অমিতাভর ফোন কিন্তু আজকে আর বেজে উঠল না। দিগ্বলয়ে সূর্যাস্তের শোভা দেখতে দেখতে একাকী বসে থাকতে থাকতে অমিতাভর মনে হল সেও তো মনীষাকে একটা কল দিতে পারে। এতে দোষের কি আছে। মনীষা পাল তো মানসিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙে পড়ার মুহুর্তে তাকে অনেকটাই মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সে অকারণেই নিজের মনের কাছে জবাবদিহি করতে লাগল যে, কৃতজ্ঞতা হিসেবেও তার অন্তত একটা ফোন করার কর্ত্তব্য থেকেই যায়। শুভঙ্কর পালের সঙ্গে তো সে কোন মাখামাখি করতে যাচ্ছে না। তাছাড়া তার কোম্পানিতে ভিআর এস হয়ে যাবার পর মনীষা তাকে কি ধরণের সাহায্য করতে পারে সেটাও জানা দরকার। এইভাবে গভীর অন্তর্মুখী অমিতাভ ... ...
খোয়াইয়ের ধারে একটা পাথরের ওপর বসে রইল নিখিল। এখনও কেউ এসে হাজির হয়নি এখানে। নিতল অম্বরতলে ঝুরো পাতাপত্রের সঙ্গে হাওয়ার ফিসফিস কানাকানি। দিনভর চলে অস্থির বাতাসের অবিরাম খেলা। নির্জন নীরব পরিপার্শ্ব। নিখিলের মনে হল সে অনন্তকাল ধরে বসে থাকে এখানে। এই রকম জনহীন শব্দহীন বনভূমিতে সে কাঁথি, বারাসাত, অনিন্দিতা, মৃদুলা, ঐশী .... তিলোত্তমা লজ, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের দপ্তর ..... জীবনের জ্বলন্ত অঙ্গারগুলো ভুলে এখানে বসে থাকে। নিখিল দাস খোয়াইয়ের এই উদাস বিবাগী পরিবেশে প্রায় এক ঘন্টা ধরে বসে রইল। এই নিরালা বাতাস বেশিক্ষণ বজায় রইল না। একটা বড় মারুতি সুজুকি ভ্যান ঘ্যাঁসস্ করে ওপাশে রাস্তার ওপর দাঁড়াল। নানা বয়সের ... ...
বুধবার পড়ন্ত বেলায় মনীষা পাল হৈ হৈ করে এসে পড়ল তিলোত্তমা লজে। হোটেলে খাওয়ার দাওয়ার পাট চুকে গেছে ততক্ষণে। সুরেশ, ননীরা তাস খেলতে বসেছে চৌকির ওপর। দুলাল কাউন্টারে বসে হিসেব মেলাচ্ছে।এই সময়ে মনীষা পাল এক গাল হেসে সেখানে আবির্ভূত হল।অপ্রত্যাশিতভাবে ওকে দেখে দুলাল বলল, ‘ আরে .... বৌদি ! কি ব্যাপার ? খাবেন তো ? এ..ই ননী.... ‘— ‘ না না .... খাব না। আমি ভাত খেয়েই বেরিয়েছি। .... রুম নেব না। রাত্রেই ফিরে যাব। ‘— ‘ ও আচ্ছা .... এখানে বসুন তা’লে। চা খাবেন তো ? ‘— ‘ না এখন না। পরে খাব। ‘— ‘ ঠিক ... ...
মনীষা আবার বলল, ‘ চিনতে পারছেন তো ? লজে আপনার উল্টোদিকের ঘরে আমরা ছিলাম। আমার ছেলে বান্টি ....’এই ফোনটা অমিতাভর কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। সে বলে, ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি, বলুন .... ‘— ‘না.... মানে, আমরা চলে যাওয়ার সময় আপনার সঙ্গে দেখা হল না তো .... তাই .... ‘— ‘ ও আচ্ছা, আপনারা কি এখন মেচেদায় ?’ অমিতাভ বেশ বিব্রত বোধ করতে থাকে। কি বলবে ভেবে পায় না।— ‘ হ্যাঁ মেচেদায়। আবার কবে দেখা হবে কে জানে। লজে বেশ ভাল লাগছিল। আপনার কথা খুব মনে পড়ছে। দেখি এর মধ্যে সময় পেলে একবার কাঁথিতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। ‘অমিতাভ দায়সারা ... ...
মনীষা যেমন বলেছিল, তার পরদিন সকাল এগারোটা নাগাদ শুভঙ্কর পালেরা তিলোত্তমা লজ ছেড়ে মেচেদার দিকে রওয়ানা দিল। অমিতাভ আর অলোক অফিসে চলে গেছে। মনীষা বেরোবার সময় দেখল ছ নম্বর ঘরে তালা মারা। বান্টি আর শুভঙ্কর আগেই নীচে নেমে গেছে। মনীষা ছ নম্বর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড কি ভাবল তারপর দ্রুতপায়ে নীচে নেমে গেল।দুলালের মনটা বেশ ফুরফুরে আছে। বরানগরে বাড়িতে একবার ফোন করে খবরাখবর নিল। শর্মিষ্ঠা এখন ভাল আছে। ওষুধপত্তর এখনও চলছে অবশ্য। ... ...
বাপি ঘরে ঢুকে চায়ের গ্লাসটা ঠক করে ছোট নীচু টেবিলটার ওপর রাখল। অমিতাভকে জিজ্ঞেস করল, ‘বিস্কুট খাবেন?’ অমিতাভ বলে ‘না:, লাগবে না। তারপর তোর কি খবর? নতুন কিছু রিপোর্ট আছে?’— ‘না.... খবর আর কি হবে.... আমাদের লজে একজন বড় সাইনটিস এসেছে। কাল সকালে চলে যাবে। ওপাশে দুলালবাবুর সঙ্গে কথা বলছে কাউন্টারের সামনে বসে।’ — ‘তাই নাকি! বড় সায়েনটিস্ট এসেছে? কলকাতা থেকে? নাম কি?’ ... ...
নিখিল রাস্তায় বেরিয়ে এসে কলটা রিসিভ করল— ‘ হ্যালো.... কি ব্যাপার ? ‘ওদিক থেকে মধুর ব্রীড়া মাখানো গলায় অনিন্দিতার কথা শোনা গেল— ‘ তুমি আমার ওপর খুব রাগ করে আছ, না ? সেটাই স্বাভাবিক.... কিন্তু বিশ্বাস কর ....’নিখিল অনিন্দিতার কথা আগে বাড়তে দেয় না। কড়কড়ে দশ হাজার টাকা বেহাত হবার শোক এখনও ফিকে হয়নি তার। সে বেশ কর্কশ ভঙ্গীতে বলল, ‘ ওসব ফালতু নকড়া ছাড়। অাসল ধান্দাটা কি বলতো সোনা ! ‘— ‘ তুমি এত রাগ করে থেক না.... আমার কোন উপায় ছিল না..... আমি বাধ্য হয়ে.... তোমার সঙ্গে দেখা হলে সবকিছু বলব.... ‘— ‘ আমার সঙ্গে কোথায় দেখা ... ...
নিখিল দাসের বাড়ি বারাসাতের কাছাকাছি। ওখান থেকে একটা মর্মান্তিক খবর এল সকাল সাতটা নাগাদ। তার বড় মেয়ে ঐশীকে কাল ফাঁকা রাস্তা থেকে কারা তুলে নিয়ে গেছে। এখনও পাওয়া যায়নি। মেয়ের বয়স আঠারো উনিশ হবে। কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে বি কম পড়ে। বাবার মতোই চালাক চতুর। তাকে অপহরণ করা খুব সোজা ব্যাপার না। ফোনটা এসেছিল স্থানীয় থানা থেকে। নিখিল সাত সকালে ওরকম একটা বার্তা পেয়ে প্রাথমিকভাবে বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু সামলে নিতে সময় নেয় নি। ... ...
বাপি যতই হতভাগা হোক তার একটা পোশাকি নাম আছে কিন্তু।তার নিতান্ত শৈশবেই পরলোকগতা মায়ের দেওয়া নাম— অর্জুন। পুরো নাম অর্জুন লস্কর। কোনদিন যদি স্কুলে যেত তাহলে হয়ত তাহলে নামটা নিশ্চয়ই কাজে লাগত। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেরকম পরিস্থিতির আগমন না ঘটায় ওই নামটা জীবনের ঘাস মাটির তলায় চাপা পড়ে পাঁশুটে হয়ে গেছে। কে আর সে আচ্ছাদন সরাবে ! তার বাবা রামকৃষ্ণ লস্কর যে লোক খারাপ তা না। কিন্তু দ্বিতীয়বার ঘরে বৌ এনে সর্বনাশ পাকিয়েছে।এমন কুটিলমনা আত্মসর্বস্ব মহিলা কমই দেখা যায়। বাপি তখন পাঁচ বছরের বালক।বাবার বিয়ের পরদিন থেকেই সে তার নতুন মায়ের চক্ষুশূল হয়ে উঠল।কারণে অকারণে তাকে মারধোর করত। খাওয়া বন্ধ করে ... ...
অলোক খেতে খেতেই বলল, ‘অবস্থা খুব খারাপ। কালকে দুটো ইউনিয়নের সঙ্গে সিটিং ছিল ম্যানেজমেন্টের। গভর্নমেন্টের একজন রিপ্রেজেন্টেটিভও ছিল।সলিউশান কিছু বেরোয়নি। কোম্পানি আড়াইশো কোটি টাকার লস দেখাচ্ছে কারেন্ট ইয়ারে। বাঁচবার কোন রাস্তা আছে বলে মনে হচ্ছে না। ‘অমিতাভর মনে ভার চেপে বসল।সে বলল, ‘ ভি আর এস হবে বলে মনে হচ্ছে..... নাকি কোম্পানি হাতে হারিকেন ধরিয়ে দিয়ে ওয়াইন্ড আপ করবে ? খবর পেয়েছ কিছু ?’— ‘ কলকাতায় হেড অফিসে দেবর্ষি রায়কে ফোন করেছিলাম। ও তো ভেতরের খবর সব রাখে। বলল, এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যাপারটা ক্লিয়ার জানা যাবে। ধরে নাও পুজোর আগেই.....’থালার ভাতে অরুচি মেখে গেল। অস্থির মনে খাবার বিস্বাদ লাগে।অমিতাভ ক্লান্ত ... ...