
মার কোলে মাথা রেখে শুলাম, মা ধীরে ধীরে চুলে বিলি কাটতে লাগল। আর তো কটা দিন, একটু মায়ের আদর খেয়ে নিই। বিয়ের পর অমিতের মাঝে বিলীন হয়ে ভালবাসায় প্লাবিত হব, মিলনসুখের মধুর তরঙ্গে দোল খাবে তৃপ্ত শরীর ও মন তবু থেকে থেকেই মিস করব পৃথিবীর সবথেকে নিশ্চিন্ত আশ্রয়, স্নেহময়ি মায়ের কোল। ঈশ্বর দুঃখকষ্ট দেওয়ার সময় কত বেহিসেবি হয়, সুখের বেলায় এত নিক্তি মেপে কাজ করে কেন বুঝিনা। একটা পেতে গিয়ে অন্য একটাকে হারাতে হবে কেন? একটু উদার হয়ে দুটোই কি একসাথে দিতে পারে না। ... ...

ছোটবেলায় আমি খুব একা একা বড় হয়েছি। আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চা যেমন একসাথে খেলে, হৈচৈ করে, তেমনটা আমি করিনি। করিনিটা বলা ভুল হল আসলে বাবার অহং, স্ট্যাটাস সচেতনতা, পারিবারিক আভিজাত্য, আমার শৈশবটাকে সাধারণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাকে গড়ে তুলেছিল এক নিঃসঙ্গ রাজকুমারের মত। ... ...

একটা সকাল কখনও কখনও একই সঙ্গে রোদ ঝলমলে আর মেঘলা গুমোট হতে পারে। বাইরে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে শীতের সকালে, মানুষজন নানান কাজে বেরিয়েছে, রবিবার বলে তবু হয়তো রাস্তায় লোক একটু কম। আর অরুণিমার মনের মধ্যে মেঘলা আকাশ। দাদা আর কিছুক্ষণের মধ্যে অফিস বেরিয়ে যাবে। তার পর আর কি কখনও দেখা হবে? হলেও কী অবস্থায় হবে। অরুণাভ ব্রেকফাস্ট খেতে এলে টেবিলে বসল অরুণিমা। দাদার হাতে বই ছিল, সেটা নামিয়ে রাখল সে। তবে সেভাবে কেউ কথা বলতে পারল না। বরং বিনীতাই একটা দুটো কথা বলে পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। সময় এসে গেল। ড্রাইভার বিকাশ এসে নিয়ম মতো তার স্যারের অফিস ব্যাগ আর খাবার নিয়ে গাড়ির দিকে চলে গেল। ... ...

মা আমার বন্ধুর মত। এইসব ক্ষেত্রে সব মায়েরা মেয়েদের যে ধরণের স্ট্যাটিউটরি ওয়ার্নিং দেয় আমার মাও সেটা হাল্কা করে দিয়েছে, তবে সব শুনেটুনে গ্রিন সিগনালও দিয়েছে। মাকে মজা করে বলেছি, “মা তোমার কত ভাগ্য বলত, না খুঁজতে হল বৌমা না খুঁজতে হল জামাই। এত বড় গুরু দায়িত্ব তোমার ছেলে মেয়েরা নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে।” শুনে মা বলল, “একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। কোন সমস্যা হলে আমার দিকে আঙুল তুলতে পারবি না, নিজেদের হ্যাপা নিজেদেরই সামলাতে হবে।” অমিতকে দেখার পর ওর আচার আচরণে মা খুব খুশি। অমিত মার রান্না খেয়ে একেবারে ফিদা হয়ে গেছে। আর অমিতের মুখে বারে বারে রান্নার প্রশংসা শুনে মাও আপ্লুত হয়ে বা একটু অন্যভাবে বললে গ্যাস খেয়ে মাঝে মাঝেই নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছে। চালু ছেলে, শুধু রান্নার প্রশংসা করেই নয় সাথে গৃহ চিকিৎসক এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বাড়িতে যে কোন সময় অবাধ যাতায়াতটা নিশ্চিত করে নিয়েছে। ... ...


স্টাডিতে গিয়ে তন্ময়ের বাবার সাথে দেখা হল। দেখেই মনে হল রাশভারী মানুষ। কাকিমা পরিচয় করিয়ে দিতে ঢিপ করে একটা পেন্নাম করলাম। আশীর্বাদের বাহুল্য বর্জন করে গম্ভীর গলায় ভাববাচ্যে প্রশ্ন করলেন—কি করা হয়? বললাম—এম এ পাশ করেছি। --সে তো হয়ে গেছে, এখন কি করা হয়? কাকিমাই আমার হয়ে উত্তর দিলেন—কি আবার করবে? এই তো কিছুদিন আগে রেজাল্ট বেরিয়েছে। ক’দিন একটু আনন্দ করুক তারপর ভাববে কি করা যায়। দু এক কথার পর কাকিমার সাথে চলে এলাম বা বলা ভাল পালিয়ে এলাম। অনেকটা ছোটবেলায় দেখা বাংলা সিনেমার কমল মিত্র। কাকিমাকে দেখে যতটা ভরসা পেলাম ওনাকে দেখে ততটাই ভয়। ... ...

জীবন পথের প্রতিটি বাঁক উন্মোচিত করে এক একটা অচেনা নতুন দিগন্ত। উত্থান-পতন, হর্ষ-বিষাদ, ভাল-মন্দের আস্বাদ নিতে নিতে কিছুটা যাওয়ার পর পথটার সাথে যখন একটু সড়গড় হয়ে যাই তখনই দেখি আর একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। ঘুরেই মুখোমুখি হতে হবে আবার একটা অনিশ্চয়তায় ভরা সমস্যা সঙ্কুল নতুন পথের। একটু ভুল পদক্ষেপ হলেই বিপদ। ... ...




অরুণিমা বলে চলে, “দেখ দাদা, আমার ইমোশন টিমোশন নেই। ডিভোর্সের পর থেকে বোধ হয় আরও কাঠখোট্টা হয়ে গেছি। তাই যা বলছি, সেটা শুনতে খারাপ লাগতে পারে। বৌদিকে জন্মদিনে সারপ্রাইজ দেওয়াটা ভাল। আগে কোনও দিন দিয়েছিস বলে তো মনে হয় না। তবে তার চেয়ে অনেক ভাল গিফট হবে ওর আর রঙিনের ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা করে যাওয়া। তোর তো যে কোন দিনই কিছু হয়ে যেতে পারে।” অরুণাভ গম্ভীর ভাবে শুনতে থাকে, চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে এক টুকরো কেক তুলে নেয়। বিনীতা বলে, “সকাল সকাল এসব আলোচনা না করলেই নয়?” ... ...


গল্পটি লিখেছিলাম বেশ কবছর আগে - আজকের দিনের মতো সেদিনও কোন এক কন্যার চরম অপমানিত হত্যার প্রতিবাদে দেশ এবং রাজ্য উত্তাল হয়েছিল। দোষীদের চরম শাস্তির আশায় তদন্ত চলেছিল, বিচার চলছিল - কিন্তু সব আশ্বাস সব সান্ত্বনা শুকিয়ে গিয়েছিল রাজনীতির মরু প্রান্তরে। আমাদের সকলের হাতে রয়ে গেল শুধু "মোমবাতির আলো" - সেদিনও - আজও একই ভাবে ... বাকি সব মরীচিকা... ... ...


বিনীতা আর গায়ত্রী বাইরের ঘরে এসে দেখে প্রচুর খাবারের প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকছে ড্রাইভার বিকাশ, তাকে সাহায্য করছে রঞ্জিত আর সবার পিছনে কেকের বাক্স নিয়ে আসছে অরুণাভ। গায়ত্রী হাসি মুখে বন্ধুর দিকে তাকায়। আর বিনীতা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। রঞ্জিত আর বিকাশ ভেতরে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর প্যাকেটগুলো রাখে। তাদের সাথে রঙিনও গেছে ভেতরে। ওদিকে অরুণাভ স্ত্রীর হাতে কেকের প্যাকেট তুলে দিয়ে বাইরের দরজার দিকে তাকায়। তার ভাব দেখে মনে হয় আরও কেউ আছে বাইরে। আর কে এল? মুহূর্তের মধ্যে আশা আর আশঙ্কা মেশানো একটা মিশ্র অনুভূতি হয় বিনীতার মনে। ডাক্তারবাবু নাকি? ... ...

হৃদ গগনের বুকে দণ্ডনীতি খুঁজে নেয় মানে। অশ্রুহীন বিচারক অনিকেত হন সবখানে! বেঁচে থাক সুখে থাক যাপিত এ হর্ষ বিষাদ। ছোট ছোট চুপ কথা,অযাচিত দায়িত্বের স্বাদ! ... ...


২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ঝাড়গ্রাম থেকে ফেরার সময় ভাবছিলাম, এই প্রান্তিক জেলার সব মানুষের সমস্যা বা চাহিদাই কি আজ স্রেফ ব্যক্তিগত? যৌথ চাহিদা কিছু নেই? আমাদের সমস্যা বলে কি আর কিছুই নেই? যদি সত্যিই তাই হয়, তবে কিষেণজির মৃত্যুতেই কি শেষ এ রাজ্যে মাওয়িস্ট আন্দোলন? জানি না এই প্রশ্নের উত্তর মাওয়িস্ট শীর্ষ নেতৃত্ব জানেন কিনা। তবে নিশ্চিত জানি, এই প্রশ্নের উত্তর জানে একজন। সে ময়ূরঝর্ণা গ্রামের ধর্মাল মান্ডি। ... ...

সিঁড়ি দিয়ে উঠে ছাদের দরজা খুলল সে, বাইরে এল। ঠান্ডা রয়েছে ভাল, চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে নিল। আকাশ ঘন নীল, পূর্ব দিকে আলো ফুটছে, আশেপাশের গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে তারাও বিনীতার চাদর গায়ে দিয়েছে, তবে তাদের চাদরগুলো কুয়াশা দিয়ে তৈরি। সেই চাদরের আড়াল থেকে পাখি ডাকছে নানা রকম, শহর থেকে দূরে হওয়ায় অনেক পাখির ডাক শোনা যায় এখানে - বুলবুল, ছাতারে, সাতভাই, মাঝে মাঝে কাঠঠোকরাও আসে দু-একটা। দরজার পাশে একটা লাল সিমেন্টের বেঞ্চ আছে দেওয়ালের গায়ে। কয়েকটা উড়ে আসা শুকনো শিরিষ আর শাল পাতা পড়ে আছে তার ওপর, ছাদেও। কয়েক পা হেঁটে প্যারাপেটের কাছে গিয়ে নিচে বাগানটা দেখল। টেবিল-চেয়ার রাখার জায়গা তৈরি হয়েছে, নতুন কিছু গাছও লেগেছে। ছাদের ধার থেকে ফিরে শুকনো শাল পাতার পাশে বেঞ্চের ওপর বসে পড়ল বিনীতা, পাতাটা হাতে তুলে ধরল, শিশির লেগে আছে তার গায়ে। রোদ উঠে গেলে শিশির আর থাকবে না। শিশির ভেজা শুকনো পাতাটাকে পাশে রেখে দিল সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বড় একটা শ্বাস নিল। ... ...

অষ্টমশ্রেণীতে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুরু হল অঙ্ক নিয়ে। সপ্তম পর্যন্ত পাটীগণিত নিজে নিজেই পারতাম। পঞ্চম আর ষষ্ঠশ্রেণীতে দাদু যা শিখিয়েছিল তাতেই হয়ে যেত। খুব সামান্য কিছু কখনও হয়ত দাদুকে জিগ্যেস করতাম, সেও নিজে তো জানিই একবার দাদুকে বলে নেওয়া। বীজগণিত শুরু হয়েছিল সপ্তম শ্রেণীতে, সে শুরুর দিকে অসুবিধে হলেও মোটামুটি পেরে গেছি। দাদু বীজগণিত দেখাতে চাইত না, আর হাফ ইয়ার্লির আগেই ছোটমামার বিয়ের দিনে দাদু সেই যে পড়ে গেল, আর তো কোন অঙ্কই দেখাতে পারল না। কিন্তু এখন তো বীজগণিত বেশ কঠিন লাগে, এমনকি পাটীগণিতেও মাঝে মাঝেই আটকে যাই। অঞ্জলীদি কতগুলো বাড়ীর কাজ দিয়ে রাখেন, না করে নিয়ে গেলে খুব বকেন তো বটেই, মা'কে বলেও দেন। মা ভাবে আমি মন দিয়ে করার চেষ্টা করি না, কখনও ঠাঁই ঠাঁই করে দুটো থাপ্পড় দেয়, কখনও আমার দ্বারা যে কিস্যু হবে না সেটুকু বলে নিজের কপালের দোষ দেয়। একদিন ভয়ে ভয়ে বড়মামার কাছে নিয়ে গেলাম অঙ্কের বই আর খাতা। বড়মামা খানিকক্ষণ দেখে করেও দিল অঙ্কটা, খানিকটা বুঝিয়েও দিল। তাতে বাকী অধ্যায়টা নিজে নিজেই করে ফেলতে পারলাম। সেই থেকে মাঝে মাঝেই অঙ্ক নিয়ে যেতে লাগলাম বড়মামার কাছে। বড়মামাকে এমনিতে আমার একটু ভয় ভয় লাগে, খুব একটা বেশী কথা বলে না। কোনোকারণে বড়মামার ভুরুদুটো প্রায় সবসময়ই অল্প কুঁচকে থাকে। বড়্মামা ওঠে খুব ভোরে, প্রায় দিদার সঙ্গে সঙ্গেই। সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে বেরিয়ে যায়, হেঁটে হেঁটে আটটার আগেই পৌঁছে যায় রিষড়ার অ্যালকালি। অ্যালকালির ভোঁ আমাদের বাড়ী থেকে শোনা যায় না, বেশ অনেকটা দূর। বেলা দশটা নাগাদ টিফিনওলা, একটা রোগা ছেলে সাইকেলের দুইদিকে অনেকগুলো টিফিন ক্যারিয়ার ঝুলিয়ে এসে দাঁড়ায়। বড়মাইমা কিম্বা দিদা গিয়ে একটা ভাত, ডাল, মাছের ঝোল ভরা হিন্ডালিয়ামের তিনথাক টিফিন ক্যারিয়ার দেয় তাকে, সে শোঁও করে সাইকেল বেঁকিয়ে চলে যায়। একটা দেড়টা নাগাদ এসে খালি টিফিনকারিটা ফেরত দিয়ে যায়। কোনও একটা বাড়ীর টিফিনকারি থাকে ওর কাছে, যার মাঝখানের আর ওপরের বাটিদুটো টোল খাওয়া, ওপরের বাটিটার টোলের পাশে কালো কালো দানা দানা মত, দেখে কেমন বিশ্রী লাগে। আরেকটা টিফিনকারি আছে তামার তৈরী বোধহয়, টাট, কোশাকুশির মত ঝলমল করে। বাটিগুলো একটু ছোট, ফলে পুরো টিফিনকারিটাই অন্যগুলোর থেকে কম লম্বা। আমার খুব পছন্দ ওটা, যতক্ষণ টিফিনওলা অপেক্ষা করে, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি। ... ...