বিদিশাকে হারিয়ে আমার প্রায় উন্মাদের অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। কোন কিছুই ভাল লাগত না। এই সমস্ত কিছুর জন্য আমি দায়ী, শুধুমাত্র আমি, আর কেউ নয়। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ বিদিশা আমায় দিয়েছিল কিন্তু সাহস করে এগোতে পারিনি। বিদিশা ঠিকই বলেছে, আমি একটা মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ। তা না হলে যে মেয়েটাকে অন্তর দিয়ে ভালবাসি তার বিপদের সময় ওভাবে কেউ গুটিয়ে থাকতে পারে না। আর সব থেকে বড় কথা তাকে সেই বিপদে ফেলেছি আমি। বাবা ওর সাথে যে ব্যবহার করেছে বাবার মত মানুষের কাছে ওই পরিস্থিতিতে সেটাই প্রত্যাশিত। বাবার কাছে ওর থেকে ভাল কিছু আশা করা যায় না। মাও বাবার সিদ্ধান্তের কাছে চিরকালের মত অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল। ... ...
পিসির বাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার পর শরীরের ভার ক্রমশ বাড়তে থাকলেও মনের ভার অনেকটাই কমে গিয়েছিল। পিসির স্নেহের পরশে যাবতীয় দ্বিধা-দ্বন্দ, সঙ্কোচ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি আগামী দিনের জন্য। মাস তিনেক কাটার পর স্কুলে জয়িতাদি একদিন ডেকে বললেন—তুমি একটা লিভ অ্যাপ্লিকেসন লিখে আমাকে দাও, কাল থেকে তোমায় আর স্কুলে আসতে হবে না। সব কিছু ভালভাবে হয়ে যাক, বাচ্চাটা একটু বড় হোক, তারপর আমি যখন বলব তখন জয়েন করার কথা ভাববে। মাইনে যেমন পাচ্ছ তেমনি পেতে থাকবে। ... ...
অমিতাভ চলে যাওয়ার পর একাকীত্বের যন্ত্রণায় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিছুই ভাল লাগত না। আশ্রমের ছেলেগুলোকে নিয়ে সময় কাটিয়ে চেষ্টা করতাম মানসিক শান্তি পেতে। কিছুটা সময় ভুলে থাকতাম, কিন্তু রাতে বা কোন সময় একা থাকলেই হারিয়ে যাওয়া সব কিছু মনটাকে গ্রাস করে ফেলত। প্রথম প্রথম বেঁচে থাকাটাই কেমন যেন অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে একটু একটু করে খানিকটা সামলে উঠেছিলাম। কিন্তু মেয়েটা আসার পর থেকে ক্রমশ সব কিছু যেন বদলে গেল। জীবনটা আর বোঝা মনে হত না, প্রতিদিন তাকে নানাভাবে, নতুনভাবে, উপভোগ করতাম। মনে হত পৃথিবীতে আমার জন্য বরাদ্দ সময় একটু বেশি হলে ভালই হয়। আসলে লোভ, ভালবাসার লোভ। সন্তানস্নেহে সিক্ত মন আরো কিছু চাইত। মনে তখন নাতি/নাতনিকে বুকেতে জড়িয়ে ধরে খেলা করার লোভ হাতছানি দিচ্ছে। ... ...
তন্ময়ের বাবা চিৎকার করে বললেন- বুলি মুখ সামলে কথা বল। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাও শিখিস নি। জানিস আমি কি করতে পারি? আর যাকে নিয়ে এসেছিস সে অন্য কোথাও নোংরামিটা করে প্রেগন্যান্ট হয়নি তার কোন প্রমাণ আছে। অর্চনাও সূর চড়িয়ে বলল- মামা একদম চোখ রাঙিয়ো না, এতক্ষণ অনেক বাজে বাজে কথা বলেছ। ছোটলোকের বাবা অন্যকে ছোটলোক বলছে। লজ্জা করে না! তুমি খুব ভাল করেই জান যে কার সন্তান তা প্রমাণ করতে সময় লাগেনা। আর তনু, তোর থেকে তো রাস্তার কুকুর বেড়াল ভাল রে। তারা অনেক বেশি বিশ্বস্ত। চেনা লোক বিপদে পড়লে তারা এগিয়ে আসে, তোর মত নিজের বাপের ভয়ে পালায় না। তুই একটা মেরুদণ্ডহীন অমানুষ। আর মামা তুমি আমার কিচ্ছু করতে পারবে না। তোমার এই বড় বড় কথা, রোয়াব, দম্ভ, সব না একদিনে ঘুচিয়ে দেব। আর তার জন্য থানায় একটা অভিযোগ লেখালেই যথেষ্ট, এই কেসে কোনো মাতব্বর তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। এরপর আমি তো নয়ই, আমার বাড়ির কারো সাথে কোনোরকম যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করবে না। আমরা ভদ্রলোক তাই নীচ, ছোটলোকদের সাথে সম্পর্ক থাকাটা কাম্য নয়। ... ...
এ আমি কি করলাম! নিজের সম্পত্তি নিজেই লুঠ করে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করেছি। সকালের দিকে চোখটা একটু লাগতেই আবার দেখলাম এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। ‘আমি একটা জলাশয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েকটা ছায়ামূর্তি দূর থেকে আমার দিকে সমানে ঢিল ছুঁড়ছে। নিজেকে বাঁচাতে আমি ছুটতে ছুটতে জলাশয়ের অন্য দিকে চলে গেলাম। খুব ঘেমে গেছি, চোখে মুখে জলের ছিটে দেওয়ার জন্য জলাশয়ের দিকে একটু ঝুঁকতেই আঁতকে উঠলাম। একটা হায়নার প্রতিবিম্ব জলে ভেসে উঠল। ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, ঘুম ভেঙে গেল। ... ...
মার কোলে মাথা রেখে শুলাম, মা ধীরে ধীরে চুলে বিলি কাটতে লাগল। আর তো কটা দিন, একটু মায়ের আদর খেয়ে নিই। বিয়ের পর অমিতের মাঝে বিলীন হয়ে ভালবাসায় প্লাবিত হব, মিলনসুখের মধুর তরঙ্গে দোল খাবে তৃপ্ত শরীর ও মন তবু থেকে থেকেই মিস করব পৃথিবীর সবথেকে নিশ্চিন্ত আশ্রয়, স্নেহময়ি মায়ের কোল। ঈশ্বর দুঃখকষ্ট দেওয়ার সময় কত বেহিসেবি হয়, সুখের বেলায় এত নিক্তি মেপে কাজ করে কেন বুঝিনা। একটা পেতে গিয়ে অন্য একটাকে হারাতে হবে কেন? একটু উদার হয়ে দুটোই কি একসাথে দিতে পারে না। ... ...
ছোটবেলায় আমি খুব একা একা বড় হয়েছি। আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চা যেমন একসাথে খেলে, হৈচৈ করে, তেমনটা আমি করিনি। করিনিটা বলা ভুল হল আসলে বাবার অহং, স্ট্যাটাস সচেতনতা, পারিবারিক আভিজাত্য, আমার শৈশবটাকে সাধারণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাকে গড়ে তুলেছিল এক নিঃসঙ্গ রাজকুমারের মত। ... ...
মা আমার বন্ধুর মত। এইসব ক্ষেত্রে সব মায়েরা মেয়েদের যে ধরণের স্ট্যাটিউটরি ওয়ার্নিং দেয় আমার মাও সেটা হাল্কা করে দিয়েছে, তবে সব শুনেটুনে গ্রিন সিগনালও দিয়েছে। মাকে মজা করে বলেছি, “মা তোমার কত ভাগ্য বলত, না খুঁজতে হল বৌমা না খুঁজতে হল জামাই। এত বড় গুরু দায়িত্ব তোমার ছেলে মেয়েরা নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে।” শুনে মা বলল, “একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। কোন সমস্যা হলে আমার দিকে আঙুল তুলতে পারবি না, নিজেদের হ্যাপা নিজেদেরই সামলাতে হবে।” অমিতকে দেখার পর ওর আচার আচরণে মা খুব খুশি। অমিত মার রান্না খেয়ে একেবারে ফিদা হয়ে গেছে। আর অমিতের মুখে বারে বারে রান্নার প্রশংসা শুনে মাও আপ্লুত হয়ে বা একটু অন্যভাবে বললে গ্যাস খেয়ে মাঝে মাঝেই নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছে। চালু ছেলে, শুধু রান্নার প্রশংসা করেই নয় সাথে গৃহ চিকিৎসক এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বাড়িতে যে কোন সময় অবাধ যাতায়াতটা নিশ্চিত করে নিয়েছে। ... ...
স্টাডিতে গিয়ে তন্ময়ের বাবার সাথে দেখা হল। দেখেই মনে হল রাশভারী মানুষ। কাকিমা পরিচয় করিয়ে দিতে ঢিপ করে একটা পেন্নাম করলাম। আশীর্বাদের বাহুল্য বর্জন করে গম্ভীর গলায় ভাববাচ্যে প্রশ্ন করলেন—কি করা হয়? বললাম—এম এ পাশ করেছি। --সে তো হয়ে গেছে, এখন কি করা হয়? কাকিমাই আমার হয়ে উত্তর দিলেন—কি আবার করবে? এই তো কিছুদিন আগে রেজাল্ট বেরিয়েছে। ক’দিন একটু আনন্দ করুক তারপর ভাববে কি করা যায়। দু এক কথার পর কাকিমার সাথে চলে এলাম বা বলা ভাল পালিয়ে এলাম। অনেকটা ছোটবেলায় দেখা বাংলা সিনেমার কমল মিত্র। কাকিমাকে দেখে যতটা ভরসা পেলাম ওনাকে দেখে ততটাই ভয়। ... ...
জীবন পথের প্রতিটি বাঁক উন্মোচিত করে এক একটা অচেনা নতুন দিগন্ত। উত্থান-পতন, হর্ষ-বিষাদ, ভাল-মন্দের আস্বাদ নিতে নিতে কিছুটা যাওয়ার পর পথটার সাথে যখন একটু সড়গড় হয়ে যাই তখনই দেখি আর একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। ঘুরেই মুখোমুখি হতে হবে আবার একটা অনিশ্চয়তায় ভরা সমস্যা সঙ্কুল নতুন পথের। একটু ভুল পদক্ষেপ হলেই বিপদ। ... ...