
'বেজাতে' বিয়ে বলে নিজ মহল্লায় দামামা বেজেছিল। পাত্র ডাক্তার এই কথাটা কর্পূর হয়ে 'হিন্দু ছেলে' এটাই প্রচার হয়েছিল। তো, এই কালী পুজো নিয়ে আমার এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। কালীমা আমার প্রতিদিনের। ছাত্রজীবন থেকে কলেজ টানা সময় জুড়ে আমায় 'মা কালী' বলে পথে ঘাটে ডেকে দিত কেউ। অবশ্যই পুরুষকণ্ঠ। কখনো পেছন ফিরে দেখিনি। দেখতে নেই এটাই ছিল পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা। তখন অবশ্য আমি খুব ভয় পেতাম এই ডাকে। লজ্জা হত খুব। কী এমন আছে এই চেহারায়? নিজের মাও মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলতেন, আমার পেটের মেয়ে এমন কালো কীকরে?বুঝতাম না এই সমাজে মেয়েদের কেন কালোরঙ হওয়া বারণ ? কেন এত নেগেটিভ? তারপর মাথায় সিঁদুর চড়ানোর পর আমায় কেউ কোনদিন 'মা কালী' বলে ডাকেনি। সিঁদুর ছাড়ার পরও। জানিনা, বিবাহিত মেয়েদের বুঝি সব মাফ। ধীরে ধীরে নিজের গায়ের রং ও চেহারার সঙ্গে কম্ফর্টেবল হয়ে গেলাম। নিজেকেই ভালবেসে ফেললাম। বিয়ের আগেই জানতাম আমার স্বামী কালীভক্ত। বিয়ে রেজেষ্ট্রির আগের দিনই সে নিয়ে যায় আমায় দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি পুজো দিতে। সেখানেই লাইনে দাঁড়িয়ে সে জানায় আমার কাছে তার একটিই দাবি। মন্দিরে তার পাশে দাঁড়িয়ে পুজো দিতে হবে ও প্রসাদ খেতে হবে। তার এই ভক্তি একইভাবে সন্তানের মধ্যে জন্ম নিল। প্রতিদিনই ড্রাইভার অভিযোগ করত মেয়ে স্কুলের পথে যেখানেই মন্দির দেখছে গাড়ীর কাচ নামাতে বলছে। নেমে পড়ে প্রণাম করছে। এরপর আমার নিজের বাড়িতে মেয়ের পছন্দের কালী মায়ের ওয়াল হ্যাঙ্গিং লাগানো হল। তার নিজের পূজা করার জায়গা ক'রে দেওয়া হল। আনা হল লাল কাপড়,ঘণ্টা,কর্পূর, সিদুর,গঙ্গাজল,ধূপকাঠি। কাছের মন্দিরের পুরোহিতের কাছে গিয়ে লিখে আনা হল মন্ত্র। আমার মা এখানেই কখনো কখনো কোরান পাঠ করতেন, নামাজ পড়তেন। আমার বাবা কালীপুজোর জন্য চারটে করে জবাফুল এনে দিতেন বাজার থেকে প্রতিদিন। ... ...

এরপরে এল আমার টিউশনকাল। কালীপুজোর দিন সব ক্লাসই ছুটি থাকত। অতএব পরের দিন থেকে ভাই-ফোঁটা অব্দি ফিরতি পথে চলত আমাদের টো-টো সফর। তবে সমস্যা হল, বারাসত আজও যে কারণে বি(?)খ্যাত, উন্নয়নের মত যেখানে সেখানে দাঁড়ানো মাতাল আর কন্যাশ্রী হারে উড়ে আসা ইভটিজিং, এসবের কল্যাণে মায়ের টেনশন এবং সে চক্করে রাতে প্যান্ডেল ঘোরা প্ল্যান ছিল এক্কেরে নট অ্যালাউড। ... ...

দীপাবলীতে পরিচিতদের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়ে ছাদে কচিকাঁচাদের নিয়ে ফানুশ ওড়াতে ওড়াতে পরিবারের একজন হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে প্রাপ্তি, জমিয়ে খাওয়াদাওয়ায় যে আত্মীয়তা, তা ধর্মের উর্ধ্বে অবস্থান করে। ভাতৃদ্বিতীয়ার মঙ্গলফোঁটা যমের দুয়ারে সত্যিই কাঁটা না দেয় কিনা সেই তর্ক উসকে দেওয়া আড্ডায় বসে দেখেছি, এইসব রীতি-রেওয়াজ সামাজিক মেলবন্ধনের জায়গা তৈরী করে দিয়েছে অজান্তেই। অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় চিন্তাভাবনার পৃথক অবস্থানের মধ্যেই রুনুরা নিজের বোনের মতো হয়ে উঠেছে। ... ...

চান্দু ঠাকুমা সুন্দরবন লােকালে যখন ভােরবেলা ওঠে, তখন ভিড় একেবারেই নেই বললেই চলে। বিশেষ করে লেডিজ কম্পার্টমেন্টে। চান্দুটা আজও খুব বায়না ধরেছিল-আমি তাের সঙ্গে কলকাতা যাব। কিন্তু এক বস্তা শাকপাতা ঘাড়ে করে, নাতির হাত ধরে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানাে চাট্টিখানি কথা না। তাই আসবার সময় জিলিপি আনবাে, ব্যাটবল আনবো এই সব প্রলােভন দেখিয়ে কোনােরকমে ঠেকিয়ে রেখে এসেছে। একটানা ভুগতে ভুগতে চান্দুর স্বভাবটাও বড় খ্যান খ্যান হয়ে গেছে। চার মা মােমিনার এক কথাপ্রতিদিন ঐসব ঘতামাতার শাক-পাতা গিলিয়ে গিলিয়ে ছেলেটার আমের ধাত কাটতে দেয় না বুড়িটা। মােমিনা যখন মুখ ছােটায়, তখন ঠিক একইভাবেই বলে। শয়তান বুড়ি, ভাতার খেয়েছিস। ... ...

প্রায় এক সপ্তাহ সেই ফোনের অপেক্ষা করেছিল শতদ্রু। আসে নি। আর এই এক সপ্তাহে ধীরে ধীরে ওই অজানা অবয়বটা আকৃতি নিয়েছিল ওর মাথায়। সেই অবয়বটার দেহ সুগঠিত ও পিচ্ছিল, দুটো বাড়ানো সরু হাতের শেষে আঁকশির মত দাঁড়া, ঘন ভুরুর নীচে দীঘল চোখে মায়া ও মোহ, আর শ্রীলেখা মিত্রর মত ভারী ঠোঁঠের তলায় তীক্ষ্ণ মাদকভরা একটা লুকোনো হুল। শতদ্রু এরপর আর দেরি করে নি। বহুদিন ধরে লুকিয়ে রাখা সেই বিছের ছবিগুলো এয়ারমেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল কলকাতায় রাজীব ঘোষের অফিসের ঠিকানায়। এক ঝটকায় বিছেটার সমস্ত চিহ্ন মুছে দিয়েছিল নিজের জীবন থেকে। তখন কে জানত, আবার ন বছর বাদে এভাবে বিছেটা ওর সামনে এসে দাঁড়াবে? এই রকম করুণ, থ্যাঁৎলানো, মৃতপ্রায় অবস্থায়? ... ...

ফোন করতে যাবে ঠিক সেই সময়ে ধড়মড় করে উঠে বসলো কাক ভিজে হওয়া চিমসে একটা লোক। সামনের লুকিং গ্লাসে ঠিক মতো মুখটাও দেখতে পেল না বল্টু। গাড়ি বুকিং হয়েছে খাল পাড় পর্যন্ত। “দাদা একদম ভিজে গেছেন। আমার কাছে একটা পরিষ্কার তোয়ালে আছে। একটু মুছে নেবেন?” বল্টুর কোন কথার উত্তর দেয় না লোকটা। বল্টু নিজেও কোন কথা বাড়ায় না। একেই অনেক রাত। চারপাশে গাড়ির সংখ্যা কম। নেশা-টেশা করে আছে কিনা সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। যাক তার চেয়ে তার নতুন গাড়ির সিট ভিজুক। কিছুক্ষণ পরে শুধু হাওয়ার মতো ফিসফিস করে লোকটা বলে “আপনার বইটা একটু দেখতে পারি?” বল্টুর মনেই ছিল না তার সিটের পাশেই রাখা বই। ‘কলকাতার গোলকধাঁধা’। কিন্তু এই অন্ধকারে বৃষ্টি আর বিদ্যুতের মাঝে লোকটা বইটা দেখতে পেল কী করে? ... ...

রুবির বাঘের নাম শান্তনু। বাঘ যেমন হয়-পেল্লায়, ডোরা কাটা, বিশাল খণ্ড ত ল্যাজ। ভারি বলিষ্ঠ থাবা ঘিরে সাদা নরম রোঁয়া। বিষণ্ণ পোখরাজ চোখ। কানের পিছনে, থাবায় গভীর ক্ষতচিহ্ন। এখন রাত বারোটায় মোড়ের মিষ্টির দোকানের ঝাঁপ বন্ধ - দু ধাপ সিঁড়ির নিচে ভাঙা ফুটপাথ-সেখানে এক ছটাক ঘাসের দখল নিয়ে কাড়াকাড়ি স্ট্রীটলাইট আর জ্যোৎস্নার; দুটো লাল গাড়ি পর পর পার্ক করা। মিত্র সুইটস আর গাড়ির মাঝখানে ঐ জ্যোৎস্নার ওপর হিসি করছিল শান্তনু - আকাশের দিকে মুখ, সামনের দুপায়ে শরীরের সম্পূর্ণ ভর, পিছনের পা ভাঁজ করা এবং লম্বা ল্যাজ মাটির সঙ্গে সমান্তরাল-ওর পিঠের ডোরা এই মুহূর্তের চাঁদের আলোয় সিপিয়া আর সাদা। রুবির হাতে একটা বড় কালো চাদর ভাঁজ করা; সে শান্তনুর পিঠে হাত রেখে সটান দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছিল। রুবি যেন এক বন্ধ দরজার পাল্লা-যার আড়ালে বসে, প্রকৃতির ডাকে নিশ্চিন্তে সাড়া দিচ্ছিল শান্তনু- ঝাঁঝালো বুনো গন্ধ সিঁড়ির ধাপ বেয়ে পৌঁছোচ্ছিল মিত্র সুইটসের সাইনবোর্ড অবধি, ঘাসের ওপর চাঁদের আলো তরল আর হলুদ হয়ে যাচ্ছিল ক্রমশঃ। ... ...

সে অনেক দিন আগের কথা। বছর ত্রিশ তো হবেই। আমরা থাকতাম ময়মনসিংহ শহরের আমলাপাড়া এলাকায়, তখ্নও সেই শহরে কিছু বাংলো বাড়ি অবশিষ্ট ছিল, তাদের সামনে ছিল মাঠ, পেছনে বাগান, বড় আঙ্গিনা বা পুকুর। আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম সে বাড়িটা ছিল দোতলা, পুরনো জমিদার বাড়ি, সামনে প্রায় বিঘাখানেক ফাঁকা জমি। ঐ শহরে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটবাড়ির ধারণা তখনও আসে নি, কিন্তু আমাদের বাড়িতে তিনটে পরিবার ভাড়া থাকত। ওপরে একটি, নিচে দুটি। বাড়িওয়ালা এমনভাবে নিচের তলাটি ভাগ করে দিয়েছিলেন যাতে অন্য অংশটির ভাড়াটেদের দেখা না যায়। বাড়ির সামনে একদিকে একটা বড় আম গাছ, অন্যদিকে গাঁদা আর জবার ছোট বাগান। তারকানাথ রায় রোড থেকে শুরু করে ঘাসের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথটা একটা ছোট সিঁড়ির তিন চারটা ধাপ বেয়ে উঠে এসেছে নিচু বারান্দায়। ... ...

মঙ্গলার ওদিকে এক গোঁ কিছুতেই পণ দিয়ে বিয়ে করবে না সে। এই নিয়ে কম অশান্তি হয় নি মা বাপের সাথে। এমন এক পাত্রের মাকে মঙ্গলা বলে ফেলেছিল ‘আপনারা শহরে গিয়ে মন্দিরের সামনে আঁচল পেতে বসতে পারেন তো, শুনেছি দিনে পাঁচ ছয় হাজার রোজগার হয়। ও দুই তিন মাস বসলেই আপনার বেশ ক লাখ ...’ কথা শেষ করতে পারে নি, মায়ের ঠাস সপাটে নামে মঙ্গলার গালে। ছোট বোনটাকে ধরে সামলায় নিজেকে, শান্ত পায়ে গিয়ে মাছমাংস কোটার বঁটিটা আর একগাছা নারকেল দড়ি এনে মায়ের সামনে ধরে বলে ‘হাত পা বেঁধে গলা কাটো আমার, নাতো পণ দিলে আমি তোমাদেরই কেটে ফেলব হয়ত।’ ... ...

রুমিকে শেখাই। দুজনে খেতে এলে মুখোমুখি বসতে হয়। কার্টেসি। এসেই ধপ করে পাশে বসে পড়ছিলো। যা যা বলি, যে সিকোয়েন্স-এ খেতে বলি, রুমি মন দিয়ে শোনে। আমার ওকে নতুন করে তোলার ইচ্ছেটাকে বুঝেই যেন শুষে নেয়। একটুও যেন বাদ না যায়, এমন অতন্দ্র হয়ে শোনে। ... ...

স্যার, এইবার আমি আমার পিতার কথা বলব, আমার মনে হচ্ছে যে মানুষের জীবনের সাথে তার পিতার জীবন জড়িত, ফলে আমার বিষয়ে বলতে গেলে আমার পিতার কথা আসবে, আমার বিষয়ে বুঝতে আমার পিতার বিষয়ে বুঝতে হবে। আপনি কি মনে করেন এই ব্যাপারে? বলব কি স্যার? হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন। আমার পিতার নাম ছিল আরশাদ মিয়া। তবে লোকে তাকে ডাকত কাবিল কবিরাজ নামে। তিন গ্রাম গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াইতেন আর অনেক অনেক লতাপাতা সংগ্রহ করতেন। আর আমাদের বাড়ির পাশে ছিল সামান্য ধান্য ক্ষেত। সেখানে চাষবাসও করতেন অল্প অল্প। আচ্ছা এই মুহুর্তে, এই ধান্য জমির কথা স্মরণে আসায় আমার দাদাজির কথা মনে হলো আমার। তিনি আমার পিতার পিতা। ফলে তিনিও আমার সাথে সংযুক্ত, তাই ধান্য জমি সংশ্লিষ্ট অদ্ভুত ঘটনাটি আমার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, বলব কি স্যার? ওকে বলুন। ... ...

টুকুন কোঁচড় থেকে ডিমগুলো বের করতেই সক্কলে হাঁ হয়ে গেল! নদীর ধারে এমন হুটোপাটির চড়ুইভাতি, তাতে আবার ডিম! তার ওপর আধাআধি ভাগাভাগি নয়, মাথাপিছু একটা করে গোটা ডিম! প্রথম চোটে আনন্দে কথা ফুটল না কারো মুখে। তারপর বিস্ময় একটু থিতোতেই হইহই করে উঠল কচিকাঁচার দল। যক্ষের ধনের মতো ডিমগুলো কোথায় রাখবে তাই নিয়ে টগবগ করতে লাগল নানান মতামত। আজ ওদের চড়ুইভাতি। বিল্বপত্র গ্রামের একধার দিয়ে বয়ে গেছে রূপনারায়ণ। নদীতটের এই অঞ্চলটা ফাঁকা। উঁচুনিচু। এদিকে-ওদিকে ঘাসের গুছি, শুকিয়ে যাওয়া কাশ আর বেতঝোপ। ফেরিঘাটও নেই কাছাকাছি। জনহীন হওয়ায় এইখানটা ছেলেপুলেদের ভারি প্রিয়। কখনও ওরা দলবেঁধে খেলতে আসে, কখনও বা জলে ঝাঁপিয়ে সাঁতার কাটে। ... ...

বিরতির সময় পলাশের সাথে দুই সেকশনের কয়েক জন খেলোয়ারের মধ্যে কী কথা হয়েছে সেটা হারাধন জানে না। কিন্তু খেলা আবার শুরু হবার পর থেকে দেখা গেলো বল বার বার তার প্রান্তে চেপে আসছে। হারাধন প্রাণপনে বল ফেরাতে থাকে। একপর্যায়ে বলের দখল নিয়ে সৃষ্ট এক জটলায় কেউ একজন হারাধনকে খুব জোরে ধাক্কা মারে। তাল সামলাতে না পেরে সে পড়ে যেতে হঠাৎ কে যেন তার বাঁ হাতের উপর লাফিয়ে পড়ে। সেটা কি সেকশন-এ’র মোটকা সাদমান নাকি সেকশন-বি’র বখা বাদল সেটা বোঝা যায় না, তবে হারাধনের কবজিতে কড়াৎ করে একটা শব্দ হয়। তারপর তীব্র ব্যথায় তার আর কিছু মনে থাকে না। ... ...

কবিতা লেখা ও পড়ার, কবিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবার পরেই অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন আসে, তার বহুমুখী অভিঘাত নিয়ে। যেহেতু কবিতা একটি মাধ্যম যেখানে একজন লেখক ও পাঠক একটি স্বতন্ত্র পথে নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় করছেন, তাই এই বিষয়ে কোন সাধারণ উপলব্ধি বলে কিছু হয়না। আমরা এরকম বলতে পারিনা যে জীবনানন্দের বনলতা সেন যা বলতে চেয়েছিলেন তার "মানে" ঠিক এই। কবি ও পাঠকের কথোপথন অনেকটা দুটি মানুষের মধ্যে একান্ত নিভৃত টেলিফোনে বাক্যালাপের মত হয়ে দাঁড়ায়। আগে একটা সময় মনে করা হত এই কথোপকথনের নিজস্ব ব্যাকরণ থাকা উচিত, কালক্রমে সেই মজবুত বাঁধন অনেক আলগা হয়েছে। এখন লেখক ও পাঠক দুজনের ব্যক্তিগত যাপন ও দর্শনের প্রত্যক্ষ প্রভাব নির্দিষ্ট করে দেয় লেখায় কী থাকবে, পাঠকের সেই জিনিস ভালো লাগবে কিনা, এবং ব্যাকরণ বহির্ভূত কবিতা বলে সেইভাবে আর হয়ত কিছু নেই, যদি কবিতার সার্থকতা ভালো লাগা দিয়ে নির্ধারিত হয়। অবশ্য ভালো লাগার বাইরেও, শিল্পবোধ বা বহুদিন ধরে মানুষকে ভাবিয়ে তোলার নিরিখেও কবিতার ভালোমন্দ বিচার হয়, এবং কী সেই আশ্চর্য ভারসাম্য যা কবিতাকে কালজয়ী ও পাঠকের অন্তরঙ্গ করে, সেই কূট তর্ক আপাতত আমরা সরিয়ে রাখবো। নাট্যমঞ্চে যেমন আলোর বৃত্ত ফেলে ফেলে ঠিক করা হয় দর্শকের কী দেখা উচিত, সেইভাবে জীবনদর্শনের ফোকাস দিয়ে কবি ঠিক করেন কী লিখবেন, পাঠক ঠিক করেন সে জিনিস তার পছন্দের কিনা। এই দ্বন্দ্ব, এই কখনও ভালো কখনও খারাপ লাগার চর্চাকেই কেউ কেউ কবি ও পাঠকের মধ্যে ঘটে চলা নিরন্তর লড়াই বলেছেন। উৎসব সংখ্যা দ্বিতীয় পর্বের কবিতা। এই পর্বে লিখেছেন যশোধরা রায়চৌধুরী, চিরশ্রী দেবনাথ, হিন্দোল ভট্টাচার্য, সাম্যব্রত জোয়ারদার, হীরক সরকার, সোমনাথ রায়, জগন্নাথদেব মন্ডল এবং সোনালী সেনগুপ্ত। ... ...

“এই দ্যাখ, এমনি করে ক্যাপটা দু আঙ্গুলে ধরে দেয়ালে চট করে ঘষে দে” - চাপা একটা ফট শব্দ -মেয়েটা ভুরু কুঁচকে ধোঁয়ার রেশটা তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখে। ... চেষ্টা করি? যদি আঙ্গুলে ছ্যাঁকা লাগে? না থাক বাবা ... উল্টে সে মাটিতে ক্যাপের রোলটা ফেলে হাওয়াই চটি দিয়ে পিষে দেয়, বারুদের আওয়াজ টা আরও চেপে গিয়ে কিরম ম্যাদামারা মত শোনায়। মরুক গে যাক! নতুন ক্যাপ বন্দুকটা কিনেছে কি করতে, সেই যদি হাতে-পায়ে করে ফাটাবে? গেলবার সেই যে বাপির সাথে বন্দুক কেনা নিয়ে দারুণ ঝগড়া হল- বলে কি না পুরনোটাতে তেল দিয়ে দিচ্ছি, ওটাই ফাটা! পুজোয় নতুন জামা পরে পুরনো ক্যাপ বন্দুক? এ আবার কেমনধারা কথা! বাপির মনখারাপ করছে বুঝতে পেরেও জেদ করে কথা বলেনি দু-দিন। তারপর তো সেই জ্যেঠু আর বড়দাদার হাত ধরে গিয়ে দোকান থেকে পছন্দ করে নতুন বন্দুক কেনা হল। ... ...

ছবি দেখার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? (অথবা, রাগসঙ্গীত শোনার? সাহিত্যপাঠের? কিম্বা, ভালো সিনেমা দেখার? এককথায়, শিল্পবিষয়ে সচেতন চর্চার কি আদপেই কোনো যুক্তি আছে?) ভেবেছিলাম, এই প্রশ্নের অতি স্বাভাবিক উত্তরটি অস্তিবাচক। কিন্তু, কিছু আলাপ-আলোচনার শেষে বুঝলাম, এই প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর পাওয়া মুশকিল। যেমন, আমার মনে হয়, এই অভ্যেস জরুরী। এই প্রসঙ্গেই, আগের একটি লেখায় বলেছিলাম, নান্দনিকতার বোধ গড়ে তুলতে এই অভ্যেস অবশ্যপ্রয়োজনীয়। পশ্চিমী দেশে, স্কুলের বাচ্চাদের নিয়মিত আর্ট গ্যালারী বা চিত্রপ্রদর্শনীতে নিয়ে যাওয়ার চল রয়েছে। এবং, শুধু দেখাই নয়, ছবি দেখে কেমন লাগলো, সেই অনুভব নিয়ে তাদের দস্তুরমতো লিখতেও হয়। এইভাবেই নান্দনিকতার বোধ তৈরী হয়, আর সাথে সাথে নিজের ভালো লাগাটিকে বিচার বা বিশ্লেষণ করার বোধটিও তৈরী হয়। সুকুমার হৃদয়বৃত্তির গঠনে এমন চর্চা বা পাঠ জরুরী, এমনই আমার ধারণা। ... ...

বজ্রডঙ্কুশ বা উদংষ্টিট্টিভ। এর মানে কী? শশীশেখর তাঁর ছেলের নাম রেখেছিলেন মৃগাঙ্কভূষণ। স্কুলে একদিন ছাত্রের মুখে বাবার নাম শুনে শিক্ষক বললেন,‘সেকী! শশীশেখরের ছেলের নাম মৃগাঙ্কভূষণ কেন? বাবাকে বল নাম বদলে মৃগাঙ্কশেখর করে দিতে। ছেলে বাবাকে বাড়ি ফিরে সেকথা বলতে শশীশেখরের জবাব, ‘মাস্টারকে বলিস আমার ছেলের নাম আমি বজ্রডঙ্কুশ রাখব না উদংষ্টিট্টিভ রাখব, তাতে মাস্টারের কী। এরকমই নতুন শব্দ সুকুমার রায়ের হিজবিজবিজ, কুমড়োপটাশ, কাঁকড়ামতী নদী বা ল্যাগব্যাগর্নিস পাখি। এরা কেউ বাস্তবে নেই, কিন্তু নাম থেকেই এদের কী কোনও ছবি মনে আসে? বা সুকুমার এই সব চরিত্রের চেহারার যে বর্ণনা লিখে গেছেন, মনে হয় নাকি, সেসব এক্কেবারে সঠিক! শব্দের এটাই শক্তি, এটাই জোর। ... ...

ফুচকার জন্মরহস্য কেউ জানে না। এমনকি তা জানতে কারুর সেরকম আগ্রহও দেখিনা। সাবেকি ফুচকার তিনটি বাসস্থান। বম্বে, থুড়ি মুম্বাইতে তার নাম পানিপুরি, দিল্লিতে গোলগাপ্পা আর কলকাতায় ফুচকা। পানিপুরি নামটি সমগ্রতই ব্যাকরণসম্মত। যে পুরির ভেতর পানি থাকে - এরকম ব্যাসবাক্য করলে স্বয়ং পাণিনিও বোধহয় রুষ্ট হতেন না। গোলগাপ্পা অন্ততঃ আধা ব্যাকরণসম্মত। আকারে এটি গোলই বটে। গাপ্পার ব্যাকরণগত ব্যুৎপত্তির হদিশ আমার কাছে নেই। কিন্তু ফুচকা? কোন মানেই হয়না। ব্যাকরণপরীক্ষায় ফুচকা ডাহা ফেল। এমনকি মার্কেটিঙেও। গুগুল বাজার গরম করার আগে জ্ঞানসমুদ্রে যার কদর ছিল রাশভারী জ্যাঠামশাইয়ে, সেই এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার অনলাইনে চাটের এন্ট্রিতে গোলগাপ্পা ও পানিপুরির উল্লখ থাকলেও ফুচকার নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে মমতা ব্যানার্জি থেকে আমরা বাঙালি - সবাইকার যে গর্জে ওঠা উচিত, সে ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করি। ... ...

মাথায় কাপড়ের মস্ত গাঁঠরি, তাতে শুধু গোলাপি নয় আছে কতো বান্ডিল বান্ডিল নানা রঙের জামাকাপড়। সে হল আমাদের বিমলা আন্টি। আমি আন্টি বলি, বলতে ভালো লাগে। বিমলা আন্টি আমাদের পাড়ার ধোপানি। ওর একটা খিটকেল বর আছে, রামস্বরূপ। কোন জামাকাপড় তাড়াতাড়ি ইস্ত্রি করতে হলে রামস্বরূপকে ফোন করতে হয়। সে বলে এখখুনি নিয়ে আসছি। আমি বলি বিমলা আন্টি আসবে? তাকেই পাঠাও না কেন? তোমার ওই হাঁড়িচাচার মতো মুখটা কি না দেখলেই নয়? বিমলা আন্টি এসেই তার গুছিয়ে পরা কোটা শাড়ির ঘোমটা একটু টেনে গলা তুলে বলে, কাপড়া। তারপর গাঁঠরি খুলে বলে, গিনলো। আবার নতুন কাপড় দেওয়া শুরু হয়। এবার টাকা দেবার পালা। আমি ফস করে বলে বসি, তুমি কী সুন্দর দেখতে, বিমলা আন্টি। মাথা নিচু করে টাকা গুনছে বিমলা আন্টি। আমার এই কথায় তার নিচু চোখের পাতা,বসা গাল, টিকলো নাক, গর্বিত চিবুক, কোথাও এতটুকু পরিবর্তন দেখতে পাই না। চোখ দুটো তুলে বলে, সত্তর রুপিয়া, ইয়ে লো তিস রুপিয়া ওয়াপস। ... ...

১৯৯৫ সাল নাগাদ শুরু হলো চরম উত্তেজক অধ্যায় যাকে ভালো বাংলায় ক্লাইম্যাক্স বলে। সেপ্টেম্বরে গণেশ দুধ খেয়ে জানালেন আর দেরি নেই। অক্টোবরে ডিডিএলজে মুক্তি পেলো, আর ডিসেম্বরে পুরুলিয়ায় ঈশ্বর পুষ্পকরথ থেকে অস্ত্রবৃষ্টি করলেন। অন্যান্য অস্ত্রের সাথে ইউরেনিয়ামে রাঙানো একটা জাঙিয়াও পড়েছিলো, তার রং বলার জন্য একটি টক শোয়ের আয়োজন হয়। সেই লাইভ অনুষ্ঠানে সমস্ত জাতি গলার শির ফুলিয়ে বলে "রং দে মোহে গেরুয়া"। সমগ্র জাতি জাঙিয়া পরতে শুরু করে তাই ঈশ্বরকে উলঙ্গ হতে হয়। ঈশ্বর জাঙিয়াহীন দেখে দ্যাবাপৃথিবী একত্র হয়ে এক অপূর্ব আলখাল্লা রচনা করে, যার সুতো ইতালির আর বোতাম প্যালেস্টাইন থেকে আনা। ... ...