সকাল আঠটার সময় দেবমাল্যর বাড়িতে চলে এল মৌসুমী। কাল রাত্রেই ফোনে পুরো বৃত্তান্ত জানিয়ে দিয়েছে কলতানকে। সব শুনে কলতান যদিও ফুরফুরে মেজাজে আছে, মনে একটা উৎকন্ঠার কাঁটা বিঁধে আছে যে রেকর্ডটা ঠিকমতো হল তো ? নাহলে এত টানাহ্যাচড়া, ঝকমারি সব মাঠে মারা যাবে। মৌসুমী ঢুকতেই কলতান বলে উঠল, ' ব্রেভো ব্রেভো ... ইয়াং গার্ল ... হ্যাটস অফ ... হোয়াট আ গ্রেট জব ... ' পারলে ওকে জড়িয়ে ধরে কলতান। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিল। মৌসুমী বলল, ' আরে দাঁড়ান দাঁড়ান ... ঠিকমতো রেকর্ডেড হল কিনা দেখে নিন আগে। তারপর সেলিব্রেট করবেন ... '----- ' ইয়েস অফ কোর্স ... ...
সকাল নটার সময় মৌসুমীর মোবাইলে কলতানের একটা কল এল। ----- ' হ্যালো স্যার ... বলুন ... '----- ' হ্যা ... ঠিক আছিস তো ? তোকে এরকম একটা আনসেভারি রেসপনসিবিলিটি দিয়ে আমি খুব আনইজি ফিল করছি। দেখ .... তোর তেমন অসুবিধে হলে ... ছেড়ে দে ... আমি অন্য কিছু ট্রাই করছি ... ' ----- ' না না ... স্যার ... আমি কাজটা যখন নিয়েছি ... শেষ করেই ছাড়ব ... আমারও তো গরজ আছে না ? একটা নীরিহ লোক এইভাবে... তাছাড়া মাঠে খেলতে নেমে গেছি ... এখন আমি ছাড়তে চাইলেও বসন্ত ছাড়তে চাইবে কি ? '----- ' এই তো ... ... ...
সকালবেলায় দেবমাল্য বলল, ' কলতানদা পরাণের পরিবারকে একবার দেখে আসবেন নাকি ? ওদের সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ করা হয়নি। কিছু টাকাও দিয়ে আসতে হবে। গত তিন বছরে কেসটা তুলে নেবার জন্য অনেক হুমকি ফেস করতে হয়েছে। কিন্তু পরাণের স্ত্রী সুজাতা তবু হাল ছাড়েনি। দাঁত কামড়ে পড়ে ছিল পাক্কা তিনবছর আমার ওপর নির্ভর করে।তাছাড়া আর একজন ওদের সাপোর্ট বলুন, শেল্টার বলুন প্রচুর দিয়েছিলেন। তিনি হলেন বীরেন ঘোষ মশাই। নাহলে এদের বেঁচে থাকাই প্রায় অসম্ভব ছিল। ওদের ছেলেগুলো প্রচুর প্রোটেকশান দিয়েছিল ... সুজাতা তার দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন পাশের গ্রাম ছামুড়িতে আছে ওর এক বোনের কাছে ... ...
আজ বুধবার। মৌসুমীর লাইব্রেরী যাবার দিন। সন্ধে ছটা নাগাদ সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।বই ফেরত দিয়ে কাউন্টারে স্লিপ জমা করে টেবিলের দিকে সরে এসে দাঁড়িয়ে একটা বাংলা সাপ্তাহিকীর পাতা খুলে সেই দিকে চেয়ে রইল। পাতার অক্ষরগুলো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। মনের ভিতর এলোমেলো চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন পরীক্ষা হলে বসে আছে প্রশ্নপত্র পাবার প্রতীক্ষায়। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে গেলে জড়তা কেটে যায়। তার উচ্চমাধ্যমিক শুরু হতে এখনও প্রায় দু মাস। কিন্তু সেটার সম্মুখীন হওয়াটা এখন অতি সহজ সরল ব্যাপার মনে হচ্ছে মৌসুমীর। এ পরীক্ষাটা কিভাবে সামলে নেওয়া যাবে সেই হিসেব ঘুরছে মনের ভিতর। ... ...
কলতান একটু দ্বিধান্বিত হয়ে বলল , ' বলছিলাম যে.... বাড়ি না গিয়ে অন্য কোথাও কথা বলা যায় না ? 'ওরা তিন জন হাঁটছিল। একপাশে একটা ছোট শিবমন্দির পড়ল। পাশে দুটো লম্বা নারকোল গাছ। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। মন্দির এখন ফাঁকা। কলতান বলল, ' এইখানটায় একটু বসলে হয় না ? '----- ' তা হয় .... কিন্তু ..... এটা ....' বলে চোখের ইশারায় গুল্টুর দিকে দেখাল ..... ' ----- ' ওকে বাড়িতে রেখে আসলে হয় না ? আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি ..... ' কলতান নীচু গলায় বলে।----- ' তা হয় .... কিন্তু ... এখানে বসলে কেউ দেখলে আবার ..... গ্রামের ... ...
থানার আই সি স্বরূপ রাউথ বলল, ' দেবমাল্যবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। উনি পরাণ বাগ্দীর কেসটার ব্যাপারে ইগারলি সিনসিয়ার। অ্যন্ড কোয়াইট জাস্টিফিয়েবলি সো .....। দেবমাল্য সরকার আপনার হেল্প নিয়ে ভালই করেছে। গড ফরবিড .... আমি কিন্তু খুব ডাউটফুল অ্যবাউট দা আউটকাম .... বিকজ অফ দা পলিটিক্যাল অ্যটমসফিয়ার অফ্ দিস প্লেস ...... আমি কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই .... 'কলতান ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে চোখ বুজিয়ে একদিকে ঘাড় কাত করল। স্বরূপ রাউথের বয়স প্রায় পঞ্চাশ। অনেক থানা ঘুরে এখানে এসেছেন। বারবার ট্রান্সফারের কারণ বোধহয় তার আপোষহীন স্বভাব। মুখ বুজে অন্যায় মেনে নেবার মানুষ স্বরূপ ... ...
দেবমাল্যদের এ গ্রামে স্কুল পড়ুয়ার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। শিক্ষার চল আছে ভালরকম। সন্ধে ছটা বেজে গেছে। দেবমাল্য কলতানকে বলল, ' ছটা বেজে গেছে ..... লাইব্রেরী খুলে গেছে। চলুন কলতানদা ফেরবার পথে আমাদের এখানকার লাইব্রেরীটা আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে যাই। লাইব্রেরী কালচারটা আমাদের গ্রাম এখনও ধরে রেখেছে। অনেক কমবয়সী ছেলেমেয়েও আসে ..... '----- ' হ্যা .... চল .... ' কলতানের দেখে মনে হল লাইব্রেরীটি অনেক পুরনো। ছোট মাপের একটা হল বলা যায়। দোতলাও আছে। লাইব্রেরিতে ঢুকে বেশ পুরনো দিনের আবহ পাওয়া গেল। বয়স্ক এবং অল্পবয়সী অনেকে লম্বা টেবিলের ধারে বসে ... ...
' ভাইজান আছেন নাকি ..... ও ভাইজান .... 'সকাল নটা বাজে। দেবমাল্যর কাল একটা হলফনামা জমা দেওয়ার ব্যাপার আছে বারাসাত কোর্টে বেলা দেড়টার সময়। কাল তৈরি হয়ে বেরোতে হবে বারোটা নাগাদ। কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে হবে আজকের মধ্যেই। একটা তহবিল তছরুপের মামলা। তাছাড়া কলতান গুপ্তেরও আজ আসার কথা। তেমনই তো কথা আছে। শিয়ালদা থেকে ছটা তেত্রিশের ট্রেনটা যদি ধরে ....।একবার ফোন করে দেখবে কিনা ভাবছিল দেবমাল্য .... এমন সময়ে ' ভাইজান ..... ও ভাইজান .... '। কে আবার ডাকে এই সময়ে। কলতান বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল লুঙ্গি আর হলুদ রঙের ফুলশার্ট ... ...
দেবমাল্য কলতানের ঘরে বসে আছে প্রায় চল্লিশ মিনিট। গোড়া থেকে আগা পরাণ মামলার সবটাই বলেছে সে কলতানকে। দেবমাল্যর কথার মাঝখানে একবারও ঢোকে নি কলতান। নিবিষ্ট মনে শুনে গেল ঘটনা পরম্পরা। ---- ' আপনি যে কেসটা টেক আপ করেছেন এজন্য যথেষ্ট ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য। ' ---- ' কলতানবাবু আপনি আমাকে তুমি বললেই আমার ভাল লাগবে .... ' ... ...
বসন্ত হেলেদুলে সেলুনের দিকে যাচ্ছিল। মন বেশ ফুরফুরে। সকাল এগারোটা বাজে। নানা তালেগোলে অনেকদিন চুল কাটা হয়নি। আজ একটু ফুরসত পাওয়া গেছে। নিত্যানন্দ হেয়ার কাটিং সেলুনে সৌরেনকে দিয়ে দলাইমলাইও করাতে হবে। ও : যা ধকল গেল .….. অ্যদ্দিন ধরে ..... বসন্ত হুসস্ করে একটা শ্বাস ফেলল মাথা নীচু করে। চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে দেখে মৌসুমী আসছে। সঙ্গে ওর আট বছর বয়সী ল্যাম্বোটটা ঠিক আছে ... ...