা দেশ যেখানে যুদ্ধ চিরন্তন। একটাই রাস্তা, আফগানদের তাঁদের নিজেদের মতো থাকতে দেওয়া হোক। হয়তো তাতে আফগানিস্তান আগামী দিনে সৌদি আরবের মতো একটা ‘সভ্য’, ‘আধুনিক’ (যেখানে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি পাওয়ার জন্য কয়েক দশক ধরে অপেক্ষা করতে হয়) মৌলবাদী দেশ হয়ে উঠতে পারবে। ইতিহাস বারবার শিক্ষা দিচ্ছে যে বহিরাগত শক্তি সেখানে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করলে শুধুমাত্র হিতে বিপরীতই হবে। ... ...

রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশন বলপূর্বক উচ্ছেদকে মানবাধিকারের উপর জঘন্যতম আঘাত বলে অভিহিত করেছে। জবরদস্তি উচ্ছেদ শুধু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদকেই লঙ্ঘন করে না, এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্র, নাগরিক ও রাজনৈতিক বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্র, শিশু অধিকারের নীতি, নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্যের অবসানের নীতি, জাতিগত বৈষম্যের অবসানের নীতিসহ একাধিক নীতিকেও লঙ্ঘন করে।.... – এমনই বিপন্ন সময়ে প্রায় অলক্ষ্যে হরিয়ানা সরকার অকথ্য অত্যাচারে উচ্ছেদ করল খোরিগাঁও-এর লক্ষাধিক গরিব মানুষকে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল – দরিদ্র মানুষের প্রতি দেশের শীর্ষ আদালতের চূড়ান্ত হৃদয়হীন এবং বৈষম্যমূলক আচরণ। জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে অল্পই জায়গা পেয়েছে এ হেন ব্যাপক রাষ্ট্রীয় উৎখাত। দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বৃত্তেও তেমন গুরুত্ব পায়নি প্রান্তবাসী বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর উপর ঘটে যাওয়া রাষ্ট্রের এই নৃশংসতা। ... ...

ভারত সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য এদেশের সমস্ত নাগরিককে সন্ত্রাস বিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে সুষ্ঠভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা। সেইসঙ্গে ভারতের সরকার ও বর্তমান শাসক দলের উচিত এই পরিপ্রেক্ষিতে সি এ এ আইনটিকে গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করা। এই আইন যখন মুসলিমদের শরণার্থী হিসেবে নাগরিকত্ব প্রার্থীর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল, তখনই এর প্রতিবাদ হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আফগানিস্তানের মুসলিমদের ভারত সহ বিভিন্ন দেশে তালিবানি সন্ত্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে আশ্রয় ও পুনর্বাসন কতটা প্রয়োজন। তালিবানকে দেখিয়ে সমস্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে নিশানা করার ঘৃণ্য অপচেষ্টাও কোনও কোনও শিবির থেকে লক্ষ করা যাচ্ছে। যদিও বাস্তবে যে বিশ্ব জনমত তালিবানি বর্বরতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে, তার মধ্যে মুসলিম সমাজের মানুষজন রয়েছেন বিরাট সংখ্যায়। এই ঘৃণা বিদ্বেষের রাজনীতিকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করা দরকার। তালিবানি শাসনের প্রত্যাবর্তন দেখিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক তৈরির চরম ক্ষতিকর চেহারাটি কেমন হতে পারে। বিশ্বের যেখানেই আধুনিককালে রাষ্ট্র ও ধর্মের নৈকট্য সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে, সেখানেই গণতন্ত্র ও আধুনিকতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। ধর্ম ও বিশ্বাসকে ব্যক্তিগত পরিসরে আবদ্ধ রেখে রাষ্ট্রকে ধর্মমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা কতটা দরকারি – বর্তমান আফগানিস্তান তা আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে দিচ্ছে। ... ...

উনিশশ’ পাঁচে বঙ্গ-ভঙ্গ হয়েছিল। মামনুর রশিদের লেখা নাটক ‘ভঙ্গ বঙ্গ’। কাস্টমস আর ইমিগ্রেশনের সময়। বেনাপুল, হরিদাসপুরের কথা। স্মাগলার রাজা আর যৌনকর্মী মালিনীর কাহিনী। দেশভাগের সঙ্গেই এসেছে কাঁটাতার। বর্ডার। স্মাগলিং। মেয়েরা দেহব্যবসাতে নেমেছে। এই কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে, ঘুরে বেড়াতে চায় এক আশ্চর্য মানুষ। যদি নদীকে, বাতাসকে দু’ভাগ করা না যায়, যদি পাখি সব আকাশে ঘুরে বেড়াতে পারে, তবে মানুষ কেন পারে না? কেউ আটকাতে পারে না তাকে। সে চলে যায় সীমানা পার হয়ে। ইমিগ্রেশন আউট অব কন্ট্রোল। এইখানে যুক্ত হয় রক্তকরবীর রাজা, রঞ্জন, নন্দিনী। সেই আশ্চর্য মানুষ, নিয়মভাঙা মানুষ রক্তকরবী খুঁজছে। ... ...

একজন চিত্রপরিচালক হিসেবে, বিগত বহুবছরের পরিশ্রমে, আমি এদেশে ফিল্ম-শিল্পের যে পরিকাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলাম – আশঙ্কা হয়, তা অচিরেই ধ্বংস করে ফেলা হবে। পুরোদস্তুর তালিবান শাসন শুরু হলেই তারা সব ধরনের শিল্প ও চারুকলার চর্চাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে। আমি এবং আমার সকল সতীর্থ তাদের চক্ষুশূল হয়ে উঠব এবং আমাদের সবার নাম তাদের হিট লিস্টে উঠে যাবে। নারীর সকল অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়া হবে অন্তপুরের অন্ধকারে, তাদের সমস্ত অভিব্যক্তির কণ্ঠরোধ করা হবে। ইতিপূর্বের তালিবান শাসনে একটি মেয়েও স্কুলে ছিল না। গত কুড়ি বছরে ৯০ লক্ষেরও বেশি আফগান মেয়েরা স্কুলে যেতে শুরু করেছিল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, যে ‘হেরাত’ শহরের (যা ইতিমধ্যে তালিবান দখলে চলে গেছে) বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ভর্তির প্রায় ৫০%-ই ছিল মেয়েরা। এমন সব সাফল্যের খবর কিন্তু বাকি দুনিয়ার কাছে পৌঁছয়নি। মাত্র গত কয়েক সপ্তাহে তালিবানরা অসংখ্য স্কুল ধ্বংস করেছে আর তার ফলে প্রায় ২০ লক্ষ মেয়েরা আবার স্কুল-ছাড়া। ... ...

সারা দেশ যখন জনগণমনঅধিনায়ক সুরে মাতোয়ারা, সারে জাঁহা সে আচ্ছা গাইছে দৃপ্ত উচ্চারণে আর তেরঙ্গা ঝান্ডা দুলিয়ে গাল ফুলিয়ে নারা তুলেছে বন্দে-মাতরম, তখন বাংলা অসম আর পাঞ্জাবের বুক চিরে উঠে আসছে অক্ষম ক্রোধের দীর্ঘশ্বাস, বিশ্বাসহীনতার কাছে পরিচয়ের হারানো অপমানিতের চিখ চিৎকার - "আমগো দ্যাশ ভাগ হৈয়া গেল / মোর দেখ ভাগ হৈ গ'ল / সাড্ডা দেস ভডিয়া গৈ" আজ সেই বিশ্বাসঘাতকাতার, সেই পিঠ পিছে ছুরি মারার, সেই চুর চুর হয়ে ভেঙ্গে পড়া স্বপ্নযাপনের পঁচাত্তর বছর। কি বীভৎস মজা ! এমন দিনে চেতনে বার বার আছড়ে পড়ে গান তার সুর আর বাণী নিয়ে, যে শোনায় তার কন্ঠ, যে শোনে তার অন্তর গেয়ে ওঠে – "যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক / আমি তোমায় ছাড়বোনা মা" ... ...

গ্রেপ্তারের সময় ফাদার স্ট্যানের বয়স ছিল ৮৪। তিনি পার্কিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত ছিলেন এবং প্রায় শ্রবণশক্তিহীন ছিলেন। এছাড়াও তাঁর বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা ছিল। তাঁকে যখন তালোজা জেলে নিয়ে আসা হয়, তখন বরেণ্য কবি ভারভারা রাও প্রবল অসুস্থ, যমে মানুষে টানাটানি চলছে। জেল তখন উপচে পড়ছে; ২১২৪ জন কয়েদি যেখানে থাকার কথা – সেখানে বন্দির সংখ্যা ৪০০০ ছাড়িয়ে গেছে। করোনার কারণে জেল খালি করার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, সেখানে তখনও আরও অভিযুক্তদের ঠুসে দেওয়া হচ্ছে। এই ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে ফাদারকে ঠেলে দেওয়া হল.. ... ...

১৯২০তে ভারতবাসী যে স্বরাজের ছবি দেখেছিল, তা ১৯৪৭ এর স্বাধীনতা এবং তার ফলে গড়ে ওঠা আজকের রাষ্ট্রব্যবস্থার থেকে পৃথক ছিল। রাষ্ট্রের থেকে সমাজের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল স্বরাজের ধারণায়। ... ...

এমনই ভরা গ্রীষ্মের এক নিঝুম দুপুরে আচমকাই বাঁশপাতা উড়ে এসেছিল চোখের টলোমলো পাতা জুড়ে। নরম পায়ের নূপুরের গন্ধে উবে গিয়েছিল খাঁখাঁ দুপুরের শূন্যতা। খুশিতে কেঁপে উঠেছিল তিরতিরে চারাগাছ। মেঠো ফুলের খিলখিল হাসিতে মেঘেরাও নেমে এসেছিল করতলে। এমনই এক চুপ দুপুরেই বাষ্প হয়ে দুরের আকাশে মিলিয়ে গিয়েছিল ধুপের গন্ধ মাখা নূপুরের কলতান। ঝরে আসা বাঁশপাতাও। তালগাছ বেষ্টিত গহীন পুকুরের ঘন জল বুক পেতে আশ্রয় দিয়েছিল ব্যাথাতুর আকাশের প্রতিবিম্বকে। চিল চিৎকারে দিগন্তের পানে পাখা মেলে উড়েছিল অস্থির পানকৌড়ি। তারপর কত কৃষ্ণচূড়ার মহাজাগতিক আলো পার হয়ে এই বীজাণু জর্জরিত কালবেলায় আবার এসে মুখোমুখি অবিকল সেই নিঝুম দুপুর। জানালার চোখ বেয়ে ঝাঁক ঝাঁক কৃষ্ণচূড়ার আবেগ ঘন গাঢ় উচ্ছ্বাস। কাঁচা আমের গন্ধ মাখা অবরুদ্ধ চুপ দুপুরে অবিকল সেই লাজুক নূপুরের রিনিঝিনি! ... ...

এসএলপি দায়ের হয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারা আবেদনকারীদের একটি রিট পিটিশন খারিজ করার বিরুদ্ধে। ওই আবেদনের বক্তব্য ছিল, পিএম কেয়ার্স ফান্ড তার ট্রাস্ট ডীড বা রেজিস্ট্রেশনের সময় পেশ করা ওর গঠন সম্বন্ধীয় মূল দস্তাবেজের ভাষ্য অনুযায়ী – একটি বেসরকারী সংস্থা। অতএব এর গঠনের জন্য কোনও আইন পাশ করার দরকার নেই। এবং একই কারণে এর কাজকর্ম-আমদানি-খরচাপাতি সরকারি অডিট বিভাগের নাগালের বাইরে থাকবে, আর পাবলিক এ নিয়ে তথ্যের অধিকার আইন – ২০০৫ অনুযায়ী পিটিশন লাগিয়ে কোন তথ্য পেতে পারবে না। ... ...

গ্রন্থনবাদী দার্শনিক রোলা বার্থ, আন্তোনিওনির ‘দি ক্রাই’-উত্তর চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন মিথের আধুনিক গূঢ় সঙ্কেত। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘চিত্রনাট্যের শৈলী’ প্রবন্ধটিতে এই ‘দি অ্যাডভেঞ্চার’ (লাভেন্তুরা) ছবির সংলাপ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন - বিষয়বস্তু ও মেজাজের দিক থেকে সম্পূর্ণ আধুনিক হয়েও আঙ্গিকের অঙ্গ হিসেবে সংলাপের ব্যবহারে আন্তোনিওনি-থুড়ি-আধুনিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তখনও পর্যন্ত কিভাবে রয়ে গিয়েছিল সনাতনী রীতি! আন্তোনিওনির ক্ষেত্রে অন্তর্বাস্তবে অন্যতম প্রধান ক্রীড়নক হিসেবে বহির্বাস্তব প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে বা অন্তর্বাস্তব ও বহির্বাস্তবের পারস্পরিক দেয়ানেয়া শুরু হয়, তাঁর ‘দি রেড ডেসার্ট’ (১৯৬৪) ছবিটি থেকে। সে হিসেবে এটিকে তাঁর চিত্রকর্মের দ্বিতীয় পর্যায় বলা যেতে পারে। আমাদের এই আলোচনার মূল কেন্দ্রটি মোটামুটি ভাবে থাকবে এই দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৬৬ সালে নির্মিত ‘ব্লো-আপ’ নামক ছবিটির উপর। ... ...

লাইফ ইনশিওরেন্স কর্পোরেশন, মানে এলআইসির কথাই বলছি। সেই মানুষটির কথা ভাবুন - অফিস-ফেরত এক-কাপ চায়ের খরচ বাঁচিয়ে, সস্তা সাবানে দাড়ি কামিয়েও, প্রতিটি পাই-পয়সা তুলে রেখেছেন প্রভিডেন্ট ফান্ডে - যাতে শেষ বয়সে টাকার জন্য বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা, ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা - আটকে না যায়। কোনও এক শুভ্র, নির্মল সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি তিনি জানতে পারেন - এই প্রতিষ্ঠানগুলি বেমালুম ভ্যানিশ হয়ে গেছে, তাহলে তো তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ারই কথা। হ্যাঁ, এটাই ঘটতে চলেছে। আমাদের আপাত-নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের আড়ালে নিঃশব্দে মাথা তুলেছে এক সর্বগ্রাসী সর্বনাশের আয়োজন। পড়তে থাকুন... ... ...

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) মতে জলবায়ু বদল থামাতে গেলে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বর্তমান বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়, তাপমাত্রার বৃদ্ধি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নীচে বেঁধে রাখতে হলে ২০২৫ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বর্তমান হারের দ্বিগুণ বিনিয়োগ করতে হবে। তবে শুধু নবায়নযোগ্য শক্তির বৃদ্ধিই জলবায়ু বদল রোখার জন্য যথেষ্ট নয়, সবুজায়ন বৃদ্ধি করলেও তা হবে না। তা করতে গেলে জীবাশ্ম জ্বালানির দহন বন্ধ করতেই হবে। কেবল কয়লাই নয়, গ্যাস ও জৈবভর পোড়ানোও বন্ধ করতে হবে। ব্রিটেনের কার্বন ট্র্যাকার এবং কাউন্সিল অন এনার্জি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (সিইইডব্লু) যৌথ ভাবে প্রকাশিত এক স্টাডি রিপোর্ট ‘রিচ দ্য সান’-এ জানিয়েছে যে, উদীয়মান দেশ কম খরচের নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ প্রায় চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশ্বের নব্বই ভাগ অঞ্চলেই নবায়নযোগ্য শক্তি সবচেয়ে সস্তা। এইসব দেশের বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যে ভারতের ভাগ ৯ শতাংশ, আবার আগামী দিনে সম্ভাব্য বৃদ্ধির ২০ শতাংশ। চিনের চাহিদা বৃদ্ধির ভাগ ৫০ শতাংশ, সম্ভাব্য বৃদ্ধির ভাগ ৩৯ শতাংশ। বেশিরভাগ উদীয়মান দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পেরিয়ে যাবতীয় বৃদ্ধি নবায়নযোগ্য শক্তি থেকেই পেতে চলেছে। ২০১০ সালে ভারতে নবায়নযোগ্য শক্তি ছিল ২০ গিগাওয়াটের কম, ২০২১-এর মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৯৬ গিগাওয়াট। বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে ধরলে তা হয়েছে ১৪২ গিগাওয়াট বা দেশের মোট বিদ্যুতের ৩৭ শতাংশ। ... ...

আমরা বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণ হিসেবে গণ্য করি যে সময়কে, প্রফুল্লচন্দ্র তারই এক প্রতিভূ।ইউরোপের নবজাগরণের সঙ্গে তুলনীয় নাই হতে পারে আমাদের নবজাগরণ, হওয়া উচিত নয় এবং সম্ভবও নয়। কিন্তু বিজ্ঞান-কারিগরি ও শিল্পের আমূল পরিবর্তন কে বাদ দিয়ে কোনো রকম নবজাগরণের কথাই ওঠে না।সেদিক থেকে দেখলে নিজেদের মত করে বিজ্ঞান ও কারিগরি জ্ঞানের আত্তীকরণ করে, নিজেদের সমাজ সংস্কৃতি ইতিহাসের সঙ্গে সুসমঞ্জস ভারী শিল্পের পথিকৃৎ বলতে হয় প্রফুল্লচন্দ্রকেই। তিনি যেন প্রাচ্যের পার্কিন (স্যার উইলিয়াম হেনরি পার্কিন, কৃত্রিম জৈব রঞ্জক পদার্থের সংশ্লেষণ পদ্ধতির প্রথম উদ্ভাবক এবং শিল্পপতি, ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের নতুন ঘরানার প্রতিনিধি - বিজ্ঞানী এবং শিল্পপতি)। কিন্তু না, আমাদের ভাবনায় নবজাগরণ আসতে পারে, 'স্বদেশী শিল্প' হতে পারে, কিন্তু 'পুঁজি ‘ ‘শিল্প ' এসব হতে পারে না।আমরা বরং আক্ষেপ করেছি, এ হে, প্রফুল্লচন্দ্রের মত একজন ঋষিতুল্য মানুষ কিনা পুঁজিপতি বনে গেলেন! একটু বিপথে চলে যাচ্ছি বোধহয়।বেঙ্গল কেম-এর মত একটা উদ্যোগ যে শুধুমাত্র একটি উৎপাদনশিল্প, একটি কারখানা নয়, তার উপযোগিতা যে শুধু লাভ ক্ষতির হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, সেটা আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম না! ... ...