
ধপাস করে সোফায় বসে পড়ল বিনীতা, তার হাতে এখন একটা প্লাস্টিকের ফোল্ডার, তাতেই রয়েছে সুপ্রিয়া ম্যাডামের দেওয়া প্রশ্নপত্র। সেটা আর নিজের ব্যাগটা পাশে রাখল সে। কী করবে, কী বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না সে। নেশা হয়ে গেলে গাড়ি চালিয়ে ফিরবে কী করে? এখানে তাদের খাওয়ার কথা ছিল, খিদেও পেয়েছে অল্প, কিন্তু এখন খাওয়াটারই বা কী হবে? রঙিন বাইরে রয়েছে, তাকে তোলার কথা ছিল ফেরার সময়ে; সেটারই বা কী করা যাবে? কতটা মদ খেয়েছে অরুণাভ? বেশি তো খায় না কখনই। তার স্বামীর মধ্যে যে সব বদল দেখছে গত কয়েক মাসে, এটাও কি তার মধ্যেই পড়ে? কিন্তু ডাক্তারই বা কী করে মদ খাওয়া অ্যালাও করল? ... ...

ট্রাম কিভাবে কলকাতার ব্যক্তি মানুষ এ সমাজের সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে ছিল গত শতাব্দীতে এ লেখা তাকে ধরতে চেয়েছে। এটি প্রবন্ধ না আবার ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ও নয় পুরোপুরি। নিজের অভিজ্ঞতাকে ট্রামের মিথের সাথে মেলানোর এক চেষ্টা মাত্র। ... ...

আপনজনেরা বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে চেষ্টা করেছে আমার কক্ষচ্যুত বিক্ষিপ্ত মনকে জীবনের সঠিক ট্র্যাকে পুনঃস্থাপন করতে, কিন্তু ধীরে ধীরে ভাবনায় পরিবর্তন এলেও বাস্তবে তার কোন প্রতিফলন হয়নি। প্রথমদিকে চাইনি আর পরে চেয়েও পারিনি। বাধ সেধেছে চক্ষুলজ্জা। ... ...

বিদেশে যাওয়ার পর তন্ময় অনেকবার এসেছে গেছে কিন্তু বেশ কয়েক বছর কাটানর পরেও কোম্পানি পাকাপাকিভাবে ওকে দেশে ফিরতে দিচ্ছিল না। দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করে, মোটা মাইনে দিয়ে ওকে আটকে রেখেছিল। দেশে এলে আর ওর ফিরতে মন চাইত না। ছেলের যেমন বাবার জন্যে মন খারাপ হত, বাবাও তেমনি বাইরে গিয়ে ছেলেকে খুব মিস করত। দুজনে কেউ কারো কাছে থাকে না ঠিকই তবু এখানে থাকলে একটু দেখা তো হয়। ওইটুকু সম্বল করেই গড়ে উঠেছে ওদের ভালবাসার সাঁকো। দেশে এলে তন্ময়ের সাথে আমার মাঝে মাঝে গল্প গুজব হত। নিজের চাওয়া পাওয়া আর না পাওয়া গুলো আমার সাথে শেয়ার করত। এগুলো শোনার মত তেমন আপনজন তো ওর কেউ ছিল না তাই আমাকে বলে মন হাল্কা করত। ... ...

--আবার আসিস মা, আমাদের একেবারে বাতিল করে দিস না। আর পারলে তনুটাকেও ওর মা বাবার কথাটা একটু মনে করিয়ে দিস।... চোখের জলে ভাসতে ভাসতে মামি অতি কষ্টে কথাগুলো বলল। পাশেই মামা দাঁড়িয়ে, তারও চোখের কোনায় জল। বাইরে বেরিয়ে অমিত বলল, “এই মানুষগুলো সম্পর্কে তুমি কত খারাপ খারাপ কথা বলছিলে!” --মানুষগুলো নয়, আমি যা খারাপ কথা বলেছি তা সবই আমার মামাকে উদ্দেশ্য করে। তুমি বাল্মীকি কে দেখলে, আমি দেখেছি রত্নাকরকে। মানসিকভাবে রিক্ত হয়েই ওনার আজ এই পরিবর্তন। ... ...

"মানুষের গায়ে কি ম্যাচিওরিটির গন্ধ থাকে ডাক্তার?” নাহ, লোকটার নেশা হয়ে গেছে। ম্যাডাম যে কখন আসবেন, ভাবল ইন্দ্রনীল। বলল, “গায়ে গন্ধ না থাকলেও কাজে কর্মে অভিজ্ঞতার ছাপ তো পড়েই।” অরুণাভ একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। “আমার কাজে পড়ে না ডাক্তার, ১২ বছর পরেও। আমি শুধু অফিস বুঝি, আর বই বুঝি। আমার বউ বলে আমি নাকি বই-এর পাতায় মুখ গুঁজে থাকি, সংসার দেখি না, সংসারের কিছু ভাবি না।” “অভিযোগটা সত্যি?” এইবার উল্টো জেরা করার সুযোগ পেল ইন্দ্রনীল। ইন্দ্রর অরুণাভ কথা খেয়াল করল বলে মনে হয় না। বলে চলল সে, “বই আর বউ-এর মধ্যে সাধারনত বনে না। তবে তাদের মিলও আছে। হাত ছাড়া হলে কোনটাকেই আর পাওয়া যায় না।” ইন্দ্রনীল জিজ্ঞাসা করল, “বই হাত ছাড়া হয়েছে কখনও আপনার?” অরুণাভ বলল, “হ্যাঁ... হয়েছে তো... আমার বই, তোমার বউ…। হা হা করে হেসে উঠল অরুণাভ, তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, “সরি, ভেরি সরি।” ... ...

যেন অমিত, সত্তর দশকে আমার সমসাময়িক পরিচিত দুজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রকে সেই সময়ের উত্তাল বামপন্থী আন্দোলনের শরিক হয়ে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় শামিল হতে দেখেছিলাম। তাদেরকে অনুসরণ করে আরো অনেক সাধারণ ছাত্র ছাত্রী যোগ দিয়েছিল সেই আন্দোলনে। আজ তাদের একজন বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থার একটি নামি প্রতিষ্ঠানে প্রথিতযশা অধ্যাপক। ঘরণীও এসেছে এক উচ্চবিত্ত ঘর থেকে। আর অপরজন এক নামি তথাকথিত বুর্জোয়া সংবাদপত্রের উচ্চপদ অলংকৃত করে রয়েছে। এঁরা এখনও বক্তব্য রাখেন, ওজনদার লেখালিখি করেন। যে ব্যবস্থা নির্মূল করতে একসময় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন আজ আয়েশ করে বসে আছেন তারই সিংহাসনে। ... ...

বিদিশাকে হারিয়ে আমার প্রায় উন্মাদের অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। কোন কিছুই ভাল লাগত না। এই সমস্ত কিছুর জন্য আমি দায়ী, শুধুমাত্র আমি, আর কেউ নয়। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ বিদিশা আমায় দিয়েছিল কিন্তু সাহস করে এগোতে পারিনি। বিদিশা ঠিকই বলেছে, আমি একটা মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ। তা না হলে যে মেয়েটাকে অন্তর দিয়ে ভালবাসি তার বিপদের সময় ওভাবে কেউ গুটিয়ে থাকতে পারে না। আর সব থেকে বড় কথা তাকে সেই বিপদে ফেলেছি আমি। বাবা ওর সাথে যে ব্যবহার করেছে বাবার মত মানুষের কাছে ওই পরিস্থিতিতে সেটাই প্রত্যাশিত। বাবার কাছে ওর থেকে ভাল কিছু আশা করা যায় না। মাও বাবার সিদ্ধান্তের কাছে চিরকালের মত অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল। ... ...


গাছে গাছে নেচে বেড়াই এই ডালে ওই ডালে। পাকা পাকা ফলগুলি ভাই,টপ করে নিই গালে।। বগল দুটি চুলকোই খুব,আরও চুলকোই ভুঁড়ি। বাঁদরামিতে এই দুনিয়ায় নেই গো মোদের জুড়ি।। ... ...

পিসির বাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার পর শরীরের ভার ক্রমশ বাড়তে থাকলেও মনের ভার অনেকটাই কমে গিয়েছিল। পিসির স্নেহের পরশে যাবতীয় দ্বিধা-দ্বন্দ, সঙ্কোচ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি আগামী দিনের জন্য। মাস তিনেক কাটার পর স্কুলে জয়িতাদি একদিন ডেকে বললেন—তুমি একটা লিভ অ্যাপ্লিকেসন লিখে আমাকে দাও, কাল থেকে তোমায় আর স্কুলে আসতে হবে না। সব কিছু ভালভাবে হয়ে যাক, বাচ্চাটা একটু বড় হোক, তারপর আমি যখন বলব তখন জয়েন করার কথা ভাববে। মাইনে যেমন পাচ্ছ তেমনি পেতে থাকবে। ... ...


বিনীতা বসে ভাবছিল নানা কথা। কত দিন আগে ডিভোর্স হয়েছে ডাক্তারবাবুর? ওই ঘরের ড্রেসিং টেবিল কি ওনার স্ত্রী ব্যবহার করতেন? বিছানায় রাখা কুশনও কি ওনার কেনা ছিল? ড্রইং রুমের কাঁচের আড়ালে রাখা শো-পিস গুলোও কি তাই? বিনীতার একবার ইচ্ছে হল রান্নাঘরের দিকে যায়, সে ইচ্ছেটা দমন করল সে। এমন কেন হচ্ছে তার? এখন মনে হচ্ছে না এলেই ভাল হত, এখন তো চলে যাওয়ারও উপায় নেই। রঙিন বাইরে আছে ওই ছুতো করে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে খেয়ে নিয়েই। ... ...

অমিতাভ চলে যাওয়ার পর একাকীত্বের যন্ত্রণায় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিছুই ভাল লাগত না। আশ্রমের ছেলেগুলোকে নিয়ে সময় কাটিয়ে চেষ্টা করতাম মানসিক শান্তি পেতে। কিছুটা সময় ভুলে থাকতাম, কিন্তু রাতে বা কোন সময় একা থাকলেই হারিয়ে যাওয়া সব কিছু মনটাকে গ্রাস করে ফেলত। প্রথম প্রথম বেঁচে থাকাটাই কেমন যেন অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে একটু একটু করে খানিকটা সামলে উঠেছিলাম। কিন্তু মেয়েটা আসার পর থেকে ক্রমশ সব কিছু যেন বদলে গেল। জীবনটা আর বোঝা মনে হত না, প্রতিদিন তাকে নানাভাবে, নতুনভাবে, উপভোগ করতাম। মনে হত পৃথিবীতে আমার জন্য বরাদ্দ সময় একটু বেশি হলে ভালই হয়। আসলে লোভ, ভালবাসার লোভ। সন্তানস্নেহে সিক্ত মন আরো কিছু চাইত। মনে তখন নাতি/নাতনিকে বুকেতে জড়িয়ে ধরে খেলা করার লোভ হাতছানি দিচ্ছে। ... ...



ইন্টারকমে রামাকৃষ্ণানজীর একটা ফোন এল, মিনিট তিনেক কথা বলে অধৈর্যভাবে ঘড়ির দিকে তাকাল সে, বিনীতার কাছ থেকে কোনও ফোন এল না এখনও। অরুণাভর বিরক্তি বাড়ছে, এইটার একটা ডিসশন নিয়ে নিলে অফিসের কাজে মন বসাতে পারে। এখনও অনেক কাজ বাকি, পরে শরীর কেমন থাকবে কে বলতে পারে? তাই এই প্রজেক্টটা শেষ হলে নিশ্চিন্ত হবে সে। ... ...

তন্ময়ের বাবা চিৎকার করে বললেন- বুলি মুখ সামলে কথা বল। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাও শিখিস নি। জানিস আমি কি করতে পারি? আর যাকে নিয়ে এসেছিস সে অন্য কোথাও নোংরামিটা করে প্রেগন্যান্ট হয়নি তার কোন প্রমাণ আছে। অর্চনাও সূর চড়িয়ে বলল- মামা একদম চোখ রাঙিয়ো না, এতক্ষণ অনেক বাজে বাজে কথা বলেছ। ছোটলোকের বাবা অন্যকে ছোটলোক বলছে। লজ্জা করে না! তুমি খুব ভাল করেই জান যে কার সন্তান তা প্রমাণ করতে সময় লাগেনা। আর তনু, তোর থেকে তো রাস্তার কুকুর বেড়াল ভাল রে। তারা অনেক বেশি বিশ্বস্ত। চেনা লোক বিপদে পড়লে তারা এগিয়ে আসে, তোর মত নিজের বাপের ভয়ে পালায় না। তুই একটা মেরুদণ্ডহীন অমানুষ। আর মামা তুমি আমার কিচ্ছু করতে পারবে না। তোমার এই বড় বড় কথা, রোয়াব, দম্ভ, সব না একদিনে ঘুচিয়ে দেব। আর তার জন্য থানায় একটা অভিযোগ লেখালেই যথেষ্ট, এই কেসে কোনো মাতব্বর তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। এরপর আমি তো নয়ই, আমার বাড়ির কারো সাথে কোনোরকম যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করবে না। আমরা ভদ্রলোক তাই নীচ, ছোটলোকদের সাথে সম্পর্ক থাকাটা কাম্য নয়। ... ...

এ আমি কি করলাম! নিজের সম্পত্তি নিজেই লুঠ করে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করেছি। সকালের দিকে চোখটা একটু লাগতেই আবার দেখলাম এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। ‘আমি একটা জলাশয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েকটা ছায়ামূর্তি দূর থেকে আমার দিকে সমানে ঢিল ছুঁড়ছে। নিজেকে বাঁচাতে আমি ছুটতে ছুটতে জলাশয়ের অন্য দিকে চলে গেলাম। খুব ঘেমে গেছি, চোখে মুখে জলের ছিটে দেওয়ার জন্য জলাশয়ের দিকে একটু ঝুঁকতেই আঁতকে উঠলাম। একটা হায়নার প্রতিবিম্ব জলে ভেসে উঠল। ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, ঘুম ভেঙে গেল। ... ...
