বউবাজার থানায় বিদ্যুৎ তরফদারের সামনে বসে একাগ্রচিত্তে কিয়স্ক রেজিস্টারের একফালি ছবির মধ্যে ডুবে গেল। প্রায় তিন মিনিট কেটে গেছে। বিদ্যুৎ নিজের টেবিলে বসে এটা ওটা ফাইল ওল্টাচ্ছে। কলতান আপনমনেই বলে উঠল, ' কারেক্ট কারেক্ট ... কোন ডাউট নেই .... খালি চোখেই পরিষ্কার .... 'কথাটা বিদ্যুতের কানে গেল। সে বলল, ' কি হল কলতানদা ? '---- ' না কিছু না .... এন্ট্রি আর এগজিট-এর হ্যান্ডরাইটিং পরিষ্কার আলাদা। এর জন্য কোন এক্সপার্টের দরকার নেই। 'বিদ্যুৎ ফাইল বন্ধ করে বলল, ' তার মানে সতীনাথ দত্ত এই কথাটা অন্তত সত্যি বলেছে। '----- ' হ্যা.... তাতেই আমাদের চিন্তা আরও ... ...
সুকিয়া স্ট্রীটের এপকন টেস্টিং ল্যাবে কলতানের অনেক বছরের যাতায়াত। ল্যাব চালায় বাদল সাহা। পিওর কেমিস্ট্রিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এস সি । বাষট্টি বছর বয়েস। কলতান বলল, ' এই স্যাম্পেলগুলো রাখ। কাল দুপুরের মধ্যে রিপোর্ট চাই। টিসু পেপারে মোড়া দুটো বোতল সবুজ রঙের বোতাম এবং ক'টা বোতল ভাঙা কাঁচের টুকরো বার করে বাদলকে দিল। বলল, ' আরও দুটো ভাইটাল টেস্ট আছে। ওগুলো পুলিশের ফরেনসিক সেল ক্যারি আউট করবে .... '------ ' খুব ইন্টারেস্টিং কেস মনে হচ্ছে। '----- ' কেস তো সবই ইন্টারেস্টিং। ইন ফ্যাক্ট কেস যত ইন্টারেস্টিং, তত ঘোরাল। ভীষণ টাফ ... ...
সন্ধে সাতটা বাজে। বিদ্যুৎ তরফদারের কাছে প্রিয়দর্শিনীর আজব কিস্যা বর্ণনা করছিল কলতান বউবাজার থানায় বসে। নেকলেসটাও থানার জিম্মায় জমা করে দিল সে। এখন পুলিশের দায়িত্ব যথাযথ জায়গায় এটা হস্তান্তর করার। প্রয়োজন হলে তারা প্রিয়দর্শিনীকে এবং সতীনাথকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কলতান বলল, ' প্রয়োজন হলে আমাকে ডাকতে পার, সে ওদের মুখোমুখি বসে বয়ান দেবার জন্যই হোক বা লিখিত বয়ান দেবার জন্যই হোক ... লিগ্যাল কোন লুপহোল না থাকে ... '----- ' আরে দূর ... ছাড় তো ... তোমাকে ডিপার্টমেন্টে কে না চেনে ... এর জন্য আবার ডিপোজিশান লাগবে ? এখন আইটেম তো বউবাজার থানার কাস্টডিতে। আইটেম ... ...
কলতান ভাবল, মিসেস দত্তকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, তার কলতানের কাছে আসার উদ্দেশ্য কি। যেসব কথা বলছে, সেসব তো সে আগেই জেনে ফেলেছে। সে প্রিয়দর্শিনীকে একটা খোঁচা মারল, ' সতীনাথবাবুর ব্যাপারে কি ভাবছেন আপনি ? 'এবার আর কোন হেঁয়ালি করলেন না ভদ্রমহিলা। প্রাঞ্জল ভাষায় বললেন, ' ওর ব্যাপারে আর ভাবার কি আছে। ইহকাল পরকাল সবই তো গেছে। আর আমার জীবনেরই বা আর কি আছে ? মেয়েটার ভবিষ্যৎ যদি সুখের হয় সেটুকুই কামনা .... ' ------ ' হ্যা ...... সে তো ঠিকই .... কিন্তু নেকলেসের সমস্যাটার তো সমাধান করতে হবে..... আপনার কাছে কো-অপারেশান চাইতেও সংকোচ বোধ ... ...
কলতান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। পরের দিন সকাল পর্যন্ত মুলতুবি রাখল চিন্তাভাবনা করার জন্য। তার গোয়েন্দা মন জানে, অত সহজে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। একজন বিবাহিতা মহিলা একা আসতে চাইছে প্রকাশ্য স্থানে কিছু বলবার জন্য এটা শিশুসুলভ সরলতায় গ্রহণ করাটা অবিমৃশ্যকারিতা হতে পারে। তাছাড়া দেখা যাচ্ছে ভদ্রমহিলা নিউ হরাইজনের কথা জানেন। এখানেই ব্যাপারটা আরও জটিল লাগছে। হয়ত তিনি মহুয়া মিত্রের ব্যাপারটাও জানেন। প্রিয়দর্শিনীকে ফোন করাটা ওনার পক্ষে নিরাপদ হবে কিনা বলা মুশকিল। তাই ভোরবেলায় কলতান প্রিয়দর্শিনী দত্তকে একটা মেসেজ পাঠাল ----- "বেটার টু মিট অ্যট মাই প্লেস ইফ পসিবল ফর ইউ, ... ...
সন্ধে ছটা নাগাদ কলতান বৌবাজার থানায় ঢুকল। বিদ্যুৎ থানায় ছিল। ----- ' আরে কলতানদা..... আসুন আসুন .... আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম ....খুব ঘেমে গেছেন ..... কোল্ড ড্রিঙ্কস আনাই ? ' কলতান রুমাল বার করে ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ' আনাও .... আনাও .... সারাদিন প্রচুর প্রেসার গেল ...... 'বিদ্যুৎ একজনকে ডেকে দুটো ঠান্ডা বোতল আনতে দিল। ----- ' তারপর ....... বালীগঞ্জ অপারেশান সাকসেসফুল ? '---- ' হ্যা .... যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম সেটা করে আসতে পেরেছি। সতীনাথবাবুর এ ব্যবসায়ে কোন অংশীদারিত্ব নেই। তিনি তার দাদার অধীনে দোকানের ম্যানেজার স্তরের কিছু ... আর কি ..... এবং যে কারণেই ... ...
ওখান থেকে লেকের গার্ডেন্সের মোড়ে এসে বাইকটা দাঁড় করিয়ে বউবাজার থানার ওসি বিদ্যুৎ তরফদারকে একটা কল দিল। ----- ' হ্যা ..... কলতানদা ..... কেসটার কদ্দুর ?'----- ' কেন .... এত তাড়া কিসের ? '----- ' আরে কি বলব ..... পার্টি বহুৎ সেয়ানা .... বারবার হুড়কো মারছে ..... খালি বাজে ধান্দা .... একটা নীরিহ গরীব মানুষকে ফাঁসাচ্ছে ..... শেমলেস ....'---- ' তুমি কি বললে ? '----- ' আমি ওসব রংবাজদের কেয়ার করিনা..…. আর যে করে করুক ..... পুলিশে কাজ করি বলে কি ..... ছো : '------ ' সে ঠিক আছে .... তুমি কি বললে ওদের ?' ----- ' ও..ই ক্যাভিয়েট পিটিশানের কপিটা ... ...
----- ' তুমহারা নাম কেয়া হ্যায় ভাই ?'----- ' দীনেশ ' কলতান ফলওয়ালাকে বলল, ' তুম হররোজ ইঁহা ব্যয়ঠতে হ্যায় কেয়া ? ' ----- ' নেহি ..... কভি কভি ব্যয়ঠতে হ্যায় ..... আভি ইয়ে পুরা মাহিনা ব্যয়ঠেগা .... '----- ' আচ্ছা ঠিক ঠিক .... কবতক রহতে ? '------ ' আট, সাড়ে আট তক ..... '----- কাল ভি সাড়ে আট তক থে ? '----- ' হাঁ জি ..... '----- ' আচ্ছা আচ্ছা .... ঠিক হ্যায় .... আজ তো লাগতা জ্যায়দা বিকা নেহি ..... ফিকর মাত করনা ..... ইয়ে লো .... এ ভি রাখ লো ..... 'বলে কলতান আর একটা পঞ্চাশ ... ...
দুপুর প্রায় আড়াইটে বাজে। কলতান বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বৌবাজারের মোড়ে এসে বাঁ দিকে ঘুরল। ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার মোড়ে এসে থামল। যাবার রাস্তায় দেখল দত্ত জুয়েলার্সে শাটার নামানো, তালা মারা। কলতান লক্ষ্য করল দত্ত জুয়েলার্স আর তার পাশের দোকানের মাঝখান দিয়ে একটা সরু গলি গেছে ছানাপট্টির দিকে। দীনবন্ধুবাবুরা নিশ্চয়ই বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছে এতক্ষণে। হ্যা ... ওরা ঠিকই বলেছে। মোড়ের মাথায় ওদিকের ফুটপাথে একটা পান সিগারেটের গল্লা আছে। ওপরে ছোট একটা টিনের সাইনবোর্ড। তাতে লাল রঙে লেখা আছে -- কস্তুরী। একজন নীল রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি ... ...
একে ওকে জিজ্ঞেস করে কলতানের বাড়িটা খুঁজে পেয়ে গেল দীনবন্ধুরা। কলতানরা থাকে তিনতলায়। এরা ঝট করে তিনতলায় উঠে যেতে পারল না। আত্মবিশ্বাসহীন মানুষের যেমন হয় আর কি। ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে আবোল তাবোল আলোচনা করতে লাগল। প্রথমত, তারা অনেকক্ষণ ধরে কজন ওপরে যাবে, কারাই বা যাবে, যারা যাবে তারা কিভাবেই বা তাদের সমস্যার কথাটা উপস্থাপন করবে, উনি যদি তাদের কেসটা নিতে রাজি না হন তাহলেই বা কিভাবে অনুনয় করবে, যদি খুব বেশী পারিশ্রমিক চেয়ে বসেন তাহলে কোন ভঙ্গীতে ভদ্রতার সঙ্গে দরাদরি করা উচিৎ, এই ভর দুপুরে ভদ্রলোককে বিরক্ত করা উচিৎ হবে ... ...